Thursday, November 26, 2015

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী সশস্ত্র বিক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ইসলামিক সেন্টারের বাইরে মুসলিমবিরোধী সশস্ত্র বিক্ষোভ করেছে একটি ডানপন্থি গ্রুপ। গত রোববার ডালাসের আরভিং শহরতলিতে এ বিক্ষোভ করেছে ব্যুরো অব আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস নামের গ্রুপটি। একই সঙ্গে গ্রুপটি তাদের ফেসবুক পেজে মুসলমানদের নাম-ঠিকানা ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের পরিচয় প্রকাশ করেছে।
সংগঠনটির মুখপাত্র ডেভিড রাইট বলেন, ‘সিরিয়ার শরণার্থীদের আমেরিকায় প্রবেশ এবং আমেরিকাকে ইসলামীকরণের প্রতিবাদে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি।’
গত মার্চে আরভিং সিটি কাউন্সিলের একটি বৈঠকে মুসলমানদের একটি গ্রুপ দেশীয় আইনের ওপর (যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলমানদের জন্য) বিদেশি আইনের প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়ে একটি বিলে সমর্থন জানিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরভিংয়ের মেয়র ডানপন্থি একটি সংবাদমাধ্যমকে জানান, মুসলমানরা টেক্সাসে শরিয়াহ আইন প্রবর্তনের চেষ্টা করছে। কিন্তু তিনি সেটা হতে দেবেন না। মেয়রের এই ভুলবার্তার পর টেক্সাসে মুসলিমবিরোধী উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিলের (কেইর) ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ শাখার নির্বাহী পরিচালক আলী সালেম জানান, গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভটি ছিল পুরোপুরি হুমকিমূলক। বিক্ষোভকারীদের হাতে এআর-১৫ রাইফেল ছিল, তাদের মুখও ঢাকা ছিল।
প্রসঙ্গত, টেক্সাসে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা বৈধ। সালেম বলেন, গত ১৩ নভেম্বর প্যারিস হামলার ঘটনার পর ঘৃণামূলক কর্মকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে গেছে। তিনি নিজে কয়েকবার মৌখিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

সুদমুক্ত আর্থিক লেনদেনের ধরন by অধ্যক্ষ মো: ইয়াছিন মজুমদার

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ইসলামে লেনদেন ও বেচাকেনার সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। রাসূল সা: ও সাহাবায়ে কেরাম রা:-এর সময়ের আমানত, করজ, বাঈ (ক্রয়-বিক্রয়) ইত্যাদির আধুনিক ও যুগোপযোগী সংস্করণ ইসলামি ব্যাংক। ইসলামি ব্যাংক ইসলামি বিধান অনুযায়ী লেনদেন করে নাকি অন্যান্য সুদভিত্তিক পরিচালিত ব্যাংকের মতোই লেনদেন করে- এ বিষয়টি এ লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়। কিছু ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়- ইসলামি ব্যাংক একটু ঘুরিয়ে সুদ খায়। কেউ কেউ বলেন, অন্যান্য ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে যেমনিভাবে সুদ দিতে হয় ইসলামি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলেও লাভ দিতে হয়। অন্যান্য ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে যেমন সুদ পাওয়া যায় ইসলামি ব্যাংকে টাকা জমা রাখলেও তেমনি লাভ পাওয়া যায়। এমনকি নির্দিষ্ট মেয়াদে নির্দিষ্ট পরিমাণ লভ্যাংশ পাওয়া যায়। তা হলে প্রচলিত সুদি ব্যাংক ও ইসলামি ব্যাংকের মধ্যে প্রার্থক্য কী? শুধু মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য ইসলামের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
নবী মুহাম্মাদ সা: মদিনাকেন্দ্রিক ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সব সুদি কারবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। পবিত্র কুরআনের চারটি সূরার বারোটি আয়াতের মাধ্যমে সুদকে হারাম ঘোষণা করা হয়। তা ছাড়া রাসূল সা:-এর অসংখ্য হাদিসে সুদের পাপের ভয়াবহতার বর্ণনা রয়েছে। সুদ হারাম ঘোষণার পর কাফিররা বলাবলি করতে লাগল, ‘অর্থ বিনিয়োগ করে কোনো দ্রব্য ক্রয় করে বিক্রয় করলে লাভের টাকা পাওয়া যায়। আবার সুদে টাকা বিনিয়োগ করলে বাড়তি টাকা পাওয়া যায়- বেচাকেনা তো সুদেরই মতোই।’ অর্থাৎ আধুনিক যুগের ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞদের ভাষা ও জাহিলি যুগের কাফিরদের ভাষায় খুব বেশি তফাত নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন, ‘যারা সুদ খায় তারা হাশরের দিন সে ব্যক্তির ন্যায় দণ্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলে- নিশ্চয় ব্যবসা তো সুদেরই অনুরূপ। অথচ আল্লাহ ব্যবসায়কে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম’ (সূরা বাকারা : ২৭৫)।
এ প্রসঙ্গে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরছি- ধরা যাক, এক ব্যক্তি বাজার থেকে দু’টি ছাগল কিনে আনল। সে একটি ছাগল বিসমিল্লাহ বলে অর্থাৎ আল্লাহর নাম নিয়ে জবেহ করল। অপর ছাগলটি ইচ্ছাকৃত বিসমিল্লাহ বাদ দিয়ে জবেহ করল। এমতাবস্থায় বিসমিল্লাহ বলে জবেহ করা ছাগলটি খাওয়া হালাল, অপর ছাগলটি খাওয়া হারাম হয়ে গেল। কেউ যদি প্রশ্ন করে- একই জাতীয় প্রাণী একই ব্যক্তি একই রকমভাবে একই ছোরা দিয়ে জবেহের কাজ করল, তবে কেন একটি খাওয়া হারাম, অপরটি হালাল? এর উত্তরে এ প্রশ্নকারীকে কী বলা যাবে?
এক যুবক এক যুবতীকে নিয়ে ইজাব কবুল অর্থাৎ বিবাহ ব্যতীত একটি কক্ষে দৈহিক মিলনসহ আনন্দ করে রাত কাটাল। অপর দিকে অন্য দু’জন যুবক-যুবতী দু’জন সাক্ষীর সামনে ইজাব কবুল বলে একই রকম রাত কাটাল। প্রথম দু’জন যুবক-যুবতীর কর্ম হবে মারাত্মক পাপ। পরবর্তী দু’জন যুবক-যুবতীর কাজ হবে সওয়াবের অর্থাৎ পুণ্যের। যদি কেউ প্রশ্ন করে, একই রকম কাজ করে এক জোড়া যুবক-যুবতীর হবে পাপ, অপর জোড়া যুবক-যুবতীর হবে পুণ্য- এ পার্থক্য কেন? এর উত্তরে এ প্রশ্নকারীকে কী বলা যাবে? কেউ যদি বলে একজন মূর্তিপূজারী ঈশ্বরে বিশ্বাস করে মাটি বা পাথরের মূর্তির সামনে সিজদা দিয়ে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করতে চায়, অপর দিকে একজন মুসলিম আল্লাহকে বিশ্বাস করে আল্লাহকে পেতে পাথরের কাবাঘরকে সামনে নিয়ে সেজদা দেয়। উভয় কাজ তো একই রকম। তা হলে মূর্তির সামনে সিজদাদানকারী জাহান্নামে এবং কাবার সামনে সিজদাকারী জান্নাতে যাবে- এ পার্থক্য কেন? এ ধরনের প্রশ্নকারীকে নিঃসন্দেহে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ ও বোকা বলা হবে।
উল্লিখিত তিনটি উদাহরণের প্রতিটিতে দু’ধরনের কাজের মধ্যে বাহ্যিক তেমন কোনো পার্থক্য না থাকলেও একটি কাজ ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক করা হয়েছে তাই তা পুণ্যের, অপরটি শরিয়াহ মোতাবেক না হওয়ায় পাপের। ঠিক তেমনিভাবে সাধারণ ব্যাংক সুদযুক্ত হওয়ায় ও শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত না হওয়ায় ইসলামি বিধানমতে তাতে লেনদেনে পাপ হবে। ইসলামি ব্যাংক শরিয়াহর নিয়ম অনুসরণ করায় তাতে লেনদেনে পুণ্য হবে।
পাঠকের যেন বিরক্তির কারণ না হয় তাই অতি সংক্ষেপে ইসলামি ব্যাংক লেনদেনে শরিয়াহর যে পদ্ধতি অনুসরণ করে তার কিছু অংশ তুলে ধরছি-
মুদারাবা পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে দু’টি পক্ষ থাকে। এক পক্ষ সাহিবুল মাল অর্থাৎ অর্থ জোগানদাতা। অপর পক্ষ ওই অর্থ দ্বারা তার মেধা, শ্রম ও চেষ্টার মাধ্যমে ব্যবসায় পরিচালনা করে। দ্বিতীয় পক্ষকে বলে মুদারিব। ইসলামি ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাবের ও সঞ্চয়ী আমানতের লেনদেনে টাকা জমাকারী সাহিবুল মাল আর ব্যাংক মুদারিব। বিনিয়োগকৃত টাকায় যে লাভ হবে শর্তানুযায়ী উভয় পক্ষ তার লভ্যাংশের ভাগ পাবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়ের অবস্থার আলোকে স্বল্পহারে মাসিক নির্দিষ্ট লভ্যাংশ প্রদান করতে পারে। বছরান্তে পূর্ণাঙ্গ লভ্যাংশ হিসাব করে পূর্বে প্রদত্ত লভ্যাংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট লাভ সাহিবুল মালকে প্রদান করতে পারে। লোকসান হলে লোকসানের ভাগও নিতে হয়। অপর দিকে ব্যাংক যখন কোনো ব্যক্তিকে ওই পদ্ধতিতে বিনিয়োগ দেয়, তখন ব্যাংক হবে সাহিবুল মাল আর বিনিয়োগগ্রহিতা মুদারিব।
আলওয়াদিয়া পদ্ধতি : চলতি হিসাবে গ্রাহক যে টাকা হিফাজতের জন্য জমা রাখে মধ্যবর্তী সময়ে তা ব্যাংককে ব্যবহারের অনুমতি দেয়। চাহিবামাত্র ব্যাংক তার অর্থ তাকে ফেরত দিতে বাধ্য। এ হিসাবের ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতির কোনো সম্পর্ক নেই। তা ছাড়া বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক বেশির ভাগ বাঈ (ক্রয়-বিক্রয়) পদ্ধতি অনুসরণ করে; যেমন- শিরকাত ফিলবাই (অংশীদারি পদ্ধতি), ইজারা (ভাড়া, মজুরি), বাইয়েমুরাবাহা (লাভে বিক্রি), বাইয়েমুয়াজ্জাল (মুনাফার ভিত্তিতে বাকিতে মাল বিক্রি), বাইয়েসালাম (আগাম মূল্যশোধে বিক্রি), বাইয়েইসতিসনা (কোনো নির্ধারিত দামে কোনো বস্তু তৈরি করে দেয়া) ইত্যাদি পদ্ধতি অনুসরণ করে। ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামে নিষিদ্ধ কোনো ব্যবসায় সম্পদ বিনিয়োগ করে না। ইসলামি ব্যাংকগুলো আমানত গ্রহণের ক্ষেত্রে মুদারাবা ও মুশারাকা পদ্ধতি গ্রহণ করলেও বিনিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে বাঈ (ক্রয়-বিক্রয়) পদ্ধতি বেশি ব্যবহার করে মুশারাকা মুদারাবা পদ্ধতিতে বিনিয়োগ প্রদান করলে জনগণ বেশি উপকৃত হতো। নিদির্ষ্ট লাভে বিনিয়োগ অবৈধ নয়; যেমন- কেউ কাউকে এক শত টাকা দিয়ে এক শত দশ টাকা গ্রহণ করলে বাড়তি দশ টাকা সুদ; কিন্তু এক শত টাকার পণ্য কারো কাছে এক শত দশ টাকায় বিক্রি করলে বাড়তি দশ টাকা লাভ ও বৈধ। ইসলামি ব্যাংকগুলো শুধু লাভ করে, লোকসান দেয় না- এ কথাটিও সঠিক নয়, কেননা ব্যাংকে সব শাখার মধ্যে কিছু শাখা লোকসান দিলেও বেশির ভাগ শাখা লাভ করলে গড়ে লাভ হয়। যদি কেউ বলে ইসলামি ব্যাংকগুলো থেকে এসব বিক্রয়সংক্রান্ত ঋণ নিতে গেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে বলা হয়, মাল কিনে ভাউচার নিয়ে আসুন। তখন গ্রাহক ভুয়া একটি ভাউচার বানিয়ে টাকা নিয়ে যায়। এটা তো টাকা নিয়ে টাকা দেয়া সুদেরই মতো। এর জবাবে বলা যায়, ব্যাংকের লোকজন গিয়ে সরাসরি মাল কিনে দিলেই উত্তম হতো। কিন্তু একটি ব্যাংকের পক্ষে বিভিন্ন কারণে সব সময় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ব্যাংক গ্রাহককে মাল কিনে ভাউচার জমা দিতে বলে মূলত তাকে মাল কেনার উকিল নিযুক্ত করে। এখন গ্রাহক যদি ভুয়া ভাউচার এনে দেয়- গ্রাহক উকালতির দায়িত্ব পালনে ত্র“টি করল। এ জন্য ব্যাংককে দায়ী করা যায় না।
উকিল নিযুক্ত করে লেনদেন, বিবাহশাদী, ক্রয়-বিক্রয় করা ইসলামি শরিয়তে বৈধ। ইসলামি আইনশাস্ত্রে বাবুল উকালাত (উকিল নিযুক্ত করণ) বিষয়ে আলাদা অধ্যায় রয়েছে। আপনি যদি আপনার বাড়িঘর ও সম্পদ বিক্রি করার জন্য কাউকে উকিল নিযুক্ত করেন, তবে ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে আপনাকে যেতে হবে না। যাকে উকিল (আমমোক্তার) নিযুক্ত করেছেন তিনি রেজিস্ট্রি করে দিলেই আপনার বাড়িঘর-সম্পদ বিক্রি হয়ে যাবে। তাহলে ব্যাংক কাউকে দায়িত্ব দিলে, তা অবৈধ হবে কেন? বিক্রয়-পদ্ধতিতে বিনিয়োগে ব্যাংক সাধারণত লোকসানের ভাগ নেয় না। যেমন- আপনি বাজার থেকে একহালি ডিম কিনলেন, ক্রেতা আপনাকে তা বুঝিয়ে দিলো; বাড়িতে আসার পথে আপনি ডিমগুলো ভেঙে ফেললেন। এর দায়ভার কি বিক্রেতা নেবে? বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অনুমতি দিয়েছে। ইসলামি ব্যাংকিং যেন শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত হয় সে জন্য ‘গাইড লাইন্স ফর ইসলামিক ব্যাংকিং’ নামে নীতিমালা জারি করেছে। ইসলামি ব্যাংকগুলো সে নীতিমালা মানছে কি না, তার তদারকি বাংলাদেশ ব্যাংক করে। দেশের সব ব্যাংক তাদের তলবি ও মেয়াদি আমানতের এসএলআর হিসাবে একটি নিদিষ্ট অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। ইসালামি ব্যাংক এ জমা ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও এবং ইসলামি বিনিয়োগ বন্ড হিসাবে জমা রাখে- এ বন্ড মুদারাবা পদ্ধতিতে ও আন্তঃইসলামি ব্যাংকিং লেনদেনে ব্যবহৃত হয়; ফলে তা সুদমুক্ত কিন্তু প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংক এ জমার বিপরীতে সুদ নেয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে ইসলামি ব্যাংকগুলো ফরেন কারেন্সি ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্টে বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখতে হয়। এবং লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেট অনুযায়ী সুদ পেয়ে থাকে, যা অবৈধ। অপর দিকে বাংলাদেশে ঋণখেলাপির প্রবণতা বেশি থাকায় ঋণখেলাপি প্রবণতা রোধে ইসলামি ব্যাংকগুলো খেলাপি বিনিয়োগের ওপর ক্ষতি পূরণ আদায় করে। যেসব দেশে ঋণখেলাপি প্রবণতা নেই এবং রাষ্ট্র খেলাপি ঋণ আদায়ের দ্রুত ব্যবস্থা করে দেয়, সেখানে শরিয়াহ বোর্ড ক্ষতিপূরণ আদায়ের অনুমতি দেয় না। ওই ক্ষতিপূরণ আদায় অবৈধ। এসব অবৈধ অর্থ এবং প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আইনের ফাঁকফোকরে অন্য উৎস থেকেও ইসলামি ব্যাংকগুলোতে সুদের টাকা আসতে পারে। ইসলামি ব্যাংকগুলো এ সুদের টাকা তার মুনাফা হিসেবে গণ্য করে না। শরিয়াহ বোর্ডের পরামর্শমতো দাতব্য খাতে ব্যয় করে এবং আলাদা করে রেখে দিয়ে হাসপাতাল-ক্লিনিকের মাধ্যমে দরিদ্র অসহায় রোগীর সেবায় ব্যয় করে। দরিদ্রদের মধ্যে শীতবস্ত্র, কম্বল বিতরণ করে, ত্রাণতহবিলে দান করে, ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দান করে।
সুদি ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করা হয়, চাকরিজীবীদের বেতন সুদি ব্যাংকের মাধ্যমে দেয়া হয়, সুদি ব্যাংকের লোনের মাধ্যমে রাস্তাঘাট তৈরি ও দেশের উন্নয়নকাজ করা হয়। আমরা কি সেই খাদ্য খাই না? সে সামগ্রী ব্যবহার করি না? সে বেতন তুলি না? সে রাস্তায় চলি না? রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে তা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় আইন কি অমান্য করা যাবে? এ ক্ষেত্রে আমরা কি সুদের পাপে পাপী হবো? এ ক্ষেত্রে আমাদের পাপ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে যদি সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার পরিবর্তন কামনা না করে খুশি মনে তা করা হয় এবং স্বাভাবিক লেনদেন সুদি ব্যাংকে করা হয় তবে পাপ হবে। ইসলামি ব্যাংকগুলো একেকটি লি: কোম্পানি, যদি কোনো কোম্পানি তাদের লাভের জন্য গোপনে শরিয়াহ নীতি লঙ্ঘন করে লেনদেন করে তার পাপ গ্রাহকের হবে না, ওই পাপ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের। ইসলামি ব্যাংকগুলো শরিয়াহভিত্তিক পরিচালনার জন্য রয়েছে বিজ্ঞ আলেমদের সমন্বয়ে শরিয়াহ বোর্ড। ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লি: নামে প্রথম বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়। এ ব্যাংকের সুফল দেখে বর্তমানে বাংলাদেশে নয়টির বেশি ইসলামি ব্যাংকের শত শত শাখা ইসলামি ব্যাংকিং পদ্ধতি অনুসরণ করছে। এসব ব্যাংকের নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ড ছাড়াও রয়েছে সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস্ অফ বাংলাদেশ। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে বিভিন্ন নামে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকিংব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (ওউই)। অন্যান্য ব্যাংক জামানত ছাড়া ঋণ দেয় না; ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী উপকৃত হয় না। এ জন্য ইসলামি ব্যাংক পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প, আরবান পুউর ডেভেলপমেন্ট স্ক্রিমের মাধ্যমে প্রায় জামানতবিহীন বিনিয়োগ করে দরিদ্র জনগণের উপকার করছে; ফলে ইসলামি ব্যাংকিং কল্যাণকর ব্যাংকিং। ইসলামি ব্যাংকিং স্বাভাবিক লেনদেন করে মুসলমানগণ সুদের ভয়াবহ পাপ থেকে রক্ষা পেতে পারে।
লেখক : অধ্যক্ষ, ফুলগাঁও ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা, কুমিল্লা

