Wednesday, February 7, 2018

গন্তব্য অনিশ্চিত by সাজেদুল হক

রাজনীতির দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বহুবারই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন বিরোধীনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তবে আজকের মতো পটভূমিতে অতীতে কখনোই নয়। আগামীকাল তার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার দিন ঠিক রয়েছে। কী হবে সে রায়। মূলত এ প্রশ্নের ওপরই নির্ভর করছে বহু কিছু। এরইমধ্যে কারাগারে ধোয়ামোছার খবর বেরিয়েছে গণমাধ্যমে।
গত কয়েকদিনে দলীয় নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন খালেদা জিয়া। মতামত নিয়েছেন তৃণমূল নেতাদের। সাফ বার্তাও দিয়েছেন তাদের। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দলীয় নেতাদের কোনো ধরনের সহিংসতায় না জড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দলীয় প্রধানের সাজা হলেও এখনই যে বিএনপি হার্ডলাইনে যাচ্ছে না সে বার্তাও মোটামুটি স্পষ্ট। যেকোনো মূল্যে ঐক্য ধরে রেখে দলকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করতে চান খালেদা জিয়া।
আগামীকাল কী হবে তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট। রাজপথ দখলে রাখতে সবরকমের প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়েছে শাসক মহলের তরফে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি মাঠে থাকবে আওয়ামী লীগ। ঢাকায় কোথাও বিএনপির নেতাকর্মীদের দাঁড়াতেই দেয়া হবে না। ঢাকার বাইরের চিত্র অবশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। কাল মাঠের চিত্র যাই হোক, রাজনীতি যে ফের এক অনিশ্চিত পথে যাত্রা শুরু করছে তা এখন অনেকটাই নিশ্চিত।
রায় যদি বিরুদ্ধে যায় তবে খালেদা জিয়া কি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন? নানা মুনীর নানা মত। সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনবিদরা বলছেন, আপিল বিভাগে চূড়ান্ত রায় হওয়ার আগ পর্যন্ত নির্বাচনে যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রশ্ন আসবে না। তবে আরো কিছু মতও রয়েছে। কারও কারও মতে, নিম্ন আদালতে সাজা হলেই নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। আবার কারও মতে নিম্ন আদালতের সাজার রায় হাইকোর্টে স্থগিত হলেই কেবল তিনি নির্বাচনের সুযোগ পাবেন।
সে যাই হোক, ২০১৮ নির্বাচনের বছর। নানা নাটকীয়তা যে অপেক্ষা করছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যদিও নিরুত্তাপ রাজনীতিতে উত্তেজনা একটু তাড়াতাড়িই তৈরি হয়েছে। আগেভাগেই হয়তো বিএনপির শক্তি পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে। শক্তি পরীক্ষা আর শক্তি সঞ্চয়ের তত্ত্ব রাজনীতিতে আলোচিত হচ্ছে। যদিও সঞ্চিত শক্তি শেষ পর্যন্ত অনেক সময় কাজে লাগে না। আগামী নির্বাচনের চালচিত্র কেমন হবে? সিইসি নুরুল হুদা এটা কবুল করেছেন যে, বিএনপি ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না। ওবায়দুল কাদের কয়দিন আগে বলেছেন, বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে যেতে চেষ্টা করছে। আর রিজভীর কথা হচ্ছে, সরকার বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়। কার কথা সত্য কে জানে।
আমরা জনগণ, এসব দৃশ্য দেখা ছাড়া আমাদের হয়তো আর কিছু করার নেই। একসময় আমরা একদিনের বাদশাহ ছিলাম এখন তাও নেই। বাড়তি সাবধানতাবশতঃ সিটবেল্ট বেঁধে অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কীইবা করার আছে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান: ফারুক আবদুল্লাহ

ভারত ও পাকিস্তান ক্রমাগত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এমন পূর্বাভাষ দিয়েছেন জম্মু ও কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই প্রেক্ষিতে দু’দেশ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। ফারুক আবদুল্লাহ কড়া সতর্কতা দিয়ে বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই উত্তেজনা উস্কে দিচ্ছে। এর ফলে পরিস্তিতি মানুষের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে।
তিনি প্রতিপক্ষের দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন রাখেনÑ শুধু কি তারাই গুলি করছে? আমরাও তো গুলি করছি। দু’পক্ষই এটা করছে। এর ফলে মানুষের জীবনে ধ্বংস নেমে আসছে। সৃষ্টি হচ্ছে যুদ্ধ পরিস্থিতি। তিনি মনে করেন ভয়াবহ এই সংঘাতের একটিই সমাধান হতে পারে। তাহলো নয়া দিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে আলোচনা। তিনি আরো বলেন, যুদ্ধ কোনো কিছুর সমাধান নয় কোনোদিনও। একমাত্র সমাধান হলো আলোচনা। পাকিস্তান দখলীকৃত কাশ্মীর পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত। বাকি অংশ ভারতে। ভারত সরকার যদি শান্তি চায় তাহলে তাদেরকে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। আর আমাদেরকে দিতে হবে শায়ত্তশাসন। এ খবর দিয়েছে বৃটেনের অনলাইন এক্সপ্রেস। এতে বলা হয়, সম্প্রতি জম্মু অঞ্চলে ভারতীয় পোস্টে পাকিস্তানের ছোড়া গোলা আঘাত করে। এতে ভারতের চারজন সেনা সদস্য নিহত হন। আহত হয়েছেন একজন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এশিয়ার এই দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কে তিক্ততা অব্যাহত রয়েছে।

‘অন্যায় করিনি, ন্যায়বিচার হলে খালাস পাবো’

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আমি অন্যায় করিনি, দুর্নীতি করিনি, ন্যায়বিচার হলে বেকসুর খালাস পাবো।’ আজ বুধবার দলের গুলশানস্থ রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া এ কথা বলেন। আগামীকাল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের দিন সামনে রেখে এ সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ওই মামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মিথ্যা মামলার রায় দেয়া হবে। রায় নিয়ে বেশি শঙ্কিত তারা। সারাদেশে বিভিষীকা তৈরী করেছে। জনগণের আন্দোলন করার সম্ভাবনাকে তারা ভয় পায়।
রায়ের অনেক আগ থেকেই আমার জেল হবে বলে গলা ফাটাচ্ছেন। প্রধান বিচারপতিকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে।
আপনাদের খালেদা জিয়া কোনো অন্যায় করেনি। কোনো দুর্নীতি করি নি। জিয়া অরফানেজের সঙ্গে আমি কখনোই জড়িত ছিলাম না। এই অর্থ সরকারি অর্থ নয়। ভুয়া কাগজপত্র তৈরী করে মিথ্যা মামলায় আমাকে জড়িত করেছে। আমার আইনজীবীরা আদালতে তা প্রমাণ করেছে। জিয়া অরফানেজের টাকা এখনো ব্যাংকে রয়েছে। সুদে আসলে সেই টাকা অনেক বেড়েছে। ন্যায়বিচার হলে আমি খালাস পাবো। যারা এই মামলা দায়ের করেছে তাদের বিরুদ্ধে রায় হওয়া উচিত। যারা মামলার নির্দেশ দিয়েছে তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি যেকোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছি। আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। মাথা নত করবো না। একদলীয় শাসন দীর্ঘায়িত করার খায়েস পূরণ হবে বলে আমি মনে করি না।’
বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, দেশ ও জাতি আজ চরম সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। বারবার গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। তথাকথিত উন্নয়নের নামে দেশে দুঃশাসন চলছে। এই স্বৈরশাসন জণগনকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। মানুষকে ভাতে মারছে। শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করছে।
লুটের রাজত্ব কায়েম করেছে। শেয়ার বাজার এরা লুটে খেয়েছে। অর্থ লোপাট করে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করেছে। সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচার করে পাহাড় গড়েছে। তদন্ত করা হয় না। তদন্ত হলেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দোষীদের বিচার হয় না। লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে সকল প্রতিবাদের পথ এরা বন্ধ করে দিয়েছে। গণতন্ত্রের আজ লক্ষ কর্মী মানবেতর জীবনযাপন করছে। অপহরণ, খুনে ঘরে ঘরে আজ হাহাকার। মানুষ স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারছে না। ভয় ভীতির মাধ্যমে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে প্রহসনের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
বেগম জিয়া আরো বলেন, যারা লগিবৈঠা দিয়ে মানুষ খুনের নির্দেশ দেয়, যারা গান পাউডার দিয়ে মানুষ মারে, আন্দোলনের নামে যারা ব্যাংকে আগুন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আগুন, চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে আগুন, বন্দরে আগুন দিয়েছে তারাই আজ আমাদের নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে। দেশের সব কয়টি প্রতিষ্ঠানেকে ধ্বংস করা হয়েছে। ১০ টাকা ধরে চাল খাওয়ানোর ওয়াদাকে ভয়াবহভাবে ভঙ্গ করা হয়েছে। চালের দাম এখন কেজি ধরে ৬০টাকা বিক্রি হচ্ছে।
দেশের আজ সত্যিকারের সংসদ নেই। নেই বিরোধী দল। শাসকদের কোথাও কোনো জবাবাদিহিতা নেই। সশস্ত্র বাহিনীর সর্ম্পকে বৈরী প্রচারণা ও ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জণগনের বিরুদ্ধে দাড় করানো হয়েছে।
মানুষের কাজ নেই। ব্যবসা নেই।
মাদকের বিষাক্ত ছোবলে তরুণ সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই দু:সহ অবস্থা থেকে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি চায়। তারা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের আশার প্রতিফলন ঘটাতে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম শুরু করেছি। সেই সংগ্রামে অনেক প্রাণ ঝরে গেছে। অগণিত নেতাকর্মী ও মানুষ হামলা, মামলার শিকার হয়েছে।
রক্তপিপাসু শাসকদের কবল থেকে দেশবাসীকে রক্ষার সংগ্রামে নেমেছি। জণগন পরাজিত হবে না। দুঃশাসন একদিন থাকবে না। কিন্তু তারা যে কলংকের ইতিহাস রচনা করেছে তা চিহ্নিত থাকবে। দেশের মানুষ তাদের নির্বাচিত করে নি। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে জণগনের সম্মতি নেই। তাদের নৈতিক শাসন নেই। হুঙ্কার দিলেও তাদের নৈতিক শাসন ও মনোবল নেই। পেশি শক্তি ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে চাই। তাই আমরা আন্দোলন করছি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য। সেই নির্বাচনে সকল দল নির্বাচন করতে পারবে। ভোট সুষ্ঠুভাবে গণণা করে প্রকাশ করা হবে।
আওয়ামী লীগের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না। তারা ক্ষমতায় থেকে, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করতে চায়। কারণ ভোট পাল্টে দিয়ে আবারো ক্ষমতায় থাকতে চায়। যার কারণে আমাদের ওপর হামলা মামলা দিচ্ছে। সরকারি খরচে এক বছর আগ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলনের কারণে আমাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে।
স্বৈরশাসক আইয়ুব খান মামলা করে এই দেশের জনপ্রিয় শাসকদের নির্বাচন থেকে দূরে সরে রেখেছিলো। কিন্তু গণঅভ্যূত্থানে তার পতন হয়েছে।
মঈনউদ্দিন ও ফখরুদ্দিনের সময় আমাকে দেশ ছাড়ার জন্য বলেছিলো। কিন্তু না যাওয়ায় আমার ও সন্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছিলো। এক বছর দুই মাস কারারুদ্ধ করেছিলো। সন্তাদের কারারুদ্ধ করেছিলো।

অ্যাসপিরিন সেবনে ফিরবে যৌন সক্ষমতা! -গবেষণায় তথ্য

যৌন জীবনে অক্ষম পুরুষদের জন্য নতুন একটি আশার বার্তা দিয়েছেন গবেষকরা। তারা বলেছেন, বেদনানাশক অ্যাসপিরিন সেবন করলে যৌবনশক্তি ফিরে পাওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে ১০০ মিলিগ্রামের শুধু একটি পিল খেতে হবে ৬ সপ্তাহ। তাহলেই কেল্লাফতে! এমন আশ্চর্য বিষয় ধরা পড়েছে নতুন এক গবেষণায়। তুরস্কের ইস্তাম্বুল মেডিপোল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক গবেষণা করে এ তথ্য প্রকাশ করেছেন। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন ডেইলি মেইল।
এতে বলা হয়েছে, তুরস্কের ওই গবেষকরা ১৮৪ জন পুরুষের ওপর গবেষণা করেন, যাদের গড় বয়স ৪৮ বছর। এর মধ্যে ১২০ জনকে প্রতিদিন একটি করে অ্যাসপিরিন খেতে দেন। ৬৪ জনকে দেন একটি করে প্লাসিবো। এই ওষুধ সেবনের আগে এই ১৮৪ জন পুরুষের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগই যৌন জীবনে ছিলেন অক্ষম। কিন্তু তাদের ওপর ৬ সপ্তাহ ওই ওষুধ প্রয়োগ করার পর দেখা যায় তাদের সক্ষমতা বেড়ে গেছে শতকরা ৭৫ ভাগ। ইস্তাম্বুল মেডিপোল ইউনিভার্সিটির ‘ইনডেক্স অব ইরেকটাইল ফাংশন’ স্কেল অনুসরণ করে এ সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষণার পরে বলা হচ্ছে যৌন সক্ষমতা বাড়ানোর চিকিৎসায় ভায়াগ্রার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় অ্যাসপিরিন। ভায়াগ্রা শতকরা ৪৮ থেকে ৮১ ভাগের মধ্যে সফলভাবে কাজ করে। সেক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন কাজ করে শতকরা ৫০ ভাগ থেকে ৭৫ ভাগ। এ গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ডা. জেকি বাইরাকতার। তিনি অনেক পুরুষের দেহে প্লেটলেটস থাকে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। এই প্লেটলেটসকে পাতলা করে দিতে পারলেই যৌন অক্ষম ব্যক্তিদের মধ্যে শক্তি ফিরিয়ে দেয়া যায়। তিনি বলেন, পুরুষের দেহে উপস্থিত বিশাল সব প্লেটলেটসের উপস্থিতি সৃষ্টি করে ত্রমবোক্সানে নামে একটি পদার্থ। এর কাজই হলো নানা রকম প্রবাহে প্রতিবন্ধক এজেন্ট হিসেবে কাজ করা। তাদের এ গবেষণায় যে ১২০ জনকে অ্যাসপিরিন ও ৬৪ জনকে প্লাসিবো দেয়া হয়েছিল তাদেরকে ৬ সপ্তাহের গবেষণার সময়ে নিয়মিত দুটি প্রশ্ন করা হতো। তা হলো- তুমি কি কোনো নারী সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষমতা অর্জন করেছো? অন্য প্রশ্নটি হলো- তোমার মধ্যে সক্ষমতার যে সাড়া পাও (ইরেকশন) তা কি যথেষ্ট সময় স্থায়ী হয়, যার ফলে তুমি সফলতা পেতে পারো?
গবেষণায় বলা হয়েছে, সব অংশগ্রহণকারীই একই রকম উত্তর দিতে শুরু করেছিলেন। প্রথম প্রশ্নটির ‘হ্যাঁ’ সুচক উত্তর দিয়েছিলেন প্লাসিবো টিকিৎসা নেয়া শতকরা ৫০ ভাগ পুরুষ। তবে যাদেরকে অ্যাসপিরিন দেয়া হয়েছিল প্রথম প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বলেছেন তাদের শতকরা ৫১.৩ ভাগ। অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে প্রতিটি গ্রুপ থেকে এক তৃতীয়াংশেরও কম মানুষ হ্যাঁ বলেছেন। কিন্তু গবেষণার শেষ প্রান্তে এসে বিস্ময়কর পার্থক্য দেখা গেল তাদের মধ্যে। ৬ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন একটি করে অ্যাসপিরিন সেবনকারীর মধ্যে শতকরা ৮৮.৩ ভাগ পুরুষ প্রথম প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বললেন। তাদের শতকরা ৭৮.৩ ভাগ হ্যাঁ বললেন দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে। তবে যাদেরকে প্লাসিবো দেয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যেও পরিবর্তন দেখা গেছে। তাদেরও সক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু অ্যাসপিরিন সেবনকারীদের চেয়ে তাদের সক্ষমতা অনেক কম। গবেষণা শেষে তাদের  মধ্যে শতকরা ৫৯.৩ ভাগ প্রথম প্রশ্নের উত্তরে হ্যা বলেছেন। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে হ্যা বলেছেন শতকরা ৪৩.৫ ভাগ পুরুষ।
তবে এই গবেষণার উপর ভিত্তি করে বা এই খবর শুনেই কাউকে সরাসরি অ্যাসপিরিন সেবন করে যৌন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক করেছেন কিছু যৌন চিকিৎসক। তারা বলছেন, এই গবেষণায় বিপুল সংখ্যক মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হয় নি। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদযন্ত্রের জটিলতা আছে তাদের জন্য এসব চিকিৎসা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এমন কোনো চিকিৎসা নিতে হলে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

