Thursday, September 12, 2013

ছাত্রলীগ কথা শুনবে তো? by ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩১ আগস্ট ঢাকার ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে যখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংগঠন করার পাশাপাশি লেখাপড়ায় মনোযোগী হতে আহ্বান জানাচ্ছিলেন, ঠিক সেদিনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আর এতে কমপক্ষে ১৩ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল ছুড়ে। প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি এর আগে অনেক এমপি-মন্ত্রীও ছাত্রলীগকে দেশ ও জাতি গঠনে ভালো কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন, দিয়েছেন অনেক পরামর্শ এবং সর্বোপরি বারবার বলেছেন নীতি আর আদর্শের কথা। কিন্তু কে শোনে কার কথা! প্রকৃত অবস্থা হল, কীভাবে লাখ লাখ টাকা কামাই করা যাবে, কীভাবে প্রভাব বিস্তার করা যাবে সেদিকে মন থাকায় এসব নীতিকথা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে যায়।
ক্ষমতায় আসার পর সরকারের পক্ষ হতে বলা হয়েছিল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে কেউ রেহাই পাবে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও বলেছিলেন, ছাত্ররাজনীতির নামে গুণ্ডামি বন্ধ করতে হবে। এসব বন্ধ না করলে তিনি যে-ই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু ছাত্রলীগের উদ্দেশে করা এতসব আহ্বান, পরামর্শ ও সতর্ক জারি করার ফলাফল যে শেষ পর্যন্ত শূন্যের কোঠায় গিয়েছে এবং বর্তমানেও যাচ্ছে, তা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগ নামধারীদের কৃতকর্ম দেখে সহজেই অনুমান করা যায়। একেই বুঝি বলে, কথায় শুধু চিঁড়া ভেজে না। আর এ ক্ষেত্রে সরকারের কথা ও কাজের মধ্যে যদি মিল না হয়, তবে তা হবে জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। তবে জনগণও যে এ ক্ষেত্রে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো কাজ করতে যথেষ্ট সক্ষম, তা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনের ফলাফলই প্রমাণ করে। সরকারের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণে রাখা।
বিগত চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছাত্রদল-ছাত্রশিবির নামধারী সন্ত্রাসীরা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন অব্যাহতভাবে শুরু করেছিল সন্ত্রাস, হত্যা, হামলা, ভাংচুর, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড; ঠিক তেমনিভাবেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা অব্যাহতভাবে শুরু করে সন্ত্রাস, হত্যা, হামলা, ভাংচুর, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। এ যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নমুনা বা প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ধরা যেতে পারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের গত কমিটির বয়স যখন মাত্র ছয় মাসে পৌঁছে, তখন ওই ছয় মাসেই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে বড় ধরনের সংঘর্ষ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি। এসব সংঘর্ষে আহত হয়েছেন প্রায় শতাধিক নেতাকর্মী, ক্ষতি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মূল্যবান সম্পদ- যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এতটাই প্রকট যে, ছাত্রলীগের এক পক্ষের কর্মীদের কাছে অপর পক্ষের কর্মীরা মোটেও নিরাপদ নন। এর একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে খাবারের টোকেন বিতরণকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সভাপতি (তৎকালীন) সমর্থিত কর্মীদের দ্বারা সাধারণ সম্পাদক (তৎকালীন) সমর্থিত কর্মী নাছরুল্লাহ্ নাসিমকে মারধর করার ঘটনায়। ওই ঘটনায় নাসিমকে শাহ্ মখদুম হলের দোতলা থেকে নিক্ষেপ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত নাসিমের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনার পরও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দ্বারা অনেক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে- যার ফলে বেশ কয়েকজন ছাত্রের প্রাণহানি ঘটাসহ অনেকে আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া মারাÍকভাবে বিঘিœত হওয়াসহ ক্ষতি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মূল্যবান সম্পদের। তবে এ ধরনের চিত্র শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ছাত্রের হতাহতের ঘটনাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটা অংকের টাকার সম্পদ বিনষ্ট হওয়ার খবর আজ আর কারও অজানা নয়। সম্প্রতি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালানোর মাধ্যমে তাদের অপকর্মের তালিকায় আরও একটি নতুন বিষয় যোগ করে।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেও ছাত্রলীগ নামধারী এসব সন্ত্রাসী বারবার রেহাই পেয়ে যাচ্ছে এবং আবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। এসব ঘটনার ফলে একদিকে যেমন দেশ-জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি শিক্ষাঙ্গনগুলোয় বারবার বিঘিœত হচ্ছে লেখাপড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ। সৃষ্টি হচ্ছে সেশনজট। ফলে শিক্ষার্থীদের পেছনে তাদের অভিভাবকদের ব্যয় করতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। দেশের উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আধিপত্য বিস্তার, স্বার্থগত দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার কারণেই যে এসব সংঘর্ষ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটে চলছে, তা সহজেই অনুমেয়। এর আগে ছাত্রলীগের উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগে ঢুকে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ কথা যদি সত্য হয়, তবে তা হবে বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা বাঁধারই নামান্তর। আর সেক্ষেত্রে ঘোগদের তাড়াতে নিশ্চই বাঘকেই এগিয়ে আসতে হবে! সরকার বা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নিজেদের স্বার্থেই ছাত্রলীগের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী ছাত্রশিবির বা ছাত্রদলের চর কিংবা সুবিধাভোগীদের বাছাই করে ছাত্রলীগকে ঢেলে সাজানো উচিত।
