Tuesday, October 14, 2025

নেতানিয়াহু রাজি হলেও ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে নানা শঙ্কা

রয়টার্সের বিশ্লেষণঃ গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় দ্বিমত থাকলেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে চুক্তিতে রাজি করিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে সেই চুক্তিতে নেতানিয়াহু স্থির থাকবেন কিনা তা নিয়ে এখনও সংশয় রয়ে গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, স্বঘোষিত শান্তিরবাহক এবং নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রচারণা চালানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট সোমবার মিশরে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যকার চুক্তিতে সই করেছেন। যা তার কূটনৈতিক বিজয় বিজয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষক এবং কূটনীতিকরা বলছেন, এই শান্তি টেকসই করতে হলে ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বজায় রাখতে হবে। কেননা শান্তি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নে তার প্রয়োজন হবে।

বিল ক্লিনটন থেকে জো বাইডেন- যুক্তরাষ্ট্রের বহু প্রেসিডেন্টই নেতানিয়াহুকে নিয়ে বেশ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনও ইসরাইলের বেশ কিছু সামরিক পদক্ষেপে হতাশ হয়েছেন। যা মার্কিন নীতিকে দুর্বলভাবে চিত্রিত করেছে বলে মনে করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে চলতি মাসে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে তার বৃহত্তর শান্তি চুক্তির পরিকল্পনা মেনে নিতে বাধ্য করেন। একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোকেও হামাসকে বোঝানোর জন্য রাজি করান, যাতে তারা ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তি দেয়। এই জিম্মিরাই ছিল হামাসের দর কষাকষির প্রধান এবং একমাত্র হাতিয়ার।

প্রাথমিক ধাপ হিসেবে জীবিত জিম্মিদের মুক্তি দেয়া হলেও এখন থেকে পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কেননা ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক নিয়ে এখনও বেশ কিছু মতপার্থক্য রয়ে গেছে। তার ২০-দফা পরিকল্পনার বহু দিক নিয়ে এখনও ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান। আগামী বছর ইসরাইলের নির্বাচনকে সামনে রেখে, নেতানিয়াহু তার ডানপন্থী জোটকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করায় তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হতে পারে। হামাসের সঙ্গে চুক্তি করায় নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করেছেন তার প্রভাবশালী জোট মিত্র ইতামার বেন-গভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচ। প্রতিবাদ হিসেবে সরকার ছাড়ার হুমকিও দিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী বেন-গভির।

ইসরাইলি বিদেশ নীতি বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক মিটভিমের সভাপতি নিমরোড গোরেন বলেন, আমরা একটি রাজনৈতিক বছরে প্রবেশ করছি যেখানে সবকিছু প্রচারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন নেতানিয়াহুর হিসাব-নিকাশ চাপের মুখে নতি স্বীকার করা থেকে রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিশ্চিত করার দিকেও ঝুঁকে যেতে পারে। কূটনীতিক এবং বিশ্লেষকরা বলেছেন, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার শক্তিই তার দুর্বলতা। চুক্তির কেন্দ্রে থাকা নথিতে অনেক কিছুই অস্পষ্ট রয়েছে এবং কোনো পক্ষই প্রতিটি শর্তের সূক্ষ্ম বিষয়গুলোতে একমত হয়নি। এই অস্পষ্টতা উভয় পক্ষকে সই করতে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এর অর্থ হলো সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক কাজ এখন শুরু হচ্ছে।

ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার সম্ভাব্য একটি সমস্যা হলো, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনে তাদের কোনো ভূমিকা না থাকার চুক্তি। হামাস যদিও ট্রাম্পের পরিকল্পনায় সাধারণভাবে সম্মত হয়েছে কিন্তু দলটির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় সেই নির্দিষ্ট শর্তগুলোর কোনো উল্লেখ নেই। হামাস নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা শাসনে তারা নিজেদের ভূমিকা দেখেন। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা জন অল্টারম্যান বলেন, এটি যে কোনো উপায়ে বিগড়ে যেতে পারে। এত কিছু পরে কাজ করার জন্য বাকি রাখা একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির কথা মনে করা কঠিন। ওয়াশিংটনে ইসরাইলি দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ট্রাম্প অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসরাইলকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করার মাধ্যমেই নেতানিয়াহুর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন। প্রথম মেয়াদে ইসরাইলের বহুল কাক্সিক্ষত জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী এবং বিতর্কিত গোলান মালভূমিকে দেশটির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরাইলের সঙ্গে যা করেছেন তা হলো তিনি মধ্যপন্থা না। তিনি মূলত শতভাগই ইসরাইলের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন। এ কারণেই তিনি তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

১৯৯০-এর দশকে নেতানিয়াহুর হয়ে কাজ করা ইসরাইলি পোলস্টার মিচেল বারাক বলেছেন, যতদিন ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আছেন ততদিন নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।

এদিকে নেতানিয়াহুর ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের মিশ্র রেকর্ড রয়েছে। জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র নতুন সিরিয়ান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করার ওপর জোর দেওয়া সত্ত্বেও ইসরাইল দামেস্কে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে বোমা হামলা চালায়। ইউরোপীয় এবং আরব মিত্রদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মানবিক উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট গাজায় কয়েক মাস ধরে নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পের সে নীতি পরিবর্তন হয়েছে। সেপ্টেম্বরে কাতারে হামাসের মধ্যস্থতাকারীদের লক্ষ্য করে একটি ব্যর্থ বোমা হামলার পর তিনি নেতানিয়াহুকে কাতারের নেতাকে ফোন করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন। শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি নেতার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে তার ২০-দফা পরিকল্পনায় সই করতে চাপ দেন।

এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ অল্টারম্যান বলেন, ইসরাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তার কারণে ট্রাম্প সম্ভবত নেতানিয়াহুর ওপর প্রভাব খাটাতে পারেন। অল্টারম্যান বলেন, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তিনি নেতানিয়াহুর চেয়ে ইসরাইলে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় এবং তিনি হয় নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে সমর্থন করতে পারেন অথবা নাকচ করতে পারেন। সোমবার ইসরাইলি পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প কৌতুক করে ইসরাইলি নেতাকে এমনভাবে খোঁচা দেন যা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি নেতানিয়াহুকে বিশেষ খাতির করার প্রয়োজন মনে করেন না। ট্রাম্প হাসতে হাসতে বলেন, ঠিক আছে এখন আপনি একটু ভালো হতে পারেন, বিবি, কারণ আপনার আর যুদ্ধে নেই। কিন্তু আগামী বছরের নির্বাচন এমনভাবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে যা অনুমান করা কঠিন।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে হামাসের নিরস্ত্রীকরণে গড়িমসি করলে জোটের ডানপন্থী অংশগুলো নেতানিয়াহুর ওপর গাজায় সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার জন্য চাপ দিতে পারে, যা কার্যকরভাবে ট্রাম্পের চুক্তিকে বাতিল করে দেবে। স্মোট্রিচের অতি-জাতীয়তাবাদী রিলিজিয়াস জায়নিজম পার্টির সদস্য সিমচা রথম্যান সোমবার রয়টার্সকে বলেন, আমরা এই বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন যে হামাস আজও গাজায় ক্ষমতায় থাকবে বলে ঘোষণা করছে। হামাসের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া আমরা কোনো চুক্তি নিয়ে খুশি নই। আমরা কোনো আংশিক বিজয় মেনে নেব না।

আরেকটি বিষয়ে বিরোধ হতে পারে। ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার একটি পয়েন্ট ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা স্বীকার করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর ইসরাইলিরা হয়ত ওই পরিকল্পনা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাবে। ইসরাইলে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরো বলেন, যদি সরকার এবং বিরোধী রাজনীতিবিদরা ব্যাপকভাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে প্রচার চালায়, তাহলে ট্রাম্পের চুক্তির অধীনে হামাসকে তার বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য চাপ দিতে আরব দেশগুলোর আগ্রহ কমে যেতে পারে। শাপিরো বলেন, আরব রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন পেতে এই অন্তর্ভুক্ত ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাজনৈতিক আলোচনা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে আমি মনে করি তা আরব পক্ষগুলোর তাদের ভূমিকা পালনে উৎসাহকে প্রভাবিত করতে পারে। 

https://mzamin.com/uploads/news/main/184662_Kaium-1.webp

মুক্তি পাওয়া ১৫৪ ফিলিস্তিনি বন্দীকে জোর করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের সঙ্গে বন্দী বিনিময় চুক্তির অধীনে মুক্তি পাওয়া অনেক ফিলিস্তিনি বন্দীর পরিবার বলছে, বহু প্রতীক্ষিত এই মুক্তি তাঁদের জন্য একই সঙ্গে আনন্দ ও কষ্টের। কারণ, তাঁরা জানতে পেরেছেন, তাঁদের প্রিয়জনদের তৃতীয় কোনো দেশে নির্বাসিত করা হবে।

ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, আজ সোমবার বন্দী বিনিময়ের অংশ হিসেবে মুক্তি পাওয়া অন্তত ১৫৪ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে ইসরায়েল নির্বাসনে যেতে বাধ্য করবে।

যাঁদের নির্বাসিত করা হচ্ছে, তাঁরা ইসরায়েলের মুক্তি দেওয়া ফিলিস্তিনের বৃহত্তর একটি দলের অংশ। এঁদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ২৫০ এবং গত দুই বছরে গাজা থেকে আটক প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি। জাতিসংঘের মতে, এঁদের মধ্যে অনেককে ‘গুম’ করা হয়েছিল।

গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী আজ সোমবার ২০ জন ইসরায়েলি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে।

মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিদের কোথায় পাঠানো হবে, সে সম্পর্কে ইসরায়েল এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তবে গত জানুয়ারিতে বন্দী মুক্তির সময় কয়েক ডজন বন্দীকে এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ যেমন তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও তুরস্কে নির্বাসিত করা হয়েছিল।

পর্যবেক্ষকেরা বলেছেন, এই জোরপূর্বক নির্বাসন মুক্তি পাওয়া বন্দীদের নাগরিকত্বের অধিকারকে লঙ্ঘন করছে। এটি বন্দী বিনিময় চুক্তির ক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতির প্রমাণ।  
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের পাবলিক পলিসির সহযোগী অধ্যাপক তামার কারমুত আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ যে অবৈধ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’

কারমুত বলেন, ‘এটি অবৈধ, কারণ তাঁরা ফিলিস্তিনের নাগরিক। তাঁদের অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব নেই। তাঁদের একটি ছোট কারাগার থেকে বের করে একটি বড় কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। তাঁদের নিজেদের সমাজ থেকে দূরে, নতুন এমন সব দেশে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে তাঁদের কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হবে। এটি অমানবিক।’

পরিবারগুলো হতবাক

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলার সময় ফিলিস্তিনি বন্দী মুহাম্মদ ইমরানের আত্মীয়রা বলেছেন, তিনি নির্বাসিত ব্যক্তিদের তালিকায় আছেন জেনে তাঁরা হতবাক হয়েছেন।

