Friday, September 24, 2010

একজন দিশারি মানুষের কথা by আবুল মোমেন

ভালো মানুষ এবং সৎ—সেই মানুষটা কেমন? সৎ মানুষ তো মেরুদণ্ডী প্রাণী, সাহসী এবং প্রয়োজনে রুখে দাঁড়াতে জানেন। ভালো মানুষ হন বিনয়ী, সদালাপী, পরোপকারী; তাঁর ব্যক্তিত্ব প্রসন্ন। সততার আছে প্রখরতা আর তেজ, প্রয়োজনে অসত্য ও দুর্বলতাকে ঝলসে দিতে পারেন; মিথ্যার মোড়ক ফাঁস করে দিতে পারেন। ভালোবাসা আর সমীহ—দুটোই মেলে এর কপালে, দুটো মিলে তৈরি হয় শ্রদ্ধা।
এমন মানুষকে একদিকে কাছের মানুষ হিসেবে আপন ভাবা যায়, অন্যদিকে সবার মানুষ হিসেবে সমীহ করতে হয়। এমনই একজন মানুষ ছিলেন ডা. মনীন্দ্রলাল চক্রবর্তী। ১৯১০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই মানুষটিকে নিয়েই লিখছি। ১৯৮৩ সালের ১৪ জুলাই তিনি মারা যান।
ব্রিটিশ-প্রবর্তিত ইংরেজি শিক্ষা উন্নত নৈতিকতা ও উচ্চ আদর্শের প্রজন্ম তৈরি করেছে, যাঁরা সংসারে থেকেও সমাজের, দেশের এবং ইতিহাসের। আর ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শাসন এই প্রজন্মকে দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও প্রগতির জন্য সংগ্রামী চেতনায় আন্দোলনে নামার উদ্দীপনা দিয়েছে। এমন মানুষ ব্রিটিশ শাসনের শেষ অর্ধশতকে সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। এদের বীরত্বে ও ত্যাগে ঔপনিবেশিক নাগপাশ থেকে উপমহাদেশ মুক্তি পেয়েছে।
দেশভাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা ভারত-পাকিস্তান উভয় দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য মস্ত বিপর্যয় ও মহা বিড়ম্বনা হিসেবে এসেছে। গান্ধী-নেহরুর নেতৃত্বে ভারত গণতন্ত্রের পতাকা সমুন্নত রেখে সংখ্যালঘুদের জন্য কিছুটা সহনীয় পরিবেশ তৈরি করতে পারলেও পাকিস্তানে এবং পরে বাংলাদেশে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুর বিড়ম্বনা কিছুতেই কাটেনি।
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামীদের বড় অংশই পাকিস্তান ত্যাগ করে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। কারণ, ধর্মীয় পরিচয়ে তাঁরা অমুসলিম। যে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ যাননি, ডা. মনীন্দ্রলাল চক্রবর্তী তাঁদেরই একজন। তিনি কেবল পাকিস্তানে, এবং বাংলাদেশে থেকে গেলেন না, তিনি রয়ে গেলেন নিজের গণ্ডগ্রামে; চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার বাজালিয়ায়। দেশ নিয়ে তাঁর মনে ক্ষোভ কিংবা হতাশা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেটা দেশের, অর্থাৎ মাতৃভূমির দুর্দশা দেখে, ভারতে যেতে না পারার বা না যাওয়ার কারণে নয়।
পাকিস্তান আমল থেকে এ দেশে সামরিক শাসন এসেছে বেশ কয়েকবার। এ রকম সময়গুলো প্রগতিশীল বাম হিন্দু রাজনীতিকের জন্য কী রকম প্রতিকূল ছিল, তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। এসব প্রতিকূলতা ও পরীক্ষা তাঁকে কাবু করতে পারেনি। কারণ, তাঁর দেশপ্রেম আর মানবপ্রেম ছিল খাঁটি।
ডা. চক্রবর্তী পরিণত বয়সে পৌঁছে নিজ গ্রাম, নিজ পেশা ও নিজের সংসার ছেড়ে দূরে যাননি। এই তিন অবলম্বনকে ঘিরে তাঁর বিচরণ ও বিকাশ। রাজনীতি কিংবা সমাজকর্ম ধীরে ধীরে মানুষের বৃত্ত প্রসারিত করে গ্রাম ছাড়িয়ে জেলা, জেলা ছাপিয়ে বিভাগ, বিভাগ থেকে দেশ—এভাবে কেউ কেউ বড় নেতা হন, ক্ষমতাবান হন। কিন্তু ডা. মনীন্দ্রলাল চক্রবর্তী যেন সহজাতভাবে গাঁয়ের মানুষ, খাঁটি মানুষ, আপন মানুষ। গাঁ ছেড়ে শহুরে হতে চাননি তিনি, বড় জীবনের মেকি কালচার তিনি সহ্য করেননি, আর ঘনিষ্ঠ আপনজনদের ছেড়ে দূরের কেউ হতে চাননি। তাঁর জীবনে বিভিন্ন সময়ে নিশ্চয় নানা রকম সুযোগ এসেছিল, যা তাঁকে গ্রামের বাইরে, ক্ষমতাবিত্তের আলগা সংস্কৃতির মোড়কে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাগুজে সম্পর্কে অভ্যস্ত করে ফেলত। কিন্তু তিনি সে সুযোগ নিতে আগ্রহ বোধ করেননি।
প্রতিষ্ঠা ও প্রচার যেন পরস্পর নির্ভরশীল, একে অন্যকে সাহায্য করে। কিন্তু স্বদেশি চেতনায় অনুপ্রাণিত মনীন্দ্রবাবু সহজাতভাবে প্রচারবিমুখ, মনে হয় প্রতিষ্ঠাবিমুখও ছিলেন।
ফিরে দেখা বইটি ঠিক তাঁর আত্মজীবনী নয়, স্মৃতিকথা; এবং তারও চেয়ে বেশি কিছু, অভিজ্ঞতার কথা। স্কুলে থাকতেই তিনি গোপন বিপ্লবী দলে যোগ দিয়েছিলেন। বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলেও তাঁর মধ্যে গৃহীসত্তা সজাগ ছিল। সংসারের দায়, মা-বাবার প্রতি কর্তব্য, ভাইবোন ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করার মানুষ নন। প্রথম জীবনের তারুণ্যের ভাবাবেগে নিশ্চয় তাঁর দুই প্রবণতায় টানাপোড়েন চলেছে, কিন্তু বরাবর তিনি দুইয়ের সমন্বয়ের চেষ্টা করে গেছেন। তরুণ বয়সে স্বভাবতই বিপ্লব পন্থার দিকেই টান ছিল প্রবল। এ সময়ে তিনি কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। শেষে কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচরে গৃহবন্দী হন, যা প্রায় আড়াই বছর স্থায়ী হয়েছিল।
মনীন্দ্রবাবু কলকাতা থেকে আয়ুর্বেদশাস্ত্র পড়ে বাবার পেশায় যোগ দেন, তাঁরই কর্মক্ষেত্র বার্মার মংডু, ভুথিডং ও রাথিডং—এই তিন মহকুমায় মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
তারপর মায়ের মৃত্যু, বাবার বার্ধক্য, বিবাহ এবং পেশার উত্তরোত্তর সাফল্য তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের যাত্রাপথ নির্ধারিত করে দিতে থাকে। পেশার সাফল্যের সঙ্গে সংসারের কলেবর বৃদ্ধি স্বভাবতই ডা. মনীন্দ্রকে সাংসারিক দায়িত্বে ক্রমেই বেঁধেছে।
কিন্তু প্রথম জীবনে যিনি দেশ ও মানুষের কল্যাণের ব্রত ধারণ করেছিলেন, তাঁর পক্ষে কি সম্ভব সম্পূর্ণ সংসারে নিমজ্জিত হওয়া? সম্ভব নয়। ফলে সংসার সচল থাকল, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে দেশের ও মানুষের কাজে যুক্ত থেকে বড় হলো, আর তিনি নেপথ্যে বটবৃক্ষের মতো সবাইকে আশ্রয় ও ছায়া দিয়ে গেলেন। বটবৃক্ষ তিনিই হন, যিনি আপন ক্ষুদ্র গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরে ভূমিকা রাখেন। তাই ছায়া তিনি কেবল আপন সংসারকে দিলেন, তা নয়; গ্রামবাসী, এলাকাবাসীকেও দিলেন। ইউনিয়ন বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন ছাড়া বরাবর এলাকাবাসীর সুখে-দুঃখে অভিভাবকের ভূমিকায় ছিলেন।
বটবৃক্ষ তো মহীরুহ, তাই নিজ গ্রামে কর্মময় জীবনের সিংহ ভাগ ব্যয় করলেও তার বারতা দেশের সমমনা ও সমদর্শী মানুষের কাছে পৌঁছেছে। তাঁদের পক্ষ থেকে শতবর্ষের এই পুণ্যলগ্নে তাঁকে স্মরণ করা এবং সেই সূত্রে দেশবাসীর সামনে একজন সৎ দেশপ্রেমিকের জীবন ও কর্ম তুলে ধরার এই সুযোগ হাতছাড়া করা সম্ভব নয়। কেননা, এ দেশ আমাদের, এবং এই দেশকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে হলে অতীত থেকে প্রেরণা নিতে হবে ও দিশারি মানুষদের চিনতে হবে। ডা. মনীন্দ্রলাল চক্রবর্তী এক অনুপ্রেরণাদায়ী চরিত্র এবং সমাজের একজন দিশারি মানুষ।

