Saturday, May 25, 2024
প্রকৃতি ও সমুদ্রনির্ভর মালদ্বীপ যেভাবে আমাদের চেয়ে এগিয়ে by মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান
মালদ্বীপে গিয়ে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রথমেই তিনটি বিষয় আপনার নজর কাড়বে। এক. মালদ্বীপের প্রায় সবাই ভালো ইংরেজি বলে। দুই. দ্বীপের মানুষগুলো হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল, বিনয়ী ও পর্যটকবান্ধব। তিন. রাস্তাঘাট নিরাপদ, গভীর রাতেও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নারীদের একক আনাগোনা দেখেছি।
সবাই ভালো ইংরেজি বলার কারণ হলো, এখানে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি। শ্রীলঙ্কা থেকে আসা শিক্ষকদের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষার হাতেখড়ি হলেও স্থানীয় লোকজন এখন সে দায়িত্ব পালন করছেন।
মালদ্বীপে তিন বছর বয়স থেকেই পড়াশোনা শুরু হয়। শিশুরা এসব বিদ্যালয়ে সাধারণ পাটিগণিত, ধিবেহী ভাষা, সামান্য আরবি ও কোরআন পাঠ করতে শেখে। এ সময়েই তাদের ইংরেজি বর্ণমালার পরিচয় ঘটে। পরিবার ও স্কুল থেকে তারা নৈতিক শিক্ষা লাভ করে। প্রকৃতি ও পরিবেশ তাদের হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল হওয়ার ও নারীর প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণের অভ্যাস গড়ে দিয়েছে।
মালদ্বীপ এশিয়ার ক্ষুদ্রতম দেশ। সমুদ্রসমেত যার আয়তন ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে ভূমির পরিমাণ মাত্র ২৯৮ বর্গকিলোমিটার, ভূমিপৃষ্ঠ থেকে যার গড় উচ্চতা ১ দশমিক ৫ মিটার।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী মালদ্বীপের জনসংখ্যা ৫ লাখ ৫০ হাজারের মতো। এসব পরিসংখ্যান বিবেচনায় মালদ্বীপ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তুলনীয় নয়। তবু কিছু তুলনামূলক পরিসংখ্যান এখানে তুলে ধরছি।
মালদ্বীপ একটি উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ। ২০২২ সালে মালদ্বীপের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১০ হাজার ৮৮০ মার্কিন ডলার, ভারতের ২ হাজার ৩৯০, বাংলাদেশের ২ হাজার ৮২০ এবং ভুটানের ৩ হাজার ৫১২ মার্কিন ডলার।
উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হওয়া ছাড়াও মালদ্বীপ অপেক্ষাকৃত কম আয়বৈষম্যের দেশ। মালদ্বীপের আর্থিক বৈষম্যের জিনি সহগ ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ, ভারতের ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ, বাংলাদেশের ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ ও ভুটানের ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
মানব উন্নয়ন সূচকেও মালদ্বীপ এগিয়ে। মালদ্বীপের মানব উন্নয়ন সূচক ০.৭৪৭ ও অবস্থান ৯০, ভারতের মানব উন্নয়ন সূচক ০.৬৩৩ ও অবস্থান ১৩২ এবং বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন সূচক ০.৬৬১ ও অবস্থান ১২৯।
এবার নিবন্ধের শিরোনামে ফিরে যাই। আসলেই প্রকৃতি ও সমুদ্রের নোনা পানিই তাদের সম্পদ। তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের ২৮ শতাংশ ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্তির ৬০ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ খাত মৎস্য। দুটি খাতই প্রকৃতি ও সমুদ্রনির্ভর। তাহলে মালদ্বীপ কী করে উচ্চমধ্যম আয়, উচ্চ মানব উন্নয়ন সূচক ও কম আয়বৈষম্যের দেশে পরিণত হলো?
শিক্ষিত জনগণ ও শিক্ষিত নেতৃত্ব
মালদ্বীপে প্রায় শতভাগ মানুষ লিখতে ও পড়তে জানে। একমাত্র সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম সলিহ বাদে সবাই উচ্চশিক্ষিত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু যুক্তরাজ্য থেকে পুরকৌশল বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। ফলে তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে সমুদ্রই তাঁদের একমাত্র সম্পদ। এটাকেই সংরক্ষণ ও বিকশিত করে তাঁদের বাঁচতে হবে। এ জন্য তাঁরা বিদেশ থেকে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে আসেন।
মালদ্বীপের মোট ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৪২৬ জন নিবাসীর মধ্যে ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৫৬ জনই (প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) বিদেশি, যার মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। মালদ্বীপে অবস্থানকালে বাংলাদেশি ব্যাংকার, নির্মাণশ্রমিক ও ব্যবসায়ী; ইন্দোনেশিয়ার পর্যটনকর্মী, শ্রীলঙ্কান শিক্ষক ও পাচক, স্পেনের স্নোরকেলিং প্রশিক্ষক, ওলন্দাজ পানিবিশেষজ্ঞ, ভারতের চিকিৎসক, নার্স, হিসাবরক্ষক, জার্মান রিসোর্ট ম্যানেজার দেখেছি। মালডিভিয়ান ও বিদেশি দক্ষ কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করে মালদ্বীপকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উচ্চ বরাদ্দ
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক সরকারি ব্যয় সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মালদ্বীপের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে যথাক্রমে গড়ে বাজেটের ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ বা জিডিপির ৪ দশমিক ৪ শতাংশ ও ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বা জিডিপির ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ যথাক্রমে জিডিপির ২ দশমিক ৬৩ ও ২ শতাংশ মাত্র। কেবল এই উপাত্ত থেকেই মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের অগ্রাধিকার বোঝা যায়। এ জন্যই মানব উন্নয়ন সূচকে মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ৯০ ও ১২৯তম।
হায় সন্দ্বীপ!
