Showing posts with label বিশ্ববিদ্যালয়. Show all posts
Showing posts with label বিশ্ববিদ্যালয়. Show all posts

Thursday, January 28, 2010

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাগ ডে-২০১০

দুই-তিন মাস ধরে ছাত্রছাত্রীদের চোখে ঘুম নেই। খাওয়া-দাওয়ারও ঠিক নেই। ঠিক নেই ক্লাসের সময়েরও। শুধু মিটিং আর আলোচনা—কীভাবে আরও বেশি জমজমাট করা যায়, অন্য সব বছর থেকে বেশি মজা করা যায়, এবারের র‌্যাগ ডে-২০১০। বিশ্ববিদ্যালয়ের-২০০৬ ব্যাচের ছাত্রছাত্রীরা তাই ভীষণ ব্যস্ত। র‌্যাগ ডের আগের এক সপ্তাহ তো তাঁদের কেটেছে উত্তেজনায়। মেয়েদের কী কম চিন্তা! সবার এক রঙের শাড়ি, তার সঙ্গে সব কিছু মিল করে কত কী যে কিনতে হবে! কত মজাই না করবেন তাঁরা বন্ধুদের সঙ্গে। দেখতে দেখতে কেমন করে চার-চারটি বছর পার করে দিলেন তাঁরা, ভাবতেই অবাক লাগে! এসব বন্ধুকে ফেলে রেখে চলে যেতে হবে কর্মজীবনে। চিরচেনা এই ক্যাম্পাস কী তাঁদের মনে রাখবে? শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা তাই তো র‌্যাগ ডে উদ্যাপনের মাধ্যমে স্মরণীয় করে রাখতে চান মুহূর্তগুলো।
জানুয়ারির ১৫ ও ১৬ তারিখ ছিল র‌্যাগ ডের অনুষ্ঠান। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় যেন সেজেছিল উত্সবের আনন্দে। পাঁচ দিন আগে থেকেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে-কানাচে আলো জ্বল জ্বল করছে। আর জানাচ্ছে-০৬ ব্যাচের আনন্দ মুহূর্তকে। র‌্যাগ ডের আগের রাত থেকেই ছাত্রছাত্রীরা মেতে উঠেছিলেন আমোদে। রাতে আলোকসজ্জা দেখার জন্য বেরিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার আগুন জ্বালিয়ে করেছেন নৈশভোজ। দূরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কটকা মনুমেন্ট থেকে ভেসে আসছে কয়েকজনের মিলিত কণ্ঠ—‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই...।’
রাত তখন নয়টা। অপরাজিতা হলের শেষ বর্ষের ছাত্রীদের মনে হলের গেট বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও কোন সংশয় দেখা যায় না। তাঁরাও মেতে উঠেছেন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়।
১৫ জানুয়ারি। খুলনা শহরবাসী তাকিয়ে আছে তাঁদের দিকে—অদ্ভুত সাজে বড় বড় রং-বেরঙের প্লাকার্ড, মুখোশ নিয়ে সাতটি ট্রাক আর তিনটি বাস চলেছে শহরের ভেতর দিয়ে। চলেছে হই-হই শব্দে। শোভাযাত্রায় লাল, বাসন্তী, কমলা, সবুজ রঙের আটপৌরে শাড়ি পরেছেন ছাত্রীরা। তারাও কম যান না, বাসের মধ্য থেকে হাত বের করে শহরবাসীকে অভিবাদন জানাতে ব্যস্ত তাঁরাও। শোভাযাত্রা শেষ হলো দুপুর ১২টার দিকে। ক্যাম্পাসে এসে গাড়ি থেকে নামতেই কোত্থেকে একদল ছাত্র ছুটে এসে আবিরে রাঙিয়ে দিলেন সবাইকে। শুরু হয়ে গেল রঙের খেলা—কে কার গায়ে কত রং দিতে পারেন! কিছুক্ষণ পর চেহারাই বদলে গেল সবার। গোলাপি, নীল রং মেখে বোঝাই যাচ্ছে না, কে সিলভি আর কে সৌরভ।
কিছুক্ষণ পর যে যাঁর মতো চলে যান, কারণ বিকেলে আবারও ক্যাম্পাসে আসতে হবে—সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। রাত ১০টা পর্যন্ত চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
১৬ জানুয়ারি, বেলা ১১টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি উপাচার্য প্রফেসর ড. সাইফুদ্দিন শাহ ৪৮৮ জন গ্র্যাজুয়েটের হাতে তুলে দিলেন ক্রেস্ট। প্রধান অতিথির আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয় আনুষ্ঠানিকতা ।
সন্ধ্যায় মেতে ওঠে আরেকবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। ব্যান্ড গ্রুপ Warfej-এর মেটাল মিউজিক আর গানের দোলায় মাতোয়ারা হলো বিশ্ববিদ্যালয়। ‘রক্তিম আকাশ স্তব্ধ সেখানে ফিরবে না আর জানিয়ে গেলে...।’ নাচে আর গানে মাতাল হলো কনসার্ট।
দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া র‌্যাগ ডের এই বিশাল আয়োজন দুই দিনেই শেষ হয়। কিন্তু ‘স্বপ্নের দূত’ (Emissary of Envisions) দের নিয়ে যায় সুদূরের দিকে। স্বপ্নোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হাতছানি দিয়ে ডাকে তাঁদের। সাঙ্গ হলো ছাত্রজীবনের এই চিরচেনা পরিবেশ।

Friday, August 21, 2009

বিশ্ববিদ্যালয় -আগস্ট-বিক্ষোভের দুই বছর ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা by বাধন অধিকারী

২০ আগস্ট ২০০৭। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত সেনা-ক্যাম্পের এক সেনাসদস্যের সঙ্গে খেলার মাঠে শিক্ষার্থীদের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই মূর্ত হয়ে ওঠে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই দিনের শিক্ষার্থী-নির্যাতনের প্রতিবাদে ২১ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মৌন মিছিল করা হয়। তাতে অংশ নেন চারজন শিক্ষক ও বেশ কিছু শিক্ষার্থী। পরের ঘটনা সবার জানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে এল অকথ্য নির্যাতন-নিপীড়ন ও গ্রেপ্তার-রিমান্ড-মামলা। স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসের নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়ে বিচারের সম্মুখীন করা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের। তাঁরাও রেহাই পেলেন না রিমান্ডের নাম করে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন-সাজা থেকে। নিম্ন আদালতের রায়ে সাজা প্রদানের পর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে সরকার তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হলো, কিন্তু সাজিয়ে রাখল সাধারণ ক্ষমতার একটি একাঙ্কিকা। মানে তোমরা অন্যায় করেছ, তোমরা সাজাপ্রাপ্তও, কিন্তু আমরা তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম। সুতরাং সেই সময়ের রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করেছিল এবং সেই সময়ের রাষ্ট্রের আইন বিভাগের চোখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকেরা ছিলেন অপরাধী।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি মামলায় উচ্চ আদালতে আপিল করা হলে তাঁরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাজাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মামলা নিয়েও উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে। এই মামলাটির ক্ষেত্রেও উচ্চ আদালতের রায় শিক্ষকদের পক্ষে যাবে বলেই আশা করছি।
কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার সুরাহা হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ভাঙচুরের যে মামলাটি দিয়েছিল, সেটি এখনো ওভাবেই আছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক দায়ের করা অপর একটি মামলার রায়ে ১১ জন সাজাপ্রাপ্ত, যাঁরা তথাকথিত সাধারণ ক্ষমায় ক্ষমাপ্রাপ্ত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁদের সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও এখনো তাদের আপিল করা হয়নি উচ্চ আদালতে। ভিসি ছাত্র উপদেষ্টাকে দেখিয়ে দেন, ছাত্র উপদেষ্টা দেখান লিগ্যাল সেলকে, কিন্তু মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয় না।
এখন কথা হলো, মামলা থেকে রেহাই না পেলেও শিক্ষকদের খুব বেশি ক্ষতির কিছু ছিল না। ৭৩-এর অধ্যাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার যতটুকু নিশ্চয়তা বিধান করেছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই শিক্ষকেরা তখন রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের চাকরি হারাননি চাকরিসংক্রান্ত এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে আছে বলে। তবে শিক্ষকেরা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে তাঁদের গায়ে সরকারের জুড়ে দেওয়া কলঙ্কের হাত থেকে রেহাই পাবেন। প্রতিবাদের ন্যায্যতার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাবেন। এটুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর রায়। এই মামলাগুলো থেকে অব্যাহতি না পেলে তাঁরা চাকরির আবেদন করতে পারবেন না। বিভিন্ন রকমের হয়রানির শিকার হবেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। অনিশ্চিত হয়ে পড়বে তাঁদের ভবিষ্যত্।
আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভ এবং পরবর্তী ছাত্র-শিক্ষক মুক্তির আন্দোলন ছিল অগণতান্ত্রিক জরুরি-ক্ষমতাসম্পন্ন সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের প্রতিবাদ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন জাগিয়ে তুলেছিল সারা দেশকে। আগস্টের সেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সঙ্গে সমাজের অন্যান্য শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রতিরোধ যুক্ত হলে অগণতান্ত্রিক সেই সরকার বাধ্য হয়ে নির্বাচন দেয় এবং সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এই সরকার। আগস্ট বিক্ষোভের সব মামলা থেকে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের অব্যাহতি দেওয়াটা তাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সঙ্গে সরকার যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, সেটার কার্যকর ভূমিকা এবং নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও এই সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। এই দায়বোধ ভুলে গেলে দেশের ছাত্র-জনতার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অশ্রদ্ধা করা হবে। দুই শতাধিক আসন পেয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া মহাজোট সরকার সেই অশ্রদ্ধা পোষণের কাজটি করবে না—এই আশাবাদটুকু তাদের কাছে রাখছি।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আগস্ট বিক্ষোভ আমাদের সামনে বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রশ্নটিকে সামনে এনেছিল। আবার প্রমাণিত হয়েছিল যে, রাষ্ট্র যখন ঠিক পথে পরিচালিত হয় না, তখন বিশ্ববিদ্যালয় তার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সমাজের অমঙ্গল হয় না। তাই এই বিরুদ্ধাচরণের মানে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করবার, প্রতিবাদ করবার নৈতিক দায়িত্ব থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বঞ্চিত করা যাবে না। ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির নাম করে বিশ্ববিদ্যালয়কে রাষ্ট্রের অঙ্গে পরিণত করবার সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। ৭৩-এর অধ্যাদেশ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতার যতটুকু নিশ্চয়তা বিধান করেছিল, তা দিয়ে আগস্টের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঠেকানো যায়নি। অধ্যাদেশের সংস্কার করে তাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা আদায় করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরই। তিনজনের প্যানেল থেকে ভিসি নিয়োগ দেওয়ার যে সুযোগ রাষ্ট্রপতির হাতে, সেটা একটা বড় সমস্যা। এই জায়গায় পরিবর্তন দরকার। দরকার অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ববাদী পরিচালন ব্যবস্থার অবসান। লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি নয়, আবার ছাত্ররাজনীতি বন্ধের নামে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন তত্পরতা বন্ধের পাঁয়তারাও নয়, দরকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বাধীন সংগঠন।
আজকে আগস্ট ঘটনার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে এসে সেই স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে অগ্রসর হওয়াটাই আমাদের কাজ। স্বাধীন চিন্তাই কেবল পারে অপেক্ষাকৃত স্বাধীন ও মুক্ত পৃথিবীর দিকে নিয়ে যেতে। ধারণাগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সেই স্বাধীন চিন্তার প্রাণকেন্দ্র। আমাদের কাজ যার যার জায়গা থেকে সেই ধারণার যথার্থ বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকা।
বাধন অধিকারী: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়