Friday, April 25, 2025

চুইংগাম চিবাতে ভালোবাসলে জেনে রাখুন কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছেন by রাফিয়া আলম

পরিবেশে মিশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক অর্থাৎ প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। খাবার কিংবা পানীয়তে মিশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকও হতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক চুইংগামে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বিস্ময়কর তথ্য জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, ছোট্ট একটা চুইংগাম মাইক্রোপ্লাস্টিকে ভরপুর থাকে। শিশুরা তো বটেই, বড়দের মধ্যেও অনেকে চুইংগাম পছন্দ করেন।

ঠিক কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন

কিছু চুইংগাম বানানো হয় প্রাকৃতিক উপকরণে, কিছু আবার কৃত্রিম উপকরণ দিয়েও তৈরি হয়। তবে যে উৎস থেকেই চুইংগাম তৈরি হোক না কেন, তা রাবারের মতো একটু আঠালো ধরনেরই হয়। এই দুই ধরনের চুইংগাম থেকেই সমান পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বলছিলেন ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডা. সাইফ হোসেন খান।

একটা চুইংগামের ওজন ২ থেকে ৬ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। মাত্র ১ গ্রাম চুইংগাম থেকেই গড়ে ১০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয়। এমনকি কিছু চুইংগামের প্রতি গ্রাম থেকে আসতে পারে ৬০০ মাইক্রোপ্লাস্টিকও। তার মানে একটা ছোট্ট চুইংগাম থেকেই শতসহস্র মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশে যেতে পারে আমাদের লালায়।

খাবার খাওয়ার পর তা যেমন পরিপাক হয়, মাইক্রোপ্লাস্টিক কিন্তু সেভাবে পরিপাক হয় না, রয়ে যায় অবিকৃত। লালায় মিশে যাওয়ার ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়তে পারে আমাদের পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অংশে। সেখান থেকে রক্তেও পৌঁছে যেতে পারে এই ছোট্ট কণা। আর রক্তের মাধ্যমে চলে যেতে দেহের পারে যেকোনো অংশেই। মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গেও জমা হতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

মাইক্রোপ্লাস্টিকে যেসব ক্ষতি হয়

দেহের যেকোনো অঙ্গে জমা হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়ে যেতে পারে। ধারণা করা হয়, মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতিতে ডায়াবেটিস এবং হৃদ্‌রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তা ছাড়া দেহের হরমোনের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোনো অঙ্গে অধিক পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হলে সেই অঙ্গের কার্যকারিতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে মস্তিষ্কের বিকাশ, নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা এবং স্মৃতিধারণের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই শিশুদের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিক মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

শেষ কথা

মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব বিষয়ে এখনো গবেষণা চলমান। তবে যতটা জানা গেছে, তা খুব একটা স্বস্তির নয়। দীর্ঘ মেয়াদে অনাকাঙ্ক্ষিত বহু সমস্যা এড়াতে আমাদের জীবনধারা এমনভাবে গড়ে তোলা ভালো, যাতে অতিরিক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের দেহে প্রবেশ করতে না পারে। চুইংগামে যেহেতু অনেকটা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, তাই যেকোনো বয়সেই চুইংগাম কম খাওয়া উত্তম।

চুইংগাম থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে
চুইংগাম থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ছবি: সংগৃহীত

চিকিৎসাবিজ্ঞান: বুড়ো বয়সের ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতও আবার গজাবে: নতুন গবেষণা by মোহাম্মদ তৌহিদ

বিজ্ঞান চিন্তাঃ মানুষের দাঁত মাত্র দুবার গজায়। ছয় মাস বয়স থেকে ওঠে দুধ দাঁত। সেগুলো ছয় থেকে বারো বছর বয়সেই পড়ে যায়। এরপর যে দাঁতের দেখা মেলে, তা স্থায়ী দাঁত। এই স্থায়ী দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রাকৃতিকভাবে সেখানে আর দাঁত গজায় না। আর কিশোর বয়সে চকলেট, আইসক্রিমের প্রেমে পড়ে অনেকেই স্থায়ী দাঁতের কয়েকটা হারিয়ে ফেলেন। অনেকের দাঁত পোকায় ধরে। ফলে অল্প বয়সে সে দাঁত পড়ে যায় বা উঠিয়ে ফেলতে হয়। এই বিষয়টা নিয়ে মানুষের আক্ষেপের শেষ নেই। থাকবে নাই-বা কেন! অনেক প্রাণীর দাঁত পড়ে, আবার নতুনভাবে গজায়। মানুষের বেলায় তা হয় না।

সেই আক্ষেপ উপশমে কিছুটা সফল হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দাঁতের চিকিৎসায় এটা যুগান্তকারী আবিষ্কার হবে! যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা সফলভাবে ল্যাবরেটরিতে দাঁত গজাতে সক্ষম হয়েছেন। চূড়ান্ত সফলতা ধরা দিলে বিপ্লব ঘটে যাবে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দাঁতও সাধারণ নিয়মে ধীর গতিতে গজাবে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে এই গবেষণা। মূল লক্ষ্য ছিল দাঁত গঠনে মানবদেহের মতো জটিল জৈব পরিবেশ সৃষ্টি করা। শরীরের কোষীয় ম্যাট্রিক্সের মতো কাজ করবে এমন বিশেষ একটা উপাদান তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই উপাদানটি দাঁত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার এ ধাপটি প্রকৃত ও কার্যকর দাঁত পাওয়ার জন্য অপরিহার্য ছিল।

কিংস কলেজ লন্ডনের রিজেনারেটিভ ডেন্টিস্ট্রির পরিচালক আনা অ্যাঞ্জেলোভা ভলপনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন উপকরণ ব্যবহার করে একটা কোষীয় ম্যাট্রিক্স তৈরি করি। এটা কোষগুলোর মধ্যে সফলভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটায়। ফলে ল্যাবের পাত্রেই দাঁত গঠন সহায়ক ও সহজ হয়। আমাদের ধারণার চেয়েও উপযোগী ছিল সেই পরিবেশ। এভাবে আমরা হয়তো মানুষের দাঁত ল্যাবে তৈরির আরও এক ধাপ কাছে চলে গেলাম।’

এই সাফল্যের গুরুত্ব কতটা, তা ধারণা করতে পারছেন! তা বুঝতে হলে প্রথমে বর্তমানের দাঁত মেরামতের পদ্ধতিগুলোর সীমাবদ্ধতা জেনে নিই। তাহলে কিছুটা খোলাসা হবে। বর্তমানে দাঁতে ফিলিং করা হয়। ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত টিকিয়ে রাখতে বহুল ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতি এটা। কিন্তু এটা সাময়িক সমাধান। ডেন্টাল অ্যান্ড ক্র্যানিওফেশিয়াল সায়েন্সেস ফ্যাকাল্টির গবেষক জিউশেন ঝ্যাং বলেন, ‘দাঁত ফিলিং করা ভালো কোনো সমাধান নয়। বরং তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাঁতের স্থায়িত্ব দুর্বল করে দেয়। ফিলিং বেশিদিন টিকেও না। এছাড়া দাঁতের অতিরিক্ত ক্ষয় হয়।’

অন্যদিকে ইমপ্লান্ট চিকিৎসা পদ্ধতি তুলনামূলক দীর্ঘস্থায়ী। তবে জটিল অপারেশন ও ভালোভাবে সংরক্ষিত ‘অ্যালভিওলার বোন’ প্রয়োজন। চোয়ালের হারকে অ্যালভিওলার বোন বলে। এই হাড়েই দাঁত যুক্ত থাকে। ওপরের দুটি সমাধানই কৃত্রিম। স্বাভাবিক দাঁতের গঠন ও কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে পুরোপুরি ব্যর্থ।

নতুন এ গবেষণার ফল এমন সমস্যাগুলোর সমাধান করবে। রোগীর নিজের কোষ থেকে সৃষ্ট দাঁত শরীরের সঙ্গে মানিয়ে নেবে। এগুলো প্রাকৃতিক দাঁতের হুবহু বিকল্প হতে পারে। স্বাভাবিকভাবে মিশে যাবে চোয়ালের সঙ্গেও। ক্ষয় হলে নিজেই সে ক্ষয় পূরণ করবে। কৃত্রিম বা সিনথেটিক পদার্থের সংস্পর্শে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এই দাঁত। ঝ্যাং জানান, ‘ল্যাবে তৈরি দাঁত প্রাকৃতিকভাবে আবার জেগে ওঠবে। আসল দাঁতের মতোই চোয়ালের সঙ্গে লেগে থাকবে। আরও মজবুত, দীর্ঘস্থায়ী হবে এগুলো।’

ওপরে কোষীয় ম্যাট্রিক্সের কথা বলেছি। এটা শরীরের আভ্যন্তরীণ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। তবে এর আগেও এই চেষ্টা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কোষের সংকেত আদান-প্রদান ছন্নছাড়া ও আচমকা ছিল বলে সে চেষ্টাগুলো আলোর মুখ দেখেনি। তাছাড়া এক সঙ্গে সব সংকেত পাঠানোর পদ্ধতিও ঠিক ছিল না। নতুন পদার্থ বা উপাদান এই সমস্যা সমাধান করেছে। নতুন দাঁত গজানোর পাশাপাশি এ সমাধানটিও বিজ্ঞানীদের জন্য অনন্য এক বিষয়। আসল দাঁতের কোষগুলো যে ক্রমে কাজ করে, ঠিক যে ধীর গতিতে সংকেত বিনিময় করে, গবেষকদের তৈরি এই উপাদানও সেভাবেই কাজ করে। কোষগুলোকে এ উপাদানের পরিবেশে রাখা হলে ধীরে ধীরে দাঁতের গঠন শুরু হয়।

এখন গবেষকেরা সম্ভাব্য দুটি চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন। দাঁত ল্যাবে তৈরি করে রোগীর চোয়ালে বসানো। আর প্রাথমিক লেবেলেই দাঁতের কোষ সরাসরি রোগীর চোয়ালে স্থাপন করা। এ পদ্ধতিতে চোয়ালে কোষ নিজেই বিকশিত হবে। অর্থাৎ, ঠিক যেখানে আসল দাঁত ছিল, সে স্থানে ল্যাবে তৈরি দাঁতের প্রাথমিক কোষ যুক্ত করার কথা ভাবছেন গবেষকরা। এরপর তা মুখের ভেতর বেড়ে ওঠবে।

দাঁত হাসির প্রতীক। শুধু হাসি নয়, খাবারে তৃপ্তি আসে মূলত দাঁতের কর্ষণে। তাই হারানো দাঁতের পুনর্জন্ম চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিশাল বিপ্লব এনে দেবে, সন্দেহ নেই। ভলপনি মনে করেন, ‘যত সময় যাবে, এ কৌশলগুলো তত উন্নত হবে। এতে দাঁতের চিকিৎসা বদলে যেতে পারে। দাঁতের এই পুনর্জন্ম টেকসই ও কার্যকর সমাধান’

হয়তো নতুন এই পদ্ধতি শিগগিরই সাধারণ চিকিৎসার অংশ হয়ে ওঠবে। বয়সের কারণে দাঁত প্রভাবিত হবে না। বুড়ো বয়সেও ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত আবার গজাবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা কলেজ
সূত্র: কিংস কলেজ লন্ডন, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউকে

ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করা কি পাকিস্তানের জন্য বড় হুমকি

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে গত মঙ্গলবার পর্যটকদের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এতে কমপক্ষে ২৬ জন নিহত হয়েছেন। এরপরই ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক হ্রাস করেছে ভারত এবং বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত, যা পাকিস্তানে পানি সরবরাহকে মারাত্মকভাবে কমতে পারে।

ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে তার প্রধান স্থল সীমান্তও বন্ধ করে দিয়েছে এবং বর্তমানে ভারতে থাকা কিছু পাকিস্তানি নাগরিককে দেশ ছাড়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভারতের বিরুদ্ধে একই ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেয় পাকিস্তান এবং উভয় দেশের মধ্যে সকল দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে অংশগ্রহণ স্থগিত করার হুমকি দেয়। যার মধ্যে ১৯৭২ সালের শিমলা চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত।

পাকিস্তানের সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে শিমলা চুক্তিসহ সমস্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্থগিত রাখার অধিকার রয়েছে তাদের। যতক্ষণ না ভারত পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসকে উস্কানি দেয়া, আন্তর্জাতিক হত্যাকাণ্ড এবং আন্তর্জাতিক আইন ভাঙা বন্ধ না করছে, তত দিন এই চুক্তি স্থগিত থাকতে পারে। সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার  হুমকিতে পাকিস্তান বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ। তারা ভারতকে সতর্ক করে দিয়েছে যে পানি সরবরাহে যেকোনো ব্যাঘাতকে ‘যুদ্ধের পদক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তারা পূর্ণ শক্তি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে।  

সিন্ধু পানি চুক্তি একটি আন্তঃসীমান্ত পানি  চুক্তি যা দুই দেশকে সিন্ধু অববাহিকা থেকে প্রবাহিত পানি ভাগাভাগি করার অনুমতি দেয়। গত ৬৫ বছর ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত এবং প্রায় অবিরাম উত্তেজনার মধ্যেও এই চুক্তিতে প্রভাব পড়েনি। যদিও ভারত ২০১৯ সালে চুক্তিটি স্থগিত করার দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলো তবুও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

ভারত কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল

কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনকারী ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী মঙ্গলবার ভারত-শাসিত কাশ্মীরের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র পহেলগাঁওয়ে হামলার দায় স্বীকার করেছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পূর্বে দাবি করেছে, টিআরএফ হল পাকিস্তান ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈইবার একটি শাখা। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে পাকিস্তান কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহকে সমর্থন করে, যদিও ইসলামাবাদ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বুধবার ভারত দাবি করেছে যে পহেলগাঁও হামলার সঙ্গে সীমান্ত সীমার বাইরের সংযোগ রয়েছে এবং এর জন্য ভারত তার পশ্চিমের  প্রতিবেশী দেশটিকে দায়ী করেছে।

বুধবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত থাকবে যতক্ষণ না পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্যভাবে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাখ্যান করছে।

এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ভারত প্রতিটি ‘সন্ত্রাসী’ ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করবে এবং শাস্তি দেবে।

সিন্ধু পানি চুক্তি কী?

১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তান সিন্ধু পানি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। অতিরিক্ত স্বাক্ষরকারী হিসেবে উপস্থিত ছিল বিশ্ব ব্যাংকও। এই চুক্তিতে সিন্ধু নদী এবং এর উপনদীগুলোর পানি দুই দেশের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে ভাগ করে দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। চুক্তির অধীনে তিনটি পূর্বাঞ্চলীয় নদী বিয়াস, রাভি ও শতদ্রুর পানি ভারতকে এবং তিনটি পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী চেনাব, সিন্ধু ও ঝিলমের পানি পাকিস্তানকে বরাদ্দ করা হয়েছিল। এই চুক্তি উভয় দেশকে নির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্যে একে অপরের নদী ব্যবহারের অনুমতি দেয়, যেমন ছোট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প যেখানে খুব কম বা একেবারেই পানি সঞ্চয়ের প্রয়োজন হয় না।

এই চুক্তি অনুসারে, তিনটি পূর্বাঞ্চলীয় নদী বিয়াস, রাভি ও শতদ্রুর পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ ভারতকে দেয়া হয়, যার গড় বার্ষিক প্রবাহ ৪১ বিলিয়ন বর্গমিটার (৩৩ মিলিয়ন একরফুট)। তেমনই পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী সিন্ধু, চেনাব ও ঝিলমের পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানকে দেয়া হয়, যার গড় বার্ষিক প্রবাহ ৯৯ বিলিয়ন বর্গমিটার (৩৩ মিলিয়ন একরফুট)। অন্যদিকে, সিন্ধু নদীর দ্বারা বহন করা মোট পানির  প্রায় ৩০% ভারত পেত, আর বাকি ৭০% পাকিস্তান পেত। এই চুক্তি ভারতকে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি সীমিত পর্যায়ে সেচের জন্য এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, নৌ চলাচল, মাছ চাষ ইত্যাদি কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

এই চুক্তি স্থগিত করার ফলে পাকিস্তানের কী হবে

এটি ভারতের দিক থেকে হুমকি স্বরূপ। তারা যখনই ইচ্ছা সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানি পাকিস্তানে প্রবাহিত করতে বাধা দিতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে ভারত অবিলম্বে নদী প্রবাহ সীমিত করার পরিকল্পনা করছে। এমনকি যদি ভারত চায়, তবুও চুক্তি থেকে তার অংশগ্রহণ স্থগিত করা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিকভাবে পানি প্রবাহ বন্ধ করার সম্ভাবনা কম। এর কারণ হল, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর উজানে জলাধার তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু তাদের জলাধারের ক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। যখন মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে হিমবাহের বরফ গলে যায় তখন পানির স্তর উচ্চ থাকে। তাই সেই পানি  সম্পূর্ণরূপে আটকে রাখার জন্য ক্ষমতা জলাধারগুলোর নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও পরিবেশগত অধ্যয়নের সহকারী অধ্যাপক হাসান এফ খান আল জাজিরাকে বলছেন, পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলো খুব বেশি প্রবাহিত হয়, মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। ভারতে বর্তমানে সেই নদী প্রবাহকে ব্যাপকভাবে সংরক্ষণ করার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। তবে, যদি ভারত পানির প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করে অথবা কমিয়ে দেয়, তাহলে পাকিস্তান শুকনো মরশুমে পানির সমস্যায় পড়বে। পাকিস্তান তার কৃষিকাজ এবং শক্তির জন্য পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। পাকিস্তানে পানির বিকল্প উৎস নেই।

