Monday, June 29, 2026

বাবরি মসজিদ ভেঙে মোদির গড়া রাম মন্দিরে দুর্নীতির মহা কেলেঙ্কারি

উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বর্তমানে যে রাম মন্দির দাঁড়িয়ে আছে, সেই স্থানেই একসময় ছিল ষোড়শ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। ১৯৯২ সালে হিন্দু উগ্রপন্থীদের হাতে মসজিদটি ভেঙে ফেলার ঘটনা গোটা ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্ম দেয়। সেই দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম।

পরবর্তীতে ওই স্থানকে কেন্দ্র করেই বিজেপি-সমর্থিত হিন্দুত্ববাদী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়। আড়াই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন রাম মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন। বহু হিন্দুর বিশ্বাস, এ স্থানই ভগবান রামের জন্মভূমি।

তবে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ইতিহাসের পর ভক্তদের কাছে ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠা এই মন্দির এখন বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায়। গত এক মাস ধরে অভিযোগ উঠেছে, ভক্তদের দেওয়া বিপুল পরিমাণ অনুদান ও মূল্যবান উপহার আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মন্দির পরিচালনাকারী ট্রাস্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।

ভক্ত ব্রজেশ কুমার আল জাজিরাকে বলেন, তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তার ভাষায়, যারা ধর্মের নামে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, তারাই সেই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছেন।

অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে।

রাম মন্দির উদ্বোধনের পর থেকেই ভারতের অন্যতম ব্যস্ত ধর্মীয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। মন্দিরটি পরিচালনা করে স্বাধীন সংস্থা ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট’। যদিও ট্রাস্টটি সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নয়, এর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিজেপির আদর্শিক সংগঠন আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়।

চলতি মাসে ট্রাস্টের হিসাব বিভাগের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মহিপাল সিং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলেও আল জাজিরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।

এদিকে বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির নেতা ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেন, মন্দিরের অনুদানের কোটি কোটি রুপি গায়েব হয়ে গেছে। বিরোধীদের চাপের মুখে উত্তর প্রদেশ সরকার তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি ইতোমধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিলেও সেটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

এরই মধ্যে পুলিশ ফৌজদারি মামলা দায়ের করে অন্তত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অনুদানের নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজনও রয়েছেন।

শুধু তাই নয়, আরও অনেক ভক্ত দাবি করেছেন, তারা ট্রাস্টের কাছে জমা দেওয়া রুপার ইট, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মূল্যবান উপহারের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না।

ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শুক্রবার ট্রাস্টের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়সহ কয়েকজন প্রভাবশালী ট্রাস্টি পদত্যাগ করেন। রাম মন্দির আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হওয়ায় চম্পত রায়ের পদত্যাগ ঘটনাটিকে আরও অভিযোগগুলো আরো শক্তিশালী করে তুলেছে।

তবে পদত্যাগের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। হাজারো ভক্তের পাশাপাশি বিজেপির একাংশের সমর্থকরাও নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন এবং অনুদানের অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছেন।

সূত্র: আল জাজিরা

বাবরি মসজিদ ভেঙে মোদির গড়া রাম মন্দিরে দুর্নীতির মহা কেলেঙ্কারি

ট্রাম্প প্রশাসনে ফাটল?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করার পর দেশটির অভ্যন্তরে, বিশেষ করে ইসরাইলপন্থী রাজনীতিক ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। তবে ট্রাম্পের পক্ষে চুক্তিটির সাফাই দিতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি একাধিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং একটি সফল চূড়ান্ত চুক্তির জন্য খুব শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। সুইজারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া ভ্যান্স ইসরাইলের প্রকাশ্য বিরোধিতার জবাবে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন।
তিনি বলেন, আপনারা ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিটি সমস্যার সমাধান শুধু মানুষ হত্যা করে করা সম্ভব নয়। ইসরাইলের সামরিক কৌশলের সমালোচনা করে ভ্যান্সের এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রুবিওর ভিন্ন অবস্থান
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যে ইসরাইলের সমালোচনা না করে বরং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন। গত সপ্তাহে তিনি মধ্যপ্রাচ্য সফর করে উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করেন, যারা যুদ্ধ চলাকালে ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল।
২৫ জুন বাহরাইনে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ (হরমুজ প্রণালি) কোনো একক রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়। এর কয়েক দিন পরই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। ১৭ জুন এমওইউ স্বাক্ষরের পর এটিই ছিল প্রথম সামরিক উত্তেজনা।

বর্তমানে উভয় পক্ষ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা কমাতে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট জ্বালানির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত সপ্তাহে ভ্যান্স ও রুবিওর দেয়া বিভিন্ন বক্তব্যে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে নীতিগত বিভক্তির জল্পনা শুরু হয়। তবে হোয়াইট হাউস জোরালোভাবে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
হোয়াইট হাউসে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভ্যান্স বলেন, বৈরুতে ইসরাইলের বেসামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান শান্তি প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর আগে ইসরাইলের সমালোচনা করে বলেছিলেন, কাউকে খুঁজছেন বলে প্রতিবার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। কারণ ওই ভবনে অনেক মানুষ থাকে, তারা সবাই হিজবুল্লাহর সদস্য নয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে দেশটিতে ইসরাইলি হামলায় চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ভ্যান্স আরও বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্পই এই মুহূর্তে বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রনেতা, যিনি ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি যদি ইসরাইলি সরকারের সদস্য হতাম, তাহলে আমার সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করতাম না।
অন্যদিকে রুবিও লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে হিজবুল্লাহর হামলার বৈধ জবাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভ্যান্সের মন্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান।

