Saturday, February 7, 2026

বৃটেনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোট নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে?

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে লন্ডনের ইস্ট এন্ডে চা-কফির আড্ডা থেকে শুরু করে মসজিদের বাইরে- সবখানেই চলছে আলোচনা। দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোট দেয়ার সুযোগ পাওয়ায় আগ্রহ বাড়লেও তাদের মধ্যে সংশয় ও অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর প্রথম জাতীয় ভোট এবং প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথম নির্বাচন। যেখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে আয়োজিত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না।

প্রথমবারের মতো বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা প্রবাসে থেকে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলেও বাস্তবে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা ৭০ লাখের বেশি। যা মোট ভোটারের প্রায় ৫ শতাংশ।

তবে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিপুল বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর তুলনায় নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা খুবই কম। মাত্র ৩২ হাজার বা তার কিছু বেশি। অথচ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বাংলাদেশি বা বৃটিশ বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকা, জটিল ডিজিটাল নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অনাস্থাই এর প্রধান কারণ।

বয়স্ক ও সদ্য প্রবাসে আসা বাংলাদেশিরা ভোট নিয়ে বেশি আগ্রহী হলেও, যুক্তরাজ্যে জন্ম নেয়া বা বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উদাসীনতা লক্ষণীয়। অনেক তরুণ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি তাদের দৈনন্দিন জীবনে তেমন প্রভাব ফেলে না, বরং যুক্তরাজ্যের রাজনীতিই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, যারা মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন ও বিতর্কিত নির্বাচন দেখেছেন, তাদের কাছে এই নির্বাচন স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িত।

ভোট দিতে জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন- এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেককে নিরুৎসাহিত করেছে। কেউ কেউ শেষ মুহূর্তে আবেদন করে সময়মতো কাগজপত্র না পাওয়ায় ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

এ ছাড়া কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বৃটেনেও স্পষ্ট। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের লন্ডনবাস এবং আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বৃটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে ঘিরে বিতর্ক প্রবাসী সমাজে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের স্থানীয় রাজনীতিবিদদের বাংলাদেশি নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও দায়বদ্ধতা নিয়ে।

অনেকের কাছে এই নির্বাচন দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটি আশার আলো। আবার কারও কাছে এটি এখনো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। এক প্রবাসীর কথায়, এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ আমাদের শিকড়। কিন্তু সত্যিকারের পরিবর্তন হবে কি না- সেটাই বড় প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে, বৃটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিরা সরাসরি সংখ্যায় খুব বড় প্রভাব না ফেললেও, কাছাকাছি লড়াইয়ের আসনে তাদের ভোট ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে তার চেয়েও বড় বিষয়- এই ভোট প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্বীকৃতির দাবি পূরণের একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

(মূল ইংরেজি প্রতিবেদন থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত)

mzamin

ওয়াশিংটন পোস্টের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাই, চাকরি হারালেন শশী থারুরের ছেলেও

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের কয়েক শ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। গত বুধবার এক দিনেই প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে বলেন, ওয়াশিংটন পোস্টের মালিক জেফ বেজোস এখনো প্রকাশনাটির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছেন।

মারে বলেন, ‘তিনি চান, ওয়াশিংটন পোস্ট আরও বড়, সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠুক।’

তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির বেশির ভাগ সাংবাদিক এ ধারণা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, খরচ কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে বড় করা যায় না।

    I have been laid off today from the @washingtonpost, along with most of the International staff and so many other wonderful colleagues. I’m heartbroken for our newsroom and especially for the peerless journalists who served the Post internationally — editors and correspondents…
    — Ishaan Tharoor (@ishaantharoor) February 4, 2026

এ সম্পর্কে জানা আছে—এমন একজন বলেন, বুধবার প্রতিষ্ঠানটির প্রায় প্রতি তিনজন কর্মীর একজনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্যে নিউজরুম বা সংবাদক্ষের কর্মীর সংখ্যাই ৩০০–এর বেশি।

এত ব্যাপক আকারে কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে জেফ বেজোসের সমালোচনা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের অনেক সাংবাদিক উদ্বেগ নিয়ে জানতে চাইছেন, তিনি কি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেবেন? কেউ কেউ অবশ্য আশায় আছেন, তিনি যেন এটাই করেন।

এ নিয়ে এক বিবৃতিতে দ্য পোস্ট গিল্ড বলেছে, ‘যদি জেফ বেজোস আর সেই লক্ষ্যে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক না হন, তবে পত্রিকাটির জন্য নতুন একজন অভিভাবকের প্রয়োজন। কারণ, বহু প্রজন্ম ধরে ওয়াশিংটন পোস্ট সাংবাদিকতার মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে সেবা দিয়ে গেছে। সেসব মানুষ এখনো এই পত্রিকার সেবার ওপর নির্ভরশীল।’

বেজোস এখনো ওয়াশিংটন পোস্ট নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পত্রিকাটির ব্যবস্থাপনা বিভাগকে বার্ষিক লোকসান কমিয়ে সেটিকে আবারও লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে একটি টেকসই পথ খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বেজোসের সঙ্গে তাঁর কবে ও কী আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি মারে। তিনি টেলিফোনে সিএনএনকে এ সাক্ষাৎকার দেন।

শেষবার বেজোসের সঙ্গে তাঁর কবে কথা হয়েছে, তিনি তা জানাতেও অস্বীকার করেন। তবে তিনি বুধবারকে একটি ‘নতুন দিনের সূচনা’ এবং বেজোসের সমর্থনের ‘পুনর্নবায়ন’ বলে উল্লেখ করেছেন।

মারে বলেন, ‘আমি আমার পক্ষ থেকে শুধু এটুকু বলতে পারি, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির সবকিছু সঠিকভাবে চলতে এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে যতটুকু সহায়তা প্রয়োজন, বেজোস সেটাই করছেন।’

ওয়াশিংটন পোস্টের নির্বাহী সম্পাদক আরও বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে, একটি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তিনি নিখুঁত—একজন মালিক হিসেবে তিনি সংবাদ প্রকাশের কাজে হস্তক্ষেপ করেন না, আমরা কী করব তার নির্দেশনা দেন না, কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের ওপর সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেখান না, কীভাবে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হবে (কভারেজ) তার নির্দেশ দেন না এবং আমাদের সাংবাদিকতার লক্ষ্য ও প্রয়োজনগুলো বোঝেন। এমন মালিকই আমি পছন্দ করি।’

২০১৩ সালে ২৫ কোটি ডলারে ওয়াশিংটন পোস্টের মালিকানা কিনে নিয়েছিলেন অনলাইন প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা জেফরি পি বেজোস।

শশী থারুরের ছেলেও চাকরি হারিয়েছেন

বুধবার ওয়াশিংটন পোস্টের যে কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়েছে, এর মধ্যে ঈশান থারুরের নামও রয়েছে। তিনি পত্রিকাটিতে আন্তর্জাতিক বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কলাম লেখক হিসেবে কাজ করতেন। ঈশান ভারতের লোকসভার সদস্য কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের ছেলে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে ঈশান থারুর নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন।

বুধবার ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের মধ্যে নিউজরুমের কর্মীর সংখ্যাই ৩০০–এর বেশি
বুধবার ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের মধ্যে নিউজরুমের কর্মীর সংখ্যাই ৩০০–এর বেশি। ছবি: এএফপি

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে শূন্যতা, কী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন সি

প্রকাশ ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ঃ চীনের সেনাবাহিনীর শীর্ষ জেনারেলরা তদন্তের মুখোমুখি হচ্ছেন। এতে করে দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের দীর্ঘদিনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এখন তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মহলেও পৌঁছে গেছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে—পার্টির নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাও কাউকে রক্ষা করতে পারছে না।

চীন–বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের দীর্ঘদিনের মিত্র ও কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য জেনারেল ঝাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে সি চিন পিংয়ের হাতে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামো আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠছে, যা আগে থেকে গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা রয়েছে। তবে এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের কারণে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনের সহসা সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা কমে গেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক জোনাথন জিন বলেন, ‘ঝাংয়ের অপসারণের অর্থ হলো—এখন নেতৃত্ব পর্যায়ের কেউ সত্যিকার অর্থে নিরাপদ নন।’ ঝাংয়ের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘটনাকে ‘বিস্ময়কর’ বলে মনে করেন জিন।

জিন দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থায় (সিআইএ) চীনবিষয়ক শীর্ষ বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে চীনবিষয়ক পরিচালক ছিলেন। তাঁর মতে, এই তদন্ত চীনের রাজনীতিতে একটি ‘গভীর পরিবর্তনের’ ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জিন বলেন, অতীতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যাঁদের লক্ষ্য করা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে সি চিন পিংয়ের কিছু রাজনৈতিক যোগসূত্র থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু এবার সেই সীমা অতিক্রম করা হয়েছে। সি চিন পিংয়ের রাজনৈতিক সৌরজগতের যে অংশকে জিন ‘গ্রহাণুপুঞ্জ’ বলে মনে করেন, এবারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সেখানে ঢুকে পড়েছে।

সি চিন পিং ও ঝাং ইউশিয়া—দুজনই ‘প্রিন্সলিং’ বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। তাঁরা দুজনেই সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সন্তান। ৭৫ বছর বয়সী ঝাং ইউশিয়ার ২০২২ সালে অবসর নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সি চিন পিং তাঁকে চীনের সর্বোচ্চ সামরিক নেতৃত্ব–বিষয়ক সংস্থা সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনে (সিএমসি) তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব দেন। এতে করে তাঁদের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ‘শৃঙ্খলা ও আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের’ অভিযোগে ঝাংয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। অথচ সিএমসির এ জোষ্ঠ্য ভাইস–চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্ট সির পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।

২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর সি চিন পিং ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেন। সেনাবাহিনী ছিল এ অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ২০২৩ সালে দেশটির সামরিক বাহিনীর অভিজাত রকেট ফোর্সের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়।

এ বাহিনী পারমাণবিক অস্ত্রের পাশাপাশি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার দায়িত্বে পালন করে। গত কয়েক বছরে দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে দুই ব্যক্তিকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁরা দুজনই একসময় প্রতিরক্ষমন্ত্রী ছিলেন।

গবেষক জোনাথন জিন বলেন, ‘আমার মনে হয় দুর্নীতির উদ্বেগ সম্ভবত সত্যি। কিন্তু চীনের রাজনীতিতে সাধারণত এই ধরনের অভিযোগ কাউকে সরিয়ে দিতে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়।’

সি চিন পিং দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর আগে দেশটিতে দুর্নীতি কতটা গভীরভাবে শেকড় গেড়েছিল, সেটাও উল্লেখ করেন জিন।

সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) জয়েন্ট স্টাফ ডিপার্টমেন্টের প্রধান ও পার্টির জ্যেষ্ঠ সদস্য লিউ ঝেনলির বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। এতে করে সাত সদস্যের এই সর্বোচ্চ সামরিক সংস্থা সংকুচিত হয়ে দুজনে নেমে এসেছে। দুজনের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সি চিন পিং।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এশিয়া সোসাইটির গবেষক নীল টমাস বলেন, ‘সি চিন পিংয়ের আগে আর কোনো নেতা (দেশটির সেনাবাহিনী তথা) পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শীর্ষ নেতৃত্বকে এভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেননি।’

হুমকি নির্মূল করা হচ্ছে

গত রোববার চীনের সেনাবাহিনীর মুখপত্র পিএলএ ডেইলির প্রথম পাতার সম্পাদকীয়তে এ তদন্তকে বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে। সেখানে বলা হয়েছে, এই দুই জেনারেল চেয়ারম্যানের দায়িত্বশীলতা ব্যবস্থা ‘গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন ও লঙ্ঘন করেছেন’।

এই ব্যবস্থায় সি চিন পিং সিএমসির চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর হাতে সর্বোচ্চ সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে। চীন সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা ‘সেনাবাহিনীর ওপর পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কার্যকর করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।’

এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর চায়না অ্যানালাইসিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক লাইল মরিস বলেন, ‘চেয়ারম্যান দায়িত্বশীলতা ব্যবস্থা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার অর্থ হলো—ঝাং ইউশিয়ার ক্ষমতা সি চিন পিংকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।’

পিএলএ ডেইলির প্রতিবেদনে বিস্তারিত কোনো তথ্য বা ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রমাণ দেওয়া হয়নি। কোনো কোনো বিশ্লেষক এটাকে আনুগত্যহীনতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে ঝাং ইউশিয়া আসলেই সি চিন পিংয়ের ক্ষমতার জন্য কতটা হুমকি হয়ে উঠেছিলেন, তা নিয়ে অনেক বিশ্লেষকের মনে সন্দেহ রয়েছে।

লাইল মরিস বলেন, ‘সির এ ধরনের নাটকীয় পদক্ষেপ গ্রহণ দুটি বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়। এক. এমন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সি কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন। দুই. সামরিক বাহিনীর ওপর নিজের ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে সংহত করার বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী।’

ঝাং ইউশিয়া আগে চীনের সেনাবাহিনী পিএলএর প্রোকিউরমেন্ট (ক্রয়) বিভাগের পরিচালক ছিলেন। এটা সি চিন পিংয়ের নির্দেশে শুরু হওয়া দুর্নীতি দমন অভিযানের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এত দিন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হয়নি।

সিঙ্গাপুরের এস. রাজারাত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক জেমস ছার বলেন, ঝাং ইউশিয়ায়ের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর মধ্য দিয়ে সি চিন পিং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা একটি সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। অভিযোগটা হলো— সি বেছে বেছে সামরিক দুর্নীতির তদন্ত করছেন। তাঁর মতো ‘প্রিন্সলিং’ বা রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরা রেহাই পাচ্ছেন।

জেমস ছার বলেন, ‘ঝাংয়ের শিষ্য লি শাংফু ২০২৩ সালের শেষভাগে সমস্যায় পড়লে তাঁর (ঝাংয়ের) কোনো শাস্তি হয়নি।’ লি শাংফু চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ২০২৩ সালের শেষার্ধে সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির সন্দেহে তাঁকে পদচ্যুত করা হয়।

সামরিক নেতৃত্বে শূন্যতা

সি চিং পিংয়ের এসব পদক্ষেপের কারণে চীনের সামরিক নেতৃত্বের এত বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসব জায়গায় নতুন কাউকে না বসালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনীটি কীভাবে পরিচালিত হবে—এই প্রশ্ন উঠেছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জোনাথান জিন বলেন, ‘নির্দেশনা–শৃঙ্খলা (চেইন অব কমান্ড) কীভাবে কাজ করবে, বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা সাধারণত এসব শূন্য পদে বসার যোগ্য, সিএমসির সেসব কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগে বাদ পড়েছেন। তাই (চীনের সেনাবাহিনী কীভাবে পরিচালিত হবে) তা সত্যিই পরিষ্কার নয়।’

অন্যান্য বিশ্লেষক মনে করেন, সি নতুন কমিটি না গড়ে তোলা পর্যন্ত যৌথ প্রশিক্ষণ বৃদ্ধির মতো উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ থমকে যেতে পারে।

উদ্ভূত সমস্যার সমাধান কীভাবে করা হতে পারে, এ বিষয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্লুপাথ ল্যাবসের গবেষণা পরিচালক এরিক হান্ডম্যান বলেন, ‘নতুন সদস্য যুক্ত করা হতে পারে। অথবা সি–কে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নেতা হিসেবে রেখে একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলারও সম্ভাবনা রয়েছে।’

এশিয়া সোসাইটির নীল টমাস বলেন, সি সামরিক নেতৃত্বকে পুনর্গঠনে আগ্রহী। এ জন্য ‘সঠিক প্রার্থী বাছাই করে’ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আগামী বছরের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান।

বিশ্লেষকরাদের মতে, ততক্ষণ (নতুন নেতৃত্ব বাছাই) পর্যন্ত সি সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যমাত্রা এগিয়ে নেবেন।

চীন অনেক দশক ধরে কোনো যুদ্ধ করেনি। কিন্তু দেশটি সম্প্রতি সমুদ্র বিবাদ এবং তাইওয়ানকে ঘিরে ক্রমশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। স্বশাসিত দ্বীপটিকে চীনে নিজেদের দাবি করে। গত বছরের শেষদিকে তাইওয়ানের আশেপাশে সর্বকালের সর্ববৃহৎ সামরিক মহড়া চালিয়েছে চীন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজর অন্যদিকে। আর তাইওয়ানের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৮ সালে। তাই, এই সময়টা সি ‘ঘর গোছানোর’ কাজে ব্যবহার করতে পারবেন।

নীল টমাস বলেন, ‘পিএলএর উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বে এ ধরনের অভিযান (শূন্যতা) এটাই ইঙ্গিত দেয়, তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সির সহসা বড় কোনো সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির পরিকল্পনা নেই। তবে (সির) এই কঠোর পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে আরও যোগ্য এবং অনুগত জেনারেলদের তুলে আনা, যাঁরা ভবিষ্যতে আরও বড় হুমকি সৃষ্টি করবেন।’

এ বিশ্লেষকের মতে, ‘সি একজন দৃঢ় সংকল্পের মানুষ। পার্টি ও সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে আনুগত এবং আদর্শগতভাবে নিষ্ঠাবান রাখার জন্য যা করা দরকার, তিনি তাই করবেন।’

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ছবি: রয়টার্স

মিয়ানমারের সামরিক–সমর্থিত দলের ভূমিধস জয়, এখনো স্বীকৃতি দেয়নি আসিয়ান

রয়টার্স ও আল–জাজিরা, প্রকাশ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ঃ মিয়ানমারে সামরিক–সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) দেশটির সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১ দেশের জোট আসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান) এখনো এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি।

মিয়ানমারে এবারের জাতীয় নির্বাচনে তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হয়ে গত সপ্তাহে নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়। এতে দেশটির পার্লামেন্টের নিম্ন ও উচ্চকক্ষে ইউএসডিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। দলটি নিম্নকক্ষ পিথু হ্লুট্টের ২৬৩টির মধ্যে ২৩২টি এবং উচ্চকক্ষ অ্যাম্যোথা হ্লুট্টে ১৫৭টির মধ্যে ১০৯টি আসনে জিতেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ও আজ শুক্রবার নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ মাধ্যম আজ এ খবর জানিয়েছে।

ইউএসডিপি দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পক্ষে কাজ করে আসছে। দলটির চেয়ারম্যান একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। আর শীর্ষপদের অনেকে উচ্চপদস্থ সাবেক সেনা কর্মকর্তা।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশটিতে গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জান্তা সরকারবিরোধী বিদ্রোহ ব্যাপক ও তীব্রতর হয়েছে। এতে দেশটির অনেক পুরোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীও যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

সেনাবাহিনী ও জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং নিজেই পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেছেন। বিতর্কিত এ নির্বাচনে সু চির নেতৃত্বাধীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিসহ (এনএলডি) গুরুত্বপূর্ণ অনেক দল অংশ নেয়নি।

গৃহযুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের অনেক প্রশাসনিক অঞ্চলে (টাউনশিপ) ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়নি। বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ভোট না হওয়ায় নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো বলছে, নির্বাচন ‘আবাধ ও সুষ্ঠু’ হয়নি। সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে রোহিঙ্গাসহ অনেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ভোট দিতে পারেনি, তা ছাড়া ভোটের সময়ে বিমান হামলায় অন্তত ১৭০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৪০০ জনকে আটক করা হয়েছে।

স্বীকৃতি দেয়নি আসিয়ান

আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসিয়ানের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে ফিলিপাইন। গতকাল দেশটির পররাষ্ট্রসচিব তেরেসা লাজারো বলেন, ‘মিয়ানমারে তিন ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি’ আসিয়ান।

লাজারো জানান, আসিয়ান এখনো মিয়ানামারের নির্বাচনের বিষয়ে নিজেদের চূড়ান্ত সম্মতি বা অবস্থান ঠিক করতে পারেনি। তিন ধাপে ভোট গ্রহণ শেষ হলেও পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

গতকাল ফিলিপাইনের সেবু শহরে চলতি বছর প্রথমবারের মতো আসিয়ানের মন্ত্রিপর্যায়ে বড় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল এবারের বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। বৈঠক শেষে লাজারো সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সময় এসব উল্লিখিত মন্তব্য করেন।

ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন  মিয়ানমারের জগনণ। রাজধানী নাইপিডোতে, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন মিয়ানমারের জগনণ। রাজধানী নাইপিডোতে, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ফাইল ছবি: রয়টার্স

এপস্টেইন–ঝড়ে স্টারমারের রাজনৈতিক শক্তি নড়বড়ে

জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক কখনো ছিল না। কিন্তু সেই এপস্টেইন–কাণ্ডেই এখন টালমাটাল স্টারমারের গদি। অন্যদিকে, আলোচিত–সমালোচিত এপস্টেইনের নথিতে বারবার নাম আসা সত্ত্বেও বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাজ্যে এখন এপস্টেইন নথি ঘিরে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন স্টারমার। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে বিচারের দাবি ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্য আসলে স্টারমারের রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং ট্রাম্পের অসীম ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। এতে পরিষ্কার যে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সক্রিয়, তখন ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে থাকা মার্কিন বিচার বিভাগ এবং রিপাবলিকান–নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস তাঁকে যেকোনো কঠিন তদন্ত থেকে আগলে রাখছে।

তবে সব ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে এপস্টেইন নথির বিশ্বব্যাপী বিস্তার। এর বিষাক্ত থাবা এখন নরওয়ে থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। সাত বছর আগে কারাকক্ষে এপস্টেইনের মৃত্যু হলেও তাঁর তৈরি করা কেলেঙ্কারি এখনো একের পর এক প্রভাবশালীকে মাটিতে নামিয়ে আনছে। এ উত্তাপ কেবল স্টারমার একাই টের পাচ্ছেন না।

টালমাটাল স্টারমার

যুক্তরাষ্ট্রের মতো ‘সব ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার’ বিলাসিতা কিয়ার স্টারমারের নেই। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হয়তো মনে মনে এমনটাই চাইছেন, কিন্তু পরিস্থিতি তার পুরো বিপরীত। বৃহস্পতিবার তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব আক্ষরিক অর্থেই সুতায় ঝুলছিল। নিজের দল লেবার পার্টির এমপিদের বিদ্রোহ এবং একের পর এক সংকটে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট এখন দিশাহারা। সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টেইনের সখ্যের কথা জেনেও কেন তাঁকে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত করা হলো—বুধবার পার্লামেন্টে এমন প্রশ্নের মুখে পড়েন স্টারমার। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যান্ডেলসন যে এপস্টেইনকে চিনতেন তা আগে থেকেই জানা ছিল, কিন্তু সেই সম্পর্কের গভীরতা আর অন্ধকার দিকগুলো আমাদের কারোরই জানা ছিল না।’

২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনকে সমর্থন দিয়ে গেছেন, এমন তথ্য আসার পর গত বছরই তাঁকে বরখাস্ত করেছিলেন স্টারমার। কিন্তু এবারের ধাক্কাটা আরও গুরুতর।

নতুন ফাঁস হওয়া নথি বলছে, ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার চরম মুহূর্তে ম্যান্ডেলসন রাষ্ট্রীয় গোপন এবং বাজার নিয়ন্ত্রণকারী তথ্য এপস্টেইনকে পাচার করেছিলেন। ওয়াল স্ট্রিটের চতুর বিনিয়োগকারীদের কাছে এই তথ্যের মূল্য ছিল অকল্পনীয়। এই অভিযোগ সামনে আসার পর ম্যান্ডেলসন হাউস অব লর্ডস এবং লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন। এখন তাঁর বিরুদ্ধে চলছে ফৌজদারি তদন্ত।

যুক্তরাজ্যে নাটকীয়তা

প্রশ্ন হলো, যে নথিপত্র ওয়াশিংটনে প্রকাশিত হলো, তার ধাক্কায় লন্ডন কেন বেশি টালমাটাল? এর কারণ হলো, যুক্তরাজ্যে এই ঝড় শুধু এপস্টেইনকে নিয়ে নয়; বরং এটি যুক্তরাজ্যের রাজনীতির তিনটি নাটকীয়তাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। একটি হচ্ছে, নিরঙ্কুশ জয়ের দুই বছর না যেতেই প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সময় যেন ফুরিয়ে আসছে। গত বুধবার পার্লামেন্টে তাঁর ‘অসহায়’ আত্মসমর্পণ লেবার পার্টির ভেতরেই তাঁর নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ নিয়ে গুঞ্জন বাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্টদের মেয়াদ যেমন নির্দিষ্ট, ডাউনিং স্ট্রিটে তেমন নয়। সেখানে প্রবেশের দিন থেকেই শুরু হয় ‘কত দিন টিকবেন’ সেই হিসাব। গত ১১ বছরে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী বদলানো যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার এক চরম উদাহরণ।

যাকে রাজনীতির ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’ বলা হয়, সেই পিটার ম্যান্ডেলসন নব্বইয়ের দশকে টনি ব্লেয়ারের সঙ্গে মিলে লেবার পার্টিকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। কিন্তু ধনী আর প্রভাবশালীদের সংস্পর্শে থাকার এক দুর্নিবার লোভ তাঁকে বারবার বিতর্কে ফেলেছে। সেই লোভই তাঁকে এপস্টেইনের ‘অভিশপ্ত’ বন্ধুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যা এখন তাঁর ক্যারিয়ারের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিল। এপস্টেইন–কাণ্ডে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নাম জড়ানোয় ব্রিটিশ রাজপরিবার এখন অস্তিত্বের সংকটে।

নির্বিকার ট্রাম্প

স্টারমার যখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছেন, ট্রাম্প তখন প্রায় নির্বিকার। যদিও নথিতে তাঁর নাম এসেছে, কিন্তু ওভাল অফিস থেকে তাঁকে টেনে নামানোর মতো কোনো পরিস্থিতি সেখানে নেই।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীকে যেখানে পার্লামেন্টে বিরোধীদের ‘হিংস্র’ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, ট্রাম্পের সামনে তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। উপরন্তু রিপাবলিকান–নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এখন তাঁর হাতের পুতুল। ট্রাম্প মঙ্গলবার ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে ‘সহমর্মিতা’ প্রকাশ করেছেন। তবে এটি কোনো সৌজন্য নয়; বরং ট্রাম্প হয়তো বুঝতে পারছেন যে ক্লিনটনদের এই সাক্ষ্যদান শেষ পর্যন্ত এই কেলেঙ্কারিকে এমন এক মোড় দেবে, যা তাঁর নিজের গদি আরও পাকাপোক্ত করবে।

কিয়ার স্টারমার
কিয়ার স্টারমার। ফাইল ছবি: রয়টার্স

‘ভোটের আগে কত নেতা আসে, ভোট শেষ হইলে আর কেউ খোঁজ নেয় না’

প্রতিবার ভোট এলে প্রচারণার কারণে সরগরম হয়ে ওঠে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা–বাগানগুলো। বাগানের কাঁচা-পাকা রাস্তার দুপাশে শোভা পায় নানা প্রার্থীর পোস্টার, অলিগলিতে ভেসে আসে নির্বাচনী গান আর মাইকিংয়ের শব্দ। তবে প্রচারণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধের কারণে এবারের চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন।

পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ থাকায় চা-বাগানগুলোয় নেই চেনা নির্বাচনী আমেজ। মাইকিংও আগের মতো নেই। ফলে ভোট আসছে—এ খবরই যেন ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না শ্রমিকদের কাছে। অথচ এই চা-বাগানগুলোর শ্রমিকেরাই এই আসনের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক।

দীর্ঘদিন ধরে ‘নৌকার ভোটার’ হিসেবে পরিচিত এই চা-শ্রমিকেরা টানা সাতবার সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস শহীদকে বিজয়ী করেছিলেন। এবার নৌকা না থাকায় অন্য দলের প্রার্থীরা তাঁদের সমর্থন পেতে শুরু করেছেন নতুন করে দৌড়ঝাঁপ।

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার-৪ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮ জন। এর মধ্যে লক্ষাধিক ভোটার চা-শ্রমিক। এই বিপুল ভোটই বদলে দিতে পারে নির্বাচনের ফলাফল।

গতকাল সোমবার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া, ভুড়ভুড়িয়া, খাইছড়া ও ফুলছড়া চা-বাগানসহ কয়েকটি বাগান ঘুরে দেখা গেছে, হাতে গোনা দু–একজন প্রার্থীর ব্যানার ঝুলছে। তবে সেগুলো চোখে পড়ার মতো নয়। কোথাও নেই আগের মতো উৎসাহ বা উত্তেজনা।

ভুড়ভুড়িয়া চা-বাগানের বাসিন্দা নারায়ণ পাশী আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘এবার পোস্টার না থাকায় বোঝাই যায় না ভোট আইছে। দুই-একটা ব্যানার ছাড়া কিছুই নাই। মাইকিংও খুব কম। কোনো আমেজ নাই। তবে ভোটের দিন সবাই ভোট দিতে যাব।’

একই বাগানের নারী শ্রমিক মিনা পাশীর কণ্ঠে উঠে আসে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার গল্প। তিনি বলেন, ‘ভোটের আগে কত নেতা আসে, কত কথা বলে। কত স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু ভোট শেষ হইলে আর কেউ খোঁজ নেয় না। সবার জীবনে ভালো দিন এলেও আমাদের জীবনে সুদিন আসে না। আমরা প্রতিবার ভোট দিই, আমাদের ভোটেই সবাই নেতা হয়, কিন্তু আমাদের দিকে কেউ তাকায় না। এবার আমরা এমন মানুষকেই ভোট দিতে চাই, যে সংসদে গিয়ে আমাদের কথা বলবে, আমাদের কষ্টের কথা তুলবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চা-শ্রমিক নেতা বলেন, ‘আমরা সারা জীবন নৌকায় ভোট দিয়েছি। কিন্তু এতবার জিতিয়েও আমাদের জীবন বদলায়নি। এখনো মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। এবার অনেক প্রার্থী এসেছে। আমরা আর শুধু মার্কা দেখে ভোট দেব না। দেখে, শুনে, বুঝে যোগ্য মানুষকেই ভোট দেব।’

এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব), জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী প্রীতম দাশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী নূরে আলম হামিদী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী জরিফ হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ)প্রার্থী আবুল হাসান এবং স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) প্রার্থী মহসিন মিয়া ওরফে মধু মিয়া।

শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগান
শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগান। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

পরিবারতান্ত্রিক সরকার চাই না, চাই জনগণের সরকার: জামায়াতের আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘একটা ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আগামী ১২ তারিখ আমাদের মুক্তির হাতছানি দিচ্ছে। ৫৪ বছরে যাঁরা রাজনীতি করেছেন, অনেকেই চেষ্টা করেছেন। আমরা কারও আন্তরিকতার ওপর কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই না। তাঁরা তাঁদের যোগ্যতা ও আন্তরিকতা দিয়ে যেটুকু পেরেছেন, বাংলাদেশ এবং তার জনগণকে দিয়েছেন। কী দিয়েছেন, কী দিতে পারেননি—তার সবকিছুর সাক্ষী এ দেশের ১৮ কোটি মানুষ।’

শুক্রবার সন্ধ্যায় ফরিদপুরের বোয়ালমারী স্টেডিয়ামে ফরিদপুর-১ (বোয়ালমারী-আলফাডাঙ্গা-মধুখালী) আসনে জামায়াত ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ইলিয়াস মোল্লার সমর্থনে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। পরে তিনি ইলিয়াস মোল্লার হাতে প্রতীক তুলে দিয়ে সবার কাছে ভোট চান।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আর চাই না, দেশের মাটিতে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে তাকে খুন করা হোক, গুম করা হোক, আয়নাঘরে পাঠানো হোক, মিথ্যা মামলা দিয়ে কাউকে নাজেহাল করা হোক। এই বাংলাদেশ আমরা আর চাই না।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমি কোনো দলের সরকার চাই না, কোনো পরিবারতান্ত্রিক সরকার চাই না, কোনো গোষ্ঠীতান্ত্রিক সরকার আমি চাই না, আমি চাই জনগণের সরকার। আমি চাই ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। আর ধর্মে-বর্ণে-জাতিতে বিভক্ত করার সুযোগ আমরা কাউকে দেব না, ইনশা আল্লাহ। এই বাংলাদেশকে সব ধর্মের, বর্ণের মানুষকে ফুলের বাগানের মতো আমরা সাজাব।’

শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘ওই বাংলাদেশটা চাই না, যেখানে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভাইবোনদের ওপর নির্যাতন করা হয়। আমরা ওই বাংলাদেশটাও চাই না, যেখানে হাজার হাজার লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার যুবকের মিছিল হয়। ওই বাংলাদেশ আমরা চাই না, যে বাংলাদেশে বিচার অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়। ওই বাংলাদেশ আমরা চাই না, যার পকেটের জোর নেই, যার বাহুতে বল নেই, যার গোষ্ঠীর জোর নেই অথবা দলীয় শক্তি নেই, তার কোনো বিচার নেই। ওই বাংলাদেশ চাই না।’

জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘শিশু জন্ম নেওয়ার পর শুধু গরিবের ঘরে জন্ম নিয়েছে এ কারণে তার শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা হবে না, সেই বাংলাদেশ চাই না। আমরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একটা বাংলাদেশ চাই। ওই বাংলাদেশটা চাই, যে বাংলাদেশে আমার মায়ের সম্পদ, ইজ্জত এবং জীবনের ওপর আর কেউ কোনো হামলা করার দুঃসাহস দেখাবে না।’

‘পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যেতে চাই না’

এর আগে বিকেলে নড়াইল সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির। পরে তিনি নড়াইলের দুটি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে দলীয় প্রতীক তুলে দেন।

জনসভায় চব্বিশের আন্দোলনে রক্ত ও জীবন দেওয়া বীরদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই বাংলাদেশে এখন স্বস্তির নিশ্বাস চাই। আর পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যেতে চাই না। এই পুরোনো রাজনীতি বাংলাদেশকে আগায় যেতে দেয় নাই। পায়ে গিঁট দিয়ে আটকে রেখেছে, সামনে আগাইতে দেয় নাই। আমরা সেই বাংলাদেশকে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পাল্টে দিতে চাই। সেই সুযোগ আগামী ১২ তারিখ।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘বলতে গেলে সমাজে কেউ ভালো নেই। এই ভালো থাকাটা কে তৈরি করবে? এই ভালোর জায়গাটা সে–ই তৈরি করবে, যার সমাজের প্রতি দরদ, দায় এবং ভালোবাসা আছে। যে সমাজের ওপর জুলুম করে, সে এটা পারবে না।’

নেতা-কর্মীদের ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যোদ্ধারা তৈরি থাকুন। কোনো কালো চিল এবং শকুন আসমান থেকে জমিনে নেমে কোনো একটা মানুষের ভোটও যেন ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে না পারে। যদি এ রকম আসে, দুই ডানা খুলে ফেলবেন।’ তিনি বলেন, ‘যদি কোনো দুর্বৃত্ত অন্য কোনো নাগরিকের ভোটের দিকে হাত বাড়ায় অথবা কেউ যদি ইঞ্জিনিয়ারিং করতে চাই, মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলছি, কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলব না।’

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। শুক্রবার সন্ধ্যায় বোয়ালমারী স্টেডিয়ামে
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। শুক্রবার সন্ধ্যায় বোয়ালমারী স্টেডিয়ামে। ছবি: প্রথম আলো

ওবামা ও মিশেলকে বানরের সঙ্গে তুলনা করা ট্রাম্পের ভিডিও সরাল হোয়াইট হাউস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাকে বানরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রকাশের প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ভিডিওটি সরিয়ে নিয়েছে হোয়াইট হাউস। তবে সরানোর আগে তারা ভিডিওটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কিছু সদস্যও ভিডিওটির সমালোচনা করেছেন। সমালোচকদের মতে, ভিডিওটিতে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের মানবিক মর্যাদা খর্ব করা হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হোয়াইট হাউসের একজন কর্মী ভুলবশত পোস্টটি করেছেন। এটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’

ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে পোস্টটি প্রকাশের আগে প্রেসিডেন্ট ভিডিওটি দেখেননি। ভিডিওটি দেখার পর তিনি সেটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

উভয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। ভিডিওটি পোস্ট করা কর্মীর পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করেনি। ট্রাম্পের ওই উপদেষ্টার তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের মাত্র কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সহকারীর সরাসরি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার আছে।

ভিডিওটি সরানোর কয়েক ঘণ্টা আগে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট পোস্টটির পক্ষে কথা বলেন। ভিডিওটি ঘিরে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াকে তিনি ‘ভুয়া ক্ষোভ’ বলে মন্তব্য করেন।

ট্রাম্পের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক মিনিটের ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছিল। ভিডিওটিতে মিথ্যা দাবি করা হয়, জালিয়াতির কারণে তিনি ২০২০ সালের নির্বাচনে হেরেছিলেন। ভিডিওটির শেষ অংশে একটি ছোট বানরের নৃত্যসংবলিত ক্লিপ দেখানো হয়, যেখানে ওবামার মুখ বসানো ছিল। ক্লিপটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে মনে হয়েছে।

এই ঘটনার পর আবারও ট্রাম্পের অতীত বিতর্কিত মন্তব্য সামনে এসেছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি মিথ্যা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে নির্বাচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেননি। গত বৃহস্পতিবার এক প্রার্থনা প্রাতঃরাশ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘ওবামা “খুব খারাপ” ও “আমাদের দেশের একজন ভয়াবহ বিভাজক” ব্যক্তি ছিলেন।’

হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে পৌঁছে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে পৌঁছে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

গুলতেকিন খানের লেখা: কোনো মেয়ে যেন আমার মতো ভুল না করে

গুলতেকিন খান ফেসবুকে একটা পাবলিক পোস্ট দিয়েছেন। ৩ অক্টোবর ২০২৫ বেলা তিনটার দিকে এটি প্রকাশিত হয়। চার ঘণ্টায় এটি শেয়ার হয়েছে সাড়ে চার হাজার। প্রতিক্রিয়া বা রিঅ্যাকশনে স্যাড বা দুঃখের ইমোজি সাড়ে ১৫ হাজার, লাইক ৬ হাজারের বেশি, লাভ আড়াই হাজার, কেয়ার ৯২৮ (সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে)।

লেখাটার গুরুত্ব বিবেচনা করে গুলতেকিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে এটি প্রথম আলোয় প্রকাশের অনুমতি চাওয়া হলে তিনি অনুমতি দেন।
ওই সময় তিনি বলেন, এটি হয়তো লিখতে ১০ মিনিট লাগত, কিন্তু দুই দিন ধরে এই লেখাটা তিনি লিখেছেন এবং লেখার সময় টপটপ করে অশ্রু ঝরছিল।
গুলতেকিন খান একজন স্বনামধন্য কবি। তাঁর বেশ কটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘আজও কেউ হাঁটে অবিরাম’, ‘আজ তবে উপনিবেশের কথা বলি’, ‘বালি-ঘড়ি উল্টে যেতে থাকে’ ও ‘দূর দ্রাঘিমায়’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।
গুলতেকিন খানের পুরো ফেসবুক স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো—

এই লেখাতে আমার সম্পর্কে একটিও খারাপ মন্তব্য দেখতে চাই না!
এই সত্যি কথাগুলো আমি লিখেছি শুধুমাত্র কিশোরী, তরুণী এবং তাদের অভিভাবকদের জন্যে।
এত ব‍্যক্তিগত ঘটনা লিখেছি, কারণ আর কোনো মেয়ে আমার (পুরো বিয়েটাতে আমার চেয়ে অভিভাবকদের বেশি ভুল ছিল) মতো ভুল যেন না করে।
জুন মাসের ৬ তারিখ ছিল রোববার। শীলাকে যেমন হাসতে হাসতে বলেছিলাম, প্রায় একইভাবে ইকবাল ভাইকেও জানালাম।
ড. ইয়াসমীন হক তাঁর পরিচিত কয়েকজন lawyer আমার বাসায় পাঠান। তাঁদের একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ব‍্যাংকে টাকাপয়সা কেমন আছে?
আমি বলি, কার ব‍্যাংকে?
আপনাদের জয়েন্ট account–এ?
আমাদের তো কোনো জয়েন্ট account নেই!
ব‍্যাংকে হুমায়ূন আহমেদের কত টাকা আছে?
সেটা তো আমি জানি না
তখন উনি upset হয়ে বলেন, কিছু একটা বলেন?
আমি বলি, একজন মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আছে!
কী ধরনের সম্পর্ক?
: যত দূর জানি সব ধরনের সম্পর্ক। উনি নিজেই আমাকে জানিয়েছেন! আমি বাকি কারও নাম বললাম না! তারা এখন বিয়ে করে শান্তিতে আছেন। কী দরকার তাদের নাম বলার!#

Lawyer–রা দখিন হাওয়ায় (আমার ফ্ল্যাটে যেখানে আমার মৌখিক agreement নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ থাকছিলেন) সেখানে যান। এবং চলেও আসেন আমার কাছে। একজন বলেন, তিনি তো কয়েকটি বই দেখান, যেখানে আগে থেকেই আন্ডার লাইন করা ছিল।
: হোটেল গ্রেভারিন, মেফ্লাওয়ার আরও কিছু বই। আপনি নাকি অনেক আগে থেকেই ডিভোর্স চাচ্ছিলেন?
: ওগুলো সত্যি না। ডিভোর্সের নিয়ম আমি এখনো জানি না! আমেরিকাতে কী ভাবে জানব? ‘হোটেল গ্রেভারিনে’ ওসব বানিয়ে লেখা! তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই এ অনেক কিছুই তাঁর কল্পনা থেকে লেখা। ওই সব বই লেখার সময় আমি তাঁকে বারবার বলেছিলাম ওসব না লিখতে! কিন্তু উনি আমাকে তখন বলেছিলেন, একদম সত্যি হচ্ছে জলের মতো, কোনো স্বাধহীন, তাই কিছু মিথ‍্যা থাকলে লোকজন পড়ে মজা পাবে!

আমি শুধু তাঁর পায়ে ধরে বাকি রেখেছিলাম। বারবার বলেছি, আমার সম্পর্কে কিছু না লিখতে। আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাইনি! ওর তখন খারাপ একটি সময় যাচ্ছিল, নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডির জন্য একটি পরীক্ষা হয়, যার নাম কিউমিলিয়েটিভ, সেখানে দশ নম্বর থাকে। পরীক্ষার জন‍্য সম্ভবত দুই বছর সময় থাকে। সেখানে অনেকগুলো পরীক্ষা হয় এবং দশের মধ‍্যে তিনটি ২ নম্বর পেতে হয়, বাকিগুলো ১ নম্বর পেলেই হয়। কিন্তু সে অনেকগুলো পরীক্ষা দিয়েও একটিতেও ২ নম্বর পাননি তখনো। এটা নিয়ে তাঁর মধ্যে ফ্রাসটেশন কাজ করছিল। তা ছাড়া তিনি রেগে গেলেই বলতেন, বাসা থেকে বের হয়ে যাও। সেদিনও পরীক্ষায় ১ পেয়ে মেজাজ খুব খারাপ ছিল। বাসায় এসেই অকারণে রাগারাগি শুরু করেন এবং একপর্যায়ে কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে বলেন, বাসা থেকে বের হয়ে যাও!

: আমি বলি কোথায় যাব?
: উনি বলেন, যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাও! আমাকে চুপচাপ কাঁদতে দেখে আরও রেগে যান এবং আমাকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেন। আমার গায়ে তখন একটি শার্ট এবং প‍্যান্ট, পায়ে স্পন্জের স‍্যান্ডেল ছিল। আর বাইরে ডিসেম্বর মাসের প্রচণ্ড ঠান্ডা! আমি শীতে কাঁপতে কাঁপতে দরজা ধাক্কা দিই আর বলি, দরজা খোলো প্লিজ, কলিংবেল বাজাতে থাকি কিন্তু দরজা খুলে না। বেশ কিছুক্ষণ পরে আমার হাত–পা প্রায়  জমে যায়! তখন দৌড়াতে থাকি। আমাদের বাসার কাছে একটি দোকান ছিল। একজন আমেরিকান বৃদ্ধা মহিলা তাঁর বিশাল ড্রয়িং রুমকে নানা রকম মসলা, আচার, হারবাল জিনিস দিয়ে দোকান বানিয়েছিলেন। নাম ছিল ‘টচি’। আমরাও ওখান থেকে মসলা কিনতাম এবং প্রায়ই যেতাম নতুন কোনো মসলার খোঁজে! এমনিতে কাছেই মনে হতো কিন্তু সে শীতের সন্ধ্যায় যেন দোকানটি বাসার কাছে ছিল, সেটি মনে হলো বহু দূরে চলে গেছে! শেষ পর্যন্ত টচি পৌঁছেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। মনে হলো স্বর্গে ঢুকেছি! বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে অনুরোধ করলাম, আমি একটি ফোন করতে পারি কি না! টাকা পরে দেব! উনি বললেন, টাকা লাগবে না, তুমি ফোন করো। তিনি আমার প্রাইভেসির জন‍্যে একটু দূরে সরে গেলেন। আমার একমাত্র মুখস্থ নম্বরে ফোন করলাম।

: এ্যান, আমি টিংকু বলছি।
: কী হয়েছে টিংকু, এমনভাবে কথা বলছ কেন?
: এ‍্যান, তুমি কি আমাকে একটু তুলে নিতে পারবে?
আমি (এ‍্যানের ছেলে, এ‍্যারোনকে আমি বেবিসিট করি। কিন্তু আমরা ভালো বন্ধুও)
ওকে ঠিকানা বলি।
এ‍্যান চলে আসে। আমি টচির বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠি। ও আমাকে একটি জ‍্যাকেট দেয়। আমি ভাবি, ও কেমন করে জানলো যে আমার গায়ে জ‍্যাকেট নেই?
ওর বাড়িতে যেতে যেতে সবকিছু বলি ওকে।
বাসায় পৌঁছে এ‍্যান আমাকে একটি রুম দেখিয়ে বলে, এখন তুমি
ঘুমাওতো!
সারা দিন কাজ করার ক্লান্তি, বাসা পরিষ্কার, রান্না কত কী করেছি! কোনো কিছুতেই ঘুম আসে না! ভয়ে, উৎকণ্ঠায়
এতক্ষণ কাঁদতেও পারিনি! বালিশে মাথা রাখতেই ঝর্ণার মতো দুচোখের জলে বালিশ ভিজে গেল! নোভার কথা ভেবে কষ্ট গলার ভেতর আটকে গেল! এখানে আমার মা-বাবা, ভাইবোন, কোনো আত্মীয়স্বজন নেই! কী করে সে পারল এমন করতে? সারা রাত কাঁদতে কাঁদতে কাটল।
বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আমি বসে থাকি।

এ‍্যান আর স্টেইনলি নাশতার টেবিলে এসে  বসে।
আমিও বসি ওদের সাথে।
টেবিলে এ‍্যান বলে, কী ঠিক করলে?
: কী বলছ, এ‍্যান?
: লয়‍্যারের সাথে কথা বলব না? একবারে ডিভোর্স পাঠাতে বলবে?
আমি ভয়ে আঁতকে উঠি!
না, না। হুমায়ূন আমাকে অনেক ভালোবাসে! রাগের মাথায় ওসব করেছে!
তুমি আমাকে একটু বাসায় দিয়ে আসতে পারবে? নোভার জন‍্য খুব মন খারাপ লাগছে!
ওরা দুজন অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকে।
বাসায় ঢুকেই আমি নোভাকে কোলে নিয়ে দোতলায় যাই। বিছানায় বসে নোভাকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কাঁদতে থাকি।
আর বলি, নোভাকে আমার বোকামি করতে দেব না। ওর হাজব্যান্ডের যেন সাহস না হয় ওকে ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেবার!
আমার চোখের সামনে অসংখ‍্য ছবি দেখতে পাই, যেখানে একটি ১৮–১৯ বয়েসের তরুণী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে এবং একজন হুমায়ূন আহমেদ তাকে যা ইচ্ছে তা বলে বকছে।
আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ইয়াসমীনের পাঠানো ওই লয়ারকে জিজ্ঞেস করতে, ‘আসলে তখনই নোভাকে নিয়ে দেশে ফিরে ওই ভদ্রলোককে ডিভোর্স দেওয়া উচিত ছিল, তাই না?’ কিন্তু পারিনি!

গুলতেকিন খান। ফেসবুক স্ট্যাটাসের সঙ্গে এই ছবি ব্যবহার করেছেন তিনি
গুলতেকিন খান। ফেসবুক স্ট্যাটাসের সঙ্গে এই ছবি ব্যবহার করেছেন তিনি। ছবি: গুলতেকিন খানের ফেসবুক থেকে

এপস্টেইনের নথিতে বিল গেটসের নাম আসার পর কী বলছেন সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথিতে সাবেক স্বামী বিল গেটসের নাম থাকা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ধনকুবের ও সমাজসেবী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস। তিনি বলেন, এ ঘটনায় সাবেক স্বামী বিল গেটসের সঙ্গে তাঁর বিবাহিত জীবনে কাটানো যন্ত্রণাদায়ক সময়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআর-এর এক পডকাস্টে মেলিন্ডা গেটস এ কথা বলেছেন।
মেলিন্ডা মনে করেন, এপস্টেইন–সম্পর্কিত নথিতে তাঁর সাবেক স্বামীসহ আরও যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের সবাইকে এর জবাব দিতে হবে।

মেলিন্ডা আরও বলেন, ‘সব সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছিলাম বলে আমার খুবই স্বস্তি হচ্ছে।’

২৭ বছর বিবাহিত সম্পর্কে থাকার পর ২০২১ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা গেটস দম্পতির বিচ্ছেদ হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি প্রয়াত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন–সম্পর্কিত যেসব নতুন নথি প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে বিল গেটসের নামও উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিল গেটস যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমিত কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তবে বিল গেটস এই অভিযোগকে ‘একেবারে অমূলক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

বিল গেটসের এক মুখপাত্র বলেন, এ অভিযোগ পুরোপুরি ‘অমূলক ও মিথ্যা।’

মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে বিল গেটসের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি।

অবশ্য, এপস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলা নারীদের কেউই বিল গেটসের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ করেননি। নথিতে বিল গেটসের নাম থাকার মানেই যে তাঁর অপরাধে জড়িত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে, এমন নয়।

এনপিআরের ওয়াইল্ড কার্ড পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেলিন্ডা গেটস বলেন, ‘এসব বিষয় সামনে এলে তা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য খুব কঠিন হয়ে যায়, তাই না? কারণ, এতে আমার বিবাহিত জীবনের খুব, খুব কষ্টদায়ক কিছু সময়ের কথা আবার মনে পড়ে যায়।’

মেলিন্ডা আরও বলেন, ‘যেসব প্রশ্ন এখনো থেকে গেছে, তার সবকিছু জানা আমার পক্ষে সম্ভবও নয়। সেই প্রশ্নগুলোর জবাব তাঁদেরই দিতে হবে, এমনকি আমার সাবেক স্বামীকেও। এসবের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদেরই, আমার নয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচ্ছেদের আগে এপস্টেইনের সঙ্গে স্বামীর যোগাযোগ থাকা নিয়ে মেলিন্ডা গেটস অস্বস্তিতে ছিলেন। তাঁদের বিচ্ছেদের ঘোষণা আসার পর বিল গেটস ২০১৯ সালে মাইক্রোসফটের এক কর্মীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ গত সপ্তাহে এপস্টেইন–সংক্রান্ত ৩০ লাখের বেশি নথি প্রকাশ করেছে। বিল গেটসকে ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো ওই সব নথির অন্তর্ভুক্ত।

এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১৮ জুলাইয়ের দুটি ই–মেইলও আছে, যেগুলো এপস্টেইন খসড়াভাবে লিখেছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সেগুলো আদৌ বিল গেটসের কাছে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ই–মেইল দুটি এপস্টেইনের ই–মেইল অ্যাকাউন্ট থেকেই সেন্ট হয়ে আবার তা একই অ্যাকাউন্টে ফিরে এসেছে। এতে বিল গেটসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ই–মেইল ঠিকানা দেখা যায়নি। ই–মেইল দুটিতে কোনো স্বাক্ষরও নেই।

ই–মেইল দুটির একটি দাতব্য সংস্থা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে পদত্যাগপত্রের মতো করে লেখা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, রুশ নারীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের পর বিল গেটস যে সমস্যার মধ্যে পড়েছিলেন, তা সামাল দিতে তাঁকে ওষুধ সংগ্রহ করতে হয়েছে।

অন্য ই–মেইলটি শুরু হয়েছে ‘প্রিয় বিল’ সম্বোধনে। এতে বিল গেটস বন্ধুত্বের ইতি টানায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে আরও দাবি করা হয়েছে, বিল গেটস যৌনবাহিত সংক্রমণ আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি সে বিষয়টি তৎকালীন স্ত্রী মেলিন্ডার কাছ থেকেও গোপন রাখতে চেয়েছিলেন।

এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগটি বিল গেটস ও তাঁর প্রতিনিধিরা বরাবরই নাকচ করে আসছেন। গেটস আগে বলেছিলেন, একটি দাতব্য প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করতে দুজন একসঙ্গে শুধু কয়েকটি নৈশভোজ করেছিলেন, তবে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

সর্বশেষ অভিযোগের পর বিল গেটসের এক মুখপাত্র বলেন, এসব নথি থেকে যা বোঝা যায়, তা হলো গেটসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক না থাকায় এপস্টেনের হতাশা এবং কাউকে ফাঁসানো ও বদনাম করতে সে কত দূর যেতে পারত।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টেইন–সংক্রান্ত যেসব নথি, ই–মেইল ও ছবি প্রকাশ করেছে, সেগুলোর অনেকটিই কুখ্যাত এ যৌন নিপীড়কের বিস্তৃত যোগাযোগ নেটওয়ার্কের চিত্র উঠে এসেছে। এতে বড় বড় তারকা, ব্যবসায়ী ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের তথ্য রয়েছে।

২০০৮ সালে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে যৌনবৃত্তিতে প্রলুব্ধ করার দায়ে এপস্টেইন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও প্রভাবশালী মানুষদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় ছিল।

যৌনকর্মের উদ্দেশ্যে পাচারসংক্রান্ত অন্য একটি মামলায় বিচার চলাকালে ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান এপস্টেইন।

২০২১ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা গেটস দম্পতির বিচ্ছেদ হয়
২০২১ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা গেটস দম্পতির বিচ্ছেদ হয়। ফাইল ছবি: রয়টার্স

তারেক রহমানকে নির্বাচনী বিতর্কে অংশ নেওয়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উন্মুক্ত মঞ্চে নির্বাচনী বিতর্কে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

শুক্রবার রাত আটটার দিকে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ইংরেজিতে দেওয়া এক পোস্টে শফিকুর রহমান এ আমন্ত্রণ জানান।

তারেক রহমানের সম্প্রতি ঘোষিত রাজনৈতিক পরিকল্পনার প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান তাঁকে একটি উন্মুক্ত মঞ্চে সরাসরি আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

শফিকুর রহমান প্রস্তাব দেন, ওই আলোচনায় দুজন নেতা জাতির সামনে নিজ নিজ ইশতেহার উপস্থাপন করবেন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার জনগণের ওপর ছেড়ে দেবেন।

শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা প্রয়োজন, যেখানে সব রাজনৈতিক শক্তি জনগণের রায় ও ইচ্ছাকে সম্মান করার অঙ্গীকার করবে।

ফেসবুক পোস্টে জামায়াত আমির বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই কেবল রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন হতে পারে। জন আস্থা ও ন্যায্যতা অর্জন ছাড়া কোনো নির্বাচনী ফল জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে না।

শফিকুর রহমান জুলাই বিপ্লব–পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় রয়েছে। তাঁর ভাষায়, রাজনীতি যে ভদ্র, শালীন ও সংঘাতমুক্ত হতে পারে, তা প্রমাণ করার সময় এসেছে।

শফিকুর রহমান বলেন, ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার মানদণ্ড হওয়া উচিত এমন, যা গণমাধ্যম ও জনগণের সরাসরি নজরদারির মধ্যে থাকবে, সমালোচনার জন্য উন্মুক্ত হবে এবং যেখানে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-02%2Fqrplun9j%2FShafiqur-Rahman.avif?rect=1%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

ক্ষুদ্রঋণ: পরিসংখ্যানের চেয়ে মানুষের গল্পটা শক্তিশালী by মুর্শেদ আলম সরকার

‘ক্ষুদ্রঋণ শুধু ঋণ নয়, এটি মর্যাদা ও স্বপ্নের বিষয়’—বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই কথাটিই সবচেয়ে গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। ক্ষুদ্রঋণ শুধু সামান্য ঋণ কার্যক্রম নয়, এটি কোটি মানুষের জন্য আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও উন্নয়নের একটি চলমান প্রক্রিয়া।

প্রাচীন ভারতের প্রাজ্ঞ গণিতবিদ ‘সিসা বেন দাহির’ রাজাকে বলেছিলেন, দাবার বোর্ডের প্রথম ঘরে এক দানা গম, পরের ঘরে দ্বিগুণ, এভাবে ৬৪তম ঘর পর্যন্ত শস্য দিলেই তিনি খুশি। রাজা হেসে বললেন, এ আর এমন কি? কিন্তু শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে রাজ্যের গণিতবিদ বোঝালেন, এ প্রক্রিয়ায় শস্য দিতে গেলে শস্যের পরিমাণ এত বেশি হবে যে রাজ্যের সব শস্য দিলেও তা পূরণ করা সম্ভব নয়! আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও, ৬৪তম ঘরে পৌঁছাতে শস্যের পরিমাণ এতটাই বিশাল হয়ে দাঁড়ায় যে তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।

ঠিক এই বহুগুণ বৃদ্ধির ধারণাটিই ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একইভাবে, অর্থনীতিতে ছোট ছোট অসংখ্য বিনিয়োগ সময়ের সঙ্গে বহুগুণে বেড়ে সামষ্টিক অর্থনীতির চালিকা শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দেওয়া ছোট অর্থ সাহায্যগুলো বিশাল পরিবর্তনের তরঙ্গ সৃষ্টি করে, যা সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনে। যখন একজন নারী উদ্যোক্তা একটি ছোট ঋণ নিয়ে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন, সেটি শুধু তাঁর আয় বৃদ্ধি করে না—তাঁর পরিবার, স্থানীয় বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল, কর্মসংস্থান ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্য দিয়ে পুরো সমাজ ও অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক তরঙ্গ সৃষ্টি করে।

১৯৩০-এর মহামন্দার সময় ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের দেওয়া ধারণা—টাকার প্রবাহ সচল রাখতে টাকা মানুষের হাতে পৌঁছাতে হবে। এটাই আজকের মাইক্রোফাইন্যান্স বা ক্ষুদ্রঋণের নীতিগত ভিত্তি। কেইনস মহামন্দার সময় বলেছিলেন, যদি টাকার প্রবাহ থেমে যায়, তবে সমাজও থেমে যায়। অর্থনীতি বাঁচাতে টাকা মানুষের হাতে পৌঁছাতে হবে, উৎপাদন ও ব্যয় বাড়াতে হবে।

১৯৭০-এর দশকের আগে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষ ঋণের জন্য নির্ভর করত স্থানীয় মহাজনের ওপর, যাদের সুদের হার ছিল বছরে ১০০ শতাংশের বেশি। জমি, ঘর, মর্যাদা সব হারাত অনেক পরিবার।

এই বাস্তবতায় মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো এক নীরব বিপ্লবের সূচনা করে। জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ মানুষের হাতে তুলে দেয় স্বাধীনতার চাবিকাঠি। বিশেষ করে নারীর জীবনে এর প্রভাব অপরিসীম। নিজের উপার্জনের পর একজন নারী যখন তার সন্তানের স্কুলে যাওয়া, নতুন কাপড় কেনা বা বাড়িতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন বোঝা যায়—ক্ষুদ্র-অর্থায়ন কেবল আর্থিক নয়, আচরণগত পরিবর্তনেরও মূল চালিকা শক্তি। অনেক গ্রামীণ নারী, যাঁরা একসময় ক্ষুদ্রঋণ গ্রুপের সদস্য ছিলেন, পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকারের সদস্য বা চেয়ারম্যান হয়ে সামাজিক নেতৃত্বেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ছোট শুরু, বড় রূপান্তর

১৯৯২-৯৩ সালে পপি কেয়ারের সহায়তায় ভৈরবে ২০টি গ্রুপকে সেলাই ও জুতা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এটি পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারিত হয়। ২০২৫ সালে ভৈরব দেশের অন্যতম বৃহৎ জুতা উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ৫ থেকে ৬ হাজার ছোট-বড় উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, ক্ষুদ্রঋণ কেবল ‘মাছ দেওয়া’ নয়, বরং মানুষকে ‘কীভাবে মাছ ধরতে হয়’ তা শেখানোর প্রক্রিয়া।

পরিসংখ্যানের চেয়ে শক্তিশালী মানুষের গল্প

২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলারিটি অথরিটির (এমআরএ) নিবন্ধনপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর (গ্রামীণ ব্যাংক বাদে) মধ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি সদস্য এবং তিন কোটি ২০ লাখের বেশি সক্রিয় ঋণগ্রহীতাকে সেবা দিচ্ছে। তারা ২৬ হাজার ৭১টি শাখা পরিচালনা করছে এবং প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন টাকা ঋণ বিতরণ করেছে।

কিন্তু পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হলো মানুষের গল্প। রংপুরের বয়নশিল্পী আয়েশা বেগম একসময় ৬০ শতাংশ সুদে মহাজনের কাছ থেকে সুতা কিনতেন। বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ২৫,০০০ টাকা ঋণ নিয়ে ও ডিজিটাল মার্কেটিং শিখে তিনি অনলাইনে শাড়ি বিক্রি করেন এবং তিনজন নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। সুনামগঞ্জের কৃষক রহিম মিয়া জলবায়ু-সহনশীল বীজ ও সোলার পাম্প কিনে এই বছর প্লাবনের মধ্যেও ফসল রক্ষা করেছেন এবং মেয়ের শিক্ষার খরচ চালাতে পারছেন।

এই গল্পগুলো প্রমাণ করে—মাইক্রোফাইন্যান্স মানে জীবন, কর্মসংস্থান, সহনশীলতা এবং ভবিষ্যতের আশার বীজ বপন করা। এই খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ফিল্ড অফিসারদের ‘মানবিক সংযোগ’—এই বিশ্বাসে যে সদস্যদের সাফল্যই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য।

চ্যালেঞ্জ ও নীতি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা

বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পোর্টফোলিও খরচ। অধিকাংশ ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে (সাড়ে ১৩ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ হারে) ঋণ নেয়, পাশাপাশি মোটা অঙ্কের জামানত রাখতে হয়। এই কারণে সদস্যদের কাছে ঋণসেবা পৌঁছে দেওয়ার খরচ ও ঋণের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, দূরবর্তী এলাকায় যাতায়াত, কাগজপত্র ও ডিজিটাল রিপোর্টিংয়ের জন্য পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ শুধু নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ না রেখে এই খাতকে গতিশীল করার জন্য আরও জোরালো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কিছু সুপারিশ আছে:

১. রিফাইন্যান্সিং সুবিধা: বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুদে রিফাইন্যান্সিং উইন্ডো চালু করা গেলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কম সুদে ঋণ দিতে পারবে।

২. ডিজিটাল লেনদেন খরচ: ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল লেনদেনের চার্জ বহন করতে হয়—এই নীতিগত খরচ সমন্বয় করা দরকার।

৩. প্রযুক্তিগত প্রণোদনা: মোবাইল ব্যাংকিং, এআইভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং ও গ্রামীণ ইন্টারনেট সংযোগে ভর্তুকি দেওয়া।

৪. দুর্যোগ সুরক্ষা: প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে আইনি সুরক্ষা জোরদার করতে দুর্যোগকালে সেবা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আলাদা ফান্ড প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ঋণ আদায় শিথিল করে, একইভাবে ব্যাংকগুলোও যাতে ওই সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোয় সহায়তা দেয় এবং নিয়মিত ইনস্টলমেন্টে শৈথিল্য আনে, তার ব্যবস্থা করা উচিত।

সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সক্রিয় ও ফলপ্রসূ সংলাপ জোরদার করে এমন একটি নীতিগত পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, যা এই খাতের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কেবল তদারকি বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে—এই সেক্টরের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকেও দৃষ্টি দেওয়া উচিত। অর্থাৎ, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে ‘আইনের কঠিন শিকল’ নয়, বরং আরও উৎসাহব্যঞ্জক ও সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে ক্ষেত্রটিকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের ক্ষুদ্রঋণ হবে ডিজিটাল, পরিবেশবান্ধব ও জেন্ডার–সহিষ্ণু। বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে সামাজিক উদ্যোক্তা , ডিজিটাল সাক্ষরতা ও জলবায়ু–সহনশীলতায় পথিকৃৎ ভূমিকা রাখছে।

বিশ্ব ক্ষুদ্রঋণ দিবসে আমাদের এই উপলব্ধি হওয়া উচিত যে ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য শুধু টাকার অঙ্কে নয়, বরং মানুষের জীবনের মানে মাপা উচিত। এটি সেই হাতিয়ার, যা একজন নারীকে প্রথমবার নিজের নামেই স্বাক্ষর করতে শেখায়, একজন কৃষককে দুর্যোগে টিকে থাকতে সহায়তা করে এবং একজন তরুণকে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস দেয়।

* মুর্শেদ আলম সরকার, নির্বাহী পরিচালক, পপি এবং চেয়ারম্যান, ক্রেডিট ডেভেলপমেন্ট ফোরাম-সিডিএফ (বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ খাতের প্রতিনিধিত্বকারী বৃহত্তম এবং একমাত্র ফোরাম)
- (মতামত লেখকের নিজস্ব)

ক্ষুদ্রঋণ: পরিসংখ্যানের চেয়ে মানুষের গল্পটা শক্তিশালী

গাজিয়াবাদে আত্মহত্যা করা তিন বোনের বাবার ২ কোটি রুপি ঋণ আছে: পুলিশ

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের গাজিয়াবাদে বহুতল ভবনের নয়তলা থেকে পড়ে ১৬ বছরের কম বয়সী তিন বোনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে। গাজিয়াবাদের অবস্থান দিল্লির উপকণ্ঠে।

বুধবার সকালে মেয়েদের বাবা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বাচ্চারা একটি কোরীয় গেম খেলছিল। সেই গেমে তাদের কিছু কাজ (টাস্ক) দেওয়া হয়েছিল এবং শেষ টাস্কটি ছিল আত্মহত্যা করা।

তবে সন্ধ্যার দিকে পুলিশ এই গেমের বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। পুলিশ জানায়, তিন বোন তাদের বাবা-মায়ের মুঠোফোনে সারাক্ষণ কোরীয় নাটক দেখত।

পুলিশের মতে, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ কোরীয় নাটকের প্রভাব থাকলেও এই পরিবারের আরও বড় সমস্যা ছিল—বিপুল অঙ্কের ঋণ।

মেয়েদের বাবা চেতন কুমার শেয়ারবাজারের একজন বিনিয়োগকারী। পুলিশের তথ্যমতে, তাঁর ওপর ২ কোটি রুপি ঋণের বোঝা ছিল। এমনকি বিদ্যুতের বিল মেটানোর জন্য তিনি মেয়েদের মুঠোফোন পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তিনি মাঝেমধ্যেই মেয়েদের হুমকি দিতেন, তাদের বিয়ে দিয়ে দেবেন।

গত সপ্তাহে চেতন কুমার মেয়েদের মুঠোফোন ব্যবহার করতে নিষেধ করেন। ১৬ বছর বয়সী নিশিকা, ১৪ বছরের প্রাচী এবং ১২ বছরের পাখি বাবার এই সিদ্ধান্তে খুব মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিল। কারণ, তারা মুঠোফোনে কোরীয় নাটকে বুঁদ হয়ে থাকত।

চেতন কুমারের দুজন স্ত্রী। দ্বিতীয় স্ত্রী হলেন তাঁর প্রথম স্ত্রীর আপন বোন। প্রথম পক্ষের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে এবং দ্বিতীয় পক্ষের এই তিন মেয়ে ছিল। আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে করোনার পর তিনি মেয়েদের আর স্কুলেও পাঠাননি।

এ ছাড়া প্রথম স্ত্রীর ১৪ বছরের ছেলেটি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল, যা পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে প্রতিবেশীরা বিকট শব্দ শুনতে পান। প্রত্যক্ষদর্শী পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা অরুণ সিং জানান, তিনি বারান্দা থেকে দেখেছিলেন, বড় মেয়েটি কার্নিশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাকি দুই বোন তাকে টেনে ধরার চেষ্টা করছিল। একপর্যায়ে সবচেয়ে ছোট মেয়েটি বড় বোনের কোমর জড়িয়ে ধরে এবং অন্যজন হাত ধরে থাকে; এভাবেই তিনজন নিচে পড়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, ঘটনার পর অ্যাম্বুলেন্স আসতে এক ঘণ্টা দেরি হয়েছিল।

তদন্তে কী পাওয়া গেল

পুলিশ মেয়েদের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে। সেখানে সিনেমার সংলাপ ও কবিতার মতো কিছু লেখা পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যদের ছবি গোল করে সাজানো ছিল। একটি ৮ পাতার ডায়েরি পাওয়া গেছে, যেখানে লেখা ছিল—‘বাবা-মা যেন এটা পড়ে, কারণ সব সত্যি।’

কক্ষে একটি মুঠোফোনও পাওয়া যায়। এটির ওয়ালপেপারে তিন বোনের ছবি ছিল। এতে তারা নিজেদের জন্য পছন্দ করা কোরীয় নাম লিখে রেখেছিল। পুলিশ সেখানে কোনো প্রাণঘাতী গেমের প্রমাণ এখনো পায়নি।

তিন বোনের বাবা পুলিশকে বলেছিলেন, গাজিয়াবাদে বসবাস শুরুর আগে তিনি উত্তর–পূর্ব দিল্লির খাজুরি খাস এলাকায় থাকতেন।

তবে ২০১৭ সালের ‘ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ’-এর মতো ঘটনার সঙ্গে এর কিছুটা মিল পাওয়া যাচ্ছে। ওই সময় মুম্বাইয়ে ১৪ বছরের এক কিশোর ওই গেম খেলে আত্মহত্যায় প্ররোচিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল।

দিল্লির উপকণ্ঠের গাজিয়াবাদের এই আবাসিক এলাকার একটি ভবনের নয়তলা থেকে তিন বোন লাফিয়ে মারা যায়। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, নয়াদিল্লি
দিল্লির উপকণ্ঠের গাজিয়াবাদের এই আবাসিক এলাকার একটি ভবনের নয়তলা থেকে তিন বোন লাফিয়ে মারা যায়। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: এএনআই