Sunday, August 18, 2024

এক গ্রুপ যাওয়ার পর আরেক গ্রুপ চাঁদা দাবি করেছে -বাণিজ্য উপদেষ্টা

এক গ্রুপ চলে গেলে আরেক গ্রুপ এসে আবার চাঁদা দাবি করেছে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ ও বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে এসব কথা বলেন তিনি।

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কী ভূমিকা রাখবেন জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, কাওরান বাজারেই একটা পণ্য চারবার হাতবদল হয়, তাই না। এগুলো প্রিজামপটিভ মানি, তুমি এত টাকায় বিক্রি করলে এত টাকা পাবে। এভাবে টাকা আদায় করা হয়। এগুলো বন্ধ করতে হবে। চাঁদাবাজি হয়, একটা ট্রাক ঢাকা পর্যন্ত আসতে সাত হাজার টাকা লাগে, কেউ একজন আমাকে বলেছিলেন। তবে এটা কিন্তু বাণিজ্য কিংবা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব না। এটা যাদের দায়িত্ব, তাদের সঙ্গে কথা বলবো।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অনেকে আত্মগোপনে গেছে। নতুন করে চাঁদাবাজ তৈরি হবে না, সেই নিশ্চয়তা কী, জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, আমার কাছে অনেক প্রতিবেদন আসছে। চাল কিনবে চাতাল থেকে, এক গ্রুপ নিয়ে চলে গেছে, আরেক গ্রুপ এসে আবার চাঁদা দাবি করেছে।

তখন আমি বলেছি, তাৎক্ষণিকভাবে ডেপুটি কমিশনারকে বলো, খোঁজ-খবর নিতে, যাতে ভালো ব্যবসায়ীরা বাধাপ্রাপ্ত না হয়। আমি জানি, এক গোষ্ঠী গেলে, নতুন আরেক গোষ্ঠী আসবে।ট্রেডিং

কর্পোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিনা, প্রশ্নে তিনি বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে খোলা বাজারে কিছু বিক্রি করতে হবে। তবে সবকিছু একদিনে প্রত্যাশা করতে না বলেছেন এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, হঠাৎ করে সবকিছু বন্ধ করে দিলে নিষ্পাপ লোকজন ভুক্তভোগী হবেন।
এসময়ে এক কর্মকর্তা বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে টিসিবির ডিস্ট্রিবিউশন স্থগিত আছে। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটা চালু করা হবে।

এদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের দেশীয় প্রধান এডিমন গিনটিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দ্রব্যমূল্যের বিষয়টি উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশে কোনো পণ্যের উৎপাদন কম হলে যতটা সম্ভব আমদানি করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন চাপে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে কী কী করা দরকার, সরকার সে বিষয়ে সজাগ আছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সরকারি কর্মচারীরা রেশন চাইলে কী করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে বেসরকারি চাকরিজীবীদের কী হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, তার কাছে সবাই সমান। সবাই যেন শোভনভাবে জীবন যাপন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে তা আমদানিবাহিত। এ বিষয়ে সরকার সচেতন রয়েছে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যতটা সম্ভব, দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সহায়ক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হবে। দুর্নীতি যেন না হয়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে বাণিজ্যের বড় ভূমিকা আছে। ফলে এসব ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করার চেষ্টা করা হবে।

মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য সংগঠনগুলোর সঙ্গে শিগগিরই বৈঠক করে বিদ্যমান সমস্যা দূর করার চেষ্টা করা হবে বলে জানান অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা। বাণিজ্য সংগঠনগুলোর বড় ভূমিকা আছে উল্লেখ করে সাংবাদিকদের তিনি আশ্বস্ত করেন, ‘বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কী হয়, সে বিষয়ে আমার ধারণা আছে। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকেন, এ বিষয়ে যা করা দরকার, আমরা তা করব।’
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, ‘চলমান যেসব প্রকল্প যৌক্তিক, সেগুলো চালিয়ে নেয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে। সেই সঙ্গে পাইপলাইনে যেসব প্রকল্প আছে বা ভবিষ্যতে আরও যেসব প্রকল্প নেয়া হবে, সেখানে তারা সহায়তা করবে। তারা ইতিবাচক। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যিনি এসেছেন, তাকে আমরা জানি; আমরা জানি কী করতে হবে।’

ট্রাইব্যুনালের সামনে ১১৩ বন্দির স্বজনদের আহাজারি: মুক্তিযুদ্ধের সময় জন্মও হয়নি এমন অনেকে আসামি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছে তাদের পরিবার। রোববার (১৮ই আগস্ট) সুপ্রিম কোর্ট মাজার গেট এলাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ মানববন্ধন করা হয়। গ্রেপ্তারদের পরিবারের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় জন্ম হয়নি এমনকি সে সময় ১০ বছর বয়স ছিল তাদেরকেও আসামি করা হয়েছে বলেও জানান তারা। দ্রুত ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে মিথ্যা মামলায় ভুক্তভোগীদের খালাস দেয়ার দাবি জানান আইনজীবীরা।

স্বজনদের দাবি, পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, এ ট্রাইব্যুনালে ৩০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ মামলাগুলোতে ১১৩ জন গ্রেপ্তার রয়েছে। আরও ৫৪ জন বিচারাধীন মানুষ বিনা চিকিৎসায় অবহেলায় মৃত্যুবরণ করেছে। গত ১৫ই জুন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান অবসরে যাওয়ার পর অদ্যাবধি ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত না হওয়ায় আসামিরা বিনা বিচারে একের পর এক মৃত্যুবরণ করছে। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের প্রতিহিংসার শিকার বয়োবৃদ্ধ আসামিদের ফাঁসাতে আজ্ঞাবহ জজ ও প্রসিকিউটর নিয়োগ দিয়ে নিরীহ বয়োবৃদ্ধ আসামিদের দিনের পর দিন অবিচার আর বিচারিক আয়নাঘর বানিয়ে তিল তিল করে হত্যা করছে। বর্তমান বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারের কাছে আবেদন যাতে ন্যায়বিচারক জজ নিয়োগ দিয়ে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে সুবিচারের মাধ্যমে আসামিদের মুক্তির জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।
স্বৈরাচার সরকার এ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করেছিল তার প্রতিপক্ষ বিরোধী দলের নেতাদেরকে ফাঁসি দিতে। ট্রাইব্যুনালে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউটরদের ব্যক্তিগত অনৈতিক স্বার্থে ট্রাইব্যুনালকে চালু রাখতে বয়োবৃদ্ধ পিতাদের ট্রাইব্যুনালের কাঁচামাল বানিয়েছে।

এখানে কেউ ন্যায়বিচার পায়নি। সরকার পক্ষ আর্থিক লোভ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে সব সময়, আসামি পক্ষে কেউ সাক্ষ্য দিতে এলে পা ভেঙে দিতে বলেছিল মন্ত্রীরা, আসামিপক্ষে তবুও সাহস করে কেউ এলে তাদের গুম করেছে সাদা পোশাকের পুলিশ। তাদের কাউকে ভারতের কারাগারে কাউকে আয়না ঘর থেকে ৮ বছর পর উদ্ধার করা হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবীকেও গুম করেছে। বিদেশি অসংখ্য পত্রিকায় এখানে সরকারের অবিচারের কথা ফুটে উঠেছে। দেশি সংবাদ মাধ্যম টিভি, যারাই সত্য সংবাদে এ বিচারের অনিয়ম তুলে ধরেছে সেটাই বন্ধ করে সম্পাদকসহ সাংবাদিকদের দেশছাড়া করেছে। বিদেশি আইনজীবীদের আসতে দেয়নি। বিদেশি সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানসহ দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ট্রাইব্যুনালে স্বচ্ছতা নিয়ে কথা বলায় কন্টেম্পট করে শাস্তি দিয়েছে। যে বা যারা ট্রাইব্যুনালের অবিচার নিয়ে কথা বলেছে তাদেরই ট্রাইব্যুনাল আদালত অবমাননার শাস্তি দিয়েছে। স্কাইফি কেলেঙ্কারির পর জজ সাহেবদের পদত্যাগ প্রমাণ করে এখানে সরকার ন্যায়বিচারের পরিবর্তে জুডিশিয়াল কিলিং করেছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এ ট্রাইব্যুনালের সব অনিয়মের প্রতিবাদ করেছে। 

শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, সংস্কারের পর নির্বাচন -কূটনীতিকদের প্রধান উপদেষ্টা

প্রথম আলোঃ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘এমন একটি সময়ে এসে দেশের দায়িত্ব নিয়েছি, যখন প্রায় সবক্ষেত্রেই চরম বিশৃঙ্খলা। তাই নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করবে।’

রাজধানীর একটি হোটেলে আজ রোববার দুপুরে ঢাকায় বিদেশি বিভিন্ন মিশনের রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের প্রথম ব্রিফিংয়ে ড. ইউনূস এ কথা বলেন। গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের নবযাত্রায় বাংলাদেশের বন্ধু, অংশীদার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাশে থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

পরে ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের জানান, প্রধান উপদেষ্টা বিদেশি কূটনীতিকদের পুরোপুরি সমর্থন চেয়েছেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের বন্ধুদের মধ্যে থাকতে পেরে আনন্দিত। দুই সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বিপ্লবের সাক্ষী হয়েছে। শেখ হাসিনার নৃশংস স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল লাখো বীরছাত্র-জনতা। কিন্তু তাঁর (শেখ হাসিনা) দলের ছাত্র সংগঠন ও শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দেশে ভয়াবহতম বেসামরিক গণহত্যা করার পর তিনি (শেখ হাসিনা) দেশ ছাড়েন।

ড. ইউনূস বলেন, ‘আমি সেই সমস্ত বীর ছাত্র এবং নিরীহ মানুষদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই, যাঁরা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন। আমাদের সাম্প্রতিক স্মৃতিতে অন্য কোনো দেশের ছাত্রদের তাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য এত মূল্য দিতে হয়নি; যেখানে একটি বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়সঙ্গত এবং পরিবেশবান্ধব একটি দেশের স্বপ্ন দেখতে হয়েছে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত থাকবে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি এমন একটি সময়ে এসে দেশের দায়িত্বভার নিয়েছি, যেখানে অনেক দিক থেকেই পুরোপুরি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ক্ষমতায় থাকার চেষ্টায় শেখ হাসিনার স্বৈরাচার সরকার দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।’ তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের নির্মম নৃশংসতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার দমন করা হয়েছিল। নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম তাদের ভোটাধিকারের চর্চা না করেই বেড়ে উঠেছে। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক লুট হয়েছে। আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে লুণ্ঠন করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার।

ড. ইউনূস বলেন, ‘দেশ নিয়ে ছাত্রদের একটি স্বপ্ন আমাদের মুগ্ধ করেছে, যে স্বপ্ন একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে।’ তিনি বলেন, ছাত্ররা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখছে যেখানে মানুষ তাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়–নির্বিশেষে, নিজেদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। সরকার গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা সমুন্নত রাখবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। সশস্ত্র বাহিনী বেসামরিক শক্তির সহায়তায় কাজ চালিয়ে যাবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না পরিস্থিতি নিশ্চিত হবে। সব ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ অন্তর্বর্তী সরকার।

প্রধান উপদেষ্টা দেশে জুলাই-আগস্ট মাসে আন্দোলনে নিহত হওয়ার ঘটনায় জাতিসংঘের তদন্তকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, তিনি চান এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। তদন্তে জাতিসংঘকে বাংলাদেশ সরকার সহায়তা দেবে।

ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ যতগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে, তার সব বাস্তবায়ন করবে সরকার। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী ও গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের জন্য দায়িত্ব পালন করব। এরপর আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করব। জাতীয় ঐকমত্য বৃদ্ধির জন্যও আমরা আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাব।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নতুন যাত্রার এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। আমাদের সাহসী ছাত্র ও জনগণের জন্য আমাদের জাতির স্থায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের যাত্রাটা কঠিন। তাদের আকাঙ্ক্ষা আমাদের পূরণ করতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সেটা হয়, ততই ভালো। আমরা বিশ্বাস করি, একটি নতুন গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের যাত্রাপথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সব বন্ধু ও অংশীদারেরা আমাদের সরকার ও জনগণের পাশে দাঁড়াবে।’

শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির আগে যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন সেনাপ্রধান -দ্য উইকের প্রতিবেদন

প্রথম আলো: বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে মাসব্যাপী বিক্ষোভের সূত্র ধরে পরিস্থিতি যখন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছিল, এমন সময় দেশজুড়ে সেনা মোতায়েন করে সরকার। এর মধ্যে ২ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ওই দিন এক বৈঠকে তরুণ সেনা কর্মকর্তারা দেশের পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বৈঠক সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র থেকে এ তথ্য পেয়েছে ভারতের সাপ্তাহিক সংবাদ সাময়িকী দ্য উইক।

বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য সেনাপ্রধান বৈঠকটি ডেকেছিলেন। সূত্রটি জানায়, সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষোভ প্রশমনে সেনাপ্রধান এ বিষয়টি তুলে ধরেন যে যদি অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়, তাহলে বাংলাদেশ কেনিয়া বা আফ্রিকার অন্যান্য দেশের মতো হয়ে যেতে পারে।

কর্মকর্তাদের সংযত থাকার পরামর্শ দিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমাদের দেশে ১৯৭০ সালের পর এমন গণবিক্ষোভ আর কখনো হয়নি। তাই এটি একটি ব্যতিক্রম ঘটনা। আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।’ তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষোভ প্রকাশের মধ্য দিয়ে বৈঠকটি শেষ হয়।

এর ৩ দিন পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা একটি সামরিক হেলিকপ্টারে চড়তে বাধ্য হন, যেটা তাঁকে ভারতীয় সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় নিয়ে যায়। সেখানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি সি১৩০ পরিবহন উড়োজাহাজ অপেক্ষমাণ ছিল, সেটা তাঁকে (শেখ হাসিনা) দিল্লির উপকণ্ঠের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে নিয়ে যায়।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের অবস্থা ছিল অস্বস্তিকর। কারণ, তাঁকে শেখ হাসিনা নিয়োগ দিয়েছিলেন। তা ছাড়া বৈবাহিক সূত্রে তিনি শেখ হাসিনার আত্মীয়। বিষয়টি সম্ভবত তাঁকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও সতর্ক করে তুলেছিল। বিশৃঙ্খলার মধ্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সেনা মোতায়েনকে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরতে সেনাপ্রধান বলেছিলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। তারা ১ হাজার ৭১৯টি গুলি ছুড়েছে, ১৪ হাজার ফাঁকা গুলি ছুড়েছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস জনতার মুখোমুখি হয়ে ৩১টি উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে।

মতবিনিময়ে সেনাপ্রধানের পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে তদন্তের আহ্বান আসে। তরুণ মেজর মো. আলী হায়দার ভূঁইয়া সেনা মোতায়েনকালে সেনাবাহিনী যে ভূমিকা রেখেছে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি পবিত্র কোরআন থেকে উদ্ধৃত করেন, তিনি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আল্লাহর করুণা ভিক্ষা করেন এবং এতে যুক্ত না হওয়ার কথা বলেন। একজন কনিষ্ঠ কর্মকর্তার এই আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শুধু বলেন, ‘আমিন’।

নারী কর্মকর্তা মেজর হাজেরা জাহান এই ঘটনায় শিশুদের প্রাণহানি ও এর ন্যায্য বিচার হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ওপর জনগণের অসন্তোষ বাড়তে থাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সেনাপ্রধান তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির এক কর্মকর্তা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কয়েকজন কর্মকর্তার ‘অগ্রহণযোগ্য’ কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন। জবাবে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, পরিস্থিতি ঠিক হলে এগুলো দেখা হবে।

সেনাবাহিনীর ওপর জনগণের সমর্থন কমে যাওয়ার কথা তুলে ধরে সেনাসদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন ৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব। চট্টগ্রামের আরেক কর্মকর্তা আহত শিক্ষার্থীদের সহায়তার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে কাজ করার পরামর্শ দেন।

সব শেষে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যে সামাজিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন, তা তুলে ধরেন এবং নিজের হতাশা প্রকাশে আইয়ুব বাচ্চুর একটি গানের কথা তুলে ধরেন।

তথ্যসূত্র: দ্য উইক

পাঁচ ক্ষেত্রে সংস্কারের পর নির্বাচন : ড. ইউনূস

বাংলাদেশে আইন, প্রশাসনসহ পাঁচ ক্ষেত্রে সংস্কারের পর অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আজ (রোববার ১৮ আগস্ট) দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফকালে তিনি এ কথা জানান।

