Wednesday, December 16, 2020
ভারত নয়, চীন পদ্মাসেতু বানিয়েছে, এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি by তারিক চয়ন
ভারতের অনলাইন পত্রিকা দ্য প্রিন্ট এ লেখা এক নিবন্ধে দিল্লিভিত্তিক সাংবাদিক জ্যোতি মালহোত্রা একথা লেখেন। সোমবার প্রকাশিত ইংরেজিতে লেখা জ্যোতি মালহোত্রার নিবন্ধটি হুবহু অনুবাদ করা হলোঃ
বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ এক দিন। গণমাধ্যম বর্ণনা করেছে ঐতিহাসিক সেই অনুষ্ঠানটি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইংরেজি সংবাদপত্র ডেইলি স্টার এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম, যিনি নিজেই একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রায়ই হাসিনা সরকারের সমালোচনা করেন, তিনি সংক্ষেপে বলেছেন, "বঙ্গবন্ধুর 'রাজনৈতিক ইচ্ছা' বাংলাদেশের জন্মের ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছিল। একইভাবে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ইচ্ছাই পদ্মা সেতুটি বাস্তবে রূপ নেবার দাবিদার।"
পদ্মাসেতুর নির্মাণ নির্ধারণ করে যে, চীন কিভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় তার পথ করে নিয়েছ। এই অঞ্চলে ভারতের অত্যধিক প্রভাব প্রতিস্থাপন করতে। এটা স্পষ্ট করতে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো জায়গা আর কি হতে পারে যেখানে ভারত বেশ কয়েক বছরের শৈশব পার করার পর অবশেষে একটি পরিণত সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
কারণ স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করা প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক বিষয়ে ভারত অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল।
২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পদ্মাসেতু তৈরিতে সহায়তার জন্য এক বিলিয়ন ডলারের 'লাইন অফ ক্রেডিট' ঘোষণা করেছিলেন। যা বাংলাদেশের নিজস্ব ৩ বিলিয়ন ডলারের সঙ্গে যুক্ত হতো। যেটি আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা থেকে বাংলাদেশ ঋণ হিসেবে নিতো।
কিন্তু বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানের জাইকার অন্য হিসেব ছিল। ২০১৩ সালে তারা দুর্নীতির অভিযোগ আনে। তাদের “অহঙ্কার” এবং “নির্দয় আচরণ” দেখে বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে হাসিনা ঋণের আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। মাহফুজ আনামের মতে, "আমাদের আত্মসম্মানে লাগা গভীর ক্ষতে" হাসিনাকে বলতে বাধ্য করে, "আমাদের ভিক্ষাবৃত্তির মানসিকতা দূরে রাখতে হবে।" এটি যদিও "আত্মনির্ভরশীল" ছিল না। হাসিনা সত্যিই টাকাওয়ালা বন্ধুদের খুঁজছিলেন।
২০১৫ সালের জুনে যখন নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় গিয়েছিলেন, তখনো ভারতের পাঠ চুকায়নি। দিল্লি ২০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান এবং পদ্মাসেতু প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়তে আরও ২ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রস্তাব দেয়। সেটা যথেষ্ট ছিল না। ইতোমধ্যেই টেন্ডার জিতে নেয়া চায়না রেলওয়ে ব্রিজ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে।
২০১৬ সালের অক্টোবরে শি জিনপিং ঢাকায় যান, যা ছিল ৩০ বছরের মধ্যে কোন চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম বাংলাদেশ ভ্রমণ। তিনি ২৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ঋণ সহায়তায় স্বাক্ষর করেন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ৪২টি স্প্যানের প্রথমটি ৩৭ এবং ৩৮ তম পিলারের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছিল।
ব্যাপারটা এমন নয় যে, একটি সেতু সম্পর্ক তৈরি বা নষ্ট করে দিতে পারে। অন্যান্য সংযোগ প্রকল্প ছাড়াও (চিলাহাটি-হলদিবাড়ী) একটি পুরনো অচল রেললাইন পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে মোদী সরকার এখন এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। শিলিগুড়ি থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত ২০১৮ সালে প্রতিশ্রুত একটি পেট্রোলিয়াম পাইপলাইনের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যন্ত শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশতম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অংশ হিসাবে মোদি ঢাকা সফর করলে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে যা তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো ঢাকার মন-মানসিকতার পরিবর্তন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ায় চূড়ান্ত বাস্তববাদী হিসেবে দেখিয়েছেন। খোলামেলাভাবে চীনাদের সঙ্গে 'মজা' করছেন। যদিও ১৯৭১'র যুদ্ধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল; প্রকৃতপক্ষে, চীন এমনকি ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশের আবেদনে ভেটো দিয়েছিল।
সুতরাং, একদিকে হাসিনা মোদির সঙ্গে ১৭ই ডিসেম্বর ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং অন্যদিকে তিনি শি জিনপিং এর বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্যও প্রস্তুত।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তিনি দিল্লিতে একটি বার্তা পাঠাতে চান যে 'বাংলাদেশীরা উইপোকা সমতুল্য, ওদের বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া উচিত' ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের এমন মন্তব্য তিনি ভুলে যাবেন না।
তদুপরি, জাতীয় নাগরিক নিবন্ধক (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) মুসলমান "বাংলাদেশিদের" ভারতীয় নাগরিক হওয়া থেকে বিরত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয় - যা ঢাকার জন্য লাগাতার উদ্বেগের বিষয়। যদিও ভারতীয় কর্মকর্তারা বারবার বলছেন যে, এনআরসি এবং সিএএ দুটোই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
তদুপরি, ভারতের বিপরীতে চীনের অর্থনীতি করোনা ভাইরাস মহামারি দ্বারা খুব খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে মনে হয় না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বাংলাদেশ তার মাথাপিছু জিডিপি আয়ের ক্ষেত্রে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। যদিও পাঁচ বছর আগে ভারত ২৫ শতাংশ বেশি ছিল। যে কারণে বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেছেন, "অভিযুক্ত উইপোকার কারখানাটি এখন জ্বলজ্বল করছে।"
তবুও সব শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশ চীনকে সম্প্রতি ধমকের সুরে চলে যেতে অথবা চীনা করোনা ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের জন্য অর্থ প্রদান করতে বলেছে। এটি ঘটেছে এমন এক সময়ে যখন তিন কোটি ডোজ ভ্যাক্সিন কেনার জন্য ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ঢাকার একটি চুক্তি স্বাক্ষর হচ্ছিল।
গল্পটি থেকে শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, মোদি সরকার নিজ দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আদর্শিক এজেন্ডাকে জাতীয় স্বার্থের উপর স্থান দেয়ার অনুমতি দিতে পারে না। ভারতের বৈদেশিক নীতি, বিশেষত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর সংবেদনশীল প্রতিবেশী অঞ্চলে, দলীয় বিবেচনার বাইরে রাখা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মোদিকে জোর দিয়ে বলতে হবে, ভারতে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ছোটাচু এবং সোনালি বিকেল by কামাল হোসাইন

ছোটাচু সিফাতকে ছোট্ট করে একটু মোডিফাই করে ‘সিফু’ বলে ডাকে।
ছোটাচু খুব ছোট্ট করে ডাকলেও সিফাত তা শুনতে পায়। যেন হৃদয়তন্ত্রীতে তা বেজে ওঠে বেহালার সুরে। যেখানেই থাকুক, শুনতে যেন পাবেই, এমন ব্যাপার।
আজও তার ব্যত্যয় ঘটল না।
সে-ও উত্তর করল- ছোটাচু, এই তো আমি, পড়ছি। আসব?
বাড়ির সবার কাছেই সে অত্যন্ত প্রিয়। সবাই ওকে আদর-স্নেহ-ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখে।
তবে ছোটাচু যেন একটু বেশিই ভালোবাসে ওকে।
ওকে না দেখে যেন থাকতে পারে না ছোটাচু। সিফাতও তেমনি ছোটাচুর দারুণ ভক্ত। ছোটাচু বলতে ও অজ্ঞান।
ছোটাচুর সাইকেলটাও সিফাতের আরও একটু আকর্ষণের অন্যতম কারণ। সিফাত যখন সাইকেলে বসতে শিখেছে, সেই ছোটবেলা থেকেই ছোটাচুর সাইকেলে উঠে ঘুরঘুর করে বেড়ানোর অভ্যাস তৈরি হয়েছে তার। যদি ছোটাচু সাইকেল নিয়ে একটু বের হয়েছে, আর ওর চোখে তা পড়েছে, তাহলে ওকে একটু সাইকেলে না চড়িয়ে চলে যাবে, এমন সাধ্যি ছোটাচুর নেই। তাড়াহুড়োর কারণে যদিবা চলে যায়, তাহলে ওর কান্না দেখে কে? বাড়ি মাথায় করবে কেঁদেকেটে।
সাইকেলে চড়তে ও খুব পছন্দ করে। সাইকেল চলবে, আর ও দুলে দুলে আধো বোলে নানারকম ছড়া কাটবে।
সুতরাং প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে তাকে সাইকেলে চড়িয়ে, মামা বিস্কুট, চিপস কিনে দিয়ে তবেই রক্ষে।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে ছোটাচুর শিয়রের পাশে হাজির হবে। তারপর ছোটাচুর চুল টেনে ঘুম ভাঙাবে। কখনও সখনো সে ছোটাচুর বুকের মধ্যে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকে। তারপর একসময় উঠে শুরু হয় ছোটাচুর প্রতিদিনকার চাকরি।
ছোটাচুও সিফাতের এ রকম নানা পদের বায়না, দুষ্টুমিপনায় নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে ভালোবাসে খুব।
এতে সামান্য কোনো বিরক্তির কারণও ঘটে না কখনও।
আবার সিফাতের অন্য তিন চাচু এলে ওর আনন্দের পালা আরও বেড়ে দ্বিগুণ থেকে ত্রিগুণ হয়ে যায়। এই তিন চাচু হলো সবুজ চাচু, নাইম চাচু আর সোহাগ চাচু। ওদেরও বেজায় ন্যাওটা সিফাত।
ওদের তিনজন তিন ধরনের গল্প করে সিফাতের সঙ্গে।
একজন রূপকথার গল্প শোনায় তো অন্যজন ভূত-প্রেতের। অপরজন তো কল্পবিজ্ঞানের গল্পে সিফাতকে মাতিয়ে রাখে।
তাই ওরা তিনজন যখন এসে হাজির হয়, তখন সিফাতকে আর পায় কে?
সিফাতের ছোটাচু কাজের মানুষ। নানারকম কাজের সঙ্গে সে জড়িত। এই যেমন গ্রামের মানুষের বই পড়ার জন্য পাঠাগার গড়া। কোথাও কোনো সাঁকো ভেঙে পড়েছে, তা ‘পিচ্চিবাহিনী’ নিয়ে মেরামত করা। কোনো গরিব মানুষ অসুখে পড়েছে, তার চিকিৎসার জন্য পয়সা কালেকশন করা। কেউ টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, তার বইপত্র-খাতাকলম কেনার ব্যবস্থা করা। সে যাতে স্কুলে বিনাবেতনে পড়তে পারে, তার জন্য দরখাস্ত লেখাসহ নানাবিধ কাজের সঙ্গে সে সরাসরি জড়িত।
সিফাতের উত্তরে ছোটাচু বলেÑ আয় খোকা।
সিফাত ছোটাচুর উত্তরেরও অপেক্ষা করে না। ছুটতে ছুটতে সে চলে আসে ছোটাচুর ঘরে।
এসেই ছোটাচুর কোলে ধপাস করে বসে পড়ে সে।
হাঁপাতে-হাঁপাতে বলেÑ বল চাচু, কী জন্য ডেকেছ?
পড়াশোনার কী হাল, বাবা?
ভালো চাচু। তবে কী জান চাচু? অঙ্ক নাÑ ও জিনিসটা একদম মাথায় ঢোকে না আমার। কী যে করি!
কী আর করবি। মাথায় ঢোকে না বললেই তো চলবে না। মাথায় ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তা তো বুঝলাম, কিন্তু...
কোনো কিন্তু নয়, অসম্ভব বলে কোনো কথা নেই। বেশি বেশি চর্চা করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তাহলে কিন্তু আমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দিতে হবে।
আচ্ছা সে হবে।
আচ্ছা এবার বল, কী জন্য ডেকেছ আমায়?
ছোটাচু বলল, এখন তো বিকেল, সন্ধ্যা হই হই করছে। চল একটু সবুজ মাঠের সবুজের বিশাল সমারোহ দেখে আসি।
সিফাত ছোটাচুর কথায় এককথায় রাজি। ছোটাচুর কেবল বলা দরকার, কোথাও যেতে হবে। ব্যস, এটুকুই যথেষ্ট। কোথায় তা ওর বিবেচ্য নয়, ছোটাচু বলেছে মানে যেতে হবে। বিনাবাক্যে সে রাজি।
বিকেলের কমলা রোদ তখন মাঠে ভেসে যাচ্ছে। হেমন্তের শেষ বিকেলের এই সোনারোদ যেন ওদের গায়ে আদর বুলিয়ে দিচ্ছে। মাঠভরা পাকা ধান তাদের সরব উপস্থিতি যেন ঝনঝন শব্দে জানান দিয়ে যাচ্ছে মাঝে মধ্যে।
ছোটাচু বলল- আজ তোকে আমাদের দেশের গল্প শোনাব।
ছোটাচু শুরু করে ঠিক গল্পের মতো করেই-
সুনীল আকাশ। পেঁজা তুলোর পাহাড়ে ঘেরা। কুয়াশাচ্ছন্ন। আস্তে-আস্তে ফিকে হয়। টুপটুপ শিশির ঝরে পাতায়-ঘাসে। মৃদু হাওয়ায় দোল খায় লাউডগা। জারুল গাছের পাতার ফাঁকে দোয়েলের শিস। পুকুর-ডোবায় আকাশের তারার মতো শাপলা ফোটে। হাসে কুটিকুটি। ঢেউ লেগে আহ্লাদে ফেটে পড়ে। পুব আকাশে চিকচিক উঁকি দেয় সূর্যিমামা। শুরু হয়ে যায় নতুন একটা দিনের।
আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশের গায়ে সোনারোদ ঝিকমিক। নদীর ঢেউ খেলে কুলকুল। পাল উড়িয়ে চলে নৌকার সারি। মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালির মিহি সুর। এক মায়াবী জগৎ। ভালো লাগার দুর্বার হাতছানি।
এমন যে দৃশ্য, তাতে মন ব্যাকুল করে। আকুল হয়।
ছোটাচুর এমন চমৎকার শব্দমালার উচ্চারণে সিফাত যেন কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো হয়ে যায়। কথাগুলো শুনতে ওর ভীষণ ভালো লাগে।
মনে হয় যেন ছোটাচুর বলা কথাগুলো হৃদয়ের কোন গহিন ভেতর থেকে উঠে আসছে।
ছোটাচু মাঝে মধ্যে একটু ঢোঁক গিলে আবার শুরু করে।
শুরু করার আগে সিফাতের দিকে তাকায়। দেখেÑ তার শ্রোতাটি ঠিকমতো শুনছে কিনা।
ছোটাচু একটু থামে। তারপর আবার বলতে থাকেÑ
এই যে চমৎকার স্বপ্নসুন্দর পরিবেশ, সে আমাদের দেশের। প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের চিরচেনা ছবি। এমন মনকাড়া ছবি বিশ্বের আর কোথাও মেলে না। তাই তো আমরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠি একটা মিষ্টি গানÑ ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...।’
হ্যাঁ, আমরা সবাই ‘বাংলা’ নামের দেশটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। মায়ের প্রতি যেমন আমাদের সীমাহীন নির্ভেজাল ভালোবাসা, তেমনই ভালোবাসা এ দেশের মাটির প্রতিও। আরও ভালোবাসা মানুষ। বাতাস। আকাশ। পাহাড়। ঘাস। ফুল। পাখি। প্রজাপতি। নদী। আর আদিগন্ত সবুজের প্রতিও।
কিন্তু এ সোনার দেশটি একদিন আমাদের ছিল না। পাকিস্তান নামের দেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর আমাদের এ অংশের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান।’
আমরা বাঙালি। আমাদের মিষ্টি একটা ভাষা আছে। নাম বাংলা। আর পাকিস্তানিরা ভিনভাষী। তাদের সবকিছুতেই আমাদের সঙ্গে অমিল। চলায়। বলায়। ভাষায়। বলতে পারিস সবকিছুতেই।
মুখের ভাষাটাও তারা কেড়ে নিতে চাইল। এ দেশের মানুষ সমস্বরে ‘না’ বলল।
এ ‘না’কে প্রতিষ্ঠা করতে কারা ভূমিকা রেখেছিল জানিস? এ দেশের অসংখ্য ছাত্র। শিক্ষক। যুবক। জেলে। চাষা। কুলি। মজুর। তাঁতি। মাঝি। আর তোদের চেয়ে একটু বয়সে বড় দামাল কিশোরটিও।
এত লোকের ‘না’ বলা কণ্ঠ তারা আবার থামিয়ে দিতে চাইল। আর এর জন্য আবার এক নয়, দুই নয় দীর্ঘ ৯ মাস লড়াই চলল তাদের সঙ্গে আমাদের।
১৯৭১ সালে সংঘটিত ওই লড়াইয়ের নাম ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ’। গোটা বাঙালি জাতিই সেদিন ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে মুক্ত হতে চেয়েছিল। তাই অমন নাম। ওরা ওইসব মুক্তিকামী মানুষকে রুখে দিতে নানারকম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রমাণ হয়েছিলÑ দেশপ্রেমের কাছে সবকিছু নস্যি।
লড়াই করার অর্থ হলোÑ আমরা আর তাদের সঙ্গে থাকতে চাই না। স্বাধীনতা চাই। চলার স্বাধীনতা। বলার স্বাধীনতা। দেখার স্বাধীনতা। ভাবার স্বাধীনতা। ভাষার স্বাধীনতাÑ কেবলই স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতা বিশ্বে আমাদের আলাদা করে চেনাবে। আমাদের একটা নিজস্ব মানচিত্র হবে। পতাকা হবে। এ দাবিই ছিল মূল। আমরা বললামÑ ‘আমাদের দাবি মানতে হবে।’
ওরা ‘না’ বলল।
‘না’ বললেই হলো? এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার নেশায় মেতে উঠল। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে গেল। বীরের মতো লড়াই করে রক্ত দিল।
ছোটাচু থামে। তার কথাগুলো কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়। ছোটাচুও যেন সেই স্বপ্নের জগতের এক ‘অন্য মানুষ’ হয়ে গেছে।
সিফাত এগুলো একটু একটু তার বইতে পড়েছে। কিন্তু এমনভাবে তার মাথায় আজ অবধি ঢোকেনি। এজন্যই তো সে ছোটাচুর কাছে অঙ্ক শিখতে চায়। তাহলে এখন থেকে আর পরীক্ষায় তাকে অঙ্কে কম নম্বর পেতে হবে না।
সিফাত ছোটাচুর কথা শুনতে উদগ্রীব। থামল মানেই যেন সব শেষ হয়ে গেল। তাই সে ছোটাচুকে তাড়া দেয়, ছোটাচু তারপর?
ছোটাচু অতিরিক্ত কোনো কথা না বলে আবার শুরু করে-
তারপর কত রক্ত! তারপর ওরা হারল। আমাদের চরম মনোবলের কাছে ওরা পরাজিত হলো।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা নতুন একটা পতাকা পেলাম। আর পেলাম নতুন একটা দেশের ঠিকানা। পেলাম স্বাধীন মানচিত্র। গর্বে আমাদের বুকটা টান টান হলো। তার মানে ওই দিন আমরা পাকিস্তানি দস্যু বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে বিজয় অর্জন করলাম।
আমাদের নতুন দেশটির নাম হলো ‘বাংলাদেশ’। বিশ্বে স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা নতুন করে পরিচিতি পেলাম।
স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা সেদিন থেকে সগৌরবে পতপত করে আকাশে ওড়ে। ঘোষণা করে তার শ্রেষ্ঠত্বের কথা।
আমাদের এ গর্বের ইতিহাস আর প্রিয় এ দেশটির কথা আমরা কখনও ভুলব না। যাদের রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ, এই মাটি, তাদের মনে রাখব চিরদিন। দেশকে ভালোবেসে প্রতিদিন অন্তত একবার আমরা সবাই বলবÑ ‘প্রিয় বাংলাদেশ, আমি তোমায় ভালোবাসি। যতদিন শরীরে প্রাণ আছে ততদিন ভালোবাসব।’
পূর্ণ গল্পটি শেষ করে নড়েচড়ে বসল ছোটাচু।
ছোটাচু এভাবেই অনেক জ্ঞানের কথা, জানার কথা দারুণ সব গল্পের মাধ্যমে শিখিয়ে দেয়।
যখন গল্পটি শেষ হলো তখন সূর্য প্রায় ডুবুডুবু।
এখন ঘরে ফেরার পালা। একটু বাদে একটু একটু শিশির পড়তে শুরু করবে। এ সময় বাইরে থাকলে ঠান্ডা লাগতে পারে। তাই আর মাঠে বেশিক্ষণ থাকা হলো না। চাচা-ভাইপোতে আবার আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করে বাড়ির দিকে।
তবে সিফাতের কাছে আজকের এ বিকেলটা অন্যরকম হয়ে ওর স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে। স্মৃতিময় এ দিনটির কথা কি সে কখনও ভুলতে পারবে?
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1403)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ▼ 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
