Sunday, December 8, 2013

নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকট- কে জিতবে কে হারবে? by আনু মুহাম্মদ

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকার কেন সব দৃঢ়তা আর প্রশাসনিক শক্তি নিয়ে একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

সাক্ষাৎকার- ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হবে না by মিজানুর রহমান খান

চলমান এ রাজনৈতিক সংকট কেন, উত্তরণের উপায় কী, এ জন্য কে বা কারা দায়ী—এসব জানতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনের মতামত জানার চেষ্টা করছে প্রথম আলো।

একতরফা নির্বাচনের ট্রেন থামা প্রয়োজন- বিশিষ্ট নাগরিক

বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফারনানদেজ তারানকো। আজ রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এতে অংশ নেন, আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. শাহদীন মালিক, সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রমুখ। বৈঠক শেষে ড. কামাল হোসেন বলেন, সংঘাত সহিংসতা আমরা কেউই চাই না। একতরফা নির্বাচনের ট্রেন থামা প্রয়োজন। এতদিন আমরা যা বলে আসছিলাম আজও তাই বলছি। তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই বলেছেন, সমঝোতা হলে তফসিল পেছানো সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাকে আর আইনের ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে না। জাতিসংঘের উদ্যোগের সফলতা ব্যর্থতা সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি বলে জানিয়ে তিনি বলেন, অপারেশন চলছে। এ অবস্থায় কতদূর এগিয়েছে তা বলা সম্ভব নয়। ড. শাহদীন মালিক বলেন, একতরফা নির্বাচন আমরা কেউই চাই না। ২০০৮ সালে যেমন সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়েছে, এবারও তেমন নির্বাচন চাই। তারানকোর নেতৃত্বে জাতিসংঘের প্রতিনিধি দল নিউ ইয়র্ক থেকে কোনও ফর্মুলা নিয়ে আসেনি। এখানকার সবার সঙ্গে আলোচনা করেই তারা সমাধান করতে চান।

তারানকো ট্রেন মিস করলেই সর্বনাশ! by গোলাম মাওলা রনি

তারানকো নামের জাতিসংঘের যে বড় কর্তা এই মূহুর্তে বাংলাদেশ সফর করছেন- কেনো জানি তাকে দেখে আমার বড্ড ভয় করছে।

বাংলাদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা এএইচআরসির

বাংলাদেশে সহিংসতা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জরুরি ভিত্তিতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চেয়েছে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি)।
যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও দারিদ্র্য পীড়িত এ জাতির স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য এমন আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে এ নিয়ে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন হংকংভিত্তিক এএইচআরসি এর নির্বাহী পরিচালক বিজো ফ্রাসিস। এতে বলা হয়েছে, গত শতাব্দীতে গৃহযুদ্ধ কবলিত কেনিয়াতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ যে ভূমিকা নিয়েছিল একই রকম ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশেও একটি স্বচ্ছ নির্বাচন করতে হবে। এতে কেনিয়া ও অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। তারানকোর তৃতীয় দফা বাংলাদেশ সফর করার প্রাক্কালে লেখা ওই চিঠিতে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে যে নৃশংসতা ঘটছে তাকে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধান থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একটি সঙ্কট সৃষ্টি করেছেন। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র ও এর বাইরের শক্তিকে। দু’ পক্ষই নির্বাচন কমিশনের শক্তি নেই এ কথা জানে।

তারানকোকেও জানিয়েছে ইসি- সমঝোতা হলে অনেক কিছুই সম্ভব

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ বলেছেন, সব দলের মধ্যে সমঝোতা হলে অনেক কিছুই করা সম্ভব, জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলকে এ কথাই জানানো হয়েছে।
আজ রোববার সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) কার্যালয়ে সিইসি গণমাধ্যমকর্মীদের এ কথা বলেন।
আজ বেলা ১১টায় জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তাঁর প্রতিনিধিদল নিয়ে সিইসির সঙ্গে দেখা করেন।

প্রতিনিধিদলের সঙ্গে কী কথা হলো তা জানতে চাইলে সিইসি বলেন, প্রতিনিধিদল সমঝোতা হলে নির্বাচন পেছানো যাবে কি না তা জানতে চেয়েছেন। সমঝোতা হলে অনেক কিছুই করা সম্ভব তা তাদের বলা হয়েছে।

সিইসি বলেন, তফসিল ঘোষণার পর দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। সমঝোতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিলতর হয়ে গেছে। আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। তবে সিইসি বলেন, ‘যেহেতু জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল সবার সঙ্গে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ বের করার চেষ্টা করছে তাই এ মুহূর্তে বেশি কিছু বলা সমীচীন হবে না। আমরা সবাই আশায় থাকি।’


জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলকে নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করা এবং নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান সিইসি। তিনি জানান, এ ছাড়া জাতিসংঘের সহযোগিতায় যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

কাল সারা দেশে হরতাল ডাকল জামায়াত

দলের নেতা কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা জারির কয়েক ঘণ্টার মাথায় হরতালের ডাক দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
পরোয়ানা জারির প্রতিক্রিয়ায় এক বিবৃতিতে কাল সোমবার সারা দেশে হরতাল আহ্বান করেছে দলটি।

আজ রোববার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের ‘পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের’ প্রতিবাদে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
এর আগে আজ দুপুরে কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।

বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সরকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। বিচারের পুরো প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করে জামায়াত বলেছে, ইতিমধ্যেই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, সরকার আবদুল কাদের মোল্লাকে ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যা’ করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে চলমান আন্দোলন থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়।

‘পদত্যাগ করলে জনগণ সহানুভূতি দেখাবে’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করলে জনগণ সহানুভূতি দেখাবে বলে  মন্তব্য করেছে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ।
আজ বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন।  সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক সমাজসহ শতকরা নব্বই ভাগ মানুষই নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচনে সংকল্পবদ্ধ। কারণ তার আমলের দুর্নীতি, দুঃশাসন, দলীয়করণ, দমন-পীড়ণের কারণে জনগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করবেÑ এই তার ধারণা। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীকে আবারও আহ্বান জানাচ্ছি, আপনি পদত্যাগ করুন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন মেনে নিন, দেশ ও জাতিকে রক্ষা করুন। জনগণ আপনার নিরাপদ প্রস্থানের বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করবে। অন্যথায় জনতার আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে আপনার ক্ষমতার তাসের ঘর বিলীন হয়ে যাবে এবং জনতার বিজয় হবেই ইনশাল্লাহ।

কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা জারি

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
এরই মধ্যে পরোয়ানাটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসির উদ্দিন মাহমুদ এ তথ্য জানিয়েছেন।

কাদের মোল্লাকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় ৫ ডিসেম্বর প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ। এ রায় ৭৯০ পৃষ্ঠার। রায় প্রকাশিত হওয়ার আগে এতে সই করেন বিচারপতিরা।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ওই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার দুই মাস ১৮ দিনের মাথায় পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। আজ দুপুর ১২টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে রায়ের অনুলিপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়।

রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) করার সুযোগ আছে কি না, এ নিয়ে সরকার ও আসামিপক্ষ দুই ধরনের মত দিয়েছে। সরকারপক্ষ বলছে, আইনে পুনর্বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। দণ্ড কার্যকর সরকারের ওপর নির্ভর করছে। আর আসামিপক্ষ বলছে, রায় পুনর্বিবেচনা আসামির সাংবিধানিক অধিকার।

কাদের মোল্লাকে গত বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটার দিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার (পার্ট-২) থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী  সেদিন বলেছিলেন, রায়ের অনুলিপি হাতে পেলে কাদের মোল্লাকে কনডেম সেলে (মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষ) রাখা হবে।

২০১০ সালের ১৩ জুলাই অন্য একটি মামলায় কাদের মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরের ১৪ অক্টোবর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তদন্ত শুরু হয় ২১ জুলাই। গত বছরের ২৮ মে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ৩ জুলাই থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে যাবজ্জীবন সাজার রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-২।



কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও রায়
প্রথম অভিযোগ (পল্লব হত্যা): কাদের মোল্লার নির্দেশে আকতার গুন্ডা একাত্তরের ৫ এপ্রিল মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে গুলি করে হত্যা করেন। রায়ে বলা হয়, প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পাওয়া গেছে, একাত্তরে নবাবপুর থেকে পল্লবকে ধরে আনার মতো দুষ্কর্মে আসামির ‘সহযোগিতা’ ছিল। পল্লব মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন, এ জন্য তিনি আসামির শিকারে পরিণত হন। এ হত্যাকাণ্ড ছিল দেশের বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে পদ্ধতিগত আক্রমণের অংশ।



দ্বিতীয় অভিযোগ (কবি মেহেরুননিসা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা): এ অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২৭ মার্চ কাদের মোল্লা তাঁর সহযোগীদের নিয়ে কবি মেহেরুননিসা, তাঁর মা এবং দুই ভাইকে মিরপুরের বাসায় গিয়ে হত্যা করেন। রায়ে এ বিষয়ে বলা হয়, সহযোগীদের নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে কাদের মোল্লা এ হত্যাকাণ্ডে ‘নৈতিক সমর্থন’ ও ‘উত্সাহ’ জুগিয়েছেন, যা দুষ্কর্মে ‘সহযোগিতার’ মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।


তৃতীয় অভিযোগ (সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যা): একাত্তরের ২৯ মার্চ সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে মিরপুরের জল্লাদখানা পাম্প হাউসে নিয়ে কাদের মোল্লা ও তাঁর সহযোগীরা জবাই করে হত্যা করেন। প্রাপ্ত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়, খন্দকার আবু তালেব হত্যাকাণ্ডে কাদের মোল্লা মূল অপরাধীদের নৈতিক সমর্থন ও উত্সাহ জুগিয়েছেন, যা মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার মধ্যে পড়ে।



চতুর্থ অভিযোগ (ঘাটারচর ও ভাওয়াল খানবাড়ি হত্যাকাণ্ড): একাত্তরের ২৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ১১টা পর্যন্ত কাদের মোল্লা ও ৬০-৭০ জন রাজাকার কেরানীগঞ্জ থানার ভাওয়াল খানবাড়ি ও ঘাটারচর (শহীদনগর) এলাকায় শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসী ও দুজন নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেন। এ বিষয়ে রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষের সপ্তম সাক্ষী আবদুল মজিদ পালোয়ান ও অষ্টম সাক্ষী নূরজাহান বেগম যে আসামিকে চিনতেন, তা প্রাপ্ত সাক্ষ্যে ট্রাইব্যুনাল বিশ্বাস করতে পারেননি। ফলে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয় না যে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাকিস্তানি সহযোগীদের সঙ্গে রাইফেল হাতে কাদের মোল্লা নিজে উপস্থিত ছিলেন। হত্যাকাণ্ড যে ঘটেছিল, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই, কিন্তু এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আসামির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।



পঞ্চম অভিযোগ (আলুব্দীতে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ): একাত্তরের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাদের একটি হেলিকপ্টার মিরপুরের আলোকদী (আলুব্দী) গ্রামের পশ্চিম দিকে নামে। কাদের মোল্লা অর্ধশত অবাঙালি, রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাসদস্য নিয়ে গ্রামের পূর্ব দিক থেকে ঢোকেন এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকেন। ওই ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৩৪৪ জনের বেশি মারা যান। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে, হত্যাকাণ্ডের সময় কাদের মোল্লাকে রাইফেল হাতে সশরীরে উপস্থিত দেখা গেছে। কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধ যখন অনেক ব্যক্তি ঘটায়, তখন ওই ব্যক্তিদের প্রত্যেকে ওই অপরাধ এককভাবে সংঘটনের জন্য সমানভাবে দায়ী।



