Monday, November 25, 2024

জিপিএস দেখে পথ চলতে গিয়ে গাড়ি নদীতে, নিহত ৩

অচেনা বা নানা গন্তব্যে যেতে গুগল ম্যাপ বা বিভিন্ন অ্যাপসের সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়টি এখন অপরিচিত নয়। তবে এভাবে পথ চলতে গিয়ে অনেক সময় বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয় অনেককে। তবে এবার ঘটেছে এক ভয়ংকর ঘটনা। জিপিএস দেখে পথ চলতে গিয়ে নদীতে পড়েছে এক গাড়ি। এতে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন।

রোববার (২৪ নভেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় সেতুর একটি অংশ ভেঙে পড়ে। ফলে সেই অংশের নির্মাণকাজ করছিলেন কমকর্তা-কর্মচারীরা। সেখানে জিপিএস দেখে দ্রুতগতিতে গাড়িয়ে চালিয়ে নদীতে পড়েন এক চালক।

এ ঘটনায় চালকসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। ভারতের উত্তরপ্রদেশের রামগঙ্গা নদীতে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে নিহতদের নাম পরিচয় জানা যায়নি।

সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তিন আরোহী গাড়িতে করে বাদায়ুন জেলার ডাটাগঞ্জের দিকে যাচ্ছিলেন। জিপিএস অনুসারে তারা খালপুর-ডাটাগঞ্জ সড়কের ওই সেতুটি পাড়ি দিচ্ছিলেন। এ সময় সেতুর ভাঙা অংশে ধাক্কা খেয়ে গাড়িটি নদীতে পড়ে যায়।

সার্কেল পুলিশের কর্মকর্তা আশুতোশ শিবম জানান, চলতি বছরে বন্যায় সেতুর সামনের অংশ নদীতে তলিয়ে যায়। এরপর পুনরায় সেতুটির নির্মাণকাজ চলছিল। তবে জিপিএসে বিষয়টি আপডেট করা ছিল না। ফলে সেতুটির বিষয়ে চালক বুঝতে পারেননি। এটি সেতু থেকে ৫০ মিটার গভীরে নদীতে পড়ে যায়।

তিনি বলেন, সেতুতে সতর্কতামূলক কোনো ধরনের বোর্ডও ছিল না। ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এনডিটিভি জানিয়েছে, খবর পেয়ে বাদায়ুন ও বরেলির পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া গাড়িটিও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটি বেশ গতিতে চলছিল। 

ব্রিজ থেকে নদীতে ছিটকে পড়া গাড়ি। ছবি : সংগৃহীত
ব্রিজ থেকে নদীতে ছিটকে পড়া গাড়ি। ছবি : সংগৃহীত

মহাবিশ্বের শুরু কখন by জাহিদ হোসাইন খান

মহাকাশের শুরু হয়েছে কবে বা মহাবিশ্ব যদি প্রসারিত হতে থাকে, তাহলে শেষ প্রান্ত কোথায়? এমন অনেক প্রশ্ন আমাদের মনে উঁকি দেয়। সম্প্রতি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ (জেডব্লিউএসটি) আমাদের মহাবিশ্বের প্রান্তে কী আছে তা নিয়ে আশ্চর্যজনক তথ্য প্রকাশ করেছে।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ সম্প্রতি ১২.৮ বিলিয়ন বছরের পুরোনো তিনটি রেড মনস্টার গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের ছবি তুলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির প্রায় সমান আকারের গ্যালাক্সিগুলোর বয়স বিগ ব্যাং বিস্ফোরণের সময় থেকেও এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি বছর বেশি। বিগ ব্যাং অর্থাৎ মহাবিস্ফোরণ হচ্ছে মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে এ পর্যন্ত চলে আসা ধারণাগুলোর মধ্যে অন্যতম ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। আর তাই বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে মহাবিশ্বের শুরু হলে তার চেয়ে এক বিলিয়ন বছর আগের গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়ে চিন্তায় পড়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

সর্বাধিক গৃহীত মহাজাগতিক মডেল ল্যাম্বডা কোল্ড ডার্ক ম্যাটার বা এলসিডিএম মডেল নামে পরিচিত। এই মডেল অনুসারে রেড মনস্টার ছায়াপথের অস্তিত্ব থাকা উচিত নয় বলে মনে করেন গবেষকেরা। এলসিডিএম অনুসারে, মহাবিশ্বে গঠিত প্রথম দিকের গ্যালাক্সি নতুন আবিষ্কৃত গ্যালাক্সির মতো বিশাল হওয়ার জন্য যথেষ্ট না। যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী স্টেজেন উয়েটস বলেন, এ ধরনের তিনটি বিশাল গ্যালাক্সির খোঁজ একটি ধাঁধার সৃষ্টি করেছে। এবারই প্রথমবার নয় জেমস ওয়েব অসম্ভবভাবে বড় ধরনের কোনো প্রাচীন গ্যালাক্সি চিহ্নিত করেছে।

গবেষকেরা নতুন আবিষ্কৃত ছায়াপথকে তাদের বিশাল আকার ও উচ্চ ধূলিকণার কারণে রেড মনস্টার বা লাল দৈত্য বলে ডাকেন। টেলিস্কোপের ছবিতে স্বতন্ত্রভাবে লাল রং হিসেবে দেখা যায় এগুলোকে। দৈত্যাকার এসব গ্যালাক্সি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করছে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মেনগুয়ান জিয়াও বলেন, আমাদের অনুসন্ধানের কারণে মহাবিশ্বের প্রাথমিক গ্যালাক্সির গঠন সম্পর্কে বোঝার ধারণা পরিবর্তন করছে। এর আগে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় ছয়টি গ্যালাক্সির কথা বলা হয়। সেই সব গ্যালাক্সি বিগ ব্যাংয়ের মাত্র ৫০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন বছর পরে গঠিত হয়েছিল। ধারণার চেয়ে ১০০ গুণ বেশি বিশাল আকার সেগুলোর। এসব গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ সাধারণ ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কেউ কেউ অবশ্য নতুন আবিষ্কারকে অযৌক্তিক দৃষ্টিবিভ্রম বলছেন।

সূত্র: ডেইলি মেইল

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের তোলা ছবিতে রেড মনস্টার গ্যালাক্সি
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের তোলা ছবিতে রেড মনস্টার গ্যালাক্সি। ছবি: নাসা

টাকা না দিলেই গায়ে সাপ ছেড়ে দেওয়ার হুঁমকি

অভিনব উপায়ে টাকা লুট। না দিলেই গায়ে বিষধর সাপ ছেড়ে দেওয়ার হুমকি। ভিড়ে ঠাসা ট্রেনে উঠে এভাবেই টাকা আদায় করছেন এক ব্যক্তি।

হাতের মুঠোয় একটি গোখরা সাপ নিয়ে ট্রেনে উঠা যাত্রীদের ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে আদায় করতে থাকেন টাকা। সম্প্রতি এমনই একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এতে দেখা যায়, ট্রেন ঘুরে ঘুরে সাপের ভয় দেখিয়ে জোর করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক ব্যক্তি।

ট্র্যাভেল উইথ বোন নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে সেই ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। যা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নজর কাড়ে নেটিজেনদের। পোস্ট করার এক দিনের মধ্যেই দশ লাখ ভিউ হয়। জানা গেছে, উত্তর ভারতগামী কোনো এক ট্রেনে ঘটে এমন ঘটনা।

কেরালার বাসিন্দা অশ্বিন নামের এক ভ্লগার ট্রেনের এক সাধারণ কোচে তার ভ্রমণের অদ্ভূত ঘটনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি বলেন, সেখানে এক জন ব্যক্তিকে খালি হাতেই দুটি বিষধর সাপ নিয়ে উঠতে দেখেছেন। তিনি সাপ দুটি নিয়ে যাত্রীদের ভয় দেখাচ্ছেন এবং টাকা বের করার জন্য জোরাজুরি করছেন। টাকা না পেলে বিষাক্ত গোখরা গায়ে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে ভিডিওতে দাবি করেছেন তিনি। ট্রেনের মধ্যে শুয়ে থাকা যাত্রীদের শরীরের কাছে সাপ দু'টি নিয়ে ভয় দেখাচ্ছেন ওই ব্যক্তি। যাকে দেখে প্রথমে বেদে সম্প্রদায়ের বলে ভুল করেন অশ্বিন। পরে তিনি জানতে পারেন সাপ দেখিয়ে ভয় দেখানো ওই ব্যক্তি স্থানীয় বাসিন্দা।

সাপগুলি সত্যিই বিষাক্ত ছিল কিনা তা নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। এই ঘটনা দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেকে। গণপরিবহণে এই ধরনের অবাঞ্ছিত ঘটনা কীভাবে ঘটছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নেটিজেনরা। 

ট্রেনে বিষধর সাপ দেখাচ্ছেন যাত্রীদের কাছে টাকা দাবি করা ব্যক্তি। ছবি : সংগৃহীত
ট্রেনে বিষধর সাপ দেখাচ্ছেন যাত্রীদের কাছে টাকা দাবি করা ব্যক্তি। ছবি : সংগৃহীত

ভারতে ‘যৌন ব্যবসায়’ বাধ্য করা হচ্ছে বাংলাদেশি তরুণীদের

দেহব্যবসা করাতে বাংলাদেশি ২৩ তরুণীকে নেওয়া হয়েছে ভারতে। দেশ থেকে তাদের নেওয়া হয় চাকরির কথা বলে। মাসে ৬০ হাজার রুপি বেতন দেওয়া হবে, এমন প্রলোভনে ভারতে নেওয়া হয় ওই তরুণীদের। কিন্তু সেখানে নিয়ে আটকে রাখা হয় তাদের। পরানো হয় যৌন আবেদনময়ী সব পোশাক। এরপর ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে তা পাঠিয়ে দেওয়া হয় খদ্দেরের কাছে।

হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো ছবি থেকে পছন্দের তরুণীকে বাছাই করেন খদ্দেররা। এরপর কথামতো বাংলাদেশি ওই তরুণীদের পাঠানো হয় আবাসিক কোনো হোটেল বা রিসোর্টে, বাধ্য করা হয় পতিতাবৃত্তিতে।

দিনের পর দিন এভাবেই জোর করে বাংলাদেশি ২৩ তরুণীকে দিয়ে দেহব্যবসা করিয়ে আসছে একটি চক্র। সম্প্রতি ভারতের ওড়িশার রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বরে চক্রটির সন্ধান পেয়েছে সেদেশের পুলিশ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ওড়িশাটিভি রোববার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে- এই তরুণীরা বড় ধরনের মানবপাচারের শিকার। তাদের দৈনিক ২ হাজার রুপি বেতনের কাজের লোভ দেখিয়ে ভুবনেশ্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের দিয়ে যৌন ব্যবসা করানো হচ্ছে।

এই যৌন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকা দালালরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে খদ্দেরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যখন কোনো খদ্দের আগ্রহ প্রকাশ করেন তখন তাদের বাংলাদেশি তরুণীদের ছবি পাঠানো হয়। সেখান থেকে যে কোনো একজনকে বেছে নেয় তারা। এরপর আগেই অর্থ পরিশোধ করতে হয়। সর্বশেষে ওই খদ্দেরকে হোটেলের ঠিকানা দেওয়া হয় যেখানে নির্দিষ্ট তরুণী অপেক্ষা করেন।

ওড়িশাটিভি জানিয়েছে, কোটাক থেকে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে উদ্ধারের পর পুরো বিষয়টি সামনে আসে। ওই কিশোরীকে লিংক রোডের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর তদন্ত শুরু হয়—কীভাবে বাংলাদেশি তরুণীদের ওড়িশায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া এক যৌনকর্মী জানান, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি এই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি এখানে আটকা পড়ে গেছেন। উদ্ধারকৃত ওই যৌনকর্মী জানান, পুরো বিষয়টি পরিচালনা করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

প্রতারণার শিকার এই তরুণীদের কয়েক বছর ধরে আটকে রেখেছে চক্রটি। যারা এরসঙ্গে জড়িত তাদের ধরে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় যেসব দালাল এই যৌনব্যবসায় জড়িত, তাদের খুঁজে বের করতে অভিযান শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ।

ভুবনেশ্বরের উপপুলিশ কমিশনার পিনাক মিশ্রা ওড়িশাটিভিকে বলেন, এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, যারা এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রমে জড়িত, শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছবি : সংগৃহীত

দুই মাস সূর্যের দেখা মিলবে না শহরে

রাত যাদের পছন্দ তারা চাইলে এই শহরটিতে ঘুরে আসতে পারেন। কারণ ওই শহরটিতে এক নাগাড়ে ৬৭ দিন ধরে দেখা মিলবে না সূর্যের। মানে ২৪ ঘণ্টাই রাতের আবহ থাকবে ওই শহরে। সূর্যোদয় হলো দিনের শুরু হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নির্দেশক। মানুষের জীবনযাত্রাও সূর্যের আলোর ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু যদি সূর্যের দেখাই যদি না মেলে?