একটি জগাখিচুড়ি নির্বাচন হচ্ছে

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, পৌরসভা নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ করতে পারবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সেটাই এখন দেখার  বিষয়। ইসি নির্বাচনকে কতটা মনিটরিং করতে পারবে, রিটার্নিং অফিসারদের কতটা নিয়ন্ত্রণে  রাখতে পারবে তার ওপরই নির্ভর করবে পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না। অতীতের নির্বাচন নিয়ে ইসির অনেক বির্তক রয়েছে। ভোটারদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যা হয়েছে, তা পুরো দুনিয়া দেখেছে। আশা করি, এবার নির্বাচন কমিশন নিরাশ করবে না। তিনি মানবজমিনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এবারের পৌরসভা নির্বাচনে মেয়ররা দলীয় প্রতীকে আর কাউন্সিলররা অন্য প্রতীকে নির্বাচন করবেন। এভাবে ভাগাভাগির নির্বাচন আমার বোধগম্য নয়। এটি একটি জগাখিচুড়ি নির্বাচন হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ধরনের নির্বাচন হয় কি না তা নিয়ে অনেক গবেষণা করেছি। কিন্তু কোথাও এ ধরনের নির্বাচন দেখতে পেলাম না। এ ধরনের নির্বাচনে  মনোনয়ন দুর্নীতি বাড়বে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয় জনগণই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে থাকে। এখানে দলের চেয়ে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়া হয় বেশি। স্থানীয়ভাবে যার গ্রহণযোগ্যতা বেশি সেই নির্বাচিত হোন। কিন্তু দলীয় মনোনয়নে দলীয় লোকদেরই প্রাধান্য দেয়া হবে, ক্লিন ইমেজের লোক মনোনয়ন না-ও পেতে পারে। এতে করে সহিংসতা বাড়তে পারে। বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক অবনতি হয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন  যদি আচরণবিধির যথাযথ প্রয়োগ করতে না পারে তবে আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে এ নির্বাচনে সহিংসতা বেড়ে যাবে। বেশ কিছু নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র ছাড়া বাকি সব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের নতুন ট্রেন্ড চালু হয়েছে। বাকি প্রার্থীদের মনোনয়ন কেন বাতিল করা হলো এ বিষয়গুলো যদি নির্বাচন কমিশন পরিষ্কার না করে তবে মানুষের মনে ইসিকে নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হবে বলে মন্তব্য করেন সাখাওয়াত হোসেন।

‘একদলীয় শাসনের কবলে দেশ’

দেশ এক দলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসনের কবলে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোদী আন্দোলনে শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন দিবস উপলক্ষে বিএনপির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে খালেদা জিয়া বলেন,  আজকের এই দিনে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন চলাকালে ১৯৯০ সালের ২৭শে নভেম্বর তৎকালীন স্বৈরচারী এরশাদ সরকারের লেলিয়ে দেয়া পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন ডা. শামসুল আলম খান মিলন। তার শাহাদত বার্ষিকীতে আমি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করি। জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদ ডা. মিলন জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় নাম। তিনি বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শহীদ মিলনের এই সর্বোচ্চ ত্যাগ ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সকল কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরাচারী গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে তিনি আমাদের প্রেরণার উৎস। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, দেশে গণতন্ত্র আবারও গভীর খাদের কিনারে গিয়ে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসনের কবলে পড়েছে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর গণতন্ত্র এখন মৃতপ্রায়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের চেতনা আজ ভূলুণ্ঠিত। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনাও আজ বিপর্যস্ত। ভোটারবিহীন বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের ক্ষমতায় থাকায় লিন্সা দেশ জাতিকে এক গভীর সঙ্কটের মধ্যে নিপতিত করেছে। এই রাজনৈতিক সঙ্কটে জনগণের ক্ষমতায়নকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে দেশে জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এখন ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। ডা. মিলনের আত্মত্যাগকে সার্থক করতে সবাইকে ঐক্য হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আ’লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যানের নির্যাতনে কাতরাচ্ছেন গৃহবধূ ফজিলা by মোঃ শহীদুল হক সরকার

নাটোরের সিংড়ায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ ওরফে বাবা সুলতানের প্রকাশ্য নির্যাতনের শিকার গৃহবধু ফজিলা বেগম এখন সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মহিলা ওয়ার্ডে যন্ত্রনায় ছটফট করছেন। প্রকাশ্যে রাস্তা দিয়ে অস্ত্রের মুখে টেনে বনকুড়ি ব্রীজে নিয়ে গিয়ে তার মাথায় রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করার পর ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে তার বাম পা ও হাত। এ ঘটনায় সোমবার বিকেলে নাটোর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ ওরফে বাবা সুলতানসহ নয় জনের নামে মামলা দায়ের করেছেন স্থানীয় মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাতেম আলী।
সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্যাতিত ফজিলা বেগম ও তার স্বামী বাবলু মিয়া এবং এলাকাবাসী জানান, রোববার দুপুরে উপজেলার বনকুড়ি গ্রামে বনকুড়ি মসজিদের নিয়ন্ত্রনে থাকা খাস জলাশয়ের মাছ ধরতে যায় ১২ নং রামানন্দ খাজুরা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ ওরফে বাবা সুলতান ও তার সহযোগীরা। এ সময় এলাকার নারী পুরুষ সকলে এসে মাছ মারতে বাঁধা দিলে তিনি পকেট থেকে পিস্তল বের করে সবাইকে তাড়িয়ে দেন। ঘটনার সময় বনকুড়ি গ্রামের বাবলু মিয়ার স্ত্রী ফজিলা বেগম (৩৮) সকলের পিছনে পড়ে গেলে বাবা সুলতান তাকে ধরে রাস্তা দিয়ে টেনে হিচড়ে বনকুড়ি ব্রিজে নিয়ে আসে। পরে তার সহযোগী শামীম ও এনামুলসহ কয়েকজন এলোপাথারিভাবে মারপিটের পর তার মাথায় রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করে ও তার বাম পা এবং হাত ভেঙ্গে দেয়। বাবা সুলতার চলে যাওয়ার পর এলাকাবাসী আহত গৃহবধু ফজিলা বেগমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে।
এলাকাবাসী জানিয়েছে ‘বাবা সুলতান’ খ্যাত সুলতান আহমেদ ২০১১ সালের ২৫ জুন ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের কারণে তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা হলে তিনি চলে যান আত্মগোপনে। বেশির ভাগ সময়ই ইউনিয়ন পরিষদ চলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিয়ে। সুলতান আতঙ্কে সাধারণ মানুষেরা কেউ আর ইউনিয়ন কার্যালয়ে যায় না। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে একটি গোপন কক্ষ রয়েছে। সেটা সবার কাছে সুলতানের টর্চার সেল নামে পরিচিত। নির্যাতনের ভয়ে প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতেও চায় না। বগুড়া অবস্থান করে সপ্তাহে ২/১দিন তিনি অফিস করেন।
এর আগে এই চেয়ারম্যান সুলতানের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে দুর্নীতিসহ সতেরোটি অভিযোগে তার উপর অনাস্থা এনে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে স্মারকলিপি দেন ইউনিয়ন পরিষদের ১০ ইউপি সদস্য। পরে চেয়ারম্যানের রোষানল থেকে বাঁচতে রাতেই জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সিংড়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তারা।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য বাবা সুলতানের মোবাইল নম্বরে বার বার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। সিংড়া থানার ওসি নাসির উদ্দিন মন্ডল বলেছেন, বিষয়টি তিনি লোকমুখে শুনেছেন তবে এ ঘটনায় এখনও কেউ থানায় মামলা করতে আসেনি। মামলা করলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বগুড়ায় শিয়া মসজিদে ঢুকে গুলি, মুয়াজ্জিন নিহত

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় শিয়া মসজিদে ঢুকে মুসল্লিদের উপর গুলি বর্ষণের ঘটনায় মসজিদের মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন (৭০) নিহত ও তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
শিবগঞ্জের আটমুল ইউনিয়নের হরিপুর বাসস্ট্যান্ড শিয়া মসজিদে আজ বৃহস্পতিবার মাগরিব নামাজের পর এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হরিপুর বাসস্ট্যান্ড শিয়া মসজিদে মাগরিব ও এশার নামাজ একসাথে পড়া হয়। বৃহস্পতিবার মাগরিব নামাজের সময় নিয়মিত মুসল্লিদের সাথে ২০-২২ বছর বয়সী অপরিচিত তিন যুবক মসজিদে প্রবেশ করে। তাদের মাথায় টুপি এবং পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি ছিল। মাগরিব নামাজ শেষে যখন মুসল্লিরা এশার নামাজের জন্য অপেক্ষা করছিল ঠিক সেই মুহূর্তে ওই তিন যুবক মুসল্লিদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে। গুলির শব্দ শুনে আশে পাশের লোকজন ছুটে এলে ওই তিন যুবক দৌঁড়ে পালিয়ে যায়।
এসময় মসজিদের মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন (৭০)সহ চারজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর মোয়াজ্জেম হোসেন মারা যান।
গুলিবিদ্ধ অপর তিনজন হলেন- হরিপুর গ্রামের বাসিন্দা আফতাব হোসেন (৪০), মাওলানা শাহিনুর ইসলাম (৩৫) ও আলাদীপুর গ্রামের আবু তাহের মিস্ত্রি (৫০)।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মন্ডল জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মসজিদটি ঘিরে রেখেছে। জড়িতদের ধরতে এলাকায় অভিযান চলছে।

দামি হাসপাতালে তোফা আরামে মনোরঞ্জনা

সারদাকাণ্ডে সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পরে এসএসকেএম হাসপাতালে কার্ডিওলজি বিভাগে  ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। হাসপাতাল কর্মীরা জানিয়েছিলেন, দিন-রাত বেজার মুখেই থাকতেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মাতঙ্গ সিংহের প্রাক্তন স্ত্রী ‘হাই-প্রোফাইল’ অভিযুক্ত মনোরঞ্জনা সিংহ।
দিন পনেরো আগে হঠাৎ সকাল থেকেই তাঁকে ফুরেফুরে মেজাজে দেখে খানিক অবাক হয়েছিলেন ওই কর্মীরা। ওই দিনই দুপুরে কার্ডিওলজি বিভাগের সামনে অ্যাম্বুল্যান্স আসার খবর শুনে বিছানা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে পড়েছিলেন মনোরঞ্জনা। তার পর তড়িঘড়ি ব্যাগপত্তর গুছিয়ে সটান অ্যাম্বুল্যান্সে উঠে পড়েন তিনি। কার্ডিওলজি বিভাগের এক কর্মী বললেন, ‘‘প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, উনি বোধ হয় জেলেই চলে গেলেন। কিন্তু প্রশ্ন জেগেছিল, জেলে গেলে এত ফূর্তি হবে কেন! পরে আসল কারণটা বুঝতে পারলাম। উনি সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে থাকার অনুমতি পেয়েছেন।’’ সিবিআইয়ের কর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেফতার হওয়ার পরেই মনোরঞ্জনা লকআপে এসি মেশিন বসানোর বায়না জুড়েছিলেন। পরে তাঁকে অসুস্থতার জন্য এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখান থেকে তিনি ভর্তি হয়েছেন একবালপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আটতলার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি বিলাসবহুল কেবিনে।
সিবিআই সূত্রের খবর, প্রথমে এসএসকেএম হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ৪ নম্বর কেবিনে মনোরঞ্জনাকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের কেবিনে এসি মেশিন নেই। এ নিয়ে অনেক বার অনুযোগ করছেন তিনি। হাসপাতালে তাঁর জন্য আলাদা শৌচালয়ের ব্যবস্থা করার দাবিও তুলেছিলেন। মনোরঞ্জনার বক্তব্য ছিল, সরকারি হাসপাতালের এই পরিবেশের সঙ্গে তিনি মানিয়ে নিতে পারছেন না। তাই আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। সিবিআই আফিসাররা জানিয়েছেন, জেরার সময়েও মনোরঞ্জনা বারবার জানিয়েছেন, যে বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় তিনি অভ্যস্ত, তাতে এই পরিবেশে থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু আইনে এ রকম কোনও ব্যবস্থা না থাকায় তাঁর এই সব দাবি মানা যায়নি বলে জানিয়েছিলেন সিবিআই অফিসারেরা।
তা হলে এখন কী করে সরকারি হাসপাতাল থেকে বিলাসবহুল বেসরকারি হাসপাতালে গেলেন মনোরঞ্জনা? সিবিআই অফিসারেরা জানিয়েছেন, গত ৭ নভেম্বর মনোরঞ্জনা আলিপুরের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারকের কাছে একটি আর্জি পেশ করে জানান, তাঁর উন্নতমানের চিকিৎসার প্রয়োজন, যা সরকারি হাসপাতালে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তিনি নিজের খরচে কোনও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে চান। ওই দিন সিবিআই তাঁকে ফের হেফাজতে নেওয়ার আর্জি জানায়নি। তাই আদালত মনোরঞ্জনার জামিনের আবেদন খারিজ করে তাঁকে জেল হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেয়। পরে তাঁর চিকিৎসা সংক্রান্ত আর্জিও মঞ্জুর করে কোর্ট। নিজের খরচে চিকিৎসা করানোর বিষয়ে সিবিআইয়ের পক্ষ থেকেও কোনও আপত্তি জানানো হয়নি। মনোরঞ্জনার আইনজীবী বিপ্লব গোস্বামী বলেন, ‘‘সব কিছু আইনের পথেই হয়েছে।’’
সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ১১ নভেম্বর একবালপুরের ওই হাসপাতালে ভর্তি হন মনোরঞ্জনা। হাসপাতাল সূত্রের খবর, তিনি যে কেবিনে রয়েছেন তার দৈনিক ভাড়া ৮ হাজার টাকা। তা ছাড়া দৈনিক আরও ৬ হাজার টাকা খরচ রয়েছে। সব মিলিয়ে রোজ প্রায় ১৪ হাজার টাকা খরচ করে ওই কেবিনে থাকছেন মনোরঞ্জনা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় ২০০ বর্গফুটের ওই কেবিনে রয়েছে সোফাসেট ও টিভি।
এ দিন আটতলার ওই কেবিনের সামনে গিয়ে দেখা গেল, দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। সামনে পুলিশ পাহারা। তবে অভিযুক্তর সঙ্গে দেখা করতে আসছেন অনেকেই। সিবিআই সূত্রের খবর, জেল হেফাজতে থেকেও পরিজনদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করছেন মাতঙ্গ সিংহের প্রাক্তন পত্নী। সিবিআইয়ের দাবি, হাসপাতালের কাছেই একটি হোটেলে এসে উঠেছেন তাঁর আত্মীয়রা।
কী চিকিৎসা হচ্ছে ওই হাসপাতালে? আদালতে দাখিল করা নথি অনুয়ায়ী, মনোরঞ্জনার হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যা রয়েছে। সঙ্গে উচ্চ-রক্তচাপ, ইউরিক অ্যাসিড ও ডায়াবেটিসজনিত সমস্যাও আছে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এখন উচ্চ-রক্তচাপজনিত অল্প সমস্যা ছাড়া বাকি সব কিছু নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
মনোরঞ্জনার প্রাক্তন স্বামী মাতঙ্গ সিংহও সারদাকাণ্ডে গ্রেফতার হয়েছেন। প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর জামিনের আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে। সিবিআই সূত্রের খবর, মাতঙ্গ সিংহের কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু তিনি এখনও জেল হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন। অন্য দিকে মনোরঞ্জনার জন্য পৃথক ব্যবস্থা। অনেকটাই রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্রের মতো। মদনও জেল হেফাজতে থাকাকালীন এসএসকেএমের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে ছিলেন। সিবিআইয়ের এক অফিসার বলেন, ‘‘মদনের সঙ্গে মনোরঞ্জনা ফারাক একটাই। মদন সরকারি খরচে সরকারি হাসপাতালে রাজার হালে ছিলেন। আর মনোরঞ্জনা নিজের খরচে তোফা আরামে রয়েছেন।
প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েও মাতঙ্গের কপালে অবশ্য এর কোনওটাই জোটেনি।’’      
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

স্বল্পোন্নত থেকে বের হতে আরও সময় লাগবে বাংলাদেশের

জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হতে বাংলাদেশের আরও সময় লাগবে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তবে তবে ২০২৪ সাল নাগাদ এই তালিকা থেকে বের হওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা আঙ্কটাডের এক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের মানদ- ইতিমধ্যে পূরণ করেছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হতে হলে দেশটিকে ন্যূনতম আরেকটি সূচকের মানদ- পূরণ করতে হবে। আর তা হলেই ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত হবে বাংলাদেশ। এরপর ছয় বছর পর্যবেক্ষণে থেকে ২০২৪ সালে তা কার্যকর হবে। সিপিডি বলেছে, স্বল্পোন্নত দেশের তিন সূচকের মধ্যে মানবসম্পদ সূচকেও বাংলাদেশ লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ফলে এই লক্ষ্যটি পূরণ হলে ২০১৮ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবে দেশটি। যদিও সেটি কার্যকর হবে ২০২৪ সালে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে বাংলাদেশের মাথাপিছু গড় আয় আগামী ছয় বছরের মধ্যে চার গুণ বৃদ্ধি করতে হবে। কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ছাড়া এই অর্জন সম্ভব না এবং বাস্তবভিত্তিকও না। আর সেটি সম্ভব না হলে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবেই থাকবে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো নিয়ে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে তিনটি সূচকের (আই সূচক, মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক) ভিত্তিতে এই তালিকাটি তৈরি করা হয়। অনুষ্ঠানে সিপিডির পক্ষে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সংস্থাটির গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ছাড়াও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান।

