Tuesday, June 29, 2010

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা লড়াই

ফাইনালের আগে দুই দলের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে এর আগেই একখণ্ড ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা লড়াই দেখা যাবে আজ প্রিটোরিয়ার লফটাস ভার্সফেল্ড স্টেডিয়ামে। অবাক হচ্ছেন? জাপানের রক্ষণ আর প্যারাগুয়ের আক্রমণভাগের বড় দুই ভরসা যে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার! একজন মার্কাস তুলিও তানাকা, ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত জাপানিজ। আরেকজন লুকাস ব্যারিয়স। জন্ম, বেড়ে ওঠা—সব আর্জেন্টিনায় হলেও এখন খেলছেন প্যারাগুয়েতে।
বিশ্বকাপের আগে তুমুল আলোচনায় ছিলেন দুজনই। প্রস্তুতি ম্যাচে ৩টি গোল করেছিলেন দুজনই। তবে ব্যারিয়স তিনবারই গোল করেছেন প্রতিপক্ষের জালে, আর তুলিও দুবার নিজেদের জালে! দিদিয়ের দ্রগবার হাতটাও কিন্তু তিনিও ভেঙেছিলেন!
ব্যারিয়সের ইচ্ছে ছিল আর্জেন্টিনার হয়েই খেলার। কিন্তু এত এত তারকার ভিড়ে সুযোগ পাচ্ছিলেন না দেখে কদিন আগে বেছে নিয়েছেন মায়ের দেশ প্যারাগুয়েকে। ৩টি প্রস্তুতি ম্যাচে ৩ গোল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁকে নিয়ে ভুল করেনি প্যারাগুয়ে। গ্রুপের তিন ম্যাচে গোল না পেলেও নিজের জাত চিনিয়েছেন অসংখ্য সুযোগ সৃষ্টি করে। বক্সের ভেতর ক্ষিপ্রতার জন্য ‘প্যান্থার’ উপাধি পেয়ে যাওয়া স্ট্রাইকার আজ গোলটাও পেতে চাইবেন।
জন্ম-বেড়ে ওঠা ব্রাজিলে বলেই হয়তো বল পায়ে তানাকা রোমাঞ্চ-প্রিয়, ডিফেন্ডার হলেও ঘোরাফেরা করেন প্রতিপক্ষের সীমানায়। ক্লাব ফুটবলে মিডফিল্ডার ও স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছেনও বেশ কিছু ম্যাচ। তবে রক্ষণ সামলানোটাই সবচেয়ে ভালো পারেন। বছর চারেক ধরেই ‘ব্লু সামুরাই’দের ডিফেন্সের বড় ভরসা। এই বিশ্বকাপেও খেলেছেন দুর্দান্ত। ব্যারিয়স-সান্তা ক্রুজদের সামলানোর পাশাপাশি আজ তিনি হানা দেবেন প্যারাগুয়ের ডিফেন্সেও।

‘আম-কাঠলি’ by আকমল হোসেন

ফল তো কমবেশি বারো মাসই পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু ফল আছে মেঘ-বাদলার সঙ্গে যাদের ঘোরতর সম্পর্ক। এই ফলগুলো যেন মাস-মৌসুম ঠিক করে একসঙ্গে মিলেমিশে গাছে আসে। গ্রীষ্ম ও বর্ষায় রং বদলায়, একসঙ্গে পাক ধরে। আম, কাঁঠাল, আনারস, জাম, লিচু—আরও অনেক জাতের স্থানীয়-অস্থানীয় ফল আছে, যা এই মৌসুমে গাছে গাছে তার রূপ-লাবণ্য মেলে ধরে। ফলের পাকা ঘ্রাণে মথিত হয় বাতাস। দেখতে ও স্বাদে আলাদা হলেও এই ফলের সবাই সবার প্রতিবেশী। জাতপাত যা-ই হোক, তারা পাতে প্রায় একসঙ্গেই ওঠে।
এখন সময় যদিও এই ফল-ফলারির ওপর তার ছোবলটা বেশ ভালোই দিয়েছে। অনেক ফলই আর দেখা যায় না। তবু আম, কাঁঠাল বা আনারস—এগুলো কমবেশি এখনো আছে। উপায় নেই তার থেকে চোখ ফেরানোর। দানাদার, কাঁটাঅলা ও টসটসে ফল দেখা যাবে, আর জিবে জল আসবে না—এটাও ভাবা মুশকিল। কিন্তু এই দেখাদেখি বা ঘরে বসে পরিবার-পরিজন নিয়ে একান্তে ফলভোজন। এর মধ্যেই ফলের মৌসুমটা ফুরিয়ে যেতে পারে না।
আর সম্ভবত একসঙ্গে এত ফল আসে বলেই এই ফলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অনেক পারিবারিক ও সামাজিক পার্বণের। শুধু মৌলভীবাজারই নয়, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অনেক এলাকায় ঘরে ঘরে এখন চলছে ‘আম-কাঠলি’ দেওয়া-নেওয়া। ধনী-দরিদ্র বলে কথা নেই। যাঁর যাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী কমবেশি ফল নিয়ে মেয়ের বাড়িতে ছুটছেন সবাই। আম-কাঠলি উপলক্ষে মেয়ের বাড়িতে জমে উঠছে উৎসবের আনন্দ। জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসে মেয়ের বাড়িতে মৌসুমি ফল দেওয়ার এ রেওয়াজ এই অঞ্চলটিতে যুগযুগের। আর এই রেওয়াজকে পালক দিতেই মৌসুমি ফলের বাজার এখন কেনাবেচায় রমরমা হয়ে উঠেছে।
মৌলভীবাজার শহরে এই সময়ে মৌসুমি ফলের সবচেয়ে বড় বাজার বসে কোর্ট মার্কেটে। শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়ার ব্রাহ্মণবাজার, রবিরবাজার, কমলগঞ্জের আদমপুর, রাজনগরের টেংরাবাজারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁঠাল ও আনারস নিয়ে আসেন পাইকারেরা। প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার কাঁঠাল ও আনারস বিক্রি হচ্ছে এই খুচরা বাজারে। কোর্ট মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতা-বিক্রেতার হই-হুল্লোড়ে এখন বাজারটি জমজমাট। বাজার ভাসছে পাকা কাঁঠাল ও আনারসের ঘ্রাণে। ছোট ট্রাক, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ঠেলাগাড়িতে বোঝাই করা হচ্ছে কাঁঠাল, আনারস, আম ও খই। এগুলো আম-কাঠলি হিসেবে মেয়ের বাড়িতে পাঠানো হবে।
কেনাকাটায় ব্যস্ত সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের দুঘর গ্রামের সুফিউর রহমান বললেন, ‘আমি মেয়ের বাড়িতে আম-কাঠলি দেব বলে কেনাকাটা করছি। জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসে এই অঞ্চলের লোকজন মেয়ের বাড়িতে আম-কাঠলি দিয়ে থাকেন। এটা অনেক দিন ধরে চলে আসছে।’ সফিউর রহমান জানান, তিনি মেয়ের বাড়িতে পাঠানোর জন্য কাঁঠাল, আনারস, আম ও খই কিনেছেন। স্থানীয় লোকজন জানালেন, জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই মেয়ের বাড়িতে একধরনের প্রতীক্ষা থাকে বাবার বাড়ি থেকে আম-কাঠলি যাওয়ার। বাবা-মা বা অভিভাবকেরাও মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। মেয়ে নাতি-নাতনি পেয়ে গেলেও বাবার বাড়ি থেকে আম-কাঠলি পাঠানো হয়ে থাকে। তবে নতুন বিয়ে হলে আম-কাঠলি দেওয়ার ধুমধাম বেশি হয়ে থাকে। নতুন মেয়ের বাড়িতে প্রথম আম-কাঠলি পাঠাতে ফলের পরিমাণ বেশিই দেওয়া হয়। সঙ্গে থাকে মিষ্টি। দুই পক্ষের আত্মীয়স্বজন মেয়ের বাড়িতে ভিড় করে। খানাপিনায় ছোটখাটো বিয়ের মতো হয়ে যায় আয়োজন। কোনো কোনো অভিভাবক আছেন, তাঁরা যে শুধু মেয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে থাকেন, এমন নয়। ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকেও আম-কাঠলি পেয়ে থাকেন। যদিও বিত্তবানদের ক্ষেত্রে এই উৎসব আনন্দেরই। দরিদ্র মানুষের এই প্রথা মানতে গিয়ে বেশ হিমশিম খেতে হয়। তবু হাত-পা গুটিয়ে থাকেন না তাঁরাও। মেয়ের মান রাখতে, জামাই, নাতি-নাতনি ও মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকদের খুশি করতে দু-চারটা কাঁঠাল, দুই-চার হালি আনারস, এক-দুই কেজি আম ও এক কেজি খই নিয়ে হলেও মেয়ের বাড়িতে যান। এটাই নিয়ম, এটাই প্রথা। আম-কাঠলি দিতে না পারলে কোনো কোনো পরিবারে মন কষাকষির ঘটনাও ঘটে।
কোর্ট মার্কেটে প্রায় ১৫ বছর ধরে মৌসুমি ফল বিক্রি করেন ওয়াহিদ মিয়া। তিনি বলেন, কেউ মেয়ের বাড়ি, কেউ বোনের বাড়ি আম-কাঠলি দেওয়ার জন্য গাড়ি ভরে ফল কিনে নিচ্ছেন। সাধারণত গাড়ি দিয়ে যাঁরা নিচ্ছেন, তাঁরা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার ফল কিনছেন। ওয়াহিদ মিয়াসহ অন্য খুচরা বিক্রেতারা জানান, কোর্ট মার্কেটে এখন প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ জন বিক্রেতা কাঁঠাল ও আনারস নিয়ে বসছেন। প্রতিদিন ছয় থেকে সাত লাখ টাকার আম, কাঁঠাল ও আনারস বিক্রি হচ্ছে। এই মার্কেটের বড় ক্রেতাই হচ্ছেন আম-কাঠলির ক্রেতা। বাজারে থাকতে থাকতেই ছয়-সাতটি গাড়ি আম-কাঠলি নিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে গেল। অভাব-অনটন, টানাপোড়েন যা-ই থাক, আম-কাঠলির পুরোনো এ প্রথাটি এই অঞ্চলে পারিবারিক বন্ধনের সম্পূর্ণ আলাদা এক উচ্ছ্বাস।

ভারতে হিটলার কেন জনপ্রিয় by আলী রীয়াজ

ভারতে হিটলারকে নিয়ে নির্মিতব্য একটি ছায়াছবি বিষয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেটা হাজার হাজার মাইল দূরে বসেও টের পাওয়া যাচ্ছে। ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে এ নিয়ে উৎসাহ ও বিতর্কের কারণ সহজেই অনুমেয়। হিটলারকে নিয়ে যেকোনো ছবি তৈরি হলেই তা বিশ্বের গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণ করে—এ ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয়নি। তা ছাড়া ভারতের চলচ্চিত্র জগতের খবরাখবর এখন হলিউডের চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়। ভারতের চলচ্চিত্র জগৎ প্রায় এক দশক ধরে সাধারণ শ্রোতা-পাঠকের মনোযোগের বিষয় হলেও স্লামডগ মিলিয়নিয়ার ছবিটি অস্কার পাওয়ার পর চলচ্চিত্রের বাইরের জগতের মানুষও কমবেশি খবরাখবর রাখেন বলিউডে কী হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে মাই নেম খান ছবিটি একশ্রেণীর দর্শকের কাছে আবেদন রেখেছে। অতীতে দীপা মেহতার তৈরি ছবি ওয়াটারও অনেকের মনোযোগ পেয়েছিল। তবে এখন ডিয়ার ফ্রেন্ড হিটলার নামের নির্মিতব্য ছবিটি যে কারণে সংবাদে উঠে এসেছে, তা ভারতের চলচ্চিত্র জগৎ নয়, হিটলারের বিষয় নিয়ে। হিটলারের শেষ দিনগুলো এবং তাঁর প্রেমিকা ইভা ব্রাউনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এ ছবি। এর নাম অবশ্য অন্যসূত্রে প্রাপ্ত—হিটলারের কাছে লেখা গান্ধীর দুটি চিঠি। হিটলারের জীবন, বিশেষ করে শেষ দিনগুলো নিয়ে এটাই প্রথম চলচ্চিত্র নয়। ২০০৪ সালে জার্মান-অস্ট্রিয় যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল ডাউনফল নামের একটি ছবি। এ ছবি শ্রেষ্ঠ বিদেশি ছবি হিসেবে ২০০৫ সালে অস্কারের জন্য মনোনয়নও পায়। অনেকেরই হয়তো স্মরণে থাকবে, ছবিটির প্রদর্শনী শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জার্মানির পত্রপত্রিকায় বিতর্কের ঝড় উঠেছিল; হিটলারকে মানবিকভাবে দেখানো কতটা গ্রহণযোগ্য? শুধু হিটলারই নয়, তাঁর চারপাশের মানুষেরা, যাঁরা ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা, তাঁদের সহানুভূতির সঙ্গে দেখানো হয়েছে বলেও বিতর্ক হয়েছে।
ফলে হিটলার নিয়ে ছবি তৈরি হলে তা যে বিতর্কের ঝড় তৈরি করবে, ছবির পরিচালক, প্রযোজক বা সংশ্লিষ্টরা তা জানতেন না, তা নয়। ২০০৯ সালে ইতালির ফ্যাসিস্ট একনায়ক মুসোলিনির গোপন প্রেমিকা আইডাডেলসার ও তাঁর ছেলের জীবন নিয়ে তৈরি ছবি ডিনসেরে (যার অর্থ হচ্ছে বিজয়ের জন্য) ও খানিক বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়। তবে এ ছবিতে মুসোলিনির প্রতি কোনোরকম সহানুভূতি ছিল না বলে এ নিয়ে হইচই হয়েছে কম।
ভারতে নির্মিতব্য ছবি নিয়ে বিতর্কের সূত্র ধরে একটা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, যা কেবল ছবির আলোচনা করলেই বোঝা যাবে না। সেটা হলো: ভারতে হিটলার কেন জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন? বিবিসির মুম্বাই সংবাদদাতা জুবায়ের আহমেদ জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে লিখেছেন, হিটলার মেমোরাবিলিয়া—অর্থাৎ হিটলার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্মৃতিমূলক বিষয় এখন ভারতে বেশ জনপ্রিয়। হিটলারের লেখা বইটির বেশ কাটতি রয়েছে। ২০০৯ সালে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, ছয় মাসে নয়াদিল্লিতে বইটির ১০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। হিটলারে আত্মজীবনী মাইন কাম্ফ বইটি যাঁদের কাছে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে, তাঁরা বয়সে তরুণ, ব্যবসায় প্রশাসন বা এ জাতীয় বিষয়ের ছাত্র। অনেক গণমাধ্যম এ খবর দিয়েছিল, তরুণেরা হিটলারকে একজন সফল ব্যক্তি বলে বিবেচনা করেন; তাঁদের বিবেচনায় হিটলারের একটি ‘ভিশন’ (রূপকল্প) ছিল, পরিকল্পনা ছিল, বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা ছিল এবং সাফল্যও ছিল। ব্যবস্থাপনার একটি পাঠ্যপুস্তক হিসেবে মাইন কাম্ফ পড়ছেন ছাত্ররা এ ধরনের সংবাদও এসেছিল।
কোনো বই পড়ার ব্যাপারে আপত্তি করার জন্য এ প্রসঙ্গের অবতারণা করছি না। হিটলারের আদর্শ বোঝার জন্য নাৎসিদের ভয়াবহ আচরণের ভিত্তি বোঝার জন্য এ বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু ভারতে এটা কেবল সেখানেই সীমাবদ্ধ আছে কি না আমি সে প্রসঙ্গটি তুলতে উৎসাহী। ২০০৬ সালে মুম্বাইতে ‘হিটলার ক্রস’ বলে একটি রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছিল, সেটা হয়তো অনেকেরই মনে থাকবে। প্রবল আপত্তির মুখে মালিক শেষ পর্যন্ত ওই রেস্তোরাঁর নাম বদল করতে বাধ্য হন। এ রেস্তোরাঁটি নতুন নামে এখনো টিকে আছে কি না আমার জানা নেই।
ভারতের রাজনীতিতে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক শক্তি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের আদর্শের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কি না সেটাও ভাবার বিষয়। বিজেপির আদর্শিক নেতা গোলওয়ালকার ১৯৩৯ সালে জার্মানদের শুদ্ধি অভিযান, বিশেষ করে ইহুদি নিধনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তার ভাষায় ‘এ থেকে হিন্দুস্তানে আমাদের ভালো কিছু শেখার আছে।’ ১৯৪৯ সালে হিন্দুত্ব আদর্শের উদ্ভাবক ভীর সাভারকার লিখেছিলেন, আমরা যদি জার্মানদের মতো শক্তিশালী হতে পারি, তবে ভারতের মুসলমানদের জার্মান ইহুদিদের মতো অবস্থা হবে। ১৯৯২ সালে মুম্বাই দাঙ্গার আগে শিব সেনা নেতা বালঠাকরে বলেছিলেন, ‘আপনি যদি মাইন কাম্ফ বইটি নেন এবং ‘‘ইহুদি’’ শব্দের বদলে সেখানে ‘‘মুসলমান’’ শব্দটি বসান, তাহলে বুঝতে পারবেন, আমি কী বিশ্বাস করি।’ এসব উদাহরণ স্পষ্টতই আদর্শিকভাবে নাৎসিদের সঙ্গে ভারতীয় বিজেপির এক ধরনের সাদৃশ্য তৈরি করে। সে কারণেই ভারতে যখন হিটলারের আত্মজীবনী গ্রন্থ জনপ্রিয়তা লাভ করে, তরুণেরা হিটলারকে আদর্শ বলে বিবেচনা করে, তখন তা কেবল বইয়ের জনপ্রিয়তা ভাবা যায় না।
প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, হিটলারের প্রতি আকর্ষণ কেবল হিন্দুত্ববাদী তরুণদের মধ্যেই লক্ষণীয় নয়; যেখানেই উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং বর্ণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, সেখানেই হিটলার ও নাৎসিদের আদর্শ অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। শুধু তাই নয়, ইতিহাসবোধের অভাব ঘটলে, সহনশীলতার আদর্শকে জলাঞ্জলি দিলে এ ধরনের উগ্র মতবাদ জায়গা করে নেয়।
ভারতে হিটলারকে নিয়ে নির্মিতব্য চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের শুরু হয়েছে, তার একটা ইতিবাচক দিক হলো এই রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো উত্থাপন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যাঁরা একে নেহাত-ই চলচ্চিত্রবিষয়ক বিতর্ক বলে মনে করছেন, আমি তাঁদের সঙ্গে একমত হতে রাজি নই। আমার বিশ্বাস, ভারতীয় রাজনীতির মধ্যেই এ জনপ্রিয়তার উপাদান আছে। পাশাপাশি এটাও মনে করিয়ে দিতে চাই, একটি রাজনৈতিক আদর্শ কেবল প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমেই জনপ্রিয়তা পায় না; বরং একটি আদর্শের ভিত্তি তৈরি হয় আস্তে আস্তে দৈনন্দিন জীবনাচরণের মধ্যে। ‘পাবলিক কালচার’ বা সাধারণ জীবনের প্রতিদিনের আচার-আচরণ, বিশ্বাস, কর্মকাণ্ড এমন ব্যবস্থা তৈরি করে, যার মধ্যে দিয়ে একটা আদর্শ দাঁড়াতে পারে। ভারতে বিজেপির উত্থানের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁরা নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন সাংস্কৃতিক শুদ্ধতার আন্দোলনের নামেই দলের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। এটা কেবল হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ও আন্দোলনের জন্য প্রযোজ্য, তা নয়। বাংলাদেশের চারপাশে তাকালে গত দশকের সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তনগুলো লক্ষ করলে এর ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।
ইলিনয়, ২৩ জুন ২০১০
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভারসিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে.. by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