উপসাগরীয় দেশগুলো নিয়ে ভিন্ন সুর
ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড সফর করেন এবং আলোচনা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন যে ভবিষ্যতে আরব দেশগুলো ইরানের পুনর্গঠন তহবিলে অবদান রাখতে পারে।
অন্যদিকে রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফর করে মিত্র দেশগুলোকে আশ্বস্ত করেন যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
২৩ জুন তিনি বলেন, ইরানের পুনর্গঠনে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নের প্রশ্ন এখনো অনেক দূরের বিষয়। তিনি বলেন, আমরা অবশ্যই একটি চুক্তি চাই। তবে যে কোনো মূল্যে চুক্তি করতে চাই না।

ইরানকে নিয়ে অবস্থানের পার্থক্য
ভ্যান্স ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, দুই দেশ একসঙ্গে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করতে পারে।
তিনি অতীতের সেই মার্কিন অবস্থান থেকেও কিছুটা সরে আসেন, যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।
ভ্যান্স বলেন, ইসরাইল হোক বা ইরান- কোনো দেশকেই আত্মরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না

অন্যদিকে রুবিও স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে কোনো ধরনের টোল বা ফি আদায় করতে দেয়া হবে না।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, এখানে একটিই শিবির রয়েছে- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শিবির। পুরো প্রশাসনই প্রেসিডেন্টের সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে একমত যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগটও বলেন, রুবিও ও ভ্যান্সের মধ্যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিভক্তির দাবি ‘পুরোনো ও ভিত্তিহীন’। রুবিও নিজেও এ ধরনের জল্পনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমরা সবাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বেই কাজ করছি। পুরো প্রশাসন একই অবস্থানে রয়েছে।

ভ্যান্স ও রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ভিন্নধর্মী অবস্থান রয়েছে।
ক্ষমতায় আসার আগে ভ্যান্স বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধকে প্রাণহানি ও অর্থের অপচয় হিসেবে সমালোচনা করতেন। অন্যদিকে রুবিও সিনেটে থাকাকালে ইরান, রাশিয়া ও কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় “হক” বা কঠোরপন্থী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত এই দুই নেতা রিপাবলিকান পার্টির দুটি ভিন্ন ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। একদিকে রয়েছেন বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ সমর্থনকারী নব্য রক্ষণশীলরা (নিওকনজারভেটিভ), অন্যদিকে রয়েছেন সেই রিপাবলিকানরা, যারা মনে করেন সাম্প্রতিক অনেক বিদেশি যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় ছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনে ফাটল?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বে কি ফাটল ধরেছে, কী ভাবছেন ইসরায়েলিরা

একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে প্রায় অটুট বলেই মনে করা হতো। তবে গত কয়েক সপ্তাহে সেই সম্পর্ক নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিক মহল ও গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৎপরতা এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য সমালোচনা ইসরায়েলে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

অনেক ইসরায়েলি এখন প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্পকে কি এখনো হোয়াইট হাউসে তাঁদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলা যায়?

এর মধ্যে গত মঙ্গলবার নিউইয়র্ক নগরের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারির ফলাফল সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েলের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া তিন ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডেমোক্র্যাট–দলীয় কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন। তাঁরা ইসরায়েলের সমর্থক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেন।

এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের কেউ এখনই চীন বা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার কথা বলছেন না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা দ্রুতই ইসরায়েলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তেল আবিবের বর্তমান ডেপুটি মেয়র আসাফ জামির বলেন, ‘আমি চরম উদ্বিগ্ন।’ তিনি বলেন, বিজয়ী তিন প্রার্থীই নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনাকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অথচ জেরুজালেমের পর নিউইয়র্ক বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি–অধ্যুষিত শহর।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, ইসরায়েল হয়তো আর বেশি দিন ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থন পাবে না। বছরে শতকোটি ডলারের সামরিক সহায়তা, জাতিসংঘে ইসরায়েলবিরোধী প্রস্তাবে মার্কিন ভেটো কিংবা ইসরায়েলি দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য কর-সুবিধা—সবকিছুই ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল সি কার্টজার বলেন, ‘সামনে একটা বড় খাদ আছে। আর আমরা সেই খাদের কিনারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

মঙ্গলবার নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট–দলীয় প্রাইমারিতে কয়েকজন ইসরায়েলপন্থী প্রার্থীও জয় পেয়েছেন। তবে জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া ব্র্যাড ল্যান্ডার ও ক্লেয়ার ভালদেজের মতো প্রার্থীদের জয় ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই প্রার্থীরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে বিজয়ী আরেক প্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন এবং ক্লেয়ার ভালদেজের মতো দেশটিকে বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

আসাফ জামির দাবি করেন, ‘ঘুম থেকে উঠেই শুনছি, আমাদের গণহত্যাকারী ও বর্ণবাদী বলা হচ্ছে।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘আমি একজন বামপন্থী, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে বিশ্বাসী এবং শান্তিপ্রিয় ইসরায়েলি। কিন্তু আমি অন্ধ নই। আমি জানি, ইসরায়েলের পরিস্থিতি কী। আমাদের যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, আমরা তেমন নই। অথচ দিন দিন আরও বেশি মার্কিন নাগরিক এসব বিশ্বাস করছেন এবং সেই ভিত্তিতে ভোট দিচ্ছেন। এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে।’

(আসাফের এই দাবি আসলেই কি সত্য? গাজায় যেভাবে ইসরায়েল ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, বাড়িঘর, হাসপাতাল–স্কুল গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, হাজার হাজার শিশু আর বেসামরিক মানুষকে নিশানা বানিয়ে হত্যা করছে, সেটাকে তিনি সঠিক মনে করেন? গাজায় খাদ্যসংকট তৈরি করে যেভাবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের অনাহার আর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেটাই কি সঠিক? নেতানিয়াহু সরকার আর উগ্র ইহুদিরা শিশুদের হামাস সদস্য বলে তাদের হত্যাকে যেভাবে সমর্থন করেন, আসাফও কি সেটাকেই সঠিক মনে করেন? কোন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল আছে বলে আসাফ দাবি করেন?)

