Friday, January 8, 2016

শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক, এও কি সম্ভব? by শশী থারুর

বড়দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আকস্মিকভাবে পাকিস্তান সফর করার মধ্য দিয়ে তাঁর গতিশীল বৈশ্বিক কূটনীতির বছরটি শেষ করলেন। আর শেষ ঘটনাটি দিয়ে সংবাদপত্রের শিরোনামও হলেন। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের পারদ শিশুদের ইয়ো-ইয়ো নামের খেলনাটির চেয়েও বেশি লাফালাফি করেছে। তাঁর মতো একজন কট্টর হিন্দুত্ববাদী মানুষ নির্বাচিত হওয়ার পর লোকে ধারণা করেছিল, সেই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বরফ আরও জমাট বাঁধবে। কারণ তিনি পূর্বসূরিদের শান্তি স্থাপনের প্রক্রিয়া ব্যাহত করেছেন, আর নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি পাকিস্তানকে দানব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দেখা গেল, তিনি এসব না করে নিজের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বসলেন।
আবার মোদির শপথ গ্রহণের দুই মাস পেরোতে না পেরোতে তিনি সীমান্তে পাকিস্তানের উসকানির জবাবে সেনাবাহিনীকে একটু বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানোর নির্দেশনা দেন। তারপর নয়াদিল্লিতে দেশ দুটির পররাষ্ট্রসচিবদের মধ্যে বৈঠক হওয়া কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানিরা অতীতের মতো সেবারও কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসলে ওই বৈঠক ভেস্তে যায়।
২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে কাঠমান্ডুতে সার্কের সম্মেলনে মোদি নওয়াজ শরিফের সঙ্গে কথা না বলার লক্ষ্যে তাঁর পাশ দিয়ে পরিচিতিমূলক পুস্তিকা পড়তে পড়তে হেঁটে যান, লোকে আবার তা দেখেছেও। (পরবর্তীকালে এটা জানা যায় যে এই দুই নেতা এক ভারতীয় ব্যবসায়ীর হোটেল কক্ষে বৈঠক করেছেন, যে ব্যবসায়ীর সঙ্গে শরিফের ভালো সম্পর্ক আছে।)
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মোদি আবারও বরফ গলানোর উদ্যোগ নেন। তিনি শরিফকে ফোন করে ক্রিকেট বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সাফল্য কামনা করেন, এমনকি ভারতের পররাষ্ট্রসচিবকে ইসলামাবাদেও পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তারপর আবারও আস্থাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তারপর গত বছরের জুলাই মাসে রাশিয়ার উফায় দুই প্রধানমন্ত্রীর আবারও সাক্ষাৎ হয়, আগে যেসব বিষয়ে আলোচনা ও ঐকমত্য হয়েছিল, সেখানে দুই পক্ষই তা অস্বীকার করে। তার কিছুদিন পর আবারও দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠক বাতিল হয়। তার কারণ আর কিছু নয়, কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বৈঠক।
কিন্তু প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলন চলাকালে ৩০ নভেম্বর মোদি ও শরিফের বৈঠক হলে দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্কের বাতাবরণ আবারও বদলে যায়। পূর্ব ঘোষণা বা প্রস্তুতি ছাড়াই দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদ্বয় ডিসেম্বর মাসে ব্যাংককে বৈঠক করেন। তার কয়েক দিন পরেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামাবাদে আফগানিস্তান-বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন হার্ট অব এশিয়া চলাকালে শরিফসহ পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই মোদি বড়দিনে আকস্মিক পাকিস্তান সফর করেন। কিন্তু বড়দিনের উৎসব শেষ হতে না হতেই পাকিস্তান সীমান্তবর্তী পাঠানকোটের বিমানঘাঁটিতে জঙ্গি হামলায় সাতজন ভারতীয় প্রাণ হারান।
তবে এ ধরনের হামলার আশঙ্কা যেহেতু সব সময়ই থাকে, সেহেতু এর ফলে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া একদম ব্যাহত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এটা তো সত্য যে প্রাণহানি হয়েছে, ফলে তা উপেক্ষাও করা যায় না। এ মাসে দুটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা, একটি হবে দুটি দেশের পররাষ্ট্রসচিবদ্বয়ের মধ্যে, আরেকটি হবে মোদি ও শরিফের মধ্যে। ফলে এই হামলার রাজনৈতিক ক্ষতি কতটা, তা বুঝতে আমাদের বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না।
কিন্তু অন্তত বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে এটা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করাটা খুব যথোচিত হবে। কারণ, পাকিস্তান ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের কূটনৈতিক প্রতিদান দেওয়ার মতো কিছু এখনো করেনি। বস্তুত, মোদি আলোচনার জন্য যেসব ন্যূনতম শর্তের কথা বলেছিলেন, সেসব তারা পূরণ করেনি। তারা ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করেনি। যে সন্ত্রাসীরা দেশটির সামরিক বাহিনীর সহায়তায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়, তারা তাদের রাশ টেনে ধরেনি।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বড়দিনে মোদির পাকিস্তান সফর যতটা না রাষ্ট্রনায়কোচিত, তার চেয়ে বেশি আবেগতাড়িত বলে মনে হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মোদি কেন এসব করছেন। তিনি এখন পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ব্যাপারে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলেননি, এমনকি বিজেপির সদস্যরাও এ সম্পর্কে কিছু জানেন না।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় মোদি একবার বলেছিলেন, হিন্দু-মুসলমান পরস্পর যুদ্ধ করতে পারে, আবার তারা একত্রে দারিদ্র্য দূর করতে পারে। তিনি সম্ভবত বিশ্বাস করেন, ভারত ও পাকিস্তানের ব্যাপারটা এ রকমই। লাহোরে যাওয়ার আগের দিন তিনি আফগানিস্তানের সংসদে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্কের সেতুবন্ধ করবে, এমনকি তার আওতা এর বাইরেও যেতে পারে।’
এটাই যদি মোদির লক্ষ্য হয়, তাহলে ভারতীয় জনগণের কাছে তাঁকে এটা স্পষ্ট করতে হবে, ধারাবাহিকভাবে এই নীতি অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু তারপরও গুরুতর ঝামেলা শুরু হতে পারে। কারণ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তো শেষমেশ নিজ দেশের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেননি। তারা তো মোদির সফরে চমকিত হয়নি। তারা কিন্তু ঠিকই ভারতবিরোধী মনোভাব চাঙা রেখে নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখছে। পাঠানকোটের ঘটনা তাদের এই মনোভাবের ইঙ্গিত হতে পারে যে তারা শান্তি চায় না। এটা আমাদের এও মনে করিয়ে দিতে পারে যে তাদের তূণে আরও তির আছে।
ভারতীয়রা এটা ভুলতে পারে না যে এই শরিফ সাহেবই ১৯৯৯ সালে লাহোরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আর এর পরিণামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কারগিলের পাহাড়ে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। শরিফ সাহেবও তার কয়েক মাস পরে ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০১৬ সাল শুরু হলো, এ সময় শান্তির পূজারিরা শুধু আশা করতে পারেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে না।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
শশী থারুর: ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান।

'ঘাস-লতা-পাতা খেয়ে বেঁচে আছে সিরিয়রা'

মানবাধিকার কর্মীরা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে
যেখানে অপুষ্টিতে ভোগা সিরিয় শিশুদের দেখা যাচ্ছে
১০ দিন ধরে এই দুধের শিশুটি শুধু লবণ-পানি খেয়ে
বেঁচে আছে (প্রকাশিত ভিডিও থেকে নেয়া)
জাতিসঙ্ঘ বলছে, সিরিয়ার মাদায়া শহরে মানবিক সহায়তা সরবরাহে সম্মত হয়েছে দেশটির সরকার। অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা মাদায়া শহরের পরিস্থিতি ভয়াবহ বলে জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো।
বিভিন্ন খবরে জানা যাচ্ছে সেখানকার বাসিন্দারা অভুক্ত অবস্থায় রয়েছেন, না খেতে পেয়ে মারা গেছেন অনেকে।
দামেস্ক থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে এবং লেবানন সীমান্তের মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাদায়া শহরটি বেশ কয়েক মাস ধরেই সরকারি বাহিনী এবং হিজবুল্লাহ’র নিয়ন্ত্রণে।
মাদায়ার একজন বাসিন্দা বিবিসিকে জানান, না খেতে পেরে দু'জন লোক বৃহস্পতিবার সেখানে মারা গেছে।
আব্দেল ওয়াহাব আহমেদ নামের ওই বাসিন্দা আরো জানান, সরকারী বাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ওই শহরটিতে অবরোধ আরোপের পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৬০ জন মারা গেছেন।
“দুই শ' দিন ধরে মাদায়া অবরুদ্ধ হয়ে আছে। আজ দু'জন মারা গেছেন। এখানকার লোকজন এখন মাটি-ঘাস-গাছের পাতা খাচ্ছে কারণ খাবার আর কিছু নাই। শীতের কারণে পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ঘাস-পাতাও শুকিয়ে যাচ্ছে।”
লেবাননের বৈরুতে জাতিসঙ্ঘ সদরদফতরের সামনে গত ডিসেম্বর মাসে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সিরিয়ান শিশুরা দাবি জানায়, মাদায়া ও জাবাদানি শহর থেকে যেন অবরোধ তুলে নেয়া হয় যদিও সেখানকার কত মানুষ না খেতে পেয়ে মারা গেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য জানা যাচ্ছে না । তবে মেদসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ে বলছে, ডিসেম্বর মাসে তাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নিতে আসা অভুক্ত মানুষদের মধ্যে ২৩ জনই মারা গেছেন।
সাতদিন ধরে না খেয়ে আছে শিশুটি
(প্রকাশিত ভিডিও থেকে নেয়া)
জাতিসঙ্ঘ বলছে, সিরিয়ার সরকার যেহেতু মাদায়ায় মানবিক সাহায্য পৌঁছাতে রাজী হয়েছে, সুতরাং কোন ঝামেলা না হলে সোমবারের মধ্যে সেখানে সাহায্য সামগ্রী নিয়ে ট্রাক পৌঁছাতে পারবে।
সেভ দা চিলড্রেন জানাচ্ছে, মাদায়ায় যদি জরুরি ভিত্তিতে খাবার, চিকিৎসা সামগ্রী, জ্বালানীসহ জরুরি সামগ্রী পৌঁছানো না যায় তাহলে আরো শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে সামনে।
সেখানকার স্থানীয় হাসপাতালের অবস্থা যে কতটা শোচনীয় ওয়াহাব আহমেদের বর্ণনায় তা স্পষ্ট প্রকাশ পায়।
“হাসপাতালে এখন দেড় শ'রও বেশি মানুষ অচেতন অবস্থায় আছে। অবরোধ আরোপের পর থেকে শহরটিতে জ্বালানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ কমে গেছে। কোনো ওষুধা নাই এখন, কোন বেডও খালি নাই এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও নাই। একদিনের জন্য যেন অবরোধ তুলে নেয়া হয় আমরা এটিই চাই।”

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কাজ করেন না’! by কাবেরী গায়েন

