Showing posts with label বইপত্র. Show all posts
Showing posts with label বইপত্র. Show all posts

Thursday, July 30, 2026

মা তুলে রেখেছিলেন সুপারম্যান কমিকসের কপি, বিক্রি হলো ১১১ কোটি টাকায়

প্রকাশ ২৪ নভেম্বর ২০২৫ঃ গত ২০২৪ বড়দিনের সময়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজ বাড়ির চিলেকোঠা ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করছিলেন তিন ভাই। ঘরটির এক কোণে ছিল পুরোনো সংবাদপত্রের স্তূপ। তা সরাতেই বেরিয়ে এল ধুলায় ঢাকা একটি কার্ডবোর্ডের বাক্স। চারপাশে মাকড়সার জাল। পরিষ্কার করার পর বাক্সটিতে যা মিলেছিল, নিমেষেই তা বদলে দিয়েছে তিন ভাইয়ের ভাগ্য।

ওই বাক্সের মধ্যে ছিল কমিকসের মোট ছয়টি বই। সেগুলোর একটি অতিমানব চরিত্র ‘সুপারম্যান’–এর প্রথম সংস্করণ। প্রকাশ করা হয়েছিল ১৯৩৯ সালের জুন মাসে। কমিকসের ওই বইটি সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন তিন ভাইয়ের প্রয়াত মা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন মহামন্দা চলছিল, তখন বইটি কিনেছিলেন ওই নারী ও তাঁর ভাই।

পুরোনো বিরল জিনিসের কদর বিশ্বজুড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে এ নিয়ে আগ্রহ আরও বেশি। তাই তো সুপারম্যান কমিকসের প্রথম সংস্করণটি বিক্রির জন্য লুফে নিয়েছিল টেক্সাসের নিলামকারী প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ। সেখানে গত বৃহস্পতিবার বইটি বিক্রি হয়েছে ৯১ লাখ ২০ হাজার ডলারে। বাংলাদেশের হিসাবে তা ১১১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। এত দামে কখনোই কোনো কমিকসের বই বিক্রি হয়নি।

অবিশ্বাস্য এই দাম পাওয়ার কারণ শুধু বইটি পুরোনো ও বিরল, তা নয়। সেটি বেশ নিখুঁত অবস্থায়ও ছিল। অক্ষত থাকার কারণেই কমিকসের মান নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান সিজিসি সুপারম্যানের বইটিকে ১০–এর মধ্যে ৯ দিয়েছে। আগে অন্য একটি কমিকসের বইয়ের সর্বোচ্চ রেটিং ছিল ৮ দশমিক ৫। আর এর আগে সুপারম্যানের আরেকটি কমিকসের বই নিলামে বিক্রি করে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ ডলার পাওয়া গিয়েছিল।

যে তিন ভাই সুপারম্যানের ওই কমিকসটি নিলামে তুলেছিলেন, তাঁরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি। তাঁদের বয়স পঞ্চাশ ও ষাটের কোঠায়। আর বইটি পাওয়ার পরপরই তাঁরা বিক্রির জন্য তাড়াহুড়া করেননি। বরং কয়েক মাস অপেক্ষার পর হেরিটেজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই সান ফ্রান্সিসকোয় তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন হেরিটেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট লন অ্যালেন।

সুপারম্যানের বইটি এত দামে বিক্রিকে হেরিটেজ উল্লেখ করেছে ‘কমিসক বিক্রি করে সর্বোচ্চ সাফল্য’ হিসেবে। লন অ্যালেন বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার ওই ভাইদের মা তাঁদের বলেছিলেন যে তাঁর কাছে মূল্যবান কমিকস আছে। তবে সেগুলো কখনোই দেখাননি। আর উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার শীতল আবহাওয়ায় পুরোনো কাগজপত্র টিকে থাকে। টেক্সাসের মতো আবহাওয়া হলে অনেক আগেই নষ্ট হয়ে যেত।

মায়ের সংরক্ষণ করা এই কমিকস নিয়ে কথা বলেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার তিন ভাইয়ের সবচেয়ে কনিষ্ঠজন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই করতে করতে লড়াইটায় জীবনের মূল জায়গাটা দখল করে নিয়েছিল। ফলে অনেক যত্ন করে তুলে রাখা কমিকসের বাক্সটির কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। অন্তত গত বছরের বড়দিন পর্যন্ত এর অস্তিত্বের কথা আমরা জানতাম না।’

নিলামকারী প্রতিষ্ঠান হেরিটেজের মাধ্যমে ওই ভাই আরও বলেন, ‘এটি শুধু কাগজের ওপর কালি দিয়ে লেখা গল্প নয়। এটি কখনোই শুধু সংগ্রহের একটি বিষয় ছিল না। অতীত স্মৃতি যে অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদের কাছে ফিরে আসতে পারে, এটি তার একটি প্রমাণ।’

সুপারম্যান কমিকসের প্রথম সংস্করণের এই কপিটি বিক্রি হয়েছে ১১১ কোটি টাকায়
সুপারম্যান কমিকসের প্রথম সংস্করণের এই কপিটি বিক্রি হয়েছে ১১১ কোটি টাকায়। ছবি: হেরিটেজ অকশনের সৌজন্যে

Tuesday, July 21, 2026

বিবলিওথেরাপি: বইয়ের মাধ্যমে মনের আরোগ্য by সরদার আব্দুল মতিন

মানুষের জীবনে মানসিক সুস্থতা ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা শারীরিক সুস্থতা। আজকের দ্রুতগতির তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও একাকিত্ব যেন এক অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘বিবলিওথেরাপি’ বা বইয়ের মাধ্যমে মানসিক আরোগ্য একটি প্রাচীন অথচ আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুনরুজ্জীবিত ধারণা হিসেবে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে।

‘বিবলিওথেরাপি’ শব্দটি এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ থেকে—‘বিবলিও’ অর্থাৎ ‘বই’ এবং ‘থেরাপিয়া’ অর্থাৎ ‘চিকিৎসা’। সহজভাবে বলতে গেলে, বিবলিওথেরাপি হলো এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে বই পড়ার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি, আত্মজ্ঞান ও আবেগীয় ভারসাম্য ফিরে পাওয়া যায়। এটি শুধু গল্প বা উপন্যাস পড়া নয়, বরং পাঠকের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বই বা সাহিত্য নির্বাচনের মাধ্যমে তার চিন্তা ও অনুভূতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো।

আমেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনের (এএলএ) দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী, বিবলিওথেরাপি হলো চিকিৎসা ও মনোরোগবিদ্যায় থেরাপিউটিক সহায়ক হিসেবে নির্বাচিত পাঠ উপকরণের ব্যবহার এবং নির্দেশিত পাঠের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানে নির্দেশনা।

স্যামুয়েল জনসন যথার্থই বলেছিলেন, ‘আ রাইটার অনলি বেগিন আ বুক; আ রিডার ফিনিশেস ইট’ বিবলিওথেরাপি কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের নিরাময় নয়, এটি নতুন করে বেঁচে থাকার মন্ত্র। একটি ভালো বই যে আলো জ্বালাতে পারে, তা কোনো ওষুধ বা পরামর্শ হয়তো পারে না।

বিবলিওথেরাপির ইতিহাস

বিবলিওথেরাপির শিকড় অনেক প্রাচীন। প্রাচীন গ্রিসে ‘থিবস’ শহরের গ্রন্থাগারের প্রবেশদ্বারে একটি শিলালিপি ছিল—‘হিলিং প্লেস ফর দ্য সোল’, অর্থাৎ ‘এটি আত্মার আরোগ্যের স্থান।’ প্রাচীন মিসরের রাজা দ্বিতীয় রামেসিস তাঁর লাইব্রেরির দরজায় লিখে রেখেছিলেন ‘আত্মা নিরাময়ের ঘর’ এগুলোই ইঙ্গিত দেয় যে মানুষ বহু আগে থেকেই বইকে মনের চিকিৎসা হিসেবে দেখত।

আধুনিক অর্থে ‘বিবলিওথেরাপি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৯১৬ সালে স্যামুয়েল ম্যাককর্ড ক্রোথারস ফোনেটিক নামক একজন আমেরিকান ধর্মযাজক, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদের প্রবন্ধে। ১৯৪১ সালে ডরল্যান্ডস মেডিকেল ডিকশনারিতে বিবলিওথেরাপি মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার অংশ হিসেবে স্বীকৃত পায়। তবে বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে এটি মনস্তত্ত্ব ও সমাজচিকিৎসার অংশ হিসেবে সুসংগঠিত রূপ পরিগ্রহ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিবলিওথেরাপির প্রয়োগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা শুধু মানুষের দেহ নয়, মনকেও ক্ষতবিক্ষত করেছিল। যুদ্ধ শেষে হাজার হাজার আহত ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত সৈনিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিল। অনেকের মধ্যে হতাশা, অপরাধবোধ, ভয় ও যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাত (পোস্ট–ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার–পিটিএসডি) দেখা দেয়।

এ সময় ইউরোপ ও আমেরিকার হাসপাতালগুলোতে বিশেষভাবে ‘হসপিটাল লাইব্রেরিস’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রশিক্ষিত গ্রন্থাগারিক ও মনোবিজ্ঞানীরা সৈনিকদের জন্য মানসিক প্রশান্তিদায়ক বই বেছে দিতেন। গল্প, আত্মজীবনী, ভ্রমণকাহিনি, কবিতা ও ধর্মগ্রন্থ—এসব বই পাঠের মাধ্যমে সৈনিকদের মনে আশার আলো জ্বালানো হতো।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হাসপাতালগুলোতে ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ‘বিবলিওথেরাপি প্রোগ্রাম’ চালু করা হয়। গ্রন্থাগারিকেরা রোগীর মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে বইয়ের তালিকা তৈরি করতেন। উদাহরণস্বরূপ—যেসব সৈনিক ভয়ের কারণে কথা বলতেন না, তাঁদের দেওয়া হতো সাহসিকতা ও আত্মবিশ্বাসের গল্প; যাঁরা পরিবার হারিয়ে একাকিত্বে ভুগতেন, তাঁদের দেওয়া হতো মানবিক সম্পর্ক ও সহানুভূতির গল্প। ফলাফল ছিল আশাজাগানিয়া—অনেক সৈনিক তাঁদের হতাশা কাটিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এই সফলতার কারণেই বিবলিওথেরাপি পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যচিকিৎসার স্বীকৃত অংশে পরিণত হয়।

বিবলিওথেরাপির ধরন

বিবলিওথেরাপি সাধারণত দুটি প্রধান ধরনে প্রয়োগ করা হয়—

১. ক্লিনিক্যাল বিবলিওথেরাপি: এটি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এখানে রোগীর মানসিক সমস্যার ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বই বেছে দেওয়া হয়। পড়ার পর থেরাপিস্ট রোগীর প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পরামর্শ দেন। এটি হতাশা, উদ্বেগ, পিটিএসডি বা আচরণগত সমস্যায় ভুগছেন, এমন রোগীদের জন্য কার্যকর।

২. স্ব-সহায়ক বা উন্নয়নমূলক বিবলিওথেরাপি: এখানে পাঠক নিজের ইচ্ছায় এমন বই বেছে নেন, যা তাকে অনুপ্রাণিত করে বা আত্মোন্নয়নে সহায়তা করে। যেমন আত্মজীবনী, প্রেরণাদায়ক সাহিত্য বা আধ্যাত্মিক বই।
বিবলিওথেরাপি কেন মানসিক রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ

মানুষের মন এমন এক জটিল ক্ষেত্র, যেখানে প্রত্যেকের যন্ত্রণা ও প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। কিন্তু সাহিত্য, গল্প বা কবিতার মাধ্যমে মানুষ নিজের মতো করে আরেক জীবনের সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পায়। এটাই বিবলিওথেরাপির মূল জাদু।

১. সহমর্মিতা জাগায়: গল্পের চরিত্রের সঙ্গে পাঠক নিজের অনুভূতির মিল খুঁজে পায়। এতে একাকিত্ব কমে, সহমর্মিতা বাড়ে এবং নিজের সমস্যাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়।

২. আবেগ প্রকাশে সাহায্য করে: অনেকেই নিজের ব্যথা বা ভয় প্রকাশ করতে পারেন না। কিন্তু কোনো বইয়ের চরিত্র যখন সেই অনুভূতি প্রকাশ করে, পাঠক মানসিকভাবে মুক্তি পেতে শুরু করেন।

৩. আত্মজ্ঞান বৃদ্ধি করে: পাঠক নিজের চিন্তা ও আচরণ নিয়ে ভাবতে শেখে। এতে আত্মবিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়ে এবং মানসিক ভারসাম্য ফিরে আসে।

৪. স্ট্রেস কমায়: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পাঠ মানসিক চাপ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। বই পড়া মস্তিষ্কে প্রশান্তি আনে, হার্টরেট ও টেনশন হরমোন কমায়।

৫. আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে: ইতিবাচক গল্প বা প্রেরণাদায়ক বই মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালায়। এতে জীবনের প্রতি বিশ্বাস ও আশাবাদ বাড়ে।

আধুনিক যুগে বিবলিওথেরাপির পুনর্জাগরণ

একুশ শতকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘রিডিং ফর ওয়েল–বিয়িং’ বা ‘বুকস অন প্রেসক্রিপশন’ নামে জাতীয় পর্যায়ের বিবলিওথেরাপি প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—যুক্তরাজ্যে ২০১৩ সালে ‘রিডিং ওয়েল’ উদ্যোগ নেওয়া হয়, যেখানে ডাক্তাররা রোগীদের নির্দিষ্ট বই পড়ার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু আমাদের দেশে মনোরোগ চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই সীমিত। এ অবস্থায় বিবলিওথেরাপি একটি কার্যকর, সাশ্রয়ী ও মানবিক সমাধান হতে পারে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক লাইব্রেরিতে ‘রিডিং থেরাপি কর্নার’ স্থাপন করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য ইতিবাচক পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। লাইব্রেরিয়ানরা প্রশিক্ষিত হয়ে মানসিক অবস্থা অনুযায়ী বই সুপারিশ করতে পারেন।

বিবলিওথেরাপি মানুষের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলার এক নীরব শক্তি। বই মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু—তা শুধু জ্ঞান দেয় না, মনের গভীরে শান্তির আলো জ্বালায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের মনোবল পুনরুদ্ধারের ইতিহাস যেমন প্রমাণ করেছে, তেমনি আজও বই হতে পারে একাকী বা হতাশ মানুষের শ্রেষ্ঠ নিরাময়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-23%2Fzyc9qduq%2FWhatsApp-Image-2025-11-23-at-20.10.13.jpeg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গ্রাফিকস: এআই/প্রথম আলো

Friday, June 19, 2026

রিগ্যান থেকে ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের পতন ও চীনের উত্থানের গল্প by মুহাম্মদ তাসনীম আলম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দুই পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের এক নম্বর শক্তি। কিন্তু তাদের সেই স্থান দখল করতে যাচ্ছে চীন। সিঙ্গাপুরের সাবেক কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ এবং ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ কিশোর মাহবুবানি ‘দ্য এশিয়ান টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ে বিশ্বশক্তি হিসেবে ওয়াশিংটনের পতন এবং বেইজিংয়ের উত্থানের গল্প বলেছেন। সেই বই নিয়ে আমাদের এই পর্যালোচনা।

চলতি শতাব্দীর শুরুটা কেমন ছিল, তা গভীরভাবে ভাবলে আমাদের অনেকের মনে হয়তো ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার কথা মনে পড়ে। কিন্তু ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর নীরবে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল, যার ফলাফলকে ভূরাজনীতির অনেক বিশেষজ্ঞ নাইন–ইলেভেনের হামলার ঘটনার চেয়েও বেশি সুদূরপ্রসারী বলে মনে করেন। তা হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) চীনের পদার্পণ।

অবশ্য ডব্লিউটিওর সদস্য হওয়ার আগে থেকে কিছুটা বড় পরিসরে চীনের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক পরিসরে উন্মুক্ত হতে শুরু করেছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সদস্য হওয়ায় তাতে রীতিমতো হাইপারসনিক গতি যুক্ত হয়। ২০২০ সাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ৪০ বছরে দেশটির প্রায় ৮০ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উঠে আসে।
এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম মধ্যবিত্ত শ্রেণির দেশে পরিণত হয়েছে কমিউনিস্ট (সিপিসি) শাসিত চীন। এই বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোক্তা গোষ্ঠী নিয়ে দেশটির খুচরা বাজার যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। এই সুবিশাল ভোক্তা গোষ্ঠীই চীনের অর্থনীতির প্রাণভোমরা।

তবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এখনো ছোট। ২০২৪ সালে চীনের মোট জিডিপি (নমিনাল) ছিল ১৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের মোট জিডিপি ছিল ২৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু বর্তমানে যে গতিতে বেইজিংয়ের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, তাতে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে মার্কিন অর্থনীতিকে টপকে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি হয়ে যেতে পারে চীন।

মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য এন্ড অব হিস্টোরি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান’ বইয়ে একটি বাঁক পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তিনি দাবি করেন, সোভিয়েত রাশিয়ার বিলুপ্তি এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা সভ্যতা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের শেষ ধাপে পৌঁছেছে। তাই পশ্চিমা সমাজের নতুন বিশ্বের সঙ্গে বড় ধরনের কাঠামো ও কৌশলগত বোঝাপড়া করার কোনো দরকার নেই; বরং পশ্চিমা বিশ্বের বাইরের সমাজকেই প্রতিনিয়ত সমন্বয় ও সমঝোতা করতে হবে।

কিন্তু এই ‘একগুঁয়ে’ ও ‘দাম্ভিক’ সিদ্ধান্ত পশ্চিমাদের পতন ডেকে আনে। পশ্চিমাদের আত্মতুষ্টির ‘মহাঘুমের’ এই কালে চীন ও ভারত ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। পুরোনো এই দুই শক্তি চলে আসতে শুরু করছে বিশ্বমঞ্চের কেন্দ্রে।

