Showing posts with label আবদুল মান্নান. Show all posts
Showing posts with label আবদুল মান্নান. Show all posts

Saturday, February 14, 2015

হালিমার ভালোবাসার গল্প by আবদুল মান্নান

(নামাজের জন্য স্বামীকে পিঠে করে মসজিদে নিয়ে যাচ্ছেন হালিমা বেগম l প্রথম আলো) প্রতিদিন ভোরে উঠে স্বামীকে নামাজ পড়ার জন্য অজু করান। সকালের নাশতা খাওয়ানো, দুপুরে গোসল করানো, কাপড় পরানো আর রাতে তাঁকে পিঠে নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ানো, সবই করেন তিনি হাসিমুখে। নয় বছর ধরে ভালোবাসার মানুষটির জন্য এভাবেই নীরবে কাজ করে চলেছেন হালিমা বেগম (৫১)। তাঁর বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ীর দক্ষিণ রানীগাঁও গ্রামে।
৩৬ বছর আগে আমজাদ আলীর (৫৯) সঙ্গে বিয়ে হয় হালিমার। হালিমা অন্যের বাড়িতে ও আমজাদ দিনমজুরি করতেন। জমানো টাকায় তাঁরা ৩০ শতক আবাদি জমি কেনেন। পাঁচ বছরের মধ্যে তাঁদের ঘর আলো করে আসে দুটি সন্তান। ২০০৫ সালে আমজাদের ডান পায়ের আঙুলে ছোট্ট একটি ফোড়া ওঠে। চিকিৎসকের পরামর্শে কেটে ফেলতে হয় আঙুলটি। চিকিৎসক জানান, এটি বারজার রোগ। এ রোগে এক বছরের মধ্যে পা কোমর পর্যন্ত কাটতে হয়। তখন এক পায়ের ওপর ভর করে কিছুটা চলতে-ফিরতে পারতেন। চার বছরের ব্যবধানে একই রোগে বাঁ পাও কেটে ফেলতে হয়। সম্প্রতি ওই দম্পতির বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, ৬ শতক জমির ওপর ছোট্ট টিনের ঘরে এ দুজন বাস করেন। উঠানে রোদের মধ্যে বসে স্বামী-স্ত্রী মিলে ছেঁড়া মশারি সেলাইয়ের কাজ করছেন। হালিমা খাতুন জানান, তাঁর স্বামীর পায়ে চারবার অস্ত্রোপচার করতে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। শেষ সম্বল জমিটুকু বন্ধক দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। স্বামীর দুটি পা কেটে ফেলায় সারাক্ষণ ঘরে থাকতে হতো। তাই স্বামীকে একা রেখে অন্যের বাড়িতে কাজ করা সম্ভব ছিল না। ২০০৯ সালে কাজের সন্ধানে তাঁরা ঢাকায় চলে যান। আমজাদ আলী ভিক্ষাবৃত্তি আর তিনি গার্মেন্টসে ঝাড়ুদারের কাজ শুরু করেন। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে হালিমার অসুখ হলে তাঁরা দুজনই গ্রামের বাড়ি ফিরে আসেন। ঢাকা থেকে ফিরেই বন্ধক দেওয়া জমিটুকু ছাড়িয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে ছেলে হাফিজুর (৩৩) ঢাকায় রিকশা চালান। মেয়ে আঞ্জুয়ারা বেগমের (৩০) বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামে।
সন্তানেরা সহযোগিতা করেন কি না, জানতে চাইলে আমজাদ আলী বলেন, ‘তাদেরই ঠিকমতো সংসার চলে না, আমগরে দিব কেমনে? তবে অসুখ-বিসুখের কথা শুনলে মেয়েডা ছুইটা আসে।’ এই অসহায় জীবনে স্ত্রী কখনো অবহেলা বা বিরক্তবোধ করেছেন কি না, জানতে চাইলে ছলছল নয়নে আমজাদ আলী বলেন, ‘ইচ্ছা করলে ও আমারে ফালাইয়া যাইবার পাইরত। অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় যখন পইড়া থাকতাম, প্রচণ্ড অস্থির লাগত। ঘুম অইত না। লোকজনের আড়ালে রাইতে ও আমারে পিঠে লইয়া গ্রামের সড়কে সড়কে ঘুরত। ও না থাকলে বাঁইচা থাহাডাই কঠিন অইত।’ স্ত্রীর জন্য কিছু করার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আবাদি জমিটুকু ওর নামে কিনছিলাম। আর বাকি যা দেওনের সবকিছু ও আমারে দিছে।’
আমজাদ আলীর সঙ্গে আলাপের সময় হালিমা বেগম পাশে বসে বারবার সুইয়ে সুতা লাগানোর চেষ্টা করছিলেন। জানতে চাইলে বললেন, ‘কষ্টরে অহন কষ্ট মনে অয় না। বাকি জীবনটা এই পঙ্গু মানুষটার সেবা কইরা যাইবার চাই।’
প্রতিবেশী হারুন-অর-রশিদ জানান, একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীর প্রতি কতটা ভালোবাসা, দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ণ হতে পারেন, হালিমাকে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।

Wednesday, October 29, 2014

তিন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের শেষ পরিণতি by আবদুল মান্নান

বাংলাদেশের মানুষের এরিখ প্রিবকের নাম শোনার কথা না। না শুনলে ক্ষতি নেই। প্রিবকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের ঘাতক দল এসএস পুলিশ বাহিনীর সদস্য হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৪৪ সালের ২৪ মার্চ ইতালির রাজধানী রোমের কাছে নাৎসিবিরোধী ৭৫ জন ইহুদিসহ ৩৩৫ জন ইতালীয় যোদ্ধার হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। ইতালীয় ভাষায় পারদর্শী প্রিবকে ১৯৩৬ সালে হিটলারের গোয়েন্দা সংস্থা গেস্টাপোর হয়ে কাজ করতে ইতালিতে যান। সেখানে দ্রুতই তিনি ইতালির ফ্যাসিস্ট পুলিশের কমান্ডারের দায়িত্ব নেন। বাস্তবে তিনি হিটলারের হয়ে ইতালিতে কাজ করছিলেন।
যুদ্ধ শেষ হলে অনেক যুদ্ধাপরাধীর মতো প্রিবকে গোপনে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যান। সেখানে তিনি নির্ঝঞ্ঝাটে ৪০ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টাইন পুলিশের কাছে ধরা পড়েন। পরে প্রিবকেকে ইতালিতে ফেরত আনা হয় এবং বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের পর তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত তাঁর বয়সের কথা চিন্তা করে তাঁকে প্রচলিত কারাগারে না রেখে বাকি জীবনের জন্য গৃহবন্দী করে রাখার আদেশ দেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইতালিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রিবকে তাঁর অপরাধের জন্য আদালত বা অন্য কারও কাছে কখনো ক্ষমা চাননি।
সেই প্রিবকে ১০০ বছর বয়সে ইতালীয় কারাগারে মারা গেলেন গত বছরের (২০১৩) ১১ অক্টোবর। মৃত্যুর আগে প্রিবকে কারা কর্তৃপক্ষকে বলে যান, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে আর্জেন্টিনায় তাঁর স্ত্রীর পাশে অথবা তাঁর জন্মস্থান বার্লিনের কাছে হেনিংসডর্ফে সমাহিত করা হয়। ইতালীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রিবকের এই অন্তিম ইচ্ছার ব্যাপারে আর্জেন্টিনা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সাফ জানিয়ে দেয়, তাদের দেশে প্রিবকের মতো একজন ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীকে কবর দেওয়ার সুযোগ নেই। আর্জেন্টাইন সরকারের এই সিদ্ধান্তে সে দেশে বসবাসরত তিন লাখ ইহুদির সংগঠন ‘আর্জেন্টিনা জুইস অ্যাসোসিয়েশন’ এক বিবৃতিতে বলে, ‘এই ঘাতক যে দীর্ঘ ৪০ বছর আর্জেন্টিনায় সব সুযোগ-সুবিধাসহ বসবাস করেছে, সেটাই তো তার বড় পাওনা।’ তারা আরও বলে, ‘কখনো কেউ যেন নাৎসি গণহত্যা অথবা যেকোনো ধরনের গণহত্যাকে না ভোলেন এবং ক্ষমা না করেন।’ জার্মান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও প্রিবকের লাশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
সিদ্ধান্ত হয়, রোমের বাইরে রক্ষণশীল ক্যাথলিক গির্জা সেন্ট পিউসের কবরস্থানে হবে প্রিবকের শেষ ঠিকানা। এরিখ প্রিবকের লাশ বহনকারী গাড়িটি গির্জার ফটকে পৌঁছাতেই সেটিকে ঘিরে ধরে কয়েক শ ক্ষুব্ধ নাগরিক। উত্তেজিত জনতা প্রিবকের লাশবাহী গাড়িটির সমানে লাথি মারতে থাকে আর থুতু ছিটাতে থাকে অনবরত। ‘আমাদের এই শহরে এই কসাইয়ের জায়গা হবে না,’ চিৎকার করে বলতে থাকে উত্তেজিত জনতা। লাশ বহনকারী গাড়িটির গায়ে একটি ব্যানার টানানো হয়, যাতে লেখা ছিল: ‘যুদ্ধাপরাধীদের কোনো ঠাঁই নেই’। পরে পুলিশের সহায়তায় লাশ বহনকারী গাড়িটি রোমের একটি সামরিক বিমানবন্দরের ছাউনিতে নেওয়া হয়। পরে অজ্ঞাত স্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
রুডলফ হেস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের ডেপুটি আর নাৎসি পার্টির নীতিনির্ধারকদের শীর্ষ পর্যায়ের একজন। পেশাদার সৈনিক। জন্ম মিসরে। হিটলারের কাজকর্মে বিরক্ত হয়ে ১৯৪১ সালে নিজে একটি যুদ্ধবিমান চালিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের কাছে প্রস্তাব নিয়ে সোজা উড়ে গেলেন স্কটল্যান্ডে। নামতেই বন্দী করা হলো হেসকে। নিশ্চয় ব্যাটা হিটলারের গুপ্তচর। চার্চিল অত বোকা নন যে বিশ্বাস করবেন হেসের প্রস্তাবে হিটলার যুদ্ধ বন্ধ করবেন। ১৯৪৫ সালে জার্মানির পরাজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হয়। জার্মানির নুরেমবার্গ শহরে বসল হিটলারের নাৎসি পার্টির আর অন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল। বিশেষ ব্যবস্থায় একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে রুডলফ হেসকে সেই ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করা হলো। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দুই মাস হেসের মামলার শুনানি চলল। ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবরে আদালত হেসকে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
হেস শান্তির জন্য চেষ্টা করেছিলেন, তা ট্রাইব্যুনাল আমলে নেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের রাশিয়ান সদস্য মেজর জেনারেল ইওনা সিকিতচেনকো মনে করেন, হেসের অপরাধ মৃত্যুদণ্ডতুল্য। তিনি ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। হেসকে ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই বার্লিনের নিকটবর্তী স্পান্ডু কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কারাগারটিতে প্রায় সব বন্দীই ছিলেন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত। আর এটি ছিল যুদ্ধকালীন চারটি মিত্র শক্তির তত্ত্বাবধানে। ৬০০ কয়েদি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই কারাগারে ১৯৬৬ সালের পর একমাত্র বন্দী ছিলেন রুডলফ হেস। এরই মধ্যে অন্যান্য কয়েদির হয় মৃত্যু হয়েছে অথবা কারাবাসের সাজা শেষে ছাড়া পেয়েছেন। ১৯৮৭ সালের ১৭ আগস্ট হেস কারাগারে আত্মহত্যা করেন। রাতের অন্ধকারে হেসকে গোপনে কবর দেওয়া হয়েছিল। এরপর জার্মান কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ কারাগারটি বুলডোজার দিয়ে ধূলিসাৎ করে দেয়, যাতে পরবর্তীকালে নব্য নাৎসিরা এই কারাগারে হেসের স্মরণে কোনো ধরনের স্মারকস্তম্ভ বা তেমন কিছু নির্মাণ করতে না পারে।
এরিখ প্রিবকে অথবা রুডলফ হেসের প্রসঙ্গটা এই কারণেই উল্লেখ করতে হলো, কারণ সম্প্রতি বাংলাদেশেও গোলাম আযম নামের এক সাজাপ্রাপ্ত ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে তাঁর পরিবারের দু-একজন সদস্য উপস্থিত ছিল। প্রিবকে বা হেস তেমন সৌভাগ্যবান ছিলেন না। গোলাম আযম তাঁর একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ঠিক কিন্তু তিনি বিচারের সময় যত রকমের সুযোগ-সুবিধা ও আইনের আশ্রয় পেয়েছেন, তার কোনোটাই প্রিবকে অথবা হেসের ভাগ্যে জোটেনি।
এই তিনজন অপরাধীর মধ্যে এক জায়গায় মিল আছে আর তা হচ্ছে, তাঁরা কেউ কখনো তাঁদের কৃত অপকর্মের জন্য ক্ষমা চাননি। জামায়াতের এককালের নেতা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে পাঁচ ধরনের অপরাধের ৬১টি অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং সেগুলোর প্রতিটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাইবু্যনাল আরও বলেছেন, গোলাম আযমের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালের অপরাধ মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য কিন্তু বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। অথচ তাঁর জানাজার আগে তাঁর ছেলে সবার সামনে বলেন, তাঁর বাবাকে অন্যায়ভাবে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। বাবা যেমন তাঁর অপকর্মের জন্য কখনো দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাননি, তাঁর সন্তানও রেওয়াজ অনুযায়ী তাঁর বাবার পক্ষে ক্ষমা না চেয়ে বরং একধরনের ক্ষমার অযোগ্য ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছেন। অথচ একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গোলাম আযম ও তাঁর দল শুধু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তাই প্রদান করেনি বরং নিরপরাধ মানুষ মারার কাজে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত ছিলেন।

শুধু গোলাম আযমের ছেলে নন, তাঁর বিচার ও রায় নিয়ে তাঁর কৌঁসুলিরা কয়েক দিন ধরে জনগণকে অবিরাম অসত্য তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন। প্রিবকের মরদেহ এখনো দাফনের অপেক্ষায়। হেসকে গোপনে কবর দিতে হয়েছিল। আর লাখ লাখ বাঙালির রক্তে হাত রঞ্জিত গোলাম আযমের শেষকৃত্য বেশ ঘটা করেই অনুষ্ঠিত হলো গত শনিবার বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। জানাজায় অংশ নিয়েছিল তাঁর কয়েক হাজার অনুসারী (জামায়াতের মতে লক্ষাধিক)। জাতীয় মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠানের প্রতিবাদে জড়ো হয়েছিলেন মাত্র কয়েকজন তরুণ, এই প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা। এই সবই জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করেছে।
অনেকের প্রশ্ন, কেমন করে ঘটল এমন অভাবিত ঘটনা? এর উত্তরে শুধু বলা যায়, ৪৩ বছরে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায় আর প্রশ্রয়ে পাকিস্তানি ধ্যানধারণার মানুষ বাংলাদেশে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। আমার এক গুরুজন আছেন। তিনি প্রায়ই বলে থাকেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১০ কোটি। অবাক হয়ে তাঁর কাছে জানতে চাই, বাকিদের কী হলো? তার সহজ উত্তর, ‘আরে বোকা, ওই বাকিরা তো পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত।’ গোলাম আযমকাণ্ড থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কিছু শিখবে, তেমন একটা আশা করি না। সহকর্মী ড. মুনতাসীর মামুনের বক্তব্য দিয়েই শেষ করি। তিনি প্রায়ই বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা দিয়ে গিয়েছিলেন।’ তার বড় প্রমাণ বাংলাদেশের গোলাম আযমের শান্তিতে মরণ ও লাখো শহীদের রক্তবিধৌত এই বাংলার মাটিতে তাঁর শেষ কৃত্যানুষ্ঠান আর তাঁর দাফন। ৩০ লাখ শহীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছাড়া আর কী করতে পারি?
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Wednesday, October 22, 2014

