Tuesday, July 28, 2015

তাজউদ্দীন আহমদের পর সৈয়দ আশরাফ by মিজানুর রহমান খান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ পরাস্ত হলো, অথচ সেই কঠিন সত্য আওয়ামী লীগ উচ্চারণ পর্যন্ত করছে না। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ‘অপসারণ’ হিসেবে প্রতীয়মান না হলে কথা ছিল। কিন্তু জনগণের কাছে এটা পরিষ্কার করা হয়েছে যে মন্ত্রিত্ব বেশি মর্যাদাসম্পন্ন। দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ মন্ত্রিত্বের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। একজন কথিতমতে ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়ে পড়া ব্যক্তিকে দলের সাধারণ সম্পাদকের পদে রাখা চলে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রাখা চলে না।
যত দূর জেনেছি মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি কখনো গরহাজির ছিলেন না, বরং তাঁর সব বিষয়েই সক্রিয় ও বুদ্ধিদীপ্ত অংশগ্রহণ ছিল। সুতরাং মন্ত্রিসভার বৈঠকে যেখানে প্রধানত আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণী বিষয় এজেন্ডা হিসেবে থাকে এবং তাঁকে কখনো মন্ত্রিসভা বৈঠক কামাই করতেও দেখা যায়নি। অফিস কামাই করাটা অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গে তুলনা করলে তাঁর নম্বর নিশ্চয় কাটা পড়বে। তবে মন্ত্রী হিসেবে তিনি সর্বদা তদবিরকারী বাহিনীকে এড়িয়েছেন।
একেবারে গোড়ার দিকের একটি শোনা ঘটনা। নতুন মন্ত্রী হিসেবে অফিসে গেছেন। চীনা রাষ্ট্রদূত এসেছেন দেখা করতে। নেতা-কর্মী, সমর্থক ও তদবিরকারীরা সেদিন এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন।হুড়মুড় করে তাঁরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন। প্রাণহানির আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত রাষ্ট্রদূত মন্ত্রীর বাথরুমে আশ্রয় নিতে যাচ্ছিলেন। এই ঘটনাটি সচিবালয়ে অফিস করার ব্যাপারে তাঁর মধ্যে অনীহা এনে দিতে পারে। অবশ্য এটাও যুক্তি যে,  মন্ত্রণালয়ের কাজ কখনো জমে থাকেনি। তার মানে সব প্রকার ফাইলেই তাঁর দস্তখত মিলেছে। তবু আশা করে এসে যাঁরা দেখা পাননি, তাঁদের হতাশ হওয়ার কারণ থাকবে।
তাই বলে কখনো এমন ঘটেনি যে, সচিবেরা তাঁকে হ্যারিকেন হাতে খুঁজেছেন। তিনি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোয়ার্টার হিসেবে তৈরি করা তাঁর ২১ বেইলি রোডের প্রাচীন বাসভবন, যার ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে দু–একবার তাঁর মাথায়ও পড়েছিল বলে শুনেছিলাম, সেখানে বসে সবই করেন কিংবা তাঁর পতাকাবাহী গাড়িতে বসেও করেন, তাহলেও তাঁকে ‘নিষ্ক্রিয়’ বা অকর্মার ঢেঁকি বলা যাবে না। বাড়ি ও গাড়ি দুটোতেই যে পতাকা ওড়ে, তার অন্যতম মূল কারণ কিন্তু এটাই যে, একজন মন্ত্রীর অফিস বলতে কেবলই নির্দিষ্ট করে দেওয়া কোনো একটি স্থানমাত্র নয়। কাজের জন্য পতাকা, পতাকার জন্য কাজ নয়। অবশ্য গত ছয় বছরে তিনি অন্য যে কারও চেয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকের একজন প্রাণবন্ত আলোচনাকারী ছিলেন কি না, সেটা তাঁর বিচক্ষণ সহকর্মীরাই বলতে পারবেন।
বঙ্গবন্ধু পঞ্চাশের দশকে প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রীর পদ থেকে সুচিন্তিতভাবে ইস্তফা দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলকে সুসংগঠিত করেছিলেন আর সেই দলের কারণেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাঙালিদের পক্ষে পাকিস্তানি কাঠামোর ভেতরে থেকেই একাত্তরের ২৫ মার্চের আগে ‘জনগণের অংশগ্রহণমূলক’ সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। তাঁর সাফল্যের নিয়ামক শক্তি বন্দুক ছিল না, ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য কোনো ধরনের পেটোয়া বাহিনী ছিল না, ছিল আওয়ামী লীগের সাচ্চা সাংগঠনিক শক্তি।সেদিন আওয়ামী লীগ যতটা উদার হতে পেরেছিল, এখন ততটাই সংকীর্ণ, ব্যক্তির প্রতি শর্তহীন আনুগত্যই যেন শেষ কথা।আজ আওয়ামী লীগের অবস্থা এতটাই করুণ যে তারা সেই ঐতিহ্য স্মরণে আনতেও দ্বিধান্বিত, ভীত। সুতরাং কয়েক সপ্তাহ পরে লন্ডন প্রত্যাগত একজন সৈয়দ আশরাফকে আমরা গণতান্ত্রিকভাবে সংগঠন গোছাতে অতীব তৎপর হতে দেখব, তা ভাবতে পারলে খুশি হতাম। যদিও ওবায়দুল কাদের এই সিদ্ধান্তকে যথার্থতা দিতে বলেছেন, হয়তো নেত্রী ভেবেছেন তিনি দলের জন্য এখন বেশি সময় দেবেন, সে জন্য এটা করা হয়েছে, আসলে এর ভিত্তি পলকা। কারণ, ক্ষমতাসীনদের কেউ প্রকাশ্যে অনুশোচনা করেন না যে দলটি অগোছালো, দুর্দশাগ্রস্ত এবং বিএনপির সাংগঠনিক রুগ্‌ণদশার সঙ্গে বহুলাংশে তুলনীয়। ছাত্রলীগ সন্ত্রাস করে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয় কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
এই আওয়ামী লীগ উনসত্তরের আওয়ামী লীগ নয়। এখন দলের শক্তি সরকার চালায় না। সরকারি শক্তি দল চালায়। সুযোগসন্ধানী একশ্রেণির রাজনীতিক এবং আমলতন্ত্রশাসিত একটি ব্যবস্থা আওয়ামী লীগকে পরিচালনা করছে। অনেকের মতে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রভাব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে নাকি কম নয়। আওয়ামী লীগের বিবেকবান ও সচেতন অংশ বড় বেশি সংখ্যালঘু এবং কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এই ধারণা সঠিক হলে সৈয়দ আশরাফ আর জিল্লুর রহমান হতে পারবেন কি? আগামী ডিসেম্বরে তিনি তৃতীয় মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক পদে থাকবেন নাকি তাঁকে যেতেই হবে? তিনি সোহেল তাজ হতে চাইবেন না, রাজনীতিতে পথ না হারানোটা তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ। তাঁকে শেখ হাসিনারও দরকার পড়বে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী একটি সম্মানজনক রীতি। সেই রীতি অনুযায়ী তাঁর কর্মচাঞ্চল্য দেখলে আমরা খুশি হব। কখনো ঘটেনি বলে নিরাশ হতে চাই না, কিন্তু অহেতুক নতুন আশার জাল বোনাও কাজের কথা নয়। ২০১০  সালে ব্রিটিশ সাংসদ ব্যারোনেস ভার্সি যখন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন তাঁকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী পদেও রাখা হয়। দলের চেয়ারম্যান যাতে মন্ত্রিসভায় অংশ নিতে পারেন, সে জন্য দলের চেয়ারম্যানকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী পদে রাখাটা ব্রিটেনে একটি কনভেনশন হিসেবে গড়ে উ​েঠছে। বাংলাদেশ তার তথাকথিত ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের গণতন্ত্রচর্চার কোন স্তরে পৌঁছালে তবে দলের চেয়ারম্যান যেকোনো অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীই হতে চাইবেন না, কেবল দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হলেই তাঁর পোষাবে, তা আমার মতো হয়তো অনেকেই কল্পনা করতে পারবেন না।
ভারত উপমহাদেশে এই পদকে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি। এই পদে রাখা মানে কাউকে খাটো করে রাখা। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় ও আরেক স্বপক্ষত্যাগী বাঙালি মাহমুদ আলী রাষ্ট্রদূত কেবল নন, বিভিন্ন সরকার উতরিয়ে তাঁরা আমৃত্যু দপ্তরবিহীন মন্ত্রীও ছিলেন, সেই ১৯৭১ সালের পর থেকে, পাকিস্তানের প্রতি অনুগত থাকার পুরস্কার। এখন দুজনই প্রয়াত। ইসলামাবাদে ত্রিদিব রায় আমাকে বলেছিলেন, তাঁরা দুজন পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে চলেন। কিন্তু মন্ত্রিসভার বৈঠকে তাঁরা অংশ নেন না। ১৯৫৭ সালে জওহরলাল নেহরু কৃষ্ণ মেননকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী করার আগের এক বছর তাঁকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করে রাখেন। মেননের জন্য সেটা মর্যাদাপূর্ণ ছিল। কিন্তু ২০০৫ সালে সাদ্দাম সরকারের তেল কেলেঙ্কারির বিষয়ে পল ভলকার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নটবর সিং পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি পদত্যাগে রাজি না হলে মনমোহন সিং তাঁকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করেছিলেন। অাওয়ামী লীগ সভানেত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সৈয়দ আশরাফ পদত্যাগ করার সুযোগ নেননি বা তাঁকে সে সুযোগ দেওয়া হয়নি, তিনি দপ্তর থেকে অপসারিত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর সম্পাদিত অবজারভার-এ খবর পড়লাম, আওয়ামী লীগের অনেকে এ ঘটনায় অশনিসংকেত দেখছেন। তাঁরা তাজউদ্দীন আহমদ উপাখ্যান স্মরণ করছেন। এটা পড়ে আমার মনে পড়ল হ্যামলেটের সেই উক্তি: ‘সামথিং ইজ রটেন ইন দ্য স্টেট অব ডেনমার্ক।’ 
কথিত নিষ্ক্রিয়তা বনাম দুর্নীতিগ্রস্ততার মধ্যে কোনটি বেশি ক্ষতিকর? যদি হঠাৎ জিরো টলারেন্স দেখানোর নীতি গ্রহণ করার ইচ্ছে জাগে, তাহলে কোনো রাষ্ট্রে কোনটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অগ্রাধিকার পাবে? নিষ্ক্রিয়তা নাকি দুর্নীতিগ্রস্ততা? কোনটি বেশি হতাশাগ্রস্ত নাগরিকদের মনে আশা জাগাবে, কাঙ্ক্ষিত বলে গণ্য হবে? বাংলাদেশ বার্তা রটিয়েছে যে দুর্নীতিগ্রস্ততার চেয়ে নিষ্ক্রিয়তাই বেশি ক্ষতিকর। তবে কী বার্তা জনগণের কাছে গেছে সেটা যদি এক বাক্যে বলতে হয়, তাহলে আমি কিশোরগঞ্জের চা দোকানির উক্তি ধার করব। ‘হুনুইন, ভালা মানুষের ভাত নাই।’ সম্প্রতি সৈয়দ আশরাফ কিশোরগঞ্জ শহরে খড়মপট্টিতে তাঁর চাচার রংচটা একতলা টিনশেড ভবনে দুরাত কাটিয়ে এসেছেন। এটি তাঁর নির্বাচনী এলাকা হলেও শহরে তাঁর বাড়ি নেই (ঢাকাতেও বাড়ি নেই), পুলিশ গার্ড অব অনার দিতে এসে বিফল মনোরথে ফিরে গেছে। নেতা-কর্মীরা ভিড় করেননি। মোটরসাইকেলের হর্নে পথঘাট চকিত হয়নি। কেউ স্লোগান তোলেনি। বর্তমান আওয়ামী লীগের এ রকম একজন সাধারণ সম্পাদক সত্যি বেমানান!     
মনে হচ্ছে সৈয়দ আশরাফ বিস্মিত হননি। সিলেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেনও যে অনেক দিন ধরেই এ রকম একটা কিছুর সিদ্ধান্তের বিষয় শোনা যাচ্ছিল, সেটাই বাস্তবে ঘটল। ব্রিটেনের লেবার রাজনীতির সক্রিয় কর্মী থাকা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আমাদের প্রচলিত বাগাড়ম্বরপূর্ণ রাজনীতির প্রতি বাহ্যত অত্যন্ত নিরাসক্ত ছিলেন, সে কথা বলা যাবে না। কারণ, বহু ক্ষেত্রে তিনি তাঁর দলের পক্ষে অনাবশ্যক সাফাই গেয়েছেন, কোরাসে সুর মিলিয়েছেন। কিন্তু সব তাল মে​লাতে পারেননি।
তবু সার্বিক বিচারে তাঁর বড় গুণ মন্ত্রিসভায় হাতে গোনা কয়েকজন, যাঁরা এখনো অপেক্ষাকৃত উঁচু নীতিনৈতিকতার ঝান্ডা তুলে ধরতে সচেষ্ট রয়েছেন, তিনি তাঁদের অন্যতম হিসেবে পরিচিত। তাঁকে ধন্যবাদ জানাই, কারণ কিছু ক্ষেত্রে তিনি প্রতিবাদী হতে চেয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তাঁর মন্ত্রণালয়টি দুই দশক ধরে দলীয় রাজনীতির সূতিকাঘর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ওই মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থা ও অফিসের বড় বড় পদে কে থাকবেন কে যাবেন, সেটা তিনি গোড়া থেকেই দৃশ্যত প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এটা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি তাঁর অবচেতনে গোড়া থেকেই আজকের দিনটি সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন।
বর্তমান মন্ত্রিসভা বা রাষ্ট্রের বড় পদে টিকে থাকার পয়লা শর্ত শর্তহীন আনুগত্য। সেখানে আশরাফ জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে গোলমাল করে ফেলেছেন, ঠিক এমনটাও বলা যাবে না। এখন আমরা কিছুটা আশ্বস্ত হতে পারি, নতুন করে কিছুটা আশাবাদী হতে পারি, যদি অবিলম্বে বিতর্কিত মন্ত্রীদের অপসারণ করা হয়। এই ঘটনার পরে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে নজর দিতে হবে। সৈয়দ আশরাফকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় এলেন। ক্ষমতার বলয় আরও নিরঙ্কুশ হলো। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত তাজউদ্দীন আহমদকে কেন অপসারণ অনিবার্য ছিল, তার উত্তর আমরা আজও খুঁজি। তিনি ‘জাতির ​বৃহত্তর স্বার্থে’ পদত্যাগ করেছিলেন। আমরা সোহেল তাজ উপাখ্যান এড়াতে পারিনি। রক্তের উত্তরাধিকারজনিত এ যেন এক মস্ত গোলকধাঁধা, তাই বুঝি অাশরা​ফকে রক্তঋণ স্মরণ করিয়ে দিতে হয়েছে।  
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