সিঙ্গাপুরের বিশিষ্ট কূটনীতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ কিশোর মাহবুবানির ‘দ্য এশিয়ান টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ের পাতায় পাতায় এ রকম তথ্য-উপাত্তের অনেক সরস বিশ্লেষণ দেখা যায়। তাঁর মতে, চলতি শতাব্দী এশিয়ার। এশিয়ার নেতৃত্বেই আগামী ১০০ বছর বিশ্ব, বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতি পরিচালিত হবে।

চীন হবে এই বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চালক। ভারত হবে দ্বিতীয় প্রধান নিয়ামক। কোয়াডের মতো সামরিক কোনো জোট নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় আঞ্চলিক জোট (আসিয়ান) এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিস্তৃত ও প্রগতিশীল অংশীদারত্ব চুক্তির (সিপিটিপিপি) মতো অর্থনৈতিক জোট হবে নতুন শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক শক্তি।

২০২১ সালে সিঙ্গাপুরের প্রকাশনা সংস্থা ‘স্প্রিঙ্গার নেচার’ থেকে প্রকাশিত মাহবুবানির কিছু ছোট-বড় প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকারের সংকলন ‘দ্য এশিয়ান টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ে তাঁর একটি প্রধান অনুসিদ্ধান্ত হলো: চলতি শতাব্দীর অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নেতৃত্ব এশিয়ার হাতে, এর ব্যত্যয় হওয়ার তেমন একটা সুযোগ নেই। তাই পুরো বিশ্বের কল্যাণের কথা চিন্তা করে পশ্চিমাদের এই বাস্তবতা মেনে নেওয়াই শ্রেয়। ‘হ্যাজ দ্য ওয়েস্ট লস্ট ইট?’ কিংবা ‘হ্যাজ চায়না ওআন?’ বইয়ে মাহবুবানি নিজের ধারণাগুলোর আরও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

গত বছর প্রকাশিত মাহবুবানির আত্মজীবনী ‘লিভিং দ্য এশিয়ান সেঞ্চুরি: অ্যান আনডিপ্লোমেটিক মেমোয়ার’ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ২৪ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে একটি অভিবাসী সিন্ধিভাষী হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। নিজের আত্মজীবনীতে শৈশব-কৈশোরের দারিদ্র্যের বেড়াজাল ছিন্ন করে কীভাবে দেশ-বিদেশের অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাঁর জীবনের সঙ্গে এশিয়ার উত্থান-পতন কীভাবে যুক্ত, সেসবের মুগ্ধকর বর্ণনা দিয়েছেন মাহবুবানি।

মাহবুবানির মতে, খ্রিষ্টাব্দ ১ থেকে ১৮২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলো ছিল এশিয়ায়—কখনো চীন, কখনো ভারত। কিন্তু ঘটনাক্রমে পরবর্তী ২০০ বছরের নেতৃত্ব পশ্চিমাদের হাতে চলে যায়। নেতৃত্ব পেয়ে পশ্চিমারা চীন ও ভারতের মতো কয়েক হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছে, বিভিন্নভাবে তাদের অপমানিত করেছে। সুখবর হলো, এই দিন শেষ হতে চলেছে।

পশ্চিমাদের নেতৃত্ব কীভাবে অস্তগামী হতে চলেছে, তার প্রাঞ্জল বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি গত ২০০ বছরে কতটা চমকপ্রদভাবে তারা উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল, সেটারও হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দিয়েছেন মাহবুবানি। তিনি বলেন, ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার পর গত আড়াই শ বছরে অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মানব জাতির ইতিহাসে এমনটি আর কখনো দেখা যায়নি।

পশ্চিমাদের দান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ঘিরে নিয়মনীতি-ভিত্তিক যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সেটার প্রায় সবকিছু পশ্চিমা সভ্যতার দান—এ কথা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেন মাহবুবানি। তিনি মনে করেন, পশ্চিমাদের এসব প্রতিষ্ঠানের কারণেই মানব জাতি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে রক্ষা পেয়েছে।

তবে নিজেদের অসংগতি, দ্বিচারিতা ও কপটতা উন্মোচনে পশ্চিমা পণ্ডিত ও সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তা ভয়ংকর বলে মনে করেন ২০০১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০২ সালের মে মাস পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী সিঙ্গাপুরের সাবেক এই কূটনীতিক।

তবে জর্জ এফ কেনান ও হেনরি কিসিঞ্জারের মতো প্রয়াত ঝানু মার্কিন কূটনীতিক এবং জন এফ কেনেডি ও বিল ক্লিনটনের মতো প্রেসিডেন্টের প্রশংসা করে থাকেন মাহবুবানি। আলোচ্য বইটির অসংখ্য জায়গায় তিনি বলেছেন, সোভিয়েত রাশিয়াকে বন্দুকের একটি দানাও খরচ না করে ভেঙে দেওয়ার বড় কৃতিত্ব জর্জ কেনানের। কারণ, সোভিয়েত রাশিয়াকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়নে ওয়াশিংটনকে তিনিই সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছিলেন।

জর্জ কেনান (১৯০৪-২০০৫) ১৯৪৭ সালে তাঁর ‘দ্য সোর্সেস অব সোভিয়েট কন্ডাক্ট’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে বিশ্ববাসীর মধ্যে কিছু প্রয়োজনীয় ধারণা তৈরি করতে পারছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ধারণাগুলো হলো, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ, যেটি জানে তার কী দরকার, যে নিজের সমস্যাগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করতে এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে অর্পিত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করতে পারছে। যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ, যার এমন একটি “আধ্যাত্মিক জীবনীশক্তি” রয়েছে, যার মাধ্যমে দেশটি সমসাময়িক প্রধান মতাদর্শগুলোর মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে।’

‘আধ্যাত্মিক সংকটে’ পশ্চিমা বিশ্ব

মাহবুবানির মতে, জর্জ কেনান ‘আধ্যাত্মিক জীবনীশক্তি’ বলতে মার্কিন নাগরিকদের ধর্মভাবকে বোঝাননি; বরং তিনি দেশটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সামর্থ্যের কথা বুঝিয়েছেন।

মাহবুবানি মনে করেন, নিজ দেশের ধনী-গরিব বৈষম্য, দেশে দেশে সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ বা সরকার পতনের নেতৃত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জাতি হিসেবে আধ্যাত্মিক সংকটের মুখে পড়েছে।

এই কূটনীতিকের ধারণা, কেনান জীবিত থাকলে টুইন টাওয়ারে হামলার প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৫ লাখ কোটি ডলার যুদ্ধের বিরোধিতা করতেন। এর বদলে এই অর্থ মার্কিন নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয়ের পরামর্শ দিতেন। এমনকি মৃত্যুর দুই বছর আগে ২০০৩ সালে ইরাকে হামলারও বিরোধিতা করেছিলেন জর্জ কেনান।

মধ্যপ্রাচ্যে ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র যখন ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ লাখ লাখ কোটি ডলার ব্যয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখন নজিরবিহীন গতিতে নিজেদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করে চলেছে চীন। ২০২০ সাল পর্যন্ত আগের ৪০ বছরে চীন অর্থনৈতিকভাবে যতটা এগিয়েছে, প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতাটির ইতিহাসে এমনটি আর কখনো ঘটেনি।

অন্যদিকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ৩০ বছরে বিশ্বে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। কিন্তু একই সময়ে দেশটির ধনী ও অতিধনী ১ শতাংশ মানুষের আয় লাগামহীনভাবে বেড়েছে। ফলে মার্কিন শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সীমাহীন অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

২০১৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী মার্কিন অধ্যাপক অ্যাংগাস ডিটন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে ‘হতাশার সাগর’ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী দেশটির আরেক অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই. স্টিগলিৎস ও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান পল ভল্কারের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রে এখন আর গণতন্ত্র নেই, যা চলছে তা প্লুটোক্রেসি বা ধনিক শ্রেণির শাসন।

রিগ্যানবাদের খেসারত

এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ধনকুবের ব্যবসায়ী প্রথমবারের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পতন শুরু হয়েছিল আরেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের (১৯৮১-১৯৮৯) হাত ধরে। রিগ্যান প্রশাসনের কর হ্রাস, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং বাজার সংস্কারের ফলে উচ্চ আয়ের মানুষ ও করদাতাদের সুবিধা বৃদ্ধি পেলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থার অবনতি ঘটে, আর্থিক বৈষম্য বৃদ্ধি করে।

১৯৮১ সালে অভিষেক অনুষ্ঠানে রিগ্যান বলেছিলেন, ‘সরকার আমাদের সমস্যার সমাধান নয়, বরং খোদ সরকারই সমস্যা।’ তাঁর সরকারের গৃহীত নীতি রিগ্যানবাদ নামে পরিচিত।

প্রায় একই সময়ে যুক্তরাজ্যে একই ধরনের নীতি শুরু করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার। রিগ্যান-থ্যাচারের নীতির কারণে বাজারের ‘অদৃশ্য হাতের’ জোরের কাছে সরকারের ‘দৃশ্যমান হাত’ দুর্বল হতে থাকে। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামের মতো চীনও অদৃশ্য ও দৃশ্যমান হাতের মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যেতে থাকে।

মাহবুবানি মনে করেন, রিগ্যান নতুন উদারনৈতিক অর্থনীতির যেসব চরম বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা যুক্তরাষ্ট্র কখনো আন্তরিকভাবে পুনর্বিবেচনা করে দেখার গরজ বোধ করেনি। তার বদলে পশ্চিমা পণ্ডিতেরা বলতে শুরু করেন, বিশ্বায়নের দিন শেষ। কিন্তু পশ্চিমা পণ্ডিতদের এই মনোভাব কপটতা ছাড়া কিছু নয়।

রিগানের মাধ্যমেই পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শেষের শুরু। কিন্তু সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের কৃতিত্বের কারণে তাঁর এসব ব্যর্থতা তেমন একটা আলোচিত হয় না। রিগ্যান যা শুরু করেছিলেন, সেটার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকছেন ট্রাম্প।

বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ, করোনা ব্যবস্থাপনায় চীন ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাফল্যের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা, বাইডেনের কাছে হারার পর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলাকে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের পতনের কয়েকটি শীর্ষবিন্দু।

ওয়াশিংটনের অভিযোগ নাকচ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেইজিংয়ের উত্থান নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ প্রধানত দুটি। প্রথমটি অর্থনৈতিক। ওয়াশিংটনের দাবি, বেইজিংয়ের অন্যায্য নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিতীয়তটি রাজনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক। মাহবুবানির মতে, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিকদের এই দুই দাবির কোনোটি সঠিক নয়।

মাহবুবানি যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিতে না পেরেই মূলত সোভিয়েত রাশিয়ার পতন হয়েছিল। ইতিহাস থেকে চীন এই শিক্ষা ভালোভাবে নিয়েছে। তারা এই ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে বদ্ধপরিকর। তাই চীন কৌশলী নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিকে অব্যাহতভাবে চাঙা রাখছে, পরিবেশ-পরিস্থিতির নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংকট উতরাতে চেষ্টা করছে।

চীন অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারিত করে নিজ দেশে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি সমানতালে রপ্তানিও বৃদ্ধি করে চলেছে। চীনের আত্মবিশ্বাসী অগ্রযাত্রার মুখে নীতিগত দুর্বলতার কারণে চাপ বোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র।

চীনের উত্থানকে রাজনৈতিকভাবে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা যেভাবে হুমকি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, সেটার ভিত্তি নেই বলে মনে করেন মাহবুবানি। তাঁর মতে, পরাশক্তি মাত্রই স্বার্থপর, নিষ্ঠুর। তারা সব সময় নিজেদের জাতীয় স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে।

সিঙ্গাপুরের সাবেক এই কূটনীতিক মনে করেন, অতীতের যেকোনো পরাশক্তির মতো চীনও তা–ই। কিন্তু লক্ষ্য অভিন্ন হলেও চীনের ধরন আলাদা। তাঁর মতে, চীন আত্মবিশ্বাসী (এসার্টিভ) হলেও আক্রমণাত্মক (এগ্রেসিভ) নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানকাল

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের পরাশক্তির রাজনীতি বিশেষজ্ঞ গ্রাহাম অ্যালিসন সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিয়ত চীনকে উপদেশ দেওয়া বেশ উপভোগ করে। ওয়াশিংটন হরদম বলে যাচ্ছে, আপনারা আমাদের মতো হোন। কিন্তু তাঁদের খেয়াল রাখা দরকার, প্রেসিডেন্ট থিয়োডর রুজভেল্টের আমলে (১৯০১-১৯০৯) গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের শুরুর দিনগুলোতে ওয়াশিংটন স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

অ্যালিসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পুয়ের্তো রিকো, গুয়াম, ফিলিপাইন অধিগ্রহণ করেছিল, নিজেদের শর্তে চুক্তিতে সম্মত না হলে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যকে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিল, নতুন দেশ পানামা তৈরি করতে কলম্বিয়ায় বিদ্রোহে সহায়তা দিয়েছিল।

চীনের উত্থান

উদীয়মান শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানকালের এসব কাজকে যদি স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে সেই তুলনায় চীন গত চার দশকের বেশি সময়ে তেমন কিছুই করেনি। ১৯৮৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে সামুদ্রিক সংঘর্ষের পর থেকে সীমান্তের বাইরে একটিও গুলি চালায়নি চীন। অর্থাৎ জাতিসংঘের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের মধ্যে চীনই একমাত্র দেশ, যেটি গত ৪৫ বছরে কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি।

অবশ্য ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চীন ও ভারতের সেনারা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ভয়াবহ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তা কারও সহায়তা ছাড়া নিজেরাই দ্রুত বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে এমন সংঘাতে না জড়ানোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছিল।

প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বেইজিংয়ের দ্বন্দ্ব আছে। উইঘুরে মুসলিম নিপীড়ন, তাইওয়ানের বাক্‌স্বাধীনতার সংকোচন বা তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসনের আশঙ্কা আছে। এসব বিষয়সহ চীনের ‘এক দেশ এক নীতি’ তথা গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ ও অভিযোগ আছে।

এসব বিষয় মাহবুবানি নানা যুক্তিতর্ক দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি চীনের মতো প্রাচীন সভ্যতার উত্থানকে উদ্যমের সঙ্গে সমর্থন করেন। তাঁর বিশ্লেষণে যথেষ্ট ফাঁকফোকর আছে, যা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে কাউকে তেমন একটা বেগ পেতে হবে না।

মাহবুবানির একটি সাধারণ যুক্তি, চীন রাজনৈতিকভাবে কর্তৃত্ববাদী হলেও সে কিন্তু তা অন্য দেশে রপ্তানি করছে না। তাদের মনোযোগ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকেই বেশি নিবদ্ধ। বেইজিং কী পরিমাণে পুঁজিবাদী, তা পশ্চিমাদের ঠিকমতো জানা আছে কি না সন্দেহ! চীনে গণতন্ত্র না থাকলেও মেধাতন্ত্র (মেরিটোক্রেসি) আছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে চলছে ধনিক শ্রেণির (প্লুটোক্রেসি) শাসন। সবচেয়ে বড় কথা, চীনের শাসনব্যবস্থা ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে, মানবাধিকার নিয়েও তারা নিজেদের মতো করে বিভিন্ন বিষয় ভাবছে। মাহবুবানির এসব বক্তব্য বাগাড়ম্বরের মতো শোনালেও পশ্চিমাদের চোখে বিশ্বস্ত সিঙ্গাপুরের সাবেক এই প্রাজ্ঞ কূটনীতিকের এসব কথার যথেষ্ট গুরুত্ব আছে।

মাহবুবানির পর্যবেক্ষণ, ট্রাম্প যেভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউএইচও) নানা আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন, তা পক্ষান্তরে চীনকে শক্তিশালী করেছে। তবে তিনি মনে করেন, আগামী এক থেকে দেড় দশকের মধ্যে চীন বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হলেই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র বা তার পশ্চিমা মিত্ররা মুখ থুবড়ে পড়বে, তা কিন্তু নয়।

ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন একটি মহাশক্তির উত্থান হয়, তখন পতনশীল শক্তির সঙ্গে প্রায় সময় উদীয়মান শক্তির রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও ইতিহাসে এর কিছু চমৎকার ব্যতিক্রম আছে। মাহবুবানির মতে, নিজেদের পতনশীল অবস্থা এবং চীন-এশিয়ার উত্থানকে মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উচিত নতুন এই মহাযাত্রা থেকে উপকৃত হওয়া।

ওয়াশিংটনে কি নতুন হাওয়া বইছে

ওয়াশিংটনের প্রতি মাহবুবানির বিনম৶ উপদেশ, দয়া করে চীনের উত্থানকে ঠেকানো বা আটকানোর চেষ্টা না করে এই পণ্ডশ্রমে ‘মুলতবি’ দেন। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে ওয়াশিংটন মাহবুবানির কথা কিছুটা হলেও শুনতে শুরু করেছে। কিন্তু এটা কত দূর গড়াবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে আগের মেয়াদের বাণিজ্যযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় সারা বিশ্বের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধ শুরু করেন। তবে চীনের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত এই নিষ্ফল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘মুলতবি’ দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠিক ‘মুলতবি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর কিছুদিন পর বাহরাইনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক নিরাপত্তা সম্মেলন ‘মানামা সংলাপে’ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড বলেন, ওয়াশিংটন ‘সরকার পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ) বা রাষ্ট্রগঠনের’ নীতি থেকে সরে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার এই দুই ঘোষণায় মাহবুবানির এক দশকের বেশি সময়ের লেখালেখির স্পষ্ট প্রতিধ্বনি রয়েছে।

সতীর্থদের প্রতি ক্লিনটনের উপদেশ

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (১৯৯৩-২০০১) হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর ২০০৩ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি রাজনৈতিক সতীর্থদের উদ্দেশে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে সে চিরদিন এক নম্বর বিশ্বশক্তি থাকবে, তাহলে তাকে অব্যাহতভাবে একতরফা আচরণ করতে হবে।

