Wednesday, July 29, 2015

স্বপ্ন হোক আকাশে ওড়ার by এ পি জে আবদুল কালাম

গতকাল প্রয়াত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম সর্বশেষ বাংলাদেশে আসেন ২০১৪ সালের অক্টোবরে। ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ১১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে যে বক্তৃতা দেন, তার একটি সংক্ষেপিত রূপ পুনঃপ্রকাশ করা হলো। এটি প্রথম প্রকাশ করা হয় গত বছরের ২৬ অক্টোবর প্রথম আলো'র স্বপ্ন নিয়ে সাময়িকীতে
বন্ধুরা, প্রথমত ধন্যবাদ জানাই আমাকে এখানে কিছু বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য। একই সঙ্গে ধন্যবাদ জানাই যারা আমাকে এখানে নিয়ে এসে তোমাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দিল। বাংলাদেশকে আমার দুটি কারণে অনেক ভালো লাগে। এক, এ দেশের বিস্তৃত জলরাশি। আজও যখন দিল্লি থেকে উড়ে এলাম তখন দেখছিলাম দেশজুড়ে কত নদী! আসলে তোমাদের নাম হওয়া উচিত ‘ওয়াটার পিপল’। তোমরা খুব সৌভাগ্যবান। আর দুই, এ দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। তোমরা নিজেরাও হয়তো জানো না তৈরি পোশাকশিল্পে তোমরা কতটা উন্নত। আর হ্যাঁ, অবশ্যই আমার ভালো লাগার একটা বড় অংশজুড়ে আছ তোমরা, এ দেশের তরুণ যুবসমাজ। এ দেশের জনসংখ্যা অনেক হতে পারে। কিন্তু মনে রাখবে এর অর্ধেকই তোমরা। তোমাদের ধ্যানধারণা, চিন্তাভাবনা ও কাজকর্মের ওপরই দেশের উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করছে। বাংলাদেশেরও উচিত তোমাদের শক্তিমত্তার কথা মাথায় রেখে তোমাদের যথাযথ ব্যবহার করা। আর তাই আমার একটি পরামর্শ রইল তোমাদের প্রতি। এখন থেকে সবকিছুতে দেশের কথা মাথায় রাখবে। কোনো স্বপ্ন দেখলে নিজের সঙ্গে বাংলাদেশকে নিয়েও দেখবে, কোনো চিন্তা করলে বাংলাদেশকে নিয়ে করবে আর কোনো কাজে মগ্ন হলে বাংলাদেশের জন্য করবে।
ভারতের তরুণদের সঙ্গে তোমাদের অনেক মিল আছে। যেমন মিল আছে দুই দেশের ইতিহাস থেকে শুরু করে শিল্প-সংস্কৃতি আর সম্পদে। অর্ধশত নদী আমাদের দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবহমান। বিশ্বের সব থেকে সুন্দর এবং সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও এই দুই দেশজুড়ে রয়েছে। তাই এই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অনেক অটুট। আমার ৮৩ বছরের জীবদ্দশায় দুই দশক ধরে দেশে এবং দেশের বাইরে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ তরুণের সংস্পর্শে এসেছি শুধু তাঁদের স্বপ্ন কী সেটা জানতে। তাই যখন তোমাদের কাছে আসার সুযোগ পেলাম, সে সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাইনি।
তোমাদের যখন পেলামই তখন আমার জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি আমি আজ আলোকপাত করব। সেগুলো হলো: জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ, জ্ঞান আহরণ, অনেক বড় সমস্যায় পড়লেও লক্ষ্য থেকে সরে না আসা এবং কোনো কাজে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোকেই নেতৃত্বগুণে সামাল দিতে পারা।
প্রথমেই তোমাদের আমার একটা ছোট্ট গল্প শোনাতে চাই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার এক স্কুলশিক্ষক ছিলেন শিব সুব্রমনিয়াম আয়ার, যাঁকে দেখলে ‘জ্ঞানের বিশুদ্ধতা’ কথাটার মানে বোঝা যায়। সেই শিক্ষক একদিন একটি পাখির ছবি এঁকেছিলেন। অনেকক্ষণ ধরে শিখিয়েছিলেন পাখি কীভাবে আকাশে ওড়ে। বলেছিলেন, কালাম কখনো কি উড়তে পারবে এই পাখির মতো? সেই থেকে আমার আকাশে ওড়ার স্বপ্নের শুরু।
ঠিক উড়তে গেলে কী করতে হবে সেটা আমি বলব না। সেটা তোমরা নিজেরাই ঠিক করে নেবে। তবে আমি তোমাদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতে পারি। কথাগুলো তোমরা আমার সঙ্গে বলো, ‘সব সময় জীবনের অনেক বড় লক্ষ্য রাখব। মনে রাখব ছোট লক্ষ্য অপরাধের সমান। আমি অব্যাহতভাবে জ্ঞান আহরণ করে যাব। সমস্যা সমাধানের অধিনায়ক হব। সমস্যার সমাধান করব। সমস্যাকে কখনো আমার ওপর চেপে বসতে দেব না। যত কঠিন সময়ই আসুক না কেন কখনোই হাল ছেড়ে দেব না। এভাবেই আমি একদিন উড়ব।’
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের জন্ম তামিলনাড়ুতে, ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন’ ছাড়াও ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবে ভূষিত। গত বছর ঢাকা সফরে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) ১১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১৭ অক্টোবর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি এই বক্তব্য দেন।
সবাইকে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। সর্বদা চিন্তা করবে, আমাকে যেন মানুষ মনে রাখে। কিন্তু মানুষ কেন মনে রাখবে, সেটি ঠিক করতে হবে। এই যে চারপাশে এত আলো দেখছ, বাতি দেখছ, বলো তো এই বাতি দেখলেই প্রথমে কার কথা মনে পড়ে? ঠিক, টমাস আলভা এডিসন। এই যে যোগাযোগের জন্য টেলিফোন, এটা দেখলে কার কথা মনে পড়ে? আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। একইভাবে এই বাংলাদেশের কথা চিন্তা করলে প্রথমেই কার কথা মাথায় আসে বলো তো? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সবাই তাঁকে মনে রেখেছে। এভাবে সবাইকে স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে। এমন কিছু করে যাবে, যাতে তোমার অনুপস্থিতিতেও পৃথিবী তোমাকে মনে রাখে।
ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কথা যখন এল তখন বলি, সফল হলেও প্রথমে কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম। আর ওই ব্যর্থতাই আমাকে সফল হতে উজ্জীবিত করেছিল। চ্যালেঞ্জ হলো এই ব্যর্থতাকে দূর করে সফল হওয়ার পথ খুঁজে নিতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন নেতৃত্বগুণের। সবার মধ্যে যে গুণটি অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। মনে রাখবে, একজন যোগ্য নেতার একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্য, পরিকল্পনা ও যেকোনো অবস্থা সঠিকভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতা থাকতে হবে। তাঁকে হতে হবে সৎ ও উদার মনের। সফলতাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে কিন্তু ব্যর্থতাকে নিজের করে নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় হতে হবে।
সমস্যাকে কখনো এড়িয়ে যেতে চাইবে না। বরং সমস্যা এলে তার মুখোমুখি দঁাড়াবে। মনে রাখবে, সমস্যাবিহীন সাফল্যে কোনো আনন্দ নেই। সব সমস্যার সমাধান আছেই। জ্ঞান আহরণ থেকে কখনো বিরত থেকো না। কারণ, এই জ্ঞানই তোমাকে মহানুভব করে তুলবে। অন্য গুণাবলি অর্জনে সাহায্য করবে। নিজেকে অনন্যসাধারণ করে তোলার চেষ্টা করো। মনে রাখবে, তোমার চারপাশের পৃথিবী সর্বদা তোমাকে সাধারণের কাতারে নিয়ে আসার চেষ্টায় লিপ্ত। হতাশ না হয়ে নিজেকে স্বপ্নপূরণের কতটা কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারছ সেদিকে নজর রাখবে। কখনোই সাহস হারাবে না। নিজের একটি দিনও যাতে বৃথা মনে না হয় সে চেষ্টা করো।
তোমরা সবাই ভালো থাকবে। সবাই কোনো না কোনো দিন উড়বে। তোমাদের সবার জন্য শুভকামনা।
মূল বক্তৃতার নির্বাচিত অংশ অবলম্বনে লিখেছেন তৌশিকুর রহমান

‘তাঁর হাসি ছিল শিশুর মতো অমলিন’ by সমরজিৎ​ রায়

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম
জন্ম: ১৫ অক্টোবর, ১৯৩১ l মৃত্যু: ২৭ জুলাই, ২০১৫
আমার সৌভাগ্য হয়েছে একজন অসাধারণ মানুষ, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ডক্টর এ পি জে আবদুল কালামের সঙ্গে তিনবার মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার। ঘটনাগুলো ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের। একটু খুলেই বলি। গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার সুবাদে দিল্লিতে প্রায় সবগুলো সরকারি অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নেয়ার সুযোগ হয়।
প্রতি বছর ২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন ও ৩০ জানুয়ারি মৃত্যুদিবসে তাঁর সমাধিস্থল রাজঘাটে সর্বধর্ম প্রার্থনা অনুষ্ঠান। ওই অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, সোনিয়া গান্ধী থেকে শুরু করে সব বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ উপস্থিত থাকেন। যখন ডক্টর এ পি জে আবদুল কালাম রাষ্ট্রপতি হয়ে প্রথম এই অনুষ্ঠানে আসেন তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন সকালবেলার রাজঘাটের অনুষ্ঠানের পরপরই একই অনুষ্ঠান রাষ্ট্রপতি ভবনেও রাখবেন। শুধু তাই নয়, অনুষ্ঠানের পরে শিল্পীদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। তাঁর এমন সিদ্ধান্তে আমরা অনেক বেশি খুশি ছিলাম, এত সহজ-সরল ও বিখ্যাত একজন মানুষের সঙ্গে খুব কাছে থেকে মেশার সুযোগ পাব বলে। কথাবার্তায় মনে হয়েছে তিনি ছিলেন বেশ সংগীতপ্রিয় মানুষ। যদিওবা এ অনুষ্ঠানের জন্য আমরা কোনো পারিশ্রমিক পেতাম না তবুও যে সম্মান তিনি আমাদের শিল্পীদের দিতেন সেটা বোঝানোর মতো ভাষা আমার নেই।
অনুষ্ঠানে আমি আমার গুরুজী পদ্মশ্রী পণ্ডিত মধুপ মুদ্গলের সঙ্গে ভজন গাওয়ার জন্য যেতাম। অনুষ্ঠানের পরে আবদুল কালাম নিজে এসে মুগ্ধ হাসিতে আমাদের গানের প্রশংসা করতেন। তাঁর হাসি ছিল ঠিক ছোট্ট একটি শিশুর মতো অমলিন। এরপরে সবাইকে নিয়ে তিনি মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিতেন এবং প্রাণ খুলে কথাও বলতেন। এমনকি আমাদের সবার পরিবারের খোঁজ ও নিতেন। তিনি নিজেও নিরামিষভোজী ছিলেন এবং আমাদের সবার জন্যও ভোজনে নিরামিষই থাকত। আমার এখনো মনে আছে, দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি ভবনের একই অনুষ্ঠানের পরে আমরা সবাই যখন খাচ্ছিলাম তখন ভিড়ের মধ্যে তাঁর গায়ের সঙ্গে আমার খাবারের প্লেটের ধাক্কা লেগে যাওয়ায় খুব লজ্জিত হয়ে গেলাম। সেটা বুঝতে পেরে উনি নিজেই আশ্বস্ত করলেন যে, উনি কিছুই মনে করেননি। এরপরেও আমার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা দেখে উনি আমার সঙ্গে সংগীত এবং আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খেতে খেতে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে আমাকে স্বাভাবিক করলেন, এতটাই সাধারণভাবে তিনি মিশতেন সবার সঙ্গে। সত্যি এত বড় মানুষ হয়েও এমন অমায়িক ব্যবহার আমি দেখিনি কোনো দিন। এ ছাড়াও, অসংখ্য অনুষ্ঠানে ওনার সামনে গাওয়ার সুযোগ হয়েছে যা ভারতের বিভিন্ন টিভিতে দেখানো হতো। তাঁর নিষ্পাপ চেহারা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ওনার মৃত্যুসংবাদটি শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে উঠল। শত বছরেও এমন একজন মানুষের জন্ম হয় কী না আমার সন্দেহ।
লেখক: সংগীত শিক্ষক, গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়, নয়াদিল্লি