৮ আগস্ট সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের ১০ দিন পর বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কূটনীতিকদের সঙ্গে এই প্রথম সাক্ষাৎ করেন তিনি। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০ জন মিশনপ্রধান যোগ দেন।

পরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি জানান, ড. ইউনূস কূটনীতিকদের বলেছেন, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা বাহিনী ও মিডিয়াতে সংস্কার করার পরে আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করব।

ড. ইউনূস বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এখনকার অগ্রাধিকার হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। দ্রুত এটি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিও সরকারের গুরুত্ব থাকবে। তৈরি পোশাকশিল্পে কোনো অস্থিরতা সহ্য করা হবে না বলেও জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।

ড. ইউনূস আরও বলেন, আমি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, তখন দেশের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ক্ষমতায় থাকার জন্য স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। বিচার বিভাগের ভঙ্গুর অবস্থা। গণতান্ত্রিক অধিকারকে ১৫ বছর ধরে দমনের মাধ্যমে খর্ব করা হয়েছে। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। নতুন প্রজন্ম ভোট ছাড়াই বেড়ে উঠছিল। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক লুট করা হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের কোষাগার শেষ করা হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারা ফেরাতে জোরালো ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার করার ওপর জোর দেন ইউনূস। তিনি বলেন, তার সরকার দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা রোধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রাধিকার দেবে।

আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আওতায় সব ধরনের বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশ মেনে চলবে বলেও কূটনীতিকদের সামনে অঙ্গীকার করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় ক্ষুদ্র-নৃ গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও জোর দেন ড. ইুউনূস। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

আমেরিকা, ভারত, চীন ও রাশিয়াসহ ৫০ জনের বেশি কূটনীতিত এই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান।

গল্প- ঘরে ফেরা by মিলি জাফতা

অনুবাদ : মেহবুব আহমেদ।
বাস থামতেই যাত্রীরা সব হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়ল। সেদিন শুক্রবার, সপ্তাহের শেষ, মাসের শেষ, বছরেরও শেষ, আর উইন্ডহিক থেকে উত্তরের এই অফুরন্ত পথে কি গরম! এবার আমি আগের মতো তাড়াহুড়ো করলাম না, বাস খালি না হওয়া পর্যন্ত বসেই রইলাম। তারপর মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগোলাম। জানালা দিয়ে চোখে পড়ল মারিয়া ঠেলেঠুলে এগিয়ে আসছে আমার স্যুটকেস দুটো ধরার জন্যে।

বাস থেকে নামতেই গায়ে লাগল শেষ বিকেলের তাপ। বাইরের এই উষ্ণতা আর বাসের ভেতরকার মানুষের শরীরের তাপ আলাদা। ঘাম আর বেশি মশলার  ফাস্টফুডের গন্ধ এখন মনে হলো দূরস্মৃতি।

এখানে নাক ভরে পেলাম কড়া রোদে মেলে রাখা মাংসের সুগন্ধ। গাছের ডাল আর অস্থায়ী সব দোকানে ঝুলিয়ে রাখা মাংসের ওপর চকচকে সবুজ রঙের মাছিগুলো চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে বসছিল। ঘুরে ঘুরে বসছিল, চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে বসছিল – সেই গুনগুন শব্দও আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। ক্রেতা-বিক্রেতারা ব্যস্তসমস্ত হয়ে দিনের শেষ বেচাকেনা সেরে নিচ্ছিল। প্রত্যাশায় ভরা ছিল বাতাস।

মারিয়া নিচু হয়ে দায়সারা গোছের একটা চুমু দিলো। তারপর হেসে বড় স্যুটকেসটা তুলে মাথায় চাপিয়ে আমার আগেই হাঁটতে শুরু করল। অন্য স্যুটকেসটা তুলে মাথায় বসিয়ে আমি দুহাত কোমরে রেখে নিজেকে স্থিত করে নিলাম, তারপর ওর পেছনে চলতে শুরু করলাম। দেখলাম মেরুদন্ড সোজা করে মারিয়া দৃপ্ত ভঙ্গিতে মাথা উঁচিয়ে দৃঢ় পায়ে হেঁটে চলেছে। অদমিত মানবসত্তা কত সুন্দর। কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল আমার; কিন্তু প্রাণান্ত চেষ্টা করেও শব্দ জোগাতে পারলাম না। ‘মাথায়’ কতরকম চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল কিন্তু মুখ ছিল বাকরুদ্ধ এবং শূন্য। সুতরাং অচেনা মানুষটি – আমারই কন্যা – আর আমি নীরবে হেঁটে চললাম।

তো এই হলো ঘটনা। কী আশা ছিল আমার? সারা গ্রাম ভেঙে চলে আসবে তার বহুকালের হারানো মেয়ের ঘরে ফেরা উদযাপন করতে? কতদিন হয়েছে? চল্লিশ বছর? প্রায় চল্লিশ তো হয়েছেই। কীভাবে হারিয়ে ফেলেছি হারানো সময়? সময়ের হিসাব রাখব            সে- আশা কি করা যায়, যখন বিদেশবিভুঁইয়ে, নিজেকে কতদিনে কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারছি কেবল সেটাই ছিল সময়ের মাপকাঠি? আমি বীজ বুনেছি কিন্তু চারা গজাতে দেখার সুযোগ হয়নি, সন্তান ধারণ করেছি – তাদের বড় হতে দেখা হয়নি কারণ আমি তখন এক বিজাতীয় ভাষায় নিজেকে বোধগম্য করে তোলার চেষ্টা করছি, শিখছি কীভাবে ইলেকট্রিক কেটলি ব্যবহার করতে হয়, কখন কীভাবে স্টোভ নেভাতে হয়, বুঝতে হয়েছে অচেনা কাউকে দরজা খুলে দিতে হয় না আর আমি সবার সঙ্গে হাত মিলিয়ে সম্ভাষণ করতে পারি না।

সামনের দীর্ঘ ধুলাওড়া পথটা না দেখে চলার চেষ্টা করছিলাম তবে বিশেষ করে দেখার মতো কিছু ছিলও না। সব মনে হচ্ছিল নিষ্ফলা আর শূন্য। গাছ না, ঘাস না, চারদিকে কেবল কমলাটে বাদামি রঙের অগোছালো জমি। অস্তমান সূর্যরশ্মি যেন তাতে সোনালি আভা দিয়েছে। আমরা দুজন মালপত্র মাথায় নিয়ে সরু রাস্তাটা ধরে পরপর হেঁটে চলেছি – অস্তমান সূর্যের বিপরীতে আমাদের ছায়া পড়েছে – নিশ্চিত জানি, এ-দৃশ্যের সুন্দর একটা ছবি হতো। সেটা ডিসেম্বর মাস – তখন ওরকম বড় একটা ছবি দেখেছিলাম, ছবিটা জিরাফের। মনে আছে, ছবিটা দেখতে দেখতে একটা মুহূর্তে বৃষ্টিভেজা মাঠের গন্ধের জন্য আকুল হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু আমি তখন গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে সোয়াকপমন্ডে আছি, তিনি সেখানে পরিবার নিয়ে গিয়েছেন বিশ্রামের প্রয়োজনে। তখন ছুটির সময়, পরিবারের সঙ্গে কাটাবার সময়; কিন্তু আমি আমার পরিবারের সঙ্গে ছিলাম না, আর আমার সারাটা বছর ওভাবেই কেটে গেছে। ওভাবেই কেটেছে আমার জীবনের অধিকাংশ ভালো সময়।

এখন সেসব পেছনে ফেলে এলাম। আমি ঘরে ফিরছি। বহু বছর আগে যে-পথে হেঁটে গিয়েছিলাম, সে-পথেই ফিরছি। কেবল তখন আমি সতেরো বছরের এক মেয়ে আর আমার দৃষ্টি ছিল সামনে। চলে গিয়েছিলাম এক কিশোরী মেয়ে – এই চল্লিশ বছরে তিনটি সন্তানের মা হয়েছি, বারদুয়েক গ্রামে এসেছি – এখন ঘরে ফিরছি এক বৃদ্ধা।

আমার অপরিচিত ওই মেয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল, তারপর ঘুরে জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। বুঝলাম একটা উত্তর বা কোনো এক ধরনের ইশারার অপেক্ষা করছে ও। এমনভাবে চিন্তায় হারিয়ে গিয়েছিলাম যে, ও কিসের অপেক্ষা করছে ধারণা করতে পারছিলাম না। অবশ্য আমার সন্তানরা কখন কী চায় সে-ধারণা তো আমার ছিল না। আবার ও শান্তস্বরে প্রশ্নটা করল, ওকি বেশি জোরে হাঁটছে, আমার কি তাতে অসুবিধে হচ্ছে। ঈশ্বর আমার – এত মায়া। অন্তত একজন সত্যিই জানতে চাইছে আমার তাল মিলিয়ে, চলতে অসুবিধে হচ্ছে কি-না, আমাকে বলছে না আরো দ্রুত হাঁটতে, বলছে না আমার ঘরে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ, বলছে না আরো ভোরে ঘুম থেকে উঠতে, কাজে আরো মনোযোগী হতে, কুকুরটাকে স্নান করাতে … আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। জলে ভরে গেল আমার দুটো চোখ, গলা বুজে এলো কিন্তু জেগে উঠল আমার প্রাণ। অপরিচিত ওই মেয়ে মাথা থেকে স্যুটকেসটা মাটিতে নামাল। তারপর আমারটা ধরে নামিয়ে ওটার পাশেই রাখল।

আস্তে বলল, ‘একটু জিরিয়ে নিই আমরা।’ বাক্স দুটোর ওপর পাশাপাশি বসার পর বলল, কী যে ভালো হয়েছে, তুমি বাড়ি ফিরেছ।’

এরপর একেবারে চুপচাপ বসে রইলাম আমরা।

বাতাসে কেবল ঝিঁ-ঝিঁ পোকার শব্দ। এত সুখ, এত শান্তি আমি কখনো পাইনি। ওই অপরিচিতার দিকে তাকিয়ে আমারই কন্যাকে দেখলাম। জানলাম আমি বাড়ি ফিরে এসেছি। আমি অযাচিত নই। আমার গর্ভজাত ফল আর আমি একত্রিত হয়েছি। আমারই শরীরে জন্মেছিল এই ফল। নিজের বিধ্বস্ত, বিকৃত শরীরটার দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর কথা মনে হলো – কত সুন্দর সব ফুল ফোটে এর মাটিতে।

উঠে পড়ে মারিয়া বলল, ‘আমাদের যেতে হবে, সবাই অপেক্ষা করে আছে।’ ‘তুমি আগে চলো, তোমার সুবিধামতো এগোও, আমি তোমার পেছনে থাকব।

এবার আমি মেরুদন্ড সোজা রেখে, দৃষ্টি সামনে প্রসারিত করে ওই সরুপথে মারিয়ার আগে আগে চলতে শুরু করলাম। তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে।

---------

লেখক-পরিচিতি

মধ্য-পঞ্চাশের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের পোর্ট এলিজাবেথে  মিলি জাফতার জন্ম। ইউনিভার্সিটি ও হস্টেল ম্যাগাজিনের জন্য তাঁর লেখালেখির শুরু। সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর ‘Home Coming’ বা ঘরে ফেরা গল্পটি প্রথম প্রকাশিত রচনা। তিনি ফিল্মের জন্য আরেকটি ‘Home Coming’ লিখেছেন, কিন্তু তার বিষয়বস্ত্ত আলাদা। তিনি কবিতাও লিখেছেন। ১৯৯০ সালের স্বাধীনতার পর তিনি নামিবিয়া প্রজাতন্ত্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন এবং রাজধানী উইন্ডহিকে বসবাস করছেন, কাজও করছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী’

প্রথম আলোঃ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের উদ্যোগে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কয়েক দিন ধরে নানা মহলে আলোচনা চলছে। যদিও শিক্ষার্থীদের এই প্ল্যাটফর্মের অগ্রভাগে থাকা সমন্বয়কেরা বলছেন, রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে তাঁরা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী’। তাঁরা আপাতত ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’ ও একটা ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ জন্য কাজ করছেন।

তবে রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে যে তাদের আগ্রহ রয়েছে, সেটা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য আকরাম হুসাইনের বক্তব্যে অনেকটাই স্পষ্ট। তিনি গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এখন প্রধানতম লক্ষ্য রাষ্ট্রের সংহতি বা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা। ধ্বংস করে দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন।এরপর ইনশা আল্লাহ অবশ্যই আমরা রাজনীতি করব, রাজনীতির দিকেই এগোব।’

আকরাম হুসাইন বলেন, রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়টি সময়ই বলে দেবে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে পরিস্থিতি অনুযায়ী।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত ১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। এক মাসের মাথায় তারা ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদেও রয়েছেন তাদের দুজন সমন্বয়ক।

উপদেষ্টা পরিষদে থাকা দুই সমন্বয়কের একজন হলেন নাহিদ ইসলাম। তাঁদের রাজনৈতিক দল গঠনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, এ বিষয়ে গতকাল তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যে জাতীয় ঐকমত্য ও স্পিরিট তৈরি হয়েছে, সেটিকে আমরা ধরে রাখতে চাই। রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হবে। সেটার ভিত্তিতে পরিস্থিতিই বলে দেবে আমরা রাজনৈতিক দল গঠনের দিকে যাব কি না। কিন্তু এ মুহূর্তে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আন্দোলনে আহতরা এখনো সুস্থ হননি, শহীদদের পরিবারকে আমরা যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিতে পারিনি। এগুলো আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। পরে দেশ গঠন ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টি রয়েছে।’ তবে তিনি এ–ও বলেন, একটা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা একটা নতুন বাংলাদেশের জন্য ঐকমত্য তৈরি করতে তাঁরা কাজ করছেন।

নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের আলোচনাটি ব্যাপকভাবে সামনে আসে গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের পর। ওই প্রতিবেদনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক মাহফুজ আলমকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, তাঁদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে। এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

যদিও ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেদিন সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে মাহফুজ আলম বলেন, রয়টার্সে তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে এসেছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, তাঁরা রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ে এখনই ভাবছেন না। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য তাঁরা কাজ করছেন। রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়েও কাজ করবেন। এ কাজে অন্তত এক মাস লাগবে। তাঁরা দল বা ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থার সংস্কার চান।

অবশ্য রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে উল্লেখ করেন আকরাম হুসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও রাষ্ট্রের সংহতি আমাদের লক্ষ্য। দ্বিতীয় স্বাধীনতা যেন জনগণ ভোগ করতে পারে এবং সবাই যেন প্রাণ খুলে নিশ্বাস নিতে পারে, সে জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। স্বাধীনতার এই স্বাদ যাতে আমরা দীর্ঘ মেয়াদে নিতে পারি, সে জন্যও আমরা চেষ্টা করব।’

নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বলতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আসলে কী বোঝাতে চাইছে, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আকরাম হুসাইন প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অর্থ হচ্ছে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে ধ্বংস করেছে যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছাড়া এখন যদি নির্বাচন হয়, জনগণ কোথাও সমান সুযোগ পাবে না। দেখা যাবে প্রশাসন–পুলিশ কোনো একটা পক্ষ নেবে, সেই পক্ষেই সবকিছু চলে যাবে। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের জন্য আমরা অপেক্ষা করব।

সাবেক মন্ত্রী-হুইপসহ আট এমপির নামে মামলা

দিনাজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সদ্য সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আট এমপির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনকে গতকাল শনিবার দুপুরে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতিফকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। বিস্তারিত কালবেলার প্রতিবেদকদের পাঠানো সংবাদে—

দিনাজপুর : দিনাজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সদ্য সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ ২৪ জনের নাম দিয়ে ও ৭৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে বোচাগঞ্জ থানায় মামলা করা হয়েছে।

মামলার আসামিরা হলেন— সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আফসার আলী, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. কাউসার, পিএ মো. আব্দুল বাশার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. আব্দুস সবুর, উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইশান ইসলাম, কলেজপাড়ার মো. শাহ জাহান, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. বাপ্পী সরকার, শহিদপাড়ার মো. সিমন ইসলাম, ছাত্রলীগ নেতা মো. নাসিরুল ইসলাম নয়ন, শহিদপাড়া মো. নিলয় ইসলাম, মো. মেহেদী হোসেন, হাজিপাড়া মো. রিয়াদ হোসেন, আটগাঁও পশ্চিমপাড়ার মো. নাঈম ইসলাম, সাবেক ছাত্রলীগ মো. শাহ নেওয়াজ সৌরভ, শহিদপাড়ার মো. আশরাফুল ইসলাম আকাশ, মো. ছুটি সেতাবগঞ্জ কলেজ শাখার ছাত্রলীগ সভাপতি মো. শাওন ইসলাম, ছাত্রলীগ নেতা মো. হৃত্তিক হোসেন, মো. সমুদ্র ইসলাম, বড় মাঠ পাড়ার মো. সোহেল রানা, উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফ আলী তুহিন, রেলকলোনিপাড়ার, মো. আরাফাত হোসেন জনি ও বোচাগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন।

