Saturday, March 8, 2025

‘নিয়মভাঙা’ আফগান নারীদের গল্প

সালটা ২০১৭। কয়েকজন আফগান তরুণী যুক্তরাষ্ট্রে আসার চেষ্টা করেন। উদ্দেশ্য, রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া। কিন্তু আফগানিস্তানে নারীদের পড়াশোনা করাই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে দেশের বাইরে গিয়ে রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তো দূরের স্বপ্ন। এই গল্প নিয়ে সিনেমা ‘রুল ব্রেকার্স’ বানিয়েছেন বিল গুটেনট্যাগ। আজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটি।

রোয়া মাহবুব আফগানিস্তানের উদ্যোক্তা। দেশটির নারীদের প্রযুক্তি শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি। ২০১৩ সালে টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যেও ছিল রোয়া মাহবুবের নাম। তাঁর জীবনের গল্প থেকে সিনেমাটি বানিয়েছেন নির্মাতা বিল। রোয়া সিনেমাটির অন্যতম প্রযোজকও বটে।

‘রুল ব্রেকার্স’ খুবই অল্প বাজেটের সিনেমা। এটি পরিবেশনার দায়িত্বে আছে অ্যাঞ্জেল স্টুডিওজ। সংগত কারণেই আফগানিস্তানে সিনেমাটির শুটিং করা যায়নি, শুটিং হয়েছে হাঙ্গেরি ও মরক্কোতে।

ড্রামা ঘরানার এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন ভারতীয় অভিনেতা আলী ফজল। এ ছাড়া আছেন নিকোল বুশহেরি, আম্বার আফজালি, নিনা হোসেইন, সারা মালাল।

মুক্তির পর সিনেমাটিতে অভিনয়, গল্প বলা ও নির্মাণের প্রশংসা করেছেন সমালোচকেরা। চলচ্চিত্রবিষয়ক মার্কিন গণমাধ্যমে ভ্যারাইটিতে সিনেমাটি সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘এই সিনেমা আপনাকে স্বপ্ন দেখাবে। কতটা ভয়াবহ অবস্থা পার করে মানুষ নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে পারে; সেটাও দেখাবে।’ সমালোচকেরা মনে করছেন, সিনেমা হিসেবে যেমনই হোক ‘রুল ব্রেকার্স’ আফগান নারীদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাবে।

বিল গুটেনট্যাগ মূলত তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে খ্যাত। সানড্যান্স, কানসহ পৃথিবীর বড় বড় উৎসবে তাঁর সিনেমার প্রিমিয়ার হয়েছে। ‘ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু ডাই’ ও ‘টুইন টাওয়ার্স’ দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্রের জন্য দুবার অস্কার পেয়েছেন তিনি।
সূত্র: আইএমডিবি, ভ্যারাইটি

‘রুল ব্রেকার্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি
‘রুল ব্রেকার্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

গোপনে খামেনিকে চিঠি দিলেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য আলোচনায় বসতে ইরানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তিনি আশা করছেন, ইরান এ প্রস্তাব গ্রহণ করে আলোচনা শুরু করবে, যা উভয় দেশের জন্যই উপকারি হবে।

শুক্রবার (৭ মার্চ) ফক্স বিজনেস নেটওয়ার্কের একটি সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বিষয়টি জানান। খবর রয়টার্স।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) আমি তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছি, যেখানে আমি আশা প্রকাশ করেছি যে তারা আলোচনা করবে, কারণ এটি ইরানের জন্য ভালো হবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, আমার মনে হয়, তারা আলোচনায় বসতে চাইবে। আর তা না হলে আমাদের বিকল্প কিছু করতে হবে, কারণ আপনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবেন না।

অপরদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের বক্তব্যের পর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কারণ, ইরানে বর্তমানে সাপ্তাহিক ছুটি চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, চিঠিটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কাছে পাঠানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

ইরানকে সামলানোর দুটি উপায় রয়েছে—একটি হচ্ছে সামরিকভাবে শক্তি প্রয়োগ করা এবং অন্যটি হলো একটি চুক্তি করা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, আমি চুক্তি করার বিষয়টিকে বেশি পছন্দ করি, কারণ আমি ইরানের ক্ষতি করতে চাই না। তারা ভালো মানুষ।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহার করার পর থেকে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি একাধিক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। তিনি রাশিয়ার প্রতি আরও আপসমূলক মনোভাব গ্রহণ করেছেন, যা পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া, তিনি ইউক্রেনে রাশিয়ার তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন।

এদিকে একটি সূত্র জানায়, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। ক্রেমলিন তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা প্রশমনে শান্তিপূর্ণ সমাধানে সহায়তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ বিষয়ে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালীর সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।  ছবি : সংগৃহীত
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত



বাংলাদেশের কাছে যে সুবিধা পাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে মেঘালয় সরকার

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে নিজেদের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্য সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনার কথা জানিয়েছেন মেঘালয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য হিলি-মহেন্দ্রগঞ্জ আন্তদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী দিনাজপুরের হিলি ও মেঘালয়ের গারো পাহাড় অঞ্চলের সীমান্তবর্তী শহর মহেন্দ্রগঞ্জ—দুটোই বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত। এই দুই অঞ্চল ব্যবহার করে কলকাতার সঙ্গে সরাসরি মেঘালয়ের যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করতে পরিকল্পনা করছেন মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা।

মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা জানিয়েছেন, ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোর চালু হলে কলকাতা থেকে তুরা, বাঘমারা, দালু ও ডাউকির মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ভ্রমণ সময় ও খরচ ২৫-৬০ শতাংশ কমে আসবে।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে ভারতের জাতীয় সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন করপোরেশন (এনএইচআইডিসিএল) এই সড়কের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শেয়ার করেছে।

মুখ্যমন্ত্রী সাংমা বলেন, ‘যদি পশ্চিমবঙ্গের হিলি ও মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জের মধ্যে বাংলাদেশ হয়ে সমান্তরাল সংযোগ সম্ভব হয়, তাহলে মেঘালয়, বরাক উপত্যকা ও ত্রিপুরার সঙ্গে কলকাতার দূরত্ব অনেক কমবে এবং প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার পথ সাশ্রয় হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটি বিকল্প অর্থনৈতিক করিডোর হয়ে উঠবে। তবে এটি কখন বাস্তবায়ন হবে, তা এখনই বলা কঠিন, কারণ এতে বাংলাদেশের অনুমোদন প্রয়োজন।’

তিনি বাংলাদেশের সাবেক সরকারের বিষয়ে বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের আগে নয়াদিল্লি ঢাকার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছে এবং এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। আমরা ফের এই উদ্যোগের চেষ্টা চালাব।’

ছবি : গুগল ম্যাপ
ছবি : গুগল ম্যাপ



১২৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াত দানব কাঁকড়াবিছে

প্রায় ১২৫ মিলিয়ন বছর আগে ক্রিটেসিয়াস যুগের জীবাশ্মগুলোর  মধ্যে কাঁকড়াবিছের সন্ধান পাওয়া  যায়নি।  এবার চীন  থেকে পাওয়া গিয়েছে নতুন একটি জীবাশ্ম। সেই জীবাশ্মকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ১২৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াত দানব কাঁকড়াবিছে। সেই একই সময় ডাইনোসররাও যে নীল গ্রহে  রাজত্ব করত সেবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।চীনের  মাটি থেকে এই দানবীয় কাঁকড়াবিছের ফসিল পাওয়া গিয়েছে। চীনের সায়েন্স বুলেটিন জার্নাল পত্রিকায় এই খবর প্রকাশিত হয়েছে। মনে করা হচ্ছে পাহাড়ের গায়ে ঘুরে বেড়াত এই দানবীয় কাঁকড়াবিছে। সেখান থেকে তারা যেকোনও প্রাণীকে অতি সহজেই কব্জা করে ফেলত। দূর থেকে এরা নিজেদের বিষ ছড়িয়ে দিত সেই প্রাণীদের দেহে। ফলে সেখান থেকে শিকার করা এদের পক্ষে অতি সহজ ছিল। এই কাঁকড়াবিছেকে ভয় পেত ডাইনোসররাও। তারাও মনে করত যদি এর বিষ তাদের দেহে প্রবেশ করে তাহলে তারাও জীবন সঙ্কটে পড়ে যাবে। কালের গতিতে কাঁকড়াবিছেদের আকার ছোটো হয়েছে। তবে তাদের বিষ এতটুকু কমেনি। ডাইনো যুগে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে দিন কাটত এই দানব কাঁকড়াবিছেদের।

