Monday, October 21, 2013

সার্বিক বিচারে ক্ষতিকারকই by ড.কে এইচ এম নাজমুল হুসাইন নাজির

আগামীকাল ২২ অক্টোবর উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক মেগাপ্রজেক্ট রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের। দারুণ খবর! দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে কেন্দ্রটি। উৎপাদন শুরু হলে রামপালে প্রতিদিন প্রয়োজন হবে ১০ হাজার টন কয়লা। ঠিকই দেখছেন, সংখ্যাটি ১০ হাজার টন। শুধু বিদ্যুৎ নয়, সঙ্গে উপহার হিসেবে কেন্দ্রটি অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের সঙ্গে প্রতিদিন দেবে ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড। বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে সাড়ে ৭ লাখ টন ফ্লাই-অ্যাশ পাওয়া যাবে। শুধু বাতাস নয়, মাটি-পানিও পাবে ২ লাখ টন বটম-অ্যাশ। এ বিপুল পরিমাণ অ্যাশ বাতাস, পানি বা মাটিতে নিরাপদ টানেল বানিয়ে বিদেশে রফতানি করা হবে কিনা- সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। অবশ্যই না। আমাদের দেশেই থেকে যাবে। ছড়িয়ে পড়বে আশপাশের এলাকায়। পরিবেশ হবে দারুণভাবে বিপর্যস্ত। ইকো-সিস্টেম মারাÍক হুমকির মুখে পড়বে। জীব-বৈচিত্র্য হবে বিপন্ন। বলা হচ্ছে, অতি উচ্চপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে যার ফলে মাত্র ১৫ ভাগ ফ্লাই-অ্যাশ বাতাসে মিশবে। যদিও বটম-অ্যাশ বা বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইডের কথা পরিষ্কার নয়। একই ধরনের কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ১৯৭৯ সালে একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল যা থেকে বছরে ৩০ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইড তৈরি হচ্ছে। ২০১০ সাল পর্যন্ত হিসাবে দেখা যায় বিশেষত সালফার ডাই-অক্সাইডের ভয়াবহ প্রভাব কেন্দ্রটি থেকে ৪৮ কিমি দূর পর্যন্ত পৌঁছলে সেখানকার পেকান, ওক প্রভৃতি গাছের বাগান মারা পড়েছে। উল্লেখ্য, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিমি দূরে অবস্থিত। রামপাল থেকে তৈরি হবে বছরে ৫১ হাজার ৮৩০ টন সালফার ডাই-অক্সাইড যা টেক্সাসের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির তুলনায় অনেক বেশি। টেক্সাসের অভিজ্ঞতা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে সুন্দরবনকে বাঁচানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই বিলীন হবে সুন্দরবন।
পশুর নদকে সুন্দরবনের প্রাণ বলা যেতে পারে। অনেকে এ নদকে সুন্দরবনের প্রাণভোমরা বলে থাকেন। সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য প্রধানত এ নদের ওপর নির্ভরশীল। জানা গেছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য প্রয়োজনীয় ঘণ্টাপ্রতি ৯১৫০ ঘনমিটার পানি সংগ্রহ করা হবে পশুর নদ থেকে। ব্যবহার ও পরিশোধন শেষে ৫১৫০ ঘনমিটার পানি পশুর নদকে ফেরত দেয়া হবে। সুতরাং পশুর নদের পানি প্রবাহে ঘাটতি হবে দিনে ৯৬০০০ ঘনমিটার। পানি ফেরত কম দেয়া হলেও বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ বাড়তি হিসেবে যোগ হবে সে পানিতে বলা যায়। কারণ পরিশোধন কত দূর হবে সে ব্যাপারেও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশে শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পরিশোধন শেষে পরিবেশে উন্মুক্ত করার কথা থাকলেও বাস্তবে কী হয় তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। বুড়িগঙ্গার পানির অবস্থা স্মরণে রাখা যেতে পারে। বুড়িগঙ্গার পানিকে অনেকে বিষ বলে অভিহিত করে থাকেন। তেমনিভাবে রামপালের ফ্লাই-অ্যাশ, বটম-অ্যাশ ও অন্যান্য ক্ষতিকর বর্জ্যরে মাধ্যমে বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডসহ আর্সেনিক, সিসা, নিকেল, ক্রোমিয়াম, ভেনাডিয়াম, পারদ ইত্যাদি প্রতিনিয়ত মিশবে মাটি-পানি-বাতাসের সঙ্গে। পশুর নদের মাছসহ অন্যান্য প্রাণী, সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের জীবনচক্রে পড়বে মারাত্মক প্রভাব। একে একে ধ্বংস হবে সব। সুন্দরবন বা রয়েল বেঙ্গল টাইগার না থাকলে ছাগল, বিড়াল বা কাঠবিড়ালিকে হয়তো দেশের জাতীয় পশু করা হবে কোনো একদিন।
যতটুকু জানা গেছে, রামপালের মালিকানা বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের ৫০ ভাগ করে। মূলধনের ১৫ ভাগ বাংলাদেশের ও ১৫ ভাগ ভারতের, বাকি ৭০ ভাগ আসবে ঋণ থেকে। ঋণ কোথা থেকে আসবে এবং তার সুদ কত তা পরিষ্কার নয়। বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশের পিডিবি। বিদ্যুতের দাম নির্ভর করবে কয়লার দামের ওপর। কয়লার দাম নির্ভর করবে প্রাপ্যতা ও পরিবহন খরচের ওপর। উৎপাদন খরচ পড়বে অনেক বেশি- সহজেই অনুমেয়। বিভিন্ন অজুহাতে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়বে। বিদ্যুতের দাম যত বাড়বে ভারতের লাভ তত বেশি। টাকা আসবে বাংলাদেশের মানুষের পকেট থেকে। লাভের ৫০ ভাগ পাবে ভারত। সমীকরণ খুব সহজ। ভারত দেবে প্রযুক্তি ও ১৫ ভাগ মূলধন। জমিসহ বাকি সব যাবে বাংলাদেশ থেকে। সুন্দরবন বিপন্ন হওয়াসহ পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘানিও টানতে হবে আমাদের। জানা গেছে, একই কোম্পানি (ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি) ভারতের গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে একই ধরনের দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চেয়েও জনসাধারণের তীব্র প্রতিবাদে ব্যর্থ হয়েছে। সুপার ক্রিটিকাল প্রযুক্তির দোহাই দেয়া হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, ভারত কেন সে দেশের বনসীমার ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ আইন করে নিষিদ্ধ করল? নিজের জন্য ষোল আনা অন্যের জন্য আঁটি- এমন নীতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর স্থানের পাশে কোম্পানিটি কিভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি পেল ও বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি হল তা ভেবে দেখার বিষয়। চুক্তির বিষয়বস্তু বিস্তারিতভাবে জানা সবার যৌক্তিক অধিকার নয় কি? সরকারি প্রেসনোটে দাবি করা হয়েছে, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে ওই এলাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে- আরও কত কী। জানা গেছে, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মসংস্থান হবে মাত্র ছয়শ মানুষের। অন্যদিকে, সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কমপক্ষে ২ লাখ মানুষ নির্ভরশীল। ছয়শ ও ২ লাখ- তুলনা চলে কি? তাছাড়া সুন্দরবনই যদি না থাকে তাহলে জীববৈচিত্র্য বা নির্ভরশীলতার কথা অমূলক, তাই নয় কি?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবনের আয়তন অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে ছিল বর্তমান আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ। নানা কারণে আয়তন ছোট হয়ে বর্তমানে ঠেকেছে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারে। যার ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশের মধ্যে অবস্থিত। উইকিপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৭ সালে সুন্দরবন ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সুতরাং বলা যায়, সুন্দরবন এখন শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়। বাংলাদেশ অংশের বন ধ্বংসের জন্য কেউ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়েছে, রামপালের কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না সুন্দরবনের ওপর। যা আদৌ নির্ভরযোগ্য নয় বলে অনেকের মতো আমিও মনে করি। প্রেসনোট তৈরিতে কারও প্রভাব বা চাপ রয়েছে কিনা, অর্থের লোভ বা প্রাণের ভয় ছিল কিনা- ভেবে দেখা দরকার। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা না শুনলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়ার হুমকির মতো বিষয়ও থাকতে পারে এর পেছনে।
পারিবারিক শান্তি থেকে শুরু করে জাতীয় উন্নয়নে বিদ্যুতের গুরুত্ব বলে শেষ নেই। কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তাও কম নয়। বিভিন্ন দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ৯৩ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় কয়লা থেকে। তেমনিভাবে চীন ও অস্ট্রেলিয়া ৭৮ ভাগ, যুক্তরাষ্ট্র ৪৯ ভাগ, ভারত ৬৮ ভাগ ও জাপান ২৭ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কয়লা থেকে। সেখানে বাংলাদেশে এক ভাগেরও কম। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে রয়েছে চড়া মূল্যের গ্যাসচালিত কুইক রেন্টাল প্লান্ট যা খুব কম দেশেই আছে। কুইক রেন্টাল স্থায়ী সমাধান নয়। যাই হোক, আমাদের দেশে গ্যাসের পাশাপাশি রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কয়লা। কুইক রেন্টালের মাধ্যমে নিঃশেষ হচ্ছে দেশের অমূল্য সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাস। পরিবেশবান্ধব কয়লানীতি প্রণয়ন করে দেশীয় কয়লা ব্যবহার করা গেলে বিদেশী কয়লা বা দেশীয় গ্যাসের প্রতি নির্ভরশীলতা কমানো যাবে। রামপালের পাশাপাশি দেশের অন্য দুটি স্থানে জাপান ও মালয়েশিয়ার সহায়তায় আরও দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেগুলোর ব্যাপারে তেমন আপত্তির কথা শোনা যায় না। রামপালের বিপক্ষে সিংহভাগ জনগণের অবস্থান কিসের কারণে? একটাই উত্তর- সুন্দরবনকে রক্ষা করা। সরকারের বেশির ভাগ যুক্তি নির্ভরযোগ্যতা হারিয়েছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার যেভাবেই হোক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। নিশ্চিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী এমন কাজে কী কারণে বা কার স্বার্থ রক্ষার্থে সরকার একগুঁয়েমির পথ বেছে নিচ্ছে সে প্রশ্ন উঠছে হরহামেশাই। তারপরও বলব, শেষবারের মতো ভেবে দেখুন। রামপালের ব্যাপারে হাইকোর্টে করা রিট আবেদন আমলে নিন। জাতির কপালে একবার রামপালের চিহ্ন বসে গেলে তা সরানো কঠিন হবে। সে টনটনে বিষফোঁড়া বয়ে বেড়াতে হবে সবাইকে সারাজীবন। মাশুল দিতে হবে গোটা জাতিকে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার নিরিখে বিদ্যুৎ উৎপাদন অবশ্যই বাড়ানো দরকার। পরিবেশের ওপর কিছুটা বিরূপ প্রভাব থাকলেও অন্যান্য দেশের মতো কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে- এতেও আপত্তি থাকার কথা নয়। যে কোনো দেশ এমনকি ভারত, নেপাল বা মিয়ানমারের ভালো প্রযুক্তিকে দেশের মানুষ গ্রহণ করবে সানন্দে। তবে কোনো অবস্থাতেই তা সুন্দরবনের মতো অমূল্য সম্পদের বিনিময়ে নয়। রামপাল অভিমুখী লংমার্চ ও তার প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন সে বার্তাই দিচ্ছে। সিডরের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে সুন্দরবন না থাকলে আর কেউ নিজেকে বিলীন করে বাংলাদেশকে রক্ষা করবে না- মনে রাখা চাই।
ড. কেএইচএম নাজমুল হুসাইন নাজির : সহযোগী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; গবেষক, ইয়াংনাম ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া

