Monday, September 19, 2016

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি

একুশ শতকে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি নির্ভর করে মূলত সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের ওপর। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে শিক্ষিত যুবকদের নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য করার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর, জাপান, চীন, তাইওয়ান ও কোরিয়ায় অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবসমাজ মুখ্য ভূমিকা রাখছে। আমাদের গ্যাস ছাড়া তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, মানবসম্পদই আমাদের বড় সম্পদ। এই মানবসম্পদই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। ১৯৭১ সালে দেশটি যখন স্বাধীন হয়, তখন মাত্র ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এখন আছে ৩৮টি। সরকার উচ্চশিক্ষাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি অনুদানের পরিমাণ ক্রমাগতভাবে কমতে থাকায় ভবিষ্যতে বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হবে না। অন্যদিকে ১৯৯৩ সালে ১৪৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮৫। ২৩ বছরের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে: বর্তমানে সংখ্যাটি তিন লাখের বেশি। ভবিষ্যতে আরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান উন্নত নয়, আন্তর্জাতিক মানের নয়।
এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। নইলে এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেমে যাবে; বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনে সক্ষম না-ও হতে পারে। কাজেই উচ্চশিক্ষা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত সনাতন পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তন নিয়ে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে। আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। আমি পাঠদান শুরু করি অসচেতনভাবে শিক্ষাগুরুদের পাঠদান রীতি অনুকরণ করে, বেশির ভাগ নবীন শিক্ষক যেভাবে শুরু করেন। এটা বলা যায় যে সনাতন পাঠদান পদ্ধতি একুশ শতকের জন্য উপযুক্ত গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারছে না, গ্র্যাজুয়েটরা কর্মজীবনে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করছেন না। শিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তক থেকে পড়ানো নয়, কিংবা শ্রেণিকক্ষে শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষকের কথা শোনা নয়। প্রশ্ন-উত্তর পর্ব না থাকায় এবং পাঠদান পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে শিক্ষকনির্ভর হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী শক্তি অর্জনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। বর্তমানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকেন।
শিক্ষক তাঁর ক্লাসের শিক্ষার্থীরা কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্বল ও কোন কোন ক্ষেত্রে শক্ত তা ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করে থাকেন। ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্টের জনপ্রিয় টেস্টগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি যেমন (১) কনসেপ্ট টেস্ট, (২) পোর্টফলিও এবং (৩) মাডি টেস্ট। একটি কথা বলা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। শিক্ষকেরা ছাত্র পড়ানোর জন্য বেতন পান, কিন্তু আমাদের অনেকেই আর্থিক প্রাপ্তি ছাড়াই গবেষণার কাজে বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে থাকেন। অধ্যাপকেরা তাঁদের গবেষণার ক্ষেত্রে প্রাপ্ত নতুন ধ্যানধারণা নিয়ে দারুণ উৎসাহ দেখিয়ে থাকেন, পক্ষান্তরে তাঁদের পাঠদান-সম্পর্কিত নতুন পদ্ধতি নিয়ে মোটেই আগ্রহ দেখাতে দেখি না। এ অবস্থার পরিবর্তন হতে হবে। শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ই পঠিত বিষয়বস্তু নিয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে থাকেন। গ্রুপ ওয়ার্ককে উৎসাহিত করা হয়। তবে বড় আকারের ক্লাসে শিক্ষকের পক্ষে ক্লাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে—বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতিতে এক শিক্ষার্থী বিষয়বস্তু বোঝার ব্যাপারে অন্য শিক্ষার্থীর ওপর নির্ভর করেন না। কিছু শিক্ষার্থী এই পদ্ধতি পছন্দ করতে পারেন। আমরা দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পারি। আমরা ক্লাস টেস্ট এবং এক বা দুটি পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে কোর্সে শিক্ষার্থীদের গ্রেড নির্ধারণ করে থাকি।