মালদ্বীপ ও সন্দ্বীপের ভূমির পরিমাণ যথাক্রমে ২৯৮ ও ৭৬২ বর্গকিলোমিটার। সমুদ্র যোগ করলে মালদ্বীপের আয়তন ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার। মালদ্বীপে এসে তাই সন্দ্বীপের কথা মনে পড়ল। মাত্র ৮৮ কিলোমিটার সড়ক বাদ দিলে মালদ্বীপের পুরো যাতায়াতব্যবস্থাই জলযাননির্ভর।
ভেলেনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেই আমাদের গন্তব্য মাফুশি দ্বীপে যেতে বোটে উঠতে হলো। তিনজন নাবিকসহ ৬৩ আসনের বোটটিতে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা। ‘গালফ ক্রাফট ট্যুরিং ৪৮ সিরিজের’ বোটটি আরব আমিরাত ও মালদ্বীপে যৌথভাবে নির্মিত হয়েছে। বোটটিতে ২৫০ অশ্বশক্তির চারটি আউটবোর্ড ইঞ্জিন, যা ৩৮ নট গতিতে চলতে পারে। বোটটি রাডার, ওয়াকিটকিসহ সমুদ্রযাত্রার সব সরঞ্জামে সজ্জিত। প্রত্যেক যাত্রীর জন্য আধুনিক লাইফ জ্যাকেট বিমানযাত্রীদের মতো।
উত্তাল সমুদ্রে ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ৪৫ মিনিটে মাফুশি দ্বীপে পৌঁছালাম। একদম ডাঙা থেকে ডাঙায়। ভাড়া ২০ মার্কিন ডলার, মালামালের জন্য আলাদা কোনো ভাড়া নেই।
সন্দ্বীপযাত্রার কষ্টের কথা মনে পড়ল। কুমিরা ঘাট থেকে আবহাওয়াভেদে ভ্যানে অথবা নৌকায়, কাদাপানি পার হয়ে মুরগি অথবা গবাদিপশুর মতো আঁটাআঁটি করে স্পিডবোট, যাতে নেই কোনো লাইফ জ্যাকেট, রাডার, ওয়াকিটকি বা অন্য কোনো নৌযান পরিচালনার সরঞ্জাম। এরপর জান হাতে নিয়ে যাত্রা। ওপারেও একই কসরত!
ঘাট নির্মাণ কৌশল ও ব্যবস্থাপনা
পাথর ফেলে সমুদ্রের ঢেউ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাঝখানে খানিকটা জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছে নৌযান ও ফেরি যাতায়াতের জন্য। নৌযান ও ফেরি রাস্তার পাশে জেটিতে যাত্রী ও পণ্য নামিয়ে দেয়। সব দ্বীপেই একই ব্যবস্থা। অথচ সন্দ্বীপে কেবল ঘাট বানানো হচ্ছে। প্রথমে ১০ কোটি টাকা দিয়ে একটা, পরে ৪০ কোটি টাকা দিয়ে আরেকটা, এখন ৩০০ কোটি টাকা দিয়ে আরেকটা করা হচ্ছে। সরকার কা মাল দরিয়ামে ঢাল! সমুদ্রের ঢেউ নিয়ন্ত্রণ না করে এ ধরনের অপব্যয় কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব।
সমুদ্র থেকে ভূমি পুনরুদ্ধার
রাজধানী মালে-সংলগ্ন হুলুমালে সৃষ্টি করা হয়েছে গভীর সমুদ্র থেকে বালুমাটি এনে উপহ্রদ ভরাট করে। সফল প্রথম পর্যায়ের পর এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে। সন্দ্বীপের আশপাশে বিপুল পরিমাণ চর জেগে উঠেছে। এর কোনো কোনো জায়গায় ভূমি পুনরুদ্ধার করলে সন্দ্বীপকে নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব। বাংলাদেশে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।
ওলন্দাজরা হুলুমালু (মালদ্বীপের দ্বীপ) পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছে। আমরা ওলন্দাজদের দিয়ে বদ্বীপ পরিকল্পনা বানাই। কিন্তু মানুষের উপকার হয়, এমন কাজের কাজ কিছুই হয় না। বাংলাদেশ সমুদ্র ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মালদ্বীপ থেকে শিখতে পারে।
পরের কিস্তিতে ভূস্বর্গ বলে পরিচিত মালদ্বীপের সমস্যা, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বিষয়ে লেখার আশা রাখি।
● মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Thursday, May 16, 2024
‘গাজায় গণকবর: কারও হাত বাঁধা, কারও মস্তক বিচ্ছিন্ন’
