Sunday, February 14, 2016

জেএনইউ’র ঘটনায় হাফিজ সাঈদ জড়িত- রাজনাথ: চ্যালেঞ্জ ওমরের

১৪ ফেব্রুয়ারি (রেডিও তেহরান): দিল্লির জওহরলাল নেহেরু (জেএনইউ) বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে লস্কর-ই তাইয়্যেবার (এলইটি) প্রধান হাফিজ সাঈদ জড়িত বলে দাবি করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।  অন্যদিকে, রাজনাথ সিংকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এর প্রমাণ দিতে বলেছেন, জম্মু-কাশ্মিরের এনসি নেতা এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ। 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং আজ (রোববার) বলেন, ‘দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রের ভারতবিরোধী স্লোগান দেয়ার ঘটনায় সরাসরি মদদ রয়েছে পাকিস্তানে ঘাঁটি গাড়া সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লস্কর-ই তাইয়্যেবার।’
রাজনাথ বলেন, ‘দেশের এই সত্যিটা মেনে নেয়া উচিত যে জেএনইউতে যা ঘটেছে, তার পিছনে মদদ রয়েছে এলইটি প্রধান হাফিজ সাঈদের। এটা দুর্ভাগ্যজনক। সরকার এ রকম ভারত বিরোধী কার্যকলাপ কিছুতেই বরদাস্ত করবে না।’ 
রাজনাথের মন্তব্যের পাল্টা মন্তব্যে এনসি নেতা ওমর আব্দুল্লাহ বলেছেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জেএনইউতে বিক্ষোভকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে যে গুরুতর অভিযোগ  আরোপ করা হয়েছে তার প্রমাণ অবশ্যই সকলের সামনে পেশ করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘জেএনইউ-এর ছাত্রদের মাথায় হাফিজ সাঈদের হাত থাকার কথা বলায় বিতর্কের স্তর খুব নীচে চলে গেছে। এনডিএ সরকারের জন্য এটা খুব কঠিন প্রমাণ হতে চলেছে।’  
অন্যদিকে, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেছেন, ‘ভারত বিরোধী স্লোগানটা সত্যি-সত্যিই কারা দিয়েছে, তার তদন্তের প্রয়োজন। জেলা প্রশাসককে এ সংক্রান্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

জিয়ার নির্দেশ না মেনে বঙ্গভবনে গিয়ে অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন এরশাদ

দ্বিতীয় ঘটনাটি জিয়ার সেনাপ্রধান হওয়ার পরের দিন, অর্থাৎ ২৫ আগস্টের। কর্নেল শাফায়াত জামিল জিয়ার অফিসে বসে আছেন। এমন সময় হঠাৎ সেই ঘরে ঢুকলেন সদ্য পদোন্নতি পাওয়া মেজর জেনারেল এরশাদ। প্রশিক্ষণের জন্য তখন তার দিল্লিতে থাকার কথা। তাকে দেখে জিয়া রেগে গিয়ে বেশ রুঢ়ভাবেই জিজ্ঞেস করলেন, অনুমতি ছাড়া তিনি কেন দেশে ফিরে এসেছেন। জবাবে এরশাদ বললেন, দিল্লিতে অবস্থানরত তার স্ত্রীর জন্য তিনি একজন গৃহভৃত্য নিতে এসেছেন। এটা শুনে জিয়া রেগে গিয়ে বলেন, আপনার মতো সিনিয়র অফিসারদের এই ধরনের লাগামচাড়া আচরণের জন্যই জুনিয়র অফিসাররা রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করে দেশের ক্ষমতা দখলের মতো কাজ করতে পেরেছে। জিয়া তার ডেপুটি এরশাদকে পরবর্তী ফ্লাইটেই দিল্লি ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাকে বঙ্গভবনে যেতেও নিষেধ করলেন। কিন্তু সেনাপ্রধানের নির্দেশ অমান্য করে রাতে এরশাদ বঙ্গভবনে যান এবং অনেকরাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থানরত অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের লেখা ‘বিএনপি সময়-অসময়’ শীর্ষক বইয়ে এসব কথা বলা হয়েছে। প্রথমা থেকে সদ্য প্রকাশিত এ বইয়ে আরও লেখা হয়েছে, ১৫ আগস্টের ঘটনাবলির পেছনে জিয়াউর রহমানের ষড়যন্ত্র আছে- এমন একটা অভিযোগ শোনা যায়। এই অভিযোগ কতটা অনুমাননির্ভর এবং কতটা যৌক্তিক এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মুখরোচক আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে তেমন কোন অনুসন্ধান কিংবা গবেষণা হয়নি। এটা ঠিক যে, পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের ফলে জিয়া সেনাপ্রধান হতে পেরেছিলেন। শেখ মুজিব নিহত না হলে জিয়ার উত্থান হতো না, এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা চলে। কিন্তু এটাও ঠিক যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে সফিউল্লাহ নন, জিয়াই হতেন সেনাপ্রধান। জিয়া সেনাবাহিনী ছেড়ে অন্য কোন অসামরিক পদে চাকরির ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। বলা যায়, তিনি মাটি কামড়ে পড়েছিলেন। একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি তার বাহিনীর চূড়ায় আরোহনের স্বপ্ন দেখতেই পারেন। একটা নির্মম হত্যাকা- ঘটিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। জিয়াউর রহমান এ ধরনের কোন পরিকল্পনা করেছিলেন কি না, তা নিয়ে কোনো অ্যাকাডেমিক আলোচনা ও বিশ্লেষণ হয়নি। জিয়ার দিকে সন্দেহের তির ছুড়ে দেওয়ার পক্ষে একটিমাত্র উদাহরণের উল্লেখ করা হয়ে থাকে। আর তা হলো- তার সঙ্গে দেখা করে রশিদের কথাবার্তা বলার ঘটনাটি। শৃঙ্খলাভঙ্গের এই অপরাধের কথা তিনি তার উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ, অর্থাৎ সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে জানাননি- সন্দেহের উৎস এখানেই। তবে দুটো ঘটনার উল্লেখ করা চলে যাতে মনে হতে পারে যে জিয়া নিজে সরাসরি কোন ষড়যন্ত্র করেননি, ষড়যন্ত্রের সুবিধা ভোগ করেছেন।
প্রথম ঘটনাটি ১৫ আগস্ট সকাল ছয়টার। রশিদ নিজ মুখে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকার ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলেন, উই হ্যাভ কিলড শেখ মুজিব।’ শাফায়াত তার ব্রিগেড মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমেই গেলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জিয়াউর রহমানের বাসায়। শাফায়াতের কাছে সব শুনে জিয়া একটু হকচকিত হয়ে গেলেন। তবে বিচলিত হলেন না তিনি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, সো হোয়াট, প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড? ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। গেট ইয়োর ট্রুপস রেডি। আপহোল্ড দ্য কনস্টিটিউশন।’ (রাষ্ট্রপতি মারা গেছেন, তাতে কী হয়েছে? উপরাষ্ট্রপতি আছেন। তোমার সৈন্যদের প্রস্তুত রাখো। সংবিধান অনুযায়ী চলো)।

আমার সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত ছিল তোমাকে পছন্দ করা : ওবামা

ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে দি এলেন ডিজেনারস অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। হঠাৎ স্ত্রী মিশেল ওবামার ভয়েস মেসেজ বেজে উঠল। চমকে উঠে ওবামা শুনলেন, কবিতা আবৃত্তি করছেন মিশেল- রোজেস আর রেড, ভায়োলেটস আর ব্লু, ইউ আর দ্য প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড আই অ্যাম ইউর বু (গোলাপ দেখতে লাল আর বেগুন নীলিমা, তুমি হলে প্রেসিডেন্ট আমি তোমার প্রেমিকা)।
এই মেসেজ পাওয়ার পর ওবামা এবার মিশেল উদ্দেশের কবিতা আবৃত্তি করলেন। তবে তার পরিকল্পনা ছিল কবিতাটি তিনি ব্যক্তিগতভাবে শোনাবেন। কিন্তু তার আগেই অনুষ্ঠানের লাল পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে পুষ্পবেষ্টিত হয়ে ওবামার কণ্ঠে বেজে উঠল ‘মিশেল এই ভ্যালেন্টাইন ডেতে আমি তোমার সঙ্গে ঠিক কাজটাই করব। আমি তোমার জন্য কিছু জাকচিনি ব্রেড তৈরি করতে যাচ্ছি। তারপর তোমার পছন্দ অনুযায়ী আমি প্লেটে কিছু সবজি ছড়িয়ে দেব।’ এবার তিনি কঠিন সিদ্ধান্তের মতো ঘোষণা করলেন, ‘মিশেল, প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে আমি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম তা ছিল তোমাকে পছন্দ করা। আমার সঙ্গে থাকার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমি তোমায় ভালোবাসি।’ ডেইলি মেইল।

বস্তি উচ্ছেদে মোদিপত্নীর অনশন

বস্তিবাসীর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য একদিনের অনশন করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্ত্রী যশোদাবেন। বর্ষা মৌসুমে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ না করার দাবি জানিয়ে এ অনশন করেন তিনি। পিটার পল প্রতিষ্ঠিত ‘গুড সামারিটান মিশন’ নামে একটি চ্যারিটেবল ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শুক্রবার আজাদ ময়দানে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দেন যশোদাবেন। গত বছরই এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী। মূলত অনাথ, রাস্তার শিশু ও মানসিক অসুস্থ বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করে এ সংস্থাটি। শনিবার এ খবর প্রকাশ করেছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
সম্প্রতি মুম্বাইয়ের উপকণ্ঠে ভিকরোলিতে একটি বস্তি উচ্ছেদ নিয়ে সরব হয় সংস্থাটি। আর তাদের পাশে দাঁড়িয়েই এ দিন দিনভর অনশন করেন মোদি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা যশোদাবেন। তার মতে, বর্ষা মৌসুমে বস্তি থেকে উচ্ছেদ করা হলে বস্তিবাসী গৃহহীন হয়ে পড়েন এবং তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। বর্ষা মৌসুমে উচ্ছেদ করা হলে তা বস্তির মানুষদের প্রতি অবিচার করা হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। চ্যারিটি সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা পল বলেন, ‘প্রত্যেকেরই এ দেশে থাকার অধিকার রয়েছে। সরকারকে প্রতিশ্র“তি দিতে হবে, বর্ষার সময় তারা বস্তির মানুষদের মাথার ওপর থেকে ছাদ কেড়ে নেবে না।’ তাদের এ মিশনে যশোদাবেন যোগ দেয়ায় তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন পল। দ্য হিন্দু।