জঙ্গি নিয়ন্ত্রণে আছে, নির্মূল সম্ভব নয়: ডিএমপি

মনিরুল ইসলাম
বাংলাদেশ থেকে একেবারে জঙ্গি নির্মূল করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশ। তবে এটি নিয়ন্ত্রণে আছে। পুলিশ মনে করছে, বৈশ্বিক নানা পরিস্থিতির কারণে এ দেশেও জঙ্গিবাদ উৎসাহিত হয়। বাংলাদেশে নিজেদের অবস্থান জানাতে জঙ্গিরা বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে আসছে।
আজ মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এ তথ্য জানান ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। এই স্থানে আজ সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা পুলিশ কারাগারে বন্দী নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের ছেলেসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করে।
মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিবাদ যে নির্মূল হয়ে যায়নি তা জানানোর জন্য তারা ব্যক্তি বা স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা করে। এর একটি দিক হচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানান দেওয়া আর একটি হচ্ছে অন্যদের তাঁদের দলে ভিড়তে উৎসাহিত করা। ডিএমপির এই মুখপত্র বলেন, জঙ্গিরা কারাগারে বসেও নানা কৌশলে বাইরে তাঁদের সংগঠনের দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য আছে, জঙ্গিরা কারাগারে মোবাইলে কথা বলছে। এ ছাড়া তাদের আইনজীবী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ভাবে দেখা করার সময় সংগঠনের বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে।’
গোয়েন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আজকে গ্রেপ্তার করা আট জঙ্গির একজন আবু তালহা মোহাম্মদ ফাহিম ওরফে পাখি গ্রেপ্তার থাকা জেএমবির আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের ছেলে। বাবা কারাগারে থাকায় তিনি জেএমবির ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে কাজ করছিলেন। আর তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ময়মনসিংহের ত্রিশালের জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটিয়ে তাঁর বাবা ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানীকে ছিনিয়ে নেওয়া।
মনিরুল ইসলাম বলেন, যারা এটা বলেন দেশে জঙ্গি নেই তাঁরা আগেও এ ধরনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে জেএমবি ৬৩ জেলায় বোমা হামলা চালিয়ে তাঁদের ব্যাপক অবস্থানের কথা জানান দেয়। তিনি আরও বলেন, জঙ্গিবাদ এ দেশ থেকে একেবারে নির্মল করা সম্ভব নয়। তবে আমাদের অভিযানের কারণে তা নিয়ন্ত্রণে আছে। তাঁর মতে, গত দুই বছরে ইরাক, সিরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জঙ্গি তৎপরতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনদের নানা কার্যক্রমে এ দেশেও জঙ্গি তৎপরতায় অনেকে উৎসাহিত হচ্ছে। যেহেতু এখন ঘরে বসেই ইন্টারনেটে অন্যান্য দেশের জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ সহ কার্যক্রম সহজেই দেখা যাচ্ছে তাই সেখান থেকে ওই কার্যক্রমের ভিডিও দেখে এ দেশেও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হয়। তার ধারাবাহিকতায় এ দেশেও জঙ্গিরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। জঙ্গিদের বিষয়ে গোয়েন্দাদের তৎপরতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা জঙ্গিদের বিষয়ে তৎপর আছি ও জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছি। আটক আট জঙ্গির বিষয়ে আমরা আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছি। ত্রিশালের ঘটনায় তাঁদের সম্পৃক্তরা আছে কি না যাচাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া তাঁদের অর্থের যোগানদাতাদেরও চিহ্নিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

নয়াদিল্লিতে কালামের মরদেহ, মোদির শ্রদ্ধা

এ পি জে আবদুল কালাম
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান পরমাণুবিজ্ঞানী আবুল পাকির জয়নাল আবেদিন আবদুল কালামের মরদেহ আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানী নয়াদিল্লিতে নেওয়া হয়েছে। পালাম বিমানবন্দরে তাঁর মরদেহ গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে কালামের প্রতি পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেখানো হয়। এনডিটিভি অনলাইনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হামিদ আনসারি, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তিন বাহিনীর প্রধান প্রমুখ। সরকারে পক্ষ থেকে জানানো হয়, কালামের মরদেহ তাঁর দিল্লির বাসভবনে নেওয়া হবে। সেখানে আজ বিকেলে সাধারণ মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। কাল বুধবার জন্মস্থান তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে কালামের দাফন হবে।
গতকাল সোমবার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন কালাম। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অবিবাহিত। খুব সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন তিনি।
নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে আবদুল কালামের প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শ্রদ্ধা। ছবি: এএফপি
গতকাল সন্ধ্যায় শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে বি-স্কুলের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ‘লিভেবেল প্ল্যানেট আর্থ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার সময় হঠাৎ পড়ে যান কালাম। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নেওয়া হয় হাসপাতালে।
কালামের মৃত্যুতে ভারতজুড়ে শোক বিরাজ করছে। ঘোষণা করা হয়েছে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক।
তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর জন্ম আবদুল কালামের। ছোট্ট শহরে এক মৎস্যজীবী পরিবারে খুব দারিদ্র্যের মধ্যে জন্ম নিলেও তাঁর স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। আর এই স্বপ্নের অনেকটাই পূরণ করে দেখিয়েও গেছেন তিনি।
২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১ তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন আবদুল কালাম। তিনি হয়ে ওঠেন ‘জনতার রাষ্ট্রপতি’। তিনি ছিলেন ভারতের তৃতীয় মুসলিম রাষ্ট্রপতি। দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন’ ছাড়াও ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবেও ভূষিত হন তিনি।
নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে আবদুল কালামের প্রতি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির শ্রদ্ধা। ছবি: এএফপি
বিমান প্রকৌশলে পড়াশোনা করে ভারতের প্রথম মহাকাশযান তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন আবদুল কালাম। ওই মহাকাশযান দিয়েই ১৯৮০ সালে দেশটি প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র রোহিনী উৎক্ষেপণ করে। ১৯৯৮ সালে ভারতের পোখরান-২ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার পেছনেও প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালে মূল পরীক্ষা চালানোর পর দীর্ঘ ২৪ বছরে ভারতের এটাই ছিল প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা। দেশটিকে পরমাণু শক্তিধর দেশে পরিণত করার জন্য যিনি নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, পরে সেই তিনিই পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রচারে সরব ছিলেন।

নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ায় জাফরুল্লাহর সাজা বাতিল

জাফরুল্লাহ চৌধুরী
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ায় তাঁকে দেওয়া আদালত অবমাননার সাজা বাতিল করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে তাঁকে সতর্ক করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালত অবমাননার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর দেওয়া সাজা চ্যালেঞ্জ করে জাফরুল্লাহর করা আবেদনের বিষয়ে আজ আদেশের দিন ধার্য ছিল। এদিন আদালতে জাফরুল্লাহর আইনজীবীরা নিঃশর্ত ক্ষমার আবেদন জমা দেন। এরপর আদালত আদেশ দেন।
জাফরুল্লাহর করা আবেদনের ওপর গতকাল সোমবার শুনানি হয়। এদিন আদালতে জাফরুল্লাহর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবদুর রেজাক খান ও আবদুল্লাহ আল মামুন। তাঁরা শুনানিতে বলেন, যে অভিযোগে জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনাল সাজা দিয়েছেন, একই অভিযোগ থেকে আরও ২২ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এ সময় আদালত জানতে চান, আদালত অবমাননার অভিযোগের বিরুদ্ধে জাফরুল্লাহ চৌধুরী আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন, নাকি নতুন করে কোনো আবেদন করবেন। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর আইনজীবীরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে সময় চান। তখন আদালত আদেশের জন্য আজ দিন ধার্য করেন।
বাংলাদেশে বসবাসরত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের সাজায় উদ্বেগ জানিয়ে আদালত অবমাননাকর বিবৃতি দেওয়ায় গত ১০ জুন জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে এজলাসে আসামির কাঠগড়ায় এক ঘণ্টার কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে তাঁকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে জরিমানার ওই টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
১০ জুনই জাফরুল্লাহ চৌধুরী এজলাসে কারাদণ্ডের সাজা ভোগ করলেও ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজা চ্যালেঞ্জ করে তিনি আপিল বিভাগে আবেদন করেন। ১৬ জুন চেম্বার আদালত তাঁর অর্থদণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত করেন এবং আবেদনটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। পরে আপিল বিভাগ শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছিলেন।