দেশের শিক্ষক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা খুব খারাপ। তাঁরা ক্লাস নেন না, পড়ান না, নিজেরাও পড়েন না। ছাত্রদের শেখাবেন কী? তাঁদের কোনো গবেষণা নেই। পৃথিবীর ১০০টি কিংবা ১০০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। কী আরামের চাকরি!
সপ্তাহে চার-পাঁচটা মাত্র ক্লাস! বাংলাদেশে খুব কম নাগরিক আছেন, যিনি এসব জানেন না এবং বলেন না। ক্ষমতার উঁচু পর্যায় থেকে শুরু করে যিনি কোনো দিন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ অবধি যাননি, তিনিও এসব কথা নিশ্চিতভাবে এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন। মাঝেমধ্যেই আশ্চর্য হয়ে ভাবি, সত্যি তো, আমরা তো কিছুই করি না, তবু কেন আমাদের বেতন দেওয়া হয়! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নামের এমন এক ‘সম্মানজনক’ পদে আমরা আছি, এই কি যথেষ্ট নয়? রাষ্ট্রের উচিত আমাদের বেতনকাঠামো থেকে আরও কয়েক ধাপ নামিয়ে সম্মানিত করা। চাইলে রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে অবৈতনিকও করে দিতে পারে।
মুশকিল হলো, যে শিক্ষকসমাজের বিদ্যা-বুদ্ধি-কমিটমেন্ট কিছু নেই, তাদের ‘সম্মানিত’ করার জন্য রাষ্ট্রের কতই–না আয়োজন! এত সম্মানিত সম্প্রদায় কেন সামান্য বেতন-ভাতা, বেতনকাঠামো নিয়ে মাথা ঘামাবে? কিছু কিছু সম্মানজনক পদ আছে, যেসব পদ টাকাকড়ি দিয়ে মাপা ঠিক নয়। আমাদের সমাজে যেমন মায়ের পদ। সন্তানের বেহেশত মায়ের পায়ের নিচে। মায়েদের সম্মান এত বেশি বলেই না সম্পত্তির উত্তরাধিকার বা সন্তানের অভিভাবকত্বে অধিকারের মতো সামান্য বিষয় দিয়ে তাঁদের সম্মান মাপা কাঙ্ক্ষিত নয়। মাপা হয়ও না।
মুশকিল আরও আছে। যে শিক্ষকেরা কোনো দিন কিছু শেখালেন না, যাঁদের নাকি শ্রেণিকক্ষে কোনো দিন পাওয়াই গেল না, তাঁদের ছাত্রছাত্রীরা যখনই সরকারি কর্মকর্তা হলেন, তাঁরা এতই শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে সক্ষম হলেন যে তাঁদের বেতনকাঠামো, পদমর্যাদা তো বাড়ানো হলোই, একই সঙ্গে সচিবের ওপরে আরও দুটি পদ সৃষ্টি করে তাঁদের পুরস্কৃত করা হলো। এই হিসাবটা অবশ্য আমি মেলাতে পারি না। স্কুল থেকে শুরু করে কোনো পর্যায়ের শিক্ষকই যখন কিছু শেখানোর মতো যোগ্যও নন, কিছু শেখালেনও না কোনো দিন, তাঁদের ছাত্রছাত্রীরা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোন ‘যন্তর মন্তর’ ঘরে ঢুকে এমন পুরস্কৃত হওয়ার মতো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলেন, সেটা জানার আগ্রহ বহুদিনের। কিন্তু যাঁরা আমাদের অবহিত করতে পারেন, তাঁরা সেই কষ্টটি করছেন না।
দুই.
আমাদের দুর্বলতাগুলো স্বীকার করার ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি নেই। আমাদের আরও যোগ্য একাডেমিক হয়ে ওঠার অবকাশ আছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকরাজনীতির অতিরিক্তপনা আছে, গবেষণার ঘাটতি আছে, বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না, বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় নাম তুলতে পারছে না। কাজেই ন্যায্য তিরস্কার মাথা পেতে নিয়েই বিনীত প্রশ্ন, আমাদের কোন সেক্টর বিশ্বের সেরা তালিকায় জায়গা করে নিতে পেরেছে? আমরা কম নিশ্চিত, আমাদের জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা, যাঁদের রাষ্ট্র পদমর্যাদা বাড়িয়ে পুরস্কৃত করছে, তাঁরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জনপ্রশাসনের প্রথম দিকে জায়গা করে নিতে পেরেছেন? এ দেশের প্রকৌশল, চিকিৎসা, কৃষি, সাংবাদিকতা, আইন, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, গণমাধ্যম, ব্যবসা—কোন সেক্টর বাংলাদেশকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তালিকায় তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে? এক ক্রিকেট ছাড়া আমাদের বিশ্বমানের সাফল্য মনে করতে পারছি না।
শিক্ষকেরা কিছুই পড়ালেন না, অথচ এ দেশের শিক্ষার্থীরা পাস করে বড় বড় ক্ষেত্রে সাফল্য দেখালেন। প্রতিবছর আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিদেশে গিয়ে দিব্যি ভালো ফল করে বের হচ্ছেন। শিক্ষকেরা রাজনীতি করেন, দেখাই যায়। মজার বিষয় হলো, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, যেখানে শিক্ষকদের রাজনীতি করতে বাধা নেই। অথচ জনপ্রশাসনে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁরা কোনো দলীয় রাজনীতি করবেন না—এমন শপথ নিয়েই ঢোকেন। তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কেন প্রশাসনে এত এত কর্মকর্তা ওএসডি হন এবং বিপরীত রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে তাঁরাই দাপটের কর্মকর্তা হন? দেশের কোন পেশাজীবীদের নির্বাচন হয় না দলীয় রাজনীতির বিভাজনে? এসব প্রশ্ন তোলার ভেতর দিয়ে আমি নিশ্চয়ই দাবি করছি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাজনীতির মধ্য দিয়ে যে দলীয়করণ হচ্ছে, তা ভালো। বরং বলছি, কোনো পেশাই এই দলীয়করণের বাইরে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান কিংবা স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা প্রাইভেট টিউশনি করেন মর্মে নিন্দা করতে শুনি, এমনকি আমার চিকিৎসক বন্ধুদের। ক্লিনিক ফেঁদে বসা চিকিৎসা ব্যবসায়ীদের। কোনো চিকিৎসক এই মানবাধিকারবিরোধী চিকিৎসা ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা নেই। গণমাধ্যমও বেশ নিশ্চুপ এ বিষয়ে। অথচ শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই আমরা ক্রমাগত লিখছি, প্রতিবাদ করছি কোচিং ব্যবসার বিরুদ্ধে, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে। আর বিশ্বের সঙ্গে গবেষণায় আমাদের পিছিয়ে থাকার কথা যখন উঠলই, তখন বিনয়ের সঙ্গে বলি, গবেষণার জন্য বিনিয়োগ করতে হয়। ওই যে শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে তালিকা আওড়ানো হয়, সেই তালিকাভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পেছনে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ সম্পর্কে কোনো খোঁজ কি নিয়েছেন আমাদের সাংবাদিকেরা কখনো? তারপর মিলিয়ে দেখেছেন গবেষণায় কিংবা সার্বিকভাবে শিক্ষায় আমাদের বিনিয়োগ কত? তুলনাটা এরপর করলে ভালো হতো।
তিন.
শিক্ষকদের সম্পর্কে এসব মন্তব্য দেখে মনে হয়, এত ক্ষয়ের পরেও কোথাও বুঝি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিমেয় সুপ্ত শক্তি আছে। যে শক্তিকে আসলে ক্ষমতাবােনরা ভয় পান। তাই কখনো স্টাফ হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, কখনো নয়টা-পাঁচটা অফিস করতে বলেন। যাঁরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো কাজ নেই, তাঁদের জন্য বিনীতভাবে শুধু বলার আছে, কোন যুগে শিক্ষকদের ক্লাস নিতে হতো না, জানি না। কিন্তু এখন আমরা চলি সেমিস্টার পদ্ধতিতে। বছরে দুটি সেমিস্টার। চার মাস ক্লাস হয় প্রতি সেমিস্টারে, তারপর ফাইনাল, রেজাল্ট। আমার বিভাগে প্রতি ক্লাসে ৭০ জনের মতো শিক্ষার্থী। এই চার মাসে ক্লাসের মধ্যেই নিতে হয় একটি মিডটার্ম (কখনো–বা দুটি), একটি গ্রুপ প্রেজেন্টেশন এবং মনোগ্রাফ। অনুপস্থিত ও অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফের পরীক্ষা নেওয়ার বিষয় তো রয়েছেই। ৭০টি মনোগ্রাফের বিষয় ঠিক করে দেওয়া, কয়েকবার করে আলাপ করা, জমা দেওয়া হলে পরে নম্বর দেওয়া। মিডটার্মের খাতা দেখা, নম্বর দেওয়া। এসব করতে হয় সেমিস্টার ফাইনালের আগেই, নম্বর টাঙিয়ে দিতে হয়।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এসব করার জন্য কোনো গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট নেই। যে শিক্ষক প্রতি সেমিস্টারে অন্তত দুটি কোর্স পড়ান, সেমিস্টার চলাকালে তাঁর আসলেই কি কোনো সময় আছে নিজের জন্য? মাস্টার্সের রিসার্চ মেথডলজি ক্লাস চলার সময় আমি স্তূপ করা খাতার বহর নিয়ে বাসায় যাই, সারা রাত জেগে পড়তে থাকি, ফের ডিপার্টমেন্টে আসি। দফায় দফায় আলোচনা চলে। আধা ঘণ্টার বিরতিতে ছয় ঘণ্টা ক্লাসও নিতে হয় শেষ দিকে। সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০০-এর বেশি। তাঁরা কীভাবে সামলান, আমি কল্পনাও করতে পারি না। আমি শুধু দেখি, সেমিস্টার চলাকালে ক্লাসের বাইরে আমি খাতা দেখছি, নয়তো রিসার্চ সম্ভাবনা ঠিক করছি, নয়তো ক্লাসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। রয়েছে থিসিস তত্ত্বাবধান, পরীক্ষা কমিটির দায়িত্ব পালন, সিলেবাস কমিটিতে কাজ, বিভাগের নানা ধরনের কাজে সংশ্লিষ্ট থাকা। আর কেউ যদি এরই মধ্যে রিসার্চ অ্যাকটিভ থাকতে চান, তাহলে তো কথাই নেই। যাঁরা রিসার্চ অ্যাকটিভ থাকতে পারেন না, তাঁদেরও যে মানেরই হোক কিছু প্রকাশনা করতে হয় এরই মধ্যে। বিজ্ঞান অনুষদগুলোর শিক্ষকদের দেখি, সাড়ে সাতটার বাসে আসেন আর বিকেল পাঁচটার বাসে বাসায় ফেরেন। কাজেই যাঁরা শিক্ষকদের কর্মহীন জীবন দেখেন, তাঁদের প্রতি অনুরোধ, সেই ম্যাজিকটা যদি একটু দেখিয়ে যেতেন! বরং সেমিস্টার রুটিন যেভাবে সাজানো, তাতে মনে হয়, এ সময় কোনো শিক্ষকের মা মারা যেতে পারবেন না, কারও এক দিন জ্বর হতে পারবে না, এক দিন বৃষ্টি হতে পারবে না।
চার.
ফিরে যাই মূল প্রসঙ্গে। শিক্ষকদের কাজ কম, এটি একটি মিথ। এই মিথের নির্মাণ সম্ভব হয়েছে শিক্ষকদের তরফ থেকে প্রতিবাদ না আসার কারণে এবং শিক্ষার্থীদেরও শিক্ষকদের কাজ সম্পর্কে ধারণা না থাকার জন্য। অন্য সব পেশায় নয়টা-পাঁচটার পরে ঘরে ফিরে টেলিভিশন দেখা যায়, সেমিস্টার পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে তাও সম্ভব নয়। দলীয় রাজনীতিতে সব পেশার মানুষই বিভক্ত। দেশের কোনো সেক্টরই বিশ্বের সেরা তালিকায় জায়গা করে নেই। তুলনা তো আমাদের সাপেক্ষে হতে হবে। এই সার্বিক পরিস্থিতিতে এখনো, সবচেয়ে ভালো ফল করা ছাত্রছাত্রী বিশ্ববিদ্যালেয়র শিক্ষকতাতেই আসেন। তবে কেন বেতন স্কেলে বৈষম্য? কেন মানহানিকর বক্তব্য?
শিক্ষকদের প্রতি এই অসম্মান চলতে থাকলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতায় আর পাওয়া যাবে না। অথচ এখনই ছিল শ্রেষ্ঠ সময় শিক্ষায় বিনিয়োগ সর্বোচ্চ করার, শিক্ষকদের মর্যাদা সর্বোচ্চ করার।
কাবেরী গায়েন: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

উ. কোরিয়ার ঘোষণায় হুমকিতে বিশ্ব

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন হাইড্রোজেন বোমা
পরীক্ষার নথিতে সই করছেন। ছবিটি গতকাল
প্রকাশ করে বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ। এএফপি
হাইড্রোজেন বোমার সফল পরীক্ষা চালানোর দাবি করল উত্তর কোরিয়া। তাৎক্ষণিকভাবে দেশটির এ দাবির সত্যতা যাচাই করা অসম্ভব। তবে যা সম্ভব হয়েছে তা হলো, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রটি বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে, ফেলে দিয়েছে দুশ্চিন্তায়। এর মধ্যে রয়েছে পিয়ংইয়ংয়ের মিত্র চীনও। শক্তিশালী পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের দৃশ্যত এ ঘটনা বিশ্ববাসীর কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও ‘ভ্রমগ্রস্ত’ একজন স্বৈরশাসক তা ঘটিয়ে দেখিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, চতুর্থ পরমাণু বোমার সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করা নিয়ে গতকাল বুধবার উত্তর কোরিয়ার ঘোষণায় বিশ্ববাসীর কতটুকুইবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কারণ রয়েছে? এককথায় যথেষ্ট, বলছিলেন সর্বাত্মক পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি-বিষয়ক সংগঠনের প্রধান লাসিনা জারবো। বলেন, ‘এ ঘোষণা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি।’ প্রধান পরীক্ষাস্থল পুংগে-রিতে উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমা ফাটানোর যে বর্ণনা পাওয়া গেছে, তা যদি সঠিক হয়ে থাকে তবে জারবোর এ সতর্কতা অমূলক নয় বলে বলছেন বিশ্লেষকেরা। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, যে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে সেটা ক্ষুদ্র ও হালকা সংস্করণের হাইড্রোজেন বোমা। আগের তিনটি পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা থেকে এবারের বিস্ফোরণ উল্লেখযোগ্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার একটি কারণ হাইড্রোজেন বোমা অন্যান্য পরমাণু বোমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক।
আবার প্রথম পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালানোর এক দশক পর হাইড্রোজেন বোমার এই পরীক্ষায় এ আশঙ্কাই দেখা দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে মূল ভূখণ্ডে হামলার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু যুদ্ধাস্ত্র প্রযুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে উত্তর কোরিয়া। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সফলভাবে হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার উত্তর কোরিয়ার ওই দাবি যাচাই করা অসম্ভব। এরই মধ্যে এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, দেশটি প্রকৃতপক্ষে ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। নিজ সামরিক সক্ষমতা ফাঁপিয়ে দেখানো দেশের বাইরে উত্তর কোরিয়াও নয়। কিন্তু উত্তর কোরিয়াকে নিরাপত্তা পরিষদের অবরোধ ও দেশটিকে একঘরে করার মার্কিন চেষ্টা সত্ত্বেও কার্যত পিয়ংইয়ং তার পরমাণু অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিকে অগ্রগতিমূলক ধাপে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের ইয়োনসেই ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক জন ডিলিউরির মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ কটি মাসে পিয়ংইয়ংকে ঘিরে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরীণ অস্ত্রশস্ত্র-সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের ওপর মনোযোগ দিচ্ছেন। কেননা, এরই মধ্যে উত্তর কোরিয়ার ওপর জাতিসংঘের অবরোধ আরোপ ও দেশটিকে একঘরে করার মার্কিন চেষ্টা উভয়ই কানাগলিতে রূপ নিয়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ওই পরীক্ষা চালানোর ঘোষণায় উত্তর কোরিয়ার প্রতি সতর্কবার্তা উচ্চারণের পুনরাবৃত্তিই করেছে। বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন মানার বাধ্যবাধকতা ও প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে। আরও বলেছে, তারা পরমাণু শক্তিধর উত্তর কোরিয়াকে মানবে না।

