Saturday, July 4, 2026
তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণে কোন পথে যাবে আমেরিকা by হাসান ফেরদৌস
১৭ সেপ্টেম্বর ১৭৮৭। ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমেরিকার শাসনতন্ত্র প্রশ্নে জাতীয় সম্মেলন। ঠিক কী চরিত্র হবে নতুন দেশটির—রাজতন্ত্র ফিরে আসবে, নাকি এক নতুন ধরনের প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠিত হবে?
১১৫ দিনের তর্ক-বিতর্ক শেষে সম্মেলনকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। তাঁকে ঘিরে ধরল অপেক্ষমাণ দর্শকেরা। একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডক্টর, কী ঠিক হলো?’
বেন ফ্রাঙ্কলিনের জবাব, ‘প্রজাতন্ত্র, তবে যদি আপনারা একে রক্ষা করতে পারেন।’
৪ জুলাই ২০২৬, আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। ফ্রাঙ্কলিনের সেই সতর্কবার্তা এখন আগের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক অর্থবহ।
এই আড়াই শ বছরে আমেরিকা অনেক চড়াই-উতরাই দিয়ে গেছে। গৃহযুদ্ধ, নাগরিক অধিকারের লড়াই, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ৯/১১, আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ।
কিন্তু কখনোই এই দেশ গণপ্রজাতান্ত্রিক হিসেবে টিকে থাকবে কি না, এমন কোনো সন্দেহ জাগেনি। এখন জাগছে, কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প যেভাবে দেশ শাসন করতে চাইছেন, অনেকে তাকে রাজতান্ত্রিক বা ‘ইম্পেরিয়াল’ নামে অভিহিত করেছেন।
ফরাসি সম্রাট ১৪তম লুই বলেছিলেন তিনিই রাষ্ট্র। অর্থাৎ তিনি যা বলবেন, তা–ই আইন। ট্রাম্প ঠিক তা–ই চাইছেন। কোনো আইন, কোনো প্রচলিত নিয়ম নয়, নিজের কাছে যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই আইন, এ তাঁর নিজের কথা।
এমন ঘটতে পারে, সে বিপদ বিষয়ে ১৯৭৩ সালে সাবধান করেছিলেন ঐতিহাসিক আর্থার স্লেসিঞ্জার। তিনি এই ভেবে ভীত ছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ক্রমে এত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন যে তাঁদের সঙ্গে ফরাসি সম্রাটের বড় কোনো ফারাক নেই।
‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’ কথাটা তখন থেকেই শোনা গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহারে অভিযুক্ত প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রসঙ্গেই কথাটা ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু ‘ইম্পেরিয়াল’ প্রেসিডেন্সি সত্যি সত্যি আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে লন্ডভন্ড করে দেবে, এ কথা সম্ভবত কেউ ভাবেনি।
সেই ভয়ের কথাই বলেছেন নিউইয়র্ক টাইমস–এর ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথান সোয়ান। তাঁদের নতুন বই রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাতে কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলা হয়েছে, ট্রাম্প শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নন, তিনি সর্বময় ক্ষমতাধর এক রাজা। তিনি নিজে তা–ই মনে করেন, পৃথিবীও এখন তাঁকে সেভাবেই দেখছে।
আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিনে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সামনে যে প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, একজন সর্বক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট, না দেশের শাসনতন্ত্র—কে এই দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে?
‘পাহাড়শীর্ষে আলোকোজ্জ্বল নগরী’
প্রেসিডেন্ট রিগ্যান বলেছিলেন, আমেরিকা হচ্ছে পাহাড়শীর্ষে আলোকোজ্জ্বল এক নগরী। ১৯৮৯ সালে তাঁর বিদায়ী ভাষণে তিনি এই আত্মপ্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, ধনজনে ও শৌর্যে সবার সেরা এই দেশ পৃথিবীর মুক্তিপ্রত্যাশী সব মানুষের জন্য একটি ‘খোলা গৃহ’।
আমেরিকা যে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ, এ কথায় কোনো সন্দেহ নেই। তার গণতান্ত্রিক ভিত্তিও সবচেয়ে পুরোনো। মুক্তি ও প্রাচুর্যের আশায় পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ এ দেশে পাড়ি জমিয়েছে। নিজের দেশে কথা বলার অধিকার হারিয়ে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ।
কিন্তু সেই আলোকোজ্জ্বল নগরীর সব বাসিন্দা সমান অধিকার ভোগ করে না। ১৭৭৬ সালে নয় যেমন, তেমনি এখনো নয়।
ইংরেজের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে সাড়ম্বরে যে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ জারি করা হয়, তাতে বলা হয়েছিল ঈশ্বরের সৃষ্ট সব মানুষই সমান। অথচ বেন ফ্রাঙ্কলিন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের দেনদরবারের পর যে শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়, তাতে দেশের লাখ লাখ কৃষ্ণকায় মানুষকে বড়জোর তিন-পঞ্চমাংশ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
১৮৬৫ সালে শাসনতন্ত্রের ১৩তম সংশোধনী গ্রহণের মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও কালো ও বাদামি মানুষেরা দেড় শ বছর পরেও পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক নয়।
আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কালো মানুষেরা এ দেশের সবচেয়ে অনগ্রসর ও দরিদ্র। প্রতি চারজন কালো শিশুর একজন অপুষ্টি ও অনাহারের শিকার। প্রতি চারজন কৃষ্ণকায় পুরুষের একজন তাদের জীবদ্দশায় একবারের জন্য হলেও জেলে গেছে।
কমবেশি একই রকম বৈষম্যের শিকার অশ্বেতকায় অভিবাসীরা। যাদের শ্রম ও মেধায় আমেরিকা বিশ্বে এখন এক নম্বর, তাদের অনেকেই অশ্বেতকায় অভিবাসী। অথচ চলতি মার্কিন প্রশাসনের চোখে কালো অথবা বাদামি এসব অভিবাসী মার্কিন সভ্যতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। যেভাবে পারো এদের খেদাও, চলতি মার্কিন প্রশাসনের এটাই এখন মন্ত্র।
আমেরিকার জনসংখ্যা ক্রমে অশ্বেতকায়-প্রধান হয়ে উঠছে, শ্বেতকায়দের ভীতির সেটাই প্রধান কারণ। বস্তুত, চলতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধরন অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সাল নাগাদ দেশটির জনসংখ্যার বৃহদংশ হবে অশ্বেতকায়।
নিয়ন্ত্রণ হারানোর এই ভয় এ দেশের শ্বেতকায় প্রভুদের মনে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। এর ফলে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই।
এই উদ্বিগ্ন শ্বেতকায়দের কণ্ঠস্বর হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দল। ২০১৭ সালে ভার্জিনিয়ার শারলটসভিলে জ্বলন্ত মশাল হাতে বর্ণবাদী মিছিলে স্লোগান ছিল, ‘ইউ উইল নট রিপ্লেস আস।’ এই ‘ইউ’ হচ্ছে বহিরাগত অশ্বেতকায়। ‘এদের মধ্যে অনেক ভালো মানুষ রয়েছে,’ এমন সাফাই গেয়েছিলেন ট্রাম্প।
বিভক্ত আমেরিকা
আমেরিকার এই রাজনৈতিক মেরুকরণকে যা আরও তীব্রতর করেছে, তা হলো সম্পদের বৈষম্য। তার ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই আমেরিকায় সম্পদ বা অধিকার প্রশ্নে সমতা ছিল না। তবে পরিশ্রম করলে একটা পর্যায় পর্যন্ত ওঠা যায়, এ কথা সত্য ছিল। এখন আর নয়।
আমেরিকা হয়তো এখনো বিশ্বের সেরা দেশ; কিন্তু সেটা কেবল তাদের জন্য যারা ধনী ও ক্ষমতার ভাগীদার। দেশের মাত্র এক শতাংশের হাতে এখন মোট জাতীয় সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ। মাত্র এক ডজন অতিধনীর হাতে রয়েছে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে অধিক সম্পদ, যা বিশ্বের সব উন্নয়নশীল দেশের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি। এদের হাতে শুধু সব সম্পদ নয়, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতাও।
একদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অন্যদিকে সম্পদের পাহাড়সমান বৈষম্যের কারণে অনেক আমেরিকানই নিজের দেশ বিষয়ে হতাশ।
গ্যালপের এক জনমত জরিপ অনুসারে, মাত্র ৩৩ শতাংশ আমেরিকান নিজের দেশ নিয়ে ‘অত্যন্ত গর্বিত’। ‘গর্বিত নয়’ এমন মানুষের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে, বিশেষত যাদের বয়স ৩০-এর নিচে। এই বয়সের ৯০ শতাংশই মনে করে, আমেরিকার চলতি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত তাদের বিপক্ষে।
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাদের ৫৩ শতাংশ মানসিক রোগের শিকার। ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, এ কারণে কোনো দিনই তারা গৃহের মালিক হবে না, এ কথা মনে করে এই বয়সী প্রতি পাঁচজনের একজন।
মামদানির বিদ্রোহ
হতাশ হলেও এ দেশের তরুণ-যুবকেরা হাল ছেড়ে দেয়নি। এই প্রজন্মের সদস্যদের একটা বড় অংশ বলছে, দেশটিকে ফিরে পেতে লড়াইয়ের জন্য তারা প্রস্তুত। আর এই লড়াইটা হবে মূলত রাজনৈতিক।
বিদ্রোহ বা প্রত্যাখ্যান, যা–ই বলি না কেন, তার সবচেয়ে লক্ষণীয় প্রকাশ ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নগরী নিউইয়র্কে। এই শহরের মেয়র বা নগরপিতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জোহরান মামদানি, যেটা প্রচলিত শ্বেত রাজনীতি ও ক্ষমতার প্রতি এক চপেটাঘাত।
মামদানি শুধু একজন অভিবাসী বা বহিরাগতই নন, তিনি অশ্বেতকায় ও মুসলমান। ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য হলেও নিজেকে তিনি একজন ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দেন।
এই দলেরই উপদল হিসেবে গড়ে উঠেছে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা, যারা বাছাইপর্বের সাম্প্রতিক নির্বাচনে যে অভাবিত সাফল্য দেখিয়েছে, অনেকেই তাকে রাজনৈতিক ভূমিকম্প হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ট্রাম্প মামদানি ও তাঁর অনুসারীদের ‘কমিউনিস্ট’ বলে গাল দিয়েছেন। কিন্তু নামের আগে কোনো লেবেল নিয়ে তাঁরা মোটেই উদ্বিগ্ন নন।
মামদানি বলেছেন, ‘সরকারের কাজ তার নাগরিকদের অধিকার, স্বাচ্ছন্দ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ধনতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বুঝি না, আমরা শুধু সরকারকে ব্যবহার করে সেই কাজটাই করতে চাই।’
অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি
আড়াই শ বছর আগে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এ দেশের প্রত্যেক মানুষ সম-অধিকারসম্পন্ন হবে। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। কিন্তু তা পূরণের জন্য লড়াই থেকেও আমেরিকার মানুষ পিছিয়ে থাকেনি। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে আব্রাহাম লিঙ্কন, সেখান থেকে আজকের মামদানি, সেই লড়াইয়েরই অব্যাহত ধারা।
জন্মের ২৫০ বছর পর আমেরিকা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তার সামনে দুটি পথ—একটি শ্বেতনির্ভর, বিভক্ত ও আগ্রাসী। অন্যটি উন্মুক্ত, বহুজাতিক ও জনকল্যাণমুখী।
কোন পথে যাবে সে?
* হাসান ফেরদৌস, সাংবাদিক
- মতামত লেখক নিজস্ব
Monday, June 22, 2026
ইরান দিয়েছে ১২ গোল, যুক্তরাষ্ট্র ২ গোল by হাসান ফেরদৌস
সেই বদ্ধ উন্মাদ ও নরাধমদের সঙ্গেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন ট্রাম্প। কথা ছিল উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়ে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ নতুন সংঘর্ষের কারণ তা বাতিল হয়ে গেলে ট্রাম্প নিজেই জেনেভায় জি-৭ শীর্ষ বৈঠকের এক ফাঁকে কলম নিয়ে সেই চুক্তি করলেন।
প্রায় সব ভাষ্যকারের বিবেচনায় ইরানের জন্য এই চুক্তি—হোক না তা সাময়িক—বিশাল বিজয় এনে দিয়েছে। যুদ্ধ করে ইরান যা করতে পারেনি, পারা সম্ভবও ছিল না, ঠিক সেই অসম্ভবটি সম্ভব হয়েছে। মাত্র ৬০ দিনের জন্য স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকের ফলে ইরানের সমুদ্রসীমায় মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হচ্ছে, সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন নৌসেনা। পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হবে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা। যে বিপুল পরিমাণ ইরানি অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জব্দ করা হয়েছে, তাও ফিরিয়ে দেওয়া হবে। শুধু তা–ই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার ফলে ইরানে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা মেটাতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ‘বিনিয়োগ তহবিল’ গঠিত হবে।
এই স্মারক সমঝোতা অনুসারে, শুধু এই দুই দেশের মধ্যে সব হানাহানি বন্ধ হবে তা–ই নয়, লেবাননে ইসরায়েলি হামলাও বন্ধ হবে। বলা হয়েছে, ইসরায়েল লেবাননের সার্বভৌমত্ব মেনে চলবে, যদিও দেশটি এই চুক্তিপত্রের অংশীদার নয়।
অন্যদিকে ইরান দুটি সুনির্দিষ্ট শর্ত পূরণে সম্মত হয়েছে তারা অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং কখনোই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করবে না এই মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে।
ইরান সব, যুক্তরাষ্ট্র কাঁচকলা
এই চুক্তিতে মোট ১৪টি ধারা রয়েছে। ফুটবলের ভাষায় বলতে হয়, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান দিয়েছে ১২ গোল, যুক্তরাষ্ট্র ২ গোল। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাই বলছেন, এই চুক্তির ফলে ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র আত্মসমর্পণ করল। রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি বলেছেন, হায় হায়, এমন আত্মঘাতী চুক্তি ট্রাম্প কীভাবে স্বাক্ষরে সম্মত হলেন! তাঁর আরেক সমর্থক সিনেটর টেড ক্রুজ বলেছেন, এমন চুক্তিকে সমর্থন করা যায় না। এদের মনোভাবের সারাংশ মিলবে ট্রাম্পের ঘোর সমর্থক নিউইয়র্ক পোস্ট পত্রিকায়, যার প্রথম পাতায় শিরোনাম হলো—এই চুক্তি ইরানকে সব দিয়েছে, আমেরিকা পেয়েছে কাঁচকলা।
ইসরায়েলের মিডিয়া ও রাজনৈতিক নেতারা যা বলেছেন তার তুলনায় এসব সমালোচনা অবশ্য বলতে গেলে নস্যি। ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ‘বিবি’ নেতানিয়াহু ও আমেরিকায় ইসরায়েলি যুদ্ধবাজ লবি। নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন, ট্রাম্পের কাঁধে বন্দুক রেখে ইরান নামক এই ‘বিষধর সাপটি’ (উপমাটি অবশ্য সৌদি বাদশা আবদুল্লার) চিরতরে নাশ করা যাবে। অথচ দেখা গেল, সাপ তো মরলই না, উল্টো তাঁর নিজের লাঠিটিই ভেঙে খানখান। প্রকাশ্যে কিছু বলার ক্ষমতা তাঁর নেই, ট্রাম্প যা বলবেন তার বিরুদ্ধাচরণ করে টিকে থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ক্ষিপ্ত নেতানিয়াহু সহকর্মীদের বলেছেন, এটি ট্রাম্পের চুক্তি, ইসরায়েলের নয়। বেসবলের উপমা ব্যবহার করে তিনি বলেছেন, এই চুক্তির ফলে ইরান ‘হোম রান’ করল। অর্থাৎ তারা যুক্তরাষ্ট্রকে গোহারা হারাল।
অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নেতানিয়াহু চাইলে পুরো চুক্তিটি বানচাল করতে পারেন। তাঁর হাতের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হলো লেবানন। সে বিবেচনা মাথায় নিয়ে নেতানিয়াহুকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক বিবৃতিতে তিনি ইসরায়েলি নেতাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব। তিনি বলেছেন, যে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আপনাদের দেশকে রক্ষা করা হলো, ভুলে যাবেন না তার দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে আমেরিকা থেকে।
কোনো সন্দেহ নেই, যে ফন্দি নিয়ে ট্রাম্প ইসরায়েলকে বগলদাবা করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তার কোনোটাই অর্জিত হয়নি। সুপরিচিত অনুসন্ধানী সাংবাদিক জেরেমি স্কেহিল ‘ডেমোক্রেসি নাও’ পডকাস্টে বলেছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন খুব সহজেই ইরানের বিপ্লবী সরকারকে হটিয়ে তাঁদের পছন্দমতো সরকার ক্ষমতায় বসাবেন এবং সে দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে ইতি টানবেন। বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি।
ইরান যদিও বলছে সে পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না—যে কথা সে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তিতেও বলেছিল—কিন্তু পারমাণবিক শক্তি শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করবে না, সে কথা সে কখনোই বলেনি। হয়তো মেনেও নেবে না। স্কেহিলের কথায়, পারমাণবিক অস্ত্র প্রশ্নে ইরানের প্রতিশ্রুতিকে ট্রাম্প মস্ত এক বিজয় বলে দাবি করছেন বটে, কিন্তু সে কথা তো ইরান ২০১৫ সালে ওবামা আমলের চুক্তিতেই বলেছিল। তাহলে এত অর্থ-অস্ত্র-লোকবল ক্ষয় করে যুদ্ধ কেন? আর হরমুজ প্রণালি তো যুদ্ধের আগে খোলাই ছিল। স্কেহিলের কথায়, এটা একটা ‘ম্যানুফাকচারড ভিক্টরি’ বা কৃত্রিম বিজয় ছাড়া অন্য কিছু নয়।
আরও বিস্ময়ের কথা, একসময় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি বাতিলের জন্য ট্রাম্প গোঁ ধরেছিলেন। এখন উল্টো গান শোনাচ্ছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরানের প্রতিবেশীদের যদি ব্যালিস্টিক মিসাইল থাকে, তাহলে ইরানের কেন থাকবে না? একই কথা পারমাণবিক অস্ত্র নিয়েও বলা যায়, যদিও ট্রাম্পকে সে প্রশ্নে কেউ চেপে ধরেনি।
কেন ট্রাম্প রাজি হলেন