মেসোজোয়িক যুগের (২৫২মিলিয়ন থেকে ৬৬মিলিয়ন বছর আগে) বেশিরভাগ কাঁকড়াবিছে অ্যাম্বারে সংরক্ষিত । চীনের নানজিং ইনস্টিটিউট অফ জিওলজি অ্যান্ড প্যালিওন্টোলজির গবেষক ডাইয়িং হুয়াং বলেছেন, কাঁকড়াবিছের জীবাশ্ম পাওয়া  বিরল কারণ এই আরাকনিডগুলো  পাথর এবং  গাছের  শাখার নীচে বাস করতো। যেখানে তাদের পলল এবং জীবাশ্মের মধ্যে আটকা পড়ার সম্ভাবনা কম। বিজ্ঞানীরা উত্তর-পূর্ব চীনের প্রারম্ভিক ক্রিটেসিয়াস জীবাশ্মের কেন্দ্রস্থল ইক্সিয়ানে  জীবাশ্মটি খুঁজে পেয়েছেন। গবেষক দলটি কাঁকড়াবিছের নতুন প্রজাতির নাম দিয়েছে জেহোলিয়া লংচেঙ্গি। "জেহোলিয়া" বলতে ১৩৩ মিলিয়ন থেকে ১২০ মিলিয়ন বছর আগে প্রারম্ভিক ক্রিটেসিয়াসের উত্তর-পূর্ব চীনের ইকোসিস্টেম জেহোল বায়োটাকে বোঝায় এবং "লংচেঙ্গি" বলতে চীনের চাওয়াংয়ের লংচেং জেলাকে বোঝায়, যেখানে জীবাশ্মটি মিলেছে।

জে. লংচেঙ্গি নামের এই কাঁকড়াবিছেগুলো  প্রায় ৪ ইঞ্চি (১০সেন্টিমিটার) লম্বা ছিল । অন্যান্য মেসোজোয়িক বিছেগুলো তাদের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। চীনের  মাটি থেকে যে ফসিল মিলেছে তাতে মনে করা হচ্ছে এই দানবীয় কাঁকড়াবিছেগুলো  যেখানে খুশি যেতে পারত। তবে পৃথিবীতে যখন ডাইনো যুগের অবসান হতে শুরু করে তখন পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি এরা। ফলে মাটির নিচে বহু বছর ধরে তারা বাস করতে শুরু করে। এই দীর্ঘসময় ধরে মাটির নিচে বাস করার ফলে এদের পরবর্তী প্রজন্ম আকারে ধীরে ধীরে ছোটো হতে শুরু করে। তারই বর্তমান রূপ এখন  আমাদের নজরে আসে।  

গবেষকরা  লিখেছেন ডাইনোসর, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পোকামাকড়সহ অন্যান্য অনেক প্রাণীর জীবাশ্ম জেহোল বায়োটাতে পাওয়া গেছে, যা একটি জটিল খাদ্য জালের পরামর্শ দেয়। যেমন, বৃহত্তর স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং ডাইনোসররা জে. লংচেঙ্গি বা কাঁকড়াবিছের  শিকার হতে পারে।  এছাড়া তাদের খাদ্যে পোকামাকড়, মাকড়সা, ব্যাঙ এমনকি ছোট টিকটিকি বা স্তন্যপায়ী প্রাণীও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।  যদিও বিছেগুলোর  মুখের অংশ  জীবাশ্মে সংরক্ষিত নয়, তাই তারা কী খেয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। হুয়াং চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়াকে বলেছেন- এই কাঁকড়াবিছে গুলোকে  আজকের পরিবেশে রাখা হলে, তারা সহজেই শিকারী হয়ে উঠতে পারতো।  এমনকি ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণীদেরও অনায়াসে  শিকার করতে পারতো। ' বিশালাকার কাঁকড়াবিছের জীবাশ্মটি চীনের চাওয়াংয়ের ফসিল ভ্যালি মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

সূত্র : লাইভ সায়েন্স

mzamin


আমেরিকার মোড়লগিরির ট্রাম্প আরও খোলামেলা করে দিলেন by জোনাথন কুক

ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটা দিকের জন্য আমরা তাঁকে ধন্যবাদ দিতে পারি। তিনি একেবারে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে আমেরিকা কখনোই ‘নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’ টিকিয়ে রাখার উপযুক্ত পুলিশ ছিল না।

আমেরিকাকে বরং এক গ্যাংস্টার সাম্রাজ্যের প্রধান বলাই ভালো। সারা বিশ্বে তাদের আট শতাধিক সামরিক ঘাঁটি আছে। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে তারা ‘বিশ্বের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ চায়।

আপনি যদি আমেরিকাকে মেনে চলেন, তাহলে ঠিক আছে। আর যদি তা না করেন, তাহলে আপনাকে সরিয়ে দেওয়া হবে। গত শুক্রবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁকে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে হোয়াইট হাউসে। সাংবাদিকদের সামনেই।

অনেকে ভাবছেন, এটা তো খুব খারাপ হলো। কিন্তু এর চেয়েও খারাপ তো হয়ে গেছে আগেই। আর তা হলো ইউক্রেন ও রাশিয়ার লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু। এই যুদ্ধ একদমই দরকার ছিল না। আমেরিকাই এই যুদ্ধ তৈরি করেছে গত বিশ বছর ধরে ন্যাটোর মাধ্যমে। এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—বিশ্বকে দেখানো, আমেরিকাই বস। ঠিক যেমন তারা ইরাকে করেছিল।

হেনরি কিসিঞ্জার একবার বলেছিলেন, আমেরিকার শত্রু হওয়া বিপজ্জনক, কিন্তু আমেরিকার বন্ধু হওয়া আরও ভয়ংকর।

জেলেনস্কি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। গ্যাংস্টারদের সাম্রাজ্য এমনই হয়। আপনাকে তারা কাজ করাবে। এরপর যখন দরকার ফুরাবে, ছুড়ে ফেলে দেবে। ঠিক যেমন হলিউড সিনেমায় দেখা যায়।

জো বাইডেনের আমলে জেলেনস্কিকে আমেরিকা কাজে লাগিয়েছে। রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে আমেরিকার একটা কাজের লোক দরকার ছিল। এখন তার পরিণতি কী হলো, সবাই দেখছে।

ন্যাটো বারবার ইউক্রেনকে নিজেদের আওতায় নেওয়ার চেষ্টা করেছে। রাশিয়া বারবার সতর্ক করেছে যে এটি তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হতে পারে। রাশিয়া কখনোই চাইবে না আমেরিকা তার সীমান্তে ক্ষেপণাস্ত্র বসাক। ঠিক যেমন ১৯৬০-এর দশকে কিউবার সীমান্তে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র বসানোকে আমেরিকা একেবারে বরদাশত করেনি।

এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের জনগণ নিজেদের শান্তির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করেছিল ভলোদিমির জেলেনস্কিকে। তাঁর মূল প্রতিশ্রুতি ছিল দেশে গৃহযুদ্ধ বন্ধ করা। এই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। পশ্চিম ইউক্রেনের রাশিয়াবিরোধী ‘জাতীয়তাবাদী’ গোষ্ঠী এবং পূর্ব ইউক্রেনের রুশভাষী জনগণের মধ্যে বিরোধের মধ্য দিয়ে এর সৃষ্টি। কিন্তু শিগগিরই জেলেনস্কি তাঁর সেই শান্তির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ‘একজন স্বৈরশাসক’ বলেছিলেন। এ অভিযোগ কিছুটা সত্য হতেও পারে। কারণ, আমেরিকা চেয়েছিল, জেলেনস্কি সেই ধরনের নেতা হোক যে তাদের প্রয়োজনে কাজ করবে। যদিও অনেক ইউক্রেনীয় চেয়েছিল অন্য কিছু।

এখন বাইডেন চলে গেছেন। নতুন প্রশাসন এসেছে। নতুন মাফিয়া ‘ডন’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে জেলেনস্কি দিয়ে কাজ হচ্ছে না। কিন্তু এর পেছনে খরচ হচ্ছে অনেক বেশি। ওদিকে রাশিয়া কোনোভাবে দুর্বল হয়নি। বরং শক্তিশালী হয়েছে। এখন নতুন কৌশল দরকার।