অসহায় ব্যাঙের পুরনো গল্প এবং হিংসার রাজনীতি by একেএম শাহ নাওয়াজ

সবার জানা গল্প। বালকরা মহা-উৎসাহে ঢিল ছুড়ছে ডোবায়। সেখানে বসত অনেক ব্যাঙের। ঢিল ব্যাঙদের গায়ে লাগছে। আহত হচ্ছে অনেকে। এতে উৎসাহ বেড়ে গেল বালকদের। হাতের নিশানা প্র্যাকটিসে মত্ত হল। এবার জল থেকে ভেসে উঠল এক প্রবীণ ব্যাঙ। বালকদের উদ্দেশে বলল, তোমাদের জন্য যা আনন্দের, আমাদের জন্য তা মৃত্যুর। আজ আমাদের ক্ষমতাবান রাজনীতিকরা ভয়ংকর বালকসুলভ বা বালখিল্যসুলভ আচরণে মেতেছেন। নিজেদের লোভের পেয়ালা পূর্ণ করতে চাইছেন। আর সে পথে মোক্ষে পৌঁছতে গিনিপিগ সাধারণ মানুষের ওপর মরণ ঢিল ছোড়া শুরু করেছেন। নিজেদের স্বার্থ আদায়ে আর কোনো দেশে এভাবে রাজনীতিকরা দেশবাসীকে জিম্মি করেন কি-না আমাদের জানা নেই। আওয়ামী লীগ বলি আর বিএনপি বলি- বর্তমানে যে ধারায় দল পরিচালিত হচ্ছে, তাতে এ দুই দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা আছে এমনটি জোর করেও বিশ্বাস করা কঠিন হবে। গণতন্ত্র চর্চার সংকট আছে বলেই বক্তৃতার মঞ্চে আর সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে বেশি বেশি গণতন্ত্রের জপ করেন আমাদের নেতা-নেত্রীরা। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করার আগ্রহ কোনো পক্ষের নেই। কার ঘাড়ে পা রেখে কে ক্ষমতার মসনদে বসবেন, তারা এ কসরৎই করছেন প্রতিনিয়ত। ফলে একের পর এক স্বেচ্ছাচারী কর্মসূচি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। কোনো গণতান্ত্রিক বোধের পরিচয় মিলছে না আমাদের রাজনীতিকদের মধ্যে। এ কারণেই সাধারণ মানুষের সমর্থনের ধার না ধেরে জনবিধ্বংসী কর্মসূচি ঘোষণা করে যাচ্ছেন জনগণের দোহাই দিয়ে।
দুই অনড় প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং তার জোটবন্ধুরা যার যার খেয়া তরীতে দাঁড়িয়ে নিশ্চল। দেশে নিজেরাই আগুন লাগিয়ে নিরোর ভূমিকায় বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছেন। সে আগুনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছে সাধারণ মানুষের, তবুও প্রতারকের মতো উভয় পক্ষ জনগণের নাম ব্যবহার করছে অবলীলায়। একদল জনগণকে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক অথবা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবেন। আর অন্যদল কাটা-ছেঁড়ায় শতছিন্ন সংবিধানের দোহাই দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবেন। কেউ কাউকে ‘একচুল’ও ছাড় দেবেন না। এসব কিছুর একটাই লক্ষ্য- মসনদ পাওয়া। একদল যে করেই হোক ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবেনই। আর অন্যদল মসনদ হারানোর সাত বছর অতিক্রম করে অস্থির হয়ে পড়েছে। যে করেই হোক মসনদ এবার পেতে হবেই। তাই রণরঙ্গিনী মূর্তি। রাজনীতি দিয়ে রাজনীতির মোকাবেলা করতে হলে চাই গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। দলের ভেতরে এবং দলের আদর্শে গণতান্ত্রিক বোধ ও চর্চা থাকলে রাজনীতির গতিপথ ধরেই মোক্ষে পৌঁছা সম্ভব। জনগণই এ চলার পথ সহজ করে দেবে। কিন্তু জনগণের প্রতি ভরসা রাখার মতো মনের জোর কোনো পক্ষের নেই। দলগুলোর পরিচালকরা গণশক্তির ওপর আস্থাশীল না হয়ে অর্থশক্তি আর পেশিশক্তির ওপর ভরসা করেছেন বেশি। তাই শক্তি প্রয়োগে সুবিধার ফসল ঘরে তুলতে চান তারা। নির্বাচন পদ্ধতি কী হবে এ নিয়ে ঝগড়া তো চলছে অনেক দিন ধরে। রাজনীতির মাঠে মধ্যাহ্ন অপরাহœ পেরিয়ে এখন সন্ধ্যা নামিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতার রাজনীতিকরা। তবুও কোনো আপস ফর্মুলায় আসতে পারেনি দুই পক্ষ। বলা ভালো, আপসের পথে হাঁটেনি কোনো পক্ষ। যার যার অবস্থানে গোঁ ধরে বসে আছেন। এ নিয়েও মজা কম হয়নি। গত এক-দেড় বছর আগে যখন সংলাপের কথা বলা হয়েছে, তখন আওয়ামী লীগ আগ্রহী হলেও বিএনপি পিছু হটেছে। আর চার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা জিতে গেলে পায়ের নিচে মাটি পেয়ে যায় বিএনপি। এবার সংলাপের জন্য বিএনপি অগ্রণী হতে থাকে আর পেছাতে থাকে আওয়ামী লীগ। এসব নাটকে বোঝা যায় সংলাপ-টংলাপ কোনো বিষয় নয়, কোনো পক্ষই জনগণের ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবছে না। তাদের ভাবনা সিংহাসন নিয়ে। তাই সুস্থতা নয়, হিংসার রাজনীতি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে চারপাশে।
আলোচনার টেবিলে বসে জাতীয় সংকট মোকাবেলার সভ্য আচরণ আমাদের ক্ষমতার রাজনীতিকরা ভুলে গেছেন অনেক আগেই। বিএনপি নেতারা তাদের নির্দলীয় সরকারের দাবি সংসদীয় গণতন্ত্রের বাংলাদেশে সংসদে এসে উত্থাপনে সাহস পাচ্ছেন না। দুর্বল সদস্যসংখ্যার ভীতি তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কণ্ঠভোটে নাকচ হওয়ার ভয়ে বিএনপি বরাবর কম্পমান। লাগাতার সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি বিএনপির মধ্যে সংসদ সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বাস্তবতার কারণে আলোচনায় দ্বন্দ্বের সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। তাছাড়া সংলাপের ইতিহাস মানুষ ভুলে যায়নি। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মরহুম আবদুল জলিল এবং বিএনপির পক্ষ থেকে মরহুম মান্নান ভূঁইয়া সংলাপ করেছেন। শেষ পর্যন্ত অশ্বডিম্বই প্রসব করতে হয়েছে। এ বাস্তবতা মানতে হবে যে, শত সদিচ্ছা থাকলেও সিদ্ধান্তে পৌঁছা অসম্ভব। কারণ এমনই গণতন্ত্র দুই দলে রয়েছে যে, ছোট-বড় যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বা এখতিয়ার রয়েছে শুধু দুই দলের সভানেত্রীর হাতে। তাই সংলাপকারীদের দৃষ্টি শুধু থাকে যার যার নেত্রীদের জ্বালানো লালবাতি-সবুজবাতির দিকে। জাতীয় স্বার্থে সার্থক সংলাপ হতে হলে দুই নেত্রীকেই মুখোমুখি বসতে হবে। কিন্তু এ তো সুকঠিন বিষয়। যে দেশে দুই প্রধান নেত্রী পরস্পরের ছায়াটা পর্যন্ত মাড়ান না, দৃষ্টপাত করেন না একে অন্যের দিকে, বক্তৃতার মঞ্চে একে অন্যের প্রতি গড়ল উগড়ে দেন- সেখানে সংলাপে বসার চিন্তা অলীক স্বপ্নবিলাস।
