Friday, August 31, 2018

কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকারের উপায়

কিডনি আমাদের শরীরের অন্যতম একটি ভাইটাল অরগান বা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, কিডনি বিকল হলে মৃত্যু নিশ্চিত। তাই কিডনি নিয়ে একটু সচেতনতা দরকার। মানবদেহে কোমরের দু'পাশে দুটি কিডনি থাকে। নানা কারণে আমাদের কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি কিডনি বিকল পর্যন্ত হতে পারে। কিডনী রোগের প্রাদুর্ভাব আজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। সমগ্র বিশ্বের সাথে সাথে ভারতেও এখন কিডনী রোগ পরিস্থিতি ভয়াবহ। লক্ষণের দুর্বোধ্যতার জন্য ক্রনিক কিডনি রোগে ভুগছেন এমন অনেকেই জানেন না যে তার এই রোগটি আছে। ক্রনিক কিডনি রোগ (CKD) অনেক বছর পরে কিডনি ফেইলিউর সৃষ্টি করে। CKD আছে এমন অনেকেরই সারা জীবনে কিডনি ফেইলিউর হয়না। ষ্টেজ ৩ CKD আছে এমন ৮০% লোকের কিডনি অকেজো হয়না।
কিডনি রোগের যেকোন ষ্টেজের জন্যই কিডনি রোগ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনই হচ্ছে এই রোগ নিরাময়ের মূল শক্তি। কিডনি রোগের লক্ষণ গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা থাকলে সেই অনুযায়ী নিরাময়ের ব্যবস্থা নেয়া সহজ হয়। আপনার অথবা আপনার পরিচিত কারো যদি কিডনি রোগের এক বা একাধিক লক্ষণ দেখা যায় তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলে ব্লাড ও ইউরিন টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত হোন। কারণ কিডনি রোগের উপসর্গ গুলোর সাথে অন্য স্বাস্থ্য সমস্যার উপসর্গের মিল আছে। আসুন জেনে নেই কিডনি রোগের উপসর্গ গুলো সম্বন্ধে।
এনার্জি কমে যাওয়া , অনেক বেশি ক্লান্ত অনুভব করা অথবা মনোযোগের সমস্যা হওয়া
কিডনির কর্মক্ষমতা যখন মারাত্মক ভাবে কমে যায় তখন রক্তে অপদ্রব্য হিসেবে টক্সিন উত্‍পন্ন হয়। এর ফলে আপনি দুর্বল ও ক্লান্ত অনুভব করেন এবং কোন বিষয়ে মনোযোগ দেয়াটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আরেকটা জটিলতা দেখা দিতে পারে, আর তা হচ্ছে এনেমিয়া। রক্তস্বল্পতার কারণেও দুর্বলতা বা অবসাদ গ্রস্থতার সমস্যা হতে পারে।
ঘুমের সমস্যা হওয়া
যখন কিডনি রক্ত পরিশোধন করতে অপারগ হয় তখন রক্তের টক্সিন প্রস্রাবের মাধ্যমে বাহির হতে পারেনা বলে রক্তেই থেকে যায়। যার কারণে ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি হয়। অবেসিটি বা স্থূলতার সাথে ক্রনিক কিডনি ডিজিজের যোগসূত্র আছে। এবং নিদ্রাহীনতা ক্রনিক কিডনি ডিজিজের একটি সাধারণ উপসর্গ।
ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া ও ফেটে যাওয়া
সুস্থ কিডনি অনেক গুরুত্ব পূর্ণ কাজ করে থাকে। কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল বাহির করে দেয়, লাল রক্ত কণিকা তৈরি করে, হাড়কে শক্তিশালী করে এবং খনিজ লবণের ভারসাম্য রক্ষা করে। শুষ্ক ও ফেটে যাওয়া ত্বক খনিজ ও হাড়ের অসুখের জন্য ও হতে পারে যা অ্যাডভান্স কিডনি রোগের সহগামী হিসেবে থাকতে পারে যখন কিডনি রক্তের পুষ্টি উপাদান ও খনিজ লবণের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেনা।
ঘন ঘন প্রস্রাব করা
যদি আপনার প্রায়ই মূত্রত্যাগের প্রয়োজন হয় বিশেষ করে রাতের বেলায় তাহলে এটা কিডনি রোগের লক্ষণ। যখন কিডনির ছাঁকনি গুলো নষ্ট হয়ে যায় তখন প্রস্রাবের বেগ বৃদ্ধি পায়। ঘন ঘন মূত্রত্যাগ ইউরিন ইনফেকশনের ও লক্ষণ হতে পারে, পুরুষের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্লেন্ড বড় হয়ে গেলেও এই উপসর্গ দেখা দেয়।
প্রস্রাবের সাথে রক্ত গেলে
সুস্থ কিডনি সাধারণত ব্লাড সেল গুলোকে শরীরের ভিতরে রেখে রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ মূত্র হিসেবে বাহির করে দেয়। যখন কিডনি ক্ষতিগ্রস্থ হয় তখন ব্লাড সেল বাহির হতে শুরু করে। প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়ার এই লক্ষণটির কিডনি রোগের সাথে সাথে টিউমার, কিডনি পাথর বা ইনফেকশনেরও ইঙ্গিত হতে পারে।
প্রস্রাবে বেশি ফেনা হলে
প্রস্রাবে অনেক বেশি ফেনা দেখা দিলে বুঝতে হবে যে, প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন যাচ্ছে। ডিমের সাদা অংশ ফাটানো হলে যেমন ফেনা বা বাবেল হয় প্রস্রাবের এই বুদবুদ ও ঠিক সেই রকম। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নামক প্রোটিনের উপস্থিতির জন্যই এমন হয়। কিডনির ফিল্টার ড্যামেজ হয়ে গেলে প্রোটিন লিক হয়ে প্রস্রাবের সাথে বাহির হয় বলে প্রস্রাবে ফেনা দেখা দেয়।
চোখের চারপাশে ফুলে গেলে
যখন কিডনি অনেক বেশি লিক করে তখন প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন প্রস্রাবের সাথে বাহির হয়ে যায় বলে চোখের চারপাশে ফুলে যায়।
পায়ের গোড়ালি ও পায়ের পাতা ফুলে গেলে
কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায় ফলে পা এবং গোড়ালি ফুলে যায়। পায়ের নীচের অংশ ফুলে যাওয়া হার্ট, লিভার এবং পায়ের শিরার দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার লক্ষণ ও হতে পারে।
ক্ষুধা কমে গেলে
এটা খুবই সাধারণ সমস্যা কিন্তু শরীরে টক্সিনের উত্‍পাদন বৃদ্ধি পেলে কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ফল স্বরূপ ক্ষুধা কমে যায়।
মাংসপেশীতে খিঁচুনি হলে
কিডনির কর্মক্ষমতা নষ্ট হলে শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা এবং মাংসপেশিতে খিল লাগার সমস্যা দেখা দেয়। যেমন- ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা কমে গেলেও মাংসপেশিতে খিল লাগার সমস্যা দেখা দেয়।
সবসময় শীত বোধ হওয়া
কিডনি রোগ হলে গরম আবহাওয়ার মধ্যেও শীত শীত অনুভব হয়। আর কিডনিতে সংক্রমণ হলে জ্বরও আসতে পারে।
ত্বকে র‍্যাশ হওয়া
কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়লে রক্তে বর্জ্য পদার্থ বাড়তে থাকে। এটি ত্বকে চুলকানি এবং র‍্যাশ তৈরি করতে পারে।
বমি বা বমি বমি ভাব
রক্তে বর্জ্যনীয় পদার্থ বেড়ে যাওয়ায় কিডনির রোগে বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়ার সমস্যা হতে পারে।
ছোটো ছোটো শ্বাস
কিডনি রোগে ফুসফুসে তরল পদার্থ জমা হয়। এ ছাড়া কিডনি রোগে শরীরে রক্তশূন্যতাও দেখা দেয়। এসব কারণে শ্বাসের সমস্যা হয়, তাই অনেকে ছোট ছোট করে শ্বাস নেন।
পেছনে ব্যথা
কিছু কিছু কিডনি রোগে শরীরে ব্যথা হয়। পিঠের পাশে নিচের দিকে ব্যথা হয়। এটিও কিডনি রোগের একটি অন্যতম লক্ষণ।
যদি উপরোক্ত উপসর্গ গুলো দেখা যায় তাহলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে সিমপল ইউরিন টেস্ট (ACR) এবং ব্লাড টেস্ট (eGFR) করিয়ে আপনার কিডনির কোন সমস্যা আছে কিনা নিশ্চিত হোন।
আসুন তাহলে আমরা সংক্ষেপে জেনে নেই কিভাবে আমরা ভয়াবহ কিডনী বিকল থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি এবং আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনীকে সুস্থ রাখতে পারি।
এই আটটি পদ্ধতি হল-
১. কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম করা
২. উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
৩. সুপ্ত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা
৪. স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
৫. পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা
৬. ধূমপান থেকে বিরত থাকা
৭. ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষধ সেবন না করা এবং
৮. নিয়মিত কিডনীর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা

সমসাময়িক সময়ে কিডনী রোগ প্রতিরোধে যে ৮টি স্বর্ণালি সোপানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে খানিকটা আলোকপাত করি ।
কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম করা
কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম কিডনী রোগ প্রতিরোধ করে। পাশাপাশি ডায়াবেটিক ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনে, কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদরোগ প্রতিরোধ করে এবং রক্তনালী সচল রাখে। সমীক্ষায় দেখা গেছে শুধু নিয়মিত হাঁটার কারণে গড় আয়ু ১৩ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস কিডনী বিকলের প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত। এ দুটি রোগ শুধু কিডনী বিকলই করে না হৃদরোগ, ব্রেইন স্ট্রোক, অন্ধত্ববরণসহ অসংখ্য রোগের জন্ম দেয়। কাজেই এদের হাত থেকে বাঁচতে হলে রক্ত চাপ এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যেন তা ১৩০/৮০ নিচে থাকে। এবংব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে যাতে হিমগ্লোবিন HbA1C লেভেল ৭ এর নিচে থাকে।
সুপ্ত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে আমাদের দেশের প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ ভাগ লোকেরই উচ্চ রক্তচাপ আছে। কিন্তু শতকরা ৫০ভাগ এর অধিক লোকই জানেন না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। কারণ এর কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তাই সুপ্ত রক্তচাপ নির্ণয়ের জন্য বছরে ৩/৪ বার রক্তচাপ মাপিয়ে নেয়া উচিত।
স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
পরিমিত সুষম খাবার সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে যে, অতি ভোজন ও অতি ওজন স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর। খাবারের সাথে আলগা লবণ পরিহার করতে হবে। অতি মসলাযুক্ত, বেশি ভাজা পোড়া খাবার, অতিরিক্ত ঝাল এবং প্রাণিজ তেল যেমন গরু খাসির চর্বি, ঘি, মাখন নিয়ন্ত্রণ করে খেতে হবে। শুধু পরিমাণে বেশি ও দামি খাবার খেলেই সুখাদ্য হয় না। খাবারের মধ্যে ৫টি উপাদান আছে কি না তা সবসময়ই খেয়াল রাখতে হবে। যেমন শর্করা জাতীয়- ভাত, রুটি, পিঠা। আমিষ জাতীয়- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল। স্নেহ জাতীয়- সয়াবিন, সরিষার তেল, সানফ্লাওয়ার।
পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা
জলের অপর নাম জীবন। কিডনী সচল রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা উচিত। একজন বয়স্ক লোকের প্রতিদিন দেড় থেকে তিন লিটার জল পান করা উচিত। তবে যাদের কিডনীতে পাথর আছে যাদের প্রশ্রাবে ঘন ঘন ইনফেকশন হয়, যারা রোদে এবং কলকারখানায় কাজ করে তাদের জল আরও বেশি পরিমাণ খেতে হবে, যাতে প্রশ্র্রাবের রং জলের মত থাকে অথবা এক থেকে দেড় লিটার প্রশ্রাব হয়। তবে যাদের শরীরের অতিরিক্ত জল জমা আছে তাদের ডাক্তারের নির্দেশ মতো জল পান করতে হবে।
ধূমপান থেকে বিরত থাকা
একটি জনপ্রিয় প্রবাদ বাক্য হচ্ছে - 'ধূমপানে বিষপান'। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর শুধু ধূমপানের জন্য সারা বিশ্বে মৃত্যু হয় ৬৬ লক্ষ মানুষের। ধূমপানের ফলে কিডনী বিকল হয়, কিডনীতে ক্যান্সার হয় , কিডনী ও মূত্রণালিতে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। এছাড়া ধূমপান ফুসফুসের ক্যান্সার, মুখ ও খাদ্যনালির ক্যান্সার, হৃদরোগ, ষ্ট্রোকসহ অসংখ্য মরণব্যধির কারণ। কাজেই এসব রোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে ধূমপান পরিহার করতে হবে।
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষধ সেবন না করা
দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন ব্যথা-বেদনার ট্যাবলেট খাওয়ার ফলে কিডনী বিকল হয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ১০ থেকে ১৫ ভাগ কিডনী বিকল হয় ঔষধ খাওয়ার কারণে। এছাড়াও এন্টিবায়োটিকসহ অনেক ঔষধ কিডনীর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এই ক্ষতির মাত্রা ঔষুধের মাত্রা ও কতোদিন খাচ্ছে তার ওপর অনেক সময় নির্ভর করে। আবার অনেক সময় এলার্জির কারণে স্বল্প মাত্রার ঔষধেও কিডনী বিকলের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কাজেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষধ সেবন করা উচিত নয়।
নিয়মিত কিডনীর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা
কিডনী রোগ কে বলা হয় নীরব ঘাতক। কারণ ৭০ থেকে ৮০ভাগ কিডনী নষ্ট হওয়ার আগে অনেকসময় কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। অথচ সামান্য রক্ত ও প্রশ্রাব পরীক্ষা করেই এ রোগ সুপ্ত অবস্থায় দেহে আছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। কাজেই যাদের মধ্যে কিডনী রোগের ঝুঁকি বেশি- যেমন যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ আছে, যাদের মুখ ও শরীর ফুলে গেছে, যাদের কিডনীতে পাথর আছে, যাদের প্রশ্রাবে বাঁধা জনিত রোগ আছে, প্রশ্রাবে যাদের ইনফেকশনের ইতিহাস আছে, যাদের বংশে কিডনী রোগের ইতিহাস আছে, যাদের বয়স ৪০ এর উপরে তাদের বছরে দুই বার কিডনী পরীক্ষা করিয়ে নেয়া উচিত।
স্বাস্থ্য একটি অমূল্য সম্পদ এই সম্পদ সংরক্ষণের জন্যে উপরে উল্লিখিত পরামর্শ সমূহ যদি জীবনের শুরু থেকেই মেনে চলা যায় তাহলে শুধু কিডনী নয় সকল অসংক্রামক ব্যাধি থেকেই নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব। কাজেই আসুন সকলেই নিয়মগুলো মেনে চলার চেষ্টা করি। এতে অর্থ ব্যয় হবে সামান্যই। তবে যে উপকার পাওয়া যাবে তা অমূল্য।