কাউন্সিল হবে, দলে গণতন্ত্র আসবে কি? by সোহরাব হাসান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০১৫ সাল হরতাল-অবরোধ, পেট্রলবোমা, পাইকারি মামলা-গ্রেপ্তারের পাশাপাশি জঙ্গি হামলার বছর হিসেবে দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল। সেই তুলনায় ২০১৬ সালের সূচনাটি ভালো বলতে হবে। ৫ জানুয়ারিকে আওয়ামী লীগ ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ এবং বিএনপি ‘গণতন্ত্র হত্যা’ দিবস হিসেবে পালন করলেও ঢাকায় মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বে দুই দলের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেছে, যা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায় দুর্লভ। বছরের শুরুতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রায় সবাই জামিনে মুক্ত হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন, এটাও ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের তিনটি প্রধান দলের কাউন্সিল বা জাতীয় সম্মেলন করার ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ আগামী ২৮ মার্চ, বিএনপি ১৯ মার্চ, জাতীয় পার্টি ১৬ এপ্রিল জাতীয় কাউন্সিল করার ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বলেছে, তাদের ২০তম ত্রিবার্ষিক জাতীয় কাউন্সিল ২৮ মার্চ সকাল ১০টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুরু হবে। আওয়ামী লীগের ১৯তম কাউন্সিল হয়েছিল ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর। সোয়া তিন বছরের মাথায় তারা এই কাউন্সিল করতে যাচ্ছে।
বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিল হয় ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় কাউন্সিলে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। সেই হিসাবে বিএনপির কমিটি ছয় বছর পার করেছে। দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের রাজনীতিতে অনেক ওলটপালট ঘটলেও দলটি আছে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।
বিএনপি ১৯ মার্চ কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত নিলেও স্থান ঠিক হয়নি। তারা তিনটি বিকল্প জায়গার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করে—সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ও বঙ্গবন্ধু কনভেনশন সেন্টার। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিষয়ে গণপূর্ত অনুমতি দিলেও ডিএমপির অনুমতি পাওয়া যায়নি। মাঝখানে খবর বের হয়েছিল, বিএনপি বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ এই খবরে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে, কোনো রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল করার সুযোগ সেখানে নেই। সে ক্ষেত্রে বিএনপির কাউন্সিল নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও প্রস্তুতি চলছে সমানেই। বিএনপি নেতারা আশা করছেন, কাউন্সিলে সরকার শেষতক বাগড়া বাধাবে না। সাধারণ মানুষও তা-ই চায়। বিরোধী দলের কাউন্সিল হলে সরকারের ক্ষতি নেই। বরং তারা কাউন্সিল করতে পারলে কিংবা করতে না দিলে ফের রাজনীতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন অনেকটা কাউন্সিলমুখী। কেবল বড় তিন দলই নয়; এ বছর কাউন্সিল করছে সরকারের অন্যতম শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। বছরের শেষ নাগাদ কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও। কিন্তু এসব দলের কাউন্সিলে কি রাজনৈতিক নীতি-কৌশলে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসবে, না এত দিন তারা যেভাবে চলছিল, সেভাবেই চলবে? কাউন্সিল নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব যাই ভাবুন না কেন, তৃণমূলে বেশ উৎসাহ–উদ্দীপনা লক্ষ করা যায়। তাঁরা দলের নীতি ও কৌশলেও পরিবর্তন চান।
বড় তিন দলের কাউন্সিলে সভাপতি বা চেয়ারপারসন পদে পরিবর্তনের কথা কেউ ভাবছেন না। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তো বলেই দিয়েছেন, তিনি বেঁচে থাকতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আর কেউ হতে পারবেন না। তিন দলে সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতা-কর্মীরা যেমন মনে করেন সৈয়দ আশরাফের বিকল্প নেই, তেমনি বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছেও মির্জা ফখরুল অ-বিকল্প নেতা। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান কিংবা সম্পাদকমণ্ডলীতে বেশ পরিবর্তন আসতে পারে। বিএনপির কাউন্সিলে পদ–পদবি নিয়ে ঝড় আসতে পারে তার পূর্বাভাস দেখা গেল ছাত্রদলের কমিটি গঠনে। খালেদা জিয়া ৭৩৬ জনের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেও ভাঙচুর কিংবা বিক্ষোভ থামাতে পারেননি।
বিএনপি বলছে, দলের চেয়ারপারসন ও জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হবে। কিন্তু অতীতে বিএনপির কোনো পর্যায়েই নির্বাচন হয়নি; অন্তত কেন্দ্রীয় কমিটিতে। সর্বশেষ ২০০৯ সালের কাউন্সিলে মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ নতুন নেতৃত্ব গঠনের সব ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল খালেদা জিয়ার ওপর। সেই কাউন্সিলে দেওয়া ভাষণে তিনি সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসকে গণতন্ত্রের শত্রু হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু বিএনপির রাজনীতিকে সেই সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী ধারায় নিতে পারেননি। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেছেন, ‘স্থায়ী কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে চেয়ারপারসন নির্বাচনের সঙ্গে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদেও নির্বাচনের লক্ষ্যে দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর জন্য চেয়ারপারসনকে অনুরোধ করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চেয়ারপারসন দলের গঠনতন্ত্রের ১৯-ক ধারায় সংশোধনী অনুমোদন করেছেন।’ বিএনপিতে স্থায়ী কমিটিই নাকি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক। তাহলে সেই কমিটি কেন চেয়ারপারসনকে অনুরোধ করবে? তারা কেন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না? খালেদা জিয়া নিজেই যখন এই কমিটির প্রধান।
দলের কট্টরপন্থীরা চাইছিলেন, তারেক রহমানের ক্ষমতা বাড়িয়ে কো-চেয়ারম্যান করা হোক। কিন্তু স্থায়ী কমিটি সে ধরনের কিছু করতে রাজি হয়নি। বিএনপির তারেকবিরোধী গ্রুপ মনে করে, লন্ডনে বসে তাঁর উগ্র কথাবার্তা ও ‘সরকার ফেলে দেওয়ার’ হুংকার দলকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নেতা-কর্মীদের করেছে বিপর্যস্ত। যদিও তিনি প্রবাসে নিরাপদে আছেন। প্রকাশ্যে না হলেও ঘরোয়া আলোচনায় নেতারা এসব নিয়ে আক্ষেপ করেন।
বিএনপি কাউন্সিলের আগে ৭৪টি সাংগঠনিক জেলা কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিলেও সম্মেলন হয়েছে গুটি কয়েক জেলায়। আওয়ামী লীগে পরিসংখ্যানে এগিয়ে থাকলেও খুব কম জেলায়ই পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পেরেছে। দুই দলেই যেখানে কমিটি, সেখানে মারামারি। সর্বশেষ চাঁদপুরে সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপ চেয়ার ছোড়াছুড়ি করেছে। রাজনীতিতে যখন নীতি–আদর্শের চেয়ে হালুয়া রুটি ভাগাভাগির বিষয়টি বড় হয়ে ওঠে, তখন এসব হওয়াই স্বাভাবিক।
কাউন্সিলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির আকার বাড়বে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসংখ্যা ৭৩। সেটি দলীয় সভানেত্রীর দেশের ফেরার বছরকে স্মরণীয় রাখতে ৮১ করা হতে পারে। পরিবর্তন আসতে পারে সম্পাদকমণ্ডলী ও সভাপতিমণ্ডলীতে। আর বিএনপির নেত্রী তো জানিয়েই দিয়েছেন, ‘যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁরা পুরস্কৃত হবেন, যাঁরা করেননি তাঁরা তিরস্কৃত।’ অন্যদিকে কাউন্সিলের আগেই নানা অঘটন ঘটে চলেছে জাতীয় পার্টিতে। ১৬ এপ্রিল জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও তিন মাস আগে দলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন এনেছেন এরশাদ। জিয়াউদ্দিন বাবলুকে মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে রুহুল আমিন হাওলাদারকে বসিয়েছেন এবং ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে করেছেন কো-চেয়ারম্যান। দলে তাঁর প্রতিপক্ষ গ্রুপ এই পরিবর্তন মানতে পারেনি। তাদের দাবি, রওশন এরশাদকে এক নম্বর কো-চেয়ারম্যান করতে হবে। তারা এরশাদ আহূত প্রেসিডিয়াম সভা বর্জন করেছে। এরশাদ চাইছেন, কাউন্সিলের আগেই দলীয় তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সরকার থেকে পদত্যাগ করুন। কিন্তু তিনি নিজে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বিশেষ দূতের পদ ছাড়েননি। জাতীয় পার্টিতে বর্তমানে যে সংকট চলছে, তা আগামী কাউন্সিলে নিরসন হবে কি না বলা কঠিন। যদিও তাঁর বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনো আসেনি।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিতাড়িত সাবেক স্বৈরাচার গণতান্ত্রিকভাবে দল চালাবেন, সেটি কেউ আশা করে না। কিন্তু সেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সফল ‘অধিনায়ক’ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলবে না? কেন দলে গণতন্ত্রায়ণ হবে না? নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগের জন্ম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বিএনপির জন্ম সেনা ছাউনিতে হলেও রাজপথেই এই দলটি বেড়ে উঠেছে। এখনো তারা রাজপথে আছে। তাহলে দলের নীতি–কাঠামোয় কেন গণতন্ত্র অনুসৃত হবে না?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলেই কার্যত গণতন্ত্র নেই। ১৯৯১ সালের পর থেকে দলগুলোর ক্ষমতা এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও একনায়কসুলভ। দলের মধ্যে গণতন্ত্র কমে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের আইনে আছে, কাউন্সিলের মাধ্যমে সব দলের কমিটি নির্বাচিত হবে। কিন্তু নেতৃত্ব নির্বাচন কেন্দ্রীভূত, পরিবার ও উত্তরাধিকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো: আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে কখনো সভাপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না বরং সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর কাউন্সিলররা অন্যান্য পদে নিয়োগ দেওয়ার অধিকার সভাপতিকে দিয়ে দেন। শুধু যে নেতৃত্বে এক পরিবার তা নয়। সাংসদেরাও পরিবারের সদস্যদের সাংসদ বানাচ্ছেন। একই পরিবারের দুজন দুই দল করেও তাঁদের পরিবার টিকিয়ে রাখছে। ‘রাজনৈতিক দলগুলো নীতি নিয়ে আলোচনা করে না। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের নিয়মানুযায়ী ৩৩ শতাংশ নারী থাকার বাধ্যবাধকতাও দলগুলো মানছে না। বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতে মাত্র ১০ শতাংশ নারী রয়েছেন। এসব দলের প্রধানের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে চান না।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাউন্সিল কি এসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারবে? না থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড় বলে সবকিছু আগের মতো চালাবে? একুশ শতকের ডিজিটাল বাংলাদেশ অ্যানালগ রাজনীতি দিয়ে চলতে পারে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে সাধারণ মানুষ তো বটেই তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা যে আস্থা-বিশ্বাস রাখেন, খুব কম ক্ষেত্রেই তাঁরা তা হেফাজত করতে পারেন। ঢাকায় আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে তীব্র হিংসা ও বিদ্বেষ প্রত্যক্ষ করি, প্রতিদিন একে অপরের বিরুদ্ধে তাঁরা যে বিষোদ্‌গার করে চলেছেন, সেটি তৃণমূলে দেখা যায় না। মত ও পথের বিভেদ সত্ত্বেও তাঁরা মুখ দেখাদেখি বন্ধ করেন না।
দেশবাসীর প্রত্যাশা, নির্ধারিত সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো সুষ্ঠুভাবে কাউন্সিল সম্পন্ন করে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করবে। কিন্তু সেই নেতৃত্ব দলকে গণতন্ত্রায়ণের পথে নিয়ে যেতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নের জবাবের জন্য হয়তো আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ব্যক্তির অহমিকা, পেশিশক্তির দাপট এবং কালোটাকার আস্ফালন চূর্ণ করে প্রতিটি দলে সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক; দলীয় প্রধানের হাতে সর্বময় ক্ষমতা অর্পণের বদলে প্রতিটি স্তরে নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা বাছাই করা হোক—কাউন্সিলের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এটুকুই একান্ত চাওয়া।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

