Wednesday, May 15, 2013

ডাস্টবিন

ঢাকার নিউমার্কেটের ২ নম্বর গেটে ঢুকতে বাঁ পাশে দুটি ডাস্টবিন রাখা আছে। এলাকার ময়লা-আবর্জনা এখানে জমা করা হয় প্রতিদিন। এর ফলে সকালে তা পচে দুর্গন্ধময় পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। অথচ এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হল, একটি হোস্টেল এবং একটি ইনস্টিটিউট অবস্থিত।
প্রতিদিন ক্লাস করতে ছাত্রছাত্রীদের এ রাস্তা মাড়াতে হয়। তখন নাকে রুমাল চাপলেও দুর্গন্ধের কাছে তা হার মানে। বিশেষ করে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী ও ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের ছাত্রীরা এর ফলে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন চাইলেই এই ডাস্টবিন দুটি সরিয়ে নিতে পারে। আর সকালের মুক্ত বাতাসের স্বাদ নিতে পারে ওই পথে চলাচলকারী অসংখ্য পথচারী।
মো. সাদ্দাম হোসেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

গাছে সাইনবোর্ড

প্রাণীকুলের বেঁচে থাকার জন্য প্রধান উপাদান গাছ। এই গাছের যে প্রাণ আছে, অনুভূতিশক্তি আছে, তা প্রমাণিত। তবে তার বাকশক্তি নেই। গাছ সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে আমাদের উপকার করে, জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। যথা—অক্সিজেন প্রদান, কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ, খাদ্য, ফল, ওষুধ-জ্বালানি-আসবাব-গৃহনির্মাণ উপাদান প্রদানসহ ভূমি ক্ষয়রোধ, বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য, ছায়াদান, প্রাণী-পাখির আবাসস্থলের জোগান দিয়ে অফুরান সাহায্য করে। এই বৃক্ষকে আমরা পেরেক বা লোহা হেনে কি তার প্রতিদান দিচ্ছি?
আজকাল বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে, গাছে গাছে যেন সাইনবোর্ড লাগানোর প্রতিযোগিতা চলছে। এতে করে কি গাছের কষ্ট হচ্ছে না? তারা বলতে পারে না ঠিকই কিন্তু তাদের যে অনুভূতিশক্তি আছে। তাই আমাদের বিবেককে জাগ্রত করা দরকার। গাছে সাইনবোর্ড লাগানোর বিরুদ্ধে একটি আইনও আছে। আসুন, এই পরম উপকারী বন্ধু গাছের গায়ে আমরা সাইনবোর্ড ঝোলানো বন্ধ রাখি। গাছকে মুক্তি দিই। এর আপন সৌন্দর্য ও স্বকীয়তাকে বজায় রাখি।
এ ব্যাপারে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
কংকন কুমার সরকার
সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা।

রেলের কালো বিড়ালেরা কোথায়?

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে সাবেক রেলমন্ত্রী এ মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা দূর করতে প্রথমেই রেলের কালো বিড়াল খুঁজে বের করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই বিড়াল খুঁজে পাওয়ার আগেই  তিনি কালো বিড়ালের শিকার হয়ে দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হন। মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী যোগ দিলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না। রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে সরকারের মৌখিক সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই কম। দীর্ঘদিন ধরে রেলের ভাড়া বৃদ্ধি হয় না—এ কারণ দেখিয়ে রেলের ভাড়া শতভাগ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। রেলে যে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল, সেটিও তুলে নেওয়া হয়। রেলপথ মন্ত্রণালয় সেবার মান বাড়াতে না পারলেও ভাড়া বাড়ানোর কাজটি সফলভাবেই করতে পেরেছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। রেল সরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকারি পর্যায়ে কিছু বিআরটিসি বাস চলাচল করলেও সড়কপথে চলে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস। রেলপথকে শক্তিশালী করতে হলে অবশ্যই সড়কপথের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে হবে। নয়তো রেল যোগাযোগ কখনোই  কার্যকর হবে না। সরকারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সড়কপথের সঙ্গে বহুমাত্রিক পুঁজির বিনিয়োগ রয়েছে। সবাই চাইবে, সড়কপথ চালু থাকুক। যারা বাসের পার্টস বিক্রি করে, তারা থেকে শুরু করে বাসের মালিক—কেউই চাইবে না রেলপথ সমৃদ্ধ হোক। কারণটা খুবই সহজ। ধরা যাক রংপুর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামের সড়ক ও রেলপথের কথা। সরকার যদি রংপুর থেকে বগুড়া পর্যন্ত সরাসরি কোনো রেলপথ গড়ে তোলে, সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ট্রেন চালু করে এবং ট্রেনের ব্যবস্থাপনা যদি ঠিক থাকে, তাহলে রংপুর থেকে কোন যাত্রী কী কারণে রেলপথ ছেড়ে সড়কপথে যাওয়া-আসা করবে? একবার যদি রেলপথ স্থান করে নেয়, তাহলে সড়কপথ আর কখনোই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। এ কারণে সড়কপথের ব্যবসায়ীরা কিছুতেই চান না, রেলপথ শক্তিশালী হোক। রেলপথে সুবিধা অনেক। প্রতিবছর বহু মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, অনেকের অঙ্গহানি ঘটে। রেলপথের প্রসার ঘটলে এসব দুর্ঘটনা অনেকটাই এড়ানো যেত। রেলযাত্রা শুধু নিরাপদই নয়, সাশ্রয়ীও। সরকার মুনাফা করতে পারবে অনেক বেশি, জ্বালানি খরচ হবে কম। পণ্য পরিবহন ব্যয় কমে আসবে। সড়কপথের ব্যবসায়ীরা রেলের উন্নয়নে প্রতিবন্ধক কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারের মেয়াদের শেষ বছর চলছে। কোনো বছরই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ রেলের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। মেয়াদের শেষ বছর হিসেবে নির্বাচনী বাজেট চেয়েছেন সাংসদেরা। স্থানীয় পর্যায়ে কাজের বহর দেখিয়ে নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে চান তাঁরা। স্থানীয় পর্যায়ে কিছু কাজ করলে সাংসদদের ভোটের রাজনীতিতে হয়তো কিছুটা সুবিধা হবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে অনেক বড় কোনো কাজ করে সরকার যদি বৃহৎ অর্থে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে, সেটা নিশ্চয় অনেক ভালো। সরকার যোগাযোগব্যবস্থায় অনেক বড় একটি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণে। রেলপথেও ভালো কিছু করা যায়নি। ৪২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ সেট ডেমু (ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট) ট্রেন চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ডেমুর প্রথম সেটের উদ্বোধনও করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ডেমু চালু করার ব্যাপারে সরকার অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। সরকারের উচিত ছিল, এক বগিবিশিষ্ট ডেমু না এনে তিন বগিযুক্ত ডেমু সেট চালু করা। আমাদের দেশে যেখানে দূরপাল্লার ট্রেনের অনেক অভাব, সেখানে ডেমু না এনে ‘এই টাকায় চারটি শক্তিশালী ইঞ্জিন ও এক শ কোচ’ কেনা যেত। এখনো আমাদের ইঞ্জিনের অভাবে কনটেইনার যথাসময়ে পরিবহন করা সম্ভব হয় না বলে রপ্তানিকাজ ব্যাহত হয়। যে ডেমু নিয়ে এসেছে সরকার, তার জন্য এখন প্ল্যাটফর্ম উঁচু করতে হবে। প্রথম দিন চলার পরই ডেমু বন্ধ রয়েছে। চলছে ডেমু সংস্কারের কাজ।
সরকার যদি আসন্ন নির্বাচনে কোনো খাতে অনেক বাজেট বরাদ্দ দিয়ে ভোটের সুবিধা নিতে চায়, তাহলে রেলকে সেই কাজে ব্যবহার করতে পারে। এই কাজটি এখন অত্যন্ত সহজ। যেসব স্থানে রেললাইন রয়েছে, সেসব স্থানে বাজেট বরাদ্দ দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ইঞ্জিন আর কোচ নিয়ে এসে রেল যোগাযোগকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। দেশের কাজও হবে, জনপ্রিয়তাও বাড়বে। আমাদের রেলব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দিনাজপুরের সৈয়দপুর-পার্বতীপুরে যে রেলকারখানা গড়ে তুলেছিলেন, সেগুলোকে সক্রিয় করে দেশেই রেলের প্রয়োজনীয় সবকিছুই উৎপাদন করা সম্ভব। রেলওয়ের প্রচুর সম্পদ রয়েছে। সেই সম্পদের এখন কোনো সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না। রেলের স্থাপনা ও ভূমি যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেও অনেক আয় করা সম্ভব।
রেলব্যবস্থা যাতে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে, হয়তো সে জন্যই রেলের প্রতি হরতালের দিনগুলোয় রেলপথকে নাশকতার বড় লক্ষ্যে পরিণত করেছে হরতালকারীরা। রেললাইন তুলে ফেলা, ফিশপ্লেট তুলে ফেলা, রেললাইনে আগুন দেওয়া, ক্লিপ খুলে ফেলা, লাইনের নিচে গ্রেনেড পুঁতে রাখা, লাইনের ওপর গাছ কেটে রাখা, স্টেশনে আগুন দেওয়াসহ বিভিন্ন নাশকতা করছে জামায়াত-শিবির। গত দু-তিন মাসে শতাধিক নাশকতা হয়েছে রেলে। এগুলো ভীতি সঞ্চার করার ক্ষেত্রে খুবই সহজ। কারণ, ট্রেন চলে অনেক দ্রুত। কোথাও দ্রুত একটি লাইন খুলে ফেললেই দুর্ঘটনা অনিবার্য। অর্থমূল্যে এ ক্ষতি প্রায় ৫০ কোটি টাকা। রেলের নাশকতা বন্ধ করা না গেলে সড়কপথের ব্যবসায়ীরাই বেশি লাভবান হবেন, ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ যাত্রী। রেলের সেবা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। স্টেশনগুলোয় জেনারেটর না থাকার কারণে বিদ্যুৎ থাকা সাপেক্ষে টিকিট পেতে হয়। এই বিড়ম্বনাও বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। রেলের যত কালো বিড়াল রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আশা করি, আসন্ন বাজেটে সরকার বরাদ্দ বাড়িয়ে রেলপথের  উন্নয়নে মনোযোগী হবে।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

তত্ত্বাবধায়ক সরকারই কি সমাধান?

রধান বিরোধী দল বিএনপি যখন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তখন সেই পটভূমিতে এ ইস্যু নিয়ে কলাম লেখার কথা ভাবছিলাম কদিন ধরে। এমন সময় প্রথম আলো আয়োজিত একটি জনমত জরিপের ফলাফলে দেখছি, দেশের ৯০ ভাগ মানুষই তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধ ও সংঘাত বন্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিবিধান হতে পারে। কিন্তু এটা যে বিগত দুই দশক ধরে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা-সংঘাতময় বাস্তবতার স্থায়ী সমাধান নয়, সে তো বাংলাদেশের মানুষের না জানার কথা নয়। কারণ, ইতিপূর্বে অন্তত চারবার নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দেশে সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন হয়েছে। সরকারগুলোর গঠন ও ধরনে রকমফের থাকলেও এগুলো সবই ছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
প্রথমবার অর্থাৎ ১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল স্বৈরাচার পতনের পর প্রথম নির্বাচন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসন শুরু হওয়ার পরে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। এভাবে চারবারের নির্বাচনে প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ অদলবদল করে ক্ষমতায় এসেছে বা ক্ষমতা হারিয়েছে। কিন্তু কথা হলো, এতে কি আমাদের রাজনীতি থেকে অস্থিরতা, বিরোধ ও সংঘাতের প্রবণতা দূর হয়েছে? সংসদ কি কোনোবার দুই দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠুভাবে চলেছে? বিরোধী দলের সংসদ বর্জন কি বন্ধ হয়েছিল? বিজয়ী দলের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার তথা ভোগদখল, লুটপাটের প্রবণতা বন্ধ হয়েছিল? সরকারের দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি কি চালু হয়েছিল? দলীয়করণ কি অব্যাহত ছিল না? আমরা জানি, এ তালিকা আরও বাড়ানো যাবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনলে এবার কি পরিস্থিতির গুণগত উন্নতি হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা আছে? আমরা সবাই জানি, উত্তরটা কী হবে। এ-ও আমরা জানি, সমাজ ও জাতির ক্রিটিক্যাল ইস্যুগুলোর কোনো সরল সমাধান নেই। যে সমস্যার আবর্তে দেশের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে, তার সমাধান অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়; বরং এটা জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেয়, মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত প্রত্যাশার জন্ম দেয়। বড় দুই দলের মধ্যে তো বটেই, সম্ভব হলে সর্বদলীয় রাজনৈতিক সংলাপ সব সময় প্রয়োজন, কিন্তু যা শুধু নির্বাচনকালীন সরকারে সীমাবদ্ধ থাকলে দেশ রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি লাভবান হবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ—সমাজের সব সংগঠন-প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের পরিবর্তে প্রতিনিধিত্বশীল যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আমাদের অপারগতা। এ থেকে শুরু হয় একদিকে ব্যক্তি ও তার পছন্দের গোষ্ঠীর দখলদারি, বাকিদের জন্য কিছু পাওয়ার লক্ষ্যে তোষামোদ ও দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ; অন্যদিকে তৈরি হয় অপ্রাপ্তি-বঞ্চনা-নির্যাতনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা এবং তা প্রতিবিধানে চাটুকারিতা ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া। অর্থাৎ দুদিক থেকেই নেতা ভিন্ন বাকিদের বাঁচতে হলে তোষামোদ ও দুর্নীতির পথ ধরতে হয়। আসলে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি এবং ক্ষমতার ব্যবহার ও প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতাই হলো সুশাসনের মূল ভিত্তি। নির্দলীয় কথাটি বাহুল্য। কারণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবাইকেই ভোট দিতে হয় এবং দিলে কোনো দলের প্রার্থীকেই দিতে হয়। তবে শাসনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার উপজীব্য হলো আইনের শাসন। দলের নয়, দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় গিয়ে আইনের শাসন বজায় রাখবে, এটাই কাম্য। আমাদের দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের অভাব হয়নি, কিন্তু সুশাসনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। সুশাসন ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি মাকাল ফল, জনগণকে প্রকৃত সুফল কিছুতেই দিতে পারে না। এ অবস্থায় আমাদের জন্য যে ইস্যুগুলো জরুরি ও জোরালোভাবে তোলা প্রয়োজন সেগুলোর একটি তালিকা করা যাক—
১. প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক গতিশীল ব্যবস্থার বিধান।
২. সংসদের সব কার্যক্রমে সরকারি ও বিরোধী দলের অংশীদারির মাধ্যমে সংসদকে কার্যকর করা।
৩. নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা।
৪. দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা।
৫. স্থানীয় সরকারগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করে সচল করা।
৬. সর্বস্তরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
৭. গণমাধ্যমের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
এসব ক্ষেত্রে লোক দেখানোর বেশি সত্যিকারের সংস্কার না করে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে  ক্ষমতার অদলবদলের খেলা চালিয়ে গেলে এটা গণতন্ত্রকে কেবল তামাশায় পরিণত করবে না, তার অবক্ষয়ও ঘটাবে। আমরা দেখেছি, দীর্ঘদিনের এই অচল ব্যবস্থা চলতে চলতে দুই বড় দলকে ঘিরে দেশে দূষিত দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতার রাজনীতির কায়েমি স্বার্থ তৈরি হচ্ছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই দূষণ-দুর্নীতি পাচার হয়ে যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেদিকে আমাদের ‘জয়যাত্রা’ শিখরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। জরিপের ফলাফলে জামায়াত নিষিদ্ধ করা বিষয়ে যেমন তেমনই গণজাগরণ মঞ্চের ব্যাপারেও না ভোট বেশি এসেছে। এ দুটিকে পরস্পরবিরোধী দুটি বিষয়ে ঐকমত্য হিসেবে ধরে নিয়ে সমাজপ্রগতি এবং জনমানসের অগ্রগতির ইতিহাসের আলোকে বিচার করলে এটিও একটি জটিল কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এবং এটিও এ রকম হ্যাঁ/না ভোটের মতো সরল মতামতের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছার বিষয় নয়। বাংলাদেশের সমাজের, বিশেষত বাঙালি মুসলিম সমাজের (বস্তুত প্রায় সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজের) অর্থাৎ ব্যাপকভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের এই দেশের পশ্চাৎপদতার একটি বড় কারণ রেনেসাঁস-উত্তর জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার ধারণাগুলোর সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক সমন্বয় সাধনে অনীহা ও ব্যর্থতা। ফলে গণতন্ত্র চাই আমরা কিন্তু অসাম্প্রদায়িক হতে পারি না, ধর্মনিরপেক্ষতাকে মানতে পারি না তবে আধুনিক শিক্ষা চাই কিন্তু বিজ্ঞানের অনেক মৌল বিষয় মানি না বা এ সম্পর্কে নিরুত্তর থাকি, একটি সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের কথা বলি কিন্তু নারীর অধিকার মানতে চাই না, মুখস্থবিদ্যার দুর্বলতা বুঝি কিন্তু জিজ্ঞাসু তারুণ্যের নিন্দা জানাই। এ সমাজে বারবার মুক্তবুদ্ধির উৎসমুখ খোলার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু রক্ষণশীলদের প্রতিক্রিয়া ও প্রবল প্রত্যাঘাতে সেসব ভেস্তে গেছে। যদিও জ্ঞানের স্ফুলিঙ্গ একবার জ্বললে তার রেশ থেকে যায়, এবং তা সময় ও সুযোগে ঠিকই যুগে যুগে মানুষকে উজ্জীবিত করেছে। আরব-পারস্যের মুতাজিলা থেকে বাংলাদেশের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন পর্যন্ত বিষয়টি এ রকমই। এবার বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধি ও ন্যায়ের পক্ষে তারুণ্যের জাগরণ আমরা দেখেছি। তাতে আতিশয্য বা ভুলভ্রান্তি ছিল, কিন্তু সমাজ তাতে নাড়া খেয়েছে এবং বহুকাল পরে শতাব্দীপ্রাচীন জড়তা ও অচলায়তন ভেঙে জেগে ওঠার লক্ষণ ফুটে উঠেছিল। যেমনটা হয়ে থাকে, এর বিরুদ্ধে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী উঠেপড়ে লেগেছিল। তার আলামত আমরা সম্প্রতি দেখছিলাম। আর এখনকার বাস্তবতা অনুযায়ী বড় দুই দল এর পক্ষে-বিপক্ষে গিয়ে তাদের ক্ষমতার রাজনীতির সুবিধা আদায়ের চেষ্টায়ও লিপ্ত ছিল। এখন সমাজের এই পরিবর্তনের প্রয়াসটি নিয়ে জনমত জরিপে রক্ষণশীলতার পক্ষে মতামত বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেটা এ সমাজের জন্য কাঙ্ক্ষিত পথ কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জরিপ ছাড়াই সবাই জানি যে বৃহত্তর সমাজে এখনো জ্ঞানের সেই আলো প্রবেশ করেনি, যা সব রকম জিজ্ঞাসা কৌতূহল সম্পর্কে সহনশীল হবে। আমরা জানি, ধর্মের নামে ধর্মান্ধতার চর্চা বেড়ে চলেছে, আর তার প্রভাব সমাজে বাড়ছে। এটা সমাজের কেবল দুর্বলতা, গভীর সংকটেরই প্রকাশ ঘটায়। আমরা স্পষ্টতই দেখেছি, হেফাজতে ইসলাম গণজাগরণের চেয়ে বেশি লোক রাজপথে নামাতে পেরেছে। এটিকে সমাজপ্রগতির দৃষ্টিতে সমাজের দুর্বলতা কিংবা বিভ্রান্ত অবস্থার লক্ষণ হিসেবেই দেখা উচিত। পাশাপাশি একে এ দেশের শিক্ষিত সমাজ, গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা হিসেবেও দেখা যায়। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ যে অকেজো শিক্ষার মধ্যে পড়ে আছে, সে অবস্থায় শিক্ষিত সমাজ তাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে আর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজেদের ক্ষমতার চালের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে দায়িত্বহীনতারই পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। সমাজের সচেতন অংশের দৃষ্টি ফেরানো দরকার তাদের এই অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার প্রতি। এ হলো সমাজের রোগ। রোগগ্রস্ত শরীরের ওপর যেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয় অত্যন্ত সাবধানতা ও বিচার-বিবেচনার সঙ্গে, তেমনি একটি রোগগ্রস্ত সমাজের দুর্বল দেহে পরীক্ষা চালাতে সাবধানতা ও সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, এর ফলে যেসব প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যুত্তর আসবে, তা সুস্থ মানসের পরিচয় বহন না করাই স্বাভাবিক। ইংরেজ আমলে বিধবাবিবাহ রদ আইন করার সময় এর বিরুদ্ধে রক্ষণশীলদের ৩৩ হাজার স্বাক্ষরসংবলিত আবেদনের পাশাপাশি বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে প্রদত্ত আবেদনে এর পক্ষে মাত্র ৯৮৭ জন স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, কারা সঠিক ছিলেন। ইংরেজ সরকারও সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেনি। এ রকম সিদ্ধান্তের যাথার্থ্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে ইতিহাসে। আমাদের সমাজ যে অবস্থানে আছে, তাতে গণমাধ্যমকে ইতিহাসের গতিপথ, জনগণের কল্যাণ এবং ভবিষ্যতের মঙ্গল ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। কেননা দারিদ্র্য, কুসংস্কার, অশিক্ষা (ও কুশিক্ষা) মানুষকে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দেয় না, তার ব্যক্তিত্ব দৃঢ় নয় বলে নিরপেক্ষও হয় না। এ রকম বিভ্রান্ত উসকানিতে ইংরেজি শিক্ষার বিরুদ্ধতা কিংবা ধর্মান্ধ রাষ্ট্র সৃষ্টি করে বাঙালি মুসলমান আত্মঘাতী কাজ আগেও করেছে। আমরা কি ইতিহাস থেকে কিছুতেই শিক্ষা গ্রহণ করব না? শেষে বলব, দর্শনে ও বিজ্ঞানে সত্য জানার পথে একটি প্রহেলিকার মতো বিষয় হলো অ্যাপিয়ারেন্স অ্যান্ড রিয়ালিটি। অর্থাৎ কোনো বস্তু বা বিষয় দেখতে যেমনটা দেখায়, বাস্তবে তা নয়—এমন অনেক কিছুই চতুর্দিকে আছে ও ঘটে। বাস্তব বিষয় থেকে একটা উদাহরণ নেওয়া যাক—আকাশ দেখতে নীল, কিন্তু বিজ্ঞানের সূত্রে আমরা জানি, আদতে আকাশের কোনো রং নেই এবং এ-ও জানি, কেন তা নীল দেখায়।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ওসাংবাদিক।

পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সংস্কৃতি

বহির্বিশ্বের বহমান ঘটনাপ্রবাহ থেকে আমরা যদি যথোপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, তাহলে গণতন্ত্রের পথে আমাদের অগ্রযাত্রা সম্ভবপর ও সহজতর হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি প্রয়াত ব্রিটেনের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সাফল্যসমৃদ্ধ জীবন এবং তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-সম্পর্কিত অনুষ্ঠানাদি ও আলোচনা থেকে আমার মনে হয়, আমাদের রাজনৈতিক দিক থেকে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে প্রচুর। এটা অনস্বীকার্য যে বিতর্কিত হলেও মার্গারেট থ্যাচার ব্রিটেনের রক্ষণশীল দলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সফল প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমান রক্ষণশীল দলীয় প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন তাঁকে ব্রিটেনের ‘শান্তিকালে শ্রেষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী’ বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন স্যার উইনস্টন চার্চিল ছিলেন ‘শ্রেষ্ঠতম যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী’। থ্যাচারের ব্যয়বহুল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজনে রক্ষণশীল দল যথেষ্ট দলগত প্রচারেরও সুবিধা পেয়েছে। থ্যাচারের বহু কর্মকাণ্ড তীব্রভাবে বিতর্কিত ছিল। লেবার পার্টি এবং ব্রিটেনের মেহনতি জনতা ও লেবার-ইউনিয়নগুলো থ্যাচারের অনুসৃত নীতিতে তাঁর আমলে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবু বহির্বিশ্বে তারা (অর্থাৎ রক্ষণশীল ও লেবার পার্টি) উভয়ই সম্মিলিতভাবে থ্যাচারকে বহির্বিশ্বে ও ইতিহাসের পাতায় প্রক্ষেপিত করল ব্রিটেনের এক সার্থক পতাকাবাহী হিসেবে। শুনে অবাক হয়েছি, ১৯৯৪ সালে স্বামী ডেনিস থ্যাচারের মৃত্যু-পরবর্তী একাকী জীবনে বছর পাঁচেক আগে যখন মার্গারেট থ্যাচারের প্রথম স্ট্রোক হলো, তখনই বিরোধীদলীয় লেবার পার্টির নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনই মার্গারেটের সম্ভাব্য শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর এই ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতাগুলোর যৌক্তিকতার সপক্ষে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন বিভিন্ন গণমাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে বলেন, পরিকল্পনার চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়ন বিরোধীদলীয় নেতা এডমিলিব্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা করে ও তাঁর সম্মতি অনুসারেই হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী লেবারের টনি ব্লেয়ার তো সস্ত্রীক প্রথমেই উপস্থিত হন অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠানে। প্রশস্তিতে বিরোধীদলীয় এডমিলিব্যান্ড বলেন, ‘তিনি (মার্গারেট) একটি পুরো প্রজন্মের রাজনীতির পূর্ণ পরিবর্তন সাধন করেন। ...তিনি ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু স্থানান্তরিত করেন। হয়ে দাঁড়ান বিশ্বমঞ্চে এক প্রধানতম ভূমিকা পালনকারী।’ আমাদের দেশের পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির ও অশ্লীল বাক্যবিনিময়ের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এসব যেন অকল্পনীয় কাহিনি। ‘ব্রিটিশ লেবার পার্টির সর্বাধিক সফল প্রতিপক্ষ’ ও ‘সর্বাত্মক শত্রু’ ব্যারনেস থ্যাচার অব কেসটেভেন জীবন শুরু করেছিলেন মার্গারেট হিলদা রবার্টস নামে, ছোট শহর গ্র্যান্থামের এক মুদির দোকানের মালিকের মেয়ে হয়ে। তাঁর ৮৭ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে কেসটেভেন, অক্সফোর্ড, পার্লামেন্ট, দলনেতা ও তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং পশ্চিমা ক্যাপিটেলিস্ট সভ্যতার প্রবক্তা হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড়তম আদর্শিক সখ্য, প্রেসিডেন্ট বুশ সিনিয়রকে তিনি উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকের বিরুদ্ধে কোনো সহনশীলতা দেখাতে তীব্রভাবে বারণ করেছিলেন। রক্ষণশীল হলেও তিনি গর্ভপাত আইনসম্মতভাবে করার পক্ষে ছিলেন, আইনানুগ মৃত্যুদণ্ডের তিনি ছিলেন সপক্ষে। ফকল্যান্ডস পুনরুদ্ধার করতে আট হাজার মাইল দূরে আটলান্টিকের ওপারে ব্রিটিশ রণতরি পাঠাতে ৩৬৮ জন নাবিকসমেত আর্জেন্টিনিয়ান যুদ্ধজাহাজকে সাবমেরিন দিয়ে ডোবাতে তিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি। তাঁর প্রয়াণ-পূর্ব নির্দেশানুসারে শেষ বিদায়ের কালে গীত হয়েছিল উগ্র ব্রিটিশ জাতীয়তাবাদের ব্যঞ্জনাময় ভিক্টোরিয়ান লিরিক: ‘হে আমার দেশ, তোমার কাছে আমি শপথবদ্ধ (আই ভাউ টু দি, মাই কান্ট্রি...)।’ তদনুসারেই বাইবেল থেকে তাঁর নাতনি আমান্দা থ্যাচার পড়ে শুনিয়েছিলেন, ‘ঋজু হয়ে দাঁড়াও। সত্যকে তুলে ধরো। ন্যায়নিষ্ঠাকে বুকে প্রোথিত করো।’  কিন্তু এ কোন সত্য, কোন ন্যায়নিষ্ঠা? শুধু যা ছিল ব্রিটেনের স্বার্থের অনুকূল, পশ্চিমি সভ্যতা প্রসারে সহায়ক। কমিউনিজম সাম্যবাদের তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। মিখাইল গর্বাচভ ক্ষমতা গ্রহণের আগেই থ্যাচার তাঁকে চিহ্নিত করেছিলেন, ‘ অ্যা ম্যান উই ক্যান ডু বিজনেস উইথ’—এ ব্যক্তির সঙ্গে আমরা কাজ করতে পারব, এই ছিল তাঁর উক্তি। এবং পরবর্তীকালে এই গর্বাচভের বিভীষণী ভূমিকাই ইউরোপে কমিউনিজমের সমাধি রচনা করতে মুখ্য হয়ে দাঁড়াল। নেলসন ম্যান্ডেলাকে থ্যাচার ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলেন। যার জন্য কেন লিভিংস্টোন ও জর্জ গ্যালওয়ের মতো বামপন্থী ব্রিটিশ রাজনীতিবিদেরা তাঁকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছিলেন। উন্নয়নশীল দেশগুলো সম্পর্কেও তাঁর একটি নাক-উঁচু কিছুটা অবজ্ঞাসূচক মনোভাব ছিল। ব্রিটেনে থাকাকালীন আমি যখন অ্যাসোসিয়েশন অব ইকোনমিক রিপ্রেজেন্টেটিভস ইন লন্ডনের (এইআরএল) সভাপতি ছিলাম, তখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কিছুদিন আগেই থ্যাচারকে একটি মধ্যাহ্নভোজ ভাষণে আমন্ত্রণ করেছিলাম। তিনি জোরেশোরে একটি কথাই বলেছিলেন, নতুন স্বাধীন ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আমার একটিই উপদেশ—সোশ্যালিজমের অভিশপ্ত পথ পরিহার করে পশ্চিমা জগতের গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করো—অনুসরণ করো তাদেরই, যারা সফল হয়েছে—(অর্থাৎ পশ্চিমকে বা ক্যাপিটেলিস্টদের) সোভিয়েত সংবাদ সংস্থা ‘টাস’ তাঁকে আয়রন লেডি বা লৌহমানবী অ্যাখ্যা দিয়েছিল। শ্লেষাত্মক ছিল তা, কিন্তু থ্যাচার এই বর্ণনাকে যথার্থ বলেই গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ওয়েস্টমিনস্টারে যখন উইনস্টন চার্চিলের বিপরীতে ২০০৭ সালে তাঁর ব্রোঞ্জনির্মিত আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল, কৌতুকচ্ছলে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা লোহার তৈরি হলেই ভালো হতো’।
যে বিষয়টি আমি লক্ষণীয় বলে মনে করি, চিন্তায় ও ভাবাদর্শে বিপরীতধর্মী হলেও ব্রিটেনের লেবার পার্টি তাঁকে সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েছে এ জন্য যে তিনি ব্রিটেনের মর্যাদা বহির্বিশ্বে উন্নত করেছিলেন এবং ব্রিটিশ জনগণকে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। জাতির স্বার্থে, রাষ্ট্রের স্বার্থে, স্বদেশের সম্মান ও পতাকা উঁচু করে ধরে রাখতে সব রাজনৈতিক দলই ঐক্যবদ্ধ। সে অবস্থা যদি প্রতিপক্ষের অনুকূলে যায়, তবুও। অবশ্য থ্যাচারও নমনীয় ও সমঝোতামূলক ভাব দেখিয়েছেন প্রয়োজনমতো। জাতীয় স্বার্থে। যখন হংকংকে চীনের কর্তৃত্বে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে চীনা নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের সঙ্গে ১৯৮২ সালে তিনি আলোচনা করেন এবং দেং তাঁকে বলেন, ‘মনে রাখবেন প্রধানমন্ত্রী, চীন ইচ্ছা করলে আজ বিকেলেই হংকংকে চীনের অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।’ তখন বাস্তববাদী থ্যাচার বলেন, ‘তা ঠিক, কিন্তু হংকংয়ের জন্য বা চীনের খ্যাতির জন্য তা ভালো হবে না। চলুন, আমরা একটি সম্মানজনক সমঝোতাভিত্তিক হস্তান্তর-প্রক্রিয়া স্থির করি।’ এবং তা-ই করা হলো। এই পরিস্থিতিতে নমনীয় হতে থ্যাচার কোনো দ্বিধা করেননি। এই ঘটনাগুলো এবং অবস্থান বিশ্লেষণ থেকে দেখা যেতে পারে যে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং নেতাদের শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। দেরিতে হলেও, বর্তমানে সংলাপের একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। আমরা আশা করব, সরকারি দল উপলব্ধি করতে চেষ্টা করবে যে দলীয় ক্ষমতাধীন নির্বাচন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হবে না এবং বিএনপি ও সহযোগী দলগুলো তাতে অংশ নেবে না। আমাদের গণতন্ত্রের ইতিহাসও সুস্পষ্টভাবে শুধু নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিচালনাধীন নির্বাচন-উত্তর সরকার গঠনের সাক্ষ্য দিচ্ছে। সুতরাং অংশগ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা নির্ধারণের জন্য আলোচনা এখনই শুরু হোক এবং রেওয়াজমতো প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতাকে লিখিতভাবে আহ্বান করুন। সব রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে মুক্তি দিয়ে, সভা-সমাবেশের অনুমতি দিয়ে আলোচনার এক অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। নইলে অন্যান্য বহু অপশক্তি ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। তাদের কিছুতেই রুখতে পারবেন না। বিভাজনের খাল কাটলে যে কুমির আসবে, সে হবে সর্বগ্রাসী। ইতিমধ্যেই তার আলামত দেখা যাচ্ছে। সব দলের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা বিধান করে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া স্থিরীকৃত হলেই দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা আসবে।
শুধু গণতন্ত্রের জন্যই নয়, অর্থনীতি ও উন্নয়নের জন্য আজ তা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐক্যবদ্ধভাবে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে আজ যদি আমরা এক ইতিবাচক বা পজিটিভ ভাবমূর্তিতে প্রকাশ না করতে পারি, তাহলে আমাদের প্রায়-বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে দাঁড়াবে। বিরোধী দলের গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার স্থিরীকৃত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন-হরতাল চলবেই। ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে আমাদের শিল্প-বাণিজ্য-অর্থনীতি। বতুতপক্ষে জীবনের সব কটি দিক।
বাংলাদেশের বর্তমান সাংঘর্ষিক সংকট এড়াতে সহায়তা দিতে কূটনৈতিক উদ্যোগের কোনো কমতি হচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাসপ্রধানেরা ছাড়াও আসছেন বহু সফরকারী। কিছুদিন আগে ওআইসির মহাসচিব এসে কথা বলে গেলেন। সফর করে গেলেন জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। সরকারের উপলব্ধির প্রয়োজন রয়েছে যে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থেকে কোনো গ্রহণযোগ্য অংশগ্রহণসমন্বিত নির্বাচন করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি প্রথম আলোর উদ্যোগে ওআরজি-কোয়েস্ট পরিচালিত এক নিরপেক্ষ জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ মানুষ চায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে সংলাপের আয়োজন করা।
নিবন্ধের প্রথমার্ধে আমি ওয়েস্টমিনস্টার টাইপের পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির সূতিকাগার ব্রিটেনে কীভাবে রাজনৈতিক দলগুলো আচরণ করে এবং একে অন্যের প্রতি সমীহ ও সহযোগিতামূলক সম্মান দেখায়, তা ব্যক্ত করেছি। প্রধানমন্ত্রী লক্ষ করতে পারেন, কীভাবে লৌহমানবী মার্গারেট থ্যাচার হংকং ইস্যুতে বাস্তববাদী হয়ে চীনের সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীকেও সংকট নিরসনে নমনীয় হয়ে সমঝোতামূলক মনোভাব গ্রহণ করতে হবে। তা না করতে পারলে কিন্তু হবে তাঁরই ব্যর্থতা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আমাদের কাছ থেকেই ধার করে নিয়ে পাকিস্তান একটা সর্বাঙ্গসুন্দর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করল। নিশ্চয়তা বিধান করল গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের। নেপালেও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তোড়জোড়।
বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায় কিন্তু সরকারের। আর এ নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার মুখ্য দায়িত্ব সরকারি দল ও তার নেত্রীর।
সরকারকে এটা ভুললে চলবে না, পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির মূল ও অপরিহার্য অঙ্গ হচ্ছে পার্টিসিপেটরি বা অংশগ্রহণসমন্বিত সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচন। আর তার নিশ্চয়তা বিধান না করতে পারলে তা হয়ে দাঁড়াবে দলীয় স্বৈরাচার।
ইনাম আহমদ চৌধুরী: উপদেষ্টা, বিএনপিরচেয়ারপারসন।

