Tuesday, May 6, 2025

তুরস্কের ভয়ংকর পদক্ষেপ, উত্তেজনার মধ্যে যুদ্ধজাহাজ পাঠাল পাকিস্তানে

ভারত-পাকিস্তান চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এবার আরও এক ভয়ানক দুঃসংবাদের সম্মুখীন নয়াদিল্লি। তুরস্কের একটি যুদ্ধজাহাজ পাকিস্তানের করাচি বন্দরে ভিড়েছে, যা ভারতের জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক ও সামরিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তান নৌবাহিনী রোববার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তুর্কি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘টিসিজি বুয়ুকাদা’ করাচি বন্দরে নোঙর করেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, করাচি বন্দরে তুরস্কের যুদ্ধজাহাজ ভেড়ার ঘটনাকে পাকিস্তান দু-দেশের মধ্যে সমুদ্র নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের অংশ বললেও ভারত এতে সন্তুষ্ট নয়। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তুরস্কের এমন পদক্ষেপে ভারত উদ্বিগ্ন।

খবরে বলা হয়, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অনেকদিনের পুরোনো হলেও, এই জাহাজের আগমন এমন এক সময়ে ঘটলো যখন পহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক চরম উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতিকে ভারত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

পাকিস্তান নৌবাহিনীর ডিরেক্টরেট জেনারেল পাবলিক রিলেশনস (DGPR) জানিয়েছে, করাচি বন্দরে পৌঁছানোর পর তুর্কি যুদ্ধজাহাজটিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। কয়েকদিন করাচি বন্দরে অবস্থানকালে তুর্কি নাবিকরা পাকিস্তান নৌবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম ও অনুশীলনে অংশ নেবেন। এই সহযোগিতা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সামুদ্রিক সম্পর্ক আরও জোরদার করবে বলে আশা প্রকাশ করেছে দুপক্ষ।

গত কয়েক বছরে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো পাকিস্তানের সাবমেরিন আপগ্রেড প্রকল্পে সহায়তা করছে। পাশাপাশি ড্রোনসহ নানা ধরনের সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানে সরবরাহ করছে তুরস্ক।

এছাড়া দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে Atatürk-XIII নামের একটি যৌথ মহড়া, যেখানে উভয় দেশের বিশেষ বাহিনী অংশ নেয়। তবে সম্প্রতি করাচিতে তুরস্তের সামরিক বিমান অবতরণের পর দুঃশ্চিন্তায় পড়েছে নয়াদিল্লি।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তুরস্ক পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ করছে। যদিও তুরস্ক এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, তাদের সামরিক বিমানের পাকিস্তানে অবতরণ ছিল কেবল জ্বালানি গ্রহণের জন্য, অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

ভারতের দিক থেকে বিষয়টি বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন পহেলগামের সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ভারত কড়া অবস্থান নিয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে করাচি বন্দরে তুর্কি যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে তুরস্কের ভূমিকা এখন থেকে আরও বেশি নজরে থাকবে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার পটভূমিতে এই ধরনের পদক্ষেপ ভারতীয় প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক মহলে চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত



কাশ্মীরে হামলার খেসারত দেবে রাজনৈতিক বন্দিরা? by মুতাছিম বিল্লাহ

ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর নতুন করে শুরু হওয়া নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়েছে। এতে করে কাশ্মীরি রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ হামলার খেসারত দিতে হচ্ছে রাজনৈতিক বন্দিদের।

সোমবার (০৫ মে) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে ভারত সরকার কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা (অনুচ্ছেদ ৩৭০) বাতিল করে সরাসরি দিল্লির নিয়ন্ত্রণে আনে অঞ্চলটিকে। এরপর থেকেই হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, ছাত্র, রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী’ আইন যেমন ইউএপিএ (Unlawful Activities Prevention Act) ও জননিরাপত্তা আইন (Public Safety Act-PSA) এর আওতায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়েছে। এসব আইনে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে জেলে রাখা সম্ভব।

২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে দীর্ঘ এক দশক পর অনুষ্ঠিত হয় কাশ্মীরের আঞ্চলিক বিধানসভা নির্বাচন। সে সময় অনেক কাশ্মীরি পরিবারের মতো ৫০ বছর বয়সী মা শাকিলারও আশা ছিল, নতুন নির্বাচিত সরকার হয়তো তার একমাত্র ছেলে ফাইয্যাবকে জেল থেকে মুক্ত করবে। তবে ২২ এপ্রিল পেহেলগামে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হামলার পর সে আশায় গুড়ে বালি পরিস্থিতি হয়েছে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাকিলা বলেন, নির্বাচনের পর যে সামান্য আশা জন্মেছিল, পেহেলগাম হামলার পর তা ভেঙে পড়েছে। আমার ছেলে বিদ্রোহীদের আইনে অভিযুক্ত হওয়ায় ওর মুক্তির সম্ভাবনা এখন আরও ক্ষীণ হয়ে গেছে।

নতুন দমন-পীড়নের আশঙ্কা পেহেলগাম হামলার পরপরই কাশ্মীরে বড় পরিসরের ধরপাকড় শুরু করে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। এখন পর্যন্ত ৯০ জনকে পিএসএতে (জননিরাপত্তা আইন) অভিযুক্ত করা হয়েছে। বহু বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলা ভারত সরকারের হাতে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিয়েছে।

শাকিলার ছেলে ফাইয্যাব ২০২২ সালে গ্রেপ্তার হন। প্রথমে শ্রীনগরের একটি জেলে রাখা হলেও পরে তাকে জম্মুতে স্থানান্তর করা হয়, যা তার বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে। শাকিলা বলেন, আমার কোনো রোজগার নেই। আমার ছেলেই ছিল একমাত্র ভরসা। এখন আমি আট মাস ধরে ওকে দেখতেও পারিনি। ঈদও কেটেছে তার অভাবে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি : ভিন্ন বাস্তবতা গত বছরের নির্বাচনে ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি), পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টিসহ (পিডিপি) কাশ্মীরি রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে বন্দিদের মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এনসি এককভাবে ৪২টি আসনে জয় পেয়ে অন্যদের সঙ্গে মিলে সরকার গঠন করে। তবে ছয় মাস কেটে গেলেও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অনেকেই বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো কেবল ভোটের জন্য আবেগ নিয়ে খেলেছে।

শাকিলা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা শুধু ভোট নেওয়ার জন্য আমাদের আবেগ নিয়ে খেলেছে। এখন তারা নিশ্চুপ।

বন্দিদের পরিবার : দুর্ভোগের সীমা নেই শুধু শাকিলাই নন, অনেক কাশ্মীরি পরিবার প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন দূরবর্তী জেলে বন্দি প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। পুলওয়ামার বাসিন্দা ইশরাতের ভাই ২০২৩ সালে পিএসএতে গ্রেপ্তার হয়ে প্রথমে জম্মু, পরে উত্তর প্রদেশে স্থানান্তরিত হন। পরিবারের আর্থিক দুর্বলতার কারণে তারা একবারও গিয়ে দেখা করতে পারেননি।

ইশরাত জানান, আমার ভাইয়ের জেলের অবস্থা ভয়াবহ। রমজানে তাদের দুপুরের খাবার দিয়ে ইফতার করতে হয়, আর রাতের খাবার সেহরিতে খেতে হয়। একটাই ফ্যান আছে, সেটাও ২৫ ফুট ওপরে লাগানো। এই গরমে সেখানে থাকা যেন দোজখে বাস করার মতো।

প্রশাসনের নীরবতা ও সাংবিধানিক প্রশ্ন কাশ্মীরের কারা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক বন্দিদের অঞ্চল থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া ভারতের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করে।

কাশ্মীরি অধ্যাপক শেখ শওকত হুসেইন আল জাজিরাকে বলেন, এভাবে বন্দিদের বাইরে পাঠানো পরিবারগুলোর ওপর ‘সম্মিলিত শাস্তি’ চাপানোর শামিল। এটা কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকেই আরও বাড়িয়ে তোলে।

সরকার কী বলছে?
ন্যাশনাল কনফারেন্সের মুখপাত্র ইমরান নাবি দার জানান, কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দায়িত্ব এখনো কেন্দ্রের নিযুক্ত লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হাতে। তিনি বলেন, আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে যারা গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত নন এবং যারা অন্যায়ভাবে আটক, তাদের মুক্তি চাই। আমরা এখনো সেই প্রতিশ্রুতিতে অটল। তবে পেহেলগামের ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। 

কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান। ছবি : সংগৃহীত
কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান। ছবি : সংগৃহীত

ভারতের মোকাবিলায় ‘ছায়া থেকে প্রকাশ্যে’ বেরিয়ে আসছেন পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি -নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সাধারণত দৃশ্যপটের আড়ালে থেকে কাজ করতে পছন্দ করেন। তবে কাশ্মীরকে ঘিরে ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এখন তিনিই পাকিস্তানের কণ্ঠস্বর হয়ে কঠোর ভাষায় বার্তা দিচ্ছেন।

এই তো কিছুদিন আগেও পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী এ ব্যক্তি পর্দার আড়ালেই থাকতে পছন্দ করতেন। তিনি জনসমক্ষে নিজের ভাবমূর্তি কঠোরভাবে বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর বক্তব্যগুলো সামরিক অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক ছিল। পূর্বনির্ধারিত ও পরিকল্পিত ভাষণেই সেগুলো সীমাবদ্ধ থাকত।

তবে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলার পর আসিম মুনির পাকিস্তান-ভারত ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। কাশ্মীরের পেহেলগাম শহরের কাছে ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হয়েছেন। এ হামলার ঘটনায় কঠোর জবাব দিতে ভারত সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। এমন অবস্থায় জেনারেল মুনির কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান সম্পর্কে জানান দিচ্ছেন।

গত বৃহস্পতিবার একটি সামরিক মহড়া চলাকালে ট্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে সেনাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন জেনারেল মুনির। তিনি বলেন, ‘কোনোরকমের বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। ভারতের যেকোনো সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দ্রুত, দৃঢ় এবং আগের চেয়ে আরও জোরালোভাবে জবাব দেওয়া হবে।’

এই বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভারতের যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পাল্টা জবাবটা হবে সমানে সমান বা আরও বেশি মাত্রায়।

ভারত ও পাকিস্তানে জেনারেল মুনিরের বক্তব্যকে দেখা হচ্ছে তাঁর শক্ত অবস্থান প্রকাশ এবং জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা হিসেবে। এমন সময়ে তিনি জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন, যখন কিনা পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক বিভাজন ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। এমনকি এসব সংকটের কারণে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রতি দেশটির জনগণের দীর্ঘদিনের অটুট আনুগত্যে চিড় ধরেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বহুদিন ধরেই পর্দার আড়ালে থেকে দেশটির রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

তবে জেনারেল মুনিরের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়াকে কেবলই একটি রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে হচ্ছে না, এর চেয়ে বেশি কিছু এখানে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি ভারতের বিষয়ে কট্টর মনোভাব পোষণ করেন। পাকিস্তানের দুই শীর্ষ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, তার ভিত্তিতে বিশ্লেষকেরা এমন মত দিয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের কারণটা মূলত ধর্মীয়।

পেহেলগামে হামলা হওয়ার ছয় দিন আগে জেনারেল মুনির যে মন্তব্য করেছিলেন, তা নিয়ে ভারতের অনেকেই এখন উদ্বিগ্ন। তখন রাজধানী ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে প্রবাসী পাকিস্তানিদের সামনে বক্তৃতাকালে তিনি কাশ্মীরকে দেশের ‘প্রাণশিরা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীরকে আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করলেও দুই দেশই এই অঞ্চলকে পুরোপুরিভাবে নিজেদের বলে দাবি করে থাকে।

কাশ্মীরের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে আসিম মুনির যে ‘প্রাণশিরা’ কথাটি ব্যবহার করেছেন, তা পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী শব্দভান্ডারে গভীরভাবে গাঁথা। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয় যে পাকিস্তান কীভাবে কাশ্মীরকে তার জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে।

আসিম মুনিরের এই মন্তব্যকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উসকানিমূলক উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। কাশ্মীরকে ভারতের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা।

বর্তমান সংকট আরও বাড়বে নাকি তা থামার পথ তৈরি হবে, তা অনেকাংশে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর নির্ভর করছে।

পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারত ও পাকিস্তানকে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে কাজ করার তাগিদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ। জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম আহমেদ শুক্রবার বলেছেন, পাকিস্তানি কূটনীতিক ও সরকারের মন্ত্রীরা ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার বিষয়ে চীনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। চীন পাকিস্তানের মিত্রদেশ এবং সেখানে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে।

তবে এ ক্ষেত্রে কূটনীতি খুব একটা কাজে না–ও লাগতে পারে। কারণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ করেন। তিনি নিজ দেশের এবং পাকিস্তানের মুসলিমদের হুমকি হিসেবে দেখেন। ভারত প্রত্যেক সন্ত্রাসী এবং তাদের সমর্থকদের পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকে হলেও খুঁজে বের করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মোদি।

কাশ্মীরে ২০১৬ ও ২০১৯ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার পর পাকিস্তানে পাল্টা হামলা চালিয়েছিল ভারত। দেশটি দাবি করেছিল, তারা পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসীশিবির লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

এবার কাশ্মীরের পর্যটনকেন্দ্রে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনাটি কয়েক দশকের মধ্যে ওই অঞ্চলে পর্যটকদের ওপর হওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।

দিল্লিভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিক আদিত্য সিনহা বলেন, ‘কেবল সীমান্ত পেরিয়ে সন্দেহভাজন শিবিরে বিমান হামলা চালালেই ডানপন্থী সমর্থকদের রক্তের তৃষ্ণা মিটবে না।’

পেহেলগামে হামলার পর জেনারেল মুনির একেবারে স্পষ্টভাবে মতাদর্শিক ভাষায় কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।

গত ২৬ এপ্রিল পাকিস্তানের শীর্ষ সামরিক প্রশিক্ষণ একাডেমির স্নাতক সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জেনারেল আসিম মুনির। সেখানে তিনি ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন, যা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রূপরেখা হিসেবে কাজ করেছে। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে, হিন্দু ও মুসলিমরা দুটি ভিন্ন জাতি এবং তাদের জন্য আলাদা মাতৃভূমির প্রয়োজন।

এই তত্ত্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয় এবং পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অতীতে দেখা গেছে, ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জেনারেলরা প্রায়ই এই তত্ত্বকে সামনে এনেছেন। আবার কূটনৈতিক সমঝোতার সুযোগ আসামাত্রই তাঁরা সুর নরম করেছেন।

তবে এবার জেনারেল মুনির এই তত্ত্বকে যেভাবে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছেন এবং আরও যেসব আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন, তার মধ্যে পাকিস্তানের নীতিতে মোড় পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে ভারতীয়দের অনেকে।

কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘প্রাণশিরা’ হিসেবে উল্লেখ করে জেনারেল মুনির যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিয়ে ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সে একই বক্তৃতায় আসিম মুনির বলেন, ‘ভারতের দখলদারির বিরুদ্ধে বীরোচিত লড়াইয়ে আমরা আমাদের কাশ্মীরি ভাইদের একা ছেড়ে দেব না।’

ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এর এডিটর ইন চিফ শেখর গুপ্ত মনে করেন, যে সময়ে এবং যে বিদ্বেষপূর্ণ ভাষায় জেনারেল মুনির কথা বলেছেন, তা ভারতীয়দের জন্য এড়িয়ে যাওয়াটা কঠিন।

অবশ্য এই দ্য প্রিন্ট অনেকটা বিজেপি–ঘেঁষা সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচিত।

দ্য প্রিন্টের শেখর গুপ্ত বলেন, জেনারেল মুনিরের বক্তৃতার পরপরই পেহেলগামে নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভারত যদি এর মধ্যে কোনো সংযোগ না টানে, তাহলে সেটা চরম উদাসীনতা হবে। বিশেষ করে তিনি হিন্দুদের বিরুদ্ধে যে শত্রুতার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা বহুদিন ধরে কোনো পাকিস্তানি বেসামরিক বা সামরিক নেতা করেননি।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জেনারেল মুনিরের বক্তব্যের সঙ্গে কাশ্মীরের হামলার কোনো সম্পর্ক থাকার দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম আহমেদ ভারতের এই অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, কাশ্মীর নিয়ে বিরোধের বিষয়টি অমীমাংসিত থাকাটাই দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে থেকে গেছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তির পর থেকেই ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার কেন্দ্রবিন্দুতে এ অঞ্চলের অবস্থান। কাশ্মীর ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ, সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং দীর্ঘ মেয়াদে সেনা মোতায়েনের ঘটনা ঘটেছে।

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এখন যে উত্তেজনা চলছে, তা জেনারেল মুনিরের জন্য প্রথম কোনো আঞ্চলিক সংকট নয়।

২০১৯ সালে কাশ্মীরে আত্মঘাতী বোমা হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত বিমান হামলা চালালে দুই দেশের মধ্যে সীমিত সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। সে সময় জেনারেল আসিম মুনির পাকিস্তানের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তবে ওই ঘটনার কয়েক মাস পরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁকে সরিয়ে দেন।

