Thursday, October 15, 2015

ভারতে সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ: সম্মাননা ফেরত দিলেন ৪১ লেখক by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

নয়নতারা সায়গল, দলীপ কৌর তিওয়ানা
ভারতে সার্বিক অসহিষ্ণুতা বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে গত চার-পাঁচ দিনে ৪১ জন লেখক-সাহিত্যিক সরকারি-বেসরকারি পুরস্কার ও সম্মাননা ফেরত দিয়েছেন। এ নিয়ে ভারতজুড়ে চলছে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক।
এ ব্যাপারে চুপ থাকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অবশ্য মুখ খুলেছেন। তিনি বলেছেন, বিজেপি এ ধরনের ঘটনা সমর্থন করে না। বিরোধীরা এসব ঘটনাকে সামনে এনে মেরুকরণের রাজনীতি করছেন। আনন্দবাজার পত্রিকাকে তিনি বলেন, অতীতেও এই বিতর্ক হয়েছে। আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে এই বিতর্কের নিরসন সম্ভব।
সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারজয়ী যুক্তিবাদী কন্নড় লেখক এম এম কুলবর্গি কর্ণাটকে নিজের বাড়ির কাছে খুন হন গত ৩০ আগস্ট। এর আগে খুন হয়েছেন যুক্তিবাদী লেখক গোবিন্দ পানসার ও নরেন্দ্র দাভোলকর। সনাতন সংস্থা নামে এক কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এসব হত্যার পেছনে রয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থার সন্দেহ। সংগঠনের একাধিক সদস্যকে এ জন্য গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। বাক্-স্বাধীনতার ওপর এই আক্রমণ সত্ত্বেও সাহিত্য আকাদেমি প্রতিবাদ না জানিয়ে চুপ থাকায় বিশিষ্ট লেখিকা জওহরলাল নেহরুর ভাগনি নয়নতারা সায়গল সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। ফেরত পাঠান এক লাখ রুপি পুরস্কারমূল্যও।
সেই থেকে বিভিন্ন ভাষার ৪১ জন লেখক-লেখিকা সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার কিম্বা খেতাব ফেরত পাঠিয়ে সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছেন। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত পশ্চিমবঙ্গের কবি মন্দাক্রান্তা সেন ও পাঞ্জাবি লেখিকা দলীপ কৌর তিওয়ানা। গৌতম বুদ্ধ ও গুরু নানকের দেশে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং তা রুখতে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে সরকারি পদ্মশ্রী খেতাব ফেরত দিয়ে তিওয়ানা বলেছেন, যা হচ্ছে তা দেশের পক্ষে লজ্জার।
শুধু যুক্তিবাদী লেখক খুনই নয়, প্রতিবাদী লেখকেরা সার্বিক অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে গলা তুলেছেন। তাঁরা মনে করছেন, রাজ্যে রাজ্যে ও কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই অসহিষ্ণুতা মাত্রাছাড়া হয়ে গেছে। নয়নতারা সায়গল অথবা কন্নড় লেখক রহমত তারিকেরি কিংবা মন্দাক্রান্তা সেন উত্তর প্রদেশের দাদরি এলাকার বিসাদা গ্রামে গোমাংস খাওয়ার অপরাধে মুহম্মদ ইকলাখকে পিটিয়ে মেরে ফেলার প্রসঙ্গও তুলেছেন। তাঁরা মনে করেন, এই সহিংসতা বন্ধে শাসক দল ও রাষ্ট্রের যে ভূমিকা পালন করা দরকার, তা করা হচ্ছে না। নয়নতারার অভিযোগ, সাহিত্যিকদের হত্যা করা হচ্ছে অথচ সাহিত্য আকাদেমি নীরব দর্শক সেজে থাকবে, কোনো প্রতিবাদ পর্যন্ত করবে না, এটা মেনে নেওয়া যায় না।
সারা জোসেফ
নয়নতারার পুরস্কার ফেরানোর ঘটনায় কটাক্ষ করে আকাদেমির চেয়ারম্যান বিশ্বনাথ প্রসাদ তিওয়ারি পুরস্কারমূল্য ফেরত দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরদিনই নয়নতারা এক লাখ রুপির একটা চেক সাহিত্য আকাদেমিতে পাঠিয়ে দেন। সাহিত্যিক সালমান রুশদি নিজের বিরক্তি গোপন না করে বলেছেন, ‘আমি ভারতের কোনো রাজনৈতিক দলকেই সমর্থন করি না। বাক্-স্বাধীনতার ওপর সব ধরনের আক্রমণের নিন্দা করি। মনে হচ্ছে, ভারতে এক নতুন হিংসার রাজনীতি জন্ম নিয়েছে।’ এই প্রতিবাদকে বিজেপি অবশ্য আমল দিচ্ছে না। বরং প্রধানমন্ত্রী সংবাদপত্রে মুখ খুলে যে প্রশ্নটা রেখেছেন, বিজেপির বড়-মেজ-ছোট নেতারাও সেই যুক্তিই খাড়া করছেন। ইকলাখ হত্যা অথবা পাকিস্তানি গজল গায়ক গুলাম আলীকে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠান করতে না দেওয়াকে দুঃখজনক জানিয়ে মোদির প্রশ্ন, এসব ঘটনার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক কী? এ প্রশ্নই তুলেছেন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী বিজেপি নেতা মহেশ শর্মা। তাঁর বক্তব্য, সাহিত্য আকাদেমি সরকারি সংস্থা নয়, স্বশাসিত সংস্থা, লেখকদের সংস্থা। লেখকেরাই এখানে দেশের লেখকদের পুরস্কার দেন। সেই পুরস্কার কেউ ফেরত দিলে সেটা তাঁদের ব্যাপার। বিজেপির সাংসদ বিজয় গোয়েল অবশ্য এতটা মোলায়েম স্বরে প্রতিবাদীদের সমালোচনা করেননি। তাঁর কথায়, লেখকেরা বরং তাঁদের কলমের দিকে নজর দিন। না হলে তাঁরা পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হবেন।
মন্দাক্রান্তা সেন, অশোক বাজপেয়ী
বিজেপির আমলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর শক্তি বৃদ্ধি হচ্ছে, ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্র নষ্ট হয়ে হিন্দুত্ববাদী হওয়ার পথে এগোচ্ছে বলে প্রতিবাদী লেখক-লেখিকারা মনে করছেন। এঁরা মনে করছেন, গো-হত্যা নিষিদ্ধকরণ, যুক্তিবাদীদের হত্যা, ইকলাখ-হত্যাকাণ্ড, পাকিস্তানিদের অনুষ্ঠানে বাধা দান, সুধীন্দ্র কুলকার্নির মুখে কালি লেপে দেওয়া—এগুলো আদৌ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতকে ক্রমশ হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার সার্বিক ছকের অঙ্গ এসব ঘটনা। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট, বিজেপি এই প্রতিবাদকে রাজনৈতিক মনে করছে। তারা মনে করছে, কংগ্রেস আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাঁরা ছরি ঘুরিয়ে এসেছেন, যাঁরা প্রকারান্তরে নেহরু-গান্ধী পরিবারের দাক্ষিণ্য পেয়েছেন, তাঁরাই আজ প্রতিবাদী। বিজেপি তাই রাজনৈতিকভাবে এই প্রতিবাদের মোকাবিলায় নেমেছে। বিজয় গোয়েল সে কারণেই বলেছেন, ‘আমরা চাই এই দাক্ষিণ্যভোগীরা দ্রুত পদ ছাড়ুন।’
সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ফেরত দেওয়া নিয়ে লেখক মহলও দ্বিধাবিভক্ত। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের লেখক মহল। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সমরেশ মজুমদার, নবনীতা দেবসেন, সুবোধ সরকাররা মনে করেন, যে সরকার ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বাড়াচ্ছে, তাদের আমলে তাঁরা সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পাননি। তাই পুরস্কার ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। তাঁরা সবাই মনে করেন, সাহিত্য আকাদেমি কোনো সরকারি সংস্থা নয়। তাই পুরস্কার ফেরত দেওয়াটা সার্বিক অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঠিক পথ বলে তাঁরা মনে করেন না।

আইন মন্ত্রণালয়ের অক্ষমতা- প্রধান বিচারপতির উষ্মা বিবেচনায় নিন

অধস্তন আদালতের লোকবল নিয়ে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতার কারণে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা উষ্মা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু পরিহাস হলো, সমস্যা কেবল বিচারকস্বল্পতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এমনকি বিচারকার্য পরিচালনার জন্য যে প্রশাসনিক লোকবল থাকা দরকার, তারও বিরাট আকাল চলছে। সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে চিঠি চালাচালি চলছে, কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না। দেশের অধস্তন আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন আছে ২৭ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৩টি মামলা এবং বছরে গড়ে ছয় লাখ মামলা জমছে। কিন্তু বিচারকসংখ্যা তো বাড়ছেই না, এমনকি বিচারকদের অনুমোদিত পদগুলোও পূরণ করতে সরকার ঔদাসীন্যের পরিচয় দিয়ে চলেছে। ১ হাজার ৬৫৫টি অনুমোদিত পদের মধ্যে এখন সাড়ে চার শতাধিক পদ শূন্য। বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। পুলিশ ভেরিফিকেশনের মতো নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লাগছে। সুপ্রিম কোর্ট বলছে যে একজন বিচারক নিয়োগে বর্তমানে গড়ে তিন থেকে চার বছর সময় লাগছে। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া বিচারক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়াও সম্ভব হয় না। আবার বিচার প্রশাসনের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও পদ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে আইন মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী।
নতুন বিচারক ও সহায়ক লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিচ্ছে, তা অগ্রহণযোগ্য। আবার পরিহাস হলো, খোদ আইন মন্ত্রণালয়ও লোকবলের সংকটে ভুগছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পাঁচ বছরের একটি পূর্ণ মেয়াদ এবং এরপর আরও দেড় বছরের বেশি সময় যুগ্ম সচিবের পাঁচটি ও অতিরিক্ত সচিবের একটি পদ শূন্য রেখে মন্ত্রণালয় চলছে। দেশের বিচার প্রশাসনের প্রতি এ ধরনের অবহেলা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
আমরা আশা করব, অধস্তন আদালত পরিচালনার জন্য প্রস্তাবিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে অবিলম্বে উল্লেখিত লোকবল সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকার উদ্যোগী হবে।

আরাকান আর্মির নেতা রোনিন সোয়ে আসলে কে?

মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির কথিত এক নেতা রোনিন সোয়ে’র সঠিক পরিচয় সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল থেকে এসেছেন বলেই পুলিশের ধারণা। পুলিশ মনে করছে বেশ কয়েকমাস আগে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন।
কিন্তু স্থানীয় সাংবাদিকদের কেউ কেউ বলছেন কথিত নেতা সোয়ের বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর। ১৯৯৬ সালে প্রথম বাংলাদেশে বসতি গড়েছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। এরপর তিনি রাজস্থলী নতুন বাজার এলাকাতেই স্থানীয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার একজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের দুই সন্তান রয়েছে। তবে সোয়ে বেশ কিছুদিন দেশের বাইরে ছিলেন এবং বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেছেন। আরাকান আর্মির কথিত এই নেতার স্ত্রী এবং সন্তানরা এখনো নেদারল্যান্ডসে বসবাস করছেন বলে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক জানতে পেরেছেন।
তবে এই ঘটনার সত্যতা কতটা সে বিষয়টি পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান বলেন, ‘তার কাছে আমরা একটি নেদারল্যান্ডসের পাসপোর্ট পেয়েছি। এই পাসপোর্ট জেনুইন (আসল) কি-না সেটি আমরা খতিয়ে দেখছি। বাংলাদেশের কোনো কাগজপত্র পাইনি।’
পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, সোয়ে রাঙামাটির যে এলাকায় থাকতেন সেখানে তিনি ডাক্তার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাজস্থলীর নতুন বাজার এলাকায় সোয়ে’র একটি সুন্দর বাড়ি রয়েছে বলে একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যক্তি এতদিন ধরে কিভাবে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন? রাঙামাটির পুলিশ সুপার আশা করেন জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সোয়ে’র বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা রয়েছে। আজ তাকে রাঙামাটির আদালতে তোলা হয়। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে।
এর আগে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির কথিত এক নেতাকে রাজস্থলী নতুন বাজার এলাকা থেকে পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী আটক করে।
পুলিশ দাবি করছে তিনি আরাকান আর্মির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। রাঙ্গামাটিতে অবস্থান করেই সোয়ে আরাকান আর্মির কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন বলে পুলিশ বলছে।
গত অগাস্ট মাসে বান্দরবানের থানচি সীমান্ত এলাকায় সেনাবাহিনী ও বিজিবির যৌথ দলের ওপর হামলা ও বন্দুকযুদ্ধের পর রোনিন সু সম্পর্কে জানতে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এর দুদিন পরেই তিনি বসবাস করছেন এমন একটি বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ ও বিজিবি।
অভিযানের সময় রোনিন সুকে না পাওয়া গেলেও তার একজন সহযোগীকে আটক করতে সক্ষম হয় যৌথবাহিনী।
পরে ওই সহযোগী স্বীকার করে যে আরাকান আর্মির সদস্য এবং তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত রেনিন সুকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় সম্ম্প্রতি মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির তৎপরতার প্রেক্ষাপটে এই ব্যক্তিকে আটক করা হলো। সূত্র : বিবিসি বাংলা