চোখের ক্ষীণ দৃষ্টি সমস্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

দেশে ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। শহরের ধুলোময় পরিবেশ, পর্যাপ্ত সবুজ গাছপালা না থাকা, অপরিশোধিত পানি ও কল-কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়াসহ নানা কারণে মানুষের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে শিশু-কিশোর ও যুবকদের কম্পিউটার, মোবাইলে ইন্টারনেটসহ ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্র ব্যবহারের আসক্তি, খোলা পরিবেশ না থাকায় এ সমস্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, এই হারে চোখের সমস্যা বাড়তে থাকলে শিগগিরই দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে কৃত্রিম উপায়ে দেখতে হবে। চোখের রোগীর সংখ্যা বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জন্মগতভাবে চোখে সমস্যা, ফরমালিনযুক্ত খাবার, খোলা পরিবেশ ও সবুজ প্রকৃতির অভাব এবং শিশু-কিশোর ও যুবকদের অধিক সময় আকাশ সংস্কৃতি বা ফেসবুক ব্যবহার। পাশাপাশি জন্মের পর বিভিন্ন রোগ যেমন চোখে পর্দা পড়া, ছানি পড়া, চোখ ট্যারা এবং অ্যালার্জির কারণে অনেক মানুষ ক্ষীণ দৃষ্টিতে ভোগেন। বিভিন্ন মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাও স্বীকার করেছেন, অধিকাংশ সময় বাসাবাড়ি বা অফিসের বদ্ধ পরিবেশে দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হচ্ছে বলে উন্মুক্ত সবুজায়ন দেখার সুযোগ মিলছে না। ফলে চোখের নানা জটিলতায় চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। গ্রামের শিশুদের তুলনায় শহরের শিশুরা ক্ষীণদৃষ্টি রোগে বেশি ভুগছে। এ মুহূর্তে শিশুদের এ রোগ থেকে মুক্তি দিতে রঙিন শাকসবজি ও ছোট মাছ খাওয়ানো দরকার বলে চিকিৎসকরা মনে করেন।
চক্ষু বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, যারা চোখে কম দেখেন তাদের চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। তিনি বলেন, বাংলাদেশে চশমা পড়ার প্রবণতা খুবই কম। প্রয়োজন হলে চশমা নেয়া উচিত। বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে ফেসবুক, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনে আসক্তির কারণে সব শিশুর চোখের দৃষ্টি কমে যাচ্ছে। সময়ের আগেই তাদের চোখে তাই ‘মাইনাস পাওয়ারের’ চশমা উঠছে। দেশের প্রথিতযশা এ চক্ষু বিশেষজ্ঞ  বলেন, লেখার  বোর্ড না দেখলে শিশুরা লেখায় মনোযোগী হবে না। ফলে মেধায় পিছিয়ে পড়বে। তাই বাবা-মার উচিত কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনে আসক্তি থেকে বাচ্চাদের দূরে রাখা।
চিকিৎসাবিদরা বলছেন, চক্ষুরোগীর বেশিরভাগই বর্তমানের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের শিকার। কারণ, ঢাকা শহর ছাড়াও অন্য শহরগুলোতে বিনোদনের জায়গার অভাব থাকায় ইন্টারনেট, ফেসবুক বা ভিডিও গেমে দীর্ঘ সময় দৃষ্টি রাখছে। এমন অসচেতনতা, ঘরমুখী জীবন ব্যবস্থা এবং পড়াশোনাসহ নানা মানসিক চাপে থাকার কারণেও চোখের সমস্যা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘ভিশন সিপ্রং’ ও বেসরকারি এনজিও ‘ব্র্যাক’ ২০০৬ সাল থেকে একটি পাইলট প্রকল্পে এ নিয়ে কাজ করছে। সংস্থা দুটির প্রতিবেদন মতে, দীর্ঘ ১০ বছরে (২০১৬ পর্যন্ত) তারা দেশের ৬১ জেলায় ৪৬ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৯ জনকে চক্ষু রোগবিষয়ক চিকিৎসা দেয়। এর মধ্যে ৩০ লাখ ৭৬ হাজার ৭৮০ জনই ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন রোগী, যা সেবাগ্রহীতাদের শতকরা ৬৬ ভাগ। প্রকল্পটি ৬১টি জেলার ৪৫৬টি উপজেলায় কার্যক্রম চালায়। চোখের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও দেয়া হয়েছে। বিষয়টি মানুষের জন্য খুবই নেতিবাচক দিক। এখন থেকে যদি সচেতন না হওয়া যায় তবে একটা সময় এটি দেশের মানুষের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। আরেক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ দৃষ্টিহীন, এর মধ্যে ৬ লাখ ৮০ হাজার মানুষই যথাসময়ে চোখের ছানি অপারেশন না হওয়ায় অন্ধত্ব বরণ করেন। প্রতি বছর দুই লাখ রোগীর ছানি অপারেশন হলেও এক লাখ ৩০ হাজার লোক চিকিৎসার অভাবে ছানির কারণে অন্ধত্ব বরণ করছেন। অপরদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ রোগীর মধ্যে চোখের ছানির অপারেশন হয় মাত্র এক হাজার ৩০০ জন রোগীর। চক্ষু চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অরবিস ইন্টারন্যাশনাল, সাইট সেভার এবং ডব্লিউএইচও এবং জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি, বিএনএসবিসহ বিভিন্ন সংস্থাসমূহের মতে, দেশে প্রায় ৪০ হাজার শিশু দৃষ্টিহীনতার শিকার। মোট জনসংখ্যার আড়াই কোটি নিয়মিত চোখের দৃষ্টিশক্তি সমস্যায় ভুগছেন। আবার বয়স্কদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ লাখের মতো ছানি রোগী আছেন, যাদের চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো করা সম্ভব।
চিকিৎসকরা বলেন, অব্যাহত নগরায়ন, পরিবর্তিত জীবনযাপন, মাত্রাতিরিক্ত ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র ব্যবহার ও আঘাতের কারণে চোখের রোগী বাড়ছে। এ ছাড়া জন্মগত চোখ বাঁকা, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে, গর্ভবতী মায়ের ভগ্নস্বাস্থ্য এবং অপরিণত বয়সে সন্তান প্রসব, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ক্ষীণদৃষ্টি সমস্যায় আক্রান্ত হয়। জন্মের সময় অনেক প্রিম্যাচিউর বেবির ক্ষেত্রে ফুসফুসের সমস্যা দেখা দেয়। আর ফুসফুসের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাচ্চার চোখের ক্ষতি হয়।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটেই প্রতিদিন গড়ে ২৫০ শিশু চোখের সমস্যা নিয়ে আসে। এদের মধ্যে আবার শতকরা ৪০ জনেরই অপারেশন লাগে। চিকিৎসকরা জানান, ২০১০ সালে শিশুদের মধ্যেই চোখের রোগীর হার ছিল ৩৫ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এখানে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে চোখের অস্ত্রোপচার সম্ভব কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে একই চিকিৎসা ব্যয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।
চিকিৎসকরা জানান, সাধারণত বয়স বাড়া, ডায়াবেটিস রোগ, অনিয়ন্ত্রিত স্টেরয়েড ব্যবহারে চোখের সমস্যা হতে পারে। দেশের কিছু জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে চক্ষু বিভাগ থাকলেও  সেখানে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত জনবল, উন্নত যন্ত্রপাতি, বাজেট ও অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। অনেক চিকিৎসকের মাইক্রো সার্জারি প্রশিক্ষণ নেই বলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগীরা যথাযথ এবং মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার প্রাইভেট মেডিকেলে চিকিৎসা ব্যয় বেশি বলে অনেকেই সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখছেন না।
৯০-দশকে শিশুরা টিভির প্রতি আসক্ত ছিল। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার, ট্যাব ও মোবাইল ফোন। চোখের চিকিৎসায় দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা বলছেন- কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনে আসক্তি শিশুর চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে। সময়ের আগেই তাদের চোখে তাই ‘মাইনাস পাওয়ারের’ চশমা উঠছে। দেশের প্রথিতযশা চক্ষু বিশেষজ্ঞরা শিশুদের চোখে সমস্যার তিনটি কারণের কথা বলেছেন। কোনো কোনো শিশু চোখে সমস্যা নিয়েই জন্মায়। ভিটামিন ‘এ’র অভাবজনিত কারণে শিশু রাতকানা রোগে ভুগতে পারে, এমনকি অন্ধও হয়ে যেতে পারে। স্ক্রিনের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার কারণে শিশুরা চশমা ছাড়া দূরের জিনিস দেখতে পায় না।
চিকিৎসকরা বলেন, চোখ শুকিয়ে যাওয়ার পেছনেও অন্যতম কারণ কম্পিউটার, ট্যাব, মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনে আটকে থাকা। শিশুরা যখন কাছ থেকে এই যন্ত্রগুলো ব্যবহার করতে থাকে, মোবাইল ফোনে একমনে খেলতে থাকে, তখন চোখের মণি এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে। শিশুরা চোখের পাতা ফেলে না। পাতা ফেললে চোখের ভেতরের পানি চোখের মণিকে আর্দ্র করে। পাতা না ফেললে কর্নিয়ার যে পানি, তা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আস্তে আস্তে চোখ শুকিয়ে যায়। শুষ্ক অনুভব করে বলে শিশু অনবরত চোখ পিটপিট করে। শিশুদের কম্পিউটার-ট্যাব-মোবাইল ফোন, স্কুল-কোচিং-বাসায় পড়া, অনেক রাতে ঘুমাতে যাওয়া, খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা- এই চক্র থেকে বের করে আনার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার জন্য শিশুর ওপর বাড়তি পড়ার চাপও চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করতে পারে। চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা যদি সূর্যের আলোয় কিছু সময় কাটায়, তাহলে তার অনেকটা রোগমুক্ত থাকতে পারে।