ফিলিস্তিনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাজার বিভিন্ন গণকবরে পাঁচ শতাধিক মানুষের মরদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে। এসব মরদেহের কোনো কোনোটিতে অঙ্গচ্ছেদ ও নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। ইসরায়েল গাজায় যে যুদ্ধাপরাধ করেছে, এগুলো তার প্রমাণ।
অবশ্য ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী যুদ্ধাপরাধের এমন অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলেছে, হামাস ও ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে ওই সব এলাকায় লড়াইয়ে নিহত হয়েছিলেন এসব ব্যক্তি। পরে ফিলিস্তিনিরা তাঁদের দাফন করেন।
এ নিয়ে সত্য উদ্ঘাটন ও দোষী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেন, ‘সব ফরেনসিক প্রমাণ ভালোভাবে সংরক্ষণ করাটা জরুরি।’
কিন্তু গাজার সর্বদক্ষিণের ও অতিঘনবসতিপূর্ণ শহর রাফায় হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। বন্ধ করে দিয়েছে মিসরের সঙ্গে গাজার সীমান্ত ক্রসিং। এতে এ উপত্যকায় ফরেনসিক দল পাঠানো বা গণকবরের সন্ধান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর দাফনের স্থানগুলোয় চলছে এলোমেলো খোঁড়াখুঁড়ি ও প্রমাণ সংগ্রহের কাজ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে এমন সব স্থানে এ রকম প্রতিবন্ধকতা সত্যের সন্ধান পাওয়াকে কঠিন করে তুলবে। তবে এ ঘটনায় ন্যায়বিচার পাওয়ার সব আশা শেষ হয়ে যাবে তা নয়।
গণকবর থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে যেভাবে
খান ইউনিস শহরে নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে তিনটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনটি পাওয়া গেছে গাজা সিটির আল–শিফা হাসপাতালে ও বেইত লাহিয়ার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে একটি।
গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য মোহাম্মদ জানিন গত বৃহস্পতিবার আল–জাজিরাকে বলেন, আল–শিফা হাসপাতালে চতুর্থ আরেকটি গণকবর পাওয়া গেছে। সেখানে ৪২ জনের মরদেহ রয়েছে। মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কারও কারও সঙ্গে পাওয়া গেছে পরিচয়পত্র ও কাউকে কাউকে তাঁদের স্বজনেরা পোশাকের নমুনা দেখে চিহ্নিত করেছেন।
মোহাম্মদ জানিন বলেন, ছবি তুলে ও ভিডিও করে এসব মরদেহের ব্যাপারে তথ্য নথিভুক্ত করে রাখছেন বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। তাঁদের সঙ্গে আছে সামান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম। অবশ্য কোনো ফরেনসিক উপকরণ নেই। তিনি বলেন, ‘মরদেহ রাখার জন্য আমাদের কাছে কিছু ব্যাগ আছে। হাত ও নাকের সুরক্ষায় আছে সামান্য কিছু সরঞ্জাম। বাস্তবতা হলো আমরা যা করছি, তা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের পদক্ষেপ। আমাদের কর্মীরা আছেন অনেক চাপের মুখে।’
থানি নিমর আবদেল রহমান গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে ‘আল মিজান ফর হিউম্যান রাইটস’ নামের সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন। আল–শিফা হাসপাতালের গণকবরগুলো পরিদর্শন করেছেন তিনি। বলেছেন, বুলডোজার ব্যবহার করে গণকবরগুলো খোঁড়া হচ্ছে।
যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেল?
বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য গণকবর দেওয়া ব্যক্তিদের নির্যাতন করাসহ তাঁদের সঙ্গে নানা ধরনের দুর্ব্যবহার, বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা ও বেসামরিক লোকজনকে বেআইনিভাবে হত্যার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছেন; যা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।
আল–শিফা হাসপাতালে গণকবর খোঁড়ায় অংশ নেওয়া বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের একজন রামি দাবাবেশ। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, তাঁর দল মস্তকবিচ্ছিন্ন কিছু মরদেহ দেখেছেন। এ ছাড়া হাসপাতালের পোশাক পরা শিশু ও নারীদের মরদেহ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মী আদেল আল-মাশারাবি।
বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর আরেকজন সদস্য মোহাম্মদ মুগির বলেন, অন্তত ১০ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে, যাঁদের হাত ছিল বাঁধা। অন্যদের শরীরে লাগানো ছিল রোগীদের জন্য ব্যবহার করা নল। তিনি বলেন, প্রায় ২০টি মরদেহের ক্ষেত্রে বাড়তি ফরেনসিক পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাঁদের ধারণা, এ ব্যক্তিদের জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে।
‘নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে কিছু মরদেহ পাওয়া গেছে, যেগুলো ছিল স্তূপীকৃত অবস্থায়। এতে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এই ব্যক্তিদের উন্মুক্ত স্থানে মেরে এখানে জড়ো করে কবর দেওয়া হয়েছে’, বলেন খান ইউনিসে ওই বাহিনীর প্রধান ইয়ামেন আবু সুলেইমান। শুধু এ স্থানেই কমপক্ষে ৩৯২ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে।
এসব প্রমাণ বিশ্বাসযোগ্য হবে কি
গণকবর নিয়ে তদন্তের কাজ করা সাধারণত খুব জটিল, দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট দক্ষতা ও উপকরণের। এ ক্ষেত্রে সংগৃহীত মরদেহ বা নমুনার কোনো ক্ষতি করা যায় না।
গণকবর নিয়ে তদন্তে বিশেষ অভিজ্ঞতা রয়েছে ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল
ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক বিজ্ঞানী স্টেফান স্মিটের। তিনি বলেন, বিশেষত আগ্রাসী পদ্ধতি, যেমন মৃতদেহের সন্ধানে বুলডোজার দিয়ে গণকবর খোঁড়া হলে এমন সব সূত্র নষ্ট হয়; যা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নির্ধারণে সহায়তা করতে পারত। এসব সূত্র দিয়েই উদ্ঘাটন করা যায়, কবে ও কোন উপকরণ ব্যবহার করে গণকবর দেওয়া হয়েছে, সেসব বিষয়।
আবার মরদেহের ময়নাতদন্ত ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিরশ্ছেদ করা বা জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো দাবি সমর্থন করাও কঠিন বলে এই ফরেনসিক বিজ্ঞানী জানান। তিনি বলেন, প্রমাণ হিসেবে শুধু মরদেহের ছবি বা ভিডিও হাজির করাটা সন্দেহ নিরসনে যথেষ্ট না–ও হতে পারে।
সহায়তা করতে পারবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো?
গাজায় গণকবরগুলো নিয়ে ‘একটি স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের’ আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। এই আহ্বান সমর্থন করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বলেছে, হাসপাতালগুলোতে মরদেহের এই সন্ধান সেখানে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করার ধারণা দেয়। আর যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত চায় তারা।
কোন সংস্থা এসব আহ্বানে সাড়া দেবে কিংবা ভবিষ্যতে কেই–বা তদন্তের বিরাট কাজ গ্রহণ করতে পারে, তা স্পষ্ট নয়।
জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক মুখপাত্র জেরেমি লরেন্স আল–জাজিরাকে বলেন, ‘গাজায় গণকবরের স্থান থেকে প্রমাণ সংগ্রহে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সহায়তা দিচ্ছে না। কেননা এ জন্য নির্দিষ্ট দক্ষতা প্রয়োজন; যা বাস্তবিক অর্থে সংস্থাগুলোর নেই।’
ন্যায়বিচারের আশা কত দূর
গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ওঠা গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে আইনি পদক্ষেপ চলমান। গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা ও এর পর থেকে গাজায় চলা ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংসতার ওপর একটি তদন্তের দেখভাল করছেন হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তদন্তকাজ চালানোর এখতিয়ার আইসিসির প্রধান কৌঁসুলির দপ্তরের রয়েছে। তবে গাজায় গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর এ বিষয়ে দপ্তর থেকে প্রকাশ্য কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
এদিকে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা একটি মামলা খতিয়ে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। অবশ্য এ নিয়ে কোনো রায় পেতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
![]() |
| উত্তর গাজার নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্স থেকে অন্তত ৩৯২ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Wednesday, May 15, 2024
গল্প- জাতীয় পক্ষপাত by ফাতু দিয়ম

জাতীয় পক্ষপাতের কথা বলছিলাম। যদি মেনে নিই যে, পসিডনের রথ সিহর্সরা টানত, তবে বাওবাব গাছের বিশাল গুঁড়ি যে দুর্বল শেকড়ের ওপর বেড়ে ওঠে, তাও মানতে হবে। সাধারণ মানুষের ব্যবহারের মধ্য দিয়েই একটি আইন চালু হয়। উইপোকারা ফেলে দিতে পারে আফ্রিকার বিশাল মেহগনি গাছ, ঠিক যেমন পিঁপড়ে-ঢিবির আকার দেখেই বোঝা যায় কর্মীপিঁপড়ের সংখ্যা আর ভৃত্য ছাড়া কী হতো রাজদরবারের দশা! ঠিক সেজন্যেই জাতীয় পক্ষপাতের কারণে যারা ছোট কাজ করে, তাদেরও কিছুটা গণ্য করা উচিত।
স্ট্রাসবুর্গের বিনা পয়সার কাগজে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে একটা চোখে পড়ল : সিটি সেন্টারে বড় বেকারিতে সেলসগার্ল প্রয়োজন। আঞ্চলিক ভাষা কাম্য। দোকানে আসুন।
ঠিকানাটা লিখে নিলাম এবং সন্ধ্যায় আমার এক বন্ধুকে ফোন করে বিজ্ঞাপনের কথা বললাম। সে প্রতিবাদের সুরে বলে উঠল, ‘পাগল নাকি? তুমি আরো ভালো কাজ পাবে। তোমার আর আমার লেখাপড়া একই – আমি তো টিচার্স ট্রেনিং শেষ করছি। দিনভর রুটি, পেস্ট্রি বিক্রি করা অসহ্য বিরক্তিকর হবে।’
বললাম, ‘অন্য কিছু করতে পারলে তো খুশি হতাম। লেখাপড়া ফ্রান্সে করেছি সত্যি; কিন্তু আমার যোগ্যতার স্বীকৃতি নেই, তাই যোগ্য কাজ করার অনুমতিও আমি পাইনে।’
কিন্তু আমাকে তো খেতে হবে। ‘রুটি বিক্রি করে অনাহারে অন্তত থাকব না।’
ও বলল, ‘কিন্তু এ তো হাস্যকর। তুমি ভালো চাকরি পাবে, এতে সন্দেহ নেই। তেমনভাবে খোঁজ করছ না।’
এ ধরনের মন্তব্য শতবার শুনেছি। আমার এখানকার জীবন সম্পর্কে ফরাসি বন্ধুদের কোনো ধারণাই নেই। তাদের প্রায়ই মনে হয়, আমার মাথা খারাপ। আমি বিরক্ত হইনে। মামাদুর গায়ের রং না হলে ফরাসি বর্ণবাদের ধারণা পাওয়া যাবে না। যারা ক্লিওপেট্রার নাক আর অস্ট্রিয়ার অ্যানের রং নিয়ে জন্মেছে তারা বুঝবে না।
পরদিন সকালে বেকারিতে গেলাম। দেখলাম কিছু ব্যাগেট আর চকোলেট কেক ছাড়া সব খাবারই সাদা রঙের। ওখানে কাজ করছে পিয়ের, পল, জোসেফ ও মারটিন নামে ছেলেরা আর মেয়েদের নাম গারচুড, জোসিয়ান ও জ্যাকুলিন। মামাদু বা আয়শার কোনো চিহ্ন দেখলাম না।