এ অবস্থায় অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে হাঁটতে হয় দেশবাসীকে। বলা যায়, অন্ধকার গহ্বরের দিকেই হাঁটতে হয়। আমাদের ক্ষমতাবান রাজনীতিকরা জনগণকে স্বস্তি দিতে না পারলেও সন্ত্রস্ত করে তুলতে পারেন অনায়াসেই। তাই নির্বাচনী ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন রাজনীতিকদের তৈরি তমসায় আবর্তিত মানুষ কুহক কাটাতে পারছে না, তখন তারা ভয়ংকর ভবিষ্যৎ রচনার গল্প শোনালেন। দেশবাসীকে পিষে চিড়ে চ্যাপটা করে হলেও ক্ষমতায় যাওয়ার হিংসার রাজনীতির পথটাই বেছে নিতে চাইলেন। বিএনপি ঘোষণা দিল ২৫ অক্টোবর থেকে তারা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে রাজপথ দখল করবে। প্রয়োজনে সব কিছু অচল করে দেয়ার ঘোষণাও দেয়া হল। অর্থাৎ ক্ষমতা দখলের রণহুঙ্কার।
আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা ঘরপোড়া গরুর মতো। সাম্প্রতিক সময়ে রাজপথ আন্দোলনে বিএনপির পারফরম্যান্স দেখেছে দেশবাসী। সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে মাঠ আগলে রাখার ক্ষমতা নেই বিএনপির। তাই ভাড়াটে শক্তি দলটির ভরসা। এর আগেও অবরোধের নামে জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি তাণ্ডবে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছিল। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় অনালোচিত হেফাজতে ইসলাম নামে একটি সংগঠিত মৌলবাদী দল বিএনপির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। দুই মৌলবাদী দলের পেশিশক্তিকে ভরসা করে সরকার পতনের বড় রকম চেষ্টা করেছে বিএনপি। সরকারি তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত ফিনিশিং দেয়া সম্ভব হয়নি। ফাঁস হওয়া ষড়যন্ত্র সব সময় ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য বিপজ্জনক। তাই ২৫ অক্টোবর বিএনপির মাঠ দখলের কর্মসূচিকে সর্বাধিক সতর্কতায় দেখছে সরকার পক্ষ। রাজনৈতিক কূটকৌশল হিসেবে একই দিনে ঢাকায় আওয়ামী লীগও সমাবেশ ডেকেছে। অর্থাৎ দুই পক্ষ সম্মুখ সমরে। পরে অবশ্য সুর নরম হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমাবেশ থেকে সরে আসার চিন্তার কথা জানিয়েছে।
আমাদের মান্যবর নেতা-নেত্রীরা কখন কী বলেন, কতটা ভেবে বলেন অথবা জনগণকে বেকুব ঠাউরে বলেন কি-না, আমরা জানি না। তবে মানুষের এই আতংকিত অবস্থায় বোমা ফাটালেন বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা। তার কথার ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, তিনি ঢাকার সমাবেশে আসার সময় নেতা-কর্মীদের দা, কুড়াল, জুতি, টেঁটার মতো ধারালো অস্ত্র বহন করার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি দলের কাছ থেকে বাধা পেলে তারা যাতে হাতের অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। রাজনীতিকদের কী ভয়ানক দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য! বিস্মিত স্তম্ভিত অনেকেই ভাবছেন, পাল্টাপাল্টি রাজনীতির এ দেশে এটা বোধহয় সাত বছর আগের লগি-বৈঠার ডাকের প্রতিশোধ। ডিজিটাল বাংলাদেশে সময় এগিয়ে যাচ্ছে। তাই লগি-বৈঠার সেকেলে অস্ত্রের চেয়ে অপেক্ষাকৃত আধুনিক ধারালো অস্ত্র বহনের কথা বলেছেন জনাব খোকা। আশংকা করছি, এর পর আধুনিক কোনো পক্ষ আগ্নেয়াস্ত্র বহনের নির্দেশ হয়তো দেবে! অবশ্য সে ইঙ্গিতও আছে। বিএনপি নেতা রিজভী সম্ভবত বারুদ বহনের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ তিনি সমাবেশে আসা ‘পদাতিক’ নেতাকর্মীদের প্রয়োজনে ‘গোলন্দাজ বাহিনী’তে পরিণত হতে বলেছেন। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, সেদিন ফাইনাল খেলা হবে। এটি কী ধরনের খেলা আমরা কমবখত তা ঠাহর করতে না পেরে আরও বেশি আতংকিত হয়েছি। এর আগে নাকি কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল হয়ে গেছে। এসব খেলার খোঁজ আমার দুর্বল অ্যান্টেনা এখনও ধরতে পারছে না। তবে এ ধারার বাৎচিত যে জনমনে আতংক ছড়াচ্ছে, তা আর বলে বোঝাতে হবে না।
জনগণের প্রতি বিরোধী দল দায়িত্ব পালন না করলেও সরকার পক্ষ দায়িত্ব এড়াতে পারে না। মানুষকে নির্ভয় করা, নিরাপত্তা দেয়া সরকারেরই দায়িত্ব। সে দায়িত্ব সরল পথে সরকার পালন করছে, এমনটি ভাবতে পারছে না মানুষ। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ব্যাপারে গোঁ ধরে বসে না থাকলে হয়তো একটি বিকল্প পথ বেরিয়ে আসতে পারত। সেসব রাস্তায় না হেঁটে হিংসার রাজনীতির পথই যেন বেছে নিল সরকার পক্ষ। বল প্রয়োগে আন্দোলন থামানোর পুরনো পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিল। দুই পক্ষের এই রাজনীতির খেলা দুরন্ত বালকদের ঢিল ছোড়ার মতোই ভয়ংকর। সাধারণ মানুষ ও জনজীবন এখন ভীষণভাবে আতংকগ্রস্ত। প্রবীণ ব্যাঙের করুণ আর্তি বালকেরা শুনেছিল কি-না জানি না। তবে সাধারণ মানুষের আর্তি শুনে ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার প্রতিযোগিতার পথে নিজ গতি শ্লথ করে দেয়ার মতো বোকামি করতে রাজি নয় কোনো পক্ষ।
শেষ পর্যন্ত মঙ্গল চিন্তা করতে ভালো লাগে। পবিত্র ঈদের দিনে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া অপেক্ষাকৃত নমনীয়ভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব দিয়ে তাতে যোগ দেয়ার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আমি মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে দুই শালিক দেখেছি। শুভ কিছুর প্রত্যাশায় অপেক্ষা করতে চাই।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আলোচনার টেবিলেই সমাধান হোক by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

