Sunday, January 5, 2014

কী ভাবছে নাগরিক সমাজ : সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক- একতরফা নির্বাচন এড়ানো যেত by সালমা খান

সংবিধানের মূল চেতনা হলো গণতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতি, যেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হচ্ছে, আজকের নির্বাচনে সেটি হচ্ছে না।
সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের কথা হলো, জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক। এই নির্বাচনে তাদের মালিকানা স্বীকার করা হচ্ছে না।

জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল, সবার অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। দুই পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে আমরা অনায়াসেই সেই নির্বাচন পেতে পারতাম। দুই দলের বিপরীতমুখী অবস্থান সত্ত্বেও আমি মনে করি, একটি সমঝোতায় পৌঁছানো অসম্ভব হতো না। সমঝোতা মানে এক পক্ষের কাছে অপর পক্ষের হার নয়। আলোচনার টেবিলে কিন্তু অনেকগুলো প্রস্তাব ছিল। সেগুলো নিয়ে বসলে একতরফা নির্বাচন এড়ানো যেত।
আন্দোলন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ। কিন্তু সরকার বিরোধী দলের সেই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে দিচ্ছে না। প্রশ্ন উঠেছে, বিরোধী দলের নেতার অবস্থান কী? সরকার বলছে, তিনি গৃহবন্দী নন। কিন্তু তাঁর বাড়ির সামনে যে পুলিশবেষ্টনী দিয়ে রাখা হয়েছে, তাঁকে ঘর থেকেও বের হতে দেওয়া হচ্ছে না।
জামায়াতে ইসলামী নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অনেক কথা বলেন। তাঁরা এদের সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করেন। আমরা দেখে এসেছি, জামায়াতকে সব দলই তাদের রাজনৈতিক দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যবহার করে এসেছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীকে মতামত শুনতে হয়। কিন্তু আমাদের বোঝানো হয়, একটি দল ও গোষ্ঠীই দেশকে ভালোবাসে।
দেশে যখন একটি আতঙ্কগ্রস্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তখন কীভাবে নির্বাচন হবে? অনেকে স্বেচ্ছায় ভোট দিতে যাবেন না, অনেকে ভয়ে যাবেন না। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী আস্থাহীনতায় আছে। তারা বুঝতে পারছে না, কার কাছে নিরাপত্তা চাইবে?
তবে আমি মনে করি, এ সংকট সাময়িক। আমাদের দেশের মানুষ অনেক বেশি সৃজনশীল ও সচেতন। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার দৃঢ়বিশ্বাস আছে। এই সাধারণ মানুষই সমাধানের একটি পথ বের করে আনবে।
বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূলে যে একনায়কত্ববাদী ব্যবস্থা, তারও অবসান হবে। কিন্তু সেটি বাইরের কেউ করবে না, দলের ভেতর থেকেই নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে।
সালমা খান: নারীনেত্রী।

কী ভাবছে নাগরিক সমাজ : সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক- দেশ বিপাকে পড়েছে by রাশেদা কে চৌধূরী

কোনো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের তিনটি শর্ত। তা হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য। বর্তমান নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে প্রশ্ন আছে।
অতএব আমরা হতাশ। দ্বিতীয় হলো, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ১৫৩ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় ভোটারদের অধিকাংশই বঞ্চিত। এতে করে তাঁদের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আস্থার অভাব দেখা যাচ্ছে। এঁদের সংখ্যা কম নয়। এবার কয়েক লাখ নতুন ভোটার তাঁদের জীবনের প্রথম ভোট দিতে পারলেন না। তৃতীয় হলো, একতরফা নির্বাচন যতবার হয়েছে, ততবারই ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে নির্বাচন এ দেশে হয় উৎসবমুখর পরিবেশে। গত নির্বাচনেও ভোটারদের উপস্থিতিতে, বিশেষ করে নারী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। এবারের পরিবেশের প্রধান চরিত্র হলো আতঙ্ক।

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রাখায় শান্তি আসবে না। তারাও দেশবাসীকে শান্তি দেবে না। তাদেরও প্রশ্ন আছে, দাবি আছে। যখন প্রধান দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের অনাস্থা, সংঘাত ও সহিংসতা চলে, পারস্পরিক বিদ্বেষ প্রধান হয়ে ওঠে, তখন প্রতিক্রিয়াশীল চক্র রাজনীতির স্থান দখল করে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের আতিপাতি সব সন্ত্রাসীই এখন মাঠে। এটাই সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার। এই রাজনীতি আমাদের কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে আতঙ্কিত আছি।
দুঃখজনক যে ‘না’ ভোটের বিধানটাই উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক মানুষ আছে বাংলাদেশে, যাঁরা এই সুযোগ থাকলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাঁদের অনাস্থা প্রকাশ করতে পারেন। এই প্রক্রিয়া আমার পছন্দ না, এই প্রার্থী আমার পছন্দ না, এখন সেটা জানানোরও সুযোগ নেই। জনগণ দুই রাজনৈতিক দলের বিবাদের মধ্যে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে গেছে। রাজনীতিবিদদের মনে রাখা দরকার, জনগণ সুযোগ পেলেই কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ীকেও এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনতে পারে।
আমরা নিশ্চিতভাবেই বিপাকে ও বিপর্যয়ে পড়েছি। প্রধান দুই জোটের দ্বারাই এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান কোনো জোট যারা দেশে তিনবার নির্বাচিত হয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে নির্বাচন পরিচালনায় জনগণের মধ্যে দ্বিধা ও অনীহা চলে আসে। রাজনীতিবিদেরা কেন সমঝোতায় আসবেন না, তা বুঝতে পারছি না। যদি দলের চেয়ে দেশ বড় হয়, তাহলে সমঝোতা না হওয়ার কোনো কারণ নেই। তার জন্য ছাড় দুই পক্ষকেই দিতে হবে। সময় চলে গেছে, কিন্তু অপশক্তির হাতে দেশ চলে যাওয়ার আগেই তাদের উচিত সাড়া দেওয়া।
রাশেদা কে চৌধূরী: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।

কী ভাবছে নাগরিক সমাজ : সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক- এ নির্বাচন বৈধতা পাবে না by হোসেন জিল্লুর রহমান

আজ যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে তা শুধু প্রশ্নবিদ্ধ নয়, আমার বিবেচনায় তিনটি কারণে বৈধতাই হারিয়েছে। প্রথমত, এই নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার হারিয়েছে।

গণতন্ত্রের যুদ্ধে বাংলাদেশ হারতে পারে না by রিয়াজউদ্দিন আহমেদ

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচন আজ। বিরোধী কোন দলই অংশ নিচ্ছে না এ নির্বাচনে। এরই মধ্যে বেসরকারিভাবে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

স্যামসন এইচ চৌধুরী :আমাদের আলোকবর্তিকা by জামান সরদার

বাংলাদেশের কিংবদন্তি উদ্যোক্তা স্যামসন এইচ চৌধুরী দুই বছর আগে এই দিনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বটে, তার জীবন ও কীর্তি আমাদের মাঝে দেদীপ্যমান। প্রচারের আলো এড়িয়ে তিনি যদিও সারাজীবন হাজারো মানুষের জীবন আলোকিত করতে চেয়েছেন, মৃত্যুর পরও তার জ্বালিয়ে রাখা আলো অবিনাশী বাতিঘরের মতো আমাদের পথ দেখায়। অন্ধকারে পথ চেনায়, আলোকিত করে। বস্তুত আলো ও অন্ধকারের দ্বন্দ্ব কেবল প্রকৃতিতে নয়, সমাজেও বিদ্যমান। রাতের অন্ধকার তাড়িয়ে শাশ্বত সূর্য যেভাবে ধরাধাম আলোকিত করে; সেভাবে সমাজেও কিছু মানুষ থাকেন, যারা আলোর পথযাত্রী। যারা নিজের মেধা, শ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে সমাজের অন্ধকার দূর করেন। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যুগে যুগে যেমন অন্ধকারের প্রতিনিধিরা আমাদের ঢেকে দিতে চেয়েছে, পেছনে টেনে ধরতে চেয়েছে; তেমনই কিছু মানুষ তাদের জীবন ও কর্ম দিয়ে আলো জ্বালাতে চেয়েছেন। কখনও কখনও নিজেই হয়ে উঠেছেন আলোকবর্তিকা। স্যামসন এইচ চৌধুরী তাদেরই একজন। তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে পুুণ্য স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। নতুন প্রজন্মের কাছে তার জীবনী রূপকথার মতোই মনে হবে। আমরা জানি, স্যামসন এইচ চৌধুরী ১৯২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এখনকার গোপালগঞ্জ জেলার অরুয়াকান্দিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইয়াকুব হোসাইন চৌধুরী, মায়ের নাম লতিকা চৌধুরী। ১৯৩০ সালে চাঁদপুরের মিশন স্কুলে তার শিক্ষাজীবন সূচিত হয়। পিতা সেখানে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৩২ সালে পিতা বদলি হলে পাবনার আতাইকুলায় একটি গ্রামের স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। পরে ভালো পড়াশোনার জন্য পিতা তাকে পাঠিয়ে দেন ময়মনসিংহের ভিক্টোরিয়া মিশন স্কুলে। সেখানে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ার পর পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুরে শিক্ষা সংঘ হাইস্কুলে গিয়ে ভর্তি হন ১৯৩৫ সালে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৪২ সালে ফিরে আসেন পাবনায়। সেখানকার আতাইকুলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ১৯৪৩ সালে। সে বছরই পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ইন্ডিয়ান রয়েল নেভিতে যোগ দেন। তবে সেখানে বেশি দিন চাকরি করতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে ডাক বিভাগে যোগ দেন এবং ওই বছরই বিয়ে করেন অনিতা চৌধুরীকে।
এর পরই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সরকারি চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন। তবে সেটা শুরু করেছিলেন খুব স্বল্প পরিসরে। ১৯৫২ সালে বাবার প্রতিষ্ঠিত 'হোসেন ফার্মেসী' দেখভাল শুরু করেন প্রথমে। বাবার পেশার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই ওষুধ নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন। বড় হয়ে ওষুধশিল্পে মনোনিবেশ এবং ক্রমে মহীরুহ হয়ে ওঠার বীজ হয়তো সেকালেই বোনা হয়েছিল। কয়েক বছর পর, ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ধীরেন দত্তের কাছে গেলেন উদ্যমী যুবক স্যামসন এইচ চৌধুরী। ওষুধ কারখানা স্থাপনের একটা লাইসেন্স চাই। পেলেনও। তিন বন্ধুর সঙ্গে যুক্তভাবে প্রত্যেকে ২০ হাজার টাকা করে মোট ৮০ হাজার টাকায় পাবনায় কারখানা স্থাপন করলেন। নাম স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। চারজন অংশীদারের সমান মালিকানা আর প্রচেষ্টায় চলবে এ শিল্প_ এ প্রেরণা থেকেই এমন নাম। স্কয়ারের নামকরণ প্রসঙ্গে স্যামসন এইচ চৌধুরী একবার একটি দৈনিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'এটি চার বন্ধুর প্রতিষ্ঠান। তা ছাড়া আমাদের চার হাত সমান। এর লোগোও তাই বর্গাকৃতির।'
এখন সবাই জানে, ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির লোকজনের কাছে তিনি আইকন। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসকে তিনি এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে স্কয়ার পণ্য শুধু দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিদেশে রফতানির তালিকায়ও শীর্ষে উঠে এসেছে। ১৯৫৬ সালের সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ বিশাল একটি গ্রুপে পরিণত হয়েছে। ২৭ হাজার কর্মীর এই বিশাল পরিবারের বার্ষিক আয় ৩০ কোটি ডলার। 'স্কয়ার' শুধু ওষুধেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়েছে প্রসাধন সামগ্রী, টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এমনকি মিডিয়াতেও।
শুরুটা ছিল অন্য আট-দশটা শিল্প প্রতিষ্ঠানের মতোই সাধারণ। তবে প্রত্যয় আর দায়বদ্ধতার দিক থেকে স্বতন্ত্র। সে জন্যই পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে শুধু এগিয়ে চলা। ওষুধ থেকে শুরু। তারপর টেক্সটাইল, টয়লেট্রিজ, কনজুমার প্রডাক্টস, স্বাস্থ্যসেবা, মিডিয়া, এমনকি বাড়ির রান্নাঘরেও সগৌরব উপস্থিতি স্কয়ারের। ব্যবসা মানেই মুনাফা_ এ চেনাপথ ধরেই কি এ সাফল্য? নাকি আরও কিছু? 'আমার কাছে কোয়ালিটিই সবার আগে। সব পর্যায়েই আমরা কোয়ালিটি নিশ্চিত করি'_ ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন স্যামসন চৌধুরী।
কেবল কোম্পানি বা পণ্যের কোয়ালিটি নয়; বস্তুত উদ্যোক্তাদেরই একটি স্ট্যান্ডার্ড সেট করে গেছেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। অনেকেই তাকে চেনেন 'ব্যবসার জাদুকর' হিসেবে। যে ব্যবসাতেই তিনি হাত দিয়েছেন, সেই ব্যবসাতেই সোনা ফলেছে। তিনি হার মানেননি কোনো চ্যালেঞ্জের কাছেই। সবাই জানেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা হিসেবে স্যামসন এইচ চৌধুরী হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন; রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন করে বিশ্বে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তার এই সাফল্যও কম নয় যে, তিনি একটি জাতিকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন। প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর দেশের ওষুধ খাত তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ তো বটেই, অন্যতম প্রধান রফতানি খাতে পরিণত হয়েছে। গুণগত মান যদি বজায় রাখা যায়, তাহলে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে উৎপন্ন হয়েও যে বিশ্ববাজারে বাঘা বাঘা কোম্পানির সঙ্গে টেক্কা দিয়ে চলতে পারে_ সেই নজির আমাদের সামনে রেখে গেছেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে, তিনি দেখিয়েছেন সাধারণ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কীভাবে অসাধারণ হয়ে ওঠা যায়। অসাধারণ এই মানুষের জীবন ও কর্ম আমাদের পথের দিশা হোক। আলো ছড়াতে থাকুক অন্ধকারের প্রতিপক্ষ হিসেবে।
সাংবাদিক