ছাত্রলীগের বিভিন্ন অপতৎপরতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষ রীতিমতো বিষিয়ে উঠেছে। তাদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ছাত্রলীগ কি অপ্রতিরোধ্য? ছাত্রলীগকে কি সামলানো সম্ভব নয়? আর যদি ছাত্রলীগকে সামলানো সম্ভব হয়, তাহলে সামলানোর দায়িত্ব কার? সরকারের নাকি অন্য কারও? ছাত্রলীগকে সামলানোর দায়িত্ব যদি প্রধানমন্ত্রী বা ছাত্রলীগের মাতৃসংগঠন কিংবা সরকারেরই হয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের দ্বারা বারবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটলেও কেন ছাত্রলীগকে সামলানো হচ্ছে না? কেন তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না? এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিরাই বা কী ভূমিকা পালন করছেন? এ কথা বলাবাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে জ্ঞানের আধার। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-গবেষণা চর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। পাশাপাশি মেধাভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তাদের দেশ গঠন, জাতি ও সমাজ গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কথা। অতীতের ছাত্ররাজনীতির দিকে দৃষ্টিপাত করলে ঠিক এমনই ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান ছাত্ররাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ছাত্ররাজনীতি করে যাদের দেশ ও জাতি গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কথা, আজ তারাই হত্যা, হামলা, ভাংচুর, হল দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা ধরনের অপতৎপরতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে একদিকে যেমন তাদের মধ্য থেকে দেশ গঠন ও জাতি গঠনের জন্য যোগ্য ও উপযুক্ত নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না, তেমনি এসব ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলেরই একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ রাখা দরকার- কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন কর্তৃক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটানো হলে সেই সংগঠনের ভাবমূর্তি বিশেষভাবে ক্ষুণ্ন হয়। তাছাড়া পরে সরকার গঠনে বা নির্বাচনে ওই রাজনৈতিক দলের ওপর এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বর্তমান সরকারসহ সব রাজনৈতিক সংগঠনেরই উচিত হবে দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু-স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা। এ ব্যাপারে যদি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন সম্মিলিতভাবে ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়, তবে তা হবে সবার জন্যই মঙ্গলজনক। সরকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে ছাত্ররাজনীতির নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে- এটাই সবার প্রত্যাশা। সর্বোপরি এ কথা সবারই ভালোভাবে স্মরণে রাখা প্রয়োজন, দলের প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ অর্থ উপার্জনসহ অবৈধ নানা সুযোগ-সুবিধা অর্জনের পথ বন্ধ না করলে শুধু নীতি কথায় বা পরামর্শে কোনো কাজ হবে না।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ইউআইটিএস; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

ভিআইপি গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের বিড়ম্বনা by এ কে এম শাহ নাওয়াজ

আমাদের চলমান রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে রাজনীতিক ও রাষ্ট্রব্যবস্থা উভয়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক বোধের অভাব। গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর জননেতাদের হওয়ার কথা জনকল্যাণকামী। কিন্তু এদেশের জননেতারা বিশেষ করে ক্ষমতাসীন জননেতারা সরকারি বড় বড় পদ-পদবিতে থাকলে জনবিচ্ছিন্ন হতে পছন্দ করেন। নিজেদের ভিআইপি হিসেবে চিহ্নিত করে একমাত্র ভোট প্রার্থনার সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়ে সাধারণ মানুষকে অতি সাধারণ বিবেচনা করে অস্পৃশ্য ভাবতে থাকেন। মানুষের কষ্ট তাদের ছুঁয়ে যায় না। ভিআইপি হিসেবে নিজেদের অধিকারকেই সুরক্ষা করেন। তরুণ তুর্কি ভিআইপি থেকে শুরু করে প্রবীণ পোড়খাওয়া রাজনীতিকও এই রোগ থেকে মুক্ত নন। তারা বুঝতে চান না যে, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে অনেক স্পর্শকাতর ভোটার রাজনৈতিক দলগুলোর খেরোখাতা খুলে বসে। এ সময় ভিআইপিদের আচরণ নতুন মূল্যায়নে সামনে এসে দাঁড়ায়। এ বাস্তবতা দলের জন্য ততটা না হলেও ব্যক্তি ভিআইপির জন্য খুব সুখপ্রদ হয় না। সাম্প্রতিক সময়ের এমনই একটি অভিজ্ঞতা পাঠকের সামনে উপস্থাপনের জন্যই আজকের এ লেখা।