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, যে চুক্তি প্রশ্নে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকেরা, বিশেষত ইসরায়েল, এমন কঠোর নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে, তা জেনেও তিনি কেন এমন চুক্তিতে সম্মত হলেন? স্পষ্টতই প্রধান কারণ রাজনৈতিক। কয়েক মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। জনমত জরিপ থেকে স্পষ্ট, এই যুদ্ধের কারণে অর্থনীতির যে বেহাল অবস্থা, তার জন্য আমেরিকার অধিকাংশ মানুষই ট্রাম্পকে দায়ী করছে। সব আগাম হিসাব-নিকাশে থেকে মনে হচ্ছে, এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি ঠেকানো কঠিন—কঠিন কেন, অসম্ভব—হবে। তবু শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি যুদ্ধের রাশ টেনে ধরলেন। তাঁর বিশ্বাস, হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেই তেলের দাম কমবে, তাঁর ওপর চাপ কমে আসবে।
অন্য কারণ, যা তিনি গত সপ্তাহে জি-৭ শীর্ষ বৈঠকে নিজেই বলেছেন। তাঁর কথায়, আমি চাই না আমার দশা হার্ভাট হুভারের মতো হোক। পাঠকের মনে থাকতে পারে, ১৯২৯-এ যে মন্দাবস্থা আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের ওপর জাঁকিয়ে বসে, ভুল হোক বা ঠিক হোক তার জন্য সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হার্ভাট হুভারকে দায়ী করা হয়। ট্রাম্প ভালো করেই জানেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে সত্যি সত্যি ১৯২৯-সালের মতো অবস্থা হতে পারে। তিনি চান না পৃথিবী তাঁকে হুভারের মতো বাঁকা চোখে স্মরণ করুক।
এই চুক্তি টিকবে তো
বাজি ধরতে হলে বলতে হয়, টেকা-না টেকার সম্ভাবনা ৫০/৫০। ইরান যদি স্মারক সমঝোতার প্রথম ৬০ দিনে বা আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর তার শর্ত পালন না করে তাহলে ফের যুদ্ধ শুরুর আগাম হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। তবে এই চুক্তি ভন্ডুলের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি যে কারণে তা হলো ইসরায়েল ও নেতানিয়াহু। অনেকেই বলছেন, নিজের রাজনৈতিক নিরাপত্তা সুরক্ষার জন্যই নেতানিয়াহু লেবানন প্রশ্নে এই চুক্তির শর্ত মেনে চলবেন না। তিনি লেবানন থেকে সৈন্য সরিয়ে আনার ব্যাপারে আদৌ আগ্রহী নন, এ কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত লেবাননে হামলা বন্ধ করেনি ইসরায়েল। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।
ট্রাম্প যদি এই চুক্তি ইসরায়েলের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে হবে, এমন কথা বলেছেন কট্টরপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।
অন্য কারণ ট্রাম্প নিজে। তিনি যদি ভাবেন এই চুক্তির ফলে তিনি রাজনৈতিকভাবে ঠকে গেলেন, তাহলে যেকোনো মুহূর্তে ‘এই চুক্তি বাতিল’ বলে লাফিয়ে উঠতে পারেন।
যেখানে আশার আলো
এই চুক্তি যদি টিকে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যেতে পারে, ক্রমাগত যুদ্ধ অথবা যুদ্ধাবস্থা থেকে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে পারে।
এই চুক্তি ইরানকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করবে, সে কারণে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও উদ্বিগ্ন। কিন্তু প্রতিবেশী এই দেশের সঙ্গে অব্যাহত উত্তেজনার বদলে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা অনেক বেশি জরুরি, এ কথা উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পেরেছে। আরব আমিরাতের দৈনিক খালিজ টাইমস লিখেছে, এই চুক্তির পর আমরা এখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। বড়সড় যুদ্ধের বদলে আমরা যে এখন শান্তির কথা বলছি, তা সমালোচনার বদলে উদ্যাপন করা উচিত।
যে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিলের কথা এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তার সিংহভাগই আসবে এসব দেশ থেকে। ইরানের অর্থনীতির যে বেহাল অবস্থা, তাতে এই মোটা অঙ্কের টাকা তাদের খুব উপকারে আসবে তাতে সন্দেহ নেই। সে কারণে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের ধারণা, ইরান নিজ থেকে এই চুক্তি ভাঙবে না।
বিগত ৪৭ বছর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কার্যত যুদ্ধাবস্থার মধ্যে থেকেছে। সেই পরিস্থিতি বদলে গেলে শুধু এই অঞ্চলের নয়, সারা বিশ্বেই তার বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। হরমুজ প্রণালির কারণে ইতিমধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকার অর্থনীতিতে বড় রকমের ঘা লেগেছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে এক দশমিক তিন শতাংশে গড়াতে পারে।
এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য নিয়ে এখনো বিস্তর কথা চালাচালি হচ্ছে। সন্দেহবাদীদের সংখ্যাই বেশি, কিন্তু এমন লোকও আছে যারা এই চুক্তিকে ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পাদিত ঐতিহাসিক সমঝোতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাদের একজন হলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, যাকে এই স্মারক সমঝোতার প্রধান রূপকার হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। সেই সফর ও পরবর্তী সময়ে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে একসময়ের এই দুই শত্রু একে অপরের কৌশলগত মিত্রতে পরিণত হয়। সম্ভাবনার অর্থে ইরান চুক্তি তেমন ফলাফল অর্জনে সক্ষম।
অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু ট্রাম্প নিজে একাধিকবার বলেছেন, পৃথিবীর প্রকৃত মহান কোনো দেশ অনন্তকাল অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে থাকে না, থাকতে পারে না। একই কথা বলেছেন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক প্রশ্নে। ‘আমাদের দুই দেশ অনন্তকাল একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।’ যে ট্রাম্প একসময় ইরানকে ধূলিসাৎ করার কথা বলেছিলেন, সেই তিনি যে শান্তির কথা বলছেন, তা ঠাট্টার বিষয় নয়, স্বস্তির বিষয়।
চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ষাট দিনের সময়-ঘণ্টা চলা শুরু হয়েছে। আমাদের প্রার্থনা থাকবে, এই চুক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক ক্রুদ্ধ ও করুণ সময় অতিক্রম করে পৃথিবী যেন দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তাচক্রে প্রবেশে সক্ষম হয়।
* হাসান ফেরদৌস, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| জি–৭ সম্মেলনের ফাঁকেই ইরানের সঙ্গে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স |
Thursday, March 19, 2026
ইরান যুদ্ধে আমাদের জড়াতে কে অনুমতি দিল: বন্ধু ট্রাম্পকে আমিরাতের ধনকুবেরের প্রশ্ন by হাসান ফেরদৌস
একসময়
এই দুজন দুবাইয়ের পাম জুমেইরাতে ‘ট্রাম্প টাওয়ার’ বানানোর পরিকল্পনা
করেছিলেন। নানা পাকচক্রে ফল ফলেনি। তবে দুজনের বন্ধুত্বে ফাটল ধরেনি। ২০১৬
সালে ট্রাম্প যখন প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করেন, তখন আল-হাবতুর
পত্রিকায় কলাম লিখে মন্তব্য করেছিলেন, ট্রাম্প একজন কর্মবীর।
এই
আল-হাবতুর হঠাৎ নিজের এক্স হ্যান্ডেলে ট্রাম্পের উদ্দেশে এক খোলাচিঠি
লিখেছেন। হুট করে ইসরায়েলের সঙ্গে আঁতাত করে ট্রাম্প ইরানে হামলা করে
বসেছেন। সাত দিন যেতে না যেতে সেই যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর ত্রাহি অবস্থা।
আল-হাবতুর
মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধে
আমাদের অঞ্চলকে জড়াতে আপনাকে কে অনুমতি দিয়েছে? কিসের ভিত্তিতে এমন
মারাত্মক সিদ্ধান্ত আপনি নিলেন?’
যুদ্ধের আঁচ শুধু আল-হাবতুরের আরব
আমিরাতে নয়, আশপাশের দেশগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাঁদের
সবার রাজত্ব ধসে যেতে পারে। সেই ভয় থেকেই এই চিঠি।
আল-হাবতুর আরও
লিখছেন, ‘যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনি কি এর মারাত্মক
ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মাথায় রেখেছিলেন? একথা কি আপনি বিবেচনা করেছিলেন, এই
যুদ্ধ বিস্তৃত হলে সবার আগে পুড়ে মরবে উপসাগরীয় দেশগুলো? এই অঞ্চলের জনগণের
এ কথা জিজ্ঞাসা করার অধিকার রয়েছে, যুদ্ধটা কি আপনার একার সিদ্ধান্ত, নাকি
নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত?’
ট্রাম্প
নিজেকে শান্তির মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত করতে ভালোবাসেন, সে লক্ষ্যে
সম্প্রতি তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের কথাও ঘোষণা করেছেন। কিছুটা উষ্মা,
কিছুটা বিদ্রূপের সুরে আল-হাবতুর লিখেছেন, শান্তির নামে যে ‘বোর্ড অব পিস’
তিনি ঘোষণা করলেন, তার কালি শুকানোর আগেই ট্রাম্প কেন এমন এক যুদ্ধ বাঁধিয়ে
বসলেন, যে কারণে বিপদে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। তাহলে সেসব শান্তি
উদ্যোগের কী হলো? শান্তির নামে যে অঙ্গীকার তিনি করলেন, তার পরিণতিই–বা কী?
আল-
হাবতুর লিখেছেন, যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে প্রকৃত নেতৃত্ব ধরা পড়ে না।
তা ধরা পড়ে প্রজ্ঞা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও শান্তি অন্বেষায়।
কেন এই চিঠি গুরুত্বপূর্ণ
উপসাগরের
শাসক বলুন বা ব্যবসায়ী, তাঁরা কেউ-ই ঘুণাক্ষরেও ট্রাম্পের ব্যাপারে মুখ
খোলেন না। ব্যবসায়িক স্বার্থ দিয়েই তাঁদের সম্পর্ক নির্ধারিত। এবার সেই
স্বার্থে টান পড়েছে বলেই আল-হাবতুর মুখ খুলেছেন। তিনি আরব আমিরাতের
কর্তাব্যক্তিদের অতি ঘনিষ্ঠ, তাঁদের সঙ্গে সলাপরামর্শ না করে এমন খোলাচিঠি
তিনি লিখবেন, তা ভাবা যায় না।
এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের
অন্যান্য দেশের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো কী বিপদে পড়বে, তার একটা সরল হিসাব
দিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। তারা
জানিয়েছে, চলতি যুদ্ধের ফলে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, তার
পরিপ্রেক্ষিতে উপসাগরের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক
সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে।
সেই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—কাতার,
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক বিনিয়োগের
পরিমাণ প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুসারে, এসব
দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বিনিয়োগ চুক্তির যে দায়দায়িত্ব রয়েছে, তা
থেকে সরে আসার কথা ভাবছে।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমটি
জানিয়েছে, যুদ্ধ বা অন্য বড় কোনো অর্থনৈতিক সংকটের মুখে চুক্তিপত্র
পরিবর্তনের আইনসম্মত বিধিব্যবস্থা রয়েছে।
চতুর্মুখী সংকট
শুধু উপসাগর নয়, এই যুদ্ধ বিশ্বের সব দেশের জন্য চার ধরনের হুমকি তৈরি করেছে।
প্রথমত,
ইরানের সমুদ্রসীমায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি
তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এই করিডর বর্তমানে কার্যত বন্ধ। হরমুজ প্রণালি
বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বিপদে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা এই প্রণালি ব্যবহার
করে গ্যাস-তেল রপ্তানি করে থাকে।
কাতার ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে,
চুক্তির মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের যে অঙ্গীকার তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে
করেছে, তা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। একই কারণে সৌদি আরব তাদের তেল উৎপাদন
কমিয়ে এনেছে। এসব কারণে তেলের দাম আগামীতে ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে
যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, তেল রপ্তানি বন্ধ বা সীমিত হয়ে এলে চীন, ভারত,
জাপানসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ মন্দাবস্থার মুখে পড়বে। এসব দেশ তাদের
জ্বালানি প্রয়োজন মেটায় আমদানি করে। এর ফলে মুখ থুবড়ে পড়বে উৎপাদন খাত ও
কৃষি। দেখা দেবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, এমনকি বিপ্লব।
তৃতীয়ত,
তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভর করে উপসাগরের দেশগুলো তাদের বিশাল জাতীয় সম্পদ
তহবিল গড়ে তুলেছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় চার লাখ কোটি ডলার। তেল-গ্যাসই যদি
রপ্তানি না করা যায়, তাহলে আংশিক হলেও এই জাতীয় তহবিল লিকুইডেট বা গুটিয়ে
ফেলতে হতে পারে।
চতুর্থত, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল হিসাব করে বলছে,
উপসাগরের চার দেশের জাতীয় সম্পদ তহবিল বিনিয়োগের প্রায় দুই লাখ কোটি ডলার
রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এই তহবিল গুটিয়ে নিলে সেটাও ধাক্কা খাবে, তাতে কোনো
সন্দেহ নেই। ধস নামতে পারে পুঁজি বাজারে।
বাণিজ্য শুল্কের কারণে
এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, মানুষের দৈনন্দিন
ক্রয়ক্ষমতাও কমে আসছে। এসবের প্রভাব যে এ বছর নভেম্বরের মধ্যবর্তী
নির্বাচনে পড়বে, তা একরকম নিশ্চিত।
সত্তর দশকের পুনরাবৃত্তি
ইরান
যুদ্ধ নিয়ে যে অর্থনৈতিক সংকট, তা আমাদের সত্তরের দশকের আরব-ইসরায়েল
যুদ্ধকালীন সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকে
কেন্দ্র করে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো ‘তৈল অবরোধ’ঘোষণা করায় জ্বালানি তেলের
দাম প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে নিম্নমুখী
প্রবৃদ্ধি সারা বিশ্বকে গ্রাস করে।
এ রকম অবস্থাকেই অর্থনীতিবিদেরা
‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দাস্ফীতি নামে অভিহত করে থাকেন। অনেকেই বলছেন, বিশ্ব
আবার সেই পথেই হাঁটছে। সত্তর দশকের সেই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বৃহৎ অর্থনীতি তাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক
বহিঃসম্পর্ক পুনর্গঠন করলেও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা মোটেই
কমাতে পারেনি।
এই সংকট শুধু জ্বালানি তেলের উৎপাদন ও রপ্তানির কারণে
নয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক পেশিশক্তি এখন বিশ্বের অর্থনীতির প্রধান
ধমনি। বিশ্বের প্রতিটি প্রধান বাজারে রয়েছে তাদের বিনিয়োগ। তাতেই যদি আঘাত
পড়ে, ছোট–বড় কেউ-ই রেহাই পাবে না।
এ কথা অজানা নয় যে উপসাগরীয়
দেশগুলোর শান-শওকতের একটা বড় কারণ বিনিয়োগের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিশ্বজুড়ে
তাদের ব্যাপারে আস্থা। এই যুদ্ধের ফলে সেই আস্থায় বড় ধাক্কা লাগল। এখন
থেকে এই অঞ্চলে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেকেই দুইবার ভাববেন।
যুদ্ধ শুরু সহজ, শেষ করা নয়
ইরানের
সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর তার গতিপ্রকৃতি কী হবে, আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সে
কথা বিবেচনায় এনেছিলেন—সে রকম ভাবার কোনো কারণ নেই। মার্কিন গোয়েন্দারা
বলেছিল, যুদ্ধে যাওয়া সহজ হবে, কিন্তু বেরোনো মোটেই সহজ হবে না। মার্কিন
গোয়েন্দাদের সে সতর্কতায় কান দেননি ট্রাম্প।
আল-হাবতুর তাঁর
খোলাচিঠিতে এই কান না-দেওয়া কতটা ভুল, সে কথাই ধরিয়ে দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এই যুদ্ধ কার স্বার্থে’।
ট্রাম্পের গোঁড়া সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভাষ্যকার টাকার কার্লসন মন্তব্য
করেছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছে, তারা মরবে না। মরবে
সাধারণ মানুষ। তারা এই যুদ্ধ চায় না। আগামী নির্বাচনে তাদের সে মনোভাবের
প্রতিফলন থাকবে।
ট্রাম্প সে কথা জানেন না, তা নয়। তবে ময়দানে নেমে
তিনি ফেঁসে গেছেন। সম্প্রতি ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন,
যুদ্ধ শেষ হল বলে। আবার এমন কথাও বলেছেন, ‘আমি ইরানের ওপর এমন আঘাত করব যে
তাদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
দেখা যাক, যুদ্ধ কোন দিকে গড়ায়।
![]() |
| আরব আমিরাতে শীর্ষ ব্যবসায়ী খালাফ আহমদ আল-হাবতুর। ছবি: রয়টার্স |
Friday, January 16, 2026
ইরানের অবস্থা এবার কি ভিন্ন by হাসান ফেরদৌস
এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লব ৪৭ বছরে পা দেবে। এই প্রায় অর্ধশতকে অন্তত আধডজন বড় ধরনের বিদ্রোহ ও গণবিক্ষোভ দেখেছে দেশটি। প্রতিবারই বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা বলেছেন, এবার বুঝি বিপ্লব শেষ। তিন বছর আগে সরকারি হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তখনো অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার আর রক্ষা নেই। কিন্তু সরকার সেবারও পরিস্থিতি সামলে নেয়। তবে এবারের পরিস্থিতি সত্যিই ভিন্ন।
এর বড় কারণ, ইরানের মানুষ মরতে শিখে গেছে। অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে বেঁচে থাকার পথ প্রায় রুদ্ধ। কেবল সেনা নামিয়ে বা কামান দেগে মানুষকে আর ঠান্ডা করা যাবে না। আজকের ইরান ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়েও আন্দোলন দমন করা যায়নি। ইরানে এখন যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি, তার প্রধান চালিকা শক্তি দেশের নবীন প্রজন্ম, নারী ও পুরুষ উভয়েই। অনেকটা বর্ষাবিপ্লবের বাংলাদেশের মতোই।
এবারের পরিস্থিতি আলাদা, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইরানি-আমেরিকান অধ্যাপক ওয়ালি নাসের। তাঁর মতে, ইসলামি বিপ্লব কেবল দেশের ভেতর থেকেই নয়, দেশের বাইরেও হুমকির মুখে। বাইরের হুমকি বলতে তিনি ইসরায়েল ও আমেরিকার কথাই বোঝাচ্ছেন। এই দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরেই সুযোগ খুঁজছে, কীভাবে ইরানের ইসলামি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো যায়।