অপরিণামদর্শী রাজনীতির কারণে বাংলাদেশ এক মহাক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। সবকিছু নিক্ষিপ্ত হচ্ছে এক সর্বগ্রাসী সংকটের আবর্তে। সামনে সংঘাত-সংঘর্ষ ও রক্তপাত ছাড়া মানুষের চোখে ভালো কিছু দৃশ্যমান হচ্ছে না। নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে যদি সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত না হয়, রাজপথই যদি হয় রাজনীতির শেষ ঠিকানা; তাহলে দেশ এক মহাক্ষতির কবলে পড়বে- এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কাজেই রাজপথ নয়, আলোচনার টেবিলেই হোক রাজনৈতিক সংকটের সমাধান; তার জন্য খোলা মন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে ক্ষমতাসীনদের। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি সেদিকে যাচ্ছে না। ক্ষমতাসীনরা বুঝে শুনেই একটা ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। বিএনপিকে রুখতে গিয়ে অসাংবিধানিক পথে কেউ ক্ষমতায় আসতে চাইলে আওয়ামী লীগ তাতেও রাজি হবে বলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয়। যার জন্য বেগম জিয়ার বারবার আহ্বান সত্ত্বেও আলোচনার টেবিলের পরিবর্তে রাজনীতিকে করা হয়েছে রাজপথমুখী। কিন্তু তাতে সবার আগে অবধারিত বেকায়দায় পড়বে আওয়ামী লীগ।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সদ্য ক্ষমতা ত্যাগী দলের ওপরই আঘাত আসে সর্বপ্রথম। তাই রাজপথে রাজনৈতিক সংকটের ফয়সালার সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের জন্য হবে নিঃসন্দেহে মারাত্মক ভুল। তাতে রাজনৈতিকভাবে অপমৃত্যু ঘটতে পারে আওয়ামী লীগের। তা ছাড়া ২৫ অক্টোবর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেয়াও আওয়ামী লীগের অদূরদর্শী ও ভুল সিদ্ধান্ত। এর ফলে সংঘাত ও রক্তপাত অনিবার্য। তাতেও অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হতে পারে ক্ষমতাসীন দল। বিরোধী দলের কর্মসূচি রাজপথে মোকাবেলা করতে গিয়ে একটি গৃহযুদ্ধের মোকাবেলা করতে হতে পারে আওয়ামী লীগের। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, অতীতে বিরোধী দলের কর্মসূচি মোকাবেলা করতে গিয়ে শাসক দলের জন্য পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ খারাপ।
কাজেই রাজপথ নয়, সংকটের সমাধান করতে হবে আলোচনার টেবিলে। তাতে ক্ষমতাসীন দলের যেমন মঙ্গল হবে, তেমনি মঙ্গল হবে দেশেরও। কেননা রাজনৈতিকভাবে একটি জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। দুটি রাজনৈতিক শক্তির পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি। সবাই মনে হয় একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে জন্য জনগণ আছে মহাআতংকে। তাদের ঈদ ও পূজার আনন্দ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ম্লান হয়ে গেছে। কোথাও কোনো স্বস্তি নেই।
বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বাগাড়ম্বরে মানুষ অস্বস্তিতে আছে। এই বাগাড়ম্বর শেষ পর্যন্ত থাকবে নাকি ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট কৌতূহল আছে সর্বত্র। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে একের পর এক নজিরবিহীন কেলেংকারির ঘটনা ঘটলেও সরকার অত্যন্ত স্বস্তির সঙ্গে মেয়াদ পার করছে। এটিও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নবদিগন্তের সূচনা করেছে। তারপরও সরকার ক্ষমতা ছাড়তে ভয় পাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। কথা ছিল মেয়াদ শেষে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সব দল একসঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে। তাতে জনগণ যে দলকে ভোট দেয়, সে দলই সরকার গঠন করবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। নির্বাচন তো দূরের কথা, দেশ কোথায় যাচ্ছে, তা রাজনীতিবিদরাও জানেন না। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বলা যায় দেশ, রাজনীতি ও রাজনীতিবিদরা এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতি তৈরির কোনো কারণ ছিল না। শুধু ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
তৃতীয় বিশ্বে ক্ষমতার রাজনীতি খুব একটা সুখকর নয়। বাংলাদেশে যে দলই ক্ষমতায় থেকেছে, শেষ পর্যন্ত সে দল বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে শূন্যের কোটায় নেমে গিয়েছিল। প্রায় ২১ বছর সময় লেগেছে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন ফিরে পেতে। এসবই বাংলাদেশের রাজনীতির জলজ্যান্ত ইতিহাস। এই ইতিহাস থেকে আওয়ামী লীগ কোনো শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হয় না। নিলে আওয়ামী লীগ জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিত না। শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। আওয়ামী লীগের অবস্থান এর বিপরীতে। ৯০ ভাগ মানুষ যা চায়, তার বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক দল অবস্থান নিতে পারে না আর সে দল যদি আওয়ামী লীগের মতো পুরনো দল হয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই। ১৯৯৬ সালে মানুষ সুষ্ঠু নির্বাচন চেয়ে রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু বিএনপি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে জনগণের দাবি মেনে নিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। ফলে জনগণ পুরস্কার হিসেবে বিএনপিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিরোধী দলের আসনে অধিষ্ঠিত করে।
আওয়ামী লীগের শুভাকাক্সক্ষী ও শুভানুধ্যায়ীরা বলছেন, জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আবার ক্ষমতায় যাওয়া তো নয়ই, আওয়ামী লীগ সুস্পষ্ট বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে ক্ষমতা বা নির্বাচন নিয়ে কোনো টালবাহানা করলে আওয়ামী লীগের পরিণতি হবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের চেয়েও ভয়াবহ। দলটি ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। সুতরাং এখনও সময় আছে আওয়ামী লীগের সুপথে আসার, জনগণের দাবি মেনে নেয়ার। জনগণের দাবি মেনে নেয়ার মধ্যে একটা গর্ব আছে কিন্তু কোনো দোষ নেই। জনগণের দাবি মেনে নিয়ে ক্ষমতা না হোক, আওয়ামী লীগ একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের আসন নিশ্চিত করতে পারে এবং আগামীতে আবার ক্ষমতায় যাওয়ার সোপান তৈরি করতে পারে। আশা করি, আওয়ামী লীগের বোধোদয় হবে।
