Thursday, November 14, 2013

প্রত্যাখ্যানই কি প্রস্তাবের অমোঘ নিয়তি? by অরবিন্দ রায়

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট প্রথমবার ভারতবর্ষে পা রেখে একই ভুখণ্ডে বহু জাতি ও ভাষার লোক দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। সেনাপতি সেলুকাসকে উদ্দেশ করে বলেন, কী বিচিত্র এ দেশ সেলুকাস! তার এ উক্তিটি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। দ্য গ্রেট যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে বর্তমান রাজনীতির হাল দেখে বিস্ময় লুকাতে পারতেন না। আবারও হয়তো নতুন কোনো উক্তি রেখে যেতেন আগামী প্রজন্মের জন্য। দেশে এখন সর্বদলীয় সরকার ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে প্রধান দুই দল মুখোমুখি অবস্থানে। সরকারের তরফ থেকে সর্বদলীয় সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব এসেছে। বিরোধী দল সরকারের দেয়া এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে। কেবল দাবি জানিয়েই নিশ্চুপ থাকছে না। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে একের পর এক সিরিজ হরতাল দিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাচ্ছে। সরকারের সর্বদলীয়ের প্রস্তাব দেয়া ও বিরোধী দলের তা প্রত্যাখ্যানের বিষয়কে পাশাপাশি দাঁড় করালে দ্য গ্রেট বিস্ময় প্রকাশ করে হয়তো বলতেন, কী বিচিত্র এ প্রত্যাখ্যান সেলুকাস!
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির আগমন ও নির্গমন বিষয়ে পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। লেখার খাতিরে তত্ত্বাবধায়ক কথাটি যে কয়বার আসে তা বাদে এ নিয়ে কোনো জ্ঞানগর্ভ বয়ানের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কেননা ভাবসাবে বোঝা যাচ্ছে, এ পদ্ধতির সরকার অতীতে দেখা দিলেও বর্তমানে দেখা দেয়ার কোনো লক্ষণ নেই। তবে আসন্ন সংসদ নির্বাচন সর্বদলীয় সরকারের অধীনে সম্পন্নের যে প্রস্তাব সরকারের তরফ থেকে এসেছে, আমার মনে হয় সরকারি দলের এ প্রস্তাব বিরোধী দল রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূত্র মতে প্রত্যাখ্যান করেছে। পরীক্ষা শুরুর কয়েক মাস আগেই প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পরও বিরোধী দলের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি হতাশ না করিয়ে ছাড়ে না। কেবল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়াই নয়। পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়ার সবুজ সংকেত পাওয়ার পরও পরীক্ষা হলের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়টি অনভিপ্রেত। ক্লাসের বর্তমান ফার্স্ট বয় নকল করবে কিংবা করতে পারে এই আশংকায় যদি সেকেন্ড বয় পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়- এ ঘটনা যে কারও মনে বিস্ময় না জাগিয়ে পারে না। কাজেই সরকারি দলের সর্বদলীয়ের এ প্রস্তাব বিরোধী দলের হাতে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফের না বলে অপসংস্কৃতি বলাই উত্তম। অপসংস্কৃতি বলতে এটাকেই বোঝানো হচ্ছে যে, একদল কোনো প্রস্তাব রাখলে তা যত ভালোই হোক অন্যদল তা অবধারিত প্রত্যাখ্যান করবে। এখানে প্রত্যাখ্যানই যেন কোনো প্রস্তাবের অমোঘ নিয়তি। বলা যায়, উভয়ের কাছে উভয়ের রাখা যে কোনো প্রস্তাব এখন কার্যকরী অর্থে ফুটবলে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ একজন গোল করার জন্য বল একদিকে কিক করার সঙ্গে সঙ্গে অন্য দল ঠিক উল্টো দিকে কিক করবে। অপসংস্কৃতির মাত্রা এখন এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে, একপক্ষ সূর্য পূর্বদিকে ওঠার কথা বললেও অন্য পক্ষ সেটি মানতে