পরবর্তী নির্বাচন কবে হবে? by সাবির মুস্তাফা

ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যেই বাংলাদেশে আজ রোববার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্বভাবতই বিরোধী দলের বর্জনের কারণে নির্বাচনে উৎসবমুখর অবস্থা দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বলেছে, তাদের দাবিকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না বলে তারা এতে অংশ নিচ্ছে না। সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে একজন করে প্রার্থী থাকার কারণে ওই আসনগুলো বাদ দিয়ে ১৪৭ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ধরনের নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠার সম্ভবনা না থাকায় ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ কম দেখা যায়। নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির ব্যবহার বাইরের লোকদের কাছে রহস্যময় ঠেকলেও বাংলাদেশে অতীতের কয়েকটি নির্বাচন এ পদ্ধতির অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগ সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ২০১১ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে রহিত করে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে কার্যত তাদের সরকারই তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে কাজ করছে। বিএনপি বলেছে, ভোট কারচুপি করতে পারবে না বলে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বাতিল করে দিয়েছে।
এ দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে অব্যাহত রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করার জন্য পশ্চিমা কূটনীতিকরা কয়েকবার চেষ্টা চালান। উভয়পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনার জন্য গত মাসে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি ঢাকা আসেন। উভয়পক্ষ আলোচনায় মিলিত হলে অচলাবস্থা কাটতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু তার প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
সরকার জোর দিচ্ছিল বিএনপি যাতে বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যেই নির্বাচনে অংশ নেয়। কোনো পরিবর্তন আনতে হলে নির্বাচনের পরেই তা করা যেতে পারে বলেও তারা মত ব্যক্ত করে।
জামায়াতে ইসলামীসহ জোট মিত্রদের নিয়ে বিএনপি সহিংস হরতাল এবং সড়কপথ, রেলপথ অবরোধের পথ নেয়। সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহে সহিংসতায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। বিরোধী দলের কিছু সমর্থক পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন এবং হরতাল-অবরোধের মধ্যে চলাচলকারী বাসে বিরোধীদের ছোড়া পেট্রোল বোমায় সাধারণ যাত্রীদের অগি্নদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বিরাজমান অস্থিতিশীলতার কারণে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অনেকে আশঙ্কা করেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে এবং অর্থনীতি ধসে পড়ার মতো পরিস্থিতি হলে সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করবে। নির্বাচন প্রতিহত করতেই বিরোধীরা যানবাহনের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ।
এদিকে কেউ কেউ এটাও মনে করছেন যে, নবনির্বাচিত সরকারের প্রতি বিরোধিতা উৎপাটিত করার জন্য আওয়ামী লীগ দেশে জরুরি আইন জারি করতে পারে।
তবে নির্বাচনটি আর যাই হোক সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছাড়া এখানে ব্যাপক জনগণের মতামত প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ কিন্তু নেই। এরপরও আওয়ামী লীগ নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করতে পারে। তারা সাংবিধানিকভাবে কর্তব্য কর্ম করলেও এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জনমত জরিপে সবার অংশগ্রহণমূলক সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের আভাস দেওয়া হচ্ছিল। আওয়ামী লীগকে তাদের পদক্ষেপ গণতন্ত্রকে কতটা এগিয়ে নেবে সেটা এই আলোকেই বিচার করতে হবে।
এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন তলানিতে, তেমনি ভোটাররাও এতে নিজেদের প্রতারিত ভাবতে পারেন।
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ভারত সম্ভবত একটি ফর্মুলা উদ্ভাবন করার জন্য বিরোধী দলের সঙ্গে সিরিয়াস আলোচনার জন্য শেখ হাসিনার ওপর চাপ দিতে পারে। এসব আলোচনার মাধ্যমে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম হতে পারে। তবে ওই নির্বাচন নিয়ম অনুযায়ী ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও এর অনেক আগেই তা অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কত আগে তা হবে সে ব্যাপারেও রয়েছে প্রশ্ন।
অনেকে মনে করেন, এখন থেকে ৬ মাসের মধ্যে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে নির্বাচনের পর সরকার জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে তেমন একটা কানাঘুষাও রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের হয়তো ভিন্ন নিজস্ব ধারণাও থাকতে পারে। তারা এক বছর বা তারও কম সময় ক্ষমতায় থাকার কথা চিন্তা করতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা আরও সহিংসতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অবলোকন করতে পারি।
গত কয়েক বছর থেকেই এই জামায়াতে ইসলামী তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য অব্যাহতভাবে সহিংস কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। প্রকাশ্যেই তারা পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। এমনকি হত্যাও করছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য এর শীর্ষ নেতাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হয়েছে এবং গত মাসে একজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াত সমর্থকরা মনে করছে, ভারতের সমর্থনে তাদের সমূলে ধ্বংস করে দেবে আওয়ামী লীগ।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ মনে করছে, বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে এলে জামায়াত তাদের ওপর প্রতিশোধ নেবে। যুদ্ধাপরাধ আদালত বিলুপ্ত করবে এবং এই আদালতের রায়কে বাতিল করবে। সে কারণে আওয়ামী লীগ নেতারা এখন বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করা এবং যুদ্ধাপরাধ আদালতের বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
তাই আগামীতে বিএনপি জামায়াতকে জোট সঙ্গী হিসেবে রাখবে কি রাখবে না তার ওপর আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার নির্বাচন নিয়ে ভবিষ্যৎ যে কোনো আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করবে।
বিবিসি থেকে ভাষান্তরিত
বিবিসি বাংলা সম্পাদক

দ্রুতই একটি স্বাভাবিক নির্বাচন হতে হবে by শান্তনু মজুমদার

(দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন) আজ ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন। আজ দশম জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য জনসাধারণ ভোট প্রদান করবেন, এমনটিই নির্ধারিত। তবে যেভাবে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাতে আমরা মোটেই আনন্দিত বা আহ্লাদিত নই। হওয়ার কথাও নয়। কারণ এটা কোনো স্বাভাবিক নির্বাচন নয়। প্রধান দুটি পক্ষের একটি এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আরেকটি বর্জন করছে। শেষোক্তদের আহ্বান কেবল বর্জন নয়, প্রতিহত করারও। কেন দেশ আজকের অবস্থায় পেঁৗছাল তা নিয়ে নানা আলোচনা আছে; মতের ভিন্নতা আছে। কারও কারও মতে, নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি কী হবে তা নিয়ে দ্বন্দ্বের পরিণতিতেই আমরা আজকের অবস্থায় এসে ঠেকেছি। কথাটি আংশিক সত্য। ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রদ হয়। বিএনপি ও তার মিত্ররা চেয়েছে এ ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে। এজন্য তারা আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। প্রথম দিকের কর্মসূচিগুলো ছিল কমবেশি শান্তিপূর্ণ। সরকার বাধা দিয়েছে তবে তা মাত্রা ছাড়ায়নি। কোনো পক্ষ পুরোপুরি অনমনীয় অবস্থানে পেঁৗছে গেছে বা সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব হবে না এমনটা কিন্তু একবারও মনে হয়নি ২০১২ সালের শেষ পর্যন্তও। কিন্তু ২০১৩ সালের শুরুর দিকে, ১৯৭১-এ যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের রায় আসার সময় থেকেই পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিতে শুরু করে। আন্দোলনে যুক্ত হয় নাশকতা; শহর ছাড়িয়ে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া হয় গ্রামাঞ্চলেও। কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নয়, জাতিগত ও ধর্মগত সংখ্যালঘুরা সহিংসতার শিকার হয় ব্যাপকভাবে। জাতিগত ও ধর্মগত সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলা চলে দেশজুড়ে। অতীতেও হামলা হয়েছে। কিন্তু এবার ব্যাপারটা ঘটেছে অনেকটা একযোগে এবং দেশজুড়ে। এটা খুবই স্পষ্ট ছিল যে নির্বাচনকালে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে এসব হিংস্রতা সংঘটিত হয়নি। বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা তুমুল আন্দোলনের পাল্টা জবাব হিসেবেই দেশজুড়ে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। তবে নির্বাচনের ব্যাপারটা একেবারেই বিবেচনায় রাখেনি হামলাকারীরা, তা বলা যাবে না। জাতিগত ও ধর্মগত সংখ্যালঘুদের ওপর টানা হামলার মধ্যে ভোটের মানচিত্রে পরিবর্তন নিয়ে আসার একটা চেষ্টা ছিল বৈকি।
আজ যে নির্বাচন হচ্ছে সেটা দেশে বা বিদেশে অংশগ্রহণমূলক হিসেবে বিবেচিত হবে না_ এ নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। আমি যতটা বুঝি এ ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় যারা থাকে তাদের ওপর দায়ভার বেশি চাপে; তাই স্বাভাবিক। বিরোধী দল হিংসা-হানাহানি করছে, সংবিধান সমুন্নত রাখার প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে না এমন কথাবার্তা বলে সরকারপক্ষ পার পাবে না। যে ধরনের নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি পুনর্বহালের দাবি নিয়ে বিরোধীরা এখন মাঠে, এক সময়ে তারা নিজেরাই এরকম দাবিতে সক্রিয় ছিল এবং তারা এটা আদায়ও করে নিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে, তখন যৌক্তিক হলে এখন অযৌক্তিক কেন? সে সময় প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি বলে একটা যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বটে কিন্তু সেটা নিতান্ত দুর্বল। আসলে কবুল করতে হবে যে 'আদি পাপ' ১৯৯০ সালেই হয়েছিল দ্বিতীয় সামরিক শাসকের হাত থেকে ক্ষমতা নেওয়ার যুক্তিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯৬ সালে সংবিধানে ঢুকিয়ে 'পাপের মাত্রা' বাড়ানো হয়। ২০১৩ সালে এসে আমরা দেখলাম 'পাপ বাপকেও ছাড়ছে না' এবং নির্বাচনকালে অনির্বাচিত সরকারের দাবি সংসদীয় গণতন্ত্রের টিকে থাকার সম্ভাবনা ধরেই টান দিয়েছে।
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। উদ্বেগ দেখা দেওয়াটা স্বাভাবিক। আফটার অল এটা একবিংশ শতাব্দী। এতে বরং বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে কথা হচ্ছে এই যে উদ্বেগ প্রদর্শন কিংবা শুভেচ্ছা জারি রাখা পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু নিদান বাতলে দেওয়া কিংবা নিদানে বাধ্য করার মতো ব্যাপার যাতে না আসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। খেয়াল রাখা হচ্ছে কি? আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উদ্যোগ এবং জাতিসংঘের উদ্যোগের মধ্যে একটা পার্থক্য চিহ্নিত করে রাখা দরকার। বলতে চাইছি এই যে, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের চেয়ে, সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জাতিসংঘের এগিয়ে আসাটা তুলনামূলকভাবে ভালো; সম্মানজনক। অবশ্য জাতিসংঘ প্রতি সেকেন্ডে সাম্রাজ্যবাদের বাঁধা-এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে, এমন ধরে নিলে বলার কিছু নেই।
বাংলাদেশ নিয়ে বছরখানেক ধরে কিছু-কিছু বিদেশি মিডিয়ার কথাবার্তা-লেখালেখিতে তৃতীয় বিশ্বের সব দেশকেই একই ছাঁদে ফেলে মাপামাপি করার প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সব দেশকেই একই ছাঁদে ফেলে মাপামাপি করার রোগটা দেখতে পাচ্ছি। এটা 'আমরা তোমাদের ব্যাপারে সব কিছু বুঝে বসে আছি' জাতীয় একটি মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ মনে হয়। কিংবা এটা পরিস্থিতি বুঝতে পারার ক্ষেত্রে আলস্য কিংবা উদাসীনতাও হতে পারে। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে কিছু কিছু বিদেশি মিডিয়ার অবস্থান এ ধরনের ধারণা তৈরি করছে। কেউ কেউ চক্রান্তের কথা বলেন। তেমন কিছু জানি না বলে সেদিকে যাচ্ছি না।
ফিরে আসি নির্বাচনের কথায়। আজকের নির্বাচনটি স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য হবে না। একটি স্বাভাবিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে দ্রুত। যত দ্রুত এটা করা যাবে, ততই মঙ্গল।
শান্তনু মজুমদার :শিক্ষক; রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনুলিখন

নির্বাচনী তামাশার গ্র্যান্ড শো আজ by ইনাম আহমেদ চৌধুরী

(দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন) বাংলাদেশ থেকে সুবচন নির্বাসনে রয়েছে বহুদিন। সাম্প্রতিককালে অবশ্য আমরা দেখছি সেই অনুপস্থিতির তীক্ষষ্টতম উচ্চারণ। আর আজ বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচন যাচ্ছে নির্বাসনে। আজকের আয়োজন নিয়ে ক্ষমতাসীন পক্ষ নানা কথা বলছে বটে, সবই অসার ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিংবা যে অবস্থা থেকে আমরা তাকিয়ে দেখি না কেন, কিছুতেই মনকে প্রবোধ দিয়ে বলতে পারি না আজ আমার প্রিয় স্বাধীন মাতৃভূমি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে।
আজকের দিনে বিস্তারিত সংখ্যাতত্ত্বে যেতে চাচ্ছি না। সংবাদপত্রের কলামে, টেলিভিশনের টক শোয় এসব অনেকবারই বলা হয়ে গেছে। সাধারণ নাগরিকরাও এখন এসব জানে। সবাই জানে কীভাবে সংসদের অধিকাংশ আসনে 'অটো এমপিরা' একজন ভোটারের সমর্থন ছাড়াই 'নির্বাচিত' হয়ে গেছেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যে কোনো রাজনৈতিক দল, গণতন্ত্রমনা পক্ষ হতাশ ছাড়া কিছু হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন পক্ষ এ নিয়েও খোঁড়া যুক্তি খাড়া করছে, চোখ-কান বুজে এটাকে 'সাফল্য' হিসেবে প্রচার করছে। কৌতুককর হলেও ইতিমধ্যে 'সরকার' গঠনের মতো 'সংখ্যাগরিষ্ঠতা' নিয়ে নিয়েছে ক্ষমতাসীন জোট। আর বাকি আসনগুলোয় আজ যে অবস্থায় যে পরিস্থিতিতে এবং যে পরিবেশে ভোট প্রদান ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তা সংক্ষেপে দেখতে গেলে নিম্নরূপ_
প্রথমত, কোনো আসনেই সত্যিকার অর্থে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। কেননা, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দল অংশগ্রহণ করছে না। বস্তুতপক্ষে সার্বিকভাবে বিরোধী দলগুলো যে এভাবে নির্বাচন বর্জন করবে, তা আগে কখনও ভাবাই যায়নি। যারা অংশগ্রহণ করেছে, তারাও প্রচার-প্রচারণা নিয়ে গা করছে না। বরং অনেক এলাকায় দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী স্বতন্ত্র কিংবা নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের মনোভাব এমনই যে যদি সম্ভব হয়, ৩০০ আসনেই তারা 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়' ওয়াকওভার পেতে যায়। ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার ব্যাপারও নয়; তারা যেন চায় কোনো গোলপোস্টই না থাকুক। এমনকি মাঠের সীমানা না থাকলে আরও ভালো। যেদিকে খুশি বল মারবে!
দ্বিতীয়ত, প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকা সম্পূর্ণভাবে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিরক্ষা বাহিনী কর্তৃক 'নিয়ন্ত্রিত'। আমাদের দেশে নির্বাচন যেখানে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে, সেখানে এবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আতঙ্কের রাজত্ব। বিরোধীদলীয় জোটের বা জনসাধারণের আন্দোলনের তীব্রতার কারণে না যতখানি, তার চেয়ে অনেক বেশি খোদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বাড়াবাড়ি। প্রকাশ্যই তারা বিভিন্ন স্থানে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বাড়িতে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করছে। বিরোধী দল অংশগ্রহণ করছে না, এটা ঠিক; কিন্তু এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো গণতান্ত্রিক বিরোধিতা দেখানোর কোনো সুযোগ খোদ সরকারই অবশিষ্ট রাখেনি। এ এক অভূতপূর্ব 'নির্বাচন'।
তৃতীয়ত, কোনো সন্দেহ নেই যে, যদিও দেশের অধিকাংশ ভোটার আজকে ভোট দেওয়ার অবকাশই পাচ্ছেন না, যারা পাচ্ছেন তারাও নিজস্ব কর্তব্য পালনের নৈতিকতা সম্পর্কে সন্দিহান। বিষয়টি নিছক আতঙ্কের নয়। ভোটাররা কেন এ ধরনের একটি নির্বাচনে ভোট দিতে যাবে? নূ্যনতম নৈতিকতা থাকলে কেউ কি এমন তামাশার অংশ হতে পারে?
পঞ্চমত, বিরোধী দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীই কারারুদ্ধ, অবরুদ্ধ বা হুলিয়াপ্রাপ্ত। আর বিরোধীদলীয় নেতা পর্যন্ত গৃহ-অবরুদ্ধ। তার বেরুবার কোনো সুযোগ নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন 'বাংকার সুরক্ষার' যেসব ব্যবস্থা আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখেছি, সে জাতীয় বালুবাহিত ট্রাক, জলকামান এবং বিভিন্ন প্রকারের (যার নাম দুর্ভাগ্যবশত আমার জানা নেই) মারণাস্ত্রসজ্জিত সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চকিত উপস্থিতি আজ তার বাড়ির সামনে। একই অবস্থান প্রধান বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও। দেশের অন্যান্য এলাকাতেও বিরোধীদলীয় কার্যালয়ের একই অবস্থা। তথাকথিত এই সাধারণ নির্বাচনে কোনো বিরোধী দলকেই কোনো সভা-সমিতি করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি সরকারের জোটভুক্ত যে জাতীয় পার্টি ছিল, তাদেরও একটি অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে দেওয়া হলো!
ষষ্ঠত, সবাই যখন উপলব্ধি করতে পারছে, তথাকথিত নির্বাচনের কোনো যৌক্তিকতা কিংবা স্বীকৃতি থাকছে না, সেখানে এত অর্থ, লোকবলের অপচয় করে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থাকে জিইয়ে রাখার মানেটাই বা কি হচ্ছে? এর সদুত্তর কি সরকার দেবে? মাননীয় অর্থমন্ত্রীসহ অনেক মন্ত্রীই তো অত্যাসন্ন আরেকটি নির্বাচনের কথা ভাবছেন। তারা হয়তো বুঝতে পেরেছেন সম্পূর্ণ নিরর্থক হচ্ছে এই প্রাণান্তর চেষ্টা। সেই উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করেই কি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হতো না?
আমার কথা পরিষ্কার। এ ধরনের একটি নিরুত্তাপ, নির্বাক, নিশ্চুপ নির্বাচন অনুষ্ঠানকে কি কোনো সংজ্ঞাতেই গণতান্ত্রিক সাধারণ নির্বাচন আখ্যায়িত করা যেতে পারে? মনে হচ্ছে, দেশে একটি কারফিউ অবস্থান বিদ্যমান। আশ্চর্যের কথা, দেশে যেসব নির্বাচনবিরোধী কাণ্ডকারখানা ঘটছে, তা যে কোনো সুনিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় নির্দেশে হচ্ছে, তা নয়। কোনো নেতার সঙ্গে অন্য নেতাকর্মীর যোগাযোগ নেই, বৈঠক নেই, আলোচনা নেই, সংবাদ সরবরাহ নেই। যা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ স্বতঃপ্রণোদিত। যে যেভাবে চাচ্ছে কিংবা পাচ্ছে, তার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। দুঃখের বিষয়, তা কখনও সাংঘর্ষিক রক্তক্ষয়ী বা সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক পরিবেশ বজায় রাখা হলে এসব নিশ্চয়ই হতো না।
বিশ্বের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এবং সংবাদমাধ্যমে আজ প্রকাশ পেয়েছে, অবরুদ্ধ বাংলাদেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রচেষ্টা চলছে, যাকে ইকোনমিস্ট আখ্যায়িত করেছে 'ফারসিক্যাল' অর্থাৎ প্রহসনের নির্বাচন হিসেবে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে, সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা জিম্মি করে, কয়েকশ' প্রাণের বিনিময়ে বর্তমান সরকার যে তামাশার আয়োজন করেছে, আজ তার স্টেজ শো। এর আগে অবশ্য এই বিশ্বখ্যাত পত্রিকা লিখেছিল, মনে হচ্ছে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে আর পরাজয় ঘটবে বাংলাদেশের। আজ বাংলাদেশের সেই পরাজয়ের দিন সমাগত। লক্ষণীয় যে, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, চীন এমনকি সরকার কর্তৃক বিশেষভাবে অনুরুদ্ধ রাশিয়াও কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। তাদের প্রশ্ন, কিসের পর্যবেক্ষক? কোথায় নির্বাচন? কী দেখতে আসব? নিরপেক্ষ দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোরও এই বক্তব্য। জানি না, সদাশয় সরকার এ অবস্থা দেখে এবং পর্যালোচনা করে কী সিদ্ধান্ত নেবে। বা কোনো প্রকারের সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করবে কি-না। তাদের কাছে একটিই অনুরোধ থাকবে। যখন তারা এ সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন যেন তারা মনে রাখেন, বাংলাদেশের দুর্দশাগ্রস্ত ১৬ কোটি মানুষের ভাগ্যের কথা। তাদের জীবন-সংগ্রামের কথা। গণতন্ত্র এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি তাদের আসক্তি ও নিষ্ঠার কথা এবং স্মরণ করেন সেই ৩০ লাখ শহীদের কথা, নিগৃহীত ও সংগ্রামী মানুষের কথা। যারা তাদের সর্বস্ব ত্যাগ করেও একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ন্যায় বিচার থাকবে, গণতন্ত্র থাকবে, মানুষের বাঁচার অধিকার থাকবে। আর অধিকার থাকবে নিজের ভোট প্রয়োগ করে পছন্দমতো গঠিত সরকার দিয়ে শাসিত হওয়ার।
হায়! স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার দাবিদার একটি দলের নেতৃত্বেই আজ মুক্তিযুদ্ধের মূল যে চেতনা, সেই গণতন্ত্র, সেই মতপ্রকাশের অধিকার, সেই নিজের পছন্দমতো প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে! ক্ষমতাসীন পক্ষ স্বীকার করুক বা না করুক_ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের ইতিহাসে আরেকটি কালো দিন যোগ হতে চলছে আজ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরও আত্মহত্যার দিন।
ইনাম আহমেদ চৌধুরী :সাবেক সচিব ও কলাম লেখক; বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অনুলিখন

নির্বাচন ঠেকাতে না পারলে নৌকার বিরুদ্ধে ভোট by নোমান আবদুল্লাহ/আনোয়ার রোজেন, চট্টগ্রাম ব্যুরো

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জনের আহ্বান করলেও চট্টগ্রামে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে বিএনপিরই একটি অংশ! আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলতে এ অংশটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বীদের জিতিয়ে আনার মিশনে থাকবে। ভোটের দিন নির্বাচন ঠেকানোই তাদের প্রধান টার্গেট হলেও এ মিশন ব্যর্থ হলে নৌকা ঠেকানোর মিশনে নামবে তারা। এ লক্ষ্যে বিএনপির একটি অংশকে 'রিজার্ভ ভোটার' হিসেবে রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও নির্বাচন নিয়ে নেতাকর্মীদের সর্বশেষ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
বিএনপি ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন বর্জনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে শনিবার দফায় দফায় বৈঠক করেছেন বিএনপি এবং জামায়াতের শীর্ষ নেতারা। বৈঠকে তারা দুই স্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। প্রথমত, ভোটাররা যাতে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারেন সেজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। এ চেষ্টা ব্যর্থ হলে 'নৌকা ঠেকাও' পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ শুরু করে দিয়েছেন অনেক বিএনপি নেতাকর্মী। ভোটের দিনও বিএনপি নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বীকে জেতানোর টার্গেটে মাঠে থাকবেন।
চট্টগ্রাম মহানগরের দুটি আসনে আওয়ামী লীগের বিজয় ঠেকানোর 'দায়িত্বে' রয়েছেন মহানগর বিএনপির এক সহসভাপতি। ইতিমধ্যে ভোটারদের একটি গ্রুপকে 'রিজার্ভ' হিসেবে রাখা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ঠেকাতে না পারলে রিজার্ভ ভোটারদের কাজে লাগানো হবে নৌকার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য।
বিএনপির এ কৌশলের কথা স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম-৯ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী আবু হানিফ। তিনি বলেন, 'বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তাদের ভোট আমার পক্ষে আসবে বলে তারা আমাকে নিশ্চয়তা দিয়েছেন।' একই কথা জানান, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী তপন চক্রবর্তী। তিনি সমকালকে বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা সহযোগিতা করছেন। নির্বাচনী প্রচারণা ছাড়াও তাদের 'রিজার্ভ' ভোটও আমার বাক্সে পড়বে বলে 'কথা' দিয়েছেন তারা। একই ধরনের কথা জানালেন সীতাকুণ্ড আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী আ আ ম হায়দার আলী। তিনি বলেন, 'বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদের ভোট আমার পক্ষেই আসবে বলে তারা আমাকে জানিয়েছেন।' বিএনপির শীর্ষ নেতারা সবাই আত্মগোপনে থাকায় এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নৌকা ঠেকানোর মিশন বিএনপি-জামায়াত বাস্তবায়ন করলেও নির্বাচন ঠেকানোর মিশন বাস্তবায়নে তৎপর থাকবে ছাত্রদল-শিবির। এ বিষয়ে বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতারা ছাত্রদল ও শিবির কর্মীদের কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ভোটাররা যাতে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারেন সে দায়িত্ব পালন করবে ছাত্রদল। ভোটকেন্দ্রে নাশকতার দায়িত্বে থাকবে শিবির।
ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন প্রতিহত করতে ছাত্রদল কর্মীদের দুটি 'দায়িত্ব' দেওয়া হয়েছে। প্রথমত ভোটকেন্দ্রে না আসতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ এবং আওয়ামী সমর্থকদের হুমকি প্রদান। গতকাল বিকেলের মধ্যেই এ দায়িত্ব পালন করে ফেলেছে ছাত্রদলের কর্মীরা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচন বর্জনের লিফলেট বিলি করা হয়েছে বলে জানান 'সংগ্রাম কমিটি'র বাকলিয়া দক্ষিণের সভাপতি ইউনুছ চৌধুরী হাকিম। আর আওয়ামী সমর্থকদের হুমকি প্রদানের কাজটিও শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন এ কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ব বাকলিয়া ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক হাছানুল করিম। আর ভোটের দিন সকালে সংগ্রাম কমিটি সংশ্লিষ্ট আসনে ভোটারদের যেতে 'বাধা' প্রদান করবে। এ ব্যাপারে নগর ছাত্রদলের সভাপতি গাজী সিরাজ উল্লাহ বলেন, 'নির্বাচন ঠেকাতে আমরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। ইতিমধ্যে আমাদের কাজ অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ভোটের দিন চূড়ান্ত কাজ করা হবে।'
এদিকে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোটাররা যাতে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারেন সেজন্য নাশকতার দায়িত্ব পালন করবে শিবিরকর্মীরা। এমনকি ভোটের দিনও ভোটার সেজে নির্বাচন কেন্দ্রে নাশকতার চেষ্টা চালাবে তারা। তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকবে ভোটকেন্দ্র এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলো। মহানগর ছাত্রশিবির দক্ষিণের প্রচার সম্পাদক জামিল আবদুল্লাহ বলেন, 'শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা নির্বাচন বর্জনের চেষ্টা করে যাব। গণসংযোগে কাজ না হলে সেক্ষেত্রে 'ভিন্ন' পন্থাও অবলম্বন করতে পারি। নির্বাচনের আগের দিন ছাড়াও নির্বাচনের দিনও ভোটকেন্দ্রে আমাদের কর্মীরা উপস্থিত থাকবে।'