কোন দেশের কত পরমাণু অস্ত্র, আর তা কোথায় রাখা আছে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের 'উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন' করার পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর এর নিন্দা করেছে চীন, রাশিয়া এবং ইরান।
পেন্টাগনের এক নীতি-নির্ধারণী কৌশলপত্রে বলা হয়, আমেরিকা এখন যে পরমাণু বোমা বানাবে তা হবে ছোট আকারের, এবং তা মূলত রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলা করার জন্যই ।
এর কারণ হলো, রাশিয়া মনে করছে মার্কিন পরমাণু বোমাগুলো এত বড় আকারের যে তা আসলে কখনো ব্যবহার করা হবে না, তাই এগুলোকে তারা হুমকি বলে মনে করছে না। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখন ঠিক করেছে তারা নতুন ধরণের এবং ছোট আকারের পারমাণবিক বোমা বানাবে।
এসব ছোট আকারের বোমার ক্ষমতা হবে ২০ কিলোটন বা তার কম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এর ধ্বংসক্ষমতাও প্রচন্ড। ১৯৪৫ সালে জাপানের নাগাসাকিতে যে বোমাটি ফেলা হয়েছিল তার ক্ষমতা ছিল এ রকমই - এবং তাতে ৭০ হাজারেরও বেশি লোক মারা গিয়েছিল।
কিন্তু পৃথিবীতে এই বড় বড় শক্তিধর দেশগুলোর হাতে এখন কত পারমাণবিক বোমা আছে - এবং সেগুলো কোথায় রাখা আছে?তবে গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে ৬ হাজার ৮শ', রাশিয়ার ৭ হাজার, ফ্রান্সের ৩শ', যুক্তরাজ্যের ২১৫, চীনের ২৭০, ভারতের ১৩০, পাকিস্তানের ১৪০, ইসরায়েলের ৮০, আর উত্তর কোরিয়ার আছে ২০টি ।
সব দেশই এসব তথ্যের ব্যাপারে কড়া গোপনীয়তা বজায় রাখে।
তবে যেটুকু জানা যায়, তা হলো - পৃথিবীর মাট ৯টি দেশের হাতে এখন ৯ হাজার পরমাণু বোমা আছে - যদিও স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এ সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে।
পরমাণু বোমাগুলো অনেক ক্ষেত্রে বসানো আছে ক্ষেপণাস্ত্রের মাথায়। তা ছাড়া আছে বিভিন্ন সামরিক বিমান-ঘাঁটিতে বা অস্ত্রের গুদামে।
বিভিন্ন দেশে এখন শত শত পারমাণবিক বোমা বসানো-ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা আছে। আমেরিকান ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বসানো আছে বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, এবং তুরস্কে - সব মিলিয়ে এগুলোর সংখ্যা প্রায় ১৫০।
অন্তত ১৮০০ পরমাণু বোমা আছে যেগুলো খুব স্বল্প সময়ের নোটিশে নিক্ষেপ করা যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব পরমাণু-শক্তিধর দেশই এখন তাদের অস্ত্রগুলোর আধুনিকায়ন করছে, বা করার পরিকল্পনা করছে।
সবচেয়ে বেশি পরমাণু বোমা আছে যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার হাতে।
এ দুটি দেশের হাতে আছে ১৫ হাজার বোমা - তবে এই হিসেবে এমন বোমাও ধরা হয়েছে যেগুলো এখন 'অবসরে' যাচ্ছে অর্থাৎ এগুলো অচিরেই খুলে ফেলা হবে। স্টকহোমের একটি শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, ১৯৮০ দশকে পারমাণবিক বোমা বা ওয়ারহেডের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ হাজার।
পরমাণু অস্ত্র আছে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়ার হাতে। ইসরাইলের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে মনে করা হলেও তারা কখনো একথা স্বীকার বা অস্বীকার কোনটাই করে নি। ভারত, ইসরায়েল আর পাকিস্তান কখনো পরমাণু অস্ত্র-বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে সই করে নি। উত্তর কোরিয়া সই করেও ২০০৩ সালে এ থেকে বেরিয়ে যায়। এই চুক্তি অনুযায়ী স্বীকৃত পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হচ্ছে মাত্র পাঁচটি স্বাক্ষরকারী দেশ - আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ও চীন।
এই চুক্তিতে অস্বীকৃত দেশগুলোর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, বেলারুস, কাজাখস্তান ও ইউক্রেন তাদের পরমাণু কর্মসূচি পরিত্যাগ করেছে।
বলা হয় আমেরিকা রাশিয়া ও ব্রিটেন তাদের পরমাণু অস্ত্রে সংখ্যা কমাচ্ছে।
ইসরায়েল ও ফ্রান্সের অস্ত্রের সংখ্যা অপরিবর্তিত আছে।
অন্যদিকে চীন, পাকিস্তান, ভারত ও উত্তর কোরিয়া্ তাদের পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা বাড়াছে বলে মার্কিন বিজ্ঞানীদের একটি ফেডারেশন বলেছে।
সুত্রঃ বিবিসি

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ছাপ অর্থনীতিতে by সাজ্জাদ আলম খান

৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলছে রাজনৈতিক নেতাদের বাহাস। সরকার, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও বিএনপি- এ দিনকে ঘিরে সবাই বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থার ছাপ পড়েছে ব্যবসার পরিবেশে। শেখ হাসিনার এ মেয়াদের সরকারে মাঠের বিরোধী দলের তেমন কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি ছিল না বললেই চলে। অনেকটা কর্মনাশা রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে এসে দলটি গোলটেবিল বৈঠক, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের নানা ধরনের প্রতিবাদী উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, হরতালের কর্মসূচি আর দেশে ফিরে আসবে না। এতে স্বস্তি ছিল ব্যবসায়ী মহলে। কিন্তু এখন যেন তা বেশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের শেষদিকে জাতীয় নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচনী বছরে বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। উদ্যোক্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। বিগত চারটি নির্বাচনী বছরের বিনিয়োগ পরিসংখ্যান অন্তত তা-ই বলছে। ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই অর্থবছরের বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় সাড়ে ১৮ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে যা ছিল প্রায় ২২ শতাংশ। ২০০১ সালের নির্বাচনী বছরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির চিত্রও অনেকটা এমনই। বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিতে ছিল ধীরগতি। ওই অর্থবছরে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও এর আগের অর্থবছরে ছিল এর সামান্য বেশি। রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের পর ২০০৯ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। আর এর আগের অর্থবছরে ছিল সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে। আর সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। ওই অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয় ৬ দশমিক ৭ ভাগ। আর এর আগের অর্থবছরে ছিল সাড়ে ৭ শতাংশ। নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়ে থাকে। ক্ষমতার পালাবদল হলে কোন কোন খাত গুরুত্ব পাবে, তা নিয়ে চলে পর্যালোচনা। নীতি কাঠামোর ধারাবাহিকতা থাকা নিয়ে দেখা দেয় এক ধরনের অনিশ্চয়তা।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগের জন্য ধীরগতিতে চলার নীতি অনুসরণ করে থাকেন উদ্যোক্তারা। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর পেছনেও ‘বিনিয়োগ’ করার রেওয়াজ এ দেশে অনেকদিনের। অনেক উদ্যোক্তার হয়তো ব্যয় বাড়ে; কিন্ত তা উৎপাদনশীল খাতে নয়। বর্তমান অর্থনীতির গতিধারা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তেমনভাবে অগ্রসর হচ্ছে না। মুদ্রানীতির প্রভাব পড়ছে ঋণ বাজারে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়বে। সরকার ব্যাংকিং খাতকে অবহেলা করেছে। ঋণখেলাপি বেড়েছে এবং সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ অনেক বেড়েছে। ডলারের দামও বেড়ে যাচ্ছে। তার ওপরে শিল্পের জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা তো আছেই। ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হারও সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। যেটা ব্যবসায়ীদের জন্য খুবই উদ্বেগের দিক। ঋণে সুদের হার বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, বিনিয়োগ কমে যায়, ব্যবসা পরিচালনার খরচও বেড়ে যায়। এজন্য আগামীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় তদারকি প্রয়োজন। মুদ্রানীতি খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। প্রবৃদ্ধির সুফল সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে ব্যাংকিং খাত সুদৃঢ়করণ ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মতো পরিকল্পনা ঘোষিত মুদ্রানীতিতে দেখা যাচ্ছে না। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এখানে অনেকটাই উপেক্ষিত হয়েছে। নির্বাচনী বছরে অর্থনীতির ওপর নানাবিধ চাপ থাকে। এরই মধ্যে সে চাপ আসতে শুরু করেছে। এসব কারণে উদ্যোক্তারা নির্বাচন দেখে তারপর ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। চলতি বাজেটে যেসব পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তার সঠিক কোনো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা আস্থা পাচ্ছেন না। ২০১৭ সালে দারিদ্র্য কিছুটা দূর হয়েছে। মেগা প্রকল্পগুলোয় বড় বিনিয়োগ চলছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ঘাটতি সাড়ে ৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। অর্থবছরের বাকি সময়ে এ ঘাটতি ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু বাণিজ্য ঘাটতিই নয়, এ অর্থবছরে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও বড় ঘাটতির আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ৪৩৪ কোটি ডলার। রফতানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় যেটুকু বেশি, তার পার্থক্যই বাণিজ্য ঘাটতি। আর চলতি হিসাবের মাধ্যমে দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি বোঝানো হয়। আমদানি-রফতানিসহ অন্যান্য নিয়মিত আয়-ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এখানে উদ্বৃত্ত হলে চলতি লেনদেনের জন্য দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানি ব্যয় বাড়ছে অস্বাভাবিক গতিতে। আর আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই চলতি হিসাবের ভারসাম্যে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমদানি ব্যয় বাড়লেও প্রকৃত আমদানির চিত্র নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুঁজিবাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। এখানে বিনিয়োগকারীদের খেয়ালি আচরণ বোঝা বড় দায়। কয়েকদিন আগে অস্থিরতার কারণ হিসেবে বলা হল মুদ্রানীতির প্রভাব পড়তে পারে। এখন বলা হচ্ছে রাজনৈতিক উত্তাপের বিষয়। এ কারণে সতর্ক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অনেকে। একের পর এক ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিনিয়োগে আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন কেউ কেউ। ফলে বিনিয়োগ কমেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের কেউ কেউ নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে রাজস্ব আদায়ে। গত চার অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে গড় রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাংলাদেশে ১১ দশমিক ৫৭ শতাংশে দাঁড়ায়, যেখানে একই সময়ে গড় রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ভারতে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ, নেপালে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শ্রীলংকায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় কম হওয়ার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বেশ হতাশ। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম পাঁচ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৪ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। কিন্তু আয়কর, মূল্য সংযোজন কর এবং শুল্ক- এ তিন খাত মিলিয়ে আয় হয়েছে ৭৫ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। সরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার কারণে বিনিয়োগের কার্যকারিতা কমে যায়। প্রতিবছর সরকার যে এডিপি গ্রহণ করে, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয় না। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২৭ শতাংশ। অর্থবছরের বাকি ছয় মাসে সরকারকে এডিপির বাকি ৭৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে হবে, যা অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। সময়মতো অর্থছাড় না হওয়া, জমির অধিগ্রহণে বিলম্ব, দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অভাব এখনও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। অভিজ্ঞতার অভাব, কর্মকৌশল গ্রহণে সরকারের ধীরগতি, ক্রয় কাজে জটিলতা, যোগ্য পরামর্শকের অনুপস্থিতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে তেমন গতি আসেনি। প্রকল্প পরিচালকদের প্রকল্প এলাকায় থাকার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেলে সেই প্রকল্প পরিচালকরা তা মানেন না। এমনকি অনেক প্রকল্প পরিচালকের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো ধারণাও থাকে না। এ বছর বাকি ৬ মাসে ৭৩ শতাংশ বা এর কাছাকাছি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এডিপি বাস্তবায়ন হবে চ্যালেঞ্জিং। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও প্রবল করে তুলছে। ফলে উৎপাদনমুখী খাতগুলোয় প্রয়োজনীয় সম্পদ বণ্টনে অদক্ষতা দেখা দেয়, যা দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, অর্থ পাচারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অস্থিতিশীলতা ও অদূরদর্শিতা প্রধান অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সাজ্জাদ আলম খান : সাংবাদিক
sirajgonjbd@gmail.com