শিশুহত্যার বিচার হয়তো হবে, শৈশব হত্যার? by আবুল মোমেন

সিলেটে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা
প্রথম আলোর খবরে দেখা যাচ্ছে, দেশে শিশুহত্যার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে (৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। গত চার বছরে প্রায় ১ হাজার ১০০ শিশুকে খুন করা হয়েছে। কেবল গত বছরই দেশে ২১ হাজার ২২০টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে গেছে। একমাত্র গত জানুয়ারিতেই হত্যা করা হয়েছে ২৯ শিশুকে। অর্থাৎ প্রায় দিনে একজন হত্যার শিকার হয়েছে। এর অনেক ব্যাখ্যা আইনবিদ, মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা দিয়েছেন। মানুষের বেপরোয়া লোভ, সম্পদ অর্জনের মাত্রাহীন আকাঙ্ক্ষা, সাধারণভাবে উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠা ইত্যাদিকে দায়ী করা যায়। মানুষেরই তো আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাভিলাষ থাকে, কিছুটা লোভও যে থাকে না তা–ও তো নয়। সমস্যা হলো মানুষ উত্তরোত্তর নিষ্ঠুর হচ্ছে, প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে পড়ছে এবং অনায়াসে জিঘাংসা বা হত্যার ইচ্ছা তাদের মনে জায়গা করে নিচ্ছে। এর অর্থ মানুষ বিবেচনাবোধ, সহিষ্ণুতা ও সংযম হারাচ্ছে। আর এ অবস্থা চলতে থাকার অর্থ হলো সমাজের সহানুভূতি ও বিবেকবোধ ভোঁতা হয়ে আসছে। সোজা ভাষায়, আমরা মনুষ্যত্ব হারাচ্ছি। কিছু কিছু ব্যতিক্রমী অসাধারণ মানবিক জীবনের দৃষ্টান্ত হাজির করে সম্ভবত সামগ্রিক সমাজ সম্পর্কে এই সিদ্ধান্তকে খারিজ করা যাবে না।
তাহলে সমস্যা দাঁড়ায় দুটি—শিশুহত্যা এবং মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ তৈরিতে বা মনুষ্যত্বে ঘাটতি। এবার নজর দিতে হবে সমাজের দিকে এবং মানুষ তৈরির ক্ষেত্রগুলোর দিকে। না, এ সমাজ শিশুবান্ধব নয়। আজ বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সব শিশুই সুবিধাবঞ্চিত। শহরের ধনী থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত সব স্তরের শিশুকেই খাঁচাবন্দী জীবন কাটাতে হয়; সেটা বাসায় যেমন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তেমনই। বস্তির শিশুরা হয়তো তুলনামূলকভাবে মুক্তজীবন কাটায় কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পারিবারিক সাহচর্য-পরিচর্যা—এসবের অভাবে তার কাটে বঞ্চিত জীবন। একদল মুক্তিবঞ্চিত তো অন্য দল সুবিধাবঞ্চিত। শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য মুক্তি বা মুক্ত পরিবেশ আবশ্যিক প্রয়োজন। গ্রামে শহরের প্রভাব পড়ছে, তা ছাড়া মধ্যবিত্ত পর্যন্ত কেউ আর গ্রামে পরিবার নিয়ে বাসও করেন না। এখানে অবশিষ্ট লোকজনের জন্য মুক্তি কিছুটা থাকলেও তার সব চাহিদা পূরণ করে বড় হওয়ার সুযোগ-সুবিধার বঞ্চনা প্রকট। এর ওপর শিশুশিক্ষায় রাষ্ট্র নিজেই বৈষম্যকে এতই প্রশ্রয় দেয় যে শিশুর বিকাশে সমতা প্রতিষ্ঠা একেবারেই অসম্ভব।
আর সমাজ যে শিশুবান্ধব নয়, তার কী হবে? যেসব প্রাণীর জীবনে মূল কাজ কেবল খাদ্যান্বেষণ করে বেঁচে থাকা, তাদের জীবনযাপনের জন্য বসত ও বিচরণের বড় এলাকার প্রয়োজন হবে, এটা সহজ বুদ্ধিতে বোঝা যায়। শুনেছি শিকারি প্রাণী একটি বাঘের প্রয়োজন পড়ে পাঁচ বর্গমাইল বিচরণ এলাকা, দলবদ্ধভাবে থাকা তৃণভোজী হরিণের হয়তো কম লাগে। আবার অনেকে পরিযায়ীও হয়। পাখি তো হাজার মাইল পাড়ি দিয়েও নতুন সাময়িক বসতি খুঁজে নেয়। মানুষ খাদ্যশৃঙ্খলসহ আরও প্রাকৃতিক সীমা ভেঙে এক অর্থে স্বাধীন, আবার সেই মানুষ ক্রমে নিজেই নিজেকে ÿক্ষুদ্র বসতির ঘেরে বন্দী করে ফেলছে। উন্নত বিশ্বে আবাসস্থল ছোট হলেও উন্মুক্ত স্থানে পার্ক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে ব্যক্তির মুক্ত বিচরণের চৌহদ্দি অনেক বেড়ে যায়। শিশুদের জন্য আরও প্রশস্ত ব্যবস্থা তারা রেখেছে। একজন শিশুর স্বাভাবিক বিচরণের ব্যাপ্তি কতটা হওয়া দরকার এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমি জানি না, কিন্তু এটুকু বুঝি যে তার অকারণ দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা, মাটি ও প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভের যে ক্ষুধা ও চাহিদা, তা মেটানো জরুরি। আমরা গরিব দেশের মানুষ, শিশুর কাছ থেকে মাঠ, আকাশ, মুক্ত বায়ু, সূর্যালোক-জ্যোৎস্নালোক, সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা, সমবয়সী বন্ধুজন-খেলাধুলা সব কেড়ে নিয়ে তাকে বড়জোর ধরিয়ে দিচ্ছি পাঠ্যবই, ঢুকিয়ে দিচ্ছি কোচিং ক্লাসে, বসিয়ে দিচ্ছি প্রাত্যহিক পরীক্ষায়। কেমন মন নিয়ে বড় হচ্ছে এই শিশু?
একদিকে বঞ্চনা আর জিপিএ-৫ পাওয়ার চাপ আর অন্যদিকে তার স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের অভাব। চাপ আর ক্ষোভ তাকে স্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেবে? জিপিএ-৫-এর সাফল্যের জন্য তার শৈশব জিম্মি করে ফেলছি না? এ ব্যবস্থায় শিশুদের সঙ্গে বড়দের সম্পর্ক চলে সাধারণত ধমক আর ঘুষের ওপর (পরীক্ষায় ভালো করলে বেড়াতে নেব, বাসায় চুপচাপ থাকলে চায়নিজ খাওয়াব ইত্যাদি)।
যারা শিশুহত্যা করে শেষ পর্যন্ত তাদের পরিচয় হয়তো জানা যায়, কারও কারও শাস্তিও হয়। কিন্তু যারা প্রতিনিয়ত শৈশব হত্যা করছে? দুটিই তো ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত অপরাধ। তবু আমরা এ দুইয়ের মধ্যে একটা পার্থক্য টানতে চাইব। শৈশব হত্যার ক্ষেত্রে হয়তো অসচেতনতা একটি বড় কারণ। আমরা তাড়াহুড়ো করে উন্নয়ন ঘটাতে চাইছি, যার অর্থ সড়ক-সেতু, ঘরবাড়ি ও স্থাপনা বানিয়ে যাওয়া। মুক্তস্থান, মাঠ, পার্ক ও প্রকৃতিকে দখল করে জলাঞ্জলি দিয়েই তা করা হচ্ছে। আমি এর জন্য এককভাবে সরকারকে দায়ী করব না। সমাজ এসব চাহিদা নিয়ে দাবি তো তুলছেই না, বরং ব্যক্তি নিজের জায়গাজুড়ে বাড়ি আর দোকানপাটই তো বানাচ্ছেন। খালি জায়গায় অর্থনৈতিক ক্ষতি, স্থাপনা তৈরি হলে লাভ মেলে। ফলে সমাজ ও সরকার যৌথভাবেই একযোগে এ কাজ করছে। সুবিধা হলো শৈশব হত্যা করলে হাতে রক্তের দাগ লাগে না, কাউকেই নির্দিষ্টভাবে অপরাধী বলা যায় না।
কিন্তু এবার একটা কথা বলতে চাই। শৈশব হত্যা থেকে শিশুহত্যা তো খুব দূরে নয়। আপনারা সিলেটের রাজন হত্যার ভিডিওর কথা চিন্তা করুন। তামাশা হিসেবে শিশুহত্যা ‘উপভোগ’ করছিলেন অনেকে। কেউ এগিয়ে এলেন না। যে একজন এগিয়ে এলেন, তাঁর উদ্দেশ্য মোবাইলে জ্বলজ্যান্ত হরর ফিল্ম ধারণ এবং সেটা সর্বসাধারণে ছড়িয়ে দিয়ে তৃপ্তি লাভ! আর কিছু পরিবারে নিষ্ঠুর পিতা বা মাতা কিংবা অন্য অভিভাবক বা সমাজ তো অহরহ খেলার আসর থেকে উঠিয়ে শিশুকন্যাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাচ্ছেন। ঘরে ঘরে কত ছেলে, কত মেয়ের সুরের, রঙের, কাব্যের, নৃত্যের, অভিনয়ের ক্ষুধা ও প্রতিভাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়া হয় একমাত্র মোহ জিপিএ-৫-এর পেছনে ছুটিয়ে? শিক্ষা ও কলা, পরীক্ষা ও খেলা, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার যে সহাবস্থান করার কথা তা যে আমরা মনেই রাখি না। তাই শিশু এবং শৈশবের ওপর স্টিম রোলার চলছেই।
সাধারণভাবেই শিশুর বেশির ভাগ ইচ্ছার ওপর আমরা নিষেধের কপাট টেনে দিই। শিশু যদি বলে লাফ দিই, অভিভাবক বলেন কাজ নেই, হাত-পা ভাঙবে। শিশু যদি বলে প্রজাপতি ধরব, মা বলবেন, রোদে ঘুরলে অসুখ করবে। শিশু যদি বলে গাছে চড়ব, পেয়ারা পাড়ব, বাবা বলবেন কাজ নেই, পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে। শিশু যদি জ্যোৎস্নায় বাইরে যেতে চায়, মা বলবেন, কী সর্বনাশ! ঠান্ডা লাগবে। এমনই দৃষ্টান্ত অজস্র দেওয়া যায়। শিশুর প্রতি আমাদের এই মজ্জাগত না-কে হ্যাঁ-তে পরিণত করতে হবে। শিশু ব্যথা পাবে, হাত ভাঙতেও পারে, মাথা কাটতে পারে (মাথা ফেটে যায় না), চোট-ব্যথা একটু লাগতেই পারে। কিন্তু এসবই জীবনের অংশ। সাবধানতা ভালো, কিন্তু শিশুকে ফার্মের মুরগি বানিয়ে ফেললে সর্বনাশ। ফার্মের মুরগির মুরগিত্বে ঘাটতি থাকে। সে ওড়ে না, ডাকে না, এমনকি বিশেষ নড়াচড়াও করে না; কেবল খায়, মলত্যাগ করে, ডিম পাড়ে, ঘুমায়। যে শিশু খেলে না, দৌড়ঝাঁপ করে না, একটু গায় না, নাচে না, আঁকে না, তার মানসিক প্রতিবন্ধিতা তৈরি হয়, মানুষ হিসেবে ঘাটতি নিয়ে সে বড় হয়। তারাই সদলে এ সমাজকে উনমানুষের সমাজে পরিণত করবে। পরিণতিতে দেখা দেয় মনুষ্যত্বের সংকট। কবে কবি বলেছেন ‘মানুষের গভীর গভীর অসুখ এখন’।
সত্যিই শিশুরা আমাদের বিবেচনার মধ্যে বিশেষ থাকে না। বাড়ির শিশুটির জন্য স্কুল, কোচিং আর জিপিএ-৫-এর ব্যবস্থা হলেই অধিকাংশ অভিভাবক মনে করেন সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন শেষ হলো। তার আরাম বা বিচরণক্ষেত্র ছোট হয়ে গেল, সেটা আমরা লক্ষই করি না। মনে রাখি না যেসব শিশু হারিয়ে যায় তাদের। কত শিশু প্রাণ হারিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে সে হিসাব কি আমরা রাখি? জীবন শুরুই হয়নি বলে তাদের তো কোনো জীবনী লেখা হয়নি। তাদের নামধামও কেউ মনে রাখেনি, এমনকি সংখ্যাও নয়। তাই অবলীলায় আমরা মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। এদের কি বাদ দেওয়া যাবে সে হিসাব থেকে?
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শুধু পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তসংলগ্ন শরণার্থী শিবিরগুলোতে জুলাই পর্যন্ত ছয় লাখ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। আর  ১২ সেপ্টেম্বর মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি শরণার্থী শিবির ঘুরে জানিয়েছিলেন, এ পর্যন্ত আট থেকে দশ লাখ শিশু এই যুদ্ধের বলি হয়েছে। তারা মূলত ডায়রিয়া ও ডায়রিয়া–জাতীয় রোগেই প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধই তো তাদের মৃত্যুর কারণ। ইউনিসেফ থেকে বলা হয়েছিল বর্ষা দীর্ঘায়িত হলে শিশুমৃত্যুর হার আরও বাড়বে। প্রবীণদের স্মরণ থাকবে, ১৯৭১ সালে বর্ষা দীর্ঘায়িত হয়েছিল। এডওয়ার্ড কেনেডি আরও বলেছিলেন, শরণার্থীদের ৪০ শতাংশ শিশু ও বৃদ্ধ, যাদের জীবন ছিল হুমকির মুখে।
শিশুহত্যা বন্ধ করতে হলে শৈশব হত্যা বন্ধ করতে হবে, শিশুহত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। সব উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিশু এবং মানুষ এবং তাদের মুক্ত প্রাকৃতিক বিচরণক্ষেত্র এবং সেই সূত্রে দেশের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে সবার আগে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