ক্লিনটন বলেন, আর যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্বিতীয় হওয়াটাকে মেনে নিতে পারে, তাহলে তাকে দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হয়, এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে বিধিবিধান, অংশীদারত্ব ও শৃঙ্খলাবদ্ধ আচরণের চর্চা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি বিশ্ব গড়তে হবে, যেখানে সে দ্বিতীয় হলেও তার জীবনযাত্রা নিজের পছন্দ অনুযায়ী থাকবে।

মাহবুবানির মতে, মার্কিন পণ্ডিত ও নীতিপ্রণেতারা যত তাড়াতাড়ি ক্লিনটনের কথা আমলে নেবেন, ততই তাঁদের মঙ্গল। ওয়াশিংটনের উচিত কিসিঞ্জারের পরামর্শ অনুযায়ী, উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সঙ্গে কীভাবে চলতে হবে, সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন করা।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান থেকে গোপনে চীন সফরের মাধ্যমে কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিলেন কিসিঞ্জার।

সিঙ্গাপুরের সাবেক এ কূটনীতিক মনে করেন, চীন জাতিসংঘসহ পশ্চিমাদের প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ও সংগঠনগুলো ধ্বংস করতে চায় না; বরং উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে এসব সংস্থায় নতুন উদ্দীপনা যুক্ত করতে চায়। তাই ‘খাটো’ না করে পশ্চিমাদের উচিত চীনের শান্তিপূর্ণ উত্থানকে স্বাগত জানানো, তার সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে আচরণ এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

বৈশ্বিক গ্রাম থেকে ক্রমশ একটি বড় ‘জাহাজে’ পরিণত হওয়া পৃথিবীতে করোনার মতো মহামারি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সংকট মোকাবিলায় পশ্চিমাদের উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ না করে উপায় নেই বলে মনে করেন মাহবুবানি।

কিন্তু চীনের শান্তিপূর্ণ উত্থান কি আদৌ সম্ভব হবে? নাকি আগামী এক থেকে দেড় দশকের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রক্তগঙ্গা বইবে, সেটা বেশ জটিল এক প্রশ্ন।

সিঙ্গাপুরের সাবেক কূটনীতিক কিশোর মাহবুবানি শিক্ষাবিদ হিসেবেও সুপরিচিত। তিনি চীন, পশ্চিমা বিশ্ব ও ভূরাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন
সিঙ্গাপুরের সাবেক কূটনীতিক কিশোর মাহবুবানি শিক্ষাবিদ হিসেবেও সুপরিচিত। তিনি চীন, পশ্চিমা বিশ্ব ও ভূরাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। ছবি: কিশোর মাহবুবানির ফেসবুক পেজ থেকে

Friday, March 27, 2026

২০০ বছরের পুরোনো কারাগারের একমাত্র রাজনৈতিক বন্দী by রুমিন ফারহানা

রুমিন ফারহানার প্রকাশিতব্য বই থেকেঃ বইমেলায় প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে এ আয়োজন। আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রুমিন ফারহানার সংসদের দিনগুলি: একাদশ সংসদে সাড়ে তিন বছর বইটি আনছে প্রথমা প্রকাশন। বইটির প্রথম অধ্যায় এখানে মুদ্রিত হলো। যেখানে উঠে এসেছে কারাগারের কোর্টরুমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে লেখকের সাক্ষাৎ আর নিজের শৈশবে বাবার কারাগার-স্মৃতি।

২০১৯ সাল। একাদশ সংসদ নির্বাচন মাত্র শেষ হয়েছে। রাজনীতিতে হতবিহ্বল ভাব। কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী হলো এটা। জয়ী-বিজিত কোনো পক্ষই স্বস্তিতে নেই। সে সময় প্রতি সপ্তাহে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেতাম আমি। যেতাম দেশনেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলায়, যেতাম ওনাকে কাছ থেকে দেখতে। উনি তখন ২০০ বছরের পুরোনো সেই বিশাল কারাগারের একমাত্র রাজনৈতিক বন্দী। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই পড়ত মামলার তারিখ। মামলার দিনগুলোতে নিচতলায় বসা কোর্টে আনা হতো ওনাকে। হুইলচেয়ারে আসতেন তিনি। যে মানুষটিকে জেলে যাওয়ার আগের দিনও স্বাভাবিকভাবে হেঁটে গাড়িতে উঠতে দেখেছি আমি, সেই মানুষটি নিজের পায়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি। এটা যে কত বড় ধাক্কা ছিল আমাদের জন্য, সেটি বলে বোঝানো কঠিন।

ছোট্ট ওই কোর্টরুমে পুলিশ, আইনজীবী আর সাংবাদিক গিজগিজ করত, সঙ্গে তো গোয়েন্দা সংস্থার লোক আছেই। উনি এলে আমি গিয়ে দাঁড়াতাম ঠিক ওনার হুইলচেয়ারটার পাশে। খুব আস্তে প্রায় ফিসফিস করে যতটুকু সম্ভব খবর দেওয়ার চেষ্টা করতাম তাঁকে। উনি বলতেন খুবই কম, শুনতেন বেশি। কিছু বলতে চাইলে হুইলচেয়ারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়তাম আমি, যাতে পুলিশের কান বাঁচিয়ে কথাগুলো শুনতে পারি। পুরোটা সময়ই তাঁকে ঘিরে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকত মহিলা পুলিশ। তাদের কান বাঁচিয়ে কথা বলা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এর মধ্যেই কথা চালিয়ে যেতাম যতটুকু পারি। তিনি কিছু নির্দেশ আমাকে দিতেন সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে বলার জন্য, সেগুলো আমি তাঁদের জানাতাম। মামলার শুনানি শেষ হলে ওই দিনের মতো কারাগারের ভেতর নিয়ে যাওয়া হতো তাঁকে। এ সময়টা আমি তাঁর পাশ থেকে সরে যেতাম। দাঁড়াতাম ভেতরের মূল ফটকের পাশে, যেখান দিয়ে যাবেন তিনি। শেষবারের মতো একবার তাকাতেন। শান্ত, স্থির দৃষ্টি। হাসতেন কখনো কখনো একটু, যেন সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যে মানুষটিকে আমি হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠে কোর্টে যেতে দেখেছি, কী করে এক মাসের ব্যবধানে তিনি চলনশক্তি হারালেন, তা আজও আমার কাছে এক বিস্ময়। একদিন হয়তো এই সত্য প্রকাশ পাবে। অনাগত কালের কোনো প্রজন্ম হয়তো উদ্‌ঘাটন করবে এই সত্যগুলো। জানবে কেমন ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি।

যা-ই হোক, ফিরে আসি আগের কথায়। তাঁকে সেখানে একা রেখে ঘরে ফেরার যে তীব্র কষ্ট, সেটি কি বুঝতে পারতেন তিনি? না হলে কেন মৃদু হাসি দিয়ে আশ্বস্ত করার এই চেষ্টা ছিল তাঁর? প্রতিশোধ আর জিঘাংসার রাজনীতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে রাজনীতি থেকে সরানোর চক্রান্ত কত ঘৃণ্য হতে পারে, তার উদাহরণ হয়ে থাকবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আওয়ামী সরকারের নির্মম আচরণ। সেই সঙ্গে অন্যায়ের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস না করে ৭৬ বছর বয়সে সব ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কারাগারকে বেছে নেওয়ার যে দৃষ্টান্ত বেগম জিয়া তৈরি করলেন, সেটিও লেখা থাকবে ইতিহাসে। তিনি চাইলেই পারতেন আপস করতে, কারাগারে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে, পারতেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা হতে, ২০১৮ সালে বিদেশ থেকে না ফিরতে। কিন্তু ১/১১ সরকারের সময়ই বেগম জিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এই দেশ ছাড়া তাঁর কোথাও আর কিছু নেই, এই দেশের মানুষই তাঁর সব।

বেগম খালেদা জিয়ার মামলার সুবাদে বহু বছর পর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে মনে হয়েছিল কিছুই ভুলিনি আমি। এরশাদ সরকারের সময় যখন আমি নিতান্তই একজন শিশু, তখন বাবাকে দেখতে বহুবার যেতে হয়েছে কারাগারে। পুরোনো সেই স্মৃতি মিলিয়ে দেখি বদলায়নি কিছুই। এমনকি বিল্ডিংয়ের ভেতরের সেই হলুদ রংটাও না। নোনাধরা দেয়ালগুলোও আছে ঠিক আগের মতোই। লোহার গরাদ বসানো সেই জানালাগুলোও পাল্টায়নি কেউ। যেন ২০০ বছরের কালের সাক্ষীকে একইভাবে রাখতে হবে যত দিন রাখা যায়। লোহার দরজা দিয়ে ঢুকেই হাতের ডানে প্রথমে জেলারের রুম। এরপর মোটামুটি বড় একটা ঘর (যেখানে আদালত বসত), তারপরই আরেকটা লম্বা টানা ঘর, যার এক পাশে সারি সারি জানালা, যেখান দিয়ে বাইরে তাকালে জেলের ভেতরটা অনেকখানি দেখা যায়। ভেতরটা যত দূর দেখা যায় সবুজ, সুন্দর। ছোট-বড় মিলিয়ে গাছের কমতি নেই। আসলে এতবার গেছি এই কেন্দ্রীয় কারাগারে যে ভোলা অসম্ভব। বাবাকে রেখে আসার সময় প্রতিবার একটা শূন্যতা, একটা তীব্র কষ্ট, হাহাকার কাজ করত। মনে হতো, আবার কবে দেখব? বাবাকে ছাড়া বাড়িটা কেমন সব সময় খালি খালি মনে হতো। ছোট আমি হয়তো বুঝিয়ে সবটা বলতে পারতাম না, কিন্তু বাবা জেলে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়তাম। হয়তো কোনো কারণ ছাড়াই ভীষণ জ্বর, নয়তো পড়ে গিয়ে ব্যথা পাওয়া। মা বলতেন, বাবাকে ধরে নিয়ে গেলে নাকি আমাকে নিয়ে ভয়ে থাকতেন বেশি—এই বুঝি কিছু একটা হয়। প্রতিবার হতোও তা-ই। তবে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, তখনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা রাজবন্দীদের সঙ্গে অসদাচরণ আজকের মতো এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তাই বাবা গ্রেপ্তার হলে কখনো আর না-ও ফিরতে পারেন—এমন ভয় মা কিংবা আমি কখনো পাইনি। স্বাধীন বাংলাদেশে এরশাদের পর আর কোনো সরকার জেলে নেয়নি বাবাকে। আর এ কারণেই আমার জীবনে ’৯০-এ এরশাদের পতন অতি আনন্দময় ঘটনাগুলোর একটি।

বাবা যখন জেলে থাকতেন, তখন বাসায় কেবল ছোট্ট আমি, মা আর কর্মচারীরা। সকালে মা চলে যেতেন অফিসে। সারা দিন আমি একা। তবে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ। কবির ভাই (রান্না করতেন), জয়নাল ভাই (বাসা দেখাশোনা), বাবুল ভাই (ড্রাইভার) কিংবা রওশনের মা যাঁরা ছিলেন, তাঁরা পরিবারের সদস্যের চেয়ে বেশি বৈ কম ছিলেন না। ছোট্ট আমাকে যেভাবে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখে বড় করেছেন তাঁরা, আজকের দিনে এমনটা চিন্তাও করা যায় না। জয়নাল ভাইয়ের বড় মেয়ে ছিল আমার বয়সী। অজপাড়াগাঁয়ে রেখে আসা শিশুকন্যাটির প্রতি জমিয়ে রাখা সব স্নেহ ‘কাবুলিওয়ালা’র মিনির মতোই ঢেলে দিয়েছিলেন আমার প্রতি। আমার মা ছিলেন খুব কড়া মেজাজের আর শক্ত ধাঁচের মানুষ। তার ওপর সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক পরিবার থেকে এসে স্বামীর রাজনীতি, জেলজীবন—সবকিছু মানিয়ে নিয়ে একা সংগ্রামের ধকল তো ছিলই। মায়ের শাসন আর বকুনি থেকে আমাকে বাঁচাতে কত চেষ্টা যে ছিল জয়নাল ভাইয়ের। মাকে আমরা সবাই ভীষণ ভয় পেতাম। কেউ তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কখনো কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। তার ওপর অতি দুষ্টু বাচ্চা বলতে যা বোঝায়, আমি ছিলাম তা-ই। বাবা জেলের বাইরে থাকলে বাবা আর না থাকলে এই চারজন কতবার যে আমার হয়ে মিথ্যা দোষ কবুল করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। মাকে নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা মজার কথা প্রচলিত ছিল। আমরা বলতাম, মা বাসায় থাকলে ভুলেও বাড়িতে কাক-চিল বসে না। তবে মজার বিষয় হলো, ঘরের বাইরে মা ছিলেন অতি মার্জিত, ভদ্র, কঠোর কিন্তু শান্ত মেজাজের মানুষ।

বাবা ছিলেন গৌরবর্ণের ঋষি পুরুষ। জেলের ভেতর দেখা করার সময় পার হলে সোজা হেঁটে যেতেন ভেতরে, যেন পেছনে কেউ নেই, কিছু নেই। আজ মনে হয়, হয়তো কষ্ট হতো তাঁর পেছনে ফিরে দেখতে, যেখানে চিন্তিত-বিষণ্ন স্ত্রী, শিশুকন্যা দাঁড়িয়ে আছে। রাজনীতিবিদদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে সব দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপানোর খেলাও পুরোনো। কিন্তু একজন রাজনীতিবিদ আর তাঁর পরিবারই শুধু জানে ঠিক কিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাদের। রাজনীতিবিদদের দোষত্রুটি আছে, ভুলভ্রান্তি আছে, কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু হাজার দোষত্রুটি সত্ত্বেও রাজনীতিবিদের বিকল্প কেবল রাজনীতিবিদই, অন্য কেউ নয়। অবশ্য আমি যে সময়ের রাজনীতিবিদের কথা বলছি, তখনো রাজনীতিবিদেরা আজকের মতো লুম্পেন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেননি। রাস্তার লোক রাজনীতি করে কোটিপতি—এটা হালের সংস্কৃতি। ঋণখেলাপি, কালোবাজারি, ব্যবসায়ী আর আয়ের কোনো বৈধ উৎস ছাড়াই কোটিপতি—এরাই সংসদের মেজরিটি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-07%2Fbb40yjxz%2FWhatsApp-Image-2026-03-07-at-15.32.20.jpeg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

Sunday, November 2, 2025

মওদুদ আহমদের স্বস্তি-অস্বস্তির আত্মজীবনী by এম এম খালেকুজ্জামান

মওদুদ আহমদ একজন আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। প্রয়াত এই রাজনীতিকের আত্মজৈবনিক বই চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। বইটি নিয়ে লিখেছেন এম এম খালেকুজ্জামান

মওদুদ আহমদ হতে পারতেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ভূমিপূত্র’। আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী, তারপর তাঁর সচিব, জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, এরশাদ আমলে উপরাষ্ট্রপতি—ঐতিহাসিক সংশ্লিষ্টতায় ঈর্ষণীয় এক ক্যারিয়ার তাঁর। কিন্তু রাজকাহিনিতে প্রিয় পুত্র যেমন ত্যাজ্যপুত্র হয়, তেমনি তাঁর কপালেও জুটেছিল প্রিয় থেকে অপ্রিয় হওয়ার ঘটনা। সম্প্রতি প্রথমা প্রকাশন থেকে বের হওয়া মওদুদ আহমদের আত্মজীবনী চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ বইটি এসবেরই এক অম্লমধুর ধারাবিবরণী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং এরপর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যক্ষদর্শীর এক মহাবিবরণী যেন তাঁর আত্মজীবনীর শেষ পর্ব। শুরুতে যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবিভক্ত ভারতের কলকাতার স্মৃতি পাওয়া যায়। খিদিরপুর ডকে দেবেন্দ্র ম্যানশনে থাকার সময় জাপানিদের বোমাবর্ষণের স্মৃতি আর বইটি শেষ করেছেন শেখ হাসিনার শাসনামলের বর্ণনা দিয়ে।

চিন্তাচর্চায় স্বতন্ত্র

মওদুদ আহমদের জীবন ও সমসাময়িক কাল ও স্থান সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা ছিল এবং তা মেনেই তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেছেন। তাঁর এই অনুশীলনের কেন্দ্রে ছিল দেশ ও দেশের মানুষ। অনেক রাজনীতিক ও আমলাকে দেখা যায়, অবসরে যাওয়ার পর তাঁরা লেখালেখিতে ব্যস্ত হন। আইন ও রাজনীতি পেশার অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য মেনে তিনি অবসর নেননি।

মওদুদ আহমদের প্রথম বইয়ের প্রকাশকাল বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পেশাজীবনের অভিজ্ঞতাকে লেখায় অনুবাদ করেছেন মধ্যজীবন থেকে। লেখালেখি তাঁকে অন্য রাজনীতিকদের চেয়ে পৃথক করেছে।

রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী মওদুদ আহমদ তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় সক্রিয় ছিলেন চিন্তাচর্চাকারী হিসেবে, যা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জীবনব্যাপী যা কিছু লিখেছেন, তা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে বলা যায় ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ধারাভাষ্যকার’।

মওদুদ আহমদের একাধিক বইয়ের সঙ্গে অনুসন্ধানী পাঠক তাৎপর্যপূর্ণভাবে তাঁর শেষ বইটিকে আলাদা করতে পারবেন। কারণ, এখানে তিনি পাঠককে তাঁর একান্ত ব্যক্তিজীবন সম্পর্কেও জানাতে চেয়েছেন। এর আগে তাঁর অন্য লেখার প্রধান ক্ষেত্র ছিল রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি। আর শেষ বইতে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে জড়িত ইতিহাসের ওপরও আলো ফেলেছেন।

আত্মজীবনীর ‘অস্বস্তি’

