Thursday, January 11, 2018

ওদের জন্য আর কোনও অ্যান্টিবায়োটিক নেই! by উদিসা ইসলাম ও তাসকিনা ইয়াসমিন

৪২ বছর বয়সী রাবেয়া খাতুন (ছদ্মনাম) তীব্র পেটব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান। ওষুধের প্রথম মাত্রা সেবনের পরই গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। সেই জ্বর নামে না টানা দুই দিনেও। আবারও চিকিৎসকের কাছে গেলে রক্ত পরীক্ষায় করে দেখা যায়, তাকে যে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল, সেটি আর তার শরীরে কাজ করছে না। কেবল তাই নয়, অন্য কোনও অ্যান্টবায়োটিকও আর তার শরীরে কাজ করবে না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
২ বছরের ছোট্ট শিশু নেহাল (ছদ্মনাম)। অসুস্থ অনুভব করায় মা-বাবা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসক তাকে বিভিন্ন ওষুধ দিলেও সুস্থ বোধ করছিল না শিশুটি। কয়েকবার ওষুধ বদলানোর পর ধীরে ধীরে নেহাল সুস্থ হতে শুরু করে। কেন এমন হলো, বিষয়টি নিয়ে অনেক পরীক্ষার পর চিকিৎসক জানতে পারেন, নেহালের শরীরে অ্যামোক্সিসিলিন ক্লাভুলানিক এসিড, অ্যামপিসিলিন, সেফাজোলিন এই তিনটি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করেন যারা, তারা বলছেন, মানবদেহে খাদ্যে নানারকমের ভেজাল ও অপরিমিত ওষুধ ব্যবহারের ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে দেশে রোগ প্রতিরোধক বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া হয়ে উঠছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। এগুলো ওষুধ কোম্পানির অপপ্রয়োগ। ফলে ওদের জন্য আর নতুন কোনও অ্যান্টিবায়োটিক নেই।
গত ১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ড্রাগ প্রশাসন বরাবর চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির সদস্য (যুগ্ম সচিব) মো. মাহবুব কবীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার, সঠিক মাত্রায় না খাওয়া, নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক ও খাদ্যের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশের ফলে মানুষের শরীরে দিন দিন অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, মাছ-মাংসের মাধ্যমেও প্রতিনিয়ত মানুষের শরীরে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে।
উল্লেখ্য, ঢাকা শহরের বিভিন্ন ১৫টি বাজার থেকে সংগ্রহ করা মুরগির নমুনা পরীক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিক উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেবল রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ীই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ও সেবন করতে হবে। যদিও রাজধানীর নামি-দামি দুই একটি ফার্মেসি ছাড়া বাকি সব জায়গায় প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি হয় অ্যান্টিবায়োটিক।
প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত দেলোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যে খাবার খাই, সেই খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। যার বেশিরভাগই আমাদের শরীরে ঢোকে। বিশেষ করে মুরগি, গরু ও মাছের মাধ্যমে আমাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক ঢোকে। এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খামারে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।’
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’র সদস্য (যুগ্ম সচিব) মো. মাহবুব কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোয় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয় না। এমনকি ওষুধের দোকানে ভিটামিনও পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের পরিবেশ বা স্বাস্থ্য বিষয়ক পরিকল্পনা যেহেতু অতটা স্ট্রং না, তাই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির নিয়ম সেভাবে মানা হয় না। নিউবর্ন বেবিও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয়ে যাচ্ছে। কারণ, মা এত অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েছেন যে, সন্তানের ওপর এর প্রভাব পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে এটি নিশ্চিত করতে হবে, যেন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না হয়।’
মো. মাহবুব কবীর বলেন, ‘খাদ্য থেকে অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে আসছে। অ্যান্টিবায়োটিক ও হরমোন দু’টিই মুরগিকে খাওয়ানো হচ্ছে। দু’টিই মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এগুলো ওষুধ কোম্পানির অপপ্রয়োগ। দিতেই হবে, এমন প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত নয়। এই বিষয়ে ৬৪টি জেলায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক জেলায় কয়টা মুরগির খামার আছে, মালিকের নাম, মালিকের মোবাইল নম্বর, হাঁস-মুরগির সংখ্যা কত, তাও জানাতে বলা হয়েছে। মাছের মধ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, মার্কারি পাওয়া যাচ্ছে। আমরা সচেতন করতে পারলে খাবারে অ্যান্টিবায়োটিকের পরিমাণ কমে আসবে।’
রোগীর দেহে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারে রোগীর ক্ষতি তো হচ্ছেই, একটি অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করলে, অন্য অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হচ্ছে। এভাবে একসময় দেখা যাচ্ছে, রোগীর জন্য আর কোনও অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘অনেক সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসক না থাকলে ফার্মাসিস্টরাই রোগীকে ওষুধ লিখে দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা রোগীকে যথাযথ মাত্র অনুযায়ী ওষুধ দিতে পারেন না। এর ডিউরেশন ঠিক কতদিন হবে, তাও জানেন না। এক্ষেত্রে রোগীর বেশি ক্ষতি হয়। অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার মাঝপথে বন্ধ করে দিলে রোগীর শরীর অবশ্যই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয়ে যাবে। তার বিপদ বাড়বে।’
এ বিষয়ে অবশ্যই সচেতনতা দরকার উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ডাক্তারদের অবশ্যই রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সময় মাত্রা ও ডিউরেশনের ব্যাপারে সচেতন করে দিতে হবে। দেশের ফার্মেসিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়ার বিকল্প নেই।’ এ ব্যাপারে কঠোর আইন করা দরকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রামে ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে ব্যাংক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামের জালিয়াতির মাধ্যমে এক ব্যক্তিকে ঋণ নিতে সহায়তায় অভিযোগে এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বৃহস্পতিবার কোতোয়ালি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় পূবালী ব্যাংকের চট্টগ্রাম প্রিন্সিপাল অফিসে উপ মহাব্যবস্থাপক পদে কর্মরত মো. নুরুল কবিরকে।

তার আগে বন্দর থানায় ৩ কোটি সাড়ে ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুই ব্যাংক কর্মকর্তাসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

মামলায় পূবালী ব্যাংকের চট্টগ্রাম বন্দর শাথার সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুরে মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপক জাকির হোসেনসহ আরও তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন মোহাম্মদ হোসেন, আনিসুল আলম চৌধুরী, মো. সাহাবউদ্দিন।

মামলার বাদী দুদকের ঢাকা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক বলেন, নুরুল কবির পূবালী ব্যাংকের চট্টগ্রাম বন্দর শাখায় ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত থাকাকালে জাকির হোসেনসহ পরষ্পর যোগসাজসে আসামি মো. হোসেনকে শফিকুল ইসলাম পরিচয় দিয়ে একটি ভূয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে সহায়তা করেন।

“২০০৪ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মোহাম্মদ হোসেনকে ভুয়া আমদানিকারক পরিচয় ও ভুয়া কাগজপত্র জমা নিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ঋণ পেতে সহায়তা করেন।”

দুদক কর্মকর্তা সিরাজুল বলেন, হোসেন ভুয়া কাগজপত্র ও আমদানিকারক পরিচয় দিয়ে নেওয়া ঋণ থেকে কিছু পরিশোধ করলেও আরও তিন কোটি ১৮ লাখ ৫৫ হাজার ৪৯৪ দশমিক ২২ টাকা আসামিরা পরষ্পর যোগসাজশে আত্মসাৎ করেন।

চট্টগ্রামে লরির ধাক্কায় শ্রমিকের মৃত্যু

চট্টগ্রামের একটি কন্টেইনার ডিপোতে লরির ধাক্কায় এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ভোরে সীতাকুণ্ড উপজেলার পোর্টল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোতে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আবুল কালাম (৫০) ছিলেন ওই ডিপোর ফোরম্যান। তার বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে; চট্টগ্রামে তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন ভাটিয়ারি এলাকায়।

তার সহকর্মীদের বরাত দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আলাউদ্দিন তালুকদার জানান, ভোরে ডিপোতে কাজ করার সময় একটি লরির ধাক্কায় গুরুতর আহত হন কালাম।

সহকর্মীরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে এএসআই আলাউদ্দিন জানান।

দেশে আর ১/১১ ঘটানো যাবে না

দেশে আর ১/১১ ঘটানো যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
 
ওবায়দুল কাদের বলেন, ১/১১ থেকে আওয়ামী লীগ শিক্ষা নিয়েছে। দেশে আর ১/১১ আসবে না। তবে ভয় ও শঙ্কা আছে। কারণ, ১/১১ থেকে বিএনপি শিক্ষা নেয়নি। তারা দেশে আবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। 
 
বৃহস্পতিবার  দলের সম্পাদক মণ্ডলীর সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

 এসময় ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, বিএনপি তাদের অবস্থা বুঝে গেছে। নির্বাচনের আগেই সারাদেশে আওয়ামী লীগের জোয়ার দেখে বিএনপি উপলব্ধি করছে; আগামী নির্বাচনে তাদের পরিণতি কী হবে। নির্বাচনে ভোট পাওয়ার মতো কোনো কাজ, কোনো দৃষ্টান্ত তারা দেখাতে পারবে না। এ কারণে তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে। তবে বিএনপির সেই দুরভিসন্ধি বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না।

 মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের ভুল থাকতে পারে, ভুল করতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগ সেটা সংশোধন করে, সুধরানোর চেষ্টা করে। আমাদের দলের কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমাদের দলের এমপির ছেলে, মন্ত্রীর ছেলে আছেন। মন্ত্রী আদালতে হাজিরা দেন। আমাদের ত্রুটি নেই, এ কথা বলবো না। চাঁদেরও তো কলঙ্ক আছে। তাই বলে কী আলো থেমে থাকে? আমাদের অনেক সফলতা আছে। কিছু ত্রুটি দিয়ে আমাদের উন্নয়নকে ঢেকে রাখা যাবে না। সরকারের ৪ বছর পূর্তি নিয়ে ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এরপর দলীয়ভাবে আমরা একটি সংবাদ সম্মেলনে আমরা আমাদের কথাগুলো বলবো।

অভিনেতা সিরাজ হায়দার আর নেই

চলচ্চিত্র অভিনেতা সিরাজ হায়দার আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।  আজ বৃহস্পতিবার ভোর ৬ টায় রাজধানীর কল্যাণপুরের নিজ বাসায় হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান তিনি। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া চেয়েছেন তার সন্তান পরিচালক লেলিন হায়দার। 

দীর্ঘ ৫৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সিরাজ হায়দার। ১৯৬২ সালে নবম শ্রেণীর ছাত্রকালীন সময়ে ১৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় দিবসে টিপু সুলতান নাটকে করিম শাহ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে অভিনয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন এই গুণী অভিনেতা।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অভিনয় করেছেন যাত্রা, মঞ্চ, রেডিও, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে। দেশ স্বাধীন হবার পর চলচ্চিত্রে আবদুল্লাহ আল মামুনের সহকারি হিসেবে জল্লাদের দরবার নামক চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। তার অভিনীত প্রথম  চলচ্চিত্রের নাম ‘সুখের সংসার’। নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত এ চলচ্চিত্রে সিরাজ হায়দার খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। 

মাত্র উনিশ বছর বয়সে মঞ্চ নাটক নির্দেশনা দেন তিনি। ১৯৭৬ সালে তিনি রঙ্গনা নাট্যগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন এবং বেশকিছু নাটকের নির্দেশনা দেন। 

সিরাজ হায়দার দুটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে একটি ‘আদম ব্যাপারী’ যা মুক্তি পায়নি, অন্যটির নাম ‘সুখ’। 
তার মৃত্যুতে চলচ্চিত্র পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ভয়ংকর এই কোন আনুশকা !

গত বছরের শেষে বিয়ের পিঁড়িতে বসে আলোচিত হয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী আনুশকা শর্মা। গত ১১ ডিসেম্বর ক্রিকেটার বিরাট কোহলির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আনুশকা। তারপর স্বামীর সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলেন।

চলতি সপ্তাহে দেশে ফিরেই সিনেমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়েছেন এই অভিনেত্রী। তার হাতে রয়েছে ‘জিরো’, ‘পরী’সহ কয়েকটি সিনেমা। এর মধ্যে পরী ছবিটি নির্মিত হয়েছে আনুশকার প্রযোজনা সংস্থা থেকে। মঙ্গলবার ‘পরী’ সিনেমার টিজার অনলাইনে প্রকাশ হয়েছে।

টিজারে কোনো সুন্দরী পরী নয়, দেখা গেল ভূতুড়ে ও ভয়ংকর আনুশকাকে। সিনেমাটির ১৮ সেকেন্ডের একটি টিজার পোস্ট করেছেন নায়িকা। লিখেছেন,‘সুইট ড্রিমজ বন্ধুরা।’ 

টিজারে ধীরে ধীরে মুখে ফুটে ওঠে আঘাতের ক্ষত। সেখান থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে রক্ত। লাল টাটকা রক্ত। ‘পরী’র চোখও রক্তাভ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, এ ‘পরী’ রূপকথার পরী নয়, কঠিন বাস্তবের। 

আনুশকার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ক্লিন স্লেট ফিল্মস পরী সিনেমাটি নিয়ে আসছে। ছবিতে আনুশকার বিপরীতে দেখা যাবে পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে। টিজার দেখেই বোঝা যাচ্ছে ‘পরী’ একটি ভয়ংকর দৃশ্যের চলচ্চিত্র। 

আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি সিনেমাটি মুক্তি পাবার কথা থাকলেও টিজারে জানানো হয়েছে, ছবি মুক্তির দিন ২ মার্চ। রঙের উৎসব ‘হোলি’র দিন সিনেমাটি মুক্তি দেয়া হবে।

স্থগিত হওয়া রাষ্ট্রীয় তিন ব্যাংকের পরীক্ষা শুক্রবার

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালি, রূপালি ও জনতা ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা নিতে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ ৬ সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছেন চেম্বার বিচারপতি।  ফলে রাষ্ট্রীয় তিন ব্যাংকের পরীক্ষা নিতে আর বাধা থাকলো না। 

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা এক আবেদনের শুনানি নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এ আদেশ দেন।

ফলে রাষ্ট্রীয় তিন ব্যাংকসহ আট ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা ১২ জানুয়ারি নির্ধারিত সময়ে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সদস্যসচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মোশাররফ হোসেন খান।

এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি আজকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েব সাইটে পাওয়া যাবে।

সোনালী ব্যাংক লিমিটেডে ৫২৭টি, জনতা ব্যাংক লিমিটেডে ১৬১টি, রূপালী ব্যাংক লিমিটেডে ২৮৩টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডে ৩৯টি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ৩৫১টি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ২৩১টি, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনে ১টি ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশে (আইসিবি) ৭০টি পদসহ মোট ১৬৬৩ পদের নিয়োগ পরীক্ষা হবে।

গেল  রোববার হাইকোর্ট রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ পরীক্ষাসহ যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ না করতে নির্দেশ দেন।

গেল বছর দেয়া পৃথক বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি জে বি এম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।