বেতন নিয়ে স্বস্তির বদলে অস্থিরতা by শরিফুজ্জামান ও মোশতাক আহমেদ

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে
শতভাগ বেতন বাড়লেও টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড তুলে দেওয়া এবং চাকরির শুরুর পদে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের চেয়ে ক্যাডার কর্মকর্তাদের বেতন স্কেল এক ধাপ ওপরে রাখায় প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া প্রায় সব পর্যায়ে অসন্তোষ, অস্থিরতা ক্রমে বাড়ছে। এ নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে শিক্ষকসহ অন্য পেশাজীবীদের দ্বন্দ্বও প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলন। ১৫ জানুয়ারি থেকে গণছুটিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী; বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও অসন্তুষ্ট। প্রজাতন্ত্রের ১২ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ব্যাংক, বিমা, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ২১ লাখ জনবলের একটি বড় অংশ এখন পর্যন্ত ক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট। তবে এঁদের মধ্যে এমপিওভুক্ত (বেতনের শুধু সরকারি অংশ পাওয়া) পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষকের অসন্তোষ কমেছে।
আন্দোলনে থাকা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সংখ্যা ১২ হাজার ৪৭ জন, সরকারি কলেজশিক্ষক (শিক্ষা ক্যাডার) প্রায় ১২ হাজার। এ ছাড়া প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসকসহ ২৬ ক্যাডারে আছেন প্রায় ১ লাখ। এর বাইরে প্রশাসন ক্যাডারে আছেন ৫ হাজার ৪৫১ জন কর্মকর্তা, যাঁদের মধ্যে জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন সূত্রের মত হচ্ছে, প্রায় শতভাগ বেতন বাড়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে যে স্বস্তি আসার কথা ছিল, তার চেয়ে অস্বস্তির মাত্রা বেশি। একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকেও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আন্দোলন ও অসন্তোষের বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার প্রশাসনে অসন্তোষ কমিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে চারজন সচিব গতকাল বৃহস্পতিবার নিজেরা বৈঠকে বসেন। এরপর তাঁরা আন্দোলনরত প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির নেতাদের সঙ্গে গতকাল রাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেন। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গেও আলোচনা হতে পারে তাঁদের।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসনসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সমন্বয় কমিটির সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। আশা করা যায়, শিগগিরই তাঁদের সমস্যাগুলো সমাধান হবে।
বৈঠকে উপস্থিত প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সচিবেরা টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড চালুর বিষয়টি নাকচ করে পদোন্নতির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়েছেন। এ জন্য অধিদপ্তরগুলো পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এক সপ্তাহের মধ্যে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। মন্ত্রণালয় পরবর্তী সপ্তাহের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবে। জনপ্রশাসন পরের চার সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পদোন্নতির জট ছাড়ানোর চেষ্টা করবে। এ ছাড়া ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের গ্রেড সমস্যা নিরসনে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলেও ওই নেতারা জানান।
আন্দোলনরত শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদসহ অন্যান্য ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, আমলাতন্ত্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কয়েকজনের কারণে তাঁরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তবে এখন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বিষয়টির সমাধান হবে বলে তাঁরা আশাবাদী হয়ে উঠছেন।
প্রশাসন ক্যাডারের বিপক্ষে অন্য প্রায় সব ক্যাডারের কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অবস্থান নেওয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্য। তিনি গত সোমবার কয়েকজন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং অগ্রাহ্য করে অর্থ মন্ত্রণালয় জাতীয় বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এ জন্য অভিযুক্ত আমলাদের বিচার দাবি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, আইন মন্ত্রণালয় ক্যাডার ও নন-ক্যাডার বৈষম্যসহ বিভিন্ন অসংগতি চিহ্নিত করে সেগুলো নিরসনের পরামর্শ দিয়েছিল।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, সচিব কমিটির সুপারিশ এবং মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সারসংক্ষেপেও ক্যাডার ও নন-ক্যাডার বৈষম্য ছিল না। এমনকি সপ্তম বেতন স্কেলেও চাকরি শুরুর পদে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার সবাই নবম ধাপেই ছিলেন। অষ্টম বেতন স্কেলে এসে ক্যাডারদের এক ধাপ এগিয়ে অষ্টম ধাপে ফেলা হয়, নন-ক্যাডাররা নবম ধাপেই থেকে যান।
সরকারি চাকরিতে ২০টি গ্রেড রয়েছে। প্রশাসন ও বিভিন্ন ক্যাডারে পদোন্নতির জট যেমন আছে, তেমনি আছে পদের অভাবও। এত দিন অনেকে পদোন্নতি না পেলেও সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল থাকার কারণে উচ্চতর গ্রেডে যেতেন।
নতুন বেতন স্কেলে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিয়ে চাকরির ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে আপত্তি ও অস্পষ্টতা আছে।
সিলেকশন গ্রেড তুলে দেওয়ায় সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেড-১-এ যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কার্যত তৃতীয় গ্রেড থেকেই তাঁদের অবসরে যেতে হবে। অবশ্য অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও গ্রেড-১ ও গ্রেড-২-এ যাওয়ার সুযোগ পাবেন, তবে সেই সংখ্যা আগের তুলনায় কমবে।
এত দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট অধ্যাপকের ২৫ শতাংশ সিলেকশন গ্রেড পেয়ে গ্রেড-১-এ যেতে পারতেন। শিক্ষকেরা সপ্তম বেতন স্কেলের মতো সব সুবিধা বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। গতকাল তাঁরা দুই ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব এ এস এম মাকসুদ কামাল বেতন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের জন্য কয়েকজন আমলাকে দায়ী করে তদন্ত সাপেক্ষে তাঁদের বিচার দাবি করেছেন। এ ছাড়া দাবি না মানলে ১১ জানুয়ারি থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন ছাড়া উপায় থাকবে না বলেও জানান তিনি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সরকারি কলেজের শিক্ষকেরা (বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা) চতুর্থ গ্রেড থেকেই অবসরে যাবেন। এত দিন ৫০ শতাংশ অধ্যাপক সিলেকশন গ্রেড পেয়ে গ্রেড-৩-এ যেতে পারতেন। এখন পদ অবনমন হওয়ার প্রতিবাদে তাঁরাও আন্দোলনে আছেন। নিয়োগবিধি ও পদোন্নতি বিধিমালা সংশোধন করে তাঁদেরও আগের মতো গ্রেড-৩-এ যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার কথা বলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু কলেজশিক্ষকেরা বলছেন, প্রজ্ঞাপন জারি করে এখনই বলে দিতে হবে, গত ১ জুলাই থেকেই তাঁরাও গ্রেড-৩-এ যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, দাবি পূরণ না হলে ২২ জানুয়ারি সমিতির সাধারণ সভায় শিক্ষকেরা নতুন কর্মসূচি দেবেন। ইতিমধ্যে কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষকেরা।
প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসকসহ ২৬টি ক্যাডারের কর্মকর্তারাও আন্দোলনে আছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গতকালও কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।
জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দেওয়া উচিত নয়। ক্যাডার ও নন-ক্যাডার বৈষম্য করাটাও ঠিক হয়নি। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আগের অবস্থানে রাখাটাই যৌক্তিক। এমনকি জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য করা বিশেষ গ্রেডে অধ্যাপকদের কয়েকজনকে রাখা উচিত। ওই গ্রেডে এখন কয়েকজন সচিব ছাড়াও পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা আছেন।

উন্নয়ন হলেও সুখ অধরা থাকছে by আবুল মোমেন

বাংলাদেশ এগোচ্ছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। উন্নয়নের বিবেচনায় অনেক বিশেষজ্ঞের কাছেই বাংলাদেশ এক বিস্ময়। এই বিস্ময়কর চমকপ্রদ অগ্রগতির জন্য জনগণের সঙ্গে সরকার, বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন।
এরপরে কি আর কথা থাকবে না? ইংরেজ বাঘা বুদ্ধিজীবী বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘বাহ্যরূপ ও বাস্তবতা’—এপিয়ারেন্স অ্যান্ড রিয়ালিটি-যুক্তিজালের গোলকধাঁধায় না ঢুকেও বলা যায়—বোধ হয় থাকবে। ছোট্ট দেশ, সার্কের সদস্যরাষ্ট্র ভুটানের রাজা তাবড় অর্থনীতিবিদ ও দুঁদে উন্নয়নবিশারদদের সূচকগুলোতেই কিন্তু সন্তুষ্ট থাকেননি। তিনি নতুন ভাবনার জোগান দিয়েছেন। দেশের উন্নয়নের হদিস নেওয়ার প্রচলিত মাপকাঠি জিডিপি, জিএনপি—অর্থাৎ মোট দেশীয় উৎপাদন, মোট জাতীয় উৎপাদন ইত্যাদিতে উন্নয়নের সম্পূর্ণ চিত্র উঠে আসে বলে মনে করেন না তিনি। রাজা ওয়াংচুক মনে করেন প্রথমত, মানুষের উন্নয়নের চাহিদা কেবল বস্তুগত বিষয়ে সীমিত থাকতে পারে না। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের চাহিদার রূপ ও মান দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। তবে তাঁর মতে, সব মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য—সুখ। তাই তিনি বলেছেন, কোনো দেশের উন্নয়ন বোঝার মাপকাঠি হবে জিএনএইচ—গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস, মোট জাতীয় সুখের পরিমাপ।
ভুটানের স্বাস্থ্যোজ্জ্বল হাসিখুশি লোকদের অল্প দেখার অভিজ্ঞতায় বেশ সুখী আর সমাজটাকেও শান্তিপূর্ণই মনে হয়েছে। ওদের বিষয়ে বেশি বলার অধিকার আমার নেই। তবে আমরা সবাই জানি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই অল্পে তুষ্ট, আশুতোষ। পশ্চিমা একটি জরিপেও দেখা গেছে, সুখের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ওপরেই আছে। এর অর্থ এ দেশের জনগণ বা সাধারণ মানুষ মোটামুটি সুখেই আছে।
এই জরিপের ফল কি সত্য? বাস্তব চিত্র কি এতে উঠে এসেছে? আবারও আমরা রাসেলের গূঢ় তর্কের মুখোমুখি হই—বাহ্যরূপ আর বাস্তবতায় কি ফারাক আছে? জানি, জরিপ আর পরিসংখ্যান অনেক সময় বোকা বানায় আমাদের, ডাহা মিথ্যাও বলতে পারে। তা ছাড়া সুখ বা শান্তির মতো বিমূর্ত এবং নিতান্ত মনোজগতের বিষয়ে পরিমাণগত ধারণা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে উন্নয়নের প্রচলিত অধিকাংশ সূচকেই বাংলাদেশের চমকপ্রদ সাফল্য অর্জিত হলেও সেসব অর্জনকে একটুও খাটো না করে বাস্তবতার আলোকেই বলা যায়, বাংলাদেশের বহু মানুষ সুখেও নেই, শান্তিতেও নেই।
দেশে অনেক ধরনের বৈষম্য বিরাজ করছে এবং তাতে এক পক্ষ অন্য পক্ষের আধিপত্যের কারণে বঞ্চিত বা বঞ্চিত-শোষিত উভয়ই হচ্ছে। অনেক উন্নয়ন হলেও বাংলাদেশের সমাজকাঠামো সামন্তধাঁচের, ধর্মসংস্কারশাসিত এবং মোটা দাগে রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক। এমন সমাজে নারী সর্বস্তরের—কর্মক্ষেত্র থেকে সংসার, শৈশব থেকে বার্ধক্য, সধবা থেকে বিধবা ইত্যাদি—বৈষম্যের শিকার, স্বভাবতই অনেকেই নিগ্রহ ও লাঞ্ছনার শিকার এবং প্রায় ঢালাওভাবে পুরুষতন্ত্রের যৌন পীড়নের আতঙ্কে কাটাতে বাধ্য হয়। তার সুখ বড় ঠুনকো, ভাসা-ভাসা, অনেক সময় মেকি এবং ছেলেভোলানো ছলনার বেশি নয়।
বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বহুকাল ধরেই—সেই পাকিস্তান আমল থেকেই বৈষম্যের শিকার। কখনো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উভয় প্রকার বৈষম্যের শিকার তারা। দীর্ঘকাল ধরে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় কেবল বৈষম্যের কারণেই নয়, বঞ্চনা-লাঞ্ছনা-নিপীড়নের ফলে ভয়ার্ত জীবন কাটাচ্ছে। তারা যে অসুখী, তার কিছু স্পষ্ট পরিসংখ্যানগত হিসাবও হাজির করা যায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তৎকালীন পূর্ববঙ্গের হিন্দু জনসংখ্যা ছিল এ দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ। পাকিস্তানে ছিল রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতা, ১৯৬৫-এর পরে যার গভীরতা ও ব্যাপ্তি কেবল বেড়েছে। ১৯৭১-এ স্বাধীনতার পরে এই সংখ্যা নেমে যায় ২২-২৩ শতাংশে। দ্বিজাতি তত্ত্বকে অগ্রাহ্য করে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান–ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলে মুক্তিযুদ্ধ করে যে স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হলো, তাতেও সংখ্যালঘুর বিড়ম্বনা থেমে থাকেনি। অনেকেরই সম্পত্তি হাতছাড়া হয়েছে, জনসংখ্যা ক্রমাগতই কমে বর্তমানে ১০ শতাংশের নিচে। সুখে থাকলে কেউ দেশ ছেড়ে যায়?
আমাদের পাহাড়ের প্রতিবেশী ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস্তবতা কী? ১৯৪৭ সালে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালির সংখ্যা ছিল ২ শতাংশ। বর্তমানে সেখানে সমতলের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। নিজ দেশে পরবাসী ওরা। তারপরে তাদের দিক থেকে স্বায়ত্তশাসন, বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সরকারের দিক থেকে সামরিক অভিযানসহ জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্ণ হলেও কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে পাহাড়িদের মনে সুখ আসেনি। বস্তুত কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ থেকেই তাদের জীবনে সুখ কমতে শুরু করেছে, বাংলাদেশ আমলে তা হ্রাসের হারই বেড়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে জিয়াউর রহমানের বাঙালি অভিবাসন নীতির ফলে তা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে, যা শান্তিচুক্তিও ঠেকাতে পারেনি।
ইদানীং সংবাদপত্রে প্রায়ই পড়ি সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর চরম ভোগান্তির নানা খবর। গত ২৪ ডিসেম্বর ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এ পড়লাম সিলেটের উরাং জাতির রাজাসহ সবার দুরবস্থার কথা। তাদের জমিজমা ভূমিদস্যুদের হাতে গ্রাস হতে হতে এখন ২০ শতাংশও নেই। স্বয়ং রাজা ও তাঁর পরিবার দারিদ্র্যের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছেছেন। একই অবস্থা সাঁওতাল-গারোসহ সমতলের ৪৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। তারা ভিটেহারা, জমিহারা হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর নারীরা অহরহ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং কোনো বিচারই পাচ্ছে না। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, দেশের ÿক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন কেউ সুখে নেই।
খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধরা এত দিন এমন করে ভাবেনি, কিন্তু রামুর ঘটনা এবং যাজক ও গির্জার ওপর হামলার পর তাদেরও মনে শান্তি ও সুখে টান পড়তে শুরু করেছে।
দেশের ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আহমদিয়া সম্প্রদায় বেশ কয়েক বছর ধরে কট্টর সুন্নিদের হুমকি ও হামলার সম্মুখীন হচ্ছে। তাদের একটি মসজিদে বোমা হামলা হয়েছে। একইভাবে দেশের আরেক ক্ষুদ্র মুসলিম সম্প্রদায় শিয়াদের একটি মসজিদেও হামলা হয়েছে, মুয়াজ্জিন নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন মুসলিম আহত হয়েছেন। আমরা কি কেউ খবর নিয়েছি দেশে আরও যেসব মুসলিম ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আছে, যেমন: বাহাই, বোরা, ইসমাইলিয়া, এরা কেমন আছে? বাস্তবের আলামত বলে, তাদের মনে সুখ থাকার কথা নয়।
যদি আমরা শিশু রাজন, রাকিব, রবিউলদের কথা মনে করি, তবে শিউরে উঠে কবুল করতে হবে, এ সমাজ শিশুবান্ধব নয়। তা ছাড়া শিক্ষাজীবন যেভাবে পরীক্ষা ও জিপিএ-৫-এর দাপটে কোচিং, মুখস্থ ও পরীক্ষার শৃঙ্খলে পরিণত হয়েছে, তা শিশুর দৈনন্দিন জীবনের সুখ নষ্ট করেছে। আর অপহরণ-মুক্তিপণ-নেশা-সাইবার অপরাধ-যানজটের মিলিত ফল হলো শিশুদের জীবনে নেই অবকাশ, নেই স্বাধীনতা। খেয়াল করলে দেখা যাবে ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে এ দেশের শিশুরা শৈশবহারা, অসুখী। কিশোর-কিশোরীরাও একই বাস্তবের শৃঙ্খলে ও চাপে সুখী কৈশোর থেকে বঞ্চিত।
হয়তো বাস্তববাদীরা ভাবছেন, সুখ-শান্তি মানসিক ব্যাপার, তা ব্যক্তিগত সাধনায় অর্জন করতে হয়। না, আমরা জানি এ বাস্তব নয়, বাস্তবের বাহ্যরূপমাত্র। কথাটা আমরা তুলেছি তুচ্ছ মানুষের নগণ্য জীবনের সামান্য চাহিদার আলোকেই। এ সমাজে যাঁরা জীবনে ভোগের কিছুই না চেয়ে আপন আনন্দে সাধনমার্গে বিচরণ করতে চান, সেই বাউল-ফকির–পীর-মুর্শিদ সহজিয়া সাধকেরাও কি সুখে আছেন? তাঁদের দাড়ি-চুল কেটে লাঞ্ছিত করা হয়নি? হুমকির মুখে রাখা হয়নি?
মুক্তচিন্তার মানুষ জানেন, তাঁদের পথটি দুর্গম। তবু কেউ কি ভাবতে পারেন, এই একবিংশ শতাব্দীতে, স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পরও তাঁদের চিন্তা নয়, জীবনই আশঙ্কার মধ্যে থাকবে!
তদুপরি দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী, দুবারের প্রধানমন্ত্রী ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীই যদি দেশের জন্মযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেন, জাতির জনককে হেয় করেন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের অবমাননা করেন, তখন সচেতন দেশপ্রেমিক মানুষের মনে সুখ থাকে কীভাবে?
দুটি সামান্য নগণ্য কথা বলে শেষ করতে চাই।
প্রথমত, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের যে চমকপ্রদ অগ্রগতি হয়েছে, তাকে অস্বীকার করি না, বর্তমান সরকার যে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে উন্নয়নের পথে, তাও অস্বীকার করার কারণ নেই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি কার্যকরের কৃতিত্ব ভোলার নয় এবং এই কর্মযজ্ঞে প্রধানমন্ত্রী যে যোগ্য নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাও মানতে দ্বিধা নেই। এসব সাফল্যে অনেকের মতো আমিও স্বস্তি পাই, আনন্দিত হই। এ দেশের মানুষের, বিশেষত তরুণদের, প্রাণশক্তির ওপরও আমি ভীষণভাবে ভরসা করি। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তাঁদেরই পক্ষে যে দেশের অর্থাৎ সমাজ ও সমাজমানসের প্রকৃত রূপান্তর ঘটানো সম্ভব, সে বিশ্বাস আমার আছে। ফলে আমি নিরাশাবাদী নই, এখনো আশাবাদী, তবে উদ্বিগ্ন আশাবাদী। আমাদের বুঝতে হবে সুখ-শান্তি সরকার একা এনে দিতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, সমাজকে প্রাচীন সংস্কারে বন্দী রেখে, নারীকে পুরুষতন্ত্রের দাপটে রেখে, শিক্ষাকে পরীক্ষার শৃঙ্খলে বেঁধে, গণতন্ত্রকে ক্ষমতার দুর্গে আটকে, চিন্তার গতিপথে অন্ধবিশ্বাসের অর্গল এঁটে সমাজমানসের রূপান্তর করা যায় না। মনের গহিনে আলো প্রবেশ না করলে অন্ধকার কাটবে কীভাবে? এমনটা চলতে থাকলে সে সমাজে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হয়। আশঙ্কার কথা, এ দেশে মুক্তচিন্তার মানুষ তৈরিতে ভাটা চলছে, বিপরীত স্রোত বরং বেশ জোরদার বলেই মনে হয়। সমাজের আলোকন (এনলাইটেনমেন্ট) ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ কাজ সরকারের নয়, সমাজের অগ্রসর মুক্তচিন্তার মানুষের। তবে এই আলোকনের সঙ্গে সঙ্গে তাকে টেকসই ও তার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে যে কাঠামোগত সংস্কার, পরিবর্তন, নবায়ন প্রয়োজন, তা সরকারের দায়িত্ব। সে কাজ অনেকটা হচ্ছে বটে, কিন্তু আলোকন ব্যতীত কেবল কাঠামোগত উন্নয়নে মানবিক সমাজ নির্মাণ হবে না। এসব কাজ আরব্ধ রেখে উন্নয়নের বাহ্যরূপে চমকপ্রদ পরিবর্তন ঘটলেও প্রকৃত সুখ অধরাই থেকে যাবে। সে রকম আলামত এ সমাজে প্রকট হয়ে উঠছে—সেটাই ভয়ের বিষয়।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