ভারত নিয়ে নয়, হতাশা শাসন পরিচালনা নিয়ে: অমর্ত্য সেন

অমর্ত্য সেন
নোবেল পুরস্কারজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, তিনি ভারতকে নিয়ে হতাশ নন কিন্তু ভারতের শাসন পরিচালনা নিয়ে তিনি হতাশ। ভারতের ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ওপর সরকারের মনোযোগ বৃদ্ধি আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। সিদ্ধার্থ ও সুরজিত গুপ্তার নেওয়া ওই সাক্ষাৎকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
উন্নয়ন রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ভারতের উন্নয়নের ব্যাপারে আমার একটা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘাটতিও আছে, আগের সরকারের আমলেও ঘাটতি ছিল। কিন্তু এই ঘাটতির প্রতিকার হচ্ছে না এবং বর্তমান সরকারের সময়ে এটা আরও তীব্রতর হচ্ছে। তার ওপর ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় সহনশীলতার মতো বিষয়গুলো নিয়েও সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
মোটের ওপর ভারতীয়রা প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পায় না এবং ভালো মানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাও পায় না। একইভাবে আমরা বিশৃঙ্খলার মধ্যেই আছি। রোগীরা জানেন না, তারা কি বা কোথায় খরচ করছেন। তারা খুব সহজেই শোষণের শিকার হতে পারেন, যদি আপনি ভালো একটি সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে না পারেন। আমরা এমনটা পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে দেখেছি অর্থাৎ ওই সরকারও এ বিষয়টি অস্বীকার করেছিল। বলা হয় বা ভাবা হয় আমি ইউপিএ জোটের (কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট) সমর্থক। আমি তাঁদের সমালোচনাও করি। তারা খুব বেশি কিছু করেনি। তারা সবার জন্য শিক্ষা অভিযানে স্কুলে খাওয়ার জন্য বরাদ্দ কমিয়েছে এবং স্বাস্থ্যের জন্য তারা কিছুই করতে পারেনি। প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে হবে এবং এটা সবার কাছে পৌঁছাতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী মতো বিষয়গুলো ভারতে ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে এবং এখন আরও বেশি হচ্ছে।
প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কৌশল সংশোধনের প্রয়োজন আছে কি?
ভারত যে বিষয়গুলোতে খুব ভালো অবস্থানে আছে, তার কোনোটির ক্ষেত্রেই কিন্তু সাধারণ শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করতে হয় না। নির্ভর করতে হয় বিশেষায়িত শ্রমিকের ওপর। যেমনটি হয়েছে তথ্য প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস ও অটোমোবাইল পণ্যের ক্ষেত্রে। অশিক্ষিত শ্রমিকদের দিয়ে এখানে নতুন পণ্য তৈরি করা কষ্টকর। কিন্তু এটা চীনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আমি আমার, কলম হাতে নিলে, টেলিফোন হাতে নিলে কিংবা হাত ঘড়ির দিকে তাকালে দেখতে পাই, সবই চীনের তৈরি। এগুলো আমরাও তৈরি করতে পারি। কিন্তু এর জন্য অর্থনৈতিক কৌশলের কোনো পদ্ধতি সংশোধনের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক কৌশলের মধ্যে সম্পর্ককে বোঝার পদ্ধতি সংশোধন করা।
মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট (এমজিএনআরইজিএ) সংশোধন করা প্রয়োজন আছে কি?
আমি মূলত এ ধরনের সংশোধনের পক্ষে। আমি কি ভেবেছিলাম যে এটা পুরোটাই ফেলনা? আমি আসলে তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু ফেলনা হওয়া সত্ত্বেও এর কিছু অর্জন আছে, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অর্জন কম। তবে মনে হচ্ছে এটা কিছু অর্জন করেছিল বলে বর্তমান সরকার স্বীকার করতে চাচ্ছে। আর তারা মনে করছে ওই অর্জনের কৃতিত্বও তাদের। এখন সরকার যদি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না করে এমজিএনআরইজিএ-কে আরও নিশ্ছিদ্র করার দিকে মনোযোগ দেয় ও সম্পদ সৃষ্টির দিকে মূল লক্ষ্য রাখে তাহলে সেটা ভালোই হবে।
সুশাসনের জন্য আপনার উদ্বেগের কারণ কি?
আমি সরকারকে কোনো উপদেশ দেব না। তবে আমি মনে করি, আমাদের অধিকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাওয়া উচিত। কারণ শক্তিশালী অর্থনীতি মূলত মানুষের শক্তির ওপর নির্ভর করে। আর মানুষের শক্তি নির্ভর করে তারা শিক্ষিত আর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী কি না তার ওপর। শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে তারা টিকে থাকতে পারবে না। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে তারা কি ওই সময় সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় কোনো সহায়তা পাবে—এসব বিষয় আমাদের গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারটি কি এখনো আপনাকে বিব্রত করে?
আমি আপনাকে এটা বলতে পারি যে কেন আমি সেখান থেকে চলে গিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা বোর্ড চাচ্ছিল যে আমি সেখানে থাকি। কিন্তু সরকার চায়নি আমি সেখানে থাকি। এ ছাড়া আমার কাছে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছিল যে, আমি যদি আমার আমিত্ব ধরে রাখার জন্য সেখানে থাকতাম, তাহলে আমাকে জরিমানা দিতে হতো। আর নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও বিষয়টি ভালো হতো না। কারণ আমার প্রতিটি বিষয়ে সরকার বিরোধিতা করছিল।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের জুলাই মাসে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হন অমর্ত্য সেন। গত বছরের জুলাই মাসে সেই মেয়াদ শেষ হয়। তাঁকে দ্বিতীয়বারের মতো ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আচার্য থাকার অনুরোধ করা হলেও তিনি এতে রাজি হননি। তিনি বরাবরই বলে আসছেন, মোদি সরকারের সমালোচনা করায় সরকারের চাপেই তিনি ওই পদে আর থাকতে রাজি হননি।