২০২৪ সালে প্রকাশিত পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক জরিপ অনুসারে, পাকিস্তানের অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক, যেখানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ২৪ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানে ৩৭.৪ শতাংশ। দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, জনসংখ্যার বেশিরভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের মতে, দেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২৪৭.৫ মিলিয়ন।

ভারতের কি এই চুক্তি স্থগিত করার ক্ষমতা আছে

ভারত চুক্তি স্থগিত ঘোষণা করলেও আইনি  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারা একতরফাভাবে চুক্তিটি স্থগিত করতে পারে না। পাকিস্তানি আইনজীবী আহমের বিলাল সুফি আল জাজিরাকে বলেছেন, ভারত ‘অ্যাবেয়েন্স’ শব্দটি ব্যবহার করেছে এবং এই চুক্তি স্থগিত রাখার কোনও বিধান নেই। চুক্তিটি কেবলমাত্র দু’পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমেই সংশোধন করা যেতে পারে। সেইসঙ্গে এটি উচ্চ এবং নিম্ন নদী সম্পর্কিত প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যেখানে পানির বণ্টন বন্ধ রাখা যায় না।

নয়াদিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনুত্তমা ব্যানার্জি আল জাজিরাকে বলেছেন, চুক্তিটি চলতে পারে, কিন্তু বর্তমানে যেভাবে চলছে সেভাবে নয়। পরিবর্তে, এটি ‘সংশোধন’, ‘পর্যালোচনা’ ও ‘পরিবর্তন’-তিনটি করা হতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নতুন চ্যালেঞ্জগুলো মূল চুক্তিতে পূরণ করা হয়নি।

টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসান এফ খানের মতে, সিন্ধু পানি  চুক্তি একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি যার কোনও মনোনীত প্রয়োগকারী সংস্থা নেই। যদিও বিশ্বব্যাংকের নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ এবং সালিসকারী নিয়োগের ভূমিকা রয়েছে, এটি কোনও প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নয়।

খান ব্যাখ্যা করে বলেন, যদি পাকিস্তান আইনি আশ্রয় নিতে চায়, তাহলে সম্ভবত তা আন্তর্জাতিক আদালতের মতো  ফোরামের মাধ্যমেই হতে হবে।   এক্ষেত্রে ভারতের ভাবমূর্তি ও সুনাম দুটোই ক্ষুণ্ন হতে পারে। সূত্র: আলজাজিরা

‘সিন্ধুর প্রত্যেক ফোঁটা পানি আমাদের অধিকার’

ভারতের তরফে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পাকিস্তানের বিদ্যুৎমন্ত্রী সরদার আওয়াইস লেঘারি।
লেঘারি ভারতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘সিদ্ধান্তটি তাড়াহুড়ো করে নেয়া হয়েছে এবং এর পরিণতি পানি যুদ্ধ।’

স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে পাক মন্ত্রী বলেছেন, ‘ভারতের বেপরোয়াভাবে  সিন্ধু পানি  চুক্তি স্থগিত করা একটি কাপুরুষোচিত, অবৈধ পদক্ষেপ। সিন্ধুর প্রতিটি ফোঁটা আমাদের অধিকার। আমরা পূর্ণভাবে আইনি, রাজনৈতিক এবং বৈশ্বিক শক্তি ব্যবহার করে এটি রক্ষা করব।’

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর বুধবার ভারত সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করার অভিযোগ তুলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির  সভাপতিত্বে উচ্চ-স্তরের নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিএস) বৈঠকের পর, বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি একটি বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের তরফে নেয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। তিনি জানিয়ে দেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত থাকবে। এছাড়াও, আটারিতে অবস্থিত ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্টটি অবিলম্বে বন্ধ করে দেয়া হবে। শুধুমাত্র যাদের বৈধ ভ্রমণে অনুমোদন আছে তারাই  ২০২৫ সালের ১ মে- এর মধ্যে সেই রুট দিয়ে ফিরে আসতে পারবেন।

সার্ক ভিসা অব্যাহতি প্রকল্পের আওতায় পাকিস্তানি নাগরিকদের ভারতে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং পূর্বে জারি করা যেকোনো SPES ভিসা এখন বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে যারা এই ধরনের ভিসা নিয়ে ভারতে আছেন তাদের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে দেশ ত্যাগ করতে হবে। ভারত পাকিস্তানি হাইকমিশনের সকল প্রতিরক্ষা, সামরিক, নৌ এবং বিমান উপদেষ্টাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তাদের এক সপ্তাহ সময় দিয়েছে দেশ ছেড়ে চলে যাবার জন্য। একইভাবে, ভারত ইসলামাবাদ থেকে তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাদের প্রত্যাহার করার কথা জন্যে দিয়েছে। ১ মে এর মধ্যে উভয় হাইকমিশনের কর্মকর্তার সংখ্যা ৩০ জনে নামিয়ে আনা হবে। মিশ্রি নিশ্চিত করেছেন যে, সিসিএস নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে। সেইসঙ্গে অপরাধী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সূত্র : টাইমস অফ ইন্ডিয়া

mzamin

ইউরোপের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অর্থ কী by আঁদেরস ফগ রাসমুসেন

মার্কিন নেতৃত্বাধীন যে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা এত দিন ছিল, তা এখন আর নেই। আগে বিশ্বের নেতৃত্ব দিত যুক্তরাষ্ট্র—একটা নির্দিষ্ট নিয়মকানুনের ভিত্তিতে চলত সবকিছু। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বিশ্বরাজনীতি পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন ইউরোপের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—নিজের প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকভাবে চালিয়ে যাওয়া, যাতে পৃথিবী আবার এমন অবস্থায় না ফিরে যায়, যেখানে যার কাছে ক্ষমতা বেশি, তার কথাই শেষ কথা। অর্থাৎ সবকিছু শুধু ওয়াশিংটন, মস্কো আর বেইজিংয়ের মতো শক্তিশালী রাজধানীগুলোর ইচ্ছেমতো না চলে, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বহুদিন ধরে রাখা বিশ্বাস ও ধারণাগুলো সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হবে। পুরোনো ধ্যানধারণা আঁকড়ে ধরলে চলবে না। শুধু কূটনৈতিক সফট পাওয়ার দিয়ে গণতন্ত্র এবং আমাদের জীবনধারা রক্ষা করা সম্ভব নয়। আমাদের এখন কঠোর শক্তির ভাষা আবার শিখতে হবে। যারা আমাদের মূল্যবোধ ও স্বার্থের বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের মোকাবিলা করতে এ ভাষাই একমাত্র উপায়।

হ্যাঁ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিরক্ষার জন্য ইউরোপের দেশগুলোকে শত শত বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করতে হয়েছে। কিন্তু এ প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়।

২০১৪ সালে ন্যাটোর লক্ষ্য ছিল জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয়—যখন যুক্তরাষ্ট্র, যদিও অনিচ্ছায়, বিশ্ব পুলিশের ভূমিকা পালন করত। এখন সেই সময় আর নেই। রাশিয়ার সামরিক আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে ইউরোপকে অন্তত দ্বিগুণ প্রতিরক্ষা ব্যয় করতে হবে। আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছি, ২০২৮ সালের মধ্যে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় ৪ শতাংশ হওয়া উচিত।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক নিজেদের দেশের জন্য যেসব উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাচ্ছেন, সেগুলো গোটা ইউরোপে বাস্তবায়িত হতে হবে।

বড় সেনাবাহিনী ও বেশি অস্ত্র সরঞ্জাম সরাসরি হামলার ভয় কমাবে, কিন্তু শুধু এসব যথেষ্ট নয়। যদি ইউরোপের বাড়তি ব্যয় শুধু সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ইউরোপ তার নিজের উচ্চপ্রযুক্তি বিপ্লব ঘটানোর সুযোগ হারাবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শক্তির পেছনে রয়েছে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন—এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বায়োটেক। এ জায়গাগুলোতে ইউরোপ পিছিয়ে পড়ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ওপর আমাদের নির্ভরতা আরও বাড়বে।

নিয়ম মেনে চলা একটা বিশ্বব্যবস্থা ধরে রাখতে হলে আমাদের নতুনভাবে ভাবতে হবে—কীভাবে একসঙ্গে কাজ করা যায়। পুরোনো কিছু জোট, যেমন জি৭, এখনো কিছু কাজে আসে। কিন্তু এখন সময় হয়েছে নতুন ধরনের জোট গড়ার—যেমন গণতান্ত্রিক দেশগুলো নিয়ে একটা দল, যেটার নাম হতে পারে ‘ডি৭ ’।

এই ডি৭ একসঙ্গে কাজ করতে পারে মুক্ত বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সাহায্য, প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি আর গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ পাওয়ার ব্যাপারে। এমনকি তারা এমন এক নিরাপত্তা চুক্তিও করতে পারে, যাতে যদি এক দেশ সাইবার হামলা বা অর্থনৈতিক চাপে পড়ে, তাহলে অন্য দেশগুলো তার পাশে দাঁড়ায়—ঠিক যেমন ন্যাটোর নিয়মে আছে, এক দেশ আক্রান্ত হলে সবাই তাকে রক্ষা করে।

এই লক্ষ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে যুক্তরাজ্যের মতো ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে এবং কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে হবে। ভারতকে নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে হবে—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যার জিডিপি গত এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে এবং এই দশকের শেষের আগেই যা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে কিছু করা নয়, বরং এমন প্রস্তুতি নেওয়া, যাতে আমেরিকা পাশে থাকুক বা না থাকুক, ইউরোপ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

অনেক দিন ধরেই ইউরোপ সস্তা রুশ জ্বালানি, সস্তা চীনা পণ্য ও সস্তা মার্কিন নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে এসেছে। কিন্তু এই পরনির্ভরশীলতা আর চলে না। আমাদের স্বনির্ভর হতে হবে। এর জন্য শুধু প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে খরচ করলেই চলবে না, আমাদের সমাজের ভেতরেও নতুন এক বোঝাপড়া দরকার।

আমরা ইউরোপীয়—এই নিয়ে আমরা যে গর্ব করি, তা ছাড়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কল্যাণরাষ্ট্রের পুরোনো কিছু নীতির বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা নিখরচা নয়। আমরা কী চ্যালেঞ্জের মুখে আছি এবং তার জন্য আমাদের কী করতে হবে, তা নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের সত্যি কথা বলতে হবে।

ইউরোপের সামনে আজ এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে মুক্ত বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণ করার। যদি আমরা এই সুযোগ হাতছাড়া করি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

আঁদেরস ফগ রাসমুসেন ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব এবং ডেনমার্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি ‘অ্যালায়েন্স অব ডেমোক্রেসিস ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ইউরোপের সামনে আজ এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে মুক্ত বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণ করার
ইউরোপের সামনে আজ এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে মুক্ত বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণ করার। ছবি: এএফপি

জীবনে একবার হলেও যে নামাজ পড়তে বলেছেন নবীজি (সা.) by ফেরদৌস ফয়সাল

নফল নামাজগুলোর মধ্যে ‘সালাতুত তসবিহ’ একটি অনন্য ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত, যা গুনাহ মাফ ও আত্মশুদ্ধির জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। সালাতুত তাসবিহ অর্থ তসবি পাঠের নামাজ। আমরা আল্লাহর প্রশংসাবাচক যে-শব্দগুলো জপমালায় সকাল-সন্ধ্যা জপি, তাকেই তাসবিহ বা প্রচলিত শব্দে তসবি বলে। এই নামাজে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’ তসবি বারবার পড়া হয়।

সালাতুত তসবির নিয়মিত আমল একজন মুমিনকে গুনাহ থেকে পবিত্র করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ সুগম করে।

জীবনে অন্তত একবার হলেও সালাতুত তসবি পড়তে হয়। এ নামাজের সুসংবাদ নবীজি (সা.) তাঁর চাচাকে দিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বরাতে হাদিসে আছে, একদিন নবীজি (সা.) আমার পিতা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.)-কে বললেন, চাচাজান, আমি কি আপনাকে উত্তম তসবি শিক্ষা দেব না, যখন আপনি তা সম্পাদন করবেন, আল্লাহ আপনার পূর্বাপর, নতুন-পুরাতন, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ছোট-বড় সকল প্রকার পাপ ক্ষমা করবেন। তা হলো, চার রাকাত নামাজ। প্রতি রাকাতে সুরা ফাতিহা এবং পরে একটি সুরা পড়বেন। প্রথম রাকাতে কিরাত পড়া হলে দাঁড়ানো অবস্থায় পনেরো বার বলবেন, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’। তারপর রুকু করবেন এবং রুকু অবস্থায় পড়বেন দশবার। রুকু হতে সোজা হয়ে দাঁড়াবেন এবং এ-অবস্থায় তসবি পড়বেন দশবার। তারপর সেজদায় নত হবেন এবং দশবার তসবি পড়বেন। তারপর সেজদা থেকে মাথা তুলে (দুই সেজদার মধ্যবর্তী সময়ে) তসবি দশবার পড়বেন। তারপর আবার সেজদায় যাবেন এবং সে-অবস্থায় দশবার তসবি পড়বেন। তারপর (দ্বিতীয়) সেজদা থেকে মাথা তুলে আরও দশবার তসবি পড়বেন। এভাবে প্রতি রাকাতে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’ তাসবিহটি ৭৫ বার পড়া হবে।

চার রাকাত নামাজের প্রতি রাকাতে এভাবে করবেন। যদি প্রতিদিন একবার এই নামাজ পড়তে পারেন, পড়বেন। না হলে প্রতি জুমার দিন একবার পড়বেন। তা-ও না পারলে প্রতি মাসে একবার। তা-ও না হলে বছরে একবার। এবং তা-ও যদি না পারেন তবে জীবনে অন্তত একবার পড়বেন। (আবু দাউদ: ১২৯৭; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৭)

সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ম

এই নামাজ ৪ রাকাত। ৪ রাকাত একত্রে বা দুই রাকাত করেও পড়া যায়। ৪ রাকাতে মোট ৩০০ বার পড়তে হয় ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’ তাসবিহটি। তাসবিহ পাঠের বিস্তারিত পদ্ধতি হলো:

১.নামাজে দাঁড়িয়ে সানা পড়ে তসবি পড়ুন ১৫ বার।

২.সুরা ফাতেহা ও অন্য সুরা মেলানোর পর রুকুর আগে তসবি পড়ুন ১০ বার।

৩.রুকুতে গিয়ে রুকুর তসবি পড়ার পর এ তসবি পড়ুন ১০ বার।

৪.রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় এ তসবি ১০ বার।

৫.সেজদায় গিয়ে সেজদার তসবি পড়ার পর সেজদাবস্থায় এ তসবি পড়ুন১০ বার।

৬.দুই সেজদার মাঝে বসা অবস্থায় এ তসবি পড়ুন ১০ বার।

৭. দ্বিতীয় সেজদায় গিয়ে সেজদার তসবি পড়ার পর আবার সেজদা অবস্থায় এ তসবি পড়ুন ১০ বার।

এভাবে প্রতি রাকাতে মোট ৭৫ বার এবং ৪ রাকাতে মোট ৩০০ বার সালাতুত তসবি নামাজের নির্ধারিত তসবি পড়া হবে।

কোথাও তসবি পড়তে ভুলে গেলে বা ভুলক্রমে নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে কম পড়লে পরবর্তী যে-রোকনে স্মরণ আসুক, তার সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে ভুলে যাওয়া সংখ্যা আদায় করে নিতে হবে। কোনো কারণে ‘সাহু সেজদা’ ওয়াজিব হলে সেই সেজদা এবং তার মধ্যবর্তী বৈঠকে তসবি পাঠ করতে হবে না। তসবির সংখ্যা স্মরণ রাখার জন্য আঙুলের কর গণনা করা যাবে না।

সালাতুত তসবিহ নামাজের ফজিলত

রাসুল (সা.) বলেছেন, এই নামাজে গুনাহ মাফ হয়, এমনকি গুনাহ সমুদ্রের ফেনার মতো বেশি হলেও। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১,২৯৭)।

এই নামাজ যেকোনো সময় পড়া যায়, তবে অন্য নামাজ পড়ার নিষিদ্ধ সময়গুলোতে, অর্থাৎ সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও ঠিক দুপুরের সময়ে পড়া যাবে না। বিশেষত রাতের বেলা বা তাহাজ্জুদ নামাজের সময় পড়া উত্তম।

নিয়ত মুখে উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। ‘সালাতুত তাসবিহর ৪ রাকাত নামাজ আল্লাহর জন্য আদায় করছি’ এটা ভেবে নামাজ শুরু করলেই হবে।

জীবনে একবার হলেও যে নামাজ পড়তে বলেছেন নবীজি (সা.)