জেলেনস্কি মনে করছিলেন যে তিনি আমেরিকার প্রিয় ‘গুন্ডা’। আর তখনই তিনি হোয়াইট হাউসে গিয়ে এক কঠিন পাঠ শিখলেন—মাফিয়া শিষ্টাচারের শিক্ষা। জানলেন যে তিনি ঠিকমতো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন না।

ট্রাম্প এখন ইউক্রেনে শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন। শান্তি আসুক আর না সুক, আসল কথা হলো এই চুক্তির পেছনে আছে মূলত অর্থনৈতিক লাভের হিসাব। ট্রাম্পের মতে, রাশিয়া এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। অবশ্য পশ্চিম বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চাইলে অন্য কথা। বাস্তবে, এই যুদ্ধের পেছনে যে শক্তি কাজ করছে, তা হলো টাকা।

এখন ট্রাম্পের চাপে একটা শান্তিচুক্তি হয়তো হবে। সেই চুক্তির ভিত্তি হবে ইউক্রেনের সম্পদ—বিরল খনিজ, কৃষিজমি এবং অন্যান্য খাত। আর এই সবই ব্যবহৃত হবে একটি শক্তিশালী দেশের প্রভাব প্রতিষ্ঠার জন্য। জেলেনস্কি এখন এটা বুঝতে পেরেছেন। বুঝতে পেরেছেন যে তিনি এবং ইউক্রেনের জনগণ এক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। মাফিয়া সংগঠনের সঙ্গে হাত মেলালে এ রকমই হয়।

ট্রাম্পের পূর্বসূরিরা যেখানে ইউক্রেন এবং গাজা সমস্যা সমাধানকে বিশ্বশান্তি বা এরকম সব গালভরা নামে ডাকত। ট্রাম্প সেখানে সরাসরি বলেছিলেন যে এই অঞ্চলগুলো শুধু আমেরিকার ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তিনি কোনো রকম আড়াল না রেখেই পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে ইউক্রেন এবং গাজা তার দেশের বৈশ্বিক স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ।

হোয়াইট হাউসে জেলেনস্কির সঙ্গে কথোপকথনে ট্রাম্প একথা আবার বলেছেন, ‘আমরা ইউক্রেনের খনিজ সম্পদ ব্যবহার করব। এসব ব্যবহৃত হবে আমাদের বিভিন্ন কাজে, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অস্ত্র ব্যবস্থাপনা ও সামরিক ক্ষেত্রে। এগুলো আমাদের দরকার।’

এই বক্তব্যে ট্রাম্পের লক্ষ্য পরিষ্কার—যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ শেষ করা এবং রাশিয়ার প্রবৃদ্ধি ঠেকানো। রাশিয়া ইউক্রেনের যত বেশি অঞ্চল দখল করবে, আমেরিকার ভাগে তত কম জায়গা থাকবে খনিজ সম্পদ লুট করার জন্য। এ জন্যই ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে এমন মরিয়া।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ন্যাটোর এই যুদ্ধ একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে খনিজ সম্পদ নিয়ে লড়াইয়ের গভীর কৌশলের অংশ। গত বছর মার্কিন কংগ্রেসের একটি কমিটিতে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য ‘সামরিক খনিজের প্রাধান্য’ নিয়ে আলোচনা করেছিল। আমেরিকার মূল লক্ষ্য ছিল চীনের প্রভাব রুখে দেওয়া এবং ইউক্রেনের মাধ্যমে রাশিয়াকে আরও একবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা।

এখানে ট্রাম্পের লক্ষ্য হচ্ছে ইউক্রেনের ভূখণ্ড কাজে লাগিয়ে পশ্চিমে একটি নতুন নিরাপত্তা–কাঠামো তৈরি করা। তা করে রাশিয়াকে আমেরিকার পক্ষে আনা যাবে। আবার চীনের একচেটিয়া প্রভাবকেও চাপের মধ্যে ফেলা যাবে। রাশিয়া ও চীন একত্র হয়ে নতুন এক শক্তিশালী জোট তৈরি করেছে। এই জোটের নাম ব্রিকস। এতে আছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

ব্রিকস আমেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্যের বিপরীতে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়তে চাচ্ছে। ইউক্রেনে শান্তিচুক্তি হলে আমেরিকা রাশিয়াকে নিজের পক্ষে এনে নতুন এক নিরাপত্তা–কাঠামো তৈরি করবে, যা চীনের একক প্রভাবকে আরও দুর্বল করে দেবে।

ট্রাম্পের আচরণ অশালীন হতে পারে। কিন্তু তিনি যে সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন, তা আগেও দুনিয়াজুড়ে ক্ষমতার লড়াই চালিয়েছে। ট্রাম্পও সেই কাজ করছেন। তবে আরও খোলামেলাভাবে।

* জোনাথন কুক লেখক, সাংবাদিক

মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া ইংরেজির সংক্ষেপিত অনুবাদ

জেলনস্কি ও ট্রাম্প ওভাল অফিসে
জেলনস্কি ও ট্রাম্প ওভাল অফিসে। ছবি: এএফপি


নির্বাচনের আগে ‘জুলাই সনদ’ কার্যকর দেখতে চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি

রাষ্ট্র সংস্কারের ‘জুলাই সনদ’ আগামী নির্বাচনের আগেই কার্যকর দেখতে চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ‘জুলাই ঘোষণাপত্রের’ যে কথা উঠেছিল, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেটিরও বাস্তবায়ন দেখতে চায় তারা। এই দুই দাবির বিষয়টি উল্লেখ করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘বিচার, সংস্কার, পরিবর্তনের কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার)—এগুলোর মধ্য দিয়ে যাতে আমরা নির্বাচনের দিকে যাই।’

আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে এনসিপি। এর আগে এই কার্যালয়ে এনসিপির প্রথম সাধারণ সভা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধান চলতি বছরের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছেন। এনসিপি এ বিষয়ে কেন স্পষ্ট বক্তব্য দিচ্ছে না? এর উত্তরে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের সময়ের চেয়েও তাঁরা প্রেক্ষাপটের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ‘জুলাই সনদের’ কথা প্রধান উপদেষ্টা নিজে বলেছেন। সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটা সনদ তৈরি হবে। যেখানে বাংলাদেশের রূপরেখা কেমন হবে, কী কী সংস্কার এই সময়ে করা হবে, কী কী সংস্কার ভবিষ্যতে করা হবে, কী কী সংস্কারের ধারাবাহিকতা থাকবে—রাজনৈতিক দলগুলোকে সেই কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার) জনগণের কাছে দিতে হবে। সেটাকে জুলাই সনদ বলা হচ্ছে।

পরিবর্তন ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা থেকে মানুষ গণ-অভ্যুত্থানে এসেছিল উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই বিষয়গুলো তো মানুষকে দিতে হবে, পূরণ করতে হবে। তার আগে আমরা কীভাবে নির্বাচনের দিকে যাব? সেই কথাটাই আমরা বলছি। এটা যাতে আমরা ভুলে না যাই। বিচার, সংস্কার, পরিবর্তনের কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার)—এগুলোর মধ্য দিয়ে যাতে আমরা নির্বাচনের দিকে যাই।’

গণপরিষদ নির্বাচন ও সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, গণপরিষদ নির্বাচন মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ঐকমত্যের ওপর নির্ভর করবে। যদি সেই ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যেই গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে করা সম্ভব। তবে নির্বাচনে যাওয়ার আগে দৃশ্যমান বিচার কার্যক্রম ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন দেখতে চান তাঁরা।

‘ক্রাউড ফান্ডিং’

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সে নাহিদ ইসলামের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সেখানে নাহিদের বরাত দিয়ে লেখা হয়, বাংলাদেশজুড়ে অনেক ‘সম্পদশালী’ (অ্যাফ্লুয়েন্ট) ব্যক্তি এনসিপিকে অর্থ দিয়ে সহায়তা করছেন। নাহিদ ইসলামকে উদ্ধৃত করে ওই সাক্ষাৎকারে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার এখনো পুরোপুরি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি এবং এ বছর জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হবে।