বোচাগঞ্জ থানার ওসি মো. আবু বক্কর সিদ্দিক রাসেল মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনকে বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। শনিবার (১৭ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজিব কুমার রায় তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদালতে মামলাটি দায়ের করেন ঠাকুরগাঁওয়ের হাজীপাড়া এলাকার রিপন ওরফে বাবু। রমেশ চন্দ্র সেন আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।

পুলিশ জানায়, শুক্রবার রাতে সাদা পোশাকে পুলিশ রমেশ চন্দ্র সেনকে আটক করে। তিনি অসুস্থ থাকায় রিমান্ড চাওয়া হয়নি। পরে রিমান্ডের আবেদন করা হবে।

রমেশ চন্দ্র সেনের স্ত্রী অঞ্জলি সেন বলেন, সাদা পোশাকে পুলিশের ১০-১৫ জনের একটি দল তাকে তুলে নিয়ে যায়। তারা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্য হতে পারেন। তাদের সবার কাছে অস্ত্র ছিল। রমেশকে তারা বলেন— ওঠেন, চলেন। তারা হাত ধরে জোর করে টেনে নিয়ে চলে যায়। কোথায় নিয়ে যাবেন, বারবার জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু তারা কিছু বলেনি।

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বলেন, ঠাকুরগাঁও সদর থানায় বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা একটি মামলায় রমেশ চন্দ্র সেনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কক্সবাজার : আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক হুইপ, কক্সবাজার সদর-রামু-ঈদগাঁও আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিনুল হক মার্শালসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে আরও ১৫০ জনকে। শনিবার (১৭ আগস্ট) মডেল থানা পুলিশের এসআই সেলিম উদ্দিন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলায় অন্য আসামিরা হলো কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মারুফ আদনান, কাউন্সিলর সালাহ উদ্দিন সেতু, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা ইশতিয়াক আহমেদ জয়, জুয়েল আহমেদ, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মঈন উদ্দিন এবং খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান ছিদ্দিকী। কক্সবাজার মডেল থানার ওসি রকিবুজ্জামান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, গত ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি চালায় আসামিরা। এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয়ে এক যুবক নিহত হন। নিহত যুবকের পরিচয় নিশ্চিত করা না গেলেও সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্ত শেষ করে শনিবার পুলিশের পক্ষ থেকে মামলাটি করা হয়।

কক্সবাজার মডেল থানার ওসি রকিবুজ্জামান জানান, শনিবার মামলাটি এফআইআরভুক্ত হয়েছে। মামলায় এজাহারভুক্ত নামীয় আসামি ১২ জন এবং অজ্ঞাতপরিচয় আসামি ১৫০ জন। ভিডিও ফুটেজ দেখে দেখে আসামিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

নাটোর : নাটোর সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলকে প্রধান আসামি করে সদর থানায় দুটি হত্যাচেষ্টার এজাহার দায়ের করা হয়েছে। শনিবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে প্রথম এজাহার দায়ের করেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফরহাদ আলী দেওয়ান শাহীন। এজাহারে শিমুলসহ ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়।

দ্বিতীয় মামলাটিতেও শিমুলকে প্রধান করে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০ থেকে ১২ জনের নামে হত্যাচেষ্টার এজাহার দাখিল করেন সাইফুল ইসলাম আফতাব।

প্রথম এজাহারে ফরহাদ আলী দেওয়ান শাহীন উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ১৩ মার্চ দুপুরে আদালতে একটি মামলার হাজিরা শেষে সিংড়া যাওয়ার সময় সদর উপজেলার সড়ক ও জনপথ ভবনের সামনে তৎকালীন সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের নির্দেশে এজাহারনামীয় আসামি সাগর, জাহিদ, কোয়েল, সেলিম মিলন, সায়েম হোসেন উজ্জ্বল, খোকন, মলয়, আমিনুল ইসলাম, কানন, সজীব, সবুজ, রাসু, মাহাতাব, সৌমেন, স্বপন, শিহাব, হৃদয়, আলিফ, জনি, সুমন, সুমন মৃধাসহ আরও ১০ থেকে ১২ জন আমার মোটরসাইকেল থামিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর ও গুলি করে ফেলে রেখে যায়। এ ঘটনায় চিকিৎসা শেষে থানায় নিজে হাজির হয়ে এজাহার দায়ের করেন ফরহাদ আলী দেওয়ান শাহীন।

দ্বিতীয় মামলার এজাহারে যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলাম আফতাব উল্লেখ করেন, গত বছরের ২৯ অক্টোবর মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ শেষে নিজ বাড়িতে ফেরার সময় স্টেশন এলাকার মামুন ফার্মেসির সামনে তৎকালীন সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের নির্দেশে এজাহারনামীয় আসামি সাগর, জাহিদুর, জামিল হোসেন মিলন, সায়েম হোসেন উজ্জ্বল, মলয় কুমার, আমিনুল ইসলাম আজম, কোয়েল, কানন, সেলিম, সজীব, সবুজ, মাহাতাব, সৌমেনসহ আরও ১০ থেকে ১২ জন মোটরসাইকেল নিয়ে এসে আমার পথরোধ করে।

তারা এলোপাতাড়ি মারধর ও গুলি করে ফেলে রেখে যায়। এ ঘটনায় চিকিৎসা শেষে থানায় নিজে হাজির হয়ে এজাহার দায়ের করেন যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলাম আফতাব।

এ ব্যাপারে জানার জন্য নাটোর সদর থানার ওসি মিজানুর রহমানের মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন না ধরায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সাভার (ঢাকা) : মারধর ও গুলি করে মানুষ হত্যা করাসহ হুকুমের অভিযোগে সাভারের আশুলিয়া থানায় ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক দুই সংসদ সদস্যসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১৯ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। শুক্রবার (১৬ আগস্ট) রাতে আশুলিয়া থানায় মামলাটি করা হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় আল-সাবুর (১৬) নামে এক স্কুলছাত্র নিহতের ঘটনায় তার প্রতিবেশী পরিচয়ে সাহিদ হাসান মিঠু নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন। পরে অভিযোগটি তদন্ত করে সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি নথিভুক্ত করে আশুলিয়া থানা পুলিশ।

নিহত আল-সাবুর আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের জামগড়ার শিমুলতলা এলাকায় পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থেকে জামগড়া শাহীন স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ত। আল-সাবুরের গ্রামের বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুর থানার মহাদেবপুর। তার বাবার নাম নায়েদ ওরফে জাকির।

মামলার আসামিরা হলেন ঢাকা-১৯ -এর সাবেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদ, আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক হাসান তুহিন, ইয়ারপুর ইউনিয়নের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম আহমেদ ভূঁইয়া, আশুলিয়া থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কবির হোসেন সরকার, পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ানসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১৯ জনের নাম রয়েছে। মামলায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বাদীর দাবি, ঘটনার দিন বাইপাইল এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলছিল। ওই সময় সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম, তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদসহ মামলার ১ থেকে ১৫ নম্বর পর্যন্ত আসামিদের নেতৃত্বে অন্য আসামিরা আল-সাবুরকে ধরে লাঠিপেটা ও গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ কালবেলাকে বলেন, একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

বড়াইগ্রাম (নাটোর) :
নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী, তার আপন চার ভাগিনাসহ ৬২ জনের নামে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।

বনপাড়া বাজারের ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন গাজী বাদী হয়ে শুক্রবার (১৬ আগস্ট) রাতে থানায় মামলাটি করেন। বাদী নাসির উদ্দিন গাজী উপজেলার মালিপাড়া মহল্লার জামাল গাজীর ছেলে।

মামলায় আসামিরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য ডা. মো. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী, ভাগিনা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি জামাল উদ্দিন মিয়াজী, শামসুদ্দিন শেরশাহ, জহির উদ্দিন ও বাহাউদ্দিন, বনপাড়া পৌর যুবলীগ সভাপতি জাকির সরকার, ছাত্রলীগ নেতা রাকিবুল ইসলাম ওরফে টিটু, ইউনুস আলী, সজীব হোসেন, আশরাফুল মণ্ডল, তোহা মিয়া, সৈনিক লীগ নেতা রুবেল বালি, সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মজনু মিয়া, ওমর ফারুক পাটোয়ারী, রফিকুল ইসলাম ওরফে পারভেজ, সিরাজ পাটোয়ারী, সাইমুন পাটোয়ারী, হাবিবুর রহমান বিশ্বাস, রুবেল হোসেন, তুহিন ব্যাপারী, সাইফুল ইসলাম ও রবিউল ইসলাম। মামলায় আরও ৩০-৪০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বনপাড়া ল্যাবরেটরি স্কুলে ঢুকে অভিযুক্তরা তিনটি মোটরসাইকেল ও একটি ল্যাপটপ পুড়িয়ে দেয়। এ সময় বাদী নাসির গাজী, তার ছেলে মুন্না ও বনপাড়া পৌর কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন মনির আগুন নেভাতে গেলে ডা. পাটোয়ারী ও জাকির সরকারের হুকুমে আসামিরা হাঁসুয়া, রামদা ও জিআই পাইপ নিয়ে আক্রমণ করে।

এ সময় তারা রামদা এবং হাঁসুয়া দিয়ে নাসির, মুন্না ও কাউন্সিলর মনিরকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। একই সঙ্গে অন্যরা পাইপ দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে।

তাদের উদ্ধারের জন্য মালিপাড়া গ্রামের জিয়াউর রহমান জুয়েল, আব্দুল মমিন, হারোয়া গ্রামের আব্দুল্লাহ আল আওয়াল মমিন, মহিষভাঙ্গা গ্রামের আনাস মোল্লা এগিয়ে গেলে আসামিরা তাদেরও পিটিয়ে জখম করে। পরে আহতদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে তারা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। স্থানীয়রা মুমূর্ষু অবস্থায় আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

বড়াইগ্রাম থানার ওসি শফিউল আযম খান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

চট্টগাম : চট্টগ্রাম-১১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য এমএ লতিফকে তিন দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। শনিবার (১৭ আগস্ট) ভোরে গ্রেপ্তারের পর সাত দিনের রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয় তাকে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল দেবের আদালত শুনানি শেষে তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

থানা সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে এরশাদ নামের এক ব্যক্তি গুলিতে আহত হন। পরে তিনি শুক্রবার ডবলমুরিং থানায় এমএ লতিফসহ ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় এম এ লতিফ গুলি করার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়।

ডবলমুরিং থানার ওসি ফজলুর কাদের পাটোয়ারী গণমাধ্যমকে জানান, সাবেক সংসদ সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য এম এ লতিফকে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ফেনী : ফেনীর মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগের গুলিতে নিহতের ঘটনায় নতুন করে আরও দুটি মামলা করা হয়েছে। এ নিয়ে পৃথক পাঁচটি হত্যা মামলায় ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীকে প্রধান করে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ ১ হাজার ৬২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

শুক্রবার (১৬ আগস্ট) মহিপালে নিহতদের মধ্যে ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সরোয়ার জাহান মাসুদের মা বিবি কুলসুম বাদী হয়ে ১৩৪ জনকে আসামি করে ও আরও ১৫০-২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ফেনী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। নিহত মাসুদ দাগনভূঞা উপজেলার উত্তর জয়লস্কর এলাকার মো. শাহজাহানের ছেলে।

এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার রাতে নিহত ফেনী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণের দাদা মো. জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া বাদী হয়ে ১০৯ জনের নাম উল্লেখ করে ও ১৫০-২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ফেনী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

এ ব্যাপারে ফেনী মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, এ ঘটনায় দায়েরকৃত পৃথক মামলায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এর আগে একই ঘটনায় দায়েরকৃত পৃথক তিনটি মামলায় জেলার অন্তত ৩০ জন জনপ্রতিনিধিসহ ৯৮০ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় ছাত্রদের দিকে গুলি করার নির্দেশনা ও অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— ফেনী সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল, ফেনী পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান করিম উল্লাহ বিকম ওরফে রেন্সু করিম, যুবলীগ নেতা জিয়া উদ্দিন বাবলু প্রমুখ।

প্রাণঘাতী এমপক্স নিয়ে বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে এমপক্স ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। মাঙ্কিপক্স নামে এ ভাইরাসটি পূর্বে পরিচিত ছিল। এমপক্স আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছড়ায়। এ ছাড়াও সঙ্গম, ত্বকের সংস্পর্শ, কথা বলা বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। আফ্রিকা, ইউরোপের পর এবার এশিয়ার পাকিস্তানে সর্বশেষ তিনজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) এ ভাইরাস নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। কেননা ছোঁয়াচে এ এমপক্স দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

কী এই এমপক্স?

এই ভাইরাসটি পূর্বে মাঙ্কিপক্স নামে পরিচিত ছিল। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছড়িয়ে পড়ে এমপক্স। কথা বলা বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। ফ্লুর মতো উপসর্গ ছাড়াও এতে পুঁজ ও ক্ষত সৃষ্টি হয়। এর উপসর্গ হিসেবে সংক্রমণের ৬ থেকে ১৩ দিন পর সাধারণত মাথাব্যথা, জ্বর, ফুসকুড়ি বা ঘা এবং মাংসপেশিতে ব্যথা দেখা দেয়। বেশিরভাগ সময় প্রভাব সামান্য হলেও মৃত্যুও হতে পারে এ রোগে। আক্রান্ত হওয়া ১০০ জনের মধ্যে এই ভাইরাসে মৃত্যু হয় গড়ে চারজনের।

কেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে?

 দেশ ও দাতা সংস্থাগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে ডব্লিওএইচও-এর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণা সংক্রামিত এলাকায় পরীক্ষা, টিকা এবং ওষুধ পাওয়া সহজ করে। এ ছাড়াও এটি ভাইরাস নিয়ে বিদ্যমান কুসংস্কার দূর করার লক্ষ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়াতে সাহায্য করে।

তবে, আগের ঘোষণা মোতাবেক বিশ্বব্যাপী মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আফ্রিকার সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) পরিচালক ডা. জিন কাসেয়া জানান, এ ঘোষণা আফ্রিকার সংস্থা ও সংস্থাগুলোকে সিদ্ধান্তমূলকভাবে দ্রুত কাজ করতে উৎসাহ জোগাবে। আফ্রিকায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া এ রোগের জন্য খুব কমই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাই আফ্রিকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে তিনি সাহায্য চেয়েছেন।

লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের অধ্যাপক মাইকেল মার্কস বলেন, বর্তমানে এ রোগের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলো কাজ না করায় আরো সাহায্যের দরকার। সাহায্যের প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হবে।

কোথায় ঘটছে সংক্রমণ?

এখন পর্যন্ত আফ্রিকার ৩৪টি দেশে এমপক্স ভাইরাসের সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন দেশেও এই ভাইরাসটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। ভাইরাসটি মূলত কঙ্গো থেকেই আশপাশের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে সংক্রমণ হয়েছে ১৪ হাজারেরো বেশি এবং মৃত্যু হয়েছে ৫২৪ জনের। যেখানে আগে কখনো সংক্রমণ ঘটেনি সেখানেও রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে আছে বুরুন্ডি, কেনিয়া, রুয়ান্ডা এবং উগান্ডাও।

কেনো বাড়ছে সংক্রমণ?

ক্লেড-১ এবং ক্লেড-২ হলো এমপক্সের দুটি প্রধান ধরন। ক্লেড ১ আবার দুই রকমের- ক্লেড ১-এ এবং ক্লেড ১-বি। ক্লেড ১-বি ভেরিয়েন্ট এর দেখা মিলেছে কঙ্গোয়। এ ছাড়াও কেনিয়া, রুয়ান্ডা ও উগান্ডায়ও এটি দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সংক্রমণ বাড়াচ্ছে এই নতুন ভ্যারিয়েন্টটি। সাধারণত আগে সংক্রমিত বুশমিট খেয়ে ছড়াতো ক্লেড ১। কিন্তু এখন মানুষের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে ক্লেড ১-বি , যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে বিশেষ করে ছড়াচ্ছে এটি। এ ছাড়াও বিছানা বা তোয়ালের মাধ্যমে কিংবা শারীরিক ছোয়ায়ও ছড়াতে পারে এটি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এমপক্স প্রধান ড. রোসামুন্ড লুইস বলেছেন, এটি বেশি সংক্রামক কি না তা অজানা হলেও, এটি সহজে ছড়িয়ে পড়ছে। ক্লেড ১-এ ভেরিয়েন্ট ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকেও পাওয়া গেছে। ডব্লিওএইচও আরও জানিয়েছে, ক্যামেরুন, লাইবেরিয়া, আইভরি কোস্ট, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায়ও ক্লেড-২ পাওয়া গেছে।

কীভাবে ভাইরাসটি ছড়াচ্ছে এবং শিশুরা কেন সহজে আক্রান্ত হচ্ছে?