আবেগের উচ্চতর পর্যায়ে ভারতীয়রা, পাকিস্তানে হামলার আহ্বান

কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে পাকিস্তানের যোগসাজশ রয়েছে- ভারতের অধিকাংশ মানুষ এমনটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স নামের গোষ্ঠীটি হামলার দায় স্বীকার করার পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও এ ধরনের প্রচার চলছে। এতে ভারতজুড়ে ক্ষোভ চরমে। আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই সরকারের প্রতি পাকিস্তানে হামলার আহ্বান জানাচ্ছেন।

আল জাজিরার সংবাদদাতা নেহা পুনিয়া নয়াদিল্লি থেকে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। তিনি কাশ্মীর ইস্যুতে চলমান উত্তেজনা নিয়ে ভারতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কথা বলেন। তাদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, ভারত বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে।

নেহা জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আসা মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ চাপ তীব্র হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওই সন্ত্রাসী হামলার সাথে সীমান্তের আন্তঃসংযোগ রয়েছে। এরপরই ভারতীয়দের আবেগ তীব্র হচ্ছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পর ভারতীয় হতবাক এবং ক্ষোভে ফুঁসছে। বিরোধী দল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সকলেই এই হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কিছু করার আহ্বান জানাচ্ছে।

এই তালিকায় আছেন বিজেপি নেতারাও। বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার গেটে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পুড়িয়েছেন বিজেপি বিধায়করা। যার নেতৃত্বে ছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হুংকার দেন।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুব ভালো করেই জানে, আন্তঃসীমান্ত নিয়ে তাদের বক্তব্য ক্ষোভ উসকে দেবে। ক্ষোভ বাড়লে পাকিস্তানে হামলা করতে মোদির ওপরও চাপ বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক। যদিও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মোদি ইচ্ছেকৃতভাবেই এসব করছেন। তার সরকার নিজেদের পরিকল্পনাতেই কাজ করছে।

এমনকি কাশ্মীর হামলাকে ভারতের ‘ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন’ হিসেবে সন্দেহ করছেন পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অব.) রশিদ ওয়ালি ভারতীয় মিডিয়ার উপর কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, হামলার পরপরই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বেসামরিক ও অসত্য অভিযোগ’ ছড়ানো শুরু হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভারত যদি আবারও কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে এর ফলাফল হতে পারে বিপর্যয়কর, যেমনটা হয়েছিল ‘বালাকোট হামলার’ পর।

অপরদিকে নেহা যেসব ভারতীয় বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলেছেন তাদের অনেক বলেছেন, ভারত ২০১৯ সালের হামলার পর পরিচালিত বিমান হামলার মতো সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করতে পারে। সে সময় কাশ্মীরের পুলওয়ামায় এক গোষ্ঠীর হামলায় ৪০ জন সৈন্য নিহত হয়েছিল।

কিন্তু অনেক বিশ্লেষক সংযমের আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা নেহাকে বলেছেন, আরেকটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের সময় এখন নয়। বিশেষ করে এই দুটি দেশের মধ্যে ইতিহাস বিবেচনা করলে এখানে শান্তি বজায় রাখা আবশ্যক। ভারত-পাকিস্তান তিনটি বড় যুদ্ধ করেছে। ইতিমধ্যেই তাদের মধ্যে খুব তিক্ত সম্পর্ক রয়েছে। ফের যুদ্ধ বাধলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। 

ভারতীয় সেনা। ছবি : সংগৃহীত
ভারতীয় সেনা। ছবি : সংগৃহীত

পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা

কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলার ঘটনায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এই হামলায় পাকিস্তানের মদদ আছে অভিযোগ তুলে গত বুধবার প্রতিবেশী দেশটির নাগরিকদের ভিসা বাতিলসহ পাঁচটি পদক্ষেপ নেয় ভারত। এর জবাবে গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের নাগরিকদের ভিসা বাতিল, দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য স্থগিত, ভারতের উড়োজাহাজের জন্য আকাশসীমা বন্ধসহ বেশ কয়েকটি পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান। আগের দিন ভারত যেসব পদক্ষেপ নেয়, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা। এর জবাবে পাকিস্তান গতকাল হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ওই চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান যে পানি পাবে, তার প্রবাহ থামানো বা অন্যদিকে নেওয়ার যেকোনো চেষ্টা যুদ্ধের শামিল বলে বিবেচনা করা হবে। এই পানির প্রবাহ রক্ষায় পূর্ণ শক্তি প্রয়োগেরও ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।

এদিকে কাশ্মীরে হামলাকারী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, যারা এই হামলা চালিয়েছে এবং যারা এই নীলনকশা সাজিয়েছিল, তাদের কল্পনাতীত পরিণতি ভোগ করতে হবে।’ নরেন্দ্র মোদি বলেন, এই সন্ত্রাসীদের যত সামান্য ভূমিই থাকুক না কেন, এখনই সময় এসেছে তা ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার। ১৪০ কোটি ভারতীয়র ইচ্ছাশক্তি এই সন্ত্রাসীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে

গত মঙ্গলবার বিকেলে কাশ্মীরের পেহেলগামের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র বৈসারণ উপত্যকায় বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের একজন ছাড়া সবাই ভারতীয়। নিহত একমাত্র বিদেশি পর্যটক নেপালের নাগরিক।

এই হামলার দায় স্বীকার করেছে দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ) নামে স্বল্প পরিচিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। ২০১৯ সালে কাশ্মীর অঞ্চলে আত্মপ্রকাশ করা এই সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবার সঙ্গে যুক্ত বলে ভারতের দাবি। ভারতের পুলিশ বলছে, পর্যটকদের ওপর হামলাকারীদের দুজন পাকিস্তানের নাগরিক।

ওই হামলার পরদিন গত বুধবার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির সভায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতসহ পাঁচটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী, আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত বন্ধ, দিল্লিতে পাকিস্তানের হাইকমিশনে নিযুক্ত সব সামরিক উপদেষ্টাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, হাইকমিশনে কর্মকর্তার সংখ্যা ৫৫ থেকে কমিয়ে ৩০ জনে আনা এবং সব পাকিস্তানির ভিসা বাতিল করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগ করতে বলা হয়।

‘যুদ্ধের শামিল’

ভারতের ওই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল ইসলামাবাদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) বৈঠক হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে ভারতের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এক বিবৃতিতে সিদ্ধান্তগুলো জানানো হয়।

সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ভারতের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে পাকিস্তান বলেছে, এই চুক্তি বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া একটি বাধ্যবাধকতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি, এককভাবে এই চুক্তি স্থগিতের কোনো বিধান নেই। পানি পাকিস্তানের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়, যা দেশের ২৪ কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করে। যেকোনো মূল্যে এই পানি পাওয়ার বিষয়টি রক্ষা করা হবে।

হুঁশিয়ারি দিয়ে ইসলামাবাদ বলেছে, সিন্ধু চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান যে পানি পাবে, তার প্রবাহ বন্ধ বা অন্যদিকে নেওয়ার যেকোনো চেষ্টা এবং ভাটি অঞ্চলের মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা যুদ্ধের শামিল বলে বিবেচনা করা হবে। জাতীয় সক্ষমতার পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করে এর জবাব দেওয়া হবে।

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে সই করেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। এ চুক্তির আওতায় সিন্ধু, চন্দ্রভাগা, শতদ্রু, ঝিলাম, ইরাবতী ও বিপাশা নদীর পানি পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়।

ভারতের পদক্ষেপকে বেপরোয়া ও দায়িত্বহীন আখ্যায়িত করে পাকিস্তান বলেছে, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তসমূহ এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। এ অবস্থায় পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে সব দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্থগিতের অধিকার প্রয়োগ করবে এবং তা শুধু সিমলা চুক্তি স্থগিতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইসলামাবাদ বলেছে, ভারত পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসবাদ উসকে দেওয়া ও আন্তসীমান্ত হত্যা বন্ধ না করা পর্যন্ত এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবসমূহ মেনে না চলা পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় সব চুক্তি স্থগিত থাকবে।

পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ভারতীয় নাগরিকদের দেওয়া সব সার্ক ভিসা বাতিল করেছে পাকিস্তান। এই ভিসার আওতায় পাকিস্তানে অবস্থানরত সব ভারতীয় নাগরিককে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য শিখ ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হচ্ছে না।

পাকিস্তান গতকালই ওয়াগা সীমান্তচৌকি বন্ধ করে দিয়েছে। বলেছে, যাঁরা বৈধভাবে এই পথ দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন, তাঁরা ফেরত যেতে পারবেন। তবে ৩০ এপ্রিলের পর এই সুযোগ দেওয়া হবে না।

এ ছাড়া ইসলামাবাদে ভারতীয় হাইকমিশনে নিযুক্ত দেশটির প্রতিরক্ষা, নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। অবিলম্বে তাঁদের দেশটি ছাড়তে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদে ভারতীয় হাইকমিশনে কর্মকর্তা ৩০ জনে নামিয়ে আনতে বলেছে পাকিস্তান। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বলা হয়েছে।

ভারতের মালিকানাধীন বা ভারত থেকে পরিচালিত সব উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থার জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পাশাপাশি পাকিস্তান হয়ে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে ভারতের সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিতেরও ঘোষণা দিয়েছে ইসলামাবাদ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব এবং দেশটির জনগণের নিরাপত্তার প্রতি যেকোনো ধরনের হুমকি সব ধরনের দৃঢ় পাল্টা পদক্ষেপের মাধ্যমে মোকাবিলা করা হবে।

এ ছাড়া গতকাল ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, ‘ভারত আমাদের বিরুদ্ধে একধরনের ছোটখাটো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। যদি তারা এর তীব্রতা বৃদ্ধি করে, আমরাও প্রস্তুত।’

হামলাকারীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে শুরু করেছে ভারত। গতকাল দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিরাপত্তাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের নাগরিকদের কাছে থাকা সব ভারতীয় ভিসা আগামী রোববার বাতিল হয়ে যাবে। পাকিস্তানি নাগরিকদের মেডিকেল ভিসার মেয়াদ থাকবে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত।

নয়াদিল্লি বলেছে, পাকিস্তানের যেসব নাগরিক বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁদের অবশ্যই দেশটি ছাড়তে হবে। এ ছাড়া ভারতের যেসব নাগরিক পাকিস্তানে অবস্থান করছেন, তাঁদের অতি দ্রুত ভারতে ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এদিকে পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণার পর ভারত এবং উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে চলাচল করা ফ্লাইটগুলো বিকল্প পথ ব্যবহার করবে বলে জানিয়েছে ভারতীয় বিমান পরিবহন সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে কাশ্মীরে বড় ধরনের গ্রেপ্তার অভিযান শুরু করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গতকাল কাশ্মীরের বসন্তগড় এলাকায় অভিযান চলাকালে বন্দুকধারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গোলাগুলি হয়েছে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।

জম্মু-কাশ্মীর পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী আজ শুক্রবার শ্রীনগরে যাচ্ছেন। সেখানে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করবেন।

এদিকে কাশ্মীরে হামলার পর ভারত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে গতকাল দেশটিতে নিযুক্ত ২০টি দেশের কূটনীতিকদের অবহিত করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও জার্মানির রাষ্ট্রদূতেরা উপস্থিত ছিলেন।

কাশ্মীরে হামলা ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল নয়াদিল্লিতে একটি সর্বদলীয় বৈঠক হয়েছে। সন্ধ্যায় ওই বৈঠকে যাওয়ার আগে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেন। সর্বদলীয় বৈঠকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ ও সংসদীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে বৈঠকে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি ও রাজ্যসভায় বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে, লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ অন্যান্য দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানা’ গুঁড়িয়ে দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে ভারত সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। গতকাল নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান দূতাবাসের কাছে বিক্ষোভ হয়েছে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে এবং ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করতে দেখা যায়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি নতুন সংকট শুরুর বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান। তাঁকে উদ্ধৃত করে পাকিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে দুই দেশের মধ্যে যে স্বল্পকালীন সামরিক সংঘাত দেখা দিয়েছিল, তার পর থেকে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

২০১৯ সালে কাশ্মীরে আত্মঘাতী হামলায় ভারতের ৪১ জন সেনা নিহত হন। ওই হামলার পর পাকিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছিল ভারত।

পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা

গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ: ভারত-পাকিস্তান নতুন সংঘাতে জড়াচ্ছে? by পেনেলোপ ম্যাকরে

কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এলাকায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় অঞ্চলটির সাম্প্রতিক শান্ত পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে।

এই পর্যটন এলাকাটি মুহূর্তেই রক্তাক্ত বিভীষিকার স্থলে পরিণত হয়েছে। এতে করে পরমাণু অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হামলার সময় বন্দুকধারীরা ঘন পাইন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

হামলার শিকার হওয়া লোকজন তখন পিকনিকের মেজাজে ছিলেন। কেউ কেউ ঘোড়ায় চড়ে ঘুরছিলেন।

হামলার পরপরই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, এর ‘কড়া ও স্পষ্ট জবাব’ দেওয়া হবে।

‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামের স্বল্প পরিচিত একটি গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেছে।

তবে ভারত মনে করছে, এই গোষ্ঠী আসলে পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বা বা এমনই অন্য কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের ছদ্মনাম।

পাকিস্তান অবশ্য জঙ্গিদের কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে তারা বলছে, কাশ্মীরিদের ‘স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে’ তারা নৈতিকভাবে সমর্থন করে।

এই নির্বিচার হত্যার ঘটনায় আবারও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। দুই দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড কাশ্মীর নিয়ে তিনটি যুদ্ধ করেছে।

এর বাইরে বেশ কয়েকবার তারা যুদ্ধের কাছাকাছি অবস্থানে গিয়েছে।

নাম প্রকাশ করতে চাননি—ভারতের এমন একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেছেন, হামলাটি এমন এক সময় হলো যখন মাত্র এক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘জাগুলার’ (‘‘জাগুলার’’ মানে গলার শিরা বা জাগুলার ভেইন। এটি শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিগুলোর একটি। কথ্য ভাষায় বা রাজনৈতিক ভাষণে ‘জাগুলার’ বলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জীবন-মরণের প্রশ্ন বা সবচেয়ে দুর্বল ও সংবেদনশীল জায়গাকে বোঝায়) বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কাশ্মীরি ভাইদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে একা ফেলে দেব না।’

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক লেখক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘এটি অঞ্চলটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। আমরা দেখছি, দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী এখন একে অপরের দিকে আক্রমণাত্মক চোখে তাকিয়ে আছে। এখন কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।’

হামলার পর ভারত প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাকিস্তানের হাই কমিশনের প্রতিরক্ষা, নৌ ও বিমানবাহিনীর উপদেষ্টাদের বহিষ্কার করেছে; গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্য পথ বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং প্রথমবারের মতো সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।

সিন্ধু পানিচুক্তির মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় নদীব্যবস্থার পানিবণ্টন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই নদ ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে এবং দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনধারণে এর প্রভাব রয়েছে।

এত দিন কখনোই ভারত এই চুক্তিকে ‘স্থগিত’ করেনি; এমনকি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ চলার সময়ও নয়।

তবে এই হামলার মধ্য দিয়ে যদি হামলাকারীরা কাশ্মীরিদের সমর্থন পাওয়া বা বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব আবার জাগিয়ে তোলার লক্ষ্য স্থির করে থাকে, তাহলে তারা নিশ্চিতভাবে হিসাবে ভুল করেছে।

নিহতদের প্রতি শোক জানাতে হামলার পর কাশ্মীরের এক ডজনের বেশি সংগঠন তাদের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে।

সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ মিছিল করেছে এবং ‘পর্যটকরাই আমাদের জীবন’ বলে স্লোগান দিয়েছে।

শিব নাডার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সিদ্দিক ওয়াহিদ বলেন, ‘কাশ্মীরিরা সত্যিই এই ঘটনায় খুব ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।’

কাশ্মীরে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। হিন্দুপ্রধান ভারত ও মুসলিমপ্রধান পাকিস্তান—দু’দেশই এই অঞ্চলকে নিজেদের দাবি করে আসছে। ১৯৮৯ সালে ভারতের বিরুদ্ধে এখানে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে।

যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সহিংসতা অনেকটাই কমেছে।

২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদির সরকার একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে দেয় এবং রাজ্যকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে ফেলে।

হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী মোদি সরকার বাইরের লোকদের কাশ্মীরে জমি কেনার অনুমতিও দেয়, যাতে কাশ্মীরকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আরও বেশি সংযুক্ত করা যায়।

এই পদক্ষেপের ফলে নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর হয় এবং জঙ্গি তৎপরতা কমে যায়। ফলে পর্যটক সংখ্যা বেড়ে যায়। ২০২৪ সালে রেকর্ড ৩৫ লাখ মানুষ কাশ্মীর ভ্রমণ করেন।

মোদি সরকার এই পরিস্থিতিকে ‘সাধারণীকরণ’ হিসেবে তুলে ধরে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করে।

তাদের মতে, শক্ত অবস্থান গ্রহণের ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদ বন্ধ হয়েছে এবং এই বরফে ঢাকা সবুজ উপত্যকা এখন ‘ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’। তবে স্থানীয় অনেকেই অতিরিক্ত সেনা উপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

আরেকজন ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, সরকার যে বলে এসেছে, ‘সব স্বাভাবিক’, এই হামলা সেই বক্তব্যের সত্যতাকে খণ্ডন করেছে।

মোদি সৌদি আরবে সরকারি সফরে থাকলেও দ্রুত দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি জানান দিনে, সরকার এ ঘটনায় কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে চায়।

দিনদুপুরে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা একটি এলাকায় এমন হামলার পর সরকারকে কড়া প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর যেমন ভারত সীমান্ত পেরিয়ে পাল্টা হামলা করেছিল, এবারও তেমন কিছু করতে পারে।

পুলওয়ামায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪০ জন ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু এবার যেহেতু নিহত ব্যক্তিরা সাধারণ পর্যটক, তাই রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘ভারত বসে থাকতে পারে না। একবার যদি উত্তেজনার পালা শুরু হয়, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আপনি মোদিকে বুঝতে পারবেন না। তিনি কী করবেন তা বলা কঠিন। তিনি খুবই আগ্রাসী মানসিকতার লোক।’

এই হামলার সময়টা রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়টাতেই যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতে সফর করছিলেন।

ভ্যান্স তাঁর প্রথম সরকারি সফরে ভারতে এসে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করার কথা বলেন এবং ভারতকে একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রশংসা করেন।

২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের পার্লামেন্টে এক সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

ভারত অভিযোগ করেছিল, হামলাটি পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীরা করেছে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিকভাবে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

এ প্রসঙ্গে মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘আমরা যেসব বার্তা পাচ্ছি, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ভারতের পাশে রয়েছে এবং ভারত কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালে যুক্তরাষ্ট্র তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করবে না।’

* পেনেলোপ ম্যাকরে দিল্লিতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ে লেখালেখি করেন।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

কাশ্মীরে হামলার ঘটনার পর ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ওয়াঘা সীমান্তের প্রবেশদ্বারে আজ ২৪ এপ্রিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পাহারা বাড়ানো হয়েছে। ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান ‘ক্রস-বর্ডার টেরোরিজমে’ মদদ দিচ্ছে।
কাশ্মীরে হামলার ঘটনার পর ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ওয়াঘা সীমান্তের প্রবেশদ্বারে ২৪ এপ্রিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পাহারা বাড়ানো হয়েছে। ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান ‘ক্রস-বর্ডার টেরোরিজমে’ মদদ দিচ্ছে। ছবি: এএফপি

যে কোনো সময় হামলা করতে পারে ভারত: আলজাজিরাকে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা

পাকিস্তানে যে কোনো সময় হামলা করতে পারে ভারত । এমন সম্ভাবনা ঘিরে ধরেছে পাকিস্তানকে। ফলে হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী।

ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের ক্রমবর্ধমান হুমকির ফলে পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এ বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে। ভারতীয় সামরিক পদক্ষেপ এখন সম্ভব হতে পারে, তাই যেকোনো ভারতীয় আক্রমণ প্রতিহতের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে পাকিস্তানি সামরিক সূত্র।

একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলজাজিরাকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা উচ্চ স্তরের সতর্কতা বজায় রাখছি। কিন্তু ভারতের মতো আমরা আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলে কোনো অপ্রয়োজনীয় ‘হাইপ’ তৈরি করতে চাই না।

ওই কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে এই বিষয়ে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবুও তিনি আলজাজিরার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ভারত যদি মনে করে যে কোনো প্রতিশোধমূলক কাজ করলেও তাদের কিছু হবে না, তাহলে তারা ভুল করবে। আমরা উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। ভারতীয় আগ্রাসন একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের উভয়েরই সাবধানতার সাথে কাজ করা উচিত।

এ কর্মকর্তা পাকিস্তানের জড়িত থাকার ভারতের অভিযোগের বিষয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। বলেন, আক্রমণটি (কাশ্মীর হামলা) নিয়ন্ত্রণ রেখা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার (১২৫ মাইল) দূরে ঘটেছে। আর কাশ্মীর উপত্যকায় ৫ লাখের বেশি ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মীর উপস্থিতি। এর মধ্যে কী করে দিবালোকে এসব ঘটল?

এদিকে পাকিস্তানে ‘সন্ত্রাসী হামলার’ পরিকল্পনা করছে ভারত। এমন অভিযোগ করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ। তিনি ভারতের এ ধরনের বিপজ্জনক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন। খবর আল জাজিরার।

বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ জানান, ভারত দেশের বিভিন্ন শহরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছে। তার কাছে এমন তথ্য আছে।

তিনি বলেন, ভারত যদি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায় তাহলে পাকিস্তানও একইভাবে জবাব দেবে এবং তাদের (ভারতকে) চরম মূল্য দিতে বাধ্য করবে। 

ভারতীয় সেনা। ছবি : সংগৃহীত
ভারতীয় সেনা। ছবি : সংগৃহীত

ইতিহাসের সাক্ষী: ১৯৪৭ সালে কীভাবে দুই ভাগ হয়েছিল কাশ্মীর by অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেড

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর অঞ্চল দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে উপজাতীয় যোদ্ধাদের এক অভিযান এবং তারপরের সামরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে। সেই সংঘাতের শিকার হয়েছিলেন এ রকম কিছু মানুষ এবং কাশ্মীরের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলেছেন বিবিসির অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেড। তা নিয়ে বিবিসি বাংলার ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্ব।

সেটা ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাস। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর উপজাতি গোষ্ঠীগুলোর যোদ্ধারা অভিযান চালান কাশ্মীর উপত্যকায়। তাদের হাতে ছিল প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র, কিন্তু তারা তেমন সুশৃঙ্খল বাহিনী ছিল না। ট্রাকে করে এই যোদ্ধাদের দল অগ্রসর হলো বারামুল্লার দিকে।

কাশ্মীর উপত্যকার এক প্রান্তে একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল এই বারামুল্লা। এখানে একটি ক্যাথলিক মিশন ও হাসপাতালের ওপর আক্রমণ চালান যোদ্ধারা।

বিবিসি রেডিওর প্রতিবেদনে বলা হয়, বারামুল্লার অন্যান্য ভবনের মতোই সেন্ট জোসেফস কনভেন্টেও এই যোদ্ধারা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন। এই উপজাতীয় যোদ্ধারা লড়াইয়ের ব্যাপারে তাঁদের নিজস্ব রীতিই মানে, আধুনিক যুদ্ধের কোনো নিয়মকানুন তাঁদের জানা নেই।

১৯৪৭ সালের ঘটনা সম্পর্কে অনুসন্ধান ও তথ্য সংগ্রহ করতে বিবিসির হয়ে ২০০৩ সালে এন্ড্রু হোয়াইটহেড কাশ্মীর গিয়েছিলেন।

ওই ঘটনায় যাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের দুজন অ্যাঞ্জেলা রারানিয়া ও টম ডাইকস। সেন্ট জোসেফস কনভেন্টে যখন আক্রমণ হয়, তখন তাঁদের বয়স একেবারেই কম।

অ্যাঞ্জেলার মা ছিলেন একজন চিকিৎসক। আর টম ডাইকস ছিলেন একটি ব্রিটিশ পরিবারের সন্তান, তাঁর মা ওই হাসপাতালে এসেছিলেন আরেকটি সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য।

অ্যাঞ্জেলা বলছিলেন, ‘আমি দেখলাম, দেয়াল টপকে ভয়ংকর কিছু লোক ভেতরে আসছেন। তাঁদের হাতে বন্দুক, মুখে দাড়ি। তাদের হাতে যাঁরা মারা যাচ্ছেন, সেই নিহত ব্যক্তিদের হাত থেকে ঘড়ি খুলে নিচ্ছিলেন তাঁরা।’

টম ডাইকসেরও মনে আছে সেই দিনটির ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, ‘আমি দরজার ফাঁক দিয়ে আক্রমণকারীদের উত্তেজিত মুখগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম, আর আতঙ্কিত নার্সরা একটা কোণে জড়োসড়ো হয়ে আছেন। আমার মনে আছে, তাঁদের কয়েকজনকে কাপড়চোপড় ছেঁড়া অবস্থায় দেখেছি। তাঁরা ধর্ষিত হয়েছিলেন কি না, আমি জানি না।’

অ্যাঞ্জেলা বলছিলেন, ‘তাঁরা যাকেই পাচ্ছিলেন, তাঁকেই ছুরি মারছিলেন বা গুলি করছিলেন। এমনকি হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা লোকদের ওপরও তাঁরা আক্রমণ চালিয়েছিলেন।’

বারামুল্লা শহরেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এই আক্রমণকারীরা। ওই শহরের একটি প্রভাবশালী শিখ পরিবার ছিল বালিরা। শিখ সম্প্রদায় ছিল আক্রমণকারীদের বড় টার্গেট।

সেই বালি পরিবারের একজন বলছিলেন, ‘শহরে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। সবাই দৌড়ে পালাচ্ছিলেন। সবার মুখেই এক কথা—বাঁচতে হলে পালাও।’

একজন শিখ মহিলা বলেছেন, যুবতী মেয়েদেরও ধরে নিয়ে যাওয়া হয় সে সময়। তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে তাঁরা আবার যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের নিয়ে যাচ্ছিলেন অন্য গ্রামে। আমার সম্পর্কীয় তিন বোন ছিলেন, তাঁদের সবাইকেই তাঁরা ধরে নিয়ে যান আমার চোখের সামনেই। এরপর তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাইনি আমরা।’

এই আক্রমণ হয়েছিল ব্রিটিশ শাসকদের ভারত ত্যাগের দুই মাস পরে।

কাশ্মীরের জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশই মুসলিম, তবে তাদের শাসক ছিলেন হরি সিং—একজন হিন্দু মহারাজা। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না যে হিন্দুপ্রধান ভারতে যোগ দেবেন, নাকি মুসলিমপ্রধান পাকিস্তানে যোগ দেবেন।

সেই রাজ্যের যুবরাজ ছিলেন হরি সিংয়ের ছেলে করণ সিং। করণ সিংয়ের কথায়, ‘১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের পর আমার পিতা তাত্ত্বিকভাবে স্বাধীন রাজায় পরিণত হয়েছিলেন। কারণ, তিনি ভারত বা পাকিস্তান কোনোটাতেই যোগ দেননি। তিনি দুটি দেশের সঙ্গেই স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। সে প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই উপজাতীয়দের ওই অভিযান হয়।’

উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলো অভিযান চালিয়েছিল পাকিস্তান ও ইসলামের নাম নিয়ে। মহারাজা তখন একটি উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন এবং এ আক্রমণের জন্য একেবারেই তৈরি ছিলেন না।

করণ সিং বলছিলেন, সে সময় কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের রাজপ্রাসাদেই ছিলেন। ‘তখন একটা দরবার চলছিল। এটা ছিল এ রকম একটি অনুষ্ঠান, যেখানে আমার পিতা সিংহাসনে বসেন এবং সবাই তাঁর প্রতি সম্মান জানান। প্রাসাদ একেবারে ফাঁকা, সবাই বাইরে। এর মধ্যে হঠাৎ সব আলো নিভে গেল। এক অদ্ভুত ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হলো। আলো নিভে গিয়েছিল কারণ, আক্রমণকারীরা মহুরায় অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দখল করে নিয়েছিল। সেটা ছিল শ্রীনগর-উরি রোডের ওপর মাত্র ৩০-৩৫ মাইল দূরে।’

কাশ্মীরের মহারাজাকে ভারতে যোগ দেওয়ার দিকে ঠেলে দিল এই আক্রমণ। তিনি ভারতের অংশ হওয়ার জন্য দিল্লির সঙ্গে একটি চুক্তি সই করলেন এবং ভারতের সামরিক সহযোগিতা চাইলেন। এরপর তিনি একটি গাড়িবহর নিয়ে পালিয়ে জম্মু শহরে চলে গেলেন।

করণ সিং বলছিলেন, ‘এটা ছিল একটা ভয়াবহ যাত্রা। আমরা যখন যাত্রা শুরু করি, তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। আমার পিতা এসব ঘটনার কারণে স্বাভাবিকভাবেই খুব বিমর্ষ এবং বিচলিত হয়ে ছিলেন। পুরো পথটায় তিনি গাড়িতে একটি কথাও বললেন না। জম্মু পৌঁছানোর পর তিনি গাড়ি থেকে নেমে বললেন, আমরা কাশ্মীরকে হারিয়েছি।’

তবে উপজাতীয় যোদ্ধাদের হাতে আক্রান্ত সেন্ট জোসেফস কনভেন্টের লোকদের অবশ্য পালানোর কোনো সুযোগ ছিল না।

আক্রমণকারীরা দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে লুটপাট চালালেন এবং নানদের লাঞ্ছিত করলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছয়জন নিহত হলেন। তাঁদের মধ্যে হাসপাতালের রোগী থেকে শুরু করে নার্স—সবাই ছিলেন।

আরও ছিলেন টম ডাইকসের মা–বাবাও। ওই হাসপাতালের পেছন দিকে একটি খোলা জায়গায় তাঁদের কবর দেওয়া হয়েছে।

টম বলছিলেন, ‘গোলাগুলি থেমে যাওয়ার পর আমরা আসলে মা–বাবাকে খুঁজছিলাম। একটা জায়গায় দেখলাম মৃতদেহের স্তূপ। আমার ভাই ডগলাস সেখানে চিৎকার করে কাঁদছিল। একজন নারী এগিয়ে এলেন। আমাকে বললেন, “তোমার মা–বাবা মারা গেছেন।”’ এই নারী ছিলেন অ্যাঞ্জেলা রারানিয়া।

করণ সিং বলেন, ‘এ আক্রমণের পেছনে পাকিস্তানের ইন্ধন এবং অর্থ কাজ করেছে। আমরা পরে জেনেছি যে এ উপজাতিদের মধ্যে সাদা পোশাকে পাকিস্তানি সৈন্য এবং সামরিক অফিসাররাও ছিলেন। কাশ্মীর দখল করাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। এটা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।’

কিন্তু পাকিস্তানের এ চেষ্টা তো সফল হয়নি। প্রশ্ন করা হয়েছিল করণ সিংকে।

করণ সিং জবাবে বলেন, ‘না, এ অপারেশন পুরোপুরি সফল হয়নি। কিন্তু আমার বাবাকে ভারতে যোগদানে বাধ্য করতে সফল হয়েছিল তারা।’

তবে এ ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেন সরদার আবদুল কাইয়ুম খান নামের একজন নেতৃস্থানীয় কাশ্মীরি মুসলিম নেতা। ১৯৪৭ সালে তিনি নিজেও কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।

কাইয়ুম খান বলেন, উপজাতীয় অভিযান আসলে তাঁর পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিয়েছিল।

কাইয়ুম খানের কথায়, ‘এর পেছনে পাকিস্তান কলকাঠি নেড়েছে, এমন সব অভিযোগই ঐতিহাসিকভাবে ভুল। আমরা সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেছিলাম ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে। তখন ব্যাপারটা এ রকম ছিল যে রাজ্যের সেনাবাহিনী রাজ্যের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তবে ধীরে ধীরে এমন হলো যে সীমান্ত এলাকা থেকে আরও লোক এতে যোগ দিতে শুরু করেছিল। কিন্তু পুরো পরিকল্পনাটাই ভেস্তে যায় উপজাতীয় লোকদের অভিযানের কারণে।’

‘সমন্বয় থাকলে তারা হয়তো বিনা বাধায় শ্রীনগর বিমানবন্দরে পৌঁছে যেতে পারত। কিন্তু এই যোদ্ধারা ছিলেন বিশৃঙ্খল। পেছন থেকে কোনো কমান্ড ছিল না। ফলে তাঁরা লুটপাট শুরু করলেন। যখন তাঁদের দুই হাত ভরে গেল, তখন তাঁরা ফিরে চলে গেলেন।’ বলেন কাইয়ুম খান।