ষষ্ঠ অভিযোগ (হযরত আলী, তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা ও ধর্ষণ): একাত্তরের ২৬ মার্চ মিরপুরের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর কালাপানি লেনের হযরত আলী, তাঁর স্ত্রী, দুই মেয়ে ও দুই বছরের ছেলেকে হত্যা এবং তাঁর ১১ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের সঙ্গে কাদের মোল্লা সংশ্লিষ্ট ছিলেন। হযরতের আরেক মেয়ে ওই ঘটনা লুকিয়ে থেকে দেখেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন হযরতের পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য লুকিয়ে থাকা ওই মেয়ে। রায়ে বলা হয়, প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণে অপরাধের ঘটনাস্থলে কাদের মোল্লার উপস্থিতি অপরাধের সঙ্গে তাঁর সংযুক্ততা প্রমাণ করে। আইনগতভাবে ধরে নেওয়া যায়, অপরাধ সংঘটনে আসামি নৈতিক সমর্থন ও সাহায্য করেছেন।


সংক্ষিপ্ত রায় অনুসারে, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চতুর্থ অভিযোগ ছাড়া বাকি পাঁচটি অভিযোগে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতা বা সহযোগিতার জন্য, পঞ্চম অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যা এবং ষষ্ঠ অভিযোগে হত্যা ও ধর্ষণের অপরাধে কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।


শাস্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বলা হয়, হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ মানবতাবোধের জন্য এক প্রচণ্ড আঘাত, ট্রাইব্যুনাল তা বিবেচনায় নিয়েছেন। অপরাধে আসামির সম্পৃক্ততার ধরন ও অপরাধের গভীরতা ট্রাইব্যুনাল সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। শাস্তি এমন হতে হবে যেন অপরাধের গভীরতার সঙ্গে অপরাধীর দায়ের মাত্রা সম্পর্কযুক্ত হয়। ট্রাইব্যুনাল একমত যে পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগের জন্য কাদের মোল্লা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগের জন্য ১৫ বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার যোগ্য।


চূড়ান্ত আদেশে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ২০(২) ধারা অনুসারে কাদের মোল্লাকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো।

এ রায়ের পর তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে তরুণ সমাজের ডাকে শাহবাগে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। পরে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সমান সুযোগ রেখে ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) সংশোধন বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আগে আইনে সরকারের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ ছিল না। গত ৩ মার্চ সর্বোচ্চ শাস্তি  চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে পরদিন আপিল করেন কাদের মোল্লা। গত ১ এপ্রিল থেকে শুনানি শুরু হয়।


আসামি ও সরকার—উভয় পক্ষের দুটি আপিলের ওপর ৩৯ কার্যদিবস শুনানি শেষে গত ২৩ জুন আপিল বিভাগ রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। শুনানি শেষ হওয়ার ৫৫ দিনের মাথায় ১৭ সেপ্টেম্বর রায় দেওয়া হয়।

আপিল বিভাগের রায়ে কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করার ব্যাপারে পাঁচ বিচারপতি একমত হলেও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ভিন্নমত দেন। আপিল বিভাগের আদেশে বলা হয়, ষষ্ঠ অভিযোগে (সপরিবারে হযরত আলী লস্কর হত্যা ও ধর্ষণ) সংখ্যাগরিষ্ঠ (৪: ১) মতামতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। চতুর্থ অভিযোগ (ঘাটারচর ও ভাওয়াল খানবাড়ি হত্যাকাণ্ড) থেকে ট্রাইব্যুনাল আসামিকে খালাস দিয়েছেন, রায়ের এ অংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে বাতিল করা হলো। এ অভিযোগে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলো। প্রথম (পল্লব হত্যাকাণ্ড), দ্বিতীয় (সপরিবারে কবি মেহেরুননিসা হত্যা), তৃতীয় (সাংবাদিক আবু তালেব হত্যাকাণ্ড) ও পঞ্চম অভিযোগে (আলুব্দী হত্যাযজ্ঞ) ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ড সংখ্যাগরিষ্ঠ (৪: ১) মতামতে বহাল রাখা হলো।

কে জিতবে কে হারবে?

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকার কেন সব দৃঢ়তা আর প্রশাসনিক শক্তি নিয়ে একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? এর কারণ হতে পারে একটাই, আওয়ামী লীগ ধারণা করছে, যদি তারা সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য কোনো আপসে যায়, তাহলে অন্তত প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে শেখ হাসিনাকে সরে যেতে হবে। এটা মেনে নিতে আওয়ামী লীগের অসুবিধা কী? অসুবিধা একটাই, সে রকম পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতে আসার ব্যাপারে ভরসা পাচ্ছে না। যদি জনসমর্থন অটুট থাকে, আওয়ামী লীগ বিভিন্ন বিলবোর্ডের এবং টিভি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে যে উন্নয়ন প্রচার করছে, তাতে জনগণের যদি আস্থা থাকে, তাহলে নির্বাচনে বিজয় তো নিশ্চিত হওয়ার কথা। তা ছাড়া যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু তো আওয়ামী লীগের বড় সাফল্যের বিষয়। তাহলে? না, আওয়ামী লীগ কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। অন্যদিকে বিএনপিও নিশ্চিত, শেখ হাসিনা যদি প্রধানমন্ত্রী থাকেন, তাহলে তাদের জয়লাভের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু যদি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা থাকেন, যদি মিডিয়া সতর্ক থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগের পক্ষে কি ইচ্ছা করলেই কারচুপি করা সম্ভব হবে? না, কোনোভাবেই এই ঝুঁকি বিএনপি নিতে রাজি নয়। কেউ পরাজয় তো নয়ই, তার ঝুঁকিও নিতে রাজি নয়। নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় কখনো জয় কখনো পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনই তো নিয়ম। কিন্তু বাংলাদেশে দুই পক্ষ কেউ যদি পরাজয়ে রাজি না থাকে, তাহলে নির্বাচন-প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করবে? দুই পক্ষই নির্বাচনে অংশ নিতে চায়, তবে নিশ্চয়তা দিতে হবে
 জিতবে শুধু তারাই। এর ফলাফল দেশ অচল। প্রতিদিন গুলি-সংঘর্ষে মানুষ মরছে, ছোড়া ককটেলে পুড়ছে, মরছে! চারদিকে রক্ত, আগুনপোড়া মানুষ, ধ্বংসপ্রাপ্ত গাড়ি, রেলের বগি, টেম্পো। যাঁরা মারা যাচ্ছেন, জীবনের তরে পঙ্গু হচ্ছেন তার বেশির ভাগ মানুষ শুধু বেঁচে থাকার তাগিদেই বের হয়েছিলেন রাস্তায়। কতজন পঙ্গু হচ্ছেন তার হিসাবও পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে ক্ষমতার যাঁরা থাকেন বা যাঁরা যেতে চান, তাঁদের কাছে যে মানুষের জীবন তুচ্ছ, দেশের ভবিষ্যৎ অর্থহীন, এগুলো তারই একেকটি চিহ্ন! সরকার মাঝেমধ্যেই বিএনপির নেতাদের গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়ন করে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের হয়তো ধারণা যে এভাবে বিএনপি-জামায়াত যত অবরোধ হরতাল দিতে থাকবে, যত জ্বালাও-পোড়াও করবে, বোমা-গুলি-সংঘর্ষে যত মানুষ মারা যাবে, যত মানুষ কাতরাবে যন্ত্রণায়, যত মানুষ জীবনের অনিশ্চয়তায় ধুঁকবে, ততই বিএনপি জনধিক্কৃত হবে এবং আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বাড়বে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারেরও নিজের সম্পর্কে এই একই ধারণা ছিল, যখন আওয়ামী লীগ-জামায়াত দিনের পর দিন হরতাল অবরোধ দিয়েছিল। ইতিহাসের কী নিষ্ঠুর পুনরাবৃত্তি! সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর থেকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আন্দোলন করছে। বিএনপিসহ চারদলীয় জোট যখন সরকারে ছিল তখন তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল, কিন্তু বিএনপি প্রথম থেকেই এই সরকার যাতে তার আজ্ঞাবহ হয়,
সে জন্য তোড়জোড় শুরু করল এবং ২০০৬ সালে দেশকে ঠেলে দিল গভীর সংকটে। এর মাধ্যমে বিএনপি নিজেই প্রমাণ করেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকাই সমস্যার সমাধান নয়। ক্ষমতায় থাকাকালে হাওয়া ভবন নামের কেন্দ্র খুলে দুর্নীতি আর দখল-লুণ্ঠনের বিস্তার অন্যদিকে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে পতাকা তোলার ব্যবস্থা করে বিএনপি জোট জনধিক্কৃত হয়েছে এবং জনগণের ভোটে বিতাড়িত হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো কেউ কাজ করে জনপ্রিয় হয়ে ক্ষমতায় আসেনি। অকাজ করার কারণে যারা জনধিক্কৃত হয়েছে, তাদের ক্ষমতা থেকে বিতাড়ন করেছে মানুষ। অন্য পক্ষ তখন ক্ষমতায় এসেছে। শেখ হাসিনা খুবই সঠিক, যখন তিনি বলেন যে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিতে পারেন না। ঠিক যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিয়ে নির্বাচন কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তাহলে স্থায়ী সমাধানের দিকে কি শেখ হাসিনা সরকার গেছেন? স্বাধীন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন? স্বাধীন বিচারব্যবস্থা? স্বাধীন প্রশাসন? না।
আসলে দুটো কারণ প্রধান, যার জন্য এই দুই পক্ষের কাছে জীবনমরণ প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রক্ষমতা। এর একটি হলো, রাজনৈতিক ক্ষমতা খুব দ্রুত সম্পদ আহরণ ও কেন্দ্রীভবনের প্রধান মাধ্যম। ওয়ার্ল্ড আলট্রাওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ন্যূনতম প্রায় ২৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিকদের সংখ্যা এখন ৯০। ২০০৯ সালে তাঁদের সংখ্যা ছিল ৫০ জন। বর্তমানে এই ৯০ জনের হাতে সম্পদ আছে এক হাজার ৫০০ কোটি ডলার, বা প্রায় এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। (বণিক বার্তা, ৩ ডিসেম্বর ২০১৩)। জমিসহ দেশের সম্পদ দখল, লুণ্ঠনের পাশাপাশি কমিশন ও দুর্নীতির মাধ্যমে কিছু লোকের মহাধনী হওয়ার এই উন্নয়ন ধরনই ক্ষমতা নিয়ে এই উন্মাদনার প্রধান কারণ। এদের কাছে তাই জনগণের জীবন, হাহাকার আর দেশের সর্বনাশ কোনো আবেদনই সৃষ্টি করে না। আর দ্বিতীয়ত, যারা ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ে, তাদের অপর পক্ষের হিংস্র প্রতিহিংসার মুখোমুখি হতে হয়। দমন-পীড়ন হয়রানি পাঁচ বছরের নিত্যসঙ্গী থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ঐক্য থাকলেও ক্ষমতা থেকে দূরত্ব তাদের বিশাল সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, বরং অনিশ্চয়তায় নিক্ষেপ করে। সংবিধান কী বলে? প্রকৃতপক্ষে আমাদের সংবিধান শুধু যে সাম্প্রদায়িক ও জাতিবিদ্বেষী তা-ই নয়, এখানে গণতন্ত্রেরও কার্যকর হওয়ার বা নড়াচড়ার সুযোগ নেই। বিধান অনুযায়ী সাংসদেরা নিজের কোনো মত ব্যক্ত করতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার স্থান সংসদ কার্যত একটি ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতা। হাত তোলা এমপি দিয়ে গণতান্ত্রিক সংসদ হয় না, হাত তোলা কর্মী দিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হয় না। সুতরাং জমিদারি ব্যবস্থাই অবধারিত পরিণতি। দেশ তাই এখন দেশ নয়, জমিদারি। তাহলে মানুষ এখন কোথায় যাবে? কী সমাধান? তৃতীয় শক্তি হিসেবে সামরিক বাহিনীর কথা মাঝেমধ্যে শোনা যায়। সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। প্রতিবারেই নতুনভাবে আবার একই দুষ্টচক্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি, যারা জমিদারি ব্যবস্থার বাইরে দেশকে নিতে চায়, সে রকম কেউ? না, সে রকম সম্ভাবনা এখন নেই। সে কারণে দুই দলের সমঝোতা ছাড়া এ মুহূর্তের আগ্নেয়গিরির হাত থেকে উদ্ধার নেই। না হলে পতন কোথায় নিয়ে যাবে, আমরা কেউ জানি না। আওয়ামী লীগ যদি একতরফা নির্বাচন নিয়েই এগিয়ে যেতে থাকে, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন, সম্পদ ও কাজের নিরাপত্তাও তাদের নিশ্চিত করতে হবে। পারবে? ঘটনাবলি প্রমাণ, পারবে না। না পারলে তাদের সমঝোতার পথেই আসতে হবে। সেখানে একটা স্বচ্ছ চুক্তিতে আসতে হবে দুই পক্ষকেই, যেখানে ভবিষ্যৎ অচলাবস্থা ঠেকানোর জন্য দুটো বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে থাকতে হবে: ১. সবাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে, তার রায় কার্যকর করতে নিজ নিজ ভূমিকা পালনে বাধ্য থাকবে। ২. যেই জয়লাভ করুক না কেন, কোনো পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক কোনো ব্যবস্থা নেবে না। স্বাধীনতার ৪২ বছরের মাথায় আমরা রক্তাক্ত, দিশাহীন, উদ্ভ্রান্ত। এই দেশ নিয়ে নিজেদের জীবন নিয়ে মানুষ নতুন কোনো উচ্চতার স্বপ্ন দেখবে কি, এখন শুধু বেঁচে থাকার জন্যই সবার আর্তনাদ। এত বছরে রাজনীতি আর অর্থনীতির কী ঘটল যে আমাদের শুনতে হচ্ছে বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী নিয়োগের সম্ভাবনার কথা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নড়াচড়ার কথা, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের চিন্তার কথা। আমাদের উন্নয়নের ধরন আর রাজনীতির মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি ছাড়া এ রকম একটি পরিস্থিতি কীভাবে সৃষ্টি হতে পারে? আমরা জানি, দেশের স্বাধীনতার জন্য এত ত্যাগ আর এত জীবন উৎসর্গ খুব কম দেশের মানুষই করেছে। অথচ সেই স্বাধীনতা লাভের পর তৈরি হয়েছে জনগণের পরাজয়ের দীর্ঘ ইতিহাস। আজকের ঘটনাবলি সেই পরাজয়ের অংশ। আক্রান্ত দেশ, আক্রান্ত জনগণ। বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করে যে জনগোষ্ঠী, তার কাছে বড় পরিবর্তনের তুলনায় আপাত-স্বস্তি পাওয়ার জন্য খড়কুটোর সন্ধানে অস্থির হওয়াই স্বাভাবিক। সেই খড়কুটোও এখন পাওয়া যাচ্ছে না। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে এখন দেশ একটু স্বস্তি পাবে। তবে তাতে জনগণের পরাজিত অবস্থার যে পরিবর্তন হবে তা নয়। দুই জমিদারি গোষ্ঠীর বিষচক্র থেকে মুক্তির চিন্তা ও শক্তির বিকাশ ছাড়া বারবার এই খাদে পতন থেকে যে উদ্ধার নেই, সেটাও তাই আমাদের মনে রাখতে হবে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