মুজিব নন হাসিনা by কুলদীপ নায়ার

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে যেন আত্মবিশ্বাস ঠিকরে পড়ছে। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো আমি ঢাকা সফর করি। বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার চার মাসের মধ্যে। ঢাকা তখন ছিল ছোট্ট একটি শহর, নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রের চাহিদা মেটাতে প্রাণান্ত চেষ্টা করছিল। এ শহরের পুরনো গভীর সবুজ গিলে ফেলেছে বহুতল ভবন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু, এ গল্প কম-বেশি দুনিয়ার প্রত্যেক রাজধানীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ব্যতিক্রম সম্ভবত ইসলামাবাদ। এ শহরটি এখনও নিজের উন্মুক্ততা ও গাছগাছালি ধরে রেখেছে।
১৯৭২ সালে ঢাকা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ছিল দীর্ঘ সারি। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল লাগেজ। কিন্তু আমি শুনতে পাই যাত্রীরা ‘জয়বাংলা’ বলে স্লোগান দিচ্ছে, যেন তারা ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’তে (প্রমিজড ল্যান্ড) ফিরে এসেছে। আমি যখন শহর ঘুরতে বের হয়ে ইতিবাচক-নেতিবাচক দিকগুলো মূল্যায়ন করলাম, আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম, এ দেশ আসলে পারবে তো! ৪০ বছর পর বিলাসবহুল এক বিমানবন্দর ও যাত্রীদের সুশৃঙ্খল সারি আপনাকে উত্তর দিয়ে দেবে, বাংলাদেশ পেরেছে!
আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, এ দেশ অনেক সংশয়বাদীকে ভুল প্রমাণ করেছে। দেশ ও দেশের বাইরে কর্মরত মানুষের কঠোর পরিশ্রম একদমই বৃথা যায়নি। বর্তমানে দেশটির প্রবৃদ্ধি ৬.৪ শতাংশ। অথচ, যে দেশটি থেকে বাংলাদেশ আলাদা হয়েছে, সেই পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি ২.৩ শতাংশ। আরও স্থিতিশীল ও উন্নত ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশিরা উন্মুখ হয়ে আছে বলে মনে হয়েছে আমার।
এটাই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তীব্র পার্থক্য। কয়েকদিন আগেই আমি পাকিস্তান সফর করেছি। এ দেশটির চেহারা রীতিমত হতোদ্যম, ভবিষ্যতে কী হবে কেউ জানেই না। দেশটিতে সন্ত্রাসবাদের ভয়ও মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়। অপরদিকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করেছেন মৌলবাদীদের প্রতি কোনো মার্জনা না দেখিয়ে। আর উলফার মতো সংগঠনকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে, যারা একসময় বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কার্যক্রম চালাতো।
একটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নোবেল লরিয়েট মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি আমি। তিনি তিক্ত কিংবা হতোদ্যম- কোনোটিই ছিলেন না। দরিদ্র মানুষকে আরও কীভাবে সহায়তা করা যায়, এ নিয়ে তার পরিকল্পনার ব্যাপারে তিনি আলোচনা করেছেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে, সারাবিশ্ব থেকে ১০৮টি গ্রামীণ ব্যাংক তার কাছে সংহতির বার্তা পাঠিয়েছিল। আমি ভেবে অবাক হই, হাসিনা যদি তাকে দেশের ‘অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ’ হিসেবে নিয়োগ করতেন, তাহলে বাংলাদেশ কতই না উপকৃত হতো! বাংলাদেশের জন্য সব দ্বার উন্মুক্ত হতো। তাকে অপসারণ করে বদনাম কুড়িয়েছেন হাসিনা। এটা আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও, হাসিনা অনুতপ্ত নন।
হাসিনার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো যে, তার মধ্যে কর্তৃত্বপরায়ণতার ছাপ আছে। তিনি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সহ্য করেন না। আমি দেখেছি, ইন্দিরা গান্ধী কিভাবে একই বিষয়গুলো ধারণ করেছিলেন। আর তার পিতা জহরলাল নেহরুর স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করেছিলেন। রাষ্ট্রকাঠামোতে ভারসাম্য বজায় রাখতে যেন ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যায় সে লক্ষ্যে নেহরু সেগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী রাষ্ট্রব্যবস্থার যে ক্ষতি করে গিয়েছিলেন, তা থেকে এখনও ভারত সেরে উঠতে পারেনি।
প্রখ্যাত আইনজীবী কামাল হোসেন আমাকে বলেছেন, ইউনূসের মামলা লড়ার সময় তিনি এমনকি ঠিকঠাক একটি শুনানিও পাননি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শাসকরা বিচার বিভাগের ওপর চাপ দিয়ে থাকেন বলে শোনা যায়। বাংলাদেশও হয়তো এর কোনো ব্যতিক্রম নয়।
শেখ হাসিনার অগণতান্ত্রিক আচরণ আরও ক্ষতি ঘটাতে পারে, কারণ সন্ত্রাসবাদী ও চরমপন্থি শক্তিগুলো ওত পেতে আছে। তারা ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি যাচাই করেছে এবং তাদেরই কয়েকটি হরতালের মাধ্যমে তারা পরিস্থিতি অনুকূল বলেও বুঝতে পেরেছে। হাসিনা সচেতন যে, তার জনপ্রিয়তার গ্রাফ নিম্নমুখী।
তিনি বিরোধীদের চিন্তা করতে দিতে চান না যে, রাজপথ দখল ও হরতাল ডাকার সময় চলে এসেছে। হরতাল এ দেশের বিরোধী দলগুলোর একটি বাতিক, অপরদিকে দেশের জন্য সর্বনাশ।
বাংলাদেশের জনক শেখ মুজিবুর রহমান বিরোধী দলকে বিলুপ্ত করেছিলেন, যখন তিনি একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। দেশে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদপত্র তিনি চেয়েছিলেন; ঠিক যেমনটি সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল প্রাভদা ও ইজভেস্তিয়া পত্রিকা। তিনি ছিলেন এমন এক আইকন যাকে জনগণ অত্যন্ত পছন্দ করতো। তাদেরকে তিনি যে কোনো কিছুই বোঝাতে পারতেন। তার কন্যা হাসিনার ওই মর্যাদা কিংবা তুমুল সমর্থন- কোনোটিই নেই। তিনি কেবল নিজের ক্ষতির পাশাপাশি পুরো জাতির ক্ষতিই করবেন।
(লেখক: কুলদীপ নায়ার ভারতের একজন প্রবীণ ও খ্যাতিমান সাংবাদিক। এ নিবন্ধটি নয়াদিল্লিভিত্তিক দ্য সানডে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ। ভাষান্তর: নাজমুল আহসান)