টানা দুই মাসের বেশি সময় ধরে সূর্য ওঠে না শহরে। প্রতিবছর শীতকালের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এমন ঘটনার সাক্ষী হন আলাস্কার উৎকিয়াভিকের বাসিন্দারা।

সৌরজগতের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নভেম্বরে শেষদিকে সেখানে শেষ সূর্যাস্ত হয়। এর ঠিক ৬৬ দিন পর ফের সূর্যোদয় হয় উৎকিয়াভিকে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উত্তরে আলাস্কা রাজ্যের অন্যতম শহর এটি। একসময় ‘ব্যারো’ নামে পরিচিত ছিল এই শীতলতম স্থানটি। মাত্র ৫ হাজার লোকের বসবাস এখানে। নভেম্বরের শেষ দিক, ডিসেম্বর এবং জানুয়ারির শুরুর দিক মিলে দুই মাস সূর্যের দেখা মেলে না।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইউএসএ টুডে জানিয়েছে, গত সোমবার শহরটিতে ৩০ মিনিটের জন্য সূর্যের দেখা মিলেছিল। এরপর সেখানে সূর্য অস্ত যায়। ওই সূর্যাস্তের পর সেখানে ‘পোলার নাইট’ শুরু হয়েছে। সেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারির আগ পর্যন্ত আর সূর্য ফিরবে না।

তাহলে কি এই দুমাসেরও বেশি সময় অন্ধকারে ডুবে থাকবে শহরটা? না, তেমনটা হবে না। এই সময়কালে প্রতিদিনই ভোর হবে নিয়ম করে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নয়, আলো থাকবে কয়েক ঘণ্টা। তারপর তা কমে গিয়ে অন্ধকার নেমে আসবে।

প্রতি বছরই এমন হয়ে থাকে। এই সময়ে সেখানকার তাপমাত্রা থাকে মোটামুটিভাবে মাইনাস ৫ থেকে মাইনাস ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। শীতের মাত্রা বৃদ্ধির দিকে যা মাইনাস ২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

এই শহরের মানুষরা এই পরিস্থিতিতে বাস করতে অভ্যস্ত। তারা বিভিন্ন কৃত্রিম আলো ব্যবহার করে এবং অন্যান্য কাজ করে দিন কাটায়। সূর্যের আলো না থাকায় ভিটামিনের ডি-র ঘাটতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেখানকার বাসিন্দাদের। ফলে এই সময়ের কথা ভেবে প্রচুর ভিটামিন ডি জমিয়ে রাখেন বাসিন্দারা। শীতের হাত থেকে বাঁচতেও নানা সতর্কতা নেন তারা।

শুধু উৎকিয়াগভিক শহরই নয়, আলাস্কার কাকটোভিক, পয়েন্ট হোপ ও আনাকটুভুক পাসের বাসিন্দারাও এক থেকে দুই মাস সূর্যের দেখা পান না।

পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় একটু ঝুঁকে থাকে। এই ঝুঁকির কারণেই বছরের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সূর্যের আলো পড়ার পরিমাণ ভিন্ন হয়। আর মেরু অঞ্চলগুলো পৃথিবীর অন্যান্য অংশের তুলনায় সূর্য থেকে অনেক দূরে থাকে। ফলে সূর্যের আলো সরাসরি এই অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে না।

প্রতীকি ছবি।
প্রতীকি ছবি।



ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ক ভাবনা by প্রণয় ভার্মা

জনগণই আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি- এই বিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন কোভিড-১৯ আমাদের আঘাত হানে এবং আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে উদারভাবে এগিয়ে আসি। এটি বাংলাদেশের জন্য আমাদের বিস্তৃত ভিসা কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হয়, তবে বর্তমানে সীমিত কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও আমরা প্রতিদিন ঢাকার অন্য যেকোনো কূটনৈতিক মিশনের তুলনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বেশি ভিসা ইস্যু করে থাকি...

বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ও অনন্য। আমরা একটি অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি ছাড়াও যৌথ ইতিহাস, যৌথ ভৌগোলিক অবস্থানের মাধ্যমে সংযুক্ত। আমরা উভয়েই পারস্পরিক বিশ্বাস ও বোঝাপড়া এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে একটি সম্পর্কের সন্ধান করি ও সেটাকে মূল্য দিই। আমাদের জনগণের মধ্যে এক সুগভীর যৌথ সহানুভূতি রয়েছে, যার অনেকটাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটিকে যেভাবেই বর্ণনা করা হোক না কেন, এটি একটি জনগণ-কেন্দ্রিক সম্পর্ক। আমাদের সম্পর্ককে জনগণ ও জনমত যে মাত্রায় প্রভাবিত করে, তা আমরা অনেক সময় ধারণা করতে পারি না।

একটি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে, যাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের প্রতি আমরা দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করি, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের বন্ধন শক্তি লাভ করে এই বিশ্বাস থেকে যে- আমাদের শান্তি, নিরাপত্তা, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। এবং তাই, আমরা বহুমুখী সহযোগিতার একটি দৃঢ় কাঠামোর মাধ্যমে পারস্পরিক সমৃদ্ধিতে অভিন্ন অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালাই। উভয় দেশই বঙ্গোপসাগরের শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। আমাদের রয়েছে একটি অভিন্ন জীবজগৎ ও বাস্তুসংস্থানীয় পরিবেশ, যা পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো যৌথ প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় আমাদের সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

ভৌগোলিক অবস্থান, উদীয়মান সক্ষমতা ও ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক আর বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে বাংলাদেশ কেবল আমাদের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতির একটি স্তম্ভই নয়, বরং এটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিসমূহের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে- যেমন ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’, সাগর মতবাদ (সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্রৌথ ফর অল ইন রিজিয়ন) এবং আমাদের ইন্দো-প্যাসিফিক দর্শন।
আমাদের বিশ্বাস, এটি শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্যও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, কারণ আমাদের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা ও পরস্পরের শক্তি ও পরিপূরকতাসমূহ কাজে লাগিয়ে আরও সংযুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। বাংলাদেশ বে-অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল, টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক)-এর অধীনে সংহতি এজেন্ডাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অনন্যভাবে অবস্থান করছে। কারণ এটি এই অঞ্চলের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং বিমসটেকের প্রধান কার্যালয়ের স্বাগতিক দেশ হিসেবেও ভূমিকা পালন করছে।

আমাদের সম্পর্কের মধ্যে যে অনেক রূপান্তরমূলক পরিবর্তন ঘটেছে এবং যা এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করেছে, সেগুলো একে অপরের উদ্বেগ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি আমরা যে পারস্পরিক সংবেদনশীলতা দেখিয়েছি তার ফল। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ‘জিরো-টলারেন্স’ নীতি ও ভারতকে লক্ষ্যবস্তুকারী বিদ্রোহীদের আশ্রয় না দেয়ার দৃঢ় সংকল্প আমাদের সহযোগিতা ও সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটি ভবিষ্যতে আমাদের দুই দেশ, আমাদের অঞ্চল ও আমাদের সম্পর্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে থাকবে।
আমাদের অন্যতম বড় সাফল্য- আমাদের সমুদ্র ও স্থল সীমানার সমাধান, যা আমাদের স্থল ও সমুদ্র সংযোগের পাশাপাশি সুনীল অর্থনীতিতে (ব্লু-ইকোনমি) সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনেক সুযোগ উন্মুক্ত করেছে। পার্মানেন্ট কোর্ট অফ আরবিট্রেশন-এ বিষয়টি উপস্থাপন করে আমাদের সমুদ্রসীমা সমাধান এবং তারপরে সেটার রায় মেনে চলাটা হলো গণতান্ত্রিক ও নীতিনির্ধারিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আমরা যে দৃঢ় বিশ্বাসী এবং তা আমাদের দ্বিপক্ষীয় আচরণে প্রতিফলিত হওয়ার একটি চমৎকার উদাহরণ।

আমাদের বহুমুখী অংশীদারিত্বের রূপান্তরের একটি মূল প্রকাশ, যা আমাদের উভয় দেশের জনগণকে সরাসরি উপকৃত করেছে, তা হলো আমাদের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং আমাদের সংযোগ লিংকসমূহ।

আজ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও বিশ্বে পঞ্চম বৃহত্তম অংশীদার। সাফটা-এর আওতায় ভারত একপক্ষীয়ভাবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশকে সব ধরনের পণ্যের জন্য শুল্ক-মুক্ত, কোটা-মুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে, যা বাংলাদেশ থেকে ভারতে বৃহত্তর রপ্তানি সক্ষম করেছে।

আমরা প্রায়ই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি সম্পর্কে উদ্বেগ শুনে থাকি, তবে এটি উপলব্ধি করাটা গুরুত্বপূর্ণ যে, ভারত কর্তৃক বাংলাদেশে রপ্তানির অধিকাংশই বাংলাদেশের রপ্তানির একটি বড় অংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বা প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ হিসেবে কাজ করে, যা বাংলাদেশকে মুদ্রাস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সাহায্য করে।

প্রকৃতপক্ষে, একটি কম প্রশংসিত বাস্তবতা হলো- ভারত এখন সমগ্র এশিয়ায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে গত কয়েক বছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি সর্বদা ২ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশেই রয়েছে। এবং, আমরা চাই এই সংখ্যাটা বৃদ্ধি পাক।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সংযোগ এক একটি প্রধান সহায়ক যা আমাদের সমাজ, আমাদের ব্যবসায় ও আমাদের জনগণকে একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হতে  ও পরস্পরের মাধ্যমে উপকৃত হতে সহায়তা করে। এবং আমরা এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছি।