শিক্ষার মান, কোচিং ও শিক্ষা-বাণিজ্য by আবদুল মান্নান

মাস দুয়েক ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বাঙালি হুজ্জত পছন্দ করে। তবে শিক্ষা নিয়ে হুজ্জত ভালো। অন্তত যাঁরা সাধারণত রাজনীতির আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাঁরা নতুন একটি ইস্যু পেলেন। শুরুটা হয়েছিল এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পরপর। ৭৮ শতাংশ ছাত্রছাত্রী এই পরীক্ষায় পাস করল। বেশুমার ছাত্রছাত্রী ‘এ প্লাস’ বা ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পেয়েছে। সবার চক্ষু চড়কগাছ। ওমা, সে কী কথা! এত পরীক্ষার্থী পাস করল আর এত বিশালসংখ্যক পরীক্ষার্থী এ প্লাস পেল, তা কেমন করে সম্ভব? যাঁরা এই আহাজারি করেন, তাঁরা সবাই আমার বা আমার আগে-পরের প্রজন্ম। তখন এসএসসি অথবা এইচএসসি পরীক্ষায় ৪০ শতাংশ পাস করলে সবাই বলত, এবার শিক্ষা বোর্ড ৪০ শতাংশ পাস করিয়েছে। কদাচিৎ শোনা যেত, ৪০ শতাংশ পাস করেছে। প্রথম বিভাগ পেলে তো কথাই নেই। আমি দুটি পরীক্ষায় বোর্ডের মেধাতালিকায় স্থান পেলে আমাদের পাড়ামহল্লায় সেকি কাণ্ড। রাতারাতি সেলিব্রেটি। যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসব (তখন কোনো ভর্তি পরীক্ষা চালু হয়নি) তখন মহল্লার লোকজন মিলে শুধু আমাকে নয়, আমার বাবাকে পর্যন্ত এক ছোটখাটো সংবর্ধনা দিল। মহল্লার প্রথম স্থানীয় ছেলের উচ্চশিক্ষায় ঢাকা যাত্রা! তখন কেউ পড়ালেখার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। তখন কোচিং শব্দটির সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত। ক্লাসের যেসব ছাত্র অঙ্কে কাঁচা, তাদের জন্য সপ্তাহে এক কি দুই দিন বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা। ইংরেজি নিয়ে সমস্যা নেই, কারণ স্কুলটা ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত খানদানি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। যুগের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু পাল্টে গেল। এখন এসব পাবলিক পরীক্ষায় পাস করলে কেউ তেমন একটা খোঁজখবর নেয় না, কারণ এখন শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বাড়ির ছেলেমেয়েরা স্কুল-মাদ্রাসায় পড়ছে। পরীক্ষায় পাস করা তেমন কোনো বিষয় নয়, কারণ পাঠশালায় গেলে একজন শিক্ষার্থী পাস করবে, তাই স্বাভাবিক। পাঠশালায় কেউ ফেল করতে যায় না। সুতরাং, এত ছেলেমেয়ে পাস করলে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।
তবে পুরো বিষয়টা অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে সামনে চলে আসে, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শতকরা ১০ থেকে ১৫ জন ভর্তির জন্য মনোনীত হলো। পুরো বিষয়ে আরও উত্তাপ ছড়াল যখন ইংরেজি বিভাগে ভর্তির জন্য মাত্র দুজন পরীক্ষার্থী নির্বাচিত হলো। সবাই সমস্বরে চিৎকার শুরু করে দিয়ে বলল, এত ছেলেমেয়ে পাস করল, গোেল্ডন এ প্লাস পেল—তাহলে এত বিরাটসংখ্যক পরীক্ষার্থী ফেল করে কীভাবে? বিষয়টা তো পাস-ফেলের বিষয় নয়। আসল বিষয় হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যার তুলনায় পরীক্ষা দিয়েছে অনেক বেশি। সুতরাং, ভর্তি হতে না পারার সংখ্যা তো বাড়বেই। সামনের বছর যদি আরও বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করে আর ঢাকা বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে অবস্থা এই বছরের তুলনায় তো আরও খারাপ হবে। এটি সাধারণ গাণিতিক হিসাব। আর ইংরেজি বিভাগে যা হয়েছে, তা হচ্ছে স্রেফ পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে। অ্যাডভান্সড ইংরেজিতে পরীক্ষা দিতে হবে, তা পরীক্ষার্থীরা জেনেছে অনেক পরে। এর দায়দায়িত্ব কিছুটা হলেও বিভাগ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। ২০০০ সালে আমার কন্যা ইংরেজিতে প্রথম দফায় টিকেও পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তির নির্ধারিত যোগ্যতা পরিবর্তন করলে তার আর ওই বিভাগে পড়া হয়নি। সবাই শিক্ষার মান নিয়েও বেশ কথা বলছেন। এত বেশিসংখ্যক পাস অথবা এত গোল্ডেন এ প্লাসের অর্থ কি শিক্ষার মানও বেড়ে গেছে? সবাই মোটামুটি একমত—না, তা বাড়েনি। তাদের সঙ্গে দ্বিমত নেই। তবে এর জন্য শিক্ষার্থীদের দায়ী করতে আমি নারাজ। আমার চার দশকের বেশি সময়ের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এর দায়দায়িত্বের বেশির ভাগ শিক্ষকদের। ১৯৯৮ সালে আমার সুযোগ হয়েছিল ইউনেসকোর আমন্ত্রণে বিশ্বভারতীর এক আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা সম্মেলনে যোগ দেওয়ার। একটি সেশনে প্রবন্ধ পাঠ করবেন বিশ্বভারতীর একসময়ের উপাচার্য ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অম্লান দত্ত। নির্ধারিত সভাপতি না আসায় সভায় সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। বিষয় ‘উচ্চশিক্ষার মান’। এই বিষয়ে বলতে গিয়ে একপর্যায়ে অধ্যাপক দত্ত বললেন, If the students have not learnt, teachers have not taught। শিক্ষার্থীরা যদি না শেখে, তাহলে বুঝতে হবে, শিক্ষক তাদের পাঠদান করেননি।
এর চেয়ে খাঁটি কথা আর কী হতে পারে? প্রথমে এটি স্বীকার করে নেওয়া ভালো, শিক্ষার মান বিষয়টা অনেকটা আপেক্ষিক এবং তা বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষকদের ওপর। একসময় গ্রামের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে পাবলিক পরীক্ষায় শহুরে শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো করত। এখন তা হয় না, তার অন্যতম কারণ গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতে এখন আর ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় না। অন্যদিকে শহুরে শিক্ষার্থীদের অনানুষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ অনেক বেশি। তবে গ্রাম হোক আর শহর, সবখানেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের লেঠা চুকেছে অনেক আগেই। ব্যতিক্রম কিছু অবশ্যই আছে। পড়ালেখা এখন প্রায় সম্পূর্ণটাই কোচিং সেন্টার আর পরীক্ষামুখী। শ্রেণিকক্ষে ঢুকে একজন শিক্ষক প্রথমে যে কাজটি করেন, তা হচ্ছে বোর্ডে তাঁর কোচিং সেন্টারের ঠিকানাটা লেখা। এ কাজে ড্রয়িং শিক্ষক থেকে বাংলার শিক্ষক—কেউ বাদ যান না। ব্যতিক্রম বাদ দিচ্ছি। চট্টগ্রামে একজন শিক্ষক বাড়িতে ইংরেজি বিষয়ে প্রাইভেট পড়াতেন। সকাল পাঁচটায় শুরু হতো। টেপরেকর্ডার ছেড়ে দিয়ে তিনি ঘুমাতে যেতেন। পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে সন্দ্বীপে বদলি করা হলো। চাকরিতে ইস্তফা দিলেন, কারণ তাঁর প্রাইভেট পড়ানোতে বিঘ্ন ঘটবে। পরের দিকে তিনি ধর্মসভায় বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতেন। এখন কেউ তেমন আর বাড়িতে প্রাইভেট পড়ান না। সবাই নিজে একটা আস্ত বাড়ি অথবা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন। পশ্চিম ধানমন্ডির ৯/এ সড়কে বিকেল চারটার পর থেকে হাঁটাচলা অসম্ভব, কারণ ওই সড়কে অবস্থিত একটি কোচিং সেন্টারে দলে দলে ছাত্রছাত্রীরা গাড়িতে করে আসে কোচিংয়ে পড়তে। সে এক এলাহি কারবার। প্রায় সব কোচিং সেন্টারের মালিকেরাই এই ঢাকা শহরে একাধিক বাড়ি-গাড়ির মালিক।
বড় প্রশ্ন, তাঁরা যে বিষয়টি এই কোচিং সেন্টারে পড়ান, তা ক্লাসে কেন পড়াতে পারেন না? এই প্রশ্নের কোনো জবাব কিন্তু তাঁদের কাছে কখনো পাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের এসব কোচিং সেন্টারে না এসে কি কোনো উপায় আছে? না, নেই। কারণ, না এলে তার পক্ষে স্কুল বা কলেজ পরীক্ষায় কখনো পাস করা সম্ভব হবে না, সে যত ভালো পরীক্ষাই দিক না কেন। কোচিং সেন্টারে আসতে সে বাধ্য। একজন অভিভাবকের তঁার প্রত্যেক সন্তানের জন্য মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা কোচিং সেন্টার বাবদ ব্যয় অনেকটা বাধ্যতামূলক। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিভিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করে, তাদের কলেজে পড়লে প্রাইভেট কোচিংয়ের প্রয়োজন হয় না। যে কথাটি তারা বলে না, এসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ক্যাম্পাসে কোচিং বাবদ বছরের শুরুতেই লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। বাংলাদেশে শিক্ষার যদি কেউ সর্বনাশ করে থাকেন, তাহলে তার দায়দায়িত্ব ওই কোচিং সেন্টারওয়ালা শিক্ষকদেরই নিতে হবে। তাঁরা সবাই মিলে বছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্য করেন কিন্তু কর-খাজনা দেন বলে তেমন একট শোনা যায় না। সেদিন একটি টিভি টক শোতে এ বিষয়ে চমৎকার একটি আলোচনা হচ্ছিল। অন্যদের সঙ্গে ছয়জন সদ্য এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীও অংশ নিয়েছিল সেই টক শোতে। তাদের একাধিকজন বলল, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও তাদের কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য করেন তাদের মায়েরা (বাবারা নন)। মায়েরা সন্তানদের পড়ালেখা নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকেন, তা সত্য কিন্তু তাঁদের প্রতি অনুরোধ কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য করে আপনার সন্তানের সৃজনশীলতা ধ্বংস করবেন না। বর্তমান ছাত্ররা মেধাবী নয়, তা মানতে রাজি নই। তবে এটি মানতে হবে, তাদের মেধার মান উন্নত করার যথেষ্ট সুযোগ আছে, সার্বিক পরিবেশের কারণে তা তারা করতে পারে না। এটি সম্ভব স্কুল কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক আর সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হোক সব কোচিং সেন্টার । স্কুলে ভালো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক দেওয়া হোক, পড়ালেখার পরিবেশ উন্নত করা হোক। আমার বাড়ির সামনে একটি প্রাইমারি স্কুল আছে। তাতে ইসলামিয়াত পড়ানোর কোনো শিক্ষক নেই কয়েক বছর ধরে। বর্তমান মন্ত্রিসভায় যে কজন সফল মন্ত্রী আছেন, নিঃসন্দেহে শিক্ষামন্ত্রী তাঁদের অন্যতম। তাঁর আমলে এমনটি ঘটবে কেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারাটা হচ্ছে স্রেফ চাহিদার চেয়ে জোগান কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় হাজার আসনের বিপরীত তিন লাখ দুই হাজার ৬৩ জন ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল। প্রতি আসনের জন্য ৪৬ জন। এ জোগানটা বাড়াতে হবে। আবার এটাও ঠিক, সবাইকে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে কেন? সারা বিশ্বে বর্তমানে কারিগরি বৃত্তিমূলক দক্ষতার মূল্য অপরিসীম। বাংলাদেশে এই শিক্ষায় তেমন একটি প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায় না। মাত্র ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী এই শিক্ষায় আসে। এখানে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার বিকল্প নেই। পরীক্ষা পাসের নম্বর বাড়িয়ে নাকি শিক্ষার মান বাড়ানোর একটি অভিনব চিন্তা করা হচ্ছে, যা নিতান্তই বোকামি। পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর শিক্ষার মানের মাপকাঠি নয়। শিক্ষক নিয়োগে পৃথক কমিশনের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এটি উত্তম প্রস্তাব। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতনকাঠামো প্রয়োজন। শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে পারলে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যাবে। যেসব শিক্ষক এ কাজ করতে অক্ষম তাঁদের আলু-পোটলের ব্যবসা করা ভালো।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Wednesday, September 10, 2014

বাংলাদেশ থেকে ভালোবাসা নিয়ে by আবদুল মান্নান

২২ ঘণ্টার এক ঝটিকা সফর শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেন গত রোববার। ১৪ বছরের মধ্যে এটি কোনো জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর। শেষবার ২০০০ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিরো মরি বাংলাদেশ সফর করেন। তখনো বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, ২০১৪ সালেও তিনি স্বপদে বহাল আছেন।
জাপান বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন-সহযোগী দেশ। গত ৪০ বছরে বাংলাদেশকে জাপান আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের পর যে কয়েকটি দেশ সাহায্য নিয়ে প্রথমে এগিয়ে এসেছিল, তার মধ্যে জাপান অন্যতম। ১৯৭৩ সালের ১৭ অক্টোবর এক সপ্তাহের সফরে প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জাপান সফর করেন। সেই সফরে একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সম্মতিপত্র স্বাক্ষর হয়েছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল যমুনা নদীর ওপর বহুমুখী সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই। সেই সফরের সময় বঙ্গবন্ধু টোকিওর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। স্বাক্ষর করেছিলেন তাঁদের অতিথি বইয়ে।
গত ২৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে তাঁকে তাঁর বাবার সেই ‘জয় বাংলা’ লেখাসংবলিত স্বাক্ষরটি দেখালে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। সেই আনন্দঘন মুহূর্তে আমার সুযোগ হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকার। ২৮ তারিখের সংবাদ সম্মেলনে এক জাপানি সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ২০১৬-১৭ মেয়াদে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত অস্থায়ী আসনটি বাংলাদেশ জাপানের সমর্থনে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবে কি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কোনো সরাসরি উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসে বলেন, সেটি তিনি দেশে গিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলে সেখানে তাঁকে হয়তো একটা সারপ্রাইজ দেবেন।
বাংলাদেশ এর আগে ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৯৯-২০০০ সালে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল এবং শেষের বার নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জাপান। তখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সক্ষমতা সম্পর্কে জাপান পুরোমাত্রায় ওয়াকিবহাল এবং এবারও দুই দেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে ফলাফল ভিন্ন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। বাংলাদেশ বিশ্বাস করেছে, জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ষদের আলংকারিক সদস্য হওয়ার চেয়ে জাপানের মতো বিশ্বের তৃতীয় অর্থনৈতিক পরাশক্তির সঙ্গে সহযোগিতার বন্ধনটাকে আরও মজবুত করা দেশের জন্য অনেক বেশি লাভজনক।
সেদিন যেতে যেতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বাংলাদেশ কি জাপানের পক্ষে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবে? তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে একটু মুচকি হেসেছিলেন। নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যদের খুব বেশি একটা ক্ষমতা থাকে না৷ কারণ, কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভোটাভুটি হলে তা পাঁচটি বৃহৎ শক্তির যেকোনো একটি ভেটো দিয়ে বাতিল করে দিতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যের সংখ্যা ১০।
অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার এক অনুজ প্রতিম সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছে, বিশ্বব্যাংকের অনুরোধে জাইকা পদ্মা সেতু থেকে সরে গিয়েছিল আর শেখ হাসিনা জাপানের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে নিরাপত্তা পরিষদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বেগম জিয়া কূটনৈতিক চালে শেখ হাসিনার সঙ্গে পারবেন কেন?
তাঁর মন্তব্যের গুরুত্ব আছে। অবশ্য বিএনপি বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারকে সমর্থন করেনি। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, আমাদের এককালের পররাষ্ট্রসচিব শমসের মবিন চৌধুরী বলেছেন, এটি একান্ত দলীয় সিদ্ধান্ত। তাঁর মতে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। এটি একটি নজিরবিহীন মন্তব্য, কারণ এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই দেশে একটি সরকার থাকে। বর্তমান সরকারকে বিএনপি স্বীকার না করতে পারে, সেটি তাদের বিষয়। তবে একজন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব যদি ‘উইন উইন’ পরিস্থিতি না বোঝেন, তাহলে তা দুঃখের বিষয়।
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তি হলে রাতের এক টিভি টক শোয় চারদলীয় জোট সরকারের আমলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান মন্তব্য করেছিলেন, যে বিষয় নিয়ে মিয়ানমারও সন্তুষ্ট, সেটিতে বাংলাদেশের বিজয় কীভাবে হলো, বোঝা গেল না। উইন উইন পরিস্থিতি শুধু শমসের মবিন বোঝেন না তা নয়, অনেকেই বোঝেন না।
শিনজো আবের এই ঝটিকা সফর থেকে কী পেল বাংলাদেশ? শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক জাপান সফরের সময় শিনজো আবে ঘোষণা করেছিলেন, আগামী চার-পাঁচ বছরে জাপান বাংলাদেশকে ছয় বিলিয়ন অথবা ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তা দেবে। শিনজো আবে জাপান সরকারের এই অঙ্গীকারের কথা বাংলাদেশে এসে পুনরুল্লেখ করেছেন। এরই মধ্যে ১ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবের সঙ্গে জাপানের ২২টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন প্রতিনিধি এসেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও বাংলাদেশের ৫০ জন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি নিজ খরচে জাপান সফর করেছেন। উভয় সফরেরই অন্যতম উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা। দুদেশের মধ্যে আন্তদেশীয় বাণিজ্য সব সময় জাপানের অনুকূলে থেকেছে। গত অর্থবছর জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ৮৬২ মিলিয়ন ডলার আর যার বিপরীতে বাংলাদেশ জাপান থেকে আমদানি করেছে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশের আগ্রহ সব সময় রপ্তানি বৃদ্ধির চেয়ে বাংলাদেশে জাপানি পঁুজি আকৃষ্ট করা, কারণ জাপানে জনসংখ্যা দ্রুত কমছে আর তাদের অভ্যন্তরীণ বাজার ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকালে জাপান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পণ্য উৎপাদনকারী দেশ ছিল।
বর্তমানে জাপানে এই পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আছে ঠিক, তবে তাদের বেশির ভাগ পণ্যই অন্য দেশে উৎপাদিত হয়৷ কারণ, জাপানের উৎপাদন খরচ দিয়ে সে দেশের পণ্য অন্য দেশে রপ্তানি করা প্রায় অসম্ভব। এখন জাপানের টয়োটা গাড়ি থেকে শুরু করে মিতসুবিসির পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি বা সংযোজন হয় চীন, ভারত, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, মেক্সিকো, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে কারণ এসব দেশে উৎপাদন ব্যয় অনেক কম।
তবে চীন প্রতিযোগিতার একাধিক অস্ত্র হারাতে বসেছে৷ কারণ, চীনেও এখন শ্রমিকদের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বাড়তির দিকে৷ ফলে চীন এখন ধীরে ধীরে কম মূল্যের পণ্যসামগ্রী, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য প্রস্তুত বন্ধ করে দিচ্ছে। চীন তাদের দেশের নাগরিকদের জন্য পোশাক বাংলাদেশ থেকেও আমদানি করছে।
জাপানের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তাদের উৎপাদনব্যবস্থা বা ম্যানুফ্যাকচারিং, যা আর নিজ দেশে সম্ভব হচ্ছে না। একটি সময় আসবে, যখন চীন থেকেও তারা তাদের কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলবে এবং পুঁজি নিয়ে অন্য কোনো গন্তব্যস্থল খঁুজবে। বিশ্বায়নের যুগে পঁুজির কোনো দেশ বা জাতীয়তা নেই। এই যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প নিয়ে আমরা এত গর্ব করি দেখা যাবে, আগামী দুই দশক পর এই খাতের আর বৃদ্ধি হচ্ছে না কারণ এই শিল্পে যারা পঁুজি বিনিয়োগ করে, তারা তাদের কলকারখানা বন্ধ করে অন্যত্র, হতে পারে তা মিয়ানমার বা কম্বোডিয়ায় হিজরত করেছে।
এমনটি ঘটেছিল মঙ্গোলিয়ায়। ২০০৪ সালে যখন বস্ত্র খাত থেকে কোটাপদ্ধতি উঠে গেল, তখন মঙ্গোলিয়ার ২০টি তৈরি পোশাক কারখানা রাতারাতি বন্ধ করে দিয়ে পঁুজি বিনিয়োগকারীরা চীনে চলে গিয়েছেন। বেকার হয়েছিলেন ২০ হাজার শ্রমিক। ধরে নিতে হবে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রমরমা অবস্থা চিরস্থায়ী নয়। আমাদের নিজেদের পঁুজি খুবই সীমিত। সুতরাং বাংলাদেশের প্রয়োজন ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে পঁুজি বিনিয়োগ, যা এখন খুবই নগণ্য৷ কারণ, এই খাতে পুঁজি বিনিয়োগ করলে তা তুলে আনতে সেবা খাতের চেয়ে অনেক বেশি সময় প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশে যেটুকু বিদেশি পুঁজি আসছে, তার সিংহভাগই সেবা খাতে। এই খাত কর্মসংস্থান করে যৎসামান্য। যেমন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ টেলিকম কোম্পানি মাত্র চার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। কিন্তু একটি গাড়ি সংযোজন কারখানা, বস্ত্রকল, পেট্রোকেমিক্যাল, জাহাজ নির্মাণ কারখানা, ওষুধ প্রস্তুতকারী কারখানা অথবা ইস্পাত কারখানা অনেক বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করে, যা ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে প্রয়োজন এবং যা জাপানের পক্ষে এই দেশে করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি৷ কারণ, আমাদের সক্ষমতার অভাব।
কথায় কথায় আমরা বলি, আমাদের সস্তা শ্রম আছে। কিন্তু তাদের প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদের উৎপাদনশীলতা এই অঞ্চলে সর্বনিম্ন। বলি আমাদের আছে বন্দর। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে নিয়মিত যে ভানুমতীর খেল হয়, তা দেখে কেন ভিনদেশের কেউ এ দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করতে আসবে? গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক কলকারখানা চালুর অপেক্ষায় আছে। চট্টগ্রামে গেলে মনে হয়, এই শহরে বাংলাদেশ সরকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই শহরে সরকারের ভেতর সরকার, তার ভেতরে আরও অনেক সরকার। কে যে আসল সরকার, তা বোঝা মুশকিল।
শুধু জাপান নয়, বাংলাদেশে আরও অনেক দেশীয় পুঁজি আসবে৷ তবে তার জন্য চাই সক্ষমতা বৃদ্ধি। শুধু সস্তা শ্রম আর বন্দরের কথা বললে হবে না। প্রয়োজন সুশাসন, দুর্নীতি বন্ধ করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা, দক্ষ জনশক্তি আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ২০১৩ সালে দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনটি হলে জাপান নয়, ভুটানও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসবে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সফরসঙ্গী হয়ে বুঝেছি, কেন অনেকে বলেন, তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করা দুরূহ। এমন কথা যদি তাঁর সরকারের অারও ১০-২০ জন সম্পর্কে বলা যেত, তাহলে বাংলাদেশ যেতে পারত অনেক দূর। শুধু জাপান নয়, সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব অটুট থাকুক।
আবদুল মান্নান: গবেষক ও বিশ্লেষক, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Friday, August 1, 2014

সংলাপ? এজেন্ডা কী হবে? by আবদুল মান্নান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০১১ সাল থেকে একটিমাত্র বিষয় ঘুরেফিরে এখনো আলোচনায় আসছে, আর তা হচ্ছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি এখনো তাদের সেই দাবি নিয়ে বেশ সোচ্চার। এমনকি ঈদের দিন দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি আর দলীয় নেতা-কর্মীদের জন্য দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তাঁর এই দাবির কথা পুনরুল্লেখ করতে ভোলেননি। তিনি সব সময় একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন এবং তা হচ্ছে, এ মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন দিয়ে বর্তমান সরকারকে বিদায় নিতে হবে।
মানলাম, বর্তমান সরকার খুবই খারাপ সরকার কিন্তু এমন একটি অসাংবিধানিক ব্যবস্থায় যদি নির্বাচন হয়ও, বেগম জিয়া কীভাবে বুঝলেন, এই ‘খারাপ সরকার’ বিদায় হবে? নাকি তাঁর কাছে এমন কোনো গোপন তথ্য আছে, যা অন্য কারও জানা নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাংলাদেশ আবিষ্কার করেনি। কারণ, এমন ব্যবস্থার অধীনে সদ্য স্বাধীন অনেক দেশে ইতিপূর্বে নির্বাচন হয়েছে। তবে অন্য সব দেশে প্রচলিত সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী একটি বিদায়ী সরকারের অধীনেই পরবর্তী সংসদ বা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের আগে আন্দোলনরত তিন জোট এই মর্মে ঘোষণা করেছিল, একবার এরশাদের পতন হলে কমপক্ষে তিনটি নির্বাচন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে এবং সেই সরকারের রূপরেখা কী হবে, তা–ও তিন জোট তাদের রূপরেখায় বর্ণনা করেছিল।
১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি এবং তাদের তখন অঘোষিত মিত্র জামায়াত বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনেই হওয়ার কথা ছিল কিন্তু ১৯৯৪ সালে মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপি ভয়াবহ কারচুপির আশ্রয় নিলে অন্যান্য রাজনৈতিক দল বুঝে ফেলে, বেগম জিয়ার সরকারের আমলে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাদের এই বিশ্বাস আরও পাকাপোক্ত হলো, যখন ১৯৯৫ সালে ঢাকা-১০ আসনে উপনির্বাচনের নামে খোদ রাজধানীতেই একটি নির্বাচনী তামাশার মাধ্যমে বেগম জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুকে জেতানো হলো। অথচ এই দুটি নির্বাচন এসব তামাশার মাধ্যমে জেতার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ, এই দুই উপনির্বাচনে হারলেও বিএনপির কোনো ক্ষতিই ছিল না। এই দুই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি গণদাবিতে পরিণত হয় এবং শেষমেশ অনেক টালবাহানা করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচন করে বেগম জিয়া সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন।যেই সংসদে এই সংশোধনী পাস করা হয়, সেই সংসদে বঙ্গবন্ধুর খুনি আবদুর রশীদও সদস্য ছিলেন।
১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনটি এই সংশোধনীর আওতায় করা হয় কিন্তু এই প্রথম নির্বাচনটিও নির্ঝঞ্ঝাটে হয়েছিল বলা যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালনকালে অনেক বিতর্কিতভাবে সেনাপ্রধানের অগোচরে সেনাবাহিনীতে বিএনপির দলীয় রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস কিছু রদবদল করলে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের পরিস্থিতি বেশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। অনেকে সামরিক অভ্যুত্থানেরও আশঙ্কা করেন। ত্রয়োদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সরকারের সব ক্ষমতা প্রধান উপদেষ্টার হাতে ন্যস্ত করলেও সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রপতির অধীনে রাখা হয়। হঠাৎ সেনাবাহিনীতে রদবদল, পুরো সেনাবাহিনীতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার পর অনেকের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে, সংবিধান সংশোধনের সময় একটি বদমতলবে সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রপতির অধীনে রাখার ব্যবস্থা হয়েছিল। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্দলীয় থাকলেও রাষ্ট্রপতি তো দলীয়ই থাকবেন।
তবে সে–যাত্রায় জাতি একটি মহাসংকট থেকে নিস্তার পেয়েছিল সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বিচক্ষণতা আর দূরদর্শিতার কারণে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল এবং সময়মতো সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিচারপতি লতিফুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমান সরকার গঠনের আগে থেকেই পুরো প্রশাসনকে তছনছ করা শুরু করেন এবং তাঁর সাথি হন প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু সাঈদ। সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ী হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম জিয়ার মেয়াদকাল ছিল নানাভাবে দেশে এবং দেশের বাইরে আলোচিত-সমালোচিত। নির্বাচনে পরপরই দক্ষিণবঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসে এক ভয়াবহ দুর্যোগ। ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, উচ্ছেদ, খুন, জখম হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা। যার ফলে কয়েক হাজার মানুষ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে অনেকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান হাওয়া ভবন থেকে চালু করেন একটি বিকল্প প্রশাসন। এই ভবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে দেশের অর্থনীতিবিধ্বংসী দুর্নীতির এক ভয়াবহ বলয়। বাংলাদেশ হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের একটি অভয়ারণ্য আর অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের একটি নিরাপদ রুট। এসব অপকর্মের মচ্ছবে সরকার থাকে নির্বিকার।
২০০৬ সালের মেয়াদ শেষে পূর্বনির্ধারিত সংসদ নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়ে যায় বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘায়িত করার নীলনকশা প্রণয়নের কাজ। যখন ২০০৪ সালে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা দুই বছর বাড়ানো হয়, যার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল বিএনপির পছন্দসই একজনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা। অবশ্য পরবর্তীকালে সেই নির্ধারিত প্রধান বিচারপতি এই পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাঁর সম্মান রক্ষা করেছিলেন। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। ২০০৬ সালে কে হবেন প্রধান উপদেষ্টা, যখন এ নিয়ে সারা দেশে এক চরম অশান্তি আর রক্তক্ষরণ, তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টা বনে যান। শুরু হয় আরেক সংকট, যার ফলে আসে এক-এগারো। ২০০৮ সালের নির্বাচনটিও একধরনের অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কারণ, সংবিধানের বাধ্যবাধকতা ছিল এই রকম একটি সরকারের মেয়াদ ছয় মাস থাকবে, যা ছিল দুই বছর।
২০০৯ থেকে ২০১৩, এই মেয়াদে সংসদে বিরোধী দল ছিল বিএনপি-জামায়াত কিন্তু তারা তাদের আসন রক্ষার বাধ্যবাধকতার কারণ ছাড়া কখনো সংসদে উপস্থিত থাকেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার জন্য বিএনপি-জামায়াত ২০১৩ সালে এত জানমালের ক্ষতি করল, তা তো সরকার নয়, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করে দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে এম সলিম উল্লাহ নামের একজন আইনজীবী হাইকোর্টে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট মামলা করেন।মহামান্য আদালত দীর্ঘ শুনানির পর ২১-০৭-২০০৩ তারিখে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য সুপারিশ করেন। তখন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায়। প্রকৃতপক্ষে ÿসংবিধানের (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬-এর আইনগত অবস্থান নিরূপণই এই মামলার একমাত্র বিচার্য বিষয় ছিল।২০১১ সালে দীর্ঘ শুনানি, অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত ইত্যাদি বিবেচনাপূর্বক মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই মর্মে ২০১২ সালে রায় প্রদান করেন এবং রায়ে বলেন, ‘তর্কিত সংবিধানের (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬-কে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হইল এবং ইহা অবশ্যই অবৈধ।’ এই ছিল মূল মামলার চূড়ান্ত আদেশ বা রায়। বাকি যা আছে তা হলো আদালতের পর্যবেক্ষণ বা মন্তব্য। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘...তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাময়িকভাবে শুধু পরবর্তী দুইটি সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে থাকিবে কি না সে সম্বন্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের প্রতিনিধি জাতীয় সংসদ লইতে পারে।’ জাতীয় সংসদ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং যেহেতু জাতীয় সংসদ সার্বভৌম, সেহেতু জাতীয় সংসদের ওপর বাইরের কারও খবরদারি চলে না। রায়ে আরও বলা হয়, জাতীয় সংসদ এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেখান থেকে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের বাদ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। মহামান্য আদালত পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, বরং ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু জনগণের নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্যদের দ্বারা গঠিত হইতে পারে, কারণ, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র, প্রজাতান্ত্রিকতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের basic structure এবং এই রায়ে উক্ত বিষয়গুলির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে।’
ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বলে, বিএনপি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবিতে রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থিতিশীল করতে হুমকি দেয়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তা যদি করার চেষ্টা করা হয় এবং তাকে কেন্দ্র করে অন্য আর একজন যদি আদালতের শরণাপন্ন হন, তাহলে কী হবে? আগের অবস্থায় ফিরতে হলে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। এর চেয়ে উন্নত কোনো উপায় দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের জানা থাকলে তা জনগণের সঙ্গে শেয়ার করলে দেশের মানুষ উপকৃত হবেন। আর যদি বিএনপি এবং তার মিত্ররা আন্দোলনের নামে আবার দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাহলে সেই ভোগান্তি থেকে তারাও নিস্তার পাবে না। তারা সব সময় সংলাপের কথা বলে। কিন্তু সেই সংলাপের তো একটি অর্থবহ ও বাস্তবমুখী এজেন্ডা থাকতে হবে। শেখ হাসিনা বিগত সময়ে সংলাপের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। আর বিএনপি যদি সামনের নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। দেশে গণতন্ত্রের স্বার্থে একাধিক বিরোধী দল থাকাটা বাঞ্ছনীয়। দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কারও লাভ নেই। কারও আগ্রহ থাকলে ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ের ৩৮৮ পৃষ্ঠার বইটি বাজারে পাওয়া যায়। সংরক্ষণের জন্য একটি অসামান্য দলিল।
আবদুল মান্নান: বিশ্লেষক ও গবেষক।

Wednesday, July 16, 2014

কোনো বিষয়ে ঢালাও মন্তব্য ঠিক নয় by আবদুল মান্নান

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সংক্ষেপে টিআইবি সাংগঠনিকভাবে একটি এনজিও, কাজ করে বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বা টিআই-এর হয়ে। নানা কারণে নন্দিত ও নিন্দিত। বার্লিন থেকে টিআই জানাল, বিশ্বের ৯১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। সবদিকে ঢি ঢি পড়ে গেল। আওয়ামী লীগের শাসনামলে এমন একটি কলঙ্কের তিলক বাংলাদেশের ভাগ্যে জুটল? কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, সে বছরই বাংলাদেশ এই জরিপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং তালিকার নিচে একটা টীকা ছিল, যা কেউই বা কোনো গণমাধ্যম উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করেনি; এমনকি টিআইবিও না। টীকায় লেখা ছিল, ‘সামগ্রিকভাবে সাতটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগৃহীত ১৪টি উৎস থেকে প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে এই সূচক তৈরি করা হয়েছে।’ টীকায় আরও লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশের উপাত্ত শুধু তিনটি উৎস থেকে সংগৃহীত হয়েছে এবং এই উপাত্তগুলোর মধ্যে তারতম্য ব্যাপক। যদিও গড় স্কোর ০.৪ (১০-এর মধ্যে)। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই স্কোরের ব্যবধান -১.৭ থেকে +৩.৮ পর্যন্ত বিস্তৃত, যা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। সুতরাং, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ফলাফল গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’
তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে দুর্নীতি নেই। আলবত বাংলাদেশে সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি আছে এবং টিআই প্রতিবছর এই ধরনের
সূচকও তৈরি করছে। একমাত্র জর্ডান ছাড়া অন্য কোনো আরব দেশ টিআইয়ের জরিপের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, থাকলে নিশ্চিতভাবে বেশ ওপরেই থাকত, এমনকি চ্যাম্পিয়নও হতে পারত। পরের বছর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমন টীকা ছিল না এবং বিএনপি আমলের চার বছরই দুর্নীতির তালিকার শীর্ষে ছিল।
সম্প্রতি টিআইবি ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেশ আলোচিত ও সমালোচিত হচ্ছে। একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে গত ৩০ জুন টিআইবি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা ইতিমধ্যে পত্রপত্রিকার কল্যাণে জনগণ জেনেছে। জনগণকে যা জানানো হয়েছে, তা হলো ১. নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতামূলক দুর্নীতির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা লাভজনক পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে; ২. এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চরম অনিয়ম ও দুর্নীতিগ্রস্ত; ৩. এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্টিফিকেট বিক্রয় হয় এবং তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জড়িত; ৪. সব কার্যক্রমে ট্রাস্টি বোর্ড হস্তক্ষেপ করে; ৫. শিক্ষার মান খারাপ; এবং ৬. সর্বোপরি সুশাসনের বড় অভাব।
টিআইবি দাবি করেছে, এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণপূর্বক প্রণীত একটি গুণগত ‘গবেষণা’। তারা আরও বলেছে, ‘তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ২২টি নির্বাচিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য, উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, সিন্ডিকেট সদস্য, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তথ্য সংগৃহীত হয়েছে।’
এসব কাজে তারা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দলীয় আলোচনা; সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনের সভা ও নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়কে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা এও বলেছে যে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর এই জরিপকাজ চালানো হয়েছে, তা দৈবচয়নের ভিত্তিতে বাছাই করা হয়েছে এবং এই কাজ তারা ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সম্পন্ন করেছে। প্রতিবেদনে কিছু ভালো পর্যবেক্ষণ, মন্তব্য ও সুপারিশ থাকলেও তা পত্রপত্রিকায় বিন্দুমাত্র প্রতিফলিত হয়নি, বরং সংবাদটি প্রায় সংবাদপত্রে এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যাতে মনে হবে, এই মুহূর্তে দেশে উচ্চশিক্ষাঙ্গনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই খলনায়ক।
পুরো বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও উপাচার্যদের নিয়ে একটি বৈঠক করেন। শিক্ষামন্ত্রীর এমন উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার, কারণ তিনি বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন। সভায় সবাই বলেছেন, টিআইবির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এমন একটা ঢালাও মন্তব্যসূচক প্রতিবেদন সমগ্র খাতকে ÿক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তাঁরা এও বলেছেন, বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ও মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান, টিআইবি থেকে কেউই তাঁদের অথবা তাঁদের দপ্তরের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে এই বিষয়ে কোনো আলাপ করেননি এবং প্রতিবেদনের কোনো কপিও তাঁদের কাছে প্রেরণ করেননি। সভায় এই প্রতিবেদনকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং দাবি করা হয়, টিআইবি যদি ঢালাওভাবে আনীত অভিযোগগুলো প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই দিন প্রথম আলো কর্তৃক পরিচালিত পাঠক জরিপে ৬২ দশমিক ৪২ শতাংশ উত্তরদাতাও এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। টিআইবি তাদের প্রতিবেদন ডাকযোগে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
এর আগে আমি প্রথম আলোতে লিখেছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়ার সংখ্যা কমছে। সে দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নামধারী প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোকে ‘ব্রিফকেস’ বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়, যেখান থেকে পাঁচ-সাত হাজার ডলার দিলে পিএইচডি ডিগ্রি পর্যন্ত পাওয়া যায়। বেশ কয়েকজন পাঠক আমার এই মন্তব্যে ÿক্ষুব্ধ হয়ে তা চ্যালেঞ্জ করেছেন। ওয়েবসাইটে গেলে তাঁরা আমার বক্তব্যের সত্যতা খুঁজে পাবেন। ২৮ জুন থেকে ৪ জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত ইকোনমিস্ট পত্রিকা যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষার হালফিল অবস্থা নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে তারা লিখেছে, ২০১২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ২ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা কমছে। ঠিক এমনই অবস্থা হয়েছিল বছর দশেক আগে যখন ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে তাদের কিছু কলেজকে বেসরকারি খাতে দিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। চারদিক থেকে তীব্র প্রতিবাদের মুখে সে যাত্রায় তারা তা করা থেকে বিরত থেকেছে।
টিআইবির গবেষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন না করেও কয়েকটি প্রশ্ন তো করা যেতেই পারে। তারা ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর জরিপ চালিয়েছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যাতে মোট বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়ার ৬১ শতাংশ পড়ে। এগুলোর মধ্যে ১৮টি আছে, যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ ভঙ্গ করে পরিচালিত হচ্ছে, যার বিরুদ্ধে মঞ্জুরি কমিশন ব্যবস্থা নিতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে। কারণ, এরা সবাই উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিয়ে তাদের কর্মকাল পরিচালনা করছে। এই ধরনের মামলার সংখ্যা বর্তমানে ৪৫টি, যার মধ্যে একাধিক ফৌজদারি মামলাও আছে।
নির্বাচিত ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এসব বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত কি না, তা পরিষ্কার নয়। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স সর্বসাকল্যে ২২ বছর। এরই মধ্যে ১৭টি নিজস্ব ক্যাম্পাস কার্যক্রম পরিচালনা করছে আর ১১টি করছে আংশিকভাবে। ১৩টি ইতিমধ্যে নিজেদের জমি সংগ্রহ করেছে। এই বিষয়গুলো গণমাধ্যমে আসেনি। বিশ্বের অন্যতম সেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ডের বয়স ৪০০ বছর। অক্সফোর্ডের ৯০০। আর বাংলাদেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৯৪ বছরে পদার্পণ করল আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স কেবল ২২ বছর। ৪০০ বছরের বা ৯০০ বছরের পথ ২২ বছরে পাড়ি দেওয়ার কথা বললে তো হবে না।
উচ্চ টিউশন ফি নিয়ে টিআইবির বড় অভিযোগ। তারা প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভেদে টিউশন ফির ভিন্নতা লক্ষণীয়। বলেছে, ‘প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একক বেতন ও ফি-কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে।’ এমন ব্যবস্থা দুনিয়ার কোথাও নেই। ফি নির্ভর করে প্রোগ্রামের মানের ওপর। প্রোগ্রামের মান ও সুযোগ-সুবিধা ভালো হলে ফি বেশি দিতেই হবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় আর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিলে মঞ্জুরি কমিশনের হিসাবমতে অন্যগুলোর মাথাপিছু পৌনঃপুনিক ব্যয় গড়ে ৭০ হাজার টাকার ওপর, যার প্রায় ৯০ শতাংশ সরকারি তহবিল থেকে ভর্তুকি হিসেবে আসে। অর্থাৎ, এগুলো জনগণের টাকা। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকার থেকে কোনো অনুদান তো পাওয়ার প্রশ্নই আসে না, বরং যদি কোনো উদ্বৃত্ত (অপারেটিং সারপ্লাস) থাকে, তাহলে তার ওপর ১৬ শতাংশ কর দিতে হয়। এসব বিষয় টিআইবির প্রতিবেদনে স্থান পেলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ত। টিআইবি সুপারিশ করেছে, অর্থ কমিটিতে সরকারি কোনো প্রতিনিধি না থাকায় অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতার অভাব আছে। সরকারি প্রতিনিধি থাকলেই যে সবকিছু স্বচ্ছ হবে, তার গ্যারান্টি কী? দেখা গেছে, যেসব কমিটিতে সরকারি প্রতিনিধি আছেন, তাঁরা কদাচিৎ এসব কমিটির সভায় উপস্থিত থাকেন।
টিআইবি এই সেক্টরে ভয়াবহ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ, উপঢৌকন গ্রহণ, বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে যোগসাজশ, না পড়িয়ে বা ক্লাস না নিয়ে অর্থের বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রি, উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, ট্রেজারার নিয়োগে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ঘুষ প্রদান, যার মধ্যে মন্ত্রণালয় ও মঞ্জুরি কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা ইত্যাদি বিষয়ে ঢালাও মন্তব্য করেছে। টিআইবির এই প্রতিবেদনের ফলে অথবা যেটুকু সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, তার কারণে একধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। দুজন মেধাবী ছাত্র এসে আমার কাছে জানতে চেয়েছে, তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো পাস করেছে। তারা এখন বিদেশে পড়াশোনার জন্য আবেদন করতে চায়, তবে টিআইবির এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর তারা শঙ্কিত। জনস্বার্থে টিআইবির উচিত সব ধরনের সন্দেহ ও বিতর্ক দূর করা, তাতে সবাই লাভবান হবে। কেউ বলবে না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম নেই, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তো নয়ই। সেসব অনিয়ম দূর করার জন্য মন্ত্রণালয় ও মঞ্জুরি কমিশন চেষ্টা করছে, তবে তাদেরও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়। তাই, যেকোনো বিষয়ে ঢালাও মন্তব্য করলে তা অনেক ÿক্ষতির কারণ হতে পারে। বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা একটি বড় সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করেছে, তাকে আঁতুড়ঘরেই গলা টিপে হত্যা করাটা সমীচীন নয়।

আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Tuesday, July 1, 2014

দেশে দেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রতারণা by আবদুল মান্নান

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর বাংলাদেশ তিন মেরুর তিন দেশ। সাম্প্রতিক কালে তিন দেশই একটি অভিন্ন সমস্যায় ভুগছে, আর তা হচ্ছে উচ্চশিক্ষায় নানামুখী সংকট। একসময় বাংলাদেশের ছাত্ররা যুক্তরাষ্ট্রে পড়ালেখা করার জন্য যেতে কত রকমের চেষ্টা-তদবির করতেন। যুক্তরাষ্ট্র আবার ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো বোঝে। তারা টোএফএল, জিআরই, জিমেট, স্যাট—কত রকমের পরীক্ষার পসরা সাজিয়ে সারা দুনিয়ার ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার তুলে নিত। এই পরীক্ষায় পাস করা ছিল সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তির পূর্বশর্ত।

এখন এসবের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয় না। বলে, ঘাটতি থাকলে তাতে সমস্যা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে আসতে পারলে আমরাই তোমাদের ঘাটতি পুষিয়ে দেব। তবে ঢালতে হবে এক কাঁড়ি ডলার। গত শনিবার পত্রিকান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে একটি এদেশীয় এজেন্ট বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছে, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এগুলোর প্রায় সবই প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়।
যুক্তরাজ্যে ৬০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে সম্প্রতি, কারণ তারা ভর্তি-বাণিজ্য করছিল। এ দুটি দেশের উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে আলোচনায় পরে আসছি। আগে নজর ফেরাই নিজের দেশের দিকে।
কয়েক দিন আগে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। নিয়োগ পেয়েছেন বেশি দিন হয়নি। জানতে চাই, কেমন চলছে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়। জবাবে বললেন, চেষ্টা করছেন, কিন্তু তেমন ভালোভাবে চালাতে পারছেন না। প্রথমে ছাত্রলীগ নামধারী মাস্তানরা নানা অজুহাতে প্রায়ই ক্যাম্পাস অচল করে দেয়। আগে তাদের সঙ্গে অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘাত হতো। বর্তমানে ক্যাম্পাসে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর তেমন তৎপরতা নেই। ফলে ছাত্রলীগ নিজেরাই ভাগ হয়ে একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয় আর হানাহানি করে।
উপাচার্য জানালেন, তাঁর এলাকায় নতুন উপদ্রব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। সাংসদ থেকে উপজেলা পরিষদের সদস্য—কেউ বাদ যাচ্ছেন না। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডে নাক গলাতে চান। পদ না থাকলেও বলেন, তাঁর পছন্দ মাফিক লোকজনকে চাকরি দিতে হবে। না দিলে দেখে নেওয়ার হুমকি। সবাই মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি যেহেতু তাঁর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত, সেহেতু এটি তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি। বুঝতে চান না যে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য একটি নিজস্ব আইন আছে। এটি মনে করিয়ে দিলে তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘আমাকে আইন দেখাবেন না।’
উপাচার্যদের এমন অসহায় অবস্থা আগে কখনো দেখা যায়নি। কদিন আগে আমার আগের কর্মক্ষেত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম চ্যান্সেলরের মনোনীত সদস্য হিসেবে বার্ষিক বাজেট অধিবেশনে অংশ নিতে। অস্বীকার করার উপায় নেই, এই বিশ্ববিদ্যালয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো চলছে। সেশনজট থেকে অনেকটা মুক্ত। প্রচুর উন্নয়নের কাজ হচ্ছে। মাঝেমধ্যে উল্লিখিত ওই ছাত্রসংগঠনের নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট হানাহানির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অচল থাকে। একবার এ বিষয়ে লিখেছিলাম বলে আমি সেখানে অবাঞ্ছিত ঘোষিত হয়েছিলাম।
সিনেট অধিবেশনে একজন সদস্য জানতে চাইলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অফিস কেন ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে চলছে? অবাক করার বিষয় হচ্ছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে কোনো দপ্তরেই পূর্ণকালীন অফিসপ্রধান নেই। এই না থাকার কারণ, বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা পর্যায়ে যেসব নিয়োগ হয়েছিল, তা সব সময় যোগ্যতার ভিত্তিতে হয়নি। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই অনিয়ম অনেক সময় হয়েছে। কেন কোনো অফিসে পূর্ণকালীন অফিসপ্রধান নেই, তা নিশ্চয় সবাই অনুমান করতে পেরেছেন। ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে অফিসপ্রধান নিয়োগের ব্যবস্থা আছে, বিশেষ করে রেজিস্ট্রার পদে। অনেক সময় প্রেষণেও আনা হয়। প্রয়োজনে বাংলাদেশেও এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের চিন্তা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার নজরদারি করার জন্য আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। দুটিরই কর্ণধার দুজন যোগ্য ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। কিন্তু তাঁদের পক্ষে সব সময় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনা প্রত্যাশা অনুযায়ী করা সম্ভব হয় না। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের অনেকটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল, যদিও তা বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। এই প্রথমবার একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হলো, যাকে নিয়ে তেমন বিতর্ক ওঠেনি।
২০১০ সালে নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। এটিও নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ৷ কিন্তু সেই আইনে অনেক অসংগতি আর অবাস্তব ধারা রয়ে গেছে, যা অনেকবার উল্লেখ করেছি। যেমন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হলে এক একর অখণ্ড জমির বাধ্যবাধকতা। এমন অবাস্তব শর্ত বিশ্বের অন্য কোনো দেশে আছে বলে জানা নেই। হওয়া উচিত ছিল ছাত্র অনুপাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গার প্রাপ্যতা। ঢাকা শহরে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেখানে ১৫ থেকে ২০ হাজার ছাত্র ভর্তি আছেন। তাঁরা কোথায় বসে ক্লাস করেন, কারা পড়ান, তার খোঁজ কি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কখনো নেওয়ার চেষ্টা করেছে? প্রায়ই মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ চৌধুরী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা দেখে অনেকটা আহাজারি করেন, কিন্তু কাজ হয় না। সম্প্রতি কমিশন ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে শনাক্ত করে বলেছে, এগুলো অবৈধভাবে তাদের কার্যক্রম চালু রেখেছে। এরপর কিন্তু মঞ্জুরি কমিশনের আর কিছু করার থাকে না কারণ তাদের নানা সীমাবদ্ধতা আছে। আর যেসব বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এই কথাগুলো বলা হচ্ছে, দেখা যাবে সেগুলোর সঙ্গে অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি জড়িত আছেন।
অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী নিয়মিত প্রতারিত হচ্ছেন। ভর্তি-বাণিজ্য কথাটি বহুল প্রচলিত। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কলেজে ছাত্রনেতারা এই বাণিজ্য করেন।কিন্তু কজনে জানেন, কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বাণিজ্যের সঙ্গে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের বেশ কিছু সদস্যও জড়িত আছেন? শিক্ষক পদেও নিয়োগের বাছাইপর্বে বোর্ড সদস্যদের কোনো ভূমিকা থাকা উচিত নয়। কিন্তু কিছু হাইপ্রোফাইল বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলোয় বোর্ড সদস্য যাকে নিয়োগ দিতে বলেন, তার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা উপাচার্য বা নির্বাচনী বোর্ডের নেই।এখানেও বাণিজ্য হয় বলে অভিযোগ আছে।
মঞ্জুরি কমিশন বলছে, তারা অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল করবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পড়ালেখার মান পরিমাপ করার জন্য। ভালো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে, কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন বাদ যাবে? অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো বিভাগ আছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থার চেয়ে খারাপ। অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল হলে তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। আর বর্তমান অবস্থায় মঞ্জুরি কমিশন এই কাজটুকু কতটা সাফল্যের সঙ্গে করতে পারবে, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কমিশনকে উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তর করার দাবি বহু পুরোনো। সম্ভবত ২০০৭ সালেই আমি প্রথমবার এ বিষয়ে লিখেছিলাম। এ পর্যন্ত কাজ হয়নি কিছু। তবে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার নামে সরাক্ষণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যারা ভালো করার চেষ্টা করছে, তাদের উৎসাহিত করতে হবে। মনে রাখা ভালো, বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি আছেন। আর সরকার বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাংলাদেশে চরম বৈষম্যমূলক শর্তে যে স্টাডি সেন্টার খোলার অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা পুনরায় ভেবে দেখতে বলব। এটি হতে পারে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম। উচ্চশিক্ষা নিয়ে সেই দেশে যে বাণিজ্য হয়, তা অন্য কোনো দেশে চিন্তাও করা যায় না। পাঁচ থেকে সাত হাজার ডলার খরচ করলে দেশের একটি অদৃশ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে কেউ পিএচডি ডিগ্রি পর্যন্ত পেয়ে যেতে পারেন। বাংলাদেশে এমন পিএইচডি শ খানেক তো আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে সে দেশে বলা হয় ‘ব্রিফকেস বিশ্ববিদ্যালয়’। সে দেশের সমস্যা হচ্ছে, তাদের ভ্রান্ত ভিসানীতির ফলে সে দেশে বি দেশি ছাত্রের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া। আর তাদের দেশের ছেলেমেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা বর্তমানে তেমন নেই।
যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা নিতে হলে আগের চেয়ে তিন গুণ অর্থ খরচ করতে হয়। সে দেশের ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন আসছেন না। তাঁদের ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের ছাত্রছাত্রীদের ওপর। সেই সুযোগে প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে উচ্চশিক্ষার নামে সেখানে গড়ে উঠেছে অনেক কলেজ আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতারিত হচ্ছেন লাখ লাখ টাকা খরচ করে যাওয়া এ দেশের মতো অনেক দেশের ছাত্রছাত্রীরা। তাঁদেরটা তাঁরা দেখবেন। এখন সময় আমাদের নিজেদেরটার দিকে নজর দেওয়ার। এই নজর কে বা কারা দেবেন, তা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তা না হলে এ ক্ষেত্রে নৈরাজ্য চলতেই থাকবে।
আবদুল মান্নান
লেখক: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Saturday, June 21, 2014

রাষ্ট্র ও শিক্ষা- উচ্চশিক্ষায় নানামুখী সংকট by আবদুল মান্নান

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নিজ হাতে ‘শ্রদ্ধেয় স্যার’ লিখে ‘খ্যাতিমান শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের’ নিয়ে সম্প্রতি একটি সভা আহ্বান করেছিলেন তাঁর মন্ত্রণালয়ে। সেই সভায় অন্যদের সঙ্গে আমিও আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। মন্ত্রিসভায় যে কজন যোগ্য ও সৎ মন্ত্রী আছেন, তাঁদের মধ্যে নুরুল ইসলাম নাহিদ একজন। ইদানীং লক্ষ করেছি, একধরনের সমালোচক আছেন, তাঁরা দাবি করেন, নুরুল ইসলাম নাহিদ বা মতিয়া চৌধুরী শতভাগ খাঁটি আওয়ামী লীগার নন, তাই তাঁদের স্থলে ‘শতভাগ’ খাঁটি আওয়ামী লীগার বসানো উচিত। তাঁরা ভুলে যান যে অযোগ্য ও অপদার্থ ‘শতভাগ’ খাঁটি আওয়ামী লীগার দেশের ও দলের দুই শ ভাগ ক্ষতি করতে পারেন, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ নারায়ণগঞ্জ অথবা ফেনী।

আগের লেখায় আমি কেন নারায়ণগঞ্জ নিয়ে কিছু উল্লেখ করিনি, তার জন্য অনেকে সমালোচনার নামে আমাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। তাঁদের বোঝা উচিত, আক্রমণ আর সমালোচনা এক জিনিস নয়। যাক, সেটি অন্য প্রসঙ্গ। সময়মতো সেই সভায় উপস্থিত হয়ে কিছুটা বিস্মিত হই, কারণ কদাচিৎ কোনো সভায় এত বিশিষ্টজনের উপস্থিতি দেখেছি। যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই রাজনীতিরও তেমন সম্পর্ক নেই। অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক অনুপম সেন, অধ্যাপক হারুন উর রশিদ, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, লেখিকা সেলিনা হোসেন—কেউ বাদ যাননি।
তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন সময় সরকারের নানা কাজের সমালোচনা করেন। কদিন আগে অনুজপ্রতিম মুহম্মদ জাফর ইকবাল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ করেছেন। অনেকেই মনে করেছিলেন, শিক্ষামন্ত্রী এই সভা সম্ভবত এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য আহ্বান করেছেন। সভায় উপস্থিত থেকে বুঝতে পারলাম, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচিত হলেও শিক্ষার অন্য দিকগুলোও বাদ যায়নি। অভিজ্ঞতা বলে, সব আওয়ামী লীগ সরকারই শিক্ষাবান্ধব ছিল। প্রাইমারি শিক্ষকদের সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দেওয়া থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কলেজ, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো, বছরের শুরুতে বিনা মূল্যে প্রায় ৩১ কোটি বই স্কুলশিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া—এসব কাজই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হয়েছে। তবে কেউ যদি মনে করেন যে এই কাজগুলোর সবটাই শতভাগ সঠিকভাবে হয়েছে, তাহলে তা সত্যের অপলাপ হবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সরকারের সদিচ্ছা ছিল কি না।
সেদিন শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা হলেও সব বিষয়ে স্বল্প পরিসরে পত্রিকার পাতায় আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই, কারণ এই পর্যায়ে শিক্ষার সঙ্গে আমি নিজে চার দশকের বেশি সময় ধরে সম্পৃক্ত। সেটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন দেশে শুধু ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, যার মধ্যে বিশেষায়িত ছিল দুটি। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা ২০ হাজারের বেশি নয়। বর্তমানে দেশে ৩৬টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এ ছাড়া দেশের গাজীপুরে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং চট্টগ্রামে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন নামে দুটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশনের (বিমক) ২০১২ সালের হিসাবমতে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এক লাখ ৯৭ হাজার ২৭৮ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করেন, যার মধ্যে ৪৫ শতাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ৫৫ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বাদে)। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার যে চরম সংকট চলছে, তা নিয়ে সেদিন কিছু আলাপ হলেও তা অসম্পূর্ণ ছিল৷ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার সংকট সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উভয় ক্ষেত্রেই প্রকট।
একটা সময় ছিল, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাইতেন। সেটি এখন আর হয় না, কারণ বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যে বেতন পান, তা অনেক ক্ষেত্রে একজন গাড়িচালকের বেতনের চেয়েও কম। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলে তাঁর জন্য তাঁর সহকর্মীরা এক দিনের বেতন দেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে একটি পা হারিয়েছেন। তাঁর একটি কৃত্রিম পা সংযোজন করতে প্রায় এক লাখ টাকার প্রয়োজন। অর্থ–সহায়তা চেয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বরাবর আবেদন জানিয়ে অপেক্ষা করছেন। প্রায় সব দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল আছে, নেই শুধু বাংলাদেশে। অন্য শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ, তাঁরা মানুষ গড়ার কারিগর।
সম্প্রতি এডিবি প্রকাশিত জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের সূচকের তলায় আছে বাংলাদেশ। আমাদের নিচে মিয়ানমার। এই সূচক আমাদের মানবসম্পদের মানের অবস্থা নির্ণয় করে। বাংলাদেশে অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এক হাজার ৬৮৭টি কলেজ আছে, যার অনেকগুলোতেই মাস্টার্স পর্যায়ে শিক্ষাদান করা হয়, কিন্তু এসব কলেজে না আছেন কোনো উন্নত মানের শিক্ষক, না আছে কোনো গ্রন্থাগার অথবা পরীক্ষাগার। আমার সুযোগ হয় পাবলিক সার্ভিস কমিশন পর্যায়ে মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে বসতে। গড়ে সেখানে যে মানের প্রার্থীরা হাজির হন, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। শিক্ষার্থীদের এই অজ্ঞতার দায়ভার তো তাঁদের নয়; বরং তাঁদের শিক্ষকদের তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। শিক্ষক না শেখালে শিক্ষার্থী কোথা থেকে শিখবে? এসব কলেজের অধিকাংশই বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়। আবার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নত মানের শিক্ষক না পাওয়ার কারণ অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অথবা সংশ্লিষ্ট বিভাগের কতিপয় শিক্ষক। এই শিক্ষকদের অনেকেই নির্বাচনী বোর্ডে অথবা বিভাগের পরিকল্পনা কমিটিতে থাকেন। তাঁদের সব সময় চেষ্টা থাকে, কীভাবে তাঁদের অনুগত একজন অযোগ্য ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিভাগের বারোটা বাজানো যায়। এ রকম একাধিক শিক্ষককে প্রায়ই দেখি বিভিন্ন টিভির টক শোতে জাতিকে নসিহত করছেন।
অন্যদিকে আছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পৌনঃপুনিক বাজেট বরাদ্দে সব সরকারেরই ভয়াবহ কৃপণতা। গত ৪০ বছরে এই পর্যায়ে বরাদ্দের পরিমাণ শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দের এক ভাগের বেশি কখনো হয়নি। সরকার বলে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে হবে। তা কী উপায়ে সম্ভব, তা বলা হয় না। কোনোভাবেই ছাত্রদের বেতন বাড়ানো সম্ভব নয়। দুই টাকা বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে উপাচার্যের জীবন নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। একশ্রেিণর ছাত্র মনে করেন, শিক্ষা কোনো দান নয়, তাঁদের অধিকার। কিন্তু এই কথাটি প্রাইমারি বা সেকেন্ডারি শিক্ষার বেলায় শতভাগ সত্য, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নয়৷ উচ্চশিক্ষা সব সময় নির্বাচিতদের জন্য। সরকারের উচিত কারিগরি শিক্ষায় যতটুকু সম্ভব ভর্তুকি দিয়ে সেই শিক্ষাকে উৎসাহিত করা আর যাঁরা মেধাবী কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ার মতো সক্ষমতা নেই, তাঁদের নিখরচায় পড়ার সুযোগ করে দেওয়া। যে ছাত্রটি পকেটে অর্ধলক্ষ টাকার স্মার্টফোন নিয়ে ঘোরেন, তাঁকে কেন ২০ টাকা মাসিক বেতনে পড়তে দিতে হবে?
এ তো গেল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা। গত দুই দশকে দেশে ৭৯টি বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এটি ভালো লক্ষণ৷ তবে এখানের সমস্যাগুলো ভিন্নমাত্রার। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সত্যিকার অর্থেই সার্টিফিকেট-বাণিজ্য করে, কিন্তু তাদের আইনের আওতায় আনার সক্ষমতা বিমকের নেই। এই ঢাকা শহরেই একাধিক হাইপ্রোফাইল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, বাজারে যাদের প্রচুর ‘সুনাম’। কিন্তু কজনে জানেন এগুলোর অনেকটাই ‘ওপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট’? এ অবস্থার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী এগুলোর প্রতিষ্ঠাতারা, যাঁরা একটি মুদি দোকান আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে অক্ষম। তবে এসবের পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বেশ কটি মানসম্পন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে, তা স্বীকার করতেই হবে।
সরকার ২০১০ সালে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করেছে। তার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। কিন্তু এই আইনে অনেক অসংগতি রয়েছে। বাংলাদেশে জমির পরিমাণ যেখানে এমনিতে কম, সেখানে বলা হয়েছে যে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য এক একর অখণ্ড জমি থাকতে হবে। এটি একেবারেই একটি অপ্রয়োজনীয় ধারা। বিশ্বের সব দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ছাত্র অনুপাতে বর্গফুট মাপা হয়, জমির পরিমাণ নয়। কদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সময় তাঁর সঙ্গে জাপানের দ্বিতীয় পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় ওসাদায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৫০ হাজার ছাত্র আর সাড়ে ছয় হাজারের ওপরে শিক্ষক আছেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, কোনো এক একর জায়গার ওপর নয়। সরকার বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশে বৈষম্যমূলক শর্তে শাখা ক্যাম্পাস অথবা কোচিং সেন্টার খোলার অনুমতি দিয়েছে। এটি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে। এসব বিষয়ে সেদিনের সভায় কম-বেশি আলোচনা হয়েছে৷ তবে তা কতটুকু ফল বয়ে আনবে, তা শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর সরকারের ওপর নির্ভর করে।
শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আবেদন থাকবে, তাঁর সেদিনের ডাকা সভাটি যেন নিষ্ফল না হয়, সেদিকে তিনি লক্ষ রাখবেন।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Friday, June 13, 2014

শুদ্ধ আওয়ামী লীগ চাই, হাইব্রিড নয় by আবদুল মান্নান

একেবারে দলকানা অথবা স্তাবক না হলে সবাই স্বীকার করবেন, বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে একধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছে। আমার এই মন্তব্যে অনেকে ক্ষুব্ধ হতে পারেন, তার পরও সত্য কথাটি না বললে নিজেকে নিজের কাছে অপরাধী মনে হবে। প্রতিদিন সকালে যখন পত্রিকার পাতা খুলি আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্যে দিনের বেলায় খুনের খবর পড়ি; তখন স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের অবস্থার কথা মনে পড়ে যায়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্র জামায়াত আর ইসলামী ছাত্র সংঘের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা। তারা কৌশলে তখন লেবাস পাল্টে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল), পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন চীনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মিশে যায়। এসব দলই ছিল গলাকাটা রাজনীতির প্রবক্তা। গঠিত হয় জাসদ আর গণবাহিনী। অনেকে সেখানে গিয়েও ভিড় করে। এরা সবাই জোটবদ্ধ হয়ে তখন শুরু করে দেশের ভেতর নানা ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড আর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বেপরোয়াভাবে হত্যা। আজ এই পাটের গুদামে আগুন লাগে তো কাল ওই নেতাকে হত্যা করা হয়।

এই সময় সবচেয়ে ভয়াবহ অন্তর্ঘাতমূলক ঘটনাটি ছিল ঘোড়াশাল সার কারখানার কন্ট্রোল রুমে বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণে কারখানার শুধু ব্যাপক ক্ষতিই হয়নি, একই সঙ্গে নিহত হন বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আবদুল হক ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ‘আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন করে চিঠি লিখে তাঁর কাছে শেখ মুজিবকে উৎখাত করার জন্য অর্থ, অস্ত্র ও বেতারযন্ত্র সহায়তা চান, যা ভুট্টো তাঁর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিগত সহকারীর কাছে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার জন্য পাঠিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষের হাতে দলের প্রায় ৭০ জন নেতা-কর্মী নিহত হন, যাঁদের মধ্যে কয়েকজন সাংসদও ছিলেন। পরিস্থিতি দ্রুত ক্রমাবনতির দিকে যেতে থাকে। একটি নতুন অনভিজ্ঞ সরকারের জন্য এটি ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসবের প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন করেছিলেন, যাঁদের সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এঁদের অনেকেরই নিয়মিত সেনাবাহিনীতে যাওয়ার নির্ধারিত যোগ্যতার ঘাটতি ছিল। বঙ্গবন্ধু মনে করেছিলেন, এঁদের আধা সামরিক বাহিনীর আদলে গড়ে তুলে দেশের ক্রমাবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে কাজে লাগাবেন। কিন্তু এই কাজে তিনি খুব বেশি সফল হয়েছিলেন তা বলা যাবে না। ইদানীং রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে অনেক সমালোচনা শোনা যায়, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর রক্ষীবাহিনীর সব সদস্যকে জেনারেল জিয়া নিয়মিত সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণ করেন৷
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হলেও বর্তমানের ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সারা দেশে সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে নিজেরাই নিজেদের খুন করছে।বাদ যাচ্ছে না ছাত্রলীগের হাতে ছাত্রলীগ খুন বা যুবলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, রাজশাহী—কোনো অঞ্চল বা জেলা বাদ যাচ্ছে না। নিজেদের মধ্যে এই হানাহানির সুযোগ নিচ্ছে প্রধানত জামায়াত-শিবির। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে তারা ছাত্রলীগের একজন নেতার পায়ের গোড়ালি কেটে দুই টুকরা করে দিয়েছে, তার নৃশংসতা নজিরবিহীন। সার্বিক বিচারে এটা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, আওয়ামী লীগ নামক দলটির অস্তিত্ব এখন অনেকটা হুমকির মুখে। দলের প্রধান শেখ হাসিনাই এই দলটির হাল ধরে রেখেছেন।
সম্প্রতি আমার সুযোগ হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে তাঁর সঙ্গে জাপান যাওয়ার। তাঁর এই সফর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সফল, কথাটি যাঁরা অস্বীকার করবেন, বলতে হয় তাঁরা শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতাই করছেন অথবা তাঁদের মধ্যে একধরনের হীনমন্যতা কাজ করে। যাত্রার আগে ও বিমানের ভেতরে অনেকে আমাকে বলেছেন, ‘একজন শেখ হাসিনা দেশের জন্য কত কষ্ট করেন, কিন্তু তাঁর সব অর্জন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দেন তাঁর নিজ দলেরই কিছু অপরিণামদর্শী নেতা-কর্মী, স্রেফ ব্যক্তিস্বার্থে। তাঁর চারপাশে যাঁরা তাঁকে ঘিরে থাকেন, তাঁরা কতটুকু তাঁর বা দলের মঙ্গল চান তা কি তিনি ভেবে দেখেছেন?’ দেশে ফেরার পর অনেকে জানতে চান, এই প্রসঙ্গে আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কোনো কথা হয়েছে কি না। বলি, তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। এঁরা সবাই যে সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তা নয়, কিন্তু তাঁরা শেখ হাসিনার বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। তাঁরা তাঁর সরকারের বিকল্প দেখছেন না। এঁদের প্রায় কারও ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই।
পটুয়াখালী থেকে একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ফোন করে জানান, তাঁর বয়স ৮৫। তিনি সেই বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে আওয়ামী লীগের একজন সমর্থক। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দলটি কোনো ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হোক, দেখতে চান না। তাঁর মতে, এক ছাত্রলীগই এই দলটির সর্বনাশ করছে। তাঁকে বলি, যারা এই কাজটি করছে তারা ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্ত।ছাত্রলীগের আদর্শে বিশ্বাস করে তেমন কোনো ব্যক্তি এমন আত্মঘাতী কাজ করতে পারে না। সেই স্কুলশিক্ষক তার পরও অনুরোধ করেন, আমি যেন এই দুর্বৃত্তদের কথা লিখি। তাঁকে বলি, ছাত্রলীগ নিয়ে কিছু লিখতে চাই না কারণ, এতে তেমন কোনো কাজ হয় না। একবার লিখেছিলাম। ফল হয়েছিল, তারা আমাকে আমার আগের কর্মক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল।
সুযোগ পেলেই নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর আর পাবনার কথা সবাই বলেন। বলেন, এসব এলাকার ‘গডফাদারদের’ দল থেকে বহিষ্কার করলে দলের কোনো ক্ষতি নেই। একই সঙ্গে ছাত্রলীগ আর যুবলীগ নামধারীদের লাগাম টেনে ধরলে সাধারণ মানুষের কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বাস্তবে আওয়ামী লীগের এই শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতের সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। দলের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে সভানেত্রী একাধিকবার বলেছেন দলের ভেতরে, বিশেষ করে ছাত্রলীগে অনেক জামায়াত-শিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং এর ফলে মূল দল এবং ছাত্রলীগ উভয়ই হাইব্রিড ‘নেতা-কর্মী’ দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছে৷ এর দায়-দায়িত্ব তো একান্তভাবে দলকেই নিতে হবে। বুঝতে হবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে জামায়াতের অস্তিত্ব এখন হুমকির সম্মুখীন। তারা চাইবেই যেভাবে হোক তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এবং দলের ক্ষতি করার জন্য আওয়ামী লীগের ভেতরে অনুপ্রবেশ করতে। এই পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সতর্ক হওয়ার বদলে অনেককে দেখা যাচ্ছে, তাদের ফুলের তোড়া দিয়ে সাদরে দলে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছেন। এই নেতারা নিশ্চয় এত বোকা নন যে এটা বুঝতে অক্ষম—কেউটে সাপের বাচ্চা কেউটে সাপই হয়। দলের জন্য এমন একটি কাজ যে চরম আত্মঘাতী, তা বোঝার জন্য কোনো বড় মাপের নেতা হওয়ার তো প্রয়োজন নেই।
এরই মধ্যে আবার শুরু হয়েছে জামায়াতকে দল হিসেবে নিষিদ্ধ করা নিয়ে আইনমন্ত্রীর দেওয়া একটি বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা। এমনিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারের রায় প্রকাশে বিলম্বের কারণে কিছুটা হলেও বিভ্রান্তি আর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। তার ওপর জামায়াতের বিচার নিয়ে আইনমন্ত্রীর এই অপ্রয়োজনীয় উক্তি। পরিস্থিতিকে আরও একটু ঘোলাটে করে দিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তাঁর মিন্ত্রসভার সদস্যকে সমর্থন করলেন। এসবের কোনোটাই প্রয়োজন হতো না, যদি আইনমন্ত্রী বিষয়টা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করতেন। দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার অনেক আইন আছে। একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ঠিকই জানেন কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

সরকারের আইনমন্ত্রী তাঁর বাবার মতো একজন প্রথিতযশা আইনজীবী, কিন্তু এখনো সম্ভবত তিনি একজন রাজনীতিবিদ হয়ে উঠতে পারেননি। গণজাগরণ মঞ্চকে প্রতিপক্ষ বানানোর মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। এর ফলে সাধারণ মানুষ ভুল সংকেত পাচ্ছে। এসব থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্যই ক্ষতির কারণ। এসব বিষয় কেবল একজন শেখ হাসিনাকে বুঝলে হবে না, বুঝতে হবে দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে। সাধারণ মানুষের অনেককে বলতে শুনেছি, তাঁরা ‘বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে’ ফেরত চান। তাঁদের বলি, চাইতে দোষ নেই, কিন্তু তা কতটুকু পাওয়া যাবে তা নির্ভর করে দলের অর্বাচীন নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে শেখ হাসিনা কতটুকু কঠোর হতে পারেন তার ওপর৷ তাঁদের অভয় দিয়ে বলি, সাম্প্রতিক কালে শেখ হাসিনা কিছু কিছু ব্যাপারে একাধিক কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনিই দলকে সঠিক পথে আনতে পারেন। এরই মধ্যে মঙ্গলবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হলো। সেই সভায় তিনি সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সব পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন।হুঁশিয়ার করেছেন দলের অর্বাচীন নেতা-কর্মীদের। এই কাজ তিনি আগেও করেছেন, কিন্তু তা তেমন একটা কাজে আসেনি। দলের সাধারণ সম্পাদকের এলাকায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে কোনো কাউন্সিল হয় না বলে আমাকে বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন। পরিস্থিতি যদি তেমনটা হয়, তাহলে দলের অবস্থা তো দুর্বল হবেই। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার চেয়ে দলে সময় দেওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তেমন নেতা আওয়ামী লীগে কজন আছেন? আগেও বলেছি, আবারও বলি—সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় মনে হয়, শেখ হাসিনা একাই পাহাড় ঠেলছেন৷ এ অবস্থায় খুব বেশি দূর অগ্রসর হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের বিকল্প আওয়ামী লীগ নিজেই, তবে তা হতে হবে শুদ্ধ আওয়ামী লীগ, হাইব্রিড নয়।

আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Monday, May 12, 2014

হঠাৎ কেন এই মহা আবিষ্কার? by আবদুল মান্নান

৪ মে খালেদা জিয়া জাতীয় প্রেসক্লাবে গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের নৃশংস সাত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ডাকা দলীয় নেতা-কর্মীদের দিনব্যাপী ‘অনশন’ ভাঙাতে। এদিন তিনি শেষ আধা ঘণ্টা আগে এই ‘অনশনে’ যোগ দেন আর দলীয় নেতা-কর্মীদের শরবত খাইয়ে ‘অনশন’ ভাঙান। শেষে বেগম জিয়া একটি বক্তৃতায় সরকারের তুমুল সমালোচনা করেন, কিন্তু কিছু সময় পর হঠাৎ তিনি তাঁর প্রয়াত স্বামী জেনারেল জিয়ার হত্যাকােণ্ডর বিষয়ে চলে যান এবং বলেন, এরশাদই তাঁর স্বামী ও জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করেছেন।

Friday, April 25, 2014

‘অতিমাত্রায় পলিটিক্যাল’ সিনড্রোম by আবদুল মান্নান

২০০০ সালের কথা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের চতুর্থ বর্ষ চলছে। চিন্তা করছি, চ্যান্সেলরকে বলে পদ থেকে ইস্তফা দেব। কারণ, ইতিমধ্যে আমার দু-একজন নিকটজন চ্যান্সেলরের কাছে চিঠিপত্র দিয়েছেন এই বলে যে আমার মতো অযোগ্য উপাচার্য আর হয় না। সুতরাং, আমাকে সরিয়ে যেন তাঁদের পছন্দমতো আরেকজনকে উপাচার্য করা হয়। কারণ, আমি তাঁদের কথামতো নিয়মনীতি ভঙ্গ করে চলতে অস্বীকার করেছি। পরবর্তীকালে সেসব চিঠির কিছু কপি আমার হাতে এসেছিল এবং সেগুলোর আবেদনের ভাষা দেখে আমি অবাকও হয়েছিলাম।

Sunday, April 13, 2014

হারিয়ে যাওয়া ছাত্রলীগের সন্ধানে by আবদুল মান্নান

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত হূদয়ে এই লেখাটি লিখতে বসেছি। কারণ, ঠিক করেছিলাম, ছাত্রলীগ তো নয়ই; বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আর কখনো কোথাও কিছু লিখব না। মাস কয়েক আগে প্রথম আলোয় ছাত্ররাজনীতি আর ছাত্রলীগ নিয়ে আমার এক লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর বেশ তোপের মুখে পড়েছিলাম। সে সময় আমার সাবেক কর্মক্ষেত্রে আমি অবাঞ্ছিত ঘোষিত হয়েছিলাম আর সাবেক একজন ছাত্রনেতা টেলিফোনে আমার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করেছিলেন। তাঁর কাছে বিনীত অনুরোধ করেছিলাম, আমার প্রতি বর্ষিত বাক্যবাণগুলো যেন তিনি লিখিত আকারে প্রকাশ করেন। তিনি তা করেননি বা করার প্রয়োজন মনে করেননি। তবে সুখের বিষয় হচ্ছে, সেই ঘটনার পর আমার আগের কর্মক্ষেত্রের ছাত্রলীগ নামক সংগঠনটির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা আমাকে টেলিফোন করে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং এ-ও বলেছেন, তাঁরা চাপে পড়ে আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে দু-একজন শিক্ষকও আছেন। এই শিক্ষকেরা আবার বঙ্গবন্ধুর নাম বেচে খান এবং কেউ কেউ মনে করেন, তাঁদের পদ-পদবি প্রাপ্তিতে আমি একটি বড় বাধা।

Saturday, March 29, 2014

সামনের লড়াই আরও কঠিন হবে by আবদুল মান্নান

ছাব্বিশে মার্চ ছিল বাংলাদেশের ৪৪তম স্বাধীনতা দিবস। আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ এদিন বেলা ১১টায় ঢাকার জাতীয় প্যারেড ময়দানে সমবেত হয়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেছেন। এ ছাড়া দেশের সব জেলায় যে যেখানে আছেন, এই সময়ে সেখানে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গেয়েছেন। দেশের বাইরেও বাঙালিরা এই সময়ে একই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন।

Thursday, January 23, 2014

রাষ্ট্র ও রাজনীতি- বিএনপির ঘাড়ে সিন্দবাদের বুড়ো by আবদুল মান্নান

আরব্য রজনীর গল্পে আছে, সিন্দবাদ সাতটি সমুদ্রযাত্রা করেছিল। প্রতিটি যাত্রায় তার যত সব রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। সিন্দবাদের পঞ্চম যাত্রার গল্পে আছে, তার কাঁধে এক বুড়ো সওয়ার হয়েছিল।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি- বিএনপির ঘাড়ে সিন্দবাদের বুড়ো by আবদুল মান্নান

আরব্য রজনীর গল্পে আছে, সিন্দবাদ সাতটি সমুদ্রযাত্রা করেছিল। প্রতিটি যাত্রায় তার যত সব রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। সিন্দবাদের পঞ্চম যাত্রার গল্পে আছে, তার কাঁধে এক বুড়ো সওয়ার হয়েছিল।
বুড়ো আবার কাঁধে এমন প্যাঁচ কষে বসেছিল যে সিন্দবাদ বস্তুতপক্ষে বুড়োর ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল। শেষে সিন্দবাদ বিশেষ সুরা তৈরি করে বুড়োকে পান করিয়ে তাকে হত্যা করে। সিন্দবাদ তো বুড়ো থেকে নিস্তার পেতে একটা উপায় বের করেছিল। কারণ, সে বুড়োর জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বিএনপির ঘাড়ে জামায়াত নামের যে বুড়ো বা দৈত্যটি গেড়ে বসেছে, সবার প্রশ্ন, তার কী হবে? কারণ, বিএনপি নামের সিন্দবাদ তো এই দৈত্যটিকে বধ করতে নারাজ।

বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান সম্পর্ক অনেকটা দুজন দুজনার মতো। অবশ্য এর আগে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, বিএনপি-জামায়াত একই মায়ের পেটের দুই ভাই। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে সাম্প্রতিক কালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির যে রাজনৈতিক বিপর্যয়, তার প্রধান কারণ জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি আর দেশ ও সম্পদ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড, যা দেড় বছর ধরে চলে আসছে। আন্দোলনের নামে তাদের মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো ভয়ানক অমানবিক কর্মকাণ্ড বিএনপির অনেক গোঁড়া সমর্থককেও বিএনপিবিমুখ করেছে।

কদিন আগে দায়িত্বশীল বিএনপি ঘরানার এক সরকারি কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন, জামায়াতের খপ্পরে পড়ে বিএনপি নিজের পাকা ধানে মই দিয়েছে। নির্বাচনের আগে অনেকে তাদের ধারণা দিয়েছিল, নির্বাচনে অংশ নিলে ভালো করবে, এমনকি হয়তো সরকারও গঠন করতে পারে। কিন্তু জামায়াত নির্বাচনে যাওয়া থেকে বিএনপিকে বিরত রাখতে পেরেছে। কারণ, বিএনপির ‘আন্দোলন’ আর জামায়াতের ‘আন্দোলন’ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে। বিএনপি চাইছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচন আর জামায়াতের উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো উপায়ে মহাজোট সরকারকে উৎখাত করে বিএনপির সঙ্গে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বানচাল করা। এই দুটি দলই আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

আওয়ামী লীগের অনেক অক্ষমতা আর দুর্বলতা আছে, কিন্তু আওয়ামী লীগের এখনো একটি রাজনৈতিক চরিত্র আছে আর আছেন তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা। অনেকেই আওয়ামী লীগের মতাদর্শের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, বিএনপির তেমন রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। তারা বুঝতে পারে না, সাধারণ মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি সচেতন। লক্ষ করলে, বেগম জিয়ার চারপাশে, যাঁরা তাঁকে সব সময় ঘিরে থাকেন, তাঁরা প্রায় সবাই সাবেক সামরিক-বেসামরিক আমলা। তাঁরা গুলশানের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের আলো-আঁধারে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করেন। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। বিএনপির এই নেতারা মিডিয়ার সামনে এলে, আধো ইংরেজি আধো বাংলায়, যা জনমানুষের কাছে দুর্ভেদ্য, তেমন ভাষায় কথা বলেন। আর সরকার অফেন্সিভে গেলে আত্মগোপন করেন। নির্বাচনের আগে তাঁরা ভিডিওবার্তার সাহায্যে আন্দোলন পরিচালনা করার নতুন সংস্কৃতি চালু করেছেন। শুধু দেশের ভেতর থেকেই আন্দোলনের এমন আহ্বান আসছে, তা-ই নয়, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকেও আন্দোলনের এমন বার্তা পাঠাচ্ছেন। যে রাজনৈতিক দল এমন নেতাদের ওপর ভর করে সরকারবিরোধী রাজনীতি করতে চায়, তারা বোকার স্বর্গে বাস করে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সমালোচকেরা তাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেন, কিন্তু তারা যে একটি সন্ত্রাসী দল, তেমন অভিযোগ একটাও নেই। মিছিল করে যাওয়ার সময় তারা দু-চারটি গাড়িতে আগুন দেয়, পুলিশের সঙ্গে মারদাঙ্গায় লিপ্ত হয় অথবা কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ছাত্রশিবিরের মতো বলা যাবে না তারা গণহারে প্রতিপক্ষের রগ কাটে, গলা কেটে মানুষ হত্যা করে অথবা নির্বিচারে সংখ্যালঘু আর আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়ি বা গ্রামে আগুন দেয়।

এযাবৎ ছাত্রশিবির যত সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে, তার অধিকাংশই ছিল ছাত্রদলের সঙ্গে। আমার আগের কর্মক্ষেত্রে জিয়া পরিষদের সভাপতি ড. এনামুল হকের ছেলে মুসাকে তো ওরা পিটিয়েই মেরে ফেলেছিল। ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আবদুল হামিদ ছাত্রদল ছেড়ে এরশাদের ছাত্রসমাজে যোগ দিয়েছিল। তাঁর হাতের কবজি কেটে কিরিচের মাথায় গেঁথে শিবির ভরদুপুরে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছিল। তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি শিবিরের রাজনীতির একজন বড় বিরুদ্ধবাদী ছিলেন। ড. কাজী আহম্মদ নবী মনেপ্রাণে জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী। তাঁর একমাত্র ছেলে মুসফিক প্রগতিশীল রাজনীতিতে নতুন দীক্ষা নিয়েছেন। এক গুলিতেই তাঁকে শেষ করে দিল শিবিরের সন্ত্রাসীরা। হেলালি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ছাত্রদলের নেতা। তাঁকে ১০ জনে টেবিলের ওপর চেপে ধরে চোখ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সময়মতো শিক্ষকেরা সেখানে হাজির না হলে হেলালি এখন অন্ধ হয়ে হয়তো বেঁচে থাকতেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনয়নে সংসদ নির্বাচন করেছেন। ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে যখন শিবির ছাত্রদলের ওপর হামলা করে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, তখন ক্ষমতায় বেগম জিয়া। তিনি কিন্তু তাঁর দলের আহত সদস্যদের একবারও দেখতে যাননি, গিয়েছিলেন সে সময়কার সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা। দুই নেত্রীর মধ্যে এটাই তফাত।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বেগম জিয়ার অনেক সমর্থক আর উপদেষ্টা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী দেশের এক কূটনীতিককে বাংলাদেশে তাঁদের রাজনৈতিক চালের বিপর্যয়ের কারণে নিজ দেশ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ২০০৬ সালেও ঠিক তেমনটি ঘটেছিল। বিদেশিরা এখন বলছে, বেগম জিয়াকে জামায়াতের সংস্পর্শ ছাড়তে হবে। এত দিনে তারা উপলব্ধি করেছে, জামায়াত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন, কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এই দেশগুলোই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিল, ‘জামায়াত একটি উদারপন্থী রাজনৈতিক দল’। কিন্তু তারা বললেই তো আর বেগম জিয়া বা বিএনপি জামায়াতকে ছাড়তে পারবে না। অদৃশ্য কারণে বিএনপির রাজনীতি জামায়াতের কাছে বাঁধা রয়েছে বলে বিশ্বাস।

সোমবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জনসভা করল। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, এটি ১৮ দলের জনসভা। পরে জানা গেল, এটি বিএনপির জনসভা। জামায়াতকে নাকি সভায় আসতে নিষেধও করা হয়েছিল। জামায়াত এসেছিল, কিন্তু ব্যানার ছাড়া। সঙ্গে ছিলেন হেফাজতের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী। মঞ্চেও জামায়াতের নেতারা ছাড়া শরিক দলগুলোর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রামেও অনুরূপ একটি সমাবেশ হয়েছিল এবং সেখানে মঞ্চে জামায়াতের নেতারা বক্তব্য দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মঞ্চে জামায়াতকে দেখে আর মঞ্চে ওঠেননি। নিচে বসে তাঁর ছাত্রদের বলেছেন, এখনো যদি বিএনপির বোধোদয় না হয়, তাহলে তাদের ভবিষ্যতে ভালো তো কিছু দেখি না।

বেগম জিয়ার সব উপদেষ্টা হিসেবে সামরিক-বেসামরিক আমলা ছাড়াও আছেন বেশ কিছু আইনজীবী নতুবা বাস্তব জীবন-জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু বুদ্ধিজীবী আর সুশীল ব্যক্তি। একজন আইনজীবী সেদিন জানান, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে শতভাগ লাভ বিএনপির। কারণ, জামায়াতের সবাই কাতারবন্দী হয়ে বিএনপিতে যোগ দেবে। এই না হলে উপদেষ্টা। তিনি বুঝতে পারেননি অথবা বুঝতে চাননি, জামায়াত হচ্ছে একটি ভাইরাস। দেহে প্রবেশ করলে দেহটাকে ধ্বংস করে দেবে। জামায়াত যদি বিএনপির সঙ্গে একীভূত হয়, তাহলে বিএনপিও যে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হয়ে উঠবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

কোনো কোনো বিএনপি-সমর্থক পেশাজীবী বিএনপিকে বাহবা দিচ্ছেন এই বলে, তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নাকি মানুষ ৫ জানুয়ারি ভোট দিতে যাননি। তাঁরাও বিএনপির ৫ শতাংশ ভোট-তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। ৫ জানুয়ারি অনেক কেন্দ্রে ভোট কম পড়েছে সত্য, কিন্তু তা স্রেফ বেগম জিয়া বা বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘটেছে, তা বিশ্বাস করা চরম আহাম্মকি। যে মাত্রায় সহিংসতা নির্বাচনের আগের কয়েক দিন হয়েছে, তাতে স্বাভাবিকভাবে মানুষ ভোট দিতে যাবে, তা তো আশা করা যায় না। বেগম জিয়ার এসব সর্বনাশা সমর্থক গোষ্ঠী তাঁকে মনে করিয়ে দেয়নি, নির্বাচনের আগের রাতে যদি ২০০ স্কুল, মাদ্রাসা আর কলেজ ভোটকেন্দ্র হওয়ার ‘অপরাধে’ জামায়াত-বিএনপির দুর্বৃত্তরা আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়, তাহলে সেসব কেন্দ্রে কোন ভরসায় ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন? ২০০৮ সালের নির্বাচনে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এককভাবে ৪২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। নির্দয়ভাবে এখান থেকে ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভোট ছাঁটাই করলেও আওয়ামী লীগের একেবারে ‘দলকানা’ ভোটার ৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ। নির্বাচন ঠেকানোর নামে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা সারা দেশে এই ভয়াবহ তাণ্ডব না চালালে আওয়ামী লীগ কমপক্ষে এই ভোটগুলো তো পেত।

যদি নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ৪০ শতাংশ হিসাব বিশ্বাস না করেন, তাই বলে ৫ শতাংশ বিশ্বাস করতে হবে কেন? বিএনপির কাঁধ থেকে জামায়াত নামের সিন্দবাদের সেই দৈত্য বা বুড়োটাকে তারা নামাবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এককভাবে তাদের। কিন্তু দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে হলে দেশে একাধিক সুস্থধারার রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। তেমনই একটি দল হিসেবে বিএনপি নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। তাদের উপলব্ধি করতে হবে, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে পাঁচ বছরের আগে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষমতা তাদের নেই। আওয়ামী লীগ অন্য চিন্তা করলে ভিন্ন কথা। বাস্তববাদী হওয়া মঙ্গল।

আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Tuesday, January 7, 2014

সন্ত্রাসে গৌণ শতাংশের হিসাব by আবদুল মান্নান

কথায় কথায় অনেকে সদ্য সমাপ্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে খালেদা জিয়ার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করেন। এটিও খালেদা জিয়ার নির্বাচনে না যাওয়ার মতো এক ধরনের বোকামি বৈ অন্য কিছু নয়। ১৯৯৬ সালের সেই নির্বাচনে প্রায় এক কোটি ৩২ লাখ ভুয়া ভোটার ছিল। ছবিযুক্ত কোনো ভোটার তালিকা ছিল না। এটি সত্য, সেই নির্বাচন বর্জন করার জন্য আওয়ামী লীগ ডাক দিয়েছিল; কিন্তু পেট্রোল বোমা মেরে তারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেনি, দিনের পর দিন অবরোধ ডেকে জনজীবন বিপর্যস্ত করেনি অথবা রেললাইন তুলে ফেলার মতো কোনো নাশকতামূলক ঘটনাও ঘটায়নি । ঘটেনি সারাদেশে প্রায় ৪০ হাজার গাছ কাটার মহোৎসব অথবা আক্রান্ত হয়নি কোনো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রাম। যারা দশম সংসদ নির্বাচনকে ১৯৯৬ সালের সেই নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করেন, তারা তা খুব ভালো উদ্দেশ্যে করেন না।
নানা তর্ক-বিতর্ক, জল্পনা-কল্পনা আর অভূতপূর্ব সব ঘটনার প্রেক্ষাপটে ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন শেষ হলো। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আর তার মিত্ররা। অনেক সময় সুশীল সমাজের আলোচকরা মনে করিয়ে দেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি আর তার মিত্ররা ৩০ ভাগের ওপর ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা কখনও বলেন না আওয়ামী লীগ আর তার মিত্ররা সেই নির্বাচনে ৪৯ ভাগ ভোট পেয়েছিলেন, যার মধ্যে এককভাবে আওয়ামী লীগের ভোট ছিল ৪২ ভাগ। সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের সর্বাত্মক জীবন হরণকারী ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের ফলে নিঃসন্দেহে নির্বাচন প্রক্রিয়া অনেক স্থানে ব্যাপকভাবে বিঘি্নত হয়েছে। নির্বাচনের আগের কয়েকদিন সহিংসতার যে রূপ দেখা গেছে আর তাতে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা ছিলেন আতঙ্কগ্রস্ত; কিন্তু তার মধ্যেও অনেক কেন্দ্রে ভোটাররা লাইন ধরে ভোট দিয়েছেন। এবার নির্বাচনী সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত প্রায় দেড়শ' স্কুল, কলেজ আর মাদ্রাসা, যেগুলো বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসীরা অগি্নসংযোগ করে ভস্মীভূত করেছে। এসব শিক্ষালয়ের সঙ্গে পুড়েছে পাঠ্যপুস্তক আর জাতীয় পতাকা। মাদ্রাসায় পুড়েছে পবিত্র কোরআন শরীফ। এই শিক্ষালয়গুলো প্রতি পাঁচ বছরে এক কি দু'দিন ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়; কিন্তু বাকি সময় সেগুলো পড়ালেখার কাজে ব্যবহৃত হয়। বলা বাহুল্য, এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরাই জড়িত। পাকিস্তানে তালেবান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তারা সব স্কুল পুড়িয়ে দিয়েছে আর বাংলাদেশে জামায়াত যে তালেবান ব্র্যান্ডের মতাদর্শে বিশ্বাস করে, তা তারা আরেকবার প্রমাণ করল। নির্বাচনের আগের দিন ঠাকুরগাঁওয়ে সন্ত্রাসীরা একজন রিটার্নিং অফিসারকে নজিরবিহীনভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে, পেট্রোল বোমা মেরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যকে গুরুতরভাবে আহত করেছে, নির্বাচনের কাজে ব্যবহৃত জিনিসপত্রে আগুন দিয়েছে আর বেশ কিছু কেন্দ্রে নির্বাচনের দিন হাতবোমা ফাটিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোটের সর্বশেষ চমকটি ছিল নির্বাচনের আগের রাতে চিকিৎসার নামে প্যারোলে মুক্ত ও লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্রের নির্বাচন বর্জন এবং প্রতিহত করার জন্য ভিডিওবাণী। তিনি অনেকটা একজন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের মতো তার মোল্লা ওমর বা বিন লাদেন স্টাইলে দেওয়া এই ভিডিওবার্তায় দেশবাসীকে শুধু এই নির্বাচন বর্জন করারই আহ্বান জানাননি, তা প্রতিরোধ করারও ডাক দিয়েছেন এবং একই সঙ্গে বাহাত্তরের সংবিধানকে কটাক্ষ করে বলেন, এই সংবিধান গণআকাঙ্ক্ষাবিরোধী। ইদানীং তালেবানি কায়দায় ভিডিওটেপের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘোষণা করা বিএনপির জন্য একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তারেক রহমান এবং এর আগে খালেদা জিয়ার ভিডিওবার্তার পরপরই দেশের বিভিন্ন জেলায় সহিংসতার মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনের আগের দু'দিন আর নির্বাচনের দিন সারাদেশে সহিংসতায় ২০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এর দায়দায়িত্ব পুরোটাই বিরোধী দলকে নিতে হবে। এই নজিরবিহীন সন্ত্রাসের মুখেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দল দেশে হরতাল-অবরোধ ডেকে মানুষের চলাচলে চরমভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। ২০০৮ সালে ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে নিজের এলাকায় ভোট দিতে গেছে, যা এবার সম্ভব ছিল না। এত কিছুর পরও যে অনেক স্থানে মানুষ জীবন বাজি রেখে ভোট দিতে এসেছে, এটাই এই নির্বাচনের জন্য একটি বড় ঘটনা। এমন একটা ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে কত শতাংশ ভোটার ভোট দিল তা এখানে গৌণ।
সদ্য সমাপ্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে স্থগিত বা বন্ধ করতে সরকারের ওপর নানামুখী স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্র্যায়ের চাপ ছিল। তাদের দাবি যেহেতু এই নির্বাচনে বিএনপি এবং তার মিত্ররা অংশ নিচ্ছে না, সুতরাং তাদের সঙ্গে নিয়ে কীভাবে নির্বাচন করা যায়, তা খুঁজে বের করতে হবে। এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, এই শক্তিটির প্রত্যাশা ছিল যে কোনো উপায়ে এ নির্বাচনে বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়া। এতে তাদের কিছু অঘোষিত স্বার্থসিদ্ধি হতো বলে ধারণা। এ মর্মে একাধিক গণমাধ্যমে জরিপ হিসেবে এও প্রচার করা হয়, এ মুহূর্তে নির্বাচন হলে বিএনপি বিপুল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হবে। কিন্তু একটি জায়গায় তারা মারাত্মক ভুল করে বসে। তারা বুঝতে পারেনি, বিএনপি নিজেদের অগোচরেই জামায়াতের ফাঁদে পড়ে গেছে আর যদিও বিএনপি তাদের তথাকথিত আন্দোলনটি করছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বাতিলকৃত ত্রয়োদশ সংশোধনীর পুনর্বহাল করে তার অধীনে নির্বাচনের জন্য কিন্তু জামায়াত তাদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়েছিল স্রেফ যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করার জন্য। বিএনপির বোঝা উচিত ছিল, ত্রয়োদশ সংশোধনীটি বাতিল হয়েছিল তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আর যা মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায় দেন, তা ইচ্ছা করলেও সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়। অথচ তাদের দলে অনেক বড় বড় ব্যারিস্টার রয়েছেন। দ্বিতীয়ত, যখন এই রায়টি হয় তখন এই ব্যারিস্টারদের কেউই রিটটির বিরুদ্ধে একটি রিভিউ পিটিশন করার প্রয়োজন মনে করেনি অথচ তারা কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ কার্যকর স্থগিত করার জন্য মধ্যরাতে চেম্বার জজের বাসভবনে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। পরে হয়তো বিএনপি উপলব্ধি করেছে তাদের এই দাবি অসাড়, তখন তারা দাবি তুলল, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়। তাদের এই দাবিটিও অসাংবিধানিক; কারণ সংবিধানে বলা হয়েছে, সংসদে যে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে তারাই সংসদ নেতা নির্বাচন করবেন, যাকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। সম্প্রতি ভারতে বিজেপি আগামী এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য লোকসভার আগে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ড. মনমোহন সিংয়ের পদত্যাগ দাবি করেছে। কিন্তু মনমোহন সিং তা অসাংবিধানিক বিধায় সে দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সত্তরের দশকে নকশালপন্থিদের দাপটে জনগণের নাভিশ্বাস। ১৯৭২ সালে রাজ্যসভা নির্বাচন ঘোষিত হলো। নকশালরা ঘোষণা করল নির্বাচনে ভোট দিতে গেলে গলা কেটে ফেলা হবে। নির্বাচন বর্জনের নামে ঠিক এমন হুমকিই সম্প্রতি দিয়েছিল বিএনপি আর জামায়াত জোট। নকশালরাও একই কায়দায় ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে, প্রার্থী হত্যা করেছে কিন্তু সরকার পিছু হটেনি। একাধিক জায়গায় নির্বাচন স্থগিত করে তা পরে নিতে হয়েছে। কারণ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করতে। তাদের ইন্ধন জুগিয়েছে কিছু বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থা, এক শ্রেণীর সুশীল সমাজ আর কিছু মিডিয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তো রাগ করে বিজয় দিবসের দিন জাতীয় স্মৃতিসৌধে সম্মান জানাতে না গিয়ে একটি অমার্জনীয় অপরাধ করেছে। শেষ সময়ে এসে সিপিবি, বাসদ, গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের জাসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে জামায়াত-বিএনপির হাতকেই শক্তিশালী করেছে। আরও দুঃখের বিষয় হচ্ছে, নির্বাচন বর্জনের নামে সারাদেশে নির্বাচনের আগের দু'দিন জামায়াত-বিএনপির দুর্বৃত্তরা যে তাণ্ডব চালাল, প্রায় দেড়শ' স্কুলে অগি্নসংযোগ করে তা জ্বালিয়ে দিল, তারা তার কোনো প্রতিবাদও করেনি। এই উপমহাদেশে তাদের পড়ন্ত বেলায়ও বামপন্থিরা এটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ যে, শুধু তত্ত্ব দিয়ে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে মানুষকে বেশি দিন ধরে রাখা যায় না।
নির্বাচনের পর বিএনপি অবরোধের মধ্যে আবার দু'দিনের হরতাল ডেকেছে। অনেকটা অবরোধের সঙ্গে হরতাল ফ্রি। তাদের নতুন দাবি, নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত করতে হবে। ফলাফল প্রকাশ করার পর নিশ্চিতভাবে আবার হরতাল। এবার আসবে নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে। তারপর সংসদ অধিবেশন ডাকা যাবে না অথবা সরকার গঠন করা যাবে না। তবে বিএনপি যতদিন জামায়াতের সঙ্গ না ছাড়ছে, ততদিন তাদের এসব দাবিনামা অধরাই থেকে যাবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ আর শেখ হাসিনার দায়িত্ব অনেকগুণ বেড়ে গেল। তারা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে, যদি বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে সংবিধানের আওতায় নির্বাচন করতে রাজি হয়, তা হলে তারা আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আলাপ করতে প্রস্তুত। এটি একটি উত্তম প্রস্তাব এবং বিএনপি যদি গণতন্ত্র ও সংবিধানে বিশ্বাস করে, তা হলে তারা বিষয়টি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করবে। সংসদীয় গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে দেশে একাধিক শক্তিশালী বিরোধী দল থাকাটা অপরিহার্য। যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে জামায়াত-বিএনপিকে বিপথগামী করেছে বলে সর্বমহলে বিশ্বাস, সেই যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আর শেখ হাসিনার কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হচ্ছে, গত মেয়াদে যাদের কারণে সরকার আর দলের ক্ষতি হয়েছে, যাদের নামে দুর্নীতির সামান্যতম বদনাম আছে তাদের সরকার থেকে দূরে রাখতে হবে।
ভোট দিতে যাওয়ার সময় দুটি ঘটনার কথা বলে লেখাটা শেষ করি। পাড়ার আলী মিয়ার কাছে জানতে চাই, তিনি ভোট দিয়েছেন কিনা। তিনি জানালেন, না, যাননি। কারণ, এবার এই নির্বাচনী এলাকায় নৌকা মার্কার কোনো প্রার্থী নেই। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, সাবেক বামপন্থি জামাল উদ্দিন চাচা লাইনে দাঁড়িয়ে। সালাম দিতেই কিছুটা উত্তেজিত স্বরে জানালেন, ভোট দিতে আসতেন না কিন্তু গত রাতে তারেক রহমানের ভিডিও ভাষণের কারণে তিনি এসেছেন। তিনি বলেন, 'আমাকে তারেক রহমানের কথা কেন শুনতে হবে? ডযড় রং যব?' ছোটকাল থেকেই দেখে আসছি, জামাল চাচা উত্তেজিত হলে ইংরেজিতে কথা বলেন। যদিও এই নির্বাচনটি হয়তো সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল না, তথাপি এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভয়াবহ সহিংসতায় অনেকে জীবন দিয়েছে, বার্ন ইউনিটগুলোতে অনেকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, অনেকে নানা ঝুঁকির মধ্যে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেছেন, ভোটাররা নানা ধরনের হুমকি-ধমকি অগ্রাহ্য করে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন, তাদের সবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। আমার বিশ্বাস, তারা কোনো দলকে ভোট দেননি, ভোট দিয়েছেন দেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের রাজপথে উঠেছে, এখন তাকে সেখানে রাখা সবার দায়িত্ব।
সাবেক উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Friday, January 3, 2014

মত-দ্বিমত- সংবিধান রক্ষার নির্বাচন by আবদুল মান্নান

৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেই নির্বাচন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের সমালোচনার মূল কথা হলো,

মত-দ্বিমত- সংবিধান রক্ষার নির্বাচন by আবদুল মান্নান

৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেই নির্বাচন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের সমালোচনার মূল কথা হলো,
প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে ছাড়া এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। কিন্তু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য এর কোনো বিকল্প ছিল বলে আমি মনে করি না। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাকে ব্যাহত হতে দেওয়া যায় না।

আমি এও মনে করি, সময়ের প্রয়োজনেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাটি এসেছিল। সেটি কোনোভাবেই স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না। তদুপরি পঞ্চম সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে যে মামলা হয়েছিল, ২০০৪ সালে বিএনপির আমলেই হাইকোর্ট তাঁকে অবৈধ বলে রায় দেন। সরকার সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে এবং সুপ্রিম কোর্ট ২০১০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী বলে ঘোষণা দেন। সেই রায়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদ চাইলে দুই মেয়াদের জন্য এই ব্যবস্থা বহাল রাখতে পারে। জাতীয় সংসদ চায়নি। এখন তো জোর করে সেই ব্যবস্থা চলতে পারে না। যদি কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবার সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেও, আইনের চোখে সেটি টিকবে না। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে যে পদ্ধতিতে নির্বাচন, বাংলাদেশেও সেই পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে। পূর্ব তিমুর বা সুদানের মতো দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হয়েছে। বাংলাদেশের মতো পুরোনো গণতান্ত্রিক দেশে সেটি কাম্য হতে পারে না।
আরেকটি কথা, ১৯৯৬ সালে যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, সেই বাস্তবতা এখন আর নেই। গত পাঁচ বছরে অনেকগুলো স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন হয়েছে, যাতে বিএনপি অংশ নিয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে জয়লাভও করেছে। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র তথা ভোটের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে খুবই সজাগ। যোগাযোগব্যবস্থাও আগের চেয়ে অনেক সহজতর হয়েছে, ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি হয়েছে, সর্বোপরি গণমাধ্যমের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। এ কারণে নির্বাচনে কারচুপি করা এখন আর সহজ নয়।
তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। বিশেষ করে বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দল, যাদের ৩০ শতাংশেরও বেশি জনসমর্থন আছে, তাদের বাইরে রেখে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা যেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে না, তেমনি উৎসবময় পরিবেশও আশা করা যায় না। সেই সঙ্গে এ কথাও স্বীকার করতে হবে, সংবিধান মানলে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে নির্বাচনটি হতেই হবে। ১৯৭০ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) বড় একটি রাজনৈতিক দল ছিল। কিন্তু তারা নির্বাচনে অংশ নেয়নি, বরং সামরিক আইনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমালোচনাও করেছিল। পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে যে মওলানা ভাসানীর নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি নির্বাচন বর্জনের পক্ষে যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারেনি। তাঁর দলের পক্ষে জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেটি যেমন অবাস্তব তেমনি জগাখিচুড়ি ধরনের। পরবর্তী সময়ে তারা দাবি করল, প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে শেখ হাসিনাকে চলে যেতে হবে। আমি মনে করি, এই দাবি সংবিধানবিরোধী। আগামী লোকসভা নির্বাচন সামনে রেখে সম্প্রতি ভারতেও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের পদত্যাগের দাবি উঠলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিন আগেও পদত্যাগ করবেন না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথেষ্ট সচেষ্ট ছিলেন। সংবিধানে না থাকা সত্ত্বেও তিনি সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। এমনকি বিরোধী দল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নিতে চায়, সেটিও জানতে চান। কিন্তু বিরোধী দল তাতে সাড়া দেয়নি।
আমি মনে করি, এর ফলে বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচনের ট্রেনটি মিস করেছে। এটি তাদের রাজনৈতিক ভুল বলেই মনে করি। অনেকে বলেন, জামায়াত নির্বাচনে যেতে পারছে না বলেই বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করেছে। এতে বিএনপির জনসমর্থন বাড়েনি। জনগণ তাদের আন্দোলনে সাড়া দিয়েছে, এ কথাও জোর দিয়ে বলা যাবে না। তদুপরি দুই মাস ধরে আন্দোলনের নামে সারা দেশে যে সহিংস তাণ্ডব চলেছে, মানুষ হত্যা ও সরকারি সম্পদ ধ্বংস করার ঘটনা ঘটেছে, তা জামায়াতেরই কাজ। কিন্তু এর দায় বিএনপিও কোনোভাবে এড়াতে পারে না। কেননা, তাদের আহূত কর্মসূচির সুযোগেই জামায়াতে ইসলামী এসব অপকর্ম করতে পেরেছে।
দ্বিতীয়ত, আমার ধারণা, এ মুহূর্তে সাংগঠনিকভাবে সংগঠিত নয় বলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একাধিক গণতান্ত্রিক দল থাকা প্রয়োজন। সে কারণে একটি শক্তিশালী দল হিসেবে বিএনপি গণতন্ত্র চর্চায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেটাই সবার প্রত্যাশা। কেননা, একক গণতান্ত্রিক দল থাকলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। আরেকটি কথা, বিএনপি জনগণকে আন্দোলনে শরিক হতে বললেও দলের নেতাদেরও আন্দোলনে নামাতে পারেনি। এটি তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা। তবে দশম নির্বাচনের ট্রেন মিস করলেও বিএনপিকে আগামী দিনে নির্বাচনী রাজনীতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীরা বলেছেন, সমঝোতার ভিত্তিতে একাদশ সংসদ নির্বাচন হতে পারে। তবে সেই সমঝোতা হতে হবে অবশ্যই সংবিধানের আলোকে এবং মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিকে না বলার মধ্য দিয়ে। বিএনপির জামায়াতকে ছাড়তে হবে। গণতন্ত্র ও জামায়াতের রাজনীতি একসঙ্গে চলতে পারে না।
অনেকেই ১৫৪টি আসনে বিনা নির্বাচনে প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার কথা বলেছেন। ওই সব আসনে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই জনপ্রতিনিধি বাছাই করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ইচ্ছা করলে ওই সব আসনে ডামি ক্যান্ডিডেট দিয়ে ভোটের মহড়া দেখাতে পারত। কিন্তু তারা সেটি দেখায়নি রাজনৈতিক সততার কারণেই। তারা শেষ পর্যন্ত ভেবেছিল, বিএনপি নির্বাচনে আসবে এবং একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে।

আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Friday, November 22, 2013

মূল্যায়ন- তারিক আলির সঙ্গে এক বিকেল by আবদুল মান্নান

আমাদের যৌবনকালের একজন নায়ক দীর্ঘ প্রায় ৪৩ বছর পর বাংলাদেশে ঘুরে গেলেন। এই নায়ক কোনো সিনেমার নায়ক নন, রাজনৈতিক অঙ্গনের নায়ক, পাকিস্তানের বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক তারিক আলি।

Friday, November 1, 2013

রাষ্ট্র ও রাজনীতি- নিজের মঙ্গল নিজেকেই বুঝতে হবে by আবদুল মান্নান

দেশে এখন ক্ষমতার জন্য একরকম মরণপণ যুদ্ধ চলছে। খালেদা জিয়া তাঁর নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট নিয়ে সামনের নির্বাচনে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া।