খান সারওয়ার মুরশিদ

অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক ছিলেন। তবে তাঁর ছাত্র হওয়ার আগে থেকেই তাঁকে চিনতাম পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের পাক্ষিক সাহিত্যসভায় যোগদানের সূত্রে। তাঁর চলাফেরা ও বাচনভঙ্গির মধ্যে তাঁর সুরুচির পরিচয় ধরা পড়ত, তাঁর বক্তব্যে প্রকাশ পেত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর স্বচ্ছ ও ঋজু ধ্যানধারণা। তখন তিনি নিউ ভ্যালুজ নামে একটি সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ওই পত্রিকায় ঢাকার সমকালীন চিত্রকলা-সম্পর্কিত আলোচনা এ-বিষয়ে আমাদের আগ্রহী করে তুলেছিল। তিনি মুক্তচিন্তার প্রবক্তা ছিলেন—তার থেকে আমরা অনেক সাহস সঞ্চয় করতে পারতাম। তাঁর সমাজমনস্কতা প্রথম থেকেই আমাদের চোখে পড়েছিল। সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক বৈষম্য তাঁকে পীড়িত করত। তিনি আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিলেন—যে-কোনো জায়গায় মানুষের মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে তিনি একাত্মবোধ করতেন। তাঁর স্বভাবধর্মে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্পৃহা—তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র পরিসরে হোক কিংবা আফ্রিকায় জাতিপীড়নের ক্ষেত্রে হোক। এসব থেকে আমরা প্রেরণা লাভ করেছি।
পাকিস্তানে বিদ্যমান আঞ্চলিক বৈষম্য সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। এ-বিষয়ে অনেকখানি ধারণা তিনি পেয়েছিলেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সাহচর্যে। দলীয় রাজনীতি না করলেও এ-কারণে ষাটের দশকে তিনি আওয়ামী লীগের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। তাঁর পিতা আলী আহমদ খান ও তাঁর স্ত্রী নূরজাহান মুরশিদ দুজনেই অবশ্য আওয়ামী লীগ দলীয় এমএলএ ছিলেন। সারওয়ার মুরশিদের মতবিনিময় হতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা অনেকেরই চোখে পড়েছিল। এই সূত্রেই তিনি সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যপদ লাভ করেছিলেন। দেশের স্বাধীনতালাভের পরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ গ্রহণ করেছিলেন। অঁদ্রে মলরোকে যেখানে সংবর্ধনাজ্ঞাপন ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রতিষ্ঠা তাঁর একটি মহৎ কাজ। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে সংকীর্ণ রাজনীতির চাপ মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়-প্রাঙ্গণ ছেড়ে তিনি চলে যান প্রথমে কূটনীতির ক্ষেত্রে, পরে আন্তর্জাতিক আমলাতন্ত্রে। এসব পরিমণ্ডলে যদিও সুনামের সঙ্গে তিনি কাজ করেছিলেন, তবু তা তাঁর নিজস্ব ক্ষেত্র ছিল না। শিক্ষাঙ্গনেই তিনি প্রত্যাবর্তন করেন শেষ পর্যন্ত, তবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে দেশের বিচ্যুতি তাঁকে প্রবলভাবে ক্ষুব্ধ করে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করেন।
স্বৈরাচারের পতনের পরও দেশের অবস্থায় তিনি স্বস্তিবোধ করেননি। তাঁর কাছে গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল বহুত্ব, অসাম্প্রদায়িকতা, পরমতসহিষ্ণুতা। এসবের অভাব তাঁকে পীড়িত করে তুলেছিল। রাজনীতিক্ষেত্রে বড়ো দুই দলের বিরোধ যখন গণতন্ত্রের পক্ষে বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন তা নিরসনের লক্ষ্যে উদেযাগগ্রহণে তিনি অংশীদার ছিলেন। কিন্তু ক্রমশই তিনি উপলব্ধি করেন যে, যোগাযোগের যে-ভাষায় তিনি অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁর চারপাশ থেকে তা হারিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তিনি নিয়েছিলেন। তার ফলে অনেক রাজনীতিবিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তিনি নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেন। স্ত্রীবিয়োগ এবং নিজের শারীরিক অবস্থার কারণেও তাঁর সক্রিয়তা বাধাগ্রস্ত হয়। শেষ দিনগুলো তাঁর কাটে প্রায় গৃহবন্দির মতো। এক বছর হয় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এখন রয়ে গেছে তাঁর অমলিন স্মৃতি এবং উজ্জ্বল রচনা। তিনি খুব বেশি লেখেননি। যা লিখেছেন তার সবই জ্ঞানের আভায়, উপলব্ধির গভীরতায়, বুদ্ধির প্রাখর্যে চিহ্নিত। এসবের মধ্য দিয়েই হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁকে চিনবে। তবে মানুষটি যে আরো বড়ো ছিলেন, তা বুঝতে হলে তাঁর সমসাময়িকদের সাক্ষ্য মানতে হবে।
আনিসুজ্জামান: লেখক ও শিক্ষাবিদ। ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নেত্রীরা, মানুষ পোড়ানো বন্ধ করুন