গত ঈদুল ফিতরের পর ১৫ আগস্ট শরীয়তপুর বেড়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। ভেবেছিলাম, এ সময়টা ফেরিঘাটে ভিড় কম হবে। কাঁঠালবাড়ি ঘাটের উদ্দেশে প্রথম ফেরি মাওয়া ছেড়ে যাবে সকাল ৮টায়। তাই একটু হাতে সময় রেখে মাওয়া ঘাটে পৌঁছে গেলাম ৭টার মধ্যে। মোটামুটি নিরাপদ দূরত্বের সিরিয়ালে আমার গাড়ি দাঁড়াল। ৮টা বাজার আগেই প্রচুর গাড়ি এসে গেল পদ্মা পাড়ি দিতে। যে ফেরিটি ঘাটে লাগল, আকারে খুব বড় নয়। নাম ‘কেতকি’। সব গাড়ির জায়গা হবে বলে মনে হল না। কিছুক্ষণ পর আমাদের ফেরির গা ঘেঁষে আরেকটি বড় ফেরি দাঁড়াল। সম্ভবত ফেরিটির নাম ‘ফরিদপুর’। জানলাম ওটি ভিআইপির জন্য। ওপারে নড়িয়া-ভেদেরগঞ্জ ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচনী এলাকা। তিনি বাড়ি যাবেন। সঙ্গে দলীয় লোকজনও থাকতে পারে। আমাদের মনে হল, বড় ফেরিটি সাধারণের জন্য থাকলে অধিকাংশ গাড়ি উঠতে পারে। আর অনায়াসেই ছোট ফেরিতে ‘ভিআইপি’দের জায়গা হয়ে যায়। ঘাটের এক কর্মকর্তাকে বললামও। তিনি আমার বোকা বোকা কথার জন্য অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন। ভিআইপিদের জন্য ওটা নির্ধারিত। ভিআইপি একজন হলেও তাকে নিয়ে ওই ফেরি ছাড়বে। তাছাড়া কেতকিতে ভিআইপিদের জন্য রেস্ট নেয়ার, ফ্রেস হওয়ার ব্যবস্থা নেই। তবে ভিআইপি অনুমতি দিলে পাবলিকের দু’-চারটি গাড়ি ওই ফেরিতেও উঠতে পারবে।
যাই হোক, আমরা অতি সাধারণ আদার ব্যাপারী (এখনকার আদার মূল্যমানে নয়), জাহাজের খোঁজ নিয়ে লাভ নেই। আমাদের ফেরি ছাড়ল। জায়গার অভাবে অনেক হতভাগ্য গাড়ি উঠতে পারল না। মনে মনে প্রার্থনা করলাম, ভিআইপির মন আজ ফুরফুরে থাক। সাধারণ মানুষের গাড়িগুলো ফেরিতে ওঠার অনুমতি পাক। শরীয়তপুরের যাত্রাটি নির্বিঘেœই কাটল। বিপত্তিতে পড়লাম ফিরতি পথে।
ফেরি ছাড়বে সকাল ১০টায়। আমরা সাড়ে ৮টার মধ্যে ঘাটে পৌঁছলাম। ঈদফেরত গাড়ির ভারি চাপ। কাঁঠালবাড়ি ঘাটে সোজাসুজি ফেরিতে ওঠার রাস্তায় অনেক ট্রাক সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাটের তদারকিতে যারা আছে, তারা আমাদের প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসগুলো ডান দিকের বিকল্প পথে নামিয়ে দিল। সাড়ে ৯টার মধ্যে মাওয়া ঘাট থেকে ‘কেতকি’ ফেরিটি চলে এলো। আনলোড করার পর এখন আমাদের গাড়ি ফেরিতে ওঠার পালা। ১৪তম সিরিয়ালে আমার গাড়ি। হিসাব করে দেখলাম, অনায়াসে আমরা ফেরিতে উঠতে পারব। কিন্তু দ্রুতই সে আশা নির্বাপিত হতে লাগল। প্রথমদিকের চার-পাঁচটা গাড়ি যাওয়ার পর আমাদের থামিয়ে দেয়া হল। যে সোজা পথে আমাদের গাড়ি আসতে মানা ছিল, সে পথেই নবাগত অনেক কার, মাইক্রোবাস ও বাস তরতর করে ফেরিতে উঠে ফেরি পূর্ণ করে দিল। আর এর জন্য ইজারাদারসহ একটি সিন্ডিকেট প্রকাশ্যেই টাকা লেনদেন করল। পাশের টং দোকানে বসে চা খেতে খেতে একজন মাঝবয়সী স্থানীয় ভদ্রলোক বললেন, এগুলো স্বাভাবিক। গাড়ির চাপ থাকলে এমন দুই নম্বরি প্রকাশ্যেই হয়। এই টাকা বহু মহলে যায় বলে এরা বেপরোয়া। আমাদের কোনো প্রতিবাদই কেউ কানে তুলল না। আমাদের অসহায় অবস্থা দেখে পান দোকানদার বলল, স্যার, ওদের সঙ্গে লাইন না করলে আপনি সহজে ফেরিতে উঠতে পারবেন না। আমাদের হতাশার নদীতে ফেলে দিয়ে ছেড়ে দিল ফেরি।
এর পরের ফেরি বেলা ২টায়। অর্থাৎ সকাল ৮টায় এসে বেলা ২টা পর্যন্ত পদ্মার ঢেউ গুনতে হবে। এর মধ্যে ফেরিঘাটের একজন আশার কথা শোনালেন। বললেন, এমন গাড়ির চাপ থাকলে মাঝে মাঝে বিশেষ ফেরি দেয়া হয়। কপাল ভালো থাকলে এর মধ্যে একটি ফেরি পেয়েও যেতে পারেন।
কপাল বোধহয় খুলল। দেখলাম ‘ফরিদপুর’ নামের সেই ফেরিটি আসছে ঘাটের দিকে। আমাদের উদ্ধার করতেই বোধহয় মাওয়া থেকে একেবারে খালি এসেছে। কিন্তু ফেরিটি আমাদের ঘাটে না ভিড়ে কয়েকশ’ গজ দূরে আরেকটি ঘাটের পন্টুনে গিয়ে ভিড়ল। ঘাট-সংশ্লিষ্ট একজন বললেন, এটি এসেছে ভিআইপি নেয়ার জন্য। ডেপুটি স্পিকার মহোদয় ফিরবেন। তিনি রাজি থাকলে আপনারাও যেতে পারবেন। কিছুটা নিশ্চিন্ত হতে পেরেছি বলে মনটা হালকা লাগল। জননেতা নিশ্চয়ই মানুষের কষ্ট বুঝবেন। আমরা প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। ঘাটের ভদ্রলোক বললেন, স্পিকার সাহেব ওঠার পর ফেরি এই ঘাটে ভিড়বে। তখন আপনারা উঠতে পারবেন।
আধা ঘণ্টা পর খবর এলো স্পিকার সাহেব মত পাল্টেছেন। এখনই ফিরবেন না। মধ্যাহ্নভোজের পর ফিরবেন। আমরা বললাম, তাহলে এই ফেরিটি একবার মাওয়া ঘুরে আসতে পারে। তাতে আটকে পড়া মানুষের অনেক উপকার হয়। ভিআইপিও যথাসময়ে ফিরতে পারবেন। আমার কথা শুনে স্বয়ংক্রিয় উত্তর এলো, ‘ফেরিটি ভিআইপিদের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য নয়।’ এদিকে ফেরির আশায় বসে থাকা যাত্রীদের অবস্থা করুণ। গত দু’দিন থেকে থেকে বৃষ্টি হওয়ার পর এ দিনটিতে ছিল মেঘভাঙা রোদ। ভীষণ গরমে পদ্মার পাড়ে মানুষের ত্রাহি অবস্থা। মাইক্রোবাসে শিশুদের কান্না। অন্যদের হাঁসফাঁস।
অবশেষে বেলা ২টার পর একটি ফেরি এলো। মুক্তি পেলাম আমরা। ৩টার পরপর কাঁঠালবাড়ি ঘাট ছাড়লাম। এই ছয়-সাত ঘণ্টায় সঞ্চয় হল অনেক অভিজ্ঞতা। বুঝতে পারলাম, ভিআইপি আর সাধারণ মানুষের মধ্যে ফারাক কত। মনে পড়ল ২০০৪-এর কথা। আমি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষক পশ্চিমবঙ্গের মালদহে একটি সেমিনারে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। সোনামসজিদ সীমান্ত পাড়ি দেয়ার পর ভারতীয় কাস্টমস খুব ভালো ব্যবহার করেনি কারও সঙ্গে। সেমিনার উদ্বোধন করতে এসেছিলেন রাজ্য সরকারের একজন পূর্ণ মন্ত্রী। পৌঢ় সৌম্যকান্তি মানুষ। রাজশাহীর একজন শিক্ষক তার কাছে এই হয়রানির কথা বললেন। মন্ত্রী লজ্জায় যেন মাথা নিচু করলেন। দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, শিক্ষকদের আমরা সবচেয়ে বেশি সম্মান দেই। কাস্টমস কর্মকর্তাদের অমন ব্যবহার করা উচিত হয়নি। আমি বিষয়টি দেখব। ফিরতি পথে আমরা এর প্রমাণ পেলাম। ভারতীয় কাস্টমস কর্মকর্তারা দ্রুত করণীয় কর্তব্য সম্পাদন করে সসম্মানে আমাদের সীমান্ত পাড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন।
আমরা আমাদের ভিআইপিদের দেখে বিস্মিত হই। জনগণের নেতা হয়েও তারা জনগণের সঙ্গে চলেন না। সাধারণ মানুষের ফেরি ‘কেতকি’তে না চড়ে ভিআইপিদের জন্য আলাদা করে রাখা ‘ফরিদপুর’ নামের ফেরিতে চড়েন। ফেরিঘাটের এই জনদুর্ভোগের সময়ও তাদের সেবার জন্য রাষ্ট্রের বহু সহস্র টাকার জ্বালানি পুড়ে মাওয়াঘাট থেকে খালি ফেরি এসে অপেক্ষা করছে। সাধারণ মানুষের টাকায় এসব বিশেষ ফেরি চলে আর বিপদে পড়া সাধারণ মানুষ অসহায় দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। আমি এজন্য অবশ্য ব্যক্তি ডেপুটি স্পিকারকে দায়ী করি না। ভিআইপি হিসেবে তাদের জন্য এসব প্রাপ্য অধিকার রাষ্ট্রযন্ত্রই নির্ধারণ করে দিয়েছে। তার এ ধারার সুবিধাভোগকে কোনোভাবেই বেআইনি বলা যাবে না। প্রশ্ন থেকে যায় শুধু নৈতিকতা আর মানবিকতার।