একটি সন্নিহিত ভৌগোলিক অবস্থান ও দীর্ঘ অভিন্ন ইতিহাস নিয়ে, বিভিন্ন উপায়ে, আমরা আসলে আমাদের দু’টি দেশকে পুনরায় সংযুক্ত করার চেষ্টা করছি। আমরা যাত্রী ও পণ্য উভয়ের জন্য ১৯৬৫-এর আগের সাতটি রেলপথের মধ্যে ছয়টি পুনরুদ্ধার করেছি। আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগের একটি বড় অংশ ছত্রিশটি কার্যকর স্থল শুল্ক বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যার মধ্যে পাঁচটিকে সমন্বিত চেক পোস্টের স্তরে উন্নীত করা হয়েছে। এই মাসের ঠিক শুরুতে, আমরা পেট্রাপোল সমন্বিত চেকপোস্টে নতুন অবকাঠামো সংযোজন করেছি, যা পণ্য পরিবহন ও যাত্রী সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।
আজ, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা তিনটি বড় ভারতীয় বিমানবন্দর- কলকাতা, দিল্লি এবং বেঙ্গালুরুকে তৃতীয় দেশে রপ্তানির জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে, যা পশ্চিমা বাজারে বাংলাদেশের পণ্যসমূহকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। আমাদের গভীর সমুদ্র বন্দরগুলো বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের একই ধরনের সুবিধা দেয়ার জন্য প্রস্তুত।

আমাদের সংযোগসমূহ শুধুমাত্র বাণিজ্য ও পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নয়। আমরা শক্তিশালী জ্বালানি সংযোগও নির্মাণ করছি। এর কিছু উদাহরণ হলো- গত বছর চালু হওয়া একটি নতুন আন্তঃসীমান্ত ডিজেল পাইপলাইন, যা ভারতের একটি শোধনাগার থেকে বাংলাদেশে হাই-স্পিড ডিজেল নিয়ে আসে; আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সংযোগ লাইনসমূহ, যা ভারতের পাওয়ার গ্রিড থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে; এবং মাত্র দুই দিন আগে ভারতের গ্রিডের মাধ্যমে নেপাল থেকে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ। আমাদের জ্বালানি সংযোগ ও সহযোগিতা কীভাবে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি করছে এবং একটি সত্যিকারের আঞ্চলিক অর্থনীতি গঠনে অবদান রাখছে, এই সমস্ত উদাহরণ তা প্রদর্শন করে।
সংক্ষেপে, সংযোগের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সহজ একটি বিষয়- আমাদের ভৌগোলিক নৈকট্যকে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করা, যা আমাদের দুই দেশের মানুষ ও পুরো অঞ্চলের জন্য উপকার বয়ে আনে।

জনগণই আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি- এই বিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন কোভিড-১৯ আমাদের আঘাত হানে এবং আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে উদারভাবে এগিয়ে আসি। এটি বাংলাদেশের জন্য আমাদের বিস্তৃত ভিসা কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হয়, তবে বর্তমানে সীমিত কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও, আমরা প্রতিদিন ঢাকার অন্য যেকোনো কূটনৈতিক মিশনের তুলনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বেশি ভিসা ইস্যু করে থাকি।
আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রক্ষক হিসেবে যুবসমাজ আমাদের অংশীদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমসহ সকল অঞ্চল ও শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশি যুব ও তরুণ পেশাজীবীদেরকে প্রতি বছর ভারত প্রদত্ত বৃত্তির মাধ্যমে এটাই সুস্পষ্ট হয়। মাত্র দুই মাস আগে, ভারতের আইসিসিআর স্কলারশিপ নিয়ে আমাদের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পাঁচ শতাধিক অত্যন্ত মেধাবী বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী রওনা দেয়। আমাদের বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেলিগেশন, বা জনপ্রিয়ভাবে পরিচিত বিওয়াইডি কর্মসূচি, আমাদের ইয়ুথ আউটরিচের জন্য আরেকটি শক্তিশালী প্ল্যাটফরম, দেশব্যাপী যার আজ একটি গর্বিত অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক রয়েছে।
সব মিলিয়ে সংক্ষেপে বলা যায়, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল, ইতিবাচক এবং গঠনমূলক সম্পর্কের চেষ্টা চালিয়ে যাবে, যেখানে আমাদের জনগণ হবে প্রধান অংশীজন। আমরা অতীতে যেমন সমর্থন করেছি, তেমনই ভবিষ্যতেও একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও অগ্রসর বাংলাদেশকে সমর্থন করে যাবো।

আমরা শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য আমাদের জনগণের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এবং আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের অংশীদারিত্ব উভয় দেশের সাধারণ মানুষের জন্য উপকার বয়ে আনবে।
ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই আজ পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত ও সক্ষম। একই সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি ও উন্নয়নের পথ একে অপরের সঙ্গে আরও জড়িয়ে যাওয়ার ফলে আমরা আজ একে অপরের ওপর আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরশীল। আমাদের এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে ক্রমাগত শক্তিশালী করতে হবে।
ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সক্ষমতাসহ দু’টি উচ্চাকাঙ্ক্ষী সমাজ হিসেবে, আমরা একে অপরকে অনেক কিছু দিতে পারি এবং যদি আমরা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে, বাস্তবসম্মত ও গঠনমূলকভাবে জড়িত থাকতে পারি তবে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারবো। আমাদের বিশ্বাস, একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ভারতের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ভারত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এবং, একটি চূড়ান্ত প্রতিফলন। বাংলাদেশের বিক্ষোভপূর্ণ পরিবর্তন সত্ত্বেও আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, পরিবহন ও জ্বালানি সংযোগ এবং জনগণের মধ্যে সম্পৃক্ততা যে ইতিবাচক গতি বজায় রেখেছে, তা প্রমাণ করে যে আমাদের সম্পর্ক সত্যিই বহুমুখী এবং একক কোনো এজেন্ডা বা ইস্যুতে সেটা সীমাবদ্ধ নয়। কিছু বিরক্তিকর বিষয় রয়েছে, কিন্তু সেগুলো আমাদের সম্পর্কের সামগ্রিক অগ্রগতিকে সীমাবদ্ধ করতে পারেনি। দু’টি জাতি হিসেবে, যাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি আমাদের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক শিকড়ের মতোই পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, আমাদের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও পারস্পরিক সুবিধার বাস্তবতা রাজনৈতিক হাওয়ায় পরিবর্তনের পরও বারবার নিজেকে পুনর্ব্যক্ত করতে থাকবে।

আমাদের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গতিপথ ও আখ্যানকে আকার প্রদান করতে হবে, বস্তুনিষ্ঠতা আর সহানুভূতির সঙ্গে।
[এই নিবন্ধটি ঢাকায় সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ কর্তৃক আয়োজিত বে-অফ বেঙ্গল কনভারসেশনস ২০২৪ (বঙ্গোপসাগর সংলাপ ২০২৪)-এ হাইকমিশনার ভার্মার সামপ্রতিক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে রচিত।]

mzamin

একটি কনসার্ট খুন এবং যৌন হয়রানি দায় কার? by প্রতীক ওমর

তুমুল সমালোচনা চলছে। ঝড়ো সমালোচনা। নষ্ট তরুণদের মদ্যপান। উন্মাদ হয়ে প্রকাশ্যে সম্মিলিতভাবে নারীদের যৌন হয়রানি। যুবক খুন। সবকিছুই ঘটেছে পুলিশের উপস্থিতিতেই। বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ ঘটনাস্থল। দর্শন বিভাগের আয়োজনে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে রাত নামার সঙ্গে শুরু হয় অ্যাশেজ ব্যান্ড দলের কনসার্ট। তারপর উপচে পড়া ভিড়। রাতের অন্ধকারে হাজার হাজার তরুণদের মধ্যে উঠতি বয়সের তরুণীরাও যায় কনসার্ট দেখতে। আলো আঁধারের অবহে শত শত নারী যৌন হেনস্তার শিকার হয়। মদের বোতল হাতে অনেকেই মাতলামি শুরু করে। নারীদের শরীরে সম্মিলিতভাবে হাত দেয়ার দৃশ্য অনেকেই ভিডিও এবং ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিলে হৈচৈ পড়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে কনসার্ট নিয়ে।

বাসদের বগুড়া জেলা শাখার সদস্য সচিব দিলরুবা নূরী তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘২৬ নভেম্বর বিকাল থেকে কলেজ ক্যাম্পাসের দিকে ছিল তরুণ-তরুণীদের ঢল। রাত সোয়া ১০টায় যখন সাতমাথা হয়ে বাসা ফিরছিলাম তখন দেখলাম তরুণদের পদচারণায় শহরের প্রত্যেক পথ গিজ গিজ করছে। গাড়ি,  সিএনজি, রিকশা শহরে তখন নাই বললেই চলে। সব পায়ে হাঁটছে গন্তব্যের দিকে। তাদের মধ্যে একটা গ্রুপকে দেখলাম একটি ছেলে খালি গায়ে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, বুঝলাম সে এত বেশি মদ খেয়েছে যে মাতাল হয়ে গেছে।

তার আগে একবার নেটে ঢুকে দেখি কনসার্ট দেখাকে কেন্দ্র করে মেহেদি নামে এক যুবক ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছে। পরে বাসায় ফিরে এসে এক মেয়েকে লাঞ্ছিত করার ভিডিও দেখলাম’। ‘সবমিলে একটি কলেজের একটি ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে এরকম একটি আয়োজন কেন দরকার পড়লো দেশের এরকম একটি সময়ে। যখন কিনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসন এখনো শিক্ষার পরিবেশই ফেরাতে পারেনি। যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো সচল হয়নি। যখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়।’

সাংবাদিক অরূপ রতন তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অনুষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া এটা মোটেও কোনো বাহাদুরি কাজ নয়। এরমধ্যে আপনারা ঘটা করে আবার ঘোষণাও দিয়েছিলেন রাত ৮টায় জনপ্রিয় অ্যাশেজ ব্যান্ড দল মঞ্চে উঠবে। এজন্য সেখানে জনস্রোত তো হবেই। তবে এই জনস্রোতে কি কি ঘটতে পারে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকবে কিনা তা দশবার ভাবা দরকার ছিল। যার ফলাফলে আমরা দেখলাম একটা যুবকের খুন, অনেক নারীর শ্লীলতাহানি, ছোট ছোট মারামারি, বিদ্যুৎস্পৃষ্টে আহত একজন আর মাদকের অবাধ সেবন।

একজন শিক্ষক লিখেছেন, ফৌজিয়া বীথি, ‘শনিবার রাতে উত্তরবঙ্গের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ আজিজুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কনসার্টে মেয়েদের হেনস্তা, শ্লীলতাহানি নিয়ে একটা ভিডিও ফেসবুকে ঘোরাফেরা করছে।

একটা স্বনামধন্য বিদ্যাপিঠে এমনটা আমাদের কারোই কাম্য নয়’।

আব্দুস ছালাম নামের একজন লিখেছেন, ‘বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ ক্যাম্পাসে নামাজের সময় বন্ধ করা হয়নি কনসার্ট।
ওদিকে, বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে কনসার্ট চলাকালে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে মেহেদী হাসান (২৬) নামের এক যুবকের মৃতু্য হয়েছে। নিহত মেহেদী শহরের মালগ্রাম চাপড়পাড়া এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি পেশায় একজন থাই মিস্ত্রি ছিলেন। এ ছাড়াও ছাত্রীদের যৌন হামলার ঘটনাগুলো ফেসবুক জুড়ে ট্রল হচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কলেজ প্রশাসনকে দোষ দিচ্ছেন। এমন জঘন্য ঘটনার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি তোলা হয়েছে।

