Saturday, August 2, 2014

আনন্দমেলা! একটি কল্পকাহিনি! by আসিফ নজরুল

বেগম খালেদা জিয়ার আজও ঘুম এল না। তিনি ঘুমান অনেক রাত করে। যত রাত হয়, তাঁর মনে পড়ে পুরোনো দিনের শানশওকতের কথা। মনে পড়ে ছেলেদের কথা, তাঁদের সন্তানদের কথা। মক্কা থেকে ঘুরে আসার পর তাঁর মন আরও উতলা হয়ে উঠেছে তাঁদের জন্য।

দেশে ফেরার পর তাঁর দুর্ভাবনাও বেড়েছে। তিনি শুনছেন, অরফানেজের মামলায় তাঁকে জেলে দেওয়া হবে। জেলে যেতে তাঁর ভয় ছিল না কখনো। কিন্তু এবার তিনি কেন যেন বিচলিত বোধ করেন। তাঁর বয়স হয়েছে, দীর্ঘদিন তিনি একা টানছেন বিএনপির রাজনীতি। তিনি জানেন, তাঁর ছেলেরা দেশে ফিরতে পারবেন না। তিনি জেলে গেলে এই দলের হাল ধরার কেউ থাকবে না। নানা দুশ্চিন্তায় তাঁর মন অস্থির হয়ে ওঠে। সত্যি কি জেলে যেতে হবে তাঁকে, জিয়ার মাজার সরিয়ে ফেলা হবে, তাঁর দল ভেঙে টুকরা টুকরা করে ফেলা হবে?
শেখ হাসিনার ওপর তাঁর রাগ হয় খুব। তাঁকে ৪০ বছরের বাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে, সংসদ থেকে হটিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার লাল পাসপোর্ট সবুজ হয়ে গেছে। তাঁর প্রটোকল নেই, পরিবার নেই, অর্থ-প্রতিপত্তি-ক্ষমতা সবই প্রায় নিঃশেষিত। তবু কি শেখ হাসিনা থামবেন? থামবেন না।
তিনি উঠে গিয়ে জানালা খোলেন। বাইরে অঝোর বৃষ্টি। অনেক দূর পর্যন্ত ঢাকা শহরের আলোয় উদ্ভাসিত আকাশ। তাঁকে যদি কাশিমপুর জেলে পোরা হয়, এই আলো দেখবেন না তিনি বহু বছর। অথচ এবার নির্বাচনে জিতে এলে তিনিই শেখ হাসিনাকে কাশিমপুর পাঠাতেন। তাঁর আশপাশে ক্ষিপ্ত মানুষজন আছে। তারা আরও ভয়ংকর বিভিন্ন শাস্তি চিন্তা করে রেখেছিল। তিনি জানেন তা। তখন কেমন লাগত শেখ হাসিনার!
বৃষ্টির ঝাপটা এসে তাঁর মুখে লাগছে। তিনি হঠাৎ শেখ হাসিনা সেজে ভাবতে থাকেন তাঁর কথা। শেখ হাসিনাকে বগুড়ার মহিলা পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে, টিভিতে প্রচার হচ্ছে কত খারাপ আর কত ভয়ংকর ছিলেন তিনি, তাঁর সন্তানদের গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সাহায্য চাওয়া হয়েছে, তাঁর বাবার নাম মুছে ফেলা হয়েছে সবকিছু থেকে। কেমন লাগত শেখ হাসিনার তখন!
বেগম জিয়া আশ্চর্য হয়ে দেখেন, শেখ হাসিনার জন্য মায়া লাগছে তাঁর। তিনি ভাবতে শুরু করলেন, শেখ হাসিনাকে সত্যি সত্যি কী কী কষ্ট দিয়েছেন তিনি। ১৫ অগাস্ট, ২১ অগাস্ট, এমনকি গত বছর অক্টোবরের টেলিফোন সংলাপের কথা মনে পড়ল তাঁর। তিনি টের পান না, কখন যেন ভোরের বৃষ্টির হিমেল স্পর্শ এসে লাগল তার মনে। গভীর দুঃখবোধ ফিকে হয়ে গেল। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়ার আগে অদ্ভুত কিছু সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
২.
শেখ হাসিনা কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে গেলেন খবর শুনে। খালেদা জিয়া ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি আর কখনো ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করবেন না। শেখ হাসিনা আরও অবাক হলেন এটি ভেবে যে এই ঘোষণার কথা তাঁর গোয়েন্দারা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারল না!
শেখ হাসিনা জানেন, বেগম জিয়ার বক্তব্যে কিছু চালাকি আছে। পত্রিকায় পাঠানো বিবৃতিতে তিনি বলেননি যে ১৫ আগস্ট তাঁর জন্মদিন নয়। তিনি শুধু বলেছেন, ১৫ আগস্ট তাঁর জন্মদিন তিনি আর কখনো পালন করবেন না, বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদেরও তিনি একই নির্দেশ দিয়েছেন। রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করার স্বার্থে তিনি একতরফাভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দেশবাসীকে জানিয়েছেন।
বেগম জিয়ার এই ঘোষণা সব পত্রিকা বড় করে ছাপিয়েছে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষকে চেনেন। তিনি জানেন, দেশের মানুষও এটি খুব ভালোভাবে নেবে; এমনকি বিদেশিরাও।
শেখ হাসিনা তাঁর খুব বিশ্বস্ত কিছু লোকের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। তিনি বেগম জিয়ার ভরং দেখে অভ্যস্ত। এর জবাব দিতে হলে তাঁর কারও সঙ্গে বুদ্ধি করার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বেগম জিয়ার এই বক্তব্যে কোনো ভরং নেই। আছে চমক! এই স্ট্যান্টবাজি বেগম জিয়া শিখলেন কীভাবে!
পরামর্শকেরা তাঁকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করলেন। বেগম জিয়ার মিথ্যাচার এত দিনে প্রমাণিত হলো—এ ধরনের বিবৃতি দেওয়ার কথাও উঠল। কিন্তু তিনি কেন যেন আজ উত্তেজিত হলেন না। ১৫ আগস্ট শুধু তাঁর বাবার মৃত্যুবার্ষিকী নয়; এদিন তাঁর সন্তানসম ছোট ভাই রাসেল, তার অন্য ভাইদের এবং তার স্নেহময়ী মায়েরও মৃত্যুবার্ষিকী। ১৫ আগস্টে বেগম জিয়ার কেক কাটার উৎসবমুখর ছবি তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না। তাঁর খুব ভালো লাগল ভেবে যে এমন ছবি আর কোনো দিন দেখতে হবে না।
তিনি বেডরুমে এসে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। প্রায় প্রতিদিন এসব ছবি দেখে কাঁদেন তিনি। আজও কাঁদলেন। কিন্তু এই কান্নার ভেতর অদ্ভুত এক শান্তির স্পর্শ পেলেন তিনি। তাঁর হঠাৎ মনে হলো, বেগম জিয়া কি জানেন, কত বড় এক মানসিক যন্ত্রণার কিছুটা হলেও অবসান ঘটেছে আজ তার!
৩.
বেগম জিয়া ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করবেন না ঘোষণা দিয়েছিলেন কারও সঙ্গে পরামর্শ না করে। বিএনপির নেতারা অবাক হয়েছিলেন, কেউ কেউ তাঁর মুখের ওপর ভিন্নমতও জানিয়েছিলেন। আজ তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, এটি কতটা ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে কড়া কথা যিনি বলেছিলেন, সেই নেতার মুখে প্রশংসা শুনে তিনি অবশেষে হেসেই ফেললেন।
বেগম জিয়ার সিদ্ধান্তকে দেশের মানুষ অভিনন্দিত করেছে। সরকারও হঠাৎ নরম আচরণ করা শুরু করেছে। বিএনপির নেতাদের ওপর পুলিশ আর গোয়েন্দাদের নজরদারি কমে গেছে। বিএনপিকে এ বছরে প্রথমবারের মতো ঢাকা শহরে জনসভা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়েছেন, জিয়ার মাজার সরিয়ে ফেলার চিন্তাও বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও সরকারের আগ্রহ কমে গেছে।
২০ আগস্ট রাতে তিনি আরেকটি অচিন্তনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার ওপর নৃশংস গ্রেনেড হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি একটি বিবৃতি তৈরি করেন। বিবৃতিতে তিনি এমনকি এই ঘটনার তদন্তে তাঁর তৎকালীন সরকারের গাফিলতি স্বীকার করে এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁর এই বিবৃতি আবারও পত্রপত্রিকায় ঝড় তোলে। কিন্তু এবার কেন জানি বিএনপির কিছু নেতা খেপে যান। ২১ আগস্ট ঘটনায় বিএনপির অনেকের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। মামলা হয়েছে তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে। কাজেই তাঁর বিবৃতিতে ক্ষুব্ধ হন দলের অনেকে।
২১ আগস্ট থেকে তাঁর বাড়ির সামনে সাংবাদিকদের ভিড় জমে। তিনি কারও সঙ্গে দেখা করেন না। তাঁর শরীর খারাপ, সত্যি তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। একরাতে মাথা ঘুরে পড়ে যান তিনি। চোখ খুলে দেখেন হাসপাতালে। তাঁর ছোট ভাই আর তাঁর স্ত্রী বসে আছেন পাশে। ডাক্তার এসে হাসিমুখে জানালেন, চিন্তার কিছু নেই। এক সপ্তাহের মধ্যে বাসায় ফিরবেন তিনি।
বেগম জিয়ার কেবিনে টিভি চালু করা হলো। তিনি দেখলেন, তাঁর হাসপাতালের সামনে মানুষের ভিড়। বিভিন্ন জায়গায় দোয়া হচ্ছে তাঁর সুস্থতার জন্য। তিনি ছেলেদের সঙ্গে কথা বললেন ফোনে। পরদিন দুপুরে ঘুম ভাঙতেই আনন্দে তাঁর চোখে পানি চলে এল। তাঁর রুম আলো করে বসে আছে জোবাইদা আর জায়মা!
বেগম জিয়ার জন্য আরও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। বিকেল চারটায় তাঁর কেবিনের দরজা খুলে গেল। ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে ঢুকলেন শেখ হাসিনা। তার সারা মুখে দুষ্টু-মধুর হাসি। বেগম জিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি ভুরু নাচালেন: কী আপা, হাসপাতালে শুয়ে থাকলে হবে? আমার বিরুদ্ধে তাহলে আন্দোলন করবে কে!
বেগম জিয়া বেডে উঠে বসলেন। শেখ হাসিনা তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটে তাঁর চোখ প্রায় অন্ধ হয়ে গেল। তবু তিনি বিশ্বাস করতে পারলেন না এ দৃশ্য!
রাতে তিনি টিভিতে দেখলেন আরেক অকল্পনীয় দৃশ্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মিছিল হচ্ছে। সেই মিছিলে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে: জয় শেখ হাসিনা, জয় খালেদা জিয়া! খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ, শেখ হাসিনা জিন্দাবাদ!
৪.
দুই নেত্রী বৈঠকে বসেছেন। তৃতীয়বারের বৈঠকে বসলেন তাঁরা শুধু দুজন। সেই বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি ভুলে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। স্বৈরাচারী, জঙ্গি, সাম্প্রদায়িক ও যুদ্ধাপরাধী—সব গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। স্থানীয় সরকার, বিচার বিভাগ, বিভিন্ন কমিশন এবং সংসদকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করার কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য জাতীয় কনভেনশন ডেকেছেন। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এখন থেকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করেছেন। পর্যায়ক্রমে জনগণের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা আর স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন।
সবচেয়ে যা উল্লেখযোগ্য, তাঁরা অচিরে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আমূল সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। এই সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়নের জন্য নাগরিক সমাজের সঙ্গে একসঙ্গে আলোচনায় বসা হবে বলে জানিয়েছেন।
সারা দেশে সারা দিন আনন্দ মিছিল হলো, মিষ্টি বিতরণ হলো, মসজিদ-মন্দির-গির্জায় দুই নেত্রীর জন্য প্রার্থনা হলো। সারা রাতের টক শো মধুর হয়ে গেল। অপু উকিল আর নিলোফার রহমান মনি টক শোর মাঝখানে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরী ‘সমাধানটা কী’—এই প্রশ্ন করা ভুলে গেলেন প্রথমবারের মতো।
পরদিন ভোরে সবচেয়ে সুন্দর এক সূর্যোদয় হলো বাংলাদেশের বুকে!
৫.
কথা ছিল বিএনপির আন্দোলনের হুমকি নিয়ে লিখব আমি। তা-ই হয়তো লিখতাম! কিন্তু সংঘাত, সন্ত্রাস, ক্রসফায়ার ও হানাহানি নিয়ে ক্লান্তিকর লেখা সত্যিই লিখতে ইচ্ছে করে না আর। লিখতে ইচ্ছে করে আনন্দ, আশাবাদ আর ভালোবাসার গল্প।
মাননীয় দুই নেত্রী, এমন একটি ভালোবাসাময় ভুবন সত্যি তৈরি করতে পারেন আপনারা। কখনো ইচ্ছে হয় না আপনাদের তা?
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

উপনিবেশকে আমরা ছাড়িনি by কুলদীপ নায়ার

মাদ্রাজ হাইকোর্টের একজন বিচারককে ধুতি পরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ফলে বেশ শোরগোল তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা এ ঘটনাকে ‘তামিল’ সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এআইএডিএমকে-প্রধান দ্রুত একটি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই প্রথা বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী তামিলনাড়ু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (টিএনসিএ) বিরুদ্ধেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই সংস্থার ক্লাবেই বিচারপতি ড. হরিপরানথমন ও আরও দুই অতিথিকে পোশাক-বিধান মান্য না করায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
একবার ভাবুন তো, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা ক্লাবে গিয়েছেন আর পোশাকের কারণে তাঁকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। প্রখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজও লাহোরের পাঞ্জাব ক্লাবে ও নজর-উল-ইসলামও ঢাকা ক্লাবে যদি একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতেন, তাহলে কী হতো? এসব ক্ষেত্রে জনরোষের মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠত।
সাদা শাসকেরা তাঁদের দেশের প্রধান ক্লাবগুলোকে অভিজাত মানুষের আড্ডাখানা হিসেবেই দেখতেন। সেখানে অসাদাদের ঢুকতে না দেওয়া বর্ণবৈষম্য টিকিয়ে রাখারই একটি কৌশল ছিল। অভিজাতদের ক্লাবের মুখে একটি বিলবোর্ডে লেখা থাকত: ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’। শুনতে খারাপ লাগলেও সাদা শাসকেরা কালো ভারতীয়দের অবমাননা করে সুখ পেতেন, তাঁদের অসম্মানের অন্যান্য তরিকার সঙ্গে এটাও তাঁরা একইভাবে করতেন।
সমাজের উঁচুতলার মানুষ যাঁরা সাদাদের সঙ্গে তাল দিয়ে চলতেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এসব ক্লাবের প্রবেশাধিকার অবাধ ছিল। সে কারণে ইউরোপীয় সাদাদের বদলে দেশীয় সাদারাই এখন সে স্থান দখল করেছেন, সেখানে অন্য তরিকার মানুষের প্রবেশ নিষেধ। ক্লাব কর্তৃপক্ষ সেখানে ঢোকার জন্য বিশেষ পোশাক পরিধানের বিধান করেছে, সেটা নিঃসন্দেহে ইউরোপীয় ঘরানার। ক্লাবের ভেতরে স্থানীয় পোশাক পরিধান নিষিদ্ধ।
সেখানে যাঁরা ঢুকবেন, তাঁদের পরিপাটি পোশাক পরে আসতে হবে। মাদ্রাজ ক্লাবের একজন সদস্য বলেন, ‘তামিলনাড়ুর স্টাইলে ধুতি পরিধান করলে শরীরের একটি বড় অংশ দৃশ্যমান হতে পারে। সে কারণে অনেক ক্লাবই অতিথিদের ধুতি পরিধান নিষিদ্ধ করেছে।’ যে দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ পশ্চিমা পোশাকের চেয়ে ধুতি ও সাদা শার্ট পছন্দ করেন, সেখানে ধুতি পরলে অশোভনভাবে শরীরের অংশ বেরিয়ে থাকে—এ কথা বলা সাজে না। ৭৭ বছর বয়স্ক প্রবীণ আইনজীবী আর. গান্ধী সে সময় বিচারপতি ড. হরিপরানথমনের সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ক্লাব কর্তৃপক্ষ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে স্বেচ্ছাচার করেছে, সে সময় তাঁরা তাঁদের নিয়মিত পোশাকেই ছিলেন।’
দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ মেজাজে যতই গণতান্ত্রিক হোন না কেন, ক্ষমতার প্রতি তাঁদের একধরনের মোহ আছে। ক্লাব হয়তো ব্রিটিশরাজের ধ্বজা বহন করছে, এগুলো একই সঙ্গে ক্ষমতার প্রতীকও বটে। সে কারণেই এসব ক্লাব এখনো আছে, ভারতের সমাজের সঙ্গে সেগুলো খাপ না খেলেও কিছু আসে-যায় না।
হ্যাঁ, বিজেপিরই জয় হয়েছে। বামপন্থীরাও যখন নমনীয় হিন্দুত্ববাদের খপ্পরে পড়ে, তখন তারা একটু উদার হতেই পারে। মুসলমানরা কংগ্রেসকে ভোট দিলেও কংগ্রেস বিগত কয়েক বছরে তার সেক্যুলার আবেদন হারিয়ে বসেছে। মুসলমানদের সামনে এখন সমস্যা হচ্ছে একটি প্রকৃত উদারনীতিক দল খুঁজে বের করা। মুসলমান সম্প্রদায় মৌলবাদের দিকে ঝুঁকে এর কোনো সুরাহা করতে পারবে না, এখন যেটা ঘটছে। এতে তাদের পুরো সমাজই কলঙ্কিত হবে। আর সংখ্যাগত দিক দিয়ে হিন্দু মৌলবাদের সামনে মুসলিম মৌলবাদ টিকতেই পারবে না।
ভারতের সাবেক প্রধান বিচারপতি জে সি ভার্মার নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। তাদের কাজ হচ্ছে ধর্ষণ আইনে ও এর বিচারের মাত্রা সম্পর্কিত পরিবর্তন আনা। ধর্ষণের বিচার হিসেবে ছাত্ররা ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড বা নপুংসকরণের দাবি তুলেছে। তার পরও সরকার কেন চাপের মধ্যে কাজ করছে, তা সত্যি বিস্ময়কর! কর্তৃপক্ষ ভীতি সঞ্চারের চেষ্টায় ইন্ডিয়া গেট অভিমুখে সব রাস্তা বন্ধ করে দেয় এবং বিক্ষোভরত ছাত্রদের ব্যারিকেডের বাইরে রাখতে পুলিশ লাঠিপেটা করে। এটা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত, এর সমালোচনাও কম হয়নি।
রাজনীতিবিদদের সবচেয়ে বড় সহায় হচ্ছে পুলিশ, এই বাহিনীই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখভাল করে। এই বাহিনী থেকে চাটুকার ও ঢিলাদের বের করে দিতে হবে। তার আগে পুলিশকে স্বাধীন করে দিতে হবে, যাতে তারা রাজনীতিবিদদের চাপমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। তা না হলে বিপদ। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা রাজ্যের পুলিশ সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এ জায়গায় গেলে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার—এসব কিছুই আর থাকে না, তখন এগুলো নিছক শব্দে পরিণত হয়।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক।

আমাদেরও একজন সঞ্জয় মিত্র চাই by সোহরাব হাসান

কোনো দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সহিংসতা হলে সেটি যে সেই দেশের সংখ্যালঘুদের চেয়ে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের জন্য বড় লজ্জার বিষয়, এই সত্যটি দেশবাসীকে জানান দিলেন সঞ্জয় মিত্র নামের একজন মহান ভারতীয় নাগরিক।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্রপন্থী হিন্দুদের হাতে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার প্রতিবাদে সঞ্জয় মিত্র ২১ বছর ধরে রোজা রেখে চলেছেন। বাবরি মসজিদ ভাঙার সঙ্গে ব্যক্তি সঞ্জয় মিত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। সে সময়ে ভারতের অনেক স্থানে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হলেও সঞ্জয় মিত্র যে শহরের বাসিন্দা, সেই কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে কোনো অঘটন ঘটেনি। তার পরও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে তিনি মনে করেন, এই ঘটনার প্রতিবাদ হওয়া উচিত। কীভাবে প্রতিবাদ হবে? একসময় সঞ্জয় মিত্র বামপন্থী রাজনীতি করতেন। তখন প্রতিবেশী মুসলিম পাড়ায় গিয়ে সদলবলে তাদের পাহারা দিতেন, যাতে দুর্বৃত্তরা কোনো ক্ষতি করতে না পারে। বর্তমানে তিনি রাজনীতি থেকে দূরে। তাই ব্যক্তিগতভাবে ব্যতিক্রমী এক প্রতিবাদের ভাষা বেছে নিলেন রমজান মাসের ৩০ দিন রোজা রেখে। প্রতিবেশী মুসলমানদের সঙ্গে সময় মিলিয়ে তিনিও রোজা রাখেন, তাঁদের সঙ্গে ইফতার করেন। তাঁর মতে, এটি হলো প্রতিবেশী মুসলমানদের প্রতি সহমর্মিতা জানানোর পাশাপাশি নিজ সম্প্রদায়ের পাপমোচনের উপায়। রোজা রেখে তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষকে সংযমী হতে বলেন, হিংসা ও দ্বেষ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেন। সঞ্জয় মিত্র আপনাকে অভিনন্দন। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি আপনার এই সহমর্মিতা অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সঞ্জয় মিত্র ভালো করেই জানেন যে তাঁর রোজা রাখার কারণে ভেঙে যাওয়া বাবরি মসজিদটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে না। কিন্তু উগ্র হিন্দুরা মসজিদটি ভেঙে যে অন্যায় করেছেন, তার প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে হবে। ব্যক্তিগত ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। ভারতে সে সময় অনেকেই বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদ করেছিলেন, এখনো করছেন। পশ্চিমবঙ্গের একজন বুদ্ধিজীবী বলেছিলেন, ‘ওরা বাবরি মসজিদ ভাঙেনি, ভারতের হৃদয় ভেঙেছে।’
মসজিদ যেমন মুসলমানদের কাছে পবিত্র, তেমনি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে মন্দিরও পবিত্র। খ্রিষ্টানদের কাছে গির্জা ও বৌদ্ধদের কাছে প্যাগোডা। ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে একজন সঞ্চয় মিত্র ২১ বছর ধরে রোজা রেখেছেন আর বাংলাদেশে যে হিন্দুদের শত শত মন্দির ভাঙা হচ্ছে, তার প্রতিবাদে সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায় কী করছে? রুটিন মাফিক প্রতিবাদ ও মৌখিক সহানুভূতি ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়ে না।
আমি রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতিকদের কথা বলছি না। রাষ্ট্রের নীতি বরাবরই শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হয়। সেই শাসকগোষ্ঠীকে পরিচালনা করে যে অর্থ বা পুঁজিতন্ত্র, তার কোনো বর্ণ নেই। যখন যে পাত্রে রাখা হয় সেই পাত্রের রং ধারণ করে। আমি বলছি সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায়ের কথা। আমি বলছি সমাজের বিবেক নামে পরিচিত লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, আইনজীবী, সংস্কৃতিসেবীসহ সচেতন অংশের কথা। আমাদের রাজনীতিকেরা কথায় কথায় বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ বলে দাবি করেন। কিন্তু দেশি-বিদেশি গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন তার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরে।
গত ২৮ জুলাই প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির-ঘরবাড়িতে আগুন ধরানোর পাশাপাশি লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর বিভিন্ন মন্দিরের ৪৯৫টি মূর্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৭৮টি বাড়ি ও ২০৮টি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে। এসব ঘটনায় একজনের মৃত্যু ও ১৮৮ জন আহত হয়েছে। (প্রথম আলো, ১ আগস্ট ২০১৪)
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর নির্বাচন ও যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পাঁচ হাজার বসতবাড়ি ও অর্ধশতাধিক মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
মানুষের বসতবাড়ি ভাঙলে একটি বাড়িই ভাঙে, যা আবার নির্মাণ করা যায়। কিন্তু মন্দির বা উপাসনালয় কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, মানুষের হৃদয় ও পবিত্রতার প্রতীক। সেটি ভাঙা মানে তার হৃদয় ভাঙা। তাঁর ধর্ম ও গোটা সম্প্রদায়কে আহত করা।
ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে তদন্ত কমিশনের সামনে জবাবদিহি করতে হয়েছে। গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দায় থেকে নরেন্দ্র মোদি রেহাই পেলেও অনেকে শাস্তি পেয়েছেন। জেল খেটেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তথ্য উদ্ঘাটনে গঠিত সাহাবুদ্দিন কমিশনের রিপোর্ট এখনো ফাইলবন্দী হয়ে আছে। অপরাধীদের শাস্তি দূরের কথা, কারও বিরুদ্ধে একটি মামলাও হয়নি। যেকোনো নির্বাচন এলে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মহা আতঙ্কে থাকেন। ভোট দিলে এক পক্ষ খুশি হয়, আরেক পক্ষ বাড়িতে গিয়ে বলে আসে, ‘আপনার ভোট পেয়ে গেছি। কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।’
সরকারের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ নীতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি সতর্কতাও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে যে ব্যর্থ হয়েছে, তার প্রমাণ নির্বাচনের আগে ও পরে দিনাজপুর, নোয়াখালী, যশোর, সাতক্ষীরা প্রভৃতি স্থানের ঘটনাবলি। গত ঈদের দুই দিন আগেও চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতেও কয়েকটি হিন্দু বাড়িতে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায় গুজব ছড়িয়ে। কেবল হিন্দু সম্প্রদায় নয়, ২০১২ সালে এক বৌদ্ধ যুবকের নামে একটি ভুয়া স্ট্যাটাস দিয়ে রামু, টেকনাফসহ কয়েকটি স্থানে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সরকার সেই সব দগ্ধ ভিটিতে নতুন ঘর তৈরি করেছে, গৌতম বুদ্ধের ভাঙা মূর্তিগুলোও নতুন রূপে সাজিয়েছে। কিন্তু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষগুলো এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদের ভয় দুর্বৃত্তরা যেহেতু কেউ শাস্তি পায়নি, সেহেতু তারা যেকেনো সময়ে যেকোনো অজুহাতে ফের হামলা চালাতে পারে।
৪৩ বছর ধরেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটছে। কখনো কম, কখনো বেশি। পাকিস্তান আমলে প্রণীত কুখ্যাত শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল হলেও হিন্দু সম্প্রদায় তাদের অপহৃত সম্পত্তি ফিরে পাচ্ছে না। আইনের মারপ্যাঁচে আটকে আছে। এখনো অনেকের ঘরবাড়ি দখল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সঞ্জয় মিত্রের মতো সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের কেউ সেটিকে নিজের অপরাধ মনে করে ‘রোজা’ রাখেননি। নিজ সম্প্রদায়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাননি। সবাই মনে করছেন, ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কী? এটি সংখ্যালঘুদের জন্য নয়, বরং সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের জন্যই নিদারুণ লজ্জার ও অপমানের। একটি সমাজ গণতান্ত্রিক কি না, তা নির্ধারিত হয় সেই সমাজে বসবাসকারী প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু মানুষগুলোর নিরাপত্তাবোধের ওপর।
তাই বাংলাদেশেও একজন সঞ্জয় মিত্র চাই, যিনি সমাজকে পথ দেখাবেন। কেবল উপদেশ দেবেন না, নজির সৃষ্টি করবেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনের ব্যথাটি বুঝবেন এবং অন্যকে বোঝাতে সচেষ্ট থাকবেন। তিনি হয়তো অন্য সম্প্রদায়ের ধর্মীয়
আচারণ পালন করবেন না। তবে সেই আচার পালনে যাতে কেউ বাধা না দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করবেন। তাদের এই বলে অভয় দেবেন যে, পুলিশ প্রহরা ছাড়াই আপনারা আপনাদের ধর্ম পালন করুন। কেউ বাধা দেবে না। বাধা দিলে আমি জীবন দিয়ে তাদের রুখে দেব। তাহলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ শত দুর্যোগ-দুর্বিপাকের মুখেও বুক চিতিয়ে বলতে পারবে, ‘এ আমার দেশ। এ দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’
বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ভেতর থেকে কেবল একজন নয়, হাজার হাজার সঞ্জয় মিত্র কিংবা আমির হোসেন চৌধুরীর (১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখতে গিয়ে যিনি দাঙ্গাবাজদের হাতে খুন হয়েছিলেন) জন্ম হোক। এই দেশটি কেবল মুসলমানের নয়, কেবল বাঙালির নয়। দেশটি হোক সব মানুষের।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

পানি জাতীয়তাবাদে সমাধান নেই by মহিউদ্দিন আহমেদ

টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখলাম, কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুরে পদ্মা নদীতে নৌকাডুবি হয়েছে। মারা গেছেন ১২ জন। খবরটা শোকের হলেও এটা শুনে অনেকেই স্বস্তি পেতে পারেন। কারণ, পদ্মায় এখন যথেষ্ট জল। নৌকা ডুবলে মানুষ তলিয়ে যায়। কিছুদিন আগের সংবাদ ছিল, ধরলা পয়েন্টে তিস্তার জল বিপৎসীমার পাঁচ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। অথচ এই পদ্মা আর তিস্তা নিয়ে শুকনো মৌসুমে আমাদের দেশে কতই না হাহাকার। পত্রিকায় ছবি দেখি, নদী দিয়ে ট্রাক চলছে। এ দৃশ্য অবশ্য নতুন নয়।
এখন অবশ্য পরিবর্তন হচ্ছে আরও দ্রুতগতিতে। প্রাকৃতিক কারণের সঙ্গে যোগ হয়েছে মানবসৃষ্ট কারণ। ফলে নদীতে পলি কিংবা বালু জমে তা ভরাট হচ্ছে, নদী মরে যাচ্ছে। বর্ষাকালেও তাই দেখা যায় লঞ্চ কিংবা ফেরি ডুবোচরে আটকে গেছে। নদী নাব্যতা হারাচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, গোয়ালন্দে পদ্মায় পানির গভীরতা দাঁড়ায় সর্বনিম্ন দুই মিটারে, ভৈরব বাজারে মেঘনার পানির স্তর হয় এক মিটার, সিলেটে সুরমা নদীতে পানি থাকে ২ দশমিক ১ মিটার।
নদী আল্লাহর দান। এগুলো তৈরি করতে আমাদের প্রকল্প বানাতে হয়নি, বাজেটে কখনো নদী বানানোর বরাদ্দ ছিল না। মুফতে পাওয়া এসব স্রোতোধারা আমরা নিজেরাই ধ্বংস করে চলেছি। আমরা কয়লা, তেল, গ্যাস, মাছ, গাছ, বাঘ, কুমির নিয়ে প্রচুর অশ্রুপাত করে চলেছি। অথচ আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ, আমাদের নদীগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তেমন কিছুই করিনি। মন্ত্রী-আমলাদের দায়িত্ব হলো কাজ করা। তাঁরা কথা বলেন বেশি, কাজের কাছাকাছি থাকেন না।
আমাদের নদীগুলোর জন্য আরেক উপদ্রব হলো, নদীর উজানে নানা ধরনের অবকাঠামো তৈরি করার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক তৈরি হচ্ছে ব্যারাজ। এর ফলে নদীর জল সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে অন্য জায়গায়। আমাদের অনেক মাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে, খেতের ফসল মরে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাচ্ছে, উপকূলীয় অঞ্চলে মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে।
আমাদের তিন দিকেই ভারত। বলা যায় ‘ইন্ডিয়া-লক্ড’। আমরা প্রায়ই বলে থাকি, ভারত আমাদের পানিতে মারছে। পানি নিয়ে এই অসম যুদ্ধে ভারত আছে সুবিধাজনক স্থানে, উজানে। আমরা ভাটির দেশের মানুষ। আমাদের চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হয়, কখন ভারত দয়া করে নদীর অর্গল খুলে দেবে আর আমরা জল পাব।
অস্বীকার করার উপায় নেই, পানির চাহিদা বাড়ছে প্রতিদিন। একটা সময় ছিল যখন শুধু কৃষি আর পরিবহনের জন্য নদীর জলের ব্যবহার হতো। এখন নগরায়ণ বাড়ছে, নতুন নতুন শিল্পকারখানা হচ্ছে, আধুনিক জীবনে পানির নানাবিধ ব্যবহার বাড়ছে। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রাখা যাচ্ছে না মোটেও। এখন শুধু পানির সরবরাহ নয়, দরকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ অতিরিক্ত পানি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করা এবং ঘাটতি হলে তা মেনে নিয়ে জীবনযাত্রা সাজানো, কোনোটাই হচ্ছে না। কেননা আমরা জানি না, আমাদের সামনে পানির জোগান আগামী বছরগুলোতে কী পরিমাণ থাকবে। জানলে তো পরিকল্পনা করা যায়।
হিমালয়ের নদীগুলো নিয়ে ভারত একটি আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এ বছরে বিভিন্ন সমীক্ষার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেটে ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ আরও কমে যাবে। আমাদের কৃষি এবং নগরজীবনে পানির ঘাটতি বেড়ে যাবে আরও।
গঙ্গায় পানিপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য ভারত সরকার ১৯৮০-এর দশকে ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা সংযোগ খালের প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী আসামের ধুবরি থেকে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা পয়েন্টে ৩২০ কিলোমিটার খাল কেটে ব্রহ্মপুত্রের পানি গঙ্গায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশ এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। অবস্থা দিনে দিনে এমন হচ্ছে, গঙ্গার পানি অদূর ভবিষ্যতে আমরা আর পাব কি না, সন্দেহ আছে। উত্তর প্রদেশ আর বিহার পার হয়ে ফারাক্কা পর্যন্ত জল কতটুকু গড়ায়, তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরও সন্দেহ আছে বিস্তর। ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো হিমালয়ের নদীগুলোর পানি খাল কেটে গঙ্গায় নিয়ে আসা এবং পরে তা দক্ষিণের অন্যান্য রাজ্যে চালান করা। ভারতের জন্য এটা প্রয়োজন। তাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আমরা শুকিয়ে মরব কেন?
এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করার কথা যৌথ নদী কমিশনের। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ এই কমিশন যাত্রা শুরু করে। একই বছরের ২৪ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, কমিশনের বৈঠক হওয়ার কথা বছরে চারবার। এ পর্যন্ত সভা হয়েছে ৩৭টি। অর্থাৎ কমিশন একটা কাগুজে বাঘ হয়ে রয়েছে। ভারতের সঙ্গে দেন-দরবার করার জন্য এখন আমরা শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকি।
আমাদের সামনে সাফল্যের একটি উদাহরণ আছে। পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে আজন্ম বৈরী সম্পর্ক। কয়েক বছর পর পর তারা যুদ্ধ করে। তার পরও তারা ‘ইন্ডাস ওয়াটার ট্রিটি’ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তি সই করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু ১৯৬০ সালে করাচি গিয়েছিলেন এবং পাকিস্তানের সেনাপতি ও রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের সঙ্গে একমত হয়ে তাঁদের মধ্যকার ট্রান্স-বাউন্ডারি নদীগুলোর একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করেছেন। চুক্তিতে তাঁরা নদীর জল ভাগাভাগি করেননি। তাঁরা নদী ভাগ করেছেন। পুবদিকের তিনটি নদী ইরাবতী, বিপাশা ও শতদ্রু পড়েছে ভারতের ভাগে। তারা এই নদীগুলো নিয়ে যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারে। পক্ষান্তরে পশ্চিমে প্রবাহিত সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব পড়েছে পাকিস্তানের ভাগে, শতকরা ১০০ ভাগ, পাকিস্তানকে ১০ বছর সময় দেওয়া হয়েছে, যাতে সে তার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে নিতে পারে। মধ্যস্থতা করেছে বিশ্বব্যাংক এবং ব্যাংকের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকার অবকাঠামো তৈরিতে পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্য দিয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে নেহরু ও আইয়ুব খানের দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে।
আমাদের অঞ্চলে পানি জাতীয়তাবাদ বেশ প্রবল। কথায় কথায় অনেকেই আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে চান। আইয়ুব খানের ওপরও এ বিষয়ে চাপ ছিল। কিন্তু তিনি দ্বিপক্ষীয়ভাবেই সমস্যাটার সমাধান করেছিলেন। আমরাও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে গঙ্গার পানি ভাগাভাগির একটা সুরাহা করেছি। আরও ৫৩টি অভিন্ন নদী রয়েছে ভারতের সঙ্গে। একটা একটা করে চুক্তি সই করতে গেলে হাজার বছর লেগে যেতে পারে।
সুতরাং আমাদের কৌশল পাল্টাতে হবে। আমাদের দেশে নীতিনির্ধারকেরা সচরাচর গতানুগতিক চিন্তাধারার বাইরে যান না, যাওয়ার সক্ষমতাও হয়তো নেই। কিন্তু তবু যেতে হবে। এ বিষয়ে আমার একটা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আছে। এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য পানি বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
ব্রহ্মপুত্র (যমুনাসহ) নদীটি এখনো আক্রান্ত হয়নি। আমাদের দেশে উজান থেকে পানির যে প্রবাহ আসে, সবচেয়ে বেশি আসে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে। আমরা তো ভারতের সঙ্গে একটা ট্রেড-অফ করতে পারি—তোমরা গঙ্গা নিয়ে নাও, ব্রহ্মপুত্র পুরোটা আমাদের থাকুক। অন্য নদীগুলোও আমরা ভাগ করে নিতে পারি।এটা দুঃখজনক হলেও সত্য, ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রায় পুরোটাই আমরা অপচয় করি এবং তা বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। ব্রহ্মপুত্র-যমুনাকে কেন্দ্র করে এ দেশে সেচ কিংবা পানীয় জলের কোনো অবকাঠামো আজও গড়ে ওঠেনি। কী নিদারুণ অপচয়?
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা পৃথিবীর বৃহত্তম সেচ নেটওয়ার্ককে ধারণ করে আছে। এখানে সেচের আওতায় আছে ২৬ মিলিয়ন একর জমি। ভুলে গেলে চলবে না, এই তিন নদীর অববাহিকার মাত্র ৭ শতাংশ বাংলাদেশে। আমরা যখন ‘ন্যায্য হিস্যার’ কথা বলি, তখন এটাও ভাবতে হবে যে এই অববাহিকায় বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের সম–অধিকার আছে, হোক সে বাংলাদেশি কিংবা ভারতীয় অথবা নেপালি কিংবা চীনা। অবাস্তব চিন্তা, একগুঁয়েমি আর সস্তা রাজনীতির নামে জল ইতিমধ্যে অনেক ঘোলা হয়েছে। এখন শুভবুদ্ধির উদয় হোক, সীমান্তের ওপারে এবং এপারে।
ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে উদ্বৃত্ত অঞ্চল থেকে ঘাটতি এলাকায় পানি সরিয়ে নেওয়া। রাজনৈতিক সীমানা দিয়ে প্রতিবেশ অঞ্চল নির্ধারণ করা যায় না। এই আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প এমনও হতে পারে, যেখানে বাংলাদেশ এবং অববাহিকার অন্যান্য দেশ, যেমন নেপাল ও ভুটান অংশীদার হবে। পুরো বিষয়টারই সমাধান হতে পারে একটি আঞ্চলিক মহাপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে। এ জন্য প্রয়োজন ‘সংলাপ’। আন্দোলনের হুমকি দিয়ে পানি সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, দেশের মধ্যে সচেতনতা ও মতৈক্য গড়ে তুলতে হবে এবং পানির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতার আলোকে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
আমাদের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
মহিউদ্দিন আহমেদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com

ইসরাইলের নারকীয় হামলায় গাজায় বইছে রক্তগঙ্গা

ইসরাইলের নারকীয় হামলায় রক্তগঙ্গা বইছে গাজায়। শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে অবিরাম গাজার রাফা এলাকায় তীব্র থেকে তীব্রতর হামলা করে যাচ্ছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ৫০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরাইলের সেনা সদস্য হাদার গোল্ডিন এই রাফায় নিখোঁজ হয়েছে। এর জবাব দিতে রাফার মাটিকে তামা বানিয়ে দিচ্ছে ইসরাইল। বাতাসে শুধু লাশের পচা গন্ধ। বারুদের উৎকট উপস্থিতি। গাজা, বিশেষ করে রাফা এখন কোন শহর কিনা বাইরে থেকে কেউ দেখে তা বুঝতে পারবে না। রাতের ওই হামলায় ধসে পড়েছে একের পর এক ভবন। তার নিচে চাপা পড়েছেন কত ফিলিস্তিনি তার সঠিক কোন হিসাব নেই। ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে জীবিতদের। কিন্তু সেখানে জীবিত মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সবই মৃতদেহ। ইসরাইল বরাবরের মতো এবারও বলছে, তারা হামাসের রকেট হামলার জবাবে এমন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। শক্তি প্রয়োগের এ ধারা কোন সামঞ্জস্য বিধান করে না। শুক্রবার সকাল থেকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়া নিয়ে দু’পক্ষই সম্মত হয়। ৭২ ঘন্টার ওই চুক্তি কার্যকর হওয়ার দু’এক ঘন্টার মধ্যেই তা ভঙ্গ করে ইসরাইল হামলা চালায় গাজায়। এ নিয়ে সেখানে কমপক্ষে ১৬৫০ ফিলিস্তিনি নিহত হলেন। এর বেশির ভাগই বেসামরিক। অন্যদিকে ইসরাইলে নিহত হয়েছে ৬৩ জন। এর বেশির ভাগই সেনা সদস্য। শান্তিচুক্তি ভঙ্গের দায়ে দু’পক্ষ একে অন্যকে দায়ী করছে। আজ শনিবার মিশরের সাবেক সেনাপ্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি বলেছেন, মিশর যে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে তার মধ্যেই এই রক্তপাত বন্ধের বাস্তব সুযোগ রয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাতে শিশুদের নিয়ে পিতামাতা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখনই ইসরাইল আকাশপথে হামলা চালায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই পিতামাতা সহ তার বুকের সন্তান লাশে পরিণত হন। ওই রাতেই নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৩৫। এ রাতেই ইসরাইলের হামলায় গাজায় কমপক্ষে ৪০টি বাড়ি, তিনটি মসজিদ ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরাইলি মিডিয়া বলছে, শুক্রবারের রাতটি ছিল তাদের কাছে মোটামুটি শান্ত। কিন্তু আজ ভোরের দিকে রাজধানী তেল আবিবে কয়েকটি রকেট এসে আঘাত হেনেছে। হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসাম ব্রিগ্রেড স্বীকার করেছে যে, তারা তেল আবিবে তিনটি রকেট ছুড়েছে। কমপক্ষে দুটি রকেট নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া আয়রন ডোম।  শুক্রবার যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে গাজার মানুষ বাড়ি থেকে বের হন। তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহে নেমে পড়েন। জেলেরা সমুদ্রে নেমে পড়েন। শিশুরা সৈকতে খেলতে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু ইসরাইল আক্রমণ তীব্র করার ফলে তারা দ্রুত ফিরে আসে মায়ের কোলে। গাজায় পরিস্থিতি এখন অবর্ণনীয়। দুর্গত মানুষ মরতে বসেছে। তাদের খাবার নেই। পানি নেই। বিদ্যুত নেই। বোমার আঘাতে রক্ত ঝরছে সব স্থান দিয়ে। এ অবস্থায় মিশর রাফা সীমান্ত খুলে দিয়েছে মানবিক কারণে। সেখান দিয়ে গাজার মানুষ যারা মিশরের দিকে ছুটে যাচ্ছে তাদের সহায়তা করছে তারা। ওদিকে কাসাম ব্রিগেড এক বিবৃতিতে বলেছে, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হাদার গোল্ডিন (২৩)-এর ভাগ্যে কি ঘটেছে সে সম্পর্কে তাদের কাছে কোন তথ্য নেই। তারা তার সম্পর্কে কোন খবর জানে না। তবে হাদার গোল্ডিনের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ইসরাইলের দাবি, এক ঘেরাওয়ের সময় হাদারকে আটক করেছে হামাস। কাসাম ব্রিগেড বলেছে, রাফা এলাকায় যেখানে ইসরাইলি সেনা নিখোঁজ হয়েছে সেই এলাকায় তাদের যে গ্রুপটি ছিল তাদের সঙ্গে তারা সংযোগ হারিয়ে ফেলেছে। তাদের ভাষায়, আমাদের মনে হয় ইসরাইলের বোমা হামলায় ইসরাইলি সেনা সহ তারা সবাই নিহত হয়েছে। ওদিকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আয়রন ডোম ব্যবস্থাপনায় অস্ত্রের মজুদ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের একটি বিল পাস করেছে।

