Friday, January 1, 2016

‘রাষ্ট্রপতির ভূমিকায় পরিবর্তন আনার ক্ষমতা শুধু সংসদের’

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ মনে করেন শপথ নেয়ার পর থেকে গত প্রায় তিন বছরে তিনি পরিপূর্ণভাবে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
বঙ্গভবনে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, সংবিধানে যা আছে তার ভেতরে থেকেই রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
বাংলাদেশে অতীতে রাজনৈতিক কোনো সঙ্কটের সময় সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ বা অন্য অনেকেই বলেছেন যে, এসব সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির একটা ভূমিকা থাকা দরকার।
এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বিষয়ে যদি কিছু যোগ করতে হয় তাহলে সংসদকেই সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বর্তমানে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির পক্ষে আসলে কতটা ভূমিকা রাখা সম্ভব?
সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, সংবিধানেই বলা আছে যে রাষ্ট্রপতি কতটা করতে পারেন, কি হবে তার ভুমিকা।
‘সংবিধানে যদি কিছু যোগ করতে হয়, তাহলে সকল দলমত নির্বিশেষে সবার সাথে আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যেভাবে সংবিধানকে দাঁড় করাবে, সে মোতাবেকই রাষ্ট্রপতিকে চলতে হবে’ - বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, সংবিধান সংশোধন করতে হলে শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সংসদ সদস্যদের দু-তৃতীয়াংশের সম্মতি লাগবে।
তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াসহ অন্যান্য দল ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দের সাথে তার আলোচনা হয়েছে। তাদের বক্তব্য পরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার সময় তাকে জানিয়েছেন।
‘অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে যেটুকু দায়িত্ব পালন করা সেখানে আমি কৃপণতা করি নি, আমি বলবো যে সততার সাথেই তা পালন করেছি’ - বলেন রাষ্ট্রপতি।

প্রতিক্রিয়ায় বাম দল : এ ইসির অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অসম্ভব তা আরার প্রমাণ হলো

নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীদেরকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলেও জনগণ তাদের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাংখা প্রত্যাখাত ও প্রতারিত হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বাম রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। সরকারের সর্বাত্মক-নিয়ন্ত্রণ, কর্তৃত্ব ও খবরদারির মধ্যে এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যে অসম্ভব তা আরেকবার প্রমাণীত হলো। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত গিয়ে বিবৃতিতে এসব কথা বলেন বাম নেতারা।
সিপিবি নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনকে কোনোভাবেই জনগণের প্রত্যাশিত অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করা যায় না। ভোটে সর্বত্র জনগণের অংশগ্রহণ ও ভোটের দিনে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক স্থানে সকল ভোটার নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে নি। নানা করচুপির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ফলে ভোটের ফলাফলে জনমতে প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে নি। নির্বাচনকে প্রহসনের ধারা থেকে মুক্ত করা যায় নি। তাই এই নির্বাচনের ফলাফলকে জনগণের মতামতের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, জামানতের টাকা বাড়িয়ে ও নির্বাচনকে কুৎসিত টাকার খেলায় পরিণত হতে দিয়ে নিষ্ঠাবান অথচ আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল মানুষদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। এরপরও নির্বাচনে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় দলসমূহের অংশগ্রহণ থাকলেও ক্ষমতাসীন ও দ্বি-দলীয় ধারার দলসমূহ অতীত দিনে যেমন নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবাধ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারেনি, এবারও স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনকে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন, স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, দুর্নীতিমুক্ত স্থানীয় শাসন ইত্যাদি মূল ইস্যুগুলো পেছনে ফেলে দিয়ে জাতীয় রাজনীতির ক্ষমতাকেন্দ্রীক ভোটে রূপান্তরিত করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। নির্বাচনে টাকার খেলা, নানাভাবে পেশী শক্তির ব্যবহার, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা ও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং রোধ করতে নির্বাচন কমিশন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করে নি।
বিপবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এক বিবৃতিতে বলেছেন সরকার দলীয় প্রার্থীদের বিপুলভাবে জয়ী ঘোষণা করা হলেও আরো একবার জনগণ এবং তাদের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাংখা প্রত্যাখাত ও প্রতারিত হয়েছে। অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন সরকারের ইচ্ছাকেই বাস্তবায়ন করেছে। সরকারি দল ও তাদের প্রার্থীদের কাছে নির্বাচন কমিশন আত্মসমর্পণ করেছে। স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে জনগণের ভোটাধিকার রা ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন আরো একবার চুড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি বলেন, এটা বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যব¯’া ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি গণহতাশা ও গণঅনাস্থার বহিঃপ্রকাশ।
বাসদ (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক মুবিনুল হায়দার চৌধুরী এক বিবৃতিতে বলেছেন, গতকাল ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে সরকারি দলের একচেটিয়া বিজয়ে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি। আপাতদৃষ্টিতে সহিংসতা ও প্রকাশ্য ভোটডাকাতি কম মনে হলেও নির্বাচনের নামে বাস্তবে প্রহসন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারী দল কর্তৃক প্রশাসনের সহযোগিতায় আগের রাতেই ব্যালটে সীল মেরে রাখা, কেন্দ্র দখল, বিরোধী পক্ষের পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়ে গণহারে সীল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা, বহিরাগতদের জড়ো করে ব্যাপক জালভোট প্রদান, বিরোধী নেতা-কর্মী ও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে ভিড়তে না দেয়া, নির্বাচনের আগে থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকজনকে পুলিশী হয়রানি করে এলাকাছাড়া করাসহ নানা কায়দায় পরিকল্পিত ও কৌশলী রিগিং করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নামাজের সময় চাওয়ায় চাকরিচ্যুত হলেন ১৯০ জন মুসলমান

কাজের সময় নামাজের জন্য সময় চাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানে ১৯০ জন কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। মঙ্গলবার কলোরাডোর ফোর্ট মরগানে অবস্থিত কারগিল মিট সলিউশন নামের মাংস প্রক্রিয়াজাত ও বিপনন প্রতিষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় একটি দৈনিকের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল শুক্রবার এ খবর জানিয়েছে।
আমেরিকায় মুসলমানদের সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্স (কাইর) জানিয়েছে, এর আগে কারগিল মিট সলিউশন মুসলমান কর্মচারীরা নামাজ পড়তে পারতেন। এমনকি মুসল্লিদের জন্য নামাজের জায়গাও করে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক এ নিয়ম পরিবর্তন করেছেন। যারা নামাজ পড়তে চায়, তাদেরকে বাসায় গিয়েই নামাজ পড়তে বলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত দুই শতাধিক মুসলমান গত মাসে কর্মবিরতি শুরু করে। এসব মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশই সোমালিয়ার অভিবাসী।
কাইরের নির্বাহী পরিচালক জায়লানি হুসেইন জানান, তারা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ১০ দিন কর্মবিরতির পর মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটি ১৯০ জন মুসলমানকে চাকরিচ্যুত করেছে।
তিনি বলেন, ‘তারা (আন্দোলনকারীরা) মনে করেছে নামাজ ছাড়ার চাইতে চাকরি হারানো অনেক উত্তম।’

মোদির রহস্যপূর্ণ লাহোর সফর এবং কাশ্মির by হামিদ মীর

কোনো সচেতন সাংবাদিক এটা মানতে প্রস্তুত নন যে, এসব হঠাৎ হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২৫ ডিসেম্বর আচানক লাহোরে পৌঁছেন। তিনি পাকিস্তানের হৃৎপিণ্ড আখ্যায়িত শহরে কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত করে বেশ বাহবা নিয়েছেন, যে সময় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতর এ বক্তব্য প্রচার করছিল, মোদির সফর এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তিনি ২৫ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে টেলিফোনে কথা বলেন এবং বিকেল ৪টার সময় কাবুল থেকে লাহোর পৌঁছেন। ইসলামাবাদের কয়েকজন সাংবাদিক পররাষ্ট্রসচিব এজাজ চৌধুরীর ঘোষণা শুনে শুধু হাসি নয়, বরং অট্টহাসি হাসতে বাধ্য হন। কেননা ওই সাংবাদিকদের ২৫ ডিসেম্বর দুপুরে ভারতের এক ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক লাঞ্চের দাওয়াত দিয়েছিলেন। ২২ ডিসেম্বর সকালে দাওয়াতকৃত সব মেহমানকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, ২৫ ডিসেম্বর লাঞ্চে তাদের সবার জন্য অপেক্ষা করা হবে। কিন্তু ওই দিনই সন্ধ্যা প্রায় ৭টার সময় সব মেহমানকে এ মেসেজ দেয়া হলো যে, এক গুরুত্বপূর্ণ ‘অফিসিয়াল ওয়ার্ক’-এর কারণে ২৫ ডিসেম্বরের দুপুরের লাঞ্চ মুলতবি করা হয়েছে। এটা ২৭ ডিসেম্বর হবে। ২৫ ডিসেম্বর ছুটির দিনে একজন কূটনীতিকের কী কাজ থাকতে পারে? নিঃসন্দেহে ওই কূটনীতিককে তিন দিন আগে জানানো হয়েছিল যে, ২৫ ডিসেম্বর নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তান আসছেন। সুতরাং তিনি অন্য সব কর্মসূচি মুলতবি করে দিয়েছেন। মোদি পাকিস্তানে তার দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ২২ ডিসেম্বর অবহিত করেছেন, ২৫ ডিসেম্বর তিনি লাহোরে আসছেন। রাষ্ট্রদূত লাহোর এয়ারপোর্টে তার অভ্যর্থনার জন্য উপস্থিত ছিলেন। তাহলে এ বিষয়টা কী করে সম্ভব যে, পাকিস্তান সরকার মোদির আগমনের খবর ২৫ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১১টায় জেনেছে? আমি এই আলোচনা এখানেই বন্ধ করে দিচ্ছি, কেননা মোদির পাকিস্তানে আগমন নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। তিনি পাকিস্তান এলেন এবং তার সংক্ষিপ্ত সফরের পর পাকিস্তান ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিবদের মাঝে রীতিমতো আলোচনার ঘোষণা হয়েছে। পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে অচলাবস্থার নিরসন ও আলোচনা পুনরায় শুরু শুভ হোক। তবে এসব বিষয়কে ‘রহস্যপূর্ণ গোপন’ না বানানো হলে বেশ ভালোই হতো। যে কাজই চুপি চুপি করা হয়, তার ব্যাপারে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। মোদির আচানক পাকিস্তান সফর নিয়ে ভারতেও বেশ প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকটি বিরোধী দল মোদির পাকিস্তান সফর নিয়ে সমালোচনাও করেছে। তবে এ সমালোচনা সামনে অগ্রসর হয়ে মোদির শক্তিতে পরিণত হবে।
ভারতে মোদির পাকিস্তান সফর নিয়ে সবেচেয়ে বড় আপত্তি হলো, পাকিস্তান এখনো দাউদ ইবরাহিমকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করেনি। মুম্বাই হামলার পরিকল্পনাকারী হাফেজ মুহাম্মদ সাঈদও গ্রেফতার হয়নি, তাহলে পাকিস্তানের সাথে কিসের বন্ধুত্ব? ভারতে এ কথাও বলা হচ্ছে যে, মোদির লাহোরযাত্রাকে বিজেপির পাকিস্তান পলিসিতে এক বড় ইউটার্ন। তবে পশ্চিমা মিডিয়াতে মোদির বেশ প্রশংসা করা হচ্ছে। কিছুকাল আগ পর্যন্ত মার্কিন ও ব্রিটিশ মিডিয়াতে ভারতের সংখ্যালঘুদের সাথে যে জুলুম-নির্যাতন করা হচ্ছে, তার নিন্দা অব্যাহত ছিল। ভারতে প্রগতিশীল ও সেকুলার শ্রেণীর পক্ষ থেকে সরকারি পুরস্কার ফেরতপ্রদানকে মোদির জন্য লজ্জাকর বলা হচ্ছিল এবং এ বিদ্রুপও করা হচ্ছিল যে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে বেশ আগ্রহী, অথচ নিজের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে তিনি যান না। কেউ মানুক আর না মানুক, মোদি কিন্তু লাহোরে স্রেফ আড়াই ঘণ্টা অতিবাহিত করে তার সমালোচকদের মুখ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন। লাহোর থেকে তিনি যা পেয়েছেন, সারা বিশ্বে কয়েকদিন পর্যন্ত তার হিসাব-নিকাশ চলবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পাকিস্তান কী পেল? পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান ভারতের সাথে একটি ক্রিকেট সিরিজের আবেদন নিয়ে নগর নগর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অতঃপর তার আবেদন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হয়ে গেছে। অনেক পাকিস্তানি বলতে শুরু করেছে যে, পাকিস্তানের ভারতের সাথে ক্রিকেট সিরিজের ভিক্ষা দরকার নেই। শাহরিয়ার খান (পিসিবির চেয়ারম্যান) এ ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, যদি ভারত পাকিস্তানের সাথে ক্রিকেট সিরিজ খেলতে লিখিত ওয়াদার প্রতি মনোযোগ না দেয়, তাহলে আমরা টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে ভারতে যাবো না। শাহরিয়ার খানের হুমকিও কাজে আসেনি। ভারত দুবাই অথবা শ্রীলঙ্কাতেও পাকিস্তানের সাথে ক্রিকেট সিরিজ খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। ভারত বড় সফলতার সাথে ক্রিকেট খেলাকে পাকিস্তানের সাথে বিবাদের অংশ বানিয়ে ফেলেছে। সরেজমিন বিবরণ হচ্ছে, পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে ভারত অবশ্যই যাবে, তবে ভারতের টিম পাকিস্তান তো দূরের কথা, কোনো তৃতীয় দেশেও পাকিস্তানের সাথে খেলতে প্রস্তুত নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাহোর আসতে পারেন, কিন্তু ভারতের ক্রিকেট টিম লাহোর এসে ম্যাচ খেলতে পারে না। আমি জানি, আমার কিছু শুভানুধ্যায়ী বলবেন, আমি পাক-ভারত বন্ধুত্বের রঙে ভাঙ ঢালছি। অর্থাৎ সুসম্পর্কের মাঝে ফাটল ধরাতে চাইছি। এ অধম আরো একবার পরিষ্কার বলতে চাই, পাক-ভারত বৈরিতা নিরসনের জন্য আলোচনার ঘোষণা বেশ শুভ উদ্যোগ। কিন্তু এর সূচনা যেভাবে হচ্ছে, তার পরিণাম নিয়ে শঙ্কা অনুভূত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ভারতের সাথে আলোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ব্যাপারে পার্লামেন্টের সহায়তা নেননি। সবাই জানেন, কয়েকটি
অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কিছু রাষ্ট্রীয় দফতরের মাঝে ভালো সম্পর্ক বিদ্যমান নেই। কেন্দ্র ও সিন্ধুর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে। খায়বার পাখতুনখাওয়ার সরকারও কেন্দ্রের আচরণে সন্তুষ্ট নয়। অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মতবিরোধের ছিটেফোঁটা পররাষ্ট্রনীতির ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিছু দিন আগে ব্যাংককে এক পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গী হয়ে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সাথে ঞৎধপশ ওও ফরঢ়ষড়সধপু-তে আমার শরিক হওয়ার সুযোগ ঘটে। ওই ঞৎধপশ ওও ফরঢ়ষড়সধপু-এর অব্যবহিত পরে ব্যাংককে পাকিস্তান ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারাও সাক্ষাৎ করেন। আমার কোনো ভুল হচ্ছে না। ভারতের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তুতি মূলত পাকিস্তান সরকারের জন্য এক বিশাল বড় পরীক্ষার সূচনা। ভারত আলোচনায় সন্ত্রাসবাদের অভিযোগগুলো সামনে রাখবে। আর পাকিস্তানের জন্য কাশ্মির সমস্যাকে তুলে ধরা বেশ কঠিন করে দেবে। দাউদ ইবরাহিম ও হাফেজ মুহাম্মদ সাঈদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের চাপও এসে যুক্ত হবে। অপর দিকে আফগানিস্তান হাক্কানি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করবে। পাকিস্তান বলবে আফগানিস্তানে আশ্রয় নেয়া মোল্লা ফজলুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। পাকিস্তানকে এমন জটিল বিষয়ের সাথে ফাঁসিয়ে আসল সমস্যা থেকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করা হবে। পাকিস্তান যখনই কাশ্মির সমস্যা তুলে ধরবে মোদি সরকার বলবে, আমরা তো শুধু আজাদ কাশ্মির নিয়ে কথা বলব। পাকিস্তান যখন খুব পীড়াপীড়ি করবে, তখন অবশেষে অনেক তামাশা করার পর খোঁটা দেয়ার ভঙ্গিতে বলা হবে, চলো ঠিক আছে, আমরা পারভেজ মোশাররফের ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা করি। কাশ্মিরি জনগণের বেশির ভাগই মোশাররফের ফর্মুলাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেননা ওই ফর্মুলার অধীনে নিয়ন্ত্রণরেখাকে স্বতন্ত্র সীমানা স্বীকার করে জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব ও পাকিস্তানের সংবিধানের ধারা ২৫৭ নাকচ করে দেয়া হবে। ওই ফর্মুলার আওতায় ভারতকে কিছুই দিতে হবে না। ভারত আজাদ কাশ্মিরের ওপর তাদের দাবি থেকে প্রত্যাবর্তন করে পাকিস্তানের ওপর অনুগ্রহ করবে। তবে পাকিস্তান সব কিছুই হারিয়ে ফেলবে। নওয়াজ শরিফ সরকারকে মোশাররফের ফর্মুলা বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। কেননা পরোক্ষভাবে এটা বলা হচ্ছে যে, ওই ফর্মুলাকে কাশ্মির শান্তি ফর্মুলার নাম দিয়ে আগে বাড়ানো হবে। ভারতের সাথে আলোচনা হবে, সেতো অনেক ভালো কথা। তবে ওই আলোচনার উদ্দেশ্য বিবাদের ন্যায়সঙ্গত সমাধান হওয়া উচিত। আলোচনার মাধ্যমে কোনো অন্যায্য দাবি কবুল করা পাকিস্তানের অস্তিত্ব না থাকার সমার্থক।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৫ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com

তিনি ছিলেন দুঃখী মানুষের নবী by সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন

মানবতার মুক্তির দিশারী মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর অপূর্ব চরিত্র মাধুর্য নৈতিক অধঃপতনের অতল থেকে মানবতাকে দান করেছে এক নতুন জীবন, নতুন উদ্যম, নতুন শক্তি, নতুন সম্মান ও নতুন করে পথ চলার সামর্থ্য ও পাথেয়। তিনি মুক্তির দিশারীরূপে এমন এক অন্ধকার যুগে আবির্ভূত হন যখন মানুষের হাতে নির্মিত মূর্তি কিংবা জীব-জানোয়ার ও গাছপালার জন্য নিষ্পাপ মানুষকে বলি দেয়া হতো। মানুষের তাজা খুন ও গোশত পেশ করা হতো দেবতাদের সামনে।
সেই জাহেলী যুগে উম্মতের নবী রহমতের কাণ্ডারী হয়ে মানবতাকে উদ্ধার করলেন অপমান ও লাঞ্ছনার কবল থেকে, ফিরিয়ে দিলেন মানুষের গৌরব ও হারিয়ে যাওয়া মান-মর্যাদা, আত্মসম্মানবোধ ও গ্রহণযোগ্যতা। ঘোষণা করলেন, এ পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে বড় ও মহান আর কিছু নেই। মানুষই হল আশরাফুল মাখলুকাত।
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অসাধারণ বিনয়ী, পরোপকারী, সদালাপী, দয়ার্দ্যহৃদয়, ন্যায়পরায়ণ ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত অনুপম চরিত্রের অধিকারী। আশৈশব তিনি নির্মল চারিত্র্যিক মাধুর্যের পরিচয় দিয়েছেন। শৈশব ও বাল্যকালেই সর্বোত্তম মানবীয় গুণাবলীর জন্য তিনি আল-আমীন বা বিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর সুন্দরতম আদর্শের কাছে কাফেররাও মাথানত করেছিল।
তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন মানবতা, সাম্য, সততা, ত্যাগ, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব এবং সহমর্মিতার শিক্ষা। বিপদ-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন। এই মানবসেবা এবং উদারতার নীতিকে অবলম্বন করেই প্রবল গতিতে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে বিস্তার লাভ করেছে ইসলাম। তলোয়ারের শক্তিতে নয়, তিনি ভালোবাসা, উদারতা, ধৈর্য, সংযম ও আদর্শ দিয়ে মানুষের মন জয় করেছিলেন। শতধা বিভক্ত মানব জাতিকে ঐক্য ও সাম্যের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। যে বৃদ্ধা রাসূলের (সা.) ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনিই তাঁর সেবা ও ভালোবাসায় অভিভূত হয়ে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। এভাবে সারা জীবন তিনি মানুষের উপকার, মানবসেবা ও মানবকল্যাণকর কাজে শ্রম ও অর্থ বিলিয়েছেন প্রশস্ত হস্তে, নিরন্নকে অন্ন দান করেছেন, রোগীর সেবা করেছেন, দাসদের মুক্তি দিয়েছেন- সর্বোপরি যেখানেই কোনো মানুষ বিপদগ্রস্ত হয়েছে; যেখানেই ক্ষুণ্ণ হয়েছে মানবতা; ক্ষুণ্ণ হয়েছে মানুষের অধিকার- সেখানেই তিনি সুষ্ঠু সমাধান ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। মানবসেবার এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে রাসূলের (সা.) ছোঁয়া লাগেনি। তাঁর স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) ছিলেন তৎকালীন মক্কার সেরা ধনীদের একজন। বিয়ের পর তিনি সব সম্পত্তি নবীজিকে (সা.) দিয়ে দিয়েছেন। আর রাসূল (সা.) গরিবদের মধ্যে সে অর্থ বিলিয়ে দিয়েছেন।
তাঁর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মানবতার কল্যাণে সাহাবিরাও এগিয়ে এসেছিলেন সমানভাবে। প্রত্যেক সাহাবি ছিলেন আত্মোৎসর্গ ও মানবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইসলাম গ্রহণ করার আগে মক্কার সেরা ধনী ছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি তাঁর সব সম্পত্তি ইসলামের নামে অসহায় ও দুস্থদের দান করেছিলেন এবং অন্য সাহাবিরাও জান-মাল সর্বস্ব দিয়েই রাসূল (সা.) ও ইসলামকে ভালোবেসে ছিলেন।
অথচ বর্তমান সময়ের আলেম-উলামা বা মুসলিম জনগোষ্ঠী আর্তমানবতার সেবায় সবচেয়ে পিছিয়ে। মানবসেবার মাধ্যমে যাদের উত্থান, মানবসেবা যাদের ধর্ম- সেখানেই মুসলিম জাতি আজ সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। সুন্দর পোশাক, বেশভূষা সবই ঠিক রয়েছে, রবং বেশিই রয়েছে। আশেকে রাসূল, আশেকে নবী, রাসূল প্রেমিক, বিশ্ব আশেকে রাসূল নানা উপাধি নিয়ে আয়োজন-উৎসবসহ বহাল তবিয়তে জীবনযাপন করছে। কিন্তু রাসূলের (সা.) আদর্শের শিক্ষা নেই। বাস্তব জীবন বা ব্যক্তিগত কার্যকলাপের মধ্যে মানবসেবার পরিচয় পাওয়া যায় না। রাসূলের (সা.) আদর্শের প্রতিফলন হয় না। কত মানুষ না খেয়ে থাকে, কত হতদরিদ্র শীতে কাতরায়, কত অনাথ সাহায্যের অভাবে শিক্ষার আলো পায় না, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনার অভাবে সমাজ ব্যবস্থা অধঃপতনের শেষ প্রান্তে ছুটে যাচ্ছে তাতে কারো মাথাব্যথা নেই।
উত্তম সমাজব্যবস্থা কায়েম রাখতে রাসূল পাক (সা.) দান-খয়রাত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কেউ যদি হালাল উপার্জন থেকে দান করে, আল্লাহ মহান সে দান নিজে গ্রহণ করেন। সেটিকে উত্তমরূপে সংরক্ষণ করেন। এক সময় সে দানের সাওয়াব পাহাড়তুল্য হয়ে যায়।’
অনত্র তিনি বলেছেন, ‘একটি খেজুরের অর্ধাংশ দিয়ে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ। আর যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে গরির-অভাবী লোকদের সঙ্গে মিষ্টি ভাষায় কথা বল, ভালো ব্যবহার করো যাতে পরকালে তোমার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।’ এভাবে মানবতার সেবা এবং অন্যের দুঃখ-কষ্টের কথা মাথায় রেখে উম্মতকে জীবনযাপন করার উপদেশ প্রদান করেছেন। একদিন তিনি হজরত আবু দারদাকে (রা.) বললেন, ঘরে তরকারি রান্না করার সময় তাতে পানি কিছুটা বাড়িয়ে দিও। খাবার সময় যাতে প্রতিবেশীকে সামান্য ঝোল হলেও দান করতে পার। দয়ার নবী এভাবেই তাঁর উম্মতকে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসার জন্য উৎসাহিত করেছেন।
ভ্রাতৃত্বপূর্ণ এবং ভারসাম্য সমাজব্যবস্থা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তিনি এরশাদ করেছেন, ‘যারা রহম করে তাদের ওপরই রহমানের রহমত বর্ষিত হয়। পৃথিবীতে যারা আছে তোমরা তাদের প্রতি রহম কর, তবে আসমানে যিনি আছেন তিনিও তোমাদের প্রতি রহমত নাজিল করবেন।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা আপন বান্দাদের উদ্দেশ করে বলবেন : হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম; তোমরা আমার সেবা-যত্ন করনি। বান্দা আরজ করবে, হে আল্লাহ! তা কেমন করে সম্ভব! আপনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেন : তুমি কি জান না, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল, কিন্তু তুমি তার সেবা-যত্ন করনি। তার পাশে দাঁড়ালে সেখানে তো আমাকেই পেতে। হে আদম সন্তান! আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তোমরা আমাকে খাবার দাওনি। বান্দা বলবে : তা কিভাবে সম্ভব, আপনি তো রাব্বুল আলামিন। আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা ক্ষুধার্ত ছিল। তুমি তাকে খেতে দাওনি। তোমার কি জানা ছিল না যে, তাকে খাওয়ালে তার কাছে আমাকে পেতে। হে আদম সন্তান! আমি পিপাসার্ত ছিলাম; তোমরা আমায় পানি দাওনি। বান্দা আরজ করবে : হে আল্লাহ! কিভাবে আপনাকে পানি পান করাব? আপনি তো তৃষ্ণা থেকে পবিত্র। আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা পিপাসার্ত ছিল, তুমি তার পিপাসা নিবারণ করনি। তোমার কি জানা ছিল না যে, তার পিপাসা মেটালে তার কাছে আমাকে পেতে।
রাসূল পাকের (সা.) উম্মত হিসেবে, তাঁর ভালোবাসার দাবিদার হিসেবে আমাদের অবশ্যই তাঁর আদর্শের অনুসরণ করতে হবে। শুধু মুখে বলা বা বেশ-ভূষাতে মুসলমানিত্ব প্রকাশ না করে কাজ-কর্মের মাধ্যমে আদর্শের বাস্তবায়ন করে যথার্থ মুসলিম পরিচয় তুলে ধরতে পারলেই তবে তা হবে ইসলামের জন্য কল্যাণকর এবং আল্লাহর কাছে প্রশংসনীয়।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, ইসলামী চিন্তাবিদ
গদিনশীন পীর, দরবারে
আউলিয়া সুরেশ্বর দ্বায়রা শরিফ
Email : ahmadinurisds@gmail.com

নববর্ষে দশটি চাওয়া by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ইংরেজি নববর্ষের দিনটি কোনোভাবেই অন্য কোনো দিন থেকে আলাদা নয়। বাংলা নববর্ষের তবুও একটা অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল যোগাযোগ আছে, নক্ষত্রপুঞ্জের অবস্থান দিয়ে আকাশকে যে বারোটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে (Zodiac) সেগুলো উদয়ের সময় দিয়েই বাংলা মাসগুলো ঠিক করা হয়েছে- তাই বাংলা নববর্ষ মোটেও জোড়াতালি দেয়া কিছু নয়! ইংরেজি মাসগুলোর বিভাজনে কিংবা ইংরেজি নববর্ষে আমি এখনও সে রকম কিছু খুঁজে পাইনি (ইংরেজি নববর্ষ যদি জুন মাসের ২১ তারিখ কিংবা ডিসেম্বরের ২১ তারিখ হতো তবুও একটা কথা ছিল, কারণ তাহলে বলতে পারতাম সূর্য তখন ঠিক কর্কটক্রান্তির ওপর কিংবা ঠিক মকরক্রান্তির ওপর এসে হাজির হয়!)। কাজেই ইংরেজি নববর্ষ আসলে অন্য যে কোনো একটা দিনের মতো- তার আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই। তারপরও যেহেতু এটা ইংরেজি নববর্ষ সেহেতু সেটা নিয়ে সারা পৃথিবীতেই নানা ধরনের বাড়াবাড়ি হয়- আমাদের দেশেও হয়েছে, পুলিশকে লাঠিপেটা করে নববর্ষের পার্টিকে ভাঙতে হয়েছে! (আমার পরিচিত একটা সংগঠন ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ রাতে সবাই যখন উদ্দাম পার্টি করার প্রস্তুতি নেয়, তখন সংগঠনের সদস্যরা কিন্তু কম্বল কিনে পথেঘাটে-স্টেশনে শীতের রাতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা মানুষের জীবনে একটু উষ্ণতার সুযোগ করে দিয়ে আসে। আমার মনে হয়েছে, একটা নববর্ষ পালনের জন্য এটা খুবই চমৎকার একটা উপায়!)।
যেহেতু আমাদের সবাইকে ইংরেজি নববর্ষ নিয়ে অনেক হইচই করতে হবে তাই আমিও তার প্রস্তুতি নিয়েছি। ইংরেজি নববর্ষে আমি কী চাই তার একটা তালিকা করেছি। আমি যখন কোনোকিছুর তালিকা করি সেটা অনেক বড় হয়ে যায়- সেই বিশাল তালিকা থেকে আমি দশটি বেছে নিয়ে আজকে এ লেখাটি লিখতে বসেছি। এই নববর্ষে আমি কী কী চাই সেগুলো এ রকম :
১. ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিচার : ১৯৭১ সালের বিজয় দিবসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর সেখান থেকে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে আলাদা করা হয়েছিল (তার ভেতরে আমার বাবার হত্যাকারীও একজন)। নতুন স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ তাদের বিচার করার জন্য যখন প্রস্তুতি নিয়েছিল, তখন জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধীর বিচার ঠেকানোর জন্য আটকে পড়া প্রায় চার লাখ বাঙালিকে জিম্মি করে ফেলেছিল। শুধু তাই নয়, তারা ২০৫ জন বাঙালিকে পাল্টা বিচার করার হুমকি দিতে শুরু করেছিল। এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশ যখনই জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার চেষ্টা করছিল, তখনই পাকিস্তান চীনকে দিয়ে ভেটো দিতে শুরু করেছিল। পাকিস্তান নিজেরাই এই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবে অঙ্গীকার করার পর বাংলাদেশ আর কোনো উপায় না দেখে তাদের পাকিস্তানে ফিরিয়ে দেয়।
পাকিস্তান কখনও তাদের বিচার করেনি। শুধু তাই নয়, এত বছর পর তারা আস্ফালন করে ঘোষণা করেছে পাকিস্তান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে কোনো গণহত্যা করেনি! কাজেই আমাদের সামনে এখন এই ১৯৫ জনকে বিচার করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। বিচার করে গ্লানিমুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা পৃথিবীকে দেখানো যাবে, পাকিস্তান নামক বর্বর রাষ্ট্রটি এ দেশের ওপর ১৯৭১ সালে কী ভয়ঙ্কর একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। কাজেই এই নববর্ষে আমার প্রথম চাওয়া পাকিস্তানের ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে বাংলাদেশের মাটিতে বিচার করা।
২. হেনরি কিসিঞ্জারের প্রতীকী বিচার : আমি যতটুকু জানি পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের এ দেশের মাটিতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব, কিন্তু হেনরি কিসিঞ্জারকে হয়তো সত্যিকারভাবে এ দেশের মাটিতে বিচার করা সম্ভব নয়। এই মানুষটি বাংলাদেশের জন্য একটি অভিশাপ, সে শুধু যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিল তা নয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেটাকে একটা তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে ঘোষণা করেছিল!
মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশের যে মানুষগুলো এ দেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, আমরা তাদের সবাইকে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছি। আর যে মানুষগুলো আমার দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তাদের কেন প্রতীকী বিচার করতে পারব না? ক্রিস্টোফার হিচেন্সের লেখা ‘ট্রায়ালস অব হেনরি কিসিঞ্জার’ বইটিতে তাকে বিচার করার জন্য প্রয়োজনীয় যথেষ্ট মালমশলা রয়েছে।
কাজেই এই নববর্ষে আমার দ্বিতীয় চাওয়াটি হচ্ছে হেনরি কিসিঞ্জারের একটি প্রতীকী বিচার!
৩. জামায়াতমুক্ত বিএনপি : বাংলাদেশের সরকারি দল ও বিরোধী দল দুটোকেই হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল। বিএনপি যতদিন জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে রাখবে ততদিন সেটা হওয়া সম্ভব নয়। কাজেই আমি মনে করি জামায়াতকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত বিরোধী দল দূরে থাকুক, বিএনপির বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল হওয়ারই নৈতিক অধিকার নেই।
কাজেই এই নববর্ষে আমার তৃতীয় চাওয়া হচ্ছে জামায়াতমুক্ত বিএনপি। আমার ধারণা, এটি যদি না ঘটে তাহলে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটিই ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাবে (বিএনপি যদি জামায়াতকে পরিত্যাগ করে, সম্ভবত গয়েশ্বর রায় এবং তার মতো মানুষরাও বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগ দেবে, কিন্তু সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই)।
৪. আলাদা সাইকেল লেন : আমার ছাত্র ও সহকর্মীরা মিলে আমাকে একটা সাইকেল উপহার দিয়েছে, বাংলাদেশের তৈরি সাইকেল এবং সাইকেলটি দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে গেছে। আজকাল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকা সাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। আমার মনে হচ্ছে, শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশেই সাইকেল নিয়ে এক ধরনের আন্দোলনের মতো শুরু হয়েছে। শুধু আন্দোলন নয়, এটাকে রীতিমতো বিপ্লব করে ফেলা সম্ভব যদি শুধু বড় বড় রাস্তার পাশে পাশে ছোট এক চিলতে জায়গায় একটা সাইকেলের লেন করে দেয়া যায়। ঢাকার যে বিশাল ট্রাফিক জ্যাম সেটা দূর করে আমাদের সময় বাঁচানোর এর থেকে সহজ কোনো পরীক্ষিত পথ আছে বলে আমার জানা নেই।
কাজেই এই নববর্ষে আমার চতুর্থ চাওয়াটি হচ্ছে দেশের বড় বড় সড়কের পাশে পাশে আলাদা সাইকেল লেন।
৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা : দেশে এখন যতগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে তাদের সবগুলোয় আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার মতো দিন খুঁজে পাওয়া যায় না। কাজেই ছাত্রছাত্রীদের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়ার জন্য অন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিত্যাগ করতে হয়। দূরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দের হলেও ছেলেমেয়েরা বাধ্য হয়ে কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়, তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জাতীয় চরিত্রটি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক চরিত্রে পাল্টে যাচ্ছে। এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার অমানবিক বিষয়টা এতদিনে সবাই জেনে গেছে। এটা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু যে বিষয়টা সবাই জানে না- সেটি হচ্ছে একই সঙ্গে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা বেশ কয়েকটাতে সুযোগ পাওয়ার পর মাত্র একটাকে বেছে নেয়ার কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু সিট ফাঁকা থেকে যায়। শেষ মুহূর্তে সেই ফাঁকা সিট বন্ধ করার জন্য অনেক তোড়জোড় করার পরও কিন্তু সব সিট পূরণ হয় না। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সিটের জন্য ছেলেমেয়েরা পাগলের মতো চেষ্টা করে, অন্যদিকে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট ফাঁকা থেকে যায়- এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে?
সমন্বিতভাবে সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটা ভর্তি পরীক্ষা নিলে এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কাজেই এখন এটা হচ্ছে শুধু সময়ের ব্যাপার, যখন এ দেশের ছেলেমেয়েরা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা দেবে, তার কারণ এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এই নববর্ষে এটি হচ্ছে আমার পঞ্চম চাওয়া- আমি এ বছরেই এটি দেখতে চাই!
৬. দুটি পাবলিক পরীক্ষা : এ দেশে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করার সময় দুটি পাবলিক পরীক্ষার কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু ছেলেমেয়েদের এখন চার-চারটি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হয়। আমাদের ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট চৌকস, তারা খুব সহজেই চারটি কেন, আরও বেশি পরীক্ষা দিতে পারত, যদি সেগুলো তারা নিজের মতো করে দিত। কিন্তু আমাদের অভিভাবকরা মোটামুটি উন্মাদের মতো হয়ে গেছেন, এই চারটি পাবলিক পরীক্ষাতেই গোল্ডেন ফাইভ নামক বিচিত্র বিষয়টি পেতেই হবে বলে তারা তাদের ছেলেমেয়েদের এত ভয়ঙ্কর চাপের মুখে রাখেন যে, এই ছেলেমেয়েদের শৈশবটি এখন বিষাক্ত হয়ে গেছে। যারা ছোট শিশুদের সংগঠন করেন তারা বলেছেন পঞ্চম শ্রেণী, অষ্টম শ্রেণী বা দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় ছেলেমেয়েগুলোকে তারা সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্প কোনো বিষয়ে আনতে পারেন না- কারণ তাদের বাবা-মায়েরা তাদের প্রাইভেট, কোচিং কিংবা ব্যাচে পড়ানো ছাড়া অন্যকিছুতে সময় দিক সেটা মানতেই রাজি নয়।
আমি চাই এই ছেলেমেয়েগুলো তাদের নিজেদের শৈশবকে উপভোগ করুক। এ দেশের শিক্ষাবিদরা মিলে দুটি পাবলিক পরীক্ষার কথা বলেছিলেন, নববর্ষে আমার চাওয়া দেশের শিশুদের আবার দুটি পাবলিক পরীক্ষার মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা হোক।
৭. পত্রিকায় গাইড বই প্রকাশ বন্ধ করা : আমাদের দেশে গাইড বই প্রকাশ করার ওপর বিধিনিষেধ আছে, কিন্তু দেশের বড় বড় বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকাগুলো বড় বড় গালভরা নাম দিয়ে নিয়মিতভাবে গাইড বই প্রকাশ করে। দেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোয় যখন সত্যিকার শিক্ষার জন্য যুদ্ধ করার কথা, তখন তারা যখন নিজেরাই গাইড বই ছাপায় (এবং অনেক সময় সেটি গর্ব করে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করে), তখন আমাদের লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।
এই নববর্ষে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে চাই না, আমি চাই এ বছরেই যেন সব দৈনিক পত্রিকা তাদের গাইড বই প্রকাশ বন্ধ করে সেই পৃষ্ঠাটিতে জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাসের চমকপ্রদ গল্প দিয়ে দেশের শিশুদের মুগ্ধ করে।
৮. প্রশ্ন ফাঁস থেকে মুক্তি : এ বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট চিৎকার করা হয়েছে। এটি অবিশ্বাস্য যে, একটি রাষ্ট্র তার লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর জন্য তৈরি করা প্রশ্নের ফাঁস হয়ে যাওয়া বন্ধ করতে পারে না। পরীক্ষায় প্রশ্নই যদি ফাঁস হয়ে যায় সেই পরীক্ষার কিংবা সেই শিক্ষার আদৌ কি কোনো অর্থ আছে?
এই নববর্ষে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া হচ্ছে সব রকম পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করে দেয়া।
৯. ফেসবুক থেকে মোহমুক্তি : খবরের কাগজের সংবাদ, এ দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ দিনে এক ঘণ্টা থেকে বেশি সময় ফেসবুক করে (শুদ্ধ করে বলতে হলে বলতে হবে, সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে)। খবরটার আরও ভয়ঙ্কর অংশটি হচ্ছে, ২৩ শতাংশ মানুষ দিনে ৫ ঘণ্টা থেকে বেশি সময় ফেসবুক করে কাটায়। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার! অল্প কয়দিনের একটা জীবন নিয়ে আমরা সবাই পৃথিবীতে এসেছি, সেই জীবনে কত কী দেখার আছে, কত কিছু করার আছে, তার কিছুই না দেখে, কিছু না করে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের পেছনে কয়টা লাইক পড়েছে সেটা গুনে গুনে জীবন কাটিয়ে দেব?
এই নববর্ষে আমার নবম চাওয়া, তরুণসমাজ যেন বুঝতে শেখে যে আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করব, প্রযুক্তিকে কখনোই আমাদের ব্যবহার করতে দেব না। ফেসবুকের বাইরে একটা জীবন আছে, ভার্চুয়াল জীবন থেকে সেই জীবন অনেক আনন্দের।
১০. সবার জন্য প্রবেশগম্যতা : একটি দেশ কতটুকু সভ্য হয়েছে সেটা একেকজন একেকভাবে বিচার করেন। আমার বিচার করার মাপকাঠিটা খুবই সহজ- যে দেশে প্রতিবন্ধী মানুষরা যত বেশি স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করবেন, সেই দেশ তত বেশি সভ্য। সেই বিচারে আমরা কিন্তু এখনও সে রকম সভ্য হতে পারিনি। হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হয় এ রকম মানুষরা কিন্তু আমাদের দেশে এখনও পথেঘাটে-বিল্ডিংয়ে স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারে না। দেশে সে ব্যাপারে আইন হয়েছে, কিন্তু এখনও সেই আইন কার্যকর হয়নি।
কাজেই এ বছরের নববর্ষে আমার শেষ চাওয়াটি প্রতিবন্ধী মানুষকে নিয়ে। আমি চাই এ বছরে আমরা যেন সব জায়গায় সব মানুষের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করি। এখানে একটা বিষয় আমি একটু পরিষ্কার করে নিতে চাই, যদিও আমি ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি, কিন্তু আমি এই শব্দটি বিশ্বাস করি না। যাদের আমরা প্রতিবন্ধী বলি, আমি তাদের অনেককে খুব কাছে থেকে দেখেছি এবং আবিষ্কার করেছি- তারা কিন্তু মোটেও প্রতিবন্ধী নন। তারা বিশেষ ধরনের মানুষ, একটা বিশেষ সুযোগ দেয়া হলেই তারা কিন্তু আমাদের পাশাপাশি ঠিক আমাদের মতোই সব কাজ করতে পারেন।
নববর্ষের এই দশটি চাওয়া ছাড়া আমার আরও অনেক চাওয়া আছে। কিছু নিজের কাছে, কিছু পরিবারের কাছে, কিছু সহকর্মীদের কাছে, কিছু ছাত্রছাত্রী বা তরুণ-তরুণীদের কাছে এবং কিছু রাষ্ট্রের কাছে। সবগুলো থেকে আমি এই দশটি বেছে নিয়েছি শুধু একটা কারণে- এই দশটি বাস্তবায়ন করতে কাউকে কোনো টাকা খরচ করতে হবে না।
দরকার শুধু একটুখানি সদিচ্ছার। সেই সদিচ্ছাটুকু কেন আমরা দেখাব না?
৩০.১২.১৫
মুহম্মদ জাফর ইকবাল : অধ্যাপক, হযরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; লেখক

অনিয়ম হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে by ড.নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ

বিগত দিনগুলোতে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের নামে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল যে ধরনের সহিংস কর্মসূচি পালন করেছে, সেসব তাণ্ডবের কথা মানুষ সহজে ভুলতে পারবে না। এবারের পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মানুষের মনে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল তা হল, নির্বাচনের দিন ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কিনা? সাধারণ মানুষ সেসব প্রশ্ন সামনে রেখেই ভোট কেন্দ্রে গিয়েছিল। আমরা লক্ষ করেছি, সারা দেশে ভোটাররা শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছেন। গত জানুয়ারির সব তাণ্ডবের কথা ভুলে মানুষ যে দলে দলে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাতে হয়। পৌরসভা নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পেছনে ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তারা আবারও প্রমাণ করলেন যে, তারা নৈরাজ্য চান না, তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে চান।
সাধারণ মানুষের মনের সব ধরনের আতংক দূর করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যে ভূমিকা পালন করেছে এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রমাণ করলেন তারা গণতন্ত্রকে সুসংহত করার পক্ষে। পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা ধরনের অভিযোগ করেছে। তারা বলার চেষ্টা করেছেন, পৌরসভা নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি। আমার মনে হয়, যারা এসব অভিযোগ করেছেন তারা কোনো রকম যাচাই-বাছাই না করেই ঢালাওভাবে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এমন মনগড়া অভিযোগ ও ঢালাও বক্তব্য প্রদানের সংস্কৃতি আমাদের দেশে নতুন নয়। আমি মনে করি, ঢালাও বক্তব্য প্রদানের আগে তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে তারপর বক্তব্য দেয়া উচিত। তারা যদি সত্যি সত্যি নির্বাচনে কোনো ত্রুটি খুঁজে পান, সেসব বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা উচিত। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে, সেসব বিষয় যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।
পৌরসভা নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় মিডিয়া ও পর্যবেক্ষকদের কল্যাণে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তবে শতকরা হিসাবে সেসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই বিবেচনা করা যায়। সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে বলা যায়, আমাদের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখের পৌরসভা নির্বাচন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
ড . নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ : চেয়ারম্যান, জানিপপ; প্রোভিসি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস

এ নির্বাচন নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে by এমাজউদ্দীন আহমদ

উৎসবমুখর পরিবেশে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এটাই ছিল আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু বুধবার সারা দেশে যেভাবে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এতে আমাদের ওই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। নির্বাচন বিষয়ক সারা দেশের বিভিন্ন খবর শুনে আমি হতাশ হয়েছি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে আমি উচ্চ ধারণা পোষণ করতাম। বুধবার সারা দেশের নির্বাচন বিষয়ক বিভিন্ন খবর শুনে আমি এতটাই হতাশ যে, আমার ওই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। পত্রিকায় দেখেছি নির্বাচন শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোনো কোনো কেন্দ্রে নির্বাচন শেষ হয় গেছে। এছাড়া শুনেছি কোনো কোনো কেন্দ্রে বিকাল চারটায় শতভাগ ভোট প্রদান সম্পন্ন হয়েছে। এসব খবর শুনে পৌরসভা নির্বাচন বিষয়ে মানুষের হতাশা বাড়বে। প্রযুক্তির কল্যাণে এসব খবরাখবর বিদেশীরাও জেনে যাবে। পৌরসভা নির্বাচন বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে বিদেশীরা আমাদের সম্পর্কে কী ধারণা পাবে? যে কোনো নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে, শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর হবে, দেশের মানুষ এটাই দেখতে চায়। বুধবার সারা দেশে যেভাবে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এতে মানুষের মনে নানা ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক।
দেশে কোন দলের আনুমানিক কত শতাংশ সমর্থক আছে, এ বিষয়ে আমাদের একটা ধারণা আছে। কিন্তু বুধবার অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা যে পরিমাণ ভোট পেয়েছেন, তার সঙ্গে আমাদের ধারণার ব্যবধান অনেক বেশি। ইতিমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি, কোনো কোনো কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর কোনো এজেন্ট ছিল না। আমার ধারণা, যেসব কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট ছিল না, সেখানে হয়তো তাদের থাকার পরিবেশই ছিল না।
বর্তমান সময়ে আমরা চেষ্টা করলেও সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারব না। আমাদের কর্মকাণ্ড বিদেশীরাও দেখছে, জানার চেষ্টা করছে। দেশে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অক্ষুণ্ণ রাখতে নির্বাচন কমিশন যথাযথ ব্যবস্থা নেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইউএনও’র বাড়িতে ককটেল বিজয়ী প্রার্থীকে গুলি

পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা, সংঘর্ষ, ভাংচুর ও লুটের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার বিকাল থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঘটা এসব ঘটনায় একজন নিহত ও ৮৭ জন আহত হয়েছেন। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর পৌরসভায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষে আবুল কাশেম নামের এক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। এখানে দু’দফা সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় একজন গুলিবিদ্ধসহ ৮ নৌকা সমর্থক আহত হয়েছেন। দাউদকান্দিতে বিজয়ী কাউন্সিলরকে গুলি করা হয়েছে। তিনি এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। শরীয়তপুরের নড়িয়ায় আওয়ামী লীগের বিজয়ী মেয়র প্রার্থীর ৫ সমর্থককে কুপিয়ে জখম করেছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা। পিরোজপুরে বিজয়ী কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় পরাজিত প্রার্থীর ৮ সমর্থক আহত হয়েছেন। নড়াইলের কালিয়ায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা ৫ নৌকা সমর্থককে কুপিয়ে জখমসহ বেশ কয়েক জনকে আহত করেছে। গৌরনদীতে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন এবং গাইবান্ধায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষে ৪ জন আহত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে সংঘর্ষে ৭ জন আহত হয়েছেন। চাঁদপুরের কচুয়ায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশসহ ৫ জন আহত হয়েছেন। ময়মনসিংহের ফুলপুরে রিটার্নিং অফিসার ও ইউএনও’র বাড়ি লক্ষ্য করে ৬টি ককটেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি স্থানে বাড়ি-ঘরে হামলা, ভাংচুর, লুট ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) : হোসেনপুর পৌরসভায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষে এক ব্যবসায়ী নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। পৌরসভার নতুনবাজার মোড় এলাকায় বুধবার সন্ধ্যায় ও বৃহস্পতিবার সকালে দু’দফা সংঘর্ষে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন রয়েছে।

জানা যায়, জাল ভোট দেয়া নিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় ২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী জহিরুল ইসলাম ওয়াসিম ও মো. শাহজাহান কাজলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে আবুল কাশেমসহ (৪৫) অন্তত ১০ জন আহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় কাশেমকে রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার সকালে চিকিৎসাধীন ওই হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তিনি নবনির্বাচিত কাউন্সিলর কাজলের চাচা।

এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে কাশেমের মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে কাজলের লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষ জহিরুল ইসলাম ওয়াসিমের সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে ৮-১০ জন আহত হন। এ সময় দু’পক্ষের লোকজন ধুলিহর গ্রাম ও নতুনবাজারে বেশকিছু বাড়িঘর ও দোকানপাট ভাংচুর করে।

হোসেনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ নান্নু মোল্লা আহত আবুল কাশেমের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানান, ঘটনায় জড়িত অভিযোগে একজনকে গ্রেফতার ও কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ছেংগারচর (চাঁদপুর) : ভোটে হেরে যাওয়ার পর চাঁদপুরের ছেংগারচর পৌরসভায় ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী নাজমুল খানের সমর্থকরা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছানাউল্যাহ সরকার ও তার সমর্থকদের বাড়ি-ঘরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করেছে। বুধবার নির্বাচনের পর সন্ধ্যার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ছানাউল্যাহ সরকারের স্ত্রী জাহানারা বেগম জানান, হামলাকারীরা ব্লেন্ডার মেশিন, ল্যাপটপ, ট্যাব মোবাইল সেট, একটি ফ্রিজ ও টিভি ভাংচুর করে। এ সময় তারা দুই ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। নাজমুল খানের কর্মীরা ছানাউল্যাহর সমর্থক আবদুল মালেক সিকদারের বাড়ি ও সাবেক কমিশনার সোহরাব মিয়ার বাড়িতেও হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র ভাংচুর করে।

কচুয়া (চাঁদপুর) : চাঁদপুরের কচুয়ায় আওয়ামী লীগের বিজয়ী ও পরাজিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশসহ ৫ জন আহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার দিকে পৌরসভার বিশ্বরোড বাইপাস এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জানা যায়, ৩নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ বিজয়ী কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন ও পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী কামাল হোসেন গাজীর সমর্থকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পুলিশ ও বিজিবি ঘটনাস্থলে পৌঁছে ১২ রাউন্ড শর্ট গানের ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নড়িয়া (শরীয়তপুর) : বৃহস্পতিবার সকালে জেলার নড়িয়া উপজেলার মাদবর বাজার সংলগ্ন লোংশিং এলাকায় পৌর নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র প্রার্থী হায়দার আলীর সমর্থক কোরবান মুন্সি, কাদের ছৈয়াল, শামিম মাদবর ও সাবেক কমিশনার আবদুল আজিজ মাদবরের বাড়িতে পরাজিত আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা হামলা চালিয়ে ৪টি ঘর ভাংচুর করে। এ সময় তারা নজরুল মাদবর, রহিমা বেগম, আমেনা বেগম ও পিয়ার হোসেনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করে। আহতদের নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে গুরুতর আহত নজরুল মাদবরকে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে।

পিরোজপুর : পিরোজপুর পৌর নির্বাচনে বিজয়ী কাউন্সিলর প্রার্থী আ. সালাম মধুর সমর্থকরা বুধবার রাত পৌনে ৮টার দিকে পরাজিত কবির সিকদারের সমর্থকদের ওপর হামলা চালালে দুই মহিলাসহ ৮ জন আহত হন। এদের মধ্যে গুরুতর একজনকে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২ জনকে আটক করা হয়েছে।

নেত্রকোনা : নেত্রকোনা পৌরসভায় দুই পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী আতাউর রহমান তারা ও মো. শামীম রেজা খান সরলের কর্মী সমর্থকরা নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করে কাটাকাটির এক পর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও র‌্যাব ঘটনাস্থলে পৌঁছে বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে দুই পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

দাউদকান্দি : দাউদকান্দি উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি ও পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর মো. রকিব উদ্দিন রকিবকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার রাত ১০টার দিকে উপজেলা পরিষদ থেকে নির্বাচনের ফল নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে উপজেলা পরিষদ মাঠ সংলগ্ন রাস্তায় দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত গৌরীপুর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে বৃহস্পতিবার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রকিব উদ্দিনের শরীর থেকে গুলি বের করা হয়।

দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) : দেওয়ানগঞ্জ পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের একজন গুলিবিদ্ধসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ছাত্রনেতা ভিপি সেলিমের পিতা আলহাজ আ. সালাম দেওয়ানী, তার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা রাসেল, আওয়ামী লীগ নেতা হাছেন মিস্ত্রী, মিজানুল হক পিন্টুসহ ৮ জনকে দেওয়ানগঞ্জ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার পর ঢাকায় পাঠানো হয়। আহতদের মধ্যে আ. সালামের অবস্থা আশংকাজনক।

নগরকান্দা (ফরিদপুর) : নগরকান্দা পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডে নির্বাচিত কাউন্সিলর নিমাই চন্দ্র সরকারের বাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট হয়েছে। বুধবার রাতে পরাজিত কাউন্সিলর জালালউদ্দিন সরদারের নেতৃত্বে এ হামলা হয়। এ ঘটনায় নগরকান্দা থানায় একটি মামলা হয়েছে। ঘটনার পর রাতেই পরাজিত কাউন্সিলর জালালউদ্দিন সরদারসহ ৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। জানা যায়, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরই পরাজিত কাউন্সিলরের নেতৃত্বে ২৫ থেকে ৩০ জন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে নিমাই চন্দ্র সরকারের বাড়িতে হামলা চালায়। এসময় নিমাই চন্দ্র সরকার বাড়িতে ছিলেন না। সন্ত্রাসীরা তার ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাংচুর করে। এ সময় তারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিও ভাংচুর করে। একপর্যায়ে হামলাকারীরা ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।

ফুলপুর (ময়মনসিংহ) : ফুলপুর পৌর নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ইউএনও সুব্রত পালের বাসভবন ও অফিসার্স ক্লাবে বুধবার ককটেল হামলা হয়েছে। এ ঘটনায় উপজেলা পরিষদ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করাসহ পুলিশ বাদী হয়ে স্থানীয় থানায় মামলা দায়ের করেছে। জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যার পর একদল দুর্বৃত্ত সুব্রত পালের বাসভবনের ভেতরে, সামনের গেটে ও অফিসার্স ক্লাবে ৬টি ককটেল নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে ৫টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এ সময় রিটার্নিং অফিসার সুব্রত পাল অফিসে ছিলেন। এ সময় এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে।

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) : গৌরীপুর পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাসুদুর রহমান শুভ্র’র নেতৃত্বে বিজয়ী কাউন্সিলর সাইফুল ইসলাম রিপনের আত্মীয়, তার ছোট ভাইয়ের কোচিং সেন্টারে হামলা হয়েছে। এদিকে এই পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী জিয়াউর রহমান জিয়া ও তার কর্মী বাহিনী পরাজিত অপর প্রার্থী একেএম রুকনুজ্জামান রুকনের বাড়ি, বাসা ও দোকানে হামলা ও ভাংচুর করে। বুধবার রাতে এসব হামলা হয়।

কালিয়া (নড়াইল) : কালিয়া পৌরসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্থানীয় এমপি কবিরুল হক মুক্তির ক্যাডাররা উপজেলার বাকা গ্রামের মোড়ে অবস্থিত স্বেচ্ছাসেবক লীগের অফিস, একই গ্রামের নৌকার সমর্থক আইউব শেখ ও ডা. রবির ডিসপেন্সারিতে হামলা, ভাংচুর ও লুট করে। একই সময়ে তারা নৌকার সমর্থক জোকা গ্রামের শিমুলকে (২৭) কুপিয়ে আহত করে। এছাড়া মুক্তির ক্যাডার বাহিনী বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে বিলবাউচ গ্রামের আ. জালালের পুত্র বাবুল (৪৫), তার সহোদর সাগর (২৫), আনন্দ দাসের ছেলে বাবুল দাসকে (৩৪) কুপিয়ে আহত করে। বুধবার রাতে নড়াগাতি থানার কলাবাড়িয়া গ্রামের নৌকার সমর্থক আছাদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালায় এমপির লোকজন। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ নেতা এমপি কবিরুল হক মুক্তি বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক। অপরদিকে বৃহস্পতিবার মহম্মদপুর গ্রামের লিকু শিকদারের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত ছাত্রলীগ নেতা মির্জাপুর গ্রামের নাদিমের বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। এ সময় ওই বাড়ির ৪ জনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। এসব ঘটনায় ৩ জনকে আটক করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ওয়াহিদুজ্জামান হীরা অভিযোগ করে বলেন, এমপি কবিরুল হক মুক্তি ক্ষমতা, অস্ত্র ও অর্থের বিনিময়ে ভোট কেন্দ্র দখল করে ভোট কেটে নৌকাকে পরাজিত করেছে। তিনি অসংখ্যবার নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন। এর প্রমাণসহ নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাইনি।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভায় বৃহস্পতিবার পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী আন্টু মিয়ার সমর্থকদের সঙ্গে বিজয়ী কাউন্সিলর জোবায়দুর রহমানের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তৌহিদুল ইসলাম শাহিনসহ (৩৮) উভয়পক্ষের চারজন আহত হয়েছেন। তাদের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

বরুড়া (কুমিল্লা) : বরুড়া পৌর নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাতে পৌরসভার শালুকিয়া গ্রামের কাউন্সিলর প্রার্থী মাহফুজুর রহমানের কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালায় একই গ্রামের কাউন্সিলর প্রার্থী আমান উল্লাহর কর্মীরা। এ সময় তারা এই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সভাপতি শফিকুল ইসলামকে মারধর করে। তার ঘরের আসবাবপত্রও ভাংচুর করা হয়। এছাড়া শফিকুলের ভাই রফিকুল ইসলাম ও পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ঘরে হামলা চালিয়ে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুটে নেয় ওই হামলাকারীরা।

বাগেরহাট : বাগেরহাট পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মীনা হাসিবুল হাসান শিপনকে (৪৫) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিজয়ী আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র খান হাবিবুর রহমানের বাড়িতে হামলার ঘটনায় বুধবার রাতে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। বৃহস্পতিবার আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

বাগেরহাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান খান জানান, বুধবার রাতে পৌরসভা নির্বাচনের ভোট গণনাকালে মীনা হাসিবুল হাসান শিপনের নেতৃত্বে তার সমর্থকরা খান হাবিবুর রহমানের নাগেরবাজারস্থ বাড়িতে বোমা হামলা চালায়। এ ঘটনায় মীনা হাসিবুল হাসান শিপনকে প্রধান আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গৌরনদী (বরিশাল) : গৌরনদী পৌরসভায় পরাজিত কাউন্সিলরের সমর্থকরা বিজয়ী কাউন্সিলরের চার সমর্থকদের বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করেছে। হামলায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। বুধবার রাতে পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পালরদী মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে।

বিজয়ী কাউন্সিলর মো. লিটন বেপারী জানান, তার বিজয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী নুরে আলম সিকদারের ২০ থেকে ২৫ জন সমর্থক দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ফারুক সরদার, নাগর ঘরামী, খলিল মাঝি ও তোতা সরদারের বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করে। হামলায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ পপি বেগমসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত ৪ জনকে গৌরনদী উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জ পৌর নির্বাচনে ৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হযরত আলীকে ভোট না দেয়ার অভিযোগে বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মানিকগঞ্জ পৌরসভার ঋষিপাড়া এলাকার দুলাল চন্দ্র দাসের বাড়িতে লোহার রড, শাবল ও বাঁশের লাঠি নিয়ে হামলা চালানো হয়। হযরত আলী এবং তার দুই ছেলে আসাদুজ্জামান আসাদ ও মো. টিপুসহ আরও ২০/২৫ জন হামলা চালায় বলে জানা গেছে। হামলাকারীরা দুলাল চন্দ্রের বসতঘর ও রান্নাঘরের টিনের বেড়া ভাংচুর করে। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হযরত আলী।

শাহজাদপুর : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের দুই পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী আনোয়ার হোসেন দুদু ও মোস্তাফিজুর রহমান পিযুষের সমর্থকদের মধ্যে হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে দুটি ঘর ভাংচুর ও ৬ রাউন্ড গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকের এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৭ জন আহত হন।

‘ক্রসফায়ার’ ও ‘হেফাজতে’ মারা গেছেন ১৯২ জন

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা ও আসক
‘রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবাধিকার লংঘনের বছর ২০১৫’
২০১৫ সালে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘হেফাজতে’ মারা গেছেন ১৯২ জন। এর মধ্যে শুধু ক্রসফায়ারে মারা যান ১৪৬ জন। এ সময় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সারা দেশে ৫৫ জনকে আটক করার অভিযোগ পাওয়া গেলেও কোনো সংস্থা তা স্বীকার করেনি। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানানো হয়।
একই দিন সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা জানায়, ২০১৫ ছিল রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবাধিকার লংঘনের বছর। আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব, বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা আর আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণে দেশে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে আইনের সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন বলে জানান সংস্থার মহাসচিব অ্যাডভোকেট জাহানারা বেগম। মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার কার্যালয়ে এ সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে সংস্থার মহাসচিব অ্যাডভোকেট জাহানারা বেগম বলেন, গত বছরের ৫ জানুয়ারি সরকারের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও সরকারদলীয় সমর্থক মহা জোট পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করে। ৬ জানুয়ারি থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক, রেল ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয় ২০ দলীয় জোট। প্রায় ৩ মাস টানা অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে পেট্রলবোমা হামলা ও আগুনে দগ্ধ হয়ে ১৬৩ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। এসব ঘটনায় গুরুতর আহত হন ১৭৩৭ জন। ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় ৩০০০ এর অধিক যানবাহনে। এছাড়া দেশে বেশ কয়েকজন শিশুকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। তবে এত অস্থিরতার মধ্যেও সরকারের কিছু কিছু পদক্ষেপ জনমনে স্বস্তি এনে দিয়েছে বলে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। বিশেষ করে শিশু রাজন, রাকিব, সাঈদ ও সুমন হত্যাসহ বেশ কিছু হত্যার দ্রুত বিচার হওয়ায় আইনের প্রতি জনগণের আস্থা কিছুটা হলেও বেড়েছে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে এসব চাঞ্চল্যকর শিশু হত্যার বিচার দ্রুত বিচার টাইব্যুনালে সম্পন্ন হওয়া এবং বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারক, আইনজীবী, সরকারী কৌঁসুলি এবং বিচারের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণকে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বছরের শুরুতেই একুশের বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়রের টিএসসি এলাকায় জনাকীর্ন স্থানে ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়। অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের ৩ মাসের মাথায় সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশ নামে আর এক ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করে জঙ্গিরা। মার্চে খুন করা হয় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে। ৩১ অক্টোবর ’১৫ ঢাকায় উগ্রপন্থী জঙ্গিদের হামলায় খুন হন জাগৃতি প্রকাশনার প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন। একই সময়ে লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর প্রকাশক আহমেদ রশিদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজন আহত হন। প্রকাশ্যে দু’দু’জন বিদেশী নাগরিক হত্যা, বোমা হামলা, নির্বিচারে মানুষ হত্যার ঘটনায় জনমনে নিরাপত্তার শংকা তৈরি হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শুধু আইন বা পুলিশ দিয়ে এ বিপর্যয় রোধ করা যাবে না। শিশু নির্যাতনের বীভৎসতায় তাই আজ অভিভাবকরা আতংকিত। একদিকে যেমন শিশু নির্যাতন, শিশু হত্যা বেড়েছে তেমনি শিশু ধর্ষণের ঘটনাও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালে দেশে ১৪১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দুপুরে সংস্থার নিজস্ব মিলনায়তনে ২০১৫ সালে দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- সংস্থার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা। তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এছাড়া সাংবাদিক সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা সোহেল, প্রকল্প পরিচালক জালাল উদ্দিন, কমিউনিকেশন অফিসার ফাতেমা ইয়াসমিনসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আসকের প্রতিবেদন : এদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ৫৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে আটজনের লাশ পাওয়া যায়, পাঁচজন ফিরে এসেছেন আর সাতজনকে পরে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন বাহিনীর হাতে ‘হেফাজতে’ ও ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছেন ১৯২ জন। শুধু ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছেন ১৪৬ জন। এর মধ্যে র?্যাবের ক্রসফায়ারে ৫০ জন, পুলিশের ক্রসফায়ারে ৭০ জন, র?্যাব ও বিজিবির ক্রসফায়ারে একজন, র?্যাব ও পুলিশের ক্রসফায়ারে একজন, বিজিবির ক্রসফায়ারে একজন, আনসারের ক্রসফায়ারে একজন, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ক্রসফায়ারে ১৪ জন, যৌথ বাহিনীর ক্রসফায়ারে দু’জন ও সেনাবাহিনীর ক্রসফায়ারে ছয়জনের মৃত্যু হয় বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া পুলিশের নির্যাতনে সাতজন, গোয়েন্দা পুলিশের নির্যাতনে একজন, র?্যাবের নির্যাতনে দু’জন ও বিজিবির নির্যাতনে একজন মারা গেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গত বছর রাজনৈতিক সংঘাতে ১৫৩ জন নিহত আর ৬ হাজার ৩১৮ জন আহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিক নির্যাতন : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৫ সালে সারা দেশে ২৪৪ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নারী নির্যাতন : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ৩৫ জন নারী। এর মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। সালিশ ও ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১২ নারী। যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৯৮ জন। যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ১৮৭ জন নারীকে আর যৌতুকের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬০ জনকে। এ ছাড়া এ বছর ৬৩ জন গৃহপরিচারিকা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের পর মারা গেছেন ৭ জন।
হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০৪টি বাসস্থান ও ছয়টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ এবং ২১৩টি প্রতিমা, পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৬০ জন আহত হয়েছেন।
সীমান্ত হত্যা : ২০১৫ সালে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত হয়েছেন ৩২ জন। অন্যদিকে নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের।

সম্ভাবনার ২০১৬ by মাহবুব হাসান

লাখ লাখ শিশু শিক্ষার্থীর নির্মল হাসি আনন্দে আলোকিত বছরের শেষ দিন। জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষায় বিশাল সাফল্যে খুশির জোয়ারে ভাসছে ওরা। ওদের সঙ্গে পুরো দেশই হাসতে হাসতেই বিদায় দিয়েছে পুরনো বছরকে। এই উচ্ছ্বাসই রাঙিয়ে দেবে আগামী বছর। এমন আশা-উদ্দীপনা-সম্ভাবনায় শুরু হচ্ছে আরও একটি বছর। সেই লাখো নিষ্পাপ শিশুর হাসিতেই নতুন বছর ২০১৬-কে স্বাগতম।
বছরের শেষ দিন আশা জাগিয়েছে ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার বিচার। এর আগের দিন অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনও অনেক সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দিয়ে গেছে। এত প্রাপ্তি, সম্ভাবনা আর হাসি দিয়ে শেষ করা বছরটি কিন্তু শুরু হয়েছিল দারুণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। ২০১৫ সালের প্রথম সপ্তাহেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। চোরাগোপ্তা হামলা, অগ্নিসংযোগ, দগ্ধ মানুষের আহাজারি, স্বজন হারানো পরিবারগুলোর হাহাকারে ভারি ছিল চারদিক। দীর্ঘ তিন মাস চলে এ অবস্থা। এরপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে সবকিছু। বছরের মাঝামাঝি শুরু হয় বিদেশী নাগরিক হত্যা, লেখক-ব্লগারদের ওপর হামলা, ধর্মযাজক, মসজিদ-মন্দির এবং সংখ্যালঘু ও সাম্প্রদায়িক হামলায় ব্যাপ্তি পায়। এসব ঘটনাসহ নানা ধরনের স্মৃতি নিয়ে মানুষ বরণ করে নিল নতুন বছর। কিন্তু কেমন কাটবে ২০১৬? দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. এমাজউদ্দীন আহমদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট মাতলুব আহমাদ এবং মানবাধিকার কর্মী খুশী কবীরের সঙ্গে কথা বলে যুগান্তর এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েছে।
তাদের প্রত্যেকের মতেই ভালোমন্দ মিলিয়েই কেটেছে গেল বছর। দেশ এগিয়েছে। হয়েছে সামগ্রিক উন্নয়ন। সব সূচকেই এগিয়ে বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে বাংলাদেশ। এসবের ধারাবাহিকতা কামনার পাশাপাশি অনেক শংকাও ব্যক্ত করেছেন তারা। নতুন বছরে শান্তি, সমঝোতা আর সংঘাতমুক্ত পরিস্থিতির স্বার্থে সব পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে বলে প্রত্যাশা তাদের সবার। তাদের কামনা রাজনীতিতে সহনশীলতা, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস এবং অপরাধ দমন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সত্যিকারের শোষণ, বঞ্চনাহীন, অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে উঠুক। তাদের প্রত্যাশা, ২০১৫-তে বিনিয়োগে আশানুরূপ সাড়া না থাকলেও ২০১৬ হয়ে উঠবে শিল্পের স্বর্ণ বছর। আর সবকিছুর মূলে অতীতে যে সুশাসনের অভাব ছিল সেটা এ বছর ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। কেননা সুশাসনই রাষ্ট্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে, জনগণকে করবে স্বাধীন ও নির্ভার।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিদায়ী বছরে রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রেই সহনশীলতার অভাব ছিল। তিনি সহনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন বছরে বৈষম্য দূর এবং উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। গেল বছরে সাম্প্রদায়িক হামলা ও বিদেশী হত্যার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা এসব ঘটাচ্ছে তারা হতাশা থেকে ঘটিয়েছে, বেকারত্ব থেকে ঘটিয়েছে। এর পেছনে বিদেশী শক্তির ইন্ধন ও অর্থ দুটোই ছিল। কেননা এরা সেই শক্তি যারা বাংলাদেশে বিভিন্ন স্বার্থ কায়েম করতে চায়। এসব শক্তির প্রসার ও ব্যাপ্তি দুটোই বাড়ছে উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, এদের মোকাবেলাই হবে ২০১৬-তে একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। দেশপ্রেমের শক্তিতে এদের রুখে দিয়ে দেশের ভেতরে যারা ভ্রান্ত পথে গিয়ে এসব ঘটিয়েছে তাদের সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারলে নতুন বছর অনেক শান্তিময় হবে বলে তিনি আশা করেন। আর তারুণ্য তাকে এখনও আশাবাদী করে। তিনি বলেন, আজকের তরুণরা প্রতিবাদ করছে, আন্দোলন করছে, লেখাপড়া করছে, নিজের ক্যারিয়ার নিজেই গড়ছে, সঠিক ইতিহাস চর্চার আগ্রহ দেখাচ্ছে, এসব খুব ইতিবাচক দিক। তাই নিজেদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আগ্রহী তারুণ্যেই আস্থা তার।
অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ : অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, তার প্রত্যাশা আগামী বছর হোক শান্তির বছর। ২০১৫ সালে গণতান্ত্রিক রীতি ও মূল্যবোধের যে নাজুক অবস্থা ছিল, তার শুভ পরিবর্তন হোক নতুন বছরে। একটি বিষয় বুঝতে হবে, এ দেশটি আর শিশুরাষ্ট্র নয়। এটি পরিণত রাষ্ট্র। এ কারণে মানবিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক রীতি, শিষ্টাচার, পরমত সহিষ্ণুতার ব্যাপারে অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাদের এ বিষয়ে বেশি সচেতন থাকা দরকার। তিনি বলেন, রাজনীতিতে অস্থিরতা-উৎকণ্ঠা কেন, এটা কারও অজানা নয়। যে বিষয় সবাই জানে, তার সমাধানও কঠিন হওয়ার কথা নয়। সমস্যা হচ্ছে শ্রদ্ধাবোধ, আস্থা এবং পরমত সহিষ্ণুতার অভাব। এই অভাবগুলোর আবর্তেই রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। আশা করা যায়, নতুন বছরে সবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে, আস্থা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে; সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিও নির্ভর করে। রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন হলে অর্থনীতিও ভালো থাকবে। কারণ, স্থিতিশীল পরিস্থিতি থাকলে নতুন বিনিয়োগ হবে, মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সামাজিক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হয়। বিশেষ করে, গেল বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বেশি উৎকণ্ঠা ছিল। রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি গুম-খুনের মতো মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রত্যাশা থাকবে, নতুন বছরে আর একজন ব্যক্তিও মানবাধিকার লংঘনের শিকার হবে না। মানুষের বিভিন্ন পর্যায়ে যে কষ্ট আছে, তা মোচনেই রাষ্ট্র-সরকার উদ্যোগী হবে। ড. এমাজউদ্দীন বলেন, “আমি লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার ভাষায় বলতে চাই, দেশে এখন ‘টক্সিক’ রাজনীতি চলছে।” সরকার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে যথেচ্ছা ব্যবহার করছে, ফলে এসব প্রতিষ্ঠান বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। যেমন নির্বাচন কমিশন যে আচরণ করছে তাতে সুশাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আর তাতেই গণতন্ত্র মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। সুশাসনের পথে উঠতে হয় গণতন্ত্র দিয়ে, গণতন্ত্রে উঠতে হয় সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে। যেখানে নির্বাচনী ব্যবস্থাটাই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, জনগণকে তাদের পছন্দের প্রতিনিধিকে দায়িত্বে বসাতে দেয়া হচ্ছে না। যে কারণে দেশ এগোচ্ছে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। তিনি আইনশৃংখলা বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, তাদের বলব, আইনশৃংখলা রক্ষাই তাদের কাজ। এর নামে নির্যাতন করা নয়, অথচ যা হচ্ছে তা আইনশৃংখলা রক্ষার নামে নির্যাতন। এ প্রসঙ্গে তিনি নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতা উল্লেখ করেন।
এম হাফিজ উদ্দিন খান : অনেকটাই হতাশাব্যঞ্জক মন্তব্য হাফিজ উদ্দিন খানের। তিনি বলেন, নতুন বছর নতুন কোনো বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। গত পুরো বছরে শাসন দিন দিন কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে, ২০১৬-তে তা আরও বেশি জেঁকে বসবে। রাজনীতিতে কোনো সমঝোতার লক্ষণ নেই মন্তব্য করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা এক্ষেত্রে সহনশীলতার অভাব তুলে ধরেন। তবে, দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে এবং আগামী বছরেও সেটা বিরাজ থাকলে জনগণের জীবনমানও উন্নত হবে বলে মনে করেন তিনি। আর এজন্য সব ক্ষেত্রেই জবাবদিহিতা এবং অপরাধ দমনের পাশাপাশি শান্তিময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি কামনা করেন তিনি।
মাতলুব আহমাদ : বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাতলুব আহমাদ অবশ্য হতাশার বিপরীতে আশার কথাই শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, গত বছর ব্যাংক সেক্টরে অনেক সাফল্য, উন্নয়ন ও অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশ ক্রমশ বিনিয়োগের জন্য উত্তম জায়গা হয়ে উঠছে, বিভিন্ন জায়গা থেকে এমন কথা শুনেছি। বাংলাদেশ নিয়ে জাতিসংঘ থেকেও বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করেছি। যে কারণে আমরা আশা করছি, ২০১৬ সাল শিল্পের জন্য হয়ে উঠবে স্বর্ণ বছর। তবে, গ্যাসের চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ায় এবং গ্যাসের কোনো বিকল্প সংকুলান না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাছাড়া গার্মেন্ট সেক্টরে অস্থিরতা বারবার নিরসন হলেও এখানে কোনো অপশক্তি কাজ করছে বলে আশংকা তার। সে কারণে এ সেক্টরে সতর্ক দৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
খুশী কবির : খুশী কবির বলেন, বিদায়ী বছর যেভাবে শেষ হয়েছে নতুন বছরটাও সেভাবে গেলে সেটা ভালো হবে না। কেননা ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সূচকের অগ্রগতিসহ আমাদের অনেক অর্জন থাকলেও মানুষ পুরো বছরই জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত ছিল। বেড়েছে নারীদের নিরাপত্তাহীনতাও। ভিন্ন মত পোষণকারী, ভিন্ন আদর্শ ধারণকারী, ভিন্ন জীবন-যাপনকারীদের ওপর খক্ষ ছিল নিয়মিতই। এসব বিষয়ে সরকার যদি আন্তরিক হয় নতুন বছরে সেটা হবে অনেক খুশির খবর। খুশী কবির বলেন, সরকারে যারা আছেন, তাদেরও সমালোচনা সহ্য করতে হবে। সহিংসতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে হবে। গণতন্ত্রের কথা শুধু মুখে নয়, কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন করতে হবে। জবাবদিহিতার জায়গা স্পষ্ট করতে হবে, সত্যিকারের অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করতে হবে। জঙ্গিদের জামিন নিয়ে আদালত-পুলিশের টানাটানি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক হামলা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই মানবাধিকার কর্মী একটি শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের অভাব পর্যবেক্ষণ করেছেন মত দিয়ে বলেন, রাজনীতিতে সহনশীলতা-সমঝোতা উন্নয়নের পূর্বশর্ত, সরকারকে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। মত প্রকাশের সুযোগ অবারিত রাখার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বিদায় ২০১৫ স্বাগত ২০১৬

আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলে কালের আবর্তে হারিয়ে গেলো আরও একটি বছর। নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হচ্ছে নতুন বছরের। ২০১৬ সাল। নানা উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষ স্বাগত জানাবে নতুন বছরকে। মেতে উঠবে নতুন বছরের আগমনী উল্লাসে। গত বছরের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাব খুঁজতে খুঁজতে নতুন বছরকে সামনে রেখে আবর্তিত হবে নতুন নতুন স্বপ্নের। বাংলাদেশে গ্রেগোরিয়ান নববর্ষ পালনের ধরন বঙ্গাব্দের নববর্ষ পালনের মতো ব্যাপক না হলেও এ উৎসবের আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া থেকে বাংলাদেশের মানুষও বিচ্ছিন্ন নয়। যদিও ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে নববর্ষ উদযাপনে। নিরাপত্তার কারণে সন্ধ্যার পর সারা দেশেই বর্ষবরণের কোনো আয়োজন ছিল না। এছাড়া ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও ছিল কড়াকড়ি। তবে বিভিন্ন হোটেল ও ক্লাবে সীমিত পরিসরে কিছু অনুষ্ঠান পালন করা হয়েছে। এদিকে বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজনে বরণ করা হয়েছে ইংরেজি নববর্ষ। যদিও নিরাপত্তার কারণে বিভিন্ন শহরে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে ছিল নিরাপত্তাজনিত কড়াকড়ি। ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
বাণীতে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলা নববর্ষ জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও ব্যবহারিক জীবনে ইংরেজি বর্ষপঞ্জিকা বহুল ব্যবহৃত হওয়ায় খ্রিষ্টীয় নববর্ষ সবাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। কালের বিবর্তনে খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদ্যাপন জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, দেশব্যাপী নানা আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করা হয়। সকলের মাঝে জাগে প্রাণের নতুন স্পন্দন। কোনো ধরনের অপসংস্কৃতি যেন আমাদের এই আনন্দধারাকে ব্যাহত করতে না পারে সে লক্ষ্যে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, আসুন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘স্বপ্নের সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠা করি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গত বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য সাফল্যময় বছর। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘ তাকে পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত এবং তথ্যপ্রযুক্তি প্রসারের জন্য আইটিইউ প্রদান করেছে।
তিনি বলেন, ‘পরনির্ভরশীল অর্থনীতির চক্র ভেঙে আজ আমরা আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির দ্বারপ্রান্তে। নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার কোটি টাকার পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। গত ডিসেম্বরে মূল সেতুর কাজ শুরু হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে দেশবাসীকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

সিরিয়ায় নিহত সাইফুল দেশে এসেছিলেন ২০১৪ সালে, বাবা ও ভাই কারাগারে by গোলাম মর্তুজা

সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আইএসবিরোধী সামরিক জোটের বিমান হামলায় নিহত সাইফুল হক ওরফে সুজনের বাংলাদেশের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যে অভিবাসন আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি ২০১৪ সালে দেশে ফেরেন। ওই বছর ঈদুল ফিতরের পর আবার দেশত্যাগ করেন। দেড় বছর পর তাঁর মৃত্যুসংবাদ পাওয়া গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার মোহাম্মদপুরে সাইফুলের বাসায় গিয়ে এসব তথ্য জানা যায়। সাইফুলের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার পাকুরদিয়ায়। তাঁর বাবা আবুল হাসনাত দন্ত চিকিৎসক। সাইফুল বড় হয়েছেন বাবার কর্মস্থল খুলনায়।
সাইফুলের বাবা ও এসএসসি পরীক্ষার্থী এক ভাইকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত ৮ ডিসেম্বর আটক করেছে। জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলাও দিয়েছে পুলিশ।
গতকাল ঢাকার বাসায় গিয়ে সাইফুলের মা ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ভাইকে পাওয়া গেছে। তাঁরা জানান, সাইফুল সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন ২০১৪ সালের ঈদুল ফিতরের আগে। তখন তাঁরা খুলনায় থাকতেন। ঈদের কয়েক দিন পর লন্ডনের উদ্দেশে সাইফুল অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, এক বাচ্চা ও বড় ভাইয়ের পাঁচ বছরের বাচ্চাকে নিয়ে দেশত্যাগ করেন। এখন পরিবার ধারণা করছে, সাইফুল তখন লন্ডন না গিয়ে সিরিয়া চলে যান।
সাইফুলরা চার ভাই। বড় ভাই থাকেন স্পেনে। তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তাঁর শিশুপুত্রকে লালনপালন করেছেন সাইফুলের স্ত্রী। তৃতীয় ভাই এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট ভাই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।
ছোট ভাই প্রথম আলোকে বলে, ২০১৪ সালের রোজার ঈদে সাইফুল তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দেশে আসেন। সবাই মিলে খুলনার সোনাডাঙার বাসায় ঈদ করেন। ঈদের পরে সাইফুল সবার কাছ থেকে দোয়া নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা দেন। তখন সাইফুলের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন। এরপর প্রায় দুই মাস পরিবারের সঙ্গে তাঁদের আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। দুই মাস পর হঠাৎ একদিন ফোন করে সাইফুল পরিবারকে জানান, সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর অসুস্থতা ও সন্তান জন্মদান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। তবে তিনি কোন দেশে আছেন, সেটা বলেননি। এরপর সাইফুলের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। মাস খানেক আগে পরিবার জানতে পারে যে সাইফুল সিরিয়ায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিতে সিরিয়া গেছেন। আর, চলতি সপ্তাহে তাঁরা খবর পান যে সাইফুল বিমান হামলায় মারা গেছেন।
সিরিয়া ও ইরাকে বিমান হামলায় নিহত আইএসের ১০ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতার একটি তালিকা গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় বাংলাদেশি সাইফুল হকের নামও রয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর খবরে বলা হয়, ১০ ডিসেম্বর আইএসের কথিত রাজধানী সিরিয়ার রাকা প্রদেশের কাছে বিমান হামলায় সাইফুল মারা যান। তিনি আইএসের হয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনাকারী, হ্যাকিং কর্মকাণ্ড, নজরদারি প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও অস্ত্র উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
তবে ঢাকা মহানগরের পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার গতকাল প্রথম আলোকে বলেছেন, সিরিয়ায় বিমান হামলায় নিহত সাইফুলের বাংলাদেশের পরিচয় সম্পর্কে তাঁদের কাছে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
ঢাকায় সাইফুলের বাসা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাইফুলের স্ত্রী দুই শিশুপুত্র ও ভাইয়ের পাঁচ বছরের ছেলে সাইফুলের সঙ্গেই ছিল। এর মধ্যে দেশ ছাড়ার পর ছোট ছেলের জন্ম হয়েছে। এর আগে ২০০৩ সালে সাইফুল লেখাপড়ার জন্য লন্ডনে যান। কম্পিউটার প্রকৌশলী সাইফুল পরে কার্ডিফে চলে যান।
গতকাল যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র টেলিগ্রাফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর সাইফুল গ্লোমরগ্যান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি আইব্যাক নামে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ব্যবসায় খুবই ভালো করেন। টেলিগ্রাফ তাঁকে স্থানীয় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে একটি পিলার হিসেবে অভিহিত করেছে। তিনি সবাইকে সাহায্য করতেন। সাইফুলের প্রতিবেশীরা টেলিগ্রাফকে জানিয়েছে, তিনি খুব দামি হাই পারফরম্যান্স কার চালাতেন। তাঁর একটি কালো বিএমডব্লিউ গাড়িও ছিল।
টেলিগ্রাফ-এর খবরে আরও বলা হয়, যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্বের আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০১৪ সালের জুলাই মাসে সাইফুল বাংলাদেশে ফিরে যান। তখন তিনি তাঁর বন্ধু ও সহকর্মীদের বলেছেন যে তিনি দেশে ফিরে যেতে চান। দেশে তাঁদের পাটের ব্যবসা রয়েছে। তখন বাংলাদেশে যাওয়ার আগে তিনি তুরস্কে গিয়েছিলেন বলেও শোনা যায়।
তবে সাইফুলের ছোট ভাই প্রথম আলোকে জানায়, বাবা আবুল হাসনাত (৬৭) দন্ত চিকিৎসক। তিনি চিকিৎসা পেশা ছেড়ে গিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে একটি বায়োফুয়েলের (জৈব জ্বালানি) কারখানা তৈরি করছেন। তবে সাইফুল দেশে থাকা অবস্থায় কোথায় পড়াশোনা করেছেন সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি তাঁর ছোট ভাই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিনি যুক্তরাজ্যেই পড়েছেন।
সাইফুলের যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বের আবেদন ফরমে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০০৩ সালে শিক্ষা ভিসায় যুক্তরাজ্যে যান। এরপর ২০১২ সাল থেকে তিনি একজন অভিবাসী উদ্যোক্তা হিসেবে সেখানে অবস্থান করছিলেন।

ছোটদের পরীক্ষায় বড় সাফল্য

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় বড় সাফল্য দেখিয়েছে শিক্ষার্থীরা। ছোটদের এ দুই পরীক্ষায় এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ গতবারের চেয়ে বেড়েছে। ভালো ফলের কারণে সারা দেশে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাস।
তবে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ফল গতবারের চেয়ে খারাপ হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয় এই চার পরীক্ষার ফল। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৯৮ দশমিক ৫২ শতাংশ। গতবার পাস করেছিল ৯৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৮০ জন। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেল। গতবার পেয়েছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ৪১১ জন।
দুপুর সাড়ে ১২টায় সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন। এর আগে সকাল ১০টায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফলের অনুলিপি দেন মন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনের পর বিদ্যালয়গুলোতে ফল প্রকাশের কথা থাকলেও অনেক বিদ্যালয়ে এর আগেই ফল পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই ওয়েবসাইট থেকে ফল জেনে যায়। তবে নির্ধারিত সময়ে ওয়েবসাইটে অসংখ্য মানুষ ফল জানার চেষ্টা করায় ফল পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৮ জন। এদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৭ লাখ ৯৭ হাজার ২৭৪ জন। এদের মধ্যে ১২ লাখ ৭৭ হাজার ১৪৬ জন ছাত্র এবং ১৫ লাখ ২০ হাজার ১২৮ জন ছাত্রী। পরিসংখ্যানই বলছে, ছাত্রীরা ভালো করেছে।
সমাপনীতে সাতটি বিভাগের মধ্যে পাসের হারের দিক থেকে এগিয়ে রাজশাহী বিভাগ। এই বিভাগে পাসের হার ৯৯ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার সিলেট বিভাগে, ৯৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অপর পাঁচটি বিভাগে পাসের হার ৯৮ শতাংশের কম-বেশি।
জেলা হিসেবে এবারও সবচেয়ে ভালো করেছে মুন্সিগঞ্জ। এই জেলার সব শিক্ষার্থীই পাস করেছে। আর সবচেয়ে পিছিয়ে বরগুনা জেলা।
এবার সেরা বিদ্যালয় প্রকাশ না করায় বিদ্যালয়গুলোতে আলাদা করে সেরা হওয়ার আনন্দ ছিল না।
ধরন অনুযায়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়গুলোর (প্রাথমিক শাখা থাকা) ফল সবচেয়ে ভালো হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে গড় পাসের হার ৯৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এবার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়গুলোর যেসব শিক্ষার্থী সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছে, তারা লটারির মাধ্যমে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। এত দিন প্রাথমিক শিক্ষা ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন (পিটিআই) পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে পাসের হার বেশি হতো। এবার তারা দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। অন্যান্য বিদ্যালয়ে গড় পাসের হার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশের মধ্যে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যেসব বিদ্যালয় ভালো করতে পারেনি, তাদের জবাবদিহি করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে সাংবাদিকেরা গণশিক্ষামন্ত্রীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।
আবারও সাফল্যের ধারায় জেএসসি: জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিক সাফল্যে গতবার ছেদ পড়েছিল। পরের বছরই আবার সাফল্যের ধারায় ফিরল এই স্তরের শিক্ষার্থীরা। এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই গতবারের চেয়ে বেড়েছে। পাসের হার প্রায় আড়াই শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৯২ দশমিক ৩১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়াদের সংখ্যা গতবারের চেয়ে ৫০ হাজার ৫৫৭ জন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫০২ জন।
দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের তথ্য তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এর আগে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফলাফলের অনুলিপি তুলে দেন।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, জেএসসি পরীক্ষার ফলে এবার সব সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। এই ফলে তাঁরা আনন্দিত।
সংবাদ সম্মেলনের পর বিদ্যালয়গুলোতে ফল প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইট ও মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে ফল জানা যায়। তবে এবার সেরা প্রতিষ্ঠান বাছাই না করায় বিদ্যালয়গুলোতে আগের মতো আনন্দ-উল্লাস ছিল না।
এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে জেএসসিতে পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখ ২৯ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৭৭০ জন।
এবার গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থীরা গতবারের চেয়ে ভালো করেছে। ভালো ফলের পেছনে এটি ভূমিকা রেখেছে। জেএসসিতে আট বোর্ডে পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই দিক দিয়েই ছাত্রীরা ভালো করেছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৯২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ছাত্রদের পাসের হার ৯২ দশমিক ২৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়াদের মধ্যে ছাত্রী ১ লাখ ৬ হাজার ৭৫৬ জন এবং ছাত্র ৮০ হাজার ৭৪৬ জন।
জেএসসিতেও সেরা রাজশাহী: প্রাথমিক সমাপনীর মতো জেএসসি পরীক্ষায়ও রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে ভালো করেছে। জেএসসিতে রাজশাহী বোর্ডে গড় পাসের হার ৯৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। সবচেয়ে পিছিয়ে চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীরা, পাসের হার ৮৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
ঢাকা বোর্ডের অধীন বিদেশের আটটি কেন্দ্রে জেএসসির ৫৫৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫৪৮ জন। পাসের হার ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ। গতবার ছিল ৯৯ দশমিক ২০ শতাংশ। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১১ জন। গতবার পেয়েছিল ১৩৮ জন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাসচিব সোহরাব হোসাইন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুন, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু বক্কর ছিদ্দিক প্রমুখ।
মাদ্রাসায় খারাপ ফল: মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন জেডিসি পরীক্ষায় পাসের হার ৯৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। গতবারের চেয়ে পাসের হার ১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ কমেছে। এই পরীক্ষায় এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮ হাজার ৭৬১ জন। গতবার পেয়েছিল ১৯ হাজার ২৯০ জন। জেডিসিতে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ১৯০ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৩১২ জন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মাদ্রাসায় খারাপ ফলের কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা হবে। আর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এ কে এম ছায়েফ উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, এবার প্রথমবারের মতো চালু হওয়া বাংলা ও ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, শারীরিক শিক্ষা/কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা বিষয়ের প্রতিটিতে পূর্ণমান ৫০-এর মধ্যে আলাদা করে ৪০ নম্বর না পেলে জিপিএ-৫ ধরা হয়নি। এ কারণেই মূলত জিপিএ-৫ কমেছে।
এবার ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৯৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৪৭৩ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬ হাজার ৫৪১ জন। এবার পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ১৩৪ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ২ লাখ ৫১ হাজার ২৬৬ জন। পাস করা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ১ লাখ ২৮ হাজার ৪২৫ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ২২ হাজার ৮৪১ জন ছাত্রী।

‘চাঁদে অবতরণ ছিল সিনেমা, দৃশ্য ধারণ করেছি আমি’

মার্কিনীদের চাঁদে অবতরণ ইস্যুতে আমেরিকার বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক স্ট্যানলি কুবরিকের একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, মার্কিনীদের চাঁদে অবতরণের পুরো ঘটনা ছিল সিনেমা। তিনি নিজেই ওইসব দৃশ্য ধারণ করেছিলেন। তার মতে, সিনেমার স্ক্রিপ্টের মতো করে ঘটনাটি সাজানো হয়েছিল।
চলচ্চিত্র নির্মাতা টি. প্যাট্রিক মিউরে সম্প্রতি ওই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছেন। প্যাট্রিক মিউরে দাবি করেছেন, ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর তিন দিন আগে স্ট্যানলি কুবরিক তাকে এ সাক্ষাৎকারটি দিয়েছিলেন। কিন্তু এতদিন তিনি তা প্রকাশ করেননি।
তবে স্ট্যানলি কুবরিকের স্ত্রী ক্রিস্টিনা কুবরিক বলেছেন, তার স্বামীর সাক্ষাৎকারটি বানোয়াট। তিনি এ ধরনের কোনো সাক্ষাৎকার দেন নি বলে দাবি করেছেন ক্রিস্টিনা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৯ সালে চাঁদে মানুষ পাঠানোর দাবি করে। কিন্তু বিশ্বের বহু বিজ্ঞানীই যুগে যুগে এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, নাসার মাধ্যমে আমেরিকার চাঁদে মানুষ পাঠানোর ঘটনাটি ছিল শুধুই সাজানো নাটক।
উন্নত বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা চাঁদে যাওয়ার এই নাটকের শুটিং করা হয়েছিল দুর্গম কোনো মরু অঞ্চলে, যেখানে নাটক সাজালে কেউ বুঝতে পারবে না। হলিউডে মার্কিন পরিচালকরা এত অবিশ্বাস্য সব সিনেমা তৈরি করে থাকেন যে তাদের পক্ষে এরকম একটি চন্দ্র বিজয়ের শুটিং করা খুবই সহজ ব্যাপার। কিছু কিছু বিজ্ঞানী এই চন্দ্র বিজয় নাটকের পরিচালকের বলেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন, এই মিথ্যা কাহিনীর পরিচালক ছিলেন বিখ্যাত মার্কিন পরিচালক স্ট্যানলি কুবরিক। এবার সেই কুবরিকের সাক্ষাৎকার প্রকাশ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুনকরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা নাসার সমালোচনা করে বলেন,১৯৬৯ সালে নাসার এমন কোনো উন্নত প্রযুক্তি ছিল না যা দিয়ে মানুষ চাঁদে গমন করতে পারে। এপোলো-১১ নামের মহাকাশ যানটি ছিল সাজানো নাটকের অংশ। মানুষ সত্যিই চাঁদে গেছে নাকি এটা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা সেটা আরো বেশি ঘনীভূত হয় মার্কিন রকেট প্রযুক্তি তত্ত্বের প্রবক্তা বিল কেসিংয়ের বক্তব্যের পর। ১৯৭৪ সালে তিনি একটি বই লেখেন ‘আমেরিকার ৩০ বিলিয়ন ডলারের জোচ্চুরি’ শিরোনামে। এই গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন আমরা কখনই চাঁদে যাইনি। চাঁদে যাওয়ার বিষয়টি ছিল বিশ্ববাসীর সঙ্গে প্রতারণা।
তিনি আরো উল্লেখ করেন এপোলো-১১ মহাকাশ যানটি উৎক্ষেপণের কিছু সময় পর যানটি অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর তিন নভোচারী বিশিষ্ট লুনার ক্যাপসুলটি একটি সামরিক কার্গো বিমানে সরিয়ে ফেলা হয় এবং আট দিন পর ক্যাপসুলটি প্রশান্ত মহাসাগরে ফেলে দেয়া হয়। তারপর নভোচারীদের নিয়ে নেভাদার মরুভূমিতে কঠোর সামরিক প্রহরার মধ্য দিয়ে চন্দ্র বিজয়ের নাটকটি মঞ্চস্থ করা হয়।
মহাকাশচারীরা চাঁদে অবতরণ করার পর সেখানে তাদের কয়েকটি ছবি ও ভিডিও তোলা হয় এবং চন্দ্র থেকে তারা কয়েকটি পাথর সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। এই ছবি,ভিডিও ও পাথরগুলো তাদের সত্যিকারের চাঁদে যাওয়ার প্রমাণ বহন করে।
যারা চাঁদে মানুষ অবতরণকে সাজানো নাটক বলে মনে করেন, তারা এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে বেশ কয়েকটি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। পৃথিবী থেকে আমরা রাতের আকাশে নক্ষত্র বা তারকা দেখতে পাই সুতরাং চাঁদের রাতের আকাশে তারকাগুলোকে আরো উজ্জ্বল দেখানোর কথা। কিন্তু নভোচারীরা চাঁদে গিয়ে যে ছবিগুলো তুলেছেন তাতে কোনো ছবিতে চাঁদের আকাশে তারকা দেখা যাচ্ছে না। চাঁদ থেকে ফেরার পর মহাকাশচারীরা বলেছিলেন সেখানে কোনো অক্সিজেন বা বাতাস নেই ফলে সেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় এক মিনিটও বাঁচা সম্ভব নয়। কিন্তু চাঁদে থাকতে মহাকাশচারীদের যে ছবি তোলা হয়েছিল তাতে দেখা যায় চাঁদে তাদের পুঁতে রাখা মার্কিন পতাকা বাতাসে উড়ছে। তাহলে চাঁদে বাতাস না থাকলে তাদের পতাকা বাতাসে উড়ছিল কীভাবে। সেটা কী তাহলে পৃথিবীর বাতাস ছিল!
ছবিতে দেখা যায় নভোচারীরা যেখানে অবতরণ করেছিলেন সেখানে পাশাপাশি বস্তুগুলোর ছায়া পরস্পরকে ছেদ করেছে এবং বিভিন্ন বস্তুর ছায়া বিভিন্ন দিকে গেছে। কিন্তু চাঁদে শুধু আলোর উৎস সূর্য হয়ে থাকলে বস্তুর ছায়া পরস্পরকে ছেদ না করে সমান্তরাল হওয়ার কথা। তাহলে কি সেখানে শুটিং করার সময় কৃত্রিম আলো ব্যবহার করা হয়েছিল! মানব ইতিহাসে চন্দ্র বিজয় ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনা তারপরও এই অভিযানের টেলিমেট্রি ডাটা পরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশ্য নাসা বলেছিল এই ডাটা তাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু এমন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ডাটা তাদের কাছ থেকে কীভাবে হারিয়ে যায় সেটা একটি প্রশ্নের বিষয়। এ সব বিষয়গুলো ছাড়াও ছোটখাটো অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন লুকিয়ে আছে চন্দ্র বিজয় কাহিনীতে। চন্দ্র বিজয় কর্মকাণ্ডে জড়িত নভোচারীদের মধ্য থেকে গাস গ্রিসাম নামের এক নভোচারী চন্দ্র জয়ের পর নিহত হন। অনেকের ধারণা, তিনি আমেরিকার ওই প্রতারণার কথা বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তাই তাকে কৌশলে হত্যা করা হয়েছিল। চন্দ্র জয় প্রসঙ্গে এ ধরনের আরো নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে যেগুলোর যৌক্তিক জবাব এখনও দিতে পারেনি আমেরিকা।
সূত্র : রেডিও তেহরান

রাজনীতি ২০১৬: গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধি দুটোই চাই! by কামাল আহমেদ

নতুন বছরে অর্থনীতি নিয়ে আছে অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু রাজনীতিতে আছে নানা শঙ্কা। সবাই মানেন যে রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা থাকলে আরও এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। তাই নতুন বছরের আকাঙ্ক্ষা—রাজনীতির গুমোট ভাব কাটবে, অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে। বাড়ুক গণতন্ত্রের চর্চা, কেটে যাক জঙ্গিবাদের হুমকি। সুস্থ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সমৃদ্ধি বাড়ুক বাংলাদেশের।
নতুন বছর ঘিরে সবার মনেই স্বপ্ন থাকে, আশা জাগে। ব্যক্তিগত সেই চাওয়াগুলোর গুরুত্ব অনেক। কারও আশা পরীক্ষায় ভালো ফল, কারও নতুন চাকরি কিংবা ব্যবসায়িক সাফল্য, বিদেশ যাত্রা, পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া, ঘর বাঁধা, নতুন বাড়ি, নতুন কিছু। সোজা কথায়, নতুন এবং আরও ভালো সমৃদ্ধ জীবন। ২০১৬-তে সবার আশা পূর্ণ হোক, সেই শুভকামনা সবার জন্যই।
২০১৬ সাল আমাদের স্বাধীনতার ৪৫তম বছর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৫ সালের বেশির ভাগ সময় আমাদের ভালো কাটেনি। একধরনের অস্থিরতা ও গুমোট রাজনৈতিক পরিবেশ স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছন্দপতনের কারণ হয়েছে।
ফেলে আসা বছরের শুরুটা ছিল অবিশ্বাস্য রকম নৃশংস ও নিষ্ঠুরতায় ভরা। রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির দায়িত্বহীনতা এবং হঠকারিতার খেসারত হিেসবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিরোধী দল প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু সেই আপাতশূন্যতার জায়গায় কখনো জঙ্গিবাদের মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা, আবার কখনো ক্ষমতাসীন দলের অন্তর্কলহ অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, শঙ্কা ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। যেমনটি কখনো শোনা যায়নি, তেমন সব নতুন নতুন নজির তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় এবং জেলা শহরের গ্রামের রাস্তায় খুন হন বিদেশি নাগরিক। আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে গুলিবিদ্ধ হয় মায়ের গর্ভে থাকা শিশু। তবে, অসম্ভব প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনের জয়রথ টিকে যায়। সেই শিশু সুরাইয়ার বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠাই হচ্ছে ক্ষমতার লড়াইয়ের নিষ্ঠুর আঘাতের শিকার দেশ এবং মানুষের অদম্য প্রাণশক্তির প্রতীক।
বছরের শুরুতে একদিকে ছিল আন্দোলনের নামে নৃশংস আগুনে বোমায় মানুষ পোড়ানো, অন্যদিকে নৈরাজ্য ঠেকানোর নামে গুলি ও বিরোধী কর্মীদের গুম বা হাওয়া করে দেওয়া। জানুয়ারির ২ তারিখে রাজপথের বিরোধিতা বন্ধে সরকারি ইশারায় যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে দেশে অঘোষিত যে অচলাবস্থা শুরু হয়, তারই ধারাবাহিকতায় বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করা হয় তাঁর অফিসে। একই সময়ে শুরু হয় দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের অবরোধ। রাজনৈতিক সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং অবরোধের পালা চলে তিন মাসের বেশি। ভীতিকর পরিস্থিতি সত্ত্বেও বিএনপির সেই অবরোধ ভেঙে পড়ে। অবশেষে বিদেশি কূটনীতিকদের নেপথ্য দূতিয়ালিতে নজিরবিহীন এই অস্থিরতার অবসান ঘটে। তবে, রাজনীতিতে কোনো সমঝোতার আভাস মেলে না। পরপর দ্বিতীয় বছরের মতো বিএনপির রাজনীতি ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়। যার ফল হিসেবে দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রায় লোপ পাওয়ার উপক্রম ঘটে।
যে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ হয়ে গেছে বলে বিএনপি ও তার সহযোগীরা, তারাই মাস খানেকের ব্যবধানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে রাজনীতির মাঠে ফেরার উপায় মেনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেয়। তবে, কমিশনের কথিত পক্ষপাত ও অযোগ্যতার দোষে দুষ্ট নির্বাচনের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা তা বর্জনের ঘোষণা দিয়ে সরে দাঁড়ায়। সেটি ছিল এপ্রিলের কথা আর নির্বাচনটিও দলীয় প্রতীকের লড়াই ছিল না। এর ঠিক সাত মাস পর সরকার সিদ্ধান্ত নিল নৌকা ও ধানের শীষের লড়াই আয়োজনের। পৌর আইন সংশোধন করে ঘোষিত হলো দলভিত্তিক মেয়র নির্বাচনের তফসিল। পুরো বছরটিতে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করার সুযোগ তেমন একটা না পেলেও বছর শেষে ডিসেম্বরজুড়ে বিএনপি আবারও তাদের রাজনীতির ধারাকে সংগঠিত করা ও জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেল। এবারে ভোটের লড়াইয়ে তারা শেষ পর্যন্ত থাকার প্রত্যয় ঘোষণা করল এবং থাকার চেষ্টাও করল। যদিও নির্বাচনী সাফল্য তেমন একটা না জোটায় তারা ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে তা প্রত্যাখ্যানের কথা বলেছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। দেশে-বিদেশে ওই নির্বাচন নিয়ে ক্লান্তিকর বিতর্ক সময়ের ব্যবধানে এখন অবশ্য কিছুটা থিতিয়েও এসেছে। কিন্তু সরকারের নানা পর্যায়ে একটা অস্বস্তি রয়েই গেছে। অস্বস্তিটা তাদের ক্ষমতায়নের পালায় গণতান্ত্রিক বোধের ঘাটতির কারণে। ইংরেজিতে যাকে বলে ডেফিশিয়েন্সি ইন ডেমোক্র্যাটিক ম্যান্ডেট। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের এই দুটি নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ ও সিদ্ধান্তের দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, একটা চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক বছর ধরে ঝুলে থাকা ঢাকার সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ। দ্বিতীয়ত, পৌর নির্বাচনকে দলীয় ভিত্তিতে আয়োজনের সিদ্ধান্ত। এই দুই সিদ্ধান্তেই চরম সংকটে পড়া রাজনৈতিক দল বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে আবারও ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে। এখন পৌর নির্বাচনে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যানের কথা বললেও তারা এমন কোনো কর্মসূচি দেয়নি, যা আবারও সহিংসতার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। তাহলে কি আমরা আশা করতে পারি নতুন বছরে বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাতেই আবার সংগঠিত হবে? রাজনৈতিক সহিংসতার পুনরাবৃত্তিও আর ঘটবে না? এমনটিই তো আমরা চাই।
সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে গত মাসে। কিন্তু গণতন্ত্রের অভিযাত্রা বজায় রাখতে তখন যে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার অধিকাংশই ঝাপসা হয়ে গেছে। নব্বইয়ে ক্ষমতা হারানো স্বৈরাচার এখন ক্ষমতারও অংশীদার, আবার একইসাথে সংসদীয় বিরোধী দলের আসনে আসীন। দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় রাজনীতির বৃত্ত ভাঙার চেষ্টা যে সফল হয়নি, তার প্রমাণ গত কয়েকটি নির্বাচন। উপজেলা, সিটি করপোরেশন কিংবা পৌরসভা—কোনো কাঠামোতেই জাতীয় পার্টি জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। স্বৈরতান্ত্রিক ও সুবিধাবাদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যানের এই ধারা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক।
এ কথা সত্যি যে সংসদের বাইরের বিরোধী দল বিএনপি আর চাপ প্রয়োগ করে দাবি আদায়ের মতো অবস্থায় নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপরই এখন নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ। তিনি চাইলে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক বিতর্ককে উৎসাহিত করার পরিবেশ সৃষ্টিতে কিছুটা ছাড় দিলেও দিতে পারেন। কোনো ধরনের সমঝোতা (নেপথ্যে হয়ে থাকলে আলাদা কথা) অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব, এমনটা আশা কেউ করেন বলে মনে হয় না। কিন্তু পরিস্থিতির গুমোট ভাব কাটাতে প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হবেন, সে আশা অনেকেই করেন। গত বছরের দুটি নির্বাচন থেকেই সেই আশাবাদের জন্ম। আগামী বছরে আরও বড় আকারের নির্বাচন—ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের আয়োজনও হতে পারে একটি বড় মহড়া, যার সাফল্যে ভর করে আগাম জাতীয় নির্বাচন কি সত্যিই অসম্ভব? অনেকে ভাবেন বা বলেন, ২০১৬ সালে এটিই হবে একটি বড় প্রশ্ন।
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি নির্বাচনগুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশন ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু পৌর নির্বাচনে তারা একেবারে নীরব দর্শকের ভূমিকা থেকে সামান্য হলেও রিঅ্যাকটিভ (প্রতিক্রিয়ামূলক ভূমিকা) হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই সামান্য পদক্ষেপকেও অনেকে ইতিবাচক চোখে দেখেছেন। আশা করা যায়, এ থেকে কমিশন কিছুটা আস্থা ফিরে পাবে এবং ভবিষ্যতে উদ্যোগী বা প্রোঅ্যাকটিভ হবে। ২০১৭ সালে তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এ বছর কমিশন কি তাহলে মেরুদণ্ড কিছুটা সোজা করে দাঁড়াবে?
কোনো গণতন্ত্রই বিরোধী দলহীন অবস্থায় চলতে পারে না। দীর্ঘ সময় তো নয়ই। বিজ্ঞান বলে, শূন্যস্থান বলে কিছু নেই। নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী রাজনীতির জায়গাটি যে শূন্য থাকতে পারে না, সেটা বেশ ভালোই টের পাওয়া যাচ্ছে। জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কায় তাই সবাই উদ্বিগ্ন। দুজন বিদেশি নাগরিক হত্যার পর একাধিক বিদেশি কূটনীতিক প্রকাশ্যেই বলেছেন যে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের জঙ্গি হিসেবে অভিহিত করাটা খুব সহজ কাজ, কিন্তু তাতে করে আসল জঙ্গিরাই পার পেয়ে যাবে। তেমনটি যাতে না হয়, সে জন্য জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় ঐকমত্যের কথাও ভাবা প্রয়োজন। তবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অস্বাভাবিক গুমোট পরিস্থিতি কোনোভাবেই তার সহায়ক হতে পারে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমকে চাপমুক্ত রাখা এবং নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটির ভূমিকা সমাজে গণতন্ত্রের চর্চা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতিকে বিকশিত করে ওই অস্বস্তির অবসান ঘটাতে পারে। সুতরাং, বিরোধীদের বিনাশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি পরিত্যাগ করে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুশীলনকে উৎসাহিত করাই হোক ২০১৬ সালের অন্যতম অগ্রাধিকার। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা রাজনীতিকদের তাই এ কথা মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে গণতন্ত্র ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা তার সমৃদ্ধি পূর্ণতা পায় না।

‘মনে হয় স্বাধীনতা বিহীন একটা অবস্থায় আছি’ -রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ রাষ্ট্রপতি। তার জন্য প্রাসাদোপম বাড়ি, বাড়ির ভেতরেই তার বহু কর্মকর্তা কর্মচারী । বাড়ি কিংবা রাস্তা –-সবজায়গাতেই তার জন্য ব্যাপক নিরাপত্তা। কোনো কিছুর কমতি নেই পৃথিবীর যে কোন দেশের রাষ্ট্রপতির জন্য। এমনকি অফিস করতে বাইরেও যেতে হয়না। রাষ্ট্রের প্রথা অনুযায়ী সবাই তার সাথে এসে দেখো করেন। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এতো কিছুর মধ্যেও মাঝে-মধ্যে হাঁপিয়ে উঠেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এতো নিরাপত্তার আয়োজনে তার অস্বস্তিও হয়। বঙ্গভবনে বিবিসি বাংলার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এভাবেই নিজের মনোভাব প্রকাশ করলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন প্রায় তিন বছর। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বঙ্গভবনে তার কেমন কাটছে? তিনি উত্তর দেন, “খারাপ সময় কাটছে এটা বলা মুশকিল। তবে আমার কাছে মনে হয়- আই ডোন্ট ফিল সো মাচ কমফোর্ট (খুব একটা ভালো অনুভব করি না)। কারণটা হলো, এখানে মনে হয় স্বাধীনতা বিহীন একটা অবস্থায় আছি।” কিশোরগঞ্জে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ পুরোদস্তুর একজন রাজনীতিবিদ আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হবার আগে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রায় ৫৫ বছর ধরে তিনি রাজনীতি করেছেন। জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে। বঙ্গভবনে তিনি যে আরামে থাকেন সে কথা তিনি অস্বীকার করছেন না। আরাম থাকলেও আগের মতো স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ তিনি হারিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, “ এতো বড় বাড়িতে থাকি। বঙ্গভবন বাইরে থেকে মনে হয় রাজভবনের মতো। রাজা-বাদশারা যে অবস্থায় থাকত তেমন মনে হয়। খুব আরাম আয়েশে থাকি,এটাই স্বাভাবিক।” মি. হামিদের কাছে সবচেয়ে সমস্যা মনে হয়, তিন চাইলেই চট করে যেকোনো জায়গায় যেতে পারেন না। বিবিসি’র কাছে সে কথাই তুলে ধরলেন রাষ্ট্রপতি, “আমার কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সারা জীবন চলার যে একটা স্টাইল ছিল, এটার মধ্যে একটা বিরাট ছন্দপতন হয়ে গেছে। অর্থাৎ আমি আমার মন যখন যেটা চায় যে আমি এটা করব বা আমি ওখানে যাবো-এ ধরনের কত কাজই তো থাকে-মনে মনে। চিন্তা করি যে এটা করা দরকার, ওইখানে যাইতে হবে, তার সঙ্গে দেখা করতে হবে- দেখা গেলো এগুলো আমি পারি না- কারণ আমার যাওয়া খুবই কঠিন। ” রাষ্ট্রপতি তিনি মনে করেন,লোকজনকে বঙ্গভবনে নিয়ে আসা আর নিজে ইচ্ছে করে কোথাও যাওয়ার মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। নিজে কোথাও গেলে যে প্রশান্তি আসে, লোকজনকে খবর দিয়ে বঙ্গভবনে আনার মধ্যে সেই স্বস্তি নেই। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার জন্য রাস্তায় বের হলেই যে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এ বিষয়টি রাষ্ট্রপতির মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে। তিনি কোথাও যাবার জন্য মনস্থির করলেও নিরাপত্তার ব্যাপক আয়োজনের কথা মনে হলে সে ইচ্ছা ‘দমে যায়’ বলে তিনি উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি আক্ষেপ করে বলেন, তিনি রাস্তায় বের হলে যতক্ষণ রাস্তা বন্ধ থাকে ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা কোনো রোগীর মৃত্যুও হতে পারে বলে নিজের হতাশা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “কারণ রাস্তা যেভাবে থাকে, সেভাবে আমাকে যেতে দিবে না। বিশেষ করে অন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের যে সমস্যা সৃষ্টি হয় এটাই আমাকে সবচেয়ে ব্যথিত করে।”- বিবিসি

খুতবায় কী বক্তব্য দেওয়া যাবে তার সীমা থাকা উচিত

ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যা মামলায় দু'জনের ফাঁসি এবং একজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত৷ এছাড়া আরো পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে৷ বাংলাদেশে ব্লগার হত্যা মামলায় এটাই প্রথম রায়৷ বৃহস্পতিবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাঈদ আহম্মেদ তার রায়ে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল বিন নাইম ওরফে দিপ ও রেদোয়ানুল আজাদ রানার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন৷ রানা অবশ্য এখনও পলাতক৷ মাকসুদুল হাসান অনিককে যাবজ্জীবন এবং এহসানুর রেজা রুম্মান, মো. নাঈম সিকদার ওরফে ইরাদ ও নাফিজ ইমতিয়াজের ১০ বছর করে কারাদণ্ড হয়েছে৷ এছাড়া সাদমান ইয়াছির মাহমুদকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং হত্যা পরিকল্পনাকারী নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়৷ বিচারক সাঈদ আহম্মেদ তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘‘খুতবায় কী বক্তব্য দেওয়া যাবে তার একটা সীমা থাকা উচিত৷ কেউ কিছু লিখলেই তাকে মেরে ফেলতে হবে?'' তিনি আরো বলেন, ‘‘শুনেছি ব্লগাররাও এমন কিছু লেখেন, যা পড়লে নাকি মারতে ইচ্ছে করে৷ আসলে আমরা সবাই ধৈর্যহারা হয়ে গেছি৷ সকলকেই ধৈর্য ধরতে হবে৷ আইন হাতে তুলে নেওয়া যাবে না৷ আবার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও ক্রসফায়ারের নামে আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন, সেটাও বন্ধ করতে হবে৷'' বিচারক মামলার তদন্তে ত্রুটির কথা তুলে ধরে আদালতে বলেন, ‘‘মামলার শুনানির সময় এমন প্রশ্নও এসেছে, তানজিলা নামের যে মেয়েটিকে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন, তিনিই রাজীবকে হত্যা করেছেন কিনা৷ এক্ষেত্রে তার একটা জবানবন্দি নেওয়া প্রয়োজন ছিল তদন্ত কর্মকর্তার৷'' সাঈদ আহম্মেদ বলেন, ‘‘এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত ও নৃশংস ছিল৷ তবে রাষ্ট্রপক্ষ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করতে পারেনি৷'' এদিকে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘রাজীব হত্যার অন্তত তিনজন আত্মস্বীকৃত খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি হয়নি৷ তদন্তে চরম গাফিলতির কথা বলেছে আদালত৷ অথচ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীকে মাত্র পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়৷ তাই আমরা এই রায় প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়েছি৷'' এরপরও অবশ্য ইমরান এইচ সরকার মনে করেন, ‘‘আরো যে ব্লগার হত্যা হয়েছে, তার বিচারে এই রায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে৷''- ডিডব্লিউ