কিউবায় পিরিস্ত্রোইকা by মশিউল আলম

১৯৮৭ সালে আমরা যখন উচ্চশিক্ষার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নে যাই, তার বছর দুয়েক আগে মিখাইল গর্বাচভের নেতৃত্বে দেশটিতে শুরু হয়েছিল পিরিস্ত্রোইকা। ১৯৮৮ সাল নাগাদ সোভিয়েত ব্যবস্থার এক আমূল রূপান্তর দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল এবং ১৯৯০ সালের মাঝ নাগাদ পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল যে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর থাকছে না। সে সময় মস্কোর বিভিন্ন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে টাকা-পয়সা উপার্জনের যে উৎসাহ দেখা গিয়েছিল, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছেলেমেয়েরা ছিল তার বাইরে, অথবা একদমই শেষ সারিতে। অন্তত মস্কোর পাত্রিস লুমুম্বা গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একজন লাতিন আমেরিকানকেও দেখতে পাইনি, যে ডলার কেনাবেচা করত বা সিঙ্গাপুর-ইস্তাম্বুল গিয়ে জিনিসপত্র কিনে এনে মস্কোতে বিক্রি করে কাঁচা পয়সা বানানোর ইঁদুর-দৌড়ে শামিল হয়েছিল। শুধু তাই নয়, লক্ষ করেছি, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের রূপান্তর বা গ্লাসনোস্ত-পিরিস্ত্রোইকার প্রতি লাতিন আমেরিকার ছেলেমেয়েদের সায় ছিল না। শুধু সমাজতান্ত্রিক কিউবা আর নিকারাগুয়ার ছেলেমেয়েরা নয়, মেক্সিকো, চিলি, আর্জেটিনা, বলিভিয়া, ভেনেজুুয়েলা, কোস্তারিকা, হন্ডুরাস, ইকুয়েডর প্রভৃতি পুঁজিতান্ত্রিক দেশের ছেলেমেয়েরাও পিরিস্ত্রোইকাকে দেখত সন্দেহের চোখে। এবং অন্য অনেকের আগেই যেন তারা টের পেয়ে গিয়েছিল, পিরিস্ত্রোইকার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে।
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়েছে। তারপর পৃথিবীতে আর কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে, এটা ভাবা যায়নি। সমাজতান্ত্রিক শিবিরভুক্ত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে আজ আর সমাজতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও নেই। সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানি মিশে গেছে পুঁজিতান্ত্রিক পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে। রোমহর্ষক রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে যুগোস্লাভিয়া; সেই চেকোস্লোভাকিয়া, আলবেনিয়াও আর অটুট নেই। পোল্যান্ড এখন এক কট্টর ক্যাথলিক পুঁজিতান্ত্রিক দেশ। সর্বত্রই মুক্তকচ্ছ পুঁজিবাদ। পৃথিবীর অন্য পুঁজিবাদী দেশগুলো থেকে ওই দেশগুলোর আজ আর কোনো পার্থক্য নেই।
তারপর প্রায় দুই দশক হতে চলল; পৃথিবীর সমস্ত দেশ থেকে আলাদা করে চেনার মতো একটি দেশ এখনো রয়ে গেছে: লাতিন আমেরিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা। সারা পৃথিবীর একক মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায়, তাদের নিরবচ্ছিন্ন শত্রুতা (ফিদেল কাস্ত্রোর অভিযোগ, সিআইএ তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছে ৬৩৮ বার), অর্থনৈতিক অবরোধ ইত্যাদির মুখে ওই ছোট্ট দরিদ্র দেশটি এখনো চলছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। কিউবা আজ একটা প্রতীকের মতো। সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে বেঁচে থাকার ও এগিয়ে চলার অনন্য দৃষ্টান্ত কিউবা।
সেই কিউবার সরকার গত সপ্তাহে ঘোষণা করেছে, আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যে পাঁচ লাখ লোককে সরকারি চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হবে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম এই সংবাদ লুফে নিয়ে বলা শুরু করল: কিউবায় সমাজতন্ত্র শেষ, মুক্তবাজার অর্থনীতি শুরু হয়ে গেছে। এর সপ্তাহখানেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের দি আটলান্টিক ম্যাগাজিনে জিওফ্রে গোল্ডবার্গ নামের এক মার্কিন সংবাদিক ফিদেল কাস্ত্রোকে উদ্ধৃত করে লেখেন, কাস্ত্রো তাঁকে বলেছেন, অর্থনীতির ক্ষেত্রে কিউবার মডেলটি আর কাজ করছে না। কাস্ত্রো এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, তিনি এটা বোঝাতে চাননি বরং বোঝাতে চেয়েছেন যে আমেরিকান পুঁজিবাদী মডেলই আর কাজ করছে না। পশ্চিমা পণ্ডিতদের একটা বড় অংশ এটা প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন যে কাস্ত্রো আসলে ওই কথাই বলেছেন, কিউবান মডেল আর কাজ করছে না। কেউ কেউ এমন কথাও বলছেন, কথাটা বলে ফেলার পর কাস্ত্রো সেটা অস্বীকার করেছেন হুগো শাভেজের চাপে। কেউ কেউ বলছেন, কিউবান মডেল যে আর কাজ করছে না এমন কথা কাস্ত্রো আগেও বলেছেন। অন্যরা বলছেন, কাস্ত্রো ভ্রাতৃদ্বয় বা কিউবার কমিউনিস্টরা স্বীকার করুক বা না করুক, কিউবার কেন্দ্রীভূত, নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ওটা দিয়ে আর চলছে না।
কিউবার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যে সমস্যা রয়েছে, তা সবচেয়ে বেশি করে উপলব্ধি করেন কিউবার নেতারাই। সে জন্য নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত শিবিরের পতনের পর থেকে কিউবান সমাজতন্ত্র নিজেকে নানাভাবে বদলে নেওয়ার চেষ্টা করে এসেছে। ২০০৫ সালে অসুস্থ ফিদেল কাস্ত্রো হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবান বিপ্লবকে পরাস্ত করতে পারেনি বটে, কিন্তু কিউবান বিপ্লব নিজেই নিজের দূষণ ও ভুলভ্রান্তির কারণে ব্যর্থ হতে পারে।
২০০৬ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর অনুজ রাউল কাস্ত্রো দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা রকম সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন কিছু ছোট শিল্পকারখানা সমবায় সমিতির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে; কিছু কিছু খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে করে কৃষিকাজে নতুন প্রণোদনা সৃষ্টি হয়। চুল কাটার সেলুন, ট্যাক্সি সার্ভিস ইত্যাদি সেবা খাতেও বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এখন এসব ক্ষেত্রে আরও কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন, আগে সমবায় সমিতিগুলোতে সরকার থেকে প্রশাসক নিয়োগ করা হতো; এখন সরকার বলছে, সরকারি প্রশাসক আর থাকবে না, সমবায় সমিতিগুলো নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। আগে ব্যক্তি-কৃষকের উৎপাদিত ফসল সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে হতো, এখন সরকার বলছে কৃষকেরা বাজারমূল্যে তা বিক্রি করতে পারবে। আরও বেশিসংখ্যক বেসরকারি ট্যাক্সির লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, আরও বেশিসংখ্যক ছোট দোকানপাট ও ব্যবসায় উদ্যোগ খোলার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো বলেছেন, কিউবার সরকারি খাতে নিয়োজিত ৫১ লাখ জনবলের মধ্যে ১০ লাখ হচ্ছে অতিরিক্ত। এই অতিরিক্ত জনবলকে ধাপে ধাপে সরকারি খাতের বাইরে নিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে। এই উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে আছে কিউবান ওয়ার্কার্স কনফেডারেশন। তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক সংস্কারের মডেলটি অনুসরণ করবে না; সোভিয়েত ইউনিয়নে বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু হলে কলকারখানা, খনিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিলেন বড় আমলারা। কিউবায় যেসব প্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হবে, সেগুলোর মালিক হবে সেখানে কর্মরত শ্রমিকেরাই, কো-অপারেটিভ গঠনের মধ্য দিয়ে তাদের যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হবে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকার এখন আর নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করবে না, তদারকি করবে।
লন্ডন মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ক্যারিবিয়ান অ্যান্ড ল্যাটিন আমেরিকান রিসার্চ অ্যান্ড কনসালট্যান্সির গবেষক-বিশ্লেষক স্টিফেন উইলকিনসন বলছেন, কিউবায় ধাপে ধাপে সরকারি কর্মী ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকারের বাজেট সংকোচনের ফলে লোকজনের চাকরি হারানোর চেয়ে কম মর্মান্তিক। যুক্তরাজ্যে হাজার হাজার লোক হঠাৎ জীবিকাহীন হয়ে পড়েছে, কেউ তাদের দায়িত্ব নেয়নি। কিন্তু কিউবায় ব্যাপারটা সেভাবে ঘটবে না: আকস্মিকভাবে তো নয়ই, বরং কিউবার সরকার প্রায় চার বছর ধরে এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছে, ট্রেড ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ করে সরকারি খাতের বাড়তি লোকবল কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ৩০ লাখ শ্রমিকের সংগঠন কিউবান ওয়ার্কার্স কনফেডারেশন সে দেশের জাতীয় সংবাদমাধ্যমে এক বিবৃতিতে সরকারের এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। শ্রমিকেরা জানে, সরকারি চাকরি থেকে ছাঁটাই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা বেকার হয়ে পড়বে এমন নয়। একই ধরনের কাজ তারা চালিয়ে যাবে, কিন্তু তাদের বেতন আর সরকার দেবে না, সমবায় সমিতি গঠন করে ছোট ছোট উৎপাদন ও সেবাক্ষেত্র রাষ্ট্রীয় প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়া হবে।
এই সব সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কিউবার অর্থনীতির স্থবিরতা কাটানোর লক্ষ্যে। রাজনীতির ক্ষেত্রে দেশটি তেমন কোনো পরিবর্তনের কথা আপাতত ভাবছে না। সোভিয়েত পিরিস্ত্রোইকায় যেমন তথাকথিত উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত মনে করা হয়েছিল, কিউবার নেতারা তা মনে করছেন না। তাঁরা বরং এ ক্ষেত্রে চীনা মডেলটি অনুসরণের চেষ্টা করছেন, যেখানে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকবে এককভাবে কমিউনিস্ট পার্টির হাতে। কিউবায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনা বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে; ভেনেজুয়েলার হুগো শাভেজ, যিনি কিউবান বিপ্লবকে মনে করেন লাতিন আমেরিকার মুক্তিসংগ্রামের জননী, তিনি কিউবাকে জ্বালানি তেল দিচ্ছেন বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে। কিউবা ভেনেজুুয়েলার সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক ইউনিয়ন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নে অধ্যয়নরত লাতিন আমেরিকান ছাত্রছাত্রীদের কথা স্মরণ করে এ লেখা শুরু করেছিলাম। তারা পিরিস্ত্রোইকা সমর্থন করেনি, কারণ গর্বাচভের ওই কর্মসূচিকে সমর্থন জুগিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের এক বলিভীয় সহপাঠীর কথা মনে পড়ছে; সে একদিন ক্লাসে সোভিয়েত শিক্ষককে বলেছিল, আমেরিকা পিরিস্ত্রোইকা সমর্থন করছে, তার মানে বুঝতে হবে পিরিস্ত্রোইকা আপনাদের ধ্বংস ডেকে আনবে। কিউবায় সূচিত অর্থনৈতিক সংস্কারকে পিরিস্ত্রোইকা বলা যায় কি না জানি না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু মনে করছে সে রকমই একটা ব্যাপার শুরু হয়েছে তাদের নিকট-প্রতিবেশী দ্বীপ দেশটিতে। সে জন্য ওবামা প্রশাসন কিউবার ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। তারা কিউবার জনগণের ‘মুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার নতুন কৌশল হিসেবে কিউবার সঙ্গে সাংস্কৃতিক-কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন মনে করছে কিউবান বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিকেরাই তাদের ‘বেস্ট অ্যাম্বাসেডরস ফর ফ্রিডম ইন কিউবা’।
গত বছর ওবামা প্রশাসন কিউবায় মার্কিনিদের ভ্রমণের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে, কিউবান বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের কিউবায় টাকা পাঠানোরও অনুমতি দিয়েছে। ফলে তিন লাখ কিউবান আমেরিকান এর মধ্যে কিউবা ভ্রমণ করেছে, ছয় কোটির বেশি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আকারে পৌঁছেছে কিউবায়। কিন্তু আমার লাতিন বন্ধুদের মতো পুরো লাতিন আমেরিকার মানুষ সম্ভবত মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘মুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ’-এর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, এটা অবিশ্বাস্য। আমেরিকার যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপকেই তারা সন্দেহের চোখে দেখে। বলিভিয়া থেকে ইকুয়েডর পর্যন্ত সমগ্র লাতিন আমেরিকান জনগণের কাছে কিউবা মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর প্রতিরোধের এক মূর্ত প্রতীক।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