সৌদি ও ইরানকে শান্ত হওয়ার আহ্বান কেরির

জন কেরি
কূটনৈতিক উত্তেজনা কমাতে সৌদি আরব ও ইরানের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। দেশটির কর্মকর্তারা এ কথা জানিয়েছেন। খবর বিবিসির। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জন কেরি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরি ফোনে সৌদি আরব ও ইরানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দুই দেশের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি সৌদি আরবের ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্সও। সৌদি আরব গত রোববার ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। ইরানের তেহরানে সৌদি দূতাবাসে বিক্ষোভকারীদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ওই পদক্ষেপ নেয় রিয়াদ। সৌদি আরবে জ্যেষ্ঠ শিয়া নেতা শেখ নিমর আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর ইরানিরা সৌদি আরবের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে সুন্নিপন্থী সৌদি আরব ও শিয়াপন্থী ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছে। বর্তমানে দেশ দুটি সিরিয়া ও ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নিয়ে বিপরীত মেরুতে রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে জন কেরি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরি সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি শান্তিচুক্তির ওপরে গুরুত্বারোপ করেছেন। কেরি বলেন, ‘তাঁর (কেরির) মাথায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঘুরছে, তার মধ্যে রয়েছে উত্তেজনা প্রশমন, শান্তি পুনঃ প্রতিষ্ঠা, সংলাপে উৎসাহদান এবং এসব দেশের মধ্যে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি। এই অঞ্চলে যে আরও বড় বড় ইস্যু রয়েছে, তা-ও তিনি বলছেন। তবে তিনি ভিয়েনা সংলাপকে (সিরিয়া নিয়ে শান্তি আলোচনা) অচলাবস্থায় পড়তে না দেওয়ার বিষয়টিই তাঁর তালিকার শীর্ষে রয়েছে।’

আইএসের হাতে শিরশ্ছেদ প্রথম নারী সাংবাদিক

রুকিয়া হাসান
জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে এক নারী সাংবাদিকের শিরশ্ছেদ করেছে। তিনি আইএসের হাতে নিহত হওয়া প্রথম নারী সাংবাদিক বলে মনে করা হচ্ছে। খবর দ্য ইনডিপেনডেন্টের। রুকিয়া হাসান নামের ওই কুর্দি নারী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি নিসান ইব্রাহিম ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। সিরিয়ার সাংবাদিকতা-বিষয়ক সংগঠন সিরিয়া ডাইরেক্ট বলেছে, গত অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত রুকিয়া পঞ্চম সাংবাদিক, যাঁরা আইএসের বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে গিয়ে খুন হলেন।
রুকিয়া তাঁর সর্বশেষ ফেসবুক পোস্টে রাকা শহরে ওয়াই-ফাই সংযোগ বন্ধ করায় আইএসের প্রতি উপহাস করেছেন। সিরিয়া ডাইরেক্টের অনুবাদ করা পোস্টটি এমন: ‘এগিয়ে যাও। আমাদের ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে দাও। আমাদের কবুতরগুলো এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ দেবে না।’ রুকিয়াকে কবে হত্যা করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সংবাদভিত্তিক আরব চ্যানেল আল-আয়ান টিভি গত সোমবার বলেছে, ‘গুপ্তচরবৃত্তি’র জন্য রুকিয়াকে হত্যার বিষয়টি তিন দিন আগে তাঁর পরিবারকে অবগত করে আইএস।

সুদেই পুঁজি শেষ তাঁতির

পুরোনো সোয়েটার থেকে উল বের করা হচ্ছে।
পাশেই সেই উল দিয়ে বোনা হচ্ছে কম্বল।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কিসামত
কেশুরবাড়ি গ্রাম থেকে তোলা ছবি -প্রথম আলো
ঠাকুরগাঁও সদরের কিসামত কেশুরবাড়ি গ্রামে কান পাতলেই শোনা যায় তাঁতের খটখট শব্দ। বিভিন্ন বাড়িতে উঁকি দিলে দেখা যায়, আঙিনায় কারিগরেরা নিপুণ হাতে বুনে চলেছেন কম্বল। এই তাঁতশিল্প এখানকার মানুষকে আর্থিক সচ্ছলতা দিয়েছিল। এখন সেই দিন অতীত।
পুঁজির অভাবে তাঁতিরা এ ব্যবসায় আগের মতো আর বিনিয়োগ করতে পারছেন না। বেশির ভাগ তাঁতিই পুঁজি জোগাতে মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের সুদের জালে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে সুদ পরিশোধেই চলে যাচ্ছে তাঁতির পুঁজির বড় অংশ।
কিসামত কেশুরবাড়ি গ্রামের তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এখানে শুরু হয় তাঁতযন্ত্রের মাধ্যমে কম্বল তৈরির কাজ। গ্রামে প্রায় ৫০০ পরিবারের বসবাস। তাদের অধিকাংশই কম্বল বুননের কাজে জড়িত। তারা বলসুতা, পুরোনো সোয়েটারের উল দিয়ে কম্বল, গায়ের চাদর, মাফলারসহ আরও অনেক কিছু তৈরি করেন।
গ্রামের তাঁতি অনিল রায় বলেন, ‘মহাজন থেকে ৫০ হাজার টাকা করে ঋণ নিয়ে কম্বল তৈরিতে খাটাচ্ছি। মাসিক সুদ দিতে হচ্ছে প্রতি হাজারে ৩০০ টাকারও বেশি। অর্থাৎ বার্ষিক সুদের হার ৩৬০ শতাংশ। ফলে যে লাভ হবে, তার বেশির ভাগই চলে যাবে মহাজনের সুদের টাকা শোধ করতে।’
তাঁতি নিতাই দেবনাথ বলেন, ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল বগুড়ার শান্তাহারের শাওয়ালহাট গিয়ে কম্বলের সুতা কিনে আনে। দুই বছর আগে যে সুতা তারা প্রতি মণ দেড় হাজার টাকায় কিনেছিল, এবার তা তিন হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক মণ ভালো মানের উলের দাম পাঁচ হাজার টাকা। এ কারণে তাঁতিরা এখন আর এ শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারছেন না।
তাঁতি জয়ন্ত দেবনাথ বলেন, ‘হাতে টাকা নেই। মহাজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে আমরা তাঁত চালু রেখেছি। কিন্তু তাঁতিদের এখন খুবই দুঃসময় চলছে। এ কারণে অনেক তাঁতি মহাজনের টাকা শোধ করতে পারছেন না। তাঁদের অনেকে মহাজনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আবার অনেকেই পুঁজি হারিয়ে চলে গেছেন অন্য পেশায়।’
পুঁজির অভাবে তাঁত বন্ধ করে মজুরের কাজ করছেন গ্রামের তাঁতি বিজয় রায়। তিনি বলেন, পুঁজি না থাকায় গত বছর মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তাঁতের কাজে লাগিয়েছিলেন। কিন্তু লাভের বেশির ভাগই সুদ শোধ করতে চলে গেছে। এ কারণে তিনি পুঁজি-সংকটে পড়েন। তাই এ বছর তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। তাঁর পাড়ার রবিন রায়, রামপ্রসাদ, ডোকরোসহ অনেকেই একই কারণে তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন। বিজয় রায় বলেন, ‘এখন ব্যবসায় লাভ একদমই নাই। তাই তাঁত বন্ধ রেখে মজুরের কাজ করছি। তবে সহজ শর্তে ঋণ পেলে আবার তাঁত সচল করব।’
তাঁতের মালিক প্রভু দেবনাথ বলেন, কেশুরবাড়ির কম্বলের চাহিদা থাকলেও সুতা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এলাকার শতাধিক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁতিদের অনেকেই এখন মহাজনের সঙ্গে চুক্তি করে কম্বল বুনে দেন। এ ক্ষেত্রে তাঁতি শুধু শ্রমের মজুরি পান। একটি কম্বল বুনে তাঁতিরা মজুরি পান মাত্র ৪০-৫০ টাকা। তবে তাঁতি নিজের পুঁজি খাঁটিয়ে বুনতে পারলে প্রতিটি কম্বলে কমপক্ষে ১০০ টাকা বেশি লাভ হবে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৈমুর রহমান বলেন, তাঁতিদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণসুবিধা ও উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা গেলে তাঁত মালিক-শ্রমিকেরা আবার কর্মসংস্থান ফিরে পাবেন। উপজেলা পরিষদ থেকে তাঁতিদের জন্য নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করা হবে।

গণতন্ত্রে ভিন্নমত সহ্য করাই গুরুত্বপূর্ণ -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : টমাস প্রিনজ by কামাল আহমেদ

হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী টমাস প্রিনজ গত বছরের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে জার্মানির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি টোকিও, ক্যানবেরা, সাংহাই, জাকার্তাসহ বিভিন্ন স্থানে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ৩০ নভেম্বর তিনি প্রথম আলোর কার্যালয়ে আসেন, যেটি ছিল তাঁর এ দেশে প্রথম কোনো পত্রিকা অফিস পরিদর্শন। সে সময়ে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় দ্বিপক্ষীয় বিষয় ছাড়াও গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সাম্প্রতিক জঙ্গিবাদের উত্থানের বিষয়টি গুরুত্ব পায়
প্রথম আলো : বাংলাদেশকে কীভাবে দেখছেন? কী ধারণা হলো আপনার?
টমাস প্রিনজ : আমি ৩২ বছর ধরে এই দেশকে জানি; বলতে গেলে এক প্রজন্ম সময়। আমি প্রথম যখন এখানে এসেছিলাম, তার তুলনায় রীতিমতো মুগ্ধ। এখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটেছে। তবে সবকিছু যে আধুনিকায়নের সঙ্গে সংগতি রেখে হয়েছে তা নয়। এ ছাড়া নতুন সমস্যা হিসেবে যুক্ত হয়েছে যানজট।
প্রথম আলো : রাজনৈতিক অধিকারের জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, মানবাধিকার ও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকারের মতো ক্ষেত্রগুলোয় বাংলাদেশে আপনার আগের অভিজ্ঞতার আলোকে বড় কোনো পরিবর্তন কি দেখতে পান?
প্রিনজ : হ্যাঁ, আমি ১৯৮৩ সালে এখানে এসেছিলাম। তখন রাষ্ট্রপতি এরশাদ ছিলেন। সেটি ছিল সামরিক শাসনকাল। এখন এখানে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
প্রথম আলো : এরপরও আমরা নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগের কথা প্রায়ই শুনতে পাই কেন?
প্রিনজ : কেবল আমিই নয়, আমার বেশির ভাগ সহকর্মীই উদ্বিগ্ন। আমরা একটি পরিবর্তিত পরিবেশে বাস করছি। নিরাপত্তার মতো ইস্যুগুলো সবাইকেই উদ্বিগ্ন করে। অবশ্যই আমাদের মাঠের বাস্তবতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। যদিও উন্নয়নের বিষয়গুলোই আমাদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।
প্রথম আলো : বাক্‌স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অবস্থা নিয়ে সময়ে-সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। কেন এই উদ্বেগ এবং এই পরিস্থিতির উন্নয়নে আপনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন?
প্রিনজ : সর্বপ্রথম আমি বলব, এ দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের বিষয়ে দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের। আমরা কেবল তাতে অবদান রাখতে পারি। আমরা যেটা করি তা হলো মুক্তমনা ব্যক্তিদের সমর্থন দেওয়া, যারা উদার এবং নিজেদের মত প্রকাশের অধিকারের জন্য সোচ্চার। এমনকি যারা কিছু ব্লগার ও প্রকাশক, যাদের মতের সঙ্গে ভিন্নমত থাকতে পারে, তাদের প্রতিও। এটা খুবই মৌলিক বিষয়। এটাই একটি গণতন্ত্রের ভিত্তি। আপনি যা চান, তা প্রকাশ করা ও বলতে পারার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো : সরকার বলে থাকে, দেশে বেসরকারি খাতে ডজন ডজন টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। শত শত সংবাদপত্র প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে। সুতরাং, গণমাধ্যমের বা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় ঘাটতি কোথায়?
প্রিনজ : গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেই একটি বা একাধিক কণ্ঠস্বর, যা আপনি শুনতে চান না। একটি গণতন্ত্রে সেই ভিন্নমতের ও সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরকে সহ্য করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার প্রশংসাকারী অথবা ধরুন যা আপনি শুনতে চান, তাই-ই বলছে এমন শত শত মানুষের সঙ্গে আপনি কেমন আচরণ করেন, সেটি ধর্তব্যের বিষয় নয় বা তা গণতন্ত্রকে গতিশীল বা শক্তিশালী করে না।
প্রথম আলো : সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত বিতর্ক এবং পাস হওয়া এক প্রস্তাবে এ দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশকে সেই পথ অনুসরণ করাতে আপনার সরকার কী ভূমিকা রাখতে পারে?
প্রিনজ : সরকার হিসেবে জার্মানি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে সমর্থন ও সহায়তা দেয়। আমরা গণমাধ্যম পুরস্কার দিই এবং লোকজনকে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানাই।
প্রথম আলো : ইউরোপ থেকে প্রায়ই বাংলাদেশের শ্রমিকদের অধিকারের কথা বলা হয়। গত এক বছর বা তার কাছাকাছি সময়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এখন আপনাদের মূল্যায়ন কী? পরিস্থিতির কী উন্নতি হয়েছে?
প্রিনজ : এটাকে এগিয়ে যেতে হবে। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা এ ক্ষেত্রে অসাধারণ ভালো করতে পারি।
প্রথম আলো : এসব সংস্কারের জন্য আর্থিক প্রতিশ্রুতিগুলো উল্লেখ করার মতো। কিন্তু আমাদের পোশাকের জন্য ক্রেতারা যে দর প্রস্তাব করে থাকে, তা অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম। যেহেতু বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের জন্য জার্মানি একটি বড় বাজার, সেহেতু আপনাদের ক্রেতাদের দাম বাড়াতে উৎসাহিত করতে আপনার সরকার কী করতে পারে?
প্রিনজ : আমরা বিষয়টি স্বীকার করি। কিন্তু একটি মুক্তবাজারে আমরা দরদাম ঠিক করে দিতে পারি না। অবশ্য আমাদের কোম্পানিগুলোর জন্য একটি ক্রেডিট লাইন তৈরির জন্য আমরা ফরাসি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি। তারা যাতে পরিস্থিতির উন্নয়নে বিনিয়োগ করে এবং বেশি বেশি কিনতে এবং ন্যায্য দাম দিতে উৎসাহিত হয়, তার জন্যই এই পদক্ষেপ।
প্রথম আলো : জঙ্গিবাদ এবং ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সৃষ্ট হুমকির বিষয়টি নিয়ে যদি কথা বলি, তাহলে মনে হয় যে এই জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তুগুলো তো বৃহত্তরভাবে ইউরোপ। তাহলে আমাদের মতো দেশে তাদের বিস্তার নিয়ে পাশ্চাত্য এতটা উদ্বিগ্ন কেন?
প্রিনজ : মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো বিশ্বের অন্য সব দেশের জন্যই একটা হুমকি।
ধর্মীয় চরমপন্থা বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। ইসলামিক স্টেটসহ অন্য চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো কেবল আরব বিশ্বেই নয়, অন্য সব মুসলিম দেশেও তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বিষয়টিই সবাইকে উদ্বিগ্ন করছে।
প্রথম আলো : ১১ সেপ্টেম্বর-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব বদলে গেছে। নিরাপত্তার বিষয়ে সহযোগিতার বিষয়টি বেশির ভাগ পশ্চিমা দেশের কাছেই অগ্রাধিকার পেয়েছে। অন্তত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সেটা সত্য। বাংলাদেশেও আমরা এ ধরনের সহযোগিতা দেখেছি। কিন্তু দুজন বিদেশি নাগরিকের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর আমরা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শুনেছি, তাদের গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া হয়নি। এর অর্থ কি এই যে সেই সহযোগিতায় ছেদ ঘটেছে?
প্রিনজ : আমি তেমনটি মনে করি না। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত ইস্যুগুলোয় সহযোগিতার বিষয়গুলো একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। আমরা একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা স্থানের বিরুদ্ধে আসন্ন হুমকির বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য প্রদান করতে পারি। এরপর সে বিষয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ফলোআপ দরকার হয়। আমাদের কাছে যেটা নেই, সেটা হলো কখন, কোথায় একটি হামলা সংঘটিত হতে পারে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য।
প্রথম আলো : ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বিদেশিদের ওপর এসব সাম্প্রতিক হামলাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, এগুলো বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কাজ। বিএনপির কিছু সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
প্রিনজ : কাউকে দোষারোপ করা খুবই সহজ। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়াই এমন দোষারোপের ঘটনা প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার কাজটা আরও কঠিন করে তোলে।
প্রথম আলো : চলমান শরণার্থী সংকট নিয়ে আপনার সরকার সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তারা অর্থনৈতিক অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওই অর্থনৈতিক অভিবাসীদেরও কেউ কেউ যুদ্ধের শিকার। তারা আরব দেশগুলো থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
প্রিনজ : জার্মানি যুদ্ধবিগ্রহ ও নিপীড়নের কারণে পালিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের স্বাগত জানিয়েছে, জানাবে। কিন্তু দেশটি অবৈধ অভিবাসীদের গ্রহণ করবে না। অর্থনৈতিক অভিবাসীদের জন্য একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া রয়েছে। আপনার দক্ষতার শর্তগুলো পূরণকারী জার্মান ব্লু-কার্ড থাকলেই আপনি জার্মানিতে যেতে পারবেন। তাঁরা তখন অভিবাসনের জন্য বৈধভাবে আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু যারা এই পদ্ধতি এবং যুদ্ধবিগ্রহ ও নিপীড়নের কারণে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের স্বাগত জানানোর নীতির অপব্যবহার করতে চায়, তাদের অবশ্যই নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
প্রিনজ : ধন্যবাদ।