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

দুই বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে এবং গাজা উপত্যকার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মনেও।

গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের এক জরিপে দেখা যায়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মার্কিন নাগরিকেরা ইসরায়েলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি প্রকাশ করছেন।

এ ছাড়া গত এপ্রিলে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪২ শতাংশ।

নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইসরায়েল পলিসি ফোরামের বিশ্লেষক মাইকেল কোপলো বলেন, ‘আমি ইসরায়েলি হলে কংগ্রেসের কট্টর বামপন্থী তিন-চারজন সদস্যকে নিয়ে এতটা চিন্তিত হতাম না।’

মাইকেল কোপলো বলেন, এই নতুন আইনপ্রণেতাদের জয় ডেমোক্রেটিক দলের ভেতরে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাবের একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

এই বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘ইসরায়েলের বিরোধিতা এখন আর কোনো গুরুত্বহীন বিষয় নয়। এটি এখন নির্বাচনী প্রচার এবং মানুষের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।’

ডেমোক্র্যাটদের প্রধান আপত্তি হলো, মানবাধিকার ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখন বড় ধরনের নৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠা ইসরায়েলি জনমত জরিপকারী ডাহলিয়া শিন্ডলিন বলেন, ‘দশকের পর দশক এই বিশেষ সম্পর্ককে চিরস্থায়ী বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।’

গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ডাহলিয়া শিন্ডলিন বলেন, ‘অনেক ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান এখন বুঝতে পেরেছেন, বিশেষ সম্পর্ক ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ ইসরায়েল গাজায় হাজার হাজার শিশুকে হত্যা না করছে। এই নির্মমতার কারণেই মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।’

অন্যদিকে রিপাবলিকান সমালোচকদের প্রধান আপত্তি হলো, ইসরায়েল নিজের যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে আনছে। তাঁদের প্রশ্ন, দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ কি এখনো এক জায়গায় আছে?

২০০০-এর দশকের শুরুতে নিউইয়র্কে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অ্যালন পিনকাস। তিনি বলেন, ‘৪০ বছর ধরে ইসরায়েল নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক কৌশলগত সম্পদ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এখন একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে—ইসরায়েল কি সত্যিই একটি সম্পদ, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের বোঝায় পরিণত হচ্ছে?’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে যদি মার্কিন জনগণকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়, তাহলে এই প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।

তবে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মূল সমর্থনে এখনো বড় ধরনের ফাটল ধরেনি।

বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের কাছে শতকোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি ও জরুরি সামরিক সহায়তা দ্রুত করার ব্যবস্থা করেছে। হামাসের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের ওপর চাপ কমিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ দমনে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে সম্পর্কের আরও অবনতি হলে ইসরায়েলের অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

ইতিমধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের, বিশেষ করে লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করছে, যা অনেক ইসরায়েলির কাছেই অকল্পনীয় ছিল।

এ ছাড়া ইসরায়েল এখন আর প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শতকোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও এ বছর ইঙ্গিত দিয়েছেন, ধীরে ধীরে মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানো উচিত।

বিশ্লেষক মাইকেল কোপলো বলেন, ‘ইসরায়েল সব সময় ধরে নিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এ ধরনের পদক্ষেপ নেবে না। কিন্তু এখন সেই সম্ভাবনাই তীব্র হয়ে উঠছে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল সি কার্টজার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘে ইসরায়েলের পক্ষে মার্কিন ভেটো প্রায় নিশ্চিত। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

কার্টজারের ভাষায়, ‘এখন এমন একজন খামখেয়ালি প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আছেন, যিনি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়; বরং কোন সিদ্ধান্তে তাঁর নিজের লাভ হবে, সেটি বিবেচনা করেই পদক্ষেপ নেন।’

দুই দেশের এই টানাপোড়েন এখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এ সপ্তাহে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে এবং এটি ঠিক করা হবে অত্যন্ত কঠিন কাজ।

বেনেট সতর্ক করে বলেন, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ইসরায়েল একটি বোঝায় পরিণত হয়েছে। এটি আমাদের জন্য এক চরম বিপর্যয়।’

তবে ইসরায়েলিদের জন্য আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া খুব বেশি কিছু করার নেই।

তেল আবিবের ডেপুটি মেয়র আসাফ জামির বলেন, সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসলে মনস্তাত্ত্বিক। তিনি বলেন, ‘আমি সামরিক সহায়তা হারানোর ভয় পাচ্ছি না। সেটা ছাড়াও আমরা বেঁচে থাকতে পারব। আমি আসলে ভয় পাচ্ছি বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সেই ভরসাটুকু হারানোর—যে অনুভূতিটা আমাদের এত দিন সাহস দিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের পেছনে কেউ একজন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’

গত মঙ্গলবার নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার
গত মঙ্গলবার নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার। ছবি: রয়টার্স

মায়ের পরিচয় নিয়ে কেন মুখ খোলেন না কিম জং উন

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের জীবনের অনেকটাই রহস্যে ঘেরা। এর মধ্যে অন্যতম তার মাকে নিয়ে তৈরি গোপনীয়তা। গত ১৫ বছর ধরে তিনি শাসন করছেন। কিন্তু একবারও প্রকাশ্যে মায়ের নাম মুখে নেননি। কিমের শাসনের বৈধতা মূলত ‘মাউন্ট পেকতু’ বংশ পরিচয়ের ওপর টিকে আছে। এটি কোরিয়ান জাতির এক পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতার বংশধারা। উত্তর কোরিয়া বংশের এই পবিত্রতা নিয়ে খুব গর্ব করে। তাই কিমের মায়ের আসল পরিচয় সেখানে কেবল একটি গোপন বিষয় নয়, বরং বর্তমান সরকারের জন্য বড় হুমকি।

পৌরাণিক জন্মস্থান

চীন ও উত্তর কোরিয়া সীমান্তে পেকতু পর্বত অবস্থিত। সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী, এখান থেকেই কোরিয়ার ইতিহাস শুরু হয়। বলা হয়, এটি কোরিয়ার প্রথম রাজ্যের পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতা দানগুনের জন্মস্থান। বহু বছর পর উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং জাপানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় এই পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার ছেলে কিম জং ইলও এই পবিত্র পাহাড়ে জন্মেছেন বলে দাবি করা হয়।

যদিও আসল তথ্য অনুযায়ী তার জন্ম হয়েছিল রাশিয়ায়। গত কয়েক দশক ধরে কিম রাজবংশের শাসন টিকিয়ে রাখতে এই পর্বতের গল্প ব্যবহার করা হচ্ছে।

উত্তর কোরিয়ার নির্বাসিত কূটনীতিক রিয়ু হিয়ুন উন তার বই ‘কিম জং উন’স সিক্রেট ভল্ট’–এ লিখেছেন, ‘কিম জং উনের বয়স যখন বিশের কোঠায়, তখনই তিনি উত্তরসূরি নির্বাচিত হন। তখনো তার উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন ছিল না। তিনি শুধু পেকতু বংশধারার সদস্য হওয়ার কারণেই সে মর্যাদা পেয়েছিলেন।’

তবে কিম জং উনের মায়ের দিকের পারিবারিক বংশপরিচয়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে।

সাবেক উত্তর কোরিয়ান কূটনীতিক রিউ হিউন-উ একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘কিম জং

কিম জং–উনের মা কো ইয়ং–হুই মাউন্ট পেকতু থেকে শত শত মাইল দূরে জাপানের ওসাকা শহরে জন্মেছিলেন বলে মনে করা হয়।

জীবনীকারদের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, কো ইয়ং–হুই ১৯৫২ সালে ওসাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা–বাবা এসেছিলেন জেজু দ্বীপ থেকে। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ উপকূলের কাছের একটি দ্বীপ।

জাপানে বসবাসকারী তাদের পরিবারটি ছিল ‘জাইনিচি কোরিয়ান’। ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সালের ঔপনিবেশিক শাসনামলে কোরিয়া থেকে জাপানে চলে যাওয়া বা সেখানে বসতি গড়া কোরীয় বংশোদ্ভূত মানুষদের একটি অংশকে জাইনিচি কোরিয়ান বলা হয়ে থাকে।

কো ইয়ং হুইয়ের বয়স যখন প্রায় ১০ বছর, তখন তার পরিবার জাপান ছেড়ে উত্তর কোরিয়ায় যায়। ১৯৫৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে উত্তর কোরিয়ায় ফিরে যাওয়া আনুমানিক ৯৩ হাজার কোরীয় অভিবাসীর মধ্যে তার পরিবারও ছিল। একটি পুনর্বাসন কর্মসূচির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এ পরিবারগুলো উত্তর কোরিয়ায় গিয়েছিল। ওই কর্মসূচির আওতায় তাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা, শিক্ষা, চাকরিসহ একটি সুখী ও সচ্ছল জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

প্রথম দিকে উত্তর কোরিয়ায় আসা এসব অভিবাসীকে অনেকেই ঈর্ষার চোখে দেখত। কারণ, তারা জাপান থেকে নগদ অর্থ, উন্নত মানের পোশাক ও বিভিন্ন গৃহস্থালিসামগ্রী নিয়ে এসেছিল। তবে উত্তর কোরিয়ায় এসব অভিবাসীকে ‘জ্যেপো’ নামে ডাকা হতো, যা একটি অবমাননাকর শব্দ। এই শব্দ এমন মানুষদের বোঝাতে ব্যবহার করা হতো, যাদের বিদেশি ও বিপজ্জনক মতাদর্শের প্রভাবে প্রভাবিত বলে মনে করা হতো।

উত্তর কোরিয়ার সমাজব্যবস্থা বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত। অনেক বিশ্লেষক এই ব্যবস্থাকে বর্ণপ্রথার সঙ্গে তুলনা করেন। দেশটিতে বিদ্যমান কঠোর সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতিটি ‘সংবুন’ নামে পরিচিত। সেখানে জ্যেপোদের স্থান ছিল ‘দোদুল্যমান শ্রেণি’-তে, অর্থাৎ শাসকগোষ্ঠীর অনুগত মূল শ্রেণি ও শত্রু শ্রেণির মাঝামাঝি অবস্থানে। এ কারণে জ্যেপোদের কড়া রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে রাখা হতো। পাশাপাশি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বা মর্যাদাপূর্ণ চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা প্রায়ই বৈষম্যের শিকার হতো।

কো ইয়ং–হুইয়ের এই ইতিহাস কিম পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রচারিত ‘পেকতু বংশধারা’র গল্পের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক।

নর্দার্ন রিসার্চ ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক কিম হিয়ুং সু বলেন, ‘শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পেকতু বংশধারার যোগসূত্রকে পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই দেশের নেতা একজন “জ্যেপো”র সন্তান হতে পারেন-এমন ধারণাই অনেকের কাছে অকল্পনীয়।’

‘সিন্ডারেলার মতো’ জীবন

কো ইয়ং–হুইকে অন্য অনেক জাইনিচি কোরিয়ানের মতো একই পরিণতির শিকার হতে হয়নি। কারণ, তার প্রেম এবং তা কিম জং ইলের মতো ব্যক্তির সঙ্গে। কিম জং–ইল তখন ছিলেন শাসনক্ষমতার উত্তরসূরি।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, কো হুইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের আগেই কিম জং ইল বিয়ে করেছিলেন। তার সেই স্ত্রী কিম ইয়ং সুক ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার মেয়ে। সেই বিয়ে হয়েছিল কিম জং ইলের বাবা তৎকালীন শাসক কিম ইল সাংয়ের পছন্দে।

কিম জং ইলের আরো দুজন প্রেমিকা ছিলেন বলেও জানা যায়।

কো ইয়ং হুই উত্তর কোরিয়ার অভিজাত সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য ছিলেন। তার সৌন্দর্য ও নাচের দক্ষতায় মোহিত হয়েছিলেন কিম জং ইল। জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমি ২০২৫ সালে কো ইয়ং–হুইকে নিয়ে লেখা একটি বইয়ে এ কথাগুলো লিখেছেন।

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, কিম জং ইল গভীরভাবে কো ইয়ং হুইয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। তাদের তিনটি সন্তানও হয়।

উত্তর কোরিয়ায় বিয়ে ছাড়া জন্ম নেওয়া সন্তানদের সামাজিকভাবে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাই কিম জং ইলের আনুষ্ঠানিক স্ত্রী ইয়ং সুক পিয়ংইয়ংয়ে বসবাস করলেও কো ইয়ং হুই ও তার সন্তানদের রাজধানী থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরের উপকূলীয় শহর ওনসানে রাখা হয়েছিল।

কিম জং ইলের সঙ্গে সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না পেলেও কো হুই এমন এক জীবন যাপন করেছিলেন, যাকে সাংবাদিক ইয়োজি গোমি তুলনা করেছেন ‘সিন্ডারেলার মতো জীবন’–এর সঙ্গে।

বিভিন্ন সূত্রের মতে, কো ইয়ং হুই ছিলেন কিম জং ইলের সবচেয়ে প্রিয় প্রেমিকা।

তবে একটি বাস্তবতা কখনো বদলায়নি। নির্বাসিত উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিয়ু হিউন উ লিখেছেন, কো ইয়ং হুইকে কখনোই পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকৃতি দেননি কিম ইল সাং। তাকে কখনো প্রকাশ্যে কো ইয়ং হুইয়ের সন্তানদের সঙ্গেও দেখা যায়নি।

সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষক চং সঙ-চাংয়ের মতে, কিম ইল সাং যদি হুইকে স্বীকৃতি দিতেন, তাহলে তার নাতি-নাতনিদের সঙ্গে কিম ইল সাংয়ের ছবি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হতো।

কিম ইল সাংয়ের মৃত্যুর পর কিম জং ইল উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা হন। তখন কো ইয়ং হুই অঘোষিত ফার্স্ট লেডির ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। তিনি কিম জং ইলের সঙ্গে সামরিক পরিদর্শনে যেতেন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

কিম জং ইলের সাবেক ব্যক্তিগত রাঁধুনি কেনজি ফুজিমোতোর বর্ণনা অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেও ইল প্রায়ই হুইয়ের মতামত চাইতেন।

২০১১ সালে নির্মিত একটি সরকারি প্রামাণ্যচিত্রে কিম জং ইলের সঙ্গে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে যেতে দেখা যায় কো ইয়ং হুইকে। তবে সেখানে তাঁর নাম বা সামাজিক শ্রেণিগত পরিচয় সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

প্রামাণ্যচিত্রটি সাধারণ মানুষের জন্য প্রকাশ করা হয়নি। গবেষক চং সঙ চাংয়ের মতে, ২০১২ সালের জুন মাসে এটি শুধু জ্যেষ্ঠ দলীয় কর্মকর্তাদের দেখানো হয়েছিল। পরে সেটি ফাঁস হয়ে যায় এবং চোরাই পথে আনা ইউএসবি ড্রাইভের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তা ছড়িয়ে পড়ে।

চং সঙ চাং বলেন, ‘এটি ছড়িয়ে পড়ার পর কো ইয়ং হুইকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। ফলে সরকার দ্রুত প্রামাণ্যচিত্রটি প্রত্যাহার করে নেয়।’

চং সঙ চাংয়ের মতে, কো ইয়ং হুইয়ের পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমি প্রকাশ্যে এলে শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে-এমন আশঙ্কায় প্রামাণ্যচিত্রটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

ক্ষমতার উত্তরাধিকার

২০০৪ সালে কো ইয়ং হুই স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্যারিসের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তবে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর খবর কোনো গুরুত্বই পায়নি।

তবে প্রেমিকার দ্বিতীয় ছেলে এবং কিম জং ইলের সবচেয়ে ছোট ছেলে কিম জং উন কীভাবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হয়ে গেলেন?

কিম জং ইলের ঘোষিত স্ত্রী কিম ইয়ং সুকের দুটি সন্তান ছিল। কিন্তু দুজনই মেয়ে হওয়ায় উত্তরসূরি হিসেবে তাদের কথা বিবেচনা করা হয়নি।

কো ইয়ং হুই ছাড়াও কিম জং ইলের আরো দু’জন প্রেমিকা ছিলেন। তারা হলেন সং হে রিম ও কিম ওক। ইলের সঙ্গে কিম ওকের কোনো সন্তান ছিল না।

একসময় মনে করা হতো, সং হে-রিমের গর্ভে জন্ম নেওয়া কিম জং ইলের বড় ছেলে কিম জং নাম উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তবে বহু বছর বিদেশে পড়াশোনা করা কিম জং নাম শুরু থেকেই শাসকগোষ্ঠীর অপছন্দের ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তিনি এক দশকের বেশি সময় বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এবং ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় সাবলীল ছিলেন।

সাংবাদিক ইয়োজি গোমি বছরের পর বছর ধরে কিম জং নামের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তিনি বলেন, কিম জং নাম উত্তর কোরিয়ার বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যবস্থার সমালোচনা করতেন এবং সংস্কারের পক্ষে মত দিতেন। এ কারণেই তিনি ক্ষমতাকেন্দ্রের সমর্থন হারান। এ ছাড়া ঘন ঘন ক্যাসিনোতে যাওয়া এবং বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপনের কারণে তার সম্পর্কে একজন আনন্দপ্রিয় ও ভোগবিলাসী ব্যক্তির ভাবমূর্তিও তৈরি হয়েছিল।

ম্যাকাউতে কয়েক বছর ধরে নির্বাসিত জীবনযাপনের পর ২০১৭ সালে কিম জং নামকে মালয়েশিয়ায় হত্যা করা হয়। বিমানবন্দরে তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল।

নির্বাসিত কূটনীতিক রিয়ু হিউন উ বলেন, কিম জং উনের বড় ভাই কিম জং চুলও উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। তবে গুরুতর আফিম-আসক্তির কারণে তাকে উত্তরাধিকারীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

ধারণা করা হয়, কো ইয়ং হুই নিজেই তার দ্বিতীয় ছেলে কিম জং উনকে ক্ষমতার উত্তরসূরি করার জন্য সক্রিয় হয়েছিলেন।

সাংবাদিক অ্যানা ফিফিল্ড তার ‘দ্য গ্রেট সাকসেসর: দ্য সিক্রেট রাইজ অ্যান্ড রুল অব কিম জং উন’ বইয়ে লিখেছেন, কো ইয়ং হুই তার বোনের পরামর্শে এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার বোন তাকে বলেছিলেন, ‘তোমার ছেলেকেই পরবর্তী নেতা হতে হবে, নইলে আমাদের পুরো পরিবার ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতার মানসিকতা কিম জং উনকে খুব দ্রুতই তার বাবা কিম জং ইলের প্রিয়পাত্র করে তুলেছিল।

কিম জং উন কিছু সময়ের জন্য সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনা করেছেন। তবে বলা হয়, বিদেশে থাকলেও তাকে তার সৎভাই কিম জং নামের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও বিচ্ছিন্ন পরিবেশে রাখা হয়েছিল।

২০১১ সালে কিম জং ইল যখন মারা যান, তখন মাত্র ২৭ বছর বয়সি কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার শীর্ষে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন।

এরপর কিম জং উন বোন কিম ইয়ো জংকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেন। তিনি উত্তর কোরিয়ার প্রভাবশালী প্রচার বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে ধারণা করা হয়।

তবে কিম জং উনের পারিবারিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন আজও তার পিছু ছাড়েনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই উনের জন্মদিনকে এখনো জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। কারণ, তার জন্ম ও শৈশব নিয়ে বেশি আলোচনা শুরু হলে তার মায়ের পরিচয় এবং কেন তিনি পিয়ংইয়ংয়ের বাইরে বড় হয়েছেন-এসব স্পর্শকাতর প্রশ্ন সামনে চলে আসতে পারে। অথচ উনের দাদা কিম ইল সাং ও বাবা কিম জং ইলের জন্মদিন উত্তর কোরিয়ায় জাতীয়ভাবে উদ্‌যাপন করা হয়।

কিম জং উনের পারিবারিক পরিচয় ঘিরে যে গোপনীয়তা রয়েছে, সেটিই সম্ভবত তাকে দ্রুত তার স্ত্রী রি সল জুকে জনসমক্ষে পরিচয় করিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রি সল জু পিয়ংইয়ংয়ের একটি উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছেন বলে মনে করা হয়। তিনি একটি স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক দলের গায়িকা ছিলেন। এ ছাড়া তরুণ বয়সে রি সল জুকে চীনে ধ্রুপদি সংগীত শেখার জন্য পাঠানো হয়েছিল, যা উত্তর কোরিয়ার সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা সংবুনে ভালো পারিবারিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।

জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমি বলেন, ‘মায়ের পারিবারিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে কিম জং উন যে বৈধতাজনিত সংকোচ ও ক্ষোভ অনুভব করতেন, সেটিই তাকে শুরুতেই স্ত্রী রি সল জু এবং মেয়ে জু আয়েকে সামনে আনার জন্য শক্তিশালী প্রেরণা জুগিয়েছিল।’

এখন প্রশ্ন হলো, যদি কোনো দিন কিম জং উনের মায়ের প্রকৃত বংশপরিচয় ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে চলে আসে, তাহলে কী হতে পারে?

নির্বাসিত উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিয়ু হিউন উর মতে, ‘যদি জানা যায় যে তার (কিম উন) মা জাপানে বসবাসকারী কোরীয় বংশোদ্ভূত পরিবারের সদস্য ছিলেন, তাহলে তা শুধু কিমের শাসনের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে না; বরং উত্তর কোরিয়ায় বংশানুক্রমিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পুরো ব্যবস্থাকেই নাড়িয়ে দেবে। উত্তর কোরীয় সমাজে এর প্রভাব হবে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের মতো।’

সূত্র: বিবিসি

মায়ের পরিচয় নিয়ে কেন মুখ খোলেন না কিম জং উন
কিম জং উন, মা কো ইয়ং হুই ও বাবা কিম জং ইল। ছবি: বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল প্রস্তাবিত চুক্তি প্রত্যাখ্যান করল লেবানন

লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার ও হিজবুল্লাহর মিত্র নাবিহ বেরি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও লেবাননকে নিয়ে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় কাঠামো চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, এই চুক্তিতে লেবাননের অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি, তাই এটি বর্তমান রূপে কার্যকর হবে না।

সোমবার (২৯ জুন) ভোরে নিজের দল আমাল মুভমেন্টের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বেরি বলেন, এই চুক্তি পাস হবে না এবং বর্তমান রূপে বাস্তবায়নও হবে না।

তিনি আরও বলেন, এটি লেবাননের অধিকার সংরক্ষণের চুক্তি নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া শর্তের একটি চুক্তি। এতে লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে তাদের দখলকৃত এলাকাগুলো থেকে সরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। যতদিন না ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সরে যাবে এবং হামলা বন্ধ না করবে ততদিন এই চুক্তির কোনো অর্থ নেই।

লেবাননের সাধারণ জনগণও এই চুক্তি পক্ষে নন। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা আল জাজিরা জানিয়েছে, লেবানন-ইসরায়েল-মার্কিন কাঠামো চুক্তির অন্যতম কঠোর সমালোচক হলেন তারাই, যারা দেশটিতে ইসরায়েলের হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