আদালত অবমাননা নিয়ে বিভ্রান্তি by এবিএম মূসা

আমাদের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ পীঠস্থান সুপ্রিম কোর্ট একটি দৈনিকের ‘ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক’ ও একজন সাংবাদিককে অবমাননার দায়ে কারাদণ্ড দিয়েছেন। আমার অর্ধশতাব্দীর অধিককালের সাংবাদিকতা জীবনে কোনো দিন কোনো সম্পাদক বা সাংবাদিকের আদালতের অবমাননার দায়ে কারাদণ্ড হয়েছে, এমন কোনো নজির মনে পড়ছে না। অন্তত এই উপমহাদেশে নয়। এর মানে এই নয়, অতীতে কোনো সম্পাদক, প্রকাশক-মুদ্রাকর আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হননি। হয়েছেন এবং তাঁরা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পেয়েছেন। কোনো মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করেননি, প্রকাশিত বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি আদালতে পেশ করেননি। এর কারণ, তাঁরা মনে করতেন, আদালতের সব পদক্ষেপ প্রশ্নাতীত, তাঁদের এতদসম্পর্কীয় এখতিয়ার একতরফা। একজন ‘ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক’ যৌক্তিক অথবা অযৌক্তিক বক্তব্য দিয়ে এই ধারণার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে জেলে গেছেন। যাঁরা আদালতের চরম সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তাঁরাও কিন্তু সেই পত্রিকায় আদালতের মতে অবমাননাকর প্রতিবেদনের যৌক্তিকতা অথবা যথার্থ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য দেননি। তাঁরা শুধু আদালতের দণ্ডদানের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রসঙ্গত বলছি, বিদেশে বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রে আদালত অবমাননার দায়ে প্রতিবেদকের জেলে যাওয়ার দু-একটি নজির আছে। তবে সে প্রেক্ষাপট ভিন্ন এবং যাঁরা কারাবরণ করেছেন, তাঁদের প্রতি বিশ্বের সাংবাদিক-সমাজের নৈতিক সমর্থন ছিল। তাঁরা কারাগারে গিয়েছেন, কারণ, পরিবেশিত সংবাদের সূত্র জানাননি, সোর্স ডিসক্লোজ করেননি। তাঁরা সগর্বে বলেছেন, মিথ্যা সংবাদ ছাপেননি, ঢালাও মন্তব্য করেননি। কোনো বিচারককে বা বিশেষ বিচারব্যবস্থাকে সমালোচনা করেননি, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করেছেন। বিদেশি কোনো আদালত এ বক্তব্য গ্রহণ করেননি। তাঁদের মতে, ‘তাঁরা সিজারস ওয়াইফ’ সমস্ত সমালোচনার ঊর্ধ্বে। সম্প্রতি যে ‘ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক’ ও একজন পেশাজীবী সাংবাদিক দণ্ডিত হয়েছেন, তাঁরা সরাসরি বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগসংবলিত প্রতিবেদন ছেপেছেন। প্রতিবেদন এবং আদালতের বিচার-প্রক্রিয়ার রায় আংশিক পড়ে আমার এই ধারণা। অভিযুক্ত হয়ে ‘ভারপ্রাপ্ত’ সম্পাদক আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন, তাঁর পত্রিকায় প্রকাশিত মন্তব্যসংবলিত প্রতিবেদনের সাফাই গেয়েছেন, কিন্তু পূর্ণ তথ্য-উপাত্ত ও উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনটির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত করছেন কি? কিংবা আদালত তাঁকে কি সেই সুযোগ দিয়েছিলেন? এ প্রশ্নটিই এখন সব আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। সর্বমহলে খটকা বেঁধেছে। কোনো আদালতের বিচার-প্রক্রিয়ায় ‘কিছু শুনতে চাই না’ প্রত্যাখ্যান পদ্ধতি কি ন্যায়বিচারের পর্যায়ে পড়ে?
একজন কর্তব্য পালনকারী পেশাজীবী সাংবাদিকের দণ্ডাদেশও তাঁদের মনে শঙ্কিত প্রশ্নের উদ্ভব ঘটিয়েছে। কারণ, যেসব আইন দ্বারা সংবাদপত্র প্রকাশনা ও মুদ্রণ নিয়ন্ত্রিত হয়, তা সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকরের ক্ষেত্রেই প্রধানত প্রযোজ্য। একজন রিপোর্টার বা সাব এডিটর সংবাদ সংগ্রহ অথবা পরিমার্জনা করেন। কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদন প্রকাশনার বা ছাপানোর দায় তাঁর নেই। তবে ‘চেম্বার জজ’-সম্পর্কীয় আমার দেশ-এর শীর্ষ প্রতিবেদনটি কি একটি তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট; নাকি সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক কর্তৃক ব্রিফিং করা, ছক বেঁধে দেওয়া মন্তব্য প্রতিবেদন—সে প্রশ্নও উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে কে দণ্ড পাবেন, সংবাদপত্র প্রকাশনা-সম্পর্কীয় আইনবলে সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর দায়ী, প্রতিবেদক নন। এ কারণেই আমি প্রতিবেদক-রিপোর্টারের জেলে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছি। দণ্ডপ্রাপ্ত ‘বাই চান্স’ সম্পাদককেও প্রশ্ন, তিনি আদালতে গর্বভরে অতীতের সর্বজনমান্য সম্পাদকদের প্রসঙ্গ বক্তব্যে আনলেন। কিন্তু তাঁরা যে অধীন সাংবাদিকদের ছায়া দিতেন সেই কথাটি বলেননি।
আদালত কাকে দণ্ড দেবেন, আর কে ক্ষমাপ্রাপ্ত হবেন, সে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ আছে কি না, সংবিধানের আদালত অবমাননা-সম্পর্কীয় অনুচ্ছেদ ১০৮-এ স্পষ্ট নয়। শুধু বলা হয়েছে, ‘সাবজেক্ট টু ল’ আইনের বিধান অনুযায়ী। এ বিধানটি সম্পর্কে জনগণের, এমনকি গণমাধ্যমেরও সুস্পষ্টভাবে জানা নেই। আমাদের মহামান্য আদালত কোনো সময় সেই ব্যাখ্যাটি দেননি বলেই গণমাধ্যম এ ব্যাপারে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। প্রায় ১০০ বছর আগের ১৯২৬ সালের একটি আইনের কথা শুনেছি, দীর্ঘ ৫৫ বছরে কোনো দিন তার খোঁজ করিনি। সেই আইনটিও নাকি আদালতের এখতিয়ার-সম্পর্কীয়, অবমাননার ব্যাখ্যাসংবলিত নয়। মাহমুদুর রহমানের মামলায় আমাদের উচ্চতম আদালত সেই ব্যাখ্যাটি দিয়ে নজির সৃষ্টি করতে পারতেন। গণমাধ্যম একটি সাইডলাইন বা নির্দেশনা পেত। তাই রায়টি স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে হচ্ছে না বলে সাংবাদিক মহল এবং গণমাধ্যম অঙ্গনে একধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কী লিখব, আর লিখব না, সেই সীমারেখাটি উচ্চতম আদালত নির্ধারণ করে দিতে পারেন না।
আলোচিত মামলার রায় যে উদ্বেগের উদ্ভব ঘটিয়েছে, তা হলো, আদালত ও গণমাধ্যমের তথা সাংবাদিকদের মধ্যে একটি দূরত্বসূচক সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। অথচ স্বৈরাচারবিরোধী অবস্থান গ্রহণে, মানবাধিকার রক্ষায় এবং জনমত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিগত দিনে একমাত্র এই দুটি প্রতিষ্ঠান, দু-একটি ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে পরস্পর সহযোগী ও সম্পূরকের ভূমিকা পালন করেছে। আজকে একটি মামলার কারণে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সম্পর্কে চিড় ধরেছে।
প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় আদালত অবমাননার বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ আইনি বা বৈচারিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংবাদপত্রে আলোচিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ আলোচকেরা শাহ্দীন মালিক, আসিফ নজরুল ও মিজানুর রহমান খান বিষয়টি নিয়ে একাধিক নিবন্ধ লিখেছেন। সব কটি পড়ে আমার ধারণা হয়েছে, তাঁরা আমার দেশ পত্রিকার ‘ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক’ যে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন, আলোচকেরা বিচার-প্রক্রিয়া নয়, তাঁর শাস্তি নিয়েই অধিকতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমার আইনি জ্ঞান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ, তাই ধারণাটি যদি ভুল হয়ে থাকে, বিশেষজ্ঞ আলোচকদের কাছে ক্ষমা চাই। আমিও সাধারণ জ্ঞান নিয়ে ‘ভারপ্রাপ্ত’ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিচার-প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার আলোকে আলোচনা করব। পাঠক বোধ হয় লক্ষ করেছেন, আমি মাহমুদুর রহমানের নামের আগে প্রতিবার কোট-আনকোট করে ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটি ব্যবহার করেছি।
ইতিপূর্বে আভাস দিয়েছি, যে দুটি প্রধান আইন দ্বারা সংবাদপত্র প্রকাশনা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে, তা হচ্ছে ‘সংবাদপত্র প্রকাশনা মুদ্রণ আইন’ এবং ‘পেশাজীবী সাংবাদিক ও সংবাদপত্র কর্মচারী কার্যপ্রণালি আইন’। ইংরেজিতে খোলাসা করে বলতে হয়, একটি ‘প্রিন্টিং প্রেস ও নিউজপেপার পাবলিকেশন’ এবং অন্যটি ‘ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট ও নিউজপেপার এমপ্লয়িজ ওয়ার্কিং কন্ডিশন আইন’। দ্বিতীয়টির পার্শ্ব উৎপাদন বা বাই প্রডাক্ট হচ্ছে ওয়েজ বোর্ড অ্যাক্ট। বস্তুত, তিনটিই পাকিস্তান আমলের। আমরা যাঁরা সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, তাঁরা প্রেস অর্ডিন্যান্সটি বাতিল প্রায় ৬০ বছর আগে করেছিলাম ১৯৬২ সালে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকাশনা নিয়ন্ত্রণ আইনটি পুনরায় কার্যকর করা হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেই আইন অনেকখানি সংশোধিত হলেও বাতিল হয়নি। আইনগুলো উল্লেখ করছি একটি তথ্য দেওয়ার জন্য। বর্তমানে এ বিধানটি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হওয়ার কারণেই অনেকে বৈধ-অবৈধ পন্থায় বিত্ত অর্জন করে সর্বস্তরে ক্ষমতাশালী হওয়ার জন্য রাতারাতি সম্পাদক বনে যাচ্ছেন। জেলা প্রশাসকের দপ্তরে ‘সম্পাদক’ পদমর্যাদা অর্জনের আবেদন জানিয়ে ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দ যোগ করেই নিশ্চিন্ত থাকেন। জেলা প্রশাসনও কেন জানি না বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখে। যে কারণে এই ভার তাঁরা অনাদিকাল বহন করেন। কোনো পেশাজীবী বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন না। এই ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটিকে আমাদের একজন মহামান্য বিচারপতি মাহমুদুর রহমানের মামলার শুনানিকালে কৌতুকী ও মজাদার একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘বাই চান্স’ সম্পাদক। বর্তমানকালের ‘এমবেডেড জার্নালিস্ট’ তথা বশংবদ সাংবাদিকতার সংজ্ঞায় একটি নতুন শব্দ চয়নের জন্য মহামান্য বিচারককে ধন্যবাদ জানাই।
আদালত অবমাননায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছে ‘বাই চান্সের’, স্ব-আরোপিত সম্পাদকের সম্পাদনায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের প্রতিবেদন। তিনি নিজে সোর্স লিখেননি। অথচ এর আগে অনেক সাহসী ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন তিনি তাঁর পত্রিকায় ছেপেছেন, এ জন্য তাঁকে অভিনন্দনও জানিয়েছি। যেদিন তাঁর জেল হলো, সে রাতে এ নিয়ে মন্তব্য করার ও মতামত দেওয়ার দায়টি আমার কাঁধে চাপিয়ে দিলেন ‘চ্যানেল আই’-এর মতিউর রহমান চৌধুরী। তাঁর একটি কৌশল হচ্ছে, বিব্রতকর অথবা বিতর্কিত কোনো বিষয় আলোচনার প্রয়োজন হলে আমাকেই ক্যামেরার সামনে হাজির করেন। যা-ই হোক, সেদিন আলোচনাপর্বে আমন্ত্রিত হয়েই আমি এ নিয়ে প্রথমে আমার প্রিয়ভাজন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কাজী এবাদুল হকের সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলাম। সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারাটি বুঝে নিলাম, ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা-সম্পর্কীয় আইনটি সম্পর্কে অবগত হলাম। আমার দেশ পত্রিকা ‘চেম্বার জজ’ সম্পর্কে একটি ‘ঢালাও’ মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে আলোচনা করলাম। আমার মূল বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট শীর্ষ খবরটি প্রকৃতপক্ষে একটি মন্তব্য প্রতিবেদন ছিল, যাকে নির্ভেজাল সংবাদ বলা হয়, সেই সংজ্ঞায় পড়ে না। আলোচ্য আদালতের কার্যপদ্ধতি-সম্পর্কীয় প্রতিবেদনটিতে আমি সব পক্ষের বক্তব্য পেলাম না। চেম্বার জজ কী করেছেন, তার বিবরণ আছে। কোন ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের কারণে কী করেননি, সেই বিবরণ খুঁজে পেলাম না। অথচ সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে পক্ষে-বিপক্ষের সব মহলের মতামতসংবলিত না করে কোনো ঢালাও মন্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রায়ের সমালোচকদের প্রতিবেদন পড়ে মনে হয়েছে, আদালত তা মানতেও চাননি। এ কারণে একজন সম্পাদক বা সাংবাদিকের সামারি ট্রায়াল বা একতরফা বিচার হয়েছে, এমন একটি ধারণাই সব মহলে আলোচিত হচ্ছে। এই আলোচনা যে মহামান্য বিচারকদেরও বিড়ম্বিত করেছে, তা আমি উচ্চতম মহল থেকে জানতে পেরেছি। আদালতের ত্বরিত রায় প্রদান, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, সর্বোপরি সম্পাদকের দায়িত্ববোধ, শুধু মন্তব্যসংবলিত সংবাদ, সামগ্রিকভাবে আমার চিন্তায় জট পাকিয়ে গেছে।
প্রসঙ্গক্রমে যা জানতে পেরেছি, তা হলো, সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদে ‘সাবজেক্ট টু ল’ আইনের অনুসরণে শব্দ কটির পরিপূর্ণ প্রতিফলনও রায়ে স্পষ্ট নয়। পত্রিকায় আইনি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদকেরাও ১৯২৬ সালের একটি আইনে অবমাননা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আদালতের অবাধ ক্ষমতার কোনো হদিস পাননি বলে মনে হচ্ছে। এ কারণেই গণমাধ্যম, বিশেষত, সংবাদপত্রের জন্য ‘আদালত অবমাননা’র সংজ্ঞা সম্পর্কে একটি দিকনির্দেশনা প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের উচ্চতম আদালতের কাছে এটিই আমার প্রার্থনা। কারণ, কথিত অবমাননা মামলার আলোচনায় সব বিশেষজ্ঞ আলোচক সাংবিধানিক ধারাটি নিয়েই আলোচনা করেছেন। মাহমুদুর রহমানকে অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ রেহাই দেননি। অনেকের আপত্তি হচ্ছে ‘লঘু পাপে গুরুদণ্ড’। তার মানে ‘অপরাধী’ পাপ করেছেন বটে, তবে সেটি লঘু ছিল, দণ্ডটি গুরু হয়েছে, তা হলে ব্যাপারটি কী দাঁড়াল? অবমাননা, নাকি দণ্ডাদেশ—কোনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে?
আগেই বলেছি, আলোচিত অবমাননা মামলার আইনি বা বৈচারিক বিষয়টি সম্পর্কে মতামত দেওয়ার জ্ঞান আমার নেই। আমি সাংবাদিকতার মানদণ্ডে এবং সাংবাদিকের এথিকস বা নীতিমালা অনুসরণে একটি বিশেষ ‘আদালত অবমাননা’ মামলার রায়ের পর্যালোচনা করেছি। সর্বশেষ (১) আদালতসংশ্লিষ্ট বা বিচারকদের আচরণ-সম্পর্কীয় সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকতার ‘নীতিমালা’ অনুযায়ী ‘আদার সাইড অব দি স্টোরি’ অপর পক্ষের মতামত গ্রহণের সুযোগ আছে কি না, এ নিয়েও আমি বিভ্রান্ত। (২) মাহমুদুর রহমানকে মামলার শুনানির দণ্ডাদেশ, মাহমুদুর রহমানের ‘জবানবন্দি’ আমার বা অন্যদের বিভ্রান্তি দূর করতে পারেনি। (৩) আদালতের অসীম ক্ষমতা নিয়েও রয়েছে সীমাহীন জিজ্ঞাসা। এ তিনটি কারণে আজ একটি আদালত অবমাননা মামলা আদালতপাড়ায় ও গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

ভয়ভীতি সমাচার by আতাউর রহমান

‘অসত্যের কাছে কভু নত নাহি হবে শির/ ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ, লড়ে যায় বীর’—একসময় এ দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের আপ্তবাক্য হিসেবে এটাই প্রতিদিন মাস্টহেডে ছাপানো হতো। মহাকবি শেক্সপিয়ারও প্রায় অনুরূপ কথা বলেছেন তাঁর একটি নাটকের কুশীলবের মাধ্যমে: ‘ভীতুরা মৃত্যুর আগে বহুবার মরে, সাহসীরা মৃত্যুর স্বাদ একবারই গ্রহণ করে।’ আর কেবল শেক্সপিয়ারের কথাই বা বলি কেন! স্নায়ুযুদ্ধের যুগে পৃথিবীটা যখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেতৃত্বে যথাক্রমে ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকে বিভক্ত ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি একটা চমকপ্রদ কথা বলেছিলেন: ‘উই শুড নট ফিয়ার টু নিগোশিয়েট; বাট উই শুড নট নিগোশিয়েট আউট অব ফিয়ার।’ অর্থাৎ ‘(রাশিয়ার সঙ্গে) মীমাংসার্থে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে আমাদের ভয় পাওয়া উচিত নয়, কিন্তু আমাদের উচিত নয় ভয়ে ভীত হয়ে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।’ তাঁর একজন পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টও বলেছেন, ‘দ্য অনলি থিং উই হ্যাভ টু ফিয়ার ইজ ফিয়ার ইটসেলফ।’ অর্থাৎ ‘স্বয়ং ভয়ই একমাত্র জিনিস, যেটাকে আমাদের ভয় করা উচিত।’
তা দুনিয়ার তাবৎ জ্ঞানী-গুণীই ভয়ভীতি সম্পর্কে বহু মূল্যবান কথা বলে গেছেন। এই যেমন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘প্রবলের ভয় আর দুর্বলের ভয়ে মস্ত একটা তফাৎ আছে। দুর্বল ভয় পায় সে ব্যথা পাবে, আর প্রবল ভয় পায় সে বাধা পাবে বলে।’ জর্জ বার্নার্ড শ বলেছেন, ‘পৃথিবীতে একটাই বিশ্বজনীন আবেগ—ভীতি।’ মহামতি ভলতেয়ার বলেছেন, ‘অপরাধ ভয়ের জন্ম দেয় এবং এটাই অপরাধের শাস্তি।’ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘ভয় হচ্ছে কুসংস্কারের প্রধান উৎস এবং নৃশংসতার অন্যতম প্রধান উৎস। ভয়কে জয় করাই হচ্ছে বিজ্ঞতার সূচনা।’ আর আমাদের উপমহাদেশীয় চাণক্য পণ্ডিত তো কাব্য করে বলেছেন—
ভয়ের কারণটাকে ভয় করা ভালো
যতক্ষণ তাহা অনাগত,
ভয়ের কারণ যদি ঘাড়ে এসে পড়ে
নাশো তারে নির্ভীকের মতো।
সত্যি বলতে কি, ভয়ভীতি দুই ধরনের লোককে বোকা বানায়—যারা কিছুই ভয় করে না, আর যারা সবকিছুকেই ভয় করে; এমনকি তেলাপোকাকেও। ভয় হচ্ছে এক ধরনের ট্যাক্স, যা বিবেক পাপ বা অপরাধকে দিয়ে থাকে। আমরা নিজেরা যখন ভীত হই, তখন বলি, ‘সতর্ক’; অন্যেরা যখন ভীত হয়, তখন বলি, ‘ভীরু’। যে লোক তার অতীত সম্পর্কে ভীত, ভবিষ্যৎ নিয়েও তার ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আর কেউ যদি গতকাল নিয়ে অনুতপ্ত ও আগামীকাল নিয়ে ভীত না হয়, বুঝতে হবে সে সাফল্যের সড়কেই আছে।
সর্বোপরি, আমরা স্রষ্টাকে কম ভয় পাই বলেই মানুষকে এত বেশি ভয় করি; ভয়ের বিশালত্ব আমাদের ঈমান তথা বিশ্বাসের পঙ্গুত্বকেই প্রমাণ করে। সে যা হোক। বাপ-বেটাতে নিম্নোক্ত কথোপকথন হচ্ছিল—
বাবা, তুমি যখন রাস্তায় গরু দেখো, তখন কি ভয় পাও না?
‘অবশ্যই না।’
তুমি যখন একটি বিরাট পতঙ্গ দেখো, তখন কি ভীত হও না?
‘না, অবশ্যই না।’
তুমি কি বজ্রবৃষ্টি ও তুফান দেখে ভয় পাও না?
‘না রে বাবা, না।’
তুমি কি ভূমিকম্পের সতর্কবাণীতেও ভয় পাও না?
‘না, তাও না।’
বাবা, তাহলে তুমি কি মা ছাড়া আর কাউকে ভয় করো না?
তাই তো, সংসারের অধিকাংশ বিবাহিত পুরুষই তো স্ত্রী ছাড়া আর কাউকে তেমন ভয় বা তোয়াক্কা করেন না। সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের এ-সম্পর্কিত সেই বহুল কথিত গল্পটি আশা করি সবারই জানা। গল্পটির আধুনিক সংস্করণ, ‘সেই যে আমেরিকান খামখেয়ালি কোটিপতি স্ত্রৈণ স্বামীকে মোরগ ও অপরদের ঘোড়া দেবার নির্দেশ সহকারে তাঁর এক প্রতিনিধিকে গ্রামাঞ্চলে পাঠালেন এবং কোথাও ঘোড়া নেবার যোগ্য কাউকে পাওয়া গেল না।’ সেই গল্পটিও আমি ইতিপূর্বে এই কলামেই উপস্থাপন করেছি। অতএব, এবারে নতুন সংযোজন প্রয়োজন—
গভীর রাতে বিবাহিত ভদ্রলোককে পার্কের ভেতরে ইতস্তত ঘোরাফেরা করতে দেখে পার্কের প্রহরী বললেন, এত রাতে পার্কের ভেতরে একা ঘোরাঘুরি করছেন কেন? কৈফিয়ত দিন। ভদ্রলোক তখন সখেদে প্রত্যুত্তর করলেন, ‘কৈফিয়তই যদি দিতে পারতাম, তাহলে এতক্ষণে বাড়ি চলে যেতাম।’ আরেকজন সার্কাস পার্টিতে বাঘের খেলা দেখান, তাঁর মুখনিঃসৃত নির্দেশ ও ডান হাতস্থ চাবুকের চালনায় বাঘকে সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত মনে হয়। তো, এক রাতে সার্কাসের বাঘের খেলা প্রদর্শন শেষে বাড়ি ফিরে ঘরের বাঘিনীর রুদ্রমূর্তি দেখে ভয় পেয়ে ফিরে গিয়ে বাকি রাত বাঘের খাঁচায় বাঘের সঙ্গে সহাবস্থান করে কাটালেন।
আর এবারের ঈদের মৌসুমে একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলে সাহিত্যিক-সাংবাদিক আনিসুল হকের লেখা একটি জীবনধর্মী নাটকের শেষাংশ দেখতে গিয়ে আমার তো ভয়ে ভীতসন্ত্রন্ত হওয়ার জোগাড়। বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্যে আজকাল আর টিভির কোনো প্রোগ্রাম পুরোপুরি দেখা যায় না। এখানেও থেকে যাচ্ছে সেই ‘ভয়’: চ্যানেলের সংখ্যা যত বাড়বে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ততই বাড়বে; কেননা সব চ্যানেলে প্রচার করতে গিয়ে সর্বমোট যে খরচ পড়বে, সেটা প্রোডাকশন কস্টে জুড়ে দিয়েই পণ্যটার মূল্য নির্ধারিত হবে এবং সেটা বহন করতে হবে কনজ্যুমারদের, অর্থাৎ আমাদের। এটা বোঝার জন্য ড. ফরাসউদ্দিনের মতো অর্থনীতিবিদ হতে হয় না। তা সে যা হোক, বলছিলাম, নাটক দেখে ভিরমি খাওয়ার কথা: দেখলাম, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েরা সমানে তাদের প্রেমিক তথা ছেলেবন্ধুকে সামান্য কারণে গালে চড়-থাপড় দিচ্ছে, আর ওরা তেমন কোনো প্রতিবাদ ব্যতিরেকেই সেটাকে হজম করে যাচ্ছে। এটা কি ভয়ের কারণে, নাকি অন্য কোনো কারণে, সেটা নির্ধারণের ভার পাঠকদের ওপরই ছেড়ে দিলাম। আমি ভয়ে বিশেষ কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলাম।
শেষ করছি ‘ভয়’-সম্পর্কিতই একটি বিদেশি গল্প উপস্থাপনের মাধ্যমে: একজন পাদরি ও একজন খ্রিষ্টান ট্রাকড্রাইভার একই দিনে মৃত্যুমুখে পতিত হলেন। তো সেন্ট পিটার পার্লি গেটে দুজনকে সাদর অভ্যর্থনা করার পর পাদরিকে তিনি বরাদ্দ দিলেন স্বর্গের একটি কক্ষ ও ট্রাকড্রাইভারকে দিলেন একটি প্রাসাদ বরাদ্দ। পাদরি এতে প্রতিবাদ জানালে তাঁকে বলা হলো, ‘গির্জায় আপনার ধর্মোপদেশ শুনে কজন লোক ঈশ্বরকে ভয় করেছে? অথচ ট্রাকড্রাইভার যখন ট্রাক চালাত, তখন রাস্তাঘাটের অন্যান্য গাড়িচালক ও পথচারী ভয়ে অহরহ ঈশ্বরের নাম নিত, যে কারণে তার মর্যাদা অনেক গুণ বেড়ে গেছে।’
অতএব, ভয়কে সব সময় ভয় করতে নেই।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক। ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক।