আমরা যখন কাঁঠালবাড়ি ঘাট ছেড়ে আসি, তখনও ঘাটে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। কৌতূহলী আমাদের জানা হল না সেসব হতভাগ্য গাড়ি ভিআইপির অনুগ্রহ পেল কি-না। নাকি এসব গাড়ি আর তাদের দুর্ভাগা ‘সাধারণ’ যাত্রীদের সন্ধ্যা ৬টার ফেরি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
বছর দেড়েক আগে একটি টিভি টকশো দেখছিলাম। বিএনপির এক মাঝারি নেতাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনারা সংসদ সদস্য হিসেবে সব সুবিধা নিচ্ছেন অথচ সংসদে গিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন না। এতে আপনাদের খারাপ লাগে না?’ মাননীয় সংসদ সদস্য বিব্রত না হয়ে সপ্রতিভ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এসব সুবিধা পাওয়া সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের প্রিভিলেজ। অর্থাৎ আমাদের জন্য নির্ধারিত সুবিধা।’ বুঝলাম, এই মাননীয়রা জনগণের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য না বুঝলেও নিজেদের প্রিভিলেজটা ঠিকই বোঝেন। এভাবে আমরা সাধারণরা সংসদ সদস্যদের প্রিভিলেজ ও ভিআইপিদের অধিকার জোগান দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছি এবং ঘাম ঝরাচ্ছি রাজধানীর জ্যামে আটকে থেকে বা পদ্মা পাড়ে রোদে পুড়ে। আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের বসতি যেসব রাজনৈতিক দলে, সেসব দল যদি মানবিক হতে পারে, গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারে, তবেই সাধারণ মানুষের মূল্যায়ন হবে এদেশে। নয়তো বারবার অমানিশায় পথ
হারাবে গণতন্ত্র।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শুধু সংলাপই সমাধান দেবে না by মাহমুদুল বাসার

নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সংলাপ। কিন্তু রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সমঝোতা। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছেন, If we cannot agree let us agree to disagree. এটাই আসল কথা। রাজনীতিতে সমঝোতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। সমঝোতা হবে রাজনীতিতে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করার জন্য। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যেসব হঠকারিতা, অগণতান্ত্রিক আচরণ, অভব্যতা, হুমকি ও পাল্টা হুমকির গলাবাজি চলছে, তার অবসানে সব পক্ষের সমঝোতার প্রয়োজন আছে। সমঝোতামূলক মনোভঙ্গিকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজস্ব ইগোতে চড়ে সংলাপ চালালে তার ফলাফল শূন্য হতে বাধ্য। এর নজির নিকট-অতীতের ঘটনায় লুকিয়ে আছে। গত জাতীয় নির্বাচনের আগেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে, প্রধান উপদেষ্টা নিয়ে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়ে জটিলতা লেগেছিল। তখন মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে সংলাপও হয়েছিল, কোনো লাভ হয়নি। এরপরই লগি-বৈঠার আবির্ভাব ঘটেছিল। অবশ্য তারেক রহমানও কাস্তে-কোদালের আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, যা সফলতার মুখ দেখেনি। এরপর একটা উত্তেজনাকর পরিবেশে পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে তাদের পছন্দমতো একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে দেয়। এতে প্রমাণিত হয়, কেবল সংলাপই রাজনৈতিক সমাধানের জাদুর কাঠি নয়।
১৯৭১ সালে নিজস্ব মতলববাজি দৃষ্টিতে, বগলে ইট রেখে, মুখে শেখ ফরিদ বলে ভুট্টো-ইয়াহিয়াও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সংলাপে বসেছিলেন। তাতে কোনো লাভ হয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুই সমঝোতার কথা বলতেন। ৭ মার্চের ভাষণেও বলেছিলেন, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও কেউ ন্যায্য কথা বললে তা মেনে নেব। চোরে কখনও ধর্মের কাহিনী শোনে না, তাই ভুট্টো-ইয়াহিয়ার সংলাপ প্রহসনে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর মধ্যে যে সূক্ষ্ম সমঝোতার ফাঁকটুকু ছিল, তাও ছিল না ভুট্টো-ইয়াহিয়ার মধ্যে। তাই তাদের সংলাপের পরিণতি হল ৩০ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ।
অর্থমন্ত্রী এমএ মুহিত বলেছেন, নির্বাচনের বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকবে। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে অতীতের মতো অবশ্যই সংলাপ হবে। তবে তার আগে সবার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সবার আগে যদি মানসিকতা পরিবর্তন না হয়, তাহলে অতীতের মতোই সংলাপ অনুষ্ঠান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া কিংবা কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর দৃষ্টিভঙ্গি সমঝোতার দৃষ্টিভঙ্গি নয়। দুই পক্ষ যেহেতু সমান সমান, সেহেতু এক পক্ষের মনের মাধুরী মেশানো প্রস্তাব অন্য পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। হাতের পাঁচটি আঙুল সমান নয়, কেউ যদি আঙুল কেটে সমান করে সমাধান করতে চান, তাহলে তার ফল হবে উল্টো। এক পক্ষ তো আগেই ঘোষণা দিয়েছে, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে রূপরেখা আছে, সেখান থেকে একটি দাঁত খুলে নিয়ে তারা পছন্দমতো একটি দাঁত বসিয়ে দেবেন, তারপর তারা তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন করবেন। আর অন্য পক্ষ তত্ত্বাবধায়কই বর্জন করেছে। এরপর সংঘাত চরমে উঠেছে।
