Tuesday, June 27, 2017

কেন গুগলের রেকর্ড জরিমানা?

যেকোনো কিছু সার্চ বা অনুসন্ধান করতে মানুষ এখন গুগলে যায়। জনপ্রিয় এ সেবাটিকে অনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে গুগলের বিরুদ্ধে।
আজ মঙ্গলবার ইউরোপে গুগলের সার্চ ফলাফলের অপব্যবহার করার অভিযোগে রেকর্ড পরিমাণ জরিমানা করা হয়েছে গুগলকে। অনলাইন শপিং সেবার ক্ষেত্রে নিজেদের পণ্যকে আগে দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা আনার অভিযোগ করা হয়েছে গুগলের বিরুদ্ধে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিযোগিতা বিষয়ক কমিশন গুগল কর্তৃপক্ষকে মোট ২৪২ কোটি ইউরো বা ২৭২ কোটি মার্কিন ডলার জরিমানা করেছেন। গুগলের বিরুদ্ধে তাদের সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে গুগলের অন্য পণ্য বিশেষ করে শপিং ব৵বসায় ট্রাফিক টেনে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
দ্য ইনডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুতবর্ধনশীল ও প্রচণ্ড প্রতিযোগিতামূলক অনলাইন শপিংয়ের দুনিয়ায় নিজেদের প্রভাবশালী অবস্থানের অপব্যবহার কারনে এই রেকর্ড পরিমান জরিমানার মুখোমুখি গুগল।
ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, অসদাচরণ শোধরানোর জন্য গুগলের হাতে ৯০ দিন আছে। এর মধ্যে ঠিক না হলে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের বিশ্বজুড়ে দৈনিক গড় আয়ের ৫ শতাংশ জরিমানা আকারে শোধ করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে এই জরিমানা হতে পারে দৈনিক প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ ডলার। প্রতিযোগিতাবিমুখ এই আচরণ গুগল কীভাবে সংশোধন করবে, রায়ে তা ঠিক করার ভার গুগলের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
গুগল এই রায়ের বিরুদ্ধে ‘আপিল করার কথা বিবেচনা করছে’ বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি। গুগল কর্তৃপক্ষ বলেছে, জরিমানার বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করে আপিল করার কথা ভাবছে। এ ছাড়া অনলাইন শপিং ব্যবসাকে পরিচালনা করার বিষয়টির পক্ষে যুক্তি দিয়েছে গুগল। তারা বলছে, এটা ব্যবহারকারী ও বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে এমনভাবে সম্পর্ক তৈরি করে যা উভয়ের জন্যই দরকারি।
গুগলের জেনারেল কাউন্সেল কেন্ট ওয়াকার বলেন, আমরা এই রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই দ্বিমত পোষণ করছি। আপিল করার লক্ষে আমরা রায়ের পূর্ণ বিশ্লেষণ করব।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অ্যান্টিট্রাস্ট কমিশনার মার্গারেট ভেস্টাজার বলেছেন, গুগলের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে। শপিং সেবাগুলোকে যেভাবে সার্চ ফলাফলে র‍্যাংকিং হিসেবে দেখায় সে বিবেচনায় এ জরিমানা করা হয়েছে। গুগলকে মোট ২৪২ কোটি ইউরো জরিমানা গুণতে হবে।
ভেস্টাজার বলেন, গুগল যেটা করেছে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যান্টিট্রাস্ট আইন অনুযায়ী অবৈধ। প্রতিষ্ঠানটি বাজারে অন্য প্রতিযোগীদের মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার এবং উদ্ভাবনের সুযোগ নষ্ট করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের ভোক্তাদের প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে।
ইউরোপীয় কমিশন জরিমানার পরিমাণ সম্পর্কে বলেছে, গুগলের কার্যক্রমের স্থায়ীত্ব ও গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গুগলকে তাদের একচেটিয়া চর্চা পরিবর্তন ও প্রতিদ্বন্দ্বী সেবগুলাকে নিজের সেবার মতোই গুরুত্ব দিয়ে প্রদর্শনের জন্য তিন মাসের সময় পাবে।
মূলত শপিং সেবাগুলোর মধ্যেকার তুলনা বিষয়টিকে কেন্দ্র করে গুগলকে এ জরিমানা করা হচ্ছে। এটি ফ্রুগল, গুগল প্রোডাক্ট সার্চ বা গুগল শপিং নামেও পরিচিত।
ভেস্টাজার বলেন, ‘গুগল মূলত তাদের বাজার আধিপত্যকে অনৈতিক ব্যবহার করেছে। নিজের সার্চ রেজাল্টে অন্যদের তুলনায় নিজের শপিং সেবাকে বেশি প্রচার করেছে। পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিচে নামিয়ে দিয়েছে। গুগলের এ আচরণ অনেকদূর পর্যন্ত গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করা হয়েছে যাতে তাদের বেড়ে ওঠার সুযোগ নেই।
গুগল ইউরোপীয় ইউনিয়নের যে ১৩টি দেশে তাদের শপিং সেবা চালু করেছে সবখানেই এ আচরণ করেছে। ২০০৮ সালে জার্মানি ও যুক্তরাজ্য, ২০১৩ সালে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নরওয়ে, পোল্যান্ড ও সুইডেনে এ আচরণ করে গুগল। গুগলের পরিকল্পনার প্রভাবে গুগলের তুলনামূলক শপিং সেবার ব্যববহারকারী বেড়েছে। গুগলের প্রতিদ্বন্দ্বীরা অভিযোগ করেছে গুগলের ট্রাফিক বাড়লেও তাদের ব্যবসা টেকাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
প্রতিদ্বন্দ্বীতার নীতিমালা বিষয়টির প্রধান মার্গারেট ভেস্টাজার বলেন, শপিং সেবাগুলোর তুলনার ক্ষেত্রে গুগলের পরিকল্পনা শুধু অন্যদের চেয়ে ভালো পণ্য তৈরি করে গ্রাহক আকৃষ্ট করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং গুগল তাদের অনুসন্ধান আধিপত্য অপব্যবহার করে নিজেদের সেরা হিসেবে জাহির করেছে। গুগল যা করেছে তা অবৈধ।
বেশ কয়েক বছর ধরেই ইইউয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গুগলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে গুগলের প্রতিদ্বন্দ্বীরা। বর্তমানে আমাজন ও ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টেক্কা দিতে শপিংকে গুরুত্ব দিচ্ছে গুগল। এটি গুগলের আয় বাড়ানোর একটি অন্যতম জায়গা।
অ্যান্টিট্রাস্ট আইনে ইইউ অসাদাচরণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে শুন্য সহনশীলতা দেখায়। তাই অ্যান্টিট্রাস্টের ক্ষেত্রে কোনো একক প্রতিষ্ঠানকে এবারই সবচেয়ে বড় জরিমানা করল অ্যান্টট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চিপ নির্মাতা ইনটেলকে ১১০ কোটি মার্কিন ডলার জরিমানা করেছিল ইইউ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
লুইস সিলকিন নামের আইনি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ অলিভার ফেয়ারহারস্ট বলেন, এ সিদ্ধান্ত গুগলের প্রতি সত্যিকারের আঘাত। এর আগে এই কমিশন যে জরিমানা করেছিল এটি তার দ্বিগুন। গুগল যেভাবে তাদের সেবা পরিচালনা করছে তা পুনরায় ভেবে দেখার সময় এসেছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তে গুগল আপিল করবে এবং পুরো আপিল প্রক্রিয়া শেষ করতে ২০২০ সাল পর্যন্ত গড়াবে।
গুগলের একচেটিয়া আচরণ নিয়ে ইউরোপীয় কমিশন গত সাত বছর ধরে তদন্ত করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে এক ডজনের বেশি অভিযোগ পাওয়ার পর অনুসন্ধানে নামে ইইউ। তথ্যসূত্র: এনপিআর, ইনডিপেন্ডেন্ট, বিবিসি, রয়টার্স।

'আসাদের সম্ভাব্য গ্যাস-হামলা' সংক্রান্ত নতুন মার্কিন দাবি ও হুঁশিয়ারির রহস্য

সিরিয়ার আসাদ সরকার সে দেশটির ভেতরেই একটি রাসায়নিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে বলে মার্কিন সরকার দাবি করেছে।
মার্কিন সরকারের এক মুখপাত্র গতকাল (সোমবার) এই অভিযোগ তুলে ধরেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এ ধরনের হামলা চালানো হলে দামেস্ক সরকার ও সিরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীকে ‘খুবই চড়া মূল্য দিতে হবে’।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব সিয়েন স্পাইসার গতকাল বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানতে পেরেছে যে সিরিয়ার আসাদ সরকার এ ধরনের হামলা চালাতে পারে  এবং তারা এ সংক্রান্ত ‘সম্ভাব্য নানা প্রস্তুতি’ সনাক্ত করেছে। এ ধরনের কথিত ‘সম্ভাব্য হামলায়’ সিরিয়ার নিষ্পাপ শিশুসহ বেসামরিক জনগণ গণহত্যার শিকার হতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
অবশ্য মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন স্পাইসারের বিবৃতিতে তারা অপ্রস্তুত বা বিস্মিত হয়েছেন, কারণ এ জাতীয় বিবৃতি দেয়ার আগে সাধারণত তাদের সঙ্গে পরামর্শ করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা এপি-কে জানিয়েছেন, এই বিবৃতি প্রকাশের পরই তারা কেবল এ বিষয় সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন সরকার সিরিয়ার সরকারি সেনাদের ওপর হামলা চালানোর অজুহাত তৈরি করতে ও উত্তেজনা বাড়াতে এ ধরনের অভিযোগ করছে। মার্কিন সরকার অতীতেও কোনো ধরনের প্রমাণ না দেখিয়ে ও কোনো রকম তদন্ত না চালিয়েই সিরিয়ায় কথিত রাসায়নিক হামলায় আসাদ সরকারের জড়িত থাকার অভিযোগ প্রচার করেছে এবং ওই অভিযোগে সিরিয়ার সরকারি সেনা অবস্থানে হামলা চালিয়েছে।
সিরিয়ার সরকারি সেনারা যখনই নানা ফ্রন্টে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যাপক সাফল্য পায় ও অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয় তখনই মার্কিন সরকার এবং ইসরাইল নানা অজুহাতে সিরিয়ার সরকারি সেনা অবস্থানে হামলা চালায়। 
সিরিয়ার আসাদ সরকার ও তার মিত্র শক্তিগুলো মার্কিন সরকারের এ জাতীয় পুরনো কৌশল ও মিথ্যাচারের নিন্দা জানিয়ে এসেছে এবং কথিত রাসায়নিক হামলার ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্ত অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে এসেছে। কিন্তু তদন্ত চালানোর দাবি মেনে নেয়নি মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা।
গত এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে ইদলিব প্রদেশের খান শাইখুন শহরে রসায়নিক হামলার এক ঘটনায় ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনাকে অজুহাত করে মার্কিন বাহিনী সিরিয়ার হোমসে একটি সরকারি বিমান ঘাঁটিতে ৫৯টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা দাবি করে যে এই ঘটনায় সিরিয় সরকার জড়িত ছিল এবং হোমসের ওই বিমান ঘাঁটি থেকে উড়ে আসা বিমানগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল কথিত ওই রাসায়নিক হামলায়।
কিন্তু সিরিয়া ও তার মিত্র রাশিয়া বলেছে, খান শাইখুনে সিরিয়ার সরকার বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অবস্থানে দেশটির বিমান বাহিনীর হামলা ছিল একটি প্রচলিত হামলা এবং ওই হামলার ফলে বিদ্রোহীদের রাসায়নিক অস্ত্রের একটি গুদাম থেকেই বিষাক্ত গ্যাস বের হওয়ায় বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
খ্যাতিমান মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক সিইমুর হার্শও সম্প্রতি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়ার ওই বিমান ঘাঁটিতে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর আগে আমেরিকার গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোকে উপেক্ষা করেছিলেন। ওইসব প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরিয়ার সরকারি বাহিনী রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল বলে যে দাবি করা হয় তার কোনো প্রমাণ নেই। বরং সরকারি সিরিয় সেনারা রাশিয়ার দেয়া প্রচলিত বিস্ফোরকযুক্ত বোমাই বর্ষণ করেছিল খান শাইখুনে বিদ্রোহীদের একটি সম্মেলন কেন্দ্রে।

স্ত্রীকে ডির্ভোস দিতে চান চঞ্চল চৌধুরী!

দুই পর্দায় ব্যস্ত জনপ্রিয় ও শক্তিমান অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। গল্পের প্রয়োজনে কত ধরনের চরিত্রেইনা তাকে অভিনয় করতে হয়। তার দাম্পত্য জীবন প্রায় দশ বছরের। কিন্তু নেই কোন সন্তান। আর তার দায়ভার চাপান স্ত্রী হামিদার উপর। সন্তান না হওয়াকে উসিলা করে গ্রামের অন্য একটি মেয়ে ছবির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন চঞ্চল। তাই বউকে ডির্ভোস দিয়ে ছবিকে ঘরে তুলতে চান তিনি। গল্পটি চঞ্চল চৌধুরীর বাস্তব জীবনের নয়। ‘উসিলা’ নামের ঈদের একটি বিশেষ নাটকে এমন একটি চরিত্রে দেখা যাবে তাকে। নাটকটি আজ সন্ধ্যা ৬ টায় গাজী টিভিতে প্রচার হবে। বৃন্দাবন দাসের রচনায় এটি পরিচালনা করেছেন দীপু হাজরা। চঞ্চল চৌধুরী ছাড়াও এতে আরো অভিনয় করেছেন শাহনাজ খুশী, ইভানা, জামিল হোসেন, মাসুদ রানা মিঠু, আশরাফ রবি প্রমুখ। নাটকটি প্রসঙ্গে চঞ্চল চৌধুরী বলেন, এর গল্পটি এক কথায় অসাধারণ। আমার অনেক ভালো লেগেছে অভিনয় করে। আর দীপু হাজরার পরিচালনায় এর আগেও ৫টি নাটকে অভিনয় করেছি। সেহেতু তার সঙ্গে ক্যামিষ্ট্রটা আমার ভালোই। দীপু হাজরা বলেন, বৃন্দাবন দার লেখার ব্যাপারে মন্তব্য করার মতো সৎ সাহস আমার নাই। তবে এটুকু বলতে পারি দাদার এর আগেও  বেশ কয়েকটি নাটক আমি নির্মাণ করেছি। কোনোটির সঙ্গে কোনোটির গল্পের কোনো মিল নাই। এবারও তাই হয়েছে। আশা করি এই ঈদে দর্শক ভিন্ন কিছু দেখতে পাবেন। ‘উসিলা’ নাটকটি আজ সন্ধ্যা ৬ টায় প্রচার হবে গাজী টিভিতে।