আমেরিকা ইরানের ওপর পৃথিবীর যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তাতে অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধর্মীয় শাসনকাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি। ইসরায়েল ও আমেরিকা মিলে ৩০ হাজার পাউন্ডের বোমা ব্যবহার করেও সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সরকারকে কাবু করতে পারেনি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা। কারণ, নাসেরের ভাষায়, এবার ধর্মীয় শাসনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
একই কথা বলেছেন আরেক ইরানি বুদ্ধিজীবী, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্বাস মিলানি। তাঁর মতে, এবার সরকার একদিকে বৈধতা হারিয়েছে, অন্যদিকে দেশের মানুষ স্পষ্টভাবে পরিবর্তন চাইছে। এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লব ছিল প্রকৃত অর্থেই একটি গণবিপ্লব। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাতে অংশ নিয়েছিল।
এমনকি শাহের অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশও বিপ্লবের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের। কারণ, শাহ আমলে অর্থনৈতিক সুবিধার সিংহভাগই ভোগ করত ইরানের অভিজাত শ্রেণি, আর প্রতিবাদকারীদের কপালে জুটত জেল ও নিপীড়ন। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, বিপ্লবের প্রায় অর্ধশতক পরেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
শাহ আমলে সবচেয়ে আতঙ্কের নাম ছিল গোপন পুলিশ সাভাক। ক্ষমতায় এসে খোমেনি সরকার সেটির বদলে গড়ে তোলে সাভামা। নাম বদলালেও কাজ রয়ে যায় একই। প্রতিবাদ দমনে আছে বিপ্লবী গার্ড ও নৈতিক পুলিশ, যাদের ইরানি নামে ঘাস্ত-ই-ইরশাদ বলা হয়। মুখ খুললেই জেল। এর শিকার শুধু বিরোধী রাজনীতিক বা অ্যাকটিভিস্টরা নন। শান্তিতে নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদী ২০২৩ সাল থেকে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যের অভিযোগে কারাগারে। আরেক নোবেলজয়ী শিরিন এবাদি ২০০৯ সাল থেকে নির্বাসনে।
নৈতিক পুলিশি নিপীড়নের সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ মাসা আমিনি। উত্তর-পশ্চিমের কুর্দি শহর সাকেজ থেকে তেহরানে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। হিজাব ঠিক না থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিন দিন পর পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। এর প্রতিবাদে গড়ে ওঠে ‘নারী, জীবন ও মুক্তি’ আন্দোলন। একই ধরনের অভিযোগে ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাবা কোর্দ আফসারি। নারী অধিকার আন্দোলনের চাপে তিনি ২০২৩ সালে মুক্তি পান।
এই তালিকা বাড়ানো যায়, তাতে কথার পুনরাবৃত্তি হবে। ইসলামি বিপ্লব হয়েছিল ইরানের মানুষকে মর্যাদা ও সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে। তার বদলে দেশটি পেয়েছে একদলীয় শাসন, অনির্বাচিত ধর্মীয় নেতাদের প্রায় চার যুগের কর্তৃত্ব এবং অবিরাম নিপীড়ন। এই কারণেই আজ সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। একদিকে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। ১৯৭৯ সালে এক ডলারের মূল্য ছিল ৭০ রিয়াল। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল (না, আপনি ভুল পড়েননি, পরিমাণটা দেড় মিলিয়ন বা ১৫ লাখ)। মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৪৮ শতাংশ। মানুষের আয় বাড়েনি, ব্যয় বেড়েছে। সরকার পরিবারপ্রতি সামান্য ভর্তুকি ঘোষণা করলেও তা দিয়ে বড়জোর কয়েকটি রুটি কেনা যায়। ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষোভ তাই অনিবার্য।
চলতি বিক্ষোভের মূল শক্তি দেশের তরুণ প্রজন্ম। দেশের ৬০ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে, বেকারত্ব ও বন্ধ্যা অর্থনীতিতে তাঁরা ক্লান্ত, ক্রুদ্ধ। ভিডিওতে নাম না–জানা এক মায়ের ছবি দেখেছি, তাঁর ছেলে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে নিহত হয়েছেন। সবাই সেই ছেলেকে শহীদ অভিহিত করে তাঁকে সান্ত্বনা দিলে, সেই মা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আমার ছেলেকে শহীদ বলবেন না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, সে বাঁচতে চেয়েছিল।’
সোশ্যাল মিডিয়া ও ইরানি ডায়াসপোরার তথ্য অনুসারে, এই পর্যন্ত কম করে হলেও হাজার দু-এক মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। অনুমান করি, সেখানেও ১ জন মরে তো ১০ জন দাঁড়িয়ে যায়। ভীত ইরানি ধর্মীয় শাসকেরা ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছেন (এমন কাণ্ড বাংলাদেশেও হয়েছিল)। তরুণেরা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে চোরাপথ ব্যবহার করে স্টারলিংকের ইন্টারনেট টার্মিনাল চালু করেছেন। সরকারের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁরা বলছেন, ‘তোমরা এখনো ১৯৭৯ সালের ভাষায় কথা বলো, আমরা কথা বলি ২০২৫-২৬ সালের ভাষায়।’
এত দূর এসেও যে নিপীড়নমূলক ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে নবপ্রজন্ম সফল হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এখনো শক্তভাবে সে দেশের সরকারের পক্ষে। নিষ্পেষণ আরও বৃদ্ধি পেলে বিদ্রোহ ভেঙে পড়তে পারে। আমরা জানি, বিপ্লবের নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিতে সুযোগ খুঁজছেন ক্ষমতাচ্যুত রাজা রেজা শাহর ছেলে রেজা পাহলভি। তাঁর পেছনে ছাতা ধরে আছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ জানিয়েছে, সে দেশের সরকার সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম ব্যবহার করে রেজা পাহলভিকে ভবিষ্যৎ শাসক বানাতে টাকা ঢালছে। ইসলামি বিপ্লববিরোধী চলতি বিপ্লবকে কক্ষচ্যুত করার জন্য এই তথ্যই যথেষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত করুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি, তিনি সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পক্ষে যেকোনো মুহূর্তে ‘কিনেটিক অ্যাটাক’ বা সরাসরি সামরিক হামলা চালাতে পারেন বলে জানানো হয়েছে।
তেমন কিছু ঘটলে ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী খুব সহজেই এই বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পাবে। আর ইতিহাস বলে, সে যুক্তি ইরানে বহুবার কাজে দিয়েছে।
● হাসান ফেরদৌস, লেখক ও প্রাবন্ধিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ইরানে চলমান বিক্ষোভের প্রতি সংহতি জানাতে লন্ডনে প্রবাসী ইরানিদের প্রতিবাদ। ছবি: রয়টার্স |
Friday, January 2, 2026
একটি জাতিরাষ্ট্র কখন, কেন ব্যর্থ হয় by হাসান ফেরদৌস
২০০৪ সালে প্রকাশিত সেই গ্রন্থে রটবার্গ লিখেছিলেন, জাতিরাষ্ট্র ব্যর্থ হয় তখনই, যখন সে নিজের মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না, অথবা তা পালনে করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। এই সব মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জন্য প্রাথমিক রাজনৈতিক অধিকার ও সেবা প্রদান করা।
আজকের বাংলাদেশ দ্রুত একটি ব্যর্থ জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, কারণ তার ওপর যে মৌলিক দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে, তার কোনোটাই সে পূরণে সক্ষম নয়। অথবা আরও স্পষ্ট করে বলি, সে দায়িত্ব পালনে সম্ভবত সে আদৌ ইচ্ছুক নয়। বাংলাদেশ নিয়ে এমন কঠোর ও হৃদয়বিদারক কথা আমি কখনো বলিনি, বলব সে কথাও ভাবিনি। গত কয়েক দিনের ঘটনা আমাকে এই কথা ভাবতে বাধ্য করেছে। কারণ হিসেবে আমি চারটি ঘটনার কথা বলব।
এক.
শরিফ ওসমান হাদির হত্যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই হত্যার আগাম সংবাদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে ছিল না, এমন দাবি তারা করতেই পারে। কিন্তু সে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পনেরো দিন পরও কেন হত্যাকারী ধরা পড়ল না? আমরা ইন্টারনেটে দেশি-বিদেশি সূত্র থেকে সে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের তাবৎ ঠিকুজিকুষ্টি জেনে বসে আছি অথচ এখনো দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অন্ধকারে ঘুষি ছুড়ছে।
শোনা যাচ্ছে, প্রধান খুনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। কীভাবে, কার বাহনে, কার প্রহরায়? কেউ কেউ বলছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি ও সমর্থনেই তাঁদের দেশ ছেড়ে পালানো সম্ভব হয়েছে। এ কথা সত্যি হলে আমরা তো অনায়াসেই বলতে পারি, রাষ্ট্র তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে শুধু ব্যর্থ নয়, দায়িত্ব পালনে সে অনাগ্রহীও বটে।
দুই.
ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় অথবা সে হত্যাকাণ্ডকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের দুটি প্রধান সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। কার্যালয় দুটি আগুন দিয়ে আংশিক জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। একাধিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর হয়েছে। এই কাজে যাঁরা নেতৃত্ব দেন; যাঁদের অশুভ চক্র বা উগ্রবাদী নামে বর্ণনা করা হচ্ছে, তাঁরা সংবাদপত্র দুটির ভবন জ্বালিয়ে দেওয়াতেই সন্তুষ্ট ছিলেন না, সম্ভবত তাঁরা এই দুই দপ্তরে কর্মরত সাংবাদিকদের পুড়িয়ে মারতেও চেয়েছিলেন।
আক্রান্ত হওয়ার পর ভবনে আটকে পড়া একজন সাংবাদিক ফেসবুকে জানিয়েছেন, চারদিকে আগুনের ধোঁয়ায় তাঁর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এখন আমরা জানি, একজন দুজন নয়, বিপুলসংখ্যক উন্মত্ত জনতা খুব পরিকল্পিতভাবে এতে অংশ নিয়েছিল।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি টিভি চ্যানেলে পুরো ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে, বিদেশে বসে আমরাও তা দেখেছি। সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সরকারি কর্তৃপক্ষ জানতেন না, সেটাও নয়। শুরু থেকেই পত্রিকা দুটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারপরও কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?
এই প্রশ্নের দুটির সম্ভাব্য উত্তর অধ্যাপক রবার্ট রটবার্গ কুড়ি বছর আগেই দিয়ে রেখেছেন: যাদের সে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল, তারা হয় সে দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়, অথবা তা পালনে আগ্রহী নয়।
এমন অভাবিত ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে শুকনা দুঃখ প্রকাশ ছাড়া একজনও তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেননি, সে জন্য ক্ষমা চাননি। পদত্যাগের তো প্রশ্নই উঠছে না। শাসক মহল যদি দায়িত্ববান হতো, তাহলে এই ব্যর্থতার দায়ভার তাঁদের কেউ না কেউ মাথায় পেতে দায়িত্ব থেকে সরে যেতেন।
ফুটবল খেলার মাঠে উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস পদত্যাগ করেছেন।
২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলা রোধে ব্যর্থতার জন্য ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাজ পাতিল পদত্যাগ করেছিলেন। ২০১৯ সালে ইস্টারের রোববার বোমা হামলা রোধে ব্যর্থতার জন্য শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধান পুজিথ জায়াসুন্দ্রা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে ভয়াবহ ফেরি দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী চুং হন-ওয়ান শুধু হাঁটু মুড়ে ক্ষমাই চাননি, পদত্যাগ করে দায়িত্ব থেকে সরেও গিয়েছিলেন।
দায়িত্ব পালনে এই ব্যর্থতা অথবা অনাগ্রহের একটা ফল হলো, এতে সব ধরনের সহিংসতা ‘নরমালাইজড’ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ঠিক সে ঘটনাটাই ঘটেছে। মবতন্ত্র এখন আর অভাবিত কোনো ব্যাপার নয়, নিয়মিত ব্যাপার। আর যাঁরা এই সহিংসতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চান, তাঁরা সরকারের তরফ থেকে এই স্পষ্ট সিগন্যাল পেয়ে যান যে সহিংসতা যত তীব্র হোক না কেন, উদ্বেগের কিছু নেই।
তিন.
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন ডিন একযোগে তাঁদের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। না, স্বেচ্ছায় নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদেরএকজন নেতা প্রকাশ্যে এই ছয়জনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি ছয় অধ্যাপকের অফিসে গিয়ে তালা লাগিয়ে আসেন। অধ্যাপকদের ‘অপরাধ’, তাঁরা বিগত সরকারের সমর্থক ছিলেন। ঠিক এই অভিযোগে শিক্ষকদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে, এমন আইন কোথায় লেখা আছে, আর এই সিদ্ধান্ত ছাত্র সংসদের এক ছাত্র তাঁর অনুগত সমর্থকদের জোরে বাস্তবায়িত করবেন, সে নিয়মই–বা কবে থেকে বহাল হলো?
বলাই বাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারের কেউ এ ব্যাপারে তাঁদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেননি। হয় তাঁরা সে দায়িত্ব পালনে অক্ষম অথবা অনাগ্রহী।
চার.
ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাস নামের এক কারখানা শ্রমিককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সত্যি কোনো অবমাননা হয়েছে বা কী সেই অবমাননা, তার কোনো সদুত্তর নেই। হত্যার পর দীপু দাসের লাশ বিবস্ত্র করে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এই অবিশ্বাস্য বর্বরোচিত কাজটি চোখের পলকে ঘটে যায় তা নয়, বেশ লম্বা সময় ধরে ঘটেছে। কয়েক শ লোক সেটা প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন, পুলিশ কোথায়, কারখানা কর্তৃপক্ষ কোথায়, স্থানীয় সরকারি প্রশাসনই–বা কোথায়? নেই, হয় তারা দায়িত্ব পালনে অপারগ, অথবা অনাগ্রহী।
রবার্ট রটবার্গ ব্যর্থ রাষ্ট্রের যে তিন লক্ষণ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন, ওপরের এই চার উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশ ক্রমে তেমন একটি রাষ্ট্রের পথে হাঁটছে। উদাহরণ বাড়ানো যায়, কিন্তু তাতে একই কথার পুনরাবৃত্তি হবে।
সত্যি সত্যি রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে তার নাগরিকদের কী দুর্দশা হয়, তা বুঝতে দয়া করে আজকের হাইতি, সোমালিয়া বা সুদানের দিকে তাকিয়ে দেখুন। স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পর আমরাও সেই একই মহাদুর্যোগে নিক্ষিপ্ত হব, সে কথা লিখতে আমার হাত কাঁপছে। কিন্তু এ কথা যে মোটেই অতিরঞ্জন নয়, তাতেও বড় কোনো ভুল নেই।
এই ব্যর্থতা আমাদের নিয়তি নয়। দেশটা আমাদের সবার। তা ব্যর্থ হোক, দেশি-বিদেশি চক্র তা চাইতে পারে, কিন্তু আমরা তা চাইব কেন? এই অবনমন ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের রয়েছে, কিন্তু সে জন্য চাই ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে নাগরিক ঐক্য। ইতিমধ্যে দেখেছি মবতন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্যের একটি প্রাথমিক উদ্যোগ এসেছে। আপাতত উদ্যোগটি নাগরিক ও সুশীল সমাজ পর্যায়ে প্রতিবাদে সীমিত, এই প্রতিবাদ কার্যকর হতে হলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। শুধু প্রতিবাদ নয়, চাই জবাবদিহি।
অধিকাংশ সভ্য দেশে এ–জাতীয় সংকটের সময় একাধিক ‘প্রেশার পয়েন্ট’ কাজ করে—যেমন আদালত, আইন পরিষদ, মানবাধিকার কমিশন ও সংবাদমাধ্যম। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম ছাড়া আর অন্য কোনো প্রেশার পয়েন্ট কার্যকর নয়। তার আশু সম্ভাবনাও নেই। অতএব সংবাদমাধ্যমকে একই সঙ্গে জাতির বিবেক ও জাতির পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমার বিশ্বাস, সে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তার রয়েছে।
এক শ বছরের আগে, ১৯০৪ সালে জোসেফ পুলিৎজার মন্তব্য করেছিলেন, কোনো দেশের উত্থান ও পতন সে দেশের সংবাদপত্রের উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িত। সৎ, দক্ষ ও জনস্বার্থে নিবেদিত সংবাদপত্রের পক্ষেই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ভণ্ডামি ও প্রহসন থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
আমাদের সংবাদমাধ্যমের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ—দেশকে তারা ভণ্ডামি ও প্রহসনে নিক্ষেপ করবে, না তাকে বাঁচাতে জননৈতিকতাকে আয়নার মতো তুলে ধরবে? এর উত্তর তারাই দেবে, সে আশা করি।
* হাসান ফেরদৌস, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Thursday, November 27, 2025
শেখ হাসিনার পতন ও ইতিহাসের শিক্ষা by হাসান ফেরদৌস
গত বছরের ৫ আগস্ট যেদিন হাসিনা ও তাঁর বোন চারটি সু৵টকেস হাতে নিয়ে দেশ ছাড়েন, তাঁদের মুখে হাসির জায়গায় স্থান পেয়েছিল ভীতি ও গভীর উদ্বেগ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। লক্ষ জনতা গণভবনের দিকে এগিয়ে আসছে—এ কথা জানার পরও তাঁর অনুগত সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ‘লেথ্যাল উইপন’ ব্যবহার করে বিক্ষোভ থামাতে। সেনাধ্যক্ষরা সম্মত হননি। শেষ চেষ্টা হিসেবে যোগাযোগ করা হলো বিদেশে অবস্থানরত তাঁর ছেলে মার্কিন নাগরিক জয়ের সঙ্গে। তিনিও নাকি বলেছেন, ‘মা, আর বিলম্ব নয়।’ শোনা যায়, নিরুপায় হাসিনা নাকি হেলিকপ্টারে ওঠার আগে স্বগত স্বরে শুধু বলেছিলেন, ‘এত কিছু করলাম, এই তার প্রতিদান!’