রুলে ২০১৭ সালে প্রকাশ করা ওই তিন ব্যাংকের বিভিন্ন পদে নিয়োগসংক্রান্ত ওই বিজ্ঞপ্তি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং ২০১৭ সালের বিজ্ঞপ্তির আলোকে পরীক্ষার আগে কেন ২০১৬ সালের বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে পরীক্ষা নেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

২০১৬ সালের পৃথক বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে তিনটি ব্যাংকে বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করা ২৮ প্রার্থী গত বছরের শেষ দিকে ওই রিটটি করেন।  রিট আবেদনকারীরা ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে ওই তিন ব্যাংকের বিভিন্ন পদের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো পরীক্ষা না নিয়ে ২০১৭ সালে নতুন করে একই পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। যার ভিত্তিতে ১২ জানুয়ারি এমসিকিউ পরীক্ষার দিন নির্ধারণ হয়। আবেদনকারীদের দাবি এটি বৈষম্যমূলক।

ইজতেমায় বিতর্কিত মাওলানা সাদকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা

দিল্লির তাবলিগ জামাতের মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে বিশ্ব ইজতেমায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন তাবলিগ জামাতের একাংশ এবং কওমীপন্থী আলেমরা।

আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুরে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সাদ বিরোধীদের সমাবেশে এ ঘোষণা দেয়া হয়।

সমাবেশে কওমীপন্থী আলেম মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ইজতেমাকে নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র হতে দেয়া হবে না। মাওলানা সাদ ইজতেমায় অংশ নিলে তারা এতে যাবেন না। ইজতেমায় সাদকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হচ্ছে।

সমাবেশে মাওলানা লোকমান বলেন, মাওলানা সাদকে ইজতেমায় অংশ নিতে দেয়া হবে না। পুলিশ যদি আমাদের বাধা দেয়, তাহলে ঘরে ঘরে আগুন জ্বলবে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে তবে তার দায় সাদকে নিতে হবে।

এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, মাওলানা সাদ বিশ্ব ইজতেমায় যাবেন কি যাবেন না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন ইজতেমার শীর্ষস্থানীয় নেতারা ও তাবলিগ জামাতের মুরব্বিরা। সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিশ্ব ইজতেমায় মুসল্লিদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে। আমরা লক্ষ্য রাখছি যাতে বিশ্ব ইজতেমায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। 

এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে মাওলানা সাদ ইজতেমায় অংশ নিতে নাও নিতে পারেন।

তাবলিগ জামাতের আয়োজনে প্রতিবছর উপমহাদেশে মুসলিমদের বৃহৎ জমায়েত বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তাবলিগের লোকজন বরাবরই শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী প্রচার করে আসছেন। তবে সম্প্রতি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাবলিগের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হয়েছে।

চলতি বছর ১২ জানুয়ারি ও ১৯ জানুয়ারি দুই দফায় তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দফায় ১৪ জানুয়ারি ও দ্বিতীয় দফায় ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় বন্যা ও ভূমিধসে নিহত ১৭

ভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে ক্যালিফোর্নিয়ায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। নিখোঁজ রয়েছেন আরো ১৩ জন। খবর বিবিসি,  স্কাই নিউজ।

একই ঘটনায় আহত ১৬৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসে সান্তা বারবারার পূর্ব দিকে অবস্থিত রোমেরো ক্যানিয়নের মধ্যে এখনো প্রায় তিনশ জন আটকা পড়ে আছেন।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের মতো দেখাচ্ছে।

এখনো অনেকে নিখোঁজ থাকায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা উদ্ধার কর্মীদের।

বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর হাজার হাজার অধিবাসী বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কাদায় চাপা পড়া অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে।  

কর্মকর্তারা জানান, যেসব এলাকা খালি করে ফেলার নির্দেশনার মধ্যে ছিল না সেসব এলাকাতেই বন্যা বড় ধরণের আঘাত হেনেছে। কেন্দ্রীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ক্যালিফোর্নিয়ায় এক জরুরি সতর্কতায় যেসব বাড়ি আগে কখনোই বন্যায় আক্রান্ত হয়নি এবার সেগুলোও ঝুঁকিতে আছে বলে জানিয়েছিল।

ভূমিধসে মন্টেসিটো এলাকার অনেক বাড়িরই ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সান্তা বারবারা কাউন্টি ফায়ার ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র মাইক এলিয়াসন জানিয়েছেন।

দমকল বাহিনীর ক্যাপ্টেন ডেভ জানিবোনি মঙ্গলবার শহরটি থেকে পাঁচ ব্যক্তির মৃতদের উদ্ধারের কথা জানান। ঝড়ের কারণে এদের মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা তার।

উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা দিতে মার্কিন কোস্টগার্ড বেশ কয়েকটি বিমান পাঠানোর কথা জানিয়েছে। এ কারণে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ড্রোন ওড়াতে সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে হওয়া ভয়াবহ দাবানলে গাছ ও মাটি পুড়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দেয়ায় বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফোরজি তরঙ্গ নিলাম হাইকোর্টে স্থগিত

ফোর-জি লাইসেন্স আবেদন ও তরঙ্গ নিলামের সময়সূচি ঘোষণা করেছিল টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। সেসময় আপত্তিও করেছিল অপারেটররা।

আজ (বৃহস্পতিবার) এ সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের শুনানি করে ওই বিজ্ঞপ্তি স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি জাফর আহমদের হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার রুলসহ এ আদেশ দেন।

সরকার বছরের প্রথম থেকেই ফোরজি সেবা চালুর কথা বলেছিল। এই আদেশের ফলে তা অনিশ্চয়তায় পড়ল।

গত ডিসেম্বর বিশেষ কমিশন সভায় বিটিআরসি একটি গাইড লাইন তৈরি করেছিল। একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করে।

বিটিআরসির ওই বিজ্ঞপ্তি ২০০৮ সালের ব্রডব্যান্ড গাইডলাইন্সের সঙ্গে সাংঘর্ষিক- এমন যুক্তি দিয়ে আদালতে এই রিট আবেদন করা হয়।

আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ড. কামাল হোসেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস।

গেলো বছর ৪ ডিসেম্বর বিটিআরসি ফোরজি লাইসেন্সের আবেদন চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এর আগে ২৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত নীতিমালার চূড়ান্ত অনুমোদন পায় টেলিযোগাযোগ বিভাগ।

বিজ্ঞপ্তিতে তরঙ্গ নিলামের জন্য ১৪ জানুয়ারির মধ্যে আগ্রহীদের ফোরজি সেবার লাইসেন্সের আবেদন জমা দিতে বলা হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি তরঙ্গ নিলাম দিন ঠিক করা হয়।

রুলে দরপত্র আহ্বানের নোটিশ সাংঘর্ষিক বলে কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, বিটিআরসির চেয়ারম্যানসহ বিবাদীদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

সরাসরি সম্প্রচারে বাবা, ঢুকে পড়ল ছেলে

রবার্ট কেলিকে মনে আছে? গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার পুসান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই অধ্যাপক যখন তাঁর বাসায় বসে বিবিসিতে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতি নিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, তখন ঘরে ঢুকে পড়ে তাঁর শিশুরা। তাঁর স্ত্রী দ্রুত ছুটে এসে সরিয়ে নেন বাচ্চাদের। তবে ততক্ষণে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়ে যায় পুরো ঘটনা। প্রথমে অধ্যাপক কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও পরে সামলে নেন। এই ভিডিও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তোলে। লাইকের বন্যা বয়ে যায়। রবার্ট কেলির মতো দরজা লক না করে একই পরিস্থিতিতে পড়লেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার চলচ্চিত্র বিশ্লেষক ডেনিয়েল স্মিথ রৌসি। বাসায় বসে আল জাজিরা টিভিতে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন ডেনিয়েল।
‘বিবিসি ড্যাড মোমেন্টের’ মতো পরিস্থিতিতে পড়লেন তিনি। এনডিটিভি অনলাইনের খবরে বলা হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ঠেকাতে ও নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে এবারের গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড আসরে সংহতি প্রকাশ করে হলিউড। সে বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন ডেনিয়েল। এ সময় বাবার পাশে এসে একদম ক্যামেরার সামনে চলে আসে ডেনিয়েলের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে। এ ঘটনায় কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হেসে উপস্থাপকের সঙ্গে ছেলেকে পরিচয় করিয়ে দেন ডেনিয়েল। বলেন, ‘এটা আমার ছেলে, মাফ করবেন।’ উপস্থাপক সোহাইল রহমান বিষয়টি সহজভাবে নিয়ে বলেন, ‘সে আসতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই ডেনিয়েল। এমন খুদে অতিথি পেয়ে আমরা খুশি হলাম।’ ছেলেও বেশ গর্বের সঙ্গে পুরো সাক্ষাৎকারে বাবার পাশে বসে থাকে। তার খেলনা মেলে ধরে ক্যামেরার সামনে। এ ঘটনার পুরো ভিডিও টুইটারে শেয়ার করে আল জাজিরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বিবিসি ড্যাড’ রবার্ট কেলির মতো ‘আল জাজিরা ড্যাড’ হয়ে গেলেন ডেনিয়েল।

ক্যাব থেকে লাফিয়ে বাঁচলেন সাংবাদিক

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আজ বুধবার দেশটির প্রসিদ্ধ এক সাংবাদিককে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। তাহা সিদ্দিকি নামের ওই সাংবাদিক সশস্ত্র অপহরণকারীদের হাত থেকে বাঁচতে সক্ষম হয়েছেন। সংবাদমাধ্যমকে তাহা সিদ্দিকি বলেন, ট্যাক্সিতে করে তিনি বিমানবন্দরে যাচ্ছিলেন। পথে অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জন লোক তাঁকে মারধর করে এবং হত্যার হুমকি দেয়।
একপর্যায়ে তিনি গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে পালাতে সক্ষম হন। তাহা বর্তমানে নিরাপদে রয়েছেন। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে। সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি হলো পাকিস্তান। সম্প্রতি পাকিস্তানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে বিবিসির একটি নিবন্ধে তাহা সিদ্দিকির কথা উল্লেখ করা হয়। তাহা সিদ্দিকি বলেন, ইসলামাবাদের প্রধান সড়ক দিয়ে ট্যাক্সিতে করে তিনি বিমানবন্দরে যাচ্ছিলেন। পথে অপহরণকারীরা তাঁর ট্যাক্সি থামায়। ইসলামাবাদে থানার সামনে বিবিসির সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময় তাহাকে হতবিহ্বল দেখাচ্ছিল। তাঁর শার্টের বোতাম ছেঁড়া দেখা যায়।