হনুজ দিল্লি দূর অস্ত by এম সাখাওয়াত হোসেন

বিগত বছরের অক্টোবর মাসে ভারতের রাজধানী দিল্লি গিয়েছিলাম গবেষণার কাজে। আমার এক সুহৃদের সহযোগিতায় দেখা হয়েছিল ভারতের রাষ্ট্রপতি মি. প্রণব মুখার্জির সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর অফিসে। এটি ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎকার। তাঁর সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচিতি ছিল না। তথাপি তিনি আমাকে অনেক সময় দিয়েছেন। ইতিপূর্বে ভারতে কোনো বাংলা ভাষাভাষী রাষ্ট্রপতি হন নাই, তাই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সে কথা চেপে রাখতে পারিনি। তিনি আমার বক্তব্যে শুধু মুচকি হেসেছিলেন।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করায় সুযোগ হয়েছিল বিশ্বের সবচাইতে বড় এই ঐতিহাসিক সরকারি বাসভবনটির কিয়দাংশ দেখবার।  রেইসিয়ানা পাহাড় কেটে এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল বৃটিশ ভারতের শাসক বৃটিশ উপনিবেশিক শক্তির ধারক বাহক ভাইসরয় হাউস হিসেবে। হার্বাট বেকারের তত্ত্বাবধানে এবং যার নকশায় এই ভবনটি তৈরি হয়েছিল তার নাম এডউইন ল্যান্ডসির লুটিয়েন্স (Edwin Landseer Lutyens)। এই ব্যক্তিই বর্তমানের নতুন দিল্লিরও নকশা করেছিলেন। তার সহযোগী ছিলেন মি. হার্বাট বেকার (Herbert Baker)। এ কারণে ভারতের রাজধানী নতুন নতুন দিল্লিকে অনেক সময় লুটিয়েন্স দিল্লি বলা হয়। এই দিল্লিই ঐতিহাসিক ভারতের অষ্টম, জনান্তরে দশম দিল্লিস্থিত রাজধানী। যাই হোক দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের বিস্তারিত বিবরণে পরে আসবো।
ইতিপূর্বেই আমি দুবার দিল্লিতে এসেছিলাম এবং সপ্তাহখানেক সময় করে কাটিয়েছিলাম। জীবনে দিল্লিতে প্রথম এসেছিলাম ২০০৯ সালে নির্বাচন কমিশনে থাকাকালে ভারতের পনেরতম সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে। তারপর আরেকবার এসেছিলাম ২০১০ সালে যখন আমি নির্বাচন সংস্কার নিয়ে গবেষণা করি। আর তৃতীয়বার ২০১৬ সালে এসেছিলাম আরেক গবেষণার কাজে। যতবারই দিল্লিতে এসেছি ততবারই মনে হয়েছে দিল্লিকে তেমনভাবে দেখা হয়নি, যেমনভাবে আমি দেখতে চেয়েছি। আমি বহু দেশের রাজধানীতে গিয়েছি। যার মধ্যে রোম নগরীও রয়েছে। তথাপি আমার মনে হয় যে দিল্লির ইতিহাসের বৈচিত্র্যের ধারেকাছেও বিশ্বের আর কোনো রাজধানী নেই। প্রথমবার এসেই মনে হয়েছিল কত পরিচিত এই শহর। কারণ উপমহাদেশের ইতিহাস যেদিন আমার পাঠ্যপুস্তকের তালিকায় এসেছিল সেদিন থেকেই আমি এই শহরের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছি। সেই ইতিহাস পড়া আজও শেষ হয়নি।
দিল্লির বর্ণনা দিতে গিয়ে বোধকরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার কয়েক পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে। এর চাইতে ভালো বর্ণনা কেউ দিতে পারেনি বলে মনে হয়। অবশ্য তিনি তার কবিতায় ভারতবর্ষের কথা বললেও তা দিল্লির জন্যও প্রযোজ্য। তিনি লিখেছিলেন-
‘হেথায় আর্য, হেথায় অনার্য
হেথা দ্রাবিড় চীন
শকহুনদল পাঠান মোগল
এক দেহে হলো লীন।’
রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই পঙক্তিতে যেন ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। দিল্লির মসনদে বসে ভারতবর্ষ শাসন করেছে আর্য, অনার্য, মোগল, পাঠান, গোত্র না জানা ক্রীতদাস, ইংরেজ। এমন বিচিত্র সাম্রাজ্যের ইতিহাস অন্য কোনো শহরে পাওয়া কল্পনাই করা যায় না।
আধুনিক ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি পক্ষান্তরে দিল্লি যতই আধুনিক হোক না কেন- নতুন বা পুরাতন দিল্লি দেখেছে সাম্রাজ্য আর শাসকদের উত্থান আর পতন। এই উত্থান আর পতনের সঙ্গে জড়িত ছিল তৎকালীন উপমহাদেশের ভাগ্য। দিল্লি শহরটি যত আধুনিকই হোক না কেন এর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের ধ্বংসস্তূপ। রয়েছে বিভিন্ন ধর্মের, গোত্রের শাসকদের উত্থান আর পতনের করুণ চিহ্ন। এই শহর গড়ে উঠেছে সাতটি রাজধানী শহরকে কেন্দ্র করে। অনেকের মতে দশ হতে বারোটি শহরও হতে পারে। এ শহরের এসব পুরাতন সমাধিস্থল আর শ্মশানঘাট মনে করিয়ে দেয় উপমহাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস। এ ইতিহাস কারও পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই শহরে আসলেই জড়িয়ে পড়তে হয় ইতিহাসের সঙ্গে। নাটক, নভেল আর ভ্রমণ কাহিনীর উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে দিল্লির বৃহৎ উদ্যানগুলোতে আর রাজপথ, অলিগলি অথবা পুরাতন শহর জুড়ে। কত জাতির রক্ত ঝরেছে এই শহরে। কত সুখ-দুঃখের ইতিহাস আর অজানা গল্প রয়েছে দিল্লির প্রতিটি পাথরের নিচে। এমনই অনুভূতি হয়েছিল আমার প্রতিবারের দিল্লি সফরে।
প্রথমবার যখন দিল্লির দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাই চেষ্টা করেছিলাম কিছু অজানা ইতিহাস জানতে। কিছু পেয়েছি কিছু পাইনি। দিল্লির সাতটি রাজধানীর নাম এখনো তেমনই রয়েছে যেমন কিনা রাই পিলোথরা সবচাইতে পুরাতন শহর বলে নথিভুক্ত রয়েছে। এই শহরটি পৃত্থিরাজ চৌহান-এর তৈরি। এর ধ্বংসবিশেষ এখনো দৃশ্যমান। জায়গাটি কুতুব মিনারের কাছাকাছি। মেহেরুলী এখানেই কুতুব মিনারসহ বহু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। রয়েছে ফিরোজ শাহ তুগলকের সমাধি ও তার তৈরি ওই সময়কার সবচাইতে বৃহৎ মুসলিম পাঠস্থান মাদরাসা, সূফী বখতিয়ার উদ্দিন কাকীর সমাধি আর সামসি তালাব, ‘শিরি’, খিলজিদের রাজধানী, ফিরোজাবাদ, গিয়াসউদ্দিন তুগলকের তৈরি শহর। যমুনা নদীর তীরে ফিরোজ শাহ কোটলা, বর্তমানে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়াম এই সুলতানের নাম ধারণ করে রয়েছে।
তুগলকাবাদ গিয়াসউদ্দিন তুগলকের শহর এখন শুধুমাত্র একটি পরিত্যক্ত বিশাল আয়তনের পাথরের তৈরি দুর্গ। ওই সময়কার অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। গিয়াসউদ্দিন তুগলকের সমসাময়িক ছিলেন দিল্লির অন্যতম সূফী সাধক নিজামউদ্দিন আউলিয়া। নিজামউদ্দিন আউলিয়া ছিলেন উপমহাদেশের সবচাইতে খ্যাত সূফী সাধক খাজা মঈনউদ্দিন চিশতির শিষ্য এবং কুতুবউদ্দিন কাকীর শিক্ষানবিশ। নিজামউদ্দিন আউলিয়া ক্রমেই বিখ্যাত হয়ে উঠেন এমন কি তিনি সূফী সাধক হিসেবে কুতুবউদ্দিন কাকীর চাইতে বেশি খ্যাত হন। ওই সময়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের নিকট নিজামউদ্দিন দারুণ একজন জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি। নিজামউদ্দিনের এ খ্যাতি গিয়াসউদ্দিন তুগলককে দারুন ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে। আমি কথা বলছি ১৩ শতাব্দীর আশেপাশের দিনগুলোর কথা। গিয়াসউদ্দিন তুগলক যখন তার শহর তৈরি করছিলেন ওই সময়ই নিজামউদ্দিন তার দরবারে, যা এখন এই সাধকের মাজার, খনন করছিলেন বিশাল এক তালাব (পুকুর), যা এখনো বিদ্যমান রয়েছে মাজারের পেছনে। ওই দীঘি খননের জন্য প্রয়োজন ছিল বহু কর্মীর। অপরদিকে দিল্লির সুলতানের শহর তৈরিতে কর্মীর অভাব হয়ে পড়লে নিজামউদ্দিনকে সুলতান তার কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন। নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে সুলতানের দরবারে ডেকে পাঠালে আওলিয়া সে ডাকে সাড়া দেননি।
গিয়াসউদ্দিন তুগলক তখন বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত। বাংলায় বিদ্রোহ থামাতে দিল্লি ছাড়লেন কিন্তু তার পূর্বেই তিনি মনঃস্থির করেছিলেন যে রাজদ্রোহের অপরাধে ফিরে এসে আউলিয়াকে চরম শাস্তি দেবেন। তুগলক বাংলার বিদ্রোহ দমন করে ফিরে আসবার পথে আবার তার সংকল্পের কথা প্রকাশ করলে আউলিয়ার শিষ্যরা আউলিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। নিজামউদ্দিনের তখন অনেক বয়স। তিনি তার অনুরাগীদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘তুগলককে দিল্লি পর্যন্ত আসতে দাও’- বলে যে উক্তি করেছিলেন তা উপমহাদেশে আজও উচ্চারিত হয়। ধ্যানরত আউলিয়া বলেছিলেন ‘হুনুজ দিল্লি দূর অস্ত’ ‘দিল্লি এখনো বহু দূরে’। গিয়াসউদ্দিন তুগলক দিল্লি পর্যন্ত আসতে পারেননি। পথে তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুগলকের তৈরি অভ্যর্থনা মঞ্চ হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মহাক্রমশালী গিয়াসউদ্দিন তুগলকের সমাধি রয়েছে পরিত্যক্ত তুগলকাবাদের দুর্গের অদূরে জনমানবশূন্য নির্জন জায়গায় আর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার থাকে লোকে লোকারণ্য। নিজামউদ্দিন আউলিয়া আরো ভবিষ্যদ্বাণী করে তুগলকাবাদ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘ইয়া রাসেগা গুজর ইয়া রহেগা উজার’ (এটা হয় থাকবে পরিত্যক্ত অথবা বসবাস করবে গুজারা। [যারা মহিষ চড়ায়]) এমনই রয়েছে তুগলকাবাদ। এখান থেকে যে শিক্ষা নেয়া উচিত আমাদের সময়কার নেতাদের, ক্ষমতার দাপট চিরস্থায়ী নয়। চিরস্থায়ী নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মতো নিঃস্বদের।
গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুগলক তৈরি করলেন মেহেরুলী এবং তুগলকাবাদের মাঝামাঝি নতুন শহর ‘জাহানপনা’। এখানে অনেক দিন ইবনে বতুতা অবস্থান করেছিলেন। পরে তুগলক রাজধানী দক্ষিণ ভারতে নিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিলেন জাহানপনাতে। জাহানপনা এখন ধ্বংসস্তূপ।
মোহাম্মদ বিন তুগলক ছিলেন অত্যন্ত কঠিন হৃদয়ের মানুষ এবং অনেকটা খেপাটে ধরনের। তিনি অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার যৌক্তিকতা ওই সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন হঠাৎ দিল্লি হতে রাজধানী দক্ষিণে নিয়ে যেতে তিনি দিল্লিবাসীদের জোর করে নিয়ে যান। কথিত রয়েছে যে, একজন বিকলাঙ্গ ভিক্ষুককেও তিনি বাদ দেননি। আবার কয়েক বছর পর ফিরে আসেন দিল্লিতে। নিয়ে আসেন সব নাগরিকদের। এসবের জন্য তাকে উদাহরণ করেই ‘বাংলা ভাষায়’ যুক্ত হয়েছে প্রবাদবাক্য ‘তুগলকি কারবার’- যখন যা খুশি তাই করা। মোহাম্মদ বিন তুগলক ছিলেন ওই সময়কার প্রবল পরাক্রমশালী স্বৈরাচার। তুগলকরা এখনো একই রকম আছেন। অনেক তথাকথিত নির্বাচিত অনির্বাচিত শাসকরা ‘তুগলকি কারবারে অভ্যস্ত- আজ এক কথা কাল তার উল্টো। মোহাম্মদ বিন তুগলকের সমাধি কোথায় তা খুঁজে পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাস্ত করে শেরশাহ তৈরি করেছিলেন শেরগড়। শেরগড় লালকিল্লার কাছাকাছি জায়গায় আর পুরাতন কিল্লা ঘিরে। এখানেই এই পুরাতন কিল্লাতেই লাইব্রেরির সিঁড়ি হতে বাবরপুত্র হুমায়ুন পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
দিল্লির পুরাতন শহরের মধ্যে এখনো যা আবাদ রয়েছে- তা হলো শাহজাহানাবাদ যা বর্তমানে পুরাতন দিল্লি বলে পরিচিত। শাহজাহানাবাদ বা বর্তমানের পুরাতন দিল্লিই দিল্লির সপ্তম শহর। এই পুরাতন দিল্লিই ইতিহাসে ভরপুর। এখানেই শাহজাহানের বড় সন্তান জাহানারা তৈরি করেছিলেন ‘চাঁদনী চক’। এখানে বড় চওড়া রাস্তার মাঝে ছিল ছোট পানির তালাব আর ফোয়ারা। রাস্তার দু’ পাশে প্রবাহিত পানি যার উপরে পূর্ণিমার চাঁদের আলো ঠিকরিয়ে চকচক করতো। তাই জাহানারা নাম রেখেছিলেন চাঁদনীচক। এখন শুধুমাত্র চাঁদনী চক-এর নামটিই রয়েছে। প্রথমবার যখন পুরাতন দিল্লি তথা শাহজাহানাবাদে আসি তখন ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলাম এখনকার
অবস্থা দেখে। পুরাতন ঢাকার চাইতে বড় এ ঐতিহাসিক শহরটি এখন হতশ্রি, ঠেলাগাড়ি, রিকশা আর মানুষের ভিড়। পাইকারি বাজার। এক সময়ের ঝলমলে এই শহরের বিখ্যাত গলিগুলো গন্ধ আর পুতময় হয়ে রয়েছে।
এক সময়ের ‘চাঁদনীচক’ যখন প্রথমবার দেখি বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম ইতিহাসের গন্ধ পেয়ে। মনে হয়েছিল শাহজাহানাবাদের অলিতে-গলিতে ইতিহাস। বড় বড় হাভেলী আর কুচাগুলোর প্রতিটির অতীতই একেকটি বড় ইতিহাস। সুখ-দুঃখ, জৌলুস, প্রেম, বঞ্চনা, জীবন-মৃত্যু- সবই ধারণ করে কয়েকশত বছরের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রত্যেকটি পুরাতন জরাজীর্ণ এক সময়ের সুরম্য হাভেলী আর কুচাগুলো। এখন এটি একটি সাধারণ চৌরাস্তা- এর এক পাশে ছিল একটি অতিথিশালা যা এখন নেই সেখানেই রয়েছে টাউন হল। শাহজাহানাবাদ বা বর্তমানের পুরাতন দিল্লির স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবার ভারত বিখ্যাত। এখানে এখনো ঐতিহ্যবাহী মোগল খাবার পাওয়া যায়। এখানে পরের দিকের মোগলদের পাচকদের এক বংশধরের একটি রেস্তরাঁ রয়েছে যার নাম ‘করিমস্‌’, উপমহাদেশ খ্যাত এই রেস্তরাঁ। এখানে পরিবেশিত হয় সবধরনের কাবাব এবং মাংসের পরিবেশনা। মাৎস হিসেবে ব্যবহার হয় মুরগি এবং ছাগল বা বকরি। মোগলরা তাদের রাজত্বকালে তাদের হিন্দু প্রজাদের দিকে লক্ষ্য রেখেই গো-মাংস ভক্ষণকে নিরুসাহিত করেছিলেন। তাই এ অঞ্চলে কোরবানি ঈদ ‘বকরা ঈদ’ নামে পরিচিত।
শাহজাহানাবাদে অনেকগুলো বাজার ছিল। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পণ্যের বাজার। এখনো এই সব বাজার রয়েছে। তবে এগুলো এখন পাইকারি বাজার। তবে খুচরা বাজারও রয়েছে। শাহজাহানাবাদ গড়ে উঠেছিল দিল্লির মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদীর তীর ধরে। যমুনা তীর ধরেই গড়ে উঠেছিল ভারতের শত শত বছরের মুসলিম সাম্রাজ্য। লক্ষণীয় বিষয় যে, মোগল স্থাপন্যের সবচাইতে দর্শনীয় এবং বিশ্বের বিস্ময় আগ্রার তাজমহল এবং মোগলদের রাজধানী বলে কথিত আগ্রার দুর্গ গড়ে উঠে যমুনা নদীর তীরে।
যমুনা নদী তখন উন্মত্ত যৌবনা। দূর্গের পেছনে দেয়ালঘেঁষা। টলটল পরিস্কার পানির প্রবাহ। সূর্যের আলোতে চিকচিক করত। এ নদীর পানি সরবরাহ হত দূর্গ আর শাহজাহানাবাদে। এখন সেই যমুনা নদী খুঁজে পাওয়া যায় না। দূর্গ হতে কয়েক কিলোমিটার পূর্বে সরে গিয়েছে। নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে বস্তি আর পানি হয়েছে দূষিত। তবুও এই যমুনা নদী কালের সাক্ষী। অগণিত সাম্রাজ্যের উত্থান আর পতনের সাক্ষী।
অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন ওই সময়কার মুসলিম শাসকরা গঙ্গার তীরে তেমন কোনো স্থাপনা তৈরি করেননি; কারণ ওই নদীটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র নদী। তবে অনেক শাসকদের উপর মন্দির বিনষ্ট করার ঐতিহাসিক অভিযোগ রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন মধ্যযুগে ধর্মস্থানের ওপর হামলা করার অন্যতম কারণ ছিল দুর্গের ভেতর হতে শত্রুসেনাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে আসার কৌশল। হয়তো ঠিক, হয়তো ঠিক নয়- এটি নিয়ে বিতর্কের অভিপ্রায় আমার নয়।
শাহজাহানাবাদ বা পুরাতন দিল্লির আকার অনেকটা পানের মতো ছিল। এ শহরের প্রান্তে রয়েছে লালকিল্লা। লালকিল্লার লাহোর গেট হতে সোজা পশ্চিম দিকে প্রধান সড়ক যার মাঝ প্রান্তে ছিল চাঁদনী চক। প্রায় শেষ মাথায় রয়েছে একটি বৃহৎ মসজিদ; এগুলো তৈরি করেছিলেন শাহজাহানের অন্য দুই পত্নী। এর মধ্যে একজন বেগম আকবরি মহল। অপরজন বেগম ফতেহপুরী যার নামে পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে ফতেহপুরী মসজিদ। কথিত যে, তিনি এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এই দুই বেগমের সমাধি রয়েছে আগ্রার তাজমহলের প্রধান প্রবেশ পথের পাশে। আকবর মহলের তৈরি মসজিদটি ১৮৫৮ সালে কোম্পানির হুকুমে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। ওই সময় শাহজাহানাবাদের বহু মসজিদ আর মোগল স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। চাঁদনী চকের মূল সড়কে যুক্ত হয়েছে গলি, কুচা। আর শহরটি ছিল দেয়ালঘেরা যার নিয়ন্ত্রণ হতো বারটি গেটের মাধ্যমে। প্রতিটি গেটের বিভিন্ন নাম ছিল। এখনো কয়েকটি গেট দাঁড়িয়ে রয়েছে তবে দেয়াল প্রায় নেই বললেই চলে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের যুদ্ধে ধ্বংস হওয়ার পর বৃটিশ বাহিনী কয়েকটি গেট ছাড়া ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করেছিল শহরের দেয়াল। আজও পাঁচটি মূল গেট দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তার মধ্যে সবচাইতে ঘটনাবহুল এবং বহুভাবে আলোচিত ৫টি গেট বা দরওয়াজার অন্যতম বর্তমানে খুনি দরওয়াজা হিসেবে পরিচিত। এটি ছিল শাহজাহানাবাদে প্রবেশের প্রথম দরওয়াজা। এই দরওয়াজাটি তৈরি করেছিলেন শেরশাহ সুর যিনি এটা শেরগড়ে প্রবেশের অন্যতম দরওয়াজা হিসেবে ব্যবহার করতেন। পরে সম্রাট শাহজাহান তার প্রাচীর শহর শাহজাহানাবাদের প্রধান ফটকে উন্নীত করেন। এখানে হালেও বহু ঘটনার জন্ম হয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন ঐতিহাসিক কারণেই ‘এই দরওয়াজা, যা এখন রাস্তার ডিভাইডার-এর মাঝে, জায়গাটি অভিশপ্ত তাই বৃষ্টিতে রক্ত ঝরে। আমি প্রথমবার গাড়ি হতে নেমে এ দরওয়াজা বা গেট দেখতে। গেটটি তিনতলা উপরে সৈনিকদের বিশ্রামের জায়গা করা ছিল। এখন পরিত্যক্ত। এখানেই যুবরাজ জাহাঙ্গীর তার পিতা আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক সময়ে যুদ্ধে আকবরের অন্যতম রত্ন ও যোদ্ধা আবুল ফজলকে হত্যা করেছিলেন। তার শিরশ্ছেদ করে মাথা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। আরো পরে ১৮৫৭ সালে কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যখন শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর মেজর হাডসনের নিকট আত্মসমর্পণ করেন ওই সময়ে তার তিন পুত্রসহ আরো অনেককে এই দরওয়াজার প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করে শিরশ্ছেদ করে লটকিয়ে রেখেছিল।
মেজর হাডসন যিনি নিজেও আরো পরে লক্ষ্ণৌতে সিপাহীদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার দেহকেও লটকিয়ে রাখা হয়েছিল। লক্ষ্ণৌ-এর লা মার্টিনিয়ার কলেজের এক কোনায় রয়েছে মেজর হাডসন-এর সমাধি। মেজর হাডসন প্রথমে ছিলেন একজন ভাড়াটে সৈনিক। তার ক্যাভেলারি পরে বৃটিশ ভারত বাহিনীতে ‘হাডসন হর্স’ নামে আত্মীকরণ করা হয়েছিল। আমি ২০১৬ সালে ইয়াঙ্গুনে বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধিতে গিয়েছিলাম। যাই হোক কিংবদন্তি রয়েছে যে, এই গেটের উপরে বৃষ্টির পানি পড়লে রক্তের রং ধারণ করে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন যে, এখানে যে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তাতে লোহার উপাদান বেশি বলে মরিচার রংয়ে পানির রং বদল হয়।
আর দুটি গেট যার মধ্যে একটি ১৮৫৭ সালের ক্ষত নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার নাম কাশ্মিরী গেট। মূলত এই গেটের পতনের পরেই ১৮৫৭ সালের সিপাহীরা পরাজিত হন। আর দক্ষিণ প্রান্তে এখনো দাঁড়িয়ে তুর্কম্যান গেট।
বলছিলাম শাহজাহানাবাদের কথা। তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল এই শহর। লালকেল্লা হতে ‘চাঁদনীচক’ পর্যন্ত ছিল উচ্চবিত্তদের বাস আর উচ্চমার্গের বিপণী বিতান। চক কোতোয়ালি (পুলিশ থানা), হতে চাঁদনীচক স্কয়ার ছিল দ্বিতীয় ভাগ। এ জায়গাতেই ছিল উচ্চবিত্তদের বাজার। কবি-সাহিত্যিকদের বাস ও আড্ডাখানা। মীর্জা গালিবের বাসস্থানও এরই ধারেকাছে। শেষবার দিল্লি সফরকালে গিয়েছিলাম মীর্জা গালিবের বাসস্থান দেখতে। যার বেশি অংশই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল বহু আগে। তবে পরে ভারত সরকার একাংশ উদ্ধার করে গালিব ট্রাস্ট বানিয়েছেন। এখন সে অংশ গালিবের জাদুঘর।
শেষ অংশ ছিল চাঁদনীচক হতে ফতেহপুরী মসজিদ পর্যন্ত। এখানে এখন এশিয়ার সবচাইতে বড় মসলার পাইকারি আড়ত।
‘চাঁদনীচকের’ আবাসনগুলো ছিল তিন স্তরের। প্রথম স্তর হাভেলী। প্রাসাদের মতো বাড়িগুলো ছিল উঁচু দেয়ালঘেরা। মালিকরা ছিলেন আমীর, ওমরাহ বা নবাব এবং তৎকালীন সমাজের উচ্চ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। এরা ছিলেন মোগল দরবারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। একটি হাভেলী যা এখনো বিখ্যাত এবং সবচাইতে বড় নাম চুনীমল হাভেলী। আমি দেখতে গিয়েছিলাম ওই হাভেলীটি। দ্বিতীয় স্তর ছিল কুচা। এখানে একই পেশার মানুষরা থাকতেন। তৃতীয় স্তর কাটরা। এখানে পেশাদারদের কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থান একই জায়গায় ছিল। এই দুই স্তরই ছিল মহল্লা।