পরীক্ষার খারাপ দিক নিয়ে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হয়। ফলে তাঁদের মুখস্থনির্ভর হতে হয়। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, উত্তরের জন্য সময় নির্ধারণ বিষয়টি শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায় না, এটা প্রশাসনিক বিষয় হতে পারে। মূলত প্রশাসনিক সুবিধা ও নকল করাকে কঠিন করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়ে থাকতে পারে। পরীক্ষার প্রশ্নগুলো কোর্স শিক্ষক প্রণয়ন করে থাকেন, তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে প্রস্তুত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। ওপেন বুক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করতে হয় না, তবে সময়ের সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। কোন প্রশ্নের উত্তর কোন বইয়ের কোন অংশে পাওয়া যাবে, তা জানা না থাকলে বিভিন্ন বই ঘাঁটাঘাঁটিতে সময় নষ্ট হয়। অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা অনেক সময় পান এবং উত্তরের জন্য তাঁদের মুখস্থনির্ভর হতে হয় না। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে চিন্তাভাবনা করার সময় পান, বিভিন্ন সোর্স থেকে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন এবং সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণ করার সময় পান। ফলে বিশ্লেষণ ও উদ্ভাবন করার ক্ষমতা অর্জন করতে থাকেন। উল্লেখযোগ্য ত্রুটি হচ্ছে,
অনেক শিক্ষার্থী সমাধানের চেষ্টা না করে অন্য কোনো শিক্ষার্থীর সমাধান নকল করেন। এসব কারণে প্রজেক্টের মাধ্যমে মূল্যায়নের পদ্ধতি দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতির চারটি স্তম্ভ হচ্ছে আধুনিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, ই-সার্ভিস ও ডিজিটালাইজেশন। শিক্ষার সব স্তরে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইংরেজি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাতির স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য বাংলা ভাষা ও অন্য বৈশিষ্ট্যগুলো শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিফলিত হতে হবে। বেশিসংখ্যক মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের কোর্স প্রতিটি প্রোগ্রামে পড়াতে হবে, এসব কোর্স শিক্ষার্থীদের সমাজসচেতন করে এবং বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা দেয়। শিক্ষা পদ্ধতিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। উন্নয়নশীল ও অধিকাংশ উন্নত দেশ সনাতন শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করে Outcome Based Education (OBE) গ্রহণ করেছে। মনে রাখতে হবে,
শিক্ষা একটি বিমূর্ত বিষয়, এর ধারণা গতিশীল। শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। মাত্র ৭১৯ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটারের দেশ সিঙ্গাপুর ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে আলাদা হওয়ার পর ৫০ বছরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অকল্পনীয় উন্নতি সাধন করেছে। দেশটি তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রারম্ভিক পর্যায়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল-কলেজের আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়েছে; এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে। সিঙ্গাপুর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতিটি পর্যায়ে বিদেশি শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েছে। ধীরগতির শিক্ষার্থীদের জন্য চার বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের বিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে। কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শিক্ষাধারা প্রবর্তন করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদহীন এই দেশটি এখন প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতা বজায় রাখার জন্য জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতি গড়তে সচেষ্ট। আমাদেরও অর্থনৈতিক উন্নতির স্বার্থে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাদান পদ্ধতি যুগোপযোগী করার সময় এসেছে।