নির্বাচন প্রতিরোধ ও বর্জন করুন

লন্ডন থেকে এক ভিডিওবার্তায় দেশবাসীর প্রতি আজকের ভোট প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি
সিনিয়র সহসভাপতি তারেক রহমান। নির্বাচনের একদিন আগে গতকাল শনিবার পাঠানো তারেক রহমানের এই ২২ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের ভিডিও বার্তাটি ইউটিউবের পাশাপাশি তারেক রহমানের নামে একটি ফেসবুক পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। ভিডিও বার্তায় দল ও জোটের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ ও পেশাজীবীদের প্রতি ভোট বর্জন ও প্রতিরোধের আহ্বান জানান। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি দেশের মানুষের বিরুদ্ধে না যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আওয়ামী লীগের উদ্দেশেও এ নির্বাচন এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন এ বিএনপি নেতা। দলের সিনিয়র সহ-সভাপতির ভিডিও বার্তার বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছেন বিএনপির সহদফতর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর গ্রেফতার এবং পরের বছর জামিনে মুক্তি নিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ লন্ডনে অবস্থান করছেন তারেক রহমান। চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার মুহূর্তে তিনি আর রাজনীতি করবেন না বলে লিখিত অঙ্গীকার করেন। লন্ডনে যাওয়ার পর দেশবাসীর উদ্দেশে এটাই তার প্রথম ভিডিও বার্তা। তবে লন্ডনে বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশে দলীয় কাউন্সিলে অংশ নিয়েছিলেন তারেক।
ভিডিও বার্তায় তারেক রহমান বলেছেন, 'সরকার একটি 'প্রহসনের' নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। আজ সময় এসেছে আমাদের সবার ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিরোধ, প্রতিহত ও বর্জন করার। ব্যক্তিস্বার্থে নয়, দলীয় স্বার্থে নয়; এটা করতে হবে দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে, দেশের অস্তিত্বের স্বার্থে।'
নির্দলীয় সরকারের দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় ভোট বর্জন করে তা ঠেকাতে শনি ও রোববার দেশব্যাপী হরতাল ডাকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া 'গৃহবন্দি' অবস্থায় রয়েছেন বলেও তারেক দাবি করেন। তবে সরকার তা অস্বীকার করছে।
'নির্দলীয় সরকার'-এর দাবি উপেক্ষা করায় আওয়ামী লীগকে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তারেক বলেন, 'তিনি কেবল অনিরপেক্ষই নন, খোদ আওয়ামী লীগের প্রধান। কোন ভরসায়, কিসের ভিত্তিতে বিএনপি বা অন্য যে কোনো দল শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে?'
সংবিধান অনুসরণের বিষয়ে তিনি বলেন, 'সংবিধান তো ঐশী বাণী নয় যে, এটিকে পরিবর্তন করা যাবে না। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এ পর্যন্ত ১৫ বার আমাদের সংবিধান সংশোধিত হয়েছে। তাহলে জনগণের চাওয়া অনুযায়ী আমরা কেন ষোড়শ সংশোধন করতে পারব না?'
'একতরফা' নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ বাকশাল কায়েমের পথে এগোচ্ছে বলেও দাবি করেন তারেক।
বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে ১৫৩ আসনের প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগকে মুক্তিকামী জনতা এমনভাবেই প্রত্যাখ্যান ও ধিক্কার জানালেন যে, তারা শতচেষ্টা করেও ৩০০টির এমনকি অর্ধেক আসনেও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করাতে পারল না।'
তিনি বলেন, 'এ দেশের হতভাগ্য জনসাধারণকে ৫ বছর অন্তর ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র অনুশীলনের একমাত্র সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত করতে চাইছে। বিশ্ব ইতিহাসে এমন প্রতারণামূলক নির্বাচন এর আগে কখনও ঘটেনি।'
খালেদা জিয়ার বড় ছেলে দাবি করেন, 'রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা, রাজনৈতিক গুম-খুন, সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যা, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের গণহত্যা, আর দুর্নীতির স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সব অভিযোগের মুখে মানুষ প্রতিটি পদে পদে এ সরকারের ওপর অনাস্থার কথা জানিয়ে দিয়েছে।'
বিএনপির চলমান আন্দোলনকে 'গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের' সংগ্রাম অভিহিত করেন তারেক বলেন, 'দেশবাসীকে সাথে নিয়ে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে আমাদের যে আন্দোলন, তাতে অনেক নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। তাদের উৎসর্গের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য হলেও আমাদের ঘরে-ঘরে, গ্রামে-গ্রামে, শহরে-শহরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।' তিনি যে কোনো মূল্যে এই সংগ্রাম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'এ সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী।
'এখন সর্বশক্তি দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময়। আর নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা নয়। এখন থেকে লক্ষ্য একটাই_ সব ক্ষুদ্র বিভাজন ভুলে স্বৈরাচারী সরকার আর তার প্রহসনের নির্বাচনকে যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করতে হবে।'
তারেক রহমান দাবি করেন, 'গত পাঁচ বছরে দেশের সম্পদের অভূতপূর্ব লুটপাট, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ন্যক্কারজনক বিনাশ আর রাজনৈতিক-বিরোধী ও সমালোচকদের নজিরবিহীন দমনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, গত নির্বাচনে তাদের ক্ষমতা লাভের প্রক্রিয়াটি প্রকৃতপক্ষেই কলঙ্কজনক ছিল।'
বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আরও দাবি করেন, 'বাংলাদেশজুড়ে গভীর রাজনৈতিক সংকট চলছে। জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগের ওপর বিক্ষুব্ধ হয়ে আছে দেশের মানুষ। জনসমর্থন ও আত্মবিশ্বাস শূন্যের কোঠায় পেঁৗছানো আওয়ামী লীগ সরকার গণমানুষের ইচ্ছাকে তাদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।'
নির্বাচন স্থগিতের জন্য আওয়ামী লীগের প্রতিও আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, 'শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়, শান্তি চান। আর সেই শান্তির পূর্বশর্ত দেশের মানুষের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে পাতানো নির্বাচনের খেলা বন্ধ করা।'
আওয়ামী লীগ নেতাদের উদ্দেশে বলেন, 'ভেবে দেখুন, দেশের সার্বভৌমত্বকে বিসর্জন দিয়ে, পদে পদে আমাদের প্রাণপ্রিয় ইসলাম ও ধর্মীয় সম্প্রীতিকে রক্তাক্ত করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো গণদাবিকে ধূলিসাৎ করে, এমন লজ্জাজনক নির্বাচন কি একটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক দলকে মানায়? এই নির্বাচন দিয়ে মানুষের ঘৃণা-অভিশাপ ছাড়া আপনাদের আর কী অর্জন হবে?'
তারেক বলেন, 'দেশের রাজনীতিতে আজকের দুটি পক্ষ বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগ নয়, ১৮ দল বনাম মহাজোট নয়। দুটি পক্ষ আজ গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র, বাংলাদেশের পক্ষের শক্তি বনাম অন্য দেশের পক্ষের শক্তি, গণমানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বনাম ব্যক্তিবিশেষের ক্ষমতার অভিলাষ।' দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, 'পরিস্থিতির বিচারে আজ কোন পক্ষটি আপনাদের অবলম্বন করা উচিত, তা আপনাদেরই সিদ্ধান্ত। যে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না বলে আপনারা সবাই বিশ্বাস করেন, সেই ব্যবস্থার পক্ষেই আমাদের এত সংগ্রাম। তাই এই সংগ্রাম আমাদের একার নয়, এটি আপনাদেরও সংগ্রাম।'
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে তারেক বলেন, 'আপনারা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কর্মী। দেশের পরিস্থিতি বা সরকারে থাকা দলের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা যা-ই হোক, আপনারা দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যেতে পারেন না।' তিনি আরও বলেন, 'আপনাদের চালক আপনাদের বিবেক, আর আপনাদের চাকরিদাতা এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের কষ্টার্জিত অর্থে আপনাদের সংস্থান হয়। এই মানুষদের ওপর জুলুম-নির্যাতনে আপনাদের অনেকেরই অংশগ্রহণ রয়েছে।' 'আজ যারা গণবিরোধী কাজ করতে আপনাদের (পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি) প্রণোদনা দিচ্ছে, গণমানুষের চাপে যখন তাদের অবশ্যম্ভাবী পতন ঘটবে, তখন জনতার কাঠগড়ায় সেই সব অপরাধীর পাশাপাশি যদি আপনাদেরও দাঁড়াতে হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত লজ্জার ও কলঙ্কের।'

তবুও তারা দুশ্চিন্তায় by শাহেদ চৌধুরী

দুশ্চিন্তায় আছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন ডাকসাইটে নেতা। বিরোধী দল নির্বাচনে নেই, তবুও নেতারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হচ্ছেন আজ। দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন। এ অবস্থায় তারা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে থেকে নির্বাচনী বৈতরণী পেরোনোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে নির্বাচনী জনসভা করে বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর পরও তাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা কমছে না। মতিয়ার অস্বস্তি : বর্তমান সরকারের একজন জনপ্রিয় ও যোগ্য মন্ত্রী হিসেবে এককালের 'অগি্নকন্যা' কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী শেরপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। তার সততা ও স্বচ্ছতাও যেন তার বৈরী। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও এ আসনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে। দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন নালিতাবাড়ী উপজেলার পদত্যাগী চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদশা। তিনি কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা। তার প্রার্থিতায় অস্বস্তিতে পড়েছেন মতিয়া চৌধুরী।
নালিতাবাড়ী ও নকলা উপজেলা নিয়ে এ আসনে নকলা উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান ছাড়া শীর্ষ নেতাদের অন্যরা দলের কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরীর পক্ষে রয়েছেন। তবে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ বদিউজ্জামান বাদশার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। ব্যক্তিগত রেষারেষির জের ধরে বাদশা নির্বাচনে লড়ছেন বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। কেউ কেউ এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিলেও শেষতক মতিয়া চৌধুরী স্বস্তিতেই নির্বাচনী বৈতরণী পেরোবেন বলে অনেকে মনে করছেন।
দুশ্চিন্তায় টুকু : দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু। তার ঘাম ঝরিয়ে ছাড়ছেন পাবনা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। তিনি সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী এবং এমপি। আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা। ওয়ান-ইলেভেনের সময় গায়ে সংস্কারপন্থির তকমা লাগায় দল থেকে বাদ পড়েছেন। গত নির্বাচনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন।
এক সময়ে অধ্যাপক আবু সাইয়িদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতি করলেও এখন শামসুল হক টুকু জেলা রাজনীতির শীর্ষ নেতা। তাই নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে তার পক্ষে একাট্টা হয়ে আছেন। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের দুর্নামচিত্র স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে নির্বাচনে রীতিমতো কাবু করে ফেলেছে। তিনি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়েছেন। অন্যদিকে লোকমুখে রয়েছে আবু সাইয়িদের প্রচার।
নাকাল ফকির : ময়মনসিংহ-৩ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) ডা. মজিবুর রহমান ফকির নাকাল হয়ে আছেন। তাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে আছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী নাজনীন আলম। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে।
নাজনীন আলমের স্বামী ফেরদৌস আলম স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। এ ছাড়াও গৌরিপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বিধু ভূষণ দাস এবং স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান আলী আহমেদ সেলভীর সমর্থন নাজনীন আলমের পক্ষে। ফলে বিপাকে পড়েছেন সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।
মন্নুজানের দুশ্চিন্তা : আত্মীয়-স্বজনের অপকর্মের খেসারত দিচ্ছেন খুলনা-৩ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে টেন্ডার ও নিয়োগবাণিজ্যসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে ইমেজ সংকটে পড়েছেন মন্নুজান সুফিয়ান। তার দুশ্চিন্তা কাটছে না।
নির্বাচনে তার প্রতিপক্ষ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুজ্জামান খান খোকন। বেশ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন এই স্বতন্ত্র প্রার্থী। মনিরুজ্জামান খান খোকন দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ কারণেও তিনি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পাচ্ছেন। সংখ্যায় কম হলেও আওয়ামী লীগের অনেক কর্মী তার জন্য গোপনে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন।
জালাল-সেলিমের লড়াই :পুরান ঢাকায় নির্বাচন জমে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা-৭ আসনের ভোটচিত্র অন্য রকমের। এ আসনের বর্তমান এবং সাবেক এমপি একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়েছেন। দু'জনই আওয়ামী লীগের। এর মধ্যে বর্তমান এমপি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন দলের মনোনয়ন পেয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সাবেক এমপি হাজি মোহাম্মদ সেলিম। এ আসনে তীব্র লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যার কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী হাজি সেলিমকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে ছিলেন ডা. জালাল। কিন্তু সে দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। এদিকে গোপনে গোপনে বিএনপির সমর্থকরা হাজি সেলিমের পক্ষে কাজ করছেন।
ম্লান কামাল :আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদার ঢাকা-১৫ আসনের বর্তমান এমপি। এলাকায় বেশ প্রভাব তার। কিন্তু নির্বাচনে সেটা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। তার প্রতিপক্ষ হয়েছেন ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাই এখলাস উদ্দিন মোল্লাহ। কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও পদ-পদবি নেই তার। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে আবদার করে এখলাস উদ্দিন মোল্লাহর বহিষ্কার চেয়েছেন কামাল আহমেদ মজুমদার। এই আবদারে সাড়া মেলেনি। নির্বাচনী এলাকায় এসে শেখ হাসিনা জনসভায় ভাষণ দেওয়ায় কিছুটা এগিয়ে গেছেন কামাল মজুমদার। তবুও তিনি এখনও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
যাদের বেহাল দশা : ঢাকা-১৬ আসনের বর্তমান এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী সর্দার মোহাম্মদ মান্নানের (এসএম মান্নান কচি) সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কচি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সহ-সভাপতি। ফরিদপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহর প্রতিপক্ষ হয়েছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী মজিবুর রহমান চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই স্বতন্ত্র প্রার্থীর ফুফু।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনেও একই অবস্থা। বর্তমান এমপি এমএ মান্নানের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিপক্ষ হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা আবদুস সামাদ আজাদের ছেলে আজিজুস সামাদ আজাদ। এই আসনেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। যশোর-৪ আসনে বর্তমান এমপি রণজিৎ কুমার রায়ের সঙ্গে লড়ছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী যশোর_৬ আসনের বর্তমান এমপি শেখ আবদুল ওহাব। এ আসনে লড়াই হবে সমানে সমান।
কুমিল্লা-১ আসনে বর্তমান এমপি সুবিদ আলী ভূঁইয়াকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা হাসান জামিলের ছেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী নাঈম হাসান। কুমিল্লা-৬ আসনে আ ক ম বাহাউদ্দিনের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা আফজাল খান অ্যাডভোকেটের ছেলে মাসুদ পারভেজ খান। নির্বাচনে তার সঙ্গেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। নোয়াখালী-৬ আসনে আয়েশা ফেরদাউসের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী আমীরুল ইসলাম চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন।
গাইবান্ধা-২ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান এমপি মাহবুব আরা বেগম গিনির সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে আছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী মকদুবর রহমান সরকার। গাইবান্ধা-৪ আসনের বর্তমান এমপি মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে সমানভাবে লড়ছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের সঙ্গে সমানভাবে লড়ছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী খুরশিদ আলম। নওগাঁ-৩ আসনে আকরাম হোসেন চৌধুরীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন ছলিম উদ্দিন তরফদার।
নওগাঁ-৫ আসনে আবদুল মালেকের সঙ্গে সমান গতিতে লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিকুল ইসলাম রফিক। রাজশাহী-৩ আসনে আয়েন উদ্দিনের সঙ্গে লড়ছেন বর্তমান এমপি স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মেরাজ উদ্দিন মোল্লা। রাজশাহী-৬ আসনে বর্তমান এমপি শাহরিয়ার আলমের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রাহেনুল হক রায়হান। তিনি সাবেক এমপি।
পাবনা-২ আসনেও একই অবস্থা। এ আসনের বর্তমান এমপি মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আবুল কালাম আজাদ। মেহেরপুর-১ আসনে ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন দলের ইয়ারুল ইসলাম। এ দুই প্রার্থীর মধ্যেই নির্বাচনী লড়াই হবে। মেহেরপুর-২ আসনের প্রার্থী এমএ খালেকের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মকবুল হোসেন। এ আসনেও লড়াই হবে।
কুষ্টিয়া-১ আসনের বর্তমান এমপি আফাজ উদ্দিন আহমেদের অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে। এগিয়ে আছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল হক চৌধুরী। কুষ্টিয়া-৪ আসনে দলীয় প্রার্থী আবদুর রউফের সঙ্গে সমান গতিতে লড়ছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী সদর উদ্দিন খান। ঝিনাইদহ-১ আসনে বর্তমান এমপি আবদুল হাই স্বতন্ত্র প্রার্থী দলের নায়েব আলী জোয়ারদারের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
ঝিনাইদহ-২ আসনে বর্তমান এমপি সফিকুল ইসলামের সঙ্গে লড়ছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহজীব আলম সিদ্দিকী। এ আসনেও তীব্র লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। ঝিনাইদহ-৩ আসনের বর্তমান এমপি শফিকুল আজম খান দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নবী নেওয়াজ বেশ ঝুঁকিতে পড়েছেন।
যশোর-২ আসনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জুতসই অবস্থানে রয়েছেন। তার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না আওয়ামী লীগের মনিরুল ইসলাম। যশোর-৫ আসনে বর্তমান এমপি খান টিপু সুলতানের সঙ্গে সমান গতিতে লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী স্বপন ভট্টাচার্য। মাগুরা-১ আসনে বর্তমান এমপি ডা. সিরাজুল আকবরের শক্ত প্রতিপক্ষ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী কুতুবুল্লাহ হোসেন মিয়া।
মাগুরা-২ আসনেও একই অবস্থা। এ আসনে বর্তমান এমপি বীরেন শিকদারের প্রতিপক্ষ হয়েছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল মান্নান। খুলনা-১ আসনের বর্তমান এমপি ননী গোপাল মণ্ডল দলের মনোনয়ন পাননি। তিনি দলীয় প্রার্থী সাবেক এমপি পঞ্চানন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনেও লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা-২ আসনে মীর মোস্তাক আহমেদ রবির বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন দলের ছাইফুল করিম সাবু। এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বেশ নাজুক অবস্থানে রয়েছেন। বরগুনা-১ আসনে বর্তমান এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন দলের দেলোয়ার হোসেন। বরগুনা-২ আসনে শওকত হাচানুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী দলের আবুল হোসেন শিকদার।
নেত্রকোনা-১ আসনের বর্তমান এমপি মোশতাক আহমেদ রুহী দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছবি বিশ্বাস খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না। নেত্রকোনা-২ আসনের প্রার্থী আরিফ খান জয়কে চ্যালেঞ্জ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের আবদুন নূর খান। মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের বর্তমান এমপি সাগুফতা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে লড়ছেন দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন আহমদ।
নরসিংদী-৩ আসনেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলেছে। এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন। তার একমাত্র প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বর্তমান এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীর প্রতিপক্ষ হয়েছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী শওকত আলী। এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর।
সিলেট-৪ আসনের বর্তমান এমপি ইমরান আহমদের বিরুদ্ধে লড়ছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী ফারুক আহমদ। সুনামগঞ্জ-১ আসনের বর্তমান এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ রফিকুল হক। তাদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। হবিগঞ্জ-৪ আসনে মাহবুব আলীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের সৈয়দ তানভীর আহমেদ। বান্দরবানে বীর বাহাদুর উ শৈ সিংয়ের প্রতিপক্ষ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা।
নড়াইল-২ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ হাফিজুর রহমানকে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ তা মেনে নেয়নি। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের সোহরাব হোসেন বিশ্বাস। তিনি বেশ এগিয়ে রয়েছেন। সাতক্ষীরা-১ আসনেও একই ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশ অমান্য করে ওয়ার্কার্স পার্টির মুস্তফা লুৎফুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের এস এম মুজিবর রহমান। তিনি বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছেন।
ময়মনসিংহ-৭ আসনে জাতীয় পার্টির এম এ হান্নানকে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের। কিন্তু সেটা মানেননি স্থানীয় নেতা হাফেজ রুহুল আমীন মাদানী। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন। কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে বর্তমান এমপি ও সর্বদলীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী জাতীয় পার্টির মুজিবুল হককে কেন্দ্রীয়ভাবে ছাড় দেওয়া হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের ড. মিজানুল হক। এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
কুমিল্লা-৩ আসনে জাতীয় পার্টির আকতার হোসেনকে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও তাকে চ্যালেঞ্জ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের আহসানুল আলম কিশোর ও ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন। এর মধ্যে ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন বলে অনেকে মনে করছেন। কুমিল্লা-৪ আসনেও একই অবস্থা। জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন রাজুকে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের রোশন আলী ও রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। স্বতন্ত্র দুই প্রার্থীই নির্বাচনের মূল প্রতিপক্ষ।
ফেনী-৩ আসনে জাতীয় পার্টির আনোয়ারুল কবির রিন্টু আনোয়ার ছাড় পেলেও তা মানেননি আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী রহিম উল্লাহ। চট্টগ্রাম-২ আসনে তরীকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীকে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত মানেনি আওয়ামী লীগ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ড. মাহমুদ হাসান। ঢাকা-৪ আসনে জাতীয় পার্টির সৈয়দ আবু হোসেনকে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের ড. আওলাদ হোসেন।