আত্মজীবনী কখনো কখনো অস্বস্তি উৎপাদন করে। যে কারণে অনেকেই জীবদ্দশায় এর প্রকাশ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকেন না। অছিয়ত করে যান, মৃত্যুর পর প্রকাশের। মওদুদ আহমদ তাঁর এই বই প্রথমা প্রকাশনকে দেওয়ার আগে আরও দুটি প্রকাশনীর কাছে দিয়েছিলেন। ‘ঝুঁকি’ বিবেচনায় তাঁরা অপারগতা দেখায়; কিন্তু প্রথমা এ ব্যাপারে সাহসিকতা ও পেশাদারত্ব দেখিয়ে তা প্রকাশের দায়িত্ব পালন করেছে। তবে বিপুলায়তন বইটির নির্ঘণ্ট যুক্ত হলে তা আরও পূর্ণতা পেত।

২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় হয় মওদুদ আহমদের বাংলাদেশ: ইমার্জেন্সি অ্যান্ড দ্য আফটারম্যাথ: ২০০৭-২০০৮ বইটি। এতে তিনি ‘এক-এগারো’র সময়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন। আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশমনে প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের অভাব নিয়ে।

মওদুদ আহমদের এমন পর্যবেক্ষণে তাঁর দলেরই নেতা-কর্মীরা প্রতিবাদ করেছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় মওদুদ বলেন, ‘সমস্ত বইয়ে চেষ্টা করেছি বস্তুনিষ্ঠভাবে দেশের ইতিহাস তুলে ধরতে। আমি তো এই বই বর্তমানের জন্য লিখিনি। এটা তো ভবিষ্যতের জন্য লিখেছি।’ (প্রথম আলো, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪)

এর আগে তাঁর লেখা আ স্টাডি অব পলিটিক্যাল অ্যান্ড মিলিটারি ইন্টারভেনশন ইন বাংলাদেশ বইটি নিয়েও ২০১৩ সালে তাঁর দলের মধ্যে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মওদুদ আহমদ। ওই সময় বইটির অংশবিশেষ আলোচনায় এনে তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল দলের নিজের একটি অংশ।

অন্য অনেক রাজনৈতিক নেতার কপটতার বিপরীতে মওদুদ আহমদ তাঁর লেখালেখিতে অন্তত অকপট ছিলেন—রাজনীতিসচেতন পাঠকেরা এমনটাই বলে থাকেন। চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ বইটিও ব্যতিক্রম নয়।

অখণ্ড সময়ের খণ্ড স্মৃতিচিহ্ন

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও লেখকদের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো, আন্দোলন–সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, ঘটনা ও বিশ্লেষণে বিশেষ কোনো ব্যক্তি কিংবা নিজের ভূমিকাই প্রকট হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে আমরা কদাচ ভারসাম্য দেখি। আর আত্মজীবনী হলে আমিত্বকে দূরে রাখা যায় না; বরং সেটিই চালক হয়ে ওঠে। তবে মওদুদ আহমদ তাঁর এই ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত সব বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে মওদুদ আহমদ অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছিলেন। এ ছাড়া একজন কৃতবিদ্য আইনবিদ ও সংবিধানবেত্তা হিসেবে তিনি সমকালীন বিশ্ব, সমাজ, রাজনীতি ও উন্নয়ন চিন্তা–সম্পর্কিত নানা বইয়ের নিয়মিত পাঠক ছিলেন তিনি। চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ বইটি পড়লে পাঠকেরা সেগুলোর একটি দারুণ অভিজ্ঞতা পাবেন।

বিখ্যাত সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতোই জেলজীবন ও মুক্তজীবনের মধ্যে শাটল কর্কের মতো আসা-যাওয়া ছিল মওদুদ আহমদের। ১৫ বছর বয়সে প্রথম তিনি জেলজীবন বরণ করেন; সেটি ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অব্যবহিত পর একুশে ফেব্রুয়ারি কর্মসূচিতে পতাকা উত্তোলনের জন্য।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে জরুরি আইন ঘোষণার পর জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে গঠিত হয়েছিল কমিটি ফর সিভিল লিবার্টিজ অ্যান্ড লিগ্যাল এইড। তিনি ছিলেন এ সংগঠনের সম্পাদক। পরিহাস হলো, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি নিজেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

এরপর ১৯৯৬ সালের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছাড়া ১৯৮২-৮৩, ১৯৯১, ২০০৭-০৮ ও ২০১৩-১৪ সালে নিজের কারাভোগকে মওদুদ আহমদ প্রতিহিংসামূলক, রাজনৈতিক উদ্দেশপ্রণোদিত বলে মনে করেন। তিনি এ বইয়ে লিখেছেন, সেসব কারাবরণে কোনো পাবলিক কজ ছিল না, কোনো গৌরব বা কোনো স্বপ্ন জড়িত ছিল না; বরং ছিল অপমান ও লাঞ্ছনায় ভরা।

মওদুদ আহমদের এই আত্মজীবনীর ব্যাপ্তি প্রায় আট দশক। তিনি তুলে এনেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা চরিত্র ও ঘটনা। তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল রাজনীতি ও আইন পেশা। স্বভাবতই এই দুটি বিষয় তাঁর আত্মজীবনীর বেশ বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। অন্য বিষয়গুলো তিনি কেবল ছুঁয়ে গেছেন।

ফলে এ বইয়ে ইতিহাসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ খুঁজতে না যাওয়াই শ্রেয়; কিন্তু বিষয়-বর্ণনায় লেখকের নির্মোহ ও মানবিক দৃষ্টি আমাদের মুগ্ধ করে। তিনি কুশলী ন্যারেটরের মতো ঘটনার সত্যনিষ্ঠ বিবরণ দিয়ে গেছেন। মাঝেমধ্যে দু–একটি মন্তব্য করেছেন; নিজেকে ঘটনার আড়ালে না নিয়ে উপস্থিত রাখতে সচেষ্ট থেকেছেন। এ বইয়ে এটাই সম্ভবত তাঁর এক অসাধারণ শৈলী, যা আগের বইগুলোর চেয়ে ভিন্ন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মূল্যয়ন

মওদুদ আহমদ লিখেছেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল মূলত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত ছিল, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো ব্যক্তিকে দলের কোনো পদে আসীন করা হবে না। সময়ের বিবর্তনে ও রাজনীতির চক্রখেলায় বিএনপি ক্রমে সেখান থেকে অনেক দূরে সরে আসে।

১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জিয়াউর রহমান নিজেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শাহ আজিজকে সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। মওদুদ আরও লেখেন, সাত্তার ও শাহ আজিজদের ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিএনপি একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকে। (পৃষ্ঠা ৬০)

মওদুদ আহমদ আফসোস করেছেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের পর বিএনপিকে জামায়াতের ‘স্থায়ী রাজনৈতিক পার্টনার’ হিসেবে প্রচার–প্রচারণা করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। ২০১১-১২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সময় তিনি অনেকবার ‘বিএনপির রাজনীতি কী’ এমন অপ্রিয় প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন।

মওদুদ আহমদ বিষয়টি দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে জানিয়েছেনও। খালেদা জিয়া বিষয়টি অনুধাবন করলেও বিএনপি সেই সময় বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেনি। জামায়াত প্রশ্নে বিএনপির এই দোদুল্যমানতায় নিদারুণ মনোবেদনায় ভুগছেন মওদুদ আহমদ।

মওদুদ আহমদ তাঁর নিজ দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চরিত্র চিত্রণে অকপট ছিলেন। তাঁর বৌদ্ধিক সততার ব্যতিক্রমী উদাহরণ রয়েছে আত্মজীবনীর পাতায় পাতায়। তিনি বলেছেন, ক্ষমতার রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনৈতিকতা ও স্ববিরোধিতার চরম দৃষ্টান্ত হলো, রাজনৈতিক অঙ্গনে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবস্থান এবং স্বীকৃতি। (পৃষ্ঠা-৩২৭)

মওদুদ আহমদ আপাদমস্তক গণতন্ত্রী ছিলেন, যে স্বভাবের কারণে তিরি তাঁর নিজ দলের কাছেও অপাঙ্‌ক্তেয় ছিলেন এবং তা দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। ঢাকার ড্যাফোডিল হোটেলে যুবদলের এক সম্মেলনে ‘দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে’ এমন কথা বলার পর তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। (পৃষ্ঠা ৫৪৬)

মওদুদ আহমদ তাঁর মেধা, যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব থেকে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়েছিলেন, আর এরশাদ তো তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি পর্যন্ত বানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে আর কেউ সঠিকভাবে মূল্যয়ন করেননি বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।

১৯৭৪ সালে মওদুদ আহমদ কিছুদিন কারাগারে আটক থাকলেও শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদারতা নিয়ে লিখেছেন কৃতজ্ঞচিত্তে। তবে শেখ হাসিনার শাসনামল যে চূড়ান্ত কতৃর্ত্বপরায়ণ সেটি বলেছেন নির্দ্বিধায়।

সম্ভাবনাকে পরিণতিতে রূপান্তর করতে না পারার ব্যর্থতা তাঁকে দারুণ পুড়িয়েছে। এখানে ইতিবাচক সমাজ রূপান্তরের সব শর্তই উপস্থিত ছিল বলে মনে করতেন মওদুদ আহমদ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির টানাপোড়েনে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বপ্ন, সামাজিক ঐক্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হয়েছে মনে করতেন তিনি।

বিচারপতিদের অবসরের বয়স বৃদ্ধি নিয়ে ‘আক্ষেপ’

চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ বইয়ের চতুর্দশ অধ্যায় আসলে বিচার বিভাগ নিয়ে মওদুদ আহমদের হতাশার সালতামামি। গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসনে বিচার বিভাগের ভূমিকা, রাজনীতি ও আইনের শাসন, বিচারিক সংস্কৃতির অবনতি—এই রকম কিছু বিষয় নিয়ে তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অবসরের বয়স বৃদ্ধি করতে আনা সংবিধান সংশোধনীর জন্য সব দায় তাঁর ওপর চাপানো অন্যায্য মনে করেন মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, নানা রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ করে বিএনপির জে্যষ্ঠ নেতারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জানিয়ে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত একরকম নিজেরাই নিয়েছিলেন।

শুরুতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কোন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন, সেই বিবেচনায় কেবল আপিল বিভাগের বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোর চিন্তা করা হয়েছিল। মওদুদ আহমদ দাবি করেছিলেন, তিনি বরং উভয় বিভাগের (হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ) বিচারপতিদের অবসরের বয়স বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখেন।

মন্ত্রিসভার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চতুর্দশ সংশোধনী পাস হয়েছিল। অথচ সব দোষ আর দায় তাঁর একার নিতে হয়েছে বলে আক্ষেপ করেছেন মওদুদ আহমদ। তাঁর আরও আক্ষেপ হলো, বিচারপতিদের অবসরের বয়স দুই বছর বাড়ানো হলেও তিনি নূ৵নতম ধন্যবাদও পাননি উপকারভোগীদের কাছ থেকে।

ইতিহাসের পথরেখায়

সুপ্রিম কোর্টের করিডরে মওদুদ আহমদকে বহুবার হেঁটে যেতে দেখেছি। মামলার শুনানিতে তিনি যখন জটিল আইনের সহজ ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিজেকে মেলে ধরতেন, সেসব মুহূর্ত ছিল তরুণ আইনজীবীদের জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা। আইনজীবী হিসেবে তিনি ছিলেন উচ্চ মার্গের।

মওদুদ আহমদের রাজনৈতিক আদর্শের কম্পাস বারবার দিক পরিবর্তিত হয়েছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁর এই আদর্শিক দোদুল্যমানতা আমাদের প্রথাগত রাজনৈতিক দুরবস্থার একটি প্রতিফলন কি না, এমন প্রশ্নও করা যেতে পারে। সবকিছুর পরেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে দূরে কখনো সরে যাননি।

* এম এম খালেকুজ্জামান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
- মতামত লেখকের নিজস্ব

মওদুদ আহমদের স্বস্তি-অস্বস্তির আত্মজীবনী

Wednesday, October 22, 2025

কাশ্মীর নিয়ে লেখা বইয়ে ভারতের কেন এত ভয় by অনুরাধা ভাসিন

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা (ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা) বাতিল করে দেয়। রাজ্যটিকে দুটি ভাগে ভাগ করে সরাসরি নয়াদিল্লির নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদায় নামিয়ে আনা হয়।

কয়েক দিন আগে ওই ঘটনার ছয় বছর পূর্তির আগমুহূর্তে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে বিভক্তি বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। শ্রীনগরের আকাশে যুদ্ধবিমানের অস্বাভাবিক ওড়াউড়ি দেখে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এতে ২০১৯ সালের ৫ আগস্টের আগে কাশ্মীরের আকাশে যুদ্ধবিমানের ওড়াউড়ি দেখে মানুষের মনে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, সেই ভয়ংকর স্মৃতি ফিরে আসে। কী ঘটতে যাচ্ছে, ভেবে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

ছয় বছর পূরণের দিনে সরকার হঠাৎ ঘোষণা দেয়, জম্মু ও কাশ্মীরের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে লেখা ২৫টি বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের অভিযোগ, এসব বই ‘মিথ্যা বয়ান’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ প্রচার করছে। কিন্তু অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি।

এসব বইয়ের মধ্যে আমার লেখা একটি বই আছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে হারপারকলিন্স থেকে প্রকাশিত বইটির শিরোনাম আ ডিসম্যান্টেলড স্টেট: দ্য আনটোল্ড স্টোরি অব কাশ্মীর আফটার আর্টিকেল ৩৭০। বইটি ২০১৯ সালের পরের কাশ্মীরের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। বইটি মাঠপর্যায়ের গবেষণা, বিস্তৃত সাক্ষাৎকার এবং নানান তথ্যসূত্রের ওপর ভিত্তি করে লেখা। এটি সরকারের প্রচার করা ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’র দাবি ভেঙে দেয়।

সরকার ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দিয়েছিল এই বলে যে এতে শান্তি ও উন্নয়ন আসবে; কিন্তু তারা যে নজিরবিহীন ফিজিক্যাল ও সাইবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল এবং তিনজন মুখ্যমন্ত্রীসহ ভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বহু রাজনীতিক ও হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছিল, তা গোপন করেছে। কাঁটাতার আর সামরিক ব্যারিকেডে কাশ্মীরকে কারফিউ অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছিল। ফোন ও ইন্টারনেট সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

ছয় মাস পরে আংশিক ইন্টারনেট চালু হলেও দমন-পীড়ন আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মীদের ওপর অভিযান তীব্র হয়েছিল। জননিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইন (এই আইনে বিনা অভিযোগে দুই বছর পর্যন্ত আটক রাখা যায়) ব্যবহার করে ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়েছিল।

এই বাস্তবতার খুব কমই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেত। স্থানীয় পত্রিকাগুলো দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। যারা সরকারের সঙ্গে তাল মেলায়নি, তাদের আর্থিকভাবে চেপে ধরা হয়, বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। যারা মানিয়ে নিয়েছিল, তারা সরকারি বিজ্ঞাপন পেয়ে বেঁচে ছিল; তবে তারা বেঁচে ছিল সাংবাদিকতা ছাড়া।

এভাবে পত্রিকাগুলো হয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, নয়তো ভয় পেয়ে চুপ হয়ে যায়। সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তোলা বন্ধ করে দেন। কিছু পত্রিকার সমৃদ্ধ আর্কাইভ (যা কাশ্মীরের প্রতিদিনের জটিল ইতিহাস ধরে রাখত) সরিয়ে ফেলা হয় বা আর দেখা যায় না।

গত ছয় বছরে সরকার কোনো সমালোচনা সহ্য করেনি। সামান্য বিরোধী মত পেলেই শুরু হয় ভয় দেখানো, জিজ্ঞাসাবাদ, ডিভাইস বাজেয়াপ্ত, আয়কর বা মানি লন্ডারিং মামলা, সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এবং কখনো স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি আটক। স্থানীয় সাংবাদিকতা সরকারের জনসংযোগ দপ্তরের দালালে পরিণত হয়। নাগরিক সমাজের সব কণ্ঠ দমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তথ্যের বড় শূন্যতা তৈরি হয়।

এই শূন্যতা পূরণ করাই ছিল আমার বইয়ের উদ্দেশ্য। ১২টি অধ্যায়ে আমি ৩৭০ ধারা বিলোপের পর প্রথম দুই বছরের চিত্র তুলে ধরেছি। বেড়ে চলা দমননীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংকোচন, বিরোধী মতকে অপরাধী করা, সরকারের শান্তি ও স্বাভাবিকতার দাবির বিপরীতে সন্ত্রাসবাদের অব্যাহত উপস্থিতি সেখানে তুলে ধরেছি।

এটি ছিল সত্যের অনুসন্ধান। এটি ছিল নগ্ন সত্য, যা সরকারের বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করেছে। একটি আতঙ্কগ্রস্ত রাষ্ট্র, যে কেবল সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে, বাসিন্দাদের দমন করে এবং সব বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করে কাশ্মীরে তার নিয়ন্ত্রণ চালায়, তারা আমার কাজে অস্বস্তি বোধ করেছিল। আমার বই সরকারকে সতর্ক করেছিল—এই নিয়ন্ত্রণনীতি, পুলিশ ও নজরদারি রাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং ভুল উন্নয়ন মডেল টেকসই নয়, এটি ব্যর্থ হবে।

গত ছয় বছরে সরকার বিশ্বের চোখে ধুলা দিয়ে এসেছে। তারা দাবি করেছে, তারা শান্তি, স্বাভাবিকতা, পর্যটন ও উন্নয়ন এনেছে; কিন্তু এ বছরের ২২ এপ্রিল ২৬ জন নিরপরাধ বেসামরিক লোকের হত্যাকাণ্ড সেই বুদ্‌বুদ ফাটিয়ে দিয়েছে। এটি সরকারের জন্য কাশ্মীর নীতি পুনর্বিবেচনা করার সতর্কবার্তা ছিল।