হাসিনাই একমাত্র ক্ষমতাধর ব্যক্তি নন, জনতার রোষে যাঁকে পালাতে হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে পূর্ব জার্মানির এরিক হোনেকার, ইরানের শাহেনশাহ রেজা শাহ পাহলভি, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস অথবা আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির কথা ভাবতে পারি।
হাসিনার পতনের সঙ্গে কাছাকাছি মিল রয়েছে মার্কোসের। একটানা ২১ বছর একনায়ক হিসেবে দেশ শাসনের পর জনতার রোষে পতন হয় মার্কোসের। দিনটি ছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬। এর তিন বছর আগে নিহত হন জনপ্রিয় বিরোধী রাজনীতিক সিনেটর অ্যাকুইনো। সেই মৃত্যুর জন্য মার্কোস দায়ী, এই সন্দেহে ফুঁসে উঠল মানুষ। রাজনৈতিক বিক্ষোভ এড়াতে মার্কোস হঠাৎ নির্বাচন ডেকে বসেন ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে; কিন্তু ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে সে নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যাত হয়, আরও জোরদার হয়ে ওঠে বিক্ষোভ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আর কেউ না হোক ফিলিপাইনে অবস্থানরত মার্কিন ছত্রীসেনারা তাঁকে রক্ষায় এগিয়ে আসবেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি, পুরো ম্যানিলা যখন বিক্ষোভে উত্তাল, মালামালাকালাং প্রাসাদে স্ত্রী ইমেলদাকে নিয়ে তিনি প্রহর গুনছিলেন কখন মার্কিন ছত্রীসেনারা হস্তক্ষেপ করবেন। বারবার চেষ্টা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের সঙ্গে কথা বলতে। অবশেষে সেই ফোন এল; কিন্তু রিগ্যানের নয়, তাঁর বিশেষ দূত পল লাক্সাল্টের কাছ থেকে। ‘মি. প্রেসিডেন্ট, এখন চলে যাওয়ার সময় এসেছে’ লাক্সাল্ট জানালেন। ভয় ও বিস্ময়ে সাদা হয়ে গেলেন মার্কোস, স্ত্রী ইমেলদার দিকে তাকিয়ে বিমর্ষে বললেন, ‘তার মানে সব শেষ।’ খানিক পরেই মালামালাকালাং প্রাসাদের লনে এসে নামল মার্কিন সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার। তাতে করেই পালালেন মার্কোস। যাওয়ার সময় তাঁর শেষ কথা ছিল, ‘সো, দিস ইজ হাউ ইট এন্ডস’, এভাবেই তাহলে সব শেষ হলো।
ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দিয়েছে—যতই পরাক্রমশালী হও, ক্ষমতার অপব্যবহার তোমাকে সিংহাসন থেকে একসময় টেনে নামাবে সেই জনতা, যাদের নামে তুমি সিংহাসন দখল করেছ। এই পতন হবে দ্রুত, তুমি সামলে নেওয়ার আগেই। রেজা শাহ, ফার্দিনান্দ মার্কোস বা শেখ হাসিনা—প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই ক্ষমতার গতিপথ এবং তার ঊর্ধ্ব ও নিম্নরেখা, কার্যত অভিন্ন। তাঁদের হাতে রাষ্ট্র, সরকার ও নেতা হয়ে পড়েন এক ও অভিন্ন। তাঁরা কেবল সব ক্ষমতার কেন্দ্রই নন, সব ক্ষমতার উৎসও বটে। একনায়কদের পতনের এটাই মূল কারণ। নেতা হয়ে ওঠেন সেই অক্ষ, যার চারদিকে সবকিছু ঘোরে। ফলে যখন সেই অক্ষ বিপদে পড়ে, তাকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসার আর কেউ থাকে না।
শেখ হাসিনার কথা ভাবুন। এমন বিপুল ক্ষমতাধর মানুষ, অথচ বিপদ যখন ঘরের দোরগোড়ায়, তাঁর পাশে কেউ নেই। এমনকি দীর্ঘ সময় ধরে যে সামরিক বাহিনীর ওপর ছিল তাঁর পুরো নিয়ন্ত্রণ, বিপদের সময় তাঁরাও উধাও।
ক্ষমতাধরেরা শুধু নিষ্ঠুর শক্তির জোরেই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকেন না, তাঁকে টিকে থাকতে একটি চমৎকার গল্প ফাঁদতে হয়। বাংলাদেশের হাসিনা, ইরানের শাহ, মিসরের হোসনি মোবারক অথবা রোমানিয়ার চসেস্কু—তাঁরা প্রত্যেকেই দেশের জন্য অপরিহার্য হিসেবে নিজেদের উপস্থিত করেছিলেন। নিজেকেই বাংলাদেশের সবকিছুর নিয়ন্তা ভাবতে শুরু করেছিলেন। ‘আমি না থাকলে বন্যায় ভেসে যাবে দেশ’ বলেছিলেন মার্কোস। হোসনি মোবারক মিসরের পরাক্রমশালী একনায়ক। পদত্যাগের দাবির কথায় বলেছিলেন, ‘আমি চলে গেলে টুকরা টুকরা হয়ে যাবে মিসর।’
এসব নেতার বলা গল্পগুলো ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে বলার জন্য স্তাবকদের অভাব থাকে না। দেশের মানুষ সে গল্প বিশ্বাস করুক বা না করুক, এসব নেতা সম্ভবত এসব গালগপ্পো নিজেরা বিশ্বাস করতেন। পালানোর সময় হাসিনার বিস্মিত মুখটি স্মরণ করুন, তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি এই দেশের মানুষ, যাদের জন্য তিনি ‘প্রাণপাত’ করেছেন, তাঁরাই চাইছিলেন তাঁর পদত্যাগ। ১৯৮৯ সালে ঠিক এমন একটি মুহূর্তের মুখোমুখি হতে হয়েছিল রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট চসেস্কুকে। ‘অসম্ভব, হতেই পারে না’, এমন দাবি করে তিনি ২১ ডিসেম্বর বুখারেস্টে রোমানিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সদর দপ্তরের ব্যালকনি থেকে জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেছি, রোমানিয়া ও তার মানুষ আমার নেতৃত্বের পেছনে ঐক্যবদ্ধ।’ তাঁর সে কথা শুনে উপস্থিত মানুষ হো হো করে হেসে উঠেছিল।
হাসিনাও সেই একই দাবি করেছিলেন—একবার নয়, বহুবার। তাঁর সে দাবিকে জায়েজ করার জন্য সদা প্রস্তুত ছিল ভাড়াটে লেখক ও রাজনীতিকেরা। যেমন ‘ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে’ ২০১৯ সালে সালমান এফ রহমান লিখিতভাবে বলেছিলেন, বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য সাফল্যের গোপন ফ্যাক্টরটি হলো শেখ হাসিনা।
কিন্তু একটা সময় আসে, যখন দেশের মানুষ বানিয়ে বানিয়ে বলা এই গল্প আর বিশ্বাস করতে চান না। রাজনৈতিক নিষ্পেষণের ভয় দেখিয়েও তাঁদের হাতে রাখা যায় না। ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের পক্ষে হয়তো সব সময় তাঁদের পতনের রেখাচিত্রটি সহজে ধরা পড়ে না। সে কারণেই যখন ইরানের শাহকে তাঁর বিশ্বস্ত জেনারেল বাদরেইয়ের মুখে শুনতে হয় ‘এখন আপনার যাওয়ার সময় হয়েছে’, অথবা শেখ হাসিনাকে আরেক জেনারেলের মুখে শুনতে হয়, ‘হেলিকপ্টার প্রস্তুত’। তখন তাঁদের মুখ–চোখে একই সঙ্গে ভীতি ও বিস্ময় দানা বাঁধে। নেতা না বুঝতে চাইলেও তাঁর অনুগত অনুগ্রহভোগীদের অনেকেই ভাগে৵র লিখন পড়ে ফেলেন। ফলে নেতাকে একা রেখে সবার আগে পালান তাঁরা। যেমন সপরিবার পালিয়েছিলেন ফজলে নূর তাপসসহ অনেকে।
হাসিনার পতন এবং পরে বিচারের রায়ে তাঁর ফাঁসির নির্দেশ থেকে এ কথা আমরা বলতে পারি—কোনো নেতা বা নেত্রী, তা তিনি যত ক্ষমতাধরই হোন না কেন, অপরিহার্য নন। ভীতি অথবা মিথ্যা গালগপ্পো তাঁর অনন্ত ক্ষমতা ধারণের কোনো নিশ্চয়তা নয়। জর্জ অরওয়েল লিখেছিলেন, ‘সব স্বৈরতন্ত্রই প্রতারণা ও বলপ্রয়োগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে; কিন্তু প্রতারণা একবার উন্মোচিত হলে, তাঁদের ভরসা থাকে শুধু শক্তির ওপর। কিন্তু সেই শক্তিও একসময় কর্পূরের মতো উবে যায়, পড়ে থাকে পতিত স্বৈরশাসকের বিস্মিত ও ভীতসন্ত্রস্ত মুখ।’
* হাসান ফেরদৌস, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| বিক্ষোভ দমনে হাসিনা বাহিনীগুলোকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের আদেশ দিয়েছিলেন। ছবি: প্রথম আলো |
Monday, October 6, 2025
ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব কি ঔপনিবেশিকতার প্রত্যাবর্তন by হাসান ফেরদৌস
১৯১৯ সাল। প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ, হার হয়েছে তুরস্কের। এত দিন সমগ্র ফিলিস্তিন ছিল তুরস্কের নিয়ন্ত্রণাধীন। যুদ্ধের পর অন্যতম বিজয়ী শক্তি ব্রিটিশ সরকার আবদার করল এই অঞ্চলের দায়িত্বভার তার হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
ফিলিস্তিনের মানুষ কী চায়, সে প্রশ্ন বিবেচনা না করেই ভার্সাইয়ের হল অব মিররসে বসে দিন কয়েক কাগজ-কলমে কাটাকুটি করে ঠিক করা হলো, যত দিন না এই অঞ্চলের মানুষ ‘নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে’, তত দিন তা শাসন করার দায়িত্ব থাকবে যুক্তরাজ্যের ওপর।
১০০ বছর পর সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। এবারও হাতে গোনা কয়েকজন ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে শলাপরামর্শের পর ঠিক করলেন; যত দিন না পরিস্থিতি অনুকূলে আসছে, তত দিন গাজা, যা ফিলিস্তিনের একটুকরা ভূমি, তা শাসনের দায়িত্বে থাকবে একটি আন্তর্জাতিক অন্তর্বর্তী প্রশাসন।
এর নেতৃত্বে থাকবেন সেই যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। সঙ্গে পরিচালনা পর্যদ বা বোর্ডের প্রধান হিসেবে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলা বাহুল্য, গাজাবাসী কী ভাবেন বা কী চান, তা বিবেচনায় আনার কোনো প্রশ্নই উঠল না।
২৯ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশে নিয়ে সাড়ম্বরে গাজার জন্য এই শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে। তাঁর কথায়, এ হলো শতাব্দীর সেরা ব্যবস্থা বা ‘ডিল’।
গাজা প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছেন, তা আগাগোড়া ক্ল্যাসিক ঔপনিবেশিক শাসন চালুর সর্বশেষ উদাহরণ। একদল মানুষ, যাদের ওই ভূখণ্ডের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, শুধু গায়ের জোরে (পড়ুন বোমার জোরে) ২২-২৩ লাখ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করছে, ‘হয় মেনে নাও, না মানলে গুলি খাও!’
-----২
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা প্রশ্নে যে ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে এই ভূখণ্ডের ভবিষ্যতের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, সেখানে গাজাবাসীর যেমন কোনো মতামত জানতে চাওয়া হয়নি, তেমনি অনাগত ভবিষ্যতেও তাদের কেউ এই তথাকথিত অন্তর্বর্তী প্রশাসনে স্থান পাবে না।
গাজা যেন ২২ লাখ মানুষের একটি ভূখণ্ড নয়, একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, যার মালিকানায় থাকবে একটি নির্বাহী বোর্ড!
প্রশাসনিক কাজে সাহায্যের জন্য বেছে বেছে অরাজনৈতিক ‘টেকনোক্র্যাটিক’ ফিলিস্তিনিদের খুঁজে আনা হবে। নিরাপত্তার জন্য আশপাশের দেশ থেকে ভাড়া করে আনা হবে পুলিশ ও সৈন্য।
বিখ্যাত ব্রিটিশ-ইসরাইয়েলি ঐতিহাসিক ড্যানিয়েল-লেভি মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্প গাজার জন্য যে পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছেন, তা পড়ে মনে হয় এটি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনো নথি। লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য জড়িত না থাকলে একে এক সেরা ‘কমেডি’ বলা যেত।
-----৩
পরিকল্পনাটির মুখ্য শর্ত, গাজার কোনো কাজে হামাসকে রাখা যাবে না। তাদের শুধু নিরস্ত্র করতে হবে তা–ই নয়, ভবিষ্যতে কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে তাদের রাখা যাবে না। শান্তি প্রশ্নে তাদের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনাও হবে না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, হামাসকে হয় এই প্রস্তাব মেনে নিতে হবে, না হয় তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। তাদের কীভাবে খতম করতে হয়, নেতানিয়াহু তা খুব ভালো করেই জানেন।
হামাসের ব্যাপারে প্রতিবেশী আরবদের মধ্যে কমবেশি মতৈক্য রয়েছে। মাহমুদ আব্বাসের ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ গাজা থেকে হামাসের বহিষ্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। আরব লীগও হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে। জাতিসংঘে গৃহীত এক প্রস্তাবেও হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে সায় দেওয়া হয়েছে।
দুই বছরের টানা যুদ্ধের পর হামাসের তেমন কোন সামরিক শক্তি নেই যে তারা এই প্রশ্নে বাগ্বিতণ্ডা করবে। ফলে অনুমান করি, কিছুটা বিলম্বে হলেও হামাস অস্ত্র ত্যাগ ও ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার দাবি মেনে নেবে।
কিন্তু তারচেয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা নিয়ে। ফিলিস্তিন সমস্যার কেন্দ্রেই রয়েছে এই জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের স্বীকৃতি ও বাস্তবায়ন।
ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনায়, অনেকটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের এক ধারা রাখা হয়েছে যাতে স্বাধীন ফিলিস্তিনকে তার ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে; কিন্তু তার বাস্তবায়নের কোনো পথরেখা চিহ্নিত হয়নি।
পরিহাসের বিষয় হলো, ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের যে পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনকে দুই ভাগ করা হয়, তাতে একই সঙ্গে একটি ইহুদি ও একটি আরব (ফিলিস্তিনি) রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল।
ইহুদি রাষ্ট্রটি অনেক আগেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে; কিন্তু প্রায় ৮০ বছর পরেও স্বাধীন ফিলিস্তিন সেখানকার জনগণের ‘আকাঙ্ক্ষাই’ রয়ে গেছে।
নেতানিয়াহু বারবার বলেছেন তিনি কোনো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হতে দেবেন না। কোনো কোনো আরব রাষ্ট্র, যেমন সৌদি আরব বলেছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া কোন শান্তি পরিকল্পনায় তাদের সমর্থন নেই। সে কথা মাথায় রেখে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় স্বাধীন ফিলিস্তিনের দাবিটি একদম উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
এতে যে সম্ভাব্য স্বাধীন ফিলিস্তিনের কথা বলা হয়েছে, কবে সে ‘আকাঙ্ক্ষা’ বাস্তবায়িত হবে তার কোনো সময়সীমা নেই। এতে শর্ত দেওয়া হয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে পশ্চিম তীরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে ঢেলে সাজাতে হবে।
ঢেলে সাজানো হয়েছে কি না, তার সনদপত্র আসবে এই নতুন ট্রাম্প-ব্লেয়ার বোর্ডের কাছ থেকে। ইসরায়েল ‘হ্যাঁ’ না বলা পর্যন্ত তারা যে এই প্রশ্নে নড়েচড়ে বসবে না তা বলাই বাহুল্য।
-----৪
বিভিন্ন বেসরকারি আরব ভাষ্যকার ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। যে বোর্ডকে দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে জাতিসংঘের নয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মিল রয়েছে, এ কথা বলেছেন আল কুদস আল-আরাবি পত্রিকার এক ভাষ্যকার।
লেবাননের সাংবাদিক রাশিদা দেরঘাম বলেন, ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে ট্রাম্প গাজাকে কোনো দেউলিয়াপ্রাপ্ত করপোরেশন ঠাউরে এখন তার দেখভালের ব্যবস্থা করছেন।
জর্দানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারওয়ান মুয়াশের আলী বলেন, এটা কোনো শান্তি পরিকল্পনা নয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনিদের সব রাজনৈতিক অধিকার অস্বীকার করে তাদের ‘ম্যানেজ’ করার বন্দোবস্ত।
গাজাবাসী ও ফিলিস্তিনিদের ঝুড়ি শূন্য থাকলেও ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর দাবির প্রায় সব কটিই আদায় করে নিয়েছেন। এত দিন তিনি বলে এসেছেন হামাসের চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তিনি হামলা বন্ধ করবেন না। এই পরিকল্পনায় কার্যত তাঁর সেই শর্ত মেনে নেওয়া হয়েছে।
নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে গাজার ব্যাপারে কোনো ভূমিকা দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন, এই পরিকল্পনায় সে দাবিও মেনে নেওয়া হয়েছে। গাজায় অনির্দিষ্টকাল ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন থাকবে, তাঁর এ দাবিও মেনে নেওয়া হয়েছে।
সোজাকথায়, নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায়, নেতানিয়াহু যা যা দাবি করেছেন, তার সবই এই পরিকল্পনায় নিশ্চিত করা হয়েছে। এ কথা ঠিক, তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিনের বিরোধিতা করেছেন। এই পরিকল্পনায় যে স্বাধীন ফিলিস্তিনের কথা বলা হয়েছে, টাইমসের ভাষায়, তা বড়জোর এক সুখকল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। কিছুটা পরিহাসের সুরেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি টাইমস লিখেছে, ‘ড্রিম অন’, অর্থাৎ স্বপ্ন দেখতে থাকো।
এসব সত্বেও গাজায় জাতিহত্যা বন্ধ হবে, শুধু এ কারণেই প্রস্তাবটিকে কেউ কেউ স্বাগত জানিয়েছেন। মিসর ও আরব আমিরাতসহ আটটি আরব দেশ প্রস্তাবটি চূড়ান্তকরণে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সতর্ক সমর্থন জানিয়েছে পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া।
ইতিপূর্বে ট্রাম্প বলেছিলেন, সব গাজাবাসীকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে তিনি অত্যাধুনিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলবেন। এই পরিকল্পনায় সেই দাবি বাদ গেছে, বলা হয়েছে গাজাবাসীকে কোথাও যেতে হবে না। কেউ যদি চলে গিয়েও থাকে, তারা চাইলে ফিরে আসতে পারবে।
-----৫
মানতে হবে, গাজায় গণহত্যা বন্ধে কোনো আরব বা ইউরোপীয় দেশ এ পর্যন্ত অর্থপূর্ণ কিছুই করেনি। সেই তুলনায় ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবে গাজাবাসী কিছুটা হলেও আলোর আভাস পেয়েছেন।
এ কথা ভাবার কারণ রয়েছে যে ট্রাম্পের চাপের কারণেই নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনা মেনে নিয়েছেন। দুই সপ্তাহ আগে দোহায় হামাসের এক বৈঠকে বোমা বর্ষণের জন্য কাতারের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি। সেটিও সম্ভব হয়েছে ট্রাম্পের চাপাচাপিতে।
আমরা জানি, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পুরস্কার হিসেবে ট্রাম্প নিজের জন্য নোবেল পুরস্কার দাবি করেছেন। সত্যি সত্যি যদি গাজায় গণহত্যা থামে, সেখানে শান্তি আসে, হোক না তা কবরের শান্তি, সে জন্য ট্রাম্প যদি সেই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন, তাতে কি আপত্তি করার কেউ থাকবেন?