এ বিষয়ে আজকের সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে কিছু মিসকোট (ভুলভাবে উদ্ধৃত) করা হয়েছে বা ভুল অনুবাদ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দলের আর্থিক বিষয়ে আমি বলেছিলাম, সমাজের সচ্ছল মানুষ, আমাদের সচ্ছল সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষী যাঁরা আছেন, তাঁরা মূলত আমাদের সহযোগিতা করেন। আমরা অনলাইন ও অফলাইনে একটা ক্রাউড ফান্ডিংয়ের (গণচাঁদা সংগ্রহ) দিকে যাচ্ছি, যে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে আমরা দলের কার্যালয় স্থাপনসহ নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ করব। আমার এ কথার একটা ভুল অনুবাদ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। এটা সংশোধনের জন্য আমাদের অনুরোধ থাকবে।’

নাহিদ বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, এখন দেশে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ যে রকম নাজুক অবস্থায় আছে, এ রকম অবস্থায় নির্বাচন করাটা অনেক বেশি কঠিন হবে এবং এই পুলিশ-প্রশাসনের একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করার সক্ষমতার পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে হয়নি। সেই জায়গা থেকে আমি বলেছি, আমাদের অবশ্যই নির্বাচনের আগে দেশের পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা অবশ্যই উন্নত করতে হবে। সেটার জন্য সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সামাজিক শক্তিকেও এগিয়ে এসে সহযোগিতা করতে হবে। নির্বাচনের জন্য এনসিপির মানসিকতা ও প্রস্তুতি রয়েছে।’

কেবল নির্বাচনই এই মুহূর্তে এনসিপির একমাত্র দাবি নয় উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, জাতীয় সংসদের পাশাপাশি গণপরিষদ নির্বাচন দেখতে চান তাঁরা। কিন্তু এর আগে দৃশ্যমান বিচার কার্যক্রম দেখতে চান।

সমন্বয়ক পরিচয় এখন আর কার্যকর নয়

এনসিপির অর্থায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, আর্থিকভাবে যাঁরা সহযোগিতা করছেন, নাম প্রকাশ করা হলে তাঁরা কোনো ধরনের ক্ষতির শিকার হবেন না, সেই নিশ্চয়তা সরকার থেকে দিতে হবে। সেই সংস্কৃতিটা বাংলাদেশে এখনো তৈরি করা যায়নি। তিনি বলেন, ‘যেসব অলিগার্ক (ক্ষমতাধর গোষ্ঠী) ছিল বাংলাদেশে, যে দুর্নীতিবাজ, লুটেরা ব্যবসায়ী শ্রেণি ছিল, আমরা কখনোই তাদের সমর্থন করি না, করব না। মূলত যারা দেশপ্রেমিক, যারা দেশকে নতুনভাবে গড়তে চায়, ছাত্রদের এই নতুন উদ্যোগকে সমর্থন করছেন, যে সৎ মানুষরা রয়েছেন সমাজে, তাঁদের থেকে আমরা সহযোগিতা চাইছি। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমরা সহযোগিতা চাইছি। রিকশাচালক থেকে শুরু করে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে আমরা আর্থিক সহায়তার জন্য যাব।’

এনসিপি একটি ‘ফিনান্সিয়াল পলিসি টিম’ (আর্থিক নীতি যারা দেখবে) গঠন করেছে বলেও জানান নাহিদ। এ সময় তিনি আরও বলেন, শিগগিরই তাঁরা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করবেন। এনসিপি তারুণ্যনির্ভর দল হলেও উপদেষ্টা পরিষদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার জ্যেষ্ঠ নাগরিকেরা যুক্ত হবেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়টি এখন আর সেই অর্থে কার্যকর নয় উল্লেখ করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অনুরোধ থাকবে, এই পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অপকর্ম করে, তারা যাতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়।

নারী নিপীড়নের নিন্দা

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম। জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি নিপীড়নকারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং এনসিপির নারী সদস্যদের চিহ্নিত করে সাইবার জগতে নানা ধরনের অপপ্রচার ও বুলিং চলছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে নানাভাবে যারা যুক্ত, তারা এসব কার্যক্রমে অনেক বেশি যুক্ত হচ্ছেন। নারীরা যাতে রাজনীতিতে ও দেশ গঠনের কাজে যুক্ত হতে না পারেন, সে জন্য তাঁদের টার্গেট করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সরকারের জায়গা থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বিচারের বিষয়ে সরকারকে চাপ দেওয়া

শেখ হাসিনার বিচার ছাড়া কেউ নির্বাচনের কথা মুখে আনবেন না—এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের সাম্প্রতিক এই মন্তব্য দলেরও অবস্থান কি না, এমন প্রশ্ন করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। এর জবাবে সারজিস বলেন, তিনি মূলত বিচারের বিষয়ে সামগ্রিকভাবে সরকারকে চাপ দেওয়া এবং এটার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে কথাটি বলেছিলেন। তাঁর ওই বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার যে সম্পর্ক দেখানো হচ্ছে, এটি কখনো সেভাবে সম্পর্কিত নয়।

আত্মপ্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যে এনসিপি থেকে তিনজন নেতার পদত্যাগ নিয়েও প্রশ্ন করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। এ প্রশ্নের উত্তরে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, গণ–অধিকার পরিষদ থেকে এনসিপিতে যোগ দেওয়া তিনজন পদত্যাগ করে আগের দলে ফিরে গেছেন। রাজনৈতিক অসততা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি না করতে সবার প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারওয়ার নিভা, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এই সংবাদ সম্মেলনের আগে এনসিপির প্রথম সাধারণ সভায় দলের কিছু কর্মসূচি ঠিক করা হয়। পরে বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ মার্চ ইফতার মাহফিল করা হবে। আর ১১ মার্চ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য এনসিপির পক্ষ থেকে ইফতারের আয়োজন করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে রূপায়ণ টাওয়ারে
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে রূপায়ণ টাওয়ারে ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

জয়সোয়ালের ব্রিফিং: এখন বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সব বিষয়ের নিষ্পত্তি চায় ভারত

ভারত বাংলাদেশ সরকারকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল, তারা চায় সে দেশের সরকার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত সাজা দিক। অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সব বিষয়ের নিষ্পত্তি করুক।

আজ শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পত্তি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষার দায়িত্ব সে দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের। সেই দায়িত্ব তারা পালন করুক।

এই প্রথম ভারতের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর ‘নির্যাতনের’ একটি খতিয়ানও দেওয়া হয়। মুখপাত্র সেই খতিয়ান দিয়ে বলেন, গত বছর ৫ আগস্ট থেকে এই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৩৭৪টি ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে সে দেশের পুলিশ ১ হাজার ২৫৪টি ঘটনা যাচাই করেছে। এসব ঘটনার ৯৮ শতাংশ ‘রাজনৈতিক’। তিনি বলেন, ভারত চায়, প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে অপরাধীদের সাজা দেওয়া হোক।

সম্প্রতি ওমানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর দেশে ফিরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এক মন্তব্যে বলেছিলেন, সংখ্যালঘুদের রক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কারণ নেই। সেই প্রশ্নের উত্তরেই জয়সোয়াল ‘নির্যাতনের’ খতিয়ান তুলে ধরে এই মন্তব্য করেন।

জয়সোয়াল দাবি করেন, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। গুরুতর অপরাধে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী এবং উগ্রপন্থীদের ছেড়ে দেওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

বাংলাদেশের আন্দোলনকারী ছাত্রসমাজ সম্প্রতি রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। সে বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে দল গঠন নিয়ে জয়সোয়াল কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, ভারত সব সময় স্থিতিশীল, প্রগতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের সমর্থক। ভারত চায়, তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সব বিষয়ের নিষ্পত্তি করুক।

শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশকে দেওয়া ভারতের ঋণ ও সেই ঋণভিত্তিক প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য সম্প্রতি সে দেশের একটি প্রতিনিধিদল ভারতে এসেছিল বলেও মুখপাত্র জানান। এক প্রশ্নের উত্তরে সেই আলোচনার উল্লেখ করে জয়সোয়াল বলেন, উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে সম্প্রতি দিল্লিতে দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে।

জয়সোয়াল বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সংক্রান্ত উদ্ভূত পরিস্থিতি, নিরাপত্তাহীনতা ও বহুদিন ধরে চলা স্থানীয় বিষয়ের কারণে প্রকল্পগুলোর গতি ব্যাহত হয়েছে।

