Wednesday, January 6, 2016

নান্দাইলে বাসে কিশোরীকে ধর্ষণ, আটক ১

ময়মনসিংহের নান্দাইল চৌরাস্তা এলাকায় বারুইগ্রাম মাদরাসার কাছে বাসে এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত আলমগীর (২২) নামে একজনকে আটক করা হয়েছে।
নান্দাইল থানা সূত্র জানায়, গত ৫ই জানুয়ারি দুপুরে ওই কিশোরীকে নরসিংদীতে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য লক্ষীগঞ্জ বাসষ্ট্যান্ড থেকে আল্লাহর দান নামের একটি বাসে তুলে দেয় তার ভাই। বাসটি চৌরাস্তা এসে বারুইগ্রাম মাদরাসার কাছে সব যাত্রী নামিয়ে দেয়। এসময় ওই কিশোরীকে বাসের হেলপার আলমগীর বলে, তাকে ভৈরব যাওয়ার গাড়ীতে তুলে দেয়া হবে। পরে সন্ধ্যা নামলে পরদিন সকালে বাসে তুলে দেয়া হবে বলে জানিয়ে হোটেল থেকে খাবার এনে খেয়ে বাসেই শুয়ে থাকতে বলে আলমগীর। মেয়েটি সরল বিশ্বাসে বাসে শুয়ে থাকা অবস্থায় রাতে আলমগীর বাসে উঠে তাকে ধর্ষণ করে। এ সময় আলমগীরের সহযোগী গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর, গ্রামের মোশাররফ ও ঈম্বরগঞ্জ উপজেলার লক্ষীগঞ্জ গ্রামের শাহজালাল (২২), বাসের গেইটে পাহারা দিচ্ছিল। মেয়েটির চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করে আলমগীরকে আটক করে। এসময় অন্য সহযোগীরা পালিয়ে যায়। আলমগীর ঈশ্বরগঞ্জের পুম্বাইল এলাকার মৃত জুলহাসের ছেলে।

‘কতিপয় আমলা চক্রান্তে লিপ্ত’

কতিপয় আমলা প্রতারণার মাধ্যমে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বেতনস্কেল নিয়ে যেসব কথা বলেছে সেগুলো ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রেরই অংশ বলে মনে করে ফেডারেশন।
গত ৪ জানুয়ারি বেতন স্কেল নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যার পাল্টা জবাব হিসেবে ফেডারেশন আজ বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের বক্তব্য তুলে ধরে।
দেশের সব সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলোর মোর্চা এই ফেডারেশন।
শিক্ষকেরা নিজের কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পান- অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই ব্যাখ্যার জবাবে ফেডারেশনের বক্তব্য: সরকারি কর্মকর্তারাও যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এমন তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তা ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এমন শিক্ষকের সংখ্যা মোট শিক্ষকের ২ থেকে ৩ শতাংশের বেশি হবে না।
নয়টা থেকে পাঁচটা অফিস সময়ের বিষয়ে ফেডারেশনের ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাচিবিক দায়িত্ব পালন শিক্ষকের কাজ নয়। একজন শিক্ষকের কাজ তাঁর শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে এমনকি তাঁর নিজ গৃহে।
বিভিন্ন দেশের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ থাকার কথা উল্লেখ করে ফেডারেশন জানায়, জাতীয় প্রয়োজনে অন্য কোনো পেশার অবসরের বয়স ৬৫ হলে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। আর সচরাচর কোনো শিক্ষক অধ্যাপক হিসেবে ন্যূনতম ১৫ থেকে ২০ বছর চাকরিসহ মোট চাকরিকাল ২৭ বছরের ঊর্ধ্বে হলে গ্রেড-১ অধ্যাপক হতে পারেন। পিএইচডি ডিগ্রি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গ্রেড-১ অর্জন করা অসম্ভব। জ্যেষ্ঠ সচিব পদ থেকে অবসরে গিয়ে আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন এমন অনেকের পিএইচডি ডিগ্রিধারী সহপাঠীরা চলতি বছর গ্রেড-১ পেয়েছেন এবং কেউ কেউ এখনো পাননি।
অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ১২ বছরের মধ্যে তৃতীয় গ্রেডভুক্ত অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। এর জবাবে ফেডারেশন বলছে, বস্তুত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোনো পদোন্নতি নেই। যোগ্যতার মাপকাঠিতে এখানে প্রতিটি পদে নতুন নিয়োগ হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় গ্রেড-১ ভুক্ত অধ্যাপকের সংখ্যা ৮২০ উল্লেখ করলেও ফেডারেশন বলেছে, এই সংখ্যা ৬০৮।
ফেডারেশনের প্রশ্ন: ক্যাডার বহির্ভূতরা কি সচিব পদে পদোন্নতি পান?
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, শিক্ষকদের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করে ফেডারেশন।
এদিকে পৃথক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন ও প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছে।

‘আমাদের রাজনীতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে’

শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন ও অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানার স্বামী ড. শফিক আহম্মেদ সিদ্দিক। বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের ‘নিউজ অ্যান্ড ভিউজ’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো ছাত্র-শিক্ষকরা ভালো করছে। আমরা অ্যাগ্রিকালচারের দিক থেকে, ফুডে সেলফ-সাফিশিয়েন্ট হয়েছি। এটায় কন্ট্রিবিউশন অ্যাগ্রিকালচার সাইয়েন্টিস্টদের। সব দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।’
তার ভাষ্য, ‘দুঃখজনকভাবে, একটি ব্যাপারে দেশ পিছিয়ে আছে। রাজনীতি। আমাদের রাজনীতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আমরা অপোজিশন সহ্য করতে পারবো না। পজিশনে থাকলে, আমি টেনে নামাবো।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে প্রথম যেটা আমি প্রথম যেটা ফিল করি: ইলেকশন কমিশনের নিউট্রাল হওয়া। ইলেকশন কমিশন ইন্ডিয়ার মতো হবে, যেটা সরকারী দল, বিরোধী দল ও সব দল একসেপ্ট করে নেবে।’
তিনি বলেন, ‘(গ্রহণযোগ্য) কমিশন খুব দরকার। এটা আমি রিকোয়েস্ট করবো পলিটিক্যাল পার্টিগুলোকে, রাস্তায় মারামারি না করে, বরং ইলেকশন কমিশনটা শক্তিশালী করা উচিৎ। প্রয়োজন সবার গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন। দুঃখজনক হলো, নির্বাচন কমিশন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি কোন পক্ষ থেকেই।’
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন মেইন। ফেয়ার অ্যান্ড ফ্রি ইলেকশন।’
তিনি বলেন, ‘যেকোন নির্বাচনে - উপজেলা নির্বাচন বলুন, ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচন বলুন বা জাতীয় পার্লামেন্টারি ইলেকশন বলুন - ভালো ইলেকশন কমিশন না হলে সম্ভব না। আমি সব দলকে রিকোয়েস্ট করবো, একটি ভালো গ্রহণযোগ্য ইলেকশন কমিশন দিন। ইন্ডিয়া, আমাদের পাশের দেশ যদি করতে পারে; ইভেন পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে অপোজিশন, পজিশনের কাছে।’

আমরা কি পারি না এ ধরনের প্রকল্প হাতে নিতে? by ইমদাদুল ইসলাম

সম্প্রতি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত কৃষিবিষয়ক অসাধারণ এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা সত্যিই আকর্ষণীয়। মাটির পুষ্টি জরিপের এ প্রকল্পে পুরো দেশকে বেশ কয়েকটা ভাগে বিভক্ত করে রাজ্যভিত্তিক মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে কোন রাজ্যের মাটির প্রকৃতি কী রকম, তা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, কোন রাজ্যের মাটিতে কী ধরনের সার প্রয়োগ করা যায়, মূলত তা নির্ধারণ করা। ‘মাটির পুষ্টি গুণাগুণ’ নির্ধারণের এ প্রকল্পে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে মাটিতে সারের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন আশাতীত রকমের ভালো করা। ওই দেশের কৃষি বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত এ জরিপের ফলে সারের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ পরিহার করে বিভিন্ন ধরনের সার থেকে একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা (যে অঞ্চলে যে ধরনের ফসল ভালো হয়) অনুসারে মাটির গুণাগুণ অনুযায়ী সার নির্ধারণ করা। সারের মাত্রা নির্ধারণ ও কোন রাজ্যে কী ধরনের ফসল উৎপাদন হবে ইত্যাদিসহ একটা যুগোপযোগী কৃষিভিত্তিক মান নির্ধারণ করা, যা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের হাত ধরে ভারতকে নিয়ে যাবে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো কৃষিতেও উন্নত দেশের সমকক্ষ অবস্থায়। সংক্ষেপে এটাই হল এ প্রকল্পের মূল ভিত্তি। প্রত্যেক রাজ্যের একটা জনাকীর্ণ স্থানে এ জরিপের ফলাফল টাঙানো থাকবে। কৃষক এটা দেখে তথ্যানুসারে কৃষিকাজ পরিচালনা করবে। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ দেশে আমরা কি পারি না, এ ধরনের কোনো প্রকল্প হাতে নিতে? ভর্তুকি মূল্যে সার বিতরণের পর দেখা যায়, আমাদের কৃষক ঠিকভাবে সার পাচ্ছে না, পেলেও মাটির পুষ্টিগুণ অনুসারে সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে ‘অগ্নিকন্যার’ (মতিয়া চৌধুরী) হাত ধরে আমাদের কৃষি বিভাগ যদি এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়, তবে তা হবে দেশে কৃষি বিপ্লব ঘটানোর অন্যতম সোপান।
এনসিসি ব্যাংক লিমিটেড, মালিবাগ শাখা, ঢাকা

জেলা-উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রহশালা চাই by লিয়াকত হোসেন খোকন

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এর ১৭ দিন পর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে। সে রাতেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তারপর শুরু হয় যুদ্ধ- বঙ্গবন্ধুর নামেই। নয় মাসের মধ্যে হেরে যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। চূড়ান্ত সময় এসেছিল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ট্রেনে ভারতের বনগাঁ হয়ে কলকাতায় গিয়ে প্রিয় অভিনেত্রী-নৃত্যশিল্পী সাধনা বসুর হাতে তুলে দিয়েছিলাম স্বাধীন বাংলার পতাকা। প্রিয় অভিনেত্রীকে স্বচক্ষে ওই প্রথম দেখা। বাংলাদেশ পেয়েছিলাম বলেই সেদিন তা সম্ভব হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তোমরা পেয়েছ স্বাধীন একটি দেশ। এজন্য তোমার এই প্রিয় অভিনেত্রীকে তুমি স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পেলে। পাকিস্তান থাকলে কি পারতে? দেখ, আমার বোনটি থাকে তোমাদের রাঙ্গামাটিতে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার কারণে এরপরে একটিবারের জন্যও ওখানে যেতে পারিনি। দেশ ভাগ আমাকে বড্ড কষ্ট দিয়েছে...।’ সাধনা বসু এও বলেছিলেন, ‘তোমরা পূর্ববাংলার বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ গড়বে। মনে রাখবে, স্বাধীনতা বিরোধীরা সুযোগ পেলে তোমাদের দেশ তছনছ করে দিবে।’ সত্যিই সাধনা বসুর এই কথা বাস্তবে রূপ নিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। পরে শাসকগোষ্ঠী স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করে সঠিক ইতিহাস মুছে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। তাই ভবিষ্যতে নবীন প্রজন্ম যাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যথাযথ ও সঠিকভাবে অবহিত হতে পারে সেজন্য-
১. প্রতিটি জেলা-উপজেলায় স্থাপন করা হোক মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রহশালা, যেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও বীর শহীদদের নামের তালিকা লিপিবদ্ধ থাকবে। প্রয়োজনে শহীদদের ছবি ও জীবনপঞ্জি রাখা যেতে পারে।
২. একাত্তরের মার্চের উত্তাল দিনগুলোর আন্দোলন-মিছিলের ছবি দেয়ালে দেয়ালে টাঙানো হোক।
৩. প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটা সময়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করা হোক।
৪. মুক্তিযুদ্ধে নিহত বীর শহীদদের নিয়ে নির্মাণ করতে হবে প্রামাণ্যচিত্র এবং তা বিশেষ বিশেষ দিনে পাড়া-মহল্লায় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. একাত্তরে স্বাধীনতার পক্ষে ভূমিকা পালনকারী ছাত্র সংগঠনসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের নামের তালিকাও রাখতে হবে।
৬. যারা মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, সেই কুখ্যাত ব্যক্তিদের নামের তালিকাও জেলা-উপজেলার মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রহশালায় রাখা যেতে পারে।
রূপনগর, ঢাকা

হঠাৎ ভূমিকম্প- কী করবেন? by মো. রেদোয়ান হোসেন

ভূমিকম্পের সময় আমরা আতংকিত হয়ে পড়ি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। অনেকে আবার এতটাই হতবাক হয়ে পড়ে যে, ফলে তারা বিপদের সম্মুখীন হন। তাই এ সময়ে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
হিমালয় সংলগ্ন অবস্থান, অভ্যন্তরে বড় ধরনের তিনটি ভূ-চ্যুতি ও দীর্ঘ বছর ধরে বড় ধরনের ভূমিকম্প না হওয়ার কারণে বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশংকা অনেক বেশি। জাতিসংঘের ভূমিকম্প দুর্যোগ সূচকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ভূ-চ্যুতির কারণে দেশের ৪৩ শতাংশ এলাকা রয়েছে ভূমিকম্পে উচ্চ ঝুঁকিতে। মধ্যম ঝুঁকিতে রয়েছে ৪১ শতাংশ এলাকা। তাই ভূমিকম্পের ব্যাপারে সতর্কতা ও সচেতনতা জরুরি। এবার জেনে নেই ভূমিকম্পের সময় করণীয়গুলো কী কী-
১. ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস লাইন বন্ধ রাখুন।
২. ঘরে হেলমেট থাকলে মাথায় দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ুন। তা না হলে মজবুত টেবিল, খাটের নিচে কিংবা পিলারের সঙ্গে অবস্থান করুন। হেলমেট না থাকলে মাথা রক্ষার জন্য হাতের কাছে বালিশ রাখতে পারেন।
৩. বাসা থেকে বের হয়ে যতটা সম্ভব খোলা জায়গায় অবস্থান করুন।
৪. বের হওয়ার জন্য লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। তবে সিঁড়িতে আশ্রয় নিবেন না। কেননা ভবন ধসে পড়লে সবার আগে সিঁড়ি ধসে পড়ার আশংকা বেশি থাকে।
৫. বিপদের সময় তাড়াহুড়ো না করে যথাসম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রাখুন।
৬. গাড়িতে কিংবা যানবাহনে অবস্থান করলে বড় ভবন কিংবা সেতু থেকে দূরে খোলা নিরাপদ স্থানে পার্ক করুন।
৭. মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভূমিকম্পে ভয়ংকর সর্বনাশ ঘটাতে পারে। তাই জীবনের প্রতি গুরুত্ব বেশি দিন।
৮. বড় ভূমিকম্পের পরপরই আরেকটা ছোট ভূমিকম্প হতে পারে। তাই একবার ভূমিকম্প থেমে গেলেই অবস্থান পরিবর্তন করবেন না। সতর্ক থাকুন এবং বেশ কিছু সময় পর্যন্ত নিরাপদ স্থানে অবস্থান করুন।
৯. ঘটনার পর এমন স্থানে অবস্থান করুন, যাতে সবাই একসঙ্গে থাকা যায় এবং যে কোনো সমস্যা একসঙ্গে মোকাবেলা করতে পারেন।
১০. কোনো কারণে আটকা পড়লে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়ার আশা ও সাহস রাখুন। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। উদ্ধারকারীর কাছে আপনার চিৎকার বা সংকেত পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
বঙ্গবন্ধু টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, টাঙ্গাইল