চাঁদনীচকের দক্ষিণ পাশে    ‘জোহরী বাজার’ এক সময় অলংকারের বড় বাজার ছিল। এখনো কিছু রয়েছে। তবে বর্তমানে এখানে শাড়ি, লেহেঙ্গা আর মহিলাদের অন্যান্য পরিধেয় জড়ির কাজ করা কাপড় ও তৈরি পোশাকের পাইকারি বাজার। সমগ্র ভারতে সরবরাহ করা হয় এখান থেকেই। এখানেই প্রথমবার আমার পরিচয় হয়েছিল একজন রিকশাচালক আহমেদ গিয়াসের সঙ্গে। যিনি ৮০ রুপির বিনিময়ে বহু গলি আর কুচা দেখিয়েছিলেন। তিনি এই জায়গারই বাসিন্দা। কথায় কথায় জেনেছিলাম যে, প্রায় দশ পুরুষ ধরে তারা মোরিগেটের বাসিন্দা। এখন তারা রিকশা আর ভ্যানগাড়ির ব্যবসা করেন। তিনি মাঝে মধ্যে মনমতো যাত্রী পেলে এলাকা ঘুরিয়ে দেখান। আমাকে দেখেই তিনি ঠাওর করেছিলেন যে, এ জায়গা দেখতে এসেছি। বাংলাদেশি শুনে বেশ খুশিই হয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, তার দুই ছেলে স্কুলে পড়ে। ইচ্ছা ছিল উচ্চশিক্ষিত করে তুলবার। তবে তার শঙ্কা ছিল সরকারি চাকরি না পাবার। তার তথ্য মোতাবেক এখানে একসময় সব বড় ব্যবসায়ীরাই ছিলেন মুসলমান। কিন্তু প্রথমবার ১৮৫৭ সালে পটপরিবর্তন হয় আর দ্বিতীয়বার ১৯৪৭ সালের দিল্লি রায়টের পরে মাত্র দশ ভাগে নেমে আসে মুসলমান ব্যবসায়ীদের সংখ্যা। ১৯৪৭ সালের পাঞ্জাব বিভক্তির পর পশ্চিম পাঞ্জাবের ভয়াবহ দাঙ্গার ফলে উদ্বাস্তু হওয়া শিখদের এখানে এবং ধারেকাছে ক্যারলবাগে পুনর্বাসন করা হয়। এখানে যে সব মুসলমানরা রয়ে গিয়েছিল তাদেরকে একপ্রকার যুদ্ধ করেই থাকতে হয়েছে। তার পূর্ব-পুরুষরা এভাবেই রয়ে গিয়েছিলেন।
আহমেদ গিয়াস দুঃখ করে বলেছিলেন যে, এখানকার মুসলমান ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় তেমন মনোযোগী নয়। ফটকাবাজারি করা ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। বয়স্করা আড্ডা আর কবুতর বাজি করে অতীতের প্রজন্মের স্বর্ণযুগের আলোচনায় তৃপ্ত হয়ে থাকেন। আহমেদ গিয়াস বলেছিলেন, এখানকার বহু বিত্তশালী যাদের হাভেলীগুলো এখনো দাঁড়িয়ে- তা তারা বিক্রি করে অনেকেই পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। আহমেদ গিয়াস দুঃখ করে বলেছিলেন যে, তার মুরুব্বিদের কাছ থেকে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা শুনেছেন। বললেন যে, তিনি শুনেছিলেন- মুসলমানদের পতন তাদের কারণেই হয়েছে। যেদিন বাহাদুর শাহ জাফরকে হাডসনের নেতৃত্বে শিখ পল্টন এই রাস্তা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তখন এখানকার ধনাঢ্য মুসলমানরা টিকে থাকবার জন্য হাত মিলিয়েছিলেন ইংরেজদের সাথে। এমন কি মীর্জা গালিবও কোম্পানির সিপাহীদের সঙ্গে মদ খেয়ে মাতাল হয়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন বাহাদুর শাহ জাফরের মোশাহেবার রত্ন। এসব কথা বিস্তারিতভাবে তার দাদার কাছে শুনেছিলেন। তিনি আমাকে অনেক গলি কুচাতে ঘুরিয়েছিলেন। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, রাজিয়া সুলতানার সমাধিতে নিয়ে যেতে পারবে কিনা। বলেছিলেন ওই জায়গা শাহজাহানাবাদেই। তবে গলির মধ্যে এ সময় যেতে বহু সময় লাগবে। তাই আর যাওয়া হয়নি। এরপরেও আর যাওয়া হয়নি। রাজিয়া সুলতানা ইলতুতমিশ-এর কন্যা ভারতবর্ষের প্রথম নারী সুলতান। আর মুসলমানদের শত শত বছরের শাসনকালের একমাত্র নারী শাসক। এর পরে আরেক নারী দিল্লি মসনদে সদর্পে ছিলেন তার নাম ইন্দিরা গান্ধী।
আহমেদ গিয়াস শিখদের গুরুদুয়ারা শিসগঞ্জ সাহেব, যেখানে আওরঙ্গজেব নবম শিখগুরুর শিরশ্ছেদ করিয়েছিলেন। দেখিয়েছিলেন। আমি যেতে চেয়েছিলাম লালকুয়া বাজার হয়ে তুর্কম্যান গেটের দিকে। এই জায়গাটির বহু ঘটনা খুশবন্ত সিং-এর বইতে পড়েছিলাম। আহমেদ গিয়াস নিয়ে যেতে সাহস পায়নি। কারণ ওই এলাকায় দিল্লির বেশির ভাগ হিজড়াদের বাসস্থান। এদের এখানে আবাস মোগল সময় হতে। এদের মধ্য হতে মোগল হেরেমের রক্ষী নিয়োজিত হতো। অনেক ঘুরিয়ে গিয়াসউদ্দিন আমাকে দিল্লির তথা ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ জামে মসজিদের সামনে নামিয়ে দিয়েছিলেন। সামনেই চোর বাজার। জামা মসজিদ এখন ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি। পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান। ১৮৫৭ সালের পর কোম্পানির সৈনিকরা ‘আস্তাবল’ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল শাহজাহানের আরেক কীর্তি, এই মসজিদ কিন্তু ওই সময়ের ইংল্যান্ডের বৃটিশ সরকারের সায় না থাকায় রয়ে গিয়েছিল। ১৮৫৭ সালে মোগলদের পতনের পর কোম্পানির শাসকরা পরবর্তী দুই বছর দিল্লিতে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রেখেছিল। ভয় পেয়েছিল আরেক উত্থানের। অবশ্য সিপাহী বিদ্রোহ বা প্রথম স্বাধীনতা ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ হতে ইংরেজদের বিতারিত করতে পলাশী যুদ্ধের ১০০ বছর পর। দিল্লির জামা মসজিদ তৈরি করেছিলেন রেড সেন্ড স্টোন দিয়ে। শাহজাহান পুত্র সম্রাট আওরঙ্গজেব এর চাইতে কিছুটা বড় একই ধাঁচের লাল পাথরের মসজিদ তৈরি করেন লাহোরে। যার নাম বাদশাহী মসজিদ। মসজিদটি তৈরি করেন তার দাদার নির্মিত লাহোর দুর্গের সামনে।
প্রথম সফরে দুপুরে ইচ্ছা হয়েছিল পুরাতন দিল্লিতেই খাবার খেতে। পরাটাওয়ালি গলির অনেক নাম শুনেছি। সেখানে চল্লিশ রকমের পরাটা পাওয়া যায়- এমনটাই শোনা যায়। গিয়েছিলাম ওই গলিতে। রিকশা নিয়েছিলাম। কোন কোন গলি দিয়ে টাউন হলের সামনে অত্যধিক সরু গলির মুখে থামিয়ে রিকশাচালক দেখিয়ে দিলো ইতিহাসখ্যাত পরাটাওয়ালি গলি। গলির ভেতরে মাত্র চার পাঁচখানা দোকান এখনো অবশিষ্ট। সবগুলোই প্রায় দেড়শত বছরের পুরনো। এক দোকানে বসে পরিচয় হলো ইকবাল আলীর সঙ্গে। দুই ভাই বংশপরম্পরায় চালিয়ে আসছে এই ছোট পরিসরের দোকান। সামনে বড় কড়াইতে ঘি ফুটছে। একজন দ্রুত হস্তে পরাটা বানিয়ে ঘিয়ের মধ্যে ডুবিয়ে ভেজে নিয়ে তুলে দিচ্ছে খদ্দেরদের প্লেটে। তিন রকমের সবজি ফ্রি। চাইলে আরো পাওয়া যায়। এমন কোনো ধরনের পরাটা নেই যা চাইলে পাওয়া যায় না। অনেক পরাটার নাম শুনলেও চল্লিশ ধরনের পরাটা হতে পারে তা আমার কল্পনাতেও ছিল না। এক প্লেটে দুটো পরাটা সঙ্গে সবজি চাটনি। অপূর্ব তার স্বাদ। ইকবাল আলীও তার সুখ-দুঃখের কথা জানালেন। বলেছিলেন, এ ব্যবসা ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাত্র চারটি দোকান রয়েছে। বাকিগুলো বিভিন্ন রকমারি শাড়ি-গহনার দোকানে রূপান্তরিত হয়েছে। বললেন, হয়তো এক দু’বছর পর আসলে এটাও বন্ধ পাবেন। নিজাম-এ (নিজামউদ্দিন আউলিয়ার নামে স্থান ও রেলওয়ে স্টেশনের নাম) ছোট রেস্তরাঁ নিয়েছি সেখানেই চলে যাবো। এবার গিয়ে মাত্র তিনটি দোকান পেয়েছিলাম। ভাটিয়া নামক একজনের দোকানে নাস্তা করেছিলাম।
তিনি জানালেন, ‘এখন পরাটা লোকে তেমন খেতে চায় না। ঘিয়ে ডুবিয়ে এই পরাটা স্বাস্থ্য সচেতন লোকে তো একেবারেই খায় না। তার উপরে ডায়াবেটিস আর হৃদরোগের ঝুঁকি। তেমন আড্ডাও হয় না। পেছনে পণ্ডিত নেহেরুর ছবি দেখিয়ে ভাটিয়া বললেন, আমার দাদা এলাকায় কংগ্রেস নেতা ছিলেন। তারই আমন্ত্রণে পণ্ডিত নেহেরু স্বাধীনতার আগে রাস্তার ওপারে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। এখান থেকে পরাটা নেয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইকবাল আলীর কথা। বললেন, নিজাম-এ খোঁজ করলে পাবেন।
আমি প্রথমবার যখন ইকবাল আলীর দোকান থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে বের হয়েছিলাম প্রায় একদিনের অভিজ্ঞতা আর মোগলদের তৈরি জৌলুসময় এই শহরের কথা চিন্তা করতে করতে ইহিাসে ডুবে গিয়েছিলাম। একদা প্রাচ্যের গর্ব এই শাহজাহানাবাদ, বর্তমানের পুরাতন দিল্লি, যে শহরের পতন হয়েছিল চারশ’ বছর আগে সেই শহর এখন মৃতনগরী। বাকি নেই কোনো জৌলুস। মানুষ আর ঠেলাগাড়ি, হট্টগোল, গালাগালি আর দোকানের বিশ্রি চেহারার পেছনের ইতিহাস ধুলোয় ডাকা পড়ছে। একদা মোগল বংশের উচ্চবিত্তদের বাসস্থানগুলো, গজল আর উর্দু শায়েরীর গুঞ্জনে মুখরিত হতো। আজ গোডাউনে পরিণত হয়েছে। বহু হাভেলী ধ্বংসপ্রায় জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ধ্বংসপ্রায় এক সময়ের ভারতের রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেনের বংশধরদের হাভেলী আর কাশ্মীরি পণ্ডিতদের আসকার হাভেলী যেখানে শত বছর পূর্বে জওহরলাল নেহেরু আর কমলা দেবীর জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এক সময়ের জৌলুসপূর্ণ শাহজাহানাবাদ, যে শহরকে নাদির শাহ তিনদিন ধরে লুট করেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল  কোহিনূর হীরক খণ্ড। সেই শহর আজ অতীতের স্বর্ণালী দিনগুলোও মনে করিয়ে দেয়ার অবস্থায় নেই। আমি প্রথমবার পুরাতন দিল্লি বা শাহজাহানাবাদে গিয়ে যখন চারদিকে দেখছিলাম তখন যেন চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ইতিহাস উঁকি দিয়ে গিয়েছিল। হয়তো যারা শাহজাহানাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের জন্য এ জায়গা কেবলমাত্র ছোট ছোট কারখানা আর বৃহৎ সস্তা, খুচরা আর পাইকারি বাজারের ধূসর দালানকোঠাগুলো মাত্র। অনেকেই হয়তো আসতেও চাইবে না। কিন্তু যারা প্রকৃত ভ্রমণ পিপাসু, যারা ভ্রমণে ইতিহাস খোঁজ করেন, পুরাতন দিল্লি এখনও সেই ইতিহাসের জৌলশময় দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দেবে। এখনকার মূল বাসিন্দারা কঠিন জীবনযাপন করে আসছেন।
এই শাহজাহানাবাদ এক সময় সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। ছিল উর্দু ভাষার কবি-মহাকবিদের মিলনস্থল। ফার্সি ভাষা চর্চার কেন্দ্র যার নেতৃত্ব দিতেন মোগল দরবারের রাজকুমার বা রাজকুমারীরা। এখনো অনেক ক্ষয়িষ্ণু পরিবারের সদস্যরা কিছু ধরে রাখবার চেষ্টা করছেন। হয়তো কয়েকটি বিবর্ণ বাঁধানো ছবি আর পুরাতন গড়গড়াটা পরিষ্কার করে অতীত জীবনের স্মৃতি হাতরিয়ে বেড়াচ্ছেন। বেশির ভাগ উর্দু সংস্কৃতি আর গজল কবিতার ধারকরা পাকিস্তানে চলে গিয়েছেন। ইতিহাস হয়ে থাকা অনেক বড় বড় নামের কবিদের অস্তিত্বই নেই। জউখ এখন লক্ষ্ণৌয়ের রেললাইনের ধারের কোনো কবরে শুয়ে আর মীর্জা গালিব নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের প্রবেশমুখে উন্মুক্ত আকাশের নিচে অযত্নে অবহেলায় রয়েছেন।
এক সময় শাহজাহানাবাদে পড়ন্ত বিকেলে ছাদের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কবুতরবাজরা কবুতরবাজি করতেন। এ খেলা ছিল বড় বড় হাভেলীর নবাবদের। মোগল সম্রাট আকবরের শখ ছিল কবুতরবাজি। যার নাম রেখেছিলেন ‘ইসকবাজি’। সে সময় হতেই উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পরে এ শখের খেলা। একজনের কবুতরের ঝাঁক অন্য কবুতরের সঙ্গে খেলা দেখাতে দেখাতে নিজের ঝাঁকের সঙ্গে নিয়ে আসা। ইতিহাসে বর্ণিত যে, সম্রাট আকবরের প্রায় বিশ হাজার কবুতর ছিল। এসব কবুতরের জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল। ছিল পরিচর্যার জন্য বিভিন্ন পদবির কর্মকর্তাগণ। আকবরের এই শখ ছিল বাল্যকাল থেকেই। হবেই বা না কেন, মাত্র ১২ বছর বয়সকালে পিতৃবিয়োগ ঘটলে মাতা হামিদা বানুর হাত ধরে সিংহাসনে বসেছিলেন। কাজেই বাল্যকালের শখ রাজকীয় শখে পরিণত হয়েছিল। আকবরের কবুতরের ঝাঁকের মধ্যে পাঁচশত কবুতর ছিল বিশেষ ধরনের। এদের জন্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। তিনি নিজে তার প্রিয় কবুতরগুলোকে নাম দিয়েছিলেন। সম্রাট শাহজাহান তার দাদার এই গুণটি পেয়েছিলেন। ওই সময়ে বিকেলে শাহজাহানাবাদের আকাশে কবুতরের পাখা ঝাপটা আর তাদের নিয়ন্ত্রকদের তীক্ষ্ণ শিসের বা অন্যান্য আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠতো শাহজাহানাবাদ।
এখনো শাহজাহানাবাদে বিকেলে চলে কবুতরবাজি। তবে এখন আর এ খেলা নবাব বা রাজকুমারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ খেলা চলে এসেছে সাধারণ মানুষের আঙ্গিনায়। এখনো উড়তে দেখা যায় সিরাজী, লাল খাল, আজাদী, গোলে, মাসাককলি এবং কাবুলী কবুতরের ঝাঁক। এখনো কবুতরের ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতিযোগিতা হয়। এখনো অন্য ঝাঁক হতে কবুতর ছিনিয়ে আনবার কৌশল শেখানো হয়। ছাদের উপর হতে ডাক শোনা যায় ‘আও আও’। তবে যা দেখা যায় না অতীতের সেই চাকচিক্য আর কবুতরবাজিতে শাহজাহানাবাদ মাতিয়ে রাখা। এখনো হুক্কার চলন থাকলেও নাকে আসে না বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি তামাকের ঘ্রাণ। নবাব আর সম্রাটদের হুক্কা এখন ‘সিসায়’ পরিণত হয়েছে। সুগন্ধি তামাকের জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে মাদক আর তৈরি হয়েছে ‘সিসা’ বার। এর ব্যাপ্তি আরেক মোগল শহর জাহাঙ্গীরনগর- এখনকার ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
কবুতরবাজি লক্ষ্ণৌ আর দিল্লি হয়ে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী শহরগুলোতে পৌঁছেছে। মহাজিরদের কল্যাণে পাকিস্তানের শহর করাচিতেও পৌঁছেছিল। আমার কৈশোর কেটেছিল এই শহরে। আমারও শখ ছিল কবুতরবাজির। প্রায় দেড়শত কবুতর ছিল আমার সংগ্রহে। এগুলো সবই পুরাতন স্মৃতি।
শাহজাহানাবাদ আজ স্মৃতির গহ্বরে ঠিক যেমনি শাহজাহানের পিতার তৈরি ঢাকার ঐতিহ্য। পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্য এখন সেকেলে। আধুনিক হবার প্রতিযোগিতায় সমাজের অবক্ষয়, যার উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি।
শাহজাহানাবাদ আর চাঁদনীচক ক্রমশই ইতিহাসের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আর কয়েক দশক পর ‘শাহজাহানাবাদ’-এর নাম ইতিহাসে খুঁজে নাও পাওয়া যেতে পারে। পুরাতন দিল্লি হয়তো থাকবে না। হয়তো পুরাতনের উপরেই গজিয়ে উঠতে পারে নতুন শহর। যে শহরের নিচে হারিয়ে যাবে মোগলদের ঐতিহ্য, জৌলুসভরা কাহিনী আর খণ্ড খণ্ড কাহিনী শোনাবার মতো আহমেদ গিয়াস আর ইকবাল আলীদের মতো ব্যক্তিরা। কতজনই বা জানেন যে ‘চাঁদনীচক’ নামটি যিনি দিয়েছিলেন সেই মোগল শাহজাদী ‘জাহানারা’, শাহজাহান কন্যা আজ নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার প্রাঙ্গণে উন্মুক্ত কবরে শায়িত। মাঝেমধ্যে দু’একজন দর্শনার্থী খুঁজে বের করেন জাহানারার সমাধি।
প্রথমবার দিল্লিতে এসেই গিয়েছিলাম দিল্লির সূফী সম্রাট হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারে। এক ঐতিহাসিক স্থান। প্রবেশপথে আমীর খসরুর মাজার যিনি উপমহাদেশে কাওয়ালীর প্রচলন করেছিলেন। তিনি নিজে কাওয়ালীর জন্য কবিতা, কাসিদা আর গজল লিখতেন। তিনি আওলিয়ার প্রধান শিষ্য ছিলেন। পরিচিত হন সূফী সাধক হিসেবে। বিখ্যাত হয়ে উঠেন সূফী সাধক হিসেবে। মাজার প্রাঙ্গণে রয়েছে মোগল বংশের বহু বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমাধি যার মধ্যে অন্যতম জাহানারা।
নিজামউদ্দিন আওলিয়ার দরগাতে সারা বছরব্যাপী প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়। সমাগম হয় সকল ধর্মের মানুষের। ভাবতে অবাক হতে হয় কিভাবে পরাক্রমশীল সুলতানদের সময়ে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেন অতীব সাধারণ মানুষের ‘মসিহা’। উপমহাদেশের সূফীদের ভক্ত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের মানুষ। আওলিয়ার সঙ্গে সুলতানদের সম্পর্ক যে মধুর ছিল না তার বিবরণ আগেই দিয়েছি। হযরত নিজামউদ্দিন আওলিয়া যখন সূফী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন তখন জালালউদ্দিন খিলজি দিল্লির মসনদে। তিনি কোনোদিন জালালউদ্দিনের ধারে কাছেও ঘেঁষেননি। বেশ কিছুক্ষণ ছিলাম এই ঐতিহাসিক চত্বরে কেবলই মনে পড়ছিল তার উক্তি- ‘হনুজ দিল্লি দূর অস্ত’। ছোটবেলা হতেই শুনেছি এ বাক্য। তখন জানতাম না এর ইতিহাস।
নিজামউদ্দিন হতে কয়েক কিলোমিটার দূরেই দিল্লির অষ্টম শহর ‘লুটিয়েন্স দিল্লি’ বা নয়াদিল্লি। এ স্বাধীন ভারতের রাজধানী। প্রথমবারও দেখেছি। এবারও দেখলাম। লুটিয়েন্স একমাত্র তাজমহল ছাড়া তৎকালীন ভারতের কোনো স্থাপনাকেই শৈল্পিক মনে করেননি। তিনি বৃটিশ রাজের জন্য তৈরি করেছিলেন সর্বাধুনিক রাজধানী। তৈরি করেছিলেন বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি আবাসস্থান যা আজ ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন। যার কথা প্রারম্ভে বলেছি। ইন্ডিয়া গেটে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অন্যতম প্রশস্ত রাজপথ যার এখনকার নাম জনপথ তার অপর প্রান্তে রেইসিয়ানা পাহাড়ের অপর প্রান্তের বিশাল প্রাসাদটি দেখা যায় না। ক্রমেই সামনের দিকে এগুলে পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের উদয়ের মতো উপরে উঠতে থাকে এই প্রাসাদ। এবারই দেখবার সুযোগ হয়েছিল ভেতরের কিছু অংশ, বিশেষ করে দরবার হল আর অশোকা হল। ১৯১১ সালে কলকাতা হতে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করলেও ১৯৩১ সালের আগে শেষ করতে পারেনি নতুন দিল্লির কাজ। যখন নতুন দিল্লি পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে ওই সময় হতেই ভারতবর্ষে বৃটিশরাজের সূর্য অস্তগামী এরপর মাত্র ১৬ বছর টিকে ছিল বৃটিশ রাজ। যখন নতুন রাজধানীর পরিকল্পনা করা হয় তখন বৃটিশ রাজ ৫০০ শ’ বছরের রাজত্বের পরিকল্পনায় বিভোর ছিল। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে ১৮৫৭-এর ঘটনা ভারতের জাতীয়তাবাদের নতুন রূপ দিবে। ওই বিদ্রোহের পর মাত্র ৯৯ বছরই টিকেছিল সমগ্র ভারতে বৃটিশ রাজ।
যাই হোক বর্তমানের রাষ্ট্রপতি ভবন, তৎকালীন ভাইসরয় প্রাসাদ, নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৯৩১ সালে, ওই সময়ে খরচ হয়েছিল ৪,৭৭,০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড। এই ভবনের মোট কক্ষ সংখ্যা ছিল ৩৫৫টি। বর্তমানে ১৯০০০ ঘন মিটার আয়তনের এই ভবনে রয়েছে ৩৪০টি কক্ষ। আমাকে যে কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির দপ্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, তার এ ভবনে ৮ বছরের কর্মকালে পঞ্চাশটি রুমের বেশি দেখতে পারেননি। রাজকীয় ভবনই বটে।
এই ভবনটি তৈরিতে কোনো স্টিল ব্যবহার হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছিল ৭০০ মিলিয়ন ইট আর ৩.৫ মিলিয়ন ঘন মিটার পাথর। ওই সময় বাগানের পরিচর্যার জন্য নিয়োজিত ছিল ৪১৮ জন মালী। এখন এ সংখ্যা অনেক কম।
এই ভবনের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। আর স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল নিয়োজিত হয়েছিলেন সি রাজা গোপালচারি। তিনি সাধাসিধা জীবনযাপন করতেন। তিনি ভাইসরয়দের জন্য নির্দিষ্ট বিশাল শয়নকক্ষে থাকেননি। তিনি বেছে নেন ছোট একটি কক্ষ যা আজও রাষ্ট্রপতির বাসকক্ষ। ওই শয়নকক্ষটি এখন অতিথিশালা।
দিল্লি আমাকে সব সময়েই রোমাঞ্চিত করে। মনে হয় এত বিশাল ইতিহাস যার পরিমাপ সম্পূর্ণভাবে এক জীবনে করা সম্ভব নয়। বিচিত্র ইতিহাস এই নগরীর। দিল্লির ইতিহাস প্রভাবিত করে রেখেছিল সমগ্র উপমহাদেশ। লাহোর-দিল্লি-ঢাকা প্রায় একই সূত্রে গাঁথা। মাঝে মধ্যে ভাবতেও অবাক লাগে কিভাবে দিল্লি হতে ১২০০ মাইল অতিক্রম করে কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি ১২০১ সাল হতে ১২০৪ সালের মধ্যে বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করে বাংলার ভাগ্য দিল্লির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। সেই বন্ধন কি এখনো কেটেছে? মনে হয় না অন্তত ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে পিতা জাহাঙ্গীরের নামে তৈরি শহর জাহাঙ্গীরনগর আর পুত্র শাহজাহানের তৈরি শাহজাহানাবাদের সঙ্গে একটা বিশাল যোগসূত্র তো ইতিহাস স্বীকৃত। তবে পর্যায়ক্রমে সে যোগাযোগ যথেষ্ট শিথিল হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর এখন ঢাকা আর শাহজাহানাবাদ পুরাতন দিল্লি। অনেক স্মৃতি আর অনেক ইতিহাস এসব জায়গা দেখতে হলে যা প্রয়োজন তাহলো ঐতিহাসিক অনুভূতির।
(এই প্রবন্ধটি লেখকের অনবদ্য ভ্রমণ কাহিনী ‘কত জনপদ কত ইতিহাস’ হতে সংকলিত।)
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭

পাকিস্তানের ভাঙন পর্ব by সোহরাব হাসান

পৃথিবীর সব দেশেই ক্ষমতার অন্দরমহলে অনেক না-বলা কথা থাকে, যা ইতিহাস বা ইতিহাসের কুশীলবদের আত্মজীবনীতে ঠাঁই পায় না। সূচনা থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতি ছিল অস্থির, অনিশ্চিত ও প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের শিকার। দেশটির প্রথম বড়লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু রহস্যাবৃত্ত তিনি মারা গেছেন, না তাঁকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে খুন হন। ‘বাঙালি’ নাজিমুদ্দিনকে সরিয়ে বড়লাট হন পাঞ্জাবি আমলা গোলাম মোহাম্মদ। তাঁকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন সামরিক আমলা ইস্কান্দার মির্জা।
আবার ১৯৫৮ সালের ২৬ অক্টোবর সেনাবাহিনীর প্রধান আইয়ুব খান তাঁকে সরিয়ে নিজেই প্রেসিডেন্ট পদটি দখল করেন। যে কায়দায় আইয়ুব মির্জাকে তাড়িয়েছেন, প্রায় একই কায়দায় ইয়াহিয়া খান তাঁকে সরিয়ে ক্ষমতার দৃশ্যপটে আসেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে জুলফিকার আলী ভুট্টো হন খণ্ডিত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট।
আইয়ুব, ইয়াহিয়া, ভুট্টো পাকিস্তানের তিন প্রেসিডেন্টের এইড ডি ক্যাম্প বা বিশ্বস্ত সহকারী ছিলেন আরশাদ সামি খান। তাঁর থ্রি প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড অ্যান এইড: লাইফ, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিকস-এ আছে পাকিস্তানের ক্ষমতার অন্দরমহলের কথা। শাসকদের পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস ও হীনম্মন্যতা কীভাবে দেশটির গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামো ধ্বংস করে, কীভাবে তাঁরা সংখ্যাগুরু বাঙালিদের ন্যায়সংগত অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছেন, তারও বর্ণনা আছে এই বইয়ে।
প্রেসিডেন্টের বিশ্বস্ত সহকারী বা এডিসির দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিমানবাহিনীর চৌকস কর্মকর্তা আরশাদ সামি খান ১৯৬৫ সালে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব সিতারাই জুরাত উপাধি পান। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস হলো, তাঁরই পুত্র প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী আদনান সামি পাকিস্তান ছেড়ে ভারতকেই দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি তরুণ প্রজন্মের হৃদয় জয় করা এই শিল্পীকে নাগরিকত্ব দেয়।
আরশাদ সামি খান ১৯৬৬ সালে আইয়ুবের এডিসি হিসেবে কাজ শুরু করেন। আইয়ুব বিদায় নিলে তিনি ইয়াহিয়ার এডিসি হন। এরপর জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গেও কিছুদিন কাজ করেন তিনি। পরবর্তীকালে আরশাদ সামি দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব ও রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।
আরশাদ সামি খান তাঁর বই শুরু করেছেন আইয়ুবের পতনের ঘটনা দিয়ে। তার আগেই সেনাবাহিনীপ্রধান ইয়াহিয়া খান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, ক্ষমতা দখল করবেন। আইয়ুব যেমন এক কাপড়ে ইস্কান্দার মির্জাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিলেন, ইয়াহিয়া খানও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত করেন।
উনসত্তরের অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব চেয়েছিলেন পুনরায় সামরিক শাসন জারি করে নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে। যেমন নব্বইয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও পুনরায় সামরিক শাসন জারি করতে চেয়েছিলেন। কেউ সফল হননি। যে সেনাবাহিনীর কাঁধে ভর দিয়ে তাঁরা ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই সেনাবাহিনী তত দিনে তাঁদের ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করেছে। এরশাদের সেই সময়ের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে নানা তথ্য আছে মনজুর রশীদ খানের বইয়ে (আমার সৈনিক জীবন, প্রথমা, ২০১৬)। আরশাদ সামি খানের ভাষ্য এবং সেই সময়ের তিন প্রধান কুশীলবের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নিয়ে সাজানো হয়েছে এই ধারাবাহিক।
জবরদখলকারী কোনো শাসকের বিদায় সুখের ও স্বাভাবিক হয় না। আইয়ুবের বেলায়ও ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের ভাগ্য মেনে নিলেন।
সেদিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আরশাদ সামি লিখেছেন, ‘আমি করিডর পার হয়ে যেতে ধীরে ধীরে দরজা খুলে দেখলাম, আইয়ুব ও তাঁর স্ত্রী বসে আছেন, নির্বাক। তাঁরা গভীর চিন্তায় মগ্ন। বাইরে তখন প্রচন্ত ঝড়বৃষ্টি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদ হারানোর আশঙ্কায় তাঁর মনে যে দমকা হাওয়া বইছিল, তার শক্তি বাইরের ঝড়ের চেয়েও অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছিল।’ উল্লেখ্য, ও রকম হতাশাজনক সময়েও তাঁরা ছিলেন পরিপাটি পোশাকে। তাঁদের চুল ছিল পাট পাট করে আঁচড়ানো। পরিষ্কারভাবেই দীর্ঘ দায়িত্ব পালনকালে তাঁরা দেশ-বিদেশের অনেক স্টাইলিশ মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলেন, যা তাঁদের রুচিকে পরিশীলিত করেছে। আমি যখন ভেতরে ঢুকলাম, তখন তাঁদের চোখের ভাষায় বুঝতে পারলাম, তাঁরা একা থাকতে চাইছেন।
আমি প্রেসিডেন্টকে বললাম, ‘স্যার, আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে এসেছি, পাঁচ মিনিট পরই আপনার ভাষণ প্রচার করা হবে।’
তিনি বললেন, ‘আমি জানি, আমি জানি, তোমাকে ধন্যবাদ।’
এরপর আইয়ুব তাঁর ভাষণ শুরু করলেন বরাবরের মতো ‘মাই ডিয়ার কান্ট্রিমেন’ বা আমার প্রিয় দেশবাসী বলে। ভাষণের সারকথা ছিল,
‘আমি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। পরিস্থিতি আর সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই এবং সব সরকারি প্রতিষ্ঠান ক্রোধ, আতঙ্ক ও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীপ্রধান আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করুন এটাই গোটা জাতির দাবি।’
আরশাদ সামি জানাচ্ছেন, ভাষণ শেষ না হতেই তাঁর কক্ষের সব টেলিফোন সচল হয়ে উঠল। বিদায়ী সরকারের মন্ত্রীরা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের প্রতি সহমর্মিতা জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু তাঁরা কারও সঙ্গে দেখা করলেন না।
এরপর আরশাদ সামি ক্ষমতার পালাবদলের যে বর্ণনা দিলেন, তাতে বিদায়ী ও নতুন শাসকের মধ্যকার তিক্ততাই লক্ষ করা যায়। তিনি লিখেছেন, একপর্যায়ে আইয়ুব তাঁকে ইয়াহিয়া খানকে টেলিফোনে ধরিয়ে দিতে বললেন। সামি অফিসে গিয়ে জেনারেল স্টাফ অফিসার ব্রিগেডিয়ার ইসহাক খানকে আইয়ুবের ইচ্ছার কথা জানালেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খান তাঁর অনুরোধ নাকচ করে দিলেন এবং নবনিযুক্ত চিফ অব স্টাফ জেনারেল এস জি এম এম পীরজাদার সঙ্গে কথা বলতে বললেন। আরশাদ তিন বছর ধরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আছেন। কখনো এ রকম ঘটনা ঘটেনি যে প্রেসিডেন্ট কারও সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে চেয়েছেন কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি কথা বলেনি। বরং মন্ত্রী-কর্মকর্তারা তাঁর টেলিফোন পেলে ধন্য হতেন।
আরশাদ লিখেছেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আখতারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। তিনি বললেন, এ ক্ষেত্রে পীরজাদাই হবেন উত্তম বিকল্প। আমি ফিল্ড মার্শালের কাছে গিয়ে বললাম, জেনারেল ইয়াহিয়া মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। তাঁর বদলে তিনি নবনিযুক্ত চিফ অব স্টাফ পীরজাদার সঙ্গে কথা বলবেন কি না, জানতে চাইলাম।’
আইয়ুব বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করছি না। শুধু জানতে চাইছি ২৫ মার্চ আমি অফিসে যে বিদায়ী নোট রেখে এসেছি, তা তিনি পেয়েছেন কি না। তিনি সেটি পড়েছেন এটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পীরজাদাকে টেলিফোন করে নিশ্চিত হও এবং তাঁকেও পড়তে বলো।’
এরপর আরশাদ সামি জেনারেল পীরজাদার সঙ্গে সরাসরি টেলিফোনে কথা বলেন। তিনি সকাল থেকে নানা ঘটনায় ব্যথিত ছিলেন। কিন্তু পীরজাদার কথা নোংরামির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তাঁদের দুজনের কথোপকথন ছিল এ রকম:
‘হ্যাঁ সামি, কী, বলো?’
‘স্যার, ফিল্ড মার্শাল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কর্মকর্তা আমাকে আপনার সঙ্গে কথা বলতে বললেন।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি সেটা জানি। দ্রুত বলো যুবক, আমি খুবই ব্যস্ত। ফিল্ড মার্শাল কী চান?’
‘স্যার, তিনি জানতে চান যে ২৫ মার্চ তিনি অফিসে যে বিদায়ী নোট রেখে গেছেন, সেটি তিনি পেয়েছেন এবং পড়েছেন কি না। তিনি চান, আপনিও এটি পড়ে দেখুন।’
এ পর্যায়ে পীরজাদা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা তা পেয়েছি। তুমি তাঁকে বলো, তিনি যেসব উপদেশ ও পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো শুনলে তাঁর মতো আমাদেরও পতন ঘটবে। তিনি যদি আমার পরামর্শ চান, বলব, অবিলম্বে তাঁর প্রেসিডেন্ট ভবন ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়া উচিত। অন্তত যেন রাজধানীর বাইরে চলে যান।’ বিদায়ী নোটে আইয়ুব রাজনীতিকদের দাবির প্রতি নমনীয় না হতে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ভেঙে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি এক ব্যক্তি এক ভোট চালু না করার কথাও বলেছিলেন, তাতে সংখ্যাগুরু পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তান শাসন করা সহজ হবে।
কিন্তু তত দিনে নতুন জেনারেল ও তাঁর শাগরেদরা নিজস্ব পদ্ধতিতে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