শ্রদ্ধাঞ্জলি- সভ্যতার রূপান্তরই ছিল তাঁর লক্ষ্য by মাধবন নায়ার

এ পি জে আবদুল কালাম (১৯৩১–২০১৫)
প্রায় এক মাস আগের এক বিকেলে ড. কালামের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। তিনি থিরুভানানথাপুরামে ছিলেন, ওখানেই আমি থাকি, আমাকে তিনি রাজ ভবনে রাতের খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। খাবারের তালিকা দেখেই তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়—সম্ভার, আভাইল, থোরান ও দই ভাত। সরল নিরামিষ খাবারের প্রতি পক্ষপাতের কারণে আমাদের অনেকেই তাঁকে কালাম আয়ার বলে ডাকতেন। আমরা সেদিন বাগানে পায়চারি করতে করতে তাঁর আগ্রহের বিষয় শিক্ষা নিয়ে বিস্তর কথা বলেছিলাম। তিনি সব মানুষের মনকে উসকে দিতে চাইতেন, যত মানুষের বেলায় তা সম্ভব হয়। তিনি বলেছিলেন, আমার উচিত হবে ছাত্রদের পথ দেখানোয় নিজেকে নিয়োজিত করা, আর তরুণ ভারতীয়দের কাছে পৌঁছে যাওয়া। তিনি সভ্যতার রূপান্তরের কথা বলতেন। এই আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে এক দশক আগে দিল্লিতে তাঁর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সারগর্ভ আলোচনার কথা মনে পড়ে গেল, তখন তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি। সময়টা ছিল সন্ধ্যার শেষের দিকে, আমরা তখন কেবলই রাতের খাওয়া শেষ করেছি। তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে মোগল বাগানে পায়চারি করতে বললেন। আমি যে চাঁদ অভিযান চন্দ্রায়ণ ১-এর নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম, তখন সে সম্পর্কে খুব উত্তেজিত হয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমাদের যে রিমোট সেন্সিং ডেটা সংগ্রহ করার ছিল, সে বিষয়ে আমি তাঁকে অবহিত করলাম। তিনি বললেন, ‘আপনাদের উচিত হবে, চাঁদে ভারতের পতাকা লাগিয়ে দেওয়া, তা ছাড়া পৃথিবীর মানুষ কীভাবে বুঝবে, আপনার দেশের নভোচারীরা চাঁদে পদার্পণ করেছে।’ আমরা সেটা করেছিলাম। তিন বছর পরে লুনার অরবিটার যখন তার প্রোব পাঠাল, তখন ভারত পৃথিবীর মধ্যে কেবল চতুর্থ দেশ হিসেবে চাঁদে তার পতাকা উড়িয়েছে, পতাকার খুঁটিটি চাঁদের গায়ে কয়েক বর্গ ইঞ্চি গাড়া হয়েছিল। এখন এর নামকরণ করা হয়েছে জওহরলাল নেহরুর নামে।
কালামের যূথবদ্ধতার চেতনার সঙ্গে তাঁর উদারতা ও উদ্বেগের সামঞ্জস্য ছিল।
১৯৬৭ সালে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় থিরুভানানথাপুরামের থামবা ইকুয়েটোরিয়াল রকেট লঞ্চিং স্টেশনে, তার কয়েক দিন পরই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি আধুনিক ভারতের স্বপ্ন দেখেন। সেটা ছিল তাঁর মতো একজন মানুষের জন্য খুবই সাদামাটা এক শুরু, যিনি পরবর্তীকালে ভারতের বৈজ্ঞানিক মিশন ও প্রাযুক্তিক শক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্যাপারটা কত সাদামাটা ছিল, তা আমাদের অফিস দেখলেই বোঝা যেত। এটা ছিল সেন্ট মেরি ম্যাগাডেলিনের গির্জা। আর ওয়ার্কশপটি ছিল এক স্থানীয় পাদরির বাড়িতে। তিনি খুব সৌজন্যতার সঙ্গে ভবনটিকে ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচির মোহিনি রকেট মিশনকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। কালামের নেতৃত্বে সেখানেই আমরা দিনে ১৬-১৮ ঘণ্টা কাজ করেছি, অহংকার করার মতো এক ডিজাইন প্রণয়নে আমরা কাজ করেছি। এ প্রক্রিয়ায় তিনি আমাদের ভেতর থেকে শক্তির প্রতিটি কণা পর্যন্ত বের করে নিয়েছেন।
আমি তখন ছিলাম একজন প্রোগ্রাম প্রকৌশলী, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় আমার ঢের জ্ঞান ছিল। তখন আমি শুধু বিজ্ঞানেই নিমজ্জিত ছিলাম। কালাম আমাদের কাছ থেকে এটাই প্রত্যাশা করতেন। কিন্তু আমরা যখন কাজে ডুবে থাকতাম, তিনি দেখতেন, যাতে কোনো কিছু আমাদের মনোযোগে চিড় ধরাতে না পারে। একদিন আমার ছেলে দিলীপন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কালাম তাঁর কার্যালয়ের ফোনে কথা বলে তাঁর সহকারীকে পাঠিয়ে আমার ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করেন। আর দিনের কাজ শেষ হওয়ার পরই তিনি আমাকে ওই বিষয়ে অবহিত করেন। তাঁর কাজে মানবতা ছিল, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রচণ্ড রকম ভাস্বর বুদ্ধিমত্তা।
আমার মনে হয়, কালাম এটাই রেখে গেছেন। অন্য কথায়, তাঁর এই গুণ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর দৃষ্টিগ্রাহ্য অর্জনের বাইরে গেলে দেখবেন, কালাম আধুনিক ভারতের সঙ্গে স্বনির্ভরতার চেতনা যুক্ত করেছিলেন। সেই থামার দিনগুলোতে মানুষ ১০ কিলোমিটার যেতে পারে, এমন রকেটের কথা ভাবত, তখনই তিনি এর চেয়ে ৪০ গুণ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের কথা বলেছেন। ভারত যখন রাশিয়ার উদার দানের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখনই কালাম কল্পনা করতেন, ভারতের আকাশে দেশে বানানো বিমান উড়বে, আর দেশের সীমান্ত রক্ষিত হবে দেশে নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে। তিনি এমন ধারার এক ভবিষ্যতের সলতেয় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; মুম্বাইমিরর থেকে নেওয়া
মাধবন নায়ার: ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের সাবেক চেয়ারম্যান।

‘এ পি জে আবদুল কালাম’ আপসহীন আদর্শবাদী by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের
শিক্ষার্থীদের এক অনুষ্ঠানে গত সন্ধ্যায় বক্তৃতা
দেওয়ার সময় অসুস্থ্য হয়ে পড়ে যান আবদুল
কালাম l ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
কোন বিশেষণ এ পি জে আবদুল কালামের জন্য প্রযোজ্য? সারা ভারত তাঁকে যে নামে ডেকে এসেছে, সেই ‘মিসাইলম্যান’, অজাতশত্রু, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা? নাকি এর সব কটাই? যাঁদের জন্য তিনি সারাটা জীবন শুধুই ভেবে এসেছেন, যাঁদের মনে কিছু হওয়ার আগুনটা জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছেন, সেই ছাত্রছাত্রীদের সান্নিধ্যেই জীবনের শেষনিশ্বাস যখন ছাড়লেন, তখন এসব কটি বিশেষণই তাঁর জন্য উপযুক্ত বলে মনে হলো।
তিনি ভারতরত্ন হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পাঁচ বছর আগে ১৯৯৭ সালে। ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার খোঁজে গোটা বিজেপি নেতৃত্ব যখন কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত, তখনই মুলায়ম সিং যাদব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় একই সঙ্গে আবদুল কালামের নাম প্রস্তাব করেন। কালাম তত দিনে মিসাইলম্যানের পরিচিতি পেয়ে গেছেন। ১৯৯৮ সালে অটল বিহারি বাজপেয়ির নির্দেশে পোখরান-টু করে ফেলে গোটা বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছেন। ‘অগ্নি’ ও ‘পৃথ্বী’ ক্ষেপণাস্ত্রের বহর বাড়ানোর জন্য তখন তিনি দিনরাত এক করে ফেলছেন। সেই সময়ে রাষ্ট্রপতি হওয়ার অনুরোধ প্রথমে তাঁকে বিস্মিত করেছিল। কিন্তু যখন দেখলেন, সব দল একভাবে একমনে তাঁকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত, তখন না করেননি। শার্ট ও ট্রাউজার্সের বাইরে আর কিছু তিনি তখনো পরতেন না। বাড়িতে লুঙ্গি ও ফতুয়া। রাষ্ট্রপতি হয়ে সেই প্রথম তিনি সমঝোতা করলেন পোশাকের সঙ্গে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রটোকলের জাঁতায় বিদ্ধ হয়েছেন নীরবে।
যে সমঝোতার সঙ্গে তিনি কোনো দিন আপস করেননি, তা হলো আদর্শ। তিনি আদ্যন্ত ভারতবাসী হিসেবে নিজেকে দেখতে চেয়েছেন এবং সেইভাবে জীবন যাপন করেছেন। অধিকাংশ মানুষ যখন ধর্ম, জাতিসত্তা ও দেশের মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে সেই দ্বন্দ্বে জেরবার, আবদুল কালাম তখন ছিলেন নির্ভেজাল এক ভারতবাসী। তাঁর সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলো ছিল ছাত্রছাত্রীদের সাহচর্য। ভবিষ্যৎ ভারতের এই রূপকারদের মনে তিনি জ্বালাতে চেয়েছেন প্রকৃত অর্থে বড় হওয়ার স্বপ্ন। তাঁর দুই বেস্ট সেলার উইংস অব ফায়ার ও ইগনাইটেড মাইন্ডস এই প্রজন্মের নবীনদের স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছে। মনে আছে, এক অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের তিনি বলেছিলেন, ‘ঘুমিয়ে যে স্বপ্ন মানুষ দেখে তা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন সেটাই, যা তোমাকে ঘুমোতে দেবে না।’
আবদুল কালামের রাজনৈতিক সংশ্রব কোনোকালেই ছিল না। সেই কারণে, রাজনীতির বাধ্যবাধকতাও ছিল না তাঁর। ফলে রাষ্ট্রপতি হয়ে রাজনীতির আলোয় কোনো সিদ্ধান্ত তিনি নেননি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংবিধানিক আবর্তের মধ্যে নিজেকে ধরে রেখেও সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয়টি ছিল লালু প্রসাদের বিহারে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সিদ্ধান্ত। আবদুল কালামের আপত্তিতে বাজপেয়ি সরকার সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছিল।
আবদুল কালাম সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব সময় প্রাধান্য দিয়েছেন বিবেক ও দেশকে। ভারতবাসীর দুর্ভাগ্য, এই ঋষিতুল্য এবং আক্ষরিক অর্থে সন্ন্যাসী অথচ পণ্ডিত ব্যক্তিকে দ্বিতীয়বারের জন্য রাষ্ট্রপতি করা হয়নি। কিন্তু তাতে কিছু আসে-যায়নি আবদুল কালামের। শিশুসুলভ হাসি নিয়ে তিনি ফিরে গেছেন তাঁর প্রিয় জগতে, যেখানে তিনি স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে নবীন প্রজন্মের মনে প্রকৃত অর্থে বড় ও ভালো মানুষ হওয়ার সলতেয় আগুন ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন।
অকৃতদার, মিষ্টভাষী, নিরামিশাষী, স্বল্পাহারি এ পি জে আবদুল কালাম জীবনের শেষ দিনেও চলে যেতে যেতে সেই কাজটিই করে গেলেন।