রায়েদ ইমরান জানান, এর আগে ইসরায়েলি এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাঁদের ফোন করে নিশ্চিত করেছিলেন, তাঁর ৪৩ বছর বয়সী ভাই মোহাম্মদ ইমরানকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং মুক্তির পর তিনি কোথায় থাকবেন, তা জানতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু আজ সোমবার পরিবারটি হতাশার খবর জানতে পারে। তাদের জানানো হয়, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার এবং ১৩টি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মুহাম্মদকে নির্বাসিত করা হবে।

রায়েদ ইমরান বলেন, ‘আজকের খবরটি বড় এক ধাক্কা ছিল। তবে আমরা এখনো অপেক্ষা করছি। হয়তো কোনোভাবে আমরা তাঁকে দেখতে পাব। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি মুক্তি পাচ্ছেন, দেশে হোক বা বিদেশে।’

এই নির্বাসনের অর্থ হলো সীমান্তের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের কারণে ইমরানের পরিবার হয়তো বিদেশে গিয়ে কখনো তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারবে না।
অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছেন আল–জাজিরার নিদা ইব্রাহিম। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন অনেক পরিবার দেখতে পাচ্ছি, যারা তাদের প্রিয়জনদের ফিলিস্তিন থেকে নির্বাসিত হতে দেখতে পারে। বন্দিত্ব থেকে মুক্ত স্বজনের সঙ্গে দেখা করার কোনো উপায় থাকবে না।’

‘ইসরায়েলের জন্য দুদিকেই লাভ’

কারমুতের মতে, এই নির্বাসনের উদ্দেশ্য হলো হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীকে এই বন্দী বিনিময় থেকে কোনো ধরনের প্রতীকী বিজয় দাবি করা থেকে বঞ্চিত করা। আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাসিত বন্দীদের যেকোনো রাজনৈতিক বা অন্যান্য কার্যকলাপ থেকে দূরে রাখা।

কারমুত বলেন, ‘নির্বাসনের অর্থ ওই সব বন্দীর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইতি ঘটা। তাঁরা যেসব দেশে যাবেন, সেখানে তাঁদের কঠোর সীমিত চলাচলের মধ্যে থাকতে হবে। তাই তাঁরা কোনো ক্ষেত্রেই সক্রিয় হতে পারবেন না।’

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, এই নির্বাসন মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের জন্য জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং তাঁদের পরিবারের জন্যও একটা শাস্তি। কারণ, পরিবারগুলো হয় তাদের নির্বাসিত প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে অথবা ইসরায়েল অনুমতি দিলে তাদের সঙ্গে দেখা করতে নিজেদের মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য হতে হবে।

সহযোগী অধ্যাপক তামার কারমুত বলেন, ‘এটা ইসরায়েলের জন্য দুদিকেই লাভ’। মুক্তিপ্রাপ্ত ইসরায়েলি বন্দীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করুন। তাঁরা আবার ইসরায়েলে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবেন।

তামার কারমুত আরও বলেন, এটা দ্বিমুখী নীতি এবং ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্ত ফিলিস্তিনিদের বাসে করে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি তাঁদের স্বাগত জানান। ১৩ অক্টোবর ২০২৫, খান ইউনিসে নাসের হাসপাতালের বাইরে
ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্ত ফিলিস্তিনিদের বাসে করে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি তাঁদের স্বাগত জানান। ১৩ অক্টোবর ২০২৫, খান ইউনিসে নাসের হাসপাতালের বাইরে। ছবি: এএফপি

বিতর্কের পর নারী সাংবাদিকদের সামনের সারিতে বসিয়ে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন তালেবান মন্ত্রীর

কথায় আছে—ছবি যেন হাজারো কথা বলে। দিল্লিতে তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে নারী সাংবাদিকদের সামনের সারিতে বসে থাকার ছবি তারই একটি উদাহরণ। শুক্রবার আফগান দূতাবাসে আমির খান মুত্তাকির প্রথম বৈঠকে নারী সাংবাদিকদের ঢুকতে বাধা দেয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর এই সম্মেলনটি ডাকা হয়। প্রায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এটি ছিল আফগান দূতাবাসে আমির খান মুত্তাকির দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলন।

রোববারের সম্মেলন প্রসঙ্গে মুত্তাকি বলেছেন, ‘‘নারী সাংবাদিকদের বাদ দেয়ার বিষয়টি ‘ইচ্ছাকৃত নয়’। স্বল্প সময়ের নোটিশে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সাংবাদিকদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যে তালিকাটি উপস্থাপন করা হয়েছিল তা খুবই সুনির্দিষ্ট ছিল। আরও একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা ছিল... আমাদের সহকর্মীরা সাংবাদিকদের একটি নির্দিষ্ট তালিকায় আমন্ত্রণ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং এর পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।’

জাতিসংঘ আফগানিস্তানের পরিস্থিতিকে ‘লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবৈষম্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছে যেখানে নারী ও মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, পার্ক বা জিমে যাওয়ার অনুমতি নেই। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখার পাশাপাশি মেয়েদের কাজ করার অনুমতি ক্রমশ সীমিত করা হচ্ছে এবং তাদের চলাফেরায় একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসা তালেবান সরকার পূর্বে বলেছে যে তারা আফগান সংস্কৃতি এবং ইসলামী আইনের ব্যাখ্যা অনুসারে নারীর অধিকারকে সম্মান করে, কিন্তু পশ্চিমা কূটনীতিকরা বলেছেন যে নারীর ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের স্বীকৃতি অর্জনের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাদের শাসনামলে নারীর অধিকারকে দমন করা হয়েছে। মুত্তাকি বৃহস্পতিবার ভারতে পৌঁছেছেন। দিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের শাসকদের স্বীকৃতি দেয়নি, তবে এটি এমন অনেক দেশের মধ্যে একটি যারা তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক বা অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এমনকি কাবুলে একটি ছোট মিশনও চালু রেখেছে যার মাধ্যমে সেখানে মানবিক সহায়তা পাঠানো হয়। এই সফরকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।  