পরবর্তী সময়ে ইমরান খান জেনারেল মুনিরকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগের বিরোধিতা করেছিলেন। আর তখন থেকেই তাঁদের দুজনের সম্পর্ক বৈরী হয়ে ওঠে।

সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পর ইমরান খান ২০২২ সালের এপ্রিলে ক্ষমতা হারান। সাত মাস পর সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব নেন জেনারেল মুনির।

ইমরান খান এখনো পাকিস্তানে ব্যাপক জনসমর্থন ধরে রেখেছেন। তবে গত দুই বছর ধরে তিনি কারাগারে আছেন।

সাধারণত জনসমক্ষে ব্যাপকভাবে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন জেনারেল মুনির। তিনি অসংযত মন্তব্য এড়িয়ে যান এবং তাঁর বক্তৃতাগুলো হয় জোরালো, পরিষ্কার ও প্রায়ই ধর্মীয় আবহে মোড়া।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হোসাইন হাক্কানি বলেন, জেনারেল মুনির গভীরভাবে ধর্মচর্চায় নিবিষ্ট—আর এটাই ভারত সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।

হাক্কানির মতে, আসিম মুনিরের কাছ থেকে সর্বোচ্চ যা আশা করা যায়, তা হলো তিনি উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজবেন। তবে সে ক্ষেত্রেও নিজের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে যাবেন।

এসবের মধ্য দিয়ে জেনারেল মুনির যেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অনেক বেশি ইসলামীকরণের চেষ্টা করছেন, যেমনটা সামরিক শাসক জেনারেল মোহাম্মদ জিয়াউল হক ১৯৮০-এর দশকে করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে জিয়াউল হক আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে জিহাদিদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়েছিলেন।

সমালোচকদের মতে, পাকিস্তানের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার ওপর ক্রমাগত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন আসিম মুনির। সেই সঙ্গে ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করছেন।

আসিম মুনির সম্পর্কে সাবেক রাষ্ট্রদূত হোসাইন হাক্কানি বলেন, ‘তিনি যেন জনপ্রিয়তা চান না, কর্তৃত্ব চান।’

হাক্কানির মতে, আসিম মুনির দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেমন কঠোর মনোভাব বজায় রাখেন, ভারতের ক্ষেত্রেও তেমনই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখবেন।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেশ হস্তক্ষেপ করছে বলে মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তি প্রচেষ্টা বা আলোচনা যেন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থাকে, তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের গোয়েন্দাপ্রধানকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ ঐতিহাসিকভাবে এ পদটি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক মানুষদের জন্য বরাদ্দ ছিল।

এই মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে আছে। আক্রমণাত্মক বার্তা ও হুঁশিয়ারি এখন দুই পক্ষের মধ্যকার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে হিসাবনিকাশে ভুল হওয়ার ঝুঁকিটা প্রকট।

ইসলামাবাদের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেন বলেন, যদি ভারত সামরিক হামলা চালায়, পাকিস্তান প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে।

জাহিদ আরও বলেন, ‘মোদি এখানেই থামবেন কি না, সেটাই প্রশ্ন। কারণ, ভারতের সীমিত মাত্রার হামলাও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।’

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনির। ছবি: এপি ফাইল ছবি

গাজা ‘দখলসহ’ নতুন যেসব পরিকল্পনা অনুমোদন দিল ইসরায়েল

ফিলিস্তিনের গাজায় সামরিক অভিযানের পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছে ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা। এর মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ‘দখলের’ বিষয়টিও। আজ সোমবার দেশটির একজন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। এরই মধ্যে গাজায় অভিযান সম্প্রসারণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাজার হাজার সংরক্ষিত সেনাসদস্যকে তলব করেছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী রয়েছেন। তাঁরা সর্বসম্মতভাবে এই পরিকল্পনার অনুমোদন দেন। ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা বলেছেন, অনুমোদন পাওয়া পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, গাজা উপত্যকা দখল, সেখান দখল করা এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং গাজার বাসিন্দাদের উপত্যকার দক্ষিণে সরিয়ে নেওয়া।

ইসরায়েলের কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, পরিকল্পনায় ‘হামাসের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হামলার’ বিষয়টিও রয়েছে। তবে হামলার প্রকৃতি কেমন হবে, তা বলা হয়নি। এ ছাড়া গাজায় নতুন কাঠামোর আওতায় ত্রাণ সরবরাহ চালু করার বিষয়টি নিয়েও মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে। ওই কাঠামো আগে থেকেই অনুমোদিত ছিল। তবে তা এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গত ১৯ জানুয়ারি উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। ১৮ মার্চ ওই যুদ্ধবিরতি ভেঙে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। আজ গাজার উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, এদিন উত্তর গাজায় আকাশপথে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে উপত্যকাটিতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৫২ হাজারে।

এর আগে গতকাল রোববার ইসরায়েলের সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেন, গাজায় তাঁদের অভিযানের পরিসর বাড়ানোর জন্য হাজার হাজার সংরক্ষিত সেনাকে তলব করা হয়েছে। তবে দেশটির গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল সফরের কথা রয়েছে। এর আগে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে না।

‘রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’

গাজায় ত্রাণসহায়তা চালু নিয়ে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভায় আলোচনার আগে শুক্রবার দেশটির সংবাদমাধ্যম এক্সিওস নিউজের খবরে বলা হয়েছিল, গাজায় ত্রাণসহায়তা চালুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও নতুন একটি আন্তর্জাতিক ত্রাণসহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিরা আলোচনা করেছেন। তাঁদের লক্ষ্য হামাসের কোনো ‘নিয়ন্ত্রণ’ ছাড়াই যেন এ ত্রাণ গাজাবাসীর কাছে সরবরাহ করা যায়।

যুদ্ধবিরতি চলাকালে ২ মার্চ থেকে গাজায় ত্রাণসহায়তা প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। এতে উপত্যকাটিতে খাবার, পানি, জ্বালানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের এ অবরোধের ভয়াবহ পরিণতি গাজার ২৪ লাখ বাসিন্দাকে ভোগ করতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। তবে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার ভাষ্য, গাজায় ‘এখনো যথেষ্ট খাবার আছে’।

আজ হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাজায় ত্রাণ সরবরাহের জন্য ইসরায়েল যে কাঠামো তৈরি করেছে, তা ‘রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের’ মতো। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে ‘মানবিক বিপর্যয়ের’ জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে তারা।

খাবার ‘লুটেরাদের’ মৃত্যুদণ্ড

গাজায় খাবারের এ সংকটের মধ্যে লুটেরাদের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহেই উপত্যকাটির বিভিন্ন খাদ্যের দোকান ও দাতব্য রান্নাঘরে লুটপাট চালিয়েছে সশস্ত্র কয়েকটি চক্র। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে হামাস। সংগঠনটির ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।

হামাসের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এই লুটেরাদের সঙ্গে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। গাজায় হামাস পরিচালিত জনসংযোগ কার্যালয়ের পরিচালক ইসমাইল আল–তাওয়াবতা বলেন, কিছু লুটেরা এক গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। অন্যরা সংঘবদ্ধ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্য। তাদের সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে ইসরায়েল সরকার।

ইসরায়েলের আগ্রাসন: অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে গাজার শিশুরা

ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, গাজায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, যা তাদের প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দুই মাসের বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনের গাজা। ইসরায়েলের বাধার কারণে কোনো ধরনের ত্রাণসামগ্রী উপত্যকাটিতে ঢুকতে পারছে না। তার ওপর ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরা। অপুষ্টির কারণেও বাড়ছে শিশুদের প্রাণহানির ঘটনা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে পথে–ঘাটে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে শিশুরা।

গাজার গণমাধ্যম দপ্তর গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরায়েল গাজার প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে রেখেছে। তারা শিশুদের ফর্মুলা দুধ ও পুষ্টিকর খাবারও ঢুকতে দিচ্ছে না। প্রয়োজনীয় খাবারের অভাবে শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে চলেছে। এখন পর্যন্ত অপুষ্টির কারণে ৫৭টি শিশু মারা গছে।

আল–জাজিরার টিম ঘটনাস্থল থেকে জানিয়েছে, গাজা শহরের পশ্চিমে রানতিসি হাসপাতালে অপুষ্টি ও পানিস্বল্পতার কারণে সালেহ আল-সাকাফি নামের একটি কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়েছে।

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ আগেই সতর্ক করে বলেছে, গাজায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে; যা তাদের প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

গাজায় কর্মরত নরওয়েজিয়ান শরণার্থী সংস্থার ব্যবস্থাপক গ্যাভিন কেলিহের বলেছেন, কোনো পদক্ষেপ না নিলে গাজার হাজার হাজার মানুষ মারা যেতে পারে। অন্যান্য সাহায্য সংস্থাও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

রেডক্রস কমিটি সতর্ক করে বলেছে, গাজার মানবিক তৎপরতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ না নিলে আরও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। তখন মানবিক কোনো প্রচেষ্টা তা ঠেকাতে পারবে না।

গাজায় এখন মানুষের জন্য খাবার খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েক দিন ধরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে গাজার পরিস্থিতি সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা উপত্যকাটিতে খাদ্যসংকট নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে।

গাজায় আন্তর্জাতিক সংস্থার খাবারের মজুত শেষ হয়ে গেছে। এ ছাড়া স্থানীয় সম্প্রদায়ের তৈরি রান্নাঘর থেকেও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য খাবার প্রস্তুত করা যাচ্ছে না।

ধ্বংসস্তূপে ভর্তি সড়কে মানুষ উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। গাজা শহরে শিশুরা আবর্জনা ঘেঁটে ঘেঁটে খাবার খুঁজছে। ফেলে দেওয়া ব্যবহৃত বোতলে খাবার পাওয়া যায় কি না, তা দেখছে তারা।

গাজায় এখন আর লাইনে দাঁড়িয়ে কাউকে খাবার নিতে দেখা যায় না। কারণ, মানুষের জন্য কোনো খাবার অবশিষ্ট নেই। আগে যতটুকু সংগ্রহ করতে পেরেছে, জীবন বাঁচাতে তা-ই খেতে হচ্ছে।

দুই মাসের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের অবরোধের কারণে রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ওষুধ এবং জরুরি খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে সতর্কতা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন রাফার কুয়েতি হাসপাতালে পরিচালক সুহাইব আল-হামস। তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত, হাসপাতালটি ৭৫ শতাংশের বেশি প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকটে ভুগছে। এর বড় একটি অংশ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, যা বিপুলসংখ্যক রোগীর জীবন হুমকির মুখে ফেলেছে।’ তিনি আরও বলেন, চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা হুমকির মুখে পড়েছে। কারণ, বর্তমানে যেসব ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত রয়েছে, তা দিয়ে এক সপ্তাহের বেশি সেবা দেওয়া যাবে না।

৭ অক্টোবর থেকে গাজাকে অবরুদ্ধ করে নির্বিচার বোমা হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। পাশাপাশি তারা গাজায় স্থল অভিযানও চালাচ্ছে
৭ অক্টোবর থেকে গাজাকে অবরুদ্ধ করে নির্বিচার বোমা হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। পাশাপাশি তারা গাজায় স্থল অভিযানও চালাচ্ছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

তিউনিসিয়াকে বাঁচাতে পারবে কি বিরোধীরা by ইউসরা ঘন্নুচি

গত মাসে তিউনিসিয়া কয়েকবার বিক্ষোভকারীদের ওপর নৃশংস দমন-পীড়ন দেখেছে। সাজানো মামলায় ৪০ জন বিরোধী মতের ব্যক্তির বিচার দেখেছে। বিপ্লবের আগের সেই অন্ধকার দিনগুলো যেন ফিরে এল।

তিউনিসিয়ার বড় শহর মেজোনায় দেয়াল ধসে তিন স্কুলশিক্ষার্থী মারা যাওয়ার পর বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। মেজোনা সিদি বাউজিদ অঞ্চলে অবস্থিত। এ অঞ্চলটিই ২০১১ সালের বিপ্লবের জন্মস্থান। সেই বিপ্লবে স্বৈরশাসক জাইন আল-আবিদিন বেন আলীর পতন হয়েছিল এবং আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল।

এবারের প্রতিবাদ এক সপ্তাহ অব্যাহত ছিল। সেখানকার স্কুল ও দোকানপাট বন্ধ ছিল। বিক্ষোভকারীরা টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন এবং সরকারের অবহেলার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়েন। শোকার্তরা যখন তাঁদের প্রিয় স্বজনদের স্মরণে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছিলেন তখনো কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়। অনেকে আহত হন, অনেককে কাছের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়, টেলিযোগাযোগও সীমাবদ্ধ করা হয়। সাংবাদিকদের ওপরেও হামলা চালানো হয়, তাদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয়।

এক দিনের বেশি সময় পার হওয়ার পরও সরকারের দিক থেকে শোক প্রকাশ করা হয়নি। এরপর যখন প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদ টেলিভিশনে ভাষণ দিলেন, তখনো তিনি কোনো সমবেদনা প্রকাশ করলেন না। তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের আঘাতে দেয়ালটি আগে থেকেই ভঙ্গুর ছিল। মন্দ কপাল যে এবার সেটি ভেঙে পড়েছে।’

দায় নেওয়ার পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদ স্কুলটির প্রিন্সিপালকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। অথচ কয়েক মাস আগে স্কুলপ্রাচীরের সেই ভঙ্গুর অবস্থার কথা তিনি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন।

রাজধানী তিউনিস ও মেজানো—দুই জায়গাতেই বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। বিক্ষোভকারীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেতে চাইলে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়।

প্রেসিডেন্ট সাইদ কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভকারীদের ‘উসকানি সৃষ্টিকারী’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে দোষারোপ করেন। স্কুলের প্রাচীর ধসে মৃত্যুর জন্য তিনি ভাগ্যকে দোষ দেন। এরপর তিনি মেজানোয় যান। সেখানে শুধু গুটিকয়েক বাসিন্দাকে বাছাই করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁরা প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান এবং প্রশংসা করেন।

প্রায় চার বছর ধরে চলা দমন-পীড়ন এবং জবাবদিহিহীন শাসনের পথ ধরে এবারের জনরোষ ও বিক্ষোভ দেখা গেল। প্রেসিডেন্ট সাইদ এখন রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন। বিক্ষোভকারীরা ভালো করেই জানেন যে সাইদ যে একক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন সেখানে কোনো মন্ত্রী, গভর্নর অথবা সরকারের কোনো প্রতিনিধির আদতে কেন ক্ষমতা নেই।

সাইদ তাঁর খেয়ালখুশিতে প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীদের নিয়োগ দেন, বরখাস্ত করেন। তিনি রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও ট্রেড ইউনিয়নকে কঠোরভাবে দমন করেন।

২০২১ সালের জুলাই মাসে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর তিনি দেশটির গণতান্ত্রিক ‘অন্ধকার দশকের’ জন্য নিজেকে ছাড়া আর সবাইকে দায়ী করেন। দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, বিরোধী দলের রাজনীতিবিদ, বিদেশি এজেন্ট—সবাইকে তিনি বলির পাঁঠা বানান।

কিন্তু এই কৌশল খুব দ্রুতই কার্যকারিতা হারাতে থাকে। সম্ভবত তিনি এখন সেই জনগোষ্ঠীর মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছেন, যাঁরা একসময় তাঁর জনতুষ্টিবাদী প্রতিশ্রুতিগুলোয় বিশ্বাস রেখেছিলেন। সব গণতান্ত্রিক রক্ষাকবচ গুঁড়িয়ে দিয়ে, বিচার বিভাগকে নিজের ইচ্ছার দাস বানিয়ে এবং সমালোচকদের জেলে পুরেও তিনি যে কল্পিত স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাস্তবে সেটা হয়নি।

এর পরিবর্তে তাঁর স্বৈরশাসন দেশের সমস্যাগুলোকেই কেবল তীব্র করেছে। মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই সাইদ এখন তাঁর জনতুষ্টিবাদী বয়ানগুলো (বিশ্বাসঘাতক, ষড়যন্ত্রকারী) আরও প্রবলভাবে সামনে আনছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আরও নির্ভরশীল হয় পড়ছেন। আর অনুগত বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে সমালোচকদের জেলে পুরছেন।

গত সপ্তাহে ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগে গত সপ্তাহে ৪০ জন বিরোধীর বিরুদ্ধে সাজানো মামলার যে রায় দেওয়া হয়েছে, সেটা সরকারের হতাশার বহিঃপ্রকাশ।

৪০ জনের বেশি আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অনেকেই বিচারের আগে দুই বছর ধরে কারাগারে ছিলেন। এর মধ্যে আমার একজন বোনও রয়েছেন। তিনি একজন শিক্ষাবিদ। রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁকে ৩৩ বছরের কারাগার জেল দেওয়া হয়েছে।

এই কথিত ষড়যন্ত্র মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা একমাত্র যে প্রমাণ সামনে এনেছেন, সেটা হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপে বিদেশি সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের সঙ্গে একটা বৈঠক।

আরও প্রায় ১০০ জন বিরোধী মতের রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আন্দোলনকর্মী এবং আমলার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগে কয়েক ডজন মামলা করা হয়েছে।

তাঁদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলী লারায়েদ রয়েছেন। বিচারের আগেই ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকেই তাঁকে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে।

আমার বাবা, রাশেদ ঘন্নুচির বিরুদ্ধেও বেশ কয়েকটি মামলা দেওয়া হয়েছে। তাঁর বয়স এখন ৮৩ বছর। মিথ্যা মামলায় তাঁকে এরই মধ্যে ২৭ বছরের জেল দেওয়া হয়েছে।

দেশের ক্রমবর্ধমান ঋণ ও বেকারত্ব এবং ব্যাপক মূল্যস্ফীতির কোনো সমাধান সাইদের কাছে নেই। তিউনিসিয়ার অনেককে এখন মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের আমলে তিউনিসিয়ায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অর্থনীতির পতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কারণে জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তাতে ব্যাপক মেধা পাচার বেড়েছে। গত বছর যেটা বেড়েছে ২৮ শতাংশ। হাজার হাজার তিউনিসিয়ার নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য অন্য দেশে পাড়ি দিচ্ছে।

২০২১ সালে অভ্যুত্থানে ইউরোপীয় সরকারগুলো উদ্বেগ জানানো সত্ত্বেও সাইদকে তাঁরা সমর্থন দিয়ে আসছেন। যদিও ক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা দেওয়ার জন্য তিনি যে সমস্যাগুলোকে কাজে লাগিয়েছিলেন, সেগুলো সমাধানে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন।

আমার বাবা তাঁর অন্যায় আটকের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে কারাগার থেকে লিখেছিলেন: ‘দায়িত্বশীল স্বাধীনতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ন্যায়বিচার এবং সবার জন্য সমান অধিকারের ভিত্তিতে গণতন্ত্র—এর মধ্যেই একমাত্র সমাধান রয়েছে।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সাইদের নির্বিচার দমন-পীড়নে বিরোধী দলগুলো নিজেদের মধ্যকার মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে পেছনে ফেলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ও তিউনিসিয়াকে খাদের কিনার থেকে ফেরাতে পারবে কি না।

ইউসরা ঘন্নুচি তিউনিসীয়-ব্রিটিশ গবেষক ও লেখক

- দ্য মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

৪০ জনের বেশি আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অনেকেই বিচারের আগে দুই বছর ধরে কারাগারে ছিলেন।
৪০ জনের বেশি আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অনেকেই বিচারের আগে দুই বছর ধরে কারাগারে ছিলেন। ছবি : এএফপি

‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নয়, সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করাই লক্ষ্য by ইমরান সিদ্দিক

ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের নয়জন সদস্যের মধ্যে পাঁচজনই বিরোধীদলীয়, যা একধরনের ‘ভারসাম্যহীনতা’ সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর লেখা থেকে এটা স্পষ্ট, তিনি ধরেই নিয়েছেন যে উচ্চকক্ষের স্পিকার বিরোধী দল থেকেই মনোনীত হবেন। এই ধারণার পক্ষে তাঁর যুক্তি হচ্ছে, ‘যেসব দেশে উচ্চকক্ষ আছে, তার মধ্যে বেশির ভাগ দেশেই কোনো দল এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না’ এবং ‘এর ফলে বিভিন্ন দলের মধ্যে পদগুলো (স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, হুইপ) ভাগাভাগির বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়।’

নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, উচ্চকক্ষে এ ধরনের নিয়োগ মূলত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক সংলাপ ও ঐকমত্যের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর এই বক্তব্য সঠিক হলে উচ্চকক্ষের স্পিকার আবশ্যিকভাবে বিরোধী দল থেকে মনোনীত হবেন, এমন কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। কেননা রাজনৈতিক সংলাপ ও ঐকমত্য নির্ভর করে দলগুলোর আলোচনা-দর-কষাকষির সক্ষমতার ওপর, যা অত্যন্ত পরিবর্তনশীল একটি বিষয়। উপরন্তু নির্বাচনের আগেই বিরোধী দলগুলোর শক্তি বা প্রভাব কতটুকু হবে, তা সঠিকভাবে অনুমান করা কঠিন। তাই  উচ্চকক্ষের স্পিকার অবশ্যই বিরোধী দল থেকে হবেন—এ ধরনের পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত নয়।

নিজাম উদ্দিন আহমেদ ‘অতীতের অভিজ্ঞতা’ থেকে ধারণা করছেন যে আসন্ন নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো সরকারি দলের চেয়ে বেশি ভোট পাবে এবং এর ফলে উচ্চকক্ষ নিয়ন্ত্রণ করবে। তাঁর এই ধারণা সঠিক হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে। অতীতের নির্বাচনী ফলাফল বা আগামী নির্বাচনের ফলাফলের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে এনসিসির গঠনপদ্ধতি নির্ধারণ করা সমীচীন হবে না। অতএব, জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদের (এনসিসি) নয়জন সদস্যের মধ্যে পাঁচজনই বিরোধীদলীয় প্রতিনিধি হবেন—এ দাবি বিবেচনাপ্রসূত বলে মনে হয় না।

------ ২.

নিজাম উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেতে সরকার যদি দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করে, তা সংসদীয় রাজনীতিতে ‘নৈতিক’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে তাঁর এই বক্তব্য সঠিক নয়। বাস্তবে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা আপস, আলোচনা, সমঝোতা ও সংলাপের মাধ্যমেই কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়।

উদাহরণস্বরূপ, ভারতে উপরাষ্ট্রপতি, যিনি রাজ্যসভার স্পিকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। ২০০২ সালে যখন বিজেপির সাবেক নেতা ভৈরন সিং শেখাওয়াত ভারতের উপরাষ্ট্রপতি  নির্বাচিত হন, তখন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) কেন্দ্রীয় স্তরে ক্ষমতায় ছিল। নির্বাচন ফলাফল থেকে প্রতীয়মান হয় যে শেখাওয়াত এনডিএ এবং তাঁর ঘোষিত মিত্রদের সম্মিলিত শক্তির চেয়ে ৪০টির বেশি ভোট পেয়েছিলেন, যা বিরোধী দলগুলোর ‘ক্রস ভোটিং’-এর ইঙ্গিত দেয়।

যুক্তরাজ্যেও অনুরূপ প্রথার প্রচলন রয়েছে। ২০১৬ সালে সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রী লর্ড ফাউলার হাউস অব লর্ডসের তৃতীয় লর্ড স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন। তাঁর নির্বাচনে ভোটাভুটির কোনো অফিশিয়াল রেকর্ড না থাকলেও লর্ডসের সদস্যদের বিবৃতি থেকে এটি অনুমেয় যে তিনি ক্রস-পার্টির সমর্থন পেয়েছিলেন। নির্বাচনের পর অভিনন্দন জানানোর সময় লেবার পার্টির ব্যারনেস স্মিথ অব ব্যাসিলডন মন্তব্য করেন যে লর্ড ফাউলারের পুরো হাউসেরই সমর্থন রয়েছে।

------- ৩.

নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, কোনো সংসদ সদস্য সরকার বা প্রধান বিরোধী দলের বাইরের কেউ হলেও তিনি ‘নিরপেক্ষ’ হবেন না এবং সে ক্ষেত্রে এনসিসিতে তিনি বিরোধীদলীয় হিসেবে বিবেচিত হবেন। তাঁর এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব অথবা ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ প্রকাশিত আমার প্রবন্ধে কোথাও এমন সংসদ সদস্যকে ‘নিরপেক্ষ’ বলে উল্লেখ করা হয়নি। মূল বিষয় হলো, এমন একজন সদস্য যিনি সরকারি দল বা প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে যুক্ত নন, তিনি উভয় দলের কোনোটিরই দলীয় অবস্থানের প্রতি দায়বদ্ধ নন। তিনি কাউন্সিলের আলোচিত বিষয়ে যেকোনো দিকে ভোট দিতে পারেন; কখনো হয়তো সরকারি দলের পক্ষে, কখনো বিরোধী দলের পক্ষে। এ ধরনের সদস্যের ভোটের পূর্বানুমান করা সম্ভব নয়। ভোটের এই অনিশ্চয়তাই নিজাম উদ্দিন আহমেদের দাবি খণ্ডন করে যে এনসিসির নয়জন সদস্যের মধ্যে পাঁচজন সদস্য অবশ্যই বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

এখানে বলা প্রয়োজন, কাউন্সিলে ভোটের এই অনিশ্চয়তা একটি বড় রকমের সুবিধা বয়ে আনবে; গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে প্রার্থী নির্বাচনের মতো সিদ্ধান্ত দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে নেওয়া সম্ভব হবে। যেহেতু কোনো দলই কাউন্সিলকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, স্বাভাবিকভাবেই আশা করা যায় দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থই অগ্রাধিকার পাবে।

------- ৪.

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের ব্যাপারে নিজাম উদ্দিন আহমেদ যথার্থই উল্লেখ করেছেন, ভারত ও পাকিস্তানেও ‘ফ্লোর ক্রসিংয়ে’ বিধিনিষেধ রয়েছে। নিজাম উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘স্থিতিশীল সরকার’ গঠনের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধান অপরিহার্য। তবে প্রকৃতপক্ষে এসব বিধান কতখানি নির্বাচিত সরকার পতন প্রতিরোধে কার্যকর, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

পাকিস্তানে ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে ইমরান খানের সরকারের পতন একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। পাকিস্তানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৩এ অনুযায়ী অনাস্থা প্রস্তাবসহ আরও কিছু বিষয়ে দলীয় নির্দেশ অমান্য করলে একজন আইনপ্রণেতার সদস্যপদ বাতিল হয়। এমন কঠোর বিধান থাকা সত্ত্বেও ইমরান খানের নির্বাচিত সরকারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কেননা এ ক্ষেত্রে পিটিআইয়ের বিদ্রোহীরা অনাস্থা প্রস্তাবের সময় নিজেদের দলের বিরুদ্ধে ভোট দেননি; বরং তাঁরা পদত্যাগ করেছেন বা ভোটদান থেকে বিরত থেকেছেন। ফলে কৌশল অবলম্বন করে অনুচ্ছেদ ৬৩এ-এর আওতা এড়িয়ে গেছেন। যেহেতু এই বিধান শুধু তখনই প্রযোজ্য, যখন একজন আইনপ্রণেতা সক্রিয়ভাবে দলীয় নির্দেশের বিরুদ্ধে ভোট দেন, বিদ্রোহীরা কোনো শাস্তির সম্মুখীন হননি।

ভারতেও অনুরূপ ফ্লোর ক্রসিং-সংক্রান্ত বিধান থাকা সত্ত্বেও তা স্থিতিশীল সরকার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি। রাজনৈতিক দলত্যাগ রোধে প্রণীত ভারতের সংবিধানের দশম তফসিল বারবার আইনি ফাঁকফোকর ও রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে উপেক্ষিত হয়েছে। দলীয় হুইপকে অগ্রাহ্য করে অযোগ্য হওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার পরিবর্তে, বিধায়কেরা প্রায়ই দলবদ্ধভাবে পদত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন। ফলে উপনির্বাচন অনিবার্য হয়ে উঠেছে এবং ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব হয়েছে।

ঠিক এভাবেই ২০১৯ সালে কর্ণাটকে কংগ্রেস-জেডি (এস) জোটের ১৭ জন বিধায়ক পদত্যাগ করেন, যার ফলে সরকার পতন হয় এবং উপনির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। একই রকম কৌশল ২০২০ সালে মধ্যপ্রদেশেও ব্যবহৃত হয়, যেখানে কংগ্রেসের ২২ জন বিধায়ক পদত্যাগ করেন, যাঁদের অনেকেই পরে বিজেপিতে যোগ দেন, ফলে কমল নাথের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে।

অতএব এটি পরিষ্কার, ফ্লোর ক্রসিং-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ নির্বাচিত সরকারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। কৌশলী পদত্যাগ, সংগঠিত দলত্যাগ বা রাজনৈতিক দর-কষাকষির মাধ্যমে খুব সহজেই ফ্লোর ক্রসিং-সংক্রান্ত বিধান অকার্যকর করা সম্ভব। ফলে এ ধরনের বিধান সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য বলে নিজাম উদ্দিন আহমেদের দাবি বাস্তব ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে টেকে না।

যুক্তরাজ্যের পপলার এবং লাইমহাউসের এমপি আপসানা বেগমের ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন যে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ায় তাঁকেও শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। তবে তাঁর এই শাস্তি নিশ্চয়ই সংসদীয় শাসনব্যবস্থার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; বরং দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কারণে এ ব্যাপারে যুক্তরাজ্যে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। লেবার পার্টির সমর্থক তৃণমূল সংগঠন ‘মোমেন্টাম’-এর সহসভাপতি কেট ডোভ লেবার পার্টির নেতৃত্বের এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘এটা স্পষ্ট, স্টারমারের নেতৃত্ব দলীয় হুইপ ওই প্রক্রিয়াকে গোষ্ঠীগত লাভের জন্য অপব্যবহার করছে।’

বাস্তবে ফ্লোর ক্রসিং-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। বরং এসব বিধান সংসদ সদস্যদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত করে, প্রকৃত মতবিরোধ ও বিতর্ককে দমন করে এবং মৌলিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে খর্ব করে। ফলে এ ধরনের বিধানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

------- ৫.


নিজাম উদ্দিন আহমেদ কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনব্যবস্থা সঠিকভাবে উপস্থাপন করেননি। তিনি দাবি করেছেন, ‘কয়েক হাজার স্থানীয় প্রতিনিধির পক্ষ থেকে মাত্র ৭৬ জন স্থানীয় প্রতিনিধি (সমন্বয়ক) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবেন’ এবং ‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা থাকবে না’—যা তাঁর মতে ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ আরেক রূপ। তাঁর এ বক্তব্যে কমিশনের প্রস্তাব সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি।

কমিশনের রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিটি ‘জেলা সমন্বয় কাউন্সিল’ (ডিসিসি) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সামষ্টিকভাবে একটি করে ভোট প্রদান করবে [অনুচ্ছেদ ৩.২.১(আ)]। দেশে মোট ৬৪টি জেলা থাকায়, প্রতিটি জেলায় ডিসিসি গঠিত হলে ভোটের সংখ্যা দাঁড়াবে ৬৪। অনুরূপভাবে অনুচ্ছেদ ৩.২.১(ই) এ বলা হয়েছে, প্রতিটি সিটি করপোরেশন সমন্বয় কাউন্সিলও (সিসিসি) একটি করে সামষ্টিকভাবে ভোট প্রদান করবে, ফলে সব সিটি করপোরেশন অন্তর্ভুক্ত হলে মোট ভোট হবে ১২টি।

কমিশনের প্রতিবেদনে কোথাও বলা হয়নি, প্রতিটি ডিসিসি বা সিসিসি থেকে একজন ব্যক্তিই পুরো কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ভোট প্রদান করবেন। বরং অনুচ্ছেদ ৩.২.২,  ৬.৩.১ এবং ৬.৩.২ একত্রে পাঠ করলে এটা সুস্পষ্ট যে ডিসিসি এবং সিসিসির প্রত্যেক সদস্য স্বাধীনভাবে ভোট প্রদান করবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যে প্রার্থী ডিসিসি বা সিসিসির সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট লাভ করবেন, তিনি সেই পরিষদের একটি ভোট পেয়েছেন বলে গণ্য হবেন।

সুতরাং ভোট গ্রহণে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির সংখ্যা ৭৬-এর চেয়ে অনেক বেশি হবে। অর্থাৎ শুধু ৭৬ জন সমন্বয়ক হাজার হাজার লোকের পক্ষে ভোট প্রদান করছেন বলে নিজাম উদ্দিন আহমেদ যে দাবি করেছেন, তা ঠিক নয়। কাজেই স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা উপেক্ষিত হচ্ছেন না, বরং তাঁরা প্রক্রিয়াটির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সংযুক্ত থাকছেন।

------- ৬.