এ পি জে কালামের কাছে যা শেখা যায়

বিদায় স্বপ্নবাজ! এপিজে আবদুল কালাম
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করতেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান পরমাণুবিজ্ঞানী আবুল পাকির জয়নাল আবেদিন আবদুল কালাম। তাঁদের মনে আলো জ্বালাতে চাইতেন তিনি। জীবনে অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়েছেন এপিজে আবদুল কালাম। জীবন তাঁকে শিখিয়েছে অনেক কিছু। জীবন থেকে নেওয়া সেসব শিক্ষার কথা খুব সহজ করে বলতেন তিনি। কেবল বিজ্ঞান নয়, শিক্ষা, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা জীবনের সবকিছু নিয়েই তিনি কথা বলতেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। আর এসব টুকরো টুকরো কথা থেকেই পাওয়া যেত অনেক বড় বড় দর্শন। যা কাজে লাগাতে পারলে জীবনটা বদলানো সম্ভব। নানা সময় বলা এপিজে আবদুল কালামের এমনই কিছু উক্তি তুলে ধরা হলো এখানে
নিজেকে একা মনে হলে আকাশের দিকে তাকাও। আমরা একা নই। পৃথিবীটা আমাদের বন্ধু। যারা কাজ করে ও স্বপ্ন দেখে প্রকৃতি তাঁদের সাহায্য করে।
যদি সূর্য হতে চাও তবে সূর্যের মতো নিজেকে পোড়াও।
মানুষের জীবনে প্রতিবন্ধকতা থাকা দরকার। বাধা না থাকলে সফলতা উপভোগ করা যায় না।
জীবন এক কঠিন খেলা। সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারলেই এ খেলায় জেতা যায়।
তিনজনই পারেন একটি দেশ বা জাতিকে বদলাতে। তাঁরা হলেন, বাবা, মা ও শিক্ষক।
কেউ যখন অসাধারণ হওয়ার জন্য জ্ঞান অর্জন করে তখন সে আসলে আর সবার মতোই সাধারণ হয়ে যায়।
নেতা সমস্যায় ভয় পাবেন না। বরং সমস্যার মোকাবিলা করতে জানবেন। তাঁকে কাজ করতে হবে সততার সঙ্গে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সম্মতি দেওয়া। আমি মনে করি পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে মানুষ অপরাধ করে। অপরাধের জন্য দায়ী সমাজ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। কিন্তু সেই ব্যবস্থাকে আমরা শাস্তি দিতে পারি না। শাস্তি দিই ব্যবস্থার শিকার মানুষদের।
স্বপ্ন, স্বপ্ন, স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখে যেতে হবে। স্বপ্ন না দেখলে কাজ করা যায় না।
যারা পরিশ্রম করেন সৃষ্টিকর্তা তাঁদের সাহায্য করেন।
স্বপ্নবাজরাই সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারেন।
উন্নত ও নিরাপদ ভারত রেখে যেতে পারলেই পরের প্রজন্ম আমাদের মনে রাখবে।
মন থেকে যারা কাজ করে না তাঁদের জীবন ফাঁপা। সাফল্যের স্বাদ তাঁরা পায় না।
সত্যি হওয়ার আগ পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে যেতে হবে।
কেবল বিশেষ সময়ে নয় সবসময় নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে।
তরুণদের নতুন চিন্তা করতে হবে, নতুন কিছু ভাবতে হবে, অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে। তবেই তারুণ্যের জয় হবে।
উদার ব্যক্তিরা ধর্মকে ব্যবহার করে বন্ধুত্বের হাত বাড়ান। কিন্তু সংকীর্ণমনস্করা ধর্মকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
এখন বিজ্ঞান জানতে ইংরেজি জানা দরকার। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি দুই দশকের মধ্যে আমাদের ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা শুরু হবে। আর তখন আমরা জ্ঞানবিজ্ঞানে জাপানিদের মতো এগিয়ে যাব।
সেই ভালো শিক্ষার্থী যে প্রশ্ন করে। প্রশ্ন না করলে কেউ শিখতে পারে না। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে।
যদি আমরা স্বাধীন হতে না পারি কেউ আমাদের শ্রদ্ধা করবে না।
গভীর দুঃখে বা প্রচণ্ড আনন্দে মানুষ কবিতা লেখে
বিজ্ঞান মানুষের জন্য উপহার। ধ্বংসের জন্য বিজ্ঞান নয়।
স্বপ্ন, স্বপ্ন, স্বপ্ন। স্বপ্ন কাজের অনুপ্রেরণা জোগায়।
আমি সুপুরুষ নই। কিন্তু যখন কেউ বিপদে পড়েন আমি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। সৌন্দর্য থাকে মানুষের মনে। চেহারায় নয়। এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে।

আবদুল কালামকে শেষ শ্রদ্ধা

চেন্নাইতে এক শোক অনুষ্ঠানে অশ্রুসিক্ত এক শিক্ষার্থী l এএফপি
‘জনতার রাষ্ট্রপতি’ এ পি জে আবদুল কালামকে চোখের জলে বিদায় জানাল নয়াদিল্লি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানে মেঘালয়ের রাজধানী শিলং থেকে জাতীয় পতাকায় মোড়া তাঁর মরদেহ দিল্লিতে পৌঁছায়। বিমানবন্দরেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিন প্রধান। প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে প্রয়াত ভারতরত্নকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
বিমানবন্দর থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজাজি মার্গে তাঁর সরকারি বাসভবনে। সেখানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিনভর শায়িত থাকে প্রয়াত ‘মিসাইলম্যানের’ নশ্বর দেহ। উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যরা, কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও বিদেশি রাষ্ট্রদূতেরা বিকেল পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানান রাজাজি মার্গে গিয়ে।
জাতীয় পতাকায় মোড়ানো এ পি জে আবদুল কালামের মরদেহে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে ফিরছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি (বাঁয়ে), প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (ডানে) ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরিকর (পেছনে)। গতকাল নয়াদিল্লি বিমানবন্দর থেকে তোলা ছবি l রয়টার্স
ভিআইপিদের আনাগোনা শেষ হলে বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হয় সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা-মিছিল। হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে অপেক্ষায় থাকেন ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালাকে’ শেষবারের মতো দেখার জন্য। নানা বয়সের বহু মানুষকে কাঁদতে দেখা যায়। দর্শনার্থীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন অল্প বয়সী, আবদুল কালাম যাঁদের মনে প্রকৃত বড় হওয়ার বীজমন্ত্র বুনে দিতে চেয়েছেন সারাটা জীবন।
ভারতের পরমাণু কর্মসূচির পথিকৃৎ আবদুল কালামের মরদেহ আজ বুধবার নিয়ে যাওয়া হবে নিজ রাজ্য তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে। কাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় সেখানেই তাঁকে দাফন করা হবে। রামেশ্বরমেই হতদরিদ্র এক পরিবারে আবদুল কালামের জন্ম। প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতির বড় ভাই মোহাম্মদ মুথু মারাইকর এখনো জীবিত। বয়স ৯৯।
কর্মযোগে বিশ্বাসী এ পি জে আবদুল কালাম ছুটিতে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর ইচ্ছাও ছিল, মৃত্যুর পর শ্রদ্ধা জানাতে সরকারি ছুটি যেন ঘোষণা করা না হয়। সরকারিভাবে সে কথা না জানানো হলেও প্রধানত সেই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার মঙ্গলবার থেকে পরবর্তী সাত দিন সারা দেশে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে জানানো হয়েছে, কালামের প্রতি শ্রদ্ধায় সরকারি অফিস খোলা থাকবে।
সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারতের সংসদের উভয় কক্ষের অধিবেশন গতকাল মুলতবি করে দেওয়া হয়। কাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংসদ মুলতবি থাকবে। কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানী জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় আবিষ্কার অভিযান কার্যক্রমের নামকরণ প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতির নামে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আবদুল কালামের মৃত্যুর খবর পেয়ে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তাঁর কর্ণাটক সফর কাটছাঁট করে দিল্লি ফিরে আসেন। বিমানে আসার পথে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অনেকেই জানেন না, সাবেক রাষ্ট্রপতি অবসরে কবিতা লিখতেন। দিল্লিতে ইন্ডিয়া গেটে অমর জওয়ান জ্যোতিতে শহীদ জওয়ানদের স্মরণে যখনই তিনি শ্রদ্ধা জানাতে যেতেন, একটি করে কবিতা লিখে নিয়ে যেতেন। রাষ্ট্রপতি জানান, আবদুল কালাম সেই কবিতা কখনো পাঠ করতেন না। নিঃসাড়ে তা কারও হাতে গুঁজে দিতেন। তাঁর কাছে এমন দু-তিনটি কবিতা রয়েছে বলে প্রণব মুখার্জি জানান।
অতি সাধারণ জীবন যাপন ও অনন্যসাধারণ চিন্তাভাবনাকে বাস্তবায়িত করা এই সর্বত্যাগী নির্লোভ মানুষটির শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আবদুল কালামের প্রথম পরিচয় তিনি দেশের এক অমূল্য সম্পদ, রাষ্ট্রপতি পরে। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল এক বিশেষ ধরনের। তাঁর জীবন দেশবাসীকে প্রেরণা জুগিয়েছে। বিশেষ করে দেশের যুব সম্প্রদায়কে।

নির্বাচনের পথ খুঁজছে বিএনপি?