অতি সম্প্রতি লক্ষ্য করছি, সাম্প্রদায়িক হামলার আশংকা করেছে কোনো কোনো মহল। আমাদের অন্যতম দাতা দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, নির্বাচনের সময় আবারও ২০০১ সালের মতো বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হতে পারে। ফলে তারা ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবে না। খুব সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর মনের কোণেও এ খণ্ডমেঘ জমাট বেঁধেছে যে, কোনো তত্ত্বাবধায়কই জামায়াত ও মৌলবাদীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না, তারা তিন মাসের মধ্যেই নৌকার ভোটারদের কচুকাটা করে ফেলবে। তাই তিনি সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচনের সময় নির্বাহী ক্ষমতা হাতে রাখতে চান। এটা ওপেন সিক্রেট যে, সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে জামায়াতকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছে। একে তো তারা মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী নীতিতে বিশ্বাসী, তার ওপর সরকার এ বিচার হাতে নিয়ে তাদের সর্বোচ্চ চাপের মুখে ফেলেছে। তাই অনেকের আশংকা, তত্ত্বাবধায়কের বাতাবরণ পাওয়া মাত্র তারা শুরু করবে কিলিং মিশন। এসব সম্ভাব্য দৃশ্যপট সামনে এনেই সমঝোতা করতে হবে।
নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থেকে সংলাপ চালালে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। উভয় পক্ষ যদি সহজ কথাটা মেনে নেয়- বিড়াল সাদা হোক বা কালো হোক, ইঁদুর মারতে পারে কি-না দেখা দরকার সেটাই- তাহলে আর সমস্যা থাকে না। দরকার সুষ্ঠু বা ফেয়ার নির্বাচন। সেজন্য দরকার একটি সিস্টেম। সব পক্ষ মিলে এ সিস্টেমের কাঠামো দাঁড় করাবে, তারপর নির্বাচন হবে। এমন মনোভাব তৈরি হলে, এমন পরিবেশ সৃষ্টি হলে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হবে এবং ফেয়ার নির্বাচন হবে।
মাহমুদুল বাসার : কলাম লেখক, গবেষক

যে নির্বাচন না হবে গণতন্ত্রসম্মত, না হবে শাসনতন্ত্রসম্মত by মইনুল হোসেন

এ সত্য আমাদের নিরাশ করে যখন আমরা দেখি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু এবং আরও অনেকের নেতৃত্বে যে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে অথবা অন্যদের সঙ্গে জোট বেঁধে গণতন্ত্রের জন্য রাকনসংগ্রাম করেছে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই আওয়ামী লীগ এ দেশে বরাবর গণতন্ত্র ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় পুরোভাগে থাকছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির জরুরি তাগিদ থেকে যদি আর একবার আমরা পরীক্ষা করি তাহলে দেখতে পাব, সরকার অপ্রত্যাশিতভাবে নিজেদের নির্বাচনী সুবিধার জন্য খেয়াল-খুশিমতো শাসনতন্ত্র সংশোধন করতে গিয়ে এমন বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে যার জন্য রাজনীতিকরা মোটেও নিন্দার তোয়াক্কা করবেন না। কিন্তু আশার কথা হবে যদি অন্যরা সংকট নিরসনে কোনো রকম চিন্তা-ভাবনা উপস্থাপন করতে উজ্জীবিত বোধ করেন। সরকারি পরিকল্পনা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিসভা এবং সংসদ সদস্যরা বহাল তবিয়তে থাকবেন এবং তারাই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করবেন আর অন্যদের বলা হচ্ছে, তারা যেন শাসনতন্ত্র মেনে চলেন এবং অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেন। জনগণ প্রদত্ত শাসনতন্ত্র মানার ব্যাপারে প্রত্যেকের জন্য একটা বাধ্যবাধকতা রয়েছে- এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সংশয়ের অবকাশ নেই। কারণ এর পেছনে জনগণের নিজস্ব ইচ্ছার অনুমোদন রয়েছে। জনগণের অনুমোদনকে দেখতে হবে পবিত্র আমানত হিসেবে এবং তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে সবাইকে, বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও আইন প্রণেতাদের। আইন প্রণেতাদের স্মরণ রাখতে হবে, তাদের ক্ষমতার উৎস হচ্ছে জনগণ প্রদত্ত শাসনতন্ত্র। শাসনতন্ত্র পরিবর্তনের ব্যাপারটিকে কতজন আইন প্রণেতা সমর্থন করেন, সেই সংখ্যার নিরিখে একে যুক্তিযুক্ত বলা যাবে না। তারা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হলেও তারা কিন্তু সার্বভৌম জনগণ নন। গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র সংশোধন করতে হলেও সে ব্যাপারে জনগণের মধ্যে একটা ঐকমত্য থাকতে হয়। একজন স্বৈরশাসকের শাসনতন্ত্র তার নিজস্ব শাসনতন্ত্র, মোটেও তা জনগণের শাসনতন্ত্র নয়। এ ধরনের শাসনতন্ত্রের অধীনে জনগণকে অধীনস্থ থাকার জন্য বাধ্য করা হয়। কিন্তু সে বাধ্যতার সঙ্গে সহজাত শ্রদ্ধার কোনো সম্পর্ক থাকে না। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাকশাল প্রবর্তন করার শাসনতন্ত্রও সংসদে অনুমোদিত হয়েছিল। কিন্তু কেউ ওই শাসনতন্ত্রকে গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র বলবেন না। যে নির্বাচন নিয়ে আমরা কথা বলছি, তা যদি আদৌ অনুষ্ঠিত হয় তবুও তাকে সরকারের একটা ফন্দি হিসেবেই দেখা হবে, তাকে গণতন্ত্রসম্মত কিংবা শাসনতন্ত্রসম্মত কোনোটাই বলা যাবে না। সরকার এ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সফল হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে থেকে যাবে।
পরিকল্পনাটি ছিল ব্যাপক। ব্যক্তির ইচ্ছা-অভিপ্রায় অনুসারে কোনো গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র একতরফাভাবে পরিবর্তন করা যায় না, আর করলে তার বৈধতা থাকে না। শাসনতন্ত্রের পঞ্চদশ সংশোধনী করা হয়েছিল সব দলের সংসদীয় কমিটির সুপারিশ এবং সুশীল সমাজের সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে। এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ ছিল পরবর্তী দুটি সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত করা যাবে।