তুমুল তর্ক বেধেছে, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে। তর্কের শেষ নেই। বিশ্বাসীরা প্রায়ই হেরে যাচ্ছেন। চাক্ষুষ প্রমাণ দানে অসমর্থ তাঁরা। একজন অবিশ্বাসী এসে জানালেন, ‘দল পরিবর্তন করছি।’ কোটরে বাসা বেঁধেছে যে কর্কট (ক্যানসার) রোগ, চিকিৎসকেরা মুখ কালো করে রায় দিয়েছেন, এ অসুখ সারার নয়। পেটের অংশ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাবে, মৃত্যু এসে আলিঙ্গন করবে সহসাই। এরই মধ্যে পেলাম অভয় মন্ত্র। ভালো হয়ে যাব, তাঁর কথামতো চললে। এক মাস চলেছি কথামতো পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে। আমাকে দেখুন। ক্যানসার নেই, রেডিওলজি, এমআরআই টেস্ট বলছে, আমি ক্যানসারমুক্ত।
টাইম ম্যাগাজিনে বের হলে নড়েচড়ে বসেন সবাই। বলেন, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০০৯-এর পত্রিকাটি আপনার আছে? যেখানে জেফরি ক্লুগার ফেঁদেছেন প্রবন্ধ, নাম: দি বায়োলজি অব বিলিফ, বিজ্ঞান ও ধর্ম পরস্পরকে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে পরাস্ত করে চলেছেন, তার খবর। এর পরই এলিস পার্কের ফোরাম: ফেইথ অ্যান্ড হিলিং। ক্যামব্রিজের ফেনোমনোলজি ইনস্টিটিউটে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি, ফি-বছর আমন্ত্রণ পাই। দুই বছর পরপর ‘রিজন ও ফেইথ’ নিয়ে বিজ্ঞানীরা তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। হয়তো কোনো দিন যাওয়ার সুযোগ হবে, হয়তো হবে না।
মরণের পরে কি এ নিয়েই ভাবনা! চিকিৎসাশাস্ত্র ও ধর্ম দেহের যত্নের কথা বলে। চিকিৎসাশাস্ত্র মৃত্যুর পরবর্তী ভাবনা নিয়ে নিশ্চুপ, বিজ্ঞানও তা-ই। ইহুদিরা জীবনের পর সম্বন্ধে প্রায় কিছুই বলে না, বরং বলে, পৃথিবীটাকে ভালো করে ঝালিয়ে দেখো, যা কিছু এর মধ্যেই। খ্রিষ্টধর্ম দেখায় দোজখ ও বেহেশতের স্বপ্ন। ইসলামও তা-ই। বৌদ্ধরা দেখায় পুনর্জন্মের স্বপ্ন, সর্বশেষে নির্বাণ। হিন্দুত্ব শেখায় পুনর্জন্ম, কর্মশেষের পরিণতিতে। তাওইজম শেখায় জীবন ও মৃত্যুর সূত্র খুবই ক্ষীণ। বেহেশত ও দোজখ বলে কিছু নেই।
মস্তিষ্ক নিয়ে যত গবেষণা তার ছিটেফোঁটাও এসে পৌঁছেছে বলে মনে হয় না। শত বই বেরুচ্ছে বছরে মস্তিষ্ক নিয়ে নানা জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে। বর্ডার্স ও বার্নস অ্যান্ড নোবেলে ভিড় করে আছেন উৎসাহীরা। ছয় হাজার রোগীর মধ্যে পরীক্ষা হয়েছে, মাঝেমধ্যে প্রার্থনায় অংশ নেন যাঁরা। কয়েক শ পৃষ্ঠা ফলাফল। বর্তমান নিবন্ধের জন্য অল্প একটু:
১. প্রার্থনালয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারীদের আয়ুষ্কাল দুই থেকে তিন বছর বর্ধিত হয়েছে।
২. ক্যানসার রোগীদের মধ্যে ৮২ জন কালো ব্যক্তি চার্চে যাতায়াত করেন। ৯২ জন কালো ব্যক্তি বিশ্বাস করেন যে ধর্ম তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয়। শতকরা ৫৫ জন সাদা ধর্মে বিশ্বাসী।
৩. উপবাস বা রোজায় অংশ নিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের জন্য ফলাফল পাওয়া গেছে। নিষ্কৃতি পেয়েছেন ক্যালরি থেকে, প্রথম লিভারে, ফ্যাট ও প্রোটিন ডিপজিট থেকে। দেহের মস্তিষ্কের খাদ্য বন্ধ হওয়ার পর অন্য পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগের সম্ভাবনা খানিকটা হলেও উন্মুক্ত। ‘Disconnect, if you wish to connect with the other.’ মুঠোফোন নিবৃত্তির বিজ্ঞাপন নয়, ইন্দ্রিয়দ্বার বন্ধের ঘোষণা। ‘চন্দ্রমুখ’, আইপড, টিভি, সিনেমা, ধূমপানের মতো শত আয়োজন উপেক্ষা করো, দেহমনকে করো প্রস্তুত।
৪. পেটে খেলে এক রকম সয়, না খেলে অন্য রকম। ফলাফল বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেনি। সবার জন্য ফলাফল এক। কেউ ভেবেছেন ভালো হতে হলে বিশ্বাসের কাছে যেতে হবে। অন্ধ বিশ্বাস। যাজকের কাজ হলো রোগীর বিশ্বাসের মান নির্ধারণ করা। যতটুকু বিশ্বাস ততটুকু ওষুধ, ততটুকু নিরাময়। সোজা ব্যাপার। বিশ্বাস ঈশ্বরের প্রতি যতটুকু নয়, তার চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসেবার ওপর।
আফ্রিকায় খ্রিষ্টধর্মের সাফল্যের চাবিকাঠি প্রচারকদের নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। দেশে দেশে পাদ্রিরা ছুটে গেছেন গভীরারণ্যে কুষ্ঠের সেবায়, পাহাড়ে পাহাড়ে ছুটে গেছেন ম্যালেরিয়ার সন্ধানে, গলগণ্ড, আর্সেনিকের সন্ধানে। তাবলিগরাও নেই পিছিয়ে। কাঁধে নিয়েছেন বায়োকেমিক, হোমিওপ্যাথি বড়ি ও পিতলের তাবিজ। দেহ একটি মন্দির, তার প্রয়োজন সুস্বাস্থ্য ও সুচেতনা।
জগতে এখন পাওয়া যাচ্ছে নানা নিরাময় কেন্দ্রের খবরাখবর। চিকিৎসক, মনোরোগ চিকিৎসক, ধর্মচারী, পবিত্র আবহ সৃষ্টিকারী প্রার্থনার শুভ নিয়ামক যেখানে একত্র হয়েছেন। তুরস্কে দেখে এসেছি দরবেশী নৃত্যের আয়োজন, পাহাড়ি উষ্ণ প্রস্রবণের পাদদেশে, প্রতি প্রাতে ইমামের শুভদৃষ্টি অসুখকে করে বিদূরিত। ‘সোহ্বৎ-ই-ফকির’ এই নিরাময় শর্তের অন্তর্ভুক্ত।
আমাদের নবীজি চিকিৎসক ছিলেন না। সাধারণের জন্য ছিল তাঁর উপদেশাবলি। ‘সুস্থ জীবন ও সুস্থ পরিবেশ’ অধ্যায়ে ৭/৮ পৃষ্ঠা মুহাম্মদের [দ.] নাম গ্রন্থে। যখনই বৃষ্টি হতো বৃষ্টিতে ভিজতেন নবী। ‘একদিন হঠাৎ মেঘের বর্ষণ শুরু হলো। বর্ষার ঘনঘটা। পৃথিবী স্নাত হতে লাগল। নবীজি তাঁর পবিত্র সুন্দর গায়ের চাদর খুলে আল্লাহ্র করুণাধারাকে সমস্ত দেহমন দিয়ে উপভোগ করলেন। বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি। সর্বাঙ্গ ভিজে গেল বৃষ্টির জলে। একজন সাহাবী বললেন, ‘আপনি যে একেবারে ভিজে গেছেন।’ নবীজি বললেন: ‘ঠিক বলেছ, এ মেঘ যে আল্লাহ্র সৃষ্টি। এর বর্ষণ তো তাঁরই করুণাধারা। সিক্ত হয়ে ধন্য হলাম আমি।’
মুস্তাফা জামান আব্বাসী: লেখক ও সংগীত ব্যক্তিত্ব।
mabbasi@dhaka.net

হরতাল পালন, না ভীতি উদযাপন by মশিউল আলম

গাবতলী থেকে গুলিস্তান যাবে বলে যাত্রী নিয়ে একটি বাস ফার্মগেটে এসে থেমে গেল। বাসটির চালক ও তাঁর সহযোগী যাত্রীদের উদ্দেশে সমস্বরে বলে উঠল, ‘নামেন নামেন, বাস আর যাইব না।’ যাত্রীদের মধ্য থেকে একজন রাগী স্বরে জানতে চাইল, ‘কেন যাবে না?’
‘সামনে রিস্কের ব্যাপার,’ বাসের কন্ডাক্টর বোঝাতে লাগলেন ওই যাত্রীকে। আশপাশে দাঁড়ানো আরও কয়েকটি বাস দেখিয়ে তিনি যাত্রীকে বললেন, ‘ওই যে দেখেন, গুলিস্তানের দিকে কুনো বাসই যাইতাছে না।’
পল্টন-গুলিস্তান, অর্থাৎ রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়; হরতাল, অবরোধ, সমাবেশসহ যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচির মূল কেন্দ্র এবং সে-কারণে সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনাগুলো ওই এলাকা বা তার আশপাশেই ঘটে বেশি। হরতালের দিনে যাত্রীসুদ্ধ বাস নিয়ে সেদিকে যাওয়ার বিপদ সম্পর্কে বাসগুলোর ড্রাইভার-কন্ডাক্টররা সচেতন ও সাবধানী। সব যাত্রী নেমে গেলে বাসটির তরুণ চালককে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘গুলিস্তানের দিকে কোনো গণ্ডগোলের খবর কি আপনারা পেয়েছেন?’ তাঁর উত্তর, ‘না। কিন্তু রিস্ক লইতে চাই না।’
তার আগে, সকাল সাড়ে নটার দিকে শ্যামলীতে এক দোকানের একটি বাদে সব ঝাঁপ বন্ধ দেখে এগিয়ে গিয়ে দোকানের কর্মীদের জিজ্ঞাসা করি, হরতাল বলে তাঁদের এই সাবধানী ব্যবস্থা কি না। উত্তরে এক কর্মী বললেন, ‘বহুত দিন পর হরতাল দিছে না? কী হয় না হয়!’
রিকশাচালকেরা যাত্রী নিয়ে দূরের গন্তব্যে যেতে রাজি হচ্ছেন না। রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখে কয়েকজন রাস্তার পাশে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। তাঁদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘আপনারা কি হরতাল করছেন?’ একজন বললেন, ‘না, ভয়ে ভয়ে আছি। এত পুলিশ-র‌্যাব দেইখ্যা মনে হয় গণ্ডগোল হইতে পারে।’ আরেকজন বললেন, ‘ধরেন, একখান ইটা আইসা ঘাড়ে পড়ল, বা ধরেন, আপনারে বাড়ি লাগাইল, চিন্তার বিষয় আছে না?’
শ্যামলী সিনেমা হলের মোড় ও আশপাশ এলাকায় অধিকাংশ দোকান বন্ধ, মিরপুর রোডে বাস, ট্যাক্সি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিরল। মানুষ হেঁটে বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে। মোড়ে পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যদের জটলা। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা শুরু করি। হরতালে জনগণের সাড়া কেমন দেখছেন? আমার এ প্রশ্নের উত্তরে একজন মৃদু হেসে বললেন, ‘ডাক দিলেই তো হরতাল হয়ে যায়। আর কিছু করা লাগে না।’ বললাম, ‘রাস্তায় আপনাদের সংখ্যা বেশি দেখতে পেলে তো মানুষ ভাবে, গণ্ডগোল হতে পারে।’ পুলিশ সদস্যের উত্তর, ‘স্বাভাবিক, গণ্ডগোল তো হইতেই পারে। হরতাল মানেই গণ্ডগোলের সম্ভাবনা।’
‘সব হরতালের ক্ষেত্রেই তো এমন কথা বলা যায়। আজকের হরতাল কিন্তু বেশ টাইট মনে হচ্ছে।’—আমার মন্তব্যে পুলিশের সদস্য বললেন, ‘অনেক দিন হরতাল ছিল না। মানুষ বুঝতে পারতেছে না, ঘর থেকে বারাইব, না ঘরেই থাকা নিরাপদ। দোকানপাট খুলতেও দোনোমনা করতেছে। সবার মনেই ভয়।’
সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বেলা পৌনে ১১টা পর্যন্ত আদাবর, রিং রোড, শ্যামলী সিনেমা হলের মোড়, সেখান থেকে হেঁটে মিরপুর রোড ধরে কলেজ গেট হয়ে আসাদ গেট পর্যন্ত যেতে যেতে অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি হরতাল প্রসঙ্গে। আসাদ গেটে গুলিস্তানগামী একটি বাসে উঠে ফার্মগেটে নামতে বাধ্য হয়েছি। কারণ বাসটির চালক ও কন্ডাক্টর আর কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার সাহস করেননি। ফার্মগেটে অনেক মানুষ, প্রত্যেককেই ঘর থেকে বেরোতে হয়েছে কোনো না-কোনো জরুরি কাজে। তাঁদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি, একান্তই জরুরি না হলে তাঁরা হরতালের মধ্যে ঘর থেকে বের হতেন না। যেমন, কল্যাণপুর থেকে আসা এক যুবক বললেন, তাঁকে যেতে হবে শাহবাগের বারডেম হাসপাতালে অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে। কিন্তু বাস ফার্মগেটের পর আর শাহবাগের দিকে যাচ্ছে না বলে তিনি হেঁটেই রওনা হয়েছেন শাহবাগের উদ্দেশে। বাসায় স্ত্রী তাঁকে বলেছিলেন, দুপুরের পর হরতাল একটু শিথিল হলে তিনি যেন বের হন। কিন্তু তবুও তিনি বেরিয়েছেন: ঝুঁকি নিয়ে।
বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও বয়সের যত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, সবাই প্রকাশ করেছেন অজানা আশঙ্কা ও ভীতির কথা। প্রত্যেকেই ঘর থেকে বের হয়েছেন মনের মধ্যে একটা ঝুঁকির বোধ নিয়ে। বিএনপির এই হরতালের ইস্যু কী, কেন তারা হরতাল ডেকেছে, তা বলতে পারলেন না একজনও। দুপুরের একটু পরই বার্তা সংস্থার খবরে জানা গেল, বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন দাবি করেছেন, সারা দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করছে। সোমবারের সংবাদমাধ্যমে হয়তো দেখা যাবে, বিএনপির নেত্রী হরতাল সফল করার জন্য দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু বিএনপির ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে—বিষয়টি বোধ হয় পুরোপুরি এ রকম নয়। আসলে জনজীবনে স্বাভাবিক ছন্দের যে পতন দেখা গেছে, তার কারণ একটা সাধারণ ভীতি, অজানা শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার বোধ। হরতালে মানুষের মনে কাজ করে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ, কী হয় না-হয়—এমন শঙ্কা।
জনগণকে এই শঙ্কার মধ্যে ফেলার অধিকার কি কারোর আছে? হরতালের ডাক দিলেই জনমনে যে ভীতি ও অজানা আশঙ্কার সঞ্চার ঘটে, তার ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে হরতালের বৈধতা প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। যে কর্মসূচি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার বিপন্নতার মুখে পড়ে, নিরাপদে চলাফেরা ও জীবিকা অর্জনের পথে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়, তেমন কর্মসূচি সম্পর্কে গুরুতর পুনর্বিবেচনা আশু কর্তব্য হয়ে উঠেছে। সংসদে ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে হরতালের মতো জবরদস্তিমূলক, নাগরিক অধিকার খর্বকারী রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়, সে বিষয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে।
ঢাকা, ২৭ জুন ২০১০
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