উইন্ডোজ ১০ ফ্রি ডাউনলোড যেভাবে করবেন

উইন্ডোজ ১০ উন্মুক্ত করছে মাইক্রোসফট
আনুষ্ঠানিকভাবে মাইক্রোসফট তাদের উইন্ডোজ ১০ সফটওয়্যারটি উন্মুক্ত করবে আগামীকাল ২৯ জুলাই। উইন্ডোজ ৭ এবং এর পরের সংস্করণের উইন্ডোজ সফটওয়্যার ব্যবহারকারীরা বিনা মূল্যেই উইন্ডোজ ১০ হালনাগাদ করে নিতে পারবেন। নতুন অপারেটিং সিস্টেমটি হালনাগাদ করার পদ্ধতির বিষয়েও জানিয়েছে মাইক্রোসফট।
মাইক্রোসফটের দাবি, উইন্ডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেম হবে অধিক দ্রুতগতির, অধিক নিরাপদ ও সহজ। নতুন এই অপারেটিং সিস্টেমে স্টার্ট বাটন ফিরে আসছে যা উইন্ডোজ ৮ এর সময় সরিয়ে ফেলেছিল মাইক্রোসফট। দীর্ঘদিন ধরেই মাইক্রোসফটের নতুন এই সফটওয়্যার প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
উইন্ডোজ ১০ ডাউনলোড করবেন যেভাবে:
১. উইন্ডোজ লোগো বা স্টার্ট বাটনে ক্লিক করতে হবে।
২. এরপর যে অ্যাপ উইন্ডোটি আসবে তাতে ‘রিজার্ভ ইয়োর ফ্রি আপগ্রেড’ ফিচারটিতে ক্লিক করতে হবে।
৩. রিজারভেশন নিশ্চিত করতে লাইভ বা আউটলুক ইমেইল অ্যাকাউন্ট দিতে হবে।
৪. যখন উইন্ডোজ রিজার্ভ প্রক্রিয়া শেষ হবে তারপর যখন নতুন সংস্করণ আসবে তখনই উইন্ডোজ হালনাগাদ হবে।
৫. হালনাগাদ সম্পূর্ণ হয়ে গেলে একটি নোটিফিকেশন আসবে।
৬. একবার ইনস্টল হয়ে গেলেই উইন্ডোজ ১০ এর অভিজ্ঞতা নেওয়া শুরু করতে পারবেন।
শর্ত: ফ্রি বা বিনা খরচায় উইন্ডোজ ১০ আপগ্রেড করতে হলে আউটলুক বা লাইভ ইমেইল অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। মাইক্রোসফটের এই মেইল সেবাও ফ্রি।
উইন্ডোজ ব্যবহারকারীকে মনে রাখতে হবে, বিনা মূল্যে হালনাগাদ সংস্করণ পাওয়া গেলেও উইন্ডোজ ১০ এর ফাইল তিন গিগাবাইটের। এই ফাইল ডাউনলোড করার জন্য ডেটা খরচের বিষয়টি মাথায় রাখলে ভালো। অবশ্য রিজার্ভেশন যেকোনো সময় বাতিল করা যায়। উইন্ডোজ ১০ উন্মুক্ত হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে যেকোনো সময় আপগ্রেড করে নিতে পারবেন ব্যবহারকারী।
উইন্ডোজ ১০ এ নতুন যা কিছু
উইন্ডোজ ১০ এর সঙ্গে মাইক্রোসফট বেশ কিছু নতুন ফিচার আনছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ডিজিটাল সহকারী কর্টানা ও নতুন উইন্ডোজ স্টোর। এই স্টোর থেকে যে অ্যাপ ডাউনলোড করা হবে তা উইন্ডোজ ১০ পিসি ও উইন্ডোজ ১০ ট্যাবে একইরকম অভিজ্ঞতা দেবে। নতুন উইন্ডোজের সঙ্গে নতুন ওয়েব ব্রাউজার এজ আনছে মাইক্রোসফট।

এক স্বপ্নবাজের গল্প...

বিজ্ঞানী, লেখক, রাষ্ট্রপতি—অনেক বিশেষণেই পরিচিত ভারতের এ পি জে আবদুল কালাম। তবে ভারতসহ বিশ্বের লাখ লাখ তরুণের কাছে তিনি আপাদমস্তক একজন স্বপ্নবাজ মানুষ, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। যিনি স্বপ্ন দেখতে এবং দেখাতে পছন্দ করতেন। স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকতেন। এক স্বপ্ন সফল হলে ঝাঁপিয়ে পরতেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়েই গতকাল সোমবার রাতে ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ভালোবাসতেন মানুষের সঙ্গে মিশতে, বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ছড়িয়ে দিতেন হাজারো স্বপ্ন। তাঁর মৃত্যুর পর এনডিটিভি গতকাল ২০০৭ সালের পুরোনো একটি অনুষ্ঠান প্রচার করে। সেই অনুষ্ঠানটি ছিল শতাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে এ পি জে কালামের নানা কথোপকথন। অনুষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীরা তাঁকে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তিনিও বেশ মজা করে সেগুলোর উত্তর দেন। আবার কখনো হেসে হেসে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করে মজাদার উত্তরটা বের করে নেন। তবে পুরো বিষয়টিতে একটি জিনিস ছিল স্পষ্ট, সেটি হলো স্বপ্ন।
স্বপ্ন নিয়ে এ পি জে আবদুল কালামের অনেক সুন্দর সুন্দর উক্তি আছে। তাঁর মতে, ‘মানুষ ঘুমিয়ে যা দেখে তা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন হলো সেটাই যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’ তিনি সব সময় ছিলেন স্বপ্নের পক্ষে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘স্বপ্ন ও স্বপ্নবাজরা সব সময় সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারেন।’ তাই তিনি সবাইকে স্বপ্ন দেখতে ও স্বপ্নের পেছনে তাড়া করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। কারণ, ‘স্বপ্ন না দেখলে তো তা সত্যি হবে না’। তাঁর মতে, ‘স্বপ্ন দেখতে হবে। কারণ, স্বপ্নটা চিন্তায় পরিণত হয়। আর চিন্তা মানুষকে কর্মে অনুপ্রাণিত করে।’
ওই শিক্ষার্থীরা আবদুল কালামের কর্মজীবন, ব্যক্তিগত জীবন, নারী, ধর্ম, রাজনীতি, সমাজ, এমনকি স্টাইল বিষয়ে তাঁর কথা জানতে চান। নারীকে কিভাবে দেখেন?—এর জবাবে তিনি বলেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণাদাত্রী তাঁর মা। তিনি চান, নারীর আরও ক্ষমতায়ন হোক। ভারতের পার্লামেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আরও অধিক সংখ্যায় নারীর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কারণ, অর্ধেক জনগোষ্ঠী পিছিয়ে থাকলে আসলে দেশ আর দেশের উন্নয়নই পিছিয়ে থাকবে।
এ পি জে কালাম স্বপ্ন দেখার এই বিষয়টি তাঁর শৈশবের শিক্ষকের কাছ থেকে পেয়েছেন বলে ​উপস্থিত শিক্ষকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন। তিনি বলেন, ছোটবেলায় তাঁর এক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বোর্ডে একটি পাখি এঁকে জানতে চেয়েছিলেন, পাখির মতো উড়তে পারবে? বিষয়টি তার ছোট মনে বেশ নাড়া দিয়েছিল, তিনি পাখির মতো ওড়ার জন্য যুদ্ধবিমানের পাইলট হতে চেয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে তিনি দমে যাননি। পরবর্তী সময়ে হয়েছিলেন রকেটবিজ্ঞানী। বিমান প্রকৌশলে পড়াশোনা করে ভারতের প্রথম মহাকাশযান তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন তিনি। ওই মহাকাশযান দিয়েই ১৯৮০ সালে ভারত প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র রোহিনী উৎক্ষেপণ করে। ১৯৯৮ সালে ভারতের পোখরান-২ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার পেছনেও প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালে মূল পরীক্ষা চালানোর পর দীর্ঘ ২৪ বছরে ভারতের এটাই ছিল প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা। তিনি পরিচিতি পান ভারতের ‘মিসাইলম্যান’ হিসেবে।
চুলের এমন স্টাইলটি ​কীভাবে এলো?—এক শিক্ষার্থীর এমন এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর চুলটা একটু অন্যরকম আর দুরন্ত ছিল। ​পরিপাটি করে রাখাটা বেশ কষ্টের ছিল। পরিপাটি করে রাখার নানা কৌশল প্রয়োগ করতে করতে একবার ভাবলেন, এইভাবে কাটলে কেমন হয়? কাটার পর দেখলেন নিজের চুলটা এভাবেই সবচেয়ে পরিপাটি থাকে। ব্যাস, সেই থেকে এটাই চুলের স্টাইল হয়ে গেল!—বলেই লাজুক হাসি হাসতে থাকলেন।
বিজ্ঞানী না রাষ্ট্রপতি কোন পরিচয়ে পরিচিত হতে পছন্দ করেন?—এমন প্রশ্নের জবাবে এ পি জে কালাম শুধুই হাসলেন। তারপর প্রশ্নকর্তা শিক্ষার্থীকে বললেন, এটা তোমরাই বলতে পারবে। ওই শিক্ষার্থী ঝটপট বলে ওঠেন, আপনি একজন ‘বৈজ্ঞানিক রাষ্ট্রপতি’। শিক্ষার্থীর এমন জবাব পেয়ে বাচ্চাদের মতো হাসলেন। সবার উদ্দেশে বললেন, হাসতে হবে প্রাণ খোলে। হাসতে পারাটা খুব দরকারি। হাসি জীবনকে সহজ করে। কঠিন সময় পার করতে সহায়তা করে।
ধর্ম খুবই ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়—এক প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করে ‘ভারতরত্ন’, ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবে ভূষিত কালাম বলেন, যারা মহৎ​ তারা ধর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের মঙ্গলে কাজ করে। আর যারা খারাপ, তারা ধর্মকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তিনি ধর্মের কাছ থেকে ভালো শিক্ষা নিয়ে তা জাতির উন্নয়নে কাজে লাগাতে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানান।
তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে এক মৎস্যজীবী পরিবারে খুব দারিদ্র্যের মধ্যে জন্ম নিলেও কালামের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। আর এই স্বপ্নের অনেকটাই পূরণ করে দেখিয়েও গেছেন এই খ্যাতিমান পরমাণুবিজ্ঞানী। নিজের বইয়ে লিখে গেছেন আকাশসম স্বপ্নের কথা। তরুণদের জন্য তাঁর বার্তা ছিল, ‘অন্য রকমভাবে চিন্তা করো। নতুন কিছু সৃষ্টি করার সাহস রাখো। সাফল্যের পথে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করো। একসঙ্গে কাজ করার জন্য এগুলোই বড় গুণ।’