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি থেকে এখনই সরে আসছে না বিএনপি। তবে দলটির নীতি নির্ধারকদের অনেকে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে। অবশ্য এখন পর্যন্ত এটি দলীয় অবস্থান নয়।
গত শনিবার রাতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হতে হবে এমন নয়। যে নামেই হোক না কেন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। খালেদা জিয়ার এ ধরনের বক্তব্য একেবারে নতুন নয়। গত বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ১৬ অক্টোবর খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘আমরা চাই অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এর জন্য প্রয়োজন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। নাম যাই হোক, এর রূপরেখা হতে হবে নির্দলীয়।’
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচনের পক্ষে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ দাবিতে অনড় থাকতে চায় দলটি। খালেদা জিয়ার বক্তব্যটি ‘ট্যাকটিক্যাল’। এ মুহূর্তে হুট করে নির্দলীয় বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি থেকে সরে আসা দলের জন্য বিব্রতকর হবে। কারণ তখন প্রশ্ন দেখা দেবে, তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কেন বিএনপি গেল না, দুই দফা কেন আন্দোলন করল। এটি বিএনপির জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক পরাজয়ও হবে। কিন্তু এখন যেভাবে চলছে তা দীর্ঘস্থায়ী হলে তাতে দলের অবস্থা কী হবে তা নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে।
তবে বিএনপির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের দুজন নেতা প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, যেকোনো ধরনের নির্বাচনে হলেই তাতে অংশগ্রহণ করা উচিত। তাঁরা মনে করেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির না যাওয়াটা ভুল ছিল। বিএনপি এখন এর মাশুল দিচ্ছে। কারণ বিএনপি কর্মীনির্ভর, আন্দোলনমুখী দল নয়। বরং সমর্থক নির্ভর দল। এর মধ্যে দু দফায় আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সরকার-বিরোধী আন্দোলন সফল হবে, তেমন আশা সমর্থকদের মধ্যে তেমন জোরালো না। আর দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় দলটিকে ভুগতে হচ্ছে। তাই এখন যেভাবে হোক তাড়াতাড়ি একটি নির্বাচন আদায় করাটা বিএনপির জন্য মঙ্গলজনক হবে বলে তাঁরা মনে করেন।
ওই দুই নেতার একজন বলেন, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে তাঁর অবস্থান থাকবে, তিনি দলীয় ফোরামে এ বিষয়ে সময়মতো সোচ্চার হওয়ারও চেষ্টা করবেন। কারণ তিনি মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক দলের কাছে প্রধান বিষয় হলো নির্বাচন। এখন মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও বিএনপি জিতবে। আর নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে জনগণই তা দেখবে।
অবশ্য বিএনপির কোনো নেতা এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেননি যে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে না যাওয়া ভুল ছিল। তবে এ নিয়ে দলের ভেতর নানা ধরনের আলোচনা আছে। গত ৫ মে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যেও তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ওই দিন তিনি বলেন, ‘অনেকে বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে জিতে যেত। আমাদের অনেক সহকর্মীও সেটা মনে করছেন। কিন্তু মানুষ খুনের মহিলা, সন্ত্রাসীর ওস্তাদ; তাঁর অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। ’
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকে তা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। পরবর্তীতে দাবিতে কিছু ছাড় দিয়ে ‘নির্দলীয় সরকারের’ অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে দলটি। এ দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি।
বিএনপির সূত্র জানায়, জাতিসংঘের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতায় ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে বিএনপি ইতিবাচকভাবে চিন্তা করছিল। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনাও অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের দুজন নেতার কারণে শেষ পর্যন্ত ওই মধ্যস্থতা ফলপ্রসূ হয়নি বলে বিএনপির দুটি সূত্র দাবি করেছে।
নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন বলেছেন, যে নামেই ডাকা হোক না কেন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। তিনি এও বলেছেন, আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আসাদুজ্জামান বলেন, বিএনপি একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধানে এখন তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের কোনো বিধান নেই। বিএনপির হাতে বিকল্প প্রস্তাব আছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর্যায়ে গেলে প্রস্তাব তুলে ধরা হবে।

ইয়াকুব নয়, টাইগারের ফাঁসির পক্ষে সালমান

ভারতের মুম্বাইয়ে সিরিজ বোমা হামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি কার্যকর করার বিপক্ষে মত দিয়েছেন বলিউড অভিনেতা সালমান খান। তাঁর ভাষ্য, ইয়াকুব নয়, তাঁর ভাই টাইগার মেমনকে ধরে ফাঁসিতে ঝোলানো উচিত।
এনডিটিভি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ৩০ জুলাই নাগপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ইয়াকুবের ফাঁসি কার্যকর হতে পারে। ওই দিন তাঁর জন্মদিন। ইয়াকুবের প্রাণভিক্ষার সবশেষ আবেদন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি নাকচ করলে নতুন আরেক দফা আবেদন করেন তিনি। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করতে নতুন করে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন তিনি। কাল সোমবার ওই আবেদনের ওপর শুনানি হবে।
মুম্বাই হামলার আরেক অন্যতম প্রধান আসামি ইব্রাহিম মেমন ইয়াকুব মেমনের ভাই, যিনি টাইগার মেমন নামে পরিচিত। ওই হামলার পর থেকেই তিনি পলাতক।
ইয়াকুবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর আসন্ন হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিক টুইট করেছেন অভিনেতা সালমান। তাঁর ভাষ্য, ইয়াকুবকে ফাঁসি দেওয়া হবে মানবতা হত্যার শামিল।
তবে সালমানের বাবা সেলিম খানের ভাষ্য, ইয়াকুবকে নিয়ে তাঁর ছেলের করা টুইট অর্থহীন।
১৯৯৩ সালে মুম্বাইতে ১৩টি সিরিজ বোমা হামলায় ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। মুম্বাইয়ের মুসলিম প্রভাবিত অপরাধী চক্রই এই হামলার নেপথ্যে ছিল বলে মনে করা হয়।
মুম্বাইয়ের সন্ত্রাসবিরোধী একটি আদালত ২০০৭ সালে ৫৩ বছর বয়সী মেমনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বর্তমানে মেমন নাগপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।

রামেশ্বরমে কালামকে দাফন বৃহস্পতিবার

ভারতের পরমাণু কর্মসূচির পথিকৃৎ আবুল পাকির জয়নাল আবেদিন আবদুল কালামকে তাঁর জন্মস্থান তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে দাফন করা হবে। আগামী বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সেখানে তাঁকে দাফন করা হবে।
গোটা ভারত চোখের জলে বিদায় জানিয়েছেন ‘জনতার রাষ্ট্রপতি’ এ পি জে আবদুল কালামকে। আজ মঙ্গলবার সকালে বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানে মেঘালয়ের রাজধানী শিলং থেকে তাঁর জাতীয় পতাকায় মোড়া মরদেহ দিল্লিতে পৌঁছায়। বিমানবন্দরেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিন প্রধান। প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে প্রয়াত ভারতরত্নকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
বিমানবন্দর থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজাজি মার্গে তাঁর সরকারি বাসভবনে। সেখানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিনভর শায়িত থাকেন প্রয়াত ‘মিসাইলম্যান’। উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যরা, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও বিদেশি রাষ্ট্রদূতেরা বিকেল পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানান রাজাজি মার্গে গিয়ে।
ভিআইপিদের আনাগোনা শেষ হলে বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হয় সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা-মিছিল। হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে অপেক্ষায় থাকেন ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালাকে’ শেষবারের মতো দেখার জন্য। নানা বয়সের বহু মানুষকে কাঁদতে দেখা যায়। দর্শনার্থীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন অল্প বয়সী, আবদুল কালাম যাঁদের মনে প্রকৃত বড় হওয়ার বীজমন্ত্র বুনে দিতে চেয়েছেন সারাটা জীবন।
রামেশ্বরমেই হতদরিদ্র এক পরিবারে আবদুল কালামের জন্ম।
কর্মযোগে বিশ্বাসী এ পি জে আবদুল কালাম ছুটিতে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর ইচ্ছাও ছিল, মৃত্যুর পর শ্রদ্ধা জানাতে সরকারি ছুটি যেন ঘোষণা করা না হয়। সরকারিভাবে সে কথা না জানানো হলেও প্রধানত সেই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার মঙ্গলবার থেকে পরবর্তী সাত দিন সারা দেশে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে জানানো হয়েছে, কালামের প্রতি শ্রদ্ধায় সরকারি অফিস খোলা থাকবে।
সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারতের সংসদের উভয় কক্ষের অধিবেশন আজ মুলতবি করে দেওয়া হয়। আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংসদ মুলতবি থাকবে। কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানী জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় আবিষ্কার অভিযান কার্যক্রমের নামকরণ প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতির নামে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আবদুল কালামের মৃত্যুর খবর পেয়ে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁর কর্ণাটক সফর কাটছাঁট করে দিল্লি ফিরে আসেন। বিমানে আসার পথে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অনেকেই জানেন না, সাবেক রাষ্ট্রপতি অবসরে কবিতা লিখতেন। দিল্লিতে ইন্ডিয়া গেটে অমর জওয়ান জ্যোতিতে শহীদ জওয়ানদের স্মরণে যখনই তিনি শ্রদ্ধা জানাতে যেতেন, একটি করে কবিতা লিখে নিয়ে যেতেন। রাষ্ট্রপতি জানান, আবদুল কালাম সেই কবিতা কখনো পাঠ করতেন না। তা কারও হাতে গুঁজে দিতেন। তাঁর কাছে এমন দু-তিনটি কবিতা রয়েছে বলে প্রণব মুখোপাধ্যায় জানান।
অতি সাধারণ জীবন যাপন ও অনন্যসাধারণ চিন্তাভাবনাকে বাস্তবায়িত করা এই সর্বত্যাগী নির্লোভ মানুষটির শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আবদুল কালামের প্রথম পরিচয়, তিনি দেশের এক অমূল্য সম্পদ, রাষ্ট্রপতি পরে। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল এক বিশেষ ধরনের। তাঁর জীবন দেশবাসীকে প্রেরণা জুগিয়েছে। বিশেষ করে দেশের যুব সম্প্রদায়কে।

কুমির প্রজনন কেন্দ্র: ডিম পেড়েছে সখিনা by এম জসীম উদ্দীন

তালতলীর সোনাকাটা ইকোপার্কের কুমির প্রজননকেন্দ্রে
ডিমের পাশে সতর্ক পাহারায় সখিনা l ছবি: প্রথম আলো
লোনা পানির স্ত্রী কুমিরটির নাম সখিনা। আবাস বরগুনার সোনাকাটা ইকো পার্কের কুমির প্রজননকেন্দ্রে। জুনের শেষ সপ্তাহে ডিম পেড়েছে ২৫-৩০টি। বন বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, ডিম ফুটে প্রাকৃতিক উপায়েই জন্মাবে কুমিরছানা।
কুমির প্রজননকেন্দ্রটির অবস্থান বরগুনা তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি বনে। এটি সুন্দরবনের পরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল। সেখানকার সোনাকাটা ইকোপার্কে এই প্রথম কোনো কুমির ডিম পাড়ল। বন বিভাগের কর্মকর্তারা গত জুলাই মাসের প্রথম দিকে সখিনাকে ডিমে তা দিতে দেখেন।
বন বিভাগ সখিনা বিটের কর্মকর্তা সজীব কুমার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, প্রাকৃতিক নিয়মে ডিমে তা দেওয়া এবং ছানা জন্মানোর সুবিধার্থে কুমির প্রজননকেন্দ্রে তাঁরা দর্শনার্থীদের প্রবেশ আপাতত বন্ধ রেখেছেন। এ ছাড়া সাতটি ডিম আলাদা করে বিশেষ ব্যবস্থায় (হিপ পদ্ধতি) বালু চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে, যেন সেগুলো ঠিকমতো ফুটতে পারে। এবার যেহেতু প্রথমবার ডিম দিয়েছে, তাই কৃত্রিম উপায়ে ডিম ফোটানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
বন বিভাগ সূত্র আরও জানায়, প্রাকৃতিক নিয়মে কুমিরের বাচ্চা না ফুটলে আগামী বছর থেকে ইনকিউবেটর যন্ত্রে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় (২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ডিম ফোটানোর ব্যবস্থা করা হবে।
ইকো-টুরিজমের সুযোগ বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সখিনা বিটে ২০১১-১২ অর্থবছরে সোনাকাটা ইকো পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর এখানে আটটি হরিণ, ২৪টি শূকর, আটটি চিতাবাঘ, দুটি অজগর ও দুটি শজারু অবমুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে এখানে বড় একটি দিঘি খনন করে সেখানে কুমির প্রজননকেন্দ্র স্থাপন করে তিনটি কুমির অবমুক্ত করা হয়। একটি বছর দেড়েক আগে মারা যায়।
গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাকাটা ইকো পার্কের কুমির প্রজননকেন্দ্রের দিঘির পাড়ে বালু খুঁড়ে শুকনো লতাপাতা দিয়ে তৈরি করা বাসায় পাড়া ডিমে তা দিচ্ছে সখিনা। খাবারের খোঁজে মাঝে মাঝে দিঘিতে নামলেও বেশির ভাগ সময় ডিমে তা দেয় এবং আশপাশে পাহারা দেয় সে।
সখিনার পাড়া ডিমের কয়েকটি।
প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাধারণত কার্তিক থেকে পৌষ মাসে স্ত্রী কুমির ডাঙায় ৩০-৩৫টি ডিম পাড়ে। এ জন্য বালুতে ৪৫-৬০ সেন্টিমিটার গভীর গর্ত করে সেখানে ডিম রেখে বালু দিয়ে ঢেকে রাখে। কুমির দুটি সারি করে ডিম পাড়ে এবং বালু দিয়ে প্রতিটি সারি আলাদা রাখে। ১১ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে ডিম ফুটে ছানা বেরোয় এবং কিচ কিচ শব্দ করে। সেই আওয়াজ শুনে স্ত্রী কুমির ছানাগুলোকে বের করে আনে এবং সঙ্গে করে পানিতে নিয়ে যায়। বরগুনা জেলা রাখাইন-বৌদ্ধ সমাজকল্যাণ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব খেমংলা তালুকদার বলেন, ‘সোনাকাটা ইকো পার্কের কুমির প্রজননকেন্দ্রের একটি কুমির মারা যাওয়ার পর আমরা কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম। তবে সখিনা ডিম দেওয়ায় আশা করছি, এখানে কুমিরের বংশবিস্তার হবে।’
সুন্দরবনের করমজল কুমির প্রজননকেন্দ্রের গবেষক জাকির হোসেন বলেন, কৃত্রিম উপায়ে কুমিরের ডিম ফুটে ছানা বেরোতে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ দিন সময় লাগে। প্রাকৃতিক উপায়ে ছানা জন্মাতে ৯০ দিন পর্যন্ত খোঁজ রাখতে হয়। ছানা জন্মানোর পর সেগুলোকে আলাদা করে ফেলতে হয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে তিন প্রজাতির কুমিরের অস্তিত্ব ছিল। লোনা পানির কুমির, মিঠা পানির কুমির ও গঙ্গোত্রীয় কুমির বা ঘড়িয়াল। এর মধ্যে মিঠা পানির কুমির ও ঘড়িয়ালের বিলুপ্তি ঘটেছে বলে বলা হয়ে থাকে। এখন শুধু লোনা পানির কুমিরের অস্তিত্বই আছে। এরা সাধারণত ৬০-৬৫ বছর পর্যন্ত ডিম দিতে পারে আর ৮০-১০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
বরগুনা-পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মিহির কুমার দো বলেন, কুমির যাতে ডিমগুলো তা দিয়ে নির্বিঘ্নে ছানার জন্ম দিতে পারে সে জন্য তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন।

থেমে গেছে সোনা চোরাচালান তদন্ত by নজরুল ইসলাম

বহুল আলোচিত সোনা চোরাচালান মামলার তদন্ত নিয়ে চুপ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত নভেম্বরে আলোচিত এই সোনা চোরাচালানের জন্য বাংলাদেশ বিমানের পরিচালনা পর্ষদ চেয়ারম্যানের কথিত ধর্মপুত্রসহ প্রতিষ্ঠানটির চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং একজন মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছিলেন। জবানবন্দিতে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ৬৯ জনের নাম আসে। তাঁদের মধ্যে ৬৪ জন বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাকিরা মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী। এরপর আট মাস পার হলেও এসব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা নেই।
অথচ সে সময়ে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছিলেন, তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারোরই শাস্তি হয়নি। বরং একজন এরই মধ্যে জামিন পেয়ে বেরিয়ে গেছেন। এদিকে, জবানবন্দিতে নাম আসার বিষয়টিকে পুঁজি করে সংশ্লিষ্ট বিমানকর্মীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে বলেও বিমানে প্রচার রয়েছে।
ডিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা না পাওয়ায় বাকিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তাই তদন্ত স্থবির হয়ে আছে।
যোগাযোগ করা হলে গতকাল শনিবার রাতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নূরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি দরকার হয় না।
নূরুল হুদা আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৈথিল্য ও গাফিলতির কারণে অনেক সময় আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আবার দুর্বল পুলিশি প্রতিবেদনের কারণেও আসামি জামিনে বেরিয়ে যায়। অথচ সোনা চোরাচালান মামলায় সাজা হলে চোরাচালান কমে আসতে পারে।
গত ১২ নভেম্বর শুল্ক গোয়েন্দারা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২ কেজি ৬০০ গ্রাম সোনাসহ বিমানের ক্রু মাজহারুল আবছারকে গ্রেপ্তার করে। মাজহারুল আবছার বিমানের ৬১ জন, সিভিল এভিয়েশনের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও একজন মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ী জড়িত বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁর জবানবন্দির ভিত্তিতে সোনা চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮ নভেম্বর বিমানের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহমেদের ‘কথিত ধর্মপুত্র’ মাহমুদুল হক ওরফে পলাশ, চিফ অব প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং ক্যাপ্টেন আবু মো. আসলাম শহিদ, ফ্লাইট সেবা শাখার উপমহাব্যবস্থাপক মো. এমদাদ হোসেন, ম্যানেজার সিকিউরিটি শিডিউলিং মো. তোজাম্মেল হোসেন এবং উত্তরার ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক মো. হারুন অর রশীদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার ওই পাঁচজন সোনা চোরাচালানে বিমানের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৩ জন জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ ঘটনায় হওয়া মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
জানতে চাইলে মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তিতে যেসব নাম এসেছে, তাঁদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঈদের আগে তিনি এ কথা বলেছিলেন। বর্তমানে শেখ নাজমুল আলম দেশের বাইরে আছেন।
গতকাল শনিবার যোগাযোগ করা হলে মামলার আরেক তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার শফিক আলম বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির সহকারী কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান সম্প্রতি বদলি হয়ে গেছেন। এই মামলার তদন্তভার অন্য কাউকে দেওয়া হয়েছে কি না, তিনি তা জানেন না।
মামলার তদন্ত ও আদালত সূত্র জানায়, কথিত ধর্মপুত্র মাহমুদুল হক ওরফে পলাশ আদালতকে জানান, ২০১০ সালে বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহমেদের ধর্মপুত্র পরিচয় দিয়ে মাহমুদুল হক ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পান। বিমানের চেয়ারম্যানকে তিনি বাবা ডাকতেন। বিমানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবাধ যাতায়াত এবং তাঁর স্ত্রী কেবিন ক্রু নূরজাহানের মাধ্যমে অন্য ক্রুদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
বিমানে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন মাহমুদুল হক পলাশ। তিনি আদালতকে আরও বলেন, তাঁর পছন্দের ক্রুদের বাছাই করে বিভিন্ন ফ্লাইটে সোনার চালান আনা হতো। পাচারের ৩০ শতাংশ সোনার চালান ধরা পড়ে। আর বেশির ভাগ ভারতে পাচার হয়ে যায়।
বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক মো. এমদাদ হোসেন জবানবন্দিতে আদালতকে বলেন, পলাশ সোনা-মুদ্রা চোরাচালানের একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন। মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ী হারুন অর রশীদ আদালতকে বলেন, তাঁর মতো উত্তরার চারটি মানি এক্সচেঞ্জে পরিচালনকারী আরও ছয়জন সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত।
বিমানের ব্যবস্থাপক (শিডিউলিং) তোজাম্মেল হোসেন আদালতকে জানান, পলাশ সোনা পাচারের সঙ্গে জড়িত তা তিনি আগে জানতেন না। তিনি জবানবন্দিতে ক্যাপ্টেন শহীদসহ বিমানের কয়েকজন কর্মচারীর নাম উল্লেখ করে বলেন, তাঁরা সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁদের মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন মাহমুদুল হক পলাশ।
সোনা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া মাহমুদুল হক ওরফে পলাশ ও বিমানের তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কারাগারে আছেন। কারাবন্দী অন্যরা হলেন আবু মো. আসলাম শহিদ, মো. এমদাদ হোসেন ও মো. তোজাম্মেল হোসেন। তবে ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক মো. হারুন অর রশীদ সম্প্রতি জামিন পেয়ে বেরিয়ে গেছেন।
সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার বাংলাদেশ বিমানের ডিজিএমসহ পাঁচজনের চার দিনের রিমান্ড আদালত মঞ্জুর করেছেন। ছবি: ফোকাস বাংলা নভেম্বর ১৯, ২০১৪ #ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) দাবি করেছে, গত ১৮ নভেম্বর ২০১৪ মঙ্গলবার রাতে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, উত্তরা ও বসুন্ধরা এলাকা থেকে সোনা চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবি পুলিশ আজ এই পাঁচজনকে আদালতে হাজির করে ১০ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে। আদালত তাঁদের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন বাংলাদেশ বিমানের ডিজিএম এমদাদ হোসেন, চিফ অব প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ, ব্যবস্থাপক (শিডিউলিং) তোজাম্মেল হোসেন, বিমানের ঠিকাদার মাহমুদুল হক ও মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ।

অভিভাবকদেরও আইনের আওতায় আনার তাগিদ -শিশুদের প্রতি নির্যাতন বন্ধে করণীয় বিষয়ে কর্মশালায় প্রতিমন্ত্রী

