Showing posts with label লাতিন আমেরিকা. Show all posts
Showing posts with label লাতিন আমেরিকা. Show all posts

Tuesday, August 11, 2026

কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ১১১ , ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা

কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১১১ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। ভূমিকম্পে বহু ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন অনেকে। এতে বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং আতঙ্কে বাসিন্দাদের অনেকেই নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

এদিকে ভূমিকম্পের কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। সংস্থ্যাটি জানিয়েছে, সোমবার (১০ আগস্ট) ভোরে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমারের কাছে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ১০৭ কিলোমিটার। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন বড় শহরেও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে পশ্চিমাঞ্চলীয় রিসারালদা প্রদেশে। কফি উৎপাদনের জন্য পরিচিত এ অঞ্চলের গভর্নর হুয়ান দিয়েগো পাতিনো টেলিভিশন চ্যানেল কারাকোলকে জানিয়েছেন, সেখানে অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন।

কলম্বিয়ার অন্যতম বড় শহর ক্যালিও ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরটির মেয়র আলেহান্দ্রো এদের জানিয়েছেন, অন্তত ৩০টি ভবন ধসে পড়েছে। এসব ভবনের মধ্যে ১০টিতে উদ্ধারকাজ চলছে। তবে ক্যালিতে এখনো প্রাণহানির সংখ্যা নিশ্চিত করেনি কর্তৃপক্ষ।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে অংশ নেওয়া ক্যালির স্থানীয় বাসিন্দা হুয়ান কার্লোস অসোরিও বলেন, ‘ভবনটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। শব্দটি বোমা বিস্ফোরণের মতো মনে হয়েছিল। পরিস্থিতি ভয়াবহ। আমরা প্রতিবেশীরা সবাই মিলে কাজ করছি। মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছি। আমাদের ভারী যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছেন।’

এদিকে রিসারালদা প্রদেশের রাজধানী পেরেইরায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে একটি ভবনের ফাটল ধরা সম্মুখভাগ ধসে পড়তে দেখা গেছে। এতে চারপাশে ধুলা ও ধ্বংসাবশেষের মেঘ তৈরি হয়। রাস্তায় থাকা মানুষ আতঙ্কে ছুটে পালান।

ম্যানিজালেস শহরের একটি নব্য-গথিক ক্যাথেড্রালের ওপরের টাওয়ারগুলোর একটিও ভূমিকম্পের আঘাতে ধসে পড়েছে।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের সবচেয়ে কাছের প্রদেশ চোকোতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। প্রদেশটির গভর্নর নুবিয়া ক্যারোলিনা কর্দোবা-কুরি জানিয়েছেন, রাজধানী কুইবদোতে প্রাণহানি, বহু মানুষ আহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে বাসিন্দাদের পরাঘাত বা আফটারশকের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লা দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিন পরই এ শক্তিশালী ভূমিকম্পে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে তার প্রশাসন। এর আগে গত জুনে প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলায় দুটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছিল। সূত্র: এপি, রয়টার্স 
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

Tuesday, July 21, 2026

দুই দশক ক্ষমতায় থাকায় পর ঘোষণা দিলেন ‘আর কোনো নির্বাচন হবে না’ -নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্ট ওর্তেগা

নিকারাগুয়ার দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা ঘোষণা দিয়েছেন, দেশটিতে আর কোনো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। তার এ ঘোষণার ফলে ক্ষমতা পরিবর্তনের সাংবিধানিক পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রোববার (১৯ জুলাই) সান্দিনিস্তা বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে ওর্তেগা বলেন, বিরোধীদের আর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে কীভাবে নির্বাচন ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

৮০ বছর বয়সী ওর্তেগা বলেন, ‘সরকার দখল বা ক্ষমতা দখলের জন্য এখানে আর কোনো নির্বাচন হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত দল এবং সোমোসা-সমর্থকদের আবার ক্ষমতায় ফেরার দিন শেষ। আর কখনো নয়।’

উল্লেখ্য, ওর্তেগা ২০০৭ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় রয়েছেন। এর আগে ১৯৮০-এর দশকেও তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বর্তমানে তিনি স্ত্রী রোসারিও মুরিলোর সঙ্গে যৌথভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।

২০২১ সালের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই নির্বাচনের আগে ওর্তেগা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী নেতা, সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার এবং ভিন্নমত দমন করার অভিযোগ ওঠে।

গত বছর সংবিধান সংশোধনীতে তার স্ত্রী রোসারিও মুরিলোকে ‘সহ-রাষ্ট্রপতি’ করা হয় এবং প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ছয় বছরে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে দম্পতিটি সরকার, সশস্ত্র বাহিনী ও বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা। ছবি: সংগৃহীত
নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা। ছবি: সংগৃহীত

Friday, June 26, 2026

‘মনে হচ্ছিল কোনো ভৌতিক সিনেমার দৃশ্য’

‘নিচে নেমে মনে হচ্ছিল যেন কোনো ভৌতিক সিনেমার দৃশ্য দেখছি। চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। সেগুলো টপকে কোনোমতে বেরিয়ে আসতে হয়েছে’—ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর রাজধানী কারাকাসে ধসে পড়া একটি ভবনের পাশের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা এভাবেই সেই মুহূর্তের কথা বর্ণনা করছিলেন।

গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় এক মিনিটের কম সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫–এ দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথমে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প কারাকাসের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে আঘাত হানে। এর ১ মিনিটের কম সময়ে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়।

ইউএসজিএসের পূর্বাভাস বলছে, হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার হতে পারে। মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে ছুটছেন উদ্ধারকর্মীরা। অনেকে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে সাহায্য চাইছেন। কয়েকজন জীবিত ব্যক্তিকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপ টপকে আমাদের বের হতে হয়েছে। আমাদের ভবনের তত্ত্বাবধায়ক তাঁর শিশুকে নিয়ে এবং অন্য প্রতিবেশীরা আতঙ্কে নিচে নেমে এসেছিলেন। কিন্তু ধসে পড়া ওই ভবন থেকে আমি শুধু একটি পরিবারকেই বের হতে দেখেছি।’

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘অনেক ভবন ধসে পড়েছে। যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য অত্যন্ত জোরাল অভিযান চলছে। এটি সত্যিকারের একটি ট্র্যাজেডি।’

ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে চালু করা একটি ওয়েবসাইটে স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার রাত দুইটার কিছু পর পর্যন্ত ৬ হাজার ৬০০–এর বেশি মানুষ নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

জাতীয় ছুটির দিনে বিকেলে ভূমিকম্প দুটি আঘাত হানায় অনেক মানুষ তখন বাড়িঘরে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলে ছিলেন।

পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্তিনেজ বলেন, ‘খুব জোরে একটা বিকট শব্দ হয়। ঘরের জিনিসপত্র সব পড়ে যেতে থাকে। জীবনে এমন কিছু কখনো দেখিনি।’

পশ্চিম কারাকাসের বাসিন্দা ৪১ বছর বয়সী অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, ‘কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই সিঁড়ি বেয়ে নিচে দৌড়াতে শুরু করে।’

দক্ষিণ কারাকাসের ৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরো বলেন, পুলিশ তাঁকে বাড়ি থেকে বের হতে সহায়তা করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘এই ভূমিকম্প ছিল ভয়াবহ; এমনকি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও।’

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মাইকেতিয়া বিমানবন্দর থেকে ভিডিও বার্তায় সাবেক আইনপ্রণেতা উইলমের আজুয়াহে বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। শক্তিশালী ভূমিকম্পে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।’

কারাকাসের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী হুয়ান অর্তিজ বলেন, ‘আমি হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারা গেছে। আরেকজন ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন। উপকূলীয় এলাকায় আমার পরিচিত আরও প্রায় ২০ জন নিখোঁজ।’

ভূমিকম্পের পর এ পর্যন্ত একের পর এক অন্তত ৩০টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে।

দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারীরা ভেনেজুয়েলায় আসছেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কয়েকজন বিদেশি নেতাকে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় যে দুটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে, তা ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম।’

কারাকাসের হাসপাতালগুলোয় আহত মানুষের চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও কর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র নিরূপণে কর্তৃপক্ষ সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, এল সালভাদর, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ব্রাজিল, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশ ভেনেজুয়েলাকে সহায়তা ও সংহতির বার্তা দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার লা গুয়ারায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে আগুন ধরে যায়
ভেনেজুয়েলার লা গুয়ারায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে আগুন ধরে যায়। ছবি: রয়টার্স

Monday, June 1, 2026

সামুদ্রিক প্রাণীর সঙ্গে মানুষের অন্যরকম সখ্যতা

কথায় আছে ভালোবাসার মায়ায় কে না বন্দি হয়। ভালোবাসা পেলে পাথরও মোমে পরিণত হয়। ঠিক তেমনই এক মন কাড়া দৃশ্যের দেখা মিলেছে চিলির সমুদ্রসৈকতে। রদ্রিগো সেপেদা নামের এক বন্দরকর্মীর সামুদ্রিক প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার দৃশ্য ইন্টারনেটে বেশ সাড়া ফেলেছে। যেখানে দেখা যায়, তিনি চিলির উত্তরাঞ্চলের মেজিলোনেস সৈকতে মাছ ধরার বন্দরে সমুদ্রের সিংহ নামে পরিচিত সিল মাছকে খাওয়াচ্ছেন এবং আদর করছেন পরম মমতার সাথে।

সামুদ্রিক প্রাণীর সঙ্গে সেপেদার ভিন্ন রকম এ ভালোবাসা গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক করুণ ঘটনা। তিনি বলেন, একটি সিল মাছকে হত্যা করার জন্য ইস্পাতের তার দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। পরে তিনি সেটিকে উদ্ধার করে সমুদ্রে ছেড়ে দেন। কিন্তু মাছটি তাকে ছেড়ে সমুদ্রের গহিনে চলে যায়নি, বরং তীরেই রয়ে যায়। এক সময় মাছটির মায়ায় জড়িয়ে যায় রদ্রিগো। দিয়েছেন একটু সুন্দর নামও।

রদ্রিগো বলেন, মাছটিকে খাওয়াতে শুরু করলাম, যত্ন নিতে লাগলাম। প্রতিদিন সকাল ৯টার সময় সৈকতে আসার আগ পর্যন্ত সিল মাছটি তার জন্য অপেক্ষায় থাকত। তবে মাঝে মধ্যে সিল মাছটি লম্বা সময়ের জন্য সমুদ্রে চলে যেত। তখন তাকে না দেখলে চোখে জল আসত। নিজের পোষা প্রাণীকে হারালে যেমনটা হয়, ঠিক তার ক্ষেত্রেও তেমনটা অনুভূতি তৈরি হয়েছে। তিনি মাছটির নাম রেখেছেন কাবেসিতা। এই নামে ডাকলেই মাছটি তার কাছে ছুটে আসে এবং সাড়া দেয়।

রদ্রিগো আরও বলেন, এই প্রাণীগুলো খুব একটা শান্ত নয়। কারণ তাদের কাছে মানুষ মানেই শত্রু, তাই তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটা আগে থেকে বলা যায় না। তবে সেপেদা আশা করছেন তার কাবেসিতার সঙ্গে যে বন্ধন তৈরি হয়েছে তা মানুষকে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল হতে অনুপ্রাণিত করবে।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির উপকূলজুড়ে সিল মাছের ব্যাপক বিচরণ রয়েছে। যা পেরু থেকে শুরু করে মহাদেশটির দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। ধারণা করা হয়, চিলিতে সিল মাছের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার। 

ছবি : সংগৃহীত

Thursday, April 30, 2026

কেন লাতিন আমেরিকান এত নেতা আইনি জটিলতায়?

