Sunday, March 9, 2014

মমতার ঘরে আগুন

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে তৃণমূল কংগ্রেস মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছে। আর একে কেন্দ্র করে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও। আর বিহারে পরিবারতন্ত্র ধরে রাখতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) নেতা লালুপ্রসাদ যাদব। তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতা ঘোষণা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তফসিল ঘোষণার পরই গত বুধবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলটির প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন অনেক তারকা। মমতার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি রয়েছেন গায়ক ও খেলোয়াড়। অন্তত ১০ জন নামীদামি তারকাকে এবার মনোনয়ন দিয়েছে তৃণমূল। যাঁরা এত দিন দলকে তৈরি করেছেন, দলের রাজনীতির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেসব পোড় খাওয়া নেতা হয়েছেন বঞ্চিত। এ নিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তৃণমূলে ৪২ প্রার্থীর মধ্যে ১১ জন মহিলা ও সাতজন মুসলিম প্রার্থী রয়েছেন। তৃণমূলে এবার অনেক তারকাকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিষয়টি বহু এলাকায় ভালো চোখে দেখছেন না তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।
বিভিন্ন এলাকায় বাইরের ও অচেনা প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষোভ বেড়েছে দলে। তবে মমতার রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় কেউ এ নিয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। দার্জিলিংয়ে ফুটবলার ভাইচুং ভুটিয়াকে মনোনয়ন দেওয়ায় পাহাড়বাসী খুশি হতে পারেনি। তারা কোনো ভূমিপুত্রকে এই আসনে প্রার্থী হিসেবে চেয়েছিল। ভাইচুং সিকিমের বাসিন্দা। পাহাড়ে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে আন্দোলনরত গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাকে না জানিয়ে তৃণমূল প্রার্থী ঘোষণা করায় তারাও ক্ষুব্ধ। ২০০৯ সালের সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থনে এই আসনে জিতেছিল বিজেপি প্রার্থী যশোবন্ত সিনহা। এবার নতুন করে টালিউড তারকা দেব, সন্ধ্যা রায়, ভূমি ব্যান্ডের সৌমিত্র রায়, নাট্যকর্মী অর্পিতা ঘোষ, অভিনেত্রী মুনমুন সেন, সংগীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেনসহ কংগ্রেস ও বাম দল থেকে তৃণমূলে আসা বিধায়কদের বিভিন্ন আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পশ্চিম মেদিনীপুরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তৃণমূল নেতা জেলার দুটি আসনে অভিনেতা দেব এবং অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়কে মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মনে হচ্ছে ছেলেখেলা হচ্ছে। পাগলামির একটা সীমা আছে। অভিনেতা-অভিনেত্রী যাঁদের প্রার্থী করা হয়েছে, তাঁরা কি এলাকায় সময় দিতে পারবেন? দলে যোগ্য নেতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের কেন বঞ্চিত করা হচ্ছে, বুঝতে পারছি না।’
এ ঘটনার পর টিপ্পনী কেটে বিজেপির জেলা সভাপতি তুষার মুখোপাধ্যায় বলেন, এই জেলার তৃণমূল নেতাদের সাংসদ হওয়ার যোগ্যতা নেই, এটাই মমতা বিশ্বাস করেন। তাই বাইরে থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের এখানে প্রার্থী করা হয়েছে। ক্ষোভের এই চিত্র শুধু পশ্চিম মেদিনপুরেই নয়। প্রার্থিতা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ আসনেই তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। এদিকে একই দিন প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে বামফ্রন্টও। তাদের ৪২ প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জনই নবাগত। প্রার্থীদের মধ্যে ছয়জন নারী, ১২ জন মুসলিম ও ১৩ জন তফসিলি ও তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের। বামফ্রন্টের সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী শেখ ইব্রাহিম আলি। তাঁর বয়স ২৫। তিনি পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক আসনে তৃণমূলের বর্তমান সাংসদ শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে লড়বেন।

সবার দৃষ্টি ছয় রাজ্যে

ভোট এগিয়ে আসছে। ব্যবসার সুযোগ বাড়ছে অনেকের।
হায়দরাবাদ শহরে গতকাল বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ব্যানার
ভাঁজ করে রাখছেন এক বিক্রেতা। ছবি: এএফপি
উত্তর প্রদেশ: ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য এটি। লোকসভায় রাজ্যটির আসনসংখ্যা ৮০। রাজ্যের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ২০০৯ সালের নির্বাচনে ২৩টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু দলটির জনপ্রিয়তা এখন নিম্নগামী। এসপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি), যারা গতবার পেয়েছিল ২০টি আসন। এ রাজ্যে গতবার অপ্রত্যাশিতভাবে ২১টি আসন পেয়েছিল কংগ্রেস। এখানে ২০০৪ সালের নির্বাচন থেকেই বিজেপির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিল ভোটাররা। তবে এবার নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির প্রতি ভোটাররা মুখ তুলে তাকাতে পারে।
মহারাষ্ট্র: নির্বাচনী রাজনীতিতে ভারতের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য মহারাষ্ট্র। লোকসভায় এর আসনসংখ্যা ৪৮। গেলবার কংগ্রেস ১৭ এবং শারদ পাওয়ারের এনসিপি আটটি আসন পেয়ে জোটগতভাবে সরকার গঠন করেছিল। শিবসেনা ও বিজেপি পেয়েছিল যথাক্রমে ১১টি ও নয়টি আসন। রাজ্যটিতে শহরের ভোটাররা ক্রমেই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই এবারের ভোটে কংগ্রেস-এনসিপি এবং শিবসেনা-বিজেপি উভয় জোটের মূল আলোকপাত তারাই। পাশাপাশি এএপিও শহুরে ভোটারদের দৃষ্টি কাড়ার আশা করছে।
অন্ধ্র প্রদেশ: অন্ধ্র প্রদেশ ভেঙে দুটি রাজ্য হওয়ায় রাজ্যটির রাজনৈতিক ভূচিত্রই পাল্টে গেছে। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কিরণ রেড্ডির নতুন দল গড়া থেকে শুরু করে আরও অনেক রাজনৈতিক খেলা এবার এই রাজ্যে উপভোগ্য হবে। গতবার অবিভক্ত অন্ধ্রে ৪২টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস পেয়েছিল ৩১টি আসন। তবে তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হয়ে যাওয়ার পর শ্রিমান্ধে মূল লড়াইটা হবে কংগ্রেস নেতা জগমোহন রেড্ডির সঙ্গে তেলেগু দেশম পার্টির এন চন্দ্রবাবু নাইডুর। হার এড়াতে এবার নাইডু বিজেপির সঙ্গে জোট করতে যাচ্ছেন। আর তেলেঙ্গানায় স্পষ্টতই এগিয়ে রয়েছেন তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতির প্রধান কে চন্দ্রশেখর রাও।
পশ্চিমবঙ্গ: রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্য দলগুলোর সঙ্গে জোট প্রশ্নে তাঁর নির্বাচনী কার্ড কীভাবে চালেন, সেটা দেখতেই মুখিয়ে আছে সবাই। মমতা এখন নিজেকে সম্ভাব্য কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন। নির্বাচনে ৪২টির মধ্যে ৩০টির মতো পেয়ে গেলেই তিনি এ ক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবেন বলে সমর্থকদের বিশ্বাস। গতবার তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ১৯টি আসন। গতবার মাত্র নয় আসন পেয়ে দুর্গ হারানো বামপন্থী সিপিএম এবার ঘুরে দাঁড়াবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বিহার: ৪০ আসনের রাজ্যটি বিজেপি ও মোদির কাছে উত্তর প্রদেশের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। জাতপাতের সংকট এখানে প্রকট। মোদিকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী করার প্রতিবাদে বিজেপির সঙ্গ ছাড়া জেডি (ইউ) নেতা নীতিশ কুমারকে জবাব দিতে উচ্চবর্ণের লোকজন মোদির পাশে দাঁড়াবে বলে দলটির বিশ্বাস। নীতিশের হিসাব ছিল, মোদিকে ত্যাগ করায় সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী ও মুসলমানেরা তাঁকে সমর্থন দেবে। তবে সে গুড়ে বালি। এখন রাজ্যের আরেক শক্তি লালুপ্রসাদের আরজেডি ও কংগ্রেস জোটের সঙ্গে তাঁকে ভাগাভাগি করে নিতে হবে মুসলিম ভোট।
তামিলনাড়ু: ৩৯ আসনের এই রাজ্যে গত নির্বাচনে ডিএমকে ১৮টি, কংগ্রেস আটটি এবং এআইএডিএমকে নয়টি আসন পেয়েছিল। তবে ডিএমকে প্রধান এম করুণানিধির বড় ছেলে আলাগিরি বিদ্রোহ করে বসায় সম্ভাবনা বাড়ছে এআইএডিমকে প্রধান জয়ললিতার। যদিও বামদের সঙ্গে তাঁর জোট ভেঙে পড়েছে। সর্বশেষ জরিপ বলছে, জয়ললিতাও খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন না। বিজেপির সঙ্গে রাজ্যের ছোট কয়েকটি দল জোট বেঁধেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

মালয়েশিয়ায় আনোয়ারের পাঁচ বছরের জেল

আনোয়ার ইব্রাহিম
মালয়েশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। সমকামিতার অভিযোগ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে আদালত এর আগে যে রায় দিয়েছিলেন, তা বাতিল করে গতকাল শুক্রবার এ রায় দেওয়া হলো। আনোয়ার সব সময় বলে আসছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মালয়েশিয়ার সেলানগর প্রদেশে চলতি মাসে অনুষ্ঠেয় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন আনোয়ার। তবে আদালতের এ রায় তাঁর ওই পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করবে।
উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হলে আনোয়ার সেলানগর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন, যেটাকে বেশ প্রভাবশালী পদ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। আদালত বলেছেন, আনোয়ার এই রায়ের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করতে এবং তার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত জামিনে মুক্ত থাকতে পারবেন। রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় আনোয়ার বলেন, ‘১৫ বছর পর আবার তারা আমাকে জেলে ভরতে চায়। এ কারণেই তারা এত তড়িঘড়ি করছে।’ বিবিসি।

‘মিত্রদের’ আবেদন উপেক্ষা করতে পারে না মস্কো

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেনে রুশ ‘মিত্রদের’ সাহায্যের আবেদন মস্কো কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারে না। আর রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় থেকেই সব পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইউক্রেন-সংকট কূটনৈতিকভাবে সমাধানের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আহ্বানের জবাবে পুতিন এসব কথা বলেন। গতকাল শুক্রবার ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেন দুই নেতা। এদিকে ইউক্রেনের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী ইয়াৎসেনিউক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সে দেশের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়ার পার্লামেন্টে রাশিয়ায় যোগ দেওয়া নিয়ে যে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে, তা ‘সভ্য পৃথিবীর কেউই’ স্বীকৃতি দেবে না। কিয়েভ সরকারের অন্যরাও ক্রিমিয়া পার্লামেন্টের এ ভোটাভুটিকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইউক্রেনের পরিস্থিতি শান্ত করতে পদক্ষেপ না নিলে রাশিয়াকে ‘ভয়ংকর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে। ওবামা ও পুতিন গতকাল টেলিফোনে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেন। পরে পুতিন এক বিবৃতিতে বলেন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ইউক্রেনের পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী। তবে বিষয়টি মস্কো-ওয়াশিংটন সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না। পুতিন অভিযোগ করেন, ইউক্রেনের নতুন কর্তৃপক্ষ দেশটির ‘পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও ক্রিমিয়া অঞ্চলের ক্ষেত্রে পুরোপুরি অবৈধ সিদ্ধান্ত নিয়েছে’।
হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ওবামা টেলিফোনে পুতিনকে বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক উপায়ে এ সংকটের সমাধান হতে পারে। কিন্তু ইউক্রেন প্রশ্নে মস্কো যা করছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ইউক্রেন পরিস্থিতি বিষয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে এ নিয়ে দুবার টেলিফোনে কথা বললেন ওবামা ও পুতিন। পুতিনের সঙ্গে কথা বলার আগে ওবামা মন্তব্য করেছিলেন, ইউক্রেনের স্বশাসিত প্রজাতন্ত্র ক্রিমিয়ার রাশিয়ার সঙ্গে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে গণভোটের আয়োজন ‘অসাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’। তখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপেরও ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ দুমার স্পিকার সের্গেই নারিস্কিন গতকাল বলেছেন, ‘ক্রিমিয়ার জনগণের “ঐতিহাসিক রায়ের” প্রতি সম্মান জানাবে রাশিয়া।’ প্যারা অলিম্পিকে থাকছে ইউক্রেন: রাশিয়ার সোচিতে অনুষ্ঠিত প্যারা অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছেন ইউক্রেনের খেলোয়াড়েরা। তবে তাঁরা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ইউক্রেন অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। দ্বিতীয় দফা অবরোধের কথা ভাবছে ফ্রান্স: ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফ্যাবিয়াস গতকাল বলেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম দফা অবরোধ সফল না হলে দ্বিতীয় দফায় রুশ ব্যবসায়ী ও পুতিনের ঘনিষ্ঠজনদের ওপর অবরোধ আরোপের কথা বিবেচনা করছে ফ্রান্স। বিবিসি, এএফপি।

বিশেষ সাক্ষাৎকার : অচ্যুত সামন্ত- ‘বাংলাদেশ আর ওডিশার ভেতরে বহুত মিল’ by ইকবাল হোসাইন চৌধুরী

অচ্যুত সামন্তর জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ জানুয়ারি, ওডিশায়। ট্রেন দুর্ঘটনায় বাবার অকালমৃত্যুর পর চরম অর্থাভাবে পড়ে তাঁদের পরিবার। তিনি টিউশনি করে পড়ালেখার খরচ চালিয়ে ওডিশার উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ডিগ্রি নেন রসায়নে। ১৯৯২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজি (কেআইআইটি বা কিট)। সেটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯৩ সালে অচ্যুত সামন্ত প্রতিষ্ঠা করেন কলিঙ্গ ইনস্টিটিউড অব সোশ্যাল সায়েন্স (কেআইআইএস বা কিস)। ওডিশার আদিবাসী দরিদ্র শিশুরা ‘কেজি টু পিজি’ বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া আর পড়ালেখার সুযোগ পায় এই প্রতিষ্ঠানে। ২০১২ সালে পেয়েছেন জওহরলাল নেহরু অ্যাওয়ার্ড। সমাজসেবায় অবদানের জন্য তিনি ভারত ছাড়াও স্বীকৃতি পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকা, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, চেক রিপাবলিকসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। গত ৬ মার্চ চতুর্থ সমাবর্তনে তাঁকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি দিয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইকবাল হোসাইন চৌধুরী

এক দেশে দুই নীতি যখন আবশ্যক

প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য না পেলে
ভোটাররা চূড়ান্তভাবে ক্ষমতাহীন হবে
গত অক্টোবরের কথা। ব্রিটেনে ভারতীয় ব্যঞ্জন বা কারি রান্নায় সেরা রেস্তোরাঁগুলোর পুরস্কার বিতরণে রন্ধনশিল্পের সাময়িকী কারি লাইফ-এর এক জমজমাট অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি ব্রিটেনের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এরিক পিকলস। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছিলেন বিবিসি টেলিভিশনের সদ্য অবসর নেওয়া উপস্থাপিকা শন লয়েডস। পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার পর অতিথির সঙ্গে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়ানো সেসব ছবি পরে রেস্তোরাঁর দেয়ালে শোভা পাবে। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন এরিক পিকলসের নির্বাচনী এলাকা, ব্রেন্টউড অ্যান্ড ওংগারের রেস্তোরাঁ মালিক।
শন ওই রেস্তোরাঁর মালিকের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানানোর সময় মন্ত্রীকে অনেকটা রসিকতা করে বললেন যে এঁর রেস্তোরাঁয় এবার নিশ্চয়ই খাওয়ার পর তোমাকে আর দাম দিতে হবে না! এরিক পিকলস খুবই বিব্রত হয়ে বললেন, ‘তোমার এটা বলা উচিত হয়নি। এ ধরনের আতিথেয়তা গ্রহণ করলে আমাকে তার ঘোষণা দিতে হবে।’ (ইউ শুড নট হ্যাভ সেইড দ্যাট, এনি সাচ ফেভারস নিডস টু বি ডিক্লেয়ার্ড) শন সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বেফাঁস মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনপ্রতিনিধিদের যে শুধু তাঁদের আয়-রোজগারের বিস্তারিতসহ সহায়-সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করতে হয় তা-ই নয়, অন্য কোথাও তাঁদের কী ধরনের স্বার্থ আছে, তা-ও জনসমক্ষে প্রকাশের একটা নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অবশ্য সবাই যে এতটা নৈতিকতার ধার ধারেন, তা নয়। আর সে কারণেই ব্রিটেনসহ বিশ্বের বহু দেশেই আইন করে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাঁচ বছর পর পর শুধু নির্বাচনের সময় নয়, বছরজুড়েই এমপিদের তাঁদের সব ধরনের উপহার, উপঢৌকন, আতিথ্য গ্রহণ এবং বেতন-ভাতার বাইরে সব ধরনের আয় প্রকাশ করতে হয়। পার্লামেন্টে তাঁদের জন্য রাখা আছে আলাদা একটি রেজিস্ট্রার, যাতে এগুলোর ঘোষণা দিতে হয়। তা না হলে, ধরা পড়লে ভোটারদের আদালতে বিচারের সম্মুখীন হওয়া থেকে নিস্তার নেই। ক্যাশ ফর কোশ্চেন কেলেঙ্কারির জন্য টোরি পার্টির সাবেক এক মন্ত্রী নিল হ্যামিলটনের নজির এখানে স্মরণীয়। লেবার পার্টিতে টনি ব্লেয়ারের ঘনিষ্ঠ মন্ত্রী লর্ড ম্যান্ডেলসনের দৃষ্টান্তটি তো আরও নিষ্ঠুর। লেবার পার্টির একজন বড় চাঁদাদানকারীর কাছ থেকে নিজের বাড়ি কেনার জন্য ঋণ নিয়েছিলেন পিটার ম্যান্ডেলসন, কিন্তু তা তিনি এমপিদের রেজিস্টারে ঘোষণা করেননি।
পরে, লেবারবিরোধী পত্রিকা টেলিগ্রাফ তা প্রকাশ করে দেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে তখন মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছিল। এই রেজিস্টারের কারণে কোন এমপি কোন বিষয়ে কী প্রশ্ন করছেন অথবা কোন দিকে ভোট দিচ্ছেন, সেগুলো সম্পর্কে ভোটাররা একটা পূর্ণাঙ্গ ধারণা পান। অবশ্য, বলে রাখা ভালো যে ব্রিটেনে যেসব সাংবাদিক পার্লামেন্টের কার্যক্রম সম্পর্কে খবরাখবর সংগ্রহের কাজ করেন, তাঁদের জন্যও রয়েছে একটি রেজিস্টার। ১৯৮৫ সালের ১৭ জানুয়ারি পার্লামেন্ট একটি প্রস্তাব পাস করে সাংবাদিকদের এই রেজিস্টার চালু করে। সাংবাদিকেরা যাতে মন্ত্রী ও এমপিদের কাছে অন্য কারও হয়ে লবিং করতে না পারেন, সে জন্যই এ ব্যবস্থা। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপিরা ভোট দিয়ে পার্লামেন্টারি কমিশনার ফর স্ট্যান্ডার্ডস নির্বাচন করেন, যাঁর দায়িত্ব হচ্ছে এসব রেজিস্টার তত্ত্বাবধান করা এবং এমপিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ—হাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডসের জন্য আলাদা আলাদা দুজন কমিশনার এই দায়িত্বটি পালন করেন। এমপিরা ভিন্ন কোনো দেশের আতিথেয়তা গ্রহণ করলে তাঁদের সেটিরও ঘোষণা দিতে হয়। বাংলাদেশবিষয়ক অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপসহ এ ধরনের যত বিশেষ গ্রুপ রয়েছে, সেগুলোর সদস্যদের তাঁদের স্বার্থ সম্পর্কে ওই রেজিস্টারে ঘোষণা দিতে হয়। আমাদের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন যে ‘নির্বাচনী হলফনামা রাজনীতিকদের চরিত্র হনননামায় পরিণত হয়েছে’ (প্রথম আলো, ৩ মার্চ, ২০১৪)। মন্ত্রী হিসেবে পুনর্জন্মের আগে যাঁর জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে ব্রিটেনে এবং এখনো যিনি পরিবারের কারণে বছরে একাধিকবার ছুটি কাটাতে লন্ডনে আসেন, তিনি আরও বলেছেন যে এক দেশে সব মানুষের জন্য এক নীতি আর রাজনীতিকদের জন্য আরেকটি নীতি বা আইন থাকতে পারে না।
সুতরাং, জনপ্রতিনিধিদের রোজগার ও সম্পদের হিসাব দেওয়ার হলফনামার বিধান সংশোধন প্রয়োজন। ৫ জানুয়ারির প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রাপ্তি ছিল গত পাঁচ বছরে ক্ষমতাসীনদের সমৃদ্ধ ও সম্পদশালী হওয়ার আংশিক চিত্র অবলোকন। সেটা বন্ধের প্রাণান্তকর চেষ্টাও আমরা দেখেছি। কিন্তু, তা সফল না হওয়ায় এখন আইন পরিবর্তনের এই ভাবনা। ২০০৯ সালের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেসব হিসাব সাধারণ মানুষের জন্য নয়। অবশ্য দুষ্টু লোকেরা বলে থাকেন, দলের জন্য কার কাছ থেকে কত চাঁদা নেওয়া যাবে, সেটা যাঁরা ঠিক করেন, তাঁরা ওসব হিসাব ঠিকই জানেন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকেরা ক্ষমতার বদৌলতে লাইসেন্সবাজি করে ধনবান হওয়ার ধারাটি নতুন কিছু নয়। তবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা তা করে থাকেন বেনামে। আর আমাদের দেশে অনেকেই মন্ত্রিত্বকালে স্বনামেই ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি আদায়ের বদৌলতে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এবং তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তাঁরা ক্ষুব্ধ। জনপ্রতিনিধিদের সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের ব্যবসা, ঠিকাদারি নিষিদ্ধ হলেও দিনের পর দিন সেটাই চলে এসেছে। কেননা, তাঁদের নাম শুনলে ঠিকাদার বাছাইকারী কর্তৃপক্ষ বা কর্মকর্তারা সাহস ও সততা দুটিই হারিয়ে ফেলেন। দুর্নীতি দমন কমিশন সম্প্রতি হাতে গোনা কয়েকজন সদ্য সাবেক মন্ত্রী এবং কয়েকজন এমপির বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। সদ্য সাবেক হওয়া এই স্বল্পসংখ্যক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। কেননা, তাঁরা যে সরকারপ্রধানের সুদৃষ্টিতে নেই, সেটা তাঁদের মন্ত্রিত্ব খোয়ানোতেই স্পষ্ট হয়েছে।
কিন্তু, মন্ত্রিত্ব ফিরে না পেলেও ক্ষমতাসীন দলে যাঁদের অবস্থান বেশ পাকাপোক্ত, তাঁদের বিরুদ্ধে কমিশন নিশ্চুপ। তা না হলে শাসক দলের যেসব মন্ত্রী, এমপি এবং নেতা ব্যাংক, বিমা, বিশ্ববিদ্যালয়, টেলিভিশনসহ নানা ধরনের বাণিজ্যের লাইসেন্স পেয়েছেন, তাঁদের সবার বিরুদ্ধেই তদন্ত হওয়া উচিত। যেসব রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বিদেশে টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গত বছর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তাঁদের একজনের বিরুদ্ধেও তদন্ত অনুষ্ঠানের কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তির মন্তব্যে ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। মহাজোটীয় সংসদে বিরোধী দল বলতে কার্যত কিছু না থাকায় সরকার চাইলেই দেশে বিদ্যমান যেকোনো আইন সহজেই পরিবর্তন করতে পারবে। প্রশাসন, সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিষয়ে গণমাধ্যমের সীমাহীন আগ্রহ মোকাবিলার পথ হিসেবে তাঁরা চাইলে তথ্য অধিকার আইনটিও বাতিল করে দিতে পারেন। কিন্তু, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তাঁদের ভেবে দেখা উচিত যে এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে। পাশ্চাত্যের উন্নত গণতন্ত্রগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু বর্তমানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু ভারতের ভালো নজিরগুলো থেকে তো শিক্ষা নেওয়া যায়। সে দেশে শুধু রাজনীতিকদেরই যে সম্পদের হিসাব দিতে হয়, তা-ই নয়, রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে বলেছেন আদালত।
২০০২ সাল থেকেই সেখানে আদালতের নির্দেশে (অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক রিফর্মস বনাম রাষ্ট্র মামলায়) প্রার্থীদের এসব তথ্য দিতে হচ্ছে। আর রাজনৈতিক দলের তহবিলের হিসাব প্রকাশ রাজনীতিকেরা দল-মতনির্বিশেষে ঠেকানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের কাছে টিকতে পারেননি। সৈয়দ আশরাফ এক দেশে দুই ধরনের নীতি ও আইন থাকতে পারে না বলে দাবি করেছেন। কিন্তু, ওই দাবিটি করার আগে ভুলে গেছেন যে এক দেশে দুই নীতি বা আইনের সুবিধা নিয়েই আমাদের জনপ্রতিনিধিরা শুল্কমুক্ত গাড়ি নিয়েছেন, সরকারি প্লট অথবা বাড়ি নিয়েছেন। আমাদের জনপ্রতিনিধিরা সেগুলো ফেরত দিলেই না তিনি দুই নীতির বিরোধিতা করতে পারতেন। বহু গণতন্ত্রেই এই দুই নীতি আছে, যার মূলে রয়েছে জনপ্রতিনিধিদের জন্য উঁচু নৈতিক মান নির্ধারণ। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির এই হাতিয়ারটি নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশে অনেকটাই ভোঁতা হয়ে গেছে। এখন সেটাকে ছুড়ে ফেলার আয়োজন হবে ভোটারদের চূড়ান্তভাবে ক্ষমতাহীন করার উৎসব। কেননা, ভোটারের সামনে তখন শুধু মার্কা ছাড়া বিবেচনার মতো আর কী অবশিষ্ট থাকবে?
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

পাহাড় থেকে কী বার্তা পেল আওয়ামী লীগ?

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই উপজেলা নির্বাচনে যে আওয়ামী লীগ প্রত্যাশিত ফল পেল না, এর কারণ নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে নানা রকম আলোচনা চলছে। যতই দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এই নির্বাচনকে দলীয় সমর্থনের মাপকাঠি নয় বলে উল্লেখ করুন, দলের অভ্যন্তরে যে এ নিয়ে অস্বস্তি আছে, এটা বোঝার জন্য অন্তত বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন হয় না। বৃহত্তর চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের ফলাফল শোচনীয়। এর ১০১টি কারণ বের করা সম্ভব। তবে প্রধান কারণ যে অন্তর্কোন্দল, তাতে সন্দেহ নেই। শুধু মিরসরাই উপজেলার নির্বাচনকেই যদি উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করাই, তাতে এ কথা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয় যে এখানে স্থানীয় সাংসদের ভূমিকার কারণেই পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। আগেরবারের চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিনকে দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেননি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং বর্তমান সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন গিয়াস উদ্দিনের। তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা স্থানীয় সাংসদের অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিল বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। পর পর দুবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে গিয়াস উদ্দিন একসময় এখানকার সংসদ সদস্য পদের জন্য দলীয় মনোনয়নের দাবিদার হয়ে উঠবেন—এমন একটি ধারণা থেকেই তিনি অঙ্কুরেই তাঁর পথ রুদ্ধ করতে চেয়েছেন বলেও মনে করেন এখানকার রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
গিয়াস উদ্দিন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে হেরেছেন। তবে বিএনপি-সমর্থিত বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে তাঁরই। মোশাররফের প্রার্থী গিয়াসের পথ আগলেছেন, নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি। এই একটি আসনের নির্বাচনের কথা উল্লেখ করলাম। উপজেলা নির্বাচনে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করতে চাইলে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড উদাহরণটা সামনে রাখতে পারেন। সারা দেশের চিত্র এর চেয়ে ভিন্ন না-ও হতে পারে। তবে চট্টগ্রামের তিনটি পার্বত্যাঞ্চলের উপজেলা নির্বাচনে যে আওয়ামী লীগ একটি আসনেও জিততে পারল না, তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে অন্যত্র। পাহাড়িরা দীর্ঘকাল আওয়ামী লীগকেই তাদের নির্ভরতার ক্ষেত্র মনে করে এসেছে। গত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলই তার প্রমাণ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করলেও রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির তিনটি সংসদীয় আসনেই জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। পাহাড়িরা বিশ্বাস করত, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তৎকালীন শান্তিবাহিনীর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেবার বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ায় শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা তিরোহিত হলো। ১৯৯৬ সালেও যথারীতি পার্বত্যাঞ্চলের তিন আসনে জয়লাভ করেছে আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি সারা দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে তারা সরকার গঠন করলে ‘শান্তি চুক্তি’ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
১৯৯৭ সালেই সম্পাদিত হলো ‘শান্তি চুক্তি’র মতো একটি বিরল ঘটনা। তখনকার প্রধান বিরোধী দল বিএনপি মুষ্টিমেয় পাহাড়ি ও পাহাড়ের বাঙালি সেটেলাররা এর বিরোধিতা করলেও দেশে-বিদেশে উচ্চ প্রশংসিত হলো এই উদ্যোগ। দীর্ঘকালের সশস্ত্র সংগ্রামের অবসান ঘটিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করল সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন শান্তিবাহিনী তথা জনসংহতি সমিতি। পাহাড়ে বয়ে গেল আনন্দের বন্যা। কিন্তু শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হলেও এর বাস্তবায়ন যে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া, তা বোঝা গেল অচিরেই। আওয়ামী লীগ সরকার তার মেয়াদের বাকি সময়ে তাই এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। চুক্তি নিয়ে হতাশ পাহাড়িরা সেবার তাদের মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছিল নির্বাচনে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাই পার্বত্যাঞ্চলের তিনটির মধ্যে দুটি আসন হারায় আওয়ামী লীগ। তবে হতাশ ও অভিমান যতটা ছিল, ততটা দানা বেঁধে ওঠেনি ক্ষোভ। দুটি আসন ন্যূনতম ব্যবধানে হারালেও পাহাড়িরা তাদের বর্জন করেছে—এমন ধারণা করার কোনো সংগত কারণ ছিল না আওয়ামী লীগের। আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগকেই নির্ভরতার ক্ষেত্র মনে করেছিল আদিবাসীরা। আওয়ামী লীগের ওপর যতটা আস্থা ও নির্ভরশীলতা পাহাড়ি মানুষের, ঠিক ততটাই অবিশ্বাস ও সন্দেহ বিএনপির প্রতি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নদীভাঙনে ও অন্যান্য কারণে ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষদের এনে পুনর্বাসন করেছিলেন এখানে। আদিবাসীদের ভূমিব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন ও অপরিচিত কিছু মানুষকে পাহাড়ে এনে পুনর্বাসন করার কারণে এখানকার সামাজিক ভারসাম্য যেমন নষ্ট হয়েছে,
তেমনি প্রকট হয়েছিল পাহাড়ি-বাঙালি সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব-সংঘাত। স্বল্প পরিসরে এ সম্পর্কে বলার সুযোগ নেই, তবে এটুকু বলা যায়, এই উদ্যোগের ফলে বাঙালি সেটেলাররা যতটা বিএনপির প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন দেখিয়েছে, ঠিক ততটাই উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে আদিবাসী পাহাড়িরা। আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের আস্থা ও প্রত্যাশা বেড়েছে। ২০০৮ সালেও তাই জাতীয় নির্বাচনে তিন পার্বত্য আসনেই বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। সেবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পাহাড়িরা আশায় বুক বেঁধেছে শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন দেখবে বলে। কিন্তু পাঁচ বছর পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরও এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে পারল না ক্ষমতাসীনেরা। বিশেষ করে ভূমিব্যবস্থা-সংক্রান্ত জটিলতার সমাধান না হওয়ায় এই দল সম্পর্কে যেন একধরনের মোহমুক্তি ঘটে আদিবাসীদের। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দীপংকর তালুকদারের বিরুদ্ধে জনসংহতি সমিতির প্রার্থী ঊষাতন তালুকদারকে বিজয়ী করে নিজেদের ক্ষোভ ও দুঃখের কথা জানান দিয়েছিলেন পাহাড়ি ভোটাররা। এবারের উপজেলা নির্বাচনে সব কটি আসনে হেরে আওয়ামী লীগ হয়তো উপলব্ধি করতে পারছে যে সেই ক্ষোভ ও দুঃখের মাত্রা কতটা তীব্র! তিন পার্বত্যাঞ্চলের বাঙালি-অধ্যুষিত ইউনিয়নগুলোয় জয় পেয়েছে বিএনপি।
অন্যদিকে, পাহাড়ি আদিবাসী-অধ্যুষিত ইউনিয়নগুলোয় জনসংহতি সমিতি ও শান্তি চুক্তিবিরোধী ইউপিডিএফের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না করার কারণে চুক্তিবিরোধী পাহাড়িদের সংগঠন ইউপিডিএফ এখন আদিবাসীদের কাছে চুক্তির অসারতা প্রমাণ করতে পেরেছে অনেকটা। এতে অনৈক্যটা প্রকট হয়ে উঠছে পাহাড়িদের মধ্যে। অন্যদিকে, লামার মতো একটি বাঙালি-অধ্যুষিত এলাকায় একজন আদিবাসী প্রার্থীকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া ছিল একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। পাহাড়ি-বাঙালি উভয় গোষ্ঠীর সমর্থনে তাঁর জয় সুনিশ্চিত হয়েছে। এই মেরুকরণ আওয়ামী লীগের জন্য অশনিসংকেত। পাহাড়ে পুনর্বাসিত বাঙালিদের অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই ‘রেশন-নির্ভর’ উদ্বাস্তু জীবন কারও কাম্য হতে পারে না। তাই তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের বিষয়টা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। পাশাপাশি শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা গড়িমসি আখেরে শুভ ফল বয়ে আনবে না। উপজেলা নির্বাচনে পাহাড় থেকে যে বার্তা পেল আওয়ামী লীগ, তা অনুধাবনে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে আম ও ছালা দুটিই হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে তাদের জন্য।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com