এ বিষয়ে সাহায্য করার জন্য সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃক নিয়োজিত আটজন আইনজীবীর সাতজনই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার অনুকূলে অভিমত দিয়েছিলেন। সুপ্রিমকোর্টের যে সাতজন বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক বিষয়ক মামলাটি শুনেছিলেন, তাদের মধ্যে তিনজন বিচারপতি এ সিদ্ধান্ত দেন যে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি অসাংবিধানিক নয়। মাত্র একজনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় শাসনতন্ত্রের বিধান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়াটা সমীচীন হতে পারে না। বিশেষ করে যখন সেই সিদ্ধান্ত জনগণের অবাধ ভোটাধিকারের স্বাধীনতা খর্ব করে।
উপরন্তু, এটা এমন একটি সংশোধনী যা বিশ্বের যে কোনো জায়গায় চালু থাকা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংসদ প্রথমে অবলুপ্ত না করে কোথাও সংসদীয় ব্যবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। এ কারণে সংসদীয় ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারের অধীনে সরকার বদলের নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ব্যাপারটি স্ববিরোধী। সংসদ বাতিল হওয়ার পর কোনো সরকার আর নির্বাচিত থাকে না। সংসদ টিকিয়ে রেখে সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যে কঠিন, সেটা বিলম্বে হলেও নির্বাচন কমিশন উপলদ্ধি করেছে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য এতটা অন্ধ যে, সবার কাছে গ্রহণীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সহজ পথ যে খোলা নেই সেটা তারা দেখতে পাচ্ছে না। সংসদ বাতিল করার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠবে, সুপ্রিমকোর্ট নির্দেশিত নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে কীভাবে? যতক্ষণ না আমরা এ অবাস্তব ধারণা স্বীকার করে নেব যে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের একটি নিরপেক্ষ সরকারকে আগে নির্বাচিত করতে হবে। সুতরাং জটিলতা শুধু শাসনতান্ত্রিক নয়, সুপ্রিমকোর্টের রায় নিয়েও - যা বদলাতে হবে। অন্যদিকে দেশে মারাত্মক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও বিশৃংখলা বেড়ে যাচ্ছে। দলের তরুণ কর্মীরা ভয়ংকর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে তাদের প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়ার জন্য এবং পরস্পরকে হত্যা করছে। গণতন্ত্রের বদলে আমরা হব্স বর্ণিত নিষ্ঠুরতার দিকে এগিয়ে চলেছি।
আমাদের নেতারা আপস-সমঝোতার পন্থা বের করার জন্য সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করার ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী নন। আবার চালকের আসনের ‘বিজ্ঞজনেরা’ মুক্ত আলোচনায় বসতে দেবেন না। এমনকি ছাড় দিয়ে তারা একটা নিজস্ব জাতীয় সরকার গঠন করতেও অক্ষম, যে সরকার নির্বাচন দেখভাল করতে এবং তাদের পারস্পরিক আÍধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবে।
আমাদের রাজনৈতিক চিন্তা ও মননের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনার জন্য দলীয় রাজনীতির বাইরে একটি জাতীয় সরকার গঠন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকার কিংবা কোন পথে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার হবে সেটা দেখার সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষিত সমাজ কম স্বার্থপর এবং অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হলে সবকিছুই করা সম্ভবপর ছিল। কোনো গণতন্ত্রই বাইরের সাহায্য ছাড়া বিকশিত হতে পারে না। কিন্তু সমস্যার সমাধান আসতে হয় ভেতর থেকে। আমরা যে নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি তাতে একটি ব্যর্থ সরকারের জায়গা নেবে আর একটি ব্যর্থ সরকার- এই ব্যবস্থা আর চলতে পারে না। রাজনীতিকে গণতন্ত্রের পথে চালিত করার আমাদের অধিকার আমাদেরই প্রয়োগ করতে হবে।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশকে কীভাবে ঝুলিয়ে রাখছে ভারত! by আনু মুহাম্মদ

কিশোরী ফেলানী হত্যার আগে ও পরে সীমান্তে বাংলাদেশের আরও বহু লোক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। তারা সবাই গরিব, কৃষক অথবা দিনমজুর, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে সপ্তাহে গড়ে একটি খুনের খবর থাকেই। নির্যাতন এমনকি ধর্ষণের খবরও আসে। গত ৪ বছরে নিহতের সংখ্যা ২৪১। পৃথিবীর আর কোথাও বন্ধু হিসেবে ঘোষিত দুই রাষ্ট্রের সীমান্তে তো নয়ই, শত্র“ হিসেবে পরিচিত দুই রাষ্ট্রের সীমান্তেও যুদ্ধ ছাড়া নিয়মিত এ ধরনের হত্যাকাণ্ড আর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে না। এমনকি ভারত-পাকিস্তান সীমান্তেও নয়। আমরা ভুলতে পারি না যে, বাংলাদেশকে ভারত এখন কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে। বাংলাদেশের এখন তিনদিকে কাঁটাতার, একদিকে বঙ্গোপসাগর। ভারতের বিখ্যাত গবেষণা পত্রিকা ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি-তে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এই কাঁটাতারের বেড়া দিতে দারিদ্রপীড়িত ভারত ব্যয় করেছে ৫০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৪০০০ কোটি টাকা। কারণ কী? কেন সার্বভৌম বাংলাদেশকে একটা খাঁচার মধ্যে রাখার দরকার পড়ল ভারতের? ভারতের পত্রপত্রিকায় বা সরকারি ও বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দের মুখে এরকম কথা মাঝে মধ্যেই শোনা যায়, বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা ভারতে যাচ্ছে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে।