মুখপাত্র বলেন, এসব উন্নয়ন কর্মসূচি ভারতের অগ্রাধিকার। কিন্তু নানা কারণে অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ায় দুই দেশ ঠিক করেছে, প্রকল্পগুলো যুক্তিযুক্ত করে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। তবে সেই সঙ্গে তিনি বলেন, এটা নির্ভর করবে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিশ্রুত সমর্থন ও প্রকল্প রূপায়ণে প্রয়োজনীয় অনুমতি দেওয়ার ওপর।

উল্লেখ্য, ভারত আগে এত জোরালোভাবে বাংলাদেশে অন্তর্ভূক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলেনি। সাংবিধানিক বৈধতার কথা বলে ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট ও ২০২৪ সালে ‘ডামি’ প্রার্থীর নির্বাচনে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছিল ভারত। এই নির্বাচনগুলোর পর ক্ষমতায় যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি সমর্থন ছিল নয়াদিল্লির। 

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল ফাইল ছবি: এএনআই

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি: যুদ্ধের হুমকি উত্তেজনা তুঙ্গে

সম্প্রতি কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনের ভাষণে চীনকে লক্ষ্য করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এতে তীব্র ক্ষোভ জানায় চীন। কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে  বেইজিং। বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো যুদ্ধ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে তারা। ওই হুমকির একদিন পরই কড়া প্রতিক্রিয়া  দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, তারাও যেকোনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি হুমকি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর সেই উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে।

ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগেই চীনের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন। তার অভিযোগ কানাডা ও মেক্সিকোর সীমান্ত ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ফেন্টানিলের মতো ভয়াবহ মাদক পাচার করছে চীন। যদিও এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে বেইজিং। জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম গত বুধবার কংগ্রেসের অধিবেশনে ভাষণ দেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি অন্যান্য দেশের সঙ্গে চীনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা আমাদের ওপর যে পরিমাণ শুল্ক বসাবে আমরাও তাদের ওপর সে পরিমাণ শুল্ক  দেবো। তার এই বিস্ফোরক মন্তব্য ভালোভাবে নেয়নি চীন। কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে কড়া জবাব দিয়েছে দেশটি। জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত রয়েছে তারা। তা যেই যুদ্ধই হোক। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট দিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানো হয়। ওই পোস্টে বলা হয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধ চায়, তা শুল্ক যুদ্ধ বা বাণিজ্য যুদ্ধ হোক অথবা অন্য যেকোনো যুদ্ধ! তাহলে আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত।  বেইজিংয়ের এই হুঁশিয়ারির পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আমরাও তৈরি। যারা শান্তি চায়, তাদের যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হয়। যেকোনো রকমের সংঘাত এড়াতে সামরিক শক্তির প্রস্তুত থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। পিট বলেন, এজন্যই আমরা নিজেদের সামরিক শক্তিকে নতুন করে সাজাচ্ছি। বিশ্লেষকরা বলছেন পাল্টাপাল্টি এই হুমকি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। যার প্রভাব গোটা বিশ্বে পড়তে পারে বলে তাদের ধারণা।

এদিকে শুক্রবার পার্লামেন্টে বক্তৃতার সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের কড়া সমালোচনা করেছেন। ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের ওপর অব্যাহতভাবে চাপ দিতে থাকলে এর দৃঢ় প্রতিশোধ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এ খবর দিয়ে ভয়েস অফ আমেরিকা বলছে, শুক্রবার পার্লামেন্টে বাৎসরিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভাষণ দেয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিকে লক্ষ্য করে ওই কড়া হুঁশিয়ারি দেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের শুল্ক আরোপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ওয়াং ই। ওয়াশিংটনকে সবরকম দ্বন্দ্ব সংঘাত এড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভাবা উচিত- তারা এত বছর ধরে যে সকল বাণিজ্য যুদ্ধ এবং শুল্ক যুদ্ধ শুরু করেছে, তা থেকে তারা কী পেয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই চীনা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। ক্ষমতায় আসার পর সেটাকে দ্বিগুণ করে ২০ শতাংশ করেছেন ট্রাম্প। এতে তীব্র ক্ষোভ দেখিয়েছে বেইজিং। তারাও পাল্টা শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বলেছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নীতিতে অটল থাকলে তাদের কৃষিজাত পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে বেইজিং।

ট্রাম্প চীনের পাশাপাশি কানাডা, মেক্সিকো, ভারতের ওপর শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। উক্ত দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারাও পাল্টা শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। এক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে, চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। উভয় দেশের পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ফলে বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে চীনা উৎপাদিত প্রযুক্তি- যেমন স্মার্টফোন, কম্পিউটার এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং বেইজিংয়ের বাণিজ্যিক অপ্রচলিত কার্যক্রমগুলোর বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগ করা। তবে চীনকে ঠেকাতে ট্রাম্পের এই নীতি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।  বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ভূমিকার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষত, এ ধরনের সংঘর্ষ পরিণামে নতুন অর্থনৈতিক ব্লক তৈরির দিকে পরিচালিত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিধারা বদলে দিতে পারে।

mzamin

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি আট পরিবারের ৩৬০০ কোটি টাকা by জুলকারনাইন সায়ের ও শরিফ রুবেল

বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনাম রয়েছে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। এদের মধ্যে ক্রেডিট সুইস ব্যাংক অন্যতম। ২০২২ সালে ফাঁস হওয়া সুইস সিক্রেটসে বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে বেশ কিছু বাংলাদেশির সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। সুইস সিক্রেটস নামে বহুল পরিচিত অনুসন্ধানী  প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত ওসিসিআরপি (অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট বা সংঘবদ্ধ অপরাধ ও দুর্নীতি প্রতিবেদন প্রকল্প) হতে প্রাপ্ত তথ্যে বাংলাদেশ অংশের নথি পর্যালোচনা করে ব্যাংকটিতে বাংলাদেশের ৮ পরিবারের প্রায় ৩৬০০ কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যাংকটিতে এসব পরিবারের অন্তত ৬৮টি একাউন্ট রয়েছে। এই ব্যাংক হিসাবগুলোতে ২৬১.৯ মিলিয়ন ডলার (২৬.১৯ কোটি) সুইস ফ্রাঁ বিভিন্ন সময়ে গচ্ছিত ছিল। পাশাপাশি ব্যাংক হিসাবগুলো থেকে মাঝেমধ্যে টাকা উত্তোলন ও জমাদানের তথ্যও পাওয়া গেছে। অধিকাংশ হিসাবই ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে খোলা হয়। কিছু হিসাব বন্ধও করে দেয়া হয়। এই বিপুল পরিমাণ টাকা জমা রাখা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে সামদানি পরিবারের নাম। এই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রাজীব সামদানি, তার স্ত্রী নাদিয়া সামদানি, ছোট ভাই মেহেদী সামদানি ও তার কোম্পানি গোল্ডেন হারভেস্ট পরিচালক মহিয়াস সামাদ চৌধুরী সুইস ব্যাংকে হাজার কোটির বেশি গচ্ছিত রেখেছেন।

অপরদিকে বিপুল পরিমাণ টাকা জমা রেখেছেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই, তার বোন নূরজাহান হুদা, জামাতা হুদা এল ইদ্রোস। এছাড়া আলোচিত-সমালোচিত মিরালী গ্রুপের সদস্যেদেরও সুইস ব্যাংকে অঢেল টাকা জমা রয়েছে। এরমধ্যে মুবারক আলী, সকিনা নাসরুল্লাহ মিরালী, সামাদ নাসরুল্লাহ মিরালী নামে এই অর্থ গচ্ছিত রয়েছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে হিসামুদ্দিন সালেহ, ফাতেমা সালেহ, আমিন সালেহ, রহিমা ফুড কর্পোরেশনের আব্দুর রউফ চৌধুরী, রবি রউফ চৌধুরী, রাফিয়া চৌধুরী, মাসুক হক, আফরোজা হক, সিলেটের সাবেক এক এমপি’র পরিবার, আরবান রেসিডেনসিয়াল চেয়ারম্যান খন্দকার ফিরোজ কাইয়ূম, ক্লিপ অ্যান্ড ফিক্স লিমিটেডের পরিচালক হীরা রাজ্জাক, প্রয়াত একজন অর্থনীতিবিদ, ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসায়ী মনসুর ইয়াজদানির ব্যাংক হিসাবেও। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুইস ব্যাংকে টাকা জমা রাখা বাংলাদেশিদের সকলের জমার পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছেন রাজীব সামদানি পরিবার। এই রাজীব সামদানি গোল্ডেন হার্ভেস্ট গ্রুপের কর্ণধার। আরও বড় পরিচয়- তিনি বিশ্বখ্যাত মূল্যবান শিল্পকর্ম সরবরাহকারী। গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতা, এমপি, মন্ত্রীদের বাসায় সোভা পাওয়া কোটি কোটি টাকার দুর্লভ শিল্পকর্ম এই রাজীবের সরবরাহ করা। প্রতি বছর ঢাকা আর্ট সামিটের নামে দেশি-বিদেশি শতকোটি টাকার শিল্পকর্ম প্রদর্শন করেন সামদানি আর্ট ফাউন্ডেশন। এই মেলার আয়োজকও তিনি।