মানুষকে লাকড়ির মতো পুড়িয়ে নিজেদের পেট ভরানোর জন্য ভাত রান্না করার এই উৎকট ও নির্মম হত্যাযজ্ঞে নেমেছেন যে নেত্রী-নেতারা এবং যাঁরা এটা বন্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছেন না, তাঁরা কেউই বোধ হয় মানুষ নন। এই মুহূর্তে কোনো চিকিৎসক তাঁদের দেহ ব্যবচ্ছেদ করার সুযোগ পেলে দেখতে পেতেন, সেসব শরীরে হূদয় নেই আর মস্তিষ্ক বহুকাল ধরে মৃত। তাঁদের চালাচ্ছে স্বার্থ, ক্ষমতার লোভ আর নির্বোধ ব্যক্তিগত জেদ ও আক্রোশ। ভূতের গল্পে সমজাতীয় জীবের দেখা মেলে। তাদের তিন অক্ষরের নামটা বড় খারাপ। গত ২৮ নভেম্বর অবরোধে শাহবাগে বাসের আগুনে পুড়ে গিয়েছিল সদ্য কৈশোর পার হওয়া ছেলেটি। কয়েক দিন পর ছেলেটি মারা গেলে তার মায়ের যে আহাজারি, সেটার রেকর্ড করা অংশ শুনেছি। কথাগুলো মাথার মধ্যে বেজে চলেছে। সান্ত্বনার অতীত দুঃখে তিনি নেতাদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখেছিলেন, মায়েদের বুক কেন তাঁরা খালি করছেন? আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, দুই নেত্রীর কাছে এটুকুই তাঁর প্রার্থনা ছিল। তাঁর অসহনীয় বিলাপে বারবার এ কথাও এসেছিল যে, এমন নেতাদের হত্যা না করলে দেশে শান্তি আসবে না। কী অসহনীয় শোক তাঁর মুখ দিয়ে এ কথা বের করিয়েছিল, তা কল্পনা করতেও ভয় করে। এটা ঠিক যে গণতন্ত্রে মানুষই সবচেয়ে বড় ও পবিত্র পুঁজি। তবে সে পুঁজি মানুষের ভোট ও সমর্থন, মানুষের প্রাণ নয়। কিন্তু আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রীরা ভোট অর্জন নয়, দখল করার লক্ষ্যে মানুষের জীবনকে পুঁজি বানিয়ে নির্মমভাবে অকাতরে খরচ করছেন।
দেউলিয়া হওয়ার ভয় করবেন, সেটুকু বুদ্ধিও তাঁদের আর নেই। মানুষকে ধনে-প্রাণে মেরে নিজেদের ফায়দা হাসিলের বিকৃত পথটাই শুধু তাঁরা দেখতে পান। এ হত্যাযজ্ঞ সুতরাং তাঁদের সুপরিকল্পিত খেলার দৌড়। ক্ষমতা ধরে রাখা বা ক্ষমতায় যাওয়া চাই? মানুষকে বলি দাও, বিশেষ করে গরিব মানুষকে। সরকারকে পথে আসতে বাধ্য করতে হবে? মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বাঁচাতে হবে? মানুষকে মেরে-পুড়িয়ে দেশজুড়ে পৈশাচিক অরাজকতার চাপ সৃষ্টি করো; মানুষের জীবন অবরুদ্ধ-অচল করে দাও। অথবা, বিরোধী দলকে সমূলে বিনাশ করতে হবে? তাদের ভোটের ত্রিসীমানার বাইরে ভাগিয়ে দিতে হবে? তাদের হত্যাকারী ও গণশত্রু প্রমাণের স্বার্থে অচলাবস্থা টিকিয়ে রাখো; সবটুকু সুযোগ নিংড়ে-কচলে ব্যবহার করো; চাই কি হত্যাযজ্ঞে গোপনে হাত লাগাও। আবার, কে বলতে পারে যে অন্য কেউ এই সুযোগে মানুষ মেরে নিজেদের পথ সুগম করার উপায় খুঁজছে কি না? তাবৎ মোড়কের হর্তাকর্তারা মানুষেরই কল্যাণের নামে নিশ্চিন্তে মানুষের রক্তে হাত ডোবাতে পারেন। সম্মিলিত স্বার্থে এসব ঘটনার সত্যের পর্দা উঠতে দেওয়া হবে না, পানি ঘোলা করে রাখা হবে। কিন্তু যাঁরা মরছেন, যাঁরা ভুগছেন, তাঁরা যে মানুষ! মানুষ মারার এই রাজনীতিতে যাঁরাই প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে শামিল রয়েছেন, প্রতিটি হত্যা আর ক্ষতির জন্য তাঁরা অন্তত নিজেদের বিবেক আর সর্বসাধারণের কাছে দায়ী থাকবেন। যত দিন বাঁচবেন, তত দিন। বিরোধী জোটের ডাকা গত অবরোধের আগের অবরোধে বাসে লাগানো আগুনে দগ্ধ গীতা সেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিছানায় শুয়ে আগুনে পোড়াদের দেখতে আসা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘আমরা আপনাদের তৈরি করছি, আপনারা আমাদের তৈরি করেন নাই।’ বিরোধীদলীয় নেত্রী বোধ হয় এঁদের দেখতে যাওয়ার মতো সাহস পাচ্ছেন না। কিন্তু সামনে পেলে গীতা সেন তাঁকেও নিশ্চয় একই কথা বলতেন। মানুষকে পুড়িয়ে মারা যায়, তার বেঁচে থাকার ন্যূনতম অবলম্বন তছনছ করে দেওয়া যায়। কিন্তু মানুষের মনে গুমরানো জবাবদিহি-চাওয়া প্রশ্নগুলো হত্যা করা যায় না।
২৭ নভেম্বর বার্ন ইউনিটের বিছানায় পিঠজোড়া পোড়া ঘা নিয়ে চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে থাকা ১৩ বছরের শিমুল গোঙানির স্বরে আমাকে বলেছিল, ‘আমি কী করছি আপা? আমারে পোড়া দিয়া দিছে!’ রিকশাচালক আমানুল্লাহ্ সরদারের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এই ছেলেটি লেগুনায় হেলপারি করার সময় হরতালের আগুনে পুড়ে যায়। হরতাল-অবরোধে জীবিকার একান্ত প্রয়োজনে প্রাণ হাতে করে যাঁরা পথেঘাটে বের হন, তাঁদের বড় অংশটিই খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষ। কাজ না করে তাঁদের উপায় নেই। নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব অস্বীকার করবেন কোন মুখে? একইভাবে মানুষের ভোটে হওয়া বিরোধীদলীয় নেত্রীও এই দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন না। ক্ষতিপূরণের দায়িত্বও উভয়েরই থাকে। প্রধানমন্ত্রীর নিজের শোয়া-বসা, যাওয়া-আসা নিরাপদ করাটা রাষ্ট্রীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৫ নম্বর সড়কের যে বাড়িটিতে জননেত্রী শেখ হাসিনা থাকেন না, দেখলাম সেটিরও সুরক্ষার জন্য কোনো এক বাহিনীর সাঁজোয়া যান মোতায়েন রয়েছে। বিরোধী দলের নেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়া আপসহীন আন্দোলনের পরের কিস্তিতে রাস্তায় নামবেন বলে নিজের কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তার খোঁজখবর নিচ্ছেন। সাবেক স্বৈরশাসক লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ব্যক্তিগত সার্কাসমঞ্চ থেকে দর-কষাকষির ডিগবাজির মধ্যেই ভীষণ হুমকি দিয়ে বলেছেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করলে চার-চারটি পিস্তলের গুলি ছুড়ে তিনি আত্মহত্যা করবেন। চমৎকার এসব খবরের প্রায় সবই ৫ ডিসেম্বরের কাগজে পড়া। নিজের নির্বিঘ্নতা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনটা প্রত্যেক নেত্রী-নেতাই বোঝেন; এমনকি নিজের প্রাণ নিজে নেওয়ার মতো ঠাট্টার বিলাসিতাও তাঁদের পোষায়। চমৎকারের ওপর চমৎকারি করা আরও খবর আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘সর্বদলীয়’ সরকারের মন্ত্রীদের এক বৈঠক শেষে ত্রাণমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যারপরনাই উন্নতি হয়েছে! গীতা সেন বলেছিলেন, ‘আমরা অসুস্থ সরকার চাই না।’ ধারণা করি, তিনি নির্দিষ্ট কোনো একটি সরকারকে বোঝাননি। কেননা, তিনিই বলেছিলেন, ‘খালেদারেও চিনি না, হাসিনার কাছেও যাই না।’ সরল মানুষের সোজাসাপ্টা কথা—কোনো ইঙ্গিত খোঁজার কিছু নেই। রাজার নীতি রাজনীতি আমিও বুঝি না। তবে এটুকু বুঝি যে, আমরা আম-জাম-কচুঘেঁচু জনতা নিজেরা নিজেদের শাসককে নির্বাচন করেই বাঁচতে চাই। সে নির্বাচন আত্মঘাতী ভুল বলে দেখা গেলে আবার সঠিক নির্বাচনের চেষ্টা করার জন্য খোলা সুযোগ, সবার মধ্য থেকে বেছে নেওয়ার অবাধ সুযোগ চাই। অরাজনৈতিক ‘তৃতীয় শক্তি’র জুজুর ভয়ে থমকে না থেকে নিজেদের সর্বৈব ভুল শোধরানোর পথ খুঁজতে চাই; পথ তৈরিতে অংশ নিতে চাই।
আর সেটা করার জন্য আমরা বেঁচে থাকতে চাই। আবার অবরোধ শুরু হয়েছে। সরকার একতরফা নির্বাচনে যাবেই বলে ভয় দেখাচ্ছে। আবার, অন্য কিছু হতে পারে বলে জল্পনা-কল্পনাও শোনা যাচ্ছে! বুকটা হিম হয়ে যায়। আরও কত মানুষ কতভাবে মরবে? ২০০৪ সালে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ডাকা এক হরতালের দিনে একটি দোতলা বাসে আগুন দিয়ে ১১ জনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। তখন আমরা হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলাম যে এমনও ঘটতে পারে! কিন্তু খারাপ দৃষ্টান্ত একবার পার পেয়ে গেলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখন বিরোধী দলের সহিংসতা ও অরাজকতা-নির্ভর আন্দোলনে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারাটা গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পন্থা হয়ে উঠতে চলেছে। মহোদয়া ও মহোদয়েরা দয়া করে মানুষ মারার এই রাজনীতি, মানুষের লাশের ওপর ভর করা এই অমানবিক রাজনীতি বন্ধ করুন। এভাবে কারও জিৎ হয় না। এমন ‘জিৎ’ অর্থহীন। টেকেও না। এভাবে সবাই মরে, সবাই হারে। নিজেদেরও ধিক্কার দিই। আমরা কেমন মানুষ যে, এই রাজনীতি চলতে দিচ্ছি? কেন ক্রোধে, দুঃখে ফেটে পড়ে গণতন্ত্রকে জীবন বাঁচানোর পথে আসতে বাধ্য করছি না?
কুর্‌রাতুল-আইন-তাহিমনা: সাংবাদিক।

