Wednesday, February 12, 2020
মাতৃভাষার রক্তক্ষরণ by ড. মো. নজরুল ইসলাম

যে ভাষার জন্য রক্ত দিল সালাম, বরকত ও আরও অসংখ্য বীর, একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণার মাধ্যমে যে ভাষা আন্দোলনকে সারা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে, সে ভাষা আজ আমাদের কাছে শুধু একটি প্রভাত ফেরি ও কিছু আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত হয়ে আছে। যে বাংলা থাকার কথা আমাদের বিশ্বাসে, চেতনায় ও কর্মে, সে বাংলা এখন ইংরেজি, হিন্দি, আরবি প্রভৃতি ভাষার ধাক্কায় অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। বাংলাকে নিয়ে গর্বের পরিবর্তে আমরা হীনম্মন্যতায় ভুগি।
প্রথমেই আসি ইংরেজি প্রসঙ্গে। ইংরেজি এখন একমাত্র আন্তর্জাতিক ভাষা, এ কথা সবাই বললেও কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা কিন্তু ইংরেজিকে এরূপ স্বীকৃতি কখনো দেয়নি। জাতিসংঘ ইংরেজির পাশাপাশি আরও কিছু ভাষাকে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর ইংরেজি সারা বিশ্বে বহুল প্রচলিত ভাষা নয়। লোকসংখ্যার হিসেবে ইংরেজি ভাষাভাষীদের স্থান দ্বিতীয় বা তৃতীয়। তবে এ কথা সত্য, ইংরেজির দাপট অন্য সব ভাষার চেয়ে অনেক বেশি। ইংরেজি ভাষার এই দাপট কি তার ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের কারণে? ইংরেজির চেয়েও উন্নত ভাষা পৃথিবীতে রয়েছে। তাহলে ইংরেজির কেন এত দাপট? এর উত্তর, ভাষা নয় বরং ভাষাভাষীদের কারণেই ইংরেজির এই দাপট। ইংরেজি ভাষাভাষী প্রধান দুটি জাতি, ব্রিটিশ ও আমেরিকান, সারা পৃথিবীতে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল এবং এখনো রেখে চলেছে। এক সময় ব্রিটিশরা রাজ্য দখল করত। এসব অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সবাইকে ইংরেজি শিখতে বাধ্য করত। এভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা ইংরেজিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাল দিয়ে আমেরিকা সারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। অতএব প্রভুর সঙ্গে যোগাযোগ, প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জন ও সুবিধা আদায়ের জন্য সারা বিশ্ব এখন ইংরেজিকেই মেনে নিয়েছে। ভবিষ্যতে চীন যদি বিশ্বকে দখল করে নেয়, তবে চীনা ভাষা হবে আন্তর্জাতিক ভাষা। খোদ আমেরিকানরাও বাণিজ্যের প্রয়োজনে অন্য ভাষার চর্চা করে থাকে। সুতরাং, দুপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম কোনো ভাষা হবে তা ভাষার গুণগত মানের ওপর নয় বরং দুপক্ষের মধ্যে কে শক্তিশালী তার ওপর।
এই লেখা ইংরেজিকে তাড়িয়ে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা নয়, বরং ইংরেজির পাশে বাংলাকে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা। অন্য ভাষার তুলনায় বাংলা ভাষার অনেক উৎকর্ষ রয়েছে। যেমন, বর্ণমালা। মানুষের মুখে যে কয়েক প্রকার ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তা বর্ণ বা অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হয় ভাষায়। ইংরেজি ভাষায় বর্ণমালার সংখ্যা ২৬। অথচ বাংলা রয়েছে ৪৬টি বা তারও বেশি বর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ‘ত’ ও ‘ট’-এর পৃথক উচ্চারণ অনেক ভাষায় নেই। ‘র’, ‘স’, ‘ণ’ ইত্যাদি বর্ণের যে প্রকারভেদ রয়েছে বাংলায় তা খুবই উন্নত বৈশিষ্ট্য। যেমন, ইংরেজিতে বর্ণের প্রকারভেদ অপ্রতুল হওয়ায় উচ্চারণের প্রকারভেদ করা হয় একটি শব্দে একটি বর্ণের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।
ভাষা বিচারের আর একটি মাপকাঠি হলো এর সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। বাংলার মতো সাহিত্যের সব শাখায় এত উন্নত মানের রচনা খুব কম ভাষাতেই রয়েছে। নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও আমাদের রয়েছে অগণিত বিশ্বমানের কবি-সাহিত্যিক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শিক্ষা, গবেষণা ও জাতিগত উন্নয়নে নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সেখানে আমরা গুরুত্ব দিই ইংরেজির ওপর। শিশুদের আমরা পাঠাই ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে। বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি ছড়া ও বর্ণমালা শেখানো হয় একেবারে শিশুকাল থেকে। ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দুভাবে সংকটাপন্ন হচ্ছে।
প্রথমত, মাতৃভাষা অবহেলিত হওয়ায় কোনো শিক্ষা পরিপূর্ণ হচ্ছে না। কারণ মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় জ্ঞান কখনোই আত্মস্থ হয় না। দ্বিতীয়ত, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় বাদ দিয়ে শুধু একটি বিদেশি ভাষার ওপর গুরুত্বারোপ করায় শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও চেতনার বিকাশ ঘটছে না। অতএব মাতৃভাষায় প্রকৃত জ্ঞানচর্চা শুরু করা উচিত। এরপর ধীরে ধীরে দ্বিতীয়, তৃতীয় ভাষা শেখা যায়। বিশ্বের অনেক দেশে জ্ঞানচর্চা এমনকি প্রযুক্তির শিক্ষায় নিজ ভাষা ব্যবহার করে থাকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো ভাষা নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নে কিন্তু ইংরেজির তুলনায় অন্য ভাষাভাষীরা এগিয়ে। আমরা ইদানীং কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার শুরু করেছি, ই-মেইল, ফেসবুক, ইত্যাদি মাধ্যমে বাংলায় লিখি। সেখানেও একটি বিষয় লক্ষণীয়, ইংরেজিতে লেখার সময় আমরা বানান ও ব্যাকরণ নিয়ে সতর্ক থাকি। কিন্তু বাংলায় অহরহ ভুল বানানে ও শব্দচয়নে লিখে যাচ্ছি কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে। ইংরেজিতে ভুল করা লজ্জার বিষয়, আর বাংলায় ভুল করা যেন গর্বের।
এবার আসি অন্যান্য ভাষার আগ্রাসন প্রসঙ্গে, যেমন উর্দু। এই আগ্রাসন শুরু হয় এ দেশে ইংরেজদের দৌরাত্ম্য শেষ হওয়ার পর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর। আমাদের দেশে প্রথম আঘাত হানল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক অন্যায়ভাবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টার মাধ্যমে। প্রাণের বিনিময়ে এই ষড়যন্ত্রকে ঠেকানো গেলেও পশ্চিম পাকিস্তানের গভীর ষড়যন্ত্র থামানো যায়নি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তারা প্রচারণায় মেতে উঠল, বাংলা হিন্দুদের ভাষা আর উর্দু মুসলমানদের ভাষা। এই ধারায় প্রথমে হিন্দু কবি অভিযোগে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। নজরুলকেও ইসলামিকরণ করা হয়, তাঁর সাম্যবাদী সাহিত্যকর্মকে বর্জন করা হয়, বাকি সাহিত্যের অনেক শব্দ পরিবর্তন করে উর্দু বা ফারসি শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়। সর্বোপরি সাম্যের কবিকে ইসলামি কবি বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। এভাবে আমরা অনেক উর্দু শব্দকে মেনে নিয়েছি। যেমন, আজ আমরা ‘জল’-এর পরিবর্তে ‘পানি’, ‘দাদা’-র পরিবর্তে ‘ভাইয়া’—এরকম বহু উর্দু শব্দ গ্রহণ করে এক ইসলামি বাংলা ভাষা তৈরি করে নিয়েছি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, উর্দু আর হিন্দি ভাষা প্রায় কাছাকাছি। হিন্দিতেও হিন্দুরা ‘পানি’, ‘ভাইয়া’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করে থাকে। তাহলে তারা কি মুসলমান হয়ে গেল?