তার সংগ্রহে রয়েছে দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান থেকে শুরু করে কোরীয় ভাস্কর হেগুয়ে ইয়াংয়ের শিল্পকর্মও। ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে শেখ রেহানার গাজীপুরের বাড়ি ও গুলশানে একজন উপদেষ্টার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। তখন সেখান থেকে মূল্যবান শিল্পকর্ম লুট হয়। এসব শিল্পকর্ম রাজীব সামদানির সরবরাহ করা ছিল। এছাড়া পতিত শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবন, শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতেও রাজীবের সরবরাহ করা প্রায় হাজার কোটি টাকার শিল্পকর্ম ছিল। যা লুট হয়ে যায়। তিনি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জানা গেছে, রাজীবের প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ২১৫ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুইস ব্যাংকে সামদানি পরিবারের মোট ১১টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এসব ব্যাংক হিসাবে ৫ কোটি ৬১ লাখ ৪২ হাজার ৭৭১ সুইস ফ্রাঁ গচ্ছিত আছে। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ৭৫৭ কোটি ৯২ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫ টাকা। এর মধ্যে রাজীব সামদানির ব্যাংক হিসাবে রয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ, ৯৩ হাজার ৫৯ সুইস ফ্রাঁ, স্ত্রী নাদিয়া সামদানির ব্যাংক হিসাবে আছে ১ কোটি ১১ লাখ ৯৩ হাজার ৫৯ সুইস ফ্রাঁ, গোল্ডেন হারভেস্টের পরিচালক মহিয়াস সামাদের ব্যাংক হিসাবে আছে ২ কোটি ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ১১৮ সুইস ফ্রাঁ, ছোট ভাই মেহেদী সামদানির ব্যাংক হিসাবে আছে ১ কোটি ১১ লাখ ৯৩ হাজার ৫৯ সুইস ফ্রাঁ। আলোচিত সুইস ব্যাংকে টাকা জমা রাখায় পিছিয়ে নেই আজিজ মোহাম্মদ ভাইর পরিবার।

ব্যাংকটিতে এই পরিবারের ১২টি হিসাব রয়েছে। এসব ব্যাংক হিসাবে ৫ কোটি ৩৩ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪১ সুইস মুদ্রা জমা আছে। যা বাংলাদেশি টাকায় ৭২০ কোটি ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৩৫ টাকা। এরমধ্যে আজিজ মোহাম্মদ ভাইর ব্যাংক হিসাবে ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ৭২৯ সুইস ফ্রাঁ। তার ছোট বোন নূরজাহান হুদার ব্যাংক হিসাবে আছে ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ সুইস ফ্রাঁ। বোন জামাই হুদা এল ইদ্রোসের ব্যাংক হিসাবে আছে ৯১ লাখ ১৯ হাজার ৪০ সুইস ফ্রাঁ। এছাড়া বিদেশি কোম্পানিতে গোপন বিনিয়োগকারীদের তথ্য প্রকাশ করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসা প্যানডোরা পেপার্সের চূড়ান্ত তালিকায় নাম এসেছিল বাংলাদেশি মিরালী পরিবারের। সুইস ব্যাংকে আলোচিত এই পরিবারের ৯টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এসব ব্যাংক হিসাবে ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৩৪ হাজার ৬০ সুইস মুদ্রা রয়েছে। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৯১ কোটি ৭৫ লাখ ৯৮ হাজার ১০০ টাকা। এর মধ্যে মোবারক আলীর ব্যাংক হিসাবে আছে ১ কোটি ১০ হাজার ৩৫০ সুইস ফ্রাঁ, স্ত্রী সকিনা নাসরুল্লাহ মিরালীর ব্যাংক হিসাবে আছে ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ সুইস ফ্রাঁ, ছেলে সামাদ নাসরুল্লাহ মিরালীর ব্যাংক হিসাবে আছে ৮২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮ সুইস ফ্রাঁ। বেঙ্গল গ্লাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসামুদ্দিন সালেহ পরিবারের সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ টাকা জমা রয়েছে। ব্যাংকটিতে এই পরিবারের অন্তত ১৮টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে।

এসব ব্যাংক হিসাবে ৫ কোটি ৩৮ লাখ ৮২৯ সুইস ফ্রাঁ গচ্ছিত আছে। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৮০ কোটি ১৪ লাখ ১১ হাজার ৯১৫ টাকা। এরমধ্যে হিসামুদ্দিন সালেহর ৯টি ব্যাংক হিসাবে আছে ২ কোটি ৩১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮১ সুইস ফ্রাঁ, স্ত্রী ফাতেমা সালেহর ৬টি ব্যাংক হিসাবে আছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ২৩ হাজার ৪৬৯ সুইস ফ্রাঁ, ছেলে আমান সালেহর ৩টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ২৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৬৮ সুইস ফ্রাঁ। রহিমা ফুড কর্পোরেশন ও সিটি সুগার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ চৌধুরী পরিবারের ৩টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এসব ব্যাংক হিসাবে ৩৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৯ সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ৫১ কোটি ৭১ লাখ ৭০ হাজার ১৫ টাকা। এরমধ্যে আব্দুর রউফ চৌধুরীর ছেলে রবি রউফ চৌধুরীর ১টি ব্যাংক হিসাবে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ১৭৫ সুইস মুদ্রা, স্ত্রী রাফিয়া চৌধুরীর ২টি ব্যাংক হিসাবে ২৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭১৩ সুইস ফ্রাঁ। এছাড়া সুইস ব্যাংকে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নির্মাণ প্রতিষ্ঠান সানমার প্রপার্টিজ এর মালিক মাসুক হক ও তার স্ত্রী আফরোজা হকের দু’টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এতে ৫৪ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮৪ সুইস ফ্রাঁ রয়েছে। বাংলাদেশি টাকার যার পরিমাণ ৭৩ কোটি ৮০ লাখ ২৯ হাজার ৩৪০ টাকা। এছাড়া এই দম্পত্তি ২০১১ সালে সুইস ব্যাংকে দু’টি একাউন্ট খুলে তাতে ৫৪ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮৪ সুইস ফ্রাঁ জমা রেখে ২০১৪ সালে তা তুলে নেন।  

সিলেটের সাবেক একজন এমপি পরিবারের ১টি জয়েন্ট ব্যাংক হিসাব রয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পরিবারটির হিসাবে ১ কোটি ৭০ লাখ ৫ হাজার ৩০৭ সুইস ফ্রাঁ গচ্ছিত আছে। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২২৯ কোটি ৫৭ লাখ ১৬ হাজার ৪৪৫ টাকা। এছাড়া প্রয়াত একজন অর্থনীতিবিদের সুইস ব্যাংকে ১টি হিসাবে ৭ লাখ ১৭ হাজার ১ সুইস ফ্রাঁ, হিরা রাজ্জাকের ব্যাংক হিসাবে ৭ লাখ ৮৯ হাজার ৮০ সুইস ফ্রাঁ, খন্দকার ফিরোজ কাইয়ূমের ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৬২ সুইস ফ্রাঁ, মনসুর ইয়াজদানি খানের ব্যাংক হিসাবে ৪১ লাখ ১৩ হাজার ৪৬২ সুইস ফ্রাঁ জমা রয়েছে। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ ২৬৯ কোটি ৪১ লাখ ১৪ হাজার ৬৭৫ টাকা। এছাড়া এর আগে ২০১০ সালে দু’টি হিসাব খুলে ২০১২ সালে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে ওই হিসাবে ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৪০ সুইস ফ্রাঁ লেনদেন করা হয়। উল্লেখ্য, সুইস ব্যাংকে যে কোনো দেশের নাগরিকরাই আর্থিক হিসাব পরিচালনা করতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ বৈধ। এই প্রতিবেদন উপরে উল্লিখিত ব্যক্তিরা অর্থপাচার বা অবৈধ পথে উপার্জন করে সুইস ব্যাংকে রেখেছেন এমন দাবি করে না।

mzamin
শেখ হাসিনার সঙ্গে রাজীব সামদানি দম্পতি ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচনের আগে দৃশ্যমান বিচার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন দেখতে চাই