নারাজ। যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটি মানাতে বাধ্য করানো হয়। তাও সেটি মানানো হয় দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে। জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে। মাত্রাতিরিক্ত বৈরী মনোভাবই রাজনৈতিক এ দীনতা সৃষ্টির কারণ বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। তাই নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব সরকারের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হওয়া সত্ত্বেও বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
সরকারের অভ্যন্তরে থাকা দলীয় লোকজনকে প্রায় সময়েই একটি কথা বলতে শোনা যায়, তারা কারও হুমকি-ধামকিকে পরোয়া করে না। অথচ নির্বাচনী বৈতরণী পার না করেই দেশের প্রায় অর্ধেক ক্ষমতা বিরোধী দলের হাতে তুলে দেয়ার প্রস্তাবটি তাদের সেই বড় গলার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। সম্পর্ক যেখানে এ রকম, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনি’, সেখানে কোনো রকম সংলাপ-সংঘাত ছাড়াই নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে বিরোধী দলকে প্রায় অর্ধেক ক্ষমতার শরিক বানানোর প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টি সরকারের নতজানু মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। বিরোধী শিবিরের প্রতি এ নমনীয়তা সময়মতো তাদের ধরাশায়ী করলে তাতে আশ্চর্য হওয়ার গরজ কেউ দেখাবে না। কারণ সরকারের তরফ থেকে উপহার পাওয়া ক্ষমতার অংশীদারিত্ব এবং সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বিপুল জনরায়কে পুঁজি করে নির্বাচনে অংশ নিলে মনে হয় না এ যাত্রায় তাদের কেউ ঠেকাতে পারবে। কাজেই এই সুবর্ণ সুযোগ পাওয়ার পরও নির্বাচনে অংশ না নেয়ার বিষয়টি বিপুল জনরায়কে বিব্রত করার শামিল।
সর্বদলীয় সরকার গঠনে উভয় দলের পাঁচজন করে দশজন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যদি সেই সরকারের প্রধান থাকেনও তারপরও যে নির্বাচনের পরিবেশ ক্ষুণœ হবে, তা ভাবার অবকাশ নেই। কারণ সর্বদলীয় সরকার গঠন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো প্রশাসন দলীয় সরকারের প্রভাবমুক্ত হয়ে পড়বে। অর্থাৎ প্রশাসনিক অবকাঠামো দলকানা রোগ থেকে মুক্তি পাবে। সেই সঙ্গে প্রশাসনে নতুন বলয়ের সৃষ্টি হবে। নতুন বলয়টির কারও অনৈতিক আবদার পূরণ না করার সম্ভাবনাই বেশি। উপরন্তু বর্তমান সরকারের বাধ্যানুগত কর্মকর্তা-কর্মচারীর চেয়ে ক্ষোভের আগুনে অঙ্গার হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাই বেশি বলে ধারণা। কারণ তাড়িয়ে ফেরা চিতার চেয়ে নিরীহ মেষের সংখ্যা বরাবরই বেশি থাকে। কাজেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের প্রধান থাকলেও পুরনো প্রভাব বলয় কতটা কার্যকর রাখতে পারবেন এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা অমূলক নয়।
বিরোধী দলের পঞ্চশক্তি সরকারি দলের পঞ্চশক্তিকে নিষ্ক্রিয় করলে মাঠে থাকবেন কেবল শেখ হাসিনা। যার শরীরে রাজরক্ত বহমান। একজন রাজরক্তবাহী নারীর পক্ষে প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টি কতটা বাস্তবসম্মত তা যথেষ্ট ভাবার বিষয়। বরং নিরপেক্ষতার স্টিকারবাহী একজন অপরীক্ষিত তত্ত্বাবধায়কের কাছ থেকে এ ধরনের কুটিল প্রস্তাব আসার আশংকা হেসে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাছাড়া অবাধ মিডিয়ার যুগে একজন নারীর পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল উল্টে দেয়ার কাজটি হিমালয় পর্বতকে তর্জনীর ডগায় নিয়ে ঘূর্ণি খেলার মতোই অসম্ভব। কেননা আসন্ন ২০১৪ সালটি ১৯৮৬-এর এক টিভি চ্যানেলীয় সাল নয়। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনী ফলাফলের মতো বিভিন্ন কেন্দ্রের ফলাফল যখন বাঁধভাঙা জোয়ারের পানির মতো এসে পড়া শুরু হবে, তখন প্রশাসনে পুরনো তল্পিবাহী কেউ থাকলেও সে যেদিকে বৃষ্টি সেদিকেই ছাতা ধরা শুরু করবে। এ পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়কের জন্য আন্দোলন চালিয়ে জনপ্রিয়তাকে নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করি না। তাছাড়া দিনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের মনে অনৈতিক চাহিদার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান সেই সুশীল বাবুটি কুশীল হতে কতক্ষণ? সুযোগ ও পরিমাণের ব্যাট-বলে সংযোগ ঘটানোর জন্য তিনি যে শিংয়ে তেল মেখে কোরবানির হাটে উঠবেন না এ নিশ্চয়তা কে দেবে। কাজেই সরকারি দলের দেয়া সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টি বিরোধী দলের জন্য আত্মঘাতী বলেই মনে হয়।
অরবিন্দ রায় : একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি পরিচালক

বিপন্ন দেশবাসীকেই প্রতিরোধ গড়তে হবে by একেএম শাহ নাওয়াজ

তবু ভালো, সরকার পক্ষের এমপিদের কেউ কেউ অবশেষে আইন করে হরতাল বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। এ দাবি সাধারণ মানুষের পক্ষে আমরা অনেক আগে থেকেই জানিয়ে আসছিলাম। সদিচ্ছার অভাবে এবং হরতাল অস্ত্র ব্যবহার করার লোভে কোনো পক্ষ গা করেনি। এ সময়ে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে হরতাল যদি গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ কর্মসূচি হতো তা হলে হরতাল বন্ধের জন্য আইন করার দাবি কেউ করত না। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গণমানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকেই নিশ্চিত করে। তাই কোনো আচরণ যদি গণবিরোধী ও গণসংহারি হয় তবে তা গণতান্ত্রিক পদবাচ্য থাকে না। এ সূত্রে ব্যবহারিক কারণে আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল কর্তৃক আরোপিত গণস্বার্থবিরোধী হরতাল কর্মসূচি আইনের আওতায় বন্ধ করে দেয়া উচিত। যেমনটি নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে বন্ধ বা হরতাল। সাধারণ মানুষ আমাদের রাজনীতিকদের পরিচালিত হরতাল নামের সন্ত্রাসে বিপন্ন হতে হতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়েছে। তাই এ বিপন্ন মানুষ এখন নিজের জীবন ও অস্তিত্ব রক্ষায় সব পক্ষের রাজনীতিক ও রাষ্ট্রের সাহায্য চায়।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না কেউ সাহায্যের হাত বাড়াবে। ক্ষমতালোভী ও সন্ত্রাসী মানসিকতার রাজনীতিকরা হরতাল ডাকবেনই। গাড়ি, ঘোড়া ভাংচুুর করবেন, পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালাবেন উৎসাহের সঙ্গে; নিরীহ শিশু, তরুণ অটোরিকশাচালক, পৌঢ় ট্রাক ড্রাইভার পুড়ে মরবে। ব্যবসা লাটে উঠবে। দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সূচক নিুমুখী হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ পথে বসবে। বাজারে ক্রমে আগুনের উত্তাপ বাড়বে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থবির হয়ে পড়বে শিক্ষা, পরীক্ষা। এসবের বিনিময়ে ক্ষমতা প্রত্যাশী বিরোধী রাজনীতিকরা মসনদের পথ পরিষ্কার করবেন। পাশাপাশি প্রতারণামূলক নানা শব্দে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের মতো প্রগলভ ব্যক্তিরা যন্ত্রের পুতুল হয়ে ক্যামেরার সামনে নিরলস কথা বলতেই থাকবেন। ডাক দিয়ে যেতেই থাকবেন ‘শান্তিপূর্ণ’ হরতালের। অতঃপর হরতাল শেষে ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে’ হরতাল পালন করার জন্য জনগণকে ধন্যবাদ জানাবেন। হরতালে বিপন্ন দেশবাসীকে এসব ভয়ংকর প্রলাপ শুনে যেতেই হবে।