স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র চলতে পারে কি -সংসদে অনির্ধারিত আলোচনা

গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় কয়েকজন সাংসদ অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ এনে প্রথম আলোসহ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন। এমনকি তাঁরা পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং সংসদে সম্পাদকদের তলব করারও দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের এই ক্ষোভ ও দাবির বিষয়টি দেখতে হবে জনপ্রতিনিধিদের অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার আলোকে। মনে রাখতে হবে, আইন অনুযায়ী সাংসদেরা যেমন নির্দিষ্ট অধিকার ভোগ করেন, তেমনি সংবাদমাধ্যমেরও বাংলাদেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু অধিকার আছে, যা কোনো গণতান্ত্রিক দেশই অগ্রাহ্য করতে পারে না।
সাংসদেরা সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছেন, তার দুটি দিক আছে। একটি তথ্যগত, অন্যটি মতামতভিত্তিক। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অসত্য ও ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষুব্ধ হতেই পারেন। সে ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধরা প্রতিবাদ পাঠালে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা তা ছাপতে বাধ্য। এ ছাড়া তাঁরা প্রতিকারের জন্য প্রেস কাউন্সিল বা আদালতেরও আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু সেসব না করে আইনপ্রণেতারা জাতীয় সংসদে যে ঢালাও অভিযোগ এনেছেন, তা সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের প্রতি হুমকি ছাড়া কিছু নয়।
এ ক্ষেত্রে কার্যপ্রণালিবিধি রক্ষিত হয়েছে কি না, সেটিও প্রশ্ন। কেননা, সাংসদেরা যেখানে এসব অভিযোগ করেছেন, সেখানে গিয়ে সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের জবাব দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংসদের কার্যপ্রণালিবিধিতে বলা হয়েছে, ‘স্পীকার বা মন্ত্রীকে পূর্বেই না জানাইয়া কোন সদস্য কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানিকর বা দোষারোপমূলক অভিযোগ আনয়ন করিতে পারিবেন না।’ আবার স্পিকার যদি মনে করেন, এসব অভিযোগ সংসদের জন্য মানহানিকর বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট নয়, তাহলে তিনি তা উত্থাপন করতে নাও দিতে পারেন। গত মঙ্গলবার একাধিক দৈনিক পত্রিকার বিরুদ্ধে সাংসদদের ঢালাও অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে তা সংসদের কার্যবিধি প্রণালি মানা হয়নি বলেই আমাদের ধারণা। দেশে ও জনজীবনে সমস্যার অন্ত নেই। সেসব বিষয়ে আলোচনা না করে সাংসদেরা কেন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগলেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
সাংসদদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে প্রথম আলো বরাবর বস্তুনিষ্ঠ খবর ও মতামত পরিবেশন করে থাকে। গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাক্ ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। হরতাল-অবরোধ বর্জনসহ ধ্বংসাত্মক রাজনীতির বিপক্ষে এবং কার্যকর সংসদের পক্ষে সব সময়ই প্রথম আলো দৃঢ় ভূমিকা রেখে আসছে। আমরা সব সময়ই সংসদকে কার্যকর হিসেবে দেখতে চাই। অতএব, গণতন্ত্র বা জাতীয় সংসদকে হেয়প্রতিপন্ন করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা শুধু অমূলক নয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা পরস্পরের পরিপূরক, বিপরীতমুখী নয়। টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মঙ্গলবার একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে যথার্থই বলেছেন, ‘কোনো অবস্থায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা যাবে না। আবার সংবাদমাধ্যমকেও তার বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা বজায় রাখতে হবে।’ সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে আমরা বরাবর এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকি। সংবাদমাধ্যমের সমালোচনাকে বৈরী হিসেবে দেখা ঠিক নয়। গণতন্ত্রের বিকাশে ভিন্নমত পোষণের পূর্ণ সুযোগ থাকতে হবে। সংবাদমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ না ভেবে সাংসদেরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন—সেটাই দেশবাসী প্রত্যাশা করে।
আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম হিসেবে দায়িত্বপালনে প্রথম আলো কখনো পিছপা হবে না, সত্য প্রকাশে থাকবে অবিচল; গণতন্ত্রের বিকাশ, মানবাধিকার রক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় রাখবে বলিষ্ঠ ভূমিকা।

কুয়েত-রাশিয়া পরমাণু সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর

কুয়েত শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু শক্তি উৎপাদনের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার কুয়েতের জাতীয় পরমাণু কমিটির (কেএনএনইসি) সচিব আহমাদ বেশারা ও রাশিয়ার পক্ষে সের্গেই কিরিয়েনকো এই স্মারকে সই করেন। এ সময় উভয় দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বার্ষিক সম্মেলনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ওই চুক্তিতে সই করা হয়। চুক্তির লক্ষ্য হলো কুয়েতকে পরমাণু শক্তি উৎপাদনে সহযোগিতা দেওয়া।
কুয়েত ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে চারটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করা হবে। আগামী জানুয়ারিতে এ-সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কুয়েতের সরকারি বার্তা সংস্থা কেইউএনএ জানিয়েছে, সে দেশে পারমাণবিক চুল্লির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে সহায়তা দেবে রাশিয়া।

ইরানে বোমা হামলায় নিহত ১০

ইরানে গতকাল বুধবার একটি সামরিক কুচকাওয়াজে বোমা হামলায় কমপক্ষে ১০ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। হতাহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রীও আছেন। আহত ব্যক্তিদের চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দি অধ্যুষিত শহর মাহাবাদে এ কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। কোনো গোষ্ঠী এখনো হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানি সেনাদের সঙ্গে লড়াইরত কোনো কুর্দি বা সুন্নি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এ হামলা চালাতে পারে।
আরবি ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল আল-আরাবিয়া জানিয়েছে, সকালে লোকজন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যখন কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করছিল, ঠিক সে সময় হামলাটি চালানো হয়।
পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের গভর্নর বাহিদ জালাল জাবেদ বলেছেন, মাহাবাদের লোকজনের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিপ্লববিরোধীরা ওই নাশকতামূলক হামলা চালিয়েছে। কুচকাওয়াজের মঞ্চ থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে ওই বোমা হামলা চালানো হয় বলে তিনি জানান।
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে কুর্দি বিদ্রোহীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায়ই সংর্ঘষ হয়। কুর্দি অধুষ্যিত এ অঞ্চলে কুর্দিদের প্রধান সংগঠন ফ্রি লাইফ অব কুর্দিস্তান (পিজেএকে) বেশ সক্রিয়।
ইসলামি বিপ্লবের কিছু দিনের মাথায় ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করেন। আর তখনই সূচনা হয় ইরান-ইরাক যুদ্ধের, যা দীর্ঘ আট বছর স্থায়ী হয়।

জাপানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি চীনা প্রধানমন্ত্রীর

জাপানের কারাগারে আটক চীনা ট্রলারের ক্যাপ্টেনকে দ্রুত মুক্তি দেওয়া না হলে জাপানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও। গতকাল বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশ নিতে গিয়ে এ কথা বলেন তিনি। ৭ সেপ্টেম্বর জাপানের নৌবাহিনী বিরোধপূর্ণ জলসীমা থেকে ক্রু ও ক্যাপ্টেনসহ চীনা ট্রলার আটক করে। ওই ঘটনায় এই প্রথম প্রতিক্রিয়া জানালেন চীনের প্রধানমন্ত্রী।
পরে ট্রলার ও ক্রুদের ছেড়ে দেওয়া হলেও ক্যাপ্টেনকে জাপানি আইনে আটকাদেশ দেওয়া হয়। একে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়। চীন এরই মধ্যে জাপানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ স্থগিত করেছে এবং সাংহাই এক্সপোতে এক হাজার জাপানি শিশুর আমন্ত্রণ বাতিল করেছে।
ওয়েন জিয়াবাওকে উদ্ধৃত করে চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ‘ট্রলারের ক্যাপ্টেনকে দ্রুত ও নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার জন্য জাপানি পক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি আমি। জাপান সরকার যদি তাদের ভুল পথে চলা অব্যাহত রাখে, তবে চীন কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে এবং এর দায়ভার বহন করতে হবে জাপানকেই।’ তিনি ভুল শুধরে দুই দেশের সম্পর্ককে ঠিক পথে আনার জন্য টোকিওর প্রতি আহ্বান জানান।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতিসংঘ অধিবেশন চলার সময় চীন ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় কোনো বৈঠক আয়োজন যথার্থ হবে না। এ ধরনের বৈঠকের জন্য পরিস্থিতি অনুকূল নয়। তবে জাপানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
টোকিওতে এক সংবাদ সম্মেলনে জাপানের চিফ কেবিনেট সেক্রেটারি ইয়োশিতো সেনগোকু বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনে তাঁরা প্রস্তুত। তাঁরা দ্রুত একটি সমন্বিত ও কৌশলগত আলোচনায় বসতে চান।

প্যারিস হিলটনকে জাপানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি

কোকেন রাখার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত মার্কিন অভিনেত্রী প্যারিস হিলটনকে জাপানে ঢোকার অনুমতি দেয়নি কর্তৃপক্ষ। ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে তিনি ব্যক্তিগত একটি বিমানে চড়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে জাপান ত্যাগ করেন।
গত মঙ্গলবার হিলটন যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস থেকে জাপানের নারিতা বিমানবন্দরে পৌঁছান। কিন্তু বিমানবন্দরের অভিবাসন কর্মকর্তারা তাঁকে জাপানে ঢোকার অনুমতি দেননি। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর প্যারিস তাঁর নির্ধারিত এশিয়া সফরের কর্মসূচি বাতিল করে গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হন।
সোমবার লাস ভেগাসের আদালত কোকেন রাখার দায়ে হিলটনকে ছয় মাসের স্থগিত কারাদণ্ডাদেশ দেন।