সংবাদপত্রের অবদমিত স্বাধীনতা by ড. আবদুল লতিফ মাসুম

আজকের পৃথিবীতে গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্র যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব এবং এর অগণিত দর্শক-পাঠক নবতর গুরুত্বের মূল কারণ। তথ্যপ্রযুক্তির বৈপ্লবিক সম্প্রসারণের কারণে রাজনীতিতেও এর জোরালো প্রভাব ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছে। গণমাধ্যমের ব্যাপক উপস্থিতি পুলিশের চেয়েও শক্তিধর প্রমাণিত হচ্ছে। সুতরাং ‘রাজা রাজ্য রাজধানী’তে গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রের প্রতি নজর, নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মমতা প্রকট হয়ে উঠছে। একই সাথে গণমাধ্যমের বিকাশ এবং বিস্তৃতির সাথে সাথে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। প্রতিনিয়ত সংবাদ অনুকূলে অথবা প্রতিকূলে প্রবাহিত হচ্ছে। ক্রমশ এগুলো রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রক্ষমতা, দলতন্ত্র এবং বাণিজ্যতন্ত্র এর মালিক মোক্তার রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বে রাজনৈতিক ‘গডফাদার’ এর মত ‘মিডিয়া ফাদার’দের ভীতিকর উদ্ভব পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের বাহন হিসেবে নিত্য নতুন গণমাধ্যমের জন্ম হচ্ছে। নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে এরা স্বৈরতন্ত্রের বাহন হিসেবে কাজ করছে। অপর দিকে স্বাধীন গণমাধ্যম-সংবাদপত্র, চ্যানেল এবং স্বাধীন ব্যক্তিত্ব রাজনীতিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।
বাংলাদেশে গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্র জগতে এমনই একজন স্বাধীন, অকুতোভয় আত্মপ্রত্যয়ী ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন, দৈনিক আমার দেশ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ‘সময়ের সাহসী পুরুষ’ মাহমুদুর রহমান। তার সম্পাদিত সংবাদপত্রের মাধ্যমে তিনি পাঠক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী হয়েছেন। দেশপ্রেম এবং জতীয় মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এই অর্জনের মধ্যদিয়ে তিনি তার জন্য শাসক বৈরিতা অনিবার্য করে তুলেছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সাংবাদিক, রাজনীতি এবং সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে তার মুক্তির আন্দোলন জোরদার হলেও ক্রমশ সাংবাদিক বিভাজন এবং সরকারী বাধা বিপত্তির মখে তা দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু জনমনে তার অবস্থান যে দুর্বল হয়নি তার প্রমাণ পাওয়া যায় জনগণের পক্ষ থেকে প্রকাশিত উদ্বেগ- উৎকণ্ঠায়। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকপর্যায়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অব্যাহতভাবে তার মুক্তির দাবি করে আসছে। গত সপ্তাহে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সংগঠন তার মুক্তির দাবিটি পুনর্ব্যক্ত করে। এসব সংগঠন হচ্ছে The Observatory for the Protection of Human Rights Defenders, Asian Human Rights Commission Ges International Human Rights Watch.
এসব সংগঠনের বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয় সরকার বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করার জন্যই তাকে আটক রেখেছে। তারা অনতিবিলম্বে মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবি জানান। তার মুক্তির জন্য রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ দিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। অথচ তিনি মুক্তি পাচ্ছেন না সরকার ছলে বলে কলে কৌশলে তার মুক্তির প্রক্রিয়া বিঘ্নিত করছে। যেখানে ভয়ঙ্কর দুর্বৃত্তরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে সেখানে মাহমুদুর রহমানের মতো একজন আলোকিত মানুষের মুক্তি নিয়ে টালবাহানা করায় সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। সরকার এ রকম একজন মানুষকে এতটা রাজনৈতিক গুরুত্ব দেয়ায় নাগরিক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার যখন তারস্বরে গণতন্ত্রের কথা বলছে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলছে, তখন মাহমুদুর রহমানের মুক্তি তরান্বিত করে তারা সহনশীলতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে।
আজকে গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রকে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের চাবিকাঠি বিবেচনা করা হয়। বহমান রাজনৈতিক যুদ্ধের ময়দানে গণমাধ্যম বা সংবাদপত্র অপ্রতিরুদ্ধ বিবেচনা করা হয়। নিকট অতীতে জার্মানির নাৎসি নেতা হিটলার সংবাদপত্রের রাজনৈতিক গুরুত্ব যথার্থভাবেই অনুধাবন করেছিলেন। তার প্রভাবশালী গ্রন্থ ‘মেইন ক্যাম্প’ এর প্রমাণ। মাকর্সবাদীরা স্বাধীন সংবাদপত্রকে এতটাই শত্রুতা জ্ঞান করেন যে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কোনো গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রের অস্তিত্ব তারা স্বীকার করেন না। বাংলাদেশে বাকশাল ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজস্ব স্টাইলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নাকচ করা হয় এবং শুধুমাত্র চারটি সংবাদপত্র রেখে সব ধরনের মতামত প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। তাদের উত্তরসূরি ক্ষমতাসীন সরকারও গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রকে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করণের পথে বাধা মনে করে। পার্থক্য এই যে বাকশাল একটি নেতিবাচক আইনি ঘোষণার মাধ্যমে বেআইনি কাজটি করেছে, আর বর্তমান সরকার ইতিবাচক আইনি ঘোষণার মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে দলন করছে। আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার পরবর্তীকালে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি মো: নিজামুল হকের সাথে বিদেশী একজন পরামর্শকের সংলাপ প্রকাশ করা। মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারের সময় কোনো রূপ আইনানুগতা ব্যতিরেকে পুলিশ আমার দেশ পত্রিকা তছনছ করে, সংবাদিক এবং প্রেস কর্মচারীদের মারধর করে এবং অবশেষে আমার দেশ পত্রিকা অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয়। সেই থেকে দৈনিক আমাদের দেশ কোনো রকম সরকারি বৈধ আদেশ ব্যতিরেকেই কার্যত বন্ধ রয়েছে।
মাহমুদুর রহমান গ্রেফতারের পর থেকে এ পযর্ন্ত (১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬) প্রায় ৩ বছর ধরে অবরুদ্ধ রয়েছেন। মাহমুদুর রহমান যে সরকারি নিপীড়ন নির্যাতনের নিকৃষ্ট শিকারে পরিণত হয়েছেন তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে, যখন সম্পদের বিবরণী যথাসময়ে দাখিল না করার নামমাত্র অজুহাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট এই অপরাধে আদালত তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়। এর আগে জনাব রহমান শাসকদলের রক্তচক্ষুর সম্মুখীন হন। তার পত্রিকায় শাসকদলের শীর্ষ ব্যক্তিদের দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ করে। মাহমুদুর রহমান সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে বিচার বিভাগের শাস্তির সম্মুখীন হন। প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে আদালতের সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে অভিযোগ পত্র দায়ের করা হয়। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুল স্বীকার করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু মাহমুদুর রহমান আত্মবিশ্বাস ও আত্¥মর্যাদায় এতটাই বলীয়ান যে তিনি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন। ফলে তাকে কারাবরণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে এ দেশে একরকম স্বেচ্ছায় কারাবরণের ইতিহাস বিরল। তাকে এভাবে অবদমিত করতে না পেরে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহিতা এবং মানহানির মামলা করা হয়। এ সময়ে ২০১০ সালের জুন মাসে তাকে হয়রানি, অপমান এবং নির্যাতনের মধ্য দিয়ে আরেকবার কারাবরণ করতে হয়। তার বিরুদ্ধে ৭০টি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা করা হয়। এসব মামলার হাজিরা দিতে সপ্তাহে তাকে তিন-চারবার কাশিমপুর কারাগার থেকে পুরনো ঢাকার আদালতে যেতে হয়। অস্বাস্থ্যকর এবং অপমানজনক অবস্থায় ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে চার-পাঁচ ঘণ্টা লেগে যায়। এ ধরনের যাতায়াত, বিভিন্নপর্যায়ে নিপীড়ন-নির্যাতন এবং নানাবিধ রোগে আক্রান্ত, ৬৩ বছর বয়সী এই মানুষটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়। প্রায় চার বছর হলো কাশিমপুর জেলে তিনি এভাবে জীবন অতিবাহিত করছেন।
ভয়ভীতি ব্যতীত একটি স্বাধীন পরিবেশে মতামত প্রকাশ, প্রচার এবং প্রতিষ্ঠা বিশ্বব্যাপী অনুসৃত মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় ব্যক্তির মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে অলঙ্ঘণীয় বলা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান সম্ভবত ব্যক্তি স্বাধীনতা সংরক্ষণে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান। এর তৃতীয় ভাগ জুড়ে আছে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি। অনুচ্ছেদ ৩৯ এর ২ (খ) ধারায় স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় সংবিধানের এত দৃঢ় রক্ষাকবচ সত্ত্বেও আমাদের সব শাসক গোষ্ঠী সংবাদপত্রের প্রতি খড়গহস্ত হয়েছে। শাসকদলের ক্ষেত্রে মাত্রাটা একটু বেশি। অবশ্য ২০০৭-০৮ সালের সামরিক সমর্থিত সরকারের সময়ে মাত্রাজ্ঞান ছিল না। এখন প্রকাশিত হচ্ছে কিভাবে কারণে অথবা অকারণে সংবাদপত্রগুলো সত্যতা নিরুপণের সুযোগ ছাড়াই মতামত প্রকাশ করতে হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক তার সদবিশ্বাসের কারণে ভুল স্বীকার করতে গিয়ে যে বিড়ম্বনার কারণ হয়েছেন তা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে কাম্য হতে পারে না। যে ভাষায় জাতীয় সংসদে তার নাম ধরে গালাগালি করা হয়েছে এবং আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেয়া হয়েছে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। মাহমুদুর রহমানের মতো তার নামেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় মামলা দেয়া হয়েছে। সরকারের কোনো কোনো কর্তাব্যক্তির মুখে নরম সুর পরিলক্ষিত হলেও দেখা যাচ্ছে, ‘রাজা যা বলে পারিষদ বলে তার শতগুণ।’
স্বাধীন মতামত তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি আওয়ামী ঘরানার মনোভাব কখনই অনুকূল ছিল না। বাকশাল আমলে বাক স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেয়া হয়েছে। এই সময়টায় (২০০৯-১৬) তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকার পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। কার্যকাল ঘেঁটে দেখা যায় বিগত আট বছরে তারা গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রের ওপর সবচেয়ে বেশি তলোয়ার চালিয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সময়ে তারা দৈনিক বাংলা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা বন্ধ করে দেয়। এবার তারা একে একে বন্ধ করে চ্যানেল ওয়ান, ইসলামিক টিভি এবং দিগন্ত টিভি। তারা আমার জানা মতে সমঝে ছিল। তাদের ভয় ছিল সরকার যেকোনো সময় তাদের ওপর চড়াও হতে পারে। যে সময়ে এবং যে পরিস্থিতিতে চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় তা ছিল অপ্রয়োজনীয়। সরকারের একটি ধমক তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। দৈনিক আমার দেশের প্রসঙ্গটিতে আসা যাক। সংবাদপত্র পরিচালনার জন্য আইন আছে, বিধি নিষেধ আছে, আরো আছে সেন্সরশিপ। তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাকিস্তান আমলের মতো সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলেও ‘স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ’ প্রত্যাশা করে- যে ব্যবস্থায় নিজ নিজ চ্যানেল বা সংবাদপত্রগুলো সরকারের মর্জিমাফিক চলাফেরা করে। সরকার এমনভাবে আমার দেশ পত্রিকাটি কৌশলে বন্ধ করে দিলো যাতে তারা আইনের আশ্রয় নেয়ারও সুযোগ পেল না। পুলিশের জোরে আমার দেশ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেল। স্রেফ গায়ের জোরে চ্যানেল দখলের ঘটনাও ঘটল। সরকার নিজের অজান্তে এসব ঘটনার মাধ্যমে অযথাই বদনাম কামিয়েছে। এত দিন গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলে বলে যারা মূখে খৈ ফুটিয়েছেন এখন তারা যখন সংবাদপত্রের দলনের জন্য খৈ ফোটাচ্ছেন তখন বলতে ইচ্ছা করে, ‘সত্যিই সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ।’এ ধরনের মতাদর্শ কেন্দ্রিক একপেশে তথ্য ব্যবস্থাপনার ফলেই দেশ আজ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক নিচে নেমে গেছে।
গণতন্ত্র এবং সংবাদপত্র একে অপরের পরিপূরক। মূলত এই দেশে, এই সময়ে গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্র গণতান্ত্রিক সমাজের শেষ আলোটুকু জালিয়ে রেখেছে। অতীতে বুদ্ধিজীবীরা সংবাদ পত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গ বলে গুরুত্ব দিয়েছেন। আজ তথ্য প্রযুক্তির এই জগতে এর গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে।সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে অবনমিত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পূর্ণমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হবে- সচেতন নাগরিক সাধারণের এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
email: mal55ju@yahoo.com

মিউনিখে সিরিয়া নিয়ে বৈঠক কার্যকর হওয়া নিয়ে প্রশ্ন- যুদ্ধবিরতিতে সম্মত বিশ্ব

সিরিয়ায় প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা রক্তপাত বন্ধে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো। যুদ্ধবিরতির এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে এক সপ্তাহের মধ্যে একটি চুক্তি সইয়ের কথা রয়েছে। খবর বিবিসি ও এএফপির।
জার্মানির মিউনিখে গত বৃহস্পতিবার ১৭ জাতির ‘আন্তর্জাতিক সিরিয়া সমর্থক গ্রুপ (আইএসএসজি)’-এর এক বৈঠকে এ সম্মতি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এ যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল-কায়েদার সহযোগী আল-নুসরা ফ্রন্টের জন্য কার্যকর হবে না। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স সিরিয়ার বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সলাপরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করবে বলেও সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে।
বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ও সিরিয়াবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত স্তেফান দ্য মিস্তুরা ওই সম্মতির কথা ঘোষণা করেন। বৈঠকে প্রতিনিধিরা সিরিয়ায় ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার ও সম্প্রসারিত করা এবং অবরুদ্ধ শহরগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়েও একমত হন।
এদিকে দীর্ঘ সময় ও বহু রক্তপাতের পর যুদ্ধবিরতির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো একমত হলেও এটি কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয় বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। এ প্রসঙ্গে জন কেরি বলেই ফেলেছেন, যুদ্ধবিরতির এ পরিকল্পনা বেশ উচ্চাভিলাষী। বিভিন্ন পক্ষ একে কতটা সম্মান করে, সেটাই হবে এর আসল পরীক্ষা।
বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে জন কেরি ও সের্গেই লাভরভ উভয় নেতা স্বীকার করেন, এই মুহূর্তে এটা কেবল কাগজে-কলমে অগ্রগতি। আর কিছু কূটনীতিক এরই মধ্যে বলেছেন, ‘কাগজে ছাপা হওয়ার বাইরে এই সম্মতি বা পরিকল্পনার কোনো মূল্য নেই।’
বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো এমন একসময়ে ওই যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সম্মত হলো, যখন রাশিয়ার বিমান হামলার সহায়তায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বাহিনী সিরিয়ার বৃহত্তম শহর আলেপ্পোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শহরটি বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে।
আলেপ্পোতে আটকে পড়ে রয়েছে হাজার হাজার মানুষ। তাদের সহায়তায় দ্রুত এগিয়ে আসার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সরকারবিরোধীরা। সরকারি বাহিনীর এগিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে শহরটির অবরুদ্ধ বাসিন্দাদের পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে সম্মতির ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট আসাদের সরকার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না জানালেও বিদ্রোহীদের একটি প্রধান জোট একে স্বাগত জানিয়েছে। বিদ্রোহীদের মুখপাত্র সেলিম আল-মুসলাত বলেন, ‘সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রতিফলন দেখলে আমরা শিগগিরই জেনেভা আলোচনায় অংশ নেব।’ সিরিয়া সরকার ও বিদ্রোহীদের শান্তি আলোচনার টেবিলে বসাতে এ শহরে শান্তি বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা চালাচ্ছে জাতিসংঘ।
ওদিকে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড বলেছেন, যুদ্ধবিরতি তখনই শুধু কার্যকর হবে, যখন রাশিয়া সিরিয়ায় বোমা হামলা থামাবে। তবে লাভরভ বলেন, তাঁদের অভিযান চলবে।
প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে সিরিয়ায় সংঘাতের শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো অনেক চেষ্টাও করেছে। কিন্তু এই যুদ্ধে আসাদের পক্ষে রাশিয়া যুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে এক সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধে পড়ে দেশটি। রাশিয়া বলছে, আইএসকে লক্ষ্য করে তাদের বিমান হামলা চলছে। কিন্তু পশ্চিমাদের অভিযোগ, আইএস নয়, বরং প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরোধীদের লক্ষ্য করেই বিমান হামলা চালাচ্ছে দেশটি।
সিরিয়ায় এ যুদ্ধে নিহত হয়েছে আড়াই লাখের বেশি মানুষ। বাস্তুচ্যুত ১ কোটি ৩৫ লাখ। তবে সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়ান সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের’ প্রতিবেদনে নিহত মানুষের সংখ্যা বলা হয় ৪ লাখ ৭০ হাজার, যা ওই পরিসংখ্যানের প্রায় দ্বিগুণ। ইতিমধ্যে গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে সিরিয়া থেকে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছে হাজার হাজার শরণার্থী।

সাংবাদিক দম্পতি হত্যা- রহস্য উদ্ঘাটন হবে না?