অন্যদিকে বিরোধী দলের জন্য রাজনীতিতে কোনো সুখবর নেই। আওয়ামী লীগকে সঠিক পথে চালাতে বিরোধী দল হিসেবে যে ভূমিকা পালন করার কথা ছিল তা বিএনপি পালন করতে পারেনি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। যতটুকু সমর্থন বিএনপির প্রতি মানুষের আছে, তা বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের জন্য নয়; আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভ থেকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে একের পর এক নজিরবিহীন কেলেংকারির ঘটনা ঘটলেও এ ক্ষেত্রে বিএনপির ভূমিকা ছিল না ঘরকা না ঘাটকা। ফলে সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসহ একের পর এক বেপরোয়া আচরণ করতে উৎসাহ পেয়েছে। মহাসচিবসহ বিরোধী দলে শীর্ষ নেতাদের পাইকারি হারে জেলে নিয়েছে। প্রধান বিরোধী দলের কার্যালয় পর্যন্ত কমান্ডো কায়দায় তছনছ করা হয়েছে, কার্যালয় থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের চোর-ডাকাতের মতো ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ, যা এক নজিরবিহীন ইতিহাস। তা ছাড়া হত্যা, গুম, অপহরণ ও দমন-পীড়ন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান সরকারের আমলে বেশি হয়েছে।
তা ছাড়া শেয়ার মার্কেট ধ্বংস, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক লোপাট, জনশক্তি রফতানি, রিয়েল এস্টেট, গার্মেন্ট ব্যবসার বারোটা বাজানো, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ড. ইউনূসসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নজিরবিহীনভাবে অপমান-অপদস্থ করে ও হেফাজতের সমাবেশে ক্র্যাকডাউন চালিয়েও সরকার মহাবীরের মতো দেশ চালিয়েছে- বিরোধী দল জোরালো কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে সরকার এখন আরও বেপরোয়া হয়ে একতরফা নির্বাচন করে বা নির্বাচন ছাড়াই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। এখন এ পথ থেকে সরকারকে ফিরিয়ে আনতে বিরোধী দলের আরও জোরালো শক্তি প্রয়োগ করা দরকার। কিন্তু সে প্রস্তুতি দৃশ্যমান হচ্ছে না। আসলে গোড়া থেকেই বিরোধী দলের রাজনীতিতে একটা বন্ধ্যত্ব ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে ফুলে-ফেপে কলাগাছ হয়েছে জামায়াত-শিবির। কিন্তু জাতীয় রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে তাদের কোনো ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তারা আছে একা বাহাদুরি দেখানোর তালে। তারা একা বাহাদুরি দেখিয়ে যে শক্তি ক্ষয় করেছে- বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে এই শক্তি ক্ষয় করলে, সরকার ভয় পেত; অনাকাক্সিক্ষত কাজ থেকে সরকার বিরত থাকত, সরকারকে সঠিক পথে রাখা সম্ভব হতো।
এখন রাজনীতি রাজপথে ও জনগণের কাছে যাচ্ছে। বিরোধী দলকে দুর্বল মনে করে সরকার রাজনীতিকে রাজপথে নিয়ে এসেছে। যার শক্তি আছে, সে-ই রাজপথ দখলে রাখবে। রাজপথ থেকেই রাজনীতি ও নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ হবে। এখন বিএনপিকে কঠিন শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পারলে বিএনপির রাজনীতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে যার যার দলীয় ইস্যু বাদ দিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতি একমুখী হতে হবে; সবাই একাট্টা হয়ে রাজপথে নামতে হবে এবং বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে অবস্থান অব্যাহত রাখতে হবে। রাজপথ কারও জন্যই সুখকর হয় না, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনের জন্য; রাজপথে সংকটের সমাধান হলে ক্ষমতাসীন দল অনিবার্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। কারণ জনমত সবসময় ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে থাকে আর বিরোধী দল পেয়ে থাকে জনগণের সহানুভূতি, যা রাজপথে তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়। কাজেই ক্ষমতাসীন দলের উচিত রাজপথ থেকে রাজনীতিকে আলোচনামুখী করা।
বিরোধী দলের দাবির প্রতি জনগণের জোরালো সমর্থন রয়েছে, যা দেশের মূলধারার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। জনগণ রাজপথে নেমে এলে রক্তপাত ও সম্পদহানির সমূহ আশংকা আছে; আশংকা আছে ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ারও। শেয়ার মার্কেট, এমএলএম ব্যবসা ও অন্যান্য কারণে কয়েক কোটি মানুষ আর্থিকভাবে নজিরবিহীন ক্ষতির শিকার হয়েছে। এই মানুষ সংক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নেমে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে; তাই ক্ষমতাসীনদের সমঝোতার পথে হাঁটতে হবে, রাজপথ থেকে রাজনীতিকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে হবে এবং আলোচনার টেবিলেই সংকটের সমাধান করতে হবে।
বিরোধী দলের চাওয়াটা বড় কিছু নয়, তারা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চাচ্ছেন মাত্র, যা এ দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষেরও দাবি। শেষ পর্যন্ত এ দাবি না মেনে সরকার যাবে কোথায়? জনগণের কাছে যাওয়া ছাড়া রাজনৈতিক দলের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। শাসক দল যদি মনে করে থাকে বিরোধী দলের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নির্বাচন ছাড়াই অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকবে, তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে; কেননা সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু বিরোধী দলের দাবি নয়, এটা জনগণেরও দাবি। সেই জনগণের দাবি নিয়ে টালবাহানা করা প্রকারান্তরে জনগণের বিপরীতে অবস্থান নেয়া। জনগণের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে কোনো শাসক টিকে থাকতে পারেনি, তাদের করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে; ইতিহাসে এমন অনেক নজির আছে। আশা করি, শাসক দল ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে। তবে ইতিহাসের শিক্ষা হল এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সকলেই হাত ভেঙে দিতে চাইলে দেশে শান্তি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