এই লেখাকে কেউ ইসলামবিরোধী ভাববেন না। মূল বক্তব্য হচ্ছে, ধর্ম ও ভাষা দুটি ভিন্ন বিষয়। ভাষা হচ্ছে মানুষের চিন্তাধারা প্রকাশের একটি উপায়। অন্যদিকে ধর্ম হচ্ছে একটি আদর্শ, জীবনযাপনের একটি মূলনীতি, একটি বিশ্বাস। এই আদর্শ, নীতি ও বিশ্বাসকে যেকোনো ভাষাতেই প্রকাশ করা যেতে পারে। ‘জল’ বলি আর ‘পানি’ বলি, আমার বিশ্বাস ও আদর্শ কিন্তু সৃষ্টিকর্তা ঠিকই বুঝে নিচ্ছেন।
একইভাবে বলা যায়, আরবি ভাষা প্রসঙ্গে। আরবি ভাষায় পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে বলে আরবি ইসলামি ভাষা হয়ে যায়নি। আরবিতে কিন্তু অনেক অমুসলমানরাও কথা বলে। আরবি নাম রাখলেই আমি মুসলমান হব আর বাংলা নাম রাখলে হিন্দু হয়ে যাব—এ ধারণা সঠিক নয়। ধর্ম ভাষার ওপর যেমন নির্ভর করে না, তেমনি একটি ভাষাও ধর্ম দ্বারা পরিচিত হয় না। তাই ধর্মের নামে আমাদের বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার প্রচেষ্টা খুবই অনুচিত।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানছে আকাশ সংস্কৃতি ও অধুনা ইন্টারনেট প্রযুক্তি। স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে হিন্দি ভাষা আমাদের সংস্কৃতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। হিন্দি ভাষা, গান ও নাচ আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র চোখ বুজে হিন্দিকে অনুকরণ করে যাচ্ছে। সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠানে হিন্দি গান ও নাচের দৌরাত্ম্য খুবই বেদনাদায়ক। এমনকি প্রবাসেও নতুন প্রজন্ম বাংলা না জানলেও হিন্দি গান ও নাচ ঠিকই শিখছে।
এভাবেই বিভিন্ন অজুহাতে বা উপায়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে নিগৃহীত ও বিকৃত করার অপচেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে হয়তো নতুন কোনো ধারার আবির্ভাব ঘটবে। আমাদের উন্নসিকতায় অন্য ভাষা ও সংস্কৃতি চেপে বসবে আমাদের ওপর। হারিয়ে যাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, হাসন রাজা, লালন। তখন বিশ্বে জাতি হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মতো কিছু বাকি থাকবে না। তবে আবার এমন দিনও আসতে পারে, জাতীয়তার সংকটে ভুগতে ভুগতে আগামী প্রজন্মের কেউ হয়তো জেগে উঠবে, গগন উঁচিয়ে দাবি জানাবে, ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’।
অধ্যাপক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্ক, ফার্মিংডেল
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
'কুরআনের প্রতিটি আয়াত আমার বিক্ষুব্ধ মনে প্রশান্তি যোগাতো'

ইসলামের রয়েছে এমন অনেক দিক বা বৈশিষ্ট্য যার যে কোনো একটি দিক মানুষের মধ্যে সত্য সম্পর্কে গবেষণার জন্য জোরালো উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে সক্ষম। যেমন, সৃষ্টি জগতের নানা দিক নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে গিয়ে এক আল্লাহর অস্তিত্বকে বুঝতে সক্ষম হন কানাডার নাগরিক কুরাত। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, 'অপূর্ব অবারিত আকাশ, সুবিশাল ভূমি, বিস্ময়-জাগানো জ্বলজ্বলে তারকারাজি-এইসব মনোহর সৃষ্টি মানুষকে স্রস্টা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। আর তাই আমি সব সময়ই ভাবতাম এই বিশ্বজগতের কোনো স্রস্টা না থেকে পারে না। প্রকৃতির রহস্যময় নানা বিষয়কে সহজেই এড়িয়ে যেতে পারিনি। তাই সব সময়ই ধর্মগুলোর বাস্তবতা সম্পর্কে গবেষণার কথা ভাবতাম যাতে বিস্ময়কর এই বিশ্বজগতের বাস্তবতাগুলো বুঝতে সক্ষম হই।'
কানাডার নাগরিক কুরাত আরো জানিয়েছেন, তিনি খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন বলে স্রস্টা বা খোদা সম্পর্কে খ্রিস্টানদের বিশ্বাসকে অন্ধের মত মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। খ্রিস্ট ধর্মের লক্ষ্য ও ভিত্তিও তার কাছে স্পষ্ট বলে মনে হয়নি। বাপ-দাদার এই ধর্মে তিন জন খোদার যে কথা বলা হয়েছে তা কুরাতের কাছে অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। তার মতে, একাধিক খোদা বিশ্ব-পরিচালনা করলে তাতে গোলযোগ দেখা দিত। এইসব বিষয়ে খ্রিস্ট ধর্মের পুরোহিতদের সঙ্গে আলোচনা কুরাতের সন্দেহগুলো নিরসন করতে পারেনি, বরং সন্দেহগুলো আরো গভীর হয়েছে। ফলে মানসিক প্রশান্তি অর্জনের জন্য তিনি খ্রিস্ট ধর্মের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং ইহুদি ধর্ম নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
ইসলাম কোনো বিশেষ জাতির ধর্ম নয়। এ ধর্ম বিশ্বজনীন বা গোটা মানব জাতির ধর্ম। অন্যদিকে ইহুদি ধর্ম কেবল বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের ধর্ম। জন্মগতভাবে বা জাতিগতভাবে ইহুদি নয় এমন কেউ ইহুদি হতে পারে না।
যাই হোক, কানাডার নাগরিক কুরাত খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে গবেষণার পর ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা করেন। গবেষণার ফল সম্পর্কে তিনি বলেছেন:
'ইহুদি ধর্মেও আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে কিছু চমক দেখা যায়। কিন্তু তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিদের হৃদয়গুলোকে তৃপ্ত করার জন্য সেসব যথেষ্ট নয়। ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত পড়াশোনার পর বুঝতে পারলাম যে, তারা জাতি হিসেবে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর মনোনীত জাতি বলে মনে করে। তাদের দৃষ্টিতে অ-ইহুদি জাতিগুলোকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন ইহুদিদের সেবার জন্যই। ইহুদিদের দৃষ্টিতে খোদা বা স্রস্টা একমাত্র তাদেরই সম্পদ, পুরো মানবজাতির জন্য নয়। সুস্থ-বিবেক কখনও এ ধরনের দাবি মেনে নিতে পারে না। এভাবে আমি যেসব বাস্তবতা বা সত্যের সন্ধান করছিলাম তার কোনো চিহ্ণই খুজে পেলাম না ইহুদি ধর্মে।'
খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্ম নিয়ে ব্যাপক গবেষণার পর তাতে পরিতৃপ্ত না হয়ে কানাডার নাগরিক কুরাত ইসলাম সম্পর্কেও গবেষণার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলো ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক কুৎসা রটনা করে রাখায় এ ব্যাপারে অগ্রসর হওয়াটা তার জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ইসলামী জ্ঞানের বৃহত্তম উৎস হিসেবে পবিত্র কুরআন পড়ার পর কুরাত যেন এ গ্রন্থের মধ্যে নিজের হারানো সত্তাসহ যা কিছু খুঁজছিলেন বহু বছর ধরে তার সবই খুঁজে পান। তার ভাষায়: 'কুরআনের প্রতিটি আয়াত আমার বিক্ষুব্ধ মনে যোগাতো প্রশান্তি'।
পবিত্র কুরআন এমন এক মহাগ্রন্থ যা প্রতিদিন কেবল কোটি কোটি মুসলমানই পাঠ করেন তা নয়, বরং বহু মুসলমানের জন্যও গবেষণা-কর্মের এক অনন্য উৎস। ফরাসি চিন্তাবিদ জোয়েল লাবুমের মতে কুরআন এক চিরজীবন্ত গ্রন্থ। গবেষক ও জ্ঞানীরা তাদের বুদ্ধি ও অনুধাবন ক্ষমতার আলোকে এই মহাগ্রন্থ থেকে উপকৃত হচ্ছেন। কুরআনের সৌন্দর্য অভিভূত করে কানাডার নাগরিক কুরাতকে। তার মতে, কুরআন বিশ্বজগতের নিরঙ্কুশ বা একক পরিচালকের কথা তুলে ধরে। এর বাণী মানুষের বাণী নয়। এ পবিত্র ধর্মে মানুষ সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং এ জন্য পুরোহিতের দরকার হয় না। কুরআন হযরত ঈসা ও মুসা (আ.) প্রমুখ নবীদের কথা বলে এবং তাঁদেরকে আল্লাহর এমন রাসূল হিসেবে বর্ণনা করেছে যারা মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানাতেন। কুরআনে এমন কোনো আয়াত নেই যেখানে সন্ত্রাস বা সহিংসতার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, অথচ পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলো মুসলমানদেরকে সন্ত্রাসী বলে প্রচার করছে। কুরাত বরং ইসলামকে শান্তি, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের ধর্ম হিসেবে দেখতে পেয়েছেন এবং তিনি ব্যাপক গবেষণার পর এই ধর্মকেই সবচেয়ে পরিপূর্ণ ধর্ম হিসেবে সনাক্ত করতে পেরেছেন।
ইসলাম সম্পর্কে জানার পর কানাডার নাগরিক কুরাত মুসলমানদের সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানান, মুসলমানদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর বুঝতে পারেন যে এর আগে তিনি কখনও এমন ভদ্র, বিনম্র ও দয়াদ্র মানুষ দেখেননি। কুরাত বলেছেন: তারা হাসিমুখে আমাকে স্বাগত: জানান এবং গভীর ধৈর্য নিয়ে আমার সঙ্গে মত বিনিময় করেন।
এরপর কুরাত আরো অনেক মুসলমানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মুসলমানদের একটি মসজিদেও যান। মসজিদে ঢোকার সময় প্রথমে কিছুটা ভীত ছিলেন। কারণ, এর আগে তিনি কখনও মসজিদে যাননি। কিন্তু মুসলমানদের সহাস্য অভ্যর্থণায় তার সব ভয় দূর হয়ে যায়। ফলে মুসলমানদের সহিষ্ণুতা ও দয়া সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত হন। কুরাত এটাও লক্ষ্য করেন যে, মুসলমানরা পরস্পরকে ভাই বলে ডাকেন এবং সৎকর্মে একে অপরকে সাহায্য করেন ও মন্দ কাজ করেন না। কুরাত ইসলামের যেসব দোষ-ত্রুটি তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন মুসলমানদের কাছে সেসবের যৌক্তিক জবাব পেয়ে যান। ধীরে ধীরে কুরাত বুঝতে পারেন যে একমাত্র ইসলামই মানুষের জীবনের জন্য বয়ে আনতে পারে সৌভাগ্য। এরপর পবিত্র রমজান মাসে একটি মসজিদে গিয়ে তিনি কলেমায়ে শাহাদাতাইন পাঠ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ঘোষণা দেন।
কানাডীয় নও-মুসলিম কুরাত সেই রমজান মাসেই নামাজ ও রোজা আদায় শুরু করেন। আর এটাকে তিনি তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় রহমত বলে মনে করেন। কারণ, তিনি মুসলমানদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ইবাদতের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান রমজান মাসে মুসলমান হওয়ার সুবাদেই। প্রথমে ইসলামী বিধি-বিধানগুলো মেনে চলা একটু কষ্টকর মনে হলেও পরে সেসব তার কাছে সহজ হয়ে যায়। ইসলামী বিধি-বিধান ও মুসলমানদের সমাজবদ্ধ জীবন তার জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছে বলে কুরাত উল্লেখ করেন।
নও-মুসলিম কুরাত মুসলমান হওয়ার পর মনে করেন যে, তার জীবনের রয়েছে লক্ষ্য। তিনি এখন মনে করেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই সবচেয়ে আনন্দদায়ক বিষয়। ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর হওয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে কুরাত মনে করেন কোনো বিষয়ে কিছু শোনার পর সে সম্পর্কে গবেষণা চালানোর পরই রায় দেয়া উচিত। তার মতে, সব সময়ই আল্লাহর কাছ থেকে পথ-নির্দেশনা চাওয়া উচিত এবং আল্লাহর সঙ্গেই হওয়া উচিত মানুষের মূল সম্পর্ক। আর তা হওয়া উচিত শক্তিশালী ও স্থায়ী।
কানাডীয় নও-মুসলিম কুরাত বলেছেন: 'আমি জানি না, আমি ইসলামকে খুঁজে পেয়েছি, না ইসলাম আমাকে খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু যারা স্রস্টার সত্যিকারের পরিচয় ও সত্য সম্পর্কে জানতে চায় আল্লাহ অবশ্যই তাদের পথ দেখান। তাই আল্লাহর ওপর ঈমান রাখবেন ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সব ধরনের কষ্ট ও তিরস্কার বা নির্যাতন সহ্য করুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দয়া করবেন ও একদিন সবাইকেই ইসলামের সত্যতার সঙ্গে পরিচিত করবেন- এই মুনাজাত করছি।'
![]() |
| কানাডার একটি মসজিদ |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
শেখ হাসিনার পর কে? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁকে খুব পছন্দ করেন। এবার লন্ডন সফরে এসে প্রকাশ্যেই বলেছেন, বরিস ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি খুশি হন। ট্রাম্পের ভাবসাব, কথাবার্তায় মনে হয় তিনি সম্ভবত ব্রিটেনকে এখন আমেরিকার উপনিবেশ মনে করেন। সেভাবেই ব্রিটেনকে উপদেশের আড়ালে নানা নির্দেশ দেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়লে তিনি ব্রিটেনকে ব্যবসা-বাণিজ্যে আঁচল ভরিয়ে দেবেন, বরিসকে যেন প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) যেন তাঁর হাতে (আমেরিকার) তুলে দেওয়া হয়। এই সার্ভিস তাঁর হাতে নিরাপদ থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
অন্যান্য দেশের মতো ব্রিটেনেও এখন বাম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল। তাই ইরাক যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়র লন্ডন সফরে এলে বিশাল জনবিক্ষোভের মুখে বাকিংহাম প্রাসাদ ছেড়ে লন্ডনের রাস্তায় নামতে পারেননি। এবার বুশের চেয়েও নিন্দিত ও বিতর্কিত ডোনাল্ড ট্রাম্প লন্ডনে এলে রাজপথে বিরাট বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে বটে, কিন্তু তাঁকে বুশের মতো গৃহবন্দি করে রাখা যায়নি, তাঁর লম্ফঝম্ফও বন্ধ করা যায়নি।
ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে লাভ নেই। শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে আসি। বলছিলাম ছোট ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বের বিশাল পরিধিতে তাঁর পরিচিত ও আলোচিত হওয়ার কথা। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের রেস্টুরেন্টে এক লেবার দলীয় তরুণ এমপির সঙ্গে খেতে গেছি। উদ্দেশ্য ছিল টোরি দলের নতুন নেতা নির্বাচন সম্পর্কে উত্তপ্ত ঘরোয়া বিতর্ক উপভোগ করা এবং পার্লামেন্টের রেস্টুরেন্টে আজকাল ডাল-ভাত খাদ্য তালিকায় আসায় তার স্বাদ নেওয়া।
খেতে বসে বন্ধু এমপি একসময় জিজ্ঞেস করলেন, এবার বরিসই হয়তো টোরি দলের নেতৃত্বে বসবেন, তোমাদের দেশের খবর কী? শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো নেতা তো শুধু আওয়ামী লীগে নয়, তোমাদের দেশেও দেখছি না, তাহলে দলের পরবর্তী নেতা কে হবেন, ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীই বা কে হবেন? উপমহাদেশে এতকালের পরিবারতন্ত্রও অচল হতে চলেছে। ভারতে রাহুল গান্ধীর পরিণাম দেখলে তো।
বললাম, বাংলাদেশ নিয়ে এসব ভাবনা এখন কেউ ভাবছে না। সামনে আওয়ামী লীগের জন্য আরো পাঁচ বছর পড়ে আছে। শেখ হাসিনা এখনো দলের নেতৃত্বের হাল ধরে আছেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদেও আসীন। দেশের রাজনীতিও এখন মোটামুটি স্থিতিশীল। আশা করা যায়, অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন গতিশীল রাখতে পারলে আগামী নির্বাচনেও মানুষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় চাইবে।
বন্ধু এমপি বললেন, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে কী হবে তুমি তা জানো না। হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন পরবর্তী নির্বাচনে তিনি নেতৃত্ব দেবেন না। ক্ষমতায়ও থাকতে চান না। এ অবস্থায় শেখ হাসিনার এবং তাঁর দলেরই তো উচিত আওয়ামী লীগের জন্য এখনই একজন যোগ্য ও দক্ষ নেতা খুঁজে বের করা এবং সময় থাকতে তাঁকে জনগণের কাছে পরিচিত করে তোলা। না হলে খালেদাবিহীন বিএনপির যে দশা হয়েছে, হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগের কি সেই অবস্থা হবে না?