নয়াদিল্লিতে নেওয়া হচ্ছে আবদুল কালামের মরদেহ

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান পরমাণুবিজ্ঞানী আবুল পাকির জয়নাল আবেদিন আবদুল কালামের মরদেহ আসামের গুয়াহাটি থেকে আজ মঙ্গলবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে নেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দরে তাঁর মরদেহ গ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গতকাল সোমবার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন আবদুল কালাম। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অবিবাহিত। খুব সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন তিনি।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান পরমাণুবিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামের মরদেহ আসামের গুয়াহাটি থেকে আজ মঙ্গলবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: এএফপি
গতকাল সন্ধ্যায় শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে বি-স্কুলের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ‘লিভেবেল প্ল্যানেট আর্থ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার সময় হঠাৎ পড়ে যান আবদুল কালাম। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নেওয়া হয় হাসপাতালে।
আবদুল কালামের মৃত্যুতে ভারতজুড়ে শোক বিরাজ করছে। ঘোষণা করা হয়েছে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক।
তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর জন্ম আবদুল কালামের। ছোট্ট শহরে এক মৎস্যজীবী পরিবারে খুব দারিদ্র্যের মধ্যে জন্ম নিলেও তাঁর স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। আর এই স্বপ্নের অনেকটাই পূরণ করে দেখিয়েও গেছেন তিনি।
২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১ তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন আবদুল কালাম। তিনি হয়ে ওঠেন ‘জনতার রাষ্ট্রপতি’। তিনি ছিলেন ভারতের তৃতীয় মুসলিম রাষ্ট্রপতি। দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন’ ছাড়াও ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবেও ভূষিত হন তিনি।
এ পি জে আবদুল কালাম। ছবি: রয়টার্স
বিমান প্রকৌশলে পড়াশোনা করে ভারতের প্রথম মহাকাশযান তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন আবদুল কালাম। ওই মহাকাশযান দিয়েই ১৯৮০ সালে দেশটি প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র রোহিনী উৎক্ষেপণ করে। ১৯৯৮ সালে ভারতের পোখরান-২ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার পেছনেও প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালে মূল পরীক্ষা চালানোর পর দীর্ঘ ২৪ বছরে ভারতের এটাই ছিল প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা। দেশটিকে পরমাণু শক্তিধর দেশে পরিণত করার জন্য যিনি নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, পরে সেই তিনিই পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রচারে সরব ছিলেন।

ভোটার তালিকায় জেন্ডার গ্যাপ বাড়ল কেন? by বদিউল আলম মজুমদার

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য ভোটার তালিকা। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত না হওয়ার একটি বড় কারণ ছিল ভোটার তালিকায় প্রায় সোয়া কোটি ভুতুড়ে ভোটারের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ। বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ভোটার তালিকা সংশোধন করে তা নির্ভুল করার নির্দেশ দেন।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশন ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি করে। তালিকাট তৈরির পর তার সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিশন ইউএনডিপির সহায়তায় একটি অডিটের আয়োজন করে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমস (আইএফইএস) তালিকাটিকে ৯৯ শতাংশ নির্ভুল বলে প্রত্যায়িত করে। সেই তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৮। এর মধ্যে নারী ভোটার ছিল ৪ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৯ এবং পুরুষ ভোটার ৩ কোটি ৯৮ লাখ ২২ হাজার ৫৪৯। অর্থাৎ ওই তালিকা অনুযায়ী নারী ভোটার ছিল পুরুষ ভোটার থেকে ১৪ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ বেশি এবং ভোটার তালিকায় নারী-পুরুষের পার্থক্য বা ‘জেন্ডার-গ্যাপ’ ছিল +১ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার পর ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার ৫৩১। এর মধ্যে নারী ভোটার ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৬ এবং পুরুষ ভোটার ৪ কোটি ৬১ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৫। অর্থাৎ ২০১৩ সালের তালিকা অনুযায়ী, নারী ভোটার ছিল পুরুষ ভোটার থেকে ২ লাখ ৯১ হাজার ৩৯৯ কম এবং জেন্ডার গ্যাপ ০.৩২ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশন ২০১৪ সালের মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার পরবর্তী উদ্যোগ নেয়। গত ২ জানুয়ারি একটি খসড়া সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করে এবং ২২ জানুয়ারির মধ্যে এটি সংশোধনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়। খসড়া তালিকা অনুযায়ী নতুন ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ লাখের কিছু বেশি এবং জেন্ডার গ্যাপ -১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
পরবর্তী সময়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন হালনাগাদের একটি সারসংক্ষেপ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ২০১৪ সালের হালনাগাদ শেষে চূড়ান্ত ভোটারসংখ্যা দাঁড়ায় মোট ৯ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫২, যার মধ্যে নারী ভোটার ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার ১০ এবং পুরুষ ভোটার ৪ কোটি ৮৪ লাখ ৫১ হাজার ৬৪২। অর্থাৎ সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের তুলনায় ৭ লাখ ৪ হাজার ৬৩২ কম এবং জেন্ডার গ্যাপ -০.৭৪ শতাংশ।
কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সারসংক্ষেপ থেকে দেখা যায় যে নভেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত নতুন ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে ৪৬ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫০। এর মধ্যে নারী ভোটার হলো ২০ লাখ ৬৬ হাজার ১৪৪ এবং পুরুষ ভোটার ২৬ লাখ ২৯ হাজার ৫০৬। অর্থাৎ সর্বশেষ চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, নতুন ভোটারের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটার থেকে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬২ জন কম এবং জেন্ডার গ্যাপ -১২ শতাংশ। লক্ষণীয়, চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় জেন্ডার গ্যাপ কিছুটা বেড়েছে।
নতুন ভোটারদের মধ্যে জেন্ডার গ্যাপের তাৎপর্য পুরোপুরি অনুধাবন করার জন্য জেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত, কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সারসংক্ষেপের সঙ্গে জেলাভিত্তিক নতুন ভোটারের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি এবং আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেও কমিশন থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি। তবে ১ জানুয়ারি প্রকাশিত খসড়া সাপ্লিমেন্টারি তালিকার সঙ্গে জেলাওয়ারি নারী-পুরুষ ভোটারের বিভাজন পাওয়া যায়—যে ক্ষেত্রে জেন্ডার গ্যাপ কিছুটা কম—এবং তা থেকে ডেন্ডার গ্যাপের প্রকটতা আরও সুস্পষ্ট হয়।
খসড়া তালিকা অনুযায়ী, আমাদের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে আটটি জেলায় জেন্ডার গ্যাপ ৫ শতাংশের নিচে, ২৮টি জেলায় ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে, নয়টি জেলায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে, ১১টি জেলায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে, চারটি জেলায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে, দুটি জেলায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে, একটি জেলায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে, এবং একটি জেলায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে।
সবচেয়ে বড় জেন্ডার গ্যাপ হলো ফেনীতে, যা মাইনাস ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপর লক্ষ্মীপুরের মাইনাস ৩০ দশমিক ৮২ শতাংশ, নোয়াখালীতে মাইনাস ২৬ দশমিক ৪৪, চাঁদপুরে মাইনাস ২৫ দশমিক ৭২, কুমিল্লায় মাইনাস ২৩ দশমিক ৪, কক্সবাজারে মাইনাস ২২ দশমিক ৫৮ এবং ভোলায় মাইনাস ২০ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
সবচেয়ে কম জেন্ডার গ্যাপ ঢাকায়, যা মাইনাস ২ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর খুলনায় মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, গাইবান্ধায় মাইনাস ২ দশমিক ৯২, রংপুরে মাইনাস ৪ দশমিক শূন্য ২, শেরপুরে মাইনাস ৪ দশমিক ০৮, বগুড়ায় মাইনাস ৪ দশমিক ২৬, পঞ্চগড়ে মাইনাস ৪ দশমিক ৪২ এবং খাগড়াছড়িতে মাইনাস ৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
উপরিউক্ত তথ্য থেকে নতুন ভোটারদের মধ্যে জেন্ডার গ্যাপের কোনো সুস্পষ্ট প্যাটার্ন লক্ষ করা যায় না। একমাত্র বৃহত্তর নোয়াখালীর তিনটি জেলায় এবং বৃহত্তর কুমিল্লার দুটি জেলায় উচ্চ হারে জেন্ডার গ্যাপ দেখা যায়। কী কারণে তা ঘটেছে, যার ফলে নারীরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন, সেই ব্যাখ্যা দাবি করার অধিকার জনগণের রয়েছে এবং কমিশন তা প্রদান করবে বলে আমরা আশা করি।
ভোটার তালিকা নিয়ে আরেকটি সমস্যা হলো, বাংলাদেশের জনসংখ্যায় নারী-পুরুষের যে বিভাজন, তার সঙ্গে ভোটার তালিকায়, বিশেষত নতুন ভোটারদের মধ্যকার দৃশ্যমান জেন্ডার গ্যাপের কোনো রূপ মিল নেই। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে পুরুষ-নারীর অনুপাত বা জেন্ডার রেশিও ১০০ দশমিক ৩। অর্থাৎ আমাদের দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। তাই ভোটার তালিকায় নতুন ভোটারদের মধ্যে নারী-পুরুষের মধ্যে যে মাইনাস ১২ শতাংশ জেন্ডার গ্যাপ দেখা যায়, তার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।
ভোটার তালিকায় শুধু নারী-পুরুষের বিভাজনের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ নয়, ভোটার বৃদ্ধির হারের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সংগতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গত ছয় বছরে—২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গড় বার্ষিক ভোটার বৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। আর গত বছর যাঁরা নতুন ভোটার হয়েছেন, তাঁদের জন্ম ১৮ বছর আগে এবং তখন আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৮০ শতাংশের কম। এ ধরনের অসংগতি ভোটার তালিকার সঠিকতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি না করে পারে না।
বস্তুত, ভোটার তালিকার হালনাগাদ, তথা সঠিকতা নিয়ে ইতিমধ্যে গুরুতর বিতর্ক বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যুগান্তর-এর (২৬ জানুয়ারি ২০১৫) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী: ‘ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। তথ্য সংগ্রহকারীরা অনেক বাড়িতেই যাননি। বাড়ি বাড়ি না গিয়েই পাড়া-মহল্লার প্রভাবশালী ও পরিচিতদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেছেন কেউ কেউ। রাজধানীসহ জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকার তথ্য সংগ্রহকারীদের দেখা পাননি ভোটার হতে ইচ্ছুক অসংখ্য মানুষ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের বিধান থাকলেও অনেক তথ্য সংগ্রহকারী এ বিধানের তোয়াক্কাও করেননি। এ ছাড়া ভোটার তালিকা হালনাগাদে চালানো হয়নি পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা।’ প্রসঙ্গত, বর্তমান লেখকের বাড়িতেও কোনো তথ্য সংগ্রহকারী আসেননি।
পরিশেষে, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং এর দায়িত্ব সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করা। এ লক্ষ্যে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ কমিশনকে চারটি সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রণয়ন। এসব দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে কমিশনকে অগাধ ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কমিশন যেন তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না, বরং পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। এমনকি ভোটার তালিকা হালনাগাদেও বিতর্ক এড়ানো যায়নি, যার বিরূপ প্রভাব আগামী নির্বাচনে পড়তে বাধ্য।
তাই আমরা মনে করি, জরুরি ভিত্তিতে আমাদের বর্তমান ভোটার তালিকার একটি নিরপেক্ষ অডিটের আয়োজন করা আবশ্যক, যাতে সময় থাকতেই ভোটার তালিকা যথাযথভাবে সংশোধন করে এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

মিলন হত্যার চার বছর: জনমনে ক্ষোভ, ব্যাখ্যা চেয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর

মিলন হত্যার চার বছর
কিশোর শামছুদ্দিন মিলনকে (১৬) ‘ডাকাত সাজিয়ে’ পিটিয়ে হত্যার মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ায় নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপারের কাছে এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক। প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘বিচার মাটিচাপা দিল পুলিশ’ শীর্ষক সংবাদটি দেখে তিনি এ ব্যাখ্যা চান। পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মিলন হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ সর্বস্তরের মানুষ। এ ঘটনায় জড়িতদের এখনো বিচারের আওতায় আনা সম্ভব বলে মনে করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ও পুলিশের সাবেক প্রধান নূরুল হুদা। যদিও পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে মিলনের পরিবারের সঙ্গে রফা করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মনে করেন, মিলন হত্যা মামলার বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রের।
এই মামলা প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক আইজি নূরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে যেসব পুলিশ সদস্য জড়িত ছিলেন, তাঁরা অন্য জগৎ থেকে আসেননি। তাঁরা এই পৃথিবীরই বাসিন্দা। দলবদ্ধ উন্মত্ততার সংস্কৃতি দেশে বিরাজমান। যখন কিশোরটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে, তখন কি সেখানে কোনো বয়স্ক লোক ছিলেন না? তাকে বাঁচাতে কেউ একজন কি এগিয়ে আসতে পারতেন না? তখন সবাই মজা দেখেছেন। পুলিশ সদস্যরাও তাঁদের পবিত্র দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়েছিলেন।
নূরুল হুদার প্রশ্ন, এ ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কী করছে? পুলিশ প্রশাসন কেন যথাযথ ব্যবস্থা নিল না? ৫২ বার আদালত থেকে সময় নিয়ে তদন্ত দীর্ঘায়িত করা হলো, অথচ কারও পক্ষ থেকে তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করা হলো না। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য সামাজিক চাপ, সামাজিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন আছে।
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক মনে করেন, ‘বয়স যা-ই হোক না কেন, এখানে একজন মানুষ খুন হয়েছে। সেই মানুষের মা-বাবা যদি বলেন, তাঁদের এ খুনের বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই, তাতে কিচ্ছু এসে যায় না। এটি কোনো জমিজমার মামলা না। এ ঘটনা টাকা দিয়ে মীমাংসারও কোনো বিষয় নয়। পাঁচ লাখ কেন, ৫০০ কোটি টাকা দিয়েও তা সুরাহা করার কোনো সুযোগ নেই। এই কিশোর খুনের ঘটনায় অবশ্যই পুনঃ তদন্ত করা জরুরি। ফৌজদারি মামলার কোনো সময়সীমা নেই। পুলিশ প্রশাসনের উঁচু পদে যাঁরা আছেন, তাঁদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
মিলনের মা কোহিনুর বেগম গতকাল প্রথম আলোর নোয়াখালী প্রতিনিধিকে বলেন, ‘মিলনের বাবাকে এসআই আকরাম শেখ বিদেশ থেকে দেশে এনে আমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। তিনি দেশে আসায় সংসারে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। তাই তিনি আমাকে মামলা নিষ্পত্তি করতে বলেন। আমিও তাতে রাজি হই। কারণ, ডিবি পুলিশ, আদালত ও বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে গিয়ে আরও আমি নিঃস্ব হয়ে পড়ি। তা ছাড়া, সংসারে পুরুষ কিছু বললে না রেখে পারা যায় না।’
এ নিয়ে আলাপকালে বসুরহাট বাজারের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মিলন হত্যার ভিডিও চিত্র প্রকাশ পাওয়ার পর সারা দেশে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে ধারণা ছিল এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য আর সাক্ষ্য-প্রমাণ খুঁজতে হবে না। কারণ, ভিডিও চিত্রে সবকিছু স্পষ্ট দেখা গেছে, কারা-কীভাবে হত্যা করেছে।
চর ফকিরা ইউনিয়নের চাপরাশিরহাট বাজারসংলগ্ন এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, পুলিশ নিজেদের বাঁচাতে গিয়ে অন্য খুনিদেরও বাঁচিয়ে দিল।
মিলনের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল তাদের চর ফকিরা গ্রামের মসজিদে মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করে পরিবার। বিকেলে বাড়ির দরজার প্রায় দুই ফুট পানি মাড়িয়ে মিলনদের ঘরে গেলে তার মা কোহিনুর বেগম বলেন, ‘ছেলে হত্যার বিচার চেয়েও পাইনি, তাই মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার জন্য বাদ জোহর এলাকার মসজিদে মিলাদ ও দোয়া করিয়েছি।’
২০১১ সালের ২৭ জুলাই কোম্পানীগঞ্জের চর কাঁকড়া এলাকায় নিরীহ কিশোর মিলনকে ডাকাত সাজিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ গাড়িতে করে এনে জনতার হাতে ছোট্ট এই কিশোরকে ছেড়ে দেয়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই মিলনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

মিলন হত্যার বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের by মানসুরা হোসাইন

নোয়াখালীর কিশোর শামছুদ্দিন মিলন হত্যার ঘটনায় জড়িতদের এখনো বিচারের আওতায় আনা সম্ভব বলে মনে করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ও পুলিশের সাবেক প্রধান নুরুল হুদা। যদিও ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে মিলনের পরিবারের সঙ্গে রফা করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মনে করেন, মিলন হত্যা মামলার বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রের।
মিলনের মামলা প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে যে পুলিশ সদস্যরা জড়িত ছিলেন তাঁরা অন্য জগৎ থেকে আসেননি। তাঁরা এই পৃথিবীরই বাসিন্দা। দলবদ্ধ উন্মত্ততার সংস্কৃতি দেশে বিরাজমান। যখন কিশোরটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে তখন কি সেখানে কোনো বয়স্ক লোক ছিলেন না? তাকে বাঁচাতে কেউ একজন কি এগিয়ে আসতে পারতেন না? তখন সবাই মজা দেখেছেন। পুলিশ সদস্যরাও তাঁদের পবিত্র দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়েছিলেন। আগে সামাজিকভাবে মানুষের মধ্যে যে ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল, তা এখন নেই। সবার মধ্যেই ঢিলেঢালা ভাব চলে এসেছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংগঠন, বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের যে ভূমিকা পালন করার কথা তা করা হচ্ছে না। আইন না মানার সংস্কৃতিও আছে। এই ঘটনায় যে সব অপরাধ করা হয়েছে দণ্ডবিধির মধ্যেই তা সব বলা আছে। সংজ্ঞায়িত করা আছে। সাজার কথাও বলা আছে। দণ্ডবিধিতে পুলিশ সদস্যদের বেলায় ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়নি। তাই এ ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে এখনো পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
নুরুল হুদা বলেন, দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে সে ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কি করছে? পুলিশ প্রশাসন কেন যথাযথ ব্যবস্থা নিল না? ঘটনা ঘটার পর গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করল, কিন্তু এরপর কেন ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করল না? ৫২ বার আদালত থেকে সময় নিয়ে তদন্ত দীর্ঘায়িত করা হলো অথচ কারও পক্ষ থেকে তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করা হলো না। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য সামাজিক চাপ, সামাজিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন আছে।
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক মনে করেন, বয়স যাই হোক না কেন, এখানে একজন মানুষ খুন হয়েছে। সেই মানুষের মা-বাবা যদি বলেন, তাঁদের এ খুনের বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই তাতে কিচ্ছু এসে যায় না। এটি কোনো জমিজমার মামলা না। এ ঘটনা টাকা দিয়ে মীমাংসারও কোনো বিষয় নয়। পাঁচ লাখ কেন, ৫০০ কোটি টাকা দিয়েও তা সুরাহা করার কোনো সুযোগ নেই। এই কিশোর খুনের ঘটনায় অবশ্যই পুনঃতদন্ত করা জরুরি। ফৌজদারি মামলার কোনো সময়সীমা নেই। পুলিশ প্রশাসনের উঁচু পদে যাঁরা আছেন তাঁদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ছেলের হত্যার বিচার না হওয়া ও সমঝোতা সম্পর্কে মিলনের মা কোহিনুর বেগম বলেছিলেন, ‘সাড়ে তিন বছর ধরে বিচারের আশায় আদালতের বারান্দায় ঘুরেছি। ডিবি পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা বলে কোর্ট থেকে ডিবি পুলিশ ৫২ বার সময় নিয়েও তা দেয়নি। আদালত আর ডিবি পুলিশের কাছে যাতায়াত করতে করতে আরও নিঃস্ব হয়েছি। তাঁরা (পুলিশ) এবং অন্য লোকজনও মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য সব সময় চাপ দিয়ে আসছে।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এলিনা খান প্রথম আলোকে বলেন, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও জোরালো নজরদারি না থাকলে একটি মামলা কীভাবে শেষ হয়ে যায় এ ঘটনা তারই প্রমাণ। এ কিশোরের ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ আছে। ছবি আছে। বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনেক কিছুই বের করা সম্ভব। প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজনের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিও আছে। সাক্ষ্য-আইনে যদি একজন উপযুক্ত সাক্ষীর সাক্ষ্য দিয়ে থাকেন তাই যথেষ্ট। এ ঘটনায় দণ্ডবিধি আইনে দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার জন্য যে বিধান আছে সেই অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ অন্য যারা দোষীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্রুত মামলা করতে হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে কিশোরকে পুলিশের গাড়ি থেকে নামানো হচ্ছে। তাই প্রথমেই দেখতে হবে ওই গাড়িতে কে ছিল। গাড়িতে যাঁরা ছিলেন তাঁরাই দোষী। এই মামলাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সব ধরনের পরিস্থিতি বিদ্যমান।
চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তির আগে মিলন হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে সন্দেহভাজন কোম্পানীগঞ্জ থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আকরাম উদ্দিন শেখ পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন মিলনের বাবাকে। প্রায় তিন মাস আগে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ওরফে বাদলের মাধ্যমে ওই টাকা দেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার সময় কোম্পানীগঞ্জ থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে বাগেরহাটের ফকিরহাট থানায় কর্মরত এসআই আকরাম উদ্দিন শেখ মামলা নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মিলনের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন প্রথম আলোর কাছে। তিনি বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, এখন আর কী করা।’
এ ছাড়া ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তসহ কিছু বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়। কিছুদিন পরে অবশ্য তাঁরা সবাই স্বীয় পদ ফিরে পান। এলিনা খান বলেন, মিলনের দরিদ্র বাবা-মা দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন। যাঁদের জনগণকে রক্ষা করার কথা অর্থাৎ পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরাই যদি এক পক্ষ হয়ে যান তখন একটি দরিদ্র পরিবারের পক্ষে লড়াই করা কঠিন। এই বাবা-মা টাকা নিয়ে থাকলে তা নিয়েছেন বাধ্য হয়ে। তাই টাকা নেওয়ার সঙ্গে মামলা পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক হবে না বা কোনো বাধা নেই। বাদী যদি কোনো কারণে হোস্টাইল ডিক্লেয়ার করে তারপরও অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র নিজেই মামলা পরিচালনা করতে পারে। সব দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। আইন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক শাহ আলম বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা দেখলে নিজেরই খুব খারাপ লাগে। সমাজ, সংস্কৃতি, মানবতা সব যে কোথায় চলে যাচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। সার্বিকভাবে পুরো সমাজে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটছে বলেই মনে হচ্ছে।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, মিলনের মামলাটিকে স্পর্শকাতর মামলা হিসেবে গণ্য করা উচিত। মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আপিল করা প্রয়োজন। মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করারও আশ্বাস দেন ফাওজিয়া করিম। অবশ্য হতাশ মিলনের মা-বাবা রাষ্ট্রের কাছে সুবিচার চাননি। তাঁরা বলেছেন, ‘দুনিয়ার আদালতে বিচার পাইনি, আল্লাহর কাছে এর বিচার চাই।’

প্রতিবেশীকে নিয়ে বিকাশের নীতিতে বিশ্বাসী চীন -প্রথম আলো কার্যালয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত

চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংচিয়াং
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘প্রতিবেশীকে সঙ্গে নিয়ে বিকশিত হও’—এই দর্শনে বিশ্বাসী চীন। এ ধারণার মূলে রয়েছে প্রতিবেশী সমৃদ্ধ না হলে নিরাপদ থাকা যায় না। তাই প্রতিবেশীকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত করার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর চীন গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কাজেই বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ হলে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আসবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংচিয়াং গতকাল সোমবার দুপুরে প্রথম আলো কার্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন। আলোচনা সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান।
চীনের রাষ্ট্রদূত তাঁর সূচনা বক্তৃতায় বলেন, দুই দেশ এ বছর কূটনৈতিক সম্পর্কের চার দশক পালন করলেও সম্পর্কটা কয়েক হাজার বছরের। মুন্সিগঞ্জের পুরাকীর্তি সে সাক্ষ্যই বহন করছে। সম্পর্কের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের অংশীদারত্ব নিবিড় করতে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেছিয়াং এ বছর ঢাকায় আসছেন। তাঁর এ সফরের আগে বাংলাদেশে আসবেন চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী গাউ হুচেং।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গিয়ে মা মিংচিয়াং অতীশ দীপঙ্করের প্রসঙ্গ টানেন। তাঁর চীন সফরের পর বাংলাদেশে পুরাকীর্তি নিদর্শনের কথা জানা যায়। মুন্সিগঞ্জে পুরাকীর্তির নিদর্শন খননে চীন আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিপুল বৈষম্য যা চীনের পক্ষে আছে, তার উল্লেখ করে মা মিংচিয়াং বলেন, ‘কীভাবে এই বৈষম্য কমানো যায়, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। তবে বাংলাদেশের চেয়ে চীনের পণ্য রপ্তানির ভান্ডারটা সমৃদ্ধ। তাই বাংলাদেশে বিনিয়োগের ওপর আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। বাংলাদেশে চীনের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য চট্টগ্রামে ৭৭৪ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। এতে জমি পেতে ইতিমধ্যেই চীনের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আমরা চীনের একটি শিল্পপার্ককে বাংলাদেশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছি।’
বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দর নির্মাণে চীনেরও আগ্রহ রয়েছে। বর্তমানে এটি কোন পর্যায়ে আছে, জানতে চাইলে মা মিংচিয়াং বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় পণ্য রপ্তানির জন্য বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে সময় ও টাকা খরচ বেশি হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বার্থেই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশের প্রকল্প, তাই কোন দেশ এটা করল, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না।’ কারণ, যেকোনো বাণিজ্যিক প্রকল্পে টাকার বিনিময়ে ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যায়। তবে এটা ঠিক যে চীনের কোনো প্রতিষ্ঠান এ কাজ পেলে সানন্দে গ্রহণ করবে।
সাধারণত বাংলাদেশ চীন থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্য দেশ থেকেও বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কিনছে। বেইজিং এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখে—জানতে চাইলে মা মিংচিয়াং বলেন, ‘আমি তো মনে করি, এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত হয়েছে বলে বিভিন্ন দেশ থেকে সমরাস্ত্র কেনা হচ্ছে। একটি সার্বভৌম দেশের কোনো বিষয়ে এককভাবে একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকাটা ঠিক নয়। বন্ধু হিসেবে মনে করি, বিভিন্ন উৎস থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ করাটা বাংলাদেশের জন্য ভালো হলে তাতে আমরাও খুশি।’
দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি উল্লেখ করে চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, এ সম্পর্ক প্রতিনিয়ত নিবিড় হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ নিবিড় হয়েছে। সেই সঙ্গে জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সব দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকাটাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে দেখা হয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিবিড় থেকে নিবিড়তম হওয়াটাকে বেশ ইতিবাচকভাবেই দেখেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ঐতিহাসিক বৈরিতা সত্ত্বেও জাপানের সঙ্গে চীন সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারত ও জাপান স্থায়ী সদস্য হতে চায়। কোন দেশের প্রতি চীনের সমর্থন রয়েছে এবং তাদের প্রার্থিতাকে চীন কীভাবে দেখে, জানতে চাইলে মা মিংচিয়াং বলেন, জাতিসংঘে সংস্কার চায় চীন। এই সংস্কারের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের শুরু ৭০ বছর আগে, প্রতিষ্ঠার সময়কার কাঠামোতে এখনো এটি চলছে। জাতিসংঘে শক্তি ও ধনী দেশের কণ্ঠই উচ্চকিত শোনা যায়। সংস্কার হতে হলে তা সামগ্রিক হতে হবে। সব শেষ কারণটি হচ্ছে, সংস্কারের পর যাতে দুর্বল ও ছোট দেশগুলোর দাবি জোরালোভাবে শোনা যায়। তাই জাতিসংঘকে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে এর সামগ্রিক সংস্কার প্রয়োজন।
চীনা রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় এখানকার লোকজনের আতিথেয়তার পরিচয় পাই। এবার রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশে এসে বুঝেছি, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে এখানকার সরকার ও বিরোধী দলের পাশাপাশি আপামর জনগণের ভাবনার সংহতি রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।’
প্রথম আলোর কার্যালয় পরিদর্শনের জন্য চীনের রাষ্ট্রদূতকে পত্রিকার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়। মা মিংচিয়াং দায়িত্ব পালনের সময় দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

সারা হোসেনের অন্য ভুবন by কাজী সুমন

১৯৮৮ সাল। বাংলাদেশে তখন ভয়াবহ বন্যা। সে সময় দেশে ফিরেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সারা হোসেন। কাছ থেকে বন্যার ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখার জন্য চলে যান মাদারীপুরে। সেখানে থাকেন তিন মাস। বন্যাপীড়িত মানুষদের সাহায্য-সহযোগিতা করেন। অসহায় মানুষদের করুণ অবস্থা তার মনের ভেতর প্রচ- রকম নাড়া দেয়। তখনই সিদ্ধান্ত নেন বিলাসী জীবন ছেড়ে কাজ করবেন বঞ্চিত মানুষের পক্ষে। সারা হোসেনের মা অক্সফোর্ড ডিগ্রিধারী ড. হামিদা হোসেনও ছিলেন একই পথের পথিক। স্বাধীনতার পর নির্যাতিত নারীদের পক্ষে কাজ করেছেন। আশির দশকে নারী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গঠন করেছিলেন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’। বিনা পারিশ্রমিকে সহায়তা দিতেন অসহায় মানুষদের। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে গবেষণার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে বের করে দিতেন। মায়ের মানবসেবার মহান পেশায় পথ চলতে শুরু করেন সারাহ হোসেন। ১৯৮৯ সালের শেষদিকে অক্সফোর্ডের পড়া শেষে নানা সুযোগ-সুবিধার মোহ ছেড়ে ফিরে আসেন নিজের দেশে। যোগ দেন ইশতিয়াক আহমেদ ল’ ফার্মে। দেশব্যাপী তখন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। ৯০-এর দিকে এরশাদ সরকারের পতন হয়। এরপর শুরু হয় এরশাদের বিচার। ওই বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। ওই ল’ ফার্মে কাজ করার সময় বিভিন্ন আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হন তিনি। তখন তার ল’ ফার্মের সহকর্মীরা তাকে কাজ করার সুযোগ দেন। কেউ বলেননি কেন চেম্বার বড় করছো না। কেন টাকা নিচ্ছো না। এক পর্যায়ে যোগ দেন বাবা প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের ল’ ফার্মে। সেখানে প্র্যাকটিস শুরু করেন। ওই ফার্মে বড় বড় মামলা আসায় তার জন্য কাজ করা সহজ হয়ে যায়। তবে নিজের মেয়ে বলে কোন কিছুতে ছাড় দেননি বাংলাদেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন। এরপর নিজের কাজের পরিধি ঠিক করে নেন তিনি। মানুষের পারিবারিক সমস্যা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) গঠন হয়। মানুষের জনস্বার্থে মামলা করে সংগঠনটি। তখনই অনেক বড় সুযোগ তৈরি হলো। ব্লাস্টের মামলায় বিনা পারিশ্রমিকে আইনি সহায়তা দেয়া শুরু করেন তিনি। সেক্ষেত্রে আদালত থেকেও অনেক সহযোগিতা পান। তখন লিঙ্গবৈষম্য, ফতোয়া, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানির ঘটনা প্রকট ছিল। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০-এর বেশি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলেও কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। এসব জনস্বার্থ বিষয় নিয়ে মামলা করেন তিনি। এছাড়া গার্মেন্ট শ্রমিকদের অধিকার নিয়েও কাজ করেন। রানা প্লাজা, তাজরিন ফ্যাশনসসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দেন। শিশু, কয়েদি ও প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে মামলা করেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ও গুমের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন তিনি। ২৫ বছর আগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সারাহ হোসেন বলেন, আগে ইন্টারনেট শব্দটির সঙ্গে মানুষ পরিচিত ছিল না। এখন ইন্টারনেট হওয়ায় নিত্যনতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কেউ ফেসবুকে লাইক দিলেও তার বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। আদালত থেকেও এসব বিষয় উসকে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ২৫ বছর আগে তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়া হলো। তার মু-ু নেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা দেয়া হলো। তখন আদালতে তার পক্ষে মামলা করে সহায়তা পেয়েছি। আদালত তাকে জামিনও দিয়েছেন। এরপর তিনি নিরাপদে দেশত্যাগ করতে পেরেছেন। এরপর ২০০৭ সালের দিকে কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে একইভাবে ফতোয়া দেয়া হলো। জেলখানায়ও তার ওপর হামলা হলো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাষ্ট্রপক্ষ থেকেও তার বিরুদ্ধে উসকানি দেয়া হলো। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের পরে ব্লগারদের ওপর প্রতিনিয়ত হামলা হচ্ছে। এফআইআর লেখার সময় পুলিশের পক্ষ থেকে এমনভাবে বলা হচ্ছে যেন তারা নাস্তিক। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে নাস্তিক হওয়া অপরাধ নয়। তাই এখন নিরাপত্তার বিষয়টি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করেন তিনি। ভবিষ্যতে মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার ও মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করতে চান। এছাড়া সম্প্রতি যেসব ব্লগার খুন হয়েছেন তাদের পরিবারকে সহায়তা দিতে চান। পরমত সহিষ্ণুতা, মানুষের বাকস্বাধীনতা ও যুক্তিতর্কের স্বাধীনতা নিশ্চিতের জন্য কাজ করতে চান। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংগঠন থেকে নানা পুরস্কার ও সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ থেকে ‘অনন্যা টপটেন অ্যাওয়ার্ড’, হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড, এশিয়া ২১ ফেলো, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফেলো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। নিজের কাজের সফলতা হিসেবে সারাহ হোসেন মনে করেন, ধারণা ছিল আইনজীবীরা শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখবেন সামাজিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন, এ ধারণা সাধারণ মানুষের ছিল না। বর্তমানে সেই জায়গায় কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক সংগঠন ও ব্যক্তি এ বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। অক্সফোর্ডে অধ্যয়নকালেই দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি সংগঠন করেছিলেন সারাহ হোসেন। তখন উপমহাদেশের শিক্ষার্থীদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন ওই সংগঠন থেকে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। বর্তমানে তিনি আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটির সদস্য। এছাড়া ব্লাস্ট-এর অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। লিগ্যাল এইড অ্যান্ড মেডিটেশন সেন্টারের নির্বাহী কমিটির সদস্য, ইন্টারন্যাশনাল ল’ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য তিনি। ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসেরও অংশীদার তিনি। আইনজীবী বাবা তাকে সব সময় একটি শিক্ষা দিয়েছেন। কামাল হোসেনের কাছে কোন মামলা নিয়ে গেলে সূক্ষ্মভাবে বিষয়টি দেখেন এবং গভীরভাবে বুঝেন। তারপর কাজের সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া বাবা কোনদিন কোন কিছুতে জোর করেননি। অগাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন মেয়েকে। ১৯৮৯ সালে অক্সফোর্ডে পড়াকালেই বৃটিশ বংশোদ্ভূত ডেভিড বার্গম্যানের সঙ্গে পরিচয় হয়। বার্গম্যান তখন লন্ডনের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন। পরিচয়ের দীর্ঘ ১১ বছর পর তার সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন সারাহ হোসেন। বার্গম্যান ঢাকায় ইংরেজি দৈনিকে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। সারাহ হোসেনের এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে। সন্তানরা রাজধানীর একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করছেন।

কর্মসূচি নেই, কারাগার আছে by কাফি কামাল

রাজপথের আন্দোলন কর্মসূচিতে নেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। কর্মসূচির বদলে ধীরে চলো নীতিতে সংগঠন গোছানোর দিকে মনোযোগী বিএনপি। কিন্তু থেমে নেই বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও গ্রেপ্তার করছেন বিরোধী নেতাকর্মীদের। তাদের বেশির ভাগকেই গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে নাশকতার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায়। পাশাপাশি নতুন অভিযোগ আনা হচ্ছে মাদকের। এছাড়া অপহরণ-হামলা-হত্যার ঘটনাও থামছে না। এমনকি ঈদের দিনও দুর্বৃত্তদের হামলায় মারা গেছেন যুবদলের এক তৃণমূল নেতা। ঈদের এক সপ্তাহ আগ থেকে চলছে এমন পরিস্থিতি। এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম তিন সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিন মাসের টানা অবরোধ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসে বিরোধী জোট। কিন্তু ততদিনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন দলের সিনিয়র নেতাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ঘরছাড়া হন হাজারো নেতাকর্মী-সমর্থক। দীর্ঘদিন ধরেই আত্মগোপনে দিন কাটছে হাজার হাজার নেতাকর্মীর। কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ জামিনে মুক্তি পেলেও জামিন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের। উচ্চ আদালতের জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাচ্ছে সরকার। সব মিলিয়ে টানা অবরোধ কর্মসূচির জের টানছে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে ফের আন্দোলনের যাওয়ার আগে দল গোছানোর কথা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া। ঈদের দিন কূটনীতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে তিনি সাংবাদিকদের এমন মনোভাবের কথা জানান। খালেদা জিয়া বলেছেন, দল পুনর্গঠন করে বিএনপি আবার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নামবে। বিএনপি’র আন্দোলন হবে জনগণের কল্যাণে এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। বিএনপির একাধিক নেতা জানান, আন্দোলনের সময় প্রশাসনকে সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করেছে সরকার। এখন দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে জেনে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে প্রতিবদ্ধকতার সৃষ্টি করছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার জন্য ঈদের পর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। এছাড়া ঈদের ছুটি শেষে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলার শুনানির তারিখ ধার্য রয়েছে আদালতে। এর মধ্যে দুদকের দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দুটির সাক্ষ্য গ্রহণের শুনানির নির্ধারিত দিন ২৩শে জুলাই।
এদিকে ঈদের পরদিন ১৯শে জুলাই রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পটুয়াখালীর লেবুখালী ফেরিঘাটে প্রাইভেট কার থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসানসহ ছয়জনকে আটক করে দুমকি থানা পুলিশ। পরে তাদের গাড়ি থেকে ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে মামলা দায়ের করে পুলিশ। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান ষড়যন্ত্রমূলক গ্রেপ্তার ও অপপ্রচারের শিকার বলে অভিযোগ করে বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, বিরোধী রাজনীতিকে দুর্বল করার অপপ্রয়াসে ছাত্রনেতা রাজীবকে গ্রেপ্তার করার কয়েক ঘণ্টা পর তাকে বহনকারী গাড়িতে মাদক পাওয়ার কথা প্রচার করা হয়। যা রাজনৈতিক কর্মীদের চরিত্রহননের একটি ঘৃণ্য প্রচারণামূলক নাটক ছাড়া আর কিছু নয়। আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন ডেকে সংগঠনটির সভাপতির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের পর মাদক মামলা দায়েরের ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত নাটক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ছাত্রদল। এমন অভিযোগ আনার ঘটনায় তারা ‘মর্মাহত’ মন্তব্য করে প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। সেই সঙ্গে সারা দেশে দুদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচিও দিয়েছে তারা। একইদিন একই সময়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের রাজধানীর রামপুরার বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। তবে সে সময় বাসায় ছিলেন না তিনি। এছাড়া একইদিন দুপুরে নরসিংদীর শিবপুরে আকরামের গ্রামের বাড়িতেও অভিযান চালায় পুলিশ। রোববার বিকালে গ্রেপ্তার করা হয় মাগুরা জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক মিজানুর রহমানকে। পুলিশ জানিয়েছে, বিরোধী জোটের অবরোধ চলাকালে গত ২১শে মার্চ সন্ধ্যায় মাগুরা-যশোর সড়কে একটি ট্রাকে পেট্রল বোমা হামলায় ৫ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাসহ একাধিক নাশকাতার মামলার আসামি মিজানুর রহমান। এদিকে পটুয়াখালীতে মাসুদ মাদবর হত্যাকা-ের ঘটনায় জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও পৌর বিএনপির সভাপতি মাকসুদ আহমেদ বায়েজিদ পান্না, জেলা কৃষকদলের সভাপতি আবদুর রব হাওলাদারসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে ২০শে জুলাই সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলায় জেলা বিএনপির চার নেতাকে আসামি করার প্রতিবাদ জানিয়ে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক পিপি মজিবর রহমান টোটন বলেছেন, এটি একটি পরিকল্পিত মামলা। গ্রামের একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতাদের আসামি করা ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছুই নয়। এর আগে ৩০শে জুন পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএ রব মিয়াসহ ৩৬ নেতার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে সদর থানা পুলিশ। অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে এ মামলা দায়েরের কথা জানায় পুলিশ। তবে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট মুুজিবর রহমান টোটন এ মামলাকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। কারাগারে আটক গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা প্রফেসর এমএ মান্নানকে আরও একটি মামলায় ২১শে জুলাই শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে। ফলে আগের সবক’টি মামলায় হাইকোর্ট তাকে জামিন দিলেও মুক্তি পাচ্ছেন না তিনি। ১৬ই জুলাই গাজীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা অধ্যক্ষ ইজাদুর রহমান মিলনকে আটক করে পুলিশ। এদিকে কারাগারেও আতঙ্ক-আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বিএনপি নেতারা। সাম্প্রতিক সময়ে কারাগারে অসুস্থ অবস্থায় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক এমপি নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু, ডিসিসির সাবেক কমিশনার মুসলেহউদ্দিন আহমেদ কয়েকজন বিএনপি নেতার মৃত্যু হয়েছে।
ওদিকে নাশকতার বিভিন্ন মামলায় হাজির হয়ে জামিন চাইলে ১৩ই জুলাই বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও রাজশাহী মহানগর সভাপতি মিজানুর রহমান মিনুকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। একইভাবে নাশকতার মামলায় হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করলে ১৪ই জুলাই খুলনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন খুলনার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। রূপসা থানার দু’টি, ফুলতলা ও তেরখাদা থানা দুটিসহ চারটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে চার সপ্তাহের জামিনে ছিলেন মনা। নির্ধারিত দিনে নিম্ন আদালতে হাজির হলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। একইভাবে নিম্ন আদালত থেকে কারাগারে পাঠানো হয় বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে। এদিকে ১১ই জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের মোবারকপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে শিবগঞ্জ থানা পুলিশ। কানসাটে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি পোড়ানোসহ নাশকতার ৮টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। রাজধানীর শ্যামপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর মেম্বারকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে কদমতলী থানা পুলিশ। ২১শে জুলাই কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা যুবদল নেতা কামাল উদ্দিন মেম্বারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৮ই জুলাই যশোর জেলা ছাত্রদলের অর্থ-সম্পাদক ইমদাদুল হক ইমদাকে বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় আটক করেছে পুলিশ। ২১শে জুলাই গোপালগঞ্জে জেলা যুবদল সভাপতি অ্যাডভোকেট তৌফিকুল ইসলাম, সদর উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি মিকাইল ইসলামসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে সদর থানা পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে সরকার বিরোধী কর্মকা-ে চালানোর পরিকল্পনার অভিযোগ। এছাড়া নাশকতা মামলায় যশোরের বাঘারপাড়া পৌরসভার কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা শহিদুল ইসলামকে সোমবার রাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়াও প্রতিদিন দেশের নানা জায়গা থেকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে জামায়াত নেতাকর্মীদের।
ওদিকে ১৫ই জুলাই সিলেটের ওসমানীনগরে উপজেলা ওলামা দলের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম রিপনের (৩০) রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৫ই জুলাই বরিশালের হিজলা উপজেলার ধুলখোলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা নান্টু বেপারীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঈদের পরদিন ১৯শে জুলাই নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয় হাবিবুর রহমান হাবিব নামে এক যুবদল কর্মী। ঈদের দিন সন্ধ্যায় তার বাড়িতে ঢুকে দুর্বৃত্তরা গুলি করার পর গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। ১৪ জুলাই রাতে বাড়ি ফেরার পথে নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক রবিউল ইসলাম রুবেলকে অপহরণ করা হয়। এখন পর্যন্ত তার কোন খোঁজ মিলেনি।