তাদের অনেকেই বলছেন, এই চুক্তিটি অসম্পূর্ণ, কারণ এতে লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে তাদের দখলকৃত এলাকাগুলো থেকে সরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়েহর বাসিন্দা আলী যায়তুন আলজাজিরাকে বলেন, এই চুক্তিটি মেনে নেওয়া তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।

যায়তুন বলেন, আমার পরিবার, আমার গ্রাম, দক্ষিণাঞ্চল এবং দাহিয়েহ যা কিছু সহ্য করেছে তার পর সেই একই রাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তি মেনে নেওয়া আমার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন, যারা আমাদের জনপদগুলোকে ধ্বংস করে দিতে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। 

লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি। ছবি : সংগৃহীত
লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি। ছবি : সংগৃহীত

সলিলের গানের ভেতরেই ছিল মিছিলের স্লোগান

প্রকাশ ১৯ নভেম্বর ২০২৫ঃ ‘গণসংগীত মানুষের রক্তে আগুন জ্বেলে দিয়েছে, উজ্জীবিত করেছে, মুক্তির পথ দেখিয়েছে’—আজ শহীদ মিনারে এই উচ্চারণে আবারও ফিরে এলেন সলিল চৌধুরী। বুধবার, সন্ধ্যায় উদীচীর আয়োজনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হলো কিংবদন্তি গণসংগীতকার সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন ‘সতত সলিল’।

আলোচনা, গান, কবিতা ও নৃত্যে সজ্জিত এই আয়োজন ছিল একাধারে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও চেতনার পুনর্জাগরণ। সভাপতিত্ব করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম। আলোচনায় অংশ নেন লেখক–গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়েম রানা এবং উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান।

সলিল চৌধুরী সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আলোচকেরা বলেন, জাতির যে ঐতিহাসিক ধারাক্রম রয়েছে, সেই ধারার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের একজন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন সলিল চৌধুরী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলার মানুষের প্রতিটি লড়াই–সংগ্রামে গণসংগীত মানুষের রক্তে আগুন জ্বেলেছে, মানুষকে উজ্জীবিত করেছে, মানুষকে তার মুক্তির পথ দেখিয়েছে। সলিল চৌধুরী ছিলেন সেই গণসংগীতের একজন কিংবদন্তি কারিগর। তাঁর হাত ধরে গণসংগীত পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। তিনি কবিতাকে, মিছিলের স্লোগানকে যেমন গানে রূপান্তর করেছেন, তেমনি তাঁর রচিত সংগীত হয়ে উঠেছে মিছিলের স্লোগান। বক্তারা আরও বলেন, ‘গণমানুষের মুক্তির বাণী নিয়ে যে গান, তা আমাদের যুগে যুগে রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসকশ্রেণি থেকে শুরু করে অনেকেরই পছন্দের নয়। তাই হয়তো আমাদের সমাজে গণসংগীত যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু তারপরও মানবমুক্তির প্রতিটি লড়াইয়ে, প্রতিটি সংগ্রামে গণসংগীত আমাদের শক্তি জোগায়, সাহস জোগায়। বাংলা আধুনিক গানের অবিস্মরণীয় সুরস্রষ্টা ও গণসংগীতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি সলিল চৌধুরীর তৈরি করা গণসংগীত সর্বকালের জন্য প্রাসঙ্গিক।’

আলোচনা শেষে আয়োজন মাতিয়ে তোলে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বৃন্দগান পরিবেশন করে উদীচী সংগীত বিভাগ ও ‘কোরাস’। একক গান করেন তানভীর আলম সজীব এবং মনসুর আহমেদ। বৃন্দনৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দন; একক নৃত্যে অংশ নেন আদৃতা আনোয়ার প্রকৃতি। আবৃত্তিতে অংশ নেয় উদীচী আবৃত্তি বিভাগ; একক আবৃত্তি করেন শাহেদ নেওয়াজ।

১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার গাজীপুর গ্রামে জন্ম গণসংগীতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব সলিল চৌধুরীর। পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সুর থেকে অসমিয়া লোকগান—বহুমাত্রিক সঙ্গীতভুবনে বেড়ে ওঠা সলিল মাত্র ২২ বছর বয়সে রচনা করেন অমর গান ‘গাঁয়ের বধূ’।

আইপিটিএতে সক্রিয় কাজের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন গণমানুষের শিল্পী। তাঁর ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘দো বিঘা জমিন’-এর সংগীত পরিচালনা করেন তিনিই, যা আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। বাংলা, হিন্দি, মালয়ালামসহ বিভিন্ন ভাষার ১৫০টির বেশি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন তিনি। কবিতা, স্লোগান ও লোকসুরের সঙ্গে পাশ্চাত্য অর্কেস্ট্রেশনের অপূর্ব সংমিশ্রণে তাঁর সৃষ্টি আজও আন্দোলনের গান, মানবমুক্তির গান। আজ সলিলের শতবর্ষে শহীদ মিনারের ওপর আজ যেন ভেসে উঠেছিল তাঁর গান-মানুষের সাহস, সংগ্রাম আর মানবমুক্তির চিরন্তন সুর।

আলোচনা, গান, কবিতা ও নৃত্যে সজ্জিত এই আয়োজন ছিল একাধারে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও চেতনার পুনর্জাগরণ
আলোচনা, গান, কবিতা ও নৃত্যে সজ্জিত এই আয়োজন ছিল একাধারে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও চেতনার পুনর্জাগরণ। উদীচী

নাম না বলেও ভালোবাসা যায়, শিখিয়েছেন সঞ্জীব by সৌমেন্দ্র গোস্বামী

লেখাপড়ায় অসাধারণ ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—দুটি পরীক্ষাতেই মেধাতালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তি হন; কিন্তু ভালো লাগল না বলে থিতু হলেন না। বিভাগ পরিবর্তন করে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে গেলেন। কর্মজীবনে সাংবাদিকতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। ভালোবেসে ফলিয়েছিলেন সোনার ফসল। তাঁর হাতে ‘ফিচার’ ভাষা পেয়েছে।