মুত্তাকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দেখা করেন। জয়শঙ্কর পর ঘোষণা করেন যে ভারত কাবুলে তার দূতাবাস পুনরায় চালু করবে, যা ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দিল্লিতে শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে প্রায় ১৬ জন পুরুষ সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন, যেখানে নারী সাংবাদিকদের দূতাবাসের গেট থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তালেবান সরকারের একটি সূত্র স্বীকার করে যে নারী সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

সমালোচনার মুখে পড়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানায় যে, এই সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না। কারণ এটি আফগান দূতাবাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় মাটিতে লিঙ্গ বৈষম্য সাংবাদিকদের ক্ষুব্ধ করেছিল, এটি ঘটতে দেওয়ার জন্য মোদি সরকার সমালোচনার মুখে পড়ে।

বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে বলতে শোনা যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের প্রতিটি নারী বলছেন যে আপনি তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য এত দুর্বল।’

এডিটরস গিল্ড অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান উইমেন্স প্রেস কর্পস (আইডব্লিউপিসি) এবং নেটওয়ার্ক অফ উইমেন ইন মিডিয়া, ইন্ডিয়া (এনডব্লিউএমআই) কঠোর বিবৃতি জারি করে এই ধরনের আচরণকে ‘অত্যন্ত বৈষম্যমূলক’ বলে উল্লেখ করে। এনডব্লিউএমআই বলে যে, ভারত সরকারের দায়িত্ব নারীদের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সাংবিধানিক স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা। তাদের এই ধরনের প্রকাশ্যে লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত ছিল।

শুক্রবারের সম্মেলনে যোগদানকারী পুরুষ সাংবাদিকদেরও তাদের নারী সহকর্মীদের পাশে না দাঁড়ানোর জন্য সমালোচনা করে দলটি। বিতর্কের পর রোববার তালেবান পক্ষ থেকে নতুন করে আমন্ত্রণ পাঠানো হয় এবং জানানো হয়, এবার ‘সব সাংবাদিকের জন্য উন্মুক্ত’ সম্মেলন হবে। যদিও সরকারি ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি, তবু ধারণা করা হচ্ছে—ভারত সরকারের চাপেই এই দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে নারী সাংবাদিকেরা কঠিন প্রশ্ন তুলেছিলেন আফগান নারীদের অধিকার ও শিক্ষার বিষয়ে।

জবাবে মুত্তাকি বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যার মধ্যে ২৮ লাখের বেশি নারী ও মেয়ে। মাদ্রাসায়ও স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ আছে। কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, তবে আমরা কখনও বলিনি নারীদের শিক্ষা শরিয়াহ অনুযায়ী হারাম, এটি শুধু সাময়িকভাবে স্থগিত।’ সূত্র: বিবিসি

https://mzamin.com/uploads/news/main/184656_Untitled-23.webp

ফুরিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের মজুত by মহিউদ্দিন

দেশে গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন কমছে ধারাবাহিকভাবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান না পেলে এবং নতুন খনি থেকে উত্তোলন শুরু না হলে আগামী আট বছরেই দেশীয় মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দিনে ১৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়। ২০১৭ সালে তা ছিল ২৭০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে। অর্থাৎ দেশীয় গ্যাসের উত্তোলন ৩৩ শতাংশ কমেছে।

দেশের খনি থেকে উৎপাদন কমে গেলে গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা বাড়ে। সে জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। ফলে চাপ বাড়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভে।

২০১৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস আমদানি শুরু করে। এখন যে ডলারের দাম বেড়ে ১২৩ টাকা হয়েছে, সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, তার পেছনে বড় একটি কারণ গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা। আমদানি করতে গিয়েই রিজার্ভ কমেছে। ডলারের দাম বেড়েছে। সঙ্গে দফায় দফায় গ্যাসের দাম বাড়াতে হয়েছে।

এর মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ভোজ্যতেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, রান্নার প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং তার ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এতটা বাড়ত না, যদি দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রয়োজনীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত।

দেশীয় গ্যাসের প্রতি ইউনিট (ঘনমিটার) দাম পড়ে তিন টাকার আশপাশে। আর বিদেশ থেকে আমদানিতে খরচ ৫৫ টাকার মতো। তা–ও এখন গ্যাসের দাম কম বলে খরচ কম পড়ছে।

অর্থনীতিবিদ ও শিল্পমালিকেরা বলছেন, বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কারোপের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ও বিনিয়োগে একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনা ধরার ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং তা সাশ্রয়ী দামে। সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।

সরকারও সেটা বোঝে। এ জন্য দেশে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশীয় গ্যাসের মজুত বিবেচনায় তিনটি কৌশল নেওয়া হয়েছে—কূপ খনন করে উৎপাদন বাড়ানো, দেশে গ্যাসের নতুন মজুত আবিষ্কারে স্থলে ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে স্থলভাগে একটি টার্মিনাল নির্মাণ করা। পাশাপাশি গ্যাস চুরি ও অপচয় রোধ করে গ্যাসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

মজুত কতটা আছে

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দেশে গ্যাসের মজুত নিয়ে সর্বশেষ সমীক্ষা চালানো হয় ২০১০ সালে। ওই সময় বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে মজুতের হিসাব করা হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ২৮ দশমিক ৭৯ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন বা লাখ কোটি ঘনফুট)। ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ২০ দশমিক ৩৩ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়ে যায়। এতে মজুত বাকি থাকে সাড়ে ৮ টিসিএফের মতো।