তার জীবন থেকে শিক্ষা নিতে হবে by ফকির আলম গীর

অবশেষে সব উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ৫ ডিসেম্বর রাতে বেজে ওঠে মহামানবের মহাবিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি। বিমূঢ় হৃদয়ে জলভরা চোখে বিশ্ববাসীর কান পেতে থাকার অবসান হল। থেমে গেল সব কোলাহল। এই সুন্দর পৃথিবী থেকে মাদিবার চলে যাওয়া এক নির্মম পরিসমাপ্তি। এ নির্মমতাই স্তব্ধ করে দিয়েছে গোটা আফ্রিকাকে, একই সঙ্গে তাবৎ পৃথিবীর মানুষকে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার আঁধারে নিমজ্জিত আফ্রিকা এখন শোকের সাগর। গোটা বিশ্ব এবং বিশ্বনেতারা এখন মহামানবের দেশের শোকার্ত মানুষের সঙ্গে একাত্ম। সিডনি থেকে হাভানার কোটি কোটি মানুষ এখন এই মহামানবের বিদায়ে শোকার্ত-বেদনার্ত। তার একজন ভক্ত অনুরাগী হিসেবে আমিও শোকার্ত বেদনায় ভারাক্রান্ত। তবে আমিও এই কালজয়ী মহামানবের মহাবিদায়ের অপেক্ষায় ছিলাম। তৈরি ছিলাম তার বিষাদময় মৃত্যু যন্ত্রণার চেয়ে চলে যাওয়ার জন্য। আফ্রিকার মানুষের সঙ্গে আমার প্রার্থনা ছিল, ঈশ্বর তুমি তাকে শান্তিতে ঘুমাতে দাও। উল্লেখ্য, আমি তার জন্মদিনে একটি গান করেছিলাম- ‘কালো কালো মানুষের দেশে ওই কালো মাটিতে রক্তের স্রোতের শামিল, নেলসন ম্যান্ডেলা তুমি অমর কবিতার অন্ত্যমিল, শুভ হোক তোমার জন্মদিন, মৃত্যুর দরজায় করাঘাত করে আসে যুদ্ধ, বিপ্লব আসবেই আফ্রিকা হাসবেই অগণিত কালো হাত পৃথিবীকে করবেই শুদ্ধ, মেঘের আকাশ হবে পতাকায় সুশোভিত নীল, নেলসন ম্যান্ডেলা তুমি অমর কবিতার অন্ত্যমিল।’
তার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর থেকেই বেশি করে মনে পড়ছে ১৯৯৭ সালে তার সঙ্গে ঢাকায় সাক্ষাতের স্মৃতি, তাকে গানটি শোনানোর স্মৃতি। তার সান্নিধ্যে ছবি তোলার স্মৃতি। আজ তিনি নেই, তবুও জেগে আছে তার নবজাগ্রত প্রাণ। বিশ্বমানচিত্রের যেখানে, যে প্রান্তে দারিদ্র্য, দুঃশাসন আর অন্যায়-অবিচার, সেখানেই নেলসন ম্যান্ডেলা এক সজাগ উচ্চারণ। যিনি জীবনের একটি বড় অংশ কারারুদ্ধ থাকায় পৃথিবীর খোলা আকাশ-বাতাস থেকে বঞ্চিত থেকেছেন। জীবনের শেষ দিকেও গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ম্যান্ডেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পৃথিবীর মানুষের প্রার্থনা ছিল মুক্তজীবনে, খোলা আকাশে-বাতাসে এই মহানায়ক আরও বহুদিন বেঁচে থাকুক। কিন্তু তা আর হল না, অবশেষে তিনি বার্ধক্য ও মরণব্যাধির কাছে হেরে গেলেন। তার মৃত্যুতে পৃথিবী হারালো একজন শ্রেষ্ঠ মানুষকে। আফ্রিকা হারালো তার পিতাকে, আর অধিকার আদায়ের সংগ্রামী মানুষ হারালো তার আপনজনকে।
আমার মনে হয়, পৃথিবীতে নেলসন ম্যান্ডেলার মতো মানুষের জন্ম বিরল ঘটনা। এমন মানুষের জন্ম হয় কালেভদ্রে, হাজার বছরে একবার। আজ সেই মানুষটির বিদায় বেলায় তার স্মৃতি উদ্ভাসিত হোক বিশ্বজুড়ে অগণিত মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়। তার বিদায়ে শ্রদ্ধাবনত বিশ্ব। বাংলাদেশ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করছে। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন ও আদর্শ থেকে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণের জন্য আজ বিশ্ববাসীকে শপথ নিতে হবে। তিনি নিজেই বলেছিলেন, আমি দেবতা হতে চাইনি, একজন সাদাসিধে খননকারী মজুর হতে পারলেই আমার চলত।
নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও বন্দিদশা থেকে যখন মুক্তি পেলেন, তখন মানুষ ভেবেছিলেন, ম্যান্ডেলা প্রতিশোধপরায়ণ এক নেতা হবেন। কিন্তু তিনি উল্টো সম্প্রীতির পথে হাঁটলেন। এটা যে কত বড় একটা সিদ্ধান্ত ছিল তা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। কেবল শোক পালন করলেই তার প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে না। আজ আমাদের মতো একটি অসহিষ্ণু, সহিংস দেশে তার জীবন থেকে বেশি করে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। ম্যান্ডেলা তার একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আসলে আপনি মানুষের সঙ্গে যেমন আচরণ করবেন, তারা তেমন সাড়া দেবে। আপনি যদি সহিংসতাকে ভিত্তি করে তাদের কাছে যান, তাহলে তারা সেভাবেই সাড়া দেবে। কিন্তু আপনি যদি বলেন, আমরা শান্তি চাই, স্থিতি চাই সে ক্ষেত্রে সে রকম সাড়াই আসবে।
যা হোক, নেলসন ম্যান্ডেলার গুণাবলি লিখে শেষ করা যাবে না। তিনি ছিলেন বিশ্বের বাতিঘর। তার বিদায়ে বিশ্বের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে মানবতা, শান্তি, সম্প্রীতি আর মুক্তির উদ্বেলিত মিছিলে তিনি ছিলেন অগ্রসেনানী। ম্যান্ডেলার মহত্ত্ব কোন ক্ষেত্রে বেশি- বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামের জন্য নাকি তার ক্ষমাশীলতার কারণে তা নিরূপণ করা কঠিন। অন্যায়-অবিচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলে ২৭ বছর কারারুদ্ধ থাকার নজির আর কারও নেই। যারা তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, যারা তাকে বন্দি করে, মুক্তির পর তাদের ক্ষমা করে দেয়ার মতো ঘটনাও ইতিহাসে বিরল। ম্যান্ডেলার মহানুভবতা ও বিচক্ষণতার কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকায় শান্তিপূর্ণভাবে অবসান ঘটে বর্ণবাদী শাসনের। যে শ্বেতাঙ্গরা শতাব্দীর পর শতাব্দী শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়েছে কালোদের ওপর, তাদের সঙ্গে সমঝোতা বা ঐক্য গড়ে তোলা আর কারও পক্ষেই হয়তো সম্ভব ছিল না।
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যান্ডেলা ছিলেন দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার শেষ রক্ষাকবচ, সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের সারা দুনিয়ার অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে সংগ্রামরত মানুষকে তার থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
ফকির আলমগীর : গণসঙ্গীত শিল্পী

প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও সমন্বয়ের রাজনীতির মহানায়ক by পল স্টবার

‘বিদায়, জাতির বর্শা’। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন, সেই সব মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করার সময় দক্ষিণ আফ্রিকাবাসী এই গানটি গেয়ে থাকে। নেলসন ম্যান্ডেলাও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। যদিও পরবর্তী বছরগুলোয় তাকে একজন শান্তি প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনামলে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠী প্রচারণাগুলোয় প্রায় প্রতিটি বর্ণবাদী আইনেরই বিরোধিতা করা হতো। এসব আইনের আওতায় ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা থেকে শুরু করে সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ পর্যন্ত। তবে মূল দাবিটি ছিল ম্যান্ডেলার মুক্তি- এমনকি যারা ম্যান্ডেলার দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) সমর্থক নন, তারাও এ দাবি তুলতেন। ম্যান্ডেলা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীর ঐক্যের শক্তি। ম্যান্ডেলা কারারুদ্ধ থাকাকালে তৎকালীন বর্ণবাদী সরকার জনগণের দাবি বারবার নস্যাৎ করে দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। তারা জনগণকে বিভক্ত করে রাখার চেষ্টায় অনেক সময় সফলও হয়েছে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার জন্য মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি ম্যান্ডেলা একবার আদালতকে বলেছিলেন : ‘আমি লড়াই করেছি শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এবং আমি লড়াই করেছি কৃষ্ণাঙ্গদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে। আমি একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের আদর্শ লালন করি, যেখানে সব মানুষ সম্প্রীতি ও সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বসবাস করবে। এটি এমন এক আদর্শ যা আমি অর্জন করা এবং সেখানে বসবাস করার প্রত্যাশা করি। এ আদর্শ বাস্তবায়নে প্রয়োজনে আমি মৃত্যুর জন্যও প্রস্তুত আছি।’
এ কথাগুলোই পরবর্তী ৩০ বছর তরুণ দক্ষিণ আফ্রিকানদের কাছে ছিল করণীয় নির্দেশনা।
ম্যান্ডেলার ছবি প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকায় তরুণ ম্যান্ডেলার ছায়ামূর্তিটি তাদের বর্ণবাদের বিরোধিতায় সাহস যুগিয়েছে এবং এএনসি ও এর সশস্ত্র শাখা উমখন্তোর প্রতি জনসমর্থন সংগঠিত করেছে। ‘ম্যান্ডেলা চান সৈনিক। তিনি আমাদের নেতা, আমরাই তার সৈনিক’- এই স্লোগান তুলে তরুণরা দেশব্যাপী পুলিশকে প্রতিরোধ করেছে। প্রায়ই এসব প্রতিবাদ, বিক্ষোভ শেষ হয়েছে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, গুলিবর্ষণ, এমনকি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তবে এসব দমনপীড়ন জনগণকে পরবর্তী প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন থেকে খুব কমই বিরত রাখতে পেরেছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কাছে রবেন দ্বীপে বন্দি তাদের নেতার গল্প শুনিয়েছেন। ম্যান্ডেলা তার ২৭ বছরের কারাজীবনের ১৮টি বছর কাটিয়েছেন ওই দ্বীপেই।
গোটা আশির দশকে যখন একজন নেতা হিসেবে ম্যান্ডেলার ভাবমূর্তি গড়ে উঠছিল, তখন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে সরকারের পতন ঘটে।
বন্দি হওয়ার আগে ম্যান্ডেলা বিচক্ষণতার সঙ্গে বছরের পর বছর উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে এএনসিকে চালিত করেছেন। হত্যা, গুপ্তহত্যা, ক্ষোভ আর গৃহযুদ্ধের ভয় ছিল। ছিল শুভেচ্ছা, বিচারবুদ্ধি, রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও আপসের মনোবৃত্তিও। প্রায়ই ম্যান্ডেলাকে সবচেয়ে বড় যে সমস্যায় পড়তে হতো তা হল, কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের মনে আলোচনার মাধ্যমে বর্ণবাদ অবসানের প্রতি বিশ্বাস ধরে রাখা। তার মুক্তি ভবিষ্যতের ব্যাপারে জনগণের মনে বড় আশাবাদ জাগিয়ে তোলে। তবে গণতন্ত্রে উত্তরণে অন্তর্বর্তীকালীন সময়টি রাজনৈতিক সহিংসতা ও জনগণের ক্ষোভের কারণে নাজুক হয়ে ওঠায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হুমকির সম্মুখীন হয়।
তরুণ দক্ষিণ আফ্রিকানরা, যারা বর্ণবাদী সরকারের পতনে বড় ভূমিকা পালন করেছিল, তারা চেয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা নেলসন ম্যান্ডেলাকে। কিন্তু ম্যান্ডেলা পরিণত হন একজন জাতীয় নেতা ও রাষ্ট্রনায়কে। তিনি তার প্রবল রাজনৈতিক ও নৈতিক কর্তৃত্ব দ্বারা সব পক্ষকে একটি বেদনাদায়ক অথচ অপরিহার্য সমঝোতায় রাজি করাতে সক্ষম হন।
‘মাদিবা জাদু’ প্রায় প্রত্যেকের মন জয় করে নেয়। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের মন জয় করে নেন। কিছু মতানৈক্য সত্ত্বেও এ কাজে সঙ্গে পান কৃষ্ণাঙ্গদের।
বহু দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীর কাছে ম্যান্ডেলার মুক্তি ছিল তাদের স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ। যে দিনটির জন্য তারা দীর্ঘকাল অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু এক সময় তাদের সেই আশা দুরাশায় পরিণত হয়েছিল। অবশেষে তাদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়ায় তরুণ-বৃদ্ধ সবাই আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠেছিল। ম্যান্ডেলা মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত অনেকের কাছেই জীবন হয়ে উঠেছিল কষ্টদায়ক। কঠিন হয়ে পড়েছিল ক্রমবর্ধমান তিক্ততাপূর্ণ রাজনৈতিক সংগ্রাম এড়িয়ে চলা। কিন্তু তার মুক্তির পর বর্ণবাদের অবসান এবং ‘সবার জন্য একটি উন্নততর জীবন’ গড়ে তোলার সুযোগ উপস্থিত হল জনগণের সামনে। ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। দক্ষিণ আফ্রিকাবাসী দুরু দুরু বুকে তাকিয়ে ছিল- কিভাবে শ্বেতাঙ্গদের ভীতির সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রত্যাশার সমন্বয় হবে। কিন্তু ম্যান্ডেলা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে হাত দিলেন। ম্যান্ডেলা ১৯৯৫ সালের রাগবি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকান দল স্প্রিংবকের পেছনে জাতিকে সমবেত করলেন। এই টুর্নামেন্ট এবং স্প্রিংবকের বিজয় দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীকে একত্রিত করল এবং তাদের দেখিয়ে দিল, একটি জাতি হওয়ার জন্য তাদের অনেক কিছুতেই মিল রয়েছে।
এক মেয়াদ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ম্যান্ডেলা দলীয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। দক্ষিণ আফ্রিকা কোনোক্রমেই আদর্শগতভাবে ‘রংধনু রাষ্ট্র’ নয়- যে নামে তাকে অভিহিত করা হয়ে থাকে। তবে ম্যান্ডেলা জানতেন, দেশটি একজন মাত্র ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে না- তা তিনি দেশে ও বিশ্বে যত বড় নেতা হিসেবেই বিবেচিত হোন না কেন।
গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তরিত
পল স্টবার : প্রখ্যাত দক্ষিণ আফ্রিকান সাংবাদিক

নির্দেশনা নাকি আইনের বিধান কোনটি বিবেচ্য? by ইকতেদার আহমেদ

চলাফেরার স্বাধীনতা সংবিধান স্বীকৃত একটি অন্যতম মৌলিক অধিকার। এর দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে একজন নাগরিকের দেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতাসহ রাষ্ট্রের যে কোনো স্থানে বসবাস ও বসতি স্থাপন এবং দেশত্যাগ ও দেশে পুনঃপ্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একজন ব্যক্তি যে কোনো ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হলে অপরাধের প্রকারভেদে তার গ্রেফতারের কারণ ঘটতে পারে। যখন কোনো ব্যক্তি অপরাধের দায়ে গ্রেফতার হয়, তখন তার সংবিধান স্বীকৃত অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতা খর্ব হয়। যে কোনো ফৌজদারি অপরাধ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তাই যে কোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধীকে আইনের হাতে সোপর্দ করে তার বিচারের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। অপরাধ বলতে সাধারণ অর্থে আমরা বুঝি এমন কোনো কাজ বা ত্র“টি, যা আপাত বলবৎ কোনো আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য। অপরাধের বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে, তবে জামিনের ক্ষেত্রে অপরাধকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর একটি হল জামিনযোগ্য এবং অপরটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। জামিনযোগ্য অপরাধ হল এমন অপরাধ, যে অপরাধকে ফৌজদারি কার্যবিধির দ্বিতীয় তফসিলে অথবা আপাত বলবৎ কোনো আইনে জামিনযোগ্য দেখানো হয়েছে এবং এর আওতার বাইরের অপর সব অপরাধ অজামিনযোগ্য। একটি অপরাধ জামিনযোগ্য বা জামিন অযোগ্য যাই হোক না কেন, যুক্তিসঙ্গত কারণ সাপেক্ষে একজন পুলিশ কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট বা জজ স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে জামিন মঞ্জুর বা না-মঞ্জুর করতে পারেন। জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধে জামিন প্রদানের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচ্য, তা সবিস্তারে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নং ৪৯৬, ৪৯৭ ও ৪৯৮-এ উল্লেখ রয়েছে। এ তিনটি ধারার যৌথ অধ্যয়নে যে ধারণা পাওয়া যায় তা হল- জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন লাভ করতে চাইলে থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা অথবা আদালত আইনজীবী ও স্থানীয় জামিনদার থেকে জামিননামা ব্যতিরেকে অপরাধীর নিজ প্রদত্ত জামিননামায় তাকে জামিনে মুক্ত করতে পারেন। তবে থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা অপরাধীর নিজ জিম্মায় তাকে জামিন দিলে অপরাধীকে নির্ধারিত দিনে স্ব-উদ্যোগে আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশনা প্রদানের আবশ্যকতা রয়েছে। আমাদের দেশে কদাচিৎ পুলিশ এ ক্ষমতাটি প্রয়োগ করে থাকে, যদিও সম্মানিত ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আইন দ্বারা অনুমোদিত এ সুযোগটি প্রদান করে পুলিশ তাদের হয়রানি বা বিড়ম্বনা লাঘব করতে পারে। জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো আদালত জামিন না-মঞ্জুর করতে চাইলে সেক্ষেত্রে আদালতকে অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত কারণ প্রদর্শন করতে হবে- আইনগতভাবে জামিন লাভের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কী কারণে তার জামিন না-মঞ্জুর করা হল।
জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন সাজার অপরাধের সঙ্গে অপরাধীর সম্পৃক্ততা বিষয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবে বিশ্বাস করার কারণ না থাকলে আদালত তাকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন। তাছাড়া অপরাধীর বয়স ১৬ বছরের কম হলে অথবা অপরাধী একজন মহিলা হলে অথবা অপরাধী অসুস্থ বা অক্ষম হলে অপরাধটি অজামিনযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অপরাধীকে জামিনে মুক্তি দেয়া আইন দ্বারা অনুমোদিত।
জামিন অযোগ্য অপরাধ সংক্রান্ত মামলার তদন্ত বা বিচার চলাকালীন পুলিশ কর্মকর্তা বা আদালতের কাছে যদি যুক্তিসঙ্গতভাবে বিশ্বাস করার কারণের উদ্ভব ঘটে যে, একজন অপরাধী জামিন অযোগ্য অপরাধ করেনি কিন্তু তার অপরাধ বিষয়ে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে, সেক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথবা আদালত স্বীয় স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতায় অপরাধীকে নিজ জিম্মায় যথাযথ কারণ উল্লেখপূর্বক জামিনে মুক্ত করতে পারেন। জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপনান্তে এবং রায় প্রদানের আগে আদালত যদি যুক্তিসঙ্গতভাবে বিশ্বাস করার সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে অপরাধী কোনো অপরাধেই দোষী নয়, সেক্ষেত্রে আদালত তাকে আটকাবস্থা থেকে নিজ জিম্মায় মুক্তি দিয়ে রায় প্রদানের নির্ধারিত তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন। হাইকোর্ট ডিভিশন ও দায়রা আদালত এবং অন্য যে কোনো আদালত একজন অপরাধীকে জামিনে মুক্ত করার পর জামিনের অপব্যবহারের কারণে পুনঃগ্রেফতারপূর্বক কারাগারে প্রেরণের নির্দেশনা দিতে পারেন।
জামিন আইন দ্বারা একজন অপরাধীকে প্রদত্ত বিশেষ অধিকার। একজন অপরাধী জামিনে মুক্ত হতে চাইলে অপরাধটি জামিনযোগ্য অথবা অজামিনযোগ্য যাই হোক না কেন, পুলিশ কর্মকর্তা বা আদালত তাকে নিজ জিম্মা অথবা আইনজীবীর জিম্মায় অথবা স্থানীয় জামিনদারের জিম্মায় অথবা আইনজীবী ও স্থানীয় জামিনদার উভয়ের জিম্মায় অর্থযুক্ত অথবা অর্থ বিমুক্ত জামিননামায় মুক্তি দিতে পারেন। তবে সচরাচর আমাদের দেশের বিভিন্ন আদালতে জামিনের ক্ষেত্রে যে বিধানটি পরিলক্ষিত হয় তা হল- অপরাধটি জামিনযোগ্য অথবা জামিন অযোগ্য যাই হোক না কেন, আদালত অপরাধীকে একজন আইনজীবী ও একজন স্থানীয় জামিনদার উভয়ের জিম্মায় অর্থযুক্ত জামিননামায় মুক্তি দিয়ে থাকেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬ ও ৪৯৭ অবলোকনে যদিও ধারণা পাওয়া যায়, কতিপয় ক্ষেত্রে অপরাধ জামিনযোগ্য অথবা জামিন অযোগ্য যাই হোক না কেন, থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা অপরাধীকে নির্ধারিত দিন আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশনা প্রদান করে অপরাধীর নিজ জিম্মায় জামিনে মুক্ত করতে পারেন, কিন্তু সংবিধানের ৩৩(২) এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারার বিধান অনুযায়ী গ্রেফতারের স্থান থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আনয়নের সময় ব্যতিরেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে হাজির করার বাধ্যবাধকতা থাকায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ব্যতিরেকে আটককৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তা কর্তৃক তাকে জামিনে মুক্তি দেয়ার সুযোগ আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধির দ্বিতীয় তফসিলের বিধান অনুযায়ী যেসব অপরাধের ক্ষেত্রে গ্রেফতারি পরোয়ানা ব্যতিরেকে আটকের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত- সেই তফসিলে ওই সব অপরাধের অধিকাংশকে জামিন অযোগ্য বলা হয়েছে। জামিন অযোগ্য অধিকাংশ অপরাধ আমলযোগ্য। আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে একজন পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতারি পরোয়ানা ব্যতিরেকে অপরাধীকে আটকের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সুতরাং আমাদের প্রধান দণ্ড আইন দণ্ডবিধি ছাড়া অপর কোনো দণ্ড আইনে যদি কোনো অপরাধকে আমলযোগ্য বলা হয়, সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে, পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতারি পরোয়ানা ব্যতিরেকে অপরাধীকে গ্রেফতারের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত।
অধিকাংশ দণ্ড আইনে তা সাধারণ বা বিশেষ যে আইনই হোক না কেন, ওই আইনের অধীন কৃত অপরাধ জামিনযোগ্য অথবা জামিন অযোগ্য কিনা তা প্রতিটি অপরাধের বিপরীতে অথবা সব অপরাধের ক্ষেত্রে এককভাবে উল্লেখ থাকে। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি এমন কোনো আইন পাওয়া যায়, যে আইন ওই আইনের অধীন কৃত অপরাধ জামিনযোগ্য অথবা জামিন অযোগ্য এ বিষয়ে নিশ্চুপ, সেক্ষেত্রে কিভাবে নির্ধারিত হবে অপরাধটি জামিনযোগ্য অথবা জামিন অযোগ্য?
এ প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নং ২৯(২) এবং অন্য আইনের অধীন অপরাধ সংশ্লেষে দ্বিতীয় তফসিলের ৮নং কলাম অধ্যয়ন আবশ্যক। ৮নং কলাম অধ্যয়ন পরবর্তী দেখা যায়, অপরাধ সংশ্লেষে সাজার পরিমাণ কতটুকু তার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় অপরাধটি জামিনযোগ্য অথবা জামিন অযোগ্য, আমলযোগ্য অথবা আমল অযোগ্য এবং কোন আদালত দ্বারা বিচার্য।
আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধিতে মামলায় বিজড়িতকরণের আশংকায় অগ্রিম জামিনের কোনো বিধান নেই। একদা ১৯৭৮ সালের অধ্যাদেশ নং ৪৯-এর মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধিতে ৪৯৭ক ধারা সংযোজন করে আগাম জামিনের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছিল। সে বিধানটি ৯নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৮২ সালে বাতিল করা হয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের ফৌজদারি কার্যবিধিতে এ বিধানটি বিদ্যমান আছে। ফৌজদারি কার্যবিধি থেকে আগাম জামিন সংক্রান্ত বিধানের অবলুপ্তির পরও দেখা যায়, উচ্চ আদালতের একটি বিভাগের দু-একজন বিচারক থানায় এজাহার দাখিলপূর্বক নিয়মিত মামলা রুজু সত্ত্বেও মামলায় বিজড়িতকরণের আশংকার অনুপস্থিতিতে আগাম জামিন দেয়ার প্রয়াস নিচ্ছেন অথবা নিু আদালতকে জামিনের বিষয় বিবেচনার নির্দেশনা দিচ্ছেন। এজাহার দায়ের পরবর্তী আগাম জামিনের সুযোগ অনুপস্থিত এ মর্মে উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত রয়েছে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তটি যখন উপেক্ষিত হয়, তা অনেক সময় হতবাক ও বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের দেশে ২০০১ পরবর্তী দেখা গেছে, আমাদের বড় দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের এজাহারে নাম না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থে হয়রানিমূলকভাবে মামলায় বিজড়িত করে নিু আদালত কর্তৃক জামিন না-মঞ্জুর করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে যদিও দেখা যায়, উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভে সফলতা পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দেখা যায়, তাদের অহেতুক এক মাস থেকে এক বছর অবধি কারারুদ্ধ থাকতে হচ্ছে। জামিন বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা উভয় আদালত কর্তৃক বিচার্য মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত কার্য ১২০ দিবসের মধ্যে সমাপ্ত না হলে প্রথমোক্ত আদালতের ক্ষেত্রে সাজার মেয়াদ ১০ বছরের কম হলে এবং শেষোক্ত আদালতের ক্ষেত্রে সাজার মেয়াদ ১০ বছরের অধিক হলে জামিনে মুক্তি দেয়ার অবকাশ সৃষ্টি হয়।
যে কোনো মামলা তদন্তাধীন থাকাবস্থায় অপরাধী গ্রেফতার হলে প্রথমত এখতিয়ারাধীন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জামিন আবেদন করতে হয়। সেখানে সফলতা পাওয়া না গেলে দায়রা আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় এবং দায়রা আদালত থেকে বিফল হলে হাইকোর্ট বিভাগের নির্ধারিত ক্ষমতাসম্পন্ন বেঞ্চে প্রতিকার প্রার্থনা করতে হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলার ক্ষেত্রে এর আগে বৃহৎ দুটি দলের একাধিক নেতা এবং দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছে তারা নিু আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা জজ থেকে জামিন লাভে বিফল হয়ে দীর্ঘ হয়রানির পর উচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে প্রতিকার পেয়েছেন।
সম্প্রতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলায় গ্রেফতার হওয়া বিএনপির তিন শীর্ষ নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এমকে আনোয়ার ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু ও চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসের আটকের বিষয় বিবেচনায় নিলে প্রতীয়মান হয় আমাদের বিভিন্ন আদালতে কর্মরত ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা ও দায়রা আদালতের শীর্ষ বিচারকরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক এবং দেশের বিশিষ্টজনদের হয়রানিমূলক মামলার ক্ষেত্রে যদি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬, ৪৯৭, ৪৯৮ ও ১৬৭ ধারার বিধানাবলী যথাযথভাবে অবলোকনপূর্বক জামিন প্রদান বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন, সেক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অথবা দায়রা আদালতে এ ধরনের মামলায় জামিন না-মঞ্জুরের সুযোগ ঘটত না। কিন্তু এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, নিু আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা জামিন প্রদান করা হবে কী হবে না এ বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করছেন। আর নির্দেশনা অমান্য করলে অপরিপক্ব হয়রানিমূলক বদলিসহ বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হওয়ার কারণের উদ্ভব ঘটে। এমনিতেই ব্যাপক জনশ্র“তি রয়েছে, রাজধানী শহর ঢাকায় ম্যাজিস্ট্রেট বা গুরুত্বপূর্ণ আদালতে দায়রা জজ বা দায়রা জজের পদমর্যাদায় নিয়োগ পেতে হলে ক্ষমতাসীন দলের অনুগামী হওয়া এবং ক্ষেত্র বিশেষে মন্ত্রণালয়ের পদস্থ ব্যক্তিকে অনৈতিকভাবে সন্তুষ্টির আবশ্যকতা দেখা দেয়। একজন সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও বিবেকবান বিচারকের পক্ষে এ দুটির যে কোনো একটির অবলম্বনে রাজধানী ঢাকা শহরে কাক্সিক্ষত পদে নিয়োগ লাভ সম্ভব নয়। তাই রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা ও দেশের বিশিষ্টজনদের হয়রানিমূলক মামলায় বিজড়িতকরণের ক্ষেত্রে উপর মহলের নির্দেশনা প্রতিপালন করতে পারলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারক এ মর্মে সন্তুষ্টি ভোগ করেন যে, উচ্চ মহলের নির্দেশনা রক্ষায় তার ক্ষেত্রে অপরিপক্ব হয়রানিমূলক বদলির কারণের উদ্ভব হবে না এবং এমনকি বিচারকার্য পরিচালনা যে কোনো ধরনের কালিমা দ্বারা আচ্ছন্ন হলেও তা উপর মহলের আশীর্বাদে উপেক্ষিত হবে। তাই রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা এবং সমাজের বিশিষ্টজনদের হয়রানিমূলক মামলায় বিজড়িতকরণে নিু আদালত থেকে জামিন লাভের ক্ষেত্রে আইনের বিধিবিধানের চেয়ে উপর মহলের নির্দেশনা যে অধিক বিবেচ্য- এ বিষয়টি আজ দিবালোকের মতো সবার কাছে স্পষ্ট।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

বর্তমান ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে সৃষ্টি হল? by বদরুদ্দীন উমর

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা যতই জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা করুন, তারাই মূলত বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর পুনর্বাসন ও উত্থানের জন্য দায়ী। ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে এবং তাদের দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসার আহ্বানের মধ্য দিয়েই জামায়াতে ইসলামীর পুনর্বাসন হয়েছিল। কারণ এই সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্তদের অধিকাংশই ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী। এভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপই ছিল ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এ কাজটি করে জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবের কাজের কোনো উল্টো কাজ করেননি। যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে তাদের প্রতি দেশ গড়ার আহ্বানের অর্থই ছিল তাদের আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো। এভাবে সক্রিয় হওয়া ধর্মীয় রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ছাড়া সম্ভব ছিল না। শেখ মুজিবের নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই শেখ মুজিবের উত্তরসূরি হিসেবে জিয়াউর রহমান ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে অন্যান্য পার্টির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীকেও পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।
এরপর এলো এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। ১৫ দল ও ৭ দলে বিভক্ত হয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে কিছুসংখ্যক দক্ষিণ ও বামদল এই আন্দোলন করে। সে সময় জামায়াতে ইসলামীও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নামে। যেহেতু তারা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে, এ কারণে ১৫ দল ও ৭ দল উভয়েই জামায়াতে ইসলামীকে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের সঙ্গে এক অঘোষিত লিয়াজোঁ গঠন করে। এর ফলে দেখা যায়, ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সব থেকে বেশি লাভবান হয় জামায়াতে ইসলামী। তারা যে এ সময় শুধু সাংবিধানিকভাবে শক্তি সঞ্চয় করে তাই নয়, রাজনৈতিকভাবে তারা মধ্যশ্রেণীর কাছে একটা স্বীকৃত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর ফলে ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদে ১৩-১৪টির মতো আসনে জয়লাভ করেছিল, যা পরবর্তী কোনো নির্বাচনেই তাদের দ্বারা আর সম্ভব হয়নি। এর অর্থ জনগণের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে এসেছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। এ কারণে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমঝোতা করে তারা তাদের তিনজনের মতো সদস্যকে নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছিল। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যে মতিউর রহমান নিজামীর এখন বিচার করা হচ্ছে জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে, তার সঙ্গে বৈঠক করেই শেখ হাসিনা এই সমঝোতা করেছিলেন!! এজন্য জামায়াতকে তারা সংসদে মহিলা আসনও দিয়েছিলেন!!! এই সমঝোতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল এবং সেই সঙ্গে জামায়াতেরও শক্তি বৃদ্ধি হয়েছিল। তাছাড়া সরকার গঠনে জামায়াতের সঙ্গে এই সমঝোতাই ছিল অন্যতম প্রধান কারণ, যে জন্য ১৯৯৬-২০০১ সালে ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের কোনো বিচার করেনি! নিজেরা খুব জামায়াতবিরোধী, ধর্মীয় রাজনীতিবিরোধী ইত্যাদি বলে অনেক শোরগোল ও প্রচার-প্রচারণা চালালেও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের এসব দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা ও সুসম্পর্কের কথা বেশ কৌশলের সঙ্গেই ধামাচাপা দেয়া হয়ে থাকে। আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা এক্ষেত্রে বেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকাই পালন করে থাকেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে চুরি, দুর্নীতি, নির্যাতনসহ নানা ধরনের গণবিরোধী কাজ করায় তাদের জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পায়। সেই সুযোগে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগ বিরোধিতা শুরু করে শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে হাত মেলায়।
কাজেই দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই নিজেদের স্বার্থে সুযোগ-সুবিধামতো জামায়াতে ইসলামীকে ব্যবহার করছে। এদিক দিয়ে তাদের মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য আছে এ কথা যারা বলে, তাদের নির্বোধ অথবা মতলববাজ ছাড়া আর কী বলা যায়?
শেখ হাসিনার সরকারের ২০০৯-১৩ সালের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাদের প্রয়োজন ছিল সসম্মানে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা। তার জন্য গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু সেটা না করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টায় তারা পঞ্চদশ সংশোধনীর মতো কাজ থেকে নিয়ে এমন অনেক কিছু করেছেন, যার ফলে দেশের পরিস্থিতির মধ্যে এক অদৃষ্টপূর্ব সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের দ্বারা এই সংকট সৃষ্টিতে কিছু এসে যেত না, যদি এর দ্বারা জনগণের জীবনে এত দুর্বিষহ অবস্থা সৃষ্টি না হতো, জনগণের জীবন ও নিরাপত্তা যদি ভয়াবহভাবে বিপন্ন না হতো। এই অবস্থা সৃষ্টি করে শেখ হাসিনা তাদের আওয়ামী লীগ ও তথাকথিত ১৪ দলীয় জোট নিয়ে একতরফা নির্বাচনের জন্য মরিয়া হয়ে যা করছেন, তা যদি না করতেন তাহলে বিএনপি এবং তাদের তথাকথিত ১৮ দলের প্রধান শরিক জামায়াতের মতো দক্ষিণ রাজনৈতিক দল নতুনভাবে শক্তি সঞ্চয়ের কোনো সুযোগ পেত না। কাজেই বর্তমানে দেশজুড়ে যে ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে এটা সরকারিভাবে বিএনপি ও প্রধানত জামায়াত করলেও এর কেন্দ্রে আছে আওয়ামী লীগ। কারণ শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট কায়দায় নিজের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা এবং তার জন্য নির্বাচনে নিজের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখার জন্য নানা ধরনের অপকর্ম যদি না করতেন, তাহলে এভাবে ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া জামায়াত-শিবিরের দ্বারা সম্ভব হতো না। এভাবে শেখ হাসিনা জামায়াতের শক্তি যেভাবে বৃদ্ধি করেছেন তার দায়-দায়িত্ব থেকে কি যুক্তিসঙ্গতভাবে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন?
আওয়ামী লীগ ও তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা বলছেন, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানে পরিণত হবে! যদি সত্যি এমন সম্ভাবনা থাকে, তাহলে এই সম্ভাবনা কিভাবে তৈরি হল? যে পাকিস্তানিদের ১৯৭১ সালে একটি যুদ্ধের মাধ্যমে এই দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, তারা নিজেদের হাজার রকম রাজনৈতিক সংকট সত্ত্বেও যদি এদেশে আবার পাকিস্তান ফেরত আনতে সক্ষম হয়, তাহলে বাঙালিদের উচিত পাকিস্তানকে কুর্নিশ করা। স্বাধীনতা অর্জনের পর গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী দেশকে পরিচালনা করা এবং এদেশ থেকে ধর্মীয় রাজনীতি উচ্ছেদ করা এ দেশের বাঙালি শাসকশ্রেণীর দ্বারা যদি সম্ভব না হয়, যদি তাদের একটানা ৪২ বছরের শাসনের পর আবার পাকিস্তানের শাসন ফেরত আসে তাহলে তার দায়িত্ব কার? এর দায়িত্ব এদেশের শাসকশ্রেণীর পরিবর্তে, এই শাসকশ্রেণীর সব থেকে বৃহৎ ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পরিবর্তে যদি হাজার মাইল দূরে থাকা পরাজিত পাকিস্তানি শত্র“দের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে তার থেকে অনৈতিহাসিক এবং নির্বোধ চিন্তা ও কাজ আর কী হতে পারে? শুধু জামায়াতে ইসলামী যে ধ্বংসযজ্ঞ করছে এটা নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে মাতামাতি করে পাকিস্তানের জুজুুকে সামনে আনার চেষ্টা করে এটা এভাবে কেন ঘটল, এই পরিস্থিতি কিভাবে ও কী কারণে তৈরি হল এ চিন্তাভাবনার ধারে কাছে না যাওয়া হয়, তাহলে এ কাজ যারা করছে তাদের চিন্তাগতভাবে দেউলিয়া এবং ফ্যাসিস্ট ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে?
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

রামধনুর দেশে রামধুনু নেই

রামধুনুর দেশে রামধুনু নেই। দ. আফ্রিকার দিগন্ত রেখা থেকে চিরতরে উবে গেল শতাধিক কিংবদন্তি রামধুনু ‘মাদিবা’। স্বপ্ন-সংগ্রাম-সৌহার্দ্য-ত্যাগ-বিরহ-দুর্ভোগ জরার মাখামাখিতে অত্যুজ্জ্বল সেই রামধুনু আর দেখা যাবে না। নিপীড়ন নিষ্পেষণে ওষ্ঠাগত দ. আফ্রিকার আকাশে জীবন বাজি রেখে আর কেউ বলবে না, ভয় নেই আমি আছি। সে চলে গেছে। বিশ্ব মানবতাকে কাঁদিয়ে দূরাকাশের যোজনা পেরিয়ে অনন্তলোকে চলে গেছেন ক্ষণজন্মা সেই মানুষটি। তিনি আর ফিরবেন না হয়তো কুনু গ্রামের সেই ঘরটার জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে আর কাউকেই ডাকবেন না কোনোদিন- কিন্তু তার অস্তিত্বের সেই স্মৃতিটুকু অমনই থেকে যাবে চিরদিন। ইতিহাসের বলি হতে তিনি আসেননি- ইতিহাস সৃষ্টি করতে এসেছিলেন। করেছেনও তাই। নেলসন ম্যান্ডেলা মানব সভ্যতার এক কিংবদন্তি ইতিহাস। সে চলে গেছে। বিশ্ব মানবতাকে কাঁদিয়ে দূর আকাশের নক্ষত্র হয়েছেন- ৫ ডিসেম্বর, জোহানেসবার্গে নিজ বাসভবনে রাত সাড়ে আটটায় তার মৃত্যু হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন- এমন ঘোষণার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল দুঃসংবাদের আশংকা। স্থির কণ্ঠে তিনি গোটা বিশ্বের সামনে ম্যান্ডেলার মৃত্যুর খবর জানালেন।
দীর্ঘদিনের অসুস্থতার ফলে এ দুঃসংবাদের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকাসহ গোটা বিশ্ব প্রস্তুত থাকলেও এ মুহূর্ত কারও কাছেই কাম্য ছিল না। সভ্যতার দোহাই দিয়ে শ্বেতাঙ্গরা একসময় যখন বর্ণবাদের ঘূর্ণাবর্তে বিলীন করে চলেছিল মানবতাবাদকে, ঠিক তখনই সব শক্তি নিয়ে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষুদ্রাকায় এ মানুষটি। প্রতিবাদের ভাষা তার জানা ছিল। বুঝেছিলেন, শক্ত হাতেই ধরতে হবে হাল, উঁচুতে তুলতে হবে ঝাণ্ডা। তাই শেষ পর্যন্ত আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস নামের সশস্ত্র দলটির নেতৃত্ব উঠে আসে তারই হাতে। অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লুমফন্টেইন শহরে গঠিত হওয়ার সময় এ দলের নাম ছিল ‘সাউথ আফ্রিকান নেটিভ ন্যাশনাল কংগ্রেস’। পরে ১৯২৩ সালে নতুন নামে আবির্ভূত হয় দলটি। ম্যান্ডেলা দলের সর্বশক্তি ব্যবহার করেন বর্ণবৈষম্য, বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামে। না, পথ মসৃণ ছিল না, ছিল বন্ধুর। এমনকি ১৯৬২ সালে নাশকতার অভিযোগ তুলে তাকে পুরে দেয়া হয় কারাগারে, দীর্ঘায়িত হতে হতে শেষ পর্যন্ত একটানা ২৭ বছরের কারাবাস। ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্র“য়ারি মুক্তি পান মানবাধিকার আন্দোলনের অবিসংবাদিত এই নেতা। ততদিনে বিশ্বসভায় সর্বজনশ্রদ্ধেয় আসন করে নিয়েছেন নিজের দেশে ‘মাদিবা’ নামে পরিচিত ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার তখনকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন, জয় হয়েছিল তার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনেরই। সুবাদে দক্ষিণ আফ্রিকা পেয়েছে রাজনীতির এক নতুন ধারা, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহুবর্ণের গণতন্ত্র। গোটা বিশ্ব প্রস্তুত থাকলেও এ দুঃসংবাদ কারও কাছেই কাম্য ছিল না।

আমি মরতে প্রস্তুত

মৃত্যু আরও আগেই নির্ধারিত ছিল তার জন্য, যা তুমুল সাহসে বরণ করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েই বরং দীর্ঘায়িত করেছেন। কাঠগড়ায় সেই সাহসী উচ্চারণ : আমি মরতে প্রস্তুত (আই অ্যাম প্রিপেয়ার্ড টু ডাই) আজ বিপ্লবের ম্যানিফেস্টো হয়ে গেছে; ঠাঁই নিয়েছে দেশমুক্তির সংগ্রামে নামা প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার মননে। ১৯৬৪ সালের জুন মাস। ‘রিভোনিয়া ট্রায়াল’ নামে সেই কুখ্যাত বিচার প্রহসনের দ্বিতীয় বছর চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার ম্যান্ডেলাসহ ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’-এর ১৯ নেতাকর্মীকে অন্তর্ঘাতসহ নানা দেশদ্রোহী অপরাধে অভিযুক্ত করে বিচার চালাচ্ছে। চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে এ বিচার যখন শুরু হয় তার আগেই ম্যান্ডেলা অন্য একটি অপরাধে পাঁচ বছরের কারাবাসে, সেটি সেই মেয়াদে তৃতীয় বছর! রায় যে মৃত্যুদণ্ড- এটা তখন আফ্রিকার দুধের শিশুটিরও জানা হয়ে গেছে। আত্মপক্ষ সমর্থনে যখন ম্যান্ডেলার পালা এলো তখন তিনি কোনো আইনজীবীর শরণ নিলেন না; বরং আÍপক্ষ সমর্থনে পড়লেন হাতে লেখা এক বিবৃতি। কিংবা এটাকে বক্তৃতা বলাই ভালো। ১৭৬ মিনিট ধরে সে ভাষণ স্তম্ভিত হয়ে শুনে গেছে আদালত।
সেই অসামান্য ভাষণের শেষ অনুচ্ছেদটুকু রাজনৈতিক বক্তৃতার সারিতে ধ্রুপদী মর্যাদায় আসীন। যার ভাবানুবাদ এরকম- গোটা জীবনটা আমি উৎসর্গ করেছি আফ্রিকার মানুষের মুক্তি-সংগ্রামে। আমি শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়েছি এবং লড়েছি কৃষ্ণাঙ্গ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও। আমি লালন করি সেই গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের স্বপ্ন, যেখানে সবাই শান্তি ও সৌহার্দ্যে থাকবে এবং কোনো বৈষম্য থাকবে না। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯- এ পাঁচটি বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়ে ম্যান্ডেলা চেষ্টা করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকাকে গড়ে তুলতে। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে ক্ষমতায় আসীন এএনসি। ঘুণা, বিদ্বেষ, প্রতিশোধস্পৃহা নয়- গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি অটুট বিশ্বাস ও প্রখর দূরদৃষ্টির মাধ্যমে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সমাজে বিভাজন অনেকটাই দূর করেন ম্যান্ডেলা। আর ইতিহাসের এমনই দিক পরিবর্তন, এক সময় নাশকতার মিথ্যা অভিযোগে যাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল, সেই নেলসন ম্যান্ডেলাকেই ভূষিত করা হয় নোবেল শান্তি পুরস্কারে।

সন্ত্রাসী ছিলেন আফ্রিকার যিশু!

কালো মানুষের মুক্তির দেবতা, আফ্রিকার যীশু, সন্ত্রাসী, একগুঁয়ে এরকম নানা নামে খ্যাত বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসে কিংবদন্তি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা এ যুগের রাজনীতিবিদদের কাছে মানবাধিকারের প্রতীক হিসেবে সমাদৃত হলেও ২০০৮ সাল পর্যন্ত তাকে সন্ত্রাসী নজরদারি তালিকায় রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একটি বিল সই করে ম্যান্ডেলার নাম এ তালিকা থেকে বাদ দেন বলে জানায় ‘দ্য হাফিংটন পোস্ট’। ওই সময়কার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস সন্ত্রাসের নজরদারি তালিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার মতো একজন মহান নেতার নাম রেখে দেয়াটাকে ‘বিব্রতকর’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তালিকা থেকে ম্যান্ডেলার নাম বাদ যাওয়ার পর ২০০৮ সালে তৎকালীন সিনেটর জন কেরিও সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের সরকারের সন্ত্রাসী নজরদারি তালিকায় তিনি নেই দেখে আশ্বস্ত হলাম’। বৃহস্পতিবার জোহানেসবার্গের বাড়িতে ৯৫ বছর বয়সে মারা গেছেন ম্যান্ডেলা। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বর্ণবৈষ্যমের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী শাসকরা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসকে (এএনসি) একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেই চিহ্নিত করেছিল।

মহানায়ক ম্যান্ডেলা

‘আমাদের বিদ্রোহ- অমানিশা পার হতে আলোকের পথে... মুক্তির যাত্রায় এ পথ আমার বুঝি শেষ হবার নয়।’ এই পংক্তি একজন কালো মানুষের, স্বাধীনতাকামী এক আজন্ম নেতার, যার ৯৫ বছরের জীবন ছিল সাদা-কালোর তফাৎ ঘুচিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অন্য নাম। এই লড়াইয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেই নেলসন ম্যান্ডেলা হয়ে ওঠেছেন বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার প্রতীক,
এ কালের ‘মহানায়ক’। তার হাত ধরেই স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠরা। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ও বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ম্যান্ডেলা বৃহস্পতিবার জোহানেসবার্গে তার নিজের বাড়িতে মারা গেছেন। নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা কালে সীমাবদ্ধ থাকেনি ম্যান্ডেলার সংগ্রাম। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্নের কথা তিনি বলেছিলেন, তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের কোটি মানুষের হৃদয়ে।