শতাধিক স্কুলে আগুন

(দিনাজপুরে পুড়ল জাতীয় পতাকাও নারায়ণগঞ্জে আধঘণ্টায় ৬০ কেন্দ্রে বোমা, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রিসাইডিং অফিসারকে কুপিয়ে হত্যা) সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হওয়া স্কুল, মাদ্রাসা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো পুড়েছে নাশকতার আগুনে। গত শুক্রবার রাতে ও শনিবার দেশের অন্তত ৪৬ জেলায় শতাধিক ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। দিনাজপুরের একটি স্কুলে দুর্বৃত্তদের আগুনে পুড়ে গেছে জাতীয় পতাকা। এ ছাড়া ৪টি ভোটকেন্দ্রে ১৫টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে গত রাতে একজন প্রিসাইডিং অফিসারকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এদিকে পার্বতীপুর উপজেলায় একটি ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারসহ কর্মকর্তাদের মারধর করে নির্বাচনসামগ্রী ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এদিকে গাইবান্ধায় ব্যালট পেপার, বাক্সসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম পুড়িয়ে দিয়েছে ১৮ দলের কর্মীরা। নারায়ণগঞ্জে শনিবার রাতে আধাঘণ্টার মধ্যে ৬০টি ভোটকেন্দ্রে বোমা হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে দুটি কেন্দ্রে হামলায় ৩ জন আহত হয়েছেন। যশোরের মনিরামপুরে পুলিশের গাড়িতে হামলায় ৯ জন আহত হয়েছেন। নীলফামারীর জলঢাকায় একটি কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারসহ কর্মকর্তাদের বেঁধে রেখে ভোটের সামগ্রীতে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। বিভিন্ন স্থানে পুড়িয়ে দেওয়া ভোটকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আগুনে বইপত্র, চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। খবর অফিস, ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের। ঠাকুরগাঁও :ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে গতকাল শনিবার রাতে দুর্বৃত্তদের হামলায় প্রিসাইডিং অফিসার জুবায়দুর রহমান নিহত হয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত রাত সাড়ে ১০টার দিকে ক্ষেত্রিপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে হামলা চালায়। তারা জুবায়দুর রহমানকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে
গুরুতর জখম করে। হামলায় এ ছাড়া দু'জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও দু'জন নিরাপত্তাকর্মী সামান্য আহত হয়েছেন। স্থানীয় লোকজন আহত জুবায়দুর রহমানকে উদ্ধার করে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নারায়ণগঞ্জ/রূপগঞ্জ :জেলার রূপগঞ্জে শনিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে একযোগে ৬০ কেন্দ্রে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। কাঞ্চন পৌর বাজার ও চরপাড়া কেন্দ্রে বোমা হামলায় ৩ জন আহত হন। রূপগঞ্জে মোট কেন্দ্র ১০১টি। রূপগঞ্জ থানার ওসি আসাদুজ্জামান মীর জানান, দুর্বৃত্তরা নির্বাচন বানচালের জন্যই স্থানে স্থানে বোমা হামলা চালিয়ে ভোটারদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। রূপগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে আছে কেন্দুয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোলাকান্দাইল দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেন্দুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মর্তুজাবাদ ফাজিল মাদ্রাসা, পাড়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আধুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নীলভিটা কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আতলাশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাইসকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভোলাব শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়, নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়, টাওরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হোড়গাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেবই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জনতা উচ্চ বিদ্যালয়, ইউসুফগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, ভোলাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুটিনা উচ্চ বিদ্যালয়, বেলদী দাখিল মাদ্রাসা, হিরনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও করাটিয়া পুবেরগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র।
দিনাজপুর :দিনাজপুরে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার একটি বিদ্যালয়ে অগি্নসংযোগে জাতীয় পতাকা পুড়ে গেছে। এলাকাবাসী জানায়, গত শুক্রবার গভীর রাতে সদর উপজেলার বড়ইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে কে বা কারা জানালা দিয়ে অগি্নসংযোগ করে। ফলে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও অফিস কক্ষের চেয়ার-টেবিল, জাতীয় পতাকা, রেজাল্টশিট, বই ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুড়ে যায়। এদিকে শনিবার রাতে দিনাজপুর শহরে ৪টি ভোটকেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে কেন্দ্রগুলোতে ১৫টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৫ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছে। দিনাজপুর শহরের তফিউদ্দিন মেমোরিয়াল ভোটকেন্দ্রে ৩টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ডাবলুর ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ভাংচুর করা হয়। একই সময়ে দিনাজপুর কলেজিয়েট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬টি ককটেলের বিস্টেম্ফারণ ঘটানো হয়। পুলিশ ৫ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বালাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬টি ককটেলের বিস্টেম্ফারণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। এদিকে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে পার্বতীপুর উপজেলার বড় হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দুর্বৃত্তরা প্রিসাইডিং অফিসার হবিবর রহমানসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধর করে নির্বাচন সামগ্রী ছিনতাই করে নিয়ে যায়। দুবর্ৃৃত্তদের হামলায় প্রিসাইডিং অফিসার, পুলিশসহ মোট ১২ জন আহত হন। জেলায় মোট ১৩টি ভোটকেন্দ্রে হামলা হয়েছে।
রংপুর :পীরগাছা উপজেলার দামুরচাকলা দেওয়ান ছালে দাখিল মাদ্রাসা ও ইটাকুমারি স্কুল ভোটকেন্দ্রের ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। দুর্বৃত্তদের আঘাতে আহত হয়েছেন প্রিসাইডিং অফিসারসহ চারজন। শনিবার রাত পৌনে ৮টায় ওই ঘটনা ঘটে। এ সময় দুর্বৃত্তরা কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। দামুরচাকলা ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আছাদ আলী জানান, ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার নিয়ে তারা ওই কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন। এ সময় দেড় থেকে দুইশ' লোক লাঠিসোটা নিয়ে কেন্দ্রের বাইরে ৫-৭টি ককটেলের বিস্টেম্ফারণ ঘটায়। তারা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে প্রিসাইডিং অফিসার ও তার দুই সহযোগীকে মারধর করে ওই কেন্দ্রের সব ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নেয়। এরপর তারা ইটাকুমারী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে হামলা চালায়। তারা প্রিসাইডিং অফিসারকে মারধর করে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয় বলে জানান ওই কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার হাসেম আলী।
যশোর :শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যশোরের মনিরামপুরের চান্দুয়া শমসকাটি গ্রামে পুলিশের গাড়িতে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে পুলিশ ও আনসার বাহিনীর ৯ সদস্য আহত হয়েছেন। হামলাকারীরা পুলিশের গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ, অগি্নসংযোগ ও ভাংচুর চালায়।
মৌলভীবাজার :বড়লেখা উপজেলার কাঁঠালতলী ও বড়খলাবাজারে সন্ধ্যায় ১৮ দলীয় জোটের মিছিল থেকে ১০টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। একই সময়ে কুলাউড়া রেলওয়ে জুনিয়র হাইস্কুল কেন্দ্রে দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছে। রাত ৯টায় বড়লেখার বড়খোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার সেলিম আহমদকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়েছে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা।
জলঢাকা (নীলফামারী) :শনিবার সন্ধ্যায় উপজেলার গোলমুণ্ডা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে কয়েকশ' দুর্বৃত্ত। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার হিরণ্ময় কুমার জানান, সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আকস্মিক ৪-৫শ' দুর্বৃত্ত কেন্দ্রটি ঘিরে ফেলে।
রাজশাহী :রাজশাহী-৬ আসনের ৬ ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার রাতে ও শনিবার ভোরে ৬টি কেন্দ্রে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আসবাবপত্র পুড়ে যায়। বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরকর্মীরা এ আগুন দিয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। শুক্রবার রাতে চারঘাটের সরদহ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও গতকাল ভোরে উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা এলাকার সরদহ উচ্চ বিদ্যালয়, কালাবিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, শলুয়া ডিগ্রি কলেজ, শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিবপুর ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
নেত্রকোনা :সদর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের কাংসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মনাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মদনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কলমাকান্দার কৈলাটি ইউনিয়নের জনতা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে শুক্রবার রাতে দুর্বৃত্তরা আগুন ধরিয়ে দেয়।
লক্ষ্মীপুর : লক্ষ্মীপুরে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি কেন্দ্র হলো_ রামগঞ্জের পশ্চিম সোনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাউলীভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুন্দরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহজকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম করপাড়া নুরে মদিনা দাখিল মাদ্রাসা ও কালিডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমলনগর উপজেলার মধ্য পশ্চিম চরমার্টিন প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং রামগতি উপজেলার চরবাদাম ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র।
চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) :চরভদ্রাসন উপজেলার হরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে গত শুক্রবার রাতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
জৈন্তাপুর (সিলেট) :সিলেট-৪ আসনের আওতাধীন জৈন্তাপুর উপজেলার দুটি কেন্দ্রে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এগুলো হচ্ছে জৈন্তাপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও চারিকাটা ইউনিয়নের থুবাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
মানিকগঞ্জ/শিবালয় :মানিকগঞ্জের শিবালয় ও ঘিওরে চারটি কেন্দ্রে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার মধ্যরাতে শিবালয় উপজেলার নিহালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পয়লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘিওর উপজেলা বেগুনার্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তরা রমজান আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া :ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে শনিবার ভোর ৫টার দিকে সদর উপজেলার নাটাই উত্তর ইউনিয়নের ক্ষুদ্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
কুষ্টিয়া :শুক্রবার রাত ২টার দিকে সদর উপজেলার আলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এদিকে রাত ১০টার দিকে জেলার ভেড়ামারায় লালন শাহ সেতুর কাছে একটি পানবোঝাই ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়।
নাটোর :দুর্বৃত্তরা শুক্রবার রাতে সিংড়া উপজেলার চৌগ্রাম ইউনিয়নের ক্ষিদ্রবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আগুন দেয়।
গৌরীপুর/ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) :ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনের রামগোপালপুর ইউনিয়নের পুম্বাইল রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দুর্বৃর্ত্তরা শুক্রবার গভীর রাতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
সিরাজগঞ্জ :বেলকুচিতে শুক্রবার গভীর রাতে দুটি ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়ে চারটি কক্ষ পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। উপজেলা সদরের দেলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দৌলতপুর ইউনিয়নের চরনবীপুর কান্দাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগুন দেওয়ার পর স্থানীয়রা আগুন নিয়ন্ত্রণ আনে।
বরগুনা :বরগুনায় ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে গত শুক্রবার রাতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া গাছ ফেলে দুই কিলোমিটার রাস্তা অবরোধ করে রাখা হয়েছে। সদরের দক্ষিণ লেমুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য পাঠাকাঠা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কে লতাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নলী মাইঠা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমতলী উপজেলার আরপাঙ্গাশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেতাগী উপজেলার রানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
সাতক্ষীরা :সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নোগঘাটা ভোটকেন্দ্রে শুক্রবার রাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা।
সুনামগঞ্জ :ধর্মপাশার দুটি কেন্দ্রে ও দোয়ারাবাজারের একটি কেন্দ্রে অগি্নসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার ভোররাতে মধ্যনগরের দক্ষিণ বংশিকুণ্ডা ইউনিয়নের গড়াকাটা স্কুলের একটি কক্ষের বেঞ্চে শনিবার রাতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। একই উপজেলার সরিসাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বারান্দায় দুর্বৃত্তরা আগুন দিলে দরজার কিছু অংশ পুড়ে যায়। দোয়ারাবাজারের রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে কিছু বই ও ম্যাট জড়ো করে পেট্রোল দিয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
ভোলা :শনিবার রাতে দৌলতখান উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের মধ্য চরশুভী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বিজয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লালমোহন উপজেলার পূর্ব চরউমেদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তজুমদ্দিন উপজেলার উত্তর জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। সকালে দৌলতখানের সৈয়দপুর ইউনিয়ন বিএনপি অফিস আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া দৌলতখান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আজহার আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বোরহানউদ্দিনে সাচড়া ইউনিয়নের গরিব মাঝি মাদ্রাসায় আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা।
মঠবাড়িয়া :শনিবার ভোরে উপজেলার মিরুখালী ইউনিয়নের দেবীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এদিকে রাতে ওহাবিয়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা।
ঝিনাইদহ :ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার মামুনশিয়া ভোটকেন্দ্রে শনিবার রাতে হামলা চালিয়ে দুই পুলিশ ও এক আনসার সদস্যকে কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তারা ভোটকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দিলে বেশ কিছু ব্যালট পেপার পুড়ে যায়। খবর পেয়ে সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে পেঁৗছে রাত ১১টার দিকে আহত পুলিশের উপ-পরিদর্শক মিলন, পুলিশ সদস্য জামিরুল ইসলাম ও আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য ওহিদুল ইসলামকে উদ্ধার করে কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেল্গক্সে ভর্তি করে। এ ছাড়া শুক্রবার রাতে একদল দুর্বৃত্ত শৈলকূপা শহরের ললিত ভুঁইয়া ও একই উপজেলার ত্রিবেণী সরকারি প্রাইমারি স্কুলের ভোটকেন্দ্রে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। সদর উপজেলার বিষয়খালী বাজার ও মহারাজপুর গ্রামের দুটি ভোটকেন্দ্রে শনিবার ভোরে দুর্বৃত্তরা পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়েছে।
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) :গত শুক্রবার রাতে মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসের পেছনের পানির পাইপে দুর্বৃত্তরা আগুন দেয়। অন্যদিকে উপজেলার খাউলিয়া ইউনিয়নের ১৩৮নং মধ্য বড়পরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে একই রাতে দুর্বৃত্তরা আগুন দিলে স্কুলের একটি কক্ষের জানালা পুড়ে যায়।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) :কমলগঞ্জে দুর্বৃত্তদের আগুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি, বইপত্র, আসবাবপত্রসহ প্রায় ২৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার ভোররাতে কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের ছলিমগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
পার্বতীপুর (দিনাজপুর) :গতকাল শনিবার দুপুরে মমিনপুর ইউনিয়নের হয়বতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে কেরোসিন ঢেলে অগি্নসংযোগ করে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরকর্মীরা। অন্যদিকে সকালে শহরে ২টি মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত দুটি অটোরিকশা ভাংচুর ছাড়াও শহরের ঢাকা মোড়ে নৌকা মার্কার পোস্টার ছিঁড়ে অগি্নসংযোগ করে ১৮ দলের কর্মীরা।
সাদুল্যাপুর (গাইবান্ধা) :সাদুল্যাপুর উপজেলার কুঞ্জমহিপুর ও তাজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের ব্যালট পেপারসহ ভোট গ্রহণের উপকরণ ছিনিয়ে নিয়ে অগি্নসংযোগ করেছে ১৮ দলের কর্মীরা। একই সঙ্গে তারা তাজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে অগি্নসংযোগ করেছে।
বগুড়া :জেলার দুটি উপজেলার ৫টি ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। কেন্দ্রগুলো হলো_ বগুড়া-৭ আসনভুক্ত গাবতলী উপজেলার মধ্যকাতুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চক কাগইল প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বগুড়া-৪ আসনের নন্দীগ্রামের রিধইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুক্রবার গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা এসব ভোটকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এদিকে শনিবার সন্ধ্যায় আরও ২টি ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে ১৮ দলীয় জোটের কর্মীরা। কেন্দ্রগুলো হলো_ গাবতলী উপজেলার সন্ধনটুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও একই এলাকার দুই কিলোমিটার দূরে জামিরবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে।
কুড়িগ্রাম/নাগেশ্বরী :নাগেশ্বরী উপজেলায় শনিবার ভোরে হাসনাবাদ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের খামার হাসনাবাদ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) :গতকাল সন্ধ্যায় শোভাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় এবং নিজাম খাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে অগি্নসংযোগ ও বিভিন্ন সড়ক কেটে অবরোধ করছে আন্দোলনকারীরা।
পীরগঞ্জ :রংপুর-৬ পীরগঞ্জ আসনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী আসনের ভেণ্ডাবাড়ী ভীম শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড় আলমপুর ইউনিয়নের পত্নীচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্বাচনী এলাকা রংপুর-৩ সদর আসনের ৫টি ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে_ নগরীর মাহিগঞ্জ মহিন্দ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আক্কেলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আক্কেলপুর উচ্চ বিদ্যালয়, মুলাটোল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পীরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
পটুয়াখালী : জেলার মাদারবুনিয়ার ৬৪ নম্বর মধ্য নন্দীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে শুক্রবার রাতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
দশমিনা (পটুয়াখালী) :দশমিনা উপজেলায় শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলার দক্ষিণ দাশপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে সন্ত্রাসীরা অগি্নসংযোগ করেছে।
কিশোরগঞ্জ/করিমগঞ্জ :কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে করিমগঞ্জ ইউএনও কার্যালয়ের কাছে ককটেল বিস্ফোরণ এবং শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলার নয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গুজাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গাংগাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দুর্বৃত্তরা অগি্নসংযোগ করে পালিয়ে যায়।
নওগাঁ :সদর উপজেলার ফতেপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে শনিবার বিকেলে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
পাবনা :একদল দুর্বৃত্ত শনিবার ভোরে সাঁথিয়া উপজেলার সামান্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের একটি কক্ষে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। বেড়া উপজেলার পৌর এলাকায় হাতিগাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) : গতকাল ফুলবাড়িয়া আছিম পাটুলি ইউনিয়নের কালাইপার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাকতা কাচিচুড়া উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
ফেনী/সোনাগাজী :শুক্রবার রাতে সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া দুর্বৃত্তরা চর দরবেশপুর ইউনিয়নের রাগিসপুর সরকারি প্রাথমিক স্কুল ভোটকেন্দ্র ও নবাবপুর ইউনিয়নের গোয়ালিয়া গ্রামের অন্নদাচরণ রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
লাকসাম :লাকসামে শুক্রবার রাতে ধামৌইছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাতাখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আতাকরা উচ্চ বিদ্যালয়, শালিপুর, চিকনিয়া, পাশাপুর ও কোমড়ার ডোগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
মুরাদনগর (কুমিল্লা) : কুমিল্লা-৩ মুরাদনগর আসনের বোরারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রের সরঞ্জামে শনিবার সকালে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
উত্তরাঞ্চল/নীলফামারী/ডোমার : ডোমারের বামুনিয়া ইউনিয়নের বারবিসা এবং ডোমার সদর ইউনিয়নের চিকনমাটি ভাদুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ভোগডাবুরী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বটতলী মাদ্রাসায় আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
লালমনিরহাট : সদর উপজেলার বড়বাড়ী ইউনিয়নের আমবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্বাচনী পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পাওয়া হাফিজুর রহমান নামে একজনকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। রাত সাড়ে ৯টায় সদর উপজেলার গোকুণ্ডা ইউনিয়নের কুর্শামারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে পুলিশের গাড়িতে অগি্নসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তারা ওই কেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে অগি্নসংযোগ করে।
নরসিংদী : নরসিংদী শহরের বানিয়াছল ও পলাশ উপজেলার নোয়াকান্দা প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে শুক্রবার রাতে অগি্নসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। এদিকে, শনিবার রাতে সদর উপজেলার নুরালাপুর ইউনিয়নে নুরালাপুর হাই স্কুল ভোটকেন্দ্রে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রিসাইডিং ও পুলিশ অফিসারদের বহনকারী রংধনু পরিবহনের বড় একটি বাস।
বরগুনা/আমতলী : বরগুনায় শনিবার ভোর রাতে সদর উপজেলার দক্ষিণ লেমুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য পাঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নলী মাইঠা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কে-লতাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আমতলীর মধ্য আড়পাঙ্গাশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মানিকঝুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বেতাগী উপজেলার পূর্ব রানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে অগি্নসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা।
বানারীপাড়া (বরিশাল) :শনিবার রাতে বানারীপাড়া পৌর শহরের ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন (পাইলট) কেন্দ্রে অগি্নসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে খোকন নামে এক বিএনপি কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। রাত ৯টার দিকে বানারীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন কেন্দ্রের একটি ভবনে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।
ঠাকুরগাঁও : জেলায় বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে বিএনপি, জামায়াতসহ ১৮ দলীয় নেতাকর্মীরা। এদিকে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিজিবি-পুলিশের সংঘর্ষে কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ :শনিবার রাতে সিরাজদীখান, টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং উপজেলায় ৩টি ভোটকেন্দ্রে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
হবিগঞ্জ :বানিয়াচং উপজেলা সদরে তোপখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
শেরপুর :ঝিনাইগাতী উপজেলার কুচনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ককটেল হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মুখোশপরা কয়েকজন দুর্বৃত্ত শনিবার রাত ৮টায় বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র লক্ষ্য করে ৩টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়।
মাগুরা :মাগুরা সদরের বরুণতৈল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে শনিবার রাতে ভাংচুর ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করেছে দুর্বৃত্তরা। এতে স্কুলের একটি টিনশেড ঘরের একটি কক্ষে আগুন ধরে যায়।
টাঙ্গাইল :গোপালপুর উপজেলায় দুটি ভোটকেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ৭৮১টি ব্যালট পেপার ছিনতাই করে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া টাঙ্গাইল সদর আসনে পৌর এলাকায় বেশ কয়েকটি কেন্দ্রের আশপাশে ককটেল বিস্ফোরণ হয়েছে।
বিশ্বনাথ (সিলেট) :বিশ্বনাথে শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় ৫টি ভোটকেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ভোটকেন্দ্রগুলো হচ্ছে_ রামপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেলীকোনার এলাহাবাদ আলিম মাদ্রাসা, কান্দিগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চন্দ্রগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাদিপুরের শাহজালাল পল্লী পরিষদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