কিন্তু তারা উল্টো দমন বাড়িয়েছে। কাশ্মীরিদের অপদস্থ করা, নির্বিচার আটক করা, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এই সময়েই কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের প্রকাশ্য নিন্দা হয়েছে। মোমবাতি প্রজ্বলিত হয়েছে। সহিংসতা বর্জনের ডাক দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী ব্যক্তিরাও জানিয়েছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডে বিদেশি জঙ্গিরা জড়িত, স্থানীয় ব্যক্তিরা নয়।

গত তিন মাসে সরকার দেখিয়েছে, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সর্বব্যাপী নজরদারির নীতি আরও তীব্র হবে। ২৫টি বইয়ের নিষেধাজ্ঞা (যার অনেকগুলোই গবেষণাসমৃদ্ধ, বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও আইনভিত্তিক রচনা) এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। এর মাধ্যমে বিকল্প বয়ান ও ভিন্ন স্মৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।

সরকার বিরোধী মত বা সরকারি বয়ানের সঙ্গে না মেলা সবকিছুকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে এখন এই বই বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংস করতে পারবে। শুধু লেখাই নয়, পড়াকেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলা হবে। এতে হয়তো চিন্তা ও স্মৃতি পুরোপুরি দমন করা যাবে না; কিন্তু মানুষ কী লিখবে ও পড়বে, তা আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

অনুরাধা ভাসিন, কাশ্মীর টাইমস–এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা রদ করে ভারত সরকার। জম্মু-কাশ্মীর ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। কাশ্মীরকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদে এক কাশ্মীরি। শ্রীনগর, কাশ্মীর,
জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা রদ করে ভারত সরকার। জম্মু-কাশ্মীর ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। কাশ্মীরকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদে এক কাশ্মীরি। শ্রীনগর, কাশ্মীর, ফাইল ছবি: রয়টার্স

Saturday, October 18, 2025

ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ মুজিবকে নিয়ে by বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশের মার্ক্সবাদী জনবুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর সম্প্রতি প্রয়াত হলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতা ও সংস্কৃতি ছিল তাঁর ভাবনার মূল বিষয়। বদরুদ্দীন উমরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০২৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি লেখা তাঁর এই অপ্রকাশিত রচনা প্রকাশ করা হলো।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এবং অন্য সময়েও শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন যে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘একুশে পদক ২০২৩’ প্রদান অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান, সেই অবদানটুকু কিন্তু মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। অনেক বিজ্ঞজন, আমি কারও নাম বলতে চাই না, চিনি তো সবাইকে। অনেকে বলেছেন, ওনার আবার কী অবদান ছিল? উনি তো জেলেই ছিলেন। বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন বলে ওনার কোনো অবদান নেই? তাহলে উনি জেলে ছিলেন কেন? এই ভাষা আন্দোলন করতে গিয়েই তো তিনি বারবার কারাগারে গিয়েছেন। সেই গুরুত্ব কিন্তু কেউ দিতে চায়নি। আমাদের ভাষা মাতৃভাষার অধিকার আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরই উদ্যোগে ভাষাসংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা অর্জন।’ পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের রিপোর্টে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদানের কথা উল্লেখ আছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টগুলো পাওয়ার পর আমি একটা ভাষণ দিয়েছিলাম। তখন একজন বিদগ্ধজন আমাকে খুব ক্রিটিসাইজ করে একটা লেখা লিখলেন যে আমি নাকি সব বানিয়ে বানিয়ে বলছি।’

ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদান মুছে ফেলার ‘অপচেষ্টা’ যে আমি করেছি, এটা শেখ হাসিনা কখনো আমার নাম উল্লেখ করে এবং কখনোবা নাম উল্লেখ না করে (যেমন ওপরের উদ্ধৃতি) সুস্পষ্ট ইঙ্গিতে বলে থাকেন। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলে রাখা দরকার যে আমি আমার লেখায় কোনো ক্ষেত্রেই কোনো দল বা ব্যক্তিকে বড় বা ছোট করার চেষ্টা কখনো করিনি। আমি সব সময় তথ্যের ভিত্তিতেই লিখেছি, তথ্যের বাইরে কোনো আন্দাজি কথাবার্তা বলার অভ্যাস আমার একেবারেই নেই। এ দেশের এবং দেশের বাইরে আমার পাঠকেরা এটা ভালো করেই জানেন। নিজের কাছে সৎ থাকাকে আমি গুরুত্ব দিই। কারণ, সেটাই হলো একজনের সৎ চিন্তা ও আচরণের অপরিহার্য শর্ত। এই আত্মমর্যাদাবোধের অভাবই বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী, লেখক–সাহিত্যিকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যায়।

শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলন করতে গিয়েই তো তিনি বারবার কারাগারে গিয়েছেন।’ এ কথা ঠিক নয়। শেখ মুজিব একবারই, ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের সময় জেলে গিয়েছিলেন। শুধু তিনি নন। সে সময় মোহাম্মদ তোয়াহা, রণেশ দাশগুপ্তসহ অনেকেই জেলে গিয়েছিলেন। চার–পাঁচ দিন পরই তাঁদের সবাইকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনের জন্য জেলে ছিলেন না।

শেখ মুজিব শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, এ দেশে অনেক আন্দোলনের সঙ্গেই জড়িত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে খাদ্য আন্দোলনের সময় তাঁর জেল হয়েছিল। জেল থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এরপরও তিনি নানা আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে বারবার জেলে গিয়েছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমাদের ভাষা মাতৃভাষার অধিকার আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরই উদ্যোগে ভাষাসংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় ১৯৪৮ সালে।’ এই বক্তব্য ঠিক নয়। পরবর্তী জীবনে শেখ মুজিবুর রহমান একজন বড় মাপের রাজনীতিবিদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, কিন্তু ১৯৪৮ সালে ঢাকার রাজনীতিতে তাঁর এমন কোনো অবদান ছিল না, যাতে তিনি ভাষা আন্দোলন বা অন্য কোনো আন্দোলনের সূচনা করতে পারেন।

এটা সবাই জানেন এবং এই সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত যে ১৯৪৮ সালে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন আবদুল মতিন। এ জন্য তিনি ‘ভাষা মতিন’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন। আবদুল মতিনের সঙ্গে সেই কমিটি গঠনের ব্যাপারে অন্যরাও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাতে শেখ মুজিবের কোনো উদ্যোগ, এমনকি উল্লেখযোগ্য সম্পৃক্ততা ছিল না। অন্য অনেকের মতো তিনি ১১ মার্চ মিছিলে রাস্তায় ছিলেন এবং জেলে গিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে যখন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়, তখন শেখ মুজিব জেলে ছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেছেন, পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের রিপোর্টে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের উল্লেখ আছে। শেখ মুজিবকে শাস্তিযোগ্য লোক প্রমাণ করার জন্যও এভাবে লেখা হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া গোয়েন্দা পুলিশরা অনেক মিথ্যা রিপোর্ট নিজেরাও তৈরি করে থাকে। মোনায়েম খানের আমলে একবার কুমিল্লার ধীরেন দত্ত, অজিত গুহ এবং আমাকে জড়িয়ে এক গোয়েন্দা রিপোর্ট দিয়েছিল। এটা নিয়ে মোনায়েম খান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শামসুল হক সাহেবের ওপর আমাকে বরখাস্ত করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তাতে কাজ হয়নি। এরপরই ওই গোয়েন্দা রিপোর্ট মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ গোয়েন্দাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় মণি সিংহের বিরুদ্ধেও এক মিথ্যা গোয়েন্দা রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল এবং সেটাও ধরা পড়েছিল।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখা যায়, তা হলো ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদদের সংগৃহীত তথ্যের পরিবর্তে গোয়েন্দা পুলিশের রিপোর্টই কি অধিকতর নির্ভরযোগ্য? ইতিহাসবিদদের পরিবর্তে পুলিশের গোয়েন্দারাই কি প্রকৃত অর্থে সত্যের ধারক–বাহক?

ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকা মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, এটা শেখ হাসিনার নিজস্ব বক্তব্য। বাস্তবত দেখা যাবে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের নায়কোচিত ভূমিকার কথা বলে এ দেশে অনেক লেখালেখি হচ্ছে। অজস্রই বলা যেতে পারে। এ ধরনের একটি লেখার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। কারণ, এটি প্রকাশিত হয়েছে কয়েক দিন আগে, ২১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকায়। আওয়ামী ঘরানার এক সাহিত্যিক ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষা আন্দোলন’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। সেই প্রবন্ধে শেখ মুজিবুর রহমানকে ভাষা আন্দোলনের মহানায়ক হিসেবে উপস্থিত করে অনেক কথা বলা হয়েছে, কিন্তু জনগণের ভূমিকার কোনো উল্লেখমাত্র এই লেখায় নেই। বলা হয়েছে, ভাষা আন্দোলন ছিল শেখ মুজিবের আন্দোলন। ‘বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ।’ বাস্তবত শেখ মুজিবের ভূমিকা কোথায় কীভাবে ছিল, এর কোনো উল্লেখ না করে তিনি বলেছেন ভাষা আন্দোলন যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে, তাতে তাঁর ‘নেপথ্য ভূমিকার অবদান’–এর কথা। এই রচনায় ইতিহাসকে যেভাবে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে, তা বিস্ময়কর। এভাবে ইতিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখাতে তিনি বলছেন, ‘তিনি না হলে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জন কত শতাব্দী পিছিয়ে যেত, তা পরিমাপ করা যায় না।’ দেখা যাচ্ছে পূর্ব বাংলায় জনগণের ওপর পাকিস্তান সরকারের শোষণ–নির্যাতন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ জনগণের ওপর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সর্বাত্মক সশস্ত্র আক্রমণ, তার বিরুদ্ধে জনগণের বিশাল স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ আন্দোলন, তাঁদের আত্মত্যাগ—এসবের কোনোই গুরুত্ব নেই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে! শেখ মুজিব না থাকলে জনগণের সেই প্রতিরোধ ‘শতাব্দীর পর শতাব্দী’ বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পারত না! এ ধরনের লেখালেখি ও ভুল ইতিহাসচর্চাই এখন বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবী, লেখক, ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক করছেন। এর ফলে বিভিন্ন পদ অধিকার করে এবং নানা প্রকার সুযোগ–সুবিধা লাভ করে তাঁরা ভালোই আছেন।

পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি বইটি লেখার সময় ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। (সেই সাক্ষাৎকারের বিবরণ আছে আমার আত্মজীবনী আমার জীবন–এর তৃতীয় খণ্ডে)। একদিন তাঁকে ফোন করে বললাম, আমি ভাষা আন্দোলনসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে একটা বই লিখছি, তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। তিনি বললেন, ‘আগামীকাল সকাল সাতটায় চলে এসো।’ আমি যথাসময়ে গেলাম ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তাঁর বাড়িতে। সেই একবারই আমি ওই বাড়িতে গেছি। গিয়ে দেখলাম সেই সাতসকালেই সেখানে লোকের ভিড়। আমি খবর দেওয়ায় তিনি বেরিয়ে এসে আমাকে তাঁর সঙ্গে ভেতর দিকের একটা কামরায় নিয়ে গেলেন। কাজের লোকদের বললেন, কেউ যেন ঘরের মধ্যে না আসে। এরপর তিনি নিজেই দরজা বন্ধ করে দিলেন।

আমি তাঁর সঙ্গে ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ধর্মঘট আন্দোলন, ১৯৪৯ সালের খাদ্য আন্দোলন, ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনসহ পরবর্তীকালের রাজনীতি ও রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে অনেকক্ষণ আলাপ করেছিলাম। তিনি তো আমাকে ছোটবেলা থেকেই চিনতেন। আগ্রহের সঙ্গে আমাকে অনেক সময় দিয়েছিলেন। কথাবার্তার মধ্যে আমাকে রসগোল্লাও খাইয়েছিলেন।

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের বিষয় আলোচনার সময় তিনি বললেন, সেই আন্দোলনে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। আমি বললাম, সেটা কী করে হয়। আপনি তো তার আগে কলকাতায় ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছিলেন। ঢাকার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক তো থাকেনি। সে সময় ঢাকায় নবাগত ছিলেন। তিনি বললেন ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ও জেলে যাওয়ার কথা। আমি বললাম, সে সময় তো শত শত ছাত্র এবং সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী রাস্তার আন্দোলনে ছিলেন। তাঁদের অনেকেরই জেল হয়েছিল। তাঁদের সবার একটা ভূমিকা থাকলেও অল্পসংখ্যকেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

এ ছাড়া আমি তাঁকে বললাম, আপনি তো বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সদস্যও ছিলেন না। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের ঠিক পরপরই জিন্নাহ সাহেব ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে এবং ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, শামসুল হক, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ অনেকে সেই দুই সাক্ষাতের সময় ছিলেন, কিন্তু আপনি তো তাঁদের মধ্যে ছিলেন না। তিনি বললেন, ‘আমি তাজউদ্দীন ও নজরুল ইসলামকে আমার প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলাম।’ কায়েদে আজমের সঙ্গে নিজে দেখা করতে না গিয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন, এ কথায় আমি খুব বিস্মিত হয়েছিলাম। তাঁকে বললাম, সেটা কী করে হয়? এখন আপনি তাঁদের আপনার প্রতিনিধি হিসেবে কোথাও পাঠাতে পারেন। কিন্তু তখন ঢাকার রাজনীতিতে তো তাজউদ্দীন ও নজরুল ইসলামের গুরুত্ব আপনার থেকে বেশি ছিল। সৈয়দ নজরুল ইসলাম তো ছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি)। সেই হিসেবে তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। তাজউদ্দীন ছিলেন একটি গ্রুপের সদস্য এবং তখনকার ঢাকার রাজনীতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি এরপর আর কিছু বললেন না, চুপ করে থাকলেন। আমার এসব কথার পর তিনি যে আমার ওপর রাগ করেছিলেন বা বিরক্ত হয়েছিলেন, এমন মনে হলো না।

ভাষা আন্দোলন বিষয়ে আমার লেখার বিরুদ্ধে লেখালেখি ও বিষোদ্​গার শুরু হয়েছিল অনেক আগে। এর সূচনা করেছিলেন অধ্যাপক মযহারুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সহকর্মী, পরে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। দৈনিক ইত্তেফাক–এ ১৯৭৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বিশেষ সংখ্যা ও পরবর্তী রবিবাসরীয় একাধিক সংখ্যায় একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মযহারুল ইসলাম ‘ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ রচনা প্রকাশ করেন। এ রচনাটিতে তাঁর বক্তব্য ছিল, আমি ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকাকে অস্বীকার করে কৌশলের সঙ্গে তাঁকে খাটো করার চেষ্টা করেছি। বস্তুতপক্ষে তাঁর রচনায় সঙ্গে তথ্য ও সত্যের কোনো সম্পর্ক ছিল না। সেটা ছিল তোষামোদের উদ্দেশ্যে আমার বিরুদ্ধে এক বড় মিথ্যাচার। সে সময় তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক।

আমি মযহারুল ইসলামের সেই রচনার একটি দীর্ঘ জবাব দিয়ে ইত্তেফাক পত্রিকায় পাঠালাম। দুই কিস্তিতে সেটা ছাপা হয়েছিল। এখানে বলা দরকার যে ইত্তেফাক–এ ড. মযহারুল ইসলাম আমার বিরুদ্ধে যা লিখেছিলেন, সেসব কথা ছিল তাঁর দ্বারা লিখিত ও বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নামে একটি বৃহদাকার বইয়ে। বইটি ছিল মিথ্যায় পরিপূর্ণ। মযহারুল ইসলাম তাঁর লেখাটিতে এমন এক কাজ করেছিলেন, যা ছিল বিস্ময়কর। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, পরবর্তীকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদাধিকারী একজন লোক যে কতখানি মূর্খ, অসৎ ও ধান্দাবাজ হতে পারেন, তাঁর দৃষ্টান্ত তিনি রেখেছিলেন। তিনি নাটকীয়ভাবে বর্ণনা করেছিলেন ভাষা আন্দোলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ভূমিকার কথা। লিয়াকত আলীর মৃত্যু হয়েছিল ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর। এ নিয়ে তখন চারদিকে মহা হইচই হয়েছিল।

মযহারুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে চলে যাওয়ার পর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হয়েছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা বাংলা বিভাগে সহকর্মী থাকার সময় তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হওয়ার পর মুস্তাফা নূরউল ইসলাম একদিন শেখ মুজিবের সঙ্গে একাডেমির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। তখন রাত প্রায় ১২টা। অন্যান্য বিষয় আলোচনার পর তিনি শেখ মুজিবকে বলেন, তাঁকে নিয়ে কিছু লেখালেখি হচ্ছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। এসবের দ্বারা তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী শুধু নন, জাতির পিতা। কাজেই তাঁর ভাবমূর্তি এভাবে নষ্ট হওয়া ঠিক নয়। মুস্তাফা সাহেব ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে পরোক্ষভাবে এসব কথা বলতে থাকার সময় শেখ মুজিব তাঁকে বলেন, ‘কী বলছিস সোজা করেই বল না। এত ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে কথা বলার কী দরকার?’ শেখ মুজিবের এ কথার পর মুস্তাফা সাহেব আমার বিরুদ্ধে মযহারুল ইসলামের লেখালেখির কথা, বিশেষ করে তাঁর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নামক বইটির কথা উল্লেখ করেন। এ কথা শুনে শেখ মুজিব তাঁকে বলেন, ‘তুই কি মনে করিস, আমি এসব বিষয়ে কিছু জানি না।’ এই বলে তিনি বইয়ের একটি শেলফ দেখিয়ে বলেন, ‘ওটার ওপর যে ফাইলটা আছে, সেটা নিয়ে আয়।’ ফাইল নিয়ে এলে তিনি বললেন, ‘দেখ, ওতে কী আছে।’ দেখা গেল, সেই ফাইলে আমার ও ড. মযহারুল ইসলামের ইত্তেফাক–এ প্রকাশিত বিতর্কমূলক রচনাগুলো একসঙ্গে সাজিয়ে রাখা আছে। খুব সম্ভবত প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে ফাইলটি তৈরি করে তাঁর কাছে দেওয়া হয়েছিল।