তাঁকে বললাম, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর ধারণার সঙ্গে আমার ধারণার একটা পার্থক্য আছে। অবশ্য আমাদের দুজনের ধারণার মধ্যে কার ধারণা সফল হবে, তা বলতে পারি না। প্রথমে শেখ হাসিনার আগামী নির্বাচনে, যা এখনো পাঁচ বছর দূরে, তাতে নেতৃত্ব না দেওয়ার সম্পর্কে বলি? চার-চারবার দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকার পর শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই ক্লান্তিবোধ করছেন এবং যথার্থভাবেই রাজনীতির সম্মুখ সারি থেকে সরে যেতে চাইছেন। এটা অনেক দেশের জনপ্রিয় নেতাই চান।
কিন্তু জনগণের বিপুলভাবে আস্থাভাজন কোনো নেতা যদি দেখেন, দেশের কল্যাণের স্বার্থেই তাঁকে ক্ষমতায় রাখতে জনগণ উন্মুখ, তাহলে তাঁকে সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়। একবার ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়ের পর জামাল নাসের মিসরের প্রেসিডেন্ট পদে ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিন্তু কায়রোর রাজপথে উত্তাল জনগণের দাবিতে তাঁকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করতে হয়েছিল।
এটা শেখ হাসিনার জীবনেও ঘটেছে। এরশাদের আমলে এক সাধারণ নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বে ইস্তফা দিয়েছিলেন। দলের নেতাকর্মীরা শুধু নয়, সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করার দাবিতে। তাঁকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। ভবিষ্যতেও শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্ব ছেড়ে রাজনীতির পেছনের সারিতে যেতে চাইলে একই অবস্থার উদ্ভব ঘটবে। তা ছাড়া তাঁর রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের বয়সও হয়নি। বর্তমানে তাঁর বয়স ৭২ বছর। পাঁচ বছর পরেও তিনি ৮০ বছর বয়সে পৌঁছাবেন না। দ্য গল, চার্চিল, রিগ্যান, মাহাথির প্রমুখ নেতা বয়সের তোয়াক্কা করে ক্ষমতায় থাকেননি। যদি দেশের স্বার্থে প্রয়োজন পড়ে তাহলে সক্ষমতা থাকা পর্যন্ত হাসিনা কেন ক্ষমতায় থাকবেন না? ইসরায়েলের নেতানিয়াহু এবার নিয়ে কত দফা ক্ষমতায় আছেন?
ব্রিটিশ এমপি বন্ধুকে বললাম, খালেদাবিহীন বিএনপির আজ যে অবস্থা, হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগের সেই অবস্থা হবে তা মনে করি না। বিএনপির জন্ম ক্যান্টনমেন্টে এবং নেতৃত্ব ব্যক্তি ও পরিবারভিত্তিক। জনগণের মধ্যে এই দলের কোনো শিকড় (root) নেই। এই দলের পরিণতি ঘটতে চলেছে মুসলিম লীগের মতো। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের জন্ম গণ-আন্দোলন থেকে। দলে নেতৃত্ব ও নীতির ক্রমবিবর্তন হয়েছে। নেতৃত্বেও বারবার বদল ঘটেছে। দলটির জন্ম মূলত মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী এসে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বসেন। মওলানা ভাসানীর পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ।
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বসেন। ছয় দফা আন্দোলনের সময় শেখ মুজিব কারাগারে বসে আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। তাঁর মৃত্যুর পর বেগম জোহরা তাজউদ্দীন ও আবদুল মালেক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। লিখতে ভুলে গেছি, বঙ্গবন্ধু যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন দলের নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন কামারুজ্জামানের ওপর। সর্বশেষ শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হন এবং এখনো আছেন। তাঁর নেতৃত্বেই দল আবার শাসন ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং এখনো শাসন ক্ষমতায় আছে।
দলের নেতৃত্বের মতো নীতিরও পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছিল একটি মডারেট সাম্প্রদায়িক দল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দলটি গড়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল হিসেবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি মডার্ন ও সেক্যুলার ডেমোক্র্যাট পার্টি। প্রতিটি সংকটে আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি আছে এবং নেতৃত্ববিহীন অবস্থায় নতুন নেতা তৈরির সক্ষমতা আছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর চরম নেতৃত্বহীন অবস্থায় দলটি কি নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে সক্ষমতা দেখায়নি? হাসিনা-নেতৃত্ব কি উঠে আসেনি?
আমার বক্তব্য শেষ করে বন্ধু ব্রিটিশ এমপিকে বলেছি, অবশ্যই বাংলাদেশের গণতন্ত্র চিরকাল এক দল, এক নেতানির্ভর থাকুক তা দেশের মানুষ চায় না। কিন্তু বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত—এরা গণতান্ত্রিক দল নয় এবং আওয়ামী লীগের বিকল্প দলও নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বিকল্প একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দল ও নেতৃত্ব গড়ে ওঠা দরকার। আজকের সুধীসমাজ নামক গোষ্ঠীর ছড়ানো বিভ্রান্তি থেকে দেশের মানুষ চূড়ান্তভাবে মুক্ত হলে জনগণের চাহিদা, আন্দোলন ও উদ্যোগ থেকে বিকল্প রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব গড়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস। পচা শামুকে বারবার জনগণের পা কাটবে না।
লন্ডন, ১৭ জুন, সোমবার ২০১৯
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বাজার ও মাজার: মুলতানে একদিন by টিম ব্লাইট

ওই সময় যে কারণে আমি পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলাম, সেটা ব্যাখ্যা করা উচিত। আমি মধ্যপ্রাচ্য এলাকা সফর করছিলাম, ঐতিহ্য, বিশ্বাস আর দর্শনের বিস্তৃতের বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম।
ইরানে গিয়ে আমি আধ্যাত্মিক প্রচারকদের সম্পর্কে জানতে পারি। তারা মধ্যযুগের ওই সময়টাতে পূর্ব দিকে পাড়ি জমিয়েছিরেন।
পাশ্চাত্য দুনিয়া ওই সময় ছিল সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। এ কারণে পরবর্তীকালে তা অন্ধকার যুগ নামে পরিচিত হয়। তবে মুসলিমরা তখন তত্ত্ব ও চিন্তাধারায় বিকশিত হচ্ছিল।
![]() |
| হারাম গেট, মুলতান |
আমি জানতাম, আধুনিক মুলতান বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠান সাজানো থাকবে না। মনে রাখতে হবে, সাম্প্রতিক ইতিহাস তো মুসলিমবিশ্বের প্রতি তেমন সদয় নয়। ওই সব পতিষ্ঠানের টানেই একসময় বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, শাহ রুকন-ই-আলম, সৈয়দ জালালুদ্দিন বুখারি, লাল শাহবাজ কালান্দার আর বাবা ফরিদউদ্দিন গঞ্জশকর এখানে এসেছিলেন।
![]() |
| মুসাফিরখানার অভ্যন্তরভাগ |
তবে এবার আমি জানতাম, নগরীটি হবে আমার। আমাকে টেনেছিল দরবেশ আর তাদের মাজারগুলো, অনেক বন্ধুও ছিল পথজুড়ে।
আমরা যেদিন মুলতানের সন্ধানে বের হয়েছিলাম, সেদিন ছিল গরম, অবশ্য মুলতানের অন্য সব দিনের মতোই। আমরা শুরু করলাম হারাম গেট দিয়ে। সম্ভবত ১৬ শতকের ইটের তৈরি একটি কাঠামো এটি।
![]() |
| শাহ রুকুন ই আলমের মাজার |
এই গেট দিয়েই আমরা প্রাচীর নগরী মুলতানে প্রবেশ করি।
![]() |
| মুলতানের পুরনো শহরের সড়কের দৃশ্য |
![]() |
| সাখি ইয়াহিয়া নওয়াবের সমাধি |
তখন সবে বিকাল শুরু হয়েছে। আমরা যে মাজারটির সামনে ছিলাম, সেটি হলো ১৬ শতকের বিখ্যাত সুফি সাধক মুসা পাক শাহিদের ছেলে সাখি ইয়াহিয়া নওয়াবের মাজার।
![]() |
| মুসা পাক শহীদের সমাধি |
![]() |
| চক বাজার |
আরো কাছে, মুসা পাক শহিদের মাজারের নিকটে আমরা একটি পুরনো মুসাফির খানার অস্তিত্ব দেখতে পেলাম। সম্প্রতি সংস্কার করে এই পুরনো উজ্জ্বলতা কিছুটা ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
![]() |
| জৈন মন্দিরের অভ্যন্তরভাগ |
বাজারের পথেই পড়ে দুটি বিখ্যাত মাজার। একটি রুকন-ই-আলমের, অপরটি বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার।
![]() |
| মুলতানের কেন্দ্রস্থলে সূর্যাস্তের দৃশ্য |
![]() |
| বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার সমাধি |
ঐতিহাসিক স্থাপত্যের প্রতি যাদের আগ্রহ আছে, তাদের কাছে এর গুরুত্ব বিপুল। এর আলোকেই পরবর্তীকালের মাজারগুলোর নক্সা হয়েছে। এর ছোঁয়া অন্য সব স্থাপনায় দেখা যায়।
![]() |
| সাখি ইয়াহিয়া নওয়াবের সমাধি |
একটু পরই শুরু হলো মাগরিবের আজান। কিছু সময় পরই শোনা গেল কাওয়ালি। এক দল লোক সমাধির কাছে বসে সুর তুলছে। আর আমি যেজন্য এসেছিলাম, তা পেয়ে গেলাম।
(সব ছবি লেখকের তোলা)
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
রবীন্দ্র-প্রতিভার পরিচয় by হাবিবুর রহমান স্বপন

রবীন্দ্র-কাব্যের মূল সুর প্রকৃতির সৌন্দর্যসম্ভোগ, মানবমহিমাবোধ এবং প্রকৃতি ও মানবের মিলনে অতীন্দ্রিয়ের স্পর্শানুভূতি। কবির কাছে প্রকৃতি জড় নয়, প্রাণময়ী। রবীন্দ্র-কাব্য পরিক্রমা করলে আমরা দেখতে পাই, এই প্রাণময়ী প্রকৃতি তাঁর কাব্যের উৎস, তাঁর আবেগ-সঞ্চারিনী শুধু তাই নয়,
রবীন্দ্র-প্রতিভার সামগ্রিক পরিচয় দেয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সৃষ্টিশীল মহৎ ব্যক্তি। বাঙালি কবি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির বিশাল রূপান্তর বা পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজন করেছেন। তাঁর কর্মকুশলতা, চিন্তা-চেতনা ও সৃষ্টিশীলতা এই সংস্কৃতিকে দিয়েছে নানা রূপময়তা, রঙ, গন্ধ ও বৈচিত্র্যমুখিতা। সংস্কৃতির এত বড় সংগঠক প্রাচীন, মধ্য ও বর্তমান আধুনিককালেও বাঙালি সমাজে জন্মগ্রহণ করেনি। তিনি আমাদের আধুনিক সংস্কৃতির প্রধান রূপকার। যদিও এই আধুনিককাল চূড়ান্ত নয়। আমাদের বোধ, মেধা ও মনন যাকে আধুনিক বলে জানতে, বুঝতে চাচ্ছে তা কতটুকু আধুনিক ও উৎকৃষ্ট সে সম্পর্কে এ যুগের মানুষ হিসেবে তার বিচারে আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। রবীন্দ্রনাথের জ্ঞান বা প্রজ্ঞার পরিধি পরিমাপ করার সাধ্য আমার মতো অধমের নেই এটা সত্য, এর পরেও এই স্বল্প পরিসরে কিছু নমুনা উপস্থাপনের চেষ্টা করছি বিজ্ঞ পাঠকদের করকমলে। মহান কবি লিখেছেন-
‘হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা!