প্রতিবাদী ওয়াক আউট

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের পদ্ধতি যুক্ত করার  প্রতিবাদে নির্বাচন কমিশনের সভা বর্জন করেছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সভা শুরুর আধা ঘণ্টা পর তিনি নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন।
নোট অব ডিসেন্টে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিরোধিতার কারণ হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপে ইভিএমের উল্লেখ না থাকা, ইভিএম প্রকল্পের তথ্য না জানা, রাজনৈতিক দলের অনীহা ও ইভিএম সম্পর্কিত যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। পরে মাহবুব তালুকদারকে ছাড়াই কমিশন সভায় ইভিএম রেখেই আরপিও সংশোধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিইসি কেএম নূরুল হুদা নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গে বলেন, ওনার ভিন্নমত থাকতে পারে, এটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।
একজন কমিশনারের আপত্তি থাকলেও বাকি চার কমিশনার আরপিও সংশোধনের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে জানান সিইসি। সিইসির ঘোষণার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মাহবুব তালুকদার সভা বর্জনের কারণ সম্পর্কে বলেন, আমি এটার (ইভিএম ব্যবহারের) বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছি। আমি মোটেই চাই না আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য আরপিও সংশোধন হোক। এখন ওনারা বসে বসে আরপিও সংশোধন করতে থাকবেন আর আমি সেখানে নোট অব ডিসেন্ট দেয়ার পর মূর্তির মতো বসে থাকব, এটা আমার কাছে যথাযথ মনে হয়নি।
মাহবুব তালুকদার আরো বলেন, ওনারা ওনাদের কাজ করুক, আমি আমার কাজ করি। আমার মনে হয়েছে ওখানে বসে থাকাটা সমীচীন না। মাহবুব তালুকদার জানান, এর আগে কোনো কমিশন সভায় ইভিএম প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। অতীতের কমিশন সভার কার্যবিবরণী খুঁজে এমন কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে না বলে দাবি করেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে মাহবুব তালুকদার বলেন, আমি একজন গণতন্ত্রমনা মানুষ। সংসদ নির্বাচন এখনও বেশ দূরে। তখনকার অবস্থা কী হবে এই মুহূর্তে বলতে পারি না। অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সংলাপে বলেছে ইভিএম চায় না। কেউ যদি বলে চায় তাহলে আমার কিছু বলার নেই। তিনি বলেন, আমি যে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি এটা কারও বিরুদ্ধে নয়। এটা একটা মতের বিরুদ্ধে আমার ভিন্নমত। আমি দ্বিমত পোষণ করতে পারি, ভিন্নমত পোষণ করতে পারি। তাই বলে আমার সহকর্মীদের সঙ্গে আমার কোনো মতবিরোধ নেই।
নোট অব ডিসেন্টে যা লিখেছেন মাহবুব তালুকদার
নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নোট অব ডিসেন্টে লেখেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ সমর্থন করি না। এমতাবস্থায় ওই নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তে ভিন্নমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রদান করছি। ২৬শে আগস্ট অনুষ্ঠিত সর্বশেষ কমিশন সভার প্রসঙ্গ টেনে ‘নোট অব ডিসেন্টে’ প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বাকি তিন কমিশনারের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) সংশোধনে ইসি তিন ধরনের প্রস্তাব উপস্থাপন করে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে বাংলা ভাষায় রূপান্তর-যা একজন পরার্শক তৈরি করে দিয়েছেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ইংরেজি আরপিওতে সুনির্দিষ্ট কিছু সংশোধন, সংযোজন বা পরিমার্জন।
সর্বশেষ প্রস্তাবটি হলো-একাদশ সংসদ নির্বাচনে সময়স্বল্পতার কারণে ইভিএম ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন। নির্বাচন কমিশনের ২৬শে আগস্টের সভায় অন্য দুটি প্রস্তাব বাদ দিয়ে কেবল ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে। ইভিএম ও আরপিও সম্পর্কে আরো বিচার-বিশ্লেষণ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিমিত্ত কমিশনের সভা ৩০শে আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। মাহবুব তালুকদার বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে ইতিমধ্যে ব্যবহার হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সিইসি প্রথম থেকেই বলে এসেছেন রাজনৈতিক দলগুলো সম্মত হলেই কেবল জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইভিএম ব্যবহারকে স্বাগত জানানো হলেও প্রধান বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করে আসছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দলগতভাবে সংলাপকালে ইভিএম সম্পর্কে সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান ছিল পরস্পর বিরোধী। এ অবস্থায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার মাধ্যমে ইভিএম ব্যবহারের কোনো সম্ভাবনা নেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অধিকতর আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন ছিল।
স্থানীয়ভাবে পরীক্ষামূলক ইভিএম ব্যবহারের শুরুতে বলা হয়েছিল উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, এজন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার ইভিএম কেনায় আমি ভিন্নমত পোষণ করেছিলাম। সমপ্রতি ৩৮২১ কোটি টাকার প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মুখে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ইভিএম কেনা কতটা যৌক্তিক, তা বিবেচনাযোগ্য। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিগত রকিব উদ্দিন কমিশন ইভিএম ব্যবহার বাতিল করে অনেক ইভিএম ধ্বংস করে দেয়। এধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কখনই কাম্য নয়।
পরিকল্পনা কমিশন অদ্যাবধি প্রকল্পটির সম্ভাব্য যাচাই করে নি বলে তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন,  যে ইভিএম বিএমটিএফ থেকে সরকারি সংস্থার সুবাদে বিনা টেন্ডারে কেনা হচ্ছে, এর অরিজিন কী, কে উদ্ভাবন করেছে কিংবা কোত্থেকে আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কারিগরি দিক থেকে এটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত কিনা তা পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করার পর অদ্যাবধি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি বলে জানা যায়।
মাহবুব তালুকদার নোটে বলেন, আরপিও তে শুধু ইভিএম ব্যবহারের যে সংশোধনীটি আনা হয়েছে তা ইতিমধ্যে কমিশন সভায় নানা প্রশ্নের সম্মুখীন। আমি ধারণা করি সর্বসম্মত রাজনৈতিক মতের বিরুদ্ধে ইভিএম ব্যবহৃত হলে তা নিয়ে আদালতে অসংখ্য মামলার সূত্রপাত হবে। অন্য কারণ ছাড়া কেবল ইভিএম ব্যবহারের কারণেই সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান ইসির পক্ষে এ ঝুঁকি নেয়া সঙ্গত হবে না।
যন্ত্রের অগ্রগতির যুগে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধী নন বলে উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঘাটতি তার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। প্রথমত, ইভিএম ব্যবহারের জন্য নির্বাচন কমিশন যাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তাদের প্রশিক্ষণ অপর্যাপ্ত এবং জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান সম্পর্কে আমি সন্দিহান। দ্বিতীয়ত, অনেক ভোটার অজ্ঞাতপ্রসূত কারণে ইভিএম ব্যবহার সম্পর্কে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তারা ইভিএমের বিষয়ে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তা নিরসনের জন্য ব্যাপক প্রচার ও ভোটারদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল। সিটি নির্বাচনে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও ইভিএম কেন্দ্র দখলের অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ধীরে ধীরে ইভিএম ব্যবহার বাড়ানো হলে ভোটাররা তাতে অভ্যস্থ হয়ে পড়বেন। এই অভ্যস্থতার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন তা একাদশ জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তবে স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবস্থা সাফল্য লাভ করলে ৫-৭ বছর পরে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
গেল বছরের ফেব্রুয়ারিতে কেএম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন ইসি দায়িত্ব নেয়ার পর এ পর্যন্ত অন্তত তিনটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিলেন এ নির্বাচন কমিশনার। বর্তমান ইসির অধীনে ৩০শে অক্টোবর থেকে ২৮শে জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সন্নিকটে আসায় আইন সংস্কারের কাজ বাদ দিয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো এগোচ্ছিল। কিন্তু আকস্মিকভাবে ইভিএম নিয়ে নতুন প্রকল্প নেয়া ও নির্বাচনী আইন সংস্কার নিয়ে তোড়জোড় শুরু করে ইসি।
এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিরোধিতা ও দক্ষ জনবলের বিষয়টি তুলে ধরে ইভিএম নিয়ে আরপিও সংশোধন নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন মাহবুব তালুকদার। সর্বশেষ সিটি নির্বাচনের আচরণবিধি সংশোধন নিয়ে অন্যদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন মাহবুব তালুকদার। এর আগে ইসি কর্মকর্তাদের বদলি নিয়েও আন-অফিসিয়াল (ইউও নোট) দেন তিনি। সেনা মোতায়েন ও গাজীপুরের ভোটে অনিয়ম নিয়েও নিজের মতামত দিয়ে আলোচনায় ছিলেন এ নির্বাচন কমিশনার। বড় নির্বাচনে অনিয়ম রোধে সিইসির এক বক্তব্য নিয়েও সর্বশেষ আলোচিত হন মাহবুব তালুকদার। উল্লেখ্য, কমিশন সভা বর্জন ও নোট অব ডিসেন্ট দেয়ার ঘটনার নজির এটাই প্রথম নয়। এর আগে ২০০৬ সালে ভোটার তালিকা নতুন করে নাকি হালনাগাদ করে ভোটারদের তালিকাভুক্ত করা হবে এ নিয়ে সাবেক এমএ আজিজের কমিশনের দু’জন কমিশনার বিরোধী করে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে বর্জন করেছিলেন ওই সংক্রান্ত সভাও।