বোরো ধান

বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ—এ নিয়ে আমরা গর্ব করি। কিন্তু যে কৃষক ফসল ফলিয়ে দেশকে এই জায়গায় নিয়ে গেছেন, তাঁদের স্বার্থরক্ষা আমরা কতটা ঠিকভাবে করতে পারছি? অনেক স্থানে এখন বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে, ধান বিক্রি করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন খরচই উঠছে না কৃষকের। কৃষকেরা এভাবে লোকসান গুনতে থাকলে ভবিষ্যতে তাঁরা ধান উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। বগুড়া ও গাইবান্ধার অভিজ্ঞতা বলছে, কৃষকেরা তাঁদের ধান বিক্রি করার জন্য ক্রেতা পাচ্ছেন না। মাঠপর্যায়ে সরকারের সংগ্রহ এখনো শুরু হয়নি। এ অবস্থায় কৃষকেরা চাতালমালিকদের কাছে ধান বিক্রি করতে গিয়ে যথাযথ দাম পাচ্ছেন না। প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ যেখানে ৬০০ টাকা, সেখানে কৃষককে তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৫৫০ টাকা বা এর চেয়েও কম দামে। এটা ঠিক যে বোরো ধান এখনো পুরোপুরি উঠতে শুরু করেনি। আমরা এ ব্যাপারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আগাম প্রস্তুতি প্রত্যাশা করছি। কৃষক যাতে তাঁদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পান, তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, চাতালমালিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নানা কারসাজির মাধ্যমে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন, যাতে কৃষক কম দামে তাঁদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। ধান উঠতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষক যাতে তা বিক্রি করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, কৃষকের পক্ষে নিজ উদ্যোগে ধান মজুত করে রাখা সম্ভব হয় না। আর অর্থের প্রয়োজনে কৃষকও ধান বিক্রি করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এই পরিস্থিতিরই সুযোগ নিয়ে থাকেন বিভিন্ন ধানকল ও চাতালমালিকেরা। কারও কারসাজিতে কৃষক যেন তাঁর উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য না হন, তা দেখার দায়িত্ব সরকারের। আমরা আশা করব, বোরো ধান ওঠার এই মৌসুমে সরকার এ ব্যাপারে সতর্ক থাকবে এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করবে।

সংলাপই পথ

বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তা কাটাতে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে। এখন জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও একই আহ্বান জানানো হলো। দেশের পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে দ্রুত সংলাপে বসার তাগিদ দিয়েছেন।
বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের আন্তর্জাতিক অভিঘাত রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাই উন্নয়ন-সহযোগী ও বন্ধুদেশগুলোর উদ্বেগের কারণ। নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসছে এবং এ নিয়ে বিরোধের কারণে দেশে সংঘাত ও সহিংসতার যে ঘটনা ঘটছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অজানা নয়। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব একটি বিরোধপূর্ণ ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সফরে আসেন। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক শেষে তিনি দুই পক্ষকে সংলাপে বসার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশের মানুষের মনের কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগেই বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব প্রধানমন্ত্রীর এই আলোচনার প্রস্তাবে সাড়া দেওয়ার জন্য বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী আমরা জেনেছি, খালেদা জিয়া এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। ফলে সংলাপ শুরু করার ক্ষেত্রে দৃশ্যত বাধা নেই। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে আগামী নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিতর্ক। যে ধরনের বা যে নামের সরকারের অধীনেই নির্বাচন হোক না কেন, নির্বাচনটি হতে হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ফলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও মতৈক্য খুবই জরুরি। কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেটা আসলে দুই পক্ষকে বসেই সমাধান করতে হবে, এ ক্ষেত্রে বাইরের কারও কিছু করার নেই।
বাংলাদেশে অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে এ ধরনের সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু তা কার্যত সফল হয়নি। এর ফলাফল কী হয়েছে, তা দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলকে স্মরণ করে দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। এবার দল দুটি অতীত থেকে শিক্ষা নেবে—সেটাই প্রত্যাশিত। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু আগেই সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন, এখন তা শুরু করার উদ্যোগও সরকারি দলকেই নিতে হবে। বিরোধী দলের উচিত হবে, সরকারি দলের এ ধরনের যেকোনো উদ্যোগে সাড়া দিয়ে আলোচনায় বসা। দুই পক্ষকেই এ ক্ষেত্রে খোলা মন নিয়ে বসতে হবে, তবেই সংলাপ অর্থবহ হবে, আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধানের পথ বের হয়ে আসবে। সংলাপের ব্যাপারে দুই পক্ষের ইতিবাচক মনোভাব যে লোক দেখানো নয়, এবং তারা যে দেশকে আরও বেশি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে চায় না, সেটা শুধু মুখে বললেই হবে না, কাজে তার প্রমাণ দিতে হবে।

মিনেসোটাতেও বৈধ

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে গত সোমবার সমলিঙ্গের বিয়েকে আইনগত বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে দেশটির ১২টি অঙ্গরাজ্যে সমলিঙ্গের বিয়েকে বৈধতা দেওয়া হলো। মিনেসোটার রাজধানী সেইন্ট পলে ৩৭ জন সিনেটর বিলটির পক্ষে এবং ৩০ জন বিপক্ষে ভোট দেন। অঙ্গরাজ্যের গভর্নর মার্ক ডেটন বিলটিতে সই করলে এটি আইনে পরিণত হবে। গতকাল মঙ্গলবারই তাঁর এতে সই করার কথা। গত ২ মে রোড আইল্যান্ডে সমলিঙ্গের বিয়ে বৈধ করা হয়। এরপর গত সপ্তাহে একই কাজ করে ডেলাওয়ার।

মুরসিকে উৎখাতে

মিসরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে উৎখাত এবং আগাম নির্বাচনের দাবিতে সরকারবিরোধীরা ২০ লক্ষাধিক নাগরিকের সই সংগ্রহ করেছেন। দুই সপ্তাহ আগে কায়রোর তাহরির স্কয়ারে মুরসির প্রতি অনাস্থা প্রকাশের জন্য বিরোধীরা সই সংগ্রহ শুরু করে। এই আন্দোলনের আয়োজকেরা বলছেন, যে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসি ক্ষমতায় এসেছেন, তার সাফল্যকে তিনি ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছেন।

জন কেরির ভাইও মার্কিন মন্ত্রিসভায় যোগ দিচ্ছেন

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ছোট ভাই ক্যামেরন কেরি ভারপ্রাপ্ত বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। মার্কিন মন্ত্রিসভায় দুই সহোদরের একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ঘটনা বিরল। ক্যামেরন কেরি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি জ্যেষ্ঠ দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আগামী ১ জুন থেকে ভারপ্রাপ্ত বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন। কারণ, বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী রেবেকা ব্ল্যাংক ওই পদ ছেড়ে দিচ্ছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রয়াত জন এফ কেনেডির আমলে তাঁর ভাই রবার্ট অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

রাশিয়ায় ‘সিআইএর চর’ পাকড়াও

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পক্ষে কাজ করার অভিযোগে গত সোমবার রাশিয়ায় এক মার্কিন নাগরিককে পাকড়াও করা হয়। তবে পরে তাঁকে মার্কিন কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস বলেছে, রায়ান ফগল নামের ওই ব্যক্তি মস্কোয় মার্কিন দূতাবাসের তৃতীয় সেক্রেটারি হিসেবে কর্মরত। তিনি রাশিয়ার একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। তাঁকে বিপুল পরিমাণ অর্থ, প্রযুক্তিগত কিছু যন্ত্র এবং ওই রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে লেখা কিছু নির্দেশনাসহ আটক করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

মালির পুনর্গঠনে অর্থ সংগ্রহে আজ সম্মেলন

উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির পুনর্গঠনে ২৪০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যে আজ বুধবার দাতা দেশগুলো ব্রাসেলসে সম্মেলনে বসবে। গতকাল মঙ্গলবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ ফ্যাবিউস এ কথা জানিয়েছেন। ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মালি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফ্রান্সের আরটিএল রেডিওকে লরাঁ ফ্যাবিউস বলেন, সবকিছুই ঠিকঠাকমতো চলছে এবং সম্মেলনে প্রায় ১০০ দেশ অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানও থাকবেন। এখন দরকার শুধু অর্থ সংগ্রহ করা। গত জানুয়ারিতে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ফ্রান্স তার সাবেক উপনিবেশ মালিতে সেনা পাঠায়। এর আগে দেশটিতে এক অভ্যুত্থানের পর ওই জঙ্গিবাদী যোদ্ধারা দেশটির উত্তরের বিস্তৃত মরু অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল। মালিতে আগামী জুলাইয়ে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। আশা করা হচ্ছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি সংকট থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে যাবে।

কুর্দিদের প্রথম দল তুরস্ক ছেড়েছে

একটি শান্তি পরিকল্পনার আওতায় কুর্দি বিদ্রোহীদের প্রথম দলটি গতকাল মঙ্গলবার তুরস্ক ছেড়ে ইরাকে প্রবেশ করেছে। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) ওই সদস্যরা ইরাক সীমান্তের মেতিনা পার্বত্য এলাকায় সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। এ ঘটনাকে ওই অঞ্চলের তিন দশকের পুরোনো বিদ্রোহের অবসানের পথে একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কুর্দি বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনাকে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এতে তাঁকে হয়তো আগামী বছর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে জাতীয়তাবাদীদের বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে। তবে বর্তমান জনমত জরিপ অনুযায়ী, এই শান্তি পরিকল্পনার প্রতি জনগণের একটা বড় অংশের সমর্থন রয়েছে। কারণ, এতে দেশটির ইরাক-ইরান-সিরিয়া সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা আসতে পারে।পিকেকের কারাবন্দী নেতা আবদুল্লাহ ওসালান গত মার্চে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। সংগঠনটির যোদ্ধারা গত সপ্তাহে তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে শুরু করে। জাতিগত সংঘাতে এ পর্যন্ত ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও তুরস্কের বিবেচনায় পিকেকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তুরস্কের বিশেষ বাহিনী ১৯৯৯ সালে ওসালানকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হলেও পরে তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তিত হয়। পিকেকের তিন থেকে চার হাজার যোদ্ধা বর্তমানে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় অবস্থান করছে। এ ছাড়া তুরস্কের অভ্যন্তরে রয়েছে আরও প্রায় দুই হাজার যোদ্ধা। তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কুর্দিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে পিকেকের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

পরাজয়ের দায় স্বীকার গিলানির

নির্বাচনে পরাজয়ের দায়িত্ব স্বীকার করে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি। অন্যদিকে পিপিপির মধ্য পাঞ্জাবের প্রেসিডেন্ট জ্যেষ্ঠ নেতা মনজুর ওয়াট্টু পদত্যাগ করেছেন। গত শনিবারের নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে সদ্য ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানো পিপিপির। জাতীয় পরিষদের মাত্র ৩৩ আসনে জয় পেয়েছে দলটি। নির্বাচনের পরপরই পদত্যাগের মিছিল শুরু হয়েছে। উল্লিখিত দুই নেতা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত শেরি রেহমান পদত্যাগ করেছেন। দীর্ঘ সময় পিপিপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। গত সোমবার মুলতানে এক সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে গিলানি বলেন, ‘একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি দলের পরাজয়ের দায়িত্ব স্বীকার করে নিচ্ছি। নির্বাচনে পিপিপির বাজে ফলাফলের জন্য বিলাওয়াল দায়ী নন।’ গিলানি বলেন, তিনি নিজে থেকেই নির্বাচনের ফলাফল মাথায় রেখে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গিলানি বলেন, পাঞ্জাবের দক্ষিণাঞ্চলে পিপিপির পরাজয়ের কারণ হচ্ছে, এই অঞ্চলের মানুষের নতুন প্রদেশ গঠনের দাবি পূরণ করতে না পারা।এদিকে জাতীয় পরিষদের আসনে পিএমএল-এনের রাও মুহাম্মদ আজমল খানের কাছে হেরে যাওয়া পিপিপির মধ্য পাঞ্জাবের প্রেসিডেন্ট মনজুর ওয়াট্টু পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বলেন, পদ ধরে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি ইতিমধ্যে পদত্যাগপত্র দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

মোশাররফের রিমান্ডের মেয়াদ বাড়ল

বেনজির ভুট্টো হত্যা মামলায় পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফের গৃহবন্দিত্বের মেয়াদ আরও ১৪ দিন বাড়িয়েছেন সন্ত্রাসবিরোধী আদালত। সরকারপক্ষের আইনজীবী চৌধুরী আজহার বার্তা সংস্থা এএফপিকে গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের ওই আদালত মোশাররফের জামিন আবেদন ২০ মে পর্যন্ত মুলতবি রেখেছেন। আর বিচার বিভাগীয় রিমান্ড ২৮ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ওই দিন শুনানি আবার শুরু হবে। মোশাররফের আইনজীবী শুনানিতে উপস্থিত না থাকতে পারায় আদালত এ মুলতবি আদেশ দেন।  রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী চৌধুরী জুলফিকার আলী গুলিতে নিহত হওয়ার পর এটিই ছিল এ মামলায় প্রথম শুনানি। আদালতে যাওয়ার পথে ৩ মে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বেনজির হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগের বিচারের পর মোশাররফকে জরুরি অবস্থার সময়ে ২০০৭ সালে বিচারকদের পদচ্যুত করা ও ২০০৪ সালে বেলুচ নেতা হত্যার অভিযোগে বিচারের সম্মুখীন হবেন।