নিয়ম রক্ষার নির্বাচন আজ by মসিউর রহমান খান ও জয়দেব দাশ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের বর্জনের মধ্যেই বহুল আলোচিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আজ রোববার। গতকাল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৩৫টি জেলায় শতাধিক ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া হয়েছে। যেখানে পুড়ে গেছে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম। সহিংস হরতাল কর্মসূচির কারণে জনমনে বিরাজ করছে আতঙ্ক। 'একতরফা' এ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ায় এ নির্বাচন উত্তাপ হারিয়েছে অনেক আগেই। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও পড়েছে প্রশ্নের মুখে। বিএনপির লাগাতার অবরোধ ও হরতালের মধ্যে নির্বাচনের উৎসব ও আনন্দের পরিবর্তে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। তবুও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় আজ দেশের ১৪৭টি আসনে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একক প্রার্থীর কারণে বাকি ১৫৩ আসনে ভোট গ্রহণের আর প্রয়োজন পড়ছে না। তবে এরই মধ্যে বেশকিছু আসনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ১৮ হাজার ২০৮টি কেন্দ্রের মধ্যে শতকরা ৭৫ ভাগ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। অবশ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছেন বিপুলসংখ্যক সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা।
সরকারি দলের একাধিক মন্ত্রী ইতিমধ্যে বলেছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য এ নির্বাচন করা ছাড়া বিকল্প নেই। ফলে নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা একে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করছেন। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে বরাবরই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনকারী বিদেশি পর্যবেক্ষকরা এবার অনুপস্থিত। সার্কভুক্ত দেশগুলোকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ইসি। সাড়া মেলেনি তাতেও। ভারত ও ভুটান থেকে মাত্র চারজন পর্যবেক্ষক ঢাকায় এসেছেন। তবে দেশীয় ১৩ হাজার ৪৩৬ পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই নির্বাচন কমিশন আজকের ভোট গ্রহণের সার্বিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে আজ সরকারি ছুটি থাকছে। এসব জেলায় যান চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। মহাসড়ক বাদে অন্য সড়কে ইসির অনুমোদিত যান ছাড়া চলাচল করার সুযোগ নেই।
তফসিল ঘোষণার পর থেকে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা ১২২ জন। গতকাল পর্যন্ত ৩৫টি জেলার শতাধিক ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে থাকা কর্মকর্তাদের নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আগের সব নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ভোটারের উপস্থিতি লক্ষণীয় হলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কায় ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতির হার নিয়ে সন্দিহান খোদ কমিশন।
সর্বশেষ ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে শতকরা ৮৭ দশমিক ১৩ ভাগ ভোটার উপস্থিত থাকলেও এবার সর্বোচ্চ ৫০ ভাগ ভোটার উপস্থিতির আশা করছে ইসি। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায়। দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪৭টিতে আজ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট গ্রহণ চলবে। ইসি সচিবালয় থেকে জানানো হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের আইডি কার্ড প্রদর্শন বা বহন বাধ্যতামূলক নয়।
নির্বাচনকালীন সরকারের শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল বলেছেন, নির্বাচন ছাড়া তাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। এ নির্বাচন বানচাল করার ক্ষমতা বিএনপি-জামায়াত জোটের নেই। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো ভোটকেন্দ্র পাহারা দেবেন। তিনি দেশবাসীকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থেকে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভোট বর্জনের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শুক্রবার রাতে ভিডিওবার্তা পাঠিয়েছেন। এরপর গতকাল বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান লন্ডন থেকে এক ভিডিওবার্তায় ভোট বর্জন, প্রতিরোধ ও প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে নয়, দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে ও দেশের অস্তিত্বের স্বার্থে আজকের ভোট প্রতিরোধ, প্রতিহত ও বর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে গতকাল দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবৃতি এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুকও সংবাদ সম্মেলন করে একই আহ্বান জানিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ১২টি এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। ৬৩ আসনের ব্যালট পেপারে তাদের দলীয় প্রতীক থাকলেও কতজন নির্বাচনে রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। এমনকি দলীয় প্রধানসহ বেশ ক'জন গুরুত্বপূর্ণ নেতার অবস্থান নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি রয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে আদালতের রায়ে অভিযুক্ত এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। ফলে তারা এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তারাও নির্বাচন ঠেকাতে ভয়াবহ সহিংসতা চালিয়ে আসছে।
দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এবারেই বিপুলসংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে ৪৯ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এবার রাজধানীর ১৫টি আসনের মধ্যে ভোট গ্রহণ হবে মাত্র ৮টি আসনে। নির্বাচনকে ঘিরে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অতীতের যে কোনো রেকর্ড এবার ছাড়িয়ে গেছে।
গতকাল ইসি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, 'রাজনৈতিক সংকট সমাধানের দায়িত্ব কার, সেটা আমার বলা ঠিক হবে না। দেশবাসী ও ইতিহাস তা বিচার করবে।' সাম্প্রতিক সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে নাশকতার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলো তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করে ভোট গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হবে। বিশেষ প্রয়োজনে অল্প কিছু কেন্দ্র পরিবর্তন করা হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। ইসির পক্ষ থেকে গতকালও ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে ভোটারদের কাছে এসএমএস পাঠানো হয়েছে।
দিনভর নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি মনিটর করতে চার নির্বাচন কমিশনারকে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন সিইসি। আজ তারা নিজ কার্যালয়ে বসেই এ দায়িত্ব পালন করবেন। এতে ঢাকা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মো. আবদুল মোবারককে। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মো. শাহনেওয়াজকে। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাবেদ আলী ও রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন মো. আবু হাফিজ।
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা :বর্তমান নবম সংসদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২৪ জানুয়ারি। সংবিধানের ১২৩(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদপূর্তির ৯০ দিন আগে নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও দশম সংসদের নির্বাচিতরা কবে নাগাদ শপথ গ্রহণ করবেন বা কার্যভার গ্রহণ করবেন তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের বিজয় ও সরকার গঠন সময়ের ব্যাপার। তবুও সরকার গঠনের দিনক্ষণ নিয়ে জোটের নীতিনির্ধারক মহলে রয়েছে ভিন্নমত।
তফসিলের পর সহিংসতা :২৫ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সিইসি দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। পরদিন থেকেই নিয়মিত বিরতিতে দেশজুড়ে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করে আসছে বিরোধী জোট। ২৬ নভেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত তারা ৫০১ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে। ২৯ ও ৩০ নভেম্বর 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি' কর্মসূচি পালন করে তারা। ১ জানুয়ারি থেকে চলছে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশব্যাপী অবরোধ। এরই মধ্যে শনিবার সকাল থেকে টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের ডাকও দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচি পালনে শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অসংখ্য যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গাছ কেটে সয়লাব করা হয়েছে। দু'দিন ধরে ভোটকেন্দ্র টার্গেট করে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
ঢাকার ৯টি আসনে ভোট :সিটি করপোরেশন এলাকার ১৫টিসহ রাজধানী ঢাকা জেলার আসনসংখ্যা ২০টি। এর মধ্যে আজ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন ৯টি আসনের ভোটাররা। সিটি করপোরেশন এলাকার ৭টি ও জেলার ৪টি আসনের ভোটাররা এবার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর মধ্যে ঢাকা-৪, ঢাকা-৬ ও ঢাকা-১৭ আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নেই। ঢাকা-১৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা তিন প্রার্থী ওই এলাকার অধিকাংশ ভোটারের অপরিচিত। বর্তমানে এই আসনের এমপি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
ভোটার ও ভোটকেন্দ্র :ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছেন ১২টি রাজনৈতিক দলের ৩৯০ প্রার্থী। সংসদ নির্বাচনে মোট আসন ৩০০। ভোট হবে ১৪৭ আসনে। ১৫৩ আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। ভোটার সংখ্যা ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭৭ জন। নারী ভোটার ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪১ হাজার ৯০৫ জন। পুরুষ ভোটার ৪ কোটি ৬১ লাখ ২৪ হাজার ৭২ জন। ১৪৭ আসনে মোট ভোটার ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৮ হাজার ৭২৪। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ কোটি ২০ লাখ ৬ হাজার ৮২৬ জন। নারী ভোটার ২ কোটি ১৯ লাখ ১ হাজার ৯২৮। মোট ভোটকেন্দ্র ৩৭ হাজার ৭০৭। ভোটকক্ষ ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮। ১৪৭ আসনে ভোটকেন্দ্র ১৮ হাজার ২০৮টি। ভোটকক্ষ ৯১ হাজার ২১৩টি। ৩০০ আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ৬৬ জন, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ৫৭৭ জন। ১৪৭ আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ৬১ জন, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ২৮৭ জন। যেসব জেলায় ভোট নেই এর মধ্যে রয়েছে চাঁদপুর, রাজবাড়ী, জয়পুরহাট, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর। মোট প্রতিদ্বন্দ্বী (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ১৫৩ জনসহ) ৫৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫১৬ ও নারী ২৭। ১৪৭ আসনে প্রার্থী ৩৯০ জন। ১৪৭ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ১২০, স্বতন্ত্র ১০৪, জাতীয় পার্টির ৬৬, জেপির ২৭, বিএনএফের ২২, জাসদের ২১, ওয়ার্কার্স পার্টির ১৬ জন। এ ছাড়াও ন্যাপের ৬, তরীকত ফেডারেশনের ৩, খেলাফত মজলিসের ২, গণতন্ত্রী পার্টির ১, গণফ্রন্টের ১ এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ১ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া ১২৭ জন আওয়ামী লীগের, ২০ জন জাতীয় পার্টির, ৩ জন জাসদের, ২ জন ওয়ার্কার্স পার্টি ও ১ জন জেপির।
সেনাবাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি :খোদ নির্বাচন কমিশনই প্রায় ১৮ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০ হাজার কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভোটের পরও অধিক সময় সেনাবাহিনীকে মাঠে রাখার কথাও জানিয়েছেন সিইসি। গতকাল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রের চারপাশে ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সেনাসদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। তবে বিরোধী জোটের নির্বাচন বয়কটের মধ্যে নাশকতার আশঙ্কা করেছেন গোয়েন্দারা। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শেরপুর, নেত্রকোনা, সাতক্ষীরা, যশোর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও হবিগঞ্জ জেলার এক বা একাধিক আসনকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে।
এবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মধ্যে আনসার ২ লাখ ১৮ হাজার ৫০০, পুলিশ ৮০ হাজার, সশস্ত্র বাহিনী ৫২ হাজার ১০০, বিজিবি ১৬ হাজার ১৮১, র‌্যাব ৮ হাজার ৪০৪ ও কোস্টগার্ডের ২০০ জন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১৫ থেকে ১৮ জন করে নিরাপত্তা রক্ষী থাকবেন। ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি ১০৩টি। নির্বাচন পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ১৩ হাজার ৩৪১ (প্রাথমিক)।
কঠোর নিরাপত্তা ভোটকেন্দ্রে :নির্বাচন কমিশন গত বুধবার ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনী মালপত্রের সুরক্ষায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কেউ যাতে আক্রমণ করে নির্বাচনী মালপত্র নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য ভোটকেন্দ্রের চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রসংলগ্ন রাস্তায় সব ধরনের যানবাহন ও জনসাধারণের চলাচল সীমিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভ্রাম্যমাণ দল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের টহল জোরদার করতে হবে।
হেলিকপ্টার ব্যবহার করবে র‌্যাব :আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব হেলিকপ্টার ব্যবহার করবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইসি সচিবালয় ও বাহিনীগুলোর অনুরোধে বিমানবাহিনী প্রয়োজনীয়সংখ্যক হেলিকপ্টার পরিবহনে সহায়তা দেবে। প্রয়োজনীয়সংখ্যক হেলিকপ্টার সুবিধাজনক স্থানে মোতায়েন রাখবে বিমানবাহিনী। সেনা সদরের বিবেচনায় প্রতিটি স্তরে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সেনাসদস্য রিজার্ভ হিসেবে মোতায়েন থাকবেন। তা ছাড়া দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাচন কর্মকর্তা, নির্বাচনী মালপত্র পাঠাতেও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হবে।
ফলাফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্র স্থাপন :রিটার্নিং অফিসারদের থেকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ভোট গ্রহণ চলাকালে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ভোট গ্রহণ শেষে প্রাথমিক বেসরকারি ফলাফল সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে ইসি সচিবালয়ে একটি 'ফলাফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্র' স্থাপন করা হয়েছে। আজ সকাল ৮টা থেকে সর্বশেষ বেসরকারি ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত এ কেন্দ্রের কর্মীরা কাজ করবেন। এ ছাড়া রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আরএমএস) পদ্ধতিতে ইন্টারনেটের মাধ্যমেও সারাদেশের ফলাফল সংগ্রহ করবে কমিশন। ইতিমধ্যে সারাদেশে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে এ জন্য সফটওয়্যার বিতরণ করা হয়েছে।
ফলাফল পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণকারী দলকে ইসির আমন্ত্রণ :নির্বাচনের ফলাফল পর্যবেক্ষণের জন্য অংশগ্রহণকারী ১২টি দলকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গত শুক্রবার রাতে কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. ফরহাদ হোসেন স্বাক্ষরিত এ চিঠিটি দলগুলোর সংশিল্গষ্ট দফতরে পাঠানো হয়। চিঠিতে জানানো হয়, নির্বাচনের ফল পর্যবেক্ষণে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে ১২টি বুথ বসানো হবে। সকাল ৮টা থেকে শুরু করে ওই বুথগুলোতে প্রতিটি দলের প্রতিনিধিরা ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবেন। সেখান থেকে ফলাফলের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করতে পারবেন দলগুলোর দায়িত্বরত প্রতিনিধিরা।
ইতিহাস :দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এবারেই বিপুলসংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনে ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। সেখানে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতসহ বড় কোনো দল অংশ নেয়নি। সে সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন। কার্যদিবস ছিল মাত্র ৪টি। ভোটার উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ২৬ দশমিক ৭৪ ভাগ। একইভাবে ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। ৮টি দলের ৯৭৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অব্যাহত আন্দোলনের মুখে ২ বছরের মাথায় ওই সংসদের বিলুপ্তি ঘটে।
২০০৭ সালেও বিএনপি একতরফা নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। তফসিলও ঘোষণা করা হয়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৯ জনকে এক প্রকার বিজয়ী ঘোষণা করা হয়; কিন্তু পরে জরুরি অবস্থা জারি হয়। ভোট গ্রহণ আর হয়নি।

জাতীয় পার্টির লড়াই হবে ৩৩ আসনে by রাজীব আহাম্মদ

৬৪ আসনের ব্যালটে লাঙ্গল প্রতীক থাকলেও ভোটের লড়াই হবে দলটির ৩৩ আসনে। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ বাকি ৩৯ জনের প্রার্থিতা থাকলেও ভোটযুদ্ধে নেই তারা। তাদের কেউ সরে দাঁড়িয়েছেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে। আবার কেউ সরে দাঁড়িয়েছেন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে 'ছাড়' না পেয়ে। জাতীয় পার্টির মোট প্রার্থীর সংখ্যা ৮৪। তবে এর মধ্যে ২১ জন আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। আজ যে ১৪৭ আসনে ভোট লড়াই হবে তার ৬৪টিতে আছেন দলটির প্রার্থীরা। যে ৩৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন তাদের ৯ জনকে লড়তে হবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। ১০ জনকে লড়তে হচ্ছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিপক্ষে। বিএনএফ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জেপি ও তরীকত ফেডারেশনের প্রার্থীদের বিপক্ষে লড়তে হবে ১৪ আসনে। এবারের নির্বাচনে ৪৮টি আসনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে ২১টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলটির প্রার্থীরা জয় পেয়ে যায়। আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ছাড় পাওয়া বাকি ২৭ আসনের ২৪টিতে স্বতন্ত্র ও অন্য দলের বিপক্ষে লড়বেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। অন্য তিন আসনে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ছাড় পেলেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা।
এরশাদ ও তার ভাই জিএম কাদের নির্বাচনে না থাকলেও এরশাদপত্নী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এ ৩৩ প্রার্থী। দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমীন এরশাদের নির্দেশে নির্বাচন বর্জনের কথা বললেও গতকালও তিনি নির্বাচনী এলাকা পটুয়াখালী-১ আসনে যান। তবে দাবি করেন, ভোট চাইতে নয়, মাজার জিয়ারতে গিয়েছিলেন। কিন্তু দিনভর আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন তিনি। তার বিপক্ষে প্রার্থী থাকলেও ভোটের মাঠে তৎপরতা নেই।
জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ভোটের লড়াইয়ে আছেন পঞ্চপড়-১, ঠাকুরগাঁও-৩, নীলফামারী-১ ও ৩, কুড়িগ্রাম-১, বগুড়া-৪ ও ৭, রাজশাহী-৩, পটুয়াখালী-১, বরিশাল-৩, জামালপুর-৪, ময়মনসিংহ-৭, কিশোরগঞ্জ-৩, ঢাকা-১, ৪ ও ৬, সিলেট-২ , মৌলভীবাজার-২, হবিগঞ্জ-৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও ৫, কুমিল্লা-১, ৩ ও ৪, ফেনী-৩, নোয়াখালী-৬, লক্ষ্মীপুর-১ ও ৪, চট্টগ্রাম-৩, ৯ ও ১৩, কক্সবাজার-৪ এবং পার্বত্য খাগড়াছড়ি আসনে।
আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি উভয় দলেরই প্রার্থী রয়েছেন এমন আসনের সংখ্যা ৩৭টি। তবে এর মধ্যে মাত্র ৯টিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভোটের মাঠে আছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। এ আসনগুলোতে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা হলেন নীলফামারী-১ জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, নীলফামারী-৩ কাজী ফারুক কাদের, রাজশাহী-৩ শাহাবুদ্দিন, ঢাকা-১ সালমা ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ মামুনুর রশিদ, নোয়াখালী-৬ আনোয়ারুল আজিম, লক্ষ্মীপুর-১ মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান, লক্ষ্মীপুর-৪ বেলাল হোসেন এবং কক্সবাজার-৪ তাহা ইয়াহিয়া।
তবে জোর লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে ঢাকা-১ আসনে। এখানে জাতীয় পাটির প্রার্থী সর্বদলীয় সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সালমা ইসলাম। আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান। লক্ষ্মীপুর-১ আসনে নৌকার বিরুদ্ধে লড়াই হলেও এখানে লাঙ্গলের প্রতিদ্বন্দ্বী তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব এমএ আউয়াল। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জয় পাওয়া কঠিন জেনেও কক্সবাজার-৪-এর তাহা ইয়াহিয়া জানান, সুষ্ঠু ভোট হলে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছেন জাতীয় পার্টির কুড়িগ্রাম-১ আসনে একেএম মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ-৭ এমএ হান্নান, কিশোরগঞ্জ-৩ মজিবুল হক চুন্নু, ঢাকা-৪ সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সিলেট-২ মো. ইয়াহিয়া, মৌলভীবাজার-২ মহিবুল কাদের চোধুরী, কুমিল্লা-১ জায়েদ আল মাহমুদ, কুমিল্লা-৩ আক্তার হোসেন, কুমিল্লা-৪ ইকবাল হোসেন রাজু এবং ফেনী-৩ আসনে রিন্টু আনোয়ার।
ময়মনসিংহ-৭-এ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী দলটির সাবেক এমপি মাওলানা রুহুল উল্লাহ মাদানী। তিনি জানান, সুষ্ঠু ভোট হলে জাতীয় পার্টির জামানত থাকবে না। জোটের কারণে তার মতো একজন ভুঁইফোড় নেতা মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ হান্নানের আশাবাদ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী তার সঙ্গেই থাকবেন। তিনিই জয়ী হবেন।
উপরের ১৯ আসনে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হলেও ১৪টি আসনে ছোট ছোট দলের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের আশা করতে পারে জাতীয় পার্টি। পঞ্চপড়-১ আবু সালেকের প্রতিদ্বন্দ্বী জাসদ, ঠাকুরগাঁও-৩ হাফিজ উদ্দিন আহমেদের প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ার্কার্স পার্টি। বগুড়া-৪ নুরুল আমিন বাচ্চুর প্রতিদ্বন্দ্বী জাসদ, বগুড়া-৭ আলতাফ আলীর প্রতিদ্বন্দ্বী জেপি, পটুয়াখালী-১ এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদারের প্রতিদ্বন্দ্বী দুর্বল স্বতন্ত্র প্রার্থী, বরিশাল-৩ গোলাম কিবরিয়া টিপুর প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ার্কার্স পার্টি, জামালপুর-৪ ইঞ্জিনিয়ার মামুনুর রশীদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনএফ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ জিয়াউল হক মৃধার প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি ছোট দলের প্রার্থী, লক্ষ্মীপুর-১ মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী তরীকত, চট্টগ্রাম-৩ এমএ ছালামের প্রতিদ্বন্দ্বী জাসদ, চট্টগ্রাম-৯ জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনএফ, চট্টগ্রাম-১৩ তপন চক্রবর্তীর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনএফ এবং পার্বত্য খাগড়াছড়িতে সোলায়মান আলম শেঠের প্রতিদ্বন্দ্বী আদিবাসী দুটি দলের প্রার্থী।
জাতীয় পার্টি সব আসনে ভোটের লড়াইয়ে না থাকলেও যে আসনগুলোতে নির্বাচন হচ্ছে সেখানে ভালো ফল করবে বলে আশাবাদী দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। ৩৩ আসনের অন্তত ২০টিতেই লাঙ্গল জয়ী হবে বলে ধারণা করছেন সর্বদলীয় সরকারের এ মন্ত্রী।