কোনো কোনো মনস্তত্ত্ববিদ বলেন, হিংসার জন্ম প্রথমে মনে। তার সংক্রমণ ঘটে জিহ্বায়। পরবর্তী পর্যায়ে তার দৈহিক প্রকাশ ঘটে। অর্থাৎ হিংসাত্মক কথাবার্তা দৈহিক আচার-আচরণে রূপান্তরিত হয়। ঝগড়া করতে করতে মানুষ একজন আরেকজনের ওপর হামলা চালায়। মানুষ যতই শিক্ষিত ও সভ্য হয়েছে, ততই হিংসা দমন করতে শিখেছে। কিন্তু কোনো কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠী শিক্ষা ও সভ্যতার আলো পাওয়া সত্ত্বেও হিংসা ও হিংস্রতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। আগে হিংস্র না থাকলেও পরে সুযোগ পেয়ে হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এবং বিশেষ একশ্রেণীর রাজনীতিকের কথাবার্তা শুনলে এবং আচার-আচরণ দেখলে কোনো কোনো মনস্তত্ত্ববিদের উপরের থিয়োরিটি সঠিক মনে হয়। বিএনপি ও জামায়াত নেতারা অতীতেও হিংসাত্মক ভাষায় কথাবার্তা বলেছেন। বিএনপি হরতালের ডাক দিয়ে জামায়াতের সঙ্গে মিলে হিংসাত্মক কার্যকলাপ ঘটিয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর থেকেও তারা আবার আন্দোলনের নামে দেশে অশান্তি সৃষ্টির হুমকি দিয়ে জনমনে এক ভীতিকর অস্বস্তি সৃষ্টি করেছেন।
গত এক সপ্তাহে তাদের হুমকির ভাষায় আরও হিংস্রতা প্রকাশ পাচ্ছে। দাবি আদায়ের জন্য বিএনপি ২৫ অক্টোবর সমাবেশ করতে চেয়েছে। ভালো কথা, সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু আন্দোলনের নামে আগেই দা-কুড়াল নিয়ে দলের সমর্থকদের মাঠে নামার ডাক দেয়া কেন? ডাকটি দিয়েছিলেন বিএনপির সামনের সারির এক নেতা সাদেক হোসেন খোকা। ডাকটি দিয়েই তিনি আত্মগোপন করেছেন, যুদ্ধের মাঠে আর নেই। হিংস্রতার উল্টো পিঠে যে ভীরুতা লুকিয়ে থাকে এটা তার প্রমাণ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। একজন শিক্ষিত লোক। এককালে বাম রাজনীতি করেছেন। কলেজের শিক্ষকতাও করেছেন। কিন্তু শিক্ষার আলোকে তার মন থেকে হিংসার বীজ দূর করতে পেরেছেন কি? রুহিয়ায় সদর উপজেলা বিএনপি কর্তৃক আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘২৪ অক্টোবরের পর যদি আমাদের আন্দোলনের ব্যাপারে সরকার কোনো রকম বাড়াবাড়ি করে তাহলে তাদের শক্ত হাত ভেঙে দেয়া হবে।’
শুধু হাত ভেঙে দেয়া নয়, মাথা গুঁড়িয়ে দেয়া হবে, শেখ মুজিবের মতো শেখ হাসিনারও পরিণতি ঘটানো হবে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করা হবে ইত্যাদি হিংসাত্মক কথাবার্তা বিএনপির জন্ম থেকেই তার নেতানেত্রীদের মুখ থেকে শোনা গেছে এবং তাদের দলীয় কর্মী ও ক্যাডারদের মধ্যে তার সহিংস প্রকাশও দেখা গেছে। বিএনপির হিংস্রতা শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, কাজের মধ্যেও প্রকাশিত। বিএনপি তার মিত্র জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের ডাক দিলেই গরিব রিকশাওয়ালা বা অটোরিকশা চালক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাবে। বাসচালক ও বাসযাত্রী গাড়ির ভেতরেই পুড়ে মরবে। প্রাইভেট গাড়ির মালিক নিজের গাড়িতেই গুলি খেয়ে মরবেন। দোকানপাটে ভাংচুর এবং সর্বত্র সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হবে।
অতীতে ব্রিটিশ আমলে মহাত্মা গান্ধী স্বাধীনতার জন্য বহু আন্দোলন করেছেন। সত্যাগ্রহ, অসহযোগের ডাক দিয়েছেন। হরতাল ডেকেছেন। তাতে পুলিশের গুলিতে আন্দোলনকারীরা মরেছেন। আন্দোলনকারীদের হাতে নিরীহ পথের মানুষ মারা যায়নি। একবার চৌরিচেরায় এক আন্দোলনে সামান্য হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল। গান্ধী সঙ্গে সঙ্গে সেই আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন থেকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন ইত্যাদি বহু বিশাল বিশাল আন্দোলন হয়েছে। হরতাল-ধর্মঘট হয়েছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনকারীরা মরেছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের হাতে সাধারণ মানুষ মরেছে তার কোনো উদাহরণ বিরল।
এখন বিএনপি দা-কুড়াল নিয়ে আন্দোলনের ডাক দিচ্ছে। অতীতে একবার আওয়ামী লীগ ডাক দিয়েছিল লগি-বৈঠা নিয়ে মাঠে নামার। দুটোতেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সহিষ্ণুতা নয়, অগণতান্ত্রিক রাজনীতির অসহিষ্ণুতা ও হিংস্রতার প্রকাশ ঘটেছে। হানাদার সশস্ত্র পাকিস্তান বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে ‘যার যাহা আছে তা নিয়ে যুদ্ধে নামা যায়’ কিন্তু নিজ দেশের নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস সৃষ্টি কি গণতন্ত্রসম্মত পন্থা?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমনভাবে সন্ত্রাস যুক্ত হওয়ার কারণ হিসেবে কেউ কেউ একটি কথা বলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল (বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত) নিজেদের কথাবার্তা দ্বারা রাজনীতিতে যে বাক্য সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, তা তাদের ছাত্র ও যুব ক্যাডারদের প্রভাবিত করে। তারা যদি বলেন, হাত গুঁড়িয়ে দেব, তাহলে তাদের ক্যাডার ও সমর্থকরা প্রতিপক্ষের হাত-পা দুই-ই গুঁড়িয়ে দেয়। আন্দোলনের অর্থই তাদের কাছে সন্ত্রাস। এটাই নেতারা তাদের যুব ও ছাত্র কর্মীদের শিখিয়েছেন। সুতরাং তারা আন্দোলনের ডাক শুনলেই সমর্থন লাভের জন্য জনসাধারণের কাছে যায় না। তাদের গাড়ি-বাড়ি-দোকানপাটে আগুন লাগিয়ে, হাটে-মাঠে-বাজারে বোমা ফাটিয়ে তাদের ভয় দেখায়। নির্যাতন করে।
জামায়াত ও শিবিরের ক্যাডারদের তো রাজনৈতিক গণআন্দোলনের ভাষা ও আচরণ শেখানো হয়নি। তাদের শেখানো হয়েছে রগকাটা, শিরা কাটা, প্রতিপক্ষের কাউকে পঙ্গু করে দেয়া, রাস্তাঘাটে নিরীহ মানুষ, গাড়ি ও বাসের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালানো ইত্যাদি। সত্তরের দশকের এক জামায়াত কর্মী (তখন তরুণ ছিলেন) পরে জামায়াত ছেড়ে দিয়ে স্বীকারোক্তি করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় রায়েরবাজারসহ বুদ্ধিজীবী হত্যার যেসব বধ্যভূমি ছিল, তাতে তারা রগ কাটা, হাত কাটা, চোখ উপড়ানো ইত্যাদি নৃশংস কাজে ট্রেনিং লাভ করেছে।
হিংসা নতুনভাবে হিংসার জন্ম দেয়, তার সংক্রমণ ঘটায়। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনগুলোতেও এখন দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের প্রবল সংক্রমণ ঘটেছে। রাজনীতিতে হিংসার সংক্রমণের মেরুকরণ থেকে তারাও মুক্ত থাকতে পারেনি। কালো টাকা যেমন সাদা টাকাকে বাজার থেকে হটিয়ে দেয়, তেমনি অশুভ রাজনীতিও শুভ রাজনীতিকে হটায়। কেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেননি, ‘আমি রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি করা দুঃসাধ্য করে দেব?’ (I will make politics difficult for politicians)। কথাটা কি তিনি কার্যকর করে যাননি? এখন বাংলাদেশে প্রকৃত রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি করা সত্যই দুঃসাধ্য। তাছাড়া কারা প্রকৃত রাজনীতিক এবং কারা নকল রাজনীতিক তাও এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাছাই করা কষ্টকর।