এ বিষয়ে এক মত মহারাজার ছেলে করণ সিং। তিনি বলেন, উপজাতীয়রা যদি কয়েক দিন ধরে লুটপাটে ব্যস্ত না থাকতেন, তাহলে পাকিস্তান-সমর্থিত বাহিনী বারামুল্লায় পৌঁছে যেত, আর কাশ্মীরের ইতিহাসও হয়তো বদলে যেত।

করণ সিং আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি খুব নাজুক হয়ে গিয়েছিল। ভারতীয় বাহিনী যখন নামতে শুরু করে, তখন আক্রমণকারীরা শ্রীনগরের বিমানবন্দরের মাত্র চার থেকে পাঁচ মাইল দূরে।’

এরপর কাশ্মীর বিভক্ত হয়ে যায় ভারত ও পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত দুটি অঞ্চলে। সেই থেকে সাত দশকের বেশি সময় ধরে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বিবাদ চলছে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ সালের পর থেকে একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভারতশাসিত কাশ্মীরে চলেছে তীব্র, সহিংস ও রক্তাক্ত বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা।

১৯৪৭–পরবর্তীকালে জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ নামে পরিচিত এক আইন অনুযায়ী বিশেষ মর্যাদা, নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার অধিকার দেওয়া হয়। কয়েক বছর আগে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কাশ্মীরের সেই বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে।

পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য পুরোপুরি মুছে ফেলে একে রূপান্তরিত করা হয় লাদাখ এবং জম্মু-কাশ্মীর নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। আজ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হওয়া কাশ্মীরের সেই বিভক্তি জোড়া লাগেনি।

কাশ্মীরের বিখ্যাত ডাল লেক। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা এই লেকের সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করেন
কাশ্মীরের বিখ্যাত ডাল লেক। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা এই লেকের সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করেন। ছবি: এএফপি

সিলেটের ২ কিশোরীকে কক্সবাজারে পাচার, অনৈতিক কাজ করানোর অভিযোগ

পোশাক কারখানায় চাকরির কথা বলে সিলেটের দুই কিশোরীকে কক্সবাজারে পাচার করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী এক নারীর বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী ওই দুই কিশোরী কক্সবাজার থেকে পালিয়ে সিলেটের শাহপরান থানায় এসে পুলিশের কাছে এ ঘটনা জানায়।

বর্তমানে দুই কিশোরীকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী কিশোরীরা কালবেলাকে বলেন, নাটক দেখার সুবাদে শাহনাজ বেগম নামে এক প্রতিবেশীর বাসায় প্রায়ই যাতায়াত ছিল তাদের। গত ৮ এপ্রিল শাহনাজ বেগম নামের ওই প্রতিবেশী নারী তাদের দুজনকে পোশাক কারখানায় চাকরির কথা বলে সিলেট থেকে কক্সবাজারে তার ছেলে কাছে পাঠায়। এরপর সে তাদেরকে কৌশলে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে অজ্ঞান করে।

তারা আরও বলেন, পরদিন জ্ঞান ফিরলে ওই দুই তরুণী নিজেদেরকে আবাসিক হোটেলে রুমে দেখতে পায়। এরপর কয়েকটি আবাসিক হোটেল নিয়ে অনৈতিক কাজ করাতো শাহনাজ বেগমের ছেলে ইমন আহমদ। গত ৯ এপ্রিল রাত থেকে শুরু করে ২৩ এপ্রিল রাত পর্যন্ত তাদের দুজনকে এসব কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে সিলেটের শাহপরান থানায় এসেছি।

ভুক্তভোগী এক কিশোরীর মা রোবেনা আক্তার কালবেলাকে জানান, শাহনাজ বেগম আমার প্রতিবেশী। স্বামী না থাকায় আমি কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে গেলে আমার মেয়ে রিয়া ও প্রতিবেশী সানা উল্লার মেয়ে মীম দুজনেই টিভি দেখতে পাশের বাসার শাহনাজ বেগমের বাসায় যেতো। ওই মহিলা তাদের দুজনকে খুব আদর-স্নেহ করতো, সেকারণে আমিও কখনো ওই বাসায় যেতে বারণ করিনি। কিন্তু দুই মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে শাহনাজ বেগমের আচার-ব্যবহারে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করি। সে প্রায়শই আমাদের মেয়েদের নিয়ে নানা রকম আজগুবি কথাবার্তা শোনাত। আমাদেরকে দোষারোপ ও গালিগালাজ করতো। এখন দীর্ঘ ১৫ দিন পর মেয়ে দুটো ফিরে এসে যে বর্ণনা দিচ্ছে তাতে তো ওই মহিলার ভয়ংকর রূপ আমাদের কাছে ফুটে উঠেছে।

তিনি আরও বলেন, আমার মেয়েসহ দুই কিশোরীর জীবন নষ্ট করে দিয়েছে শাহনাজ বেগম। প্রায় ১৪ দিন ছোট্ট দুটি মেয়ের শরীরের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। আমাদের মেয়েদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে ওই নারী। বর্তমানে আমার মেয়ে ওসমানী হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

ভুক্তভোগী অপর কিশোরীর বাবা সানাউল্লা বলেন, আমাদের মেয়েদের সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে আমরা তার যথাযথ বিচার দাবি করছি। বিশেষ করে শাহনাজ বেগম ও তার ছেলে ইমন আহমদ। তারা দুজনে মিলে আমাদের মেয়েদের মান-মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়েছে। আমরা তাদের দুজনের সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করছি।

শাহপরাণ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহেল চন্দ্র সরকার বলেন, দুই কিশোরীর মা-বাবা তাদেরকে নির্যাতন করতো, ঘরে আটকে রাখতো। তাই অভিমান করে পূর্ব পরিচিত ওই নারীর ফাঁদে পা দেয়। কাজের জন্য তাদেরকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল কিনা বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সেখানে তাদেরকে আটকে পাশবিক নির্যাতনের ব্যাপারে বলেন, একটি বাসায় তাদেরকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে তারা সেখান থেকে মুক্ত হয়ে সিলেটে আসেন।

শাহপরাণ থানার ওসি মো. মনির হোসেন কালবেলাকে বলেন, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে অভিমান করে দুই বান্ধবী কক্সবাজার পালিয়ে যায়। এরপর তারা দুজনে বৃহস্পতিবার সিলেটে ফিরে আসে। এ ঘটনায় দুজনের পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা মিসিং ডায়েরি পেয়েছিলাম। সে কারণে আমাদের তদন্ত কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে তাদেরকে বুঝিয়ে ফেরত আসতে বলে এবং তারা ফিরে আসে। দুজনকেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

হোটেলে নিয়ে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার বিষয়ে তিনি বলেন, এরকম কোনো কথা তারা আমাদের কাছে বলেনি। এ ছাড়া এমন ঘটনার কোনো অভিযোগও আমরা পাইনি। আমরা যতটুকু জানি, পরিবারের নির্যাতনের শিকার হয়ে দুই বান্ধবী পালিয়েছিল।

তাহলে দুই কিশোরী ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি কেন এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। 

প্রতীকী ছবি : সংগৃহীত

হামাস যেভাবে ইসরায়েলের ‘অপরাজেয়তার মিথ’ ভেঙে দিল by ডেভিড হার্স্ট

ইসরায়েল ভয়াবহ মাত্রায় ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ ভয়াবহতা শুধু গাজা নয়, পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর, এমনকি ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের জীবনের সঙ্গে হামাসের ভবিষ্যৎকে একসূত্রে গেঁথে ফেলেছে। আজ হামাস আত্মসমর্পণ করলে অনেকের চোখে তা পুরো ফিলিস্তিনি জাতিসত্তার পরাজয় বলে বিবেচিত হবে।

গাজার বর্তমান অবস্থা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। একে কেউ কেউ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খোলা বন্দিশিবির বলছেন, কেউ বলছেন হত্যাক্ষেত্র। অথচ এর এক ঘণ্টার দূরত্বে তেল আবিব। তেল আবিবের অনেক বাসিন্দা নিশ্চিন্তে আরামে জীবন কাটাচ্ছেন, যেন কিছুই ঘটছে না।

তবে এক বিষয় তাঁরা বোঝেন না, হামাস আত্মসমর্পণ করবে না।

যে কেউ ভেবে নিচ্ছেন, হামাসের নেতারা অর্থ নিয়ে পালিয়ে যাবেন। যেমন একসময় ফাতাহ করেছিল। তাদের এ ভাবনা প্রমাণ করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর প্রতিপক্ষকে কতটা ভুলভাবে বুঝেছেন। ১৮ মাসের যুদ্ধে, দুই মাসের অবরোধে ক্ষুধার যন্ত্রণায় নিপতিত এক জনগোষ্ঠীকে এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা কার্যত আত্মসমর্পণের সমান। প্রস্তাব ছিল, সব বন্দী মুক্তির বিনিময়ে দেওয়া হবে ৪৫ দিনের খাবার ও পানি। আর হামাসকে নিরস্ত্র হতে হবে।

হামাস পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছিল, বন্দী মুক্তির বদলে কিছু ফিলিস্তিনি বন্দীর মুক্তি দিতে হবে, করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি, গাজা শাসনের ভার অন্য দলকে দিতে হবে। কিন্তু দুটি শর্তে হামাস এখনো অটল—তারা নিরস্ত্র হবে না ও ইসরায়েলি বাহিনীর গাজা পুরোপুরি ছাড়তে হবে।

এ অচলাবস্থার প্রধান কারণ নেতানিয়াহু নিজেই। আর আগে দুবার হামাসের সঙ্গে চুক্তি করে নিজেই তিনি তা ভেঙেছেন। জানুয়ারির এক চুক্তিতে যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩৩ বন্দীর মুক্তি ঘটেছিল। এরপর আরও আলোচনার কথা ছিল, কিন্তু নেতানিয়াহু সে আলোচনায় কোনো গরজ দেখাননি। তাঁদের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও তাতে কোনো বাধা দেয়নি।

এই যে নেতানিয়াহুর এমন ঔদ্ধত্য আচরণ, এর কারণ কিন্তু সামরিক নয়; বরং রাজনৈতিক। ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর যে রাজনৈতিক জোটের সরকার, তা রক্ষা করতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। এ পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়ে খাদ্যগুদামও বোমায় গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল। ক্ষুধাকেই যেন অস্ত্র বানানো হয়েছে। অথচ এর মধ্যেও হামাস প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিনিধি অ্যাডাম বোয়েলারও জানিয়েছেন, সব বন্দী মুক্তি দিলে যুদ্ধ থেমে যেতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নিজেই সে পথে বাধা। এমনকি সিআইএর প্রধান বিল বার্নসের মধ্যস্থতায় একসময় হামাস চুক্তিতে সই করেছিল; কিন্তু নেতানিয়াহু সেখান থেকেও সরে আসেন।

একটা কারণ মানবিক বিপর্যয় নিজেই। গাজায় গত ৭ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভাঙার পর থেকে ১ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামাসের নেতারা নিহত হয়েছেন। প্রশাসন, হাসপাতাল, স্কুল—সবকিছু ধ্বংস হয়েছে। রাফা শহরও এখন ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু অর্থের প্রলোভনেও ফিলিস্তিনিরা গাজা ছাড়ছেন না।

একসময় পিএলওর নেতা ইয়াসির আরাফাত বা ফাতাহ, অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে নির্বাসনে চলে যেতেন, কিন্তু হামাসের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। কারণ কী?

ইসরায়েলি বর্বরতায় গাজা ধ্বংস হয়ে গিয়ে পুরো ফিলিস্তিনি জাতিসত্তার একটি পবিত্র প্রতীক হয়ে গেছে। আজ আর হামাস আলাদা কোনো সংগঠন নয়। তারা সেই জনগণের অংশ, যাঁদের প্রত্যেকে এক বা একাধিক প্রিয়জন হারিয়েছেন। সেই অর্থে এ প্রতিরোধও একটি জাতিগত সংকল্প।

আর এ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় কারণ ইসরায়েল নিজেই। যে ইসরায়েল রাষ্ট্র কখনো থামে না, আরও জমি চায়, অন্য ধর্ম ও জনগণের অস্তিত্ব মুছে দিতে চায়। খ্রিষ্টান, মুসলিম—সবাই এখন নিপীড়নের শিকার। শান্তিকালে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন বেড়েছে—ওসলো চুক্তির পরও থামেনি। ইসরায়েল নামের রাষ্ট্রটি কোনো সময়ই দুই রাষ্ট্র সমাধানে আগ্রহী ছিল না।

এখন যাঁরা ক্ষমতায়—নেতানিয়াহু, ইতামার বেন গাভির, বেজালেল স্মোত্রিচ—তাঁরা মূলত ডেভিড বেন গুরিয়নের অসমাপ্ত কাজ শেষ করছেন। সেই কাজ হলো ‘ইসরায়েলের ভূমি’ থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া। ইসরায়েলের ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মভিত্তিক—সব পক্ষই যেন এ লক্ষ্যে একমত।

সম্প্রতি আল-আকসা মসজিদে রেকর্ডসংখ্যক ইহুদিকে প্রার্থনার করবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ আদালত গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠানোর আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। ইসরায়েল রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান এক হয়ে ফিলিস্তিনকে নির্মূল করতে উঠেপড়ে লেগেছে।

এ প্রেক্ষাপটে হামাস যদি আত্মসমর্পণ করে, তাহলে ফিলিস্তিনিদের কাছে তা হবে তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে পরাজিত হওয়া। কারণ ধর্মীয় নয়, কৌশলগতভাবেই হামাস এখন প্রতিরোধের একমাত্র বাস্তব পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হামাস ফাতাহর মতো নয়। এ সংঘাত শুরু হয়েছিল আল-আকসায় ইহুদি উপদ্রব নিয়ে। গাজার অনেক মানুষ হামাসের সদস্য না হয়েও এ নির্মমতার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের ধর্মের মধ্যেই সান্ত্বনা খুঁজছেন। যেমন ২৩ বছর বয়সী প্যারামেডিক রিফাত রাদওয়ান। তিনি মারা যাওয়ার আগে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছিলেন, তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় না করায় অনুতপ্ত ছিলেন। শেষ মুহূর্তে বিশ্বাসটাই ছিল তাঁর শেষ আশ্রয়।

তবে আত্মসমর্পণ না করার আরেকটি কারণ আছে। আর তা হলো হামাস তাদের লক্ষ্য ইতোমধ্যে কিছুটা অর্জন করেছে বলে মনে করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার দাবি বিশ্বমঞ্চে আবার জোরালোভাবে তুলে ধরা।

সেই অর্থে আন্তর্জাতিক পরিসরে হামাস যেন সত্যিই ছাপ ফেলতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আজ ৫৩ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। মাত্র কিছুদিন আগেও এ সংখ্যা ছিল অনেক কম।

পশ্চিমা আইন হয়তো হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু অনেক সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিরোধকারী হিসেবে দেখছেন। তাঁরা হয়তো হামাসের হামলাকে অন্যায় ভাবছেন। কিন্তু ইসরায়েলকেও আর সমর্থন করতে পারছেন না।

এ যুদ্ধ ইসরায়েল বলপ্রয়োগে চিরতরে শেষ করতে চায়। এর মানে, এ যুদ্ধ এখন প্রত্যেক ফিলিস্তিনির আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই একাধিক জটিল মধ্যস্থতা করতে ব্যস্ত। যেমন গাজা, ইরান আর সৌদি-ইসরায়েল সমঝোতা। কিন্তু এর একটিও সহজ নয়। একদিকে চলছে ইরানে হামলার প্রস্তুতির গুঞ্জন। অন্যদিকে গাজা থেকে জনগণকে স্থানান্তরের পরিকল্পনায় প্রতিবেশীরা একমত নয়। মিসর আর ইসরায়েল, এমনকি সিনাই নিয়ে খোলাখুলি দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে।

আফগানিস্তানে তালেবান কিংবা ইরাকে প্রতিরোধ আন্দোলন বড় শক্তিগুলোকেও দেশ থেকে তাড়িয়েছিল। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ইসরায়েলের মতো ছোট দেশ গাজায় ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ চালিয়ে যাওয়া কতটা সম্ভব? তাই নেতানিয়াহুকে দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের ‘অপরাজেয়তার মিথ’ ভেঙে গেছে। সেই ভাঙন আর জোড়া দেওয়া সম্ভব নয়। এখন সময়, পরাজয়ের আগেই নিজ থেকে সরে দাঁড়ানোর।

* ডেভিড হার্স্ট মিডল ইস্ট আই-র সম্পাদক

- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

ফিলিস্তিনি ও হামাস যোদ্ধাদের বন্দি মুক্তির উল্লাস
ফিলিস্তিনি ও হামাস যোদ্ধাদের বন্দি মুক্তির উল্লাস। ছবি: এএফপি

হামাস কেন আত্মসমর্পণ করবে না by ডেভিড হার্স্ট

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের হামলার পরেও হামাসের মনোবল দৃঢ় রয়েছে। এই যুদ্ধ বন্ধ না হওয়ার পেছনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মনোভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। এ অবস্থায় হামাস ইসরায়েলের কাছে কেন আত্মসমর্পণ করবে না, তা নিয়ে লিখেছেন মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট। ২২ এপ্রিল লেখাটি মিডল ইস্ট আইয়ের অনলাইনে প্রকাশ করা হয়েছে।

গাজাকে আপনি যা ইচ্ছা বলতে পারেন—হত্যার ময়দান; রক্ত, যন্ত্রণা ও মৃত্যুর অবিরাম চক্র কিংবা বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাতিগত বন্দিশালা।

তেল আবিবের আশকেনাজি ইহুদিরা পশ্চিমা বুদ্‌বুদের মধ্যে বসবাস করেন। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্রেব্রেনিকা বা রুয়ান্ডার পর বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যাবলি থেকে মাত্র এক ঘণ্টা গাড়ি চালানোর দূরত্বে বসে কাপুচিনোর মগে চুমুক দিয়ে যোগব্যয়ামের শিক্ষক বিষয়ে গজগজ করতে করতে তাঁরা দিন শুরু করেন। কিন্তু একটা বিষয় তাঁদের কেউই বুঝতে পারছেন না, সেটা হলো এই যে হামাস আত্মসমর্পণ করবে না।

টানা ১৮ মাস ধরে চলা যুদ্ধ এবং ২ মাস ধরে অনাহারের পর গাজার নেতারা টাকা নিয়ে ভেগে যাবেন, যেমনটা একবার ফাতাহ নিয়েছিল—এমন কথা ভাবাটা অজ্ঞতা। এমন প্রত্যাশা বলে দেয়, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর শত্রুকে কতটা কম বোঝেন।

হামাসের প্রতি ইসরায়েলের শেষ ‘প্রস্তাব’ যে কার্যত তাদের আত্মসমর্পণে গড়াত, তা বুঝতে ভুল করার অবকাশ নেই। এ প্রস্তাবের মানে আসলে ৪৫ দিনের মতো খাবার ও পানির বিনিময়ে সব ইসরায়েলি জিম্মিকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং হামাস সদস্যদের নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নেওয়া।

এ প্রস্তাবের জবাবে হামাস বলেছিল, তারা ইসরায়েলের কারাগারে থাকা নির্দিষ্টসংখ্যক ফিলিস্তিনি বন্দির বিনিময়ে সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে তৈরি আছে। শুধু তা–ই নয়, তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতিরও প্রস্তাব করেছিল, যার আওতায় হামাস নিজেদের সুড়ঙ্গগুলো আবার তৈরি করবে না কিংবা অস্ত্র বানাবে না এবং গাজার শাসন ফিলিস্তিনের অন্য দলগুলোর কাছে হস্তান্তর করবে।

তবে এ যুদ্ধের শুরুতে দেওয়া দুটি শর্ত থেকে সরে আসেনি হামাস। একটি শর্ত হলো—তারা নিরস্ত্র হবে না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তারা গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত সমাপ্তি চায়।

নেতানিয়াহু একজন অন্তর্ঘাতী নাশকতাকারী

এটা বারবার সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে অন্তরায় নেতানিয়াহু নিজেই। তিনি দুই দফায় হামাসের সঙ্গে চুক্তি করেছেন, কিন্তু একতরফাভাবে নিজেই তা ভেঙে দিয়েছেন।

সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে একটি পর্যায়ক্রমিক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হন নেতানিয়াহু, এর সুবাদে ৩৩ জন জিম্মিকে মুক্তি দেয় হামাস। কথা ছিল, দ্বিতীয় ধাপে যুদ্ধবিরতি ও গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু করবে ইসরায়েল।

কিন্তু নেতানিয়াহু সেই চুক্তি একটানে ছিঁড়ে ফেলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে এটা করতে দেন। যদিও চুক্তিনামাটির কৃতিত্ব একসময় ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছিলেন।

পারস্পরিক সম্মতিতে নেতানিয়াহু যুদ্ধে ফিরে যান শুধু বাজেটবিষয়ক ভোটে আসন্ন পরাজয় থেকে নিজের জোটকে বাঁচাতে। যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্যগুলো অনেক আগেই ব্যবহার করা হয়ে গেছে।

গাজা যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দূতদের নেতানিয়াহুর সঙ্গে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, ট্রাম্পের সাবেক জিম্মিবিষয়ক দূত অ্যাডাম বয়েহলারকেও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। হামাস সরাসরি দর–কষাকষির মাধ্যমে জিম্মি বিনিময়ের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি স্বাধীন চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু নেতানিয়াহু এ কথা জানতে পেরে গণমাধ্যমে ফাঁস করে দেন।

হামাস আত্মসমর্পণ করবে না

হামাস এবং গাজাবাসী প্রতি রাতে যে সাজা ভোগ করছে, তাতে সংগঠনটির নত না হওয়ার অনেক কারণ আছে। গত মার্চ মাসে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙে গাজায় হামলা চালানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েলের হামলায় হামাসের প্রথম সারির নেতৃত্ব, বেসামরিক সরকার, পুলিশ এবং প্রায় প্রতিটি হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে গেছে। রাফাও ধ্বংস করা হচ্ছে। তবু দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যাওয়ার বিনিময়ে মোটা টাকা দেওয়ার প্রস্তাবকে তারা অগ্রাহ্য করে চলেছে।

ফিলিস্তিনের প্রয়াত নেতা ইয়াসির আরাফাত অনেক আগেই নির্বাসনে চলে যেতেন, যেমনটা তিনি করেছিলেন ১৯৮২ সালে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের পশ্চিমে অবস্থিত ফিলিস্তিনি বাহিনীদের ইসরায়েল অবরুদ্ধ করার পর। ফাতাহ এতক্ষণে বিমানে উঠে পড়ত।

কিন্তু এই উদাহরণগুলোর কোনোটিই হামাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেন?

সবচেয়ে বড় কথা হলো, ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা এবং দক্ষিণ ইসরায়েলে চালানো নৃশংসতা যদি ইসরায়েলকে চিরতরে বদলে দেয়, তেমনি গাজার ধ্বংসযজ্ঞও ফিলিস্তিনি লক্ষ্য–আদর্শকে আমূল বদলে দিয়েছে।

দুনিয়ার নানা প্রান্তে ফিলিস্তিনিদের কাছে গাজা হয়ে উঠেছে পবিত্র ভূমি। গাজার এমন কোনো পরিবার নেই যারা এই যুদ্ধে আত্মীয়স্বজন কিংবা তাদের ঘরবাড়ি হারায়নি।

হামাস কিংবা অন্য কোনো প্রতিরোধ গোষ্ঠীকে সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। এই মানুষদের জন্যই তারা লড়াই করছে। সম্মিলিত দুর্ভোগ যত বাড়ছে, ততই নিজেদের ভূমিতে থাকার সম্মিলিত ইচ্ছাও বাড়ে, যেমনটি দক্ষিণ হেবরনের নিরস্ত্র কৃষকেরা করেছিলেন।

ফিলিস্তিনকে নিশ্চিহ্ন করা

ইসরায়েল কখনো জমি বা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্তুষ্ট হয় না। তারা সব সময়ই আরও বেশি চায়। তারা এই জায়গায় কখনোই অন্য ধর্মের ওপর তাদের ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া বন্ধ করতে পারবে না। ইস্টার সানডের সময় খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের মতোই ইসরায়েলের আধিপত্যবাদী কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

দখল করা পশ্চিম তীরে অসলো চুক্তির পর ইহুদি বসতি স্থাপনের ইতিহাস প্রমাণ করে, যুদ্ধের সময়ের চেয়ে শান্তির সময়ে ইসরায়েলের বসতি স্থাপন বেশি জোরদার থাকে।

ইসরায়েল দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান মানে না। কারণ, দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁদের উত্তরসূরিরা মনে করেন, এখানে শুধু একটি রাষ্ট্রই ছিল। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেনগভি, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্মিলিতভাবে ‘ইসরায়েলের ভূমি’ থেকে ফিলিস্তিনিদের নির্মূল করার কাজটি ‘শেষ’ করছেন মাত্র। ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড বেন গুরিওন কাজটি শুরু করে পরে বন্ধ করেছিলেন।

কৌশলগত বিষয়

হামাসের সম্মিলিত শৃঙ্খলা ও বিশ্বাস তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত হতে দেয়নি। এটি সবার ওপর প্রভাব ফেলে।

২৩ বছর বয়সী প্যারামেডিক রিফাত রাদওয়ানের মৃত্যুকালীন কথা তাঁর ফোনে ধারণ করা আছে। তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়ার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি ধর্মকর্ম চর্চায় অতটা নিয়মিত ছিলেন না কিংবা হামাসের সদস্যও ছিলেন না, কিন্তু মৃত্যুর সময় ক্ষমা চাওয়ার মতো ধার্মিক ছিলেন।

অবিশ্বাস্য প্রতিকূলতার মুখে গাজার ফিলিস্তিনিরা যে সাহসিকতা ও ত্যাগ স্বীকার করছেন, কখনো তার যদি কোনো প্রতীক থাকে, তাহলে রাদওয়ানই ছিলেন সেই প্রতীক। মৃত্যুশয্যায়ও তাঁর বিশ্বাস টলানো যায়নি। গাজার বিশ্বাসও অটল থাকবে।

হামাস কেন হাল ছাড়বে না, তার আরও কিছু কম প্রত্যক্ষ কারণ আছে।

হামাসের ভাগ্যে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে। সংগঠনটি বিশ্বাস করে, তারা তাদের কৌশলগত লক্ষ্যও অর্জন করে ফেলেছে। তামিল টাইগার্স বা চেচেন বিদ্রোহীদের বল প্রয়োগ করে দমন করা হয়েছে। অন্যদিকে স্পেনের ইটিএর মতো বিদ্রোহীরা মূল লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই হাল ছেড়ে দিয়েছে।

কৌশলগত লক্ষ্যটি হলো, ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে বিশ্বের মানবাধিকার এজেন্ডার শীর্ষে ফিরিয়ে আনা।

পিউ রিসার্চের গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি ধারণা নেতিবাচক হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক (৫৩ শতাংশ) ইসরায়েল সম্পর্কে প্রতিকূল মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ৭ অক্টোবরের আগের চেয়ে এই হার ৯ শতাংশ বেশি।

জনমতের যুদ্ধে হামাস জিতে যাচ্ছে আর ইসরায়েল হেরে যাচ্ছে, বিশেষ করে যেসব দেশে হামাসকে নিষিদ্ধ সংগঠন ঘোষণা করা হয়েছিল সেখানে। আইন মানুষকে বলছে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ভাবতে, কিন্তু তাঁরা ক্রমেই তা চাচ্ছেন না। যদিও তাঁরা মনে করেন, ৭ অক্টোবর কাজটা খুব খারাপ হয়েছিল।

জটিল আলোচনা

ট্রাম্পের দূতরা বর্তমানে একই সঙ্গে তিনটি জটিল আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, প্রতিটি আলোচনা কতটা আয়ত্তের অতীত।

এ তিনটি বিষয়ের মধ্যে গাজা একটি। তবে এ বিষয়টিতে ট্রাম্প দ্রুত সমাধান চান। তাঁর ধৈর্য নেই যে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কোনো জটিল বিষয়ের পেছনে ছুটবেন। আর এর মধ্যে দুটি সংঘাত গভীরভাবে পরস্পর সংযুক্ত।

ইরানে হামলা চালাতে যেসব দেশ নিজেদের আকাশসীমা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিষিদ্ধ করছে, সে দেশগুলোই গাজা থেকে বিপুল জনগোষ্ঠীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিরোধিতা করছে। এ ছাড়া সিনাই নিয়ে ইসরায়েল ও মিসর প্রকাশ্য শত্রুতার মধ্যে রয়েছে, তারা একে অপরকে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ী করছে।

যদি ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালানোর জন্য নতুন করে চাপ দেবেন। তখন গাজার জন্য কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাস্তববাদী নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসছে। তাঁর হাতে খেলার জন্য যতগুলো তাস আছে তিনি মনে করছেন, এগুলো আসলে তাঁর কাছে থাকবে না।

হামাস এবং গাজাবাসী প্রতি রাতে যে সাজা ভোগ করছে, তাতে সংগঠনটির নত না হওয়ার অনেক কারণ আছে।
হামাস এবং গাজাবাসী প্রতি রাতে যে সাজা ভোগ করছে, তাতে সংগঠনটির নত না হওয়ার অনেক কারণ আছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

‘ছোট্ট অতিথি’: গাজায় হারিয়ে যাওয়া শিশু মায়ার বন্ধনে বাঁধল দুই পরিবারকে

ছোট মোহাম্মদ এখন তার বাবার দুই বাহুর মাঝে। সে নিখোঁজ হওয়ার পর যে পরিবারটি তার দেখভাল করেছে, তাঁদের সঙ্গে সে খুশি মনে খেলছে। 

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আগ্রাসনের মুখে একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিল মোহাম্মদের পরিবার। প্রায় ১৬ মাস আগে ওই স্কুলে বোমা হামলা চালান ইসরায়েলি সেনারা। হামলার পর চারপাশে পড়ে ছিল হতাহত মানুষের দেহ। এর মধ্যেই মাত্র ১৩ মাস বয়সী মোহাম্মদ তার মায়ের নিথর দেহের পাশে বসে কাঁদছিল।

সে দিন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো যখন আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মধ্যে পালাচ্ছিল, তখন মোহাম্মদ সেখান থেকে হারিয়ে যায়।

তার বাবা তারেক আবু জাবাল এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মোহাম্মদকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। অথচ তিনি জানতেন না, ওই স্কুলে থাকা আরেকজন মানুষ তারেককে খুঁজে ফিরছিলেন।

‘একটি ছোট্ট অতিথি’

রাসেম নাবহান ও তার পরিবারও বাস্তুচ্যুত হয়ে উত্তর গাজার জাবালিয়ায় আল-রাফেই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিল। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে দুটি ইসরায়েলি বোমা সে স্কুলে আঘাত হানে।

৪১ বছর বয়সী রাসেম বলেন, ‘আমরা ভীষণ আতঙ্কিত ছিলাম, বাচ্চারা চিৎকার করছিল। কয়েক মুহূর্ত পর সেখানে একটি ড্রোন এসে হাজির হয়। সেখান থেকে সবাইকে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা জারি করা হচ্ছিল। চারদিক থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছিল।’

রাসেম প্রথমে তাঁর স্ত্রী ও সাত সন্তানকে অন্য নারী ও শিশুদের সঙ্গে স্কুল থেকে বের করে দেন। তারপর দৌড়ে দগ্ধ শ্রেণিকক্ষগুলোতে ফিরে যান আগুন নেভাতে এবং কেউ বেঁচে আছে কি না, সেটি দেখতে।

রাসেম বলেন, ‘দেয়ালগুলো রক্তে ভিজে গিয়েছিল। আহত ও নিহত ব্যক্তিদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চারপাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়েছিল। ওই দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করার মতো না।’

এই গাজার বাসিন্দা বলেন, ‘এই বিভীষিকার মধ্যেই আমি দেখতে পেলাম, এক শিশু কাঁদছে। তার পাশে পড়ে আছে এক নারীর দেহ। তাঁর মাথা আর পেট ছিন্নভিন্ন। শরীর রক্তে ভেজা। মনে হলো, ওই নারীই শিশুটির মা।’

কিছু না ভেবেই রাসেম শিশুটিকে তুলে নিয়ে ছুটে যান। তিনি বলেন, ‘শিশুটির মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। সে এত জোরে কাঁদছিল যে, দম নিতে পারছিল না।’

রাসেম বলেন, ‘আমি আশপাশের সবাইকে জিজ্ঞাসা করছিলাম, ‘এই শিশুকে কেউ চিনো? তার মাকে মেরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু কেউ চিনতে পারেনি। এটি ছিল দুঃসহ অভিজ্ঞতা। আমার কাছে মনে হয়েছিল কেয়ামত ঘটে যাচ্ছে। সন্তানদের আঁকড়ে ধরে সবাই ছুটে পালাচ্ছে।’

রাসেম বলেন, ততক্ষণে কিছু ট্যাংক স্কুলটিকে ঘিরে ফেলেছিল। সবাইকে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে বাধ্য করা হচ্ছিল। তিনি শিশুটিকে কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে সড়কের পাশে অপেক্ষা করতে থাকা তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে পৌঁছান। তিনি বলেন, ‘আমি শিশুটিকে আমার স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, তাকে আমি স্কুলে পেয়েছি। তার মাকে মেরে ফেলা হয়েছে।’

রাসেমের স্ত্রী ৩৪ বছর বয়সী ফাওয়াকেহ নাবহান শিশুটিকে কোলে তুলে নেন। তাদের দুই মেয়ে ইসলাম (১৯) ও আমিনা (১৮) শিশুটিকে কোলে নেওয়ার জন্য উত্সাহিত হয়ে ওঠে।

ফাওয়াকেহ বলেন, ‘এক মুহূর্তের জন্য সব ভয় মুছে গেল। আমরা ছোট্ট অতিথিটিকে স্বাগত জানালাম। তার মুখটা ছিল অপূর্ব সুন্দর। আমি সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতি গভীর টান অনুভব করলাম।’

এই দম্পতি শিশুটির নাম রাখেন হামুদ, যা মোহাম্মদ ও আহমেদের আদুরে রূপ। শিশুটিকে নিয়েই তাঁরা দক্ষিণে রাসিদ সড়কের দিকে হাঁটতে থাকেন, পেরিয়ে যান ইসরায়েলি বাহিনীর নেতসারিম তল্লাশিচৌকি।

শিশুটিকে কোলে নেওয়ার দায়িত্ব ভাগ করে নেন রাসেম, ফাওয়াকেহ এবং তাঁদের দুই মেয়ে।

ফাওয়াকেহ বলেন, ‘সে আমাদের কোলেই ঘুমিয়ে পড়ত আবার জেগে উঠত। অন্য যেকোনো শিশু যেমনটি করে। সে জানত না, তার চারপাশে কী ঘটছে।’

আপন হয়ে ওঠা

শিশুটির বয়স ঠিক কত ছিল, তা পরিবারটি জানত না। তবে তার গড়ন ও ওজন দেখে তারা অনুমান করেছিল, সে সাত থেকে নয় মাস বয়সী হবে।

ফাওয়াকেহ বলেন, ‘আমরা তাকে এর আগে কখনো স্কুলে দেখিনি। তার প্রকৃত বয়স বা জন্মদিন সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।

রাসেম ও তাঁর পরিবার হেঁটে গাজা উপত্যকার মাঝামাঝি অঞ্চলের দেইর আল-বালাহতে পৌঁছান এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর দক্ষিণের খান ইউনিসের দিকে রওনা হন। সেখানকার আরেকটি স্কুল–আশ্রয়কেন্দ্রে কিছু জায়গা খালি আছে বলে তাঁরা শুনেছিলেন।

ফাওয়াকেহ বলেন, ‘সব ঝুঁকি সত্ত্বেও আমি মনে করেছিলাম, তাবুতে থাকার চেয়ে স্কুলে থাকা ভালো। অন্তত মাথার ওপর পাকা ছাদ তো থাকবে।’

এই পরিবারের বাস্তুচ্যুত হওয়ার কাহিনি দীর্ঘ ও জটিল—স্কুল থেকে একটি বাস্তুচ্যুত শিবির, সেখান থেকে একটি তাঁবুতে খুব কঠিন পরিবেশে মাসের পর মাস ঘুমাতে হয়েছে।

এই পুরো সময়ে রাসেম ও ফাওয়াকেহ শিশুটিকে উষ্ণতা আর আনন্দের উৎস হিসেবে দেখেছিলেন।

রাসেম বলেন, ‘প্রথম দিকে সে ছিল একেবারে চুপচাপ। যতই চেষ্টা করতাম, সে হাসত না। প্রায় ৫০ দিন ধরে সে এমনই ছিল—যেন সে তার মাকে খুঁজছিল আর ভাবছিল আমরা কারা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে ধীরে ধীরে মিশতে শুরু করল। সে আমাদের আপন করে নিল আর আমরা তার আপন হয়ে উঠলাম।’

এই পুরোটা সময় ফাওয়াকেহ ও তাঁর মেয়েরা শিশুটির যত্ন নিয়েছেন। তবে তাকে খাওয়ানোর দায়িত্ব ফাওয়াকেহ নিজেই পালন করতেন।

কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার মধ্যে একটি শিশুর দেখভাল করা মানে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়া। কারণ, সেখানে দুধ, ডায়পার ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়া যায় না বললেই চলে। আবার পাওয়া গেলেও এসবের দাম নাগালের বাইরে।

ফাওয়াকেহ বলেন, ‘আমরা দক্ষিণে পৌঁছে তার জন্য দুধ কিনি। কিন্তু সে খেতে চাইত না। মনে হয়, তার মা তাকে বুকের দুধ খাওয়াতেন। একদিকে এটাও স্বস্তিরও ছিল। কারণ, দুধের দাম অনেক বেশি। তার বদলে আমি তাকে মসুর ডাল, শিম ও ভাত খাওয়াতাম। আমরা যা খেতাম, সেও তা–ই খেত।’

আশীর্বাদ

রাসেম জানান, পরিবারটি যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছিল, তখন শিশুটি তাদের পরিচিত ও প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছিল। তাদের জীবনে আশীর্বাদ নিয়ে এসেছিল।

ফাওয়াকেহ গলা নিচু করে তাঁর ছোট ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘শিশুটি আমার স্বামীকে বাবা বলে ডাকত, আর আমাকে মাম্মা। সে আমার কোলে ঘুমাত। আমি যখন শিশুটিকে একটু বেশি সময় দিতাম, তখন আমার চার বছরের ছেলে আবদুল্লাহ খুব ঈর্ষান্বিত হতো এবং কেঁদে ফেলত।’

বিভিন্ন সংস্থা, অনাথ শিশুদের পৃষ্ঠপোষক কর্মসূচি, এমনকি কিছু পরিবারও শিশুটিকে দত্তক নিতে চেয়েছিল। কিন্তু রাসেম দৃঢ়ভাবে তাঁদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘সে আমার অষ্টম সন্তান। আমি তাকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি কখনোই তাকে কাউকে দিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করিনি। তাদের প্রতি আমার উত্তর সবসময় একটাই ছিল—শুধু তার প্রকৃত পরিবারকে খুঁজে পেলেই তাকে যেতে দেব।’

তারপর রাসেম নিচুস্বরে স্বীকার করেন: ‘মনে মনে আমি প্রার্থনা করছিলাম, যেন আমি তার পরিবারকে খুঁজে না পাই। আমি তাদের খোঁজাও বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আমরা একে অপরের অনেক আপন হয়ে গিয়েছিলাম।’

এক বাবার ছুটে চলা

রাসেম যখন কথা বলছিলেন, তখন পাশে বসে ছিলেন মোহাম্মদের বাবা তারেক (৩৫)। ছোট ছেলেটিকে মায়াভরা চোখে দেখছিলেন তিনি। তাঁর মুখে লেগে ছিল মৃদু হাসি।

তিন সন্তানের জনক তারেক—ওমর (১৪), তুলায় (৯) এবং এখন ২৬ মাস বয়সী মোহাম্মদ। এক মুহূর্তের জন্যও নিখোঁজ ছেলেকে খোঁজা বন্ধ করেননি তিনি।

তারেক বলেন, ‘যেদিন আল-রাফি স্কুলে ইসরায়েল বোমা হামলা চালায়, সেদিন আমার স্ত্রী আর তিন সন্তান আমাদের শ্রেণিকক্ষেই ছিল। আমি তখন স্কুলের মাঠে ছিলাম। আকাশ থেকে বোমা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌড় দিলাম। চিৎকার করে ছুটে গেলাম তাদের কাছে।’

ইসরায়েলি বাহিনী শুধু আল-রাফি নয়, পাশের স্কুলটিতেও নির্বিচার গোলাবর্ষণ করেছিল। তারেক বলেন, ওই হামলায় আমার স্ত্রী, ভাগ্নে এবং আরও ছয়জন নিহত হয়। এক ঝটকায় আটটি প্রাণ ঝরে গেল।

তারেক আরও বলেন, ‘আমি যখন শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাই, দেখি ওমর আর তুলায় আহত। ওমরের পিঠে বোমার টুকরো ঢুকে গিয়েছিল। আর আমার মেয়ের পেটে আঘাত লেগেছিল। এরপর আমি আমার স্ত্রীকে দেখতে পাই। তাঁর শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।’

বলতে বলতে তারেকের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি ভেঙে পড়ি। কিন্তু কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর মরদেহ সেখান থেকে বের করে আনি।’

তারেকের স্ত্রী ইমান আবু জাবাল ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী। তুলায় তিন মাস পেটে বোমার টুকরা নিয়ে বেঁচে ছিল।

তারেক বলেন, ‘শোক, আহত সন্তানদের জন্য ভয়, চারপাশে চিৎকার, আতঙ্কে পালানোর তাড়া—এসবের মধ্যে আমি যখন বড় দুই সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে আসি, তখন মোহাম্মদকে আনতে ভুলে যাই।’

পরে তারেক ফিরে গিয়ে মোহাম্মদকে খুঁজতে থাকেন। কিন্তু ছেলেকে কোথাও খুঁজে পাননি। সে হারিয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি সবার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছি। কেউ বলেছে সে মারা গেছে, আবার কেউ বলেছে—একজন তাকে নিয়ে গেছে। গল্পগুলো বদলে যাচ্ছিল বারবার।’

তারেক বলেন, ‘আমি ভেঙে পড়েছিলাম। ভিড়ের ভেতর মোহাম্মদকে খুঁজছিলাম। কিন্তু সবাই তখন দৌড়াচ্ছিল, চিৎকার করছে এবং যার যার সন্তানকে নিয়ে পালাচ্ছে।’
মোহাম্মদকে খুঁজে না পেয়ে তারেক কয়েকজনের সঙ্গে স্কুলে ফিরে যান নিহত ব্যক্তিদের কবর দিতে। তিনি বলেন, ‘আমরা আমার স্ত্রীর মরদেহ চাদরে মুড়িয়ে একটা ক্লাসরুমে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলাম। কারণ, বাইরে বেরিয়ে স্কুলের মাঠে গিয়ে তাঁকে কবর দেওয়া তখন অসম্ভব ছিল। ইসরায়েলের গোলাবর্ষণ আর গুলিবৃষ্টি চলছিল। কিন্তু আমি যেকোনো মূল্য স্ত্রীর দাফন করতে চেয়েছিলাম।’

স্কুলে যাঁরা প্রিয়জনদের মরদেহ উদ্ধার করে কবর দিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে সন্তানদের নিয়ে সেখানেই রাত কাটান তারেক। সকালে তাঁরা স্কুলের দেয়ালের একটি ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে বেরিয়ে আসেন। তারেক বিভিন্ন ঘুরপথ পেরিয়ে পশ্চিম জাবালিয়ায় তাঁর ভাইয়ের বাড়িতে পৌঁছান।

বড় সন্তানদের সেখানে রেখে তারেক সারা দিন জাবালিয়ার বিভিন্ন হাসপাতাল আর আশ্রয়কেন্দ্রে মোহাম্মদের খোঁজ করতে থাকেন। এ সময় কেউ তাঁকে বলেছে, একটা পরিবার মোহাম্মদকে দক্ষিণে নিয়ে গেছে। আবার কেউ বলেছে, তাঁরা কিছুই জানে না।

এর মধ্যেই তারেককে অন্য সন্তানদের দিকে নজর দিতে হয়েছিল। চোখের সামনে মায়ের মৃত্যু দেখা সন্তানদের তখন খাদ্য, ওষুধ আর যত্নের দরকার ছিল।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ উত্তর গাজায় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। ফলে সন্তানদের বাঁচাতে তারেক দক্ষিণে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

রাফাহতে পৌঁছানোর পরপরই তারেক আবার মোহাম্মদের খোঁজ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আত্মীয়স্বজন, পরিচিত মানুষ আর স্কুল থেকে যারা আমাদের সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল, তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসা করতাম। কিন্তু কেউ মোহাম্মদের খোঁজ দিতে পারেনি। এভাবেই দিন কাটাতে লাগল। শেষমেশ আমি সব আশা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম।’

তারেক আরও বলেন, ‘আমি দেখতাম, মানুষ পালাচ্ছে, বোমার আঘাতে বা তাড়াহুড়ায় তাদের সন্তানদের ফেলে রেখে যাচ্ছে। দেখতাম হারিয়ে যাওয়া শিশুরা কাঁদছে…তখন আমার নিজের ছেলের কথা মনে পড়ত।’

সন্তানকে ফিরে পাওয়া

২৭ জানুয়ারি যখন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে উত্তর গাজায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, তখন আবু জাবাল এবং নাভহান পরিবার হেঁটে জাবালিয়ায় ফিরে আসেন।

তারেক আল–জাজিরাকে বলেন, ‘সকাল ৮টার দিকে, আমি ও আমার সন্তানেরা জাবালিয়ায় আমাদের বাড়ির ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভোর ৪টায় আমরা রওনা দিয়েছিলাম, আর ধৈর্য ধরতে পারছিলাম না।’

রাসেম ও ফাওয়াকেহর পরিবার একটু পরে রওনা দেয়। পথে এক সাংবাদিক তাঁদের থামিয়ে সাক্ষাৎকার নেন।

রাসেম বলেন, ‘নিজ এলাকায় ফিরে যাচ্ছি। সে জন্য কত আনন্দ হচ্ছিল, তাই বলছিলাম। হঠাৎ ওই সাংবাদিক শিশুটিকে নিয়ে প্রশ্ন করলেন। ভাবলেন, সে আমার ছেলে। আমি বললাম, সে আমার সন্তান নয় এবং পুরো ঘটনাটা বললাম। তিনি এতটাই আবেগে আপ্লুত হলেন যে টিভিতে সরাসরি অনুরোধ করলেন—কেউ যদি শিশুটিকে চিনে থাকেন, যেন যোগাযোগ করেন।’

পরিবারটি শেষ পর্যন্ত রাসেমের মা–বাবার বাড়িতে পৌঁছায়। পরে জানতে পারে, হামুদের আসল পরিবারের কাছাকাছিই ছিল তারা।

পরদিন সকালে তারেক ওই টিভি সাক্ষাৎকারের ভিডিও দেখতে পান। তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদের চেহারায় তেমন পরিবর্তন হয়নি। শুধু একটু বড় হয়েছে। আমি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করছিলাম, আমার ছেলে বেঁচে আছে! আমার ছেলে মোহাম্মদ বেঁচে আছে! আমার ভাই, তার স্ত্রী, পরিবার ও আশপাশের প্রতিবেশীরা দৌড়ে আসে—কী হয়েছে জানতে।’

তারেক আরও বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে ভিডিওটা দেখি। রাসেমের মুখ চেনা লাগছিল। কারণ, আমরা একই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলাম।’

খোঁজখবর নিয়ে রাসেমের পরিবার কোথায় আছে, তা জেনে নেন তারেক। তিনি দৌড়ে সেখানে পৌঁছান।
তারেক বলেন, ‘আমি, আমার সন্তান ও ভাই মিলে সেখানে গেলাম। নিজের পরিচয় দিলাম। রাসেম সঙ্গে সঙ্গে আমাকে চিনে ফেলেন। মোহাম্মদ আমাকে চিনতে পারেনি। সে কেঁদে ফেলেছিল।’

নাভহান পরিবার দ্বিধায় পড়ে যায়। একদিকে তাঁরা খুশি যে হামুদ—যার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ—পরিবারকে ফিরে পেয়েছে। অন্যদিকে তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে ভেবে তাঁদের গভীর দুঃখ ছেয়ে ফেলেছিল।

রাসেম বলেন, ‘মনে হচ্ছিল নিজের আত্মার একটা অংশ ছেড়ে দিচ্ছি। সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত ছিল, যখন ও চলে যাচ্ছিল আর কাঁদতে কাঁদতে আমাকে ‘বাবা’ ‘বাবা’ বলে ডাকছিল।

ফাওয়াকেহ অশ্রুভরা চোখে বলেন, ‘হামুদকে হারানোর দুঃখে আমি রাতে বসে বসে কেঁদেছি। আমার মেয়েরা পুরো এক সপ্তাহ কেঁদেছে। ঘরটা যেন শোকগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। হামুদ আমাদের জীবনের একটা অংশ হয়ে গিয়েছিল। এসব কথা যখন বলছিলেন, তখনো তিনি মোহাম্মদকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন। সে এখনো তাঁকে ‘মা’ বলেই ডাকে।

ফাওয়াকেহ বলেন, ‘আমি আমার স্বামী ও তারেককে বলেছিলাম, হামুদ যেন মাঝেমধ্যে আমাদের দেখতে আসে। সে আমাদের সন্তানের মতো এবং সে আমার জীবনে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।’

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার খান ইউনিস এলাকায় ইসরায়েলি বোমা হামলায় আহত শিশু
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার খান ইউনিস এলাকায় ইসরায়েলি বোমা হামলায় আহত শিশু। ফাইল ছবি: রয়টার্স

পাক-ভারত পাল্টাপাল্টি

পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাশ্মীরের পহেলগাঁও হামলাকে কেন্দ্র করে জবাবে সামরিক প্রতিক্রিয়া হবে কিনা প্রশ্ন সেটা নয়। প্রশ্ন হলো তা কখন হবে, শক্তির পরিমাণ কী হবে এবং তার মূল্য কেমন হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বাগাড়ম্বরতার ফলে পরিস্থিতি ক্রমশ ভীতিকর রূপ নিচ্ছে। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সহ অন্যরা হামলার নেপথ্যে পাকিস্তানের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পহেলগাঁওয়ে হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্ত করা হবে। প্রতিজন সন্ত্রাসীকে এবং তাদের মদতদাতাকে শাস্তি দেয়া হবে। তার ভাষায়- আমাদের উদ্যম কখনো ভেঙে যায়নি। তিনি বিহারের মধুবানিতে এক সরকারি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তিনি আরও বলেন, পুরো দেশ বেদনাহত। কারণ, পহেলগাঁওয়ে নিরপরাধ পর্যটকদের নির্দয়ের মতো হত্যা করা হয়েছে। পুরো দেশ নিহতদের পরিবারের পাশে রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে প্রতিক্রিয়া দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার সেখানে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) ‘ভারতের আগ্রাসী পদক্ষেপের’ জবাব মূল্যায়ন ও তার জবাবে কি ব্যবস্থা নেয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করে। ভারত আটারি সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার পর বৃহস্পতিবার পাকিস্তান সরকার ওয়াগা সীমান্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর আগে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, পাকিস্তানও ভারতের বিরুদ্ধে প্রায় একই রকম ব্যবস্থা নিয়েছে। ভারতের জন্য বন্ধ করেছে পাকিস্তানের আকাশসীমা। উদ্ভূত ঘটনার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকে পহেলগাঁও হামলার পর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে ওয়াগা সীমান্ত বন্ধ করা সহ আরও কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ওই মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। এতে যোগ দেন সামরিক- বেসামরিক শীর্ষ নেতারা। ওদিকে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ নিয়েছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। বৃহস্পতিবার দলটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। তাতে উপস্থিত ছিলেন দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। কমিটি পহেলগাঁওয়ে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। একে কাপুরুষোচিত কাজ বলে অভিহিত করেন তারা। একই সঙ্গে এ হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পাকিস্তানকে দায়ী করে দলটি।

বিবিসি’র সাংবাদিক সৌতিক বিশ্বাস লিখেছেন, মঙ্গলবার পহেলগাঁওয়ে কমপক্ষে ২৬ পর্যটককে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৯ সালের পর থেকে ভারতশাসিত কাশ্মীরে এটাই সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা। ওই হত্যার পর দ্রুতই নয়াদিল্লি ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এগুলো হলো-  ১) সিন্ধুনদের পানি চুক্তি স্থগিত করেছে ভারত। ২) উপরন্তু কূটনৈতিক সম্পর্ককে অবনমন করেছে। কূটনৈতিক মিশনের সদস্য প্রায় অর্ধেক কমিয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যদিয়ে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে দমন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৩) আটারিতে অবস্থিত সমন্বিত চেকপোস্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ৪) সার্ক ভিসা ছাড়ের স্কিমের আওতায় পাকিস্তানি নাগরিকরা ভারত সফরের অনুমতি পাবেন না এবং ৫) পাকিস্তানি হাইকমিশনের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ১লা মে’র মধ্যে হাইকমিশনের শক্তি ৫৫ থেকে কমিয়ে ৩০-এ নামিয়ে আনতে বলা হয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কড়া জবাব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছেন, ভারতের মাটিতে ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি এবং এর মূলহোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমন অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালাতে পারে ভারত। তবে তা কখন এবং কীভাবে, কী মাত্রার হবে তা কেউ জানেন না। সামরিক ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন বলেন, আমরা সম্ভবত খুব দৃঢ় একটি প্রতিক্রিয়া দেখতে পাবো, যা পাকিস্তানের মানুষ এবং তাদের নেতাদের সবার প্রতিই দৃঢ় ইঙ্গিত দেয়। ২০১৬ সালের পর থেকে, বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিশোধ নেয়ার সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর চেয়ে কম করা সম্ভবত (ভারত) সরকারের জন্য কঠিন হবে। কিন্তু আগে যেমন ঘটেছে, পাকিস্তানও তার জবাব দিতে পারে। তবে সব সময়ই উভয়পক্ষে ভুল করার ঝুঁকি থেকে যায়। ২০১৬ সালে উরি’তে হামলায় নিহত হয় ভারতের ১৯ সেনাসদস্য। এরপরই ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসে সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানের ভেতরে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বা হামলা করে ভারত। তারা তখন বলে, পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে জঙ্গিদের লঞ্চপ্যাড লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। ২০১৯ সালে পুলওয়ামায় হামলায় ভারতের কমপক্ষে ৪০ জন আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত হয়। এর জবাবে বালাকোটা ‘জঙ্গিদের ক্যাম্প’ লক্ষ্য করে হামলা চালায় ভারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এটাই পাকিস্তানের অনেক  ভেতরে প্রবেশ করে ভারতের হামলা। ওই হামলার জবাবে আকাশ পথে অভিযান চালায় পাকিস্তান। ফলে উভয় বাহিনীর মধ্যে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যুদ্ধ হয়। তাতে ভারতের একজন পাইলটকে আটক করে পাকিস্তান। এই স্বল্প সময়ের যুদ্ধে উভয় পক্ষ শক্তি প্রদর্শন করেছে। তবে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে সক্ষম হয়েছে। এর দুই বছর পরে ২০২১ সালে তারা নিয়ন্ত্রণরেখায় যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বিশ্বাস করেন, এর আগের হামলায় ভারতের যে উচ্চ পর্যায়ের প্রাণহানি হয়েছে এবং বেসামরিক লোকজনকে টার্গেট করা হয়েছে তার প্রেক্ষিতে বলা যায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের শক্তিশালী সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার সম্ভাবনা আছে। অবশ্য, যদি (পহেলগাঁও) হামলায় পাকিস্তান কোনোভাবে জড়িত বলে যদি দিল্লি নিশ্চিত হয় বা ধরে নেয়, (তাহলেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে)। ভারতের জন্য এই ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার প্রধান সুবিধা হবে রাজনৈতিক। কারণ, এমন জোরালো প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য সরকারের ওপর জনগণের প্রবল চাপ থাকবে। এর আরেকটি সুবিধা আছে। যদি ভারত সফলভাবে সন্ত্রাসীদের টার্গেট ধ্বংস করে তাহলে ভারতবিরোধী হুমকি কমে যাবে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার হবে। তবে অসুবিধা হলো, এমন প্রতিশোধ নিতে গেলে তাতে গুরুতর সংকট সৃষ্টির ঝুঁকি থাকবে। এমনকি যুদ্ধও হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অ্যাট আলবেনি’র ক্রিস্টোফার ক্লেরি বলেন, প্রথমত ২০২১ সালের নিয়ন্ত্রণরেখার যুদ্ধবিরতি লংঘিত হচ্ছে এবং সীমান্ত অতিক্রম করে হামলায় সবুজসংকেত দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দ্বিতীয়ত, ২০১৯ সালের মতো প্রচলিত বিমান হামলা অথবা প্রচলিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয় হাতে থাকতে পারে। তবে এর প্রতিটিতেই প্রতিশোধ নেয়ার ঝুঁকি থাকবে। ফলে ঝুঁকিমুক্ত কোনো পথই নেই। এতে যুক্তরাষ্ট্রও হতাশ হতে পারে। তারা সংকট সমাধানে সহায়তা করতে আগ্রহী নাও হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভারত-পাকিস্তান সংকটে উভয় দেশই পারমাণবিক অস্ত্রধারী। এই অস্ত্র বিপজ্জনক। উভয় পক্ষকে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। আক্রান্ত হলে পাকিস্তানও প্রতিশোধ নিতে পারে। রাঘবন আরও বলেন, এই ধারা আমরা অন্য যুদ্ধ বা উত্তেজনাগুলোতে দেখেছি। যেমন ইসরাইল-ইরানের মধ্যে হামলায়। মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, পুলওয়ামা সংকটের একটি শিক্ষা হতে পারে যে- প্রতিটি দেশকে পাল্টা প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষেত্রে সীমিত শক্তি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা। যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন হুসেইন হাক্কানি। তিনি বিশ্বাস করেন, এবার উত্তেজনা বড় আকার ধারণ করতে পারে। ২০১৬ সালের মতো সীমিত ‘সার্জিক্যাল অপারেশনের’ কথা ভাবতে পারে ভারত। ভারত হয়তো ভাবতে পারে এমন হামলা চালালে পাকিস্তান জবাব দেবে না। তাতে ভারতের জনগণও খুশি হবে। বর্তমানে আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক একাডেমি অ্যান্ড হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো হুসেইন হাক্কানি বলেন, কিন্তু এমন হামলা চালালে পাকিস্তানকেও প্রতিশোধ নিতে উদ্বুদ্ধ করা হবে। পাকিস্তান বলতে পারে, কোনো তদন্ত বা প্রমাণ ছাড়াই এই অভিযোগ দেয়া হচ্ছে তাদেরকে। 

mzamin

কাশ্মীরে ভঙ্গুর শান্তি কি টিকিয়ে রাখা সম্ভব? পর্যটক হত্যাকাণ্ডের পর সংকটের মুখোমুখি মোদি সরকার

কাশ্মীরে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘরে-বাইরে প্রচণ্ড চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই ঘটনাটি পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে সন্দেহভাজন জঙ্গিরা পর্যটকদের একটি দলের উপর গুলি চালালে কমপক্ষে ২৬ জন নিহত এবং ১৭ জন আহত হন। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত মনোরম এই শহরটি দেশীয় ভ্রমণকারী এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে  কাছে বেশ জনপ্রিয়।

সাম্প্রতিককালের মধ্যে ভয়াবহ এই সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের কবলে থাকা এই অঞ্চলের আপেক্ষিক শান্তিকে বিঘ্নিত করেছে। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অধ্যয়নের অধ্যাপক অজয় ​​দর্শন বেহেরা বলেছেন-' এটি এমন কোনও ঘটনা নয় যেখানে  ভারত সরকার চুপ করে থাকবে। 'যদিও এই ঘটনার সাথে কোনও রাষ্ট্রীয় পক্ষের আনুষ্ঠানিকভাবে জড়িত থাকার কথা বলা হয়নি, তবে বেহেরা মনে করেন যে 'জঙ্গিদের এই অভিযানের নেপথ্যে  পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাত রয়েছে। যে পেশাদার পদ্ধতিতে গোটা অপারেশন পরিচালনা করা  হয়েছিল তাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছাপ রয়েছে। কোথায় হামলা করা হবে, পালানোর পথ এবং সময় স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর সামর্থ্যের বাইরে সূক্ষ্ম পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।'

এই হামলাটি কাশ্মীর সম্পর্কে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বক্তব্যের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে মোদির সরকার ২০১৯ সালে এই অঞ্চলের আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে এবং তারপর থেকে কাশ্মীরে নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রচার চালিয়ে এটিকে একটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু করে তুলেছে। এটি মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্সের উচ্চ-পর্যায়ের সফরের মাঝে করা হয়েছে। লক্ষ্য হলো -ভারত যখন বিশ্বব্যাপী অংশীদারদের সাথে দেখা করছে, তখন কাশ্মীরের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতাকে তুলে ধরা। বেহেরা দাবি করেছেন -'এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি সংকেত যে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হয়নি। '

কাশ্মীর- একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল যা সম্পূর্ণরূপে দাবি করা হলেও আংশিকভাবে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ১৯৮৯ সালে ভারত-বিরোধী বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এই উপত্যকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সহিংসতা কমে গেলেও হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। ২০১৯ সালে ভারত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে, রাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করে- জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ। এই পদক্ষেপের ফলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বহিরাগতদের বসবাসের অধিকার প্রদান করতে সক্ষম হয়, যার ফলে তারা এই অঞ্চলে চাকরি পেতে এবং জমি কিনতে পারে। এর ফলে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।  এই বিরোধ পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর মধ্যে তীব্র শত্রুতা এবং সামরিক সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।

"কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স" নামে একটি স্বল্প পরিচিত জঙ্গি গোষ্ঠী সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বার্তায় এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে যে ৮৫,০০০ এরও বেশি "বহিরাগত" এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে, যা এই অঞ্চলে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তিন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। হামলার পর সৌদি আরব সফর সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত ভারতে ফিরে আসেন মোদি, বুধবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য তার শীর্ষ সহযোগীদের সাথে একটি বৈঠক করেন। স্বাধীন রাজনৈতিক ভাষ্যকার নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলছেন-"এটি মোদির  জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হবে। এই আক্রমণের জন্য একটি নিরাপত্তামূলক প্রতিক্রিয়া থাকা উচিত। এটি দেশের রাজনৈতিক আখ্যানের উপরও বড় প্রভাব ফেলবে। 'তিনি বলেন, 'এই ঘটনা বিজেপির দাবিকে দুর্বল করে দেয় যে সীমান্তের ওপারে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক সহ তাদের শক্তিশালী নিরাপত্তা  আন্তঃসীমান্ত জঙ্গিবাদকে সফলভাবে দমন করেছে।'

২০১৯ সালে, ভারত বালাকোটে জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে বলে দাবি করে পাকিস্তানের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল। কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মীদের একটি কনভয়কে লক্ষ্য করে আত্মঘাতী বোমা হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছিল। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় সেনা কমান্ডোদের একটি দল পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে প্রবেশ করে  আক্রমণ করার পর এই আক্রমণটি ছিল দ্বিতীয়বারের মতো বড় হামলা। উরিতে ভারতীয় সেনা চৌকিতে চার জঙ্গি হামলা চালানোর ১০ দিন পর এই আক্রমণটি ঘটে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে সর্বশেষ হামলার পেছনে থাকা জঙ্গিরা ক্ষতিগ্রস্তদের ইসলামী আয়াত পাঠ করতে বাধ্য করেছিল এবং তাদের মোদি  সরকারকে সমর্থন করার জন্য দোষারোপ করেছিল। কারণ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসংখ্যার একটি মূল অংশ থেকে সমর্থন পায় বিজেপি। নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলছেন-' একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে মোদি কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া দেখান তা দেশে আরও বড় ধর্মীয় মেরুকরণের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এটি ভারতের অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে বিশেষত এমন এক সময়ে যখন পুরো বিশ্ব বাণিজ্য উত্তেজনায় জর্জরিত। '

বিশ্বের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকার নীলাঞ্জনের কথায় - ' "কাশ্মীরের মাটিতে এই আক্রমণ ভারতের ইতিহাসে বছরের পর বছর ধরে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মোদিকে এ ব্যাপারে কিছু করতে হবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে হোক বা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে। "কাশ্মীরে পর্যটকদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা বিরল। সর্বশেষ প্রাণঘাতী ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের জুনে, যখন জঙ্গি হামলায় হিন্দু তীর্থযাত্রীদের বহনকারী একটি বাস খাদে পড়ে যাওয়ার পর কমপক্ষে নয়জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত হন।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির কাশ্মীরকে ইসলামাবাদের "গলার শিরা" বলে মন্তব্য করার এক সপ্তাহ পর এই হামলাটি ঘটল। এই বক্তব্য ভারতে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বুধবার, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ হামলায় ইসলামাবাদের কোনও সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। লন্ডন-ভিত্তিক লেখক এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বিশেষজ্ঞ প্রিয়জিৎ দেবসরকার বলেন, মুনিরের মন্তব্য হিন্দু ও মুসলিম যে একসাথে থাকতে পারে না সেই বিভাজনমূলক ধারণাটিকে উস্কে দিয়েছে। এই বিশ্বাসটি ১৯৪৭ সালে বৃটিশ ভারতের বিভাজনের সময় রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় ইন্ধন জুগিয়েছিল। দেবসরকার উল্লেখ করেছেন যে, পাকিস্তান তার অশান্ত বেলুচিস্তান অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতার কারণে ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীলতার সাথে লড়াই করছে।

তিনি পরামর্শ দেন যে, পহেলগাঁওয়ে হামলাটি হয়তো ইসলামাবাদের কাশ্মীর বিরোধের প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের একটি প্রচেষ্টা ছিল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মূলত বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছে। দেবসরকার বলেন, এই হামলার ফলে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী আত্মতুষ্টির অনুভূতিতে ধাক্কা খেয়েছে। তাদের ধারণা ছিল এই অঞ্চলে অনেক দেশী-বিদেশী পর্যটকের আগমনের সাথে সাথে জীবন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। পহেলগাঁওকে প্রায়শই তার মনোরম দৃশ্যের জন্য 'মিনি সুইজারল্যান্ড' হিসাবে বর্ণনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বলিউডের সিনেমাগুলোর জন্য এটি একটি প্রিয় পটভূমি। দেবসরকারের কথায় -  'এই ঘটনাটি পহেলগাঁওয়ের ক্রমবর্ধমান পর্যটন অর্থনীতিতে একটি কালো দাগ হয়ে থেকে যাবে। '

সূত্র : সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

mzamin