বসের গোঁফ জার্মান কায়দার আর হ্যাটে ফরাসি পতাকার রং, আমাকে সে অ্যালসাস উচ্চারণে স্বাগত জানাল। তবে তার তাকানোর ভঙ্গি থেকেই বুঝলাম, আমি পাশ করতে পারিনি। চকোলেট রঙের চামড়া এ-লোক পছন্দ করে না। চেষ্টায় হাসি টেনে বললাম, ‘হ্যালো স্যার, আমি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি।’
লোকটি মাথা নেড়ে যেন বলতে চাইল, ‘ওই তো, আমাদের বাচ্চাদের কাপড় খুলে নিতে চায় তাদেরই একজন এসেছে।’ কিন্তু চতুর লোক, বলল, ‘অ্যালসাস তো কিছু বলতে পারো – তাই না?’
‘আঞ্চলিক ভাষা কাম্য’ – এটা বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা ছিল ঠিকই কিন্তু আমি আমার আঞ্চলিক ভাষা জানি, তারটা নয়। আমি ভাবতাম, ফরাসিরা নিজেদের ভাষাটা অন্ততপক্ষে তাদের উপনিবেশের লোকজনের মতো তো বলতে পারবে, আর আমার ফরাসি ভাষাজ্ঞান ভিক্টর হুগোর এই এক স্বদেশির চেয়ে তো বেশিই আছে। তারপরও আবার এ-লোক চাইছে আমি যেন ক্রেতাদের সঙ্গে অ্যালসাস বলতে পারি। সুতরাং যে-উত্তরটা সে আশা করছিল এবং চাইছিল আমি সেটাই দিলাম, ‘না, স্যার’।
কুগলফ খেতে শুরু করেছি সে মাত্র দুবছর, এর মধ্যেই এ-লোক চাইছে আমি তার ভাষা রপ্ত করে ফেলব। তার ঘোলাটে চোখের দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যান দেখতে পেলাম। কিন্তু সেটা তো যুক্তিসংগত করতে হবে আর আমাকে অপমান করার ইচ্ছেও তার ছিল, বলল, ‘দেশে ফিরে যাও না কেন? দেশে গিয়ে কাজ করো।’
এ-লোক প্রথমে ‘তু’ সম্বোধনেই কথা বলেছিল; কিন্তু এখন ‘ভু’ ব্যবহার করল; কিন্তু তা বিনয়বশত নয়, যে-বিদেশিকে সে আবর্জনার মতো রাইনে ছুড়ে ফেলে দিতে চায় তার জন্যেই ‘ভু’ ব্যবহার করে।*
এরপর আমার রূঢ় হওয়া কেবল অধিকার নয়, মনে হলো কর্তব্যও বটে। আমি সংযম হারিয়ে ফেললাম। ‘তোমার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল এরকম একটা বাজে কাজের জন্য কেন আমাকে আসতে হলো। প্রায় দুটো বছর তোমার মতো এক ফরাসির কাছে আমার শরীর দান করে রেখেছিলাম; কিন্তু সে আমাকে যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই দেয়নি, তার প্লাস্টিক ক্যাপ থেকে যদি একটিমাত্র শুক্রাণু বেরিয়ে আসতে পারত তবে আমার অন্তত বেঁচে থাকার অবস্থাটুকু হতো, অন্তত ওই ফরাসি শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে যা পেতাম তার অবশিষ্ট ক্ষুদকুড়ো দিয়ে আমার চলে যেত। সে তো হলো না আর আমার বোধ হারিয়ে যেতে লাগল, স্বামীর আত্মীয়পরিজনের জাতীয় পক্ষপাত আমার মুক্তির স্বপ্ন ভেঙে দিলো। চলি স্যার, তবে তোমরা তোমাদের জন্য আখ আর বাদাম চাষ করিয়ে আফ্রিকার মাটিকে অসার করে দিয়েছ। আমাদের অ্যালুমিনিয়াম, ফসফেট আর সোনার খনি লুটে এনে নিজের দেশকে তোমরা সমৃদ্ধ করেছ, তাও আমাদেরই খরচে করেছ। সবচেয়ে বড় কথা, তোমরা সেনেগালের মানুষদের নিয়ে সেনাবাহিনী তৈরি করে যুদ্ধে তাদের কামানের তোপ হিসেবে ব্যবহার করেছ, তোমাদেরই স্বার্থে। স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে তাদের হত্যা করিয়েছ অথচ তাদের নিজের দেশের স্বাধীনতাই কেড়ে নিয়েছিলে। এই সাদাদের মাটিতেই যুদ্ধ হয়েছে – এখানেই বোমার টুকরো ছিটকে গিয়ে আমার দাদুর চোখ উড়ে গিয়েছিল; স্যার – সে-চোখ তোমাদের লক্ষ করছে, সে-চোখের আয়নায় আমি তোমাদের ইতিহাসের ভয়াবহতা দেখতে পাচ্ছি। সে-চোখ দেখছে – যে-সন্তানরা এখানে এসেছে সামান্য কিছু হৃত সম্পদ দাবি করতে, তাদের সঙ্গে তোমরা কী ব্যবহার করছ। আমার দেশের মানুষের রক্তের গন্ধ আমাকে পথ দেখিয়ে এখানে এনেছে – ঘরে গর্ভিনী স্ত্রী ফেলে তারা এসেছিল আর সেই সাহসী মানুষগুলোই তোমাদের এই উদ্ধৃত মাটিতে সার হয়ে মিশে গেছে। ভারদুনের কতশত নামহীন কবরে ধ্বনিত রণহুঙ্কার, প্রতিধ্বনিত হয়ে পৌঁছেছে সন্তানহারা আফ্রিকা পর্যন্ত – তা শুনেই আমি এসেছি। সবচেয়ে বড় কথা, স্যার, আমি একটি নতুন সত্য প্রতিষ্ঠা করতে এসেছি – তোমরা আমাকে গাইতে শিখিয়েছিলে, ‘আমাদের পূর্বসূরি গল’, কিন্তু আমি বুঝেছি ও-কথা সত্যি নয়, আমি তোমাদের বাচ্চাদের গাইতে শেখাব, ‘আমাদের পূর্বসূরি সেনেগালি যোদ্ধা, কারণ ফ্রান্সের সম্ভার যে-উচ্চতায় অবস্থান করছে, তার অনেক খুঁটিই এসেছে আফ্রিকা থেকে।’