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জায়ের বোলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচন উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২৭ বছরের বেশি কারাদণ্ডের শাস্তি পেয়েছেন। আইনি জটিলতায় পড়া লাতিন আমেরিকার প্রথম নেতা তিনি নন। পেরুতে বর্তমানে কমপক্ষে চারজন সাবেক প্রেসিডেন্ট লিমার বারবাদিলো কারাগারে বন্দি। কলোম্বিয়ায় সম্প্রতি সাবেক প্রেসিডেন্ট আলভারো উরিবে সাক্ষী প্রভাবিত করা ও বিচারিক প্রক্রিয়া ভাঙচুরের অভিযোগে ১২ বছরের গৃহবন্দির সাজা পেয়েছেন। তবে এই সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তিনি।

এ খবর দিয়ে অনলাইন সিএনএন বলছে, আসলে লাতিন আমেরিকার প্রায় দেশেই কমপক্ষে একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারিক তদন্তের মুখোমুখি। ব্যতিক্রম মাত্র একটি দেশ। ইকুয়েডরে ১৯৯৬ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিজন প্রেসিডেন্ট (মোট আটজন) আইনি তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। রাফায়েল কোরেয়া ঘুষকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হয়ে বর্তমানে বেলজিয়ামে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। পেরুতে নতুন শতাব্দীর শুরু থেকে সাতজন প্রেসিডেন্ট দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিচার বা তদন্তের সম্মুখীন। পুলিশ গ্রেপ্তার করতে গেলে অষ্টমজন আত্মহত্যা করেন। আর্জেন্টিনা, গুয়াতেমালা, মেক্সিকো ও এল সালভাদর- প্রতিটি দেশে পাঁচজন সাবেক প্রেসিডেন্ট আইনি ঝামেলায় পড়েছেন। আর্জেন্টিনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ দে কির্চনার ২০২২ সালে প্রতারণার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে গৃহবন্দি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ। ব্রাজিল, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে ও কোস্টারিকা- প্রতিটি দেশে চারজন সাবেক নেতা আইনি তদন্তের মুখে পড়েছেন। পানামা ও হন্ডুরাসে এ সংখ্যা তিনজন করে। নিকারাগুয়া, হাইতি, ডোমিনিকান রিপাবলিক, ভেনিজুয়েলা, চিলি ও কলোম্বিয়ার প্রতিটি দেশে কমপক্ষে একজন করে প্রেসিডেন্ট আইনি তদন্তের মুখে।

একমাত্র ব্যতিক্রম উরুগুয়ে: উরুগুয়ের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এ পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি, কারও বিরুদ্ধে উন্মুক্ত তদন্তও হয়নি। বরং দেশটি গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে শীর্ষে। দ্য ইকোনমিস্ট ডেমোক্রেসি ইনডেক্স ২০২৪ এ উরুগুয়ে বিশ্বে ১৫তম এবং এ অঞ্চলের একমাত্র ‘পূর্ণ গণতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উরুগুয়ের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যানজেল আরেয়ানো বলেন, এর পেছনে রয়েছে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি’। মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, সাধারণ বাড়িতে বসবাস এবং বিলাসী সুবিধার অভাব এ সংস্কৃতির অংশ।
উরুগুয়ে ছাড়া বাকি লাতিন আমেরিকায় নেতাদের আইনি জটিলতার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন- দুর্নীতি ও ঘুষকাণ্ড, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রেসিডেন্ট-কেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার দেশগুলো গড়ে ১০০ এর মধ্যে মাত্র ৪২ পয়েন্ট পেয়েছে। যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় ২২ পয়েন্ট কম। আরেয়ানোর মতে, লাতিন আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণ দুর্নীতির বড় কারণ।
গবেষকরা বলছেন, ১৯৮০-এর দশকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের পর থেকে সাবেক প্রেসিডেন্টদের বিচারের প্রবণতা বেড়েছে। আর্জেন্টিনার অধ্যাপক ক্যাটালিনা স্মুলোভিত্জের মতে, দুর্নীতি নিয়ে জনসচেতনতা আগে কম থাকায় আগের তুলনায় এখন মামলার সংখ্যা বেড়েছে নাকি নজরদারি বেড়েছে-তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ল’ফেয়ার বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মামলার ফাঁদে ফেলার প্রবণতাও বাড়ছে। এতে জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।

লাতিন আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট পদে থেকে দুর্নীতির সুযোগ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অধিকাংশ নেতা আইনি জটিলতায় জড়ান। তবে উরুগুয়ে প্রমাণ করেছে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকলে ব্যতিক্রম হওয়া সম্ভব।

mzamin

Sunday, February 22, 2026

ট্রাম্পের চাপের মধ্যে ভেনেজুয়েলা, নতুন প্রেসিডেন্টের কৌশল কি

প্রকাশ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ জানুয়ারিতে কারাকাসের আকাশে নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের আলোকিত প্রোফাইল দেখানো হয়। সরকারের আয়োজন করা ড্রোন শোতে শত শত ড্রোনের স্থির আলো তাদের চিত্রকে মেঘের সামনে স্থির রাখে। তারপর পুনর্বিন্যস্ত হয়ে পুনরায় তাদের প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানায়: ‘জনতা তাদের ফেরার প্রত্যাশায়’।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঝটিকা অভিযানের পর ৩রা জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে দেশ থেকে তুলে নিয়ে যায় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ভেনেজুয়েলা তখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং এখনকার কার্যনির্বাহী লিডার ডেলসি রদ্রিগেজ নতুন করে মাদুরো ও ফ্লোরেসের প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানালেও, এমন কোনো চিহ্ন নেই যে তাদেরকে ফেরত দেয়া হবে। মাদুরো ও তার স্ত্রী এখন নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বিচার অপেক্ষায় রয়েছেন। ড্রাগ ট্রাফিকিংসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তারপরও মাদুরোর অনুগত রদ্রিগেজ একটি জটিল ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য: তার সমাজতান্ত্রিক ভিত্তিকে ধরে রাখতে মাদুরোকে সমর্থন করে থাকে এবং একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মধ্যে নীতি পরিবর্তন করে, যেহেতু না মানলে তার ভাগ্যও মাদুরোর মতো হতে পারে।

চাতাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ল্যাটিন আমেরিকা সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ক্রিস্টোফার সাবাতিনি বলেন, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভেনেজুয়েলা এখন মার্কিন প্রোটেক্টরেট। তাই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছায় কাজ করছেন। তার বিরুদ্ধেও তদন্ত হচ্ছে। এ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হননি, ইন্ডিক্টমেন্ট বা বাউন্টি নেই। তবে হুমকি সবসময় আছেই। হুমকি হলো, ‘আমাদের কাছে আপনার বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে।’

রদ্রিগেজ এখন কূটনৈতিক একটি তীব্র ভারসাম্য ধরে রেখেছেন। তার প্রথম বক্তব্যে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট মাদুরো ইতিমধ্যেই এরকম আক্রমণের সতর্কতা দিয়েছিলেন। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও আগ্রহ আছে। তবে পরে ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, কারাকাস ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে এবং তিনি সেই অর্থ পরিচালনা করবেন।

১৬ জানুয়ারি জাতীয় পরিষদে তার প্রথম ভাষণে রদ্রিগেজ ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণের’ সমালোচনা করেন। একই দিনে তিনি সিআইএ ডিরেক্টর জন রাটক্লিফের সঙ্গে কারাকাসে সাক্ষাৎ করেন। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বিশ্লেষক কারমেন বিয়াট্রিজ ফার্নান্দেজ বলেন, রদ্রিগেজের বৈধতা মার্কিন সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করছে। এটি টিকে থাকবে যদি ট্রাম্প চায়। তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন না। একটি বড় প্রশ্ন হলো, রদ্রিগেজ কতক্ষণ ভেনেজুয়েলার বামপন্থী এবং মার্কিন প্রশাসন উভয়ের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারবে? আর যদি তাকে বেছে নিতে হয়, কতটা কঠিন হবে তা, নাকি একপক্ষ সুস্পষ্টভাবে ক্ষমতাশালী?

ট্রাম্পের চাপের মধ্যে ভেনেজুয়েলা, নতুন প্রেসিডেন্টের কৌশল কি

Saturday, February 21, 2026

মেক্সিকোতে এক দশকে গুমের ঘটনা বেড়েছে ২০০ শতাংশ

লাতিন আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতে গত দশ বছরে গুমের ঘটনা ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দেশটির পাবলিক পলিসি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ‘মেক্সিকো ইভালু’। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশটিতে গুমের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য একটি অংশ তরুণ। এ খবর দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান

এতে বলা হয়, ২০২২ সালের আগস্টের এক উজ্জ্বল সকালে ৩১ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক অ্যাঞ্জেল মন্টেনেগ্রোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মেক্সিকোর কুয়াউতলা শহরে সারারাত বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর তিনি কুয়ের্নাভাকায় ফেরার জন্য বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিলেন। সকাল ১০টার দিকে একটি সাদা ভ্যান এসে থামে। কয়েকজন ব্যক্তি নেমে তাকে ও তার এক সহকর্মীকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। কিছু দূর গিয়ে সহকর্মীকে ছেড়ে দেয়া হলেও মন্টেনেগ্রোকে আর পাওয়া যায়নি।

খবর পেয়ে তার মা প্যাট্রিসিয়া গার্সিয়া দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে পাওয়া যায় শুধু তার ছেলের একটি ক্যাপ ও এক পাটি জুতা। তিন বছরের বেশি সময় ধরে তিনি ছেলেকে খুঁজে ফিরছেন। গার্সিয়া বলেন, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে হতাশা শুরু হয়।

মন্টেনেগ্রো মেক্সিকোর ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি নিখোঁজ বা গুম হওয়া মানুষের একজন। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরেই গুমের সংকট চলছে। জননীতি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান গল্কীরপড় ঊাধষúধ–র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে দেশে গুমের ঘটনা ২০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

মেক্সিকো ইভালুর নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরমান্দো ভার্গাস বলেন, এটি জাতীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া সমস্যা। তার মতে, গত এক দশকে অপরাধী চক্রগুলোর দেশজুড়ে বিস্তার এবং মাদক পাচারের বাইরে নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়াই গুম বৃদ্ধির বড় কারণ।

অপরাধী গোষ্ঠীগুলো নতুন সদস্য সংগ্রহে জোরপূর্বক নিয়োগ করছে এবং নতুন এলাকা দখলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ‘নিশ্চিহ্ন’ করছে। সরাসরি হত্যা করলে নজরদারি বাড়ে বলে অনেক ক্ষেত্রে তারা লাশ গোপন কবরস্থানে পুঁতে ফেলে, পুড়িয়ে ফেলে বা অ্যাসিডে গলিয়ে দেয়। এভাবে লাশ গুম করে সহিংসতাকে ‘অদৃশ্য’ করে ফেলা হয় বলে মন্তব্য করেন ভার্গাস।

এদিকে মেক্সিকো সরকার অপরাধী চক্রগুলোর বিস্তার ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। ২০১৮ সালে সরকার নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে একটি জাতীয় অনুসন্ধান কমিশন গঠন করে এবং একটি উন্মুক্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করে। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাদোর নিখোঁজের তালিকা পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেন এবং সংখ্যা কমিয়ে ১২ হাজার ৩৭৭ দেখান। এতে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমকে প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তা খারিজ করে বলেন, আগের প্ল্যাটফর্মে অনেক সমস্যা ছিল এবং সরকার নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিবন্ধিত গুমের সংখ্যাও প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম হতে পারে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মেক্সিকোতে ৯৬ শতাংশের বেশি অপরাধের কোনো সমাধান হয়নি।

সরকারি উদ্যোগের ঘাটতির কারণে গার্সিয়ার মতো বহু মা নিজেরাই খোঁজে নেমেছেন। তিনি ১২ নারীর একটি দলে যুক্ত হয়ে নিয়মিত বিভিন্ন এলাকায় ধাতব রড দিয়ে মাটি খুঁড়ে সম্ভাব্য গণকবরের সন্ধান করেন। মন্টেনেগ্রোর ফোনের শেষ সিগন্যালের সূত্র ধরে তারা কুয়াউতলার উপকণ্ঠের একটি মাঠে ছয়টি লাশ পান। কিন্তু এখনও তার ছেলের খোঁজ মেলেনি।

মেক্সিকোতে এক দশকে গুমের ঘটনা বেড়েছে ২০০ শতাংশ

Saturday, February 14, 2026

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনে লাভ হবে পুতিনের by লিওনিদ রাগোজিন

ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে হুমকি বাড়ানোকে সহজেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু বিষয়টি এতটাই বড় সংঘাতের সঙ্গে জড়িত যে একে সীমিত প্রভাবের আঞ্চলিক ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইউক্রেনের মতোই ভেনেজুয়েলা এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এর মানে এই নয় যে বিশ্ব নিশ্চিতভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। যদিও সেই আশঙ্কা সব সময়ই থাকে। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রধান দুই চরিত্র ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন এখন সংঘাতের চেয়ে পারস্পরিক লাভজনক লেনদেনের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। তাই বৈশ্বিক যুদ্ধের চেয়ে বৈশ্বিক সমঝোতার সম্ভাবনাই এখন বেশি মনে হয়।

ভেনেজুয়েলা কোনো বড় শক্তি নয়। তবু দেশটি বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি চীন, ইরান ও রাশিয়ার রাজনৈতিক মিত্র। এই দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। এই তিন দেশের মধ্যে ভেনেজুয়েলা প্রশ্নে সবচেয়ে জটিল অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ক্রেমলিনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তবে এর মধ্যেই কিছু সম্ভাব্য লাভও আছে। ২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরতেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের পরিস্থিতি হঠাৎ একধরনের অংশীদারত্বে ফিরে যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তারা প্রায় নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়। তবে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া চালু রাখে। জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সর্বশেষ সংস্করণে যুক্তরাষ্ট্র ‘সরাসরি হুমকি’ তালিকা থেকে রাশিয়ার নামও বাদ দেয়। ট্রাম্পের উদ্যোগে ইউক্রেন নিয়ে শান্তি আলোচনা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পুতিনের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে যুদ্ধটি তাঁর শর্তেই শেষের দিকে যাচ্ছে।

এই সবকিছু বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, ভেনেজুয়েলার মতো দূরের এবং রাশিয়ার মূল স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন বিষয় নিয়ে ক্রেমলিন এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে না । রাশিয়া কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ লাতিন আমেরিকান সরকারকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠবে না। ভেনেজুয়েলার প্রতি রাশিয়ার সমর্থন সব সময়ই ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর কতটা চাপ দিচ্ছে, তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত থাকবে।

নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সম্ভাব্য পতন ক্রেমলিনের জন্য পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের শাসন পরিবর্তনের নেশার কারণে যেসব দেশে রাশিয়ার ঐতিহ্যগত মিত্ররা ক্ষমতা হারিয়েছে, সেখানে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রাশিয়ার আছে। এখানে একটি নির্দয় রাজনৈতিক হিসেবেও কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালায়, তাহলে সেই পদক্ষেপ থেকে পাওয়া ভূরাজনৈতিক লাভ সম্ভাব্য ক্ষতির চেয়েও বেশি হতে পারে রাশিয়ার। কারণ, এতে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রশ্নে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র নৈতিকভাবে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ‘নিজস্ব উঠানে’ সামরিক শক্তি দিয়ে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে, তাহলে রাশিয়া কেন নিজের অঞ্চলে একই কাজ করতে পারবে না?