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার-মেহেরুন রুনি
হত্যাকান্ডের ৪৮ ঘণ্টা থেকে ৪৮ মাস। ফলাফল শূন্য
পেরিয়ে গেল ৪৮ মাস, তবু মেহেরুন রুনি ও সাগর সরওয়ারের হত্যারহস্য উন্মোচিত হলো না। অথচ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই খুনিদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন, চার বছরের মাথায়, সাগর সরওয়ারের মা হতাশার সঙ্গে বলছেন, ‘দেখো, ৪৮ বছরেও কিছু বের হয় কি না!’ এই হতাশা আমাদের সবার। কিন্তু এ শুধু হতাশা নয়, এর সঙ্গে মিশে আছে জাতির ক্ষোভ আর আইন প্রয়োগকারীদের ব্যর্থতার গ্লানি। অবশ্য আমরা জানি না, এই গ্লানি আইন প্রয়োগকারীরা অনুভব করেন কি না; খোদ সরকারের এ ব্যাপারে কোনো দায়বোধ আছে কি না।
সাংবাদিক দম্পতি মেহেরুন রুনি ও সাগর সরওয়ার দুটি পৃথক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের কর্মী থাকা অবস্থায় ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে রাজধানী ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ফ্ল্যাটে নৃশংসভাবে খুন হন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দুই মাস ধরে ‘তদন্ত’ চালানোর পর ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টকে নিজেদের ব্যর্থতার কথা জানায়, যা আরও এক রহস্যের জন্ম দেয়। তারপর হাইকোর্টের নির্দেশে এই হত্যা মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। র্যাব কবর থেকে দুজনের লাশ তুলে নিয়মমাফিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে; নিহত দম্পতির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণাগারে পাঠায়, ইত্যাদি নানা কিছু করে। কিন্তু সবকিছুর ফলাফল এ পর্যন্ত শূন্য।
বাস্তবে অস্তিত্বমান দুজন মানুষ সাগর ও রুনি একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থানকালে ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি আঘাতে খুন হয়েছেন—এই তথ্য যদি বাস্তব সত্য হয়, তাহলে কারা তাঁদের খুন করেছেন, সে রহস্য উন্মোচন করা হচ্ছে না কেন? কোনো অশরীরী আত্মা কি আকাশ থেকে নেমে এসে তাঁদের হত্যা করে আকাশেই ফিরে গেছে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে?
বিষয়টি শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নয়, সরকারেরও। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে সম্ভবত সর্বাধিক আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন ও খুনিদের বিচার করার দায়িত্ব এড়িয়ে থাকা উচিত নয়।

আসলে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বলতে কিছু নেই -শফিক রেহমান

শফিক রেহমান। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও উপস্থাপক। সাংবাদিকতার খ্যাতিতে আড়ালে চলে যায় তার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট পরিচয়। বহুমাত্রায় খ্যাতিমান শফিক রেহমান বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবসের প্রচলক হিসেবেও পরিচিত। তার সম্পাদিত যায়যায়দিন পত্রিকাটি এ দিবসটি জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিজ বাসায় মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শফিক রেহমান কথা বলেছেন ভালোবাসার আদ্যপান্ত নিয়ে।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত লন্ডনে নির্বাসিত থাকার সময় ভালোবাসা দিবস উদযাপন হতে দেখেছেন শফিক রেহমান। তিনি জানান, যদিও আশির দশকের তুলনায় নব্বইয়ের দশকে এটা খুব বেশি উদযাপন হওয়া শুরু হয়। তবে সেটা বাণিজ্যিক কারণে। তবুও স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা এটা সাদরে গ্রহণ করেন। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস শুধু সীমাবদ্ধ ছিল প্রেমিক-প্রেমিকা এবং তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। শফিক রেহমান বলেন, নির্বাসন থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসার পর মনে হলো এটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। কারণ, এখানে ভালোবাসার বাণী আছে। তবে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে করা যাবে না। কারণ, ছোটবেলায় আমরা এটাও লক্ষ্য করেছি এপ্রিল ফুল ডে করতে গেলে বলা হতো এটা খ্রিষ্টানদের জিনিস, মুসলিমবিরোধী। ভয় ছিল আমি কোনো কিছু করতে গেলে আমার বিরুদ্ধে প্রচার হতে পারে আমি ইসলামবিরোধী। সেজন্য সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে নামটা কেটে দিয়ে শুধু ভালোবাসার দিন হিসেবে নাম দিয়েছি। পরবর্তীতে দেখলাম এটা ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হলো। বাঙালি সবকিছুতে আন্তর্জাতিকতা পছন্দ করে বলে এটাকে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বলা শুরু হলো। আমরা বিশ্বখ্যাতি পাওয়ার জন্য কাঙাল। আসলে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বলতে কিছু নেই।
শফিক রেহমান বলেন, আমার পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল এটা শুধু স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। ভাই-বোন, পিতা-মাতা-সন্তানদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমি বলছি, এই দিনে মায়ের প্রতি ভালোবাসা দেখাও। অন্তত এক কাপ চা বানিয়ে মাকে খাওয়াও। আমার খুব দুঃখ, আমি আমার মায়ের জন্য কিছু করতে পারিনি। তবে বাংলাদেশে ভালোবাসাটা অনেক বেশি দরকার। কারণ, এখানে জনবসতি অনেক বেশি। সুসম্পর্ক, সহাবস্থান গড়ে ওঠা জরুরি। ভালোবাসার পরিধিটা বৃদ্ধি করতে হবে যেন সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে।
আমি তো একা, তাহলে আমি কীভাবে পালন করবো ভালোবাসা দিবস। সেই চিন্তা থেকে আমি আমার পাঠকদের লেখা পাঠাতে বললাম। তাদের জীবনের গল্প। পাঠকদের এতো লেখা পেয়েছি যে ৬৪ পৃষ্ঠার চারটা বিশেষ সংখ্যা বের করতে হয়েছে। আমি অবাক হয়েছি, আমাদের দেশের মানুষ এত ভালোবাসে। তাইতো জনসংখ্যা এত বেশি। পাঠকের সহযোগিতায় ভালোবাসা দিবসটি আমি ছড়িয়ে দিতে পেরেছি।
শফিক রেহমান বলেন, ভালোবাসা দিবস নিজে স্পেশালি কখনো উদযাপন করিনি। পার্টি, ডিনার, ড্রিংকস এসব কখনো করা হয়নি। ওই দিনটিতে ভালোবাসার বাণী প্রচারে ব্যস্ত থাকি। আমি ভাবিনি এটা এত দূরে যাবে। মানুষ এই দিনটাকে এত সুন্দরভাবে উদযাপন করবে। ভালো লাগে যখন মানুষ এই দিবসকে বিশেষভাবে পালন করে। তবে আমার মনে হয় ভালোবাসার দিনটা একমাত্র প্রোগ্রাম, যেটা সারাবিশ্বে একসঙ্গে উদযাপিত হয়। তবে অনেকেই হয়তো বলে নির্দিষ্ট একদিনেই কেন ভালোবাসার প্রকাশ হতে হবে। এক্ষেত্রে আমি বলবো, প্রতিদিন যদি ‘ভালোবাসি’ বলে তাহলে খুবই ভালো। কিন্তু বাংলাদেশে ভালোবাসার প্রকাশটা অনেক কম। একদিন অন্তত বলুক। ভালোবাসার প্রকাশ হওয়াটা দরকার। ফেসবুকে চুমু খাওয়ার বিষয়ে যে ঝড় উঠেছে, আমি মনে করি চুমু খাওয়া কোনো বাহাদুরি নয়। যারা করেছে একটা ফালতু জিনিস করেছে। ঘোষণা দিয়ে পুলিশের সামনে চুমু খাওয়া, আমাকে টিকিট দিলেও আমি যাবো না।
প্রকৃত ভালোবাসার সংজ্ঞা দেয়া মুশকিল। ভালোবাসা একটা পারস্পরিক আকর্ষণ। যদি এটা পারস্পরিক আকর্ষণ হয়, এটা একতরফা নয়। ভালোবাসা চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। সৌন্দর্য এবং অনুভূতি নির্ভর করে মনের ওপর। তবে আমি মনে করি ভালোবাসা হচ্ছে যে মানুষকে তুমি ভালোবাসবে তাকে কখনো কষ্ট দেয়া যাবে না। এমন কিছু করা যাবে না যেটাতে সে কষ্ট পাবে। মমত্ববোধ এবং শ্রদ্ধবোধের মিশ্রণই হচ্ছে ভালোবাসা। নিজের ভালোবাসার গল্পটা সবসময় এড়িয়ে যাই। কারণ, এখানে আমি জিনিসটা গৌণ। ভালোবাসা বিষয়টা প্রধান। তবে নিজের গল্পটা আমি হয়তো কোনো বইয়ের মাধ্যমে সবাইকে জানাবো।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসার পরিবর্তন হচ্ছে। আমি নিজে যখন বিয়ে করেছি তখন ভালোবেসে বিয়ে করাটা মানুষ ভালো চোখে দেখতো না। অভিভাবকরা ভাবতো নিজেরা দেখে বিয়ে দিলে সেটাই ভালো হবে। কিন্তু এখন চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে। তবে কেউ যদি একই সময়ে একের অধিক মানুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তাহলে আমি বলবো এখানে ভালোবাসা নেই। ভালোবাসার মানুষ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ায় আগে মা-বাবার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
ভালোবাসা দিবসে রাজনীতিবিদদের আমি বলবো হিংসা-প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করুন। গুম, হত্যা, পুলিশি নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। এতে করে প্রতিনিয়ত মানুষ নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিবিদদের এটা বুঝতে হবে সমাজে যদি প্রতিহিংসার রাজনীতি চলে তবে এটা ছড়িয়ে যাবে। কাউকে ফাঁসি দিলেও প্রতিহিংসাটা বেড়ে যায়। ভালোবাসা এবং মৃত্যুদণ্ড দুটা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বর্তমান তরুণরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে চায় বলে গণতন্ত্র নিয়ে চিন্তাটা করছে না। তবে আমি বলবো, শেখ হাসিনার গণতন্ত্র সেনাতন্ত্রের চেয়ে ভালো। গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য আমাকে নির্বাসিত হতে হয়েছে।
শফিক রেহমান বলেন, চট্টগ্রামে প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম। সেখানে ডিসি হিলের উল্টো দিকে ছোট্ট একটি রাস্তার নাম ছিল লাভ লেন। এই লেনের শুরুতে পানের দোকান ছিল। প্রেমিক-প্রেমিকারা সেখানে এসে পান খেত। পানের আকৃতিও ছিল হার্টের মতো। হয়তো সেই পানের জন্যই রোডটা এত বিখ্যাত ছিল। আমি যখন যায়যায়দিনের প্লট বুকিং দেই তখন সেখানে রাস্তার নাম ছিল না। তখন আমি সে সময়ের নগর পিতাকে বলেছি চট্টগ্রামের মতো এখানে আমি একটা লাভ রোড চাই। কিন্তু আমি চাই বলে রোডের নামকরণ হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পরিবর্তন করে ফেলতে পারবে। তবে যদি এলাকাবাসীর চাওয়ার জন্য এই নামে রোড হয় তাহলে সেটা পরিবর্তন করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় জনগণের দাবিতে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তমদের নামে সড়ক তৈরি করা হবে। তখন লাভ রোড নাম চেঞ্জ করতে হলে অন্য সড়কের নামও পরিবর্তন করতে হবে। তবে এখন সবাই এটাকে লাভ রোড বললেও একটি দৈনিক পত্রিকা এই নাম ব্যবহার করছে না। তাতে আমার কিছু আসে যায় না। ভালোবাসার জয় একদিন হবেই, ওরাও লিখবে।
শফিক রেহমান বলেন, ভালোবাসার রঙ লাল এটা ভাবার কারণ হতে পারে রক্তের রঙ লাল এবং হার্টের রঙও লাল। তবে লাল জিনিসটা মানুষকে আকৃষ্ট করে। অনেক মানুষের সঙ্গে কানেক্ট করার একটা মাধ্যম হচ্ছে লাল। ভালোবাসার দিনের প্রবর্তক হিসেবে আমি বলবো এই দিনটি শুধু স্বামী-স্ত্রী কিংবা প্রেমিক প্রেমিকার জন্য নয়। পুরো পরিবারের জন্য, সব সম্পর্কের জন্য। পশ্চিমাদের কাছ থেকে আমরা যেসব নিবো সেটা কিন্তু নয়। তাদের পরিবার ভেঙে গেছে। কিন্তু আমরা সেটা ধরে রাখতে পেরেছি। এটা ভালো এবং এটাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। পরবর্তী প্রজন্ম এই দিনটাকে কীভাবে উদযাপন করবে এটা তারা ঠিক করবে। তবে ভালোবাসার সম্পর্কটা প্রকাশ হতে হবে।

এবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। আগামী মাস থেকে ছাপার হরফে আর প্রকাশিত হবে না ব্রিটেনের এই সংবাদপত্রটি। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র অনলাইন সংস্করণই এর পর থেকে দেখা যাবে।
গত শুক্রবার সংবাদপত্রের মালিকপক্ষ ইএসআই মিডিয়া গ্রুপ জানিয়েছে, খানিকটা বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। জনস্টন প্রেসের শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতি থাকলে ইন্টারনেট সংস্করণও তাদের বিক্রি করা হবে। ইএসআই মিডিয়া গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার ইভজেনি লেবেদেভ বলেন, 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্র্যান্ডকে প্রিজার্ভ করতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এডিটোরিয়াল কনটেন্ট নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। অনলাইনে আরও বেশি সংখ্যক পাঠকরা যাতে আসেন সে দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।'
তিনি আরও জানিয়েছেন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর শেষ মু্দ্রিত সংস্করণটি প্রকাশিত হবে ২৬ মার্চ শনিবার। রোববারের শেষ সংখ্যা হবে ২০ মার্চ। ২৭ মার্চ থেকে শুধু অনলাইনেই সংবাদপত্র পড়া যাবে। ১৯৮৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। ৩০ বছর প্রকাশিত হওয়ার পর প্রতিদিন সার্কুলেশন ছিল ৬০ হাজার। সার্কুলেশন না বাড়ায় শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র ডিজিটাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিল কর্তৃপক্ষ। খুব শীঘ্রই নতুন অ্যাপও আসছে। যদিও এমনটাই যে হবে তা বহু দিন আগে গার্ডিয়ানের ওয়েবসাইটে একটি নিবদ্ধে জার্নালিজমের অধ্যাপক ব্রায়ান ক্যাথকার্ট লেখেন। সেখানে লেখা ছিল, 'ব্রিটেনের সমস্ত সংবাদপত্র ধীরে ধীরে ছাপার হরফে বেরনো বন্ধ হয়ে যাবে। তবে কোন সংবাদপত্র আগে বন্ধ হবে তা অবশ্য বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এটা হবেই। এমনকী সান এবং ডেইলি মেইলের মতো সংবাদপত্রেও বাদ যাবে না।'

বাংলা একাডেমি ব্যস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর প্রদর্শনী নিয়ে : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, বাংলা একাডেমির কাজ হচ্ছে গবেষণা আর অনুবাদে বেশি মনোযোগী হওয়া। কিন্তু তারা ব্যস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর প্রদর্শনী নিয়ে। এ ধরণের কাজ করবে শিল্পকলা একাডেমি। শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘শৈল্পিক বাচন’ শিরোনামের সিডি-ডিভিডির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি আরো বলেন, বাংলা ভাষা হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভাষা। গরীর মানুষের ভাষা। এজন্য একে নিয়ে কাজ করে না বাংলা একাডেমি। তারা ধনী পুজিবাদীদের স্বার্থ দেখে। অথচ বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশে ভাষার ওপর অনুবাদ ও গবেষণা করতে।
তিনি বলেন, বাংলা ভাষার বিকাশ করতে হলে আমাদের জ্ঞানের সাধনা করতে হবে। আমাদেরকে আড়ম্বর ত্যাগ এবং দেশপ্রেমের চর্চা করতে হবে।
জাতীয়তাবাদ বিকাশের প্রধান মাধ্যম ভাষা উল্লেখ করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের বাংলা ভাষা চর্চার এ আয়োজনকে স্বাগত জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা বাংলা ভাষার চর্চা করবো শৈল্পিকভাবে। ভাষার ব্যাপারে আমরা আঞ্চলিকতা চাই না, আন্তর্জাতিকতা চাই।
বাংলা বাচন পরিশীলন কর্মশালার উপকরণ হিসেবে প্রমিত বাংলা চর্চার সহায়ক ‘শৈল্পিক বাচন’ নামের সিডি-ডিভিডির মোড়ক উন্মোচন করা হয় অনুষ্ঠানে। বাচন কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদপত্রও প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মিডিয়া সেলের আহবায়ক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান এবং বাংলা বাচন পরিশীলন কর্মশালার প্রশিক্ষক নাট্য ব্যক্তিত্ব মো. গোলাম সারোয়ার।
সভাপতিত্ব করেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের পরিচালক সমন্বয় মিসেস সুরাইয়া রহমান।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ কর্মশালার ২৪টি ব্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অংশ নেন নয় শতাধিক ব্যক্তি।

যৌনচক্রে বন্দি ১২ মাস

কেটি ল্যাং (২৭)। এই যুবতী ১২ মাস বন্দি ছিলেন একটি যৌনচক্রে। তাকে দিয়ে পতিতাবৃত্তি করানো হয়েছে কুইন্সল্যান্ড, দুবাই, আবু ধাবি এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে। তার সঙ্গে এ সময় ব্যবহার করা হতো ক্রীতদাসীর মতো। তিনি বন্দি ছিলেন ডামিওন সেন্ট প্যাট্রিক ব্যাসটনের যৌনচক্রে। সে জামাইকার একজন পর্যটক। তার সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন কেটি ল্যাং। তারপর থেকেই তাকে যৌনতার ফাঁদে আটকে ফেলা হয়। অস্ট্রেলিয়ার সিক্সটি মিনিটস শোতে এসব কথা বলেছেন কেটি ল্যাং। বলেছেন, এখনও মনে আছে বস্টনে যখন তিনি প্যাট্রিকের কথায় শারীরিক সম্পর্ক গড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তখন কিভাবে তার ওপর হামলা হয়েছিল। কেট বলেন, সে লাফিয়ে উঠে আমার গলা চেপে ধরে। আমাকে ছুড়ে ফেলে। প্যাট্রিক ব্যাস্টন সাবেক একজন পুরুষ স্ট্রিপার। তাকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে ফ্লোরিডায় যৌনচক্রে পাচার সহ ২১টি অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। এর ফলে সেখানে তাকে ২৭ বছরের জেল দেয়া হয়। তার সম্পর্কে কেটি ল্যাং বলেন, তাকে দেখে আমি সব সময় থাকতাম ভীতসন্ত্রস্ত্র। সে শুধু আমাকেই আঘাত করতো না। একই সঙ্গে আমার পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি দিতে। সে সব সময়ই বলতো- আমি জানি তোমার পরিবারের সদস্যরা কোথায় আছে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিই আমার যা হবার হোক, আমার পরিবারের যেন কোন ক্ষতি না হয়। ফলে বাধ্য হয়ে তার হাতে আমাকে তুলে দিই। প্যাট্রিক ব্যাস্টনের বিরুদ্ধে একই রকম সাক্ষ্য দিয়েছেন আরও ৫ নারী। তারাও বলেছেন, তাদেরকেও দেহ ব্যবসায়ী বানানো হয়েছিল। অর্থের বিনিময়ে নর্তকী বানানো হয়েছিল। কেটি ল্যাং বলেন, একবার সে আমাকে দুবাই নিয়ে আসে। আমার আত্মীয়দের ক্ষতি হতে পারে এ ভয়ে তার সঙ্গে দুবাই যেতে রাজি হই। সেখানে নিয়ে আমাকে দিয়ে দেহ ব্যবসা করানো হয়। এক বছর পরে কেটি ল্যাং অস্ট্রেলিয়া ফেরেন তার ভিসা নবায়নের জন্য। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাকে এ সময় প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি প্যাট্রিক ব্যাস্টনের বিরুদ্ধে সব তথ্য প্রকাশ করে দেন।