২০২৩ সালে পেট্রোবাংলা গ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলোকে দিয়ে মজুত কত আছে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করায়। এতে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মজুত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ টিসিএফ। অবশ্য সে পর্যন্ত উৎপাদন করা হয়েছে প্রায় ২২ টিসিএফ গ্যাস। ফলে মজুত রয়েছে ৮ টিসিএফের মতো।

দেশে এখন বছরে গড়ে গ্যাস উৎপাদন করা হয় পৌনে এক টিসিএফ গ্যাস। এ হিসাবে মজুত গ্যাস দিয়ে আরও বর্তমান হারে প্রায় ১১ বছর উৎপাদন চলার কথা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খনিতে শেষ দিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্যাস রেখে উত্তোলন বন্ধ করে দিতে হয়। কারণ, সেই গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য থাকে না, কিন্তু মজুতের হিসাবে ধরা হয়। বিশেষজ্ঞরা এসব বিবেচনায় নিয়ে মজুত গ্যাস দিয়ে আর আট বছরের মতো চলতে পারে বলে প্রাক্কলন করছেন, তা–ও বর্তমান হারে উত্তোলন ধরে।

কোন খনিতে কত মজুত

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদনে আছে ২০টি। বাকিগুলোর মধ্যে চারটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা হলেও উত্তোলন করা হচ্ছে না। সেগুলো হলো ভোলার ইলিশা ও ভোলা নর্থ, সিলেটের জকিগঞ্জ এবং কুতুবদিয়া। এসব খনি থেকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য পাইপলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি হয়নি।

বাকি পাঁচটি খনিতে ৬৬১ বিসিএফ গ্যাস থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময় উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, ওই গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য নয়। খনিগুলো হলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, সিলেটের ছাতক, গাজীপুরের কামতা, ফেনী ও সাংগু (চট্টগ্রাম)।

২০২৪ সালের ১ জুলাইয়ের হিসাবে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাসে অবশিষ্ট মজুত আছে প্রায় ২ টিসিএফ। হবিগঞ্জের বিবিয়ানায় আছে ১ দশমিক ৬৬ টিসিএফ। সিলেটের মৌলভীবাজারে আছে প্রায় ২০ বিসিএফ (বিলিয়ন বা শতকোটি ঘনফুট) গ্যাস। ৭০০ বিসিএফের কম মজুত আছে জালালাবাদে। সিলেটের বাখরাবাদ, কৈলাসটিলা, রশিদপুরসহ বাকি গ্যাসগুলোতেও মোটামুটি পরিমাণে গ্যাসের মজুত আছে।

আমদানিতে ঝোঁক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস অনুসন্ধান বাদ দিয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। তখন কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়, যেখানে জাহাজে করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এনে তা আবার রূপান্তর করে পাইপলাইনে দেওয়া হয়।

২০১৮ সালে শুরু হয় গ্যাস আমদানি। তখন বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কম ছিল, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত যথেষ্ট ছিল। কিন্তু অনেকে তখনই সতর্ক করে বলেছিলেন, বিদেশে দাম বেড়ে গেলে অর্থনীতি সংকটে পড়তে পারে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রতি এমএমবিটিইউ (ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) গ্যাস কিনেছিল ৪ ডলার ধরে। ২০২২ সালে তা দাঁড়ায় ৬০ ডলার। গ্যাসের সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে আমদানি খরচ বেড়ে যায়। কমে যায় ডলারের মজুত, বাড়তে থাকে দাম। ডলার–সংকটে ২০২২ সালে টানা ৭ মাস খোলাবাজার থেকে গ্যাস আমদানি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বিগত সরকার বিপুল দেনাও তৈরি করেছিল, যা বর্তমান সরকার শোধ করেছে। এখন অবশ্য এলএনজির দাম বিশ্ববাজারে ১৫ ডলারের নিচে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, আগের সরকারের ভ্রান্ত নীতি ও পরিকল্পনার জেরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে। তবে এ সরকারেরও অনুসন্ধানের চেয়ে এলএনজি আমদানির দিকে ঝোঁকটা বেশি দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমায় বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ নেই। অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব সবার জানা। এখন দরকার বিকল্প সমাধানের উদ্যোগ।

কূপ খননের উদ্যোগ

চাপে পড়ে ২০২২ সালেই আওয়ামী লীগ সরকার দেশে উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। পেট্রোবাংলা বলছে, তখন অনুসন্ধান, সংস্কার ও উন্নয়ন মিলিয়ে ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তা করা গেলে জাতীয় গ্রিডে দিনে প্রায় ৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার কথা। যদিও এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কূপ খননে জোর দিয়েছে। নতুন করে আরও ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে অগ্রাধিকার বিবেচনায় ৩১টি পুরোনো কূপ সংস্কারে জোর দিয়েছে সরকার। সংস্কার করলে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকে।

সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রে কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাস আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়। পাওয়া গেলে কূপের মাধ্যমেই উত্তোলন শুরু হয়।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ে ফল পাওয়া কঠিন। গ্যাস উৎপাদনে অধিকাংশ কূপের চুক্তি হয়ে গেছে। বেশ কিছু কূপের কাজ শেষ পর্যায়ে। আগামী নভেম্বর থেকে প্রতি মাসেই নতুন কিছু গ্যাস যুক্ত হবে। এ ছাড়া আগামী বছর থেকে আরও ১০০ কূপ খননের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, এখন সংস্কার, উন্নয়ন ও নতুন খনন মিলিয়ে ৫০টি কূপের প্রকল্প চলমান আছে। সব মিলিয়ে আগামী দুই থেকে তিন বছরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নতুন গ্যাসক্ষেত্রের খোঁজ কত দূর

দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৬২ সালে। সর্বশেষ বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল ১৯৯৮ সালে, সেটি সিলেটের বিবিয়ানা। বিবিয়ানা থেকেই এখন সবচেয়ে বেশি গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। এরপর আর কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ২০২১ সালে সিলেটের জকিগঞ্জে একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। যদিও সেখানে মজুত মাত্র ৫২ বিসিএফ।

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বহুমাত্রিক জরিপেও সে সম্ভাবনা দেখা গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সমুদ্রে গ্যাস আবিষ্কার করা যায়নি। যদিও ভারত ও মিয়ানমার বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল গ্যাস উত্তোলন করছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির (পিএসসি) খসড়া তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে ভারতের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়।

ভূতত্ত্ববিদ বদরূল ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসের জন্য বাংলাদেশ খুবই সম্ভাবনাময়। সম্ভাবনার খুবই ক্ষুদ্র অংশ আবিষ্কৃত হয়েছে। একটা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে আরেকটা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। নীতিনির্ধারকেরা এটি করতে চান না। কোনো সরকার অনুসন্ধানে জোর দেয় না। তিনি বলেন, ব্যাপক হারে অনুসন্ধান চালাতে হবে। সরকারের উচিত দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া।

‘আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস চাই’

কারখানা চালাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ দরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দরকার গ্যাস। নতুন বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান বাড়বে না, তরুণেরা কাজ পাবে না। ফলে মানুষের জীবিকা ও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অনেকটা নির্ভর করে গ্যাসের ওপর। শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখতে দরকার সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাস।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্পে গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, আমদানি বাড়ানো হবে। তাই দাম বাড়ানো দরকার। কিন্তু দাম বাড়িয়ে আমদানি আর বাড়াতে পারেনি তৎকালীন সরকার। বর্তমান সরকার নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ৩৩ শতাংশ। এখন আমদানি কিছুটা বেড়েছে।

বাংলাদেশ নিট পোশাক রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নিজেদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এখন বড় ইস্যু নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস চাই। এ জন্য আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশে উত্তোলন জরুরি। এ ক্ষেত্রে অনেক আগেই জোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-24%2Fllsi49oa%2F5483bbc2-6798-4d1c-b9d0-1934ee2bfa31.jfif?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

হামাস নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করলেন ট্রাম্প জামাতা ও মার্কিন দূত

মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার গত বুধবার (৮ অক্টোবর) মিসরের শারম আল-শেখে হামাসের শীর্ষ নেতা, বিশেষ করে খালিল আল-হায়ার সঙ্গে বিরল এক বৈঠক করেছেন। ফিলিস্তিনি আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছে, এই বৈঠকই গাজায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি চূড়ান্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

পরদিন বৃহস্পতিবার ইসরায়েল, হামাস ও মিসরের মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তিতে সই করেন। ওই চুক্তির মাধ্যমে গাজায় জাতিগত নিধন বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়।

হামাস নেতাদের শঙ্কা ছিল, জীবিত ২০ জন ইসরায়েলি বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার পর ইসরায়েল আবার গাজায় হামলা শুরু করতে পারে।

সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন দূত উইটকফ এবং কুশনার হামাস নেতাদের সঙ্গে এক বিরল বৈঠক করতে মিসরে উড়ে যান। ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল, চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করা।

মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হামাসের এই বৈঠকের খবর প্রথম প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস। তাঁদের প্রতিবেদনে বলা হয়, উইটকফ কাতার, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের বলেছেন, ট্রাম্প নিজেই এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

গত বুধবার স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা উইটকফের ভিলা (ফোর সিজনস হোটেলে) গিয়ে জানান, গাজায় যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তাঁরা প্রস্তাব দেন, মার্কিন দূতরা যেন সরাসরি হামাস নেতাদের সঙ্গে বসেন।

পরে উইটকফ ও কুশনার আরেকটি ভিলায় যান যেখানে তুরস্ক ও মিসরের গোয়েন্দা প্রধান, কাতারের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং হামাসের চারজন শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে হামাসের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন হায়া। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে দোহায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

প্রায় ৪০ মিনিটের আলোচনায় উইটকফ হামাস নেতাদের বলেন, গাজায় আটক ইসরায়েলি বন্দীরা এখন আর ‘সম্পদ নয়, বরং বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে’। তাই প্রথম ধাপের চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সময় হয়েছে এবং ‘সীমান্তের দুই পাশের মানুষকে ঘরে ফেরানো দরকার।’

হায়া জানতে চান, ট্রাম্পের পক্ষ থেকে হামাসের জন্য কোনো বার্তা আছে কি না। জবাবে উইটকফ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার্তা হলো, আপনাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা হবে। তিনি তাঁর শান্তি পরিকল্পনার ২০টি শর্তের সব মানার পক্ষে আছেন এবং সেগুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন।’

বৈঠক শেষে হামাস নেতারা মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলাদা কক্ষে আলোচনা করেন। কিছুক্ষণ পর মিসরের গোয়েন্দা প্রধান হাসান রাশাদ তুর্কি ও কাতারি কর্মকর্তাদের নিয়ে ফিরে এসে উইটকফ ও কুশনারকে বলেন, ‘আমাদের বৈঠকের ভিত্তিতে চুক্তি হয়ে গেছে।’