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো নিজাম উদ্দিন আহমেদ খুব সহজেই কমিশনের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। আইয়ুব খানের শাসনামলে মাত্র ৮০ হাজার ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’—যাঁরা দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করতেন—জাতীয় নেতাদের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল একটি পরোক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো ভূমিকা ছিল না। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আইয়ুব খান নিজের ক্ষমতা আরও দৃঢ় করেছিলেন।

এটি সাধারণভাবে স্বীকৃত, আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ছিল মূলত একধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত’ বা ‘প্রতারণামূলক’ গণতন্ত্র। অন্যদিকে কমিশনের প্রস্তাব স্পষ্টভাবে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে, যেখানে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিক সরাসরি তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকা শক্তি। তাই কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ তুলনা করা একেবারেই যুক্তিযুক্ত নয়।

উপরন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বকে আরও সম্প্রসারিত করা, সংসদীয় প্রক্রিয়াকে বিলুপ্ত বা দুর্বল করা নয়। এখানে স্পষ্ট করে বলা জরুরি, স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পৃক্তি সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকারের বিকল্প নয়; এটি সংসদীয় ভোটাধিকারের পাশাপাশি বিদ্যমান থাকবে।

নিজাম উদ্দিন আহমেদের আশঙ্কা, এ ব্যবস্থায় ‘মৌলিক গণতন্ত্র’-এর দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত রয়েছে, তা একেবারেই অমূলক। কমিশনের কোনো প্রস্তাবই আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’-এর কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর সঙ্গে দূরতম সাদৃশ্যও বহন করে না। এ ধরনের তুলনা শুধু সংবিধান সংস্কারের প্রকৃত প্রচেষ্টাকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

নিজাম উদ্দিন আহমেদের প্রবন্ধের শিরোনাম ‘সংসদীয় গণতন্ত্র নাকি “মৌলিক গণতন্ত্রের” অন্য রূপ’ মূলত বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য কোনো হুমকি নয়; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করারই একটি প্রচেষ্টা।

* ইমরান সিদ্দিক সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নয়, সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করাই লক্ষ্য

ফারাক্কার ৫০ বছর: বাংলাদেশের নদনদীতে কী প্রভাব? টিকতে পারে কতদিন? by শুভজ্যোতি ঘোষ ও আবুল কালাম আজাদ

ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বেশিদিন ধরে অস্বস্তির কারণ হয়ে থেকেছে যে বিষয়টি, সেটি নি:সন্দেহে ফারাক্কা বাঁধ। ভারতে এটির পোশাকি নাম 'ফারাক্কা ব্যারাজ প্রজেক্ট', এবং বহু আলোচনা ও বিতর্ক পেরিয়ে চলতি বছরের এই মে মাসে প্রকল্পটি পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করছে।

বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে ফারাক্কা নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান অভিযোগ ছিল এই ফারাক্কার ফলেই প্রমত্তা পদ্মা শুকিয়ে গেছে। অন্য দিকে ভারত বরাবর যুক্তি দিয়ে এসেছে কলকাতা বন্দরকে রক্ষা করার জন্য ফারাক্কা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না!

ফারাক্কা চালু হওয়ার দু'দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯৬তে ভারত ও বাংলাদেশ যে ঐতিহাসিক গঙ্গা জলচুক্তি স্বাক্ষর করে, তাতে অবশ্য ভাগীরথী ও পদ্মায় গঙ্গার জল ভাগাভাগি নিয়ে একটা ফর্মুলায় দুই দেশ একমত হতে পেরেছিল।

তিরিশ বছর মেয়াদি সেই চুক্তির কার্যকালও প্রায় শেষের পথে, চুক্তির নবায়ন নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে। তবে ফারাক্কা নিয়ে বিতর্ক, বিরোধ বা দোষারোপের পালা কিন্তু কখনওই থামেনি।

তবে ফারাক্কার জন্যই পদ্মার দু'কূলে মানুষের জীবন-জীবিকা আজ বিপন্ন বলে যেমন বাংলাদেশের অভিযোগ – তেমনি ভারতেও কিন্তু ফারাক্কার সমালোচনা কম নয়।

যেমন মাত্র কয়েক বছর আগেই ফারাক্কা ব্যারাজ ভেঙে দেওয়ারও দাবি তুলেছিল বিহার সরকার, যে রাজ্যটির অভিযোগ প্রতি বছর ফারাক্কার কারণেই তাদের বন্যায় ভুবতে হয়। ফারাক্কার উজানে ও ভাঁটিতে গঙ্গার ভাঙনও ওই এলাকার মানুষের জন্য খুব বড় সমস্যা।

তা ছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞই মানেন কলকাতা বন্দরকেও সেভাবে বাঁচাতে পারেনি ফারাক্কা – যে কারণে উপকূলের কাছে তৈরি করতে হয়েছিল আর একটি স্যাটেলাইট বন্দর হলদিয়া।

তাহলে আজ ৫০ বছর পরে এসে ফারাক্কার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারত ঠিক কী ভাবছে? পাশাপাশি, ফারাক্কা প্রকল্পটাতেই বা তখন ঠিক কী করা হয়েছিল এবং সেগুলো কী ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেছে?

ফারাক্কা ব্যারাজ প্রোজেক্ট বা এফবিপি-র সার্ধশর্তবর্ষপূর্তিতে সরেজমিনে ফারাক্কা ও আশেপাশের এলাকায় এবং কলকাতা বন্দরে গিয়ে ঠিক এই বিষয়গুলোতেই নজর দিয়েছে বিবিসি বাংলা – এই প্রতিবেদনে থাকছে তারই সারাংশ।

ফারাক্কা প্রকল্পটা আসলে ঠিক কী?

এক কথায় বলতে গেলে, ফারাক্কা হলো গঙ্গায় বাঁধ দিয়ে ও কৃত্রিম খাল কেটে পদ্মার দিক থেকে জলের প্রবাহ ভাগীরথীর দিকে সরিয়ে আনা – যাতে কলকাতা বন্দরকে বাঁচিয়ে রাখা যায়!

প্রকল্পের বর্তমান প্রধান, টেকনোক্র্যাট আর ডি দেশপান্ডের বলতে কোনো দ্বিধা নেই, "যে লক্ষ্য সামনে রেখে ফারাক্কা তৈরি করা হয়েছিল, আমরা জোর গলায় বলতে পারি সেটা পুরোপুরি সফল হয়েছে। কলকাতা বন্দর যে আজও টিঁকে আছে, তা ফারাক্কার জন্যই!"

আসলে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১৮ কিলোমিটার উজানে নির্মিত এই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্যই ছিল গঙ্গার প্রবাহ থেকে অতিরিক্ত জল ভাগীরথীতে সরিয়ে আনা ও তার মাধ্যমে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানো – যার জন্য কাটা হয়েছিল প্রায় ৪০ কিলোমিটার লম্বা একটি 'লিঙ্ক ক্যানাল' বা কৃত্রিম খাল।

ফারাক্কা ব্যারাজ প্রকল্পর সুন্দর সাজানো গোছানো টাউনশিপে নিজের বাতানুকূল অফিসঘরে বসে আর ডি দেশপান্ডে বিবিসিকে বলছিলেন, পদ্মা নয়, গঙ্গার মূল প্রবাহ আগে ভাগীরথী দিয়েই যেত – ফারাক্কা শুধু সেই 'পুরনো ইতিহাস'কেই কিছুটা ফিরিয়ে এনেছে।

তিনি জানাচ্ছেন, "গঙ্গোত্রী থেকে উৎপন্ন হয়েছে যে পবিত্র গঙ্গা নদী, সাতশো বছর আগেও তার পুরো প্রবাহটা কিন্তু এখনকার ভাগীরথী-হুগলী দিয়েই যেত আর মোহনায় তা সাগরদ্বীপের কাছে গিয়ে মিশত – ওটাই গঙ্গার আসল মোহনা ছিল বলে সেই তীর্থের নাম হয়েছিল গঙ্গাসাগর।"

"তখন পদ্মা ছিল গঙ্গার একটা ছোট শাখানদী। কিন্তু পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ধীরে ধীরে সেই প্রবাহ পদ্মার দিকে সরতে থাকে।"

"ফলে ব্রিটিশ আমলে যখন দেখা গেল তাদের জাহাজ কলকাতা বন্দরে ন্যূনতম ড্রাফটও পাচ্ছে না, তখন ১৮৫৩ সালে ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার আর্থার কটন গঙ্গা থেকে সম্ভাব্য দুটো জায়গায় – রাজমহল বা ফারাক্কায় – খাল কেটে ভাগীরথীতে জল টানার প্রস্তাব দেন।"

ফারাক্কা থেকে খাল কাটলে দৈর্ঘ্য অনেক কম হবে বলে অবশেষে ফারাক্কাকেই এই কাজের জন্য বেছে নেওয়া হয়।

স্বাধীন ভারতে ১৯৬১ সালে অবশেষে সেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, আর ১৯৭৫ সালে এসে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন ফারাক্কা ব্যারাজ।

প্রকল্পের কাজ অবশ্য তারও বছরকয়েক আগেই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম ফারাক্কার কমিশনিং পিছিয়ে দিয়েছিল বলে অনেকেই মানেন।

ফারাক্কার কাজ যখন শুরু হয়, তখন গঙ্গার ভাঁটিতে ছিল 'শত্রু দেশ' পূর্ব পাকিস্তান – কিন্তু রাতারাতি সেখানে একটি 'বন্ধু দেশ' চলে আসার ফলে ফারাক্কায় একতরফাভাবে গঙ্গা থেকে জল প্রত্যাহার ভারতের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠেছিল।

যদিও অবশেষে ১৯৭৫-এর গোড়ায় এসে ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় আসতে সক্ষম হন – ঠিক হয় এপ্রিল-মে মাসে প্রতি দশদিন অন্তর গঙ্গা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ জল সরানো হবে। সেই 'পরীক্ষা' অবশ্য পরেও আরও বহু বছর ধরে চলতে থাকে।

সে বছরের মে মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে ফারাক্কার উদ্বোধন করেন দেশের সেচমন্ত্রী জগজীবন রাম, পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে যা কয়েক কোটি কিউসেক বাড়তি জল কলকাতায় এনে ফেলেছে!

ভূতাত্ত্বিক ও নদী গবেষক ড: পার্থসারথি চক্রবর্তী বলছিলেন, "কলকাতা বন্দরে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত কিন্তু আমাদের নাব্যতা (নেভিগেবিলিটি) ছিল, ২৬ ফুট ড্রাফট ছিল। এবং তাতে ২৯১ দিন এই বন্দরে জাহাজ ঢুকত, মানে ওই ২৬ ফুট ড্রাফটের জাহাজ ঢুকত। ১৯৬০ সালের পর থেকে কিন্তু মারাত্মক অবস্থা হয়।"

"এখন এই ফারাক্কা অঞ্চল কেন? ফারাক্কা অঞ্চলকে ব্যারাজ করার জন্য বাছা হলো, তার কারণ সেখানে একশো বছরের মধ্যে নদী নড়াচড়া করেনি, তার ব্যাঙ্কের মধ্যেই ছিল। এবং ওই ব্যারাজটা ওইখানে করলে, জলটা, ব্যারাজটার ঠিকমতো স্টেবিলিটি থাকবে।"

তিনি আরও জানাচ্ছেন, ফারাক্কায় এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, যাতে কলকাতায় সম্পূর্ণ 'সিল্ট-ফ্রি' বা পলিমুক্ত জল সরবরাহ করা যায়।

"তার জন্য ওখানে 'ছাঁকনি' দেওয়া আছে, যে কারণে ফারাক্কার জল কলকাতায় পানীয় জল হিসেবেও সাপ্লাই দেওয়া হয়", বলছিলেন মি চক্রবর্তী।

ফলে ১০০০ মাইলেরও বেশি পথ পেরিয়ে উত্তর ভারতের 'লাইফলাইন' গঙ্গা ফারাক্কাতে এসে ব্যারাজের বাধায় বাঁধা পড়েছে – আর সেখানে মোট ১০৯টি লকগেটেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে নদীর জলের প্রবাহ।

আর ফারাক্কাতে নদীর ডান দিক থেকে কাটা হয়েছে ৩৮.৩ কিলোমিটার লম্বা ভাগীরথী ফিডার ক্যানাল, যা জঙ্গীপুরের কাছে ভাগীরথীতে গিয়ে মিশেছে এবং পরে সেই নদী হুগলী নামে পরিচিতি পেয়েছে।

এককালের ছোট্ট গ্রাম ফারাক্কাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে একটি আধুনিক উপনগরী, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণপ্রান্তের মধ্যে রেল ও সড়ক যোগাযোগও স্থাপন করেছে ব্যারাজের ওপর দিয়ে তৈরি ট্রেনলাইন ও রাস্তা।

ক্যানালের জলে প্রচুর মাছ ধরা পড়ে, এমন কী ইলিশও! ভারতে হলদিয়া থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত '১ নম্বর জাতীয় জলপথে'রও অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই ক্যানাল।

আশির দশকে ফারাক্কাতে এনটিপিসি-র যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়, তারাও ব্যবহার করে এই ক্যানালের জল। ভাঁটির দিকে মুর্শিদাবাদের সাগরদীঘিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারও একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে, তারাও এই জলের ওপর নির্ভরশীল।

সব মিলিয়ে ফারাক্কা শুধুমাত্র একটি বাঁধ ও খালই নয়, এই প্রকল্পকে ঘিরে গত পঞ্চাশ বছরে একটা বিরাট ক্যানভাসই আঁকা হয়ে গেছে বলা চলে – যাকে বিশেষজ্ঞরা 'ফারাক্কা ইকোসিস্টেম' নামে বর্ণনা করে থাকেন।

ফারাক্কা নিয়ে ভারতেও এতো বিতর্ক কেন?

ফারাক্কার প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে ভারতেও অনেক বিশেষজ্ঞ সন্দিহান ছিলেন। তবে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানোর যুক্তিটা এতটাই প্রবল ছিল যে সেই সব আপত্তি বিশেষ ধোপে টেঁকেনি।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ বিভাগের একজন শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশলী, কপিল ভট্টাচার্য তো ফারাক্কার বিরোধিতা করে সরকারি চাকরিও ছেড়ে দিয়েছিলেন।

ফারাক্কা প্রকল্প কেন বিপজ্জনক, তার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি অনেক লেখালেখিও করেছেন। পরবর্তী জীবনে কপিল ভট্টাচার্য অ্যাক্টিভিস্টে পরিণত হন, যুক্ত ছিলেন মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআরের সঙ্গেও।

১৯৮৯ সালে মি ভট্টাচার্যের মৃত্যুর ২৭ বছর পর, ২০১৬ সালে বিহারের রাজ্য সরকার ফারাক্কা বাঁধ 'তুলে দেওয়ার জন্য' কেন্দ্রের কাছে আনুষ্ঠানিক দাবি জানায়।

তখন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করে যুক্তি দিয়েছিলেন, ফারাক্কার জন্যই তার রাজ্য প্রতি বছর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে – অতএব বাঁধটাই তুলে দেওয়া হোক!

নীতীশ কুমার তখন প্রকাশ্যেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "গঙ্গায় খুব বেশি পলি পড়ছে বলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।"

"আর যখন থেকে ফারাক্কা বাঁধ তৈরি হয়েছে তখন থেকেই এই অবস্থা। নইলে আগে নদীর প্রবাহের সঙ্গে অনেকটা পলি বঙ্গোপসাগরে চলে যেত, সমুদ্রে গিয়ে মিশত।"

দশ-বারো বছর ধরে ফারাক্কার 'প্যাটার্ন' স্টাডি করেই এ মন্তব্য করছেন, তখন এ কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

নীতীশ কুমার আজও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী, তবে যে কোনো কারণেই হোক ফারাক্কা বিরোধিতার সুর তিনি অনেক স্তিমিত করে ফেলেছেন। এই মুহুর্তে তিনি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজনৈতিক সঙ্গীও।

তবে ফারাক্কার উজানে ঝাড়খন্ড-বিহারের সীমান্ত এলাকায় গিয়েও দেখেছি, সেখানে আমজনতারও এই বাঁধকে নিয়ে বিস্তর অভিযোগ - বর্ষাতে যেমন, তেমনি শুকনা মৌসুমেও!

বিহারের আহমদাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ওয়াহিদ শেখের কথায়, "বর্ষার সময় ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়া উচিত, নইলে বিহারবাসীর খুব দুর্দশা! অথচ বর্ষার সময়ই গেট বন্ধ রাখে, নদী ওভারফ্লো করলে তখনই গিয়ে গেট খোলে – যখন বিহার ডুবে গেছে!"

"বর্ষার মৌসুম এলেই যদি গেট খুলে দেয়, তাহলে বিহার একটু স্বস্তি পাবে!"

ঝাড়খন্ডের সাহেবগঞ্জ জেলায়, গঙ্গাতীরের লাধোপাড়া গ্রামের মিশির শেখ আবার বলছিলেন, "রাজমহলের ওপারে গঙ্গা যদি দেখেন – গরমে নদী তো একদম শুকিয়ে যায়!"

"ছোট একটা নালার মতো গঙ্গা বইতে থাকে, বাকি পুরোটা শুকিয়ে যায়। এখন সব জল (বাংলাদেশে) ছেড়ে দিলে কোনো ফসলই হবে না, কিষাণ তো না খেয়ে মরবে!"

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড: সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায় ফারাক্কা অঞ্চলে বাঁধের প্রভাব নিয়ে ফিল্ড স্টাডি ও গবেষণা করেছেন – এ ব্যাপারে তারও মিশ্র অভিজ্ঞতা।

"ফারাক্কায় নদীর বুকেও চর পড়েছে, মাঝনদীতে বক দাঁড়িয়ে আছে এটাও যেমন দেখেছি – তেমনি গঙ্গার বিধ্বংসী ভাঙনে পারের মানুষের জীবন ছারখার হয়ে যেতেও দেখেছি", বলছিলেন তিনি।

সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, "এই নদীর যে প্যাটার্নের চেঞ্জটা, ইটসেল্ফ নদীটার মধ্যে, তার দুই পারে সবটারই ওপরে একটা ইমপ্যাক্ট ফেলেছে ফারাক্কা ব্যারাজ। ডেফিনিটলি। তার পজিটিভগুলো আমরা পেয়েছি, নেগেটিভগুলোও আমরা দেখতে পাচ্ছি।"

ফারাক্কাতে তার শেষ ফিল্ড স্টাডিতে স্থানীয় গ্রামবাসীরা ফারাক্কা বাঁধকে তুলনা করেছিলেন একটা সাপের মাথা চেপে ধরার সঙ্গে!