উচ্চবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের মা-বাবার উদাসীনতার জন্য কোনো কোনো শিশু অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। তিনি শিশুদের এ দুরবস্থার জন্য দায়ী অভিভাবকদেরও আইনের আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছেন।
গত রোববার শিশুদের প্রতি নির্যাতন বন্ধে করণীয় বিষয়ে আয়োজিত একটি কর্মশালায় মেহের আফরোজ এ মন্তব্য করেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাজধানীর শিশু একাডেমি মিলনায়তনে এ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে অন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
মেহের আফরোজ আরও বলেন, ‘উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুরা কম্পিউটার-মোবাইল নিয়ে বসে থাকছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কখনো কখনো শিশু বিপদে পড়ছে। দরিদ্র পরিবারে বাবা-মা কখনো কখনো সন্তান জন্ম দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছেন। শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠাচ্ছেন। তারা নির্যাতিত হচ্ছে। কখনো কখনো শিশুরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’ যেসব মা-বাবার অসচেতনতার কারণে শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে প্রতিমন্ত্রী মন্তব্য করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিশু সুরক্ষায় ৫০টির মতো আইন আছে। আইনগুলো সম্পর্কে সবাই জানে না। তিনি শিশু নির্যাতন বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। রাজনকে পিটিয়ে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সেখানে কি এমন একজন ছিলেন না যাঁর মধ্যে মানবতাবোধ ছিল? কেউ একটা ফোন করতে পারলেন না?’
মেহের আফরোজ বলেন, ‘শিশু রাসেলকে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেকে টক শো তে কথা বলেন, কিন্তু এ প্রসঙ্গটি নিয়ে কিছু বলেন না।’
মহিলা ও শিশুবিষয়ক সচিব নাসিমা বেগম বলেন, ‘শিশু রাজনের হত্যাকারীদের বিচার হবে। এই বিচারের মাধ্যমে আমরা উদাহরণ স্থাপন করতে চাই।’
আইন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাসরিন বেগম বলেন, আন্তর্জাতিক সনদের সঙ্গে শিশু সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের ফারাকগুলো কি তা খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু খুঁজে বের করলেই হবে না, সমন্বয় করতে হবে।
কর্মশালায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, শিশুকে বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম, পাচার ও শারীরিক নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে সরকার কাজ করছে। বাংলাদেশ শিশু নির্যাতন বন্ধে দক্ষিণ এশীয় মোর্চা সাইভেকের সদস্য। অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। তবে অর্থাভাবে বাংলাদেশ চাইলেও অনেক কিছু করতে পারছে না।
নতুন মাদক সিসা। প্রাচীনকালের হুঁক্কার নগর-সংস্করণ। নিকোটিনের প্রভাব থেকে রেহাই পেতে হুঁক্কার উদ্ভব হয়েছিল। এখন সেই হুঁক্কাকে ব্যবহার করা হচ্ছে সিসার নিকোটিনকে ভিন্নভাবে উপভোগের কাজে। সিসায় আসক্ত শহরের ধনিক শ্রেণীর সন্তানরা। প্রথমে এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার থেকে সিসা গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনে আসক্ত হয়ে পড়েছে। পান সালসা, লিমোরা ডিলাইট, অরেঞ্জ কাউন্টি, ওয়াইল্ড মিন্ট, কিউই, ট্রিপল আপেল, চকোলাভা, ক্রেজিকেয়ারি, ব্লুবেরিসহ বিভিন্ন ফ্লেভারের সিসা পাওয়া যাচ্ছে। উচ্চবিত্ত ঘরের কিছু বিপথগামী তরুণ-তরুণীর মধ্যে সিসা সেবনের প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বস্তরে। তরুণ-তরুণীরা সিসা সেবনকে নিজেদের আভিজাত্য ও স্মার্টনেসের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছে। শীতের সময় সিসাবারগুলোতে বেশি ভিড় থাকে। রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বারিধারা, বনানীসহ অভিজাত এলাকায় রয়েছে বেশিরভাগ সিসাবার। সরেজমিনে গিয়ে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর সিসা লাউঞ্জগুলোর মধ্যে মোহাম্মদপুরে অ্যারাবিয়ান নাইটস, ফুড কিং, ধানমন্ডির সেভেন টুয়েলভ লাউঞ্জ, এইচ টু ও লাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, ঝাল লাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, গুলশানের এডিট লাউঞ্জ, জোন জিরো লাউঞ্জ, মাউন্ট আল্ট্রা লাউঞ্জ, জাবেদ বাড লাউঞ্জ, ক্লাব অ্যারাবিয়ান, হাবুল-বাবুল, বনানীর মিলাউন্স, ডকসিন, কফি হাউস (বেইজিং লাউঞ্জ), মিট লাউঞ্জ, সিন্থ ফ্লোর, বেইলি রোডের থার্টি থ্রি ও খিলক্ষেত্রের হোটেল রিজেন্সি অন্যতম। এসব লাউঞ্জের ছোট ছোট কেবিনে দুজন বা তার বেশি তরুণ-তরুণী বসে সিসার পাইপ মুখে নিয়ে ধোঁয়া টানতে থাকে। আধো আলোতে চারপাশে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। হালকা মিউজিক তৈরি করে স্বপ্নময় মাদকতাপূর্ণ পরিবেশ।অভিযোগ আছে, এমন পরিবেশে অসামাজিক কার্যকলাপও চলছে।

মানব পাচার নিয়ন্ত্রণে ১৫ রোহিঙ্গা দালাল by সরওয়ার আলম শাহীন

উখিয়া উপজেলার কুতুপালং সরকারি বনভূমি রোহিঙ্গা বস্তি ও তৎসংলগ্ন এলাকার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প ব্যবহৃত হচ্ছে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে স্থায়ীভাবে বসবাসরত ৫ প্রভাবশালী রোহিঙ্গাসহ কুতুপালং নিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্পের ১৫ রোহিঙ্গা দালাল মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করছে। কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ভুক্তভোগী কয়েক রোহিঙ্গার কাছে জানতে চাওয়া হলে এসব তথ্য উঠে আসে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিও সংস্থার নেতারা দাবি করছেন, রোহিঙ্গা মানব পাচারকারী চক্রের মালয়েশিয়াভিত্তিক একটি দালাল চক্রের সঙ্গে কুতুপালং ক্যাম্পের কতিপয় দালাল চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফলে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে সাগরপথে মানব পাচার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক রোহিঙ্গা নাগরিক জানায়, ১৯৯১ সালে মিয়ানমার থেকে এসে কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে ২০০৪ সালের দিকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় গিয়ে সেখানে প্রভাব-প্রতিপত্তির মাধ্যমে বসবাস করা রোহিঙ্গা হাশেম উল্লাহ, মাস্টার কবির, মাস্টার হাশিম, মাস্টার সাবেরসহ ৫ জন রোহিঙ্গা নাগরিক বর্তমানে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে স্থায়ীভাবে সপরিবারে বসবাস করছে। তারা সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়া রোহিঙ্গাদের পরিচয় শনাক্ত করে তাদের নিয়ন্ত্রণে আশ্রয়-পশ্রয় দিয়ে বিভিন্ন কাজকর্মে পুনর্বাসন করছে। কুতুপালংয়ের সাবেক ইউপি, সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা বখতেয়ার আহমদ জানান, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থানরত ৫ প্রভাবশালী মানব পাচারকারী রোহিঙ্গার প্রতিনিধিত্ব করছেন কুতুপালং শরণার্থী রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নাগরিক যথাক্রমে কেফায়েত উল্লাহ (৩০), পিতা রশিদ আহমদ প্রকাশ এমপি রশিদ, সাইদুল হক (২১), পিতা আইয়ুব আলী মাঝি, ব্লক নং-সি, নূর বেগম (৪০), প্রকাশ খুইল্যা বুবু, স্বামী এহছেন উল্লাহ, ব্লক নং-ডি, আরেফা বেগম (৪০), পিতা মৌলভী গফফার, ব্লক নং-সি, নূর মোহাম্মদ (২২), পিতা সোনা আলী, ব্লক নং-ডি, জকির আহমদ (৪২), পিতা মোহাম্মদ বসু, সেট নং- ০৬, এমআরসি নং- ৪৭৭২৫, ব্লক নং-এফসহ ১৫ জনের একটি প্রভাবশালী মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট।
আমেরিকাভিত্তিক এনজিও সংস্থা রিলিপ ইন্টারন্যাশনালের অর্থায়নে পরিচালিত এনজিও সংস্থা হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম এম এ সাংবাদিকদের জানান, এসব মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা সাগরপথে মালয়েশিয়া গিয়ে সেখানে নিরাপদে বসবাস করার সুযোগ পেয়ে যাওয়ার খবরে মিয়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে প্রতিনিয়ত সীমান্তের নাফনদী পাড় হয়ে শত শত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে। অনুপ্রবেশকারী এসব রোহিঙ্গা কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ও রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে ওই সব দালালের মাধ্যমে সাগরপথে পাড়ি জমাচ্ছে। রোহিঙ্গারা নিরাপদে মালয়েশিয়া পৌঁছে যাওয়ার খবরে স্থানীয় গ্রামবাসীও ওই সব দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে সাগরপথে অনিশ্চিত যাত্রা করছে। এভাবেই রোহিঙ্গা ও স্থানীয় গ্রামবাসী যৌথভাবে পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল হক খান অভিযোগ করে জানান, প্রভাবশালী এসব রোহিঙ্গা মানব পাচারকারীর প্রলোভনে পড়ে স্থানীয় অনেক যুবক নিখোঁজ হয়েও তাদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম খান জানান, পুলিশ রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও রোহিঙ্গা বস্তিতে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। তা ছাড়া বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করে মানব পাচার প্রতিরোধে উদ্বুুদ্ধ করছে। তিনি এও বলেন, তালিকাভুক্ত তিন শতাধিক মানব পাচারকারীকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।

আমি শতভাগ শিল্পী

শিল্পী আহমেদ নেওয়াজ
শিল্পী আহমেদ নেওয়াজ। সত্তরের দশক থেকে সক্রিয় শিল্পচর্চার নানা মাধ্যমে। ৩১ জুলাই কালি-কলমে অাঁকা ৬০টি চিত্রকর্ম নিয়ে শিল্পকলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাঁর চতুর্থ একক প্রদর্শনী। ২০ জুলাই তাঁর জীবন ও শিল্পচর্চা নিয়ে কথা বলেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
শিল্পের সঙ্গে পাঁচ দশক
১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবনের শুরু। ১০ বছরের শিক্ষক জীবনে শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে শিখিয়েছেন ড্রয়িং, ড্রাফটিং, ডিজাইন ও পেইন্টিং। ১৯৮৬ সালে চাকরি ছেড়ে শিল্পচর্চায় মন দেন। এই সময়ে বিভিন্ন অফিস ও রেস্তোরাঁর অন্দরসজ্জা, নাটকের মঞ্চসজ্জা, বাণিজ্যিক কোম্পানির লোগো ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রোডাক্ট ডিজাইন, বিজ্ঞাপন নির্মাণ ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত হন। পাশাপাশি চলতে থাকে শিল্পচর্চা।
শিল্প চর্চার অনুপ্রেরণা
বাবা আবু মোহাম্মদ তৈয়বুল আলমের ছাপাখানা ছিল। আন্দরকিল্লায় কোহিনুর প্রেস নামের সেই ছাপাখানার ওপরেই থাকতেন আহমেদ নেওয়াজেরা। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি মেজো। ছাপাখানার নানা ধরনের ব্লক তৈরি হতে দেখতেন প্রতিদিন। কাঠের ওপর শিসা দিয়ে তৈরি ব্লকগুলো পরবর্তী জীবনে তাঁর শিল্পচর্চার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। স্কুলে পড়ার সময় প্রায় যেতেন আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ এলাকায়। মসজিদের সিঁড়িতে বসত এক মুচি। কাজের অবসরে সেই মুচি কাগজে ছবি আঁকতেন। নেওয়াজের শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা ছিল এই মানুষটিরও।
এ ছাড়া আন্দরকিল্লার পাশের এলাকা রহমতগঞ্জে ছিল নবীন মেলা নামের একটি ক্লাব। সেই ক্লাবের সদস্য হন স্কুলে পড়ার সময়ই। নবীন মেলার উদ্যোগে বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করার পাশাপাশি নাটকের মঞ্চসজ্জাও করেন।
যখন চারুকলার শিক্ষার্থী
১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজের যাত্রা শুরু হলে পরিবারের অমতে আহমেদ নেওয়াজ সেখানে ভর্তি হন। চারুকলার শিক্ষার্থী থাকার সময়ই সুব্রত বড়ুয়া, সাজিদুল আলম, মমতাজুল হক ও তপন চৌধুরীর সঙ্গে মিলে গঠন করেন ব্যান্ডদল সোলস। এ ছাড়া থিয়েটার ৭৩ নামের নাটকের দলের সঙ্গেও যুক্ত হন। অধুনালুপ্ত এই নাট্যদলটির একাংশ ভেঙে অরিন্দম নাট্যসম্প্রদায় গঠিত হয়েছিল। পরে অরিন্দমের হয়ে বেশ কিছু নাটকের মঞ্চসজ্জা করে খ্যাতি অর্জন করেন।
শিল্পের বিষয়-আশয়
ড্রয়িং, পেইন্টিং, ডিজাইন, ছাপচিত্রসহ নানা মাধ্যমে কাজ করেন নেওয়াজ। নেওয়াজের ভাষায় প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম অনুপ্রেরণা। যে কাজই করেন তা গুরুত্ব দিয়ে করার চেষ্টা করেন তিনি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে নিজেকে শতভাগ শিল্পীই মনে করেন।
সাক্ষাৎকার: আহমেদ মুনির