চলে গেলেন মিসাইলম্যান: এপিজে আবদুল কালাম

এপিজে আবদুল কালাম
ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট, মিসাইল প্রযুক্তির জনক এপিজে আবদুল কালাম মারা গেছেন। গত রাতে তিনি শিলংয়ে মারা যান। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট ইন শিলংয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি অকস্মাৎ অচেতন হয়ে পড়ে যান। তাকে দ্রুততার সঙ্গে বিথানি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয় তাকে। রাখা হয় হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউতে)। তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকরা তৎপর হয়ে ওঠেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারেননি তারা। চিকিৎসকরা বলেছেন, তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া। এতে বলা হয়, খাসি হিলসের এসপি এম খারক্রাং এ কথার সত্যতা স্বীকার করেছেন। মহত এই ব্যক্তিত্ব ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩১ সালের ১৫ই অক্টোবর রামেশ্বরমে তার জন্ম। ১৯৯৮ সালে পোখরান-২ নিউক্লিয়ার যে পরীক্ষা চালানো হয় তাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর আগে ১৯৭৪ সালে প্রথম ভারতে এ পরীক্ষা করা হয়েছিল। তিনি ভারতে দ্য মিসাইল ম্যান নামেও বেশি পরিচিত। তার অসাধারণ অর্জনের জন্য ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ ও ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করে। এরপর ২০০২ সালে তিনি ১১তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পদার্থবিদ্যা ও এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। চার দশক ধরে পালন করেছেন ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব। যুক্ত ছিলেন ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের সঙ্গেও।
ওদিকে তার মৃত্যুতে ভারত সরকার সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে। তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন  করছে ভারতের সর্বস্তরের মানুষ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ড . কালাম ছিলেন একজন অসাধারণ মানুষ। তার ছিল অঢেল জ্ঞানের ভাণ্ডার। তার এ মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি যে শূন্যতা রেখে গেলে তা সহজে পূরণ হবার নয়।  পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এক টুইট বার্তায় বলেন, ড. এপিজে আবদুল কালাম ছিলেন জনগণের প্রেসিডেন্ট। মহান এই আত্মার প্রতি আমার শ্রদ্ধা। জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বলেন, স্মরণ করছি ড. কালাম যখন প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, তখন কেন্দ্রীয় সরকারে দু’টি প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে। তাহলো তিনি কি গলাবন্ধ পরবেন? তিনি কি তার চুলের ধরণ পাল্টাবেন? তিনি গলাবন্ধ নিয়ে বেশ খুশিমনে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু নিজের চুলের ধরণ পাল্টাতে অস্বীকার করেন।
এক নজরে আবদুল কালাম: পুরো নাম আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আবদুল কালাম (এপিজে আবদুল কালাম)। ভারতের ১১তম প্রেসিডেন্ট তিনি (২০০২ থেকে ২০০৭) এবং একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তিনিই ভারতে প্রথম পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করেন। এ জন্য তাকে মিসাইল প্রযুক্তির জনক বলা হয়। আবদুল কালামের জন্ম তামিলনাড়ুর উপকূল সংলগ্ন রামেশ্বরামে। পিতার নাম জয়নুল আবেদিন ও মাতার নাম আসিআম্মা। তিনি খুব গরিব পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং খুব অল্প বয়সেই তাকে জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশায় কাজ করতে হয়েছিল। তার পড়াশুনার বিষয় ছিল এ্যারোসেপস ইঞ্জিনিয়ারিং। চল্লিশ বছর যাবৎ তিনি ভারতের বিভিন্ন বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ডিআরডিও) ও ইন্ডিয়ান সেপস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (আইএসআরও) কর্তব্যরত অবস্থায় তিনি বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা ও সামরিক মিসাইল তৈরিতে প্রচুর অবদান রাখেন। ব্যালেস্টিক মিসাইল ও তার উৎক্ষেপণ যান তৈরিতে তার অবদানের জন্য তিনি ‘মিসাইল ম্যান’ হিসেবে স্বীকৃতি পান। ১৯৯৮ সালে ভারতের প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা পোখরান-২ এর তিনি ছিলেন মুখ্য অবদানকারী। তিনি ২০০২ সালে ভারত প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
এপিজে আবদুল কালামের স্মরণীয় ১০ উক্তি
ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট, মিসাইল ম্যান হিসেবে খ্যাত ড. এপিজে আবদুল কালাম গতকাল মেঘালয়ের শিলংয়ে মারা গেছেন। ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, শিলংয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে অকস্মাৎ তিনি অচেতন হয়ে পড়ে যান। দ্রুত তাকে বিথান হাসপাতালে ভর্তির পর মারা যান তিনি। একধারে তিনি ছিলেন ভারতের আধুনিক প্রযুক্তির জনক, লেখক। সর্বশেষ তিনি ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন ভারতের প্রেসিডেন্ট। জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন একজন দার্শনিকও। তার দর্শন ফুটে উঠেছে তার বিভিন্ন লেখা, বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। এখানে তার আলোচিত ১০টি উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলো।
এক. স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে স্বপ্ন দেখতে হবে।
দুই. পরম উৎকর্ষতা হলো একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটা হঠাৎ করেই আসে না।
তিন. জীবন হলো এক জটিল খেলা। ব্যক্তিত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে তুমি তাকে জয় করতে পার।
চার. সফলতার আনন্দ পাওয়ার জন্য মানুষের কাজ জটিল হওয়া উচিত।
পাঁচ. যদি আমরা আমাদের তরুণ প্রজন্মে কাছে একটি সমৃদ্ধ ও নিরাপদ ভারত দিয়ে যেতে পারি তাহলে আমরা স্মরণীয় হতে পারবো।
ছয়.  যারা হৃদয় দিয়ে কাজ করে না তারা যা অর্জন করে তা ফাঁকা, তা হয় অর্ধেক হৃদয়ের সফলতা। তাতে সব সময়ই একরকম তিক্ততা থেকে যায়।
সাত. শিক্ষাবিদদের উচিত শিক্ষার্থীদের মাঝে অনুসন্ধানী, সৃষ্টিশীল, উদ্যোগী ও নৈতিক শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়া, যাতে তারা আদর্শ মডেল হতে পারে।
আট. আকাশের দিকে তাকাও। আমরা একা নই। মহাবিশ্ব আমাদের প্রতি বন্ধুপ্রতীম। যারা স্বপ্ন দেখে ও সেমতো কাজ করে তাদের কাছে সেরাটা ধরা দেয়।
নয়. যদি কোন দেশ দুর্নীতিমুক্ত হয় ও সুন্দর মনের মানসিকতা গড়ে ওঠে, আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি সেখানকার সামাজিক জীবনে তিন রকম মানুষ থাকবে, যারা পরিবর্তন আনতে পারেন। তারা হলেন পিতা, মাতা ও শিক্ষক।
দশ. তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার আহ্বান হলো ভিন্নভাবে চিন্তা করার সাহস থাকতে হবে, আবিষ্কারের নেশা থাকতে হবে, যেপথে কেউ যায় নি সেপথে চলতে হবে, অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস থাকতে হবে, সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে এবং তারপর সফল হতে হবে। এগুলোই হলো সবচেয়ে মহত গুণ। এভাবেই তাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। তরুণদের কাছে এটাই আমার বার্তা।
মায়ের স্বপ্ন: সমুদ্র পেরিয়ে যাবে ছেলের নাম
এপিজে আবদুল কালামের মা আসিআম্মা। তিনি ছেলেকে নিয়ে দেখতেন বড় স্বপ্ন। হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দিন আনি দিন খাই পরিবারে জন্ম নেয়া এই ছেলেটি একদিন এমন নাম করবে, যা পেরিয়ে যাবে সমুদ্র পেরিয়ে দূরে। তাই তিনি সংসারের নামমাত্র পুঁজি থেকে কিনতেন ছেলের পড়াশোনার জন্য বাড়তি কেরোসিন। তাতেই রাত জেগে আবদুল কালাম পড়াশোনা করতেন। কর্মজীবনে ঠিক দু’দিন ছুটি নিয়েছিলেন আবদুল কালাম। সেটা মায়ের আর বাবার মৃত্যুদিনে। বলে গিয়েছিলেন, আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা করো না। আমায় যদি ভালবাসো, মন দিয়ে কাজ করো সে দিন।
ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে তার শৈশবকালের, কৈশোর আর জীবনের নানা প্রান্তের কথা। এতে বলা হয়েছেÑ আর সাত ভাইবোনের জন্য মা শুধু ভাত রাঁধতেন। কিন্তু ছোট ছেলেটার জন্য করতেন বাড়তি কয়েকটা রুটি। ভোর চারটেয় উঠে পড়তে বসবে সে। তখন খিদে পাবে তো। শুধু তা-ই নয়। দিন-আনি-দিন-খাইয়ের সংসারে নামমাত্র পুঁজি থেকে কিনতেন বাড়তি কেরোসিন। কত রাত পর্যন্ত ছেলে পড়াশোনা করবে কে জানে! লেখাপড়া শিখেই যে এই ছেলে অনেক দূর যাবে, ঠিক জানতেন মা। স্বপ্ন দেখতেন, তাঁদের বাড়ির খুব কাছেই যে বঙ্গোপসাগর, সেই বিশাল সমুদ্রও ছাড়িয়ে যাবে তাঁর ছেলের নামডাক।
মায়ের সেই স্বপ্ন সত্যি করেছিলেন আবদুল কালাম। তবে রাস্তাটা নেহায়েত সোজা ছিল না। ১৯৩১ সালের ১৫ ই অক্টোবর। তামিলনাড়–র রামেশ্বরমে এক অতি দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবুল পাকির জয়নুল আবদিন আবদুল কালাম। বাবা জয়নুল আবদিন ছিলেন এক সাধারণ মৎস্যজীবী। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই রোজগারের তাগিদে খবরের কাগজ বিক্রি করতে হতো আবদুলকে। স্কুল পাশ করে কলেজে পড়ার জন্য একটা বৃত্তি পান তিনি। ভর্তি হন তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফ কলেজে। ১৯৫৪ সালে সেখান থেকেই পদার্থবিদ্যায় স্নাতক। তার পর ফের স্কলারশিপ নিয়ে চেন্নাইয়ে। পড়তে শুরু করেন  এয়ারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং। তার স্বপ্ন ছিল ভারতীয় বিমান বাহিনীতে বিমানচালক হবেন। তাঁর ক্লাসের প্রথম আট জনকে বিমানববাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। কালাম হয়েছিলেন নবম। সে-যাত্রায় তাই আর যুদ্ধবিমানের চালক হয়ে উঠা হয়নি কালামের।
বিমানচালক হয়ে ওঠা হল না। তবে নিজের অদম্য চেষ্টায় তিনি হয়ে উঠলেন দেশের ‘মিসাইল ম্যান’। ১৯৯৮ সালে পোখরান বিস্ফোরণ পরীক্ষার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। পড়াশোনার জন্য একবারই শুধু গিয়েছিলেন বিদেশে, ১৯৬৩-৬৪ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ‘নাসা’য়। যে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতেন মা আসিআম্মা, সেই সমুদ্রসৈকতেই দু’দশক ধরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ করে গিয়েছেন তার ছেলে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ছিলেন ডিআরডিও, ইসরোয়। মহাকাশ ও পরমাণু গবেষণায় তাঁর অবদানের জন্য পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ও ভারতরতেœ সম্মানীত হয়েছিলেন আবদুল কালাম। ২০০২ সালে ভারতের একাদশতম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন তিনি। রাষ্ট্রপতি ভবনে ছিলেন ২০০৭ সাল পর্যন্ত। তাঁর সময়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের দরজা সর্বসাধারণ, বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল। ছেলে-বুড়ো, বিজ্ঞানী-শিক্ষক সকলের কাছেই তিনি ছিলেন ‘সর্বসাধারণের প্রেসিডেন্ট’। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি আবার ফিরে যান পড়াশোনার জগতে। শিলং, ইনদওর ও আহমদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, তিরুঅনন্তপুরমের ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র,  বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে নিয়মিত পড়াতেন। এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মঞ্চেই বক্তৃতা দিতে দিতে তাঁর হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া তাই এক আশ্চর্য সমাপতন!
ধর্মের গোঁড়ামি এড়িয়ে চলতেন বাবা-মা। ছোটবেলা থেকে মুক্তমনা ছিলেন কালামও। গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারতেন ভগবদ্গীতা। পবিত্র কোরআন শরিফও। শুধু বইয়েই ডুবে থাকতেন না তিনি। তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানাচ্ছেন, কোথাও যাওয়ার আগেই পকেট থেকে বার করে ফেলতেন ছোট্ট চিরুনি। নামজাদা হেয়ার স্টাইলিস্টের কল্যাণে তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজস্ব চুলের ছাঁট। সব সময় বলতেন, লেখাপড়ার কোনও বিকল্প হয় না। স্কুলপড়–য়াদেরও বার বার অনুপ্রাণিত করে বলেছেন, নিজের ভবিষ্যতের কারিগর হতে গেলে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। আর কখনও কাজে ফাঁকি দেবে না। নিজের জীবনেও এ কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গিয়েছেন। কর্মজীবনে ঠিক দু’দিন ছুটি নিয়েছিলেন, মায়ের আর বাবার মৃত্যুদিনে। বলে গিয়েছিলেন, আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা করো না। আমায় যদি ভালবাসো, মন দিয়ে কাজ করো সে দিন।