Saturday, April 11, 2015

ওবামা-ক্যাস্ত্রো ‘ঐতিহাসিক’ করমর্দন

পানামায় গতকাল অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ত্রো পরস্পরের সঙ্গে করমর্দন করেছেন। তাদের এ করমর্দনকে দেখা হচ্ছে প্রতীকী অর্থেই। ঠা-া যুদ্ধের দুই শত্রু-রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘ঐতিহাসিক’ এ বৈঠককে। সুদীর্ঘ ৫৬ বছর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো দেশ দুটির মধ্যে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এদিকে ওবামা বলেছেন, লাতিন আমেরিকার ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র আর আগ্রহী নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার প্রসঙ্গ টেনে ওবামা বলেন, সেসব দিন এখন অতীত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৯৫৯ সাল থেকে দেশ দুটির মধ্যে যে শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছিল, প্রকৃত অর্থেই তার অবসান হবে এ বৈঠকের মাধ্যমে। একটি ছবিতে ওবামা ও ক্যাস্ত্রো উভয়কেই গাঢ় রঙের স্যুট পরিধান করতে দেখা গেছে। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অল্প কয়েক নেতার উপস্থিতিতে আলাপ-আলোচনা করছিলেন তারা। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ওবামা-ক্যাস্ত্রোর করমর্দন ও তাদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অনানুষ্ঠানিকভাবেই এ বৈঠক হয়। আশা করা হচ্ছে, আজ আবার ওবামা-ক্যাস্ত্রো সাক্ষাৎ করবেন এবং দুই শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পুনঃমিত্রতা স্থাপনে ফলপ্রসূ আলোচনায় অংশ নেবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং বাণিজ্য ও ভ্রমণকে উৎসাহিত করতে ও বাড়ানোর ব্যাপারে বৈঠক করবেন তারা। ১৯৫৯ সালের কিউবা বিপ্লবের সময় জন্মগ্রহণও করেননি ওবামা। সে সময় কিউবার রাজনীতিতে পরপর ক্ষমতায় আসেন বড় ভাই ফিদেল ক্যাস্ত্রো (৮৮) ও ছোট ভাই রাউল ক্যাস্ত্রো (৮৩)।

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। গতকাল রাত ১০টার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে কামারুজ্জামানের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে কামারুজ্জামানের লাশ তার জন্মস্থান শেরপুরে পাঠিয়ে দেয়া হবে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে।
কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরবিষয়ক সরকারের নির্বাহী আদেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে বেলা পৌনে ৩টায় কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছে।
দণ্ড কার্যকর উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হতে থাকে। বিপুলসংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ, কারারক্ষী এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। কারাগারের আশপাশ এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর থেকে পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে নির্দিষ্ট কয়েকটি রোডে পুলিশ, সাংবাদিক, প্রশাসনের যানবাহন ছাড়া সব গাড়ি এবং লোকজনকে বের হয়ে যেতে বলা হয়।
গতকাল বিকেল ৪টার দিকে কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যদের কারাগারে আসা উপলক্ষে দুপুরের পর থেকেই বিপুলসংখ্যক দেশী-বিদেশী সাংবাদিক জড়ো হন।
সন্ধ্যা ৭টার পর কারাগারে একটি অ্যাম্বুলেন্স (ঢাকা মেট্রো-চ ৭৪-০১২৭) প্রবেশ করে।
সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখারুজ্জামান প্রবেশ করেন। ৭টার দিকে প্রবেশ করেন অতিরিক্ত আইজিপি কর্নেল বজলুল কবির। সোয়া ৭টায় প্রবেশ করেন সহকারী সিভিল সার্জন আহসান হাবিব। পরবর্তীতে লালবাগ জোনের ডিসি, ইমাম এবং ফাঁসি কার্যকরের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যরা প্রবেশ করেন।
কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামি জানান, গতকাল সোয়া ১টার দিকে ডেপুটি জেল সুপার তাদেরকে ফোনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসতে বলেন কামারুজ্জামানের সাথে দেখা করার জন্য। বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে কামারুজ্জামানের ২২ জন নিকটাত্মীয় কারাগারে প্রবেশ করেন। সাক্ষাৎ শেষে ৫টা ২০ মিনিটে তারা বের হয়ে আসেন। কারাফটকের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের হাসান ইকবাল ওয়ামি জানান, তার বাবা প্রাণভিক্ষা চাননি। তিনি বলেছেন, প্রাণ দেয়ার এবং নেয়ার মালিক আল্লাহ। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার কোনো প্রশ্নই আসে না।
এর আগে গত ৬ এপ্রিল রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর ওই দিনই কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যদের কেন্দ্রীয় কারাগারে ডেকে আনে তার সাথে সাক্ষাতের জন্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিন রাতেই কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে মর্মে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিচারপতিদের স্বাক্ষরিত রায় কারাগারে না পৌঁছায় দণ্ড কার্যকর করা থেকে বিরত থাকে কর্তৃপক্ষ। এরপর ৮ এপ্রিল রিভিউ মামলার রায়ের কপিতে বিচারপতিদের স্বাক্ষর এবং তা ওই দিন কারাগারে পাঠানোর পর যেকোনো সময় ফাঁসি কার্যকর হতে পারে মর্মে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বলা হতে থাকে। কারাগার সূত্র এবং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় ফাঁসি কার্যকরের জন্য সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় ৯ এপ্রিল কামারুজ্জামানের সাথে দেখা করেন তার আইনজীবীরা। সাক্ষাৎ শেষে অ্যাডভোকেট শিশির মো: মনির সাংবাদিকদের জানান, কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না সে বিষয়ে তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে যথাসময়ে জানাবেন।
এরপর গত শুক্রবার সকালে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন দুইজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। কামারুজ্জামানের প্রাণভিক্ষা বিষয়ে জানার জন্য তারা কারাগারে যাচ্ছেন কি না সাংবাদিকেরা কারাফটকে জানতে চাইলে তারা এ বিষয়ে কোনো কিছু জানাতে অস্বীকার করেন।
১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এর আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
গত ৬ এপ্রিল সোমবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন। ৮ এপ্রিল রিভিউ রায়ের কপিতে স্বাক্ষর করেন চার বিচারপতি। এরপর গত রাতে কার্যকর করা হলো তার মৃত্যুদণ্ড।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দু’টি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেন। গত বছর ৩ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডের একটি অভিযোগ বহাল রাখেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। মৃত্যুদণ্ডের আরেকটি সাজা বাতিল করে যাবজ্জীবন করেন।
গত ৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়। এর মাধ্যমে আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে গত বছর ৩ নভেম্বর যে রায় দিয়েছিলেন তা চূড়ান্তভাবে বহাল থাকে।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ : ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
ট্রাইব্যুনালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাতটি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের রায়ে মোট পাঁচটিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়া হয়। দু’টি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, দু’টি অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং অপর আরেকটি অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়।
নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার এক মাসের মধ্যে আসামিপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করে। গত বছরের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখে রায় দেন। আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। ট্রাইব্যুনালের দেয়া আরেকটি মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন করা হয়।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছর ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
কামারুজ্জামানের আপিল শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেনÑ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী।
আপিল মামলায় কামারুজ্জামানের পক্ষে প্রধান আইনজীবী ছিলেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মো: মনির।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালে শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি জি কে এম ইনস্টিটিউশন থেকে চার বিষয়ে লেটারসহ প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭২ সালে ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৭৩ (১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত) সালে তিনি ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে কৃতিত্বসহ বিএ পাস করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে কামারুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন।
১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে এ দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি দীর্ঘ দিন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদকসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। জামায়াতে যোগ দেয়ার আগে তিনি ১৯৭৮-৭৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৮০ সাল থেকে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। দীর্ঘ দিন তিনি দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন।
কামারুজ্জামান এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলনে লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন।
একজন লেখক এবং সুবক্তা হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। তার পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে

পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই পরাজিত করবে : খোকন

আসন্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী সাঈদ খোকন বলেছেন, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সাথে আমাদের এই নির্বাচনী যুদ্ধ। এই নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই আমাদের পরাজিত করবে।
আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের সাথে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ। তবে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ‘বিতর্কিত’দের সমর্থন দেয়াকে কেন্দ্র করে সভায় ব্যাপক হৈ-চৈ ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজের সভাপতিত্ব ও সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের পরিচালনায় এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমন্বয়ক ড. আবদুর রাজ্জাক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকন, সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, ফজলে নূর তাপস, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম বাবু, সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, হাবিবুর রহমান সিরাজ, ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম প্রমুখ।
সাঈদ খোকন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ৭১’র পরাজিত শক্তির কাছে পরাজিত হওয়ার কারণ নেই। আমি বিশ্বাস করি, ঢাকাবাসী অতীতের মত আমাদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেবে না।
তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। পৃথিবীর কোনো শক্তি নাই আমাদের পরাজিত করে। আপনারা ধৈর্য্য ধরবেন। সবাই মিলে কাজ করবেন।
এসময় বিএনপির হরতাল-অবরোধে মানুষ হত্যার বিচারের আহ্বান জানিয়ে সাঈদ খোকন বলেন, গত তিন মাসে তারা একজন নয়, দু’জন নয়, শতাধিক নিরাপরাধ মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছে। এর কি কোনো বিচার হবে না? ২৮ এপ্রিল সিটি নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে আপনারা এ বিচার প্রক্রিয়া শুরু করবেন।
বাবার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, যে বন্ধন, আবেগ ঢাকার সাথে আমার ও আমার পরিবারের তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। এর স্বীকৃতি স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। একটি করে ভোট প্রার্থনা করে আমাকে বিজয়ী করেন। বাসযোগ্য একটি ঢাকা আপনাদের উপহার দিতে পারব।
ব্যাপক হৈ-চৈ ও হাতাহাতি
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ‘বিতর্কিত’দের সমর্থন দেয়াকে কেন্দ্র করে সভায় ব্যাপক হৈ-চৈ ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।
সভার শুরুতেই দফায় দফায় মঞ্চে প্রার্থীদের সাথে হাতাহাতি হয়। পরে নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও উত্তপ্ত থাকে দর্শক সারি। নেতারা দফায় দফায় শান্ত করতে চাইলেও কোনো লাভ হয়নি। পরে দ্রুত বক্তব্য দিয়ে সভা শেষ করার কৌশল নেন আয়োজকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২১ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন প্রত্যাশী ছিলেন ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। তার পরিবর্তে সেখানে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে এম এ হামিদকে। এম এ হামিদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুর লোক বলে দাবি করছে আসাদের সমর্থকরা। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ফালুর সাথে হামিদ ও তার পরিবারের একান্ত ছবিও প্রকাশ করে তারা। ৮ এপ্রিল আওয়ামী সমর্থিত কাউন্সিলরদের তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই ক্ষোভে ফুঁসছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যার প্রকাশ্য রূপ নেয় আজকের এ মতবিনিময় সভায়। তাদের স্লোগানের ভাষা ছিল, হামিদকে মানি না, মানব না। আসাদ ভাই, আসাদ ভাই। বিএনপি নেতাকে মানি না, মানব না। আসাদ ভাই, আসাদ ভাই। ২২ থেকে ২৭ বছরের তরুণদেরকে গায়ের পোষাক খুলেও স্লোগান দিতে দেখা গেছে।

‘প্রাণের মালিক আল্লাহ, প্রেসিডেন্ট নন’ -কামারুজ্জামান

কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে জেল গেটে স্বজনেরা
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামান বলেছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ প্রাণ দেয়ার মালিক আল্লাহ, নেয়ার মালিকও তিনি। রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষা দেয়ার কে? আল্লাহর কাছেই প্রাণভিক্ষা চাইব।
আজ শনিবার বিকেলে পরিবারের সদস্যরা কারাগারে কামারুজ্জামানের সাথে সাক্ষাত করতে গেলে তিনি তাদের কাছে একথা বলেছেন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন তার বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী। সাক্ষাত শেষে বিকেল পাঁচটা ১০ মিনেটে কারাগার থেকে বের হন তারা। এর আগে বিকেল চারটা পাঁচ মিনিটে কামারুজ্জামানের সাথে দেখা করতে কারাগারে প্রবেশ করেন পরিবারের ২১ সদস্য।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার গেট থেকে সামান্য দূরে এসে কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী সাংবাদিকদের আরো বলেন, তার পিতা সুস্থ আছেন এবং মানসিকভাবে দৃঢ় আছেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের হাসিমুখে বিদায় দিয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও হাসিমুখে বিদায় নিয়েছেন। তার মনোবল দৃঢ় আছে। তিনি সুস্থ আছেন। ফাঁসির ব্যাপারে তিনি মোটেও বিচলিত নন।
ওয়ামী বলেন, কামারুজ্জামান বলেছেন, ‘দুইজন ম্যাজিস্ট্রেট গতকাল শুক্রবার আমাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করেননি। এমনকি তারা কথাও বলেননি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মিথ্যাচার করেছেন।’ এ ছাড়া ১৮ বছরের ছেলেকে যুদ্ধাপরাধী সাজিয়ে সরকার স্বার্থ হাসিল করছে বলেও পরিবারকে জানিয়েছেন কামারুজ্জামান।
ওয়ামী অভিযোগ করেন, সরকার প্রাণভিক্ষার নামে গত কয়েকদিন ধরে তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সময়ক্ষেপণ করেছে। কামারুজ্জামান সুস্থ এবং সবল আছেন। তিনি এদেশে ইসলামী আন্দোলনের বিজয় কামনা করেছেন।
কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে জেল গেটে স্বজনেরা
কামারুজ্জামানের ছেলে আরো বলেন, ‘আমার বাবা বলেছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিচারপতিরা মিথ্যা সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার জন্যই আমাকে ফাঁসি দিচ্ছে। এটি একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। আল্লাহ তাদের কেয়ামতের ময়দানে বিচার করবেন।’
শেষ ইচ্ছা হিসেবে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবির বাংলাদেশের মাটিতে ইসলাম কায়েম করবে এমনটাই আশা করেন তিনি। যে আদর্শ তিনি ধারণ করেন তরুণ প্রজন্ম সেই আদর্শ বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেছেন, আমি বাংলাদেশে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। এখন তরুণ প্রজন্ম এ আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবে। তারাই এ অন্যায়ের জবাব দেবে। বাবা আমাদের সৎ পথে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।

অন্যতম সন্দেহভাজন রঞ্জু by নেসারুল হক খোকন ও ওবায়েদ অংশুমান

মাকসুদুর রহমান রঞ্জু। এটিএন বাংলার একজন পরিচালক। তিনি এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই। পেশায় একজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী যেদিন খুন হন সেদিনই তিনি দেশ ত্যাগ করেন। ওই দিনই তার বিদেশে চলে যাওয়া স্বাভাবিক কিংবা কাকতালীয় ঘটনা হলেও নানা কারণে আইনশৃংখলা বাহিনী তাকে সন্দেহের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। অপরদিকে যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তিনি খুনের ঘটনার এক মাস পর পুরনো পাসপোর্ট পরিবর্তন করে নতুন পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। আবার নতুন পাসপোর্ট নেয়ার পর তিনি রহস্যজনকভাবে পুরনো পাসপোর্ট ব্যবহার করে দু’বার বিদেশ সফর করেন।
ওই সময় তার দেশ ত্যাগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে পুলিশ রঞ্জুর ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ নেয়। তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, সাগর-রুনীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় তার যাতায়াত ছিল। পরবর্তী সময়ে মামলাটি র‌্যাবে স্থানান্তর হওয়ার পর তারাও তাকে সন্দেহের তালিকায় রাখে। র‌্যাবের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এমন সন্দেহভাজন আসামিদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাই তাকে তারা গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে র‌্যাবের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরের অনুসন্ধানী টিমের কাছে দাবি করেন, ‘এ মামলায় রঞ্জু অন্যতম সন্দেহভাজন আসামি। তাকে পেলে অবশ্যই গ্রেফতার করতাম।’ শুধু র‌্যাবের এই শীর্ষ কর্মকর্তা নন, তদন্ত তদারকির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পুলিশের অন্য এক পদস্থ কর্মকর্তাও বলেন, ‘শুরু থেকে রঞ্জু তাদের সন্দেহের তালিকায় ছিলেন।’
পুলিশের অনুসন্ধানে রঞ্জু : ২০১২ সালের ১১ ফেব্র“য়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসা থেকে সাগর-রুনীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন মামলাটি তদন্ত করে শেরেবাংলা নগর থানা। ওই সময় তদন্ত তদারকির দায়িত্বে ছিলেন পুলিশের এমন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার (ডিসি) মুখোমুখি হয় যুগান্তরের অনুসন্ধানী টিম। অনুসন্ধানী টিমের পক্ষ থেকে গত চার মাসের ব্যবধানে ওই কর্মকর্তার নিজ কার্যালয়ে পাঁচ দফায় তার সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করা হয় (১৪ জানুয়ারি, ২০ জানুয়ারি, ১৭ ফেব্র“য়ারি, ১২ মার্চ ও ২ এপ্রিল)। তিনি বলেন, ‘রঞ্জু সাগরদের পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় একবার কনফার্ম গিয়েছিল। এ বিষয়ে রুনীর মাকে তো অনেকবারই ইন্টারভিউ করেছি। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম রঞ্জু এই বাসায় গিয়েছিলেন কিনা, তাকে চেনেন কিনা, প্রথমে তো চেনেই না বলে জানান। এই না, সেই না। পরে তিনি বলেন, ‘একদিন তিনি আমার সঙ্গে ওই বাসায় গিয়েছিল।’ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ‘আসলে তিনি অনেকবারই গিয়েছেন, একবার না। রুনীর মা কিন্তু খুব চালাক মহিলা।’ পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘রুনীর সঙ্গে রঞ্জুর এসএমএসের প্রমাণ পেয়েছিলাম। রুনীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ পরিচয়ও ছিল। রঞ্জুর মোবাইলের তিন মাসের কললিস্ট আমাদের কাছে ছিল। সিডিআরে রুনীর সঙ্গে রঞ্জুর কথাবার্তার প্রমাণও আছে। তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল, এসএমএসও ছিল...।’ এদিকে রুনীর সঙ্গে কখনও তার মোবাইলে কথা হয়নি বলে দাবি করে রঞ্জু যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার একটাই অ্যাকটেল মোবাইল নাম্বার। অনেক পুরাতন নম্বর। আর আমি কোনো নম্বর চেঞ্জ করিনি। রুনীর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচয় থাকলে তো তা সিডিআরে থাকার কথা।’ রুনীদের বাসায় যাওয়া প্রসঙ্গে রঞ্জু দাবি করেন, ‘আমি যদি তার (রুনীর) বাসায় যাই, তার সঙ্গে পরিচয় থাকে, তাহলে কোনো না কোনো দিন কোনোভাবে আমার সঙ্গে তার কথা হইছে। একদিন হলেও তো কথা হবে। সত্যিটা হল, আমি তো তাদের পশ্চিম রাজাবাজারের বাসা-ই চিনি না।’ অপরদিকে রঞ্জুর বিদেশ যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রঞ্জুকে যে আমরা পেছন থেকে ট্র্যাকিং করেছি সেটা তার ভাই এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান টের পাননি। তবে তার কানে ছিল, আমরা এটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে পারি। রঞ্জুকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু ঘটনার পর সে দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় তখন তার সঙ্গে আর কমিউনিকেট করা যায়নি। আর যে নাম্বারটি পেয়েছিলাম তাতে যোগাযোগ করা যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রঞ্জুকে প্রথমে আমরা সাসপেক্টেড আসামি হিসেবে নিইনি। যখন মোবাইলের কললিস্ট দেখলাম এবং তাতে দেখা গেল, রুনীর সঙ্গে তার ফোনে কথাও হয়েছে। রয়েছে এসএমএস বিনিময়। এছাড়া ঘটনার দিন বিদেশে চলে যাওয়ায় তার প্রতি আমাদের সন্দেহ আরও বাড়ে। এজন্য তাকে পেলে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করতাম। এজন্য রঞ্জু সাহেব আমাদের সন্দেহের তালিকায় ছিলেন।’
র‌্যাবের চোখে রঞ্জু : থানা পুলিশ ও ডিবির হাত ঘুরে মামলাটি তদন্তের জন্য ঘটনার ৭৬ দিন পর র‌্যাব দায়িত্ব পায়। তাদের তদন্তেও বেরিয়ে আসে, ড. মাহফুজুর রহমানের ভাই রঞ্জু অন্যতম সন্দেহভাজন আসামি। ঘটনার পর তিনি দেশ ত্যাগ করেন। ব্যাপক অনুসন্ধানের পর তারাও সিদ্ধান্ত নেয়, দেশে ফিরলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে। আর এমন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে যুগান্তর অনুসন্ধানী টিম র‌্যাবের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তার মুখোমুখি হয়। চার মাসের ব্যবধানে ওই কর্মকর্তার নিজ বাসায় তিনবার (গত ২১ ফেব্রুয়ারি, ১১ মার্চ ও ২ এপ্রিল) সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। তবে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় প্রতিবারই তিনি তার পরিচয় গোপন রাখার শর্ত জুড়ে দেন। প্রকৃত সত্য উদঘাটনের স্বার্থে যুগান্তর অনুসন্ধানী টিমও তার শর্তে রাজি হয়। এরমধ্যে দ্বিতীয় দফায় ১১ মার্চ দেয়া সাক্ষাৎকারে এটিএন বাংলার পরিচালক রঞ্জুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রুনীর সঙ্গে যাদের রিলেশন ছিল তারা সবাই সন্দেহভাজন। যেমন তানভীরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ তিনি জানান, ‘এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজের ভাই রঞ্জুর সঙ্গে তার (রুনীর) ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। যেদিন সাগর-রুনী খুন হয় সেদিনই তিনি বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আজও তিনি দেশে ফিরে আসেনি। ওর নাম মাকসুদুর রহমান রঞ্জু। ও সন্দেহভাজন আসামিদের মধ্যে অন্যতম।’ তিনি আরও বলেন,‘ রুনীর সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। এমনকি এই হত্যাকাণ্ডে তার ইনভল্বমেন্ট থাকতে পারে। তবে তার বিষয়টি ডিসক্লোজ করা হয়নি। কিন্তু তার বিষয়টা এমন যে, মেইন সাসপেক্টেডের মধ্যে সেও একজন। সে জন্য তাকে পাহারা দেয়া হচ্ছে। এখনও দেয়া হয়। সে দেশে আসে কিনা তা সব সময় পাহারা দিচ্ছে র‌্যাব। তার বিষয় খোঁজ রাখা হচ্ছে। সেটা তো আর বাইরে কাউকে বলা হয় না। যেমন তানভীরকে ঘটনার পর পরই ধরা হয়েছিল। তেমনি ড. মাহফুজের ভাই দেশে থাকলে তাকেও ধরত র‌্যাব।’
রঞ্জুর অস্বীকার : ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা সরাসরি অস্বীকার করেন মাকসুদুর রহমান রঞ্জু। তার বিষয়ে র‌্যাব এবং পুলিশের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার দেয়া তথ্য যাচাইয়ের জন্য যুগান্তর অনুসন্ধানী টিমের পক্ষ থেকে রঞ্জুকে ১৮ মার্চ ফোন করা হয়। পরে তার দেয়া সময় অনুযায়ী ২২ মার্চ এটিএন বাংলার কনফারেন্স রুমে যুগান্তর অনুসন্ধানী টিমের মুখোমুখি হন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন এটিএন বাংলার দু’জন বিশেষ প্রতিনিধি নাদিরা কিরণ ও মাহমুদুর রহমান। এ সময় তিনি যুগান্তরের অনুসন্ধানী টিমকে বলেন, ‘সাগর-রুনীর নিহত হওয়ার খবর আমি দেশে থেকে শুনেছি। ঘটনার পরে তো দেশেই ছিলাম। ঘটনার পরদিন আমি বিদেশে গেছি। আমার বিষয়ে পুলিশ কিংবা র‌্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তারা যা বলেছেন তা তারা অনেকটা ধারণা করেই হয় তো বলছেন। এটা স্রেফ ধারণা। প্রমাণ কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রমাণ দিতে পারবে বলেও আমার মনে হয় না।’
বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য মিথ্যা দাবি করে এটিএন বাংলার এ পরিচালক বলেন, ‘আমি তো কোথাও লুকাইনি। আমি তো ওপেনলি ঘুরছি। সব যায়গায় যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি, কোথায় গেছি তা তো তাদের জানার কথা। তাহলে আমার বিরুদ্ধে কেন ঢালাওভাবে এসব মিথ্যা কথা বলা হচ্ছে। যারা এসব কথা বলছেন, তারা সঠিক কথা বলেননি।’
রুনীকে চেনেন না রঞ্জু : এটিএন বাংলার পরিচালক রঞ্জু যুগান্তরের অনুসন্ধানী টিমের কাছে দাবি করেন, তিনি রুনীকে চেনেন না। তবে নাম জানতেন। ব্যবসায়ী রঞ্জু বলেন, ‘সত্য একটাই, আমি রুনী কিংবা সাগরকে কখনও দেখিনি। আপনারা বলতে পারেন, সেলফ ডিফেন্স নেয়ার জন্য অনেকে মিথ্যা কথা বলতে পারে। আল্লাহ তো উপরে আছেন। আমাকে তো জবাব দিতে হবে। সাগরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তাকে কখনও আমি দেখিওনি। আর রুনীকেও আমি চিনি না।’ আবার তিনি এও বলেন, ‘অনেক সময় আমি নাদিরা কিরণের সঙ্গে রুনীকে মিক্সড করে ফেলতাম।’
তথ্য লুকাতে পারে কেউ : এটিএন বাংলার পরিচালক ঘটনার পরদিন বিদেশে পালিয়ে গেছেন। এরপর আর ফিরে আসেননি। এমন তথ্য যুগান্তর অনুসন্ধানী টিমকে ১১ মার্চ দেয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন র‌্যাব থেকে সদ্য বিদায়ী নীতিনির্ধারক পর্যায়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা। কিন্তু পরে যুগান্তর অনুসন্ধানী টিম খোঁজ নিয়ে জানতে পারে রঞ্জু বর্তমানে দেশেই আছেন। এরপর তার সাক্ষাৎকারও নেয়া হয়।
এদিকে রঞ্জু দেশে থাকার পরও বিষয়টি র‌্যাব কেন জানে না এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যুগান্তরের অনুসন্ধানী টিম পুনরায় র‌্যাবের ওই সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মুখোমুখি হয় ২ এপ্রিল। এ সময় তার কাছে রঞ্জুর দেশে থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হলে তিনি রীতিমতো হতবাক হন। এরপর যুগান্তরকে তিনি জানান, ‘হয় তো কেউ শেল্টার দিচ্ছে। রঞ্জু দেশে আসছে-গেছে তা আমার কাছে হাইড (গোপন) করে রেখেছিল। রঞ্জুর বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার তথ্য যদি আগে পেতাম তাহলে আমি দেখতাম। তবে হ্যাঁ, এখনও তাকে অ্যারেস্ট করা যেতে পারে। কারণ মামলা তো তদন্তাধীন। এখন তাকে পাওয়া গেলে সন্দেহভাজন হিসেবেই অ্যারেস্ট করা উচিত।’ তিনি দাবি করেন, ‘আমি অফিসে থাকাকালীন (দায়িত্বে থাকাকালীন সময়) পেলে অবশ্যই তাকে ধরতাম। আমি মনে করি, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।’
রঞ্জুর দ্বিতীয় পাসপোর্ট রহস্য : তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ব্যবসায়ী রঞ্জু সত্যিই ঘটনার দিন (২০১২ সালের ১১ ফেব্র“য়ারি) সিঙ্গাপুর হয়ে (সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স-ফ্লাইট নম্বর-এসকে ৪৪৭) আমেরিকার লসএঞ্জেলসে যান। আর দেশে ফিরে আসেন ২২ ফেব্র“য়ারি। তার দেয়া প্রথম পাসপোর্টের নম্বর-এএ৯০৬৬২১০। এটি একটি এমআরপি পাসপোর্ট। এ পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি কাঠমান্ডু (যান ১২ জুন-ফেরেন ১৬ জুন) ও ব্যাংকক ভ্রমণ করেন (গমন-১১ জুলাই-আগমন-১৬ জুলাই)। এরপর থেকে প্রথম পাসপোর্টটি তিনি আর ব্যবহার করেননি। বিষয়টির ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে তাকে ফোন দেয়া হয় ২৩ মার্চ। তার কাছে অনুসন্ধানী টিমের প্রশ্ন ছিল, আপনি কি আর কোনো পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে গেছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রথম পাসপোর্টের বিপরীতে নতুন পাসপোর্ট নিয়েছিলাম। পরে আমি নতুন পাসপোর্টই ব্যবহার করি।’ এই বক্তব্যের সূত্র ধরে তার কাছে দ্বিতীয় পাসপোর্টের নম্বরটি জানতে চাওয়া হলে রঞ্জু বলেন, ‘এটা আপনারা ইমিগ্রেশন থেকে সহজেই নিতে পারবেন। সেখানে সব তথ্যই আছে।’ পরদিন ঢাকার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরাতন পাসপোর্টের বিপরীতে ২০১২ সালের ২৮ মার্চ নতুন আরেকটি পাসপোর্ট (পাসপোর্ট নম্বর এসি ৪৪৮৬২৫১) তার নামে ইস্যু করা হয়। অথচ নিয়ম রয়েছে, পুরাতন পাসপোর্টের বিপরীতে নতুন পাসপোর্ট নিলেই পূর্বেরটি বাতিল বলে গণ্য হবে। কিন্তু এটিএন বাংলার পরিচালক রঞ্জু পুরাতন পাসপোর্টটি ২০১২ সালের ১১ জুলাই ব্যবহার করে সিঙ্গাপুরে চলে যান।
এভাবে পাসপোর্ট পরিবর্তন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পাসপোর্ট অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী, পুরাতন পাসপোর্টের বিপরীতে নতুন পাসপোর্ট নিলে অটোমেটিক্যালি পুরাতনটি ইনভ্যালিড হয়ে যাবে।’
এদিকে এ বিষয়ে রঞ্জুর মন্তব্য নেয়ার জন্য বৃহস্পতি ও শুক্রবার একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল দেয়া হয়। কিন্তু তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। এরপরও এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেয়ার জন্য শুক্রবার অনুসন্ধানী টিমের পক্ষ থেকে এটিএন বাংলার বিশেষ প্রতিনিধি মাহমুদুর রহমানের (প্রথমদিন সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় যিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন) সহযোগিতা চাওয়া হয়। তিনি জানান, ‘তার পক্ষে উনার (রঞ্জু) সঙ্গে এখন যোগাযোগ করে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
এরপর এ বিষয়ে এটিএন বাংলার অপর বিশেষ প্রতিনিধি মনিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেলে তিনি হয়তো বিদেশে থাকতে পারেন।’
উল্লেখ্য, রঞ্জু তার দ্বিতীয় পাসপোর্টটি ব্যবহার করে গত তিন বছরে ২৮ বার বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ৮ বার (ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও মালয়েশিয়া), ২০১৪ সালে ১৭ বার (ব্যাংকক, হংকং, ফ্রাংকফুট ও লসএঞ্জেলস) এবং ২০১৫ সালে তিন বার (ব্যাংকক, জেদ্দা ও সিঙ্গাপুর) বিদেশ ভ্রমণ করেন। সর্বশেষ তিনি ১০ মার্চ মাস্কাট থেকে দেশে ফিরে আসেন।
জানেন না আইজিপি : মাকসুদুর রহমান রঞ্জুর বিষয়ে সদ্য বিদায়ী র‌্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ ওই কর্মকর্তার দেয়া সব তথ্য সবিস্তারে ৩ এপ্রিল বর্ণনা করা হয় আইজিপি একেএম শহীদুল হকের কাছে। তবে তিনি যুগান্তর অনুসন্ধানী টিমকে জানান, রঞ্জুর বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই।
এদিকে মাকসুদুর রহমান রঞ্জুর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমানের মন্তব্য নেয়ার জন্য শুক্রবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। এটিএন বাংলার বার্তা সম্পাদক ভানু রঞ্জন চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে সহযোগিতা কামনা করলে তিনি জানান, তার (ড. মাহফুজ) মোবাইল নম্বর জানা নেই। এছাড়া আরও কয়েকটি মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
(সকল সাক্ষাৎকারের অডিও ও ভিডিও যুগান্তরের কাছে সংরক্ষিত)

কে জিতবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে by আসিফ নজরুল

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মৃত্যু ঘোষণার একটি প্রবণতা আছে। পঁচাত্তরের পর বহুবার শোনা গেছে যে আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আরেকটু ভদ্র যাঁরা, তাঁরা বলতেন আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগ হয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ কখনোই তা হয়নি। বরং শেখ হাসিনার নেতৃত্ব গ্রহণের পর দলটি ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছিল, ২০০৯ সালে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনে নজিরবিহীন বিশাল বিজয় অর্জন করেছিল। পরের দিকে এই প্রবণতার শিকার হয়েছে বিএনপি। ১৯৯৪ সালে মাগুরার কুখ্যাত উপনির্বাচন করার পর বিএনপির রাজনৈতিক মৃত্যু ঘোষিত হয়েছে বারবার। অতিসম্প্রতি ২০১৩-১৪ সালে গণজাগরণ মঞ্চের জোয়ারকালীন বিএনপি কেন এই মঞ্চে শামিল হয়নি, এ নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছে। গণমাধ্যমে রাজনীতিবিদেরা তো বটেই, বহু বিশ্লেষক এমন মন্তব্যও করেছেন যে বিএনপি এ কারণে জনগণের মন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অথচ ঠিক সেই সময়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দেখা যায় সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। বিএনপি একের পর এক নির্বাচনে বিজয়ী হতে থাকে, এমনকি আওয়ামী লীগের একচেটিয়া বিজয়ের অঞ্চল গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও তারা বিরাট ব্যবধানে বিজয়ী হয় ২০১৩ সালে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ার পর দলটির আরেক দফা সমালোচনায় মেতে ওঠে গণমাধ্যমের একটি অংশ। বিএনপি বিলুপ্ত হওয়ার পথে—এমন কথা তখনো শোনা যায়। এমন অবস্থায় বিএনপি আবারও ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপে সুস্পষ্টভাবে বিজয়ী হয়। পরবর্তী ধাপগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিএনপি পরাজিত হলেও এসব নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে ফলাফল পাল্টে দেওয়া হয় বলে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে।
এ বছরের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে না দেওয়ার পর থেকে বিএনপি টানা অবরোধ ও হরতাল পালন করে। এতে পেট্রলবোমাসহ নানা নাশকতায় বহু মানুষের ভয়াবহ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। যথেষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই এই মৃত্যুর দায়ভার সরকারের লোকজন এবং সরকারের বিভিন্ন সুবিধাভোগী ব্যক্তি পুরোপুরিভাবে বিএনপির ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। তাদের ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে: নাশকতার কারণে বিএনপিকে আর ভোট দেবে না মানুষ, বিলুপ্তির পথে রয়েছে এখন বিএনপি।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের একটি বিশাল অংশের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে বিএনপিবিরোধী এই প্রচারণা হয়তো প্রভাবিত করেছে কিছু কিছু মানুষকে। কয়েক দিন আগে একজন প্রখ্যাত আইনজীবীকে প্রথম আলোয় ভবিষ্যদ্বাণী করতে দেখলাম যে চট্টগ্রামে বিএনপি বিজয়ী হবে, ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনেই জিতবে আওয়ামী লীগ। কেন তাঁর এ ধারণা হলো, এর কোনো ব্যাখ্যা ছিল না সেখানে। তবে সরকারের লোকজনের যেসব বক্তব্য শোনা যায় আজকাল, তাতে মনে হয় তাঁদের ধারণা, বিএনপির পেট্রলবোমার কারণেই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জিতে যাবে আওয়ামী লীগ!
২...
আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর এমন কিছু করেনি, যাতে তারা মানুষের মন জয় করতে পারে। বরং এ সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম, দলীয়করণ ও সরকারি নেতাদের লাগামহীন কথাবার্তা অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ডিজিটালাইজেশনের কিছুটা অগ্রগতি ছাড়া ঢাকা বা চট্টগ্রামে নাগরিক সুবিধারও কোনো উন্নতি হয়নি, বরং জনপরিবহন ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। মোট কথা, আওয়ামী লীগের দেশ পরিচালনায় মুগ্ধ হয়ে ভাসমান ভোটাররা আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন ভাবার মতো জোরালো কোনো কারণ ঘটেনি দেশে।
সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগের জেতার তাই মূল অস্ত্র বা সম্বল হতে পারে পেট্রলবোমার ঘটনায় বিএনপির প্রতি ক্ষুব্ধ ভোটারদের নেগেটিভ ভোট। তবে আমার ধারণা, এ ক্ষেত্রে পেট্রলবোমা-সংক্রান্ত প্রচারণার প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করে ভাবা হচ্ছে। প্রথমত, এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে (কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের লোকজনের বিরুদ্ধেও যে অভিযোগ উঠেছে) গ্রেপ্তারকৃতরা বিএনপি-জামায়াতের লোক হলেও তাঁদের তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে অনেক মানুষই সন্দেহ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, এখন পর্যন্ত একটি ঘটনায়ও পুলিশ কোনো বিশ্বাসযোগ্য তদন্তকাজ সম্পন্ন করেনি, যাতে এসব ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সাধারণ মানুষের সন্দেহ দূরীভূত হতে পারে।
পেট্রলবোমার কারণে তাই লোকে বিএনপির বদলে দলে দলে এসে আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে যাঁরা ভাবছেন, তাঁরা সঠিক ভাবছেন বলে আমার মনে হয় না। অতীতে জামায়াত-সংশ্লিষ্টতা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে দোদুল্যমানতা, নির্বাচন বর্জন বা নাশকতা ইস্যুতে ভোটাররা বিএনপিকে বর্জন করবে বলে যেসব বিশ্লেষণ ছিল, তা অনেকাংশে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এবারও তা-ই হতে পারে। তা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বিএনপি বরং সিটি করপোরেশনে জিততে পারে চিরন্তন অ্যান্টি-এনকাম্বেন্সি (যেকোনো সরকারের প্রতি জনগণের চিরন্তন ক্ষোভ ও হতাশা) ভোটের কারণে। তা ছাড়া, আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচন হয়েছে ওপরের নির্দেশে। আনিসুল হকের পক্ষে কামাল মজুমদার বা সাঈদ খোকনের পক্ষে হাজি সেলিম ইচ্ছা করে বসে যাননি। আনিসুল হক আওয়ামী লীগের রাজনীতির বাইরের মানুষ বলে ঢাকা উত্তরের বহু ছোট-বড় নেতার তাঁর পক্ষে কাজ করতে অনীহ থাকতে পারেন, ঢাকা দক্ষিণের কিছু অঞ্চলে হাজি সেলিম খুবই প্রভাবশালী। বলে তাঁর লোকজন একই ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন। এমন কোন্দলের সুবিধা বিএনপি কীভাবে পায়, তার বহু নজির সাম্প্রতিক কালের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে রয়েছে।
৩...
আওয়ামী লীগের জেতার সম্ভাবনা তাই বলে একেবারে নেই, তা নয়। বিএনপির অপ্রস্তুতি বা বিএনপির প্রার্থীর দোদুল্যমানতার কারণে আওয়ামী লীগ জিততে পারে। তবে তার সম্ভাবনা কম।
আবার আওয়ামী লীগ জিততে পারে অন্যভাবেও। সেটি হচ্ছে কারচুপি, অত্যাচার ও অবিচার করে। আওয়ামী লীগ সরকার ও নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচন আয়োজনে সৎ ও নিরপেক্ষ থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ করার মতো কিছু কারণ ইতিমধ্যে ঘটেছে। যেভাবে সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেভাবে নির্বাচন কমিশন পুলিশের আইজির পরামর্শে নির্বাচনের তারিখ ঠিক করেছে, যেভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিএনপির পক্ষের দাবিগুলোকে নাকচ করেছেন, যেভাবে আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রার্থী হতে পারেন, এটি ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর যমুনা রিসোর্টের ইজারা বাতিল করা হয়েছে, তার কোনোটিই স্বস্তিকর বিষয় নয়।
বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মী হয় জেলে রয়েছেন বা এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঠিকমতো প্রচারণা চালানো দূরের কথা, পোলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত লোকজন বিএনপি এই পরিস্থিতিতে খুঁজে পাবে কি না, তাই এখনো বলা মুশকিল। এ ধরনের অবস্থায় অনুগত নির্বাচন কমিশন, সাজানো জনপ্রশাসন ও পার্টিজান পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে নির্বাচনে কারচুপি করা কোনো কষ্টসাধ্য বিষয় হবে না।
তবে আওয়ামী লীগ এভাবে নির্বাচনে জিতলে এই নির্বাচন বরং রাজনৈতিক সংকটকে ঘনীভূত করবে। বরং সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনের আয়োজন করে সিটি করপোরেশনের তিনটি নির্বাচনে হেরে গেলেও নির্বাচন অনুষ্ঠানে দলীয় সরকারের সক্ষমতার দাবি জোরালো হবে। আওয়ামী লীগ আবারও বলতে পারবে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো প্রয়োজন নেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কিছুটা হলেও আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
মনে রাখতে হবে, বিরোধী দল যখন মনে করে যে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব, তখনই কেবল দেশে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা ঘটে। এই বিশ্বাস ভেঙে গেলে অরাজনৈতিক শক্তির হস্তক্ষেপ, গৃহযুদ্ধ, এমনকি দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে পৃথিবীতে।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন তাই তখনই হবে শুভকর, যদি তা নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। নির্বাচনে যে ফলাফলই হোক না কেন, তাতে জিতবে গণতন্ত্র।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লি কুয়ানের কাছ থেকে আমরা কী নেব, কী নেব না by মইনুল ইসলাম

সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা নেতা লি কুয়ান ইউ ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাম্প্রতিক ৫৬ বছরের ইতিহাসে বিশ্বের উজ্জ্বল সাফল্য অর্জনকারী এশীয় বাঘদের মধ্যে সফলতম উদাহরণ। লি কুয়ান এই সাফল্যগাথার রূপকার। তাই তাঁকে ভালোবাসা দিয়ে বিদায় জানিয়েছে সিঙ্গাপুরের শোকাহত জনগণ। ১৯৫৯ সালে লি কুয়ানের নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর অভ্যন্তরীণ স্বশাসনক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জোয়ালমুক্ত হয়েছিল। (তিনটি প্রধান জাতিসত্তার সমন্বয়ে গঠিত নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে ‘জাতি’ কনসেপ্টটি খুব প্রযোজ্য নয় বিধায় তাঁকে জাতির পিতা অভিধায় ভূষিত করা হয় না।) ১৯৬৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া ফেডারেশনে যোগ দিয়েছিল সিঙ্গাপুর, কিন্তু ফেডারেল সরকারের সঙ্গে ফেডারেটিং ইউনিটগুলোর ক্ষমতার ভাগাভাগির প্রশ্নে লি কুয়ানের অতিরিক্ত দর-কষাকষি ও ঝগড়াঝাঁটিতে রুষ্ট হয়ে দুই বছরের মধ্যেই তৎকালীন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আবদুর রহমান পার্লামেন্টে সিদ্ধান্ত নিয়ে সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়া থেকে বের করে দিয়েছিলেন। বাধ্য হয়ে ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং এক মাস পর পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ওই ঘোষণা দেওয়ার সময় লি কুয়ান বিশ্ব মিডিয়ার সামনে কেঁদে ফেলেছিলেন সিঙ্গাপুরের ভবিষ্যৎ ভেবে। অথচ, গত ৫৬ বছরে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এক অবিস্মরণীয় রচনাগাথা করেছে সিঙ্গাপুর, যার রচয়িতা লি কুয়ান।
মূলত একটি প্রধান দ্বীপ ও ৫৮টি ক্ষুদ্রাকার দ্বীপ নিয়ে সিঙ্গাপুর রাষ্ট্র। আয়তন ৬৯২ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ২০১৪ সালে ৫৫ লাখ ৬৭ হাজার ৩০১, যার মধ্যে ৫১ লাখই প্রধান দ্বীপনগরীতে বাস করে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য মোতাবেক ২০১৩ সালে সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৫৫ হাজার ১৮২ মার্কিন ডলার, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৫৪ হাজার ৬৪৯ ডলার। দুটোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি। পিপিপি ডলার বা ইন্টারন্যাশনাল ডলারে সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু জিডিপি ২০১৩ সালে ছিল ৭৮ হাজার ৭৬২ (আরেক প্রকাশনায় ৭২ হাজার ৩৭১ বলা হয়েছে)। উপনিবেশ হিসেবে সিঙ্গাপুরের গোড়াপত্তন হয়েছিল মাত্র ১৮১৯ সালে। ভূরাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থানের দিক থেকে অনন্য-গুরুত্বপূর্ণ মালাক্কা প্রণালির তীরবর্তী এই স্থানটিকে বেছে নেন ১৮১৯ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি স্ট্যাম্ফোর্ড র্যা ফলস। তিনি স্থানীয় জোহোরের সুলতানের কাছ থেকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে ওখানে একটি বাণিজ্য কুঠি ও ফ্যাক্টরি স্থাপনের অনুমতি আদায় করেন। ১৮২৪ সালে জোহোরের সুলতানের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি বলে সিঙ্গাপুরে একটি ব্রিটিশ বাণিজ্যকেন্দ্র ও নৌঘাঁটি স্থাপনের পর্ব শুরু হয়। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারত সাম্রাজ্যের অন্তর্গত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অঞ্চল হিসেবে ঔপনিবেশিক ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুরের শাসনকাজ পরিচালনার ব্যবস্থা চালু হয়। ১৮৫১ সালে সিঙ্গাপুরের শাসনভার সরাসরি ভারতবর্ষের কোম্পানি নিযুক্ত শাসকদের হাতে অর্পিত হয় এবং ১৮৬৭ সালে লন্ডনের ব্রিটিশ কলোনিয়াল অফিসে তা অর্পণের আগ পর্যন্ত ওই ব্যবস্থা চালু ছিল। অতএব, সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠার মূল কারণই ছিল ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিরক্ষা ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থরক্ষা। বলাবাহুল্য, ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ-ভারতেরই অংশ ছিল সিঙ্গাপুর।
১৯৯৬-৯৭ সালে একটি গবেষণাকাজে তিন মাসের জন্য সিঙ্গাপুরের বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজ’-এ (আইএসইএএস) ভিজিটিং ফেলো হিসেবে অবস্থান করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর একটা গবেষণা করার সুবাদে সিঙ্গাপুরকে গভীরভাবে জানার সুযোগ হয়েছে আমার। সিঙ্গাপুর আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরলেও সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার ভালো-খারাপ দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিষয়গুলোকে আমি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য বলব না। ব্যাখ্যাটা দেখুন:
সিঙ্গাপুর নগরকে একটা সাজানো বাগান বলা চলে, নাগরিক ভূস্বর্গ বললেও অত্যুক্তি হবে না। নগরের রাস্তাঘাট ঝকঝকে পরিষ্কার, যানজটের কোনো বালাই নেই। দক্ষতম পরিবহনব্যবস্থা, সর্বাধুনিক আবাসিক ব্যবস্থা, লোভনীয় শপিং, বৈচিত্র্যময় পর্যটন ও বিনোদনের পর্যাপ্ত আয়োজন, সর্বাধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা—এগুলোর বিচারে সিঙ্গাপুরকে অনায়াসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবাসস্থল বলা যায়। ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনন্য-গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ মালাক্কা প্রণালি ভারত মহাসাগর এবং চীন সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগের সবচেয়ে সুগম জলপথ বিধায় এই প্রণালির তীরে অবস্থিত সিঙ্গাপুর বিশ্বের সর্বাধিক জাহাজ চলাচলের রুটের জন্য বেশ কয়েকটি আধুনিক ও দক্ষ বন্দরসুবিধা গড়ে তুলে এই খাতকে দেশের আয়ের অন্যতম প্রধান সূত্রে পরিণত করেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ‘হাব’ বা ‘এনট্রেপো’ হিসেবে পুনরায় রপ্তানির জন্য শিল্পায়নের এক সফল কেন্দ্র এবং বাণিজ্য ও ফিন্যানশিয়াল সেন্টার হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অতুলনীয় সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুর। প্রায় সব নাগরিকের জন্য আধুনিক পরিকল্পিত আবাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে সিঙ্গাপুর। সব শিশু ও কিশোর-কিশোরীকে স্কুলে পাঠানো মা-বাবার জন্য বাধ্যতামূলক—এই আইন না মানলে জেলে যেতে হবে মা-বাবাকে। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালগুলো বিশ্বসেরা; বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও পলিটেকনিকগুলোর মান প্রতীচ্যের সঙ্গে তুলনীয়।
আবার অন্যদিকে, নগররাষ্ট্র হলেও প্রবল শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রতীকও সিঙ্গাপুর। প্রকৃতপক্ষে লি কুয়ানের শাসন ১৯৫৯ সাল থেকে ২০১৫ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ৫৬ বছর ধরেই বহাল ছিল। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত লি কুয়ান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, তারপর ছিলেন ‘সিনিয়র মন্ত্রী’, এরপর ছেলেকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে প্রকৃত ক্ষমতাদণ্ডটি আমৃত্যু নিজের হাতেই রেখে দিয়েছেন। এখনো তাঁর ছেলেই প্রধানমন্ত্রী। এ ব্যাপারে তেমন রাখঢাক করার প্রয়োজন বোধ করেননি তিনি। ১৯৫৯ সাল থেকেই তাঁর রাজনৈতিক দল ‘পিপলস অ্যাকশন পার্টি’ (পিএপি) সিঙ্গাপুরের ক্ষমতাসীন দল। সিঙ্গাপুরের সব নাগরিকের জন্য ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক, ভোট না দিলে পুলিশ এসে গ্রেপ্তার করে জেলে পুরবে। কিন্তু সর্বশেষ নির্বাচনেও ৮৭ জন সাংসদের পার্লামেন্টে বিরোধী দলের সদস্য সাকল্যে ছয়জন। এ অবস্থাকে তাঁর দলের বিপুল জনপ্রিয়তার প্রমাণ বলা ভুল হবে, এটা একটা ‘ভয়ের রাজত্বের’ প্রতিফলনও হতে পারে। (হয়তো অবাধ নির্বাচন হলেও পিএপি বিপুল ভোটে জিতত!)
লি কুয়ান যত দিন বেঁচে ছিলেন, সিঙ্গাপুরের অধিকাংশ ভোটার কৃতজ্ঞচিত্তে স্বেচ্ছায় তাঁকে ভোট দিয়েছেন, এটা যেমন অস্বীকার করা যাবে না, কিন্তু এটাও সত্য যে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে একেবারেই সহ্য করতেন না লি কুয়ান। অতএব, প্রকৃত বিচারে সিঙ্গাপুরে গণতন্ত্রের ভড়ং চলছে—খোলসটাই শুধু আছে, প্রকৃতপক্ষে ওখানে ৫৬ বছর ধরে চলেছে লি কুয়ানের একনায়কত্ব, একজন ‘টাফ টাস্কমাস্টার’ একনায়কের সুদক্ষ শাসন। সব ‘সিস্টেম’ প্রায় শতভাগ কার্যকর ওখানে। সিঙ্গাপুরের প্রশাসন আইন প্রয়োগে কঠোর, এমনকি শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাত এখনো চালু আছে সিঙ্গাপুরে। রাস্তায় চুইংগাম বা ধূমপানের অপরাধেও সপ্তাহ খানেক রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার শাস্তি মিলতে পারে। লি কুয়ান বড়াই করেই বলতেন, প্রতীচ্যের গণতন্ত্র প্রাচ্যের সংস্কৃতির জন্য উপযোগী নয়। প্রাচ্যের জন্য প্রয়োজন ‘ডিসিপ্লিন’ ও দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন। তাই দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ছিল তাঁর। তাঁর বা তাঁর পরিবারের কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা পুঁজি লুণ্ঠনের কোনো অভিযোগ শোনা যায় না। কোনো মন্ত্রীর দুর্নীতিও সহ্য করতেন না লি কুয়ান।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিচারে সিঙ্গাপুরের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। তবু সিঙ্গাপুরকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিংবা রাজনৈতিকভাবে মুক্ত সমাজ বলা যাবে না। লি কুয়ান সিঙ্গাপুরকে একটা ‘মেরিটোক্রেসি’ হিসেবে গড়ে তুলেছেন সারা বিশ্ব থেকে মেধাবী ব্যক্তিদের আকর্ষণ করে এবং সিঙ্গাপুরের অধিবাসীদের মেধা বিকাশের সর্বাধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলে। ‘মিডিওকারদের’ নানাভাবে লি কুয়ান বুঝিয়ে দিতেন তাঁর এই পছন্দের ব্যাপারটা। কোনো অভিবাসী শ্রমিকই একাধারে চার বছরের বেশি সিঙ্গাপুরে থাকার অনুমতি পান না, কিন্তু প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা ভার্সিটি শিক্ষকের মতো পেশাজীবীর জন্য আলাদা নিয়ম। আশপাশের দেশগুলো থেকে যেসব নারী শ্রমিক সিঙ্গাপুরে প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের নিয়মিত প্রেগনেন্সি টেস্ট দিতে হয়, তাঁরা গর্ভধারণ করলে সরাসরি বের করে দেওয়া হয় সিঙ্গাপুর থেকে। আবার এমন নজিরও আছে, লি কুয়ান ঘটকালি করেছেন দুই মেধাবী নারী-পুরুষের বিয়েতে। তাঁরা যাতে বেশি সন্তানের জন্ম দেন, সে ব্যাপারেও প্রকাশ্যে উৎসাহ দিতেন তিনি। তিনি ঠাট্টা করে বলতেন, ‘আমার সিঙ্গাপুর হচ্ছে বিশ্বের একমাত্র “কমিউনিস্ট” রাষ্ট্র।’ সামাজিকভাবে সিঙ্গাপুরের চৈনিক (৭১ শতাংশ), মালয়ি (১৮ শতাংশ) ও ভারতীয় (৭ শতাংশ) জাতিসত্তার জনগণ অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান ও মেলামেশার পরিবেশ গড়ে তুলেছেন, সত্যিকার অর্থে একটা ‘মাল্টি-এথনিক’ সমাজ বিরাজ করছে সিঙ্গাপুরে। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ উদাহরণও সৃষ্টি করেছে সিঙ্গাপুর।
ওপরে সিঙ্গাপুরের যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদত্ত হলো, তাতে কি মনে হয় ওখানকার সবকিছু গ্রহণযোগ্য ও অনুকরণীয়? এশিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতিমুক্ত দেশ সিঙ্গাপুর, কিন্তু গণতন্ত্র তো নেই। যেখানে গণতন্ত্র নেই, সেখানে বোঝা যায়, গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন চায় না কোনো দেশের জনগণ, ‘ভয়ের রাজত্ব’ স্বর্গ হতে পারবে না কখনোই। গণচীনের বেশ কয়েকটা নগরে যাওয়ার সৌভাগ্যও হয়েছে আমার, ওখানেও একই ‘ভয়ের রাজত্ব’।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমরা কী দেখি। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গত ২৪ বছরে কোনো ক্ষমতাসীন দল বা জোট গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে এ দেশে পুনর্নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেনি। কারণ, প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল বা জোট দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও দুঃশাসনের জন্য জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর যেনতেনভাবে পুনর্নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য এ দেশের প্রতিটি ক্ষমতাসীন দল বা জোট ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করেও গদি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। ২০০৬-০৭-এর ঘটনাবলি পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে ইয়াজউদ্দিন আহেম্মদের মাধ্যমে বেগম জিয়া ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য কতখানি মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন! ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পেছনেও একই কাহিনি। তাই সিঙ্গাপুর থেকে শিক্ষণীয় হলো: জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে দুর্নীতি বাদ দিতেই হবে, সুশাসন দিতেই হবে।
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

চাওয়া পাওয়া by

প্রায় তেরো ঘণ্টা একটানা আকাশে উড়ে আসার পর ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ অলস সারি, তারপর লাগেজের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা—এসব অব্যবস্থাপনা দেখে আমার মেজাজ খিঁচড়ে থাকলেও আমি কিছুই গায়ে না মাখার চেষ্টা করি। অনেক বছর পর দেশে ফিরে যার সঙ্গে দেখা হবে তার চেহারার স্নিগ্ধ বিষণ্নতার একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে রেখে আমি একটা তাপ অপরিবাহী বর্ম রচনা করে রাখি নিজের চারপাশে। এয়ারপোর্টে আমাদেরকে নিতে এসেছে পারুলের ছোট ভাই, ওকে পেয়ে সে তার স্বামী, প্লেন কোম্পানির চরম অব্যবস্থা, ঢাকা এয়ারপোর্টে যাত্রী পরিষেবার ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে এক গাদা অভিযোগ শুরু করলে ও বোনের অলক্ষ্যে আমার দিকে চোখ টিপে তার কথায় সায় দেয়। আমি ভাইবোনের কথায় যোগ দেই না, এমনকি ঢাকার বিশৃঙ্খল ট্রাফিক, গাড়ির জানালার বাইরে নাছোড় ভিক্ষুকের অসহিষ্ণু টোকা—কিছুই আমাকে স্পর্শ করে না। আমার মাথার মধ্যে কেবল পুরোনো পরিচিত গানের কলির মতো কিংবা বহু আগে দেখা কোনো সিনেমার দৃশ্যের মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল নিশাদের মুখ। অনেক বছর আগে ওকে পেছনে ফেলে রেখে যখন বিদেশে চলে যাই,
তখন প্রথম দিকে নিশাদ ছিল হারিয়ে যাওয়া কোনো গোপন সম্পদের মতো, যার কথা আচমকা মনে পড়লে বুকের ভেতর একধরনের কষ্ট জেগে ওঠে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তারপর দিন, মাস, বছর ঘুরে যেতে মেয়েটি হানা দিতে শুরু করে সংগোপনে। নিউইয়র্ক সিটির সাবওয়ের দীর্ঘ একঘেয়ে সুড়ঙ্গপথে সেসব দিনের স্মৃতিগুলো হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ত। নিশাদ আমার দূর সম্পর্কের চাচাতো বোন, একই বাড়ির দুপ্রান্তে থাকতে থাকতে চোখের সামনে মেয়েটা কখন যে ফুটে উঠল পথের পাশের অতিপরিচিত নাম না জানা বুনোফুলের মতো, কখন যে স্কুলের বর্ণহীন ইউনিফর্ম ছেড়ে স্বরূপে উদ্ভাসিত হলো টের পাইনি। ছুটিছাটায় বাড়িতে গেলে ওকে দেখতাম আর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। কখনো মনে হতো, এই সকালবেলাতেও চোখে কাজল? পরে বুঝতে পেরেছি, ওর চোখগুলোই এ রকম—মনে হয় সব সময় কাজল পরে আছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে বাড়িতে আমার বেশ কদর। তাই ওকে দেখলেই খুব কায়দা করে পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করতাম, কী কী সাবজেক্ট পড়ানো হয় কলেজে—এসব মামুলি কথার ফাঁকে আর কতক্ষণ আটকে রাখা যায়?
ওকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার পর সুযোগ পেলেই বাড়িতে চলে যেতাম, হয়তো একটু ঘন ঘনই। অবশ্য সদরে গিয়ে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে রোজ আড্ডা দেওয়াও ছিল একটা কারণ। এক সকালে রাস্তায় গিয়ে দেখি নিশাদ দাঁড়িয়ে আছে রিকশার অপেক্ষায়, ওকে দেখে বুকের ভেতর এক অজানা পাখি চিড়িক করে ডেকে ওঠে। দূর থেকে একটা খালি রিকশা আসতে দেখে বলি, চল, তোরে কলেজে পৌঁছায়ে দিয়ে যাই। জানি না, মনে মনে ও এটাই চাইছিল কি না, তবে কোনো আপত্তি না করে উঠে বসে। এ রকম বেশ কয়েকবার ঘটেছে, কখনো স্বেচ্ছায়, কখনো কাকতালীয়ভাবে। তেমনি একদিন রিকশায় বসে ওর শরীর আর সুগন্ধির মিলিত ঘ্রাণের বিহ্বল অবস্থায় কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বলি, তুই এত সুন্দর হয়ে গেলি কখন, বল তো? ও এক ঝলক আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়, তারপর বিষণ্ন কণ্ঠে বলে, আপনি এত কিছু দেখতে পান কীভাবে? আপনার দেখার সময় আছে নাকি? বাড়িতে এলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, আর ঢাকায় গেলে ইউনিভার্সিটির সুন্দরী বান্ধবীদের দেখতে ব্যস্ত। আমি ওর এ রকম জবাবে কী বলব ভেবে পাই না। সামনে এলজিইডির নতুন পিচ করা সোজা রাস্তা দুই পাশের আকাশমণি গাছের সারির মাঝে মরা শিংমাছের মতো সটান পড়ে থাকে।
সেই ক্ষণিক দুর্লভ নৈঃশব্দ্যের মাঝে আমি স্বভাবসুলভ চপলতা হারাই, পড়তে পারি ওর আচমকা অনুযোগের ভাষা। ধীরে সুস্থে বলি, না রে, যেমন ভাবিস তেমন নয়, রাজধানীর মেয়েরা একটু খলবলানি টাইপের হয়, তোমাদের মতো নয়। আচমকা তুই থেকে তুমিতে উঠে এলাম বলে ও বোধ হয় একটু অবাক হয়ে ওর কাজল পরা মনে হওয়া চোখে আমার দিকে তাকায়, আমি ওর ফিরে তাকানোটা অনুভব করি, যেন সেই দৃষ্টি আমার ভেতর দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। ও বলে, আমাদের মতো নয় মানে কী? আমি সে কথার কোনো জবাব না দিয়ে একটু হালকা চালে বলি, একটা জিনিস খেয়াল করলাম, তোমার কসমেটিকসের মধ্যে কাজলের খরচটা লাগে না, তাই না? ও বোধ হয় একটু লজ্জা পায়, বলে, যত কাঠখোট্টা মনে হয়, তত নয় দেখি। তারপর বলে, খুব তো মাখো মাখো কথা বলছেন এখন, ঢাকায় গেলে এসব খেয়াল থাকে? আমি এলায়িত লতার মতো পড়ে থাকা ওর হাতের ওপর হাত রেখে বলি, আগে না থাকলেও এখন থাকে, সে জন্যই তো ঘন ঘন বাড়ি চলে আসি। আমার হাতের স্পর্শে তির তির করে কেঁপে ওঠে ও, কিন্তু হাত সরিয়ে নেয় না। তারপর সারা পথ আর কোনো কথা হয় না আমাদের। রাস্তার স্বাভাবিক শব্দ থেমে গেলে আমি খুব কাছ থেকে ওর হালকা শ্বাসের শব্দ পাই। আমার ঘন ঘন বাড়ি আসা আমার রিটায়ার্ড শিক্ষক বাবা পছন্দ না করলেও মায়ের ছিল প্রচ্ছন্ন সমর্থন।
নিশাদকে মা যে পছন্দ করতেন সেটা বুঝতে পারতাম। খুব শান্ত স্নিগ্ধশ্রী বিষণ্ন চেহারায় কাজলটানা চোখের মেয়েটিকে মায়েদের পছন্দ হওয়ারই কথা। হয়তো মনের ভেতর ওকে ঘরের বউ হিসেবে কল্পনা করে নিয়েছিলেন তিনি। আমি ঘরে থাকলে নিশাদকে কোনো অছিলায় ডাকিয়ে আনাতেন। তারপর ও এলে বলতেন, নিশু, তোর বড় চাচার পাঞ্জাবির বোতামগুলা লাগাইয়া দে তো মা, এখন একদম চক্ষে দেখি না। চশমা দিয়াও পারি না। নিশাদ আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে কোনো কথা না বলে ভালো মানুষের মতো সুতোর মাথাটা ভিজিয়ে সরু করার জন্য মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে বের করে সুইয়ে পরিয়ে নেয়। মা একসময় কী একটা কাজের অজুহাতে বের হয়ে গেলে নিশাদ দাঁত দিয়ে সুতা কাটতে কাটতে বলে, আজ আড্ডা মারতে গেলেন না? আমি বলি, আজ তো তোমার কলেজ ছুটি, রিকশায় একা একা যেতে হবে বলে গেলাম না। ও দরজার দিকে চকিতে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলে, খুব সাহস বাড়ছে আপনার। রোজ রোজ একসঙ্গে রিকশায় গেলে মানুষ নানান কথা ছড়াবে। আমাকেও গলা নামাতে হয়, কেউ যাতে কিছু না বলে, তার ব্যবস্থা হবে আমি পাস করে বের হবার পর। ও ‘ইশশশ’ বলে মাথা নিচু করে ফেলে। ওর মুখের রক্তিম আভা যেন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে বিকেলের কনে দেখা আলোর মতো। আমি বুঝতে পারি, ওর হাত বিবশ হয়ে গেছে। মুখের লালিমা ধীরে ধীরে মুছে গেলেও হাত আর গতি ফিরে পায় না। আমি ওকে নতমুখী অবস্থা থেকে বের করার জন্য বলি, ঢাকায় ইউনিভার্সিটিতে পড়তে হলে ভালো রেজাল্ট করতে হবে, এখন খুব কম্পিটিশন। ও মুখ তুলে চায়, কোনো কথা বলে না, শুধু ভীত চোখে একবার দরজার দিকে তাকায়। আমি এবার গলা নামাই, তুমি ঢাকায় ভর্তি হতে পারলে রোজ একসঙ্গে রিকশায় ঘুরলেও কেউ কিছু দেখবে না, বলবেও না। ধরো, তুমি রোকেয়া বা শামসুন্নাহার হলে থাকবে, আমি বুয়েটের হল থেকে চলে আসব রোজ বিকেলে। এ সময় ওর কাজল টানা চোখ দুটো হঠাৎ খুব উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, বলে, তারপর? আমি গলাটা আর একটু নামাই, আমরা ফুলার রোড ধরে হাঁটব, তুমি তখন গুনগুন করে গাইবে, তুমি রোজ বিকেলে আমার বাগানে ফুল নিতে আসতে, জানি না তুমি ফুল না আমাকেই বেশি ভালোবাসতে...। আমি লক্ষ করি, ওর চোখ দুটো আবার নিভে যায়, চেহারায় ফিরে আসে বিষণ্ন বিকেলের ম্লান আভা। ও হাতের কাজ থেকে চোখ না তুলে বলে, বেশি বেশি স্বপ্ন দেখা ঠিক না। একসময় হঠাৎ উঠে পড়ে বলে, যাই, আমার কাজ শেষ।
বাড়িতে তো একা হওয়ার সুযোগ ছিল না খুব, তাই আমাদের বহু বিকেল, দুপুর কেটে গেছে ইঙ্গিতের ভাষায়, দৃষ্টির বিনিময়ে আর অপ্রকাশ্য অনুভূতির ইশারায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকার কোনো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে নিশাদকে স্থানীয় কলেজেই পড়তে হয়। আমারও ইউনিভার্সিটির শেষ বছরগুলোতে পড়াশোনার চাপ বেড়ে গেলে বাড়িতে যাওয়া হতো না তেমন। তখন ক্ষীণ হয়ে আসে আমাদের যোগাযোগ। ওর নিজস্ব মোবাইল ফোন হওয়ার পর আমরা কথা বলতাম, তবে উভয়ের সুবিধাজনক সময় মিলত না বলে খুব বেশি কথা হতো না। এর মধ্যে আমার এক প্রফেসরের বাসায় আসা যাওয়ার সুবাদে পরিচয় হয় তাঁর মেয়ে পারুলের সঙ্গে। রেজাল্ট ইত্যাদি মিলিয়ে আমাকে হয়তো স্যারের অপছন্দ ছিল না, নিজের অজান্তেই পারুলের সঙ্গে কখন ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ি টের পাই না। সেই ঘনিষ্ঠতা থেকে আমার পাস করে বের হওয়ার পরপরই আমেরিকার এক ইউনিভার্সিটিতে একটা স্কলারশিপের সুবাদে পারুলের সঙ্গে বিয়েটাও ঘটে যায়। ঘটনা বিচারে এসব প্রক্রিয়ায় কয়েক বছর লাগলেও সবকিছু ঘটে যায় দীর্ঘ স্বপ্নের মতো। মেয়েদের বহু কিছু বোঝার একটা সহজাত ক্ষমতা আছে, নিশাদ সেই সহজাত ক্ষমতাবলে বুঝে নিয়েছিল সব, তাই ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয় ওর আপন বিষণ্নতার চাদরে। একবার আমি বাড়ি গেলে ওর মুখোমুখি হওয়ার পর কেবল একটা কথা বলেছিল, বলছিলাম না, বেশি স্বপ্ন দেখা ঠিক না? আমি কোনো জবাব দেওয়ার আগেই দ্রুত চলে গিয়েছিল ও, অবশ্য চলে না গেলে আমিও কোনো জবাব দিতে পারতাম না।
আমার এ রকম আচমকা পাল্টি খাওয়ার শোক সইতে না পেরেই বছর খানেকের মধ্যে মারা যান মা, সেই শোকেই হয়তো বাবা যান তার পরের বছর। তাই দেশে ফেরার কোনো তাগিদ অনুভব করি না আগের মতো। নিউইয়র্ক থেকে মাঝে মাঝে গ্রামে থাকা বড় ভাই বা ভাবির সঙ্গে ফোনে কথা হয়। একদিন ভাবিকে জিজ্ঞেস করি, নিশাদের খবর কী? ভাবি বলেন, ভালো না, জামাইটা বদের হাড্ডি, কাজকাম তেমন কিছু করে না, খালি ধান্দায় ঘোরে, আর বউটারে খুব জ্বালায়। কয়েক মাস পর তেমনি এক ফোনে জানতে পারি, নিশাদ বাবার বাড়ি চলে এসেছে, আর ফিরে যাবে না। ভাবি বলেন, ইশ্, তুমি ওরে বিয়া করলে ওর জীবনটা এই রকম নষ্ট হইত না। এই কথার ভেতর দিয়ে সাত-আট হাজার মাইল দূর থেকেও আমি নিশাদের দীর্ঘশ্বাস শুনি। এটা শোনার পর দেশে যাওয়ার জন্য আমার ভেতরটা উতল হাওয়াময় দিনে বাতাসের দীর্ঘশ্বাসের মতো হু হু করতে থাকে, কিন্তু ছেলেমেয়েদের স্কুল, আমার চাকরির ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে শিগগিরই দেশে আসা হয়নি। সেই আসা হলো এবার। ঢাকায় কয়েক দিন জেটল্যাগের ধকল কাটিয়ে আমি বাড়িতে যাওয়ার উদ্যোগ নেই। পারুল যাবে না জানিয়ে দিয়ে বলে, বাড়িতে তো তেমন কেউ নেই, এত উতলা হয়ে যার জন্য যাচ্ছ, তাকে দেখেও এখন আর ভালো লাগবে না, যেমন আমাকে দেখে লাগে না। নিশাদকে আবার দেখার জন্য আমার নিজেকে প্রায় স্বপ্নোত্থিত মানুষের মতো মনে হয়, তাই অহেতুক ঝামেলা এড়াতে পারুলের কথার কোনো জবাব দেই না আমি। দেশের রাস্তাঘাটের হাজার হুজ্জত গায়ে না মেখে আমি যখন বাড়িতে পৌঁছি তখন সাঁঝবেলা। বাড়ির অন্য শরিকদের সবাই দেখা করতে আসে আমার সঙ্গে, নিশাদের ভাই—ভাবিও আসে, কিন্তু নিশাদ আসে না। একসময় সব দ্বিধা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করি, নিশাদের খবর কী? ওর ভাই বলে, আর কী, নিজে থেকে আইসা পড়সে। স্কুলের মাস্টারিটা ছিল বইলা সাহস করতে পারসে। আমার অবস্থাও তো ভালো না। একধরনের অপরাধবোধ থেকেই আমি কিছু বলার মতো কথা খুঁজে পাই না।
সে রাতে আমার ভালো ঘুম হয় না, নতুন জায়গা বলে, নাকি নিশাদের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলাম না বলে, জানি না। পরদিন সকালে নাশতা করার পরই ওদের ঘরে যাই, ও তখন স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। আমি ওকে দেখে কিছুক্ষণ অবাক তাকিয়ে থাকি। আমার সামনে যেন একটা অস্পষ্ট আরশি ঝোলানো, যাতে সবকিছু বিবর্ণ মলিন দেখায়। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় বহু বছর আগে নীলনয়না এক আফগান কিশোরীর ছবি ছাপা হয়েছিল। অনেক বছর পর সেই নীলনয়নাকে খুঁজে বের করে ছবিটির ফটোগ্রাফার। মেয়েটির আগের ছবির তুলনায় পরের বয়স্কা ছবিটা দেখে যে রকম লেগেছিল, ওকে দেখেও আমার মাথায় আচমকা সেই উপমাটা চলে আসে। সেই কাজলটানা চোখের কাজল এখন আর আগের মতো নেই, চুলে সামান্য পাক ধরেছে, মুখের শান্তশ্রী কমনীয়তা উধাও। আমি ওর দিকে পলকহীন চেয়ে থাকি। আমার দৃষ্টির সামনে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, কয় দিন থাকবেন? বিকেলে এসে আপনার সঙ্গে কথা বলব, এখন স্কুলের সময় হয়ে গেছে। ওর এই শীতল জবাবে আমার ভেতর অকারণ অভিমান জাগলেও আমি শুধু বলি, তুমি ভালো আছ? ও খুব ম্লান হেসে বলে, হ্যাঁ, খারাপ কেন থাকব? বুঝতে পারি, এই কথার ভেতর অনেক অভিমানের বাষ্প জমে আছে। একটা প্রবল অপরাধবোধে বিদ্ধ হয়ে ফিরে আসি আমি। বিকেলে ও নিজেই দেখা করতে আসে। একথা-সেকথার পর ওর ভাঙা সংসারের কাহিনি বলে কোনো রাখঢাক ছাড়াই। স্বামীর ঘর ছেড়ে আসার পর একাকী জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে কখনো ওর চোখের ভরাকাটালের জোয়ার বহু কষ্টে রোধ করে ও। আমি কেবল ওর ভেতর বহু বছর আগে ছেড়ে যাওয়া নিশাদকে খুঁজছিলাম, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ফাঁকে হঠাৎ দেখা দেওয়া চাঁদের মতো মাঝে মাঝে একঝলক দেখা দিয়ে আবার লুকিয়ে পড়ছিল সে। ওকে একান্তে পাওয়ার কোনো সুযোগ মিলছিল না বলে, আমি যেসব কথা ভেবে এসেছিলাম, সেসবের কিছুই বলা হয় না। আমি আরও কয়েক দিন অলসভাবে বাড়িতে কাটিয়ে দেই কেবল নিশাদের জন্য। একদিন কথার ফাঁকে মৃদুস্বরে আমাকে বলে, সন্ধ্যায় পুকুর ঘাটে থাকবেন একটু? কথা বলব। আমার ভেতর বিদ্যুৎপ্রবাহের মতো কিছু একটা বয়ে যায়। প্রতীক্ষার প্রতিটা প্রহর মনে হয় দুর্ভার। কী কথা বলতে একাকী দেখা করতে চায় নিশাদ? আমাদের সেই সব দিনের স্মৃতি?
সন্ধ্যার আগেই আমি পুকুরের ঘাটে বাঁধানো বেঞ্চে গিয়ে বসে থাকি, আমার বুকের ভেতর এই বয়সেও তারুণ্যের মতো গুড়গুড় করে মেঘ ডাকতে থাকে। সন্ধ্যার ঠিক কিছু আগে ও আসে, তখন আশপাশে কেউ নেই, পাশের কোনো গাছ থেকে ঝিঁঝি পোকার করাত সন্ধ্যার নৈঃশব্দ্যকে নির্মমভাবে চিরে ফেলছিল। ঘোমটাটা দিয়ে অর্ধেক মাথা ঢাকা, হালকা বৈকালিক সাজ থাকতেও পারে, কাজলটানা চোখ এখন কিছুটা দৃশ্যমান। কাছে এসে দাঁড়ালে ওর শরীরের হালকা অপরিচিত সুবাস পাই। বসতে বললেও বসে না ও। আমি অপরাধীর মতো বলি, তোমার কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া হয়নি কখনো, অথচ উচিত ছিল। ও বলে, মাফ চাওয়ার কী আছে, আমি জানতাম, তাই তো স্বপ্ন দেখাতে নিষেধ করতাম। আমি আরও কী যেন বলতে চাইলে ও সুযোগ না দিয়ে বলে, এখানে বেশি সময় থাকা ভালো দেখাবে না, এখন সবকিছুতে মনে রাখতে হয়, আমি সিঙ্গেল। শোনেন, যে কথা বলতে ডেকেছি আপনাকে, সেটাই বলি। তারপর কিছু সময় নেয়, যেন ফিরে যেতে চাইছে আমাদের আগের দিনগুলোতে। আমার বুকের ভেতরের আলোড়ন প্রায় সশব্দ হয়ে ওঠে। একসময় খুব নিরুপায় কুণ্ঠা নিয়ে বলে, যাওয়ার আগে আমাকে কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করে যেতে পারবেন?
সন্ধ্যার সেই আলোয় ওর চোখের কাজল লেপ্টে যাচ্ছিল ঘনায়মান অন্ধকারে, আমাদের মাথার ওপরের গাছে নিশীথাশ্রয়ে আসা কয়েকটা পাখি ডানা ছটফটিয়ে ডাল বদল করে, আর আমি সেই অন্ধকারের ভেতর হাতড়াতে থাকি, ওকে আমার কী বলা উচিত।

যখন সকাল হলো by আহমাদ মোস্তফা কামাল

শেষ পর্যন্ত অমিতকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হলো। শঙ্কাটা ছিল আগে থেকেই। কারণ, বেশ কিছুদিন ধরেই তার আচরণ অস্বাভাবিক লাগছিল বন্ধুদের কাছে। কোনো এক অজানা কারণে ভয় ঢুকেছে অমিতের মনে। তীব্র, অপ্রতিরোধ্য মৃত্যুভয়। এবং ভয়ের যা স্বভাব, অন্যান্য সব চিন্তা, সব কল্পনা, এমনকি সব বাস্তবতাকেও গ্রাস করে নিয়ে অধিপতির মতো আসন গেড়ে বসে, তার বেলায়ও তেমনটিই ঘটেছে। ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকে সে, কাজকর্ম থামিয়ে দিয়ে জবুথবু হয়ে বসে থাকে। তরুণ বয়সে এ রকম মৃত্যুভয়ে তটস্থ হওয়াটা বেশ অস্বাভাবিক। এমনও নয় যে সে কোনো জটিল রোগে ভুগছে, বরং বেশ সুঠাম স্বাস্থ্য তার, জ্বর-কাশির মতো সাধারণ অসুখ-বিসুখও তার কাছ থেকে দূরেই থাকে, তবু কেন যে এত ভয় ওর! ভয়ের ধরনটিও ঠিক স্বাভাবিক নয়। কেন যেন তার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে, বাইরে বেরোলেই সে মারা পড়বে। বন্ধুরা এ রকম ভয়ের কোনো কারণ খুঁজে পায় না। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তারাও দুশ্চিন্তা আর অস্বস্তিতে ভোগে বটে, কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে ‘বাইরে গেলেই মরে যাব’ টাইপের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে হবে। সকলেই চাকরিজীবী, যাবতীয় শঙ্কা মাথায় নিয়েই প্রতিদিন অফিসে যেতে হচ্ছে, এত ভয় পেলে চলবে কী করে! কিন্তু অমিতকে এসব বোঝাবে কে? তার সবকিছুতেই ভয়। বাসে উঠতে ভয়—যদি পেট্রলবোমায় ঝলসে যায়, রাস্তায় হাঁটতে ভয়—যদি ককটেল এসে পড়ে গায়ের ওপর, এমনকি পেছন থেকে কেউ এসে ঘাড়ের ওপর কোপ বসিয়ে দেবে না—তারই বা নিশ্চয়তা কী? এই তো সেদিন, বইমেলা চলার সময় জনাকীর্ণ রাস্তায় পুলিশের সামনে এক লেখককে কুপিয়ে মেরে ফেলা হলো। ভাবা যায়? এ দেশে এখন অসম্ভব বলে কিছু নেই। ভয় সে পাবে না কেন? এমনকি ঘরের ভেতরে বসেও তার ভয় লাগে, যদি কেউ এসে ধরে নিয়ে যায়! এ রকমও তো ঘটছে অহরহ। কে যে কখন কাকে কেন ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তারপর আর খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না, রহস্যের কূলকিনারা করতে পারছে না কেউ, যদি তার জীবনেও ওরকম ঘটে! বন্ধুরা বোঝায়, ‘শোন, আমরা সবাই অতি সাধারণ মানুষ। ওরকম ঘটনা ঘটে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের বেলায়। আমরা কারও সাতে-পাঁচে থাকি না, কোনোরকমে টিকে থাকার চেষ্টা করি, মুখ বুজে সব মেনে নিই, আমরা যে আছি সেটাই তো বোঝার উপায় নেই। একটা টুঁ-শব্দও করি না আমরা, ওদের কাছে আমরা প্রায় মৃত মানুষ, আমাদের মারবে কেন? ওরা মারবে জীবিতদের, যারা কথাটথা বলে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়।’
অমিত উল্টো প্রশ্ন করে, ‘বাসে বোমা ছুড়ে যাদেরকে মারা হচ্ছে, তারাও তো সাধারণ মানুষ; ককটেলে যে আহত হচ্ছে, সেও তো সাধারণ মানুষ; তারা তাহলে মরছে কেন? আর ওই যে বললি “ওরা”, কারা ওরা? যারা বোমা মারে, আর যারা কোপায়, আর যারা ঘর থেকে ধরে নিয়ে যায়, তারা কি সব এক পক্ষ?’
এ প্রশ্নের উত্তর বন্ধুদের কাছে নেই। থাকবেই বা কী করে, রাজনীতি ব্যাপারটাই যে তারা বোঝে না। সে প্রশ্ন করতেই থাকে, বন্ধুরাও উত্তর দিতে না পেরে বিরক্ত হতে শুরু করে। ভাবে, ও থাকুক ওর মৃত্যুভয় নিয়ে, অন্ধকার নিয়ে, আমাদের কী! কিন্তু এ রকম সময়েই ঘটনাটা ঘটে।
এক রাতে অমিত জানায়, তার বুকে ব্যথা হচ্ছে। ধীরে ধীরে সেই ব্যথা বাড়ে। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। প্রচণ্ড ব্যথায় আর শ্বাসকষ্টে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে। আকস্মিক এই ঘটনায় বিমূঢ় হয়েও তার বন্ধুরা বুদ্ধি হারায় না, অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। জরুরি বিভাগে তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় সম্ভবত কাজ হয়, জ্ঞান ফেরে, অক্সিজেন মাস্ক থেকে শ্বাস নিয়ে বোধ হয় একটু আরামও পায়। দুদিন কাটে সিসিইউতে, তারপর ডাক্তাররা ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলে বন্ধুরা চেষ্টাচরিত করে তাকে কেবিনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। এখানে মরণাপন্ন সব রোগী, দেখতে দেখতে নাকি সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বড় ছেলেমানুষি করেছে অমিত এ কদিন, কিছুতেই থাকতে চায় না হাসপাতালে, কেবিনে গিয়েও তার ছেলেমানুষি কাটে না। নার্সরা ইনজেকশন দিতে এলে বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রক্ত নিতে এলে ‘ব্যথা পাব, ব্যথা পাব’ বলে বাচ্চাদের মতো চেঁচায়। বন্ধুরা কেউ কেউ রেগে যায়—
‘তুই কী শুরু করলি বল তো, এভাবে ট্রিটমেন্ট হবে কী করে?’
‘কিসের ট্রিটমেন্ট? আমার অসুখটা কী?’
‘তোর মাথা! চুপ করে থাক।’
অমিত চুপ করে বটে, তবে চুপ যে থাকবে না বন্ধুরা, সেটা ভালো করেই জানে। সমস্যাটি নিয়ে তারা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘আসলে আপনাদের বন্ধু একটা সাইকোলজিক্যাল ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। যেকোনো কারণেই হোক, মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। ঠিক আছে, আমি মীরাকে বলব ব্যাপারটা দেখতে। এই ধরনের রোগীদের ও খুব ভালো ডিল করতে পারে।’
মীরা নামের নার্সটি এল এর পরপরই। ইনজেকশন তুলে নিল হাতে, বন্ধুর ধমক খেয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল অমিত, বাহুতে কারও স্পর্শ পেয়ে বুঝল, আবারও কেউ এসেছে! কিন্তু চুপ করেই রইল সে। নিঃশব্দে ইনজেশন পুশ করল মীরা, সে একটু শব্দও করল না দেখে মীরাই বলল, ‘লাগল ভাইয়া? ব্যথা পেয়েছেন?’
প্রশ্ন শুনেও চোখ খুলল না অমিত, মাথা নেড়ে কেবল জানাল, না লাগেনি। কথা না বললেও, বা চোখ খুলে না দেখলেও কণ্ঠস্বরটি কানে লেগে রইল তার। কেমন ভেজা ভেজা একটা কণ্ঠ, নরম, বিষণ্ন—যেন কান্না জড়ানো আছে ওই কণ্ঠে। অনেক দিন পর মাকে মনে পড়ল তার। মায়ের কণ্ঠস্বরটা ঠিক এ রকম ছিল। এ রকম কান্নাভেজা, কোমল, মায়াময়। আচ্ছা, কারও কারও কণ্ঠস্বর এমন হয় কেন? এরা কি সত্যিই কান্না বয়ে বেড়ায়? মাকে দেখেছে, কেউ কোনো শক্ত কথা বললে উত্তরে কিছুই বলত না, কিন্তু চোখ দুটো টলমল করে উঠত। মায়ের মনে কি অনেক কষ্ট ছিল? অনেক দুঃখ বয়ে বেড়াত? মায়ের মনের খবর নেওয়ার সুযোগই পায়নি সে। কিন্তু এখন মনে হয়, বড় একা ছিল মা, বড় অন্তর্মুখীন। নিজেকে প্রকাশ করত না কখনো, কেউ কখনো তাকে বোঝেনি, বুঝতে চায়নি, মা-ও বোধ হয় বুঝতে দেয়নি। এই যে অদেখা-অচেনা মেয়েটি, সে-ও কি এ রকম? কল্পনায় সে মেয়েটির মুখ আঁকতে চেষ্টা করল। মায়াকাড়া একটা মুখ, চোখ দুটো বড় বড়, ঘনকালো আঁখিপল্লব, চোখে-মুখে বিষণ্নতা। কল্পনার সঙ্গে বাস্তব কতটা মেলে, দেখার জন্য চোখ খুলে সে দেখে—হ্যাঁ, অনেকটাই মিলে গেছে। মেয়েটি খুব যত্ন করে তুলা দিয়ে মুছে দিচ্ছিল সুচ ফোটানোর জায়গাটি। তুলোর মধ্যে কী যেন একটা ওষুধ দেয় ওরা, বেশ আরাম লাগে, একটা শীতল স্পর্শ সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছিল সারা শরীরে। তার ভালো লাগছিল, ভালো লাগছিল। একবার মনে হলো, মেয়েটিকে একটা শক্ত কথা বলে দেখা যাক, ওর চোখে জল আসে কি না! কিন্তু ইচ্ছেটা দমন করল সে। অচেনা একটা মেয়েকে এভাবে অহেতুক শক্ত কথা বলা যায় নাকি? বরং একটু হেসে বলল, ‘থ্যাংক ইউ। একদম ব্যথা পাইনি।’
মেয়েটিও মিষ্টি করে হাসল, ‘ব্যথা পাওয়ার কথাও নয়। সামান্য ব্যাপার।’
‘না না, অনেকে ইচ্ছে করেই ব্যথা দেয়।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ, এর আগে একজন দিল! মনে হলো আমার ওপর খুব রাগ, জোর করে ধরে ঘ্যাঁচ করে...’
‘আপনার ওপর রাগ করবে কেন? আপনি তো চমৎকার একজন মানুষ!’
‘আমি কেমন মানুষ তা আপনি জানলেন কীভাবে?’
‘তা তো বলব না!’
‘ও!’
‘রাগ করলেন?’
‘না। ভাবছি, আবার কে না কে ইনজেকশন দিতে আসে, রক্ত নিতে আসে, এসে নিশ্চয়ই ব্যথা দেবে!’
‘আমি এলে চলবে?’
‘হ্যাঁ, তা চলবে। কিন্তু আপনি যখন থাকবেন না?’
‘থাকব না কেন?’
‘না, মানে আপনি তো আর চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করেন না!’
‘ও এই কথা! না, তা করি না। ঠিক আছে, আমি বলে যাব, আর কেউ যেন ইনজেকশন দিতে না আসে!’
‘থ্যাংক ইউ। আমার হয়েছে কী? কঠিন কোনো অসুখ?’
‘তা তো জানি না! ডাক্তাররা বলতে পারবেন!’
‘আপনি একটু ফাইল-টাইল দেখে বলুন না!’
‘নার্সদের এসব নিয়ে কথা বলা নিষেধ। তবে ফাইলে তো তেমন কিছু দেখলাম না।’
‘মানে বড় কোনো অসুখবিসুখ নেই?’
‘না মনে হয়।’
‘তাহলে হাসপাতালে শুয়ে আছি কেন?’
‘তা আমি কী করে বলব? ডাক্তার এলে জিজ্ঞেস করবেন। আচ্ছা, এখন যাই।’
‘যাবেন? আরেকটু বসুন না! কথা বলতে ভালো লাগছে।’
‘বসে থাকলে চলবে? কাজ আছে না?’
‘হ্যাঁ, তা বটে। আচ্ছা, যান তাহলে।’
মীরা চলে গেলে একটু একা একা লাগে অমিতের। হাসপাতাল একটা ঝামেলাপূর্ণ জায়গা, সে বোঝে। কে কাকে দেখে এখানে, সবাই নিজের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। ডাক্তার-নার্স-ওয়ার্ডবয়রা রুটিনমাফিক চলে, একেবারে আবেগহীন, কোনো কিছুতেই যেন কিছু যায়-আসে না তাদের। রোগ-শোক দেখতে দেখতে পাথুরে হৃদয় অর্জন করতে পেরেছে এরা সবাই। নিজের লোক না থাকলে হাসপাতালে থাকা যে কী কঠিন ব্যাপার! কিন্তু তার তো কেউ নেই, কে থাকবে সঙ্গে? সেই কবে, কত বছর আগে বাড়ি থেকে চলে এসেছিল সে, আর ফেরেনি। কলেজে পড়ার সময় মা চলে গেল হঠাৎ করেই, সেই শোক কাটিয়ে উঠতে অনেকটা সময় লেগেছিল তার। বছর খানেক যেতে না–যেতেই চাচা-ফুফুরা তাকে বোঝাতে এসেছিল, বাবাকে আবার বিয়ে করানো দরকার, একা একা বাকি জীবনটা কাটাবে কীভাবে? বয়স হয়ে যাচ্ছে, দেখাশোনাই বা করবে কে? সে আপত্তি করেনি। চাচা-ফুফুরা নিশ্চয়ই বাবার মতামত নিয়েই বলছে এসব কথা, আপত্তি করে কী লাভ? আর করবেই বা কেন? একা যদি না থাকতে পারেন তিনি, তাহলে সঙ্গী জুটিয়ে নেওয়াই তো ভালো। তার মনের কথা জানতে পারেনি কেউই। সেদিনই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—একবার এই বাড়ি থেকে বেরোতে পারলে আর ফিরবে না কখনো। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পেরে নিজেকে মুক্ত মানুষ বলে মনে হচ্ছিল তার। যেদিন বাড়ি ছেড়ে চলে আসে, সেদিন মায়ের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল অমিত, কেঁদেছিল বুক ভাসিয়ে, বলেছিল, ‘চলে যাচ্ছি মা, আর কোনো দিন এ বাড়িতে ফিরব না। তুমি কিন্তু রাগ করো না আমার ওপর। তুমি তো এখন মুক্ত হয়ে গেছ, নিশ্চয়ই এই কবরে শুয়ে থাকো না, নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াও! আমি যেখানেই যাই, তুমি কিন্তু আমার পাশে থেকো।’ অনেক দিন পর সেই সব কথা মনে পড়ল তার, কান্নাও পেল খুব, হাসপাতালের বিছানায় একা একা শুয়ে অনেকক্ষণ মন ভরে কাঁদলও!
কেঁদে একটু মন হালকাও হলো। ভাবল, কেউ না থাকুক, বন্ধুরা তো আছে। কত দিনের বন্ধুতা ওদের সঙ্গে! ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের বন্ধুত্বে চিড় ধরেনি। এমনকি পাশ করে বেরোবার পর চার বন্ধু মিলে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করেছে একসঙ্গে থাকবে বলে। এই শহরে তারা সবাই বহিরাগত, নিজেরাই নিজেদের আপনজন। ছাত্রজীবনে হলে একসঙ্গে থেকেছে, এখনো একসঙ্গেই আছে। বাসাটা সুন্দর। সবারই আলাদা রুম। ড্রয়িং-ডাইনিংও আছে। কিন্তু কারও বউ নেই বলে অ্যাপার্টমেন্টের কোনো শ্রীছাদ নেই। মাথাব্যথাও নেই কারও এ নিয়ে। হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই সবাই বিয়েটিয়ে করে থিতু হবে, তত দিন পর্যন্ত এই রকম উল্টোপাল্টা জীবনই ভালো। দিনশেষে বাসায় ফিরে আড্ডায় মাতে তারা, তাস খেলে, টিভি দেখে, কোনো কোনো দিন বাইরে ডিনার করতে যায় সেজেগুজে। মন্দ নয় জীবনটা। সারা দিন হাসপাতালে থাকার কেউ নেই। এটা অবশ্য সমস্যা নয় অমিতের কাছে। একা একা শুয়ে সে আকাশ-পাতাল ভাবে, ভাবতে ভালো লাগে। কত কথা মনে হয়! বাড়ি ছেড়ে আসার পর এ ক-বছরে বাবা অনেকবার এসেছেন তাকে নিয়ে যেতে, চাচা–ফুফুরাও এসেছেন, সে যায়নি। এমনকি ঈদ বা অন্য কোনো উৎসবেও যায়নি। কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেনি, সুযোগ পেয়ে দু-কথা শুনিয়ে দেবে, তেমন স্বভাবই নেই তার। সে শুধু হেসে অসম্মতি জানিয়েছে, বলেছে, ‘সময় হলে যাব। আর কেনইবা তোমরা ভাবছ, আমি রাগ করে বাড়িতে যাচ্ছি না? আমার কোনো রাগ নেই কারও ওপরে, অভিমানও নেই।’
আসলেই নেই। অভিমান থাকলে বুক পোড়ে, বুকের ভেতরে হুহু করে। ওরকম অনুভূতি কারও জন্যই হয় না তার। না, হয়, মায়ের জন্য হয়। তবে সেটা অভিমান নয়, অন্য কিছু। ফেলে আসা বাড়ি, মেঠোপথ, ফসলের মাঠ, ছোট্ট নদী, মায়ের কবর, নিজ হাতে লাগানো গাছগুলোর জন্যও মন কেমন করে। ভোরের বাতাস, টিনের চালে টুপটাপ শিশিরের শব্দ, উঠোনের এক পাশে সযত্নে রচিত বাগানে ফুটে থাকা বেলিফুল, ঘাসের ডগায় জমে থাকা টলমলে শিশিরবিন্দু—এসব আর কখনো জীবনে ফিরে আসবে না বলে মন কাঁদে বৈকি! এসব ভাবে সে, আর কখনো মীরা এলে গল্প জুড়ে দেয়। তার জীবনে খুব বেশি গল্প নেই, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই গল্প বারবার বলে। আর মীরা ভাবে, মানুষটা কী অদ্ভুত! শিশুর সারল্য নিয়ে এই নির্মম-রুক্ষ পৃথিবীতে বাস করছে! মায়া লাগে তার, অকারণ মায়া। মনে হয়, যদি সারাক্ষণ বসে থাকা যেত তার কাছে! কিন্তু এ তো সম্ভব নয়! এটা তার চাকরি, কত কাজ তার! আবেগ-মায়া-মমতা সব বাক্সে বন্দী করে এখানে আসতে হয়। তবু সারা দিন অমিত একা থাকে বলে মীরা সুযোগ পেলেই তাকে এসে দেখে যায়, দুদণ্ড বসে গল্প করে। বন্ধুরা কেউ এলে তার হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাসায় ফেরে সে। বন্ধুরা সবাই অফিসে যায়, ফেরে রাতে। তারপর পালাক্রমে কেউ না কেউ রাতে থাকতে আসে। তবে মীরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ওরা অনেকখানি নিশ্চিত,
অমিতের ছেলেমানুষি ভাবটা কেটে গেছে, আগের মতো অত ভয়ও পাচ্ছে না। বোধ হয় স্বাভাবিক হয়ে আসছে ক্রমশ। এই মীরা মেয়েটা অন্য রকম—অমিত ভাবে। তার সবকিছুর মধ্যেই বড় মায়া, বড় কোমলতা। আজকাল এসব ব্যাপার বড় দুর্লভ। চারপাশে কেবল রুক্ষতা, চিৎকার, চেঁচামেচি। অসহিষ্ণুতা, উত্তেজনা, নিষ্ঠুরতা। স্বর নিচু করে, মায়াভরা কণ্ঠে কথা বলতে ভুলে গেছে মানুষ। সবারই উচ্চকণ্ঠ, যেন চিৎকার করে কথা বললেই নিজের মতামত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে! আসলে যে তা হয় না, এইটুকু বোঝার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে সবাই। তার মনে হয়, যদি একজন মা থাকত দেশটার, যদি অমন করে কোমল-মায়াভরা কণ্ঠে ভালোবাসার কথা শোনাত, তাহলে চৈত্রের খরদুপুরও হেমন্তের মায়াময় সকাল হয়ে যেত। মীরার সঙ্গে এসব গল্পসল্প করে সে আর মীরার ফের মনে হয়, কী সরল এই মানুষটি, আর কী পবিত্র তার চিন্তার ধরন! এ রকম বিমূঢ় সময়ে এই ধরনের লোকগুলোই সবচেয়ে বিপন্ন হয়ে থাকে। অমিতের অবশ্য দিনগুলো ভালোই কাটছে। অফিসের তাড়া নেই, বাইরে বেরোবার টেনশন নেই, যেন অফুরন্ত অবসর পেয়ে গেছে হঠাৎ করে। নির্ভার, দুশ্চিন্তাহীন। একদিন সকালে মীরা হাসপাতালে এসেই উঁকি দিয়েছিল অমিতের রুমে, বলেছিল, ‘কেমন আছেন আজকে?’
আর তাকে একনজর দেখেই অমিতের মনে হয়েছিল, আজকে মীরার শাড়ির শাদা রংটি কি একটু অন্য রকম? তার বাগানে ভোরবেলায় যে রকম অজস্র বেলিফুল ফুটে থাকত, সে রকম শুভ্র মনে হচ্ছে ওকে। প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অমিত বলল, ‘একটু ভেতরে আসবেন?’
মীরা এসে বসল, বিনা কারণে কপালে হাত রাখল, বলল, ‘নাহ্, জ্বরটর নেই।’
অমিত হঠাৎ করেই বলল, ‘আপনারা সব সময় শাদা শাড়ি পরেন কেন? রঙিন শাড়ি পরতে সমস্যা কী?’ ‘এত কিছু কি আমি জানি? রীতি মেনে চলি।’ ‘আপনাকে একদিন অন্য কোনো রঙের শাড়িতে দেখতে ইচ্ছে করে!’
মুখ নিচু করে চুপ করে রইল মীরা।
‘কী হলো?’
‘কী?’
‘কথা বলছেন না যে!’
‘কী রং পছন্দ আপনার?’
‘নীল। ঘন-গভীর নীল। একদিন ওরকম একটা নীল শাড়ি পরে আসবেন?’
‘ও রঙের শাড়ি আমার নেই।’
‘যদি আমি কিনে দিই?’
‘হাসপাতালে কি ওরকম শাড়ি পরে আসা যায় বলুন? এটা আমার চাকরি না? আপনি ভালো হয়ে উঠুন, তারপর...’
আজকে মীরার কণ্ঠস্বরটি যেন আরও নিচু, কোমল, ভেজা ভেজা। যেন টিনের চালে টুপটাপ শিশির ঝরে পড়ছে এমনভাবে শব্দগুলো ওর কণ্ঠ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল। কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলে অমিত অবাক হয়ে দেখলো, মীরার দু-চোখে জল টলমল করছে। সেই প্রথম দিন সে ভেবেছিল, একটা শক্ত কথা বলে দেখবে, মেয়েটার চোখে জল আসে কি না। আজকে কি সে নিজের অজান্তেই সে রকম কিছু বলে ফেলেছে? না, তা কেন হবে? নীল শাড়ি পরতে বলায় নিশ্চয়ই আহত হয়নি মেয়েটি! সে দেখল, মীরার টলমল চোখে অশ্রুর ফোঁটা আরেকটু বড় হয়েছে, কিন্তু ঝরে পড়ছে না, আবার শুকিয়েও যাচ্ছে না। গ্রামের কথা মনে পড়ল তার। হেমন্তের সকালে, সূর্য ওঠার আগে আগে, যখন মৃদু কুয়াশায় ভরে থাকে পৃথিবী, তখন ঘাসের ডগায় এ রকম বড় বড় ফোঁটায় শিশিরবিন্দু জমে থাকে। ঝরেও পড়ে না, শুকিয়েও যায় না। রোদ উঠলে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কী যে অপরূপ লাগে! এই সব দেখে দেখে বেড়াত সে একসময়। ভাবত, যদি রোদ না উঠত, যদি এই মায়াময় সকাল রয়ে যেত অনন্তকাল, তাহলে এই অপূর্ব দৃশ্যের সমাপ্তি ঘটত না কখনো। মনে মনে কামনা করত সে, রোদ না উঠুক, অন্তত একদিন পৃথিবীজুড়ে কেবল ভোর থাকুক। সেসব কামনা পূর্ণ হয়নি কখনো। আজকে এই অচেনা-অনাত্মীয় শহরে হঠাৎ-চেনা কোমল-সুন্দর এই মেয়েটির চোখে টলমল অশ্রু দেখে অনেক দিন পর আবার মনে হলো, যেন আকস্মিক কোনো রোদে– হাওয়ায় মিলিয়ে না যায় এই শিশিরবিন্দু। বহুদিন ধরে মায়াময় সকাল হয় না পৃথিবীতে, কেবলই রুক্ষ দুপুর আর রাতের গভীর-কালো অন্ধকার। আজকের এই কোমল সকালটুকু না হয় বেঁচে থাকুক সারাটি দিন।

একই ঝুড়িতে সকল ডিম by হাসান ফেরদৌস

মাহবুবুর রব সাদী ঠিক আমাদের চেনা রাজনীতিকদের একজন নন। স্বাধীনচেতা মানুষ তিনি, স্রোতের বিপরীতে যাওয়াই তাঁর অভ্যাস। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছিলেন, কিন্তু সরকারের সঙ্গে নীতিগত মতৈক্য না হওয়ায় সে খেতাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
সাদী এখন আর রাজনীতির কেন্দ্রে নেই। বলতে গেলে একরকম অবসরেই চলে গেছেন। ছেলেমেয়ের কাছে আমেরিকায় থাকছেন, যদিও স্থায়ীভাবে থাকার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। দুই সপ্তাহ আগে নিউইয়র্কে এসেছিলেন, নিজেই আমাদের খুঁজে বের করে জানালেন তাঁর কিছু বলার আছে।
দেশের চলতি রাজনৈতিক স্থবিরতায় সাদী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। একসময় যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, ক্রমশ সে স্বপ্ন ধূসর হয়ে আসছে। পেশাদার রাজনীতিকদের ক্ষীণদৃষ্টি রাজনীতির ফলে আমরা ক্রমশই এক গভীর অন্ধকার কূপে তলিয়ে যাচ্ছি।
সাদী মনে করেন, এ মুহূর্তে খুব জরুরি তিনটি ব্যাপারে সাধারণ মতৈক্য অর্জন। সেগুলো হলো: ১. তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্কের অবসান এবং রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সর্বজনীন স্বীকৃতি। ২. যুদ্ধাপরাধী প্রশ্নে মতৈক্য। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা ঠেকাতে হবে এবং তাদের বিচারের প্রশ্নটি সাধারণ সম্মতির ভিত্তিতে সুনিশ্চিত করতে হবে। ৩. ভবিষ্যৎ নির্বাচন পরিচালনার সব দায়দায়িত্ব সমর্পণ করতে হবে একটি প্রকৃত স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের হাতে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে এমন একজনকে নির্বাচন করতে হবে, যাঁর ব্যক্তিগত সততা, নিয়মনিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতা হবে তর্কাতীত। তাঁর চোখে সে রকম একজন আদর্শ নির্বাচন কমিশনার ছিলেন ভারতের টি এন সেশন। ভারত সরকারের এই সাবেক সচিব ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সে দেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতে যে আজ মোটের ওপর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, নির্বাচনের পর কারচুপি বা সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ নিয়ে কেউ জল ঘোলা করে না, তার ভূমি তৈরির জন্য প্রধান কৃতিত্ব টি এন সেশনের, এ কথা অনেকেই বলেন।
খুব যে নতুন কোনো কথা বলেছেন মাহবুবুর রব সাদী, আমার তা মনে হয় না। সবাই তাঁর প্রস্তাবিত ফর্মুলার সঙ্গে একমত হবেন, তা-ও মনে হয় না। সে কথা তিনি জানেন, কিন্তু তিনি এ কথাও জানেন যে, কোথাও না কোথাও, কাউকে না কাউকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নে একটি ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত করতে হবে। সমাধানের সর্বজনগ্রাহ্য একটি ফর্মুলা সেই সংলাপ বা জাতীয় মতৈক্য থেকেই উঠে আসবে। একা কোনো ব্যক্তি, কোনো দল বা এমনকি কোনো উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত থেকে প্রকৃত সমাধান আসবে না। তাঁর যুক্তি—আসুন, কথা বলি, তা থেকেই ভালো কোনো ফর্মুলা বেরিয়ে আসবে।
সাদীর প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা যাক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নটি নতুন করে তোলার বিপক্ষে সাদী। আমরা জানি, এই প্রশ্নে ইতিমধ্যে আদালত তাঁর রায় দিয়েছেন। ২০১১ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী বলে রায় দেন, যদিও তাঁদের পরামর্শ ছিল পরবর্তী দুটি জাতীয় নির্বাচন এই ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হোক। সে বছরই, আদালতের রায়ের ভিত্তিতে, আওয়ামী লীগনিয়ন্ত্রিত সংসদ ২৯১-১ ভোটে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী গ্রহণের মাধ্যমে সে সিদ্ধান্তের স্থায়ী রূপ দেয়। এমন বিপুল সংখ্যাধিক্যে এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার কারণ প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সে সময় সংসদ বয়কট করছিল।
সাদী মনে করেন, বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই, বাংলাদেশেও থাকা উচিত নয়। যেকোনো ক্ষমতাসীন সরকার তার মেয়াদ পেরোবার আগেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে, তবে সে নির্বাচনের পুরো দায়িত্ব থাকবে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ওপর। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকার কোনো রকম নাক গলাবে না।
কথাটা ঠিক, ‘স্বাভাবিক’ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শুধু নির্বাচন পরিচালনার জন্য ওপর থেকে বসিয়ে দেওয়া একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রচলন নেই। কিন্তু সে তো ‘স্বাভাবিক’ রাষ্ট্রব্যবস্থায়, আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বাভাবিক এমন জিনিস খুব কমই আছে। নিজেরা না জিতলে সে নির্বাচনকে বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করার কোনো অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। এমনকি যখন সারা দেশ ও দেশের বাইরের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকেরা জানান নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, তখনো নয়। আমাদের রাজনীতিকেরা ধরেই নেন, তঁাদের চোখে যা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ, এমন নির্বাচন হলে তাঁরাই জিতবেন ও সরকার গঠন করবেন। বস্তুত, আজ পর্যন্ত আমরা দেখিনি, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পরাজিত নেতা কখনো বিজয়ী নেতাকে মৌখিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সাংসদ হিসেবে শপথ নিয়েছেন, এমনকি সাংসদ হিসেবে প্রাপ্য ভাতা ও অন্য সব সুবিধা নেওয়ার পরেও দিনের পর দিন সংসদ বয়কট করে চলেছেন, এ তো আমাদের প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দলের ডিএনএর ভেতর ঢুকে গেছে।
অন্য কথায়, আমাদের রাজনীতির কোনোটাই ঠিক ‘স্বাভাবিক’ নয়।
এই চূড়ান্ত অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার কারণে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা একটি যৌক্তিক বিকল্প হতে পারে। বাংলাদেশের উদাহরণ সামনে রেখে পাকিস্তানে ও নেপালে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা চালু হয়েছে। জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় আশি ও নব্বইয়ের দশকে বেশ কয়েকটি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেও কার্যত একধরনের তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা। ইউরোপের কোনো কোনো দেশেও শূন্য স্থান পূরণের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছে। যেমন বেলজিয়ামে ২০১০ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠন করা সম্ভব না হলে দেশ পরিচালনার ভার পড়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর।
সাদী বলেছেন তিনি একজন টি এন সেশনের অপেক্ষায় আছেন। অপেক্ষায় আমরাও, কিন্তু কোথায় সেই মহাত্মা, যিনি আত্মগোপন করে আছেন? নিজের গায়ে দলবাজির নামাবলি চড়েনি, এমন কোনো সর্বজনমান্য লোক নেই তা নয়, কিন্তু কে সেই লোক, জিজ্ঞেস করলে তার উত্তর মেলেনি। যদি ধরে নিই তেমন লোক আছেন, কিন্তু তাঁকে যে বিনা তর্কে গ্রহণ করা হবে, এ কথা যাঁরা ভাবেন, তাঁরা সম্ভবত মূর্খের স্বর্গে বাস করেন। বুদ্ধিজীবী বলুন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বলুন, আর আমলাদের কথাই বলুন, আজকের বাংলাদেশে প্রায় সবাই হয় দাগের এই ধারে, নয় ওই ধারে।
সাদী যদি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং প্রকৃত নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনার দাবি না করে সোনার পাথরবাটি দাবি করতেন, সেটা বোধ হয় অধিক সহজলভ্য হতো।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে সাদীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের কোনো কারণ নেই। কিন্তু দেশের প্রধান বিরোধী দল যেখানে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত একটি দলের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে রেখেছে, সেখানে এই প্রশ্নে জাতীয় মতৈক্য স্বতঃসিদ্ধ বা ‘অটোমেটিক’, তা ভাবারও কোনো কারণ নেই। এই প্রশ্ন রাজনৈতিক নয়, নৈতিক। কিন্তু সেই নৈতিক স্বতঃসিদ্ধতা অর্জনের জন্য এই প্রশ্ন থেকে তার দলীয় রাজনৈতিক চরিত্র বিচ্ছিন্ন করা দরকার। আমার মনে হয় না এই বিচ্ছিন্নতা অর্জিত হয়েছে বা তা অর্জনে আমরা সম্পূর্ণ একনিষ্ঠ।
সাদীর উদ্বেগের কারণ আমরা বুঝি, তাঁর উদ্দেশ্যের সাধুতা নিয়েও আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই। বস্তুত, এই প্রস্তাবসমূহকে তাদের ‘মুখ-মূল্যে’ যদি আমরা গ্রহণ করে নিই, তাহলে ব্যাপক জাতীয় সংলাপের জন্য এটি একটি প্রাথমিক কাঠামো হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তেমন কোনো জাতীয় সংলাপের জন্য ডাকটি দেবেন কে? আর ডাক দিলে তাতে সাড়া মিলবে—এমন অদ্ভুত কথাই বা কে বলল! আমাদের দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল এবং তাদের নেতা-নেত্রীদের মধ্যে বিবাদ ও তিক্ততা এত তীব্র ও এমন ব্যক্তিগত যে তাঁরা কখনো একই টেবিলের এপাশ-ওপাশ বসবেন, তা আশা করা বোকামি।
আশার কথা, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা বদলাতে শুরু করেছে। চারদিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের হাওয়া। দুই দিন আগেও যাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে গররাজি বা নিমরাজি ছিলেন, এখন তাঁরাও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নির্বাচনী রাজনীতিতে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে তো সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। তিন মাসের টানা হানাহানিতে অসংখ্য মৃত্যুর পাহাড় ডিঙিয়ে আমরা একটি সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি। এই পৌঁছানো এখন পর্যন্ত কেবল সম্ভাবনার অর্থে, তাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার দায়িত্ব পেশাদার রাজনীতিকদের। যদি সবাই শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের ব্যাপারে ঐকান্তিক থাকেন, তাহলে অবিশ্বাস ও ঘৃণার চলতি বদ হাওয়াটা হয়তো পাল্টানো যাবে।
আপাতত সে সম্ভাবনার ঝুড়িতে আমরা সকল ডিম রাখছি।
হাসান ফেরদৌস: নিউইয়র্কে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

কী করবেন মাহী-রনি by কাফি কামাল

মাহী বি. চৌধুরী ও গোলাম মওলা রনি। ঢাকা সিটি নির্বাচনে উত্তর ও দক্ষিণে তরুণ প্রজন্মের দুই আলোচিত মেয়র প্রার্থী। সাবেক এমপি মাহী বি. চৌধুরী বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব হলেও নির্বাচন করছেন একটি অনলাইন ভিত্তিক সংগঠন ‘ব্লু ব্যান্ড কল’-এর ব্যানারে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাবেক আলোচিত এমপি গোলাম মওলা রনি লড়ছেন স্বতন্ত্র। বিএনপি সরাসরি নির্বাচনে না গেলে বিকল্প প্রার্থীদের সমর্থন দেয়ার ব্যাপারে একটি গুঞ্জন ছিল রাজনৈতিক মহলে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তরে সমমনা রাজনৈতিক দল বিকল্পধারার মাহী বি. চৌধুরী ও ঢাকা দক্ষিণে গোলাম মওলা রনির নাম ছিল আলোচনায়। রনির চেয়েও মাহীকে নিয়েই আলোচনা ছিল বেশী । কিন্তু সিটি নির্বাচনে দলের এক নীতি-নির্ধারক মির্জা আব্বাস এবং সিনিয়র এক নেতার ছেলে তাবিথ আউয়ালকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। জাতীয়তাবাদী ঘরানার বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’-এর ব্যানারে তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ফলে এখন কি করবেন মাহী বি. চৌধুরী ও গোলাম মওলা রনি। তারা কি সক্রিয়ভাবে নির্বাচন করবেন নাকি ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হবেন প্রচারণার মাঠে? যদিও ইতিমধ্যে তাদের নামে প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে। মাহী ঈগল ও রনি পেয়েছেন আংটি। বড় রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনার মতো এখন নির্বাচনে থাকা-না থাকার ব্যাপারে নতুন গুঞ্জন তৈরি হলে দুইপক্ষই তা উড়িয়ে দিয়েছেন। গোলাম মওলা রনি বলেছেন, কোনভাবেই তিনি নির্বাচন থেকে সরছেন না। দিন যত যাবে, ততই তার পক্ষে সমর্থনের জোয়ার দৃশ্যমান হবে। অন্যদিকে মাহী বি. চৌধুরীর ব্যাপারে তার নির্বাচনী প্রচার সেল-এর চীফ কো-অর্ডিনেটর জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, কোমর বেঁধেই নির্বাচনে নেমেছেন মাহী। শারীরিক অসুস্থতার কারণে শুক্রবার বাইরে জনসংযোগ না করলেও আজ শনিবার থেকে তাকে পুরোদমে জনসংযোগে দেখা যাবে। এদিকে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, মাহী বি. চৌধুরী বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটে নেই। তাহলে কেন তার প্রতি বিএনপি সমর্থন দেবে? সমর্থনের ব্যাপারে রাজনৈতিক মহলে আলোচনার যৌক্তিকতা নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। সাদা চোখে দেখলে মাহীকে বিএনপির সমর্থন দেয়ার বিষয়টি অযৌক্তিকই বটে। তবে এ আলোচনার নেপথ্যে রয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। বিএনপি ও জোটের একাধিক নেতা জানান, ঢাকা উত্তরে আবদুল আউয়াল মিন্টু একক প্রার্থী হওয়ায় দলের কেউ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেননি। কিন্তু তার মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় বিএনপি একটি ধাক্কা খায়। শেষদিন তার পুত্র তাবিথের মনোনয়ন জমা দেয়া নিয়ে বিএনপি মহলে তৈরি হয় নতুন প্রশ্ন। রাজনীতিতে ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করতেই কি ইচ্ছাকৃত ভুল করেছেন মিন্টু? কিন্তু তখন হিসাব করা হয় আবদুল আউয়াল মিন্টুর কারণে আওয়ামী লীগ আলোচিত ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হককে সমর্থন দিয়েছে। সেখানে রাজনীতির বাইরের এবং সার্বিকভাবে স্বল্পপরিচিত তাবিথ কতটুকু সফল হবেন। এছাড়া মিন্টুর ভুলের পাশাপাশি তাবিথের অনিশ্চয়তা ছিল ঋণ খেলাপি হিসেবে সোনালী ব্যাংকের আপিল নিয়ে। তখনই বিএনপি ও জোটের একটি মহল থেকে আলোচনায় আনা হয় মাহীর নাম। তার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলা হয়, মাহী সকল মহলে পরিচিত মুখ। এছাড়া মাহীকে সমর্থন দেয়া হলে ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্দোলন সংগ্রামে একই প্ল্যাটফরমে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়া যাবে। জোটের শরিকদের মধ্যে বিএনপির প্রতি আস্থাও বাড়বে। কিন্তু বিএনপির একটি বড় অংশ ও জোটের প্রভাবশালী শরিকরা মাহীর চেয়ে তাবিথের প্রতি আস্থা রাখার পক্ষ নেন। শীর্ষ নেতার কাছে তাদের যুক্তি ছিল দলে মিন্টুর অবদান আছে, তার ছেলেই সমর্থন প্রাপ্য। ক্লিন ইমেজ ও শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা তাবিথকেই পছন্দ করবেন। সর্বশেষ সোনালী ব্যাংকের গেরো পার হয়ে তাবিথের মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পর সুগম হয় বিএনপির সিদ্ধান্ত নেয়ার পথ। এছাড়া মাহীর নাম আলোচনায় এলেও বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনায় যায়নি বিকল্পধারা। সমর্থনের প্রত্যাশায় মাহী একদফা পেছালেও সবুজ সংকেত না পেয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জনসংযোগে নামেন। সেদিন তিনি বিএনপির সমর্থন চাইলেও বাস্তবে কার্যকর উদ্যোগ নেননি । এমনকি প্রশ্নোত্তরে তার কিছু বক্তব্যে বিএনপির নেতারা আহত হন। তবে বিকল্পধারার একাধিক নেতা জানান, বিএনপি নেতারা বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে এলেও বিএনপি-বিকল্পধারার মধ্যে এ নিয়ে কোন আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তারা নিজেদের শক্তিতেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ।
এদিকে নির্বাচনে নিজেদের অবস্থানের ব্যাপারে গোলাম মওলান রনি মানবজমিনকে বলেন, আমি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী, আমার কৌশলও স্বতন্ত্র। আমি অন্যদের মতো রাস্তায় রাস্তায় জনসংযোগের রীতিতে পথ চলতে চাই না। সে কথা আমি আমার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছি। তিনি বলেন, গত দুইদিন অন্যদের মতো আমার জনসংযোগ নিয়ে হয়তো ব্যাপক প্রচারণা হয়নি। কিন্তু আমিই বেশি মানুষের সঙ্গে সশরীরে জনসংযোগ করেছি। তার চিত্র দেখুন- আমি জুমার নামাজ পড়েছি নিউ মার্কেটে বিশ্বাস মসজিদে। সেখানে অন্তত দুই হাজার মানুষের সামনে আমি খুতবা দিয়েছি। তারপর গেছি লালবাগ শাহী মসজিদে।  সেখানে মাওলানা জুবায়ের আহমেদ, মুফতি ফয়জুল্লাহ, মুফতি জাহিদসহ হেফাজত ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। আমার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সেখানে বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছিল। তারা আমার জন্য দোয়া  করেছেন। এরপর নারিন্দা পীর সাহেবের কাছে গিয়েছি। সেখানেই আসরের নামাজের পর দুই হাজারের মতো মুরিদান ও মুসল্লির সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। এরপর মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদ হয়ে আরামবাগ বাগে রহমতে গিয়েছি। মাগরিবের নামাজ পড়ে বায়তুল মোকাররমে মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলেছি, কোলাকুলি করেছি। সন্ধ্যার পর যাবো রোটারি ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে। রনি বলেন, আমি হুট করে নির্বাচনে অংশ নিইনি। অনেক চিন্তা ভাবনা করেই ভোটের মাঠে নেমেছি। জাতীয় নির্বাচনে আমার নির্বাচনী এলাকার অন্তত ৫০ হাজার মানুষ ঢাকায় থাকেন। এছাড়া ফরিদপুর ও বরিশালের ভোটাররা আমাকেই বেছে নেবেন। বরিশাল ইজম কিন্তু সবচেয়ে বড় ইজম। রনি বলেন, ঢাকায় ভোটের হিসেবে ৩০ ভাগ বিএনপি, ২৫ ভাগ আওয়ামী লীগ, ১২ ভাগ জামায়াত ও ৩৩ ভাগ পপুলার ভোট। ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে যদি তিনজনকে মূল প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করেন তাহলে বিজয়ীকে ৭ লাখের বেশি ভোট পেতে হবে। কিন্তু বিএনপি ও আওয়ামী লীগের এত ভোট নেই। দলীয় কোন্দলের কারণে তারা আবার নিজেদের ঘরানার অর্ধেকের বেশি ভোট পাবেন না। এই হিসাব কষলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী দেড় লাখের বেশি ভোট পাওয়ার কথা নয়। বাকি ভোটের জন্য তাদের নির্ভর করতে হবে পপুলার ভোটারদের ওপর। রনি বলেন, এখানেই আমি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকব। প্রথমত, ভোটারদের অর্ধেক নারী। মার্জিত রুচির মানুষ, নিষ্পাপ মুখদর্শনের কারণে তাদের বেশিরভাগই বেছে নেবেন আমাকে। নতুন ভোটারদের কাছে জংধরা রাজনীতি এবং রাজনীতিকদের প্রতি অনীহা আছে। তারা অন্যদের ভালো মতো চেনেও না। তারা চেনে গোলাম মওলা রনি, মাহী বি চৌধুরী ও ব্যারিস্টার পার্থের মতো তরুণদের। এসব তরুণ জীবনের প্রথম ভোটটি আদর্শহীন রাজনীতি ও রাজনীতিকদের দেয়ার মতো বোকা নয়। এছাড়া বিএনপির আত্মকেন্দ্রিকতা, সুবিধাবাদী অবস্থান, আন্দোলনে পিছুটানসহ অভ্যন্তরীণ বেইমানির কারণে জামায়াত তাদের বিশ্বাস করে না। জামায়াতের ভোটও বিএনপি পাবে না, আওয়ামী লীগতো নয়ই। সবমিলিয়ে আমি বিশ্বাস করি, ঢাকা দক্ষিণে কাস্টিং ভোটের অর্ধেকই আমি পাব। এদিকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে গতকাল বিশ্রামে ছিলেন মাহী বি চৌধুরী। কয়েক দফা যোগাযোগ করেও তার সঙ্গে আলাপ করা যায়নি। তবে তার হয়ে মানবজমিনকে নিজেদের অবস্থানের কথা জানান, নির্বাচনী প্রচার সেল-এর চীফ কো-অর্ডিনেটর জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, মাহী বি চৌধুরী আজ সকাল থেকেই পুরোদমে প্রচারণা শুরু করবেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে গতকাল তিনি প্রচারণায় অংশ নেননি। অনেকেই বিষয়টির ভিন্ন ব্যাখ্যা ও নানা গুঞ্জন ছড়াচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে মাহী বি চৌধুরী নির্বাচনে আছেন এবং থাকবেন। আগামী দু-একদিনের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণার দৃশ্য সবার চোখে পড়বে। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একজন প্রার্থী হিসেবে সব মহলের সমর্থন প্রত্যাশা করাটাই স্বাভাবিক। সংবাদ সম্মেলনে মাহী চৌধুরী এক প্রশ্নের জবাবে সেটা পরিষ্কার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ঢাকা উত্তরের ভোটার হিসেবে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছেও যাবেন। তিনি সবার সমর্থন প্রত্যাশা করেন। এখন বিএনপি তাদের মতো নির্বাচনে প্রার্থী সমর্থন দিয়েছে, আমরা আমাদের মতো নির্বাচন করছি। লড়াইয়ের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই আমরা নির্বাচনে নেমেছি। এদিকে গতরাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে প্রচার সেল-এর চীফ কো-অর্ডিনেটর জাহাঙ্গীর আলম জানান, শনিবার দুপুর ২টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন মাহী বি চৌধুরী। এছাড়া বিকাল ৪টায় খিলক্ষেত তালের টেক এলাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় বৈঠক ও রাত ৮টায় কাফরুল থানা এলাকায় গণসংযোগ করবেন তিনি।

গণতন্ত্র না ‘রক্ষা’ পেল, না ‘উদ্ধার’ হলো by এ কে এম জাকারিয়া

গণতন্ত্র ‘রক্ষা’ বা ‘উদ্ধারের’ লড়াই বাংলাদেশের জন্য মনে হয় এমন এক লড়াই, যা কখনো শেষ হওয়ার নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করতে হয়েছিল গণতন্ত্র ‘রক্ষার’ জন্য। একতরফা সেই নির্বাচন গণতন্ত্রকে কতটুকু রক্ষা করতে পেরেছে, তা নিয়ে তর্কবিতর্ক চলতে পারে। তবে ওই নির্বাচন গণতন্ত্রকে যে অসুস্থ করেছে, তা অস্বীকার কারার উপায় নেই। সেই নির্বাচনের বছর খানেকের মাথায়ই দরকার হয়ে পড়ল গণতন্ত্র ‘উদ্ধার’ আন্দোলনের। বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের এই গণতন্ত্র ‘উদ্ধারের’ আন্দোলনে নাশকতা ও বর্বরতার চূড়ান্তই ঘটল। তিন মাস পর এর ফলাফলকে এখন শূন্য বলেই মানতে হচ্ছে। মানে, গণতন্ত্র ‘উদ্ধারের’ আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র ‘রক্ষার’ কী হলো? ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন যদি গণতন্ত্রকে অসুস্থ করে থাকে, তবে বিরোধীদের ওপর আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকারের দমন-নিপীড়ন তো গণতন্ত্রকে মুমূর্ষু দশায় নিয়ে গেল!
২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, এর এক বছরের মাথায় বিএনপির নেতৃত্বে নজিরবিহীন লাগাতার আন্দোলন, আন্দোলনের কৌশল হিসেবে নাশকতা ও বর্বরতা চালানো এবং সেই আন্দোলনের ব্যর্থতার পর এখন নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। বিএনপির ব্যর্থতাকে আওয়ামী লীগের বিজয় হিসেবে দেখে এমন লোকের অভাব নেই। কিন্তু যে গণতন্ত্রের জন্য এত কিছু, সেই গণতন্ত্রের আদৌ কোনো বিজয় হলো কি?
বাংলাদেশের মতো দেশে গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনের সূচনা ঘটে সাধারণত রাজপথে, আন্দোলনকারীদের প্রাণ দেওয়ার নজিরই বেশি, এসব ‘আত্মত্যাগ’ কখনো কখনো আন্দোলনকে জোরালো করে।
এবার বিএনপির আন্দোলনের কৌশল ছিল বলা যায় উল্টো। সরকারের দমন-নিপীড়নের মুখে তারা যেকোনোভাবে রাস্তায় নামার চেয়ে পালিয়ে থেকে নাশকতা চালানোর কৌশল নেয়। পেট্রলবোমা হয়ে ওঠে প্রধান অস্ত্র এবং এর শিকারে পরিণত হয় সাধারণ জনগণ। মাস তিনেকের আন্দোলনে পেট্রলবোমায় পুড়েই মারা গেছে ৭৫ জন। পুড়ে গিয়েও বেঁচে আছে এবং বাকি জীবন এর যন্ত্রণা বয়ে বেড়াবে এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ২০০। আন্দোলনের নামে এই মাত্রার বর্বরতা বাংলাদেশে আগে কখনো ঘটেনি। সাধারণ নাগরিকদের শিকারে পরিণত করা বা তাদের ওপর বর্বরতা চালানোর কৌশল সাধারণত বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠনই নিয়ে থাকে। বিএনপির আন্দোলনে এবার তার নজির দেখা গেল।
বিএনপির এই গণতন্ত্র ‘উদ্ধারের’ আন্দোলনকে তাই কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলা যাচ্ছে না। আর এ ধরনের আন্দোলন করে কখনো গণতন্ত্র উদ্ধার করাও সম্ভব নয়। বিএনপির এবারের আন্দোলনের এই ভয়ংকর কৌশল শুধু তাদের আন্দোলনকেই ব্যর্থ করেনি, বরং ভবিষ্যতে গণতন্ত্র উদ্ধারের যেকোনো আন্দোলন বা গণ-আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরিতেও নেতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
তবে বিএনপির এবারের গণতন্ত্র ‘উদ্ধার’ আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। এ ধরনের নজিরবিহীন নির্বাচনের মুখোমুখি দেশবাসী আগে কখনো হয়নি। আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগ বা তাদের জোট এই নির্বাচন করেছে গণতন্ত্র রক্ষার নামে।
এ ধরনের একতরফা নির্বাচন দেশে একটি বিকৃত ও অসুস্থ গণতন্ত্রের পরিস্থিতি তৈরি করে। আমরা দেখলাম, এমন একটি ‘নিয়ম রক্ষার’ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমঝোতার পথ না ধরে সরকার আস্তে আস্তে কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার কৌশল বা নীতি নেয়। গণতান্ত্রিক আচরণের সামান্য ছিটেফোঁটা দেখাতেও সরকার সম্ভবত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবিলায় রাজনৈতিক পথ ধরার চেয়ে দমন-নিপীড়ন এবং এসব কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু করে। আইনের শাসন বা মানবাধিকার—গণতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এসব বিষয় যেন দেশে স্থগিত হয়ে যায়। বিএনপির এই মাস তিনেকের আন্দোলনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে ৩৩ জন। নিখোঁজ বা গুমের হিসাবটি আসলে কত, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া একতরফা নির্বাচন, বিরোধী দলের প্রায় সব বড় নেতাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা, সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়া, বিএনপির প্রধান কার্যালয় তালাবদ্ধ করা, বিএনপির চেয়ারপারসনকে তাঁর কার্যালয়ে আটকে রাখা (পুরো তিন মাস না হলেও অন্তত প্রথম কিছুদিন), বিরোধী নেতা-কর্মীদের বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়া বা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও দলের প্রধান মুখপাত্রের মতো নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদের গায়েব হয়ে যাওয়া—সুস্থ গণতন্ত্রে কখনো এসব ঘটনা ঘটতে পারে না। যেসব দেশে এমন ঘটনা ঘটে, সেগুলো গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পায় না। আর গুম বা বিরোধী রাজনীতিকদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা তো সেই ষাট, সত্তর ও আশির দশকে ‘ডার্টি ওয়ারের’ সময় আর্জেন্টিনায় বা ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ঘটেছে স্বৈরশাসকদের শাসনে। সংখ্যা বা মাত্রার দিক দিয়ে সেই পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের গুম বা নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি হয়তো তুলনা করা কঠিন। তবে এটাও ঠিক যে এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা বা মানবাধিকার লঙ্ঘন সংখ্যার হিসাবে বিবেচনার বিষয় নয়। বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের কেউ কেউ নিখোঁজ, গায়েব বা গুম হয়ে গেছেন এবং তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না—এই তথ্যটি বাংলাদেশ ও এর গণতন্ত্র সম্পর্কে কী ধারণা তুলে ধরে বিশ্ববাসীর সামনে?
‘বন্দুকযুদ্ধে’ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মারা যাওয়া অথবা গুম বা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার যে ধারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেখা গেল, সেটা গণতন্ত্রের পেছনযাত্রারই ইঙ্গিত দেয়। আর্জেন্টিনা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের গুম ও অপহরণের ঘটনাগুলোর যখন তদন্ত হচ্ছে, বিচার হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এ ধরনের রাজনীতির সূচনাকে আমরা কীভাবে দেখব? গণতন্ত্র রক্ষার নামে আওয়ামী লীগ সরকার যা করল বা করে যাচ্ছে, সেটা গণতন্ত্রের জন্য একটি চরম মন্দ নজির হয়েই থাকবে। ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনো সরকার গণতন্ত্র রক্ষায় একই পথ ধরে, তবে গণতন্ত্রের বর্তমান মুমূর্ষু দশা থেকে এর দমটি বের হয়ে যাওয়ার কাজটিই সারা হবে।
এটা পরিষ্কার যে গণতন্ত্র ‘উদ্ধার’ বা ‘রক্ষার’ কাজে দুই পক্ষই ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপির ব্যর্থতা মানে তাই আওয়ামী লীগের বিজয় নয়। গত তিন মাসে চূড়ান্তভাবে যা পরাজিত হলো, তা হচ্ছে গণতন্ত্র। আন্দোলন এবং এই সময়ের ক্ষয়ক্ষতির নানা তথ্য-উপাত্ত ও হিসাব–নিকাশ বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাণহানির হিসাব আছে, অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও আছে। অর্থনীতির ক্ষতি হয়তো দেশটি কোনোভাবে বা কখনো না কখনো কাটিয়ে উঠতে পারবে, কিন্তু আগুনে পুড়ে, বন্দুকযুদ্ধে বা সহিংসতায় প্রাণ গেল যে ১৩১ জনের, বা যাঁরা নিখোঁজ হিসেবেই থেকে যাবেন, সেই ক্ষতি পূরণ হবে কীভাবে? গণতন্ত্রের জন্য দুনিয়ায় যুগে যুগে অনেক আত্মত্যাগ হয়েছে, অনেক প্রাণ গেছে, বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে। কিন্তু গণতন্ত্রকে উদ্ধার ও রক্ষা করার যে রাজনীতিতে গণতন্ত্র পরাজিত হলো, এর দশা আরও মুমূর্ষু হলো, সেখানে এতগুলো মৃত্যুকে কীভাবে জায়েজ করা যাবে?
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন পাওয়া, অফিস থেকে তাঁর বাড়ি ফিরে যাওয়া, তিন সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে দলটির ইতিবাচক অবস্থানকে অনেকেই স্বস্তি হিসেবে দেখছেন। গত তিন মাসে যা ঘটেছে, সে তুলনায় এটা স্বস্তিই বটে! কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছাড়া বিএনপি বা ২০-দলীয় জোট কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ কর্মসূচি এখনো উঠিয়ে নেয়নি। এই স্বস্তি আসলে কত দিনের? দুই পক্ষের একধরনের ‘নমনীয়’ অবস্থান বা ‘সমঝোতার’ পরিণতি কী? আগুনে পুড়ে যারা মারা গেল বা সারা জীবন পোড়ার কষ্ট বয়ে বেড়াবে, তারা কি বিচার পাবে? এসব ঘটনায় যে মামলাগুলো হয়েছে, তার একটিরও কি বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত শেষে বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হবে? বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলোর কী তদন্ত হবে? সালাহ উদ্দিন আহমদ কি ফিরে আসবেন বা তাঁর খোঁজ পাওয়া যাবে? সরকার কি এর জন্য জবাবদিহি করবে?
গণতন্ত্রের আশা যদি আমরা এখনো ধরে রাখতে চাই, গণতন্ত্রকেই যদি চূড়ান্ত মানি, তবে এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

বৈচিত্র্যই ভারতীয় সমাজের শক্তি by কুলদীপ নায়ার

এই গত ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের ভারত ভাগের প্রস্তাব পেশের ৭৫ বছর পূর্তি হয়ে গেল। পাকিস্তানে খুব বেশি মানুষ এই দিবসটি স্মরণ করেনি, আর ভারতে সেই সংখ্যাটা আরও কম। এই প্রস্তাবটি লাহোর প্রস্তাব হিসেবে পরিচিতি, এতে বলা হয়েছিল: ‘এই দেশে কোনো সাংবিধানিক পরিকল্পনাই কার্যকর ও মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি না সেটা নিম্নোক্ত নীতির ভিত্তিতে প্রণীত হয়: ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত এলাকাগুলো অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, প্রয়োজনবোধে সেই ভৌগোলিক বিন্যাসে আবার পরিবর্তন আনা যাবে, যাতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো যেমন ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল একত্র হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠন করতে পারে, যেখানে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের’ সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাষ্ট্র বা প্রদেশসমূহ হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।
‘পাকিস্তান’ শব্দবন্ধটি সেই প্রস্তাব বা তার পরবর্তী বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু হিন্দুদের মালিকানাধীন অধিকাংশ পত্রিকায় এটাকে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে ‘প্রয়োজনবোধে সেই ভৌগোলিক বিন্যাসে আবার পরিবর্তন আনা যাবে’ শব্দবন্ধটি এতে যুক্ত করেছিলেন, তার জন্য তিনি নিশ্চয়ই অনুতাপ করেছেন। কারণ, এই শব্দবন্ধটির কারণেই উপমহাদেশ ভাঙার সময় মুসলিম অধ্যুষিত পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করা হয়েছে।
জিন্নাহর অনুতাপের আরও বড় কারণ হচ্ছে, পাকিস্তান প্রস্তাবে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ শব্দবন্ধের ব্যবহার বিপর্যয়কর। কারণ, পরবর্তীকালে স্বাধীন ‘পূর্ব বাংলার’ (বর্তমানে বাংলাদেশ) সমর্থকেরা বলেছেন, লাহোর প্রস্তাবেই ভারতের ‘উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল’ ও ‘পূর্বাঞ্চলে’ দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল।
জিন্নাহ পরবর্তীকালে এই বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে এটা আসলে ছিল মুদ্রণ প্রমাদ, ‘রাষ্ট্রের’ বদলে ভুল করে ‘রাষ্ট্রসমূহ’ লেখা হয়েছিল। অর্থাৎ ইংরেজিতে ‘স্টেট’-এর বদলে ‘স্টেটস’ লেখা হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে তরুণ নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো রঙ্গ করে বলেছিলেন, তিনি ভবিষ্যতে স্টেনোগ্রাফারদের সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। তার পরও পাকিস্তান প্রস্তাবের সমর্থক ও মুসলিম লীগের উত্তর প্রদেশের নেতা খালিকুজ্জামান বলেছিলেন, তিনি ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কনভেনশনের পক্ষে প্রস্তাবের খসড়া রচনা করতে গিয়ে ‘কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই’ ইংরেজিতে স্টেটের বদলে স্টেটস লিখেছিলেন। তিনি আবার সেই প্রস্তাবে সুযোগমতো ‘উইথ সাচ টেরিটোরিয়াল রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট’ শব্দবন্ধটি বাদও দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে যেটা আবার লাহোর প্রস্তাবে স্থান পায়।
আমি দেশভাগের বিপক্ষে। তার পরও আমার আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে, সেটা প্রস্তাবের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু শেষমেশ ধর্মের ভিত্তিতেই বিভাজনটা হলো।
এর ফলে যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি হয়, তাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়। এর যেন শেষ নেই, ভারতে প্রায় ১৬–১৭ কোটি মুসলমান বসবাস করে। ১৮ বছর আগে হাশিমপুরায় যা ঘটেছিল, সেটা এক উদাহরণ মাত্র। ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখুন।
হাশিমপুরার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিক্সটিন প্রভিন্সিয়াল আর্মড কনস্ট্যাবুলারির (পিএসি) কর্মকর্তাদের নির্দোষ বলে খালাস দেওয়া হয়েছিল। মামলাটি প্রমাণের উপযুক্ত প্রমাণ না থাকায় আদালত বলেছিলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচিতি সম্বন্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব ছিল। আদালত পরবর্তীকালে ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের জন্য মামলাটিকে দিল্লি স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯৮৭ সালের মে মাসে ১৯ জন পিএসি কর্মকর্তাকে উত্তর প্রদেশের মিরাটে ৪২ জন মানুষকে হত্যার দায়ে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। এদের মধ্যে তিনজন বিচারের সময়ই মারা যায়। অভিযোগ আছে, মিরাটের হাশিমপুরা মহল্লা থেকে লোকজনকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
যে রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান রয়েছে, সেখানে এমন ঘটনা ঘটবে, সেটা শুধু তিরস্কারযোগ্য নয়, বিব্রতকরও বটে। জনগণের মাঝে আমরা যে ধর্মনিরপেক্ষতার আলো ছড়িয়ে দিতে পারিনি, তার দায় আমাদের স্বীকার করতে হবে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের নির্দেশনায় পরিচালিত হন। অনেক আমলাই সংকীর্ণ পরিবেশে থেকে নিজেরাই বিভাজনের রাজনীতি গলাধঃকরণ করছেন।
অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও আমাদের সংবিধানের প্রাক-কথনে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি এখনো রয়ে গেছে, এটা সত্য। কিন্তু এটা একধরনের ছলচাতুরী। সংখ্যালঘুরা ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। তারা মনে করে, হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ধারণ করা তাদের অধিকার আর সংবিধানের গায়েও গেরুয়া রং চড়ানো তাদের অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। যাতে করে তারা উদার হওয়ার ভান করে যেতে পারে। ভারত রাষ্ট্রের মূল্যবোধ ধ্বংসে মোদি সরকার বহু কিছু করেছে।
হরিয়ানায় সংস্কৃত ভাষাশিক্ষা ও গীতা পড়ানো শুরু হওয়ার ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে অশনিসংকেত, আমাদের ভাগ্যে আরও কী আছে আমরা তা এখনো জানি না। হয়তো বিজেপি এসব বাজারে ছেড়ে পরিস্থিতি আঁচ করার চেষ্টা করছে। তারা যদি দেখে যে হিন্দুত্ব প্রচারের তাদের গোপন কর্মসূচি আগের মতো আর উন্মাদনা সৃষ্টি করছে না, তাহলে তারা পূর্ণ গতিতে তা বাস্তবায়ন করবে।
উদার শক্তিগুলো ভূমি অধিগ্রহণ বিলের বিরোধিতা করছে এবং কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে তারা এর বিরোধিতাও করেছে, এটা সত্যিই বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু ভারতের ধারণাটাই যখন হুমকির মুখে পড়েছে, তখন তারা নিজেদের ক্ষুদ্র এজেন্ডা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে তারা সংকীর্ণ শক্তিগুলোর হাতে মাঠ ছেড়ে দিয়েছে। আর মোদি সরকারের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা উন্মোচিত হয়ে গেলেও উদার শক্তিগুলো নিষ্ক্রিয়। বিজেপির কার্যক্রম ঠেকাতে হলে সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।
সময় এসেছে, আমাদের এখন পাকিস্তান প্রস্তাবের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলতে হবে, যেটা শেষ পর্যন্ত বিভাজনের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে। তবে ভৌগোলিক নয়, ধর্মীয় বিভাজনে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের অসহায়ের মতো দেখতে হচ্ছে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তালেবানের পথে হাঁটছে। কারণ, মৌলবাদীরা সেখানে জেঁকে বসেছে। ভারতের উচিত ছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা; স্বাধীনতার পর সে যে পথে ছিল।
এমনকি অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে বিজেপির আগের সরকার ভারতের মৌলভিত্তি পরিবর্তনের চেষ্টা তেমন করেনি। তিনি নিজেও এটা জানতেন যে বৈচিত্র্যই ভারতীয় সমাজের শক্তি। কোনো একটি ধর্মের প্রাবল্য থাকলে ভারতের শক্তি ধ্বংস হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মোদি আরএসএসের দর্শনে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছেন, এটা সত্যিই করুণার উদ্রেক করে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।