সুপ্রিম কোর্টে রায় পেছানোর আবেদনের শুনানি স্থগিত

অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার রায় ঘোষণা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য করা আবেদনের শুনানি গতকাল বুধবার স্থগিত করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আগামীকাল শুক্রবার এ মামলার রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে।
রমেশ চাঁদ ত্রিপাঠি নামের এক ব্যক্তি মামলার রায় পিছিয়ে দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চে আবেদন করেন। বিচারপতি আলতামাস কবির ও বিচারপতি এ কে পাটানিকের সমন্বয়ে গঠিত ওই বেঞ্চ জানান, এই আদালতে এমন বিষয়ে শুনানি হয় না। শুনানির জন্য আদালত রমেশ চাঁদকে সঠিক বেঞ্চে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তবে কোন বেঞ্চে এমন বিষয়ের শুনানি হয়, তা উল্লেখ করেননি আদালত। আজ আবার কোনো এক বেঞ্চে ওই আবেদন শুনানির জন্য তোলা হতে পারে বলে জানা গেছে।
রমেশ চাঁদ উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্টে মামলার রায় পেছানোর জন্য ওই আবেদন করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ওই আবেদন নাকচ করে একে রায় ঘোষণায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা বলে অভিহিত করেন। আদালত রমেশকে ৫০ হাজার রুপি জরিমানাও করেন। পরে রমেশ চাঁদ সুপ্রিম কোর্টে যান।
বাবরি মসজিদ মামলার রায় ঘোষণা করবেন তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ। এলাহাবাদ হাইকোর্টের লক্ষেৗ বেঞ্চের বিচারপতি এস ইউ খান, বিচারপতি সুধীর আগরওয়াল ও বিচারপতি ধরমবীর শর্মার সমন্বয়ে এই বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।

তেরেসা লুইসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে আজ

স্বামী ও সৎছেলেকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা তেরেসা লুইসের ক্ষমার আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। ফলে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত নয়টায় প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগ করে এ দণ্ড কার্যকর করা হবে।
আদালত আবেদন নাকচ করার আগে তেরেসা (৪১) সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি কিছুটা স্নায়ুচাপে আছি। আতঙ্কিতও বটে। তবে আমি শান্তিতে আছি। কেননা, ঈশ্বর আমার সঙ্গে আছেন।’
প্রায় ১০০ বছরের মধ্যে ভার্জিনিয়ায় এই প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে। এর আগে ১৯১২ সালে ক্রিশ্চিয়ান নামের ১৭ বছর বয়সী এক তরুণীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
তেরেসার আইনজীবীরা তাঁদের মক্কেলকে বিশেষ বিবেচনায় ক্ষমা করে দিতে গত ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন। তাঁরা বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য যথেষ্ট মানসিক সুস্থতা নেই তেরেসার। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট গত মঙ্গলবার বিকেলে এ আবেদন খারিজ করে দেন। বিচারক প্যানেলের নয়জনের মধ্যে দুজন নারী সদস্য অবশ্য এর বিরোধিতা করেছেন।
ভার্জিনিয়ার গভর্নর রবার্ট ম্যাকডোনেল বলেছেন, আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে তেরেসা সম্পূর্ণ সুস্থ। শাস্তি শিথিল করার দাবি নাকচ করে তিনি বলেন, লুইস নিজেই নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন।
গভর্নর বলেন, আদালত মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে ও পরে বেশ কয়েকজন মনোরোগ চিকিৎসক তেরেসাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। কিন্তু কেউই তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে সিদ্ধান্ত দেননি।

দারিদ্র্য দূর করতে রান্নাঘরের দিকে নজর জাতিসংঘের

দারিদ্র্য দূর করার জন্য জাতিসংঘ এর আগেও অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তাদের এবারের পদক্ষেপটি একটু অন্য রকম। মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা বা সরাসরি খাবার সরবরাহ করা নয়। তাদের এবারের লক্ষ্য খাবার রান্নার ব্যবস্থাটা একটু জুতসই করা। জাতিসংঘের বার্তাটি এমন—কেক খাওয়া নয়, কেকটা তৈরিতে তাদের সাহায্য করতে হবে। তারা যেন একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চুলায় কেকটি তৈরি করতে পারে।
বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে কাঠ বা গোবর-নুড়ির সনাতন চুলায় রান্নার পরিবর্তে প্রতিটি বাড়িতে একটি করে আধুনিক চুলা যেন থাকে, তা নিশ্চিত করাই জাতিসংঘের এবারের কর্মসূচির লক্ষ্য।
জাতিসংঘ সম্মেলনে গত মঙ্গলবার কর্মকর্তারা জানান, বাড়িতে শুধু একটি ভালো চুলা ও বিদ্যুতের অভাব আধুনিক অন্ধকার যুগের সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ অর্থাৎ ১৪০ কোটি মানুষ বিদ্যুৎসুবিধা থেকে বঞ্চিত। আর ৪০ শতাংশ মানুষ রান্নার জন্য কাঠ অথবা গোবর ব্যবহার করে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পেশ করা একটি প্রতিবেদনে আইইএ বলেছে, এটি লজ্জাজনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দরিদ্র দেশগুলোতে শিল্পায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআইডিও। সংস্থার উপপরিচালক ইয়োশিতেরু উরামোতো আইইএ প্রতিবেদন প্রকাশের পর বলেন, জ্বালানি নিশ্চিত করা না গেলে উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ কীভাবে মানুষের জীবনযাত্রা আমূল বদলে দিতে পারে, তার উদাহরণ দিতে গিয়ে উরামোতো জানান, তিনি সম্প্রতি কেনিয়া সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি গ্রামে গিয়ে তিনি দেখেন, গ্রামটিতে বিদ্যুৎ দেওয়ার পর মানুষ পাম্পের সাহায্যে তোলা বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারছে। ইউকিউবেটর বসিয়ে মুরগির ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর মাধ্যমে তারা নিজেদের আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করেছে।
উরামোতো বলেন, ‘সেখানে এখন রাতে বাজার বসে, রাস্তায় বাতি জ্বলে, নিরাপত্তাব্যবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে এবং বাড়িতেও তারা অনেক কাজ করতে পারছে।
বিদ্যুতের মূল্য বুঝি এত দিনে বিশ্বের অনেক ধনী দেশের নেতারাও উপলব্ধি করতে পারছেন। মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জাতিসংঘ ভবনে বৈদ্যুতিক সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করতে হয়েছে।
আইইএর হিসাবমতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সাড়ে ১৯ লাখ মানুষের ব্যবহূত বিদ্যুতের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সাবসাহারা অঞ্চলের ৭৯ কোটি ১০ লাখ মানুষ।
সংস্থাটি জানিয়েছে, যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া নেওয়া হলে ২০৩০ সালে পৌঁছেও ১২০ কোটি মানুষ বিদ্যুৎসুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবে। এর বেশির ভাগই সাবসাহারা অঞ্চল, ভারত ও এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষ।
আইইএর গবেষণা অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিশ্বমন্দার কারণে অনেক মানুষ নতুন করে কাঠ, গোবর, কয়লা ও অন্যান্য সনাতন পদ্ধতিতে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে।
একটি নোংরা রান্নাঘর শুধু কষ্টের ব্যাপার নয়, পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যও তা হুমকির।

প্রায় চার হাজার অভিযোগ তদন্ত করবে ইসিসি

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন নিয়ে আফগানিস্তানের নির্বাচন নজরদারি সংস্থা ইলেকটোরাল কমপ্লায়েন্টস কমিশনের (ইসিসি) কাছে প্রায় চার হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। গতকাল বুধবার দেশটির স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের (আইইসি) পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়। ভোট গ্রহণে জালিয়াতি থেকে তালেবানের হস্তক্ষেপ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ জমা পড়েছে।
নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, গত শনিবারের নির্বাচনে ৪৩ লাখ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তালেবান শাসনের অবসানের পর এটি দেশটির দ্বিতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। দেশের ৩৪টি প্রদেশের বেশির ভাগ কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষ হয়েছে এবং আংশিক ফলাফল কাবুলে পাঠানো হয়েছে। আইইসি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৯ অক্টোবর নির্বাচনের প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হতে পারে। আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হবে ৩০ অক্টোবর।
আইইসির কর্মকর্তারা জানান, বেশ কিছু অনিয়ম হয়েছে, যা এড়ানোর উপায় ছিল না। কিন্তু ইসিসির সহযোগিতায় এসব অনিয়মের তদন্তের ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পের কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
ইসিসির কমিশনার ও মুখপাত্র আহমাদ জিয়া রাফাত বলেন, ‘ভোট গ্রহণের সময়ের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল গত মঙ্গলবার। আমরা মোট তিন হাজার ৭৬৪টি অভিযোগ পেয়েছি। এর মধ্যে ভোট গ্রহণের দিনের অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে দুই হাজার ৬৪টি। এক হাজার ৭০০ অভিযোগ জমা পড়েছে প্রাক-নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে।’
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা এশিয়া নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন (এএনএফআরইএল) নির্বাচন নিয়ে গতকাল একটি নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা হুমকি ও অনিয়মের একাধিক ঘটনায় নির্বাচন বিঘ্নিত হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনীতিকেরাও ভোটাভুটিতে হস্তক্ষেপ করেছেন।
গত বছরের আগস্টে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। ওই নির্বাচনে হামিদ কারজাই প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন রাষ্ট্রপতি

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল গতকাল বুধবার সকালে কলকাতায় মেট্রো বা পাতালরেলের তৃতীয় প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। দক্ষিণ কলকাতার জোকায় এই রেলপথের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়, রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল এম কে নারায়ণন প্রমুখ।
জোকা থেকে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র বিবাদীবাগ পর্যন্ত যাবে এই রেলপথ। এর মধ্যে জোকা থেকে মাঝেরহাট পর্যন্ত রেলপথ যাবে মাটির ওপর দিয়ে, মাঝেরহাট থেকে বিবাদীবাগ পর্যন্ত যাবে মাটির তলদেশ দিয়ে। সাড়ে ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে থাকবে ১৩টি স্টেশন। এটি নির্মাণের ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৬২৫ কোটি রুপি।
রেলপথের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের আগে রেলমন্ত্রী মমতা বলেন, পাতালরেলের আরও তিনটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসব পথ যাবে দক্ষিণেশ্বর থেকে নোয়াপাড়া, দমদম থেকে বারাসত ও বরাহনগর থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত।

নারী ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ৪০০০ কোটি ডলার ব্যয় হবে

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন গতকাল বুধবার বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়নে চার হাজার কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করার কথা ঘোষণা করেছেন। বিভিন্ন দেশের সরকার, জনসেবামূলক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এর মাধ্যমে নিউইয়র্কে সফলভাবে শেষ হয়েছে জাতিসংঘের তিন দিনব্যাপী সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) শীর্ষ সম্মেলন। এতে দারিদ্র্য মোচনের ওপর আলোকপাত করা হয়।
বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য মোচনের লক্ষ্যে জাতিসংঘ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়ন অন্যতম। এর আগে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এ উদ্যোগ সফল হয়নি।
গতকাল বান কি মুন এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা জানি যে কী করলে নারী ও শিশুর জীবন রক্ষা পাবে। সব ক্ষেত্রেই নারী ও শিশুর অবস্থা সংকটপূর্ণ। এ সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বের প্রয়োজন।
বান কি মুন বলেন, নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে তাঁর এই বৈশ্বিক কৌশল ২০১৫ সাল নাগাদ এক কোটি ৬০ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করবে। তিনি বলেন, এক দশক আগে যে আটটি মূল উন্নয়ন লক্ষ্য বেছে নেওয়া হয়, তার মধ্যে দুটি সবচেয়ে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তা হচ্ছে অন্তঃসত্ত্বা মা ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু হ্রাস।
জাতিসংঘ বলেছে, নারী ও শিশুর পেছনে এই ব্যয় দারিদ্র্য কমাবে, প্রবৃদ্ধি বাড়াবে। নারী ও শিশুর এই সেবা পাওয়ার বিষয়টি মানুষ হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকার।
সম্মেলনে ১৪০টি দেশের নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধানরা যোগ দেন। নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়ন তহবিল গঠনে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, জাপান, রাশিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর অবদান রয়েছে। আরও অবদান রয়েছে আফগানিস্তান থেকে জাম্বিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই তহবিল গঠনে অবদান রাখেন মেক্সিকোর ধনকুবের কার্লোস স্লিম ও মাইক্রোসফটের কর্ণধার বিল গেটস। মানবাধিকার সংস্থার মধ্যে রয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে এলজি ইলেকট্রনিকস ও ফাইজার।
এ ব্যাপারে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জেনস স্টোলটেনবার্গ বলেন, নারী ও শিশুর জীবন রক্ষায় একসঙ্গে এত দাতা এর আগে কখনো এগিয়ে আসেননি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দাতা দেশগুলোর মধ্যে একটি নরওয়ে।

আফগান যুদ্ধকৌশল নিয়ে বিভক্ত ওবামা প্রশাসন

আফগান যুদ্ধকৌশল নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেও জড়িয়ে পড়েছেন ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সদস্যরা। এমনকি আফগানিস্তানে নিযুক্ত ওমাবার বিশেষ দূত রিচার্ড হল ব্রুকও মনে করেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশল কাজে আসবে না।
বিখ্যাত সাংবাদিক বব উডওয়ার্ডের লেখা নতুন বই ওবামা’স ওয়ার-এ এসব কথা বলা হয়েছে বলে গত মঙ্গলবার জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস। বইটির একটি কপি তাদের হাতে এসেছে দাবি করে পত্রিকাটি লিখেছে, এ বইয়ে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের নানা চিত্র উঠে এসেছে। আগামী সোমবার বইটি প্রকাশিত হবে।
আফগানিস্তান বিষয়ে বর্তমান মার্কিনকৌশল কাজে আসবে কি আসবে না, তা নিয়ে চরম মতভেদ রয়েছে প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রধান প্রধান উপদেষ্টার মধ্যে। এমনকি এ নিয়ে গত ২০ মাসে তাঁদের মধ্যে নানা তিক্ত ঘটনা ঘটেছে। আফগানিস্তানে নতুন করে ৩০ হাজার সেনা পাঠানো এবং আগামী গ্রীষ্ম থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরুর প্রশ্নেও তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ফাঁস করে দিয়ে দুনিয়া কাঁপিয়ে দেন সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং ইরাকযুদ্ধ নিয়ে ধারবাহিকভাবে কয়েকটি বই লিখেছেন তিনি। কাজেই তাঁর নতুন বই ওবামা’স ওয়ার-এর অপেক্ষায় আছে ওয়াশিংটন। উডওয়ার্ড বর্তমানে ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সহযোগী সম্পাদক।
উডওয়ার্ড তাঁর বইয়ে হল ব্রুককে উদ্ধৃত করেছেন এভাবে, ‘নতুন আফগানকৌশল কাজে আসবে না।’ আর আফগানিস্তান বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, কয়েক মাস ধরে খাটাখাটুনি করে আফগানিস্তান বিষয়ে পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করা হলো, অথচ নতুন কৌশলে তার কিছুই অন্তর্ভুক্ত করা হলো না।
আফগানকৌশল নিয়ে ভিন্নমত আছে ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ বাইডেনের। হল ব্রুক সস্পর্কে তিনি বলছেন, ‘এমন দাম্ভিক বেজন্মা আমি কখনো দেখিনি।’
ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেমস জোনসকে দুই চোখে দেখতে পারেন না প্রশাসনের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটসের দুশ্চিন্তা, জোনসের জায়গায় ওবামার নিরাপত্তা উপদেষ্টা হতে যাচ্ছেন জোনসেরই সহযোগী টমাস ডনিলোন। গেটসের মতে, সেটি হবে একটি ‘বিপর্যয়’।