বিষয়গুলো নিয়ে বগুড়া পুলিশ সুপার জেদান আল মুসার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি বরাবরের মতোই ফোন রিসিভ করেননি। পরে বগুড়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন রঞ্জন সরকার মানবজমিনকে বলেন, পূর্ব শত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ধরতে এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। নিহতের মা সুখী বেগম বাদী হয়ে তিন জনকে আসামি করে বগুড়া সদর থানায় মামলা করেছেন।

তিনি বলেন, আয়োজক কমিটি বলেছিল অনুষ্ঠান ছোট হবে। এত বেশি মানুষের উপস্থিতি হবে না। কিন্তু বাস্তবে ছিল তার উল্টো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ যথাযথভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছে। 

mzamin

সিলেটে পীযূষের সাজা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

সিলেটের আলোচিত ক্যাডার পীযূষ কান্তি দে’র ১২ বছরের সাজা হয়েছে। সে বর্তমানে পলাতক রয়েছে। তার বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। দলিল জালিয়াতির ঘটনায় সিলেটের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শাহাদাত হোসেন প্রামাণিক এই রায় দেন। সূত্র জানিয়েছে, জালিয়াতির ও ভূমিদস্যুতার একটি মামলায় বৃহস্পতিবার দেয়া রায়ে পীযূষ ও তার সহযোগী ৮ জনের প্রত্যেককে ১২ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এ মামলার বাদী মিহির দেব নামে এক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন ভূমির প্রকৃত মালিক। তার ভূমি জালিয়াতি করে জোরপূর্বক দখল করতে চেয়েছিল পীযূষ। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে পীযূষের সহযোগী প্রণয়, বিনয় ভূষণ, নোমান ও দুলাল দত্তকে রায় ঘোষণার পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আর পীযূষ সহ বাকি ৪ জন পলাতক রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগের সাবেক ক্যাডার পীযূষ কান্তি দে নগরের মীর্জাজাঙ্গাল এলাকায় আসন গেড়ে বসে। ওখানে সে জমি দখল করে নিজের অপরাধ কর্মের অফিস ও ক্যাডারদের আস্তানা গড়ে তোলে। ফলে জমির মালিকরা তার দাপটের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। ২০১৯ সালের ২২শে জানুয়ারি ও একই বছরের ১২ই  সেপ্টেম্বর র‌্যাব-৯ পীযূষকে নগরের তালতলা এলাকায় গ্রেপ্তার করেছিল। পরে সে জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। ওই সময় তালতলার একটি হোটেল দখলের সময় তাকে অস্ত্র সহ আটক করা হয়। ইয়াবাও উদ্ধার করা হয় তার কাছ থেকে। তবে পীযূষের অপরাধ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা সোচ্চার ছিলেন। এ কারণে প্রশাসনিক ভাবে পীযূষ কোনো ছাড় পায়নি। বাদীপক্ষ জানিয়েছেন- আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় মামলা পরিচালনায় নানা ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। বাদীকে হুমকি দেয়া ছাড়াও সাক্ষীদের ভীতি প্রদর্শন করে সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত রাখে। বার বার বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করতে নানাভাবে সময়ক্ষেপণ করে। ৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করে রায় ঘোষণা করেন বিচারক। আদালতের  বেঞ্চ সহকারী জামিল আহমদ জানিয়েছেন- ‘পীযূষ সহ ৮ জনের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারজন কারাগারে ও চারজন পলাতক রয়েছেন। পলাতকদের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।’ এদিকে পরপর দু’বার গ্রেপ্তার হওয়ার পর পীযূষ পরবর্তীতে তার ওই অপরাধ আস্তানা ছেড়ে দেয়। ওই সময় সে জাল দলিল ও বালাম বইয়ের পাতা টেম্পারিং করে জমির বৈধতা নেয়ার চেষ্টা চালায়। এতে ভূমির মালিকরা নানা ধরনের হেনস্তার শিকার হন। একই সময় সিলেটের সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও  সে প্রভাব বিস্তার করে। অফিসের কয়েকজন কপিস্টকে হাত করে সে কয়েকটি ভুয়া দলিল সৃজন করে। একই সঙ্গে বালাম বইও পরিবর্তন করে ফেলে। এ নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলিল লেখকদের মধ্যে তোলপাড় হয়। এদিকে পীযূষের নানা বিতর্কিত ঘটনার পর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন খান ওই এলাকাতে তার ব্যক্তিগত অফিস করেন। এরপর থেকে পীযূষ মীর্জাজাঙালের ওই এলাকা ছেড়ে মন্দির এলাকায় তার দলবল নিয়ে অবস্থান নেয়। পীযূষ কান্তি সিলেট ছাত্রলীগের সাবেক দুর্ধর্ষ ক্যাডার। তার বাড়ি নগরীর শেখঘাট ভাঙাটিকর এলাকায়। তিনি বর্তমানে সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি। কয়েক বছর আগে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ভাঙচুরের দিন পীযূষ তার সঙ্গীদের নিয়ে সিলেট নগরে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেয়। ওই সময় সে নগরের আলহামরা শপিং সেন্টার ভাঙচুর ও আগুন দেয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও পীযূষের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অস্ত্রসহ বন্দুক হাতে থাকা পীযূষের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা দেখা দেয় সিলেট জুড়ে। এদিকে ৫ই আগস্টের পূর্বে সিলেটের রাজপথে সশস্ত্র অবস্থায় পীযূষ মাঠে ছিল। তার নেতৃত্বে ছিল কয়েকজনের একটি গ্রুপ। ওই গ্রুপের কর্মীদের হাতে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। দুর্ধর্ষ সব অস্ত্রবাজ নিয়ে নানা সময় নগরে মহড়া দেয়া হয়। আহতরা জানিয়েছেন- নগরের কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, বারুদখানা, জল্লারপাড় সহ কয়েকটি এলাকায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পীযূষের গ্রুপের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা জনতাকে উদ্দেশ্য করে গুলিবর্ষণ করে। জিন্দাবাজার এলাকার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- ৪ঠা আগস্ট সিলেটের রাজপথে যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শিত হয়েছে অতীতে কখনোই এত অস্ত্র প্রদর্শিত হয়নি। এসব আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ হন। ওই দিন নগরের জিন্দাবাজার থেকে গুলিবিদ্ধ কয়েকজনকে উদ্ধার করে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়। ৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর থেকে পীযূষের আস্তানা ও তার ভাঙাটিকরস্থ বাড়িতে উত্তেজিত জনতা হামলা চালায়। পীযূষের বাড়িতে ভাঙচুর ছাড়াও জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এরপর থেকে পলাতক রয়েছে পীযূষ। ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলিবর্ষণ, নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় ১০টিরও বেশি মামলায় আসামি হয়েছে সে। তার খোঁজে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একাধিক স্থানে অভিযান চালালেও খুঁজে পায়নি।
mzamin

একজন ‘বিদ্রোহী’ মুসলিম প্রিন্সেসের কাহিনী: স্বামীকে বললেন- আমাকে গুলি করো, না হয় আমিই করবো

আবিদা সুলতানা। ভারতের ‘বিদ্রোহী’ মুসলিম প্রিন্সেস। তিনি কোনো নিয়মনীতি মানতেন না। ইচ্ছে হলেই গুলি করে হত্যা করতেন বাঘ। খেলতে চলে যেতেন পোলো। মাথায় রাখতেন শর্ট চুল। চালাতেন বিমান। এমনকি মাত্র নয় বছর বয়স থেকেই তিনি রোলস-রয়েস চালাতেন। ১৯১৩ সালে ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য ভুপালে সাহসী বেগমদের এক পরিবারে জন্ম হয়েছিল তার। সে এখন থেকে এক শতাব্দীরও অনেক আগের কথা। ভারত তখন ছিল ইংরেজদের অধীনে। তা সত্ত্বেও আবিদা প্রথাগত সাধারণ মুসলিম নারীদের রীতি অনুসরণ করতেন না। মুসলিম নারী আবার কিছু হিন্দু নারীদের আচরিত পর্দা প্রথার বিরোধী ছিলেন তিনি। নারীরা পুরুষদের থেকে নিজেদের আলাদা করার জন্য এসব প্রথা ব্যবহার করতেন। কিন্তু সেই যুগে তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হন। কমপক্ষে এক দশক ধরে তিনি তার পিতার মন্ত্রিপরিষদ পরিচালনা করেন। ভারতের স্বাধীনতা যোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে থাকেন। ওই সময় ভুপালের শাসক ছিলেন তার দাদী সুলতান জেজান। তার তত্ত্বাবধানে তার শাসনের শিখাকে প্রজ্বলিত রাখার জন্য তিনিই আবিদাকে অল্প বয়স থেকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে থাকেন। আবিদা সুলতানা ২০০৪ সালে লেখা তার জীবনী ‘মোমোইরস অব এ রিবেল প্রিন্সেস’। এতে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে ওই সময় ভোর চারটার সময় তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হতো পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের জন্য। এরপরই শুরু হতো সারাদিনের কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে আছে খেলাধুলা, গান, ঘোড়া চালানো ও শিক্ষাগ্রহণ। এর মধ্যে ছিল ঘরের মেঝে ধৌত করা এবং বাথরুম পরিষ্কার করা। তার শৈশব নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে আবিদা সুলতানা বলেছেন, আমাদের লিঙ্গগত কোনো কারণে মেয়েদেরকে হীনমন্যতায় ভুগতে দেয়া হয়নি। সব কিছুতেই ছিল সমতা। একজন ছেলের যেসব স্বাধীনতা থাকে, আমাদেরও ছিল তেমন। আমরা পছন্দমতো যেকোনো খেলা খেলতে পারতাম। গাছে চড়তে পারতাম। কোনো বিধিনিষেধ ছিল না।

শৈশব থেকেই আবিদা সুলতানার মধ্যে ছিল তীব্র স্বাধীনচেতা মনোভাব। ১৩ বছর বয়সে দাদী যখন তাকে পর্দায় ঢাকতে চেষ্টা করেন, তখন তিনি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তার পিতার বিশাল মানসিকতা ও নিজের আত্মবিশ্বাস তাকে বাকি জীবনে নিজে কি করবেন সেই স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করেছে। ইতিমধ্যেই ভুপালের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়েছেন আবিদা। তা সত্ত্বেও মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রতিবেশী কুরাওয়েই রাজ্যে রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার সুযোগ আসে তার জীবনে। তার বাল্যবন্ধু ও কুরাওয়েইয়ের শাসক সারওয়ার আলি খানকে বিয়ে করেন।  বিবাহ সম্পর্কে বলেছেন এতে কোনো ক্লু ছিল না। একদিন তার কাজিনদের সঙ্গে বালিশযুদ্ধে মত্ত ছিলেন। আবিদা লিখেছেন, এমনই একদিন তার দাদী ওই রুমে প্রবেশ করেন এবং তাকে বিয়ের পোশাক পরতে বলেন। কিন্তু কেউই বলেননি যে- তিনি বিয়ের পাত্রী। আবিদা লিখেছেন- ‘কীভাবে আমাকে প্রস্তুত করতে হবে তা কেউ বলেনি। কেউ নির্দেশনাও দেয়নি। ফলে আমি বিয়ের আসরে হেঁটে উপস্থিত হই। আমার পথে ভিড় করা নারীদের সরিয়ে দিয়ে উন্মুক্ত মুখে এগিয়ে যাই। নতুন কিছু অভিজ্ঞতা হলো।
এই বিয়েটা আবিদার মতোই স্বল্প স্থায়ী ছিল। টিকে ছিল এক দশকেরও কম সময়। বিবাহিত জীবন ছিল তার কাছে বেশ কঠিন। শুধু যে তার বয়স অল্প এ জন্য সমস্যা ছিল এমন নয়। এর কারণ ছিল কঠোর ধর্মীয়ভাবে লালনপালনের কারণে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যৌনতার বিষয়ে জ্ঞানের স্বল্পতা এবং অস্বস্তি তার বিয়েতে কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল। আবিদা সুলতানা লিখেছেন- আমার বিয়ের পরপরই আমি বিবাহিত জীবনে এক ট্রমা অবস্থায় প্রবেশ করি। আমি বুঝতে পারিনি যে, এরপর যা আসবে আমার জীবনে তা এতটা ভীতিকর, অসাড় এবং অস্বস্তিকর হবে। এর ফলে যে সমস্যা সৃষ্টি হয় সে সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে বৈবাহিক যে সম্পর্ক তিনি তা মেনে নিতে পারেননি। এ জন্যই তার বিয়ে ভেঙে যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম নারীদের আত্মজীবনীতে অন্তরঙ্গতা ও যৌনতার বিষয়ে গবেষণা করেন ইতিহাসবিদ সিওভান ল্যাম্বার্ট-হার্লি। তিনি তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন, কীভাবে আবিদার সৎ স্বীকারোক্তি মুসলিম নারীদের তাদের স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটায়। এসব বিষয়ে মুসলিম নারীরা লিখতে চান না।  

বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর আবিদা কুরওয়াইয়ে তার শ্বশুরালয় ত্যাগ করেন এবং ফিরে যান ভুপালে। কিন্তু তাদের একমাত্র ছেলে শাহরিয়ার মোহাম্মদ খানকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে কাস্টডিয়ান বিরোধ সৃষ্টি হয়। দিনমান লড়াইয়ে হতাশ হয়ে এবং ছেলেকে আলাদা করতে না চেয়ে আবিদা বিরাট এক পদক্ষেপ নেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন স্বামীর গৃহে ফিরে যাবেন। ১৯৩৫ সালের মার্চের এক উষ্ণ রাতে টানা তিন ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আবিদা সুলতানা ছুটে যান তার স্বামীর কুরওয়াইয়ের বাড়িতে। তার বেডরুমে প্রবেশ করেন আবিদা। একটি রিভলবার বের করেন। তা তার স্বামীর দিকে ছুড়ে দিয়ে সাহসী উচ্চারণে বলেন- ‘আমাকে গুলি করো, না হয় আমি তোমাকে গুলি করবো’। এই ঘটনায় এই দম্পতির মধ্যে শারীরিক সংঘাত পর্যন্ত হয়। তাতে আবিদা বিজয়ী হন। তাতে সন্তানের কাস্টডি কার কাছে থাকবে সেই বিরোধের অবসান হয়। একজন সিঙ্গেল মা হিসেবে ছেলেকে বড় করতে থাকেন। একই সঙ্গে সিংহাসনের দায়িত্বও পালন করতে থাকেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি নিজের রাজ্যের মন্ত্রিপরিষদ পরিচালনা করেন। তারপর ভুপাল যুক্ত হয় মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে।
ভারত সরকারের ভবিষ্যতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে সে বিষয়ে বৃটিশ সরকারের ডাকা এক গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন আবিদা সুলতানা। এ সময়ই ভারতের মহান নেতা মহাত্মা গান্ধী, মতিলাল নেহরু তার ছেলে জওয়াহেরলাল নেহরুর মতো নেতাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন জওয়াহেরলাল নেহরু।  হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্কের যে অবনতি যাচ্ছিল, তিনি সে বিষয়েও কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর যে সহিংসতা সৃষ্টি হয় তা দমনেও তিনি ভূমিকা রাখেন। আবিদা তার স্মৃতিকথায় ভুপালে যে বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছেন তারও বর্ণনা করেছেন। এতে আছে তার পরিবারকে কীভাবে বহিরাগত হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছিল। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে যে সহিংসতা দেখা দিয়েছিল সে সম্পর্কে তিনি স্মৃতিকথায় বিরক্তিকর বর্ণনা দিয়েছেন।
একদিন ভারত সরকার তাকে জানায় যে, মুসলিম শরণার্থীদের নিয়ে একটি ট্রেন পৌঁছাবে ভুপালে। তিনি সেখানে যে তাদেরকে তত্ত্বাবধান করতে উপস্থিত থাকেন। আবিদা সুলতানা লিখেছেন- ‘যখন (ট্রেনের) কম্পার্টমেন্ট খোলা হলো, দেখা গেল তার ভেতরে সবাই মৃত’। আবিদা বলেন, এই সহিংসতা ও অবিশ্বাস তাকে ১৯৫০ সালে পাকিস্তান চলে যেতে বাধ্য করেছিল। তারপর থেকে তিনি তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় একেবারে নীরব ছিলেন। পাকিস্তানে তিনি গণতন্ত্রের পক্ষের একজন চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নারীদের অধিকারের পক্ষে লড়াই করেছেন। ২০০২ সালে করাচিতে তিনি মারা যান। তিনি পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পর ভারত সরকার তার বোনকে সিংহাসনে বসায়। কিন্তু ভুপালে আবিদা এখনো সর্বজন পরিচিত। সেখানে জনগণ তাকে ‘বিয়া হুজুর’ ডাক নামে চেনেন।

mzamin

নিয়ত সহিহ একতরফা নির্বাচনে বিশ্বাস করি না

দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন এ এম এম নাসির উদ্দীন নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচন কমিশন। গতকাল দুপুর দেড়টায় সুপ্রিম কোর্ট জাজেজ লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ নিয়েই ভালো নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন। বলেন, আশ্বস্ত থাকুন, আমাদের নিয়ত সহিহ। আমি কনফিডেন্টলি বলতে পারি, ভালো নির্বাচন হবে। এদিকে শপথগ্রহণের পর দুপুর ২টা ৫০ মিনিটের দিকে নির্বাচন কমিশনে পৌঁছান সিইসিসহ চার কমিশনার। এ সময় তাদেরকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। পরে বিকালে নির্বাচন কমিশনের সাংবাদিকদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন করে নবগঠিত কমিশন। সিইসি বলেন, আমরা একতরফা নির্বাচনে বিশ্বাস করি না। একতরফা নির্বাচন করে দেশের বারোটা বেজে গেছে। প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের জন্য আমরা একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে দেবো।

শপথ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট থেকে বের হওয়ার পর সিইসি বলেন, শপথ নিয়েছি। শপথের সম্মানটা রাখতে চাই। আমি এই দায়িত্বটাকে নিজের জীবনের বড় অপরচুনিটি হিসেবে দেখছি। অপরচুনিটি টু সার্ভ দ্য নেশন। দেশের মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। তারা অবাধ ও নিরপেক্ষ একটা নির্বাচনের জন্য অনেক সংগ্রাম করেছে। অনেক আন্দোলন করেছে বিগত বছরগুলোয় এবং অনেকে রক্ত দিয়েছে। আমি তাদের একটা অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য সর্বোচ্চটুকু করবো।

বিশেষ পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করবেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমন বিশেষ পরিস্থিতি আমার চাকরি জীবনে অনেক এসেছে, আমি তথ্য মন্ত্রণালয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলাম। জীবনে বহু চ্যালেঞ্জ দেখেছি। সফলভাবে মোকাবিলা করেছি। এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সাহস এবং অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ আসুক সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ওভারকাম করবো।  
নাসির উদ্দীন বলেন, সংস্কার একটা চলমান প্রক্রিয়া। একটা নির্বাচন করতে গেলে কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার তো লাগবেই। কেউ প্রপোশনাল রিপ্রেজেন্টেশন, আবার কেউ বলে আগের সিস্টেমে ইলেকশন। সংবিধানে যদি এটা ফয়সালা না হয়, আমরা নির্বাচনটা করবো কীভাবে? নির্বাচন করতে গেলে নতুন প্রজন্ম, যারা ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছে বছরের পর বছর, তাদের তো ভোটার তালিকায় আনতে হবে। ভোটার তালিকা করতে হবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশন কাজ করছে উল্লেখ করে সিইসি বলেন, তারাও সংবিধানের বিষয়ে সাজেশন দেবেন। আমি ও আমার টিম সংবিধানের প্রোডাক্ট। সংবিধান যদি ঠিক না হয়, তাহলে আমাদের যাত্রা এলোপাতাড়ি হয়ে যাবে। সুতরাং এই কার্যক্রমও শেষ হোক। সব সুপারিশ আসুক। বেশিদিন তো নেই। উনারা তো বলছেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছে। অতি অল্প সময়, আপনারা আশ্বস্ত থাকুন। এবারের মতো সুযোগ আগে ছিল না বলে উল্লেখ করেন নাসির উদ্দীন। তিনি বলেন, শুধু আমরা নই, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করবে। তারা ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে বলে আসছে তারা ভোটের অধিকার চায়, অবাধে ভোট দিতে চায়। সুতরাং তাদের সঙ্গে পাবো। তাদের ডিমান্ডটা বাস্তবায়নে আমরা সহযোগিতা করবো। সুতরাং আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। তারাও জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ।

এদিকে নির্বাচন কমিশনে সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেন, নির্বাচনকে প্রভাবিত করা, ভোট চুরিসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জ থাকবে। আরও বহু চ্যালেঞ্জ আছে যা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। আমরাও জানি না। এগুলো আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সব প্রচেষ্টা নিবেদিত থাকবে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা যেন দেশের সব ভোটার নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। আমরা একতরফা নির্বাচনে বিশ্বাস করি না। একতরফা করে দেশের বারোটা বেজে গেছে। গায়ের জোরে নির্বাচন করে যা হওয়ার তা হয়েছে। আমরা একতরফা বা গায়ের জোরে নির্বাচন দেখতে চাই না। প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের জন্য আমরা একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে দেবো।

আরেক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে শতভাগ ফেয়ার নির্বাচনের। আগে ডামি নির্বাচন হয়েছে, ১৫৩ জন বিনা ভোটে এমপি হয়েছেন। আমাদের আগমন এগুলো মোকাবিলা করতেই। এজন্যই আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন মনে হচ্ছে। এটাকে আমি সুযোগ হিসেবে নিচ্ছি।
আপনারা কি প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করতে পারবেন-এমন প্রশ্নে নবনিযুক্ত সিইসি বলেন, এই সরকার সেই সরকার নয়, যেই সরকার চাপ দেয়। আগের সরকার দলীয় এজেন্ডার জন্য চাপ দিয়েছিল। এই সরকারের দলীয় এজেন্ডা নেই। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন যে, উনার কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নাই। উনি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতা দিতে চান। আমাদের কোনো চাপ নেই এবং থাকবে না।

কবে নাগাদ নির্বাচন দেবেন-এমন প্রশ্নে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, দিনক্ষণ এখন তো বলা যাবে না। আগে কাজকর্ম বুঝে নিই। ইতিমধ্যে ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে ইসি সংস্কার কমিশন এবং প্রফেসর ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছে। তাদের গ্রহণযোগ্য পরামর্শগুলো আমরা নেবো। পরে ভোট করার মতো সবকিছু যখন প্রস্তুত হবে, তখনই আমরা নির্বাচনের তারিখ নিয়ে চিন্তা করতে পারবো। এ ছাড়া কেউ বলে ৩০০ আসনের ভোট হোক, আবার কেউ ৪০০ আসনের কথা বলে। আসন সংখ্যা ফয়সালা না হলে আমি কীভাবে নির্বাচন করবো। সুতরাং প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো তো ফয়সালা হতে হবে। তাছাড়া সম্ভব না।

আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনে আনার ইচ্ছা আছে কি-না এবং সংলাপে ডাকা হবে কি-না এমন প্রশ্নে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, অনেক বিতর্ক চলছে, বিতর্কের ফয়সালা হোক। আমরা ফয়সালার অপেক্ষা করছি। ফয়সালা হলে আপনারা দেখতে পারবেন।  

তিনি বলেন, কারও ডিজায়ারের কারণে আমাদের নিযুক্ত করা হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নাম চাওয়া হয়েছিল, তারা বিভিন্ন পদের এগেনেস্টে অনেক নাম দিয়েছে। ওই নামগুলো থেকে তারা বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে আমাদেরকে বাছাই করেছে। সুতরাং একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা এসেছি।

আপনারা জানেন জাতি এখন একটা ক্রান্তিকালের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে আমাদের এই দায়িত্ব একটা গুরুদায়িত্ব। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবো। জাতির প্রত্যাশা পূরণে আমরা আমাদেরকে নিয়োজিত রাখবো। তিনি বলেন, জাতির প্রতি যে ওয়াদা ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ক্রেডিবল নির্বাচন দেয়ার জন্য যা যা করার দরকার করবো। অনেক কঠিন কাজ জীবনে করতে হয়েছে। আমার জীবনে কোনো ব্যর্থতা নাই।

ওদিকে এ সময় নবনিযুক্ত নির্বাচন কমিশনার, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ আবদুর রহমান মাসুদ, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব বেগম তাহমিদা আহমদ ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

mzamin

ট্রেড ইউনিয়ন করার শর্ত শিথিলসহ ১১ দফার বাস্তবায়ন চায় যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশে শ্রম অধিকার সংক্রান্ত ১১ দফার দ্রুত বাস্তবায়ন চায় যুক্তরাষ্ট্র। এসব দফা বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অগ্রাধিকার বাণিজ্য সুবিধাও (জিএসপি) পাওয়া যাবে। রোববার ঢাকায় সচিবালয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্তর্জাতিক শ্রমবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি সফররত কেলি এম ফে রদ্রিগেজের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এমন আশাবাদের কথা শোনান বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। এ সময় বাণিজ্যসচিব মোহাং সেলিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, আমরা কতো দ্রুত শ্রম অধিকারের এই ১১ দফা বাস্তবায়ন করতে পারি, সেটা নিয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে। এগুলো করতে পারলে আমরা অবশ্যই জিএসপি সুবিধা পাব। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলটি আলোচনায় ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের বিষয়ে জোর দেয়। এসব অধিকার এখনো আছে, তবে বিপরীতে রয়েছে নানা শর্ত। যুক্তরাষ্ট্র চায় শর্তগুলো শিথিল করা হোক। অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব দফা বাস্তবায়নে প্রতিনিধিদলকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের একটি দল বাংলাদেশের শ্রম অধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি কর্মপরিকল্পনা জানিয়ে যায়। ওই কর্মপরিকল্পনায় মোটাদাগে ১১টি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। এর প্রথমটিই হচ্ছে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, শ্রমিক ও শ্রম অধিকারকর্মীদের যারা নিপীড়ন করেন ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালান, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এরপরই রয়েছে শ্রমিকনেতা ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কাজ করে, এমন কারখানার মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা। এ ছাড়া রয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলো যে মানের অধিকার ভোগ করে, সে অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রম আইন ও বিদ্যমান শ্রমবিধি সংশোধন।

আরও যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোর (ইপিজেড) শ্রমিকেরা যাতে পুরোদমে ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারেন, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) আইনের ৩৪ নম্বর ধারা সংশোধন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় (এসইজেড) সেটির প্রয়োগ এবং সেখানকার শ্রমিকেরা যাতে সংগঠিত হতে পারেন ও সম্মিলিতভাবে দর-কষাকষিতে সক্ষম হন, তা নিশ্চিত করা; ট্রেড ইউনিয়ন করার আবেদনের প্রক্রিয়া ৫৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা; শ্রম অধিদপ্তরের মাধ্যমে তার বিদ্যমান অনলাইন নিবন্ধন পোর্টালে অপেক্ষমাণ থাকা সব আবেদনের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ; বার্ষিক বাজেটের মাধ্যমে শ্রম পরিদর্শক নিয়োগ ও এজন্য তহবিল বরাদ্দ দেয়া; আরও শ্রম পরিদর্শকের পদ অনুমোদন এবং নিবন্ধন বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করার অভ্যাস বন্ধ করা ইত্যাদি।

বাণিজ্য সচিব বলেন, এসব বিষয়ে প্রধানত কাজ করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। শ্রমিকের জীবনযাপন, মানোন্নয়ন ও ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম করার জন্য এগুলো করা হচ্ছে। আমরা সবাই এক লাইনেই কাজ করছি। আমরা আমাদের দিক থেকে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাণিজ্য আরও বৃদ্ধি করা যায়, তা নিয়ে তাগিদ দিয়েছি। তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন। তারা আমাদের শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যূনতম মজুরিসহ অন্যান্য বিষয়ে নজর দিতে বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যে প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রপ্তানি করতে হয়, এ বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব বলেন, কথা বলেছি। জিএসপি সুবিধা থাকলে এটা দিতে হতো না। বলেছি, জিএসপি সুবিধায় আমরা থাকতে চাই। শুল্ক ও কোটামুক্ত পণ্য রপ্তানির যে সুবিধা আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পাচ্ছি, সেটা আমরা সব জায়গায় চাচ্ছি। তাদেরও বলেছি। কিন্তু তারা সেই লাইনে কোনো কথা বলেননি।

mzamin

গুলিতে হাবিবের মৃত্যু: অকূল পাথারে দুই সন্তান by ফাহিমা আক্তার সুমি

ছোটবেলা থেকে বাবা অনেক কষ্ট করেছেন। আমাদের চার ভাইবোনকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। অভাবে থেকেও আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। আমরা কীভাবে বাবাকে ভুলে থাকবো। এত অল্প বয়সে আমরা বাবাকে হারিয়েছি। বাবাকে ছাড়া আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখছি না।

কথাগুলো বলছিলেন গত ২০শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে নিহত মো. হাবিবের মেয়ে ফাতেমা আক্তার। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন পরিবারটি। ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী ও সন্তানরা। ফাতেমা বলেন, বাবার মৃত্যুর পর একমাত্র ভাইয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে। পরিবারের হাল ধরতে সে একটি কারখানায় চাকরি নিয়েছে। এ বছর আমি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছি। বাবাকে ছাড়া কোনোমতে ঢাকায় টিকে আছি। একমাত্র ভাইকে বাবা মাওলানা বানাতে চেয়েছিলেন সে যতদূর পড়াশোনা করবে ততদূর তাকে পড়াবে। আমাদের সবাইকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল বাবার। আমারও অনেক ইচ্ছা ছিল বাবার স্বপ্ন পূরণ করবো। এখন পড়াশোনাটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আমি পরিবারের বড় সন্তান। ভাই ও আমাকে মিলে দু’জনে কিছু একটা করে সংসারের হাল ধরতে হবে। আমার ছয় ও দেড় বছরের দুইটা বোন আছে। ছয় বছরের বোনটা প্লে-তে পড়ে। পরিবারের বড় সন্তানের প্রতি একটা দায়িত্ব থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক পড়ার স্বপ্ন ছিল আমার কিন্তু কতোটুকু পড়াশোনা করতে পারবো জানি না। ছোটবেলায় আমরা অনেক টানাটানির মধ্যে বড় হয়েছি। যত কষ্ট হোক বাবা আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। আমার অনেক স্বপ্ন ছিল বড় হবো, নিজে কিছু করবো, বাবার পাশে দাঁড়াবো। এটা কখনো ভাবিনি যে বাবা এত আগে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। আমার বাবা অনেক প্রশংসা করতো সবসময় যে আমার মেয়েটা আমার পাশে থাকতে চায়। কীভাবে আমরা ভুলে থাকবো আমার বাবাকে।
তিনি বলেন, মা আমাদের নিয়ে চিন্তিত। সে পড়াশোনা খুব একটা জানে না। আমাদের জন্য কিছু একটা কাজ করতে চায় কিন্তু দুইবোনই আমার ছোট তাদের নিয়ে কীভাবে কি করবে। দুইবোন ও সংসার সামলাতে গিয়ে মায়ের সারাদিন চলে যায়। বর্তমানে শনির আখড়া পাটেরবাগে ভাড়া বাসায় থাকি। বাবা যা আয় করেছেন সব আমাদের পেছনে খরচ করতেন। আমার বাবা জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন সেও ছোটবেলায় তার বাবাকে হারায়। আমাদের গ্রামের বাড়ি ভোলা লালমোহন থানায়। আমরা অনেক আগে ঢাকায় আসি। গ্রামেও আমাদের তেমন কিছু নেই। কমলাপুর শেরেবাংলা কলেজ থেকে এইবার মানবিক বিভাগ থেকে ৩.৫৮ পেয়ে এসএসসি পাস করেছি। আমার ছোট বোন বাবার ছবি হাতে নিয়ে বাবা বাবা করে ডাকতে থাকে। আর মেজো বোন বাবার স্মৃতিগুলো সবসময় বলতে থাকে।

ওইদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফাতেমা বলেন, আমার বাবা গাড়িচালক ছিলেন। সিএনজি, বাস, প্রাইভেটকার যখন যেটা পেতেন সেটি চালাতেন। আন্দোলন যখন চলছিল তখন রাস্তা-ঘাট বন্ধ ছিল। বাবার হাতেও খুব একটা টাকা ছিল না। তবুও বাবা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যেতো কিন্তু এটা বাসায় কাউকে বলতো না। সে আন্দোলনে গিয়ে ছাত্রদের পানি, খাবার দিতো। ২০শে জুলাই আড়াইটার দিকে আমার বাবা আন্দোলনকারীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছিলেন। শনির আখড়ায় খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করছিল। এ অবস্থায় পুলিশের গুলিতে আমার বাবা গুলিবিদ্ধ হয়। তার বুকে গুলি লাগে। দুজন পথচারী কিছুক্ষণ পর বাবাকে ধরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেয়। সেখানে কোনমতে ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢাকা মেডিকেলে পাঠায় চিকিৎসার জন্য। ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার পর তিনি বিকালের দিকে মারা যান। খবর পেয়ে আমি আর আমার ভাই সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি বাবা শুয়ে আছেন তখন বাবাকে ডাকি কিন্তু ওঠে না। পাশে থাকা একজন চিকিৎসক বলেন উনি মারা গেছেন এটি শুনেই আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। বাবার লাশ আনতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। প্রায় দুইদিন পর আমরা মরদেহ বুঝে পাই। তখন গ্রামে নেয়ার পরিস্থিতি ছিল না সেজন্য বাবাকে দাফন করা হয় জুরাইন কবরস্থানে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার বাবা অনেক ভালো মনের মানুষ ছিলেন। কখনো কারও বিপদে ঘরে বসে থাকতেন না। বাইরে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে বাবাকে বের হতে নিষেধ করেছিলাম। বলেছিলাম বাবা আমাদের আর কে আছে, তোমার কিছু হয়ে গেলে আমাদের কি হবে? বাবা বলেন, ‘তোর বাবার বুকে অনেক সাহস আছে, কিছু হবে না, আমি একজন মানুষ হয়ে এভাবে ঘরে বসে থাকতে পারি না।’ বাবার মৃত্যুতে ছোট ভাই একটি কারখানায় চাকরি নিয়েছে পরিবারের হাল ধরতে। কারণ আমাদের তো চলতে হবে, কে দেখবে আমাদের। আমার ভাইয়ের ইনকামে কিছু হয় না আমাদের। কীভাবে যে আমাদের দিন যাচ্ছে সেটি আমরা জানি। তিনি আরও বলেন, আমরা কোথাও থেকে এখনো তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। কিছুদিন আগে জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে কল করে তথ্য নিয়েছে কিন্তু এখনো আমরা কোনো খবর পাইনি। আমরা কার কাছে যাবো, কোথায় যাবো? কোনো কিছুই চিনি না। এখন আমাদের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত আছি। পড়াশোনা তো আমার ভাই বন্ধ করেছে এখন আমিও কি পড়তে পারবো। আমার বাবা আমাকে কম্পিউটারের কাজও শিখিয়েছিলেন। আমার ইচ্ছা আছে পড়াশোনা করার। আমি নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমার ছোট ভাইবোনগুলোকে দেখে রাখতে চাই। 