এম এম শহিদুল হাসান: উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ঢাকা, বাংলাদেশ।
vc@ewubd.edu

বাণিজ্যিক ভবনে সবজি চাষ

বিষয়টি অবাক করার মতোই বৈকি! ভবনের ভেতরে গাছ নিয়ে অনেক গবেষণা কিংবা লেখালেখি হয়েছে। এমনকি বাস্তবিক অর্থে এমন অনেক নির্মাণের উদাহরণও দেখা যায় আমাদের দেশের স্থাপত্য ভাবনায়, যার শুধু বাইরের আবরণীতেই সবুজ গাছ শোভা পায়। তবে একবার ভেবে দেখুন তো—আপনি যে অফিসে বসে দিন-রাত কাজ করছেন, তার সভাকক্ষের ওপরে ঝুলে আছে লাল টমেটো, অভ্যর্থনাকক্ষে শোভা পাচ্ছে বাঁধাকপি কিংবা ফুলকপি কিংবা অফিসে ঢোকার সময় দেখতে পেলেন ধানগাছের বাতাসে দোল খাওয়ার দৃশ্য, সতেজ চিচিঙা আর করলা ঝুলে আছে আপনার টেবিলের পাশের দেয়ালেই। অবাক হওয়ার মতোই বিষয় নয় কি? আর অবাক করা কাজটিই বাস্তবে করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘কোনো ডিজাইনারস’, যাদের নকশা এবং তত্ত্বাবধানে জাপানের রাজধানী টোকিওতে নির্মিত হয়েছে নয়তলাবিশিষ্ট ‘পাসোনা আরবান ফার্ম’ প্রতিষ্ঠানটি। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবনের কাজের ফাঁকে কর্মীদের প্রকৃতির স্পর্শ দেওয়া, বিভিন্ন ঋতুতে বৈচিত্র্যের সমাবেশ ঘটানো। সেই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানকার কর্মীরা ভবনে উৎপন্ন সতেজ শাকসবজি দিয়েই তাঁদের প্রতিদিনকার সকাল কিংবা দুপুরের বেশির ভাগ খাবার সারেন, এমনকি অতিথিদেরও আপ্যায়ন করা হয় এসব দিয়ে।
৫০ বছরের পুরোনো প্রায় ১৯ হাজার ৯৭৪ বর্গমিটারের (৪৩ হাজার বর্গফুট) ভবনটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দুই শতাধিক প্রজাতির শাকসবজি আর ফুল-ফলের গাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে, যা থেকে প্রতিদিন এই অফিসের কর্মীরা নির্ভেজাল খাদ্যের জোগান পাচ্ছেন। অফিসের সব কর্মীকেই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। স্থাপনাটি নির্মাণে স্থপতি ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিরলস কাজ করেছেন একদল অভিজ্ঞ কৃষিবিদ। অফিসের ভেতরে এই ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও আলো-বাতাস নিয়ন্ত্রণ করে। শক্তির অপচয় কমানোর ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে আলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো সাধারণের থেকে প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ কম শক্তিসম্পন্ন। আর এর জন্য অফিসের সবাইকে বিশেষভাবে স্থাপত্য-কৃষি জ্ঞানের ওপর সমন্বয়িক অভিজ্ঞতা রাখতে হয়, পরিবেশ ঠিক রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হয়, এমনকি সবাইকেই কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করতে হয়। এখন তাঁরা কাজ করছেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ভবনটিতে কর্মরত সবারই দিনের বেশির ভাগ খাদ্যের জোগান হচ্ছে, তেমনি এর কারণে কর্মীদের যাতায়াতের খরচ কমিয়ে যানবাহন ব্যবহার ও শক্তির অপচয় কমানো হয়েছে। ভবনটিতে যৌথভাবে মাটিবিহীন (হাইড্রোফোনিক) ও মাটিতে ফসল উৎপাদনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে আসা জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি–বিষয়ক পিএইচডি গবেষক সবুর তালুকদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এ উপায়গুলো খুব সহজেই আমাদের দেশে ব্যবহার করা যেতে পারে।
দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব কম খরচেই তা করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন মনমানসিকতার পরিবর্তন আর নিজস্ব কিছু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, আর এ ক্ষেত্রে হাইড্রোফোনিক ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে আমাদের মাটির উর্বরতার কারণেও খুব কম সময়ে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারি। এবার চোখ ফেরানো যাক আমাদের দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ বড় বড় শহরের অফিস ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর দিকে। কম করে হলেও এসব জায়গায় বাণিজ্যিক ভবনের উচ্চতা ছয়তলার কম নয়। এগুলোর রয়েছে সুবিশাল ছাদ, পার্কিং ব্যবস্থাপনা ও বিস্তর কাচ দিয়ে ঘেরা বহিঃআচ্ছাদন, যেখানে বেশির ভাগ স্থাপনার প্রায় ৬০ শতাংশের বেশিই আচ্ছাদিত, প্রায় ১০-১৫ শতাংশ মাটি বা সবুজ অংশ। অনেক ভবনে সবুজের পরিমাণ এর থেকেও কম, যে কারণে ভবনের ভেতরে বিশুদ্ধ বাতাস প্রবাহের বড়ই অভাব। এমতাবস্থায় শহরের সবুজের পরিমাণও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। আমরা যদি স্বেচ্ছায় স্থপতি, প্রকৌশলী ও কৃষিবিদের সাহায্য নিয়ে অন্তত নিজেদের প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ আরবান ফার্মিংয়ের কাজ শুরু করে দিতে পারি, তাহলে অচিরেই আমাদের বসবাসের অনুপযোগী শহরকেও পৃথিবীর বুকে সব থেকে স্বাস্থ্যসম্মত বসবাসের উপযোগী সবুজ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।
আমাদের স্থপতিরা যেকোনো নকশা প্রণয়নে প্রয়োজনবোধে কৃষিবিদের নিয়ে (যাঁরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ খাদ্য কিংবা সবুজ উৎপাদনে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ) টিম গঠন করতে পারেন। সেই সঙ্গে নতুন ও পুরোনো স্থাপনার ক্ষেত্রে বর্তমানের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায়ও বিশেষ একটি অনুচ্ছেদ সংযোগ করা যেতে পারে—এসব ক্ষেত্রে স্থাপনার কাঠামো, সময় ও ধরন হিসাব করে যেখানে অভ্যন্তরীণ ফ্লোর এরিয়া রেশিওতে কতটুকু কৃষি উৎপাদন কিংবা সবুজের সমারোহ সম্ভব, সেটি উল্লেখপূর্বক তার উপযোগিতা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অসদুপায় অবলম্বন করা না হয় এবং নির্মাণাধীন স্থাপনাতে সঠিক মনিটরিং থাকতে হবে। শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বাসা কিংবা অফিসে সময় কাটাতে একপ্রকার বাধ্য হন। শরীর ও মনের ওপর এর প্রভাব তাঁদের কর্মক্ষমতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। তা ছাড়া, বাণিজ্যিক ভবন ও অফিসগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতির ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। তাই আমরা যদি বাণিজ্যিক অফিস ভবনগুলোতে সাধারণ নিয়মে অথবা হাইড্রোফোনিক উপায়ে সবজি চাষ করতে পারি, সেটা আমাদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হবে, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায়। আর এমন মনোভাব ও ইচ্ছাশক্তিই হয়তো বদলে দেবে আমাদের শহরগুলোকে দূষিত এবং অস্বাস্থ্যকর নগরীর দায়ভার থেকে।
সজল চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
sajal_c@yahoo.com

নির্বাচন রিয়েলিটি শো নয়

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় গত শুক্রবার নির্বাচনী প্রচারণা অনুষ্ঠানে
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের সময়
হাততালি দেন তাঁর সমর্থকেরা। ছবি: এএফপি
আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার ধরনের তীব্র সমালোচনা করেছেন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা। তিনি ট্রাম্পের নাম উচ্চারণ না করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট হওয়াটা টেলিভিশনের রিয়েলিটি শো নয়। নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার আগে রিয়েল এস্টেট ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ধনকুবের ট্রাম্প টিভির জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো তারকা ছিলেন। ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফেয়ারফ্যাক্সে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের সমর্থনে এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্ত্রী মিশেল। যুক্তরাষ্ট্রের এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় এই প্রথম কোনো একক সভায় অংশ নিলেন তিনি। সভায় মিশেল ওবামা প্রায় আধা ঘণ্টা বক্তব্য দেন। হিলারির পক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি তাঁর স্বামীর আট বছরের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার বিষয়েও মুখ খোলেন মিশেল। তিনি বলেন, ‘অনেকেই আছেন, যাঁরা গত আট বছরের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করছেন এবং করেই যাচ্ছেন। আবার আমার স্বামী এ দেশে জন্ম নিয়েছেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