আমি এক রাজনৈতিক নেতাকে বলেছি, কেবল দেশের বড় ছাত্র সংগঠন ও যুব সংগঠনগুলোকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের জন্য দায়ী করবেন না। আগে আপনারা বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেরা বাক্য সন্ত্রাস বা বক্তৃতা সন্ত্রাস বন্ধ করুন। নিজেদের দুর্নীতি বন্ধ করুন। দলের ছাত্র ও যুবক ক্যাডারদের নিজেদের অশুভ রাজনৈতিক স্বার্থ ও উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য লেবেল হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করুন। নিজেদের আদর্শ রাজনীতির মডেল হিসেবে তরুণ প্রজন্মর কাছে তুলে ধরুন। তাহলেই দেখবেন দেশের ছাত্র ও যুব রাজনীতির অর্ধেকের বেশি গলদ দূর হয়ে গেছে। আমার একটি ধারণা, দেশের উচ্চশিক্ষার পীঠস্থান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যন্ত এখন যে এত সন্ত্রাস, রক্তপাত, হিংস্র হানাহানি, তার অর্ধেকের বেশি হ্রাস পাবে, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণীর শিক্ষক আদর্শ শিক্ষক হন এবং ছাত্রদের নিজেদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে বিভক্ত ও ব্যবহার করা থেকে বিরত হন।
আগে ছাত্র ও যুব সমাজের কাছে রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতার আদর্শ পুরুষ ছিলেন গান্ধী, জিন্না, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ বসু, কমরেড মুজাফফর আহমদ, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিব প্রমুখ। তারা কেউ বাক্য সন্ত্রাসী ছিলেন না। সন্ত্রাসের রাজনীতিও করেননি। গান্ধী ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে এত আন্দোলন করেছেন, তাদের হাতে এত নির্যাতন সহ্য করেছেন, তবু বারবার বলেছেন কুইট ইন্ডিয়া, ভারত ছাড়। ব্রিটিশ শাসকদের হাত বা নাক গুঁড়িয়ে দেবেন এমন কথা একবারও বলেননি।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এখন আমাদের তরুণ প্রজন্মর কাছে রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতার আদর্শ চরিত্র কারা? কার্টেসির খাতিরে শীর্ষ পর্যায়ের দু’একটি নাম বাদ দিলেও বড় দলগুলোর বড় নামগুলোর তালিকা তৈরি করুন। দেশের তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার মতো ক’টি নাম খুঁজে পাবেন? এখন আর ডান ও বাম বিচার করে লাভ নেই। বাক্য সন্ত্রাস, সন্ত্রাসী কাজকর্ম ও দুর্নীতির গন্ধমুক্ত রাজনৈতিক নেতা নেই বলব না। আছেন, তবে তারা কোণঠাসা। বাজার এখন জমাট করে রেখেছেন মির্জা ফখরুলের মতো নেতারা। অবশ্যই তিনি বিএনপির ‘আদর্শ নেতা’। তার আগের এবং সমসাময়িক অধিকাংশ বিএনপি নেতানেত্রীই কথায় ও কাজে সন্ত্রাস ছড়িয়েছেন ও ছড়ান। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
লিখেছি, গত গোটা সপ্তাহটিই কেবল বিএনপি-জামায়াত শিবির থেকে ‘দা-কুড়াল নিয়ে রণযাত্রা’, ‘শক্ত হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব’ ইত্যাদি সন্ত্রাসী গর্জন শুনেছি। ২৫ অক্টোবর এই গর্জন আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে রূপান্তর হবে কিনা তা জানি না। সরকার অবশ্য এই হুমকির মুখে ঢাকা শহরে গতকাল (রবিবার) থেকে সব ধরনের জনসমাবেশ, সভা, মিছিল নিষিদ্ধ করে নিজেরাও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাতে সরকার বিএনপির ফাঁদেই পা দিল কিনা তা বলতে পারব না। অর্থাৎ হিংসা ঠেকাতে গিয়ে সরকার নিজেই হিংসা ও সংঘাত সৃষ্টির দিকে প্রতিপক্ষকে ঠেলে দিল।
আমাদের দেশের রাজনীতিতে হিংসার কতটা প্রাবল্য ঘটেছে এবং দেশের মেধা ও মনীষাও তার দ্বারা কতটা আক্রান্ত তার একটা উদাহরণ দেই। সম্প্রতি অর্ধ নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রামে এক নারী সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছেন। তিনি গ্রামীণ ব্যাংক সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ায় সরকারের ওপর খুবই ক্ষুব্ধ এবং এ সম্পর্কে কিছু ক্ষুব্ধ কথাবার্তাও বলেছেন। তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে ফখর মির্জাদের মতো হিংসাত্মক ভাষায় তিনি কথা বলবেন, তা ছিল আমার কাছে অকল্পনীয়। তিনি তার বক্তৃতায় সরকারকে হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের দিকে হাত বাড়ালে সেই হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে।’
একজন নোবেলজয়ী, তাও, যিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তার মুখে এই হিংসাত্মক কথা, অশান্তি সৃষ্টির হুমকি আদৌ মানায় কি? সরকার কর্তৃক গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ ভালো কী মন্দ সেই বিতর্কে আমি এখন যাচ্ছি না। তবে এই সরকারি হস্তক্ষেপ যে অবৈধ নয়, সেই রায় দেশের শীর্ষ আদালত দিয়েছেন। ড. ইউনূস হাত ভাঙতে চান কার? সরকার এবং দেশের সুপ্রিমকোর্ট, উভয়েরই কি?
এই হিংসাত্মক হুমকি একজন নোবেলজয়ীর (তাও আবার শান্তিতে) মুখে মানায়নি। তিনি দেশের সরকার, আইন-আদালত না মানুন, গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে তার তো হিংসাত্মক কার্যক্রম গ্রহণের দরকার নেই। তার পেছনে এ ব্যাপারে একটি সুপার পাওয়ার থেকে অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ ও সংস্থা রয়েছে। বিএনপির অঙ্গীকার তারা আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে গ্রামীণ ব্যাংকে ড. ইউনূসের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে। এ অবস্থায় সারা বিশ্বে নন্দিত ও বন্দিত তার মতো ব্যক্তিত্ব কেন হাত ভাঙাভাঙির মতো নিচুস্তরের রাজনীতিতে নামতে যাবেন? নিজেকে খাটো করবেন?
এসব দেখেশুনেই মনে হয়, কোনো কোনো মনস্তাত্ত্বিকের এই থিয়োরিটি সঠিক, হিংসার জন্ম প্রথমে মনে। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে পরে বাক্যে ও কার্যক্রমে। এটা তখন আর ঠেকিয়ে রাখা যায় না। ড. ইউনূসের মতো ‘বিশ্ব নন্দিত’ মানুষটিও পারেননি। এই হিংসাত্মক বাক্য ও আচরণ থেকে মুক্ত না হলে বাংলাদেশের রাজনীতি কখনও সন্ত্রাসমুক্ত হবে না; শান্তি ফিরে আসবে না, গণতন্ত্র টেকসই হবে না। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে হিংসামুক্ত গণতান্ত্রিক রাজনীতির আদর্শ চরিত্র তুলে ধরা যাবে না।
দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দলই এ সম্পর্কে সতর্ক হোন, বাক্যে ও আচরণে সংযত হোন। বিএনপি দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ ও প্রকৃত গণআন্দোলনে নামুন। অহিংস অসহযোগ ও প্রতিরোধ দ্বারা সরকারের দমননীতি ঠেকান। কিন্তু দোহাই আল্লাহর, ২৫ অক্টোবর থেকে জনজীবনে উপদ্রব সৃষ্টিকারী হিংসা ও অশান্তির আগুন জ্বেলে দেবেন না। জ্বালালে সেই আগুনে আপনারাই প্রথমে পুড়ে মরবেন।