ট্রাম্প প্রশাসন ও হামাসের মধ্যে ওই বৈঠক ছিল দ্বিতীয় বড় ধরনের সরাসরি যোগাযোগ। এর আগে গত মার্চে মার্কিন জিম্মি অ্যাডান আলেকসান্ডারকে মুক্ত করতে মার্কিন দূত অ্যাডাম বোয়েলার হামাস নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের (বাঁয়ে) সঙ্গে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, হোয়াইট হাউস
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের (বাঁয়ে) সঙ্গে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, হোয়াইট হাউস। ছবি: রয়টার্স

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতন কত হওয়া দরকার by মো. মাইন উদ্দিন

আপনি ধনী না গরিব, তা শুধু আপনার সম্পদের ওপর নির্ভর করে না, এটা নির্ভর করে আপনার কাছাকাছি যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের সম্পদ কেমন তার ওপর। আপনি হয়তো মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতনে পরমভাবে খুশি থাকবেন। কিন্তু যখনি আপনি দেখবেন, আপনার বন্ধু কিংবা পরিচিতজন আপনার চেয়ে কম যোগ্যতা নিয়ে আপনার থেকে বেশি টাকা বেতন পাচ্ছে, তখন আপনার মাথায় তুলনামূলক চিন্তা ঢুকে যাবে এবং আপনি নিজেকে গরিব ভাবতে শুরু করবেন, এমনকি আপনার চাকরির প্রতিও একধরনের বিরক্তি জন্ম নেবে।

ধরুন, আপনি বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করে সর্বোচ্চ সিজিপিএ নিয়ে পরবর্তী সময়ে ওখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেন। এই যে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেন, আপনার জন্য প্রণোদনা কী? আপনি চাকরিতে কেমন আছেন বা আপনার চাকরির সুযোগ-সুবিধা কেমন, তা জানবেন কীভাবে? প্রথম উপায় হলো আপনার ক্লাসমেটদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা। যারা আপনার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না পেরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা বিসিএস দিয়ে বিভিন্ন ক্যাডারে যোগদান করেছে, তাদের সঙ্গেই আপনি প্রথমে আপনাকে তুলনা করবেন।

চাকরির শুরুতেই এ চিন্তা না এলেও কয়েক বছর পরে আসতে বাধ্য এবং আপনি এ তুলনা করতে গিয়ে প্রথমে বড় একটা ধাক্কা খাবেন। যখন দেখবেন, সরকারি কলেজের শিক্ষকও আপনার সমান বেতন পায়, তখন আপনার মন খারাপ না হয়ে পারবে না। আপনি যখন দেখবেন, যে চাকরিতে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা প্রথম শ্রেণি (যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা) তার সুযোগ-সুবিধা ওই চাকরির (যেমন বিসিএস) থেকে কম, যেখানে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা দ্বিতীয় শ্রেণি।

আবার এই বিসিএস চাকরিতে কিছুদিন আগেও ৫৬ শতাংশ কোটা থেকে আসত, যাদের যোগ্যতা ছিল নিম্নমানের। কিন্তু তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের, যাঁরা বেশির ভাগ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন, চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এ অবস্থায় আপনি কোন বিবেচনায় নির্বিকার থাকবেন? ক্লাসে প্রথম হওয়ার গৌরব নিজের কাছেই আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যাবে।

আপনার মন খারাপের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে চাকরির কয়েক বছর পর। কারণ, এ সময়ের মধ্যে আপনার বিসিএস বন্ধুদের আর্থিক অবস্থা আপনাকে ছাপিয়ে যাবে। দেখবেন, তাদের অনেকেই বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যাচ্ছে সরকারি বড় বড় গাড়িতে চড়ে। কেউ কেউ ইতিমধ্যে আবার ব্যক্তিগত গাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে যাবে। আপনি ভালো করেই জানেন, তাদের এত টাকাপয়সা কোথা থেকে এসেছে। কিন্তু বেশি কিছু বলতে পারবেন না। তাহলে সমাজ ভাববে, আপনি তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত। আপনি তো শিক্ষক, আপনার অত টাকাপয়সা দরকার নেই। শুধু সালাম পেলেই চলবে। ঈর্ষান্বিত হওয়া তো যাবেই না।

আরও মন খারাপ হবে যখন দেখবেন, এ রকম একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে আপনার আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী অপছন্দের পরিবর্তে সমীহ করছে। কোনো অনুষ্ঠানে গেলে দেখবেন, অনেকেই তার জন্য গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। তার অনুপস্থিতি কেমন যেন সবাই অনুভব করছে। দেখবেন, এ রকম দুর্নীতিবাজ লোকের কাছ থেকে অনেকেই নানা রকম সুবিধা নিচ্ছে। বিভিন্ন উৎসবে তার কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়ে দারুণ খুশি হচ্ছে। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা এখন পড়াশোনা করছে, তারা তাকেই আইকন হিসেবে দেখছে এবং ভবিষ্যতে তার মতো হওয়ার স্বপ্ন বুনছে।

একটা সময় ছিল যখন সরকারি চাকরিজীবীরা দুর্নীতি করলেও চাকরিকালে তার প্রকাশ খুব বেশি দেখা যেত না। আবার এত বেশিসংখ্যক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাও ছিল না। গত দেড় দশকে সরকার আমলাদের সুবিধা অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে যে রকম অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা সহ্যের সব সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে। কোনো কোনো ক্যাডারে দুর্নীতি না করা কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় হাতে গোনা। এসব ক্যাডারে চাকরির ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে কর্মকর্তারা অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়ে যায়। এসব অসৎ কর্মকর্তাদের সম্পদের পাহাড় সৎ কর্মকর্তাদের ওপরে একধরনের চাপ তৈরি করে। একই সমাজে বসবাসের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জীবনেও এর প্রভাব এসে পড়ছে।