বিএনপির আশাবাদ by আবদুল লতিফ মন্ডল

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে শাসক দল আওয়ামী লীগের বেপরোয়া প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যথা- বোমা বিস্ফোরণ, ভোটকেন্দ্র দখল, বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেয়া বা কেন্দ্র থেকে জোর করে বের করে দেয়া, জাল ভোট প্রদান ছাড়াও আইনশৃংখলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা ও সর্বোপরি নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সরকারবিরোধী জাতীয় সংসদের বাইরের দল দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ দাবি করলেও দলটি নির্বাচনে তাদের রাজনৈতিক বিজয় হয়েছে বলে দাবি করেছে। এর চেয়ে বড় কথা, ২৩৪টি মেয়র পদে নির্বাচনে কম-বেশি ১০ শতাংশ পদে জয়ী হলেও দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্প্র্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে খুব শিগগিরই সরকারের পরিবর্তন হবে। যেখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের বর্তমান মেয়াদ পূর্ণ করার আগে অর্থাৎ ২০১৯ সালের আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে একাধিকবার সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, সেখানে বিএনপির চেয়ারপারসনের ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে খুব শিগগিরই সরকারের পরিবর্তন হবে’- এরূপ জোরালো আশাবাদের ভিত্তি নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও দেশবাসীর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনায় যাওয়ার আগে দেখা যাক, বিএনপির এই দুই শীর্ষ নেতা কি বলেছেন। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলীয় চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির বড় বিজয় হয়েছে। কারণ দলটির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও মিথ্যা মামলা দিয়ে সরকার যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, সে অবস্থা থেকে তারা বেরিয়ে এসে জনগণের সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছেন। তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পেরেছিলেন। সেটা একটা বড় বিজয়। আরেকটি বিজয় হচ্ছে- সরকার যে জনবিচ্ছিন্ন সেটা আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে। সরকারের ফ্যাসিবাদী চেহারা উন্মোচিত হয়েছে। পরদিন ১ জানুয়ারি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে খালেদা জিয়া বলেছেন, খুব শিগগিরই দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের বিদায় হবে।
বিএনপি ছাড়াও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ করেছে। জাতীয় পার্টির নেতারা আরও বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন যে সম্ভব নয়, পৌরসভা নির্বাচনে এ সত্যটি আরও এক দফা প্রমাণিত হল।
এটা সত্য যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও এর বিকাশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই- সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। কারণ কেবল অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন, সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই হোক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের নজির বেশি নেই। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বপ্ন স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে। আশ্রয় নেয় ষড়যন্ত্র ও ভয়ভীতির। কোনো কোনো আসনে বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে ১১টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। নির্বাচন কমিশন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। সংসদের মোট ৩০০ আসনের ২৯৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের কমিশন কর্তৃক বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পরবর্তী ১৫ বছর অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা প্রথমে তাদের ক্ষমতা দখলকে তথাকথিত বৈধতা দেয়ার জন্য ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে নির্বাচন কমিশন ও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রজাতন্ত্রের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় রায় নিজেদের পক্ষে নেন। এরপর তারা বেসামরিক লেবাস পরে যেসব সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন, সেগুলোর ফলাফল ছিল পূর্বনির্ধারিত। নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই ছকে বাঁধা থাকায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনোরূপ প্রভাব ফেলতে পারেনি। আর এ ধরনের পূর্বনির্ধারিত প্রহসনের নির্বাচনগুলোর ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।
নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের গণদাবির মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হয় এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বিএনপির শাসনামলে ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়, যা বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে জোরদার করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগ দেয় জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালের ফেব্র“য়ারিতে একদলীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সপ্তম, ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের অষ্টম এবং ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতার জন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। এসব নির্বাচন পরিচালনায় সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। তবে ২০০৪ সালে বিএনপির শাসনকালে ঢাকা-১০ আসনে উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয় এবং বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক আলী ফালু নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচিত ঘোষিত হন।
নবম সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগের গত মেয়াদে (২০০৯-১৩) ২০১২ সালের প্রথমদিকে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশন ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মার্চ-এপ্রিলে উপজেলা নির্বাচন, চলতি বছর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং সদ্য অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়েছে।
এখন নিবন্ধের মূল বিষয় অর্থাৎ ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে খুব শিগগিরই সরকারের পরিবর্তন হবে’- বিএনপির চেয়ারপারসনের এমন আশাবাদ প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। দশম সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় এবং এতে জনগণের-আকাঙ্ক্ষার বিশ্বাসযোগ্য আশা প্রতিফলন না ঘটায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহসহ প্রায় সারা গণতান্ত্রিক বিশ্ব হতাশা প্রকাশ করে এবং বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এমনকি ভারত ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন সমর্থন করলেও তারা একই সঙ্গে দেশে রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে আরেকটি সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শেখ হাসিনার সরকারকে পরামর্শ দেয়। এতে সরকার এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এ নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬ জানুয়ারি গণভবনে নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে আলোচনার মাধ্যমে একাদশ সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন। দুঃখের বিষয় কয়েক মাস যেতে না যেতেই তিনি তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসেন এবং তার সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এ অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগ সরে আসছে কিনা এমন খবর জানা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ এবং জাতিসংঘ বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকুক ভারতের বর্তমান সরকারও চায়। এসব কারণেই হয়তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশম সংসদ নির্বাচনের পরপরই দেয়া তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে আগাম নির্বাচনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। তাছাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ও পৌরসভা নির্বাচনে দলের সাফল্য আওয়ামী লীগকে আগাম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে উৎসাহিত করে তুলতে পারে। পদ্মা সেতু নির্মাণসহ সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে গৃহীত কার্যক্রম এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনে অভাবিত সাফল্য বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা বহু পরিমাণে বাড়িয়েছে। আগাম নির্বাচন দিয়ে এ জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতে উদ্যোগী হতে পারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
সবশেষে যা বলা দরকার তা হল, জনগণ চায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হোক একটি জাতীয় সরকার। জাতীয় ও স্থানীয় সব পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হোক নির্ভেজাল গণতন্ত্র। ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র পচে গেছে’ মর্মে বিদেশী মিডিয়ায় যে খবর প্রকাশিত হয় তার অবসান হোক। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব ও কলাম লেখক
latifm43@gmail.com

প্রথম শ্রেণীর ভর্তি থেকে বই উৎসব কী আনন্দ, কী কান্না! by বদিউর রহমান

প্রথম শ্রেণীর ভর্তিতে এবার আমি তৃতীয় প্রজন্মে পড়লাম। আমার নিজের ভর্তি, তারপর আমার দু’ছেলের ভর্তি, আর এবার আমার পোতার (ছেলের ছেলে) ভর্তি- এ তিন প্রজন্মের ভর্তিতে ১৯৫৭ থেকে ২০১৫ (ডিসেম্বর) সে কী এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। ষাটের দশকের শেষের দিকেও ছাত্ররাজনীতির দেয়াল-লেখনীতে স্লোগান ছিল- শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার। আমরা যখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন শিক্ষা সুযোগ না অধিকার তার কোনোটাই জানতে পারিনি। তখন শহরে কিন্ডারগার্টেন ছিল কিনা তাও জানতাম না। উত্তম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সপ্তম শ্রেণী থেকে ক্যাডেট কলেজ ছিল সুপরিচিত। এখন কিন্ডারগার্টেন আর ক্যাডেট মাদ্রাসাও ছড়িয়েছে প্রায় গ্রাম্যবাজার পর্যন্ত। ছড়াবে নাই বা কেন, রাজনীতির পর স্কুল-মাদ্রাসা এখন আরেক বড় ব্যবসা। আগে আমরা বিষয়ভিত্তিক স্যার বলতাম, স্যারের নাম মুখে আনতাম না, অনেকের নাম জানতামও না। অতএব স্যারদের পরিচিতি ছিল হেড স্যার, হুজুর, বাংলা স্যার, ইংরেজি স্যার, অংক স্যার ইত্যাদি। এখন শিক্ষা ব্যবসায়ী অনেক স্যারের নাম দেয়ালে, ছোট্ট ছোট্ট কাগজে, সংবাদপত্রের ভাঁজে ভাঁজে অমুক স্যার, অমুক স্যার। তারপর আবার শ্রেণীর সে কী বিন্যাস- আর্লি ওয়ান, আর্লি টু, প্লে, নার্সারি, কেজি ওয়ান, কেজি টু, তারপর নাকি ওয়ান। কত বই, কত খাতা, কত রং পেন্সিল- শিক্ষার কত কত উপকরণ! দেশে যেহেতু সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কম, বিশেষত ছাত্রছাত্রীর অনুপাতে শহরে আরও কম, সেহেতু শিক্ষা এখন একটা ব্যবসারও ক্ষেত্র। টাকাওয়ালারা হাসপাতাল-ক্লিনিকের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও বেশ চালাতে পারছে। ভর্তির মৌসুমে তো কোনো কোনো অভিভাবক ঝুঁকি না নেয়ার জন্য সুযোগ হাতে রাখতে একাধিক স্কুল-কলেজেও নিজ সন্তানদের ভর্তি করিয়ে থাকেন। পছন্দমতো ভালোটাতে পরে যদি না হয়, এ ভয়ে হাতের পাঁচ হিসেবে অন্যটাতেও ভর্তি করিয়ে রাখেন। ভর্তির তারিখ ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায়, ফল প্রকাশের (ভর্তির) তারিখ ভিন্ন হওয়ায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের এ ছাড়া উপায়ও থাকে না। ছাত্রছাত্রী পরে অন্য স্কুলে ভর্তি হল, আগের প্রতিষ্ঠান ফাও অনেক টাকা পেয়ে গেল, পরে আবার ওই শূন্য আসনে নতুন ভর্তি, আবার টাকা, কী মজা! আবার বড় ছেলেকে নর্থ সাউথে ভর্তি করিয়ে আমি দশ হাজার টাকা গচ্চা দিলাম। গত বছর এক বৃহস্পতিবার বিকালে ভর্তি করিয়ে শনিবার সকালে ভর্তি বাতিল করায়ও আমার এক নাতনির জন্য ক্যামব্রিয়ান আবার পঁচিশ হাজার টাকা খেয়ে ফেলল। মারবেই তো ভর্তি ফিস যে অফেরতযোগ্য! আহা, এমন ব্যবসা না হলে কী আর এসব প্রতিষ্ঠানের আলিশান আলিশান দালানকোঠা আর ক্যাম্পাস বাড়ে!
তিন প্রজন্মের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তিতে কী পার্থক্য দেখলাম তা যেন ভাববার বিষয়। আমার দাদা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, তখন বলা হতো পণ্ডিত। আমি অবশ্য তাকে শিক্ষক হিসেবে পাইনি, আগেই তিনি অবসরে। তবে দাদার মুখে পণ্ডিতদের প্রভাব আর দায়িত্বের কথা শুনেছিলাম। আবিদ আলী পণ্ডিত নামে দাদার (এ দাদা মানে আব্বার আব্বা, বড় ভাই বা গডফাদার দাদা নন) এক সহকর্মী একদিন পড়া না পারায় স্থানীয় কদুর তেল কোম্পানির মালিকের ছেলেকে বেশ বেত্রাঘাত করেছিলেন। বেত্রাঘাত, নিলডাউন, সূর্যচেঙ্গী, নাকে খত, কানমলা, এমনকি স্লেট-ডাস্টার দিয়ে মারাও তখন স্বীকৃত শাস্তি ছিল। স্থানীয় জগইর গ্রামের ফেনী কদুর তেল কোম্পানির মালিকের বড় নাম, ফেনীতে তাদের কারখানা ও অফিস। আমাদের এলাহিগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য ছাত্ররা ফেনী গেলে তাদের ফেনীর অফিসে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হতো। দানশীল হিসেবেও তাদের খ্যাতি ছিল। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার হওয়ার পর ছোট্ট সময়ে তাদের নামে ছড়া হয়েছিল- অদুর বাপের কদুর লোট, রাস্তা হল ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের অধীনে তাদের সহায়তায় রাস্তা হওয়ার সুবাদে ছন্দমেলানো এ ছড়া তখন মুখে মুখে ছিল।
যাক যা বলছিলাম, বেত্রাঘাত খেয়ে ওই ছাত্র কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গিয়ে আবিদ আলী পণ্ডিতের তাকে মারার কথা জানালেন। অভিভাবক ছেলেকে নিয়ে স্কুলে হাজির, দাদাসহ আবিদ আলী পণ্ডিত ভয় পাচ্ছিলেন, কদুর তেল কোম্পানির ছেলেকে মেরে না জানি কী ঝামেলায় পড়লেন। অভিভাবক মারের কারণ জিজ্ঞেস করলে পরপর কয়েকদিন পড়া না শেখার কারণ জানালেন আবিদ আলী পণ্ডিত। এরপর অভিভাবক পণ্ডিতকে বলে গেলেন, এরপর পড়া না শিখে এলে ছেলের সব মাংস আপনার, আমার জন্য শুধু তার হাড়গুলো রাখলেই চলবে। হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বলতেন, স্পেয়ার দ্য রড অ্যান্ড স্পয়েল দ্য চাইল্ড। আগে পড়ার জন্য মারের এমন স্বীকৃতি ছিল, এখন তা ভাবাও কষ্টকর। জমানা বদল গ্যায়া!
হ্যাঁ, জমানা বদল হওয়াতেই শিক্ষার প্রসার বেড়েছে, মান বেড়েছে কিনা এখনও প্রশ্নসাপেক্ষ। বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের চাকরির পরীক্ষা নিতে গিয়ে অনেক করুণ চিত্র লক্ষ্য করেছি। এবার প্রাথমিক পিইসি এবং নিু মাধ্যমিক জেএসসিতে ফলের উন্নয়ন বড় আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু প্রকৃত মেধা কতটুকু হয়েছে তা এখনও ভাবায়। আগের শিক্ষকরা শেখানোতে যত আগ্রহী ছিলেন, এখন পাসের জন্য তত বেশি প্রতিযোগিতা। সরকারের স্কুল অনেক বেড়েছে, শিক্ষকদের সুবিধাও তুলনামূলকভাবে বেশ বেড়েছে, কিন্তু ছাত্রের প্রতি আগের মতো দায়িত্বশীলতা বেড়েছে মর্মে মনে হয় না। আমরা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি। বড় ভাইয়ের সঙ্গে স্কুলে যেতে যেতে শিশুশ্রেণীতে বসে বসে পরে যে কোন ফাঁকে পঞ্চম শ্রেণীতে উঠে গেছি বুঝতেই পারলাম না। দাদার মুখে শুনেছিলাম, আগে উচ্চ প্রাইমারি ছিল ষষ্ঠ শ্রেণী, চতুর্থ শ্রেণী ছিল নিু প্রাইমারি, শিক্ষকরা বেশিরভাগ ছিলেন নন-মেট্রিক জিটি। জিটি মানে জেনারেল ট্রেনিং। মাঠে গরু বেঁধে দৌড়ে ক্লাসে এসেছেন কেউ কেউ। নিবেদিত প্রাণ ছিলেন অনেক শিক্ষক, হাতে-কলমে শিখিয়ে তবে ছুটি, দায়সারা বাড়ির কাজে অভিভাবকদের বোঝা তেমন বাড়াতেন না। সুন্দর হস্তাক্ষর, দ্রুতলিপি, শ্রুতলিপি- আমরাও পেয়েছিলাম। খড়িমাটির অর্থাৎ চকের কালো বোর্ডের জমানা এখন লুপ্ত হওয়ার পথে, কাঠের স্লেটতো নেইই বলা চলে, বাঁশের কঞ্চি থেকে কলম বানানো, সজারুর কাঁটাকে কলম বানিয়ে লেখা- সে কী আর এখন ভাবতে। যাক, প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির ঝামেলা তো ছিলই না, বরং স্কুলে গেলেই হল। পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষার সময় জানা গেল আমি প্রথম শ্রেণীতে ভর্তিই হইনি। প্রধান শিক্ষক আমাদের স্বনামধন্য হেড স্যার মরহুম হাসিমউল্লাহ চৌধুরী প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে নিলেন, জন্ম তারিখটা তিনি হিসাব করে দিলেন। বললেন, তুই আমাদের ওস্তাদের নাতি, ভর্তি না হয়েই পার পেয়ে গেলি। গ্রামে এখনও ভর্তির এত ঝামেলা নেই, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতে বরং ছাত্রছাত্রীর চাপ কমেছে। সরকারের শিক্ষা প্রসারের উদারনীতি আর নানা রকমের সুযোগ-সুবিধা আর উপবৃত্তি প্রাথমিক শিক্ষাকে অনেক প্রসারিত করেছে। এখন গ্রামের স্কুলে না যাওয়া শিশু খুবই কম। সরকারের চলমান প্রক্রিয়ায় শিক্ষার হার বেড়েছে, ঝরে পড়া কমেছে, কিন্তু বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের অবসর সুবিধা আর কল্যাণ ভাতা পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চার বছরের বেশি বিলম্ব বড় দুঃখজনক। এদিকে সরকারের নজর দেয়া আবশ্যক মনে করি।
আমার ভর্তি তো বিনা ভর্তিতেই হয়ে গেল। কিন্তু আমার দু’ছেলের বেলায় সে এক ভিন্নরূপ। একে-তো ঢাকা শহর, তদুপরি নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি- সে কী কাণ্ড! প্রথমে কলোনির বিদ্যানিকেতনে প্লে, তারপর, নার্সারি, অপর সুযোগ নিয়ে রাখার জন্য শুক্রাবাদে এক স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে রাখা। এদিকে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের ভর্তি পরীক্ষার জন্য শিক্ষকের কাছে কোচিং, কোচিং ক্লাসের পর বাসায় অনেক শিটের হোম-ওয়ার্ক, ছাত্রের মায়েদের সে কী ব্যস্ততা। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন দেখে, তার আগে নমুনা দেখে আমি-তো তাজ্জব, রীতিমতো বিসিএস যেন। ছাত্রগুলো দেখি অনেক এগোনো, এরা পারেও। বাংলা ছড়া, কবিতা, অংক থেকে শুরু করে সাধারণ জ্ঞান, কিছু জ্যামিতিক চিহ্ন, শূন্যস্থান, একজাতীয়, ভিন্নজাতীয় কত রকমের জ্ঞান-পরীক্ষা! আমার এখনও পরিষ্কার মনে আছে, কোনটি একজাতীয় নয় এমন এক প্রশ্নে মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, তামাক- এ চারটি শব্দ দিয়ে একজাতীয় নয় শব্দটিতে টিক দিতে বলা হয়েছে। স্কুলের মডেল উত্তর ছিল মাছ, কিন্তু এক ছাত্র তামাক বললে তার মা ভুল হয়েছে বললেন। ছেলে বলল, তাকেও নম্বর দিতে হবে, তারটাও শুদ্ধ। সে ব্যাখ্যা দিল মা মাছ, পেঁয়াজ, রসুন একসঙ্গে রান্না করেন, তামাক রান্না করা হয় না। অতএব ভিন্নজাতীয় হচ্ছে তামাক। কৌতূহলবশত তখন সহকারী প্রধান শিক্ষক জহিরুল হকের কাছে ছেলেটাকে নিয়ে গেলাম। স্যার, এই পিচ্চির ওকালতি যুক্তি শুনে বললেন, হ্যাঁ, ওকেও নম্বর দিতে হবে, তার যুক্তিটাও ঠিক, সে মেধাবী। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো আরও চৌকস, এরা মায়ের পেটে থাকতেই ইলেকট্রনিক টাচ্ পেয়ে যাচ্ছে। আমার পৌনে দু’বছরের নাতনি যেভাবে মোবাইল অন করে হ্যালো-হ্যালো করে, আমি-তো থ’ বনে যাই। ১৯৭০ সালে ল্যাবরেটরি স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর এক ছাত্রের ‘পোয়াবারো’ বাগধারা নিয়ে বাক্য গঠন দেখেছিলাম, সে লিখেছিল- শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হলে তোফায়েলের পোয়াবারো। আরেক ছাত্রের চা দিয়ে বাক্য ছিল- সকালে কাকগুলো, যেমন করে কা কা, বাঙালির ছেলেরা এখন ঘুম থেকে ওঠে করে চা চা। মেধার লড়াই, সে কী লড়াই; ভর্তির বেলায় নিজ ছেলেদের ক্ষেত্রে দেখেছি। তা-ও ছোট ছেলে প্রথম চান্সে উতরায়নি, আরেক শিফট করলে তারপর ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় চান্সে টিকেছে।
এবার তৃতীয় প্রজন্মে ছোট ছেলের ছেলের ভর্তি নিয়ে কৌতূহল হল। ঘোষিত হল, প্রথম শ্রেণীতে শুধু লটারি। রূপনগরের মনিপুর শাখায় লটারিতে ওয়েটিং-এ নাম পাওয়া গেল। কিন্তু শোনা গেল, যে যায় সেই ভর্তি হতে পারছে। ফরম বিক্রি বাবদ সব স্কুলই বোধহয় টাকা নিয়েছে। মিরপুর-১৪-এর পুলিশ স্কুলে আগে ছাত্রের মৌখিক পরীক্ষা, তারপর লটারি। শোনা গেল, যারা মৌখিক পরীক্ষায় টিকবে তাদের রোল নম্বর থেকে লটারি হবে- সত্য-মিথ্যা জানি না। পোতাকে (নাতি) গেট থেকে ভেতরে নেয়া হল, কোনো অভিভাবক ঢুকতে পারেনি। কী প্রশ্ন হল, কি পারল না-পারল জানলাম না। লটারিতে নাম নেই। হারম্যান মেইনারেও লটারিতে নাম নেই। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে প্রভাতি শাখায় ছাত্রের সঙ্গে তার মা এবং আমিও মৌখিক পরীক্ষার সময়ে গেলাম। এ স্কুলে ছাত্রের সঙ্গে অভিভাবক যেতে দিয়েছেন, বড় মুগ্ধ হলাম, অভিভাবক অন্তত ছাত্রের পরীক্ষা দেখতে পেরেছেন। বাংলা পড়তে দেয়া হল, আমার দাদা ভালো- লিখতে বলা হল। ছাত্র পড়তেও পারল, লিখতেও পারল, বরং দাদাকে ভালোর পরিবর্তে খুব ভালো লিখে দিল। শিক্ষক বললেন, একাডেমিক্যালি ফিট, কিন্তু সাইজে ছোট; বললাম, বয়স-তো সাড়ে পাঁচ পেরিয়েছে, প্লে-নার্সারি দুটো শেষ করেছে, যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ সহজগুলো পারে, দশ পর্যন্ত নামতাও পারে, এক থেকে একশ’ বাংলা-ইংরেজি অংকে এবং কথায় লিখতেও পারে। প্রয়োজনে আরও পরীক্ষা নিন। কিন্তু আর পরীক্ষার প্রয়োজন নেই বলে সুন্দর ব্যবহারে আমাদের বিদায় দিলেন। কিন্তু লটারিতে হল না। দিবা শাখায় লটারিতে নাম উঠল, ভর্তিও হল, ইংরেজি নববর্ষের প্রথমদিন উৎসব আমেজে নতুন বইও পেল। বেশ সুশৃঙ্খলভাবেই আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল বই বিতরণের উৎসবটা সেরে নিল, চমৎকার।
অনেক শিশু ভর্তি হতে পারেনি নিজের পছন্দের ভালো স্কুলে। তাদের মায়েদের কারও কারও সে কী কান্না! বিপরীতে যারা ভর্তি হতে পেরেছে তাদের সে কী আনন্দ! এক মা তো বলেই ফেললেন, দশটা স্কুলে দৌড়ালাম, তারচেয়ে নিজে একটা স্কুল খুলে ফেললেই ভালো করতাম। হ্যাঁ, এ জন্যই তো অলিতে-গলিতে কত কত স্কুল হয়েছে। আচ্ছা, ভর্তি নিয়ে এত কষ্টের কী কোনো সমাধান সম্ভব নয়? সরকার কি এ বিষয়ে আরও অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে না? পছন্দমতো একটা ভালো স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হলে সে কী প্রশান্তি, অন্তত দশ বছরের স্বস্তি, যেন এক সোমনাথ মন্দির বিজয়। এ বিজয় আরও সহজ করা হোক।
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

বলাৎকার মামলার রায়ের আগে আনোয়ার ইব্রাহিমের সফর

মানবজমিন ডেস্ক: মালয়েশিয়ার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী, বর্তমান বিরোধী নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম তার বিরুদ্ধে বিতর্কিত বলাৎকার মামলার রায় ঘোষণার আগে দেশজুড়ে এক রাজনৈতিক সফরে বের হয়েছেন। দুই বছরের বিচারপ্রক্রিয়া শেষে আগামী ৯ই জানুয়ারি এই মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়া হতে পারে। ফলে আগামী নির্বাচনে তার অংশ নেয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আনোয়ার ইব্রাহিম নির্বাচনকে সামনে রেখে মঙ্গলবার তার দলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়ার জহুর থেকে ৬ দিনের এই সফরের সূচনা করেছেন। তার এই সফর মালয়েশিয়ার  ৮টি প্রদেশ পরিভ্রমণ করে রাজধানী কুয়ালালামপুরে হাইকোর্টের সামনে রায় ঘোষণার আগে এক সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হবে। আনোয়ার ইব্রাহিম এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই সফর কেবল আমাকে নির্দোষ ঘোষণার জন্য নয়- দেশকে আরও গণতান্ত্রিক ও উন্মুক্ত করতে এবং প্রধানমন্ত্রী নজিব রাজাকের সরকারকে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরানোর যে এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময় জনগণকে এ কথা বোঝানোর জন্যই এই সফর। আনোয়ার ইব্রাহিমের দল কিদিলান রেকায়েতের যুব শাখার প্রধান সামসুল ইসকান্দার রায় ঘোষণার দিন প্রায় ২০ হাজার লোকের জমায়েত হবে বলে জানিয়েছেন।

মধ্যম আয়ের দেশ বনাম উন্নত জাতি by সৈয়দ আবুল মকসুদ

কোন রেস্তোরাঁর রান্না সুস্বাদু, তা তার ভোজনকারীরাই ভালো জানেন, তার মালিক বা ম্যানেজার নন। কোন ভাষার সাহিত্যের অবস্থা কী, তা সেই ভাষার লেখকদের চেয়ে পাঠকেরা ভালো বলতে পারেন। কোন হাসপাতালের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা কেমন, তা তার ডাক্তার-নার্সদের চেয়ে রোগী ও তাদের দেখাশোনায় নিয়োজিত সঙ্গীরাই ভালো জানেন। কোন ট্রেনে যাতায়াতে কী সুবিধা-অসুবিধা, তা ওই ট্রেনের চালক ও গার্ডের চেয়ে যাত্রীরাই সঠিক বলতে পারেন। কোন দেশের কী অবস্থা, তা সে দেশের সরকারের চেয়ে সাধারণ মানুষ হাজার গুণ বেশি জানে। এবং তাদের মতামতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—অন্য কারও সার্টিফিকেট নয়।
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ৪৫ বছরে পা দিয়ে বাংলাদেশ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে—এমন প্রশ্ন যদি কেউ করেন, এক কথায় জবাব দেওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কেউ বলতে পারেন, একটি নিম্ন মাঝারি পর্বতের ওপর দাঁড়িয়ে। কেউ বলবেন তিনি দাঁড়িয়ে নেই, নিম্ন মধ্যম গতিতে ছুটে চলেছেন। কেউ বলবেন, তিনি একটি মাঝারি পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন বটে, কিন্তু তার পাশেই গভীর এক খাদ, নড়াচড়ায় অসাবধান হলেই সর্বনাশ!
মোটামুটি আশাবাদী, তবে খুব সাবধানি কোনো সাধারণ নাগরিক বলবেন, বাংলাদেশের একদিকে সম্ভাবনা, আরেক দিকে অনিশ্চয়তা। একদিকে অশেষ আশার আলো, আরেক দিকে অপার হতাশার অন্ধকার। একদিকে সূর্যালোক, অন্যদিকে ঘন কুয়াশা। খুব ভালো নেতৃত্বই পারে অনিশ্চয়তা, অন্ধকার ও কুয়াশার অমঙ্গল থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে।
সব বাঙালিই, তা তিনি বাংলাদেশিই হোন বা অন্য কোনো দেশের হোন, মেটাফোর বা রূপক-অলংকার দিয়ে ভাব প্রকাশ করা পছন্দ করেন। একশ্রেণির বাঙালি সমস্বরে বলছেন, বাংলাদেশ নাকি এশিয়ার বাঘ হতে যাচ্ছে। বাঘ—তা মানুষের চেয়ে যত বেশি শক্তিমানই হোক, সে পশু। পশুর ভেতরে পাশবিকতাই প্রাধান্য পাবে, মানবিক গুণাবলি নয়। ৪৫ বছর আগে যখন আমাদের মধ্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার স্পৃহা জাগ্রত হয়, সেদিন আমরা একটি মধ্যমানের মহৎ জাতি হতে চেয়েছিলাম। বাঘ-ভাল্লুক নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিন্দুকে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা মজুত আছে, তা দিয়ে কোনো জাতির যোগ্যতা ও মহত্তের পরিমাপ হয় না।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঢাকার রাস্তায় মোটরগাড়ির দীর্ঘ সারি বা যানজট দেখে সন্তুষ্ট ও তাজ্জব হয়েছেন। কারণ, এত চকচকে দামি গাড়ি দুই দশক আগে তিনি দেখেননি। রাস্তায় দামি মোটরগাড়ির বহর টেকসই অর্থনীতির পরিচয় কি না, তা আমার মতো অজ্ঞ লোকের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমরা সাধারণ মানুষ শুধু এটুকুই বলতে পারি, এই গাড়িবহর দেখে আমরাও খুশি হতে পারতাম, যদি গাড়িগুলো মালয়েশিয়ার মতো আমরাই তৈরি করতাম। প্রমোশন পেলাম প্রায় মধ্যম আয়ের দেশে, বানাতে পারি না একখানা মোটরগাড়ি। অথচ স্বাধীনতার আগেই প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ চট্টগ্রামে মোটরগাড়ি বানাতে শুরু করেছিল।
স্বাধীনতার পরে দেশে বহু নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। পাটকল, চিনিকল প্রভৃতি বহু পুরোনো শিল্প ধ্বংস হয়েছে দুর্নীতির কারণে। গড়ে উঠেছে তৈরি পোশাক, সিমেন্ট প্রভৃতি শিল্প। কর্মসংস্থানও হয়েছে বহু মানুষের। জিডিপিতে শিল্প খাত থেকে অর্জন ৩০ শতাংশের বেশি। অথচ এই খাতের ৯০ শতাংশ শ্রমিকের সামাজিক ও আইনগত সুরক্ষা নেই। অনানুষ্ঠানিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের নিরাপত্তা নেই। এমপ্লয়মেন্ট বেনিফিট থেকে তাঁরা বঞ্চিত।
আমরা অবশ্যই মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই। তবে যেটা বেশি চাই তা হলো উন্নত জাতির দেশ। যেখানে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব পাবে, কিন্তু প্রাধান্য পাবে জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড লুণ্ঠনের অর্থনীতি আর উন্নয়নের অর্থনীতি দুই জিনিস। রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি ছোট্ট শ্রেণি যখন ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন তা অনুৎপাদনশীল অর্থনীতি। দুর্নীতির অর্থনীতি ও দুর্নীতির সংস্কৃতি যখন একাকার হয়ে যায়, তা দেশকে টেকসই অর্থনীতি উপহার দেয় না। দায়িত্ববান গণমুখী রাজনীতি ছাড়া উৎপাদনশীল অর্থনীতির প্রাধান্য সৃষ্টি হবে না।
সাবেক বাঙালি মধ্যশ্রেণি একটি অনতিক্রান্ত বৃত্তের মধ্যে আটকে আছে। সমাজে উচ্চবিত্ত শ্রেণির আকার বাড়ছে। উন্নয়নের সুফল তারাই ভোগ করছে। বারো আনা মানুষ উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত। সামগ্রিক উন্নয়ন আর শ্রেণিবিশেষের আংশিক উন্নয়ন দুই জিনিস।
বাঙালির সভ্যতা হচ্ছে গ্রামীণ কৃষি সভ্যতা। সেই কৃষি ও গ্রামই উপেক্ষিত। উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের, পেশাজীবীদের সম্পর্ক শূন্য। গ্রামে এখন যে ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তাতে উপকৃত হচ্ছে সরকারি দলগুলোর ক্যাডার ও টাউট-ধড়িবাজ ধরনের মানুষ—সব শ্রেণির পেশাজীবী সাধারণ মানুষ নয়।
জাতি গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। বিশাল যুবসমাজের মেধা ও শক্তি অব্যবহৃত থাকছে। তার ফলে রাষ্ট্র থাকছে বঞ্চিত তাদের সেবা থেকে। অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে হতাশা দেখা দিচ্ছে। তাদের কেউ কেউ উগ্রপন্থায় ঝুঁকে পড়লে সমাজের ও জাতির সর্বনাশ ঘটবে। বিশেষ করে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা যদি হতাশায় ভোগে, তারা ধরবে মাদক, ঝুঁকবে যৌনাচারের দিকে। গরিবের সন্তানদের ক্ষোভ থেকে যে হতাশা, তার ফলে তারা হিংসার পথ ধরবে। হিংসার পথ হলো উগ্র রাজনীতির পথ। বিশ্বব্যাপী এই পথটি বর্তমানে খুবই বাণিজ্যসফল। সমাজে অনুৎপাদনশীল অর্থনীতি যত বিস্তৃত হবে, উগ্র রাজনীতির কর্মীদের অর্থায়নের সুযোগও তত বাড়বে।
জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টিশীল কাজের চেয়ে আমরা অর্থহীন হট্টগোলে বেশি অভ্যস্ত। সরল মানুষের মন ভোলানোর কায়দা রপ্ত করেছি ভালো। মানসম্মত বই পড়ে মেধার বিকাশ ঘটানো এক কথা আর নতুন বই নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক-শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা-মন্ত্রীসহ লাফালাফি করা আরেক জিনিস। মানবজাতির ইতিহাসে কোনোকালে কোনো দেশে বই উৎসব নামে কিছু হয়েছে, ইন্টারনেট ঘেঁটে তা পাওয়া যাবে না। যে দেশে বই উৎসব উদ্ভাবিত হয়, সেখানে বিদেশি অনুদানে অর্থনৈতিক অবস্থা আর একটু ভালো হলে ব্যাগ উৎসব, খাতা উৎসব, পেনসিল উৎসব হবে না তার নিশ্চয়তা কী? তা ছাড়া বই দিয়েছে রাষ্ট্র বিনা মূল্যে, অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তা প্রকাশ্যে করছেন বিক্রি। এই আমাদের নৈতিকতা!
দুই দিন আগে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা জগন্নাথ হলে বলেছেন, শিক্ষার মান আগে কী ছিল আর এখন কী হয়েছে। নিম্নমানের শিক্ষা যারা পাচ্ছে, তাদের কেউই উঁচু মাপের কিছু হতে পারবে না। বড় লেখক হতে পারবে না, গবেষক হতে পারবে না, বিজ্ঞানী হতে পারবে না। দেশে জীবন রক্ষাকারী নতুন ওষুধ বা নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হবে না। এ-জাতীয় বিদ্যায় তেজারতি করে বা নানা অবৈধ উপায়ে টাকা রোজগার করতে পারবে। তার ফলে দেশ মধ্যম আয়ে প্রমোশন পাবে। আমাদের ওই মধ্যম আয়ের দেশে উপকৃত হবেন বিদেশি এয়ারলাইনস, ব্যাংকক ও বালি দ্বীপের পর্যটনকেন্দ্রগুলো, বামরুনগ্রাদ ও মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মালিকেরা।
আমাদের পরম হিতার্থী বিশ্বব্যাংক চায় আমরা দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশ হই। সরকারি দলেই থাকুন আর বিরোধী দলেই থাকুন, আমাদের শাসকশ্রেণির পরিকল্পনাবিদেরা চান বাংলাদেশের গায়ে মধ্যম আয়ের তকমা আঁটতে। বাংলাদেশের মতো একটি জাতিরাষ্ট্রের, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অপরিমেয় রক্তের বিনিময়ে, প্রধানতম ও একমাত্র অন্বেষা হওয়া উচিত উন্নত জাতি গঠন।
আমাদের মাথা ছোট, বিদ্যা-বুদ্ধি কম, তবে এটুকু বুঝি যে নিম্নমানের শিক্ষা দিয়ে নানা কায়দায় টাকা কামাই করা যায়, যোগ্য ও উন্নত মানুষ হওয়া যায় না। বহু পাইকারি বাজারে ভুঁড়িঅলা আড়তদারের অনেক টাকা; একজন বিজ্ঞানী, শিল্পী বা দার্শনিকের তাঁর তুলনায় অর্থবিত্ত অতি কম, জগতে কার দাম বেশি বা মানবজাতির জন্য কার প্রয়োজন বেশি?
দারিদ্র্য দূর করে, বৈষম্য কমিয়ে আমরা অবশ্যই মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই। তবে তা হই বা না হই, যেটা বেশি চাই তা হলো উন্নত জাতির দেশ। যেখানে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব পাবে, কিন্তু প্রাধান্য পাবে জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

নিজামীর ফাঁসি বহাল, বৃহস্পতিবার সারাদেশে জামায়াতের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ  আজ এ রায় ঘোষণা করে। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই পুরো সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
গত বছরের ২৯শে অক্টোবর জামায়াতের প্রধান নেতা নিজামীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। তার বিরুদ্ধে গঠন করা ১৬টি অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগ প্রমাণিত হয় বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়। এর মধ্যে চারটি অভিযোগে তাকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৩শে নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন তিনি। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯শে জুন মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই বছরের ২রা আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বৃহস্পতিবার সারাদেশে জামায়াতের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল
জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার প্রতিবাদে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে দলটি। বুধবার সকালে জামায়াতে ইসলামীর ওয়েব সাইটের মাধ্যমে দলটির ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এক যুক্ত বিবৃতির মাধ্যমে এ হরতালের ডাক দেন। বিবৃতিতে বলা হয়, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ঠাণ্ডা মাথায় সরকারের নির্ধারিত ছকে হত্যা করে সরকার পরিকল্পিতভাবে দেশকে এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে চায়। সরকারের জুলুম, নির্যাতন ও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে আমরা আগামীকাল ৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা শানিত্মপুর্ণ হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করছি। বিবৃতিতে ঘোষিত কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সফল করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সকল শাখা এবং কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ ও পেশাজীবীসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ তথা দেশের আপামর জনতার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। তবে বিবৃতিতে জানানো হয়, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, ফায়ার সার্ভিস ও সংবাদপত্রের গাড়ি হরতালের আওতামুক্ত থাকবে।
‘অপরাধ স্বীকার করিনি’
জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, যেহেতু আদালত রায় দিয়েছে তাই আইনজীবী হিসেবে তাদের এ রায় মেনে নিতে হবে। রিভিউ দায়েরের ব্যাপারে তিনি বলেছেন, এ ব্যাপারে নিজামীর পরামর্শ অনুযায়ী তারা কাজ করবেন।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমরা শুনানিতে কোন অপরাধ স্বীকার করিনি। আমরা বলেছিলাম, এই মামলার অভিযোগেই বলা হয়েছে, পাকিস্তানি আর্মি এসব ক্ষেত্রে প্রধান আসামি। নিজামীকে বলা হয়েছে সহযোগী আসামি। প্রধান আসামি, পাকিস্তানি আর্মি যাদের আমরা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলাম তাদের ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। আমরা বলেছি, প্রধান আসামিদের ছেড়ে দিয়ে সহযোগী আসামিদের শাস্তি দেয়া যায় না। এরপরও যদি শাস্তি দেয়া হয় কিছুতেই সে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না। তিনি বলেন, কে অপরাধার করেছে আর কে করে নাই তা ভবিষ্যতে ইতিহাসের মাধ্যমে সবাই জানবে। তিনি বলেন, নিজামী একজন ইসলামি চিন্তাবিদ। ট্রাইব্যুনালের রায়েও তা বলা হয়েছে। তিনি বয়স্ক মানুষ। এসব দিক বিবেচনা করে আমরা আবেদন জানিয়েছিলাম যেন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া না হয়।

উন্নত রাজনীতির আকাঙ্ক্ষায় by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম
নববর্ষের শুভেচ্ছা দিয়েই শুরু করছি। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের আগমন উপলক্ষে আমি ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখের অপরাহ্ণ ৬:২৫-এর সময় আমার ফেইসবুকে যে স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলাম, সেটি এখানে হুবহু উদ্ধৃত করছি। উদ্ধৃতি শুরু। নববর্ষ ও শুভেচ্ছা। সৌরজগতে চন্দ্র এবং সূর্য, মহান সৃষ্টিকর্তার হুকুমেই নিজ নিজ কক্ষপথে চলছে ও ঘুরছে। চন্দ্র-সূর্যের ভ্রমণের অনেক মাপের সমষ্টিগত একক হচ্ছে একটি বছর। আমাদের জীবনের দৈর্ঘ্য যতটুকুই হোক না কেন, ঐখান থেকে, একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব কমে গেল। শেষপ্রান্ত আরো একটু কাছে এগিয়ে এলো! অবশিষ্ট জীবনের, আগামী বছরটি ২০১৬ যেন সুন্দর ও ফলপ্রসূ হয় সবার জন্য এই প্রার্থনা। উদ্ধৃতি শেষ।
আলোচনা ও সমালোচনায় ২০১৫
বিগত বছরটি ঘটনাবহুল ছিল। প্রথম তিন মাস আন্দোলনে উত্তপ্ত ছিল। আন্দোলনকারীরা করুক বা আন্দোলনের বিরোধিতাকারীরা করুক, অনেক সহিংস ঘটনা ঘটেছিল যেটি পরিহার্য ও নিন্দনীয়। মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ছিল। বছরের একদম শেষে অনেক পৌরসভায় নির্বাচন ছিল। মুক্তিযুদ্ধ আলোচনায় এসেছে একাধিক আঙ্গিকে; ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের এবং সরেজমিন বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে আলোচনা ও সমালোচনা ছিল প্রচুর। নির্বাচন কমিশন ছিল আলোচিত ও সমালোচিত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে, পুকুর বা নদী বা সাগর চুরি নয় বরং মহাসাগর-চুরির যে প্রক্রিয়া উদ্ভাসিত হয়েছে সেটিও আলোচিত ছিল। ব্যক্তি ইবরাহিম অথবা পরিবার প্রধান ইবরাহিম অথবা কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান ইবরাহিমও ব্যস্ত ছিল এবং আলোচিত-সমালোচিত ছিল। আমার ব্যস্ততার অন্যতম একটি আঙ্গিক হলো পত্রিকার জন্য কলাম লেখা এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর পক্ষ থেকে দাওয়াত পেলে টকশোতে অংশগ্রহণ করা। পত্রিকায় কলাম লিখি প্রায় আঠারো বছর ধরে। ছয়টি কলাম-সংকলন বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে চারটি ভিন্ন প্রকাশনী সংস্থা থেকে। এই দীর্ঘ দেড় যুগ সময়ে, প্রচুর সংখ্যক কলামে আমি বাংলাদেশকে নিয়ে আমার চিন্তা চেতনা, বাংলাদেশের নেতৃত্ব প্রসঙ্গে আমার আগামী দিনের চিন্তাচেতনা এবং পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের অনুকরণীয় নেতৃত্ব প্রসঙ্গে লিখেছি। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশ যেন এগিয়ে যায়। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশে যেন পরিশীলিত, পরিমার্জিত যুযোপযোগী নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়। উদ্দেশ্য, আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়া। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের কলামটিতে ছোট ছোট দু’চারটি কথা তুলে ধরতে চাই, যেগুলো চিন্তাশীল পাঠকের জন্য চিন্তার খোরাক হতে পারে।
রাজনীতির জন্য রাজনৈতিক চিকিৎসক প্রয়োজন
১৯৬৮-৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অনার্স পড়ার সময়, প্রতিটি এক শ’ নম্বরের আটটি বিষয় ছিল। যতটুকু মনে পড়ে, একটি বিষয়ের নাম ছিল কমপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট ইকোনমি বা ওই ধরনের কিছু। ওই বিষয়ের আওতায় জাপান ও কোরিয়াসহ মোট চারটি দেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়া আমাদের পাঠ্যসূচিতে ছিল। এখন রাজনীতিতে এসে, শুধু উন্নয়নপ্রক্রিয়া নয়, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব প্রসঙ্গেও আমি তুলনামূলক পর্যালোচনা করতে বাধ্য। তবে স্থানাভাবে আমি শুধুমাত্র সুপরিচিত দু’টি দেশের নেতার কথা উল্লেখ করছি। একটি দেশ হলো সিঙ্গাপুর। ১৯৬৫ সালে বাধ্য হয়েই মালয়েশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা নিয়েছিল নগর রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর। ১৮ বছর একনাগাড়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লি কুয়ান ইউ। সিঙ্গাপুর নামক অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশকে উন্নত প্রথম বিশ্বের দেশে রূপান্তরিত করেছিলেন তিনি। আরেকটি দেশের নাম মালয়েশিয়া। একনাগাড়ে ২২ বছর মালয়েশিয়ার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার ডাক্তার মাহাথির মুহাম্মদ, তারা উভয়েই আত্মজীবনী লিখেছেন। মাহাথিরের লেখা দীর্ঘ বইটির নাম ‘এ ডক্টর ইন দি হাউজ’। নামটির বাংলা অনুবাদ করলে এ রকম দাঁড়ায়, ‘বাড়িতে একজন চিকিৎসক’। তরুণ বয়সে আইনজীবী হতে চাইলেও পরিস্থিতির কারণে মাহাথির চিকিৎসক হয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসক হিসেবে তিনি শুধু রোগী দেখেননি, চিকিৎসকের অভিজ্ঞতায় রাজনীতিকেও দেখেছেন। নিজের লেখা বইয়ের মধ্যেই মাহাথির মুহাম্মদ ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছেন যে, পঞ্চাশের দশকে বা ষাটের দশকে বা সত্তরের দশকেও মালয়েশিয়া নামক দেশ ও সমাজকে একটি রোগী বিবেচনা করলে, তার চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের প্রয়োজন ছিল। ওই ডাক্তার রাজনৈতিক ডাক্তার। মাহাথির মুহাম্মদ নামে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ওই রাজনৈতিক ডাক্তারের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই তিনি তার আত্মজীবনীর নাম দিয়েছেন ‘বাড়িতে একজন চিকিৎসক’। ইংরেজিতে বইটি অনেক দীর্ঘ; এতদসত্ত্বেও যাদের দ্বারা পড়া সম্ভব, তারা যেন এটি পড়েন সেই অনুরোধ রাখছি। এই অনুরোধ রাখার পেছনে একটি কারণ আছে। ইদানীং বাংলাদেশে পত্রপত্রিকায় এবং টকশোগুলোতে একটি বিষয় বহুল আলোচিত। বিষয়টি হলো অর্থনৈতিক উন্নতি আগে; নাকি গণতান্ত্রিক উন্নতি আগে? বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিরা এই মর্মে সোচ্চার যে, গণতন্ত্র যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গতি ও স্বচ্ছতা যদি একটু কমেও যায় তাতে কিছু আসে যায় না (!)। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের এরূপ ব্যক্তিরা প্রায়ই সিঙ্গাপুর বা কোরিয়া বা মালয়েশিয়ার উদাহরণ টানেন। এ জন্যই এই কলামের পাঠকদের মধ্যে যারা অধিকতর সচেতন তাদের কাছে অনুরোধ, তারা যেন মাহাথিরের আত্মজীবনী পড়েন। তা হলে তারা নিজেরাই পূর্ণ ধারণা পাবেন মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ার মধ্যে কী মিল আছে এবং কী মিল নেই। তারা এই ধারণাও পাবেন যে, মালয়েশিয়ার নেতা ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ ও তার পরিবার এবং বাংলাদেশের বর্তমান নেতা মাননীয় শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বৈশিষ্ট্যাবলী এবং কর্মকাণ্ডের মধ্যে কী মিল আছে এবং কী মিল নেই।
বাংলাদেশের সুস্থতা ও অসুস্থতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অসুস্থতার নিরাময় করার জন্যও চিকিৎসক প্রয়োজন। বাংলাদেশ কি রাজনৈতিকভাবে বা সামাজিকভাবে অসুস্থ? আমার মতে, উত্তর হলো অসুস্থ না বললেও অবশ্যই বলতে হবে যে, পুরোপুরি সুস্থ নয়। সুস্থতায় ঘাটতি কতটুকু অথবা অন্য ভাষায় কতটুকু অসুস্থ, তার উত্তর একেকজন চিন্তাশীল ব্যক্তি বা বিশ্লেষক একেক নিয়মে দিবেন। উত্তরটি পাঁচ পৃষ্ঠার রচনা থেকে নিয়ে পাঁচ শ’ পৃষ্ঠার বই করেও দেয়া যাবে। পাঁচ পৃষ্ঠার থেকেও ছোট হলো তিন হাজার শব্দের একটি কলাম। এ রকম একটি কলাম লিখেছেন একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক যার নাম পীর হাবিবুর রহমান। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিন নামক জনপ্রিয় পত্রিকার নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। আমি বাংলাদেশের অসুস্থতা প্রসঙ্গে উত্তর নিজের ভাষায় না দিয়ে, পীর হাবিবুর রহমানের ভাষায় দিচ্ছি। আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ মাস পূর্বে, মঙ্গলবার ২৫ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে তিনি ওই সময় যেই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন, সেই পত্রিকায় (বাংলাদেশ প্রতিদিন), যেই কলামটি লিখেছিলেন সেই কলামটির কিছু অংশ এখানে হুবহু উদ্ধৃত করছি। উদ্ধৃতি শুরু ... ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মতো কঠিন এবং রাজনীতির মতো দুর্বোধ্য বিষয় মোকাবেলা করেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক ছোট খাটো বিষয়ের সমস্যা সমাধানেও যখন ভূমিকা রাখতে দেখা যায় তখন নেতৃত্বের সঙ্কট উন্মোচিত হয়। দেশে দলীয়করণের প্রতিযোগিতা, প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা ও সম্মানের জায়গা সরিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। ছাত্র রাজনীতি মেধাবী সৃজনশীল ছাত্রদের কাছ থেকে বহু দূরে সরে গিয়ে ছাত্রসমাজের আস্থা হারিয়েছে। নিয়োগ-বাণিজ্য বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ স্বীকৃত হয়েছে। দুর্নীতি দিনে দিনে বহু বেড়েছে। রাজনীতিতে সহনশীলতার উল্টো পথে আগ্রাসী রূপ নিয়েছে প্রতিহিংসা। গুম, খুন মানুষের জীবনকে নিরাপত্তাহীন করেছে। ইয়াবাসহ মাদকের আগ্রাসন একেকটি পরিবারকেই নয় দেশের একটি প্রজন্মকে অন্ধকার পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সম্পদ সীমিত, জনসংখ্যা বাড়ছে। শিল্প, কলকারখানা থেকে ব্যবসায়-বাণিজ্যে বিনিয়োগকারীরার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, কর্মসংস্থানের খবর নেই। উন্নয়ন চলছে, দুর্নীতি থেমে নেই। রাজনীতিতে ত্যাগবাদী আদর্শের উল্টোপথে উন্নাসিক রূপ নিয়েছে, ভোগবিলাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। তদবিরবাণিজ্য সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। মানুষের লোভ-লালসা এতটাই তীব্র যে, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে বাজিকরদের আস্ফালন চলছে। গণতন্ত্রের নামে রাজনৈতিক দমনপীড়ন যেমন চলছে তেমনই আন্দোলনের নামে দেখা দেয় মানুষ হত্যা আর জানমালের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। সাংবিধানিকভাবে জনগণ ক্ষমতার মালিক হলেও রাজনৈতিক শক্তির কাছে মানুষের অধিকার ও সম্মানবোধ দিনে দিনে পদদলিত হচ্ছে... ।’ উদ্ধৃতি শেষ। কলাম লেখার চৌদ্দ মাস পরেও, কলাম-লেখক প্রখ্যাত সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমানের কথাগুলো হুবহু প্রযোজ্য। এরূপ পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘ দিনের অশুভ পৃষ্ঠপোষকতায় এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অতএব এরূপ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণও এক দিনে পাওয়া যাবে না।
যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ও ওইগুলোর প্রভাব
পরিত্রাণ পেতে হলে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। যেকোনো কাজ করতে গেলে শুধু শ্রম দিয়েও হয় না। মেধা, শ্রম, সময় এবং অর্থ এসব কিছুর সমন্বিত বিনিয়োগেই একটি ফলাফল পাওয়া যায়। কিন্তু সব কিছুর আগে প্রয়োজন একটি সিদ্ধান্ত। ইতিহাসের একেকজন মহানায়ক, তার পারিপার্শ্বিকতার পরিপ্রেক্ষিতে একেকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; সিদ্ধান্তগুলো যুগান্তকারী ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম সংবিধানপ্রণেতা ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনী থেকে, দক্ষিণ আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ কালো মানুষের মুক্তিদূত নেলসন মেন্ডেলার জীবনী থেকে, পূর্বতিমুরের স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা জানানান গুজমাও-এর জীবনী থেকে, উত্তর ভিয়েতনামের সংগ্রামী রাষ্ট্রনায়ক হো চি মিন এর জীবনী থেকে অনেক উদাহরণ আমরা টানতে পারি। বর্তমানে যা বাংলাদেশ, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সেটিই ছিল পূর্ব পাকিস্তান। নয় মাসের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের নেতৃত্বকেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তারা নিকটতম প্রতিবেশী, একটু দূরের প্রতিবেশী, অনেক দূরের প্রতিবেশী এরূপ রাষ্ট্রগুলোর সাথে কি রকম সম্পর্ক রাখবে এবং বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা কি রকম হবে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাথমিক বছরগুলোতে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো, পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবান্বিত করছে। স্থানের অভাবে সিদ্ধান্তগুলো আজ এখানে আলোচনা করছি না; অন্য দিন করব। সরকার বলছে যে, তারা বাংলাদেশকে অগ্রগতি ও উন্নয়নের মহাসড়কে তুলেছে। দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও আছে। কিন্তু সরকার যে কথাগুলো জনগণকে স্বচ্ছভাবে বলছে না সেটি হচ্ছে আপাতত দৃশ্যমান উন্নয়নের বিনিময় মূল্য কী? অর্থাৎ সামাজিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কতটুকু মূল্য দিয়ে বা কতটুকু ছাড় দিয়ে বা কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করে আমরা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছি?
একটি সুসংবাদ আলোচনা করা যেতেই পারে
২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসের পয়লা তারিখ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুস্তক বিতরণ অনুষ্ঠানে অতিথি হয়েছিলাম। চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রতিবেশী হচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগরে চানগাঁও থানা। আমার বাড়ি হাটহাজারী থানায় (বা উপজেলার) সর্বদক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত ১৫ নম্বর বুড়িশ্চর ইউনিয়নের উত্তর বুড়িশ্চর গ্রামে। উত্তর বুড়িশ্চর এবং দক্ষিণ বুড়িশ্চরের সাথে কমন সীমান্ত আছে চানগাঁও থানার মোহরা গ্রামে। মোহরা গ্রামের বিখ্যাত পরিবারগুলোর মধ্যে অন্যতম দু’টি বিখ্যাত পরিবার বা বাড়ি, আমাদের আত্মীয় বাড়িও বটে। একটি বাড়ি হলো কাজী বাড়ি, আরেকটি বাড়ি হলো কাদেরি বাড়ি। সেই মোহরায়, ‘ছায়রা খাতুন কাদেরিয়া বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ’-এ শিশুদের জন্য সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বিনামূলের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ অনুষ্ঠান বা উৎসব ছিল। ১৯৬৮ সালে মাত্র দুইজন ছাত্রী নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত নয় শ’র অধিক ছাত্রী আছে। ফলাফল খুবই ভালো। ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান এবং বিভিন্ন সময়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী বা প্রিন্সিপালদের নেতৃত্বে সকলে মিলে প্রতিষ্ঠানটির উন্নতিতে অবদান রেখেছেন। শিক্ষা থেকে আমাদের দেশের ধারাবাহিক অগ্রগতির অন্যতম উদাহরণ এই পুস্তক বিতরণ উৎসব। যাহোক, পুনরায় বলি : আমাদের দেশে বিভিন্ন আঙ্গিকে উন্নতি অবশ্যই অনেক হয়েছে; কিন্তু আমাদেরই মতো পরিস্থিতিতে থাকা অন্যান্য দেশের তুলনায় সেটি কম। অন্য ভাষায় বলা যায় যে, যতটুকু উন্নতি করতে পারতাম, ততটুকু হয়নি। আমাদের সাফল্য যা কিছু আছে তার জন্য কৃতিত্ব যেমন আমাদের, তেমনই ব্যর্থতাগুলোর জন্য দায়িত্বও আমাদের। এরূপ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন। অতীতের ভুল সংশোধন প্রয়োজন। একটি দেশ যেহেতু রাজনীতিবিদেরা পরিচালনা করেন, তাই রাজনীতিতেই চিকিৎসা প্রয়োজন। এইটুকু সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই রাজনীতি করছি।
পরিবর্তন আহ্বান বিদেশে ও বাংলাদেশে
আমি ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৬ সালের জুন পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছি মহান আল্লাহ তায়ালার দয়ায় সম্মান ও সন্তুষ্টির সাথে মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে অংশগ্রহণসহ। আমার এলপিআর বা প্রাক-অবসর ছুটি শেষ হয় জুন ১৯৯৭ সালে। দশ বছর গ্যাপ-এর পর ২০০৭ সালে প্রত্যক্ষভাবে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করি। পার্থক্য হলো, আমি একটি দল প্রতিষ্ঠা করি, সেই দলের কর্মী হিসেবে রাজনীতির মাঠে সংগ্রামী জীবন শুরু করেছি ৫৮ বা ৫৯ বছর বয়সে। যখন আরাম-আয়েশের দিকে বা বিশ্রামের দিকে মনোযোগ দেয়াটাই স্বাভাবিক, তখন কষ্ট বেছে নিয়েছি। ২০০৭-০৮ সালে বারাক ওবামা এবং ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা উভয়েই, পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বা পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের রাজনৈতিক দলগত কাঠামো ছিল, তাদের দলের আর্থিক শক্তি ছিল, তাদের দলের প্রতি শুভাকাক্সক্ষী মিডিয়া ছিল এবং তাদের দলের শুভাকাক্সক্ষীদের মেধাশক্তি ছিল। সব কিছু ব্যবহার করেই যথাক্রমে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট এবং শেখ হাসিনা পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখে অনেক চিন্তাশীল সচেতন নাগরিক মিলে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে, পরিবর্তনের প্রচারণার সূচনা করেই বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নামক একটি নতুন রাজনৈতিক দল যাত্রা শুরু করেছিল। জন্মদিবস থেকেই এদের নীতিবাক্য (বা ইংরেজি ভাষায় ‘মটো’) ছিল ‘পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি’ বা ‘পলিটিক্স ফর চেইঞ্জ’। পরিবর্তন অনেক আঙ্গিকেই কাম্য ছিল এবং এখনো কাম্য আছে। প্রথম এবং প্রধানতম কামনা হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে গুণগত পরিবর্তন। কিন্তু বারাক ওবামার দলের মতো বা মাননীয় শেখ হাসিনার দলের মতো এই নতুন দলটির ঐতিহ্য ছিল না, মেধা-শক্তি সীমিত ছিল, অর্থ-শক্তি অতি নগণ্য ছিল। এই নতুন দলটি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৩৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশের প্রাচীন ও বিদ্যমান প্রথা ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের বিকল্প হিসেবে পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি স্লোগান নিয়ে আমরা চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারিনি। নির্বাচনে জিততে পারিনি, তার মানে এই নয় যে, পরিবর্তনের জন্য মনের আকাক্সক্ষা স্থগিত হয়েছে। আকাক্সক্ষা এখনো জাগ্রত এবং প্রচেষ্টা অব্যাহত। তবে কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত হয়েছে। সচেতন মহলের কাছে সহযোগিতার কামনা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুণগত পরিবর্তন চাই। বাংলাদেশে বিদ্যমান বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য থেকেই এই গুণগত পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করতে হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা চাই সৎ, মেধাবী, সাহসী ব্যক্তিগণ রাজনীতিতে জড়িত হোক। আমরা চাই সৎ, সাহসী, মেধাবী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনগণের খেদমতের সুযোগ পাক। আমরা চাই যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এমন হোক যেখানে সৎ, সাহসী, মেধাবী ব্যক্তিরা নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন, জনগণের সামনে নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে পারেন এবং জনগণকে আশ্বস্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেতে পারেন। যথেষ্ঠ সংখ্যক বা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৎ, মেধাবী, সাহসী ব্যক্তি যদি পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন, তাহলে পার্লামেন্ট সদস্যদের মধ্যে একটি গুণগত পরিবর্তন সূচিত হবে। সেজন্য বাংলাদেশে সাহসী ভোটার প্রয়োজন, যেই ভোটাররা সৎ, সাহসী, মেধাবী ব্যক্তিদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে। সেজন্য বাংলাদেশে সাহসী মিডিয়া প্রয়োজন, যেই মিডিয়া সৎ, সাহসী, মেধাবী ব্যক্তিদেরকে উৎসাহিত করবে এবং প্রচারণায় পৃষ্ঠপোষকতা করবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কাক্সিক্ষত গুণগত পরিবর্তনের আরো কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নি¤œরূপ। প্রথম: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনা সম্মিলিতভাবে বা যুগপৎ বিদ্যমান থাকবে। দ্বিতীয়: ধর্মীয় নেতারা, মুক্তিযুদ্ধের নেতারা এবং জাতীয় নেতারা, জাতীয় ঐক্যের প্রেরণা হবে, জাতীয় বিভক্তির কারণ হবে না। তৃতীয়: সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। চতুর্থত: জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস শুরু হবে। পঞ্চমত: প্রতিহিংসা নয়, পারস্পরিক প্রতিযোগিতাই হবে উন্নয়নের এবং অবদানের কাঠামো। ষষ্ঠ: আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা সততা এবং প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সপ্তম: রাজনীতি ও ব্যবসায় তারুণ্যকে তথা বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে উৎসাহিত করতে হবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অষ্টম এবং শেষ: বাংলাদেশের মঙ্গল, বাংলাদেশের কল্যাণ, বাংলাদেশের নাগরিকগণের উপকার কোন কোন পন্থায় এবং কিসে কিসে নিহিত এই প্রসঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিকল্পিতভাবে সচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচি চালু করতে হবে।
উপসংহার ও দোয়া প্রার্থনা
এই মুহূর্তে আমরা দুইটি রাজনৈতিক সংগ্রামে লিপ্ত। একটি সংগ্রাম অতি সহজেই দেখা যাচ্ছে, আরেকটি সংগ্রাম অত সহজে দেখা যাচ্ছে না বা অনেক সহজে অনুভব হচ্ছে না। সহজেই দেখা যাচ্ছে এমন সংগ্রামটি হচ্ছে: সঠিক গণতন্ত্রের চর্চা নিশ্চিত করার জন্য তথা সর্বদলীয় অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধানে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। সহজে দেখা যাচ্ছে না বা অনুভূত হচ্ছে না এমন সংগ্রাম হচ্ছে: রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার সংগ্রাম। নয়া দিগন্তের পাঠকগণ তাদের মনের চক্ষুকে প্র্রসারিত করে অনুভব করার চেষ্টা করবেন বলে আমরা আশা রাখি। ২০১৬ সালের জন্য আমাদের সবার সৎ কর্ম প্রচেষ্টাগুলো যেন সাফল্যের তরঙ্গে থাকে, সেই দোয়া প্রার্থনা করি।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

ভারতে ভূমিকম্পে ৬ জন নিহত, ১০০ আহত

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যের ইম্ফলে গতকাল ভোরে
শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভবন। ৬ দশমিক ৭ তীব্রতার
এই ভূমিকম্পে ভারতে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছে। এএফপি
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ছয়জন নিহত ও অন্তত ১০০ জন আহত হয়েছেন। দেশটির আরও কয়েকটি রাজ্য ছাড়াও বাংলাদেশ, নেপাল ও মিয়ানমারেও অনুভূত হয় এ ভূমিকম্প। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উৎপত্তিস্থল মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা ছিল ৬ দশমিক ৭। বার্তা সংস্থা এএফপি, ভারতের ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ইম্ফলে অনেক বাড়িঘরে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ধসে পড়েছে বিভিন্ন ভবনের দেয়াল। মণিপুর ছাড়াও আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও বিহারে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ স্থানগুলোতেও অনেক ভবনে ফাটল ধরেছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ইম্ফল থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে টামেংলং জেলার নোনি গ্রামে। এটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকা। ভারতের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা অনুরাগ গুপ্তের বরাত দিয়ে এএফপি জানায়, ভূমিকম্পে ইম্ফলে পাঁচজন মারা যাওয়ার নিশ্চিত খবর জানা গেছে। এখানে আহত হয়েছেন অন্তত ৩৩ জন। ছয়তলা একটি ভবন আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। কিছু ছোট স্থাপনাতেও দেখা দিয়েছে ফাটল। এএফপি আরও জানায়,
ইম্ফলের প্রধান হাসপাতালগুলোর একটির কর্মকর্তা জানান, ভূমিকম্পের পর থেকে তাঁদের হাসপাতালটিতে মাথা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আঘাত নিয়ে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ভর্তি হয়েছেন। রয়টার্সের খবরে ইম্ফলে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ছয়জন বলে উল্লেখ করা হয়। আহত ১০০ জনের মধ্যে ৩৩ জনের অবস্থা গুরুতর। টাইমস অব ইন্ডিয়া বলেছে, আসামের প্রধান বাণিজ্যিক শহর গুয়াহাটিতেও ভূমিকম্পের পর আতঙ্কে লোকজন দৌড়ে বাইরের খোলা জায়গায় চলে যান। ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুরের বাসিন্দা সুধীর কুমার বলেন, একজন তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। উঠে দেখেন খুব জোরে সব কাঁপছে। ইম্ফলের বাসিন্দা শিবচন্দ্র সিং বলেন, ঝাঁকুনিতে তাঁর ঘরের জিনিসপত্র পড়ে যায়। দীপক নামের ইম্ফলের আরেক বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, ভূমিকম্পের পর বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। যখন এটি আঘাত হানে তখন প্রায় সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে তাঁরা বাইরে বেরিয়ে আসেন। রাস্তা ও খোলা জায়গায় তখন অনেকেই ভয়ে কাঁদছিলেন ও প্রার্থনা করছিলেন। ভূমিকম্প-পরবর্তী কম্পনের আশঙ্কায় শত শত মানুষ কয়েক ঘণ্টা বাইরেই কাটান। বার্তা সংস্থা পিটিআই বলেছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছের কয়েকটি ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সেখানকার বিদ্যুৎ সরবরাহ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইটে ভূমিকম্পে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার কথা জানিয়েছেন। এর আগে ১৯৫০ সালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসামে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার প্রচণ্ড ভূমিকম্পে বেশ কিছু গ্রাম মাটিতে মিশে যায়। এ ভূমিকম্প এবং এর পরপরই হওয়া ভূমিধস ও বন্যায় নিহত হয়েছিলেন দেড় হাজারের বেশি লোক। ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল তিব্বত।

‘এআই’ তৈরি করছেন মার্ক জাকারবার্গ

মার্ক জাকারবার্গ
২০১৪ সালে ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের নিজের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছিল ওই বছরের মধ্যে মান্দারিন ভাষা শেখা। গত বছরের ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছিল মাসে অন্তত দুটি বই পড়া। আর এ বছরের চ্যালেঞ্জ হলো, তাঁর বাসা এবং অফিসে টুকটাক ফুটফরমাশ খাটতে পারে এমন বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন একটি ব্যবস্থা (যাকে বলা হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) তৈরি করা। গতকাল সোমবার নিজের ফেসবুক পাতায় পোস্ট করা একটি স্ট্যাটাসে জাকারবার্গ নতুন এই চ্যালেঞ্জের কথা ঘোষণা করেছেন। মার্কিন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মার্ভেল কমিকসের প্রকাশ করা বিশ্বনন্দিত কমিক বই ও অ্যাকশন ছবি আয়রনম্যান-এর প্রধান চরিত্র আয়রনম্যানের একজন বুদ্ধিসম্পন্ন যন্ত্র সহকারী বা এআই আছে। তার নাম জারভিস।
জাকারবার্গ বলেন, তিনিও জারভিসের মতো একটি ‘মামুলি এআই’ বানাতে চান। জাকারবার্গ বলেন, তিনি এমন একটি এআই বানানোর কাজ শুরু করেছেন যেটি তাঁর কণ্ঠ চিনতে পারবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাসার মিউজিক সিস্টেম, আলো ও তাপমাত্রা থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। জাকারবার্গ বলেন, তিনি ওই এআইকে কোনো বন্ধু বাসায় এসে কলবেল বাজালে তাঁদের চিনে ঘরে ঢুকতে দেওয়া, তিনি যখন তাঁর শিশুকন্যা ম্যাক্সের রুমে থাকেন না তখন সেখানে ম্যাক্সের কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না, তা দেখভাল করা—ইত্যাদি শেখাবেন। এই ব্যবস্থাটি ফেসবুককে আরও উন্নত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করছেন। জাকারবার্গ বলেন, বছরজুড়ে তিনি তাঁর কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য জানাবেন। বিবিসি।

সচিবালয়ের আন্দোলন ও ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চ by এমাজউদ্দীন আহমদ

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় পর্যন্ত আন্দোলনের উত্তপ্ত ক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। বেতনবৈষম্যকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সচিবালয়ের ভেতরে ও বাইরে। বিসিএসের ২৮টি ক্যাডারের মধ্যে শুধু প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ছাড়া অন্যরা বেতনবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে আন্দোলন শুরু করেছেন। এর সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছেন নন-ক্যাডার কর্মকর্তারাও। প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা সচিবালয়ের অভ্যন্তরে কাজ করছেন কালো ব্যাজ ধারণ করে। এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে দেরি হলে সরকারের কর্মকাণ্ডে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হবে। দেশে ক্যাডার ও নন-ক্যাডারভুক্ত মিলিয়ে রয়েছেন প্রায় চার লাখ ১০ হাজার কর্মকর্তা। এর মধ্যে প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে রয়েছেন প্রায় ছয় হাজারের মতো এবং নন-ক্যাডার কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ। বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল পুনর্বহাল এবং ক্যাডার ও নন-ক্যাডার বৈষম্য নিরসনসহ কয়েকটি দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলছেন প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক ও অন্য ২৬টি ক্যাডারের বিসিএস কর্মকর্তারা। অন্য কথায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে গড়ে তুলছেন তীব্র এক আন্দোলন। সরকার এই আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে শক্তিশালী উদ্যোগ এখনো নেয়নি। কিন্তু দমন করার কোনো বিকল্প আছে কি? এর কোনো বিকল্প নেই, তবে এর একটি অতীত আছে। এ জন্য এই আন্দোলনের যেমন রয়েছে তীব্র এক গতি, তেমনি এই আন্দোলন দমনের গরজও বড্ড বেশি। অতীতটা অনেকটা সেই কল্পকাহিনী, যা নররূপী দানব ফ্রাঙ্কেস্টাইনের মতোই। বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সেই ‘জনতার মঞ্চে’ ফেসলেস আমলাদের মধ্য থেকে কিছুসংখ্যককে আহ্বান করে রাজনীতির সাথে সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারবিরোধী আন্দোলনে একাত্ম করার ‘অশুভ’ পদক্ষেপের কাহিনী।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বের মধ্যে যে পার্থক্য সে সম্পর্কে প্রত্যেক সচেতন নাগরিক সজ্ঞাত। নীতিনির্ধারণ করেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তা বাস্তবায়ন করেন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। রাজনৈতিক ব্যবস্থার শীর্ষে অবস্থানকারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিকনির্দেশ করেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কর্মচঞ্চল থেকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। সুষ্ঠু নীতির জন্য যেসব তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা তা সংগ্রহ করেন, সমন্বয় করেন, সংরক্ষণ করেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি একান্তভাবে অনুগত থেকে সহযোগিতা করেন। রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে মানবদেহের সাথে তুলনা করলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেকটা মস্তিষ্কের মতো এবং প্রশাসন হাত, পা, নাক, কান, চোখের মতো। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রদীপের সাথে তুলনা করলে প্রশাসন অনেকটা পিলসুজের মতো। অপরিহার্য বটে, কিন্তু মুখ্য নয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ বটে; কিন্তু মৌল নিয়ামক নয়। গণতন্ত্রে প্রশাসন রাজনৈতিক নেতৃত্বের আজ্ঞাবহ মাত্র। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে প্রতিনিয়ত অধোবদন।
গণতন্ত্র এক অর্থে দলীয় শাসন। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, শাসন পরিচালনার দায়িত্ব সে দলের ওপর ন্যস্ত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে সে দল শাসন পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করে। এ দিক থেকে বলা যায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনশীল। প্রশাসন কিন্তু স্থায়িত্বের প্রতীক। স্থায়ীভাবে নিয়োজিত এবং প্রশিক্ষিত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়েও ঝড়ের মুখে স্থায়িত্বের খুঁটি হিসেবে টিকে থাকেন। মোট কথা, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য, প্রকৃতি ও অবস্থান ভিন্নমুখী। একটি দৃশ্যমান, অন্যটি কিন্তু নিয়মপদ্ধতির আড়ালে ঢাকা। একটি গতিশীল অন্যটি কিন্তু রুটিনের ছকে বাঁধা। একটি জাতীয়, অন্যটি কিন্তু দাফতরিক অথবা বিভাগীয়। একটি নির্দেশ দেয়, অন্যটির দায়িত্ব হলো নির্দেশ পালন করা। একটি সৃজনশীলতায় সচকিত, অন্যটি পেশাদারিত্ব অর্জনের গৌরবে তৃপ্ত। কোনো বিচ্যুতি ঘটলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জবাবদিহি করার জন্য তৈরি থাকতে হয়। প্রশাসন কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের আড়ালে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা দিতে পারে।
ভিন্ন প্রকৃতির হয়েও গণতন্ত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসন এক ঘনিষ্ঠ সূত্রে আবদ্ধ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অক্ষুণœ রেখে অথচ দু’টিকে স্বতন্ত্র অবস্থানে স্থাপন করতে হয়। দুয়ের সুষম সম্পর্ক বিনষ্ট হলে দেশের শাসন-প্রশাসনে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। গণতান্ত্রিক নর্ম বিধ্বস্ত হয়। শাসন-প্রশাসনে ষড়যন্ত্র বাসা বাঁধে। দলীয় চেতনা মুখ্য হয়ে ওঠে। কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্যমান স্বাতন্ত্র্য অবলুপ্ত হয়ে সরকার এক ফ্যাসিস্ট চরিত্র ধারন করে। দেশে গণতন্ত্রের কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও ওই কাঠামোয় ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ফ্যাসিবাদী স্লোগান- এক দেশ, এক জাতি, এক দল, এক নেতা। চূড়ান্ত পর্যায়ে গণতন্ত্র ওই সমাজ থেকে নির্বাসিত হয়।
এত কথা বলা হলো এ কারণে যে, আজ বাংলাদেশের সচিবালয়ে যে আন্দোলন গতিশীল রয়েছে এবং এই আন্দোলনকে বানচাল করার জন্য সরকারের নির্মম ষড়যন্ত্র যেভাবে প্রসারিত, তার মূল নিহিত রয়েছে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণের সামনে আজকের ক্ষমতাশ্রয়ী ক্ষমতাসীনদের ‘জনতার মঞ্চে’। ক্ষমতালাভের উদগ্র কামনায় তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণার জন্য নির্মিত এই মঞ্চে আহ্বান করে ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবহারবিদ-প্রকৌশলী, কৃষিবিদ-চিকিৎসক, শ্রমজীবী, সংস্কৃতিসেবী, বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিক, এমনকি সরকারের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিরোধী দলের অবিবেচনাপ্রসূত ডাকে সাড়া দিয়ে জনতার মঞ্চে এসে উপস্থিত হন বেশ কিছুসংখ্যক প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ‘ব্যুরোক্র্যাটিক’ নর্মকে দুমড়ে মুচড়ে, এতদিনের গড়া প্রশাসন ব্যবস্থার সব নিয়ম-নীতি ভঙ্গ করে, একেক জন খুদে রাজনীতিকের অবয়বে, লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে।
এ ক্ষেত্রে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পরে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধানের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রশাসন ছেড়ে রাজনৈতিক নেতায় রূপান্তরিত হয়েছেন এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক- উভয় ক্ষেত্রের সুবিধা উপভোগ করে এবং (যেহেতু তিনি উভয় ক্ষেত্রের দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত) দুই দিকেই ছড়ি ঘুরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়কে দেশের প্রধান শক্তিকেন্দ্রে পরিণত করেছেন। এই শক্তিকেন্দ্রই আজ বাংলাদেশের একধরনের ভাগ্যনিয়ন্তা। দুই ক্ষেত্র থেকে যা কিছু লাভ করা সম্ভব, তা তিনি এবং ‘জনতার মঞ্চে’ আরোহণকারীরা তার সহযোগিতায় লাভ করেছেন। শক্তিমত্তার দাপটে প্রশাসনের সবাইকে ভীতসন্ত্রস্ত রেখেছেন।
আজকের বাংলাদেশে যেসব সমস্যা আজ বিষধর সাপের মতো ফণা উদ্যত করে রয়েছে, তাদের বেশির ভাগের মূল তাই চিহ্নিত করা যায় ওই ‘জনতার মঞ্চ’ নির্মাণের অর্বাচীনতায়। বিভক্ত হয়েছে সমাজ এবং সমাজের প্রায় সব শ্রেণীর পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীরা। বিভক্ত আজ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। কোনো উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমনটি হতে কখনো দেখা যায়নি। যে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জাতীয় দুর্যোগের দিনেও স্থায়িত্বের প্রতীক হিসেবে, সমাজে নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে, ঝড়ের মুখেও জাতীয় স্বার্থ এবং জনস্বার্থের জাহাজটি নিরাপদে নোঙর করেছেন অতীতে, তারাও আজ বিভ্রান্তির মধ্যে। এই অবস্থা শুধু অনাকাক্সিক্ষত নয়, জাতীয় স্বার্থের পুরোপুরি পরিপন্থী।
‘জনতার মঞ্চে’র কর্মকর্তাদেরই একাংশ সচিবালয়ের সাধারণ আন্দোলনকে, তাদের রুটি-রুজির এই দাবিকে রাজনৈতিক আন্দোরন রূপে চিহ্নিত করে, স্বল্প বেতনের কর্মচারীদের জীবনে টেনে এনেছেন এক অভিশাপ। কারণ তারাও রাজনীতি ও প্রশাসনের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে কোনো দ্বিধা করেননি। অফিসের টাইমিং তাদেরই পরামর্শে পরিবর্তন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ভাবখানা, উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের মতো উন্নত বাংলাদেশ সমাজে পাঁচ দিনের বেশি কাজ করবেন কেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা? কেন তাদের প্রয়োজন হবে অত বেশি অর্থের? প্রধানমন্ত্রী এসব স্বার্থান্বেষীর হাতে প্রায় বন্দী। নিজের এবং নিজের আত্মীয়-স্বজনের স্মৃতি রক্ষার্থে হাজার কোটি ব্যয় করলেও এসব ‘নিম্নস্তরের’ কর্মচারীদের জন্য কোনো ভাবনা তিনি ভাবতে পারেন না, যা তাদের প্রাপ্য। অর্থাৎ ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর দন্তনখর তারা আঁচ করুক। দেখুক, আন্দোলনে যাওয়ার মজাটা।
ক’দিন আগে একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক দুঃখ করে বলেছিলেন, মাত্র দু-একজনের জন্য বাংলাদেশ ব্যুরোক্র্যাসির মূল যেভাবে শিথিল হয়েছে, ব্যুরোক্র্যাসির মর্মবাণী যেভাবে অপমানিত হয়েছে তার তুলনা নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান এ সম্পর্কে একবার উক্তি করেছিলেন বটে; কিন্তু এই নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তিনি কিছুই করেননি। কোনো কোনো সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ‘সুয়োমটো’ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও এমন স্বার্থপরদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত গৃহীত হয়নি। অথচ ‘জনতার মঞ্চে’র ওই পদক্ষেপ দেশের রাজনীতিকে করেছে নীতিহীন এবং দরিদ্র, এবং প্রশাসনকে করেছে দায়িত্বহীন ও পক্ষপাতপূর্ণ। আইনের শাসনের কথা বলা হয়; কিন্তু আইনের শাসনে বিঘ্ন সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কে এখনো কেউ তেমন সোচ্চার হয়ে ওঠেননি।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের কূটনীতিককে প্রত্যাহার করতে বলল পাকিস্তান by রাহীদ এজাজ

মৌসুমী রহমান। ছবি: সংগৃহীত
জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ঢাকা থেকে পাকিস্তানি কূটনীতিক ফারিনা আরশাদকে প্রত্যাহারের জেরে এবার ইসলামাবাদ থেকে বাংলাদেশের কূটনীতিক মৌসুমী রহমানকে ফিরিয়ে নিতে বলেছে পাকিস্তান। বৃহস্পতিবার বিকেলের মধ্যে ইসলামাবাদ থেকে তাঁকে প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কিন্তু কূটনীতিক মৌসুমী রহমানকে কেন বাংলাদেশ ফিরিয়ে নেবে, তা জানায়নি ইসলামাবাদ। জানা গেছে, ফারিনা আরশাদকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ যেমন পাকিস্তানকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছিল, তেমনি মৌসুমী রহমানকে ফিরিয়ে নিতে ঢাকাকে মৌখিকভাবে বলেছে ইসলামাবাদ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর (রাজনৈতিক) মৌসুমী রহমানকে সরকার ঢাকায় ফিরিয়ে আনছে না। তাঁকে পাকিস্তান থেকে পর্তুগালে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবারের মধ্যে তাঁকে লিসবনে বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠানো হতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেলে ইসলামাবাদে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সোহরাব হোসেনকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মৌসুমী রহমানকে নিয়ে সোহরাব হোসেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া ও সার্ক) মোহাম্মদ ফয়সালের সঙ্গে দেখা করতে যান। এ সময় মোহাম্মদ ফয়সাল বৃহস্পতিবার বিকেলের মধ্যে মৌসুমী রহমানকে ইসলামাবাদ থেকে প্রত্যাহার করে নিতে বলেন। কিন্তু কেন মৌসুমী রহমানকে বাংলাদেশ ফিরিয়ে নেবে, সে সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক।
জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ফারিনা আরশাদকে বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে বলার কয়েক দিন পর গত ২৩ ডিসেম্বর তাঁকে প্রত্যাহার করে নেয় ইসলামাবাদ। এর এক দিন পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, পাকিস্তান হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব ফারিনা আরশাদকে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ধারাবাহিকভাবে হেনস্তা করেছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ধারাবাহিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর পর তাঁকে ইসলামাবাদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
২০১৫ সালে ফারিনাসহ পাকিস্তানের দুই সরকারি কর্মকর্তাকে ঢাকা থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে পাকিস্তান। জঙ্গিদের অর্থায়নের অভিযোগে ওই বছরের ১২ জানুয়ারি বনানী থেকে গ্রেপ্তার করা হয় পাকিস্তান হাইকমিশনের কনস্যুলার কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাজহার খানকে। এরপর পাকিস্তানের হাইকমিশন মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার পর ৩১ জানুয়ারি তাঁকে ইসলামাবাদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর থেকে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দণ্ড দেওয়ায় পাকিস্তান ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নিন্দা প্রস্তাব এনে সরাসরি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়েছে। প্রতিবারই পাকিস্তানের এসব তৎপরতার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

ভূমিকম্প সম্পর্কে ভয়াবহ কিছু তথ্য

সোমবার ভোরে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল বিশাল এলাকা। ভূমিকম্পে আতঙ্কিত শহরের মানুষ। আসুন এমন সময় জেনে নিই ভূমিকম্প নিয়ে দশটা জানা অজানা তথ্য-
১) প্রতি ৩০ সেকেন্ডে দুনিয়ার কোথাও না কোথাও ভূমিকম্প হচ্ছে। এটা আলাদা কথা কী মানুষ সেগুলোর সব টের পাচ্ছে না।
২) ভূমিকম্পের ফলে আগ্নেয়গিরি জেগে উঠে অগ্ন্যুত্‍পাত হতে পারে
৩) দুই মাত্রার কম ভূমিকম্প আমরা টের পাই না। রিখটার স্কেলে ৩ মাত্রার থেকে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে মাটি কেঁপে ওঠে।
৪) সাত বা তার থেকে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে গোটা একটা শহর ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
৫) বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল চিলিতে ১৯৬০ সালে। রিখটার স্কেলে চিলির সেই ভূমিকম্পের মাত্র ছিল ৯.৫।
৬) দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল চীনে। ১৫৫৬ সালে। ৮ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল এই ভূমিকম্পে।
৭) ১৯৮৫ সালে মেক্সিকো সিটিতে ৮ মাত্রার ভয়ানক ভূমিকম্প হয়। সেই ভূমিকম্পে মেক্সিকোর এক হাসপাতাল ভেঙে পড়ে। এক সপ্তাহ সেই হাসপাতালের ভিতর কেউ ঢুকতে পারেননি। দিন আটেক পর উদ্ধারকারী দল গিয়ে বেশ কয়েকজন সদ্যোজাতকে উদ্ধার করে। এক সপ্তাহ ধরে সেইসব সদ্যোজাত শিশুদের কোনো পানি বা খাবার, বা কোনো মানুষের সান্নিধ্য পায়নি। এরপরেও কীভাবে শিশুরা বেঁচে ছিল সেটাই আশ্চর্যের।
৮) হিন্দু পুরাণমতে আটটি বিশালকায় হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে আছে পৃথিবী। ওই সব হাতি আবার দাঁড়িয়ে আছে কচ্ছপের পিঠের ওপর। কচ্ছপগুলো আবার নিজেদের সামলে রেখেছে কুণ্ডলি পাকানো সাপের ওপর দাঁড়িয়ে। এসব প্রাণীর কোনো একটা একটু নড়লেই নড়ে ওঠে পৃথিবী।
৯) ১৮৮১ সালে ১৬ ডিসেম্বর এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মিসিসিপি নদীর একটা অংশ পিছন দিকে বইতে শুরু করে।
১০) বিশ্বে প্রতি বছর ৫ লক্ষ ভূমিকম্প রিখটার স্কেলে ধরা পড়ে। তাদের মধ্যে মাত্র এক লক্ষ আমরা অনুভব করতে পারি। তাদের মধ্যে ১০০টা ভূমিকম্প ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ি থাকে।
১১) কিছু কিছু প্রাণী নাকি ভূমিকম্প আগেই টের পায়। তবে সম্প্রতি গবেষণায় জানা যায়, মানুষও আগে থেকে ভূমিকম্প টের পেতে পারে। এর টের পাওয়ার কারণ হচ্ছে মাটির তলার
কিছু গ্যাস পুকুর বা জলাশয়ের পানির মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। মানুষ সে অস্বাভাবিক গন্ধ থেকেই ভূমিকম্পের বিষয়টি টের পায়।
১২) আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার পার্কফিল্ডকে বলা হয় 'পৃথিবীর ভূমিকম্পের রাজধানী'। এখানে একটি ব্রিজ আছে, যেটি দুটি টেকটনিক প্লেটের ওপর অবস্থিত ভূমিকম্প নিরূপক যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল দুই হাজার বছর আগে। তৈরি করেছিলেন চিনের বিজ্ঞানী ঝ্যাং হ্যাং।
১৩) প্রাচীন গ্রিকরা মনে করত ভূমিকম্প হয় তাদের সমুদ্র দেবতা পসিডনের কারণে। রেগে গেলে মাটি ধরে ঝাঁকি দেয় সমুদ্র দেবতা। আবার জাপানি পুরাণে আছে, ন্যামাজু নামের
একটি ক্যাটফিশের কারণেই ভূমিকম্প হয়।
১৪) প্রতিবছর ভূমিকম্পে প্রায় আট হাজার মানুষ মারা যায়। গত চার হাজার বছরে এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ মারা গেছে ভূমিকম্পে।
১৫) দক্ষিণ গোলার্ধের চেয়ে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে ভূমিকম্প বেশি হয়।
১৬) প্রতি বছর জাপানে দেড় হাজার বার ভূমিকম্প হয়
১৭) ইনকা সভ্যতার ভাস্কর্য এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যা যেকোনো বড় ধরনের ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারে। সেই স্থাপত্য, ভাস্কর্যগুলো বেশ কয়েকবার মাঝারি মাপের ভূমিকম্পের মুখে পড়লেও কোনও ক্ষতি হয়নি।
১৮) যেমন 'আর্থ কোয়েক হয় তেমন 'মুন কোয়েক'ও হয়। মানে ভূমিকম্পের মত চন্দ্রকম্পও হয়। চাঁদেও পৃথিবীর মতও ভূমিকম্প হয়। তবে পৃথিবীর থেকে কম মাত্রার ভূ কম্প হয়ে চাঁদে। পৃথিবীর মতো অত ঘনঘন কেঁপে ওঠে না চাঁদ।

ভারতীয় দূতাবাস রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন স্বয়ং আফগান গভর্নর

ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া আতা মুহাম্মদ নূরের ছবি
বন্ধুত্বের পরম উজ্জ্বল উদাহরণ। ভারতীয় কনস্যুলেট রক্ষা করতে সশস্ত্র জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আফগান গভর্নর আতা মুহাম্মদ নূর।
রোববার রাতে আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরিফে ভারতীয় কনস্যুলেট আক্রমণ করে সশস্ত্র জঙ্গির দল। পিছনের গেট ব্যবহার করে দূতাবাস চত্বরে ঢোকার চেষ্টা করে সন্ত্রাসবাদীরা। তাদের বাধা দেন নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানরা। প্রতিবেশী দেশের চরম বিপদের সময় চুপ করে বসে থাকতে পারেননি বাল্খ প্রদেশের গভর্নর আতা মহম্মদ নুর। নিজের অ্যাসল্ট রাইফেল বের করে রাতের অন্ধকারে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান তিনি। জওয়ানদের সঙ্গে আলোচনা করে জঙ্গি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেন আফগানিস্তানের এই প্রদেশীয় শাসক।
নূরের কীর্তি চাপা মিডিয়ার নজর এড়িয়ে যায়নি। সোমবার থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় ভাইরাল হয়ে গিয়েছে তার বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ার ছবি। দেখা গিয়েছে, শত্রু দমনে রাইফেল তাক করে রীতিমতোনিশানা খুঁজছেন নূর।
আফগানিস্তানে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত অমর সিনহা টুইটারে জানিয়েছেন, 'মাজার-এ স্পেশ্যাল ফোর্স সাফাই অভিযানে ব্যস্ত। জোরদার লড়াই চলেছে। গভর্নর আতা নিজে অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কনস্যুলেটের সকলেই নিরাপদে আছেন।'
রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য রিটুইট করে এক সাংবাদিক পাল্টা মন্তব্য করেছেন, 'বিপদের সময়ের বন্ধু... চিনে রাখুন মাজার-ই-শরিফে ভারতীয় কনস্যুলেট বাঁচাতে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া আফগান গভর্নরকে।'
উল্লেখ্য, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় লড়াইয়ের ময়দানে সক্রিয় ছিলেন প্রাক্তন মুজাহিদিন আতা মুহাম্মদ নূর। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আহমেদ শাহ মাসুদের তালিবান-বিরোধী নর্দার্ন অ্যালায়েন্স বাহিনীতে তিনি কম্যান্ডার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
সূত্র : এইসময়

শীতে চর্মরোগ by ডা: দিদারুল আহসান

আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, শীত এলে বেশ কিছু চর্মরোগ দেখা যায়, যা গরমকালে তেমন একটা দেখা যায় না। আরেকটি ব্যাপার আমরা প্রায়ই লক্ষ করে থাকি, রোগীরা এসে বলেন- শীত এলে তার শরীর খুব চুলকায়। যদি একান্তই অসহ্য হয়ে পড়ে, তবে সে ক্ষেত্রে হালকাভাবে হাতের তালু দিয়ে ত্বক চুলকানো যেতে পারে।
শুষ্কতার কারণেই এ রকম চুলকানি দেখা দেয়, তাহলে ভালো কোনো ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বক ভালো থাকে। ময়েশ্চারাইজার পাওয়া না গেলে অলিভ অয়েল ব্যবহার করলেও ত্বক ভালো থাকে। চুলকানির পরিমাণ মারাত্মক হলে গ্লিসারিনের সাথে পানি মিশিয়ে ব্যবহার করলেও ভালো ফল পাওয়া যায়।
এরপর একটি রোগের কথায় আসা যাক, যা শীত এলেই বাড়ে। সেটির নাম হচ্ছে ইকথায়োসিস। এ রোগটি একটি জন্মগত রোগ এবং এ রোগটি শিশুকাল থেকেই লক্ষ করা যায় এবং দেখা গেছে, প্রতি হাজারে একজন এ রোগে ভুগে থাকেন। নারী-পুরুষের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যাও সমপরিমাণ। এ রোগে যারা আক্রান্ত হন, তাদের হাত ও পায়ের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, ত্বক ফাটা ফাটা এবং ছোট ছোট গুঁড়ি গুঁড়ি আঁশ পায়ের সামনের অংশ ও হাতের চামড়ায় দেখা যাবে। তবে হাত ও পায়ের ভাঁজযুক্ত স্থান থাকবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তাদের কাছে প্রশ্ন করলে তারা বলবেন, রোগটি তার দেহে ছোটবেলা থেকেই আছে এবং প্রতি বছর শীত এলেই এটি বেড়ে যায়। এদের হাত ও পায়ের তালুর দিকে তাকালে দেখা যাবে, হাতের রেখাগুলো খুবই স্পষ্ট, যা কি না সাধারণ লোকের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় নয়। তাদের অ্যালার্জির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারা বলবে, তাদের নাক দিয়ে প্রায়ই পানি পড়তে থাকে; অর্থাৎ তাদের সর্দি অবস্থা থাকে। তাদের মা-বাবার ব্যাপারে খবর নিলে আরো পরিষ্কারভাবে দেখা যাবে, তাদেরও কোনো না কোনো ধরনের অ্যালার্জিজনিত সমস্যা ছিল বা এখনো আছে। এ রোগটি কখনোই একেবারে ভালো হয় না। তবে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, যদি ত্বকে তৈলাক্ত পদার্থ নিয়মিত মাখা যায়। সে ক্ষেত্রে আলফা হাইড্রোক্সি এসিড খুবই কার্যকর। এটি পাওয়া না গেলে গ্লিসারিনের সাথে সমপরিমাণ পানি মিশিয়ে ত্বকে ব্যবহার করলেও খুবই ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে গ্লিসারিন ব্যবহারের সমস্যা হচ্ছে, ত্বক আঠা আঠা হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে একটি টাওয়েল দিয়ে অতিরিক্ত গ্লিসারিনটুকু চেপে তুলে নিলে ত্বকের আঠালো বা চটচটে ভাব কেটে যায় এবং ত্বক খুবই ভালো রাখা সম্ভব। অ্যাকজিমার নাম আমরা সবাই জানি। সেই অ্যাকজিমাও কিন্তু শীত এলে বাড়তে পারে। তাই অ্যাকজিমায় আক্রান্ত রোগীদের আমরা সব সময়ই বলে দিই, ভালো হওয়ার পরও যেন সে স্থানটি শুষ্ক হতে দেয়া না হয়। একটি বিশেষ ধরনের অ্যাকজিমা আছে, যার নাম হচ্ছে- অ্যাকজিমা ক্রাকুয়েলেটাম। এটি সাধারণত ৪০ বছরের ঊর্ধ্বের লোকদের হয়। এটি শীত এলেই বাড়ে। কারণ শীতে বাতাসের জলীয় পদার্থ কমে যায়। এ ক্ষেত্রে শুষ্ক ত্বকের গায়ে ফাটা ফাটা দাগ ও হালকা আঁশ লক্ষ করা যায়। কখনো কখনো ত্বক পুরো হয়ে পড়তেও দেখা যায়। একটি কথা মনে রাখা খুবই প্রয়োজন, চুলকালে ত্বক পুরো হতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা শক্ত ও অস্বাভাবিক আকার ধারণ করে থাকে।
আরেকটি রোগ আছে, যার নাম আমরা প্রায় সবাই জানি, রোগটি হচ্ছে স্কেবিস। বাংলায় খুজলি-পাঁচড়াও বলে থাকেন অনেকেই। এটির সাথে যদিও সরাসরি শীতের বা বাতাসের আর্দ্রতার কোনো সম্পর্কের কথা জানা যায় না, তবুও দেখা গেছে এ রোগটি শীত এলেই ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। বিশেষ করে শিশুরা এতে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হতে থাকে। হতে পারে শীতকালে যেহেতু এক বিছানায় একত্রে অনেকেই চাপাচাপি করে ঘুমায়, সে কারণে রোগটি এ সময় ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে। এ রোগটি আমাদের দেশের গরিব শ্রেণীর মধ্যে বেশি হতে দেখা যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেসব শিশু স্কুলে যায় তারাই এতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এটি একটি জীবাণুবাহিত রোগ। যে কীটটি দিয়ে এ রোগটি হয় তার নাম হচ্ছে স্কেবিয়াইসারকপটিস স্কেরিবাই। এ ক্ষেত্রে শরীরে অসম্ভব চুলকানি হতে দেখা যায় এবং রাতের বেলা চুলকানির তীব্রতা আরো বাড়ে।
রোগটি খুবই সাধারণ হলেও রোগটির চিকিৎসায় দেরি হলে এমন সব অবস্থা নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসে যে, ভালো অভিজ্ঞতা না থাকলে অনেকেই ভুল চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণত ঘরের একাধিক ব্যক্তি এ রোগে ভুগে থাকেন। ফলে ঘরের সবাইকে এ রোগের চিকিৎসা একসাথে করাতে হয়, নয়তো ভালো হয়ে এ রোগ আবার তার দেহে দেখা দেবেই।
এ ছাড়াও কিছু কিছু রোগ আছে, যেমন- হাম ও চিকেনপক্স। এগুলোর সাথে আমরা খুবই পরিচিত। এগুলো ভাইরাসজনিত চর্মরোগ। লক্ষ করলে দেখবেন, এগুলোও শীতকালেই বেশি হয়ে থাকে।
লেখক : চর্ম, অ্যালার্জি ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : আলরাজী হাসপাতাল, ১২ ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন : ০১৮১৯২১৮৩৭৮

মেয়েদের মূত্রাশয়ের প্রদাহ by ডা: হামিদা বেগম

মহিলাদের মূত্রাশয়ের প্রদাহ বা (সিস্টাইটিস) সব সময়েই পুরুষের চেয়ে বেশি ও মারাত্মক ধরনের হয়। এটি হয় মেয়েদের মূত্রনালীর দৈর্ঘ্য খুব কম (৪ সেন্টিমিটার) বলে, ভালভা বা স্ত্রী বহিঃজনন অঙ্গ খুব কাছাকাছি থাকে বলে, মাসিকের সময় ও যৌন মিলনের সময় ঝুঁকি বেশি থাকে বলে, গর্ভবতী হওয়ার জন্য, বারবার ক্যাথেটার করার জন্যও হয়, প্রস্রাবের বেগ হওয়ার পরও পরিবেশ ও সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার জন্য দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখার জন্য।
রোগের কারণ : স্বাভাবিক জীবাণুমুক্ত নিম্নমূত্রপথ (মূত্রনালী ও মূত্রাশয়) ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত হলে সিস্টাইটিস হয়। এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলী অন্ত্র পথের নিচের অংশে দেখা যায়। এটি যৌন মিলনের ঝুঁকি বাড়ায়। এ সময় ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালী দিয়ে মূত্রাশয়ে ঢুকতে পারে। একবার ব্যাকটেরিয়া মূত্রাশয়ে ঢুকলে সাধারণত প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায় কিন্তু এর আগেই যদি ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার করে, তাহলে মূত্রাশয়ে সংক্রমণ ঘটায়। এর পরও যদি রোগীর ডায়াবেটিস থাকে, রোগী এইচআইভিতে আক্রান্ত হলে, ব্যথানাশক ওষুধ বেশি নিলে এর প্রবণতা বেড়ে যায়। সাধারণত ই:কলাই (৭৫%) ক্লেবসেলা (১০%), প্রোটিয়াস বা গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়াই এর জন্য দায়ী।
পর্যাপ্ত তরল পান না করলে, দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকলে (অবশ বা প্যারালাইসিস রোগী), পায়খানা বা প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারলে, প্রস্রাবের বেগ হওয়ার পরও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে দীর্ঘ সময় প্রস্রাব ধরে রাখলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
গর্ভবর্তী অবস্থায় কেন বেশি হয় : স্ত্রী হরমোনজনিত কারণে কিডনি, মূত্রনালী ও মূত্রাশয়ে অনেক পরিবর্তন হয়, আয়তনে ও প্রস্থে কিছুটা প্রসারণ ঘটে। তা ছাড়া গর্ভস্থ শিশুসহ জরায়ু ওই মূত্রাশয়ের ওপর কিছুটা চাপ ফেলে। তাই এখানে স্টাসিস বা শ্লথগতি পরিলক্ষিত হয়। ২-১০ শতাংশ গর্ভবতী মহিলার কোনো রকম উপসর্গ ছাড়াই ব্যাকটেরিয়া দ্রুতগতিতে বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। সাধারণত দরিদ্র মহিলাদের বেশি হয়ে থাকে। এ ছাড়া বেশি সন্তান জন্মদানের পর, বেশি বয়সে, বেশি যৌন মিলনের পর, ডায়াবেটিস ও রক্তশূন্যতার জন্য এটি হতে পারে।
উপসর্গ : নিম্ন মূত্র পথে প্রচণ্ড জ্বালা ও প্রস্রাব করার সময় ব্যথা হওয়া, গা কাঁপিয়ে জ্বর আসা, বমি বমি ভাব হওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাব করা বা প্রস্রাবের তীব্র ইচ্ছা জাগা বা বেগ হওয়ার সাথে সাথেই প্রস্রাব হয়ে যাওয়া, রাতে প্রস্রাবের ইচ্ছা জাগা, তলপেটে ব্যথা অনুভব করা, প্রস্রাব ঘোলাটে হওয়া বা প্রস্রাবে দুর্গন্ধ হওয়া, প্রস্রাবের সাথে রক্ত যেতে পারে। উল্লেখ্য, বারবার সংক্রমণ হলে রোগীর রক্তশূন্যতা হতে পারে।
চিকিৎসা : যেহেতু ইনফেকশন কিডনিতে ছড়ানোর ঝুঁকি ও বিভিন্ন রকম জটিলতার ঝুঁকি থাকে তাই যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা দিতে হবে। সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ও সময়সহ অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে পূর্ণাঙ্গ ডোজ ও সময়সহ।
সম্ভাব্য জটিলতা : বারবার মূত্রপথে সংক্রমণ বা দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ হতে পারে, জটিল মূত্রপথে সংক্রমণ বা পাইলোনেফ্রাইটিস হতে পারে, ধীরে ধীরে কিডনির কার্যকারিতা লোপ পেতে পারে।
প্রতিরোধ : প্রচুর পানি পান করতে হবে ও পানি জাতীয় খাবার খেতে হবে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে, মল ত্যাগের পর পায়ু এলাকা সামনে থেকে পেছনে ধুয়ে ফেলতে হবে, তাতে পায়ু এলাকা থেকে মূত্রনালিতে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের ঝুঁকি কমবে। মাসিকের সময়, যৌন মিলনের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। কর্মরত মহিলাদের, স্কুল-কলেজের মেয়েদের প্রয়োজনে সাধ্যমতো উপযুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
চেম্বার : গ্যালাক্সি হসপিটাল (প্রা.) লি., মিরপুর ১০ নম্বর সংলগ্ন ফায়ার সার্ভিসের দক্ষিণ পাশে।
ফোন : ০১৮১৯২৪৩৬১৯