‘বারবার বলবেন না বিয়ের বয়স কমে যাচ্ছে’ -প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি

মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেছেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, এই সরকার নারী বান্ধব সরকার। এই সরকার নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী। তাই সেই সরকার দিয়ে নারীর ক্ষতি হবে, আইন হবে তা হতে পারে না। বিয়ের বয়স ১৮ই থাকবে। সেখানে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আমি বলতে চাই, এর বাইরে দ্বিতীয় কোনো কথা বলবেন না। আপনারা পত্রপত্রিকায় বারবার বলবেন না বিয়ের বয়স কমে যাচ্ছে। মোটেই কমে যাবে না।’ মঙ্গলবার দুপুরে ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বাল্যবিয়ে নিমূ‌র্লকরণে করণীয় বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। রাজধানীর গুলশানে স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত সভায় প্রতিমন্ত্রী বাল্যবিয়েকে একটি সামাজিক বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৮ বছরের কম বয়সীরা শিশু। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামের সঙ্গে বাংলাদেশও শিশুর বয়সের সঙ্গে একমত। বিয়ের বয়সটি শিশুর বয়স হবে না। বিয়ের আগে গর্ভধারণসহ অন্যান্য সামাজিক সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। তবে একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ইরানের উদাহরণও তুলে ধরে বলেন, ইরানে বিয়ের বয়স ১৩ বছর। তবে অভিভাবকেরা শিক্ষিত এবং সচেতন হওয়ায় ২০ বছর বয়সের আগে বিয়ে দেন না। বাংলাদেশেও এ ধরনের ঘটনা ঘটবে।
প্রতিমন্ত্রী এনজিও প্রতিনিধিসহ সভায় উপস্থিতদের উদ্দেশে আবারও বলেন, ‘অনেক সময় পত্রপত্রিকায় বলছেন বিয়ের বয়স ১৫ বা ১৬ বছর। ১৬ বছরের কথাই বেশি বলা হচ্ছে। বারবার বললে ভাব আসবে, বিয়ের বয়স কমে যাবে বোধ হয়।’
প্রতিমন্ত্রী যখন বিয়ের বয়স ১৮ই থাকছে বলে ঘোষণা দেন তখন সভায় উপস্থিত প্রতিনিধিরা তুমুল করতালির মাধ্যমে সেই বক্তব্যকে স্বাগত জানান। সভা শেষে প্রথম আলোসহ কয়েকটি গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বিয়ের বয়স প্রসঙ্গে আইনে কোনো ধরনের শর্ত থাকছে না—সরাসরি এমন কথা বলা যাবে কি না জানতে চাওয়া হয় প্রতিমন্ত্রীর কাছে। তখনো প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিয়ের বয়স ১৮ই থাকছে, এর বাইরে তো আর এত কথা লেখার দরকার নাই।’
গত বছর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের একটি খসড়া তৈরি করে। ওই খসড়া আইনটির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৮ ডিসেম্বর অনুশাসন দিয়ে বলেছেন, ‘বিয়ের বয়স ১৮, তবে পিতামাতা বা আদালতের সম্মতিতে ১৬ বছর সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সামাজিক সমস্যা কম হবে।’ গত জানুয়ারি মাসে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ অনুশাসন সংযুক্ত করে খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিয়ের বয়স নিয়ে জটিলতার অবসান হয়নি। ফলে আইনের খসড়াটি প্রায় সাত মাস ধরে আইন মন্ত্রণালয়েই পড়ে রয়েছে। তাই আজকের সভায় সবাই আইনে কোনো শর্ত থাকছে কি না তা জানতে চান প্রতিমন্ত্রীর কাছে।
সভায় প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম, জাতিসংঘের সিডও কমিটির সাবেক চেয়ারপারসন সালমা খান, গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরীসহ একাধিকজন বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সরকার যে আইন করতে যাচ্ছে সেখানে বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ বা ‘তবে’ দিয়ে কোনো ধরনের শর্ত থাকছে কি না সরকারের পক্ষ থেকে তা স্পষ্ট করার জন্য প্রতিমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানান।
প্রধান অতিথি হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সভার সভাপতি ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিয়ের বয়স নিয়ে আইনে আর ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘তবে’ না থাকার কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে।’
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস ও ডাইভারসিটির মেয়েদের জন্য নিরাপদ নাগরিকত্ব (মেজনিন) কর্মসূচি এবং জেন্ডার কোয়ালিটি অ্যাকশন লার্নিং (জিকিউএএল) কর্মসূচির মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১৯টি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, নিকাহ রেজিস্ট্রারসহ ১ হাজার ২৯৪ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। এসব কর্মশালা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো জানানোর জন্যই আজকের এ জাতীয় পর্যায়ের মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাঁরা কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছিলেন আজকের সভায় তাঁদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। এর বাইরে ইউনিসেফসহ বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বাল্যবিয়ে নিয়ে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির পরিচালক শীপা হাফিজা। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পুলিশের উপ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিলি বিশ্বাস, উইমেন ফর উইমেনের চেয়ারপারসন জাকিয়া কে হাসান, দাতা সংস্থা ডিএফআইডি’র দেশীয় পরিচালক সারাহ কুক প্রমুখ।

ভোলা-লক্ষ্মীপুর নৌপথ বন্ধ: এক কিলোমিটার সড়ক মেঘনায় বিলীন

বরিশাল-ভোলা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভোলা অংশের
প্রায় এক কিলোমিটার মেঘনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
মহাসড়কের মিছির আলীর ট্রলারঘাট থেকে তোলা ছবি
বরিশাল-ভোলা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ভোলা সদর উপজেলার চডারমাথা থেকে ইলিশা ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশ গত রোববার রাতে মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ভোলা-লক্ষ্মীপুর নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে লঞ্চ এবং সি-ট্রাক চলাচলও বন্ধ রয়েছে। বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে যাওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয় লোকজন বাড়িঘর ও স্থাপনা সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন এবং মাছ ও গাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন।
এদিকে নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঈদের ছুটি শেষে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে কয়েক হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছেন। তাঁরা ঘাট থেকে পুনরায় বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। শনিবার ভোর থেকে ঝড়-বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া শুরু হওয়ার পর ওই নৌপথে ফেরি, লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। রোববার রাতে চডারমাথা থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক মেঘনা নদীতে বিলীন হওয়ায় নৌপথটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভোলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে কয়েক হাজার যাত্রী ঘাটে এসে পুনরায় বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।
ভোলা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরের চরফ্যাশন উপজেলার মুজিবনগর থেকে গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে সপরিবারে ইলিশা ঘাটে পৌঁছান আবদুল অদুদ (৪৩)। তিনি চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন। তিনি জানান, পরিবার নিয়ে ফেরিঘাটে এসেছেন প্রায় ৫৫০ টাকা খরচ করে। আবারও ৫৫০ টাকা খরচ করে তাঁকে বাড়ি ফিরে যেতে হচ্ছে। শারীরিক ভোগান্তি তো রয়েছেই।
ইলিশা ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক আবু আলম হাওলাদার বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই নৌপথে লঞ্চ, সি-ট্রাক ও ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। রোববার রাতে মহাসড়ক ভেঙে যাওয়ায় ফেরি চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
গতকাল সকাল আটটা থেকে একটা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, চডারমাথা থেকে ভোলা ইলিশা ফেরিঘাট পর্যন্ত এক কিলোমিটার মহাসড়ক পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। হুমকিতে পড়েছে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই এক কিলোমিটার সড়কের পাশে থাকা শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ৫৫০ মিটার মহাসড়ক রক্ষা ব্লকবাঁধও রোববার রাতে বিলীন হয়ে যায়। প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ ওই ব্লকবাঁধ নির্মাণ করে। ভাঙন প্রতিরোধে পাউবো ও ঠিকাদারের লোকজন গত শুক্রবার থেকে বালুভর্তি জিও টেক্সটাইল বস্তা ফেললেও তা কোনো কাজে আসেনি।
দক্ষিণ রাজাপুরের বাসিন্দা আলাউদ্দিন মাঝি অভিযোগ করেন, সময়মতো ভূমিকা নিলে মানুষের এত ক্ষতি হতো না। এলাকাও ভাঙনের কবলে পড়ত না। অভিযোগ অস্বীকার করে পাউবোর ভোলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হেকীম বলেন, তাঁদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। নদী ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও ভাঙন প্রতিরোধে তাঁদের লোকজন নিরলস চেষ্টা করছেন। এ কারণে এখন পর্যন্ত লোকালয়ে পানি ঢোকেনি।
এদিকে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে যাওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সদর উপজেলার রাজাপুর, পূর্ব ইলিশা, বাপ্তা ও পশ্চিম ইলিশার লক্ষাধিক মানুষ। তাঁরা পুকুরের মাছ ও বাগানের গাছ বিক্রি করে ফেলছেন। ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন। সদর উপজেলার দক্ষিণ রাজাপুরের বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, ‘যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ছুটে পানি ঢুকবে। পূর্ব ইলিশা, রাজাপুর ডুবে যাবে। এই ভয়ে পুকুরের মাছ কম দামে ছোট অবস্থায় বিক্রি করে ফেলছি।’
দক্ষিণ রাজাপুরের পল্লি চিকিৎসক আমির হোসেন মিজি বলেন, ভয়ে তিনি পুকুরের মাছ, বাগানের গাছ ও হাঁস-মুরগি বিক্রি করে ফেলছেন।

মানব পাচার প্রতিরোধে তিনটি বিধিমালা হচ্ছে- মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিচার হবে ট্রাইব্যুনালে by রোজিনা ইসলাম