মাই লর্ড মেয়র মন্জুর আলম by মিজানুর রহমান খান

চট্টগ্রামের মেয়রকে ‘মাই লর্ড মেয়র’ হিসেবে সম্বোধন করতে চাই। কারণ এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা একটি সামন্তসমাজের প্রতিচ্ছবি দেখি। দেখি তেমনই সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। ফিউডালিজমের বাংলা হলো সামন্ততন্ত্র। ১৬১৪ সালে শব্দটির প্রয়োগ শুরু। আপনারা লক্ষ করেছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দলের প্রতীকে হয় না। তবুও আমরা দুই পরীক্ষিত বন্ধুর দেখা পাই। মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মন্জুর আলমকে রাজধানীতে আসতে দেখি। তাঁরা প্রধান দুই দলের নেতার কাছে দোয়া নিয়েছেন। জনাব চৌধুরী কায়ক্লেশে তাঁর সংশয়গ্রস্ত আনুগত্য নবায়ন করেন। মন্জুর আলম জিয়ার প্রথম সমাধি জিয়ারত করেন। তাঁর ভাইকেও বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে ফুল নিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করতে দেখা যায়। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকলে তিনি নিজেই ছুটে আসতেন। এসব ঘটনা প্রমাণ দেয়, স্থানীয় নির্বাচন নয়, চট্টগ্রামে একটা কেন্দ্রীয় নির্বাচন হলো। আর এই কেন্দ্র কোনো রকম বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী নয়।
মিলটা দেখুন। মধ্যযুগীয় সামন্তসমাজে লর্ড ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। লর্ড কথাটি বহু দেশে বহু অর্থে ব্যবহূত হয়। আমাদের দেশে বিচারপতিদের লর্ড সম্বোধন করা হয়। তার উৎপত্তি সম্ভবত প্রাচীন জার্মান উপজাতীয় প্রথায়। এই লর্ড মানে ‘রুটিরক্ষক’। অস্ট্রেলিয়া, কানাডার প্রধান নগরপিতাদের এখনো বলা হয় লর্ড মেয়র। ব্রিটেনে রাজা ছিলেন প্রধান লর্ড। আমরা ব্রিটেনের বিবর্তন মনে রাখব। মন্জুর আলমকে লর্ড মেয়র সম্বোধন করলাম। সেটা ‘রাজার খাস ভাড়াটে’ অর্থে। মধ্যযুগীয় ব্রিটেনের অনুসরণে।
রানি এলিজাবেথ আজও প্রধান লর্ড। কিন্তু ওই খোলসটুকু মাত্র। ভেতরে গণতন্ত্র। সামন্তসমাজে রাজাদের কাছে বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের শপথ নিতে হতো। জনগণ সেখানে অনুপস্থিত ছিল। চট্টগ্রামে মানুষ ভোট দিয়েছে। কিন্তু তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকবে।
মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সমাজে দুজন ব্যক্তির মধ্যে এই শপথ হতো। আমাদের সমাজেও এর বাস্তব অনুশীলন চলছে। মহিউদ্দিন ও মন্জুর ঢাকায় এসে শপথ নেন। এই শপথই আমাদের সমাজের চালিকাশক্তি মনে হয়। মধ্যযুগে যে আনুগত্য দেখাত, তাকে বলা হতো ‘ভেসাল’ বা দাসখতদাতা। যার কাছে শপথ বা দাসখত দেওয়া হতো, তাঁর ছিল লর্ড উপাধি। আমাদের সমাজে এখন লর্ড নেই। আছে অন্য নামে। এরাই ভাইয়া। চাচা। বড় ভাই। কখনো আপা, ম্যাডাম ইত্যাদি। ২২ জুন মন্জুর সাংবাদিকদের বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরীকে তিনি ‘আজীবন বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা’ করেছেন।
লর্ড-ভেসাল শপথের সময় একটি চুক্তি হতো। ভেসাল বলত, আপনার অবাধ্য হব না। লর্ড বলত, তোমাকে আমি সুরক্ষা দেব। রাতবিরাতে ফুলের তোড়া হাতে ছোটাছুটির মধ্যে আমরা উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে সেই মধ্যযুগীয় চুক্তির ছায়া দেখি।
নির্বাচনের আগে দুই নেতা ঢাকায় ওই শপথ পাঠ করেন। নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। এটা করতে তাঁরা বাধ্য ছিলেন। কারও পক্ষেই তা এড়ানো সম্ভব ছিল না। কারণ ক্ষমতার রাজনীতিটা চট্টগ্রামের মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে না। ভোটাররা সমাজ নিয়ন্ত্রণ করলে বাংলাদেশে গোত্র গণতন্ত্রের এতটা বাড়বাড়ন্ত হতো না। ঢাকায় ওই যে শপথ হলো, এর মাধ্যমে তারা আসলে চট্টগ্রামকে ‘ভেসেল স্টেট’ বা পুতুল নগরে নামিয়ে আনল। বড় নেতা-নেত্রীরা চাইবেন না, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চাইবে না, অথচ স্থানীয় জনগণ চাইবে বলে সেটা মানতে হবে, সেটা হবে না। আর সেটা যখন হয় না বা নামকাওয়াস্তে কিছু হয়, তখন সেখানে স্থানীয় সরকার আর থাকে না। স্থানীয় শাসন কায়েমের প্রশ্ন মাঠে মারা পড়ে।
চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে আমরা খোলস-গণতন্ত্রের মহড়া দেখি। কিন্তু গণতন্ত্রের বিজয় দেখি না। লাতিন শব্দ মেয়র। এর অর্থ মহত্তম। প্রায় ১১০০ বছর আগে এডওয়ার্ড দ্য এলডারের আমলে এই পদটির জন্ম। পরিহাস হলো, সম্রাটের অনুগত ও বিশ্বস্তরাই এ পদ পেতেন। আজও সেই আনুগত্যই বড় পরীক্ষা। প্রার্থী হতে হলে তা অর্জন করতে হবে। ভোটের পরে তাকে রক্ষা করতে হবে।
১৮৮২ সালে ব্রিটেনে প্রথম মেয়র নির্বাচন আইন হয়। সে আইনে কিন্তু মেয়রের মেয়াদ এক বছর নির্দিষ্ট হয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যথাসময়ে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হতে হবে। আমার কাছে মনে হলো, কথাটা ১২৮ বছর দূর থেকে ভেসে এসেছে। মেয়াদ শেষে যাতে নির্বাচন না হয়, সে জন্য কৌশলের কোনো অভাব নেই। ওই আইনেই কিন্তু নির্দিষ্ট ছিল, প্রতিবছর ৯ নভেম্বর নির্বাচন হবে। ব্রিটেনের শুরুটা এমন ছিল। এখন কোথাও মেয়াদ বেড়েছে। ভাবুন তো, আমরা কেন গণতন্ত্র শেখার পর্বে এখন এমন আইন তৈরি করি না।
সব রকম উদাহরণই আছে। কোনটা আমরা নেব। দেখব। শিখব। সেটাই বড় বিষয়। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে মেয়রের মেয়াদ ছয় বছরের। বেলজিয়াম অনির্দিষ্টকাল মেয়াদে। অনেক দেশে কেন্দ্রীয় সরকার মেয়র নিয়োগ দেয়। অনেক দেশে আমাদের মতো প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র হয়। তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা হলো নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা মেয়র নির্বাচন। প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত মেয়রদের অনেকেই স্বৈরশাসক হয়ে উঠছেন। যে মডেলটা আমাদের দেশে এখন চলছে, সেটায় ত্যক্তবিরক্ত ব্রিটেন। একজন নির্বাচিত মেয়র, সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের একজন আমলা। দুজন মিলে কাউন্সিলরদের পাত্তা না দেওয়া। মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর ১৭ বছরের অধিকাংশ সময় সম্ভবত এটাই চালিয়েছেন।
এক দশক ধরে ব্রিটেন এই প্রশ্নে অস্থিরতা দেখাচ্ছে। ৩৭টি স্থানে গণভোট হয়েছে। মাত্র ১২টিতে প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচন সমর্থিত হয়েছে। বাকি ২৫টিতে কাউন্সিলরদের ভোটে মেয়র নির্বাচনের পরোক্ষ ব্যবস্থা সমর্থিত হয়েছে। বাংলাদেশে এই পরোক্ষ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিন সদস্যের স্থানীয় সরকার কমিশন পরোক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচনের সুপারিশ করে। আওয়ামী লীগ এই বিধান বিলোপ করেছে। পরোক্ষ ভোট শুনলে অনেকে আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তো পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। সেটা কি আইয়ুবের মডেল? এই তুলনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
গত ১৭ জুনের ভোটে শুধু কাউন্সিলর নির্বাচন হতে পারত। ৪১ জনের যে কেউ মেয়র হতে পারতেন। তখন মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আসত প্রতিটি ওয়ার্ড। গণমাধ্যম শুধু দুজনকে ঘিরে মাতামাতি করল। মোনায়েম খাঁ শুধু পিন্ডির মনোভঞ্জনে আগ্রহী ছিলেন। আমাদের এই ব্যবস্থায় ঢাকাকে বানালাম পিন্ডি। নব্য পিন্ডিকে সন্তুষ্ট রাখাটাই মাই লর্ড মেয়রের চ্যালেঞ্জ। এখানে বীরত্ব কিংবা অবাধ্যতার সুযোগ নেই। মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার কোনো ফাটাফাটির খবর নেই। ‘বিএনপির সময় যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করেছি, সেভাবে আমি আওয়ামী লীগের সময় পারিনি’, জনাব চৌধুরীর মুখে এ কথা বহুবার শোনা গেছে। ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেনকে নিয়ে শেখ হাসিনার আদৌ কোনো অস্বস্তি আছে বলে আমরা জানি না।
আমি মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের বড়ই মিল পাই। তখন রাজারাই ছিলেন ফিউডাল লর্ড। কাউন্টরা (রাজার সহচর) উঁচুতে ছিলেন। সামন্ত প্রভুরা ছিল নিচু। কাউন্টরা অর্পিত ক্ষমতা (ডেলিগেটেড পাওয়ার) ভোগ করতেন। কিন্তু ফিউডাল লর্ডদের সেই সুযোগও ছিল না। দয়াপরবশ হয়ে রাজারা যতটুকু ক্ষমতা দিতেন, সেটুকুই তাঁদের ভোগ করতে হতো। আমাদের মেয়র, সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, যেখানে যাঁর নাম যাই হোক, তাঁরা সেই ফিউডাল লর্ড। কেউ কাউন্ট। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এই ভূখণ্ডে তাঁরা যে যাই হোন, জনগণের অর্পিত প্রকৃত দায়িত্ব তাঁরা পালন করেন না। সামন্ততন্ত্র আর গণতন্ত্র পাশাপাশি চলে না। উপজেলা প্রশাসনকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলে সামন্ততন্ত্রে কুঠারাঘাত পড়বে। তাই তা দেওয়া হয় না। স্থানীয় শাসনের উত্থান ঘটলে সংসদের মুখোশটা খুলে পড়বে। তাই স্বায়ত্তশাসনকে দুই বড় দল যমের মতো ভয় পাচ্ছে। দুদক, মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, তথ্য কমিশন—সবটাকেই সুতো দিয়ে বাঁধার প্রবণতা। সবশেষ বিটিআরসিকে পদানত করার সূত্র ওই একই।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ঢাকাভিত্তিক সরকারের দয়াভিক্ষায় টিকে থাকে। অথচ প্রজাতন্ত্রের মালিকেরা তাদের স্বায়ত্তশাসন দিতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু মুজিবের সেই স্বায়ত্তশাসনের স্বাদ। প্রদেশ, রাজ্য বলা হয়নি ঠিকই, নামকরণ একটা করেছিল। ‘প্রশাসনিক একাংশ’। থমাস জেফারসন ও জেমস মেডিসনেরা অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে পতাকা দিয়েছিলেন। সংবিধান দিয়েছিলেন। আমাদের সংবিধানপ্রণেতারা অতটা ভাবেননি। তবে তাঁরা ছায়াটা নেন। কখনো মনে হয় সেটা দিলেই বুঝি ভালো হতো। বাংলাদেশে প্রদেশ ও ফেডারেল সরকার পদ্ধতি চালুর বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। চট্টগ্রামে ১৭ লাখ ভোটার। তরুণ ভোটার পাঁচ লাখ। ভুটানের লোকসংখ্যা সাত লাখ। চট্টগ্রাম মহানগরে লোকসংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ। এর চেয়ে কম লোকসংখ্যার দেশের সংখ্যা ৮০টির বেশি হবে।
প্রশ্ন হলো, আমাদের মাই লর্ড মেয়রগণ তাঁদের শহরগুলোকে প্রকারান্তরে আর কতকাল ভেসেল স্টেট হিসেবে গণ্য করে চলবেন? মোঙ্গল শাসক ও তাঁদের চেলাচামুণ্ডারা ছিলেন মারকুটে। নগরগুলোর লর্ডরা তা টের পেতেন। তাই তাঁদের নগর আক্রমণের আগেই আত্মসমর্পণ করতেন। এর মূলমন্ত্র ছিল একটাই—শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শন। এটাই লিটমাস টেস্ট। বাংলাদেশেও টেস্ট ওই একটাই।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর আনুগত্যবিচ্যুতি দেখা দিয়েছিল। তিনি অনেকগুলো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি নগর সরকারের স্বপ্ন দেখতেন। এসব বিষয় ওই আনুগত্যের সঙ্গে যায় না। মন্জুর আলম আনুগত্যের পরীক্ষায় এ পর্যন্ত উত্তীর্ণ। সেটা জনাব চৌধুরীরও জানা। মন্জুর আলম গত ২২ জুন জনাব চৌধুরীর বাসভবনে যান। জনাব চৌধুরীর শোবার ঘরে পর্যন্ত তাঁর প্রবেশাধিকার রয়েছে। সম্পর্কটা এমনই অন্তরঙ্গ। জনাব চৌধুরী তাঁর ১৭ বছরে মন্জুর আলমকে সর্বোচ্চ নয়বার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব দেন।
আমরা চট্টগ্রামের নগর-রাজনীতিতে কোনো মৌলিক গুণগত পরিবর্তন আশা করছি না। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে, গণতন্ত্র শুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া চালু হবে—এসব অলীক স্বপ্ন। কিছু ক্ষেত্রে যা বিএনপি তা-ই আওয়ামী লীগ। মাই লর্ড মেয়র সে রকম একটি চরিত্র। তিনি তাঁর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। তাঁর পিতা একই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। এর সুফল তিনি নেবেন। তাঁর ব্যক্তিগত সততার সুনাম আমরা শুনেছি। সে জন্য তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। মহিউদ্দিন ৫০ বছর আর নতুন মেয়র রাজনীতিতে আছেন ৪০ বছর। মহিউদ্দিন ‘আমৃত্যু’ রাজনীতি করবেন। জনাব আলমের সামনে সংসদ নির্বাচনের টিকিট ঝুলছে। তদবির করে আর হতাশ হতে হবে না। হয়তো তিনি কার কাছ থেকে নেবেন, সেটা একটা প্রশ্ন।
মাই লর্ডকে প্রশ্ন করুন। কবে অবসর নেবেন। তিনি অবমাননা বোধ করবেন। মহিউদ্দিন সম্পদের বিবরণী দেননি। কাউন্সিলরদের কাছ থেকে আদায় করেননি। একই পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন নতুন মাই লর্ড। তাঁর ব্যক্তিগত সততা হয়তো থাকবে। কিন্তু উল্লিখিত লর্ড-ভেসেল শর্ত তাঁকে মানতে হবে। শর্ত ভাঙতে চাইলে তিনিই ভেঙে যাবেন। তেমন ঝুঁকি নেওয়ার লোক তিনি নন বলেই শুনিছি। চ্যালেঞ্জ নিতে সংকল্প হচ্ছে? আচ্ছা নিন। নাগরিকদের পক্ষে এই একটি কাজ করে দেখান। লর্ড-ভেসেলের সুতাটা ছিন্ন করুন। অবসরের ঘোষণা দিন কিংবা নিজের ও পোষ্যদের সম্পদ ও দায়দেনা এবং স্বার্থের সংঘাতের বিবরণী প্রকাশ করুন। মাই লর্ড মেয়র, আপনাকে আমরা অভিনন্দন জানাব। অপেক্ষায় রইলাম।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

ভিস্যাট বন্ধ -বিকল্প ব্যবস্থা না রাখা অপরিণামদর্শিতা

কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ চালু রাখার ব্যবস্থা ভিস্যাট বন্ধ করে দিচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিসিএল)। ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগের জন্য একটিমাত্র সাবমেরিন কেব্ল সংযোগের বাইরে কোনো বিকল্প তাই আর খোলা রইল না। এত দিন ভিস্যাটের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে বিকল্পভাবে অথবা জরুরি অবস্থায় ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগের কাজ চালাতে পারত। বিকল্প না রেখে ভিস্যাট বন্ধের এই সিদ্ধান্তকে সংশ্লিষ্ট সবাই বিতর্কিতই মনে করছেন।
ভিস্যাট হলো কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার প্রযুক্তি। বিটিআরসি ভিস্যাট বন্ধের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধের কথা বলেছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ভিস্যাট ব্যয়বহুল হওয়ায় একে ব্যবহার করে ভিওআইপি ব্যবসা মোটেই লাভজনক নয়। সুতরাং ভিওআইপি বন্ধ করার জন্য ভিস্যাট বন্ধ করার কথা বলা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার শামিল। বিটিআরসি তাহলে কোন উদ্দেশ্যে ভিস্যাট বন্ধ করে দিল, তা জানা প্রয়োজন। ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির পক্ষ থেকে বিটিআরসির এই সিদ্ধান্তকে ‘বিরাট ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট যুক্ততার প্রধান উপায় হলো সাবমেরিন কেব্ল। কিন্তু দেখা যায়, মাঝেমাঝেই সমুদ্রের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই কেব্ল কাটা পড়ে সেই সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ৫৭ লাখ আর কম্পিউটারের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত সাড়ে চার লাখ গ্রাহকের সামনে সাবমেরিন কেব্ল সংযোগ বন্ধ থাকার সময় কোনো বিকল্প আর রইল না। আচমকা ভিস্যাট ব্যবহার বন্ধ করা তাই অপরিণামদর্শী কাজ। সরকারের উচিত, ভিওআইপি বন্ধের আরও কার্যকর পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া, বিকল্প সাবমেরিন কেবলের বন্দোবস্ত রাখা। এক বিকল্প বন্ধ করার আগে আরও সহজ ও আইনানুগ বিকল্পের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

হরতালে বাড়াবাড়ি -সংসদই হোক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু



রোববারের হরতাল নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষই যে আচরণ করেছে, তাতে রাজনৈতিক সংঘাত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাকেই বাড়িয়ে তুলল। বিএনপি শান্তিপূর্ণ হরতাল পালনের ওয়াদা করলেও শনিবার মধ্যরাতে রাজধানীতে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা জনমনে যে ভীতির সঞ্চার করেছে, তার জবাব কী? অন্যদিকে হরতালের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণের মধ্যেও ছিল বাড়াবাড়ি, যা সমর্থনযোগ্য নয়।
বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিনা উসকানিতে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ পুরো অসত্য নয়। সরকার কাউকে ধরে নিতে বললে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেঁধে নিয়ে যায়, সে উদাহরণেরও অভাব নেই। কয়েকটি স্থানে বিরোধী দলের কর্মীদের ওপর হামলা এবং হরতাল-সমর্থকদের বাড়াবাড়িও পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। হরতালের আগের রাতে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা জনমনে ব্যাপক ভীতি সঞ্চার করেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। যে বা যারাই এ অপকর্ম করুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। বিএনপি হরতালকে সফল বলে দাবি করে জনগণের প্রতি যে অভিনন্দনবার্তা পাঠিয়েছে, তাতেও নতুনত্ব কিছু নেই। প্রতিবারই হরতাল সফল করার জন্য বিরোধী দল এবং প্রত্যাখ্যান করার জন্য সরকার জনগণকে সাধুবাদ জানিয়ে থাকে। কিন্তু জনজীবনের সমস্যা নিয়ে আদৌ তারা বিচলিত বলে মনে হয় না।
হরতাল-অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক রাজনীতি দেশের কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। বর্তমান বিরোধী দল যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনো আমরা হরতালের বিরোধিতা করেছি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় হরতালই প্রতিবাদের একমাত্র ভাষা নয়। হরতালে কোনো সরকারের পতন হয় না বরং এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ ও জনগণ। এমনকি এর মাধ্যমে হরতাল পালনকারীদেরও কোনো লাভ হয় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জ্বালাও-পোড়াও করে জনসমর্থন বাড়ানো যায় না। সরকার কোনো অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিলে তার প্রতিবাদ জানানোর উপযুক্ত স্থান হলো সংসদ। তা ছাড়া সভা-সমাবেশের মাধ্যমেও জনগণকে সজাগ করা যেতে পারে। রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের চেয়ে জনগণের সমস্যা নিয়ে তাঁদের বোঝাতে পারলে যে জনসমর্থন পাওয়া যায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনই তার প্রমাণ।
বিরোধী দল জনজীবনের সমস্যা সমাধানে যেসব দাবি সামনে নিয়ে এসেছে তার যৌক্তিকতা নেই, সে কথা বলব না। তবে তা পূরণের স্থান নিশ্চয়ই রাজপথ নয়। তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রচার চালাতে পারে। কিন্তু সেটি কোনোভাবেই ধ্বংসাত্মক হতে পারে না। বর্তমানে বাজেট অধিবেশন চলছে। বিরোধী দলের কর্তব্য হবে, সংসদে গিয়ে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে জনজীবনের প্রাত্যহিক সমস্যাগুলো তুলে ধরা। অন্যদিকে সরকারেরও উচিত হবে, শক্তি প্রয়োগের বদলে বিরোধী দলের ন্যায়সংগত দাবিদাওয়া আমলে নিয়ে সুস্থ রাজনৈতিক স্থিতি ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। দলীয় অহমিকা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সরকার ও বিরোধী দল দেশ ও জনগণের কল্যাণে একযোগে কাজ করবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

চীনের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী উ গুয়ানজং আর নেই

চীনের আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম জনক উ গুয়ানজং শুক্রবার মধ্যরাতে বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তাঁর অনেক চিত্রকর্ম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
উ হচ্ছেন চীনের ইতিহাসে প্রথম চিত্রশিল্পী জীবদ্দশায় যাঁর চিত্রকর্ম ব্রিটিশ জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাঁর ওপর দিয়ে অনেক ঝড়ঝাপটা গেছে। পশ্চিমা চিত্রকলার সঙ্গে দেশীয় চিত্রকলার সংযোগ ঘটিয়ে তিনি নতুন ধারার এক শিল্পের সূচনা করেছিলেন।
চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, মৃত্যুর আগে উ তাঁর পাঁচটি বিখ্যাত শিল্পকর্ম হংকং মিউজিয়াম অব আর্টকে দান করে গেছেন।

নতুন কমান্ডার আফগান যুদ্ধনীতিতে পরিবর্তন আনবেন না

ন্যাটো জোটের নতুন কমান্ডার আফগান যুদ্ধের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনাবেন না বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইকে এ নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, পূর্ববর্তী কমান্ডার জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টালের নীতির কারণে আফগানিস্তানে বেসামরিক লোকজনের হতাহতের সংখ্যা কমেছে। তাই এই নীতি নতুন কমান্ডার জেনারেল ডেভিড পেট্রাউসের সময়েও অব্যাহত রাখা হবে।
এদিকে পদচ্যুত হওয়ার আগে সাবেক কমান্ডার ম্যাকক্রিস্টাল আফগান যুদ্ধ নিয়ে বিতর্কিত এক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি বলেছেন, আগামী ছয় মাসেও আফগান যুদ্ধের কোনো উন্নতি আসবে না। লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী পত্রিকা ইন্ডিপেন্ডেন্ট গতকাল রোববার এ কথা জানিয়েছে।
আফগানিস্তানে গত শনিবার পাঁচ বিদেশি সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে রাস্তার পাশে পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে এক মার্কিন সেনাসদস্যসহ দুজন মারা গেছেন। পূর্বাঞ্চলে বোমা হামলায় মারা গেছেন আরও দুজন। তাঁদের মধ্যেও একজন মার্কিন সেনা রয়েছেন। এ নিয়ে চলতি মাসে এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানে নিহত বিদেশি সেনাসদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯। গত নয় বছরের মধ্যে এক মাসে এত বেশি বিদেশি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। নিহত সেনাদের মধ্যে ৫২ জনই যুক্তরাষ্ট্রের।
আফগান প্রেসিডেন্ট কারজাই সব সময় বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির এড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো না গেলে তালেবানের বিরুদ্ধে ন্যাটো জোটের চলমান অভিযানে সফলতা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তাঁর প্রশাসনের সমালোচনা করায় ম্যাকক্রিস্টালকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পদচ্যুত হওয়ার আগে আফগান যুদ্ধ নিয়ে ম্যাকক্রিস্টাল ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন। সেখানে ম্যাকক্রিস্টাল বলেন, পরবর্তী ছয় মাসে আফগান যুদ্ধের কোনো পরিবর্তন হবে না। ফাঁস হওয়া সামরিক নথিপত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিপেন্ডেন্ট এ কথা জানিয়েছে। এ মাসের গোড়া দিকে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পত্রিকাটি ম্যাকক্রিস্টালের বরাত দিয়ে জানায়, বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান বাধার মুখে আফগানিস্তানের দুর্নীতি ও নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। স্থিতিশীল আফগানিস্তানের জন্য দুর্নীতি দমন এবং সেখানে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাচ্ছে না। তাদের মান উন্নয়নের জন্য জরুরি সরঞ্জাম দরকার। দেশের ওপর আফগান সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আটক ইসরায়েলি সেনার মুক্তির দাবিতে পরিবারের মিছিল

হামাসের হাতে বন্দী ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিতকে মুক্ত করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য তাঁর পরিবারের সদস্যরা গতকাল রোববার থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেছেন। তাঁদের এ মিছিল চলবে টানা ১২ দিন। এ সময় তাঁরা লেবানন সীমান্তের কাছে মিজেপ হিলা থেকে রাজধানী জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হবেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাসভবনের কাছেও অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন। তাঁদের এ মিছিলে হাজার হাজার সাধারণ ইসরায়েলিও যোগ দিয়েছে।
গাজা নিয়ন্ত্রণকারী জঙ্গি সংগঠন হামাস ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিতকে আটক করে চার বছর আগে। তাঁকে মুক্ত করার জন্য ইসরায়েল হামাসের সঙ্গে অনেক দেন-দরবার করলেও কাজ হয়নি। তাঁর মুক্তির বিনিময়ে হামাস ইসরায়েলের হাতে বন্দী শত শত হামাস নেতা-কর্মীর মুক্তি দাবি করে আসছে। কিন্তু ইসরায়েল ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করায় শালিত এখনো বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। এ অবস্থার অবসানের জন্য শালিতের বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যরা গতকাল তাঁদের নিজ শহর মিজেপ হিলা থেকে রাজধানী অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আরও দুই হাজার ইসরায়েলি। ফলে মিছিলটি বিশাল আকার ধারণ করে।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা ‘শালিত এখনো জীবিত, শালিতকে মুক্ত করার সময় এসেছে’ ইত্যাদি স্লোগান লেখা ব্যানার বহন করে। ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মিছিলটি আগামী ১২ দিনের মধ্যে রাজধানী জেরুজালেমে পৌঁছাবে।
মিছিলে অংশ নেওয়া গিলাদ শালিতের বাবা নোয়াম শালিত জানান, শালিতকে না নিয়ে তিনি ঘরে ফিরবেন না।

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ইস্তফা

ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় গতকাল রোববার পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। জানা গেছে, মন্ত্রী হিসেবে প্রচণ্ড কাজের চাপে থাকায় রাজ্যে দলীয় কাজে প্রয়োজনীয় সময় দিতে না পারার জন্য প্রণব মুখোপাধ্যায় ইস্তফার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ইস্তফাপত্র গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন রাজ্য বিধান সভায় কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের নেতা মানস ভূঁইয়াকে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারের পৌর নির্বাচনে কংগ্রেসের ব্যাপক পরাজয়ের হার মেনে নিতে না পেরেই প্রণব মুখোপাধ্যায় এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

গিনিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনিতে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৫৮ সালে স্বাধীনতালাভের পর দেশটিতে সামরিক ও বেসামরিক স্বৈরশাসন জারি ছিল। সর্বশেষ সামরিক শাসক সেক্যুবা কোনাতের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গতকাল রোববার এ নির্বাচন হয়।
কর্মকর্তারা বলেছেন, সারা দেশে ভোটকেন্দ্র ছিল আট হাজার ২৬১টি। প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা একজন নারীসহ মোট ২৪ জন। তবে শীর্ষস্থানীয় তিন প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন সেল্লু দালেইন ও সিদইয়া তৌরি এবং সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা আলফা কন্ডি।
সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, তিন দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
জেনারেল সেক্যুবা কোনাতে ভোটারদের যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।

ইউরোপের অর্থনৈতিক নীতির কঠোর সমালোচনা

বিক্ষোভ সমাবেশে ভাঙচুর, গ্রেপ্তার ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে জি-২০ সম্মেলনের প্রথম দিন শেষ হয়েছে। বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ১৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্মেলনে সদস্যদেশগুলোর নেতারা প্রথম দিনেই ইউরোপের অর্থনৈতিক নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠার উপায় নিয়েও আলোচনা করেন তাঁরা।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ উন্নত দেশের নেতারা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় পরিচালন ব্যয় ও বাজেট কমানো এবং বিক্রয় কর বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
টরন্টো শহরের মেট্রো কনভেনশন সেন্টারে গত শনিবার রাতে বিশ্বের বিকাশমান অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংগঠন জি-২০ সম্মেলন শুরু হয়।
সম্মেলনকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরিবেশ রক্ষা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক অস্থিরতা রোধ, বেকারত্ব ঠেকানোসহ বিভিন্ন দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভ সমাবেশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ অংশ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিক্ষোভকারীদের কালো হেলমেট ও কালো কাপড়ে মাথা ঢেকে পুলিশের ওপর হামলা চালাতে দেখা যায়। তারা নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে ইউনিভার্সিটি এভুসু ও কলেজ সড়কের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসে ছোড়ে। রাবার বুলেটে একজন ফটোসাংবাদিক গুরুতর আহত হন। একজন বিদেশি সংবাদিক অভিযোগ করেন, পুলিশ তাঁর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাঁকে পরিচয়পত্র দেখাতে বলে।
কিং ও বে স্ট্রিট এলাকায় বেলা তিনটার দিকে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের তিনটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই গাড়ি তিনটি পুড়ে যায়। শনিবার টরন্টোর রেলওয়ে জংশন ইউনিয়ট পুরোপুরি বন্ধ ছিল। সিএন টাওয়ার এলাকা থেকে শুরু করে কিং কুইন্স স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, ইয়াং স্ট্রিট ও ইউনিভার্সিটি সড়কে দিনভর বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের লাঠিপেটা ও রাবার বুলেটে শতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হয়।
টরন্টোর পুলিশপ্রধান বিল ব্লেয়ার বলেন, ‘টরন্টো শহরের ইতিহাসে বিক্ষোভ ঠেকাতে এই প্রথম পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে হয়েছে। এমন বিক্ষোভের ঘটনা আমরা কখনো দেখেনি।’ পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ১৫০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কানাডার জননিরাপত্তামন্ত্রী ভিক টোয়েস বলেন, ‘আমরা বিশ্বনেতা ও সম্মেলনের প্রতিনিধিদের নিরপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। বর্তমান পরিস্থিতি কানাডার জনগণের জন্য দুঃখজনক।’
বিক্ষোভকারীদের এতটা সহিংস হয়ে ওঠার কারণ হিসেবে গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা জানান, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত সম্মেলনের চেয়ে এবারের সম্মেলনে কানাডা ৫১ গুণ অর্থ বেশি খরচ করেছে। সম্মেলনের নিরাপত্তায় ৯০ কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছে। অথচ বর্তমানে কানাডায় বেকারত্বের হার নয় শতাংশ।
সম্মেলনে ব্রাজিলের অর্থমন্ত্রী গুইদো ম্যানতেগা ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলো বাজেট কমালে তাতে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হবে। এতে ব্রাজিল, চীন, ভারতসহ বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্নয়নশীল বিশ্ব ও বিকাশমান অর্থনীতির দেশের নেতারা তাঁর কথা সমর্থন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ঘাটতি মোকাবিলায় বেশ কিছু কঠোর কর্মসূচি নেওয়ায় মন্দা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে। এখন ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেন, ‘আমাদের মত বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোতে সম্প্রতি সৃষ্টি হওয়া আর্থিক ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। ঘাটতি মোকাবিলায় আমাদের জাতীয় ব্যয় কমাতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সবারই একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।’
সম্প্রতি গ্রিসের আর্থিক ধসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইউরোপীয় নেতারা বলেন, কেবল বাজেট কমিয়ে তারা আর্থিক সংকট মোকাবিলা করে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মকর্তারা বলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রস্তাবকে তাঁরা স্বাগত জানান। কিন্তু তা আয়কর বৃদ্ধি না করে বিক্রয় কর বাড়ানোর মাধ্যমে করা যেতে পারে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার বলেন, উন্নত দেশগুলোকে তিন বছরের মধ্যে তাদের ঘাটতি অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে কর্মসংস্থানের। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গর্ভপাতের জন্য সরকার কোনো অর্থ ব্যয় করবে না। হার্পার ইরাক-উত্তর কোরিয়ার উচ্চাভিলাষী পারমাণবিক নীতির সমালোচনা করেন।

‘এমভি এজিয়ান গ্লোরি’ ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে

পশ্চিমবঙ্গে গত শুক্রবার আটক হওয়া জাহাজ ‘এমভি এজিয়ান গ্লোরি’ ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। জাহাজটি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর হওয়ায় কোনো তল্লাশি ছাড়াই তা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। কলকাতা বন্দর থেকে এটি পাকিস্তানে যাওয়ার কথা।
বেআইনি অস্ত্র ও গোলাবারুদ আছে সন্দেহে ভারতীয় নৌবাহিনী জাহাজটি পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্রসীমা থেকে আটক করে। গতকাল রোববার দুপুরে তা কলকাতা বন্দরে নেওয়া হয়। এর আগে জাহাজের ক্যাপ্টেন অস্ত্র ও গোলাবারুদের কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে পুলিশ জাহাজে তল্লাশি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, জাহাজটিতে শান্তিরক্ষী বাহিনীর সরঞ্জাম রয়েছে। নথিপত্রের সঙ্গে জাহাজের সরঞ্জামের গরমিল থাকায় চিঠিতে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। এতে আরও জানানো হয়, জাহাজের কন্টেইনারে যে অস্ত্র এবং গোলাবারুদ রয়েছে তা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে যোগ দেওয়া পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপালের সেনাবাহিনীর। এতে কোনো অবৈধ অস্ত্র নেই। অন্যদিকে, লাইবেরিয়া সরকারও ভারতকে চিঠি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, জাহাজটি লাইবেরিয়া থেকে পাকিস্তানের উদ্দেশে ছেড়ে আসে।
জাহাজটি আটকের পর এর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ভারত সরকার নিউইয়র্কের জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যোগাযোগ করে। তাদের চিঠি পেয়ে জাহাজে তল্লাশি থেকে বিরত হয় ভারত সরকার।
পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে কলকাতা বন্দরে নেপালের কন্টেইনার খালাসের পর জাহাজটি যথারীতি পাকিস্তানের করাচি বন্দরে যাবে।

জনবহুল অস্ট্রেলিয়া চান না গিলার্ড

অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড জনবহুল অস্ট্রেলিয়া নীতিতে বিশ্বাসী নন। তিনি সরকারের জনসংখ্যা বাড়ানোর নীতিতে পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গিলার্ড বলেছেন, প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য জনসংখ্যা নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, ‘বড় অস্ট্রেলিয়ায় আমি বিশ্বাসী নই।’
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীজুলিয়া গিলার্ড গতকাল রোববার নাইন নেটওয়ার্ককে এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘কেভিন রাড জনবহুল অস্ট্রেলিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আমি তাঁর সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করি। আমরা টেকসই অস্ট্রেলিয়া চাই।’
অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে দুই কোটি ২০ লাখ লোক রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড জন্মহার ও অভিবাসন বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০৫০ সাল নাগাদ এই জনসংখ্যা তিন কোটি ৬০ লাখে উন্নীত করার আশা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু গিলার্ড বলেন, এভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় পানি ও খাদ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে।
গিলার্ড বলেন, ‘সাড়ে তিন কোটি বা চার কোটি লোকে আমি বিশ্বাসী নই। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে সিডনি, মেলবোর্ন অথবা কুইন্সল্যান্ডে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করলে তিনি আপনার দিকে চেয়ে থাকবেন এবং বলবেন, এসব লোক যাবেটা কোথায়?’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের একটা টেকসই অস্ট্রেলিয়া দরকার। যেটা হবে আমাদের অভয়ারণ্য, আমাদের বাড়ি।’
তবে অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দক্ষ অভিবাসী এখনো প্রয়োজন। শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এখনো অব্যাহত রাখবে ক্যানবেরা। আমি চাই না দক্ষ জনবলের অভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাক। কিন্তু এটাও চাই না—অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায় ২৫ শতাংশ লোক বেকার থাকুক।’
রক্ষণশীল বিরোধী শিবির প্রধানমন্ত্রী গিলার্ডের জনসংখ্যা নীতির সমালোচনা করে বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর এ নীতি টেকসই জনসংখ্যার পরিপন্থী। তবে যাঁরা বলছেন, বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ অস্ট্রেলিয়াতে নেই, তাঁরা নতুন প্রধানমন্ত্রীর নীতির প্রশংসা করেছেন।
ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতা কেলভিন থম্পসন বলেছেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ অস্ট্রেলিয়ানদের কল্যাণের কথা ভাবছেন। তিনি বলেন, জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ অস্ট্রেলিয়ানরা খাদ্য ও পানিসংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। আবাসন সংকট, কার্বন নিগর্মন ও ক্রমবর্ধমান যানজট সমস্যা নিয়ে তাঁরা চিন্তিত। নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান ও বন্য জীবজন্তুর নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত বৃহস্পতিবার শপথ নেন জুলিয়া গিলার্ড।