তুলনীয় চাকরির সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করে, এমন উৎসগুলো যথাসম্ভব কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে। যেমন একজন ডিসির যেহেতু জেলার বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, তাই তার জন্য একটা বড় গাড়ির দরকার হতে পারে। কিন্তু কোন বিবেচনায় অসহনীয় যানজটের এ ঢাকা শহরে আজিমপুর থেকে সচিবালয়ে যেতে একজন কর্মকর্তার জন্য ঢাউস সাইজের একটা গাড়ি বরাদ্দ করতে হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষক যদি একটা মিনিবাসে করে উত্তরা থেকে তাঁদের নিজ নিজ ক্যাম্পাসে আসতে পারেন, তাহলে আমলাদের একই রকম বাসে করে অফিসে যেতে সমস্যা কোথায়? আবার ঢাকা মেডিকেলের একজন ডাক্তারকে যদি সাত দিন আগে রিকুইজিশন দিয়ে একটা গাড়ি পেতে হয়, আর সে রকম যোগ্যতার একই ডাক্তার যখন কোনো বাহিনীতে চাকরি করে দেখেন, তাঁর জন্য দুটি গাড়ি বরাদ্দ থাকে, তাহলে ঢাকা মেডিকেল তাঁর কাছ থেকে ভালো সেবা পাবে না। গাড়িকে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে না দেখে প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করলে বেতন–বৈষম্যের উৎসও কমে যাবে। বড় গাড়ি মানে বেশি মর্যাদা, বেশি ক্ষমতা—এ নিচুতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের জন্য বেতন–বৈষম্য দূর করা জরুরি। সমযোগ্যতার চাকরির ক্ষেত্রে এ বৈষম্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, যা সারা বিশ্বে স্বীকৃত ও কর্মক্ষেত্রে অবদান বিবেচনায় নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের সামগ্রিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানকে বিবেচনায় নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি বুয়েট, মেডিকেলও এ দেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। একইভাবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, টাকাই মানুষের ব্যবহার পরিবর্তনের একমাত্র নিয়ামক নয়। তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। কারণ, টাকার ঘাটতি কোনো কিছু দিয়ে পূরণ করা যায় না। বর্তমান বেতনকাঠামোয় একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পক্ষে সচ্ছল জীবনযাপন সম্ভব নয়। তাই তাঁরা কেউ কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন কোর্স পড়ান। একসময় কেউ কেউ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেও পড়াতেন। একমাত্র আর্থিক কারণেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক চাকরি ছেড়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে যোগদান করেছেন। এ রকম আর্থিক অনটন থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা রকম সান্ধ্যকোর্স চালু হয়েছে, যেখানে অনেক নিম্নমানের শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পায়। কাউকে আর্থিক সংকটে রেখে তার কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না।

একটি ন্যায়ভিত্তিক বেতনকাঠামো নির্ণয়ে আর্থিক ও প্রকৃত মজুরির পার্থক্য বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার যখন আমলাদের গাড়ি–সুবিধা, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, চালকের বেতন ও গৃহকর্মীর ভাতা প্রদান করে, তখন তাঁদের প্রকৃত মজুরি আর্থিক মজুরিকে ব্যাপকভাবে ছাপিয়ে যায়। আবার এই গাড়ি যখন অফিসবহির্ভূত কাজ, যেমন দৈনন্দিন বাজার করা, সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে গমনাগমনে ব্যবহৃত হয়, তখন প্রকৃত মজুরি আরও অনেক বেড়ে যায়। যদি মাসে ভাতাসহ কয়েকটি মিটিং থাকে, তা–ও প্রকৃত মজুরিকে বাড়িয়ে দেয়। অথচ এ রকম জীবনযাপনের জন্য একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে বাড়তি প্রতিটি টাকা অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে আয় করতে হয়।

এ বাড়তি মজুরির সঙ্গে রয়েছে ক্ষমতা অপব্যবহারের সুযোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য কেউ কেউ আমলা হয়েছেন বলে তাঁদের মুখ থেকেই শুনেছি। তবে তাঁরা বেশির ভাগই চাকরি জীবনে সৎ ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল কম।

এ অপশাসনের দেশে ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকলে একদিকে যেমন দুর্নীতি করার সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি সামাজিক ও রাজনৈতিক অনেক হয়রানি থেকেও মুক্ত থাকা যায়। এখন এ ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন ডাক্তার ও প্রকৌশলীরা। দুর্নীতি তো করছেনই। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন ও ক্ষমতার অপব্যবহার কমানো গেলে বিসিএসের কয়েকটি ক্যাডারের প্রতি যে সীমাহীন মোহ, তা কেটে যাবে। এসব ক্যাডার চাকরির বাজারে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে, তা–ও অনেকটা কমে আসবে।

আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে একজন শিক্ষক ও আমলা যখন একই সঙ্গে বাজারে উপস্থিত হন, তাঁদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যেন বড় পার্থক্য না থাকে। পার্থক্যের উৎসগুলো বিবেচনায় নিয়ে বৈষম্য কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রাথমিক উৎস ছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাপদ্ধতি। এখনই সময় সমযোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রকৃত বেতন-বৈষম্য দূর করা। যদি তা করা না হয়, তাহলে এ প্রজন্ম, যারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করে জীবন দিয়েছে, চাকরিতে ঢুকে বিদ্যমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবশ্যই রুখে দাঁড়াবে। নতুন পে কমিশন এসব বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন বলে আশা করছি।

* ড. মো. মাইন উদ্দিন, অধ্যাপক, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়
- (মতামত লেখকের নিজস্ব)

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-23%2Fdxfh1wzw%2Fjjjoo.JPG?rect=0%2C0%2C616%2C411&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif