Sunday, June 14, 2026

খারগ দ্বীপ দখলের জুয়া আমেরিকার জন্য বুমেরাং হবে by জানুস টি এইচ সিয়ান

পারস্য উপসাগরে সামরিক উত্তেজনা আবার বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে গত এপ্রিল থেকে চলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা পুরোপুরি ভেস্তে গেছে।

হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানি বাহিনীর হাতে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়। এর পরপরই উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। জবাবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের রাডার, যোগাযোগ ও বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। তেহরানও বসে থাকেনি। তারা জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা পাঁচটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে। এর মধ্যে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরও রয়েছে।

সহিংসতার এই চক্রের মধ্যেই বড় বাজি ধরেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী চরম শক্তি প্রয়োগ করে ইরানে হামলা চালিয়ে তারা ইরানের তেল ও গ্যাসশিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং খারগ দ্বীপ দখল করবে।

ট্রাম্প স্পষ্ট করেই এই পরিকল্পনার তুলনা করেছেন চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় চালানো অপারেশনের সঙ্গে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর ভেনেজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল ওয়াশিংটন।

খারগ দ্বীপ দখলের এই হুমকি ওয়াশিংটনের গভীর হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তাদের সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতা উদ্যোগ থমকে গেছে। কোনো পক্ষই নিজেদের দাবি থেকে সরতে রাজি নয়।

প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের নীতি হচ্ছে ‘বোমা নিয়ে আলোচনা’। হোয়াইট হাউস এখন এই নীতিতেই চলছে। তারা তেহরানকে সমঝোতায় বাধ্য করতে সর্বোচ্চ চাপ তৈরি করছে। অবশ্য পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কিছুটা ভিন্ন সুর ধরেন। তিনি জানান, ইরান হরমুজ প্রণালি খোলা রাখলে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা করবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে খারগ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা এখনো পেন্টাগনের টেবিলে রয়েছে।

ভূ-কৌশলগত দিক থেকে খারগ দ্বীপ পারস্য উপসাগরের সাধারণ কোনো দ্বীপ নয়। পারস্য উপসাগরের উত্তরে মাত্র ২২ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। এই সংকটের আগে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশই হতো এই দ্বীপ দিয়ে। প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল জাহাজে তোলা হতো।

ইরানের মূল ভূখণ্ডের উপকূলভাগ বেশ অগভীর। ফলে সেখানে বড় বড় তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি) ভিড়তে পারে না। খারগ দ্বীপের গভীর সমুদ্রবন্দরই বিশ্ববাজারে তেল পাঠানোর একমাত্র পথ। বিশেষ করে চীনের বাজারে তেল পাঠানোর জন্য এটি অপরিহার্য। এই দ্বীপটি না থাকলে তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। কারণ, সরকারের মোট খরচের প্রায় অর্ধেকই আসে এই তেলের রাজস্ব থেকে।

সামরিক হিসাব-নিকাশ


পেন্টাগন অবশ্য খারগ দ্বীপ দখলের জন্য মূল ভূখণ্ডে বড় কোনো অভিযানের কথা ভাবছে না। সেন্টকম সীমিত আকারে উভচর হামলা ও নিখুঁত বিমান হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে। এই অভিযান কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে। পারস্য উপসাগরে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে।

তবে খারগ দ্বীপ দখল করা যত সহজ, ধরে রাখা ততটাই কঠিন। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দ্বীপে অবস্থান নেওয়া মার্কিন সেনারা সরাসরি ইরানের হামলার আওতায় থাকবে।

খারগ দ্বীপটি ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২১ মাইল (৩৩ কিলোমিটার) দূরে। এত কম দূরত্বের কারণে দ্বীপে থাকা প্রতিটি মার্কিন সেনা, রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চরম ঝুঁকিতে থাকবে। ইরান সহজেই তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে কামান, রকেট, ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সেখানে হামলা চালাতে পারবে।

ভূপ্রকৃতিও মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি বড় বাধা। বুশেহরের পাহাড়ি উপকূলের কারণে ইরানি বাহিনী প্রাকৃতিক সুবিধা পাবে। ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো সময়মতো আগাম ক্ষেপণাস্ত্রের খোঁজ পাবে না।

রসদ সরবরাহ করাও হবে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো খারগ দ্বীপ থেকে ১০০ নটিক্যাল মাইলেরও বেশি দূরে। প্রতিটি রসদবাহী জাহাজকে সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক জলপথ পাড়ি দিতে হবে। ফলে সরবরাহ জাহাজের পাহারায় মার্কিন নৌবাহিনীকে বাড়তি যুদ্ধজাহাজ খাটাতে হবে। অর্থাৎ খারগ দ্বীপ কোনো কৌশলগত সম্পদ না হয়ে আমেরিকার জন্য এক বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল

এমন হুমকির মুখে ইরান হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। খারগ দ্বীপের সুরক্ষায় ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সাগরে আইআরজিসির ১১২তম জুলফিকার সারফেস কমব্যাট ব্রিগেড রয়েছে। তারা দ্রুতগামী ও ক্ষেপণাস্ত্রবাহী বোটের মাধ্যমে ঝাঁকে ঝাঁকে হামলা চালাতে পারদর্শী।

আকাশ প্রতিরক্ষায় তাদের রয়েছে রাশিয়ার তৈরি এস-৩০০ পিএমইউ-২ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এর পাশাপাশি ড্রোন ও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে টর-এম১ এবং প্যান্টসির-এস১ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও রয়েছে।

তবে ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা। তেহরানের কাছে প্রায় ২ থেকে ৬ হাজার উন্নত নৌ-মাইনের মজুত রয়েছে। যুদ্ধের মধ্যে এই মাইনগুলো পরিষ্কার করা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। বিশেষ করে যদি উপকূল থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে অনবরত হামলা চালানো হয়।

ইরানি কর্মকর্তারা খারগ দ্বীপের বাইরেও যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। প্রবীণ রাজনীতিক ও সংসদ সদস্য মানুচেহর মোত্তাকি সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন বাহিনী দ্বীপের কোনো অংশ দখল করলে ইরানি বিশেষ বাহিনী কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে কমান্ডো হামলা চালাবে। তাদের উদ্দেশ্য হবে মার্কিন সেনাদের জিম্মি করা। অর্থাৎ তেহরান এই আঞ্চলিক লড়াইকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা

খারগ দ্বীপে সামরিক সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়াবে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ১১ জুনের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এটি করোনা মহামারির পর সর্বনিম্ন। জ্বালানি বাজারে ইতিমধ্যে এর প্রভাব পড়েছে। ২০২৬ সালে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি গড়ে ৯৪ ডলার হতে পারে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি।

খারগ দ্বীপের লড়াইয়ে তেল সরবরাহ আরও বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে যেতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। আরেকটি বড় ধাক্কা আসবে সারের বাজারে। পারস্য উপসাগর থেকে সালফার ও অ্যামোনিয়া সরবরাহ বন্ধ হলে সারের দাম ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৩ শতাংশে নামবে।

তবে ওয়াশিংটনের হিসাবের মধ্যে একটি বড় গলদ রয়েছে। ট্রাম্প ভাবছেন খারগ দ্বীপ দখল করলে ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে এবং তারা আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত ১৩ এপ্রিল থেকে চলা মার্কিন কঠোর নৌ-অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি এমনিতেই প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। খারগ দ্বীপের কাছে ২০টিরও বেশি তেলবাহী জাহাজ আটকে আছে। তারা এশিয়ায় তেল পাঠাতে পারছে না। অর্থনৈতিকভাবে ইরান এখন তেল রাজস্ব ছাড়াই জরুরি অবস্থার মধ্যে চলছে।

তাই খারগ দ্বীপ দখল করলেও ইরানের ওপর নতুন করে কোনো অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে না। উল্টো এটি ইরানি জাতীয়তাবাদকে উসকে দেবে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যপন্থী সরকার এবং আইআরজিসির কট্টরপন্থী নেতৃত্ব—উভয় পক্ষই স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা আত্মসমর্পণের চেয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই বেশি পছন্দ করে।

ভেনেজুয়েলার মতো দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমাধান ওয়াশিংটন এখানে পাবে না। উল্টো আমেরিকা এক দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যার কোনো শেষ নেই। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করবে, জ্বালানি বাজার ধ্বংস করবে এবং বিশ্বকে মন্দার দিকে ঠেলে দেবে। সংক্ষেপে বলা যায়, খারগ দ্বীপ কোনো ভেনেজুয়েলা নয়।

* জানুস টি এইচ সিয়ান, ইন্দোনেশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপ
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপ। ছবি : রয়টার্স

রাশিয়ায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযান, গণহারে মুফতি-আলেমদের গ্রেপ্তার

মুসলিমদের বিরুদ্ধে নতুন এক অভিযান শুরু করেছে রাশিয়া। এশিয়া নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে বিশিষ্ট আলেম ও মুসলিম ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের গ্রেপ্তার ও আটক করার হিড়িক পড়েছে।

চলতি বছরের মে মাস থেকে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মুফতি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিকে আটক ও গ্রেপ্তারের খবর আসতে শুরু করে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব গ্রেপ্তারের খবর দেশটির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে সীমিত আকারে প্রচার হলেও অনলাইনে এ নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা সামনে এসেছে। রাশিয়ার উগ্র-ডানপন্থি সংগঠন ও চ্যানেলগুলোর কাছে এসব গ্রেপ্তার ও আটকের ঘটনা ক্রেমলিন-সমর্থিত স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম) ভেঙে দেয়ার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত অভিযানের সূচনা।

বিবিসি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ছিলেন কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিল। রুশ সংবাদসংস্থা তাস জানায়, গত ১৪ মে শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে ‘পুলিশের সঙ্গে অবাধ্যতা’র অভিযোগে তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ফোরতাঙ্গার তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার এফএসবি সংস্থা ১২ মে ধর্মযাজক ও বারর্দভিলের ডেপুটি আখমাদ তাঙ্গিয়েভকেও আটক করে।

দেশটির জনপ্রিয় সংবাদ সাইট লেন্তা ডট রু জানায়, মর্দোভিয়া প্রজাতন্ত্রের মুফতি রয়াল আসেনভকে গত ১৯ মে ‘ঘুষ চাওয়ার’ সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরবর্তীতে গত ২৩ মে ব্যবসাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দৈনিক কোমেরসান্ত বিচার বিভাগের প্রেস অফিস এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তকারীদের উদ্ধৃতি দিয়ে আটক ব্যক্তিদের একটি দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করে।

কোমেরসান্তের তথ্য অনুযায়ী, ‘মুসলিম কমিউনিটি অব দ্য নর্থওয়েস্ট’ নামের কেন্দ্রীয় ধর্মীয় সংগঠনের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খেনিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে তার এক আত্মীয় এবং রাশিয়ার সারাতভ অঞ্চলের ডেপুটি মুফতি আল-খেইখ নিদাল আওয়াদুল্লাহ আহমদের সঙ্গে আটক করা হয়।
এ ছাড়া ওয়েবসাইটটি আরও চারজন আটক ব্যক্তির আদ্যক্ষর ও পদবী প্রকাশ করেছে।

গ্রেপ্তারের নেপথ্যে?

রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী গ্রেপ্তারকৃত আলেমদের বিরুদ্ধে ‘ঘুষ’ থেকে ‘অবাধ্যতা’ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগ এনেছে। তবে দেশটির কিছু ব্লগার ও গণমাধ্যম আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছে।

কোমেরসান্তের দাবি, ২৩ মে তারা সংশ্লিষ্ট মামলার নথি দেখেছে। নথির বরাতে কোমেরসান্ত জানিয়েছে, কয়েকজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

রাশিয়া ২০০৩ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রভাবশালী প্রচারক রুসলান অস্তাশকোও এই অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি আলেমদের নতুন ‘পঞ্চম স্তম্ভ’ হিসেবে দেখান, যারা ‘বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা’ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন।
তিনি হুমকির সুরে বলেন, প্রশ্নটি বাড়ছে- এটি কি একটি ধর্মীয় কাঠামো, নাকি বিদেশ থেকে

নিয়ন্ত্রিত একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক?

১৯ মে উগ্র-ডানপন্থি চ্যানেল ‘সন্স অব মনার্কি’ লিখেছে, সাহসী রুশ নিরাপত্তা বাহিনী অবশেষে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে, যারা রাশিয়ায় ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিভেদ উসকে দিচ্ছে। তারা আরও লিখেছে, আমি আশা করি এটি কেবল শুরু!
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার মুসলিম আলেমদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত একটি মামলা সামনে আসে গত ২৯ মে। এটি ছিল ডিইউএম চেয়ারম্যান মুফতি রাভিল গনুতদিনের প্রথম ডেপুটি দামির মুখেতদিনভের বিরুদ্ধে। তিনি ‘ঘৃণা বা শত্রুতা উসকে দেয়ার’ অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ব্যবসায়িক দৈনিক আরবিসি।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে দমন অভিযানের ইঙ্গিত

গত মে মাসের শুরুতে রাভিল গনুতদিন আবাসিক ভবনে ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতবদ্ধ নামাজ কার্যত নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত একটি বিলের প্রতিবাদে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে আবেদন জানান।

এই বিলটি ২০২৪ সালে উত্থাপিত হয় এবং শাসক দলের বিশিষ্ট রাজনীতিক পিওতর তলস্তয়, জ্যেষ্ঠ এমপি সের্গেই মিরোনভ এবং এলডিপিআর নেতা লিওনিদ স্লুতস্কির সমর্থন পায়।
নির্বাসিত পত্রিকা নোভায়া গাজেতা গত ১১ মার্চ পূর্বাভাস দিয়েছিল, এর মানে এবার বিলটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ।

এরপর ৬ মে পুতিনের কাছে খোলা চিঠিতে গনুতদিন বলেন, এর মানে হলো কেবল নিবন্ধিত বাসিন্দারাই অ্যাপার্টমেন্টে নামাজ পড়তে পারবেন। এমনকি আপনি যদি আত্মীয় বা বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে একসঙ্গে নামাজ পড়েন, তবুও আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।
নির্বাসিত গণমাধ্যম নোভায়া গাজেতা ইউরোপা বলেছে, বিলটিতে ‘অভিবাসীবিরোধী প্রবণতা’ রয়েছে এবং ২০২৩ সালে দেশজুড়ে মুসলিম উপাসনালয়ে চালানো একাধিক ‘অভিযান’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

রাশিয়ায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিম বাস করে, যা ইউরোপের মধ্যে বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা এবং তাদের অধিকাংশই দেশটির উত্তর ককেশাস ও ভলগা অঞ্চলে বাস। 

রাশিয়ায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযান, গণহারে মুফতি-আলেমদের গ্রেপ্তার

বাজেটে অবহেলিত কৃষি by ফরিদা-আখতার

বিএনপি সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে ঘোষণা করেছে। বিশাল বাজেট। অনেক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি কৃষি খাতের বরাদ্দ কত হয়েছে দেখার জন্য বাজেটে খুঁজেছি। বিস্ময়কর বিষয় হলো কৃষি খাতে বরাদ্দের বিষয়টি পত্রপত্রিকায় এত গৌণভাবে এসেছে যে, টর্চ দিয়ে খুঁজেও বিশেষ কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। হ্যাঁ, বাজেট বরাদ্দ অবশ্যই হয়েছে। কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, যা দেশের জিডিপির শূন্য ০.৬৩ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতের জন্য ৩৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৬১ শতাংশ) বরাদ্দ ছিল। মোট ৬ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। এই বৃদ্ধি খুবই সামান্য। কৃষির এই বরাদ্দ মোট বাজেটের ৩.২ শতাংশ, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় সর্বনিম্ন (জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বাদ দিয়ে)।

কৃষির নামে বরাদ্দকৃত এই বাজেটে আরো দুটি ভাগীদার আছে। ভাগীদাররা হচ্ছে খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। অথচ কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তিনটি ভিন্ন ও স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়, কিন্তু এবারে সরকার কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গুচ্ছ করে একসঙ্গে করেছে। একজন পূর্ণ মন্ত্রী আছেন, যিনি কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় দেখছেন, আর একজন প্রতিমন্ত্রী দেখছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সরকারের বাজেট ঘোষণায় এখনো পরিষ্কার নয়, কৃষি আলাদাভাবে কত বরাদ্দ পাচ্ছে; তেমনি খাদ্য আলাদাভাবে এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ কত পাচ্ছে, তা আমরা এখনো জানি না। তাদের কাজ আলাদা, অতএব তাদের বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় এই বরাদ্দ সব সময়ের মতো এবারও অপ্রতুল।

সরকার খাদ্য মজুত ও সংগ্রহের প্রতি নজর দেয় অনেক বেশি। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনে এবং সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ৪১ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীতকরণের পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাদ্যশস্য সংগ্রহের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টন।

এখানে তিনটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটা হচ্ছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজ খাদ্যফসলসহ সব ধরনের কৃষি ফসলের উৎপাদন বাড়ানো। বড় দাগে এই মন্ত্রণালয়ের মূল দায়িত্ব হচ্ছে খাদ্যফসল বিশেষ করে ধান উৎপাদন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে তিনটি মৌসুমে বছরে প্রায় ৩.৯ কোটি মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী দেশে বার্ষিক ধানের চাহিদা হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি থেকে তিন কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন। বন্যা, খরা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদনে ঘাটতি হলে খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল রাখে। তাদের লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ খাদ্যফসল বিশেষ করে ধান উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য কৃষকদের সহায়তা করা এবং সেটা করা হয় বিদ্যমান কৃষিনীতি, যা আসলে কৃষির নীতি নয়, বরং ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফুড প্রোডাকশন’। এই কৃষি মূলত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, গভীর নলকূপ দিয়ে সেচ এবং ধান লাগানো থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত যন্ত্রের ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। এই বিকৃত কৃষিব্যবস্থার ত্রুটি এবারের বোরো মৌসুমে দেখা গেছে। ইরানে মার্কিন-ইসরাইলের অবৈধ ও আগ্রাসী যুদ্ধের কারণে সারা দেশে জ্বালানি সংকটের সময়ে বোরো ফসলে ডিজেল সংকটের কারণে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি; এবং হাওরে অসময়ে বৃষ্টিতে প্রায় পাকা ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এই সময় দ্রুত ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় নি, এমনকি এতদিন কৃষকদের মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া সেই কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনও কাদায় নামতে পারেনি। হাওরের একটি মাত্র কৃষি ফসল বোরো ধান, কৃষকের চোখের সামনে পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেল। বলাবাহুল্য, হাওরে এখন যে ধান উৎপাদিত হয়, তা অধিকাংশ উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের। বর্তমানে ধানের তিনটি মৌসুমের মধ্যে বোরো মৌসুম থেকে আসে ৫৫ শতাংশ এবং হাওরে মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয়।

এ বছর হাওরে বোরো ধানের ক্ষতির পরিমাণ পত্রপত্রিকা থেকে জানা গেছে দুই লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন এবং প্রায় দুই লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী কৃষিতে কৃষকের বিপর্যয়সহ টিকে থাকার নানা চ্যালেঞ্জের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কোনো প্রণোদনা দিলেন না। আফসোস।

কৃষিতে বরাদ্দ মানে সার-কীটনাশকে ভর্তুকি দেওয়া, অর্থাৎ বিষ কোম্পানি ও সার কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতের সম্প্রসারণ ও উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে সার ও কীটনাশকের ওপর বিদ্যমান সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট ও কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করছে সরকার। কিন্তু বুঝতে হবে এই সুবিধা কৃষকের জন্য আসছে না, আসছে সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীদের জন্য। যেখানে সার ও বিষনির্ভর কৃষিব্যবস্থা থেকে সরে আসা কৃষিনীতির প্রধান মেরুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল, সরকার তার উল্টোটা সবসময় করে আসছে। সার-কীটনাশকের খরচ আছে অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু অন্যান্য খরচও তো আছে। যেমন ধান লাগানো ও ধান কাটার জন্য কৃষিশ্রমিকের খরচ, সেচের পানির খরচ, উৎপাদন-পরবর্তী প্রক্রিয়ার খরচ প্রভৃতি। কিন্তু সেসব খরচের দায় সরকার নিচ্ছে না। তার চেয়েও জরুরি বিষয় হচ্ছে, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, যা বেশিরভাগ সময় উৎপাদন খরচের চেয়ে কম থাকে এবং তাই কৃষকের দেনা কমে না। খাদ্য আমদানিসহ সরকারের বাণিজ্যনীতি সবসময়ই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সরাসরি কৃষকের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। অথচ বাজেটে এ বিষয়ে কোনো কথা নেই। ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ মওকুফ করা এবং কৃষক কার্ডের সুবিধা সব কৃষক পাবে, তার কোনো গ্যারান্টি কি আছে?

তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সমস্যাসহ কৃষির উৎপাদনশীলতা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেজন্য সার-কীটনাশকে ভর্তুকির চেয়েও বেশি দরকার কৃষিনীতিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো। এই কৃষিব্যবস্থা ১৮ কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্য জোগান দিতে পারছে না। খাদ্যে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারে ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটছে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেই স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উন্নত হবে না, যদি খাদ্য উৎপাদন নিরাপদ করা না হয়।

জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ক্রমেই কমে আসছে, এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০.৯ শতাংশে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল, যেখানে কৃষির অবদান ছিল ৬২ শতাংশ। কিন্তু দেশ ক্রমে শিল্পায়ন (৩৪ শতাংশ) এবং সেবা খাতের (৫১ শতাংশ) দিকে এগোচ্ছে। শিল্পায়ন বলতে তৈরি পোশাকশিল্পই মূলত বোঝায়, যা আমাদের অর্থনীতিতে স্বল্প মেয়াদে কিছু অর্থের জোগান দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীল খাত তৈরি করছে না। কৃষির প্রতি সরকারের মনোযোগের অভাবে জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে যাওয়া দ্রুত গতিতে ঘটছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এক দশকে কমেছে ১৭ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০ বছরে পাঁচ শতাংশ অবদান কমে গেছে। কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা। কৃষি থেকে উৎখাত হলে তাদের শহরে চলে আসতে হয়। তাদের মেয়েরা যায় গার্মেন্ট কারখানায় আর ছেলেরা যায় প্রবাসে শ্রমিক হয়ে। এই সুযোগও ক্রমে সীমিত হয়ে আসছে।

কৃষি বরাদ্দের মধ্যে আর এক ভাগীদার হচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। এ খাতের মাধ্যমে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের মতো প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ করা হয়। কৃষির মতোই এ খাতের সঙ্গে যুক্ত আছে বিশাল গোষ্ঠী; যেমন জেলে/মৎস্যজীবী, গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনকারী গরিব নারী এবং লাখ লাখ ছোট খামারি। তারা কী ধরনের বাজেট সুবিধা পাবে, তার কোনো উল্লেখ নেই।

জিডিপিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের অবদান একত্রে প্রায় ৪.৩ শতাংশ। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শ্রমজীবী মানুষের ২৫ শতাংশ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। মৎস্য খাতে প্রায় ১৮ লাখ নিবন্ধিত মৎস্যজীবী আছে। প্রাণিসম্পদে যুক্ত আছে প্রায় ১৪ লাখ খামার, যেখানে প্রায় এক কোটি মহিলা গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনে নিয়োজিত আছে। এক বিশাল জনগোষ্ঠী এ খাতে যুক্ত হয়েও বাজেটের সময় উপেক্ষিত থাকছে।

এবার বাজেটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ভাগে কত বরাদ্দ হবে, তা জানা যায়নি, তবে গত বাজেটের ৩৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকার মধ্যে কৃষিফসল খাতে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা (৬৮ শতাংশ), আর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ছিল মাত্র ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা, মাত্র ৮.৫ শতাংশ ।

সামগ্রিক বাজেটে কৃষিতে অবহেলা বিপজ্জনক। তার মধ্যে আরো বিশেষভাবে অবহেলিত হচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। অথচ দুটো খাত মিলেই শুধু খাদ্যের জোগান দিচ্ছে না, পুষ্টি নিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা ধারণ করে।

কৃষির অবহেলা জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা অনিশ্চিত করে তুলবে—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই অবহেলা দেশের অর্থনীতির জন্যে মঙ্গল বয়ে আনবে না।

লেখক : অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

বাজেটে অবহেলিত কৃষি

ইরানের ইউরেনিয়াম দখলে অভিযান থামিয়েছিলেন ট্রাম্প, কারণ কী

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সদর দপ্তর। মে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে অত্যন্ত গোপনে আর অনেকটা আকস্মিকভাবে সেখানে সফর করেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ জেনারেল। তাঁর এ সফরের উদ্দেশ্য, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জোরপূর্বক দখল করতে দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর স্থল অভিযানের পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে অবহিত হওয়া।

বিষয়টির সঙ্গে জানাশোনা রয়েছে এমন দুটি সূত্র যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ছিলেন বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে। সেখানে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ছিল।

কিন্তু গত ১৯ মে ফ্লোরিডার টাম্পায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক এতটাই জরুরি ও সংবেদনশীল ছিল যে জেনারেল কেইনকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে দ্রুত সেখানে আসতে হয়েছিল বলে জানান সূত্র দুটি। সূত্র আরও জানিয়েছে, উচ্চপর্যায়ের ও জরুরি এ ব্রিফিং এটাই স্পষ্ট করে যে মার্কিন প্রশাসন ইরানে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্থল অভিযান অনুমোদন দেওয়ার কতটা কাছাকাছি চলে এসেছিল।

ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়ে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ওই দুই সূত্রের একজন সিএনএনকে জানিয়েছেন, ফ্লোরিডার বৈঠকের পরপর জেনারেল কেইন ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিকল্পগুলো সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবহিত করেছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিকল্পনাটি আটকে দেন।

এ বিষয়ে সূত্রগুলো জানিয়েছে, এমন অভিযান চালানো হলে ইরান কঠোর প্রতিশোধ নিতে পারে বলে ট্রাম্প সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। এই পরিস্থিতি চলমান যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। সেই সঙ্গে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলতে পারে। সম্ভাব্য এসব পরিস্থিতি ও সতর্কবার্তা বিবেচনায় নিয়ে ট্রাম্প অভিযানের পথ থেকে সরে আসেন।

বিষয়টির সঙ্গে জানাশোনা রয়েছে এমন সূত্র জানায়, ইরানে স্থল অভিযান চালালে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা হতাহত হতে পারেন, এমন শঙ্কাও বিবেচনায় নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

সম্ভাব্য এ স্থল অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ট্রাম্প বারবার বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তির দোরগোড়ায় রয়েছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করছে। সর্বশেষ ট্রাম্প বলেছেন, আজ (১৪ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চুক্তি সই হতে পারে।

স্থল অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়ে জানেন এমন একটি সূত্র জানায়, গত মাসে ট্রাম্প যে পরিকল্পনাটিতে সায় দেননি, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘অনেক ঝুঁকি’ রয়েছে।

যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে, তাহলে তেহরানের পক্ষ থেকেও অর্থনৈতিক ‘পারমাণবিক বিকল্পের’ পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিষয়টির সঙ্গে জানাশোনা রয়েছে এমন তিনটি সূত্র সিএনএনকে এ কথা জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, ইরানের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের হুতিদের দিয়ে বাব–এল–মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। হরমুজ প্রণালির মতো এটাও বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। তবে হরমুজের তুলনায় বেশ সংকীর্ণ। ইরানের মাসব্যাপী হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার সময়ে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের পথ হিসেবে এটি ভূমিকা রেখেছে।

১০টি বোমা বানাতে পারবে ইরান

ইরান নিয়ে ট্রাম্পের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলোর একটি হলো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ‘সুরক্ষা নিশ্চিত’ করা। আলোচনা কিংবা সামরিক, কোনো উপায়েই এ লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি ওয়াশিংটন।

ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো জোরপূর্বক ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল করতে পারে। তবে তিনি এমন কোনো অভিযান নিয়ে এগোতে ইচ্ছুক নন, যা বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনার প্রাণহানির কারণ হতে পারে। মার্কিন নাগরিকেরা এ অভিযান সমর্থন করবেন কি না, এ নিয়েও সন্দিহান তিনি।

ফক্স নিউজে গত বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেখানে ইরানের প্রধান তেলকেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপের’ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন তিনি। সম্ভাব্য এই অভিযানেও ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আসলেই জানি না, আমেরিকার সেই তেজ আছে কি না।’

যদিও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য সম্ভাব্য অভিযানের বিষয়টি পুরোপুরি খারিজ করে দেননি ট্রাম্প। দাবি করা হয়ে থাকে, ইরান ৯৭০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম অস্ত্রের প্রায় সমপর্যায়ে সমৃদ্ধ করেছে।

তবে ইরান এমন একটি চুক্তি করা নিয়ে গড়িমসি করছে, যেটায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য ছাড় দেওয়ার কথা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে স্বেচ্ছায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করার বিষয়টিও রয়েছে। সিএনএনকে সূত্রটি জানিয়েছে, এসব মজুত ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায়, প্রধানত ইস্পাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদো পারমাণবিক কেন্দ্রে ছড়িয়ে রয়েছে এবং সুড়ঙ্গের গভীরে পুঁতে রাখা হয়েছে।

পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক অভিযানের সময় ইরানের লুকানো ইউরেনিয়ামের পুরোটা মার্কিন বাহিনী খুঁজে পাবে কি না, যাচাই করতে পারবে কি না, প্রতিকূল পরিবেশে সেসব পুরোপুরি নিরাপদে অপসারণ করতে পারবে কি না—এসব নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। সিএনএন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের এসব ইউরেনিয়াম গ্যাসীয় অবস্থায় আছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২৫ সালের জুনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সর্বশেষ পরিদর্শনের সময় সেটা জানা গেছে।

নিজেদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান আইএইএর পরিদর্শন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। হামলায় এসব কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক উপাদানগুলো ধ্বংস করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে সিএনএন।

আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এখনকার ইউরেনিয়ামের মজুত দিয়ে ১০টি বোমা বানিয়ে ফেলতে পারবে।

তবে সূত্র দুটি আরও জানিয়েছে, ইরানের সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুত কোথাও আছে সেটা জানার বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দারা আত্মবিশ্বাসী। আর এ আত্মবিশ্বাসের কারণ, আকাশপথে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি।

ইরানের জবাবের ঝুঁকি

মার্কিন বাহিনীর স্থল অভিযানের জবাবে ইরান বাব–এল–মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছেন গোয়েন্দারা। এতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি রয়েছে। এর জেরে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে পারে।

মার্কিন গোয়েন্দাদের সাম্প্রতিক সতর্কতার বিষয়ে জানেন এমন একটি সূত্র সিএনএনকে বলে, এটা লক্ষ করতে হবে, হুতিরা মার্কিন কিংবা ইউরোপীয় কোনো জাহাজে এখনো বড় ধরনের হামলা চালায়নি। তবে হুতিরা বলেছে, তারা ইসরায়েলের পতাকাবাহী বা ইসরায়েলি মালিকানাধীন যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করবে।

এ বিষয়ে সূত্রটি জানিয়েছে, ইসরায়েলি জাহাজের বাইরে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর পরিধি বাড়ানো হলে, তা একটি গুরুতর উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তাদের মতে, ইরানিরা এখন পর্যন্ত হুতিদের এমন পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে রাজি করানো থেকে বিরত থেকেছে। কারণ, ইরান ভালোভাবে জানে, এটা চলমান শান্তি আলোচনাকে ব্যাহত করতে পারে।

যদি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো না যায় এবং ট্রাম্প সতর্ক থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন ইরানও এই কৌশলগত ‘কার্ডটি’ খেলতে পারে।

জেনারেল কেইন ও অন্য সামরিক কমান্ডাররা এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘায়িত সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা, জটিলতা ও সম্ভাব্য মার্কিন হতাহতের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি ও পেন্টাগনের অনেকে সতর্ক করেছিলেন, এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেটা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত ও সামরিক প্রস্তুতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের ইস্পাহান পারমাণবিক স্থাপনার ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের ওপর নতুন করে ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের ইস্পাহান পারমাণবিক স্থাপনার ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের ওপর নতুন করে ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

ফুরিয়ে যাচ্ছে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক, এখন উপায় কী by মুনীরউদ্দিন আহমদ

গত ১৩ অক্টোবর ২০২৫ যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা ‘শার্প গ্লোবাল রেইজ ইন অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট ইনফেকশন ইন হসপিটালস, ডব্লিউএইচও ফাইন্ডস’ (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক অনুসন্ধানে দেখতে পেয়েছে, বিশ্বব্যাপী হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট সংক্রামক রোগ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে) শীর্ষক এক উদ্বেগজনক সংবাদ প্রচার করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী যেসব সাধারণ সংক্রামক রোগ প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকে সহজে সারানো যেত, তা এখন আর সারানো যাচ্ছে না। চিকিৎসকেরা আতঙ্কের সঙ্গে বলছেন, সামনের দিনগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধির ফলে সাধারণ সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।

২০২৩ সালের এক জরিপে বলা হয়, পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ছয়টির মধ্যে একটি সংক্রামক রোগ অ্যান্টিবায়োটিকে সারানো যাচ্ছে না। রক্ত, অন্ত্র, মূত্রনালি এবং যৌন সংক্রমণের মতো সাধারণ সংক্রামক রোগে ৪০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হলো, গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা দেখাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৫০ সাল নাগাদ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ৭০ শতাংশে পৌঁছাবে।

২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একইভাবে উদ্বেগজনক সংবাদ প্রচার করেছিল। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ রানিং আউট অব অ্যান্টিবায়োটিকস’ শিরোনামের খবরে বলা হয়, অতি দ্রুত পৃথিবী থেকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক নিঃশেষ হচ্ছে। ‘অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্টস ইন ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট পাইপলাইন ইনক্লুডিং টিউবারকিউলোসিস’ শীর্ষক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয়, বাজারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আসা স্থবির হয়ে গেছে।

বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রচলিত আছে, তার বেশির ভাগই এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যে হারে জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে, সে হারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হচ্ছে না। যে গতিতে পৃথিবী থেকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক নিঃশেষ হচ্ছে, তাতে অচিরেই চিকিৎসকদের সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে।

রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু সংক্রমণের ভয়ে অতি ছোট সার্জারি করতেও চিকিৎসকেরা সাহস পাবেন না। বর্তমানে বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে, তা পুরোনো বা প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের সংক্ষিপ্ত রাসায়নিক রূপান্তরমাত্র। এসব অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে না বা পারবে না।

বর্তমান বিশ্বে কয়েকটি জীবাণু ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। এসব জীবাণুর মধ্যে রয়েছে ই. কোলাই ও মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস। মূত্রনালি সংক্রমণ ও যক্ষ্মার জন্য এই দুটো জীবাণু দায়ী। মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিউবারকিউলোসিসের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১২ প্রজাতির জীবাণু শনাক্ত করেছে। এর কয়েকটি অতি সাধারণ নিউমোনিয়া ও মূত্রনালি সংক্রমণের জন্য দায়ী। এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে ইদানীং কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বিশ্বব্যাপী এক মহাসংকট সৃষ্টি করেছে, যা আধুনিক ওষুধ ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক জানান, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ঠেকানোর জন্য নতুন নতুন কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারে পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। নয়তো নতুন নতুন জীবাণু সংক্রমণ থেকে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৫১টি পরীক্ষাধীন অ্যান্টিবায়োটিক চিহ্নিত করেছে, যা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে কার্যকর হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র আটটি সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস, গ্রাম নেগেটিভ প্যাথেজেন ক্লেবসিলা ও ই. কোলাই চিকিৎসায় কার্যকর কোনো অপশন চিকিৎসকদের হাতে নেই।

এসব জীবাণু সংক্রমণ অনেক সময় হাসপাতাল ও নার্সিং হোমগুলোতে মানুষের মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। পাইপলাইনে খুব বেশি ওরাল বা মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক নেই। ওষুধ কোম্পানি ও গবেষকদের প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বিভাগের পরিচালক ড. সুজান হিল। তিনি বলেন, ‘এসব ভয়াবহ সংক্রামক রোগের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার মতো আমাদের তেমন কোনো প্রতিরক্ষাব্যূহ নেই।’

যক্ষ্মার গবেষণায় খুব বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে না। ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট যক্ষ্মার চিকিৎসায় গত ৭০ বছরে মাত্র দুটো ওষুধ বাজারে এসেছে। যক্ষ্মাকে সমূল বিনাশ করার জন্য এবং যক্ষ্মার চিকিৎসার ওষুধ উদ্ভাবনে অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট মোকাবিলায় নতুন ওষুধ বা চিকিৎসা এককভাবে কার্যকর হবে না। চিকিৎসার সঙ্গে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। তারপর রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিকের যুক্তিসংগত ব্যবহার। যুক্তিসংগত ব্যবহার শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, এটি পশু ও কৃষিক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বখ্যাত ল্যানসেট জার্নালে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স—নিড ফর গ্লোবাল সলিউশন’ শীর্ষক একটি বিশ্লেষণধর্মী দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ছাপা হয় কিছুদিন আগে। বিশ্বের ২৬ জন বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও ওষুধবিশেষজ্ঞ প্রবন্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স যে হারে বাড়ছে, তাতে হয়তো দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে মানুষ সংক্রামক রোগে অসহায় মৃত্যুবরণ করবে।

ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণজনিত মৃত্যুহার বিংশ শতাব্দীর পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সে সময় কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক ছিল না। কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে অতি সাধারণ অস্ত্রোপচার অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। প্রবন্ধটি প্রকাশের পর বিশ্বব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ঠেকানোর ব্যাপারে বিশ্বে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।

কিছুদিন আগে আমার হাতে একটি নামকরা হাসপাতালের জীবাণু কালচারের একটি রিপোর্ট আসে। এক বছরের এক শিশুর ঘায়ের পুঁজ কালচার করে ই. কোলাইয়ের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জীবাণু কালচারে দেখা গেছে, ই. কোলাইয়ের বিরুদ্ধে বহুল ব্যবহৃত সব অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট। যার মধ্যে রয়েছে অ্যামোক্সিসিলিন, সেপ্টাজিডিম, জেন্টামাইসিন, কোট্রাইমোক্সাজল, অ্যামিকাসিন, ন্যালিডিক্সিক অ্যাসিড, সেফুরক্সিম, সেফোটেক্সামিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, অ্যাজট্রিওনাম, নেটিলমাইসিন ও সেফট্রিয়াক্সন।

শুধু একটিমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর বলে পরীক্ষায় দেখা গেছে আর তা হলো মেরোপেনেম। আমি রিপোর্টটি দেখে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেছি। ১৩টি অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে শুধু একটি অ্যান্টিবায়োটিক ই. কোলাই জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর, বাকি সব রেজিস্ট্যান্ট। এই রিপোর্ট থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা বিপদে আছি, যে বিপদের ভয়াবহতা কল্পনাশক্তিরও বাইরে।

প্রথমত, বিশেষ কোনো এনজাইম অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেতে এমন কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে, যার কারণে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় জীবাণু এমন সব এনজাইম তৈরি করে, যা অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেতকে ভেঙে দিতে সক্ষম। এই গাঠনিক সংকেত ভেঙে গেলে অ্যান্টিবায়োটিক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, কোনো কোনো জীবাণু আছে, যেগুলো জন্মগতভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি সংবেদনশীল নয়। যেমন গ্রাম নেগেটিভ জীবাণুগুলোর কোষপ্রাচীর এমন জটিলভাবে তৈরি, যার প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে অসংখ্য অ্যান্টিবায়োটিক কোনোভাবেই কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে না।

চতুর্থত, জেনেটিক মিউটেশনের (জিনের রাসায়নিক পরিবর্তন) মাধ্যমে অনেক জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। কোটি কোটি জীবাণুর মধ্যে যেকোনো একটি যদি মিউটেশনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে যায়, সেই জীবাণু পরে বংশবৃদ্ধি ও বিস্তারের মাধ্যমে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এসব জীবাণু পরিবর্তিত জিনকে অন্য জীবাণুতে ট্রান্সফার করার মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। এসব জীবাণুতে আক্রান্ত রোগী তখন কোনো অ্যান্টিবায়োটিকে সংক্রমণমুক্ত হতে পারে না। ফলে রোগীর ভোগান্তি বাড়ে কিংবা কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করে।

জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিন বিভাগের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ড. পাউল আউওয়েটার প্রতিদিন এই সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রোগীরা দিন দিন আরও বেশি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। এ কারণে আমাদের ব্যাপকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে জীবাণু নিজেদের কাঠামো পরিবর্তন করছে। অন্যদিকে আমরা এসব জীবাণু মোকাবিলায় নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলছি।

সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া বা দুশ্চিন্তা নেই। তারা মনে করে, অতীতের মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা পর্যাপ্ত কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করে সংকট মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেবেন। ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের স্বার্থে এ ধরনের আবিষ্কারে এগিয়ে আসবে, যেমনটা অতীতে এসেছে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছি না অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে এই পটভূমি ভিন্ন।’

গ্রেফেন স্কুল অব মেডিসিনের জেনারেল ইন্টারনাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক স্পেনবার্গ বলেন, ‘আমাদের বুঝতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিকের এমন কতগুলো অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অন্যান্য ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আজ যে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা প্রদর্শন করছে, তা ১০-১৫ বছর পর অকার্যকর হতে পারে, অন্য ওষুধের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। তাই জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার অব্যাহত রাখতে হবে।

অর্থনৈতিক মন্দা আর কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে পরিস্থিতি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে ওষুধ কোম্পানিগুলো নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে আগ্রহ হারাচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা প্রায় সব অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার উৎপত্তি লক্ষ করছি। কিন্তু সে হারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আসছে না।

রেজিস্ট্যান্ট সংক্রামক ব্যাধির সংখ্যা আগামী পাঁচ বছরে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে। আমরা যে একদম অ্যান্টিবায়োটিক পাচ্ছি না, তা নয়; কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে আসছে। কিন্তু সেসব অ্যান্টিবায়োটিক গ্রাম নেগেটিভ সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। আমাদের অভাব হলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের।’

নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনীহার কারণও রয়েছে। একটি অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু সে তুলনায় মুনাফা করা যায় না। কোম্পানিগুলোর মতে, মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে অল্প কয়েক দিনের জন্য। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের ক্ষেত্রে যেমন রোগীকে আজীবন ওষুধ গ্রহণ করতে হয়, অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে তেমন হয় না। দ্বিতীয়ত, একটি অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হওয়ার পর অল্প কয়েক বছরে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেলে মুনাফা তো দূর, পুঁজিও ফেরত আসে না। উদ্ভাবনের পর অ্যান্টিবায়োটিকের অনুমোদন পেতেও অনেক ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনও পাওয়া যায় না। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে বিনিয়োগে আজকাল আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোগী, জয়ী হচ্ছে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এই অশনিসংকেত বারবার উচ্চারিত হলেও সবাই নির্বিকার। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কথা বাদই দিলাম, ওষুধ কোম্পানির মালিকেরা কি জানেন, কোনো না কোনো সময় তাঁরাও রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার শিকার হতে পারেন এবং কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে তাঁদেরও করুণ পরিণতি হতে পারে!

২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর ১১৪টি দেশে পরিচালিত গবেষণার ভিত্তিতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উদ্বেগের সঙ্গে বলা হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স থেকে সৃষ্ট মহাবিপর্যয় এখন ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ব্যাপার নয়।

এখনই বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সব বয়সের সব মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের শিকার হওয়ার প্রবল হুমকির মধ্যে রয়েছে। ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: গ্লোবাল রিপোর্ট অন সার্ভেইলেন্স’ (জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন: কড়া নজরদারির ওপর বিশ্ব প্রতিবেদন) শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী অসংখ্য জীবাণু বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে।

প্রতিবেদনে ডায়রিয়া, কলেরা, নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ, গনোরিয়া, সেপসিসের (রক্তের সংক্রমণ) মতো সাধারণ থেকে শুরু করে খুব মারাত্মক সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর ওপর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যা খুব উদ্বেগজনক। কারণ, প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনকারী বহু জীবাণুর বিরুদ্ধে শেষ অবলম্বন হিসেবে বিবেচিত খুব কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকগুলোও এখন কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। কার্বাপেনেমকে এত দিন একমাত্র নন-রেজিস্ট্যান্ট শতভাগ কার্যকর শেষ অবলম্বন অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে গণ্য করা হতো।

জীবন বিপন্নকারী অন্ত্রের জীবাণু ক্লেবসিলা নিউমোনি কার্বাপেনেমের কার্যকারিতাকে ব্যর্থ করে দিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্লেবসিলা নিউমোনি হাসপাতালে নিউমোনিয়া, সেপসিস, নবজাতকের সংক্রমণ এবং জরুরি বিভাগে চিকিৎসারত বিপন্ন রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু দেশে রেজিস্ট্যান্সের কারণে কার্বাপেনেম ক্লেবসিলা নিউমোনিতে আক্রান্ত ৫০ শতাংশ রোগীকে সুস্থ করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। মূত্রনালির সংক্রমণের জন্য দায়ী গ্রাম নেগেটিভ জীবাণু ই. কোলাইয়ের বিরুদ্ধে বহুল পরিচিত সিপ্রোগ্রুপের (ফ্লোরোকুনোলন) অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন আর কাজ করছে না।

১৯৮০ সালে বাজারে আসা সিপ্রোগ্রুপের ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের পরিমাণ ছিল শূন্য। এখন পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় সিপ্রোগ্রুপের ওষুধগুলোর কার্যকারিতা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। গনোরিয়া চিকিৎসায় শেষ অবলম্বন হিসেবে পরিচিত তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন গ্রুপের ওষুধগুলো এখন অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান, নরওয়ে, স্লোভেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের গনোরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সারা বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয়।

অ্যান্টিবায়োটিক-সম্পর্কিত সংকট নিয়ে মানুষ এখনো পুরোপুরি অবহিত ও সচেতন হচ্ছে না। যখন অবহিত হবে, তখন সম্ভবত অনেক দেরি হয়ে যাবে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট সংক্রামক রোগ মানবসভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে যাচ্ছে। এই বিপর্যয়ের মাত্রা অনিশ্চিত, ভেদাভেদ অনির্ধারিত, ধনী-গরিব, শিশু-বয়স্ক, সুস্থ, প্রতিরোধক্ষমতাবিহীন রোগী—কেউই এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে না। তখন বুক চাপড়ানো ছাড়া আমাদের আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।

* ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক, সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
- drmuniruddin@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-16%2Fk2k05ivp%2Fsuperbugkk.JPG?rect=62%2C0%2C674%2C449&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রচলিত আছে, তার বেশির ভাগই এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ছবি : রয়টার্স

এই সাত ধরনের খাবার খেলে ৭০ বছর বয়সেও থাকবেন তরুণ by রাফিয়া আলম

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, উদ্ভিজ্জ খাবার খেলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এমনকি দীর্ঘ আয়ু পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। কম বয়স থেকে তো বটেই, মধ্যবয়সে এসে এই অভ্যাস গড়ে তুললেও ফলাফল হয় দারুণ ইতিবাচক।

গত মার্চ মাসে ‘নেচার মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, উদ্ভিজ্জ খাবার খেলে বয়সজনিত জটিলতার হার কমে। গবেষণাটির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী সুস্থ ব্যক্তিদের। অর্থাৎ যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যা নেই। ৩৯–৬৯ বছর বয়সী ১ লাখ ৫ হাজার ব্যক্তিকে ৩০ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন গবেষকেরা। মধ্যবয়সে খাদ্যাভ্যাস কীভাবে তাঁদের পরবর্তী বছরগুলোর সুস্থতাকে প্রভাবিত করেছে, সেটিই দেখা হয়েছে সেই গবেষণায়।
সুস্থ থাকার সম্ভাবনা কতটা

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট স্কোর দেওয়া হয়েছে। এই স্কোর হার্ভার্ডের উদ্ভাবিত অল্টারনেটিভ হেলদি ইটিং ইনডেক্সের সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’ অনুসারে, যাঁদের এই স্কোর সবচেয়ে বেশি ছিল, ৭০ বছর বয়সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাঁদের সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে ৮৬ শতাংশ; ৭৫ বছর বয়সে সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে ২ দশমিক ২ গুণ। বুঝতেই পারছেন, এই অল্টারনেটিভ হেলদি ইটিং ইনডেক্সই দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
কী আছে হার্ভার্ডের এই খাদ্যভ্যাসে, যা দীর্ঘদিন তারুণ্য ধরে রাখতে সহায়ক? চলুন, জেনে নেওয়া যাক।

যে সাত ধরনের খাবার বেশি খেতে হবে

১. ফলমূল
২. সবজি
৩. গোটা শস্য, অর্থাৎ যা রিফাইনড (পরিশোধিত) নয়
৪. লেগিউম, অর্থাৎ শিম, মটর, ছোলা, চানা, মসুর ডাল প্রভৃতি
৫. নানান ধরনের বাদাম
৬. অসম্পৃক্ত স্নেহ পদার্থ, অর্থাৎ যা কক্ষতাপমাত্রায় তরল থাকে। যেমন স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ তেল, মাছের তেল
৭. লো ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার (পরিমিত পরিমাণে)

যে পাঁচ ধরনের খাবার কম খেতে হবে কিংবা বাদ দিতে হবে

১. চিনিমিশ্রিত পানীয়
২. লাল মাংস
৩. ট্রান্স ফ্যাট, যেমন ফাস্টফুড বা বেক করা খাবারে ব্যবহৃত আংশিক হাইড্রোজিনেটেড উদ্ভিজ্জ তেল, মার্জারিন
৪. বাড়তি লবণ, যেমন পাতে লবণ নেওয়া
৫. প্রক্রিয়াজাত মাংস

উদ্ভিজ্জ খাবারই সুস্থতার অন্যতম চাবিকাঠি। এ ধরনের খাবার খেলে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগ থেকে বাঁচবেন আপনি। সঙ্গে বুঝেশুনে যোগ করতে পারেন পরিমিত পরিমাণ প্রাণীজ খাদ্য। ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস হতে চলেছে এটাই। এমনটাই জানিয়েছেন হার্ভার্ডের এই গবেষক দল।

সূত্র: সিএনবিসি

দীর্ঘদিন তারুণ্য ধরে রাখা খাদ্যাভ্যাসের ওপরও নির্ভর করে
দীর্ঘদিন তারুণ্য ধরে রাখা খাদ্যাভ্যাসের ওপরও নির্ভর করে। ছবি: প্রথম আলো