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ও বিডিসিএলের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড ও বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেডের (বিডিসিএল) মধ্যে সম্প্রতি একটি চুক্তি হয়েছে।
এ চুক্তি অনুযায়ী ঢাকার পুরানা পল্টনে ১৫ দশমিক ৩৭ কাঠা জমির ওপর আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ১৬ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করবে বিডিসিএল।
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একরামুল হক এবং বিডিসিএলের চেয়ারম্যান মাঞ্জুরুল ইসলাম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বদিউর রহমান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আবদুল মালেক মোল্লা, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এ জেড এম শামসুল আলম, সাবেক পরিচালক খন্দকার মেসবাহ্উদ্দীন আহমেদ, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এহ্সানুল আজিজ ও মো. রফিকুল ইসলাম, কোম্পানির সচিব মো. মোফাজ্জল হোসাইন, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. হাবিব উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

বিক্রয় দক্ষতা বিষয়ে সিটিব্যাংকে কর্মশালা

সিটিব্যাংক এনএ সম্প্রতি ঢাকায় ‘সিটি সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড্ লারনিং’, ফিলিপাইন্স-এর সহায়তায় দুই দিনব্যাপী এক কর্মশালার আয়োজন করেছে।
সিটির ১২ জন কর্মকর্তা এই কর্মশালায় যোগ দেন। এটি পরিচালনা করেন সিঙ্গাপুর থেকে আগত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষক হুথওয়েইট। কর্মশালা শেষে সিটিব্যাংক এনএ বাংলাদেশের গ্লোবাল মার্কেটস বিভাগের প্রধান সাজেদ উল ইসলাম অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করেন।

চট্টগ্রামের আমানবাজারে এনসিসি ব্যাংকের নতুন শাখা চালু

প্রথম দিন থেকেই অনলাইন সুবিধা নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমানবাজারে এনসিসি ব্যাংক লিমিটেডের ৭১তম শাখার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী প্রধান অতিথি হিসেবে গতকাল বুধবার নতুন এই শাখাটির উদ্বোধন করেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। এতে ব্যাংকের পরিচালক তোফাজ্জল হোসেন, নূরুন নেওয়াজ সেলিম ও খায়রুল আলম চাকলাদার এবং উদ্যোক্তা আনোয়ার পাশা বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম হাফিজ আহমেদ, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রধান স্বপন কুমার দাশসহ ঊর্ধ্বতন নির্বাহী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ইয়াকুব আলী বলেন, চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অনেক সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে। এসব সম্ভাবনাময় খাতকে এগিয়ে নিতে আধুনিক ব্যাংকিং-সুবিধা নিয়ে আমানবাজারে এনসিসি ব্যাংকের নতুন শাখা খোলা হয়েছে। এসব সুবিধা ও সেবা গ্রহণের জন্য তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান।
মোহাম্মদ নূরুল আমিন দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে এনসিসি ব্যাংকের বিভিন্ন পণ্য ও উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি এনসিসি ব্যাংকের এসব সুবিধা গ্রহণ করার জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
নূরুল আমিন এনসিসি ব্যাংকের বিভিন্ন সামাজিক অঙ্গীকারের কথা বর্ণনা করে বলেন, এই ব্যাংক শুধু মুনাফা বৃদ্ধি নয়, জনকল্যাণেও ব্যাপক কাজ করে চলেছে।

সমাজসেবার নামে ব্যবসা বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ

সমাজসেবার নাম ভাঙিয়ে অন্য কিছু করার পথ বন্ধ হচ্ছে। সমাজসেবার কথা বললে সমাজসেবাই করতে হবে। অর্থাৎ সোসাইটির নাম নিয়ে ব্যবসা করা যাবে না। অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কথা বলে নিবন্ধন নিয়ে গঠন করা যাবে না কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠানও।
শুধু তা-ই নয়, সোসাইটি হিসেবে নিবন্ধন পেতে হলে এর উদ্যোক্তাদের হতে হবে আয়কর প্রদানকারী ব্যক্তি। পেশাগত পরিচয়ও থাকতে হবে তাঁদের।
এসব বৈশিষ্ট্য সামনে রেখে নতুন করে সোসাইটি নিবন্ধন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৫০ বছরের পুরোনো সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০ যুগোপযোগী ও সংশোধিত হয়ে নতুন আইন হবে সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল অ্যাক্ট, ২০১০। তবে গত পাঁচ বছর এ আইন সংশোধনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
আগে এই আইনের আওতায় নিবন্ধিত সমাজসেবামূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের কোনো হাতিয়ার ছিল না, ছিল না জবাবদিহিও। এবার জবাবদিহির বিধান রেখে আইন তুলনামূলক কঠোর করা হচ্ছে।
গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যৌথ মূলধনি কোম্পানিজ ও ফার্মসগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) তৈরি করা সংশোধিত আইনের খসড়ার ওপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এম মর্তুজা রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় যৌথ মূলধনি কোম্পানির নিবন্ধক আহমেদুর রহিম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তানকীন হক সিদ্দিকী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, বিদ্যমান সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন আইনে বিভিন্ন সোসাইটির উদ্দেশ্যের সঙ্গে এদের কার্যক্রমের কোনো মিল নেই। অনেকে নিবন্ধন নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকে আবার নিবন্ধন নিয়েই এখতিয়ার-বহির্ভূতভাবে নেমে পড়েছে ব্যবসায়।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, এসব কর্মকাণ্ডের খবর সরকার জানে। কিন্তু আইনে কঠোর শাস্তির বিধান না থাকায় লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। আবার দেশে এত বেশি সোসাইটি হয়ে গেছে যে এদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং লোকবলও যৌথ মূলধনি কোম্পানিজের নেই।
কী পরিমাণ প্রতিষ্ঠান আইন লঙ্ঘন করছে বা সোসাইটি নাম নিয়ে এনজিও কার্যক্রম চালাচ্ছে—এ বিষয়ে কোনো তথ্য আরজেএসসির কাছে নেই। তথ্য সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা বা পদ্ধতিও নেই।
সূত্র জানায়, সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন আইনের সংশোধনের ব্যাপারে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০৫ সালে। আইনটির বিভিন্ন অপব্যবহার রোধে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসগুলোর পরিদপ্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একাধিক আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তৈরি হয়েছে খসড়াও। কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপে এই খসড়া মন্ত্রিসভার বৈঠকেই তোলা যায়নি।
বিদ্যমান সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন আইনের ব্যাপক অপব্যবহার হওয়ার কথা প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেন নিবন্ধক আহমেদুর রহিম। তিনি জানান, আইনটির সংশোধনীর খসড়া নিয়ে কিছুদিনের মধ্যে আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তার পরই বিষয়টি যাবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। নতুন আইন পাস হলে দেশের সোসাইটি-সম্পর্কিত কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সোসাইটি নিবন্ধন প্রদানকারী সংস্থা আরজেএসসি এখন বেছে বেছেই নিবন্ধন দিচ্ছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা যেসব প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রে ব্যবসা বা এনজিও কার্যক্রমের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোকেই আটকে দেওয়া হচ্ছে। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান, কলা, দাতব্য, সাহিত্য, ইতিহাস ও গ্রন্থাগারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বেশি।
জানা গেছে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অন্তর্ভুক্ত ভলান্টারি অর্গানাইজেশন রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের মাধ্যমেও সোসাইটির নিবন্ধন নেওয়া যায়। অনেকে আবার সোসাইটির নিবন্ধন নিয়ে থাকেন ১৮৮২ সালের ট্রাস্ট আইনের আওতায়। কিন্তু সহজলভ্যতার কারণে বেশির ভাগ সোসাইটিরই নিবন্ধন হয়ে থাকে আরজেএসসিতে।

সুতার অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি রোধের আহ্বান

সুতার মূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরার জন্য দেশের স্পিনিং মিলের মালিক ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। এ ব্যাপারে সংগঠন দুটি সরকারের সহযোগিতাও কামনা করেছে।
বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান ও বিজেএমএই সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী স্বাক্ষরিত যৌথ বিবৃতিতে গতকাল এই আহ্বান জানানো হয়। গতকাল বিকেএমইএ ঢাকা কার্যালয়ে বিকেএমইএ ও বিজিএমইএর যৌথ জরুরি আলোচনা সভার পর এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, একদিকে বিশ্বমন্দা, অন্যদিকে অস্থিতিশীল সুতার বাজার দেশের নিটশিল্পের মালিকদের বিপাকে ফেলেছে। আসন্ন মৌসুমের জন্য বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে নিট পণ্য রপ্তানির জন্য ইতিমধ্যেই (জুলাই-আগস্ট) সাড়ে তিন ডলার সর্বোচ্চ সুতার দর ধরে চুক্তি হয়েছে। অথচ ঈদের এক সপ্তাহ আগেও সুতার সর্বোচ্চ মূল্য ছিল ৩ দশমিক ৭০ ডলার, যা বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪০ ডলারে।
এ অবস্থায় রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন নিট রপ্তানিকারকেরা। সরকারের সহযোগিতায় এ খাতের মালিকেরা গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা সত্ত্বেও ঈদুল ফিতরের ছুটির আগে শ্রমিকদের বেতনসহ সব পাওনা পরিশোধ করে পরিস্থিতি শান্ত রেখেছেন।
কিন্তু সুতার অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে আসন্ন ঈদুল আজহার আগে আবার এ খাতের পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ, ওই সময়েই রয়েছে সরকার ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করার কথা।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বিকেএমইএ, বিজিএমইএ ও বিটিএমএ নেতাদের যৌথ আলোচনার মাধ্যমে সুতার একটি যৌক্তিক ও সহনশীল মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি সমম্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন বলে বিবৃতিতে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে।

চার হাজার টাকায় বাতিসহ সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল আসবে

সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী বাতিসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন সন লিমিটেড। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে এসব পণ্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করছেন কোম্পানির উদ্যোক্তারা।
তাইওয়ানের কারিগরি সহায়তায় মাত্র চার হাজার টাকায় তিন ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন (এলইডি) প্যানেল তৈরি করবে কোম্পানিটি। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য শুধু প্রয়োজনীয় সেল আমদানি করা হবে। আর বাকি সব উপকরণ প্রস্তুত হবে দেশেই। আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকেই পণ্যটি বাজারজাত করা সম্ভব হবে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে গোল্ডেন সন লিমিটেড আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলাল আহমেদ এসব তথ্য জানান।
বেলাল আহমেদ বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৪৫ কোটি টাকা শেয়ারবাজারে রাইট শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এরই মধ্যে তাদের রাইট শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন দিয়েছে। এ ছাড়া স্বল্পমূল্যে কম্পিউটারের কেসিং উৎপাদনেরও পরিকল্পনা আছে তাদের।
রাইট শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে ওঠানো অর্থ কী কাজে ব্যবহার করা হবে, তার পরিকল্পনা তুলে ধরতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে গোল্ডেন সন কর্তৃপক্ষ। সংবাদ সম্মেলনে কোম্পানির চেয়ারম্যান লিন ইউ চেন ও স্বতন্ত্র পরিচালক মনিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
বেলাল আহমেদ বলেন, এখনো দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগের বাইরে। দেশব্যাপী বিদ্যুৎসেবা পৌঁছে দিতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও তা সময়সাপেক্ষ। কিন্তু গোল্ডেন সনের উৎপাদিত পণ্য অত্যন্ত কম সময় ও স্বল্প খরচের মধ্যে বিদ্যুৎবঞ্চিত মানুষের কাছে বিদ্যুৎসেবা পৌঁছাতে পারবে।
বেলাল আহমেদ জানান, গোল্ডেন সন কয়েকটি মডিউলের পণ্য বাজারজাত করবে। এর মধ্যে তিন ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্যানেলটির সূর্যের সাধারণ আলো থেকে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করতে সময় লাগবে ছয় ঘণ্টা, যা পরের আট ঘণ্টা বিরামহীনভাবে আলো দেবে। এ প্যানেলে একটি মোবাইল চার্জার ব্যবহারেরও সুযোগ থাকবে। এ রকম একটি সৌর প্যানেল ন্যূনতম ২৫ বছর চলবে। তবে দু-তিন বছর পরপর ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হবে। আর এ জন্য খরচ পড়বে মাত্র ৭০০ টাকা। পণ্যটি রপ্তানির পরিকল্পনা আছে তাঁদের।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগামী তিন বছরে গোল্ডেন সনের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হবে আট টাকা ৭০ পয়সার মতো। এতে কোম্পানির লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষমতাও বাড়বে। প্রতিষ্ঠানটির ২০০৯ সালের নিরীক্ষিত ইপিএস দুই টাকা ৬১ পয়সা।

রিয়ালে ফিরছেন স্নাইডার

রিয়াল মাদ্রিদে তাঁর দুই বছর সময়টা ভালো কাটেনি মোটেও। কিন্তু ইন্টার মিলানে গিয়ে হোসে মরিনহোর শিষ্যত্ব নিয়ে ওয়েসলি স্নাইডার যেন নতুন করে আবিষ্কার করেন নিজেকে। সেই দুর্দান্ত ফর্মের ঝলক ছিল গত বিশ্বকাপেও। মরিনহো ঠিকানা পাল্টে রিয়ালে এসেছেন। শোনা যাচ্ছে, এই ডাচ মিডফিল্ডারও নাকি ফিরছেন পুরোনো ডেরায়। ইন্টার মিলানের সঙ্গে তাঁর নতুন চুক্তির প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার পরই গুঞ্জন উঠেছে, মরিনহোর ডাকে সাড়া দিয়ে রিয়ালে ফিরছেন স্নাইডার।
গুঞ্জন নয়, ইন্টারকে গত মৌসুমে ট্রেবল জেতানো এই ফুটবলারের এজেন্ট প্রকাশ্যেই বলছেন, ‘হ্যাঁ, চুক্তির ব্যাপারে আমরা মতৈক্যে পৌঁছাতে পারি। আলোচনা আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে। সেটা তখনই শুরু হবে যদি ইন্টার নিজে থেকে এগিয়ে আসে। ওয়েসলির ব্যাপারে ইউরোপের অনেক খেলোয়াড়ই আগ্রহ দেখিয়েছে। ও অবশ্য ইন্টারে থাকতেই চেয়েছিল। মাত্র একটা মৌসুম এখানে কাটিয়ে দল পাল্টানোতে ওর সায় ছিল না।’
ওই মুখপাত্রের দাবি, পরিস্থিতি পাল্টে গেছে ইন্টার প্রতিশ্রুতি না রাখায়, ‘ক্লাবের সভাপতি মাসিমো মোরাত্তি ওকে নিয়ে অনেক বড় বড় কথাই বলেছেন। আগামী দিনগুলোয় ওয়েসলিই দলের নেতা হবে—এমনটাও বলা হয়েছে। এখানে দারুণ বেতন, বড় অঙ্কের ট্রান্সফার ফি পাওয়ার কথা ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলো, এই প্রতিশ্রুতিগুলো রাখা হয়নি। ইন্টারের ভাবভঙ্গিতে ওয়েসলি বিব্রত। রিয়াল মাদ্রিদের আগ্রহ থাকায় এখানে সে আরও বেশি অস্বস্তি অনুভব করছে।’