এখনো বেকার, এখনো বিশ্বাস করছি দাদুর চোখের আলোয় ইউরোপে আমার পথ আলোকিত হবে। ভক্ত আত্মাহুতি দিয়ে সম্মানিত করলে আফ্রিকীয় দেবতারা অন্তত বংশপরম্পরায় তার ইহকাল-পরকাল সুরক্ষিত রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতেন। হয়তো ইউরোপের দেবতারাও একই রকম দয়ালু হবেন। সুতরাং তিনদিন পর থেকে আবার আমি বিনা পয়সার কাগজগুলো দেখতে শুরু করলাম। একটা নতুন বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল, ‘ফরাসি ভাষা শেখার জন্য টিউটর প্রয়োজন। ডিগ্রি বাঞ্ছনীয়। যোগাযোগের নম্বর… সন্ধে ৭টার পর।’
নম্বরটা টুকে নিলাম। এবার আর বন্ধুকে কিছু জানালাম না। ও জিজ্ঞেস করত বেকারিতে আমার ইন্টারভিউ কেমন হলো এবং আমার কথা বিশ্বাস করত না। একটা বক্তৃতা শুনতে হতো, ‘তোমার মাথাটা যাচ্ছেতাই রকম খারাপ হয়েছে, লোকটাকে আমার বর্ণবিদ্বেষী মনে হচ্ছে না, ওর স্বভাব খারাপ।’
সন্ধে ৭টা বেজে ১০ মিনিটের সময় ফোন করলাম। এক মহিলা ধরল, বলল, সে স্ট্রাসবুর্গের বড় একটা সুপার মার্কেটে ক্যাশিয়ার এবং তার ১১ বছরের মেয়েকে পড়ানোর জন্য টিউটর খুঁজছে। পরদিন বিকেলে সিটি সেন্টারের এক ক্যাফেতে দেখা করতে বলল।
বিজ্ঞাপনে যেহেতু ডিগ্রির উল্লেখ ছিল, ভেবেছিলাম ছাত্র ব্যাক্কালরিয়েটের জন্য তৈরি হচ্ছে, তবু দেখা করতে রাজি হলাম – খেতে তো হবে, সে চাকরি থেকেই আসুক আর দেবতারই দান হোক।
পৌঁছে দেখি ক্যাফেতে বহু লোক কিন্তু ম্যাডাম বলে দিয়েছিল যে, তার পরনে নীল ডোরাকাটা সাদা জার্সি থাকবে, তাই তাকে পেতে সময় লাগল না। টকটকে লাল লিপস্টিক-ঘষা মহিলা ফরাসি পতাকার প্রতীক। পরিচয় দিয়ে ফোল্ডার থেকে আমার ডিগ্রির বিখ্যাত সার্টিফিকেটটা বের করে দিলাম।
কর্তব্যসচেতন ওয়েটার বন্ধুসুলভ ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে জানতে চাইল, ‘আপনাকে কী দেব ম্যাডাম?’
তাকে বললাম একটা জুস দিতে – ভাবলাম পুঁজিবাদী সমাজের মজাটা দেখো – ক্রেতার সঙ্গে জাতি-বর্ণের বৈষম্য কোথাও দেখা যাবে না। ওয়েটার আমার গ্লাস নিয়ে এলো।
মহিলা আমার উলটোদিকে বসে ছিল, সার্টিফিকেটটা নিরীক্ষণ করে ফেরত দিতে দিতে বলল, ‘আমি একজন ইউরোপীয়কে চাচ্ছি’। তারপর চিবুকটা ওপরে তুলে যোগ করল, ‘আমি চাই না আমার বাচ্চার লেখাপড়ায় কেউ তালগোল পাকিয়ে ফেলুক।’
ম্যাডাম ফরাসি সত্যি কিন্তু ব্যাক্কালরিয়েটটাও তো পাশ করেনি এবং মেয়েকে যে পড়াতে পারবে না সেটা জানে না, তা নয়। আমাকে সে প্রত্যাখ্যান করছে আমার কালো ঠোঁটের জন্যে; কিন্তু আমার এই কালো ঠোঁট দিয়েই ফরাসি ব্যাকরণের সূক্ষ্ম নিয়মগুলো কমিয়ে বললেও তার চেয়ে ভালো করে পড়াতে পারব। রাগে জ্বলে উঠলাম, বললাম, ‘চলি ম্যাডাম, আমার মাথায় যা আছে তা তোমার মাথায় থাকলে সুপার মার্কেটে ক্যাশিয়ারের কাজটা করতে হতো না।’
মহিলা চিৎকার করে বলল, ‘এসে ড্রিঙ্কের দাম দিয়ে যাও।’
বিরক্তিতে মুখটা বেঁকে গেল আমার, বললাম, ‘না ম্যাডাম, ধরে নাও ওটা যাতায়াত খরচ। ক্যাশিয়ারের জানা থাকা উচিত, পয়সা ছাড়া কিছুই হয় না। তোমরা তো আমাদের কালো মানুষ বলো, তাদের কাজেরও কিন্তু মজুরি দিতে হয়।’
মহিলার ব্যক্তিগত অশিক্ষা আমাকে ততটা রাগিয়ে দিতে পারত না – আমি জানি এর মূলে আছে সংস্কৃতির অভাব। আমি বেশি ক্ষেপে গিয়েছিলাম কারণ মহিলাটি মিস্টার বডার্সের জঘন্য কাজটারই অনুসারী। আসলে নেতাদের নির্বুদ্ধিতা সাধারণ মানুষকে নির্বোধ করে রাখে। অন্ধ পথনির্দেশকের অনুসারীরা অন্ধকারেই পথ চলবে।