এক শয্যা থেকে একটি বটবৃক্ষ

চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট শহর ভেলোর। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজধানী চেন্নাইয়ের কাছেই। গেলে মনে হবে যেন বাংলাদেশেরই কোনো জায়গা। রংপুর থেকে আসা কেউ থাকার হোটেল খুঁজছেন। নোয়াখালী থেকে আসা কেউ বাজারে মাছ কিনছেন। ঢাকা থেকে গিয়ে কেউ আবার ট্যাক্সি থেকে মালপত্র নামাচ্ছেন। এ অন্য রকম ব্যস্ততা। ভেলোর কোনো পর্যটন শহর নয়। বিপদে পড়েই মানুষ যায় সেখানে। উদ্দেশ্য একটাই—চিকিৎসা। সীমিত আয় বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে ভেলোরের স্বনামধন্য খ্রিষ্টান মিশনারি হাসপাতালের (সিএমসি) চিকিৎসার খরচটা নাগালের মধ্যেই। থাকা-খাওয়ার খরচও খুব বেশি নয়। সিএমসিতে বেশির ভাগ রোগীই বাংলাদেশি। কলকাতার বাঙালির সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ভারতের ঝাড়খন্ড, ওডিশা, কেরালা বা অন্যান্য রাজ্যের মানুষও চোখে পড়ে। আছে নেপাল, সিঙ্গাপুর থেকে আসা মানুষও। আর স্থানীয় লোকজন তো রয়েছেই। ১১৮ বছরের পুরোনো এই সিএমসি হাসপাতাল। হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. ইদা সোফিয়া স্কুডার। ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল শুরুর ভাবনাটি আরও আগে। ১৮৯০ সালে ইদা সোফিয়া স্কুডার যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ ভারতে তাঁর ধর্মপ্রচারক মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে যান। এক রাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা তিন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে সন্তান জন্মদানে সহায়তা করতে বলা হয় ইদাকে। ইদার কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। তিনি বাবার সহায়তা চান। বাবা চিকিৎসকও ছিলেন। কিন্তু ওই তিন নারীর পরিবারের কেউই পুরুষ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসাসেবা নিতে রাজি হননি। পরদিন সকালে ওই তিন নারীই মারা যান। ইদা মানসিকভাবে ভীষণ আঘাত পান। সামাজিক বাধার কারণে তিন মায়ের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তিনি। চিকিৎসক হবেন বলে শপথ নেন। নারী ও শিশুদের সেবা করবেন বলে ব্রত নেন। ইদা এরপর আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। ১৮৯৯ সালে কর্নেল ইউনিভার্সিটি মেডিকেল কলেজ থেকে উত্তীর্ণ হন। সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের সেটিই ছিল প্রথম ব্যাচ। ১৯০০ সালে আবার ভারতে ফিরে যান ইদা। বাবার বাড়িতে একটিমাত্র বেড নিয়ে চালু করেন হাসপাতাল। এখন সিএমসিতে অভ্যন্তরীণ রোগী দুই হাজারেরও বেশি। দৈনিক বহির্বিভাগীয় রোগী সাত হাজার। হাসপাতালে ওয়ার্ড ৬৭টি। বিভিন্ন রোগের বিভাগ ১৪৪টি। হাসপাতাল শুরুর পরই ইদা বুঝেছিলেন, নারীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য নারীদেরই চিকিৎসাসেবায় প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। ১৯০৯ সালে তিনি চিকিৎসাসেবায় নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি স্কুল গড়ে তোলেন। ১৯১৮ সালে নারীদের চিকিৎসাসেবার জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেন। ১৯৪৬ সালে সেটি কলেজ অব নার্সিংয়ে উন্নীত করা হয়। ১৯৪৭ সাল থেকে পুরুষদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে এখানে। সিএমসি এখন নারী-পুরুষদের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১৬৩-এরও বেশি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করে। ওয়ার্ল্ড কনসালটিং অ্যান্ড রিসার্চ করপোরেশন চিকিৎসাসেবায় এশিয়ার সবচেয়ে ভালো ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান (এশিয়াস বেস্ট প্রাইভেট এডুকেশনাল ইনস্টিটিউট ইন মেডিকেল ক্যাটাগরি) হিসেবে সিএমসিকে পুরস্কৃত করেছে। সিএমসি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে অতিরিক্ত ভিড় ও নিয়ম-কানুনের জটিলতায় অনেকেই হিমশিম খান। তবে নিয়মগুলো সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা থাকলে ঝক্কিটা কমে যায়। যাঁরা সিএমসিতে যাবেন বলে ভাবছেন, তাঁদের প্রথমেই সংকটে পড়তে হয় ভিসা নিয়ে। নিয়ম অনুসারে মেডিকেল ভিসা নিয়ে যাওয়ার কথা।
কিন্তু এ জন্য সিএমসির চিকিৎসকদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেখাতে হয়। এই অ্যাপয়েন্টমেন্ট আবার অর্থ পরিশোধ করা ছাড়া নেওয়া যায় না। যাঁরা প্রথমবার যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য বিষয়টি জটিল। তবে পরিচিত কেউ ভারতে থাকলে তাঁদের মাধ্যমে অথবা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মানিগ্রাম, ক্লাসিড, ফার্স্ট ট্র্যাকের মাধ্যমে এই অর্থ পাঠাতে পারেন। মেডিকেল ভিসার জন্য বাংলাদেশ থেকে একজন চিকিৎসকের সুপারিশও দরকার হয়। অনেকে এসব ঝক্কি এড়াতে ট্যুরিস্ট ভিসা নেন। কিন্তু এতে ইমিগ্রেশনে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কারণ ভেলোরে পর্যটকদের যাওয়ার খুব বেশি কারণ নেই। চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্টের নির্ধারিত দিনের অন্তত দুই দিন আগে সময় নিয়ে ভেলোরে যাওয়া ভালো। কারণ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলেও বাংলাদেশি রোগী হিসেবে সিএমসিতে গিয়ে প্রথমেই আপনাকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। নিতে হবে হাসপাতাল নম্বর। তা না হলে সেখানে চিকিৎসা করাতে পারবেন না। পুরোনো রোগী হিসেবে সিএমসির হাসপাতাল নম্বর থাকলেও বাংলাদেশ থেকে গেলে আবার রেজিস্ট্রেশন করাতেই হবে। যতবারই যাবেন, ততবারই নতুন করে নিবন্ধন করতে হবে। এটিই সিএমসির নিয়ম। সিএমসির মূল চত্বরের পাশে রয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য এই নিবন্ধনের ভবন। ভোরের দিকেই যাওয়া ভালো। তাহলে কাজটা আগে হবে। সিএমসি হাসপাতালে ঢুকতেই চোখে পড়বে ক্রিস কার্ডের বিজ্ঞপ্তি। লম্বা লাইন এড়াতে চাইলে ক্রিস কার্ড খুবই উপকারী একটি জিনিস। হাসপাতাল নম্বর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপনি ক্রিস কার্ড পেয়ে যেতে পারেন। না পেলে সেটি চেয়ে নিতে ভুলবেন না। ক্রিস কার্ড পাওয়ার পরই আপনি আন্দাজমতো রুপি সেটিতে ভরে নেবেন। আইএসএস বিল্ডিংয়ের ১ ও ৩ নম্বর কাউন্টার থেকে আপনি ক্রিস কার্ডে রিচার্জ করতে পারবেন। এমআরও, টেস্টের জন্য বা ওষুধ কেনার জন্য যেটাই হোক না কেন, আপনি দেখবেন ক্রিস কার্ডের কাউন্টার আলাদা থাকে। অনেক সময় আইএসএস বিল্ডিংয়ের কাউন্টার থেকেই আপনি সব জায়গায় ক্রিস কার্ডের মাধ্যমে রুপি পরিশোধ করতে পারবেন। এটি করলে ভোগান্তি অনেকাংশেই কমে আসবে। আরও একটি সুবিধা হলো, একবার ক্রিস কার্ড পেয়ে গেলে সেটি ব্যবহার করে পরে আবার আসতে হলে আপনি সহজেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে পারবেন বাংলাদেশ থেকে। চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার সময় অবশ্যই ক্রিস কার্ডে রুপি ভরে নেবেন। সেই রুপি দিয়েই আপনি পরবর্তী চেকআপের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসতে পারবেন। নিবন্ধন ও ক্রিস কার্ড তো হলো। নির্ধারিত দিনে আপনাকে অ্যাপয়েন্টমেন্টে উল্লেখ করা সময়ের অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে গিয়ে এমআরও কাউন্টারে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে আপনি আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্টের রসিদটি জমা দেবেন। এরপর চিকিৎসকের ডাকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। টেস্টের জন্যও সংশ্লিষ্ট কাউন্টারে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে রসিদ জমা দিতে হবে। এরপর স্ক্রিনে আপনার সিরিয়াল নম্বর এলে পরীক্ষা করাতে পারবেন। অনেক ক্ষেত্রে টেস্টের সিরিয়াল পেতে বেশ কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে এমআরআই বা সিটি স্ক্যানের জন্য। কারণ, সিএমসিতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা রোগীর প্রচুর ভিড় থাকে। বিভিন্ন কাউন্টার থেকে দেওয়া রসিদটি ভালো করে পড়ে নেবেন। সেখানেই লেখা থাকে পরবর্তী সময়ে আপনাকে কত নম্বর কাউন্টারে যেতে হবে। এ তো গেল চিকিৎসক দেখানো ও সংশ্লিষ্ট শারীরিক পরীক্ষার বিষয়। ওষুধ কেনার জন্যও আলাদা কাউন্টারে রুপি জমা দেবেন। সিএমসির ওষুধ কেবল এই হাসপাতালেই পাওয়া যায়। এগুলো সরকার অনুমোদিত। বাইরে কোথাও আপনি ঠিক ওই ওষুধ পাবেন না। তবে এর বিকল্প পাবেন। আর একটি কথা, সিএমসিতে পুরো চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার সময় কোনো চিকিৎসক আপনাকে কোনো প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র দেবেন না। এখানে পুরো প্রক্রিয়াটিই চলে কমপিউটার সিস্টেমে। চিকিৎসক আপনাকে দেখার পর ব্যবস্থাপত্র পাঠিয়ে দেন ওষুধপত্রের বিভাগে। তাঁরাই সেটি দেখে আপনাকে ওষুধ দিয়ে দেবেন। আপনার হাতে পৌঁছাবে কেবল ওষুধের ফাইল। কোনো ব্যবস্থাপত্র নয়। আবার কোনো টেস্ট দিলে সেটিও কমপিউটার সিস্টেমে চলে যায় সংশ্লিষ্ট বিভাগে। তবে প্রয়োজন মনে করলে আপনি সেটার সিডি সংগ্রহ করতে পারবেন। সিএমসিতে রোগীরা জেনারেল অথবা প্রাইভেটে চিকিৎসকদের দেখাতে পারবেন। জেনারেলে সাধারণত জুনিয়র চিকিৎসকেরা চিকিৎসা দেন। প্রয়োজন মনে করলে তাঁরা সিনিয়রদের কাছে পাঠান। আর প্রাইভেটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা চিকিৎসা দেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ, বাইরের দেশ বা অন্য কোনো দেশ থেকে আসা রোগীদের জন্য চালু রয়েছে আলফা ক্লিনিক। এখানে সহজেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায়। ভিড়ও অনেকটা কম। তবে সব বিভাগ এই আলফা ক্লিনিকে নেই। আলফা ক্লিনিকে খরচটাও কিছুটা বেশি। এ ছাড়া তদকাল নামে আরেকটি পদ্ধতিতে কিছুটা বেশি খরচে তাড়াতাড়ি অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায়। এ তো গেল চিকিৎসার কথা। যাঁরা প্রথমবার যাচ্ছেন, তাঁরা থাকবেন কোথায়? খাবেন কী? সিএমসি হাসপাতালের গেটের উল্টো পাশে অসংখ্য থাকার হোটেল রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলো লজ নামে পরিচিত। একটু ঘুরে-ফিরে পছন্দমতো লজ পাবেন। ভাড়া ২০০ থেকে ৪০০ রুপির মধ্যে। ৫০০ বা ১০০০ রুপির মধ্যে বেশ ভালো থাকার লজ পাবেন। এসব লজে নিজেদের রান্না করে খাওয়ার বন্দোবস্ত রয়েছে। ভেলোরের এই এলাকার বাজারও বেশ মজার। বাইরে থেকে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীদের কথা ভেবে তিন দিন বা সাত দিন চলার মতো ছোট ছোট প্যাকেট করে মসলার গুঁড়ো, মুড়ি বা চাল কিনতে পারবেন। লজগুলোর নিয়ম সাধারণত একবার উঠলে আপনাকে প্রথম তিন দিন সেখানে থাকতে হবে। এর কম থাকলেও তিন দিনের ভাড়া দিতে হবে। তাই একটু বুঝেশুনে ওঠা ভালো। যদি হাতে সময় না থাকে তাহলে এ রকম ব্যবস্থা নেই (অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা থাকা যায়) এমন কোনো লজে একটু বেশি রুপি দিয়ে থাকবেন। পরে দেখেশুনে ভালো লজে যাবেন। না হলে আপনাদের তিন দিনের খরচ জলে যাবে। বাংলাদেশের অনেককেই অনেক লজে রাখার ব্যাপারে আপত্তি থাকে। আপনি পাসপোর্ট দেওয়ার পরও তাঁরা আপত্তি করতে পারেন। সেটি জেনে নেবেন। এ ছাড়া নতুন কোনো লজে উঠলে বাইরের দেশের নাগরিক হিসেবে আপনাকে পুলিশ স্টেশনে যেতে হবে। সেখান থেকে একটি অনুমোদনপত্র নিয়ে আসতে হবে। ভেলোরে বেশ কয়েকটি বাঙালি হোটেল আছে। সেগুলোয় খেতে পারেন। আবার রান্না করেও খেতে পারেন। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা টেস্টের ফাঁকে দুই দিন বা তিন দিন সময় বেড়ানোর জন্য পেতে পারেন। ভেলোরে বেড়ানোর জায়গা খুব বেশি নেই। বেশির ভাগই মন্দির। সেগুলো পাহাড়ের ওপর। যেতে পারেন পালামোদি। ভেলোর থেকে পাহাড়ি পথ দিয়ে এক ঘণ্টার পথ। প্রায় দেড়-দুই হাজার ফুট উঁচু থেকে পুরো শহর দেখতে দারুণ লাগে। যাতায়াতের পথের সৌন্দর্যও দারুণ। এ ছাড়া যেতে পারেন টিপু সুলতানের ফোর্টে। এর ভেতরে মন্দির রয়েছে। কাছাকাছি বিশাল একটি মাঠ আছে। খেলতে পারবে শিশুরা। যেতে পারেন স্বর্ণমন্দির, রত্নগিরি মন্দির। চাইলে নিউমার্কেট অথবা পাচ্চিপাই নামে সিল্কের কাপড়ের বাজারে কেনাকাটা করতে পারেন। এ ছাড়া রাস্তার পাশেই বিভিন্ন ধরনের শৌখিন জিনিস পাবেন।

একটি অম্লমধুর সম্পর্কের ইতিহাস by মাহফুজার রহমান

সম্পর্কের আপাতত শেষ ধাপের শুরুটা হলো একটি টুইট বার্তা দিয়ে। নতুন বছরের প্রথম টুইট বার্তাতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দিলেন কথাটা-‘ওয়াশিংটনকে মিথ্যা ও ছলনা ছাড়া কিছুই দেয়নি পাকিস্তান। গত ১৫ বছরে ওয়াশিংটন বোকামি করে পাকিস্তানকে ৩ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে।’ ট্রাম্পের ওই বার্তা আসলে ছিল পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন সহায়তা বন্ধের আভাস। ওই আভাসের পরদিনই জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন দূত নিকি হ্যালি বললেন, পাকিস্তানকে ২৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার অর্থসহায়তা দিচ্ছে না ওয়াশিংটন। এর দুদিন পরেই ৯০ কোটি ডলার সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এখানেই শেষ নয়-গত শুক্রবার মার্কিন এক কর্মকর্তা জানিয়ে দিলেন, আসলে ৯০ কোটি নয়, ২০০ কোটি ডলার সহায়তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
কেন সহায়তা বন্ধ
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, দেশটি সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ দমনেরে চেয়ে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে ইসলামাবাদ।
সহায়তা বন্ধের ছোটখাটো ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পাকিস্তান যাতে নিজ ভূখণ্ডকে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ স্বর্গ হয়ে ওঠা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়-সে লক্ষ্যেই এই সামরিক সহায়তা বন্ধ করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের জবাব
ট্রাম্পের টুইট বার্তা ও এই সহায়তা বন্ধের জবাব দিতে সরব পাকিস্তানও। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলেছে ইসলামাবাদ। তারা বলেছে, এটি ‘স্বেচ্ছাচারমূলক ও একতরফা সিদ্ধান্ত’। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হয়েছে ও হচ্ছে বলে দাবি পাকিস্তানের। বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে ইসলামাবাদ বলেছে, গত ১৫ বছরে প্রধানত নিজস্ব সম্পদ দিয়েই তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে। পাকিস্তান এই সময়ে এ কাজে ১২ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। বলা হচ্ছে, এই মুহূর্তে গত কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে তলানিতে ঠেকেছে। যদিও দেশ দুটির সম্পর্কের এমন পর্যায় নতুন কোনো ঘটনা নয়। তাদের অম্লমধুর সম্পর্কের ইতিহাসটা বেশ পুরোনো। আফগানিস্তানে সর্বশেষ সন্ত্রাসবাদবিরোধী মার্কিন অভিযানের অন্যতম মিত্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে আপাতত শেষবারের মতো মধুর সম্পর্কে জড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
সম্পর্কের সূচনা
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর নতুন দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকারী প্রথম দেশগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন পোস্টের এক নিবন্ধে বলা হয়, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধে পাকিস্তানকে পাশে পেতে এটা করেছিল ওয়াশিংটন। ভারতকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানকে কেন কাছে টানল যুক্তরাষ্ট্র? বলা যায়, নয়াদিল্লিকে না পেয়েই ইসলামাবাদমুখী হয় ওয়াশিংটন। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস বলছে, ১৯৪৯ সালে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরু যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানকে বার্তা দেন-স্নায়ুযুদ্ধে কোনো পক্ষে না গিয়ে নিরপেক্ষ থাকবে নয়াদিল্লি। আর এ বার্তাতেই মূলত ওয়াশিংটন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে যায়। বিপরীতে ভারত-রাশিয়া বন্ধুত্বের পথ সহজ হয়। নেহরুর পর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ওয়াশিংটন সফর করেন। তাঁর ওই সফরকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন।
উত্থান-পতন
৫০-এর দশকে সোভিয়েতের ওপর নজর রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে পেশোয়ার বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয় পাকিস্তান। অনুমতি দেয় মস্কোর ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করতে ওয়াশিংটনকে নিজের ভূখণ্ড ব্যবহারেরও। শুধু তা-ই নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে তাঁর প্রথম চীন সফরে মধ্যস্থতা করে ইসলামাবাদ। এর বিনিময়ে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে লাখ লাখ ডলার সামরিক সহায়তা পায় পাকিস্তান। ওয়াশিংটন পোস্টের নিবন্ধে বলা হয়, আশির দশকে প্রথমবারের মতো দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা নেমে আসে। মার্কিন কংগ্রেস পাকিস্তানকে দেওয়া সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা স্থগিত করে। ওয়াশিংটন বলে, পাকিস্তানকে দেওয়া সহায়তা দেশটি তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করছে না-এটা নিশ্চিত করতে হবে। তা করতে না পারা পর্যন্ত সহায়তা স্থগিতই থাকবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস পায় তখন, যখন মস্কোর বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাচ্ছিল। আর ১৯৯২ সালে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন দূত নিকোলাস প্ল্যাট সরাসরি বলে বসলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। তবে নাইন-ইলেভেনের পর দেশ দুটির সম্পর্ক নতুন মোড় নেয়। মস্কোর বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধের সময় যেমন পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র; এবার তেমনি সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়েও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে ইসলামাবাদকে কাছে টানে ওয়াশিংটন। পাকিস্তানের নেতারা ওই সময় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যাওয়া ছাড়া আসলে ইসলামাবাদের কাছে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ, পাকিস্তানকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে না থাকলে পাকিস্তানে বোমা হামলা চালিয়ে ‘প্রস্তর যুগে ফেরত পাঠানো হবে’। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকার পুরস্কার অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবেই পেয়েছিল পাকিস্তান। দেশটির ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। ১০০ কোটি ডলার ঋণ মাফ করে দেয়। ২০০৪ সালের মধ্যে সামরিক জোট ন্যাটোর নতুন বন্ধু হিসেবে অস্ত্রও কেনার সুযোগ পায় ইসলামাবাদ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থেকে শুধু যে লাভ হয়েছে পাকিস্তানের, তা কিন্তু নয়। বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি করেও। কারণ, আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় অনেক পাকিস্তানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। নানাভাবে নিহত হয়েছে পাকিস্তানি সেনারাও। এরপর আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরু হলে পাকিস্তানের বিষয়ে সুর বদলাতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলতে থাকেন, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের জন্য যে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, সেটা কি সত্যিই ওই কাজে ব্যবহার করেছে? এরপর বুশ ও ওবামা প্রশাসন পাকিস্তানের প্রতি হতাশা ব্যক্ত করে। বলতে থাকে, সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে দেশটি পর্যাপ্ত সহায়তা করেনি। এর ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে দেওয়া ৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা স্থগিত করে। আর ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে বুশ-ওবামার প্রশাসনের অবস্থানটা আরও কঠোর করলেন। সে আভাস অবশ্য তিনি গত আগস্টে দিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তানকে যখন আমরা শত শত কোটি ডলার সহায়তা দিচ্ছি, তখন দেশটি সন্ত্রাসীদের জন্য বাসস্থান গড়েছে। আমরা আবার সেই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি।’ যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তানের সম্পর্কের ইতিহাসই বলছে, এটা সম্ভবত তাদের সম্পর্কের শেষ ধাপ নয়। প্রয়োজন হলে আবার নতুন মোড় নেবে এই সম্পর্ক। তবে কোন উদ্দেশ্যে বা কোন ঘটনাকে ঘিরে সম্পর্ক নতুন মাত্রা নেবে, সেটাই দেখার বিষয়।