মরেনোর মরণ অন্ধকার জগতে

২০০২ বিশ্বকাপে ইতালি-দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচের জন্য ‘কুখ্যাত’ হয়ে আছেন তিনি। অন্তত ইতালিতে। ইকুয়েডরের সাবেক রেফারি বায়রন মরেনো এবার সত্যিই কুখ্যাত হয়ে গেলেন মাদক পাচারের সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে তাঁর দেহতল্লাশি করে ১০ ব্যাগ হেরোইন পাওয়া যায়। প্রায় ১০ পাউন্ড হেরোইন শরীরে লুকিয়ে পাচারের চেষ্টা করছিলেন মরেনো। তাঁকে গ্রেপ্তার করে হাজতে পাঠানো হয়েছে।
মরেনোর গ্রেপ্তারের পর পুরোনো ক্ষোভ উগরে দিয়েছে ইতালিয়ানরা। জিয়ানলুইজি বুফন তো দাবি করেছেন, ২০০২ বিশ্বকাপে নেশা করেই মাঠে নেমেছিলেন মরেনো। ৬ কেজি ড্রাগ নিয়ে মরেনো ধরা পড়ার খবরে তাই মোটেও বিস্মিত নন বুফন, ‘ছয় কেজি ড্রাগ? আমার তো মনে হয়, ২০০২ বিশ্বকাপেও ওর কাছে এর চেয়েও বেশি ছিল; না অন্তর্বাসে নয়, দেহে।’ বুফনদের রাগ হওয়াই স্বাভাবিক। ওই ম্যাচে ইতালির একটা গোল বাতিল করেছিলেন মরেনো। লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন টট্টিকে। কোরীয়দের ফাউলের সময় চোখ বন্ধ করে ছিলেন বলেও অভিযোগ ইতালীয়দের।

আশা জিইয়ে রাখল ভারত

খেলা শেষে কোচ শুক্লা দত্তও ছুটে এলেন জয় ছিনিয়ে আনা কমলা-বীণাদের স্বাগত জানাতে। কোচের দুশ্চিন্তা কি একটু কমল? পুরোপুরি নয়। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে অনেক ‘কিন্তু’র হিসাব রয়ে গেছে। কাল বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে জর্ডানকে ২-০ গোলে হারিয়ে পরের রাউন্ডে যাওয়ার আশা আপাতত জিইয়ে রাখল ভারত। দুই খেলায় দুই দেশের পয়েন্টই ৩।
আগের ম্যাচে স্বাগতিক বাংলাদেশকে ৬ গোলে হারিয়ে বেশ চাঙা ছিল জর্ডান। মিনিট দশেক আধিপত্য নিয়েই খেলল। কিন্তু এর পর থেকে শুরু ভারতের আক্রমণ। এবং ফলও এল হাতেনাতে—১৯ মিনিটে রিনার গোল। ২৫ মিনিটে ২-০ করেন কমলা দেবী।
দ্বিতীয়ার্ধেও আধিপত্য ধরে রাখে ভারত। বীণা-আশালতাদের খেলায় ছিল গতি, ছিল চমৎকার বোঝাপড়া। পুরো ম্যাচই ছন্নছাড়া ফুটবল খেলল জর্ডান। আরও বড় ব্যবধানেই জিততে পারত ভারত। ম্যাচের ৭১ মিনিটে জবামণির দূরপাল্লার চমৎকার শটটি বারে লেগে বাইরে চলে যায়। তবে ম্যাচ শেষে তৃপ্তির হাসিই ছিল কোচ শুক্লা দত্তের মুখে, ‘আমাদের মেয়েরা খুবই ভালো খেলেছে। একরকম নিশ্চিতই ছিলাম যে জর্ডানের বিপক্ষে জিতব।’ তবে এখনই পরের রাউন্ডে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছেন না তিনি, ‘আশা করি, বাংলাদেশের বিপক্ষেও জিতব। এরপরের ব্যাপারটা নির্ভর করছে ইরান-জর্ডান ম্যাচের ওপর।’ জর্ডান কোচ আমের আবু হান্তাস দুষলেন নিজেদেরই, ‘অসংখ্য ভুল পাস খেলেছি আমরা। ওরা বেশি সুযোগ পেয়েছে। দুটো সহজ গোল খেয়ে আর খেলায় ফিরতে পারিনি।’

গেমস নিয়ে উদ্বেগ থাকছেই

দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে যথাসময়ে দিল্লি কমনওয়েলথ গেমস হওয়া নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ততই বাড়ছে। গেমস-পল্লি অ্যাথলেটদের জন্য এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় বাইরের পর্যবেক্ষকদের অসন্তোষের মুখে নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক তারকা অ্যাথলেট ৩-১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
গেমস-পল্লিকে যথাসময়ে অ্যাথলেটদের জন্য প্রস্তুত করে না তুলতে পারায় কয়েক দিন ধরেই বিদেশি পত্রপত্রিকায় সমালোচনা হচ্ছে আয়োজকদের। এবার সমালোচনার তীর ছুটছে খোদ ভারত থেকেই। গত মঙ্গলবার গেমসের প্রধান ভেন্যু জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের বাইরে একটি নির্মাণাধীন ফুটব্রিজ ভেঙে পড়ার পর কাল ধসে পড়েছে গেমসের ভারোত্তোলন ভেন্যুর অস্থায়ী ছাদের একাংশ। আর এটিকে ভারতীয় পত্রপত্রিকায় দেখা হচ্ছে ‘জাতীয় লজ্জা’ হিসেবে। গেমসের ভেন্যুগুলোকে সময়মতো প্রস্তুত করার জন্য আয়োজকেরা যে প্রবল চাপের মুখে, এসব দুর্ঘটনা তারই ইঙ্গিত।
গেমস-পল্লিতে এখনো যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইট-সুরকির মাঝে জায়গায় জায়গায় জমে আছে পানি, যা মশার উপদ্রব বেড়েছে। দিল্লিতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে বলে খবর। সব মিলিয়ে সরেজমিনে গেমস-পল্লি দেখতে আসা পর্যবেক্ষকেরা বলে দিয়েছেন গেমস-পল্লি পরিষ্কার করা না হলে প্রতিযোগিতা হওয়া সম্ভব নয়। গেমসের প্রস্তুতি নিয়ে নিউজিল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড আগেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কানাডাও পরশু ইঙ্গিত দিয়েছে, সমস্যার সমাধান না হলে তারা গেমস থেকে দল প্রত্যাহারও করে নিতে পারে।
কোনো দেশ টুর্নামেন্ট থেকে এখনো দল প্রত্যাহারের ঘোষণা না দিলেও বিচ্ছিন্নভাবে অ্যাথলেটরা নাম প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করেছেন। চাকতি নিক্ষেপে অস্ট্রেলিয়ার চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট ড্যানি স্যামুয়েলস জানিয়েছেন, নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে তিনি গেমসে অংশ নিচ্ছেন না। ইংল্যান্ডের ট্রিপল জাম্প চ্যাম্পিয়ন ফিলিপ ইডোউ দিল্লিতে যাচ্ছেন না। ইংল্যান্ডের আলোচিত আরও দুই অ্যাথলেট বেইজিং অলিম্পিকে মহিলাদের ৪০০ মিটারে সোনাজয়ী ক্রিস্টিন অরুগু এবং ১৫০০ মিটারের দৌড়বিদ লিসা দোবরিস্কিও নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে যাচ্ছেন না। নিউজিল্যান্ড সরকার ঘোষণা করেছে, না চাইলে কোনো অ্যাথলেটকে দিল্লি যেতে চাপ দেবে না তারা। এর আগেও অবশ্য বিভিন্ন কারণে প্রতিযোগিতা থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ১০০ মিটারে বিশ্ব রেকর্ডধারী উসাইন বোল্ট, কমনওয়েলথ গেমসের দ্রুততম মানব আসাফা পাওয়েল, মহিলা ম্যারাথনার পাওলা র‌্যাডক্লিফের মতো তারকা।
অনেক অ্যাথলেট যখন দ্বিধায়, তখন গেমসের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে রীতিমতো এক ‘বোমা’ই ফাটিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার এক টেলিভিশন চ্যানেল। ভিডিও ফুটেজে চ্যানেলটি দেখিয়েছে কীভাবে তাদের এক রিপোর্টার গেমসের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে বোমা তৈরির উপকরণ নিয়ে গেমস-পল্লিতে ঢুকে আবার নির্বিঘ্নে বের হয়ে আসছেন। দিল্লি পুলিশ অবশ্য অস্ট্রেলিয়ান টিভিতে প্রচারিত ভিডিও ফুটেজকে ‘পুরোপুরি ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। গেমস চলাকালীন অ্যাথলেটদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার কথাও বলছে তারা। কিন্তু নিরাপত্তার আগেও যে প্রশ্নটি চলে আসছে তা হলো গেমস যথাসময়ে হবে তো? এএফপি, ওয়েবসাইট।

শেষ চারে চেন্নাই

সেমিফাইনালে যেতে হলে জিততেই হবে, এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ১০ রানে ওয়ারিয়র্সকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে উঠে গেছে চেন্নাই সুপার কিংস। কাল পোর্ট এলিজাবেথে ‘এ’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ১৩৬ রান তুলেছিল চেন্নাই। সর্বোচ্চ ৫০ রান আসে মাইক হাসির ব্যাট থেকে। জবাবে ওয়ারিয়র্স ২০ ওভার খেললেও ৮ উইকেটে ১২৬ রানের বেশি করতে পারেনি।
এই জয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই সেমিতে উঠল চেন্নাই। পরাজয় অবশ্য ওয়ারিয়র্সের শেষ চারে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে গেছে তারাও।

ফুটবলে গ্রামীণফোন

প্রথমবারের মতো কোনো ফুটবল টুর্নামেন্টে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এগিয়ে এল মোবাইল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন। ঢাকার বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে এখন চলছে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল। এই টুর্নামেন্টে পৃষ্ঠপোষণা করতে বাফুফের অনুরোধে সাড়া দিয়েছে গ্রামীণফোন। কাল স্টেডিয়ামে দেখা গেল গ্রামীণফোনের বেশ কিছু বিলবোর্ড। আর্থিক সংকটের মধ্যে বাফুফের জন্য এটা সুখবরই।
বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, ‘বিপণন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফুটবলের স্পনসরশিপ বিক্রির চেষ্টা করছি আমরা। এরই অংশ হিসেবে গ্রামীণফোনের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে অনেক দূর। আমাদের অনুরোধ রক্ষা করে এএফসি মহিলা ফুটবলে তারা পৃষ্ঠপোষণা করছে। আশা করছি, ফুটবলে আমরা গ্রামীণফোনকে লম্বা সময়ের জন্য পাব।’

দক্ষিণ আফ্রিকা দলে ইনগ্রাম

চলতি চ্যাম্পিয়নস লিগ টি-টোয়েন্টির প্রথম ৩ ম্যাচে করেছেন মাত্র ৪৩। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে কলিন ইনগ্রাম যেমন খেলেছেন, জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল সেটাই। পাকিস্তান ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজের দলে ডাক পেয়েছেন ২৫ বছর বয়সী বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রান করেছিলেন ইনগ্রাম, নজর কেড়েছিলেন ‘এ’ দলের হয়ে বাংলাদেশ সফরেও।
ইনগ্রামের সঙ্গেই বাংলাদেশ সফরে নজরকাড়া ডেভিড মিলার ধরে রেখেছেন জায়গা। ‘এ’ দলের হয়ে বাংলাদেশ সফরের পরই দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে দলে সুযোগ পেয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী মিলার। ওয়েস্ট ইন্ডিজে তিনটি ওয়ানডেতে করেছিলেন ৫৪ রান। তবে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলে ফিরতে পারেননি দুই অভিজ্ঞ মার্ক বাউচার ও হার্শেল গিবস। টেস্ট দলে অবশ্য উইকেটের পেছনে এখনো প্রথম পছন্দ বাউচার। টেস্ট দলে নেই কোনো নতুন মুখ, তবে চোট কাটিয়ে সাত মাস পর ফিরেছেন ওয়েইন পারনেল। চোটের কারণে টি-টোয়েন্টিতে খেলতে পারবেন না ক্যালিস ও ডেল স্টেইন। নেতৃত্ব ছাড়লেও টি-টোয়েন্টি দলে থাকছেন গ্রায়েম স্মিথ। দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু ৮ অক্টোবর, তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু ১৫ অক্টোবর। পাকিস্তানের বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টি, পাঁচ ওয়ানডে ও দুটি টেস্টের সিরিজ শুরু ২৬ অক্টোবর।
দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট দল: গ্রায়েম স্মিথ (অধি.), হাশিম আমলা, ইয়োহান বোথা, মার্ক বাউচার, এবি ডি ভিলিয়ার্স, জেপি ডুমিনি, পল হ্যারিস, জ্যাক ক্যালিস, মরনে মরকেল, ওয়েইন পারনেল, আলভিরো পিটারসেন, অ্যাশওয়েল প্রিন্স, ডেল স্টেইন, লনওয়াবো সোতসোবে।
 ১৫ সদস্যের ওয়ানডে সিরিজের দলে বাউচার, হ্যারিস, পিটারসেন ও প্রিন্সের বদলে আছেন কলিন ইনগ্রাম, ডেভিড মিলার, আলবি মরকেল, চার্ল ল্যাঙ্গেভেল্ট ও রবিন পিটারসন।

অনুপ্রেরণার নাম ট্রট

যে ঘটনায় পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চেয়েছিলেন আফ্রিদিরা, সেটা থেকেই আত্মবিশ্বাসের রসদ খুঁজছে ইংলিশরা। ইংল্যান্ড ব্যাটসম্যান ইয়ান বেলের দাবি, ওয়াহাব রিয়াজের মুখে ইয়ান বেলের প্যাড দিয়ে আঘাত করার ঘটনা নাকি উদ্বুদ্ধ করবে ইংলিশদের! ‘আপাত নিরীহ’ ট্রটের এভাবে জ্বলে ওঠায় নাকি টিম স্পিরিট পোক্ত হবে। অস্ট্রেলিয়ায় জ্বলে ওঠার জন্য যে বারুদের প্রয়োজন, ইংলিশদের সেটার জোগানই নাকি দিয়েছেন ট্রট!
লর্ডসে চতুর্থ ওয়ানডের আগে গা গরমের পর রিয়াজ ফিরে আসছিলেন, তখন হঠাৎ করেই ট্রট তাঁকে বলেন, ‘ম্যাচ ফিক্সার, তুমি ক্রিকেটকে ধ্বংস করছ।’ রিয়াজও পাল্টা জবাবে ট্রটের পরিবার তুলে কটু কথা বলেন। সঙ্গে সঙ্গে রিয়াজের মুখে মুখে প্যাড দিয়ে আঘাত করেন ট্রট। ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো নিরস্ত করেছেন দুজনকে। পাকিস্তান অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদির দাবি, উদারতা দেখিয়ে তাঁরা পুলিশের কাছে ট্রটের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি।
ট্রটকে সতর্ক করা দূরের কথা, এ ঘটনাকে উল্টো অনুপ্রেরণা মানছেন বেলরা, ‘এ ঘটনা পুরো দলকে আরও এককাট্টা করেছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে এটা আমাদের সাহায্য করবে, কারণ অস্ট্রেলিয়া সফরটা হবে দারুণ কঠিন। সবাই মিলে যদি এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারি, তাহলে দল হিসেবে আমাদের পথচলা আরও মসৃণ হবে।’ ট্রটের মতো ধীরস্থির স্বভাবের একজনের এমন ঘটনায় জড়িয়ে পড়া অবশ্য অবাক করেছে বেলকে, ‘ট্রটি আমার খুব ভালো বন্ধু, ওর সঙ্গে আমি অনেক খেলেছি। ও এ রকম একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ায় আমি সত্যিই অবাক হয়েছি। তবে ও খুবই আবেগপ্রবণ, এ ঘটনা হয়তো সেই আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ।’

দুজনের অন্য জীবন

২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে তাঁরা ছিলেন প্রতিপক্ষ। একজন জিতেছিলেন সোনার বল, অন্যজন জুতা। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে দুজনই অনেক দূরে চলে গেছেন। সেবারের সেরা খেলোয়াড় জার্মানির গোলরক্ষক অলিভার কান ফুটবল থেকে অবসরই নিয়ে নিয়েছেন। এখন বায়ার্ন মিউনিখ ক্লাবের চেয়ারম্যান হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে বর্তমান চেয়ারম্যান কার্ল হেইঞ্জ রুমেনিগের মেয়াদ শেষ হলেই তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার পরিকল্পনা কানের। আর ২০০২ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো এখনো ফুটবল খেলছেন, তবে তাঁর নতুন পরিকল্পনার জন্য তিনি কানের মতো বেছে নিয়েছেন ২০১১ সালটিকেই। ওই সময়ে খেলোয়াড়ি জীবনটা শেষ করে তিন বারের ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় শুরু করতে চান ক্রীড়াসামগ্রীর ব্যবসা।

লরগাতকে বরখাস্তের দাবি বাটের

কোনো এক মন্ত্রবলে ‘দুর্বল শাসক’ থেকে হঠাৎই যেন ‘প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর’ হয়ে উঠেছেন ইজাজ বাট। ইংলিশ ক্রিকেটারদের ম্যাচ পাতানোয় অভিযুক্ত করার পর এবার পিসিবি প্রধানের দাবি, বরখাস্ত করা হোক আইসিসির প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাতকে! বাটের অভিযোগ, ম্যাচ পাতানো বিতর্কের পরিস্থিতিটা ঠিকভাবে সামলাতে ব্যর্থ হয়েছেন লরগাত।
পিসিবিকে না জানিয়ে আইসিসি পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার পর থেকেই চরম অবনতি হয়েছে দুই পক্ষের সম্পর্কের। আইসিসি প্রধান শারদ পাওয়ারের সঙ্গে দেখা করে দুবাই যাওয়ার পরপরই বাটের সঙ্গে দেখা করেছিলেন লরগাত। কিন্তু সম্পর্কের বরফ তো গলেইনি, উল্টো আরও জমাট বেঁধেছে। এরই প্রমাণ বাটের নতুন দাবি, ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া স্রেফ মিডিয়ার কিছু তথ্য থেকে এভাবে তদন্ত শুরু করা নির্বোধের মতো কাজ হয়েছে। এটি বিশ্বাস করা কঠিন, সত্যিই ভয়াবহ। সে (লরগাত) আইসিসির চাকুরে, আইসিসির উচিত পরবর্তী সভাতেই তাকে বরখাস্ত করা। তাদের উচিত, ইংল্যান্ড দলের বিপক্ষেও তদন্ত করা। দুই দলের বিপক্ষেই তদন্ত করে দেখা হোক, আসলে দোষী কোন দল।’
বাটের দাবির ভিত্তিও আছে। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, তদন্ত শুরুর আগে লরগাতের উচিত ছিল দুই দেশের বোর্ডকেই জানানো। কিন্তু পিসিবি পুরো ব্যাপারটা জানতে পেরেছে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর। লরগাতও তাই বিপদে পড়তে পারেন। ইসিবির দাবি অনুযায়ী ‘ক্ষমা’ চাইবেন না বলেও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন পিসিবি প্রধান। বাটের দাবি, যে অভিযোগ তিনি করেনইনি, সেই অভিযোগের জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না! ওভাল ওয়ানডে নিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে গড়াপেটার অভিযোগ ওঠার পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর পাল্টা অভিযোগ করে বাট বলেছিলেন, ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররাই টাকা খেয়ে ম্যাচ হেরেছে। যতটা নাটকীয়ভাবে অভিযোগ করেছিলেন, তার চেয়েও চমকপ্রদভাবে পরদিনই অস্বীকার করেছিলেন অভিযোগ করার কথা।
বিতর্কের এই ডামাডোলে একটা সুখবরও আছে পাকিস্তান ক্রিকেটের জন্য। বছরের শেষে নিউজিল্যান্ডে তাদের সফরটা হচ্ছেই। সাম্প্রতিক বিতর্কের পর সিরিজটাকে ঘিরে শঙ্কা জেগেছিল। ক্রিকেট নিউজিল্যান্ডের প্রধান নির্বাহী জাস্টিন ভনের নানা রকম মন্তব্যে মনে হয়েছিল, সিরিজটা খেলতে খুব একটা উৎসাহী নয় তারা। তবে সেই ভনই কাল জানালেন, ‘আইসিসির এফটিপি যেভাবে করা হয়েছে, সেটি পরিবর্তনের কোনো উপায় নেই। এমনকি প্রতিপক্ষ পাল্টানোরও কোনো উপায় নেই।’ তবে সিরিজটা দর্শকদের কতটা টানবে, এটি নিয়ে ঠিকই শঙ্কিত ভন। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, এফটিপির কোনো সিরিজ কোনো দল খেলতে না চাইলে বিপুল অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়। এ জন্যই হয়তো সিরিজ বাতিলের পথে যায়নি নিউজিল্যান্ড।

পাকিস্তান না ইংল্যান্ড সিরিজ কোন দলের

পত্রিকা যখন পাঠকদের হাতে পৌঁছাবে, তার আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে পাকিস্তান-ইংল্যান্ডের ৫ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে কোন দল। তবে এ রিপোর্ট খেলার সময় বলার উপায় ছিল না ২-২ ম্যাচে সমতায় থাকা সিরিজের শেষ ম্যাচে শেষ হাসি হাসতে যাচ্ছে কোন দল। ইংল্যান্ডের ২৫৬ রানের জবাবে পাকিস্তান ১৬ ওভারে ২ উইকেটে তুলেছিল ৭২ রান। অর্থাৎ, বাকি ৩৪ ওভারে জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল আরও ১৮৫ রান।
৮টি চার ও ১টি ছয়ে মরগানের ১০৭* রানের সুবাদে আড়াই শ ছাড়িয়ে যাওয়া ইনিংসের আগে ইংল্যান্ডকে চাপের মধ্যেই রেখেছিলেন পাকিস্তানি বোলাররা। ৪৭ রান তুলতেই স্বাগতিকেরা হারিয়ে ফেলেছিল ৩ উইকেট। ৪০ রানে ৩ উইকেট নিয়ে সবচেয়ে সফল বোলার শোয়েব আখতার।
হাফিজ ও আকমল পাকিস্তানকে ৬৩ রানের ভালো একটা সূচনা এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর আর কোনো রান যোগ না হতেই ২ উইকেট হারিয়ে ফেলে পাকিস্তান। ওয়েবসাইট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: ইংল্যান্ড: ৫০ ওভারে ২৫৬/৬ (স্ট্রাউস ২৫, বেল ২৮, কলিংউড ৪৭, মরগান ১০৭*, ব্রেসনান ১৮*; শোয়েব ৩/৪০, আফ্রিদি ১/৪০, হাফিজ ১/৪০, গুল ১/৫৫)।
পাকিস্তান: ১৬ ওভারে ৭২/২ (আকমল ৩৬*, হাফিজ ২৯, শফিক ০, ইউসুফ ৩*; ব্রড ২/২১)।

৬৮ জনের বহরের খরচ ৯০ লাখ

৭ খেলায় খেলোয়াড় ৩৭ জন। কোচ-ম্যানেজার এবং দলের সঙ্গে নিজ খরচে যাওয়া আরও ১৬ জন। এই ৫৩ জনের সঙ্গে কাটছাঁট করে আরও ১৫ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে দিল্লি কমনওয়েলথ গেমসের দলে। ১০ জনকে বাদ দিয়ে তালিকা সংশোধন করা হয়েছে কাল। ৬৮ জনের জিওর (সরকারি আদেশ) জন্য ফাইল পাঠানো হচ্ছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে।
শুরুতে দল ছিল ৭৮ সদস্যের। কোচ-খেলোয়াড়-কর্মকর্তা-ম্যানেজার আগেও ৫৩ জন ছিলেন। বাকি ২৫ জনই অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন ডেলিগেট, আমন্ত্রিত অতিথি এবং আরও নানা শ্রেণীতে। যাতে ছিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার ও তাঁর একান্ত সচিব শিবনাথ রায়ের স্ত্রী। সমালোচনার মুখে সরকারি দল থেকে এই দুজন সরে দাঁড়িয়েছেন বলে জানা গেছে। জিওর জন্য কাল তৈরি করা চূড়ান্ত তালিকায় তাঁদের নাম নেই। তাঁরা গেলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যেতে পারেন।
বাদ পড়েছেন দলের মহিলা ম্যানেজার হিসেবে এর আগে মনোনীত বিওএর উপমহাসচিব ফেরদৌস আরা খানম এবং এসএ গেমসে সাইক্লিং কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত সাইক্লিং ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হাসান। আগের তালিকায় সরকারি দলের অংশ হিসেবে যাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) মহাসচিব কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও বিওএর সিইও কর্নেল (অব.) ওয়ালিউল্লাহর। তাঁরা এখন বেসরকারিভাবে যাবেন।
খোলোয়াড়-কোচ-ম্যানেজারের বাইরে আরও যে ১৫ জনকে সরকারি দলে রাখা হয়েছে, তাঁরা হলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, তাঁর একান্ত সচিব, ক্রীড়াবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ আহসান রাসেল, এই কমিটির সদস্য সাংসদ তৌহিদ জং মুরাদ ও শামসুল হক চৌধুরী। বিওএর সভাপতি জেনারেল আব্দুল মুবীন, তাঁর একান্ত সচিব মাইনুল্লাহ চৌধুরী আছেন দলে। বিওএ সভাপতি গেমসে আমন্ত্রণ পান সব সময়ই।
দলের সঙ্গে যাচ্ছেন শেফ দ্য মিশন নুরুল ফজল বুলবুল, জেনারেল ম্যানেজার জোবায়দুর রহমান (রানা), ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ হানিফ, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ক্রীড়া পরিচালক হাইয়ুল কাইয়ুম, বিওএর দুজন বেতনভুক্ত কর্মকর্তা ও একজন সদস্য।
তালিকাটি দেখে হতাশা ব্যক্ত করলেন দীর্ঘদিন ধরে ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান কোহিনুর, ‘যাঁরা এই সফরে গেলে ক্রীড়াঙ্গনের কোনো লাভ হবে না, তাঁদের যাওয়া অনৈতিক। এটা কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। এটা সরকারি টাকার অপচয় এবং এতে সত্যিকারের ক্রীড়া সংগঠকদের নিরুৎসাহিত করা হলো। কারণ সরকারি টাকায় গেমসে যাওয়ার অধিকার ক্রীড়াসংশ্লিষ্টদেরই আছে।’
সফরের খরচ বাবদ সরকার বিওএকে ৮৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকা দিচ্ছে। এর মধ্যে যাওয়া-আসার জন্য বরাদ্দ ৩৩ লাখ টাকা। বাকি টাকার একটা অংশ খরচ হবে খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের পোশাক, হাতখরচসহ আরও কিছু খাতে। বিদেশে দল যাওয়ার সময় বরাবরই যেমন বিশাল বহর সঙ্গী হয়, এবারও ব্যতিক্রম না হওয়ায় সরকারের প্রায় ২০ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।
বাংলাদেশ দল অংশ নিচ্ছে ৭টি খেলায়—অ্যাথলেটিকস (৪ জন অ্যাথলেট, ২ জন কোচ-ম্যানেজার), আর্চারি (৬ জন আর্চার, কোচ-ম্যানেজারসহ ৪ জন), বক্সিং (৩ জন বক্সার, ২ জন কোচ-ম্যানেজার), ভারোত্তোলন (৬ জন ভারোত্তোলক, ২ জন কোচ-ম্যানেজার), স্কোয়াশ (মোট ৩ জন), সাঁতার (৪ জন সাঁতারু, ২ জন কোচ-ম্যানেজার), শ্যুটিং (১২ জন শ্যুটার, ২ জন কোচ-ম্যানেজার)।
৩-১৩ অক্টোবর দিল্লিতে হচ্ছে ১৯তম কমনওয়েলথ গেমস। আর এই গেমসে মেয়েদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেল শ্যুটিং ও আর্চারিতে পদকের আশা করা হচ্ছে। মেয়েদের ভারোত্তোলনেও ভালো কিছুর প্রত্যাশা আছে। বিওএর সহসভাপতি ও কোচিং কমিটির প্রধান মিজানুর রহমান (মানু) বলছেন, ‘শ্যুটিং-আর্চারি-ভারোত্তোলনে প্রত্যাশা অনুযায়ী ভালো করলে সফরটা সফল হবে। নইলে বদনাম হয়ে যাবে!’