কোন পথে ২০১৬ সালের বিশ্ব: অস্থিরতা বাড়তে পারে বাংলা-পাক-ভারতে by মাসুম খলিলী

২০১৫ সালের শেষার্ধেই মধ্যপ্রাচ্যে সর্বব্যাপী সঙ্ঘাত বিস্তৃত হওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। এ সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে এশিয়ায়ও। আফগানিস্তান থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় ২০১৬ সালে বাড়তে পারে অস্থিরতা এবং প্রভাব বিস্তারের লড়াই। এ সময়ে আফগানিস্তান থেকে বিদায় নেয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের। এরপর সেখানে কারা ক্ষমতায় থাকবে, তালেবানদের সাথে সরকারের বোঝাপড়া কী হবে, নতুন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী পাকিস্তান বা ভারতের কী ভূমিকা থাকবে, কতটা সক্রিয় প্রভাব থাকবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা চীনের- ইত্যাদি নানা প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্নের সুরাহার জন্য তিক্ত প্রতিযোগিতা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে দেখা যাবে অচিরেই।
পাকিস্তানের সার্বিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রশ্নে রাজনৈতিক সরকারের ওপর প্রভাব বাড়ছে নিরাপত্তা বাহিনীর। আফগানিস্তান ও কাশ্মিরসহ সংবেদনশীল ইস্যুগুলোয় সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার কমে আসছে রাজনৈতিক সরকারের। প্রতিবেশী ভারতের সাথে সম্পর্ক তৈরির প্রচেষ্টার মধ্যেই অনাস্থা নতুন করে বৃদ্ধির মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বৈশ্বিক প্রভাববলয় পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া বিদায়ী বছরে ভারত-পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সম্পর্কে শুরু হয়েছিল, তা ২০১৬ সালে স্পষ্ট অবয়ব নিতে পারে। দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্কের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ভারত সরকার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমৃদ্ধি অর্জন, নতুন কাজ সৃষ্টি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর অধিক জোর দিতে গিয়ে বিভিন্ন সংবেদনশীল সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের প্রভাবও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়তে পারে। নেপালের তরাই অঞ্চলের মাধেসিদের বিদ্রোহ ধরনের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০১৫ সালে ভারত ও চীনের সাথে দেশটির সম্পর্কে যে মেরুকরণ শুরু হয়েছিল, তা একটি অবয়ব নিতে পারে। ভারত চাইবে মাধেসির দাবিকে সমন্বয় করে বিষয়টির নিষ্পত্তি হোক; কিন্তু নেপালের মূল ধারার নেতারা রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও কর্তৃত্ব নেপালিদের হাতে রাখার ব্যাপারে আপসহীন থাকতে পারেন। এতে নেপাল আরো বেশি ঝুঁকে যেতে পারে চীনের দিকে। এর ফলে নেপাল নিয়ে দিল্লি-বেইজিং ঠাণ্ডা লড়াই জোরদার হতে পারে।
বাংলাদেশকে ভারত তার নিরাপত্তা রাডারে আরো কঠিনভাবে আবদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেবে। এতে এখানকার রাজনীতি ও নিরাপত্তাপ্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ একতরফা করার প্রচেষ্টায় প্রতিপক্ষের সাথে নেপথ্য লড়াইও শুরু হতে পারে। আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতীয় নির্দেশনায় সেকুলারাইজ করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটাকে বহাল রেখে একধরনের গণতান্ত্রিক চর্চার আবহ আনার প্রতি গুরুত্ব দিতে পারে। এর প্রভাবে ২০১৬ সালেই আয়োজন হতে পারে নির্বাচনের। আবার দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আইএসের মতো চরমপন্থী দলের জঙ্গি তৎপরতা বিস্তৃতির কারণে অবনতিও ঘটতে পারে।
ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মালদ্বীপে প্রভাব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ২০১৬ সালে অস্থিরতা সৃষ্টির ঘটনা ঘটতে পারে। এর ওপর দক্ষিণ চীন সাগরে সৃষ্ট উত্তেজনার একটি প্রভাব থাকতে পারে। শ্রীলঙ্কা সরকার ভারসাম্য নীতির ওপর গুরুত্ব দেয়ায় দেশটি আরো একটি স্থিতিশীল বছর পার করতে পারে।
আফগানিস্তান : প্রভাব বিস্তারের লড়াই
ভূকৌশলগত বিবেচনায় আফগানিস্তান এমন একটি অঞ্চল, যেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুগের পর যুগ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। দেশটি থেকে ২০১৪ সালে মার্কিন সেনাবাহিনী বিদায় নেয়ার কথা ছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামা নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও তালেবান উত্থানকে কেন্দ্র করে এ প্রত্যাহার বিলম্বিত করেছেন। ২০১৬ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার কথা। ২০১৫ সালে তালেবানদের প্রাদেশিক রাজধানী কুন্দুজ দখলের পর সেনা প্রত্যাহারের পর সরকারের হাতে দেশটির নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে তালেবানদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে স্থলাভিষিক্ত করতে; কিন্তু প্রতিবেশী পাকিস্তান ও চীন এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার বিকল্প নেই। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানে ভারতীয় উপস্থিতির ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র আপত্তি রয়েছে। আফগান সরকারের ওপর ভারতের কিছু প্রভাব থাকলেও তালেবানদের ওপর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে পাকিস্তানের। শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকে আফগানিস্তানের ব্যাপারে সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইরানের কিছুটা সংশ্লিষ্টতা রাখা গেলেও ভারতের বড় কোনো ভূমিকা এখানে মার্কিন প্রত্যাহার-উত্তর সরকারে থাকার সম্ভাবনা কম। ২০১৬ সাল হতে পারে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। গভীর স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কারণে আফগান ইস্যুতে পাকিস্তান-চীন-রাশিয়া এক দিকে আর যুক্তরাষ্ট্র-ভারত অন্য দিকে ভূমিকা রাখতে পারে। ইরান পালন করতে পারে মধ্যবর্তী ভূমিকা।
পাকিস্তান : রাষ্ট্রনীতিতে সেনাপ্রাধান্য বাড়বে
২০১৬ সালে পাকিস্তানের নওয়াজ সরকারের চতুর্থ বছর পার হবে। বাণিজ্যমুখী রাজনীতিবিদ হিসেবে নওয়াজ শরিফ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যখনই পালন করেছেন, তখন ভূরাজনৈতিক বিষয়ের চেয়ে অর্থনৈতিক বিষয়াবলি প্রাধান্য পেয়েছে। এ কারণে তিনি ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ব্যাপারে বাড়তি আগ্রহ প্রকাশ করেন; কিন্তু পাকিস্তানের ভেতরে সামরিক-বেসামরিক আমলা ও গোয়েন্দা এস্টাবলিশমেন্টের যে ডিপ স্টেট বা নিয়ন্ত্রণ শক্তি রয়েছে, তারা অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দিল্লির আদি ডকট্রিনের ব্যাপারে বরাবরই সন্দিহান। নওয়াজ শরিফ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার ব্যাপারে রাজনৈতিক সম্পর্কের অজুহাতে সীমা অতিক্রম করতে চাইলে ডিপ স্টেটের বাধা তৈরি হয়। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতা গ্রহণের পর নওয়াজ শরিফ তার শপথ অনুষ্ঠানে হাজির হওয়ার বিষয়টি পাকিস্তানের ‘নিয়ন্ত্রক শক্তি’ পছন্দ করেনি। এরপর ইমরান খান ও ড. তাহিরের আন্দোলনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয় নওয়াজের ওপর। এবার ভারতের সাথে অফট্র্যাক ও গোপন আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগের একপর্যায়ে মোদি নওয়াজের বাড়িতে হাজির হন ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে। নেপথ্যে কাশ্মির ইস্যু নিষ্পত্তির ব্যাপারে আমেরিকান পৃষ্ঠপোষকতায় একটি উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে পড়ে, যে উদ্যোগ অনুসারে কাশ্মিরের বর্তমান নিয়ন্ত্রণরেখাকে চূড়ান্ত সীমানা ধরে নিয়ে এটিকে নিষ্পন্ন করে ফেলা হবে। পাকিস্তান যখনই দুর্বল অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে, তখনই দিল্লি এ প্রস্তাবে এই প্রতিবেশীকে সম্মত করানোর চেষ্টা করেছে। ১৯৭৩ সালে সিমলা চুক্তির সময় এ ধরনের একটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। পারভেজ মোশাররফের ফর্মুলা হিসেবে একই বিষয় আবার সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। পাকিস্তানের মূল নিয়ন্ত্রকেরা কাশ্মিরের মানুষের স্বাধীনতা বা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে এ ধরনের সমঝোতাকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী মনে করেন।
আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের ভারতপন্থী অংশটি মনে করে, কাশ্মির সমস্যার নিষ্পত্তি হলে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সরকারপ্রধান মোদি ও নওয়াজকে বেগিন-সাদাতের মতো নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া যাবে। আর কাশ্মির সমস্যার সমাধান হলে পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা এস্টাবলিশমেন্টের অবয়ব সঙ্কুচিত হবে। এতে রাষ্ট্রটির প্রতিরক্ষা সামর্থ্যও কমে আসবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে পাকিস্তানের আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে ভারতের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রক শক্তি এটি কোনোভাবেই হতে দিতে চায় না। এবার পাঠানকোটে ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় নতুন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার ওপর এক দিকে কালো ছায়া বিস্তার করেছে, অন্য দিকে দিল্লি-ইসলামাবাদ সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৬ সালে এই উত্তেজনাকর সম্পর্কই চলতে থাকার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ভারতের সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ
২০১৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনে রয়েছে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। এক দিকে বিভিন্ন রাজ্য বিধানসভায় বিপর্যয়কর ফলাফল আর সংস্কার কর্মসূচিতে বাধা প্রদান, অন্য দিকে রয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোয় ভারতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রায়ই হুমকির মধ্যে পড়া। নেপালে মাধেসিদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থার সাথে ভারত জড়িয়ে পড়ায় চীন নেপালের সাথে কৌশলগত গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়ায় যেকোনো সময় সার্বিক অবস্থা উল্টোমুখী হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষত আইএসের সন্ত্রাসী তৎপরতার আওতা যেভাবে এখানে বাড়ছে, তা উদ্বেগ সৃষ্টি করছে মোদি প্রশাসনের সামনে। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ককে যেভাবে মোদি এগিয়ে নিতে চাইছেন, সেভাবে ঘটনাবলি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। পাঠানকোটে ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে জঙ্গি হামলা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের সহায়তায় সাত রাজ্যে বিদ্রোহ তৎপরতাকে শান্তি আলোচনায় রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে বেশ খানিকটা সাফল্য এলেও বিদ্রোহীদের মূলধারাকে এর মধ্যে আনা যায়নি। আসামের বিদ্রোহীদের ওপর বিচ্ছিন্নতাবাদী পরেশ বড়–য়ার কর্তৃত্ব জোরদার হচ্ছে। এতে চীনের পরোক্ষ ইন্ধন রয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে দিল্লির ওপর মহলে। এর পাশাপাশি নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে পাঞ্জাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী নানা তৎপরতা নিয়ে। এর বাইরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ মোদির সামনে বিজেপির জনসমর্থনে ভাটির টান নিয়ে। উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিগত নির্বাচনে জনসমর্থনের জোয়ার আনতে পেরেছিলেন, সে তৎপরতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দুত্ব কর্মসূচির ব্যাপকতা। সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা এতে এক দিকে বাড়ছে, অন্য দিকে বিজেপির পাল্টা শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মেরুকরণ সৃষ্টি হচ্ছে। দিল্লি বিধানসভার পর বিহার রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপির বিপর্যয় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে এক মঞ্চে আসতে উৎসাহিত করছে। সামনের রাজ্য বিধানসভার যে নির্বাচন রয়েছে তার মধ্যে আসাম ছাড়া আর কোনো রাজ্যেই ২০১৬ সালে বিজেপি সাফল্য পাবে বলে মনে হচ্ছে না।
বিজেপির সামনে এগোনোর বাহন হওয়ার কথা ছিল অর্থনীতি। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বেশ প্রচারণা চালানো হচ্ছিল শাসক শিবির থেকে; কিন্তু ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি চীন দশককাল ধরেই অর্জন করে এসেছে। মোদি এখন জাপানি বিনিয়োগ, চীনের নেতৃত্বাধীন ব্রিকস ব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তা এবং আমেরিকার সাথে প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতা চুক্তির কল্যাণে এক ধরনের চাঙ্গা অবস্থা সৃষ্টি করতে পারবেন শিল্পায়নে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানেও মোদি সাফল্য পাবেন। কিন্তু এ জন্য তিনি রাজ্য-কেন্দ্র নির্বিশেষে অভিন্ন করহার সৃষ্টিসহ যে সংস্কার আনতে চাইছেন, তাতে সফল হবেন কি না নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থতা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ : জঙ্গি অস্থিরতার শঙ্কা
২০১৬ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি অস্থিরতাপূর্ণ ও ঘটনাবহুল বছর হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেক বিশ্লেষক। যারা ইতিবাচকভাবে বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে দেখছেন তারা মনে করেন, ২০১৬ সালে এখানে একটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ নেবে। জামায়াতকে স্বনামে বা ভিন্ন নামে অথবা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে দেয়া হবে। এ নির্বাচনের ফলাফলে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ এককভাবে অথবা একটি সেকুলার-জাতীয় সরকারের অংশ হিসেবে ক্ষমতায় থাকতে পারে। বিএনপি উল্লেখযোগ্য আসন নিয়ে বিরোধী দলে থাকতে পারে। অথবা নির্বাচনে সৃষ্ট জোয়ারে নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা সফল না হলে সরকারও গঠন করতে পারে কিংবা হতে পারে জাতীয় সরকারের অংশীদার। এ নির্বাচনের আগে এ সরকার ক্ষমতায় থাকতেই মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালতের একটি পর্যায়ের সমাপ্তি টানা হবে। এ ধরনের একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে সক্রিয় থাকতে পারে প্রভাবশালী বৈশ্বিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক ক্ষমতাধর ভারত। চীনের থাকতে পারে দুর্বোধ্য এক বাণিজ্য স্বার্থকেন্দ্রিক ভূমিকা। অন্য দিকে যারা এতটা আশাবাদী নন, তারা বাংলাদেশে চরমপন্থী সঙ্ঘাতের সমূহ শঙ্কা দেখতে পাচ্ছেন। গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন সাময়িকীতে খ্যাতিমান বিশ্লেষক অ্যান্ড্রো কোরিবকো (Androw korybiko) তেমন একটি দৃশ্যপট এঁকেছেন। তিনি ‘২০১৫ ট্রেন্ডস অ্যান্ড জিওপলিটিক্যাল ফোরকাস্ট’ শিরোনামে বিশ্বপরিস্থিতির গতিধারা দীর্ঘ বিশ্লেষণে বাংলাদেশ অংশের শিরোনাম দিয়েছেন ‘বাংলাদেশ টার্নিং ইনটু বাংলা-দায়েশ’। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ স্বল্পতম সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সামনের কাতারের দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আইসিস পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মুসলিম দেশটির ১৫ কোটি মানুষের মধ্যে একটি নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করতে পারে। ‘ছোট আকারের’ সন্ত্রাসী ঘটনা দিয়েও এখানে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে আইসিস। যদিও আইসিসের উগ্রপন্থার প্রতি আকর্ষণবোধ করার মতো মানুষ এখানে এক শতাংশও পাওয়া যাবে না; কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামিস্টদের ওপর নানা ধরনের দমনপীড়ন, মিয়ানমারের বাংলাভাষী রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার অস্বীকার করা, আসামে বাংলাভাষী মুসলিমরা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হওয়া ইত্যাদি আইএসের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ সরকারের সামনে এ ধরনের একটি ঝুঁকির ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য থাকতে পারে। হয়তো বা এ কারণে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতকে সামনে রেখে ভারত-রাশিয়া বলয় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার পরও আমেরিকার পরামর্শে বাংলাদেশ সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কেটে যেতে পারে। ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে আমেরিকার সহায়তাও পাওয়া যেতে পারে; কিন্তু এতে বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে চীন, রাশিয়া- এমনকি ভারতেরও। এ বিষয়টির প্রভাব ২০১৬ সালের বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।
নেপাল : চীন-ভারত স্নায়ুযুদ্ধের ক্ষেত্র
২০১৫ সালে গণপরিষদের সংবিধান গ্রহণ এবং কমিউনিস্ট পার্টি ও মাওবাদী জোটের সরকার গঠন আর ভারতের সমর্থন নিয়ে নতুন সংবিধানের বিরুদ্ধে তরাই অঞ্চলে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নেপালিদের আন্দোলনে হিমালয়ান দেশটিতে ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে চীনের সাথে মহাসড়ক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে নেপাল। অবরোধের কারণে নেপালের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। এর জের ধরে নেপালের সাথে ভারত ও চীনের সম্পর্কের মাত্রা পুনর্নির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটলে নেপাল ভারতের সাথে সম্পাদিত ১৯৫১ সালের মৈত্রী চুক্তি বাতিল করতে পারে অথবা অনুরূপ একটি মৈত্রী চুক্তি চীনের সাথেও স্বাক্ষর করতে পারে।
অন্য দিকে, ভারতীয়রা নেপালের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হলে দেশটির সরকার মাধেসিদের দাবি মেনে নিতে পারে। এটি করা হলে অন্যান্য জাতিতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোও একই দাবি নিয়ে মাঠে হাজির হতে পারে। ভারতের সাথে সম্পর্কের অধিক অবনতি ঘটলে তরাই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা শুরু হতে পারে। ভারত এতে প্রত্যক্ষ ইন্ধন জোগালে বিষয়টি বড় রকমের আঞ্চলিক অস্থিরতা ও স্নায়ুযুদ্ধের কারণ হতে পারে। এ কারণে ২০১৬ সাল নেপালের জন্য হতে পারে অস্থিরতার বছর।
শ্রীলঙ্কা : ভারসাম্য নীতি অনুসৃত হবে
চীনপন্থী রাজাপাকসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর সিরিসেনার সরকারের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার নীতির আমূল পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল; কিন্তু চীনের বিপুল বিনিয়োগ ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি এবং সার্বিক বিবেচনায় সিরিসেনা সে ধরনের বিপ্লবী পরিবর্তন থেকে সরে এসে ভারসাম্য নীতি অনুসরণ করতে থাকেন। তিনি নিজে ভারত সফরের পর চীন সফরেও গেছেন। রাজাপাকসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে পুনর্বাসিত হওয়ার চেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়নি। তবে তিনি এখনো শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে একজন নির্ণায়ক বলে প্রমাণ রেখেছেন। শ্রীলঙ্কার পরবর্তী নির্বাচনের আগে ভুলগুলো শুধরে নিতে পারলে রাজাপাকসে ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন। শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা বাহিনী সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ যে ভূমিকা রাখছে তা আগামীতেও দেশটিকে একতরফা নীতি অনুসরণ থেকে সরিয়ে রাখতে পারে।
দুই ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপ ও ভুটান
দক্ষিণ এশিয়ার দুই ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপ আর ভুটানও এখন আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক প্রভাবশালীদের দৃষ্টির বাইরে নয়। মালদ্বীপের রাজনৈতিক অস্থিরতা কয়েক বছর ধরেই চলে আসছে। ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত মুহাম্মদ নাশিদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অনেকটাই ছিটকে পড়েছেন। নানা মামলা ও হয়রানির মুখে তিনি কোনোভাবেই রাজনীতির নিয়ন্ত্রকের আসনে বসতে পারছেন না। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন গাইয়ুমকে হত্যার ষড়যন্ত্রের জন্য তার সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতার ও বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। বিশ্বের আবহাওয়াগত বিবেচনায় সবচেয়ে ভঙ্গুর হিসেবে পরিচিত এই দ্বীপমালার দেশটি ভূকৌশলগত কারণে ক্ষমতাধরদের প্রভাব বিস্তার প্রতিযোগিতার শিকার। এ কারণে এটি যেকোনো সময় অস্থিরতার মধ্যে পড়তে পারে। এর মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা হলো, মালদ্বীপের সৌদি জোটে যোগদান।
ভুটানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পরোক্ষভাবে ভারতের কাছে। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হয় দিল্লির প্রভাবে। বড় বড় প্রশাসনিক, বিশেষজ্ঞ ও টেকনিক্যাল পদগুলোতে বসে আছেন ভারতীয়রা। নরেন্দ্র মোদি তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য এই ভুটানকেই বেছে নিয়েছিলেন। ভুটানের আরেক প্রতিবেশী চীন সহায়তার হাত বাড়িয়েছে দেশটির প্রতি এবং বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ফলে এ শান্তির ক্ষুদ্র দেশটিতেও শুরু হয়েছে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ দুই প্রতিবেশী চীন ও ভারতের মধ্যে।
সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া ক্রমেই দু’টি আন্তর্জাতিক বলয়ের প্রভাবের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার মতো দু-একটি দেশ একধরনের ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে। বাংলাদেশের শেখ হাসিনাও চীন-রাশিয়াকে আস্থায় রেখে ভারত-আমেরিকার এজেন্ডা পূরণে মনোযোগী রয়েছেন, যার জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা তিনি পার হতে পেরেছেন। এখানে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের পক্ষগুলোর মধ্যে স্বার্থের সঙ্ঘাত যেমন রয়েছে, তেমনি আবার নির্ভরতাও রয়েছে। মহাসড়ক, রেল ও পাইপলাইন সংযোগের অর্থনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় সঙ্ঘাতকে জয় করে সহযোগিতার বন্ধন তৈরি করে। অস্থির সম্ভাবনার মধ্যেও এটিই হলো দক্ষিণ এশিয়ার সামনে আশার আলো।
mrkmmb@gmail.com

পৌর নির্বাচনের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান by গোলাম মাওলা রনি