mzamin

তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে সবাই একমত

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সঙ্গে নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা সংলাপ করেন। সংলাপ শেষে সংস্কার কমিশনের প্রধান এ কথা জানান।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আগের নির্বাচন কমিশন যে বিতর্কিত, কলঙ্কজনক ও পাতানো নির্বাচন করেছে, তার মাধ্যমে তারা শপথ ভঙ্গ করেছে, সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। তাদের বিচারের আওতায় আনার কথা প্রায় সবাই বলেছেন।

রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে- তা আশা করা দূরাশা বলে মনে করেন সংস্কার কমিশনের প্রধান। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে। কমিশনকে আর্থিক স্বাধীনতাও দিতে হবে। এমন শক্তিশালী ও স্বাধীন হতে হবে যে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের অধীন একটা সরকার হতে হবে।

জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সরাসরি আসন থাকতে হবে এবং প্রত্যক্ষ নির্বাচন হতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, আমরা যে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতির কথা বলেছি, তা-ও হতে পারে, অন্য পদ্ধতিও হতে পারে। এ ছাড়া সংলাপে নির্বাচন কমিশনের আইন পরিবর্তন করা, পিআর সিস্টেমসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সরাসরি নির্বাচনের কথা অনেকে বলেছেন। রাষ্ট্রপতির পদকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলেছেন। এ ছাড়া সংলাপে না ভোটের বিধান রাখার ব্যাপারে সবাই একমত ছিলেন বলেও জানান তিনি।

সংলাপে অংশ নিয়ে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, প্রার্থীদের মধ্যে কাউকে পছন্দ না হলে যেন না ভোট দেয়া যায়, সেই ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। নির্বাচনে কারও প্রতি অন্যায় হলে তিনি মামলা করেন। সেই মামলা নিষ্পত্তি হতে হতে টার্ম (মেয়াদ) চলে যায়। তখন বাদী বিচার পান না। তিনি প্রস্তাব দেন, নির্বাচন কমিশনের মধ্যে একটা বিচারের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে, যাতে কমিশনই দ্রুততার সঙ্গে বিচার করতে পারে। যাতে বাদী বঞ্চিত না হন, তিনি তার অধিকার ফিরে পেতে পারেন।

আরেকটি প্রস্তাব সম্পর্কে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, বিগত সরকারের সময় নির্বাচন কমিশন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনসহ (ইভিএম) নানা কিছু কিনে অনেক টাকা তছরুপ করেছে। যার কারণে সাধারণ মানুষের নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা থাকে না। স্বচ্ছতা কীভাবে নির্বাচন কমিশনের মধ্যে আনা যেতে পারে, সেটার ব্যবস্থা করতে হবে।

সংলাপে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান তার মতামত দিয়েছেন। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সভায় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন সত্তার বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। সভায় আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মত এসেছে। কেউ কেউ বলেছেন, এটা মিশ্র পদ্ধতিতে আসা উচিত। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ করা, স্বচ্ছভাবে দলীয় অর্থায়ন করা, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব অংশীজনের সক্রিয় সংশ্লিষ্টতা থাকার কথাও সভায় আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। তার বক্তব্য, সভায় নির্বাচনে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং না ভোটের প্রসঙ্গও এসেছে।

mzamin

অরাজকতা

বিক্ষোভ, ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ, অবস্থান কর্মসূচি। রোববার রাজধানীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। পুরান ঢাকায় হাসপাতালে কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জেরে ওই এলাকায় তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। হাসপাতালসহ ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। পরীক্ষা চলাকালে সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজে হামলা হলে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। কলেজটিতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। হামলা-সংঘর্ষের সময় ওই এলাকায় এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ওদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক ও মালিকদের বিক্ষোভ হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় অনেক এলাকায়। এতে দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। উচ্চ আদালত থেকে অটোরিকশা বন্ধের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করার দাবিতে অটোরিকশা চালকরা কয়েকদিন থেকেই এই আন্দোলন করছেন। গতকাল বিকালে সরকারের আশ্বাস পেয়ে অবশ্য চালকরা আন্দোলন স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন।
ওদিকে কাওরান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে দিনভর বিক্ষোভ করেছেন একদল লোক। তারা পত্রিকাটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলে এই কর্মসূচি পালন করেন। পত্রিকা কার্যালয়ের সামনে গরু জবাই করে ‘জিয়াফত’ এর আয়োজন করা হয়। দুপুর থেকে চলা এই অবস্থান ও বিক্ষোভ সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়। আন্দোলনকারীদের সরে যেতে বারবার অনুরোধ করেও সাড়া না পেয়ে সন্ধ্যার পর কঠোর অবস্থানে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা আন্দোলনকারীদের সরাতে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা অলিগলিতে সরে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

অটোরিকশাচালকদের সড়ক অবরোধ, দুর্ভোগ
রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল তিন দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশনার প্রতিবাদে গতকালও বিভিন্ন এলাকায় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন চালকরা। সকাল থেকে ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় জড়ো হতে থাকেন তারা। একপর্যায়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন অটোরিকশাচালকরা। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। এরমধ্যে যাত্রাবাড়ী এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

গতকাল সকাল ১০টায় যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ব্যাটারিচালিত রিকশা চালকরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ অবস্থান নেয়। এ সময় পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সড়ক স্বাভাবিক করতে আন্দোলনরত রিকশাচালকদের ধাওয়া করে স্থানীয় বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। এ সময় কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে চালকরা। পরে কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থী খবর পেয়ে রিকশাচালকদের ধাওয়া দেয়। রিকশাচালকরা সড়ক ছেড়ে পালিয়ে যায়। সোহেল নামে রিকশাচালক বলেন, কয়েক মাস আগে সমিতি থেকে কিস্তি নিয়ে রিকশাটি কিনছি। এখন যদি চলতে না দেয়, তাহলে আমরা পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো। আমাদের কিস্তির টাকা দিতেও কষ্ট হয়ে যাবে। এ বিষয়ে ওয়ারী জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিন বলেন, অটোরিকশাচালকরা সকাল ১০টার দিকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার মোড়ে সড়ক বন্ধ করে বিক্ষোভ করে। খবর পেয়ে আমি রিকশাচালকদের সড়ক থেকে সরে যেতে বললেও তারা রাজি হয়নি। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে থাকা কিছু দুষ্কৃতকারী বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুর করে। হামলায় কয়েকজন যাত্রীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। পুলিশ বাধা দিলে তারা পুলিশকে দেখে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়।

এদিকে ১২ দফা দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের ব্যানারে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। সকালে প্রেস ক্লাবে এসে জড়ো হন অটোরিকশার চালকরা। সকাল থেকে মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মাজার মোড় ও কদম ফোয়ারা হয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আসেন তারা। অটোরিকশা বন্ধে হাইকোর্টের আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন তারা। এতে হাইকোর্ট থেকে কদম ফোয়ারা এবং প্রেস ক্লাব থেকে পল্টন পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। আন্দোলনকারীদের দাবি, দ্রুত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। একইসঙ্গে রুট পারমিট দিতে হবে। অটোরিকশা চালকদের গণঅবস্থান কর্মসূচি থেকে জানানো হয়, আজ বেলা ১১টায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর সঙ্গে বৈঠকে বসবে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন।

মোহাম্মদপুরেও একই দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকরা। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে তাদের এই অবরোধের ফলে মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, মিরপুর ও গাবতলী সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন এই রুটে চলাচল করা মানুষজন। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার হাসান বলেন, হঠাৎ সকাল সাড়ে ১০টা দিকে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ চার রাস্তার মোড় ও ঢাকা উদ্যান এলাকায় অটোরিকশাচালকরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশাচালকরা অবস্থান নেয়ায় যানজটে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে। বাসের দূরের যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয় যানজটে। অনেকে আবার পায়ে হেঁটে ছোটেন গন্তব্যে। যাত্রীরা উষ্মা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, প্রতিদিনই সড়ক অবরোধের ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের। সড়ক অবরোধ না করে আন্দোলন চালানোর পরামর্শও দেন তারা। আব্দুল্লাহ নামের এক বাসযাত্রী বলেন, এখন কোনো আন্দোলন হলেই সড়ক অবরোধ করে দেয়া হচ্ছে। আমাদের হেঁটে অফিস করতে হয়। আমাদের ভোগান্তির কথা কেউ চিন্তা করে না।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সম্পর্কে উচ্চ আদালত থেকে একটি ভালো নির্দেশনা আসবে বলে আশা করছি। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করবো। গতকাল সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভা শেষে এসব কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এই সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান হবে। এর আগে আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচির আহ্বান জানাচ্ছি।

মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর এলাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল তিন দিনের মধ্যে বন্ধ বা বিধিনিষেধ আরোপ করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ঢাকার জেলা প্রশাসক, দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ বিবাদীদের রুলসহ এই নির্দেশ দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। এর পর বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করা হয়। এ ছাড়া মিরপুর, মালিবাগ, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, আগারগাঁও, নাখালপাড়া, রামপুরা, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। পরদিন শুক্রবার ঢাকার জুরাইনে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন চালকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের, ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।  

পুরান ঢাকায় তুলকালাম, দুই কলেজে ব্যাপক ভাঙচুর
হাসপাতালে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তুলকালাম ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর পুরান ঢাকা এলাকায়। বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থী মিলে ন্যাশনাল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কাজী নজরুল ইসলাম কলেজে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছেন। এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের প্রথম বর্ষের ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। পরীক্ষা চলার সময়েই এই হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন।

ঘটনার সূত্রপাত ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত ড. মাহাবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের (ডিএমআরসি) এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ কলেজটির শিক্ষার্থী অভিজিতের মৃত্যু ভুল চিকিৎসার কারণে হয়েছে। এমন দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের ওপর শনিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজের কিছু শিক্ষার্থী হামলা চালায়। এরই প্রেক্ষিতে আশপাশের কয়েকটি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এক হয়ে কলেজ দু’টিতে ভাঙচুর চালায় ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করেন।