কেন বারবার লক্ষ্যবস্তু গাজা?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় বারবার অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল। বড় অভিযানগুলোর মধ্যে ২০০৮ ও ২০১২ সালের পর গত ৭ জুলাই থেকে আরেকটি রক্তাক্ত অভিযান শুরু করেছে তারা। প্রশ্ন হলো, কেন বারবার গাজায় অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল।

>>ইসরায়েলি হামলায় গাজা উপত্যকায় প্রতিদিন হতাহত হচ্ছে অনেক শিশু। গতকাল আহত এক শিশুকে রাফা শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় l ছবি: এএফপি
ভৌগোলিকভাবে ইসরায়েল ও মিসরের মাঝখানে অবস্থান গাজা উপত্যকার। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর দখল করা ভূখণ্ডের মধ্যে শুধু গাজা থেকেই সেনা ও বসতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা একেই গাজা থেকে নিজেদের দখলদারির অবসান বলে মনে করে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখনো গাজার অধিকাংশ সীমান্তই নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েলি বাহিনী। শুধু দক্ষিণের সীমান্তচৌকির নিয়ন্ত্রণ মিসরের হাতে।
ইসরায়েল গাজার সীমান্ত, নৌ ও আকাশপথগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো মানুষ বা মালামাল গাজায় ঢোকা কিংবা বের হওয়া—সবই হচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যে। ইসরায়েলের দাবি, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এটা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ইসরায়েলের এ তৎপরতার কারণে গাজার বাসিন্দারা কার্যত অবরুদ্ধ। গাজাবাসী তাদের আর্থসামাজিক দুরবস্থার জন্য দায়ী করে ইসরায়েলকে। আর হামাসসহ কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের এ তৎপরতাকে অসহনীয় ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে।
নিজেদের সনদ অনুযায়ী হামাস ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংগঠনটি বলেছে, তারা ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রবিরতির বিষয়টি বিবেচনা করবে। হামাস বলছে, পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারি অব্যাহত থাকায়ই বিভিন্ন সময়ে তারা দেশটি লক্ষ্য করে রকেট ছোড়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০০৮ সালে গাজায় বড় ধরনের অভিযান চালায় ইসরায়েল। ডিসেম্বরে শুরু করে ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২২ দিনের ওই অভিযানে এক হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়। বিপরীতে নিহত হয় ইসরায়েলের ১৩ সেনা। চার বছর পর ২০১২ সালের নভেম্বরে ‘অপারেশন পিলার অব ডিফেন্স’ নামে আবারও রক্তাক্ত অভিযান চালায় ইসরায়েল। এতে ১৬৭ ফিলিস্তিনি ও ছয় ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়। এ অভিযানের স্থায়িত্ব ছিল আট দিন। হামাসকে দমনের নামে এসব অভিযান পরিচালনা করা হলেও এর মূল্য দিতে হয়েছে ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষকে।
ইসরায়েল সর্বশেষ ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামে গাজায় যে অভিযান শুরু করেছে, তার স্থায়িত্ব ও ধ্বংসযজ্ঞ আগের দুটি অভিযানকে ছাড়িয়ে গেছে। নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ১৪ শ ছাড়িয়েছে। এদের অধিকাংশই শিশুসহ সাধারণ মানুষ। ইসরায়েলের দাবি, নিহত হয়েছে তাদেরও ৬৩ সেনা ও সাধারণ নাগরিক।
অপারেশন প্রটেক্টিভ এজের শুরু ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অপহরণ ও হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। গত জুনে ইসরায়েলি তিন তরুণকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার জন্য ইসরায়েল হামাসকে দায়ী করে। এরপর গত ২ জুলাই জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনি এক কিশোরকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। অভিযোগ ওঠে, ইসরায়েলি তরুণদের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ফিলিস্তিনি ওই কিশোরকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার পর হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামাস ইসরায়েল লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালাচ্ছে অভিযোগ তুলে ৭ জুলাই থেকে গাজা অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েল বলছে, হামাসের রকেট হামলা বন্ধ করতে এ অভিযান শুরু করেছে তারা। হামলার জন্য ব্যবহৃত গাজার সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, হামাস গাজায় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। ঘনিষ্ঠ মিত্র সিরিয়া ও ইরানের কাছ থেকে সহায়তা কমে যাওয়া, মিসরে সমমনা সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের পতন এবং মিসর-ইসরায়েলের অবরোধে গাজার অর্থনৈতিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে হামাস। এ পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানো শুরু করে তারা। তাদের প্রত্যাশা, এতে করে হয়তো হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়া যাবে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েলের অবরোধ প্রত্যাহারের পথ তৈরি হবে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব শিগগির দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ৭ জুলাই হামলা শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এ পর্যন্ত কয়েক দফা সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি হলেও তা কার্যকর হয়নি। ইসরায়েল বলছে, গাজা থেকে ইসরায়েলে হামলা চালানোর জন্য ব্যবহৃত সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান চলবে। এমনকি যুদ্ধবিরতি হলেও লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত কিছু জায়গায় তাদের অভিযান চলবে। অন্যদিকে হামাস বলছে, গাজার ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে যাবে না তারা।
তারপরও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। মিসরের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেই প্রক্রিয়া চলছে। যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করে। তাই হামাসের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে হামাসকে সমর্থনকারী তুরস্ক ও কাতার এই যুদ্ধবিরতির আলোচনায় সম্পৃক্ত রয়েছে। বিবিসি।