সাধারণভাবে রাশিয়ানরা নিজেদের পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে দেখে। তারা নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিতে চূড়ান্ত রক্ষণশীল মনে করে। তাদের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব একটি সংশোধনবাদী শক্তি, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার জন্য দায়ী। ইউক্রেন যুদ্ধকে তারা সেই সংশোধনবাদ ঠেকানোর একটি উপায় হিসেবে দেখে। তবে তাদের যুক্তি হলো যদি পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই না থাকে, আর তার জন্য পশ্চিমাই দায়ী হয়, তাহলে নতুন একটি ব্যবস্থার জন্য দর–কষাকষি করা যাক।

এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার পশ্চিম গোলার্ধে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করবে, আর রাশিয়া সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলগুলোতে নিজের প্রভাব বজায় রাখবে। রাশিয়ার জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ভেনেজুয়েলায় জড়িয়ে পড়ে। তবে মাদুরো দ্রুত ক্ষমতা হারালেও সেটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। সবকিছু স্থির হওয়ার পর পরিস্থিতি হয়তো একধরনের লেনদেনের মতো দেখাবে। যেমন রাশিয়ার শর্তে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী একটি ভেনেজুয়েলা।

* লিওনিদ রাগোজিন, রিগাভিত্তিক একজন সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তারে অনূদিত

ভেনেজুয়েলা এখন পরাশক্তিগুলোর দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে
ভেনেজুয়েলা এখন পরাশক্তিগুলোর দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ছবি: রয়টার্স

Saturday, January 24, 2026

মাচাদোকে পরিকল্পনা করেই নির্বাসনে পাঠিয়েছেন ট্রাম্প! by পিওতর এইচ কোসিকি

‘স্বাধীনতার সেই ঘণ্টা বেজে উঠেছে’—৩ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এমন ঘোষণাই দিয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ঠিক সেই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ধরে নিয়ে নিউইয়র্কের পথে ছিল মার্কিন বাহিনী। তবে মাচাদোর সেই উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে যায়। কারণ, কিছু পরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলার শাসনক্ষমতা গণতান্ত্রিক শক্তির হাতে দেওয়া হবে না; বরং তাঁর প্রশাসনই দেশটি চালাবে।

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার ভেতরে এবং প্রবাসী ভেনেজুয়েলানদের মধ্যে আনন্দের জায়গায় নেয় আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে মাচাদোর বৈঠকও সেই ধোঁয়াশা কাটাতে পারেনি। এখন প্রশ্ন একটাই—ভেনেজুয়েলার মানুষের বহুদিনের স্বাধীনতার স্বপ্নের কী হবে? যে গণতান্ত্রিক অধিকার ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকৃত বিজয়ী এদমুন্দো গোনসালেসের কাছ থেকে মাদুরো কেড়ে নিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কি তা ফিরিয়ে দেবে?

মাচাদো এ মাসের শুরুতে আমেরিকানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমাদের একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আছেন। জনগণ যে দায়িত্ব আমাদের দিয়েছে, তা পালনে আমরা প্রস্তুত।’ কয়েক দিনের মধ্যেই ভ্যাটিকানও তার সমর্থনের বার্তা দেয়। পোপ লিও চতুর্দশের সঙ্গে মাচাদোর একটি পূর্বঘোষণাহীন ব্যক্তিগত সাক্ষাতের ছবি তখন প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু কারাকাসে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রায় দুই সপ্তাহ পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রকে পাশে সরিয়ে রেখে ‘শাসন-ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গোনসালেসকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল ভেনেজুয়েলার মানুষ। তবু ট্রাম্প সেই গণরায় উপেক্ষা করতেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমনকি মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কারও ট্রাম্পকে তাঁর বৈধতা মানতে রাজি করাতে পারেনি। বরং সেটিকে তিনি ব্যক্তিগত অপমান হিসেবেই দেখেছেন বলে মনে হয়।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, ‘তিনি (মাচাদো) যদি পুরস্কারটি ফিরিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে আমি এটি নিতে পারি না’, তাহলে আজ তিনিই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হতেন।’ এই মন্তব্য ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবেই মাচাদোকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছে, যাতে মাদুরোকে অপসারণের পথে তিনি কোনো জটিলতা তৈরি করতে না পারেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই তিনি দেশ ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিলেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সিআইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী চাভেজপন্থী নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার বিরোধীরা টিকে থাকতে পারবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও–ও একই সুরে বলেছেন—মাচাদো ‘অসাধারণ’ হলেও বাস্তবতা হলো, ‘বিরোধীদের বড় অংশ এখন আর ভেনেজুয়েলার ভেতরে নেই।’ তাঁর ভাষায়, এখন প্রশাসনের দৃষ্টি ‘স্বল্পমেয়াদি জরুরি বিষয়’-এর দিকে।

রুবিওর তিন ধাপের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো ‘স্থিতিশীলতা’, যার মেয়াদ কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস। এই সময়ে দেশটি শাসন করবেন মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস। কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণের কোনো অঙ্গীকার তিনি করেননি। উপরন্তু মাদুরোর গোপন পুলিশপ্রধান দিয়োসদাদো কাবেয়ো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেসের ক্ষমতার ছায়ায় তাঁর নিজেরই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ট্রাম্পের ‘পুতুল’ হিসেবে তাঁর অবস্থানও স্বভাবতই ভঙ্গুর।

এই পরিস্থিতিকে কারাকাস ক্রনিকলস যথার্থই ‘স্থবির উত্তরণ’ বলে অভিহিত করেছে। মাচাদো যদিও বলেছেন, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ‘খুব ভালো’ হয়েছে, তবু বাস্তব চিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।

ট্রাম্পকে তুষ্ট করতে গিয়ে ১৫ জানুয়ারির সেই বৈঠকে তিনি তাঁকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারও উপহার দেন। ট্রাম্প খুব আগ্রহভরে তা গ্রহণও করেন। তবে যদিও নোবেল কমিটি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—এই পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়। কিন্তু তোষামোদ দিয়ে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। ট্রাম্প মাচাদোকে সমর্থন করেন না, কারণ তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী; ট্রাম্পের তেলকেন্দ্রিক পরিকল্পনায় নয়।

ভেনেজুয়েলার বিরোধীদের এখন আর ট্রাম্পের অহংকারী মাথায় হাত বুলিয়ে চলার সুযোগ নেই। গত দুই বছরে দেশ-বিদেশের ভেনেজুয়েলানদের সংগঠিত করেই মাচাদো নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। রাজনৈতিক উত্তরণে নিজেদের কণ্ঠস্বর টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁকে সেই পথেই আবার ফিরতে হবে। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, সারা দেশে প্রতিবাদ সংগঠিত করার ক্ষমতাই মাচাদোর হাতে থাকা ‘একমাত্র অস্ত্র’।

মাচাদো একজন ধর্মভীরু রোমান ক্যাথলিক। তিনি জানেন, ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজ গড়ে উঠেছে মূলত খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রের নৈতিকতা ও সংগঠনী শক্তির ওপর। মাচাদো ও ট্রাম্পের মূল্যবোধ (নৈতিক হোক বা রাজনৈতিক) কখনোই এক পথে আসবে না। তাই ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রীকে ফিরতে হবে সেই কৌশলে, যেটি তাঁকে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছিল। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর সামনে এখন শেষ সুযোগ—নিজেদের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনে অর্থবহ ভূমিকা নিশ্চিত করা।

* পিওতর এইচ কোসিকি, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড-এর ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ছবি: রয়টার্স

Thursday, January 15, 2026

বিশ্বের কোথায় সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলান অভিবাসন?

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ৩ জানুয়ারি অপহরণের ঘটনার পর দেশটির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রতিবেশী দেশগুলো। কলম্বিয়া ও পেরুসহ যেসব দেশে বিপুল সংখ্যক ভেনেজুয়েলান বসবাস করছেন, তারা নতুন করে শরণার্থীর ঢল নামার সতর্কতা দিয়েছে।

আল জাজিরার এক ভিজ্যুয়াল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ভেনেজুয়েলানের সংখ্যা কমপক্ষে ৭৯ লাখ। প্রায় এক দশক ধরে চলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।

কোন কোন দেশে সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলার নাগরিক?
ভেনেজুয়েলা থেকে অভিবাসনের সূচনা হয় ১৯৯৯ সালে বামপন্থী নেতা হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসার পর। সে সময় মূলত পেশাজীবীদের একটি ছোট অংশ দেশ ছাড়ে। শাভেজ দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তেলখাতের আয় ব্যবহার করে সরকারি ব্যয় বাড়ান এবং কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে তুলে আনেন।
২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় এসে উচ্চ ঋণ ও বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির ভার বহন করেন। ২০১৪ সালে তেলের দাম ধসে পড়লে অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়ে। গভীর মন্দা ও লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ করে তোলে। এর ফলেই লক্ষাধিক মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, যাদের বড় অংশ দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানায়, জুন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলান শরণার্থী ও অভিবাসী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৬৭ লাখ বা ৮৫ শতাংশ লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থান করছে। সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলান আশ্রয় নিয়েছে কলম্বিয়ায়- যার সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ।

কী ধরনের সুরক্ষা পাচ্ছেন ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা?
মানবিক সংকটের কারণে ইউএনএইচসিআর ভেনেজুয়েলানদের একটি বিশেষ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর ফলে তারা স্বাগতিক দেশগুলোতে আইনি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়সহ মৌলিক সুবিধা পেতে পারেন।

কলম্বিয়ায় ‘টেম্পোরারি প্রোটেকশন স্ট্যাটিউট’-এর আওতায় ভেনেজুয়েলানদের ১০ বছরের আবাসিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলানদের জন্য দেয়া টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) প্রত্যাহার করে নেয়। এতে ছয় লাখের বেশি ভেনেজুয়েলানের বসবাস ও কাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একই সময়ে শত শত ভেনেজুয়েলানকে বহিষ্কার করা হয়, যাদের কয়েকজনকে এল সালভাদরের কুখ্যাত কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সেখানে অনেকেই নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, দেশত্যাগী ভেনেজুয়েলানদের প্রায় অর্ধেক অনানুষ্ঠানিক ও কম মজুরির কাজে নিয়োজিত। ৪২ শতাংশ পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং ২৩ শতাংশ গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।

ভেনেজুয়েলার পাসপোর্ট কতটা শক্তিশালী?
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার পাসপোর্ট এখনও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ২০২৬ সালের পাসপোর্ট সূচকে এটি ৪২তম অবস্থানে রয়েছে। এই পাসপোর্টধারীরা ১২৪টি দেশে ভিসামুক্ত, ভিসা-অন-অ্যারাইভাল বা ই-ভিসার সুবিধা পান।

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে শেনজেন অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ভিসা অব্যাহতি চুক্তি রয়েছে। যার ফলে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে ৯০ দিন পর্যন্ত ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করা যায়। পাশাপাশি আঞ্চলিক চলাচল চুক্তির কারণে দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশে ভেনেজুয়েলানরা প্রবেশ ও কাজ করার সুযোগ পান।
(আল জাজিরা থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত)

mzamin

Friday, January 9, 2026

অধিকাংশ আমেরিকান ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের পদক্ষেপ সমর্থন করে না

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপঃ সফল অভিযানের মাধ্যমে সপ্তাহের শুরুতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের মধ্যদিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনীতির নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এর মাধ্যমে রিপাবলিকানদের সমর্থন পেলেও বেশির ভাগ আমেরিকান তার এমন সাম্রাজ্যবাদী পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে।

সোমবার প্রকাশিত দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফল বলছে ট্রাম্পের বিদেশনীতি নিয়ে আমেরিকার জনগণের বিভক্তি তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় হামলা ও মাদুরোকে আটকের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পদক্ষেপ যাচাই করতে ওয়াশিংটন পোস্ট এক হাজার আমেরিকানের ওপর জরিপ চালায়। এসব আমেরিকানদের জবাবের ভিত্তিতেই জরিপটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী এই সংবাদমাধ্যম।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট প্রকাশিত জরিপটিকে প্রথম মানসম্মত জরিপ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। জরিপে দেখা যায়, ৪০ শতাংশ ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান সমর্থন করলেও এর বিরোধিতা করেছেন ৪২ শতাংশ আমেরিকান। অর্থাৎ জনমত প্রায় সমান ভাগে বিভক্ত। রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে সমর্থন তুলনামূলক বেশি হলেও সামগ্রিকভাবে এটিকে জনপ্রিয় বলা যাচ্ছে না।