সুইস প্রেসিডেন্টের সফর

সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট অ্যালেন বেরসের চার দিনের বাংলাদেশ সফর আমাদের জন্য নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন এক সময় এ সফরে এসেছেন, যখন মিয়ানমার থেকে আসা দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভার মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। এ সংকট নিরসনে নানামুখী কূটনৈতিক প্রয়াস চলছে। এ পটভূমিতে সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের যে একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। স্বভাবতই তার এ সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি প্রাধান্য পেয়েছে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি। মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুতেই গতকাল ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন সুইস প্রেসিডেন্ট। গতকাল কক্সবাজারে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ছাড়াও কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা স্থাপিত রোহিঙ্গা ইউনিটে চিকিৎসাধীন রোগী ও চিকিৎসা ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন। সোমবার ঢাকায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন সুইস প্রেসিডেন্ট। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অ্যালেন বেরসে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট আমাদের দেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।’ উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের জন্য সুইজারল্যান্ড গত বছরের অক্টোবরে জেনেভায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ৮০ লাখ সুইস ফ্রাঁ জরুরি মানবিক সাহায্য দেয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছে। আর চলতি বছর আরও ১ কোটি ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট অ্যালেন বেরসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সুইজারল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন আমাদের। বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গারা যাতে মিয়ানমারে টেকসইভাবে ফিরে যেতে পারে এবং সেখানে নিরাপদে বসবাস করতে পারে, সে ব্যাপারে সুইজারল্যান্ড রাখতে পারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ সুইজারল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উন্নত রাষ্ট্র। দেশটির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গণতন্ত্র থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। সুইজারল্যান্ড বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতিদানকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর অন্যতম। ১৯৭২ সালের ১৩ মার্চ বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তবে এই প্রথম কোনো সুইস প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশ সফরে এলেন। তার এ সফরে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) বিষয়ে সহযোগিতার জন্য একটি দলিলে স্বাক্ষরে একমত হয়েছে দু’দেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো উন্নত দেশের এ ধরনের দলিল স্বাক্ষরে সম্মতির ঘটনা এটাই প্রথম। শুরুতে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক লেনদেন খুব বেশি না হলেও গত সাত বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ভবিষ্যতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সুইস ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলা যায়। এ ক্ষেত্রে কূটনীতি অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে। আজকের বিশ্বে কূটনীতি অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই সম্পর্কের উন্নতি ঘটে এবং তা থেকে লাভবান হতে পারে উভয় দেশই। সফররত সুইস প্রেসিডেন্ট অ্যালেন বেরসে আশা প্রকাশ করেছেন, দু’দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ভবিষ্যতে নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে। তার এ প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিক।

প্রধান বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক কাম্য নয় by আবদুল লতিফ মন্ডল

সম্প্রতি বাংলাদেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ পেয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারক সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। ফলে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারক এবং গত ১০ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এসকে সিনহা) পদত্যাগের পর অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগে তার জুনিয়র কর্তৃক অতিক্রান্ত হন। মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে আপিল বিভাগের বিচারকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। উল্লেখ্য, দেশের ইতিহাসে এসকে সিনহা হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে পদত্যাগ করেন। প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ প্রদানে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার পদত্যাগ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, এটা যার যার নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও মূল্যবোধের বিষয়। অতীতেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘিত হয়েছে। যাদের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘিত হয়েছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ পদে থেকেছেন, বিচার কাজ পরিচালনা করেছেন। আবার কেউ কেউ পদত্যাগ করেছেন। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেছেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতার লঙ্ঘন হয়েছে। সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন সব সময়ই এর বিরুদ্ধে। অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাই প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাবেন- এমনটাই তাদের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে’ নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগকে তিনি স্বাগত জানাচ্ছেন। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনের মতে, প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ প্রদানে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন কখনও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে না। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, প্রধান বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতার নীতি অনুসরণ করাই প্রত্যাশিত ছিল, কারণ তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের এক বছরেরও কম সময়ে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদে গৃহীত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (অতঃপর মূল সংবিধান নামে অভিহিত), যা ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর বলবৎ হয়। এ সংবিধানের ৯৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ ও অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাবে না।’ ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গৃহীত চতুর্থ সংশোধনীতে সংসদের সুপারিশ বাদ দিয়ে সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারককে অপসারণের ক্ষমতা এককভাবে রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান বিচারক অপসারণে রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতা রহিত করে প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিমকোর্টের দু’জন জ্যেষ্ঠ বিচারকের সমন্বয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের বিধান করেন। এতে বলা হয়, কাউন্সিল কোনো বিচারকের অসদাচরণ ও অসামর্থ্যরে তদন্ত করে সুপারিশসংবলিত রিপোর্ট প্রদান করলে রাষ্ট্রপতি তদনুযায়ী আদেশ প্রদান করবেন। বর্তমান সরকারের আমলে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক অপসারণের প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হলেও প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ গত বছরের ৩ জুলাই তা বাতিল করে দেন। এরপর শুরু হয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন। সরকারি দল আওয়ামী লীগ প্রথমে আপিল বিভাগের রায়ের মন্তব্যগুলো বাদ দেয়ার দাবি তুললেও পরে দাবি তোলে পুরো রায় বাতিলের। অনেকে বলেছেন, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ছুটিতে যান সরকারের চাপে এবং ছুটিতে থাকাবস্থায় তিনি প্রধান বিচারপতি পদে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। তার পদত্যাগের পর অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার সময়কালে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য গত ২৪ ডিসেম্বর সরকার আপিল বিভাগে আবেদন করে। ১৯৭২ সালে গৃহীত মূল সংবিধানে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হওয়ার বিধান করা হয়, যা আজ পর্যন্ত বহাল আছে। তবে ওই সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে কেবল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত অন্যসব দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ সম্পাদন করার বিধান করা হয়।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান বিচারপতি নিয়োগদানে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ প্রয়োজন হতো। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রের মতো প্রধান বিচারপতি নিয়োগেও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দূরীভূত করা হয়। ইতিপূর্বে বিএনপি সরকারের আমলে নীতিনির্ধারকদের বলতে শোনা গেছে এবং বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তাদের বলতে শোনা যাচ্ছে, প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। এটা ঠিক, সংবিধান [অনুচ্ছেদ ৪৮(৩)] প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে একক ক্ষমতা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, রাষ্ট্রপতি কি এ ক্ষমতা বাস্তবে প্রয়োগ করেন বা করতে পারেন? বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগে রাষ্ট্রপতির কোনো স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা নেই। যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগদানে সাংবিধানিকভাবে [অনুচ্ছেদ ৫৬(৩)] বাধ্য। আপিল বিভাগের যে বিচারককে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগদানের জন্য সরকার সুপারিশ করে, তাকে নিয়োগদান ছাড়া রাষ্ট্রপতির আর কিছুই করণীয় থাকে না। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করেই তার মৌখিক সম্মতিতে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগদানের জন্য সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ প্রেরণ করেন বলেই এতদিন জানা ছিল। ১৬ নভেম্বর একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংবিধানের ৪৮(৩) নম্বর অনুচ্ছেদের বিধান অগ্রাহ্য করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের আমলে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের নথি প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে যেত এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একই নিয়ম চালু আছে। বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু ও ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের বক্তব্য থেকে এর সত্যতা পাওয়া যায়। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হয়েও প্রধানমন্ত্রীরা দেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। দলীয় সরকারপ্রধান বিচারপতি নিয়োগে যে দলের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন, তা বলাই বাহুল্য। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এবার নিয়ে তিনবার আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হল। ২০১১ সালের ১৩ মে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারক শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানকে ডিঙিয়ে জ্যেষ্ঠতা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিচারক মো. মোজাম্মেল হোসেনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হলে শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান পদত্যাগ করেন। এর আগেও ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানকে ডিঙিয়ে বিচারক এবিএম খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। সর্বশেষ আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারক মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে ডিঙিয়ে দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারক সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি আমলে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারক মো. রুহুল আমিন ও বিচারক মোহাম্মদ ফজলুল করিমকে ডিঙিয়ে যথাক্রমে বিচারক কেএম হাসান ও বিচারক সৈয়দ জেআর মোদাচ্ছির হোসেনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়। এখন দেখা যাক, আমাদের পাশের দেশগুলোয় প্রধান বিচারপতি নিয়োগে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগদান ভারতে একটি রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদ্দূর জানা যায়, ভারতের ইতিহাসে দু’বার অর্থাৎ ১৯৭৩ ও ১৯৭৭ সালে সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৭৭ সালের পরে আর ব্যত্যয় হয়নি। পাকিস্তানে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তবে ২০১০ সালে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন একটি রুটিন বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীতে সুপ্রিমকোর্টে বিচারক নিয়োগে সুপারিশ প্রদানের জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠনের বিধান করা হয়। আরও বিধান করা হয় যে, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে (most senior Judge of the Supreme Court) প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেবেন। এটা ঠিক, আমাদের সংবিধানে প্রধান বিচারপতি নিয়োগদানে বিচারকদের জ্যেষ্ঠতা বিবেচনায় নেয়ার ব্যাপারে কিছু বলা নেই। তবে এটাও অনস্বীকার্য, প্রধান বিচারপতি নিয়োগে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে নিয়োগ দেয়া হলে তা প্রধান বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের অবসান হবে। সুতরাং আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ রেওয়াজে পরিণত হোক।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক
latifm43@gmail.com

সবুজ পাসপোর্টের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনুন

চাকরি, ব্যবসা, ভ্রমণ, চিকিৎসা, শিক্ষা বা নানা কারণে এক দেশ থেকে অন্যদেশে যেতে হলে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হচ্ছে পাসপোর্ট। আজ দেশের বাইরে বিমানবন্দরে বাংলাদেশীদের অস্বস্তির অন্যতম প্রধান কারণ এই সবুজ পাসপোর্ট। বাংলাদেশের পাসপোর্ট, বাংলাদেশের ঠিকানা বিশ্বের অনেক দেশে কেমন অস্বস্তি, অমর্যাদা ও কষ্টের- তা ভুক্তভোগী মাত্রই অবগত। এক সময় যে দেশগুলো পোর্ট এন্ট্রি ভিসা দিত- সেই দেশগুলো এখন বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট দেখলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, বাঁকা চোখে তাকায়। বাংলাদেশির মর্যাদাহানি বিদেশে দিন দিন প্রকট হচ্ছে, একই ফ্লাইটের অন্য দেশের যাত্রীরা ১০ মিনিটে এয়ারপোর্ট ছাড়তে পারলেও বাংলাদেশীদের লাগছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই কাউন্টারে রেখে দেয়া হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে বেশির ভাগ বাংলাদেশির আলাদা ইন্টারভিউ নিচ্ছে সেখানকার কর্তৃপক্ষ। এই ইন্টারভিউগুলো কোনো অপরাধীকে জিজ্ঞাসাবাদের আদল পাচ্ছে। বিশ্বের অনেক এয়ারপোর্টে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখানো মাত্র দুর্ব্যবহার শুরু হয়। পড়তে হয় পাসপোর্ট জটিলতা ও বিড়ম্বনায়। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ভ্রূকুটি, তদন্ত ও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। ভিনদেশের ইমিগ্রেশনের লাইনে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের অধিক সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যা খুবই বিরক্তিকর। অন্য সব দেশের নাগরিকরা এক লাইনে থেকে ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে পারলেও বাংলাদেশিদের নিয়ে যাওয়া হয় আলাদা লাইনে। এদেশের নাগরিকদের জন্য এখন ভিসা না পাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশির ভিসা আবেদন নাকচ হচ্ছে। এমনকি ভারত, নেপালও এ কাজ করছে। এটি একটি নির্মম পরিহাস। যত দিন যাচ্ছে, অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। অথচ একজন বাংলাদেশির কাছে পাসপোর্টের মূল্য অনেক। কারণ এটি অনেক কষ্টে অর্জিত এক সম্পদ। সম্প্রতি হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের করা এক সূচকে ১৯৯টি দেশ জায়গা পেয়েছে। হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের এ বছরের তথ্য অনুসারে, ওই ১৯৯ দেশের মধ্যে মাত্র ১০টি দেশ আছে, যাদের পাসপোর্ট অন অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাসপোর্টের তুলনায় কম শক্তিশালী। আর ১৮৫টি দেশের পাসপোর্ট এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চাইতে বেশি শক্তিশালী। হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্য বলছে, ২০০৮ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই সূচকে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান নেমেছে ২৩ ধাপ। এ বছর ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকারের ভিত্তিতে যে র‌্যাংকিং করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ৯৬তম অবস্থানে আছে। অথচ আগের বছর ছিল ৯৫তম অবস্থানে। তালিকা অনুসারে প্রায় একঘরে হয়ে থাকা উত্তর কোরিয়া কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত দক্ষিণ সুদানের পাসপোর্টও বাংলাদেশের পাসপোর্টের চাইতে বেশি শক্তিশালী। এদিকে গত বছরের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যার্টন ক্যাপিটালের প্রকাশিত ‘পাসপোর্ট ইনডেক্স’ প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশ ও ইয়েমেন যৌথভাবে ৯০তম অবস্থানে ছিল। ১৯৯টি দেশ নিয়ে তৈরি এ সূচকে বিশ্বের পঞ্চম দুর্বলতম পাসপোর্ট বাংলাদেশের। উল্লেখ্য, একটি দেশের পাসপোর্ট দিয়ে ভিসা ছাড়াই কয়টি দেশে যাওয়া বা ঢোকা যায়, তার ওপর দেশটির পাসপোর্ট র‌্যাংকিংয়ের মান নির্ভর করে। আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকরা সবুজ রঙের- যার ওপর লেখা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ পাসপোর্ট দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে পোর্ট এন্ট্রি ভিসা নিয়ে যাতায়াত করতে পারত। এক সময় বাংলাদেশি সবুজ পাসপোর্টের মর্যাদা আজকের চেয়ে ভিন্ন ছিল। কতটা ভিন্ন ছিল, সেটা ওপরের লেখা থেকেই বোঝা যায়। আর এখন কতটা খারাপ হয়েছে, সেটাও। পাসপোর্ট অত্যন্ত জরুরি ও মূল্যবান একটি জিনিস। সব দেশের সব নাগরিকের কাছে যার যার পাসপোর্ট তার আন্তর্জাতিক পরিচয়ের সনদ। আমরা বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করি, দেশে ও বিদেশে আমরা যেন নিরাপদ থাকি। সম্মানজনক জীবনের অধিকারী হতে পারি। কোথাও যেন আমরা অমানবিক আচরণ ও নির্যাতনের শিকার না হই। কোথাও যেন অবহেলার সম্মুখীন না হই। এটা আমাদের মানবিক অধিকার, এটা ন্যায়সঙ্গত অধিকার। এই অধিকার দেশে ও বিদেশে নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে সরকারকে কৃতিত্ব দেখাতে হবে। কৃতিত্ব কেবল পোস্টার, ব্যানার আর বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
ব্যবসায়ী, কোরপাই, বুড়িচং, কুমিল্লা
moonzeerahcklham@gmail.com

পত্রিকার মতো পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও কি প্রকাশ্যে বিক্রি হবে? by মাহবুব নাহিদ