আমার কাছে মনে হয় না যে, ডিসেম্বরে নির্বাচন সম্ভব নয়। গণপরিষদ নির্বাচন করতে হলে তা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে, ঐকমত্যের ওপর নির্ভর করবে। তবে যেকোনো নির্বাচনে যাওয়ার আগে দৃশ্যমান বিচার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন দেখতে চাই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

গতকাল রাজধানীর বাংলামোটরের রূপায়ণ টাওয়ারে এনসিপি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি যেন জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার যেন কঠোর অবস্থান নেন। নারী নিপীড়নকারীদের যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের আওতায় আনা হয়।

রয়টার্স প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাক্ষাৎকারে কিছু মিসকোট হয়েছে বা ভুল অনুবাদ হয়েছে। আর্থিক বিষয়ে আমি বলেছিলাম আমাদের সমাজের সচ্ছল মানুষ ও শুভাকাঙ্ক্ষী যারা রয়েছেন তারা মূলত আমাদের সহযোগিতা করেন। আমরা একটা ক্রাউডফান্ডিংয়ের দিকে যাচ্ছি। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের কার্যালয় ও নির্বাচনের ফান্ড গঠন করবো। এটার ভুল অনুবাদ এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এটা সংশোধনের অনুরোধ থাকবে।
‘দ্বিতীয়ত, বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এ বছর নির্বাচন করা সম্ভব নয়। আমি ঠিক এভাবে কথা বলিনি। আমি বলেছিলাম, এখন দেশের যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ যেমন নাজুক অবস্থায় আছে, এ রকম নাজুক অবস্থায় নির্বাচন করা অনেক বেশি কঠিন হবে। তাদের সক্ষমতার পরীক্ষা হয়নি দীর্ঘদিন ধরে। সেখান থেকে আমি বলেছি, অবশ্যই নির্বাচনের আগে পুলিশিং ব্যবস্থা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে, সামাজিক শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে।

এনসিপি’র কার্যক্রম বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে নাহিদ বলেন, আমরা এখন রাজনৈতিক নিবন্ধনের শর্তাবলী নিয়ে মনোযোগী হচ্ছি। তৃণমূলে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেছি। রোজার পর পুরোদমে শুরু করবো। আমরা নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করছি। জোট গঠনের বা নির্বাচনের প্রার্থীর বিষয়ে আমাদের অবস্থান ব্যক্ত করতে আরও সময় লাগবে। আমরা নির্বাচনের সময়ের চেয়ে প্রেক্ষাপটকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা আমাদের জায়গা থেকে দাবি জানাচ্ছি। জুলাই সনদ আর জুলাই ঘোষণাপত্র আলাদা জিনিস। ঘোষণাপত্রের দাবি আরও আগে উঠেছিল ছাত্রদের পক্ষ থেকে। আর জুলাই সনদ প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করছিলেন যে, সংস্কারের ঐকমত্যের ওপর একটা চার্টার তৈরি হবে যেখানে বাংলাদেশের রূপরেখা ও সংস্কারের কী কী এখন করবো, কী কী ভবিষ্যতে করবো, রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের কাছে কমিটমেন্ট দিতে হবে। সেটাকে আমরা বলছি জুলাই সনদ। গণ-অভ্যুত্থানে মানুষ পরিবর্তনের ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা থেকে এসেছিল। এই দুইটা পূরণ করতে হবে। সেটা আমি বলেছি যে, আমরা যেন ভুলে না যাই বিচার ও সংস্কারের মধ্যদিয়ে যেন আমরা নির্বাচনের দিকে যাই।

তিনি আরও বলেন, আর্থিক জায়গা নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ বিষয়টা পরিবর্তন আসুক- তা আমরা চাই। আমাদের জায়গা থেকে এটা দাবি করছি। এককভাবে এই সংস্কৃতি আমরা পরিবর্তন করতে পারবো না। আমাদের কারা সহযোগিতা করছে, এটা যদি আমরা প্রকাশ করি, তারা যে ক্ষতির শিকার হবেন না, সেটার নিশ্চয়তা আমাদের দিতে হবে। এই কালচার তো বাংলাদেশে তৈরি করা যায়নি। আমরা চাই- এই কালচার তৈরি হোক এবং সব রাজনৈতিক দল তা গ্রহণ করুক।

mzamin

মাগুরায় বর্বরতা: বেড়াতে এসে শিশু ধর্ষিত

মাগুরায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে আট বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অচেতন অবস্থায় শিশুটিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় শিশুটির  দুলাভাই ও তার বাবাকে আটক করেছে পুলিশ।

সূত্রমতে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। এখনো সে অচেতন অবস্থায় আছে। তাকে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অবস্থা আরও খারাপ হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হবে। পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় শিশুটিকে মাগুরা হাসপাতালে আনা হয়। সেখান থেকে দুপুরেই উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

শিশুটির পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের বাড়ি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলায়। শিশুটি কয়েকদিন আগে তার বড় বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় শিশুটিকে মাগুরা হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার বোনের শাশুড়ি। পরে শিশুটির মা হাসপাতালে আসেন। অভিযুক্তের স্ত্রী জাহেরা বেগম বলেন, আমি মাঠে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি একটি শিশু পড়ে আছে। তাড়াতাড়ি সবাইকে খবর দিয়ে তাকে জরুরি ভিত্তিতে মাগুরা হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করি। বিকালে তার অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হলে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়। এ ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি ও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করছি। আমার স্বামী খুবই খারাপ প্রকৃতির একজন মানুষ। সে আমার সঙ্গেও সব সময় দুর্ব্যবহার করে। তার সঙ্গে আমি কোনো ভাবেই পারছি না। যেকোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করলে আমার ওপর নেমে আসে নানা ধরনের নির্যাতন।

মাগুরা হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করে দেখা গেছে শিশুটির গলায় একটা দাগ আছে। মনে হচ্ছে, কিছু দিয়ে চেপে ধরা হয়েছিল। শরীরের বেশ কিছু জায়গায় আঁচড় আছে। তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এ বিষয়ে মাগুরা সদর থানার ওসি আইয়ুব আলী বলেন, শিশুটির সঙ্গে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শিশুটি অচেতন অবস্থায় ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, যে বাসায় সে বেড়াতে এসেছিল সেখানেই ঘটনাটি ঘটেছে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তার দুলাভাই ও দুলাভাইয়ের বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে।

মাগুরা শহরে বিক্ষোভ:
এ ঘটনায় গতকাল দুপুরে শহর ছিল উত্তাল। জুমার নামাজ শেষে শহরের পারনান্দুয়ালী, নিজনান্দুয়ালী চরপাড়া গ্রাম থেকে শত শত যুবক ধর্ষকের ফাঁসি চেয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় বিক্ষোভ মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ভায়না মোড় অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করে। সমাবেশে বক্তারা অবিলম্বে হিটু ও তার ছেলে সজীবের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে ফাঁসি কার্যকরের দাবি জানান। সমাবেশ শেষে বিক্ষুব্ধ জনতা খুলনা-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে। তারপর মিছিল নিয়ে জনতা সদর থানা ঘেরাও করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।  