ওগো তপন, স্বপন দেখি যে, করিতে পারিনে সেবা।’
অন্তরের নিবিড়তম, সত্যতম কথাটি এমন সহজ সুরে কে গাইতে পারে? মানুষের ব্যক্ত-অব্যক্ত, জানা-অজানা, বোঝা-না-বোঝা, চেতন-অবচেতন সব লোকেরই কথা কবি বুঝেছেন এবং তা ব্যক্ত করেছেন। মানুষের মনের বিচিত্র আনন্দ-বেদনা, তৃপ্তি-অতৃপ্তি, পাওয়া-না-পাওয়ার কথা ফুট ওঠে তাঁর প্রতিটি ছন্দে। সর্বমানবের মনের মর্মকথার মূর্ত প্রতীক রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্র-প্রতিভা সূর্যেরই মতো বিরাট বিস্ময়কর ব্যাপার। অফুরন্ত বিচিত্র বিচ্ছুরিত উজ্জ্বল সূর্যরশ্মির যেমন পরিমাপ করা যায় না এবং সমগ্রভাবে তা ধরাও যায় না, রবীন্দ্র-প্রতিভা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা করাও আমাদের পক্ষে তেমনি অসম্ভব। এত বড় বিরাট প্রতিভার সামনে দাঁড়াবে কে? তা ছাড়া আর একটা কথাও অন্তরের মধ্যে বিশেষভাবে নাড়া দেয় যে, যে অতিমানবীয় প্রতিভা বা ক্ষমতা রবীন্দ্রনাথ অধিকার করেছেন সে প্রতিভা বা ক্ষমতা না-কি তাঁর নয়! এ কথা কবি বহুবার বলেছেন যে, কোনো এক অদৃষ্ট শক্তি বা প্রেরণা তাঁকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছেন তিনি তাই করেছেন। কবি বলেছেন-
অন্তর মাঝে বসি অহরহ
মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ,
মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ
মিশায়ে আপন সুরে।
কী বলিতে চাই সব ভুলে যাই,
তুমি যা বলাও আমি বলি তাই,
সঙ্গীতস্রোতে কূল নাহি পাই,
কোথা ভেসে যাই দূরে।
কবি কত কিছু বলেছেন সে তো কবির নিজের কথা নয়, সে তাঁর অন্তরের আদেশ; তাই একে বুঝতে চাওয়া সহজ নয়।
তবুও দুর্নিবার আগ্রহ, অসীম সাহস মানুষের, জানবার। দুঃসাধ্য সাধন করতে চায় মানুষ, দুর্লঙ্ঘকে লঙ্ঘন করতে সাহসী হয় মানুষ, অপ্রাপ্যকে করায়ত্ত করতে চায়- সেও তো মানুষ। অজানাকে জানতে হবে, অপ্রাপ্যকে পেতে হবে, মানুষকে পেতে হবে অমিত, দিতে হবে অমিত, তাকে হতে হবে অমিত মানব। এই সাধনা সহজ নয়, দুঃখের দুর্গম পথেই এর জয়যাত্রা। মানুষ সুখের কাঙাল নয়, দুঃখভীরু নয়, তাই সে এই পথই বেছে নিয়েছে।
রবীন্দ্র-প্রতিভার কোনো একটি দিকের আস্বাদন করতে হলে এই সাধনা ও একান্ত তন্ময়তার প্রয়োজন। একাগ্র ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনা, ধ্যান-ধারণায় মানুষের অন্তরেন্দ্রিয় তীক্ষ্ণ আর আবিলতামুক্ত হয়। তখন যা অজ্ঞেয় রহস্যময়তায় সমাচ্ছন্ন তাকে জানা যায়, বোঝা যায়, উপলব্ধি করা যায়। এই সাধনার বেদনা যে বহন করতে পারে চির-আকাক্সিক্ষত প্রিয় বস্তুটি তার কাছে এসে আপনি ধরা দেয়। যাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসা যায়, তাকেই সত্যরূপে জানতে পারা যায়।
তাই রবীন্দ্র-প্রতিভার কোনো একটি দিকের সমগ্র পরিচয় পাওয়া অসম্ভব হলেও এ কাজে কোনো কোনো দুঃসাহসী অগ্রসর হয়েছেন। তার কারণ ভালোবাসার মধ্যে ঐশ্বর্য-ভয়-ভীতি তো কিছু নেই, সেখানে শুধু অনাবিল মাধুর্য আর চির-পরিচয়ের স্বচ্ছ-আনন্দ। এই দাবিতে আমরাও কবিকে দেখব, জানব, বুঝব, নিবিড় করে কাছে পাব।
রবীন্দ্রনাথ বাংলার কবি, রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের কবি, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের সকল দেশের ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম। রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র বহুমুখী অলোকসামান্য প্রতিভা সকল দেশ ও কালের গণ্ডিকে অবলীলাক্রমে অতিক্রম করে গিয়েছে- সে গৌরব কেবলমাত্র ভারতবর্ষের নয়, সারা বিশ্বেরও। তাঁর বাণী ছিল বিশ্বজনীন, তাঁর প্রেম ছিল সর্বব্যাপী, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ছিল সুগভীর। অনন্তকে আস্বাদন করবার জন্য মানুষের যে আর্তি, তাই ব্যক্ত হয়েছিল তাঁর ভাবধারার মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশে রবীন্দ্র-প্রতিভার অভ্যুদয় পরম বিস্ময়কর এবং আকস্মিক ব্যাপার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই ঠিকই, কিন্তু একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়। তার প্রধান কারণ রবীন্দ্রনাথ বাংলার তথা ভারতবর্ষেরই কবি, ভারতীয় ভাবসাধনার আদর্শেই তাঁর কবিমানস অনুপ্রণিত ও পরিপুষ্ট।
রবীন্দ্র-সাহিত্য একটি বহু রূপময় বিচিত্র শিল্পসম্ভার; তাতে নব নব রেখা ও বর্ণবিন্যাসের অন্ত নেই। রবীন্দ্রনাথ সঙ্গীতজ্ঞ, নাট্যকার, গল্পরচয়িতা, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, সমালোচক, চিত্রকর, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক একাধারে সবই, কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ পরিচয় তিনি কবি।
রবীন্দ্রনাথের কাব্য-প্রতিভা শতমুখী। তিনি নিজের সৃষ্টিকে নিজেই অতিক্রম করে নতুন রূপসৃষ্টির আনন্দে চিরচঞ্চল ছিলেন। কবি নিত্য নতুন ভাব চিন্তা আবেগ কল্পনা ভাষা ছন্দ অলঙ্কার করেছেন এবং তার প্রকাশভঙ্গিমায় কবিমানসের সে একটি অভিনব রূপ তিনি প্রকাশ করেছেন তা জগতের কাছে পরম বিস্ময়ের বস্তু।
রবীন্দ্র-কাব্যে আমরা যেমন ভারতীয় সাহিত্যের ঐতিহ্যের সন্ধান পাই, যেমন মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবিদের রসমাধুর্যের আস্বাদ পাই, বাউলদের মনের মানুষের সন্ধান পাই, তেমনি পাই প্রতীচ্য সাহিত্যের তীব্র আবেগ, তার বাধাহীনতা, দেশকালনিরপেক্ষ মানবিকতা। বিশ্ব-প্রাণের বিচিত্র তরঙ্গমালা রবীন্দ্রনাথের ভাব ও কল্পনাকে আলোড়িত করেছে। এই আলোড়নের অভিব্যক্তি ঘটেছে নানা রূপে, রসে, ছন্দে ও মাধুর্যে। রবীন্দ্র-সাহিত্যে বিশেষ কোনো দেশের, বিশেষ কোনো কালের বা বিশেষ কোনো জাতির নির্দিষ্ট কোনো ছাপ পড়েনি। সব দেশ কাল জাতি, সব বন্ধনমুক্ত, সর্বজনীন ভাব, কল্পনা ও আদর্শের ওপর তাঁর সাহিত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাই তাঁর কাব্য যুগের হয়েও যুগাতীত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সারাজীবনের সাধনার ধন কাব্য তথা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে দেখেছেন যে, শান্তিময় বিশ্বপ্রেমই মানুষের জীবনের কাম্য বস্তু; বিশ্বজনীন ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ধরা দিয়ে তবে তার বিশেষ অভিব্যক্তি লাভ করে, আবার ব্যক্তিজীবন বিশ্বজীবনের মধ্যে লীলায়িত হয়ে তবেই তার সার্থকতা প্রাপ্ত হয়। এমনি করে সীমায় অসীমে, খণ্ডে পূর্ণে, ব্যক্তিজীবনে ও বিশ্বজীবনে একটি চিরন্তন লীলা চলছে। এই লীলাই সৃষ্টির আনন্দ ও সৌন্দর্য। এই আনন্দ ও সৌন্দর্য রবীন্দ্রনাথ আকণ্ঠ পান করেছেন এবং তাঁর কাব্যে বিচিত্রভাবে প্রকাশ করেছেন।
রবীন্দ্র-কাব্যের মূল সুর প্রকৃতির সৌন্দর্যসম্ভোগ, মানবমহিমাবোধ এবং প্রকৃতি ও মানবের মিলনে অতীন্দ্রিয়ের স্পর্শানুভূতি। কবির কাছে প্রকৃতি জড় নয়, প্রাণময়ী। রবীন্দ্র-কাব্য পরিক্রমা করলে আমরা দেখতে পাই, এই প্রাণময়ী প্রকৃতি তাঁর কাব্যের উৎস, তাঁর আবেগ-সঞ্চারিণী শুধু তাই নয়, যেন তাঁর অন্তর-সত্তার চিরসঙ্গিনী। এই সঙ্গিনীর সঙ্গে কবি নিগূঢ়-আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। প্রকৃতির তুচ্ছতম বস্তুটির সঙ্গে পর্যন্ত কবি আদিজন্মের নাড়ির টান অনুভব করছেন। তাই তাঁর কাছে-
যাহা কিছু হেরি চোখে কিছু তুচ্ছ নয়,
সকলি দুর্লভ বলে আজি মনে হয়।
দুর্লভ এ ধরণীর লেশতম স্থান,
দুর্লভ এ জগতের ব্যর্থতম প্রাণ।
এই পৃথিবীর জল-স্থল, আকাশ-বাতাস, পশু-পাখি, সমস্ত রূপ-রস-স্পর্শ কবির চিত্তবীণায় নব নব রাগ-রাগিনীর সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের সব কিছুর সঙ্গে কবি স্বীয় প্রাণচেতনার স্পন্দন অনুভব করেছেন। তাই তিনি বিশ্বাস করেছেন যে, আদি প্রাণের যে প্রবল জীবনোচ্ছ্বাস পৃথিবীর প্রত্যেক গাছে, শিকড়ে শিকড়ে, শিরায় শিরায়, তৃণের প্রত্যেকটি রোমে রোমে প্রবাহিত হচ্ছে, সেই প্রাণধারা প্রত্যেকটি জীবের মধ্যেই সঞ্চারিত এবং কম্পিত হচ্ছে। তাই এত বড় বিশাল পৃথিবীকে আমাদের অনাত্মীয় বা অদ্ভুত বলে মনে হচ্ছে না। কবি বলেছেন-
“প্রকৃতির মধ্যে যে এমন গভীর আনন্দ পাওয়া যায়, সে কেবল তার সঙ্গে আমাদের একটা নিগূঢ় আত্মীয়তা অনুভব করে। এই তৃণগুল্মতা, জলধারা, বায়ুপ্রবাহ, এই ছায়ালোকের আবর্তন, জ্যেতিষ্কদলের প্রবাহ, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীপর্যায়- এই সমস্তের সঙ্গেই আমাদের নাড়ি-ছন্দের যেখানেই যতি পড়েছে সেখানেই ঝঙ্কার উঠছে, সেখানেই আমাদের মনের ভিতর থেকে সায় পাওয়া যাচ্ছে।’
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির কবি, রবীন্দ্রনাথ আনন্দের কবি। অতুলনীয় মানবমুখিতা কবির কাব্যে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। রবীন্দ্রনাথ এই পৃথিবীর কবি। তিনি মানুষকে, ধরণীকে ভালোবাসেন। রবীন্দ্র-কাব্যে মানবের অবিনশ্বর অনুভূতির প্রকাশ অতি ব্যাপকভাবেই রয়েছে। কবি বারবার কলেছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’
‘আত্ম-পরিচয়’-এ কবি বলেছেন, “প্রকৃতি তাহার রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ লইয়া, মানুষ তাহার স্নেহ-প্রেম লইয়া আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে। সেই মোহকে আমি অবিশ্বাস করি না, সেই মোহকে আমি নিন্দা করি না।”
অবজ্ঞা করিনি তোমার মাটির দান
আমি যে মাটির কাছে ঋণী
জানিয়েছি বারম্বার-
কবি শুধু ঋণ স্বীকারই করেননি, তিনি মানুষকে চরম শ্রদ্ধাও দেখিয়েছেন-
তব প্রয়োজন হতে যে অতিরিক্ত মানুষ-
তারে দিতে হবে চরম সম্মান তব
শেষ নমস্কারে।
মানুষকে কবি কোনোদিনই ছোট পরিধির মধ্যে ছোট করে ভাবতে পারেননি। মহামানবের আবির্ভাব তিনি ক্ষণে ক্ষণে দেখেছেন। মানুষের ক্ষণিক অংশের মধ্যে চিরন্তনের অভিব্যক্তি তাঁকে বারে বারেই বিস্মিত পুলকে অবিভূত করেছে। মানুষের স্নেহ প্রেম দয়া ভক্তি প্রভৃতি সুকোমল চিত্তবৃত্তির ভিতর দিয়ে তিনি চির রসময়ের রসের পরিচয় পেয়েছেন। তাই রবীন্দ্রকাব্য মানুষের জয়গানে মুখরিত। সে মানুষ ব্যক্তিগত পরিধি, দেশ কাল অতিক্রম করে মহামানবে পর্যবসিত। উপনিষদের বাণীঘন মূর্তি রবীন্দ্রনাথ মানুষকে অনন্তের সন্তান রূপেই দেখেছেন, তাই তিনি উপনিষদের বাণীতে বলেছেন, মানুষ মানুষ নয়, মানুষ ব্রহ্ম।
কবির ভগবৎ-উপলব্ধিও মানববিমুখতা নয়। সংসারের মধ্য দিয়েই তিনি তাঁর স্পর্শ লাভ করতে চেয়েছেন। ‘সংসারে বঞ্চিত করি তব পূজা নয়’ অথবা ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি আমার নয়’ -এই উক্তির মধ্য দিয়েই বুঝতে পারা যায় যে, সংসারকে বাদ দিয়ে কবিসংসারাতীতের সন্ধান করেননি। পরন্তু এই জগতের খণ্ড স্নেহ প্রেম প্রীতির মধ্য দিয়েই তিনি পরম প্রিয়তমের স্পর্শ পেতে চেয়েছেন। বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবপ্রকৃতির বিচিত্র রূপকে তিনি আনন্দময়ের অমৃত রূপ বলেই অনুভব করেছেন। সর্বত্রই তাঁর লীলাবিলাস বিকম্পিত- এই উপলব্ধিই রবীন্দ্র-কাব্যের বৈশিষ্ট্য।
রবীন্দ্রনাথ সাধক, তবে সে সাধনা বৈরাগ্য-সাধনে নয়, শিল্পসাধনে, রূপ সাধনে, ভাব সাধনে। নানা রূপের ক্ষুধা, রসের ক্ষুধা তাঁর ভাবকল্পনাকে উদ্বোধিত করেছে। বিশ্বের যেখানে যা কিছু আছে- অণু-পরমাণু পর্যন্ত, তাঁর কাছে রূপ রসে সৌন্দর্যে মাধুর্যে প্রতিভাত হয়েছে। সৌন্দর্যানুভূতিকে কবি একটি বিশেষ সত্তা রূপে দেখেছেন। সেই আদি অখণ্ড সত্তা অন্তরে বাইরে বিরাজিত। বাইরে যিনি বহুবিচিত্র, অন্তরে তিনি একা, অখণ্ড, স্থির-গম্ভীর। এই সৌন্দর্য-রূপিণী নারীকে তিনি বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন ভাবে তাঁর কাব্যে প্রকাশ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্য কল্পনার মধ্যেও সেই একই সুর ধ্বনিত, যে সুর নদী-গিরির ওপার থেকে ভেসে আসছে। রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছেন, বিশ্ব প্রকৃতিতে, মানবপ্রকৃতিতে যে সৌন্দর্য উদ্ভাসিত তা সেই চিরসুন্দরেরই অঙ্গদ্যুতি। বিশ্ব-ভ্রহ্মাণ্ড সেই আদি রূপের ঝরনাধারায় অভিস্নাত। সমস্ত খণ্ড সৌন্দর্যের মধ্যে কবি অলৌকিক ও অখণ্ড সৌন্দর্য দেখেছেন। তাই কবির কাছে কিছুই তুচ্ছ নয়, কিছুই অসুন্দর নয়। অসুন্দর যদি কিছু থাকে তবে তা সুন্দরের খণ্ডিত প্রকাশ মাত্র। পরিপূর্ণতার কবি সব কিছুকেই সমগ্রভাবে দেখেছেন। তাই কোথাও কিছু অসুন্দর তাঁর চোখে পড়েনি, পড়লেও তার সামঞ্জস্য করিয়ে নিয়ে তবে স্বস্তি পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের জীবনসাধনা, কাব্যসাধনার বিরাট সৌধ এই সৌন্দর্যানুভূতির শ্বেত প্রস্তরের উপরেই ভিত্তি স্থাপন করেছে। তাঁর সমস্ত অনুভূতিই সুন্দরের অনুভূতিতে রঞ্জিত।
কবির প্রেমানুভূতির মধ্যেও আছে এই সূক্ষ্ম মহিমাবোধ। তাই তাঁর প্রেমসাধনা একান্ত ভোগবাসনায় পর্যবসিত না হয়ে একটি বিশেষ আনন্দবোধে উপভোগ্য হয়েছে।
সৌন্দর্যানুভূতির সঙ্গে যে একটি ভোগতৃষ্ণা জেগে থাকে তাকে অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু ভোগ সৌন্দর্র্যলাভের শ্রেষ্ঠ উপায় হতে পারে না যদি তার মধ্যে সংযত না থাকে। সেই কথাই কবি বলেছেন- “প্রবৃত্তিকে যদি একেবারে পুরামাত্রায় জ্বলিয়া উঠিতে দিই, তবে যে সৌন্দর্যকে কেবল রাঙাইয়া তুলিবার জন্য তাহার প্রয়োজন, তাহাকে জ্বালাইয়া ছাই করিয়া তবে সে ছাড়ে, ফুলকে তুলিতে গিয়া তাহাকে ছিঁড়িয়া ধুলায় লুটাইয়া দেয়। সৌন্দর্য আমাদের প্রবৃত্তিকে সংযত করিয়া আনিয়াছে।…সৌন্দর্য যেমন আমাদিগকে ক্রমে শোভনতার দিকে, সংযমের দিকে আকর্ষণ করিয়া আনিতেছে, সংযমও তেমনি আমাদের সৌন্দর্যভোগের গভীরতা বাড়াইয়া দিতেছে।” তাই আমরা দেখি, রবীন্দ্রনাথের কাব্যে প্রেমসাধনা দেহকে অস্বীকার করেনি, আত্মা যেমন সত্য দেহও তেমনি, দেহ-আত্মার যে প্রেম তাই পূর্ণ প্রেম। ভোগ-বাসনা কবির কাব্যে যথেষ্ট আছে, কিন্তু সে ভোগ একান্তভাবে দেহের সীমাতেই আবদ্ধ নয়, দেহকে আশ্রয় করে সে প্রেম দেহাতীত এক অপার্থিব সৌন্দর্যলোকে তার নিত্য আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্য ও প্রেমানুভূতির এই যে বৈশিষ্ট্য, একে তিনি প্রকাশ করেছেন এইভাবে- “জীবের মধ্যে অখণ্ডকে অনুভব করারই অন্য নাম ভালোবাসা, প্রকৃতির মধ্যে অনুভব করার নাম সৌন্দর্যসম্ভোগ।”
রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতার রহস্যও এইরকম একটি ভাবানুভূতি বলা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথের সুগভীর অধ্যাত্মবোধের মূলেও আছে এই ভাবানুভূতি। যে অদ্বিতীয় অর্ধপরিচিত দেবতার স্পর্শ তিনি বারংবার হৃয়ের মধ্যে অনুভব করেছেন, যার নিত্যনতুন লীলায় তাঁর কাব্যজীবন নব নব আনন্দরসে সিঞ্চিত পুষ্পিত হয়ে উঠেছে, সেই চিরবাঞ্ছিত হৃদয়দেবতাকেও তিনি লাভ করেছেন তাঁর নিবিড় অনুভূতির মধ্যে নানা রূপে। কখনো সখা রূপে, কখনো দেবতা রূপে, কখনো মানসসুন্দরী রূপে অদৃশ্য এই সত্তার স্পর্শ তিনি জীবনের ঊষালোক থেকেই পেয়ে এসেছেন। এই প্রণয়িনীর স্পর্শে কবি কখনো বেদনায় ব্যাকুল হয়েছেন, কখনো আনন্দে অধীর হয়েছেন। কখনো মিলনে, কখনো বিরহে এই মধুর স্পর্শটি ক্রমশই রসনিবিড় হয়ে উঠেছে। সুখে দুঃখে বিপদে সম্পদে জীবনের সকল অবস্থায় কবি এই জীবন-দেবতার স্পর্শ লাভ করেছেন। নিদারুণ দুঃখেও তিনি দুঃখরাতের রাজাকে অভ্যর্থনা করে নিয়েছেন। এইভাবে সীমা-অসীমের, পূর্ণ-অপূর্ণের, খণ্ড-অখণ্ডের লীলা-অভিসার চলেছে রবীন্দ্র-কাব্যে।
রবীন্দ্রনাথ সত্য-শিব-সুন্দরের একনিষ্ঠ পূজারি। কঠোর দুঃখ, নির্মম কষাঘাতের মধ্য দিয়ে যে শান্তি লাভ করা যায়, সত্য লাভ করা যায় তাই তাঁর কাম্য। তাই অত্যন্ত সহজেই তিনি বলতে পেরেছেন-
‘মনেরে আজ কহ যে,
ভালমন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।’
সত্যসন্ধানী কবি আরো বলেছেন-
আরাম হতে ছিন্ন করে
সেই গভীরে লও গো মোরে
অশান্তির অন্তরে যেথায়
শান্তি সুমহান।
এইজন্য তাঁর কাব্যে রুদ্র ও শিব সমান পূজা লাভ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের জীবন-দর্শনে মৃত্যু একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মৃত্যুর এত মহিমাময় ঐশ্বর্যময় মাধুর্যময় কল্পনা অন্য কোনো কবির কাব্যে আছে কিনা সন্দেহ। জীবনের সোনালি ঊষাতেই কবি অনুরাগকম্পিত কণ্ঠে বলেছেন- ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সম।’
মৃত্যু-বরের জন্য জীবন-বধূ উৎসুক হয়ে সর্বক্ষণ প্রতীক্ষা করে থাকে। রবীন্দ্রনাথ জীবনের অনন্ত-অনাদি প্রবাহবোধ স্বীকার করেছেন। জীবন-মরণ তো শুধু ইহলোকের বিষয় নয়। তা লোক-লোকান্তরের একটি সংলগ্ন ঘটনা- এ বিশ্বাস তাঁর দৃঢ় ছিল। তাই তিনি জীবন ও মরণকে স্বতন্ত্র করে দেখতে পারেননি।
বিশ্ববোধ আর সর্বানুভূতি রবীন্দ্র-সাহিত্যের একটি মূল সুর। এই বোধের উদ্ভব হয়েছে তাঁর অতীন্দ্রিয় অনুভূতি থেকে। এই অধ্যাত্ম-অনুভূতিই সমগ্র রবীন্দ্র-জীবন ও সাহিত্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ভারতের অধ্যাত্ম-সাধনায় যে ভূমার আদর্শ ‘ঈশাবাস্যং ঈদং সর্বং কিষ্ণ জগত্যাং জগৎ’- ঈশ্বরের দ্বারা নিখিল জগৎ পরিব্যাপ্ত রয়েছে, সেই সর্বব্যাপিত্বের আদর্শই রবীন্দ্রনাথের জীবন-দর্শনের মূল কথা। তিনি রসো বই সঃ-তিনি রসস্বরূপ, আনন্দানুভূতির তিনিই পরম প্রকাশ। আমাদের কবি এই সর্বানুভূতির কথা, এই আনন্দের কথা অক্লান্ত সুরে নানা ছন্দে রূপে রসে বর্ণে বৈচিত্র্যে প্রকাশ করেছেন। এই অনুভূতির প্রেরণাতেই তিনি লিখেছেন-
“পাগল হইয়া বনে বনে ফিরি আপন গন্ধে মম
কস্তরীমৃগ সম।”
এই প্রেরণাতেই সারা জীবন ধরে তিনি পৃথিবীর নানা পথে প্রান্তরে মরুতে পর্বতে অনন্ত পথ-পরিক্রমায় চলেছিলেন, তিনি চঞ্চলের চিরসহচর ছিলেন। তাঁর কাব্যে চিরদিনই এই আকুতি ধ্বনিত হয়েছে- “আমি চঞ্চল হে আমি সুদূরের পিয়াসী।”
রবীন্দ্রনাথে সুবিপুল, সর্বোতমুখী প্রতিভা ও বিরাট ব্যক্তিত্বের সামনে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। কত বিচিত্র দিকে, কত বিচিত্রভাবে যে তাঁর প্রতিভা বিকাশ লাভ করেছে, কোনটিকে ছাপিয়ে কোন দিকটি যে বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তা সমগ্ররূপে ধারণা করাই দুঃসাধ্য। সৃষ্টি, চিন্তা ও কর্মের সমস্ত দিকে কারও প্রতিভা এমন অম্লান দীপ্তিতে প্রতিভাত হয়েছে পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্তে দুর্লভ বলা যায়। রবীন্দ্র-জীবন ও কর্মের সম্যক ও সত্য উপলব্ধি আজো স্বদেশে-বিদেশে কোনো দেশেই হয়েছে কি-না সন্দেহ। কবি নিজেই তাঁর ‘আত্মপরিচয়’-এ বলেছেন- ‘নিজের সত্য পরিচয় পাওয়া সহজ নয়। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভিতরকার মূল সূত্রটি ধরা পড়তে চায় না।… নানাখানা করে দেখেছি, নানা কাজে প্রবর্তিত করেছি, ক্ষণে ক্ষণে তাতে আপনার অভিজ্ঞান আপনার কাছে বিক্ষিপ্ত হয়েছে। জীবনের এই দীর্ঘ চক্রপথ প্রদক্ষিণ করতে করতে বিদায়কালে আজ সেই চক্রকে সমগ্ররূপে দেখতে পেলাম। তখন এটা বুঝতে পেরেছি যে, একটি মাত্র পরিচয় আমার আছে, সে আর কিছুই নয়, আমি কবি মাত্র। আমার চিত্ত নানা কর্মের উপলক্ষে ক্ষণে ক্ষণে নানা জনের গোচর হয়েছে। তাতে আমার পরিচয়ের সমগ্রতা নেই।’
পরিপূর্ণতার প্রতি মানুষের একটা স্বাভাবিক টান আছে, তাই আমরা আমাদের প্রিয়তম কবিকে পরিপূর্ণ রূপেই পেতে চাই। বিশ্বের অমৃত ছবির পরিপূর্ণ সার্থক প্রকাশ রবীন্দ্রনাথ। তাই তাঁর কাব্যের মধ্য দিয়ে আমরা পরিপূর্ণতার স্বাদ পাই।
বিশ্বচিত্তের দূত রবীন্দ্রনাথ, তাঁর শ্রেষ্ঠ পরিচয় তাঁর কাব্যে, তাই তিনি সবার উপরে কবি, তাহার উপরে নাই।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
অনন্য সংস্কৃতির ইতিহাস by রাজিউদ্দিন আকিল

গোলাম মুর্শিদের গ্রন্থটি এসেছে রেডিও প্রোগ্রাম ও পত্রিকার কলাম থেকে। এই মাধ্যমেই তিনি বৃহত্তর জনসাধারণের কাছে হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন। একটু মনোযোগী হলে দেখা যাবে যে অঞ্চল হিসেবে বাংলা, বাংলা ভাষা, ও বাঙালি লোকজন গত ছয় থেকে সাত শতকের ব্যাপ্তিতে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্ত্বা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বইটি ১৪টি অধ্যায়ে ৬৪৪ পৃষ্ঠায় বাংলার সংস্কৃতির পুরো ইতিহাস সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলা ভাষাভাষী ও মাছ-ভাত খাওয়া লোকজনকে বাঙলি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যদিও অঞ্চল, ধর্ম (বর্ণ), গ্রাম-শহর ব্যবধান ব্যাপক রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তাছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গ, বরেন্দ্র ও রাঢ় এগুলো স্রেফ ভৌগোলিক বিভক্তি নয়, এখানে সামাজিক ঐক্যের অভাবও ছিল। তিনি বলেছেন, ভাষাই আমাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে দিয়েছে। বাঙালি বলতে আসলে যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে, তাদেরই বোঝায়।
আর তা কাকতালীয়ভাবে হয়নি। বাঙালি আড্ডাকে বাঙালি আড্ডায় পরিণত করতে সাংস্কৃতিক বিনিয়োগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
ভাষার পর ধর্মের দিকে নজর দেয়া হয়েছে। সমসাময়িক পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। তাদের কাছে মুসলিমরা হলো মুসলিম, এমনকি তারা বাংলা ভাষায় কথা বললেও। বাঙালি মুসলিমরা তাদের দ্বৈত পরিচয় নিয়ে সংগ্রাম করেছে। জন্ম ও ভাষার সূত্রে তাই বাঙালি হওয়া সতর্কভাবে বাছাই করা পরিচয়।
বিজ্ঞ বাঙালি ব্যক্তিত্বরা সবসময়ই রাজনৈতিক বিভক্তির ঊর্ধ্বে ওঠে অভিন্ন সাংস্কৃতিক অবস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন।
উপজাতীয় লোকজনের বাঙালি পরিচিতি নির্মাণের অসমাপ্ত কাজটি এখনো সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে জটিলতা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
বাঙালি ও মুসলিম
বাঙালি সংস্কৃতি গঠন নিয়ে সংক্ষিপ্ত একটি অধ্যায়ের পর মুর্শিদ যথাযথভাবেই ইন্দো-মুসলিম যুগের সাংস্কৃতিক রূপান্তরের দিকে ছুটে গেছেন। তিনি ১৩ শ’ শতক থেকে ১৮ শ’ শতক পর্যন্ত ব্যাপ্ত বাঙলার মুসলিম শাসনের প্রায় ৫৫০ বছরের ইতিহাসের দিকে মনোযোগী হয়েছেন। মুসলিম শাসকেরা এসেছিলেন মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অংশ থেকে। তারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলতেন, একক সংস্কৃতির অধিকারী ছিলেন না। তাদের অভিন্ন ধর্মীয় পরিচিতি থাকলেও তারা ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলা সফর করতেন না। আরবি, পাররি, তুর্কি ভাষাভাষী মুসলিম অভিবাসীরা সাথে করে নানা ধরনের সংস্কৃতি ও সভ্যতা নিয়ে এসেছিলেন। স্থানীয় রমণীদের বিয়ের মাধ্যমে ওই সংস্কৃতি স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে। একইভাবে উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ অভিবাসীরাও সাঁওতাল রমণীদের বিয়ে করে বাঙালি ব্রাহ্মণ সৃষ্টি করেছে।
মুসলিম শাসক ও মধ্য ইসলামিক ভূমির অভিজাতদের ও সেইসাথে স্থানীয় মধ্যবর্তীদের সাথে মেলামেশার ফলে বাঙালি সভ্যতার উদ্ভব ঘটিয়েছে। আর তা ধর্ম, স্থাপত্য, সাহিত্যসহ সংস্কৃতির নানা উপাদানে নতুনত্ব সৃষ্টি করেছে। মসজিদ, মাজার, দরগায় এসব চিহ্ন বিপুলভাবে দেখা যায়।
সামাজিক ও ধর্মীয় অধ্যায়ে মুর্শিদ লিখেছেন যে মধ্য যুগে ইসলামের অভ্যুদয়ের ফলে স্থানীয় ও আমদানিকৃত ধর্মের মধ্যে নানা মাত্রিক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
লেখক ধর্মীয় মাত্রার নানা দিক তুলে ধরেছেন। সমাজ ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ব্যাপক পরিসরে। ধর্মকে কেবল ধর্মীয় পরিসরেই সীমিত রাখা যায় না। ইসলাম ধর্ম ও হিন্দু ধর্মকে বাঙালিরা কিভাবে ব্যাখ্যা করেছে, সেটিও বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। ভিন্নতার কারণেই বাঙালি মুসলিম কিন্তু বিহারি মুসলিম বা পাঞ্জাবি মুসলিম হয়নি।
লেখক ধর্মীয় একীভূত করার প্রক্রিয়ায় বৌদ্ধ তান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর বেশ গুরুত্বারোপ করেছেন। আবার শিবের স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রবধূ হিসেবে অনার্য দেবীরা হিন্দু ঐতিহ্যের দেবী হিসেবে গৃহীত হয়েছে। মঙ্গল কাব্যগুলোতে বিষয়টি প্রবলভাবে দেখা যায়। তাছাড়া চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে হিন্দু ধর্ম পুনর্জীবন আন্দোলন ইসলামের ব্যাপক রাজনৈতিক উপস্থিতিকে প্রতিরোধ করতে দেখা যায়।
বাঙলার বিশ্বাস সবসময়েই ছিল ভক্তিমূলক, গুরুদের প্রতি ছিল নিবেদিতপ্রাণ। এ কারণে গুরুমুখী ইসলামই এখানে বিকশিত হয়েছে। বৌদ্ধ সহজিয়া আদর্শ, সুফি ধ্যান ধারণা ও বৈষ্ণববাদের মিলন এখানে ঘটতে পেরেছে।
মাছ পছন্দ
লেখক ঐতিহাসিক তথ্যের সাহায্যে দেখিয়েছেন এই এলাকার লোকজন মাছের প্রতি বিপুলভাবে আকৃষ্ট ছিল। মুসলিম ও অন্যান্য আমলে খাদ্যাভ্যাসে বিপুল বৈচিত্র্য সৃষ্টি হলেও গত ১০০০ বছরে বাঙালি খাদ্য আলাদাই থেকে গেছে।
তবে মুর্শিদ কিন্তু কেবল ধর্ম বা খাদ্যেই সীমিত থাকেননি। তিনি সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, অন্যান্য ধরনের শিল্পকলার দিকেও নজর দিয়েছেন। এমনকি বাবু সংস্কৃতিও তিনি সামনে নিয়ে এসেছেন।
লেখক এই বইটিতে যেভাবে বাঙালি ইতিহাস তুলে ধরেছেন, তা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। বইটি বাঙলার সংস্কৃতির ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ বিবেচিত হতে পারে।
লেখক: শিক্ষক, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি এর আগে ছিলেন ফেলো, সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা। তার গ্রন্থরাজির মধ্যে রয়েছে ‘দি মুসলিম কোশ্চেন আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলাম অ্যান্ড ইন্ডিয়ান হিস্টরি’ (পেঙ্গুইন)।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
প্রেম বাঁচে কতকাল? -আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর প্রেম থেকে

কেন প্রেমে এত আগুন? কেন হারিয়ে ফেলার এমন আতঙ্ক? উৎকণ্ঠায় যন্ত্রণায় কেন এত তিল তিল কষ্ট? কাছে পেয়েও কেন এমন হা-হুতাশ? (‘কেন আমার রজনী যায়/কাছে পেয়েও কাছে না পায়/ কেন গো তার মালার পরশ বুকে লাগেনি।’) প্রেমে দু-ধরনের দূরত্বেই কষ্ট। যে হারিয়ে গেছে তার জন্যে বেদনা তো আছেই, সে তবু সহ্যের, কিন্তু যে কাছে আছে অথচ থেকেও নেই, তার জন্যে শুধু দোজখের দাউদাউ অনল। আসুন এবার আমরা দেখতে চেষ্টা করি, প্রেম কেন এমন হারানোর অশান্তি আর উৎকণ্ঠা দিয়ে ভরা।
সুধীবৃন্দ,
আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন যে, যাকে আমরা ভালোবাসি প্রথম দেখাতেই কিন্তু তাকে আমরা পুরো ভালোবেসে ফেলি না। প্রথমে তার কোনো-একটি দিক আমাদের ভালো লাগে, হয়ত কোনো গুণ, হয়ত রূপ, ব্যক্তিত্বের কোনো দিক, এমনকি কিছু একটা। তারপর সে-ভালো লাগার রং ধীরে ধীরে তার অন্য সবকিছুর ওপর ছড়িয়ে যায়। তখন আমরা সেই গোটা মানুষটাকেই ভালোবেসে ফেলি। কেবল ভালোবাসি না, তার ব্যাপারে ধীরে ধীরে এতটাই আচ্ছন্ন আর অন্ধ হয়ে পড়ি যে, তার ভেতরে-যে খারাপ কিছু আছে তা দেখার ক্ষমতা পর্যন্ত আমাদের এক সময় লোপ পায়। আমরা পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাই।
যখন কারো প্রতি আমরা ঠিক ওই পরিমাণে আচ্ছন্ন হই, তখনই সেটা ভালোবাসা। যদি তার ভালোমন্দ বিচার করার বা বোঝার ক্ষমতা আমাদের থাকে তবে বুঝতে হবে, আমরা তখনো ভালোবাসি নি, তাকে আমাদের ভালো লেগেছে মাত্র।
এখন প্রশ্ন, যাকে ভালোবাসি তার ব্যাপারে আমরা এতটা অসহায় আর অন্ধ হই কেন? কেবল অন্ধ নয়: অন্ধ, আচ্ছন্ন, সম্মোহিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত? তার ভালোমন্দ বিচার তো করতে পারিই না, তার বাইরে-যে পৃথিবীতে আর কিছু আছে তাও ভাবতে পারি না?
আগেই বলেছি, আমরা যাদের প্রেমে পড়ি তাদের সবকিছু প্রথমেই আমরা ভালোবেসে ফেলি না। প্রথমে তাদের কোনো-একটা দিক আমাদের ভালো লাগে। একটা জিনিশ নিশ্চয়ই আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, কোনো মানুষের কোনো-একটি বিশেষ দিক ভালো লাগার সঙ্গে সঙ্গেই ওই মানুষটি আমাদের কাছে কিছুটা বড় হয়ে ওঠে। আমাদের ভালোবাসাই তাকে বড় করে তোলে। আমাদের জীবনে যে ছিল দশজন মানুষের একজন, সে হঠাৎ ‘একাদশ’ হয়ে যায়। আমাদের জীবনের একান্ত মুহূর্তগুলোকে সে তখন খুশির হাওয়ায় ভরিয়ে তুলতে শুরু করে। যতই তাকে ভালো লাগতে থাকে ততই সে আমাদের চোখে বড় হয়ে উঠতে থাকে। এভাবে বড় হতে হতে সে এক সময় আমাদের জীবনের সমান হয়ে যায়। এক সময় সে হয় তারও চেয়ে বেশি, আমাদের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। হয়ে আমাদের বিশ্বচরাচরকে গ্রাস করে আমাদের একচ্ছত্র ঈশ্বর হয়ে বসে। আমাদের জীবনকে সে তখন পূর্ণ করে ফেলে এক অপার্থিব অলৌকিক আনন্দে আর চরিতার্থতায়। জীবন হয়ে ওঠে মধুময়, মধুময় হয় বিশ্বচরাচরের সব ধূলিকণা। সে যখন আমাদের কাছে ছোট ছিল তখন তাকে হারাবার ভয়টাও ছিল ছোট। কিন্তু সে এত বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাকে তারাবার ভয়ও হয়ে যায় অতিকায়। ফলে শুরু হয় প্রেমের আতঙ্ক আর যন্ত্রণা। তাই যে একদিন আমাদের চোখে ছিল একজন সামান্য মানুষ, সে দেখতে দেখতে আমাদের সর্বময় প্রভু হয়ে আমাদের জীবনকে দুহাতের নখরে চিরে রক্ত পান করতে শুরু করে। আমাদের অসহায়তার সুযোগে সে আমাদেরকে তার নিশ্চিত ক্রীতদাস বানায়। নির্দয় স্বৈরাচারীর মতো আমাদের ছিন্নভিন্ন রক্তমাখা জীবনটাকে নিয়ে ইচ্ছামতো ছিনিমিনি করে। আমাদের শান্তি-স্বস্তি হরণ করে জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুনের দাহ দেয়। অথচ এ সবাই কিন্তু হয় আমাদেরই ভেতরকার আশঙ্কা আর অশান্তির কারণে। মধ্যযুগের গোবিন্দদাসের একটা কবিতায় কৃষ্ণ রাধাকে দেখিয়ে তাঁর সঙ্গীকে বলছেন।
ঈ সখি কো ধনি সহচরি মেলি
হামারি জীবন সঙে করতাই খেলি।
‘সখি, কে ঐ রূপসী যে তার সহচরীদের সঙ্গে মিলে আমার জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলছে।’ স্বয়ং ভগবানেরই যখন এই অবস্থা তখন আমরা তো ছার। এমনি করে প্রেম আমাদের জিম্মি করে। আমরা পড়ে যাই এক অভেদ্য চক্রে। যাকে ভালোবাসি তাকে দেবতার পর্যায়ে তুলে নেওয়ায় তাকে নিয়ে আমাদের প্রতিটি স্বপ্ন বা তার প্রতিটি স্পর্শ আমাদের অস্তিত্বকে এমন অনির্বচণীয়, স্বর্গীয় ও জ্বলন্ত আনন্দে ভরিয়ে তুলতে থাকে যে, তাকে তুচ্ছতায় নামিয়ে এনে সেই অবিশ্বাস্য সুখের স্বর্গকে হারানোর ক্ষমতা আমাদের শেষ হয়ে যায়। আবার একইসঙ্গে সেই দেবতার মতো বড় হয়ে ওঠা মানুষটির বিশালতার চাপ বা হারানোর দুর্ভাবানা সহ্য করাও আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। স্বর্গের এমন দুর্লভ দানকে হারিয়ে ভিখিরি হয়ে পড়ার আতঙ্কে আমাদের দিনরাত্রির সব সুখ-স্বস্তি শেষ হয়ে যায়। এক অসহ্য যন্ত্রণার ভেতর নিদ্রাহীন বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে আমরা প্রায় মানসিক অসুস্থতায় জর্জরিত হতে থাকি। তাই যে-প্রেমের হওয়ার কথা ছিল শুধুমাত্র সুখের তৃপ্তিতে থৈ থৈ, তা একইসঙ্গে হয়ে ওঠে যন্ত্রণা আর আর্তনাদে ভরা এক জ্বলন্ত নরক।
এভাবে প্রেমের ভেতর একজন মানুষকে অন্যায়রকম বড় করে তুলে আমরা নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনি। একদিন সে ছিল নিতান্তই তুচ্ছ বা সামান্য মানুষ, যার বেঁচে থাকা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো ব্যাপার ছিল না, সেই মানুষকে হারানোর সামান্যতম আশঙ্কায় আমরা কাঁপতে থাকি। সে অন্যদিকে এতটুকু মুখ ঘোরালেও বুকের ভেতরটা উৎকণ্ঠায় অস্থির হয়ে ওঠে: ‘ওদিকে কেন তাকায়? তবে কি তার মন সম্পূর্ণভাবে আমার দিকে নেই?’ আকাশের প্লেনের দিকে সে তাকালেও মনে হয়, ‘প্লেনের দিকে তাকাল কেন? তবে কি ওই প্লেনে এমন কেউ যাচ্ছে, যার কথা সে ভাবছে?’
সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা ঐ যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা:
নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে;
এই কবিতাও কি এমনি কোনো যন্ত্রণা থেকে লেখা? সে তখন আমাদের ছাপিয়ে এতবড় হয়ে উঠছে যে, তাকে হারানোর বিশাল ক্ষতির কথা ভাবতে আমরা পুরো ভেঙে পড়ি। যে আমাদের এত অপরিমেয় সুখে পরিপূর্ণ করে রেখেছে সেই দুর্লভ স্বর্গকে হারাই কী করে? তাই এত যন্ত্রণা প্রেমে বন্ধুরা! সে মানুষটি সামান্য কেউ হলে কিন্তু এত আতঙ্ক থাকত না। কিন্তু সে বড় বলে, তার দেওয়া সুখ অসম্ভবরকম বেশি বলে, তাকে হারানোর আতঙ্ক দিয়ে সে আমাদের এভাবে কাঁদায়।
-----৫----
প্রেম কতদিন বাঁচে সুধীবৃন্দ? মানুষ বলে ‘আমি চিরদিন তোমাকে ভালোবাসব’। এটা বলে এজন্যে যে, মানুষ মরণশীল হলেও তার মধ্যে রয়েছে এক ব্যক্তিগত অমরত্বের স্বর্গীয় অনুভূতি। সে তার এই নশ্বর ছোট্ট জীবনকে চিরকালের সমান মনে করে। কিন্তু আসলে কতদিন পর্যন্ত সে ভালোবাসে? কতদিন পর্যন্ত একজন মানুষের পক্ষে ভালোবাসা সম্ভব? বড়ই অল্পদিন সুধীরা। প্রেম বড় ক্ষণস্থায়ী। বসন্তের ফুলের মতোই সে দুদ-ের! চ-ীদাস লিখেছিলেন:
হাসিতে হাসিতে পিরীতি করিয়া
কাঁদিতে জনম গেল।
প্রেমে হাসির মুহূর্তে ক্ষণকালের, কান্নাই চিরকালের। ভেবে দেখুন, মানুষ জীবনে প্রেম করে কটা দিন আর প্রেমের স্মৃতি নিয়ে বাঁচে কতকাল? কেন প্রেমের স্মৃতি এত দীর্ঘায়ু? কারণ প্রেমের দিনগুলোতে আমরা বাস করি আবেগের এক অসম্ভব তুঙ্গ মুহূর্তে। আবেগের সেই তীব্রতা আমাদের ভালোবাসার পৃথিবীটাকে এমন আলোকিত ও বিভাময় করে রাখে যে, সেই শীর্ষ থেকে নেম এলেও সে দিনগুলোর উজ্জ্বলতম আলোকচ্ছটা আমাদের চোখ থেকে হারায় না।
কেন প্রেম মরে যায় এত তাড়াতাড়ি? কতদিন বাঁচে প্রেম? এমন উদগ্র ঝাঁঝালো সর্বনাশা আবেগকে কতদিন আমাদের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন: কিছুতেই এক বছরের বেশি নয়। প্রেমে যে অকথ্য যন্ত্রণা আর অসহ্য সুখ আমাদের সর্বগ্রাসীভাবে দগ্ধ করে তা বেশিদিন বইতে হলে মাথার উচ্চ রক্তচাপে আমরা ছিঁড়ে যেতাম। তাই, চাই বা না-চাই কিছুদিনের মধ্যে প্রেমকে আমাদের বিদায় দিতে হয়। এটা করতে পারি আমরা দুটো উপায়ে: প্রেমকে হত্যা করে, অথবা প্রেমকে বন্ধুত্বের পর্যায়ে নামিয়ে তাকে ছোট বা সহনীয় করে ফেলে।
কিন্তু এ দুয়ের কোনোটাই কি আমাদের পক্ষে সম্ভব? প্রেম একবার জন্ম নিলে সে কি কোনোদিন মরে? মীর্জা গালিব লিখেছিলেন: ‘প্রেমের ওপর জোর খাঠে না। এ এমন এক আগুন, গালিব, যা জ্বালালে জ্বলে না, নেভালে নেভে না।’ প্রেম কখনো নেভে না, বন্ধুরা। পেলেও না, না-পেলেও না। যাকে আমরা ভালোবাসি তাকে গোটা হৃদয়টাই আমরা দিয়ে বসি। তাই তার কাছ থেকেও তার গোটা হৃদয়টাই চাই। এর কম পেলে আমরা তা নিতে অস্বীকার করি। করি, কিন্তু তার প্রেমকেও তো ছাড়তে পারি না। যে-মানুষকে আমরা বড় করে তুলেছি সে ছোট হয়ে গেলে তার কাছ থেকে পাওয়া সুখও তো ছোট হয়ে গেল। আমরাই যে ছোট হয়ে গেলাম। তাই ছোট সেই সুখকে নিতে আমরা অস্বীকার করি। এইজন্যে রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে রতন পোস্টমাস্টারের সহৃদয় সৌজন্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রেম থেকে নিচে নামতে এ কারণেই আমাদের কত কষ্ট। তাই বন্ধু কখনো কখনো প্রেমিক বা প্রেমিক হয়ে যেতে পারে, কিন্তু কেউ একবার প্রেমিক বা প্রেমিক হলে সে আর কখনো বন্ধু হয় না। কেউ যদি প্রেমকে বন্ধুত্বের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে, তখন বুঝতে হবে তার প্রেম ছোট ছিল। প্রেমিক বা প্রেমিকাকে সে বড় করে তুলেছিল ঠিকই কিন্তু তাকে বিশ্বব্যাপী করতে পারে নি। তা জন্মান্ধ বা নিষ্কৃতিহীন ছিল না। যাকে সে প্রেম বলে ভেবেছে আসলে তা ছিল বন্ধুত্ব। হয়ত সম্পন্ন মাপের বন্ধুত্ব, কিন্তু বন্ধুত্ব।
বন্ধুত্ব নিয়ে এখানে একটা কথা বলে রাখতে চাই। বন্ধুত্বকে নিয়ে অনেকেই অনেক সময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। কিন্তু আসলে তা আদৌ হেলা করার জিনিশ নয়। ফ্রান্সিস বেকন, শোপেন হাওয়ার, রাশফুকো বন্ধুত্বকে প্রেমের চেয়ে বড় জায়গা দিয়েছেন। প্রেম জীবনের উজ্জ্বলতম মুহূর্ত। এর চেয়ে সৌন্দর্যময় আলোময় রূপময় পৃথিবীতে কিছু নেই। এ হল মানব-অস্তিত্বের সর্বোচ্চ শীর্ষ; মানুষের জীবনের শুভ্রতম উত্তুঙ্গতম কাঞ্চনজঙ্ঘা। মানুষের জীবনকে তীব্রতম সুখের আস্বাদ দেয় সে। বন্ধুত্ব প্রেমের মতো অত উঁচু নয়। প্রেম যদি কাঞ্চনজঙ্ঘা হয় তবে বন্ধুত্ব পামীর মালভূমি। কিন্তু নিচু হলেও প্রেমের তুলনায় একটা বড় জিনিশ আছে তার মধ্যে: বিশালতা। সে প্রশস্ত, দিগন্তবিস্তৃত। তার আয়তন বিশাল। তার মধ্যে আছে অনেক মানুষ আর সবুজ হৃদয়ের নিরাপদ আশ্রয়। তাছাড়া উচ্চতায় সে কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো না হলেও সমতল থেকে সে তো অনেক ওপরে। অনেক উঁচু পর্বতের চেয়েও ওপরে। এই বা কম কিসে? তাছাড়া প্রেমের মতো আগুনের লেলিহান শিখা বা কাঞ্চনজঙ্ঘার তীক্ষè নির্মম শীর্ষ দিয়ে জীবনকে সে তো ছিন্নভিন্ন বা রক্তাক্ত করে না। প্রেমে মানুষ বড় সুখের আশায় বড় দুঃখ ডেকে আনে। এনে সেই দুঃখের ভেতর ককিয়ে ককিয়ে শেষ হয়। বন্ধুত্বে সুখ-দুঃখ কোনোটাই এতবড় নয়। কিন্তু অনেক মানুষের প্রীতিতে, তৃপ্তিতে, দীর্ঘস্থায়িতায়, সহাবস্থানে তা চরিতার্থ। কিন্তু যা নিয়ে আমি বলছি তা প্রেম; বন্ধুত্ব নয়। প্রেম একটা কারণেই কেবল শেষ হয়ে যেতে পারে বা বন্ধুত্বের পর্যায়ে নেমে আসতে পারে: শ্রদ্ধা হারালে। বড় হয়ে-ওঠা মানুষটা কোনো কারণে আমাদের চোখে ছোট হয়ে গেলে। কিন্তু সে-বিষয়ে একটু পরে আসছি। (চলবে)
>>>আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ- এর বক্তৃতা সংগ্রহ থেকে নেয়া
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1406)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
-
▼
2020
(416)
-
▼
February
(58)
-
▼
Feb 12
(7)
- মাতৃভাষার রক্তক্ষরণ by ড. মো. নজরুল ইসলাম
- 'কুরআনের প্রতিটি আয়াত আমার বিক্ষুব্ধ মনে প্রশান্তি...
- শেখ হাসিনার পর কে? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
- বাজার ও মাজার: মুলতানে একদিন by টিম ব্লাইট
- রবীন্দ্র-প্রতিভার পরিচয় by হাবিবুর রহমান স্বপন
- অনন্য সংস্কৃতির ইতিহাস by রাজিউদ্দিন আকিল
- প্রেম বাঁচে কতকাল? -আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর প্রেম থেকে
-
▼
Feb 12
(7)
-
▼
February
(58)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...