‘স্বজনদের ফিরিয়ে দাও’

‘আমার বাবা মারুফ জামানের নিখোঁজের ৯ মাস হয়েছে। প্রতিদিন সকালে আমি আমার বাবার রুমে যাই। বাবা সকালে উঠেই এক কাপ চা পান করতেন।সেই চায়ের কাপটি সেখানেই রয়েছে। পাঁচ বছর আগে আমার মা মারা যান। বাবা না থাকায় আমরা ভাইবোন সবাই ভেঙে পড়েছি। এভাবে একটি মানুষ নিখোঁজ থাকবে সেটি কীভাবে মেনে নেয়া যায়। আর কত অপেক্ষা করবো? দয়া করে আমার বাবাকে আপনারা আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন। কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের মেয়ে সামিহা জামান। তার কান্নায় সভাস্থলের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। 
গতকাল সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ‘মায়ের ডাক’ প্রতিবাদী সমাবেশ গুম ও জোর করে অন্তর্ধানের শিকার এমন ৪০টি পরিবার উপস্থিত হন। অনেকেই নিখোঁজ হওয়া পরিবারের সদস্যদের ছবি নিয়ে এসেছিলেন। তাদের কান্না আর আকুতিতে এক বেদনাঘন আবহ তৈরি হয়। নিখোঁজ হওয়াদের মা, ভাইবোন আর স্ত্রী সন্তানের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ।
অনুষ্ঠান থেকে জানানো হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ বার সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই পরিবারের সদস্যরা কেউ ছাত্র, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ করতেন চাকরি। বাড়ি, কর্মস্থল অথবা রাস্তা থেকে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ। বছরের পর বছর তাদের অপেক্ষায় স্বজনরা। অপেক্ষার যেন শেষ নেই। নিদারুণ কষ্ট নিয়ে পার হচ্ছে এই পরিবারগুলোর প্রতিটি দিন, মুহূর্ত। সভা থেকে জানানো হয়, গত ৫ বছরে গুমের শিকার হয়েছেন ৭২৭ জন। গুমের পর কেউ কেউ ফিরে এলেও অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন।
অনুষ্ঠানে গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন মারুফা ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালে আমার ভাইকে বাসা থেকে র‌্যাব তুলে নিয়ে যায়। এরপর তার কোনো খোঁজ নেই। প্রেস ক্লাবের বারান্দায় আমরা ২৫ বার এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা একটি স্বাধীন দেশে বাস করি এটা ভাবতে অবাক লাগে। একটি মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আর কোনো খোঁজ মেলে না। তিনি আরও বলেন, আপনারা বলতে পারেন? আর কত অপেক্ষা করবো। সেদিনের অবুঝ শিশুরা এখন বুঝতে শিখেছে, তাদের বোঝাতে পারি না তাদের বাবা কোথায় কীভাবে আছে?
নিখোঁজ হওয়া পিন্টুর বোন রেহানা খানম মুন্নি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ২০১৪ সালে আমার ভাই পিন্টুকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকধারীরা তুলে নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে ধর্না দিয়ে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। একটা লোক হারিয়ে যাবে, তার দায় কী সরকারের নেই? কার কাছে বিচার দেবো? ছেলের আশায় থেকে আমার মা পাগল হয়ে গেছেন।
নিখোঁজ মোয়াজ্জেম হোসেনের মা সালেহা বেগম জানান, আমার ছেলে নির্দোষ ছিল। আইন অনুযায়ী যদি সে ভুল করে তাহলে তার বিচার করেন। কিন্তু, এটা কোন নিয়ম  চালু করেছেন যে, মানুষের খোঁজ পাওয়া যাবে না।
নিখোঁজ মাসুমের বোন ফাওজিয়া ইসলাম বলেন, তার ভাইকে ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর উত্তরার একটি প্রাইভেট কোচিং থেকে ধরে নিয়ে গেছে ডিবি পুলিশের নাম করে। মাসুম সরকারি তিতুমীর কলেজের ফিন্যান্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। সক্রিয় কোনো দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, প্রতিবারই একই কথা শুনি। পাঁচ বছর ধরে একটা মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের প্রশ্ন রয়েছে যে, এদের কান্না কী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের কানে যায় না? তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে আপনাদের কান্নার পাত্তা এই সরকার দেবে না। নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসবে নাকি পুরনো বোতলে নতুন মদ আসবে- এ কথা কেউ জানে না।
তিনি আরও বলেন, বুঝে-শুনে গুম করা হয়েছে। এসব গুম মূলত রাজনৈতিক। যারা গুম হয়েছে তারা হয় বিএনপি করে আর না হয় অন্য দল করে। রাজনীতিতে ভয়ের ত্রাস কায়েম করে রাখার জন্য গুমকে জিইয়ে রাখা হয়েছে। এই অন্যায় অত্যাচারের প্রতিকার আছে। প্রতিজ্ঞা করুন যারা আমার সন্তানকে নিয়ে গেছে তাদের কাউকে ভোট দেবেন না।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, সভ্য দেশে গুম মেনে নেয়া যায় না। এতে আইনের শাসন বাধাগ্রস্ত হয়। অনেকেই গুমের শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন। কারও লাশও পাওয়া গেছে ডোবাতে, নালাতে। এখন তাও পাওয়া যায় না। এমন অবস্থায় দেশের প্রত্যেক বিবেকবান নাগরিককে আমাদের সজাগ হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, প্রেস ক্লাবে যারা পরিবারের নিখোঁজদের সন্ধানের দাবি করছেন তাদের এটি যৌক্তিক দাবি। এই দাবি রাষ্ট্রকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে এসময় অন্যানের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রফিক সিকদার ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী।

‘বিতর্কিত’ ইভিএমের পক্ষে হুদা কমিশনের রায়

খোদ কমিশনেই আপত্তি থাকার পরও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের বিধান যুক্ত করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব  অনুমোদন করেছে ইসি। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত উপেক্ষা করে গতকাল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সিইসিসহ চার কমিশনার। এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সভা বর্জন করেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। প্রস্তাবিত আইনটি আগামী সপ্তাহে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ হবে কিনা সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া আরপিওতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় রাখা হয়নি সেনাবাহিনী’কে। নির্বাচন ভবনে আরপিও সংশোধন সংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো নুরুল হুদা সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। এর আগে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে সিইসির সভাপতিত্বে দু’দফা বৈঠক করে কমিশন এ সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে ইভিএম এর বিধান যুক্ত করে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে বৈঠক বর্জন করেন মাহবুব তালুকদার। বৈঠক শেষে সিইসি সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, আমরা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-৭২ এর কিছু সংশোধনের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ইভিএম ব্যবহার করে ভালো ফল পেয়ে জাতীয় নির্বাচনে এই বিধান যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয় ও সংসদে পাঠানোসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আইনটি সংশোধন হবে।
সিইসি জানান, মাহবুব তালুকদারের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকলেও কমিশনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতের ভিত্তিতে সংস্কারের পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিইসি আরো বলেন, উনি (মাহবুব তালুকদার) ভিন্নমত পোষণ করেছেন। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু, আমরা চারজন সম্মত হয়েছি। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ তৈরির জন্য এই সংশোধনী আনা হয়েছে।
তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কিনা এ বিষয়ে কমিশন এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ইভিএম নিয়ে আইনে সংশোধনী আনা হবে। এটা নিয়ে আমরা একটা মেলা করবো। সবার মতামত নেবো। সেখানে পরিবেশ পরিস্থিতি যদি অনুকূলে থাকে তখন সিদ্ধান্ত হবে। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যমে আমরা প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে রাখছি। ২০১০ সালে ইভিএম চালু হয়। তবে এতদিন শুধু স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে এটি ব্যবহার করা হয়ে আসছে। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে ১০০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে সাংবাদিকদের জানান ইসি সচিব হেলালুদ্দীন।
সাংবাদিকরা এদিন এ বিষয়টি নজরে আনলে সিইসি বলেন, এভাবে বলা তার উচিত হয়নি। কারণ, আমি স্পষ্ট করে বলছি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইন আগে পাস হোক। সবার মতামত নেই। তখন যদি সম্ভব হয় একাদশে (একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম) ব্যবহারের বিষয়ে দেখা যাবে। ইভিএম কেনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইভিএম কেনার বিষয়ে এখনো কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। আমাদের নিজস্ব কিছু ইভিএম রয়েছে। আমরা সেগুলো দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চালাচ্ছি।
উল্লেখ্য, গত বছর অংশীজনদের সঙ্গে ইসির সংলাপে আলোচিত বিষয় ছিল ইভিএম। ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সংলাপে অংশ নিয়েছিল। ২৩টি দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম নিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছিল। এর মধ্যে বিএনপিসহ ১২টি দল ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দেয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ সাতটি দল ইভিএমের পক্ষে।
তিনটি দল পরীক্ষামূলক ও আংশিকভাবে এবং একটি দল শর্ত সাপেক্ষে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছিল। ইসি এতদিন বলে এসেছে, সব দল না চাইলে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু এর মধ্যে দেড় লাখ ইভিএম কেনার জন্য ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইসি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইসিকে ইভিএম সরবরাহ করবে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)। ‘নির্বাচন ব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহার’ শীর্ষক পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের অধীনে দেড় লাখ ইভিএম সংগ্রহ করতে চায় ইসি। অবশ্য ১৯শে আগস্ট এই প্রকল্প নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার যথার্থ: জয়