* হাসান ফেরদৌস, সাংবাদিক ও লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Friday, September 19, 2025
বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের ‘গেমপ্ল্যান’টা কী by হাসান ফেরদৌস
কেমন আছেন, তার একটি বেশ জমকালো বিবরণ দিয়েছে ভারতের অনলাইন পোর্টাল দি প্রিন্ট। তার একটি সারসংক্ষেপ প্রথম আলোতেও মুদ্রিত হয়েছে। এতে বিগত সরকারের একজন বাক্চতুর সহকারী মন্ত্রী, মোহাম্মদ আরাফাত বলেছেন, তাঁরা রাত–দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কী করে শেখ হাসিনাকে ফের ক্ষমতায় বসানো যায়।
তিনি একা নন, আরও হাজার দুয়েক আওয়ামী নেতা-কর্মী রয়েছেন, যাঁরা বেশ আরামেই ভারতীয় আতিথ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ জিমে যাচ্ছেন, কেউ মাথায় নকল চুল বসাচ্ছেন, কেউ অনলাইন বৈঠকে যুক্ত হচ্ছেন। অবশ্য তিনি অর্থাৎ জনাব আরাফাত, অন্য সব আরাম-আয়েশ বাদ দিয়ে দিন–রাত খেটে যাচ্ছেন, কীভাবে ইউনূস সরকারকে হটিয়ে হাসিনাকে ফের মসনদে বসানো যায় সেই কাজে।
তাঁরা যে ভারতে আছেন, সেটা কোনো ‘হাইলি ক্লাসিফায়েড’ তথ্য নয়। খোদ হাসিনা প্রায় প্রতিদিন একটি–দুটি করে টেলিফোন-নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন কখন, কোথায় কী করতে হবে। তিনি শিগগিরই দেশে ফিরে আসছেন—এমন আশ্বাসও মাঝেমধ্যে জানাচ্ছেন।
বিগত সরকারপ্রধানের এমন প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতায় উদ্বিগ্ন হয়ে তা বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে ভারতের কাছে একটি পত্র পাঠিয়েছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যত দূর মনে পড়ে, স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস তিন মাস আগে ব্যাংককে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁদের একমাত্র মুখোমুখি আলাপচারিতায় সেই একই অনুরোধ রেখেছিলেন।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক প্রেস বিবৃতি দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সে অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে। এতে সাফ সাফ বলা হয়েছে, ‘না, আমরা আওয়ামী লীগের কোনো সদস্যের বাংলাদেশবিরোধী কার্যকলাপের ব্যাপারে অবহিত নই। ভারত সরকার এমন কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপ বরদাশত করে না। অন্য কথায়, অন্তর্বর্তী সরকার যে অভিযোগ করেছে, তা ভিত্তিহীন।’
ভারতের এই সরকারি বিবৃতিটি যে ডাহা মিথ্যা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দি প্রিন্ট পোর্টালের সাংবাদিক যে খবর টেলিফোন তুলে সরাসরি ঘোড়ার মুখ থেকে জেনে নিতে পারেন, ভারত সরকার নিজের তাবত গোয়েন্দা অ্যাপারেটাস ব্যবহার করেও তার সন্ধান পায়নি, সে কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
দি প্রিন্টের প্রতিবেদনে এসব আওয়ামী কর্তা কলকাতার কোন পাড়ায়, কোন অ্যাপার্টমেন্টে একা বা রুমমেট সঙ্গে নিয়ে দিন গুজরান করছেন, তার সবিস্তার বিবরণ রয়েছে। ইউটিউবেও একাধিক সচিত্র বিবরণীতে এসব রাজনীতিকের ব্যাপারে বেশ রসালো কাহিনি রয়েছে।
তার মানে ভারত সরকার সবই জানে এবং জেনেশুনেই হাসিনা ও তাঁর অনুগামীদের ভারতে অবস্থান এবং কার্যকলাপে অনুমতি দিয়েছে। যত দূর জানি, হাসিনা রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আশ্রয় পেয়েছেন। তার মানে খানাপিনা, টেলিফোন বিল ও নিরাপত্তার জন্য খাইখরচা সবই ভারত সরকারের। কোনো কোনো ভারতীয় রাজনীতিক প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন, এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা জেনেও ভারত ঠিক কোন কারণে হাসিনাকে ‘জামাই আদরে’ থাকতে দিচ্ছে।
সর্বভারতীয় মজলিশ-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের প্রধান আসাবুদ্দিন ওয়াইসি জানতে চেয়েছেন, ভারত সরকার যেখানে শুধু বাংলা বলার জন্য লোকজনকে ধরেবেঁধে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে, সেখানে হাসিনাকে এত খাতির কেন। বাংলাদেশ থেকে আগত বহিরাগতদের যদি বহিষ্কার করতে হয়, তো সেই কাজ হাসিনাকে দিয়েই শুরু করা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
এ কথা অনেকেই বলেছেন, ক্ষমতা থেকে হাসিনার পতন ভারতের জন্য একটা বড় ধরনের কূটনৈতিক বিপর্যয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি শেখ হাসিনাকে নিজের লোক মনে করে তাঁর পেছনে বিস্তর বিনিয়োগ করেছেন। সে বিনিয়োগের সুফলও পেয়েছেন। ‘ভারতের নিজের স্বার্থেই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে হবে’—এ কথা একজন আওয়ামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে গিয়ে মামাকে মাসির গল্প শোনানোর মতো শুনিয়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু একই ঝুড়িতে সব ডিম রাখার ফল কী হতে পারে, সে শিক্ষাটা ভারত মনে রাখেনি। ফলে বর্ষাবিপ্লবে হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গে ভারত, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর আম-ছালা দুটোই হারালেন (তার সঙ্গে ঝুড়িভর্তি ডিমও)। অনেকেই বলেছেন, এ বিনিয়োগটাই যদি শুধু হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ওপর না হয়ে বাংলাদেশ ও তার জনগণের পেছনে হতো, তাহলে আজকের এই বিপন্ন অবস্থায় ভারতকে পড়তে হতো না।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে ভারত এখনো হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে তার বুকপকেটে রেখে দিয়েছে কেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর, পরে কোনো এক সময় কাজে লাগবে, এই বিবেচনা থেকে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে স্ট্র্যাটেজিক লেভারেজ বা কৌশলগত সুবিধা নামে অভিহিত করে থাকেন। একে আপনারা দর-কষাকষির হাতিয়ার বা বার্গেনিং চিপ হিসেবেও ভাবতে পারেন। ভারতের হিসাবে, হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে টিকিয়ে রাখা যায়, তাহলে পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বাণিজ্য থেকে কূটনীতি, যেকোনো প্রশ্নেই দিল্লি সেই তাসকে দর-কষাকষির জন্য ব্যবহার করতে পারবে।
এই দুই দেশ একে অপরের প্রতিবেশী, চাইলেই ছুমন্তর করে তাকে ‘ভ্যানিশ’ করা যাবে না। আজ হোক বা কাল, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নিতেই হবে। তেমন পরিস্থিতিতে ভারত একদম মোক্ষম সময়ে এই ‘হাসিনা তাস’কে টেবিলে ছুড়ে দেবে। এ রকম কৌশলগত ‘লেভারেজের’ অনেক অভিজ্ঞতাই আমাদের জানা। যেমন কোনো না কোনো ফায়দা হবে, এই আশায় পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। অথবা এখন ভারত যে কারণে বালুচ বিদ্রোহীদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে আগলে রেখেছে।
এর চেয়েও ভয়াবহ আরেকটি আশঙ্কা রয়েছে। এমন হতে পারে যে ভারত সত্যি সত্যি আঁক করে বসে আছে যে আজ হোক বা কাল, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরবেন। হাসিনা নিজে সে কথা বলেছেন, ইউটিউব তার সাক্ষী। মোহাম্মদ আরাফাতসহ তাঁর আরও কয়েক হাজার অনুগামী ভারতে বসে ভারতের মদদে সে লক্ষ্য পূরণে দিন–রাত কাজ করে চলেছেন, ভারতীয় পত্রিকা দি প্রিন্ট সে কথা জানিয়েছে। ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া এর কোনোটাই সম্ভব নয়।
আওয়ামী লীগ যে এখনো ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আশা করে, তার আরও একটি আলামত আমরা সপ্তাহ দুয়েক আগে সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে জেনেছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মরত অফিসারের নেতৃত্বে শ চারেক আওয়ামী কর্মী নাশকতামূলক কাজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
অন্য কথায়, হাসিনা ক্ষমতায় ফিরবেন এটা কেবল থিওরি নয়, প্র্যাকটিসও বটে। উর্বর মস্তিষ্কের কেউ কেউ অনায়াসেই ভাবতে পারেন, বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের কাছ থেকে সবুজসংকেত ছাড়া খোদ রাজধানীতে এমন দুঃসাহসী কর্মযজ্ঞে তাঁরা নামবেন, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।
কোনো ষড়যন্ত্র তুলে ধরার জন্য আপনাদের আমি এই গল্প শোনাচ্ছি না। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, শুধু সে ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়ার জন্যই এই নিরীক্ষার অবতারণা।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আগামী নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করেছে। আওয়ামী সমর্থকেরা এই যুক্তি দিয়ে থাকেন, অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার অবৈধ। ফলে তাঁকে হটানোর দাবিটা তাঁদের চোখে মোটেই অগণতান্ত্রিক নয়। কিন্তু সরকার গঠনের লক্ষ্যে পরবর্তী নির্বাচন যদি একবার নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, হাসিনার বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। সেই বিবেচনায় স্বাভাবিকভাবেই হাসিনা বা আরাফাতদের লক্ষ্য হবে এই নির্বাচন ঠেকানো।
অনুমান করি, বাংলাদেশ সরকার এই বিপদ সম্পর্কে অবগত। অন্যথায় তাঁরা ভারতের কাছে আওয়ামী তৎপরতার প্রতিবাদ জানাতেন না। কিন্তু তাঁদের দায়িত্ব শুধু এই প্রতিবাদ জানানোর মধ্যে শেষ করলে চলবে না। বিষয়টা পৃথিবীর সামনে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরতে হবে। সবাইকে জানাতে হবে, দেশের ভেতরে, দেশের বাইরে বাংলাদেশকে নিয়ে এক ষড়যন্ত্রের ছক পাতা হচ্ছে।
* হাসান ফেরদৌস, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোলাজ: প্রথম আলো |
Wednesday, August 20, 2025
ফিলিস্তিনিদের হাতের মুঠোয় আনতেই কি স্বীকৃতির কথা সামনে আনা হচ্ছে by হাসান ফেরদৌস
হামাসের জায়গায় অঞ্চলটির শাসনভার গ্রহণ করবে মাহমুদ আব্বাসের ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটি, সংক্ষেপে পিএ)। তবে তিনি একা নন, তাঁকে এই কাজে সাহায্য করবে একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনী। প্রশাসনিক কাজে সাহায্য করতেও বিদেশি, মুখ্যত আরব, বিশেষজ্ঞেরা যোগ দেবেন।
প্রস্তাবটি খুব নতুন, তা নয়। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রধান মাহমুদ আব্বাস নিজেও মাত্র দুই সপ্তাহ আগে গাজা থেকে হামাসের সশস্ত্র সদস্যদের সরে যাওয়ার দাবি করেছেন। তবে প্রথমবারের মতো সৌদি আরব ও কাতারের মতো আরব দেশ, যাদের অর্থে হামাস টিকে আছে, তারা নিরস্ত্র করার পাশাপাশি গাজার শাসনব্যবস্থা থেকে হামাসকে সরে যাওয়ার দাবি তুলল। আর কিছু না হোক, এই দুই দেশের সমর্থনের কারণে প্রস্তাবটি এখন নানা মহলে আলোচিত হচ্ছে।
প্রায় দুই বছর হতে চলল গাজায় নির্বিচার গণহত্যা চলছে। সেখানে মৃতের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই ১৮ হাজার ৫০০। এত দিন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই সংখ্যা সঠিক নয় বলে নানা সাফাই গেয়ে এসেছে।
জাতিসংঘ সম্মেলনের সঙ্গে মিল রেখে চলতি সপ্তাহেই ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা গাজায় নিহত সব শিশুর নাম প্রকাশ করেছে। অনেকের ছবি ও মৃত্যুর কাহিনিও তুলে ধরেছে। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিন প্রশ্নে অধিকাংশ মার্কিন তথ্যমাধ্যমে ইসরায়েল নাখোশ হয়, এমন কথা বলা হয় না। গাজায় কোনো গণহত্যা চলছে না, এ কথাও তারা নানাভাবে জানান দিয়েছে। সেখানে এমন খোলামেলাভাবে গণহত্যার সবচেয়ে নির্মম দিকটির এই সচিত্র পরিবেশনা বিস্ময়কর, তবে এর পেছনে যে গাজায় ইসরায়েলি হামলা প্রশ্নে মার্কিন নাগরিকদের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।
গ্যালপের গৃহীত সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষ গাজায় ইসরায়েলি ভূমিকা সমর্থন করে, যা গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৪২ শতাংশ কম। একই জরিপ অনুসারে, ৬০ শতাংশ মার্কিন ফিলিস্তিনের ব্যাপারে ইসরায়েলের চলতি নীতি সমর্থন করে না। এই মনোভাব পশ্চিম ইউরোপসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সঙ্গে তুলনীয়। পিউ রিসার্চ জানিয়েছে, বর্তমানে ইসরায়েলের ভূমিকা সমর্থন করে না, এমন পশ্চিম ইউরোপীয়দের সংখ্যা ৬২ শতাংশ।
গাজায় গণহত্যা বন্ধের পক্ষে সারা বিশ্বে জোরদার সমর্থন থাকলেও অবস্থার আদৌ কোনো পরিবর্তন হয়নি, তার একটি প্রধান কারণ ইসরায়েলের সমর্থনে মার্কিন প্রশাসনের অনড় অবস্থান। ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তুষ্ট, এমন একটি গল্প এ দেশের গণমাধ্যমে আজকাল শোনা যাচ্ছে। কিন্তু মুখে যতই সমালোচনা হোক, ইসরায়েলের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়, এমন কাজ কোনো মার্কিন প্রশাসন কখনোই করবে না, এটা স্বতঃসিদ্ধ।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের আশায় ডোনাল্ড ট্রাম্প মনগড়া শান্তি প্রস্তাব করতে পারেন বটে, কিন্তু ইসরায়েলে আমেরিকার অর্থ বা অস্ত্র প্রেরণ কোনোটাই বন্ধ হবে না। গত মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বোমাবর্ষণ থেকেও স্পষ্ট—এই দুই দেশ একে অপরের কোমর কত শক্তভাবে জড়িয়ে আছে।
ঠিক এই বাস্তবতার মুখে আরব দেশগুলোর সমর্থনে হামাসকে গাজা থেকে সরে যাওয়ার প্রস্তাবটি এসেছে। হামাস নিরস্ত্র হলে ও অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণভার তাদের হাতে না থাকলে গাজায় অব্যাহত হামলা বা অধিগ্রহণের পক্ষে ইসরায়েলের কোনো যুক্তি ধোপে টিকবে না। অন্যদিকে, এই যুদ্ধের কঠোর বাস্তবতা হামাসের প্রতিকূলে। প্রায় দুই বছরের টানা ইসরায়েলি আক্রমণের মুখে অধিকাংশ হামাস যোদ্ধা হয় নিহত হয়েছে, অথবা সামরিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বাকি যে হাজার বারো যোদ্ধা এখনো অবশিষ্ট, তারা ইসরায়েলকে পরাজিত করবে, সে প্রশ্ন ওঠে না।
গাজার অনেক মানুষ তাদের দুর্ভোগের জন্য ইসরায়েলের পাশাপাশি হামাসকেও দায়ী করে। তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিক্ষোভও বাড়ছে। এ অবস্থায় বৃহত্তর শান্তি ও নিরাপত্তার খাতিরে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ একটি বাস্তবসম্মত সমাধান বলে সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশ মনে করছে। উল্লেখযোগ্য, আরব লীগের সদস্য ২২টি দেশই নিউইয়র্ক প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়।
গত পাঁচ বছরে মার্কিন প্রশাসনের সমর্থনে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক সামাজিকীকরণের যে প্রক্রিয়া চলছে, তার ফলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নটি কার্যত চাপা পড়ে গেছে। নিউইয়র্ক সম্মেলনে সেই দাবি নতুন করে উত্থাপিত হলো।
ইতিমধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ও গাজার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ডজনখানেক প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে গাজা থেকে প্রায় ২২ লাখ ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে সেখানে বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি অতি আধুনিক প্রমোদকানন বানানোর প্রস্তাবও রয়েছে। এই প্রস্তাব করেছেন (হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি চান মিসর ও জর্ডান বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীকে জায়গা দিকে। এই দুই দেশ ‘না’ করায় গাজাবাসীকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল একাধিক আফ্রিকান দেশের সঙ্গে কথা বলেছে।
অবাস্তব বিবেচনা করে মিসর ও অন্যান্য আরব দেশ মিলে একটি পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে, যার মোদ্দাকথা, ফিলিস্তিনিদের না তাড়িয়েই গাজায় এক অত্যাধুনিক নগর নির্মাণ সম্ভব। টাকাপয়সা সব আরব দেশগুলোই দেবে। মিসরের একটি কোম্পানি ইতিমধ্যেই নির্মাণ নকশা চূড়ান্ত করে ফেলেছে। মিসর বলেছে, ট্রাম্প সাহেব, যিনি নিজে একজন সুপরিচিত ‘ডেভেলপার’, তিনিও এই উদ্যোগে শামিল হতে পারেন।
আপাতলোভনীয় এত সব প্রস্তাব সত্ত্বেও গাজায় গণহত্যা থামেনি। থামবেও না, কারণ ইসরায়েল মনে করে গাজার ফিলিস্তিনিদের চিরতরে বহিষ্কার ও অঞ্চলটির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণের এটাই সুবর্ণ সুযোগ। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মন্ত্রিপরিষদে এমন জনা দুই সদস্য রয়েছেন, যাঁরা কোনো শর্তেই গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহারে সম্মত নন। তাঁরা মনে করেন, বৃহত্তর ইসরায়েল গঠনের যে স্বপ্ন জায়নবাদীরা দীর্ঘদিন থেকে দেখে আসছে, তার বাস্তবায়নের এই সুযোগ। গাজা কবজায় এলে পশ্চিম তীরের অবশিষ্ট আরব ভূমি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন কোনো ব্যাপার হবে না। এরপর আর ফিলিস্তিন নামক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবিই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে।
সম্মেলনে গৃহীত ঘোষণার কেন্দ্রে একটি ‘নিরস্ত্র’ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ইসরায়েলের পাশাপাশি শান্তি ও নিরাপদে অবস্থান করবে। নিরস্ত্র বা ‘ডি-মিলিটারাইজড’ ফিলিস্তিনের অর্থ হলো স্বাধীন ও সার্বভৌম হলেও এই রাষ্ট্র কখনো নিজস্ব সামরিক বাহিনী গঠন করতে পারবে না। গাজা হবে এই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রস্তাবে ইসরায়েলকে এই নতুন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। তবে সবার আগে অবিলম্বে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে হবে।
লক্ষণীয়, প্রস্তাবটিতে হামাসকে নিরস্ত্র করার কথা বলা হলেও ইসরায়েলকে একই ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো শর্ত রাখা হয়নি। মিসরীয় ভাষ্যকার আমর আবদেলরাহমান সে কথা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে প্রশ্ন করেছেন, গাজায় ইসরায়েলি সৈন্যদের নিরস্ত্র করার কথা কেউ বলছে না। তাহলে গাজাকে আত্মরক্ষার ও প্রতিরোধের সব সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে কেন?