আরশাদ সামি খান পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও তিন প্রেসিডেন্টের বিশ্বস্ত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর বইটি (থ্রি প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড অ্যান এইড: লাইফ, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিকস) কিন্তু পাকিস্তানে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এটি প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লির পেন্টাগন প্রেস। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল বইয়ের প্রকাশনা উৎসবেও যোগ দিয়েছিলেন। এ থেকে ধারণা করা যায় যে সামি খানের বইটিতে এমন সব তথ্য আছে, যা পাকিস্তানের রাজনীতিকদের জন্য অস্বস্তিকর। সেখানকার রাজনীতি সুস্থ ধারায় চলেনি বলেই আজ যিনি সাচ্চা দেশপ্রেমিক হিসেবে নন্দিত হয়েছেন, আগামীকাল তাঁকেই দেশদ্রোহী হিসেবে নিন্দিত করা হয়েছে।
আরশাদ সামি খান পাকিস্তানের তিন প্রেসিডেন্টের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও আইয়ুব খানের সঙ্গেই বেশি সময় ছিলেন। তাঁর প্রতি লেখকের যে কিছুটা পক্ষপাত আছে, তা তিনি গোপন করেননি। তিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে তাঁর কাছে আইয়ুবকেই ‘উত্তম’ মনে হয়েছে। কিন্তু সেই ‘উত্তম’ প্রেসিডেন্ট পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানের জনপ্রিয়তায় এতটাই সন্ত্রস্ত ছিলেন যে তিনি কিছু আজগুবি অভিযোগ এনে তাঁকে সরিয়ে দেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ময়মনসিংহের উকিল নামে পরিচিত আবদুল মোনায়েম খান। এর আগে অবশ্য তিনি আইয়ুবের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। আইয়ুবও স্বীকার করেছেন, অর্থনীতি, উন্নয়ন ও উচ্চতর প্রশাসন সম্পর্কে লোকটির কোনো ধারণা নেই। তারপরও কেন তাঁকে গভর্নর নিয়োগ করা হয়েছে? অপরিসীম আনুগত্য। যোগ্যতার ঘাটতি তিনি আনুগত্য দিয়ে পুষিয়ে নিয়েছেন।
সামি খান পাকিস্তানের অনেক রাজনীতিক ও সামরিক-বেসামরিক আমলার চারিত্রিক দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন, যার সবটা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। তবে তাঁর বইয়ে মোনায়েম খান সম্পর্কে যেসব মজার তথ্য ও ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, তা যেকোনো কৌতুকুনাটকের উৎকৃষ্ট চরিত্র হতে পারে। এখানে একটি ঘটনা তুলে ধরছি।
আবদুল মোনায়েম খানের পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হওয়া নিয়ে গভর্নর ভবনের কর্মীদের মধ্যে যে কৌতুকটি চালু ছিল, তা এ রকম: একদিন ‘শুভক্ষণে’ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ঘোষণা করলেন, ঢাকার পুবদিকের ফটক দিয়ে আগামীকাল সকালে যে ‘খাঁটি বাঙালি রক্তের’ ব্যক্তিটি ঢাকায় প্রথম ঢুকবেন, তাঁকেই গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। মোনায়েম খান এমন একটি প্রাণীর (গাধার) পিঠে চড়ে এসেছিলেন, যেটি পূর্ব পাকিস্তানে কদাচিৎ দেখা গেলেও পশ্চিম পাকিস্তানে মালামাল বহনের জন্য প্রায়ই ব্যবহৃত হতো। আর মোনায়েম খান এমনই বিরল বাহনে চড়ে সেদিন সকালে প্রথম ঢাকায় ঢুকলেন এবং আইয়ুবের সব শর্ত মেনেই তিনি গভর্নরের চেয়ারে বসলেন।
আরশাদ সামি খান লিখেছেন, তিনি গভর্নর মোনায়েম খান সম্পর্কে অনেক কৌতুককর ঘটনার কথা শুনেছেন। সেগুলো নিয়ে বেশি আলোচনা করেননি। নিজের দেখা কিছু ঘটনা তুলে ধরেছেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব যেহেতু বাংলা বলতে পারেন না, সেহেতু উর্দু কিংবা ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন এবং দলের কোনো নেতা কিংবা মন্ত্রী তা বাংলায় অনুবাদ করেন।
১৯৬৭ সালের মার্চের শুরুতে ময়মনসিংহে আয়োজিত এক জনসভায় আইয়ুব খানের ভাষণ মোনায়েম খান নিজেই ভাষান্তর করবেন বলে তাঁর (প্রেসিডেন্ট) সামরিক সচিবকে অনুরোধ করেন। সেটি ছিল বেশ বড় সমাবেশ। সেই সময় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে আসামি করায় তা আরও বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের ধারণা হলো, মোনায়েম খান শেখ মুজিব ও ছয় দফা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি, তাঁর ভয়, মানুষ তাতে ক্ষুব্ধ হবে। আইয়ুবের ভাষণ ভাষান্তরের উদ্দেশ্য হলো, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে সেটি লুকানো।
এরপর সামি খান জনসভাস্থলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘নিরাপত্তার কারণে মঞ্চ অনেক উঁচু করা হয়েছিল এবং জনগণের বসার জায়গা ছিল বেশ দূরে। মঞ্চে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে গভর্নর ছাড়াও সাদাপোশাকের নিরাপত্তাকর্মী, ওই এলাকার প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পোডিয়াম থেকে ভাষণ শুরু করলেন। গভর্নর বসে ছিলেন প্রেসিডেন্টের ঠিক পেছনে, যাতে তিনি তাঁর ভাষণ ভাষান্তর করতে পারেন। কিন্তু তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন এবং নাক ডাকতে থাকলেন। মঞ্চে উপবিষ্ট সবাই তাঁর নাকডাকা শুনতে পেলেন। গভর্নর যখন ঘুমাচ্ছিলেন, সামি তাঁর সচিব ক্যাপ্টেন জিলানিকে ডেকে তাঁকে জাগিয়ে দিতে বললেন; না হলে তিনি তো ভাষান্তর করতে পারবেন না। কিন্তু সচিবের জবাব ছিল, ‘চিন্তা করবেন না, আমি নোট নিচ্ছি, যাতে গভর্নর ভাষান্তর করতে পারেন।’
সামি আরও বলেন, ‘আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে গভর্নরের নাকডাকা শুনতে লাগলাম এবং ভাবলাম, তৃতীয় একজনের নোটের ভিত্তিতে তিনি কীভাবে ভাষান্তর করবেন?’ প্রেসিডেন্ট প্রায় এক ঘণ্টা ভাষণ দিলেন, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের ছয় দফা এবং আরও বেশি দাবিদাওয়ার ওপর আলোকপাত করা হয়। তিনি জনসমাবেশকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, এসব দাবির উদ্দেশ্য হলো কেন্দ্রীয় সরকারকে দুর্বল করা, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাঙন ধরানো, যা ভারতের উদ্দেশ্য।
যখন প্রেসিডেন্ট ভাষণ শেষ করলেন, তখন সচিব দ্রুত গিয়ে তাঁর বসের ঘুম ভাঙালেন। গভর্নর দীর্ঘ হাই তুললেন এবং সচিবকে নোটগুলো পোডিয়ামে রাখতে বললেন। এরপর গভর্নর প্রেসিডেন্টের কাছে ভাষণ অনুবাদ করার অনুমতি চাইলেন। তিনি ভাষণ শুরু করলেন কোরআনের আয়াত পাঠ দিয়ে, যদিও প্রেসিডেন্টের ভাষণে তা ছিল না। এরপর তিনি প্রেসিডেন্টের এক ঘণ্টার ভাষণের ভাষান্তর করতে দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করলেন। দ্রুতগতির ট্রেনের মতো তিনি কোথাও থামলেন না। হিটলার যেভাবে নাজিদের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন, গভর্নরও সেভাবে কখনো গলার স্বর উচ্চগ্রামে, কখনো নিম্নগ্রামে নিয়ে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ, গালিব ও ইকবালের কবিতা থেকে আবৃত্তি করলেন, যা প্রেসিডেন্ট বলেননি। এটি ছিল একবারেই নজিরবিহীন ঘটনা।
বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে প্রেসিডেন্ট তাঁর পাশে বসা গভর্নরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মোনায়েম সাব, আমি তো অত বড় বক্তৃতা দিইনি। আপনি যে কবিতাগুলো আবৃত্তি করলেন, আমি সেসব বলিনি। এমনকি টেগরের (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কোনো কবিতাই আমি পড়িনি। আপনার ভাষান্তরে এসব এল কীভাবে?’
মোনায়েম খান হাসলেন এবং বললেন, ‘স্যার, কিছু মনে করবেন না। আপনি কী বলেছেন আর আমি কী যোগ করেছি, সেটি বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগণ তা শুনতে চেয়েছে। আপনি কি লক্ষ করেননি, আমি যখন গান গাইছিলাম, তখন তারাও গান গাইছিল। আমি যখন হাসছিলাম, তখন তারাও হাসছিল। দূরদূরান্ত থেকে আসা এই মানুষগুলো আপনার বা আমার বক্তৃতা শুনতে চায়নি। তারা এসেছে আনন্দের জন্য, স্যার। তাদের একঘেয়ে জীবনে আনন্দের প্রয়োজন আছে। এ কারণেই তারা যৌনতার প্রতি বেশি আকৃষ্ট, বিশেষ করে যখন যৌনতা ছাড়া তাদের কিছু করার থাকে না। আপনি দেশব্যাপী যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করছেন, তারপরও জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে। তারা এসব কেন্দ্রে যায় বিনা মূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী নিতে নয়, এটির ব্যবহারবিধি শুনে যৌনানন্দ পাওয়ার জন্য।’
এরপর সামি খান লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট আইয়ুব, যাঁকে আমি অত্যন্ত উঁচু রুচির ও গুরুগম্ভীর মানুষ বলে মনে করি, হঠাৎই তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। সামনের আসনে বসা আমার পক্ষেও হাসি সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়ল।’
সামি খান আরও একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যেখানে বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবকে অভ্যর্থনা উপলক্ষে সড়কে সব ধরনের যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেখানো হয়েছিল প্রেসিডেন্ট কত জনপ্রিয়। সেদিন আইয়ুবের এডিসি সামি খান তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েও ঠিক সময় পৌঁছাতে পারেননি। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মোনায়েম খান বলেন, ভবিষ্যতে তাঁকে যেন আগেভাগে জানানো হয়। তাহলে গভর্নর তাঁর সহায়তায় আরও বেশি নিরাপত্তা বাহন দিতে পারবেন। এ কথা শুনে সামি হাসছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বলছিলেন; আর গভর্নর ভাবছেন প্রটোকলের কথা!
ভাবা যায়, এই চরিত্রের একজন মানুষ ছিলেন পূর্ববঙ্গের গভর্নর, তাও স্বল্প সময়ের জন্য নয়, দীর্ঘ ছয় বছর। এই মোনায়েম খানই নাকি বলেছিলেন, তিনি গভর্নর থাকতে শেখ মুজিব জেলখানা থেকে মুক্তি পাবেন না। আইয়ুব খান অস্ত্রের ভাষায় ছয় দফার জবাব দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো উনসত্তরে শেখ মুজিব জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার কয়েক দিনের মাথায় মোনায়েম ও তাঁর নিয়োগকর্তা দৃশ্যপট থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। আইয়ুব প্রথমে মোনায়েম খানকে সরিয়ে ড. এম এন হুদাকে গভর্নর করেন। পরে তাঁকেও ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
আর শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাংলাদেশের ভাগ্যনিয়ন্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হন।