২০১৫ সালের শেষ মাসের শেষ দিকের একটি দিনে হয়ে যাওয়া যজ্ঞটির নাম ছিল পৌর নির্বাচন। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন শুরুর দিকে এমন হম্বিতম্বি শুরু করল, যাতে করে কিছু মানুষের বিশ্বাস জন্ম নিলো- এবার হয়তো যুগান্তকারী কিছু একটা ঘটবে। নির্বাচনের পরে দেখা গেল, সত্যিই যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে গেছে। আমাদের রাজনৈতিক দল, গণতান্ত্রিক চেতনা, জনগণের বিশ্বাস এবং আস্থা সর্বোপরি বহির্বিশ্বে সভ্যতার ভাবমূর্তিতে যে ক্ষত সৃষ্টি হলো, তা কাটিয়ে উঠতে কত যুগ অপেক্ষা করতে হবে তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। নির্বাচন-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে কার কতটুকু লাভ কিংবা ক্ষতি হলো, তা নিয়ে কেউ কেউ নিবন্ধ লিখে যেমন পত্রপত্রিকা ভরে ফেলেছেন, তেমনি গলা ফাটানো শব্দসন্ত্রাসে টেলিভিশনগুলোর পর্দায় সর্বনেশে পদ্মার ঢেউয়ের তাণ্ডব চালিয়েছেন অনেকে। আজকের নিবন্ধে আমি অবশ্য ওদিকে পা বাড়াব না- বরং পৌর নির্বাচন নিয়ে ভিন্নতর কিছু উপস্থাপনের চেষ্টা করব।
আমার মতে- সাম্প্রতিক কালের পৌর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই অনাগত দিনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে নিয়ে আসবে এবং সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি, দুর্ভোগ ও লাঞ্ছনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। নির্বাচন কমিশন, জনগণ, রাজনৈতিক দল, সুবিধাবাদী গোষ্ঠী, সুশীলসমাজ, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ধর্মীয় নেতারা পর্যন্ত নতুন নতুন বিরূপ পরিস্থিতির কবলে পড়বেন। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে নির্বাচন কমিশন। পত্রপত্রিকায় দেখলাম- কর্নেল অলিসহ আরো অনেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এবং কমিশনের বড় কর্তাদের আগামী দিনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সর্বোচ্চ কঠোর সাজা দেয়ার কথা বলেছেন। কর্নেল অলির বক্তব্যের বেশ কয়েক দিন আগে সম্ভবত নির্বাচনের দিন সন্ধ্যার দিকে অধ্যাপক আসিফ নজরুল একই আশঙ্কার কথা বলেছিলেন বাংলাভিশনের একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে। তিনি বলেছিলেন, এই নির্বাচন কমিশন গত ৫ জানুয়ারি থেকে আজ অবধি যতগুলো নির্বাচন করেছে এবং সেসব নির্বাচনে এমন সব অদ্ভুত বেআইনি কর্মকাণ্ড করেছে, যা আগামী দিনে তাদেরকে অবশ্যই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। কোন আইনের ভিত্তিতে তারা দায়ী হবেন সে ব্যাখ্যাও অধ্যাপক আসিফ নজরুল করেছেন।
আমাদের দেশে নির্বাচনসংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতি মোটামুটি সব সরকারের আমলেই কম-বেশি হয়েছে। সময়ের বিবর্তনে সংশ্লিষ্ট সরকারের পতনের পর জনরোষ এবং আইনভঙ্গের দায় কেবল রাজনীতিবিদ এবং তাদের দোসরদেরই ভোগ করতে হয়েছে- কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে হুমকির মধ্যে ফেলা হয়নি। কিন্তু বর্তমান কমিশনের কর্মকাণ্ডে সম্ভবত অতীতের সেই ধারাবাহিকতা থাকবে না। আগামী দিনে নির্বাচন কমিশনের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা এবং তাদের মদদদাতাদের একই কাঠগড়ায় হাজির করানোর বিষয়ে জনমত তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সামাজিকভাবেও নির্বাচন কমিশনে কর্মরতদের ভালো চোখে দেখা হচ্ছে না। তাদের নামধাম, কথাবার্তা এবং অঙ্গভঙ্গিকে লোকজন তাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা ক্রীড়া, কৌতুক ও রঙ-তামাশায় উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এসব লক্ষণ ইতঃপূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে অনাগত দিনগুলোতে ১৭ কোটি মানুষের মন ও মনন, চিন্তা ও চেতনা কিছু মানুষকে ঘৃণা, অশ্রদ্ধা এবং বিরক্তির এমন এক সীমায় নিয়ে যাবে, যা কল্পনা বা চিন্তা করলে শিউরে ওঠা ছাড়া উপায় থাকবে না।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনের জয়-পরাজয় নিয়ে কী ভাবছে তা আমার জানা নেই। তবে দলটির নেতৃবৃন্দের কথাবর্তা শুনে মনে হচ্ছে, তারা আত্মবিশ্বাসের চূড়ান্ত শিখরে উঠে গেছেন। তাদের মুচকি মুচকি হাসি, ব্যঙ্গাত্মক কথাবার্তা এবং মিথ্যা দম্ভ দেখে বিবেকবান লোকের বোবা হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। নির্বাচনকে ঘিরে সংঘটিত সব অনিয়ম, অপরাধ, মিথ্যাচার, তাণ্ডব, জালজালিয়াতি প্রভৃতিকে জীবন্ত কবর দিয়ে ক্ষমতাসীনেরা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন- এ নিয়ে কোনো কথা নয়; নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং আমরা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছি। তাদের এসব কথাবার্তার প্রতিবাদ করবে কিংবা সামান্যতম প্রতিরোধ করবে এমন শক্তি, সাহস ও স্পর্ধা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কারো নেই। ফলে এত বড় একটি বেইনসাফি কর্মের পরও সারা দেশে আশ্চর্য এক সুমসাম নীরবতা বিরাজ করছে। ফলে সরকারি লোকজনের আত্মবিশ্বাস হিমালয়ের উচ্চতা ছাড়িয়ে নতুন মাত্রার উঁচু জিনিসের খোঁজে ইতিউতি আরম্ভ করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো- সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনের ফলাফলে সরকারি দলের কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে? এ ব্যাপারে জগৎ-সংসারের একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কোনো পিতা যদি তার সন্তানদের পরিশ্রম করার পরিবর্তে চুরি-ডাকাতি কিংবা রাহাজানি করতে প্রেরণা দেয় এবং পিতার আশকারা পেয়ে সন্তানেরা যদি ওসব মন্দকর্মে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে ফেলে, তবে সময়ের বিবর্তনে পিতা চাইলেও সন্তানেরা মন্দকর্ম পরিহার করে সুপথে ফিরে আসতে পারবে না। মন্দকর্মের দ্বারা অর্জিত সম্পদ সবাইকে নিঃশেষ করে দেয়। তারা অহঙ্কারী ও অত্যাচারী জাহেলে পরিণত হয়। জগৎ-সংসারের কোনো নীতিকথা, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি তাদেরকে স্পর্শ করে না। তারা আমৃত্যু মানবের পরিবর্তে দানবীয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা তাদের আত্মীয়পরিজনকে নিয়ে ধ্বংসের অতলগহ্বরে ডুব দেয়ার আগে তাদের জন্মদাতাদের দুনিয়া ও আখেরাতকে সর্বনাশ করে ছাড়ে। একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তাদের দলীয় প্রধানের কাছে সন্তানতুল্য বলে বিবেচিত হয়। অন্য দিকে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো, নিয়মকানুন, বিধিবিধান এবং কর্মকাণ্ড সেনাবাহিনীর মতো বিধিবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানের সাথে তুলনীয়। দল চালাতে গিয়ে যদি কোনো অনিয়ম, নীতিবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ড এবং অনাচারকে প্রশ্রয় দেয়া হয়, তবে তা শেষ অবধি দলের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। আওয়ামী লীগের কর্মীরা এক সময় গর্ব করে বলত, তারা অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করে ক্ষমতায় এসেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা যখন নিজেরাই ওসব কর্ম করছে, তখন তাদের পরিণতি তাবৎ দুনিয়ার অন্যায়কারীদের মতোই হবে। তারা যেসব পদ-পদবি অর্জন করেছে বা অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়ে তুলেছে, তার জন্য কোনো দিন তারা দলের প্রতি বা দলীয় প্রধানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না, তাদের মন্দ অর্জনের সফলতাকে নিত্যনতুন মন্দকর্ম দ্বারা অলঙ্কৃত করবে। অতিরিক্ত ভোগ ও দখলের মনোবৃত্তির কারণে তারা লোভী, স্বার্থপর ও নিষ্কর্মা হয়ে পড়বে। তারা শয়তানের সাথে দোস্তি ও পিশাচের সাথে মাস্তি করার অছিলা তালাশ করবে। দলের প্রয়োজনে কিংবা দলের দুর্দিনে তারা ভয়ানক কৃপণতা ও কাপুরুষতার পরকাষ্ঠা দেখাবে। নিজেদের পদ-পদবি রক্ষার জন্য প্রয়োজনে তারা শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করবে অথবা ধনসম্পদের একটি অংশ নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
যে পিতা সন্তানদের মিথ্যা বলতে উৎসাহিত করে, মন্দকাজে প্রেরণা জোগায় এবং অসৎ উপার্জন ও অত্যাচারী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে, সেই পিতার দুর্ভাগ্য তাকে কিয়ামত পর্যন্ত তাড়া করে ফেরে। সন্তানেরা তাদের পিতাকে নিজেদের চেয়ে মন্দলোক বলে বিবেচনা করে এবং নিজেদের সব অধঃপতনের জন্য আমৃত্যু জন্মদাতাকে গালাগালি ও অভিশাপ প্রদান করতে থাকে। তারা নিজেদের জীবন থেকে পিতার পরিচয় মুছে ফেলার অবিরত চেষ্টা করে এবং সময় সুযোগমতো নিজেদের সব কুকীর্তির দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরাকাষ্ঠা পিতার ওপর প্রয়োগ করার সুবন্দোবস্ত করে থাকে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তত এক হাজার যোগ্য লোক ছিলেন, যারা যেকোনো পরিস্থিতিতে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার শক্তি ও সাহস দেখাতে পারতেন। অন্য দিকে উপজেলা, পৌরসভা প্রভৃতি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো শক্তিশালী হাজার হাজার নেতাকর্মী ছিলেন। ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন, তার পরের উপজেলা এবং সবশেষের পৌর নির্বাচন নামক যজ্ঞের মাধ্যমে যারা সুবিধাভোগী হয়েছেন, তারা আগামী দিনের প্রতিযোগিতামূলক মাঠে টিকে থাকা তো দূরের কথা- দাঁড়াতেই সাহস পাবেন না। দলের অবশিষ্ট লড়াকু নেতাকর্মীরা বর্তমানের সুবিধাভোগীদের তাপচাপ ও অত্যাচারে গত দুই বছরে এমন পঙ্গুত্ববরণ করেছেন যে, তাদের প্রায় সবাই নিজেদের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এ অবস্থায় সামান্য বিপত্তি দেখা দিলে কতজনকে মাঠে পাওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় ও সন্দেহ দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে।
এবার পৌর নির্বাচনে অংশ নেয়া অন্য দলগুলো সম্পর্কে কিছু বলি। আমি মনে করি, বিরোধী দলের যেসব প্রার্থী জয়ী হয়েছেন কিংবা হেরেছেন, তারা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং আগামী দিনে আরো হবেন। জয়ী ব্যক্তিরা যদি সরকারের সাথে মিশে যেতে পারেন, তবে তারা দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন এবং নিজেরা নতুন এক অনৈতিক জীবন ও জীবিকার ফাঁদে পড়বেন। অন্য দিকে যারা সরকারের সাথে হাত মেলাবেন না তারা মামলা-হামলা ও হয়রানির শিকার হয়ে নিজেদের এবং আত্মীয়পরিজনকে নতুন করে বিপদে ফেলবেন। অনেকে বহিষ্কারাদেশের কবলে পড়বেন এবং জেলে গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করবেন। যারা নির্বাচনে গিয়ে রামধরা খেয়েছেন এবং চোখের সামনে বিজয়ী হওয়ার নাটক দেখে পরাজিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন, তারা আগামী দিনে মনোবল হারিয়ে ফেলবেন। তথাকথিত অবমাননাকর পরাজয়, বিজয়ীর দম্ভ, আর্থিক ক্ষতি, অপমান এবং নিকটজনের ধিক্কার তাকে যারপরনাই বিষাদগ্রস্ত বানিয়ে ফেলবে। ফলে আগামী দিনে নতুন একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো যোগ্যতাই হয়তো আর অবশিষ্ট থাকবে না। দলের প্রতি তার একটা অভিমান পয়দা হয়ে যাবে এবং অনেক কিছু থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার প্রবণতার কারণে তিনি দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নীরবে দূরে সরে যাবেন। ফলে দল লড়াকু কর্মীর অভাবে দিনকে দিন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়বে।
দেশের সংবাদপত্র শিল্প এবং সুশীলসমাজ এবারের পৌর নির্বাচন দ্বারা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১০-১২ বছর ধরে যেসব পত্রপত্রিকা তার পাঠকদের কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিল, এবারের নির্বাচন নিয়ে তাদের সৃষ্ট প্রতিবেদন পরিবেশনার জন্য তারা মানুষজনের ধিক্কারের পাত্রে পরিণত হয়েছে। তাদের অতীতের সাহস-শক্তি এবং কৌশল আজ কেবলই স্মৃতি। তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ড, লোভলালসা ও আত্মসমর্পণ করার গতিপ্রকৃতি দেখে স্বয়ং ক্ষমতাবানেরা আশ্চর্য হয়ে বলাবলি করছেন- ওরা এত সহজে এতটা নিচে নামতে পারে, তা তো আগে জানতাম না। আমরা অযথাই ইঁদুরকে বিড়াল ভেবেছিলুম- আর বিড়ালকে ভেবেছিলুম বাঘ। অন্য দিকে, সুশীলদের চিন্তা ও চেতনায় এবারের পৌর নির্বাচন নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। তারা সবাই হাশরের ময়দানের থিওরিতে বিশ্বাস স্থাপন করে নির্বাচনের দিন থেকেই ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি জিকির আরম্ভ করে দিয়েছেন। তারা কনফুসিয়াসের তত্ত্বের ভিত্তিতে নিজ নিজ কর্ম এবং নিজ নিজ জীবন ও সংসারের প্রতি অতি মাত্রায় যত্নশীল হয়ে পড়েছেন।
সবশেষে বলছি জনগণের কথা। পৌর নির্বাচনের ডামাডোল এবং ফলাফলের সাতকাহনে জনগণ রীতিমতো পরশপাথর বনে গেছেন। তারা সরকারকে এই বলে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন যে, সরকার দয়া করে ভোটার তালিকায় তাদের নাম ও ছবিটি রেখেছে। যদি তালিকায় নামধামই না থাকত তাহলে কী-ই বা করার ছিল, তারা নির্বাচন কমিশনের প্রতি কায়মনোবাক্যে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন এই বলে যে- আহা, কী সুন্দর ব্যবস্থা! আগের রাইতেই সব ফকফকা- ও মানিক কী বাতি লাগাইছিলি!!
জনগণ বেশখানিকটা অবাক হয়ে টিভিতে দেখলেন যে, দশ-বারো বছরের ছেলেমেয়েরা ভোট দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। সাংবাদিকেরা যখন ওই সব সোনামণিকে জিজ্ঞেস করলেন- মনুরা, তোমাগো বাপের নাম কী? তখন তারা বাপের নামটি ভুলে গেল- কেউ কেউ আবার নিজের নামটি পর্যন্ত ভুলে বসল। বিকেলের দিকে নির্বাচনের ফলাফল দেখে জনগণ প্রচণ্ড আবেগ ও কৃতজ্ঞতায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন- আমরা হীরক রাজার দেশের বাসিন্দা নই- আমরা কোনো যন্তরমন্তর কামরায় ঢুকিনি- আমরা সত্য বলছি- ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে’। কারণ, আমাদের সত্যবাদী প্রধান নির্বাচন কমিশনার মহাক্ষমতাধর কর্তা কাজী রকীবউদ্দিন মহোদয় জীবনসায়াহ্নে এসে আল্লাহ ও রাসূল সা:কে সাক্ষী রেখে দেশবাসীর সামনে বীরদর্পে ঘোষণা করেছেন- ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে’। তার কথার ওপর কথা বলা যাবে না- তার সব বক্তব্যকে সমস্বরে সমর্থন জানাতে হবে এবং আগামী দিনে আরো সুন্দর ও ভয়ঙ্কর নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিনি যেন শতায়ু লাভ করেন, এমন দোয়া পাঠান্তে ঘুমোতে যাওয়ার প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞা করার শক্তি এ দেশের জনগণ লাভ করেছেন সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনের মাধ্যমে। জনগণের এই নতুন প্রাপ্তি তাদের ভাগ্যকে কতটা রঞ্জিত করে, এটাই এখন দেখার বিষয়।