এসব ভাবতে ভাবতে ক্যাশিয়ারের চিৎকার শুনতে পেলাম, ‘যা তোর জঙ্গলে ফিরে যা।’
বর্ণবাদীদের শব্দভান্ডার বোধহয় খুব কম। আজন্ম শিক্ষার অভাবই এর কারণ হবে। একই ভাষা আমার শাশুড়িও ব্যবহার করত আর আমি বাড়ি ফিরে দেখতাম ছেলেকে বুকে আগলে রেখেছে।
পালটা জবাবে বললাম, ‘তুমিও চলে এসো আমার সঙ্গে। তাজা বাতাসে চেহারা ফিরে যাবে – রূপচর্চার খরচটা বাঁচবে।’
থলথলে পেছনটা চেয়ারে ঠেসে দিয়ে লাল ঠোঁটদুটো চেপে বিড়বিড় করতে লাগল মহিলা, মুখটা লাল হয়ে গেছে। মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম – সঙ্কোচ বা রাগ কোনোটাই আমার মুখের রঙে ধরা পড়ে না। আমার ত্বক সবসময়ই অন্তত নিজের সম্মানটুকু রাখতে পারে।
ক্যাফে থেকে বেরিয়ে আসছি, দেখলাম এক বয়স্ক লোক চোখ টিপে তার উলটোদিকের চেয়ারে আমাকে বসতে ইশারা করল। ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে চলে এলাম – আরেক নিঃসঙ্গ বয়স্ক লোক, নিজের কাছে পাওয়া মেয়েদের মাঝে-মধ্যেকার উল্লাসধ্বনি আর ঘন ঘন অশ্রুবর্ষণের মধ্যে আত্মপ্রেমে এতটাই মশগুল থেকেছে যে, পরিবার তৈরি করতে পারেনি এবং সেটাই এখন তার পরিতাপের বিষয় হয়েছে। না, ওর আমন্ত্রণ আমি গ্রহণ করব না। হয়তো ওর চিন্তাভাবনা সেই মান্ধাতা আমলের, হয়তোবা মাকে এতটাই ভালোবাসে বা ঘৃণা করে যে, অন্য মেয়েকে সুখী করার ক্ষমতাই ওর নেই। হতে পারে সে-লোকটার মতো – বিছানায় কালো মেয়ের সঙ্গকামী অথচ পথে হাত-ধরতেও লজ্জা, একদিন হঠাৎ তার মা এসে পড়লে আমাকে ওপরতলায় গিয়ে দরজা লাগিয়ে থাকতে বলেছিল। না মশাই, আমি তোমাদের হাত থেকে নিষ্কৃতি চাই।
হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন ব্যাগ থেকে আমার এদেশে থাকার অনুমতিপত্রটি বের করেছি – পেছনে ঠিক আমার আগমনের তারিখ এবং আমার ঠিকানার মাঝখানে বড় হাতে অক্ষরে লেখা রয়েছে : বর্তমান আইনের সুযোগের মধ্যে ফ্রান্স মহানগরীতে যে- কোনো কাজ অনুমিত। কী মোহময় মরীচিকা। ভাবলাম, শেষে কেবল সরকারি বা বেসরকারি শব্দদুটোর সংযোজন দরকার ছিল।
কলেজে থাকতে ধূসর সোনালি চুলের এক মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল। মেয়েটি বাস্তবিক অর্থেই সাদা। ডিগ্রি করার সময়টাতে ও একটা খন্ডকালীন কাজ খুঁজছিল, সেদিনই সন্ধ্যায় ওকে ফোন করে ক্যাশিয়ারের নম্বরটা দিলাম। পরদিন সন্ধ্যায় আমার ফোনের মেসেজ থেকে খুশির সুরে ওর গলা বেজে উঠল, ‘খবরটা দেওয়ার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ, আজ সকাল থেকেই আমি মহিলার ওখানে কাজ শুরু করেছি। আর হ্যাঁ, এ-মহিলার এক প্রতিবেশী আছে, তার ঝাড়ামোছার লোক দরকার, তুমি চাইলে কাজটা নিতে পারো।’
*ফরাসি ভাষায় তু (tu) এবং ভু (vous) দুটি শব্দই ইংরেজি you অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে ‘তু’ সাধারণত বন্ধু বা সমকক্ষদের জন্য। এবং যেখানে ভদ্রতা বা লৌকিকতার সম্পর্ক অর্থাৎ যারা বন্ধু বা পরিবারের কেউ নয় এবং বহুবচন বোঝাতে ‘ভু’ ব্যবহার করা হয়। তবে একবার যাকে ‘তু’ সম্বোধনে কথা বলা হয়েছে, তাকে ‘ভু’ সম্বোধন করাটা ব্যঙ্গ বা অপমানের শামিল।
------------
লেখক-পরিচিতি
সেনেগালি লেখক ফাতু দিয়মের জন্ম ১৯৬৮ সালে। তিনি ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেছেন এবং বর্তমানে ওই ইউনিভার্সিটিতেই শিক্ষকতা করছেন। এছাড়া তিনি ফ্রেঞ্চ টেলিভিশনের FR- এ একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর দুটি উপন্যাস আছে – The Belly of The Atlantic এবং Ketala । তিনি এখানে ফ্রান্স ও আফ্রিকার সম্পর্ক উন্মোচন করেছেন। LA Preference Nationale নামে তাঁর একটি গল্প-সংকলনও রয়েছে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1402)
- ► 2025 (3281)
- ▼ 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