সাংবাদিক শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার যথার্থ (এপ্রোপ্রিয়েট) বলে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। তার দাবি, গত মাসে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রবিক্ষোভ চলাকালে গুজব ছড়িয়ে দিয়ে সহিংসতায় উস্কানি দিচ্ছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিডিয়া আউটলেট রিয়েল ক্লিয়ার পলিটিক্সে প্রকাশিত একটি লেখায় এমন মন্তব্য করেছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা বাসস। ওই লেখায় জয় লিখেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দ্রুততার সঙ্গে সহিংসতায় রূপ নেয়। এই সহিংসতায় রূপ নেয়ার জন্য যারা দায়ী তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি ফটো সাংবাদিক শহিদুল আলম। সহিংসতায় তিনি উস্কানি দিয়েছিলেন বলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা সত্ত্বেও তিনি সেলিব্রেটি হওয়ার কারণে তার পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে।
জয় বলেছেন, ঢাকায় কলেজ পড়ুয়া দু’জন শিক্ষার্থীকে একটি বাস চাপা দেয়ার পর তারা মারা যায়। এ ঘটনায় বেদনাহত শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। তারা নিরাপদ সড়কের দাবি জানায়। তবে সরকার তাদের কথা শুনেছে এবং প্রশ্নাতীতভাবে তাদেরকে ‘হ্যাঁ’ বলেছে।
তিনি বলেছেন, সরকার ট্রাফিক আইন উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বেপরোয়াভাবে গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে শাস্তি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে বিক্ষোভ সফল হয়েছে। কিন্তু দেশের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতারা এটাকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের একটি সুযোগ হিসেবে দেখে। এতে ছাত্রদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ ঘটায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সদস্যরা। কখনো কখনো তাদেরকে শিক্ষার্থীদের পোশাক পরিয়ে নামায় এবং পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে তোলে। কিন্তু বিএনপির ওই উস্কানি বেশিদূর এগুতে পারে নি।
ওই লেখায় জয় লিখেছেন, শহিদুল আলম বিএনপির পাশাপাশি ভূমিকা রাখাকে বেছে নেন এবং যথার্থভাবেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছাত্রদের মৃত্যু সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তিনি সামাজিক ও প্রথাগত মিডিয়া আউটলেট দুটি মাধ্যমকেই ব্যবহার করেছেন। এতে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রধান কার্যালয়ে হামলা হয়।
ওই লেখায় আরো বলা হয়েছে, শহিদুল আলমের মিথ্যা ও প্ররোচণামূলক তথ্যের কারণে অনেক মানুষ আহত হয়েছেন। আর ওই হামলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক সদস্য স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে যান। শহিদুল আলমের বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই শুধু তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নি। একই সঙ্গে তার সর্বশেষ কথাবার্তা বাস্তবেই ক্ষতির কারণ হয়েছিল। মিস্টার আলমের বক্তব্যে একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পরিণত হয় আইন না মানা এক সহিংসতায়।
জয় আরো লিখেছেন, তরুণ ছাত্রদের বিক্ষোভকে হাইজ্যাক করে এবং তাদের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে, পাশাপাশি আরো অনেক বাংলাদেশির জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়ার নাম রাজনীতি নয়। এটা সন্ত্রাস।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জয় বলেছেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক ভিন্নমত অবাধে প্রকাশ করে আসছেন শহিদুল আলম। কখনো তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। আবার কখনো তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু প্রতিটি সময় সরকার তার অবাধ মত প্রকাশের অধিকারকে সুরক্ষিত রেখেছে। এটা এমন একটি অধিকার যা সব বাংলাদেশির আছে। জনগণের নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে সরকার শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করেছে, প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া সরকারের জন্য জরুরি ছিল। এক্ষেত্রে শহিদুল আলম একজন ভিকটিম নন। তার কর্মকাণ্ডে প্রচুর মানুষের ক্ষতি হয়েছে।

দুর্নীতির শীর্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা -টিআইবি’র রিপোর্ট