সরল গরল- প্রধানমন্ত্রীর সংবিধান ব্যাখ্যার ভ্রান্তি by মিজানুর রহমান খান

যখন যেমন তখন তেমন রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ হলো ম্যাকিয়াভেলিয় (ষোড়শ শতাব্দীর ইতালীয় রাজনীতিক ও দার্শনিক) রাজনীতি। কিন্তু তাই বলে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইনের ম্যাকিয়াভেলিয় ব্যাখ্যা, সেটা সম্ভবত বাংলাদেশেই সম্ভব।

হাসিনাকে ‘না’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ১৮দলীয় জোট নেতা খালেদা জিয়া। গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন।

সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে কওমি মাদরাসার জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ by দীন ইসলাম

দেশের সব কওমি মাদরাসাগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনতে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করা হচ্ছে। এ কর্তৃপক্ষে একজন চেয়ারম্যান ও সাত জন সদস্য থাকবেন। তারা কর্তৃপক্ষের নীতিনির্ধারণী কাজ করবেন।

তালেবানরা একরোখা! ক্লিনটনকে নওয়াজ শরীফ

১৯৯৮ সালের ১৮ই ডিসেম্বর। বিল ক্লিনটন তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। আর নওয়াজ শরীফ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। ঠিক ওইদিনই নওয়াজ শরীফকে যুক্তরাষ্ট্রের ওভাল অফিস থেকে ফোন করেন বিল ক্লিনটন।

কর্মসংস্থানে পিছিয়ে নেই কৃষক বধূরাও by লিয়াকত হোসেন খোকন

কৃষক পরিবারের দ‍ারিদ্র বিমোচনে ঋণ দিয়ে কর্মসংস্থান কিংবা বাড়তি আয়ের ব্যবস্থার পথ দেখাচ্ছে কোনো কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান। এজন্য দেশে দিন দিন কমছে দারিদ্রের হার।

ভিয়েতকংদের কোচি টানেল, গেরিলা যুদ্ধে অবিস্মরণীয় চিহ্ন by প্রণব সাহা

কোচি টানেলের কথা শুনেছিলাম ভিয়েতনামে নেমেই। গেরিলা যুদ্ধের অভিনবত্ব দেখাতে গাইড কেলভিন আমাদেরও নিয়ে গিয়েছিলেন সেই সুড়ঙ্গপথে। তার আগে গিয়েছিলাম মার্কিনীদের সঙ্গে যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম আর হাজারো ছবি নিয়ে যুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘরে।

এদেশে ক্ষুধার রং বদলেছে! by জিনিয়া জাহিদ

তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র একটি দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যার চাপ আর সেই সঙ্গে অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত এ দেশটিতে ক্ষুধাই হল প্রধান সমস্যা।

“আমার বুকে হাত পড়েছে বলে এতো কথা”

জিলা গাজিয়াবাদ ছবিতে মিনিশার বুকে হাত দিয়ে বলিউডের সীমা ক্রস করেছিলেন আরশাদ ওয়ার্শি।এ নিয়ে আরশাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দৃশ্যটি নিয়ে আলাদা করে আমাদের কোন পরিকল্পনা ছিল না।

‘আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষায় সাঈদী’

জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বলেছেন, আমি ধৈর্য ধরে আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষায় আছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই আমার ভাগ্য নির্ধারণ করবেন।

সম্পর্ক ভাঙার সঠিক সময় জানেন সুইফট

পপ শিল্পী টেইলর সুইফটের বয়স চলছে ২৩। ইতিমধ্যে প্রেম করে ফেলেছেন হাফ ডজনের মত। এটা সবার জানা খবর। মানুষের অজান্তে সুইফট আরো কত প্রেম করেছেন কে জানে!

বিএনপি না এলে নির্বাচনে যাবো না, বললেন এরশাদ

`বিএনপি নির্বাচনে না এলে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ আলাদাভাবে নির্বাচন করবে` মর্মে রোববার রাতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্যকে `ভিত্তিহীন ও অসত্য` বলে উড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

দুই ইস্যুতে আটকে যাচ্ছে সমঝোতা by মহিউদ্দিন মাহমুদ

অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের মধ্যে দুটি প্রধান ইস্যুতে মতবিরোধ থাকছে। জামায়াতে ইসলামের প্রতিনিধি এই সরকারে থাকবে কিনা এবং এই সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র অবস্থান দুই মেরুতে।

পুলিশি বাধায় মালদ্বীপে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন স্থগিত

পুলিশি বাধার কারণে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। শনিবার এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করার কথা ছিল। কিন্তু ভোট শুরুর কিছুক্ষণ আগে পুলিশ এ নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে। মালদ্বীপের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন শনিবার সকালে এক বিবৃতিতে বলেছে, আমরা ভোটের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে ফেলেছিলাম, কিন্তু পুলিশ নির্দেশ দিয়েছে, নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র কমিশনের দফতর থেকে বের করা যাবে না। নির্বাচনের পরবর্তী তারিখ শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। এর আগের খবরে বলা হয়েছিল, দু’জন প্রার্থীর পক্ষ থেকে ভোটগ্রহণ পিছিয়ে দেয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও শনিবার নির্ধারিত সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রধান ফুয়াদ তৌফিক শনিবার সকালে জানিয়েছিলেন,
সুপ্রিমকোর্টের পক্ষ থেকে ঘোষিত দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী তারা নির্বাচন করবেন। মালদ্বীপে ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন গত সপ্তাহে বাতিল করে দেয় দেশটির সুপ্রিমকোর্ট। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ওই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে ঘোষণা করলেও সর্বোচ্চ আদালত দাবি করে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। সুপ্রিমকোর্ট নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেয় এবং সে নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ১৯ অক্টোবরকে নতুন ভোটগ্রহণের তারিখ হিসেবে ঘোষণা করে। ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ নাশিদ সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন। তিন প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র নাশিদ বর্তমান ভোটার তালিকা অনুমোদন করেছিলেন। সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, সব প্রার্থীকে ভোটার তালিকা অনুমোদন করতে হবে। নাশিদ ছাড়া বাকি দুই প্রার্থী বর্তমান ভোটার তালিকা মেনে নেননি। তারা ভোটার তালিকা ঠিক করার পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। বিশেষ মহলের ধারণা পুলিশ ওই দুই প্রার্থীর কথা বিবেচনা করেই নির্বাচন স্থগিত করে দিল। এএফপি,বিবিসি।