এদিকে, ঘটনাটি কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছে না তার পরিবারসহ মাগুরাবাসী। সরজমিন নিজনান্দুয়ালী মাঠ পাড়া এলাকায় দেখা যায়, এলাকাটি পুরোপুরি থমথমে। মাঠপাড়া মানুষের মুখে নেমে এসেছে বিস্ময়ের ছায়া। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী, কৃষান-কৃষানি থেকে শুরু করে সব মানুষের একটাই দাবি, এ ঘটনার সঠিক বিচার হোক এবং জড়িতদের ফাঁসি হোক। পবিত্র রমজান মাসে যারা এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে তারা অমানুষ। স্থানীয় কৃষক সোহানুর রহমান জানান, আমি মাঠে কাজ করছিলাম। দুপুরের পর ঘটনাটি শুনে হতবাক হয়েছি। যে এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে সে আমাদের গ্রামেরই একজন খারাপ প্রকৃতির মানুষ। পূর্বেও হিটুর নামে এমন অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ী আওয়াল হোসেন জানান, এ ঘটনায় আমরা গ্রামবাসী শুক্রবার শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে প্রশাসনের নিকট ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় এনে ফাঁসির দাবি করছি।

mzamin


নিষিদ্ধ হিযবুতের মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড

রাজধানীতে ‘মার্চ ফর খিলাফত’- কর্মসূচিতে মিছিল করেছে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীর। গতকাল পুলিশি বাধা অতিক্রম করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট থেকে মিছিল নিয়ে পল্টন মোড় হয়ে বিজয় নগর পানির ট্যাঙ্কি এলাকা অভিমুখে যাত্রা করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। পরে লাঠিচার্জ, টিআরশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এ সময় বেশক’জনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় দুই সংবাদকর্মীসহ আহত হয়েছেন বেশক’জন। 

গতকাল সকাল থেকেই নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের পূর্ব-ঘোষিত ‘মার্চ ফর খিলাফাত’- কর্মসূচি ঘিরে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট হয়ে জুমার নামাজ পড়তে ঢোকা সকল মুসল্লিকেই তল্লাশি করা হয়। ব্যাগ হাতে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের সন্দেহ হলেই তল্লাশি চালায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা। উপস্থিত ছিল বিপুলসংখ্যক র‌্যাব সদস্যরাও। সাদা পোশাকে ছিল- গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা। জল কামান, এপিসি গাড়িও প্রস্তুত রাখা হয় পল্টন এলাকায়। নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের কর্মসূচি থেকে মুসল্লিদের বিরত থাকতে জুমার খুতবায় মসজিদের মাইকে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধও করা হয়। তবে এতকিছুর পরও সরজমিন দেখা যায়, জুমার নামাজের সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেইটের সামনে থেকে মিছিল বের করেন হিযবুত তাহ্‌রীরের নেতাকর্মীরা। মিছিল নিয়ে মূল রাস্তায় নেমে ব্যানার ঠিক করাসহ নেতাকর্মীদের সুসজ্জিত করার জন্য বেশ কিছু সময় নিলেও কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরকে দেখা যায়নি।

এরপর তারা ব্যানার, ফেস্টুন সংবলিত মিছিল নিয়ে পল্টন মোড়ের দিকে অগ্রসর হন তখন হাতেগোনা কয়েকজন পুলিশ সদস্য গিয়ে তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। তবে বাধা পেরিয়ে হিযবুত তাহ্‌রীরের মিছিলটি পল্টন মোড়ের দিকে এগুতে থাকলে তাতে আবারো বাধা দেয় পুলিশ সদস্যরা। দ্বিতীয় দফার পুলিশি বাধা ভেঙে পল্টন মোড় হয়ে হিযবুত তাহ্‌রীরের মিছিল বিজয় নগরের দিকে চলে যায়। এ সময় পল্টন মোড়ের টার্নিংয়ে উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। র‌্যাব, ডিবি, সিটিটিসি সহ প্রায় সকল বাহিনীর সদস্যরাই ছিলেন। হিযবুত তাহ্‌রীরের নেতাকর্মীরা তাদের খেলাফতের মিছিল নিয়ে বিজয় নগর পানির ট্যাঙ্কি এলাকায় অগ্রসর হয়। এ সময় তারা নানা স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের মিছিল নির্ধারিত স্থান পানির ট্যাঙ্কি থেকে ঘুরে আবারো পল্টন মোড়ের দিকে রওনা হয়। তখন মিছিলটি লক্ষ্য করে লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। এ সময় হিযবুত তাহ্‌রীরের নেতাকর্মীরাও পুলিশকে ধাওয়া দেয়। শুরু হয় উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এ সময় ইটপাটকেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জে দুই সংবাদকর্মীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। বেশ কিছু সময় ধাওয়া-পাল্টার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত তোপের মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় হিযবুত তাহ্‌রীরের নেতাকর্মীরা। মিছিলকারীরা অলিগলিতে ঢুকে পড়লে লাঠি হাতে পুলিশ তাদের তাড়া করে কয়েকজনকে আটক করে। কিছুক্ষণ পরে তারা আবার সংগঠিত হয়ে পল্টন মোড়ের দিকে মিছিল নিয়ে আসার চেষ্টা করে। পুলিশকে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে তারা। এ সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের উপর সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে মিছিলটি আবারো ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে হিযবুত তাহ্‌রীরের কয়েক সদস্যকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্থানীয় কিছু দোকানিও ককেজনকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেন। পরে তাদের শাহ্‌বাগ, রমনাসহ বিভিন্ন থানায় পাঠানো হয়। আর একজনকে সোপর্দ করা হয় সিটিটিসি সদস্যদের কাছে।

মিছিলে যোগ দেয়া দনিয়া কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী  মো. সায়েম বলেন, আমরা এখানে এসেছি খেলাফতের জন্য। আমার সঙ্গে আরও অনেকে এই জায়গায় এসেছেন মিছিলে যোগ দিতে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ ঢাকার আশেপাশের অনেক এলাকা থেকেও বিপুলসংখ্যক লোক এই মিছিলে যোগ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। তবে কীসের খেলাফত, কেনই বা তারা খেলাফতের ডাক দিচ্ছেন এই বিষয়ে তেমন কিছুই বলতে পারেননি মিছিলে যোগ দেয়া এই শিক্ষার্থী। প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল আলিম নামে এক মুসল্লি বলেন, আসলে এই খেলাফতের মিছিলে বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তে আসা অনেক সাধারণ মুসল্লি না জেনেই যোগ দিয়েছিলেন। পরে পুলিশের বাধার মুখে তারা নিষিদ্ধ সংগঠনের কথা জানতে পেরে চলে যান। তিনি বলেন, হিযবুত তাহ্‌রীর এই মিছিলে যোগ দেয়া অনেকের হাতেই সাদা ও কালো পতাকা ছিল। সাদা রঙের পতাকায় কালো হরফে ও কালো রঙের পতাকায় সাদা হরফে আরবি ভাষায় বিভিন্ন কিছু লেখা ছিল। তাদের অনেকের হাতে আবার গেরুয়া রঙের ব্যানার ও পতাকা ছিল। যার বেশির ভাগই বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় লেখা ছিল- ‘ডিমান্ড দ্য ম্যাথোড অফ প্রফেটহুড মার্চ ফর খিলাফাহ্‌’। যার বাংলা-‘নবুয়তের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে মার্চ ফর খিলাফত’। অন্য ব্যানারে লেখা ছিল- মুক্তির এক পথ, খেলাফত খেলাফত।

এসব বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খালিদ মনসুর বলেন, পল্টনের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করে বিভিন্ন থানায় পাঠানো হয়। সেই প্রেক্ষিতে আমাদের থানাতেও কয়েকজনকে পাঠানো হয়েছিল। পরে আমরা তাদেরকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে ডিবি অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি।

এসব বিষয়ে ডিএমপি’র রমনা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদ আলম বলেন, আমরা পল্টন মোড় এলাকা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের ১২ জনকে আটক করেছি। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাই চলছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীর সমর্থকদের মিছিল নিয়ে পল্টন হয়ে বিজয়নগরের দিকে এগোতে থাকলে পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়ে ও লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ওই সময় পুলিশের পাশাপাশি লুঙ্গি পরা এক ব্যক্তিকেও হিযবুত তাহ্‌রীর সদস্যকে পেটাতে দেখা যায়। পরে ওই ব্যক্তিকে আটক করে যৌথ বাহিনী। পরে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়। ওই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে যান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। পরে সেই ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে ডিবি কার্যালয়ের ফটক দিয়ে হেঁটে বের হয়ে রাস্তায় অপেক্ষমাণ গাড়িতে করে ওই ব্যক্তিকে নিয়ে যান। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ছাড়া পাওয়া ওই ব্যক্তি বায়তুল মোকাররম এলাকায় পানি সরবরাহ করে থাকেন।

mzamin