বাংলাদেশে মৃত্যু ও ধবংসের চক্র by সুনন্দা কে. দত্ত রায়

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৯৭৩ সালের ১৭ই জুলাই ফজলুল কাদের চৌধুরী যখন মারা গিয়েছিলেন, তখন তার পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের ধারণা ছিল তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, যিনি লন্ডনের যোগ্যতাস¤পন্ন একজন ব্যারিস্টার ছিলেন, তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শেখ মুজিবুর রহমানের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক তাজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। সেদিন তাজউদ্দীন আহমেদকে সতর্ক করে দিয়ে সালাউদ্দিন কাদের বলেছিলেন, ‘আপনার সময়ও আসবে। ওই কারাগারের কক্ষগুলোতে ফার্নিচার, আসবাবপত্র ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র লাগিয়ে আসলেই ভালো হবে।’
সালাউদ্দিন চৌধুরী নিজেও হয়তো জানতেন না, তার সেদিনকার কথাগুলো কতটা নির্দয় ভবিষ্যদ্বাণীপূর্ণ ছিল। মাত্র দুই বছর পর শেখ মুজিবুর রহমান ও পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য তার ধানমন্ডির বাসায় নির্দয়ভাবে খুন হন। তাজউদ্দীন আহমেদ ও অন্য মন্ত্রীদের টেনেহিঁচড়ে ঢাকার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। শেখ মুজিবের হত্যাকারী অথবা তাদের কট্টর সমর্থকরা কারাগারে ঢুকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে তাদের।
জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ স¤পাদক আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সঙ্গে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও এখন ফাঁসি দেয়া হলো। ২০১০ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা ওয়াজেদের প্রতিষ্ঠিত দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালের অক্টোবরে ফাঁসির দ- দেয় সালাউদ্দিনকে। তার করা আপিল খারিজ করে দেয় বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট।
যথাযথ প্রক্রিয়াই এখানে অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু এ উপমহাদেশে, যেখানে সাক্ষী কেনাবেচা করা যায়, প্রমাণও যেখানে প্রায়ই কাগজে লেখার উপযুক্ত নয়, সেখানে এসবের মূল্যই বা কি? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আর কতদিন বাংলাদেশ অতীতের কয়েদি হয়ে থাকবে, যে অতীত প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের মধ্যকার পার্থক্য অস্পষ্ট করে দেয়? সত্যিকারের স্বাধীন হওয়ার জন্য কখন বাংলাদেশ পর্যাপ্ত আত্মবিশ্বাস অর্জন করবে?
মৃত্যু ও ধ্বংসের চক্রে আরেকটি সংযোজন সালাউদ্দিনের মৃত্যু। সামাজিক স্থিতিশীলতা উপভোগ করার যে সুযোগটুকু বাংলাদেশের এখনও রয়েছে, এ চক্র তাও ধ্বংস করতে পারে।
সমান্তরাল আরেকটি বিষয় যেটি মাথায় আসে, তা হলো ভিয়েতনাম, যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ও তিক্ত একটি যুদ্ধ লড়েছিল। কিন্তু বহু বছর ধরে চলা সংঘাতের তিক্ততা ভিয়েতনামে যতটা স্মরণ করা হয়, তার চেয়ে বেশি করা হয় দেশটির বাইরে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য মিটিয়ে ফেলাই হবে জাতীয় ভবিষ্যতের জন্য উত্তম, এ পরিপক্ব সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পেরেছিল ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনামিজরা। এ কারণেই তারা অতীতের দাস নয়, বরং তারা অতীতকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে এসেছে। তারা ভারতীয়দের মতো নয়, যারা সড়কের নাম পরিবর্তন করে বা ব্যক্তি-ভাস্কর্য অপসারণ করে ইতিহাসকে মুছে ফেলার শিশুতোষ প্রচেষ্টা চালায়। ভিয়েতনাম গর্বের সঙ্গে তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সব টানেল ও ধ্বংসাবশেষ অক্ষত রেখেছে।
অনুরূপ ঘটনা আরেকটি হতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকা, যে দেশটির কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয়-বংশোদ্ভূত নাগরিকরা বহু দশক ধরে চলা নিষ্ঠুর নিপীড়নমূলক শাসনে সবচেয়ে কঠোর বর্ণবাদী বৈষম্যের ভুক্তভোগী ছিল। তারাও অতীতের শত্রুতা কাটিয়ে উঠে নিজেদের জন্য নতুন জীবন সৃষ্টির সাহসী প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এটা সত্য, অনেক শ্বেতাঙ্গ বহুজাতিক সমাজে বসবাস না করে অস্ট্রেলিয়ায় চলে গিয়েছিল। কিন্তু আমি এক শ্বেতাঙ্গ পরিবারকে চিনি। তারা পুরনো দক্ষিণ রোডেশিয়া (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) থেকে জাতিবিদ্বেষ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে গিয়েছিল। কারণ, তারা বিশ্বাস করেছিল ওই দক্ষিণ আফ্রিকাই তাদের জন্য অনেক বেশি সাম্যের দেশ হবে। তারা কিন্তু হতাশ হয়নি। এটার অন্যতম কৃতিত্ব বিশপ ডেসমন্ড টুটুর। তার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, সর্বজনীন দূরদর্শিতার ফলে গঠিত হয়েছিল কমিশন অব ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন। এ কারণেই তিনি যোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার জয় করেন।
এ জিনিসটিই আহত ও ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশের খুব বেশি দরকার। এ দেশটি এক রাষ্ট্রনায়কের নিরাময়ের ছোঁয়ার জন্য আর্তনাদ করছে। যে রাষ্ট্রনায়ক ইতিহাস বুঝবেন, ফলে নিজের ব্যক্তিগত শোকের অন্ধকার ছাড়িয়ে উজ্জ্বলতর দিগন্তে চোখ রাখতে সক্ষম হবেন। তা যতদূরেই হোক না কেন। শাসকের আকস্মিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা যে দেশগুলোর রয়েছে, সেখানে সমাপ্তি খুব সুখকর হয়নি।
এটা ভাবা মূর্খতা হবে যে, বৃটিশ শাসনের সময় ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সকল জ্যেষ্ঠ ভারতীয় সদস্য তৎকালীন কংগ্রেস দল ও ‘স্বরাজ’-এর লক্ষ্য সমর্থন করেছিলেন। আবেগি জহরলাল নেহরু তাদেরকে বহিষ্কার করার জন্য উত্তেজিত হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু চির বাস্তববাদী বল্লবভাই প্যাটেল নির্দেশ দিয়েছিলেন অন্য কিছু। তিনি অবশ্যই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, সরকারি ব্যক্তিদের তাদের ওই সময়ের প্রেক্ষাপটের বাইরে বিবেচনা করাটা অন্যায্য।
সালাউদ্দিনের পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির পঞ্চম স্পিকার। আইয়ুব খানের অধীনে কনভেনশন মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। তিনি কিছু সময়ের জন্য পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টও ছিলেন। রাঙ্গামাটির চাকমা প্রধান রাজা ত্রিদিব রায়ের মতো তিনিও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন, তার সে অধিকারও ছিল। কিন্তু তিনি কোন যুদ্ধাপরাধ করেছিলেন কিনা যার দরুন তাকে কারাদ- দেয়া হয়েছিল, সে ব্যাপারে আমার জানা নেই। আটক থাকা অবস্থায় তার আকস্মিক মৃত্যুর কারণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও তাকে বিচারের মুখোমুখি করার প্রয়োজনীয়তা এড়াতে পেরেছিল কর্তৃপক্ষ।
সালাউদ্দিনও সম্ভবত পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন। তাকে আমি যখন জানতে পেরেছি, ততদিনে তিনি নতুন বাস্তবতা মেনে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশেই তিনি রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গঠনের জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন। নিজের এলাকা চট্টগ্রাম থেকে কমপক্ষে ছয় বার তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। প্রাথমিকভাবে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে কাজ করেছেন। পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। তার বিরুদ্ধে হিন্দু গণহত্যা এবং আওয়ামী লীগের হিন্দু ও মুসলিম কর্মীদের উদ্দেশ্যমূলক হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল। অনেক ভারতীয়র সন্দেহ, তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের সহায়তা ও সমরাস্ত্র সরবরাহ করে আসছিলেন। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। আর যুদ্ধের পর মাথার খুলির পাহাড়ের যে দৃশ্য সবাই দেখেছিল, তাতে করে এটা আশ্চর্য্যজনক নয় যে, ওই ক্ষত দীর্ঘদিন থেকে যাবে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এ ক্ষতকে জীবিত রাখে, রক্তপাত ঘটায়। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন ও বেছে বেছে ও বিচ্ছিন্নভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের হত্যা বাংলাদেশী সমাজের মৌলিক একটি অস্থিতিশীলতার কথা মনে করিয়ে দেয়। সম্ভবত, যখন একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছে ভেবে ভারতীয়রা উদ্যাপন করছিল, তখনই হয়তো পূর্ব বাংলার কিছু মুসলিম বেছে বেছে হত্যা করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন।
পাকিস্তান বিভক্তির বিরোধিতা করেছিলেন তৎকালীন এমন এক বাঙালি কূটনীতিক পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরাজয়ের কথা শোনার পর ঢাকায় ফেরার উদ্দেশে রওনা দেন। তিনি ও তার মালামাল তখন মাঝ সমুদ্রে। কি মনে করে তিনি এক পর্যায়ে জাহাজ থেকে নেমে যান কাছের এক বন্দরে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রগামী আরেকটি জাহাজে মালামালসমেত উঠে যান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রেই তিনি বাকি জীবন কাটিয়েছেন। তিনি আসলে বিজ্ঞ ছিলেন।
[সুনন্দা কে. দত্ত রায় ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও লেখক। উপরের লেখাটি ভারতের দ্য এশিয়ান এইজ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ট্রাবল্ড ঢাকা’ শীর্ষক তার নিবন্ধের অনুবাদ।]

নারীরা পুরুষের সমান নন: এরদোয়ান

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, নারীরা পুরুষের সমান নয়। তাঁদের এক কাতারে মাপা যায় না। গতকাল মঙ্গলবার ইস্তাম্বুলে নারীবিষয়ক এক সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। খবর বিবিসির। ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেন, ইসলাম ধর্মে মাতৃত্বকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ নারীবাদীরা মাতৃত্বের গুরুত্বটা উপলব্ধি করতে পারেন না। নারীদের পুরুষের সমকক্ষ গণ্য করা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ। বিষয়টি নারীবাদীরা বুঝতে পারেন না। নারী ও পুরুষদের সমান ভাবার চেয়ে জরুরি হলো, নারীদের প্রতি সমান সম্মান প্রদর্শন করা।
প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য তুরস্কের উদারপন্থীদের ক্ষুব্ধ করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থকেরা বলছেন, এরদোয়ানের সরকারের সামাজিক নীতি দেশটিকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সম্মেলনে এরদোয়ান আরও বলেন, কর্মস্থলে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও একজন পুরুষ কর্মীর সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করা যাবে না। এ ছাড়া পুরুষেরা যেসব কাজ করতে সক্ষম, সেসব কাজ নারীরা করতে পারেন না। ‘কোমল প্রকৃতিগত’ কারণেই নারীরা তা পারেন না। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এর আগে প্রত্যেক নারীকে অন্তত তিনটি করে সন্তান জন্ম দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। গর্ভপাত ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে (সিজারিয়ান) সন্তান প্রসবের বিরোধিতা করেও বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। এরদোয়ানের কথায় প্রায়ই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে তিনি বলেন, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অন্তত ৩০০ বছর আগে মুসলিমরা আমেরিকা আবিষ্কার করেছিল।

তুরস্কের পরিকল্পিত উস্কানিতে যুদ্ধে জড়াবে না রাশিয়া

সিরিয়া সীমান্তে রুশ বিমান ভূপাতিত করাকে তুরস্কের ‘পরিকল্পিত উস্কানি’ বলে মন্তব্য করেছে রাশিয়া। তবে এই উস্কানির পরিপ্রেক্ষিতে আঙ্কারার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর ইচ্ছে নেই বলে জানিয়েছে মস্কো। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই ল্যাভরভ বুধবার বলেছেন, ‘তুরস্কের এই আচরণের পেছনে আমাদের গভীর সন্দেহ রয়েছে। এটা স্পষ্টতই পরিকল্পিত উস্কানি বলে মনে হচ্ছে।’ তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলুর সঙ্গে আলোচনার পর মস্কোতে এক সংবাদ সম্মেলনে ল্যাভরভ আরও বলেন, ‘কিন্তু এই ঘটনায় আমরা তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভাবছি না। তুর্কি জনগণের প্রতি আমাদের প্রতিশ্র“তি পরিবর্তন হবে না।’ একই সঙ্গে এ ধরনের হামলা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য না বলেও সতর্ক করেন তিনি। এদিকে, রুশ বিমান ভূপাতিত করাকে অনাকাক্সিক্ষত ও অপরিকল্পিত উল্লেখ করে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে তুরস্ক। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান জানিয়েছেন, এই সামান্য আকাশসীমা লংঘন হামলা করার মতো কারণ নয়। তিনি বলেন, ‘সংক্ষিপ্ত পরিসরের সীমান্ত লংঘনের কারণে হামলা করা বাস্তবসম্মত নয়।’ একই সঙ্গে এরদোগান জানান, তুর্কি-সিরিয়া সীমান্তে সামরিক মহড়া উদ্বেগের কারণ। এরদোগানের এই বক্তব্যকে ‘প্রতারণা’ বলে উল্লেখ করেছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সিরীয় উপকূলে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ : সিরিয়ার উপকূলে একটি গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে রাশিয়া। তুরস্ক সীমান্তবর্তী সিরীয় আকাশসীমায় রুশ যুদ্ধবিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করার পরই এ রণতরী মোতায়েন করা হল। রুশ জেনারেল স্টাফের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা লে জেনারেল সের্গেই রুদস্কোই বলেন, মস্কো পরিষ্কার ভাষায় হুশিয়ার করে দিচ্ছে যে, সম্ভাব্য হুমকি বলে যেসব লক্ষ্যবস্তুকে গণ্য করা হবে তা ধ্বংস করে দেয়া হবে। এদিকে, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সিরিয়ার হেমিমিম বিমান ঘাঁটিতে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হবে। সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দরনগরী লাতাকিয়ায় রুশের এ ঘাঁটি অবস্থিত। এস-৪০০ হচ্ছে রুশ অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় দীর্ঘ এবং মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটি ৪০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। কৌশলগত বিমান ছাড়াও ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারে এটি।
কয়েকটি রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার এবং কমান্ড পোস্ট নিয়ে এ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
তুরস্ক-রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতায় ছেদ : তুরস্কের সঙ্গে সব ধরনের সামরিক সহযোগিতা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ তুরস্ক সফর বাতিল করেছেন।

ভারত ছাড়ার চিন্তা করিনি : আমির খান

‘আমার বা আমার স্ত্রীর ভারত ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই। ভারতীয় হয়ে আমি গর্বিত। তবে যা বলেছি, তাতে আমি অনড়।’ বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা আমির খান এক বিবৃতিতে বুধবার এ কথা বলেছেন। হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, কয়েক দিনের জন্য মুম্বাইয়ের বাইরে ঘুরে আসতে চান আমিরের পরিবার। বুধবার তার বিরুদ্ধে এক বিজেপি নেতা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছেন। ৫০ বছর বয়সী বলিউড তারকা বিবৃতিতে বলেন, আমরা কখনও ভারত ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করিনি, ভবিষ্যতে করব না। তবে বিরোধিতার খাতিরে অনেকে আমার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তারা আমার সাক্ষাৎকারও ভালোভাবে পড়েননি। ভারত আমার দেশ। আমি ভারতকে ভালোবাসি। এ দেশে জন্ম নিয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। আর এখানেই আমি থাকছি, অন্য কোথাও নয়। সোমবার এক অনুষ্ঠানে আমির খান ভারতে ‘অসহিষ্ণুতা’ বেড়ে যাওয়ায় তার পরিবারের আতংকের কথা উল্লেখ করেন। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতায় দিন দিন বেড়ে যাওয়া নিরাপত্তাহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে তার স্ত্রী কিরণ রাও ভয়ে আছেন। তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও তারা আতংকিত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তার স্ত্রী তাকে বলেন, ‘তাহলে আমাদের কি ভারত ছেড়ে যাওয়া উচিত?’ অসহিষ্ণুতা ইস্যুতে কথা বলায় আমিরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাদের অনুসারীরা। টুইটার ও ফেসবুকে কটাক্ষ করা হয়েছে আমিরকে। তবে আমিরের পক্ষেও কথা বলেছেন অনেকে।

আমিরের মতো এআর রহমানও অনিরাপদ

শাহরুখ খানের পর বলিউডের আরেক তারকা আমির খান নিজ দেশ ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিয়ে কথা বলার পর দেশটির ক্ষমতাসীনদের তোপের মুখে পড়েছেন। এবার এ তালিকায় নাম লেখালেন অস্কারজয়ী ভারতীয় সুরকার এআর রহমান। ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বাড়ছে বলে আমির খানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত বলে জানিয়েছেন তিনি। বুধবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, সেপ্টেম্বর মাসে একই রকম পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন তিনি। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের একজন হিসেবে তাকেও অসহিষ্ণু মানসিকতার শিকার হতে হয়েছিল। একটি মুসলিম সংগঠন তার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছিল। ভারতে ৪৬তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিয়ে মঙ্গলবার এসব কথা বলেন তিনি।
‘মুহাম্মদ : মেসেঞ্জার অব গড’ নামের একটি ইরানি চলচ্চিত্রে সুর দেয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছিল মুম্বাইভিত্তিক রাজা একাডেমি। মুসলিম একাডেমিটির অভিযোগ ছিল- চলচ্চিত্রটির নাম ইসলাম ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল মহানবী হযরত মুহাম্মদের (স.) জন্য অপমানজনক। এ প্রসঙ্গে এআর রহমান বলেন, ‘আমিরের মতো আমিও নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছি না। কয়েক মাস আগে আমিও এ ধরনের সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়েছিলাম। কোনো কিছুই সহিংস হওয়া উচিত নয়। আমরা প্রত্যেকেই অতি সভ্য মানুষ এবং বিশ্বের সামনে নিজেদের সেরা সভ্য জাতি হিসেবে দাঁড় করানো উচিত আমাদের।’ ফতোয়াটি জারি হওয়ার পর দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশে এআর রহমানের পূর্বনির্ধারিত কনসার্ট বাতিল হয়ে গিয়েছিল।

পিছু হটতে নারাজ রাশিয়া, তুরস্ক ভূমধ্যসাগরে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন

রাশিয়া, তুরস্ক কোন পক্ষই পিছু হটতে নারাজ। উল্টো নিজের যুদ্ধবিমানগুলোকে নিরাপত্তা দিতে এরই মধ্যে ভূমধ্য সাগরে এডভান্সড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে রাশিয়া। মঙ্গলবার রাশিয়ার যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে তুরস্ক। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বলেছেন, তার দেশের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। অর্থাৎ তাদের আকাশসীমায় রাশিয়ার যুদ্ধবিমান প্রবেশ করায় তা গুলি করে ভূপাতিত করা সঠিক। এর জবাবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি ভূমধ্য সাগরে মোতায়েন করেছেন অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এর সহায়তা নিয়ে তুরস্ক সীমান্তের কাছে সিরিয়ায় অভিযান চালাবে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান। সহজেই ধারণা করা যায় যে, যদি এরপর তুরস্ক একই কাজ করে তাহলে রাশিয়া তার কড়া জবাব দিতে প্রস্তুত। বার্তা সংস্থা রয়টার্স খবর দিয়েছে যে, বুধবার সিরিয়ার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাক লাতাকিয়ায় তীব্র বোমা বর্ষণ করেছে রাশিয়া। এ এলাকার কাছেই মঙ্গলবার রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল। এসব ঘটনায় রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে তাতে তাদেরকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। তারা রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভকে টেলিফোন করে কথা বলেছে। এ দুটি দেশের মধ্যে যদি যুদ্ধ লেগে যায় তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আগেভাগেই বিশেষজ্ঞরা সতর্কতা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, তুরস্ক এখন ন্যাটোর একটি সদস্য দেশ। ফলে মঙ্গলবারের ঘটনাকে গত প্রায় অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে রাশিয়া ও ন্যাটোর এই সদস্যের মধ্যে সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি বলে মনে করা হচ্ছে। রাশিয়ার বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান তো ক্ষমা চানই নি, উপরন্তু তিনি বলেছেন, তার নিজের দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অধিকার তার আছে। তিনি সে কাজটিই করেছেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, তুরস্কের নীতিতে কোন পরিবর্তন আসবে না। তুরস্কের এমন কর্মকা-ে রাশিয়ার কর্মকর্তারা ক্ষোভে ফুঁসছেন। তারা তুরস্কের কোন অবকাশ যাপন কেন্দ্রে যাতে কোন রাশিয়ান না যান সে জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্যে কিছু বিধিনিষেধের আহ্বানও জানান।

বাংলাদেশী হাই কমিশনারকে তলব করবে পাকিস্তান

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির জের ধরে  পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে তলব করবে পাকিস্তান সরকার। ওই ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তান কড়া সমালোচনা করে। তার পাল্টা জবাবও দিয়েছে বাংলাদেশ। এবার প্রতিবাদ হিসেবে পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে তলব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। বুধবার পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এমপিদের কাছে এ কথা বলেছেন ক্ষমতাসীন দলের এক এমপি। এ খবর দিয়েছে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের পাকিস্তানি সংস্করণ এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। এতে বলা হয়, বাংলাদেশী ওই দু’নেতাকে ‘ত্রুটিপূর্ণ বিচার’ করার অভিযোগে এমপিরা সর্বসম্মতভাবে নিন্দা জানান। এর একদিন পরই জাতীয় পরিষদ সদস্য শেখ আফতাব আহমেদ এ ঘটনা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)-এ তোলার জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, রোববার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয়। একে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। পাকিস্তানের এমন অবস্থানের জবাবে বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে প্রতিবাদ পাঠিয়েছে। তারা ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাই কমিশনারকে তলব করে প্রতিবাদ জানায়। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়টিকে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মনে করে এবং এটাকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে। বুধবার পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর তোলা এক নোটিশের জবাবে বুধবার জাতীয় পরিষদে বক্তব্য রাখেন শেখ আফতাব আহমদ। জামায়াতে ইসলামী থেকে দেয়া নোটিশে বলা হয়েছিল, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তা লঙ্ঘন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এর জবাবে আফতাব আহমেদ বলেন, ১৯৭১ সালে যে যুদ্ধ হয়েছে তা ছিল পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে। যেসব মানুষ পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন তাদের বিচার করা ছিল অযৌক্তিক। প্রতিবাদ স্বরূপ ঢাকায় নিয়োজিত পাকিস্তানের হাই কমিশনারকে ডেকে পাঠানোর আহ্বান জানান পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ দলের এমপি শিরিন মাজারি।

সংসদে বিতর্কে ধর্মনিরপেক্ষতা by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

দিন দিন বেড়ে চলা অসহিষ্ণুতার যে প্রশ্নে ভারত ক্রমশ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে, ভারতীয় সংসদের শীতকালীন অধিবেশনের শুরুতে আজ বৃহস্পতিবার সেটাই বড় হয়ে দেখা দিল। সেই সঙ্গে আলোচনায় উঠে এল ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রও। দুই বিষয়েই সরকারকে কোণঠাসা করলেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী।
ভারতীয় সংবিধান নিবেদনের ৬৫তম এবং সংবিধানের অন্যতম রূপকার বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে অধিবেশনের প্রথম দুদিন বিশেষ এক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এই বিশেষ আলোচনাপর্বেই বড় হয়ে উঠে আসে অসহিষ্ণুতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন। আর সেখানেই শাসক বিজেপিকে সরাসরি কটাক্ষ করে সোনিয়া বলেন, ‘সংবিধান রচনায় যাঁদের পূর্বসূরিদের কোনো ভূমিকাই ছিল না, সংবিধানের ওপর যাঁদের আস্থাই নেই, তাঁরাই আজ সংবিধান রক্ষকের দাবি জানাচ্ছেন!’ আক্রমণাত্মক সোনিয়া বলেন, ‘কংগ্রেসই সংবিধানের জন্য লড়াই করেছে। অথচ আজ আমরা দেখছি, সংবিধানের মূল আদর্শগুলো ধ্বংস হওয়ার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। কয়েক মাস ধরে দেশে যা চলছে, তা সংবিধানের মূল ধ্যানধারণা ও আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।’
সংবিধান রচনা, তাতে আম্বেদকরের ভূমিকা এবং সংবিধানের বেঁধে দেওয়া মূল সুর অনুযায়ী ভারতের এগিয়ে চলা নিয়ে আলোচনা শুরু করে বিরোধী আক্রমণের মুখে পড়েন লোকসভার উপনেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। বলিউড সুপারস্টার আমির খানের নাম না করে প্রথমে তিনি কটাক্ষ করেন এই বলে যে, ‘জীবনকালে আম্বেদকরকে প্রবল প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে, পদে পদে বাধা পেতে হয়েছে, কিন্তু তিনি কোনো দিন দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবেননি।’ এর পরেই তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক শব্দ দুটি সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রথমে ছিল না। কারণ, আম্বেদকর মনে করেছিলেন, দুই বিষয়ই ভারতের মূল প্রকৃতির মধ্যেই নিহিত। রাজনাথ বলেন, এ দেশে যে শব্দটির অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি, তা হলো ‘ধর্মনিরপেক্ষ’। এই শব্দটির বদলে ‘পন্থ (পথ) নিরপেক্ষ’ ব্যবহার হওয়া উচিত।
ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা নিয়েই অসহিষ্ণুতার মাথাচাড়া দেওয়া। কাজেই কংগ্রেস বেঞ্চ থেকে শুরু হয় প্রবল প্রতিরোধ। দলনেতা মল্লিকার্জুন খারগে বলেন, আম্বেদকর অবশ্যই প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিরোধের দরুন পারেননি। তাই পরে জুড়তে হয়।
রাজনাথের পরেই বলতে ওঠেন সোনিয়া। সংবিধান রচনায় কংগ্রেসের ভূমিকার উল্লেখ করে তিনি সরাসরি চলে যান সরকার বিরোধিতায় এবং তাতেও তাঁর হাতিয়ার হন আম্বেদকর। সোনিয়া বলেন, ‘আম্বেদকর বলেছিলেন, সংবিধান যতই ভালো হোক, যাঁরা তা রূপায়ণ করবেন তাঁরা ভালো মানুষ না হলে সংবিধানও বাজে হয়ে যায়। আবার রূপায়ণকারীরা ভালো মানুষ হলে খারাপ সংবিধানও ভালো হয়ে যায়।’ এই টিপ্পনী কেটেই সোনিয়া বিরোধীদের দিকে চেয়ে অর্থপূর্ণ হাসি হেসে বলেন, ‘এটা আপনারা ও আমাদের উদ্দেশে।’
সংবিধান-সভায় (কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) আম্বেদকরের নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয় তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আম্বেদকর সংবিধান সভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলা থেকে। বিজেপির সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন বোম্বে থেকে। এই বিতর্কের অবসান ঘটান তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাসবিদ সাংসদ সুগত বসু। তিনি বলেন, ১৯৪৬ সালে সংবিধান সভায় আম্বেদকর নির্বাচিত হন যশোর-খুলনা কেন্দ্র থেকে। কিন্তু ৪৭ সালে দেশভাগের পর তাঁর নির্বাচনী কেন্দ্র পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় আম্বেদকরকে বোম্বে থেকে নির্বাচিত করা হয়।
আম্বেদকর ও সংবিধান প্রথম দুদিনের বিশেষ অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় হলেও ঘুরেফিরে লোকসভায় প্রাধান্য পায় অসহিষ্ণুতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংরক্ষণ। স্বাধীনতার ৬৭ বছর পর এখন সংরক্ষণ ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন, মন্তব্য করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত বিতর্কের শীর্ষে উঠেছিলেন। ওই মন্তব্য বিহারে বিজেপির বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ বলেও মনে করা হচ্ছে। রাজনাথসহ অন্য সদস্যরা তাই এই অবকাশে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং সেই ক্ষেত্রে আম্বেদকরের অভিমতকেও তুলে ধরেন। তবে সব ছাপিয়ে বড় হয়ে থাকে অসহিষ্ণুতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন।
কাল শুক্রবার এই বিতর্কে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অসহিষ্ণুতা নিয়ে এ যাবৎ মৌন প্রধানমন্ত্রী এই প্রথম প্রকাশ্যে এবং সংসদে তাঁর ও সরকারের মনোভাব জানাবেন। তা যাতে নির্বিঘ্নে হয় এবং সংসদ যাতে সুষ্ঠুভাবে চলে সে জন্য আবেদন জানিয়েছেন সংসদীয় মন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডু। তিনি বলেছেন, সরকারের লুকানোর কিছুই নেই। সরকার সবকিছু নিয়ে আলোচনায় রাজি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন এই কথা। মোদি বৃহস্পতিবার সংসদ শুরুর আগে বলেন, ‘বিতর্ক ও আলোচনাই সংসদের প্রাণ। আশা করি, বিরোধীরা সংসদীয় অধিবেশন সুষ্ঠুভাবে চলতে সাহায্য করবেন।’

তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে না রাশিয়া

তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভ। সংবাদ সম্মেলন তিনি বলেন, তুর্কি এফ-সিক্সটিন বিমানের হামলায় রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত এবং এক পাইলট নিহত হলেও আপাতত তুরস্কের সঙ্গে কোনো যুদ্ধে জড়াচ্ছে না রাশিয়া।
দু’দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। আলাপে রুশ বিমান ভূপাতিত করাকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে এর জন্য তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমবেদনা জানিয়েছেন বলেও জানান লাভরভ। আকাশসীমা লঙ্ঘনের দাবি করা তুরস্কের ভূমিকাকে ‘ভণ্ডামি’ বলেছে রাশিয়া। কারণ ২০১২ সালে তুর্কি ফ্যান্টম বিমান সিরিয়ার আকাশসীমা অতিক্রম করায় তা ভূপাতিত করা হয়।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান বলেছিলেন,‘ কয়েক মিনিটের জন্য আকাশসীমা অতিক্রম করার মানে এই নয় যে কোনো দেশের বিমানকে ভূপাতিত করতে হবে’। অথচ কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে এই তুরস্কই রুশ বিমান ভূপাতিত করে।
সুখোয়-টোয়েন্টি ফোর ভূপাতিত করার জন্য তুরস্ককে তিরস্কার অব্যাহত রেখেছে রাশিয়া। পাশাপাশি হুঁশিয়ারি হিসেবে ভূমধ্যসাগরে ‘মস্কোভা’ নামের বিশালাকার ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। ‘যে কোনো টার্গেট’ ধ্বংস করতে ডেস্ট্রয়ারটি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় প্রহরা দিচ্ছে।
এ ছাড়া সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট বা আইএস বিরোধী বিমান হামলা চলবে বলে জানিয়েছে রাশিয়া। প্রয়োজনে বোমা নিক্ষেপের সময় রুশ বোমারু বিমানের নিরাপত্তায় একসঙ্গে উড়বে রাশিয়ার অত্যাধুনিক সব ফাইটার জেট। অবস্থা গুরুতর হলে আকাশে যেকোনো হুমকি রুখতে প্রস্তত রাখা হয়েছে সর্বাধুনিক এস- ফোর হানড্রেড মিসাইল ব্যবস্থা।
আইএস জঙ্গিদের তেলবাহী লরিবহরে হামলা চালিয়ে ফেরার সময় তুরস্কের এফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমানের হামলায় রাশিয়ার একটি সুখোয় বিমান বিধ্বস্ত হয়। বিমানের দু’জন পাইলট প্যারাশ্যুটে অবতরণের চেষ্টার সময় সিরিয়ার তুরস্কপন্থী বিদ্রোহীদের গুলিতে এক রুশ পাইলট নিহত হন। অপর রুশ পাইলটকে বিশেষ অভিযানে উদ্ধার করে রাশিয়া। তবে সে সময় বিদ্রোহীদের হামলায় আরও এক রুশ মেরিন সেনা নিহত হন।

বাংলাদেশে চলাফেরা সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন বিদেশীরা by অ্যানি গোয়েন

কয়েক সপ্তাহ আগেও অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক অ্যানে মার্টন বাংলাদেশে নিশ্চিন্তে ঘুরতে পারতেন। কাজের জন্য বেছে নিতেন বাইসাইকেল কিংবা রিকশা। ঢাকার বস্তিগুলোর জন্য একটি চাকরি-সেবা পরিচালনা করেন তিনি। কিন্তু মার্টন ও অন্য অনেকের জন্য, এ বছর বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার পর বাংলাদেশের জনাকীর্ণ রাজধানীটিতে বসবাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। সন্ত্রাসী হামলাগুলোর মধ্যে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস কর্তৃক দায় স্বীকার করে নেয়া গোলাগুলির কয়েকটি ঘটনা রয়েছে, যেগুলোতে দুই বিদেশী নিহত ও এক ইতালিয়ান মিশনারি কর্মী গুরুতরভাবে আহত হয়েছে।
কাজে যাবার ক্ষেত্রে অনেকেই হাঁটা বা বাইসাইকেলে চড়া থামিয়ে দিয়েছেন, বেছে নিচ্ছেন কো¤পানির গাড়ি। একটি আন্তর্জাতিক এইডস বিষয়ক সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে, আরও কয়েকটি অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। এ সপ্তাহান্তের ঢাকা লিট ফেস্টে’র মতো যেসব অনুষ্ঠানগুলো আয়োজিত হয়েছে, সেগুলোতে উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সাহায্য সংস্থাগুলো নীরবে নিজ নিজ কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। যারা এখনও ঢাকায় রয়ে গেছেন, তারা নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী অনলাইনে কিনছেন। অন্ধকার হওয়ার আগেই ফিরছেন ঘরে। মার্কিন দূতাবাস নিজেদের কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বেশিরভাগ পাবলিক প্লেসে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না। এমনকি সড়কে ও ফুটপাতে হাঁটা, আন্তর্জাতিক হোটেল সহ বড় জনসমাবেশে অংশ নিতেও কড়া বারণ।
৬১ বছর বয়সী মার্টন বলেন, আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে আটকে গেছি। আমি নিরাপদ বোধ করিনি। তিনি বলেন, ঘরের বাইরে একমাত্র যে জায়গাটিতে তিনি বসতে পারেন, সেটি হলো শহরের প্রাইভেট ক্লাবগুলো। সেগুলোর উঁচু দেয়ালের বাইরেই পাহারা দেয় সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী। ওখানেই তিনি অন্য বিদেশীদের সঙ্গে সামাজিকতা রক্ষা করেন। মার্টন ও তার স্বামী বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করছেন। তিনি বলেন, এটা আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। পুরো উল্টো করে ফেলেছে, সত্যি। আগে যা ছিল, তাতে আমি আর কখনও ফিরতে পারবো কিনা, আমি জানি না।
ফেব্রুয়ারিতে আটলান্টা-ভিত্তিক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান ব্লগার অভিজিৎ রায় তার স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার একটি বইমেলা থেকে বের হচ্ছিলেন। তখনই চাপাতি হাতে দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। পুলিশ বলেছে, হত্যাকারীরা ছিল উগ্রপন্থী, যারা ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে অভিজিতের ধর্মনিরপেক্ষ লেখালেখির বিরুদ্ধে ছিল। এ ঘটনার পর আরও তিন ব্লগার ও অভিজিতের প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দিপনকে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে - এমন শঙ্কা ক্রমেই বেড়েছে সাম্প্রতিক দিনগুলিতে, যখন তিন বিদেশী নাগরিক, শিয়া ধর্মীয় সমাবেশ ও পুলিশ চেকপয়েন্টে হামলার দায় অনলাইনে স্বীকার করে নিয়েছে আইএস। ২৮ই সেপ্টেম্বর ইতালিয়ান এক সাহায্যকর্মী কূটনৈতিক এলাকায় জগিং করার সময় গুলিবিদ্ধ হন। এরপর একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে জাপানের এক কৃষিকর্মীও গুরুতরভাবে গুলিবিদ্ধ হন ৩রা অক্টোবর। ১৮ই নভেম্বর উত্তরাঞ্চলীয় জেলা দিনাজপুরে ইতালিয়ান মিশনারি কর্মী পিয়েরো পারোলারি গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। অন্যান্য পাদ্রিরা মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন, ধর্মীয় একটি ফোরামের এক হিন্দু নেতার ওপর মঙ্গলবার ছুরি হাতে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বাংলাদেশে নিজেদের কর্মকান্ডের কথিত সম্প্রসারণ নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছে আইএস। গত সপ্তাহে প্রকাশিত নিজেদের অনলাইন ম্যাগাজিন দাবিকে ‘দ্য রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে বাংলাদেশকে তারা আখ্যায়িত করেছে বেঙ্গল নামে।
নিবন্ধটিতে বলা হয়, এ ধারাবাহিক হামলাগুলোর ফলে বেঙ্গলে বসবাসরত ক্রুসেডার দেশগুলোর নাগরিক ও তাদের সহযোগিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে তাদের কূটনীতিক, পর্যটক ও অভিবাসীরা নিজেদের চলাচল সীমাবদ্ধ করতে ও নিত্য ভয়াল পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার এ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির উপস্থিতি অস্বীকার করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক স¤পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভি বলেন, আমাদের মনে হচ্ছে যে বাংলাদেশে আইএস শক্তিশালী নয়। আমাদের খুব উদার একটি মুসলিম সমাজ রয়েছে। বৃহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে এ দেশে কোন চরমপন্থী মৌলবাদ নেই। বাংলাদেশে আকস্মিকভাবে আইএস সক্রিয় থাকার যে ধারণা, তা অনেক দূরবর্তী বলেই মনে হয়। তবে তিনি আরও বলেন, আমরা অবশ্যই যেকোন সম্ভাবনার বিষয়েই সজাগ। সন্ত্রাসীদের যেকোন হুমকিই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিই।
কিন্তু এরপরও বাংলাদেশে আইএস-এর সহযোগীদের কার্যক্রম পরিচালনা করার লক্ষণ রয়েছে। বুধবার পুলিশ স্থানীয় একটি জঙ্গি গোষ্ঠীর এক সদস্যকে আটক করে, যে আইএস-এর নামে ইন্টারনেটে হত্যার হুমকি ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত। মঙ্গলবার ঢাকার একটি আদালত সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করেছে। এদের একজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে আইএস-এর আঞ্চলিক সমন্বয়ক হিসেবে। জানুয়ারিতে যখন তাদের আটক করা হয়, তখন তাদের ল্যাপটপে আইএস-এর প্রচারপত্র ও জিহাদি ভিডিও পেয়েছিল।
সরকার এর আগে হামলার দায় চাপিয়েছিল হাসিনার প্রতিপক্ষদের ওপর। একটি তত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল যে, হামলাগুলো পরিচালিত হয়েছে দেশটির চলমান যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ করার উদ্দেশ্যে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত নৃশংস অপরাধের বিচারের উদ্দেশ্যে ট্রাব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তবে ট্রাইব্যুনালকে পক্ষপাতদুষ্টতার দায়ে ব্যপক সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। রবিবার সকালে দুই জন দ-িত যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
বাংলাদেশের অবরুদ্ধ বিরোধী দল বিএনপি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলের মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, এটা একটা স্থুল মিথ্যা। ২০১৪ সালে বিতর্কিত একটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ওই নির্বাচনে হাসিনা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বিএনপির অনেক শীর্ষ নেতা পলাতক কিংবা হাসিনা সরকারের হাতে আটক।
প্রায় ১৬ কোটি মানুষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশটি ব্যপকভাবে আধুনিকায়িত হচ্ছে। কৃষি ও উঠতি গার্মেন্ট শিল্পের বদৌলতে দেশটির অর্থনীতি প্রতি বছর ৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকেই মধ্যপন্থী ইসলামকে গ্রহণ করেছে দেশটি। কিন্তু এরপরও দেশটিতে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থকদের মধ্যে সবসময়ই একটি বিভাজন ছিল। সংঘাত এ দেশে হয় রাস্তায়, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও হরতাল সহিংস হয়ে উঠে।
গোপন চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অস্তিত্ব ১৯৯০’র পর থেকেই ছিল, যখন আফগানিস্তান থেকে জিহাদি যোদ্ধারা দেশে ফেরত এসেছিল, বললেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স¤পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক আবদুর রব খান। ২০০৫ সালের আগস্টে একই দিনে সারা দেশে শ’ শ’ বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় একটি জঙ্গি সংগঠন। এর পর থেকেই ছোট আকারের এ জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্কে হানা দিয়ে আসছে সরকার। আবদুর রব বলেন, এ দেশে অবশ্যই জঙ্গিবাদ আছে। আমরা দাবি করতাম, এগুলোর বেশিরভাগই দেশীয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। মনে হচ্ছে, পরস্থিতি পাল্টাচ্ছে। যদিও আইএস-এর শারিরীক উপস্থিতি এখানে নেই, কিন্তু এখানে তাদের সমর্থক রয়েছে। তারা আইএস-এর নিয়ন্ত্রণাধীন।
আল কায়দার লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত আরেকটি জঙ্গি সংগঠনের চার জনকে সরকার ব্লগার হত্যার দায়ে আটক করেছে। অথচ, এরপরও দেশের বহু নেতৃত্বাস্থানীয় বুদ্ধিজীবী আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছেন। এদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে নজরে পড়ে যাওয়া বা কোন হিটলিস্টে নিজের নাম উঠে যাওয়ার ভয়ে কর্মকা- গুটিয়ে ফেলতে শুরু করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, আবদুর রব খান নিজেও নিয়মিত সান্ধ্যকালীন টক শো’তে হাজির হতেন, কিন্তু এখন তিনি তা করেন না বললেই চলে।
অন্ধকার ঘনিয়ে আসায় সন্ধ্যা নেমেছে। ঢাকার বাসিন্দারা শহরের পুনঃসংস্কারকৃত হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি লেকের ধারে হাঁটছেন। কয়েক বছর আগে ওই লেক উদ্বোধন করা হয়েছে। নব-নির্মিত এ স্থাপনায় বহু রঙের বাতি জ্বলছে। পার্কের বেঞ্চে মানুষজন হাত ধরে রেখেছে একে অপরের, ভ্রাম্যমান বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনেছে মশলাদার স্ন্যাক ও ক্যান্ডি। দেশের সর্ববৃহৎ ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টারের স¤পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, ঢাকা উদ্দীপনায় ভরপুর একটি শহর। তাই জীবন এগিয়ে যায়। কিন্তু ওই ঘটনাগুলো খুবই উদ্বেগজনক। হঠাৎ করেই পুরো সমাজকে অরক্ষিত দেখাচ্ছে। কিভাবে এর জবাব দেব, তা নিয়ে আমরা লড়ছি।
লেকের ধারে মানুষের আনাগোনা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে কমেছে বলে জানালেন রুবেল ইসলাম (২৬)। তিনি বলেন, এখানকার একটি জায়গায় তিনি বন্ধুদের নিয়ে সচরাচর রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত আড্ডা দিতেন। কিন্তু হামলাগুলোর পর থেকে তিনি কখনই একা হাঁটাচলা করেন না। অন্ধকার ঝেঁকে ধরার আগেই তিনি বাড়িতে ফেরেন। পাশের একটি কলেজের গণিতের প্রভাষক একেএম নাজিমুদ্দিন (২৮) পানিতে পড়া আলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ধরে আছেন স্ত্রী ফারজানার হাত। তিনি জানালেন, এটা সুন্দর একটা সন্ধ্যা ছিল। কিন্তু এ অনুভূতি বেশিক্ষণ টিকবে না। কারণ, তার ভাষায়, ‘যেকোন সময় যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে’।
[অ্যানি গোয়েন ওয়াশিংটন পোস্টের ভারত ব্যুরো চীফ। এ লেখাটি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত তার নিবন্ধের অনুবাদ।]

বিশিষ্টজনদের হুমকি মূল কারিগর পুলিশের খাঁচায়

অন্যদের ফাঁসাতে গিয়ে এবার নিজেই ফেঁসে গেলেন আবদুল হক। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁও থেকে তাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। যিনি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, মুনতাসির মামুন, সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার হুমকির নেপথ্য কারিগর। বুধবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে এমনই তথ্য দেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি জানান, দেশের বিশিষ্টজন ও রাজনীতিবিদদের হত্যার হুমকির ঘটনায় তদন্তে নেমে পুলিশ হুমকি রহস্যের আদ্যোপান্তের সন্ধান পায়। মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘স্পুফিং’ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সাংবাদিক ও কলামিস্ট মিজানুর রহমান খানকে হত্যার হুমকি ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের অব্যাহত অভিযানে তাকে আটক করা সম্ভব হয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল জানান, ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতেই আবদুল হক প্রযুক্তির ব্যবহার করে বিভিন্ন জনের মোবাইল নাম্বার ক্লোন করে দেশের বিশিষ্টজনের মোবাইলে হত্যার হুমকি পাঠাতেন। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকায় তিনি ফায়যুর রহমান, মাওলানা সাদ উদ্দিন ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সালেহ আহমদ ফুয়াদসহ বিভিন্ন জনের নম্বর থেকে হুমকিবার্তা দিয়েছিলেন।
এর আগে আনিসুজ্জামানকে হত্যার হুমকির ঘটনা প্রসঙ্গে ১৬ই নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক জানিয়েছিলেন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে যে নম্বর থেকে হুমকি দেয়া হয়েছিল, ওই নম্বর ব্যবহারকারীকে আটকের পর পুলিশ নিশ্চিত হয় মোবাইল ক্লোনিং করে হুমকিবার্তা গেছে অন্য আরেকজনের কাছ থেকে। সে আরেকজনই হলেন আবদুল হক।
আনিসুজ্জামানের কাছে যে নম্বরটি থেকে হুমকিবার্তা যায় একসময় সে ফোন নম্বরটি (০১৭৩৮-৭২৫৮১৫) ব্যবহার করতেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদিসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সালেহ আহমদ ফুয়াদ। তবে এক যন্ত্রণার কারণে সে নম্বরের সঙ্গ ত্যাগ করেছিলেন তিনি। কীভাবে জানি তার মোবাইলে পরিচিতজনের কাছে আজেবাজে এসএমএস যেতে থাকে। কোন কিছুতেই যেন সমাধান পাচ্ছিলেন না। বাধ্য হয়ে গ্রামীণফোনের অফিসে গিয়ে ২০১৪ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর সিমটি বন্ধ করে দেন সালেহ ফুয়াদ। প্রিয় নম্বরটির সঙ্গে সেই তার সম্পর্কের শেষ।
গত ১১ই নভেম্বর ক্লাসে যাওয়ার আগ মুহূর্তে সালেহ ফুয়াদ চোখ বুলাচ্ছিলেন পত্রিকায়। দৈনিক প্রথম আলোয় ছাপা হওয়া অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে হত্যার হুমকির সংবাদে তার চোখ আটকে যায়। অভিযোক্ত নম্বরটি তার চোখে পড়ে। এটি তার বন্ধ করে দেয়া নম্বর। এ নম্বর থেকেই হত্যার হুমকি গেছে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে। আতঙ্কে হিম হয়ে যায় সালেহ ফুয়াদের শরীর। কী সর্বনাশ! একটু ধাতস্থ হয়ে ফোন দেন সিলেটে তার এক পরিচিতজনের কাছে। যিনি এমন ‘সর্বনাশে’র শিকার হয়েছিলেন।
হাফিজ ফায়যুর রাহমান। দু-দুবার আটক হয়েছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এসএমএসে হুমকির অভিযোগে। প্রথমবার আটক হন ২০১৩ সালের ১৪ই জুন অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীসহ ছয় সংসদ সদস্যকে হুমকির অভিযোগে। প্রায় ৪ মাস কারাভোগ শেষে বেরিয়ে আসার পর ২০১৪ সালের ৩০শে জুন আবারও র‌্যাবের হাতে আটক হন তিনি। এবারও অভিযোগ, আইনমন্ত্রীর মোবাইলে হত্যার হুমকি দিয়ে খুদে বার্তা প্রেরণ। মসজিদে খতমে তারাবিহ পড়িয়ে আসা ফায়যুরের দু-দুটো রমজান কাটে কারাগারের অন্ধকারে। দুবার হুমকির অভিযোগে আটক হলেও ফায়যুরের দাবি তিনি ঘটনাগুলোর সঙ্গে মোটেও সংশ্লিষ্ট নন। তিনি আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রমাণও দিয়েছেন তার সংশ্লিষ্ট না থাকার।
কোন উপায় পেতে সেই ফায়যুর রহমানকেই ফোন দেন সালেহ ফুয়াদ। ফায়যুর তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, পুলিশের সাহায্য নিলে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা যাবে। ফায়যুর যোগাযোগ করেন সিলেট ডিবি অফিসে। কিন্তু কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকায় বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি। তবে পরে দেখা করার অনুমতি নিয়ে রাখেন।
এদিকে, নম্বরের সূত্র ধরে পুলিশ ট্র্যাক করছিল সালেহ ফুয়াদকে। সালেহ ফুয়াদের সঙ্গে কথোপকথনের সূত্রে ট্র্যাকিংয়ের আওতায় পড়েন ফায়যুর রহমানও। ওইদিনই পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে সিলেটে নির্দেশনা আসে ফায়যুরের সঙ্গে যোগাযোগের। ডাক পড়ে ফায়যুরের। বিকাল ৫টায় সিলেটে ডিবি কার্যালয়ে পৌঁছেন ফায়যুর রাহমান। ঢুকতেই প্রশ্ন ছুটে আসে, সালেহ ফুয়াদের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? সালেহ ফুয়াদের নম্বর থেকে হুমকি গেছে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে, এটা তিনি জানেন কিনা। ফায়যুর জানান, সে কথা জানিয়ে প্রতিকার চাইতেই তিনি এখানে এসেছেন। পুলিশ যোগাযোগ করে সালেহ ফুয়াদের সঙ্গে। ফুয়াদ পুলিশকে বলেন, তিনিও আসছেন। তৎক্ষণাৎ কুষ্টিয়া থেকে রওনা হন সালেহ ফুয়াদ। হাজির হন সিলেট ডিবি কার্যালয়ে। প্রমাণ দেন হুমকির ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ত না থাকার।
ফায়যুর রাহমান ও সালেহ ফুয়াদ দুজনেই পুলিশের নজরে থাকেন। হেডকোয়ার্টার থেকে নির্দেশ পেয়ে ১৪ই নভেম্বর তাদের নিয়ে ঢাকায় রওনা হন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। পরদিন মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হন দুজন। নিজেদের সম্পৃক্ত না থাকার কথা দুজনেই জোর গলায় বলেন। তবে নিজেদের একটা সন্দেহের কথা জানান পুলিশের কাছে। সামনে আসে আরও একটি নাম। আবদুল হক। যিনি ফায়যুর ও ফুয়াদের সঙ্গে ‘মুক্তস্বর’ সাংস্কৃতিক ফোরামের সাহিত্য আসরে আসতেন। সালেহ ফুয়াদের সহকর্মী হিসেবে জকিগঞ্জের একটি মাদরাসায় কম্পিউটার শিক্ষকতাও করেছেন।
আবদুল হকের নাম আলোচনায় এসেছিল ফায়যুর রহমান প্রথম যখন আটক হয়েছিলেন তখন থেকেই। ফায়যুর রহমানের পরিবারের অভিযোগ, এসএমএস জালিয়াতি করে আবদুল হকই ফাঁসিয়েছিলেন ফায়যুর রহমানকে। ফায়যুর এককালে তার প্রতিবেশী আবদুল হকের বন্ধু ছিলেন। তবে পারিবারিক বিরোধের কারণে দুজনের সম্পর্কে ফাটল ধরে। পরিবারের অভিযোগ, সেই শোধ তুলতেই তিনি ফায়যুরকে বারবার ফাঁসিয়েছেন এসএমএস সন্ত্রাসের মাধ্যমে।
পরে আরও কয়েকটি এমন অভিযোগ উঠে আবদুল হকের বিরুদ্ধে। তারই কারসাজিতে হত্যার হুমকিবার্তা পান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আইনূর আক্তার পান্না ও ছাতক থানার ওসি শাহজালাল মুন্সি। শেখ সেলিমকে হত্যার হুমকির ঘটনায় ফেঁসেছিলেন আবদুল হকের মাদরাসার সহকর্মী মাওলানা সাদ উদ্দিন। আর ছাতকের ইউএনও এবং ওসিকে হুমকির দায়ে ফাঁসেন আবদুল হকের গ্রামের বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান।
দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে পুলিশ অনেকটাই নিশ্চিত হয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে হুমকিবার্তা গেছে আবদুল হকের মাধ্যমেই। বিভিন্ন জায়গায় নিরন্তর অভিযানের পর অবশেষে পুলিশের খাঁচায় বন্দি হন আবদুল হক।

বিচিত্র জীবন আবদুল হকের by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

‘আপনি কি চাপাতির আঘাতে মৃত্যুর সময় হাঁসফাঁস করতে চান?’ মুঠোফোনে ভয়াবহ এমন বার্তাই গিয়েছিল অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য যিনি নিজের জীবনের পুরোটা নিংড়ে দিয়েছেন- নির্বিরোধী এ ব্যক্তির কাছে এমন বার্তা দেয়ার মতো মানুষও যে আছে কেউই ভাবতে পারেন না। অথচ যার হাত হয়ে হুমকিবার্তা গেছে তারই ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকেন রবীন্দ্রনাথ। তারও ভালোবাসা(!) সাহিত্যের প্রতি। আবদুল হকের বিরুদ্ধে মোবাইল ফোনে এসএমএস জালিয়াতির মাধ্যমে হুমকি দিয়ে অনেককে ফাঁসানোর অভিযোগ অনেক আগে থেকেই। অভিযোগ আছে বিভিন্ন জনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়েরও। মানবজমিনেও বেশ কয়েকবার এমন অভিযোগের খবর উঠেছে। তার বিরুদ্ধে প্রথম যখন অভিযোগ উঠেছিল নিজের বক্তব্য জানিয়ে একটি ই-মেইল বার্তা পাঠিয়েছিলেন তিনি। কোন প্রতিবাদ নয়, নিছক নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছিলেন সে বার্তায় ‘বারবার হ্যাকিঙের অভিযোগ আমার দিকেই ছুটে আসে কেন, ভাবছি। মনে হয় তার কারণ এই যে, লোকে মনে করে আমি আইটি বিশেষজ্ঞ। আসলে আমি বিশেষজ্ঞ নই। যদি হয়েও থাকি, তাহলে অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অপরাধ নয়। অপরাধ হলো মানুষের ক্ষতি করা। আমি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ায় কারও ক্ষতি করেছি- এমন প্রমাণ কারও কাছে নেই। আছে শুধু সন্দেহ।’ আবদুল হক মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি। সনদ পাওয়ার আগেই থেমে গেছে তার শিক্ষাজীবন। তবে তার কলম থেমে থাকেনি। লেখালেখির হাত আবদুল হকের বেশ ভালোই। কলমেও ধার আছে। সাহিত্যের ভুবনের প্রতি তার যেন আজন্মের ভালোবাসা। মাদরাসার শিক্ষক আবদুল হক চোখ বুঝে ছেলের নাম রাখেন এক সাহিত্য পুরুষের নামে। অদ্বৈত, তার দুই বছর বয়সী ছেলের নাম। আবদুল হক ভালোবাসেন রবীন্দ্রনাথকে। ভালোবাসেন জীবনানন্দ দাশকে। যখন মাদরাসার শিক্ষক তখন মাদরাসায় তার কক্ষেও স্থান হয় এই লেখকদের। মাদরাসার শিক্ষক হলেও আবদুল হকের ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারে নিজের মুখের পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথের জায়গাও হয় অনায়াসেই। কানাঘুষা হয় মাদরাসায়। কান দেন না আবদুল হক। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার শাহবাগ জামেয়া মাদরাসার কম্পিউটার শিক্ষক আবদুল হক চলেন নিজের মতোই। কম্পিউটার ও প্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষ দখল তার। তাই কানাঘুষা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে সরব হয়নি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। তবে তার বিরুদ্ধে এসএমএস জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষ তাকে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ উঠে তার কারসাজিতেই ফায়যুর রাহমান নামের এক কোরআনে হাফেজের মোবাইল ফোন থেকে হত্যার হুমকি দিয়ে এসএমএস গেছে অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর মোবাইল ফোনে। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর হতে হয় মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে। তবে আবদুল হকের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্ত নেয় না মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। তারা আবদুল হককে নিজ থেকে অব্যাহতি চাওয়ার সুপারিশ করে। আবদুল হক অব্যাহতি নেন ২০১৪ সালের ২৯শে অক্টোবর। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গাঙপাড় নোয়াকোটের খলিলুর রহমানের ছেলে আবদুল হক মাদরাসার চাকরি হারিয়ে ফিরে আসেন নিজের গ্রামে। দিনের সময়টুকু বাড়িতেই কাটে, সন্ধ্যা হলে চলে যান স্থানীয় শারপিন বাজারস্থ জনৈক ইয়াকুবের দোকানে। সময় কাটান সেখানেই। বাড়িতে অবস্থানরত সময়ে এসএমএসের মাধ্যমে হত্যা হুমকির আরও দুটো ঘটনা ঘটে। একটি ঘটনায় হত্যার হুমকি বার্তা পৌঁছে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের কাছে। অন্য ঘটনায় হুমকি পৌঁছে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আইনূর আক্তার পান্না ও ছাতক থানার ওসি শাহজালাল মুন্সির মোবাইলে। যে দুটো মোবাইল থেকে এমন হুমকি গেছে দুটো মোবাইল ফোনের মালিকের সঙ্গেই যোগসূত্র রয়েছে আবদুল হকের। শেখ সেলিমের মোবাইল ফোনে হুমকি বার্তা নিয়ে যে নম্বর পৌঁছেছে সে নম্বরটির মালিক আবদুল হকের মাদরাসার সহকর্মী মাওলানা সাদ উদ্দিনের। সাদ উদ্দিন আবদুল হকের ছেড়ে আসা পদে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। আর অপর যে মোবাইল নম্বরটি হুমকি বার্তা নিয়ে ছাতকের ইউএনও, ওসির কাছে গেছে সে নম্বরের মালিক আবদুল হকের গ্রামের বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান। দুটো ঘটনাতেই সন্দেহের তীর ছুটে আবদুল হকের দিকে। আর তা অভিযোগ হয়ে পৌঁছে মানবজমিন পর্যন্ত। অভিযোগগুলো প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হলে আবদুল হকের আরও একটি ই-মেইল বার্তা পৌঁছে প্রতিবেদকের কাছে। আবদুল হক আবারও অস্বীকার করেন তার সংশ্লিষ্টতা। প্রথম ই-মেইল বার্তায় আবদুল হক উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষ নই, সাধারণেরও নিচে, অবসাধারণ-খুব ছোট মানুষ। জন্মাবধি বইয়ে ডুবে আছি। টুকটাক লিখি মাঝেমধ্যে, প্রবন্ধ আর কবিতা। সেসব কিছু হয় কি না জানি না। শুধু জানি যে, সাহিত্যের বাইরে আমার আর কোন স্বপ্ন নেই। শিক্ষকতা আমার বাহ্যিক জীবিকার উপায়, আগ্রহের পেশা নয়।’ ইন্টারনেটের ভুবন ঘেঁটেও আবদুল হককে এমনই মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, সাহিত্যের মাঝেই যেন তার প্রাণ রাখা। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বিপদে ফেলা, এসএমএস জালিয়াতির মাধ্যমে কাউকে সন্ত্রাসী সাজানো তার এ পরিচয়ের সঙ্গে খুব একটা খাপ খায় না। তবে ঘটনাগুলোর সঙ্গে আবদুল হকের সুতোর যোগ, প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান সব খাপে খাপে মিলে গিয়ে আবদুল হকই অপরাধীর খোপে আটকে গেছেন। আবদুল হক বলছেন, তিনি অপরাধী নন। তবে প্রমাণগুলো তার পক্ষে বলছে না। তার বিরুদ্ধে থাকা প্রমাণগুলো বলছে, আবদুল হক এক বিচিত্র জীবনযাপন করছেন। সাহিত্যের সফেদ শুভ্র বসন ভালোবাসেন তিনি। ভালোবাসেন অপরাধের কালিমাও।

বাংলাদেশে অপরাধ ও শাস্তি

একাত্তরে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সংঘটিত গর্হিত অপরাধে দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে সমাজের দশক পুরনো ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা করছে বাংলাদেশে চলমান যুদ্ধাপরাধ বিচার। এ বিচার অনেক প্রশংসা পেয়েছে। আবার অনেক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। স্বাধীনতার ৪০ বছরেরও বেশি সময় পর অবশেষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হতে দেখা যাচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দায়িত্ব নিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী জটিল ইতিহাসের কারণে এত বছর এসব অপরাধ অমীমাংসিত ছিল। অতীতের ঘটনাপ্রবাহ যে অমীমাংসিত তা এখনও দৃশ্যমান। মৌলবাদীরা এমনকি পাকিস্তান সরকারও বিচার ও বিচারপরবর্তী শাস্তির বিরোধিতা করেছে। পক্ষান্তরে ধর্মনিরপেক্ষ সুশীলসমাজ বিচার চালিয়ে নিয়ে যেতে ও যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দিতে সরকারকে চাপ দিয়েছে। রোববার অভিযুক্ত দুই যুদ্ধাপরাধী- জামায়াতের আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির পর আবারও এ মতানৈক্য দৃশ্যমান হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দিতে আওয়ামী লীগ সরকার যা কিছু সম্ভব করতে সংকল্পবদ্ধ- এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে এটাকে যে বিষয়টা দুর্বল করে তা হলো, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যম হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে বেছে নেয়া। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ফাঁসি আসলে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। এটা বিচার প্রক্রিয়াকে ন্যায়বিচারের প্রত্যয়ের পরিবর্তে প্রতিহিংসার রংয়ে রঞ্জিত করে। ন্যায়বিচারের প্রত্যয়ই হওয়া উচিত একটি রাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থার ভিত্তি। পক্ষান্তরে এসব ফাঁসি এমন সময় হলো যখন কিনা বাংলাদেশ ইসলামপন্থি মৌলবাদ সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে। শেখ হাসিনার সরকার যদি ভেবে থাকেন, এসব ফাঁসি বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনীতিকে দুর্বল করে তুলবে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ভুল প্রমাণিত হতেই পারে। বিরোধীদের বিরুদ্ধে সরকার যে শক্ত (হার্ডলাইন) অবস্থান নিয়েছে, তা তিক্ত-বিরক্ত বিরোধী সহমর্মীদের মধ্য থেকে অনুসারী রিক্রুট করতে জঙ্গি দলগুলোকে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা গেছে এমনটা ইতিমধ্যে হচ্ছে। দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং দলটির নেতাদের ফাঁসি দেয়া সত্ত্বেও দলটি সাংগঠনিকভাবে এখনও শক্তিশালী। আর তারা ‘বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা’ করার মাধ্যমে ‘প্রতিশোধ নেয়ার’ অঙ্গীকার করেছে। এছাড়াও, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি শুরু হওয়ার পর থেকে ধর্মনিরপেক্ষ লেখক ও তাদের প্রকাশকদের ওপর হামলা বাড়ার বিষয়টি কাকতালীয় নাও হতে পারে। অন্য কথায়, সরকারের অবস্থান অতীতের অন্যায় লাঘব করার তুলনায় বর্তমানের মতপার্থক্যকে তীব্র করেছে। ঢাকার সামনে এখন বিরাট চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের সময় যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনাটা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে কট্টরপন্থি শক্তিগুলো যেন ওই বিচার প্রক্রিয়াকে তাদের ফায়দা হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে তা প্রতিহত করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে তারা হয়তো মর্মান্তিক ঘটনাপ্রবাহের ন্যায় সমাপ্তি টানতে পারতো। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের ওপর নির্ভর করায় এ প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছে। এছাড়া এটা সমাদৃত।
[ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য হিন্দুতে গতকাল প্রকাশিত ‘ক্রাইম অ্যান্ড পেনাল্টি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সম্পাদকীয়র অনুবাদ]