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেই সেবাগ্রহীতারা সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার। এ বাহিনীর কাছে দুর্নীতির শিকার হচ্ছে ৭২ দশমিক ২ ভাগ সেবাগ্রহীতা। আর আইনি সেবা পেতে ৪৯ দশমিক ৮ ভাগ মানুষকে গুনতে হচ্ছে ঘুষের টাকা। একইভাবে ২৩টি সেবা খাতে প্রাত্যহিক ও গুরুত্বপূর্ণ সেবা পেতে ঘুষ-দুর্নীতিতে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে  সাধারণ মানুষকে। দেশে দুর্নীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’ এ। গতকাল সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. সুমাইয়া খায়ের এবং রিসার্চ ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ওয়াহিদ আলম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফারহানা রহমান ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ নূরে আলম।
টিআইবির ২০১৭ সালের খানা জরিপে তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২৭টি সেবা খাতে এই জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে প্রধান ১৫টি খাত হলো- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ভূমি, সেবা, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বিচারিক সেবা, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং, বিআরটিএ, কর ও শুল্ক, এনজিও, পাসপোর্ট, বীমা এবং গ্যাস। দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলার গ্রাম ও শহরাঞ্চলের ১৫ হাজার ৫৮১টি খানা বা পরিবারের উপর চূড়ান্তভাবে এই জরিপ চালানো হয়। তাতে সেবাখাতে ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহারকে দুর্নীতি হিসেবে ধরা হয়েছে। এই দুর্নীতির আওতার মধ্যে রয়েছে ঘুষ, সম্পদ আত্মসাৎ, প্রতারণা, দায়িত্বে অবহেলা, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানি। খাতগুলোর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেই মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছে।
এই বাহিনীগুলোর কাছে গত বছর গ্রামাঞ্চলের ৭৬ ও শহরাঞ্চলের প্রায় ৭১ভাগ খানা প্রধান বা পরিবারের কর্তা দুর্নীতির শিকার হয়েছে। অপরদিকে দুর্নীতিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা পাসপোর্ট সেবা পেতে ৬৭, বিআরটিতে ৬৫, বিচারিক সেবায় ৬০, ভূমি সেবায় প্রায় ৪৯, শিক্ষায় ৪২, স্বাস্থ্যে (সরকারি) ৪২, কৃষিতে ৪১, বিদ্যুতে প্রায় ৩৯, গ্যাসে ৩৮, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ২৬, বীমায় ১২, কর ও শুল্কে ১১, ব্যাংকিংয়ে প্রায় ৬, এনজিওতে (ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ) ৫ ভাগ সেবা গ্রহীতা দুর্নীতির শিকার।
অপর দিকে এসব ক্ষেত্রে সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয় প্রায় ৫০ ভাগ সেবা গ্রহীতাকে। ঘুষে শীর্ষে রয়েছে বিআরটিএ। গত বছর ৬৩ ভাগ সেবা গ্রহীতাকে বিআরটিতে ঘুষ গুণতে হয়। দ্বিতীয় স্থানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের কাছে প্রায় ৬১ ভাগ সেবা টাকা দিয়ে পেতে হয়েছে। প্রায় ৬০ ভাগ মানুষকে পাসপোর্টের জন্য অর্থ দিতে হয়। এছাড়া ভূমি সেবায় প্রায় ৩৮, শিক্ষায় ৩৪, বিচারিক সেবায় প্রায় ৩৩, কৃষিতে ৩০, স্বাস্থ্যে প্রায় ১৯, বিদ্যুতে ১৮, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ১৮, গ্যাসে প্রায় ১২ ভাগ সেবাগ্রহীতাকে ঘুষের টাকা গুনতে হয়। দু’বছর পর পর পরিচালিত জরিপের মধ্যে ইতিপূর্বে ২০১৫ সালের তুলনায় ৮ দশমিক ৩ পয়েন্ট কম। তবে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে সেবা খাতে ঘুষের শিকার খানার হার কমলেও ঘুষ আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে।
২০১৭ সালে একজন সেবাগ্রহীতাকে গড়ে ৫ হাজার ৯৩০টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। ২০১৫ সালে তা ছিল ৪ হাজার ৫৩৮ টাকা। সর্বোচ্চ ঘুষ আদায়ের হয় গ্যাস (৩৩,৮০৫ টাকা), বিচারিক সেবা (১৬,৬৮৮ টাকা) ও বীমা খাত (১৪,৮৬৫ টাকা)। জাতীয়ভাবে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ গত ২০১৫ সালের জরিপে ৮ হাজার ৮২১ কোটি টাকা থাকলেও গত বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের (সংশোধিত) ৩.৪% এবং বাংলাদেশের জিডিপি’র ০.৫%। ঘুষ প্রদানের প্রধান কারণ হলো ঘুষ না দিলে সেবা মিলবে না এমন ধারণা বা মানসিকতা। ঠিক এই কারণে ৮৯ ভাগ সেবাগ্রহীতা ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া হয়রানি বা জটিলতা এড়াতে ঘুষ দিচ্ছে ৪৭ ভাগ মানুষ। নির্ধারিত ফি না জানা ও নির্ধারিত সময়ে সেবা পেতে ঘুষ দিচ্ছে যথাক্রমে ৩৭ ও ২৩ ভাগ সেবাগ্রহীতা। অন্য কারণগুলোর মধ্যে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দ্রুত সেবা পাওয়া ও অবৈধ সুযোগ-সুবিধা আদায়।
অপর দিকে দুর্নীতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্রায় ৫০ ভাগ মানুষই ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের ফাঁদে পড়ে তাতে শিকার হচ্ছেন। দায়িত্বে অবহেলার জন্য দুর্নীতির শিকার প্রায় ৪০ ভাগ সেবাগ্রহীতার।
এ ছাড়া জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষিতদের চেয়ে কম বা অশিক্ষিতরা বেশি ঘুষ বা দুর্নীতির শিকার। শিক্ষিত পেশাজীবীদের চেয়ে কৃষক, জেলে, পরিবহন শ্রমিক, কামার, কুমার, প্রবাসী, কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি ইত্যাদি স্বল্প বা অশিক্ষিত পেশাজীবীদেরকে বেশি টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়। স্বল্প আয়ের লোকেদেরকেই ঘুষের বোঝা বেশি বইতে হচ্ছে। যেমন ১৬ হাজার টাকার নিচে যাদের আয় তাদের আয়ের ২ দশমিক ৪১ ভাগ টাকা যাচ্ছে ঘুষে। অন্য দিকে ৬৪ হাজার টাকা বেশি যাদের আয় তাদেরকে ঘুষে দিতে হচ্ছে দশমিক এক দুই ভাগ টাকা। তবে আশার কথা হলো, বয়স্কদের চেয়ে অল্প বয়স্ক তরুণরা কম দুর্নীতির শিকার।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না এই মানসিকতা আমাদের মধ্যে চলে এসেছে। যাদের ওপর দায়িত্ব তারা দুর্নীতিকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনছেন না। জনগণকে প্রদত্ত অঙ্গীকার সরকার যথাযথভাবে পালন না করায় সমাজের অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাভোগী মানুষের ওপর ঘুষের বোঝা ও বঞ্চনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘুষ ও দুর্নীতি মেনে নেওয়া সার্বিকভাবে আমাদের জীবনের সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে, যার ফলে জাতি হিসেবে আমরা আমাদের আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও আত্মসম্মানবোধ হারাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে কিছু সূচক ও খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সার্বিকভাবে দেশের দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকারি খাতে বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে দুর্নীতি ও ঘুষের পরিমাণ কমে যাবে বলে অনেকের প্রত্যাশা থাকলেও গবেষণার ফলাফল বিবেচনায় আশাব্যঞ্জক কিছু বলা যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও ঘুষের লেনদেন কমেছে যার পেছনে বর্ধিত  বেতন-ভাতাসহ অন্য কারণ থাকতে পারে। কিন্তু যারা দুর্নীতি করে অভ্যস্ত তাদের জন্য বেতন-ভাতা কোনো বিষয় নয়। তারা বেতন-ভাতার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আয় করেন দুর্নীতি, ঘুষ ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে।
সাংবাদিকের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরো বলেন, সকল পর্যায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে এবং প্রত্যেক নাগরিককে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সেবাগ্রহীতা, সেবা প্রদানকারী, পর্যবেক্ষক ও তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সরকার, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যদি দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে আন্তরিক হন এবং দুর্নীতির বিচারের সময় যদি দুর্নীতিকারীর পরিচয়, অবস্থান প্রভৃতি বিবেচনা করার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশনা না থাকে তাহলে দুর্নীতির মাত্রা এত বেশি হতো না।
জবাবদিহিতার ক্ষেত্রগুলোকে আরো বেশি প্রসারিত করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন যত বেশি স্ব স্ব দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবে জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তত বেশি শক্তিশালী হবে বলে ড. জামান অভিমত ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সেবাখাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে টিআইবি ১২ দফা সুপারিশ পেশ করে। এর মধ্যে রয়েছে, বিভাগীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ কার্যকর করা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুদৃঢ় নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে তার ভিত্তিতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া রয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবাদানের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গণ-শুনানির মতো জনগণের অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও জন-অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করাসহ গণমাধ্যমের সক্রিয়তা বৃদ্ধি করা। ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ ও ‘তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষা আইন ২০১১’ এর কার্যকর বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ সকল অংশীজনের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা।
উল্লেযোগ্য অপর সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে  সেবাদাতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হ্রাসে অনলাইনে স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ বৃদ্ধি, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সুর্নিদিষ্ট অভিযোগ নিরসন প্রক্রিয়া প্রচলন ও কার্যকর করার পাশাপাশি নাগরিক সনদের কার্যকর বাস্তবায়ন করা এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ধাপ ও অন্যান্য বাধা দূর করতে পদ্ধতিগত সংস্কার করা। এছাড়াও জনবল, অবকাঠামো ও লজিস্টিকস এর ঘাটতি দূরীকরণে সেবাখাতগুলোতে আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধে সকল পর্যায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার সুপারিশ করে টিআইবি।