যুদ্ধোত্তর গাজা পুনর্নির্মাণের একটি পরিকল্পনা এতে সংযুক্ত করা হয়েছে, সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একটি বহুজাতিক কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সে পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের কার্যকর অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। সম্মেলনের প্রস্তাবগুলোর একটি অলিখিত লক্ষ্য, আরব দেশগুলো ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির কথা বলা হলেও পরিকল্পনাটির আসল লক্ষ্য, আরব দেশগুলো ও ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ। ‘আব্রাহাম চুক্তি’র মাধ্যমে ইসরায়েল সে পথে ইতিমধ্যেই অনেকটা এগিয়ে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রাইজ সৌদি আরবকে বড়শি দিয়ে টেনে তুলতে হলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের মুলোটি ঝোলাতেই হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ভাষ্যকার খালেদ এলজিন্ডি মন্তব্য করেছেন, এটা মোটেই কোনো শান্তি পরিকল্পনা নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের হাতের মুঠোয় আনার পরিকল্পনা। এতে আক্রান্ত ফিলিস্তিনিদের নিরস্ত্র করা হবে, আক্রমণকারী ইসরায়েলকে পুরস্কৃত করা হবে। আর তাকেই নাম দেওয়া হবে পুনর্গঠন।
* হাসান ফেরদৌস, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপ হয়ে যাওয়া গাজা। ছবি: এএফপি |
Sunday, August 17, 2025
আলাস্কা শীর্ষ বৈঠক: পুতিন ১, ট্রাম্প ০ by হাসান ফেরদৌস
ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বের সেরা ‘ডিল মেকার’ হিসেবে পরিচয় করাতে ভালোবাসেন। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় বসামাত্রই তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। ছয় মাস চলে গেছে, যুদ্ধ বন্ধ হয়নি। শুরুতে দোষ দিয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে, হোয়াইট হাউসে ডেকে এনে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, এই যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে খেলার মতো কোনো তাসই তাঁর হাতে নেই। পরে মস্কোর আগ্রাসী বিমান হামলা থামাতে ব্যর্থ হয়ে চোখ ফেরালেন পুতিনের দিকে, বললেন লোকটা অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, কিন্তু সে সবই ফালতু। খেপে গিয়ে এমন কথাও বললেন, আগামী ১০–১২ দিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি না মেনে নিলে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।
অথচ নিষেধাজ্ঞা নয়, অতিরিক্ত বাণিজ্যশুল্ক নয়, উল্টো কোনো আগাম শর্ত ছাড়াই পুতিনের সঙ্গে তিনি আলাস্কায় শীর্ষ বৈঠকে সম্মত হয়ে গেলেন। আলোচনার বিষয়—ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি। অথচ সেই বৈঠকে ইউক্রেনের কোনো প্রতিনিধি নেই। নিউইয়র্ক টাইমস টিপ্পনী কেটে বলেছে, পুরো ব্যাপারটাই দুই পরাশক্তির মধ্যে আপসে দুনিয়া ভাগাভাগির মতো, ঠিক যেভাবে একসময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে দুই-তিনটি ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল।
ট্রাম্প অবশ্য আশ্বাস দিয়েছিলেন, ইউক্রেনের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো চুক্তি হবে না। আলাস্কাতেই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে ডেকে এনে ত্রিমুখী বৈঠক হবে, এমন কথাও বলেছিলেন। তা হয়নি, সম্ভবত পুতিনের অনাগ্রহেই জেলেনস্কির নাম বাদ যায়। তবে নিজের দুই সহকারী—বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে সঙ্গে নিয়ে পুতিনের দুই সহকারীর সঙ্গে মুখোমুখি বসেছিলেন ট্রাম্প। মাঝখানে কোনো টেবিল নেই, মুখোমুখি তিনখানা করে চেয়ার বিছিয়ে বৈঠক। ট্রাম্প হয়তো বিশ্বাস করতেন, তিনি একবার যদি পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসতে পারেন, তাহলে যুদ্ধবিরতিতে তাঁকে সম্মত করাতে সক্ষম হবেন। এর আগে একই কথা বলেছিলেন উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং-উন সম্বন্ধে। সেখানে চিড়ে ভেজেনি। একই ফলাফল পুতিনের সঙ্গে বৈঠকেরও।
ইউক্রেনে হামলার জন্য পুতিন বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অনাহূত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। সেই পুতিনকে ট্রাম্প অ্যাঙ্কোরেজের বিমানবন্দরে লালগালিচা সংবর্ধনার ব্যবস্থা করলেন। শুধু তা–ই নয়, পুতিন বিমান থেকে নামতে না নামতে তিনি দূর থেকে হাততালি দেওয়া শুরু করলেন। এমন দৃশ্য আগে কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। ট্রাম্প তাঁর সরকারি গাড়ি ‘বিস্ট’-এ পুতিনকে নিজের পাশে বসালেন। সেটাও অভিনব। সেখানে তাঁদের দুজনের একান্তে কী কথা হলো, আমরা জানি না। পুতিন ভালোই ইংরেজি জানেন। অনেকেই বলছেন, গাড়িতেই ট্রাম্পকে খুশি করার মতো যা বলার তিনি বলে দিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রথম দুই-চার মিনিটের মধ্যেই তিনি বুঝে যাবেন যুদ্ধবিরতি অর্জন সম্ভব হবে কি না। যদি দেখেন, না, কোনো আশা নেই; তাহলে নিজেই সভা থেকে বেরিয়ে যাবেন। তিন-চার মিনিট নয়, আড়াই ঘণ্টা বৈঠক শেষে বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি জানালেন, খুব ভালো আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কোনো ‘ডিল’ হয়নি। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়নি। এমনিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে ট্রাম্পকে থামানো কঠিন। কিন্তু এদিন ঘরভর্তি সাংবাদিক থাকলেও তাঁদের কারও কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়েই মঞ্চের পেছনে প্রস্থান করলেন।
যাঁরা পুতিনকে ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, তাঁরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি আলাস্কার বৈঠকে আসেননি। এই মুহূর্তে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনারা স্বস্তিকর অবস্থায় আছেন। মস্কো বলছে, যুদ্ধে তারাই জিতছে। অতএব এই সময়ে যুদ্ধবিরতির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে পুতিন আলাস্কায় এসেছিলেন কেন?
তিনি আসলে বিশ্বমঞ্চে আবার প্রবেশের এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। অন্য কেউ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তাঁকে সমান মর্যাদা দিয়ে নিজ দেশে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছেন। এটাই তাঁর জন্য মস্ত কূটনৈতিক জয়। ট্রাম্প যাতে অতিরিক্ত শুল্ক না বসায় বা অন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি না করে, সে জন্য কিছু বাড়তি সময় সংগ্রহ তাঁর অন্য উদ্দেশ্য।
পুতিনের অন্য বড় জয় ছিল, এই যুদ্ধ বন্ধে কী কী শর্ত রয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর ‘মূল কারণ’গুলোর সমাধান করতে হবে। এ জন্য যা করতে হবে তার মধ্যে রয়েছে—ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ, তার ন্যাটো জোটে অংশগ্রহণ না করার নিশ্চয়তা এবং সেখানে নতুন নির্বাচন। অনুমান করা হচ্ছে, অপর যে শর্তটি তিনি ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, তা হলো, এরই মধ্যে পূর্বাঞ্চলের যে এলাকাগুলো মস্কো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, রাশিয়ার সীমানা হিসেবে তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, ট্রাম্প নিজেই ইউক্রেনের দখলকৃত এলাকা রাশিয়ার দখলে রাখার ব্যাপারে নিজের সম্মতির কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, যুদ্ধরত দুই দেশকে একে অপরের সঙ্গে জায়গা বদল করে নিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, রাশিয়া এরই মধ্যে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ জমি নিজের দখলে নিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য শূন্য ৮ শতাংশ রুশ জমি বা পাঁচ বর্গমাইল। তাহলে একে অপরের সঙ্গে কী বদলাবদলি হবে?
ইউক্রেনের শাসনতন্ত্রে বলা আছে, কোনো অবস্থাতেই দেশের কোনো জমি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। জেলেনস্কিও মুখে বলেছেন, ইউক্রেনের ‘দ্বিতীয় দেশভাগ’ মেনে নেওয়া হবে না। ইউক্রেনের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো শান্তিচুক্তি হবে না, জেলেনস্কি সে কথাও জানিয়ে দিয়েছেন।
ইউক্রেনে যুদ্ধ থামুক, তা যে শর্তেই হোক, এটা সম্ভবত ট্রাম্প চান। তিনি আশায় আছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি অর্জন সম্ভব হলে তিনি নির্ঘাত শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাবেন। এরই মধ্যে ইসরায়েল, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সরকার তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে নোবেল কমিটির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। ট্রাম্প নিজেও এখানে–সেখানে ফোন করে নিজের হয়ে তদবির করেছেন। সম্প্রতি জানা গেছে, নরওয়ের অর্থমন্ত্রীকে ফোন করে নোবেল পুরস্কারের বিষয়ে কথা বলেছেন।
* হাসান ফেরদৌস, লেখক ও প্রাবন্ধিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের অ্যাঙ্কোরেজ শহরের এলমেনডর্ফ–রিচার্ডসন সামরিক ঘাঁটিতে, ১৫ আগস্ট ২০২৫ ছবি: এএফপি |
Thursday, June 12, 2025
ক্যালিফোর্নিয়া কেন জ্বলছে by হাসান ফেরদৌস
পরপর তিন দিনের বিক্ষোভ ও দাঙ্গার পর অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই হাজার ন্যাশনাল গার্ড পাঠানোর নির্দেশ দেন। নিয়মিত বাহিনীর অংশ হিসেবে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা একই সঙ্গে ফেডারেল পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ও অঙ্গরাজ্যে গভর্নরের নির্দেশে কাজ করে থাকে। কয়েক দিন আগে গার্ডদের প্রথম দলটি আইস বা ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট–বিরোধী দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছায়। ভারী অস্ত্রসজ্জিত এসব গার্ডের উপস্থিতি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে তা আরও উসকে দেয়। দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত ঘটনাকে কেন এভাবে একটি ফেডারেল সমস্যায় দাঁড় করানো হলো, তা নিয়ে এখন বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ন্যাশনাল গার্ডদের নিয়োগ নতুন ঘটনা নয়—গত ৬০ বছরে অবস্থা সামাল দিতে দুই ডজনের বেশি সময় তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু একবার ছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই হয় স্থানীয় গভর্নরের অনুরোধে, অথবা গভর্নরের অনুমতি ও সমর্থনেই তেমন নিয়োগ হয়েছে। এবার তার ব্যতিক্রম কেন?
সেই প্রশ্ন তুলে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গেভিন নিউসাম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তাঁর যুক্তি—যে আইনের ভিত্তিতে ন্যাশনাল গার্ডদের ট্রাম্প প্রেরণ করেছেন, তা শুধু বহিরাগত ‘আক্রমণ’ বা বড় ধরনের ‘বিদ্রোহ’ ঠেকাতে করা হয়ে থাকে। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ায় কোনো বিদেশি আক্রমণ ঘটেনি, কোনো বিদ্রোহ হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষমতা ক্যালিফোর্নিয়ার নিজের রয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টিকে রাজনীতিকরণের উদ্দেশ্যেই এমন অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ন্যাশনাল গার্ডের তিনি সেনাধ্যক্ষ, অথচ এ বিষয়ে তাঁর সম্মতি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন ট্রাম্প দেখেননি।
ট্রাম্প ও নিউসামের মধ্যে বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। নিউসামকে যে তিনি পছন্দ করেন না, সেটাও কোনো গোপন ব্যাপার নয়। তাঁকে অযোগ্য ও ব্যর্থ অতি বাম রাজনীতিক হিসেবে হরহামেশাই বিদ্রূপ করে থাকেন ট্রাম্প। তিনি নিউসামের নতুন নাম দিয়েছেন নিউস্কাম (স্কাম শব্দের এক অর্থ জঘন্য বা আবর্জনা)। আইসের অভিযানের সময় গোলযোগ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে অযোগ্য ও অপদার্থ প্রমাণের এমন একটি সুযোগ তিনি সম্ভবত হাতছাড়া করতে চাননি।
নিউসামের পক্ষ নিয়ে ডেমোক্রেট দলীয় গভর্নররা এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ন্যাশনাল গার্ডের অধিনায়ক হচ্ছেন সে রাজ্যের গভর্নর। অথচ সেই অধিনায়কের সম্মতি ছাড়াই ন্যাশনাল গার্ড নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত অকার্যকর ও ভয়াবহ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য সব সমালোচনা শুধু অগ্রাহ্য করেছেন তা–ই নয়, প্রয়োজন হলে নিউসামকে গ্রেপ্তারের পক্ষে মত দিয়েছেন। উত্তাপ কমানোর বদলে তার প্রশাসন আরও দুই হাজার গার্ডকে গোলযোগ দমনে পাঠাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। কয়েক হাজার নৌ সেনাকেও সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।
‘দেশ বাঁচাও’ যুক্তিতে ন্যাশনাল গার্ড ও নিয়মিত সেনাসদস্যদের নিয়োগ করা হলেও ট্রাম্প যে একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা অনুসরণ করছেন, তাতে সন্দেহ নেই। তাঁর অন্যতম উপদেষ্টা স্টিভেন মিলার বলেছেন, তাঁরা ‘সভ্যতা বাঁচানোর’ লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছেন। অথচ ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ট্রাম্পের অনুসারীরা কংগ্রেস ভবন আক্রমণ করে মার্কিন গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি হুমকি দিয়েছিল, তা ঠেকাতে শত অনুরোধ সত্ত্বেও কোনো ন্যাশনাল গার্ড তিনি পাঠাননি।
ট্রাম্প অনেক দিন থেকেই বলে আসছেন ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ডেমোক্রাটদের নিয়ন্ত্রিত রাজ্য ও শহরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যেমন নিউইয়র্ক সিটি সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন, এটি অপরাধ ও দুষ্কর্মে ভরা এক অবিশ্বাস্য ‘নরকের গর্ত’ (তাঁর কথায় ‘হেল হোল’)। শিকাগো, বাল্টিমোর বা ফিলাডেলফিয়াসহ যেকোনো ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত শহর ও রাজ্যকেও তিনি এই ভাষায় আক্রমণ করেছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের আইসবিরোধী দাঙ্গার উদাহরণ তুলে ট্রাম্প এখন তাদের ওপর একহাত নেওয়ার ভালো সুযোগ পেয়েছেন।
এ কথা ভাবার কারণ রয়েছে, একই রকম প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ ঠেকাতে ট্রাম্প অন্য অনেক শহরেও সৈন্য পাঠাতে পারেন। যে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তিনি সৈন্য প্রেরণের নির্দেশ দেন, তাতে কোথাও ক্যালিফোর্নিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়নি। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেখানেই অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ হবে, এমনকি তা যদি শান্তিপূর্ণও হয়, তা প্রতিরোধে ন্যাশনাল গার্ড পাঠানো হবে। অর্থাৎ ট্রাম্প ভাবছেন আইনবিরোধী বিক্ষোভ দেশের অন্যত্রও হবে। তাদের দমনেও ফেডারেল সৈন্য ব্যবহার করা হবে—এমন আগাম হুঁশিয়ারি তিনি এই নির্বাহী আদেশে দিয়ে রাখলেন।
কয়েক দিনের বিক্ষোভ ও দাঙ্গায় লস অ্যাঞ্জেলেসের শহরতলির কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হাতবোমা থেকে কিছু লোক আহত হয়েছেন। কিন্তু কেউ নিহত হননি। এ ধরনের বিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শহরে মোটেই নতুন কোনো ঘটনা নয়। নতুন যা হলো, এ ঘটনাকে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তরের চেষ্টা। সে কথা উল্লেখ করে নিউইয়র্ক টাইমস এক সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছে, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে ট্রাম্পের আসল লক্ষ্য বেপরোয়া শক্তির প্রদর্শনী।
আরও কঠোর ভাষায় ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে ব্রেনন সেন্টার ফর জাস্টিস। মানবাধিকারভিত্তিক এই সংস্থার অন্যতম পরিচালক এলিজাবেথ গয়তিন স্থানীয় গভর্নরের সম্মতি ছাড়া সৈন্য প্রেরণের সিদ্ধান্তকে অভূতপূর্ব ও আইনবহির্ভূত বলেছেন। যে আইনের ব্যবহার করে ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাতে শুধু ‘শেষ ব্যবস্থা’ হিসেবে সৈন্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই কথা বলেছেন নাগরিক অধিকার সংস্থা এসিএলইউ। এই সংস্থার পরিচালক হিনা শামসি বলেছেন, বেসামরিক পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তি ব্যবহার না করার যে নীতি এত দিন আমরা মেনে এসেছি, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এর ফলে শুধু যে স্থানীয় নাগরিকেরা বিপদের মুখে পড়বে তা নয়, সৈন্যরাও বিপদে পড়তে পারে। কারণ, তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে পড়বে।
যেভাবে ও যে ভাষায় হোয়াইট হাউস থেকে এই অভিযানের পক্ষে কথা বলেছেন, তাতে মনে হয় ব্যাপারটায় তারা মহাখুশি। অবৈধ অভিবাসন ও আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নে তিনি আপসহীন ও কঠোর, নির্বাচনের আগে থেকেই ট্রাম্প বলে আসছেন। এখন হাতে–কলমে সে কথার এক প্রমাণ দিলেন। ঠিক এই মুহূর্তে কেন, তারও একটা ব্যাখ্যা রয়েছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, বাজেট প্রশ্নে বিতর্ক ও অব্যাহত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে এখন তাঁর প্রয়োজন ছিল দেশের মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ফেরানো। ক্ষমতা গ্রহণের চার মাস হতে না হতেই তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। তবে যে একটি বিষয়ে তিনি এখনো আমেরিকানদের, বিশেষ করে তাঁর রিপাবলিকান সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয়, তা হলো অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নে তাঁর অব্যাহত কঠোর অবস্থান। মনে হয়, নিজের নড়বড়ে জনপ্রিয়তাকে জোড়া লাগাতে তিনি সেই অভিবাসন প্রশ্নটিকেই ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাতে কাজও দিয়েছে। সিবিএস নিউজ পরিচালিত এক জনমত জরিপ অনুসারে, দেশের ৫৪ শতাংশ মানুষ অভিবাসন প্রশ্নে তাঁর এই কঠোর অবস্থানে খুশি। খুশি নন, এমন মানুষের সংখ্যা ৪৪ শতাংশ।
| এক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সোমবার ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা অ্যানা শহরে। ছবি: এএফপি |
Sunday, June 8, 2025
হামাস নিয়ে ভাবার সময় এসেছে by হাসান ফেরদৌস
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তার একটি ছবি মিলেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের পাঠানো এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। তাতে ইসলাম আবু তাইয়েমা নামের একজন মা ও তাঁর ৯ বছরের মেয়ের কথা বলা হয়েছে। আবু তাইয়েমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। গাজায় যুদ্ধ শুরুর আগে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করতেন। এখন চাকরি নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই, ঘরে দানাপানি নেই। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তাই তিনি গাজার রাস্তায় রাস্তায় ডাস্টবিন থেকে খাদ্য সংগ্রহ করছেন। সারা দিন ঘুরে হয়তো আধখাওয়া রুটি জুটল। ‘আজকের জন্য এটাই আমাদের আহার,’ আবু তাইয়েমা এপিকে বলেছেন। ‘কেউ বুঝতেও পারবে না কী দুর্যোগের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি।’
গাজা অভিযানের শুরুতে এক ইসরায়েলি মন্ত্রী হাতের তিন আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের সামনে তিনটি পথ খোলা। পালানো, গুলি খেয়ে মরা অথবা সাগরে ডুবে মরা। তাঁদের পরিকল্পনামাফিক ইসরায়েল তার সে কাজ গুছিয়ে এনেছে। কাজটা যে এত সহজ হবে দেশটির সরকার তা হয়তো ভাবেনি। তাদের ভয় ছিল, হামাস মরণপণ লড়াই করে তাদের মস্ত ক্ষতি করবে। আরব দেশগুলোও ক্রোধে জ্বলে উঠবে, বিশ্বসভায় আপ্তবাক্য শোনানো ছাড়াও তাকে থামানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছুই হয়নি, ফলে চালাও গুলি।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত পৌনে দুই বছরে প্রায় ৫৪ হাজার ৬৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৩০ জন। ইসরায়েল বলেছে, হামাসের শেষ সেনা শেষ না করা পর্যন্ত তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। ইসরায়েলের হিসাবমতে, গত দেড় বছরে ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন ১৭ হাজার হামাস সেনা। হামাস নতুন যোদ্ধা সংগ্রহ করেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁরা কেউ প্রশিক্ষিত নন। তাদের ট্যাংক বা ভারী কোনো সাঁজোয়া বহর নেই। সামরিক বিমানের তো প্রশ্নই উঠছে না।
ইসরায়েল হামাসকে ভয়ংকর প্রতিপক্ষ হিসেবে, পূর্ণ সেনাবাহিনী হিসেবে আমাদের কাছে পরিচয় করিয়েছে। আমরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা ভেবে প্রশংসা করেছি। এমন কথাও বলেছি, হামাসের ভয়ে ইসরায়েল কাঁপছে।
এই দুই বাহিনীর তুলনা একদমই অবাস্তব। ইসরায়েলের রয়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ নিয়মিত সৈন্য। আছে আরও সাড়ে চার লাখ রিজার্ভ। প্রযুক্তিগতভাবে তারা বিশ্বের সবচেয়ে অগ্রসর সামরিক বাহিনী। বছরে সেনা খাতে দেশটির ব্যয় বরাদ্দ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া মাথার ওপর ছাতা হয়ে ‘আঙ্কল স্যাম’তো রয়েছেনই।
মাথা মোটা এমন কারও পক্ষেও বোঝা সম্ভব যে ইসরায়েলকে সামরিকভাবে পরাস্ত করা একা হামাসের পক্ষে সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো এককাট্টা হয়ে সে চেষ্টা করলে একটা মরণকামড় দেওয়া হয়তো সম্ভব, যেমন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন আরব দেশগুলো ব্যস্ত ইসরায়েলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে। আর এই কাজে দূতিয়ালির দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এসব জানা সত্ত্বেও হামাসের যোদ্ধারা মরণপণ লড়ে যাচ্ছেন। তাঁরা মরছেন, সঙ্গে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ গাজাবাসী, সংখ্যায় যাঁদের মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যায় বেশি। যেহেতু হামাস যোদ্ধা ও সাধারণ গাজাবাসীর মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই—এই শহরে সবাই যোদ্ধা—সে কারণে ইসরায়েল একজন হামাস যোদ্ধাকে টার্গেট করে দুই ডজন মানুষ মারছে।
স্পষ্টতই লড়াই করে ইসরায়েলকে হারাব, হামাসের এই রণকৌশল কাজে দিচ্ছে না। তাদের ভিন্ন রণকৌশলের কথা ভাবতে হবে। যেমন ইয়াসির আরাফাত ভেবেছিলেন। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে দেখা যাক।
১৯৮২ সালে, বৈরুতে অব্যাহত ইসরায়েলি আক্রমণ এড়াতে ফিলিস্তিন মুক্তিসংগ্রামের নেতা আরাফাত তাঁর সঙ্গী ১৪ হাজার ফিলিস্তিনি যোদ্ধাসহ লেবানন ছেড়ে তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে সরে আসেন। আত্মসমর্পণ না করে যুদ্ধ চালিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারতেন, কিন্তু নতুন যুদ্ধের কৌশল নির্মাণ করতেই তিনি পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন। এর ১০ বছর পর ১৯৯৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় অসলো চুক্তি, যার ভিত্তিতে সীমিত আকারে হলেও পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিন প্রশাসন গঠিত হয়। এ কথা ঠিক, সে চুক্তির ২০ বছর পরেও ফিলিস্তিনিরা স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেনি; বরং প্রতিদিন ইসরায়েলি আগ্রাসন ও অধিগ্রহণে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার পরিমাণ ক্রমেই কমে এসেছে। এ জন্য অবশ্যই পূর্ণ স্বাধীনতা প্রশ্নে ইসরায়েলের অনীহা প্রধান কারণ, তবে ২০০৬ সালের পর গাজার নিয়ন্ত্রণ হামাসের হাতে চলে আসাও একটা কারণ। সে বছর পশ্চিম তীর ও গাজায় যে নির্বাচন হয়, তাতে হামাস বিপুল সংখ্যাধিক্য ভোটে জয় লাভ করে। এ নিয়ে বিবাদ বাধলে গাজার নিয়ন্ত্রণভার একরকম জোর করেই গ্রহণ করে হামাস। তখন থেকেই পশ্চিম তীর ও গাজায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক আন্দোলন—ফাতাহ ও হামাস, তাদের অভিন্ন শত্রু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দুই হাত এক করে লড়াইয়ের বদলে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। ইসরায়েল তাতে ইন্ধন জোগানোয় এ বিভক্তি আরও বেড়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে স্পষ্ট, লড়াই করে তাঁকে পরাস্ত করা হামাসের পক্ষে সম্ভব নয়। শেষ হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করার কথা বলে ইসরায়েল শুধু যে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে তা–ই নয়, গাজাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এক সপ্তাহ আগেও ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলছেন, গাজার শেষ বাসিন্দাটি সরে না যাওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে। পাশাপাশি গাজার ২২ লাখ মানুষকে মিসর, জর্ডান ও আফ্রিকার একাধিক দেশে স্থানান্তরের জোর চেষ্টা চলছে। এই চেষ্টার পেছনে চলতি মার্কিন প্রশাসনেরও সমর্থন রয়েছে।
গাজা থেকে যদি হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সদলবল মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোথায় সরে যেতে সম্মত হয়, অনুমান করি, গাজার চূড়ান্ত ধ্বংস হয়তো ঠেকানো সম্ভব। হামাস ইসরায়েলের ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ এই যুক্তি দেখিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। যদি হামাসই না থাকে, তাহলে অব্যাহত বোমাবাজির পক্ষে যুক্তি দেখাবেন কী করে?