স্তন অপসারণ করলেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি

ঝুঁকিপূর্ণ জিনের কারণে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় উভয় স্তনই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করেছেন অস্কার বিজয়ী হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়  গতকালমঙ্গলবার ‘মাই মেডিকেল চয়েস’ শীর্ষক এক লেখায় এ খবর জানিয়েছেন ৩৭ বছর বয়সী জোলি। জনপ্রিয় অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির মা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। মায়ের সেই ক্যানসারের জিন জোলির শরীরে ধরা পড়ার পর চিকিৎসকেরা বলেন, তাঁর স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ৮৭ শতাংশ এবং ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশ। জোলি বলেছেন, মায়ের মতো অল্প বয়সে মারা না গিয়ে নিজের সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকতে চান তিনি। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই উভয় স্তন অপসারণের সাহসী সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিউইয়র্ক টাইমস-এ জোলি লিখেছেন, ‘আমরা প্রায়ই আমার মায়ের মৃত্যু নিয়ে কথা বলি। তিনি যে অসুখে মারা গেছেন, তা সন্তানদের বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি। ওরা জানতে চায়, আমারও একই অসুখ হতে পারে কি না। আমি সব সময় বলতাম, ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমার শরীরে সেই সমস্যাযুক্ত জিনটি আছে।’ লারা ক্রফট: টুম রেইডার, চেঞ্জলিং, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস স্মিথ-এর মতো আলোচিত ছবির নায়িকা জোলি বলেন, ‘যখন জানতে পারলাম এটাই বাস্তবতা, তখন আমি যতটা সম্ভব ঝুঁকি কমানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। দুটি স্তনই অপসারণের মাধ্যমে ক্যানসার ঠেকানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম।’ জোলি জানান, জীবনসঙ্গী আরেক হলিউড তারকা ব্র্যাড পিট এই পুরোটা সময় তাঁর পাশে থেকে সমর্থন জুগিয়ে গেছেন। গত এপ্রিলের শেষ দিকে তিন মাসের অস্ত্রোপচারজনিত প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন জোলি। ক্যানসার নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা দূর করা এবং অন্য নারীদেরও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসায় উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে নিজের চিকিৎসার কথা প্রকাশ করছেন বলে জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। তিনি বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের ওই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ ছিল না। কিন্তু এটা করতে পেরে আমি খুবই খুশি। চিকিৎসার পর স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি এখন ৮৭ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।’

সিরিয়ার বিষয়ে অগ্রসর হতে রাশিয়াকে নতুন করে চাপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সিরিয়ার বিষয়ে অগ্রসর হতে রাশিয়াকে নতুন করে চাপ দিয়েছেন। গত সোমবার হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকের পর তাঁরা সিরিয়ার বিষয়ে রাশিয়ার প্রস্তাবিত নতুন শান্তি সম্মেলন নিয়ে কথা বলেন। এদিকে সিরিয়া বলেছে, তারা রাশিয়ার প্রস্তাবিত শান্তি সম্মেলনে যোগ দেবে কি না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওই সম্মেলনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চায়। ওয়াশিংটনে ডেভিড ক্যামেরন বলেন, সিরিয়ার হত্যাযজ্ঞ থামাতে বিশ্বকে জরুরি ভিত্তিতে একাত্ম হতে হবে। সিরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া সফর থেকে সবেমাত্র ফেরা ক্যামেরন বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, সিরীয় সংকটের বিষয়ে ওয়াশিংটন, লন্ডন ও মস্কো একটা ‘সাধারণ ভিত্তি’ খুঁজে পেয়েছে। ওবামা বলেন, সিরীয় সংঘাতের ইতি টানতে রাশিয়ার ‘আগ্রহের পাশাপাশি বাধ্যবাধকতাও’ রয়েছে। ওবামা জানান, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির মস্কো সফর সামনে রেখে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এ বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গতকাল ঝটিকা সফরে মস্কো যাওয়ার কথা। সিরিয়াকে মস্কোর অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে নেতানিয়াহু বৈঠক করবেন পুতিনের সঙ্গে। ‘আসাদের ভূমিকা চাই না’: পাঁচটি আরব দেশ ও তুরস্ক আবারও বলেছে, ভবিষ্যৎ সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মিসর, জর্ডান, কাতার ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সোমবার রাতে আবুধাবিতে এক বৈঠকে মিলিত হন। খবরে বলা হয়, এই মন্ত্রীরা ততক্ষণ পর্যন্তই সিরিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল-সংক্রান্ত ২০১২ সালের জেনেভা পরিকল্পনাকে সমর্থন করবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে যে ভবিষ্যৎ সিরিয়ায় আসাদ ও তাঁর রক্তে রঞ্জিত সহযোগীদের কোনো স্থান থাকবে না। ভিডিও নিয়ে বিতর্ক: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় একটি ভিডিওচিত্র প্রচারিত হয়েছে, যাতে দেখা যাচ্ছে, এক ব্যক্তি (দৃশ্যত বিদ্রোহী যোদ্ধা) সিরিয়ার সরকারি এক সেনার হূৎপিণ্ড কেটে বের করে খাচ্ছে। বীভৎস ওই ভিডিওচিত্র নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হবে আমার সরকারের প্রধান কাজ

পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) দলের প্রধান নওয়াজ শরিফ বলেছেন, জাতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পুনরুদ্ধারই হবে তাঁর সরকারের প্রধান কাজ। গতকাল মঙ্গলবার বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়ে নওয়াজ শরিফ বলেন, অর্থনীতি চাঙা করা গেলে তা উগ্রপন্থা, সন্ত্রাসবাদ, দুর্নীতি, দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন সমস্যা দূর করায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এক প্রশ্নের জবাবে নওয়াজ শরিফ বলেন, তিনি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সব দলের সঙ্গে কাজ করবেন। সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থনীতি শক্তিশালী করায় সহযোগিতা করতে সব দলকে আহ্বান জানাবেন। নওয়াজ শরিফ আরও বলেন, বিভিন্ন প্রদেশে যেসব দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছে, সেখানে সরকার গঠনের অধিকার তাদের রয়েছে। তাঁর সরকার এসব প্রাদেশিক সরকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। হবু প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংলাপের ব্যাপারে তালেবান যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক প্রসঙ্গে নওয়াজ শরিফ বলেন, দুই দেশের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করা হবে। এর মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তাঁর সরকার সুসম্পর্ক অব্যাহত রাখবে। এদিকে, গত সোমবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে নওয়াজ শরিফের অঙ্গীকারের  প্রশংসা করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে। টেলিফোনে আলাপকালে দুই নেতা ‘জোরালো সম্পর্ক’ অব্যাহত রাখার ব্যপারে একমত হন। এ ছাড়া আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান—এই ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের ব্যাপারেও তাঁরা একমত হন। ইমরানের অভিযোগ: এদিকে সদ্য সমাপ্ত সাধারণ নির্বাচনের ভোট গ্রহণে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রধান ইমরান খান। তাঁর অভিযোগ, অন্তত ২৫ আসনে কারচুপি হয়েছে। তিনি এসব আসনের ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছেন। পিটিআই বলেছে, তাদের দলের নির্বাচনী অভিযোগ সেল ইতিমধ্যে প্রায় আট হাজার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছে। ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়ে পিটিআইয়ের নেতা-কর্মীরা গতকাল মঙ্গলবার পাকিস্তানের কয়েকটি শহরে অবস্থান ধর্মঘট করেন। ইমরান খান বলেছেন, তাঁর দল শিগগিরই নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ সংবলিত একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে। হাতে পাওয়া ‘ব্যাপক ভোট জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ’ নিয়ে আলোচনা করতে পিটিআইয়ের পাঞ্জাব অঞ্চলের নেতারা লাহোরে তাঁদের সংসদীয় দলের সভা ডেকেছেন। এ ছাড়া দলের সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা লাহোরের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি এলাকাসহ পাঞ্জাব প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ইমরান?: নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ইমরান খানকে পার্লামেন্টের দুর্নীতি নজরদারি কর্তৃপক্ষ পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিতে পারে। দলীয় সূত্র ডন পত্রিকাকে বলেছে, নওয়াজ তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করছেন। পিটিআইয়ের নেতা সাবেক ক্রিকেটার ইমরানের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা।