Tuesday, June 8, 2010

হাটে হাটে কাঁঠাল-বন্যা by আকমল হোসেন

বাতাসে ভাসছে পাকা কাঁঠালের মত্ত ঘ্রাণ। মন চনমন করা কেমন ঘোর লাগানো গন্ধ। হাটের মধ্যে, রাস্তার পাশে কাঁঠালের ওপর কাঁঠাল স্তূপ করে রাখা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই পাহাড়ি এলাকা থেকে বাজারমুখী নামে এই কাঁঠালের ঢল। কাঁধভার, ট্রলি, ঠেলাগাড়ি, রিকশা, বাইসাইকেল আর ট্রাকে করে আসতে থাকে কাঁঠাল। একসময় কাঁঠালে কাঁঠালে ভরে ওঠে হাট। সেই কাঁঠালের ওপর মৌমাছির মতো হুমড়ি খাওয়া মানুষ; চলে দরদামের মিঠেকড়া কথার গুঞ্জন।
এই কাঁঠাল-বন্যা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার, রবিরবাজার; রাজনগরের টেংরাবাজার, মুন্সীবাজার; বড়লেখা সদর; কমলগঞ্জের আদমপুর, শ্রীমঙ্গল সদরসহ পাহাড়ি এলাকার হাটবাজারগুলোতে। হাটগুলো এখন কাঁঠালে কাঁঠালে সয়লাব হয়ে আছে। লোকজন জানিয়েছেন, এই হাটগুলো মূলত কাঁঠালের পাইকারি বাজার। তবে অনেকের মতে, কাঁঠালের বড় হাটটি বসে কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজারে। বিভিন্ন পাহাড়-টিলায় এত দিন যেসব কাঁঠাল গাছে গাছে দানাদার শরীর নিয়ে ঝুলেছিল, বড় হয়েছিল; সেগুলো এখন মানুষের হাত ঘুরে হাটে আসছে। যত দিন কাঁঠালের মৌসুম ফুরিয়ে না গেছে, তত দিন সপ্তাহের শনি ও বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাজারে কাঁঠালের হাট বসবে।
দেখা গেছে, ভোরের আলো স্পষ্ট হওয়ার আগে যেখানে সুনসান নীরবতা, রোদ যখন একটু একটু করে স্পষ্ট হতে থাকে, তখন স্রোতের মতো আসতে থাকে লোকজন; সঙ্গে কাঁঠাল। টুকরিতে করে কাঁধভারে, ট্রলি, বাইসাইকেল, ঠেলাগাড়ি, রিকশা ও ট্রাকে করে দূর-দূরান্ত থেকে কাঁঠাল নিয়ে আসতে থাকেন তাঁরা। মুহূর্তেই মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের প্রায় আধা কিলোমিটার, কোনো কোনো দিন তারও বেশি জায়গার দুই পাশে কাঁঠালের বন্যা। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ; সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারেরা এসে ভিড় করেন। কাঁঠাল ব্যবসায়ীরা জানালেন, জ্যৈষ্ঠ মাসেই কাঁঠালের জমজমাট এই হাটটি বসে। কুলাউড়া উপজেলার বুধবাসি, টাট্টিউলি, মুরইছড়া, গণকিয়া, ধামুলি, টিকরিয়া, রাঙ্গিছড়া, হিঙ্গাজিয়া, গাজীপুর, লোয়াইউনি, জালালাবাদ, কালিটি, মনছড়া; রাজনগর উপজেলার টেংরা এলাকা থেকে এখানে কাঁঠাল নিয়ে আসেন কাঁঠালচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
ইরফান আলী, আবদুল করিমসহ অনেকে জানালেন, আট-দশ মাইল দূর থেকে ট্রাকে করে কাঁঠাল নিয়ে এসেছেন অনেকে। একা এত দূর কাঁঠাল নিয়ে আসতে খরচে পোষায় না। কাঁঠাল আনতে কয়েকজন মিলে ট্রাক ভাড়া করেন। তাঁরা জানান, তাঁদের এলাকায় এমন কোনো বাড়ি নেই যে বাড়িতে ৫০-১০০টি কাঁঠালগাছ নেই। ফসল ভালো হলে প্রতি গাছে ২০০-২৫০টি কাঁঠাল ধরে। এতে করে ৭০-৮০ হাজার টাকা মৌসুমে আয় করতে পারেন অনেকে। কাঁঠালের এই মৌসুমের জন্য এক ধরনের গোপন তাড়না থাকে তাঁদের। গাছ থেকে কাঁঠাল পেড়ে বাজার পর্যন্ত নিয়ে আসতে প্রতিটি কাঁঠালে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ পড়ে প্রায় পাঁচ-ছয় টাকা।
তবে এই মৌসুমি ফল কাঁঠাল নিয়ে তৈরি হয়েছে এক নীরব বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। বাজারে আসা কাঁঠালচাষি ও পাইকারেরা জানালেন, গাছের সংখ্যা অনুপাতে চৈত্র ও বৈশাখ মাসে আগাম একেকটি বাড়ির গাছের কাঁঠাল বিক্রি হয়ে যায় পাইকারদের কাছে। আবার কোনো কোনো পাইকার আছেন, যাঁরা এক-দুই বছর আগেও কাঁঠালবাগান কিনে নেন। জ্যৈষ্ঠ মাস কাঁঠালের প্রধান মৌসুম হলেও অনেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত কাঁঠাল বিক্রি করতে পারবেন বলে জানালেন। আরজ আলীসহ যাঁরা সাইকেলে করে কাঁঠাল নিয়ে আসেন, তাঁদের অনেকের জীবিকার অন্য রকম সন্ধান। অনেকেই মূলত দিনমজুর। কিন্তু এই সময়টায় দিনমজুরির কাজে যান না। তাঁরা হয় আগাম ক্ষুদ্র পুঁজিতে কাঁঠালের কিছু গাছ কিনে নেন, না-হয় মৌসুমে সরাসরি চাষির কাছ থেকে কাঁঠাল কিনে সাইকেলে বা কাঁধে করে বাজারে নিয়ে আসেন। সেগুলো বিক্রি করে যা মুনাফা হয়, তাতে কখনো কখনো লাভ ভালো হয় আবার কখনো কখনো কোনো রকম দিন চলার ব্যবস্থা হয়। এতেও তাঁরা সন্তুষ্ট থাকেন এটা মনে করে যে দিনমজুরিতে গিয়ে সারা দিনে যা পেতেন, তা না করে আধবেলায় সেই রুজিটা করলেন।
তবে গাছের কাঁঠাল যখন হাটে আসে, তখন তার দামের ওঠানামা আছে। একই রকম কথা বললেন প্রায় সব হাটের কাঁঠাল বিক্রেতারা। সব সময় ভালো দামে কাঁঠাল কেনাবেচা যায় না। কাঁঠালের দামের উঠতি-পড়তি আছে। হাটে যেদিন আমদানি বেশি হয়, সেদিন দাম পড়ে যায়। এতে কারও কারও মুনাফা দূরে থাক, পুঁজিতে হাত পড়ে। তবে মনে মনে আফসোস আছে অনেকের। এত ফল, কাঁঠালের বন্যা হাটে হাটে, তবু এই কাঁঠাল সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই দাম যা-ই পাওয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গেই তা বিক্রি করে দিতে হয়। এখানে লাভ-লোকসান নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই। কাঁঠালচাষিরা জানালেন, প্রাকৃতিকভাবেই বাপ-দাদার আমল থেকে পাহাড়ি এলাকায় কাঁঠাল চাষ হচ্ছে। কাঁঠাল চাষের ক্ষেত্রে তাঁদের আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ নেই। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ বা পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে তাঁরা অসহায় হয়ে পড়েন।
জেলার কাঁঠালের হাট ঘুরে মনে হয়েছে, ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’—এই প্রবাদটি এখন কাঁঠাল-বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে। গাছের কাঁঠাল এখন হাটে হাটে।

শুধু তদন্ত নয়, এক্ষুনি কাজ শুরু করতে হবে by ফরিদা আখতার

বেগুনবাড়ি থেকে নিমতলীর দূরত্ব ছয় কিলোমিটারের মতো। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দুটো এলাকার দুই ধরনের ঘটনা পুরো ঢাকা শহরকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতের খবর দেখছিলাম টেলিভিশনে। বেগুনবাড়ির ত্রুটিপূর্ণ বিল্ডিং ধসে টিনের বাড়ির মানুষের মৃত্যুর ঘটনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। ২৫ জন মানুষ মরে গেল, যার মধ্যে ১৪ জনই নারী ও শিশু। এরা সবাই শ্রমজীবী মানুষ, সারা দিন কাজের পর ঘরে পরিবারের সবার সঙ্গে মিলে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমাবে, আবার পরদিন যথারীতি কাজে যাবে, এমন একটি নিয়মের মধ্যে যারা জীবন কাটায়, তাদের মৃতদেহ ধসে যাওয়া বিল্ডিংয়ের তলায় পানির ভেতর থেকে উদ্ধার করেছে দমকল বাহিনী। বৃহস্পতিবার রাতে খবরে দেখছিলাম, দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা ঘোষণা দিচ্ছিলেন, পানির মধ্যে আর কোনো মৃতদেহ নেই। যদিও কেউ কেউ তখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করছিলেন। আর ঠিক তখনই চোখে পড়ল, টিভিস্ক্রিনের নিচে একটি লেখা ঘুরছে, পুরোনো ঢাকায় ভয়াবহ আগুন লেগেছে।
মনটা আঁতকে উঠেছিল কিছু না বুঝেই। বেগুনবাড়ির ঘটনাই তখনো মনে কষ্ট ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ভাবছিলাম, রাজউকের এই গাফিলতি আর কত দিন আমরা সহ্য করব? গরিব মানুষকে ঢাকা শহর থেকে বের করে দেওয়ার কোনো ফন্দি নয় তো? শুধু ঢাকা শহর থেকেই নয়, এই পৃথিবী থেকেই তাদের একটি অংশকে বের করে দিলে আরও ভালো। রাজউকের কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কিন্তু যে কারণেই হোক, এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এখনো দেখা যাচ্ছে না।
ধীরে ধীরে খবর আসতে থাকল, বেগুনবাড়ির বিল্ডিং ধসে পড়ার খবরটাই ধসে পড়ল। এবার নিমতলীর আগুনের ঘটনা। আগুনের ভয়াবহতা সবাই দেখেছেন। বলা হচ্ছে, এটা ছিল স্মরণকালের ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনা। এলাকার মানুষ পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। যে যার মতো করে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছিল বলে সাংবাদিকেরা পরে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখা এত বেশি তীব্র ছিল যে ১১৭ জন জ্যান্ত পুড়ে মরেছে, আরও অনেকে আহত আবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছে। আগ্নিদগ্ধ বীভৎস লাশ সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছিল। সেখানে জায়গা হচ্ছিল না। যুদ্ধাবস্থা ছাড়া এত ঝলসে যাওয়া এবং লাশের কফিন নিয়ে কবর দিতে যাওয়া আমি দেখিনি। আজিমপুর গোরস্থানে যখন লাশগুলো একের পর এক আনা হচ্ছিল তখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ফিলিস্তিন ও ইরাকের কথা। আমরা কোথায় আছি? আমি কেঁদেছি সেই দৃশ্য দেখে। আমি একা নই, সেদিন আমার যাদের সঙ্গেই দেখা হয়েছে, তারা সবাই এক কথা বলেছে। বলতে গেলে সবাই কেঁদেছে। আজিমপুর গোরস্থানের গোরখোদক রিপন মিয়া, যাঁর কাজই হচ্ছে কবর খোঁড়া, বলেছেন, ‘এক দিনে এত কবর খুঁড়তে হবে, স্বপ্নেও ভাবিনি।’ আসলে শোকদিবস ঘোষণা জনগণই দিয়েছিল। সরকার শোক দিবস পালন করেছে, প্রধানমন্ত্রী সেদিনের কর্মসূচিও বাতিল করেছেন। ভালো কথা। ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস ছিল, কর্মসূচি স্থগিত হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর এ ব্যাপারে কোনো দায়িত্ব নেবে না। তাদের কাজ কি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করা? এত বড় পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে গেল, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কোনো নড়াচড়া দেখলাম না। বরং পরিবেশ দিবসে এই বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হতে পারত। এর চেয়ে বড় পরিবেশ দূষণ আর কী হতে পারে! খাদ্য ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়েরও একই অবস্থা। খোদ ঢাকা শহরে এত বড় মানুষ-সৃষ্ট দুর্যোগ ঘটে গেল, তারা কিছু করছে না। এখন বিষয়টি যেন শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। সেখানেও কিছু ফাঁক লক্ষ করেছি। শনিবার হাসপাতালে গিয়ে আহত ব্যক্তিদের আভিযোগ শুনব আশা করিনি। যেখানে প্রধানমন্ত্রী এসে আহত সবাইকে বিনা পয়সায় চিকিৎসার ঘোষণা দিয়ে গেছেন, সেখানে ওষুধ ও সেবা পাওয়া কষ্টকর হওয়া উচিত ছিল না।
আগুনের সূত্রপাত একটি বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ থেকে হোক বা বিয়েবাড়ির রান্না থেকে হোক, যা শেষ পর্যন্ত এতগুলো মৃত্যুর কারণ ঘটিয়েছে, তা হচ্ছে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদামে আগুন ধরার পরেই আগুনের লেলিহান রূপ নেওয়া। কেউ কেউ বলেছেন, আগ্নেয়গিরির লাভার মতো আগুন ছুটে আসছিল। দমকল বাহিনীও বলেছে, বেশির ভাগ মানুষ মারা গেছে রাসায়নিক ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে। আমি শুক্রবার টেলিভিশনের খবর প্রায় সব শুনেছি, সব পত্রিকা পড়েছি এবং বোঝার চেষ্টা করেছি, কেন এমন ঘটনা ঘটে গেল। সবখানেই দেখেছি, রাসায়নিক গুদামের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্লাস্টিক কারখানা, স্যান্ডেল ইত্যাদি রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম আবাসিক এলাকার মধ্যেই হয়ে আছে। সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিতে গিয়ে সেখানকার পরিবেশকে ‘ওত পাতা মৃত্যু’ কিংবা ‘নিরন্তর জীবনের ঝুঁকি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমি সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানদের অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই যে তাঁরা ঘটনার চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি সমস্যাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। ৫ জুন পত্রিকায় একাধিক শিরোনামে প্রথম পাতায় খবরটি প্রকাশিত হয়েছে। টিভিতেও খবরের পাশাপাশি প্রতিবেদকের নিজস্ব মন্তব্য, এমনকি ক্যামেরাম্যানের অনুভূতি তুলে ধরা হয়েছে। আমার কাছে ভালো লেগেছে যে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রচারমাধ্যম নিজ নিজ দক্ষতা অনুযায়ী বিস্তারিত তুলে ধরতে পারছে। এই ঘটনা কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় কি না জানি না, কিন্তু সরকারের প্রচারমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া যে কত জরুরি তা বোঝা যায়। সংবাদমাধ্যম জনগণকে তথ্য তুলে ধরে সাহায্য করবে, এটাই কাম্য। কারও কণ্ঠ যেন রোধ করা না হয়।
সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু আমি বুঝলাম না, তাদের এক সপ্তাহ সময় লাগবে কেন? সেদিন এত আগুনের মধ্যেও যদি সাংবাদিকেরা এত তথ্য জানতে পারেন, সেখানে সরকারের তদন্তের প্রাথমিক কাজ তো হয়েই গেছে। তদন্ত কমিটি সব প্রকাশিত সংবাদ এবং টিভির ভিডিও ছবি দেখে অনেক কিছুই সহজে বুঝতে পারবে। আমার ভয় হচ্ছে, তদন্তে দেরি হলে সমস্যার সমাধান হবে না। আরও অনেক দুর্ঘটনা মনে হচ্ছে যেন ওত পেতে আছে। এই ঘটনাকে নিছক একটিমাত্র দুর্ঘটনা ভাবলে আমরা মারাত্মক ভুল করব, এটা এর চেয়ে বড় কোনো দুর্ঘটনার পূর্বাভাস। লাগাতার ঘটনাও হতে পারে। বেগুনবাড়ির পর যেমন একের পর এক দালান হেলে পড়ার ঘটনা মানুষের চোখে পড়ছে, আতঙ্ক বাড়ছে, তেমনি রাসায়নিক গুদাম, প্লাস্টিক ফ্যাক্টরি বিরাট হুমকি হয়ে আছে। কালের কণ্ঠ (৫ জুন, ২০১০) পুরান ঢাকায় ‘ওত পাতা মৃত্যু’ শিরোনামে যে প্রতিবেদন করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, আরও অনেক এলাকা এমন মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছে। যেমন লালবাগ, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি, শ্যামপুর, মতিঝিল—সব এলাকাই ভীতিকর হয়ে আছে। যায় যায় দিন (৫ জুন, ২০১০) বলেছে, কেমিক্যালের আগুনে বারবার পুড়ছে ঢাকা। তার অর্থ হচ্ছে, এই আগুনের ঘটনা এবারই নয়, আগেও ঘটেছে। সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এবারের ঘটনা ঘটতে পারল। সেদিক থেকে দেখলে এবারের এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। এই গাফিলতি ক্ষমার যোগ্য নয়।
নিমতলীর মানুষ স্বজন হারিয়ে শোকাহত। একই সঙ্গে তারা ক্ষুব্ধ, রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম নিয়ে আতঙ্কিত। তাদের সঙ্গে জনগণও ক্ষুব্ধ। তাই আর দেরি নয়, এক্ষুনি কাজ শুরু করতে হবে। আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই এই রাসায়নিক কারখানা আবাসিক এলাকা থেকে সরাতে হবে।
ফরিদা আখতার: নারীনেত্রী, উন্নয়নকর্মী।

ডিজিটাল যুগে অ্যানালগ বন্দর by মশিউল আলম

চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষ। দুজন যুবক কাজে ভীষণ ব্যস্ত: ক্রমাগত বেতারে কথা বলতে হচ্ছে তাঁদের। তাঁরা বন্দরের রেডিও অবজারভার (আরও) বা বেতার পর্যবেক্ষক। বিদেশ থেকে আসা কোনো জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের আওতাধীন বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ভেতরে প্রবেশের এবং বহির্নোঙরে ভেড়ার আগে যোগাযোগ করে এই বেতার পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে। বেতার পর্যবেক্ষকেরা জাহাজটি সম্পর্কে অনেক রকমের তথ্য নথিভুক্ত করেন, বিশেষত, কয়টার সময় ভিড়ল, জাহাজটির সর্বশেষ ছেড়ে আসা বন্দরটি ছিল কোন দেশের কোন বন্দর, জাহাজটিতে কী মালামাল রয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানের পণ্য সেগুলো ইত্যাদি। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জাহাজটিকে বহির্নোঙর থেকে জেটিতে ভেড়ার সিরিয়াল নম্বর দেওয়া হয়। এই পুরোটা সময় বন্দরের বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে জাহাজটির সঙ্গে যে বেতারযন্ত্রের সাহায্যে যোগাযোগ রক্ষা করেন বেতার পর্যবেক্ষকেরা, সেটিকে বলে ভিএইচএফ বা ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি বেতারযন্ত্র। কেন্দ্রীয় বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষটিতে এমন যন্ত্র রয়েছে মোট তিনটি। ছয়জন বেতার পর্যবেক্ষক সপ্তাহে সাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা তিন শিফটে এগুলো নিয়ে কাজ করেন।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষটি দেখতে গিয়ে প্রথমেই খটকা লাগল দেখে যে পুরো কক্ষটি জুড়ে একটিও কম্পিউটার নেই। ভিএইচএফ বা অতি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির বেতারযন্ত্রগুলোর চেহারা দেখে মনে হলো যেন উনিশ শতকের প্রযুক্তি। একজন বেতার পর্যবেক্ষক অবশ্য আমার ভুল ভাঙিয়ে দিলেন এই তথ্য জানিয়ে যে এগুলো বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের প্রযুক্তি। বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর আজ থেকে অন্তত কুড়ি-পঁচিশ বছর আগেই এ প্রযুক্তি পরিত্যাগ করেছে। এ ধরনের অ্যানালগ বেতারযন্ত্র আর ব্যবহূত হয় না।
বেতার পর্যবেক্ষকদের একজন বললেন, এখন অনেক আধুনিক ডিজিটাল-প্রযুক্তি সহজলভ্য; সেগুলো অডিও-ভিজুয়াল, সেগুলোর সাহায্যে বহির্নোঙরে ও জেটিতে জাহাজগুলোর গতিবিধি লক্ষ করা যায় বন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসেই। ফলে কোনো জাহাজ জেটিতে ভেড়ার সিরিয়াল পাওয়ার মতলবে বহির্নোঙরে আসার দুই ঘণ্টা আগেই যদি বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষকে মিথ্যা করে বলে, ‘আমরা এই বিকেল চারটার সময় ভিড়লাম’, তাহলে ধরা পড়ে যাবে, কারণ, কম্পিউটার মনিটরে সেটা যাচাই করা যাবে। কিন্তু বেতারের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণকক্ষকে এ রকম ফাঁকি দেয় অনেক জাহাজ। কারণ, বেতারে শুধু তাদের কথা শোনা যায়, জাহাজটির অবস্থান দেখা যায় না। সে জন্য দরকার ভিটিএস বা ভেসেল ট্রাভেল সিস্টেম ও এ ধরনের আরও কিছু অত্যাধুনিক ডিজিটাল-প্রযুক্তি প্রয়োজন।
বন্দরের এই বেতার পর্যবেক্ষকদের আরও কষ্টের কথা হলো, মান্ধাতা আমলের বেতারযন্ত্র এক হাতে ধরে বহির্নোঙরে ভিড়ছে, এমন জাহাজের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেসব তথ্য লিখে নিতে হয় অন্য হাতে কলম ধরে, লম্বা রুল টানা খাতায় (লগ বুক)। একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার পর্যন্ত নেই।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়ার পর ১৭ মাস চলে গেছে, খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে গ্রামগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল-প্রযুক্তি, অথচ দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের কেন্দ্রীয় রেডিও কন্ট্রোল রুমের এই অ্যানালগ অবস্থা।
দায়িত্বপালনরত দুই বেতার পর্যবেক্ষকের কাছে জানতে চাইলাম, এখানে একটা কম্পিউটার পর্যন্ত নেই কেন? দুজনেই নীরব, তাঁদের চোখেমুখে দেখা গেল, শুধু একধরনের হতাশার হাসি। এই যুবকদের একজন ইলেকট্রনিকসে ডিপ্লোমা, অন্যজন মেজর ইমপোর্ট অ্যান্ড শিপিং ম্যানেজমেন্টে এমবিএ করেছেন। তাঁদের পদটি অবশ্য এমন যোগ্যতা দাবি করে না, এ চাকরির জন্য আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক ডিগ্রি। কিন্তু কার্যত একজন এইচএসসি ডিগ্রিধারীর পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়, বললেন একজন। বিশেষত, বিদেশি মার্চেন্ট ভেসেলগুলোর সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে হয় ইংরেজি ভাষায়। তাঁরা মনে করেন, এই পদটির মর্যাদা বাড়ানো উচিত।
তাঁদের জিগ্যেস করলাম, সমুদ্রবন্দরে নিয়ন্ত্রণকক্ষের জন্য যেসব আধুনিক ডিজিটাল-প্রযুক্তি এখন পাওয়া যায়, সেগুলো কি খুব ব্যয়বহুল? বন্দর কর্তৃপক্ষের কি তা কেনার আর্থিক সামর্থ্য নেই? উত্তরে একজন বললেন, সামর্থ্য থাকবে না কেন? বন্দর কর্তৃপক্ষের তো কোটি কোটি টাকা।
আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সংকল্প করেছি, তারপর তো প্রায় দেড় বছর পার হতে চলল। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষের অ্যানালগ ব্যবস্থা থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটানো উচিত ছিল নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাস তিনেকের মধ্যেই।
অথবা কোনো একটি সরকারের ডিজিটাল-প্রযুক্তির প্রতি বেশি আগ্রহ না থাকলে কি সেই দেশ এগোবে না? এর আগের সরকারগুলো ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান দেয়নি বলে কি নতুন নতুন ডিজিটাল-প্রযুক্তির আবির্ভাব ও ব্যবহার থেমে থেকেছে? বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির যে উন্নয়ন ঘটে চলেছে, তার ব্যবহার কি সরকার-নির্বিশেষে সব দেশেই ছড়িয়ে পড়ছে না? বাংলাদেশও কি পিছিয়ে থাকছে বা থাকতে পারবে? তাহলে তার প্রধান সমুদ্রবন্দরটিতে কেন এই অ্যানালগ দশা এখনো রয়ে গেছে? এ বিষয়ে কি কর্তৃপক্ষ কিছু ভাবেনি? টেলিফোনে যোগাযোগ করলাম চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মেম্বার অপারেশন্স (হারবার অ্যান্ড মেরিন) এবং বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষের প্রধান ক্যাপ্টেন আরিফ মাহমুদকে। ‘চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের আওতাধীন পুরো জলসীমায় সার্বক্ষণিকভাবে বিদেশি মার্চেন্ট ভেসেলগুলোর মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ করা হয় যে বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে, সেখানে একটিও কম্পিউটার নেই কেন? অন্যান্য দেশে যেসব প্রযুক্তি বিশ-পঁচিশ বছর আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে, আপনাদের বন্দর কেন এখনো সেগুলো দিয়েই চলছে? আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি কেনার সামর্থ্য কি বন্দর কর্তৃপক্ষের নেই?’
উত্তরে তিনি বললেন, খুব শিগগির নিয়ন্ত্রণক্ষটির চেহারাই পাল্টে যাবে, কারণ, আধুনিক ডিজিটাল-প্রযুক্তি আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অচিরেই দরপত্র আহ্বান করা হবে। বন্দরের চেয়ারম্যান কমোডর আর ইউ আহমদ জানালেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনার জন্য ভিটিএমআইএস (ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) প্রযুক্তি ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে; এর ফলে বন্দরের বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষের কিছুটা প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসবে। আর আগামী অর্থবছরে তাঁরা আরও কিছু ডিজিটাল-প্রযুক্তি কেনার উদ্যোগ নেবেন, যা বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষটিকে পুরোপুরি ডিজিটাল-প্রযুক্তিসমৃদ্ধ করবে।
তাই যেন হয় এবং যথাশিগগির। কারণ, এই ডিজিটাল যুগে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় অঙ্গীকারবদ্ধ সরকারের আমলে অ্যানালগ পদ্ধতিতে চলতে পারে না দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর। ডিজিটাল-প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে বন্দরের দক্ষতা ও ফলপ্রসূতা বাড়ানোর উদ্যোগ অবশ্যই জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।
চট্টগ্রাম, ৩ জুন ২০১০
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

রেল কেন উপেক্ষিত by হানিফ মাহমুদ

সামাজিক সেবা ও লাভজনক কোম্পানি হিসেবে টিকে থাকার মধ্যে এক সফল সমন্বয় করেছে ভারতীয় রেল। এই সাফল্য এসেছে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাড়িয়ে। যে যাত্রীবাহী ট্রেন আগে আটশ যাত্রী বহন করত, এখন তা দুই হাজার। আর এতেই খরচ কমে গেছে ৪৫ ভাগ। ফলে কোনো ভাড়া না বাড়িয়েই যাত্রীদের জন্য সেবা বেড়েছে।
যেসব নিম্ন আয়ের মানুষ নিয়মিত ট্রেনে বিলাসবহুল কামরায় ভ্রমণ করতে পারে না, তাদের জন্য চালু হয়েছে ‘গরিব রথ’। এই ট্রেনে আছে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত কামরা থেকে আরামদায়ক আসন। এভাবেই বিগত এক দশকে প্রতিবেশী ভারতে যোগাযোগব্যবস্থায় রেলের একটি বিপ্লবী পরিবর্তন ঘটে গেছে। সরকারনিয়ন্ত্রিত একসময়ের লোকসানী রেল এখন বিপুল মুনাফার একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রায় ১৬ লাখ লোক কাজ করেন। উড়োজাহাজে চড়ার সুখ না পেলেও ভারতের দুই কোটি মানুষ প্রতিদিন চলছে ভারতের প্রায় ১১ হাজার ট্রেনে। এই রেলব্যবস্থায় প্রতিদিন ১৫ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে, যা ভারতীয় রেলওয়ে উদ্যোক্তাদের অন্যান্য পরিবহনের তুলনায় অনেকটা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দিয়েছে।
কিন্তু যেকোনো দেশের উন্নয়নে অত্যাবশ্যকীয় এই অবকাঠামোতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। যেসব পথ চালু ছিল নব্বইয়ের দশকে তার অনেকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। নতুন কোনো কোচ এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত না হওয়ার কারণে ক্রমেই সাধারণ ভ্রমণকারীদের কাছে রেল অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে।
অতীতে বিরোধিতা করলেও নৌপথ ছোট হয়ে পড়া এবং সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে ২০০৫ সালের দিকে উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশে রেল উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ দিতে থাকে। বিগত জোট সরকারের আমলে উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহে বাংলাদেশ রেলওয়েকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং বিভিন্ন স্থানে রেললাইন স্থাপন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনে ডবল ট্রাকে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০১১ সালের মধ্যে মোট ৯২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় ছয় হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক(এডিবি), বিশ্বব্যাংক এবং জাইকা অধিকাংশ অর্থ জোগান দিতে রাজি হয়। কিন্তু এসব অর্থ বিনিয়োগে উন্নয়নের সহযোগীরা শর্ত জুড়ে দেয়। সরকার তাদের সংস্কার প্রস্তাবে প্রাথমিকভাবে রাজিও হয়। রেলওয়ের এই সংস্কারপ্রক্রিয়া তদারকির জন্য যোগাযোগসচিবকে চেয়ারম্যান এবং অর্থসচিবকে কো-চেয়ারম্যান করে আন্তমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক ডজন বৈঠক করেছে কিন্তু সংস্কার পরিকল্পনা অনুমোদনের ব্যাপারে কিছুই হয়নি।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেলওয়ে থেকে সংস্কারের প্রস্তাবটি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বর্তমান কাঠামো ভেঙে সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানায় একটি বোর্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়েকে কয়েকটি বিভাগ বা ‘লাইন অব বিজনেস’-এ (এলওবি) রূপান্তরের কথা আছে খসড়া সংস্কার প্রস্তাবে। খসড়া সংস্কার প্রস্তাবে পুরো রেলওয়েকে আটটি এলওবিতে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন এবং রেলওয়ের ভূমি ব্যবহার—এ তিনটিকে আয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর ব্যয় করা হবে পরিচালন, অবকাঠামো, রোলিং স্টক (ইঞ্জিন-কোচ), করপোরেট সার্ভিস, অর্থ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে। প্রতিটি বিভাগ নিজ নিজ কাজের জন্য জবাবদিহি করবে। সংস্কারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যোগাযোগমন্ত্রীর অধীনে রেলওয়ের জন্য আট সদস্যবিশিষ্ট একটি স্বাধীন বোর্ড গঠনেরও সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু সংস্কার হলে মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা খর্ব হবে—এই আশঙ্কায় এই সংক্রান্ত ফাইলটি ঝুলে গেছে বলে একটি সুত্রে জানা গেছে।
শুধু ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার নয়, রেলওয়ের সেবা সম্প্রসারণ ও যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর জন্য নেওয়া প্রকল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কাগজে-কলমে রেলওয়েতে বর্তমানে ৩৪টি প্রকল্প চালু রয়েছে। এর মধ্যে কিছু চুক্তি হয়েছে, কিন্তু কাজ শুরু হয়নি। কিছু প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে কিন্তু অগ্রগতি শূন্য। বেশ কিছু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০১১ সালে কিন্তু প্রকৃত বাস্তবায়ন ২-৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে রেলের সেবা উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি রেলের যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের জন্য ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ এবং ৬০টি ব্রডগেজ কোচ মেরামত/পুনর্বাসনে ১২৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এক বছর পাঁচ মাস পার হতে চলেছে, বাস্তব অগ্রগতি শূন্য। বাকি ছয় মাসে ২৬০টি কোচের সংস্কারকাজ কীভাবে হবে, এর উত্তর কেউ জানে না।
আরো কয়েকটি উদাহরন দেওয়া যাক। রেল ট্রানজিটের ব্যাপারে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সরকার। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে সীমান্ত এলাকার—এ ধরনের রেললাইনের মেরামতকাজ দুই বছর ধরে ঝুলে আছে। রাজশাহী-রোহানপুর সীমান্ত এবং আমনুরা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখায় ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রেললাইনের উন্নয়ন প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয় আড়াই বছর আগে। বাস্তবায়নের জন্য সময় আছে আর এক বছর তিন মাস। বাস্তব অগ্রগতি মাত্র এক শতাংশ। চারবার দরপত্র বাতিল হয়েছে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী জেলা শহর নারায়ণগঞ্জের মধ্যে রেলযোগাযোগ-ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় তিন বছর আগে। ৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্পটির ঠিকাদার ঠিক করতে রেলওয়ে সময় নিয়েছে দুই বছর। গত বছর অক্টোবরে ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত হলেও এখন পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়নি। টঙ্গী থেকে ভৈরববাজার পর্যন্ত দুই লাইন করার উদ্যোগও একই ভাবে ঝুলে আছে। প্রায় ৭২৫ কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন হয় ২০০৬ সালের ১ জুলাই। এরপর প্রায় চার বছর সময় পার হতে চলেছে, কিন্তু বাস্তবে প্রকল্পের তেমন কোনো কাজ শুরু হয়নি।
অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ২০০২-০৩ থেকে ২০০৬-০৭ পর্যন্ত তাদের দশম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রেল উন্নয়নে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি রুপি (ভারতীয় মুদ্রা) ব্যয় করেছে। আর ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত একাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তাদের ব্যয়ের পরিকল্পনা দুই লাখ ৫১ হাজার কোটি রুপি। নতুন রেলমন্ত্রী ভারতে ২০২০ সালের মধ্যে ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার গতিবেগের ট্রেন চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। এভাবেই ভারত ধাপে ধাপে রেলের উন্নয়ন ঘটিয়ে চলেছে। অথচ অত্যাবশ্যকীয় এই অবকাঠামো উন্নয়নে স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকার অবহেলা দেখিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের দেশ যেখানে সমাজের একটি বড় অংশ মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন, এদের অর্থনীতির মূল স্রোতের আওতায় নিয়ে আসতে রেল একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য এ এম এম সফিউল্লাহর সঙ্গে কথা হচ্ছিল এ প্রসঙ্গে। তিনি বললেন, রেলওয়ে অগ্রাধিকার বা পরিকল্পনা প্রণয়নে যত এগিয়ে, বাস্তবায়নে ততটা পিছিয়ে থাকে। এ জন্যই ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া রেলওয়ের বড় ধরনের উন্নতি হয়নি, বরং রেলপথ কমেছে। রেলওয়ের উন্নয়নে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, সেগুলোর উন্নয়ন একদিন পিছিয়ে যাওয়া দেশের উন্নয়নও কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার মতো।
কম খরচে, পরিবেশবান্ধব উপায়ে একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করতে পারে রেল। বাংলাদেশের মত জনবহুল ও প্রায় সমতল একটি দেশে গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবহন ব্যবস্থাটি কেন উপেক্ষিত তা সত্যিই এক বড় প্রশ্ন। ভারতের অভিজ্ঞতা কী আমাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না?
হানিফ মাহমুদ: সাংবাদিক।

আমার দেশ: সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা by আসিফ নজরুল

৩০ মে একটি আলোচনা সভা ছিল টিভি চ্যানেলগুলো নিয়ে। চ্যানেল ওয়ান সরকার বন্ধ করেছে, যমুনা টিভির পরীক্ষামূলক সম্প্রচার বন্ধ রয়েছে। সবারই অভিমত, এগুলো কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশের পরিচায়ক নয়। তবে আলোচনাকালে আমরা একমত হলাম যে প্রিন্ট মিডিয়ার অন্তত সে দুরবস্থা নেই, সরকার চাইলেই কোনো পত্রিকা এখন আর বন্ধ করে দিতে পারবে না। আমরা তখন ভাবতে পারিনি, সরকার চাইলে আসলে সব পারে। সরকারের হাতে আইন, ক্ষমতা, পুলিশ। এসবের অপব্যবহার করে কীভাবে সরকার রাতারাতি একটি দৈনিকের কণ্ঠরোধ করতে পারে তার খুবই খারাপ একটি নজির স্থাপিত হলো ১ জুন। যে প্রক্রিয়ায় এদিন আমার দেশ বন্ধ করে দেওয়া হলো, যে অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হলো, যেভাবে পরে পত্রিকাটির সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুলিশি গ্রেপ্তারে বাধা সৃষ্টির অভিযোগে মামলা হলো তা অচিন্তনীয়, অগ্রহণযোগ্য এবং সকল অর্থে নিন্দনীয়।
আমার দেশ পত্রিকায় সরকারের মন্ত্রী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় প্রতিবেদন ছাপানো হয়েছে। এই পত্রিকাটি সরকারের বিদেশনীতি বিশেষ করে ভারতের প্রতি ‘নতজানু’নীতির তীব্র সমালোচক। এসব প্রতিবেদন ও সমালোচনা সবই ন্যায়সংগত বা বস্তুনিষ্ঠ তা হয়তো বলা যাবে না (আরও বহু পত্রিকার ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য)। এর ফলে দেশের কোনো আইনেরও (যেমন মানহানিসংক্রান্ত দণ্ডবিধির বিধান) লঙ্ঘন হতে পারে, সে ক্ষেত্রে তার বিচার করার জন্য আদালত রয়েছেন। বিভিন্ন আদালতে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে কয়েক ডজন মামলাও করা হয়েছে সে কারণে। অতীতেও বিভিন্ন সরকারের বিরুদ্ধে কিছু পত্রিকার অব্যাহত সমালোচনার মুখে এ রকম মামলা হয়েছে। কিন্তু সে জন্য পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা নব্বই-পরবর্তী সময়ে এই প্রথম।
অতীতে চার দলীয় জোট সরকার কিছু সাংবাদিক ও লেখকের প্রতি নানাভাবে তার অসহিষ্ণুতা ও কখনো কখনো নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছে। তখন আওয়ামী লীগ তীব্রভাবে তার প্রতিবাদ করেছে এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। কিন্তু একের পর এক গণমাধ্যম দমনের পদক্ষেপ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার এই অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ইতিমধ্যেই ধূলিসাৎ করেছে। সবচেয়ে যা ভয়াবহ, আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে সংবাদপত্র দমনে আইনের অপব্যবহারের এক আতঙ্কজনক নজির স্থাপন করেছে।

২.
সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ সাংবাদিকদের ইতিমধ্যে বলেছেন, আমার দেশ সরকার বন্ধ করেনি, বন্ধ করেছেন প্রকাশক! ২ জুন টিভিতে দেখলাম, এই কথা বলে তিনি তড়িঘড়ি সচিবালয়ের লিফটে ঢুকে গেছেন। তাঁর এই বক্তব্য এতই অসার এবং ঠুনকো যে এটি যেকোনো বিবেকবান মানুষকে আরও হতাশ ও বিক্ষুব্ধ করবে।
আমার দেশ প্রকাশক বন্ধ করেননি, এটি সরকারই পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করেছে, এটি সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গ্রেপ্তারের আগে বিভিন্ন প্রমাণসহ সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদুর রহমানের দেওয়া তথ্য এবং বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হওয়া প্রতিবেদন অনুসারে, হাসমত আলীর সম্মতিক্রমে তাঁর বদলে মাহমুদুর রহমানকে আমার দেশ-এর প্রকাশক হিসেবে প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আমার দেশ কর্তৃপক্ষ। সে মোতাবেক জেলা প্রশাসক অফিসে চিঠি লিখে হাসমত আলীর পদত্যাগ ও প্রকাশক হিসেবে মাহমুদুর রহমানের নাম ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়। ৫ নভেম্বর ২০০৯ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দপ্তরের উপপরিচালক (নিবন্ধন) স্বাক্ষরিত একটি পত্রে জেলা প্রশাসক অফিসকে জানানো হয়, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করায় হাসমত আলীর পরিবর্তে প্রকাশক হিসেবে মাহমুদুর রহমানের নাম প্রতিস্থাপন করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এরপর দীর্ঘদিন জেলা প্রশাসক অফিস এ বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
জেলা প্রশাসক এই চিঠি লিখে অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত প্রকাশক হিসেবে হাসমত আলীর নাম ব্যবহার করেছে আমার দেশ কর্তৃপক্ষ। ১৯৭৩ সালের দ্য প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশন (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট অনুসারে প্রকাশক হিসেবে কারও নাম না ছাপিয়ে পত্রিকা বের করা সম্পূর্ণ অবৈধ। আমার দেশ কর্তৃপক্ষের তাই মাত্র দুটো বিকল্প খোলা ছিল: ক. হাসমত আলীর বদলে মাহমুদুর রহমানের নাম প্রকাশক হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত হাসমত আলীর নামই প্রকাশক হিসেবে ছাপানো; খ. অথবা আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা তত দিন পর্যন্ত বন্ধ রাখা। আমার দেশ কর্তৃপক্ষ প্রথম কাজটি করেছে। এটি যদি অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে তার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব জেলা প্রশাসক অফিস তথা সরকারের। ডিএফপি এবং এসবির অনাপত্তি থাকা সত্ত্বেও এত দিন ধরে তার আবেদনটি ঝুলিয়ে রাখা হলো কেন? কেনই বা পত্রিকা বন্ধ ও মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা পরে জানানো হলো যে প্রকাশক হিসেবে মাহমুদুর রহমানের নাম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না?
আগের প্রকাশকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ ও প্রস্তাবিত নতুন প্রকাশকের নাম অনুমোদন না করার মানে হলো, একটি পত্রিকাকে প্রকাশকহীন করে ফেলা। প্রকাশকহীন করা মানে হলো পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়াকে আইনসিদ্ধ করা। ‘দিনবদলের’ সরকারের এই অভিনব আবিষ্কার ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার আরও বিভিন্নভাবে ব্যবহার করবে না এটি ভাবার কোনো কারণ নেই। কুবুদ্ধির প্রতিযোগিতায় কেউ কারও চেয়ে কম যায় না, আমাদের সরকারগুলোর ইতিহাস তো এটিই!
মাহমুদুর রহমানের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াও অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে পারে এ দেশে। হাসমত আলীকে সরকারের একটি বিশেষ এজেন্সি ধরে নিয়ে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করিয়েছে, পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকার ছাপাখানা সিলগালা করেছে, পত্রিকার সম্পাদককে গ্রেপ্তারের জন্য সদলবলে পত্রিকা অফিস ঘিরে ফেলেছে। এসব যদি আমরা সমর্থনীয় ধরে নিই, তাহলে ভবিষ্যতে যেনতেনভাবে মামলা করিয়েই বিরুদ্ধ মতের যে কাউকে গ্রেপ্তার এবং পত্রিকা বন্ধের ঘটনা আমাদের মেনে নিতে হবে। তাই যদি হয়, দেশে আর যা-ই থাকুক, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মানবাধিকার আর আইনের শাসন বলে কিছু থাকবে না।

৩.
মাহমুদুর রহমান ও আমার দেশ-এর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে অর্থাৎ গ্রেপ্তারে বাধাদানের অভিযোগও আনা হয়েছে। মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে গেলে পত্রিকাটির সাংবাদিকেরা অফিসের প্রবেশপথ আগলে রেখেছিলেন। চাইলে এটিকে সরকারি কাজে বাধাদান হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়তো সম্ভব। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো দেশের আইন প্রয়োগ করা হয় সে দেশের সমাজ-সংস্কৃতি অনুসারে। গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কোষাধ্যক্ষকে কোনো একটি মামলায় মধ্যরাতে গ্রেপ্তারের জন্য শাহবাগ থানার ওসিসহ অসংখ্য পুলিশ তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করে। খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কোষাধ্যক্ষসহ অনেক শিক্ষক সেখানে ছুটে যান। পুলিশ একপর্যায়ে তাঁকে গ্রেপ্তার না করে চলে যায়। ওই ঘটনাকেও এক অর্থে সরকারি কাজে বাধাদান বলে আখ্যায়িত করা যায়। আমাদের দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করতে গেলে সমর্থকদের দ্বারা বিক্ষোভ বা তা কিছুটা বিলম্বিত করার ঘটনা ঘটেছে। তাই বলে এসব ঘটনায় সরকারি কাজে বাধাদানের কারণে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি।
সরকার তাহলে এবার এমন খড়্গহস্ত হলো কেন আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে? পত্রিকাটির কয়েকজন প্রসিদ্ধ সাংবাদিকসহ অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার মানে হলো, পত্রিকাটির যেকোনো সাংবাদিককে সেই মামলায় গ্রেপ্তার করার লাইসেন্স নিয়ে রাখা। শুধু চাকরিচ্যুতি নয়, আমার দেশ-এর সাংবাদিকদের তাই এখন পালিয়ে থাকতে হবে গ্রেপ্তার এড়াতে চাইলে।
এই পরিস্থিতি সংবাদকর্মী তথা সংবাদপত্রশিল্পের জন্য এক ঘোর অমানিশার ইঙ্গিতবাহী।

৪.
এসব ঘটনার ভয়াবহ পরিণতি চিন্তা করে আমরা উদ্বিগ্ন। এতে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শুধু তা নয়, এটি অন্য সব সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের জন্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশে সরকারগুলো ঐতিহাসিকভাবে অদক্ষ, দুর্নীতিপরায়ণ এবং চিন্তাচেতনায় সামন্তবাদী। এর বিরুদ্ধে নাগরিক স্বার্থের শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ হচ্ছে সংবাদপত্র। পত্রিকা যে চাইলেই আসলে বন্ধ করে দেওয়া যায়, এই আশঙ্কা গেড়ে বসলে সাংবাদিকতা নানাভাবে শৃঙ্খলিত হবে। সরকারগুলো আরও স্বৈরাচারী হওয়ার সুযোগ পাবে।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সাংবাদিকদের সুস্পষ্ট অনৈক্যই বাংলাদেশের সরকারগুলোকে ক্রমাগত গণমাধ্যমবিরোধী ভূমিকা গ্রহণে বাড়তি সাহস জুগিয়েছে। মাহমুদুর রহমান যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মামলা করেছেন এবং তাঁর পত্রিকায় লিখেছেন, সেই পত্রিকাগুলোতেও আমার দেশ বন্ধের ও তাঁকে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়ার নিন্দা করে সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিক সমিতিগুলো এখনো ঐক্যবদ্ধভাবে এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে পারেনি।
দলমতনির্বিশেষে সাংবাদিকনেতারা সবাই মিলে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার পদক্ষেপ নিলে আমার দেশ (এবং চ্যানেল ওয়ান ও যমুনা টিভি) বন্ধের আদেশ এবং প্রশ্নবিদ্ধ মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়তো সম্ভব। এটুকু দায়িত্ব পালনে তাঁরা যদি ঐক্যবদ্ধ হতে না পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে আরও সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল বন্ধ হবে। আরও সাংবাদিক কোনো না কোনো সময় অন্যায় গ্রেপ্তারের শিকার হবেন।
কোনো মুক্তবুদ্ধির মানুষের কাছে এই পরিস্থিতি কাম্য হতে পারে না।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভেজাল গুড়ের কারখানা -জনস্বাস্থ্যের সর্বনাশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন

নাটোরের লালপুর উপজেলায় গড়ে উঠেছে শতাধিক ভেজাল গুড়ের কারখানা। এসব কারখানায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক হাইড্রোজ, ফিটকারি ও রং ব্যবহার করা হচ্ছে। গুড়ে ভেজাল মিশিয়ে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে। গত রোববারের প্রথম আলোর এ খবরে তাই আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই।
খাদ্যসামগ্রী তৈরির সময় জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা থাকা দরকার। কিন্তু অধিক মুনাফার আশায় পণ্যকে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করতে কিছু সংখ্যক অসাধু ব্যবসায়ী ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করছেন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে। তা ছাড়া যে পরিবেশে সাধারণের জন্য গুড় প্রস্তুত করা হয়, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি ছবিই বলে দেয়, লালপুরে কতটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হয় গুড়—একদিক খোলা একটি ঘরের ভেতর, যেখানে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে গুড়, তার পাশেই স্তূপ করে রাখা আছে ময়লা। এমন পরিবেশে এবং ক্ষতিকর উপাদানে প্রস্তুত ভেজাল গুড় শুধু জনস্বাস্থ্যের সর্বনাশই নয়, ভোক্তার জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণও হতে পারে। এ ধরনের গুড় খেলে কিডনি ও পাকস্থলীর নানা জটিল রোগ হতে পারে।
সারা দেশের মানুষের কাছে গুড় অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গ্রাম-শহর সর্বত্র গুড় দিয়ে তৈরি করা হয় নানা উপাদেয় খাবার। এর ভোক্তা সারা দেশের সাধারণ মানুষ। তাই যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এ ধরনের দূষিত খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন ও বাজারজাত করে জনস্বাস্থ্যের সর্বনাশ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কেও সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার। ভেজাল মেশানোর প্রবণতা রুখতে নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। প্রতিটি ভেজালবিরোধী অভিযান কিছু মাত্রায় অবস্থার উন্নতি ঘটায়।

আবাসিক ভবনের আতঙ্কিত মানুষ -সমবায়ভিত্তিক নিরাপদ আবাসন গড়ে তুলুন

নিমতলীর অভিশপ্ত ভবনের নিচতলায় অতিমাত্রায় দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের মজুদ ছিল। রোববার প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনের মালিক বিছানার ফোম ও জুতার সোল তৈরির কাজে ব্যবহূত দুই ধরনের রাসায়নিক পদার্থের ব্যবসা করতেন। তিনিই ওই মারাত্মক রাসায়নিক পদার্থ এনে নিজের বাসায় রেখেছিলেন। আগুনের কাছে এলে রাসায়নিক পদার্থগুলো প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়ায়। ধারণা করা হয়, বিয়েবাড়ির রান্নার আয়োজন থেকে রাসায়নিক পদার্থ উত্তপ্ত হয়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সবকিছু পরিষ্কার হবে। কিন্তু আপাতত দেখা যাচ্ছে, আবাসিক ভবনে দাহ্য পদার্থ রাখার কারণে মুহূর্তের মধ্যে আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়ির মালিকেরা মনে করেন, নিজের বাড়িতে যা খুশি রাখবেন, তাতে কার কী? কিন্তু রাসায়নিক পদার্থ সংরক্ষণ, গুদামজাত করা ও পরিবহনের সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। আবাসিক ভবনে এসব বিপজ্জনক বস্তু রাখা প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। যিনি ব্যবসা করেন, তাঁকে রাসায়নিক পদার্থের বিপদ সম্পর্কে অবহিত থাকতে হবে। এখানে অজ্ঞতার কোনো স্থান নেই।
নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সরকার ও নগর কর্তৃপক্ষের চোখ খুলে যাওয়া উচিত। এ মুহূর্তে একটি ঝটিকা জরিপ চালিয়ে পুরান ঢাকাসহ সমগ্র মহানগরের কোন কোন এলাকায় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থের মজুদ রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেক আবাসিক এলাকার কোনো বাসার সামান্য খোলা প্রাঙ্গণ মবিলের মতো দাহ্য পদার্থের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেখানে আগুনের সামান্য ফুলকি থেকে জ্বলে উঠতে পারে একেকটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এসব বিপজ্জনক স্থান চিহ্নিত ও দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা করা না হলে বারবার নিমতলীর মতো ভয়াবহ মৃত্যু হানা দেবে এ মহানগরে।
পুরান ঢাকায়ই শুধু নয়, নতুন ঢাকার বেগুনবাড়ি, মহাখালী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আরামবাগ, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় নিম্নবিত্তদের বস্তি তো আছেই, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে-ওঠা বহুতল ভবনের ‘অভিজাত বস্তি’ও রয়েছে। কোথাও ভবন হেলে পড়ছে, আবার কোনো কাঁচা বস্তি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, অসহায় মানুষ জীবন দিচ্ছে। পুরান ঢাকার ঘনবসতি এলাকায় বিদ্যুতের তারগুলো এমনভাবে জড়াজড়ি করে রয়েছে যে অলৌকিক কারণ ছাড়া কারও বাঁচার কথা নয়। গত ছয় মাসে শুধু রাজধানী ঢাকায়ই ৮৮১টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর পরও কি সরকার ও কর্তৃপক্ষ নির্লিপ্ত থাকবে?
ঘনবসতি এলাকাগুলোর জমির মালিকেরা নিজ উদ্যোগে ছোট ছোট সমবায় গড়ে তুলতে পারেন। তাঁরা সম্মিলিতভাবে একেকটি আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। রাজউকের নিয়ম মেনে চারপাশে পর্যাপ্ত জমি ছেড়ে বহুতল ভবন নির্মিত হবে। জমির মালিকানার অনুপাতে ফ্ল্যাট—এ নীতির ভিত্তিতে আবাসিক প্রকল্প নেওয়া সম্ভব। সরকারের উচিত, এ ধরনের উদ্যোগে ব্যাংকঋণ সহজলভ্য করা। রাজউকের উচিত, স্থাপত্যবিদ ও প্রকৌশলী দিয়ে সাহায্য করা। এগুলো হবে সমবায়ভিত্তিক আবাসিক প্রকল্প। প্রচলিত ‘হাউজিং’ ব্যবসার মুনাফা দ্বারা চালিত না হয়ে সমবায়ভিত্তিক পারস্পরিক কল্যাণ সাধনই হবে এর মূল প্রেরণা। এভাবে নিজেদের জন্য নিজেরা নিরাপদ আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু এ জন্য রাজউককে পুরোনো ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগ করে এগিয়ে আসতে হবে কল্যাণধর্মী নতুন পরিকল্পনা নিয়ে। নগর পরিকল্পনাবিদেরা এ ক্ষেত্রে সহায়তা দিতে পারেন। বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনার সময় এসেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান পদে জেমস ক্ল্যাপারের নাম ঘোষণা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জেমস ক্ল্যাপারকে দেশটির গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন। সাবেক এই জেনারেল মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগনের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রেসিডেন্ট ওবামা গত শনিবার হোয়াইট হাউসে বলেন, ‘আমি দেশের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে সাবেক জেনারেল জেমস ক্ল্যাপারের নাম ঘোষণা করছি। তিনি অনেক অভিজ্ঞ এবং সম্মানিত একজন কর্মকর্তা।’ এ সময় প্রেসিডেন্ট যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই পদে ক্ল্যাপারের মনোনয়ন অনুমোদন করতে সিনেটের প্রতি আহ্বান জানান।
৬৯ বছর বয়সী ক্ল্যাপার মার্কিন বিমানবাহিনীতে ৩২ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯৫ সালে অবসরগ্রহণ করেন।
১৬ মাস দায়িত্ব পালন শেষে প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তার পদ থেকে পদত্যাগ করেন ডেনিস ব্লেয়ার। এর প্রায় দুই সপ্তাহ পর ওই পদে ক্ল্যাপারকে মনোনয়ন দেওয়া হলো।

সাগর থেকে দিনে ১০ হাজার ব্যারেল তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে

মেক্সিকো উপসাগরে তেলক্ষেত্রের ক্ষতিগ্রস্ত পাইপ দিয়ে বেরিয়ে আসা তেল সংগ্রহের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে। এখন সাগরের পানি থেকে প্রতিদিন ১০ হাজার ব্যারেল তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর পরিমাণ আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ওই তেলক্ষেত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রলিয়াম এ তথ্য জানিয়েছে।
এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শনিবার সাপ্তাহিক বেতার ভাষণে বলেছেন, তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হবে। উপকূল রক্ষায় সম্ভাব্য সবকিছু করা হবে।
বিপির নির্বাহী প্রধান টনি হেওয়ার্ড গতকাল রোববার বলেন, ‘আমরা এখন দিনে ১০ হাজার ব্যারেল তেল সংগ্রহ করছি। যা আগে ছিল দিনে ছয় হাজার ব্যারেল পর্যন্ত।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, তেল সংগ্রহের জন্য শিগগিরই পৃথক একটি পদ্ধতি চালু করা হবে। এতে তেলক্ষেত্র থেকে বের হওয়া একটি বড় অংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। নতুন পদ্ধতিতে দিনে কী পরিমাণ তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেননি তিনি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, এতে সব মিলে দিনে ১৯ হাজার ব্যারেলেরও বেশি তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। নতুন পদ্ধতিতে তেলক্ষেত্রের পাইপের ছিদ্র হওয়া জায়গায় পাইপ লাগিয়ে তা দিয়ে তেল সরাসরি জাহাজের কন্টেইনারে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এর আগেও এভাবে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। তবে গতবারের পদ্ধতি কিছুটা পরিবর্তন করে এবার আরও বাস্তবসম্মত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত বিকল্প কূপ খনন করে পর্যাপ্ত সিমেন্ট ও কাদা ব্যবহার করে পাইপের ছিদ্র বন্ধ করতে হবে। বিপি অবশ্য কূপ খনন কাজ শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে তারা এটা করতে পারবে।
গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের কাছে মেক্সিকো উপসাগরের ওই তেলক্ষেত্রে বিস্ফোরণ হয়। এরপর থেকে তেলক্ষেত্রের ক্ষতিগ্রস্ত পাইপ দিয়ে অনবরত তেল বেরিয়ে সাগরের পানিতে মিশছে। এ পর্যন্ত দুই কোটি গ্যালন অশোধিত তেল সাগরে মিশেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলি নারী বিয়ে করা পুরুষের নাগরিকত্ব রদের তাগিদ

ইসরায়েলি নারীদের বিয়ে করা মিসরীয় পুরুষদের নাগরিকত্ব বাতিল করা-সংক্রান্ত নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখেছেন কায়রোর একটি উচ্চ আদালত। আদালত এসব মিসরীয় পুরুষ ও তাঁদের সন্তানদের নাগরিকত্ব বাতিল করার বিষয়টি বিবেচনা করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন।
গত বছর একটি নিম্ন আদালত নাগরিকত্ব আইনের একটি বিশেষ ধারা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। ওই আইনের আওতায় ইসরায়েলের সেনাবাহিনীতে কাজ করেছে অথবা জায়নবাদের (ইহুদি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন) সমর্থক এমন কাউকে বিয়ে করা মিসরীয়র নাগরিকত্ব বাতিলের বিধান রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিম্ন আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করেছিল। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কায়রোর একটি উচ্চ আদালত গতকাল রোববার এ রায় দেন।
নিম্ন আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, কর্মকর্তারা সব কেস মন্ত্রিসভায় পাঠাবেন এবং আলাদা আলাদাভাবে তা বিবেচনা করা হবে।
আদালতের এ রায়কে ১৯৭৯ সালের শান্তি চুক্তি সত্ত্বেও প্রতিবেশী ইসরায়েলের প্রতি মিসরের নেতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফিলিস্তিনের গাজার জন্য ত্রাণবাহী নৌবহরে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় মিসরে এ মুহূর্তে তীব্র ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বিরাজ করছে।
নাগরিকত্ব আইন বাস্তবায়নের দাবিতে নাবিহ ইল-ওয়াহাস নামের একজন আইনজীবী মামলাটি করেছিলেন। তিনি বলেন, মিসরের তরুণ-তরুণীদের সুরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি এ মামলা করেছেন। তিনি আরও বলেন, মিসরীয় পুরুষ ও ইসরায়েলি নারীর সন্তানদের মিসরের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়। আরব বিশ্ব ও মিসরের প্রতি অনুগত নয়, এমন একটি প্রজন্ম সৃষ্টি করা ঠিক হবে না।
উচ্চ আদালতের এ রায়ে অনেকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নেগাদ আল-বোরাই নামের একজন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী আদালতের এ রায়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, কেবল দেশের বিরুদ্ধে কেউ গুপ্তচরবৃত্তি করলে তাঁর নাগরিকত্ব বাতিলের বিধান রয়েছে। আদালত এ রায়ের মাধ্যমে একজন ইসরায়েলিকে বিয়ে করাকে গুপ্তচরবৃত্তির সমান বিবেচনা করছেন।
প্রায় ৩০ হাজার মিসরীয় ইসরায়েলি নারীদের বিয়ে করেছেন।

নাওতো কানকে সহযোগিতার অঙ্গীকার ওবামার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। গত শনিবার টেলিফোন করে ওবামা তাঁকে এ শুভেচ্ছা জানান। এ সময় ওবামা জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে কানকে সর্বাত্মক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেন। এ ছাড়া তাঁরা উত্তর কোরিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন।
জাপানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওকিনাওয়া ঘাঁটি নিয়ে বর্তমান সরকার খুবই বিব্রতকর অবস্থায় আছে। এ জন্য কান ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ওই সমস্যা নিরসনের ব্যাপারে সাধ্যমতো চেষ্টা করার অঙ্গীকার করেন। জাপানের আগের সরকার এ ইস্যুটিকে কেন্দ্র করেই পদত্যাগ করে। ওই সরকারের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল জাপানের মাটি থেকে মার্কিন ঘাঁটির অপসারণ। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে হাতোইয়ামা সরকারকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। ওকিনাওয়া দ্বীপের অনেক অধিবাসীই মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ব্যাপারে ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে তিন মার্কিন সেনার হাতে ১২ বছরের এক জাপানি কিশোরী ধর্ষিতা হওয়ার পর থেকে মার্কিন ঘাঁটি অপসারণের ব্যাপারে জনমত জোরালো হতে থাকে।

কলকাতার মেয়র হচ্ছেন শোভন চট্টোপাধ্যায়

কলকাতা পুরসভার মেয়র হিসেবে শোভন চট্টোপাধ্যায়কে মনোনীত করা হয়েছে। আর ডেপুটি মেয়র হিসেবে মনোনীত হয়েছেন ফরজানা আলম। শোভন চট্টোপাধ্যায় আগের কলকাতা পুরসভার দু-দুবার মেয়র পারিষদ সদস্য ছিলেন।
গতকাল রোববার তৃণমূল কংগ্রেসের নবনির্বাচিত কাউন্সিলরদের এক বৈঠকে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান হিসেবে সচ্চিদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলনেতা হিসেবে মনজর ইকবালের নাম ঘোষণা করা হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই জানিয়েছিলেন, এবার মেয়র ও ডেপুটি মেয়র নির্বাচনে তিনি অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আনুগত্যকেও গুরুত্ব দেবেন। ১৬ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র নির্বাচন করা হবে এবং ওই দিনই মেয়র শপথ নেবেন।
গতকালের সভা থেকেই কলকাতা পুরসভার জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ ঘোষণা করা হয়। এই উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন ডেরেক ওব্রায়েন, সুমিত্রা সেন, দেবশ্রী রায়, নচিকেতা, ব্রাত্য বসুসহ শহরের বিশিষ্ট নাগরিকেরা।
উল্লেখ্য, কলকাতা পুরসভায় ছয় বছর পর তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরল। কলকাতার ১৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ৯৫টি ওয়ার্ডে জয়ী হয়ে এককভাবে বোর্ড গঠন করতে চলেছে।

নিউইয়র্কে সোমালিয়াগামী দুই মার্কিন গ্রেপ্তার

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের দুজন নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। শনিবার নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। সোমালিয়ায় অবস্থিত মার্কিন সেনাদের হত্যার উদ্দেশে তাঁরা সেখানে যাচ্ছিলেন বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা ।
নিউইয়র্কের স্টার লেজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হচ্ছেন মোহাম্মদ হামাউদ এলিসা (২০) এবং কার্লোস এডওয়ার্ডো (২৬)। বিমান ছাড়ার কিছুক্ষণ আগে তাঁদের সেখান থেকে নামিয়ে আনা হয়। তাঁরা মিসর হয়ে সোমালিয়া যাচ্ছিলেন।

উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই: যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র ও তার এশীয় মিত্ররাষ্ট্রগুলো দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধজাহাজডুবির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। ওয়াশিংটন বলেছে, এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যকর নাও হতে পারে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কম বিকল্প পথই খোলা রয়েছে। এদিকে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে সিউলের অব্যাহত কূটনৈতিক তৎপরতার কড়া সমালোচনা করেছে উত্তর কোরিয়া। তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানকে নিয়ে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে সিউল।
যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত শনিবার সিঙ্গাপুরে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা-প্রধানদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘উত্তর কোরিয়ার উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে আমাদের একতাবদ্ধ থাকাটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ।’
বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে গেটস বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাষ্ট্রগুলোর কাছে কম বিকল্প পথই খোলা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বহির্বিশ্ব কী ভাবছে তার তোয়াক্কা করছে না পিয়ংইয়ং। নিজ দেশের জনগণের কল্যাণের কথাও ভাবছে না তারা। কূটনৈতিকভাবে তাদের বিরত রাখা যাবে বলে মনে হয় না। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।’ তিনি আরও বলেন, নিয়ত পরিবর্তনশীল পিয়ংইয়ং যে আবারও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাবে না, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
গত মার্চ মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজ টর্পেডোর আঘাতে ডুবে যায়। এতে ৪৬ জন নাবিকের প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনায় গঠিত আন্তর্জাতিক তদন্ত দল বলেছে, উত্তর কোরিয়ার ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে যুদ্ধজাহাজটি ডুবে যায়।
দক্ষিণ কোরিয়া তাদের জাহাজডুবির ঘটনায় গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
পিয়ংইয়ং জাহাজডুবির ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এ ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তেজনামূলক কূটনৈতিক তৎপরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। উত্তর কোরীয় মুখপাত্র মিনজু জসন বলেন, বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা এবং উত্তর কোরিয়ার লোকজনকে আঘাত ও হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে বিশ্বাসঘাতকতা করছে দক্ষিণ কোরিয়া।
দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে তাদের দাবি হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার নতুন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা। এ ছাড়া তারা পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে।
আন্তর্জাতিক তদন্ত দলের প্রতিবেদন প্রকাশের পর পিয়ংইয়ং সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, জাহাজডুবির ঘটনাকে সিউল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপনের চেষ্টা চালালে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের প্রস্তাব উত্থাপিত হলে তা পাস হতে পাঁচ ভেটো দানকারী দেশের মধ্যে রাশিয়া ও চীনের সমর্থন অবশ্যই লাভ করতে হবে সিউলকে।
তবে রাশিয়া বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজডুবির ঘটনায় উত্তর কোরিয়া জড়িত বলে যে অভিযোগ উঠেছে মস্কোর এ ব্যাপারে শতভাগ প্রমাণ দরকার। আন্তর্জাতিক তদন্ত দলের প্রতিবেদন যাচাইয়ের জন্য রাশিয়া তাদের নৌবাহিনীর একটি বিশেষজ্ঞ দল সিউলে পাঠিয়েছে। এই দলটি জাহাজডুবির ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করবে। দক্ষিণ কোরিয়া বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য চীনের কাছেও তাদের বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে বেইজিং এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি।

ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে বৈঠক করবেন মার্গারেট থ্যাচার

ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার আগামী বুধবার দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে এ দুই নেতা সাক্ষাৎ করবেন বলে জানা গেছে।
ব্রিটিশ ডেইলি মেইল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কনজারভেটিভ পার্টি (টোরি) লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টির (লিব ডেম) সঙ্গে জোট সরকার গঠন করায় কনজারভেটিভ অনেকের আশঙ্কা, এতে তাঁদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি হুমকির মুখে পড়বে। মূলত এমন কিছু ঘটবে না—এ বিষয়ে দলকে আশ্বস্ত করতেই লৌহমানবীখ্যাত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থ্যাচার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন যৌথভাবে এ বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেন।
৮৪ বছর বয়সী থ্যাচার লিব ডেমের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়টি সমর্থন করলেও, হাউস অব কমন্সে নির্বাচনপ্রক্রিয়া সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি দলটির অবস্থান নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন।
ক্যামেরন ১৯৯৫ সালে কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান নির্বাচিত হওয়ার সময় থেকে মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে শুরু করে।
গত বছর এক সাক্ষাৎকারে ডেভিড ক্যামেরন অঙ্গীকার করেন, কঠিন অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেও তিনি সাহস, প্রত্যয় এবং প্রজ্ঞায় মার্গারেট থ্যাচারকে ছাড়িয়ে যাবেন।

টাইটানে প্রাণীর অস্তিত্ব আছে: নাসা

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, শনি গ্রহের অন্যতম বড় উপগ্রহ টাইটানে আদি-পর্যায়ের প্রাণী থাকার ব্যাপারে তাঁরা সূত্র পেয়েছেন। টাইটানের পৃষ্ঠের রাসায়নিক মিশ্রণ পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, সেখানকার আবহাওয়া মণ্ডলে ওই প্রাণীরা শ্বাস নিচ্ছে ও টাইটানের পৃষ্ঠের জ্বালানি থেকে খাদ্য পাচ্ছে।
নাসার ‘ক্যাসিনি’ মহাকাশযান থেকে পাঠানো তথ্য নিয়ে দুটো আলাদা গবেষণা পরিচালনা করেন বিজ্ঞানীরা। ওই গবেষণার ভিত্তিতে টাইটানে প্রাণের সন্ধান পাওয়ার এই দাবি করেন তাঁরা।
গ্রহ-উপগ্রহবিষয়ক সাময়িকী ইকারুস-এ প্রকাশিত প্রথম গবেষণাপত্রে বলা হয়, টাইটানের আবহাওয়া মণ্ডলে বিদ্যমান হাইড্রোজেন গ্যাস এর পৃষ্ঠে হারিয়ে যায়। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওই প্রাণীরা শ্বাস নিতে পারে। জার্নাল অব জিওফিজিক্যাল রিসার্চ-এ প্রকাশিত দ্বিতীয় গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, ওই উপগ্রহের পৃষ্ঠে রাসায়নিক পদার্থের ঘাটতি দেখা গেছে। সম্ভবত, প্রাণীরা খেয়ে ফেলার কারণে এই ঘাটতি হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার আমেস রিসার্চ সেন্টারের জোত্যির্জীব বিজ্ঞানী ক্রিস ম্যাককেই বলেন, ‘টাইটানে হাইড্রোজেন গ্রহণ করার বিষয়টিকে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি, কারণ এটি সেখানে জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য গ্যাস। পৃথিবীতে আমরা যেভাবে অক্সিজেন গ্রহণ করি, টাইটানে হাইড্রোজেন গ্রহণ করার বৈশিষ্ট্য তার খুব কাছাকাছি।’
ম্যাককেই বলেন, ‘যদি এই বিষয়গুলো সেখানে প্রাণের উপস্থিতি নিশ্চিত করে, তাহলে আমাদের আবিষ্কার দ্বিগুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ এটি দ্বিতীয় এক ধরনের প্রাণের উপস্থিতি নিশ্চিত করবে, যা পৃথিবীর পানিনির্ভর প্রাণ থেকে পুরোপুরি আলাদা।

সোনিয়াকে নিয়ে লেখা বিতর্কিত বই প্রকাশে লড়াই করবেন মোরো

ভারতের ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান শরিক দল কংগ্রেসের প্রধান সোনিয়া গান্ধীর জীবনী নিয়ে স্পেনের এক লেখকের বিতর্কিত বই ভারতে প্রকাশ নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে কংগ্রেস। তবে এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন স্প্যানিস লেখক হাভিয়ের মোরো।
সোনিয়ার জীবনী নিয়ে মোরোর লেখা ‘দ্য রেড শাড়ি: হোয়েন লাইফ ইজ দ্য প্রাইস অব পাওয়ার’ শিরোনামের বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, ডেনমার্কসহ কয়েকটি দেশে এ পর্যন্ত বইটির তিন লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।
সোনিয়ার দল কংগ্রেসের অভিযোগ, বইটিতে লেখক সোনিয়াকে উন্নাসিক চরিত্রের একজন নারী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। এতে বলা হয়, ১৯৯১ সালের ২১ মে স্বামী রাজীব গান্ধী নিহত হওয়ার পর সোনিয়া তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে ভারত ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ১৯৭৫ সালে সোনিয়ার শাশুড়ি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির নেপথ্যেও তাঁর হাত ছিল। মোট কথা, বইটিতে সোনিয়া সম্পর্কে অসত্য, অর্ধসত্য, অপমানজনক মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই বইটি ভারতে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশে উদ্যোগ নিয়েছে রলি বুকস নামের একটি প্রকাশনা সংস্থা। এই খবর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রকাশকের কাছে আইনি নোটিশ পাঠায় কংগ্রেস। কিন্তু রলি বুকস বই প্রকাশের সিদ্ধান্তে অনড়। তাই কংগ্রেস নেতৃত্ব বইটির প্রকাশনা বন্ধে আইনি লড়াইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। সোনিয়ার আইনজীবীরা দাবি করেন, বইটিতে অসত্য, বিকৃত ও মানহানিকর বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়েছে। একই দাবি করে শনিবার মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ করেছেন সোনিয়ার সমর্থকেরা। তাঁরা ইন্টারনেট থেকে বইটির কপি সংগ্রহ করে তা পুড়িয়ে দেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে লেখক মোরো বইটি ভারতে প্রকাশের ব্যাপারে লড়াই শুরুর প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি বলেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো হয়। আমি মনে করি বইটি প্রকাশ করতে কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।’ লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকাকে মোরো বলেন, ‘বইয়ে উল্লিখিত বিষয়বস্তু শত ভাগ ঠিক, তা বলব না। তবে গবেষণা করে বাস্তবানুগভাবে তা তুলে ধরেছি।’

শিশুদের মুটিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে মিশেল ওবামার যুদ্ধ ঘোষণা

শিশুদের মুটিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা। স্কুল শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেরা সব রন্ধনশিল্পীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। মার্কিন রন্ধনশিল্পীদের এক সমাবেশে মিশেল ওবামা এ আহ্বান জানান।
মিশেল ওবামা গত শনিবার হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে ওই বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেন। ফার্স্ব লেডির আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সব রন্ধনশিল্পীর সমাবেশ ঘটেছিল সেদিন।
ব্যতিক্রমী এ সমাবেশে মিশেল ওবামা বলেন, শিশুদের মুটিয়ে যাওয়া রোধে সবার মেধা ও সময়কে কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, রান্নার কাজে নিয়োজিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাই এ কাজে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সব জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে মার্কিন শিশুদের রক্ষা করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
মিশেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ এখন মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যায় জর্জরিত। গত তিন দশকে মার্কিন শিশুদের মধ্যে এ স্বাস্থ্য সমস্যা তিনগুণ বেড়েছে। খাদ্যাভ্যাসে নাটকীয় পরিবর্তন না আনলে মুটিয়ে যাওয়াটা মহামারি আকারে দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শনিবারের সমাবেশ থেকে ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য। প্রাথমিকভাবে পাঁচ শতাধিক রন্ধনশিল্পী বাছাই করা হয়েছে। এই রন্ধনশিল্পীরা স্কুল-কলেজে যাবেন। স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর এবং সুষম খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করবেন।
সমবেত রন্ধনশিল্পীদের উদ্দেশে মিশেল ওবামা বলেন, মুটিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে আমাদের এ লড়াইটি সহজ হবে না। স্থানীয়ভাবে সমস্যা অনুধাবন করতে হবে। স্কুলের রান্নাঘরে খাবার তৈরিতে পরিবর্তন আনতে হবে। পুরো কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি এবং এর সাফল্যের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার জন্য তিনি রন্ধনশিল্পীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্তবেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় টিটি

প্রথমবারের মতো নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে কাল শুরু হয়েছে এই টুর্নামেন্ট। পাঁচ দিনের টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে ১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়—ইউআইইউ, প্রাইম এশিয়া, নর্থসাউথ, ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্দান, সাউথ ইস্ট, আহসানউল্লাহ, প্রেসিডেন্সি, ড্যাফোডিল, ইউ ল্যাব, পিপলস, আইইউটি, দারুল ইহসান, আইইউবিএটি, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ‘এ’ দল ও বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ।

রাজত্ব ফিরে পেলেন নাদাল

মাটির কোর্টই প্রিয় দুজনের। এবার ফ্রেঞ্চ ওপেনে দুজন খেলছিলেনও দুর্দান্ত। রবিন সোদারলিং তো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন রজার ফেদেরারকে হারিয়েছেন কোয়ার্টার ফাইনালে। সব মিলে কাল জমাট একটা লড়াই দেখার প্রত্যাশায় ছিল সবাই। কোথায় কী! সোদারলিংকে নিয়ে স্রেফ ছেলেখেলা করলেন রাফায়েল নাদাল। ৬-৪, ৬-২, ৬-৪ গেমে হারিয়ে পুনরুদ্ধার করলেন তাঁর রাজত্ব। ফ্রেঞ্চ ওপেনে এটি তাঁর পঞ্চম শিরোপা। সব মিলে ক্যারিয়ারের সপ্তম গ্র্যান্ড স্লাম। এই জয়ে নাদাল ফিরে পেলেন তাঁর র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর জায়গাটিও।
গত বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতার পর থেকে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন আগুনে মূর্তির নাদাল। এই সোদারলিংয়ের কাছে ফ্রেঞ্চ ওপেনে হেরেছিলেন চতুর্থ রাউন্ডে। উইম্বলডনের শিরোপাও ধরে রাখা হয়নি চোটের কারণে। নতুন বছরে নাদাল আবারও অপ্রতিরোধ্য। কাল প্যারিসে সোদারলিংয়ের অসহায় আত্মসমর্পণ যেন সেই আভাসই দিল। এবার পুরো টুর্নামেন্টে নাদাল একটি সেটও হারেননি। ২০০৮ সালেও এই কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। তা ছাড়া এই ট্রফিটা বিওন বোর্গের একদম পেছনে নিয়ে বসাল তাঁকে। রেকর্ড ছয়টি ফ্রেঞ্চ ওপেন শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব আছে বোর্গের। আগামী বছরই হয়তো তাঁকে ছুঁয়ে ফেলবেন এই ২৪ বছর বয়সী স্প্যানিয়ার্ড।
অন্যদিকে টানা দ্বিতীয় বছর এখানে ফাইনালে উঠেও রানারআপ হওয়ার সান্ত্বনাই সঙ্গী হলো সোদারলিংয়ের। নাদালের কাছ থেকেই অবশ্য সবার আগে পেলেন সহানুভূতি, ‘আমি আমার সেরা খেলাটাই খেলেছি। না হলে তোমাকে হারানো আসলেই কঠিন।

দোলাচলেই দ্রগবা-রোবেন

আর মাত্র চারটি দিনের অপেক্ষা। কোন তারকা কী বলছেন, কোচদের মনের অবস্থা কী—কত বিষয় নিয়েই না আলোচনা হতে পারত এখন। তা না, বিশ্বকাপ শুরুর এই অন্তিমলগ্নে এসে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠল ইনজুরি।
আপাতত এসব আলোচনার শীর্ষভাগ-জুড়ে আছেন দিদিয়ের দ্রগবা ও আরিয়েন রোবেন। এই দুজনেরই ইনজুরির পর খবর ছিল, বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছেন তাঁরা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত দ্রগবার ব্যাপারে আশা শুনিয়ে যাচ্ছে আইভরিকোস্ট। অন্যদিকে রোবেনের ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো খবর নেই। শনিবার নিজ দেশে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ৬-১ গোলে জেতা ম্যাচে ঊরুতে চোট পান এই মিডফিল্ডার। ওই ম্যাচে তিনি নিজেও করেছেন জোড়া গোল।
দ্রগবা চোট পেয়েছিলেন একদিন আগে। সুইজারল্যান্ডের সিয়নে শুক্রবার জাপানের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে হাত ভেঙে যায় তাঁর। এর পর থেকেই আইভরিকোস্ট অধিনায়ককে নিয়ে সংশয়। নিশ্চিত কোনো খবর এখনো নেই। তবে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরশু তাঁর হাতে সফলভাবে অস্ত্রোপচার করানো হয়েছে। ১১ জুন বিশ্বকাপ শুরু হলেও দ্রগবাদের প্রথম ম্যাচ পড়েছে ১৫ তারিখ। ফলে বাড়তি কিছুদিন সময় পাওয়া যাবে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এই স্ট্রাইকারের পুরো ফিট হয়ে উঠতে। দ্রগবা প্রথম ম্যাচে খেলতে না পারলেও অন্তত গ্রুপ পর্বের বাকি দুই ম্যাচে তাঁকে পেতে চায় আইভরিকোস্ট।
রোবেনকেও পাওয়ার আশা ছাড়ছে না ডাচরা। রোবেনকে দেশে রেখেই দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছে দল। দেশেই চলবে তাঁর চিকিৎসা। তাঁর জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে নেদারল্যান্ড। দেশে রেখে গেলেও পুরো দলের শুভকামনা থাকছে তাঁর জন্য। যদিও হল্যান্ড অধিনায়ক জিওভান্নি ফন ব্রঙ্কহর্স্টের আশঙ্কা, রোবেনের বিশ্বকাপ হয়তো শেষ হয়েই গেছে, ‘আমি আশাবাদী হতে পারছি না। ওর খুব ব্যথা হচ্ছে এবং হাঁটতেই কষ্ট হচ্ছে।’
আগেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেছে ইংলিশ অধিনায়ক ফার্ডিনান্ডের। স্টিভেন জেরার্ডকে নতুন অধিনায়ক ঘোষণা করা হয়েছে, নেওয়া হয়েছে তাঁর বদলি খেলোয়াড়। ইংল্যান্ডের রাস্টেনবার্গ বেসক্যাম্প থেকে ফার্ডিনান্ডের বিদায়ের সব আয়োজন শেষ হলেও, ফার্ডিনান্ড নিজে নাকি দেশে ফিরতে চাচ্ছেন না। ফার্ডিনান্ডও নাকি এখন বেকহামের মতো দলের সঙ্গে থেকে সতীর্থদের উজ্জীবিত করতে চান। এখন দেখার বিষয়, ইংল্যান্ড উজ্জীবিত হতে কতজনকে এ রকম রাখতে পারে!
সে ফার্ডিনান্ডের যাই হোক, তার মতো বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া থেকে রেহাই পেয়ে গেছেন ডিয়েগো ফোরলান। উরুগুয়ের এই বড় তারকা কিম্বার্লিতে বেসক্যাম্পের অনুশীলনে পায়ে চোট পেয়েছিলেন। খানিক পরে তাঁকে সুস্থ ঘোষণা করা হয়েছে। একই অবস্থা স্লোভাকিয়ার ডিফেন্ডার মার্টিন স্কার্টেলের। কোস্টারিকার বিপক্ষে ৩-০ গোলে জেতা ম্যাচে ইনজুরিতে পড়েছিলেন এই লিভারপুল ডিফেন্ডার। জাপানের ডিফেন্ডার ইয়াসুয়ুকি অবশ্য কমপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ মিস করতে যাচ্ছেন। দ্রগবার ইনজুরিতে পড়া ম্যাচেই হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন তিনি।
সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, প্রস্তুতি ম্যাচে না নেমে ঘরে বসে থাকাই এখন তারকাদের জন্য নিরাপদ। তবে ক্যাপেলো জানিয়ে দিয়েছেন, শেষ প্রস্তুতি ম্যাচেও দলের তারকাদের মাঠে নামাবেন তিনি, ‘সতর্ক থাকলেও অনেক সময় কাজ হয় না। কেউ ভবিষ্যৎ জানে না। কিন্তু খেলতে তো হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে খেলবে এমন সব খেলোয়াড়কে আমার (প্রস্তুতি ম্যাচে) খেলাতেই হবে।’
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ঠিক আগে আগে তৈরি হওয়া ইনজুরির মিছিল দেখে একটু সান্ত্বনা পেতে পারেন মাইকেল বালাক, রিও ফার্ডিনান্ডরা। এবার বড় তারকার ছিটকে পড়া শুরু হয়েছিল বালাককে দিয়ে। চেলসির হয়ে এফএ কাপের ফাইনালে খেলতে গিয়ে চোট পান জার্মান অধিনায়ক। এর পর থেকে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, চেলসির খেলোয়াড়দেরই এবার বিশ্বকাপে কোনো একটা অভিশাপ লেগেছে। বালাকের পর একে একে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছেন চেলসির খেলোয়াড় ঘানার মাইকেল এসিয়েন, নাইজেরিয়ার জন ওবি মিকেল এবং সংশয়ে আছেন দ্রগবা।

যে রহস্যের ব্যাখ্যা নেই!

বৃষ্টির কারণে খেলা শুরু হতে হতে লাঞ্চের পর। কাল সকালের সময়টা বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানদের কাটল টেলিভিশন রিপ্লেতে প্রথম ইনিংসের আউটগুলো দেখে। ব্যাটসম্যানরা সেগুলো দেখেছেন, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলেননি। বলবেন কি? ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের আসলেই কি কোনো ব্যাখ্যা হয়!
প্রথম ইনিংসে ওপেনিং জুটিতে ১২৬ রান, এর পর মাত্র ৯০ রানের ব্যবধানেই অলআউট! দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৪.১ ওভারে ১২৩ রানে অলআউট হয়ে এক ইনিংস ও ৮০ রানে হারেরই বা কী ব্যাখ্যা আছে?
পরশু মাঠ ছাড়ার সময় টিম বাসে উঠতে উঠতে একটা ব্যাখ্যা অবশ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কোচ জেমি সিডন্স, ‘ওদের স্পিনটাই সমস্যা করেছে। বল অনেক বেশি টার্ন করেছে। আর যখনই বল বেশি টার্ন করে আমাদের এ রকম অবস্থা হয়। এই জায়গায় উন্নতির দরকার আছে।’ লর্ডসের পর এখানেও সেঞ্চুরি করা ওপেনার তামিম ইকবালও একই ঢাল ধরলেন সতীর্থদের বাঁচাতে, ‘বল আসলেই অনেক টার্ন করেছে।’
অবিশ্বাস্য শোনাল—ইংলিশ কন্ডিশনে বাংলাদেশ কি না অজুহাত দিচ্ছে স্পিনিং উইকেটের! বছরের পর বছর যে ধরনের উইকেটে খেলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা অভ্যস্ত, ইংল্যান্ডে এসে সেটা পেয়ে কোথায় তাঁরা একটু খুশি হবেন, তা না উল্টো সে উইকেটেই ভেঙে পড়লেন তাসের ঘরের মতো! উইকেট পেস বোলারদের হলে বাউন্স-মুভমেন্টে সমস্যা হয়, টার্নিং হলেও ব্যাটসম্যানরা খেলতে পারেন না—বাংলাদেশের হোম কন্ডিশন যে কোনটা!
পরশু ওল্ড ট্রাফোর্ডের উইকেটে যে টার্নিং ছিল, সেটা মিথ্যে নয়। দিন শেষের সংবাদ সম্মেলনে ৫ উইকেট পাওয়া গ্রায়েম সোয়ানও উইকেট থেকে বাড়তি টার্ন পাওয়ার কথা বলেছেন। এক সেশনে ১০ উইকেট পড়ার ঘটনাও নাকি এবারই প্রথম দেখলেন এই ইংলিশ অফ স্পিনার! সবকিছু মেনেও ওল্ড ট্রাফোর্ডে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতা মেনে নেওয়া যায় না। একে তো স্পিন উইকেটে খেলে ব্যাটসম্যানরা অভ্যস্ত, তার ওপর ওল্ড ট্রাফোর্ডের উইকেট যে এ রকম হবে বাংলাদেশ দল আগে থেকেই সেটা অনুমান করতে পেরেছিল। যে কারণে তাদের গেম প্ল্যানটাও ছিল স্পিনকেন্দ্রিক। তিন পেসারের জায়গায় খেলানো হলো দুই পেসার, নেওয়া হলো একজন বাড়তি স্পিনার। আর ইতিহাসও তো বলে, এই উইকেট মাঝে মাঝেই স্পিনারদের স্বর্গরাজ্য! এ মাঠেই এক টেস্টে ১৯ উইকেট নেওয়ার কীর্তি আছে ইংল্যান্ডের সাবেক অফ স্পিনার জিম লেকারের। স্পিন উইকেটের অজুহাতটা তাই কানে বড় লাগে।
মনে মনে হয়তো জেমি সিডন্সও সেটাই মনে করেন। বাইরে উইকেটের অজুহাত দাঁড় করালেও পরশু টিম মিটিংয়ে কোচ নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন ব্যাটসম্যানদের ওপরই। একের পর এক যেভাবে উইকেট বিসর্জনের খেলা চলল, কোচ মেনে নিতে পারেননি সেটা। অফ স্পিনের বিপরীতে ড্রাইভ কিংবা অকারণে পুল খেলার চেষ্টা—ব্যাটসম্যানদের কাছে এসবের ব্যাখ্যা চেয়েও কিছু পাননি কোচ। ব্যাটসম্যানরা নাকি ব্যাটিং ব্যর্থতার জন্য কেবল দুঃখই প্রকাশ করেছেন।
দুঃখ প্রকাশ করে লাভ? কাল তো আরও লজ্জাজনকই হলো বাংলাদেশের ব্যাটিং! যে ব্রিটিশ মিডিয়া আগের দিন তামিমের সেঞ্চুরি দেখে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল মাঠের দিকে, তারাই কাল জহুরুল-আশরাফুলদের আউট দেখে প্রেসবক্সে গলা ফাটিয়ে হাসছেন। যেন বাংলাদেশের এ রকম ব্যাটিংই করার কথা, লর্ডস বা ওল্ড ট্রাফোর্ডে তামিমের ব্যাটিংটা ব্যতিক্রম মাত্র।
ভালো কথা, বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস ধসিয়ে দিতে আর স্পিনারদের ভরসা করতে হয়নি ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসকে। বৃষ্টির কারণে লাঞ্চের পর খেলা শুরু হয়ে চা-বিরতির আগেই ১২৩ রানে শেষ হওয়া বাংলাদেশ ইনিংসের ৯টি উইকেটই পেসারদের। স্টিভেন ফিন আবার ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ৪২ রানে। বাকি ৫ উইকেটের চারটিও নিয়েছেন দুই পেসার অ্যান্ডারসন (৩/১৬) ও শাহজাদ (১/১৮)। আগের ইনিংসের ঘাতক সোয়ান নিয়েছেন শুধু রাজ্জাকের উইকেটটি।
ওল্ড ট্রাফোর্ডের উইকেট আসলেই রহস্যময়, অন্তত বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছে তো অবশ্যই।

২৪ বছর পর বিশ্বকাপ ব্রাজিলের

যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হয় বিশ্ব ক্রীড়ার সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন বাজার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেও এ দেশটির পরিচিতি। তাই ফিফা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর মার্কিন মুলুকে নিয়ে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাসই ফেলেছিল। তবে ফিফা চিন্তিত ছিল একটি ব্যাপারে, সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের জনপ্রিয়তা। যে দেশে খেলাটিকে ‘ফুটবল’ নামেই কেউ চেনে না, যে দেশের মানুষ ব্যস্ত বেসবল আর বাস্কেটবল নিয়ে—সে দেশে বিশ্বকাপ আয়োজন একেবারেই সমালোচনা মুক্ত ছিল না। তবে সবকিছু ছাপিয়ে ফিফার লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি।
তবে শুধু ফুটবলের প্রসার বাড়ানোর জন্যই যে ফিফা যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপের আয়োজন করেছিল, সে কথা পুরোপুরি ঠিক নয়। দেশটিতে ১৯৮৪ সালে নর্থ আমেরিকান সকার লিগ নামে একটি পেশাদার প্রতিযোগিতা চালু হলেও সেটি তেমন জনপ্রিয় ছিল না। উপরন্তু মার্কিন সমাজে ফুটবলকে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ কোনো খেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সেখানে বিশ্বকাপ আয়োজন করার ঝুঁকি সম্পর্কেও ফিফাকে সাবধান করে দিয়েছিল অনেকে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা এমন একটি জায়গায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানকার অধিবাসীরা ফুটবল সম্পর্কেই কিছু জানে না। ব্যাপারটি অনেকটা বাংলাদেশে গলফ প্রতিযোগিতা আয়োজনের মতো। এমনকি ফুটবলের কোনো বড় তারকাকেও সে দেশের মানুষ নামে চেনে না। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা ফিফাকে সতর্ক করে দেয় যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজিত হলে প্রতিটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে—যেটা বিশ্বকাপ ফুটবলের ইমেজের জন্য মোটেও সুখকর কোনো ব্যাপার নয়। এত সাবধান বাণী, এত সতর্ক বার্তার পরেও ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। এবং আশ্চর্য হলেও সত্যি, ইতিহাসের অন্যতম সফল একটি বিশ্বকাপ আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করে দেয় তাদের যোগ্যতা।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ একটি সফল আয়োজন হলেও সেই ’৭০ ও ’৮৬-র মতো টেলিভিশন সম্প্রচারের ‘প্রাইম টাইম’ ধরতে ’৯৪-তেও বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো আয়োজন করা হয় সব ভরদুপুর বেলায়। জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে খেলতে গিয়ে আবার গলদঘর্ম হন বিশ্বের নামজাদা ফুটবলাররা। এ বিশ্বকাপেই যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো একটি ইনডোর স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করে। ডেট্রয়েটে এই ইনডোর স্টেডিয়ামে ‘কৃত্রিমভাবে উত্পাদিত’ প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠে অনুষ্ঠিত খেলাগুলো বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করে।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে দলগুলোর অতিমাত্রায় রক্ষণাত্মক কৌশল ফুটবলের সৌন্দর্যহানি ঘটিয়েছিল। এবার ফিফা রক্ষণাত্মক ফুটবলের অপব্যবহার রোধ করতে কয়েকটি কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘ব্যাকপাস আইন’। যে আইনের মাধ্যমে ব্যাকপাসের মাধ্যমে গোলরক্ষকের কাছে ফেরত যাওয়া বল হাত দিয়ে না ধরার নিয়ম করা হয়। আরেকটি হলো জিতলে ‘তিন’ পয়েন্ট ও ড্রর জন্য ‘এক’ পয়েন্টের বিধান। এর মাধ্যমে ড্র হয়ে পড়ে হারার কাছাকাছিই একটি ব্যাপার। এ দুটি নতুন আইনের প্রয়োগ ঘটানো হয় ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে। যার মাধ্যমে বিশ্বকাপে দলগুলো আবার আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয়।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, এতে বিশ্ব ফুটবলের অনেক ‘পাওয়ার হাউসখ্যাত’ দলের কোয়ালিফাই করতে না পারা। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও পর্তুগালের মতো দেশগুলো ’৯৪-এর বিশ্বকাপে না খেলায় এ বিশ্বকাপের সৌন্দর্য কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে যায়।
একটি মর্মান্তিক ঘটনা ’৯৪-এর বিশ্বকাপকে আচ্ছন্ন করে রাখে। প্রথম রাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্র-কলম্বিয়া ম্যাচে কলম্বিয়ার রক্ষণভাগের খেলোয়াড় এসকোবার একটি আত্মঘাতী গোল করলে তাঁকে জীবন দিয়ে এর মূল্য পরিশোধ করতে হয়। প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়ে কলম্বিয়া দেশে ফিরে গেলে রাজধানী বোগোটায় এসকোবারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ফুটবল মাঠে একটি ভুলের মাসুল যে কোনো খেলোয়াড়কে এভাবে দিতে হবে—সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না বিশ্ববাসীর।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ অন্তত একটি ব্যাপারে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আর্জেন্টিনার অযুত-নিযুত সমর্থকদের জন্য ব্যাপারটি অবশ্য বেশ বিব্রতকর ও দুঃখজনক। ফুটবলের বরপুত্র ডিয়েগো ম্যারাডোনা এ বিশ্বকাপেই নিষিদ্ধ মাদক সেবনের দায়ে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার আগে আর্জেন্টিনার হয়ে ম্যারাডোনা দুটি ম্যাচে অধিনায়ক হিসেবেই মাঠে নেমেছিলেন। প্রথম ম্যাচে গ্রিসের বিপক্ষে একটি গোলও করেছিলেন। দ্বিতীয় ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পরেই ডোপ পরীক্ষায় ধরা পড়ে ম্যারাডোনা নিষিদ্ধ ‘এফিড্রিন’ ওষুধ খেয়ে খেলতে নেমেছিলেন। আর্জেন্টিনা ম্যারাডোনাকে বহিষ্কার করার ফিফার এ সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানায়। আর্জেন্টিনা ম্যারাডোনার এই এফিড্রিন ওষুধ সেবনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলে, এটা নিষিদ্ধ কি না—ম্যারাডোনা তা জানতেন না। বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কিন্তু ফিফা স্পষ্টতই জানিয়ে দেয়, ‘ম্যারাডোনা জেনে খান অথবা না জেনে খান এফিড্রিন একটি নিষিদ্ধ ওষুধ। এবং এই ওষুধ সেবনে একজন ক্রীড়াবিদের শরীরে কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়, যা ডোপ পাপের পর্যায়ে পড়ে।’
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে দীর্ঘ ২৪ বছর পর চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে ব্রাজিল। বেবেতো, দুঙ্গা, ব্র্যাংকো, রোমারিও, মাওরো সিলভা, তাফারেলের সমন্বয়ে গড়া ব্রাজিল দল পুরো টুর্নামেন্টেই ছন্দময় ফুটবল খেলে সবার মন জয় করে। এ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সেরা ম্যাচটি অবশ্য কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে। সে ম্যাচে ৩-২ গোলে ব্রাজিল জয়লাভ করে সেমিফাইনালে উত্তীর্ণ হয়।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা তারকা ইতালির রবার্তো ব্যাজ্জিও। তিনি প্রায় একক নৈপুণ্যে ইতালির ভঙ্গুর দলকে উজ্জীবিত করে ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যান। সেমিফাইনালে তাঁর দেওয়া দুই গোলেই বুলগেরিয়াকে পরাজিত করে ইতালি।
বুলগেরিয়া ছিল ’৯৪-এর বিশ্বকাপের আরেক বিস্ময়। বিশ্ব ফুটবলের একেবারে অখ্যাত এই দলটি অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বুলগেরিয়ান স্ট্রাইকার রিস্টো স্টইচকভ সেবার ছয়টি গোল করে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কোর সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এ বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো রাশিয়া খেলতে আসে। রাশিয়া অবশ্য প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেয়।
এশিয়ার প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম রাউন্ডের গণ্ডি পর হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে সৌদি আরব। সৌদিরা বেলজিয়ামকে ১-০ গোলে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করে। এই ম্যাচে সৌদি স্ট্রাইকার সাঈদ আল ওয়াইরান পাঁচজন বেলজিয়ান খেলোয়াড়কে কাটিয়ে একটি অসাধারণ গোল করেন। ’৮৬-তে ছয় ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে ম্যারাডোনা যে গোলটি করেন, সেটা যদি শতাব্দীর সেরা গোল হয় সাঈদ আল ওয়াইরানের গোলটিকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি দিতেই হবে।
১৯৯০ সালের ‘অদম্য সিংহ’ ক্যামেরুন ’৯৪-এ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। রাশিয়ার সঙ্গে গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচে তারা ৬-১ গোলে পরাজিত হয়, যা ’৯৪-এর বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে পরাজয়। এই ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে খেলতে নেমে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কো একাই পাঁচ গোল করেন। পরের ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে সালেঙ্কো আরও একটি গোল করেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সালেঙ্কোর মতো কোনো অখ্যাত খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার রেকর্ড নেই। মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেই সালেঙ্কো এই রেকর্ড গড়েন। বিশ্বকাপ ফুটবলে সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মান পাওয়ার অনন্য নজির তিনি সৃষ্টি করেছিলেন।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল রোমারিওর দেওয়া গোলে সুইডেনকে ১-০ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে উত্তীর্ণ হয়। অপরদিকে ইতালি বুলগেরিয়াকে ২-১ গোলে পরাজিত করে ফাইনালের টিকিট হাতে পায়। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় লস অ্যাঞ্জেলসের প্যাসিডেনা রোজ বোল স্টেডিয়ামে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের নিষ্ফলা খেলাটি গড়িয়ে যায় টাইব্রেকারে। ফাইনালে ইতালি তাদের চিরাচরিত ‘ঘর বাঁচিয়ে খেলো’ নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ২৪ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় ব্রাজিলও ছিল ফাইনালে অতিমাত্রায় সাবধানী । সব মিলিয়ে একটি ভালো ফাইনালের জন্য যেসব অনুষঙ্গ প্রয়োজন, তার অনেক কিছুই অনুপস্থিত ছিল ’৯৪-এর ফাইনালে।
টাইব্রেকারে ব্রাজিল ৩-২ গোলে ইতালিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ‘ফিফা বিশ্বকাপ’ ট্রফিটি হাত দিয়ে ধরার সুযোগ পায়। ব্রাজিলের এর আগের তিনটি শিরোপাই ছিল জুলেরিমে ট্রফির। টাইব্রেকারে ইতালির পক্ষে পেনাল্টি মিস করেন সেই রবার্তো ব্যাজ্জিও। যিনি ইতালির ফাইনালে ওঠার পেছনে রেখেছেন সবচেয়ে বড় ভূমিকা। আরও দুটি পেনাল্টি মিস করেন মাসারো ও ফ্রাঙ্কো বারেসি। ব্রাজিলের পক্ষে অবশ্য একজন পেনাল্টি মিস করেন, তাঁর নাম মার্সিও সান্তোস। ব্রাজিলের গোলরক্ষক তাফারেল মাসারোর পেনাল্টি ঠেকিয়ে দুই যুগ পর ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ে রাখেন অনন্য ভূমিকা।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের দীর্ঘ ২৪ বছরের খরা কাটে। ১৯৮২, ১৯৮৬ কিংবা ১৯৯০-এর মতো অল আউট ফুটবল না খেলে এবার ব্রাজিল উপহার দেয় সম্পূর্ণ অন্যমাত্রার ফুটবল। নিজেদের ঘর বাঁচিয়ে আক্রমণ করার এ খেলার মাধ্যমে ব্রাজিল ফলনির্ভর ফুটবলের জগতে প্রবেশ করে। জয়ের নেশায় বিশ্ব ফুটবলের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয় লাতিন ফুটবলের ছন্দের আনন্দে উদ্ভাসিত সাম্বা নৃত্যের দেশ ব্রাজিল।

অঘটন! অঘটন!

‘আমি খুব আপসেট’ বললে আপনি কী বুঝবেন? কোনো কারণে ‘আমি খুব হতাশ’—এই তো! এই ‘আপসেট’ শব্দটিই খেলায় এসে কেমন অর্থ বদলে ফেলে! সেখানে আপসেট মানে ‘ছোট’র কাছে ‘বড়’র পরাজয়। বাংলা প্রতিশব্দটা বড় সুন্দর—অঘটন।
খেলার অনেক মজার মধ্যে এই অঘটনও একটা। সবচেয়ে বেশি মজাও বলতে পারেন। আপনার প্রিয় দল বা খেলোয়াড় সেই আপসেট বা অঘটনের শিকার হলে অবশ্য ব্যাপারটা আর মোটেই মজার থাকে না।
সেদিন এক পাঠক ফোন করে জানতে চাইলেন, ‘এবারের বিশ্বকাপে কী অঘটন ঘটতে পারে বলে আপনি মনে করেন?’ আমি হেসে বললাম, ‘ভাই রে, অঘটনের যদি ভবিষ্যদ্বাণীই করা যায়, তাহলে কি আর সেটি অঘটন থাকে?
অঘটন মানেই তো অপ্রত্যাশিতের চমক, অভাবিতের বিস্ময়। সেই অঘটন যখন বিশ্বকাপে হয়, স্বাভাবিকভাবেই তা বেশি মনে থাকে। সেই অঘটনের প্রত্যক্ষদর্শীদের মনে তো চিরদিনের জন্যই গাঁথা হয়ে যায়। বাকিদের জন্য ইতিহাস সেই ‘রূপকথা’ বয়ে নিয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
‘রূপকথা’ শব্দটা বুঝেশুনেই ব্যবহার করা। বিশ্বকাপ ফুটবল এমন সব অঘটনের সাক্ষী, যা যুক্তি-বুদ্ধির অগম্য—রূপকথাও তো তাই-ই, নাকি! তেমনই এক রূপকথার গল্পের খুব স্মৃতিচারণা হচ্ছে এবার। ইংল্যান্ড-যুক্তরাষ্ট্র আবার মুখোমুখি বলে ফিরে-ফিরে আসছে ৬০ বছর আগের বেলো হরিজন্তে। ব্রাজিলের ছোট্ট একটা শহর, ফুটবল অনুসারীদের কাছে যেটির সমার্থক হয়ে গেছে সেই বিখ্যাত স্কোরলাইন: যুক্তরাষ্ট্র ১-ইংল্যান্ড ০! ইংল্যান্ডের কোন পত্রিকা নাকি রিপোর্টার ভুল করেছে ভেবে সংশোধন করে ইংল্যান্ড ১১-যুক্তরাষ্ট্র ০ ছেপে দিয়েছিল!
কেন—সময়টা মনে রাখলে তা বুঝতে সুবিধা হবে। এই বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিলে সেটিও অঘটন বলে বিবেচিত হবে। তবে একেবারে অভাবিতের মর্যাদা পাবে না। বাস্কেটবল আর বেসবলের দেশ বলে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলটাও যে খুব খারাপ একটা খেলে না, তা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। নইলে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা দশেও তো উঠেছে ওরা। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের র‌্যাঙ্কিং ১৪। ইংল্যান্ডের ৮। বিশ্বের ১৪ নম্বর দল ৮ নম্বরকে হারালে সেটিকে কি খুব বড় অঘটন বলা উচিত?
১৯৫০ বিশ্বকাপের গল্প তো ছিল অন্য রকম। ‘আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে আবার বিশ্বকাপ লাগে নাকি’—এই অহংবোধ থেকেই কিনা ফুটবলের জনকেরা এর আগের তিনটি বিশ্বকাপে খেলেইনি। সেবারই ইংল্যান্ডের প্রথম বিশ্বকাপ এবং স্ট্যানলি ম্যাথুজের দল সেখানে অন্যতম ফেবারিট। আর যুক্তরাষ্ট্র জোড়াতালি দিয়ে নামানো এক দল। বিরতির ৮ মিনিট আগে হেডে গোল করে ওই মার্কিন রূপকথার লেখক গায়েটজেন্স। তা গায়েটজেন্স বলে হেড করেছিলেন, নাকি বলটা তাঁর মাথায় লেগে গিয়েছিল—এটা এখনো রহস্যই হয়ে আছে!
ফুটবলের যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে হেলাফেলাই করা হয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ-ঐতিহ্য কিন্তু বিশ্বকাপের সমান বয়সী। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপেও ছিল ওরা; বিশ্বাস করবেন কি না, শীর্ষ বাছাই চার দলের একটি হয়ে!
দ্যাখো কাণ্ড, বিশ্বকাপে অঘটনের কথা বলতে গিয়ে কেমন যুক্তরাষ্ট্র-কীর্তনে মেতে উঠেছি! ১৯৫০ বিশ্বকাপের ওই মার্কিন-রূপকথা শুধুই পড়ে জানা। ফুটেজ-টুটেজও দেখিনি। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে উত্তর কোরিয়ার কাছে ইতালির পরাজয়টাও একই রকম শুধুই পঠিত ‘জ্ঞান’। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনের মর্যাদা নিয়ে লড়াইটা এই দুটির মধ্যেই হয়।
লিখতে বসার আগে বিশ্বকাপ-জ্ঞানটা আরেকটু ঝালিয়ে নিতে বসে দেখলাম, অঘটন চর্মচক্ষে বিশ্বকাপ দেখার সময়েই বেশি ঘটেছে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের পরের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই হেরে যাওয়ার তিনটি ঘটনাই তো টেলিভিশনে সরাসরি দেখেছি।
১৯৮২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের কাছে হেরে গেল আর্জেন্টিনা। অবশ্যই অঘটন, তবে খুব বড় নয়। কারণ বেলজিয়াম তখন ইউরোপিয়ান রানার্সআপ। সেই ম্যাচেই প্রথম ম্যারাডোনাকে দেখা এবং ওই ম্যাচের কথা মনে হলে ৬২ মিনিটে ভ্যানডারবার্গের করা বেলজিয়ামের গোলটি নয়, মনে পড়ে একটি ম্যারাডোনা-মোমেন্টের কথাই। অনেক দূর থেকে গোলার মতো এক শটে তাঁর গোলপোস্ট কাঁপিয়ে দেওয়া।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের প্রথম ম্যাচেই হেরে যাওয়ার পরের দুটি ঘটনা ১৯৯০ ও ২০০২ বিশ্বকাপে। প্রথমটির শিকার আবারও আর্জেন্টিনা। ক্যামেরুনের মারদাঙ্গা ফুটবল দুটি লাল কার্ডের সঙ্গে জয়ও এনেছিল। ২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের পরাজয়ও এক আফ্রিকান নবাগতের বিপক্ষে। তবে সেনেগালের কীর্তি অন্তত সে ম্যাচের যোগ্যতর দলের জয়ই ঘোষণা করেছিল।
কী অদ্ভুত দেখুন, বিশ্বকাপে এই যে বড় সব অঘটনের কথা বললাম, সব কটিরই ফল ১-০! শুধু কাকতালীয় বলে শান্তি পাচ্ছি না; এ তো দেখছি ‘মহা-কাকতালীয়’!

স্পেনের সাফল্যের রহস্য এই!

দাপটে গ্রুপ পর্ব পার হয়ে নকআউট রাউন্ডে বিদায়—বিশ্বকাপের স্পেন মানে তো এই! চিত্রনাট্যের ব্যতিক্রম হয়নি জার্মানিতেও। গ্রুপে দুর্দান্ত খেলে দ্বিতীয় রাউন্ডে বিদায়, হেরেছে ফ্রান্সের কাছে, যারা ধুঁকতে ধুঁকতে গ্রুপ পর্ব পার হয়েছে। তবে এর পর থেকেই অপ্রতিরোধ্য স্পেন, ইউরো জিতেছে, ছুঁয়েছে টানা ৩৫ ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড। এই বদলে যাওয়া স্পেনের রহস্য জানতে চান? শুনুন ফার্নান্দো তোরেসের মুখে, ‘২০০৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স আমাদের বড় একটা শিক্ষা দিয়েছে। সবাই ওই ম্যাচে আমাদের ফেবারিট বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ফ্রান্স বিশ্বকাপ জেতা দল, ওরা বড় ম্যাচের চাপ নিতে জানে। চাপ নিতে না পেরে আমরা হারলাম। এর পর যে সমালোচনাটা হলো, তা আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ করল। এর পর থেকে আমরা সব জিততে থাকলাম।’

মিডিয়ার তোপের মুখে জাপান দল

বিশ্বকাপে জাপানের কোনো আশাই দেখছে না সে দেশের মিডিয়া। বৃহস্পতিবার আইভরিকোস্টের বিপক্ষে পরাজয়ের পর থেকে ‘ব্লু সামুরাই’দের নিয়ে চলছে নিরন্তর সমালোচনা। আইভরিকোস্টের বিপক্ষে জাপানের ২-০ গোলে পরাজয়টি ছিল কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে জাপানের টানা চতুর্থ হার। গত এক যুগে জাপান কখনোই পরপর চারটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ হারেনি।
কয়েক দিন আগে জাপান ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরে গিয়েছিল। সেই ম্যাচে জাপানের দু-দুটি আত্মঘাতী গোল কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না জাপানের সংবাদপত্রগুলো। অনেক সংবাদপত্র তো জাপানের বিশ্বকাপ যোগ্যতা নিয়েই ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরাজয়ে তাও কিছুটা সান্ত্বনা থাকে। কিন্তু জাপানের পত্রিকাগুলোর কাছে সমমানের সার্বিয়া কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে পরাজয় কেবলই গ্লানির।
বৃহস্পতিবার আইভরিকোস্টের কাছে হেরে যাওয়ার পর শুক্রবার জাপানের শীর্ষ খেলাধুলাবিষয়ক দৈনিক নিক্কান স্পোর্টসে শিরোনাম এসেছে ‘ন্যক্কারজনক’। একটি শিরোনাম থেকেই অনুমান করে নেওয়া যায়, বিশ্বকাপের আগ দিয়ে জাপান জাতীয় দলের ওপর কী পরিমাণ খেপে আছে সে দেশের মিডিয়া।
একই দিন স্পোর্টস নিপ্পন নামের আরও একটি পত্রিকা অবশ্য শিরোনামে এতটা আবেগি হয়নি। তারা জাপানের খেলার ধরন নিয়ে লিখেছে, ‘উদ্দেশ্যহীন ফুটবল।’
টোকিওর শিমবান পত্রিকা জাপানের ফুটবলারদের দৈহিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছে, ‘আইভরিকোস্টের বিপক্ষে আকাশের বলগুলো ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছিল জাপানের খর্বকায় খেলোয়াড়েরা।’
জাপানের সাবেক কোচ ব্রাজিলিয়ান গ্রেট জিকো মন্তব্য করেছেন, বিশ্বকাপে জাপান শারীরিক কারণেই নানা ধরনের সমস্যায় পড়বে। যেকোনো সেটপিসে জাপানের খেলোয়াড়দের চিরন্তন দুর্বলতা বিশ্বকাপের সময় প্রকট হয়ে দেখা দেবে। তিনি আরও বলেছেন, বিশ্বকাপের সময় জাপানের গোলমুখে প্রচুর ক্রস আসবে। সেসব ক্রসে গোল খেয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। জিকোর প্রশিক্ষণে জাপান নিজ মাটিতে ২০০২ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলেছিল। এযাবত্কালে মহাদেশীয় প্রতিযোগিতার শিরোপা জেতা ছাড়া সেটাই ছিল ফুটবলে জাপানের সেরা সাফল্য।
জাপান বিশ্বকাপের ‘ই’ গ্রুপে শক্তিশালী নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক ও ক্যামেরুনের বিপক্ষে খেলবে। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের বিচারে দীর্ঘদেহী ডাচ, ডেনিশ ও আফ্রিকার ‘অদম্য সিংহ’দের সামনে ‘নিপ্পন’দের কোনো আশাই দেখছেন না বিশ্লেষকেরা।

‘পর্যবেক্ষক’ হুদার প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য

গত ৫ জুন প্রথম আলোর খেলার পাতায় প্রকাশিত ‘পর্যবেক্ষকের খোঁজ নেই’ খবরটির প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ও ইংল্যান্ড সফরে দলের সঙ্গে পর্যবেক্ষক হিসেবে যাওয়া ইমতিয়াজ আহমেদ সামসুল হুদা।
প্রতিবাদে তিনি দাবি করেছেন, পর্যবেক্ষক হিসেবে তাঁর ইংল্যান্ড সফর ছিল ২৪ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত। এই ১০ দিনে একটি টেস্ট ‘কাভারেজের’ দায়িত্বই নাকি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। প্রথম টেস্টের পর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজ খরচে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে তিনি সস্ত্রীক কানাডায় যান। এ ছাড়া ইংল্যান্ড সফরে দলনেতা জালাল ইউনুসসহ বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কয়েক দফা সভা করেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি প্রতিবাদে। ‘পর্যবেক্ষকের খোঁজ নেই’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিকে তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন।
প্রতিবেদকের বক্তব্য: প্রতিবেদনটি ইংল্যান্ডে সফররত জাতীয় দলের ক্রিকেটার, টিম স্টাফ এবং দলের সঙ্গে থাকা বিসিবি পরিচালক জালাল ইউনুসের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ীই করা হয়েছে। প্রতিবেদনে মনগড়া কোনো তথ্য ব্যবহার করা হয়নি।
ইমতিয়াজ আহমেদ সামসুল হুদার প্রতিবাদের পর বাংলাদেশ দলের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করে জানা গেছে, দলের সঙ্গে কোনোরকম সভাই তিনি করেননি। দু-একজন ক্রিকেটার বা কোচিং স্টাফের সঙ্গে লন্ডনের হোটেল লবিতে দু-একবার দেখা হওয়া ছাড়া কারও সঙ্গে তাঁর সেভাবে কথাও হয়নি। আর দলনেতা জালাল ইউনুসের বক্তব্য তো প্রতিবেদনেই ছাপা হয়েছে। পর্যবেক্ষক কোথায়—জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘ম্যানচেস্টারে আসার পর ওনার (ইমতিয়াজ আহমেদ সামসুল হুদা) সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। জানি না, উনি কোথায় আছেন। শুনেছি, লর্ডস টেস্টের শেষ দিনে তিনি লন্ডন থেকেই সস্ত্রীক কানাডা চলে গেছেন। তবে আমাকে জানিয়ে যাননি।’ দলনেতাই যেখানে জানেন না, কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কানাডা যাওয়ার দাবিটি কি তারপরও টেকে?
আর ইমতিয়াজ আহমেদ সামসুল হুদা যদি ওই ১০ দিনের জন্যই ইংল্যান্ড সফরে এসে থাকেন, তাহলে দলনেতা হিসেবে সেটা জানার কথা বোর্ড পরিচালক জালাল ইউনুসের। কিন্তু জালাল ইউনুস সে রকম কিছু জানেন না বলেই জানিয়েছেন।

শেষটা হলো হতাশাতেই



জেমি সিডন্স ভুল ভেবেছিলেন। আগের দিন মাঠ ছাড়ার সময় বলে গেলেন, ‘ইংল্যান্ড হয়তো আমাদের ফলোঅন করাবে না। দ্বিতীয় ইনিংস ব্যাটিং করে অনেক বড় একটা টার্গেট দিয়ে দেবে সামনে...আমার তাই মনে হয়।’
সিডন্সের অনুমান ঠিক হলে ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টের আয়ু আরও বাড়তে পারত কিন্তু ইংল্যান্ড সেটা করবে কেন? শিকার যখন হাতের মুঠোয়, পিষে মারতে সময় নিল না অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের দল। বাংলাদেশ শুধু ফলোঅনই করল না, লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মতো ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী দেখিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট মাত্র ১২৩ রানে। টেস্টের দুই দিন বাকি থাকতেই ইনিংস ও ৮০ রানের হার। সকালের বৃষ্টিতে যে টেস্টটা পঞ্চম দিনে যাবে বলে মনে হচ্ছিল, সেটা শেষ তৃতীয় দিন চা-বিরতির আগেই। টেস্টে পরপর দুই দিন এক সেশনে অলআউট হয়ে যাওয়ার ব্যতিক্রমধর্মী রেকর্ডই গড়ে ফেলল কি না বাংলাদেশ, কে জানে!
ম্যানচেস্টারে পরশু রাত থেকেই পড়া গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি থামল কাল দুপুরে। লাঞ্চের পর খেলা শুরু হলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস যেন সেই বৃষ্টিতেই পা পিছলে পড়ল। প্রথম ইনিংসে স্পিনে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ এবার পেসে ঘায়েল! ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস গ্রায়েম সোয়ানকে দিয়ে স্পিন আনলেন ইনিংসের ২১তম ওভারে এবং বাংলাদেশ যে ৩৪.১ ওভার ব্যাট করল তাতে সোয়ানই একমাত্র স্পিনার। আর কাউকে আনার দরকারও হয়নি কারণ তিন পেসার জেমস অ্যান্ডারসন, স্টিভেন ফিন ও আজমল শেহজাদ মিলেই পেসারদের জন্য পয়মন্ত কন্ডিশনে বাংলাদেশকে ডুবিয়ে দিলেন চরম হতাশায়। বিশেষ করে ফিন—এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটা টেস্ট খেলেছেন, তিনটাই বাংলাদেশের বিপক্ষে। আর এই তিন টেস্টে কাল তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ৫ উইকেট নিয়ে হয়ে গেলেন ইংল্যান্ড দলের ম্যান অব দ্য সিরিজ। দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ আরেকটু ভালো খেললে হয়তো আলাদা করে দুই দলের ম্যান অব দ্য সিরিজ ঘোষণা করতে হতো না ইসিবিকে, তামিম একাই পেয়ে যেতে পারতেন পুরস্কারটা। সেটা না হওয়ায় এখন ফিনের মতো তামিমও কেবল বাংলাদেশেরই ম্যান অব দ্য সিরিজ। আর সেঞ্চুরির জন্য ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টের ম্যান অব দ্য ম্যাচও হয়েছেন ইংল্যান্ডের ইয়ান বেল।
ইংল্যান্ডকে আরেকবার ব্যাটিংয়ে নামাতে অন্তত ২০৩ রান দরকার ছিল বাংলাদেশের, কিন্তু এমন বিকলাঙ্গ ব্যাটিংয়ে আর কত দূরই বা যাওয়া সম্ভব? পেসারদের দাপটে ৩৯ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই এক শ পেরিয়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটিং-ব্যর্থতার জন্য আলাদা করে কাউকে কিছু বলার নেই। কাঠগড়ায় ব্যাটসম্যানদের সবাই। লর্ডসে ৫৫ ও ১০৩ এবং ওল্ড ট্রাফোর্ডের প্রথম ইনিংসে ১০৮ রান করা তামিম দিনের দ্বিতীয় বলেই আউট। জেমস অ্যান্ডারসনের প্রথম বলে ২ রান নিলেন, সিমের ওপর পড়ে লাফিয়ে ওঠা পরের বলটাই তামিমের ব্যাটে চুমু খেয়ে জমা পড়ল উইকেটকিপার ম্যাট প্রিয়রের গ্লাভসে। প্রতিদিনই তো আর ভালো খেলা সম্ভব না, তামিমের পক্ষে এটা একটা সাফাই হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের অন্য ব্যাটসম্যানরা যেন উল্টোটাই মনে করলেন—‘তামিমই যেখানে পারে না, সেখানে আর আমরা পারব কী?’
লর্ডস থেকে বয়ে আনা সম্মান একটার পর একটা উইকেটের পতনে ওল্ড ট্রাফোর্ডের ধুলোয় মিটাল। ইংল্যান্ডের বোলারদের সামনে বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ গড়তে পারলেন না কেউ। প্রথম ছয় ব্যাটসম্যানের মধ্যে দুই অঙ্কের রান কেবল মোহাম্মদ আশরাফুলের (১৪)। সপ্তম উইকেটে ৩৭ রানের জুটিতে মুশফিকুর রহিম আর মাহমুদউল্লাহর সামান্য প্রতিরোধের চেষ্টা বা কিছু সময়ের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের হাততালি কুড়ানো মাহমুদউল্লাহর ওয়ানডে সুলভ ব্যাটিং ম্যাচের চিত্র বদলাতে পারেনি একটুও। ৫২ বলে ৩৮ রানের ইনিংসে পাঁচটা বাউন্ডারি—সিরিজের শেষ দিনে এসে প্রথমবারের মতো কিছু পেলেন মাহমুদউল্লাহ, অন্যদের ব্যর্থতায় যেটা কি না দলের কোনো কাজেই এল না!
লর্ডসে ড্রয়ের স্বপ্ন জাগানো দিয়ে যে সিরিজের শুরু ওল্ড ট্রাফোর্ডে সেটা কলঙ্কিত লজ্জাজনক ব্যাটিংয়ে। ইংল্যান্ড সফর থেকে তাহলে কী নিয়ে দেশে ফিরছে বাংলাদেশ দল? হতাশাই তো!

ওয়েলকম না সুইড আফ্রিকা

জোহানেসবার্গ ও আর টাম্বো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঢুকতেই বিশ্বকাপের গরম বাতাস গায়ে এসে লাগল। দেয়ালে দেয়ালে নেলসন ম্যান্ডেলার ছবি। দক্ষিণ আফ্রিকার মহান এই নেতা সোয়া ছয় কেজি ওজনের জগদ্বিখ্যাত সোনার ট্রফিটা আঁকড়ে ধরে আছেন এমন করেই, যেন ওটা আর ছাড়বেন না। পাশে বাফানা বাফানাদের বিশালাকৃতির সব কাটআউট। কোনোটায় মোকোয়েনা মুষ্টিবদ্ধ হাত ওপরে তুলে ধরেছেন। কোনোটায় একই ভঙ্গিতে স্টিভ পিনার। আর পাশাপাশি বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকারা তো আছেনই—আছেন মেসি, রোনালদো, কাকা, রুনিরা।
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ভদ্রমহিলার অফিশিয়াল ব্যাজে দেখা গেল অনেক বড় নাম। তবে মনে রাখার সুবিধার জন্য একটি নামই এঁকে নিলাম, হেনরিয়েটা। দেখতে রাশভারী, বিশালাকার—ভয় ভয় করছিল। ভিসা করে আসিনি। ফিফার সরকারিভাবে অনুমোদিত অ্যাক্রিডিটেশন-বিষয়ক চিঠিখানিই সম্বল। কিন্তু কাছে যেতেই ভদ্রমহিলা হাসলেন, একেবারে অন্তরঙ্গ হাসি। পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কোনো ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা এমনভাবে হাসতে পারেন, জানা ছিল না। হেসে হেসেই দুটো দুর্বোধ্য বাক্য উচ্চারণ করলেন। পর পর। ওয়েলকম না সুইড আফ্রিকা। ও অ্যামোকেলেকিলে মো আফ্রিকা বোরওয়া। পরে দুটোরই অর্থ বুঝিয়ে দিলেন—দক্ষিণ আফ্রিকায় স্বাগতম। প্রথমটি আফ্রিকানস ভাষায়, দ্বিতীয়টি চুয়ানায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় সরকারিভাবে ১১টি ভাষা প্রচলিত।
পরশু রাতে বিমানবন্দরে পৌঁছেই মনকে শক্ত করে নিলাম, এ রকম আরও অনেক দুর্বোধ্য ভাষাই শুনতে হবে। তবে একটা সুবিধাও আছে এই দেশটায়। ইংরেজি এদের সবচেয়ে প্রচলিত ভাষা। সবাই কমবেশি ইংরেজি জানে। কোরিয়া-জাপানের মতো ‘মূকাভিনয়’ করার প্রয়োজন পড়বে না সামান্য ইংরেজি জানাশোনা লোকদের।
তো আবার ফিরে আসা যাক ইমিগ্রেশন প্রসঙ্গে। ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেমন কড়াকড়ি, না, কড়াকড়ি না বলে অতিসতর্কতাই বলা উচিত। প্রথমে এমিরেটস এয়ারলাইনসের কর্মকর্তারা আমাকে ভিসা ছাড়া দেখে যেভাবে আঁতকে উঠলেন, সে আর কী বলব! আঁতিপাঁতি করে আমার সব কাগজ দেখে বোর্ডিং পাস দিলেন। ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়িয়েছি, সেখান থেকে ডেকে নিয়ে গেলেন এমিরেটসের আরেক কর্তা। বললেন, দেখুন, আপনার পাসপোর্ট আর পত্রিকার ওজন দেখেই ছাড়ছি। না হলে শুধু একটা ফিফার চিঠির বলে ছাড়তাম না। ইমিগ্রেশনে গিয়েও বারদুয়েক খানাতল্লাশির কবলে পড়লাম। একসময় সব বাধা ডিঙিয়ে বিশাল বোয়িংটার পেটের মধ্যে ঢুকলাম। শেষ মুহূর্তে বিমানে উঠতে যাব, তখন আবারও সতর্ক করে দেওয়া হলো, দুবাইতে বিমানবন্দরে কিছু ঘটলে সেটা আমরা জানি না!
আদতে কিছুই ঘটল না। দুবাইয়ের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আমার ফিফা অ্যাক্রিডিটেশন আইডেন্টিফিকেশন নম্বরটা জেনে নিয়েই ছেড়ে দিলেন। এমনকি কাগজখানিও দেখতে চাইলেন না। তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়? একটাই যুক্তি সাজিয়ে নেওয়া গেল নিজের মতো করে। বাংলাদেশের ফুটবলকে যেমন ফিফা মানচিত্রে দুরবিন দিয়ে দেখতে হয়, সে রকমই ফিফার একটি নির্দেশ আর একখানা কাগজের মূল্য কতটা, সেটি বুঝতে অক্ষম বাংলাদেশ বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা।
রাত নয়টায় জোহানেসবার্গ বিমানবন্দর থেকে ভিসা নিয়ে বেরোলাম। সঙ্গে অবশ্যই হেনরিয়েটার শুভকামনা, দক্ষিণ আফ্রিকায় যেন আমার দিনগুলো ভালো কাটে এবং আমি যেন বাফানা বাফানা মানে দক্ষিণ আফ্রিকা দলকে নিয়ে বেশি বেশি ও ভালো ভালো লিখি।
কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা দলকে নিয়ে কী লেখা যায়! বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো আয়োজক দেশ প্রথম রাউন্ডের গণ্ডি পেরোবে না বলে ধরে নিয়েছে গোটা পৃথিবী। খবরদার, আফ্রিকানদের কাছে ও-কথা বলতে যাবেন না। তাদের গভীর বিশ্বাস, কোচ কার্লোস আলবার্তো পাহেইরা আর দুই খেলোয়াড় মোকোয়েনা ও স্টিভ পিনার দেশকে এমন লজ্জার মুখে পড়তে দেবেন না। হোটেলের কর্মচারী থেকে শুরু করে মিডিয়া সেন্টারের স্বেচ্ছাসেবক—সবাই একই বিশ্বাস নিয়ে সময় গুনছেন। যে গাড়িতে করে পরশু রাতে হোটেলে এলাম, সেটির ড্রাইভার নাকি ভীষণ উত্তেজিত। এই প্রথম কোনো সাংবাদিককে তিনি এবারের বিশ্বকাপে বহন করে নিয়ে এলেন বিমানবন্দর থেকে! তাঁর আরেকটা খুশির জায়গা, বাফানা বাফানাদের বেশি বেশি খবর আমার কাছ থেকে জানতে পারবে। মিডিয়া সেন্টার থেকে যখনই নতুন কার্ডটা গলায় ঝোলাতে পারলাম, দূর থেকে দৌড়ে এসে মাইকেল নামের এক স্বেচ্ছাসেবক, বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে বললেন, গো সাউথ আফ্রিকা গো!
পরে নিজেই এসে বললেন, ‘আমরা জানি, সাউথ আফ্রিকা বেশি দূর যেতে পারবে না। তবে একটা বাজি ধরলাম, দ্বিতীয় রাউন্ডে আমরা যাবই।’
এটা আসলে স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখতে তো আর কর দেওয়া লাগে না। সাধারণ জনতার আর দোষ কী? যাঁকে কেন্দ্র করে এই স্বপ্ন দেখা, সেই বাফানা বাফানাদের সবচেয়ে বড় তারকা স্টিভ পিনার নিজেই তো বারবার বলছেন, তাঁদের ভালো সুযোগ আছে। সুযোগটা আগেভাগে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া, না ২০০২ দক্ষিণ কোরিয়ার মতো রূপকথা লেখা, সেটি অবশ্য ভেঙে বলছেন না তিনি। কাল বিশাল একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন পিনার অ্যানিহোয়্যার অ্যানিটাইম ম্যাগাজিনে। তাতে ভীষণ একটা চমকজাগানো কথা বলেছেন এভারটনের মিডফিল্ডার। তিনি নাকি দিব্যদৃষ্টি দিয়ে দেখছেন, এবার ট্রফিটা নিয়ে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলেরও সুযোগ আছে, সে তো সব সময়ই থাকে। ইংল্যান্ডে খেলেন। ইংল্যান্ড দলটিকে নিয়ে ইংলিশ মিডিয়া যেভাবে ধেই ধেই করে নাচছে, তাতে ৪৪ বছর পর ইংল্যান্ড এবার চ্যাম্পিয়ন না হয়ে যায়ই না। ইংল্যান্ডকে দু-চারটে আশার কথা শোনাবেন তা না, পিনার শুনিয়েছেন চরম হতাশার কথা। ইংল্যান্ডের কোনো সুযোগই নেই!