জেরুজালেমে গুলি ও ছুরিকাঘাতে তিন ইসরায়েলি নিহত

পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য
করে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ছেন একজন ইসরায়েলি সেনা। রয়টার্স
জেরুজালেমে গতকাল মঙ্গলবার গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন তিনজন ইসরায়েলি নাগরিক। পরে ইসরায়েলি পুলিশের গুলিতে এক হামলাকারী প্রাণ হারায়। এ ছাড়া গতকাল গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে সহিংসতায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে পাঁচ ফিলিস্তিনি। খবর এএফপির। ইসরায়েলি পুলিশের মুখপাত্র মিকি রোজেনফেল্ড বলেন, সকালে জেরুজালেমের একটি বাসে যাত্রীদের লক্ষ্য করে গুলি করা শুরু করেন দুই ব্যক্তি। এতে দুই ইসরায়েলি নিহত ও পাঁচজন আহত হন। এ সময় এক হামলাকারীকে হত্যা ও অপরজনকে আটক করে পুলিশ।
প্রায় একই সময়ে জেরুজালেমের একটি বাসস্ট্যান্ডে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় এক ব্যক্তি নিহত ও কয়েকজন আহত হন। ইসরায়েলি পুলিশ বলছে, ইসরায়েলের সীমান্তের কাছে গতকালও শত শত ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে টায়ার জ্বালিয়ে এবং পাথর ছুড়ে বিক্ষোভ করেছেন। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে ইসরায়েলি বাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি চিকিৎসকদের একটি সূত্র জানায়, সীমান্তে জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনী গুলি ছুড়লে পাঁচ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গত মাসের মাঝামাঝি পূর্ব জেরুজালেমের ওল্ড সিটিতে মুসলমানদের পবিত্র আল-আকসা মসজিদের প্রাঙ্গণে ইহুদিদের অনুষ্ঠান আয়োজন ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। চলতি মাসের শুরুতে বন্দুকধারীদের গুলিতে ইসরায়েলি এক দম্পতি নিহত হয়। ইসরায়েল এর জন্য হামাসকে দায়ী করলে সৃষ্ট উত্তেজনা আরও তীব্রতা পায়। একের পর এক ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটতে থাকে। যদিও বেশির ভাগ ছুরিকাঘাতের ঘটনায় হামলাকারীরা ইসরায়েলি পুলিশের হাতে নিহত হন।

১৩ বছর লড়াইয়েও আফগানিস্তানে শান্তি আসেনি: ওবামা

বারাক ওবামা
আফগানিস্তানে ১৩ বছর ধরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের লড়াইয়ের পরও সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি বলে স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশ দুটিতে মার্কিন সেনা পাঠানোর ধারণাও নাকচ করে দেন ওবামা। খবর ডনের। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন ও রেডিও নেটওয়ার্ক সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে ওবামা আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইরাক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। ইরাক ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কেন সেনা পাঠাতে চায় না—তার ব্যাখ্যায় ওবামা বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। আমরা সেখানে ১৩ বছর ছিলাম। এখনো সেখানে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠোর। কাজেই সিরিয়ায় সেনা পাঠানো হলে এক বছর পর যেকোনোভাবে আমরা সমস্যার সমাধান করতে পারব—এ ধারণা কাল্পনিক।’
তবে সিরিয়ার পরিস্থিতি আফগানিস্তানের থেকে ভিন্ন বলে উল্লেখ করে ওবামা বলেন, ‘তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আফগানিস্তানের সরকারই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সেখানে সেনা পাঠানো জন্য বলে। কিন্তু সিরিয়ার বর্তমান সরকার আমাদের আমন্ত্রণ জানায়নি বরং সক্রিয়ভাবেই আমাদের দূরে রেখেছে।’ ওবামা বলেন, তিনি জানেন রিপাবলিকান পার্টির কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যে অসংখ্য সেনা পাঠানোর পক্ষে। তবে এ ব্যাপারে ওই দলের মধ্যেই বিভাজন রয়েছে। ওবামা আরও বলেন, সেখানে সেনা পাঠানো হলে কয়েক হাজার সেনা হতাহত হবে এবং ওয়াশিংটনের কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে।

ঘুষের অভিযোগ, জাতিসংঘে অস্বস্তি

জন অ্যাশ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনের সভাপতি জন অ্যাশের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এখনো কানাঘুষা চলছে। ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের দ্বারপ্রান্তে এসে এমন একটি ঘটনায় জাতিসংঘের মহাসচিব ও কর্মকর্তারা বিব্রতকর সমালোচনার মুখে পড়েছেন।  মার্কিন বিচার বিভাগের ম্যানহাটনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যতম কৌঁসুলি প্রীত ভারারার করা মামলায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ক্যারিবীয় দেশ এন্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতি থাকার সময় চীনা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১০ লাখ ডলারের ঘুষ নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসরত জন অ্যাশ ইতিমধ্যে তাঁর কূটনৈতিক নিরাপত্তা (ইমিউনিটি) হারিয়েছেন। এন্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গ্যাস্টন ব্রাউন তাঁর (অ্যাশ) বিরুদ্ধে করা মামলায় মার্কিন কর্তৃপক্ষকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এই মামলা এমন এক সময়ে তথ্যমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে, যখন জাতিসংঘ তার ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের আয়োজন করছে। গত মাসে প্রায় ১৬০ জন বিশ্বনেতার উপস্থিতিতে পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে বিশ্বসংস্থার নতুন ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ ঘোষিত হয়েছে। এই সময়ে জাতিসংঘের সাফল্য নিয়ে আলোচনার জায়গায় সংস্থার অভ্যন্তরে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় মহাসচিব বান কি মুনও পড়েছেন বিব্রতকর এক পরিস্থিতিতে। প্রথম আলোকে এ কথা জানান জাতিসংঘ সচিবালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। জন অ্যাশ যে দামি ঘড়ি ও ব্যক্তিগত সফরের জন্য চীনা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিমান ভ্রমণের টিকিট সংগ্রহ করেছেন, তাতে সচিবালয়ের কর্মকর্তারাও হতবাক হয়েছেন। মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক স্বীকার করেছেন, দুর্নীতির এই অভিযোগ জাতিসংঘের সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তাঁর ভাষায়, ‘মহাসচিব এ ঘটনায় ভীষণ আঘাত পেয়েছেন। ব্যাপারটা তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছে।’ জন অ্যাশ যে বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন, তা অনেকেরই নজরে এসেছিল। সংস্থার সাবেক উপমহাসচিব, বাংলাদেশের আনোয়ারুল করিম চৌধুরী বলেছেন, নিজের দপ্তরে থাকার বদলে জন অ্যাশ প্রায়শই বিভিন্ন সরকারের অতিথি হিসেবে বিদেশে ভ্রমণ করতে ভালবাসতেন। তাঁর এমন অভ্যাসের সুযোগ কোনো কোনো ব্যবসায়ী গ্রহণ করে থাকলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রীত ভারারার অভিযোগ অনুসারে, জন অ্যাশ চীনের ম্যাকাওতে একটি আন্তর্জাতিকমানের সম্মেলন কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে জাতিসংঘ মহাসচিবের সমর্থন চেয়ে লবিং করছিলেন। সম্মেলন কেন্দ্রটি স্থাপনে বিনিয়োগে আগ্রহী একজন চীনা ব্যবসায়ীর অনুরোধে অ্যাশ মহাসচিবকে একটি চিঠি পাঠান। এই কাজের জন্য ২০১২ সালে তিনি ঘুষ হিসেবে এক মিলিয়ন মার্কিন ডলার পান। প্রীত ভারারা অবশ্য অ্যাশের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ আনেননি, সেটি তাঁর আওতার বাইরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা বা গ্রিনকার্ডের অধিকারী হিসেবে এই উপার্জন তাঁর আয়কর ঘোষণায় গোপন রাখা এবং এর ওপর ধার্য করা কর দিতে ব্যর্থ হওয়ায় জন অ্যাশের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে জন অ্যাশ ছয় বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে পারেন। স্তেফান দুজারিক জানান, অ্যাশের চিঠির কোনো জবাব দেননি মহাসচিব বান কি মুন। ম্যাকাওতে সম্মেলন কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে তাঁর সমর্থনও প্রকাশ করেননি।

প্রবীণ অবসরভোগীদের প্রত্যাশা by কাজী আশরাফ আলী

সিন্ডিকেট শব্দটি অর্থবহ। প্রতিনিধিদের সভা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সভা বোঝাতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিসভা বোঝাতে শব্দটির ব্যবহার হয়। কার্যকর সুবিধা আদায়ে, মতের কেন্দ্রিকতায়, অস্তিত্বের সুরক্ষায়, চাপ সৃষ্টিতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে এর সদস্য প্রতিনিধিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন। দাম বৃদ্ধি-কমাতে, কর সুবিধা আদায়ে, লাভ বাড়াতে, আমদানি-রফতানিতে সমগোত্রীয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার প্রয়াস অব্যাহত রাখতে সিন্ডিকেট নামের মাধ্যমটির গুরুত্ব বহন করে। সমস্বার্থে, মতের সম্মিলন ঘটিয়ে জনকল্যাণে ইচ্ছার প্রকাশ ও বাস্তবায়নে সিন্ডিকেট না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষিত হয় না। ফলে যথাযথ উপলব্ধি ব্যতিরেকে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে থাকে যাতে জনকল্যাণের ইচ্ছা থাকলেও তা যথাযথ হয় না এবং যথার্থ প্রতিফলন ঘটে না। বছরের ১ অক্টোবর ছিল আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। সারা বিশ্বে প্রবীণদের কল্যাণ, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় জাতিসঙ্ঘের আহ্বানে দিবসটি পালিত হয়।
বাংলাদেশে প্রবীণ হিতৈষী সঙ্ঘ যোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালন করে এবং প্রবীণদের কল্যাণে বিভিন্ন সামাজিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। প্রবীণদের চাহিদা ও সামর্থ্য বিবেচনার অপেক্ষা রাখে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা উপেক্ষিত হয়। প্রবীণেরা গ্রামে ও শহরে বসবাসরত। যারা এক সময়ে যুবক, যাদের শ্রমে সেবা সৃষ্টি হয়েছে তারাই আজ প্রবীণ, অবেহেলিত ও নির্যাতিত। বাস্তবতা হলো বার্ধক্য ও মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে সবাইকে। বাংলাদেশে প্রবীণের সংখ্যা এক কোটির ঊর্ধ্বে ছাড়িয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলছে। তাদের প্রতি সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার পরিধি বিস্তৃত করা প্রয়োজন। প্রবীণদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত কর্মচারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৫৯-৬০ এ উন্নীত হয়েছে। প্রবীণবিষয়ক জাতীয় নীতিমালা-২০১৩ প্রণয়ন, অবসর গ্রহণের সময়বৃদ্ধি, প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন গঠন-প্রক্রিয়াধীন, স্বাস্থ্যভাতা বৃদ্ধি, একটি পৃথক ব্যাংক গঠনের প্রস্তাব সরকারের প্রবীণ বান্ধবনীতির একটি মৌলিক অবদান যা প্রশংসনীয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অবসরভোগীদের সামাজিক সুরক্ষায় শতবর্ষের পুরনো ব্রিটিশ ভারতের পেনশন আইনের সংস্কারসহ সময়ের চাহিদা উপযোগী সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণে আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচিত হতে পারে। উল্লেখ্য, এসব প্রবীণের নিজের মতো সিন্ডিকেট ব্যতিরেকে তাদের কিসে কল্যাণ হবে তা সরকারি পর্যায়ে উপস্থাপন করতে পারে না। তাই এরা পুরোপুরিভাবেই সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু দেখা যায় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় অমানবিক, অসামঞ্জস্যপূর্ণ, অকল্যাণকর ও অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রবীণদের একাংশ অবসরভোগী ভীষণভাবে আশাহত হন এবং প্রতিকার হতেও বিরত থাকেন। এ ধরনের কিছু ন্যায্য মৌলিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হলো : (ক) প্রভিডেন্ট ফান্ডের জমা টাকা, চাকরিকালীন সঞ্চয়, নিজ প্রাপ্য টাকা করমুক্ত, অথচ চাকরি শেষে এ খাতের সমুদয় প্রাপ্তি দিয়ে বিশেষ সঞ্চয়পত্র- পেনশনার সঞ্চয়পত্র কিনলে তা উৎস করের আওতায় আসে- আয়কর দিতে হয়। (খ) মাসিক পেনশন যারা গ্রহণ করেন তা আয়করমুক্ত। কিন্তু যারা মাসিক পেনশন গ্রহণ করেননি শতভাগ সমর্পণ করে একমাত্র প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে পেনশনার সঞ্চয়পত্র নির্দিষ্ট অনুমোদিত সীমায় ক্রয় করেছেন এবং অন্য উৎসের আয় ছাড়া ওই নিরাপত্তা জামানতের আয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করেন তাদের উৎসকর ও আয়কর দিতে হচ্ছে। (গ) অনুমোদিত সীমায় গ্র্যাচুইটির টাকা দিয়ে কেনা পেনশনার সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত আয়ে পারিবারিক ব্যয়, ছেলেমেয়ের বিয়ে, পড়ালেখা বাবদ ব্যয় হয় তাতেও উৎসকর ও আয়কর দিতে হয়। (ঘ) সরকার সময়ে সময়ে মুদ্রাস্ফীতির সমন্বয়ে মহার্ঘভাতা দিয়ে থাকে, যা মাসিক পেনশনাররা পেয়ে থাকেন। কিন্তু যাদের পেনশন বিক্রয় করা হয়েছে মাসিক টাকা পান না, দুই ঈদে উৎসবভাতা পান তাদের বেলায় কমিউটেশনের টাকা ছাড়া অতিরিক্ত কিছুই দেয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে মহার্ঘভাতা উৎসবভাতার সাথে যোগ হলে পেনশনাররা বর্ধিত টাকা পেতেন ও প্রাপ্যতা সময়োপযোগী হতো। (ঙ) বাংলাদেশ সঞ্চয় ব্যুরো ইতোমধ্যে বিভিন্ন হারে সঞ্চয়পত্রগুলোর সুদহার কমিয়েছে। নির্দিষ্ট সীমায় পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্র শুধু সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ক্রয়ের জন্য নির্ধারিত হলেও এর সুদ হার কমানো হয়েছে। এতে যারা শুধু এ স্থির আয় দিয়ে পারিবারিক খরচ নির্বাহ করেন তাদের ওপর আঘাত করা হয়েছে।
অন্য দিকে উৎসকর বিলোপ না করে তা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। (চ) অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো কোনো ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের সংস্থাপন ও কল্যাণ বিভাগ অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের চিকিৎসা সহায়তা দেয়ার নীতি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রচার করলেও ২৫ বছর চাকরির পর স্বেচ্ছায় অবসরে যারা যান তাদের এ সুবিধা দেয়া হয়নি। তাদের এ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যা অনৈতিক ও অনভিপ্রেত। প্রত্যেক অবসরভোগীকে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান থেকে মানবিক কারণেই চিকিৎসার সহায়তা দিতে পারে। (ছ) প্রবীণ অবসরভোগীদের চিকিৎসা ও সাহায্যার্থে প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআর কর্মসূচির শতকরা হারে কল্যাণ খাতে ব্যয় নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। (জ) প্রবীণ অবসরভোগীদের যেহেতু বেতনাদি নেই, বাড়িভাড়া ভাতা নেই, শুধু দুই ঈদের দুই উৎসব ভাতা থাকে। তাদের জ্ঞাতার্থে কর প্রদান সম্পর্কিত পৃথক নির্দেশনা এনবিআর কর্তৃক প্রকাশ করা প্রয়োজন। (ঝ) অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হয়েছে। সম্মানজনক বেতনভাতা, টাইম স্কেল ও মর্যাদা অনুযায়ী বেতন নির্ধারণে সরকার সচেষ্ট। কিন্তু কর্মজীবীদের পাশাপাশি অবসরভোগী প্রবীণদের অবসর গ্রহণের সময় তাদের স্ব স্ব গ্রেড-মর্যাদা নতুন স্কেলে হিসাবায়ন পূর্বক নতুনভাবে কমিউটেশন হিসাবায়ন করা বা যে হারে বেতন বৃদ্ধি হচ্ছে সে হারে অবসরভোগীদের উৎসবভাতা বৃদ্ধি করে অন্তত দু’টি উৎসবভাতা প্রদান করা। এতে মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্মূল্যের বাজারে তারা যথেষ্ট উপকৃত হবেন। (ঞ) অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত জাতীয়করণকৃত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের প্রজ্ঞাপনে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরভোগীদের বকেয়া উৎসবভাতার নির্দেশ থাকলেও জনতা ও রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের প্রজ্ঞাপনে একই বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। এ ধরনের ভিন্ন ধর্মী ব্যবস্থা বোধগম্য নয়। (ট) শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীর উত্তরাধিকারীদের উৎসব বোনাস ও চিকিৎসাভাতা প্রদান করার সিদ্ধান্ত বিবেচনার অপেক্ষা রাখে।
বর্তমানে দেশে গড় আয়ু ৭০ বছর। অবসর নেয়ার পরবর্তী বছরগুলোতে প্রত্যেকের মেধা, মনন, জ্ঞান জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত। তাই তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। প্রবীণ অবসরভোগীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সঞ্চয় ব্যুরো ও এনবিআর পারস্পরিক সহযোগিতা, সমন্বয় ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে গৃহীত ও গৃহীতব্য সংস্কারের মাধ্যমে অবসরভোগীরা বিশেষভাবে উপকৃত হতে পারেন এবং এতে তারা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে মর্যাদাবান থাকবেন।
লেখক : নির্বাহী কর্মকর্তা (অব:), রূপালী ব্যাংক লি.

বন্যার কারণে মিয়ানমারের নির্বাচন স্থগিত হতে পারে

অং সান সু চি
ভয়াবহ বন্যার কারণে মিয়ানমারে আগামী ৮ নভেম্বরের নির্ধারিত নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চায় দেশটির নির্বাচন কমিশন। মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) কমিশনের এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। তবে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে রয়েছে ক্ষমতাসীন ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। খবর রয়টার্সের। মিয়ানমারের ১০টি রাজনৈতিক দলকে গতকাল মঙ্গলবার বৈঠকে আমন্ত্রণ জানায় নির্বাচন কমিশন। বন্যার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে তাদের মতামত জানতে চাওয়া হয় বৈঠকে। বৈঠকে উপস্থিত দুজন রাজনৈতিক নেতা জানান, নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে বিরোধিতা করে এনএলডি। তবে ক্ষমতাসীন ইউএসডিপি পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষেই মত দেয়। বৈঠকে সব দলের মতামত নেওয়া হলেও এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা জেয়ার মং বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত জানতে আমরা তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। এর মূল কারণ ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং এর ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীল অবস্থা। তবে নির্বাচন পেছানো হবে কি না তা এখনো ঠিক হয়নি।’বৈঠকে অংশ নেওয়া এনএলডির জ্যেষ্ঠ নেতা উইন থেইন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন দ্রুতই তাদের সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেবে।’ তিনি বলেন, ‘বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিমাঞ্চলের চিন রাজ্য। কেবল একটি অঞ্চলে বন্যাকে নির্বাচন পেছানোর কারণ দেখানো একটি খোঁড়া যুক্তি।’ মিয়ানমারের ২৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছিলেন পর্যবেক্ষকেরা। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সুচির দল ওই নির্বাচনে ভালো ফল করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বাংলা মায়ের বদনখানি মলিন by সৈয়দ আবুল মকসুদ

অনেক দেশের জাতীয় সংগীতে জাতির অহংকার ও বীরত্বের কথাই বেশি। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে বাংলার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনাই প্রাধান্য পেয়েছে। তবে শেষ কথাটি: ‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, আমি নয়ন জলে ভাসি।।’ দেশ মায়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে তার বদন বা মুখটি মলিন হওয়ার আশঙ্কাও করেছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কবি ১১০ বছর আগে।
মায়ের মুখ মলিন কখন হয়? যখন সে তার সন্তানের অমঙ্গল দ্যাখে। সন্তানের সুখ-সমৃদ্ধিতে মায়ের মুখে হাসি ফোটে, অমঙ্গলে জননীর মুখখানি শুকিয়ে মলিন হয়ে যায়। টেলিভিশন সেটের ভেতরে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে যাঁরা যে কথাই বলুন, আজ বাংলা মায়ের মুখখানি যে বিষণ্নতায় মলিন, তা তার সন্তানদের চোখ এড়ানোর কথা নয়। রঙিন বিলবোর্ড দিয়ে রাস্তাঘাট, অলিগলি, গ্রামগঞ্জ ভরে ফেললেও বাংলা মায়ের মলিন মুখ আড়াল করা সম্ভব নয়।
কী কী কারণে মায়ের মুখ ম্লান হতে পারে, তা অনুসন্ধানের চেষ্টা এখন আর শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে লক্ষ করা যায় না।
স্বাধীনতা একটি পরম মূল্যবান জিনিস। স্বাধীন–সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কঠিন কাজ। সেই রাষ্ট্রকে সুসংহত ও সমৃদ্ধ করার কাজটি আরও কঠিন। অনেক জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র থাকে না। যেমন কুর্দিরা। আবার জাতি গঠনের আগেই জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্র গঠনের পরে বহু সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে সবার স্বার্থ রক্ষা করে জাতিরাষ্ট্র গঠন কঠিনতর কাজ। কাজটি কঠিন শুধু নয়, সাধনাসাপেক্ষ। সবার সম্মিলিত প্রয়াসসাপেক্ষ। আধুনিক ইন্দোনেশীয় জাতি আগে ছিল না। বালি, সুমাত্রা, বোর্নিও, লোম্বোকসহ শত শত দ্বীপে বাস করত বহু ভাষাভাষী বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বহু জাতিগোষ্ঠী। ডাচ সাম্রাজ্যবাদীরা সেখানে উপনিবেশ স্থাপন করে শোষণ-শাসন করেছে। বহু জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে বহু দ্বীপ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইন্দোনেশিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। গঠিত হয় ইন্দোনেশীয় জাতি। জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিক চিহ্নগুলো মুছে ফেলেছে। আমরা ছোটবেলায় যাকে বলতাম বাটাভিয়া, এখন তার নাম জাকার্তা। একটি আধুনিক রাজধানী নগরী। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। মালয়, চৈনিক প্রভৃতি সম্প্রদায় ছিল মালয় দ্বীপপুঞ্জে। তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র ছিল না। তারা বাঙালির মতোই ছিল পরাধীন। ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে এখন সমৃদ্ধ মালয়েশীয় জাতিতে পরিণত হয়েছে।
বাঙালিকে ইন্দোনেশীয় বা মালয়েশীয়দের মতো অত ঝামেলা পোহাতে হয়নি। হাজার হাজার বছরে বাংলাভাষী একটি জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। একটি অখণ্ড ভূমিতে তারা বসবাস করছে। একটি অভিন্ন সংস্কৃতি তারা নির্মাণ করেছে। আগেও অনেকবার তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক ছিল। তবে দীর্ঘদিন তারা স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারেনি। অষ্টম শতকে পাল রাজারা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখনই বাঙালির মধ্যে একটি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চল বা গৌড়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। তুর্কি শাসনামলে বঙ্গ বা বাংলা নামটি প্রতিষ্ঠা পায়। শক্তিশালী বাংলা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। আলীবর্দী খাঁ বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার স্বাধীন শাসকই ছিলেন। ইংরেজের শাসনাধীন আমলে বাঙালির হাতে শাসনক্ষমতা না থাকলেও এ সময় বাঙালি শিক্ষা-সংস্কৃতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে এশিয়ার অধিকাংশ জাতির থেকে এগিয়ে যায়। বিত্ত কম ছিল, কিন্তু বিদ্যায় কমতি ছিল না। ১৯৪৭-এর পরে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রদেশের নাগরিক হিসেবে পূর্ব বাংলার মানুষ জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা অর্জন করে। তখন সক্ষমতা অর্জন না করলে একাত্তরে একটি বর্বর সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করতে পারত না। পাঞ্জাবিরা একেবারে পিষে মেরে ফেলত।
রাষ্ট্র যদি একটি নৌকা হয়ে থাকে, তাহলে জনগণ তার যাত্রী, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তার দাঁড়ি এবং কর্ণধার বা মাঝি হলো সরকার। মাঝি যদি দক্ষ না হন, তাহলে নৌকা ঘূর্ণাবর্তে গিয়ে পড়তে পারে অথবা কোনো চড়ায় গিয়ে ঠেকে যাত্রা বিঘ্নিত হতে পারে। বাঙালির যোগ্যতার অভাব নেই, কিন্তু স্বাধীন–সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা তার ১৯৭২-এর আগে ছিল না। স্বাধীনতার চেতনা বলতে বাঙালির একটি শ্রেণি বোঝে টাকা ও জমি, ঘন ঘন চাকরিতে প্রমোশন, অস্বাভাবিক উপায়ে রাতারাতি বিত্তবান হওয়া, যেকোনো পথে ব্যবসা-বাণিজ্যে ফুলে-ফেঁপে ওঠা এবং জিডিপি বাড়া। স্বাধীনতা এসবের চেয়ে আরও অনেক বড় বিষয়।
বাংলাদেশ হলো আন্দোলনের দেশ। আন্দোলন আগেও হতো, এখনো হচ্ছে। আগে হতো জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনের জন্য আন্দোলন; এখন বিভিন্ন গোত্র তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আন্দোলন করে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছাড়া, দেশের কল্যাণের জন্য সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করা ছাড়া, মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করা ছাড়া আর সব ব্যাপারেই উত্তাল আন্দোলন হয়। সড়ক অবরোধ হয়, ভাঙচুর পর্যন্ত।
কোনো সরকারের সময় যদি দেশ বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে উন্নতি করে, তাহলে পুরো কৃতিত্ব সেই সরকারের। কিন্তু যদি দেশের মুখ কোনো কারণে মলিন হয় বা রাষ্ট্র সমস্যায় পড়ে, তার দায় শুধু সরকারের নয়, সব রাজনৈতিক দল ও শ্রেণিপেশার নেতৃস্থানীয় মানুষের। আজ জাতির মর্যাদা রক্ষায় সরকারের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কী, তা মানুষ জানে না। ইতিহাসের কাছে রাজনৈতিক নেতা, শ্রমিক নেতা, পেশাজীবী নেতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতি জগতের নেতারা কী জবাব দেবেন? দুর্নীতি, অপচয়, মাদক ও নানা অনাচারে চিরকালের বাঙালি সমাজ আজ ধ্বংসের পথে, রাজনীতি শেষ হতে হতে বিরাজনীতির চূড়ান্ত পর্যায়ে, এর প্রতিবিধানে কেউ তো এগিয়ে আসছেন না। গোলটেবিল আর মানববন্ধনে দুই কথা বললে সমাজ তো এক ইঞ্চিও নড়বে না, রাষ্ট্র একচুলও সংশোধন হবে না।
আমাদের বয়সী যারা, রাজনীতির মধ্যে, রাজনীতি দেখতে দেখতে, কোনো না কোনোভাবে অংশগ্রহণ করে বেড়ে উঠেছি, তাদের কাছে বর্তমান পরিস্থিতি অস্বাভাবিক মনে হয়। খুবই বেদনাদায়ক। ষাটের দশক ছিল সামরিক একনায়কত্বের সময়। তখন ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষিত তরুণেরা রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। কৃষকেরা মাঠের কাজ ফেলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। শ্রমিক কিস্তি টুপি খুলে মাথায় দিয়েছেন লাল টুপি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্ররা জানতেন আন্দোলনে যোগ দিলে সরকারি চাকরি পেতে অসুবিধা হবে। তবু দ্বিধা করেননি। তাঁদের অভিভাবকদেরও নীরব সমর্থন ছিল। তাঁরা সমাজেরও সহানুভূতি পেয়েছেন ত্যাগের জন্য। ত্যাগ ছাড়া শুধু বক্তৃতা দিয়ে বা গণমাধ্যমে প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে কিছু অর্জন সম্ভব নয়। স্বাধীনতার আগে যা কিছু অর্জিত হয়েছে, তা আমাদের নেতাদের ত্যাগ ও জনগণের অংশগ্রহণে হয়েছে। প্রেস রিলিজ দ্বারা হয়নি।
বিক্রি হওয়ার মতো মানুষ সব সমাজে সব কালেই থাকেন। স্বাধীনতার আগে বাঙালি সমাজেও ঢের ছিলেন। কথায় কথায় দৌড় দিতেন ইসলামাবাদ, করাচি ও লাহোরে। কিন্তু এমনও তো অনেকেই ছিলেন, যাঁদের মাথা কেনা যায়নি। তাঁরা ঝুঁকি নিয়েছেন। নীতি বিসর্জন দেননি। ছাত্রসমাজে ছিলেন, শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন, শিল্পী-সাহিত্যিক ও আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন। শ্রমিক নেতারা শ্রমিকের স্বার্থরক্ষায় জেলে গেছেন। শ্রমিকদের মধ্যে দালাল ছিল না। সামরিক শাসনের মধ্যে নিম্ন ও উচ্চ আদালতের বিচারকেরা সাহস করে রায় দিয়েছেন। ষাটের দশকেও আদালতকে বলতে দেখা গেছে, নৌবাহিনীর লোক কামাল উদ্দিনকে কোর্টে হাজির করা হোক। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় সরকার সমর্থন পায়নি আইনজীবী ও বিচারকদের।
নানা প্রক্রিয়ায় সমাজের প্রগতিশীল শক্তিও আজ নির্জীব হয়ে গেছে। বড় মানুষই বিক্রি হন। কেউ অবৈধ টাকায় ব্যাংক খুলেছেন। কেউ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি পেয়েছেন। নিজের ও সন্তান–সন্ততির জন্য চাকরি বাগাচ্ছেন। আগে ছিল ১০ কাঠা ৭ কাঠা। এখন জায়গার অভাব, মানুষ বেশি। তাই ৪ কাঠা, ৩ কাঠা হলেও চলে। ভোটেই নির্বাচিত হোন বা বিনা ভোটেই নির্বাচিত হোন, সংসদের জনপ্রতিনিধিরা কোন সাংবিধানিক অধিকারে আবাসিক প্লট পাবেন? তিনি কি তাঁর এলাকার সব ভোটারের আবাসিক সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন? বিপুল বেতন-ভাতার পরে এখন শুনছি তাঁরা নাকি ছাপোষা কেরানিদের মতো পেনশনও চান। এ দেশে কিছু চাইলে তা পাওয়া যাবেই।
দীর্ঘদিনের লালিত হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে এমনভাবে বিভক্ত করেছে যে দেশ, জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি সম্পর্কে সুস্থ ও যুক্তিঋদ্ধ চিন্তার প্রকাশ কঠিন। অসুস্থ সামাজিক পরিবেশেও পঞ্চাশের দশক থেকে একটি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল মধ্যশ্রেণি গড়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে সাহস ও ত্যাগের মনোভাব নেই। অন্যদিকে, শাসকশ্রেণি নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতীয়তা সম্পর্কে সচেতন নয়। এর ফলে তাঁদের কেউ কেউ এমন সব কথাবার্তা বলেন এবং কাণ্ড করেন, যা গোটা জাতির বেইজ্জতির কারণ হয়। বহির্বিশ্বে দেশের মুখ ম্লান হয়। যে প্রসঙ্গে কথা বলার কথা থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা বা আইওর, সে প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা। জনগণের কালেক্টিভ পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা হার্ভার্ডের ঝানু প্রফেসরের চেয়ে কম নয়। তা ছাড়া ব্যক্তি-মানুষের চোখে ধুলা দেওয়া সম্ভব, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বিশ্ববিধাতার চক্ষে ধুলা দিবার আয়োজন’ করা বোকামি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

বিদেশীদের মর্যাদা অনুযায়ী নিরাপত্তা by দীন ইসলাম

বিদেশী নাগরিকদের মর্যাদা অনুযায়ী  নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশস্থ হাইকমিশন বা অ্যাম্বাসি প্রধান, বিদেশী সহায়তাপুষ্ট বিভিন্ন সংস্থা প্রধানদের প্রথম শ্রেণীর নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশীদের মধ্যে যারা এদেশে বড় বিনিয়োগকারী, মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির প্রধান তারাও নিরাপত্তা পাচ্ছেন তাদের মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ের বিদেশীদের মর্যাদা অনুযায়ী নিরাপত্তা পাচ্ছেন। নিজের অফিস বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বাইরে বের হলে ওই অনুযায়ী তাদেরকে অনুসরণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সাধারণ বিদেশীরা নিরাপত্তার প্রয়োজন মনে করলে নিরাপত্তা চাইলেই তাদের নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। তবে পদ্মা সেতুতে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের প্রকল্প এলাকার বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে প্রায় ১১০০ বিদেশী কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে ৭০০ চীনা নাগরিক। বাকিদের মধ্যে আর্জেন্টিনা, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশের নাগরিক কাজ করছেন। তাদেরকে খুব বেশি কাজ না থাকলে প্রকল্প এলাকার বাইরে যেতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দূতাবাসগুলোতে কর্মরতরা খুব বেশি প্রয়োজন না পড়লে এখন আর বাইরে বের হন না। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কিছু বিদেশী এখন নিয়মিতই আসছেন। তারা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই বাইরে আসছেন। বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে বৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশীর সংখ্যা দুই লাখ ২১ হাজার ৫৫৯ জন। অবৈধ বিদেশীর সংখ্যা এর চেয়ে কয়েকগুণ। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ যেমন- নাইজেরিয়া, উগান্ডা, ঘানা, আলজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, সেনেগাল, ক্যামেরুন ও লাইবেরিয়া থেকে আসা অবৈধ নাগরিকদের অনেকে প্রায়ই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। সরকারের কাছে থাকা তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বৈধ নাগরিক রয়েছে ভারতের। ৭১ হাজার ৩২ জন নাগরিক বর্তমানে বাংলাদেশে আছেন। এরপরই যুক্তরাজ্যের অবস্থান। তাদের ২৭ হাজার ৮৫৯ জন নাগরিক বাংলাদেশে আছেন। এ ছাড়া চীনের নয় হাজার ৪৬৬ জন, পাকিস্তানের আট হাজার ৯৪২ জন, যুক্তরাষ্ট্রের আট হাজার ৮৪ জন, জাপানের দুই হাজার ৯১৫ জন, ইতালির দুই হাজার ৫৯৫ জনসহ ২২৫টি দেশের দুই লাখ ২১ হাজার ৫৫৯ জন নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। ঢাকা ও রংপুরে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের পর বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তায় বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে বিদেশীদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে বিপত্তি তৈরি হয়েছে। বৈধভাবে অবস্থানকারীদের নাম, পরিচয়, ঠিকানা ও কর্মস্থল সরকারের কাছে থাকলেও অবৈধভাবে যারা আছেন তাদের সম্পর্কে কোন তথ্য নেই। ফলে অবৈধদের ঠিকভাবে নিরাপত্তা দিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে বেসরকারি খাতের কোন প্রতিষ্ঠান যদি কোন বিদেশী নাগরিককে নিয়োগ দিতে চায় তাহলে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্ধারিত ফরমে আগেই আবেদন করতে হয়। বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকদের কর্মসংস্থানের জন্য ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক। সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাসহ প্রতিষ্ঠানে বিদেশী কর্মচারীর সংখ্যা শতকরা পাঁচ ভাগের বেশি হতে পারবে না। এমন সব নিয়ম থাকলেও ওয়ার্ক পারমিট নেয়ার ক্ষেত্রে এসব জটিলতায় যেতে পছন্দ করেন না বিদেশী নাগরিকরা। এ কারণে ভ্রমণ ভিসা নিয়েই তারা বাংলাদেশে আসেন। এরপর এখানে চাকরি বা ব্যবসা- বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন করেন না। এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বেশি শঙ্কার কারণে সরকার চাইছে ২৭ ও ২৮শে অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ‘বুড্ডিস্ট সার্কিট ট্যুরিজম’- শিরোনামের ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সটি সফলভাবে শেষ করতে। এজন্য চীন, জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে পর্যটন মন্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সরকার আশা করছে, এসব দেশের পর্যটন মন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আমন্ত্রিত অতিথিরা কনফারেন্সটিতে অংশ নেবে। এটা করতে পারলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে বলে মনে করছে সরকারের বিভিন্ন মহল। এজন্য রাত দিন প্রস্তুতি চলছে।

শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যই আন্দোলন -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : ফরিদ উদ্দিন আহমেদ by মশিউল আলম

প্রথম আলো : অষ্টম জাতীয় বেতনকাঠামো ঘোষণার পর থেকে আপনাদের যে আন্দোলন চলছে, তাতে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আপনারা বলছেন, দাবি মানা না হলে অচিরেই আন্দোলনের আরও কঠোর কর্মসূচি নেওয়া হবে। তাহলে কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে?
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : আসলে আমাদের আন্দোলন শুরু হয়েছে এ বছরের ১৪ মে থেকে, যখন সচিব কমিটির বেতনকাঠামো পর্যালোচনার বিবরণ নিয়ে সংবাদপত্রে খবর ছাপা হলো এবং আমরা জানতে পারলাম যে শিক্ষকদের মর্যাদার অবনমন ঘটতে যাচ্ছে। শিক্ষকেরা মর্যাদার যে জায়গায় ছিলেন, সেখানে আর থাকতে পারবেন না।
প্রথম আলো : কীভাবে অবনমন ঘটতে যাচ্ছিল?
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : শিক্ষকদের জন্য যে সিলেকশন গ্রেড ছিল, অষ্টম বেতনকাঠামোতে সেটা বাদ দেওয়া হয়েছে, উপরন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য শূন্য গ্রেড ও সুপার গ্রেড সৃষ্টি করে শিক্ষকদের দৃশ্যত চার ধাপ নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। সপ্তম বেতনকাঠামোতে কিন্তু সিনিয়র সচিব বলতে কিছু ছিল না, দুনিয়ার কোথাও নেই। তারপর আরেকটা করা হলো পদায়িত সচিব। এভাবে শিক্ষকদের মর্যাদার অবনমন করা হয়েছে।
প্রথম আলো : কিন্তু নতুন বেতনকাঠামোতে আপনাদের বেতন-ভাতা তো ৯১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবু আন্দোলন কেন?
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে বেতন-ভাতা বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। সেটা করা হয়েছে, ভালো হয়েছে। আবার এটাও দেখার বিষয় যে নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রব্যমূল্য যেভাবে বাড়তে শুরু করেছে, তাতে এই বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুফল বাস্তবে কতটা পাওয়া যাবে, সেটাও চিন্তার বিষয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে বেতন-ভাতার বিষয়টি প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আন্দোলন হচ্ছে মর্যাদার প্রশ্নে। বাড়তি মর্যাদা আমরা দাবি করছি না, মর্যাদার অবনমনের প্রতিবাদ জানাচ্ছি। যে মর্যাদা ছিল, তা রক্ষার জন্য আন্দোলন করছি। শিক্ষকদের সিলেকশন গ্রেড ছিল, তাতে কী সমস্যা হচ্ছিল? সেটা বাতিল করা হলো কেন? কী প্রয়োজন ছিল বাতিল করার?
প্রথম আলো : কিন্তু সে জন্য শিক্ষকদের আন্দোলন, কর্মবিরতি—এসবের ফলে তো শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হচ্ছে। আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে তারা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বিষয়টি কি আপনাদের বিবেচনায় আছে?
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : অবশ্যই আছে। আমরা কখনোই আমাদের ছেলেমেয়েদের ক্ষতি করে আন্দোলন করতে চাই না। সে জন্য আমরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা ইত্যাদির ব্যাঘাত ঘটিয়ে কোনো আন্দোলনের কর্মসূচি খুব একটা দিইনি। মাত্র তিন দিন ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে, কারণ আমাদের মানববন্ধন ছিল, শিক্ষকেরা সেখানে যোগ দিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তারপরে একদিন মাত্র আমরা ক্লাস বিরতি দিয়েছি পূর্ণ দিন, তার মধ্যে পরীক্ষাও ছিল। ওই তিন দিন আর এই ছয় ঘণ্টা ছাড়া আমরা কিন্তু ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে কিছু করিনি।
প্রথম আলো : কিন্তু আপনারা তো ঘোষণা দিয়েছেন যে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাচ্ছেন, তখন কী হবে?
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : আন্দোলন-কর্মসূচির নানা রকম পদ্ধতি আছে, তার মানে এটা নয় যে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে আমরা আন্দোলনে যাব।
প্রথম আলো : তাহলে আপনাদের ‘কঠোর কর্মসূচি’র বাস্তব রূপটা কী হবে?
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : সেটা এখন বলতে চাইছি না। আমাদের কিছু উদ্ভাবনী ভাবনা আছে। সমস্যাটা এখন যে পর্যায়ে আছে, তাতে আমরা আশাবাদী যে অচিরেই একটা সমাধান হবে। মন্ত্রিপরিষদ এ বিষয়টা দেখার জন্য একটা মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীও সেই উপকমিটির সদস্য, ৫ অক্টোবর আমরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে তুলে ধরেছি।
প্রথম আলো : বেতন কমিশন কিন্তু বলেছে, নতুন বেতনকাঠামোতে শিক্ষকদের প্রতি বৈষম্য করা হয়নি।
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : এর আগে সাতটি বেতন কমিশন হয়েছে, কিন্তু অষ্টম বেতন কমিশন শিক্ষকদের বেতন যতটা বাড়িয়েছে, আগের কোনো কমিশনই ততটা বাড়ায়নি। সেদিক থেকে এই বেতন কমিশন অবশ্যই বেশি দিয়েছে। কিন্তু আপনাকে আগেই বলেছি, শিক্ষকেরা বেতন-ভাতা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন, আমাদের সবার উদ্বেগের জায়গাটা হলো আমাদের মর্যাদার অবনমন।
প্রথম আলো : আপনারা সিলেকশন গ্রেড বহাল রাখতে বলছেন?
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : বিষয়টি শুধু সিলেকশন গ্রেড নিয়ে নয়। সুপার গ্রেড যেটা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিব—এ দুটি কিন্তু আগে গ্রেডিংয়ের মধ্যে ছিল না। আগে ছিল একটা ফুটনোট হিসেবে, এখন এটাকে ওপরে রাখা হয়েছে। তারপর আরেকটা হলো সিনিয়র সচিব। যদি তাঁদের ওপরে রাখতেই হয়, গ্রেড হিসেবে রাখলে কী ক্ষতি ছিল? এটাকে সুপার গ্রেড বা জিরো গ্রেড করার কী প্রয়োজন ছিল? আরেকটা কথা স্পষ্টভাবে বলতে চাই,শিক্ষকেরা যখন অধ্যাপক হন, সেখান থেকে সিলেকশন গ্রেড বা গ্রেড-১ পেতে ১৬-১৭ বছর লেগে যেত। আর সিলেকশন গ্রেড পেতেন অধ্যাপকদের মাত্র ২৫ শতাংশ। অধিকাংশই সিলেকশন গ্রেড না পেয়ে অবসরে চলে যেতেন। কিন্তু কিছুসংখ্যক তো পেতেন। এখন সিলেকশন গ্রেড বাতিল করার কারণে অধ্যাপকেরা কোনো দিনই আর ওই জায়গায় যেতে পারবেন না। অধ্যাপকেরা এখন শুরু করবেন তৃতীয় গ্রেড থেকে। আমাদের কথা হচ্ছে, শিক্ষকদের একটা মর্যাদা দেওয়ার পরে তো আপনি সেটা ফিরিয়ে নিতে পারেন না, নেওয়া উচিত নয়। সিনিয়র সচিব, মুখ্য সচিবদের বেতন বাড়ানো হয়েছে ১০০ শতাংশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষকদের বেতন বেড়েছে ৯১ শতাংশ, সব মিলিয়ে। কিন্তু আমরা এটা নিয়ে চিন্তিত নই, বেতন একটু কম-বেশি হতে পারে। আমাদের কথা হচ্ছে, শিক্ষকেরা এই পেশায় আসেন সম্মানের জন্য, মর্যাদার জন্য। সেই সম্মান দিয়ে আপনি কেড়ে নেবেন—এটা তো হয় না, এটা ন্যায়বিচার হতে পারে না। ওপরের দিকের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার বেতন-ভাতা দিগুণ বাড়ানো হলো, মর্যাদা বাড়ানো হলো, নতুন নতুন পদ তৈরি করা হলো, আর শিক্ষকেরা যে মর্যাদা পেয়ে আসছিলেন, সেটা কেড়ে নিয়ে তাঁদের অবমানিত করা হলো—এটা তো হতে পারে না।
প্রথম আলো : আপনারা আপনাদের দাবিনামার এক জায়গায় বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকদের বেতনকাঠামো সপ্তম গ্রেডে নির্ধারণ করা হোক। কিন্তু বিসিএস ক্যাডারদের চাকরি তো শুরু হয় নবম গ্রেড থেকে। আপনারা বাড়তি দাবি করছেন কেন?
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : এর মূল উদ্দেশ্য দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশার প্রতি আকৃষ্ট করা। আমরা যদি দেশ-জাতির আরও উন্নয়ন-অগ্রগতি চাই, তাহলে ভালো শিক্ষক দরকার। শিক্ষকদের হাতেই তৈরি হন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, সচিবসহ অন্যান্য সব পেশাজীবী। সুদক্ষ সচিব তৈরির জন্য মেধাবী শিক্ষক দরকার। এটাই আমাদের এই দাবির মৌলিক ভাবনা। এটা সরকারের বা একটা রাষ্ট্রের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হওয়া উচিত। বিশ্বের যেসব দেশ এগিয়ে গেছে, তারা শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে সবচেয়ে বেশি; সবচেয়ে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য তারা সবকিছু করে।
প্রথম আলো : আপনাদের আন্দোলন কিন্তু এক মাস পেরিয়ে যাচ্ছে। আর কত দিন চালাবেন?
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : সরকার একটা মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে, সেখানে অত্যন্ত সুবিবেচক অনেকে আছেন। আমি মনে করি, সমস্যাটা সমাধানের জন্য আর বেশি সময় লাগার কথা নয়, একটি-দুটি বৈঠক হলেই কিন্তু সমাধান হয়ে যায়। আমরা পাঁচ মাস ধরে অপেক্ষা করছি, আমরা কঠোর আন্দোলনে যাইনি। যাইনি এ জন্য যে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের জিম্মি করে কিছু করতে চাইছি না। আমরা অনেক কষ্ট করে তাদের সেশনজট দূর করেছি। এখন আমরা মনে করি, অনেক সময়ক্ষেপণ হয়েছে, আর বিলম্ব না করে সমস্যাটার সমাধান করা হোক।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।
সভাপতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

হুমকির মুখে সুষ্ঠু আলোচনা হতে পারে না -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন by সোহরাব হাসান

প্রথম আলো : অষ্টম বেতন কমিশনের রিপোর্ট প্রশংসিত হলেও শিক্ষকেরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন, তাঁদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। কমিশনের সভাপতি হিসেবে বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : নতুন বেতন কমিশন রিপোর্টে সব ক্ষেত্রে বেতন প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। স্বীকার করতে হবে, এটি দুঃসাহসিক কাজ। এ নিয়ে সর্বস্তরে যে ইতিবাচক প্রবাহ সৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল, তা হতে দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, একটি খারাপ কাজ হয়েছে। এ নিয়ে সত্যিই আমার মনে খেদ আছে।
প্রথম আলো : কিন্তু অনেকেই বেতন কমিশনকে দায়ী করছেন।
ফরাসউদ্দিন : বেতন কমিশনকে দায়ী করার সুযোগ নেই। কমিশনের কাজ হলো সুপারিশ করা, এটি গ্রহণ করা কিংবা বাস্তবায়ন করা সম্পূর্ণ সরকারের এখতিয়ার। ভারত বা অন্যান্য দেশে বেতন কমিশনের আকার খুব ছোট হয়, কিন্তু আমাদের কমিশন ছিল ১৭ সদস্যের। এতে কয়েকজন শিক্ষক প্রতিনিধিও ছিলেন। গত ২১ ডিসেম্বর যেদিন আমরা অর্থমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট জমা দিই, একজন ছাড়া সবাই উপস্থিত ছিলেন। ব্যক্তিগত কাজ থাকায় তিনি সই দিয়ে আগে আগেই চলে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ এটি ছিল ঐকমত্যের সুপারিশ। এখানে যেটি ব্যত্যয় ঘটেছে তা হলো, অন্যান্য দেশে এসব কমিশনের সুপারিশ মন্ত্রিসভা কমিটিতে বিবেচনা করা হয়। এখানে করেছে সচিব কমিটি। তাঁরাও একটি পক্ষ।
প্রথম আলো : আপনারা যে সুপারিশ করেছেন আর সরকার যেটি চূড়ান্ত করেছে, তার মধ্যে পার্থক্য কতটা?
ফরাসউদ্দিন : পার্থক্য বেশি নয়। কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য হয়েছে। যেমন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ঔপনিবেশিক আমলের শ্রেণি প্রথা বিলোপ করা হয়েছে। এবং সেখানে এফিসিয়েন্সি বার বা দক্ষতার বাধা বলে  যে দুষ্ট প্রকৃতির জিনিস ছিল, সেটি দূর করা হয়েছে। বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ওপরের দিকে সামান্য কমানো এবং নিচের দিকে কাঙ্ক্ষিতভাবেই বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বেতন কমিশন ১৬টি স্কেল বা স্তর সুপারিশ করলেও সেটিতে স্তর ২০টি করতে গিয়ে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যই আন্দোলন কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল ছয়জনের পরিবার যাতে সম্মানজনকভাবে জীবন যাপন করতে পারে এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মীরা সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা ও গতিশীলতা দিয়ে রাষ্ট্রকে সেবা দিতে পারেন। এরপর রাষ্ট্র তাঁদের দুর্নীতিমুক্ত থাকার ব্যাপারেও অনুশাসন দিতে পারবে। এ কারণেই বেতন বৃদ্ধির হারটা বেশি ছিল। বেতনের বাইরে আমরা একটি সমৃদ্ধি সোপান ব্যাংক, বিমা, শিক্ষা ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতার বৃদ্ধি ও যৌক্তিক করার যে সুপারিশ করেছিলাম, সেগুলোও সরকার গ্রহণ করেছে। দু-একটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হওয়ায় বিতর্ক দেখা দিয়েছে। আরেকটি কথা, বেতন কমিশন সুপারিশ করে গত ডিসেম্বরে। আর এ বছরের সেপ্টেম্বরে সরকার তা গ্রহণ করে। এই দীর্ঘ সময়ের কারণে বিভিন্ন স্বার্থের শাখা-উপশাখা ও ষড়যন্ত্র ডালপালা মেলেছে। এটি আরও আগে করা উচিত ছিল বলে মনে করি।
প্রথম আলো : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভিযোগ, সপ্তম বেতনকাঠামো থেকে এবার তাঁদের পদমর্যাদা কয়েক ধাপ নামিয়ে দেওয়া এবং সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
ফরাসউদ্দিন : আমি শিক্ষকদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। সপ্তম বেতনকাঠামো থেকে বর্তমান বেতনকাঠামোয় যদি তাঁদের পদমর্যাদার অবনমন ঘটে, সেটি ঘোরতর অন্যায় এবং তার যৌক্তিক মীমাংসা হওয়া দরকার। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, কোন গ্রেডে কত বেতন হবে, সেটি ঠিক করেছে কমিশন। কিন্তু কোন গ্রেডে কারা থাকবেন, সেটি ঠিক করার এখতিয়ার সরকারের। আমি যতটা জানি, সপ্তম বেতনকাঠামোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা দ্বিতীয় গ্রেডে ছিলেন। সে সময় এর বেতন ছিল ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা। আমরা সুপারিশ করেছিলাম ৭০ হাজার টাকা। সরকার ৬৭ হাজার টাকা চূড়ান্ত করেছে। অর্থাৎ, বেতন দ্বিগুণ হয়েছে। এখন অধ্যাপকেরা যদি দ্বিতীয় গ্রেডে ও প্রভাষকেরা নবম গ্রেডে থাকেন, তাহলে তো তাঁদের আপত্তি থাকতে পারে না।
প্রথম আলো : তাঁদের আপত্তি হলো, আগে অধ্যাপকদের শুরু দ্বিতীয় গ্রেড পেলেও  সিলেকশন গ্রেডের মাধ্যমে প্রথম গ্রেডে যেতে পারতেন। সিলেকশন গ্রেড রহিত হওয়ায় তাঁরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
ফরাসউদ্দিন : এর সমাধানও আমি বলেছি। নবম গ্রেডে প্রভাষকেরা আছেন। যেমন জনপ্রশাসনে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তারাও আছেন। এখন শিক্ষক বন্ধুরা যে প্রভাষকদের জন্য সপ্তম গ্রেড দাবি করছেন, সেটি বোধ হয় ঠিক নয়। তাঁদের নবম থেকে দ্বিতীয় গ্রেডে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি তৈরি করতে হবে। তারপর অধ্যাপকেরা যাতে একটি নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট অনুপাতে জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের পদ পেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমার জানামতে, সরকার এটি করতে রাজি আছে। সে ক্ষেত্রে সপ্তম বেতন কমিশনের সঙ্গে কোনো পার্থক্য থাকছে না। তাহলে আন্দোলন কেন?
প্রথম আলো : কিন্তু আগে জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকেরা সচিবের পদমর্যাদা পেতেন। এখন সচিবদের ওপর আরও দুটি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।
ফরাসউদ্দিন : মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিব সব সময়ই গ্রেডের বাইরে ছিলেন। আবার সব প্রথম গ্রেড মানেই সচিব নন। সচিবের পদ ৭০টি। আর প্রথম গ্রেড পান কয়েক শ সরকারি কর্মকর্তা। আমি মনে করি, প্রথম গ্রেড পাওয়াটাই মুখ্য। অধ্যাপকদের পদোন্নতি দিয়ে সেখানে নিয়ে গেলে সমস্যা থাকে না। এরপর যে প্রশ্নটি এসেছে, তা হলো পদমর্যাদার। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স। এ নিয়ে আদালতে মামলা-মোকদ্দমাও হয়েছে। আমরা কমিশনের পক্ষ থেকে কমিশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ মর্যাদারও সুপারিশ করেছিলাম, যদিও এর সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করা উচিত ছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকেরা তাঁদের বুয়েটের সঙ্গে তুলনা করায় আপত্তি তুলেছেন।
২০১২ সালে আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকটি জ্যেষ্ঠ সচিবের পদ সৃষ্টি করা হয়। এটি না করলে জনপ্রশাসনে অচলাবস্থা দেখা দিত। সেটিকে গ্রেডের মানদণ্ডে দেখাও বোধ হয় ঠিক হবে না।
প্রথম আলো : শিক্ষকেরা আলাদা বেতন কমিশনের দাবি করেছেন।
ফরাসউদ্দিন : বেতন কমিশন বলেছে,  যেসব বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের বেতন সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হয়, সেগুলো একই বেতনকাঠামোয় হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একদিকে সপ্তম বেতনকাঠামোর সমমর্যাদা চাইছেন, আরেক দিকে পৃথক বেতনকাঠামোরও দাবি করছেন। এটি যৌক্তিক নয়। আলাদা বেতন কমিশন হলে তার অর্থের উৎস নিয়েও ভাবতে হবে। ভারত বা শ্রীলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নের একমাত্র উৎস সরকার নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা বেতনকাঠামোর প্রশ্ন এলে অর্থায়নের প্রশ্নটিও সামনে আসবে। আর কলেজশিক্ষকদের জন্য আলাদা কর্মকমিশন গঠনের কথা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রথম আলো : এখন বেতনকাঠামো নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার সমাধান আসবে কীভাবে? শিক্ষকেরা আন্দোলনে আছেন।
ফরাসউদ্দিন : দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। যতটা জানি, এ ব্যাপারে সরকারও অনেক দূর এগিয়েছে। বিষয়টি পুনর্বিবেচনায় জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের নিয়ে মন্ত্রিসভা কমিটি করা হয়েছে। আলোচনার জন্য মুক্তমন ও সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন। আমার মনে হয়, সরকারের সেটি আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা যেসব মন্তব্য করেছেন, তা ইতিবাচক নয়। দ্বিতীয়ত, তাঁরা বলছেন, দাবি না মানলে ১ নভেম্বর থেকে লাগাতার ধর্মঘট হবে। হুমকির মুখে সুষ্ঠু আলোচনা হতে পারে না। মুক্তমনে আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব শিক্ষক বন্ধুদেরই।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সব সংস্থাই স্বীকার করেছে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক রূপান্তর হয়েছে, তা দৃষ্টান্তমূলক, অনুসরণীয়। আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে চলে যাবে। এই সাফল্যের প্রতি যদি শিক্ষকেরা সংবেদনশীল হন, তাহলে তাঁদের উচিত হবে না এমন কিছু করা, যাতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হয়।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
ফরাসউদ্দিন : আপনাকেও ধন্যবাদ।
সরকারি বেতন ও সেবা কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

মা ইলিশ রক্ষায় সময়সীমার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন- বাজারে ডিমওয়ালা ইলিশই বেশি

মা ইলিশ রক্ষায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও সাগরে জাল ফেলা নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। কিন্তু এখন জেলেদের জালে বেশির ভাগই ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা পড়ছে। এ অবস্থায় মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের সময়সীমার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চাঁদপুর সদরের পুরানবাজার, সাখুয়া ও হরিণা এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, শত শত জেলে গুটি জাল ও কারেন্ট জাল দিয়ে ইলিশ শিকারের পর নদীর পাড়ে ফিরছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন বছর ধরে একই সময়ে মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি অভিযান চলছে। এবার অভিযান শেষে শনিবার ভোর থেকে তাঁরা নদীতে নামেন। কিন্তু নদীতে ইলিশ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাওয়া যাচ্ছে তার সবই ডিমওয়ালা। সাখুয়ার জেলে আবদুল হালিম বলেন, এ বছর মা ইলিশ রক্ষার সময় নির্ধারণ ঠিক হয়নি। আরও কদিন পর অভিযান বা নিষেধাজ্ঞা দিলে সব ইলিশই ডিম ছাড়ার সুযোগ পেত।
মঙ্গলবার পর্যন্ত মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদর বাজার, মুন্সীরহাট, নারায়ণপুর, বরদিয়া আড়ং, মাছুয়াখাল বাজার এবং মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর, আমিরাবাদ, এখলাশপুর, মোহনপুর বাজারসহ আরও কয়েকটি হাটবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, বড় ও মাঝারি আকারের ডিমওয়ালা ইলিশের ছড়াছড়ি। বিক্রেতারা বরফে ঢেকে রাখছেন এসব ইলিশ। মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদরের কলাদী এলাকার বাসিন্দা মো. হান্নান বলেন, ‘ডিমওয়ালা ইলিশ কিনতে বিবেকে বাধে। তবু তিন কেজি কিনলাম। এত ডিমওয়ালা মাছ বাজারে আসবে তা ভাবিনি। আসলে কি এবার ডিমওয়ালা ইলিশ রক্ষা হয়েছে?’
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে চার দিন ধরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে বলে জানান জেলেরা। কিন্তু এসব ইলিশের অধিকাংশেরই পেটভর্তি ডিম। এখানকার মাছ ব্যবসায়ী বাদল বিশ্বাস বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় অনেকে ইলিশ ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেগুলো এখন আনছেন। পাশাপাশি এখন যে ইলিশ ধরা পড়ছে সেগুলোরও অধিকাংশ ডিমওয়ালা। ছোট ইলিশেও ডিম পাওয়া যাচ্ছে।’
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রতন দত্ত বলেন, ‘কী কারণে এমনটা হচ্ছে তা নিয়ে বর্তমানে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে আলোচনা চলছে। তবে আমার মতে, অঞ্চলভেদে নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা আরও বাড়ানো দরকার।’
মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুরের রায়পুর শহরের মেইন রোড ও পীরবাড়ীসংলগ্ন দুটি বাজারে গিয়ে পাঁচ খারি ইলিশ দেখা যায়। একেকটি খারিতে আড়াই শতাধিক ইলিশ ছিল। একটি খারির ইলিশ ধরে দেখা যায়, সেগুলোর ৮০টির পেটে ডিম নেই। বাকিগুলোর পেটে ডিম ছিল।
খাসেরহাট নাইয়াপাড়া জেলেভুক্ত সমিতির সভাপতি মো. মোস্তফা বেপারী প্রথম আলোকে বলেন, অনেক ইলিশ এখনো ডিম ছাড়েনি। জালে ধরা পড়া অধিকাংশ ইলিশেরই পেটে ডিম।
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম মহিব উল্যাহ বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে কিছু ইলিশ ডিম ছাড়েনি। বিষয়টি মৎস্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালককে জানানো হবে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সফিকুর রহমান বলেন, আশ্বিনে ভরা পূর্ণিমায় মা ইলিশ প্রচুর ডিম পাড়ে। পূর্ণিমার আগের ও পরের ১৫ দিনকে ইলিশের প্রজনন মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এ সময়ে মা ইলিশ উপকূলীয় এলাকা থেকে ডিম ছাড়ার জন্য পদ্মা-মেঘনায় চলে আসে। তিনি বলেন, সরকারের এই অভিযান সফল হয়েছে। ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, চাঁদপুর ইলিশের বিচরণক্ষেত্র, প্রজননক্ষেত্র নয়। ইলিশ ডিম ছাড়া না-ছাড়া নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর চাঁদপুর ও মতলব দক্ষিণ, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) ও গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধ|

নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য আটকে গেছে by জাহাঙ্গীর শাহ ও শহীদুল ইসলাম

বেশ কয়েক দিন ধরে ভারত-নেপালের কাঁকরভিটা সীমান্তে বাংলাদেশের ওয়ালটনের ৩০০ রেফ্রিজারেটরের চালান আটকে আছে। পথেই আটকে গেছে বাংলাদেশি এ পণ্যের চালান। নেপালে জ্বালানিসংকটে পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না, তাই এ চালানটি নেপাল সীমান্তে পড়ে আছে।
এ সমস্যার কারণে আরও ২ হাজার ৪০০ রেফ্রিজারেটরের অর্ডার থাকলেও বাংলাদেশ থেকেই পাঠানো হচ্ছে না। এমনকি চাহিদা সত্ত্বেও নেপাল থেকে আপাতত কোনো অর্ডারও নিচ্ছে না ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ।
নেপালে পরিবহনে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ থাকা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য-সংকটের কারণে এভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের বাণিজ্য শ্লথ হয়ে গেছে। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে এই অবস্থা চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ালটনের অপারেটিভ পরিচালক উদয় হাকিম প্রথম আলোকে বলেন, নেপাল-সংকটের কারণে আপাতত নতুন কোনো অর্ডার নেওয়া হচ্ছে না। সংকট কেটে গেলে আবারও স্বাভাবিকভাবে নেপালে পণ্য যাবে। নেপালে পরিবেশকের মাধ্যমে মূলত রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, মোটরসাইকেল ও মুঠোফোন বাজারজাত করে ওয়ালটন।
অন্যদিকে জুস, ড্রিংকস, চকলেট, বেকারি পণ্য, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য নেপালে রপ্তানি করে থাকে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ। ঈদের পর থেকে এসব পণ্য নেপালে রপ্তানি করতে পারেনি এ প্রতিষ্ঠান। গত সোমবার থেকে সীমিত পরিসরে কিছু পণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে।
এ প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি বিভাগের প্রধান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, ২০-২৫ দিনে ধরে পণ্য রপ্তানি বন্ধ থাকায় প্রায় ১৫ লাখ ডলারের বিক্রি কমেছে। এ সংকটের কারণে নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য শঙ্কার মধ্যে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
গত মাসের শেষ দিকে ভূবেষ্টিত নেপালের নতুন সংবিধান অনুমোদন, ক্ষমতার পট পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। মাধেসি জনগোষ্ঠীর সড়ক অবরোধে পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হতে থাকে। ভারতের রপ্তানিকারকেরাও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পণ্য জ্বালানিসহ নিত্যপণ্য রপ্তানি প্রায় বন্ধ রাখে। তাই নেপালজুড়ে চলছে তীব্র জ্বালানিসংকট।
নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বেশির ভাগ বাণিজ্য হয় উত্তরের পঞ্চগড় জেলার বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে। এ বন্দর দিয়ে ডাল, ঔষধি গাছগাছড়া ও প্রসাধন পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করে নেপাল। আর বাংলাদেশ থেকে ফ্রিজ, টেলিভিশন, তৈরি পোশাক, তুলা, ওষুধ,
ব্যাটারি, সুতা, ফলের রস, আলু, গুঁড়া দুধ, বিস্কুট, পাটের কাঁচামাল ও সোলার টিউবলাইট আমদানি করা হয়। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে পণ্যের চালান ভারতের পানিটাংকি সীমান্ত দিয়ে নেপালের কাঁকরভিটায় পৌঁছায়।
ঈদের ছুটি ও নেপালের সংকটের কারণে গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে নেপালে পণ্য রপ্তানি ১৮ দিন বন্ধ থাকে। ৮ অক্টোবর সীমিত আকারে পণ্য যেতে শুরু করে। তবে নেপাল থেকে পণ্য আমদানি হয়নি বললেই চলে। গত সাত দিনে ‘ডাবর নেপাল’-এর মাত্র দুই ট্রাক প্রসাধনসামগ্রী বাংলাদেশে আসে। এ পণ্য সংকট তৈরির আগেই নেপাল সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে এসেছিল। আর নেপাল থেকে যত টাকার পণ্য বাংলাদেশে আসে, এর অর্ধেকের বেশিই ডাল। কিন্তু তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে নেপালি ডালের কোনো চালান আসেনি।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, আগে এ বন্দর দিয়ে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০টি ট্রাক পণ্য ভারতে আসা-যাওয়া করত। চলতি সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ১০-১২টি পণ্যবাহী ট্রাক গেছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ব্যাটারি, সুতা, ফলের রস ও পাটের ১২ ট্রাক পণ্য নেপালের উদ্দেশে বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়েছে। তবে এ পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে ভারত-নেপাল সীমান্তে গিয়ে বসে থাকতে হবে।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে। নতুন করে চালু হলেও আগের মতো আর হচ্ছে না। আশা করছি শিগগিরই এই অচলাবস্থা কেটে যাবে।’
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ থেকে সীমিত আকারে পণ্য রপ্তানি হলেও নেপাল থেকে কোনো পণ্য আসছে না। নেপালি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিরা তাঁকে জানিয়েছেন, নেপালে সড়ক-মহাসড়কে অবরোধের কারণে সেখান থেকে পণ্য নিয়ে কোনো ট্রাক আসতে পারছে না।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে আসা নেপালের ঝাপা জেলার কাঁকরভিটা এলাকার সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি নবীন দাহাল ও দিলীপ থিমসিনা বলেন, ‘রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে নেপালের প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না।’
এক দশক পর গত অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য বাংলাদেশের পক্ষে রয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে নেপাল থেকে এসেছে ১১৫ কোটি টাকার পণ্য।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে কাঁকরভিটা-ফুলবাড়ী-বাংলাবান্ধা পথে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য শুরু হয়। নেপালি ট্রাক শিলিগুড়ির ফুলবাড়ী স্থলবন্দর পর্যন্ত এসে পণ্য পরিবহন করে থাকে।

শিক্ষকের প্রেমের ফাঁদ: জীবন দিলো মেডিক্যাল ছাত্রী বিউটি

প্রেমিকের বিয়ের সংবাদ সহ্য করতে না পেরে খুলনা মেডিক্যাল কলেজের (খুমেক) শেষ বর্ষের ছাত্রী আরমনি সুলতানা বিউটি আত্মহত্যা করেছে। গতকাল দুপুরে কলেজের সুফিয়া কামাল ছাত্রী হলের নিজ কক্ষে সে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে। এদিকে খবর পেয়ে চট্টগ্রাম থেকে নিহতের ভাই লাশ গ্রহণের জন্য খুলনার উদ্দেশে রওনা হয়েছে।
বিউটির সহপাঠীরা জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের এক সহকারী রেজিস্ট্রারের সঙ্গে বিউটির প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এমনকি সহপাঠীরা জানতো এই প্রেমিক ডাক্তারের সঙ্গে তার বিয়ে হবে। কিন্তু ওই ডাক্তারের অপর এক ডাক্তারের সঙ্গেও প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একই সময় দুই প্রেমিকার সঙ্গে যে ডাক্তারের সম্পর্ক ছিল তা বিউটি জানতো না। সমপ্রতি ওই প্রেমিকা ডাক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয়। এরপর থেকে বিউটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। সুফিয়া কামাল ছাত্রী হলের রুমমেট ও সহপাঠীদের বিউটি সব সময় এড়িয়ে চলতো। প্রেমিক ডাক্তার হিন্দুধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে সে কারোর কাছে বিষয়টি বলতো না। এ ঘটনার পর সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডা ও মেলামেশা বন্ধ করে দেয়।
সহপাঠীরা আরও জানায়, গতকাল দুপুরে অন্যরা যখন ক্লাসে ও বিভিন্ন কাজে রুম থেকে চলে যায়। এই ফাঁকে বিউটি নিজ কক্ষের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে  ঝুলে আত্মহত্যা করে। ক্লাস শেষে এসে অনেকক্ষণ  দরজা ধাক্কাধাক্কি করে না পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ দুপুর ১টা ২০ মিনিটে হলে এসে বিউটির কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে ঝুলন্ত অবস্থায় বিউটিকে দেখতে পায়। লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। নিহত আরমনি সুলতানা বিউটি চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার স্বন্দ্বীপের মো. ইদ্রীস আলী মিয়ার মেয়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুমেকের সুফিয়া কামাল হলের মেডিক্যাল শেষ বর্ষের এক ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, ব্যবহারিক পরীক্ষায় নম্বর দেয়ার ফাঁদ পেতে অনেক ছাত্রীর সম্ভ্রম কেড়ে নেয় কিছু লম্পট শিক্ষক। আজ আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি এটা জানতে পারলেও আমাকে পড়াশুনার শেষ প্রান্তে এসে খেসারত দিতে হবে। সহজ-সরল ও মিশুক বিউটির জীবন গেলো শিক্ষকের প্রেমের ফাঁদে পড়ে। ওই শিক্ষক একই সময় একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে প্রাকটিক্যাল নম্বরের ফাঁদ পেতে প্রেমের নামে সব কেড়ে নিয়েছে। মেডিক্যালে লেখাপড়ার শেষ প্রান্তে  এসে যখন ডাক্তার হয়ে বের হবে ঠিক তখনই পরিবারের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে লাশ হয়ে বের হচ্ছে ছাত্রীরা। এসব শিক্ষক নামের যারা কলঙ্ক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
সুফিয়া কামাল ছাত্রী হলের সহকারী হল সুপার তালজিলা রহমান বলেন, দুপুরে আমরা ক্লাসে ছিলাম। সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে শুনতে পাই বিউটিকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে জানতে পারি সে মারা গেছে।
খুমেকে কর্তব্যরত পুলিশের এসআই আসাদ জানান, বিউটির কক্ষের দরজা বন্ধ দেখে সহপাঠীরা ডাকাডাকি করার পরও দরজা না খোলায় তারা পুলিশকে খবর দেয়। দুপুর ১টা ২০ মিনিটে পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঝুলন্ত লাশ দেখতে পায়। তবে কি কারণে ওই ছাত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে সে বিষয়ে কিছু জানাতে পারেনি।
ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা সোনাডাঙ্গা মডেল থানার এসআই সরদার ইব্রাহিম হোসেন সোহেল বলেন, খুলনা মেডিক্যাল কলেজের সুফিয়া কামাল ছাত্রী হলের চতুর্থ তলাস্থ বিউটির কক্ষ থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তা দেখা হয়নি। মোবাইল ফোন ও ডায়েরি পর্যালোচনা করলে হয়তোবা আত্মহত্যার কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ কোন অভিযোগ করেনি।

দুই শিবিরই চাপের মুখে

বাংলাদেশে এখন যে রাজনীতি নেই এ কথা একবাক্যে সবাই কবুল করেন। এমনকি নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা প্রকাশ্যেই বলেন ক্ষমতাসীনরা। কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা একাধিকবার এ সত্য উচ্চারণ করেছেন। এর বিপদের দিকটি নিয়েও দলকে সতর্ক করেছেন তারা। বিশেষ করে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন সবচেয়ে সরব। ৫ই জানুয়ারি চ্যালেঞ্জ উৎরে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করছে একক কর্তৃত্বে। বিরোধীদের আন্দোলনের সময় পেট্রলবোমার ব্যবহার আর সাধারণ মানুষের মৃত্যু সরকারের কর্তৃত্বকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে সারা দুনিয়ায়। যে পশ্চিমা শক্তি সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট ছিল তারাও এক সময় ম্যানেজ হয়ে যায়। উল্টো সহিংস আন্দোলনের জন্য বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনায় সরব হয়ে ওঠেন বিদেশীরা।
তবে আচমকা দুটি হত্যাকাণ্ড চাপ এবং চ্যালেঞ্জ হয়ে আসে সরকারের জন্য। সিজার তাভেলা ও হোশি কুনিও হত্যাকাণ্ড শুধু সরকার নয়, আসলে চাপে ফেলেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেই। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা নারী ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত হয়েছে। কবে এ সফর হবে তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। বাংলাদেশে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে পশ্চিমা দুনিয়া। পোশাক খাতের বিদেশী ক্রেতাদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ সফর স্থগিত করেছেন। যা পোশাক খাতকে শঙ্কার মুখে ফেলেছে। পর্যটকদের সংখ্যাও গেছে কমে। নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত ৪২ জন বিদেশীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে তাদের কর্মস্থল থেকে।
তবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মনোভাবের মধ্যে পার্থক্যও অনেকটা স্পষ্ট। বাংলাদেশ সফরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ইতালি, নেদারল্যান্ডসহ বেশকিছু দেশ সতর্কতা জারি করেছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে এসব দেশ। তবে চীন, রাশিয়া এবং ভারতের মতো শক্তিগুলো এ পথে হাঁটেনি। দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার তদন্তে রাশিয়া এবং ভারতের গোয়েন্দাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেয়ার কথা বলেছেন সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক ধরনের ছায়া দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবশালী শক্তিগুলো এলার্ট জারি করে সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে বলেই মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। এ ধরনের চাপ প্রয়োগ গ্রহণযোগ্য নয় বলে সরকারের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি বিবৃতি দিয়েই বলেছে। সরকারের অনেকেই এর ভেতরে ষড়যন্ত্র দেখছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এরই মধ্যে সরকারের তরফে ব্রিফ করা হয়েছে কূটনীতিকদের। প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা আলাদা করে কথাও বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। সর্বশেষ সতর্কতা প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে তাদেরকে। তবে এতে এখন পর্যন্ত বরফ গলার আভাস পাওয়া যায়নি। দুটি বিষয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছে পশ্চিমা কয়েকটি দেশের। ১. বাংলাদেশে আইএস’র অস্তিত্ব রয়েছে কি-না এ ব্যাপারে নিবিড় অনুসন্ধান দেখতে চান তারা। ২. সরকার যেভাবে তদন্তের আগেই বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ করছে তাও ভালভাবে নিচ্ছেন না একদল কূটনীতিক। দুই বিদেশী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পশ্চিমাদের চাপ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে সরকার। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মন্ত্রীদেরও সতর্ক থাকতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
দুটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন পর্যন্ত কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। কোন উপসংহার টানতে পারেননি নীতি-নির্ধারকরা। উচ্চপর্যায়ে একের পর এক মিটিংয়েও এ নিয়ে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, শিগগিরই এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে অবহিত করা হবে। একটি সূত্র দাবি করছে, ঢাকা থেকে আইএস’র নামে বার্তা দেয়ার সন্দেহে এক সফটওয়্যার প্রকৌশলীকে নজরদারির মধ্যে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ার দিকে নিবিড় নজর রাখছে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র পাশে থাকায় এ যাত্রায় কূটনীতিক চাপ শেষ পর্যন্ত সরকার কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। তবে বিশেষ করে বিদেশী পোশাক ক্রেতাদের আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ সরকারকে উৎরাতে হবে। কারণ এখন পর্যন্ত পোশাক খাতই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে সত্যিকার অর্থেই এ দুটি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা ছিল সে ব্যাপারে উপসংহারে পৌঁছাতে হবে। সে উপসংহার টানা না গেলে ঝুঁকি থেকেই যাবে।
দুই বিদেশী হত্যাকাণ্ড বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের জন্যও চাপ হয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে চলেছেন বিএনপিকে। এমনকি সরাসরি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকেও দায়ী করা হয়েছে। দুটি হত্যাকাণ্ডের পর নতুন উদ্যমে গ্রেপ্তার অভিযান চলছে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। জাপানি নাগরিক হত্যায় স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। যিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবীন-উন-নবী খান সোহেলের ভাই। প্রতিদিনই সহিংসতার নানা মামলায় সারা দেশে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পুলিশি অভিযানে। বিভিন্নস্থানে সম্মেলনের সময় দলটির নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আটক রয়েছেন। একটি মামলায় জামিন পেলে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে আরেকটি মামলায়।
এমনিতেই গত নয় বছর ধরে টানা দুঃসময় কাটাচ্ছে বিএনপি। এ অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর দলটির মধ্যে এক ধরনের চ্যাঞ্চল্য তৈরি করেছিল। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন গেছেন। তবে সবাই জানতেন, যুক্তরাজ্য সফরে দল পুনর্গঠন নিয়ে তিনি কথা বলবেন, তার ছেলে এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে। আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গেও তার বৈঠকের কথা ছিল। বিএনপি চেয়ারপারসনের দেশে ফেরার জন্য অনেকটাই আটকে আছে দল পুনর্গঠনের কার্যক্রম। এখন সরকার থেকে নতুন করে চাপ প্রয়োগের ফলে এ কার্যক্রম কতটা কিভাবে এগোয় সেদিকে দৃষ্টি রাখছেন পর্যবেক্ষকরা। এছাড়া, জোটে জামায়াতসহ কয়েকটি ইসলামপন্থি দল থাকায় ‘জঙ্গি’ ইস্যুটি সবসময়ই বিএনপির জন্য স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে দেখা হয়।

দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার তদন্তে বড় অগ্রগতি?

সিজার তাবেলা, কুনিও হোশি
দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, তদন্ত এগিয়েছে। তাঁদের মতে, সরকারকে বিপাকে ফেলতে একটি চক্র ওই দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এর সঙ্গে জঙ্গিদের সম্পৃক্ততারও আভাস দিয়েছেন তাঁরা।
ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলাকে গত ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়ায় জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে একইভাবে হত্যা করা হয়। হত্যা মামলা দুটি তদন্তে থানার পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, র্যাবের পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে।
৫ অক্টোবর পাবনার ঈশ্বরদীতে এক যাজককে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। একই দিনে রাজধানীতে পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে হত্যা করা হয়। দুটি ঘটনাই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি ঘটিয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যার সঙ্গেও জঙ্গিদের সম্পৃক্ততার আভাস দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের বিষয়ে কিছু না বললেও গতকাল বুধবার পৃথক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, দ্রুতই রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। গতকাল সচিবালয়ে দুই বিদেশি নাগরিক ও রাজধানীতে পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যানকে হত্যা এবং পাবনায় এক খ্রিষ্টান যাজককে হত্যাচেষ্টার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। দ্রুতই অগ্রগতি জানাতে পারব। আরেকটু অপেক্ষা করেন।’
একই দিনে আইজিপি শহীদুল হক দুই বিদেশি হত্যার বিষয়ে বলেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাচ্ছে না। এখন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখা হচ্ছে। তবে শিগগিরই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সে পর্যন্ত তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলেন এবং সবার সহযোগিতা ও দোয়া চান। সেগুনবাগিচায় পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মতবিনিময় ও অপরাধ সভায় আইজিপি এ কথা বলেন।
দুই বিদেশি হত্যার ধরন দেখে পুলিশ কর্মকর্তারা শুরু থেকেই ধারণা দিয়ে আসছিলেন যে দুটি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা একই জায়গা থেকে এসেছে। দুটি হত্যাকাণ্ডেই তিন মোটরসাইকেল আরোহীর কথা বলেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এঁদের মধ্যে দুজন গুলি করে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, আরেকজন মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষমাণ ছিলেন। তবে একই ব্যক্তিরা দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে তদন্তকারীদের মধ্যে। কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যায় খুনিরা ৭ দশমিক ৬৫ এমএম (মিলিমিটার) বোরের পিস্তল ব্যবহার করেছে। আর কুনিও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি ছিল নাইন এমএম বোরের পিস্তল। রংপুরে কুনিও হত্যার ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা গুলির অংশবিশেষের বিস্ফোরক পরীক্ষার পর গত রোববার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যা মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ জানিয়েছে, গুলশানে সিজার হত্যার ঘটনাস্থলের আশপাশের ১৩টি সড়কের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেল আরোহীসহ অন্তত ২০ জনকে সন্দেহের তালিকায় আনা হয়। সেখান থেকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সংগৃহীত তথ্য এবং আরও কিছু মাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা সন্দেহের তালিকা ছোট করে তিনজনে নামিয়ে এনেছে। কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই তিনজনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও নিশ্চিত হয়েছেন। শিগগিরই তাঁদের ধরা যাবে বলে আশা করছেন গোয়েন্দা সদস্যরা।
আর রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। এই দুজন হলেন রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য রাশেদ-উন-নবী ও নিহত কুনিওর ব্যবসায়িক সহযোগী হুমায়ুন কবীর। এ ঘটনায় রংপুরের পুলিশ রাজশাহী থেকে দুই ব্যাংক কর্মকর্তাকে ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে পরে ছেড়ে দেয়। তাঁদের কাছ থেকে কুনিও হত্যার বিষয়ে রংপুরের কর্মকর্তারা কী তথ্য পেলেন, তা জানা যায়নি।
তবে কুনিও হত্যার বিষয়ে র্যাব জানিয়েছে, কুনিও হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাচালকের তথ্যের সূত্র ধরে তাঁরা একজনকে শনাক্ত করতে পেরেছেন। ওই ব্যক্তির আরেক সহযোগীও ঘটনার পর থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। ওই দুজন রংপুরের স্থানীয় সন্ত্রাসী বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

খিজির খান হত্যার নেপথ্যে জেএমবি!

রাজধানীর বাড্ডায় কথিত পীর ও পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খান হত্যার ঘটনায় উগ্রপন্থি ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত তারিকুল্লাহ ওরফে রুবেল নামে জেএমবির এক সদস্যকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। আটক তারিকুল্লাহ ওরফে রুবেল হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে বলে গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে। তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করতে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মাহফুজুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত একজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে নিয়ে সহযোগীদের আটক করতে অভিযান চালানো হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কথিত পীর খিজির খানকে ধর্মীয় মতাদর্শের জের ধরে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি সাংগঠনিকভাবে সম্পৃক্ত। জেএমবির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হওয়ার পর দলটিতে ভাঙন শুরু হয়। সর্বশেষ জেএমবির আমীর মাওলানা সাইদুর গ্রেপ্তার হওয়ার পর সংগঠনের মধ্যম সারির নেতারা নিজেদের নেতৃত্বে আলাদা আলাদা করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে থাকেন। এরই একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন ময়মনসিংহের নজরুল ডাক্তার। যাকে অনুসারীরা ‘ডাক্তার সাহেব’ বলে ডাকেন। এই গ্রুপটি ধর্মীয় মতাদর্শের বিরোধের জের ধরে ‘সাইলেন্ট কিলিং’ করার জন্য মাঠে সক্রিয় হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তারিকুল্লাহ ওরফে রুবেল ও তার সহযোগীরা কথিত পীর খিজির খানকে হত্যা করে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, খিজির খানকে হত্যা মিশনে ৮-১০ জনের একটি দল কাজ করেছে। এর মধ্যে তারিকুল্লাহ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে গোয়েন্দারা তথ্য পায়। এই তথ্যের ভিত্তিতে তারেকের ভাই সফটওয়্যার প্রকৌশলীকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ভাইয়ের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে গোয়েন্দা পুলিশ টাঙ্গাইল এলাকা থেকে তারেককে আটক করে। তারেককে আটকের পরপরই ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে সে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে ও সহযোগীদের নাম বলে। পরে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল তারেককে সঙ্গে নিয়ে অভিযান শুরু করে। তবে অভিযানে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া অপর কোন সদস্যকে আটক করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খিজির হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন তারা। দু-একদিনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য দেশবাসীকে জানানো হবে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আটককৃত তারিকুল্লাহ ওরফে রুবেল ২০০৯ সালের ১১ই এপ্রিল রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন ডুমনি ইউনিয়নের টেকপাড়া এলাকা থেকে সাত সহযোগীসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়। সে সময় তারিকুল্লাহ জেএমবির গায়েরি এহসার হিসেবে কাজ করতো। দুই বছর পর ২০১১ সালের ২৬শে এপ্রিল আদালত থেকে জামিন পেয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হয়ে আসে সে। কিন্তু জেল গেট থেকে র‌্যাব আবারও তাকে গ্রেপ্তার করে। আবার বছরখানেকের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে এসে জেএমবির নজরুল গ্রুপের সঙ্গে যোগ দেয় সে। এরপর পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় মতাদর্শের জের ধরে ‘সাইলেন্ট কিলিং’-এ অংশ নেয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, জেএমবি প্রথম থেকেই ‘কাট আউট’ পদ্ধতিতে কাজ করে আসছিল। এই পদ্ধতিতে এক গ্রুপ অপর গ্রুপের সম্পর্কে জানে না। গোয়েন্দাদের ধারণা, জেএমবি’র এই গ্রুপটির বিভিন্ন স্লিপার সেলই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় মতাদর্শের জের ধরে বেছে বেছে হত্যা করে যাচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, খিজির হত্যায় আটককৃত তারিকুল্লাহ ওরফে রুবেলের বাবার নাম হাবিবউল্লাহ ওরফে মজনু। তাদের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার এলাকার মৌলভীপাড়ায়। তার বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা রয়েছে।