Showing posts with label Exclusive. Show all posts
Showing posts with label Exclusive. Show all posts

Tuesday, September 15, 2026

ইরান যুদ্ধে অস্ত্র সংকটের বিষয় স্বীকার করে নিজেদের দুর্দশার কথা জানাল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে সংকট তৈরি হয়েছিল বলে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে পেন্টাগন।

নিজেদের দুর্দশার কথা জানিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের (ইন্সপেক্টর জেনারেল) বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোলাবারুদের মজুতও প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের ওপর তৈরি প্রতিবেদনে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মজুত কমে যায়। এর আগে চালানো হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার রাডারসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামও ধ্বংস হয়েছিল।

ইরান ও তার মিত্রদের হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন বাহিনীর পরিচালন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হয়। হামলার পর সেন্টকমকে সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র সংরক্ষণাগার সরিয়ে নিতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে ইরাক ও কুয়েত থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীর চিকিৎসা-উদ্ধার হেলিকপ্টার প্রত্যাহার করা হয়। ফলে অধিকাংশ আহত সেনাকে আকাশপথের বদলে স্থলপথে স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।

বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর আঞ্চলিক ঘাঁটি ধ্বংস হওয়ায় পর্যাপ্ত নৌঘাঁটি ও সহায়ক বন্দর তৈরি করতেও বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে।

পরিস্থিতির কারণে ভারত মহাসাগরের দুর্গম দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপকে সামুদ্রিক রসদ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে মার্কিন বাহিনী। এতে নতুন করে রসদ সরবরাহের সময় বেড়ে ১৪ থেকে ১৮ দিন হয়েছে।

রসদ সরবরাহে অনিয়মিত ঘাটতির পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনীর আঞ্চলিক ডাকব্যবস্থায়ও বিঘ্ন ঘটে। এতে পারস্য উপসাগরে মার্কিন সেনা মোতায়েন আরও জটিল হয়ে পড়ে।

ইরানে বিমান হামলা এবং পরবর্তী সময়ে ইরানি বন্দর অবরোধের প্রচেষ্টায় মার্কিন বাহিনীর অভিযান পরিচালনাতেও এসব সংকটের প্রভাব পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কিছু পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধের পর অঞ্চলটিতে দীর্ঘমেয়াদে সেনা ও সামরিক স্থাপনা কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি প্রতিবেদনে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলায় পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোতে প্রায় ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে। তবে সামরিক ঘাঁটিগুলোর মোট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়নি।

মার্চের শুরুতে ইরানি দুটি ড্রোন রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস কম্পাউন্ডে আঘাত হানে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার মধ্যে সেখানে থাকা একটি সিআইএ স্থাপনাও ছিল। একই সময়ে দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন হামলায় একটি ইউটিলিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইরানি ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মার্চে কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস পুরোপুরি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। জুনের শেষ দিকে মার্কিন নাগরিকদের জন্য জরুরি কার্যক্রম আবার চালু করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাকে মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ৬০০টির বেশি হামলার খবর পাওয়া যায়। এতে প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়, যা কূটনৈতিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে সবচেয়ে বেশি।

যুদ্ধের সময় ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুনের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন কূটনৈতিক কর্মকর্তা অঞ্চলটির বাইরে অবস্থান করছিলেন। একই সময়ে পশ্চিম এশিয়ায় অধিকাংশ মার্কিন কূটনৈতিক মিশন সীমিত কার্যক্রমের মধ্যে ছিল।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জরুরি দায়িত্বে না থাকা কর্মকর্তা এবং সব পরিবারের সদস্যকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

প্রতিবেদন তৈরির সময়ও অঞ্চলটির অধিকাংশ মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে সীমিত কার্যক্রম চলছিল। অর্থাৎ এসব মিশনে স্বাভাবিক সংখ্যায় কর্মী ফেরেননি।

প্রতিবেদনে যুদ্ধের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ইরানের পাল্টা প্রতিরোধের প্রভাবও উঠে এসেছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে মার্কিন সামরিক তৎপরতা বাড়ে। পরে ইরান প্রণালিটি সব ধরনের নৌযান চলাচলের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক অভিযান, রসদ সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি হয়।

সূত্র : সিবিএস নিউজ

ইরানের হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: রয়টার্স
ইরানের হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: রয়টার্স

হুতি–সৌদির সংঘাতে ট্রাম্প কি নতুন বিপদে পড়ছেন

ইরান-সমর্থিত হুতিরা কয়েক দিন ধরে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। গত শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরে পুরো ইয়েমেন উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে। তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার দখলও নেয়।

ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী বাব আল-মানদেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবিও করেছে এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে সরবরাহকৃত তেলের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর এর বিকল্প বাণিজ্যিক পথ হিসেবে সামনে চলে আসে বাব আল-মানদেব। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য ইরান যুদ্ধের মধ্যে নিজেদের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। ইরানের সমর্থনে হুতিরা সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে কাবু করতে ইরানও হরমুজ প্রণালির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিম দিকে হুতিদের অব্যাহত হামলার বিষয়টি ওয়াশিংটন হয়তো আর উপেক্ষা করতে পারবে না। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের দ্বিতীয় অস্থিতিশীল ফ্রন্টটি বন্ধ করতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আরও বিস্তৃত একটি জোটের প্রয়োজন হতে পারে।

হুতিরা সৌদি আরবে হামলা করছে কেন

হুতি বিদ্রোহীরা সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন চালিয়ে আসছে। ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে তারা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানির বাজার বারবার উল্টেপাল্টে দিয়েছে।

ইয়েমেনে হুতিদের বড় ধরনের উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। সে বছর তারা রাজধানী সানা দখল করে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়, যার জেরে ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়। ইয়েমেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গাজায় হামাসের সমর্থনে বাব আল-মানদেবে চলাচল করা জাহাজে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গোষ্ঠীটি আবার আলোচনায় আসে।

জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল-মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকেও তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

২০২৫ সালে লোহিত সাগর যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে একটা উত্তেজনাকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষশক্তি’র অংশ হিসেবে সেবার হুতিরা আন্তর্জাতিক জাহাজে তাদের হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছিল।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় হুতিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামে বড় সামরিক অভিযান শুরু করেন। এতে খরচ হয় প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার।

এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, ড্রোন ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় ও আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহারের পরও এ অভিযান কৌশলগত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। হুতিদের সামরিক সক্ষমতার ওপর এ অভিযানের তেমন কোনো প্রভাবই পড়েনি। অভিযানে ইয়েমেনে আট শতাধিক স্থানে হামলা চালানো হয়েছিল।

ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ও ইরানের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে হুতিরা যে সে সময়ে শুধু টিকে ছিল, তা নয়; বরং বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের ওপর হামলা আরও বাড়িয়ে দেয়। হুতিদের এ আক্রমণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্যের ওপর বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। হুতিরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। এমনকি মার্কিন যুদ্ধজাহাজও বারবার হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ওই অভিযান শুরুর দুই মাসের মাথায় ওই বছরের ৬ মে ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে ইসরায়েলকে এড়িয়ে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন। ওই এলাকা শান্ত হয়ে আসে।

কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে তেহরানের পক্ষে আবারও হুতিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা বেড়েছে। সংকীর্ণ এ প্রণালি সমুদ্রপথে, বিশেষ করে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে মহাগুরুত্বপূর্ণ। আরব সাগর থেকে এডেন উপসাগর দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশ করতে হলে সরু এ প্রণালিই একমাত্র পথ।

হুতিরা বলেছে, ইরানের সমর্থনে তারা এসব হামলা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোকে যুদ্ধে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইয়েমেনে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এডমুন্ড ফিটন-ব্রাউন দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছেন, হুতিরা যে তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করবে, এতে কোনো সন্দেহ কখনোই ছিল না।

ফিটন-ব্রাউন আরও বলেন, কয়েক মাস ধরে সমুদ্রে হামলা চালানোর পর হুতিরা হয়তো মনে করছে, সৌদি আরব তাদের যেসব হুমকি দিয়ে রেখেছে, বাস্তবে সেগুলো যাচাই করার সময় এসেছে। হয়তো তারা মনে করছে, সৌদি আরব লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তারা মনে করছে, ইরানিদের সামনে সৌদিরা নিজেদের দুর্বল ও ভীত হিসেবে তুলে ধরেছে।

হুতিরা এ সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিক ফিটন–ব্রাউন। তিনি বলেন, ‘হুতিরা মনে করছে, এটাই সেই সময়, যখন তারা নিজেদের দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে এবং সৌদি আরবের কাছ থেকে তাদের (হুতি) আগের দাবিদাওয়ার চেয়ে আরও বেশি সুবিধাজনক শর্ত আদায় এবং প্রতিপক্ষকে সেটা মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবে।’

সৌদি আরব বহু বছর ধরে হুতিদের দমন করার চেষ্টা করে আসছে। ২০১৫ সাল থেকে গোষ্ঠীটিকে রাজধানী থেকে হটিয়ে ২০১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

তবে এখন পর্যন্ত তারা লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ভয় দেখিয়ে ওই পথে চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা থেকে হুতিদের বিরত রাখতে পারেনি।

হামলাগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কী প্রভাব ফেলছে

গত মঙ্গলবার হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো। কিন্তু এতে বহু মানুষ হতাহত হন। বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এটাই ছিল সৌদি আরবে সবচেয়ে বড় হামলা।

চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, এই হামলাগুলো নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান বৃহত্তর সংঘাতেরই অংশ।

দ্য ইনডিপেনডেন্টকে লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, বড় একটি প্রশ্ন হলো, পুরো অঞ্চলে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কতটা প্রতিরোধক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা গেছে। কিন্তু নানা চেষ্টা সত্ত্বেও হুতিদের সামরিক শাখাকে ঠেকানো ‘আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠছে’।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিতে হুতিদের বিষয়টির কোনো সমাধান হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই ওয়াশিংটন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনের বিষয়টি আলোচনায় তুলতে চাপ দিয়ে আসছিল।

লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে একটি সমাধান বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত অবসানের যেকোনো উদ্যোগের অংশ হতে হবে। তা না হলে এসব গোষ্ঠী আবার অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারবে এবং পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীল করে তুলতে সক্ষম হবে।

এরপর কী হতে পারে

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ হুতিদের হামলার নিন্দা করেছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘কূটনীতির পথ এখনো বন্ধ হয়নি।’

যদিও হুতিরা দাবি করেছে, সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-জওফ, আল-বায়দা, মারিব ও তাইজ প্রদেশে হামলা চালিয়েছে।

এ নিয়ে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরব সব সময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে থাকবে। তবে নিজেদের ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এ রাষ্ট্র কখনোই পিছপা হবে না। নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আমরা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করব।’

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড হুতিদের ‘শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা’ করার অঙ্গীকার করেছে।

সৌদি আরবের বিশ্লেষক আলী শিহাবি হুতিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরব বুঝতে পেরেছে, হুতিরা যুক্তিসংগত আচরণ করছে না। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম।’

এ বিষয়ে ফিটন-ব্রাউন বলেন, সৌদি আরব পাল্টা লড়াই করতে প্রস্তুত বলেই তাঁর মনে হচ্ছে। হুতিদের আগ্রাসন ঠেকাতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় (মক্কা চুক্তি) তারা একটি নৌ জোট গঠন করেছে।

যদিও এখনো আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ রিয়াদের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। এদিকে ইয়েমেনে কারা শাসন করবে, তা নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

সর্বশেষ এ উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ সালমান ওয়াশিংটনে ফোন করে হুতিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছেন বলে কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে।

ফিটন-ব্রাউন বলেন, এ অঞ্চলের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব চাইছে। তারা চায়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সংঘাত যে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, যুক্তরাষ্ট্র তা স্বীকার করুক এবং সেখানে হস্তক্ষেপ করুক। কারণ, সৌদি আরব সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি লোহিত সাগরকে উপেক্ষা করে, হুতিদের কাছ থেকে সৌদি আরবের ওপর তৈরি হওয়া এই হুমকিকে উপেক্ষা করে, তাহলে সেটি আসলে পুরো বিষয়কে নিজেদের জন্যই আরও কঠিন করে তোলা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন না পাওয়ায় মার্কিন নাগরিকেরা ক্ষুব্ধ। তবে আমার মনে হয়েছে, সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করতে একটি জোট গড়ে তোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র খুব সামান্যই চেষ্টা করেছে।’

ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে কড়া পদক্ষেপ নেন বা পারস্য উপসাগরে আকাশ, নৌ ও স্থলপথে বড় ধরনের কোনো অভিযান চালান, তবে সেটি শুরুতেই নস্যাৎ করা হুতিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হুতিরা তাদের নৌ সক্ষমতা ব্যবহার করে ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারবে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে। তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াস আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির দূরত্ব এক হাজার কিলোমিটারের বেশি হওয়া মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা।

সম্প্রতি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা ও এর অন্তর্নিহিত সতর্কবার্তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমাবেশ প্রতিহত করা। ইরানের ওপর কোনো বড় হামলার আগে অথবা কড়া পাহারায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন চেষ্টাকে আটকে দিতেই মূলত এ কৌশল নিয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বহুবার হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে এবং আগামী দিনেও সেই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এরপরও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলে হুতিদের এ অব্যাহত হামলা মার্কিন বাহিনীর সমরপ্রস্তুতি ও সেনাসমাবেশের গতি বেশ খানিকটা মন্থর করে দিতে পারবে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের কাছে হুতিবিরোধী ইয়েমেনি একটি সূত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছে। সেই সূত্রের ভাষ্যমতে, সংঘাতের পেছনের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া তেলের বিশাল পাইপলাইন (ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন)।

ইরাক থেকে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পাইপলাইনের একটি অংশে হামলা চালানোর পর লোহিত সাগর দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহনের এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন শুক্রবার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ইউরোপে জ্বালানি তেলের জোগান স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রেও এ পাইপলাইনের ভূমিকা অনেক।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় হুতিদের কড়া জবাব দিতে এবং নিজেদের রণতরি ঝুঁকিমুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে হুতিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করতে পারে ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে পুরো যুদ্ধের মানচিত্রে খুলে যেতে পারে নতুন আরেকটি বিপজ্জনক রণাঙ্গন। কারণ, হুতি বিদ্রোহীদের শক্তিশালী করতে সম্প্রতি নিজেদের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা, মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসংক্রান্ত সরঞ্জাম ইয়েমেনে পাঠিয়েছে ইরান।

(দ্য ইনডিপেনডেন্ট, রয়টার্স, আল–জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন শামিমা নাসরিন)

পতাকা হাতে দুই হুতি যোদ্ধা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
পতাকা হাতে দুই হুতি যোদ্ধা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: কোলাজ/রয়টার্স ফাইল ছবি

Sunday, September 13, 2026

এক দেশ, বহু শক্তির লড়াই: ইয়েমেন কীভাবে বারবার যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে by অনিন্দ্য সাইমুম

বিস্তীর্ণ আরব উপত্যকার একেবারে দক্ষিণ–পশ্চিম কোণের দেশ ইয়েমেন। আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বড়। ভূপ্রকৃতি, পাহাড় আর মরুভূমি ঘেরা। দেশটিতে চার কোটির কিছু বেশি মানুষের বসবাস। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাজধানী সানা।

ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা করে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। দেশটির দুদিকে স্থলভাগ, দুদিকে সাগর। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, উত্তরে সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির বিশাল সীমানা। পূর্বে ওমান। পশ্চিমে লোহিত সাগর। দক্ষিণে এডেন উপসাগর ও আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগরের সুনীল জলরাশি।

লোহিত সাগর আর এডেন উপসাগর হয়ে আরব সাগরে চলাচলের জন্য ইয়েমেন ঘেঁষে সরু একটি করিডর রয়েছে। এ জলপথকে বাব আল–মানদেব প্রণালি নামে ডাকা হয়। প্রণালির এক পাশে ইয়েমেন, অন্য পাশে আফ্রিকার জিবুতি। এই সরু জলপথ দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের দিকে জাহাজ চলাচল করে।

লোহিত সাগর থেকে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বাব আল–মানদেব প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। আর এমন বাণিজ্যিক গুরুত্ব ইয়েমেনের ভূরাজনৈতিক আবেদন বহু গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আফ্রিকা ও আরবের (বৃহত্তর এশিয়ার) অন্যতম সংযোগস্থল বলা হয় ইয়েমেনকে।

সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইয়েমেনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ, হাজারো বছরের পুরোনো। অর্থনৈতিকভাবে সম্পদশালী ভূখণ্ড ছিল ইয়েমেন। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে সাবা, মাইন ও হিময়ারের মতো রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ভারত মহাসাগর, পূর্ব আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যকার বাণিজ্যপথে অবস্থানের কারণে ইয়েমেন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ধূপ, সুগন্ধি দ্রব্য ও মসলার বাণিজ্য ছিল এ সমৃদ্ধির বড় উৎস।

সপ্তম শতাব্দীতে ইয়েমেন মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় বিভিন্ন স্থানীয় রাজবংশ ও ধর্মীয় নেতা দেশটির বিভিন্ন অংশ শাসন করেন। নবম শতাব্দীর শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে ‘জায়দি’ শিয়া ইমামদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান হুতি আন্দোলনের সামাজিক ও ধর্মীয় ভিত্তি বুঝতে এই জায়দি ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন গ্রিসের খ্যাতিমান ভূগোলবিদ টলেমি একসময় ইয়েমেনকে ‘সুখী আরব’ বলেছিলেন। রোমানরাও ইয়েমেনকে ‘সুখী অঞ্চল’ বলেই চিনত। সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সম্পদশালী অর্থনীতি, সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে ইয়েমেনিরা বরাবরই বিশ্ববাসীর মনোযোগ কেড়েছে।

যদিও আধুনিক ইয়েমেন অনেকটা আলাদা। দেশটির সমৃদ্ধির ইতিহাস ফিকে হয়ে এসেছে। এখন ইয়েমেন বলতে বিশ্বের মানুষ বোঝে, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ও সংঘাতকবলিত এক ভূখণ্ড; যেখানে অর্থের বদলে অস্ত্রের ঝনঝনানি এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

ঔপনিবেশিকতা থেকে স্বাধীনতা

ইয়েমেনকে ঘিরে বিদেশি শক্তিগুলোর আগ্রহের ইতিহাস কয়েক শ বছরের পুরোনো। ষোড়শ শতকের দিকে তখন অটোমান সাম্রাজ্যের জয়জয়কার। ইয়েমেনের একটি অংশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে তুর্কিরা; কিন্তু স্থায়ী হয়নি। মোটামুটি এক শতাব্দীর মধ্যে ইয়েমেন থেকে অটোমানরা বিদায় নিতে বাধ্য হয়।

লোহিত সাগরে এরপর অনেক জল গড়িয়েছে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো একে একে আফ্রিকা ও এশিয়ায় ছড়িয়েছে। ইয়েমেনের এডেন (বিখ্যাত বন্দর) ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীন আসে। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হয়। তখন এডেন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র বা রিফুয়েলিং বন্দর হয়ে ওঠে। এর আগে ১৮৪৯ সালে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল আবার নিয়ন্ত্রণে নেয় অটোমানরা। আর দক্ষিণাঞ্চল থাকে ব্রিটিশদের হাতে।

বিংশ শতকের শুরুর দিক। রক্তক্ষয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি তখনো দগদগে। ১৯১৮ সালে ইয়েমেন থেকে অটোমান সাম্রাজ্য বিদায় নেয় (এ সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে ১৯২২ সালে)। স্বাধীন হয় উত্তর ইয়েমেন। শাসনভার যায় ইমাম ইয়াহিয়া মুহাম্মদ হামিদ এদ্দিনের হাতে। তাঁকে মুতাওয়াক্কিলি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিন দশক দেশ শাসন করেন তিনি। তখন সামন্ততান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে ইয়েমেনে।

১৯৪৮ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন ইমাম ইয়াহিয়া। বিদ্রোহীদের দমন করে উত্তরসূরি হন তাঁর বড় ছেলে আহমদ বিন ইয়াহিয়া। তিনি বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। ১৯৬২ সালে মারা যান। ক্ষমতায় বসেন তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আল-বদর। অভিষেকের পরপর সেনা বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়ে তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয়।

অবসান ঘটে ইয়েমেনি রাজতন্ত্রের। সেনা কর্মকর্তাদের হাত ধরে ইয়েমেনে আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এতে সৌদি আরব রাজতন্ত্রপন্থীদের ও মিসর প্রজাতন্ত্রপন্থীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়।

দুই দেশের এক হওয়া

গত শতকের ষাটের দশকে পুরো ইয়েমেন অঞ্চল ছিল বেশ উত্তাল। সশস্ত্র আন্দোলনের মুখে ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশরা দক্ষিণ ইয়েমেন ছেড়ে চলে যায়। ব্রিটিশশাসিত অঞ্চলগুলো এক ছাতার নিচে এনে নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। সেটাও বেশি দিন টেকেনি। দুই বছরের মাথায় (১৯৬৯ সালে) সফল কমিউনিস্ট বিদ্রোহ হলে এটির নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেন’।

নতুন এ দেশ স্পষ্টতই সোভিয়েত প্রভাব বলয়ে ছিল, যা ওই সময় আরব বিশ্বের একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ছিল পরিচিত। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে তখনো রক্ষণশীল প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দুই অংশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও আলাদা। চলছিল সীমান্তবিরোধ। এর মধ্যেই দুই অংশকে এক করার একটি প্রচেষ্টা চালু ছিল।

১৯৭৮ সাল। উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। পরের বছরই উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন সংঘর্ষে জড়ায়। আশির দশকের মাঝামাঝি দক্ষিণ ইয়েমেনে ক্ষমতার লড়াইয়ে হাজারো মানুষ নিহত হন। ফলে দেশটির প্রথম প্রজন্মের নেতাদের বড় অংশ ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।

এমন উত্তাল পরিস্থিতিতে দুই ইয়েমেনকে এক করার প্রচেষ্টা জোরেশোরে শুরু হয়। সেটা আরও জোরালো হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময়ে। সফলতা আসে ১৯৯০ সালে। ওই বছরের ২২ মে দুই ইয়েমেন এক হয়। নতুন রাষ্ট্রের নাম রাখা হয় ‘রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ।

একীভূত হলেও দুই অংশের মধ্যে বিরোধ আর উত্তেজনা রয়ে যায়। ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি প্রেসিডেন্ট সালেহ জরুরি অবস্থা জারি করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট আলী সালেম আল-বেইদসহ দক্ষিণের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন তিনি। জবাবে তাঁরা দক্ষিণে নতুন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেন। তবে সালেহর বাহিনী তাঁদের পরাস্ত করে। দেশটি আবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায়।

সালেহর দীর্ঘ শাসন ও হুতিদের উত্থান

প্রেসিডেন্ট সালেহ দক্ষিণ ইয়েমেনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু অনেক মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক বঞ্চনা, জমি ও সম্পদ হারানো এবং সরকারি চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের ক্ষোভ রয়ে যায়। এসবই পরে অঞ্চলটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ ছড়ানোর পেছনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

আলী আবদুল্লাহ সালেহ প্রথমে উত্তর ইয়েমেনের শাসক, পরে দুই ইয়েমেন এক হলে প্রেসিডেন্ট হন। সব মিলিয়ে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়েছিল সেনাবাহিনী, উপজাতীয় নেতা, রাজনৈতিক মিত্র ও পৃষ্ঠপোষকতার জটিল সম্পর্কের ওপর।

সালেহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মিত্র বানিয়েছেন। আবার প্রয়োজন ফুরালে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ কৌশল তাঁকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখে। কিন্তু দেশটিতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। দুর্নীতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পানি ও সম্পদের সংকট এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়তে থাকে। সঙ্গে বাড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাব।

নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ‘জায়দি’ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অংশ হিসেবে হুতি আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি। তিনি সালেহ সরকারের বিভিন্ন নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাবের সমালোচনা করতেন। তখন থেকেই হুতিদের সমর্থন জোগায় ইরান।

নতুন শতকে ইয়েমেন

একবিংশ শতকের শুরুতে ইয়েমেনে ব্যাপক রক্তপাত দেখা দেয়। ২০০০ সালে এডেন বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে প্রাণঘাতী হামলা চালায় আল–কায়েদা। পরের বছর নির্বাচন ঘিরে দেশটিতে বড় ধরনের সহিংসতা হয়। ২০০২ সালে আল–কায়েদার বিরুদ্ধে বেশ বড়সড় অভিযানে নামে ইয়েমেন সরকার। আল–কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দেশটি থেকে কয়েক শ ইসলামিক স্কলারকে বহিষ্কার করা হয়।

উত্তরাঞ্চলে ২০০৪ সালের জুন–আগস্টে হুতিদের নেতৃত্বাধীন শিয়া বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে শত শত মানুষ নিহত হন। নিহত হন হুসেইন আল-হুতিও। ২০০৫ সালের শুরুর দিকে হুসেইন আল-হুতির সমর্থকদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

২০০৭ সালের জানুয়ারি–মার্চ মাসে ইয়েমেনের উত্তরে নিরাপত্তা বাহিনী ও হুতিদের সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হন। গ্রীষ্মে বিদ্রোহী নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে সানায় মার্কিন দূতাবাসে আল-কায়েদার হামলায় হামলাকারীসহ ১৬ জন নিহত হন।

২০০৯–১০ সালজুড়েও ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি হামলা দেখা যায়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন বাহিনীর হামলায় দেশটিতে আল–কায়েদার নেতা আনোয়ার আল–আওলাকি নিহত হন। এত কিছুর পরও ইয়েমেনে আল–কায়েদা ও হুতি, কারও প্রভাব কমেনি।

আরব বসন্তের ছোঁয়া

আরব বিশ্ব ২০১১ সালে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয়। তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্ত একে একে আরব দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। বাদ যায়নি ইয়েমেনও। ওই বছর দেশটিতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা সালেহর পদত্যাগ, দুর্নীতির অবসান ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানান।

দীর্ঘ আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার পর সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন। ২০১২ সালে আবেদরাব্বো মানসুর হাদি ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর নেতৃত্বে একটি জাতীয় সংলাপ শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল, নতুন সংবিধান তৈরি, রাষ্ট্রের কাঠামো সংস্কার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক পক্ষকে ক্ষমতায় যুক্ত করা।

রূপান্তরের এ প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। সরকার অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরোধ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। নতুন রাষ্ট্রকাঠামো ও ক্ষমতা বণ্টনের প্রস্তাবেও ঐকমত্য হয়নি। এতে হুতিরা অভিযোগ করে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করবে।

এ পরিস্থিতিতে হুতিরা উত্তরাঞ্চল থেকে অগ্রসর হতে থাকে। একসময় পুরোনো শত্রু সালেহ ও তাঁর অনুগত সেনাসদস্যদের সঙ্গে হুতিদের সমঝোতা হয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। ২০১৫ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হাদি সানা ছেড়ে এডেনে চলে যান। এডেনকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। পরে প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।

গৃহযুদ্ধ থেকে আঞ্চলিক সংঘাত

আরব বসন্তের পর থেকে ইয়েমেন টালমাটাল ছিল। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। হুতিরাও একের পর এক এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে। এ অবস্থায় ২০১৫ সালে নতুন করে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ইয়েমেনে।

হুতিরা এডেনের দিকে অগ্রসর হলে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। জোটের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, হাদি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো। যুক্তরাষ্ট্র জোটকে গোয়েন্দা ও কারিগরি সহায়তা দেয়।

সৌদিরা হুতিদের উত্থানকে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তের জন্য হুমকি এবং ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখে থাকে। সৌদি জোটের বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধের মধ্যেও হুতিরা সানা আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। সৌদি আরবের ভেতরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা। পরে যুদ্ধ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে।

২০১৭ সালে হুতি আর সালেহপন্থীদের জোট ভেঙে যায়। সালেহ হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর সংঘর্ষে নিহত হন। এরপরও তাঁর অনুগত বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইয়েমেনের সংঘাতে সক্রিয় থাকে।

শান্তি এখনো আসেনি

ইয়েমেনে সংঘাত শুধু হুতি ও সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে ঘটছে, তা নয়। দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) গড়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এসটিসিকে সমর্থন জোগায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেয় সৌদি আরব।

২০১৯ সালে এসটিসি এডেনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় সরকার ও এসটিসির মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এরপরও বাহিনীগুলো একীভূত করা ও ক্ষমতা ভাগাভাগির অনেক শর্ত কার্যকর হয়নি। চলতে থাকে সংঘাত। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে দুই মাসের অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়। পরে এর মেয়াদ কয়েক দফায় বৃদ্ধি করা হয়।

একই বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হাদি প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা থেকে পিএলসি গঠন করা হয়। কিন্তু কাউন্সিলের সদস্য ও সমর্থক শক্তিগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য দূর হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত শান্তিও আসেনি।

ফিলিস্তিনের গাজা ও ইরান যুদ্ধ

২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। হুতিরা অসহায় গাজাবাসীর পক্ষে দাঁড়ায়। ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে লোহিত সাগর ও আব আল–মানদেব প্রণালিতে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়।

বসে থাকেনি ইসরায়েল ও এর পশ্চিমা মিত্ররা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে ইয়েমেনে হুতিদের ওপর ব্যাপকভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। ওই দিন ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায় ইরান। স্বাভাবিকভাবে ইরান–সমর্থিত হুতিরা যুদ্ধের বাইরে থাকতে পারেনি। তেহরানের পক্ষে রণাঙ্গনে নেমেছে তারাও।

গত জুলাই থেকে ইয়েমেনে সামরিক উত্তেজনা আবার বাড়তে শুরু করে। হুতিদের লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং উপকূলীয় এলাকায় অগ্রযাত্রা নতুন সংকট তৈরি করে। লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরিগুলোর অবাধ চলাচল ব্যাহত করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।

হুতিদের হুমকি ও প্রতিক্রিয়া

জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল–মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকে তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

হুতিদের এসব সক্ষমতা ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারে। মার্কিন রণতরিগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে।

তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াসে আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর দখল করে নিয়েছে। এত দিন বন্দরটি ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

জবাবে সৌদি আরব মোখায় বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে হুতিরাও বাব আল–মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আগে থেকেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন হুতিরা বাব আল–মানদেব পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকটে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, সংঘাতের বিস্তার ইয়েমেনকে আবার বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই সঙ্গে দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের আরও গভীরে নিয়ে যেতে পারে।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সংঘাত ও গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অবস্থা শোচনীয়। লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশে–বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। অর্থনীতির অবস্থা তথৈবচ। নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট। ভেঙে পড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও প্রশাসনব্যবস্থা। খাদ্যসংকটে দেখা দিয়েছে তীব্র মানবিক সংকট।

অপুষ্টি–দুর্ভিক্ষ–মহামারিতে ইয়েমেনে আরও অনেক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও ত্রাণ সরবরাহে বাধা পাচ্ছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইয়েমেনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কার কথা জানিয়ে রেখেছে।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এখন যদি গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাত আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তবে ইয়েমেন সংকট এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা ভেবে উদ্বিগ্ন হতেই হয়।

{তথ্যসূত্র: বিবিসি, টাইম, দ্য গার্ডিয়ান, এপি, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, আরব সেন্টার ও ব্রিটানিকা}

টানা সংঘাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বড় অংশ এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে
টানা সংঘাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বড় অংশ এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Saturday, September 12, 2026

লোহিত সাগরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার: ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধের ঘোষণা সৌদি আরবের

রয়টার্সঃ লোহিত সাগর দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহনের ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। হামলার শিকার হওয়ার পর তারা তেল রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ এ পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিল। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার মধ্যেই এ হামলা হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। ইরাকে তৎপর থাকা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এ হামলা চালিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বাগদাদ ও রিয়াদ। হামলার পর আজ শনিবার ইরাকের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

আরব উপদ্বীপজুড়ে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) দীর্ঘ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জট এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাইপলাইনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়। এরপর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিয়েছে।

হামলাটি এমন সময়ে হয়েছে, যখন ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান

ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন বাব আল–মানদেব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া ও ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ ঘোষণার ফলে আরব উপদ্বীপের দুপাশেই জ্বালানি সরবরাহে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

ইয়েমেনের চারটি সরকারি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছে, গতকাল শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করেছে।

সৌদি আরবের পাইপলাইন ও পেরিম দ্বীপে হামলা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও থমকে গেছে।

কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, সৌদি আরব হুতিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে। এমন সময়ে এ অনুরোধ জানানো হলো, যখন যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল চাপে রয়েছে।

এ বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর নিজ দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি এরই মধ্যে রাজনৈতিকভাবে ইরান যুদ্ধের খেসারত দিচ্ছে।

ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনে কারা হামলা চালিয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। স্যাটেলাইটের ছবিতে পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন ও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তেল রপ্তানিতে এর কী প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এদিকে ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আজ শনিবার দেওয়া এক বিবৃতি অনুযায়ী, বরখাস্ত হওয়া ইরাকি সামরিক কমান্ডার মাইসান প্রদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকে ইরানের সীমান্তবর্তী মাইসান প্রদেশকে দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ও প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইরাক সরকার সৌদি আরবে এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের কাছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধও করেছেন। তবে এখনই এ অনুরোধে সাড়া দিচ্ছে না সৌদি আরব।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরাকের অনুরোধের পরও সৌদি আরব এখন পর্যন্ত পাল্টা হামলা না চালানোর সিদ্ধান্তে অটল আছে। তবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার’ অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) গতকাল জানিয়েছে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা এর পেছনে আংশিকভাবে দায়ী।

এদিকে ইরাক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরান সীমান্তের শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধ করে দিয়েছে। দুটি নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছে। ইরান থেকে ইরাকে সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানির অন্যতম প্রধান পথ এ শালামচেহ সীমান্তপথ।

ওই দুই সূত্র বলেছে, পাইপলাইনে হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে বড় পরিসরে অভিযান চলছে।

পাল্টা হামলার প্রস্তুতি

জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন হুতি যোদ্ধারা।

ইয়েমেনের স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি এ কথা জানিয়েছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, গতকাল লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালির ঠিক মাঝে অবস্থিত একটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় হুতিরা। এর মাধ্যমে পুরো প্রণালিতেই তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, ময়উন নামের দ্বীপ (পেরিম নামেও পরিচিত) থেকে গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর সশস্ত্র হুতি যোদ্ধাদের বহনকারী নৌযান ওই দ্বীপে পৌঁছায়।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে বলেছেন, সশস্ত্র ব্যক্তিরা বাব আল-মানদেব উপকূলজুড়ে মোতায়েন রয়েছেন ও সামরিক যানবাহনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ইরান-সমর্থিত হুতিরা গত সপ্তাহে বাব আল-মানদেব এলাকায় সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরুর পর কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছে। ইয়েমেনি বাহিনী বলেছে, তারা হুতিদের দখলে নেওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে।

রয়টার্স বৃহস্পতিবার বলেছিল, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুতিদের নাটকীয় অগ্রযাত্রায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইরানের দুটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরান হুতিদের সৌদি আরবে হামলা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছিল। এ কাজে সহায়তার জন্য আরও অর্থ, অস্ত্র ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল তেহরান।

ইরান হুতিদের মিত্র হিসেবে বর্ণনা করে। তবে প্রকাশ্যে তাদের সামরিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে। ইরানের ভাষ্য, হুতিরা তাদের ‘প্রক্সি বাহিনী নয়’।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, আগে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সৌদি জাহাজ ছাড়া বাকি সব জাহাজের জন্য সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদই রয়েছে।

সৌদি আরব সহায়তা চেয়েছে

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র গতকাল রয়টার্সকে বলেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করেন।

এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

সূত্র দুটি জানায়, ওয়াশিংটন রিয়াদকে বলেছে, আপাতত তারা হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। তবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করবে।

দুই নেতার মধ্যে কোনো ফোনালাপ হয়েছে কি না—রয়টার্সের এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত যোগাযোগ চলছে।

পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইটে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। হিজাজ অঞ্চল, সৌদি আরব। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইটে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। হিজাজ অঞ্চল, সৌদি আরব। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

হুতিদের ঝড়ো গতির অগ্রযাত্রা

বিবিসির বিশ্লেষণঃ ইয়েমেনের শুষ্ক উপকূলীয় সমভূমি তিহামাহর দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে হুতিদের ঝড়ের গতির অগ্রযাত্রা অধিকাংশ পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করেছে। সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ইরানবিরোধী জোট ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স’ ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এর বড় একটি অংশ হুতিদের দখলে চলে গেছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, ইরান সমর্থিত বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার এলাকা দখল করেছে।

গত কয়েক বছরের মধ্যে এটি হুতিদের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, ১২ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের ভয়াবহ বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও বৃটেনের হামলার পরও হুতিরা এখনও বড় ধরনের শক্তি হিসেবে টিকে আছে। প্রতিপক্ষরা হতবিহ্বল ও মনোবল হারিয়ে ফেলায় অদূর ভবিষ্যতে হুতিদের এই অবস্থান থেকে সরানো কঠিন হতে পারে। ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন, এখন তারা সেখানে পৌঁছে গেছে। তারা সেখানে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলবে। আর তাদের সেখান থেকে সরানো অনেক বেশি ব্যয়বহুল হবে।

অবশ্য হুতিরা একা নয়। তারা ইরানের সমর্থন পেয়ে থাকে। ইরানের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অন্য অংশগুলো যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস এবং সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের শাসনব্যবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ধাক্কা ও পরাজয়ের মুখে পড়ায় হুতিদের প্রতি ইরানের সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আল-ওমেইসি বলেন, তাই তারা তাদের সমর্থন হুতিদের দিকে সরিয়ে দিয়েছে। আর অবশ্যই হুতিদের সেই সমর্থন প্রয়োজন।

অধিকাংশ বিশ্লেষকই হুতিদের কেবল ইরানের ‘পুতুল’ হিসেবে বর্ণনা করাকে ভুল মনে করেন। তবে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ একটি অস্বস্তিকর নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ হামলা শুরুর সাত মাস পর এখন তেহরানের কর্তৃত্ব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। তা হলো পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব।

লন্ডনের থিঙ্কট্যাংক চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, এখন ইরান সরাসরি এবং প্রক্সিদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটপথ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার মতে, এটি পারমাণবিক বোমার মতোই শক্তিশালী চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার। হুতিরা যদি লোহিত সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে থাকে, যার মধ্যে বাব আল-মান্দাবের সবচেয়ে সরু অংশের মাঝখানে অবস্থিত পেরিম দ্বীপও রয়েছে, তাহলে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা তাদের অনেক বেড়ে যাবে।

গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের পর হুতিদের কর্মকাণ্ড এরই মধ্যে দেখিয়েছে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল হুতি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট আকারের হামলাকারী নৌযানের কাছে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেইগ শুক্রবার বিবিসির এক রেডিও অনুষ্ঠানে বলেন, ভূখণ্ড দখল না করেও তারা বাব আল-মান্দাব দিয়ে এবং সুয়েজের দিকে কী ঢুকছে ও বের হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। এখন তারা বাব আল-মান্দাবের ঠিক পাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তাদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা অনেক বেড়েছে।

শুক্রবার বিকেলে হুতিদের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সমুদ্রপথে চলাচল সব কোম্পানির জন্য ‘নিরাপদ’। তবে সৌদি জাহাজ এর বাইরে থাকবে। কারণ এসব জাহাজের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। তবে জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানিগুলো হুতিদের এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে সন্দিহান থাকতে পারে। অতীতে হুতিরা দাবি করেছিল, তারা শুধু ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। বাস্তবে এমন কয়েকটি জাহাজও হামলার শিকার হয়েছে, যেগুলোর ইসরাইলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। এর মধ্যে নরওয়ের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজও ছিল।

তবে আইওনা ক্রেইগের মতে, হুতিরা নির্বিচারে হামলা থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ তারা ২০২৫ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন রাফ রাইডার’-এর পুনরাবৃত্তি চায় না। ওই অভিযানে ছয় সপ্তাহ ধরে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের মার্কিন বিমান ও নৌ হামলা চালানো হয়েছিল। ক্রেইগ বলেন, তারা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির স্বাদ পেয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আদৌ নতুন করে এই সংঘাতে জড়াতে চাইবে কি না। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এমনিতেই জনপ্রিয় নয়। এর মধ্যে তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে ইয়েমেনে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিংবা নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনা বাড়াবে এমনটা মনে করার কারণ কম। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানালেও এ পর্যন্ত তার প্রতি সাড়া মেলেনি। অ্যাক্সিওস বলছে, ইয়েমেনে সংঘাত আরও বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন, তবে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলতে চাইছে।

তবে সৌদি আরবের উদ্বেগ শুধু বাব আল-মান্দাবের সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে নয়। উপগ্রহচিত্রে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হুতি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সম্ভাব্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চলতি বছরের শুরুতে তেল রপ্তানির বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে এই পাইপলাইনটি ব্যবহার করা হচ্ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ থেকে তৈরি অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ইরান সরাসরি এই হামলার নির্দেশ না দিলেও এর সুফল তেহরান পাবে এমনটাই স্পষ্ট। লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারায়া শাইবান বলেন, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াইয়ের সূত্রপাত জুলাইয়ে। ওই সময় হুতিদের একটি প্রতিনিধি দল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে দেশে ফিরে আসে। তিনি বলেন, এর পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। দেখে স্পষ্ট মনে হচ্ছিল, (ইরান) এখন লোহিত সাগরে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ইয়েমেন আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সৌদি আরব লোহিত সাগরের দিকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পথটি নিরাপদ রাখতে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে ডনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাতে সরাসরি জড়াতে অনাগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। ফলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতে ইয়েমেনের এই পরিস্থিতি নতুন এবং সম্ভাব্যভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি মাত্রা যোগ করেছে। আর ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হুতিদের ঝড়ো গতির অগ্রযাত্রা
হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রয়টার্স

হুতিদের হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি এখন কী করতে পারে by খালেদ এম বাতারফি

ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা এখন আর স্রেফ সে দেশের মধ্যকার কোনো যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। রিয়াদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এখন সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক উত্তাপকে নিজের সীমানার বাইরে আটকে রাখার সক্ষমতার ওপর এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলাগুলো সেই বার্তাই দিচ্ছে। আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরানের বেসামরিক এলাকা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এতে বহু বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জ্বালানি কেন্দ্রে সাময়িক অগ্নিকাণ্ড ও কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে।

একদিকে ইয়েমেনের ভেতরে এবং দেশটির পশ্চিম উপকূলে যখন সংঘাত তীব্র রূপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হুমকি বজায় রেখেছে হুতিরা।

সৌদি আরব তাই এখন দুটি পরস্পর সংযুক্ত সংকটে মুখোমুখি: প্রথমত, নিজস্ব ভূখণ্ডে সরাসরি আক্রমণ; দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য সামুদ্রিক পথ অবরুদ্ধ করার প্রচেষ্টা।

পরিস্থিতি রিয়াদের সামনে এক জটিল কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করেছে। গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরব ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে এনে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি, উত্তেজনা প্রশমন এবং রাজনৈতিক সমাধানের দিকে জোর দিচ্ছিল।

কিন্তু একটি নতুন দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া মানে সেই কৌশল থেকে বিচ্যুত হওয়া, যা অনাবশ্যক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে।

তবে সংযম দেখানোর অর্থ এই নয় যে নিজস্ব ভূখণ্ডে একের পর এক হামলা চুপচাপ সহ্য করে নেওয়া হবে।

বদলে যাওয়া নিরাপত্তা বাস্তবতা

ইয়েমেন যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর তুলনায় আজকের নিরাপত্তাসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের ধরন অনেকটাই আলাদা।

সৌদি আরব তাদের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বহুলাংশে আধুনিক করেছে। সেই সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে এক দশক আগের তুলনায় রিয়াদ এখন নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত।

তবে হুতিদের শক্তির জায়গাতেও বিবর্তন ঘটেছে।

তাদের হাতে এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্রোনের এক শক্তিশালী ভান্ডার রয়েছে। অধিকাংশ হামলা আকাশেই ব্যর্থ করে দেওয়া হলেও, তুলনামূলক সস্তা এই ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করতে সৌদিকে গুনতে হচ্ছে চড়া প্রতিরক্ষামূলক খরচ।

উপরন্তু বিমানবন্দর, শিল্পাঞ্চল, সীমান্ত এলাকা ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে একটি স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

এর অর্থ হলো, সৌদি আরব শুধু এই প্রতিরক্ষা বা ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার ওপর নির্ভর করে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। পৃথিবীর কোনো বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই শতভাগ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারে না।
তাই সৌদি আরবের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘প্রতিরোধমূলক বার্তা’ (ডিটারেন্স) দেওয়া। হুতিদের এটা স্পষ্ট করে বোঝানো প্রয়োজন যে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে তারা রাজনৈতিক বা সামরিকভাবে যতটা সুবিধা পাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি চড়া মূল্য তাদের দিতে হবে।

এর জন্য পূর্বের মতো বড় আকারের সামরিক অভিযানে নামার কোনো প্রয়োজন নেই; কারণ, রিয়াদের সামনে এখন একাধিক বিকল্প খোলা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে শক্তিশালী করা, সীমান্ত নিরাপত্তা কঠোর করা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পথ রুদ্ধ করা এবং প্রয়োজনে যেসব পয়েন্ট থেকে হামলা চালানো হচ্ছে, সেখানে সুনির্দিষ্ট ও আনুপাতিক পাল্টা হামলা চালানোর পথ খোলাই আছে।

এখানে পার্থক্যটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ: নীরব দর্শক হয়ে থাকা আর পুরোমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মাঝখানেও সৌদি আরবের হাতে অনেকগুলো কার্যকর পথ রয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপ ও কৌশলগত সুবিধা

এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি রপ্তানিকারক হিসেবে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারেও, তা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যতই কম হোক না কেন। সাম্প্রতিক এসব হামলায় বেশ কিছু জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

এখানে একটি আপাত বৈপরীত্য বা প্যারাডক্স কাজ করে: আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণে তেলের দাম সাময়িকভাবে বাড়লে সৌদি আরবের রাজস্ব বৃদ্ধি পায় ঠিকই, তবে যুদ্ধের কারণে তেলের চড়া দামকে কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্য বলা চলে না।

সীমান্তজুড়ে চলতে থাকা এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চোখ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে, যা পরিবহন ও বিমা খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আরও বড় কৌশলগত দুশ্চিন্তার জায়গা হলো সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা।

বিশ্বের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের মধ্যে সৌদি আরবের অবস্থান-পূর্বে হরমুজ প্রণালি আর পশ্চিমে বাব আল-মানদেব। এই দুটি পথের যেকোনো একটিতে বিঘ্ন ঘটা পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই বড় হুমকি।
এই প্রেক্ষাপটে ইয়েমেন সংঘাতের লোহিত সাগর অংশটি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

বাব আল-মানদেব প্রণালি ভারত মহাসাগরকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এখানে বাণিজ্য জাহাজে হুতিদের ধারাবাহিক হুমকি পণ্য পরিবহন ও বিমা খরচ বাড়াবে, যার ফলে বাধ্য হয়ে অনেক জাহাজকে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যাতায়াত করতে হবে।

তবে এ ক্ষেত্রে রিয়াদের একটি বড় কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। তাদের পুরো জ্বালানি খাত কেবল পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশটি তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে লোহিত সাগরের টার্মিনালগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অপরিশোধিত তেল পাঠাতে পারে। এটি হরমুজ প্রণালির চমৎকার একটি বিকল্প এবং রিয়াদকে কৌশলগত সুবিধা দেয়।

তবে এই সুবিধা সত্ত্বেও লোহিত সাগর বা বাব আল-মানদেবের অস্থিতিশীলতা থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি থেকে সৌদি আরব পুরোপুরি মুক্ত নয়।

কাজেই বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে শুধু সৌদি বা ইয়েমেনের নিজস্ব স্বার্থ হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটিকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

হুতিদের ফাঁদ এড়িয়ে চলা

রিয়াদের জন্য আসল বিপদ সামরিক শক্তির চেয়ে রাজনৈতিক ফাঁদে।

হুতিরা চাইছে সৌদি আরবকে আবার সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে টেনে আনতে। এতে করে তারা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আবার ‘বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে ইয়েমেনের লড়াই’ হিসেবে প্রচার করার সুযোগ পাবে।

সৌদি আরবকে অবশ্যই এই রাজনৈতিক কৌশল এড়িয়ে চলতে হবে।

হুতি সংঘাতের মুখোমুখি হওয়ার মূল দায়িত্বটি ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও তাদের সামরিক বাহিনীকেই ভূমিতে হুতিদের প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব নিতে হবে; আর সৌদি আরব পেছন থেকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দিয়ে যাবে।

বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের উপকূলীয় সামরিক অবস্থানগুলোতে হুতিদের শিকড় যেন শক্ত না হতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

তাই লক্ষ্য আবার সানা দখলের জন্য কোনো সর্বাত্মক বিমান হামলা চালানো বা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হওয়া উচিত নয়। বরং আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত—হুতিরা যেন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দিতে না পারে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক নৌপথকে জিম্মি করতে না পারে।

কূটনীতি এবং সামরিক ভারসাম্য

সৌদি নীতিকে এখন একই সঙ্গে কয়েকটি ট্র্যাকে চালাতে হবে।

প্রথমত, নিজেদের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার করা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা। দ্বিতীয়ত, প্রত্যক্ষ যুদ্ধে না জড়িয়ে ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া। তৃতীয়ত, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক জোটের সহযোগিতা জোরদার করা।

একই সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখতে হবে।

সৌদি আরব বারবার ইয়েমেনে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পক্ষেই মত দিয়েছে। তবে আলোচনা তখনই সফল হয়, যখন প্রতিপক্ষ বুঝতে পারে যে সংঘাত বাড়ালে তাদেরই বেশি ক্ষতি হবে।
সহজ কথায়, কার্যকর কূটনীতির পেছনে শক্তিশালী সামরিক শক্তির বার্তাও থাকতে হয়।

সৌদি আরব অবশ্যই চাইবে না ইয়েমেন আঞ্চলিক সংঘাতের একটি স্থায়ী ফ্রন্টে পরিণত হোক। দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য স্থিতিশীলতা জরুরি, আর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন নিরাপদ সীমান্ত, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি রপ্তানি ও নিরাপদ নৌপথ।

তবে যে যুক্তি সৌদিকে সংযমী হতে বলছে, সেই একই যুক্তি তাদের ধৈর্যের সীমানাও নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

যদি সৌদি শহর, বেসামরিক নাগরিক ও তেল স্থাপনায় হামলা চলতে থাকে, তবে রিয়াদ এটিকে আর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ হিসেবে দেখবে না—বরং একে তারা দেখবে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড রক্ষার লড়াই হিসেবে।

সেই দৃষ্টিভঙ্গিই ঠিক করে দেবে আগামী দিনের পদক্ষেপ।

* খালেদ এম বাতারফি, সৌদিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক।
- আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

সৌদি সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে হুতিদের হামলার দৃশ্য
সৌদি সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে হুতিদের হামলার দৃশ্য। এএফপি

ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে হত্যায় কোন গোপন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে ইসরায়েল :-প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এল সেই বয়ান

দ্য গার্ডিয়ানঃ গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে হত্যায় কোন ধরনের গোপন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা বেরিয়ে এসেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অন্দরের ২৪ জন সদস্যের জবানবন্দিতে। নতুন একটি প্রামাণ্যচিত্রে তাঁদের এসব চাঞ্চল্যকর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

অস্কারজয়ী ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল জোরের নতুন ছবি ‘নাজা’ (এনএজেডএ) গতকাল বৃহস্পতিবার ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। উৎসবটির মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরস্কারের লড়াইয়ে থাকা একমাত্র প্রামাণ্যচিত্র এটি।

ছবিটির নামকরণ করা হয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি সংক্ষেপিত শব্দ থেকে। কোনো সামরিক হামলায় সম্ভাব্য নিহত সাধারণ নাগরিকদের বোঝাতে কৌশলে এ পরিভাষা ব্যবহার করে থাকে তারা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রযোজিত এ প্রামাণ্যচিত্রে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনাদের বিস্তারিত জবানবন্দি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁরা ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানো ও দূরনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

ইসরায়েলের যুদ্ধসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ঝুঁকি এড়াতে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সাক্ষাৎকারগুলো নেওয়া হয়েছিল। রাজধানী তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের ছাদে রাতে এসব সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পরিচয় লুকিয়ে রাখতে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রামাণ্যচিত্রে অংশগ্রহণকারীদের চেহারা ও কণ্ঠ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়।

গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত বিভিন্ন গোপন কৌশলের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন সাক্ষাৎকারদাতারা। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক বিশেষ প্রযুক্তিও, যার মাধ্যমে হামাসের তুলনামূলক নিচু স্তরের বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য সদস্যকে চিহ্নিত করা হতো। এরপর পরিবারের সদস্যরাও নিহত হবেন জেনেও রাতের বেলা তাঁদের বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হতো।

নিশানা করা সম্ভাব্য হামাস যোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ইসরায়েলি বাহিনী তাঁদের ফোন হ্যাক করত। এরপর সপরিবার হত্যা করার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে তাঁদের কথোপকথন গোপনে শুনত তারা।

প্রামাণ্যচিত্রটিতে কিছু প্রত্যক্ষ বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর হিসাবেই প্রায় ২৫ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের ঘরে আছেন জেনেও পুরো এলাকা ধ্বংস করা, সুপরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং একটি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনা।

সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এমন এক গোপন গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ করতেন, যা সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তরে বার্তা পাঠাত। এ ইউনিটের একজন বলেন, তাঁদের মূল মিশনই ছিল ‘শান্তি বিনষ্ট করা’।

পরিচালকদের এক যৌথ বিবৃতিতে আব্রাহাম ও জোর বলেন, ‘আমাদের দেশ যে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচার হত্যার জন্য দায়ী, তার নেপথ্যের কলকাঠি ও ব্যবস্থাগুলো খতিয়ে দেখার একটি দায়বদ্ধতা থেকে আমরা ছবিটি তৈরি করেছি। ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে আমাদের অবস্থানের জায়গা থেকে আমরা এ দায়িত্ব পালন করেছি।’

পরিচালকেরা জোর দিয়ে বলেন, প্রামাণ্যচিত্রটির মূল লক্ষ্য ‘বিপথগামী সেনাদের দিয়ে সংঘটিত বিচ্ছিন্ন যুদ্ধাপরাধের’ ওপর ছিল না; লক্ষ্য ছিল সামরিক নির্দেশ, গৃহীত নীতি, এসব কার্যকর করার পেছনের যুক্তি এবং এ কাঠামোর ভেতরে থাকা মানুষগুলো উন্মোচন করা। অন্য কথায়, পুরো অবিচারমূলক ব্যবস্থা এবং সে ব্যবস্থার চালিকা শক্তি বা যন্ত্রের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশগুলো তুলে ধরা, কোনো একক ব্যক্তিকে দায়ী করা নয়।

প্রামাণ্যচিত্রটির সহপ্রযোজক ছিলেন জেমস উইলসন ও নির্বাহী প্রযোজক জোনাথন গ্লেজার। অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’–এর নেপথ্যেও ছিলেন তাঁরা।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি প্রকাশনা ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’, হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম লোকাল কল এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রথম প্রকাশিত তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ‘নাজা’। সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের ঝুঁকির কারণে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে এটির চিত্রগ্রহণ ও প্রযোজনার কাজ করা হয়েছে। আর বৃহস্পতিবারের উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগপর্যন্ত এটির বিষয়বস্তু রাখা হয়েছিল কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে।

দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী বিভাগের প্রধান ও ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক পল লুইস ‘নাজা’কে বর্ণনা করেছেন গাজায় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত ব্যবস্থাগুলোর উন্মোচন ও যাচাইয়ে বছরের পর বছর ধরে করা শ্রমসাধ্য এক কাজের চূড়ান্ত রূপ’ হিসেবে।

প্রামাণ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগে সাংবাদিকদের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের শিল্পনির্দেশক আলবার্তো বারবেরা বলেন, ‘নাজা’ হবে ‘সত্যিই যুগান্তকারী’। তিনি একে ‘রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও সিনেমার দিক থেকে অত্যন্ত চমৎকার একটি কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেন।

বারবেরার বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে ইতালির চিনেচিত্তা নিউজ লিখেছে, ‘এটি শুধু সাক্ষাৎকারের কোনো সাধারণ সংগ্রহ নয়; গাজায় অভিযান শুরুর সময় তাঁরা কী কাজ করেছিলেন, তা প্রকাশ করতে এ ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের রাজি করাতে তিন বছর লেগেছে। আর আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, তাঁদের জবানবন্দি রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো।’

২০২৩ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। আর আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ। এ দুই মিলিয়ে হতাহতের সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগের গাজার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি।

খাদ্যের চালানে ইসরায়েলি বিধিনিষেধ গত গ্রীষ্মে গাজায় এক মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছিল। পাশাপাশি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তিন-চতুর্থাংশের বেশি বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ায় বা ক্ষতিগ্রস্ত করায় বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনিরা এখন তাঁবুর শিবিরে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন; যেখানে বিশুদ্ধ পানি কিংবা স্যানিটেশনের সুবিধা নেই বললেই চলে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর গাজায় বর্বরতা শুরু করেছে দেশটি।

২০২৫ সালে সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে অস্কারজয়ী ‘নো আদার ল্যান্ড’ ছবির চার সহপরিচালকের দুজন ছিলেন আব্রাহাম ও জোর।

দুই ছবির মধ্যে যোগসূত্র টেনে পরিচালকেরা বলেন, ‘নো আদার ল্যান্ড’ প্রামাণ্যচিত্রে তাঁরা (ফিলিস্তিনি সহপরিচালক) বাসেল আদরা ও হামদান বালালকে সঙ্গে নিয়ে পাঁচ বছর কাটিয়েছেন। মূলত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা দখলদারত্ব ও জাতিগত আধিপত্যের একটি বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এ জন্য ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো তাঁরা বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত (ক্যামেরাবন্দী) করেছেন।

একইভাবে ‘নাজা’ প্রামাণ্যচিত্রে তাঁরা একটি ব্যবস্থার নানা সূত্র মিলিয়ে দেখেছেন। এতে দুই ডজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনার সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে ইসরায়েলি সামরিক ব্যবস্থার চিত্র, যা এমন এক অপরাধ ঘটাতে ব্যবহার করা হয়েছে, যাকে জাতিসংঘের একটি কমিশন ও বিশ্বের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো জাতিহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছে।
গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবন থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে
গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবন থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Friday, September 11, 2026

গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গোপনে ক্লড এআই ব্যবহার করেছিল হুতিরা

গাইডেড রকেটসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরিতে গোপনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল ইয়েমেনের হুতিরা। এ কাজে তারা অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড’ এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যানথ্রপিকের এক প্রতিবেদনে উত্তর ইয়েমেনে অবস্থানরত একটি ‘হুমকি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’র কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে সরাসরি হুতিদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে উত্তর ইয়েমেন বর্তমানে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এআইয়ের অপব্যবহার শনাক্ত ও প্রতিরোধ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অ্যানথ্রপিক জানায়, ওই গোষ্ঠী ‘ক্লড কোড’ ব্যবহার করে উড্ডয়নকারী যান নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখার সফটওয়্যার তৈরির কাজ করেছে। একই সঙ্গে তারা অ্যানথ্রপিকের কাছ থেকে নিজেদের কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করার চেষ্টা করেছে।

অ্যানথ্রপিকের তথ্য অনুযায়ী, গোষ্ঠীটি তিনটি অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছিল। এর মধ্যে ছিল ‘ফোন-শ্রেণির ফ্লাইট কম্পিউটার’ ও শেষ পর্যায়ের লক্ষ্যভেদী নির্দেশনা ব্যবস্থা সম্বলিত একটি গাইডেড রকেট। দ্বিতীয়টি ছিল দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি পাল্লার লক্ষ্য নির্ধারণ করা একটি বহু-ধাপের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। তৃতীয় কর্মসূচিটির নাম ছিল ‘আর-২০০০ সেট’, যাতে একটি হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলের সংস্করণও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্দেশনা, নেভিগেশন ও নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত সফটওয়্যার তৈরিতে মানব সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের পরিবর্তে ‘ক্লড কোড’ ব্যবহার করেছিল তারা।

অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন ধাপে ক্লডকে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সফটওয়্যার লেখা, গবেষণা, উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সমন্বয়, সফটওয়্যার তৈরি এবং উড্ডয়ন সিমুলেশন পরিচালনার কাজও ছিল।

হুতিরা একই সময়ে ক্লডের একাধিক সেশন চালাত। আলাদা এআই ব্যবস্থাকে আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। একটি দিয়ে কোড লেখা, অন্যটি দিয়ে গবেষণা এবং তৃতীয়টি দিয়ে প্রথমটির তৈরি কাজ পর্যালোচনা করা হতো।

অ্যানথ্রপিক জানায়, তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গোষ্ঠীটির অনেক অনুরোধ আটকে দিয়েছিল। তবে কিছু বিধিনিষেধ পাশ কাটানোর উপায় খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছিল তারা।

নিজেদের উদ্দেশ্য ও সফটওয়্যারের সম্ভাব্য ব্যবহার গোপন করার চেষ্টা করেছিল গোষ্ঠীটি। একই সঙ্গে কাজগুলো একাধিক সেশনে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোনো একটি কথোপকথন থেকে পুরো অস্ত্র কর্মসূচির চিত্র পাওয়া না যায়।

অ্যানথ্রপিকের দাবি, শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনে একটি গাইডেড রকেটের সরাসরি পরীক্ষা চালিয়েছিল গোষ্ঠীটি। তবে পরীক্ষাটি ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কী ভুল হয়েছিল তা খুঁজে বের করতে তারা আবার ক্লডের সাহায্য নেয়।

অ্যানথ্রপিক বলেছে, গোষ্ঠীটি কোনো কার্যকর অস্ত্র সফলভাবে মোতায়েন করতে পেরেছিল এমন প্রমাণ তাদের হাতে নেই। তবে রকেট কর্মসূচির বাইরেও দীর্ঘ সময় ধরে অস্ত্র তৈরি ও সিমুলেশনের চেষ্টা চালানোর প্রমাণ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ক্লড ব্যবহার করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সিমুলেশন এবং অন্যান্য অস্ত্র নিয়েও কাজ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ মডেলিং ও উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার কাজ ছিল।

এ ছাড়া গোষ্ঠীটি এমন একটি অফলাইন সিমুলেশন টুলকিট তৈরি করেছিল, যা ক্লড কিংবা ম্যাটল্যাবের মতো প্রকৌশল সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। পরে সেটিকে একটি স্বতন্ত্র প্রোগ্রামে রূপান্তর করা হয়, যা ‘ক্লড ছাড়াই চলতে ও কাজ চালিয়ে যেতে’ সক্ষম ছিল।

অ্যানথ্রপিক বলেছে, এর ফলে তাদের এআই ব্যবস্থা ছাড়াই স্বাধীনভাবে প্রকৌশলগত কাজ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল গোষ্ঠীটির।

পরে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করে অ্যানথ্রপিক। পাশাপাশি তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের তথ্য জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যানথ্রপিকের মতে, ঘটনাটি দেখিয়েছে ব্যবহারকারীরা যখন ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের উদ্দেশ্য গোপন করে এবং জটিল প্রকল্পের কাজ একাধিক আলাদা যোগাযোগে ভাগ করে নেয়, তখন এআই-সহায়তায় অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা ঠেকানো কতটা কঠিন।

এআই প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে অস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হওয়ার আশঙ্কাও এই ঘটনায় সামনে এসেছে। বিশেষ করে ব্যবহারকারীরা যখন নিজেদের উদ্দেশ্য গোপন করে এবং এআই প্ল্যাটফর্মের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এমন সরঞ্জামে কাজ স্থানান্তর করে, তখন ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

এমন সময় এই তথ্য সামনে এলো, যখন সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে হুতিরা এবং এর জবাবে রিয়াদ বিমান হামলা চালাচ্ছে। ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী ইয়েমেনের কৌশলগত উপকূলীয় শহর মোখার নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে তাদের সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র : টিআরটি ওয়ার্ল্ড

ইয়েমেনের সানায় হুতিদের একটি সামরিক কুচকাওয়াজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন। ছবি: রয়টার্স
ইয়েমেনের সানায় হুতিদের একটি সামরিক কুচকাওয়াজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন। ছবি: রয়টার্স

এক হাজার টন বিস্ফোরক দিয়ে হিজবুল্লাহর ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি ইসরাইলের

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর একটি বড় ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। তাদের ভাষ্য, আলি তাহের রিজের নিচে বিস্তৃত দুটি সুড়ঙ্গসহ ওই বিশাল কমপ্লেক্স ধ্বংস করতে এক হাজার টনেরও বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ধ্বংস করা সুড়ঙ্গ দুটির সম্মিলিত দৈর্ঘ্য দুই কিলোমিটারের বেশি। বিস্ফোরণের পর সৃষ্ট কম্পন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা ভূমিকম্পের মতো অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বিস্ফোরণের ফলে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ভূকম্পন সৃষ্টি হয়।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আইডিএফের ভিডিও ও ছবিতে বিস্ফোরণের পর আকাশজুড়ে বিশাল আগুনের গোলা দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণের পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে।

নাবাতিয়েহ শহরের বাসিন্দা আহমেদ বলেন, বিস্ফোরণের প্রায় ১৫ সেকেন্ড পর বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর পুরো বাড়ি এমনভাবে কেঁপে ওঠে, যেন সত্যিই ভূমিকম্প হয়েছে। আতঙ্কে মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসে; শিশুদের কান্না ও মানুষের চিৎকার শোনা যায়। অনেক গাড়ি এলাকা ছেড়ে বৈরুতের দিকে চলে যায়।

আলি তাহের রিজ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় শহর সাইদাতেও বিস্ফোরণের কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

কী ছিল ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটিতে

আইডিএফের দাবি, ভূগর্ভস্থ এই অবকাঠামোটি হিজবুল্লাহর বদর ইউনিটের একটি কমান্ড সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে কয়েক ডজন রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও মানববিহীন আকাশযান (ড্রোন) ছাড়াও ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র, মাইন ও বিস্ফোরক মজুত ছিল।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বলেছে, স্থাপনাটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। আইডিএফের দাবি, ইরানের অর্থায়ন ও পরিকল্পনায় এটি গড়ে তোলা হয়। আইডিএফ আরো জানিয়েছে, স্থাপনাটির ভেতরে থাকা হিজবুল্লাহর সদস্যদের কেউ নিহত হয়েছেন, আবার কেউ পালিয়ে গেছেন। ইসরাইলি বাহিনীর ভাষ্য, এই স্থাপনা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ওই এলাকায় হিজবুল্লাহর আটটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস এবং একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। তবে ইসরাইলের এসব দাবির বিষয়ে হিজবুল্লাহ কিংবা লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

দক্ষিণ লেবাননে ফের বেড়েছে উত্তেজনা

আলি তাহের রিজের নিয়ন্ত্রণ গত সপ্তাহে নেয় ইসরাইলি বাহিনী। কয়েক মাস ধরে সেখানে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষের পর ওই এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে তারা।

মার্চে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ নতুন করে শুরু হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান করছে। ইসরাইল এই এলাকাকে সীমান্তসংলগ্ন ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ হিসেবে উল্লেখ করছে।

লেবাননের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবারও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ইসরাইলি হামলা হয়েছে। এর মধ্যে নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এবং টায়ার জেলার মানসুরির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এলাকাগুলোতে লেবাননের সেনাবাহিনী তাদের মোতায়েন বাড়িয়েছে। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল এমটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাবাতিয়েহেও সেনা উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। এর লক্ষ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা।

সংঘাতের পটভূমি

গত ২ মার্চ ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধে লেবাননও জড়িয়ে পড়ে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালালে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়।

এর জবাবে ইসরাইল লেবাননজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে স্থল অভিযান চালায়। ইসরাইলি বাহিনী এখনো লেবাননের প্রায় ৫ শতাংশ ভূখণ্ড দখলে রেখেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং একই সময়ে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে একটি পৃথক সমঝোতার পর সংঘর্ষের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে। ওই কাঠামোর আওতায় হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি বাহিনীর ধীরে ধীরে প্রত্যাহার এবং সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহ সরাসরি ওই চুক্তির অংশ ছিল না এবং তারা ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনাও প্রত্যাখ্যান করেছে। যুদ্ধের তীব্রতা কমলেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলা ও স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলমান সংঘাতে দেশটিতে অন্তত ৪ হাজার ৩৬২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৯৫ জন নারী ও ২৫৯ শিশু রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে নিহতদের মধ্যে কতজন যোদ্ধা ও কতজন বেসামরিক নাগরিক, তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। অন্যদিকে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, সংঘাতে দেশটির ৪০ সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি

এক হাজার টন বিস্ফোরক দিয়ে হিজবুল্লাহর ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি ইসরাইলের

হরমুজের বিকল্প বাব-এল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণে হুথিরা

হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে পরিচিত বাব-এল-মান্দেব প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। শুক্রবার ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলীয় এলাকায় সরকারি বাহিনীকে পিছু হটিয়ে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দখলে নেয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। খবর আলজাজিরার।

সম্প্রতি দ্রুত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন উপকূলীয় শেষ শহরগুলো দখলে নেয় হুথিরা। পাশাপাশি প্রণালিটির গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোতেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে তারা। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরো জোরালো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রপ্তানির জন্য বাবেল-মান্দেব প্রণালিটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প নৌপথ হিসেবে সামনে এসেছে।

তবে, হুথিরা উপকূলীয় ধুবাব শহর এবং প্রণালির মাঝে অবস্থিত কৌশলগত মায়উন (পেরিম) দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

উদ্ভূত উদ্বেগের বিষয়ে হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রতিনিধি হাজেম আল-আসাদ বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেই। তার দাবি, এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে সৌদি আরব ইতোমধ্যে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন মোখা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে অস্থিরতা এড়াতে এবং ইয়েমেনের ওপর সৌদি অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিতে কূটনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

হরমুজের বিকল্প বাব-এল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণে হুথিরা
ছবি: সংগৃহীত।

হুতিদের অগ্রযাত্রা: বাব–আল মানদেব নিয়ন্ত্রণে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বড় সুবিধা পাবে ইরান

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির বন্দরনগরী আল–মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর লোহিত সাগরের উপকূল ধরে কৌশলগত কয়েকটি দ্বীপের দিকে অগ্রসর হয়েছে। সামরিক সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধ শেষ হবে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই হুতিদের এ অগ্রযাত্রার খবর এল।

ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রগুলো বলেছে, হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। লোহিত সাগরের দক্ষিণে অবস্থিত এই প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। প্রণালিটির কাছে হানিস দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে হুতিরা।

হুতিরা বাব–আল মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে তাদের পৃষ্ঠপোষক ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা পাবে। তেহরান ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে যুদ্ধে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করে চলেছে।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাব–আল মানদেব প্রণালি একই পরিস্থিতির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রসহ এ বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার বড় সংকটে পড়বে।

হুতিদের অগ্রসর হওয়ার এ ঘটনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য খারাপ খবর। ইরান যুদ্ধের কারণে নিজ দেশে ইতিমধ্যেই চাপের মুখে আছেন তিনি। এর প্রভাব পড়তে পারে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে।

নির্বাচনে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির অবস্থান ধরে রাখতে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছেন ট্রাম্প। এমন সময় বাব–আল মানদেবে হুতিদের প্রভাব পাকাপোক্ত হলে তাঁকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।

হুতি–নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র এক বিবৃতিতে বলেছে, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া সব নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠানের জন্য লোহিত সাগরে চলাচল নিরাপদ রয়েছে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। জলপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরব জ্বালানি তেল রপ্তানিতে লোহিত সাগরের জলপথগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা (সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট) লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণে বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে ধুবাব শহরের দিকে সরে যাচ্ছে। ধুবাবের অপর পাশে রয়েছে পেরিম দ্বীপ। সামরিক সূত্রগুলো বলেছে, এ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে ধুবাব ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।

গতকাল ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে ইয়েমেন–বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বলেন, ইয়েমেনের যুদ্ধে ‘নতুন এবং আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি’ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পদক্ষেপ নিতে হবে।

গ্রুন্ডবার্গ বলেন, হুতিরা ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অর্থ হলো, তারা বাব–আল মানদেব প্রণালির প্রবেশপথে পৌঁছে গেছে। এতে সেখানে অবাধে নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট ডি অর্টিজ হুতিদের ‘ইরানের এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘এ উত্তেজনা অগ্রহণযোগ্য। যাদের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে, তাদের এর পরিণতির দায় নিতে হবে।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে অবরোধ বা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইয়েমেন সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়। তারা সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। তবে বিবৃতিতে ইয়েমেনে ইরানের ভূমিকার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

ইয়েমেন সরকার, ইরান ও আঞ্চলিক কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সরাসরি নির্দেশনায় চলতি সপ্তাহে হুতিরা উপকূল ধরে অগ্রসর হয়েছে।

হুতিদের মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুস সালাম বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে বলেছেন, তাঁদের অভিযান আত্মরক্ষামূলক। ইয়েমেনে (সৌদি আরবের) হামলা বন্ধ হলে এসব অভিযানও বন্ধ হবে।

তেলের দাম বেড়েছে

বাব–আল মানদেব প্রণালি দিয়ে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গতকাল অশোধিত জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠেছে।

জ্বালানির মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে ইসরায়েলে হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধে জড়ায় হুতিরা। এরপর জুলাইয়ে তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। চলতি মাসে গোষ্ঠীটি সৌদির বিরুদ্ধে হামলা আরও বাড়িয়েছে।

হুতিদের হামলার মধ্যে সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চতুর্থবারের মতো জরুরি সতর্কতা জারি করেছে।

হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে ইরানের প্রতি সৌদি আরবের সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তান। সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ 
হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ বছরের যুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে বিপর্যস্ত কোটি মানুষের জীবন

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ ৯/১১ হামলার ২৫ বছর পরও এর পরিণতি শেষ হয়নি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার ১৯ সদস্য চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে আঘাত হানে। এতে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হয় একের পর এক যুদ্ধ, ক প্রজন্মের জন্য ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিকে আমূল বদলে দেয় এবং বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলে।

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ৪৫ লাখ মানুষের মৃত্যু

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৫ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় নয় লাখ ৪০ হাজার মানুষ সরাসরি যুদ্ধে এবং ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতায় মারা যান।

আফগানিস্তান: প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার নিহত

৯/১১-এর এক মাসেরও কম সময় পর, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। তালেবান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত হলেও যুদ্ধ চলে প্রায় ২০ বছর।

কস্ট অব ওয়ারের হিসাবে, যুদ্ধে সরাসরি প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হন। খাদ্যসংকট, রোগ, চিকিৎসার অভাব এবং অবিস্ফোরিত বোমা ও স্থলমাইন আরো বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করে।

ইরাক: প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার নিহত

২০০৩ সালের ১৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন শুরু করে। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের দাবি ছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। পরে সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

ইরাকের তৎকালীন ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ওমর স্মরণ করেন, বোমা হামলার শব্দে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তার কয়েকজন বন্ধু যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখতে বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসেননি।

কস্ট অব ওয়ারের হিসাবে, ইরাক যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ নিহত হন।

ড্রোন ও বিমান হামলা

স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাক-সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযানে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালায়।

ব্রিটেনভিত্তিক ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের হিসাবে, ২০০৪ সালের পর পাকিস্তানে শত শত মার্কিন হামলায় চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকশ বেসামরিক নাগরিক। ইয়েমেনে ৮৫৩ ও সোমালিয়াতে ১৮৮ থেকে ২৭৬ জন নিহত হন।

২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে চলা বিক্ষোভ দমনের সময়, জাতিসংঘের ম্যান্ডেট অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো একটি বিমান হামলা চালায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, গাদ্দাফি বিদ্রোহী যোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ার ও নিহত হওয়ার আগে সাত মাস ধরে দেশটিতে প্রায় নয় হাজার ৭০০টি হামলা চালানো হয়েছিল।

২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসবিরোধী মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানেও হাজার হাজার বোমা নিক্ষেপ করা হয়। বেসামরিক প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত

কস্ট অব ওয়ারের হিসাবে, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যুদ্ধের কারণে তিন কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

দুই দশক পরও এই বাস্তুচ্যুতি থামেনি। আফগানদের বড় একটি অংশ এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোতে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। ইরাকেও যুদ্ধের দুই দশক পর ১০ লাখের বেশি মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ সেনাসদস্যদের ওপর প্রভাব

আফগানিস্তানে আট লাখের বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে প্রায় দুই হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজার আহত হন। ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তিন হাজার ৪৮১ সদস্য নিহত এবং ৩১ হাজারের বেশি আহত হন।

যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও শারীরিক ক্ষতও গুরুতর। কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-পরবর্তী প্রবীণ সেনাসদস্যদের সেবার পেছনে ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে, যার বড় একটি অংশ এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

‘কস্টস অফ ওয়ার প্রজেক্ট’-এর পরিচালক স্টেফানি সাভেল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে সম্মুখ সমরে যত মার্কিন সেনা ও প্রবীণ সেনাসদস্য নিহত হয়েছিলেন, তার চেয়ে চার গুণ বেশি সেনা ও প্রবীণ সদস্য আত্মহত্যায় প্রাণ হারিয়েছেন।’

চিরস্থায়ী যুদ্ধ: খরচ ৮ ট্রিলিয়ন ডলার

দুই দশকের যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রবীণ সেনাদের ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করলে মোট খরচ দাঁড়ায় অন্তত আট ট্রিলিয়ন ডলার।

এই যুদ্ধগুলোর অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য এখনো পরিশোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে যুদ্ধক্লান্ত মার্কিন জনগণের মধ্যে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি আগ্রহও কমেছে।

কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের মতে, ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা সমর্থন পেয়েছিলেন, তাদের আমলেও বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযান ও বিমান হামলা আরো জোরদার হয়েছে।

২৫ বছর পর নাইন ইলেভেন পরবর্তী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাই শুধু নিহত ও ধ্বংসস্তূপ নয়—বাস্তুচ্যুতি, মানসিক আঘাত, অর্থনৈতিক বোঝা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা যুদ্ধের ক্ষত।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ বছরের যুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে বিপর্যস্ত কোটি মানুষের জীবন
আল জাজিরা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র হুথিদের বড় বিজয়

নিউইয়র্ক টাইমসঃ ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর বড় জয় হয়েছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। লোহিত সাগরের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল হুথিদের বড় ধরনের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা বাড়তে পারে, প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিতে পারে এবং জ্বালানি বাজারে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইয়েমেন বিষয়ক গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, মোখা দখলের ফলে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও তাদের মিত্ররা আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে। নিউ আমেরিকার ইয়েমেন বিষয়ক ফেলো অ্যাডাম ব্যারনও ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ইয়েমেন সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

মোখা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের সংকীর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে ৫০ মাইলেরও কম দূরে। কয়েক শতাব্দী ধরে শহরটির ভৌগোলিক অবস্থান একে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামুদ্রিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। একসময় ইয়েমেনের কফি রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ছিল মোখা। বৃহস্পতিবার মোখা দখলের খবরের পর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের বেশি উঠে যায়, যা কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বৃহস্পতিবার ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে হটিয়ে শহর ও এর বন্দর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় হুথিরা। এরপর ইয়েমেনের স্থানীয় এক কর্মকর্তা ও প্রাদেশিক পর্যায়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কয়েক দিন ধরে মোখায় হুথি ও ইয়েমেন সরকারের সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে তীব্র স্থলযুদ্ধ চলছিল। বৃহস্পতিবার সেই লড়াইয়ে সরকারি বাহিনীকে সরিয়ে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয় হুথিরা। নিরাপত্তাজনিত কারণে সরকারি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা বলেন।

২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে দেশটির সংঘাত চলছে। এরপর সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিমান হামলা শুরু করে। এতে দেশটি দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ২০২২ সালে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা কার্যত ভেঙে পড়েছে।

মোখা দখলের পর হুথিরা আরো দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি এলাকা এবং জলপথের একটি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিউ আমেরিকার অ্যাডাম ব্যারনের মতে, ওই এলাকা ইয়েমেনের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে মূল্যবান ভূখণ্ডগুলোর একটি। হুথিরা সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আরব উপদ্বীপের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ—বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান ও তার মিত্রদের অন্তত আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তবে হুথিদের সংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, সমুদ্রপথে নৌ চলাচল নিরাপদ রয়েছে। পশ্চিম ইয়েমেনে চলমান ‘বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ’ শেষ হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছে। মোখা এর আগে ইয়েমেন সরকারের মিত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল তারেক সালেহর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। বৃহস্পতিবার জেনারেল সালেহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি তার বাহিনীকে পুনর্গঠিত করার এবং নিরাপদ স্থানে বিকল্প কমান্ড সেন্টার স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ সিদ্ধান্ত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে মোখার কাছের হুনাইশ ও জুকার—লোহিত সাগরের দুটি দ্বীপ থেকেও সালেহর বাহিনী সরে গেছে বলে ইয়েমেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে বাব আল-মান্দাবের ভেতরে অবস্থিত পেরিম বা মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

হুথিদের রাজনৈতিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলেছেন, তাদের লক্ষ্য ইয়েমেনের ‘সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ করা এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া; ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করা নয়। দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্যান্য গোষ্ঠী রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকতে পারবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। হুথিরা গত জুলাইয়ে লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর অবরোধ ঘোষণা করে এবং উত্তর ইয়েমেনের ঘাঁটি থেকে জাহাজ ও সৌদি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুতি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সৌদি আরব তাদের মিত্রদের সহায়তায় ইয়েমেনে শতাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি সরকার এসব দাবির বিষয়ে মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে হুথিরা সৌদি আরবের ভেতরে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, সাম্প্রতিক হুথি হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ৭০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন।

ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফারেয়া আল-মুসলিমির ধারণা, সৌদি আরবের বিমান হামলার সহায়তায় ইয়েমেন সরকার মোখা পুনর্দখলের চেষ্টা করতে পারে। তবে সৌদি আরব সংঘাতে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে চায় না এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইয়েমেন সরকারকে সহায়তা দেওয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র হুথিদের বড় বিজয়

Thursday, September 10, 2026

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে যেভাবে ইরানে ঢুকছে বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য

রয়টার্স এক্সক্লুসিভঃ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীনের কাছে তেল বিক্রি করে এর বিনিময়ে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কিনতে বিনিময়ভিত্তিক এক গোপন বাণিজ্যব্যবস্থা ব্যবহার করছে ইরান। এর মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন থেকে ওষুধ, যানবাহন, যোগাযোগ সরঞ্জামসহ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে দেশটি। এমনকি গত এক বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলারের বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তিতেও এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইরানের দুটি জ্যেষ্ঠ সূত্র এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরও তিন ব্যক্তি রয়টার্সকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, এই ব্যবস্থায় ইরানি তেলের অর্থ সরাসরি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে চীনা রপ্তানিকারকদের কাছে পাঠানো হয় না। বরং তেল বিক্রির অর্থ চীনা পণ্য আমদানির জন্য ক্রেডিট হিসেবে জমা রাখা হয়।

সূত্রগুলোর মতে, এ ব্যবস্থা ইরানের জন্য মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পথ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে চীনও এতে সুবিধা পাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশটি ছাড়মূল্যে ইরানি তেল পাওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে পারছে, পাশাপাশি ইরানে পণ্য রপ্তানিকারক চীনা ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থেকে নিজেদের আড়াল রাখতে পারছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল কেনা বা পরিবহনে সহায়তা করা কিছু ছোট চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—এমন কঠোর পদক্ষেপ থেকে এখনো বিরত রয়েছে ওয়াশিংটন।

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর প্রচেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির ওপর চাপ আরো বাড়িয়েছে। গত আগস্টে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেন, দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, নইলে তারা ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে এই গোপন বাণিজ্যব্যবস্থায় মার্কিন নৌ অবরোধের কী প্রভাব পড়েছে, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। গত ১৪ জুলাই অবরোধ পুনর্বহালের পর থেকে ইরানের কোনো অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে চীনে পৌঁছাতে পারেনি বলে গত সপ্তাহে জানিয়েছিল সংস্থাটি।

কীভাবে চলছে এই বাণিজ্য

রয়টার্সের তথ্যমতে, এই ব্যবস্থার অন্যতম অংশ হলো চীনে অবস্থিত ‘চুশিন’ নামে একটি অস্পষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পশ্চিমা একটি সূত্র এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরও দুজনের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ঝুহাই ঝেনরংয়ের হয়ে কাজ করা একটি ক্রেতা চলতি বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার চুশিনে জমা দিত।

এই অর্থ ব্যবহার করা হতো ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির (এনআইওসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হংকং-নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা আমদানি চুক্তির অর্থ পরিশোধে। এরপর চুশিন চীনা রপ্তানিকারক ও ইরানে অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অর্থ পাঠাত—সম্ভবত চীনের অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

সূত্রগুলোর হিসাবে, চুশিনের মাধ্যমে পরিচালিত ইরানি তেল বিক্রির অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। বাকি অর্থ রাখা হয় একটি বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিষ্ঠানের (এসপিভি) হিসাবে। এই অর্থ ইরানে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিল পরিশোধে ব্যবহার করা হয়।

ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র রয়টার্সকে এসপিভিটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এসপিভিতে থাকা অর্থ দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে—একটি চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করে এবং অন্যটি ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো আমদানিকারককে এসপিভির অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন দিলে ইরান-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি চীনা প্রতিষ্ঠানে তা জানায়। এরপর সংশ্লিষ্ট চীনা সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হয়।

তবে রয়টার্স চীনের কোনো কোম্পানি নিবন্ধন নথিতে ‘চুশিন’ নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে কাজ করে বলে দাবি করা প্রতিষ্ঠানগুলোরও কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি রেকর্ড পাওয়া যায়নি। একটি সূত্র এমনকি বলেছে, চুশিন হয়তো শুধু একটি স্প্রেডশিটে থাকা নাম।

নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল

এই ব্যবস্থাটি অন্তত ২০২১ সাল থেকে চালু রয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো। শুরুতে ইরানে ওষুধ ও কোভিড-১৯ টিকা সরবরাহের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়ালে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

সূত্রগুলোর হিসাবে, গত এক বছরে এই এসপিভির মাধ্যমে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার লেনদেন হয়েছে।

ইরানের তেল রপ্তানির ওপর চীনের নির্ভরতা এই ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে পাঠানো তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনেছে, যার পরিমাণ ছিল গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।

ইরান ও চীন ২০২১ সালে জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি করে। তবে সেই চুক্তির বিস্তারিত এখনো খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেনি।

যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লির মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করছে এবং দেখাচ্ছে যে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে দেশটিকে সহজে বাধ্য করা যাবে না।

রাজনৈতিকসংবাদ

তবে তার মতে, চীনের নেতৃত্ব একই সঙ্গে নিজেদের ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকেও দূরে রাখতে চায়। তাঁর ভাষায়, এ ক্ষেত্রে চীনের লক্ষ্য হলো ‘দায় অস্বীকার করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ’ রাখা।

চীন রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা প্রতিবেদনে বর্ণিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেই—এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে চীন।

ইরানের জাতিসংঘ মিশন এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। একইভাবে ঝুহাই ঝেনরং ও ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানিও তাদের কথিত ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করেনি। মার্কিন প্রশাসনও এই নির্দিষ্ট বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে যেভাবে ইরানে ঢুকছে বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য
ছবি: সংগৃহীত।

ইরানের ‘কাসেম বাসির’ ক্ষেপণাস্ত্র যেভাবে সমুদ্রযুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিয়েছে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি সংঘাতের সমীকরণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘কাসেম বাসির’-এর অন্তর্ভুক্তিকে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং আরব সাগরের উত্তরাঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য হুমকির ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

এক হাজার ২০০ কিলোমিটার পাল্লার ‘কাসেম বাসির’ ক্ষেপণাস্ত্রটি ৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ইরানের ইসফাহান থেকে উত্তর আরব সাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এড়াতে ওই রণতরীকে প্রতিরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে।

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চ পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই এ বিষয়ে বলেন, ‘৪৮ ঘণ্টা আগে আমরা প্রথমবারের মতো একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ওপর দিয়ে ইরানের অ্যান্টি-ডেস্ট্রয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্রটি আমেরিকানদের জন্য নরক তৈরি করেছিল এবং তারা পালিয়ে যায়।’

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্র্যান্ডন ওয়েইকার্ট এ বিষয়ে বলেন, ইরানিরা ‘কাসেম বাসির’ নিক্ষেপ করেছে, যা একটি মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।

তার ভাষায়, এটি ইরানের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে উন্নত অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে এই ক্ষেপণাস্ত্রে গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ম্যানুভারিং থ্রাস্টার রয়েছে।

ব্র্যান্ডন ওয়েইকার্ট বলেন, এটি বিমানবাহী রণতরী শিকারের জন্য তৈরি একটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং এটিকে ভূপাতিত করা অত্যন্ত কঠিন।

তার মতে, ইরানিদের পক্ষ থেকে এটি ছিল একটি সতর্কবার্তা—‘প্রণালি থেকে বেরিয়ে যাও, নইলে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব; আর তোমরাও আমাদের ঠেকাতে পারবে না’।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘কাসেম বাসির’-এর গুরুত্ব কেবল এর পাল্লা বা গতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কঠিন জ্বালানিচালিত প্রপালশন, জিপিএস-নির্ভরতা ছাড়াই স্বতন্ত্র নির্দেশনা, চূড়ান্ত পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা এবং তুলনামূলক বেশি নির্ভুলতার সমন্বয়—এসব সক্ষমতা যুদ্ধক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রমাণিত হলে মার্কিন নৌবহরের কার্যক্রমের হিসাবকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

২০২৫ সালের মে মাসে ক্ষেপণাস্ত্রটি উন্মোচনের সময় নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রে এর পাল্লা কমপক্ষে এক হাজার ২০০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। পাশাপাশি এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উন্নত নির্দেশনা ব্যবস্থা এবং জিপিএসের ওপর নির্ভর না করেই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার কথা বলা হয়।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকের সংঘর্ষ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ ইউনিট একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও একটি ডেস্ট্রয়ারের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। সেন্টকম জানায়, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো কৌশলগতভাবে অবস্থান পরিবর্তন করে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এড়াতে সক্ষম হয় এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনাও ঘটেনি। তবে সেন্টকম ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সঠিক ধরন প্রকাশ করেনি।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে ‘কাসেম বাসির’ ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা স্থলভাগের স্থির লক্ষ্যবস্তুতে হামলার প্রচলিত ভূমিকা থেকে বেরিয়ে জাহাজবিধ্বংসী বা অ্যান্টি-শিপ মিশনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

একটি বিমানবাহী রণতরীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার প্রধান সমস্যা কেবল ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেয়া নয়, বরং লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা, সেটিকে ট্র্যাক করা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়ে লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য হালনাগাদ করা। একটি বিমানবাহী রণতরী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মুহূর্ত থেকে সেটির ওয়ারহেড চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার দূরে সরে যেতে পারে। ফলে ব্যালিস্টিক অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি অনুসন্ধানী সিকার এবং লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান নির্ধারণের জন্য সেন্সরের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে কাসেম বাসিরের সম্ভাব্য সুবিধা হলো চূড়ান্ত পর্যায়ে ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড নির্দেশনা ব্যবস্থার ব্যবহার। জিপিএসনির্ভর নির্দেশনার বিপরীতে এ ধরনের ব্যবস্থা প্রচলিত রেডিও জ্যামিংয়ের কারণে তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গতিপথ সংশোধনে ব্যবহৃত হতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যই মার্কিন ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতার বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওয়ারহেডের গতি ও ম্যানুভার করার সক্ষমতা। কাসেম বাসির সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য থেকে উচ্চ গতিতে পুনঃপ্রবেশ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একটি ম্যানুভারিং ওয়ারহেডের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল একটি নির্দিষ্ট ব্যালিস্টিক গতিপথের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে না।

এর ফলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় কমে যায় এবং ‘এজিস’-এর মতো ব্যবস্থা ও সমুদ্রভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরগুলোর জন্য কাজটি আরো কঠিন হয়ে ওঠে।

তবে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রকে শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেটিকে প্রতিহত করা অসম্ভব। মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে রয়েছে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—দূরপাল্লার রাডার, এজিস-সজ্জিত ডেস্ট্রয়ার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, ডিকয় বা বিভ্রান্তিকর লক্ষ্যবস্তু এবং আগাম সতর্কতামূলক বিমান।

এ কারণেই একটি নির্ভুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্ভরযোগ্য ‘ডেস্ট্রয়ার-ধ্বংসকারী’ বা ‘বিমানবাহী রণতরী-বিধ্বংসী’ অস্ত্রে রূপান্তর করা একটি স্থির ঘাঁটিকে লক্ষ্য করার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

তবে কাসেম বাসিরের কৌশলগত প্রভাব সরাসরি আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদি একটি বিমানবাহী রণতরী ঝুঁকি কমানোর জন্য ইরানের উপকূল থেকে শত শত কিলোমিটার অতিরিক্ত দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য হয়, তাহলে সেটিকে ডুবিয়ে না দিয়েও ইরান তার অপারেশনাল উদ্দেশ্যের একটি অংশ অর্জন করতে পারে।

দূরত্ব বৃদ্ধি পেলে বিমানবাহী রণতরী থেকে উড্ডয়নকারী যুদ্ধবিমানগুলোর উড়ান সময় বাড়বে, আকাশে জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন বাড়বে, সহায়ক বিমানগুলোর ওপর চাপ বৃদ্ধি পাবে এবং মার্কিন আক্রমণাত্মক অভিযান আরো জটিল হয়ে উঠবে।

সামরিক পরিভাষায় এটি ‘অ্যান্টি-অ্যাকসেস/এরিয়া ডিনায়াল’ বা প্রবেশাধিকার প্রতিরোধ ও নির্দিষ্ট অঞ্চলে কার্যক্রম সীমিত করার কৌশলের অংশ—অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় শত্রু বাহিনীর প্রবেশ ও অবস্থানকে আরো ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা।

কাসেম বাসিরের হুমকি আরো গুরুতর হয়ে ওঠে যখন এটিকে একটি বহুস্তরীয় সামরিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মনুষ্যবিহীন নৌযান এবং সমন্বিত একযোগে হামলার সংমিশ্রণ একটি নৌবহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভিন্ন গতি, উচ্চতা ও গতিপথের একাধিক লক্ষ্যবস্তুর মুখোমুখি করতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে আক্রমণকারী অস্ত্রের একটি বড় অংশ প্রতিহত করা গেলেও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিরিক্ত লক্ষ্যবস্তুতে পরিপূর্ণ হয়ে পড়া এবং দ্রুত বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চলতি বছরের বিভিন্ন প্রতিবেদনও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ম্যানুভারিং ওয়ারহেড ব্যবহারে ইরানের অগ্রগতি মার্কিন বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কাজকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

তবে কাসেম বাসিরকে এমন কোনো অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, যা একাই মার্কিন নৌ-শক্তির শ্রেষ্ঠত্বকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক সংঘাতে এর আবির্ভাব যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌসম্পদ—বিমানবাহী রণতরী ও ডেস্ট্রয়ারগুলোর ওপর হুমকির মাত্রা বাড়াতে পারে।

এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত গুরুত্ব হলো—এটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ দূরত্ব বাড়াতে পারে, প্রতিরক্ষায় আরো বেশি সম্পদ নিয়োজিত করতে বাধ্য করতে পারে এবং ইরানের কাছাকাছি পানিসীমায় তাদের স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ সীমিত করতে পারে।

যদি প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে চলমান লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে এর চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্দেশনা ও আঘাত হানার সক্ষমতা প্রমাণিত হয়, তাহলে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর মার্কিন বড় যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য আগের চেয়ে আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পরিণত হতে পারে—যেখানে উপস্থিত থাকার অর্থ হবে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ঝুঁকি ও ব্যয় মেনে নেয়া।

সূত্র : পার্সটুডে

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ‘কাসেম বাসির’
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ‘কাসেম বাসির’। সংগৃহীত