ফাইলে লেখাগুলো দেখে মুস্তাফা সাহেব বলেন, ‘আপনি তো এগুলো দেখেছেন। এ বিষয়ে আপনার মত কী?’ শেখ মুজিব বললেন, ‘উমর যা লিখেছে, তার তথ্যগুলি ঠিক, সে বিষয়ে আমার বলার কিছু নেই। তবে তার মূল্যায়নের সাথে আমি একমত নই।’ মুস্তাফা সাহেব বললেন, ‘ডক্টর মযহারুল ইসলামের বই যদি ভুল তথ্যে এভাবে ভরা থাকে, তাহলে সেটা তো আপনার ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। আপনি তো দেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাতির পিতা। কিন্তু আপনি যদি বলেন, তাহলে বইটির যে হাজার হাজার কপি গুদামে আছে, সেগুলো আমি স্কুল–কলেজে ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে দিতে পারি। তবে সেটা তো ভালো হবে না। কিন্তু যদি এভাবে বিক্রি করা না হয়, তাহলে আবার বাংলা একাডেমির বিরাট ক্ষতি।’

মুস্তাফা সাহেব এ কথা বলার পর শেখ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, ‘যা, বইগুলো ফেলে দেগা। কোনো অসুবিধা হবে না। ওপরে আল্লাহ, নিচে শেখ মুজিব।’ এর পরদিন সকালের দিকে বাংলা একাডেমিতে গিয়ে মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ড. মযহারুল ইসলামের নধরকান্তি বইটির হাজার হাজার কপি গুদাম থেকে বের করে ফেলে দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ আছে পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত আমার আত্মজীবনী আমার জীবন–এর (প্রকাশক বাঙ্গালা গবেষণা) চতুর্থ খণ্ডে। হাজার হোক, নিজের একটা বৃহদাকার জীবনীগ্রন্থ এভাবে ফেলে দেওয়ার মধ্যে যে শেখ মুজিবের সততার একটা পরিচয় ছিল, এতে সন্দেহ নেই।

ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকা মুছে ফেলা তো দূরের কথা, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে আমি বাঙলাদেশের অভ্যুদয় নামক আমার দুই খণ্ডে প্রকাশিত (প্রকাশক বাতিঘর) বইয়ে অনেক লিখেছি। এক শ ভাগ তথ্যের ভিত্তিতে লিখিত বিবরণে তাঁর ভূমিকা যা–ই হোক না কেন, তা মুছে ফেলার কোনো চেষ্টা আমি করিনি।

ইতিহাসে যেকোনো ব্যক্তির ভূমিকা আলোচনার জন্য ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। কারণ, কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে কে কী মনে করে, তার দ্বারা কোনো ব্যক্তির সঠিক ভূমিকা নির্ণয় করা একেবারেই অবৈজ্ঞানিক এবং প্রকৃত ইতিহাসচর্চার পথে মস্ত অন্তরায়। এ কথা সত্য যে একজন বড় মাপের ঐতিহাসিক ব্যক্তি তাঁর নিজের বিশেষ ক্ষেত্রে সমাজকে, সমাজের চিন্তাভাবনা, সাহিত্যকর্ম, বিজ্ঞানচর্চা, রাজনীতি ইত্যাদিকে অল্পবিস্তর প্রভাবিত করে থাকেন। কিন্তু তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, তাঁদের প্রত্যেকেই নিজের সময়ের সমাজকাঠামোর অধীন। প্রত্যেক মানুষের—তিনি যতই সামান্য বা বিরাট হোন—চিন্তাভাবনা ও কার্যকলাপ তাঁর পরিপার্শ্ব এবং তাঁর সময়কার সমাজ সম্পর্ক ও বিদ্যমান পরিস্থিতি দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আঠারো শতকের সমাজে সম্ভব ছিলেন না। ডারউইন ও মার্ক্সও সম্ভব ছিলেন না আঠারো শতকে। উনিশ শতকে সম্ভব ছিল না গান্ধী, জিন্নাহ, নেহরুর মতো রাজনৈতিক নেতার আবির্ভাব। আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানী সম্ভব ছিলেন না উনিশ শতকে। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকের মতো চিত্রপরিচালক সম্ভব ছিলেন না বিশ শতকের প্রথম দিকেও। শুধু তা–ই নয়, এসব বিরাট পুরুষ ছাড়াও সাধারণ রাম–রহিমের জীবনও এভাবে তাঁদের বিদ্যমান সমাজ দ্বারাই গঠিত। যেকোনো মানুষের—তিনি ছোট, বড়, মাঝারি যে মাপেরই হোন না কেন—জীবন, চিন্তাভাবনা ও কর্ম তাঁর সময় ও সমাজ দ্বারা নির্ধারিত। কাজেই কে কার সম্পর্কে কী মনে করছে বা মনে করতে চায়, তার দ্বারা কোনো ব্যক্তির ঐতিহাসিক ভূমিকা নির্ধারণ প্রচেষ্টা বিবেচনার বিষয় হতে পারে না। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে মার্ক্স, প্লেখানভ ও লেনিনের তাত্ত্বিক রচনা আছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কারও কারও মতো আমিও ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা বিষয়ে লিখেছি।

ইতিহাসে দেখা যায়, যাঁরা নিজের বিশেষ ক্ষেত্রে বড় মাপের মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, ভূমিকা পালন করেছেন, সেটা রাতারাতি হয়নি। ছোট থেকে বড় হওয়ার জন্য তাঁদের চেষ্টা করতে হয়েছে। বড় হয়ে তিনি যেসব কাজ করেছেন, ছোট থাকা অবস্থায় সেসব কাজ তাঁর দ্বারা সম্ভব ছিল না।

সমাজ পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই প্রতিটি সমাজ অগ্রসর হয়। এভাবে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রই বিকশিত হয়। এ জন্য সময়ের একপর্যায়ে যা হয় বা পাওয়া যায়, অন্য পর্যায়ে তা হয় না, তা পাওয়া যায় না। আবার একই সময়ে বা একই পর্যায়ের প্রয়োজনের তাগিদে দেখা যায় একই ধরনের মানুষ, তাঁদের একই ধরনের কাজ। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, একাধিক ব্যক্তির একই রকম কাজ। একই বিন্দুতে তাঁদের অবস্থান। নিউটন এবং জার্মান দার্শনিক ও গণিতবিদ লাইবনিৎস একই সময়ে স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন ডিফারেনশিয়াল অ্যান্ড ইন্টেগ্রাল ক্যালকুলাস; একই সময় আবির্ভাব হয়েছিল মার্ক্স ও এঙ্গেলস এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয় দত্ত; আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞানীরা খুব কাছাকাছি সময়ে স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন আণবিক বোমা।

সমাজের বিবর্তন সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিনিরপেক্ষ। বিবর্তনের প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে কখন সমাজে কী ঘটবে, কী ধরনের সব নতুন নতুন শক্তির উত্থান হবে, কী ধরনের ব্যক্তির আবির্ভাব হবে। এসবের সঙ্গে ব্যক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। সবই ব্যক্তিনিরপেক্ষ। এভাবেই ইতিহাসে আবির্ভাব হয় একেক সময়ে, একেক পর্যায়ে বিশেষ ধরনের ব্যক্তির। এখানে ব্যক্তি নির্ধারক নয়, ইতিহাসই আবির্ভাব ঘটায় প্রয়োজনীয় ব্যক্তির। প্লেখানভ লিখেছিলেন, নেপোলিয়ন যদি না থাকতেন, তাহলে তৎকালে ফ্রান্সে নেপোলিয়নের মতো অন্য এক সামরিক নায়কের আবির্ভাব ঘটত। শেখ মুজিব না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দু–চার বছর বা দু–দশ বছর নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী পিছিয়ে যেত—এ ধরনের বক্তব্যের মধ্যে অন্য যে জ্ঞানই থাকুক, সামান্যতম ইতিহাসজ্ঞান নেই।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-12%2F88cwn7g7%2F12092025-cm-14.jpg?rect=0%2C94%2C2631%2C1754&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বদরুদ্দীন উমর

Monday, September 8, 2025

ইতিহাসের আয়নায় বদরুদ্দীন উমর ও বামপন্থা by লাবণী মণ্ডল

লেখক-গবেষক, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

আজ রোববার সকাল ১০টার একটু পর রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বদরুদ্দীন উমরের বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।

একাধারে শিক্ষক, লেখক, চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী— বদরুদ্দীন উমর বামপন্থী ধারার এক ব্যতিক্রমী ও গভীরতম প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তার অনুপম পাঠ হলো মহিউদ্দিন আহমদের লেখা বামপন্থার সুরতহাল: বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস পরিক্রমা।

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ১৯২ পৃষ্ঠার এই বই এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও এটি নিছক কথোপকথন নয়। বরং এখানে মিলেছে আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক ইতিহাস, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের বাম রাজনীতির বহু অজানা অধ্যায়ের প্রাণবন্ত বিবরণ। বইটি যেমন ব্যক্তি বদরুদ্দীন উমরের ভাবনার ভেতর প্রবেশের দরজা খুলে দেয়, তেমনি পাঠককে নিয়ে যায় ইতিহাসের উত্থান-পতনের অভ্যন্তরেও।

এই বই নিয়ে লেখাটি পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যাঁর নাম অবধারিতভাবে চলে আসে, তিনি বদরুদ্দীন উমর। একাধারে শিক্ষক, লেখক, চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী—তিনি বামপন্থী ধারার এক ব্যতিক্রমী ও গভীরতম প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তার অনুপম পাঠ হলো মহিউদ্দিন আহমদের লেখা বামপন্থার সুরতহাল: বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস পরিক্রমা।

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ১৯২ পৃষ্ঠার এই বই এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও এটি নিছক কথোপকথন নয়। বরং এখানে মিলেছে আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক ইতিহাস, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের বাম রাজনীতির বহু অজানা অধ্যায়ের প্রাণবন্ত বিবরণ। বইটি যেমন ব্যক্তি বদরুদ্দীন উমরের ভাবনার ভেতর প্রবেশের দরজা খুলে দেয়, তেমনি পাঠককে নিয়ে যায় ইতিহাসের উত্থান-পতনের অভ্যন্তরেও।

‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ হয়ে ওঠার পথে

বদরুদ্দীন উমরের চিন্তাজগৎ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’, যার উৎপত্তি ইউরোপীয় মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকদের ভাবনায়। এই ধারণায় এমন এক বুদ্ধিজীবীর কথা বলা হয়, যিনি কেবল তত্ত্ব নির্মাণ করেন না, বরং বাস্তবেও সেই তত্ত্ব প্রয়োগে সক্রিয় থাকেন। বদরুদ্দীন উমর এ ধারণার বাস্তব প্রতিফলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে তিনি যুক্ত হন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিতে (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী)। যদিও পরবর্তীকালে মতপার্থক্যের কারণে দলীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবু বাম রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সংলগ্নতা অটুট থাকে। গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে আন্দোলন, সভা-সেমিনার, লেখালিখি—সবখানেই তিনি থেকেছেন সক্রিয়।

রাজনীতি, দর্শন ও ব্যক্তি

বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে বদরুদ্দীন উমরের ব্যক্তিজীবনের সংযোগটি এতে যত্নের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কাটানো শৈশব ও কৈশোর, পরিবারের পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসা, ছাত্রজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, শিক্ষকতা, পরবর্তীকালে লেখালেখিতে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ—সবই এসেছে তাঁর নিজস্ব কণ্ঠে। যদিও এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী নয়, তবু তাঁর চিন্তার পেছনের পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা এখানে গভীরভাবে প্রতিফলিত।

বদরুদ্দীন উমর অকপটে জানিয়েছেন, ছাত্ররাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না থেকেও কীভাবে তিনি বাম রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের চেষ্টাও করেন। তবে পরবর্তীকালে সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠকের চেয়ে তাঁর ভূমিকা বেশি হয়ে ওঠে চিন্তক ও লেখকের। এটি এক অর্থে তাঁর রাজনৈতিকতা ও আত্মজিজ্ঞাসার অনুপম দলিল।

বামপন্থার সুরতহাল

বইয়ের মূল অংশজুড়ে এসেছে বাম রাজনীতির নানা বাঁকবদলের আলোচনা। সেখানে অবধারিতভাবে এসেছে আওয়ামী লীগের জন্ম, শেখ মুজিবের উত্থান, ভাসানীর রাজনৈতিক অবস্থান, ন্যাপ গঠন, পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য, ঊনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তর–পরবর্তী সময়, জাসদের উত্থান, সর্বহারা পার্টির রাজনীতি, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, এমনকি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও।

এ বই কেবল ইতিহাস নয়, দৃষ্টিভঙ্গিরও দলিল। বদরুদ্দীন উমরের বিশ্লেষণ তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দায়বদ্ধতা থেকে উৎসারিত। তিনি কেবল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তাত্ত্বিকতা নয়; বরং জীবনের বাস্তবতায় তার প্রয়োগযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে বইটি হয়ে উঠেছে তত্ত্ব ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব-সন্ধির এক মনস্তাত্ত্বিক দলিলও।

বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়জুড়ে রয়েছে তাঁর পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের গল্প। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ না করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিজের তাগিদে, নিজের আনন্দে বই লিখি। এর জন্য কেউ আমাকে পুরস্কার দেবে, এটা আমি গ্রহণ করতে পারি না। এটা একধরনের ইগো বলতে পারেন।’ নোবেল পুরস্কার সম্পর্কেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, নোবেল অনেক সময় সাম্রাজ্যবাদের কূটকৌশলের অংশ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এখানে কেবল প্রশ্নকারী নন; তিনি একধরনের শ্রুতিলেখক, যিনি বক্তার কণ্ঠস্বর ও বয়ানের স্বচ্ছতা বজায় রেখে তাঁর অন্তর্গত চিন্তার বিন্যাসে এক ধ্যানস্থ দক্ষতা দেখিয়েছেন। তাঁর ভাষা সহজ, নির্ভার। রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো কঠিন বিষয়কেও তিনি উপস্থাপন করেছেন কথোপকথনের প্রাণবন্ত ধারায়।

ইতিহাসের আয়নায় একটি চিন্তার পরিক্রমা

এ গ্রন্থ বাংলাদেশের বাম রাজনীতির চূড়ান্ত বা সামগ্রিক সুরতহাল নয়, বরং একজন তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মীর আত্মপ্রবণ যাত্রার দলিল। ষাট-সত্তরের দশকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাস ও অন্তর্দ্বন্দ্ব জানতে আগ্রহী পাঠকের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। তবে এই পাঠ গ্রহণের জন্য প্রয়োজন পাঠকের বিশ্লেষণী মনোভাব। ‘বামপন্থার সুরতহাল’ শুধু ব্যক্তির আত্মকথা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মূল্যবান অনুরণন।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

Friday, August 15, 2025

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর সেনানিবাসে কী ঘটেছিল by হাফিজ উদ্দিন আহমদ

সৈনিক জীবন: গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর বইয়ের লেখক হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আত্মজৈবনিক বইটিতে রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ, শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং সেনাবাহিনীর ভেঙে পড়া চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধারের চেষ্টা—এসব ঘটনার বিস্তারিত বয়ান রয়েছে। এ বইয়ের প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সকাল পৌনে ছয়টা বাজে। দরজার কলবেলের একটানা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।

ড্রয়িংরুমের দরজা খুলে দেখি ২য় ফিল্ডের সিও মেজর রশিদ এবং সেনাসদরের একজন স্টাফ অফিসার মেজর আমীন আহম্মেদ চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। আমীন সিভিল ড্রেসে কিছুটা উদ্‌ভ্রান্ত, বিমর্ষ। শান্ত-নিরুত্তাপ গলায় রশিদ বললেন, ‘উই হ্যাভ ডান ইট। শেখ মুজিব হ্যাজ বিন কিলড।’

সদ্য ঘুম থেকে উঠে এ ধরনের ভয়াবহ সংবাদ শুনে বিস্ময়ে বিমূঢ় দৃষ্টিতে আমীনের দিকে তাকালাম। এঁরা দুজন বন্ধু, পিএমের কোর্সমেট এবং আমার সিনিয়র। আমীন নিশ্চুপ রইলেন। বাইরে তাকিয়ে দেখি এক গাড়ি ভর্তি আর্টিলারি সৈনিক রশিদের সঙ্গেই আমার বাসার গেট খুলে প্রবেশ করেছে। ড্রয়িংরুমের বাইরেই তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

রশিদ আদেশের সুরে বললেন, ‘আমি কমান্ডারের (কর্নেল শাফায়াত) কাছে যাচ্ছি। তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে।’  ইতিমধ্যে রাইফেলধারী দুজন সৈনিক আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে আমার ড্রয়িংরুমে ঢোকে। রশিদের নির্দেশ পেলেই তারা আমাকে গুলি করবে কিংবা বন্দী করবে, এমনটি মনে হলো। রশিদের কথা শুনে আমি হতভম্ব, বলে কী! প্রেসিডেন্টকে হত্যা করে এমনভাবে বলছে, যেন কিছুই হয়নি। আমি একটু সময় নিয়ে ধাতস্থ হওয়ার জন্য বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি ইউনিফর্ম পরে আসছি।’

দ্রুত ইউনিফর্ম পরে নিলাম। ভাবলাম এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমার প্রথম কাজ ব্রিগেড কমান্ডারকে ঘটনা সম্পর্কে জানানো। সুতরাং তাঁর কাছেই যাব। রশিদের প্রস্তাবে রাজি না হলে এরা যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারে। আমি একেবারেই নিরস্ত্র, বাসায় কোনো গার্ডও নেই। স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে। তাকেও জানালাম না।

আমার বাসা সেনানিবাসের মেইন রোডের পাশেই। রাস্তার উল্টো দিকেই ডেপুটি চিফ জেনারেল জিয়ার বাসা। জিয়ার বাসার পেছনের রাস্তার ওপারেই ৫০ গজ দূরে কমান্ডার কর্নেল শাফায়াতের বাসা। রশিদের কথামতো বাসা থেকে বেরিয়ে আমি ও আমীন আহম্মেদ তাঁর জিপে উঠলাম। গাড়িভর্তি সৈনিকেরাও আমাদের ফলো করে।

মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ব্রিগেড কমান্ডারের বাসায় পৌঁছে গেলাম। রাস্তায় কোনো জনপ্রাণী নেই, সবাই তখনো সুখনিদ্রায় বিভোর। কমান্ডারের বাসায়ও ২য় ফিল্ডের সৈনিকেরা গার্ড ডিউটি করছে। আমি কলবেল বাজাতেই ব্যাটম্যান দরজা খুলে দিল। আমরা ড্রয়িংরুমে সোফায় বসলাম। মিনিট দুয়েকের মধ্যে লুঙ্গি-শার্ট পরা কর্নেল শাফায়াত ড্রয়িংরুমে এসে বললেন, ‘কী ব্যাপার?’