লাফার্জের সহযোগী হোলসিম

হোলসিম বাংলাদেশকে কিনে নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া প্রায় ৫০৫ কোটি টাকায় হোলসিমের সব শেয়ার কিনে নিয়েছে লাফার্জ। এরই মধ্যে হোলসিমকে কেনা বাবদ অর্থও পরিশোধ করেছে লাফার্জ কর্তৃপক্ষ। গতকাল বুধবার প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে কোম্পানিটি। লাফার্জ জানিয়েছে, এখন থেকে হোলসিম বাংলাদেশ লাফার্জের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মালিকানা একীভূত হলেও আপাতত বাংলাদেশে কোম্পানি দুটি আলাদা ব্র্যান্ডেই ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। অর্থাৎ নিজ নিজ ব্র্যান্ডেই সিমেন্টের বাজারে ব্যবসা চালিয়ে যাবে কোম্পানি দুটি। বর্তমানে লাফার্জের নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত সিমেন্ট সুপারক্রিট নামে বাজারে বিক্রি হয়। আর হোলসিম সিমেন্টের হোলসিম নামেই বাজারে বিক্রি হয়। জানা যায়, ২০১৪ সালের এপ্রিলে বৈশ্বিকভাবে লাফার্জ ও হোলসিম একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী, বৈশ্বিকভাবে কোম্পানি দুটির একীভূত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। ফলে বিশ্বের সিমেন্ট খাতে জায়ান্ট দুই কোম্পানি এক ছাতার নিচে এসে ‘লাফার্জহোলসিম’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এতে দুই কোম্পানি মিলে হয়ে যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় সিমেন্ট কোম্পানি। বৈশ্বিকভাবে একীভূত হওয়ার পর বাংলাদেশেও কোম্পানি দুটি একীভূতকরণের বিষয়টি সামনে আসে। কারণ, এ দেশেও দুই কোম্পানির আলাদা কার্যক্রম ছিল।
এর মধ্যে লাফার্জ সুরমা বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও হোলসিম তালিকাভুক্ত নয়। তাই বৈশ্বিকভাবে একীভূত হওয়া লাফার্জহোলসিম গ্রুপ থেকে হোলসিম বাংলাদেশের সব শেয়ার কিনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় লাফার্জ। তবে শেয়ারের দরদাম নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। কারণ কেনাবেচার জন্য হোলসিমের প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যমানের শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৬ হাজার টাকা। তাতে হোলসিম বাংলাদেশকে কিনতে লাফার্জের খরচ হতো ১১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ৮০ টাকা ধরে) ৯৩৬ কোটি টাকা। কিন্তু এ দামে লাফার্জের পক্ষ থেকে হোলসিমকে কেনার প্রস্তাব দেওয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে আপত্তি জানায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক যাচাই-বাছাই করে হোলসিমের ১০০ টাকা মূল্যমানের শেয়ারের বিক্রয়মূল্য ঠিক করে ৫৭ হাজার টাকা। তাতে প্রায় ৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার বা ৫০৫ কোটি টাকায় দুই কোম্পানির একীভূত হওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দামেই হোলসিমকে কিনতে রাজি হয় লাফার্জ। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে গতকাল তা নিষ্পন্ন হয়। তবে গতকাল শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের দামে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। ঢাকার বাজারে বুধবার লাফার্জের প্রতিটি শেয়ারের দাম ৪ শতাংশ বা ২ টাকা ৭০ পয়সা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৩ টাকা ৪০ পয়সায়। এদিন কোম্পানিটি ডিএসইতে লেনদেনে পঞ্চম অবস্থানে ছিল। দিন শেষে প্রায় সোয়া ১১ কোটি টাকার শেয়ারের হাতবদল হয় লাফার্জের।

কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই

খুলনা হার্ডবোর্ড মিলের কারখানা ও গুদামে পড়ে আছে প্রায় আড়াই কোটি টাকার হার্ডবোর্ড। দাম বেশি হওয়ায় এসব পণ্য ডিলারদের কাছে বিক্রি করা যায়নি। তাই অনেক হার্ডবোর্ড ইতিমধ্যে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। এদিকে প্রায় চার বছরের বেশি সময় ধরে মিলটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তাতে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণে থাকা মিলটির উৎপাদন পুনরায় চালু করা কিংবা গুদামে পড়ে থাকা হার্ডবোর্ড বিক্রির কোনো উদ্যোগ নেই। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বিসিআইসির কাগজপত্রে মিলটি চালু আছে। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে করপোরেশনের আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিলটি ৬০ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে। মূলধনের অভাবে এবং কাঁচামালের সংকটের কারণে মিলটির উৎপাদন ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে বন্ধ আছে। দেশের একমাত্র সরকারি হার্ডবোর্ড মিলটি ১৯৬৫ সালে স্থাপন করা হয়। কানাডীয় অনুদানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা মিলটি স্থাপন করে। স্বাধীনতার পরে সেটি বিসিআইসির কাছে আসে। তখন কারখানার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩ কোটি বর্গফুট। খুলনার খালিশপুর এলাকার এই মিলে গত বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায়, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলসের পাশের ১০ একর জমির ওপর হার্ডবোর্ড মিলের পুরো চত্বর খাঁ খাঁ করছে। মূল কারখানা ভবন ও গুদাম, এমনকি প্রশাসনিক ভবনটিও তালা মারা। কাঠ গুঁড়া করার মেশিন এখন অলস পড়ে আছে। নিরাপত্তাকর্মী লুৎফর রহমান বললেন, সব মিলিয়ে সাতজন নিরাপত্তাকর্মী মিলটি পালাক্রমে পাহারা দেন। তা ছাড়া দুজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। তবে তাঁরা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলেই দাপ্তরিক কাজ করেন। ২০০২ সালে বিএনপি সরকার মিলটি লে অফ ঘোষণা করে। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে সেটি আবার চালু করা হয়। তখন কাজ নেই, মজুরি নেই ভিত্তিতে মিল চলছিল। তবে জোড়াতালি দিয়ে চলা মিলটির লোকসান বেড়েই যাচ্ছিল। অর্থের সংকটে পড়ে ২০১১ সালের জুলাইয়ে এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারি বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর ঘোষণা দেয়। পরে ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী খুলনা সফরে এসে হার্ডবোর্ড মিলটি চালুর ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসেবে ১০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়ে মিলটি চালুর উদ্যোগ নেয় বিসিআইসি।
২০১৩ সালের আগস্ট মাসে মিলটি চালু করা হয়। তবে তিন মাসের মধ্যে আবার বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। তখন শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা মিলে কর্মরত ছিলেন প্রায় ২০০ জন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হার্ডবোর্ডের কাঁচামাল কাঠ ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১১ সালে মিলটি বন্ধ হওয়ার আগে প্রতি পিস (৩২ বর্গফুট) হার্ডবোর্ড ডিলারদের কাছে বিক্রি করা হতো ২৬২ টাকায়। ২০১৩ সালে সরকারি নির্দেশে চালু হওয়ার পর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি পিস হার্ডবোর্ডের বিক্রয়মূল্য ঠিক করা হয়েছে ৫৪০ টাকা। নিরাপত্তাকর্মী লুৎফর রহমান বলেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিলাররা আমাদের হার্ডবোর্ড নিতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ বাজারে তখন আরও কম দামে বোর্ড পাওয়া যায়। তাতে গুদামে জমতে থাকল পণ্য। এদিকে চলতি মূলধনে সংকট দেখা দিল। শেষ পর্যন্ত বন্ধই হয়ে গেল। তিনি বলেন, সুন্দরী ও গড়ান কাঠ এবং পরে স্থানীয় কাঠ দিয়ে হার্ডবোর্ড তৈরি হতো। আমাদের মিলের বোর্ডের মান খুবই ভালো ছিল। লুৎফর রহমানের আক্ষেপ, গুদামে পড়ে থাকতে থাকতে হার্ডবোর্ড নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দাম কমিয়ে হলেও বিক্রি করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার বিসিআইসির। না হলে ভবিষ্যতে এগুলো আর বিক্রিই হবে না। মিলের পাশেই ভৈরব নদ। সেখানে গিয়ে পাওয়া গেল মিলের সাবেক শ্রমিক সাইদুল ইসলামকে। বললেন, মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন ঘাটে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। আশায় আছেন, আবার মিল চালু হবে এবং কাজ করবেন সেখানে। অবশ্য সাইদুলের আশা পূরণের কোনো লক্ষণ নেই। ২০১৪ সালে বন্ধ শিল্পে প্রাণ ফেরাতে বিলুপ্ত প্রাইভেটাইজেশন কমিশন খুলনা হার্ডবোর্ড মিলসহ চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় শিল্পপার্ক স্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠায়। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। মিল চালুর বিষয়ে কোনো উদ্যোগ আপাতত নেই বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান মো. নুরুল্লাহ বাহার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবিক্রীত হার্ডবোর্ড বিক্রির চেষ্টা চলছে। আশা করছি হয়ে যাবে।’

৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ

বাংলাদেশে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে চীনা ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ঝেজিয়াং জিনজুন হোল্ডিং গ্রুপ, যাকে একক হিসেবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বলছেন সরকারি কর্মকর্তারা। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি হবে চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে। এ জন্য সেখানে ১ হাজার একর জমি ইজারা নিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানটি। ইতিমধ্যে তারা জমির ইজারামূল্যের একটি অংশ জমা দিয়েছে। কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, দু-এক মাসের মধ্যেই ঝেজিয়াং জিনদুন হোল্ডিংকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হবে। তারা আগামী মাসেই জমি উন্নয়নের কাজ শুরু করতে চায়। আর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে চায় ২০২২ সালের মে মাসে। জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় খবর। চীনা বিনিয়োগকারীরা যে বাংলাদেশকে বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে দেখছে, এটা তারই নমুনা। তিনি বলেন, চীনা কোম্পানিটির এই বিনিয়োগ দেশের বিদ্যুৎ খাতে মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে। জিনদুনের বিনিয়োগকে দেশে সবচেয়ে বড় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বলে উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে মোট ২৫৪ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৫৪ কোটি ডলার বেশি। তবে এ পরিমাণ বাংলাদেশের প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে মনে করা হয়। চীনা কোম্পানিটির বিনিয়োগ প্রস্তাবের আবেদন করা হয়েছে ঝেজিয়াং জিনদুন প্রেশার ভেসেল কোম্পানি লিমিটেডের নামে। এ প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ চাপের গ্যাস সিলিন্ডার তৈরি করে। এ কোম্পানিটি আবার ঝেজিয়াং জিনদুন হোল্ডিং গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। গ্রুপটির খনিজ সম্পদ উত্তোলন, ভারী সরঞ্জাম উৎপাদন, পণ্য বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা আছে। বেজা জানিয়েছে, বাংলাদেশে এ চীনা কোম্পানিটির বিনিয়োগ প্রস্তাবের বাস্তব রূপ দিতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চলছিল। অবশেষে সম্প্রতি তা চূড়ান্ত হয় এবং চীনা কোম্পানিটি জমি ইজারার মূল্য বাবদ শুরুতে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ডলার বেজাকে দেয়। জানা গেছে, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ঝেজিয়াং জিনদুনকে অনুন্নত জমি দিচ্ছে বেজা। তারা এ জমি ইজারা নিচ্ছে ৫০ বছরের এককালীন ইজারামূল্যে। এতে মোট ইজারামূল্য হয় ৬ কোটি ৯৮ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৭২ কোটি টাকা। জিনদুনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ বিনিয়োগে বাংলাদেশে প্রায় দেড় হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী সদস্য মো. হারুনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, জিনদুন তাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রি করবে। এ জন্য তাদের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, মিরসরাইয়ে আরও কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হবে ৩০ হাজার একরের। এর মধ্যে ১২ হাজার একর জমি বেজার অধীনে রয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে মিরসরাইয়ে জমি বরাদ্দের বিবরণপত্র প্রকাশ করে বেজা। এরপর এখন পর্যন্ত কারখানা করতে জমি বরাদ্দ অথবা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠান ৩ হাজার ৬৫০ একর জমি পাবে। মিরসরাইয়ে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ১ হাজার একর জমি রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) সেখানে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল করতে ১ হাজার ১৫০ একর জমি নিয়েছে। উন্নত করে ইজারা দেওয়ার জন্য ৫৫০ একর জমি পেয়েছে বসুন্ধরা-গ্যাসমিন-পাওয়ার প্যাক কনসোর্টিয়াম। এ ছাড়া দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য ৫০০ একর জমি দেওয়ার কথা বলেছে বেজা।