এই ফলাফল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো, কারণ অভিযানের আগে নেয়া জরিপগুলোতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে ছিল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির জরিপে ৬৩ শতাংশ এবং সিবিএস নিউজ-বিডিএমএফ জরিপে ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে লক্ষ্য করে সীমিত অভিযানের কারণে কিছু মানুষের সমর্থন বেড়েছে। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ নয় বরং একজন অজনপ্রিয় শাসককে আটক করার বিষয়টি জনমনে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।
পাশাপাশি, দলীয় আনুগত্যও ভূমিকা রেখেছে। অভিযানের পর রিপাবলিকানদের মধ্যে সমর্থন বেড়ে ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে অভিযানের আগে তা ছিল ৫২-৫৮ শতাংশের মধ্যে। স্বাধীন ভোটারদের সমর্থন তুলনামূলক কম। মাত্র ৩৪ শতাংশ।
ইতিহাস বলছে- এ ধরনের সামরিক অভিযানের শুরুতে সাধারণত ব্যাপক জনসমর্থন দেখা যায়। ১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে তখন ৮০ শতাংশ আমেরিকান সমর্থন জানিয়েছিলেন।

গ্রানাডা (১৯৮৩), আফগানিস্তান (২০০১) ও ইরাক (২০০৩) অভিযানের ক্ষেত্রেও শুরুতে সমর্থন ছিল প্রবল। সে তুলনায় ভেনেজুয়েলা অভিযান শুরুর দিকেই মাঝারি সমর্থন পাওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা শাসনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার ও তেলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার ইঙ্গিত জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।
জরিপগুলো দেখাচ্ছে, বেশির ভাগ আমেরিকান এখন বিদেশনীতি নয় বরং দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক সমস্যা, মূল্যস্ফীতি ও ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ আমেরিকান চান যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে কম জড়াক। এপি-এনওআরসি জরিপে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে বিদেশনীতি ছিল তালিকার একেবারে নিচে।
এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও অভিযানের প্রতি ‘দৃঢ় সমর্থন’ সীমিত। ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপে মাত্র ৪৫ শতাংশ রিপাবলিকান জোরালোভাবে এই অভিযান সমর্থন করেছেন।

রাজনৈতিকভাবে জনসমর্থন সীমিত হলেও এই অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের বার্তা দিতে পেরেছেন। প্রশাসনের ভাষায়, এটি শক্তি প্রদর্শনের একটি বড় পদক্ষেপ। তবে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি জড়িত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
একই সঙ্গে এই অভিযান ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট নীতি’ জোটের ভেতর বিভাজন বাড়াতে পারে। হস্তক্ষেপবিরোধী রিপাবলিকান নেতা ও প্রভাবশালীরা ইতিমধ্যে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। তাদের আশঙ্কা ভেনেজুয়েলায় গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে আটকে যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় অভিযান ট্রাম্প প্রশাসনকে রিপাবলিকানদের বাহবা পাইয়ে দিলেও জরিপ বলছে- আমেরিকান জনমত এমন সাম্রাজ্যবাদী বিদেশনীতির বিপক্ষে।

সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে,  ভেনেজুয়েলা অভিযান কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ‘ডনরো ডকট্রিন’ শব্দটি ব্যবহার করে ট্রাম্প কার্যত ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে আবারো একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সমপ্রতি প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও হুমকি, চাপ ও সামরিক শক্তির ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত প্রতীকী ছবিতে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাম্পের হাতে ‘ডনরো ডকট্রিন’ লেখা ব্যাট- এই কৌশলকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একজন অবাধ্য বিদেশি নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের শক্তি প্রদর্শন। এর মাধ্যমে শুধু ভেনেজুয়েলাকেই নয় বরং অন্য দেশগুলোকেও একটি কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উপেক্ষা করলে পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
সিএনএনের বিশ্লেষক নিক পেটন ওয়ালশের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ট্রাম্পের আলোচনার কৌশলেরই অংশ, যেখানে ভয় ও শক্তি ব্যবহার করে অন্যদের তার ইচ্ছার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়।

এই অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে ট্রাম্পের নিজস্ব ঘাঁটিতে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পক্ষে থাকা হস্তক্ষেপবিরোধী রিপাবলিকানরা ক্রমেই অস্বস্তি প্রকাশ করছেন। কংগ্রেস সদস্য টমাস ম্যাসি ও মার্জরি টেলর গ্রিনের প্রকাশ্য সমালোচনা এবং সিনেটর র‌্যান্ড পল, লিসা মুরকোস্কি ও ড্যান সুলিভানের সতর্ক বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে-দলের ভেতরে ঐকমত্য আর আগের মতো শক্ত নেই।

ট্রাম্প-সমর্থক গণমাধ্যম ও অনলাইন প্রভাবকদের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট। ক্যান্ডেস ওয়েন্স এই অভিযানকে ‘বিশ্বায়নবাদীদের শত্রুতামূলক দখলদারিত্ব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে স্টিভ ব্যানন প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কি নব্য রক্ষণশীল বা ‘নিওকন’দের প্রভাবে এ পথে হাঁটছেন?
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ ও শাসনব্যবস্থা ঘিরে। ট্রাম্প যদি সত্যিই দেশটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে এগোন, তবে তা শুধু আন্তর্জাতিক সমালোচনাই নয়, ঘরোয়া রাজনীতিতেও বড় ধাক্কা দিতে পারে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/197616_odhi.webp

Wednesday, January 7, 2026

নিকোলাস মাদুরো: বাসচালক থেকে লৌহমুষ্টি শাসক

এএফপির বিশ্লেষণঃ ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো নিজেকে সাধারণ মানুষের বিনয়ী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও বাস্তবে তিনি লৌহমুষ্টি শাসনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র চাপের মুখেও ৬৩ বছর বয়সী এই সাবেক বাসচালক প্রায় প্রতিদিনের জনসভায় টেকনো সঙ্গীতে নাচতেন, যা সরাসরি সম্প্রচারিত হতো। সেখানে তিনি ইংরেজিতে বারবার স্লোগান দিতেন- ‘নো ওয়ার, ইয়েস পিস!’

কিন্তু বহু ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে মাদুরো কখনোই শান্তিপ্রিয় নেতা হিসেবে ধরা দেননি। তার শাসনামলে সাত মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে অভিবাসনে গেছে। অভিযোগ রয়েছে নির্বিচার গ্রেপ্তার, সাজানো বিচার, নির্যাতন ও সেন্সরশিপের। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশের অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়ে টানা চার বছর অতিমুদ্রাস্ফীতি এবং এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদনে ৮০ ভাগ পতনের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতার লাগাম ধরে রাখতে মাদুরো ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক অল্প কিছু মিত্রের ওপর। বিশেষত চীন, কিউবা ও রাশিয়া, পাশাপাশি দেশের সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা ও আধাসামরিক বাহিনীর ওপর।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে তার বিতর্কিত বিজয়ের পর যে প্রতিবাদ শুরু হয়, তা দমনে ২,৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, ২৮ জন মারা যায় এবং প্রায় ২০০ জন আহত হন। এই সহিংসতা তার আগের দমনপীড়নের ধারাবাহিকতা। ২০১৪, ২০১৭ ও ২০১৯ সালেও একই রকম অভিযান চালানো হয়।

‘প্রথম যোদ্ধা’
উঁচু দেহ, ঘন গোঁফ ও পেছনে আচড়ানো পাকা চুল এমন চেহারার মাদুরো প্রথম ক্ষমতায় আসেন ২০১৩ সালে এবং দাবি করেন যে তিনি দু’বার পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে। ওই নির্বাচন ব্যাপকভাবে কারচুপিপূর্ণ হিসেবে সমালোচিত। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার তৃতীয় দফার শপথ সম্পন্ন হয় যা পূর্ণ হলে তিনি ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকতেন। এটা হতো তার বিপ্লবী নায়ক হুগো শাভেজের চেয়েও বেশি। শাভেজ ১৪ বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে মাদুরো ছিলেন সংসদ সদস্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তিন মাস আগে নিজ উত্তরসূরি হিসেবে তাকেই বেছে নিয়েছিলেন শাভেজ। কিন্তু শাভেজের মতো বক্তৃতা ও ব্যক্তিত্বের জৌলুস মাদুরোর ছিল না, যা শাসক দল পিএসইউভির ভেতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তিনি অল্প ব্যবধানে জিতেছিলেন। এরপর তিনি একের পর এক সঙ্কট সামাল দেন- যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, আবার তেলের দামের পতনে দেশের প্রধান আয়ের উৎস হারানো-  সবকিছুর মাঝেও তিনি টিকে থাকেন।

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক মহলের বড় অংশ সংসদীয় স্পিকার হুয়ান গুইদোকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তার সমান্তরাল সরকার দ্রুত ভেঙে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচন শেষে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশ ও কয়েকটি লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্র বিরোধী নেতা এডমনদো গনজালেজ উরুতিয়াকে প্রকৃত নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। সবসময়ই তার পাশে ছিলেন স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। তাকে তিনি ডাকেন ‘প্রথম যোদ্ধা’ ও ‘সিলিতা’ নামে। পেশায় সাবেক সরকারি কৌঁসুলি ফ্লোরেস ছিলেন সংসদ সদস্য ও পরে জাতীয় পরিষদের স্পিকার । পর্দার আড়ালে মাদুরো শাসনে তিনি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভোররাতের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী মাদুরোর সঙ্গে তাকেও আটক করে নিউইয়র্কে নেয়া হয়েছে।

‘মার্কসবাদী ও খ্রিস্টান’
রাজধানী কারাকাসজুড়ে সর্বত্র টাঙানো মাদুরোর বিশাল পোস্টার ও দেয়ালচিত্র। নিজেকে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেন- নিজেকে বলেন বেসবলপ্রেমী, সালসা নাচের ভক্ত  এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রায়ই নাচতে দেখা যেত তাকে, পাশে স্ত্রীকে নিয়ে। কারাকাসে জন্ম নেয়া মাদুরো নিজেকে একইসঙ্গে ঘোষিত মার্কসবাদী ও খ্রিস্টান বলে দাবি করেন। কৈশোরে তিনি একটি রক ব্যান্ডেও গিটার বাজাতেন। ধারণা করা হয়, ইংরেজিতে ইচ্ছে করেই তিনি ভুল বলেন- যাতে উচ্চবিত্ত মনে না হয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে নানা ধরনের বাস্তব ও কল্পিত হুমকির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০১৮ সালে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা ব্যর্থ হলেও কয়েকজন সেনা আহত হন। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দায় এড়াতে তিনি শাভেজের আমলের মার্কিনবিরোধী ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে এগিয়ে নেন। বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে তাকে উৎখাতের চক্রান্তে অভিযুক্ত করেন। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার দাবি করতে করতে তিনি দেশের রাজনৈতিক বিরোধিতার পথ বন্ধ করে দেন। যথেচ্ছ গ্রেপ্তার, বিচারহীন আটক ও বিরোধীদের দমন ছিল নিয়মিত। তার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও দক্ষ প্রমাণিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচন আয়োজনের চুক্তিতে রাজি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করাতে সক্ষম হন। তবে পরবর্তীতে তিনি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন এবং নিষেধাজ্ঞা আবার ফিরিয়ে আনা হয়। ভেনেজুয়েলার ক্লান্ত জনগণের দৈনন্দিন জীবনে মাদুরো ছিলেন প্রায় সর্বব্যাপী চরিত্র নিয়মিত টেলিভিশনে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তৃতা দিতে দেখা যেত তাকে।
এমনকি কার্টুন চরিত্র হিসেবেও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন- ‘সুপার-বিগোতে’ বা ‘সুপার-মোচ’ নামে এক কেপ পরা সুপারহিরো, যে নাকি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

mzamin

প্রত্যাখ্যান করি আমার মাতৃভূমিকে অপমানিত করার নীতি by মিশেল এলনার

৩রা জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রেস কনফারেন্সটি আমি শুনেছি বুকের ভেতর টান নিয়ে। একজন ভেনেজুয়েলান বংশোদ্ভূত আমেরিকান হিসেবে আমি যা শুনলাম, তা ছিল একেবারে পরিষ্কার। আর সেই পরিষ্কার কথাগুলো ছিল শীতল, ভীতিকর। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বললেন যে যুক্তরাষ্ট্র ‘দেশটি চালাবে’ যতক্ষণ না তাদের মতে ‘নিরাপদ’ ও ‘বিবেচনাপ্রসূত’ একটি উত্তরণ ঘটে। তিনি বললেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করার কথা, তাকে একটি মার্কিন সামরিক জাহাজে তোলার কথা, ভেনেজুয়েলাকে অস্থায়ীভাবে প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণের কথা এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে এনে শিল্প আবার ‘গড়ে তোলার’ কথা। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কথা ওঠাতেই তিনি এমন একটি বাক্য বললেন, যা সবার জন্যই উদ্বেগজনক হওয়া উচিত: ‘তারা বোঝে এটি আমাদের গোলার্ধ।’

ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে এই কথাগুলো একটি দীর্ঘ, বেদনাদায়ক ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।
চলুন, পরিষ্কার করে বলি প্রেসিডেন্ট যেসব দাবি করেছেন, সেগুলো কী। তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার আছে একটি বৈধভাবে ক্ষমতায় থাকা বিদেশি প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে মার্কিন ফৌজদারি আইনের আওতায় আটক করার। যুক্তরাষ্ট্র একটি সার্বভৌম দেশকে আন্তর্জাতিক কোনো ম্যান্ডেট ছাড়াই পরিচালনা করতে পারে। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ওয়াশিংটনে বসে ঠিক করা যেতে পারে। তেল সম্পদ ও ‘পুনর্গঠন’-এর নিয়ন্ত্রণ হস্তক্ষেপের স্বাভাবিক ফল। এগুলোর কোনোটি করতে কংগ্রেসের অনুমোদন বা আসন্ন কোনো হুমকি প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
এ ধরনের ভাষা আমরা আগেও শুনেছি। ইরাকে প্রথমে ‘সীমিত হস্তক্ষেপ’ ও ‘অস্থায়ী প্রশাসন’-এর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হয়ে উঠেছিল বছরের পর বছর দখলদারিত্ব, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দখল, আর পেছনে রেখে যাওয়া ধ্বংস ও অস্থিতিশীলতা। স্টেওয়ার্ডশিপের নামে যা শুরু হয়েছিল, তা পরিণত হয়েছিল আধিপত্যে। এখন ভেনেজুয়েলাকে নিয়েও একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘অস্থায়ী প্রশাসন’- শেষে হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্থায়ী বিপর্যয়।

আন্তর্জাতিক আইনে এই প্রেস কনফারেন্সে বর্ণিত কোনো কিছুই বৈধ নয়। জাতিসংঘ সনদ অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের হুমকি বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে এবং কোনো দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপও নিষিদ্ধ। রাজনৈতিক ফলাফল চাপিয়ে দিতে ও নাগরিক ভোগান্তি তৈরি করতে যে ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়- তা সমষ্টিগত শাস্তির শামিল। ‘একটি দেশ চালানোর’ অধিকার ঘোষণা করা মানে দখলদারিত্বের ভাষায় কথা বলা-  যতই শব্দটা এড়িয়ে যাওয়া হোক।

মার্কিন আইনের ক্ষেত্রেও দাবিগুলো সমানভাবে উদ্বেগজনক। যুদ্ধের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কোনো অনুমোদন নেই, কোনো ঘোষণা নেই, এমন কিছুই নেই যা একজন নির্বাহীর হাতে ক্ষমতা দেয় বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করতে বা কোনো দেশ পরিচালনা করতে। একে ‘আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগ’ বলা মানেই তা বৈধ হয়ে যায় না। ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করেনি, কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির সতর্কতাও দেয়নি- যা বৈধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে। দেশটির বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের কোনো বৈধ ভিত্তি নেই- না মার্কিন আইন অনুযায়ী, না আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে।
কিন্তু আইন বা নজিরের বাইরেও রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি: এই আগ্রাসনের খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার বোঝা সমানভাবে পড়ে না- তা গিয়ে আঘাত করে নারীদের, শিশুদের, বৃদ্ধদের, গরিবদের ওপর। এর মানে হলো ওষুধ ও খাবারের সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ভাঙন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহারের বৃদ্ধি, আর অবরুদ্ধ জীবনে প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াই। এর সঙ্গে যোগ হয় সেইসব মৃত্যু- যা অনিবার্য নয়, প্রাকৃতিকও নয়, বরং বিদ্যুৎ, পরিবহন, চিকিৎসা বা ওষুধের নাগাল ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে ঘটে। প্রতিটি উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে এবং বেসামরিক মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে- যেগুলোকে পরবর্তীতে ‘পার্শ্বক্ষয়’ বলা হয়, যদিও এসব ছিল আগে থেকেই অনুমেয় ও এড়ানো সম্ভব।
এটিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে সেই অন্তর্নিহিত ধারণাটি যে, ভেনেজুয়েলাবাসীরা অপমান ও বলপ্রয়োগের মুখে নিশ্চুপ ও অনুগত থাকবে। এই ধারণাটি ভুল। যখন এটি ভেঙে পড়বে- যা অবশ্যম্ভাবী, তখন মূল্য দিতে হবে অপ্রয়োজনীয় রক্তপাতের মাধ্যমে। যখন একটি দেশকে ‘উত্তরণ সমস্যা’ বা ‘প্রশাসনিক সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়- তখন মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়। জীবনগুলোকে হিসাবের খাতায় গ্রহণযোগ্য ক্ষতিতে পরিণত করা হয়। আর যে সহিংসতা পরে আসে, তাকে বলা হয় ‘দুঃখজনক পরিণতি’- অথচ সেটিই ছিল ঔদ্ধত্য ও জবরদস্তির পূর্বনির্ধারিত ফল।

একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যখন একটি দেশকে এমনভাবে বলতে শুনি- ‘পরিচালনা করা, স্থিতিশীল করা, আর শৃঙ্খলায় এলে হস্তান্তর করা’-  তা আঘাত করে। অপমানিত করে এবং ক্রুদ্ধ করে।
হ্যাঁ- ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিকভাবে একতাবদ্ধ নয়। কখনোই ছিল না। সরকার, অর্থনীতি, নেতৃত্ব, ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়েই আছে গভীর বিভাজন। কেউ নিজেকে চাভিস্তা হিসেবে চিহ্নিত করে, কেউ কঠোর বিরোধী, কেউ ক্লান্ত ও বিমুখ- এবং হ্যাঁ, কেউ কেউ হয়তো উদযাপন করছে, ভেবে যে অবশেষে পরিবর্তন আসতে পারে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন দখলদারিত্বকে আমন্ত্রণ জানায় না।
লাতিন আমেরিকা এই যুক্তি আগেও দেখেছে। চিলিতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে ‘অচলাবস্থা’ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার হুমকির অজুহাতে মার্কিন হস্তক্ষেপের যুক্তি বানানো হয়েছিল- যার শেষ হয়েছিল গণতন্ত্রে নয়, বরং স্বৈরশাসন, দমনপীড়ন ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রমায়।
বাস্তবে, অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী- যারা সরকারের বিরোধী- তারাও এই মুহূর্তটিকে প্রত্যাখ্যান করছে। তারা জানে বোমা, নিষেধাজ্ঞা ও বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া ‘উত্তরণ’ গণতন্ত্র আনে না; বরং গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা- নিখুঁত অবস্থান নয়। আপনি মাদুরোকে অপছন্দ করতেই পারেন, তবুও মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে পারেন। আপনি পরিবর্তন চাইতে পারেন, তবুও বিদেশি আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। আপনি রাগান্বিত, ক্লান্ত বা আশাবাদী হতে পারেন,  তবুও বলতে পারেন: অন্য দেশের শাসনের অধীনে থাকতে চাই না।

ভেনেজুয়েলা এমন এক দেশ, যেখানে কমিউনাল কাউন্সিল, শ্রমিক সংগঠন, পাড়াভিত্তিক কমিটি ও সামাজিক আন্দোলনগুলো তৈরি হয়েছে চাপের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক শিক্ষা এসেছে না থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক থেকে- এসেছে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে। এখন ভেনেজুয়েলাবাসীরা লুকিয়ে নেই, বরং ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। কারণ তারা ধরণটি চিনে ফেলে। তারা জানে ‘উত্তরণ’ ও ‘অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ কথাগুলোর পর সাধারণত কী আসে। এবং তারা সবসময় যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে: ভয়কে রূপ দিচ্ছে সামষ্টিক কর্মে।
এই প্রেস কনফারেন্স শুধু ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে ছিল না, বরং ছিল এই প্রশ্ন নিয়ে: সাম্রাজ্য কি আবার প্রকাশ্যে বলতে পারে- অন্য দেশগুলোকে শাসনের অধিকার তার আছে এবং আশা করতে পারে বিশ্ব চুপ থাকবে?
যদি এটি টিকে যায় তাহলে বার্তাটি নির্মম:
সার্বভৌমত্ব শর্তসাপেক্ষ, সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘গ্রহণযোগ্য’, আর গণতন্ত্র টিকে থাকে কেবল সাম্রাজ্যিক অনুমতিতে।
একজন ভেনেজুয়েলান-আমেরিকান হিসেবে আমি এই শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করি।
আমি প্রত্যাখ্যান করি- আমার করের টাকা দিয়ে আমার মাতৃভূমিকে অপমানিত করার নীতি। আমি প্রত্যাখ্যান করি- যুদ্ধ ও জবরদস্তিকে ‘ভেনেজুয়েলাবাসীর কল্যাণ’ বলে চালানোর মিথ্যা। এবং আমি নীরব থাকতে রাজি নই, যখন একটি প্রিয় দেশকে মানুষের সমাজ হিসেবে নয়, বরং মার্কিন স্বার্থের কাঁচামাল হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোনো মার্কিন কর্মকর্তা, কোনো করপোরেট বোর্ড, বা এমন কোনো প্রেসিডেন্টের হাতে নয়, যে মনে করে পুরো গোলার্ধ তার অধীনস্ত।
ভবিষ্যৎ কেবল ভেনেজুয়েলাবাসীর।

(মিশেল এলনার, কোডপিঙ্ক-এর লাতিন আমেরিকা ক্যাম্পেইনের সমন্বয়কারী। তিনি ভেনেজুয়েলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং প্যারিসের লা সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় (প্যারিস-৪) থেকে ভাষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকের পর তিনি কারাকাস ও প্যারিসের অফিস থেকে একটি আন্তর্জাতিক বৃত্তি কর্মসূচিতে কাজ করেন এবং আবেদনকারীদের মূল্যায়ন ও নির্বাচন করার কাজে হাইতি, কিউবা, গাম্বিয়া ও অন্যান্য দেশে পাঠানো হয় তাকে। তার এ লেখাটি অনলাইন ভেনেজুয়েলা এনালাইসিস থেকে অনুবাদ)

mzamin

ট্রাম্পের পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী শক্তিগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে by জেরেমি বোয়েন

বিবিসির বিশ্লেষণঃ ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এর আগে কখনও দেখা যায়নি এমন শক্তভাবে দেখালেন যে, নিজের ইচ্ছাশক্তির উপর তার বিশ্বাস। তার এ বিশ্বাস ভরসা পায় নগ্ন মার্কিন সামরিক শক্তির পেছনে। তার নির্দেশেই এখন মাদুরো কারাগারে এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে তারা এখন ভেনেজুয়েলা চালাবে।

ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে অবস্থিত নিজের ক্লাব ও বাসভবনে এক ব্যতিক্রমী সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে। তিনি বলেন, যতদিন না আমরা একটি নিরাপদ, যথাযথ ও সুবিবেচিত রাজনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে পারি, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। ট্রাম্প বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ কথা বলেছেন। তিনি নাকি বলেছেন, আপনাদের যেটা দরকার আমরা সেটাই করব। তিনি যথেষ্ট ভদ্রতা প্রদর্শন করেছেন এ সময়। কারণ, তার সামনে আসলে কোনো বিকল্প নেই।

ট্রাম্প খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনায় যাননি। তিনি শুধু বলেছেন, ‘প্রয়োজনে (ভেনেজুয়েলায়) স্থলবাহিনী পাঠাতে আমরা ভয় পাই না।’ কিন্তু তিনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, দূর থেকে ভেনেজুয়েলা শাসন করা সম্ভব? মার-এ-লাগোতে রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ তাকে ঘিরে যে প্রশস্তি শোনা গেল- সেটা কি লাতিন আমেরিকার অন্য নেতাদের ভীতসন্ত্রস্ত্র করে আজ্ঞাবহ করতে যথেষ্ট হবে? শোনার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল, তিনি তা-ই বিশ্বাস করেন। কিন্তু প্রমাণ বলছে, এ পথ সহজ হবে না।

থিঙ্কট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ গত অক্টোবরে সতর্ক করেছিল, মাদুরোর পতন ভেনেজুয়েলায় সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে। একই মাসে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা যুদ্ধাভ্যাসের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছিলেন, মাদুরো পতনের পর কী হতে পারে। তাদের উপসংহার ছিল, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে সহিংস বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা।

নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণ ও কারাবন্দি করা আমেরিকান সামরিক শক্তির অসাধারণ প্রদর্শন। যুক্তরাষ্ট্র বিশাল বহর জড়ো করে বিন্দুমাত্র প্রাণহানি ছাড়াই লক্ষ্য অর্জন করেছে। মাদুরো জনগণের রায় উপেক্ষা করে নিজের নির্বাচনী পরাজয় বাতিল করেছেন এবং নিঃসন্দেহে তার বিদায় ভেনেজুয়েলার বহু নাগরিককে স্বস্তি দেবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের অভিঘাত ভেনেজুয়েলার সীমানা পেরিয়ে বহু দূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হবে। মার-এ-লাগোর সংবাদ সম্মেলনের আবহ ছিল বিজয়োৎসবের মতো- যেন এক নিখুঁত সামরিক অভিযানের সাফল্য উদ্যাপন ছিল সেটা।