ভারতে খুন, সন্ত্রাস, ধর্ষণের খবর আমরা নিয়মিতই পাই। বাংলাদেশের মতো সেদেশেও বহু অঞ্চলে সাধারণ নারী-পুরুষের জীবন মাফিয়া সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি। পাশাপাশি এটাও দেখি, বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের সহিংসতা আর নির্মমতার প্রাথমিক পাঠ নেয়ার অন্যতম উৎস হচ্ছে হিন্দি সিনেমা, যার অনুকরণে আবার বাংলাদেশেও সন্ত্রাস-সহিংসতা ভরা অনেক ছবি তৈরি হয়। আমরা এটাও দেখি যে, বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে তার বেশিরভাগের জোগান আসে ভারত থেকে। আমরা আরও দেখি, বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে যে নেশা দ্রব্য ভাইরাসের মতো শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে, যার বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী জাল তৈরি হচ্ছে সেই ফেনসিডিলসহ আরও নানা নেশাদ্রব্য আসে ভারত থেকেই। শোনা যায়, বাংলাদেশে জোগান দেয়ার জন্য ফেনসিডিলের বহু কারখানা তৈরি হয়েছে সীমান্ত এলাকায়।
বাংলাদেশে বেআইনিভাবে অস্ত্র, মাদকদ্রব্য পাচার করে, এদেশে সন্ত্রাস, সহিংসতা আর মাদক ব্যবসা ছড়িয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে ভারতের প্রভাবশালী মাফিয়া চক্র আর সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগী চোরাই টাকার মালিকরা। আর চোরাচালান সন্ত্রাসীর কথা বলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রতিনিয়ত খুন করছে বাংলাদেশে গরিব নাগরিকদের।
যে দেশের সন্ত্রাসীদের ভয়ে ভারত বাংলাদেশের তিনদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে, সে দেশে বহু হাজার ভারতীয় আইনি-বেআইনিভাবে কাজ করছেন। সেই সন্ত্রাসীভরা দেশের এক মাথায় প্রবেশ করে অন্য মাথা দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক, রেলপথ ও নৌপথে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চলছে। বিনিয়োগ বাড়ছে, বাজারের বিস্তার ঘটছে। প্রশ্ন হল, এ রকম একটি দেশে এগুলো কীভাবে হচ্ছে? ট্রানজিট নামের নানা ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে গোপনে। নদী ভরাট করে ভারতের ভারি যন্ত্রপাতি পণ্য পরিবহনের ঘটনাও ঘটেছে। নিজের দেশের নদীপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে অন্য দেশের পরিবহনের দৃষ্টান্ত আর কোথাও আছে বলে জানি না।
ভারতের সরকার এবং সেদেশের বৃহৎ ব্যবসায়ীরা যা যা চায়, তা দিতে এদেশের কোনো সরকার কখনোই কার্পণ্য করেনি। বাংলাদেশে ভারতের বৈধ ও অবৈধ পণ্যের বাজার বিস্তৃত হয়েছে সব সরকারের আমলে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আদমজী পাটকল বন্ধ করে পাটের ক্ষেত্রে ভারতের আপেক্ষিক শক্তি বাড়ানো হয়েছে। ওই সরকারের সময় ভারতে গ্যাস রফতানি, টাটার বিপজ্জনক বিনিয়োগ নিয়ে বহু চেষ্টা করা হয়েছে। জনগণের প্রতিরোধ না থাকলে দেশ আরও বড় সর্বনাশে পতিত হতো।
এত বছরেও অনেক ছাড় দেয়া সত্ত্বেও ভারত নদী নিয়ে কোনো সম্মানজনক সমাধানে আসেনি, ছিটমহল জটিলতা জিইয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের পণ্য বৈধভাবে ভারতে যাওয়ার ব্যাপারে শুল্ক ও অশুল্ক নানা বাধার প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করতে নানা জটিলতা অব্যাহত রেখেছে। টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের নদী-জীববৈচিত্র্যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা এখনও চলছে। ভারতের আইন অনুযায়ী যা অবৈধ, ভারতের কোম্পানি এনটিপিসি সেটাই করছে বাংলাদেশে। সুন্দরবন ধ্বংস করে এই কোম্পানির উচ্চ মুনাফার স্বার্থে বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার আয়োজন চলছে। ভারত সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বহুবার বন্ধ করার প্রতিশ্র“তি দেয়া সত্ত্বেও অবিরাম সীমান্ত হত্যা এটাই প্রমাণ করছে যে, তাদের কথার ওপর কোনোভাবেই ভরসা করা যায় না।
ভারতের ক্রমাগত প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ, সীমান্ত হত্যা, বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা নানা প্রকল্প গ্রহণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিক্ষুব্ধ জনগণ আত্মরক্ষার জন্য তাদের নির্বাচিত সরকারের দিকেই তাকান। কিন্তু সেখানে স্বাধীন দেশের জনগণের মর্যাদার প্রতিফলন ঘটানোর, তাদের ক্ষোভ, দাবি প্রকাশের জন্য কোনো শক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকার নামে যারা আছে, তারা ভারতের পক্ষে সাফাই গাইতেই ব্যস্ত থাকে। বিভিন্ন মন্ত্রী-উপদেষ্টার মুখে আমরা শুনি, ‘ফেলানী বাংলাদেশের নাগরিক নয়’, ‘টিপাইমুখ বাঁধে আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না’, ‘ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশের লাভ হবে’, ‘ভারতীয় কোম্পানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না’, ‘সীমান্তে যারা খুন হচ্ছে তারা চোরাচালানি’ ‘ভারত কথা দিয়েছে তারা আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না’। এ ধরনের কথা ভারতের নানা কর্তাব্যক্তির মুখেও শোনা যায়। ফলে কে ভারতের কে বাংলাদেশের তা আলাদা করা যায় না।
বহু অনুসন্ধান আর আদালতের দীর্ঘ শুনানিতেও প্রমাণ হয়নি, ফেলানী চোরাচালানি করতে সীমান্ত পার হচ্ছিল। বিএসএফ বা ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সে দাবিও করেনি। তাহলে ফেলানী কেন গিয়েছিল সীমান্তে? বস্তুত, সীমান্ত দিয়ে ভাগ করলেও ওই অঞ্চলে এপার-ওপারের মানুষের সামাজিক বন্ধন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বহু প্রজন্মের, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও তা ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। এখনও উৎসব-পার্বণে যাতায়াত, প্রেম-বিয়ে, লেনদেন সবই হচ্ছে। কৃষিজমি চাষবাসেও এখনও এপার-ওপারের ভাইবেরাদরের যোগাযোগ আছে। ছিটমহল সমস্যা জিইয়ে রাখায় সম্পর্কের জটিলতা আরও বাড়ছে, কিন্তু থাকছেই।
ঘটনা হল এ রকম যে, ভারতের পুঁজি প্রবাহ বাংলাদেশে বাড়ছে, ভারত থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষও আসছেন এখানে। এসব ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কমছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য, পুঁজি ও মানুষ- সব ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিধিনিষেধ বজায় থাকছে। আর সর্বোপরি থাকছে অসম্মান।