মানব পাচার প্রতিরোধে তিনটি বিধিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সাত বিভাগে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল না হওয়া পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত মামলার বিচার হবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে।
আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, বর্তমানে মানব পাচার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সাগরপথে। মানব পাচার আইনে অপরাধ হলেও অনেক ক্ষেত্রে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে পাসপোর্ট আইনে। মানব পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। এ কারণে তিনটি বিধিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ৪৩ ও ৪৬ ধারার ক্ষমতাবলে এসব বিধিমালা করা হবে। এগুলো হলো: জাতীয় মানব পাচার দমন সংস্থা বিধিমালা ২০১৫, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা ২০১৫ এবং মানব পাচার প্রতিরোধ ও তহবিল বিধিমালা ২০১৫। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তিনটি বিধিমালার খসড়া ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, মানব পাচার-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজার, যশোর ও নড়াইলের মানব পাচারের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মানব পাচার-সংক্রান্ত জাতীয় কর্মপরিকল্পনাবিষয়ক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ও সুপারিশ করা হয়।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মানব পাচার বন্ধে তাঁরা নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর মধ্যে এ ধরনের অপরাধ দমনে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে জনপ্রশাসন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার আগ পর্যন্ত আপাতত এ-সংক্রান্ত সব মামলা বিচার হচ্ছে জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। তিনি বলেন, বিভাগীয় পর্যায়ে মানব পাচারের মামলাগুলোর বিচার হলে ঘটনার শিকার লোকজনের বিচার পাওয়া সহজ হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, মানব পাচার-সংক্রান্ত ৫৫৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫৭টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ১২টি মামলার রায় হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে অপরাধ হলেও অনেক ক্ষেত্রে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে পাসপোর্ট আইনে। মানব পাচার আইনে সংঘবদ্ধভাবে মানব পাচারের অপরাধে সর্বনিম্ন সাত বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। মানব পাচার মামলার বিচারের বিষয়ে এ আইনে দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারককে নিয়ে যেকোনো জেলায় ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথাও বলা আছে।
সূত্র বলেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত মানব পাচার-সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনাবিষয়ক বৈঠকে বলা হয়, বাংলাদেশ মূলত মানব পাচারের উৎস দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রানজিট ও গন্তব্য দেশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। বৈঠকে মানব পাচার প্রতিরোধে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ ছাড়া উপকূল ও সমুদ্রে চলাচলকারী নৌযান ট্রলার এবং এসব যানে কর্মরত ব্যক্তির রেজিস্ট্রেশন দ্রুত করতে হবে। মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে আরও অধিক হারে লোক পাঠানোর বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি সুপারিশ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, টেকনাফসহ সীমান্তবর্তী এলাকার হঠাৎ করে ধনী হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, কক্সবাজার, টেকনাফ ও উখিয়াতে চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তি মানব পাচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তদন্তের মাধ্যমে এসব ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া টেকনাফসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু অসাধু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকেন। এঁরা যাতে একই কর্মস্থলে বেশি দিন না থাকতে পারেন এবং বদলি হয়ে আবার একই স্থানে না আসতে পারেন সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গঠিত মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটির তদারক কার্যক্রমও জোরদার করতে হবে।
কর্মকর্তারা আরও বলেন, মানব পাচার বন্ধে জাল পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্তাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। মিয়ানমারের নাগরিকসহ বিদেশি কোনো নাগরিক যেন জরুরি ফি দিয়ে বিনা ভেরিফিকেশনে পাসপোর্ট নিতে না পারেন সে জন্য বিনা ভেরিফিকেশনে পাসপোর্ট দেওয়া নিরুৎসাহিত করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রসচিব মোজাম্মেল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, বিধিমালা হলে মানব পাচারের মামলার বিচার সহজ হবে। তিনি বলেন, অশিক্ষা ও অজ্ঞতার কারণে লোকজন দালালদের ফাঁদে পড়ে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশে যাচ্ছে। এটি বন্ধে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধের জন্য সরকারি, বেসরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

বরিশাল সিটি করপোরেশন: গর্তে ভরা একেকটা সড়ক by সাইফুর রহমান

বরিশাল নগরের বাংলাবাজার থেকে ছবিটি সম্প্রতি তোলা
নগরজুড়ে খানাখন্দ। ভাঙাচোরা নেই এমন রাস্তা পাওয়া দুষ্কর। যে রাস্তাতেই চোখ যায়, সেখানেই গর্ত। বিটুমিন উঠে গিয়ে ছোট ছোট ডোবার মতো তৈরি হয়েছে বেশির ভাগ রাস্তায়।
ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে নগরের অনেক রাস্তাই সংস্কার করা হয়। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সেসব রাস্তা এখন গর্ত আর খানাখন্দে ভরা। নগরবাসী বলছেন, আগেভাগে সংস্কার করলে এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। কিন্তু সিটি করপোরেশনের দাবি, অতিবৃষ্টির কারণে রাস্তাগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। এগুলো সংস্কারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (সদর রোড) সড়ক, হাসপাতাল রোড, ফজলুল হক অ্যাভিনিউ, রাজা বাহাদুর সড়ক, জিলা স্কুল সড়ক, জীবনানন্দ দাশ (বগুড়া রোড) সড়ক, পুলিশ লাইন রোড, আলেকান্দা, নথুল্লাবাদ, বাংলা বাজার, নৌবন্দর, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বান্দ রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সব রাস্তাতেই বিটুমিন উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। গাড়ি চললেই কাদাপানিতে একাকার হয়ে যায় রাস্তা।
মানবাধিকার জোট বরিশালের সভাপতি ও প্রবীণ চিকিৎসক সৈয়দ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আগে দেখতাম রাস্তায় একটু গর্ত হলেই সঙ্গে সঙ্গে সেটি মেরামত হতো। এখন আর তা হচ্ছে না। নগরের রাস্তাগুলো দিয়ে চলা যাচ্ছে না। দ্রুত সংস্কার করা না হলে আরও ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের অক্টোবরে ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ফজলুল হক অ্যাভিনিউর ৪০০ মিটার রাস্তা সংস্কার করা হয়। এর কিছুদিন আগে সংস্কার করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (সদর রোড) সড়ক ও রাজা বাহাদুর সড়ক। হাসপাতাল রোড ও বান্দ রোডও সংস্কার করা হয় এক বছর আগে। কিন্তু এখন সব রাস্তাই খানাখন্দে ভরে গেছে।
গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে নগরের ২, ৩, ৪, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের রাস্তাগুলো সংস্কার করে সিটি করপোরেশন। সেসব সড়কের বেশ কিছু স্থানে বিটুমিন উঠে গেছে। খানাখন্দে বৃষ্টির পানি জমে কাদাপানিতে সয়লাব। এতে প্রতিনিয়ত নাকাল হতে হচ্ছে পথচারী ও যানবাহন চালকদের।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, কিছু রাস্তা ছয়-সাত মাস আগে সংস্কার করা হলেও বেশির ভাগই এক বছর আগে করা হয়েছে। যেসব স্থানে সংস্কার হয়েছে সেখানের বিটুমিন উঠে যায়নি। পাশের অংশ নষ্ট হয়ে গেছে।
সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মোতালেব হাওলাদার বলেন, ‘বিটুমিনের শত্রু পানি। সড়ক যতই ভালোভাবে করা হোক না কেন, পানি জমলে বিটুমিন উঠে যাবেই। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েক দিন সড়ক ডুবে ছিল। সেই কারণে সব সড়কের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। সড়ক সংস্কারে উদ্যোগ নিলেও বৃষ্টির কারণে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।’
মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, এ বছর প্রবল বৃষ্টিতে বেশ কিছু রাস্তায় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ওই সব রাস্তা সংস্কারে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। ঈদের আগেই রাস্তা সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টি কমে গেলে সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।

ঢাকা উত্তরের ওয়ার্ড ২৭ রাজাবাজার–ইন্দিরা রোডের বেহাল অবস্থা by মোছাব্বের হোসেন

পূর্ব রাজাবাজার ও পশ্চিম রাজাবাজারের সরু সড়কটি খুঁড়ে
নালার পাইপ বসানোর কাজ চলছে দুই মাসের বেশি সময় ধরে।
এতে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এলাকাবাসী l সাবিনা ​ইয়াসমিন
ইটের সুরকি বিছানো এবড়োখেবড়ো আর খানাখন্দে ভরা রাস্তা। কোথাও উঁচু-নিচু। বৃষ্টিতে কোথাও কোথাও কাদাপানি জমেছে। রাস্তার ওপরই আবার ফেলে রাখা হয়েছে সিমেন্টের বড় বড় পাইপ, ইট, পিচ ও মাটি। ফলে চলাচলের জায়গা আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশৃঙ্খল অবস্থা। পথচারীদের ভোগান্তি প্রচণ্ড। এই অবস্থা রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম রাজাবাজার এবং ইন্দিরা রোডের বড় একটি অংশজুড়ে। এই এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব এলাকায় গত দুই মাস আগে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ড্রেনেজ লাইনের পুরোনো পাইপলাইন সরিয়ে সেখানে নতুন বড় পাইপ বসানো ও সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হয়। এতে এক মাস এই রাস্তা বন্ধ ছিল। পাইপ বসানোর পরে কিছুদিন থেকে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করার জন্য ইট-সুরকি বিছিয়ে দেওয়া হলেও রাস্তা পুরোপুরি সংস্কার হয়নি।
সরেজমিনে গত রোববার সকালে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তাগুলোর বিভিন্ন স্থানে উঁচু-নিচু ও কোথাও গর্ত তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া রাস্তা খোঁড়ার পর মাটি, পিচ, ও ইট রাস্তার ওপরেই স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সিমেন্টের বড় বড় পাইপ রাখা হয়েছে। এতে রাস্তা আরও সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। দুই পাশে ঠিকমতো যান চলাচল না করতে পারায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন এখানকার মানুষ ও পথচারীরা। এলাকাবাসীরা জানান, মূল সড়কের যানজট এড়িয়ে এই পথটি ধরে অল্প সময়ে পূর্ব ও পশ্চিম রাজাবাজার, সোবহানবাগ, পান্থপথ, কলাবাগানসহ আরও কয়েকটি গন্তব্যে প্রতিদিন হাজারো লোক চলাচল করেন। রাস্তার সংস্কার না হওয়ায় তাঁদের প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
পূর্ব রাজাবাজারে একটি স্কুলের সামনে কথা হয় মাহবুবা নাসরিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ছেলের স্কুলে আসতে প্রতিদিন কলাবাগান থেকে তিনি এই রাস্তায় যাওয়া-আসা করেন। পুরোটা রাস্তাই ঝাঁকুনি খেতে খেতে আসতে হয়। কখনো পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। অনেকটা বিরক্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘রাস্তা নিয়ে আর কী বলব? দেখতেই পাচ্ছেন কী অবস্থা!’
পূর্ব রাজাবাজারের পর পশ্চিম রাজাবাজার ও ইন্দিরা রোড ঘুরে দেখা গেল রাস্তার পাশাপাশি গলিতেও মাটি, পিচ, ও ইট রাস্তার ওপরেই স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারী ও বাসিন্দারা। এই এলাকায় নিয়মিত রিকশা চালান তারা মিয়া। তিনি বলেন, ‘রাস্তা ভালা না, ঝাঁকি লাগে। আমিও কষ্ট পাই, যাত্রীরাও দুঃখ পায়। বৃষ্টি হইলে পানি জইমা থাকে।’
পথচারী আমিন বলেন, ‘ এক মাস তো রাস্তা বন্ধই ছিল। সে সময় একদফা ভুগেছি। আর এখন তো নতুন উপদ্রব হচ্ছে ভাঙাচোরা রাস্তা। কী যে সমস্যা তা কি কর্তৃপক্ষ দেখে না?।’
এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান কাজটি দেখভাল করছেন। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেই যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটির দায়িত্ব পেয়েছে, সেটিতে তাঁর অংশীদারিও ছিল। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তা ছেড়ে দেন বলে জানান। তিনি বলেন, অংশীদারি ছেড়ে দিলেও এখন পর্যন্ত এক অর্থে তিনিই কাজটি দেখভাল করছেন।
রাস্তা সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আড়াই মাসের কাজ এক মাসে শেষ করেছি। আগে এই রাস্তায় পানি জমত। সেটি আমরা এমনভাবে ঠিক করছি, যাতে আর পানি না জমে।’ কাজের অগ্রগতি ও রাস্তার সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পাইপলাইন বসানোর কাজ শেষ। এখন বর্ষা কমলে রাস্তা ঢালাই দেওয়ার কাজ শুরু হবে।’