"এমনিভাবে দেখাল যে, একটা সাপ রয়েছে তার মুখটা আপনি চেপে ধরলেন – মানে মাথাটা, তাহলে সে তো দেখবেন ছটফট করছে বেরোনোর জন্য।"

"অ্যাজ ইফ ব্যারাজটা যেন একটা সাপের মুখটা চেপে ধরার মতো জিনিস – এবং নদী তখন, নদীর কোর্সটা তো পাল্টাচ্ছে – সে আর একভাবে যেতে পারছে না, সে যেহেতু রেস্ট্রিক্টেড, বাউন্ডেড ... তাই সে আরও বেশি করে ... প্যাটার্নটা, কার্ভসগুলো আরও বেশি হচ্ছে, ছটফট করার মতো ... ওরা সুন্দর একটা এক্সপ্ল্যানেশন দিয়েছিল", জানাচ্ছেন তিনি।

ফারাক্কার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আবার জানাচ্ছেন, নদীর ভাঙন ঠেকাতে না-পারলে ফারাক্কা অচিরেই তাদের জন্য চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে!

ফারাক্কা আসনের এমএলএ (বিধায়ক) মনিরুল ইসলাম বিবিসিকে বলছিলেন, "ফারাক্কার জন্য আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাটা অবশ্যই ভাল হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের মেলবন্ধন এটা তৈরি করেছে ঠিক, কিন্তু আমাদের আপিল কি গঙ্গার ড্রেজিং-টা করে দিলে আমরা কিন্তু বিপদমুক্ত হব আর কী!"

"এই ড্রেজিং না করলে আগামী পঞ্চাশ বছর বলছেন কেন, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমরা নদীর গর্ভে চলে যাব। তো আমাদের কাছে ব্যারাজ একরকম অভিশাপের কারণ হয়েও দাঁড়িয়ে গেছে আর কী!"

তিনি আরও বলছিলেন, "মুর্শিদাবাদের মোরগ্রাম থেকে নিয়ে আপনার মালদা পর্যন্ত আমাদের এই ভৌগোলিক অবস্থানটা দেখবেন – আমরা একটা সরু রাস্তার ওপর বাস করছি। ওদিকে ঝাড়খন্ড, এদিকে নদী, বাংলাদেশ – এইটুকুনটা!"

"তাই আমাদের হাজার হাজার একর যে নদীর গর্ভে গিয়েছে, মাঝনদীটাকে যদি ড্রেজিং করে পাথর দিয়ে বেঁধে দেয় আর কী, তাহলে অনেক লোক ওখানে চাষবাস করে, বাড়িঘর করে থাকতে পারবে", কেন্দ্রের কাছে দাবি জানান তিনি।

তবে ফারাক্কা নিয়ে এরকম অনেক বিতর্ক থাকলেও বাঁধ তুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে কাজ কিন্তু বিশেষ এগোয়নি!

ফারাক্কা বাঁধ 'ডিকমিশন' করতে নীতিশ কুমার প্রস্তাব দেওয়ার পর দেশের জলসম্পদ মন্ত্রণালয় কিন্তু একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করেছিল – যাতে কেন্দ্রের তরফে পাঁচজন আর বিহার সরকারের তরফে পাঁচজন সদস্য ছিলেন।

সেই কমিটিতে বিহারের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন দেশের সুপরিচিত নদী বিশেষজ্ঞ ও গবেষক হিমাংশু ঠক্কর।

মি. ঠক্কর বিবিসিকে বলছিলেন, "আমাদের দায়িত্ব ছিল ফারাক্কা বিহারের ওপর ঠিক কী প্রভাব ফেলেছে, তা নিরূপণ করা।"

"কিন্তু ফারাক্কা হওয়ার আগে ও পরে নদীতে ড্রেইনেজ কনজেসশন কী, বন্যার তীব্রতা ও কত ঘন ঘন বন্যা হয়েছে, নদীর ধারণক্ষমতা কত, সে সব ব্যাপারে সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন আমাদের কোনো তথ্য-উপাত্তই দেয়নি, ফলে আমরাও কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি।"

তবে ফারাক্কার 'বিরূপ প্রভাব' যে গোটা এলাকায় পড়েছে তাতে মি. ঠক্করের কোনো সন্দেহ নেই, নীতিশ কুমারের প্রস্তাবেও যথেষ্ঠ যুক্তি ছিল বলে তিনি মনে করেন।

আগামী পঞ্চাশ বছরে ফারাক্কার ভবিষ্যৎ কী?

ফারাক্কা থেকে টানা ফিডার ক্যানালে শুষ্ক মৌসুমে কতটা জল টানা যাবে, আর মূল নদী দিয়ে পদ্মায় কতটা জল ছাড়া হবে – ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা চুক্তির মূল কথা কিন্তু সেটাই।

এখনকার চুক্তি বলছে, প্রতি বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে মে – এই শুকনা মৌসুমের সময়টায় প্রথম দশদিন ক্যানাল আর পরের দশদিন করে পদ্মা অন্তত ৩৫০০০ কিউসেক পরিমাণ জল পাবেই ('অ্যাশিওর্ড অ্যামাউন্ট' বা প্রতিশ্রুত পরিমাণ)।

এই জলের প্রবাহ ঠিকঠাক যাচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য ব্যারাজ থেকে কয়েকশো মিটার দূরে ভাঁটির দিকে মনিটরিং স্টেশন-ও আছে, যেখানে ভারত ও বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা একসঙ্গে সার্বক্ষণিক অবস্থান করেন।

ঠিক একই ধরনের যৌথ মনিটরিং স্টেশন আছে বাংলাদেশের দিকে পদ্মার ওপরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছেও।

এখন আগামী বছর (২০২৬) কোন শর্তে সেই গঙ্গা চুক্তির নবায়ন হয় – বা আদৌ হয় কি না – যথারীতি তার ওপরও অনেকটা নির্ভর করছে ফারাক্কার ভবিষ্যৎ।

এদিকে উজানের বিহারে কিংবা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানিকচক-ধুলিয়ানে ফারাক্কাকে নিয়ে যতই বিতর্ক থাক, খোদ ফারাক্কা এলাকার গ্রামবাসীরা কিন্তু প্রকল্পের কারণে খুশি - তারা চান বাঁধের দীর্ঘায়ু।

ফারাক্কা উপনগরী লাগোয়া পলাশিগ্রামের বাসিন্দা তপন মিশ্র যেমন বলছিলেন, "অনেক কিছু থেকে সুবিধা হয়েছে। যেমন কৃষকরা জল পাচ্ছে, জেলেরা মাছ ধরে দুটো খেতে পাচ্ছে।"

"এই বাঁধ হওয়াতে এখানে শহর তৈরি হয়েছে মোটামুটি ছোটমোট একটা, কেউ বিজনেস করে খাচ্ছে, কেউ চাকরি করে খাচ্ছে ... দূর দূর ঝাড়খন্ড-ফাড়খন্ড কোথায় বন্যা হচ্ছে ওটা তো ধরলে চলবে না! ভালো হয়েছে, খারাপ হয়নি!"

ফারাক্কা ব্রিজ হওয়ায় স্থানীয় মৎস্যজীবী খগেন প্রামাণিকের আবার খুব সুবিধা হয়েছে দূরদূরান্তে মাছের চালান পাঠাতে।

তিনি পাশ থেকে যোগ করেন, "এই গঙ্গায় যে ব্রিজটা হওয়া, ব্রিজটা হওয়াতে কি উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দারুণ যোগাযোগ হয়ে গেছে – এইটা মেইন মেরুদন্ড হয়ে গেছে উত্তরবঙ্গের জন্য!"

"আগে এখানে সকালে নৌকাতে চাপলে দুপুর, বৈকালে গিয়ে পৌঁছাত ওপারে – সেই জিনিসটা এখন আর নেই!"

ফারাক্কার 'হিউম্যান জিওগ্রাফি' নিয়ে কাজ করেছেন যে গবেষকরা, তারা অবশ্য নিশ্চিত নন সাধারণ লোকের ভাবনা প্রকল্পে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে।

সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বলছিলেন, "আমার রেজিলিয়েন্স বিল্ডিংয়ের মধ্যে যদি আমি মানুষের মতামত, তাদের চোখে দেখা বা তাদের এক্সপেরিয়েন্স – কীভাবে তারা দেখছে নদীটাকে, সেটা যদি আমরা না ধরতে পারি, তাহলে কিন্তু একটা গ্যাপ রয়ে গেল।"

"আর যেটা আপনি বলছেন যে পঞ্চাশ বছর পরে কী হবে, এই গ্যাপটা কিন্তু আগাগোড়া রয়েই গেছে। আমরা কিন্তু কখনও দেখছি না এই রেজিলিয়েন্স বিল্ডিংয়ের মধ্যে মানুষকে ইনভলভ করা হচ্ছে বা কমিউনিটিগুলোকে ইনভলভ করা হচ্ছে।"

তিনি আরও মনে করেন, ফারাক্কাকে ঘিরে যে প্রযুক্তিগত সমাধানগুলো ভাবা হয়েছে - কত বছর তার মেয়াদ, বা তার পরে কী হবে – এগুলো নিয়ে একটা অস্পষ্টতা আছেই, আর সেখানে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের সঙ্গে প্রোজেক্টের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

"কারণ এটা একটা শক্তিশালী নদী, সেটাও তো আমাদের মেনে নিতে হবে যে তার একটা ন্যাচারাল প্রসেস বা স্বাভাবিক গতি ও ছন্দ আছে! সেটা গ্রামের মানুষ যেভাবে বুঝছে আমরা বুঝছি না", বলছিলেন সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আবার এই প্রেক্ষাপটেই কোনো কোনো পর্যবেক্ষক মনে করেন, বাঁধটা কিন্তু বর্তমান আকারে আর না রাখলেও চলে!

হিমাংশু ঠক্কর বিবিসিকে বলছিলেন, "আমেরিকা, ইউরোপ ও সারা দুনিয়া জুড়ে অজস্র বাঁধের ডিকমিশনিং হচ্ছে – শুধু আমেরিকাতেই গত ৩০ বছরে ২০০০রও বেশি ড্যাম ডিকমিশন করা হয়েছে, ইউরোপেও হয়েছে শত শত।"

"তবে এটাও ঠিক, গঙ্গার মতো বিশাল একটা নদীতে কোনো ড্যাম ডিকমিশন করার পূর্ব অভিজ্ঞতা কিন্তু তেমন নেই। তবে তার পরেও কাজটা খুবই সম্ভব – আর নানাভাবেই এই ডিকমিশনিং করা যায়।"

এখানে তিনি প্রস্তাব দিচ্ছেন 'অপারেশনাল ডিকমিশনিং'-এর, অর্থাৎ ব্যারাজের ওপরে ট্রান্সপোর্ট লিঙ্কটা রেখে গেটগুলো সব খুলে রাখার বা তুলে দেওয়ার, যাতে রেল ও সড়ক সংযোগ রেখেও নদীকে স্বাভাবিকভাবে বইতে দেওয়া যায়।

"পাশাপাশি ক্যানালটা এখন যে সুবিধাগুলো দিচ্ছে, সেটা কীভাবে বজায় রাখা যায় তাও দেখতে হবে। এতে কী হবে, ড্যামের মূল কাঠামোটা অক্ষত রেখেও ফারাক্কার অপারেশনাল ডিকমিশনিং করা যাবে", বলছিলেন মি ঠক্কর।

আবার এর একদম উল্টো মতবাদটা হল – কলকাতার স্বার্থেই ফারাক্কাকে যেভাবে হোক বর্তমান আকারেই রক্ষা করতে হবে!

এই মতে বিশ্বাসী ড: পার্থসারথি চক্রবর্তীর কথায়, "কলকাতা নদীবন্দরকে বাঁচাতেই হবে। কারণ কলকাতা নদীবন্দর শুধু কলকাতা কলকাতা বললে হবে না, সমগ্র পূর্ব ভারত এবং নর্থ-ইস্টার্ন রিজিওন – তার একটাই পোর্ট ভারতবর্ষের বলতে গেলে, আমাদের কলকাতা বন্দর। সেখানে কোনও কম্প্রোমাইজ নেই।"

"এর জন্য ফারাক্কা ব্যারাজটাকে যেভাবে হোক রেনোভেট করতে হবে, ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্রাকচার কীভাবে রেনোভেট করবে সেটা পুরোপুরি প্রকৌশলীদের ওপর।"

"আমার নদীটা তো আছে, নদীর খাত আছে ... আর আপনারা যেটা ভাবেন নদীর পার ভাঙছে, সব নদীরই পার ভাঙে! আমি নদীর ধারে থাকবো কেন? নদীর ধারে একটা বাফার থাকবে তো, সেই বাফার জোনটা দিয়ে রাখতে হবে", যুক্তি দিচ্ছেন তিনি।

এটা ঠিকই, পৃথিবীতে কোনো নদীবাঁধের আয়ুই অনন্তকাল নয় - কখনও তিরিশ, কখনও চল্লিশ বা কখনও আশি বছর পর একটি ব্যারাজ ডিকমিশনিং করা বা তুলে দেওয়ার বহু নজির নানা দেশে আছে।

ফারাক্কার ক্ষেত্রে ঠিক কী করা হবে আর কখন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ভারতের জলসম্পদ মন্ত্রণালয়ের – কিন্তু সেই লক্ষ্যে নির্দিষ্ট ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে বলে এখনও কোনো প্রমাণ নেই।

ফারাক্কা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ কিন্তু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এই প্রকল্পের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণই নেই।

ফারাক্কা ব্যারাজ প্রকল্পের মহাপরিচালক আর ডি দেশপান্ডে বিবিসিকে বলছিলেন, "দেখুন, এটা তো শুধু একটা ডাইভারশান বা জল টানার প্রকল্প, এখানে কিন্তু তেমন স্টোরেজ বা জলাধার কিছু নেই।"

"স্টোরেজ প্রকল্পগুলোর আয়ু হয়তো একশো বছর হয়, কারণ পলি পড়ে তার ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে যায়। ফারাক্কায় সে সমস্যা নেই, ফলে এটা অনায়াসে একশো বছরেরও বেশি টিঁকতে পারে।"

তবে তিনি স্বীকার করেন ফিডার ক্যানালের বেড (খাত) আর দু'পারের ক্ষয় ও ভাঙন একটা বড় সমস্যা, যেটা হয়তো 'ক্রস রেগুলেটরে'র মতো কিছু বসিয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মোকাবিলা করতে হবে।

"কিন্তু ফারাক্কা বাঁচবেই, বাঁচাতেই হবে – কারণ কলকাতা শহর, কলকাতা বন্দর আর গত পঞ্চাশ বছরে নদীকে ঘিরে যে ইকোসিস্টেম তৈরি হয়ে গেছে তাকে রক্ষা করতে হলে ফারাক্কাই একমাত্র ভরসা", খুব আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গীতে বলেন প্রকল্পের প্রধান।

ফলে ফারাক্কা নিয়ে আগামী দিনে কী করা উচিত, সে সম্বন্ধে ভারতেও নানা ধরনের মতামত আছে।

ফারাক্কার ভবিষ্যত ঠিক কোন পথে, তা এখনও কারও জানা নেই, কিন্তু এটা বলা যায়, ফারাক্কাকে নিয়ে বিতর্ক বোধহয় পরের ৫০ বছর ধরেও চলবে!