ইয়াহিয়া খান ছিলেন আরশাদ সামি খানের বস। এ কারণে তিনি তাঁর অনেক ‘দুষ্কর্ম’ গোপন করেছেন। সামি খান তাঁর বইয়ে ইয়াহিয়াকে একজন প্রেমিক ও রসিক পুরুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু যাঁরা পাকিস্তানের অন্দরমহলের খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন ইয়াহিয়া খান কী চরিত্রের মানুষ ছিলেন। তিনি প্রেমিক ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর প্রেমিকার সংখ্যা ছিল অগুনতি। পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাদের অনেকের লেখায় এসব উঠে এসেছে। পাকিস্তান পুলিশের সাবেক আইজি সরদার মুহাম্মদ চৌধুরী দ্য আলটিমেট ক্রাইম-এ লিখেছেন, ‘স্বয়ং প্রেসিডেন্টের ছিল মদ ও নারীভোগের নেশা। আর তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্নেল ছিলেন সমকামী...। বারবনিতা আর বেশ্যার দালালদের প্রেসিডেন্ট হাউসে যাতায়াত ছিল অঢেল ও অবাধ। তাঁদের কজন আবার বেশ হাই স্ট্যাটাস ভোগ করতেন। আকলিম আখতার, মিসেস কে এন হোসেইন ও লায়লা মুজাফফরের মর্যাদা ছিল সর্বোচ্চ। মোহময়ী রমণীদের পাল ঘুরে বেড়াত ভবনের সর্বত্র। তাঁরা ধূমপান করতেন, মদ পান করতেন, নেচে-গেয়ে হেলেদুলে হই-হুল্লোড় করতেন।’ ১৯৭১-এ ঢাকায় মার্কিন মিশনের প্রধান আর্চার কে ব্লাড, যিনি নিক্সন-কিসিঞ্জার চক্রের চোখ রাঙানি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন, দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ বইয়ে লিখেছেন, ‘১৯৪৪ সালে ইয়াহিয়া ছুটিতে বাড়িতে এসে বিয়ে করেন এক আর্মি অফিসারের মেয়েকে। তাঁদের এক ছেলে এক মেয়ে। দিনে দিনে ইয়াহিয়া বিখ্যাত হয়ে ওঠেন এক নারীবাজ হিসেবে। তিনি তাঁর এই কীর্তি গোপন করার চেষ্টা করতেন না। নাইট ক্লাবে তাঁর রক্ষিতাকে বগলদাবা করে প্রকাশ্যে আবির্ভূত হতেন। আমাকে কয়েকজন অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিবাহিত মহিলার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলা হয়েছিল, এরা সবাই ইয়াহিয়ার রক্ষিতা।’
কথাশিল্পী আনিসুল হক ইয়াহিয়ার প্রেম ও লাম্পট্য নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন জেনারেল ও নারীরা। বইয়ের এক জায়গায় আছে, ‘রানি ইয়াহিয়াকে কোট পরালেন। তাঁর টাইয়ের নট বেঁধে দিলেন। তাঁর মনে পড়ে গেল তাঁর ফেলে আসা স্বামীর কথা। একদিন তিনি এভাবে স্বামীর টাইয়ের নটও বেঁধে দিতেন। তাঁরও দুই বাহু পাখির ডানার মতো উড়িয়ে দিয়ে তাঁকে পরিয়ে দিতেন কোট। আগাজি তাঁকে চুম্বন করলেন কপালে।’ (প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬) আরশাদ সামি খান নারী ও গানপ্রেমিক ইয়াহিয়া খানের দুটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। একটি ঢাকায় তাঁর রোমাঞ্চকর নৈশবিহার এবং অপরটি সংগীতসম্রাজ্ঞী নূরজাহানের গানের রেকর্ড নিয়ে। সামি লিখেছেন, ‘আমরা তখন ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে ছিলাম। একদিন বিকেলে ইয়াহিয়া তাঁর অফিসের কাজ সেরে আমাকে ডাকলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন এই সন্ধ্যায় আমার কোনো পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি আছে কি না।’
আমি বললাম, ‘না স্যার’
এরপরের কথপোকথন এ রকম:
‘তুমি একটি পার্টিতে আমন্ত্রিত!’
‘তাই, স্যার, কে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন’ আমি মৃদু হাসলাম।
‘মি. খন্দকার’
‘কিন্তু আমি তো তাঁর কাছ থেকে কোনো আমন্ত্রণ পাইনি।’
‘তুমি আমন্ত্রণ পাওনি এ কারণে যে এখনই আমন্ত্রণ জানানো হলো। তিনি আজ রাত নয়টায় তোমাকে নৈশভোজ ও নাচের আসরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তাঁদের বাড়িতে নাচের জন্য সুন্দর কাঠের মেঝে আছে এবং তুমি সেখানে নাচবে।’
‘কিন্তু আমি তাঁকে ভালোভাবে চিনি না এবং তাঁর ঠিকানাও জানা নেই, স্যার।’
‘তাতে কিছু আসে যায় না। আমি তোমার পক্ষ হয়ে তাঁর আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেছি এবং তোমার সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ঢাকায় তুমি কী গাড়ি ব্যবহার করো?’
‘আমি প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে পাওয়া একটি মাসির্ডিজ ব্যবহার করি।’
আচ্ছা, আজ রাতে ব্যতিক্রম হবে। তুমি তোমার গাড়িটা নিয়ে বের হয়ে তোমার কক্ষের সামনে থাকবে, যেখান থেকে প্রেসিডেন্ট ভবনের পেছনে যাওয়া যায়। চালকের কাছ থেকে গাড়ির চাবিটি নিয়ে নাও এবং আজ রাতে চালককে ছুটি দাও। এবং সুন্দর কালো লাউঞ্জ স্যুট পরবে। তোমাকে অফিস থেকে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হয়েছে?
‘হ্যাঁ স্যার, অফিস থেকে আমাকে ৩৮ স্পেশাল মডেলের পাঁচ গুলির একটি রিভলবার দেওয়া হয়েছে, যেটি এফবিআই ব্যবহার করে।’
‘আমি আশা করি তোমার কাছে মারাত্মক অস্ত্রই আছে। এটি তোমার ভেতরের পকেটে কৌশলে সতর্কতার সঙ্গে রাখবে। এরপর সামি লিখেছেন, তাঁর এসব কথাবার্তায় আমন্ত্রণটি রহস্যজনক মনে হলো। জিজ্ঞেস করলাম, ‘সতর্কতা কেন স্যার? আমি তো নাচের আসরে যাচ্ছি, মল্লযুদ্ধে নয়। তিনি হাসলেন এবং বললেন, ঠিক আছে। ঠিক ৯টার সময় তৈরি থাকবে এবং ৯টা ৫ মিনিটে বারান্দার সব বাতি বন্ধ করে দেবে এবং তোমার গাড়ির ছাদের বাতিও। পেছনের আসনে রাখার জন্য বিছানার চাদর নেবে। তুমি গাইডকে বিছানার চাদর দিয়ে ঢেকে দেবে। মনে রাখবে, গেটে নিরাপত্তারক্ষীদের কেউ যাতে দেখতে না পায় তুমি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে পাচার করে নিয়ে যাচ্ছ। তাহলে আমি চিৎকার দিতে থাকব যে তুমি আমাকে অপহরণ করছ।’ তিনি হাসলেন এবং বললেন, ‘এখন যাও, এবং সবকিছু প্রস্তুত করো। এবং কোনো কিছু যাতে ফাঁস না হয়।’ এরপর সামি খান যোগ করেন, ‘পরিকল্পনামতো পার্টির উদ্দেশে আমরা রওনা দিলাম। নিরাপত্তা ফটক পেরিয়ে এসে ইয়াহিয়া গাড়িতে বসলেন এবং গাড়ি আমাকে থামাতে বললেন। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সামনের যাত্রী আসনে বসলেন। তিনি চাইছিলেন যে আমি নিজেকে চালক না ভাবি।’ গাড়ি চলা শুরু করলে ইয়াহিয়া বললেন, আমাদের কোথাও থামতে হবে। আমন্ত্রণকারীর জন্য কিছু ফুল নিতে হবে। আমি নিরাপত্তাকর্মী ও প্রটোকল ছাড়া কোথাও যাইনি।
কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি হিসেবে ঢাকায় থাকার সুবাদে তিনি শহরের সবকিছু চেনেন। এবং চাদরে মুখের অর্ধেক ঢেকে ফুল কিনলেন; যাতে
তাঁকে ফুলবিক্রেতা বা পথচারীরা না চিনতে পারেন। বন্ধুর বাসভবনে পৌঁছে তিনি ডোর বেল বাজালেন। আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ানো। প্রেসিডেন্টকে দেখে বিস্মিত খন্দকার। ভাবলেশহীন। তিনি ভাবেননি কোনো স্কোয়াড, নিরাপত্তার গাড়ি ও মানুষ ছাড়া চুপচাপ সেখানে যেতে পারেন। গৃহকর্তাকে সম্বোধন করে ইয়াহিয়া বললেন, ‘কানু, তুমি আমাদের ভেতরে যেতে বলবে না! এ আমার এডিসি স্কোয়াড্রন লিডার আরশাদ সামি খান।’ খন্দকারের দিন তখন ভালোই যাচ্ছিল। তিনি খুবই আধুনিক ও সুন্দরভাবে সজ্জিত বাড়িতে থাকেন এবং পার্টির আয়োজনও ছিল জৌলুশপূর্ণ। আর সেখানে অনেক অভ্যাগত ছিলেন, যাঁদের অনেককে আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখেছি। তাঁরা সবাই প্রেসিডেন্টকে ঘিরে দাঁড়ালেন। এবং প্রেসিডেন্টও তাঁদের অভিনন্দিত করলেন। সামি খান সেদিনের আয়োজনের বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ‘ভারী, স্থূল শরীর সত্ত্বেও ইয়াহিয়া ছিলেন খুবই চৌকস নাচুনে। সেখানে উপস্থিত প্রায় সব নারীর সঙ্গেই তিনি নাচলেন। তবে তিনি যেকোনো ভদ্রলোকের মতোই দূরত্ব বজায় রাখলেন এবং মার্জিত রুচির পরিচয় দিলেন।
যেহেতু এটি সপ্তাহ শেষের আয়োজন ছিল, সেহেতু অনেক রাত কার্যত প্রায় ভোর পর্যন্ত চলছিল।’ সামির ভাষায়, ‘খোদাকে ধন্যবাদ যে তিনি প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। কেউ তাঁর অনুপস্থিতি টের পায়নি। ওই রাতে তিনি কোনো মদ পান করেননি এবং তিনি গাড়ির পেছনের আসনে বসে আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন। এবং রুমে গিয়েছিলেন স্বাভাবিকভাবেই।’ অনেক বছর পর আবুধাবিতে এক বাঙালি নারী সেই রাতের গল্প বলেছিলেন রসিয়ে রসিয়ে। তিনি সামিকে চিনতেন না এবং অবলীলায় বলে যাচ্ছিলেন, প্রেসিডেন্ট নাকি ঢাকায় এক মেয়েবন্ধুর সঙ্গে রাত কাটিয়েছেন, যাঁর স্বামীর নাম কানু এবং তাঁর স্বামী ওই দিন শহরের বাইরে ছিলেন। দ্বিতীয় ঘটনাটি করাচির। একবার সেখানে এক গানের অনুষ্ঠানে ইয়াহিয়া খান তাঁর বন্ধুদের দেখিয়ে সপ্রতিভ কণ্ঠে সামি খানকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পুত্র, এরা আমাকে সংগীতম্রাজ্ঞী নূরজাহানের সামপ্রতিক পাঞ্জাবি গানের একটি রেকর্ড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমি এটি সংগ্রহ করব।’ সমাবেশ থেকে এক বন্ধুকে ডেকে তিনি ওই গানের কলি আওড়ালেন ‘মেরি চিচি দ্য চালা মাহি লা লেয়া, কেরে যা কেহ সিকেত লাউঙ্গি’। এরপর ইয়াহিয়া বললেন, ‘পুত্র, আমি জানি দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু আমি বন্ধুদের বলেছি আমার এডিসি এটি আমার জন্য এনে দিতে পারবে। তুমি কি মনে করো,
পারবে?’ তাঁর শিশুসুলভ অনুরোধে আমি হাসলাম এবং বললাম, চেষ্টা করে দেখি, ‘স্যার’। এরপর সামি খান রেকর্ডের খোঁজে বের হলেন। তিনি জানেন, অনেক আগেই করাচির দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করে সামি একজন এক অডিও ক্যাসেটের দোকানের মালিককে খুঁজে বের করলেন। এরপর তাঁকে ব্যাকুলকণ্ঠে জানানো হলো, জরুরি ভিত্তিতে তাঁর নূরজাহানের সর্বশেষ রেকর্ডটি প্রয়োজন। এ জন্য বাঙতি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে ওই মালিক দোকান খুলে রেকর্ড বের করে দিলেন। সামি দোকানদারকে যখন বাড়ি পৌঁছে দিয়ে প্রেসিডেন্টের বসার ঘরে ঢুকলেন তখন তাঁর কিশোরসুলভ মনটি ‘হুররে’ বলে উল্লাস করছিল।’ সামি লিখেছেন, ঘটনাটিতে রংচং লাগিয়ে এই প্রচার চালানো হলো যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মদ্যপ অবস্থায় নূরজাহানকে তাঁর সর্বশেষ রেকর্ডের গানটি গাওয়ানোর জন্য প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমানে করে করাচি নিয়ে আসতে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। এরপর তিনি সারা রাত ইয়াহিয়ার সঙ্গে ছিলেন। বিষয়টি সম্পর্কে এক বন্ধু জানতে চাইলে তাঁকে বললাম, ‘কী নির্বোধ!’ কী বাজে কথা চাউর হয়ে গেছে! মদ্যপ ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে নূরজাহান রাত কাটিয়েছেন!

একাত্তরে পাকিস্তানের তিন প্রধান চরিত্র শেখ মুজিব, ইয়াহিয়া ও ভুট্টো তিনজনই ছিলেন পরস্পরের প্রতি সন্দিহান। মুজিব নির্বাচনে জিতেও ভরসা রাখতে পারছিলেন না যে, ইয়াহিয়া তাঁর হাতে ক্ষমতা দেবেন। ভুট্টোর ভয় মুজিব-ইয়াহিয়া সমঝোতা হলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে যাবেন। আর ইয়াহিয়া দুই প্রধান নেতার বিবাদ জিইয়ে রেখে নিজের ক্ষমতা স্থায়ী করতে চান।
আরশাদ সামি খানের ভাষ্যমতে, ৭ই ডিসেম্বর সকালে ইয়াহিয়া খান রাওয়ালপিন্ডির কনভেন্ট স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে যান। যাওয়ার সময় তিনি ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বললেন, সামি, এজাজ, মনে রাখবে আমাদের সাইকেল মার্কায় ভোট দিতে হবে। সাইকেল ছিল মুসলিম লীগের প্রতীক।
সামির মনে হয়েছে, নিরাপত্তার দেয়ালে বন্দী থাকায় প্রেসিডেন্ট সাধারণ মানুষের মনোভাব আঁচ করতে পারেননি। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা সেলের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল উমর তাঁকে ভুল রিপোর্ট দিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তাঁর পক্ষে অনুমান করা কঠিন ছিল।
পরদিন রাত তিনটায় ইয়াহিয়া জেনারেল উমরকে টেলিফোনে ধরতে বললেন। সামি জানাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ও উমর যখন কথা বলছিলেন, তখন ইন্টারকমে তিনি তা শুনেছেন। দুজনের কথোপকথন ছিল এ রকম:
‘উমর এসব কী ঘটছে? তোমাদের হিসাবনিকাশ কোথায় গেল? কাইয়ুম খান, সবুর খানকে যে টাকাপয়সা দিলে তাতে কী লাভ হলো? হায় খোদা! তুমি (উমর) সবকিছু গড়বড় করে দিয়েছ। উমর তুমি কি টেলিফোনে নেই? তুমি কি বাক্রুদ্ধ হয়ে গেছ। কথা বলো।’
‘হ্যাঁ স্যার, আমি শুনতে পাচ্ছি।’
‘শোনা বন্ধ করো, উত্তর দাও। আমি উত্তর চাই। তুমি যে পরিস্থিতি তৈরি করেছ তা কীভাবে সামাল দেবে?’
‘হ্যাঁ স্যার, আমি কী বলব স্যার? একটি পথ বের হবেই।’
‘এখন আমার কথা ভালো করে শোনো। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন এক সপ্তাহ পর। সেই নির্বাচন সুষ্ঠু হোক আর না হোক, আমি চাই ফলাফল উল্টে যাক। প্রাদেশিক পরিষদের ফল ভিন্ন হতে হবে। আমি নিশ্চিত, আজকের নির্বাচনে যারা শোচনীয়ভাবে হেরেছে তারা আমাদের সঙ্গে থাকবে। কাল আমার সঙ্গে দেখা কোরো এবং সজাগ থাকো। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পেরেছ।’
‘হ্যাঁ, স্যার, হ্যাঁ স্যার। আপনার সুবিধামতো কাল দেখা করব।’
এরপর সামি খান লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়া ও উমরের কথোপকথনের পর আমার কাছে গেম প্ল্যান পরিষ্কার হলো। জাতীয় নিরাপত্তা সেল ধারণা দিয়েছিল যে নির্বাচনে কোনো দলই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না এবং একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা  তৈরি হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়ী হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ৯৯ শতাংশ আসন পেলে পশ্চিম পাকিস্তানে এবং পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের ৭২ শতাংশ আসন পেলেও পূর্ব পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি।
এরপর ইয়াহিয়া খান ঢাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
করেন এবং বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে বারবার বলতে থাকেন, ‘হবু প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিনন্দন জানাতে এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আমি এসেছি।’
এখানে অবশ্য লেখক সামি খানও পাকিস্তানি মানসিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। ইয়াহিয়ার সফরসঙ্গী দুই বাঙালি কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার বাচ্চু করিম ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহমুদকে সন্দেহ করেন। তাঁর ধারণা, প্রেসিডেন্ট তাঁর পারিষদবর্গের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যেসব আলোচনা করতেন, তা এই দুই কর্মকর্তা শেখ মুজিবের কাছে ফাঁস করে দিতেন। 
সফরসঙ্গীদের সঙ্গে ইয়াহিয়া খান যেসব বিষয়ে আলোচনা করতেন তার মধ্যে ইয়াহিয়া খানকে কার্যকর প্রেসিডেন্ট হিসেবে হবু প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির কথাও ছিল। প্রেসিডেন্ট তখন ১৯৬০ সালে রানি এলিজাবেথের আগমন উপলক্ষে নির্মিত ভবনে অবস্থান করছিলেন। ড. কামাল হোসেন, তাজউদ্দীন আহমদ ও খোন্দকার মোশতাককে সঙ্গে নিয়ে শেখ মুজিব সেখানে ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি তাঁর দিকে এগিয়ে করমর্দন করেন এবং উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নির্বাচনে নজিরবিহীন সাফল্যের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানান।
 অভিনন্দনের জবাবে শেখ মুজিবও নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসায় ইয়াহিয়াকে ধন্যবাদ জানান। আলোচনায় প্রেসিডেন্ট স্মরণ করিয়ে দেন যে, হাজার মাইল দূরের দুই ভূখণ্ডকে একসঙ্গে রাখতে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইয়াহিয়া তিনটি বিকল্পের কথা বলেন। প্রথমত, আওয়ামী লীগ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে; কিন্তু তাতে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব থাকবে না। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম পাকিস্তানের বিজয়ী দল পিপলস পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন করতে পারে। অথবা পিপলস পার্টির বাইরের দলগুলোকে নিয়েও সরকার গঠন করতে পারে।
ইয়াহিয়া যে বিষয়টির ওপর জোর দিলেন তা হলো ক্ষমতার সব পক্ষকে যুক্ত করতে না পারলে কিংবা তাদের সহযোগিতা না পেলে কোনো রাজনৈতিক দলই কার্যকর সরকার পরিচালনা করতে পারবে না। তিনি বললেন, ‘জনাব, আমি ব্যারাকে ফিরে যেতে চাই এবং বেসামরিক সরকার দেশ চালাক এটাই চাই।’
শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগীরা প্রেসিডেন্টের কথা ধীরস্থিরভাবে শুনছিলেন। তিনি ইয়াহিয়া খানকে ভারতের মতো প্রতীকী প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে বললেন। ইয়াহিয়া হাসলেন এবং বললেন, ‘শেখ সাহেব, আমি আশা করি আপনার বিপুল বিজয় আপনার ভিশনকে (ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা) ভণ্ডুল করে দেবে না। আপনি একজন সামরিক লোককে রাষ্ট্রপ্রধান করতে চান, যিনি হবেন দন্তবিহীন সিংহ!’
ইয়াহিয়া যে কার্যকর প্রেসিডেন্টের কথা বলেছেন, শেখ মুজিব তার মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করলেন এবং জানতে চাইলেন, ‘স্যার, আপনি সংসদীয় ব্যবস্থার স্থলে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারের পরামর্শ দিচ্ছেন?’
ইয়াহিয়ার জবাব, ‘মিশ্রিত।’ দুই পক্ষ যাতে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে পারে।
স্বাভাবিকভাবেই শেখ মুজিবের পক্ষে এই প্রস্তাব মানা সম্ভব ছিল না। ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা জি ডব্লিউ চৌধুরী লিখেছেন, শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকের পর ক্ষুব্ধ ইয়াহিয়া তাঁকে জানান, ‘মুজিব আমাকে হেয় করেছেন। আমি তাঁকে বিশ্বাস করে ভুল করেছি।’
ওই বৈঠকে শেখ মুজিব ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার অনুরোধ জানালে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ বাস্তবসম্মত নয়। শেষ সপ্তাহে হতে পারে। কিন্তু সেই অধিবেশন আর কখনোই বসেনি, পাকিস্তানও এক থাকেনি।

ইয়াহিয়া খান ঢাকায় নেমে বিজয়ী দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেটি তাঁর মনের কথা ছিল কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। তিনি যদি নির্বাচনী ফল সানন্দে গ্রহণই করবেন, তাহলে গোয়েন্দাপ্রধানের ওপর খেপে যাবেন কেন? কেনইবা পিপিপি নেতা ভুট্টোর সঙ্গে লারকানা ষড়যন্ত্রে মিলিত হবেন?
করাচির পথে ঢাকা ত্যাগের আগে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালামকে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন, যাতে তিনি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন। ইয়াহিয়ার দাবি, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাস্তবতার ভিত্তিতে সমস্যাগুলো সমাধান করতেই তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা করতে ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের নেতাকে মীমাংসায় পৌঁছাতে দেয়নি।
আরশাদ সামি লিখেছেন, ‘আমরা করাচি পৌঁছানোর পরই জেনারেল পীরজাদা চাইছিলেন প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করুন। পীরজাদা আমাকে দুবার ডেকে জানতে চান এ ব্যাপারে ভুট্টোর পক্ষ থেকে কোনো অনুরোধ এসেছে কি না কিংবা প্রেসিডেন্ট নিজে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন কি না। একদিন সকালে ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি নিজেই আমাকে বললেন, প্রেসিডেন্ট ভবনে ভুট্টোর সম্মানে একটি ছোট নৈশভোজের আয়োজন করা হবে।’
আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া-ভুট্টোর মধ্যে যে আঁতাত গড়ে উঠেছিল, সেটি আবার পুনর্জীবিত হলো এবং এই আঁতাতই পাকিস্তান ও ইয়াহিয়াকে বিপর্যয়ের দিক ঠেলে দিল। এই ব্যক্তিগত নৈশভোজে ভুট্টো জুনগড়ের নবাব মোহাম্মদ দিলওয়ার খানজি ও বেগম জুনাগড়কে নিয়ে এসেছিলেন। সেই নৈশভোজে ইয়াহিয়া ও বেগম জুনাগড়ের সখ্য সম্পর্কে সামি লিখেছেন, ‘আকর্ষণীয় বেগম জুনাগড়ের অঙ্গভঙ্গির ওপর ইয়াহিয়ার প্রলুব্ধ চাহনি নিবদ্ধ ছিল। প্রত্যুত্তরে বেগম জুনাগড় এমনভাবে তাকালেন, যাতে অনুমোদনের চেয়ে বেশি কিছু ছিল।’ পরের সপ্তাহে ইয়াহিয়া ভুট্টোর লারকানার বাড়িতে গেলে সেখানেও জুনাগড় দম্পতি যোগ দেন।
লারকানায় ভুট্টো ইয়াহিয়ার কাছে জানতে চান, মুজিব ও আওয়ামী লীগ চরমপন্থা নিলে তাঁর কাছে কী বিকল্প থাকবে? ইয়াহিয়া জবাব দিলেন, ‘মাত্র দুটি। এক. জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা, যাতে রাজনীতিকেরাই তাঁদের অরাজকতা দূর করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান ভাঙার দায়ে মুজিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’
এরপর ইয়াহিয়া পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করবে?’ ভুট্টোর জবাব ছিল, ‘কখনো না, কখনো না।’ তিনি আরও যোগ করলেন, ‘পাকিস্তান ভাঙার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নীলনকশা আছে। কিন্তু আমি পাকিস্তান ভাঙার দায় নিতে পারি না।’
লারকানা বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং জেনারেলদের মধ্যে তাঁর নিজস্ব চক্রটি ইতিমধ্যে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
দলের ভেতরের লোকদের মতে, আওয়ামী লীগ ও মুজিব সরকার গঠন করলে ভুট্টো ও পিপিপি সংসদীয় ভূমিকা রাখতে এবং বিরোধী দলের আসনে বসতে ইচ্ছুক নয়। দুই দলই পৃথকভাবে সরকার গঠনে আগ্রহী। এ প্রসঙ্গে ভুট্টো বলেছিলেন, ‘এ ধার হাম ও ধার তোম।’ তুমি পূর্বাংশ নিয়ে থাকো, আর আমি পশ্চিমাংশ। প্রস্তাবটি আওয়ামী লীগের জন্য খানিকটা রাজনৈতিক সুযোগ এনে দেয়। অন্যদিকে ইয়াহিয়া চক্রের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও চলতে থাকে।
সামি খানের ভাষ্য, ‘আমরা প্রায়ই পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শক্তি যাচাই করতে সদর দপ্তরে যেতাম এবং আওয়ামী লীগেই চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে বাড়তি কী প্রয়োজন, তা খতিয়ে দেখতাম। এটি জানা কথা যে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক দিক দিয়ে ছিল খুবই ভঙ্গুর।’ এর পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর দুই অংশে সমান ভাগ করলে ভারতের শক্তিশালী বাহিনীর কাছে তা অধিকতর দুর্বল হতো যেকোনো অংশের জন্য। ভারতীয় বাহিনী সহজেই পশ্চিম পাকিস্তানকে ধ্বংস করে দিতে পারত।’
অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা পশ্চিম পাকিস্তানের শক্তির ওপরই নিভর্রশীল করে রেখেছিল। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে নাকি এই কৌশল কাজে লেগেছিল। কিন্তু সামরিক দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে দুর্বল রাখার কারণে যে বাঙালিদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল, সেটি সামি খানসহ পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তারা আমলেই আনেননি। আওয়ামী লীগের ছয় দফা জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল পঁয়ষট্টির যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের অরক্ষিত থাকা।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে শেখ মুজিব সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ছয় দফা অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত।’ জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানেও তিনি ঘোষণা করেন, ছয় দফা এখন জনগণের সম্পত্তি। এটি পরিবর্তনের ক্ষমতা কারও নেই। সামি স্বীকার করেছেন, ‘এটাই গণতান্ত্রিক রীতি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তিনি সেই দাবি করতেই পারেন।’ কিন্তু পাকিস্তানি শাসকেরা গণতান্ত্রিক রীতির তোয়াক্কা করতেন না।
মুজিবের সঙ্গে টেলিফোনে কথা শেষ হতেই ইয়াহিয়ার পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডমিরাল গভর্নর আহসানকে সংযোগ লাগিয়ে দিতে বলেন। প্রেসিডেন্ট তাঁকে বললেন, ‘মুজিবের কণ্ঠ খুবই অবাধ্যতার সুর।’ এরপর তিনি ইয়াকুব আলী খানের সঙ্গে কথা বলেন। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠকেই সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। ২৫শে মার্চ সামরিক অভিযানের পর ইয়াহিয়া খান বেতার টিভিতে দেওয়া ভাষণে শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর হবু প্রধানমন্ত্রী হলেন ট্রেইটর। তবে তাঁর শেষ রক্ষা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের পর তিনি নিজেও ক্ষমতাচ্যুত হন। ইয়াহিয়া যেভাবে আইয়ুবকে হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, ভুট্টোও একইভাবে তাঁকে মসনদ থেকে বিতাড়িত করেন।
আইয়ুবের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সামি খান দুই পীরের যে ঘটনা বিবৃত করেছেন, সেটাই এখানে তুলে ধরছি।
‘প্রেসিডেন্টের এডিসি হিসেবে যোগদানের (১ এপ্রিল ১৯৬৬) পরপরই যখন আমি কাজ শিখছি মাত্র, একদিন সকালে প্রবেশফটক থেকে টেলিফোনে জানানো হলো, দেউল শরিফের পীর সাহেব এসেছেন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর সঙ্গে শ-খানেক অনুসারী আছেন। নিরাপত্তাকর্মী জিজ্ঞেস করলেন, নির্ধারিত সময়সূচির দুই ঘণ্টা আগে তিনি এসেছেন, তাঁকে আসতে দেওয়া হবে কি না। আমি আমার সহকর্মী লে. খালিদ মিরের পরামর্শ চাইছিলাম। তিনি হাসলেন এবং জানালেন, প্রেসিডেন্ট সত্যিকারভাবে কোনো পীরে বিশ্বাস করেন না। অন্য রাজনীতিকদের ব্যাপারে তাঁর যতটা আগ্রহ, তাঁদের প্রতি তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। আমার উচিত তাঁকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া। তবে তিনি আমাকে সজাগ করে দিয়ে বললেন, নির্ধারিত সময়ের আগে যেন পীর সাহেব সরাসরি প্রেসিডেন্ট অফিসে যেতে না পারেন। তিনি আরও যোগ করলেন, ‘তুমি দেখতে পাচ্ছ সামি, পীর সাহেব শ-খানেক বা দুই শ লোক নিয়ে আসেন এবং প্রেসিডেন্ট মধ্যাহ্নভোজের জন্য অফিস ত্যাগ করার পর জায়গা ছেড়ে যান, এটাই তাঁদের বৈশিষ্ট্য।’
‘এর মাধ্যমে তাঁরা অনুসারীদের বোঝাতে চান যে প্রেসিডেন্ট নিজেও পীর সাহেবের অনুগত এবং তিনি প্রাতঃরাশে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান এবং দুপুরের খাবারও তাঁর সঙ্গে খান। প্রেসিডেন্ট আরও বেশি সময় তাঁকে সেখানে রাখতে চেয়েছিলেন; কিন্তু বাইরে অপেক্ষমাণ শিষ্যদের কারণেই তিনি চলে এসেছেন।
‘নির্দেশনামতে, আমি শুধু পীর সাহেবকে ভেতরে আসার অনুমতি দিতে বলি, তাঁর সঙ্গীদের নয়। কয়েক মিনিট পর আবারও ফটক থেকে জানানো হলো, মানকি শরিফের পীর সাহেব এসেছেন। তাঁকেও প্রেসিডেন্ট সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছেন। আগের মতোই তাঁকে আসার অনুমতি দিলাম।
‘সাড়ে আটটায় দুই পীর প্রেসিডেন্টের অতিথিকক্ষে এলেন। তাঁদের একজনের নির্ধারিত সময় ১০টা, আরেকজনের সাড়ে ১০টা। দ্বিতীয় পীর আসার আধা ঘণ্টা পর আমার অফিসের বাইরে শোরগোল শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি দ্রুত বেরিয়ে এলাম এবং দেখতে পেলাম যে অতিথিকক্ষে দুই পীর মল্লযুদ্ধে রত। আমি তাঁদের দুজনকে বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করলাম। তাঁরা এক হাতে একে অন্যের দাড়ি ধরে আছেন, আরেক হাতে জামার কলার। তাঁদের পদযুগলও অলস বসে ছিল না। পা দিয়ে তাঁরা ক্যাঙারুর মতো একে অন্যকে লাথি মারছেন। আমি যখন তাঁদের নিবৃত্ত করতে পারছিলাম না, তখন নিরাপত্তাকর্মীদের ডাকলাম। তাঁরা কার্যত বন্দুকের মুখে তাঁদের বিচ্ছিন্ন করলেন। এরপর আমি বিষয়টি প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মোহাম্মদ রাফিকে জানালাম। তিনি তাঁদের থামালেন এবং কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীকে এনে নির্দেশনা দিলেন যে তাঁরা যদি একে অন্যকে মারতে যান, তাহলে তাঁদের গ্রেপ্তার করে স্থানীয় থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। প্রেসিডেন্ট অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষ করলে সামরিক সচিব আমাকে নিয়ে তাঁর কাছে বিষয়টি জানালেন।
উত্তেজনা শেষ হলে দেউল শরিফের পীরকে আনার জন্য প্রেসিডেন্ট আমাকে হুকুম দিলেন। যদিও তখনো তাঁরা শান্ত হননি। এর ১০ মিনিট পর মানকি পীরকে আনা হলো। আমি যখন দ্বিতীয় পীরকে নিয়ে এলাম, প্রথম পীর গজগজ করতে লাগলেন। প্রেসিডেন্ট তাঁকে থামিয়ে দিলেন এবং তাঁদের দুজনকে পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলাতে এবং ক্ষমা চাইতে বললেন। দুজনই অস্বীকৃতি জানালেন। এরপর প্রেসিডেন্ট আমাকে উদ্দেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের ডেকে দুজনকে হাতকড়া পরাতে এবং প্রেসিডেন্ট ভবনে গোলযোগ করার জন্য স্থানীয় থানায় গিয়ে মামলা ঠুকতে বললেন। এতে কাজ হলো। প্রেসিডেন্ট কথা শেষ না করতেই দুই পীর উঠে দাঁড়ালেন। একে অন্যের কাছে মাফ চাইলেন। এরপর তাঁরা প্রেসিডেন্টের ডেস্কের সামনে দুটি সোফায় বসলেন। তিনি উভয় পীরকে প্রেসিডেন্ট ভবন ত্যাগ করতে বললেন, যদিও তাঁরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত থাকতে চেয়েছিলেন।
তাঁদের আর কখনো প্রেসিডেন্ট ভবনে দেখা যায়নি।’

একাত্তরের ঘটনাবলি পাকিস্তানের একেক কুশীলব একেকভাবে দেখেছেন।
ব্যাখ্যা করেছেন। সিদ্দিক সালিক ও আরশাদ সামি খান দুজনই ছিলেন পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তা। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সিদ্দিক সালিক ছিলেন ঢাকায় আর সামি খান রাওয়ালপিন্ডিতে। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকের বর্ণনা দিতে গিয়ে সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, ‘জেনারেল নিয়াজি ১৪ই ডিসেম্বর রাও ফরমান আলীকে সঙ্গে নিয়ে মার্কিন কনসাল জেনারেল স্পিভাকের কাছে যান এবং যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করার অনুরোধ জানান। কিন্তু স্পিভাক জানিয়ে দেন যে তিনি তাঁদের পক্ষ নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন না, বার্তাটি পাঠিয়ে দিতে পারেন মাত্র।
জেনারেল নিয়াজি চেয়েছিলেন, প্রস্তাবটি ভারতের সেনাপ্রধান স্যাম মানেকশর কাছে পাঠানো হোক। কিন্তু স্পিভাক পাঠিয়েছেন ওয়াশিংটনে। মার্কিন সরকার ভারতের কাছে পাঠানোর আগে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে পরামর্শ করার চেষ্টা করে, কিন্তু ইয়াহিয়া খানকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সিদ্দিক সালিক জানাচ্ছেন, ইয়াহিয়া ৩রা ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং আর অফিসে আসেননি। তাঁর সামরিক সচিব মানচিত্রের মাধ্যমে তাঁকে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাতেন। একবার সেই মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আমি কী করতে পারি?’
১৬ই ডিসেম্বর লাখ লাখ বাঙালির উপস্থিতিতে তৎকালীন রমনা রেসকোর্স ময়দানে জেনারেল নিয়াজি বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। নিয়াজি প্রথমে যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানালে ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা তাঁর অবস্থানে অনড় থেকে বলেন, ‘এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’ তখন নিয়াজি যৌথবাহিনীর কাছেই আত্মসমর্পণ করেন।
যুদ্ধ আরও কয়েক দিন প্রলম্বিত করতে পারতেন কি না, পরে সিদ্দিক সালিক জিজ্ঞেস করলে নিয়াজি জবাব দেন, ‘তাতে আরও বেশি মানুষের মৃত্যু ও সম্পদ ধ্বংস হতো। নগরজীবন অচল হয়ে যেত। মহামারি ও অন্যান্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু পরিণতি একই হতো। এরপর তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, ‘আমি ৯০ হাজার বিধবা ও ৫০ লাখ এতিমের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে এখন ৯০ হাজার যুদ্ধবন্দী পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাচ্ছি।’
এর আগের একটি ঘটনা। যুদ্ধে পরাজয় এড়ানোর জন্য পাকিস্তান তখন মরিয়া। ইয়াহিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে সহায়তা চেয়ে বার্তা পাঠালেন। পাকিস্তান সময় রাত দুইটায় নিক্সন যখন টেলিফোন করেন, ইয়াহিয়া তখন নিদ্রামগ্ন। তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলে দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে কথোপকথন হয়। নিক্সন পাকিস্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর উদ্বেগের কথা জানান এবং বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর নির্দেশ দেন। দুই নেতার টেলিফোন সংলাপ শেষ হওয়ার পর উদ্দীপ্ত ইয়াহিয়া জেনারেল হামিদকে টেলিফোনে লাগিয়ে দিতে বলেন। ইয়াহিয়ার মতো সামিও তখন উদ্দীপ্ত।
ইয়াহিয়া বললেন, ‘হামিদ, আমরা এটা করেছি। আমেরিকানরা পথে আছে।’ এরপর সামির মন্তব্য, ‘পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও জীবনহানি সত্ত্বেও সেই আমেরিকান নৌবহর আর আসেনি, এমনকি ঢাকা পতনের পরও নয়।’ তাঁর কাছে ঢাকার পতন এবং আত্মসমর্পণ ছিল একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। তিনি বলেছেন, ‘আমি কেঁদেছি এবং আমাদের টিমের আরও অনেকেই কেঁদেছে। পরাজিত ও অবমাননার বোধ তাড়িত করেছিল আমাদের। এসব যখন আমাদের সঙ্গে ঘটছে, আমরা তখন তা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সামি ভেবেছেন, সেটি ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন এবং তা একসময় কেটে যাবে।
কিছুক্ষণ পর তাঁর বোধোদয় হলো, এটি কোনো দুঃস্বপ্ন ছিল না। প্রতিদিনের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ধ্রুব সত্য।
ভুট্টো বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করেছিলেন, সেখানে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সামি খান তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সেটি অবশ্য নিজের জন্য নয়। তিনি যার এডিসি ছিলেন, সেই পদচ্যুত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জন্য। কমিশনের প্রধান তাঁকে বহু নারীর নাম উল্লেখ করে জানতে চান, ‘স্কোয়াড্রন লিডার, আপনি এঁদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন, আপনি কি বলতে পারেন, তাঁরা ভেতরে যাওয়ার পর কী হয়েছে? মনে রাখবেন, আপনি শপথ নিয়েছেন।’
এই প্রশ্নে সামি খান বিরক্ত হলেও মাথা ঠান্ডা করে বললেন, ‘এখানে দুটি বিষয় আছে, প্রটোকল ও নিরাপত্তা। এডিসি হিসেবে যাঁরা সাক্ষাতের সময় ঠিক না করে আসেন, তাঁদের বিষয়টি দেখা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আপনি স্মরণ করে দেখতে পারেন, অনুমতি নিয়ে অনেকবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু ভেতরে প্রেসিডেন্ট ও আপনার মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে, সেটি আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। প্রেসিডেন্ট ও আপনি যেসব নারীর কথা বললেন, তাঁদের মধ্যে কী হয়েছে, তাও আমার জানার কথা নয়।’
দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, জেনারেল ইয়াহিয়া সব সময় মদ খেতেন। আপনি কী বলতে পারেন দিনে কী পরিমাণ মদ তিনি খেতেন?
সামি উত্তর দিলেন, ‘স্যার, আপনি ভুল লোককে প্রশ্ন করেছেন। আমি তাঁর মদ পরিবেশনকারী ছিলাম না। আপনি যদি এই প্রশ্নের উত্তর চান তাহলে বার বয় বা হাউস কম্পট্রোলারের কাছে জিজ্ঞেস করুন।’
নিয়াজির বার্তা পেয়ে ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং ঢাকার পরাজয়কে দুঃখজনক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন,
এই বিপর্যয় সাময়িক এবং পশ্চিম ফ্রন্টে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। কিন্তু প্রেসিডেন্টের ভাষণের মূল রূপরেখা অনেক দিন আগেই তৈরি করে রাখা হয়েছিল।
এরপর ইয়াহিয়া জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে এই বার্তা পাঠান যে, পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে এবং ভারতকেও এটি মানতে হবে। তিনি এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়েরও সহযোগিতা চান।
তখনো পশ্চিম পাকিস্তানের ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড এবং ৯০ হাজার যুদ্ধবন্দীর বিষয়টি জনগণকে জানানো হয়নি। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে জয়ী না হয়েও যেভাবে জনগণকে বোঝানো গিয়েছিল, এবার আর সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এর অর্থ হলো, জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তাঁর সহযোগীদের বিদায়। জেনারেলদের সঙ্গে ইয়াহিয়ার বৈঠকের মাঝখানেই জানা গেল সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইয়াহিয়া তাঁর এডিসি সামি খানকে লক্ষ করে বললেন, ‘শোনো, ব্রিগেড বিদ্রোহ করেছে, এ খবর সত্য হোক বা না হোক, খেলা শেষ।
২০ ডিসেম্বর জুলফিকার আলী ভুট্টো দেশে ফিরে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে শপথ নেন।
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭

জেলখানায় বন্দী মায়ের শিশুদের দিন কাটে কিভাবে?

বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে মোট বন্দীর সংখ্যা প্রায় আটাত্তর হাজার। যদিও ধারণ সংখ্যা মাত্র সাড়ে ছত্রিশ হাজার।
এর মধ্যে একটি বড় অংশই নারী বন্দী অর্থাৎ মোট বন্দীর ৩.৪ শতাংশ। এই নারী কয়েদীদের অনেকের সাথেই তাদের শিশু সন্তানরাও থাকছে কারাগারের উঁচু ফটকের ভেতরে।
বন্দী মায়েদের সাথে তারাও অনেকটা বন্দী দশায় থাকলেও, তাদের মানসিক বিকাশ কিংবা বিনোদনের কি ব্যবস্থা আছে কারাগারে?
কারাগারে শিশুর নামকরণ
মায়ের কোলে চার মাসের শিশু আরোহী। তার মা যখন নয়মাসের গর্ভবতী তখন সন্দেহজনক চুরির মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আসার কিছুদিন পর শিশুটির জন্ম।
কারাগারের ভেতরে অন্য কয়েদীরাই তার নাম দিয়েছে আরোহী। চার বছরের আরো একটি শিশুসহ তার মা পুরান ঢাকার রেবেকা চারমাস ধরে কারাগারে বন্দী।
রেবেকার স্বামীও আরেকটি মামলায় কারাভোগ করছে।
এরকম বহু নারী নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ মাথায় নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার কারাগারগুলোতে বন্দী আছেন। আর তাদের অনেকের সাথেই কারা দেয়ালের ভেতরে বন্দী-জীবন শিশু সন্তানদেরও।
উল্লেখ করা দরকার এখানে প্রকৃত নাম ব্যবহার করা হচ্ছে না।
কেমন কাটে সময়?
ঢাকার কাশিমপুরে একমাত্র নারী কারাগারে সবচেয়ে বেশি শিশুর বসবাস। নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কারাগারটিতে ৪৭১ জন নারী কয়েদী রয়েছেন (সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুসারে)।
আর সেখানে কারা দেয়ালের ভেতরে বন্দী থাকা মায়েদের সঙ্গেই আছে ৩১টি শিশু। এদের প্রত্যেকের বয়স ছয় বছরের কম।
এইসব শিশুরা মায়েদের জন্য নির্ধারিত নারী কয়েদীদের ওয়ার্ডেই ঘুমায়। সারাদিন অবশ্য তাদের কাটে খেলার মাঠে, ডে কেয়ার সেন্টারে ঘুরে ফিরে।
কাশিমপুর কারাগারে কর্তৃপক্ষ এখানে তাদের পড়ানোর এবং অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রেখেছে। তবে সব কারাগারে শিশুদের জন্য এমন ব্যবস্থা নেই।
এখানেই বিশেষ সেলে বন্দী সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া নারী জঙ্গি সদস্যের সন্তানও রয়েছে।
"কোর্টে হাজিরার দিন ঈদের মতো"
যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর দুইবছর আটমাস ধরে কারাগারে শারমিন । একটি শিশুকে নিজের মায়ের কাছে রেখে এলেও, একমাস বয়সী শিশুকে নিয়ে কারাগারে প্রবেশ। এরপর সেখানেই বড় হচ্ছে শিশুটি।
এই শিশুরা এতই ছোট এর বাইরে যে আরেকটি জগত আছে তা জানেনা অনেকেই। তারা যে কারাগারের ভেতর বন্দী অবস্থায় রয়েছে সেটি অনুধাবন করা তাদের পক্ষে এখনও সম্ভব নয়।
কারো কারো কাছে মায়ের জেলখানা থেকে কোর্টে হাজিরার দিনটিকেই মনে হয় যেন বেড়াতে যাওয়ার মত। একজন বন্দী নারী বলছিলেন তার মেয়ে তাকে বলে "মা কোর্টে কবে যাবা? কোর্টে হাজিরার দিন তার কাছে ঈদের মতো"।
বিশেষ উৎসব এবং ঈদের দিন নতুন কাপড়-জামা পায় তারা।
জেল কোড অনুসারে কারাগারের ভেতরে থাকা কোনো শিশুর বয়স ছয় বছর পেরিয়ে গেলে তাকে বাইরে থাকা স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। আর যাদের কোনো স্বজন থাকে না, তাদের সরকারি শিশু পরিবারে পাঠানো হয়।
আর ছয় থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সী কোনো শিশুকে কারাগারে রাখা হয় না।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, এইসব শিশুর অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই বলেই বন্দী মায়েদের সাথে থাকছে।
"সেখানে কর্তৃপক্ষ শিশুদের স্বার্থেই তাদের রাখছে। তবে তাদের মানসিক বিকাশ যেন কারা ফটকের ভেতরেও চলতে পারে সেজন্য কিছু কিছু উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে"। বলছিলেন কাশিমপুর কারাগারের জেল সুপার সাজাহান আহমেদ।
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে যত সংখ্যক বন্দীদের চাপ তার কারণে অন্য অনেক জেলাতে কারাগারের ভেতর নারী বন্দী কিংবা তাদের শিশুদের জন্য এখনো পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
অনেকসময় কয়েদী নারীদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ঝাটিও হয় । সেসবও চাক্ষুষ করতে হয় এই শিশুদের কখনো কখনো।
আর এই শিশুরা কারাগার থেকে বের হওয়ার পর সমাজে তাদের কতটা সহজভাবে গ্রহণ করা হবে সে প্রশ্ন ভাবায় বন্দী মায়েদেরকেও। মাদক মামলায় গ্রেফতার হওয়া নরসিংদীর নাছিমা যেমনটা বলছিলেন।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে এত বিশাল সংখ্যক কয়েদী সামলানোর পর তাদের মুক্তির পর সন্তানদের ভবিষ্যত বিষয়ে ফলোআপ করা তাদের পক্ষে সহজ কাজ নয়।
'এই শিশুদের নিয়ে কাজের অভাব আছে'
এই শিশুরা বন্দী মায়েদের সাথে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তাদের সমাজে খাপ খাইয়ে নিতে, বিশেষ পরিচর্যা কিংবা কাউন্সিলিং এর সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগের অভাব রয়েছে। বিষয়টি স্বীকার কারা মহপরিদর্শক বলেন এধরনের উদ্যোগ কেউ নিলে তাতে সহায়তা দেবেন তারা।
এই শিশুরা কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তাদের সমাজে খাপ খাইয়ে নিতে, বিশেষ পরিচর্যা কিংবা কাউন্সিলিং এর সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগের অভাব রয়েছে। বিষয়টি স্বীকার কারা মহপরিদর্শক বলেন এধরনের উদ্যোগ কেউ নিলে তাতে সহায়তা দেবেন তারা।
সূত্র : বিবিসি

কাতার সঙ্কট : বাড়াবাড়ি করছে সৌদি আরব?

কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে তাদের দাবি মানার জন্য যেভাবে চাপ দিচ্ছে চারটি উপসাগরীয় দেশ- তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব। কিন্তু এই সঙ্কট সৃষ্টি করে তারা কি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে?
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, কাতারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার পূর্বশর্ত হিসেবে তাদেরকে যে ১৩টি শর্ত মেনে নিতে বলেছে উপসাগরীয় দেশগুলো- তা 'পূরণ করা কঠিন'।
ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠতা কমানো, সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দেয়া থামানো, আল-জাজিরা টিভি বন্ধ করা, তুর্কি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা- ইত্যাদি দাবি মানার জন্য কাতারের ওপর অথনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সৌদি আরব, বাহরাইন, মিশর, ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
এটা বেশ স্পষ্ট যে এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে সৌদি আরব। তবে কোন কোন বিশ্লেষক এ প্রশ্ন করছেন যে সৌদি আরব এক্ষেত্রে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে কিনা।
বিবিসির বিশ্লেষক ফ্রাংক গার্ডনার বলছেন, কাতারের পেছনে লেগেছে যে চারটি দেশ- এদের শাসকরা সবাই সুন্নি মুসলিম, যাদের চোখে তাদের প্রতি দুই প্রধান হুমকি হচ্ছে ইরান এবং রাজনৈতিক ইসলাম, আর সহিংস জিহাদ।
তাদের অভিযোগ, এই দুটি বিপদকেই উস্কে দিচ্ছে কাতার।
কাতারের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৩১ বছর বয়স্ক সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান - যাকে সংক্ষেপে ডাকা হয় এমবিএস বলে।
অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, এমবিএস কি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন?
এটা ভাবার কারণ হলো, সৌদি আরবের নিজেরই সমস্যার শেষ নেই। তারা আমিরাতের সাথে মিলে ইয়েমেনে দু'বছর ধরে এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে জড়িত- যার কোনো নিষ্পত্তির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।
তা ছাড়া সৌদি আরবের শিয়া-প্রধান পূর্বাঞ্চলে বহুদিন ধরে বিদ্রোহী তৎপরতা চলছে।
সৌদি আরব ইসলামিক স্টেট বিরোধী মার্কিন কোয়ালিশনেরও সদস্য এবং আইএস দেশটির একাধিক মসজিদে বোমা হামলা চালিয়েছে।
তা ছাড়া, দীর্ঘমেয়াদে কাতারকে বিচ্ছিন্ন করার প্রতিক্রিয়া হবে অর্থনীতি ও ব্যবসাবাণিজ্যের ওপর।
ফলে যতই এ সমস্যা চলতে থাকবে, ততই এর অভিঘাত দেশ ছাড়িয়ে গোটা অঞ্চলের ওপর পড়তে।
কিন্তু সৌদি আরবের শাসকরা সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কড়া ইরানবিরোধী কথাবার্তায় উৎসাহিত হয়েছেন। তারা চান, তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের বিরুদ্ধে উপসাগরের দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হোক।
উপসাগরের রাজতন্ত্রগুলো রাজনৈতিক ইসলামকে তাদের জন্য বিপদ মনে করে। কেন, তা বোঝা খুবই সহজ।
কাতারের শাসক আল-থানির পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক ছিল- এবং ব্রাদারহুড চায় একটি নিখিল-ইসলামিক খিলাফত- যা শেষ পর্যন্ত এখনকার শাসকদের উচ্ছেদ ঘটাবে। মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া এবং গাজায় ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোকে সমর্থনও দিয়েছে কাতার। তাদের আল-জাজিরা টিভি কাতারের ছাড়া সব আরব নেতাদের সমালোচকদের কথা বলার জায়গা দিয়েছে।
কিন্তু সন্ত্রাসবাদের বেলায় চিত্রটা বেশ অস্পষ্ট।
সৌদি আরব বলে, কাতার সিরিয়া-ইরাকে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে অর্থ দিচ্ছে। অনেকেই মনে করেন এ কথা ভন্ডামি ছাড়া কিছু নয়, কারণ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদকে উৎখাত করার চেষ্টায় সৌ+
দি আরব নিজেই কোটি কোটি ডলার দিয়েছে সেখানকার সুন্নি যোদ্ধাদের - যাদের কিছু অংশ শেষে ইসলামিক স্টেটে যোগ দিয়েছে। তবে কাতারের সাথে যে আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট আল-নুসরার যোগাযোগ ছিল তা অস্বীকার করা যায় না।
ফ্রাংক গার্ডনার বলছেন, কাতারি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে এ ব্যাপারে তথ্য দিয়েছেন। তবে কাতার তা স্বীকার করে না।
তবে সৌদি-নেতৃ্ত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার পরিণতিতে এখন কাতারের আকাশসীমা বন্ধ, আমদানি আটকে যাচ্ছে সীমান্তে, কাতারি অভিবাসীরা অন্য দেশগুলো থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছেন।
জিসিসি-র মতো সংগঠন গড়ে আরব ঐক্যের যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল - তা এখন খসে পড়তে শুরু করেছে। আলোচনার মাধ্যমে এই সঙ্কটের সমাধান কখনো যদি হয়ও, তাহলেও মধ্যপ্রাচ্য আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না।
অনেকের ভয়, এসব পদক্ষেপ হয়তো পুরো অঞ্চলকেই এক বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিতে পারে।
সূত্র : বিবিসি

মানসীর মাথায় ‘মিস ইন্ডিয়া’র বিজয় মুকুট

এ বছর ফেমিনা ‘মিস ইন্ডিয়া’র বিজয় মুকুট উঠলো হারিয়ানার মানসী চিল্লার মাথায়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য  থেকে আসা ৩০ জন সুন্দরীর মধ্যে ঘোষিত হল তার নাম। আর এ খেতাব অর্জনের মধ্য দিয়ে এবার বিশ্বসুন্দরীর মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন তিনি। রোববার মুম্বইর যশরাজ স্টুডিওতে অনুষ্ঠিত এবারের ‘মিস ইন্ডিয়া’ আয়োজনে বিচারক ছিলেন অর্জুন রামপাল, মণীশ মালহোত্রা, ইলিয়ানা ডি’ক্রুজ, বিপাশা বসু, অভিষেক কাপুর, বিদ্যু জামওয়াল এবং ২০১৬ সালের বিশ্বসুন্দরী স্টেফানি ডেল ভালের মতো ব্যক্তিত্বরা। বিজয়ী নির্বাচিত হওয়ার আগে প্রত্যেক সুন্দরীকে কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। শুধুমাত্র দৈহিক সৌন্দয্যই নয়, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা এবং সচেতনতা নিয়ে সুন্দরীরা তাদের মতামত ব্যক্ত করেন বিচারকদের সামনে। অবশেষে ৩০ জন সুন্দরীর মধ্যে শেফালি সুদ, সানা দুয়া, প্রিয়াঙ্কা কুমারী, মানসী চিল্লার, অনুকৃতি গুসেইন এবং ঐশ্বর্য দেবনকে এই প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত প্রতিযোগী হিসাবে বেছে নেয়া হয়। বাছাই করা ছ’জন সুন্দরীকে একটাই প্রশ্ন করেন বিচারকেরা। সেই প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতেই মিস ইন্ডিয়া ২০১৭ নির্বাচিত হয়। প্রশ্নটি ছিল, প্রায় একমাস ৩০ জন প্রতিযোগীর সঙ্গে থেকে কী শিক্ষা গ্রহণ করলেন? হারিয়ানার মানসী এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, প্রতিযোগিতার এই সম্পূর্ণ সফরে আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো দৃঢ় করেছি এবং নিজের মধ্যে এই বিশ্বাস এনেছি যে, আমি বিশ্বকে পরিবর্তন করতে পারব। এ উত্তর বিচারকদের খুব ভালো লাগে। স্টেফানি ডেল ভালে মানসীকে বিজয়ী ঘোষণা করে ‘মিস ইন্ডিয়া’র মুকুট পরিয়ে দেন। মিস জম্মু-কাশ্মীর সানা দুয়া প্রথম রানার-আপ এবং মিস বিহার প্রিয়াঙ্কা কুমারী দ্বিতীয় রানার-আপ হন।