এ কথা ঠিক, ইসরায়েলের ভেতরে ও বাইরে গাজায় গণহত্যার তীব্র নিন্দা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। ইসরায়েলের ভেতরেই কেউ কেউ বলেছেন, হামাস নয়, এই আগ্রাসনের কারণে বিশ্বজুড়ে যে নিন্দা রব উঠেছে, সেটাই ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য আসল সংকট। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট হারেৎজ পত্রিকায় এক উপসম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছেন, ‘গাজায় ইসরায়েল যা করছে, তা যুদ্ধাপরাধ ভিন্ন অন্য কিছু নয়।’ পরে সিএনএনকে তিনি বলেছেন, ‘হামাস এখন আর আমাদের জন্য হুমকি নয়। এখন যা করা হচ্ছে, তা নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড।’ তিনি আরও মন্তব্য করেছেন, ‘আগ্রাসন অব্যাহত রেখে ইসরায়েলের কোনো সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না, বরং রাজনৈতিকভাবে আমরা বিশ্বব্যাপী ধিক্কারের মুখোমুখি হচ্ছি।’
নেতানিয়াহু সে কথা মানতে রাজি নন। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে এই যুদ্ধ তাঁর প্রয়োজন। যুদ্ধ বন্ধের পরদিনই তাঁর অতি দক্ষিণপন্থী কোয়ালিশন ভেঙে পড়বে, সে কথা তিনি জানেন। ফলে হামাসের দিকে আঙুল তুলে তিনি নিজেকে নৈতিকভাবে অধিক বলবান বলে প্রমাণ করতে চান। সম্প্রতি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সীমিত আকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে। সে কথার জবাবে নেতানিয়াহু বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার কথা বলে এই তিন দেশ সন্ত্রাসীদের পক্ষে কাজ করছে, মানবতার পক্ষে নয়।
হামাস যদি আর কোনো ‘ফ্যাক্টর’ না হয়, এই দলের যোদ্ধাদের হত্যার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে নেতানিয়াহুর পক্ষে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের খোঁড়া যুক্তি দেখানো সহজ হবে না। হামাসের প্রস্থানের অন্য আরেক সম্ভাব্য ফল হবে, পশ্চিম তীর ও গাজা এই দুই ভূখণ্ডকে আবার মিলিত করা। রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নে এত দিন যে কোনো অগ্রগতি হয়নি, তার অন্যতম কারণই হলো গাজাকে ঘিরে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বে বিভক্তি।
দেশের বাইরে বসে হামাসের সাহসিকতার যত প্রশংসাই আমরা করি না, গাজায় এ মুহূর্তে তার পক্ষে জনসমর্থন ১০ শতাংশেরও কম। ইসরায়েলে হামলার পর নেওয়া জনমত জরিপ অনুসারে, গাজার মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ হামাসকে এই এলাকার শাসনভার তুলে দিতে সম্মত। এই জনমত সত্যি হলে হামাসের হাতে গাজার নিরপরাধ মানুষ জিম্মি হয়ে আছে, এ কথা বলা একদম অযৌক্তিক হবে না।
হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব গাজা থেকে সরিয়ে নিতে হলে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে। এত দিন তারাই অর্থ দিয়ে তাকে জিইয়ে রেখেছে। বস্তুত, হামাসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রায় সবাই এখন কাতার অথবা উপসাগরের কোনো না কোনো দেশে অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রস্থানের সময় হামাসকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে সম্মত হয়, তাহলে ব্যাপারটা ত্বরান্বিত হবে তাতে সন্দেহ নেই। ১৯৮২ সালে আরাফাতকে যুক্তরাষ্ট্র সে নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
| ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতাল—গাজার সব জায়গায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল। গাজা থেকে হামাসকে উৎখাতের পর এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কাকে দেওয়া হবে, এখন বিশ্ব মোড়লেরা ব্যস্ত সেই চিন্তায়। রাফাহ এলাকায়। ছবি: রয়টার্স |
Friday, April 11, 2025
আমাদের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ by হাসান ফেরদৌস
কথাটা আমার নয়, জর্জ ওরওয়েলের। অ্যানিমেল ফার্ম নামের প্রহসনে তিনি ব্যাপারটা আমাদের হাতে-কলমে ধরিয়ে দিয়েছেন। অন্য আরেক স্মরণীয় গ্রন্থ ১৯৮৪-তেও বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে স্বৈরাচারকে আগলে রাখে, তার সবিস্তার বিবরণ দিয়েছেন তিনি। উভয় গ্রন্থেই মুখ্যত স্তালিনের সোভিয়েত আমলের কথা তিনি বলেছেন, কিন্তু তাঁর সে কথা পৃথিবীর যেকোনো স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বেলাতেই প্রযোজ্য। এ অভিজ্ঞতা আমাদের বাংলাদেশেও।
শূকরপাল ও তাদের নেতাদের গল্প
অ্যানিমেল ফার্ম এক শূকরের খোঁয়াড় নিয়ে গল্প, যার বাসিন্দারা খোঁয়াড়মালিক মিস্টার জোন্সের নিষ্ঠুর ব্যবহারে অতিষ্ঠ। খামারের পুরোনো বাসিন্দা ওল্ড মেজর, সে প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ। অন্য শূকরদের ডেকে সে বোঝায়, তাদের বর্তমান হতদরিদ্র দশার কারণ মি. জোন্স। অবস্থা বদলাতে হলে এই লোকের কবজা থেকে মুক্ত হতে হবে। তার প্রেরণায় খামারের শূকরেরা এক সফল বিদ্রোহে মি. জোন্সকে তাড়িয়ে খোঁয়াড়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয় খোঁয়াড়ের দুই চতুর শূকর—স্নোবল ও নেপোলিয়ন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই এই দুজনের মধ্যে নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। অধিক চতুর নেপোলিয়ন তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্নোবলকে তাড়িয়ে দেয়।
খামারের অন্য সদস্যরা টিকে থাকার জন্য নেপোলিয়নের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। তার নেকনজর ও বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য তাদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এ কাজে সবচেয়ে এগিয়ে থাকে স্কুইলার নামের এক শূকর। তার দায়িত্ব ছিল খামারের নতুন নেতা নেপোলিয়নকে নিয়ে সত্য-মিথ্যা গল্প বানিয়ে অন্য শূকরদের প্রভাবিত করা।
১৯৮৪ গ্রন্থে ওরওয়েল যে মিনিস্ট্রি অব ট্রুথের কথা লেখেন, স্কুইলার হচ্ছে সে মিনিস্ট্রির সেরা খাদেম। তার নেতৃত্বে নতুন যে প্রচার-ভাষার জন্ম হয়, ওরওয়েল তাকেই নিউজস্পিক নাম দিয়েছিলেন। যে অনুগত বুদ্ধিজীবীদের কথা গোড়ায় বলেছি, স্কুইলার তাদেরই একজন।
বোঝা কঠিন নয়, এই রূপকের ওল্ড মেজর কার্ল মার্ক্স ও লেনিন, যাঁরা এক শোষণহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্নোবল সম্ভবত ট্রটস্কি ও অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতা, যাঁরা লেনিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুন সোভিয়েত সমাজ গড়ার কাজে হাত লাগিয়েছিলেন। আর নেপোলিয়ন অবশ্যই স্তালিন, যাঁর ক্ষমতার ক্ষুধার বলি হয়েছিলেন ট্রটস্কির মতো অসংখ্য স্বপ্নতাড়িত মানুষ। নেপোলিয়ন নিজে নিজেই ওরওয়েলের শূকর খামারের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসেনি। তাকে সেই কাজে সাহায্য করেছে স্কুইলারের মতো অসংখ্য সেবক। বস্তুত স্কুইলার সেসব লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিধি, যাঁরা নগদ পাওনার লোভে চোখ বুজে, কখনো কখনো চোখ খুলে সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্য বানিয়েছেন।
ওরওয়েল বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা প্রশ্নে বারবার ফিরে গেছেন। আর তা মুখ্যত এই বেদনা থেকে যে বিশ শতকের প্রায় প্রতিটি বৃহৎ ট্র্যাজেডি, যেমন স্তালিনীয় একনায়কতন্ত্র ও হিটলারীয় নাৎসিবাদ—তার কোনোটাই সফল হতো না যদি বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে সক্ষম হতেন। তিনি এ বিষয়ে প্রবল সচেতন যে বিপ্লব বা ইতিবাচক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। আবার তাঁরাই বা তাঁদের কেউ কেউ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একনায়কের রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। উভয় ক্ষেত্রেই, অর্থাৎ বিপ্লবপূর্ব ও বিপ্লবোত্তর সময়ে স্বৈরাচারের পক্ষে ও বিপক্ষে তাদের হাতিয়ার কিন্তু একটাই—ভাষা।
ওরওয়েল তাঁর ‘নোটস অন ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছেন। সব সময়েই একদল বুদ্ধিজীবী মুখ উঁচিয়ে থাকেন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে হাত মেলাতে। আদর্শগতভাবে নৈকট্যের কারণে তাঁরা কোনো বাদবিচার ছাড়াই তাঁদের পছন্দের শাসকদের গুণকীর্তনে বিন্দুমাত্র অস্বস্তি অথবা বিবেকের তাড়না বোধ করেন না। প্রবল উষ্মা ও বিদ্রূপের সঙ্গে তিনি লিখেছেন, একমাত্র বুদ্ধিজীবীদের পক্ষেই সেসব গালগপ্প বলা বা বিশ্বাস করা সম্ভব। ‘নো অর্ডিনারি ম্যান কুড বি সাচ আ ফুল।’ অর্থাৎ কোনো সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এমন নির্বোধ হতে পারে না।
স্বৈরাচার তোষণকারী বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্লেষ ও বিদ্রূপ করেই ওরওয়েল অ্যানিমেল ফার্ম প্রহসনটি লিখেছিলেন, কিন্তু এর সঙ্গে গভীর বেদনা ও বঞ্চনার এক অলিখিত অধ্যায়ও জড়িয়ে আছে। বামপন্থী ও প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি নিজে একসময় স্তালিনীয় বন্দনায় অংশ নিয়েছিলেন। একই চেতনাবোধ থেকে ১৯৩৬ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক ব্রিগেডে নাম লিখিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধের সময়েই তিনি স্তালিনীয় স্বৈরাচারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হন। এই যুদ্ধে ভিন্নমত পোষণের জন্য আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের অনেক সদস্যই মস্কোপন্থী স্প্যানিশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হন। মস্কো নির্দেশিত নীতি অনুসরণে অনাগ্রহী অনেক কমরেড হতাহত হন। ১৯৩৭ সালে সংঘটিত ব্যাটল অব বার্সেলোনা সেই রক্তাক্ত ও লজ্জাকর ইতিহাসের সাক্ষী। এ অভিজ্ঞতাই ওরওয়েলকে স্বৈরাচারের পক্ষে ও বিপক্ষে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা প্রশ্নে সচেতন করে তোলে।
আমাদের শূকরের খোঁয়াড়
গল্পটা আমাদের খুব পরিচিত। জুলাই-আগস্টের গণজাগরণে বিতাড়িত শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরে আমরা অসংখ্য স্কুইলারের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। স্বৈরশাসকের সমর্থনে তাঁর বলা গল্পটাই এই স্কুইলাররা আমাদের নানাভাবে, নানা ভঙ্গিতে শুনিয়েছেন। আমরা সে গল্প শুনেছি এবং বহুলাংশে বিশ্বাসও করেছি। কিন্তু আমরা লিঙ্কনের মাধ্যমে তো এই কথাও জানি যে কিছু লোককে অনন্তকাল বোকা বানানো যায়, অনেক লোককে কিছুদিনের জন্য বোকা বানানো যায়। কিন্তু সব লোককে অনন্তকাল বোকা বানিয়ে রাখা যায় না।
যেমন যায়নি বাংলাদেশে। আগামী দিনের গবেষক ও ছাত্ররা যখন লিঙ্কনের কথার প্রমাণ খুঁজতে ইতিহাসের পাতা হাতড়াবেন, তাঁরা নির্ঘাত বাংলাদেশের উদাহরণটিকেও হিসাবে আনবেন।
হাসিনা সরকারের পতনের দিন দশেক আগে বাংলাদেশের নামজাদা কয়েকজন সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা বিগত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন। এর দিন দু-এক আগে একদল প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক বিবৃতিতে ছাত্র আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী চক্রান্তের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। প্রায় একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক উপাচার্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে আসেন।
এ ঘটনায় অভিনবত্ব কিছুই নেই। স্বৈরাচারের ১৫ বছর অথবা তারও আগে আমরা অনুগত বুদ্ধিজীবীদের দেখেছি, যাঁরা বরাবর কথা ও যুক্তি দিয়ে আমাদের বুঝিয়েছেন, কেন এই স্বৈরাচার আমাদের নিজের স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে এ পরিস্থিতিতে বড় রকমের পরিবর্তন আসে। এটা এমন এক সময়ের কথা, যখন ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় পাখির মতো নিহত হচ্ছে মানুষ। হেলিকপ্টার থেকে এলোপাথাড়ি ছোড়া হচ্ছে গুলি, মারা যাচ্ছে মায়ের কোলের শিশুকেও। এই অভাবিত হত্যাকাণ্ডে ভীত না হয়ে দেশের লাখ লাখ মানুষ স্বৈরাচারের পতন দাবি করে বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দিয়েছেন।
স্বৈরাচারের শেষ সময়েও আমাদের এই সেরা বুদ্ধিজীবীরা জনতার দাবির যৌক্তিকতা ও তাঁদের প্রতিবাদের তীব্রতা টের পাননি। তাঁরা জনবিযুক্ত, এমন একটা অভিযোগ বরাবরই ছিল, কিন্তু তাঁরা যে জনতার পাশে দাঁড়ানোর বদলে স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বন শ্রেয় ভাববেন, সে কথা ভাবা কঠিন। এই বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে স্বৈরাচারের হাতে সঁপে দিয়েছিলেন। অনুমান করি, তাঁরা হয়তো ধরে নিয়েছিলেন বিগত ১৫ বছরের মতো এবারও শক্তি প্রয়োগ করে স্বৈরাচারের পক্ষে ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হবে। হলো না, এর দিন কয়েকের মধ্যেই পতন ঘটে স্বৈরাচারী সরকারের।
জর্জ ওরওয়েল বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলাদেশের এই বুদ্ধিজীবীদের নিয়েই লিখতেন আরেক অ্যানিমেল ফার্ম। আমাদের এই শূকরের খোঁয়াড়ে কে হবেন স্নোবল, কে হবেন নেপোলিয়ন এবং কে বা কারা হবেন স্কুইলার, সে কথা অনুমান করা খুব কঠিন নয়। আমাদের বিবেক বলে যাঁদের ভেবেছি, যাঁদের কলমে রচিত হয়েছে বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের রূপরেখা ও বহিঃকাঠামো, সংকটের সময় তাঁদের জনতার মিছিলে পেলাম না। এর চেয়ে বড় পরিহাস, যাঁরা এ সরকারের সমর্থনে ‘সবকিছু করার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেতু ভেঙে বানের জল প্রবেশ করতে না করতেই ভীতসন্ত্রস্ত সেই বুদ্ধিজীবীরা হয় দেশ ছেড়ে পালালেন, অথবা ইঁদুরের গর্তে লুকালেন। এই গল্প একই সঙ্গে বেদনার ও বঞ্চনার।
স্বৈরাচারের দোসর
স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদ—যে নামই তাকে দিই না কেন, বিগত সরকার বলতে বোঝাত দেশের সব ক্ষমতা এক ব্যক্তি ও তাঁর সহযোগী ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া। এ ব্যবস্থাকে আমরা অলিগার্কিও বলতে পারি, যেমন আজকের রাশিয়ার পুতিন সরকার। নামমাত্র গণতান্ত্রিক হলেও এ এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে এক ব্যক্তিকে ঘিরে হাতে গোনা কয়েকজন ক্ষমতার প্রতিটি ক্ষেত্রের ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তাদের মূল লক্ষ্য দেশের আর্থিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন, তাকে নিয়ে যা খুশি করার অধিকার কবজা করা। সে জন্য চাই আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ, তথ্যব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ, এমনকি মানুষের ভাবনাচিন্তার ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য।
ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা যত শক্তিধর ও বিত্তশালী হন না কেন, ক্ষমতার কেন্দ্রে যে একনায়ক ও তাঁর সঙ্গে যে হাতে গোনা গোষ্ঠীপতি, তাঁদের একার পক্ষে এই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ অর্জন ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ সম্ভব নয়। এর জন্য চাই বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্ক, যাদের একটি বড় অংশ হলেন সেই সব মানুষ, যাঁদের আমরা সম্ভবত পরিহাসভরে বুদ্ধিজীবী বলে থাকি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন লেখক, সাংবাদিক, ও সংস্কৃতিকর্মী। তাঁদের কেউ কেউ যথার্থই প্রতিভাবান, কেউ কেউ হয়তো দেশের বাইরেও তাঁদের প্রতিভার স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন।
স্বৈরাচারের কাছে এমন লোকের মূল্য অন্য সব ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা পেটোয়া বাহিনীর চেয়ে অধিক মূল্যবান। কারণ, তাঁরা যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে বোঝাতে সক্ষম, কেন এই স্বৈরাচার শুধু বৈধ ও ন্যায্য নয়, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কেন তা অপরিহার্য। গত ১৫ বছর আমাদের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ ঠিক এ কাজই করে গেছেন।
বুদ্ধিজীবীরা কেন জনগণের পাশে থাকার পরিবর্তে স্বৈরাচারের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়? বিশ শতকে রুশ বিপ্লবের পর আমরা দেখেছি, মায়াকোভস্কি বা এরেনবুর্গের মতো প্রথিতযশা লেখক, যাঁরা তাঁদের নিকট বন্ধুদের ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে ঢলে পড়তে দেখেছেন, প্রকাশ্যে তা নিয়ে কথা না বলে বিপ্লবের নির্মমতাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন।
আরেক বিখ্যাত লেখক ম্যাক্সিম গোর্কি, লেনিন বেঁচে থাকতে ঢালাও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান, কিন্তু স্তালিনের ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই স্বৈরশাসককে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে গেছেন। মার্টিন হাইডেগারের মতো দার্শনিক, অথবা লেনি রেফিনিস্তালের মতো চিত্রপরিচালককে হিটলারের পক্ষে সাফাই গাইতে দেখেছি।
চীনা বিপ্লবের পর, বিশেষত তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর সীমাহীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা জেনেও তা নিঃশব্দে মেনে নিয়েছেন বা প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে সাফাই গেছেন সে দেশের প্রধান কবি গুয়ো মরু ও বিখ্যাত লেখক মাও দুন। পাকিস্তান আমলে সামরিক স্বৈরাচারকে স্বাগত জানিয়েছেন আলতাফ হোসেনের মতো যশস্বী সাংবাদিক। একই চিত্র একাত্তরের গণহত্যার সময়।
বুদ্ধিজীবী কেন স্বৈরাচারের পক্ষে
নোয়াম চমস্কির কথায়, বুদ্ধিজীবীদের একটা কাজ হলো সত্যের পক্ষে থাকা। আমি অন্য আরেকটি কাজের কথা বলব, তা হলো দেশের মানুষের পক্ষে থাকা। অথচ সত্য প্রকাশের বদলে সে সত্য ঢাকতে অথবা ভিন্ন সত্য প্রকাশে এবং দেশের মানুষের পক্ষে থাকার বদলে ক্ষমতাধরদের পক্ষাবলম্বনে কোনো কোনো লেখক-বুদ্ধিজীবীর এমন আগ্রহ কেন?
আমরা এর তিনটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলতে পারি, বস্তুগত ফায়দা, ভীতি ও আদর্শগত আনুগত্য।
বস্তুগত ফায়দার ব্যাপারটা বোঝা সহজ। মোটা উৎকোচ, ভালো সরকারি পদ (যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অথবা বিদেশে রাষ্ট্রদূত), সস্তায় সরকারি জমি, অথবা নিদেনপক্ষে সরকারপ্রধানের সঙ্গে নিখরচায় বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ—এমন ফায়দা যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তো আমাদের জানাশোনা অনেকেই আছেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের অনেককে দেখেছি হাত কচলে চৌদ্দবার ‘মাননীয় নেত্রী’ বলে ঢোক গিলতে। অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে তাঁরাই আবার ভিন্নকথা বলেছেন। কিন্তু স্বৈরাচারের হাত থেকে একবার যাঁরা সুবিধা নিয়েছেন, তাঁদের পক্ষে মত ও পথ বদলানো কঠিন। বার্নাড শর একটি উক্তি কিছুটা ঘুরিয়ে বলতে পারি, একবার যে সতীত্ব হারিয়েছে, তার পক্ষে সতীত্ব ফিরে পাওয়া অসম্ভব।
ভীতির ব্যাপারটাও বোঝা কঠিন নয়। স্তালিনের সোভিয়েত রাশিয়া বা হিটলারের জার্মানিতে স্বৈরতন্ত্রের প্রতিবাদ করায় জীবন গেছে, এমন উদাহরণ অসংখ্য। নিকোলাই বুখারিন বা আইজাক বাবেলের মতো অসাধারণ লেখক ও চিন্তাবিদকে জান দিতে হয়েছে শুধু রাজনৈতিক মতান্তরের কারণে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কার্ল ভন ওসিয়েতজস্কিকে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কার্যত না–খেয়ে মরতে হয়েছে। পালাতে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের মতো দার্শনিক।
ফলে দৈহিক নিষ্পেষণের ভয়ে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সখ্য বা সমঝোতা অভাবিত নয়। একাত্তরে ঠিক এ কারণে প্রবল ঘৃণা সত্ত্বেও কেউ কেউ সামরিক অধিগ্রহণের পক্ষে কলাম লিখেছেন, অথবা রেডিও বা টিভির টক শোতে অংশ নিয়েছেন। জ্যঁ পল সার্ত্রের মতো দার্শনিক অবশ্য বলবেন, কঠিনতম সময়েও বুদ্ধিজীবীর বা সব নাগরিকের জন্যই ‘কলাবরেশন’ বা সোজা বাংলায় দালালি একমাত্র পথ নয়। ব্যক্তি জন্মগতভাবে স্বাধীন—‘ম্যান ইজ কনডেমন্ড টুবি ফ্রি’—সে মুক্ত হতে বাধ্য। সে কারণে যে সিদ্ধান্তই সে নেয়, তার দায়দায়িত্ব একা তার। মুক্ত মানব হিসেবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভেতর দিয়েই আমাদের মানবিকতা প্রকাশিত হয়, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণেই আমাদের ‘স্বাধীনতা’ নিহিত।
কোনো ব্যক্তি যখন স্বৈরতন্ত্রের হাতে নিজেকে সঁপে দেন, সেটিও মুক্ত মানুষ হিসাবে তাঁর স্বাধীনতারই প্রকাশ। কিন্তু তাঁকে দালাল হতেই হবে, এ কথা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বিকল্প হিসেবে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের পথও তাঁর সামনে খোলা আছে। কেউ সে পথ বেছে নিতে গিয়ে জেলে যান, কেউ দেশত্যাগ করেন, কেউবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। যেমন আত্মহত্যা করেছিলেন মায়াকোভস্কি। এ সবই ব্যক্তির ‘মুক্ত ইচ্ছার’ প্রকাশ।
বাংলাদেশের স্বৈরাচার সম্ভবত স্তালিন বা হিটলারের মতো নির্মম ও দক্ষ নন, কিন্তু নিষ্পেষণের অস্ত্র ও উপকরণ তাঁর হাতেও কম ছিল না। ‘আয়নাঘরের’ কথা আমরা জানি। হারুনের ডিবি অফিসের কথা জানি। গুম-খুনের উদাহরণও কম নয়। ভয়-ভীতি থেকে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বন করেন, এ কথা মানতে আমাদের কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। কিন্তু এমন উদাহরণও কম নয়, যেখানে শুধু ‘গুড লাইফ’, অর্থাৎ পকেটে কিছুটা বাড়তি পয়সা, মাসে দু-চারটে টিভি অনুষ্ঠান, নিদেনপক্ষে ঢাকা ক্লাবে অন্যের পয়সায় মদ্যপানের সুযোগ—এসব কারণেও কেউ কেউ দালালির পথ বেছে নেন।
বাকি থাকল আদর্শগত আনুগত্যের বিষয়টি। বিপ্লবে গভীরভাবে বিশ্বাস থেকে কেউ কেউ সজ্ঞানে স্বৈরাচারের সঙ্গে সহযোগিতার পথ বেছে নেন, এমন লোকের সংখ্যাও তো কম নয়। আমরা নিকোলাই বুখারিনের কথা জানি, তিনি রুশ বিপ্লবে গভীর আস্থাবান ছিলেন, এর সোনালি ভবিষ্যতে নিশ্চিত ছিলেন। বিদেশি চর হিসেবে মিথ্যা মামলার সম্মুখীন হয়েও সে বিপ্লব ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এই বিবেচনায় প্রকাশ্যে স্তালিনের বিরুদ্ধাচরণ করেননি।
অথবা আমরা আর্জেন্টিনার লেখক হুলিও করতাজারের কথা ভাবতে পারি। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আগে তিনিই আমাদের ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ উপহার দিয়েছেন। লাতিন আমেরিকার যে কয়জন লেখক-বুদ্ধিজীবীকে আমরা কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান সমর্থক বলে জানি, তিনি তাঁদের একজন। ফিদেল কাস্ত্রোর শাসনামলে তাঁর অনেক নিকট বন্ধু নিগৃহীত হয়েছেন, এমন প্রমাণ তাঁর হাতে থাকা সত্ত্বেও করতাজার সে বিপ্লবের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করেননি। ১৯৭১ সালে বিখ্যাত কিউবান লেখক হেবার্তো পাদিয়াকে বিপ্লববিরোধী কবিতা ও বক্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়।
পশ্চিমের অনেক লেখক, যাঁরা একসময় কিউবার বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, পাদিয়ার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে তাঁদের অনেকে কাস্ত্রো প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করেন। কিন্তু করতাজার তাঁর অবস্থান বদলাননি। সে সময় তিনি বলেছিলেন, যত সন্দেহ ও উদ্বেগই থাকুক না কেন, আমি কিছুতেই কিউবার বিপ্লবের প্রতি আমার বিশ্বাস পরিবর্তন করব না। কোনো বিপ্লব সর্বশুদ্ধ নয়, কিন্তু শুদ্ধতার চেয়ে অনেক জরুরি সাম্রাজ্যবাদের প্রতিরোধ।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের আদর্শিক আনুগত্য
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ বরাবর জনতার পাশে থেকেছেন, সামরিক ও বেসামরিক দুঃশাসনের প্রতিবাদ করেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, যা আসলে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ, তার নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশ। ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রবিরোধী নির্দেশের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে গণজাগরণ, তার নেতৃত্বেও বুদ্ধিজীবীশ্রেণি। এমনকি স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে তাঁর প্রস্তাবিত বাকশালি রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন শামসুর রাহমান, আনিসুজ্জামান, আহমদ শরীফ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মতো খ্যাতিমান লেখক, বুদ্ধিজীবী। তাঁদের কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর নিকটজন ও আদর্শের অনুসারী, তা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রত্যাখ্যান করার নৈতিক বল তাঁদের ছিল। সে জন্য বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁদের উদ্দেশ্যে আমরা এখনো মাথা নোয়াই।
সেই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ, সম্ভবত বৃহদাংশ কেন গত দেড় যুগ শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন শুধু মেনেই নেননি, তাঁর প্রতি কথায় ও কাজে নানাভাবে সমর্থন জানিয়ে গেছেন?
অনুমান করি, নগদ লাভ ও ভীতি থেকেই অধিকাংশ সরকারপন্থী বুদ্ধিজীবী স্বৈরাচারের ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে সেসব সুবিধাভোগীদের বাইরে এমন অনেক বুদ্ধিজীবী ছিলেন, যাঁরা শুদ্ধ আদর্শিক কারণেও হাসিনা সরকারের প্রতি অনুগত ছিলেন। তাঁদের অনেককেই আমরা চিনি। তাঁরা সেই সব মানুষ, যাঁরা এই সরকারের কাছ থেকে চিহ্নিত করা যায়, এমন কোনো সুবিধাভোগ করেছেন, তা বলা যাবে না। নগদ কোনো সুবিধাও পাননি। স্বল্পমূল্যে সরকারি জমিও পাননি। তাঁরা নির্বোধ নন।
হাসিনা সরকার যে খোলামেলাভাবে স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত, এর একমাত্র লক্ষ্য পরিবারতন্ত্র ও তাঁর অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখা, এ কথা তাঁরা খুব ভালোভাবেই জানতেন। তা জানা সত্ত্বেও তাঁরা সচেতনভাবে বিগত সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসনকে সমর্থন দিয়ে গেছেন সম্ভবত এই বিশ্বাস থেকে যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা ও মৌলবাদ প্রতিরোধে হাসিনার কোনো বিকল্প নেই।
এই বুদ্ধিজীবীদের প্রতি করুণা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি আমার নেই। বিগত সরকারের হাতে মুক্তিযুদ্ধের সব মূল্যবোধ নিরন্তর ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, সে কথার তারাও সাক্ষী। এই সরকারের হাতে বাক্স্বাধীনতা হরণ হয়েছে, হরণ হয়েছে ভোটাধিকার।
বিচার বিভাগ থেকে পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তম্ভ অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। শুধু আদর্শিক ভিন্নতার জন্য কারাগারে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এর কোনোটাই গোপনে বা খুব চালাকির সঙ্গে করা হয়েছে, তা নয়। কোনো কিছুই গোপন নয়, কোনো কিছুই অপ্রকাশিত নয়। তারপরও বুদ্ধিজীবীরা যখন নিজেদের পছন্দের ‘আইডিওলজি’ রক্ষিত হবে, এই বিশ্বাস থেকে স্বৈরাচারের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাঁদের করুণা করা ছাড়া আর কী করতে পারি!
আনাক্সিওস
বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আমার প্রিয় নায়কদের একজন হলেন চেকোস্লোভাকিয়ার বিবেকী লেখক ভাসলাভ হাভেল। স্বৈরাচারের প্রতিবাদ করায় তাঁকে বারবার জেলে যেতে হয়েছে।
তিনি বলেছিলেন, বুদ্ধিজীবী হলো এমন ব্যক্তি, যে পৃথিবীর সব দুর্ভোগের সাক্ষী, যে সব রকম আপসবিরোধী, যে সব গোপন চাপ ও চালবাজির বিপক্ষে, যে ক্ষমতাসীনদের ব্যাপারে সবার আগে সন্দেহ ও প্রতিবাদী কণ্ঠ উচ্চারণ করে, যে ক্ষমতাধরদের নিরন্তর মিথ্যাচারের সরব সাক্ষী।
সেই রকম একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন সক্রেটিস। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালে, অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় সাড়ে আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিসের অত্যাচারী শাসকদের নির্দেশ মানার পরিবর্তে তিনি বিষের পানপাত্র তুলে নিয়েছিলেন। সমঝোতা বা পালাবার পরামর্শ তাঁকে অনেকেই দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজ সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন সক্রেটিস। মৃত্যুর আগে তাঁর মন্তব্য ছিল, প্রশ্ন না করে আত্মসমর্পণের যে জীবন, তা অর্থহীন।
সক্রেটিস মহামতি, তাঁকে অনুসরণ করে এ কথা অনায়াসেই বলা যায়, আমাদের আপসবাদী বুদ্ধিজীবীরা যে জীবন যাপন করেছেন, তা অর্থহীন। সক্রেটিসের ভাষায় ‘আনাক্সিওস’।
* হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1965)
-
▼
September
(172)
-
▼
Sep 16
(13)
- ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গোলাবারুদের ঘাটতি, পেন্ট...
- উত্তরপ্রদেশে স্কুলের সামনে মুসলিম শিক্ষককে গুলি কর...
- সৌদির যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি, মক্কায় হামলার অভি...
- ইয়েমেনের সঙ্গে এখনই সংঘাতে জড়াতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র
- ইউরোপে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়ছে মুসলিমদের
- গাজায় ধসের ঝুঁকিতে প্রায় ২ হাজার ভবন, ধ্বংসস্তূপে ...
- মারিবে সৌদির এফ-১৫ ভূপাতিতের দাবি হুতিদের, মক্কামু...
- যে প্রকল্পে বদলে গেল ওদের জীবন by রোকনুজ্জামান পিয়াস
- ধ্বংসস্তূপে থাকা মৃতদেহের প্রতি অসম্মান দেখাচ্ছে ই...
- তেলের জন্য সৌদির বিকল্প উৎস খুঁজছে ইউরোপের ক্রেতারা
- মক্কা অভিমুখে ড্রোন হামলায় ওআইসির নিন্দা, অস্বীকার...
- ‘দর্শক আবার ধারাবাহিক নিয়ে কথা বলছে’
- পশ্চিমবঙ্গে ইসলামি অভিবাদন জানানোর জেরে বিতর্ক, না...
-
▼
Sep 16
(13)
-
▼
September
(172)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...