প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন অতি পরিচিত একটি শব্দ। এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত নয়, এমন কাউকে এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ছোট ছোট শিশুরাও বলে দিতে পারবে- প্রশ্ন ফাঁস বিষয়টা কী? আমাদের দেশে এখন আদর্শলিপি পড়ানোর মতোই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি শিখিয়ে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষা আমাদের দেশে বহু আগেই পণ্য হয়ে গেছে। এখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রকে পণ্য বানানোর যথাসম্ভব চেষ্টা করা হচ্ছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এখন নিলামে ওঠার দ্বারপ্রান্তে। দেশে এমন দিন এলে অবাক হব না- যখন দেখব, পত্রিকার মতো ক্যানভাস করে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র বিক্রি করা হচ্ছে। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন আমাদের দেশে নতুন নয়। এটি বংশপরম্পরায় চলে আসছে। বলা হচ্ছে, দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে আমরা উন্নত হচ্ছি, নতুন নতুন প্রযুক্তি শিখছি।
এখন ভালো কাজগুলোর প্রযুক্তি যদি উন্নত হয়, তবে খারাপ কাজগুলোর প্রযুক্তি কেন উন্নত হবে না? আগে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ চিরকুট কিংবা বই নিয়ে যেত, যাকে আমরা নকল করা বলে জানতাম। আগেকার দিনে অনেক অভিভাবক পরীক্ষাকেন্দ্রের জানালার পাশে বই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। যখন যে প্রশ্নের উত্তর দরকার হয়, তা বলে দেয়ার জন্য। অথবা কোনো অভিভাবক পরিচিত শিক্ষকের কাছে অনুরোধ রাখত যাতে পরীক্ষার হলে তার সন্তানকে একটু ছাড় দেয়া হয়। বর্তমানে পরীক্ষায় নকল হয় না বললেই চলে। তবে পরীক্ষায় অসদুপায় ঠিকই রয়ে গেছে, শুধু ধরনটার পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর পরীক্ষার হলে চিরকুট নিয়ে যেতে হয় না। কারণ এখন পরীক্ষার প্রশ্ন আগে থেকেই জানা থাকে। যেহেতু টেকনোলজির যুগ, তাই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের উত্তরও বলে দিতে হয় না। এখন হেডফোনে ডিভাইস লাগিয়ে রাখা হয়। এর মাধ্যমে পরীক্ষার্থীকে উত্তর বলে দেয়া হয়। আর হ্যাঁ, অভিভাবকরা এখনও তদবির করে। আগে তদবির করত পরীক্ষার হলে কম কড়াকড়ি আরোপের জন্য আর এখন করছে সরাসরি প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার জন্য। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত বাবা-মায়ের উচিত, সন্তানকে আদর্শলিপি পড়ানো বাদ দেয়া। কারণ তাতে লেখা থাকে- ‘অ’ তে অসৎ সঙ্গ ত্যাগ কর। তা যদি করতে হয়, তাহলে তো নিজের প্রশ্নচোর বাবা-মাকে আগে ত্যাগ করতে হবে! অভিভাবকবৃন্দ, আপনাদের বিবেকে কি একটুও নাড়া দেয় না? কীভাবে নিজের সন্তানকে এ কুকর্ম শেখাচ্ছেন!
স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রশ্নপত্র ফাঁস : শেষ কোথায়? by রিজওয়ানা তাসনীম

প্রায় প্রতিটি বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন বর্তমানে একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার ধরনটাও পাল্টে গেছে। পরীক্ষার আগে পড়াশোনা করার চেয়ে তারা বেশি ব্যস্ত ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের খোঁজে। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ, মিছিল প্রভৃতি অরাজকতা।
উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও দুর্নীতিতে শীর্ষে অবস্থান করছি আমরা, যা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি এখন আর নতুন কিছু নয়। আশঙ্কার বিষয় হল, বর্তমান প্রজন্ম কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগে শিক্ষাজীবনেই দুর্নীতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে দুর্নীতির এক অভিনব পদ্ধতি প্রশ্নপত্র ফাঁস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁস করার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এ ওয়েবসাইটগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে সক্ষম হতো না, যদি এতে পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের যোগসাজশ না থাকত। স্কুল, কলেজ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি এটাই প্রমাণ করে- এজন্য দায়ী প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নেতৃত্ব ও সুষ্ঠু তত্ত্বাবধায়নের অভাব, কর্তব্যে অবহেলা এবং নৈতিকতার অবক্ষয়। অত্যন্ত লজ্জার ব্যাপার এই যে, শিক্ষকদের একাংশ প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ফাঁস হওয়া প্রশ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ ধ্বংস করতে ভূমিকা রাখছেন।
কিছু কিছু অভিভাবককেও দেখা যায়, পরীক্ষার আগে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের খোঁজ করার জন্য সন্তানদের উসকে দিতে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে পুরস্কার ঘোষণা। প্রশ্ন ফাঁস রোধে সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন ফাঁস প্রতিরোধের সব চেষ্টাই পণ্ড হতে পারে, যদি শর্ষের মধ্যেই ভূত থেকে যায়। তাই অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের সুষ্ঠু পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রাখা জরুরি। প্রশ্নপত্র ফাঁস সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। তা না হলে নীতিবিবর্জিত ও মেধাশূন্য জাতিতে পরিণত হব আমরা।
শিক্ষার্থী, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার: অর্থমন্ত্রী

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) বিরুদ্ধে সরকার মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বুধবার তিনি জানান, বাংলাদেশের পক্ষে এ মামলার বাদী হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক (ফেড)।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নিউইয়র্ক ফেডে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরির ঘটনা ঘটে। আর্থিক লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদানকারী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সুইফটের সিস্টেমের মাধ্যমে ভুয়া আদেশে এ অর্থ চুরি করে হ্যাকাররা। চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে ২ কোটি ডলার চলে যায় শ্রীলংকায় আর বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের আরসিবিসিতে। ব্যাংকটির মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় বদলে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতে চলে যায় বেশির ভাগ অর্থ। শ্রীলংকায় যাওয়া ২ কোটি ডলার ফেরত পাওয়া গেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়। পরে ফিলিপাইনের সিনেট শুনানির মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার ফেরত পায় বাংলাদেশ। কিন্তু বাকি অর্থ এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় বাকি অর্থ উদ্ধারের জন্য গত বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক ফেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কনফারেন্স কলের মাধ্যমে আলোচনা করেন। সেই সময় আরসিবিসির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এ আলোচনায় সুইফটের দুজন প্রতিনিধিও অংশগ্রহণ করেন। ওই আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক মামলার বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাঠাবে নিউইয়র্ক ফেডের কাছে। এর পর ফেডারেল রিজার্ভ বাদী হয়ে ২০১৮ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে নিউইয়র্কে মামলা করবে।

প্রশ্ন ফাঁসের দায়ভার সাধারণ পরীক্ষার্থীরা বইবে কেন?

এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া গেলেই পরীক্ষা বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন। ২৫ জানুয়ারি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় মনিটরিং কমিটির সভার শুরুতেই এ কথা জানান তিনি। প্রয়োজনে একই পরীক্ষা ১০ বার নিয়ে ফল প্রকাশের কথাও বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের পর পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক? অর্থের মোহে একদল মানুষ প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে, এর বিপরীতে যদি লাখো শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে বরং প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে আমরা কি শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করতে পারি? তবে কেন পরীক্ষা বাতিল করে তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে? শাস্তি যদি দিতে হয়, তবে দোষীদের দিতে হবে। দোষীদের শাস্তির আওতায় না এনে পরীক্ষা বাতিল করা হলে তা রীতিমতো অন্যায় করা হবে।  প্রশ্ন ফাঁস রোধের ব্যর্থতা কার? ব্যর্থতা যারই হোক দায়ভার কিন্তু সংশ্লিষ্ট সবার।সুতরাং সংশ্লিষ্টরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে এর দায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো ঠিক হবে না। যারা কষ্ট ও অর্থ খরচ করে সারা বছর পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিল, পরীক্ষা বাতিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাদের সবকিছু অর্থহীন করে দেয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্তমানে প্রায় সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। কয়টা পরীক্ষা বাতিল করা সম্ভব?
তাই এর একমাত্র সমাধান হল, যে কোনো মূল্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা হলে প্রশ্ন ফাঁস অবশ্যই রোধ হবে। আমরা ইতিমধ্যে প্রশ্ন ফাঁসকারী অনেককেই ধরা পড়তে শুনেছি বা দেখেছি। পত্রিকা বা টেলিভিশনে তাদের চেহারা স্পষ্ট দেখানো হয় না। পরবর্তী সময়ে তাদের কী শাস্তি হল, সে খবরও গণমাধ্যমে আসছে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শাস্তি ন্যূনতম ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর ৪ নম্বর ধারায় এ শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, এমনকি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই শাস্তির এ বিধান সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না। প্রশ্ন ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধীরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এদের সমূলে বিনাশ করতে হবে। পরীক্ষার্থী, অভিভাবকরা বলছেন- পরীক্ষার যে প্রশ্নপত্রটি তারা অনলাইনে পেয়েছেন, তার সঙ্গে পরীক্ষা নেয়া প্রশ্নের হুবহু মিল থাকে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী পরিশ্রম করে পড়ালেখা করতে চায় না। তাদের ভাবনায় থাকে- প্রশ্ন তো আগের রাতে পেয়েই যাব। আবার অনেকেই প্রশ্নগুলো আগের রাতে পেয়েও দেখে না, তারা পরে আফসোস করতে থাকে! কড়া নিরাপত্তার মধ্যে জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হুবহু ফাঁস হয় কী করে? প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে- এটা সবাই দেখছেন, জানছেন অথচ কর্তৃপক্ষ কেন দেখছেন না? প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা স্পষ্ট হলেও সংশ্লিষ্টরা এর দায় কেন নিচ্ছেন না? কেন তারা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন? এ অবস্থা চলতে থাকলে ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ কথাটি ভুল প্রমাণিত হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। শিক্ষার মান বলে কিছু থাকবে না। প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে জাতি, অন্ধকারে পতিত হবে দেশ।
প্রভাষক, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ, ঢাকা

ন্যায়বিচার, অবিচার ও রাজনীতি by কামাল আহমেদ

পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা যে বিএনপির জন্য ভালো হয়নি সে কথা দলটির নেতারাও স্বীকার করছেনপুলিশের ওপর হামলার ঘটনা যে বিএনপির জন্য ভালো হয়নি সে কথা দলটির নেতারাও স্বীকার করছেনস্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সম্ভবত এই প্রথম এমন একটি মামলার রায় হতে যাচ্ছে, রাজনীতিতে যার প্রভাব বহুদিন ধরেই অনুভূত হবে।
রাজনীতিকদের জবাবদিহি ও বিচারের ভার জনতার আদালতে বলে একটি কথা বহুল প্রচলিত। কিন্তু আইনের আদালতেও যে অপরাধের জবাবদিহির বিষয় আছে, সে কথা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি সময়ের রাজনীতি যে দুজন নেত্রীকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, তাঁদেরই একজন, দশ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী এবং অন্যতম প্রধান একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হলেন ওই মামলার প্রধান অভিযুক্ত। এই মামলা নিয়েও রাজনীতির অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং বিরোধী দল যতটা না উত্তাপ তৈরি করতে পেরেছে, তার চেয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীরা করেছে অনেক বেশি। দেশে যখন রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকারব্যবস্থা চালু ছিল, তখন বেআইনিভাবে ক্ষমতা দখল করে সরকার পরিচালনায় দুর্নীতির জন্য এর আগে আরেকটি রাজনৈতিক দলের প্রধানকেও আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং তিনি দণ্ডিতও হয়েছেন। কিন্তু সাবেক সামরিক শাসক ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক এরশাদের বিচার ও রায় নিয়ে তেমন কোনো রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল না। অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখলকারী সাবেক ওই সেনাশাসক ক্ষমতা ও অর্থের যতটা অপব্যবহার করেছেন, সেই তুলনায় তাঁর প্রাপ্য বিচার এখনো হয়নি এবং তাঁর জীবদ্দশায় যে সেগুলো সম্পন্ন হবে, তেমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রের প্রতি আস্থায় ঘাটতির সুযোগ নিয়ে তিনি গাছেরও খাচ্ছেন, তলারও কুড়াচ্ছেন। হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের মামলায় তাঁর বিচার শেষ হয়েও হয় না। তবে ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ খালেদা জিয়ার যে মামলাকে নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, সেটি তৈরিতে তাঁর ও তাঁর দলের উৎসাহে কোনো ঘাটতি নেই। তাঁর সহযোগীদের একজন প্রতিমন্ত্রী, মসিউর রহমান রায় ঘোষণার তারিখ ঠিক হওয়ার আগেই জনবক্তৃতায় বলেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খালেদা জিয়াকে জেলের ভাত খেতে হবে। তিনি নিজেও খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমাকে আপনারা জেলে পাঠিয়েছিলেন, এখন জেল আপনার খুবই সন্নিকটে।’ সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির এই উৎসাহের সঙ্গে অবশ্য সরকারের অন্যান্য মন্ত্রী এবং সরকারি দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের প্রকাশিত উচ্ছ্বাসের কোনো তুলনা চলে না। গৃহায়ণমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন মামলার রায়ের এক দিন আগে, অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই দলীয় নেতা-কর্মীদের রাস্তা দখল নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার জন্য’ খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে ঢাকা শহরের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার পড়েছে। পোস্টারের ভাষা এবং মন্ত্রীদের কথায় খালেদা জিয়াকে ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এখন তাই তাঁদের দাবিটা সর্বোচ্চ সাজার। মামলার বিষয়ে বিএনপিও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে পিছিয়ে নেই। দলের নেতারা ৮ তারিখে দলের নেতা-কর্মীদের রাজপথে নামার নির্দেশনা দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়া-আসার সময় শত শত নেতা-কর্মী দল বেঁধে যেভাবে তাঁকে অনুসরণ করেন, তাতে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য থাকে। গ্রেপ্তার-মামলা-হয়রানির পরও যে দল বিলুপ্ত হয়ে যায়নি এবং তাঁদের নেত্রী যে একা নন, সেটি বোঝানোর চেষ্টাতেই তাঁদের এই দলীয় রুটিন। এই কর্মসূচির সময়ই গত সপ্তাহে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির কর্মীদের যে হাঙ্গামা হয়, সেটিও এই উত্তেজনা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল পুলিশের ওপর হামলাকারীরা দলের কেউ নন বললেও তাঁর সহযোগী রিজভী বলেছেন উল্টো কথা। তবে পুলিশের ওপর হামলাকারীরা বিএনপির হোক অথবা অন্য কোনো অন্তর্ঘাতক হোক, পরিণতিটা দলটির জন্য যে ভালো হয়নি সে কথা তাঁরাও স্বীকার করছেন। দলটি তার জাতীয় কমিটির সভা আয়োজনেও বাধার মুখে পড়েছে। দলটির সভা আয়োজনে এ ধরনের বাধা সৃষ্টিতেও রাজনৈতিক উত্তাপ বেড়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বিচারের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত এবং কষ্টকর। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার দায়ে যাঁদের বিচার হয়েছে, তাঁদের কথা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। শুধু সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে যত প্রাণহানি এবং সম্পদনাশের ঘটনা ঘটেছে, তা রীতিমতো একটি দুঃস্বপ্নের বিষয়। এ রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত বিষয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের রাজপথ দখলে রাখার প্রস্তুতি মোটেও স্বাভাবিক নয়। বরং তাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই প্রতিফলিত হয়। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা তিন ডজনের বেশি। দুর্নীতির মামলা ১০ টির মতো, বাকিগুলো হত্যা ও নাশকতার হুকুমদাতা হিসেবে অভিযোগ। দুর্নীতির মামলাগুলোর মধ্যে বিস্ময়করভাবে সবচেয়ে কম আর্থিক মূল্য যে অভিযোগের, সেটিই হচ্ছে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা। শতকোটি টাকার দুর্নীতির মামলা রেখে এই মামলাটি কেন অগ্রাধিকার পেল, সেই প্রশ্নটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার বিচার চেয়ে পোস্টার পড়েছে। ভোটের রাজনীতিতে এটা চলবে ভালো। মামলায় দোষী অথবা নির্দোষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার ও এখতিয়ার একান্তভাবেই আদালতের। গণমাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যাসত্য, সাক্ষ্য-প্রমাণের গুণাগুণ বা বিশ্বাসযোগ্যতার বিচার একেবারেই অনুচিত। সুতরাং, সেসব দিক আমি সচেতনভাবে পরিহার করে এই মামলার রাজনৈতিক বিতর্কের দিকটিতেই আলোচনা সীমিত রাখব। আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে দলের অনুসারী এবং আইন পেশায় শীর্ষস্থানীয় সাত-আটজন মামলাটিতে অভিযুক্তের পক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তারপর খালেদা জিয়া নিজেও কয়েক দিন ধরে দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন, যার অনেকটাই রাজনৈতিক। আদালতে তিনি বলেছেন, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার (২০০৭-০৮) সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীকে নাজেহাল করে তাঁদের উৎখাত করতে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নের জন্য অনেকগুলো মামলা দায়ের করে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলাগুলো তাঁর ভাষায় ‘জাদুর বলে’ বাতিল হয়েছে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, একই ধরনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারাধীন এই মামলাও নিষ্পত্তিতে তাড়াহুড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আদালতে তিনি যেভাবে বৈপরীত্য বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কূটনীতিকদের কাছেও সেই একই বার্তা দেওয়া হয়েছে। মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনে খালেদা জিয়া তাঁর বিরুদ্ধে এই মামলাটিকে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় কতটা সফল হয়েছেন বলা মুশকিল। কিন্তু গত কয়েক দিনে ক্ষমতাসীন দল ও তাঁর সহযোগীদের বক্তৃতা-বিবৃতি ও কার্যক্রমে মামলাটির ওপর যে অনেক বেশি রাজনৈতিক রং পড়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। এ ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কে কে বেশি লাভবান হবেন, সে বিষয়েও ইতিমধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। রাজনীতিকদের জন্য ক্ষমতার আসন এবং কারাগারের মধ্যকার দূরত্ব খুব সামান্যই। আবার ছোটখাটো দুর্নীতির অভিযোগে জেল খেটে রাজনীতিকদের ভাবমূর্তি বা ইমেজ বাড়ার নজিরও কম নেই। দণ্ডিত হওয়ার পর আপিল প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং জোরেশোরে রাজনীতি করার দৃষ্টান্ত বর্তমান ক্ষমতাসীন দলেও অনেক আছে। অনেকেই তাই বলছেন যে খালেদা জিয়া এই মামলায় খালাস পেলে যেমন রাজনৈতিক হয়রানির দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে, তেমনি দণ্ডিত হলে ন্যায়বিচার না পাওয়ার দাবিতে তাঁর অনুসারীরা আরও সংগঠিত হবেন। প্রায় বারো বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় বিএনপিকে ভাঙার একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ হলেও ক্ষমতাসীন জোটের একাংশের ধারণা, এবার দল ভাঙা ত্বরান্বিত হবে। বিশেষ করে জোটের সহযোগী সাবেক সেনাশাসক জেনারেল এরশাদের আশা, বিএনপি দুর্বল হলে তাঁর দল লাভবান হবে এবং আওয়ামী লীগের বিকল্প হতে পারবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য এবং অংশীদারত্বের সমসাময়িক ইতিহাসের পটভূমিতে তাঁর এই আশা দুরাশাই রয়ে যাবে বলে মনে হয়। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ যে এখনো বিএনপি, সেটি অনুধাবন করার কারণেই সম্ভবত খালেদা জিয়ার মামলা ঘিরে এত রাজনৈতিক উত্তেজনা। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এ ধরনের উত্তেজনায় ন্যায়বিচার বা অবিচার বড় না হয়ে রাজনীতিটাই বড় হয়ে দেখা দেয়।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক

লোহিতসাগরের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা by কামাল গাবালা

লোহিতসাগর নিয়ে চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক তৎপরতার বিষয়ে যাঁরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন, নিশ্চিতভাবেই তাঁরা একটি বিষয়ে আতঙ্কে আছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, এই সাগরের উপকূল যেসব আরব ও অনারব দেশের সীমানা ছুঁয়ে গেছে, তাদের মধ্যে আজ হোক কাল হোক, বড় একটা দাঙ্গা-ফ্যাসাদ বাধতে যাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের আঁচ নীল নদের দখল এবং লোহিতসাগরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কোন্দলরত উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে গিয়ে পড়বে। বিশেষত, পূর্ব সুদান এবং দক্ষিণ মিসরের মধ্যকার লোহিতসাগরের হিস্যাসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বজোড়া বাণিজ্যের ১৩ শতাংশ পণ্য এবং দিনে ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল এই সাগরের মধ্য দিয়ে আসা-যাওয়া করে। মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশ থাকায় এই কিছুদিন আগে পর্যন্তও বিশেষজ্ঞরা লোহিতসাগরকে শান্ত আরব সাগর বলে অভিহিত করতেন। কিন্তু সম্প্রতি পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। সম্প্রতি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সুদানে সফর করার পর মিসর ও সুদানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। এর কারণ হলো, এরদোয়ানের সফরের সময় আঙ্কারা ও খার্তুমের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক ১৩টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি চুক্তির আওতায় আঙ্কারাকে ৯৯ বছরের জন্য সুয়াকিন দ্বীপ ইজারা দিয়েছে খার্তুম। সামরিক ঘাঁটি হিসেবে লোহিতসাগরের পারের তিন দেশ জিবুতি, ইরিত্রিয়া ও ইয়েমেন সম্প্রতি বিদেশিদের নজরে পড়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদেশ রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের লোভাতুর দৃষ্টি এখন এই তিন দেশের ওপর। জাপান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের পাশাপাশি ইতালিও এখানকার ব্যাপারে আগে থেকেই আগ্রহী ছিল। শেষ পর্যন্ত তুরস্কও সোমালিয়ার পর এবার সুদানের দিকে ঝুঁকল। দক্ষিণ দিকের প্রতিবেশী সুদানের সঙ্গে মিসরের বেশ ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তুরস্ক যেভাবে সোমালিয়ার পর কাতার এবং সেখান থেকে একবারে মিসরের গায়ে ঘেঁষা সুদানে ঢুকে সেখানকার সুয়াকিন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলছে, তা দেখে সুদানকে মিসরের সন্দেহের নজরেই দেখার কথা। মিসরের সিসি সরকার যে ইসলামপন্থী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে, সেই মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক হলো তুরস্কের বর্তমান এরদোয়ান সরকার।
ফলে সুদানে তুরস্কের ঘাঁটি মিসর ও তুরস্কের মধ্যে বৈরিতা বাড়াবে। অন্যদিকে সুদান ও কাতারের নেতারাও মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক। তুরস্ক-কাতার-সুদান-এই ত্রিদেশীয় জোটের মুখে পড়ে মিসর লোহিতসাগরের উপকূলবর্তী অপর দেশ ইরিত্রিয়াকে নিয়ে একটি পাল্টা দ্বিপক্ষীয় ‘জোট’ গড়তে চাইছে। তাদের সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কাতারে সামরিক ঘাঁটি গড়ে সেখানে তুরস্ক ৩০ হাজার সেনা মোতায়েন করে আছে। একই কায়দায় তুরস্ক যাতে সুদানে ঘাঁটি গাড়তে না পারে, সে জন্য সৌদি ও আমিরাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। খবর ছড়ানো শুরু হয়েছে, সুদানের বিরুদ্ধে ইরিত্রিয়ার জনগণ বিক্ষোভ করছে এবং আসমারা (ইরিত্রিয়ার রাজধানী) ও কায়রোর মদদ নিয়ে সুদান সরকারকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর জের ধরে ইরিত্রিয়ার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় সুদান সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে রেখেছে। সুদানের প্রেসিডেন্ট বশির অভিযোগ করেছেন, দারফুরকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য মিসর সেখানকার বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিচ্ছে। অবশ্য মিসর এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কাতারের সমর্থন নিয়ে তুরস্ক ধীরে ধীরে মিসরের দক্ষিণ সীমান্ত, সোমালিয়া ও সুদানে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে বলেই যে মিসর বিচলিত হয়ে পড়েছে, তা নয়। এ ছাড়া নীল নদের পানি ধরে রাখার জন্য ইথিওপিয়া যে বিশাল বাঁধ তৈরি করছে, তা নিয়ে ইথিওপিয়ার সঙ্গে সৃষ্ট উত্তেজনাও কায়রোকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। মিসর মনে করে, ক্ষমতাসীন সিসি সরকারের বিরোধী দেশগুলোর পরিকল্পনায় এই বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে এবং এটি তৈরি হলে তাদের নীল নদের পানি পাওয়ার পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। লোহিতসাগরের হালায়েব ও সালাতিন-এই দুটি দ্বীপকে সৌদির সীমানাভুক্ত বলে সম্প্রতি মিসর ঘোষণা করার পর খার্তুমের সঙ্গে কায়রোর টানাপোড়েন বেড়ে যায়। এই দুটি দ্বীপকে সুদানের বলে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মিসরকে অনুরোধ জানাচ্ছে সুদান। সুদান ও মিসরের এই মৌলিক সীমান্তসংকটকে ব্যবহার করে লোহিতসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার ঘোরতর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে আরবের ঐতিহাসিক শত্রু ইসরায়েল লাভবান হবে সবচেয়ে বেশি। এর মাধ্যমে নীল নদের পানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে, বিশেষ করে মিসরকে ব্ল্যাকমেল করা ইসরায়েলের পক্ষে সহজ হবে।
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
কামাল গাবালা: মিসরের সাংবাদিক ও আল আহরাম পত্রিকার কলাম লেখক

ধর্ষণের শিকারকে বিশ্বাস করবেন না কেন?

খবর পেলাম, রাজধানীতে আরেক হোটেলে ঘটেছে আরেক দলবদ্ধ ধর্ষণ। এবারও জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে এক নারীকে ধর্ষণ করলেন দুই বন্ধু মিলে। এ রকম ঘটনা গতবার রেইনট্রি হোটেলে যখন ঘটেছিল, তখন মামলা নিতে চাননি পুলিশ কর্মকর্তা। এবার নিয়েছেন। আমাকে এটা মনে করাল ব্যান্ডুরার ‘সোশ্যাল লার্নিং’ তত্ত্বের কথা।
ব্যান্ডুরা প্রথম বলেছিলেন, আমাদের সামাজিক পরিবেশ দ্বারা আমরা প্রভাবিত হই। এই দুই বন্ধু আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলের থেকে কী শিখেছেন, সেটা দেখার আর বাকি নেই। অবাক হওয়ার বিষয় একটিই, ওই রেইনট্রির ধর্ষকদের পরিণতি দেখেও তাঁরা দ্বিধা বোধ করেননি। কেন করেননি, সে প্রশ্ন আজকে থাক। অন্যদিকে, যিনি এর শিকার হয়েছেন, তিনিও শিখেছেন ধর্ষণের শিকার হলে পুলিশের কাছে যাওয়া যায়। পুলিশ মশাইও শিখেছে, মামলা কীভাবে গ্রহণ করতে হয়। এটাকে হয়তো অনেকে অগ্রগতি বলবেন। বলতেই পারেন। তার সঙ্গে মনে করিয়ে দিল আমার নিজের গবেষণার কথা। আমার গবেষণার একটা ধারা নারী নির্যাতন নিয়ে। আমি আরেকজন গবেষকের সঙ্গে সম্প্রতি একটা কাজ শেষ করেছি। সেখানে বিভিন্ন ধরনের অঙ্ক করে আমরা দেখিয়েছি, বাংলাদেশে যেসব নারী নির্যাতিত বা ধর্ষণের শিকার হন, তাঁদের মানসিক রোগ হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। তাহলে কি সদ্য ধর্ষণের শিকার এই নারীর মানসিক রোগ হওয়া ছাড়া উপায় নেই? আমার গবেষণার কাজ দিয়েই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। এই গবেষণার ভিত্তিতে যে নিপীড়ন আর মানসিক রোগের মধ্যে সংযোগ পেলাম, সেটার সূত্র ধরে আমি কিছু নারীর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছি। তাঁদের থেকে জানতে চেয়েছি তাঁদের জীবনের কথা, নিপীড়নের কথা, মানসিক অবস্থার কথা। অনেকেই বলেছেন তাঁদের স্বামী বা প্রেমিক দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার কথা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সূত্রে আমরা জানি, নারীদের স্বামী বা প্রেমিক দ্বারা নির্যাতনের হার প্রায় ৮০ শতাংশ। নির্যাতিত নারীরা সরাসরি এসব বলছেন, এটা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিথির (নাম পাল্টানো হয়েছে নিরাপত্তার কারণে) উদাহরণ দিয়ে বোঝাই ব্যাপারটা।
তিথির কথায়: ‘আমার আগের এক জীবনে আমি বীভৎস এক লোকের প্রেমে পড়ে তাঁকে বিয়ে করেছিলাম। সে নানান কারণবশত আমাকে মারধর করত, মানসিক নির্যাতন করত, গালাগালি করত, নানানভাবে জোর খাটাত। বলত, এসব নিপীড়নের কথা কাউকে জানালে সে আমার নামে এমন সব কথা বলবে, তাতে আমার মানসম্মান বলে কিছু বাকি থাকবে না। বাংলাদেশের যেকোনো মেয়ের জন্য এটা খুব বড় একটা হুমকি। চুন থেকে পান খসলেই যা হয় আমাদের দেশে, কেউ আগ বাড়িয়ে বরবাদ করার চেষ্টা করলে তো শেষ হয়ে যেতে হবে। কিন্তু আমার পক্ষে মুখ বন্ধ করে থাকা সম্ভব হয়নি। যখন জীবনটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, তখন মানুষ কী বলবে, সেটা নিয়ে আর ভাবা যায় না। তাই তার সেই কুৎসা রটানোর হুমকি যখন বাস্তবায়ন করা হলো, নানান ধরনের হুমকির চাপে আমার নিজেকে বন্দী করে রাখতে হলো। আর মানুষের কথা কী বলব! তাঁরা যার যার মনের মতো ভেবে নিয়েছেন। তাঁরা হয়তো আমাকে গালমন্দ করে নিজেদের জীবনকে আরও সহনীয় মনে করেছেন, নৈতিক শ্রেষ্ঠতা আদায় করেছেন, নিজের কাছেই। আমাদের তো এসব খুব পছন্দ—অন্যের দুঃখ যেন নিজের সুখ।’ একসময় ছিল—যখন এ ধরনের কথা নারীরা ভাবতেন, তাঁদের একান্ত কথা বাইরে বলা যাবে না। অনেকে এখনো বলেন না। হয়তো অচেনা মানুষকে এসব বলা সহজ। তাই আমরা গবেষকেরা জানতে পারি, কত বীভৎস হতে পারে মানুষ, তাও আবার ভালোবাসার নামে। এমন না যে আমি জানতাম না, আমার জীবনেও এ রকম ঘটনা আছে, কিন্তু গবেষণা করতে গিয়ে বুঝলাম, এ রকম নিপীড়নের প্রাদুর্ভাব কত ব্যাপক। কত হাজার হাজার মানুষ নিপীড়িত হয়েছেন, হয়ে থাকেন প্রতিদিন। আমি আমার জীবনে এখন এমন জায়গায় এসেছি, আমি মনে করি, সব মানুষের মানসিক বা শারীরিক আঘাতের ইতিহাস (trauma history) আছে, সবাই আক্রান্ত হয়েছেন কারও না কারও হিংস্র ব্যবহারে। সবাই কিছু না কিছু নেতিবাচক আচরণ থেকে শুরু করে নিপীড়নের পর্যায় পড়ে—এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন। এবং অনেকে অনেক কিছু লুকিয়ে রাখেন, রাখতে হয়। সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো আমারও বলতে হয়, মানুষের তিন রকম জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন। তাই সবার পক্ষে জানা সম্ভব না কার জীবনে কী ঘটনা ঘটেছে। আর আমরা জানি আর না জানি, আঘাত পাওয়ার মানসিক প্রতিফলন নিশ্চয়ই আছে, থাকা স্বাভাবিক। যেমন ধরুন, অনেকেই বলতে চান না ছোটবেলার জঘন্য সেই আত্মীয়ের কথা, যিনি সবার গায়ে হাত দিতেন। অনেকেই বলেন না তাঁদের নিজ মা-বাবার হাতে নির্মমভাবে মার খাওয়ার কথা। বলেন না তাঁদের মায়েদের মার খেতে দেখার কথা। বলেন না সেসব দেখে নিজের জীবনের নির্যাতনকে স্বাভাবিক মনে হওয়ার কথা। অনেকে হয়তো বোঝেন না যে এসব ঘটনা একটার সঙ্গে আরেকটা সংশ্লিষ্ট। কিন্তু না বুঝলেই কি তা অসত্য হয়ে যায়? তাই আমার মানতেই হবে, আমাকে নির্যাতনের শিকার যেসব নারী তাঁদের সব কথা খুলে বলেছেন, তা তাঁদের জীবনের সব কথা নয়। আমাকে যা বলা হয়, এবং যা বলা হয় না, দুটো থেকেই আমি অনেক কিছু জানতে পারি। তার মধ্যে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমাদের অঙ্ক করে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলেছে আমার নিজে সাক্ষাৎকার করে দেখা তথ্য। অনেকের মধ্যে আমি একধরনের মানসিক চাপ বা বিষণ্নতার লক্ষণ খেয়াল করেছি। লক্ষ করেছি নিজেদের দায়ী করার প্রবণতা। আজকাল যেভাবে সেলফ-হেল্প বা নিজেকে সাহায্য করার জন্য বই লেখা হয়, মনে হয় আমরা নিজেরাই নিজেদের সব ধরনের সমস্যা সমাধান করতে পারব।
সেটা করতে পারার প্রথম পদক্ষেপ হলো সব দোষ নিজের ঘাড়ে নেওয়া। কিন্তু এটা কি অপরের দ্বারা নির্যাতিতের আবার নিজেকেই নির্যাতিত করার মতো নয়? নিজেকে দোষ দিতে দিতে হয়তো সেখানে আমরা অনেকেই পৌঁছে গিয়েছি। তবে এটাও সত্যি, অনেকেই এমনটি বললেও সবাই তা বলেননি। তিথির কারণ তাঁর সাবেক প্রেমিকের নির্যাতন। অবশ্য তিথি (এবং তাঁর মতো অনেকেই) এটাকে বিষণ্নতার লেন্স দিয়ে দেখছেন না, তাঁকে আমার বিষণ্ন মনেও হয়নি। কারণ, তাঁরা তাঁদের মানসিক অবস্থার কারণ শনাক্ত করতে পারছেন, সেটাকে অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যক্তিগত করছেন না, নিজের হাজারটা দোষ তুলে ধরছেন না। এমনকি কপালের দোষও দিচ্ছেন না। তাঁরা কিছুটা হলেও বুঝতে পারছেন তাঁদের মানসিক চাপ কাঠামোগতভাবে তৈরি হয়েছে। এবং সেই কারণেই, আমার ধারণা, সেটা মানসিক রোগে রূপান্তরিত হচ্ছে না। তবে তাহলে আমরা কি বলতে পারি, মানসিক রোগ হওয়ার আশঙ্কা নির্ভর করে আমরা পৃথিবীকে কীভাবে দেখছি তার ওপর? আমরা কি বলতে পারি, তিথির মতো আমরা আমাদের সমস্যার কারণ শনাক্ত করতে পারলে আমাদের মানসিক চাপ কমবে? হয়তো। আরও গবেষণা করার প্রয়োজন আছে। আরও জানার বিষয় আছে। জানার দরকারও আছে। না জানতে পারলে আমাদের সবার হয়ে যেতে হবে ওঁদের মতো, যারা কেমন উদাস, যেন পৃথিবীতে কিছুই আসে-যায় না। সম্প্রতি ধর্ষণের শিকার এই নারীর কী হবে, আমরা জানি না। তবে এটা জানি, তাঁর মানসিক রোগ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাঁকে সাহায্য করার উপায় অবশ্য আমাদের আছে। তাঁর সমালোচনা না করে আমরা তাঁকে একটু হলেও শান্তি দিতে পারি। আমাদের উচিত হবে তাঁকে (বা যেকোনো ধর্ষণের শিকার নারীকে) অবান্তর প্রশ্ন না করা। তিনি কেন ওই লোকের মনে কী ছিল তা বুঝতে পারেননি, সেটা নিয়ে প্রশ্ন না করলেও খুব ভালো হয়। আরও ভালো হয়, তাঁর পোশাক কী ছিল, সে ধরনের প্রশ্ন না তোলা। সবচেয়ে ভালো হয় যদি আমরা তাঁর কথা বিশ্বাস করি। উনি কারোর মা-বোন বলে নয়, তাঁর মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, তিনি দোষ করেননি, অপরের দোষের ভুক্তভোগী তিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজনের ওপর করা অবিচার আসলে জনগণের জন্যই অবিচার।
নাদিন শান্তা মুরশিদ: সহকারী অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফালো, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক

সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই সময় by শিশির ভট্টাচার্য্য

২০২৪ সালের আগেই নাকি বাংলাদেশের কপালে উন্নত দেশের তকমা লাগতে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে: রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নের সমাধান না করে কোনো জাতি কি কখনো উন্নত হতে পেরেছে? কাগজে-কলমে বাংলা তো বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষাই। কিন্তু কাজির গরু কাগজে আছে, গোয়ালে নেই। যদিও আমলাতন্ত্রে এবং নিম্ন আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বেড়েছে, কিন্তু সরকার ও জনগণের পছন্দের ভাষা যে বাংলা নয়, তা বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রবণতাতেই প্রকাশ পাচ্ছে। একটি বিভাগীয় ক্রিকেট দলের নামও বাংলায় রাখা হয়নি। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং একাধিক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি। শিক্ষা, ব্যবসা, বিচারব্যবস্থা, দেশরক্ষাসহ রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা এখন পর্যন্ত যোগাযোগের বাধ্যতামূলক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। অনেকে এই যুক্তি দিতে পারেন যে আফ্রিকার যেসব দেশের রাষ্ট্রভাষা ফরাসি বা ইংরেজি, সেখানে কি উন্নয়ন হচ্ছে না? প্রথমত, উন্নয়ন টেকসই হচ্ছে কি হচ্ছে না, সেটা বোঝা যাবে আরও কয়েক দশক পরে। দ্বিতীয়ত, আফ্রিকার একাধিক দেশের আর বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতি এক নয়। আফ্রিকার দেশগুলো ইংরেজি বা ফরাসিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছে বাধ্য হয়ে। কারণ, সবার কাছে বোধগম্য এমন কোনো ভাষাগোষ্ঠী বিভাজিত আফ্রিকার দেশগুলোতে নেই। এসব দেশে যারা ফরাসি বা ইংরেজি শিখেছে, উন্নয়নের ননিটুকু তারাই খেয়ে নিচ্ছে। কেউ খাবে তো কেউ খাবে না-এটা কখনোই টেকসই উন্নয়নের মডেল হতে পারে না। এর ফলে আফ্রিকার সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে; অসন্তোষ থেকে অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাস, বোকো হারামের জঙ্গি হাঙ্গামা। প্রথমত, বাংলাদেশের জনগণের প্রায় শতভাগ রাষ্ট্রভাষা বাংলা ব্যবহার করে। এ পরিস্থিতিতে বাংলা কেন বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে ব্যবহৃত হবে না? দ্বিতীয়ত, ইংরেজিকে অবলম্বন করে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন সাধন আদৌ কি সম্ভব? ইংরেজি শিখতে গিয়ে বাংলায় দুর্বল হয়ে বাঙালিরা একেকজন দ্বিভাষী নয়, অর্ধভাষী হয়ে উঠবে-এমন আশঙ্কাই প্রবল। সুতরাং বাংলার দিকেই ঝুঁকতে হবে আমাদের, একান্ত বাধ্য হয়ে। এই সিদ্ধান্ত যত দেরিতে নেওয়া হবে, উন্নয়নও তত দেরিতে হবে। ভাষা পরিস্থিতির অপরিহার্য প্রভাবে বাংলা আগে-পরে বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হয়ে উঠবেই, অনেকটা ইংরেজি যেভাবে ফরাসিকে হটিয়ে ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রভাষা হয়ে উঠেছিল। অতীতে যেসব দেশ জ্ঞানচর্চায় বিনিয়োগ করেছে, শুধু সেই দেশগুলোই উন্নত হয়েছে। জ্ঞানচর্চা শতভাগ ভাষানির্ভর। আমরা যদি পরনির্ভরতা কমাতে জ্ঞানভিত্তিক টেকসই উন্নয়ন চাই, তবে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যম কী হবে। অতীতে গ্রিক, রোমান, ভারতীয়, ইংরেজ ও রুশরা যখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নতির শীর্ষে উঠতে যাচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তারা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? রাশিয়ায় দীর্ঘদিন রুশের তুলনায় ফরাসির গ্রহণযোগ্যতা বেশি ছিল। কিন্তু বিপ্লবের পর অপেক্ষাকৃত দুর্বল রুশকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। চীনা ভাষার অন্তত দশটি উপভাষা ছিল, এখনো আছে। কিন্তু বিপ্লবের পর থেকে ম্যান্ডারিনকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে। যখনই কোনো জাতি অন্যদের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেই জাতি নিজের রাষ্ট্রভাষাকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রিকেরা গ্রিক, রোমানরা ল্যাটিন, ভারতীয়রা সংস্কৃত, আরবরা আরবি এবং ইংরেজরা ইংরেজি ভাষাকে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা করে তুলতে সমর্থ হয়েছে।
অস্ত্র দিয়ে দেশ জয় করা যায়, কিন্তু সেই জয় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একমাত্র ভাষাগত বিজয় দীর্ঘস্থায়ী হয়। ভাষা এমন একটি অস্ত্র, যেটি যত বেশি লোকের দখলে থাকে, ততই তার ক্ষমতা বেড়ে যায়। যখন থেকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে, তখন থেকে চীনারা গ্রিক, রোমান ও ইংরেজ উপনিবেশকদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সারা পৃথিবীতে চীনা ভাষা শিক্ষা দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। সর্বত্র কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট খোলা হচ্ছে। কোটি কোটি ইউয়ান বৃত্তি দিয়ে সারা পৃথিবীর তরুণদের চীন দেশে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে চীনা ভাষা শিখতে। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা বাংলা ভাষা শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করছি। বিদেশিদের পক্ষে বাংলাদেশে এসে (ধরা যাক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে) বাংলা শেখার জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা বা অনাপত্তি সনদ জোগাড় করা সহজ নয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রায়ই তাঁদের হাতে আসে না বলে অনেক সময় পরীক্ষা না দিয়েই বাংলাদেশ ছাড়তে হয় তাঁদের। এই সব ঝামেলা এড়াতে বাংলা শিখতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে না এসে যান পশ্চিমবঙ্গে। ভাষা বা জ্ঞানগত উন্নয়নের সঙ্গে ভৌত উন্নয়নের তফাত আছে। বিদেশি কোনো কোম্পানিকে দিয়ে রাস্তাঘাট, ভবন বা নগরের উন্নয়ন করিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু ভাষা বা জ্ঞানগত উন্নয়ন সাধন করতে হলে কোনো জনগোষ্ঠীর কয়েক দশকের নিরলস প্রস্তুতি ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ শূন্যের কাছাকাছি, সে দেশে জ্ঞানগত উন্নয়নের আকাশকুসুম স্বপ্ন না দেখাই শ্রেয়। সরকার সম্প্রতি বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য প্রায় ১৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এ অর্থ ব্যয় করার উদ্দেশ্যে যে প্রকল্পগুলো বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল হাতে নিয়েছে, সেগুলো সম্পাদন করার উপযুক্ত ভাষাবিজ্ঞানী বাংলাদেশে নেই। যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভাষা গবেষক সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল-যেমন বাংলা একাডেমি, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট-দুর্ভাগ্যজনক হলেও এ কথা সত্য যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কী করণীয় হওয়া উচিত, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সে ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই।
শিশির ভট্টাচার্য্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক

ঢাকা এক অভিভাবক পাবে কবে? by এ কে এম জাকারিয়া

রাস্তায় ও যানজটে বসেই এখন ঢাকাবাসীর বেশি সময় কাটে। মোবাইল ফোন ও ফেসবুকই তখন আমাদের সঙ্গ দেয়। কিন্তু অপেক্ষার বিরক্তি কি আর এতে কাটে! জ্যামে বসে থাকার অসহ্য বিরক্তি আর এই ক্ষোভ জানানোর একটি জায়গাও তাই হয়ে উঠেছে ফেসবুক। কে কোন রাস্তায় কত সময় ধরে আটক আছে, কতক্ষণ গাড়ি এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বা গন্তব্যে পৌঁছাল কত ঘণ্টায়-এসব নিয়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো বন্ধুর স্ট্যাটাস পাই। যানজটে সবাই অস্থির। একমাত্র দেশি-বিদেশি ভিভিআইপিরা এ থেকে ছাড় পান। কারণ, তাঁদের নিরাপত্তার ইস্যু রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের ‘ভিআইপি’ যাঁরা, তাঁদের এ থেকে মুক্তি নেই। তাঁদের অনেকেই অবশ্য আইনকানুন মানা বাদ দিয়েছেন। সবাই যখন যানজটে আটকে আছে, তখন বড় বড় গাড়ি নিয়ে উল্টো পথে তাঁরা রওনা দেন। পুলিশের গাড়িও তাঁদের পাহারা দেয়। তাঁদের ক্ষমতার দাপট আর দম্ভ অসহায় নাগরিকদের চোখ এড়ায় না। তারা কী আর করতে পারে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া ছাড়া! সেখানে সমালোচনা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেই জনগণ তাদের রাগ-ক্ষোভ হালকা করছে। ভিআইপিদের মোটা চামড়া ভেদ করে তা এত দিনে গায়ে লেগেছে বলে মনে হয়। তাঁরা সম্ভবত উল্টো পথে আর যেতে চান না। তাঁরা নিজেদের জন্য রাস্তায় আলাদা লেন চান। অবস্থাটা তাহলে দাঁড়াবে কী? ভিআইপি লেন করা মানে আমাদের রাস্তাগুলো আরও সরু হবে। আমরা যারা সাধারণ জনগণ, তাদের বিপদ আরও বাড়বে, আরও বেশি সময় যানজটে আটকে থাকতে হবে। আর নিজেদের লেন দিয়ে ‘ভিআইপিরা’ চলে যাবেন! প্রস্তাবটি এসেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে। এর পেছনের যুক্তিটি ব্যাখ্যা করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। ‘আমাদের এখানে ভিআইপিদের গাড়ি অনেক সময় উল্টো পথে যায়, এ নিয়ে নানান ঝামেলা হয়।’
ভাবটা এমন যে ভিআইপিদের উল্টো পথে যাওয়া ঠেকাতে হলে তাঁদের জন্য আলাদা লেন করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তাঁকে প্রশ্ন করতে চাই, ভিআইপিরা উল্টো পথে যান কেন? দেশের আইন বা সংবিধান কি তাঁদের সেই অধিকার দিয়েছে? মনে প্রশ্ন জাগে, এমন একটি লেন যদি ঢাকার রাস্তাগুলোতে বানানো হয়, তবে সেই লেনে চলতে পারবেন এমন ভিআইপিদের তালিকায় কাদের কাদের জায়গা হবে? মন্ত্রী-সাংসদদের সঙ্গে সচিব-আমলাদেরও? মন্ত্রী-সাংসদেরা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন, জনগণের সেবা করাই তাঁদের কাজ। আর সচিব ও আমলারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাঁরা যদি ভিআইপি লেন দিয়ে চলাচল শুরু করেন, তাহলে তাঁরা কি আর জনগণের সেবক বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী থাকছেন, নাকি জনগণের সামনে প্রভু হিসেবে হাজির হচ্ছেন! মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যাঁদের মাথা থেকে ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন করার ধারণা এসেছে, তাঁদের উদ্দেশে বলি, ভিআইপি কোনো চিরস্থায়ী বিষয় নয়। মন্ত্রিত্ব, সাংসদ বা আমলাগিরি-সবকিছুরই মেয়াদ আছে। এখন যাঁরা ভিআইপি লেনে চলবেন বলে স্বপ্ন দেখছেন, তাঁরাও কিন্তু একসময় ‘সাধারণ জনগণে’ পরিণত হবেন। তখন ভিআইপি লেনের পাশে যানজটে আটকে থেকে কিন্তু মাথার চুল ছিঁড়তে হতে পারে। একসময় ‘ভিআইপি’ ছিলেন এমন অনেকেই কিন্তু এখন আমজনতার জীবন যাপন করছেন। ঢাকার জনসংখ্যা কত, তার খুব বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নেই। এই সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি পর্যন্ত ধরা হয়। এর মধ্যে ভিআইপির সংখ্যা কত? আর ভিআইপি লেন বানাতে ঢাকার সড়কের কত ভাগ জায়গা লাগবে? যাঁরা এই প্রস্তাব তৈরি করেছেন তাঁরা কি বিষয়গুলো একবারও ভেবেছেন? এক সাংবাদিক বন্ধু ফেসবুকে যানজট নিয়ে তাঁর ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে লিখেছেন, ‘এই শহরের নগর পরিকল্পনাবিদেরা গলায় দড়ি দেয় না কেন?’ যিনি এই মন্তব্য করেছেন, তিনি কতটা হতাশা আর বিরক্তি থেকে তা করেছেন আমরা অনুমান করতে পারি। কিন্তু এর দায় কি নগর পরিকল্পনাবিদদের, নাকি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের? স্থপতি মোবাশ্বের হোসেনের কাছে এই প্রশ্ন রেখেছিলাম। ঢাকা নগরীর বর্তমান দশা ও যানজটে অচল হয়ে পড়া এই নগরী নিয়ে তাঁরও ক্ষোভের শেষ নেই। বললেন, পরিকল্পনায় তো সবই আছে। বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব যাঁদের, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলারা যদি তা না করেন, তবে পরিকল্পনা দিয়ে কী হবে! দুনিয়ার সেরা নগর পরিকল্পনাবিদ দিয়ে পরিকল্পনা করেও কাজ হবে না, যদি সেই পরিকল্পনা নিয়ম মেনে বাস্তবায়ন করা না হয়। এখন হুট করে ভিআইপি লেনের প্রস্তাব এসেছে, এটা কোন নগর পরিকল্পনাবিদের কাছ থেকে এসেছে? ঢাকা নগরীর কত ভাগ জনগণ এর সুফল পাবে? এমন লেন হলে রাস্তা আরও সরু হবে, যানজট আরও বাড়বে। মোবাশ্বের হোসেন অনেক উদাহরণ দিলেন। বললেন, আমরা সবাই জানি ঢাকার যানজটকে সহনীয় পর্যায়ে নিতে হলে কী কী করতে হবে। ব্যবস্থাপনার কাজটি ঠিকভাবে করতে পারলে ঢাকার যানজট অন্তত ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব। ঢাকার ফুটপাতকে এমন করতে হবে, যাতে একজন অন্ধও সেই পথে হাঁটতে পারে। ব্যক্তিমালিকানার হাজার হাজার বাস-মিনিবাসের গণপরিবহন ব্যবস্থা থেকে সরে আসতে হবে। বাস চালাতে হবে একটি-দুটি কোম্পানির মাধ্যমে। ছাল-চামড়া নেই এমন বাসগুলো যাত্রী ওঠাতে যখন প্রতিযোগিতা করে, যেখানে-সেখানে গাড়ি থামায়-তখন সেই শহর যানজটমুক্ত হবে কীভাবে? ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা হয়েছে, সেখানে নানা বিষয় আছে। তার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না অথচ এখন ভিআইপি লেনের কথা বলা হচ্ছে। ঢাকা শহরে বেশ কিছু ফ্লাইওভার হয়েছে।
কিন্তু এগুলো যানজট কমাতে কী ভূমিকা রাখছে? কত শতাংশ মানুষ এর ফল পাচ্ছে? স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন জানালেন, ২ থেকে ৩ শতাংশ মানুষ এর সুফল ভোগ করে। তাঁর ভাষায়, ঢাকা সম্ভবত দুনিয়ার একমাত্র শহর, যেখানে একেকটি ফ্লাইওভার একেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বানিয়েছে। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ গোপনে পরিকল্পনা করে ও বাস্তবায়ন করে। কারণ, এক মন্ত্রণালয় আরেক মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা জেনে গেলে প্রকল্প নিয়ে টানাটানি পড়ে যেতে পারে। এসব উড়ালসড়ক যে খুব বিচার-বিবেচনা ও পরিকল্পনা করে হয়নি, তা এরই মধ্যে আমরা টের পেতে শুরু করেছি। মৌচাক-মগবাজার উড়ালসড়কের কারণে তেজগাঁও-মগবাজার ও রামপুরা-মৌচাক রুটের বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বাতিল হয়ে যেতে পারে। হানিফ ফ্লাইওভারের কারণে মেট্রোরেল যাত্রাবাড়ীর পরে আর সম্প্রসারণ করার সুযোগ থাকবে না। স্থপতি মোবাশ্বের কৌতুক করে বললেন, ‘সরকার ঢাকা শহরকে স্যুট পরাতে চেয়েছে, শার্ট ও কোট নিয়ে চিন্তাভাবনার আগে শুরুতেই টাই পরিয়েছে, আর এখন দেখা যাচ্ছে প্যান্টও নেই। ভাবটা এমন যে প্যান্টের কথা পরে ভাবলেও হবে।’ ঢাকা শহরের সামগ্রিক নগর বা পরিবহন পরিকল্পনায় সমন্বয়হীনতার বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হকের সঙ্গে এ নিয়ে বিভিন্ন সময় অনেক কথা বলেছি। তিনি সব সময়ই সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থার কথা বলেন। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য বহুমাত্রিক গণপরিবহনব্যবস্থার কথা বলেন। কিন্তু সরকারের কাজকর্মে গণপরিবহন বা সাধারণ মানুষ তাদের বিবেচনায় আছে বলে মনে হয় না। ফ্লাইওভার হয়, কিন্তু বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট গুরুত্ব পায় না। ব্যক্তিমালিকানার বাস সার্ভিসের বদলে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালু করা যায় না। গত সোমবার তাঁর সঙ্গে আবারও কথা হলো। ঘুরেফিরে আবার সেই সমন্বয়হীনতার কথা এল। বললেন, ঢাকাকে দেখার একক কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় এই শহর নিয়ে কারও আসলে কোনো দায় নেই। বিমান ওঠানামার জন্য বিমানবন্দর হয়েছে, ঢাকায় লঞ্চ ভেড়ানোর জন্য লঞ্চ টার্মিনাল হয়েছে। কিন্তু এসব জায়গায় যাত্রীরা কীভাবে আসা-যাওয়া করবে, তা দেখবে কে? আসলে আমরা এমন এক ‘উন্নয়ন’ হুজুগের মধ্যে গিয়ে পড়েছি, কে কাকে বোঝাবে যে পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন উন্নয়ন নয়। অবকাঠামো তৈরি করা মানে উন্নয়ন নয়। উন্নয়ন মানে এমন অবকাঠামো বানানো, যা কাজে লাগে। উন্নয়নে বহুমাত্রিকতা লাগে, খেয়াল রাখতে হয় একটি অবকাঠামো যাতে অপরটির পরিপূরক হয়। আর শুধু অবকাঠামো বানালেই হয় না, ঠিকমতো এর ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে অবকাঠামো একটি পরিত্যক্ত বিষয় ও বোঝায় পরিণত হয়। সমন্বিত পরিকল্পনা, গণপরিবহনব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া, একক ও শক্তিশালী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঢাকার উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ-ঢাকার ব্যাপারে এসব পরামর্শ নতুন নয়। সমস্যাটি তাহলে কার? এসব পরামর্শ বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব যাঁদের, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের। কিন্তু ঢাকা কি আদৌ তাঁদের চিন্তার মধ্যে আছে? স্থপতি মোবাশ্বের ক্ষোভ নিয়ে বললেন, ‘একটি সন্তানের যদি ৫৪ জন অভিভাবক হয়, তবে সেই সন্তানের যে দুর্দশা হওয়ার কথা, ঢাকারও তা-ই হয়েছে। ৭ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৫৪ সংস্থা ঢাকার দেখভাল করে। ঢাকার যদি একজন পিতা হতো, তাহলে শহরের এই অবস্থার জন্য তাঁকে আমরা বিচারের মুখোমুখি করতে পারতাম। আমরা এখন কাকে ধরব?’ ৫৪ অভিভাবকের বদলে ঢাকা এক অভিভাবক কবে পাবে? মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকেও ঢাকার রাস্তায় কী করতে হবে সেই পরামর্শ আসে! এমন পরামর্শ বাস্তবায়ন হয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। ঢাকা তো জনগণের নয়, ভিআইপিদের। ঢাকা তবে ভিআইপিদেরই হোক! তাঁরা ঠিকমতো চলতে পারলেই তো হলো। হয় উল্টো রাস্তায় অথবা আলাদা লেনে।
এ কে এম জাকারিয়া: প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক
akmzakaria@gmail.com

ভিআইপি করে দাও, হে দয়াময় by আনিসুল হক

আমাকে খুগুব্য করে দাও, হে দয়াময়। খুগুব্য মানে খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ইংরেজিতে ভিআইপি। এ দেশে এখন রথীন্দ্রনাথ রায়ের মুক্তিযুদ্ধের গান অচল-‘ছোটদের বড়দের সকলের/গরিবের নিঃস্বের ফকিরের/আমার এ দেশ সব মানুষের।’ এই দেশ এখন সবার নয়, এই দেশ এখন খুগুব্য বা ভিআইপিদের। তাঁদের জন্য বাসের ট্রেনের প্লেনের লঞ্চের টিকিট রেখে দেওয়া হয়। এমনকি স্টেডিয়ামের গ্যালারির টিকিটও বেশির ভাগ তাঁরাই পেয়ে যান। সারা রাত যে প্রকৃত ক্রীড়ামোদীরা ব্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে টিকিটের জন্য, সকালবেলা টিকিটের বদলে পায় পুলিশের লাঠ্যৌষধি, তাদের ভেতর থেকেই কিন্তু বেরিয়ে আসে মুস্তাফিজ-মাশরাফিরা। তারা পিঠে লাঠির আঘাত নিয়ে রাস্তার টিভির সামনে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে চেঁচায়।
আর ভিআইপি বক্সে বসে ভিআইপিরা বলাবলি করেন, উইকেট ভেঙে দিলে খেলাটা হবে কোথায়! উইকেট যে ভাঙে, তাকে রক্ষক বলছে কেন? আসলেই তো, রক্ষকেরা কেন ভাঙবেন? কিন্তু তাঁরাই ভাঙেন। ট্রাফিক কানুন ভেঙে উল্টো দিকে গাড়ি চালান। উল্টো দিকে গাড়ি চালালে চাকা ফাটিয়ে দেওয়ার যন্ত্র বসানো হলো একবার, ধরা খেলেন ভিআইপিরা। রক্ষক যদি ভক্ষক হয়, কে করিবে তবে রক্ষা। আর এই দেশে ভিআইপিদের সংখ্যা-বিস্ফোরণও ঘটে গেছে। গিনেস রেকর্ড বইয়ে আমাদের নাম ওঠা উচিত, সর্বোচ্চসংখ্যক ভিআইপির জন্ম দিয়েছে স্বর্ণপ্রসবিনী দেশমাতা। রাস্তায় সাইরেন বাজছে, বিশেষ হর্ন বাজছে, পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে বাকিদের শাসাচ্ছে-ওরে আমপাবলিক, সর, সর, সরে দাঁড়া, আমপাতা জোড়া জোড়া. মারব চাবুক চলবে ঘোড়া। চাবুক পাবলিকের পিঠেই মারব। ভিআইপি-বহরের সান্ত্রিদের চোখ এত গরম থাকে যে ডিমে নজর পড়লে ওই ডিম সেদ্ধ হয়ে যাবে। ভিআইপিরা যে উল্টো দিকে চলেন, ভিআইপিরা যে রাস্তার মানুষদের দুর্ভোগের কারণ হন-এটা কি চলতে দেওয়া উচিত। সমস্যার চমৎকার সমাধান বের করা হয়েছে, ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন। আমেরিকায় কিন্তু আছে। ইমার্জেন্সি লেন। প্রধানত পুলিশদের জন্য; অ্যাম্বুলেন্স, দমকলের জন্য। কোনো বিপদ হলে সাধারণ নাগরিকদের বাঁচাতে ছুটে যান তাঁরা।
ওই লেনকে অবশ্য কেউ ভিআইপি লেন বলে না। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হবেন যিনি, তিনি সকালবেলা হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় পাউরুটি কেনেন, ইউরোপে অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রিপুত্ররা দ্রুত গাড়ি চালিয়ে জরিমানা খান। আমাদের দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ অগণন ভিআইপির চাপে ত্রাহি ত্রাহি করে। আমাদের দেশে যদি রাস্তাঘাট উন্নত হতো, পর্যাপ্ত হতো, তাহলে জরুরি সার্ভিস লেন দুপাশে রাখা যেত। যে দেশে মহাসড়কে গরুগাড়ি চলে, ফুটপাতে দোকান বসে এবং গাড়িঘোড়া উঠে পড়ে, সে দেশে সার্ভিস রোডের স্বপ্ন যিনি দেখেছেন, তাঁকে আকাশকুসুম পদক দেওয়া হোক। যিনি ভিআইপি লেনের স্বপ্ন দেখেছেন, তাঁকে বলব, দুবাইতে উড়ন্ত ট্যাক্সি সার্ভিস হচ্ছে, ভিআইপিদের জন্য সেসব এই দেশে নিয়ে আসুন। ভিআইপিরা অতি গুরুত্বপূর্ণ, আমরা তাঁদের মাথার ওপরেই দেখতে চাই, আমাদের অচল লেনের পাশে ছুটে গেলেও তাঁরা তো একই সমতলেই থেকে যাবেন। তাতে তাঁদের আসল গৌরব দেখানো যাবে না। আমরা অবশ্যই জানি, এই দেশের অগ্রাধিকার সব বাই দ্য ভিআইপিজ, অব দ্য ভিআইপিজ, ফর দ্য ভিআইপিজ।

ইসরাইলি আগ্রাসনের জবাব দিল সিরিয়া

ইহুদিবাদী ইসরাইলের নতুন আগ্রাসনের জবাব দিয়েছে সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট। আজ বুধবার সকালে ইসরাইল থেকে ছোঁড়া কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে সিরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল আল-ইখবারিয়া জানিয়েছে, রাজধানী দামেস্কের কাছে জামরাইয়া এলাকায় অবস্থিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেন্দ্রকে লক্ষ্য করে আজ সকালে ইহুদিবাদী ইসরাইল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। কিন্তু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই সিরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। ইসরাইলের যুদ্ধবিমান থেকে সিরিয়ার গবেষণাকেন্দ্র লক্ষ্য করে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছিল। ইহুদিবাদী ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অধিকৃত গোলান মালভূমি পরিদর্শনের পরপরই এ হামলা চালানো হয়। গোলান পরিদর্শনের সময় নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তেল আবিব প্রস্তুত রয়েছে এবং কেউ যেন বিষয়টি পরীক্ষা করে না দেখে।’ এর আগে, ইসরাইলের যুদ্ধমন্ত্রী লেবাননের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের হুমকি দিয়েছেন।

তালেবানের ওপর সবচেয়ে বেশি ওজনের বোমা নিক্ষেপ বি-৫২ বিমানের

সম্প্রতি আফগানিস্তানের তালেবানদের ওপর বোমা নিক্ষেপে নতুন রেকর্ড করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান বি-৫২ । বোমারু বিমানটি সবচেয়ে বেশি ওজনের বোমা বহনে নতুন এ রেকর্ডটি করেছে।
সিএনএন’র তথ্যমতে, মার্কিন বিমান বাহিনী জানিয়েছে, ৯৬ ঘণ্টার অপারেশনে বি-৫২ বিমানটি তালেবান বাহিনীর ওপর ২৪টি গাইডেড বোমা নিক্ষেপ করে। তালেবান অর্থের উৎসস্থল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সাপোর্ট নেটওয়ার্কের ওপর এ হামলা চালানো হয়। মার্কিন বি ৫২ বোমারু বিমানের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মিশন পরিচালনা করার রেকর্ড রয়েছে। গালফ ওয়ারের সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি বি-৫২ ইরাকে উড়ে গিয়ে হামলা করে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায়। সে সময় বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার মাইল উড়েছিল।

লাল বালতিতে ছোট, সবুজটিতে বড় ছেলের লাশ!

‘ক্ষেতের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে স্ত্রী ও সন্তানের খোঁজ করি। পরে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করি। সেখানে বাথরুমের লাল বালতির ভেতরে ছোট সন্তান রুমানের লাশ ও বড় সবুজ বালতিতে বড় ছেলে মারুয়ানের লাশ দেখতে পাই’। এভাবেই দুই সন্তানের লাশ উদ্ধারের কথা জানালেন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের কোনাউড়া-নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা বাবা কবির আলী।
মঙ্গলবার রাতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, বাথরুমে দুই সন্তানের লাশের পাশে বালতির ওপর স্ত্রী রনি বেগমকে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি বলেন, লাল বালতির ওপর থেকে রনি বেগমকে সরিয়ে দেখেন ভেতরে ছোট সন্তান রুমানের লাশ ও বড় সবুজ রঙের বালতির ভেতরে ঢাকনা খুলে তিনি বড় সন্তান মারুয়ানের লাশ পান। এ ব্যাপারে থানার এসআই রফিকুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার বিকালে সিলেটের বিশ্বনাথে দুই শিশুসন্তানকে হত্যার পর মা ডেটলপানে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। নিহত দুই শিশু তিন বছর বয়সী নাহিদুল ইসলাম মারুয়ান ও ১৮ মাস বয়সী ওয়াহিদুল ইসলাম রুমান। এদিকে এ ঘটনায় দুটি বালতি, একটি ডাকনা ও একটি কলস জব্ধ করেছে পুলিশ। লাশ দুটি ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার দুপুরে বাড়িতে নেয়া হয়েছে। আর রনি বেগম সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শিশু দুটিকে হত্যার পর মা রনি বেগম আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তবে কী কারণে শিশু দুটিকে হত্যা করে মা আত্মহত্যার চেষ্টা করেন এ বিষয়টি এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। এসআই আরও বলেন, শিশুদের বাবা কবির আলীর কাছ থেকে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মা রনি বেগমের জ্ঞান ফেরার পর ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।

গাজায় যে কোনো সময় ইসরাইলি আগ্রাসন, প্রতিরোধে প্রস্তুত হামাস

দখলদার ইসরাইলি বাহিনী যে কোনো মুহূর্তে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় সামরিক আগ্রাসন চালাতে পারে। এ আগ্রাসন মোকাবিলায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংস্থা হামাসসহ গাজার অধিবাসীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত আরবি পত্রিকা আল-হায়াতের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসসহ ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংস্থাগুলোর হামলার সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ বলে আশঙ্কা করছে। তারা মনে করছে, কয়েক দিন অথবা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরাইল এ আগ্রাসন শুরু করতে পারে। একই ধরনের প্রতিবেদন ছাপিয়েছে ইসরাইলি পত্রিকা হারেৎজ।অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি বলেছে, হামাসের গাজা উপত্যকার প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার মনে করছেন ইসরাইলের পরিকল্পিত হামলা খুব নিকটবর্তী। সূত্রটি দাবি করেছে, তিনি নিজে ইয়াহিয়া সিনওয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। আল-হায়াত পত্রিকা বলছে, হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জেদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেড গাজা উপত্যকায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে। এছাড়া, হামাস সদস্যদের ঘর-বাড়ি খালি করা হয়েছে। তবে হারেৎজ পত্রিকা বলছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ ধরনের সামরিক সংঘাতের আশংকা নেই। শিগগিরি ইসরাইল হামলা শুরু করতে পারে -এমন খবরকে হামাসের প্রচারণা বলে মন্তব্য করেছে পত্রিকাটি। হারেৎজ বলছে, গাজার মারাত্মক মানবিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হামাস এ ধরনের প্রচার চালাচ্ছে। গাজা উপত্যকার ওপর সর্বশেষ ২০১৪ সালের জুলাই মাসে আগ্রাসন চালিয়েছিল ইসরাইল। ওই আগ্রাসনে ২২০০ ফিলিস্তিনি শহাদাত বরণ করেন।

১০০ বছর পরও পুরুষের সমান হয়নি নারী

এখন থেকে ১০০ বছর আগে ভোটাধিকার অর্জন করে ব্রিটেনের নারীরা। তবে ১০০ বছর পরও দেশটিতে নানা ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার পায়নি নারীরা। নারীর সম-অধিকার এক ধরনের মায়াই রয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি নারীর যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে নারীজাগরণ তৈরি হয়েছে, তা নারীর সম-অধিকারের ধারণাক নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। নারীর ভোটাধিকার প্রাপ্তির ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এএফপিকে এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন এক খ্যাতনামা নারীবাদী লেখিকা। প্যারিসের দিদারাত ইউনিভার্সিটির উইমেনস হিস্টরি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডি বিভাগের অধ্যাপক মারিয়াম বোসাহবা। ব্রাভার্দ বলেন, ‘এটা মূলত নারীর সম-অধিকারের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা। ভোটাধিকার নারীকে আনুষ্ঠানিক অধিকার দিয়েছে।
তবে এখন নারীর প্রকৃত সম-অধিকারের প্রশ্ন সামনে আসছে।’ ব্রিটিশ নারীদের ভোটাধিকার দেয়া দ্য রিপ্রেজেনটেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্ট নামের আইনটি গৃহীত হয় ১৯১৮ সালের ৬ ফেব্র“য়ারি। এ আইন অনুসারে ত্রিশোর্ধ্ব সম্পদশালী নারীরাই ভোট দিতে পারতেন। একই আইনে পুরুষদের বয়স ৩০ থেকে ২১ করা হয়। ব্রিটেনকে অনুসরণ করে একই বছর অস্ট্রিয়া ও জার্মানিও নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে। তবে নারীদের ভোটাধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথম দেশ নিউজিল্যান্ড। ১৮৯৩ সালে এ মর্মে আইন পাস করে দেশটি। আদিবাসী নারীদের বাদ দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নারীরা এ অধিকার পায় ১৯০২ সালে। ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ১৯০৬ সালে ফিনল্যান্ড এ উদ্যোগ নেয়। ব্রিটিশ নারীরা ১০০ বছর ধরে ভোট দিলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে তারা এখনও সংখ্যালঘু।

তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে একজন শিশু

বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন এক লাখ ৭৫ হাজার শিশু নতুন ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করে। এর অর্থ প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন শিশু প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট জগতে প্রবেশ করছে। পৃথিবীজুড়ে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে একজন শিশু। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটি বলছে, প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক শিশু যেমন প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট জগতে আসছে, একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহার তাদের জন্য নানাবিধ ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে - ক্ষতিকারক বিষয়ের দিকে আসক্তি তৈরি হওয়া, যৌন হয়রানির শিকার কিংবা নিজের ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হয়ে যাবার ঝুঁকি। ইউনিসেফ বলছে, প্রতিদিন এতো বিপুল সংখ্যক শিশু যখন অনলাইন জগতের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে তখন তারা নানা ধরনের বিপদের মুখোমুখিও হচ্ছে। শিশুদের এসব ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন দেশের সরকার নানা ধরনের নীতি প্রণয়ন করেছে- একথা উল্লেখ করে ইউনিসেফ বলছে আরো অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। ইউনিসেফ মনে করে অনলাইনের ক্ষতিকারক বিষয়বস্তুর হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা দায়িত্ব সকলের উপরই বর্তায়। এক্ষেত্রে সরকার, পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া প্রযুক্তি শিল্পের ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রয়েছে ইউনিসেফ উল্লেখ করেছে। শিশুরা নিজেদের নিরাপদ রেখে কিভাবে অনলাইন ব্যবহার করতে পারে সেটি শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন। সূত্র: বিবিসি

বিশ্বে দুর্নীতির শীর্ষে সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ সুইজারল্যান্ড, এর পর যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক নামে একটি অ্যাডভোকেসি গোষ্ঠী নতুন এ সূচক প্রকাশ করেছে। খবর আরটি অনলাইন। করস্বর্গ ও অফশোর আর্থিক কেন্দ্র বিবেচনায় নিয়ে দুর্নীতির এ সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে।
দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রয়েছে কেম্যান আইল্যান্ডের নাম। ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ফিন্যান্সিয়াল সিক্রেসি ইনডেক্সের ২০১৮ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। গবেষণা বলছে, বর্তমানে সুইজারল্যান্ড ট্যাক্স হেভেন দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে। পাশাপাশি এ দেশ বিশ্বের সর্ববৃহৎ অফশোর আর্থিক কেন্দ্র। ১১২ দেশের তালিকায় চারে আছে হংকং, পাঁচে সিঙ্গাপুর, ছয়ে লুক্সেমবার্গ। তালিকায় ভারত ৩২তম অবস্থানে থাকলেও নেই বাংলাদেশের নাম। সুইজারল্যান্ডকে করস্বর্গ ও অফশোর অর্থ লেনদেনের জনক বলা হয়।

দেশে তৈরি হবে মোবাইল

চলতি বছরের জুনের মধ্যে বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন সেট উৎপাদন শুরু হবে। নবনিযুক্ত ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে সম্প্রতি সৌজন্য সাক্ষাতে এসে এমন তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন আমদানিকারক সমিতি (বিএমপিআইএ)। সংগঠনটির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনে সরকার এখন অনেক সুবিধা দিচ্ছে।
সে জন্য এসব সুবিধা নিয়ে বিশ্বের নামকরা ব্র্যান্ডের সেট দেশে তৈরি ও রপ্তানি করার পরামর্শ দেন মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। মন্ত্রী বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে ফোর–জি মোবাইল হ্যান্ডসেট দেশের মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। সরকার মোবাইল ফোনের নিবন্ধন তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ শুরু করেছে। ফলে দেশে অবৈধ হ্যান্ডসেট আমদানি বন্ধ হবে। বিএমপিআইএর সভাপতি রুহুল আলম আল মাহবুব, সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শহীদসহ সমিতির সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বিএমপিআইএর নেতারা মন্ত্রীকে জানান, বিএমপিআইএ ইতিমধ্যে নিজস্ব খরচে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সহযোগিতায় মোবাইল ফোনের তথ্যভান্ডার তৈরির প্রাথমিক কাজ শেষ করেছে।