প্রাচীন বৃক্ষগুলোর অপরাধ কী by মোকারম হোসেন

৭ জানুয়ারি। দৈনিক প্রথম আলোর ছোট্ট একটি সচিত্র খবর-যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীত করার প্রয়োজনে যশোর রোডের পুরোনো বৃক্ষগুলো কেটে ফেলার পক্ষে মত দিয়েছে জেলা প্রশাসন। খবরটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল মোটেও সুখকর নয়। কারণ, যশোর রোড অন্য দশটি রোডের মতো সাদামাটা কিছু নয়, এর ভেতর লুকিয়ে আছে দীর্ঘ এক ইতিহাস। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতি, বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর সুদীর্ঘ সময়ের যোগাযোগমাধ্যম এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ থেকে যশোর রোড এখন আর কোনো আঞ্চলিক সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একাধারে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য-সম্পদ। অবিভক্ত ভারতবর্ষে দীর্ঘ এই পথ পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বিস্তৃত ছিল। পূর্ব থেকে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার একমাত্র আনুষ্ঠানিক সড়কও ছিল এটি। দেশভাগের পর কিছু অংশ ভারতে আর কিছু অংশ পড়েছে বাংলাদেশে। ভারতীয় অংশে গাছের সংখ্যায় খুব একটা হেরফের না হলেও বাংলাদেশ সীমানায় তা স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান। জেলা প্রশাসনের দায়িত্বহীন মতামতের কারণে এত দিন গাছ লোপাটের ক্ষেত্রে কিছুটা লুকোছাপা থাকলেও এখন বাদবাকি গাছের ক্ষেত্রে বিষয়টি বৈধতা পেতে যাচ্ছে! ভাবতেই অবাক লাগছে। বিস্মিত না হয়ে পারি না।
সরকারের একটি দায়িত্বশীল সংস্থা কীভাবে এমন একটি ঘৃণ্য ও হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারে! জেলা প্রশাসনের এমন একটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত দেশের প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। কারণ, শতোর্ধ্ববর্ষী বৃক্ষহীন যশোর রোড আমাদের চোখের সামনে কেবল বিভীষিকার চিহ্নই এঁকে দিতে পারে। এমন একটি দৃশ্য আমরা কল্পনাও করতে চাই না, যা আমাদের স্বস্তির পরিবর্তে শুধু আতঙ্কিতই করবে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ৮ জানুয়ারি প্রথম আলোর সম্পাদকীয় বিভাগেও সড়ক উন্নয়নের বিকল্প প্রস্তাবসংবলিত মতামত ছাপা হয়েছে। জেলা প্রশাসন অতি দ্রুত এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ। যশোর রোডের প্রসঙ্গ এলেই বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে। গিন্সবার্গ একাত্তরের শেষ দিকে কলকাতা হয়ে যশোর সীমান্তে আসেন শরণার্থী ক্যাম্পগুলো দেখতে। অতিবর্ষণ ও প্লাবনে যশোর রোড তখন পানির নিচে। অগত্যা নৌকা নিয়েই তিনি সেখানে পৌঁছান। শরণার্থীশিবিরে মানুষের দুর্দশা তাঁর মনে দাগ কেটেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিখ্যাত এই কবিতা লিখেছিলেন। পরে কবিতাটি গানে রূপান্তরিত হলে তাঁর মার্কিন গায়ক বন্ধু বব ডিলান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন কনসার্টে গেয়ে শোনান। মুক্তিযুদ্ধ ও এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাই যশোর রোডের ঐতিহাসিক মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। পাঠক, যাঁরা বেনাপোল হয়ে কলকাতা গিয়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারবেন, সীমান্তের ওপারে বনগাঁয়ের দিকে গাছের সংখ্যা নিঃসন্দেহে আরও বেশি। বেনাপোলের ওপারে পেট্রাপোল থেকে কলকাতা পর্যন্ত ভারতীয় অংশের এই সড়কটিও কোথাও কোথাও চার লেনের। ওখানে সারিবদ্ধ গাছগুলো রাস্তার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা গাছগুলোকে সড়ক বিভাজকের মতো মাঝখানে রেখে পাশে আরেকটি সড়ক তৈরি করে নিয়েছে। তাতে দুদিকই রক্ষা পেয়েছে। আমরা কেন তা ভাবতে পারছি না। যশোরের জেলা প্রশাসনের এ খবরটি কি জানা নেই? আমরা তো নানান অজুহাতে ইতিমধ্যেই সড়কটির অনেক গাছ ধ্বংস করেছি। ঠুনকো কারণে কাটা পড়েছে অসংখ্য গাছ। পত্রিকার পাতায় এমন খবর আমরা ঢের দেখেছি। যশোর শহরের দড়াটানা মোড় থেকে বেনাপোল বন্দর পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার এই মহাসড়কের দুই পাশে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার গাছ। এর মধ্যে ১৭৪ বছরের পুরোনো যশোরের তৎকালীন জমিদার কালী পোদ্দারের লাগানো তিন শতাধিক মেঘ শিরীষও রয়েছে। বর্তমানে যশোর রোড মানেই এই সব প্রাচীন বৃক্ষের সমাহার। গাছগুলো বাদ দিয়ে সড়কটির অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। তা ছাড়া মহিরুহসম এই বৃক্ষগুলো এখন আর নিরেট বৃক্ষই নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক প্রাণবৈচিত্র্য-পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ ও পরজীবীদের বাঁচা-মরার বিষয়। আমরা কি ইচ্ছা করলে এমন একটিও বৃক্ষ বানাতে পারব? এমনকি একটি ডালও? ওদের তো পৌনে দুই শ বছরের সঞ্চিত জীবন। একটি তরু শিশু জন্মের পর থেকে প্রায় দুই শ বছরের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছে। বিষয়টি হেলাফেলা করার মতো নয়। আমরা যদি এমন একটি গাছেরও জীবন দিতে না পারি, এমনকি একটি পাতাও বানাতে না পারি, তাহলে প্রাণসংহার করব কোন যুক্তিতে? সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য? উন্নয়নের জন্য? তা হতেই পারে, তবে গাছগুলো অক্ষত রেখে। যদি একটি গাছের জন্য কোনো পথ এক কিলোমিটারও ঘুরিয়ে নিতে হয়, তা-ই নিতে হবে। এটাই সভ্যতা। এই একবিংশ শতাব্দীতে আমরা এমন সভ্যতা এবং দূরদর্শিতাই প্রত্যাশা করি। কাজেই জেলা প্রশাসনকে বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। একটু মাথা খাটালেই জুতসই কোনো উপায়ও খুঁজে পাওয়া যাবে।
মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক। সাধারণ সম্পাদক, তরুপল্লব।
tarupallab@gmail.com

সাতকানিয়ায় ৩ দিনব্যাপী উন্নয়ন মেলার শুরুতে জমজমাট


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে দেশব্যাপী উন্নয়ন মেলার ধারাবাহিকতায় সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসনও তিন দিনব্যাপী উন্নয়ন মেলা আয়োজন করেছে। ৬০টি স্টলের মাধ্যমে জমজমাট হয়ে ওঠেছে মেলা প্রাঙ্গন।

বৃহস্পতিবার ১১ জানুয়ারি সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক  এই উন্নয়ন মেলার আয়োজন করা  হয় সাতকানিয়া মডেল উচ্চবিদ্যালয় মাঠে।

বৃহস্পতিবার  সকাল ১০টায় এই উন্নয়ন মেলার উদ্বোধন করবেন সাতকানিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) মোহাম্মদ মোবারক হোসেন। যেখানে সাতকানিয়া  পৌর সভার মেয়র মোহাম্মদ জোবায়ের, এসিল্যান্ড, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাতকানিয়া উপজেলার সিনিয়র সহ-সভাপতি ড. ফরিদুল আলম, দপ্তর সম্পাদক সাইদুর রহমান দুলাল সহ সরকারি, বেসরকারি সংস্থার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

মেলা উদ্বোধনের পর সাতকানিয়া মডেল উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এক সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয় যেখানে সভাপতিত্ব করছেন সাতকানিয়ার ইউএনও মোহাম্মদ মোবারক হোসেন।


সাতকানিয়ার ইউএনও মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে দেশব্যাপী উন্নয়ন মেলার ধারাবাহিকতায় সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসনও উন্নয়ন মেলা আয়োজন করেছে। সরকারের উন্নয়ন মুলক কার্যত্রমসমূহ জনসম্মুখে দেখার জন্য এই মেলার আয়োজন।

তিনি আরো বলেন, সরকারি সকল  প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি এনজিও, বেসরকারি ব্যাংকসহ মোট৬০টি সংস্থার স্টল রয়েছে এই উন্নয়ন মেলায়।  সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এই মেলায় প্রবেশ করে উপভোগ করতে  পারবে আগত দর্শনার্থীরা।


শনিবার বিকেলে মেলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে বলেও জানান সাতকানিয়ার ইউএনও মোহাম্মদ মোবারক হোসেন।

গ্রামের চিকিৎসা: দায়িত্ব আমাদের সবার by মাহবুব হোসেন

গত ২১ ডিসেম্বর প্রথম আলোর ‘গ্রামে চিকিৎসার দায়িত্ব কারা নেবেন’ শিরোনামে স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত একটি কলাম প্রকাশিত হয়েছে। পেশাগতভাবে ভারতের দুটি রাজ্যের স্বাস্থ্যনীতি-বিষয়ক গবেষণায় সম্পৃক্ত থাকায় কলামটি আগ্রহ নিয়ে পড়লাম। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাব্যবস্থা শহরের মতো উন্নত নয়। এই সমস্যা ভারতেও আছে এবং বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশই এই সংকটে আক্রান্ত। মানবসভ্যতার ১৫ হাজার বছরের ইতিহাসে এটা প্রমাণিত যে গ্রাম আছে বলেই শহরের জন্ম হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি শহরের বেঁচে থাকার খোরাক জোগায়। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ গ্রামে থাকে, অথচ বাকি ৩৫ শতাংশের জন্য আধুনিক জীবনযাত্রার সব উপকরণ ও সেবা নিয়োজিত। এই বৈষম্যের দায় কার? আলোচ্য কলামে লেখক এ ক্ষেত্রে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা যে বিস্তৃত, সেটা উল্লেখ করে সেই সেবার কাঙ্ক্ষিত মান না থাকার কারণ হিসেবে চিকিৎসকদের গ্রামে না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। বৈষম্য না মেনে নেওয়া যে জাতি একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই জাতির বড় একটি অংশ কেন স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক বিষয়ে আজ বৈষম্যের শিকার, সেটা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করার জন্য ছয়টি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন-প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, তথ্য-উপাত্ত, সেবাদানের সঠিক নির্দেশিকা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা। এর যেকোনো একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।
যেমন ধরা যাক, কোনো একটি উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে যে পরিমাণ ওষুধ ও যন্ত্রপাতি দরকার, সেটা না থাকলে সেখানে কয়েক ডজন চিকিৎসক বসিয়ে রাখলে কোনো লাভ হবে না। অর্থ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলের সবকিছু থাকলেও যদি ‘কীভাবে কাজ করতে হবে’ এবং ‘কে কতটুকু কাজ করবেন’-এসব নির্দিষ্ট না করা হয়, তাহলে নামকাওয়াস্তে স্বাস্থ্যকাঠামো টিকে থাকবে বটে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে না। এসব ধারণাপ্রসূত কথা নয়, ভূরি ভূরি গবেষণাপত্রে এসব তথ্য লেখা আছে। তারপরও কেবল চিকিৎসকের অনুপস্থিতিকে তুলে ধরলে যাঁরা সত্যিই গ্রামাঞ্চলে সীমিত সাধ্যে সেবা দিয়ে চলেছেন, তাঁদের কেবল অপমানই করা হয় না, বরং আরও যেসব অত্যাবশ্যকীয় বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন ছিল, সেগুলোকে উপেক্ষাও করা হয়। যেহেতু ‘স্বাস্থ্যসেবা’ বাংলাদেশের সব নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, সেহেতু রাষ্ট্র এই ছয়টি নিয়ামকের সঠিক বরাদ্দ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে শহুরে ও গ্রাম্য স্বাস্থ্যকাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমবে বলে আশা করা যায়। এবার চিকিৎসকদের গ্রামে থাকার প্রসঙ্গে আসা যাক। যদি বলি যে চিকিৎসকেরা গ্রামে থাকতে অত্যন্ত উৎসাহী, তাহলে সেটা অন্যায় ও পক্ষপাতদুষ্ট হবে। শুধু চিকিৎসক নন, দক্ষ পেশাজীবীদের অধিকাংশই গ্রামে থাকতে অনিচ্ছুক, যাঁরা ইচ্ছুক তাঁরা চাইলেও থাকতে পারেন না। এরপরও যাঁরা নানা প্রতিকূলতা মেনে নিয়ে গ্রামে আছেন, তাঁদের সাধুবাদ জানাতে হয়। ভালো বাসস্থান, নিরাপত্তা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা শহুরে সাহেবেরা যেভাবে নিজেদের জন্য সাজিয়ে রেখেছেন, গ্রামে তার কিছুমাত্র নেই। স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য দূর করতে গিয়ে কোনো কর্মচারীকে জোর করে গ্রামে রাখাও যুক্তিহীন, কারণ তাঁর সমকক্ষ বন্ধুরা শহরে সপরিবার সানন্দে বসবাস করছেন। এ রকম ঘটনা ভারতের রাজস্থানে ঘটেছিল, রাজ্য সরকার ডাক্তারদের গ্রামে থাকা বাধ্যতামূলক করার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক হাজার ডাক্তার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, গ্রামে থাকতে সমস্যা কী? একটি বড় অংশের উত্তরদাতারা বলেছিলেন, ‘আমি না হয় ভাঙাচোরা জায়গায় অফিস করলাম, কিন্তু আমার ছেলেমেয়ের কী হবে? ওদের জন্য স্কুল-কলেজ কই পাব?’ একপেশেভাবে কোনো নিয়ম চাপিয়ে দিয়ে নয়, বরং এসব সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হবে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতি অনুসারে, যদি কোনো কর্মচারীর জীবনের উন্নতির সঙ্গে পেশাকে সমান্তরালে রাখা যায়, তাহলে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারেন। যেমন ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানের পড়ালেখা নিয়ে ভাবনা কম। এই সময়টাতে একজন চিকিৎসককে চাকরি দিয়ে গ্রামে পদায়ন করলে তাঁর পক্ষে সেবা দেওয়া সহজতর হয়। এর সঙ্গে গ্রামে থাকাকালে যদি পেশাগত উন্নতির ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে ব্যাপারটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। যেমন অনেক দেশেই গ্রামে কাজ করার সময়টিকে স্নাতকোত্তরের জন্য প্রশিক্ষণকালীন সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চতর স্কেল বা পদে উন্নতির ব্যবস্থা থাকে। আমাদের দেশেও সেটি করা যেতে পারে। উচ্চতর পড়াশোনার বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন, সম্ভব হলে দূরশিক্ষণ কোর্স চালু করতে হবে। এমন সুবিধাদি কেবল চিকিৎসকদের জন্য নয়, বরং গ্রামপর্যায়ে কাজ করা সব পেশাজীবীর জন্যও নিশ্চিত করা প্রয়োজন, না হলে অন্যান্য সেবাদানকারীর সঙ্গে বৈষম্য সৃষ্টি করা হবে। স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসক যেমন প্রয়োজন, নার্স ও অন্যান্য জনবলের গুরুত্বও কিছুমাত্র কম নয়। কীভাবে সব পেশার দক্ষ ও তারুণ্যদীপ্ত জনবলকে গ্রামের মানুষের সার্বক্ষণিক সেবায় নিয়োজিত করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি কাজ করলে এই তারুণ্যের সঙ্গে অভিজ্ঞ বয়োজ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের দক্ষতা যোগ করা যেতে পারে। সেটা হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। ধরা যাক একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নবজাতক বিশেষজ্ঞ নেই, কিন্তু যে চিকিৎসক আছেন, তিনি শহরে নবজাতক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে টেলি-কনফারেন্সের মাধ্যমে রোগের খুঁটিনাটি আলাপ করে আধুনিক চিকিৎসা দিতে পারেন। আইসিইউ এবং কিছু অত্যাধুনিক সুবিধা ছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা এভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দেওয়া সম্ভব। এসব বিকল্প ব্যবস্থায় কীভাবে শহরের সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। প্রাসঙ্গিক একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে শেষ করি। কয়েক দিন আগে আমার এক ছাত্র ফোনে জানতে চাইল, ‘বাংলাদেশে প্রতিদিন কত লোক যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে মারা যায়? আমাদের কি সম্পদের এতই অভাব যে এই মানুষগুলোর ভাগ্যে চিকিৎসা জোটে না?’ তার এই প্রশ্নের উত্তরটি বোধ হয় আমাদের সবারই জানা। আমাদের দেশে প্রচুর না হলেও অতীতের তুলনায় পর্যাপ্ত ডাক্তার ও অন্যান্য জনবল আছে, ওষুধ-যন্ত্রপাতিও আছে, কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক সেবা সঠিক জায়গায় সঠিক উপায়ে পাওয়ার আয়োজনটি নেই। চূড়ান্ত বৈষম্যে ভরা এই কাঠামোতে প্রতিদিন যত মৃত্যু হচ্ছে, আমরা কেউই তার দায় এড়াতে পারি না।
ডা. মাহবুব হোসেন: চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য গবেষক, আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন এবং গবেষণা কর্মকর্তা, ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্ট রিসার্চ, ভারত।
mahbub321@gmail.com