শিক্ষক-ব্যাংকারদের আলটিমেটাম

অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে বৈষম্য নিরসনের দাবিতে আলটিমেটাম দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ব্যাংকাররা। গতকাল পৃথক কর্মসূচি থেকে তারা এ আলটিমেটাম দেন। আগামী শনিবারের মধ্যে দাবি না মানা হলে লাগাতার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। পূর্ব-ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন। এদিকে গতকাল এক ঘণ্টার কর্মসূচি পালন করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বেতন-বৈষম্য দূর না করলে সামনে গণছুটিতে যাওয়ার মতো কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
গতকাল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের আহ্বানে সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত দেশের ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করা হয়। তিন ঘণ্টার কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট আগামীকাল পর্যন্ত চলবে। শিক্ষকদের কালোব্যাজ ধারণ কর্মসূচি চলছে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে ১০ই জানুয়ারি কোনো কর্মসূচি রাখা হয়নি। এর মধ্যে দাবি মানা না হলে ১১ই জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করা হবে। এদিকে কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলাস্থ বটতলায় কর্মসূচি পালন করে। অবস্থান কর্মসূচিতে শিক্ষকরা তাদের আন্দোলন চলাকালে কতিপয় আমলা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে ভুয়া পরিপত্র দিয়ে শিক্ষকদের অপমান করেছে অভিযোগ করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ১১ই জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লাগাতার ধর্মঘট শুরু হলে এর দায়ভার সরকারকে নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তারা। ফেডারেশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হকের সভাপতিত্বে অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তৃতা করেন মহাসচিব অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল, অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন, অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক, অধ্যাপক ড. শফিক-উজ-জামান, কলা অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, টেলিভিশন ও ফিল্ম অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এজেএম শফিউল আলম ভূঁইয়া, অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়াউর রহমান, অধ্যাপক মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী, অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্লাহ প্রমুখ। তিন দফা দাবিতে শিক্ষকরা দুই মাস ধরে আন্দোলন করে আসছেন। দাবিগুলো হলো- অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য সপ্তম জাতীয় বেতন কাঠামোর সম্পূর্ণ অনুরূপ সিলেকশন গ্রেড ও টাইম-স্কেল বহালসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে; অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে সিনিয়র সচিবের যে স্থান রাখা হয়েছে, সেই স্থানে গ্রেড-১ প্রাপ্ত অধ্যাপকদের মধ্য থেকে একটি অংশকে শতকরা হারে উন্নীত করার বিধান রাখতে হবে; সরকারি কর্মকর্তাদের অনুরূপ গাড়ি ও অন্যান্য সুবিধা শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে।
অবস্থান কর্মসূচিতে অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, আমরা অনেক সময় দিয়েছি সরকারকে। শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয় এমন কোন কর্মসূচি দেইনি। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কতিপয় আমলাদের কারণে আজ শিক্ষকরা অপমানিত হচ্ছেন। এসব আমলারা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়ার পাঁয়তারা করছে। লাগাতার কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটলে এর দায়ভার শিক্ষকরা নেবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষকরা গত দুই মাস থেকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিয়ে দাবী আদায়ের চেষ্টা করছেন। অর্থমন্ত্রী দাবি পূরণ হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে অর্থমন্ত্রী শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। ঘোষিত বেতন কাঠামোতে শিক্ষকদের কোন দাবিই পূরণ হয়নি। তাই যে কোন কঠোর আন্দোলনের জন্য সরকারই দায়ী থাকবে। অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের স্বাক্ষরিত একটি ভুয়া পরিপত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেই পরিপত্রে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে পাল্টিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ অপরাধ যারা করেছে তাদেরকে আমরা চিনি। শিক্ষকরা সবসময় সত্য প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। আমরা সত্যের পক্ষে, ওই আমলারা অসত্যের পক্ষে। আমরা যদি আরো আন্দোলন করতে চাই তবে ওই আমলাদের বিপক্ষেই করব। এ সময় তিনি তদন্তের মাধ্যমে শিক্ষকদেরকে অসম্মানের সঙ্গে জড়িত আমলাদের বিচার দাবি করেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এখন অর্থমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে নানান ধরনের কথা বলছেন। তার মতো একজন সিনিয়র মন্ত্রীর ওপর যদি শিক্ষকেরা আস্থা রাখতে না পারে, তাহলে কার ওপরে রাখবে?
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক বলেন, শিক্ষকদের দাবি খুবই সীমিত এবং সুনির্দিষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাদের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে কোনভাবেই শিক্ষার্থীদেরকে জিম্মি করতে চান না। পেট্রলবোমা সন্ত্রাসের সময়ও জীবনবাজি রেখে তারা ক্লাস নিয়েছে। শুক্রবার নির্ধারিত ছুটির দিনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়ে শিক্ষকরা ক্লাস নিয়েছেন। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন সেশনজট নেই। তিনি বলেন, সরকারের ওপর মহলের ব্যর্থতায় যদি শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে যেতে হয় তবে সে দায় তাদের। যারা ষড়যন্ত্র করছে তাদের ওপর সেই দায় বর্তাবে। শিক্ষকদের আন্দোলন মর্যাদা রক্ষার। মর্যাদাহানি করে, এমন কোন কিছু আমরা চাই না। অধ্যাপক নাজমা শাহীন বলেন, শিক্ষকদেরকে নিয়ে সব সময় ষড়যন্ত্র হয়েছে এখনো হচ্ছে। শিক্ষক সমাজকে হেয় করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এটা কোন রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। এটা মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন। অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, এমন একটা সরকারের সময় এটা হচ্ছে যে সরকার আমাদের কাম্য। তাদের বক্তব্য আজ আমাদেরকে ব্যথিত করে। সরকারের যে অংশটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদেরকে নিয়ে এমন কাজে ব্যস্ত তারা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য বোঝে না। তিনি বলেন, এটা আমাদের ব্যর্থতা। কারণ আমরা ওই শিক্ষার্থীদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে পারিনি। অধ্যাপক ড. এজেএম শফিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, অষ্টম বেতন কাঠামোতে গ্রেড-২ থেকে গ্রেড-১ এ যাওয়ার যে পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে তা ‘৭৩ সালের অধ্যাদেশ পরিপন্থি। অধ্যাদেশ অনুসারে গ্রেড-২ থেকে গ্রেড-১ উন্নীত হওয়া ঠিক করবে বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বেতন কাঠামোতে তা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি কমিটি ঠিক করবে বলে বলা হয়। তিনি বলেন, আমলা আমাদের বলেন আপনাদের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত আছে কিনা। আমাদের কাছে অনেক শিক্ষার্থী এসে আন্দোলনে শরিক হতে চেয়েছেন। কিন্তু আমরা তাদের নিষেধ করেছি। প্রয়োজন হলে তারাও কর্মসূচি দিয়ে তাদের শিক্ষকদের মর্যাদার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম। অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, অর্থমন্ত্রী আত্মীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত। তিনি তার আত্মীয়দের সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসিয়েছেন। সুতরাং ভূতের মুখে রাম রাম মানায় না। এদিকে দেশের ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
ইবি প্রতিনিধি জানান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অনুষদ ভবনের করিডরে কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচিতে বক্তারা তাদের দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান। তা না হলে আগামী ১১ তারিখ থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতিসহ টানা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন শিক্ষকরা। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আয়োজনে অবস্থান কর্মসূচি ও কর্মবিরতি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইবিশিস এর সভাপতি প্রফেসর ড. এমতাজ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. অলী উল্ল্যাহ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আশকারী, ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব প্রফেসর ড. আক্তারুল ইসলাম জিল্লুসহ অন্যান্য শিক্ষক নেতৃবৃন্দ ও শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। সভায় বক্তারা বলেন, ‘দেশের যত বড় বড় অবদান আছে জ্ঞানীদের, শিক্ষকদের। মুক্তিযুদ্ধের সময় শিক্ষক তথা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল। কারণ তারা দেশের চালিকাশক্তি। দেশে লবণাক্ত এলাকায় ফসল চাষ করা আবিষ্কার করেছেন শিক্ষকরা, সচিবরা নন। এছাড়াও আরও অনেক অবদান রয়েছে শিক্ষকদের। সচিব তৈরি করা শিক্ষকদের কাজ। এতদসত্ত্বেও কেন শিক্ষকদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া হবে না।’
বাকৃবি প্রতিনিধি জানান, অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে অর্থমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ ও সব অসঙ্গতি দূরীকরণের দাবিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। বৃহস্পতিবার কৃষি অনুষদীয় করিডরে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ব্যানারে শিক্ষকরা এ কর্মসূচি পালন করেন। সকাল ১১টা থেকে ক্লাস বর্জন করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. খন্দকার শরীফুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম সরদারের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. মনোরঞ্জন দাস, অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. খন্দকার মো. মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মহির উদ্দীন, অধ্যাপক ড. মো. হারুন-অর-রশিদ, অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ ইকবাল, অধ্যাপক মো. সাইদুর রহমান প্রমুখ।
হাবিপ্রবি প্রতিনিধি জানান, অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল-সংক্রান্ত গেজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবিসমূহের প্রতিফলন না হওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের কর্মসূচি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। বৃহস্পতিবার েেবলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা। অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে বক্তব্য দেন হাবিপ্রবির শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর মো. মিজানুর রহমান, সদস্য প্রফেসর ড. বলরাম রায়, প্রফেসর ড. মো. আবদুল হামিদ, প্রফেসর ড. সাইফুল হুদা, ড. মো. মামুনুর রশীদ প্রমুখ। বক্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। ১১ই জানুয়ারি থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করা হবে। অনতিবিলম্বে অষ্টম বেতন কাঠামোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবিগুলো অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বক্তারা।
জাবি প্রতিনিধি জানান, অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে অর্থমন্ত্রী প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ ও অন্যান্য অসঙ্গতি দূরীকরণের দাবিতে কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। গতকাল বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত নতুন কলা ও মানবিক অনুষদ ভবনের সামনে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা। কর্মসূচিতে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার বলেন, আমরা শুধু বেতন-ভাতার জন্য আন্দোলন করছি না, আমরা আমাদের মর্যাদার লড়াইয়ের জন্য এ আন্দোলন করছি। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে আন্দোলন করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই আমরা এ ধরনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছি। অবস্থান কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা তাদের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। এ সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি আদায় না হলে ১১ই জানুয়ারি থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক খবির উদ্দিনের সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন, অধ্যাপক সামসুল আলম সেলিম, অধ্যাপক এ টি এম আতিকুর রহমান, অধ্যাপক হানিফ আলী, অধ্যাপক মানস চৌধুরী, অধ্যাপক এ কে এম শাহনেওয়াজ, অধ্যাপক আবু দায়েন প্রমুখ।
শাবি প্রতিনিধি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্যে অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে অর্থমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং অসঙ্গতি দূরীকরণের দাবি জানিয়ে অবস্থান ধর্মঘট ও সমাবেশ করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। গতকাল সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘চেতনা-৭১’ চত্বরে প্যান্ডেল স্থাপন করে ব্যানার টানিয়ে এ অবস্থান কর্মসূচি ও সমাবেশ করেন শিক্ষকরা। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এ অবস্থান ধর্মঘট ও সমাবেশের আয়োজন করে। শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মুহিবুল আলমের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আবদুল গণির সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ, অধ্যাপক সৈয়দ ড. সামসুল আলম, অধ্যাপক ড. আখতারুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. সাজেদুল করিম, অধ্যাপক ড. সাবিনা ইসলাম, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুছ, অধ্যাপক ড. আবদুল আউয়াল বিশ্বাস, অধ্যাপক ড. দ্বীপেন দেবনাথ প্রমুখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, শিক্ষকরা হচ্ছেন জাতির মেরুদণ্ড। একটি জাতি আলোকিত হয় এ শিক্ষক সমাজের ওপর ভিত্তি করে। তাই শিক্ষককে যথাযত মর্য়াদা দিতে হবে। তা না হলে জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ওপর আমাদের যথেষ্ট আস্থা আছে। আমাদের দাবি নৈতিক। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরব না। এ সময় বক্তারা অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করার আহ্বান জানান। অন্যথায় বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের এ আন্দোলন আরও কঠোর থেকে কঠোরতর করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন।
আন্দোলনে সাড়ে চার হাজার ব্যাংকার
এদিকে গতকাল সকাল ১০টা থেকে ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কর্মকর্তা একযোগে নিচে নেমে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সবার হাতে নানা ধরনের স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, ব্যানার ছিল। নতুন বেতন কাঠামোয় পদবৈষম্য দূর করাসহ তিন দফা দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকালে সব স্তরের কর্মকর্তারা কাজ বন্ধ রেখে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় চত্বরে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। এ সময় বাইরে থেকে কাউকে ব্যাংকচত্বরে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
দাবি আদায়ে আগামী ১০ ও ১১ই জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এবং ১২-১৪ই জানুয়ারি সকাল ১০ থেকে ১২টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করা হবে বলে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন। এর মধ্যে সরকার দাবি মেনে না নিলে ১৫ই জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গণছুটিতে যাবেন বলে কাউন্সিলের সভাপতি ছিদ্দিকুর রহমান মোল্লা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ- অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে তাদের মর্যাদাহানি করা হয়েছে। এর আগে সব বেতন স্কেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক, বিসিএস ক্যাডার ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা একই স্কেল বা গ্রেডভুক্ত থাকলেও নতুন বেতন কাঠামোয় সহকারী পরিচালক পদ এক ধাপ নামিয়ে নবম গ্রেড করা হয়েছে। আর বিসিএস ক্যাডার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অষ্টম গ্রেডে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বেতন স্কেলের গেজেটে বাংলাদেশ ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে দেখানো হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। গেজেট প্রকাশের পর গত ২২ই ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে সহকারী পরিচালক পদ অষ্টম গ্রেডে উন্নীত করা, গেজেটে বাংলাদেশ ব্যাংককে আলাদাভাবে উল্লেখ করা এবং নির্বাহী পরিচালক পদ গ্রেড-১-এ উন্নীত করার দাবি তোলা হয়। দাবি আদায়ে এরপর কালোব্যাজ ধারণ, প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধনও করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বৃহস্পতিবার কর্মবিরতিতে ছিদ্দিকুর রহমান মোল্লা বলেন, গভর্নর বলেছেন, আমাদের দাবি পূরণের দায়িত্ব তিনি নিচ্ছেন। কিন্তু আমরা এতে সন্তুষ্ট না। আমরা আর কথায় বিশ্বাস করতে চাই না। বাস্তবায়ন চাই। ১৪ই জানুয়ারির মধ্যে দাবি আদায় না হলে গণছুটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। একটি সূত্র দাবি করেছে, বৃহস্পতিবার আন্দোলন চলাকালীন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব গভর্নর ড. আতিউর রহমানের কাছে টেলিফোন করেছেন। তাতে আন্দোলন থামানোর চেষ্টার কথা বলা হয়।