‘স্যার, উই হ্যাভ কিলড প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব। আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অ্যাকশনে যাবেন না। গেলে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে।’ বলেই কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে রশিদ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

শাফায়াতও হতভম্ব। আমাকে ও আমীনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রশিদ এসব কী বলছে?’এমন সময় তাঁর বেডরুমে রেড ফোন বেজে ওঠে। তিনি ফোন ধরতে গেলেন। মিনিট দুয়েক পর ফিরে এসে আমাকে বললেন, ‘চিফ (জেনারেল সফিউল্লাহ) ফোন করেছেন। তিনি জানতে চাচ্ছেন কিছুক্ষণ আগে ৩২ নম্বরে প্রেসিডেন্টের বাড়িতে কারা হামলা করেছে। প্রেসিডেন্ট তাঁকে ফোর্স পাঠিয়ে উদ্ধার করতে বলেছেন। আমি কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চিফ কোনো নির্দেশ দিয়েছেন?’

‘না, উনি শুধু কাঁদছেন আর বলছেন, প্রেসিডেন্ট তাঁকে বিশ্বাস করলেন না।’ শাফায়াত বললেন।

‘স্যার, ইউনিফর্ম পরে আসুন, তাড়াতাড়ি অফিসে যাওয়া দরকার।’ আমি বললাম।

‘ওকে।’ বললেন শাফায়াত।

কয়েক মিনিট পরই আমি ও কমান্ডার বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম। আমীন গেলেন তাঁর অফিসার মেসে। এত ভোরে কারও গাড়ি আসেনি। তাই পায়ে হেঁটে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। রাস্তার মোড়েই জেনারেল জিয়ার শহীদ মইনুল রোডের বাসার পূর্ব পাশের দেয়াল। শাফায়াত বলে উঠলেন, ‘চলো, জেনারেল জিয়ার বাসায় যাই, ঘটনাটি তাঁকে জানাই।’

আমরা দুজন দ্রুত হেঁটে জিয়ার বাসায় গেলাম। সেখানে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের সৈনিকেরা গার্ড ডিউটি করছে, সবাই আমার পরিচিত। তারা গেট খুলে দিলে আমরা দুজন দ্রুত হেঁটে জিয়ার বাসায় গেলাম। সেখানে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের বাসার ভেতরে ঢুকি।

কলবেল টিপলে জিয়া নিজেই দরজা খুলে দিলেন। তাঁর পরনে সাদা পায়জামা, সাদা হাফহাতা গেঞ্জি। শেভ করছিলেন, মুখে সাদা শেভিং ক্রিম, কাঁধে তোয়ালে। আমাদের দেখে বললেন, ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড?’

‘স্যার, প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড। একটু আগে মেজর রশিদ এসে আমাকে জানিয়ে গেল।’ শাফায়াত বললেন।

‘সো হোয়াট? প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। উই উইল আপহোল্ড দ্য কনস্টিটিউশন। (আমরা সংবিধান মেনে চলব) গো অ্যান্ড গেট ইউর ট্রুপস রেডি।’ জিয়ার মন্তব্য। আমরা গেট দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় জিয়াকে নেওয়ার জন্য একটি জিপ বাসায় ঢুকছিল। আমরা ড্রাইভারকে বললাম আমাদের অফিসে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ড্রাইভার রাজি হয়ে গাড়ি ঘোরাল আমাদের তুলে নেওয়ার জন্য।

জিপে উঠে আমি কমান্ডারকে পরামর্শ দিলাম অরক্ষিত ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে না গিয়ে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের সৈনিকদের সঙ্গে থাকাই আমাদের জন্য শ্রেয়। আমার বিবেচনায় এই ইউনিট আমাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। কমান্ডার রাজি হলেন। আমরা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের ২০০ গজ দূরে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের অফিস এলাকায় ঢুকে জিয়ার গাড়িটি ছেড়ে দিই। আসার পথে প্রধান সড়কে দেখা হলো আমার স্ত্রীর বড় ভাই মেজর ইকবালের সঙ্গে। তিনি ব্যক্তিগত ভক্সওয়াগন গাড়ি চালিয়ে আমার বাসার দিকে আসছিলেন। তিনিও আমাদের সঙ্গী হলেন। ইকবাল ১ম ইস্ট বেঙ্গলের চার্লি কোম্পানির কমান্ডার।

১ম ইস্ট বেঙ্গলে যাওয়ার জন্য মেইন রোড থেকে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে এয়ারফোর্স হ্যাঙ্গারের সামনে আসতেই দেখতে পেলাম একটি ট্যাংক দাঁড়িয়ে রয়েছে। ট্যাংকের টারেটে বসে আছেন মেজর ফারুক রহমান, ১ম ইস্ট বেঙ্গল ল্যান্সারের উপ–অধিনায়ক (টুআইসি)। পরনে কালো ইউনিফর্ম, মাথায় কালো হেড গিয়ার। ট্যাংকের মেইনগানের মুখ প্রধান সড়কের দিকে।

৪৬তম ব্রিগেডের ঢাকায় অবস্থিত ৩টি পদাতিক ব্যাটালিয়নের দুটি ১ম ইস্ট বেঙ্গল ও ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল পাশাপাশি রয়েছে। এদের বিভক্ত করেছে একটি ২০ ফুট প্রশস্ত পাকা সড়ক। ১ম ইস্ট বেঙ্গলে প্রবেশ করার সময় লক্ষ করলাম, এ সড়কের ওপরও একটি ট্যাংক অবস্থান নিয়েছে। আমাদের দুটি ব্যাটালিয়নের মাঝামাঝি ট্যাংকের আক্রমণাত্মক অবস্থান দেখে বিস্মিত হলাম, এদের মতলবটা কী?

মিনিট দশেকের মধ্যে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের সব অফিসার সিওর অফিসে সমবেত হলেন। সবার চোখেমুখে উত্তেজনা। একজন বললেন, তিনি সৈনিক ব্যারাকের পাশ দিয়ে হেঁটে আসার সময় রেডিওতে মেজর ডালিমের ঘোষণা শুনেছেন, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে এবং দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে। কমান্ডার জিজ্ঞেস করলেন, ‘সৈনিকদের রিঅ্যাকশন কী?’

‘তারা উল্লাসধ্বনি দিচ্ছে, আনন্দ প্রকাশ করছে,’ অফিসারের সংক্ষিপ্ত জবাব।

কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক আমি ৪৬ ব্রিগেডের সব ইউনিটকে স্ট্যান্ড টু (লোকাল ডিফেন্স এবং বাইরে মুভ করার প্রস্তুতি) অবস্থানে থাকার নির্দেশ জারি করি। অফিসকক্ষে তুমুল উত্তেজনা। মিনিটে মিনিটে টেলিফোন আসছে। কারও বিস্ময়ের ঘোর তখনো কাটেনি। নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রায় এত বড় প্রলয়ংকরী ঘটনা। সিনিয়র অফিসাররা কেউ কিছু জানে না, দেশের প্রেসিডেন্ট নিহত! ব্রিগেড অফিসার মেসে আর্টিলারির কয়েকজন অফিসার বসবাস করে। সবাই বলাবলি করছে, গত রাতে নাইট ট্রেনিং ছিল, ২য় ফিল্ডের অফিসাররা সকাল নাগাদ ফিরে আসেনি।

১ম ইস্ট বেঙ্গলের সিও মেজর মতিউর, কমান্ডার ও আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছি। হঠাৎ কাচ ভাঙার শব্দ শুনলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি একজন লেফটেন্যান্ট সিওর অফিসের দেয়াল থেকে রাষ্ট্রপতি মুজিবের ছবি নামিয়ে সবার সামনেই আছাড় মেরে সশব্দে ভেঙে ফেলেছে। কাচের টুকরা বারান্দায়ও ছিটকে পড়ে! সবাই তাকিয়ে দেখছে, আশ্চর্য! কেউ তাকে কিছুই বললেন না!

এমন সময় অ্যাডজুট্যান্ট এসে কমান্ডারকে জানাল, সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ টেলিফোন ধরে আছেন, ব্রিগেড কমান্ডারকে চাইছেন। কমান্ডার সিওর অফিসে ঢুকে টেলিফোনে সিজিএসের সঙ্গে কথা বললেন, নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানালেন। বললেন, ‘স্যার, ১ম বেঙ্গলে চলে আসুন।’

মিনিট পনেরো পর সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ সিজিএস খালেদ ১ম বেঙ্গলে এসে সিওর রুমে ঢুকলেন। মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টর এবং কে ফোর্সের কমান্ডার খালেদ, আর্টিলারি শেলের টুকরা তাঁর মাথায় আঘাত হেনেছিল। কপালে ক্ষতচিহ্ন তাঁর লম্বাটে মুখের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘকায়, সুঠামদেহী, সুদর্শন অফিসার। আসামাত্র সবাই তাঁকে ঘিরে ধরে। একই জিজ্ঞাসা, হচ্ছেটা কী? হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং? খালেদ জানালেন, ২য় ফিল্ড আর্টিলারি এবং ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের সৈনিকেরা গান ও ট্যাংক নিয়ে শহরে মুভ করেছে গত রাতে এবং সূর্যোদয়ের কিছু আগে ৩২ নম্বরে গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেছে!

কর্নেল শাফায়াত সিজিএসকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ট্যাংক রেজিমেন্ট তো আপনার অধীন, আমার ইউনিট এলাকায় ট্যাংক পজিশন নিয়েছে কেন?’

‘তারা আমার নির্দেশ ছাড়াই মুভ করেছে, দে আর রেবেলস।’ খালেদ বললেন!

‘এখন আমাদের করণীয় কী?’ শাফায়াত বললেন।

খানিকক্ষণ চিন্তা করে খালেদ বললেন, ‘লেট আস বারগেইন উইথ দেম।’

এমন সময় চিফ মেজর জেনারেল সফিউল্লাহর টেলিফোন এল। খালেদ ধরলেন। চিফ সিজিএসকে সেনাসদরে ডেকে পাঠালেন। উপস্থিত সবার ধারণা, এ ধরনের ক্রাইসিস মুহূর্তে ব্রিগেডিয়ার খালেদই ত্বরিত সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম। শাফায়াত খালেদকে বললেন, ‘আপনি আমাদের সঙ্গেই থাকুন। আমার ব্রিগেড স্ট্যান্ড টু অবস্থায় রয়েছে। বলুন আমরা কী করব?’

‘আমাকে যেতে দাও। আমি চিফের সঙ্গে কথা বলে আধা ঘণ্টার মধ্যেই এখানে ফিরে আসছি।’ খালেদ বেরিয়ে গেলেন।

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় আমরা অপেক্ষমাণ সেনাসদরের নির্দেশের। নয়টা বেজে গেল। কোনো নির্দেশ আসেনি ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জামিলের কাছে।

সকাল নয়টার একটু পরই ১ম বেঙ্গলে একটি বড় গাড়িবহর এসে উপস্থিত হলো। সর্বাগ্রে ফ্ল্যাগ কারে চিফ সফিউল্লাহ, তারপর নেভি চিফ রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এইচ খান, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং শেষ প্রান্তে একটি এম-৩৮ হুডখোলা জিপে অবসরপ্রাপ্ত মেজর শরিফুল হক ডালিম। ডালিমের পরনে ইস্তিরিবিহীন পুরোনো ইউনিফর্ম, কাঁধে ঝোলানো ভারতে তৈরি নাইনএমএম স্টেন কারবাইন।

চিফ, ডেপুটি চিফ, নেভি চিফ ও এয়ার চিফ, ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত সিওর অফিসে ঢুকে মিনিট দশেক আলাপ করলেন। অন্যান্য অফিসার বাইরে বারান্দায়। চিফ ও অন্যরা বারান্দায় বেরিয়ে এলে সবাই জিজ্ঞেস করলেন, কী হচ্ছে? চিফ সংক্ষেপে জানালেন, ‘রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। মেজর ডালিম সেনাসদরে আমার অফিসে এসেছে কিছুক্ষণ আগে। সে বলছে খন্দকার মোশতাক নাকি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি রেডিও স্টেশনে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’ ‘এখন কী করা যায়?’ সবার দিকে তাকিয়ে বললেন সিএএস মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ।

বারান্দায় দণ্ডায়মান তিন-চারজন অফিসার, এমনকি নেভি চিফ বললেন, ‘স্যার, আপনার যাওয়া উচিত। প্লিজ সেভ দ্য সিচুয়েশন। ব্রিং থিংস আন্ডার কন্ট্রোল।’ মেজর ডালিম এগিয়ে এসে তীব্র স্বরে বলে ওঠে, ‘স্যার, তাড়াতাড়ি করুন, প্রেসিডেন্ট ইজ ওয়েটিং।’

এরপর সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর চিফত্রয় গাড়িতে উঠে রেডিও স্টেশনের দিকে যাত্রা করলেন। মেজর জেনারেল জিয়া এতক্ষণ নীরবে এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, ‘স্যার, আপনি রেডিও স্টেশনে যাচ্ছেন না?’

‘নাহ্, আমি আমার অফিসে যাচ্ছি।’ নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন জিয়া।

আমি ও কমান্ডার শাফায়াত ১ম বেঙ্গলে বসে বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে টেলিফোনে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে আলাপ করছি। সিএএস ১ম বেঙ্গলে থাকার সময়ই শাফায়াত তাঁকে জানালেন, ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের সিও মেজর খালেকুজ্জামান ছুটিতে রয়েছেন। ক্রাইসিস পিরিয়ডে পল্টন পরিচালনা করার জন্য একজন নিয়মিত কমান্ডিং অফিসার প্রয়োজন। চিফ বললেন, ‘কাকে চাও?’ কমান্ডার মেজর আমীন আহম্মেদ চৌধুরীর নাম বললেন। চিফ সিও অফিসের ডেস্ক ক্যালেন্ডারের একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে আমীন আহম্মেদ চৌধুরীকে ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের সিওরূপে পোস্টিং দিলেন। আমীন সেটি হাতে নিয়ে জয়দেবপুরের উদ্দেশে রওনা হলেন। ’৭২ সালে তিনি এই ইউনিট কমান্ড করেছিলেন।

আমরা একটি রেডিও আনিয়ে সংবাদ বুলেটিন শুনছিলাম। একটু পরই শুনতে পেলাম খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানেরা নিজ নিজ বাহিনীর পক্ষ থেকে খন্দকার মোশতাকের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন ব্যক্ত করেন। বিডিআর, পুলিশপ্রধান এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মেজর আবুল হাসানও নতুন রাষ্ট্রপতির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। রক্ষীবাহিনীর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান এ সময় সরকারি কাজে বিদেশে ছিলেন।

বাহিনীপ্রধানদের আনুগত্য প্রকাশের পর প্রতিটি সেনানিবাসে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। মেজর ডালিমের রেডিও ঘোষণার কোনো প্রতিক্রিয়া কোনো সেনানিবাসে দেখা যায়নি। একমাত্র চট্টগ্রামে ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার কাজী গোলাম দস্তগীর চট্টগ্রাম রেডিও স্টেশনে ফোন করে ডালিমের ঘোষণা প্রচার না করার নির্দেশ দেন। তবে নানা কারণে সামরিক বাহিনীর অফিসার ও সদস্যরা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং তাঁরা নির্দ্বিধায় এ পরিবর্তনকে মেনে নিয়েছেন। এত বড় মাপের নেতার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারা দেশে আওয়ামী লীগ কিংবা কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়নি। রাজধানী ও জেলা শহরের আওয়ামী লীগ নেতারা আতঙ্কিত হয়ে গা ঢাকা দেন।...

* মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী ও রাজনীতিক

চিত্রশিল্পীর অঙ্কনে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড।
চিত্রশিল্পীর অঙ্কনে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড।

Saturday, June 28, 2025

বইপত্র- বাংলাদেশি নারীর লাতিন আমেরিকা ভ্রমণবৃত্তান্ত by লোকমান হোসাইন

আজ থেকে ১০০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনায়। সেখানে তিনি আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন আর্জেন্টাইন কবি ও মানবাধিকারকর্মী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর। দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত সেসব জায়গায় ছুটে গিয়েছেন এক বাংলাদেশি নারী। খুঁজে ফিরেছেন বাঙালি এই কবির স্মৃতিচিহ্ন। কান পেতে যেন শোনার চেষ্টা করেছেন দুই কিংবদন্তির সম্পর্কের আদ্যোপান্ত। বলছিলাম লেখক মহুয়া রউফের ভ্রমণ বই লাতিনের নাটাই–এর ‘প্লাতা সব জানে’ গল্পটির কথা।

মূলত দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা স্থান পেয়েছে এই বইয়ে। লেখক জানাচ্ছেন, কিশোর বয়সেই লাতিন আমেরিকান সভ্যতা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। কথোপকথন ও গল্পের ঢঙে লেখা ভ্রমণ গল্পগুলোতে লেখক নিজের দেখা বর্তমানের লাতিন আমেরিকার সমান্তরালে এ অঞ্চলের বিচিত্র ভূগোল, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, সভ্যতা ও ইতিহাসের নানা বিষয় তুলে এনেছেন। বইয়ের সর্বত্রই স্বদেশকে কেন্দ্রে রেখে এই সব দেশ, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে লেখকের একধরনের তুলনামনস্কতা চোখে পড়ে।

বইয়ের ‘ভ্রমণের ভগবান’ গল্পে লেখক আর্জেন্টিনা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন বলিভিয়ায়। এই ভ্রমণের ভগবান আর কেউ নয়—স্বয়ং চে গুয়েভারা! তিনি ঘুরে ঘুরে চের স্মৃতিধন্য প্রতিটি জায়গা পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন—কোথায় তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল, কোথায় গোপনে কবর দেওয়া হয়েছিল—সবকিছু। এ জন্য তাঁকে বলিভিয়ার দুর্গম লাইগেরা ভ্রমণ করতে হয়েছিল। একজন নারী, নিজের প্রাণ ও অচেনা পুরুষের ভয়কে তুচ্ছ করে পাহাড়ি বিপৎসংকুল পথে, রাত্রিকালীন, অনিরাপদ যাত্রা করেন অচেনা ড্রাইভারকে সঙ্গী করে লাইগেরার উদ্দেশে। এ যাত্রা তাই নিছক ভ্রমণ নয়, তীর্থযাত্রা।

দক্ষিণ-পশ্চিম বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার কাছে অবস্থিত ‘সালার দে উইউনি’ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে ‘নুনের মতো ভালোবাসি’ গল্পে। এখানে চারদিকে বিস্তীর্ণ ধু ধু লবণের মরুভূমি দেখার দারুণ এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন লেখক।

বলিভিয়া থেকে লেখকের পরের গন্তব্য চিলি। সেখানকার দুই বিখ্যাত কবি ভিক্তর হারা ও পাবলো নেরুদা। সাম্যবাদী কবি ও সংগীতজ্ঞ ভিক্তর হারা সামরিক স্বৈরশাসকের হাতে নিহত হন। তাঁর স্মৃতিময় জায়গা দেখার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে ‘ভিক্তর হারার শেষ কবিতা—এস্তাদিও চিলি’ অংশে। আর সান্তিয়াগোতে পাবলো নেরুদার বাড়ি পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা হয়েছে ‘নেরুদা, বাড়ি আছ’ অংশটি। লেখক জানাচ্ছেন, নেরুদা বাড়ির নামকরণ করেছেন তৃতীয় স্ত্রীর চুলের নামানুসারে—‘লা চাসকোনা’ যার অর্থ কোঁকড়ানো চুল!

উত্তর চিলিতে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমি আতাকামা। আতাকামা দেখতে গিয়ে লেখক বৈরী আবহাওয়ার সম্মুখীন হন। সেই প্রতিকূলতার বর্ণনা রয়েছে ‘আটকা পড়েছি আতাকামায়’ ভ্রমণগল্পে ‘সেনোরিতা’ ও ‘সভ্যতায় বেঁধেছি প্রাণ’ গল্প দুটি পেরুর ইনকাদের সমৃদ্ধ সভ্যতার গল্প। ৫০০ বছর আগে ইনকা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল পেরুর আন্দিজ পর্বতকে কেন্দ্র করে। লেখক ইনকাদের বয়নশিল্পের রঙিন ইতিহাস, তাদের বিস্ময়কর স্থাপত্যশৈলী, অনন্য কৃষিপ্রযুক্তির নানা বিষয় জানিয়েছেন এখানে।

‘কৃষ্ণ গেছেন রিও’ গল্পটি ব্রাজিলের কর্কোভাডো পর্বতে প্রসারিত বাহুতে সফেদ যিশুখ্রিষ্টের মূর্তি দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে। আবার মেক্সিকোর চিচেন ইতজায় ভ্রমণের বৃত্তান্ত স্থান পেয়েছে ‘চিচেন ইতজা: বিস্ময় এক’ গল্পে। এখানে মায়াসভ্যতার বিস্ময়কর নিদর্শন পিরামিড ও তাঁদের আবিষ্কৃত বর্ষপঞ্জি দেখার অভিজ্ঞতা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি এই সভ্যতার পৈশাচিকতার নিদর্শন ‘বল কোর্টে’র বর্বরতার কাহিনিও তুলে ধরেছেন লেখক। ক্যারিবিয়ান সাগরের তীরবর্তী মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়া ভ্রমণের বর্ণনা আছে ‘ওলা নিকারাগুয়া’, ‘দূরদেশের বড়দিন’, ‘আগুন পাহাড়’—এই তিন গল্পজুড়ে। এসব গল্পে আছে হ্রদ ও আগ্নেয়গিরির দেশ নিকারাগুয়ার বৃষ্টিবন, জলপ্রপাত, মুগ্ধতা ছড়ানো ফুলের শহর মাসায়ার শরৎ কার্নিভ্যাল আর সেরো নেগ্রো’ সামিটে গিয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার কথা।

এক বাংলাদেশি লেখকের লাতিন আমেরিকা ভ্রমণের বৃত্তান্ত জানার সমান্তরালে এই ভ্রমণ বইয়ের ঝরঝরে গদ্য ও ছবি পাঠককে নিয়ে যাবে এই অঞ্চলের ইতিহাস–ঐতিহ্যের কাছে, তা সহজেই বলা যায়।

লাতিনের নাটাই

মহুয়া রউফ

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন

প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল

মূল্য: ৩৪০ টাকা; পৃষ্ঠা: ১৬০

প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৫

বাংলাদেশি নারীর লাতিন আমেরিকা ভ্রমণবৃত্তান্ত

Saturday, March 15, 2025

নেতৃত্বের কাড়াকাড়ি বা ব্যানারবাজি জুলাই আন্দোলনে ছিল না -বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম

জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন অংশীজন, সাধারণ মানুষসহ নানা জায়গা থেকে সহায়তা আসার কথা জানিয়েছেন সেই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। জুলাই অভ্যুত্থানের এই শীর্ষ নেতা বলেন, আন্দোলনে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর একটা ভূমিকা ছিল। বেশির ভাগ আন্দোলন ভন্ডুল হয়ে যায় নেতৃত্বের কাড়াকাড়ি অথবা ব্যানারবাজির কারণে। এই আন্দোলনে এই বিষয়গুলো ছিল না।

আন্দোলনে ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ সংগঠন) বিদ্রোহী একটা অংশেরও ভূমিকা ছিল বলে জানান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়কের দায়িত্ব নেওয়া নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘ছাত্রলীগ থেকে বের হয়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়াদের আমরা বিদ্রোহী বা বিপ্লবী ছাত্রলীগ বলি। ছাত্রলীগের বিদ্রোহী অংশ বের না হলে আন্দোলনটা বড় হতো না।’

জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে লেখা একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তা ছিলেন নাহিদ ইসলাম। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার গণ-অভ্যুত্থানবিষয়ক বই ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন।

জুলাই–আগস্টের উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করে নাহিদ বলেন, আন্দোলনে সব ছাত্রসংগঠনের একটা বোঝাপড়া একদম শুরু থেকেই ছিল। তারা (ছাত্র সংগঠনগুলো) তাদের মতো করে লোকবল পাঠিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও একধরনের অলিখিত সমঝোতা ছিল। যদিও কখনো বসে পরিকল্পনা করা হয়নি।

অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, আমরা যারা এই আন্দোলনে সামনের দিকে ছিলাম, আমার জায়গা থেকে, কথা বলার সময় এখনো আসেনি। সেই সময়টা আরও পরে আসবে, যখন সব কথা বলা যাবে। আবার এটাও সত্য যদি আমরা এখন কিছু কথা বলে না রাখি, তাহলে অনেক ঘটনার বিভিন্ন ইন্টারপ্রিটেশন (ব্যাখ্যা) হবে বা হচ্ছেও। সেই জায়গা আসিফ (উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ) এই কাজটা করেছেন। এটা সবার জন্যই সহায়ক হবে। আসিফের বইতে মোটামুটি একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আছে। এই আন্দোলনটা একটা পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, আবার পরিকল্পনার বাইরে গিয়েও ঘটনাপ্রবাহ এগিয়েছে। মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কানেক্ট করতে হবে, এটাই ছিল এই আন্দোলনের মূল পরিকল্পনা। শুরুতেই আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কৌশলের বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা ছিল।’

নাহিদ বলেন, গত ৭-৮ বছর ক্যাম্পাসে ছাত্রদের পক্ষের বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলের বাইরে গিয়ে একেবারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জায়গা থেকে বিভিন্ন সময়ে তাঁরা আন্দোলন করেছেন। তাঁদের একটা ছাত্রসংগঠন ছিল ছাত্রশক্তি। এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আখতার হোসেন (এখন এনসিপির সদস্যসচিব) ক্যাম্পাসে পরিচিত মুখ ছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের শুরুতে বোঝাপড়া ছিল যে আখতার হোসেন সামনের দিকে থাকবেন না। এমনকি এমন ব্যাপারও ছিল যে তিনিও সামনের দিকে থাকবেন না।...আন্দোলনের পরিসর বিস্তৃত করার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিচয়টা নেওয়া হয়েছিল।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘একটা স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থান এবং নানা মানুষের অংশগ্রহণ ও অবদান ছিল। আমরা নিজেরাও জানি না, কোথা থেকে কত সহযোগিতা তখন এসেছে। আমি বললে সেটা আমার গল্পই হবে আসলে। আসিফ যখন বইটা লিখছেন, তখন এটা আসিফেরই গল্প। আমাদের প্রত্যেকেরই এই অভ্যুত্থানে আলাদা আলাদা গল্প আছে। এই আলাদা আলাদা গল্পগুলো একটা কালেকটিভ স্টোরি (সামগ্রিক গল্প) তৈরি করবে। আমরা নিশ্চয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গল্প বলছি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরাও নেমে এসেছিলেন। আমি তো এখনো জানি না কুমিল্লা, নরসিংদী বা ঢাকার বাইরে আন্দোলনটা কীভাবে সংগঠিত হয়েছে। তাঁদের গল্পগুলো আরও বেশি করে আসা দরকার।’

এক দফার সিদ্ধান্ত মানুষই নিয়েছে

নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, ১৬ জুলাই তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, আন্দোলনটা সরকারবিরোধী আন্দোলনের দিকে যাবে এবং নিয়ে যেতে হবে। কারণ, ওই সরকারের হাতে ইতিমধ্যেই রক্তের দাগ লেগে গিয়েছিল। এরপর তাঁদের যে ৯ দফা, তার মধ্যে এক দফার বার্তাটা ছিল। কিন্তু তাঁরা প্রথমেই এক দফার দিকে যাননি।

এর কারণ বলতে গিয়ে নাহিদ বলেন, এক দফা বা সরকার পতনের বিষয়টি জনগণের ভেতর থেকে আসতে হয়। মানুষ যখন চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে, তখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক দফার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু তার আগেই মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। শহীদ মিনারে আসলে এক দফার বাইরে অন্য কিছু বলার ক্ষমতা কারও ছিল না। এ ছাড়া ৫ আগস্ট কিন্তু গণভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ছিল না। কর্মসূচিটা ছিল ‘লং মার্চ টু ঢাকা’, ঢাকায় আসতে হবে। ঢাকায় এসে কী করবে, সেই সিদ্ধান্ত মানুষই নেবে।

আন্দোলনের সময় গত বছরের ২৩ জুলাই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) যে সংবাদ সম্মেলন হয়, সে প্রসঙ্গও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ডিজিএফআই থেকে বলা হয়েছিল যেন আমরা বলি এটা বিএনপি–জামায়াতের আন্দোলন এবং সব অগ্নিসন্ত্রাস তারা করছে। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে থেকে আমি আরও বলি  সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিরোধীদলের নেতা–কর্মীদেরও নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আমরা এটার নিন্দা জানাচ্ছি। ফলে এখানে একধরনের মিথষ্ক্রিয়া ঘটেছে এবং এর মধ্য দিয়ে আন্দোলনটা পরিণতির দিকে গেছে।’

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদার (এখন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক) আন্দোলনে মাঠের কর্মসূচির বিষয়টি মূলত দেখতেন বলে জানান নাহিদ। তিনি বলেন, এই দুজনের সঙ্গে রিফাত রশিদ (এখন এনসিপির নেতা), হাসিব আল ইসলাম (এখন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতা) ও আবদুল কাদের (এখন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতা) সমন্বয় করতেন। পেছন থেকে সহযোগিতা করেছেন মাহফুজ আলম (বর্তমান তথ্য উপদেষ্টা) ও আখতার হোসেন। পরে এসে যুক্ত হন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী (এখন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক)।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আরেকটা ফ্যাসিবাদ তৈরি হবে না, এ রকম একটা রাষ্ট্রকাঠামো বা সমাজব্যবস্থা তৈরি করার জন্য কাজ করতে হবে। জুলাই থেকে আমরা শুরু করেছি, শিখেছি। এই গণতান্ত্রিক লড়াইটা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে।’

গণ-অভ্যুত্থানবিষয়ক ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে (ডান থেকে) আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, বইয়ের লেখক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব রিফাত রশিদ। জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা, ১৫ মার্চ
গণ-অভ্যুত্থানবিষয়ক ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে (ডান থেকে) আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, বইয়ের লেখক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব রিফাত রশিদ। জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা, ১৫ মার্চ। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

Monday, March 3, 2025

মারুফ ইবনে মাহবুবের আকাশের উল্টোপাশে: জীবনকে ভিন্নভাবে আলোকপাত by মো. পলাশ সরকার

মারুফ ইবনে মাহবুবের প্রথম বই আকাশের উল্টোপাশে নতুন এক  চোখে মানুষ, সমাজ ও আমাদের চারপাশকে দেখতে শেখায়।

এই বইটি লেখকের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার একটি সমাহার। ভিন্ন কিছু ভাবা শিরোনামে ৫৩টি নতুন চিন্তা তিনি হাজির করেছেন এবং দুই বা এক শব্দে উপশিরোনাম দিয়েছেন, এতে চিন্তাগুলোর একটি মূল বিষয়বস্তু ফুটে উঠেছে।
প্রতিটি অভিজ্ঞতার নিচে দেয়া তারিখ দেখে বোঝা যায়, এই ঘটনাগুলো ভিন্ন সময়ের। বোঝা যায়, এই ঘটনাগুলো তাকে নাড়া দিয়েছিল ভীষণভাবে, তারপর যেটি তিনি সঞ্চার করেছেন তা হলো আত্মোপলব্ধি।
নিজেকে তিনি বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বারংবার এবং  জীবনের মূল লক্ষ্য ও দর্শন, আইনকানুন, প্রথা, সৃষ্টিকর্তার আদেশ ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি নিজেকে নিজে জিজ্ঞাসা করেছেন, যে তিনি নিজে আসল পথে হাঁটছেন তো?
তার জীবনের এসব অভিজ্ঞতা তাকে একবার ভেঙেছে এবং সেখান থেকে নতুন বোধোদয় সম্পন্ন আমরা আরেকজন মানুষ বের হয়ে আসতে দেখি। আমরা যেভাবে এই সমাজ দেখি, বা যেভাবে আমাদের দেখতে শেখানো হয়, সেটি আসলে একটি ভ্রম কিংবা দৃষ্টিনন্দন  নকল মোড়কে মোড়া কিছু একটা।  
জীবনকে পাঠ করার ভিন্ন শিক্ষা এই ভ্রম ভাঙতে সাহায্য করে।
মারুফ ইবনে মাহবুব মুখোশ খুলে পেছনের মানুষকে দেখিয়েছেন। অতি সাধারণ মানুষ তিনি, কিন্তু জগতকে দেখা ও বোঝার অন্তর্দৃষ্টি  তাকে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ করেছে।
এই অন্তর্দৃষ্টি তিনি দিনের পর দিন মানুষকে পরম মমতা, স্নেহ ও নিস্বার্থ ভালোবাসার মধ্যদিয়ে দেখে রপ্ত করেছেন। পাশাপাশি তিনি প্রতিনিয়ত মজলুম, নিপীড়িত, শোষিত, দরিদ্র, অসহায় মানুষের স্থান থেকে নিজের ওপর আলোকপাত করেছেন। যার মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনের কিছু সাধারণ মানুষ, যাদের অস্তিত্ব আমরা অনেকেই বুঝেও বুঝি না সেসব মানুষও উঠে এসেছে জীবনের উল্টোপাশে।  
অসহায় মানুষ এবং আমরা, নাম, চেয়ার প্রীতি, পড়াশুনার চাপ, জানাজার ভাবনা, শোধ-প্রভৃতি উপশিরোনামের লেখাগুলো কিছু সময়ের জন্য পাঠককে বিমূঢ় করে দেবে।
তার বদল উপশিরোনামের লেখাটার প্রসঙ্গ নিয়েই কথা বলা যাক। এখানে লেখক জীবনের প্রতি মুহূর্তের পরিবর্তন বা একটি নির্দিষ্ট বলয় থেকে আরেকটি বলয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন, চিন্তার বদল, জীবনদর্শন, পেশা, দেশ, অভ্যাস, রুচি, বন্ধু বদলের কথা বলেছেন। এসব বড্ড আপেক্ষিক। লেখক লিখেছেন,
মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে চিন্তা করি, জীবনের শেষ পর্যায়ে কোন দর্শন কোন চেতনা ধারণ করে বিদায় নেবো? কোন মানুষকে পাশে রেখে বিদায় নেবো? কোন কাজকে সঙ্গে করে বিদায়  নেবো? আজ যেটাকে ধ্রুব সত্য বলে ভাবছি কাল সেটা যে জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যা হবে না তা জোর দিয়ে কি বলা যায়?  আজ যাকে সবচেয়ে আপন ভাবছি কাল সেই সবচেয়ে পর হয়ে  যাবে না তা কি বলা যায় জোর দিয়ে? কিংবা উল্টোটা?
আকাশের উল্টোপাশে বইটির প্রকাশনী সংস্থা সাহিত্য কুটির। ১২৭ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ৩৫০ টাকা।

mzamin