ফারাক্কার ৫০ বছর: পদ্মাসহ বাংলাদেশের নদনদীতে কী প্রভাব পড়েছে? by আবুল কালাম আজাদ

পদ্মা নদীর উজানে ভারতের গঙ্গায় নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ৫০ বছর হলো। আন্তসীমান্ত নদীর গতিপথে এই বাঁধ বিরূপ প্রভাব ফেলেছে বাংলাদেশের পদ্মাসহ এর শাখা নদ-নদীর ওপর।

ভারতে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেওয়ার কারণে পাঁচ দশকে বাংলাদেশের পদ্মায় চর জেগেছে, শুকিয়ে মরে গেছে পদ্মার উৎস থেকে সৃষ্ট বেশকিছু নদ-নদী।

বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সবচেয়ে বেশিদিন ধরে অস্বস্তির কারণ হয়ে থেকেছে যে বিষয়টি–– সেটি হচ্ছে ফারাক্কা।

এই বিতর্কিত বাঁধের কারণে বহু নদীর মৃত্যু, জীবন-জীবিকা ও জীববৈচিত্রের ক্ষতিসহ বহুমাত্রিক প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশ-এমনকি ভারতের কিছু অংশেও এর জোরালো বিরোধিতা রয়েছে।

গত ৫০ বছরে ফারাক্কা ব্যারাজ বাংলাদেশের নদ-নদীতে যে বিরূপ প্রভাব রেখেছে তার বড় সাক্ষী বাংলাদেশে পদ্মা পাড়ের মানুষ।

ফারাক্কা পয়েন্টে ভারত পানি সরিয়ে নেওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় মারাত্মক পানি সংকট তৈরি হচ্ছে। এক সময়ের খরস্রোতা প্রমত্তা পদ্মার বুকে বিশাল চর জেগেছে, নদীর গতিপথ সংকীর্ণ হয়ে গেছে, নদীটিই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

আবার বর্ষাকালে সেই ফারাক্কারই সবগুলো গেট খুলে দেওয়া হচ্ছে। এরে ফলে প্রায় প্রতিবছরই গঙ্গা ও পদ্মা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বন্যা ও ভাঙনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

পদ্মায় ফারাক্কার প্রভাব

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পদ্মা নদী। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এ নদীটি উত্তরবঙ্গে রাজশাহী বিভাগ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

নদী গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের দীর্ঘতম এ নদীর গতিপথ থেকে শুরু করে এর শাখা নদনদীর প্রবাহে মারাত্মক ক্ষতি করেছে ফারাক্কা।

শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা যায় ধু ধু বালুচর।

রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন জানান, তাদের এক গবেষণায় দেখেছেন উজানে ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগের সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী পদ্মার ৮০ শতাংশ পানির প্রবাহ কমে গেছে এখন।

পদ্মা নদী-তীরবর্তী হাকিমপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ সানাউল্লা ৭০ বছর ধরে দেখে আসছেন পদ্মা নদী। ফারাক্কা বাঁধের আগে-পরে পদ্মার চরিত্র এবং পানির প্রবাহ নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয় রাজশাহীর গোদাগাড়ি ঘাটে।

দুই সময়ের তুলনা করে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, আগে অনেক স্রোত ছিল, নদী বড় ছিল। এখন তো পুরো চর।

"এখন আর তখনের বহুত ডিফারেন্স। বাঁধ ছিল না। যখন তখন পানির খুব বেগ, ক্ষমতা আর স্রোত ছিল। এ নদীর একটা পাড়ে নৌকা ভেড়াতে চারজন লোকও ঘাবড়ে গেছে, কারণ পানির এত স্রোত ছিল। এখন তো শুধু ডাঙ্গা।"

ছোট বেলা থেকেই রাজশাহী এলাকায় পদ্মা নদীতে মাছ শিকার করেন মোহাম্মদ রাব্বির হোসেন। পদ্মা নদীতে তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় নদীর পানি কমে যাওয়ায় মাছও অনেক কমে গেছে।

অতীতে তারা যেসব মাছ পেতেন, এখন আর সে ধরনের মাছ নদীতে ধরা পড়ে না। বর্ষা মৌসুমে কিছু মাছ ধরা পড়লেও বছরের অন্যান্য সময় বড় বড় মাছ এখন নদীতে মিলছে না।

অনেকে মাছ ধরা পেশা ছেড়ে দিয়েছেন বলেও জানান রাব্বির হোসেন।

প্রায় ৩৫ বছর নদীতে থাকার অভিজ্ঞতার স্মৃতি থেকে মি. হোসেন বলেন, "পদ্মার অনেক শাখা নদীও গত ৫০ বছরে শুকিয়ে গেছে। আগে পদ্মা কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত ছিল। শুষ্ক মৌসুমে এখন অনেক যায়গায় সরু খালের মতো পানি প্রবাহিত হচ্ছে।"

"চর পড়ে নদীর কন্ডিশন খারাপ। নদী আগে অনেক বড় ছিল। বড় বড় ডিঙি নৌকায় মাল লিয়া যাইতো। যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থাইকা ঢাকা যাইতো মাল লিয়া; আপনার আম, সবজি-তরকারি লিয়া ঢাকা যাইতো, আমার বয়সে আমি দেখেছি। সেরকম এখন যায় নাতো আর।"

পদ্মা নদী শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে রাব্বির হোসেন আশপাশের বেশকটি শাখা নদী মরে যেতে দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন।

পদ্মার শাখা নদ-নদীর মৃত্যু

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে পদ্মার বেশ কিছু শাখা নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সবগুলো শাখা নদীর।

পানি সংকটের কারণে পদ্মার যে শাখা নদীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বড়াল। রাজশাহী থেকে ভাটিতে চারঘাটে বড়াল নদীর উৎসমুখ।

সরেজমিনে গিয়ে বড়ালের উৎসমুখে দেখা যায় বিশাল চর জেগেছে, সেখানে পানির প্রবাহ নেই। বড়ালের দুই পাশে চর পড়ে উঁচু হয়ে গেছে। মাঝখানে সরু নালার মতো।

পদ্মা থেকে রাজশাহী, নাটোর হয়ে বড়াল নদীর গতিপথ যমুনা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ নদীর জীবন মৃত্যুর সাক্ষী চারঘাট এলাকার শিক্ষক মোহাম্মদ রেজাউল করীম। এ নদীতে বড় বড় নৌকা চলতে দেখেছেন বলে জানান তিনি।

তার বর্ণনায়, বড়ালে মালবাহী নৌযানের সঙ্গে যাত্রীবাহী নৌকাও চলাচল করতো। ষাটের কাছাকাছি নিজের বয়স উল্লেখ করে মি. করীম বলেন, কলেজ জীবনে বড়াল নদীতে নৌকায় চলাচল করতেন তিনি। এমনকি শিক্ষকতা জীবনের শুরুতেও কলেজ থেকে বাড়িতে বড়াল নদী দিয়েই তার যাতায়াত ছিল।

"যখন কলেজে পড়ি তখন তো নদীপথে এসে কলেজ করছি। এ নদীর শুকিয়ে যাওয়ার দুটি কারণ। একটা হলো ফারাক্কার বাঁধের জন্য এ নদীতে পানি আসছে কম। নদীটা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আর আরেকটা কারণ হলো এখানে স্লুইচ গেট দিয়ে পানি এদিকে যেতে পারছে না," নদীর পাশে দাঁড়িয়ে বলেন রেজাউল করীম।

পানি সংকটে পদ্মার যে শাখানদীগুলো সংকটে তার মধ্যে অন্যতম কুষ্টিয়ার গড়াই নদী অন্যতম।

অর্ধশতাব্দির বেশি সময় পদ্মা আর গড়াই নদীতে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা চলছে নায়েব আলীর। তার মতে, পদ্মার শাখা নদী গড়াইকে এখন জীবিত বলা চলে না। এই নদীতে আগের মত মাছ নেই। চর জেগেছে। আর খনন করলেও প্রতিবছর আবার পলি পড়ে ভরাট হয়ে যায়।

তিনি বলেন, "এ নদী মরে গেছে, নদী বেঁচে নেই। খালি বর্ষাকালডায় থাকে একটু পানি। বর্ষা চলে গেলি আর থাকে না।"

পদ্মায় গড়াই নদীর উৎসমুখে গিয়েও দেখা যায় বিশাল চর জেগেছে। ড্রেজার দিয়ে নদী খনন করে গড়াই নদী বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান বিবিসিকে বলেন, গড়াই নদী হলো পদ্মার একমাত্র পানির উৎস। আর এই গড়াই নদী সুন্দরবন পর্যন্ত মিঠা পানির প্রধান সোর্স।

"আমাদের গড়াই নদীটায় টোটাল ৪৪ কিলোমিটার চর পড়ে গিয়েছিল। বর্তমানে আমরা গড়াই নদী ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে সচল রাখছি। আর আমাদের কুষ্টিয়াতে ১১টা নদী আছে। এই নদীগুলো পদ্মা এবং গড়াই নদীর সঙ্গে লিংকআপ (যুক্ত)। এখন যদি টোট্যালি পদ্মায় পানি না পাওয়া যায় তাহলে এই নদীগুলো মৃতপ্রায় হয়ে যাবে।"

নদনদীর পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটা বড় দুশ্চিন্তা গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প নিয়ে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই সেচ প্রকল্প সম্পূর্ণ পদ্মার পানির ওপর নির্ভরশীল।

চারটি জেলার প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে সেচের জন্য ষাটের দশকে এই সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানি সংকটে সেচ প্রকল্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে বিভিন্ন সময়।

গত বছর পানির সংকটে শুষ্ক মৌসুমে জিকে সেচ প্রকল্প সেচের পানি পদ্মা থেকে উত্তোলন করে সরবরাহ করতে পারেনি।

পদ্মার আরও বেশ কিছু শাখা নদী ফারাক্কার প্রভাবে মৃতপ্রায় বলে উল্লেখ করেন নদী নিয়ে কাজ করা রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন।

"কপোতাক্ষ, ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, কুমার এই সবগুলো নদী যেগুলো সুন্দরবনে পানিপ্রবাহ নিয়ে যায় এগুলো মরে গেছে। আক্ষরিক অর্থে কার্যত মরে গেছে। আপনি কপোতাক্ষ নদের কাছে গিয়ে দেখবেন কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও পানিই নেই। যে হাঁটু পানি দেখা যায় এটা বৃষ্টির পানি। গঙ্গা থেকে আর আসে না," বলেন মি. রোকন।

"ভারতে জলাঙ্গী তারপর বাংলাদেশে মাথাভাঙ্গা, কুমার, নবগঙ্গা, গড়াই এবং চন্দনা–– এই সবগুলো নদী একসময় গঙ্গার মূল প্রবাহ ছিল। এই সবগুলো নদীই শাখানদীও টেকে নাই। সবগুলো মরে গেছে। ৬০ থেকে ৮০ ভাগ প্রবাহ যদি কমে যায় তাহলে সেই নদীর যে বায়োলজিক্যাল ক্যারেক্টার সেটা আর ঠিক থাকার কোনো কারণ নাই," তিনি যুক্ত করেন।

নদী গবেষকরা জানাচ্ছেন, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই বাংলাদেশে পদ্মা ও শাখানদীগুলোতে পানি সংকট শুরু হয়েছে।

রিভারাইন পিপলের শেখ রোকন পদ্মা ও এর শাখা নদনদীগুলোর বর্তমান সংকটের পেছনে ফারাক্কা ব্যারাজকে দায়ী করেন।

"নিঃসন্দেহে ফারাক্কার প্রভাব। আমরা আমাদের গবেষণায় দেখেছি যে ফারাক্কা চালু হলো ১৯৭৫ সালে, তার আগ পর্যন্ত এই নদীগুলো ঠিক ছিল। যখন ফারাক্কা বাঁধ চালু হলো তারপর এই নদীগুলো মরে যাওয়া শুরু হয়েছে।"

"আমরা একটি চুক্তি করেছি ১৯৯৬ সালে যেটা ২০২৬ সালে শেষ হবে– সেই চুক্তির পর আমরা কিছু পানি পেয়েছি। কিন্তু তার আগে ২০ বছরে যে পানি আসে নাই তখন এই নদীগুলো মরে গেছে। গড়াইয়ের মতো নদীগুলো উঁচু হয়ে গেছে। যখন নদীখাত উঁচু হয়ে যায়, তখন পরে পানি দিয়ে খুব বেশি লাভ পাওয়া যায় না।"

শেখ রোকন বলছেন, পদ্মার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অবিলম্বে গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নসহ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।

"দ্রুত চুক্তি নবায়ন করতে হবে। আর আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচগুলো থাকতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে আন্তসীমান্ত নদীর জন্য দুটো সনদ আছে জাতিসংঘ থেকে। একটা হচ্ছে ইউএন ওয়াটার কনভেনশন ১৯৯২। আরেকটা হলো ইউএন ওয়াটার কোর্সেস কনভেনশন ১৯৯৭। তো এই দুটোর ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে দ্রুত র‍্যাটিফাই (অনুমোদন) করতে হবে।"

"৯৭ সালেরটা আমরা ভোট দিয়েছি, কিন্তু এখনও রেটিফাই করিনি সংসদে। এটা করতে হবে। আর '৯২ সালেরটা সাক্ষর করার জন্য বাংলাদেশ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই মাসেই। তো এটা দ্রুত অনুসাক্ষর করতে হবে," বলেন শেখ রোকন।

ফারাক্কা ব্যারাজ ও সংলগ্ন ফিডার ক্যানাল, আকাশ থেকে তোলা ছবি
ফারাক্কা ব্যারাজ ও সংলগ্ন ফিডার ক্যানাল, আকাশ থেকে তোলা ছবি

চীনে কেন নতুন সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়েছে? by ফ্রান্সেসকো সিসি

ষাট বছর আগে চীনে যেভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়েছিল, তা ছিল বিশৃঙ্খল, সহিংস ও অগোছালো। কিন্তু এবার চীন সংস্কৃতিগত পরিবর্তনের যে উদ্যোগটি নিয়েছে, তা অনেক বেশি পরিকল্পিত, গোছানো এবং শক্ত অবস্থান থেকে পরিচালিত হচ্ছে।

চীন এখন দেশের ভেতরে পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজস্ব সংস্কৃতিকে জোরদার করছে। অনেকের মতে, এটি এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। চীন হয়তো দীর্ঘ সময়ের জন্য নিজের মতো করে টিকে থাকার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘চীন একটি নতুন একাডেমিক শাখা চালু করেছে। এর উদ্দেশ্য জাতিগত গবেষণায় পশ্চিমা পক্ষপাত দূর করা এবং একক জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের বয়ানকে মজবুত করা।’ এই উদ্যোগ সম্ভবত সোভিয়েত যুগ থেকে পাওয়া জাতিগত দ্বন্দ্বের বোধকে অতিক্রম করার চেষ্টা।

চীনের জাতীয় জাতিগত–বিষয়ক কমিশনের পরিচালক পান ইউয়ে বলেছেন, ‘চীনের জাদুঘরগুলোর উচিত সব ধরনের ভুল ইতিহাসভিত্তিক ধারণার বিরোধিতা করা। বিশেষ করে হান ও অ-হান জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ তৈরির যেকোনো চেষ্টা রুখে দেওয়া।’

পান ইউয়ে পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযানেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাই এই উদ্যোগকে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর লক্ষ্য হচ্ছে—জাতীয় ঐক্য মজবুত করা, জাতিগত বিভাজন কমিয়ে আনা এবং ধীরে ধীরে বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রভাব দূর করা।

তবে এই উদ্যোগ শুধু রাজনৈতিক নয়, একে একটি সাংস্কৃতিক প্রশ্ন হিসেবেও দেখা যায়। চীনা চিন্তাবিদ গো ঝাওগুয়াং তাঁর ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘চীনা চিন্তার ইতিহাস’ বইয়ের তৃতীয় খণ্ডে লিখেছেন, বিশ শতকের শুরুর দিকে চীন তার সব চিন্তা-পদ্ধতি পশ্চিমা ক্যাটাগরিতে পুনর্গঠিত করেছিল। যেমন ‘দর্শন’, ‘ধর্ম’ বা ‘অর্থনীতি’—এগুলো চীনা চিন্তায় আগে ছিল না। জাপানি অনুবাদের মাধ্যমে এই শব্দগুলো এসেছে।

এই পুনর্বিন্যাসের ফলে চীনের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গিকেও নতুনভাবে সাজানো হবে। কিন্তু সমাজের অনেকেই হয়তো এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি এখনো। ফলে তারা দুই জগতের মধ্যে আটকে গেছে। একদিকে পশ্চিমা ধারণা, অন্যদিকে চিরাচরিত চীনা চিন্তা।

মাও সে–তুংয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবও এই দ্বন্দ্ব মোকাবিলার চেষ্টা করেছিল। তবে তা ছিল ধ্বংসাত্মক। এবারকার প্রচেষ্টা তুলনামূলকভাবে বেশি স্থির, অনেক বেশি বাস্তবভিত্তিক। তবে এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতের নানা বিকাশকেও বাধা দিতে পারে।

আমেরিকার সঙ্গে কথোপকথন

বেইজিং এখন আমেরিকাকে দেখছে নেশায় আসক্ত এক দেশ হিসেবে। ঠিক যেমন একসময় চীন আফিম আসক্তিতে ধ্বংসের মুখে পড়েছিল, আমেরিকা তেমনভাবেই এখন একটি ভয়াবহ মাদকসংকটে ভুগছে। চীনের সরকারি দৈনিক পিপলস ডেইলি জানিয়েছে—আমেরিকার জনসংখ্যা বিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ, কিন্তু তারা পুরো বিশ্বের ৮০ শতাংশ আফিমজাত মাদক ব্যবহার করে।

দুই শ বছর আগে, চীনের রাজসভার আদেশে আফিম আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, আফিমই একমাত্র পণ্য, যা চীনারা বিদেশ থেকে কিনতে আগ্রহী।

এরপর ১৮৪০ সালে ব্রিটিশরা এবং ১৮৫৬ সালে আরও কিছু পশ্চিমা শক্তি চীনের সঙ্গে আফিম বাণিজ্য চালু রাখতে যুদ্ধ করে। ইতিহাসে তা ‘আফিম যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। চীন আফিমকে জাতীয় পতনের অন্যতম কারণ মনে করলেও পশ্চিমারা বলেছিল, চীনারা যদি বেশি আফিম খায়, সেটা তাদেরই সমস্যা।

এখন দৃশ্যপট উল্টো। যুক্তরাষ্ট্র ফেন্টানিল নামের ভয়াবহ এক সিনথেটিক ড্রাগে আক্রান্ত। এই ড্রাগের মূল উপাদান চীন থেকে রপ্তানি হয়। এই উপাদান অনেক সময় বৈধ ওষুধ তৈরিতেও লাগে। তবে এর অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করতে চীন যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করছে। অন্যদিকে চীন বলছে, আমেরিকান সমাজের আসক্তিই আসল সমস্যা—শুধু চীনকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

১৮-৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ফেন্টানিল এখন মৃত্যুর প্রধান কারণ বলে অনেকেই মনে করেন। দুই শ বছর আগে আফিম নিয়ে টানাপোড়েন যুদ্ধ ডেকে এনেছিল। আজকের এই মাদকসংকট কি নতুন কোনো সংঘর্ষ ডেকে আনবে?

যোগাযোগ ও সংস্কৃতির প্রশ্ন

বিশ্ব এখনো যোগাযোগে পশ্চিমা সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল। শুধু ভাষা নয়, পুরো চিন্তাপদ্ধতিই এখানে পশ্চিমাদের আদলে তৈরি।

তাই চীন যদি তার নিজস্ব সংস্কৃতি বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে বর্তমান যোগাযোগব্যবস্থার ভাষা হারাতে পারে। অথচ বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এখনো চীনকে পশ্চিমা ঘরানার ভাষা ও চিন্তা ব্যবহার করতে হয়। কারণ, বিশ্ব তো এখনো ‘চীনকেন্দ্রিক’ ভাবনায় অভ্যস্ত নয়।

পাঁচ শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক কাঠামোকে সরিয়ে দিতে চাইলে সময় লাগবে। আর যদি আমেরিকা পিছিয়ে পড়ে এবং চীন সেই শূন্যতা পূরণ করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই পশ্চিমা ভাবভাষায় কথা বলতে জানতে হবে। তা না হলে তাদের কেউ বুঝবে না। চীনও অন্যদের বুঝতে পারবে না।

তা ছাড়া, যদি আমেরিকার এই সংকট কখনো চূড়ান্ত পতনের দিকে যায়, তাহলেও চীনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ চালু রাখতেই হবে। বিশ্ব হয়তো এক শতক পর ‘চীনা সংস্কৃতি’কে ভালোভাবে চিনবে। কিন্তু এই সময়টাতে পশ্চিমা ধারণাকে উপেক্ষা করা আত্মঘাতী হতে পারে।

বাস্তবে সমস্যাটা আরও গভীর। অনেক পশ্চিমা ধারণাই এখন আর বাস্তবতা অনুযায়ী কাজ করছে না। ট্রাম্পের আমলে আমেরিকায় যে ধাক্কা লেগেছে, তা একটি নিরাপত্তাহীন ও দিশাহারা জাতির চিত্র তুলে ধরেছে।

চীন এখন সংস্কৃতিকে পুনর্বিন্যাস করছে, নতুন ক্যাটাগরিতে সাজাচ্ছে। তারা তা করতে চাইছে সংঘাতের বদলে সামগ্রিক সমাধানমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে। তারা মনে করে, গোটা বিশ্বব্যবস্থারই পুনর্গঠন দরকার। এর মানে এই নয় যে সমাধানটা নিখুঁত হবে। কিন্তু সমস্যার অস্তিত্ব যে প্রকট, তা অস্বীকার করা যাবে না।

প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রও কি তার মাদক সমস্যা বা বাণিজ্য দ্বন্দ্বের মতো অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো মোকাবিলায় এমন কোনো সামগ্রিক ভাবনা ভাবছে? নাকি কেবল বাইরের দিকেই শত্রু খুঁজে বেড়াচ্ছে? এই সংকটগুলো চীনকে ঘিরে হলেও সেগুলোর সমাধান কেবল চীন দিয়ে হবে না।

* ফ্রান্সেসকো সিসি ইতালীয় লেখক

- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

চীন হয়তো দীর্ঘ সময়ের জন্য নিজের মতো করে টিকে থাকার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
চীন হয়তো দীর্ঘ সময়ের জন্য নিজের মতো করে টিকে থাকার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ছবি : রয়টার্স

আমাজনে কুমিরে ভরা জলাভূমিতে ৩৬ ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন তাঁরা

আমাজন জঙ্গলের ভেতর কুমিরে ভরা এক জলাভূমি। এর মধ্যেই জরুরি অবতরণে বাধ্য হয় একটি ছোট উড়োজাহাজ। পাইলটসহ পাঁচ আরোহী প্রাণে বেঁচে গেলেও পড়ে যান আরেক বিপদে। চারপাশে কুমির ঘিরে রেখেছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, সাহায্যের কোনো চিহ্ন নেই। সেই বিভীষিকাময় পরিবেশে তাঁরা কাটিয়েছেন ৩৬ ঘণ্টা। শেষমেশ তাঁরা জীবিত উদ্ধার হন।

সম্প্রতি বলিভিয়ার আমাজন অঞ্চলে ঘটেছে এমন ঘটনা। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বলিভিয়ার বেনি বিভাগের রাডার থেকে হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যায় উড়োজাহাজটি। এর পরপরই এটির সন্ধানে অভিযান শুরু হয়। তবে হদিস মিলছিল না। পরদিন শুক্রবার বলিভিয়ার আমাজন অঞ্চলের স্থানীয় জেলেরা এর খোঁজ পান।

বেনি বিভাগের জরুরি অভিযান পরিচালনা কেন্দ্রের পরিচালক উইলসন আভিলা বলেছেন, তিন নারী, এক শিশু এবং ২৯ বছর বয়সী পাইলট উদ্ধার হয়েছেন। তাঁরা শারীরিকভাবে বেশ ভালো অবস্থায় আছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমকে পাইলট বলেন, উড়োজাহাজটি উত্তরাঞ্চলীয় বলিভিয়ার বাউরেস শহর থেকে ত্রিনিদাদ শহরের দিকে যাচ্ছিল। ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় উড়োজাহাজটিকে ইতানোমাস নদীর কাছে জরুরি অবতরণের প্রয়োজন হয়।

আন্দ্রেস ভেলার্দে নামের ওই পাইলট আরও বলেন, হঠাৎ করেই উড়োজাহাজটি উড়তে পারছিল না। তিনি একটি জলাভূমিতে উড়োজাহাজটি অবতরণ করাতে বাধ্য হন। পাইলটসহ পাঁচ আরোহী উড়োজাহাজটির ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। কুমিরেরা চারপাশ ঘিরে ফেলেছিল। কোনো কোনো কুমির তিন মিটারেরও কম দূরত্বে চলে এসেছিল।

পাইলটের ধারণা, বিমানের ট্যাংক থেকে চুইয়ে পড়া পেট্রলের গন্ধই হয়তো ওই শিকারি প্রাণীদের দূরে রেখেছিল। তাঁরা পানিতে একটি অ্যানাকোন্ডা সাপও দেখতে পেয়েছিলেন। এমন আতঙ্কজনক পরিস্থিতির মধ্যেই তাঁরা উদ্ধার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

ভেলার্দে বলেন, ‘কুমিরদের জন্য আমরা পানি পান করতে পারিনি, কোথাও যেতেও পারিনি।’ যাত্রীদের একজনের সঙ্গে ময়দাজাতীয় খাবার কাসাভা ফ্লাওয়ার ছিল। তা দিয়েই তাঁরা ক্ষুধা মিটিয়েছেন।

জেলেরা উড়োজাহাজটির খোঁজ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে একটি হেলিকপ্টার পাঠায় কর্তৃপক্ষ। ওই পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

বেনি অঞ্চলের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক রুবেন টোরেস রয়টার্সকে বলেন, উড়োজাহাজটি নিখোঁজ হওয়ার পর নানা জল্পনা ও তত্ত্ব ছড়িয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সব সংস্থা একসঙ্গে কাজ করে জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে পেরেছে। এটাতেই তিনি খুশি।

উড়োজাহাজের ওপরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন পাঁচ আরোহী
উড়োজাহাজের ওপরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন পাঁচ আরোহী। ছবি: টারবাইনট্রাভেলার নামক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত

ঢাকায় এয়ার পিউরিফায়ারের মতো স্বপ্নবিলাসী প্রকল্প কেন by সুবাইল বিন আলম ও মার্জিয়া মিথিলা

ঢাকার বায়ুদূষণের কথা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। পরিবেশ উপদেষ্টা বায়ুদূষণের ৩০ শতাংশ দায় পাশের দেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। হ্যাঁ! বিভিন্ন গবেষণায় এ দাবির সত্যতা এসেছে। কিন্তু তাই বলে কি আমরা বাকি ৭০ শতাংশ নিয়ে কাজ করব না?

সেই কাজ করতে গিয়েই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নিয়ে এসেছে এক কুইক ফিক্স প্রজেক্ট। তারা ঢাকা শহরে ৫০টি এয়ারপিউরিফায়ার (যাকে বলে স্মগ টাওয়ার) বসিয়ে বাতাস ঠিক করবে।

বলা হচ্ছে, একেকটি পিউরিফায়ার ১০০টি গাছের সমান বাতাস পরিষ্কার করতে পারে। তা–ই যদি হয়, তাহলে এই বিশাল যজ্ঞ না করে পাঁচ হাজার গাছ ঢাকা শহরে লাগানো কি খুব কষ্টের কাজ?

ঢাকার দূষণ কোনো পৃষ্ঠের ধুলো নয়, বরং গভীর কাঠামোগত সমস্যা। পরিবেশ অধিদপ্তর (ডিওই) এবং বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, ৫৮ শতাংশ পিএম ২.৫ (অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার উপাদান) আসে ইটভাটা থেকে, ১৮ শতাংশ আসে যানবাহন থেকে, ১০ শতাংশ আসে নির্মাণকাজের ধুলো থেকে এবং ১৪ শতাংশ আসে বর্জ্য পোড়ানো, জৈব জ্বালানি ও শিল্প থেকে। এই দূষণ সার্বক্ষণিক তৈরি হচ্ছে।

এখন হিসাব করে দেখি পিউরিফায়ার আমাদের কী কাজে লাগবে। একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পিউরিফায়ার ঘণ্টায় ৩০ হাজার ঘনমিটার বাতাস পরিষ্কার করতে পারে, যা ২৪ ঘণ্টায় করে ৭ দশমিক ২ লাখ ঘনমিটার। ১ বর্গকিলোমিটার এলাকার বাতাসের আয়তন (১০ মিটার উচ্চতা ধরে) হচ্ছে ১ কোটি ঘনমিটার।

তাহলে ১ বর্গকিলোমিটার এলাকার বাতাস পরিষ্কার করতে সময় লাগবে ১৪ দিন। ঢাকার আয়তন ৩০৬ বর্গকিলোমিটার হলে প্রতিদিন এই শহরের বাতাস পরিষ্কার করতে প্রয়োজন≈৪ হাজার ২৫০টি পিউরিফায়ার।

প্রতিটি পিউরিফায়ারের আনুমানিক দাম এক লাখ মার্কিন ডলার। তাহলে ঢাকার বাতাস পরিষ্কার করতে পিউরিফায়ার কিনতে খরচ হবে ৪২৫ মিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে যুক্ত হবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, সরকার মাত্র ৫০টি পিউরিফায়ার বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মোট চাহিদার ১ দশমিক ১৭ শতাংশ।

একটি পিউরিফায়ার ২৪ ঘণ্টা চালানোর জন্য দরকার ১৫০ থেকে ২৫০ ওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুৎ। সেই হিসাবে বার্ষিক খরচ হবে ১ হাজার ৩১৪ থেকে ২ হাজার ১৯০ কিলোওয়াট/ঘণ্টা। এ হিসাবে ৪ হাজার ২৫০টি পিউরিফায়ারের জন্য বছরে খরচ হবে ৫ দশমিক ৫৮ থেকে ৯ দশমিক ৩১ মিলিয়ন কিলোওয়াট/ঘণ্টা। একটি বাংলাদেশি পরিবার বছরে ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। এই প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে ২০ থেকে ৩০ হাজার পরিবারের সমান বিদ্যুৎ খরচ হবে এর পেছনে।

পিউরিফায়ারের রক্ষণাবেক্ষণকাজও অত্যন্ত সংবেদনশীল। ধুলোয় ফিল্টার দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়, বর্ষা ও বন্যায় ক্ষতি হয়, বিদ্যুৎ–বিভ্রাট সমস্যা করে, নিয়মিত পরিষেবা ও কারিগরি সাপোর্ট প্রয়োজন। এ ছাড়া ঢাকায় যেখানে ম্যানহোলের ঢাকনা, বৈদ্যুতিক তার পর্যন্ত চুরি হয়; সেখানে একটি পিউরিফায়ারে থাকে দামি ধাতু ও ইলেকট্রনিক অংশ, সহজে বিক্রয়যোগ্য ফিল্টার ও খোলা তার। চীনে প্রতি ২ মিলিয়ন ডলারের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ধরা হয় প্রতিবছর ৩০ হাজার ডলার। বাংলাদেশে এর খরচ আরও বেশি হবে বলেই ধারণা করা যায়। রক্ষণাবেক্ষণের কাজ যে কোম্পানি পাবে, তাদের লাভের অঙ্কটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে।

আরও একটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। বাতাসের প্রবাহ সর্বদা চলমান। মাত্র ২ মিটার/সেকেন্ড গতির বাতাস কয়েক মিনিটে দূষিত বাতাস ছড়িয়ে দিতে পারে। দিল্লির ২০১৯ সালের পরীক্ষায় দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (সিপিসিবি) বলেছে, এ ধরনের পিউরিফায়ারের প্রভাব ‘অতি সামান্য থেকে নেই বললেই চলে’। দিল্লির স্মগ টাওয়ার প্রকল্পে ২০ কোটি রুপি (২.৪ মিলিয়ন ডলার) খরচ হয়েছিল। প্রতিশ্রুতি ছিল, ১ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে দূষণ ৫০ শতাংশ কমাবে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে সিপিসিবি রিপোর্ট করে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি নেই। দূষণ কমানোর প্রভাব কয়েক শ মিটারের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। উপরন্তু করতে হয় ফিল্টার ব্লক। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিশাল খরচ।

বিশ্বে বেইজিং হচ্ছে বায়ুদূষণ রোধের জীবন্ত উদাহরণ। তারা কয়লাভিত্তিক শিল্প স্থানান্তর করেছে, জীবাশ্ম জ্বালানিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর করেছে, গণপরিবহনব্যবস্থা উন্নত করেছে এবং কঠোরভাবে নির্গমন মানদণ্ড প্রয়োগ করেছে। ৫ বছরে তারা পিএম ২.৫ হ্রাস করেছে ৩৫ শতাংশ। (ইউএনইপি, ২০২১)। এ জন্য বেইজিংকে কোনো পিউরিফায়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়নি।

আমাদের দরকার অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা, বৈদ্যুতিক ও গণপরিপরিবহন বাড়ানো, বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ, নির্মাণ প্রকল্পের ধুলো নিয়ন্ত্রণ, গাছ লাগানো ও সবুজ এলাকা সম্প্রসারণ, স্কুল ও হাসপাতালে এইচইপিএ ফিল্টার বসানো, শিল্প ও আবাসিক এলাকা আলাদা করা, জনসচেতনতা ও বায়ু পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

৪ হাজার ২৫০টি এয়ার পিউরিফায়ার দিয়ে যে পরিমাণ বাতাস পরিষ্কার করা যাবে, মাত্র ৪ লাখ ২৫ হাজার দেশীয় ফলের গাছ (ফুল বা বিদেশি গাছ নয়) লাগিয়েই সেটা করা সম্ভব। বাতাস বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এক বছরে যে খরচ, তা দিয়েই ঢাকায় এই পরিমাণ গাছ লাগানো সম্ভব। ঢাকার খালগুলো উদ্ধার করে, সেগুলো পুনঃখনন করে চারপাশে প্রচুর গাছ লাগানো যায়। এর জন্য দরকার একটা সমন্বিত পরিকল্পনা।

বিগত সরকারের আমলে সিটি করপোরেশন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ–চালিত ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি, ফুটওভার ব্রিজে এস্কেলেটর বসানোর মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়েছিল। সব জিনিস এখন নষ্ট হয়ে বেকার পড়ে আছে। আর আমরা ঋণের সুদ ঠিকই শোধ করে যাচ্ছি। ঢাকার জন্য দরকার একটা মানবিক নীতি। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সেটা আশা করছিলাম। কিন্তু পপুলিস্ট প্রকল্প নিয়ে তারা নিজেদের যোগ্যতাকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করছে।

* সুবাইল বিন আলম, টেকসই উন্নয়নবিষয়ক কলামিস্ট

* মার্জিয়া মিথিলা, সাস্টেইনেবিলিটি প্রফেশনাল (সাউথ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র)

ঢাকায় ৫৮ শতাংশ পিএম ২.৫  আসে ইটভাটা থেকে
ঢাকায় ৫৮ শতাংশ পিএম ২.৫ আসে ইটভাটা থেকে। ছবি : রয়টার্স

গাজায় হামলা জোরালো, নিহত আরও ১৯: গাজা দখলের পরিকল্পনা অনুমোদন দিলো ইসরাইল

ইসরাইলি বাহিনী গাজায় টানা হামলা জোরদার করেছে। সোমবার ভোরে হামলায় কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হয়েছেন বলে গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে। এর আগের দিন রোববার গাজাজুড়ে ২৪ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরাইলি বাহিনী। অন্যদিকে মানবিক ত্রাণ বন্ধ করে দেয়ায় গাজার মানুষ এখন অনাহারে। তাদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ ও অন্য মানবিক সংস্থাগুলো ইসরাইলের প্রস্তাবিত সাহায্য বিতরণ পরিকল্পনাকে বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছে। ইসরাইলের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানিগুলো খাদ্য বিতরণ করবে। আর ইসরাইলি সেনারা বাইরের নিরাপত্তা দেবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে,  ইসরাইলি সেনাদের অধীনে নাগরিকদের রেশন সংগ্রহে বাধ্য করা হবে। এমন হলে পরিস্থিতি মানবিক কর্মীসহ অনেকের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতিসংঘের হিউম্যানিটারিয়ান কান্ট্রি টিম। তারা আরও বলেছে, গাজার বেশির ভাগ অসহায় ও অক্ষম মানুষ এই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়বে।

ইসরাইল গত ৯ সপ্তাহ ধরে গাজায় খাদ্য ও সহায়তা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর ফলে গাজাবাসীর রান্না বন্ধ। খাদ্যের গুদাম খালি। শিশুদের অপুষ্টির হার বেড়েছে। ওদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, কমপক্ষে ৫২,৫৩৫ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। তাদের হামলায় আহত হয়েছেন ১,১৮,৪৯১ জন। তবে সরকারের মিডিয়া অফিস বলছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ চাপা পড়ে থাকার কারণে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা ৬১,৭০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওদিকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ইসরাইলের একটি বিমানবন্দরের খুব কাছে হামলা করেছে। এর প্রতিবাদে ইরানে ও ইয়েমেনে হুতিদের লক্ষ্য করে হামলা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে হুতিরা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, গাজায় ইসরাইলের ‘আগ্রাসী যুদ্ধ’ চালিয়ে যাওয়ার জবাবে তারা বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতেই থাকবে।

পশ্চিম তীরে সোমবার ভোরে শুকবা (রামাল্লাহর পশ্চিমে), আল-ইয়ামুন (জেনিনের উত্তরে), বেইত উম্মার (হেব্রনের উত্তরে) ও খিরবেত ইয়ানুন (নাবলুসের দক্ষিণে) অভিযান চালিয়ে অনেক ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করেছে ইসরাইলি বাহিনী।

গাজা দখলের পরিকল্পনা অনুমোদন দিলো ইসরাইল

ফিলিস্তিনের গাজা দখলে নেয়ার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে ইসরাইলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা। এর মধ্যে হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা বৃদ্ধির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইসরাইলি এক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজার ২১ লাখ ফিলিস্তিনিকে উপত্যকাটির দক্ষিণে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনার বিষয়টিও অনুমোদন পেয়েছে। যাতে সেখানের মানবিক সংকট আরও প্রকট হবে। গাজা দখলের বিষয়টিকে ‘ভালো পরিকল্পনা’ বলে অভিহিত করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামাসকে নির্মূল করে জিম্মিদের দেশে ফেরাতে তাদের পরিকল্পনাই উত্তম। মন্ত্রিসভা নীতিগতভাবে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে মানবিক সহায়তা সরবরাহ ও বিতরণের একটি পরিকল্পনাও অনুমোদন করেছে। ইসরাইলের গত দুই মাসের অবরোধের ফলে গাজায় যে তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে তা কমিয়ে আনতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তবে এসব পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে জাতিসংঘসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা। তারা বলেছে, এসব প্রস্তাব মৌলিক মানবিক নীতির লঙ্ঘন হবে। ফলত ইসরাইলের এসব প্রস্তাবে তাদের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা করা হবে না। এদিকে ইসরাইলের প্রস্তাবকে ‘রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’ বলে অভিহিত করেছে হামাস।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় হামলা শুরু করে ইসরাইল। গত ১৯ জানুয়ারি উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। ১৮ মার্চ ওই যুদ্ধবিরতি ভেঙে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। সোমবার গাজার উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, এদিন উত্তর গাজায় আকাশপথে ইসরাইলের হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে উপত্যকাটিতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৫২ হাজারে। 

mzamin

হামাসের হাত থেকে মুক্ত জিম্মি ইসরাইলে ধর্ষিত!

হামাসের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নিজদেশ ইসরাইলে ধর্ষিত হয়েছেন মিয়া শেম (২৩)। তাকে ধর্ষণ করেছে সুপরিচিত একজন ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল।

এতে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরাইলে নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যালে হামাসের হামলার সময় তাকে জিম্মি করা হয়। আন্তর্জাতিক চাপ ও দেনদরবারের পর হামাসের হাত থেকে মুক্তি পান মিয়া শেম। কিন্তু দেশে ফেরার পর তার সঙ্গে যে যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে সে সম্পর্কে ইসরাইলের চ্যালেন ১২’কে বিস্তারিত বলেছেন।

মিয়া শেম একজন ফরাসি বংশোদ্ভূত ইসরাইলি। ইসরাইলে ধর্ষিত হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা আমরা জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নিজদেশে ঘটেছে, যেখানে আমার সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা। মিয়া শেম জানান, তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে গত মাসে। তারপর থেকে তিনি মানসিক যন্ত্রণায় কাতর। এই যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠার জন্য চেষ্টা করছেন। বলেন, আমি এই কাহিনী বলতে এসেছি। গত মাসে আমার একটি দুর্ঘটনা ঘটে। তারপর থেকে নিজের ঘরের মধ্যেই আমাকে বন্দি করে ফেলেছি। চরম মানসিক অস্থিরতায় আছি। দিনশেষে আমি একজন নির্যাতিতা, আমি আহত।

ধর্ষণের জন্য তিনি দায়ী করেন তার ব্যক্তিগত প্রশিক্ষককে। তার বয়স ৩০-এর কোটায়। তবে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয় মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি একজন ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার। সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রী সহ তার ক্লায়েন্ট তালিকায় আছেন বেশ কিছু সেলিব্রেটি। এ ঘটনায় মার্চে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু তথ্য প্রমাণের অভাবে তাকে ছেড়ে দেয়। তবে তদন্ত চলছে।

ওদিকে তেল আবিবে ওই ব্যক্তির জিম পরিদর্শনে গিয়েছিলেন মিয়া শেম। তার বাড়ি থেকে ওই জিম কয়েক মিনিটের পথ। তিনটি প্রশিক্ষণ সেশনের জন্য সেখানে যান মিয়া শেম। তারপরই তাকে ধর্ষণ করা হয়। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি তাকে ধর্ষণের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসরাইলি মিডিয়া বলেছে, মিয়া শেম যখন পোশাক পরিবর্তন করছিলেন তখন বেশ কয়েকবার তার ড্রেসিং রুমে প্রবেশের কথা স্বীকার করেছেন ওই ব্যক্তি। মিয়া শেম বলেছেন, হলিউডের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথা বলেছে ওই ব্যক্তি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার জিম্মি দশার কথা বলার জন্য বিগ স্ক্রিনের যাওয়ার সুযোগ করে দেয়ার। ওই ব্যক্তি কখন আমার কক্ষে প্রবেশ করেছেন তা স্মরণ করতে পারছি না। আমি কিছুই মনে করতে পারছি না। তবে আমার শরীর স্মরণ করতে পারে। আমার শরীর অনুভব করে। আমার দেহ জানে কি এক কষ্টের ভিতর দিয়ে গিয়েছি।  মিয়া শেম আরও বলেন, আমি একটি বই লিখছি। আমি জানি অনেক মানুষ আছেন, যারা আমার এই কাহিনী জানতে চান।

mzamin

দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ পাকিস্তানের: ১১ রাত গুলিবিনিময়, প্রতিরক্ষা সচিবের সঙ্গে মোদির বৈঠক

দিল্লি-ইসলামাবাদ উত্তেজনার মধ্যেই দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ করেছে পাকিস্তান। সোমবার ফাতাহ সিরিজের একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সফল পরীক্ষা চালিয়েছে দেশটি। ১২০ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ভূমি থেকে ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম। চলমান এক্স সিন্ধু নামের সামরিক মহড়ায় প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।

সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের সময় সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পাকিস্তানের কৌশলগত সংস্থার কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন। উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া সফল হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছেন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা ও সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনির।
আইএসপিআর বলেছে, এই উৎক্ষেপণের লক্ষ্য ছিল সেনাসদস্যদের অভিযানের প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্রটির উন্নত ন্যাভিগেশন সিস্টেম বা নির্ধারিত পথে নির্ভুলভাবে গন্তব্যে আঘাত হানতে পারে কি না, তা যাচাই করা ও নির্ভুলতা পরিমাপ করা।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধসক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় পূর্ণ আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেছেন দেশটির সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিবৃতিতে আইএসপিআর বলেছে, পাকিস্তানের ভূখণ্ডে যেকোনো হামলা মোকাবিলায় সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণের জন্য বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও গোটা জাতিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি।

টানা ১১ রাত গুলিবিনিময় ভারতের প্রতিরক্ষা সচিবের সঙ্গে মোদির রুদ্ধদ্বার বৈঠক

ভারত ও পাকিস্তানের উত্তেজনার মধ্যে রণংদেহী মনোভাব ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে ভারত। নিয়মিত সামরিক মহড়া চলছে। এরই মধ্যে সীমান্তের বিভিন্ন সেক্টরে টানা এগারো দিন ধরে গুলিবিনিময়           
চলছে। পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা স্তরে একের পর এক কঠোর অবস্থান নিয়েছে ভারত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যেই তিন বাহিনীকে যথাযথ পদক্ষেপের অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন। গতকাল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে তিনি এর আগে বিমান বাহিনী প্রধান এডমিরাল এপি সিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এবং নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশ কে ত্রিপাঠীর মধ্যে পৃথক বৈঠকের ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এপি সিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী গত সপ্তাহে সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। এরই মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং  রোববার দিল্লিতে বলেছেন,  সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে কাজ করা এবং যারা ভারতের দিকে খারাপ নজর রাখে তাদের ‘যোগ্য জবাব’ দেয়া তার দায়িত্ব।
তার মতে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে, সৈন্যদের নিয়ে কাজ করা এবং দেশের সীমান্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব। যারা আমাদের দেশের দিকে খারাপ নজর রাখে তাদের উপযুক্ত জবাব দেয়াও আমার দায়িত্ব।

সোমবার ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জম্মু ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর আটটি অগ্রবর্তী সেক্টরে পাকিস্তানি সেনারা বিনা উস্কানিতে গুলি চালিয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে এটি নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পাকিস্তানের গুলি চালানোর টানা ১১তম রাত বলে জানানো হয়েছে।
জম্মুর একজন প্রতিরক্ষা মুখপাত্র জানিয়েছেন, ৪ঠা ও ৫ই মে রাতে, জম্মু ও কাশ্মীরের কুপওয়ারা, বারামুল্লা, পুঞ্চ, রাজৌরি, মেন্ধার, নওশেরা, সুন্দরবানি এবং আখনুরের বিপরীতে নিয়ন্ত্রণরেখায় ছোট অস্ত্র থেকে গুলি চালিয়েছে পাকিস্তান। ভারতীয় সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে এবং আনুপাতিকভাবে জবাব দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।

সংবাদ সংস্থা সূত্রে জানা  গেছে, জম্মু অঞ্চলের পীর পাঞ্জাল রেঞ্জের দক্ষিণে জম্মু, রাজৌরি ও পুঞ্চ এবং কাশ্মীর উপত্যকার বারামুল্লা ও কুপওয়ারার পাঁচটি সীমান্ত জেলা জুড়ে রাতভর গুলিবিনিময় হয়েছে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে।

এদিকে, ভারতের পশ্চিম দিকে  ভারতীয় সেনার একের পর এক  মহড়ার ছবি সামনে আসছে।  রোববার রাত ৯টা থেকে ৯.৩০ মিনিট পর্যন্ত পঞ্জাবের ফিরোজপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ব্ল্যাকআউট ড্রিল হয়েছে।  পাঞ্জাবের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা এই আধ ঘণ্টা এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। যতক্ষণ ড্রিল চলে ততক্ষণ বেজেছিল  হুটার।

জানা গেছে, প্রশাসনের তরফে বাসিন্দাদের আগেই অনুরোধ জানানো হয়েছিল, যাতে এই ৩০ মিনিট সময় তারা বাড়িতে কোনো ইনভার্টার না জ্বালান, কোনো জেনারেটর না চালান। এই সময় কোনো আলো যেন বাড়ির বাইরে না আসে, তার জন্য স্থানীয়দের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ডেপুটি পুলিশ কমিশনার দীপশিখা শর্মা জানিয়েছেন, এটি রুটিন প্রস্তুতির অঙ্গ ছিল। এই নিয়ে অযথা আতঙ্কের কোনো কিছু নেই।

ফিরোজপুরের ক্যান্টনমেন্টে এই ড্রিলের আগে, সমপ্রতি উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরে  এক্সপ্রেসওয়েতে চলেছে ভারতীয় বায়ুসেনার মহড়া। আপৎকালে বিকল্প রানওয়ে হিসেবে গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষমতা যাচাই করতেই এই মহড়া চলে।

ভারতীয় নৌবাহিনীও ১লা মে থেকে আরব সাগরে মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে। ৭ই মে পর্যন্ত আরব সাগরে লাইভ ফায়ারিং ড্রিল জারি থাকবে বলে জানিয়েছে ভারতীয় নৌবাহিনী। লাইভ ফায়ারিং ড্রিল হলো যুদ্ধপরিস্থিতির মতো পরিবেশ তৈরি করে অনুশীলন করা। এই মহড়া মূলত অস্ত্র পরীক্ষা এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য করা হয়। সমুদ্রে আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছে ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর রণতরীও মোতায়েন রাখা হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে রণকৌশল এলাকা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে।

mzamin

সংস্কারে সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দেয়ার পক্ষে ইইউ

সংস্কারের জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘পর্যাপ্ত’ সময় দেয়ার পক্ষে ইউরোপের ২৭ রাষ্ট্রের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ ডেলিগেশন প্রধান মাইকেল মিলার এমনটাই জানালেন। সোমবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিকাবের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে (ডিকাব টক) তিনি জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ড, দায়ীদের বিচার, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান আপৎকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রম এবং আগামীর নির্বাচন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আকাঙ্ক্ষাসহ সম-সাময়িক নানা বিষয়ে কথা বলেন। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন কখন হতে পারে? উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ইইউ কি চায়? নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং অন্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনায় ইইউ কী বুঝতে পেরেছে? এমন এক গাদা প্রশ্নের সমন্বিত জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে কখন পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত-সে বিষয়ে বাংলাদেশই সিদ্ধান্ত নেবে। তবে তার আগে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ হওয়া জরুরি, কারণ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক রূপান্তর বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাবে এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ইইউ এমনটাই মনে করে। এ জন্য আমরা নির্বাচনের তারিখ নিয়ে কোনো চাপ দিচ্ছি না। আমরা মনে করি, সংস্কার কাজের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। এর জন্য ন্যাশনাল কনসেনসাস কমিটি কাজ করছে এবং দেখা যাক, কতোটুকু ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে জানিয়ে মাইকেল মিলার বলেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সংস্কার এখন বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। নির্বাচনের আগে সংস্কার চেয়ে ইইউ দূত বলেন, এখানে আমি একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, তা হলো নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ওপর আমাদের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই। আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো একত্রে কাজ করবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন উন্নয়ন বন্ধু ইইউ’র রাষ্ট্রদূত। সেই সঙ্গে তিনি জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেকের বিচার স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হওয়ার আশা প্রকাশ করেন। ডিকাব টকে অপর প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সমর্থন করে ইইউ। এমন কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ইউরোপীয় ইউনিয়ন। রাখাইনে মানবিক করিডোর নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত বলেন, করিডোর ইতিবাচক উদ্যোগ। উভয় পাশেই ভুক্তভোগীদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। সবাই যেন সমানভাবে ত্রাণ সহায়তা পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

উন্মুক্ত সেশনে এক প্রশ্নের জবাবে মাইকেল মিলার বলেন, ইউরোপে পাচার হওয়া অর্থ যদি বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ফেরত আনতে চায়, তবে এ নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যথাযথ তথ্য-উপাত্ত নিয়ে যোগাযোগ করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি শেষ হতে ৩-৪ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ইইউ’র আমন্ত্রণে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটির ৫ সদস্যের প্রতিনিধিদলের ব্রাসেলস সফর বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, দলটির আগ্রহে আমরা তাদের শীর্ষ নেতাসহ একটি প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। বিএনপি, এনসিপি বা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেডকোয়ার্টারের দ্বার  উন্মুক্ত জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলগুলোর মতামত এবং জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে আমরা স্ব স্ব দলের ভাষ্য শুনতে আগ্রহী। নারী সংস্কার কমিশন নিয়ে চলমান বিতর্কের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইইউ দূত বলেন, এটি একান্তই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে হ্যাঁ, আমরা নারী-পুরুষ সমান অধিকারে বিশ্বাসী, দুনিয়া জুড়ে এটি আমরা প্রমোট করি। বাংলাদেশের গ্রাউন্ড রিয়েলিটি বা মাঠ পর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এ দেশের নারীদের উন্নয়ন ও অগ্রগতি দেখতে চাই আমরা। ডিকাব সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মামুন।

mzamin