...আমি বলব, বারাক ক্ষমতায় থাকার সময়ে এসব প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিয়েছেন। তিনি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।’  যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আদৌ যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছেন কি না ট্রাম্প তা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার একেবারে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলে আসছিলেন। এ নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ উঠেছিল। তবে মাত্র গেল বৃহস্পতিবার দলের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ওবামা যুক্তরাষ্ট্রেই জন্মেছেন বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়। পরে এক সভায় ট্রাম্প নিজেও বিষয়টি স্বীকার করে নেন। এর পরপরই গত শুক্রবারের সভায় মিশেল ওবামা কথাগুলো বলেন। সভায় মিশেল বলেন, প্রেসিডেন্ট হওয়াটা টেলিভিশনের রিয়েলিটি শো নয়। প্রেসিডেন্ট হওয়া মানে টুইটারে অপমানসূচক কথা বলা বা অপমান করে ভাষণ দেওয়া নয়। একজন মানুষ একটি দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার অসামান্য দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি পারবে না—এখানে বিচার্য বিষয় এটাই।
ফেয়ারফ্যাক্সে মিশেল ওবামা
মিশেল বলেন, ‘একজন প্রার্থী যদি কথাবার্তায় অসাবধানী হন বা হুমকি দেন, তিনি যদি ভীতি সৃষ্টি করেন বা মিথ্যা কথা বলেন, তাঁর যদি লক্ষ্য পূরণে কোনো স্বচ্ছ পরিকল্পনা না থাকে, যাঁরা দেশের জন্য অসামান্য অবদান রাখেন এমন ব্যক্তিদের অসম্মান করেন; আমি বলে দিচ্ছি—তাঁরা এ ধরনের প্রেসিডেন্টই হবেন। বিশ্বাস করুন, এঁরা এমন ধরনেরই প্রেসিডেন্ট হবেন।’ হিলারির ভূয়সী প্রশংসা করে মিশেল ওবামা সভায় বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনী বাছাইপর্বে জিততে না পারলেও তিনি সবকিছু ছেড়ে যাননি। দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। মিশেল বলেন, ‘আমি বলছি, প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যে গুণাবলির দরকার তা হিলারির আছে। ...আমি সত্যি সত্যি সত্যিই চাই হিলারি প্রেসিডেন্ট হোন।’ এ বছর মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণা বেশ তিক্ততা ও উত্তেজনায় পূর্ণ। এই প্রচারণা থেকে এত দিন বেশ দূরেই ছিলেন মিশেল ওবামা। শুক্রবারের সভার মধ্যে দিয়ে এই তপ্ত নির্বাচনী প্রচারণায় পদার্পণ ঘটল মিশেলের। এর আগে স্বামীর দুবারের নির্বাচনী প্রচারণায় কাছে কাছেই ছিলেন তিনি। তবে সেই লড়াইগুলোতে এবারের মতো এত তিক্ততার সৃষ্টি হয়নি।

নাট্যকার এডওয়ার্ড অ্যালবির প্রয়াণ

এডওয়ার্ড অ্যালবি
পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী প্রখ্যাত মার্কিন নাট্যকার এডওয়ার্ড অ্যালবি (৮৮) গত শুক্রবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। হু ইজ অ্যাফরেইড অব ভার্জিনিয়া উলফ নামে নাটকটি তাঁর লেখা একটি বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম। অ্যালবির দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী জ্যাকব হোল্ডার বলেন, লেখক অসুস্থ ছিলেন। নিউইয়র্কের মোনটকে অবস্থিত বাড়িতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এডওয়ার্ড অ্যালবির জন্ম ১৯২৮ সালের ১২ মার্চ। সমকালীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নাট্যকারদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। প্রধানত হাস্যরসাত্মক নাটক লিখলেও তিনি বিয়ে, ধর্ম, সন্তান লালন ও মার্কিন জীবনযাত্রার নানা অন্ধকার দিক তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। ১৯৫৮ সালে ৩০ বছর বয়সে দ্য জু স্টোরি নাটক লিখে মঞ্চ জগতে আলোচনায় আসেন অ্যালবি। তিনি তিনবার পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন।