Friday, August 7, 2009

চোখের আলোয় দেখেছিলেম by অদিতি ফাল্গুনী

‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে, অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহিরে!’ রবীন্দ্রনাথের এই বহুগীত গানটি আবারও মনে পড়বে, যদি আপনি মিরপুরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের স্কুলে যান। ‘জাতীয় বিশেষ শিক্ষাকেন্দ্র’ নামাঙ্কিত এই প্রতিষ্ঠানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাড়াও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্যও বিশাল সবুজ ক্যাম্পাসে আরও দুটো আলাদা স্কুল রয়েছে।
‘মনে আমার ঝলসে ওঠে একাত্তরের কথা, পাখির ডানায় লিখেছিলাম প্রিয় স্বাধীনতা’—১২ বছরের দৃষ্টিশক্তিহীণ বালক মোখলেসুর রহমান খুব আবেগ মিশিয়ে আবৃত্তি করে শোনাল শামসুর রাহমানের কবিতা। ব্রেইলে সাদা কাগজের ওপর ফুটো করে করে সে নিজেও কবিতা ও ছড়া লেখে।
একা মোখলেসুরই নয়, চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী ও ১৩ বছরের কিশোরী শিল্পী ও তার সহপাঠী ফাহিমা, কাকলী, তাহমিনা, ডালিয়া, তমা সবাই মিলে টিফিন বিরতিতে কোরাস গাইছিল।
জীবনে কী হতে চায়, এমন প্রশ্নের উত্তরে কেউ গায়িকা, কেউ শিক্ষক আবার কেউ দুটোই হতে চাইল। চতুর্থ শ্রেণীতে প্রথম হওয়া ফাহিমা বলল, ‘জীবনে বড় কিছু করতে চাই!’
‘আমাদের এই স্কুলে মোট ৫০ জনের মতো আবাসিক ও ২০ জনের মতো অনাবাসিক ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এ ক্যাম্পাসের ভেতরই ছেলেমেয়েদের আলাদা হোস্টেল রয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ওরা এখানে আসে। স্বাভাবিক বয়সের তুলনায় এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শুরু করে একটু দেরিতে। কাজেই হয়তো তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীর বয়স দেখা যায় অনেক সময় ১৩ বা ১৪।’ বললেন এই স্কুলে ১৯৯১ সাল থেকে কর্মরত শিক্ষিকা মরিয়ম খাতুন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক সেরাজুল হক ভুঁইয়া বললেন, ১৯৯১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নরওয়েজিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ব্লাইন্ড অ্যান্ড পার্শিয়ালি সাইটেড প্রজেক্টের আর্থিক সহায়তায় এই বিশেষ শিক্ষাকেন্দ্র যাত্রা শুরু করে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য স্কুল সিলেবাসে ব্রেইল ইংরেজি, বাংলা, ব্র্র্র্র্র্রেইল বাগানবিদ্যা, মুরগি চাষ, গণিত শিক্ষা, বিজ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষা, চলাচল গতি এডিএল (অ্যাক্টিভিটিজ ফর ডেইলি লিভিং) শিক্ষা, সামাজিক বিজ্ঞানসহ প্রভৃতি পাঠ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সেরাজুল হক আরও বলেন, ‘বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলার প্রত্যেকটিতে একটি করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুল ছাড়াও পাঁচটি বিভাগীয় শহর অর্থাৎ ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও রাজশাহীতে আরও পাঁচটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুল রয়েছে। তবে এ স্কুলগুলোতে সাধারণত পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত আমরা শিক্ষা দান করে থাকি। যারা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত টিকে থাকে, তারা পরে অন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে বিশেষ ব্যবস্থায় পড়াশোনা চালিয়ে যায়।’
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষক কক্ষে বসেই পরিচয় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র শরিফ আহমেদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবু নাঈম মামুনের সঙ্গে। ‘এই স্কুলেই আমরা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি।’ বললেন এ দুই বন্ধু। আইনের ছাত্র শরিফ পড়াশোনা শেষে ঢাকা হাইকোর্টে প্রাকটিস করতে চান। কিন্তু তা আদৌ সম্ভব হবে কি না তিনি জানেন না।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলের একাধিক শিক্ষক যেমন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম কিংবা কল্পনা আক্তার তাঁদের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান ও স্নাতকোত্তর অর্জন করে শিক্ষক পেশা গ্রহণ করেছেন।
সাধারণত গ্লুকোমা থেকে চোখে পানি জমে যাওয়া, ক্যাটারাক্ট বা ছানি পড়া, গুটি বসন্ত, শৈশবে টাইফয়েড বা জ্বর, উত্তর বাংলা অঞ্চলে দারিদ্র্য ও অপুষ্টি, দুর্ঘটনা প্রভৃতি অন্ধত্বের প্রধান কারণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বললেন, ‘আমাদের এখানকার প্রতিবন্ধী শিশুদের শতকরা ৬০ ভাগই নিকটাত্মীয়দের ভেতর যেমন চাচাতো, মামাতো, ফুপাতো, খালাতো ভাইবোনের ভেতর বিয়ের ফলাফল। সময় এসেছে নিকট রক্তে বিয়ের এই প্রচলনটি পরিবর্তনের।’
আট বছরের শিশু রূপমের কথা কিছুতেই ভোলা যাবে না। অসম্ভব মিষ্টি দেখতে এই শিশুটির মাত্র আড়াই বছর বয়সে ব্রেন টিউমার অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে দৃষ্টিশক্তি হারাতে হয়। ব্যবসায়ী বাবার সন্তান রূপম অবশ্য এখানকার আবাসিক ছাত্র নয়। মিরপুরের বাসা থেকেই সে আসা-যাওয়া করে। ব্রেইলে দ্বিতীয় শ্রেণীর সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়েই কোনো স্টিক ছাড়াই দুদ্দাড় করে দোতলার সিঁড়ি ভেঙে নিচে মিউজিক ক্লাসের আকর্ষণে একাই ছুটে নামতে লাগল রূপম।
স্কুলে শিশুদের চলাচল গতিশিক্ষা প্রদানকারী মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বললেন, ‘সাধারণত পঞ্চম শ্রেণীর আগ অবধি আমরা সাদা ছড়ি প্রশিক্ষণ দিই না। আমরা ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন ল্যান্ডমার্ক, সিঁড়ি, করিডর, হোস্টেল অবধি যাওয়ার রাস্তা ব্যবহার প্রভৃতি শেখাই। দৃষ্টিশক্তি হারা ছেলেমেয়েরা সাধারণত ঘ্রাণ, স্পর্শ ও শ্রবণশক্তিতে প্রখর হয়। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাই বাথরুম ব্যবহার, কাপড় কাচা, খাদ্র গ্রহণ প্রভৃতি কাজ নিজেরাই করতে পারে।’
মিউজিক ক্লাসের শিক্ষক নুসরাত জাহান কুমকুম বললেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের হারমোনিয়াম বাজানো শিখাচ্ছি। তবে আরও হারমোনিয়াম দরকার।’
আমি ফিরে আসার সময় তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কিশোরী মেয়েরা দৌড়ে আসে। ওরা মাঠে বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করছিল। শিক্ষকদের বকায় আবার স্কুলে ঢোকে। আমার গায়ে হাত রেখে বলতে থাকে, ‘আপা, আমাদের চোখ না থাকলেও মনের চোখে আপনারে ঠিকই দেখছি! আমাদের কাছে কেউ আসে না। আপনি কি আবার আসবেন?’
ডাক্তার বা প্রকৌশলী না হতে চেয়ে অমলকান্তি যেমন শুধুই বৃষ্টি শেষের গাছের পাতার রোদ্দুর হতে চেয়েছিল, প্রকৃতির সন্তান এই দৃষ্টিশক্তিহীন শিশু কিশোর-কিশোরীদের আলোকপথের যাত্রা দেখার অপেক্ষায় যেন থাকতে পারি আমরা সবাই।

আইলা-পরবর্তী স্থায়ী পুনর্বাসন খুবই প্রয়োজন -দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা by আসাদউল্লাহ খান

২০০৭ সালের নভেম্বরে সিডরের আঘাতে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জেলাগুলো মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল। সরকারি হিসাবে প্রাণহানির সংখ্যাই ছিল সাড়ে তিন হাজার, বেসরকারি হিসেবে আরও বেশি। কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ সাগরের লোনা পানি ভাসিয়ে নিয়েছিল। সিডরের ক্ষত কাটিয়ে না উঠতেই গত ২৫ মে আইলা নামের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায়। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতক্ষীরায় শ্যামনগর এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলা। সরকারি তথ্য মোতাবেক এ পর্যন্ত ১৭৫ জনে প্রাণহানি হয়েছে। বয়স্ক এবং শিশু যারা ভেসে গেছে তাদের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি অঞ্চলের শতকরা আশি ভাগ মানুষ একেবারে হতদরিদ্র বলতে যা বোঝায় তাই। তাদের ঘরবাড়ি সব কাদামাটির তৈরি। মাটির দেয়ালের ওপরে ছন কিংবা গোলপাতার ছাউনি। এবার আইলার আঘাতে মাটির দেয়াল আবার মাটিতে মিশে গেছে। ছিন্নমূল মানুষ এখনো বেড়িবাঁধের ওপরে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে। ছোটখাটো দুই-একটা পয়েন্টে স্বেচ্ছাশ্রম কিংবা সরকারি উদ্যোগে বেড়িবাঁধ মেরামত করা হলেও শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পাতাখালী, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ এবং আশশুনি ইউনিয়নের প্রতাপনগর এলাকায় বেড়িবাঁধের ভাঙন অনেক বড় হওয়ায় জোয়ারের পানি ওঠানামা করছে। সরকারি উদ্যোগে এসব বড় ভাঙন মেরামত করা না হলে জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ করা যাবে না। ষাট ও সত্তরের দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে এই বেড়িবাঁধগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। নির্মাণকালে উচ্চতা ছিল ১৪ ফুট। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাঁধ অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং কোথাও কোথাও এর উচ্চতা ৮-৯ ফুটে এসে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিংড়ি ঘেরের কিছু মালিকের অপতৎপরতা। বেড়িবাঁধের অসংখ্য পয়েন্টে নিচ দিয়ে ছিদ্র করে পাইপ ঢুকিয়ে তাদের ঘেরে পানি ঢোকানোর ফলে বাঁধের কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে যায়। ফলে বাঁধটি আইলার আঘাতে সহজেই ধসে পড়েছে।
জানা গেছে, এবারের আইলার আঘাতে সাতক্ষীরার ৭০০ কিলোমিটার উকূলীয় বাঁধের ৩৫ কিলোমিটার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ছাড়া ২৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। আইলার আঘাতে আটটি স্লুইস গেট নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং ৬১টি অকেজো হয়ে গেছে। আর যত দিন জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হবে ততদিন এ অঞ্চলে কৃষি কাজ থেকে শুরু করে আবাসন নির্মাণ, মাছের ঘের পুনঃস্থাপন কিংবা পুকুরের মত্স্য চাষ, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি প্রতিপালন এবং একই সঙ্গে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
সরকার উপদ্রুত এলাকায় ভিজিএফ কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে, যার মাধ্যমে আপাতত চালের অভাব হয়তো মিটবে, কিন্তু পুকুরে মাছ নেই, খেতে সবজি নেই, ডাল নেই, তেল নেই, পানি নেই এবং মাথা গোজার ঠাঁইও নেই। এখন প্রয়োজন সব হারানো এসব মানুষের জীবিকার সংস্থান, তাদের কর্মসংস্থানসহ স্থায়ী পুনর্বাসন এবং গ্রাম উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা। সবচেয়ে ভালো হবে যদি সরকার সেনাবাহিনীর প্রকৌশল শাখার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার লোকদের একটা পরিসখ্যান নিয়ে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে টিকে থাকতে পারে এমন বাড়িঘর তৈরি করার ব্যবস্থা নেয়।
সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ডিএফআইডি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সাত কোটি পাউন্ডের একটি কর্ম-পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই অর্থ সুসমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে আইলা এবং সিডরে ক্ষতিগ্রস্তদের আবাসন নির্মাণ এবং সর্বোপরি স্থায়ীভাবে পানীয় জলের ব্যবস্থা করার জন্য ব্যয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। সেনাবাহিনী এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে গঠিত টিমের যৌথ উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় কাজটি করা হলে আবাসন অবকাঠামো টেকসই ও মজবুত হবে এবং সমগ্র প্রক্রিয়াই দুর্নীতিমুক্ত হবে বলে বিশিষ্টজনেরা মনে করেন। জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে দুর্যোগ বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলকে আঘাত হানতেই থাকবে। তাই ভবিষ্যৎ দুর্যোগের কথা মনে রেখে আরও কিছু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থা হাতে নেওয়া প্রয়োজন।
সিডরের পরও এটা ঘটেছে এবং এবার আইলার পর দুই মাস কেটে গেলেও এখন মানুষ পানীয় জলের অভাবে খুবই কষ্ট পাচ্ছে। প্রায় ১৬ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে শ্যামনগর, আশাশুনি, দাকোপ প্রভৃতি এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লোনা পানি ঢুকে পড়েছে এবং সমগ্র এলাকার মিঠা পানির পুকুরগুলোর পানি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সাত লাখ দুর্গত মানুষের জন্য দূর-দুরান্ত থেকে ট্যাংকে পানি এনে সেই, পানি ঘরে ঘরে সরবরাহ করে মাসের পর মাস চলতে পারে না। নলকূপ এখানে কাজ করে না, ১০০ ফুট নিচ পর্যন্ত গেলেও মিঠা পানি পাওয়া যায় না, তাই এ অঞ্চলের লোকেরা বরাবরই বর্ষা মৌসুমে পুকুরে জমা বৃষ্টির পানি পান করে থাকে। এবার বৃষ্টির পরিমাণও অনেক কম।
২০০৬ সালে সুনামি-আক্রান্ত ভারতের তামিলনাড়ু প্রদেশের নাগাপুট্টিনাম অঞ্চলে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের কারণে সুপেয় পানির তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়। তখন হায়দরাবাদের টাটা প্রকল্প লবণাক্ততা দূর করে ঘণ্টায় সাড়ে তিন হাজার লিটার সুপেয় পানি সরবরাহে সক্ষম চলমান ইঞ্জিন নিয়ে সেখানে হাজির হয়। আমাদের দেশের উপকূলীয় অঞ্চলেও এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার।
সবচেয়ে বড় সংকট সৃষ্টি হয়েছে কৃষি কাজ নিয়ে। বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো লোনা পানিতে ডুবে আছে। এই লোনা পানি সরে গেলেও এই জমিতে প্রচলিত রোপা আমন ধান চাষ করা যাবে না। এ অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহনক্ষম বিআর ৪০ এবং বিআর ৪১ বীজ সরবরাহ করা এ মুহূর্তে একান্ত প্রয়োজন। চাষিদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেছে, এ দুই জাতের ধান বীজের একরপ্রতি ফলনও অনেক বেশি। তবে এলাকা থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনে জানা গেছে, এই বীজের সরবরাহ এত কম যে কৃষকেরা হতোদ্যম হয়ে পড়েছে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জনজীবনকে অনবরত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এটা সাম্প্রতিকালে একটা অনিবার্য নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা অর্থাৎ আবহাওয়া ও জলবায়ুর ক্রমাগত পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা ক্রমাগতভাবে জোরদার করতে হবে।
আসাদউল্লাহ খান: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক
aukhanbd@gmail.com

দুর্নীতিবান্ধব সমাজে দুর্নীতি দমন by মনজুর রশীদ খান

দুর্নীতি ও মৌলিক অসাধুতা আমাদের সমাজে, বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিব্যাপ্ত হয়ে এক ধরনের সংস্কৃতির রূপ নিয়ে বসছে। ফলে সর্বত্র যেন দুর্নীতিবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। অনিয়ম, অসাধুতা ও অপকর্ম সাধনের সহায়ক অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই বিরাজমান। রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক রীতিনীতি এমন হয়ে উঠছে, যেখানে নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার তাগিদ ও শাসন কমে গেছে। দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডকে অনৈতিক ও অপরাধ বলে মনে না করার লোকের সংখ্যা বাড়ছে। অপরাধের শাস্তি বা মন্দ পরিণাম এখন অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত। কেউ যদি অর্থ-বিত্ত-সম্পদের অধিকারী এবং সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হন, তাহলে তো কথাই নেই। পার পেয়ে যাওয়া সহজ। আইন প্রয়োগের শিথিল অবস্থা দুর্নীতিসহ সব অপরাধ বাড়াচ্ছে। যেমন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কমিশনবাজি, ছিনতাই, দখলবাজি, জিম্মি করে অর্থ আদায় ইত্যাদি। আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বস্বীকৃত অন্যতম সমস্যা হলো দুর্নীতি, যা দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির প্রধান অন্তরায়। এর বিরুদ্ধে অনেক কথা বলা হলেও অবস্থার পরিবর্তন নেই। কি সামরিক শাসন, কি অসামরিক শাসন বা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক শাসন, প্রভৃতি যে ব্যবস্থাই আসুক, দুর্নীতির প্রকোপ কমেনি। বরং ব্যাপকতা ও পরিধি আরও বেড়েছে। কারণ অর্থলিপ্সা বা অর্থগৃধ্নুতা বৃদ্ধি ও শাস্তির ভয় তিরোহিত হওয়া। বিগত কয়েকটি বছরে, বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে যে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিল, এর অনেক কিছু ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পট-পরিবর্তনের আগে সংবাদমাধ্যমে ও লোকমুখে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু সরকারের উচ্চমহল নিষ্ক্রিয় থেকেছে ও প্রশ্রয় দিয়েছে। পরে দুর্নীতি ও অসাধুতার অবিশ্বাস্য সব কাহিনী আরও বিস্তৃত আকারে প্রকাশ পেয়েছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রবল ঝাঁকুনি দেওয়া পট-পরিবর্তনের পর দেশবাসী আশাবাদী হয়েছিল, দুর্নীতি নির্মূল না হলেও অনেকটাই কমবে। লাগামহীন অবস্থা থাকবে না।
যে আশার আলো দেখা যাচ্ছিল, তা দপ করেই যেন নিভে গেল। দুই বছর পর এখন ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। একসময় যাঁরা বড় দুর্নীতিবাজ বলে পরিচিত হলেন এবং কেউ কেউ অভিযুক্ত হয়ে দণ্ডিতও হলেন, তাঁদের অনেকে বেকসুর খালাস পেয়ে বা জামিন নিয়ে বা উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে বীর বেশে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে সচেষ্ট। দুর্নীতির কুশীলবদের ভয়ঙ্কর দুঃসময় গেছে; তাঁরা এখন বিক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধ নিতে এককাট্টা। খুঁজে বেড়াচ্ছেন, যাঁরা অমন অবস্থায় ফেলেছিলেন তাঁদের। দুই বছর যেমন এক পক্ষের কথা শুনেছি, এখন অপর পক্ষের কথা শুনছি। পত্রপত্রিকা আর টক শোতে চলছে দেদার সব কাহিনী। সবাই নির্দোষ, তাঁদের রাজনৈতিক কারণে হয়রানি ও নির্যাতন করে মিথ্যা দুর্নীতির মামলা করা হয়েছে। এখন মামলা তুলে নেওয়ার দাবি উঠছে। দেশে সরকার পরিবর্তনের পর এমন দাবি নতুন নয়। কেউ হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি অসংগত নয়। তবে প্রশ্ন, সরকার বদলালেও মামলার অভিযোগ, তদন্ত প্রক্রিয়া, এমনকি বিচারিক কাজ বদলে যাবে কেন? অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ আমীরুল ইসলাম সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে যথার্থই বলেছেন, ‘সরকারের পরিবর্তন এলে বিচারের মানদণ্ড বদলে যায়, যা বড়ই দুর্ভাগ্যজনক’; (প্রথম আলো, ২৬.০৭.০৯)। এমন অবস্থায় একজন সাধারণ নাগরিকের মনেও বিচারকাজ নিয়ে নানা প্রশ্ন জাগতে বাধ্য। একটি সভ্য জনগোষ্ঠীর বিচারালয়ই হচ্ছে শেষ ভরসার স্থল। সেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার সবারই। কে, কারা, কীভাবে ও কখন তা নিশ্চিত করবেন, আমরা সে ভরসা পাচ্ছি কই।
আইন সবার জন্য সমান ও আইন নিজস্ব গতিতে চলবে, এমন সব কথা আমরা ক্ষমতাসীনদের মুখ থেকেই প্রচুর শুনেছি। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্নতর। আইনের গতি থামিয়ে ভিন্ন ধারায় চালানোর অনেক উদাহরণ রয়েছে। বিদেশে থাকা পলাতক ফাঁসির আসামি দেশে ফিরে কত দ্রুত রাষ্ট্রপতির মার্জনা আদায় করেছিলেন, সে খবর জাতীয় দৈনিকে এসেছে। অঢেল সম্পদশালী ও প্রভাব-প্রতিপত্তিধারীদের আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে অসুবিধা হয় না। তাঁরা আইনের মানদণ্ডকেও সহজেই বাঁকিয়ে নিতে পারেন।
ইংরেজি প্রবাদে আছে: A thief passes for a gentleman when stealing has made him rich. অর্থ দাঁড়ায়, ‘চোর ভদ্রলোক হয়ে যান, যখন চৌর্যবৃত্তি তাঁকে বিত্তশালী করে তোলে।’ কথাটি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা সত্য, তা জ্ঞানী-গুণী-সজ্জন পাঠকদের বিবেচনায় থাকল। দুর্নীতিবাজদের প্রতি ঘৃণার বদলে প্রীতি বেড়ে গেছে। নমনীয়তা, সহমর্মিতা সৃষ্টির প্রয়াশ হরহামেশা চলছে। এখন যেন দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক নামের সংস্থাটিতে নিষ্ক্রিয়তা এসে গেছে। বোঝা যাচ্ছে, তারা উত্সাহ বা সাহস পাচ্ছে না। রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বলে মামলা তুলে নেওয়ার যে প্রক্রিয়া চলছে এবং বড় মাপের মামলাগুলোর পরিণতি দেখে এমন আশঙ্কাই বাড়ছে। এ কথা সত্য যে রাজনৈতিক নেতৃত্বে সদিচ্ছা ও দৃঢ় অঙ্গীকার না থাকলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং শক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়। দুর্নীতির ব্যাধিও দূর হবে না। কিন্তু সে অবস্থান, সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার বাস্তবে কথা ও কাজে কবে দেখা যাবে সেটাই জিজ্ঞাস্য। দুদক কি আসলেই একটি স্বাধীন শক্তিশালী ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারবে, নাকি শুধু নামকাওয়াস্তেই এর অস্তিত্ব ধরে রাখা হবে, সে প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসছে। সম্প্রতি দুর্নীতির বড় বড় মামলার বেশির ভাগেরই যে পরিণতি হয়েছে, এর জন্য দুদকের প্রতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দায়ী, নাকি পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি দায়ী, তা দেখার বিষয়। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে সরকারকেই জবাবদিহি করতে হবে বেশি। কারণ দুদকের শক্তি, সামর্থ্য ও তৎপরতা অনেকটাই নির্ভর করে সরকারের ওপর। সন্দেহ নেই, এর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা অনেক। অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অভাব, তাঁদের অনেকের অদক্ষতা, অসততা, পক্ষপাতিত্ব এবং মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীদের দুর্বলতা বা নিষ্ক্রিয়তা ইত্যাদি। এর বিপরীতে দেশের বাঘা বাঘা ঝানু আইনজীবীর আইনের ফাঁকফোকর আবিষ্কার ও সুচতুর উপস্থাপনায় চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের কেউ কেউ উচ্চ আদালতের আদেশে বেরিয়ে আসছেন। অর্থাৎ পার পেয়ে যাচ্ছেন। এতে যে বার্তা বহন করছে, তা দুর্নীতিবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতেই সহায়ক হবে, দুর্নীতি দমনে নয়। সম্ভবত মহলবিশেষ এমনটিই চায়।
আমরা দেখে আসছি, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের অনেক কিছু পাল্টে যায়। আদালত অঙ্গনেও তা-ই ঘটে। বিচার প্রশাসন ব্যবস্থাপনার গুণগত পরিবর্তন অতি জরুরি। অনুসন্ধান তদন্ত ও বিচারকাজকে প্রভাবমুক্ত রাখা এবং নিম্ন ও উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচারক, আইনজীবী সম্প্রদায়সহ সরকার ও বিচার প্রশাসনসংশ্লিষ্ট সবার। তবে সরকারের দায়িত্বই সর্বাধিক। সম্প্রতি উচ্চ আদালতে দুর্নীতির কিছু মামলা নিষ্পত্তি নিয়ে আমার মতো আইন বিষয়ে অজ্ঞদের মনেও কিছু বিভ্রান্তির উদ্রেক হয়েছে। বিচারপতি সৈয়দ আমীরুল ইসলামের মতে, ‘দুদকের অধিকাংশ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে টেকনিক্যাল পয়েন্টে, মেরিট বা মামলার গুণগত বিচারে নয়...।’ নোটিশ ঠিকমতো দেওয়া হয়নি, সে কারণে দণ্ডপ্রাপ্তরাও খালাস পেয়ে গেলেন। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন, এদিকটি কি মহামান্য আদালত বিবেচনায় নেননি। বাদীপক্ষের কৌঁসুলি কি তুলে ধরেননি? আইন বিষয়ে আমার জ্ঞান যত্সামান্য। তাই বিষয়টি বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। বিচারপতির আমীরুল ইসলামের মতে, ‘বিচারক নিয়োগে বড় বেশি মাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ ঘটেছে এবং বিচারকক্ষে এখন কখনো দলীয় পরিচয়ের নিরিখে আইনের পরিবর্তিত ব্যাখ্যা লক্ষ করা যাচ্ছে।’ এ তো খুবই ভয়ঙ্কর কথা। এ বক্তব্যে বিচারব্যবস্থার নৈরাজ্যকর চিত্রটি আরও সমর্থন পেল বৈকি। এমন অবস্থায় বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাহলে সমাজে দুর্নীতিবান্ধব পরিবেশটাই আরও জোরদার হয়ে একদিন ঘুষ-উপরি বাণিজ্য প্রকাশ্যে চললে কেউ ঠেকাতে পারবে না।
এ প্রসঙ্গে যোগ করতে চাই, দেশে বিচারব্যবস্থা মনে হয় যেন একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহে তা আরও পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো। প্রতিদিন হাজার হাজার লোককে দেশের বিভিন্ন আদালতে ধরনা দিতে হয়। এদের গাঁটের লাখ লাখ টাকা আদালত চত্বরে পকেট বদল হয় (এর কতটা হালাল উপার্জন আর কতটা অবৈধ, এর সমীক্ষা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কাছে নিশ্চয়ই রয়েছে)। আদালতগুলোকে ঘিরে নানা স্বার্থবাদী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব যুক্ত হয়ে আরও সম্পদশালী ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি কিছু আইনজীবী ও তাঁদের প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের পক্ষে মামলা পরিচালনায় পারদর্শিতা দেখিয়ে প্রিয়পাত্র হয়েছেন। তাঁরা যে লাখ লাখ টাকার আইন-ব্যবসার সুবিধা করে নিয়েছেন, তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ফসল তাঁদের ঘরেই বেশি উঠেছে। আইন-ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত যে বিরাট সুবিধাভোগী শ্রেণী সৃষ্টি হয়েছে, তাতে কিছু বিচারক অন্তর্ভুক্ত থাকার কথাও শোনা যায়। এখানে আইনজীবী ছাড়া আরও আছে আদালতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি ও পুলিশ বিভাগের লোকজন।
আদালতে মামলা-মোকদ্দমার জট এবং হাজার হাজার লোকের দুর্ভোগ ও ভোগান্তির কথা সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই আসে (সম্প্রতি এই লেখকের জানার কিছু সুযোগ হয়েছিল)। সরকারি সূত্রমতে, বিভিন্ন আদালতে ২০ লক্ষাধিক মামলা বিচারাধীন। এ ছাড়া বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশ, দুদক ও অন্যান্য সংস্থায় প্রাথমিক অনুসন্ধান, তদন্ত ইত্যাদি পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত আছে আরও বহু ব্যক্তি ও তাদের পরিবার। সব মেলালে ভুক্তভোগীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যাওয়া কাল্পনিক হবে না। এরা প্রতি পদে দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার। কেউ পুলিশের হাতে, কেউ আদালতের লোক ও দালালদের হাতে, কেউ বা আইনজীবীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। আরও আছে পুলিশ বা দুদকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্তৃক মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে বা পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া মামলা দায়ের করা, তদন্ত না করে ঝুলিয়ে রাখা বা মামলা ফাইলবন্দী ফেলে রেখে সুবিধা আদায়কারীদের দল। এমন অবস্থা থেকে জনসাধারণের একটি বিরাট অংশকে মুক্তি দিতে দিন বদলের সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। আদালত প্রাঙ্গণ তথা বিচার বিভাগ ও বিচার প্রশাসনসংশ্লিষ্ট বিষয়ের আমূল সংস্কার দাবি আইনজীবী মহলসহ সব মহলের। সঠিক প্রক্রিয়ায় যথাসম্ভব দ্রুততর বিচারকাজ পরিচালিত হলে জনগণের একটি বিরাট অংশকে হয়রানি ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যাবে এবং প্রশাসনকে গতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত করে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সমাজে দুর্নীতিবান্ধব পরিবেশও দূর হবে। আশা করি, এবারের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে মহাজোট সরকার দুর্নীতি নির্মূলের যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পিছ পা হবে না।
মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) মনজুর রশীদ খান: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা।
mnzr23@gmail.com

পুষ্টিকে কেন্দ্রে রেখেই হোক উন্নয়ন আলোচনা by মিখাল রুেকাভস্কি

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতিবছর দুই কোটি শিশু অপুষ্টির শিকার হয়ে মারা যায়, যা বিশ্বজুড়ে শিশুমৃত্যুর একক বৃহত্তম কারণ। বর্তমানে বিশ্বে অপুষ্টিতে ভুগছে এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটির কাছাকাছি। এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। দক্ষিণ এশিয়ায় ৪৫ শতাংশ শিশুই পুষ্টিস্বল্পতায় ভুগছে। অপুষ্টি ও খর্বাকৃতি উভয়ের হার বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল এমনকি সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশগুলোর চেয়েও অনেক বেশি।
প্রায় এক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে মোটামুটি তেজিভাব বজায় থাকলেও এ অঞ্চলের শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে তেমন অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ অঞ্চলের কোনো দেশই ২০১৫ সাল নাগাদ পুষ্টি-পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল) অর্জনে জন্য কম ওজনের শিশুদের সংখ্যা কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনার সঠিক পথে নেই। বাংলাদেশ নব্বইয়ের দশকে শিশুদের অপুষ্টি দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও ২০০০ সালে এসে তা আর ধরে রাখতে পারেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এ দেশে শিশুদের অপুষ্টি ও কম ওজন সমস্যার হার ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
উল্লিখিত পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য যে একটি বড় ধরনের অভিঘাত এবং কঠিন সমস্যা তা এখন পরিষ্কার। সে জন্য বিষয়টি বিশ্লেষণ করে দেখার পাশাপাশি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের করণীয় সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারকেও এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের বিষয়ে জোর দিতে হবে, যা বাংলাদেশে পুষ্টি-পরিস্থিতির উন্নয়নে নেওয়া সব কর্মসূচি ও নীতিমালা সফলভাবে বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা—ইউনিসেফ, বিল অ্যান্ড মেলিন্দা গেটস ফাউন্ডেশন, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন (জিএআইএন) এবং পেপসিকো, শিশুদের অপুষ্টি সমস্যা সমাধানে উদ্ভাবনী ধারণাগুলোকে সহায়তা করার লক্ষ্যে ডেভেলপমেন্ট মার্কেট প্লেস শীর্ষক একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে।
অপুষ্টির পরিণতি হবে অমোঘ ও ভয়াবহ। যেসব শিশু তার জীবনের প্রথম দুই বছরে পুষ্টিস্বল্পতায় ভোগে, তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করতে পারার সম্ভাবনা অনেক কম। এমনকি অপুষ্টির শিকার শিশুরা জীবনের পরবর্তী সময়েও গড়ে ১০ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কম পরিমাণে আয় করে। অর্থাৎ শিশুদের পুষ্টিহীনতাজনিত আর্থিক মূল্য খুব বেশি হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে দেখা গেছে যে দরিদ্র দেশগুলোর শিশুর অপুষ্টির আর্থিক মানদণ্ডে মূল্য তাদের মোট বার্ষিক দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) তিন শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
তথ্য-উপাত্তগুলোকে বাদ দিয়েও বলা যায় যে দক্ষিণ এশিয়ার শিশুর অপুষ্টির হার সহজ কথায় অগ্রহণযোগ্য। আর এই অপুষ্টি শিশুদের জীবনে সফল হওয়া, সুস্থভাবে জীবনযাপন করা, সৃজনশীল হয়ে ওঠার সুযোগ ও সম্ভাবনাকে ছিনিয়ে নেয়। অথচ সঠিক কর্মপরিকল্পনা ও অঙ্গীকার দ্বারা অপুষ্টি ঠেকানো সম্ভব।
শিশুদের প্রচুর খাবার দিলেই তাদের অপুষ্টি দূর হবে—প্রচলিত এই ধারণা কিন্তু সঠিক নয়। বাস্তবিক পক্ষে, পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া সত্ত্বেও অনেকে শিশুরই সে তুলনায় ওজন যেমন কম এবং শারীরিক বৃদ্ধি অর্থাৎ উচ্চতাও কম। সঠিক খাবার না দেওয়া, পরিচর্যার অভাব, যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা না দেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই এমনটি হয়।
অধিকন্তু, শিশুদের অপুষ্টির সূচক ও মান পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে শহর ও গ্রামের এবং দরিদ্র ও ধনী পরিবারের শিশুদের মধ্যে যথেষ্ট বৈষম্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে গরিব পরিবারের ৫০ শতাংশেরও বেশি শিশু খর্বকায় বা বয়সের তুলনায় খাটো হয়। ধনী পরিবারগুলোতে এই হার ২৬ শতাংশ। গ্রামের শিশুদের ৪৫ শতাংশেরই বয়সের তুলনায় খাটো। শহুরে শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৬ শতাংশ। বিশেষ করে অশিক্ষিত মায়েদের শিশুরাই বেশি খর্বকায় হয় বয়সের তুলনায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুদের ব্যাপকহারে অপুষ্টি কী রোধ করা সম্ভব? প্রথমত, অপুষ্টির সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব শুরু হয় গর্ভবতী হওয়ার ঠিক আগে থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর হওয়া পর্যন্ত। এ সময়টি শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মস্তিষ্কের উন্নয়ন এবং মানবিক বিকাশের সম্ভাবনা যে রুদ্ধ হয়ে যায় তা নিয়ে দ্বিমত নেই। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গর্ভবতী নারীদের প্রতি অধিকতর মনোযোগ দেওয়া দরকার। এই অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ শিশুরই জন্মের সময় ওজন কম হয়। সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশগুলোতে এই হার হচ্ছে মাত্র ১৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় নবজাতকদের ওজন কম হওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, তারা মায়ের গর্ভে থাকাবস্থায়ই অপুষ্টির শিকার হয়, তাদের মায়েরাও নিজেদের শিশুবেলায় অথবা গর্ভধারণের সময়ে অপুষ্টিতে ভুগছিলেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশিসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ওজন কম ও শরীরে আয়রনের ৫৫ থেকে ৮১ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
আগামী ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ‘ডেভেলপমেন্ট মার্কেট প্লেস’ শীর্ষক সম্মেলনে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সুশীল সমাজ ও তৃণমূল পর্যায়ের মোট ৬০টি সংগঠন যোগ দেবে। এতে উল্লিখিত দেশগুলোর সুশীল সমাজ ও তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলো গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের অপুষ্টি দূর করা তথা পুষ্টি বাড়ানোর ব্যাপারে ধারণাগুলো উপস্থাপন করবে।
‘ডেভেলপমেন্ট মার্কেট প্লেসের’ অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের পুষ্টিস্বল্পতা দূর করার ব্যাপারে সৃজনশীল ধারণাগুলো তুলে ধরা। যাতে দেশগুলো তাদের নিজ নিজ জাতীয় পুষ্টিবিষয়ক পরিকল্পনা ও কর্মসূচিগুলোর কৌশল নির্ধারণ করতে পারে। আমরা আশা করি, ডেভেলপমেন্ট মার্কেট প্লেস পুষ্টি বৃদ্ধির ব্যাপারে পরিবারে তথা গোষ্ঠীগত পর্যায়ে নারীদের ক্ষমতায়নের বিষয়ে জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি অপুষ্টি দূরীকরণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও জনমত সৃষ্টির বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এ ছাড়া শিশুদের পুষ্টিস্বল্পতা দূরীকরণে পারিবারিক পর্যায়ের আচরণ বা দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো এবং শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য পুষ্টিমানসমৃদ্ধ সম্পূরক খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দেওয়া হবে।
আমরা আশা করি যে ডেভেলপমেন্ট মার্কেট প্লেসের সুবাদে এই অঞ্চলের উন্নয়ন-আলোচনায় নারী ও শিশুদের পুষ্টি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। যা-ই হোক, এ অঞ্চলের দেশগুলোতে জনগণের শক্ত-সামর্থ্য স্বাস্থ্য গঠনে মনোযোগ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ কাজটি সূচারুভাবে সম্পন্ন করা গেলে একদিকে জাতিগুলো শিক্ষিত হয়ে উঠবে অন্যদিকে তারা বর্তমান সময়ের দ্রুত বিশ্বায়িত বিশ্বে কর্মসংস্থানের অবারিত সুযোগ লুফে নিতে পারবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আমরা দেখেছি, যেসব দেশ তাদের শিশুদের পুষ্টি বাড়ানোর বিষয়ে বেশি পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করেছে, তারা তত সুফল পেয়েছে। পুষ্টিমান ভালো হলে তা কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহজ হয়। কারণ যেসব শিশু অধিকতর পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার পায়, তারা কম অসুস্থ হয়, বেশি করে স্কুলে যেতে পারে ও স্কুল থেকে ছিটকেও পড়ে কম এবং বেশি জ্ঞানার্জনের সুযোগ পায়। বদৌলতে নিজেদের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে তারা।
বর্তমান সংকটের সময়ে পুষ্ট শিশু মানেই হলো একটি দেশের দক্ষ মানবসম্পদের প্রতিচ্ছবি বা মানবপুঁজি। কোনো দেশকে ভবিষ্যৎ অভিঘাত থেকে রক্ষায় বা মোকাবিলায় উের যেতে হলে শিশুদের জন্য পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। কাজটি করার এখনই উপযুক্ত সময়। বিশ্বব্যাংকও এ ব্যাপারে দেশগুলোকে তাদের মানবসম্পদ বা মানবপুঁজি গঠনের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
মিখাল রুেকাভস্কি, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ায় মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক পরিচালক।

কথা নয়, সরকারের কাজ দেখতে চায় সবাই -বাজার অস্থির হয়ে পড়ছে

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। এ যেন রমজান মাস আসার আগে বাজারে আগুন লাগার পূর্বলক্ষণ। কোন কারণে হঠাৎ কাঁচামরিচের দর একলাফে কেজিপ্রতি ২০০ টাকা উঠেছিল আর কেনই বা ৩২ টাকার রসুন লাফিয়ে ৭০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, এর কোনো সদুত্তর নেই। বাড়ছে ডাল, ছোলা ও ভোজ্যতেলের দাম। সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। আর খুচরা বাজারে এ অস্থিরতা মানুষকে এরই মধ্যে শঙ্কিত করে তুলেছে। তারা ভাবতে শুরু করেছে যে সরকার বাজার স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে ততটা সচেষ্ট নয়। বিশেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রী দফায় দফায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করার পরও বাজারের অস্থিরতা চলতে থাকায় এ রকম ভাবাটা অমূলক নয়।
রমজান মাস সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বিভিন্ন পণ্য আমদানি ও বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তা বাজারের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। আর সরকারি প্রক্রিয়াগত জটিলতায় পণ্য আমদানি ও বিতরণের কাজটি প্রলম্বিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে টিসিবির উদ্যোগ বাজারে কতটুকু ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। তা ছাড়া বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি ও বিতরণের প্রায় পুরোটাই ব্যক্তি খাতনির্ভর। সুতরাং ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পাওয়া না গেলে বাজারের অস্থিরতা কমানো খুব কঠিন।
বাজারে জোগান-শৃঙ্খল ঠিক রাখার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো দূর করার জন্য বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে। এটা দু-চার দিনের কাজ নয়; বরং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার মতো বিষয়গুলো সমাধান করতে হলে কঠোর আইনি প্রয়োগ প্রয়োজন। আর এটা সরকারকেই করতে হবে। একইভাবে অভ্যন্তরীণ উত্পাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে দীর্ঘমেয়াদি কৃষিনীতির প্রয়োজন। মাত্রাতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা সংকটকালে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অথচ সরকার নিজের অপ্রতুল প্রস্তুতির দিকে নজর না দিয়ে অনেক বেশি কথা বলছে। জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে এই বলে যে রমজান মাসে দাম সহনীয় থাকবে, যথেষ্ট সরবরাহ আছে প্রভৃতি। তবে এ আশ্বাস তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা বাস্তবে দেখা যাবে। একইভাবে অযৌক্তিক দাম বাড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ারও কোনো মানে নেই। মানুষজন আর কথা শুনতে চায় না; কাজ দেখতে চায়।

ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষায় এ আইন সংশোধন করতে হবে -সংরক্ষণের নামে অধিকার হরণ

অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল শিশুখাদ্য বা নকল ওষুধ বিক্রি করবেন, তা খেয়ে মারা যাবে কোলের শিশু, মা-বাবা বুকফাটা আর্তনাদ করবেন; কিন্তু কোনো প্রতিকার চাইতে পারবেন না, আদালতে মামলা করতে পারবেন না। কার্যত এমনই বিধান রাখা হয়েছে সম্প্রতি প্রণীত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণের নামে এ আইনে আসলে ভোক্তার অধিকার হরণ করা হয়েছে।
সোমবারের প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু শিশুখাদ্য বা খাদ্যপণ্য নয়, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাবে না। কোনো বিক্রেতা পণ্যের উত্পাদনপ্রক্রিয়ায় জড়িত না থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। সরাসরি কারও বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন না ভোক্তা; ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে হবে। কিন্তু অভিযোগ দায়েরের ৯০ দিনের মধ্যে যদি অভিযোগপত্র দাখিল করা না হয়, তাহলে সে মামলা আদালতে আমলযোগ্য হবে না। ফলে বহুলপ্রতীক্ষিত আইনটি প্রণয়নের দুই মাসের মধ্যেই এটি সংশোধনের জোর দাবি উঠেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের নামে অধিকার হরণের এ প্রহসন কেন? এ আইনে যেভাবে ভোক্তাদের অধিকার কেড়ে নিয়ে অসত্ উত্পাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে, তাতে ব্যবসায়িক অসততা ও ভেজালকেই উত্সাহিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল এ আইন না করাই বরং ভালো ছিল। তাহলে সরকারের পবিত্র দায়িত্ব কোনটি? ভোক্তাদের অধিকার দেখা, নাকি অসত্ ব্যবসায়ীদের রক্ষা করা? আইনের ৭২ ধারায় ওষুধবিষয়ক বিশেষ বিধান-(১) শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘ঔষধে ভেজাল মিশ্রণ বা নকল ঔষধ প্রস্তুত করা হইতেছে কি না, অনুসন্ধান করিয়া উহা উদ্ঘাটন করিবার ক্ষমতা ও দায়িত্ব মহাপরিচালকের থাকিলেও উহাদের বিষয়ে এই আইনের অধীন কোনো বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণ বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করা যাইবে না।’ অবাক ব্যাপার, কোনো রাষ্ট্র কীভাবে পারে তার নাগরিকের ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকার এভাবে কেড়ে নিতে? সম্প্রতি রিড ফার্মার প্যারাসিটামল সিরাপে বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে। সেই সিরাপ খেয়ে ২৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কিডনি নষ্ট হয়ে অনেক শিশুর জীবন এখনো সংকটাপন্ন। এসব শিশুর মা-বাবারা কি তাঁদের শিশুহত্যার বিচার দাবি করতে পারবেন না? কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন না?
ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা জাতির সঙ্গে প্রতারণারই নামান্তর। তাই আইনটি অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে; তা না হলে জাতির সঙ্গে প্রতারণার ভয়াবহ পরিণতি দেখার জন্য সবাইকে প্রস্তুত হতে হবে।

অভিমত ভিন্নমত

গৌরবের পথে বাংলাদেশের ক্রিকেট
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিজয় সত্যিই রূপকথার মতো। আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসে এর আগে কখনোই রচিত হয়নি এমন গৌরবময় উপাখ্যান। ২-০ তে টেস্ট সিরিজ এবং ৩-০ তে ওয়ান ডে সিরিজ জয়। বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো সাফল্যের গৌরব।
১৯৯৭ সালে বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে কেনিয়ার বিপক্ষে জয়লাভের পর সারা দেশের মানুষ আনন্দের জোয়ারে ভেসেছিল। সেদিন সমগ্র জাতি এক হয়ে রাস্তায় নেমেছিল বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করতে। সর্বস্তরের মানুষ সেদিন নেচে-গেয়ে আর রং মেখে প্রকাশ করেছিল উচ্ছ্বাস। টাইগাররা বিশ্বকাপের প্রথম আসরে খেলতে নেমেই শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে নিজেদের আগমনি বার্তা জানান দিয়েছিল। কিন্তু এই জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে সাফল্য এসেছে ধীরে ধীরে। জয় এসেছে কালেভদ্রে। কিন্তু ধারাবাহিক সাফল্য দেখা দিল এই প্রথমবারের মতো। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর মাধ্যমে একদিনের ক্রিকেটে ইংল্যান্ড ছাড়া সব দলকেই হারাতে সক্ষম হলো বাংলাদেশ।
একমাত্র টি টোয়েন্টি ছাড়া সব ম্যাচ জিতেছে ধারাবাহিকভাবে, অর্জন করেছে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজ জয়ের দুর্লভ সম্মান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইট ওয়াশ করে নতুন এক ইতিহাস গড়েছে টাইগাররা। দলের এই সাফল্য নতুন করে উদ্দীপ্ত করেছে জাতিকে। এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কি হতে পারে!
বাংলাদেশ দল নিয়ে সমর্থকদের আশাভঙ্গের বেদনা দীর্ঘদিনের। শুধু জয় নয়, ভালো খেলার ক্ষেত্রেও দলের ঘাটতি লক্ষ করা যেত। অতীতের বিভিন্ন ম্যাচ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাজে বল খেলে আউট হওয়া, প্রতিপক্ষকে অকারণে উইকেট বিলিয়ে দেওয়া, বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা টাইগারদের নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দলের এই বেহাল দশাকে অনেকেই রসিকতা করে বলতেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ইনস্ট্যান্ট নুডলস্ তৈরির কারখানা, ‘যাওয়া-আসা মাত্র দুই মিনিট’। সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে এমন একটা বিজয়গাথা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছিল।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পুরো সময়টাতেই টাইগারদের মধ্যে ছিল প্রবল আত্মবিশ্বাস। প্রতিটা ম্যাচেই ছিল তাঁদের লড়াকু মনোভাবের পরিচয়। বোলিং বা ব্যাটিং, কোনোটাতেই সুবিধা করতে দেননি ওয়েন্ট ইন্ডিজ দলকে। ধারাবাহিক সাফল্যের এই জয়যাত্রা দেশের মানুষকে যেমন আনন্দ দিয়েছে, তেমনি প্রত্যাশাও বাড়িয়েছে অনেক। নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করতে শুরু করেছে ক্রিকেটপ্রেমী সমর্থকেরা। তবে রাতারাতি খুব বড় কোনো পরিবর্তন আশা করা ঠিক হবে না। দলের এই বিজয় ইতিবাচক একটা পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে, যা আমাদের ক্রিকেটের অস্তিত্বের স্বার্থেই খুব প্রয়োজন ছিল।
ওয়ানডে ক্রিকেটে এখন ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং তিনটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনটির যেকোনো একটির দুর্বলতা দলের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এই সফরের বেশির ভাগ ম্যাচেই টপ অর্ডার ব্যাটস্ম্যানরা ভালো করতে পারেননি। কিন্তু বোলাররা অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন সঠিকভাবে। ধারাবাহিক সাফল্য পেতে বোলারদের পাশাপাশি ব্যাটসম্যানদেরও ভালো পারফরম্যানস করতে হবে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের কাছে শোচনীয় পরাজয়ে দারুণভাবে হতাশ হয়েছিল দেশবাসী। তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠেছিল ক্রিকেট আঙিনায়। মোহাম্মদ আশরাফুল অধিনায়কত্ব হারান।
বেশ কিছু দিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশ্ন উঠেছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের মান নিয়ে। বলতে দ্বিধা নেই, অনেকটা হুমকির মুখে পড়েছিল টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। এবার তার উচিৎ জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এখন প্রয়োজন সাফল্যকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। একটি বিজয়ের আনন্দে গা না ভাসিয়ে ভবিষ্যতে কীভাবে আরও ভালো করা যায়, সেদিকে মনোনিবেশ করা দরকার। বিগত দিনের ভুলগুলো সংশোধন করে প্রতিটা ম্যাচে নিজের সেরা খেলাটা উপহার দিতে হবে খেলোয়াড়দের। আর সেই দৃঢ় প্রত্যয়ের হাত ধরেই আসবে ধারাবাহিক বিজয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে প্রত্যেক ক্রিকেটার উজাড় করে দিয়েছেন নিজেকে। তবে বিশেষ করে বলতে হয় অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের কথা। শেষ ওয়ানডে ম্যাচটি ছাড়া পুরো সফরে অলরাউন্ড নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন বিশ্বের এক নম্বর অল রাউন্ডার। পুরো সফরেই তিনি ছিলেন নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে। মাশরাফির অসুস্থতায় পাওয়া অধিনায়কত্বের চাপ তাঁকে ভারাক্রান্ত করতে পারেনি, বরং এনে দিয়েছে অনেক ভারত্ব। দলকে প্রতিটি ম্যাচেই নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। দীর্ঘ রান-খরা কাটিয়ে আশরাফুলের রানে ফেরা ছিল এই সিরিজ থেকে আমাদের বড় পাওয়া। তামিম ইকবাল টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন। তার পরও ব্যাটিংয়ে ঘাটতি রয়েই গেছে।
‘নিষিদ্ধ’ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল) ফেরত ক্রিকেটারদের বিসিবি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। তাহলে এখন তো তাদের জাতীয় দলে খেলতে আর কোনো বাধা নেই। ব্যাটিং সাইডকে শক্তিশালী করতে হলে হাবিবুল বাশার, শাহরিয়ার নাফীস, আফতাব বা অলক কাপালির মতো পরীক্ষিত খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে একাধিক খেলোয়াড়কে অতিসত্বর দলে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নির্বাচকেরা ভাববেন বলেই আশা করি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকে দলে যে গতি এসেছে, তা ধরে রাখতে না পারলে আবারও হোঁচট খেতে পারে আমাদের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। তাই সাফল্যের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে নতুন প্রতিভাবান ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সংমিশ্রণ খুবই জরুরি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর শেষ করেই ৫ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে জিম্বাবুয়ে যাচ্ছেন টাইগাররা। আমরা আশা করি, সেখান থেকেও তাঁরা সিরিজ জয় করে দেশে ফিরবেন। দলের বিজয় যেমন জাতিকে আনন্দ দেয়, ঠিক তেমনি দায়িত্ববোধও বাড়িয়ে দেয় খেলোয়াড়দের। দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আশরাফুল তো বলেই বসলেন, ‘জয় একটা অভ্যাসের ব্যাপার।’ সত্যিই তাই। আমরাও বিশ্বাস করতে চাই, আমরা যেন প্রায়ই জয়ের দেখা পাই। জয় যেন সত্যি সত্যিই অভ্যাসে পরিণত হয়।
সফলতা ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু খেলোয়াড়দের একার নয়। ভালো ফল পেতে ভালো খেলোয়াড়ের পাশাপাশি প্রয়োজন সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেরও (বিসিবি) একটা বড় দায়িত্ব রয়েছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভার অনুসন্ধান করতে বিসিবিকে আরও মনোযোগী হতে হবে। বিশ্বমানের ক্রিকেটার তৈরি করতে হলে পেশাদারি ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দিতে হবে দেশের ছোট্ট শহরগুলোয়ও।
তারেক মাহমুদ, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
tareq.mahamud@gmail.com
মাতৃত্বকালীন ছুটি
আগস্টের ১ তারিখ থেকে মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উদ্যাপিত হচ্ছে। এ সংক্রান্ত একটি জাতীয় অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাসের স্থলে ছয় মাস করার পরিকল্পনা আছে। শুনে ভালো লেগেছে। এ জন্য সরকারকে অভিনন্দন। কিন্তু ওই ঘোষণায় বলা হয়েছে, এর মধ্যে চার মাস সবেতন ও দুই মাস বিনা বেতনে ছুটির কথা।
আমাদের আবেদন, সবেতন ছুটি অন্তত পাঁচ মাস করা হোক। বাকি এক মাস বিনা বেতনে করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে নবজাতকের বাবা যদি সরকারি চাকরিজীবী হন, তাহলে তাঁকে অন্তত দুই সপ্তাহের পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করা হোক। কারণ, অনেক স্বামী-স্ত্রী আছেন, যাঁরা এককভাবে শহরে বসবাস করেন। অথচ শহরে তেমন আত্মীয়স্বজন নেই। এ ক্ষেত্রে স্বামীকেই স্ত্রী ও সন্তানের সেবাযত্নসহ আনুষঙ্গিক সব কাজ করতে হয়। স্বামী চাকরিজীবী হলে তাঁর জন্য একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। সামপ্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, কর্মজীবী নারীদের অধিকাংশেরই নবজাতক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্মলাভ করছে, যা ব্যয়বহুল। এ ক্ষেত্রে সীমিত আয়ের মানুষ হিসেবে ছয় মাসই সবেতন ছুটি হওয়া তাঁদের জন্য স্বস্তিদায়ক।
অন্যদিকে একজন মা সীমাহীন কষ্টের পর সন্তান জন্ম দিয়ে জাতিকে ভবিষ্যৎ নাগরিক উপহার দিচ্ছেন। সেই সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তার মৌলিক চাহিদা পূরণ করা অত্যাবশ্যক। এ ক্ষেত্রে শিশুর প্রথম ও প্রধান মৌলিক চাহিদা হচ্ছে মায়ের দুধ পান করার অধিকার। আমরা জানি, মায়ের সঙ্গে শিশুর রয়েছে গভীর সম্পর্ক, শিশুর সুস্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, সর্বোপরি শিশু মেধাবী হওয়ার জন্য মায়ের দুধ পান করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু মা কর্মজীবী হলে শিশু এই অধিকার থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়। শিশুর এই অধিকার রক্ষায় কর্মজীবী মায়েদের বিষয়টি তাই সরকারকেই ভাবতে হবে।
তাসনীম চৌধুরী
কাগাবলা, মৌলভীবাজার।
ভিক্টোরিয়া কলেজের ফলবিপর্যয় কেন
এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ফল ভালো হয়নি। কলেজটিতে পাসের হারের সঙ্গে সঙ্গে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও কমেছে। এমনকি পাসের হারের দিক থেকে কলেজের অবস্থান কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে ৫১তম। খবরটি চাউর হওয়ার পর কুমিল্লাজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ কলেজে শত শত জিপিএ-৫ (এসএসসিতে) পাওয়া শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়, কিন্তু ওরা বছর ঘুরেই হারিয়ে যায়। ওদের ফলাফলে ছন্দপতন ঘটে কেন? সবার একটাই প্রশ্ন, কী করে এ কলেজের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়া যাবে?
গত কয়েক বছরের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসএসসিতে ভালো ফল করে এখানে ভর্তি হওয়ার পর বেশির ভাগ শিক্ষার্থী আগের ফল ধরে রাখতে পারে না। ২০০৭-২০০৮ শিক্ষাবর্ষে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৫৬৩ জন এ কলেজে ভর্তি হয়ে এবার এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১৫৮ জন। ২০০৬-২০০৭ শিক্ষাবর্ষে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে ৬৭৭ জন ভর্তি হয়। এর মধ্যে ২৪০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। কত কয়েক বছর ধরেই উচ্চ মাধ্যমিকে ফলাফল খারাপ হচ্ছে। এর কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে জিপিএ-৫ পাওয়ার হিসাবটা কোনো অবস্থাতেই মেনে নিচ্ছে না শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহল। তারা বলেছে, গৃহশিক্ষামুখী প্রবণতা, কোচিং-নির্ভরতা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ক্লাসের প্রতি অনীহা, ভর্তিবাণিজ্য, প্রয়োজনীয়-সংখ্যক ক্লাসে উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক চাপে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া, নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণদের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া, কলেজ চলাকালে প্রাইভেট পড়ানো, ছাত্র সংগঠনগুলোর অপতৎপরতা, বখাটেপনা, মাদকসেবীদের আড্ডা, অভিভাবকদের অসচেনতা ও শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলার প্রতি ঢিমেতাল ভাবের কারণে উচ্চমাধ্যমিকে ওই ফল বিপর্যয় হয়েছে।
মনে পড়ে, ‘আমরা যখন এ কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন ক্লাসমুখী প্রবণতা ছিল। উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টিও ছিল চোখে পড়ার মতো। একই সঙ্গে সহশিক্ষা কার্যক্রমও ছিল। এখন দল বেঁধে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট আর কোচিং করতে যায়। শ্রেণীকক্ষগুলো আক্ষরিক অর্থে ফাঁকা থাকে। প্রাণহীন থাকে শ্রেণীকক্ষ।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উচ্চমাধ্যমিক শাখায় শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে বেশ কিছু বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। এগুলো হলো, অভিভাবকদের তাঁদের সন্তান কলেজে যাচ্ছে কি না তা তদারক করতে হবে; শিক্ষকদের নিয়মিত ক্লাস নিতে হবে; সাপ্তাহিক, মাসিক পরীক্ষা ও মডেল টেস্ট নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পর্যাপ্তসংখ্যক ক্লাসে উপস্থিতি ছাড়া চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যাবে না; উচ্চমাধ্যমিক শাখাকে ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ঘোষণা করে তা যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে; কলেজ কর্তৃপক্ষকে মনিটরিং সেল তৈরি করে পাঠদানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে; ভর্তিবাণিজ্য ঠেকানো ও শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি যাতায়াত-সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী (বদলি হয়ে আসা) ভর্তি নেওয়া চলবে না। সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ তৈরি করে পাঠদান উজ্জীবিত করতে হবে। সর্বোপরি অধ্যক্ষের নেতৃত্বে শিক্ষকদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তাই আসুন, সবাই মিলে কলেজটিকে বাঁচাই। কুমিল্লা অঞ্চলের সর্ববৃহৎ এ প্রতিষ্ঠান বাঁচলে মেধাবীরা ভালো করে উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে স্থান করে নিতে পারবে।
গাজীউল হক, সাংবাদিক ও সাবেক শিক্ষার্থী,
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ।
gajiulhoqsohag@gmail.com
আলোকিত মানুষের সন্ধান
প্রথম আলোর ১০ জুলাই সংখ্যায় প্রয়াত দেশপ্রেমী শামসুদ্দীন মোল্লার ওপর তমাল তাহসীনের লেখাটির জন্য তাঁকে ধন্যবাদ।
অনেক দেরিতে হলেও আমরা, তাঁর সন্তানেরা, শামসুদ্দীন মোল্লা স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করতে চলেছি। কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। যাঁরা বাবার সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো বলতে পারতেন, তাঁরা অনেক আগেই দেশের শত্রুদের হাতে নিহত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেই, নেই তাজউদ্দীন আহমদসহ জাতীয় চার নেতা, যাঁদের কাতারে থেকে তিনি আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। তবুও গেল দুটো বছর আমরা, বিশেষভাবে আমাদের অগ্রজ শাহরিয়ার রুমী অক্লান্ত পরিশ্রম করে সাক্ষাত্কারগুলো নিয়েছেন। শুধু বাবার রাজনৈতিক, সামাজিক সহকর্মী নন, গাজীউল হকের কথার মতো তাঁকে যাঁরা চিনতেন, সেই ছোটবেলা থেকে, সেই সব মানুষকেও আমরা শামিল করেছি এই স্মৃতিগ্রন্থে। আমরা ছয় ভাই, ছয় বোন যার যার পেশাগত দায়িত্ব পালন করার পরও বাবার আদর্শের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি। স্মারক গ্রন্থটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আমরা পরিবার থেকে একটি সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারব বলেই বিশ্বাস করি।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি অনেক ছোট, তবু স্মৃতিতে অম্লান কিছু তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি স্মারক গ্রন্থে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর যে নির্যাতন নেমে আসে আমাদের পরিবারের ওপর, সেটা একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংবিধান রচয়িতাদের অন্যতম, গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ কর্মীর পরিবার স্বাধীন দেশে প্রত্যাশা করে না। দীর্ঘ ছয় মাস আমাদের ফরিদপুরের বাড়ি ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল। এর পর তিন বছর আমরা ঢাকায় শাহজাহানপুরের একটি বাসায় আত্মগোপন করেছিলাম। বাবা বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়েছেন, আমার বড় ভাই শাহরিয়ার রুমীও তাঁর সঙ্গে। আমার মেজ ভাই জাকারিয়া জামী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র। আট ভাইবোন নিয়ে আমার মায়ের সেই দুর্বিষহ জীবন, আমাদের সেই আতঙ্ক আর উদ্বেগ, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের এই রূপকারকে নিজের দেশে নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কারণ তিনি রাজপথে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার হত্যার বিচার চেয়েছিলেন। ইতিহাসের প্রয়োজনেই শামসুদ্দীন মোল্লাকে জাতি মনে রাখবে। তাঁকে কোনো দিন ভোলা সম্ভব নয়।
ধন্যবাদ প্রথম আলোকে; তাদের আলোকিত মানুষের সন্ধান অব্যাহত থাক। স্মারক গ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের হাতে আমরা গর্ব করে তুলে দিতে চাই একজন আদর্শ ব্যক্তির প্রতিকৃতি।
কামরুজ্জামান কাফী, ঢাকা।
ঢাকার ট্রাইবাল হোস্টেলটির সংস্কার প্রয়োজন
ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত পাহাড়ি ছাত্রদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া একমাত্র হোস্টেলটির সংস্কার করা অতীব জরুরি। সুদূর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের ঢাকায় এসে খুব আবাসন সমস্যায় পড়তে হয়। এই আবাসন সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৮৩ সালে তৎকালীন সরকার ঢাকার মোহাম্মদপুরে ’ক’ তালিকাভুক্ত একটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের ছাত্রাবাস হিসেবে বরাদ্দ দেয়। পার্বত্য এলাকার অনেক কৃতী শিক্ষার্থী এই ছা্ত্রাবাসে অবস্থান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছেন। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত আদিবাসী ব্যক্তি এই ছাত্রাবাসে বসবাস করে লেখাপড়া করেছেন, যাঁর মধ্যে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা তাঁদের সমমর্যাদার অনেকে ছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায়, পাহাড়িদের শিক্ষা বিস্তারে এই ছাত্রাবাসের গুরুত্ব কতটা।
কিন্তু আজ বড়ই দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এই হোস্টেলটি বর্তমানে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। আমরা চাই না, এই হোস্টেলটির পরিণতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মতো হোক। উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর জগন্নাথ হলের ছাদ ধসে প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যু হয়।
১৯৮৩ সালে ছাত্রাবাসের বাড়িটি বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এটির কোনো প্রকার সংস্কার হয়নি। বর্তমানে হোস্টেলটির পয়োনিষ্কাশন ও পানি সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। দরজা-জানালা খুলে খুলে পড়ছে, দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে। বর্ষাকালে ছাদের বিভিন্ন স্থান দিয়ে পানি পড়ে। এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রামের দায়িত্বশীল সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে লিখিতভাবে অনেক আবেদন করা সত্ত্বেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। হোস্টেলটি সংস্কার করা তাদের আওতাভুক্ত নয় বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিনীত অনুরোধ, অবিলম্বে ট্রাইবাল হোস্টেলটির সংস্কার করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
মেরিন চাক্মা, অনন্ত বিকাশ ধামাই, ছোটন তঞ্চঙ্গ্যা, ক্যশৈনু মার্মা, জেমসন আমলাই বম
আবাসিক শিক্ষার্থী,
ট্রাইবাল হোস্টেল, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
প্রসঙ্গ জ্বালানি নিরাপত্তা
১৪ জুলাই প্রথম আলোতে অধ্যাপক আবু আহমেদের ‘জ্বালানি নিরাপত্তা: সরকারি উদ্যোগে এত দিনে কয়লা উঠে যেত’ শীর্ষক লেখাটি পড়লাম। এতে তিনি বিদেশি কোম্পানি ও বেসরকারি খাতের বদলে সরকারি সংস্থা ও সরকারি মালিকানার বিষয়টি উচ্চকিত করে তুলেছেন। এটি তাঁর দ্বৈতনীতি বলে মনে হয়।
নিবন্ধের বেশির ভাগ জায়গাজুড়ে আবু আহমেদ বিদেশি জ্বালানি কোম্পানির সঙ্গে দেশি সংস্থা-কোম্পানির চুলচেরা তুলনা করেছেন। ‘বাপেক্সের গ্যাস কেনা হয় প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা, যেখানে বিদেশি কোম্পানিগুলো থেকে সেই একই গ্যাস কেনা হয় ২৫০ টাকা করে। বাপেক্স ট্যাক্স দেয়, বিদেশি কোম্পানিগুলো ট্যাক্স দেয় না। বাপেক্স পেমেন্ট পায় দেশীয় টাকায়, বিদেশি কোম্পানিগুলো পেমেন্ট পায় ডলার-ইউরোতে।’ এভাবে তিনি বিদেশি কোম্পানিকে দেশের জন্য ক্ষতিকর ও দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন।
বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের বিনিয়োগনীতির আওতায় ট্যাক্স হলিডেসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিদেশি কোম্পানিকে বিনিয়োগের জন্য স্বাগত জানানো হয়েছে। খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের মতো বিনিয়োগঘন বাণিজ্যে রয়েছে বিশ্ব স্বীকৃত উত্পাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি)। ওই চুক্তির অনুকরণে এ দেশে সম্পাদিত মডেল পিএসসি আশির দশক থেকে চলে আসছে। এর মোদ্দা কথা, বিদেশি কোম্পানি নিজ খরচে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলন করবে। আবিষ্কৃত সম্পদের একটি হিস্যা থেকে তারা খরচ উসুল (কস্ট রিকভারি) করবে। বাকি উত্পাদন থেকেও ছোট্ট অংশ একটি পাবে।
সমস্যা হচ্ছে, বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ ভূগর্ভস্থ অনাবিষ্কৃত খনিজ মজুদকেও সম্পদ হিসেবে ধরে নেন। ফলে পিএসসির কস্ট রিকভারির গ্যাস আন্তর্জাতিক দামে কেনাকেও মনে হয় আমাদের গ্যাসই বিদেশিদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনছি। আমাদের যদি অর্থ ও প্রযুক্তি সক্ষমতা থাকত, তাতেও তো আবিষ্কৃত সম্পদ থেকে অনুসন্ধান-উন্নয়ন খরচ বাদ দিতে হতো। উন্নত, অনুন্নত বহু দেশ জাতীয় খরচে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের ঝুঁকি নিতে পারে না বলে বিশেষায়িত কোম্পানির ওপর নির্ভর করে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ বহু সংগতিসম্পন্ন দেশও দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভর করে তাদের খনিজ সম্পদ তুলছে। আমাদের দেশের বিনিয়োগনীতিতে দেশি-বিদেশি সব বিনিয়োগের সমানাধিকার নিশ্চিত করার পর ‘বিদেশি খেদাও’ মনোভাব প্রকাশ কতটা যৌক্তিক?
আলোচ্য লেখাটির উপসংহারে আকস্মিকভাবে দেশের কয়লাসম্পদকে জোর করে টেনে আনা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে কয়লা তোলার মধ্যে ‘ষড়যন্ত্র’র গন্ধ খুঁজে বলা হয়েছে, ‘সরকারি উদ্যোগে কয়লা তোলার সিদ্ধান্ত হলে ফুলবাড়ীর কয়লা এত দিনে উঠে যেত। উত্তোলনপদ্ধতি নিয়েও এত বিতর্ক হতো না।’
সরকারি উদ্যোগে কয়লা তোলার সিদ্ধান্ত হলে বিতর্ক হতো না—এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে? তাহলে উত্তোলনপদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক কি নিছক বিদেশি কোম্পানির জন্য? আর ফুলবাড়ীর কয়লা সরকারি মালিকানায় উঠলেই বা কী হতো? আমরা জানি, সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলা বড়পুকুরিয়া থেকে কয়লা তুলছে। কিন্তু পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, ‘বড়পুকুরিয়ায় দুই লাখ ৩২ হাজার টন কয়লা খনিতে অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে।’ এই কয়লা তুলতে ভূমিধ্বস ও পরিবেশের সমস্যা নিয়েও এলাকায় অস্থিরতার কমতি নেই।
প্রথম আলোতে ১৯ জুলাই প্রকাশিত ‘জ্বালানি: আমদানি বনাম অবিক্রীত দেশি কয়লা’ শীর্ষক লেখায় ড. মুশফিকুর রহমান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, মেঘালয়ের কয়লা দেশে উত্পাদিত কয়লার চেয়ে দামে সস্তা। বড়পুকুরিয়ার কয়লার মূল্য যেখানে ৯৭ মার্কিন ডলার, সেখানে মেঘালয়ের কয়লা আমদানি করা হচ্ছে টনপ্রতি তিন থেকে চার হাজার টাকায়। ‘নিম্নমানের আমদানি করা কয়লা পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে কি না তা উচ্চমূল্যের দেশি কয়লার কাছে গৌণ হয়ে যাচ্ছে। সরকার, আমদানিকারক ও ক্রেতা সম্মিলিতভাবেই সস্তা কয়লা চাইছে। ...সরকারি মালিকানায় বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা অবিক্রীত থাকা সত্ত্বেও নিম্নমানের কয়লা আমদানির ফলে খনির অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ বা সরকারি মালিকানার খনি প্রসঙ্গটি ভোক্তার জন্য সামান্যই অর্থ বহন করে, যদি উত্পাদিত কয়লা বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।’ এখানে বাজারকেই মুখ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশি মালিকানা ও দেশি কোম্পানির টিকে থাকাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশি কোম্পানি ও মালিকানার প্রশ্নে যারা উচ্চকিত, তাদের এই বাজার বাস্তবতা স্বীকার না করে উপায় নেই।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বরাবর বেসরকারি খাতে ব্যবসা পরিচালনার ওপর জোর দিয়ে আসছেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর এই বিপরীত অবস্থান কেন?
চম্পক চৌধুরী, ঢাকা।
champaok_chowdhury@yahoo.com
তিনটি ছবি: অতঃপর...
ছবি তিনটি দুর্লভ কোনো ছবি নয়। এক মুক্তিযোদ্ধা অভাবের তাড়নায় তাঁর বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ হওয়ার পদক বিক্রি করতে চান। বুকের কাছে সেই পদকের স্মারক তুলে ধরা ছবি। অন্যটি তাঁতীবাজারের একটি বিদ্যালয়কক্ষের ছাদের একাংশ খসে পড়া অবস্থায় শিক্ষার্থীদের ছবি। তৃতীয় ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সপরিবারে প্রধানমন্ত্রীর হাস্যোজ্জ্বল ছবি। ছবির নিচে শিরোনামে লেখা, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তার বিধান। ছবিগুলো সংগ্রহ করতে বেগ পেতে হয়নি সাংবাদিকদের। কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে ছাপা হয়েছে বলেও মনে হয় না। ছবিগুলো ছাপা হয়েছে গত ৭ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে।
তিনটি ছবি একই পাতায় ছাপা হওয়ায় চোখের জলের আর হতাশার পাশাপাশি প্রাপ্তির হাসি বড্ড চোখে লাগছিল। আমরা যদি বাংলাদেশকে একটি পরিবার ভাবি, তবে বিপুল ভোটে বিজয়ী শেখ হাসিনাই সেই পরিবারের অভিভাবক। ১৫ কোটি সন্তান তাকিয়ে থাকে তাঁর দিকে। আর যদি সেই সন্তান হয় সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা, যাঁদের বদৌলতে এ দেশে স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র এসেছে; তাঁদের আদর মা তথা অভিভাবকের কাছে তো একটু বেশিই হওয়ার কথা। কিন্তু একি! মায়ের সন্তানেরা কি ভালো আছে? মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাক আহমেদ অভাবের তাড়নায় বিক্রি করতে চান তাঁর অর্জিত বর্ষসেরা অ্যাথলেট হওয়ার পদক। আর অন্য ছবিটিতে জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের মাথায় ভেঙে পড়েছে অর্ধশত বছরের পুরোনো বিদ্যালয়ের ছাদ। তাতে আহত হয়েছে সাত শিশু।
ছবি তিনটি যেন বাংলাদেশের প্রতীকী চিত্র।
শাহানা আক্তার, মহাখালী, ঢাকা।