আরামিটের ৬৫% লভ্যাংশ অনুমোদন

আরামিট লিমিটেড ২০০৯ সালের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৬৫ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে বোনাস শেয়ারে ৫০ ও নগদ ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের একটি হোটেলে গত শনিবার অনুষ্ঠিত কোম্পানির ৩৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায় এ লভ্যাংশ অনুমেদান করা হয়।
কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় অন্যান্যের মধ্যে পরিচালক মো. রেজাউল করিম, মো. ইফতিখার-উজ-জামান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, আরামিট লিমিটেড ২০০৯ সালে ১০ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার করপূর্ব নিট মুনাফা এবং আট কোটি ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকার কর-পরবর্তী নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এই মুনাফা আগের বছরের তুলনায় যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৫২ ও ১৬ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি।
আলোচ্য ২০০৯ সালে কোম্পানি আমদানি শুল্ক, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বাবদ জাতীয় কোষাগারে ১২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা প্রদান করেছে।

লালপুর চিনিকলে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই

নাটোরের লালপুর উপজেলার নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কো-জেনারেশন বা সহ-উৎপাদন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে ২৫০ কোটি টাকা লাভ হবে বলে সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, এই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা এবং এটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে প্রায় দুই বছর। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তা দেশে কিছুটা হলেও বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এবং অতিরিক্ত কর্মসংস্থান ও মৌসুমি শ্রমিকদের জন্য সারা বছর কাজের সুযোগ সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের জন্য ২০০৭ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রধানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এই দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিনিধিদলটি সম্প্রতি প্রাথমিক জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার (বিএসএফআইসি) একটি প্রতিনিধিদল নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কো-জেনারেশন প্লান্ট স্থাপনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার জন্য লালপুর আসে। বিএসএফআইসির পরিচালক (উৎপাদন ও প্রকৌশল) মো. আবুল কাশেমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলটিতে ছিলেন সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল হক, প্রধান রসায়নবিদ লোকমান হোসেন, প্রধান তড়িৎ প্রকৌশলী জোতিশময় বড়ুয়া ও প্রধান পূরপ্রকৌশলী ইনতাজ আলী। এ সময় মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজুল হক, সিবিএ সভাপতি খন্দকার শহিদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার কামালসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মো. আবুল কাশেম স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানান, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কো-জেনারেশন বা সহ-উৎপাদন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের সব দিক ইতিবাচক রয়েছে। এখানে তিনটি টারবাইনের পাওয়ার প্লান্ট স্থাপিত হলে প্রতিদিন নয় মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এর মধ্যে ২ দশমিক ৫ থেকে তিন মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এই চিনিকলে ব্যবহূত হবে। অবশিষ্ট ছয় থেকে সাড়ে ছয় মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লালপুর, বাগাতিপাড়া, বাঘা ও চারঘাট উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডেও কিছু পরিমাণে দেওয়া সম্ভব হবে।
আবুল কাশেম আরও জানান, এই প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আখ মাড়াই মৌসুমে আখের ছোবড়া ও কয়লা এবং অন্য সময় কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে এখানে প্রতিদিন ৭৩৫ মেট্রিক টন সাদা চিনি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। বর্তমানে এই চিনিকলে মাড়াই মৌসুমে গড়ে ১২০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদিত হয়।
চিনিকলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজুল হক বলেন, এখানে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের সব সুবিধা ও সুষ্ঠু পরিবেশ রয়েছে।
চিনিকল শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি খন্দকার শহিদুল ইসলাম প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।

রংপুর ফাউন্ড্রির ২০.৫% লভ্যাংশ অনুমোদন

রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেডের (আরএফএল) ৩০তম বার্ষিক সাধারণ সভা সম্প্রতি ঢাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কোম্পানির ২০০৯ সালের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২০.৫% লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়।
কোম্পানির চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) মাহতাব উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান খান চৌধুরী, পরিচালক মে. জে. (অব.) আমজাদ খান চৌধুরী, উজমা চৌধুরী, রথীন্দ্র নাথ পাল, চৌধুরী আতিয়ুর রাসুল, চৌধুরী কামরুজ্জামান, শিবেন কুমার নাহা, কোম্পানি সচিব মো. আবু কাউসারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বাজারে ঝুঁকিপূর্ণ ‘মূল্য সংশোধন’

গত শনিবার মৌলভীবাজারে সরবরাহের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় সুপার পাম তেল বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ দুই হাজার ৬৩০ টাকা দরে। দুই সপ্তাহ আগে দর ছিল দুই হাজার ৪৭০ টাকা। আর দুই মাস আগে এই দর ছিল দুই হাজার ৩০০ টাকার নিচে। তার মানে দাম ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমতির দিকে। এ বছর ৮ এপ্রিল বেঞ্চমার্ক কুয়ালালামপুর কমোডিটি এক্সচেঞ্জে প্রতি টন অশোধিত পাম ওলিনের দর দুই হাজার ৬০০ রিঙ্গিত ছুঁই ছুঁই ছিল। প্রায় দেড় মাস পরে ২৪ মে দাম কমে হয় দুই হাজার ৪৮০ রিঙ্গিত। আর গত সপ্তাহে তা দুই হাজার ৪০০ রিঙ্গিতের নিচে নেমে গেছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকায় সয়াবিনের মজুদও ভালো, উৎপাদনের পূূর্বাভাসও ইতিবাচক। তাহলে বাংলাদেশে কেন ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে?
বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে দামটি সংশোধন হয়েছে। যাঁরা স্বাভাবিক মুনাফার ব্যবসা করতে চান, তাঁদের জন্য সুপার পামের মণপ্রতি দুই হাজার ৬০০ টাকা পাইকারি দর এখন স্বাভাবিক। এর ওপর দর উঠলে তা হবে নিকটবর্তী আমদানিমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক মুনাফা।
তবে কি ভোক্তা এতদিন অস্বাভাবিক কম দামে তেল খেয়েছেন? আর এবার অস্বাভাবিক বেশি মূল্য দিয়ে মাশুল গুণবেন?
খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের পাইকারেরাও গোলক ধাঁধায়। তাঁরা বলছেন, গত ১২ মাসের বাজারে অন্তত ছয় মাসই ভোজ্যতেলের পাইকারিমূল্য আমদানিমূল্যের চেয়ে কমে বিক্রি হয়েছে। বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের ৯৫ শতাংশ চাহিদাই মেটে আমদানি করা পাম তেল ও সয়াবিন দিয়ে।
অস্বাভাবিক লোকসান বা অস্বাভাবিক লাভের খেলাটা আমদানিকারকই খেলবেন। হয়েছেও তাই।
বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করেন, একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ কখনো আমদানিমূল্যের চেয়ে কম দামে তেল ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্যরা আমদানি কমিয়ে দিচ্ছেন। এতে যখনই সরবরাহ ঘাটতি হচ্ছে তখন দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা মাসে গড়ে সাড়ে তিন লাখ মণ। পাইকারি দাম গড়ে ১৫০ টাকা কম থাকলে লোকসান মাসে সাড়ে ৫২ কোটি টাকা, সাড়ে ৩৫০ টাকা কম থাকলে শত কোটি ছাড়িয়ে যায়।
দুই মাস আগেও প্রতি টন ৮০০ ডলারে (৫৬ হাজার টাকায়) সামান্য বেশি দিয়ে অশোধিত পাম তেল আমদানি করা হয়। অথচ এরপরই সুপার পাম বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ দুই হাজার ৩০০ টাকারও কমে। সরল হিসাবেই লোকসান ৩০০ টাকা।
চিনির বাজারেও এমন খেলা চলেছে। পরিবহন খরচের হিসাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তেল ও চিনির পাইকারি দরে স্বাভাবিক পার্থক্য মণপ্রতি যথাক্রমে ২০ থেকে ৩০ টাকা। গত কয়েক মাসের অনেক সময়ই পার্থক্য ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতার কারণে ডেলিভারি অর্ডারে (ডিও) সরবরাহের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় তেল ও চিনির দামের পার্থক্যও ১০০ টাকার বেশি থেকেছে কয়েক মাস ধরে। স্বাভাবিক বাজারে এটি বড়জোর ২০-৩০ টাকা।
আমদানি করা তেল, চিনি ও গমের বাজারে এই অবস্থা বছর পাঁচেক ধরেই। অনেক পাইকার কাঁড়ি কাঁড়ি কামাচ্ছেন ঘন ঘন মূল্য বৃদ্ধিতে। আবার গদি ছেড়ে পালাচ্ছেন দ্রুত মূল্যপতনের পর।
মূলত শত কোটি টাকা অস্বাভাবিক লাভ বা লোকসানের খেলায় মত্ত কিছু বড় আমদানিকারক।
দেশে প্রতিবছর কম-বেশি ৩০ লাখ টন গম এবং ১২ থেকে ১৪ লাখ টন করে চিনি ও ভোজ্যতেলের বার্ষিক আমদানি ব্যয় কম করে হলেও ২০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এখানে শত কোটির খেলা মামুলি বটে। তার পরও এ খেলাই বাজার অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করায়।
খাদ্যপণ্য আমদানির বাজারে অর্থায়ন করতে এখন বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। ব্যাংকিং সূত্রগুলো বলছে, অনেক আমদানিকারকের বিভিন্ন হিসাবে শত কোটি টাকার মন্দ ঋণ জমে যাচ্ছে। তার পরও ব্যবসা সচল দেখিয়ে তারা আরও ঋণ নিচ্ছেন।
এসব মন্দ ঋণ কি একসময় দেশে ঋণ সংকট ডেকে আনবে সেই পশ্চিমা বিশ্বের ঋণ সংকটের মতো, যা ছিল বিশ্বমন্দার সূতিকাগার?
তারচেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সরকার কি এসব অস্বাভাবিক মুনাফা ও লোকসানের খবর রাখেন?
কিছুদিন অস্বাভাবিকভাবে দাম কম থাকা আবার দাম বাড়ার একটি প্রস্তুতিপর্ব মাত্র। এটিই প্রমাণ হলো, গত দুই সপ্তাহে তেলের দাম আবার বাড়াতে। স্বল্প মেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম অনুসরণ করে লাভ বা লোকসান হবে—এটি স্বাভাবিক।
কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে উদ্দেশ্যমূলক আর অসুস্থ প্রতিযোগিতা একপর্যায়ে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকট ডেকে আনবে—যার চরম মাশুল গুণবে ভোক্তা।

কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা এবারও অর্জিত হচ্ছে না

কৃষিঋণ বিতরণের বার্ষিক যে লক্ষ্যমাত্রা চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা আর অর্জিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৬ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। তাই বছর শেষে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না।
তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও শেষ পর্যন্ত মোট কৃষিঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার বেশ কাছাকাছি থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১১ হাজার ৫১২ কোটি ৩০ লাখ টাকার সমপরিমাণ কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করে।
আর অর্থবছরের জুলাই-মে সময় পর্যন্ত ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে নয় হাজার ৮৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার সমপরিমাণ কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে। আর গত অর্থবছরের একই সময়ে বিতরণ করা হয়েছিল আট হাজার ৩৫০ কোটি ১০ লাখ টাকা। ফলে কৃষিঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১৮ শতাংশ।
তবে চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে বিতরণকৃত কৃষিঋণের পরিমাণ গত ২০০৮-০৯ অর্থবছরের মোট বিতরণকৃত ঋণের তুলনায় বেশি।
গত অর্থবছরে মোট নয় হাজার ২৮৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল নয় হাজার ৩৭৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছর কৃষিঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি গিয়েছিল।
২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে ১২ হাজার কোটি টাকা।
কৃষিঋণ বিতরণ জোরদার করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এ বছর নানা ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দেশের কিছু স্থানে নিজে উপস্থিত থেকে সরাসরি কৃষকদের ঋণ প্রদান করেছেন। তিনি সরাসরি মোবাইল ফোনে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে ঋণের অবস্থাও তদারক করেছেন।
এবার ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওকে এ কাজে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। প্রতি মাসেই ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ বিতরণের তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠানোর আরেকটি সিদ্ধান্ত সেপ্টেম্বর মাস থেকে কার্যকর করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে শুধু ২০০৭-০৮ অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছিল। এ বছর আট হাজার ৩০৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বছর শেষে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় আট হাজার ৫৮০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে আরও দেখা যায়, আলোচ্য সময়কালে ব্যাংকগুলো বকেয়া ঋণ বাবদ মোট নয় হাজার ৪১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার কৃষিঋণ আদায় করেছে।
অন্যদিকে গত অর্থবছরের ১২ মাসে ব্যাংকগুলো মোট আট হাজার ৩৭৭ কোটি ৬২ লাখ টাকার কৃষিঋণ আদায় করেছিল।
কৃষিঋণ বিতরণের পাশাপাশি কৃষিঋণ আদায় বাড়ায় তা একদিকে নিট কৃষিঋণ বিতরণকে কমিয়ে দিলেও এটি আবার পরবর্তী সময়ে কৃষিঋণ বিতরণ অব্যাহত রাখতে ব্যাংকগুলোর জন্য সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে

ল্যান লাইন পুড়ে ডিএসইতে লেনদেন বিঘ্নিত

মতিঝিলে ইস্পাহানি বিল্ডিংয়ের সামনে আজ সোমবার ভোর ছয়টার দিকে বিদ্যুৎ লাইনে আগুন লেগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ল্যান লাইন পুড়ে যায়। আগুনে লাইনটির ৫০ গজের মতো অংশ বা তার পুড়ে যায়।
এর ফলে বেলা ১১টায় লেনদেন শুরু হলে ওই এলাকার ৫০টি ব্রোকারেজ হাউস তাতে অংশ নিতে পারেনি। পরে ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ডায়ালাপের মাধ্যমে লেনদেন শুরু করলেও বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ১৪টি প্রতিষ্ঠান লেনদেন শুরু করতে পারেনি।
এখন ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ বা ডেসা পুড়ে যাওয়া বিদ্যুৎ লাইন মেরামতের কাজ করছে। দুপুর নাগাদ সব প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নিতে পারবে বলে ডিএসই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে

দেশদ্রোহী লা ভোলপে

দুজনেরই বিশ্বকাপ ছোঁয়ার ইতিহাস আছে। ১৯৭৮ সালে অতিরিক্ত গোলরক্ষক হিসেবে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলে ছিলেন রিকার্ডো লা ভোলপে। আর ১৯৮৬ সালে অধিনায়ক হিসেবেই বিশ্বকাপ জিতেছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা।
গত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কাছে হারের পরই লা ভোলপে ছেড়ে দিয়েছেন মেক্সিকো কোচের চাকরি। তা না হলে গত রাতে ম্যারাডোনার মুখোমুখি হয়ে যেতে হতো তাঁকে। কিন্তু ডাগ-আউটে মুখোমুখি না হলে কী হবে, দুই আর্জেন্টাইন কথার লড়াই দিব্যি করছেন!
কাল রাতে আর্জেন্টিনা-মেক্সিকো ম্যাচের আগে লা ভোলপে আশা করছিলেন, মেক্সিকো এবার আর্জেন্টিনাকে থামাতে পারবে। আর এই কথা শুনে ভীষণ চটেছেন ম্যারাডোনা।
লা ভোলপে মেক্সিকোর চাকরি করতেন, তিনি মেক্সিকোর শুভকামনা করতেই পারেন। কিন্তু ম্যারাডোনার রাগ, সাবেক গোলরক্ষক কেন মাতৃভূমির বিপক্ষে কথা বলবেন, ‘আমি খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছি। আরও শ্রদ্ধার সঙ্গে কথাটা বলতে পারতেন তিনি। যে দেশ আপনাকে খাইয়েছে-পরিয়েছে, তাদের বিপক্ষে যাওয়া তো ঠিক না। এটা এক ধরনের দেশদ্রোহ। তিনি সীমা অতিক্রম করেছেন। হ্যাঁ, মেক্সিকো তাঁকে পয়সাওয়ালা বানিয়েছে, তিনি ওদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতেই পারেন। তার পরও এমন কথা বলা ঠিক না।’

‘পেলে’র ছেলে ও এক গোলমেশিন

আবেদি পেলের বুকটা কি পরশু আরেকটু চওড়া হয়ে গেল? গর্ব করার মতো কীর্তি তাঁর নিজেরই অনেক আছে। ঘানার তো বটেই, সর্বকালের সেরা আফ্রিকান ফুটবলারদের একজন তিনি। আফ্রিকার বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছেন রেকর্ড তিনবার। ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁকে ডাকা হতো আফ্রিকার পেলে নামে। নামটা এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় যে খেতাবি নামের আড়ালে হারিয়ে যায় তাঁর আসল নামটি। আবেদি আইয়ু নন, তাঁকে চেনে সবাই আবেদি পেলে নামে।
তবে ছেলে যদি কোনো দিক থেকে ছাড়িয়ে যান বাবাকে, তাহলে সবচেয়ে বেশি গর্ব তো বাবারই হওয়ার কথা। ফুটবলার আবেদিকে ছোঁয়া এখনো অনেক দূরের পথ। তবে ঘানার বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেয়েই একটা দিক থেকে আবেদিকে ছাড়িয়ে গেছেন তাঁর দুই ছেলে আন্দ্রে আইয়ু ও আবদুর রহিম আইয়ু। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে কখনো বিশ্বকাপ খেলা হয়নি আবেদির, ঘানা প্রথম বিশ্বকাপ খেলল তো তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার আট বছর পর! বাবার আক্ষেপ ঘুচিয়েছেন ছেলেরা। ২২ বছর বয়সী রহিমের এখনো বিশ্বকাপে মাঠে নামা হয়নি, তবে প্রতিটি ম্যাচেই খেলেছেন দু বছরের ছোট আন্দ্রে। খেলেছেনও ভালো, তবে আলোটুকু কেড়ে নিয়েছেন জিয়ান-পান্টসিল-মেনশারা।
অবশেষে নিজেকে আলাদাভাবে চেনালেন পরশু। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ড, জিতলেই ছোঁয়া হবে ইতিহাস, গ্যালারিতে বাবার উপস্থিতি—নিজেকে মেলে ধরার জন্য এর চেয়ে বড় উপলক্ষ আর কী হতে পারে! আন্দ্রে তাই খেললেন জীবনের সেরা খেলা। গোল তিনি পাননি, তবে ম্যাচ-সেরা হয়েছেন ঠিকই। ঘানাকে জয় এনে দেওয়া আসামোয়া জিয়ানের গোলটি এসেছে তাঁর অসাধারণ পাসেই। আন্দ্রে আজ ঘানা দলে খেলছেনও তো বাবার জন্যই। জন্ম, বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে বলে প্রথমে ভেবেছিলেন ‘লা ব্লু’দের হয়েই খেলবেন। পরে বাবার জন্যই বেছে নিয়েছেন ঘানাকে। আবেদির আরেক ছেলে জর্ডান আইয়ুও ফুটবল খেলছেন। এখনো জাতীয় দলে খেলা হয়নি, ১৮ বছর বয়সী স্ট্রাইকার এখন খেলছেন ফ্রেঞ্চ ক্লাব মার্শেইতে। আন্দ্রের জন্য অবশ্য হতাশার খবর আছে একটি, টানা দু ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখায় কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে পারবেন না তিনি।
উরুগুয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা ডিয়েগো ফোরলান ও লুইস সুয়ারেজের স্ট্রাইকিং জুটি। প্রথম দুই ম্যাচে সেরা হয়েছিলেন ফোরলান, ওই দুই ম্যাচে আবার অনেকটাই নিষ্প্রভ ছিলেন সুয়ারেজ। তবে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ পরের দুটি ম্যাচেই সেরা হলেন সুয়ারেজ। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাঁর গোলেই মেক্সিকোকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনাকে এড়িয়েছে উরুগুয়ে। পরশু তাঁর দুই গোলেই দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের শেষ আটে উঠেছে দুবারের চ্যাম্পিয়নরা। আয়াক্স আমস্টারডামের হয়ে ৯৭ ম্যাচে ৭৪ গোল করে ‘গোলমেশিন’ উপাধি পেয়ে যাওয়া সুয়ারেজ এখন হিগুয়েইন-ভিতেক-ভিয়াদের সঙ্গী সোনার জুতোর লড়াইয়ে।

চিলি ছাড় দেবে না ব্রাজিলকে

শেষ ষোলোর লড়াই আরও জমে উঠল বলে। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট দলগুলো নামছে মাঠে। চিলি-ব্রাজিল ম্যাচটা হবে দেখার মতো। কারণ দুই লাতিন দেশ মুখোমুখি হচ্ছে এই ম্যাচে। ব্রাজিল সব সময়ই ফেবারিট। আর স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচেও চিলি দেখিয়ে দিয়েছে, তারা কতটা লড়াকু।
দ্বিতীয় রাউন্ডে আসার পথে চোখ ধাঁধানো ফুটবল খেলেছে চিলি। ওদের দশ নম্বর, জর্জ ভালদিভিয়া খুবই প্রতিভাবান। দুই উইঙ্গার বোশেজো আর সানচেজ ঝটপট উঠে যায় আক্রমণে। ‘এল লোকো’ বিয়েলসা এই দলটাকেও গড়ে তুলেছেন তাঁর মতো আক্রমণাত্মক মেজাজ দিয়ে। গ্রুপ অব ডেথের বৈতরণী পেরিয়ে এসেছে দুঙ্গার ব্রাজিল। এর মূল কৃতিত্ব আমি দেব ওদের রক্ষণভাগকে, যেটি আমার দেখা টুর্নামেন্টের সেরা রক্ষণ। দলনায়ক লুসিও এই জায়গাতেও নেতৃত্ব দিচ্ছে, যেখানে আছে মাইকনের মতো খেলোয়াড়। ডান পাশ দিয়ে দ্রুত আক্রমণে উঠে যাওয়ার লাইসেন্স আছে মাইকনের হাতে।
মাঝমাঠে জিলবার্তো সিলভা, ফেলিপ মেলো এবং সম্ভবত এলানো যোগ দেবে দলের আক্রমণ তৈরিতে। আক্রমণভাগে থাকবে রবিনহো, লুইস ফ্যাবিয়ানো আর কাকা। অদম্য এক আক্রমণভাগ। তবে ব্রাজিল সহজে পার পাবে না। চিলি দেখিয়ে দিয়েছে তারা রোমাঞ্চপ্রিয় এবং ভয়ংকর। অবশ্য যতক্ষণ না হামবার্তো সুয়াজো জাল খুঁজে পাচ্ছে, আমার ধারণা, চিলির প্রতি-আক্রমণ আর গতি আটকে দেওয়ার ক্ষমতা ব্রাজিলের ডিফেন্সের আছে। আক্রমণ আর রক্ষণ দুই জায়গাতেই তিনজন করে খেলাচ্ছে ব্রাজিল। মূল লড়াইটা হবে কাকা-রবিনহো-ফ্যাবিয়ানো বনাম চিলির জারা-পনচি-মেদেলের মধ্যে। ব্রাজিল ফেবারিট, তবে চমকে দিতে পারে চিলিও।
চোখ ধাঁধানো যদি নাও হয় অন্তত খাদহীন ফুটবল খেলে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে এসেছে হল্যান্ড। প্রতিপক্ষের ওপর অনায়াসে ছড়ি ঘুরিয়েছে ওরা। আরিয়েন রোবেনের ফিরে আসাও দলের জন্য বোনাস।
স্লোভাকিয়া দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে এসেছে ইতালির মতো দলকে ৩-২ গোলে হারিয়ে। সেই চমকের পুনরাবৃত্তি করতে হলে আবারও একই রকম দুর্দান্ত ফুটবল তাদের খেলতে হবে। হল্যান্ড কোচ ফন মারউইক দেখলাম ৪-২-৩-১ ছকে খেলাচ্ছেন। সুদৃঢ় এবং অভিজ্ঞ এক রক্ষণ আছে তাঁর। দুজন হোল্ডিং মিডফিল্ডার ফন বোমেল আর ডি জং; কিউট, স্নাইডার, ফন ডার ভার্ট, রোবেন এবং ফন পার্সি নামগুলো বলে দেয় ওদের আক্রমণ কত ধারালো।
স্লোভাকিয়ার সেরা খেলোয়াড় রবার্ট ভিতেক। মাঝমাঠে আছে অধিনায়ক হামসিক। রক্ষণের নেতৃত্বে স্কার্টেল। স্লোভাকিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, ওরা খেলবে কোনো ধরনের ভয়ডর ছাড়া। এটা ওদের ভালো খেলতে সাহায্য করবে। সাহায্য করবে ডাচদের ঝামেলায় ফেলতে। অবশ্য ব্যক্তিগত নৈপুণ্য তুলনা করলে হল্যান্ডের পাল্লাটা ভারী হবে। বিশেষ করে আক্রমণে ফন পার্সি, রোবেন আর স্নাইডার থাকায় এই ম্যাচে ওদেরই ফেবারিট মনে হচ্ছে আমার।
টুর্নামেন্টের আসল চমক আসলে জাপান। ওরা ডেনমার্ক আর ক্যামেরুনকে হারিয়েছে। ডাচদেরও ঘাম ছুটিয়ে ছেড়েছে। মাৎসুই আর ওকুবোর খেলা আমার খুব ভালো লেগেছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে কেইসুকে হোন্ডার খেলা। ওর ফ্রি-কিক, নেতৃত্বগুণ এবং নিঃস্বার্থভাবে সতীর্থদের জন্য খেলা বানিয়ে দেওয়া—সব মিলে এই বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ ও। বয়সও মাত্র ২৪। এবারের দলবদলের বাজারে ক্লাবগুলো নিশ্চয় ছেঁকে ধরবে ওকে।
কোচ তাকেশি ওকাদা এমন একটা দল গড়ে তুলেছে যারা বল চালাচালি করে খুব দ্রুত। প্রতিপক্ষের নামের দিকে তাকিয়ে খেলে না। এর চেয়ে মনোযোগ দেয় নিজেদের খেলার দিকেই। জাপানের প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ের খুঁত গ্রুপ পর্বে খুব একটা চোখে পড়েনি। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে মাত্র একটি গোল খেয়ে এসেছে ওরা। আমার চোখে এই ম্যাচটা হবে প্রাণোচ্ছ্বাসে ছুটে চলা জাপানিদের বিপক্ষে সুসংগঠিত এবং মানসিকভাবে দৃঢ় প্যারাগুইয়ানদের লড়াই। হোন্ডার যে ফর্ম, ও আবারও ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। আন্দাজ করে নিতে পেরেছেন নিশ্চয়ই, হ্যাঁ, আমি জাপানিদের আরও একটা অঘটন আশা করছি।

ডাচ-ভরসা ‘ওঁরা চার’

দল ভালো খেলছে, জয় আসছে, তার পরও কোথায় যেন খামতি থেকে যাচ্ছিল। কিসের যেন একটা অপূর্ণতা। সেই শূন্যতা মিটেও ঠিক মিটল না। কারণ দুই ম্যাচের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আরিয়েন রোবেন মাঠে নামলেন ঠিকই, তাঁকে জায়গা দিতে উঠে আসতে হলো রবিন ফন পার্সিকে। হল্যান্ডের ‘চারমূর্তি’কে একসঙ্গে দেখাই যাবে না মাঠে!
মেসি-কাকা-রোনালদোরা আলোর সবটুকু চুরি করে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তারই ফাঁকে হল্যান্ডের ‘ফ্যাবুলাস ফোর’ও কিন্তু ঠিকই আছেন আলোচনায়। রোবেন, ফন পার্সি, ওয়েসলি স্নাইডার আর রাফায়েল ফন ডার ভার্ট...চারজনই ক্লাব ফুটবলের বড় তারকা। ফন পার্সি খেলেন আর্সেনালে, ফন ডার ভার্ট রিয়াল মাদ্রিদে। বায়ার্ন মিউনিখের রোবেন আর ইন্টার মিলানের স্নাইডার তো মুখোমুখিই হলেন গত চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে।
ক্লাব ফুটবলে সবাই সফল একটা ক্যারিয়ারই কাটাচ্ছেন। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে অর্জনের খাতাটা একেবারেই সাদা। বিশ্বকাপ শিরোপা হল্যান্ড তো এখন পর্যন্ত জেতেইনি, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের একমাত্র শিরোপাটিও এসেছে ১৯৮৮ সালে। রোবেনরা কি পারবেন এই ইতিহাস পাল্টে দিতে?
মুখে বাগাড়ম্বর নেই। হ্যান কারেঙ্গা-ত্যান কারেঙ্গা বলে ঢাকও পেটাচ্ছেন না। তবে নিঃশব্দে নিজেদের কাজটা ঠিকই করে চলেছে ডাচরা। ফন পার্সি যেমন বলেই দিয়েছেন, এটাই তাঁদের জন্য কিছু করে দেখানোর সবচেয়ে ভালো সুযোগ, ‘যতই সামনে এগিয়ে যাব, কঠিন থেকে কঠিনতর দলের মুখোমুখিই হতে হবে আমাদের। কিন্তু এই দলের ওপর আস্থা আছে আমার, আমাদের পক্ষে কিছু করে দেখানো সম্ভব। এটাই আমার খেলা সেরা দল।’
কেন সেরা সুযোগ মনে করছেন সেটিরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফন পার্সি, ‘আমাদের সিনিয়র খেলোয়াড়দের বয়স ২৫-২৬। পরের বিশ্বকাপে বয়স হয়ে যাবে ৩০। বয়সটা মন্দ নয়, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এটাই আমাদের সেরা সময়।

সতীর্থদের সতর্ক করলেন জিলবার্তো

দুই দেশের দূরত্ব খুব বেশি নয়। মহাদেশ এক, ফুটবল অঞ্চলও এক ব্রাজিল-চিলির। তবে ফুটবলীয় ইতিহাস আর ঐতিহ্যে দুই দেশের ব্যবধান যোজন যোজন। পাঁচবার বিশ্ব জয় করেছে ব্রাজিল, চিলির ঘরে শূন্য। মুখোমুখি লড়াইয়ে বিস্তর ব্যবধান। এর পরও আজ যখন বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে মুখোমুখি দুই দল, ব্রাজিরের মিডফিল্ডার জিলবার্তো সিলভা সতীর্থদের পরামর্শ দিচ্ছেন সতর্ক থাকতে।
‘আমরা ওদের যেটুকু গুরুত্ব সব সময় দিই, এ ম্যাচের আগে সেটা দ্বিগুণ করা দরকার’—বলেছেন জিলবার্তো সিলভা। কেন, এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি, ‘এটা একেবারে ভিন্ন রকম একটা ম্যাচ। চিলির বিপক্ষে আমাদের রেকর্ড ভালো, কিন্তু এই ম্যাচে ওদের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে।’
স্পেনের বিপক্ষে চিলির ১-২ গোলে হেরে যাওয়া ম্যাচটির উদাহরণ টেনে সিলভা বলেছেন, ‘ওদের যেমনটা দেখেছি তাতে মনে হয়েছে, ওরা কোনো প্রকার ভয় ছাড়াই খেলে। ওদের খেলায় গতিও আছে অনেক। কোনো ভুল করার অবকাশ নেই আমাদের।

দুই গোল-ভরসা

এমনিতে রবিন ফন পার্সির সঙ্গে রবার্ট ভিতেকের কোনো তুলনাই চলে না। ফন পার্সি খেলেন আর্সেনালে, বড় তারকা তিনি। আর ভিতেকের আঙ্কারাগুচু দলের নাম জানা লোক খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। তবে আজ দুজন একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে—গোলের জন্য যাঁর যাঁর দলের বড় ভরসা তাঁরা।
চিত্রকর মা এবং ভাস্কর বাবার ছেলে ফন পার্সি তুলি বা ছেনি হাতে নেননি। বল পায়ে যা করেছেন, তাতেই লোকে তাঁকে ‘শিল্পী’ বলে চেনে। আর্সেনালের ঘরের ছেলে হয়ে যাওয়া ফন পার্সি হল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন ৪৭ ম্যাচ। ওয়েসলি স্নাইডার, আরিয়েন রোবেনদের ভিড়ে এমনিতে হয়তো একটু পিছিয়ে ফন পার্সি। তবে গোল করায় কারও চেয়ে কম নন। হল্যান্ডের এই দলে দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ (১৯টি) গোল তাঁরই।
ফর্মহীনতা আর চোটের কারণে ক্লাবে সর্বশেষ মৌসুমটা ভালো না কাটলেও বিশ্বকাপে এরই মধ্যে আঁচড় কেটেছেন শিল্পিত ফুটবলের। ক্যামেরুনের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে দলকে এগিয়ে দেওয়া গোলটি করেছেন।
এই বিশ্বকাপে গোলের বিবেচনাতেই ফন পার্সিকে ছাড়িয়ে গেছেন ভিতেক। স্লোভাকিয়ার মতো দলের একজন খেলোয়াড়ের নাম এমনিতে লোকেদের জানারই কথা না। কিন্তু বিশ্বকাপে ৩ গোল করে গত পরশু পর্যন্ত সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন হয়ে ছিলেন তিনি।
এর মধ্যে জোড়া গোল করেছেন ইতালির বিপক্ষে। ভিতেকের জোড়া গোলে চারবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালি বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব থেকেই ছিটকে গেছে। আর স্লোভাকিয়া চলে এসেছে দ্বিতীয় পর্বে। ভিতেকের নাম অন্য কেউ ভুললেও ইতালিয়ানরা ভোলার কথা না।

ফাইনালে চোখ ফোরলানদের

আনন্দে কেউ দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে ছুটলেন, কেউ মাঠের মধ্যে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। আবার কারও বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন খেলোয়াড়-কর্মকর্তারা। উল্লাস দেখে মনে হয়, বিশ্বকাপই জিতে ফেলেছেন তাঁরা!
উরুগুয়ের কোচ অস্কার তাবারেজ বিশ্বকাপ জয়ের মতোই আনন্দ করে বললেন, ‘অনেক অনেক সময় লেগে গেল এই অর্জনটা পেতে। এখন আমরা বলতে পারি, আমরা বিশ্বের সেরা আট দলের একটি।’
দু দুটি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস আছে যাদের, আছে আরও দুবার সেমিফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা; সেই উরুগুয়ে কিনা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে এমন ‘অর্জনের’ আনন্দ করছে! পরিসংখ্যান দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। এবারের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার ভেতর দিয়ে নতুন জন্ম হলো উরুগুয়ে ফুটবলের। অস্কার তাবারেজ, ডিয়েগো ফোরলানদের উৎসব এই নবজন্মের উৎসব।
আজকের লাতিন পরাশক্তি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলও যখন বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারেনি, তখনই দুবার বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছে উরুগুয়ে। জিতেছে তারা ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ এবং নিজেদের দ্বিতীয় আগমনে ১৯৫০ বিশ্বকাপ। ১৯৫৪ ও ১৯৭০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলেছে উরুগুয়ে।
ওই ১৯৭০ সালের পর থেকেই শুরু উরুগুয়ে ফুটবলের ‘অন্ধকার যুগ’। এরপর এবারের আগ পর্যন্ত গত ৯টি বিশ্বকাপের পাঁচটিতে বাছাইপর্বই পার হতে পারেনি তারা। এবারও পারত না। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে পঞ্চম হওয়া দলটি শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার টিকিট পেয়েছে কোস্টারিকার বিপক্ষে প্লে-অফ ম্যাচ জিতে।
অথচ সেই দলই বিশ্বকাপে এসে আমূল বদলে গেল! ফ্রান্সের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু করার পর দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকোকে হারাল তারা। জ্বলে উঠলেন ডিয়েগো ফোরলান, লুইস সুয়ারেজের মতো ইউরোপ মাতানো উরুগুয়ে তারকারা। সেই সুয়ারেজের পায়ে ভর করে উরুগুয়ে ৪০ বছর পর আবার শেষ আটে পৌঁছাল। এ তো পুনর্জন্মই!
পুনর্জন্ম উদ্যাপনে কমতি নেই কারও। দলের অন্যতম তারকা ডিয়েগো ফোরলান উদ্যাপনের ঢঙেই বললেন, ‘আমরা খুবই গর্বিত ও খুশি। আমরা সর্বোচ্চ উদ্যাপন করছি, উপভোগ করছি।’
আক্রমণভাগের আরেক সৈনিক এডিনসন কাভানি বলছেন, তাঁদের পরিবার-বন্ধুরাও ভেসে যাচ্ছেন আনন্দে, ‘আমরা সবাই খুব খুশি। আমাদের নিজেদের জন্য, দেশের জন্য অসাধারণ একটা অর্জন করেছি। এই আনন্দটা আমরা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি।’
উৎসব-উদ্যাপনের মধ্যে দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কথাবার্তা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কোচ তাবারেজ শুধু বললেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে দলকে যেমন বলেছেন, তেমন খেলেছে। দক্ষিণ কোরিয়া দ্বিতীয়ার্ধে ভালোভাবে ফিরে এলেও তাঁর ছেলেরা হাল ছাড়েনি।
কিন্তু তাবারেজদের কথায় আর মনে হচ্ছে না যে পেছন ফিরে দেখার সময় তাঁদের আছে। তাবারেজের চোখ এখন সামনে, ‘দেশ থেকে যত টেক্সট ম্যাসেজ এবং ফোন পেয়েছি, তাতেই বুঝতে পারছি দেশের লোকজন কেমন খুশি। আমাদের এই সাফল্য আমাদের ছোট্ট দেশটার জন্য অনেক কিছু। আমরা অনেক দিন ধরে এই কাজটা করতে চাচ্ছিলাম। অবশেষে সেটা হতে শুরু করেছে। এবার আমরা দেশের লোকজনকে আরও উৎসবের উপলক্ষ এনে দিতে চাই।’
সেই উপলক্ষটা কী? কোনো ভয়-ডর না করে, রাখ-ঢাক না করে ডিয়েগো ফোরলান বলে দিলেন, ‘অবশ্যই আমরা এখন ফাইনালে যেতে চাই। আর মাত্র দুটো ম্যাচ দূরে আছি। আমরা কোনো চাপ নিচ্ছি না। ধাপে ধাপে যেতে চাই। সামনে কে এল সেটা কোনো ঘটনা না।’

নকআউট পর্বের ট্র্যাজেডি by মোহীত উল আলম

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচ দেখে জার্মান দার্শনিক ফ্রেডেরিক হেগেলের ট্র্যাজেডির সংজ্ঞা মনে না এসে পারল না। এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ট্র্যাজেডি তখনই ঘটে যখন দুটি ভালো চরিত্র কিংবা আদর্শের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে: ট্র্যাজেডি ইজ দ্য কনফ্লিক্ট অব টু গুডস।’
কালকে (২৬ জুন) প্রথমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো দক্ষিণ কোরিয়া আর উরুগুয়ের মধ্যে। মনের একটা অংশ কোরিয়াকে সমর্থন দিচ্ছিল আর আরেকটি অংশ হেগেলীয় কায়দায় উরুগুয়ের পক্ষ নিচ্ছিল। দক্ষিণ কোরিয়া আমার মহাদেশ এশিয়ার একটি দল, কিন্তু উরুগুয়ে যে ম্যারাডোনার আগে আমার প্রিয় খেলোয়াড় ফ্রান্সিস কোলির দেশ! কী করি? ফোরলান আর সুয়ারেজের চোখজুড়ানো শৈল্পিক ফুটবল উপভোগ করব, নাকি গতিশীল অ্যাক্রোবেটিক স্বমহাদেশীয় দল কোরিয়াকে সমর্থন দেব। মার্ক অ্যান্টনি যেমন রোম ও ক্লিওপেট্রার মধ্যে ক্লিওপেট্রাকে বেছে নিয়েছিলেন, আমিও তেমনই নান্দনিক দল উরুগুয়েকে বেছে নিলাম। কোরিয়া গোল দিয়ে দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় পৌঁঁছালে আমার সত্যি সত্যি খারাপ লাগা শুরু হলো। যা হোক, সুয়ারেজ যখন দ্বিতীয় গোলটিও করে ফেললেন এবং খেলা ওই ২-১ ফলাফলে শেষ হলো, তখন আবার মাঠজুড়ে উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের বিজয়োল্লাসের পাশাপাশি কোরীয়দের কান্না দেখে নিজেরও কান্না পেতে শুরু করল। ভাবলাম, ওরাও তো ভালো খেলেছে। বাদ পড়ার মতো দল তো ওরা নয়! আবার সেই হেগেলীয় দোটানায় ভুগতে ভুগতে একসময় মনে হলো, দ্বিতীয় রাউন্ড যেন নকআউট পর্ব নয়, একটা ফায়ারিং স্কোয়াড। দুটি ভালো দলের একটিকে বিদায় নিতেই হবে।
পরের খেলায় ঘানা পড়ল যুক্তরাষ্ট্রের সামনে। এখন অবশ্য মন আগের মতো দুই ভাগ হলো না, ঘানা একমাত্র আফ্রিকান দেশ যারা এখনো টিকে আছে। স্বভাবতই মন তাদেরই টানল। কিন্তু প্যাভিলিয়নে যে লাল রঙের জ্যাকেট পরে বসে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন! আমি যে কী কারণে ক্লিনটনের ভক্ত, সেটি পাঠককে জানানোর দরকার নেই, কিন্তু তাঁর উপস্থিতির কারণে মনটা আবার হেগেলীয় কায়দায় খানিকটা বিচলিত হয়ে উঠল। কিন্তু ঘানার গোলই প্রথমে এল। করলেন কেভিন প্রিন্স বোয়েটাং, যিনি এফএ কাপের ফাইনালে পোর্টসমাউথের পক্ষে খেলে চেলসির জার্মান মহাতারকা মাইকেল বালাককে খোঁড়া করে দিয়ে বিশ্বকাপ থেকেই আউট করে দেন। জার্মানি যদি এবার দ্বিতীয় রাউন্ড পার হতে না পারে, তাহলে খলনায়ক হিসেবে বিবেচিত হবেন এ বোয়েটাংই, কেননা তিনি ঘানার বংশোদ্ভূত হলেও জার্মানির নাগরিক।
বোয়েটাংয়ের গোলটি খুব সুন্দর। মাঠের বাঁ প্রান্ত দিয়ে প্রতিপক্ষের দুজন খেলোয়াড়কে অবজ্ঞা করে একটা নিচু শট, যেটি অবলীলায় জালে ঢুকে গেল। এরপর ঘানা ল্যানডন ডনোভানের পেনাল্টি খেয়ে ফেললে খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়, কিন্তু এর প্রথম তিন মিনিটের মধ্যেই প্রতিযোগিতার একটি শ্রেষ্ঠ গোল করেন ঘানার আসোমোয়া জিয়ান। বুক দিয়ে ঠেকিয়ে বলটি মাটি ছোঁয়ার আগেই বাঁ পায়ে তাকে উড়িয়ে দিলেন জার্মানির জালে। ইংরেজ ভাষ্যকার সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আ ক্লাসিক স্ট্রাইকারস গোল’।
প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়া মার্কিনদের কান্নার পর্ব শুরু হয়। দেখা গেল, ক্লিনটন নিজেই ডাগ-আউটে চলে গেছেন খেলোয়াড়দের সান্ত্বনা দিতে।
আজকের খেলা (২৭ জুন) আর্জেন্টিনা বনাম মেক্সিকো এবং জার্মানি বনাম ইংল্যান্ড। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে চিন্তা নেই। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে জেতা উচিত তাদের। নকআউটের খাঁড়া অবশ্য যেকোনো দলের ওপরই নেমে আসতে পারে। সব চিন্তা জার্মানি আর ইংল্যান্ডের ম্যাচ নিয়ে। ইংল্যান্ডের কোচ ইতালিয়ান ফ্যাবিও ক্যাপেলো ধরেই নিয়েছেন, ম্যাচ অমীমাংসিত থেকে পেনাল্টি শ্যুট-আউটে গড়াবে। তাই তিনি পাঁচজন টেকারও (স্ট্রাইকার) ঠিক করে ফেলেছেন। কারণ বিশ্বকাপে গত দুই দশকের পেনাল্টি শ্যুট-আউটে ইংল্যান্ডের ইতিহাস খুব খারাপ। তারা আগে জার্মানি, ইতালি ও পর্তুগালের কাছে শ্যুট-আউটে হেরেছে।
পেনাল্টি ঠেকিয়ে খুবই নাম করেছিলেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক সের্জিও গোয়েকোচিয়া। তিনি ১৯৯০-এর ইতালি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দু-দুটি পেনাল্টি রক্ষা করে স্বাগতিক দেশকে আউট করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, পেনাল্টি শ্যুট-আউটকে অনেকে যে ভাগ্য, লটারি বা রাশিয়ান রুলেটের (পিস্তল নিজের মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করার মতো বিপজ্জনক জুয়া খেলা) সঙ্গে তুলনা করেন, সে মতের সঙ্গে তিনি একমত নন। এটি আসলে ইচ্ছাশক্তির যুদ্ধ, গোলরক্ষক এবং টেকারের মধ্যে। জার্মানির বিশ্বখ্যাত সাবেক গোলরক্ষক অলিভার কানও অনেকটা একই রকম কথা বলেছেন। ২০০১ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ভ্যালেন্সিয়ার পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে বলেছেন কান: তখন আমি দর্শক দেখিনি, সহ-খেলোয়াড়দের দেখিনি, দেখিনি প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দেরও, আমি শুধু নিবিষ্টচিত্তে টেকারদের মনোভাব বুঝতে চাইছিলাম। তাদের বুঝতে দিচ্ছিলাম যে মানসিক শক্তিতে আমিই এগিয়ে।’

এবার আর হলো না

আর ফিরে আসা হলো না। ল্যান্ডন ডনোভান, মাইকেল ব্র্যাডলিরা এবার আর ম্যাচে ফেরাতে পারলেন না যুক্তরাষ্ট্রকে। ‘নেভার সে ডাই’—স্লোগান নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে পথ চলতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এবার আর শেষ লড়াকুকে খুঁজে পেল না। আরও একবার দ্বিতীয় পর্ব থেকে ফিরে আসতে হলো ‘নতুন যুগের’ যুক্তরাষ্ট্র দলকে।
এবারের বিশ্বকাপে পেছন থেকে ম্যাচে ফিরে আসাটা অভ্যেসে পরিণত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র দল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক গোলে পিছিয়ে পড়ে ম্যাচ ড্র করেছিল তারা। স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে দুই দুইবার পিছিয়ে পড়ে ম্যাচ ড্র করেছিলেন ডনোভান ও ব্র্যাডলি। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আলজেরিয়াকে হারিয়েছিল তারা ডনোভানের ইনজুরি সময়ের গোলে।
ঘানার বিপক্ষেও একবার ম্যাচে ফিরিয়েছিলেন ডনোভান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় আর ফেরা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ে কোচ খেলোয়াড়দের আফসোসের বড়টাই এই ফিরতে না পারা নিয়ে।
অবশ্য বারবার এমন কেন পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফিরতে হবে, এটা নিয়েই একটু বিরক্ত কোচ বব ব্র্যাডলি, ‘ঘটনা হচ্ছে আমরা আবারও শুরুতেই একটা গোল খেয়ে বসেছিলাম। ম্যাচে ফেরাটা তাই খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। ১-১ করতেই আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়ে। সমতায় ফিরতে গিয়েই তো আমাদের শক্তি শেষ।’
ব্র্যাডলির মতে, এবার বিশ্বকাপে যা হওয়ার হয়ে গেছে, কিন্তু এখন থেকেই তাদের শুরুতে পিছিয়ে পড়ার ব্যাপারটা নিয়ে সতর্ক হতে হবে, ‘অবশ্যই এই বিষয়টা নিয়ে সতর্ক হওয়া দরকার। আমরা সমস্যাটা চিহ্নিত করতে পেরেছি। কিন্তু সমস্যা নিয়ে আলোচনা করলেই তো সমাধান হয় না! এটা আমাদের জন্য ভালো একটা শিক্ষা হলো। আশা করি, এরপর এই উন্নতিটা করতে পারব।’
আগের ম্যাচগুলোর কথা বাদ। ঘানার বিপক্ষে এই ম্যাচটায় পিছিয়ে পড়ার জন্য নিজেকে দোষ দিচ্ছেন ডিফেন্ডার রিকার্ডো ক্লার্ক। ক্লার্কের ভুলেই ম্যাচের শুরুর দিকে তাঁর কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে গোল করতে পেরেছেন কেভিন-প্রিন্স বোয়েটাং।
ক্লার্ক বলছেন, ‘এটা অবশ্যই আমার ভালো কোনো পারফরম্যান্স না। আমার একটা ব্যর্থতায়ই কাউন্টার অ্যাটাকে এই গোলটা হয়ে গেল। আমার মতো অভিজ্ঞ একজন খেলোয়াড়ের এই ভুল করা উচিত হয়নি। আমি এই গোলের পুরো দায় নিচ্ছি।’
অবশ্য ক্লার্ককে দায় দিতে নারাজ ডনোভান। তিনি বলছেন, এটা আসলে সবার সম্মিলিত দায়, ‘আমরা সবাই মিলে এই দায়টা নিচ্ছি। ফুটবলে এ রকম নিষ্ঠুর ঘটনা কখনো কখনো ঘটে। এক মুহূর্তে আপনি বিশ্বের সেরা থাকবেন, পরের মুহূর্তেই পাতালে চলে যাবেন। তবে সবকিছুর পরও আমি দলের পারফরম্যান্সে গর্ব বোধ করছি।’
হ্যাঁ, এই কথাটার সঙ্গে কোচ ব্র্যাডলি একমত। দলের পারফরম্যান্স নিয়ে তিনিও সন্তুষ্ট। ব্র্যাডলি মনে করছেন, দল যা খেলেছে, তাতে আরও সামনে যাওয়া উচিত ছিল, ‘আমাদের অবশ্যই আরও সামনে যাওয়ার মতো যোগ্যতা ছিল।

সেই বোয়েটাং

তিনি কিছু করুন আর নাই করুন আলোচনায় থাকতেন। বিশ্বকাপে এক মিনিটের জন্য মাঠে নামতে না পারলেও আলোচনায় থাকতেন কেভিন-প্রিন্স বোয়েটাং। ঘানার লোকদের কাছে নয়, আলোচ্য ছিলেন তিনি জার্মানদের কাছে।
কিন্তু নেতিবাচক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকাটা পছন্দ করলেন না বোয়েটাং। সেন্ট্রাল ডিফেন্স থেকে উঠে এসে তাই ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটা করে ফেললেন। অসাধারণ এই গোল করে ভূমিকা রাখলেন দ্বিতীয় পর্বে ঘানার জয়ে। দেশটির ইতিহাসে ঢুকে গেলেন বোয়েটাং। এবার যদি তাঁর পরিচয়টা বদলায়।
জার্মানিতে জন্ম নেওয়া বোয়েটাং তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন হার্থা বার্লিনের হয়ে। ২০০৭ সাল থেকে খেলছেন ইংলিশ লিগে। কিন্তু ঘানাইয়ান বাবার সুবাদে খেলেন তিনি ঘানার হয়ে। এই জার্মান-ঘানার দ্বৈত নাগরিকত্বই সংকটে ফেলে দিয়েছে তাঁকে।
বড় সংকটটা তৈরি হলো এফএ কাপের ফাইনালে। পোর্টসমাউথের ডিফেন্ডার বোয়েটাং ট্যাকল করলেন চেলসির মিডফিল্ডার বালাককে। সেই ট্যাকলের ধাক্কায় পা ভেঙে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেলেন বালাক।
সবাই বলল, ঘানা-জার্মানি যেহেতু একই গ্রুপের দল, তাই বালাককে ইচ্ছে করে ফাউল করেছেন বোয়েটাং। এই নিয়ে কত আলোচনা। এই চাপ পড়ল জার্মানিতে থাকা বোয়েটাং পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপরও। এই চাপে সম্পর্ক ছিন্ন হলো তাঁর জার্মান দলে থাকা ভাই জেরোম বোয়েটাংয়ের সঙ্গে।
এত সব মিলিয়ে কিছু না করেও এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম উচ্চারিত নাম বোয়েটাং। নামটা থেকেই যেত। অন্তত ২০১০ বিশ্বকাপ ও বালাক প্রসঙ্গ উঠলেই তাঁর নাম আসত। এখনো আসবে। তবে ঘানার ফুটবলের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলেই তাঁর নাম উচ্চারণ করতে হবে।

ইতিহাসের পথে

আবারও সেই দৃশ্য। পতাকা হাতে পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করছেন ঘানার ফুটবলাররা, দেশের পতাকার আবরণে যেটা আসলে পুরো মহাদেশেরই পতাকা। এই বিশ্বকাপে প্রতিটি জয়কেই তারা বলছে আফ্রিকার জয়, তাদের টিম বাসের নাম দিয়েছে, ‘হোপ অব আফ্রিকা’। টানা দ্বিতীয়বার একমাত্র আফ্রিকান দেশ হিসেবে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল ঘানা। কিন্তু আফ্রিকার বিশ্বকাপে ‘হোপ অব আফ্রিকা’র কি আর স্রেফ দ্বিতীয় রাউন্ডে খেললেই চলে! ঘানা তাই ছুঁয়ে ফেলল বিশ্বকাপে আফ্রিকার সেরা সাফল্য, কোয়ার্টার ফাইনাল। হাতছানি এবার শেষ চারে উঠে নতুন ইতিহাস গড়ার। স্বপ্নযাত্রায় ‘ব্ল্যাক স্টার’দের সামনে এবার বাধা উরুগুয়ে, জোহানেসবার্গের সকার সিটিতে দু দল মুখোমুখি হবে ২ জুলাই।
১৯৭৪ সালে সেই সময়ের জায়ারেকে দিয়ে (এখনকার কঙ্গো) আফ্রিকার বিশ্বকাপ-যাত্রা শুরু। সেই থেকে দশটি বিশ্বকাপে আফ্রিকার সেরা সাফল্য দুবার কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও রুমানিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল ক্যামেরুন, এরপর বেলজিয়ামকে হারিয়ে কোয়ার্টারে। সেখানে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নির্ধারিত সময়ে ২-২ গোলে ড্রয়ের পর ‘অদম্য সিংহ’দের থামিয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে গ্যারি লিনেকারের পেনাল্টি গোল। ২০০২ বিশ্বকাপে ওই কীর্তির পুনরাবৃত্তি হলো প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা সেনেগালের হাতে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে শুরু, এরপর ডেনমার্ক ও উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করে দ্বিতীয় রাউন্ড। সেখানে সুইডেনকে হারানোর পর কোয়ার্টারে তাদের থামাল তুরস্ক। এবার ঘানা পারবে তাদের ছাড়িয়ে যেতে?
আফ্রিকার ইতিহাসে আফ্রিকার নতুন ইতিহাস তারা গড়তে পারবেন—এই স্বপ্ন দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচ-সেরা আন্দ্রে আইয়ু, ‘আমরা স্বপ্নে লাগাম পরাচ্ছি না। আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ফুটবলে সবই সম্ভব। লড়াই চালিয়ে গেলে আমরা আরও বড় কিছু পাব।’ ঘানার কিংবদন্তি ফুটবলার আবেদি পেলের ছেলে আইয়ু স্বপ্ন পূরণের রসদ হিসেবে দেখছেন পুরো আফ্রিকার সমর্থনকে, ‘আমরা অনুভব করি পুরো মহাদেশ আমাদের সঙ্গে আছে। এটাই আমাদের সব বাধা ভেঙে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করছে। আর কোনো আফ্রিকান দেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পারেনি বলে আমরা কিছুটা হতাশ, পুরো মহাদেশকেই গর্বিত করার দায়িত্ব তাই আমাদের।’ দলের ডিফেন্ডার জন পান্টসিল বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না—আমরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছি! এখন আমরা নতুন ইতিহাসের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।

ব্যতিক্রম সুইজারল্যান্ড

দল হেরেছে তো কোচ সরেছেন—এমনটাই দেখা গিয়েছিল অতীতে। এমনকি এবারের বিশ্বকাপেও ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে সরে পড়েছেন গ্রিস ও ক্যামেরুনের কোচ। সুইজারল্যান্ডই শুধু উল্টোপথের যাত্রী হলো। বিশ্বকাপে বাজে পারফরম্যান্সের পরও সুইস ফুটবল ভরসা রাখছে কোচ ওটমার হিজফেল্ডের ওপরই। সে দেশের ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, ২০১২-এর জুলাই পর্যন্ত কোচ ওটমার তাদের সঙ্গেই থাকছেন। গত বছরের আগস্টে সুইস ফেডারেশনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন এই জার্মান। বিশ্বকাপে দলের শেষ ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে বসেছিলেন তিনি। তখন জার্মানির বিভিন্ন ক্লাব থেকে ডাক আসার পরও সুইস দলের সঙ্গে থাকবেন কি না—এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে বলেছিলেন, ‘সুইজারল্যান্ডের মানুষ যদি আমাকে আবার চায়, অবশ্যই থাকব।’

শেষ আটে আর্জেন্টিনা

২৫ মিনিটে পরিষ্কার অফসাইড লাইন্সম্যানের চোখ এড়িয়ে যাওয়া আর ৩২ মিনিটে গঞ্জালো হিগুয়েইনকে দেওয়া মেক্সিকোর ডিফেন্ডার রিকার্ডো ওসোরিওর ‘উপহার’— মারাত্মক দুটি ভুলই নির্ধারণ করে দিল ম্যাচের গতিপথ। দ্বিতীয়ার্ধে দু দলই গোল করেছে একটি করে। কিন্তু প্রথমার্ধের ওই দুটি ভুল দারুণভাবে কাজে লাগানো আর্জেন্টিনা জিতল ৩-১ গোলে। আর টানা পঞ্চমবারের মতো মেক্সিকোর বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হলো দ্বিতীয় রাউন্ডে। ৩ জুলাই কেপটাউনে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ জার্মানি।
আর্জেন্টিনার প্রথম গোলটি হয়েছে লাইন্সম্যানের ভুলে। মেসির পাস ধরে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন তেভেজ। মেক্সিকোর গোলরক্ষক অস্কার পেরেজ ছুটে এসে ডাইভ দিয়ে বল ফেরালেও ফিরতি বল ধরে মেসি আবারও পাস দেন তেভেজকে। হেডে বল জালে জড়ান তেভেজ। টিভি রিপ্লেতে দেখা গেল, পরিষ্কার অফসাইডে ছিলেন তেভেজ। রেফারি-লাইন্সম্যানের কাছে গোল বাতিলের দাবি জানান মেক্সিকানরা। কিন্তু গোলটি বাতিল করেননি রেফারি।
সাত মিনিট পর ওসোরিও নিজেদের বক্সের সামনে থেকে সতীর্থকে পাস দিতে গিয়ে বল দিয়ে ফেলেন হিগুয়েইনের পায়ে। চিতার ক্ষিপ্রতায় বল ধরে এগিয়ে গিয়ে গোলকিপারকে কাটিয়ে বল জালে জড়ান হিগুয়েইন। চার গোল নিয়ে ‘এল পিপিতা’ এখন এককভাবে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৫১ মিনিটে অসাধারণ এক গোল করে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করে দেন তেভেজ। ৭০ মিনিটে মেক্সিকোর সান্ত্বনার গোলটি করেছেন হার্নান্দেজ।

মেসি গোল না পাওয়ার কারণ ‘ফাউল’

মেক্সিকোকে গোল-বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়ার ম্যাচেও গোল পেলেন না লিওনেল মেসি। তবে বরাবরের মতো স্বরূপে উজ্জ্বল ছিলেন আর্জেন্টিনার এই প্রাণভোমরা। কিন্তু দলের হয়ে সেরা পারফরম্যান্স করেও কেন গোল পাচ্ছে না মেসি? এ প্রশ্নের উত্তর আপনি আপনার মতো করে ভাবতে থাকুন। দলের সেরা অস্ত্রের গোল না পাওয়ার কারণটা এরই মধ্যে বের করে ফেলেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। আর্জেন্টিনার এই কোচের অভিযোগ, প্রতিপক্ষের ফুটবলারদের একের পর এক ‘ফাউলের’ কারণেই গোলের দেখা পাচ্ছেন না মেসি।
গ্রুপ পর্বে খেলেছেন দুর্দান্ত। পারফরম্যান্সের তুলনা করলে, আর্জেন্টিনার কোনো ফুটবলার তাঁর ধারে-কাছেও নেই। তাঁর কারণেই অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে ডিয়েগো ম্যারাডোনার দল। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যতটি গোল পেয়েছে তার প্রায় সব কটির পেছনেই সিংহ ভাগ অবদান মেসির। কিন্তু যাঁকে ঘিরে আর্জেন্টিনার এত সফলতা, তিনি গোল না পেলে তো সমর্থকদের আক্ষেপ একটু থাকবেই। গতকাল সে আক্ষেপের অবসান ঘটতে গিয়েও ঘটেনি।
মেসি চতুর্থ ম্যাচেও গোল না পাওয়ায় ম্যারাডোনা সরাসরি দায়ী করছেন মেক্সিকোর ফুটবলারদের। ক্ষুব্ধ আর্জেন্টিনার এই কোচ বলছেন, ‘এটা অনৈতিক। বলের দিকে লক্ষ্যই ছিল না তাদের। পরিকল্পিতভাবে কখনো মেসির ডান পা, কখনো বাঁ পায়ে আঘাত করে গেছে তারা।’ ম্যারাডোনার অভিযোগের তীর থেকে রেহাই পাচ্ছেন না মাঠে দায়িত্ব পালন করা রেফারিরাও। তিনি বলছেন, ‘মেক্সিকোর ফুটবলাররা ভয়ংকরভাবে মেসিকে আক্রমণ করে গেছে। কিন্তু রেফারিরা কিছুই বলেননি। রেফারিদের প্রশ্রয়েই আরও বেশি আঘাত করার সাহস পেয়েছে তারা।’

অনিশ্চয়তার মুখে ফ্যাবিও ক্যাপেলো

ইংল্যান্ডের কোচের দায়িত্ব নিয়েই দলকে সফলতার মুখ দেখিয়েছিলেন ফ্যাবিও ক্যাপেলো। যে দলটি ২০০৮ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপেই খেলার সুযোগ পায়নি, তাদের বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে এনে দিয়েছিলেন আশাজাগানিয়া ফলাফল। ইংল্যান্ড বাছাই পর্বের ১০টি ম্যাচের নয়টিতেই জয় পেয়েছিল অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে। ক্যাপেলোর অধীনে ২৭টি ম্যাচের ১৯টিতেই জয় তুলে নেয় ইংলিশরা। বিশ্বকাপের আগে তাই ইংল্যান্ডকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল প্রত্যাশার ফানুস। সেই ফানুস চুপসে গেল কাল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে জার্মানির কাছে বিধ্বস্ত হয়ে। ৪৪ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা ইংল্যান্ড দল দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়ে কাঁদাল লাখো-কোটি দেশবাসীকে।
বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডের এমন লজ্জাজনক বিদায়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে কোচ হিসেবে ক্যাপেলোর চাকরি। অবশ্য এর আগে ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছিল, ক্যাপেলো ২০১২ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের কোচের দায়িত্ব পালন করবেন। তবে ক্যাপেলো নিজেই যে বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর তাঁর চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন, তা বোঝা যাচ্ছে তাঁর কথাবার্তাতেই। তিনি বলেছেন, ‘আমি এফএর সভাপতির সঙ্গে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করব। আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলে বুঝব, আমার ওপর তাঁদের আস্থা রয়েছে কি না।’ তবে ক্যাপেলো এ কথা বলতে ভোলেননি যে, নিজে থেকে তিনি পদত্যাগ করবেন না।
জার্মানির বিপক্ষে লজ্জাজনকভাবে ৪-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারার পর ক্যাপেলো এখন তাঁর কৈফিয়তের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন রেফারির ভুল সিদ্ধান্তকে। ৩৮ মিনিটের মাথায় ফ্রাংক ল্যাম্পার্ডের শট গোললাইন অতিক্রম করলেও রেফারির ভুলে গোল পায়নি ইংল্যান্ড। আর এটাই খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে দাবি ক্যাপেলোর, ‘এই গোলটা পেলে ২-২ গোলে সমতা ফেরাতে পারতাম আমরা। খেলার ধরনটাও তখন অন্য রকম হতো।’ কিন্তু ব্যর্থতার সব দায়ভারই কি রেফারির ওপর চাপিয়ে দিতে পারবেন ক্যাপেলো?

হল্যান্ডের বিপক্ষে নির্ভার স্লোভাক কোচ

বিশ্বকাপে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রথমবারের মতো খেলতে এসেই দ্বিতীয় রাউন্ডে চলে এসেছে স্লোভাকিয়া। এই যাত্রায় দেশটি বধ করেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে। দর্শকেরাও একবাক্যে স্বীকার করছেন, ইতালির বিপক্ষে স্লোভাকিয়া যা খেলেছে, তা দ্বিতীয় রাউন্ডেও অব্যাহত রাখতে পারলে অনেক দূর যাবে দলটি। এই ‘অনেক দূরে যাওয়া’র স্বপ্ন নিয়ে আজ সন্ধ্যায় হল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছে ভ্লাদিমির ভেইসের ছেলেরা।
হল্যান্ডের তুলনায় স্লোভাকিয়ার শক্তির তুলনামূলক বিচারে স্লোভাকরা বেশ পিছিয়েই থাকছে। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে অপেক্ষাকৃত স্বল্প শক্তির দলগুলোর সামনে বড় দলগুলোর মুখ থুবড়ে পড়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে স্লোভাকরা আত্মবিশ্বাসী হতেই পারে। ফন পার্সি, বোমেল, হেইটিঙ্গা, রোবেনদের নিয়ে গড়া ডাচ দলের বিপক্ষে ভালো খেলতে স্লোভাকদের শক্তি জোগাচ্ছে ইতালির বিপক্ষে সেই ম্যাচটিই।
স্লোভাকিয়ার জাতীয় গণমাধ্যমেই নাকি নিজেদের জাতীয় দলের দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠাটাকে ‘অঘটন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদনেই লেখা হয়েছে, ‘আমাদের জাতীয় দল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেই আমাদের গর্বিত করেছে। তাদের কাছ থেকে দেশবাসীর আর কিছুই চাওয়ার নেই। বিশ্বকাপে যে দলগুলো খেলতে আসে, তাদের মূল মাথা ব্যথা থাকে দেশবাসীর অতিরিক্ত প্রত্যাশা নিয়েই। অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপেই দলগুলো ভেঙে পড়ে, কার্যকর পারফরম্যান্সে ব্যর্থ হয়। আজকের ম্যাচে স্লোভাকিয়ার প্রতিপক্ষ হল্যান্ডের কথাই ধরা যাক। হল্যান্ড দলটিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবেই দেখতে বেশি আগ্রহী সে দেশের গণমাধ্যম। দলের প্রতিটি ম্যাচকেই নাকি মাইক্রোস্কোপের নিচে নিয়ে গবেষণায় বসছে ডাচ মিডিয়া। স্লোভাক কোচ নিজেও মনে করেন, ‘আজকের ম্যাচে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, দেশবাসীর প্রত্যাশাহীনতা। দেশে কেউই ভাবেনি, আমরা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলব। তাই আমাদের পারফরম্যান্সে দেশবাসী সন্তুষ্ট। তাই আজকের ম্যাচটি উত্কণ্ঠা নয়, আনন্দ নিয়েই উপভোগ করবে স্লোভাকিয়ার মানুষ। আমরাও নির্ভার হয়েই হল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামতে পারব।’
প্রতিপক্ষ হল্যান্ড সম্পর্কে ভেইসের অভিমত, হল্যান্ড খুবই ভালো দল। দলটিতে কয়েকজন বিশ্বসেরা খেলোয়াড় রয়েছে। এর পরই নিজ দলের সম্ভাবনা তিনি বললেন, ‘আজকের ম্যাচে স্লোভাাকিয়া হল্যান্ডকে হারানোর জন্য সর্বশক্তিই প্রয়োগ করবে।’ তিনি বলেন, ‘ইতালির বিপক্ষেও কেউ আমাদের গণনায় ধরেনি। কিন্তু দিনশেষে আমরা ইতালিকে হারিয়ে আমরা নিজেদের প্রমাণ করেছি। আজকের ম্যাচেও আমাদের সেই চেষ্টাই থাকবে।’
ভেইস স্লোভাকিয়ার কয়েকজন খেলোয়াড় নিয়েও উচ্ছ্বাস পোষণ করেছেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মারেক হামসিক। ইতালীয় লিগে ন্যাপোলির হয়ে খেলা এই খেলোয়াড় এবারের সিরি আ-তে ১২ গোল করে তাঁর গোল করার ক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছেন। কোচ ভেইস হামসিককে বিশ্বমানের খেলোয়াড় হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, হল্যান্ডের বিপক্ষে আজকের ম্যাচে হামসিক স্লোভাকিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হতে পারে।
স্লোভাকিয়ার আরেক খেলোয়াড় ভিতেককে নিয়ে আলাদাভাবেই কথা বললেন ভেইস। ইতালির বিপক্ষে দুই গোল করা ভিতেককে স্লোভাকিয়ার অন্যতম তুরুপের তাস বলে মন্তব্য করেছেন ভেইস।

চিলির শত্রু ইতিহাস

দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ‘মধুর’ বললেও ঠিক বোঝা যায় না। সেই উনিশ শতক থেকে ব্রাজিল ও চিলি দুই দেশের গলায় গলায় ভাব। এখনো দক্ষিণ আমেরিকায় নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে হাতে হাত রেখে কাজ করে তারা। একসঙ্গে কাজ করে যুযুধান কোনো গোষ্ঠী বা জাতির মধ্যে শান্তি আনতেও।
অথচ ফুটবল মাঠে নামলেই যেন এই ‘মৈত্রী’র কথা ভুলে যায় ব্রাজিল! ইতিহাসই সাক্ষী দেবে এই কথার। ইতিহাস বেশি দূর খোঁজার দরকারও নেই। গত পাঁচ বছরে দুই দলের সাত সাক্ষাতে সাতবারই হেরেছে চিলি; গোল হজম করেছে ২৬টি!
বিশ্বকাপের কথাই ধরুন। এ পর্যন্ত দুবার ব্রাজিল-চিলি বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছে; দুবারই জিতেছে ব্রাজিল। ১৯৬২ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ৪-২ গোলে এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে ৪-১ গোলে।
এসব হিসাব জানার পর চিলির কি আর আজ খেলতে নামার দরকার আছে? আছে। এই চিলি একটু বদলে যাওয়া দল। এটা ঠিক, এবার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের দুই ম্যাচেই ব্রাজিলের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে তারা। কিন্তু ওই বাছাইপর্বেই ব্রাজিলের চেয়ে মাত্র ১ পয়েন্ট কম নিয়ে তারা দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলে হয়েছে দ্বিতীয়।
সব মিলে গত তিন বছরে চিলি নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করেছে বলা চলে। সেই ‘আবিষ্কার’ করার কৃতিত্বটা মার্সেলো বিয়েলসার। ২০০৭ সালে নড়বড়ে একটা দলের দায়িত্ব নিয়ে তাদের ১২ বছর পর আরেকটা বিশ্বকাপে নিয়ে এসেছেন।
এবার তো তাহলে ইতিহাস ভুলে সামনে তাকাতে পারে চিলি। না, আর কেউ না, খোদ বিয়েলসাই আপত্তি করছেন এ কথায়। ইতিহাস চিলির এতটাই বিপক্ষে যে এই প্রসঙ্গ উঠলেই তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, ‘অতীতে ব্রাজিল যা করেছে, তাতে এটা নিয়ে কথা না-বলাই ভালো। ওরা সব সময়ই ভীতিকর একটা দল। আর এখনকার দলটায় ঐতিহ্যবাহী সব ফুটবলীয় বৈশিষ্ট্য তো আছেই, সঙ্গে যোগ হয়েছে গতি আর খুনে মানসিকতাও।’
তার পরও ‘অসম্ভব’ চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি অন্তত দিলেন বিয়েলসা, ‘আমরা আমাদের পক্ষে যা সম্ভব না, তাও করার চেষ্টা করব। অন্তত আমাদের শেষটা যাতে এত আগে না হয়ে যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে।’
চেষ্টা তো বিয়েলসাকে করতেই হবে। অভিশাপ তাড়ানোর একটা ব্যাপারও যে আছে তাঁর জন্য! ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ‘সেরা’ দল নিয়ে গিয়েও প্রথম পর্ব থেকে ফিরতে হয়েছিল। চিলিকে নিয়ে প্রথম পর্ব পার হয়ে খানিকটা কলঙ্কমোচন হয়েছে। ব্রাজিলকে হারিয়ে দিতে পারলে ২০০২ বিশ্বকাপের ‘ভূত’কে পুরোপুরিই কবর দেওয়া যাবে।