চোরাচালানি নিয়মিতই হচ্ছে। সবার জানাশোনার মধ্যেই হচ্ছে। এতে জড়িত আছে দুই দেশেরই প্রভাবশালী লোকজন, আর পারাপারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে দুই দেশেরই গরিব মানুষ। এ রকম বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা জানি যেখানে গরু ও ফেনসিডিল চোরাচালানির ঘুষের বখরা নিয়ে বিএসএফ সদস্যরা অতিরিক্ত দাবি করছে বা দরকষাকষিতে ক্ষিপ্ত হয়ে নানাজনকে হয়রানি করছে। খুনও হচ্ছে। এ রকম এক ঘটনার শিকার একজন বাংলাদেশী তরুণের ওপর চালানো বিএসএফ সদস্যদের ভয়ংকর নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ভারতের এনডিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল।
আমরা প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছি। তার সঙ্গে বাংলাদেশ হচ্ছে অপমানিত। ভারতের সরকার বাংলাদেশ নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারে। প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ, মিথ্যাচার সব করতে পারে। বাংলাদেশের সম্পদ, অবকাঠামোর সবকিছুর দিকে তারা নজর দিতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ভারতের বৃহৎ পুঁজি নানা প্রকল্প বিছাতে পারে। কিন্তু ভারতের বৈষম্যমূলক আচরণ, প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ, এমনকি হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে যথাযোগ্য প্রতিবাদের ভাষাও আমরা আমাদের সরকারের কাছ থেকে পাই না।
মুক্তিযুদ্ধ করে এদেশের মানুষ দেশ স্বাধীন করেছে, অপমান আর দাসত্বের জন্য নয়। এদেশে যে সম্পদ আছে, মানুষের যে শক্তি আছে তাতে অনেক সম্মানজনক জীবন নিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে। নানা দলের ব্যানারে লুটেরা, দখলদার, কমিশনভোগীদের দাপটে দেশ এখনও ভয়ংকর অনিশ্চতায়, অপমানে। ফেলানী কাঁটাতারে ঝুলেছিল কয়েক ঘণ্টা। এই ঝুলে থাকার চিত্র এখন স্থায়ী রূপকে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব দেখেছে বাংলাদেশকে ভারত কীভাবে ঝুলিয়ে রাখছে। ভারতের ভেতর থেকেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। সেখানেও জনগণ আমাদের মতোই নিজেদের জীবন ও সম্পদের জন্য লড়াই করছেন। বিচারের প্রহসন করে ভারত কর্তৃপক্ষ খুনিদের সাহস বাড়িয়েছে, আরও খুনের জায়গা তৈরি করেছে। আমাদের প্রতিবাদ ও ক্ষোভে সোচ্চার হতে হবে এবং তা ভারতের জনগণ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে, যাতে আমরা যৌথভাবে দুই দেশের মাফিয়াদের হাত থেকে মুক্তির পথ সন্ধান করতে পারি।
আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

বিত্ত-বৈভবে বিব্রত নরওয়ে!

ইউরোপীয় অঞ্চলের সৃমদ্ধির উপদ্বীপ হিসেবেই খ্যাত নরওয়ে! অর্থনৈতিক গতিশীলতার প্রক্রিয়ায় দেশটির রাষ্ট্রীয় অর্থের পরিমাণ বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে সবচেয়ে বেশি। দেশটির রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী কোষাগারে বর্তমানে জমা আছে ৭৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার! কিন্তু দেশটির এত বেশি পরিমাণ অর্থ রয়েছে যে, কিভাবে এর ব্যবহার করবে কর্তৃপক্ষ তাও বুঝতে পারছে না!
অবস্থা এমন যে, নিজ রাষ্ট্র সম্পর্কে নাগরিকদের মুখে রসিকতার রস গড়িয়ে পড়ছে তার খেদোক্তি হল ‘আমরা নরওয়েবাসী বিত্ত-বৈভবে বিব্রত।’ প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ও সম্পদ থাকায় স্ক্যান্ডেনেভিয়ান অঞ্চলের এ রাষ্ট্রের নাগরিকরা সত্যিই বিব্রত! এ জন্য দেশটি অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াই কীভাবে এত বেশি পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ খরচ করা যায় তার চিন্তায় বিভোর প্রশাসন! নরওয়ের সর্ববৃহৎ ব্যাংক ডিএনবির প্রধান অর্থনীতিবিদ ওয়েস্টেন ডোরাম বলেন, আমাদের প্রতিবেশী সবগুলো দেশ তাদের খরচ কমাচ্ছে।
অর্থ বেশি বলে আমরা অপচয় করতে পারি না। তিনি বলেন, আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, মানহীন প্রকল্পে ছেড়ে দিয়ে পর্যাপ্ত লাভ ছাড়া যাতে তেল সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার অপচয় না করে ফেলি। জানা যায়, ১৯৯০ সালের পর থেকেই নিশীথ সূর্যের দেশটিতে অর্থনৈতিক গতিশীলতা লক্ষ্য করা যায়। তারপর দেশটির রাজস্বে অলস অর্থ জমা হতে থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে স্টক, বন্ড ও রিয়েল স্টেটে বিনিয়োগ করা হয়! এমনকি অর্থের অপচয় ঠেকাতে বিদেশেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ করা হয়! প্রশাসকদের আশা, এতসব পদক্ষেপেও যদি অর্থনৈতিক অপচয় থামে! বিবিসি, হাফিংটন পোস্ট।

সিরিয়া হামলার বিরুদ্ধে মার্কিন ফার্স্ট লেডি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঘরেও সিরিয়া হামলার তিব্র বিরোধিতা। ওবামা পরিবার সিরিয়ায় কোনো ধরনের সামরিক হামলা চায় না। মার্কিন ফার্স্ট লেডি ও ওবামা পতœী মিশেল ওবামা যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের বিরোধিতা করে এ যুদ্ধে না জড়াতে পরামর্শ দিয়েছেন। মিশেলের এ দ্ব্যর্থহীন অবস্থানের কথা কোনো গণমাধ্যম প্রকাশ করেনি। আবার মিশেল ও ঢাকঢোল পিটিয়ে তার বিরোধিতার কথা বিশ্ববাসীকে জানাননি। জানিয়েছেন পারিবারিক অন্দরে,
গোপনে, হয়তো ওবামার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সে কথা স্বয়ং ওবামাই জানালেন। সোমবার পিবিএস ও এনবিসি নিউজের সঙ্গে কথা বলার সময় ওবামা বলেন, ‘ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা সিরিয়ায় সামরিক হামলার বিরোধী। আমার নিজের পরিবারের সদস্যরা... তারা ভীষণ উদ্বিগ্ন ও সন্দিহান।’ তিনি আরও বলেন, মিশেল চায় না দেশ আরও একটি যুদ্ধে জড়াক। এনবিসিকে ওবামা বলেন, ‘আপনি যদি মিশেলকে জিজ্ঞাসা করেন, আমরা কি আরও একটি যুদ্ধে জড়াতে চাই? উত্তর হবে ‘না’।’