জামালপুরে ব্রহ্মপুত্র নদ

সরকারের কোনো অনুমতি না নিয়ে জামালপুর সদর উপজেলার চরযথার্থপুর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে যে কায়দায় বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তাতে মনে হয় না এখানে প্রশাসন বলে কিছু আছে। সোমবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ইউনাইটেড জামালপুর পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এক মাস ধরে ব্রহ্মপুত্র নদের একই স্থানে নয়টি খননযন্ত্র বসিয়ে বালু তুলে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এই গ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে ১১৫ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটের জন্য কেন্দ্রের পূর্ব পাশে নদ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এভাবে বালু তোলার কারণে নদের আশপাশের চাষের জমি হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, বর্ষার সময় বালু তোলার ক্ষতি বোঝা যাবে।
ওই সময় একসঙ্গে অনেক জমি ভাঙনের কবলে পড়ার এবং নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদীতে বালুমহালের ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী, খননযন্ত্র দিয়ে নদীগর্ভ থেকে বালু তোলা নিষিদ্ধ। অথচ সেই নিষিদ্ধ কাজটিই প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে করে যাচ্ছে ইউনাইটেড জামালপুর পাওয়ার লিমিটেড। কিন্তু তা বন্ধে প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ নেই। বালু তোলার ফলে স্থানীয় কৃষকেরা যে ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশাসনের মাথাব্যথা না থাকাটা খুবই দুঃখজনক। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে গ্রামের অনেক উন্নয়ন ঘটবে এটা ঠিক, কিন্তু যে উন্নয়ন করতে গিয়ে ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সেই ‘উন্নয়ন’ দিয়ে জনগণ কী করবে! জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বলেছেন, কিছু আইনি জটিলতার কারণে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও বালু তোলা বন্ধ করা যাচ্ছে না। আইনি কী জটিলতা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে সরকারকে অনুরোধ করছি। স্থানীয় প্রশাসনকেও এ ব্যাপারে তৎপর হতে হবে। তা না হলে নদ-নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাবে না।

আফসানার প্রতিবাদ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের একদল কর্মীর প্রথম বর্ষের ছাত্রী আফসানা আহমেদকে শীতের রাতে হল থেকে বের করে দেওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে ছাত্রলীগকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অব্যাহত শিথিল মনোভাবের বিষয়টিকে নাকচ করা যাবে না। ছাত্রলীগের মিছিলে যোগ না দেওয়ার ‘অপরাধে’ একজন আফসানার প্রতিবাদী হয়ে ‘খবর’ হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি দায়সারা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ ধরনের উদ্যোগের ফল নিয়ে খুব আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ দূষণমুক্ত করা অপরিহার্য। সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে চাইলে আওয়ামী লীগকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে বাকৃবির ওপর কেন্দ্রীয়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের চলমান প্রশ্নবিদ্ধ তৎপরতা বন্ধ না করা হলে এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকে যাবে। বহু বছর ধরে ওই বিদ্যাপীঠে এক অলিখিত রুগ্‌ণ রেওয়াজ চালু করা হয়েছে যে ছাত্রলীগের মিছিল ও নানা ধরনের কর্মসূচিতে, বিশেষ করে নবাগত শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করতেই হবে। প্রায় প্রতিটি হল থেকে প্রায় প্রতি সপ্তাহে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীকে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন কেয়ার মার্কেটে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয়। নৈতিক সাহস প্রদর্শনের জন্য আফসানাকে আমরা অভিবাদন জানাই। কিন্তু তাঁর একক প্রতিবাদ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক যে জবরদস্তি বা হয়রানি চলে আসছে, তা প্রতিহত করার জন্য যথেষ্ট হবে না। আফসানার ঘটনাকে ছাত্রলীগ তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রফ্রন্টের চক্রান্ত হিসেবে দেখছে। আমরা মনে করি, এ ধরনের অবস্থায় নীরবতা পালন করে আওয়ামী লীগ তার এই সহযোগী এবং জাতির ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির কী সর্বনাশ করেছে, তা তাদের মূল্যায়ন করা উচিত। গত ৪২ বছরে ছাত্রসংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ১৬ জন বলি হয়েছেন। ১৯৯৩-৯৪ সালে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কোন্দলে লাশ পড়েছে, বিচার হয়নি, প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ থেকেছে। আবার এখন শতভাগ ওই সব সংগঠন‘মুক্ত’ পরিবেশেও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশ পড়ে। ২০১৩ সালে টেন্ডারবাজি ও নিয়োগ-বাণিজ্যে ছাত্রলীগের সভাপতি, সম্পাদক ও সমর্থকদের সংঘাতে শিশু রাব্বি নিহত হয়। পরের বছরই ছাত্রলীগের কর্মী সায়াদ খুন হন। ছাত্রলীগেরই ১৪ জন অভিযুক্ত হন। কিন্তু বিচারহীনতার ধারা ছিন্ন হয়নি। সুতরাং আফসানাকে হল থেকে বের করে দেওয়া এবং প্রতি সপ্তাহে বাধ্যতামূলক কর্মসূচি পালন করানোর যে অপরাধ, তার দায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এড়াতে পারেন না। আশা করব, উল্লিখিত তদন্ত কমিটি আফসানাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারবে।

প্রতিবাদী আফসানাকে অভিনন্দন by সোহরাব হাসান

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা টেলিফোন করে জানান, তাঁরা জনগণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে এ বছর ৪ জানুয়ারি ঢাকায় কোনো সমাবেশ বা মিছিলের আয়োজন করেননি। তাঁরা মিছিলটি করেছেন ৬ জানুয়ারি শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। খুবই ভালো খবর। প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন হিসেবে জনগণের প্রতি তাদের একটি দায়িত্ব আছে। কিন্তু ৫ জানুয়ারি শুক্রবার ছুটির দিন সত্ত্বেও বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি না দিয়ে কেন একটি অখ্যাত ইসলামি সংগঠনকে দেওয়া হলো, সেই প্রশ্নের জবাব ওই ছাত্রনেতা কিংবা আওয়ামী লীগের কোনো নেতা দিতে পারেননি।  ওই ছাত্রনেতা অনেকটা উপদেশের সুরে বললেন, ‘ছাত্রলীগের কোনো কর্মী মন্দ কাজ করলে আপনারা সমালোচনা করুন। কিন্তু ভালো কাজ করলে সেটিও বলুন। আমি তাঁকে বললাম, ‘ছাত্রলীগ অন্তত একটি ভালো কাজ করে দেখাক, আমরা অবশ্যই তার প্রশংসা করব।’ শুধু ছাত্রলীগ কেন, যেকোনো সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ভালো কাজ করলে আমরা তাঁদের তারিফ করতে কার্পণ্য করব না। কিন্তু ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ছাত্রলীগ ঢাকায় কর্মসূচি না নিলেও কুমিল্লা, বরিশাল ও চট্টগ্রামে সংগঠনের দুই পক্ষের কর্মীরা মারামারিতে লিপ্ত হয়েছেন। কুমিল্লায় ১০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন আহত হয়েছেন।
আর ৭ জানুয়ারি সিলেটের টিলাগড়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ছাত্রলীগের এক কর্মী নিহত হন। বলা যায়, নতুন বছরে ছাত্রলীগের হাতে ছাত্রলীগের প্রথম খতম। এর আগে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত এক ছাত্রলীগ কর্মীর মা সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে আমরণ অনশন করেছিলেন। পরে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের আশ্বাসে অনশন ভাঙলেও মামলার অগ্রগতি হয়েছে কি না, আমাদের জানা নেই। ঢাকায় ছাত্রলীগ কর্মীরা মারামারি ছাড়াই ৬ জানুয়ারি মিছিল শেষ করতে পেরেছেন, সে জন্য তাঁরা ধন্যবাদ পেতে পারেন। কিন্তু এর তিন দিন না যেতেই ছাত্রলীগ পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীকে কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ছাত্রীর নাম আফসানা আহমেদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের প্রথম বর্ষের ছাত্রী এবং বেগম রোকেয়া হলের বাসিন্দা। আফসানা ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে অংশ নেননি। এরপর হলের ছাত্রলীগের কর্মী ওয়াহিদা সিনথি, সাদিয়া স্বর্ণা, শিলা, ইলাসহ কয়েকজন তাঁকে হল থেকে সোমবার রাতে বের করে দেন।’ আফসানা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রফন্টের একজন কর্মী হওয়ায় তিনি ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যোগ দেননি। কিন্তু ছাত্রলীগ নাকি নিয়ম জারি করেছে, প্রথম বর্ষের সব ছাত্রীকে ছাত্রলীগের সব কর্মসূচিতে যোগ দিতে হবে। অন্যথায় তাঁরা হলে থাকতে পারবেন না। সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আফসানাকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হলে প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইসমত আরা বেগম তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে (হলের সংস্কারকাজ চলায় সাময়িক ব্যবস্থা) অবস্থান করার কথা বলেন। এতে তিনি রাজি না হয়ে রাতে হলের ফটকের সামনে অবস্থান করেন এবং ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকালে আফসানা রোকেয়া হলের সামনে ‘আমরণ অনশনে’ বসেন। ব্যানারে লেখা ছিল, ‘ছাত্রলীগ কর্তৃক হল থেকে বের করে দেওয়ার প্রতিবাদে আমরণ অনশন।’ কয়েক ঘণ্টা পর আফসানার কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ নিয়ে সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম জাকির হোসেন ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য ওই ছাত্রীকে তাঁর কক্ষে দিয়ে আসেন। এর আগে দুপুরে হলের ছাত্রলীগের চার কর্মীর নেতৃত্বে অর্ধশত ছাত্রী আফসানার বিরুদ্ধে হল ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তাঁদের দাবি, ‘ওই ছাত্রী হলে ওঠার পর থেকেই সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বেয়াদবি করছিলেন। এমনকি প্রভোস্টের সঙ্গেও বেয়াদবি করেন। তাই সাধারণ ছাত্রীরা তাঁকে হল থেকে বের করে দিয়েছেন।’ ‘সাধারণ ছাত্রীরা’ এ রকম একটি অসাধারণ কাজ করতে কেন গেলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর নেই। এ ঘটনায় হল কর্তৃপক্ষও তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। একজন ছাত্রীকে যাঁরা হল থেকে জোর করে বের করে দিলেন, কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ওই ছাত্রীকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা আফসানার সাহসকে অভিনন্দন জানাই। তিনি ছাত্রলীগ কিংবা কথিত সাধারণ ছাত্রীদের জবরদস্তির প্রতিবাদ করেছেন। কেউ সঙ্গে না থাকলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে একা দাঁড়াতে হবে। আর ছাত্রলীগের অভিযোগ অনুযায়ী আফসানা যদি হল কর্তৃপক্ষ কিংবা কোনো ছাত্রীর সঙ্গে বেয়াদবি করে থাকেন, সেটি দেখার দায়িত্ব হল কর্তৃপক্ষের, ছাত্রলীগের কর্মী কিংবা কথিত সাধারণ ছাত্রীদের নয়। তথাকথিত সাধারণ ছাত্রীরা হল কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ না করে নিজেরা আইন হাতে তুলে নিয়েছেন। হল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি করেছে। আমরা দেখতে চাই, কমিটি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে। এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের কিংবা তাদের অভিভাবক সংগঠনের নেতারা কী বলেন, তা-ও শোনার অপেক্ষায় আছি। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য ঢাকার দেয়ালে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘ছাত্রলীগ কর্মীদের শুধু ভালো ছাত্র নয়, ভালো মানুষ হতে হবে।’ কিন্তু তাঁর কোনো উপদেশই যে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের কানে পৌঁছায়নি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাই তার প্রমাণ। এ প্রসঙ্গে অতীতের একটি ঘটনা মনে পড়ল। খবরটি ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোয় ১৮ জানুয়ারি ২০১১। অভিযোগ ও অ্যাকশন প্রায় একই। স্থানকাল ভিন্ন। খবরটির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি, ‘কনকনে শীতের রাতে গত রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের অতিথি কক্ষের চিত্র ছিল কিছুটা আলাদা। ছাত্রলীগের হল শাখার সভাপতি ও তাঁর অনুসারীদের সামনে ‘কাঠগড়ায়’ দাঁড়িয়েছিলেন বিভিন্ন বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের ১০-১২ জন ছাত্র। তাঁরা সবাই হলের ২২৬ (ক) কক্ষে থাকেন। তাঁদের অপরাধ, অতিথি কক্ষে ছাত্রলীগের সভায় উপস্থিত হননি, বড় ভাইদের দেখেও সালাম দেননি। প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্ররা জানান, জেরার একপর্যায়ে হল শাখার সভাপতি সাইদ মজুমদার ও তাঁর অনুসারী কয়েকজন নেতা-কর্মী ওই শিক্ষার্থীদের ভাঙা টেবিল ও চেয়ারের পায়া দিয়ে মারধর শুরু করেন। ছাত্রলীগের ওই নেতাদের মধ্যে একজন এ সময় কয়েকজন ছাত্রের মাথা দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা দেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র শফিক। এ ছাড়া বিশ্ব ধর্মতত্ত্ব বিভাগের প্রভাষ, উর্দু বিভাগের বাশার এখনো হলের বাইরে অবস্থান করছেন। এ বিষয়ে হল সভাপতি সাইদ মজুমদার রাতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বড় ভাইদের সালাম দেয় না, সম্মান করে না, প্রোগ্রামে আসে না—তাদের মারব না তো কী করব?’ তবে বিকেলে সাইদ মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু ছাত্র হলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছিল। তাই তাদের হল থেকে বের করে দিয়েছি।’ ২০১১ সালে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন, এখন আর তাঁরা নেই। নতুন নেতৃত্ব এসেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী মার্চে ছাত্রলীগের সম্মেলন হলে বর্তমান নেতৃত্বও থাকবে না। আরেক দল নেতা ছাত্রলীগের হাল ধরবেন। কিন্তু ‘বেয়াদবির কারণে’ মধ্যরাতে হল থেকে বের করে দেওয়ার এই সংস্কৃতি বদলাবে কি?
সোহরাব হাসান: লেখক ও সাংবাদিক।

বিয়েটাই সব নয়... by রোকেয়া রহমান

রিতার জন্য একদিকে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে তার ওপর খুব রাগও হচ্ছে। এত বোকা কেন মেয়েটা? কয়েকজন মানুষ তাকে পছন্দ করল না বলে যে নিজের জীবন দিয়ে দেয়, তাকে বোকা ছাড়া আর কী বলব? পাঠকেরা কি রিতাকে চিনতে পারছেন? রিতার পুরো নাম রিতা চক্রবর্তী। বাড়ি পিরোজপুরের সদর উপজেলার শিকদার মল্লিক গ্রামে। গায়ের রংটি একটু চাপা ছিল রিতার আর উচ্চতাও ছিল একটু কম। তাই বিয়ের পাত্রী হিসেবে তাকে পছন্দ হচ্ছিল না অনেকের। পাত্রপক্ষ তাকে দেখে দেখে যায়। কিন্তু বিয়ে আর হয় না রিতার। শেষমেশ এক জায়গায় তার বিয়ে ঠিক হয় ঠিকই কিন্তু বরপক্ষ শেষ পর্যন্ত বিয়েটি ভেঙে দেয়। চরম হতাশা দেখা দেয় রিতার মনে। ফলাফল গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা। গত মঙ্গলবার প্রথম আলোয় রিতার এই দুঃখজনক পরিণতির খবরটি ছাপা হয়। আহারে, বোকা মেয়েটা কেন বুঝল না বিয়ে হওয়াটাই এই জীবনের সবকিছু নয়? বিয়ে করা ছাড়াও মানুষের আরও অনেক কাজ আছে। সেসব কাজের মধ্যে মানুষ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারে। হ্যাঁ, রিতা ভুল করেছে। কিন্তু তার এই মৃত্যুর জন্য সে মোটেও দায়ী নয়। আসলে আমাদের সমাজব্যবস্থাই রিতাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, রিতা পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে সম্মান দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছিল। বয়স হয়েছিল ২১ বছর। গ্রামাঞ্চলে যেখানে বেশির ভাগ মেয়ের বয়স ১৮ বছর না হতেই বিয়ে হয়ে যায়, সেখানে ২১ বছর তো বিয়ে জন্য বড্ড বেশি বয়স। তার ওপর কালো আর খাটো হলে তো কোনো কথাই নেই। এমন মেয়ে যে বিয়ের পাত্রী হিসেবে খুব একটা ভালো নয়, তা আমাদের সমাজে কে না জানে? তাই তো রিতার মা-বাবা ব্যস্ত হয়ে পড়েন মেয়েকে বিয়ে দিতে। কিন্তু বারবার পাত্রপক্ষের প্রত্যাখ্যান রিতাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বারবার পাত্রপক্ষ প্রত্যাখ্যান করায় নিশ্চয়ই রিতাকে পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের কটু কথা শুনতে হয়েছে। হয়তো মা-বাবাও তাকে ছাড় দেননি। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার দায় তার ওপর চাপিয়েছিলেন। রিতা তো ভালোভাবে পড়ালেখা করছিল।
মা-বাবা যদি তার বিয়ের চেষ্টা না করতেন, তাহলে আজ রিতা বেঁচে থাকত। বারবার যখন পাত্রপক্ষ ফিরে যাচ্ছিল, তখন রিতার মা-বাবার উচিত ছিল মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে তাকে পড়ালেখায় উৎসাহিত করা। আর তাঁদেরই–বা আর কী দোষ দেব, হয়তো সমাজের চাপে পড়ে তাঁরা সেটা করতে পারেননি। হায় রে সমাজ! আচ্ছা, সমাজ জিনিসটা আসলে কী? মানুষকে নিয়েই তো সমাজ গড়ে ওঠে। তার মানে মানুষই সমস্যা। একটি মেয়ের বিয়ে না হলে কেন মানুষ এত কথা বলে? কেন সেই মেয়ের মা-বাবাকে নানা কথা শুনতে হয়? কেন তাদের হেনস্তা হতে হয়? শুধু গ্রামীণ সমাজে নয়, শহুরে সমাজেও এমনটা ঘটছে আকছার। গায়ের রং কালো হলে আমাদের সমাজে একজন মেয়েকে যে ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও অপমানের সম্মুখীন হতে হয়, তা বোধ হয় খুব কম দেশেই দেখা যায়। সে হয়তো পড়ালেখায় ভালো, তার হয়তো আরও অনেক ভালো গুণ রয়েছে। কিন্তু গায়ের কালো রং তার সেসব গুণকে ঢেকে দেয়। বিয়ের বাজারে তার কোনো দাম নেই। আর যদিওবা বিয়ে হয়, দেখা যায়, গায়ের কালো রঙের জন্য পাত্রপক্ষকে যৌতুক দিতে হচ্ছে অনেক বেশি। এমন সমাজ আর এমন মানুষদের পাত্তা দেওয়ার কী আছে? এদের কথায় যদি কেউ আত্মহত্যা করে, তাহলে তো এই দুষ্ট সমাজের দুষ্ট মানুষদেরই জয় হলো। এদের জয়ী হতে দেওয়া যাবে না। মেয়েদের উচিত তাদের কথাকে গায়ে না মেখে নিজের লক্ষ্যপূরণে এগিয়ে যাওয়া; পড়ালেখা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল ২০১৬ সালে ঘটা ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের একটি ঘটনার কথা। গায়ের রং কালো বলে এক তরুণীকে বিয়ের শর্ত হিসেবে বরপক্ষের পরিবার বড় অঙ্কের যৌতুক দাবি করেছিল। কিন্তু জ্যোতি চৌধুরী নামের ওই তরুণী ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানিয়ে দেন, তিনি ওই পাত্রকে বিয়ে করবেন না। গায়ের কালো রঙের জন্য তিনি কাউকে টাকা দেবেন না। আসুন, আমরা সবাই জ্যোতি চৌধুরীকে অনুসরণ করি। যারা কালো রঙের নিন্দা করে, তাদের আমরা প্রত্যাখ্যান করি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি । এটাই আসল কথা। একবার নিজের পায়ে দাঁড়ালে তখন বিয়ের জন্য কিংবা গায়ের রঙের জন্য আলাদা করে ভাবতে হবে না।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক

এমন বন্ধু থাকলে শত্রুর কী দরকার? by হাসান ফেরদৌস

ফিলিস্তিনের নামজাদা শিল্পী উমাইয়া জুহার একটি কার্টুন এ রকম: একজন ফিলিস্তিনি নারী, একটি হাত পেছন থেকে ছুরি মারছে তাঁর পিঠে, আরেকটি হাত সামনে থেকে ছুরি মারছে তাঁর বুকে। প্রথম হাতটি একজন আরবের, অন্যটি ইসরায়েলের। গত ৭০ বছরের ইতিহাসে ফিলিস্তিনিদের বারবার এ রকম আরব বিশ্বাসঘাতকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনাটি গত বছরের শেষ মাসে, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রশ্নটি ঘিরে। প্রথমে নিরাপত্তা পরিষদে ও পরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই প্রশ্নে যে ভোট হয়, তাতে আরব দেশগুলো ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের নিন্দা করে বটে, কিন্তু পর্দার অন্তরালে তাদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তটি সঠিক, তাই তা ফিলিস্তিনিদের মেনে নেওয়া উচিত—এমন যুক্তি দেখানো শুরু করে। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে আরব বিশ্বের অন্যতম নেতৃত্বস্থানীয় দেশ মিসর। খবরটা দিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস। পত্রিকাটি লিখেছে, মিসরের টিভি দর্শকদের এ কথা বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে যে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে জেরুজালেমের স্বীকৃতি আর পশ্চিম তীরের রামাল্লাহকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির মধ্যে কোনো তফাত নেই। একাধিক টেপ রেকর্ডিং শুনে দেখা গেছে, মিসরের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা টিভির টক শোর বক্তাদের শিখিয়ে দিচ্ছেন যে ট্রাম্প প্রশাসন জেরুজালেমকে স্বীকৃতির যে ঘোষণা করেছে, তা নিয়ে যেন বেশি কথা তাঁরা না বলেন। কারণ, এর ফলে শুধু হামাস ও ইসলামপন্থীদের উসকে দেওয়া হবে। আশরাফ আল খোলি নামের এক মিসরীয় সামরিক কর্মকর্তার চারটি রেকর্ডিং নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে আছে। তার একটিতে ক্যাপ্টেন খোলিকে বলতে শোনা যায়, ‘দেখুন, সব আরব ভাইয়ের মতো আমরাও (আমেরিকার সিদ্ধান্ত) নিন্দা করি। (কিন্তু) যখন এই সিদ্ধান্ত বাস্তবতায় পরিণত হবে, ফিলিস্তিনিদের সাধ্য নেই তা ঠেকায়। আর আমরা তো এ নিয়ে নতুন এক যুদ্ধে যাব না। এমনিতে আমাদের নিজেদেরই সমস্যার অন্ত নেই।’ বলা বাহুল্য, ফিলিস্তিন নামে কোনো রাষ্ট্র নেই এবং রামাল্লাহ তার রাজধানী নয়। এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থামাত্র। যেদিন সত্যি সত্যি স্বাধীন ফিলিস্তিন নামের রাষ্ট্রটি গঠিত হবে, পূর্ব জেরুজালেম হবে তার রাজধানী, ফিলিস্তিনি ও বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের সেই আশা। নিরাপত্তা পরিষদে এক যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকি ১৪টি সদস্যরাষ্ট্র গত মাসেও তাদের ভোটের মাধ্যমে সে সম্ভাবনায় তাদের আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
তাহলে মিসর মুখে এক কথা আর পেছন থেকে অন্য কথা কেন বলছে? উত্তরটা খুব কঠিন নয়। আজকের কোনো আরব দেশই গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুপাক্ষিক রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের প্রতিষ্ঠা চায় না। তাদের নিজেদের রাষ্ট্রব্যবস্থা হয় রাজতন্ত্র, নয়তো আধা সামরিক একনায়কতন্ত্র। স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন তাদের জন্য রীতিমতো হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি আরবদের বিশ্বাসঘাতকতা সাত দশকেরও বেশি পুরোনো। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের জন্য নির্ধারিত অঞ্চল হয় মিসর নয়তো জর্ডান দখল করে নেয় ইসরায়েল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনের জন্য নির্ধারিত পুরো অঞ্চলই ইসরায়েলের অধীনে চলে যায়, আরও যায় সিনাইতে মিসরের নিজস্ব জমি। ১৯৭৩ সালে মিসর সে জমি পুনরুদ্ধারের পর ফিলিস্তিনের প্রশ্নটি নিজেদের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরবর্তী ৩০ বছরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির একটা বড় গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। একদিকে শিয়া রাষ্ট্র ইরানের উদ্ভব, অন্যদিকে ধর্মীয় উগ্রবাদ—এই দুই পরিস্থিতিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক আঁতাতের নতুন মেরুকরণ ঘটে। সৌদি আরব, মিসর ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ইসরায়েলের মোকাবিলার চেয়ে অনেক জরুরি হয়ে পড়ে ইরানের সামরিক আধিপত্য ঠেকানো। ফলে পুরোনো অসদ্ভাব ঝেড়ে ফেলে এই দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে গোপনে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে, কৌশলগত আঁতাতে জড়িয়ে পড়ে। এই আঁতাতের একটি অনিবার্য বলি হয় ফিলিস্তিন। এই মুহূর্তে স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার মতো ক্ষমতা ফিলিস্তিনের নেই। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ একটি আরব রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে সীমানা বরাদ্দ রেখেছিল, এখন তার অর্ধেকও ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে নেই। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের হটিয়ে তাদের জমির ওপর প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ইহুদির জন্য বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া, পশ্চিম তীরের এক শহর বা গ্রাম থেকে অন্যত্র যেতে হলে ইসরায়েলি চেকপোস্টের অনুমতি চাই। বছর পাঁচেক আগে ইসরায়েলি চেকপোস্ট পেরিয়ে আমাকে পশ্চিম তীরে যেতে হয়েছিল। মনে আছে, জাতিসংঘের গাড়ি নিয়েও সে চেকপোস্ট পেরোতে আমাকে অর্ধেক দিন নিরাপত্তা প্রহরীদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আরব হলে তো কথাই নেই। সমুদ্রসীমা বন্ধ, নিজস্ব কোনো বিমানবন্দর নেই, নিজ সীমান্তের ভেতর কাজের কোনো সুযোগ নেই, ভালো কোনো স্কুল বা হাসপাতাল পর্যন্ত নেই। টিকে থাকার জন্য নির্ভর করতে হয় জাতিসংঘের ওপর অথবা বিদেশি সাহায্যের ওপর। এমন একটা দেশ স্বাধীন হয়েই–বা কী করবে? একসময় আরব দেশগুলো নিজের দেশের মানুষের অসন্তোষ ঠেকাতে বেশ উদার হস্তেই ফিলিস্তিনিদের অর্থ সাহায্য দিয়েছে। এখন তা–ও বন্ধ। অবস্থা এতটা গুরুতর যে বিদেশ থেকে অর্থ সাহায্য না এসে পৌঁছালে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কর্মচারীদের মাসিক বেতন জোগানোই অসম্ভব। অধিকাংশ আরব দেশ শুধু অগণতান্ত্রিক নয়, প্রবল স্বেচ্ছাচারী ও দুর্নীতিপরায়ণ।
যেকোনো দুর্নীতপরায়ণ ও স্বেচ্ছাচারী দেশের মতো তাদেরও প্রধান ভয় দেশের জনগণকে। জনগণ যদি খেপে ওঠে, বাক্স-পেটরা ও হাতানো ডলারের বস্তা নিয়ে এসব দেশের নেতারা পালাবেন কোথায়? মানুষ যে খেপে উঠতে পারে তার প্রমাণ রয়েছে, ২০১১ সালে তিউনিসিয়া থেকে ইয়েমেন, প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই এক অভাবিত ‘আরব বসন্ত’ আগুনের গোলার মতো ফেটে পড়ে। বড় ধরনের কোনো বিপদ ঘটার আগেই সে আগুন নেভানো গেছে, কিন্তু আবারও যে একই ঘটনা ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা নেই। তা যাতে না ঘটে, সে লক্ষ্যে উদ্বিগ্ন আরব রাজা-রাজড়ারা ইসরায়েলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার উদ্যোগ নেয়। এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা গোলাবারুদ ও ভাড়াটে লেঠেল দিয়ে গণতান্ত্রিক বিস্ফোরণ ঠেকানো গেছে, কিন্তু বারাক ওবামার সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রমশ নিজেদের গুটিয়ে নেয়। রাজা-রাজড়াদের প্রয়োজন পড়ে নতুন লেঠেলের। আর সেই শূন্যস্থানে ঢুকে পড়ে ইসরায়েল। ইসরায়েলের সঙ্গে আরবদের আলোচনা গোপনে গোপনে অনেক দিন থেকেই চলছিল। ২০০২ সালে এই আলোচনা একটি সুনির্দিষ্ট রূপ নেয়। তথাকথিত ‘আরব শান্তি উদ্যোগ’ নামে এক ফর্মুলার অধীনে আরব দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের বদলে দেশটিকে সম্পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিতে সম্মত হয়। কাগজে-কলমে এই উদ্যোগের লক্ষ্য সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বলা হলেও আসল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে একদিকে ইরানকে ঠেকানো, অন্যদিকে হামাসসহ সব জঙ্গি আন্দোলনকে কোণঠাসা করা। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর এই প্রক্রিয়া আরও তীব্রতা পায়। এই নতুন প্রশাসনের চাপেই আরবরা ইসরায়েলের সঙ্গে খোলামেলাভাবে গাঁটছড়া বাঁধে। বস্তুত, ২০১৭ সালে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনে কোনো শর্ত ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সম্মত বলে জানায়। আরব ও ইসরায়েলের এই সখ্যের ফল দাঁড়াল এই যে ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ায় এমন আর কেউ থাকল না। এমনিতেই সামান্য কিছু অর্থ সাহায্য ছাড়া তেমন কিছুই আরব দেশগুলো করেনি, এখন ইসরায়েলকে খুশি করতে সে সাহায্যও কমে এসেছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা ফিলিস্তিন প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করায় হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারাও ফিলিস্তিনিদের কোনো রকম অর্থ সাহায্য দেবে না। শুধু সরাসরি সাহায্য নয়, জাতিসংঘের মাধ্যমে যে সাহায্য যেত, দরকার হলে সে সাহায্যও বাতিল করা হবে। সন্দেহ নেই, ফিলিস্তিনিরা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ভাগ্যময় এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেয়ালে তাদের পিঠ ঠেকে গেছে, হাঁটু মুড়ে এসেছে। একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তারা এখন ক্লান্ত, পর্যুদস্ত। এই এলাকায় নতুন আরেক ‘ইন্তিফাদা’ ফেটে পড়বে, তেমন সম্ভাবনাও কম। একমাত্র আশা, তা–ও অতি ক্ষীণ, তা হলো আরব দেশগুলোয় আরেক ‘আরব বসন্তের’ সম্ভাবনা। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ ফিলিস্তিনের সঙ্গে অবিচারের কথা জানে, এই অবিচার তাদের নিজের বিরুদ্ধে অবিচার, এই কথা তারা ভাবে। এই মনোভাব যে আগামী দিনে নতুন বিস্ফোরণে পরিণত হবে না, এ কথা কে বলতে পারে? আর তেমন বিস্ফোরণ ঠেকাতেই যে মিসর সরকারের গোয়েন্দারা দেশের মানুষের কানে ফুসমন্তর দিচ্ছেন, রামাল্লাহ আর জেরুজালেমের তফাত কী—তাতেও কোনো ভুল নেই।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