শিশুদের মধ্যে এমপক্স ভাইরাসটি বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে,রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে আছে। এ ছাড়া, শিশুরা বেশি শারীরিক সংস্পর্শে আসে এবং নিজেরা অনেক সময় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে পারে না। ফলে তারা বেশি সংক্রমিত হতে পারে।

সংক্রমিত মানুষের মাধ্যমে ভাইরাসটি বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। দূরপাল্লার একজন ট্রাকচালকের মধ্যে এমপক্স শনাক্ত করেছেন কেনিয়ার কর্মকর্তারা। যিনি তানজানিয়া, রুয়ান্ডা এবং উগান্ডায়ও ছিলেন। এ ছাড়া ভাইরাসটি যৌনসম্পর্কের মাধ্যমেও অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। যৌনকর্মীরা শুরুর দিকে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল।

২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে এমপক্স ছড়িয়ে পড়ায় সমকামী এবং উভয়কামী পুরুষরা প্রধানত আক্রান্ত হয়েছিল। তবে কঙ্গোতে ১৫ বছরের নিচে ৭০ শতাংশ শিশু ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে মৃত্যু ঘটছে ৮৫ শতাংশের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় এবং পুষ্টির অভাব থাকায় তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। গুটিবসন্তের টিকা নেওয়ায় বয়স্করা কিছু সুরক্ষা পেতে পারেন। সেভ দ্য চিলড্রেনের কঙ্গো পরিচালক গ্রেগ রাম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা শিশুরা বেশি শঙ্কায় আছে— যেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অন্তত তিন লাখ ৪৫ হাজার শিশু বসবাস করছে।

ভ্যাক্সিন কি আছে?

হ্যাঁ, এই রোগের ভ্যাক্সিন বা টিকা আছে, তবে মূল সমস্যা এটি সরবরাহ করতে পারায়। আফ্রিকার সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন সংস্থা মাত্র দুই লাখ ডোজের সরবরাহ পেয়েছে। যেখানে প্রয়োজন ছিল ১০ মিলিয়ন ডোজের। পরীক্ষার এবং চিকিৎসা অভাবেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

এখনো পর্যালোচনাধীন আছে টিকাদানের পরিকল্পনা। তবে সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা রোগী এবং এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তিদের মতো ঝুঁকিপূর্ণদের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে আগে প্রাধান্য দেওয়া হবে। এ পর্যন্ত দুটি টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর আগে বিশেষ করে সমকামী পুরুষদের মধ্যে ভাইরাসটি ইউরোপ থেকে ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

২০২২ সালের জুলাই মাসে ডব্লিউএইচও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। সেইসাথে ব্যাপক টিকাদান ও সুরক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ২০২৩ সালের মে মাসে তুলে নেওয়া হয় জরুরি অবস্থা।

বিপ্লব কেন ব্যর্থ হয়? by মতিউর রহমান চৌধুরী

বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লব নতুন কোনো ঘটনা নয়। দেশে দেশে বারবার এমনটাই ঘটেছে। কোথাও সফল, কোথাও বা ব্যর্থ। বাংলাদেশের বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লবের সময়গুলোর অনেকখানি মিল রয়েছে। ল্যাতিন আমেরিকা থেকে আরব বিশ্ব ও পূর্ব ইউরোপের বিপ্লব পর্যালোচনা করলে এমনটাই দেখা যায়। বিপ্লবের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বিপ্লব পরবর্তী মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড আশাবাদ তৈরি হয়। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও এমনটা  দেখা যায়। কিন্তু ইতিহাস দেখায় যে, এসব প্রত্যাশা কখনো বাস্তবসম্মত হয় না। পরিবর্তন আসতে সময় লাগে।

কিন্তু অল্পতেই মানুষ বিগড়ে যায়। আরব বিশ্বের উদাহরণ তাই। তিউনিশিয়া ও মিশরের শাসকদের পতন হলেও প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। তিউনিশিয়ার বিপ্লব একটি দুর্বল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। যা এখনো অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মিশরে অল্পদিন পরেই সেনাশাসন ফিরে আসে। ভেঙে খান খান হয়ে যায় বিপ্লবের আশাগুলো। বিপ্লবের সাফল্য একটি কঠিন পথ। বাংলাদেশেও একই ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে চলেছে। স্থিতিশীল শাসন না হলে মানুষ নানাভাবে অঙ্ক মেলাতে শুরু করবে।  বিপ্লব সাধারণত বিভিন্ন শ্রেণি-গোষ্ঠীর মিলন ঘটিয়ে থাকে। যারা পরিবর্তনের জন্য একতাবদ্ধ হয়। শক্তিশালী শাসকদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। বিপ্লব ব্যর্থ করার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে গুজব। ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। যেমনটা বিরামহীনভাবে চলছে বাংলাদেশে। এক কোটি হিন্দু দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন এই গুজবের কোনো ভিত্তি নেই। এই কার্ড খেলার পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য রয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম অনবরত মিথ্যা প্রচার করে বিভাজন উস্কে দিচ্ছে।

উত্তর আফ্রিকার তিউনিশিয়াই একমাত্র দেশ যার উত্তরণ ঘটেছে অনেক নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে। ২০১০ সনের ১৭ই ডিসেম্বর বিদ্রোহের জন্ম। রাস্তার এক ফলবিক্রেতা যুবকের কাছে ঘুষ চেয়ে পুলিশ তাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। সরকারি দুর্নীতি আর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কারণ লোকেরা চাকরি, উন্নত জীবনযাত্রা এবং বৃহত্তর স্বাধীনতা দাবি করেছিল। এই ঘটনার পর তিউনিশিয়ার পুলিশ শতাধিক মানুষকে হত্যা করে। প্রেসিডেন্ট জাইন আল আবিদিন বেন আলীর সংস্কারের  প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অনাস্থা বাড়তেই থাকে। ২০১১ সনের ১৪ই জানুয়ারি বেন আলী তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তিউনিশিয়ার সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে। কোটা আন্দোলন থেকে শুরু। হাসিনার পদত্যাগে শেষ। গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। এখানেও পুলিশ শত শত মানুষকে হত্যা করে। দেশি-বিদেশি নানা শক্তি তাকে ক্ষমতায় রাখার চেষ্টা করেও চরমভাবে ব্যর্থ হয়। নিজের দেশের লোকদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি করায় মানুষের মনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। যা কিনা এই অঞ্চলে নজিরবিহীন। সফল বিপ্লবের পর দুই সপ্তাহ কেটেছে অনেক ষড়যন্ত্র আর চ্যালেঞ্জের মধ্যদিয়ে।

জুডিশিয়াল ক্যু-এর চেষ্টা ছিল অন্যতম। কিছু কিছু ঘটনা বিপ্লবের কর্মকাণ্ডকে বিতর্কিত করে তুলছে। আশার কথা, ঘটনার পর দায় স্বীকার করা হচ্ছে। যেটা আগে হতো না। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস একমাত্র আশার প্রতীক। তাকে ঘিরেই এখন বিপ্লব পরবর্তী সংস্কারের দিকে এগুচ্ছে দেশ।  যদিও সর্বক্ষেত্রে তার নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রতিষ্ঠা হয়নি। নড়বড়ে এবং ভঙ্গুর পরিস্থিতি সবখানে। শেখ হাসিনার প্রশাসন দিয়ে ইউনূসের শাসন যে চলতে পারে না এটা বোধ করি বিপ্লবের নায়কেরা বুঝতে পারছেন।  

এই অবস্থায় রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি  সঠিক রাজনীতি না করে তাহলে বিপ্লবের সাফল্য ধরে রাখা হয়তো কঠিন হবে। যেমনটা হয়েছে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে। ল্যাতিন আমেরিকার বিপ্লব থেকে শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। কারণ সেখানকার বিপ্লব ছিল অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায়। ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞতা হচ্ছে বিপ্লবের পর অর্থনীতি সঠিকভাবে পরিচালনা করা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। বিপ্লবের পর সামাজিক উত্তেজনা বাড়াটাই স্বাভাবিক। যা কিনা আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিপ্লবের জন্য একটি বড় হুমকি হলো- প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পুনরুত্থান। যা পুরনো ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ঘটে। অনেকক্ষেত্রে সামরিক অভ্যুত্থানেও শেষ হয়। বাংলাদেশের পতিত  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এই বিপ্লবকে অবৈধ এবং বিশৃঙ্খলা বলে বর্ণনা করেছেন। মিথ্যা প্রচার বিভাজন সৃষ্টি করে। মানুষের মনে নানা সন্দেহ তৈরি হয় । বিপ্লবকে দুর্বল করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মনে রাখতে হবে- এসব কৌশল নতুন সরকারকে অস্থিতিশীল করবে। এটা করার অন্যতম উদ্দেশ্য বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি করা।  ১৯১৭ সনের রুশ বিপ্লবে রাশিয়ার জার শাসনের অবসান ঘটে। সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার ইতিহাসে একটি বড় বাঁক নেয়। খাদ্য ঘাটতি, সামরিক ব্যর্থতা ও স্বৈরশাসনের কারণে জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই বিক্ষোভ নতুন বিপ্লবে রূপ নেয়। জার নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করেন। তৈরি হয় শূন্যতা। নতুন সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। যার ফলে দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়। একইভাবে বাংলাদেশেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করে। পুলিশ কাজ করা থেকে বিরত থাকে। যেমনটা রাশিয়াতে হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছিল। বাংলাদেশে আইন প্রয়োগের অভাবে নিরাপত্তাহীনতা এবং ভয়ের সৃষ্টি হয়। যা জনগণের দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিপ্লবের সাফল্য ধরে রাখার জন্য  মানুষ সংগঠিত হয়। নিজেদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণত, বিপ্লবের পর সামাজিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। যার ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ এবং সংঘাতের সৃষ্টি হয়। রাশিয়ার বিপ্লবের সময় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংস আক্রমণ হয়। ফলে ভয়ের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিছু ঘটনা অবশ্য ঘটে। যদিও বেশির ভাগ ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। রাজনৈতিক সমর্থকদের দ্বারা উত্তেজনা সৃষ্টিই ছিল মূল লক্ষ্য। কর্মকর্তাদের ব্যাপক পদত্যাগ সরকারকে দুর্বল করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগ রাশিয়ার সরকারের পদত্যাগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করে। রাশিয়ার পুলিশ ও বিচারবিভাগের পতনের ফলে পেট্রোগ্রাদে নিয়ন্ত্রণের অভাব হয়। যা জনগণের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।  রাশিয়ায় সরকার ব্যর্থ হওয়ায় বলশেভিকরা ক্ষমতায় আসে। তারা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। যাতে করে জনগণের অধিকার  সীমিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও চরমপন্থিরা বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা লাভ করতে পারে। যেমনটা রাশিয়ায় বিপ্লবী চরমপন্থিরা করেছিল। পৃথিবীর নানা অঞ্চলে বিপ্লবের সাফল্য ও ব্যর্থতা শিখিয়েছে জনগণের সঙ্গে স্বচ্ছভাবে যোগাযোগ স্থাপন করা না গেলে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি না করলে বিপ্লব লাইনচ্যুত হতে পারে। জনগণকে সঠিক তথ্য এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ রাখাই হচ্ছে প্রধান কাজ। বিপ্লবের চূড়ান্ত পরীক্ষা হচ্ছে নতুন শাসন ব্যবস্থা চালু করা। ল্যাতিন আমেরিকার বিপ্লবী সরকারগুলোর মতো বাংলাদেশের সরকারকেও বিপ্লবী আদর্শ রক্ষা করা হবে অন্যতম কাজ। শাসনের বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে বিশৃঙ্খলা বাড়বে। নতুন রাজনৈতিক  ও সামাজিক ব্যবস্থা সব মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য  সহায়ক হচ্ছে কিনা সেটাও সার্বক্ষণিক পর্যালোচনার দরকার। বিপ্লবের সাফল্য ধরে রাখার অনেকটাই নির্ভর করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ওপর। তারা এই বিপ্লবের চালিকা শক্তি। তাদের কথা বলার সময় অধিক মাত্রায় সতর্ক থাকতে হবে। আমরা সবাই জানি অতি প্রচার নয়া সংকটের জন্ম দেয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এর জ্বলন্ত প্রমাণ।  

দেশে দেশে বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর জোর দেয়া, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। একনায়কতন্ত্র থেকে সাবধান থাকা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা। তিউনিশিয়ার নবজাত গণতন্ত্র বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ এবং ইসলামপন্থি উভয় দলগুলোর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি করে। ২০১৩ সালে উত্তেজনা চরম বৃদ্ধি পায়। এ সময় দুই বিশিষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ চোকরি বেলাইদ ও মোহাম্মদ ব্রাম্মীকে হত্যা করা হয়। দেশটি তখন রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়। আর তখনই শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শেখ হাসিনা, তাপস, সেলিম সরাসরি জড়িত: নিহতদের স্বজনদের সংবাদ সম্মেলন

বিডিআর বিদ্রোহের নামে ২০০৯ সালে পিলখানায় যেই হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় তার সঙ্গে শেখ হাসিনা, তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলুল করিম সেলিম সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন নিহত সেনা অফিসারদের স্বজনরা। গতকাল  দুপুরে রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া ক্লাবের স্কাইলাইন রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ সব কথা বলেন তারা।

আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিহত তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত শেখ হাসিনা, তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলুল করিম সেলিম। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর দেশপ্রেমিক অনেক সেনা অফিসার বিচার চাইতে গিয়ে চাকরি হারিয়েছেন। কেউ কেউ জেলে গেছেন। দরবারের শত শত অফিসারের জীবন ধ্বংস করা হয়েছে। তাই আমরা দাবি করছি, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। ক্ষতিগ্রস্ত সেনা অফিসারদের পরিবারকে যেন যথাযথ সম্মান ও ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। যেসব নির্দোষ, দেশপ্রেমিক বিডিআর সৈনিক জেল খাটছেন, সুষ্ঠু তদন্তে যেন তাদের মুক্তি দেয়া হয়। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের উদ্দেশ্য করে রাকিন আহমেদ বলেন, আপনারা সাংবাদিকরাও কম নির্যাতনের শিকার হননি। অনেক কিছুই প্রকাশ করতে পারতেন না।

এক আওয়ামী লীগ নেতা ফোন করে আমাকে বলেছিলেন- ওনার নেত্রী (শেখ হাসিনা) আমার বাবা-মা’কে জবাই দিয়েছেন। যদি বেশি বাড়াবাড়ি করি তাহলে বাবা-মা’র মতো আমাকেও জবাই দিয়ে দেবে। তিনি বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই- যেখানে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) অন্য একটা বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে রাজধানীতে ৫৭ সেনা অফিসারকে হত্যা করে। ওই দিনটিকে আমরা শহীদ সেনাদিবস দাবি করছি। রাকিন আহমেদ বলেন, গত ১৫ বছরে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচারের ট্রায়াল বা তদন্তকে আমরা মানি না। কারণ প্রধান যে হত্যাকারী, নির্দেশদাতা তিনি তখন ক্ষমতায় ছিলেন। খুনি কী তার নিজের বিচার করবে? মুখ বন্ধ করে দেখতে হয়েছে, কেমন করে তদন্ত, ট্রায়াল প্রভাবিত করলো, ডাল-ভাতের কথা বলল। নীরবতায় সহ্য করতে হয়েছে। সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের প্রয়োজনে সেনাবাহিনী এগিয়ে যায়। তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই ছাত্র-জনতার ওপর গুলি না করে এগিয়ে এসেছেন। জনগণকে অনুরোধ করবো, সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করুন।

সংবাদ সম্মেলনে নিহত লে. কর্নেল এনায়েতুল হকের মেয়ে নাবিলা বলেন, এটা আন্তর্জাতিক চক্রের কাজ। আন্তর্জাতিক শক্তির দ্বারাই কাজটি করা হয়েছে। আপনারা বের করবেন আসল কারণ। এটা বিদ্রোহ নয়, এটা হত্যাকাণ্ড, পরিষ্কার হত্যাকাণ্ড। আমার বাবা মারা যাননি। হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। কিছু অপপ্রচারের জন্য আমরা হেনস্তা হয়েছি। এতদিন ভয়ে কথা বলিনি, আজ নির্ভয়ে কথা বলছি। ১৫ বছর ধরে আমাদের একটাই দাবি, বিচার চাই। একটা স্বচ্ছ বিচার হোক। আমরা এ বিষয়ে আর লুকোচুরি চাই না। চাপ দিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করা হয়েছিল। বাধার মধ্যে ১৬ বছর পার করেছি। নিহত মেজর কাজী মোসাদ্দেক হোসেনের মেয়ে নাজিয়া বলেন, আমাদের কষ্টের কথা যদি বলি, একই পরিস্থিতিতে এখনও যাচ্ছি। কষ্ট দূর হয়ে যায়নি। এর পেছনে অনেক ঘটনা ছিল। আমরা তো আমাদের স্বজনদের হারিয়ে ফেলেছি। মানুষ জানুক এই হত্যাকাণ্ড কারা করেছে। কেন এত বছর পরও আমাদের মুভমেন্টে বাধা হয়। নিহত কর্নেল কুদরত ইলাহী রহমানের স্ত্রী লবী রহমান বলেন, হয়তো বলবেন এতদিন পর কেন আমরা এখানে। অনেক কিছুই তো পেয়েছি। কিন্তু গত ১৫ বছরে আমরা কিন্তু শুধু বিচারই চেয়েছি। প্রথমেই আমাদের প্রশ্ন করা হয়, কি কি পেয়েছি। ইচ্ছা হয় সব ফেরত দেই, আমার স্বামী শহীদ কর্নেল কুদরত ইলাহীকে ফিরিয়ে দেন। এটা সিনেমা বা নাটকের প্রমোশন না, এটা খুবই সেনসিটিভ।

পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঠিক বিচার দাবি করে বিডিআর বিদ্রোহে নিহত কর্নেল কুদরত ইলাহী রহমান শফিকের ছেলে এডভোকেট সাকিব রহমান বলেন, এই ঘটনায়  দুটো তদন্ত কমিটি হয়েছিল। বাহিনীর পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন বাংলাদেশ রাইফেলসের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর। যিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। আমরা খুব করে চাইবো অন্তত তার তদন্ত কমিটির রিপোর্টটা পাবো। কারণ আমরা খুব কাটছাঁট অংশ গণমাধ্যমে জেনেছি। আমরা পুরোটাই দেখতে চাই। তাতে আমরা অনেক কিছু জানতে পারবো। আর উচ্চ আদালত যে তদন্ত কমিশনের কথা বলেছেন, সেগুলো যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে পর্দার আড়ালে যারা ষড়যন্ত্রকারী তারা বেরিয়ে আসবে। তাদের আইনের আওতায় আনতে আমরা চার্জ করতে পারবো। তিনি বলেন, একজন আইনজীবী হিসেবে আমি তো কাউকে সরাসরি দায়ী করতে পারি না। আমরা তো অনেক নাম শুনি। আপনারাও শোনেন। কিন্তু সেই নামগুলো আমরা তখনই বলতে পারবো যদি তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। এমনি এমনি নাম বলে দেওয়া যায় না। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করারও পরামর্শ দেন তিনি। এ সময় পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিহত ৫৭ সেনা অফিসার ও ১৭ সাধারণ নাগরিকের পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে ৭ দফা দাবি তুলে ধরেন এডভোকেট সাকিব রহমান।

দাবিগুলো হলো- ১. পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সত্য উদ্‌ঘাটনের ক্ষেত্রে আগে যে সমস্ত তদন্ত হয়েছে, সেসব তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। ২. হাইকোর্ট ডিভিশনের রায় মোতাবেক তিনজন জজ যে তদন্ত কমিশনের কথা বলেছেন, অবিলম্বে সেই তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। এতে পর্দার আড়ালে রয়ে যাওয়া ষড়যন্ত্রকারীদের নাম বেরিয়ে আসবে। ৩. অফিসিয়াল গেজেট করে ২৫শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ সেনাদিবস হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। গেজেটে শাহাদাতবরণকারী সকলকে শহীদের মর্যাদা দিতে হবে। ৪. ২৫শে ফেব্রুয়ারি শহীদ সেনা ও শোক দিবসকে ঘিরে গোটা দেশজুড়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখতে হবে। ৫. পিলখানা ট্র্যাজেডিকে স্কুলের পাঠ্য বইয়ের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারবে, কি ছিল এই শহীদদের ত্যাগ। ৬. যে সকল সেনা কর্মকর্তা এ ঘটনাকে ঘিরে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন, তাদের চাকরি ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা যথাযথ কম্পেন্সেশন প্রদান করতে হবে। ৭. নির্দোষ কোনো বিডিআর সদস্যকে যেন কোনোভাবেই সাজা না দেয়া হয়।

আদালত থেকে সরছে লোহার খাঁচা by রাশিম মোল্লা

আদালত থেকে লোহার খাঁচা সরানোর উদ্যোগকে বিচার বিভাগের সংস্কার এবং সভ্য সমাজে পদার্পণ বলে মন্তব্য করেছেন আইনজ্ঞরা। গত শুক্রবার ঢাকার চিফ  মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (সিএমএম) থেকে লোহার খাঁচা সরানো হয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, নিম্ন আদালতে লোহার খাঁচা ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছিল। এমনকি জামিনে থাকা আসামিদের হাজিরার জন্যও এই খাঁচা ব্যবহার করা হতো। লোহার খাঁচা অপসারণের ফলে এ থেকে খুব শিগগিরই মুক্তি মিলবে। সরকারের এমন উদ্যোগ আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের অংশবিশেষ মনে করেন তারা। এবার ডাণ্ডাবেড়ি প্রথারও অপসারণ চান। গত বৃহস্পতিবার  সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতকে আদালতে হাজির করা হয়। তবে  সেদিন এজলাসে থাকা লোহার খাঁচায় কাউকেই ঢোকানো হয়নি। এজলাস কক্ষ থেকে লোহার খাঁচা সরানোর এ উদ্যোগকে নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন লোহার খাঁচা সরানোর রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির।

তিনি মানবজমিনকে বলেন, আদালত থেকে লোহার খাঁচা সরানোর উদ্যোগকে বিচার বিভাগের সংস্কার হিসেবে মনে করি। নাগরিককে লোহার খাঁচায় ঢুকানো মানবাধিকারের চরম লংঘন। নিঃসন্দেহে অন্তর্বর্তী সরকারের একাজ  প্রশংসনীয়। দেশ-বিদেশেও এটি প্রশংসিত হবে।  কেননা, সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ, নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদসহ অন্যান্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দলিল এই ধরনের আচরণ অনুমোদন করে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুর্ধর্ষ, জঙ্গি আসামিদেরকে আদালতে না এনেও সাক্ষী নেয়ার বিধান রয়েছে। জেল কতৃপক্ষ যদি মনে করে তবে এসব আসামির সাক্ষী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নিতে পারে। এজলাসে আনা আসামি যাতে অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনা ঘটাতে না পারে সেজন্য পুলিশকে সজাগ থাকতে হবে।
এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্রের চেয়ারপারসন ও সুপ্রিম কোর্টের  জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না মানবজমিনকে বলেন, একটি সভ্য রাষ্ট্রের আদালতে লোহার খাঁচা থাকতে পারে না। বর্তমান সরকার আদালত থেকে এই লোহার খাঁচা সরানোর কাজ শুরু করেছে। এটি একটি পজিটিভ দিক। ভালো দিক। সরকারের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আমাদের আশান্বিত করেছে। আদালতে আসামিকে  লোহার খাঁচায় রাখাকে সংবিধানের পরিপন্থি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারের মুখোমুখি কোনো আসামির সঙ্গে সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের চেতনার পরিপন্থি কোনো আচরণ সমর্থনযোগ্য নয়। একজন আসামিকে লোহার খাঁচায় ঢোকানো কিংবা ঢুকতে বাধ্য করা অমানবিক। লোহার খাঁচা সরানোর কার্যক্রম হাতে নেয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ডাণ্ডাবেড়ি পরানো প্রথা অপসারণ করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এখনো আমাদের জেলখানাগুলোতে আসামিদের ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হয়। এমনকী আদালতেও আসামিকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আনা হয়। এই সরকারের কাছে এই প্রথারও অপসারণ চাই।

সাবেক জেলা জজ ও রিটায়ার্ড জাজ এসোসিয়েশনের মহাসচিব ড. শাহজাহান সাজু মানবজমিনকে বলেন, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদের (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস আইসিসিপিআর) ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি দেয়া যাবে না। আইসিসিপিআরের অনুচ্ছেদ ১৪(২) অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধের জন্য অভিযুক্ত প্রত্যেকের আইন অনুযায়ী দোষী প্রমাণের আগ পর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য হওয়ার অধিকার থাকবে। এসব বিধানের তোয়াক্কা না করে এত দিন পর্যন্ত নিম্ন আদালতে লোহার খাঁচায় সব আসামিকে ঢোকানো হতো।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী মোহাম্মদ ফারুক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, দেশের অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের লোহার খাঁচা অতীতে ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী আনিসুল হক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আদালতে কাঠগড়ার পরিবর্তে লোহার খাঁচা স্থাপন করে। এ ধরনের খাঁচা ব্যবস্থা সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা আছে, কারও সঙ্গে নিষ্ঠুর-অমানবিক আচরণ করা যাবে না। অথচ, এই খাঁচা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এত দিন পর্যন্ত নাগরিকদের সঙ্গে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও বর্বর আচরণ করা হয়েছে। গত শুক্রবার দেখলাম আদালত থেকে এই লোহার খাঁচা সরানো হচ্ছে। এই আইনজীবীর মতে, এটি গণতান্ত্রিক সরকারের আলামত। সরকারের এমন উদ্যোগকে আমরা আইনজীবীরা স্বাগত জানাই। সরকারের এমন সংস্কার নাগরিকরাও সাধুবাদ জানাবে।

শুক্রবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের দু’জন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত কক্ষ থেকে লোহার খাঁচা সরানো হয়েছে। আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উচ্চপর্যায় থেকে লোহার খাঁচা সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা পাওয়ার পর শুক্রবার দুপুরের পর থেকে ঢাকার সিএমএম আদালতের কক্ষ থেকে লোহার খাঁচা সরানো হয়।

সিএমএম আদালতের এক কর্মকর্তা জানান, গণপূর্ত বিভাগের লোকজন লোহার খাঁচা সরানের কাজটি করেছেন। আমাদের ২৭টি কোর্টে লোহার খাঁচা রয়েছে।  এখন পর্যন্ত  ৪-৫টি এজলাসের খাঁচা অপসারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব লোহার খাঁচাই সরিয়ে ফেলা হবে। শিশির মনিরসহ হাইকোর্টের ১০ আইনজীবী আদালত থেকে লোহার খাঁচা সরানোর জন্য রিট করেছিলেন। সেই রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দিয়েছিলেন। সারা দেশে অধস্তন আদালত কক্ষে কতোগুলো লোহার খাঁচা রয়েছে সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সেইসঙ্গে হাইকোর্ট তার রুলে আদালত কক্ষে লোহার খাঁচার পরিবর্তে কাঠগড়া পুনঃস্থাপনের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়েছিলেন। এ ছাড়া আদালত কক্ষে লোহার খাঁচা বসানো কেন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১, ৩২ ও ৩৫ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল।

গত ১২ই জুন ঢাকার আদালতের লোহার খাঁচা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আজকে আমরা অনেকক্ষণ খাঁচার (আসামির কাঠগড়া) মধ্যে ছিলাম। আমি যতদূর জানি, যত দিন আসামি অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত না হচ্ছে, তত দিন তিনি নিরপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবেন। একজন নিরপরাধ নাগরিককে শুনানির সময় লোহার খাঁচায় (আসামির কাঠগড়া) দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এটা আমার কাছে অত্যন্ত অপমানজনক বলে মনে হয়েছে। এটা গর্হিত কাজ। এটা কারও ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। এটা পর্যালোচনা হোক। একটা সভ্য দেশে কেন একজন নাগরিককে শুনানির সময় পশুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে?

ভূরাজনীতিতে এরদোগানের ভিন্ন কৌশল -তুর্কি পার্লামেন্টে মাহমুদ আব্বাসের বক্তব্য

মস্কোতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তুরস্কের আঙ্কারা সফর করেছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে ফিলিস্তিনিদের একতা ও যুদ্ধবিরতির বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এ দুটি দেশের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন আব্বাস। হামাসের প্রতিপক্ষ ফাতাহ প্যালেস্টাইন আন্দোলনের নেতা মাহমুদ আব্বাস। তুরস্ক সরকারের সঙ্গে তার রয়েছে অনেক দূরবর্তী সম্পর্ক। তবে তুরস্ক সফরে আব্বাসকে আমন্ত্রণ জানানো ছিল কৌশলী। ২৫শে জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ভাষণ দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে আঙ্কারা। তারপর তারা মাহমুদ আব্বাসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বুধবার আঙ্কারায় আব্বাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। তিনি তার ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির সদস্যদের উদ্দেশ্যে একই দিন বলেন, নেতানিয়াহু যেমন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বক্তব্য দেয়ার অধিকার রাখেন, ঠিক তেমনিভাবে আমরা দেখাতে চাই যে, আমাদের পার্লামেন্টে আব্বাসের বক্তব্য দেয়ার অধিকার আছে।

উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট এরদোগান গাজার হামাস যোদ্ধাগোষ্ঠীর কট্টর সমর্থক। এ জন্য মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক দূরত্বের। তিনি বলেছেন, হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়েকে ইরানের রাজধানী তেহরানে হত্যা করার আগে তাকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা ছিল। বৃহস্পতিবার তুরস্কের পার্লামেন্টে ব্যতিক্রমী এক অধিবেশনে বক্তব্য রেখেছেন মাহমুদ আব্বাস। এই পার্লামেন্ট সাজানো হয়েছিল ইসমাইল হানিয়ের ছবি দিয়ে। তিনি ঘন ঘন তুরস্ক সফর করতেন এবং এরদোগানের একজন ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্সি বলেছে, আব্বাসের জন্য বিশেষ এই অধিবেশনের উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি তুরস্কের শক্তিশালী সমর্থন প্রদর্শনের জন্য। নিষ্পেষিত ফিলিস্তিনি জনগণের কণ্ঠ যাতে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, সেজন্য এমন আয়োজন করা হয়েছিল।
মাহমুদ আব্বাস বক্তব্য রাখার সময় হাততালি দেয়ায় বেশ কয়েকবার তাকে থামতে হয়। তিনি বলেন, গাজায় ইসরাইলি যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তিনি অধিকৃত গাজা উপত্যকা সফরে যাবেন। ফিলিস্তিনি ভূমি থেকে ইসরাইল নিজেদেরকে প্রত্যাহার না করলে এই যুদ্ধ শেষ হবে না। ২০০৭ সাল থেকে গাজা উপত্যকা যান না মাহমুদ আব্বাস। তিনি বলেন, নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়াবেন। গাজাকে বাদ দিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হতে পারে না।
এর আগে ৫ই মার্চ তুরস্ক সফর করেন মাহমুদ আব্বাস। কিন্তু তখন ইরান ও হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেবে- এমন এক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজমান ছিল। এরই মধ্যে ইসমাইল হানিয়েকে হত্যার পর হামাসের প্রধান নিয়োগ করা হয়েছে ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে। তিনি ইরানের খুব ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। ফলে হামাসের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে আঙ্কারা। ইসমাইল হানিয়েকে হত্যার কারণে নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেয়া হচ্ছিল। কিন্তু তা ব্লক করে দেয় ওই মিডিয়া। এ জন্য এক সপ্তাহের জন্য তুরস্কে ইনস্টাগ্রাম ব্লক করে রাখা হয়।
আঙ্কারা ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী প্রফেসর বেতুল দোগান-আক্কাস বিশ্বাস করেন, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে বেশ কিছু বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত আছে তুরস্কের পার্লামেন্টে মাহমুদ আব্বাসের বক্তব্য ও সফর। ফিলিস্তিনিদের সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দেয় তুরস্ক। কিন্তু গত এক দশকে হামাসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অধিক থেকে অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন অবস্থায় মাহমুদ আব্বাসকে পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখার অনুরোধ করার মাধ্যমে তুরস্ক এটাই দেখাতে চাইছে যে, পশ্চিমতীর ও গাজার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ইসমাইল হানিয়েকে হত্যার মধ্যদিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই সফর বড় রকম প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন দোগান আক্কাস।

কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে তরুণদের স্থান দিতে হবে

টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ ও নতুন বিশ্ব গড়ে তুলতে গ্লোবাল সাউথের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে  তরুণ ও ছাত্রদের রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, তরুণরা নতুন বিশ্ব গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘থার্ড ভয়েস অব গ্লোবাল সাউথ সামিট-২০২৪’র ইনঅগারাল লিডার্স অধিবেশনে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এসব কথা বলেন। তিনি গ্লোবাল সাউথ নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদের কৌশলগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই তরুণ এবং ছাত্রদের রাখতে হবে, যারা গ্লোবাল সাউথের জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ। আমাদের জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ তরুণ এবং তারা সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ।

তিনি ঢাকা থেকে ভার্চ্যুয়ালি সম্মেলনে যুক্ত হন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেয়ার পর এটিই ড. ইউনূসের প্রথম বহুপক্ষীয় কোনো অনুষ্ঠানে যোগদান।
আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশ গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভুক্ত।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের তরুণদের প্রশংসা করে বলেন, বীর ছাত্রদের নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত ৫ই আগস্ট দ্বিতীয় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। আর জনগণের যোগদানের মাধ্যমে এই বিপ্লব গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যার ফলস্বরূপ গত ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণ করে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বৈপ্লবিক পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে তরুণরা আন্দোলন করেছে এবং তাদের আকাক্সক্ষা দেশবাসীকে প্রভাবিত করেছে। এখন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে অর্থবহ সংস্কার জরুরি। যার মাধ্যমে ভঙ্গুর হয়ে পড়া রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধার করা হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বহুত্ববাদী গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং একটি পরিবেশ তৈরি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যার মাধ্যমে  অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে নানা পরিবর্তন ঘটছে উল্লেখ করে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্লোবাল সাউথের নেতৃবৃন্দকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, ‘তরুণ ছাত্র এবং ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুরা ৪০০ বছরের শহরের দেয়ালে একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ছবি আঁকছে।

এর জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা নির্দেশনা তাদের নেই। কারোর পক্ষ থেকে বাজেট সমর্থনও নেই। এটি দ্বিতীয় বিপ্লবের আকাক্সক্ষার প্রতি তাদের আবেগ এবং অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের দেয়ালের লেখা পড়ে যে কেউ বুঝবেন, তারা কী স্বপ্ন দেখছে। তরুণদের স্বপ্ন পূরণ করাই প্রধান কাজ বলে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিশ্বব্যাপী তরুণরা আলাদা, তারা সক্ষম এবং প্রযুক্তিগতভাবে আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক এগিয়ে। তিনি বলেন, ‘তারা সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। তারা উদ্যোক্তা। কিন্তু তারা চাকরি চায়, কারণ দেশে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা তাদেরকে চাকরির জন্য প্রস্তুত করে। অথচ সকল মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা রয়েছে।

কেবলমাত্র চাকরিপ্রার্থী তৈরি করে এমন শিক্ষা ও আর্থিক ব্যবস্থা নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানান অধ্যাপক ইউনূস।
তৃতীয়বারের মতো গ্লোবাল সাউথ সম্মেলনের আয়োজন করেছে ভারত। এবারের সম্মেলনে রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের নিয়ে উদ্বোধনী অধিবেশনের প্রতিপাদ্য এবং মূল সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হলো- ‘অ্যান এমপাওয়ারড গ্লোবাল সাউথ ফর এ সাসটেইনেবল ফিউচার’।
রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান পর্যায়ে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

নাটকীয় পরিস্থিতি: জামায়াতের আমীরের মূল্যায়ন

নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা। সেনাপ্রধান, প্রেসিডেন্ট, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক। গেল কয়েকটি দিন জামায়াতের জন্য চরম নাটকীয়। দলটি এখনো নিষিদ্ধ। তবে সেটা কেবলই কাগজে কলমে। বরং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় পর স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। খুলে দেয়া হয়েছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। নতুন এই পরিস্থিতি নিয়ে নিজের মূল্যায়ন জানিয়েছেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্ট নানা ইস্যুতে। তার সাফ কথা, ‘আমরা অন্যায়ের কাছে মাথানত করিনি।’ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিশেষত ছাত্রদের প্রতি। জামায়াত নতুন কোনো দল তৈরি করবে- এমন সম্ভাবনা নাকচ করেছেন তিনি।

শুক্রবার সকাল সকাল পৌঁছাই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীরের ঢাকার বাসায়। তিনি দলটির একজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। দ্রুতই সময় দেন আমাদের। সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা ডা. শফিকুর রহমান দলটির অন্য শীর্ষ নেতাদের তুলনায় কিছুটা আলাদা। কথা বলেন বেশ খোলামেলা। বর্তমান পরিস্থিতির মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি অবশ্য ফেরত যান অতীতে। বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথম আঘাতটা করা হয় সেনা কর্মকর্তাদের ওপর। পিলখানায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয় বিডিআর বিদ্রোহের নামে। এরপর আঘাত আসে জামায়াতের ওপর। অন্যায়ভাবে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেয়া হয়। তিনি বলেন, শত হামলা, ফাঁসির পরও আমরা মাথানত করিনি।  তারপর বিএনপি, বেগম খালেদা জিয়া, আলেমদের ওপর আক্রমণ এসেছে। তাদের নির্যাতন করা হয়েছে। ছাত্ররা আমাদের এ অবস্থা থেকে মুক্ত করেছে। তাদের সঙ্গী হয়েছে পুরো জাতি।

ছাত্র-জনতার আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা কোনো গণঅভ্যুত্থান নয়। এটি একটা গণবিপ্লব। ’৬৯ এবং ’৯০-এ যেটা হয়েছে সেটা ছিল গণঅভ্যুত্থান। এবারের গণবিপ্লবে সব শ্রেণি- পেশার মানুষই অংশ নিয়েছে। এ আন্দোলনে হতাহতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে পাওয়া তথ্য মতে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে চূড়ান্ত হিসাব এখনো পাইনি। আর কতো মানুষ আহত হয়েছেন, কতো মানুষ পঙ্গু হয়েছেন তার কোনো হিসাবই নেই। শেখ হাসিনা বলেছিলেন পালাবেন না, তিনি ঠিকই পালালেন। তবে দেশ এবং জাতির অনেক ক্ষতি করার পর। এখনো তিনি ষড়যন্ত্র করছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যাপারে জামায়াতের বক্তব্য কী- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা অভিজ্ঞ এবং দক্ষ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশ্বব্যাপী খ্যাতি রয়েছে। আমরা সরকারের ভালো কাজকে সমর্থন করবো। ভুলত্রুটি হলে সেটা নিয়েও কথা বলবো। জামায়াত তো এখনো নিষিদ্ধ দল এমন মন্তব্যের ব্যাপারে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার শেষ মুহূর্তে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে জামায়াত নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করেছেন। জামায়াতের ওপর এত চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে এ কারণে যে, তারা জানতো দেশপ্রেমের প্রশ্নে জামায়াত কোনো আপস করবে না।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ভাঙচুর ও হামলা প্রসঙ্গে জামায়াতের আমীর বলেন, পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে যেসব ঘটনা ঘটেছে তাও আমরা সমর্থন করি না। নেতাকর্মীদের আমরা কঠোর নির্দেশনা দিয়েছিলাম তারা যেন কোনো অন্যায় না করে, তাদের সামনে কোনো অন্যায় হলে যেন বাধা দেয়। সরকারে যারা আছেন তাদের প্রতিও অনুরোধ এসব ব্যাপারে যেন তারা কঠোর হন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কার প্রয়োজন বলে মত দেন জামায়াতের আমীর।  বলেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সে সংস্কার হতে পারে। যুগের প্রয়োজনে অনেক পরিবর্তন হয়। আমরা যে সংস্কার করছি না- এমন নয়।  জামায়াতের নতুন কোনো দল বা সংগঠন গড়ে তোলার সম্ভাবনা অবশ্য নাকচ করেন তিনি। জামায়াতের আমীর বলেন, আমরা যা করি ঐকমত্যের ভিত্তিতে করি। কখনো কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে করি। নতুন দল নিয়ে আমাদের মধ্যে যে আলোচনা হয়নি, তা নয়। আমরা এ নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু আমরা মনে করি না- এতে কোনো উপকার হবে। যারা সমালোচনা করার তারা সেটা করবেই। আমরা তো আমাদের ডিএনএ চেঞ্জ করতে পারবো না। ডা. শফিকুর রহমান জানান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি নৌকার পোস্টার লিখেছিলেন। ছিলেন ছাত্রলীগ কর্মী। একসময় জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতেও জড়িত ছিলেন। পরে ছাত্রশিবিরে যোগ দেন।  

আবু সাঈদ হত্যার তদন্ত নিয়ে সংশয় by জাভেদ ইকবাল

আবু সাঈদ। কোটা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগী রংপুরের এই শিক্ষার্থী। যার রক্তের বিনিময়ে এসেছে নতুন স্বাধীনতা। ন্যায্য দাবি আদায়ে বেরোবি’র বিপ্লবী শিক্ষার্থী। বন্দুকের নলের সামনে বুক চিতিয়ে দিয়েছিলেন। প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান। তার নিহতের ঘটনায়  বারুদ জ্বলে উঠেছিল সারা দেশের ছাত্র-জনতার বুকে। অসহযোগ আন্দোলনে পতন হয়েছে শেখ হাসিনার সাম্রাজ্যের। সূচনা হয়েছে নতুন এক ইতিহাসের। সেই মহানায়কের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।

মৃত্যুর এক মাসেও আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে হয়নি কোনো মামলা। পুলিশের করা তাজহাট থানার আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের অংশে তদন্ত করছে পিবিআই। তবে কোটা আন্দোলনের সময় দায়ের করা পুলিশের মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন আইন উপদেষ্টা। ঘোষণা অনুাযায়ী তাজহাট থানার মামলাটি প্রত্যাহার হলে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অবিলম্বে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা, তদন্তের জন্য কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

আবু সাঈদ হত্যায় সুনির্দিষ্ট মামলা হয়নি: গত ১৬ই জুলাই আন্দোলনে বেরোবি শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষে নিরস্ত্র আবু সাঈদের মৃত্যু হয়। পরদিন ১৭ই জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় পরস্পর যোগসাজশে বেআইনি জনতাবদ্ধে সাধারণ ও মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সরকারি কাজে বাধার সৃষ্টি করে গুরুতর জখম, চুরি, ভাঙচুর, ক্ষতিসাধন, অগ্নিসংযোগ ও নিরীহ ছাত্রকে হত্যার অপরাধে মেট্রোপলিটন তাজহাট থানায় মামলা করেন। এতে আসামি করা হয় অজ্ঞতানামা উচ্ছৃঙ্খল দুই থেকে তিন হাজার আন্দোলনকারী ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তসহ বিএনপি, জামায়াত-শিবির সমর্থিত নেতাকর্মীকে। মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়‘ বিভিন্ন দিক থেকে আন্দোলনকারীদের ছোড়া গোলাগুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে একজন শিক্ষার্থী রাস্তায় পড়ে যায়। তখন সহপাঠীরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কোনো কমিটিই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। সেইসঙ্গে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা আবু সাঈদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি। আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় মাহিম নামে এক নাবালক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে মেট্রোপলিটন পুলিশ। দু’সপ্তাহ জেল খাটার পর আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পায় ওই কিশোর। এদিকে গত ৩রা আগস্ট আবু সাঈদ নিহতের ঘটনায় অপেশাদার আচরণের অভিযোগে এএসআই আমীর হোসেন ও তাজহাট থানার কনস্টেবল সুজন চন্দ্রকে সাময়িক বরখাস্ত করে মেট্রোপলিটন পুলিশ। গত ১২ই আগস্ট তাজহাট থানার মামলার আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের অংশটির তদন্তের ভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), রংপুর। পরদিন আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের সময় দায়িত্বে থাকা রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।  

আবু সাঈদ হত্যার বিচার নিয়ে সংশয়: গত ১৪ই আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে জানান, কোটা পদ্ধতি সংস্কার ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশে পুলিশের করা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা আগামী ৩১শে আগস্টের মধ্যে প্রত্যাহার করা হবে। এতে করে পুলিশের করা তাজহাট থানার মামলাটি প্রত্যাহার হলে আবু সাঈদের হত্যার ঘটনায় আর কোনো মামলা থাকবে না। সচেতনদের মতে, আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা না হওয়ায় এটির সঠিক বিচার নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। পুলিশের দায়ের করা মামলা, পুলিশের একটি বিভাগ তদন্ত করায় এটির সঠিক তদন্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। সেই সঙ্গে পরিবার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবু সাঈদের হত্যার ঘটনায় মামলা না হলে তৃতীয় পক্ষ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করে বিভিন্ন মহলকে মামলায় জড়ানোর হুমকি নিয়ে বাণিজ্যে মেতে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছে।

পিবিআই যা বলছে: আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে পিবিআই রংপুর অফিসের এসআই জিল্লুর রহমান মামলাটি তদন্ত শুরু করেছেন। পিবিআই বলছে, আইন উপদেষ্টার নির্দেশে পুলিশের করা মামলাগুলো খারিজ হলেও আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলাটি থেকে যাবে। পিবিআই রংপুরের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, আবু সাঈদের পরিবার কিংবা অন্য কোনো পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি। যদি বিজ্ঞ আদালত কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মামলা হয় তবে আমরা অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে তদন্ত করবো। তবে তাজহাট থানায় দায়ের করা মামলার আবু সাঈদের অংশের তদন্ত ভার পেয়ে আমরা তদন্ত শুরু করেছি।

আবু সাঈদ হত্যার বিচারে সোচ্চার শিক্ষার্থীরা: গত ১৪ই আগস্ট থেকে চার দফা দাবিতে ‘প্রতিরোধ সপ্তাহ’ পালন করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। প্রতিদিনের কর্মসূচিতে আবু সাঈদসহ কোটা আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থীদের সঠিক বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। ৪ দফা দাবি আদায়সহ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছেড়ে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র মনিরুজ্জামান বলেন, দেশবাসী দেখেছে আবু সাঈদকে কীভাবে পুলিশ লীগ গুলি করে হত্যা করেছে। শিক্ষার্থী তাসিন বলেন, আবু সাঈদ ভাইয়ের মৃত্যু স্বৈরাচার সরকার হটাও বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছে। আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর দাবি জানাচ্ছি যেন আবু সাঈদ ভাইয়ের পরিবার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি মামলা দায়ের করে। এরপরেও কেউ মামলা করতে এগিয়ে না আসলে ছাত্রদের পক্ষ থেকে আবু সাঈদ হত্যা মামলা দায়ের করে খুনিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ঢেলে সাজানো অপরিহার্য: টিআইবি

দুর্নীতি ও অর্থপাচারের জবাবদিহি নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিএফআইইউ ও দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ঢেলে সাজানো অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছে টিআইবি। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন।

প্রাক্তন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ ও তার স্ত্রী রুখমিলা জামান চৌধুরীর নামে যুক্তরাজ্যে বিপুল অঘোষিত সম্পদের তথ্য প্রমাণ থাকা স্বত্বেও দীর্ঘদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বিষয়টি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে নেতৃত্বের পর্যায়ে দলীয়করণ ও অকার্যকরতার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নজির হিসেবে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতি ও অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে জবাবদিহি নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই মর্মে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গত ডিসেম্বর থেকে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর দেশের বাইরে অপ্রদর্শিত সম্পদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ ও ব্যাপক জনউদ্বেগ স্বত্বেও কোনো ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিষয়টিকে চরম হতাশাজনক। ‘হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি’ শীর্ষক টিআইবির প্রতিবেদন ও ‘নো ইউর ক্যান্ডিডেট’ ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং পরবর্তীতে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ফলে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর যুক্তরাজ্যে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ ও চলমান ব্যবসা সম্পর্কে দেশবাসীর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত হয়েছে। পরবর্তীতে টিআই-ইউকে এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা এ সংক্রান্ত সকল সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত, প্রমাণ ও নথি টিআই-ইউকে ও টিআইবির উদ্যোগে বিএফআইইউ, দুদক, পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয় এ বছরের ৪ঠা মার্চ। তিনি বলেন, সকল তথ্য-প্রমাণ হাতে থাকা স্বত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। সরকার পতনের পর ও বিএফআইইউ এর প্রধানের পদত্যাগের প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে, যা ইতিবাচক বলে বিবেচিত হতে পারে। সকল তথ্য-প্রমাণ হাতে থাকা স্বত্বেও এতো দিনেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?- এই প্রশ্ন করেছে সংস্থাটি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, এমন নিষ্ক্রিয়তা কি প্রমাণ করে না- সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে দলীয়করণের মাধ্যমে অকার্যকর করে রাখা হয়েছিলো এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের নেতৃত্বস্থানীয়রা এ অকার্যকরতার অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন? বস্তুত অর্থ পাচার ও অপ্রদর্শিত সম্পদ অর্জনের বিষয়টিকে প্রকারান্তরে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বৈধতা দেয়া হয়েছে।

আশঙ্কার বিষয়- দেশের আর্থিক দুর্নীতির তদন্তের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোকে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ, পদায়ন ও অনৈতিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে করায়ত্ত করে দুর্নীতির করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিদেশে বিপুল অঘোষিত সম্পদ অর্জনের ঘটনা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে এ সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আপাদমস্তক ঢেলে সাজাতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতিমুক্ত, সুশাসিত, গণতান্ত্রিক ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে।

সরকারকে স্বল্প মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে -সেমিনারে বক্তারা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিপ্লবী সরকার আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেছেন, বর্তমান সরকার রক্তাক্ত মঞ্চ থেকে তৈরি হয়েছে। শত শত মানুষ জীবন দিয়েছে। এই সরকার, এই বিপ্লব ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে। তাই বর্তমান সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে। গতকাল জাতীয় রাষ্ট্রচিন্তা পরিষদ (এনসিপিটি) আয়োজিত জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া   হলে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা।

এতে স্বাগত বক্তব্য দেন এনসিপিটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে স্বৈরাচারী শাসনের নিষ্পেষণে এ দেশের মানুষ যখন দমবন্ধ অবস্থায় ছিল তখন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আমরা মুক্তি পেলাম। এই ভয়াবহ স্বৈরাচারী শাসন নিপীড়ন, গুম, খুন যেমন একদিকে জনগণকে নিষ্পেষিত করেছে অন্যদিকে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটতরাজ, চুরি, অর্থপাচার দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে একেবারে দুর্বল করে দিয়েছে। অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার হাসিনা সরকার পালানোর পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, বিধ্বস্ত এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তার সামনে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জনগণেরও আশা-আকাক্সক্ষা তাকে ঘিরে অনেক বেশি। বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে রয়েছে বৈষম্যহীন দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ। যেখানে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যেখানে থাকবে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ। যেখানে মানুষ মন খুলে কথা বলতে পারবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, একটা প্রচণ্ড রক্তাক্ত মঞ্চ থেকে এই সরকার তৈরি হয়েছে। সেই মঞ্চ ও আপামর জনগণের কিছু দাবি ছিল। গত ১৫-১৬ বছর ধরে এই দাবিগুলো উত্থাপিত হয়েছে। সেই দাবি থেকেই এই সরকারের কর্মকাণ্ডগুলো প্রায়োরিটি পাবে। যারা এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন তাদের স্বীকৃতি সবার আগে দিতে হবে। এটা অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। যারা আহত হয়েছেন রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের চিকিৎসা দিতে হবে। এটাও হচ্ছে না। আহতদেরও স্বীকৃতি দিতে হবে। এটা না করলে এই বিপ্লবের সত্যিকার ইতিহাস তৈরি হবে না। তিনি বলেন, একটা ফ্যাসিবাদের প্রেক্ষাপটে শত শত মানুষ জীবন দিয়েছে। এই ফ্যাসিবাদের মূল উৎপাটন করতে হবে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো ঠিক না করলে এই ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে। আমরা আর রক্ত দিতে চাই না। এই সরকার, এই বিপ্লব ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেজবাহ-উল আজম সওদাগর বলেন, সারা দেশের মানুষ সাক্ষী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে একটি সরকার, সরকারপ্রধান ও তার সকল বাহিনী যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধ ঘোষণার পর সেই বাহিনী পরাজিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার সম্পূর্ণ ক্যাবিনেট পালিয়েছে। এই অবস্থায় যে সরকার গঠিত হলো তার ন্যাচার কী হবে। এই সরকার কি নিরপেক্ষ হবে নাকি যারা বিপ্লব সাধিত করেছে তাদের ইচ্ছায়, তাদের অংশগ্রহণে এই সরকার পরিচালিত হবে। এটিই এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন। এই উত্তর না পাওয়ায় আমাদের মাঝে প্রতিবিপ্লবের সম্ভাবনা, ষড়যন্ত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হলে আমরা নিরপেক্ষতা খুঁজতাম। কিন্তু এখানে একটা শক্তি পরাজিত। একটা পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা কেন সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে বর্তমান সরকারকে। সরকারকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। প্রত্যেকটা হাসপাতালে চোখ হারানো, হাত-পা হারানো অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী, সাধারণ মানুষ কাতরাচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এখনো দেখি নাই সরকার থেকে সেখানে বিশেষ কোনো সহায়তা এসেছে বা বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি এসবের ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কীভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট করা যায়, কীভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে এই বিষয়গুলো সরকারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম বলন, এই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার না করলে স্বচ্ছ, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। একটা জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। পুলিশ প্রসাশন, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সরকারি স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক ফজল বলেন, এই সরকারের ইমিডিয়েট কাজ হচ্ছে, সংবিধানের ষষ্ঠদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করা। এটি বাতিল ঘোষণা করলে আমরা মোটামুটি সহ অবস্থায় ফিরতে পারবো। এই সরকারের তিন ধরনের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কাজগুলো খুব সাধারণ কাজ। এগুলো কোনো রাজনৈতিক দল বাধা দিবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো, ভোটের অধিকার, পরিবেশ, বাস্তবতা নিশ্চিত করা।
সভাপতির বক্তব্যে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, এটা নামে অন্তর্বর্তী সরকার বললেও এর ক্যারেক্টার হচ্ছে বিপ্লবী সরকারের মতো। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে তাদের সংশ্লিষ্টতা না থাকলে ওই বিপ্লবের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারকে সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা। সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ না করলে তা ধীরে ধীরে কচ্ছপের মতো মাথা বের করবে, আবার লুকাবে, আবার মাথা বের করবে। তাই এই জাতিকে যদি আমরা নিরাপদ রাখতে চাই তাহলে স্বাধীনতাবিরোধী, ফ্যাসিবাদী শক্তিকে কোনোক্রমেই অধিকার দেয়া যাবে না। আমাদের রাষ্ট্র এক আজব রাষ্ট্র। আমরা শত দলে বিভক্ত। আমাদের এই বিভেদ হলো আর্টিফেশিয়াল। আমাদের জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।

অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে -গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিপ্লবী সরকার আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেছেন, বর্তমান সরকার রক্তাক্ত মঞ্চ থেকে তৈরি হয়েছে। শত শত মানুষ জীবন দিয়েছে। এই সরকার, এই বিপ্লব ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে। তাই বর্তমান সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে। শনিবার জাতীয় রাষ্ট্রচিন্তা পরিষদ (এনসিপিটি) আয়োজিত জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা।

গোলটেবিল বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন এনসিপিটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন। বক্তব্যে তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে স্বৈরাচারী শাসনের নিষ্পেষণে এ দেশের মানুষ যখন দমবন্ধ অবস্থায় ছিল তখন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে মনে হয়েছে আমরা মুক্তি পেলাম। এই ভয়াবহ স্বৈরাচারী শাসন নিপীড়ন, গুম, খুন যেমন একদিকে জনগণকে নিষ্পেষিত করেছে অন্যদিকে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটতরাজ, চুরি, অর্থপাচার দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে একেবারে দুর্বল করে দিয়েছে। অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার হাসিনা সরকার পালানোর পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, বিধ্বস্ত এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তার সামনে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জনগণেরও আশা-আকাক্সক্ষা তাকে ঘিরে অনেক বেশি। বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে রয়েছে বৈষম্যহীন দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ। যেখানে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যেখানে থাকবে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ। যেখানে মানুষ মন খুলে কথা বলতে পারবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, একটা প্রচণ্ড রক্তাক্ত মঞ্চ থেকে এই সরকার (অন্তর্বর্তী) তৈরি হয়েছে। সেই মঞ্চ ও আপামর জনগণের কিছু দাবি ছিল। গত ১৫-১৬ বছর ধরে এই দাবিগুলো উত্থাপিত হয়েছে। সেই দাবি থেকেই এই সরকারের কর্মকাণ্ডগুলো প্রায়োরিটি পাবে। যারা এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন তাদের স্বীকৃতি সবার আগে দিতে হবে। এটা অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। যারা আহত হয়েছেন রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের চিকিৎসা দিতে হবে। এটাও হচ্ছে না। আহতদেরও স্বীকৃতি দিতে হবে। এটা না করলে এই বিপ্লবের সত্যিকার ইতিহাস তৈরি হবে না। তিনি বলেন, একটা ফ্যাসিবাদের প্রেক্ষাপটে শত শত মানুষ জীবন দিয়েছে। এই ফ্যাসিবাদের মূল উৎপাটন করতে হবে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো ঠিক না করলে এই ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে। আমরা আর রক্ত দিতে চাই না। এই সরকার, এই বিপ্লব ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেজবাহ-উল আজম সওদাগর বলেন, সারা দেশের মানুষ সাক্ষী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে একটি সরকার, সরকারপ্রধান ও তার সকল বাহিনী যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধ ঘোষণার পর সেই বাহিনী পরাজিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার সম্পূর্ণ ক্যাবিনেট পালিয়েছে। এই অবস্থায় যে সরকার গঠিত হলো তার ন্যাচার কী হবে। এই সরকার কি নিরপেক্ষ হবে নাকি যারা বিপ্লব সাধিত করেছে তাদের ইচ্ছায়, তাদের অংশগ্রহণে এই সরকার পরিচালিত হবে। এটিই এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন। এই উত্তর না পাওয়ায় আমাদের মাঝে প্রতিবিপ্লবের সম্ভাবনা, ষড়যন্ত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হলে আমরা নিরপেক্ষতা খুঁজতাম। কিন্তু এখানে একটা শক্তি পরাজিত। একটা পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা কেন সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে বর্তমান সরকারকে। সরকারকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। প্রত্যেকটা হাসপাতালে চোখ হারানো, হাত-পা হারানো অসংখ্য ছাত্র-ছাত্র, সাধারণ মানুষ কাতরাচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এখনো দেখি নাই সরকার থেকে সেখানে বিশেষ কোনো সহায়তা এসেছে বা বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি এসবের ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কীভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট করা যায়, কীভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে এই বিষয়গুলো নিয়ে এই সরকারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম বলন, এই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার না করলে স্বচ্ছ, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। একটা জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। পুলিশ প্রসাশন, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সরকারি স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক ফজল বলেন, এই সরকারের ইমিডিয়েট কাজ হচ্ছে, সংবিধানের ষষ্ঠদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করা। এটি বাতিল ঘোষণা করলে আমরা মোটামুটি সহ অবস্থায় ফিরতে পারবো। এই সরকারের তিন ধরনের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কাজগুলো খুব সাধারণ কাজ। এগুলো কোনো রাজনৈতিক দল বাধা দিবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো, ভোটের অধিকার, পরিবেশ, বাস্তবতা নিশ্চিত করা।
সভাপতির বক্তব্যে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, এটা নামে অন্তর্বর্তী সরকার বললেও এর ক্যারেক্টার হচ্ছে বিপ্লবী সরকারের মতো। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে তাদের সংশ্লিষ্টতা না থাকলে ওই বিপ্লবের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারকে সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা। সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ না করলে তা ধীরে ধীরে কচ্ছপের মতো মাথা বের করবে, আবার লুকাবে, আবার মাথা বের করবে। তাই এই জাতিকে যদি আমরা নিরাপদ রাখতে চাই তাহলে স্বাধীনতাবিরোধী, ফ্যাসিবাদী শক্তিকে কোনোক্রমেই অধিকার দেয়া যাবে না। আমাদের রাষ্ট্র এক আজব রাষ্ট্র। আমরা শত দলে বিভক্ত। আমাদের এই বিভেদ হলো আর্টিফেশিয়াল। আমাদের জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।

নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: ডাক্তারদের কর্মবিরতি পশ্চিমবঙ্গে দোষারোপের রাজনীতি

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আরজি কর মেডিকেল কলেজের একজন নারী ডাক্তার (৩১)কে ধর্ষণ শেষে হত্যাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনায় ফুটছে পুরো দেশ। শনিবার ইন্ডিয়ান মেডিকেল এসোসিয়েশনের (আইএমএ) ডাকে সারা দেশে কর্মবিরতি পালন করেছেন চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, অত্যাবশ্যক নয় হাসপাতালে এমন সব সেবা এদিন বন্ধ করে রাখেন তারা। আইএমএ হলো ভারতে চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। গত সপ্তাহে ওই হাসপাতালের একজন নারী ডাক্তারকে হাসপাতালের ভেতরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল হয়ে ওঠে। রাজ্য সরকার এ মামলার তদন্ত সিবিআই-এর হাতে হস্তান্তর করেছে। এরই মধ্যে নিহত চিকিৎসকের পিতামাতা বলেছেন, তাকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়েছে। তার শরীরে পুরুষের বিপুল পরিমাণ শুক্রাণু পাওয়া গেছে।

এর পরিমাণ ১৫০ মিলিগ্রাম। নারীদের নিরাপত্তার স্থান সংকুচিত হয়ে আসায় এই হত্যাকে বর্বরোচিত মাত্রা বলে আখ্যায়িত করেছে আইএমএ। ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইয়ে তারা দেশবাসীর সমর্থন দাবি করেছেন। যে হাসপাতালে এই ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি উত্তেজিত জনতা সেখানে ভাঙচুর করেছে। তারপর থেকে কয়েকদিনে নারীদের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ এবং তাদের উন্নত সুরক্ষার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনরতরা। এক বিবৃতিতে আইএমএ বলেছে, জরুরি এবং হতাহতের সেবা অব্যাহত থাকবে। তাদের ধর্মঘট স্থায়ী হবে ২৪ ঘণ্টা। এমআরআই-এর প্রেসিডেন্ট আর ভি আসোকান বিবিসিকে বলেছেন, অনেক বছর ধরেই সহিংসতার শিকার হয়ে আসছেন চিকিৎসকরা। তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করছেন। কিন্তু সর্বশেষ যে ঘটনা ঘটেছে তা ভিন্ন মাত্রার। একটি বড় শহরে একটি মেডিকেল কলেজে যদি এমন অপরাধ হতে পারে তাহলে এটা থেকে বলে দেয় যে, চিকিৎসকরা কোথাও নিরাপদ নন। এ সপ্তাহের শুরুর দিকে কিছু সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। সহিংসতার বিরুদ্ধে মেডিকেল স্টাফদের অধিক সুরক্ষিত রাখতে আইন শক্তিশালী করা সহ দাবিসমূহের একটি তালিকা দিয়েছে আইএমএ। এতে আরও আছে হাসপাতালে নিরাপত্তার মাত্রা বৃদ্ধি করা। বিশ্রামের জন্য নিরাপদ স্থান তৈরি করা। হত্যাকাণ্ডের একটি নিপুণ ও পেশাদারি তদন্ত দাবি করেছে তারা। হাসপাতালে ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিচার করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি নিহত ও ধর্ষিত নারীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

আরজি কর মেডিকেল কলেজে গত সপ্তাহে উদ্ধার করা হয় ৩১ বছর বয়সী ট্রেইনি ওই নারী ডাক্তারের মৃতদেহ। এ সময় কলেজের  সেমিনার হলে তাকে আহত ও অর্ধনগ্ন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। শিফট পরিবর্তনের সময় তিনি সেখানে বিশ্রাম নিতে গিয়েছিলেন। এই অপরাধে জড়িত সন্দেহে হাসপাতালের একজন স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই নারীর মৃত্যুর পর ভারতে আরও ধর্ষণের খবর সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন- নারীর বিরুদ্ধে দানবীয় আচরণের কঠোর ও দ্রুত শাস্তি দেয়া হবে।

ওদিকে এই নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দোষারোপের রাজনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এই হামলার জন্য রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস পার্টিকে দায়ী করেছে বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি। এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। সহিংসতাকে উস্কে দেয়ার জন্য রাজনৈতিক বহিরাগতদের দায়ী করেছে তারা। ওদিকে ভয়হীন, স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার দাবিতে বুধবার রাতে পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার নারী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। যদিও এই বিক্ষোভ ছিল শান্তিপূর্ণ, তবু পুলিশ এবং আরজি কর হাসপাতালে প্রবেশ করা অজ্ঞাত একটি গ্রুপ পুরুষের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। ওই সময় ওই গ্রুপটি হাসপাতালের জরুরি ওয়ার্ডে ভাঙচুর করেছে। এসব ঘটনায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কমপক্ষে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দিল্লি, হায়দরাবাদ, মুম্বই ও পুনে সহ ভারতের অন্য বড় বড় শহরেও প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে।

শতকোটি টাকার মালিক সাবেক মন্ত্রীর এপিএস by মিলন পাটোয়ারী

এপিএস মিজান। পুরো নাম মিজানুর রহমান। ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহম্মেদের এপিএস। সেই থেকে এলাকায় এপিএস মিজান নামে পরিচিত। ঘুষের টাকায় অঢেল সম্পদের মালিক। মালিক হয়েছেন কয়েক শত একর জমিরও। বাবা নজরুল ইসলাম ছিলেন কাঠ ব্যবসায়ী। ছিলেন বিএনপি নেতা। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতির সুবাদে হয়েছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর এপিএস। এপিএস মিজান দীর্ঘ ৮ বছর ধরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়টিকে বানিয়েছিলেন দুর্নীতির আখড়া। মহিষখোচায় বালু মহাল তৈরি করে হয়েছেন অনেক টাকার মালিকও।

জানা গেছে, অবৈধভাবে ঘুষের টাকায় আমেরিকায় কিনেছেন বিলাসবহুল ফ্লাট। সেখানে থাকেন স্ত্রী তমা ও তার সন্তান। বিদেশেও পাচার করেছেন বিশাল অংকের টাকা। দুর্নীতির যেন শেষ নাই মিজানের। লালমনিরহাটের কাকিনার বানিনগরে তার শশুরবাড়ি। শশুর আবু তালেব ছিলেন সামান্য সম্পদের মালিক। এখন হয়েছে প্রায় শত বিঘা জমি। রয়েছে ব্যাংক ব্যালেন্স। মিজানের স্ত্রী তমা এলাকার ফার্স্ট লেডি বলে পরিচিত। স্ত্রী তমাকে দিয়েছেন গাড়ি আমেরিকায় বাড়ি। কালীগঞ্জের কাকিনা মহিপুর এলাকায় মিজানের স্ত্রী তমার গাড়িতে পাচার করা হতো মদ, ফেনসিডিলসহ মাদক। গাড়ি তল্লাশি করায় ছিল না কোনো পুলিশের সাধ্য। এ সুবাদে প্রতিদিন সেই গাড়িতে পাচার করা হতো মাদক। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গাড়িটি আটক করে ডিবি পুলিশ। মন্ত্রীর এপিএস মিজানের স্ত্রীর গাড়ি হওয়ায় পুলিশ বিষয়টি পাশ কাটিয়ে মামলাটি ভিন্নভাবে দায়ের করেন।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এপিএস মিজানের শ্যালক মাদক নিয়ন্ত্রণ করতো। গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এপিএস এম মিজানের ক্যাশিয়ার বলে পরিচিত রেল কর্মচারী জাকির হোসেন। এ ছাড়াও সোনা পাচারের রয়েছে ব্যবসা। এই সোনা পাচারে তার পাটনার রয়েছে মহিষখোচা কলেজের শিক্ষক সেফাউল। অভিযোগ রয়েছে, মিজান প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গেও জড়িত ছিল। তার সহযোগী ছিলেন এমডি মিজান। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, মিজান অনামিকা ট্রেডার্স এর নামে মহিষখোচা তিস্তা বাঁধ নির্মাণে ১০ কোটি টাকার কাজ জোর করে টেন্ডারে নিয়ে নিম্নমানের কাজ করেন। যা ৬ মাসেই লণ্ড ভণ্ড হয়ে পড়ে। জানা গেছে, সুইস ব্যাংকেও রয়েছে টাকা। আদিতমারীর মহিষখোচা গ্রামে গেলে গ্রামবাসীরা জানান, মিজান কোটি কোটি টাকার মালিক। তার বাপের জমি নদীতে ভেঙে যায়। তাদের তেমন কিছু ছিল না। এখন অঢেল জমির মালিক তার পরিবারের লোকজন।

জানা গেছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর এপিএস থাকার সময়ে আদিতমারীর মহিষখোচার কচুমুড়া এলাকায় ২০ বিঘা, বারঘরিয়া বালুঘাটে ১৫ বিঘা, গোবধন চরে ৫০ বিঘা জমি ক্রয় করে। মহিষখোচা বাজারে কোটি টাকার উপরে জমি ক্রয় করে। মন্ত্রীর এপিএস হওয়ায় ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। প্রতিবাদ করলে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে পেটাতো। হয়রানি করতো মিথ্যা মামলা দিয়ে। তিস্তা নদীর অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে ১৫ বছরে শত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে। রয়েছে তার অবৈধ মালু মহাল। তিনি ৮টি ট্রাকের মালিক। প্রতিদিন অবৈধ বালুর কারবার থেকে বালু বিক্রি করছে এপিএস’র লোকজন। প্রশাসন সবেই জানেন কিন্তু অসহায়। মহিষখোচায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৮টি গ্রুপের ৪৪ কোটি টাকার কাজ সাব কন্ট্রাক্ট বাগিয়ে নেয়। কাজ করেছে অত্যন্ত নিম্নমানের।

অপরদিকে মিজানের ছোটভাই এরশাদুল হক চাকরি করেন হাতিবান্ধায় ভূমি অফিসের পিয়ন পদে। ২০ তম গ্রেডে চাকরি করে ১০ হাজার টাকা তার বেতন। বড়ভাই মন্ত্রীর এপিএস হওয়ায় চাকরি না করেও তুলতেন বেতন। পিয়ন থেকে সেও এখন কোটি টাকার মালিক। মহিষখোচা বাজারে সোনালী ব্যাংকের সামনে বড় বড় গোডাউনে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার ভুট্টা। নামে-বেনামে মিজান জেলার আদিতমারী পলাশীর বনচৌকি দোলাসহ বিভিন্ন স্থানে আরও প্রায় দেড়শত বিঘার অধিক জমি ক্রয় করেছে। যার মূল্য প্রায় কয়েক কোটি টাকা। এ ছাড়াও আদিতমারী ভাদাই ঘোষের দোকানের পিছনে জমি ক্রয় করে ১১ শতকের উপরে। এতে ৭৫ লাখ টাকা মূল্য হবে বলে জানান এলাকাবাসী।

মিজানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ছিল না কারও। থানা-পুলিশ ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। এ ছাড়াও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পেতো না কেউ। প্রতিবাদ করলেই পুলিশ দিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করতো। মিজানসহ সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নামে দুদকে একটি অভিযোগ দায়ের হয়। সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীদের পক্ষে মনি কিশোর নামে এক কর্মচারী দুদকে অভিযোগ করেছিলেন। এই অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ পর্যন্ত হয়। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এসব বিষয়ে এপিএস মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পলাতক রয়েছে বলে তার ঘনিষ্টজনরা জানান। ওদিকে লালমনিরহাট জেলার দায়িত্বে কুড়িগ্রাম দুদক উপ-পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগ দিলে তাদের নির্দেশে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

চট্টগ্রামে যুবলীগ নেতার বাসায় গিয়ে জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক লাঞ্ছিত

যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও আলোচিত ব্যবসায়ী নিয়াজ মোরশেদ এলিটের বাসায় বৈঠক করতে গিয়ে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য গোলাম আকবর খোন্দকার। পরে সেনাবাহিনীর একটি টিম এসে বিক্ষুব্ধ জনতার কাছ থেকে তাকে উদ্ধার করে। শনিবার দুপুরে মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নে নিয়াজ মোরশেদ এলিটের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।

এসময় বিএনপি’র বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা গোলাম আকবর খোন্দকারকে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন। এলিট মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নগদের পরিচালক ও চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। তার বাবা মনিরুল ইসলাম ইউসুফ বিএনপি’র উত্তর জেলা কমিটির সাবেক সদস্য। এছাড়া তিনি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি।

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গোলাম আকবর দলের কয়কজন নেতাকর্মী নিয়ে এলিটের বাড়িতে যান। সেসময় এলিটের পাশাপাশি তার বাবা বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম ইউসুফও ছিলেন। একপর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হতেই স্থানীয় বিএনপি’র নেতাকর্মীর ওই বাড়ি ঘেরাও করেন। এরমধ্যে তাদের সঙ্গে গোলাম আকবর খোন্দকারের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে বিকেল ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি টিম এসে খোন্দকার ও তার সহযাত্রীদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

উপজেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব গাজী নিজাম উদ্দিন বলেন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের নেতা ও শেখ হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগী নিয়াজ মোর্শেদ এলিট নিজের গ্রামের বাড়িতে আত্মগোপনে ছিলেন এমন খবর ছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে।

শনিবার দুপুরে তাকে উদ্ধার করতে ওই বাড়িতে যান বিএনপির জেলা আহবায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার। এ খবর শুনে দীর্ঘ ১৫ বছর শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের শিকার বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে। পরে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম অবরুদ্ধ গোলাম আকবরকে উদ্ধার করতে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক নুরুল আমিনকে জানালে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে এবং নিরাপদে ফিরে যেতে সাহায্য করেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা মিরসরাই উপজেলা বিএনপির এক নেতা মানবজমিনকে বলেন, নিয়াজ মোর্শেদ এলিট দীর্ঘদিন ধরে যুবলীগের পদ ব্যবহার করে আমাদের নেতাকর্মীদের হয়রানি করেছে। সে ও মোশাররফ ( ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন) মিলে আমাদের জুলুম করেছিল। তাদের কারণে নেতাকর্মীরা বাড়িছাড়া হয়েছিল। এলিট যুবলীগের সাইনবোর্ড বিক্রি করে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। মূলত তার অবৈধ সম্পদের ঠিকাদারি করতেই খোন্দকার সাহেব তার বাসায় গোপনে বৈঠক করতে গিয়েছিল।

এ বিষয়ে বিএনপি’র চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও সাবেক এমপি গোলাম আকবর খোন্দকার মানবজমিনকে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে ইউসুফ সাহেব আমাকে তার বাসায় দাওয়াত দিচ্ছিলেন। আজকে ঢাকায় যাওয়ার সময় মিরসরাইয়ে আমাদের এক প্রয়াত নেতার কবর জেয়ারত করি। পরে মনিরুল ইসলাম ইউসুফ সাহেবের বাসায় যাই। সেখানে যাওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে নুরুল আমিন চেয়ারম্যান তার লোকজন দিয়ে আমাদেরকে হয়রানি করেছে। তিনি বলেন, মনিরুল ইসলাম ইউসুফ বিএনপি’র প্রবীণ নেতা। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে মিরসরাই আসন থেকে প্রাথমিকভাবে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছিলেন। পরে তার কাছ থেকে নিয়ে নুরুল আমিনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। তখন থেকেই হয়তো তাদের দু’জনের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। আমি জেলা বিএনপি’র আহবায়ক হিসেবে সবাইকে নিয়েই তো কাজ করতে হয়। আর ইউসুফ সাহেবের ছেলে এলিট যে যুবলীগের নেতা, সেটা আমার সেভাবে জানা ছিলো না।

বর্তমানের পথভ্রষ্ট সাংবাদিকতাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে একজন নাজিমুদ্দিন মোস্তানকে আজ বড়ই প্রয়োজন by হুমায়ুন কবির বুলবুল

জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন কিংবা রাজনৈতিক দলের বিশাল কোনো কর্মসূচি। সাংবাদিকদের বসার জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সকল মিডিয়ার সাংবাদিকরা রয়েছে সেখানে। কিন্তু সবচেয়ে বহুল প্রচারিত দৈনিক ইত্তেফাকের কোনো সাংবাদিক নেই প্রেস গ্যালারিতে!

আয়োজকরা প্রথমে কিছুটা বিস্মিতই হয়েছেন। এক পর্যায়ে দেখা গেল, সবার পেছনে চুপচাপ বসে মনোযোগ সহকারে নোট নিচ্ছেন একজন সাংবাদিক। পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকেই প্রকাশিত হলো সবচেয়ে তথ্যবহুল সংবাদ। আর এই কাজটির জন্য যার মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা কাজ করেছে, তিনিই হচ্ছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের কিংবদন্তি নাজিমুদ্দিন মোস্তান।
‘শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস’ সিরিজ রিপোর্টিংয়ের গাইড লাইন দিয়েছিলেন নাজিমুদ্দিন মোস্তান। ১৯৮৬-১৯৯২ পর্যন্ত আমি দৈনিক ইত্তেফাকের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ছিলাম। তখন বাংলাদেশে ছিল মাত্র ৫টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। স্বৈরশাসনের কালো থাবায় তখন সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছিল নিরবচ্ছিন্ন সন্ত্রাস।

এক পর্যায়ে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের ওপর সিরিজ রিপোর্টিং করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তৎকালীন বার্তা সম্পাদক গোলাম সারওয়ার অনুমোদনও দিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে আমার একটা গাইড লাইন দরকার ছিল। মোস্তান ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করলাম। তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বললেন। হাতের কাজ শেষ করে আমাকে নিয়ে বসলেন। দীর্ঘ আলাপচারিতায় দিলেন একটা চমৎকার গাইড লাইন। মোস্তান ভাইয়ের দিকনির্দেশনায় সম্পন্ন সেই সিরিজ রিপোর্ট ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। যেখানেই ইত্তেফাকের সার্কুলেশন কমে যেত, সেখানেই নাজিমুদ্দিন মোস্তান।
আশির দশকের শেষদিকে প্রকাশিত হয় দৈনিক ইনকিলাব। হঠাৎ করেই ইত্তেফাকের একটা প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়, যদিও সেটা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তারপর পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটা দৈনিক বাজারে আসে। তখন কোনো কোনো জেলায় ইত্তেফাকের সার্কুলেশন পড়ে যেতে থাকে। কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন, ঐ সব জেলা থেকে সরজমিন ধারাবাহিক রিপোর্ট করবেন নাজিমুদ্দিন মোস্তান। যেই কথা সেই কাজ। অন্তত মাসখানেকের জন্য ঐ জেলায় ঘাঁটি গাড়লেন নাজিমুদ্দিন মোস্তান। প্রতিদিন ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হতে থাকলো ব্যতিক্রমী সব রিপোর্ট। আর প্রতিদিনই বাড়তে থাকলো সার্কুলেশন। নাজিমুদ্দিন মোস্তানের উপস্থিতিতেই প্রচার সংখ্যায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেল ইত্তেফাক।

সাপ্তাহিক রাষ্ট্র: ছোট কাগজ কিন্তু ব্যাপ্তি বহুদূর: নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নাজিমুদ্দিন মোস্তানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক রাষ্ট্র। সচরাচর ৮ পৃষ্ঠার সাদাকালো কাগজই বেরুতো। তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন ছিল না। কিন্তু সাপ্তাহিক রাষ্ট্র এমন ব্যতিক্রমী ও তথ্যবহুল কাগজ ছিল যে, অল্পদিনের মধ্যে সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। সরকারের বিভিন্ন সংস্থায়ও সাপ্তাহিক রাষ্ট্র’র ছিল ব্যাপক কদর। সবাই উন্মুখ হয়ে থাকতো, হয়তো পরবর্তী সংখ্যায় আসছে ব্যতিক্রমী তথ্যসমৃদ্ধ বিশেষ কোনো রিপোর্ট। ছোট কাগজ কিন্তু তার ব্যাপ্তি ছিল বহুদূর।

সজ্জন, মৃদুভাষী ও নিরহঙ্কার মানুষ ছিলেন নাজিমুদ্দিন মোস্তান। তিনি এত বড় মাপের সাংবাদিক ছিলেন, কিন্তু সচরাচর নিজের পরিচয় দিতেন না। বিত্ত-বৈভবের দিকে নজর ছিল না তার কোনোদিন। খুব সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। বাংলাদেশের মিডিয়াকে তিনি যা দিয়ে গেছেন, তা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বর্তমানের পথভ্রষ্ট সাংবাদিকতাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য একজন নাজিমুদ্দিন মোস্তানকে আজ বড়ই প্রয়োজন।

[লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। দৈনিক ইত্তেফাক ও The New Nation পত্রিকার প্রাক্তন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার। অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার সাবেক সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য]