সঞ্জীব চৌধুরীর জন্ম ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের মাকালকান্দি গ্রামে। বাবা-মায়ের সপ্তম সন্তান তিনি। কর্মমুখর জীবনে অনেক পরিচয়ে অভিষিক্ত করেছেন নিজেকে। লিখেছেন কবিতা, গল্প, নাটকসহ নানা কিছু। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর পৃথিবীর বাতাসে শেষবার নিশ্বাস ছেড়েছেন তিনি। ৪৩ বছর বয়সের ছোট্ট জীবনে বাংলা গানে তৈরি করে গেছেন নতুন ধারা। গান দিয়ে জিতে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়। ১৮ বছর পরও তাঁর গানের রং ফিকে হয়নি। একইভাবে ভালোবেসে তাঁর গান আঁকড়ে রেখেছেন শ্রোতারা। ভক্ত, অনুরাগীরা আজও তাঁকে শ্রদ্ধা নিয়ে স্মরণ করছেন। আজ সারা দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে কথা হয়েছে, ছবি শেয়ার করেছেন অনেকে।

‘আমি তোমাকেই বলে দেব/ কী যে একা দীর্ঘ রাত, আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে/ আমি তোমাকেই বলে দেব/ সেই ভুলে ভরা গল্প, কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়/ ছুঁয়ে কান্নার রং, ছুঁয়ে জোছনার ছায়া’। কথাগুলো উচ্চারিত হতেই কেমন যেন ভালো লাগা অনুরণিত হয়। বাপ্পা মজুমদারের সুরে গানটিতে জীবনের চূড়ান্ত সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন সঞ্জীব। তাই তো গানের পরের চরণে তিনি যখন গেয়ে ওঠেন, ‘আমি কাউকে বলিনি সে নাম/ কেউ জানে না, না জানে আড়াল/ জানে কান্নার রং, জানে জোছনার ছায়া’,  তখন মন কেমন করে ওঠে।
ভালোবাসা, প্রেম, বিরহ, প্রতিবাদ, দ্রোহ—প্রতিটি বিষয়কেই নিজস্ব ভাষায় গানে তুলে ধরেছেন সঞ্জীব। যা কেবল তাঁর নিজের ভাষা বা নিজের গান হয়েই থেকে যায়নি, ক্রমেই শ্রোতাদের ভাষা ও অভিব্যক্তি হয়ে উঠেছে। শোষকের বিরুদ্ধে গানে গানে সব সময় সোচ্চার ছিলেন তিনি। কঠিন সময়েও তাঁর গান থামেনি, প্রতিবাদ জারি রেখেছেন।
সঞ্জীব সংগীতচর্চা শুরু করেছিলেন শঙ্খচিল নামের একটি সংগীত দলে যুক্ত হয়ে। ফোক গানের প্রতি তাঁর বিশেষ ভালো লাগা ছিল। তাঁর কণ্ঠে ফোক জমেছেও বেশ। বাউল শাহ আবদুল করিমের লেখা ‘গাড়ি চলে না চলে না/ চলে না রে, গাড়ি চলে না’ গানটি তাঁর কণ্ঠে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গে জনপ্রিয় ব্যান্ড দলছুট গঠন করেন সঞ্জীব। দুজনের প্রয়াসে দলছুট শ্রোতাদের মন জিতে নেয়। দলছুটের প্রথম অ্যালবাম ‘আহ’। ১৯৯৭ সালে এটি প্রকাশিত হয়। এরপর ‘হৃদয়পুর’, ‘স্বপ্নবাজি’, ‘আকাশচুরি’, ‘জোছনা বিহার’, ‘টুকরো কথা’, ‘আয় আমন্ত্রণ’ নামে আরও কয়েকটি অ্যালবাম বেরিয়েছে দলছুট থেকে।

কবি কামরুজ্জামান কামুর লেখা সঞ্জীব চৌধুরীর গাওয়া ‘আগুনের কথা বন্ধুকে বলি,’ ‘তোমার ভাঁজ খোলো, আনন্দ দেখাও’, ‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ’ গানগুলোও তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে।
নিজের লেখা কবিতাতেও সুর দিয়েছেন সঞ্জীব। কবিতা থেকে বানিয়েছেন গান। ছোটগল্পও লিখেছেন কিছু। তাঁর ‘রাশ প্রিন্ট’ আশির দশকে বাংলা একাডেমি কর্তৃক সেরা গল্পগ্রন্থ হিসেবে নির্বাচিত হয়। নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখার কাজেও দক্ষ ছিলেন সঞ্জীব। ‘সুখের লাগিয়া’ নাটকের মাধ্যমে অভিনয়েও নাম লিখিয়েছিলেন এই শিল্পী।

গল্পকার, নাট্যকার, সাংবাদিক—নানা পরিচয়ের মধ্যে শিল্পী হিসেবেই সমধিক পরিচিত সঞ্জীব চৌধুরী। গান দিয়েই আসন করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে। ‘আমি ফিরে পেতে চাই/ সেই বৃষ্টিভেজা সুর/ আমি ফিরে পেতে চাই /সাত সুখের সুমুদ্দুর’।

গানের এই আহ্বান কেবল সঞ্জীবের একার নয়, প্রত্যেকে এভাবে বলতে চাই। প্রেমিকমাত্রই বলতে চাই, ‘আমি রাগ করে চলে যাব ফিরেও আসব না/ আমি কষ্ট চেপে চলে যাব খুঁজেও পাবে না/ মেয়ে আমাকে ফেরাও/ আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’। গানে সহজভাবে বলতে পারা, সবার কথা বলতে পারাই কি তাঁর গানের প্রতি শ্রোতাদের আগ্রহ বাড়িয়েছে? কনসার্ট থেকে ঘরোয়া আয়োজন—সর্বত্র নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাঁর গান গেয়ে থাকেন।

সঞ্জীব চৌধুরী
সঞ্জীব চৌধুরী (২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪—১৯ নভেম্বর ২০০৭) ছবি: সংগৃহীত