পোশাক খাতে আরো সংস্কার প্রয়োজন -সেমিনারে সিপিডি

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে অনেকটা পরিবর্তন হলেও সংস্কার আরো প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া পোশাক শিল্পে শোভন কাজের পরিবেশ কার্যক্রমের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। বেশির ভাগ উদ্যোগ শুধু কর্মস্থলের নিরাপত্তা কেন্দ্রিক। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আরএমজি খাতবিষয়ক সিপিডি আয়োজিত সেমিনারের মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন আন্তঃপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভাপতি ও সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু, এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
প্রবন্ধে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গার্মেন্ট খাতে নতুন পণ্য উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। বাড়ছে না প্রযুক্তির ব্যবহারও। কাজেই পরিকল্পিত বিনিয়োগ না হলে আগামীতে এ খাতটি প্রতিকূলতায় পড়ে যাবে। এ খাতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সুদের ঋণ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। প্রবন্ধে তিনি বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর এ খাতটি সামাজিক সূচকে এগিয়েছে। কিন্তু অন্যভাবে অর্থনৈতিক সূচকে পিছিয়ে পড়ছে।
সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, পোশাক খাত অনেক দূর এগিয়েছে। আজকে পোশাক খাতের উন্নয়নের মূল কারিগর শ্রমিক সমাজ। দেশের রপ্তানি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। তাই এ খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাত উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। একসঙ্গে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিযোগিতার বিশ্বে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টিকে থাকতে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতি সহায়তা দিতে হবে। ন্যায্য মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের সম্মান করতে মালিকদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকরা পশু নয়, তাদের মূল্যায়ন করুন। কারণ শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করেই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, পোশাক খাতে রপ্তানি আয় ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর এ খাতে রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে, যা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এটি অর্জনে আমাদের রপ্তানির গতি আরো  বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মনীতির পরিবর্তন করতে হবে।বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু বলেন, পোশাক খাতে নামিদামি কোম্পানির প্রবেশ ঘটেছে। শ্রমিকের উন্নয়ন, বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তাসহ গুণগত অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তবে এ উন্নয়নের গতি আরো বাড়াতে হবে।
শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বড় ধাক্কা আসে রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি। এ দুর্ঘটনা আমাদের অনেক কিছু শিক্ষাও দিয়েছে। আর এ থেকে শিক্ষা পেয়ে পোশাক ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের জরিপ, শ্রমিক সেফটি, ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং সেফটির মতো উন্নয়ন হয়েছে। তিনি বলেন, এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। আমরা মালিক-শ্রমিক মিলে মাথা আরো উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। একই সঙ্গে সরকারের ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে বড় ধরনের ভূমিকায় থাকতে চাই। গবেষণায় বলা হয়, দেশের পোশাক কারখানাগুলোয় পারিবারিক প্রাধান্য রয়েছে। কারখানাগুলোর অধিকাংশই দ্বিতীয় প্রজন্ম দ্বারা পরিচালিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসেছে তৃতীয় প্রজন্মও। সিপিডি বলছে, ৬৫ শতাংশ গার্মেন্ট দ্বিতীয় প্রজন্ম দ্বারা পরিচালিত। ৮৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের ৩ জন পরিচালকের মধ্যে দু’জনই একই পরিবারের। সেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো স্বাধীন পরিচালক নেই। একই সঙ্গে ৫৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান একই গ্রুপের ভিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিচ্ছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর দেশে ১৯ শতাংশ কারখানা গড়ে উঠেছে। তবে আশঙ্কার বিষয়, এর বড় অংশটিই ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত। গবেষণায় কারিগরি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বলা হয়, ২১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। খুবই নিম্ন মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। আর ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশে উন্নত প্রযুক্তি এবং ৩৮ শতাংশে মধ্যম ও বৃহৎ পরিসরে প্রযুক্তির ব্যবহার হয়। এ ছাড়া, বিকেএমইএ’র চেয়ে বিজিএমইএ’র প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ৩.১ শতাংশ বেশি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পোশাক কারখানাগুলোর উন্নয়নে প্রযুক্তির অভিমুখী অবশ্যম্ভাবী। এ উন্নয়নের লক্ষ্যে কর্মকৌশল ও ব্যবস্থাপনা হতে হবে শ্রমিকদের স্বার্থে। সামগ্রিকভাবে যে নীতি কাঠামো আছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে যেসব প্রণোদনা দেয়া হয় সেগুলোকে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। যে উত্তরণ আমরা চাচ্ছি, সেই রূপান্তরের সঙ্গে এই নীতিগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ কি-না সেগুলো আরেকটু ভালো করে বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে কারখানার আয়তন ও স্থান সম্পৃক্ত। সব কারখানায় প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটছে না। কারখানায় ব্যবস্থাপনা পরিচালনার ক্ষেত্রে খুব একটা উন্নয়ন হচ্ছে না। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের উৎপাদনশীলতা এখনও খুবই নিম্ন।
বিজিএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান বলেন, অনেক গার্মেন্ট পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে গেছে। মালিকানায় পরিবর্তন আসছে। শুধু দ্বিতীয় প্রজন্ম নয়, কোনো কোনো কোম্পানিতে তৃতীয় প্রজন্মও এসেছে। করপোরেট ম্যানেজমেন্ট শুরু হয়েছে। দিনে দিনে পরিবর্তন আসছে। ভবিষ্যতে মূলধনের জন্য আমাদেরকে শেয়ার মার্কেটেও যেতে হবে। এ ছাড়া পোশাক রপ্তানি বাড়লেও বাইরে থেকে জনবল আমদানি কমেছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতে যেন টপ ম্যানেজমেন্টের কর্মী দেশেই গড়ে ওঠে।
দিনব্যাপী এই আলোচনায় কয়েকটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিপিডির বিভিন্ন গবেষকসহ পোশাক খাতের মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা এতে উপস্থিত ছিলেন।

অবশেষে শ্রম আইনে সংশোধনী আসছে by দীন ইসলাম

আহার ও বিশ্রামের বিরতি ছাড়া শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ১০ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না। এ ছাড়া কারখানা ও শিল্পের ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে একদিন এবং দোকান ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেড়দিন ছুটি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন প্রতিষ্ঠানে  কর্মরত পাইলট, প্রকৌশলী ও কেবিন ক্রুরা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারবে। এসব বিধান রেখে শ্রম আইনে সংশোধনী আনতে যাচ্ছে সরকার।
আগামী সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে শ্রম আইনের সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উঠবে। আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে খাবার কক্ষ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২৫ জনের বেশি শ্রমিক নিযুক্ত থাকেন এমন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা যাতে তাদের সঙ্গে আনা খাবার খেতে এবং বিশ্রাম করতে পারেন সেজন্য পানির ব্যবস্থাসহ একটি কক্ষ থাকতে হবে।
এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কক্ষের ব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, শ্রমিকরা ইচ্ছা প্রকাশ করলে যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি বা অংশগ্রহণকারী কমিটির সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করে পরে ওই সাপ্তাহিক ছুটি উৎসব ছুটির সঙ্গে যোগ করে ভোগ করতে পারবে।
সেক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের কাজের জন্য কোনো বেশি ভাতা দেয়া হবে না। চাকরি থেকে বাদ দিতে কি কি প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে ওই বিষয়টিও সংশোধনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিক বিনা নোটিশে বা বিনা অনুমতিতে ১০ দিনের বেশি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে মালিক ওই শ্রমিককে ১০ দিনের সময় দিয়ে এই সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে বলবে এবং চাকরিতে পুনরায় যোগদানের জন্য নোটিশ দেবে।
এমন ক্ষেত্রে ওই শ্রমিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান বা চাকরিতে যোগদান না করলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আরো সাত দিন সময় দেবে। তাতেও যদি সংশ্লিষ্ট শ্রমিক চাকরিতে যোগদান বা আত্মপক্ষ সমর্থন না করেন তবে ওই শ্রমিক অনুপস্থিতির দিন থেকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছে বলে গণ্য হবে। এর আগে ২০১৬ সালে সরকার নতুন শ্রম আইন পাস করে। তবে এটি শ্রমিকবান্ধব হয়নি বলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনা সমালোচনা করতে থাকে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় বিশাল সংখ্যক শ্রমিক হতাহতের পর নতুন করে এটি আলোচনায় আসে।
বিশেষত শ্রমিকের সংঘবদ্ধ হওয়া বা ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের বিষয়টি আলোচিত হয়। সমালোচনার মুখে ওই বছরই সরকার আইনটিতে বেশকিছু সংশোধনী আনে। এর পর কারখানার ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনে গতি আসলেও শ্রমিকের হয়রানি, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমেনি বলে অভিযোগ উঠে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) পূর্ণাঙ্গ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার বিষয়টি নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে আপত্তি তোলা হয়।
একই সঙ্গে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইপিজেড এলাকার কারখানার শ্রমমানকে তাদের পরিদর্শনের আওতায় আনাসহ বেশকিছু ইস্যু সামনে আসে। গত বছর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল লেবার কনফারেন্সে (আইএলসি) এ বিষয়ে অগ্রগতি অর্জনের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বাংলাদেশকে ‘স্পেশাল প্যারাগ্রাফ’-এর আওতায় আনা হয়। এর পর শ্রম আইনের সংশোধনীর বিষয়ে গুরুত্ব বাড়ায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে গঠিত কমিটির মতামতের ভিত্তিতে গত মে মাসে তা চূড়ান্ত করা হয়। এটি চূড়ান্ত করার পর ওই মাসেই অনুষ্ঠিত চলতি বছরের আইএলসিতে এ অগ্রগতি তুলে ধরে সরকার। সেই সঙ্গে তা আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ পাস হবে বলেও সরকারের তরফে আশ্বস্ত করা হয়। ফলে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেয় আইএলসি। আগামী অধিবেশনেই এর সংশোধনী আসতে যাচ্ছে।