বুধবার থেকে ডিএমআরসি কলেজের শিক্ষার্থীরা ‘ভুল চিকিৎসায় শিক্ষার্থী মৃত্যুর’ অভিযোগে হাসপাতালটির সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি করছিলেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজের বিরুদ্ধে যেহেতু আমাদের আন্দোলন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই দুই কলেজের ছাত্রদল নেতাদের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন।

শনিবার কবি নজরুল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর নেতৃত্বে আন্দোলনরতদের ওপর হামলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গতকালও দুপুর ১২টা থেকে ডিএমআরসি কলেজের নেতৃত্বে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী হাসপাতালটি ঘেরাও করে। এতে ছিলেন ডিএমআরসি, নটর ডেম কলেজ, সিটি কলেজ, ঢাকা কলেজ, নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, নারায়ণগঞ্জ সরকারি কলেজ, খিলগাঁও সরকারি কলেজসহ অন্তত ৩০টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তারা হাসপাতালটির নামফলক ভেঙে ফেলেন। এবং হাসপাতালে ভাঙচুর চালান। শনিবারের হামলার প্রতিবাদে কবি নজরুল কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও আন্দোলনকারীরা সংঘর্ষে জড়ায়।

ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় এই দুই কলেজে ভাঙচুর চালান আন্দোলনকারী কলেজ শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী কলেজে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। কলেজটিতে চলমান অনার্স প্রথম বর্ষের ইয়ার ফাইনাল (ইতিহাস) পরীক্ষা এক পর্যায়ে স্থগিত করা হয়। কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীরা এই কলেজে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। ১২টা ৩০ মিনিটে শুরু হওয়া পরীক্ষা দুই ঘণ্টা চলার পর নিরাপত্তার স্বার্থে স্থগিত করা হয়।

এদিকে কলেজে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সোহ্‌রাওয়ার্দী কলেজে ঢুকে পড়ায় পরীক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এ সময় কলেজের উপাধ্যক্ষের রুমসহ অধিকাংশ কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়। কলেজ প্রাঙ্গণে থাকা একটি প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও এম্বুলেন্স এবং দু’টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। শিক্ষার্থীদের কলেজের ট্রফি, চেয়ারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যেতেও দেখা যায়। পরে শিক্ষক ও স্টাফদের অনুরোধে শিক্ষার্থীরা কলেজ প্রাঙ্গণ ছেড়ে যান। এরপর কলেজে থাকা পরীক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে বের হন।

সোহ্‌রাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ কাকলি মুখোপাধ্যায় বলেন, আমরা বাকরুদ্ধ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমাদের ওপর হামলা করে। আমাদের সব কক্ষে ভাঙচুর করেছে। কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা আমরা দেখে বলতে পারবো। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি পুলিশকে কল দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের জানায় তাদের উপযুক্ত ফোর্স না থাকায় পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

প্রথম আলোর সামনে বিক্ষোভ, টিয়ারশেল-সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ
রাজধানীর কাওরান বাজারে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ও বিক্ষোভ করেছেন একদল লোক। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টা অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি পালন করেছেন ‘বাংলাদেশের জনতা’ ব্যানারে কিছু মানুষ। দিনভর অবস্থানের পর জনবহুল এলাকা হিসেবে সন্ধ্যা ৭টায় আন্দোলনকারীদের রাস্তা ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অনুরোধের পরও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কাওরান বাজারের প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল। ‘প্রথম আলোর সামনে জিয়াফত’ এই শিরোনাম দিয়ে আন্দোলনকারীরা বেলা ২টার দিকে পত্রিকা কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় গরু জবাই করা হয়। পরে রাস্তার অপর পাশে মাংস কেটে রান্নার আয়োজন করা হয়। একদিকে রান্না চলে আর অন্যদিকে প্রথম আলোর সামনে রাস্তায় বসে মাইকে স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। রাস্তার উপরই নামাজ আদায় করেন তারা। তাদের ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়েছিলেন।
বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে এলাকাটির দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে রাস্তা ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে তা আমলে নেননি আন্দোলনকারীরা।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর পুলিশ ও সেনা সদস্যরা  আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। তখন আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় টিয়ারশেলের আঘাতে একটি ছিন্নমূল শিশু আহত হয়।

এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, পুলিশ সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। কাওরান বাজারের মতো জনবহুল এলাকার একটি রাস্তা সারাদিন অবরোধ করে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও পুলিশ তাদের কিছুই বলেনি। উল্টো তাদেরকে অনুরোধ করা হয়েছে রাস্তা ছেড়ে দিতে। কিন্তু তারা অনুরোধ না শোনায় আমরা তাদের সরিয়ে দিয়েছি। 

mzamin

দরিদ্র কমলেও বৈষম্য বেড়েছে

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মনে করে, বাংলাদেশের দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু বৈষম্য বেড়েছে। দারিদ্র্যটা এমন অবস্থায় আছে যদি হঠাৎ করে একটা ধাক্কা আসে, তখন অনেক মানুষ আবার দরিদ্র হয়ে যাবে। সামাজিক নিরাপত্তায় অনেক দুর্বলতা আছে। ভাতা অনেকেই পায় না। আবার দীর্ঘদিন ধরে ভাতার পরিমাণ না বাড়ায় এর কার্যকারিতা হারাচ্ছে। কারণ দেশের আর্থিক সক্ষমতা খুব একটা ভালো না। ট্যাক্স জিডিপি রেশিও অনেক কম। রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকামের (ইউবিআই) কার্যকারিতা মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তুলে ধরে সিপিডি। সভাপতি হিসেবে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সিপিডি’র বিশেষ ফেলো এবং শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বক্তব্য রাখেন সিপিডি’র ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সিপিডি’র বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি উপস্থিত ছিলেন। এতে ইউবিআইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডি’র জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয় বৈষম্যে সাধারণ জীবনযাপন বিঘ্নিত হচ্ছে দেশের বড় জনগোষ্ঠীর। কল্যাণ রাষ্ট্রের ভাবনা থেকে এসব মানুষের ন্যূনতম আয় নিশ্চিতের তাগিদ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এক্ষেত্রে কর্মসূচির ব্যাপ্তি অনুযায়ী বছরে ১৫ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা সরকারি নগদ সহায়তা দরকার। এমন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুর্নীতি, অপচয়রোধ করা গেলে দারিদ্র্যবিমোচন টেকসই হবে বলে মনে করেন বক্তারা।

সিপিডি’র গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সবার জন্য ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করা যায় এজন্য ইউবিআই করা হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রোগ্রাম হাতে নেয়ার কী ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে, তা এই গবেষণার উদ্দেশ্য। এই ইউবিআই শুধু উন্নত দেশেই নয়, নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ এবং নিম্নআয়ের দেশেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। সবাইকে ন্যূনতম আয় দেয়া হলে এটায় কোনো অসুবিধা নেই; কিন্তু এখানে বড় চিন্তার জায়গা হলো আর্থিক সক্ষমতা হবে কীভাবে।

বর্তমানে দেশে দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে ২০ শতাংশের মতো মানুষ। এর বাইরে অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে আরও অনেকেই। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অপশাসনে বেড়েছে আয় বৈষম্য, নিত্যপণ্যের চড়া দামে নাজুক এসব নিম্নআয়ের মানুষের যাপিত জীবন।

আয় বৈষম্য কমিয়ে দারিদ্র্যের হার কমানো এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উৎপাদন গতিশীল করতে সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রস্তাব করেছে সিপিডি। প্রস্তাবে বলা হয়, জাতীয় পর্যায়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে এক কোটি ৪৭ লাখ ২৫ হাজার পরিবারের জন্য ৮০ হাজার ২১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা দরকার হবে। এই অর্থ চলতি মূল্যে মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি’র ১.৩৫ শতাংশ অর্থের সমান। এর ফলে দারিদ্র্য কমবে জাতীয় পর্যায়ে ৬.১৩ শতাংশ, দারিদ্র্যপীড়িত ৩৬ জেলায় ৩.৭২ শতাংশ, জলবায়ুর প্রভাবজনিত ৩৪ জেলায় ৩.০৭ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যপীড়িত ১১ জেলায় ১.৪৬ শতাংশ।
সিপিডি’র গবেষণা বলছে, সারা দেশে প্রায় ৩৬ ভাগ পরিবার খেয়ে পরে বাঁচার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে। ন্যূনতম নিশ্চিত আয়ে পরিবারপ্রতি ৪ হাজার ৫৪০ টাকা মাসিক সহায়তা করতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ দরকার ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অতি দরিদ্রপ্রবণ এলাকায় এমন কর্মসূচিতে খরচ হবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

বক্তারা বলেন, গত ৫ই আগস্ট পরিবর্তনের মূল চেতনা ছিল দেশে বৈষম্যমুক্ত একটি কল্যাণমূলক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। এখন আয় বৈষম্য কমানোর সময় এসেছে। তাই সর্বজনীন ন্যূনতম আয় একটি সময়োপযোগী প্রস্তাবনা। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি নির্ধারকরা এটি আগামী অর্থবছর থেকে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আসছে জানুয়ারি থেকেই কাজ শুরু করতে পারেন।

ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, ইউবিআই যেসব দেশে আছে সেখানে ট্যাক্স টু জিডিপি রেশিও অন্তত ১০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে উন্নতি হওয়ার পরে মাত্র ১.২ শতাংশ ট্যাক্স জিডিপি রেশিও বেড়েছে। এই রেশিও দিয়ে অর্থায়ন সম্ভব কিনা, সেটার পাশাপাশি অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তো আছেই। তিনি বলেন, এটা যেহেতু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে, এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেয়া জরুরি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটার একটা রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে।

কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণে সার্বজনীন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দারিদ্র্যবিমোচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন এই রাজনীতিবিদ। যেখানে বিতরণের দুর্বলতা এড়ানো সহজ। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১০ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট ৩০ হাজার কোটি টাকার না করলে তো প্রবলেম হয় না। এটা তো আমরা দেখেছি বাংলাদেশে। আপনি যদি দেশের মানুষকে সার্ভিস দিতে পারেন সত্যিকার অর্থে, তখন আপনি ক্লেইম করতে পারবেন, ট্যাক্স কালেকশনটা আপনার জন্য তখন অনেক সহজ হয়ে যাবে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, ২৪ লাখ মানুষ কর দেন অথচ ১ কোটিরও বেশি মানুষের ক্রেডিট কার্ড আছে। বিরাট একটা অংশের মানুষ কর দিচ্ছেন না, এটা বিবেচনায় আনতে হবে। তিনি বলেন, পাচার ও দুর্নীতি মোকাবিলা করতে পারবো কিনা, এটাই প্রধান সমস্যা। এটা মোকাবিলা করা গেলে ন্যূনতম মজুরি ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

সিপিডি’র বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন যে সরকার গঠিত হয়েছে তাদের প্রতি মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা বেশি। সরকারও মানুষের এ আশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল। আমি এই মুহূর্তটাকে গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের সন্ধিক্ষণ হিসেবে আখ্যায়িত করছি। এরকম সন্ধিক্ষণে আমাদের যত ধরনের স্বপ্ন, যত ধরনের আকাঙ্ক্ষা আছে সব তুলে ধরতে হবে। এটিই সঠিক সময়।