কিন্তু সামরিক অভিযান কেবল প্রথম ধাপ। রাজনৈতিক অনুসরণ পর্বই নির্ধারণ করে এর সাফল্য বা ব্যর্থতা। গত ৩০ বছরে সামরিক শক্তি দিয়ে ‘রেজিম-চেঞ্জ’ করার আমেরিকার রেকর্ড ভয়াবহ। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর দেশটি রক্তাক্ত বিপর্যয়ে নিমজ্জিত হয়। আফগানিস্তানে দুই দশকের ‘রাষ্ট্রগঠন’ প্রচেষ্টা ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর কয়েক দিনের মধ্যেই ধসে পড়ে।

লাতিন আমেরিকায় অতীতের হস্তক্ষেপের স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের আশঙ্কা- একইভাবে অশুভ। ট্রাম্প এবার মনরো ডকট্রিনের নতুন নাম দিলেন- ‘ডনরো ডকট্রিন’। ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর সেই ঘোষণা, যাতে পশ্চিম গোলার্ধে অন্য শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা ছিল। ট্রাম্প বলেন, মনরো ডকট্রিন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা এখন সেটা অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছি। আমাদের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অধীনে পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকান কর্তৃত্ব আর কখনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। তিনি আরও বলেন, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে নিজের পশ্চাৎদেশ সামলাতে হবে। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, মেক্সিকো নিয়েও কিছু একটা করতে হবে।

কিউবাও নিঃসন্দেহে এই তালিকায় আছে, যেখানে ভূমিকা রাখছেন কিউবান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত রুবিও। লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৯৯৪ সালে আমি হাইতিতে ছিলাম- যখন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ২৫ হাজার সেনা ও দুটি বিমানবাহী রণতরী পাঠান। সেদিন কোনো গুলি না ছোঁড়ায় শাসন ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু ভালো ভবিষ্যৎ আসে নি- গত ৩০ বছর প্রায় অবিরাম দুর্দশায় কেটেছে হাইতির মানুষের। আজ দেশটি সশস্ত্র গ্যাং দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এক ব্যর্থ রাষ্ট্র সেটি।
ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে ‘মহান’ করার কথা বলেছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের কথা বলেননি। তিনি নোবেলজয়ী বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে দেশ পরিচালনার পক্ষে নন বলে স্পষ্ট জানান। তিনি বলেন- তার পক্ষে নেতা হওয়া খুব কঠিন। তার সমর্থন নেই, সম্মান নেই। তিনি উল্লেখই করেননি এডমুন্দো গনজালেসের নাম, যাকে অনেকে মনে করেন ২০২৪ সালের নির্বাচনের প্রকৃত বিজয়ী। বরং আপাতত যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে। মাদুরোকে সরাতে যে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বা সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল, তা হয়তো কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে। তবে হুগো শাভেজের গড়া শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট  আছে বলেই মনে হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী যে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সহজে রাজি হবে, সে সম্ভাবনা কম।
শাসনের সঙ্গে যুক্ত সামরিক ও বেসামরিক গোষ্ঠীগুলো দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেদের ধনী করেছে, এ সুবিধা তারা হারাতে চাইবে না।

বেসামরিক মিলিশিয়াদের অস্ত্র দিয়েছে সরকার, এছাড়াও দেশটিতে রয়েছে অপরাধচক্র ও কলম্বিয়ান গেরিলারা, যারা আশ্রয়ের বিনিময়ে মাদুরোকে সমর্থন দিয়েছে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ট্রাম্পের বিশ্বদৃষ্টিকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। তিনি খোলাখুলি অন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি লোভের কথা বলেন। এমনকি ইউক্রেনের সম্পদ বিনিময়ে সামরিক সহায়তার প্রসঙ্গও সামনে এসেছে আগে। তিনি ভেনেজুয়েলার বিপুল খনিজসম্পদ ও জাতীয়করণকৃত তেলশিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে আগ্রহী। ট্রাম্প বলেন, আমরা মাটির নিচ থেকে বিপুল সম্পদ তুলব, যা যাবে ভেনেজুয়েলার মানুষের কাছে, বাইরে থাকা ভেনেজুয়েলানদের কাছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও ক্ষতিপূরণের অংশ হিসেবে।

এতে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে। কারণ সেখানেও ট্রাম্পের আগ্রহ রয়েছে। মাদুরোকে আটক করার অভিযান আরেকটি বড় আঘাত আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণায়। ট্রাম্প আগেও দেখিয়েছেন, তিনি অপছন্দের আইন উপেক্ষা করতে দ্বিধা করেন না। ইউরোপীয় মিত্ররা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারসহ এখন এমন ভাষা খুঁজছেন যাতে আন্তর্জাতিক আইনকে সমর্থন জানান, আবার একইসঙ্গে মাদুরো অভিযানের নিন্দাও না করেন- যদিও এটি জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি- এটি কেবল এক ‘মাদকসম্রাট’ গ্রেপ্তারের আইনগত সহায়তা। কিন্তু ট্রাম্পের স্পষ্ট ঘোষণা, যুক্তরাষ্ট্র এখন দেশটির তেলশিল্পসহ পুরো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেবে। এই যুক্তিকে দুর্বল করে।
মাদুরোকে আটক করার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি কারাকাসে চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চীন এই পদক্ষেপের নিন্দা জানায়। তারা বলে, মার্কিন আধিপত্যমূলক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করছে। তবে একইসঙ্গে এই নজিরকে চীন হয়তো নিজের জন্য সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবেও দেখবে। তাইওয়ানকে তারা ‘বিদ্রোহী প্রদেশ’ মনে করে এবং পুনর্মিলনকে জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করেছে। এ কারণেই মার্কিন সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্রেট সহ-সভাপতি মার্ক ওয়ার্নার সতর্ক করে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিদেশি নেতাকে গ্রেপ্তারের অধিকার দাবি করে তাহলে চীন কেন তাইওয়ানের নেতাদের বিরুদ্ধে একই দাবি তুলতে পারবে না? পুতিন কেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে অপহরণের যুক্তি দাঁড় করাবেন না? এই সীমা একবার ভাঙা হলে বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণকারী নিয়ম ভেঙে পড়তে শুরু করবে এবং প্রথম সুযোগ নেবে কর্তৃত্ববাদী শাসনগুলো।

ডনাল্ড ট্রাম্প যেন বিশ্বাস করেন, নিয়ম তিনিই বানান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা প্রযোজ্য, অন্যদের জন্য তা নয়। কিন্তু বাস্তব বিশ্বের শক্তির রাজনীতিতে তা এভাবে চলে না। ২০২৬ সালের শুরুতেই তার পদক্ষেপ আরেকটি অস্থির বছরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

mzamin

Tuesday, January 6, 2026

‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’: ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন চালিয়ে যেভাবে পুরোনো রূপে ফিরছে যুক্তরাষ্ট্র

দ্য গার্ডিয়ানঃ দুই শতক ধরে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বোমাবর্ষণ এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়া। কিন্তু সর্বশেষ ঘটনা একটি নজিরও গড়েছে। কারণ, দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশে এটিই প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা।

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নের মুখে পড়বে না।’

কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার মহাদেশীয় প্রতিবেশীদের ওপর কেবল অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেই নয়, সামরিকভাবেও হস্তক্ষেপ করে আসছে। এ দীর্ঘ তালিকায় আগ্রাসন, দখলদারত্ব এবং বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ১৯৮৯ সালে পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটকের বিষয়টিও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তৎপরতা ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাতে এবং সামরিক স্বৈরশাসনের পথ প্রশস্ত করতে সহায়তা করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সামরিক অভিযানগুলো ঐতিহাসিকভাবে মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের তুলনামূলক নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর স্টেট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মাউরিসিও সান্তোরো বলেন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশের ওপর প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশিত নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এ অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছিল।’

ওই কৌশলপত্রে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ‘সম্প্রসারণের’ আহ্বান জানানো হয়েছে এবং একে মনরো ডকট্রিনে ‘ট্রাম্প করোলেরি’ বা সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মনরো ডকট্রিন হলো ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত ‘আমেরিকানদের জন্য আমেরিকা’ নীতি, যা পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের বৈধতা দিতে ব্যবহৃত হয়।

টেম্পল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক এবং ‘আ শর্ট হিস্ট্রি অব ইউএস ইন্টারভেনশনস ইন লাতিন আমেরিকা অ্যান্ড দ্য ক্যারিবিয়ান’ গ্রন্থের লেখক অ্যালান ম্যাকফারসন বলেন, শনিবারের এই পদক্ষেপ অতীতের অনেক অভিযানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও তা অবাক করার মতো। কারণ, ১৯৮৯ সালের পর এ ধরনের কিছু আর ঘটেনি।

এই ইতিহাসবিদ আরও বলেন, ‘কেউ কেউ হয়তো ভেবেছিলেন, শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে লাতিন আমেরিকায় নিজেদের পছন্দমতো রাজনৈতিক ফলাফল আদায়ের এই নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী যুগের অবসান একুশ শতকে ঘটবে, কিন্তু স্পষ্টতই তা ঘটেনি।’

গত দশকগুলোতে এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশই প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো না কোনোভাবে মার্কিন হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। নিচে এর কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো:

মেক্সিকো

মেক্সিকোর ভূখণ্ড টেক্সাসকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত বিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোতে আগ্রাসন চালায়। ১৮৪৭ সালে মার্কিন সেনারা রাজধানী মেক্সিকো সিটি দখল করে নেয়।

১৮৪৮ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। তবে ওই চুক্তির ফলে মেক্সিকো তাদের মোট ভূখণ্ডের ৫৫ শতাংশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এই বিশাল এলাকার মধ্যেই বর্তমান ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা ও ইউটা অঙ্গরাজ্যসহ অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো এবং ওয়াইমিংয়ের কিছু অংশ রয়েছে।

কিউবা

১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে কিউবার স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র। এই বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র পুয়ের্তো রিকোর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে এবং ১৯০২ সাল পর্যন্ত কিউবা দখল করে রাখে। সে বছর একটি চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন নৌবাহিনীকে গুয়ানতানামো বের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে মার্কিন সেনারা ১৯০৬ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত এবং আবার ১৯১৭ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত দ্বীপটি দখলে রাখে। ফিদেল কাস্ত্রোর ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ১৯৬১ সালে ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ আগ্রাসনে সমর্থন দেয়।

হাইতি

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জেরে হাইতির নেতারা বারবার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় দেশটিকে ‘স্থিতিশীল’ করা এবং মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ১৯১৫ সালে হাইতিতে আগ্রাসন চালায়। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত তারা দেশটির শুল্ক ও অর্থ দপ্তর এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে।

১৯৫৯ সালে একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা স্বৈরশাসক ফ্রাঁসোয়া ‘পাপা ডক’ দুভালিয়েরকে হুমকির মুখে ফেলে। তখন সিআইএ তাঁকে ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা বিপ্লবের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে একজন মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাঁর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পর্দার আড়ালে কাজ করে।

ব্রাজিল

১৯৬৪ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থী প্রেসিডেন্ট জোয়াও গোলার্টকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ দেখা দিলে হস্তক্ষেপের জন্য ব্রাজিলের উপকূলে একটি মার্কিন নৌ টাস্কফোর্স অবস্থান নিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করা হয়নি।

সত্তরের দশকে ‘অপারেশন কন্ডর’ নামে পরিচিতি পাওয়া এক কর্মসূচির অধীন সিআইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশের স্বৈরশাসনের নিপীড়ক সংস্থাগুলোকে ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতন ও গুপ্তহত্যায় সরাসরি পরামর্শ দিত।

পানামা

যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সামরিকভাবে সমর্থন দিলে ১৯০৩ সালে কলাম্বিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায় পানামা। স্বাধীনতার পর ওয়াশিংটন মধ্য আমেরিকার এ দেশটির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় রাখে।

১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ প্রায় ২৭ হাজার সেনা নিয়ে পানামায় আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেন। এর লক্ষ্য ছিল স্বৈরশাসক নরিয়েগাকে আটক করা। সিআইএর এই সাবেক মিত্রের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

এই আগ্রাসনে পানামার প্রায় ৩০০ সেনার পাশাপাশি আনুমানিক ২০০ থেকে ৫০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এই হামলার কয়েক ঘণ্টা পর নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষিত গিয়েরমো এন্দারাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসায় যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ভেনেজুয়েলায়ও একই পরিণতি ঘটবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প বলেছেন, ‘যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ‘পরিচালনা’ করবে।

ইতিহাসবিদ ম্যাকফারসন বলেন, এই অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপের পর ‘শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন ঘটনা ‘খুবই বিরল’। তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন হস্তক্ষেপগুলো প্রায় সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করে।’

একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানের ভেতর মার্কিন এজেন্টদের হাতে আটক পানামার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা। ৪ জানুয়ারি, ১৯৯০
একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানের ভেতর মার্কিন এজেন্টদের হাতে আটক পানামার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা। ৪ জানুয়ারি, ১৯৯০ ছবি: ইউএস আর্মির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর ট্রাম্পের নজর কেন, কী আছে সেখানে by প্রতীক বর্ধন

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার নিকোলা মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র পাচার করছে। এ নিয়ে ভেনেজুয়েলার ওপর নানা রকম চাপ প্রয়োগের পর শেষমেশ যুক্তরাষ্ট্র অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে। তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

কিন্তু ভেনেজুয়েলা সরকার এই দাবি অগ্রাহ্য করেছে। তারা বলছে, দেশের তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র এ হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, ভেনেজুয়েলায় এ রকম ন্যক্কারজনক অভিযানের পেছনে আছে দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলসম্পদ দখলের পাঁয়তারা।

গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় তিনি আরও যা বলেন, তাতেও বিষয়টি স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প দখলের জন্য এ কাণ্ড করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেলে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প ‘অনেক টাকা আয় করতে পারবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় তেল কোম্পানিকে (বিশ্বের সবচেয়ে বড়) ভেনেজুয়েলায় পাঠাব। তারা হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে; ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো ঠিক করবে। এই তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার হয়ে আয় করবে’।

ট্রাম্প আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’; অনেক দিন ধরেই তাদের এ অবস্থা। তাঁর ভাষায়, ‘যতটা তেল তারা তুলতে পারত, সে তুলনায় তারা প্রায় কিছুই তুলতে পারেনি।’

ভেনেজুয়েলার তেল কেন প্রয়োজন

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক—এ ক্ষেত্রে অন্য সবার চেয়ে তারা অনেকটাই এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যে তেল উৎপাদন করে, তা মূলত হালকা ও অপরিশোধিত ধরনের। কিন্তু তাদের বেশির ভাগ তেল পরিশোধনাগারের যে সক্ষমতা, তাতে তাদের ভারী ও অপরিশোধিত তেল প্রয়োজন।

অন্য কথায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের দেশের রাস্তায় চলাচল করা গাড়িগুলোয় নিয়মিত পেট্রল সরবরাহ করতে চায়, তাহলে তাদের এই থিকথিকে ও ভারী অপরিশোধিত তেলের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

এ–ই হচ্ছে বাস্তবতা। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন হবে হাজার হাজার কোটি ডলার। এ কারণে নিকট ভবিষ্যতে কেউই তা করতে বিশেষ আগ্রহী নয়।

কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভূখণ্ড থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করলেও ভারী তেলের চাহিদা মেটাতে দেশটিকে এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অধিকাংশ হালকা অপরিশোধিত তেল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। অথচ টেক্সাস ও লুইজিয়ানার পরিশোধনাগারগুলো চালু রাখতে তাদের প্রতিদিন ছয় হাজার ব্যারেলের বেশি ভারী তেল আমদানি করতে হয়।

এ বাস্তবতা মাথায় রাখলেই সমীকরণ মেলানো সম্ভব। এ সমীকরণ অনিবার্যভাবে ভেনেজুয়েলার দিকেই নিয়ে যায়। কেননা, কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভারী তেলের মজুত ভেনেজুয়েলায়।

কত মজুত আছে ভেনেজুয়েলায়

এনার্জি ইনস্টিটিউটের হিসাব বলছে, বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ ভেনেজুয়েলার হাতে, যার পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল।

একসময় ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা জারির পর সেই সম্পর্ক বদলে গেছে। এখন দেশটির তেলের প্রধান গন্তব্য চীন।
একসময় বৈশ্বিক তেলবাজারে প্রভাবশালী ছিল ভেনেজুয়েলা। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় আগে সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটে—দেশটির তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের শাসনামলে। নিকোলা মাদুরোর শাসনে সেই পরিস্থিতি আরও গভীর হয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ তেলশিল্প কার্যত ভেঙে পড়েছে, ফলে বৈশ্বিক সরবরাহের হিসাবে ভেনেজুয়েলা এখনো ঠিক ‘শূন্যের কোঠায়’ না পড়লেও বাস্তবে তারা প্রায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

১৯৭০-এর দশকে প্রতিদিন সাড়ে ৩ মিলিয়ন বা ৩৫ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল উত্তোলন করত দেশটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উৎপাদন নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। দেশটির দৈনিক উৎপাদন কমতে কমতে ২০২০ সালে মাত্র পাঁচ লাখ ব্যারেলে এসে ঠেকে।
এরপর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বর্তমানে ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন ১০ লাখ ব্যারেলের সামান্য বেশি। এর বড় অংশই দেশটির নিজস্ব চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় বৈশ্বিক বাজারের ১ শতাংশের কম, যে বাজারের আকার এখন দৈনিক ১০ কোটি ব্যারেলের বেশি।

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের বর্তমান অবস্থা

হুগো চাভেজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে জনগণের কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। তাঁর সময় পিডিভিএসের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং বিদেশি চুক্তি পুনর্বিন্যাস করা হয়। তখন থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।

চাভেজের আমলে তেল থেকে আয়ের বড় অংশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করা হয়। এতে দেশটি সামাজিক সূচকে প্রাথমিকভাবে উন্নতি করে।

চাভেজ তেলশিল্প জাতীয়করণ করেন। এতে কিছু মার্কিন কোম্পানি ভেনেজুয়েলা থেকে বেরিয়ে যায়, যদিও শেভরনের মতো কোম্পানি সীমিত অংশীদারি রেখে ব্যবসা চালিয়ে যায়। চাভেজের নীতির কারণে দেশটির তেলক্ষেত্র থেকে অভিজ্ঞ কর্মী ঝরে পড়ে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ থমকে যায়। উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে তেলশিল্পের কাঠামোগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। নিকোলা মাদুরো একই নীতি বজায় রাখেন।

বিপুল তেলের মজুত থাকলেও ভেনেজুয়েলার উৎপাদন যে নগণ্য, তার কারণ বুঝতে এই পটভূমি জানা প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো, দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসের হাতে উৎপাদন বাড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় পুঁজি ও দক্ষতার ঘাটতি আছে।

গবেষণা সংস্থা এনার্জি অ্যাসপেক্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর পর্যাপ্ত খনন না হওয়া, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, ঘন ঘন বিদ্যুৎ–বিভ্রাট ও যন্ত্রপাতি চুরির কারণে তেলক্ষেত্রগুলোর অবস্থা শোচনীয়।

চাভেজের আমলে অনেক পশ্চিমা তেল কোম্পানি ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যায়। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় কাজ করা একমাত্র বড় পশ্চিমা তেল কোম্পানি হচ্ছে শেভরন। দেশটির মোট তেল উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই শেভরনের মাধ্যমে হয়। তাদের উৎপাদিত তেলের প্রায় অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তেলশিল্প

এ বাস্তবতায় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর হাতে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প চলে যাবে—এমনটা মনে করা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কাগজে-কলমে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেলের বেশি হিস্যা পেলে তারা দেশটির তেলশিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। তবে এনার্জি অ্যাসপেক্টসের ভূরাজনীতি বিভাগের প্রধান রিচার্ড ব্রোঞ্জ বলেন, ‘বিষয়টি মোটেও সহজ কিছু নয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির খরচ অনেক বেশি। এনার্জি অ্যাসপেক্টস হিসাব করেছে, দৈনিক তেল উৎপাদন আরও ৫ লাখ ব্যারেল বাড়াতে অন্তত ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে সময় লাগবে প্রায় দুই বছর।

এ থেকেই বোঝা যায় চ্যালেঞ্জ ঠিক কতটা। উৎপাদন আরও বেশি হারে বাড়াতে হাজার হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। সময় লাগবে কয়েক দশক।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার সরকার পতনের কারণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে; যদিও তাদের সামনে বন্ধুর পথ। সেখানে গিয়ে তারা জটিল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের পণ্যবিষয়ক প্রধান হেলিমা ক্রফট বিনিয়োগবিষয়ক নোটে এক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি লিখেছেন, ট্রাম্পের চাপের কারণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ‘অনেকটা সরকারি দায়িত্বের মতো করে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে নামতে হতে পারে’।
ট্রাম্প ব্যবসায়ী মানুষ। সবকিছুকেই তিনি ব্যবসায়িক স্বার্থে দেখেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থাকে অগ্রাহ্য করে তিনি বিশ্বায়নকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছেন; যদিও এই বিশ্বায়নব্যবস্থা গড়ে তোলায় যুক্তরাষ্ট্রই একসময় নেতৃত্ব দিয়েছে।

ভেনেজুয়েলায় সামরিক আগ্রাসনও সেই ব্যবসায়িক স্বার্থ বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। সেই সঙ্গে ট্রাম্প জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিশ্বাস করেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ নেই। এ প্রসঙ্গে তাঁর সেই বিখ্যাত স্লোগান মনে রাখা যেতে পারে, ‘ড্রিল বেবি, ড্রিল’। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়াও। এ স্লোগান মনে রাখলে অনেক কিছুর উত্তর পাওয়া সম্ভব।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, স্কাই নিউজ, বিবিসি

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিকোলা মাদুরো
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিকোলা মাদুরো। ছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলার নতুন নেত্রীকে ট্রাম্পের সতর্কতা, মাদুরোর চেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়েই ক্ষান্ত হননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিতে আরও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার নতুন নেতা ডেলসি রদ্রিগেজকে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, তিনি যদি সঠিক কাজ না করেন, তবে তাকে ‘খুব বড় মূল্য দিতে হবে- সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড় হবে তা’। মার্কিন সাময়িকী দ্য অ্যাটলান্টিককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, মাদক পাচার ও অস্ত্র সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থেকে মাদুরো একটি ‘নার্কো-সন্ত্রাসী শাসন’ পরিচালনা করছিলেন। মাদুরো এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, কারাকাসে শনিবারের বিমান হামলার পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এলেও, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় নেই। যদিও কিছু ডেমোক্রেট নেতার ভাষ্য, এই অভিযান ছিল ‘যুদ্ধ ঘোষণার সামিল’। রবিবার দ্য অ্যাটলান্টিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে রদ্রিগেজের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি যদি সঠিক কাজ না করেন, তবে তাকে খুব বড় মূল্য দিতে হবে। সম্ভবত মাদুরোর থেকেও বড় হবে তা।

ভেনেজুয়েলা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘রেজিম-চেঞ্জ- আপনি যা-ই বলুন না কেন- এখনকার পরিস্থিতির চেয়ে ভালোই হবে। এর চেয়ে খারাপ আর হতে পারে না।’ শনিবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি নিরাপদ, যথাযথ ও সুবিবেচিত রাজনৈতিক পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে।

তিনি আরও বলেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটির অবকাঠামো মেরামতে কাজ করবে এবং দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে। তবে ট্রাম্পের এমন ঘোষণার মাঝেও মাদুরোর মিত্ররা এখনো ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করছে।

কিউবা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে ৩২ জন সাহসী কিউবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের সমাজতান্ত্রিক মিত্র হিসেবে দেশটি দু’দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে। রবিবার একাধিক টিভি সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, এই সামরিক অভিযান যুদ্ধ নয়, বরং মাদক পাচারকারী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান। তিনি বলেন, আমরা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে নয়, মাদক চক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি। তিনি আরও জানান, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে ‘কোয়ারেন্টাইন’ দিয়েছে, সেটিও চাপ বজায় রাখার কৌশলের অংশ।

মাদুরো ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দল দমন ও সহিংসতা ব্যবহারের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। বহু দেশ তার ২০২৪ সালের নির্বাচনী জয়কে অবৈধ বলে ঘোষণা করে। শনিবার ভোরে রাজধানী কারাকাসে পরিচালিত বিশেষ বাহিনীর অভিযানে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়। এরপর তাদের অস্ত্র ও মাদক মামলায় অভিযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। মাদুরো অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ও ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে।

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো দাবি করেছেন, অভিযানে মাদুরোর নিরাপত্তা বাহিনীর বড় অংশ, পাশাপাশি সামরিক সদস্য ও সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। রুবিও বলেছেন, এ অভিযান আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অপারেশন। তাই কংগ্রেসের অনুমতি প্রয়োজন ছিল না। তিনি বলেন, এ ধরনের গোপন অভিযানের ব্যাপারে কংগ্রেসকে জানানো যায় না। কারণ তাতে তথ্য ফাঁস হয়ে যায়।

মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এখন অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপ্রধান। সেনাবাহিনীও তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সোমবার কারাকাসে তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ পড়ানোর কথা।
মার্কিন গণমাধ্যম রুবিও’র কাছে জানতে চায়, যুক্তরাষ্ট্র কি রদ্রিগেজকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়? তিনি উত্তরে বলেন, এটা বৈধতা নিয়ে নয়, যুক্তরাষ্ট্র পুরো শাসনকেই অবৈধ মনে করে। ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতারা অভিযানে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেন, এ অভিযান ছিল শুধু মাদকবিরোধী অপারেশন নয়। এটা ছিল যুদ্ধের কর্মসূচি। সিনেট সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার বলেন, আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে আরেকটি আইনভঙ্গকে সমর্থন করা যায় না। এমন রেজিম-চেঞ্জের অভিজ্ঞতা আমেরিকানদের রক্ত ও অর্থ- দুই দিকেই ক্ষতি করেছে।