জামায়াতকে বর্জন করে পরবর্তী নির্বাচনের আলোচনায় বসুন

(অর্থনীতি সমিতির গোলটেবিল বৈঠকে আহ্বান) বর্তমান সংকট ও তার উত্তরণ বিষয়ে এক আলোচনায় বিশিষ্ট নাগরিকরা পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়োজনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে। এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনার আর অবকাশ নেই। এখন পরবর্তী নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে দুই নেত্রী আলোচনা শুরু করুক। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সংগঠন জামায়াতে ইসলামী থাকতে পারবে না। কোনোভাবেই জামায়াতের সঙ্গে আপস হতে পারে না। বক্তারা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবির দেশব্যাপী হত্যাসহ যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে তার সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। জামায়াত-শিবির মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বন্ধ করতে '৭১ সালের মতো মানুষ হত্যা করছে। তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ হতে পারে না। রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের নিষিদ্ধ করতে হবে। তাদের সন্ত্রাস রুখে দিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তারা। রাজধানীর গুলশানে হোটেল লেকশোরে গতকাল শনিবার বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি 'সহিংস রাজনীতি, সংকটে দেশ : ভবিষ্যৎ ভাবনা' শিরোনামের এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাতের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের আলোচকদের অনেকেই বলেন, এখনকার সহিংসতার কারণ শুধু নির্বাচন নয়; যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ায় জামায়াত-শিবির দেশে পরিকল্পিত সন্ত্রাস চালাচ্ছে। বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের একটি অংশ এর প্রতিবাদ না করে নির্বাচন স্থগিতের দাবি করছেন। তারা জামায়াতের সহিংসতাকে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের দাবির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। বৈঠকে বেশ কয়েকজন আলোচক জামায়াতে ইসলামী এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেন। কেউ কেউ বলেন, জামায়াতকে বাদ দিয়ে দু'দল আলোচনায় বসুক। সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে জামায়াতের এজেন্ডা আর নির্বাচন পদ্ধতির প্রশ্নে বিএনপির এজেন্ডা এক নয় বলে মনে করেন তারা।
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, দেশে সন্ত্রাসের রাজনীতি শুরু হয়েছে। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে তা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিয়ে এ সহিংসতা মোকাবেলা করতে হবে। নির্বাচন প্রশ্নে সমঝোতা হলেই সংকট শেষ হবে তা নয়। বিষয়টি এখন জনগণের বেঁচে থাকার সংকটে পরিণত হয়েছে। এখানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয় চেতনাসহ প্রত্যেকটি বিষয় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দেশে যা চলছে তা ভবিষ্যতের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। দেশে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা চলছে কি-না তাই মুখ্য বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ভোটার হত্যা করে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সব সময়ই কাম্য। কিন্তু বুঝতে হবে, যারা একে কেন্দ্র করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে চাইছে, তাদের উদ্দেশ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বন্ধ করা। তারা সন্ত্রাস করছে । তাদের অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে।
অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, যুদ্ধাপরাধীর বিচার ঠেকাতে এ সহিংসতা। এটি কোনোভাবেই হতে দেওয়া যায় না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাওয়ার আগে সমঝোতা কয়েকটি শর্ত দিয়ে হতে পারে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা, জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখা, দুর্নীতি দমন এবং সহিংসতা বন্ধ করার শর্ত মেনে সমঝোতায় যারা আসতে চান কেবল তাদের সঙ্গে সংলাপ হতে পারে । তিনি বলেন, জঙ্গিবাদের অর্থনীতি দৃঢ় ভিত্তি পেয়েছে। এখনই দমন করতে না পারলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার, এভাবে সহিংসতা চলতে থাকলে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে।
অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত বলেন, অর্থনীতির মধ্যে আরেকটি মৌলবাদী অর্থনীতি দাঁড়িয়ে গেছে। অর্থনীতি দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর অধীনে এখন ১২৫টি জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। ইসলামী ব্যাংক, বীমাসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে এদের অর্থের জোগান দেওয়া হয়। এসব দিয়ে জামায়াত গৃহযুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এই অপশক্তিতে রুখতে হবে। তিনি আরও বলেন, গত এক মাসে জামায়াতের সহিংসতায় পরিমাপযোগ্য ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে এক লাখ কোটি টাকা। দেশের কৃষক-শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশির ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতির প্রকৃত অবস্থা আগামী এক বছরের মধ্যে টের পাওয়া যাবে।
বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল বলেন, যখন বুদ্ধিজীবীরা নির্বাচন বন্ধ করতে এমনকি জামায়াতকেও নির্বাচন করতে দেওয়ার কথা বলেন তখন তিনি হতাশ হন। তার মতে, সমাধানের আগে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। প্রথমে জামায়াতকে পরিত্যাগ করতে হবে। তারপর আলোচনায় বসতে হবে। সহিংসতা বন্ধ না করলে নির্বাচন নিয়ে কথা বলার অধিকার নেই। তার ভাষায়, 'আমি সুশীল-বুদ্ধিজীবী হতে চাই না। আমার ফিল্টার হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। এই ফিল্টার দিয়ে আমি বিচার করি কার সঙ্গে থাকব কি থাকব না। জামায়াতকে কিছু বুদ্ধিজীবী লাই দিচ্ছেন, যা সত্যিই বিরক্তিকর।' তিনি বলেন, দুঃখ হয়, বড় বড় দু'একটি পত্রিকা তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তারা কি বাংলাদেশের মানুষ নন_ প্রশ্ন রাখেন তিনি। নির্বাচন বন্ধে দুটি পত্রিকায় প্রকাশিত একই লেখার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, একই লেখা ইংরেজিতে ছাপা হয়ে পরের দিন বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন বন্ধের দায়িত্ব তাদের কে দিয়েছে_ প্রশ্ন রাখেন তিনি। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'তোমাদের আওয়ামী লীগ-বিএনপি করতে হবে না, সুশীল হতে হবে না, বাংলাদেশকে ভালোবাসলেই হবে।' জাফর ইকবাল তার বক্তব্যে ১৬ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠানে ইইউ কূটনীতিকদের অংশগ্রহণ না করার সমালোচনা করেন।
মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, চলমান সহিংসতা আসলে নির্বাচনের জন্য নয়। এটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থামানোর জন্য হচ্ছে। সাঈদীর রায়ের পরে দেশে যা হয়েছিল তা কোনোভাবেই নির্বাচনের জন্য ছিল না। আমাদের প্রধান বিবেচ্য স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস। এর বাইরে গিয়ে কোনো মীমাংসা হতে পারে না।
২৯ ডিসেম্বর টিআইবিসহ ৪টি প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে সংলাপে নির্বাচন স্থগিতের যে সুপারিশ করা হয় গতকালের আলোচনা সভার কয়েকজন বক্তা তার সমালোচনা করেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে এ বিষয়ে বলেন, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। ২৯ ডিসেম্বরের আলোচনায় আয়োজকরা নিজেরা কোনো সুনির্দিষ্ট অবস্থান ঘোষণা করেননি। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের মধ্যে জামায়াতও থাকতে হবে, তা তিনি মনে করেন না। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠান সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে সঠিক থাকলেও তা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়_ এমন কথা সরকারের মন্ত্রীরাও বলছেন। তিনি বলেন, রোববার নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে। তাই এখন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে দুই নেত্রীর মধ্যে আলোচনা হতে পারে। এর জন্য অনতিবিলম্বে একটি সময় ঠিক করা যেতে পারে। তিনি বলেন, দেশ বর্তমানে অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সরকারকে কোনো পথ দেখাতে পারছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সঙ্গে আগামীকালের ( ৫ জানুয়ারি) নির্বাচনের তুলনা করা ঠিক হবে না। এ নির্বাচনে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। প্রায় ৬০ ভাগ ভোটার ভোট দিতে আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। '৯৬-এর নির্বাচনে মাত্র ২৬ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কিন্তু তা সফল হবে না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, লক্ষ্য এক না থাকলে সংলাপ ফলপ্রসূ হয় না। এ কারণে খালেদা-হাসিনার সংলাপ ফলপ্রসূ হবে না। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আপসের বিষয় নয়। নাগরিকরা যারা মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশে বিশ্বাস করেন তাদের সংহতির বড়ই দরকার। তারা যদি সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন তাহলে সংঘাত কমে আসবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক হারুন-অর রশিদ বলেন, সহিংসতা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয়। জামায়াত ও বিএনপির অবস্থান এক হয়ে গেছে। এ কারণে বিএনপি নির্বাচনে আসছে না। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নির্বাচন শেষ করে একাদশ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ব্যক্তির বিচার হলে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত সংগঠন জামায়াতের বিচারের পথে বাধা থাকা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি।
পরিবেশ আইনজীবী রিজওয়ানা হাসান বলেন, হরতাল ও অবরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সুশীল কিংবা নাগরিক সমাজের রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে। কিন্তু যে কোনো কিছুতেই বিভক্ত না হয়ে জনগণের সমস্যার বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলকে তারা চাপের মধ্যে রাখলে সংকট সমাধানে তা সহায়তা করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, যদি আরেকটি ২১ আগস্ট ঘটিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যা করা হয় তাহলে অসাম্প্রদায়িক চেতনার লোকজনকে কচুকাটা করা হবে। তিনি ইসলামী ব্যাংকসহ জামায়াতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয়করণ দাবি করেন। আর কত সন্ত্রাস হলে জামায়াত নিষিদ্ধ হবে_ প্রশ্ন রাখেন তিনি। তথ্য কমিশনার ড. সাদেকা হালিম নির্বাচন কমিশন ও দুদককে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন।
ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। একটা অভ্যুত্থানের আশায় তারা জামায়াত-শিবিরকে নামিয়েছিল। কিন্তু তা সফল হয়নি। তা না হলেও একটি সামরিক শাসন আসবে বলে তারা মনে করেছিল। তাও হয়নি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুল মান্নান বলেন, এখনকার সংকট যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে। ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি ৪২ বছরে দেশের উন্নয়নকে সইতে পারছে না। তারা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে। বৈঠকে এফবিসিসিআই সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন চলমান সহিংসতায় ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে জোট পরিহারের আহ্বান জানান।
বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি কখনোই সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার পেতে পারে না। নারী নেত্রী রোকেয়া কবীর বলেন, যারা জনগণকে পুড়িয়ে মারছে তাদের জন্য সমান মাঠ তৈরির পরামর্শ কূটনীতিকদের পক্ষ থেকেও আসছে। তাদের এই অবস্থান দুঃখজনক। আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিয়া রহমান, রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহমদ আল কবির, সাংবাদিক নঈম নিজাম, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আবদুর রশিদ প্রমুখ।

চাল ডাল তেল দিয়ে ফুরফুরে লতিফ! by আনোয়ার রোজেন

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উড়ে এসে জুড়ে বসেছিলেন এমএ লতিফ। এমপি নির্বাচিত হয়ে দিয়েছিলেন চমকও। পাঁচ বছর নানা কাজ করে এ চমক জিইয়ে রেখেছিলেন তিনি। কখনও রাস্তার ওপরে প্রকাশ্যে পিটিয়েছেন পুলিশকে। কখনও বন্দরে গিয়ে শাসিয়ে এসেছেন কর্মকর্তাদের। ভোটারদের কথা বিবেচনা করে গত পাঁচ বছরে ব্যতিক্রমী কাজও করেছেন তিনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সবাই যখন দিশেহারা তখন সুলভ মূল্যে তা এলাকার বাসিন্দাদের কাছে সরবরাহ করেছেন তিনি। পুরো পাঁচ বছর এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় এবারের নির্বাচনে অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে আছেন লতিফ। অবশ্য ফুরফুরে মেজাজে থাকার অন্য একটা কারণও আছে। আজকের নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে নেই শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী!
জাসদের জসিম উদ্দিন ও জাতীয় পার্টির (জাপা) কামাল উদ্দিন চৌধুরী লড়ছেন লতিফের সঙ্গে। প্রার্থী হিসেবে তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই। আবার প্রার্থী হিসেবে নেই আওয়ামী লীগেরও কোনো বিদ্রোহী। অথচ গতবার এ আসন থেকে এমপি হলেও মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন লতিফ। বন্দরের শ্রমিক রাজনীতি নিয়ে এ দ্বন্দ্বের সূচনা। অনেকের ধারণা ছিল, লতিফকে শিক্ষা দিতে এবার এ আসনে প্রার্থী হবেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। আবার এ আসন থেকে প্রার্থী হতে প্রচারণা চালিয়েছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজনও। মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে সখ্য আছে সুজনের। তাই রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন ছিল, মহিউদ্দিন নিজে না দাঁড়ালেও এ আসনে প্রার্থী করবেন তার পছন্দের সুজনকে। শেষ পর্যন্ত তার কোনোটিই না হওয়ায় এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত লতিফ।
চট্টগ্রাম বন্দর-পতেঙ্গা আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৯। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ৫৮১, নারী ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৮। এসব ভোটারের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। এ আসনে দুটি ইপিজেডসহ রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। ইপিজেডে নিম্নবিত্ত পরিবারই বেশি। বছর ধরে লতিফের সুলভ মূল্যে দেওয়া চাল-ডাল-তেলের সুবিধা ভোগ করেছে এসব পরিবার। তাই ধারণা করা হচ্ছে, আজকের ভোটে এর প্রভাব পড়বে।
সরে দাঁড়ালেন জাসদ প্রার্থীও
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে জাসদ থেকে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী জসিম উদ্দিন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুরোধে গত শুক্রবার লতিফকে সমর্থন দিয়ে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান। এ কারণে নির্বাচনের মাঠে লতিফের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জসিম উদ্দিন বলেন, 'চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুরোধে আমি নির্বাচন থেকে সরে এসেছি।' একই বিষয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, '১৪ দলের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জসিম উদ্দিন।' উল্লেখ্য, জসিম উদ্দিন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় এ আসনে এখন লতিফের প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল জাপার কামাল উদ্দিন চৌধুরী।
ব্যতিক্রমী প্রচার
শুক্রবার সকাল ৮টার পর নির্বাচনী প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে যাওয়ায় বন্দর-পতেঙ্গা আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী এমএ লতিফ জুমার নামাজ পড়েন নিজ এলাকার ওয়ারিশ সওদাগরের বাড়ির মসজিদে। পরে মসজিদে দাঁড়িয়েই স্থানীয় মুরবি্ব আবদুর রহিম সওদাগরের কবর জেয়ারত করেন তিনি। এরপর ছুটে যান নিমতলা এলাকার বাসিন্দা জানে আলমের নামাজে জানাজায়। কিন্তু তিনি পেঁৗছার আগেই জানাজা শেষ হয়ে গেলে লাশের খাটিয়া ধরে লতিফ গেলেন জানে আলমের কবর পর্যন্ত। এমপি প্রার্থীকে এভাবে খাটিয়া ধরে এগোতে দেখে কিছুটা অবাক হন ভোটাররা। তাদের বিস্ময় বাড়াতে দাফন সম্পন্ন পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন লতিফ। এ সময় অনেকের সঙ্গেই তিনি কুশল বিনিময় করেন। কৌশলে চাইলেন ভোটও। এভাবেই গত পাঁচ বছর অনেক কৌশলী আচরণ করেছেন লতিফ।