ভেনিজুয়েলায় মাদুরোপন্থী আইনপ্রণেতা নিহত

ভেনিজুয়েলার ক্ষমতাসীন দলের সাংবিধানিক পরিষদের এক আইনপ্রণেতা বুধবার অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও কর্মকর্তারা একথা জানায়। খবর এএফপি’র। খবরে বলা হয়, ভেলারা নগরীতে এক মটরসাইকেল আরোহী টমাস লুসেনার গাড়ি লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এতে লুসানা মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেয় হয়।
পরে সেখানে তিনি মারা যান। হামলার সময় লুসেনার স্ত্রীও গাড়িতে ছিল। লুসানা ভেনিজুয়েলার পশ্চিমাঞ্চলীয় ট্রুজিলো রাজ্য পরিষদের সদস্য ছিলেন। গভর্নিং বডি’র প্রধান ডেলসি রদ্রিগুয়েজ এ হত্যার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা ট্রুজিলো পরিষদ সদস্য টমাস লুসানা হত্যার নিন্দা জানাচ্ছি। এ ঘটনায় আমরা তার বাবা-মা, সন্তান ও বন্ধু-বান্ধবের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি।’ রদ্রিগুয়েজ এ হত্যার উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে কিছু উল্লেখ না করে আরো জানান, এ অপরাধের সাথে জড়িতদের শাস্তি দেয়া হবে। তবে এই ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত থাকতে পারে বলে জানান এই নারী।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এমন প্রতিশোধ নিচ্ছে পাকিস্তান!

পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আফগানিস্তানে যাতায়াতকারী ন্যাটো সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী কন্টেইনারের টোল ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামাবাদ সরকার। স্থানীয় গণমাধ্যম বলছে, পাক সরকার ন্যাটো বহরের জন্য শতকরা ১০০ থেকে ১৫০ ভাগ ট্যাক্স বাড়াতে পারে। বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় টোল ট্যাক্স বাড়াতে একটি সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী মাহিদ খাকান আব্বাসির কাছে পেশ করতে যাচ্ছে। পাকিস্তান সরকার ন্যাটো সেনাদের পণ্যবাহী প্রতিটি কন্টেইনারের জন্য ২,৫০০ ডলার ট্যাক্স নেয়। কন্টেইনারবাহী ট্রাকগুলো করাচি বন্দর থেকে জাতীয় মহাসড়ক দিয়ে আফগান সীমান্তের তোরখাম ও চামান ক্রসিং পর্যন্ত যায়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যের কারণে আমরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি দেখা দিয়েছে। তবে, গত ১ জানুয়ারি ট্রাম্প অত্যন্ত অবমাননাকর এক টুইটার পোস্ট দেয়ার পর ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক একেবার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ট্রাম্প ওই পোস্টে বলেছেন, “গত ১৫ বছর ধরে আমেরিকা বোকার মতো পাকিস্তানকে তিন হাজার তিন শ' কোটি ডলার অর্থ সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু তারা মিথ্যা ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই দেয়নি; আমাদের নেতাদেরকে বোকা মনে করেছে। আমরা যেসব সন্ত্রাসীকে আফগানিস্তানে ধরার জন্য খুঁজি সে বিষয়ে পাকিস্তান সাহায্য করে না বরং তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয় দেয় পাকিস্তান। আর সাহায্য দেয়া হবে না।” ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের পর পাকিস্তান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ন্যাটো বাহিনীর সামরিক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্যাক্স বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। আফগানিস্তানে মোতায়েন ন্যাটো বাহিনীতে বর্তমানে বেশিরভাগই মার্কিন সেনা।

বিলুপ্তির পথে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ী

বিলুপ্তির পথে ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ী রাজবাড়ী। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অবহেলায় আড়াইশ বছরের পুরনো এ জমিদার বাড়ীটি কালের স্বাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে। আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ী ময়মনসিংহ জেলার অর্ন্তগত ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার একটি সমৃদ্ধ এলাকা । ব্রিটিশ শাসন আমল থেকেই এলাকাটি ব্যবসা-ব্যাণিজ্যে ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় অগ্রসর। এমন একটি সমৃদ্ধ এলাকায় জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায়ের পরিত্যক্ত দৃষ্টিনন্দন সুবিশাল জমিদার বাড়ী এখনও ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে নিরব দাড়িয়ে আছে। চমৎকার কারুকার্যময় এ রাজবাড়ীটির বয়স প্রায় আড়াই শত বছর। ময়মনসিংহ কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার পূর্বে কিছু অগ্রসর হলেই চোখে পড়বে জমিদারের বিশাল অট্টালিকা। জানা যায়, ১৭৯৩ খ্রিষ্ঠাব্দ পর্যন্ত হোসেন শাহী পরগনা রাজশাহী কালেক্টরের অধিনে ছিল। সে সময় মহা রাজ রামকৃষ্ণের জমিদারি খাজনার দায়ে নিলামে উঠলেএ পরগনাটি খাজে আরাতুন নামে এক আর্মেনীয় ক্রয় করেন। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে আরাতুনের ২ মেয়ে বিবি কেথারিনা, বিবি এজিনা এবং তার দুই আত্মীয় স্টিফেন্স ও কেসর্পাজ প্রত্যেক চারআনা অংশে এ পরগানার জমিদারী লাভ করেন। ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আঠার বাড়ী জমিদার সম্ভুরায় চৌধরী, বিবি এনিজার অংশ কিংবা মতান্তরে কেসপাজেব্র অংশ ক্রয় করেন। পরে মুক্তাগাছার জমিদার রামকিশোর চৌধরী জমিদারী ঝনের দায়ে নিলামে উঠলেতা সম্ভুরায় চৌধরীর পুত্র মহিম চন্দ্র রায় চৌধুরী কিনে নেন। শুধু তাই নয়, ঊঁনিশবিশ শতাব্দীর প্রথম দিকে (১৯০৪ খ্রিষ্টব্দে) মহিম চন্দ্র রায় চৌধুরীর স্ত্রী জ্ঞানেদা সুন্দরীর স্বামীর উত্তরাধিকার ও ক্রয় সূত্রে পরনায় ১৪ আনার মলিক হন। বাকী দুই আনা অন্য এলাকার জমিদাররা কিনে নেন। জমিদারী প্রতিষ্ঠার পর তাদের আয়ত্তে আসে উত্তর গৌরীপুরের রাজবাড়ী, পশ্চিমে রামগোপাল পুর, ঢৌহাখলা দক্ষিনে কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেন পুর ও নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলা। তাছাড়া বৃহৎত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর জেলার কয়েকটি মৌজা, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বেশ কিছু মৌজা ছিল এ জমিদারের দখলে। প্রতি বছরে নির্দিষ্ট এক সময়ে এসব জেলা শহরে স্থাপিত আঠারবাড়ী কাচারী বাড়ীতে নায়েব উপস্থিত হয়ে খাজনা আদায় করত। আজ ও এসব কাচারী আঠারবাড়ী বিল্ডিং নামে নিজ নিজ জেলায় পরিচিতি পেয়েছে। জমিদার সম্ভুরায় চৌধরীর পিতা দিপ রায় চৌধুরীর প্রথম নিবাস ছিল বর্তমান যশোর জেলায়।তিনি যশোর জেলার একটি পরগনায় জমিদার ছিলেন। সুযোগ বুঝে এক সময় দ্রীপ রায় চৌধুরী তার পুত্র সম্ভুরায় চৌধুরীকে নিয়ে যশোর থেকে আলাপ সিং পরগনায় অর্থ্যাৎ আঠারবাড়ী আসেন। আগে এ জায়গাটার নাম ছিল শিবগঞ্জ বা গোবিন্দ বাজার। দীপ রায় চৌধুরী নিজ পুত্রের নামে জমিদারি ক্রয় করে এ এলাকায় এসে দ্রুত আধিপত্য স্থাপন করতে সক্ষম হন এবং এলাকার নাম পরির্তন করে তাদের পারিবারিক উপাধি (রা) থেকে রায় বাজার রাকেন। আর রায় বাবু একটি অংশে এক একর জমির উপর নিজে রাজবাড়ী, পুকুর ও পরিখা তৈরী করেন। রায় বাবু যশোর থেকে আসার সময় রাজ পরিবারের কাজর্কম দেখাশুনার জন্য আঠারটি হিন্দু পরিবার সংঙ্গে নিয়ে আসেন। তাদের রাজ বাড়ী তৈরী করে দেন। তখন থেকে জায়গাটি আঠারবাড়ী নামে পরিচিত লাভ করে। দীপ রায় চৌধুরী মৃত্যুর পর তার পুত্র সম্ভুরায় চৌধুরী জমিদার লাভ করেন। তবে কোন পুত্র সন্তন না থাকায় তিনি নান্দাইল উপজেলায় খারুয়া এলাকা থেকে এক ব্রাম্মণ প্রমোদ রায় চৌধুরীকে দত্তক এনে লালন পালন করে এক সময় জমিদারী কর্ণধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর প্রমোদ রায় চৌধুরীর বংশধররা এখান থেকে ময়মনসিংহ জেলা সদরে চলে যান। কালের স্বাক্ষী হয়ে রয়ে যায় জমিদার বাড়ি। জমিদাড়ির বিলুপ্তির পর সরকার জমিদার বাড়িকে প্রতœত্ত্ব বিভাগের অধিনে নেয়। আঠারবাড়ির জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্র। ওই সময় কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তার (সরাসরি) শিক্ষক। এ শেষ জমিদারের আমন্ত্রণেই কবিগুরু এসেছিলেন এ জমিদার বাড়িতে। ওই সময় ‘রবীন্দ্রনাথ কী জয়’ ধ্বনি তুলে রেলস্টেশন থেকে কবিকে বরণ করা হয়েছিল। হাতির পিঠে চড়িয়ে কবিকে নিয়ে আসা হয়েছিল এ জমিদার বাড়িতে। কবিকে জমিদার উপহার দিয়েছিলেন সোনার চাবি। ৯২ বছর আগের সেই স্মৃতি আজো অম্লান। এ স্মৃতি এখনো আগলে রেখেছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ি ডিগ্রি কলেজ। ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম এসেছিলেন ঈশ্বরগঞ্জে। তিনি তার প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। এ উপজেলার শিক্ষিত ও সুশীল সমাজ এক্ষেত্রে ছিলেন আবেগ উদ্দীপ্ত। অনেক ইতিহাস ঐতিহ্যে ও কালের স্বাক্ষী সেই আঠারবাড়ি জমিদার বাড়ি এখন জরাজীর্ণ। পড়ে আছে অযতœ-অবহেলায়। কবির ঘুরে যাবার ৪৩ বছর পর ১৯৬৮ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আঠারবাড়ি ডিগ্রি কলেজ। জমিদারবাড়িতে কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রতœত্ব বিভাগ আর এখানে কর্তৃত্ব দেখায়নি। বর্তমানে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কবলে পরে দিনে দিনে জমিদার বাড়ির মূল্যবান দরজা, জানালা, শাল কাঠের বিভিন্ন তৈজসপত্র সহ বিভিন্ন জিনিস লুট করে নিয়ে যাওয়ার পর এখন দালানের ইট খুলে নিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অবহেলা অযতেœ ধ্বংসের দার প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা জমিদার বাড়িতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই কিছু কিছু স্থানে চলে অসামাজিক কাজ। নিত্যদিন বসে মদ. জুয়া সহ গাঁজার আড্ডা। এ জমিদার বাড়ি এখন অসামাজিক কার্যকলাপের কেন্দ্র বিন্দু বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সংস্কার করা হলে এই জমিদারবাড়িটির ঘিরে গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। বাংলার গৌরবউজ্জল ইতিহাসের স্বাক্ষী এই জমিদারবাড়ীটি প্রতœত্ত্ব বিভাগের অধিনে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। ইতিহাসের নিদর্শন জমিদারবাড়ীটি সংস্কার কাজে প্রতœত্ত্ব বিভাগের এগিয়ে আসা উচিৎ বলে মনে করে সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।