তারা কংগ্রেসে এমন প্রস্তাব আনার ঘোষণা দেন যাতে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ভেনেজুয়েলা সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে না পারে হোয়াইট হাউস। ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, উরুগুয়ে ও স্পেন যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত, যা আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তারা শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও আলোচনাভিত্তিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
mzamin

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের আড়াই দশক

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির এ অভিযান সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের টানাপোড়েন একেবারে নতুন নয়। ২৬ বছর ধরেই ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ ও আগ্রাসন দেখিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৯ হুগো চাভেজ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন। তখন থেকে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র–ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক কেমন ছিল, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক।

১৯৯৯ সাল: হুগো চাভেজ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর তিনি আলোচিত ‘বলিভিয়ারা বিপ্লব’ শুরু করেন। ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা সিমন বলিভারের নামে এ বিপ্লব বা আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছিল। বলিভিয়ারা বিপ্লবের অংশ হিসেবে সংবিধান সংস্কার ও তেল খাতের জাতীয়করণ করেন। তখন থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।

২০০০ সাল: চাভেজ রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। তাঁর সরকার যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত এনজিও ও কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে। যুক্তরাষ্ট্র চাভেজের বিরুদ্ধে স্বৈরাচার ও সংবামাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি আরোপের অভিযোগ আনে।

২০০২ সাল: একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টার জন্য চাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এ অভ্যুত্থানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে ভেনেজুয়েলা। কিন্তু ওয়াশিংটন এ অভিযোগ অস্বীকার করে। এরপর দুদেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাস গড়ে ওঠে।

২০১৩ সাল: হুগো চাভেজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেন মাদুরো। তিনি চাভেজের নীতিগুলোই এগিয়ে নেন। তাঁর শাসনের সময় থেকে অর্থনৈতিক দুরবস্থা শুরু হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।

২০১৪–১৫ সাল: যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ে।

২০১৭–১৯ সাল: ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রবেশ বন্ধ করে এবং তেলের কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে। ফলে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যায়।

২০১৮ সাল: মাদুরোর পুনর্নির্বাচন ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়। বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পান।

২০২৪ সাল: এদমুন্দো গোনসালেসকে হারিয়ে মাদুরো বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হন। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সরকার নির্বাচনী ফল নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

২০২৫ সাল: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ নতুন করে বাড়ান। ক্যারিবীয় সাগরে ব্যাপক সেনা ও রণতরি মোতায়েন করেন।

২০২৬ সাল: কারাকাসে ব্যাপক বিস্ফোরণ ও মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নেওয়া হয়।

হুগো চাভেজ
হুগো চাভেজ। ফাইল ছবি রয়টার্স

আমি নির্দোষ, আমি আমার দেশের প্রেসিডেন্ট: নিকোলা মাদুরো

নিকোলা মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মাদক-সন্ত্রাসবাদ মামলায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বিচারককে বলেছেন, ‘আমি আমার দেশের প্রেসিডেন্ট।’ তিনি আরও বলেন, তাঁকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে।

মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও আদালতে মাদক সম্পর্কিত অভিযোগ থেকে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

মাদুরোর মামলার বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পড়ে শোনানোর পর তাঁর বক্তব্য জানতে চান। তখন মাদুরো বলেন, ‘আমি নির্দোষ। এখানে যে অভিযোগগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি আমি করিনি।’

শুনানি নিয়ে আদালত আগামী ১৭ মার্চ মাদুরোর পরবর্তী হাজিরার দিন ধার্য করেন।বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন এ নির্দেশ দিয়েছেন।

আজ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ম্যানহাটনের আদালতে তাঁদের হাজির করা হয়। গত শনিবার ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।

নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।  আটককেন্দ্র থেকে হেলিকপ্টারে করে নিউইয়র্কে আদালতের কাছের একটি হেলিপোর্টে নেওয়া হয় তাঁদের। সেখান থেকে ভ্যানে তুলে আদালতে নেওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র, ৫ জানুয়ারি
নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আটককেন্দ্র থেকে হেলিকপ্টারে করে নিউইয়র্কে আদালতের কাছের একটি হেলিপোর্টে নেওয়া হয় তাঁদের। সেখান থেকে ভ্যানে তুলে আদালতে নেওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র, ৫ জানুয়ারি। ছবি: রয়টার্স

Monday, January 5, 2026

ভেনেজুয়েলাকে নিশানা করলেন ট্রাম্প, এরপর কে by স্টিফেন ওয়ার্থাইম

গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করা আর পানামা ক্যানেলে (পানামা খাল) মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন ট্রাম্প। এখন তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে উৎখাত করলেন। এরপর কোন দেশগুলো তাঁর নিশানা হতে যাচ্ছে?

‘একেবারে বুদ্ধিমানের কাজ’—ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে তখন ছিল উচ্ছ্বাস। সময়টা ছিল ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২। ভ্লাদিমির পুতিন কেবলই পূর্ব ইউক্রেনের কিছু অংশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং কথিত ‘শান্তিরক্ষী’ হিসেবে সেখানে রুশ সেনা পাঠিয়েছেন। পুতিনের পদক্ষেপে বেশ মুগ্ধ, এমনকি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সাবেক ও বর্তমান এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। অবচেতন মনে ট্রাম্প তখন বলে ফেলেন, ‘আমাদের দক্ষিণ সীমান্তেও আমরা এ কৌশল কাজে লাগাতে পারি।’

ট্রাম্প তখন জানতেন না যে তিনি একটি পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সূচনালগ্নে এ কথা বলছেন। যে আগ্রাসন প্রায় চার বছর ধরে চলছে এবং এখন পর্যন্ত ১৫ লাখের বেশি মানুষের হতাহতের কারণ হয়েছে এবং আরও হতাহত হচ্ছেন। একইভাবে ট্রাম্প এখন বুঝতে পারছেন না যে ভেনেজুয়েলায় তিনি আসলে কী শুরু করেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ ইউক্রেন নয়, এমনকি এটি আফগানিস্তান, ইরাক বা লিবিয়ার মতোও নয়। কিন্তু নিকোলা মাদুরোকে ধরার জন্য সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের একটি দেশকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি গত কয়েক দশকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা থেকে পাওয়া সবচেয়ে স্পষ্ট ও কষ্টার্জিত শিক্ষাটিকেও ছুড়ে ফেলেছেন; ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু জয়ী হওয়া কঠিন। আর একে প্রকৃত সাফল্যে রূপান্তর করা তো আরও দুরূহ।

এখন পর্যন্ত ট্রাম্প কেবল প্রথম পদক্ষেপটি নিয়েছেন বলা যায়। তিনি ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থাকে এখনো পতনের দ্বারপ্রান্তে আনতে পারেননি; বরং কেবল শীর্ষ ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে আসার মাধ্যমে এর মাথা ভেঙে দিয়েছেন মাত্র। যাহোক, যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া ভাষণে ট্রাম্পকে এক বিজয়ী বীরের ভূমিকায় দেখা গেছে। তিনি দীর্ঘক্ষণ তাঁর প্রদর্শিত ‘প্রচণ্ড সামরিক শক্তি’ নিয়ে বড়াই করেছেন, যেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এমন কোনো ‘অপারেশনাল ট্রায়াম্ফ’ বা আভিযানিক সাফল্য নেই, যা পরবর্তী সময়ে কৌশলগত বিপর্যয়ের পথ তৈরি করেনি। এ ক্ষেত্রে বাগদাদে চালানো চোখধাঁধানো সামরিক অভিযানের কথা স্মরণ করা যায়।

ট্রাম্পের কথা শুনলে মনে হতে পারে, কঠিন অংশটুকু বোধহয় শেষ হয়ে গেছে। এখন কেবল শান্তি, সমৃদ্ধি আর স্বাধীনতার শুরু। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমরা দেশটি চালাতে যাচ্ছি।’ আর তা করার জন্য ট্রাম্প দেশটিতে স্থলবাহিনী পাঠাতে আগ্রহী এবং দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলনে উন্মুখ। মাদুরো-পরবর্তী শাসনের জন্য ট্রাম্পের ‘প্ল্যান এ’ ছিল মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় রাখা। কারণ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মতো করে কাজ করতে সাহায্য করবেন। কিন্তু সেই ঘোষণার দুই ঘণ্টার মধ্যেই রদ্রিগেজ জোর দিয়ে বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার বৈধ নেতা। সেই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অবৈধ, সাম্রাজ্যবাদী দখলদার শক্তি হিসেবে অভিহিত করেন, যারা দেশটি লুণ্ঠন করতে চাইছে।

‘প্ল্যান বি, অতঃপর’

ভেনেজুয়েলায় পরবর্তী সময়ে যা-ই ঘটুক না কেন, এর পরিণতি কেবল দেশটিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই এ হামলার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য জাহির করতে চেয়েছেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নিয়ে আর কখনোই কোনো প্রশ্ন উঠবে না।’ গত মাসে প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ট্রাম্প প্রশাসন ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’–এর একটি ‘ট্রাম্প করোলেরি’ বা সংযোজন ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে আমেরিকা অঞ্চল থেকে যেকোনো ধরনের বাহ্যিক প্রভাব দূর করতে প্রয়োজনীয় যেকোনো উপায় অবলম্বনের অধিকার দাবি করা হয়েছে। প্রশাসন তাদের এ বহুল প্রচারিত নীতিটি কেবল প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। ট্রাম্প নিজের দেশের কাছাকাছি থাকা পক্ষগুলোকে, যেমন অভিবাসী, গ্যাং এবং মাদক কার্টেল (মাদক কারবারি গোষ্ঠীগুলো)—যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করতে পছন্দ করেন; যারা বাইরে থেকে দেশটিতে অনুপ্রবেশ করছে এবং ভেতর থেকে একে ধ্বংস করছে।

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের এ হামলা ক্যারিবীয় অঞ্চলে কয়েক মাস ধরে স্পিডবোটে চালিয়ে আসা তাঁর হামলার মাধ্যমে কী ইঙ্গিত দিতে চেয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করেছে—যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের ক্লান্তিকর ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে’ কথিত ‘নারকো-টেরর’ বা মাদক-সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে রূপান্তর করছে। একসময় মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসীদের প্রতি যে শত্রুতা ছিল, তা এখন পশ্চিম গোলার্ধের আন্তসীমান্ত নানাবিধ হুমকির দিকে মোড় নিচ্ছে। এসব হুমকির বিষয়ে ট্রাম্পের সংজ্ঞায় এতটাই ফাঁকফোকর রয়েছে যে এর আওতায় তিনি যাঁদের বারবার ‘ভেতরের শত্রু’ বলে বর্ণনা করেছেন, তাঁরাও পড়েন। ভেনেজুয়েলা নিয়ে দেওয়া ভাষণের মাঝপথে ট্রাম্প হঠাৎ থেমে গিয়ে মার্কিন শহরগুলোতে টহল দেওয়ার জন্য পাঠানো সেনাদের সম্পর্কে যে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেছেন, তা মোটেও অকারণে ছিল না।

আজকের লক্ষ্য ছিল কারাকাস। আগামীকাল কী হবে? ট্রাম্প ইতিমধ্যে একটি তালিকা তৈরি করে ফেলেছেন। গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করা আর পানামা ক্যানেলে (পানামা খাল) মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন তিনি। এখন যেহেতু তিনি মাদুরোকে উৎখাত করেছেন, তাই একই যুক্তি ব্যবহার করে তিনি যেকোনো সংখ্যক দেশে হামলা চালাতে পারেন। গতকাল ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘মেক্সিকো চালাচ্ছে মাদক কার্টেলগুলো’। এ একটি দাবিই মেক্সিকোতে আগ্রাসন চালানোর জন্য ট্রাম্পের কাছে যথেষ্ট অজুহাত হতে পারে। এদিকে কিউবা সরকারের ‘উদ্বিগ্ন’ হওয়া উচিত বলে সতর্ক করে দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

যদি ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিও তৈরি হয়, অর্থাৎ যদি একটি স্থিতিশীল, তেলসমৃদ্ধ এবং মার্কিনপন্থী গণতন্ত্র হঠাৎ যাত্রা শুরু করে, তাহলে সেই সাফল্য এ প্রশাসনকে আরও উৎসাহী করে তুলতে পারে। এটি তারা নিজেদের পছন্দমতো এ অঞ্চলকে পুনর্গঠন করতে আর কত দূর যেতে পারে, সেটি খতিয়ে দেখতে উৎসাহী করতে পারে।

তবে সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি বাস্তবে খুব কমই ঘটে; বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ঝটিকা সামরিক হামলার (হিট অ্যান্ড রান) ভাগ্য এবার ফুরিয়ে আসার সম্ভাবনাই বেশি। নিজের প্রথম মেয়াদে তিনি বলেছিলেন, ‘শক্তিশালী দেশগুলো অন্তহীন যুদ্ধে লিপ্ত হয় না।’ তাহলে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখন কোন ধরনের দেশ?

* স্টিফেন ওয়ার্থাইম, কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের আমেরিকান স্টেটক্রাফট প্রোগ্রামের একজন সিনিয়র ফেলো এবং ইয়েল ল স্কুলের একজন ভিজিটিং লেকচারার।

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। ৩ জানুয়ারি ২০২৬
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। ৩ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স