অসহায় মানুষকে নিয়ে এভাবে আগুনে খেলা খেলে যাচ্ছেন আমাদের রাজনীতিকরা। ক্ষমতা কেন্দ্রে পৌঁছার জন্য বা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য বিরোধী দল জনগণের বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে বা গুলি করে দুর্বল করতে চায় সরকারকে। সরকার পক্ষের রাজনীতিকরাও কখনও কখনও সঙ্গোপনে ইন্ধন জোগান বিরোধী পক্ষকে। অথবা বলা যায় ফাঁদ পাতেন। আর সে ফাঁদে পা দিয়ে হরতালের পর হরতাল চাপিয়ে দিতে থাকেন জনগণের ঘাড়ে। কারণ সরকারি হিসেবে এতে জনসমর্থন কমবে বিরোধী পক্ষের। অর্থাৎ দু’পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য শেষ পর্যন্ত জনগণেরই কলজে খুবলে খান। হরতালের রাজনৈতিক সৌন্দর্য হারিয়ে যখন তা জীবন ও সম্পদ সংহারি সন্ত্রাসে রূপান্তরিত হয়েছে, তখন তা থেকে জনগণকে রক্ষার দায়িত্ব রাজনীতিকদেরই। আর যখন রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার রেসে ছোটা বিরোধী দল হরতাল চর্চা করেন তখন এ ধারার হরতালের বিরুদ্ধে সবার সোচ্চার হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা তেমন প্রতিক্রিয়া দৈবাৎও দেখি না। সরকারের তো কর্তব্যই দেশবাসীর জানমালের নিরাপত্তা দেয়া। বিশেষ করে এবার আওয়ামী লীগ সরকার যদি নিজেদের গণমুখী সরকার মনে করত, তা হলে সংসদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে সহজেই হরতালের বিরুদ্ধে আইন পাস করতে পারত। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছরেও সে পথে হাঁটেনি সরকার। অনাচার করার সুযোগ দিয়েছে জামায়াত ও বিএনপিকে। কারণ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বও জানেন, তারা যখন ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ে বিরোধী দলের আসনে বসবেন তখন তাদেরও দরকার পড়বে হরতাল অস্ত্রের। কারণ সরকারকে বিব্রত ও দুর্বল করতে জনগণের বুকে অস্ত্র ঠেকানোর মজাটাই আলাদা। জেনে বুঝে সে সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় না। তাই এ বীভৎস ধারার হরতাল বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার।
এখন দিনকে দিন হরতালের চেহারা অনেক বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠছে। অতীতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দায়িত্বহীন অনেক হরতাল করেছে। হরতালের নামে জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। জীবন সংহারও হয়েছে। তবে সাম্প্র্রতিক সময়ের বিএনপি-জামায়াতের হরতাল সব সময়ের সীমা অতিক্রম করেছে। টানা হরতালের সময়সীমা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। হরতালের আগের দিন থেকে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে। গাড়ি পুড়িয়ে মানুষ খুন করে আর মুড়ি মুড়কির মতো ককটেল ফুটিয়ে পেট্রল বোমা ছুড়ে সৃষ্টি করা হচ্ছে চরম অরাজকতা আর ভীতিকর পরিবেশ। হরতালের দিনগুলোতেও ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনা বাড়ছে। রেললাইন উপড়ে ফেলা হচ্ছে। আগুন দেয়া হচ্ছে বগিতে। বাস ডিপোতে ঢুকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা বাস পুড়িয়ে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করা হচ্ছে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখোমুখি করে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এভাবে হরতাল ডাকিয়েরা ভয়ংকর সন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। অথচ এজন্য সামান্যতম অনুশোচনা তাদের আছে বলে মনে হয় না।
এমন সব অপকীর্তি করছেন আবার হরতাল ডাকার প্রেস ব্রিফিংয়ে কোনো রকম লাজ-লজ্জার বালাই না রেখে চরম অশান্তি সৃষ্টি করবেন জেনেও বিএনপির মুখপাত্ররা ‘শান্তিপূর্ণ’ হরতালের কথা বলে যাচ্ছেন। হরতালের আগের দিন কেন ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে সে ব্যাপারে কোনো শব্দ উচ্চারণ করছেন না। স্কুল-মাদ্রাসা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় বিঘœ ঘটিয়ে তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন হরতাল। অথচ একটিবারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছেন না। যেন যথেষ্ট ভোট দিয়ে ক্ষমতায় না বসানোর জন্য এটি জননেতাদের দেয়া জনগণের জন্য বিশেষ শাস্তি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অংক মিলিয়ে ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এবার তাও তছনছ করে ফেলা হচ্ছে। হরতালের আগুনে পুড়ে মারা যাচ্ছেন শিশু-যুবা-প্রৌঢ়। এ বিষয়ে টুঁ-শব্দটিও উচ্চারণ করছেন না তারা। এসব দেখে এ ধারার রাজনীতিকদের সুন্দরকান্তি অবয়বের আড়ালে দন্ত বের করা জান্তব চেহারাটাই স্পষ্ট হচ্ছে। তাই সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে এসব মানুষের হাতে গণতন্ত্র, জনগণের নিরাপত্তা, জনজীবন ও দেশের অর্থনীতি কীভাবে নিরাপদ থাকবে? রাজনীতির এসব নায়ক সরকার গঠন করলে জাতি কোন অন্ধকারে তলিয়ে যাবে!
প্রচারিত আছে, এবার বিএনপির ডাকা হরতালের সহিংসতার ধরন জামায়াতের ডাকা হরতালের জঙ্গি রূপের মতোই। বোমাবাজি, আগুনের ব্যবহার এবং হাসতে হাসতে মানুষ পুড়িয়ে মারা একাত্তরের জামায়াতেরই প্রতিরূপ। বিএনপি হরতালে জঙ্গিবাদী জামায়াত-শিবিরকেই ব্যবহার করছে বলে মানুষের ধারণা। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে সব অপকীর্তির দায় নিতে হচ্ছে বিএনপিকেই। বাস্তব অবস্থাদৃষ্টিতে মানতেই হচ্ছে, নিজেদের রাজনৈতিক লাভ অর্জনের জন্য আমাদের রাজনীতিকরা দিন দিন আরও বড় সন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। জনগণের জানমাল ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বিপর্যস্ত করে তুলবেন।
এসব কারণে দেশবাসীকে আজ নতুনভাবে বাস্তবতা উপলব্ধি করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ক্ষমতাপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের হাতে এখন সাধারণ মানুষ জিম্মি। সরকারকে দুর্বল আর অস্থির করে তুলতে বিরোধী দল হাতে তুলে নিয়েছে হরতাল অস্ত্র। এতে যে দেশের মানুষের প্রত্যক্ষ ক্ষতি হচ্ছে তা এদের ছুঁয়ে যাচ্ছে না। তাই ৬০ ঘণ্টা হরতালের রেশ না কাটতেই ৭২ ঘণ্টার হরতাল চাপিয়ে দেয়া হল। আবার সরকার কেন বিএনপির জাতীয় নেতাদের গ্রেফতার করল তার দায়ও নিতে হল জনগণকে। ৭২ ঘণ্টার টানা হরতালকে আরেকটু টেনে চারদিন পূরণ করে দেয়া হল।
এখন বিএনপির অফিস যেন হয়ে গেছে মৃত্যুদূতের চেম্বার। সেখানকার নিরাপদ আশ্রয়ে বসে নানা চ্যানেলের টিভি ক্যামেরার সামনে হরতাল ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিপন্ন মানুষ, সম্পদ আর দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার রায় ঘোষণা করে দেন নেতারা। এরপর মাঠে নেমে পড়েন যুক্তিবুদ্ধিহীন নির্বোধ দলীয় কর্মী-সমর্থকরা। তারা পিকেটিং করেন। জীবন সংহার করেন স্বদেশী নিরপরাধ ভাইবোনের। গাড়ি, ঘোড়া ভাংচুর আর অগ্নিসংযোগ করেন। আবার পুলিশের লাঠিপেটা ও বুলেট হজম করতে হয় তাদেরই। অন্যদিকে সন্ধ্যায় বেশ তৃপ্তির সঙ্গে রাস্তায় না নামা নেতারা দলীয় কর্মীদের ওপর পুলিশ কতটা নির্যাতন করেছে- কজনকে গ্রেফতার করেছে, এসব ফিরিস্তি দিয়ে টিভির পর্দা গুলজার করেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিরোধী দলের প্রতি যদি সরকার অন্যায়ই করে থাকে তবে তার দায় জনগণকে নিতে হবে কেন?
এমন সব বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এমন বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেতে সাধারণ মানুষকেই প্রতিবাদী হতে হবে। নিজেদের টিকে থাকার জন্য, সন্তানের ভবিষ্যৎ পথযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়ানো পাহাড় সরাতে এবং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ার আগে ঘুরে দাঁড়াতে হবে দেশবাসীকেই। অপশক্তির ভয়ে ভীত হয়ে ঘরে বসে আত্মরক্ষার সময় নয় এটি। খড়ের গাদায় যখন আগুন লেগেছে তখন তা পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়বেই। তাই সব ভীতি আর অবসাদ ঝেরে ফেলে দেশবাসীকেই নেমে আসতে হবে রাস্তায়। ধাওয়া দিয়ে হরতাল ডাকিয়ে আর নির্মম পিকেটারদের দিগন্ত রেখা পার করে দিতে হবে। জনরোষের বারুদ ওদের ককটেল বোমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ইদানীং বিএনপি নেতারা খুব ‘গণঅভ্যুত্থান’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য না বুঝেই বোধহয় এমনটি বলেন তারা। দেয়ালে পিঠ ঠেকা দেশবাসীকেই বুঝিয়ে দিতে হবে গণঅভ্যুত্থান কাকে বলে।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মানবতা লংঘনের রাজনীতির অবসান চাই by মাহমুদুল বাসার

একদল আরেক দলের মন্দ দিকটি অনুকরণ করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। আর এটাই এখন আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতি এখন পুরোমাত্রায় জনস্বার্থের বিপক্ষে চলে গেছে। রাজনীতি এখন মানুষের কাছে ভয়াবহ আতংকের নাম। দেশে বর্তমানে যেন অঘোষিত গৃহযুদ্ধ চলছে। দেশ মূলত অচল, স্থবির হয়ে পড়েছে। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রশ্নে একমত না হলে যে দেশে লাগাতার হরতাল আসবে, এটা জানা কথা। এটাও অজানা নয় যে, হরতাল এখন আগের মতো অহিংস থাকবে না। তবে এতটা হিংস তার পথ ধরবে, তা দেশের মানুষ ভাবতে পারেনি। রাজনীতির একটি মৌলিক নীতি হচ্ছে ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’। প্রতিপক্ষকে জব্দ করার কৌশল আগে যেমন ছিল এখন আর তেমন নেই। কৌশল পরিবর্তন হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও হয়েছে। পরিবর্তনটা ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে হয়েছে অনেকটাই কালচারাল পদ্ধতিতে। কিন্তু গোটা মধ্যপ্রাচ্যে হয়েছে রক্তাক্ত অগণতান্ত্রিক পথে। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশেও পরিবর্তনের কৌশলটা গণতন্ত্রের প্রক্রিয়ার মধ্যে না থেকে রক্তাক্ত অগণতান্ত্রিক পথ ধরেছে। তাই আমাদের দেশের হরতালের রাজনীতি মানবতা লংঘনের রাজনীতিতে রূপ নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন, ১৮ দলীয় জোটের দুই দফায় ১২০ ঘণ্টা হরতালে চরমভাবে মানবাধিকার লংঘন করা হয়েছে। এর জন্য কাকে দায়ী করে মনে সান্ত্বনা পাব? ব্যাপারটা তো সেই তর্কের মতো- ‘ডিম আগে না মুরগি আগে?’
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আগেও সংঘাত হয়েছে। এ সরকারের কাঠামো নিয়ে, প্রধান উপদেষ্টা নিয়ে এমনকি উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিয়েও বিতর্ক, বাকযুদ্ধ, হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও, অবরোধ হয়েছে। খুব সম্ভবত এ কথা সরাসরি বলার অবকাশ নেই যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেয়া হল না বলে বর্তমান সংঘাত লেগেছে। বরং এ কথা বলাই শ্রেয়, বড় দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হল না বলে দেশ রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হতে চলেছে। অতীতে দুই নেত্রীই যথেষ্ট হেনস্থা হয়েছেন, তারপরও তারা এক জায়গায় বসে নির্বাচনের ফর্মুলা তৈরি করতে পারলেন না। এই না পারার পরিণতি দেশে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ডেকে আনছে।
এদেশের নাগরিক হিসেবে অনুতাপে মরে যাচ্ছি, আমাদের শিশু-কিশোররা অসুস্থ, জেদাজিদির রাজনীতির নির্মম শিকার হচ্ছে দেখে। ফুলের মতো ফুটন্ত বয়সে তারা জীবন হারাচ্ছে, অন্ধত্বের শিকার হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে, না হয় অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে। পত্রিকায় শিরোনাম এসেছে, ‘বাড়ি যাওয়া হল না মনিরের’, ‘হরতালে গাজীপুরে অগ্নিদগ্ধ স্কুলছাত্রের মৃত্যু’। কী নিষ্পাপ চেহারা, কী মায়াবী মুখমণ্ডল, টানা টানা চোখ। মাথায় ঘন কালো চুল। হরতালের রাজনীতির শিকার হল। পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে বেড়ে ওঠার আগে এমন একটি সম্ভাবনাময় মানবশিশু অকালে হরতালের আগুনে ঝলসে পুড়ে গেল। এর দায় কে নেবে? এই দোষ কাকে দেব?
গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার বড়কাঞ্চনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র ছিল মনির হোসেন। বাবা রমজান আলী ছিলেন পেশায় একজন ভ্যানচালক। ১৮ দলীয় জোটের ডাকা ৬০ ঘণ্টা হরতাল চলাকালে সোমবার গাজীপুর চৌরাস্তায় জাতীয় আইন কলেজের পাশে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয় এই কিশোর। যারা জেএসসি পরীক্ষার্থী তারাও কিশোর। যারা পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষার্থী তারাও মনিরের মতোই অবুঝ শিশু। এদের কে বাঁচাবে?
গাজীপুরের মনির হোসেনের আগে ককটেল হিংস্রতার শিকার হয়েছে তিন শিশু। তাদের অগ্নিদগ্ধ চেহারা জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। সড়ক বিভাজনের মধ্যে লাগানো গাছের ফুল তুলে রাস্তা পার হচ্ছিল আট বছরের শিশু সোহেল মিয়া। এ সময় মোটরসাইকেল আরোহী তিন যুবক এসে কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে দ্রুত পালিয়ে যায়। একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয় রাস্তায়। এতে শিশুটির হাত-পাসহ শরীর ঝলসে যায়। সোমবার (২৮-১০-১৩) হরতাল চলাকালে সকাল ৭টার দিকে বগুড়া শহরের রেলস্টেশন সংলগ্ন সাতমাথা-তিনমাথা স্টেশন সড়কে এ ঘটনা ঘটে। সোহেলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সে সেউজগাড়ি রেলবস্তিতে মা-বাবার সঙ্গে থাকত। তার বাবা শহীদুল ইসলাম একজন রিকশাচালক। শুধু সোহেল নয়, সেদিন হরতাল সমর্থকদের ককটেলে আহত হয়েছে বগুড়ার আরও দুই পথশিশু। সকাল ১০টার দিকে শহরে স্টেশন ক্লাব সংলগ্ন ঝাই-জঙ্গলে কাগজ কুড়াচ্ছিল ৭ বছরের শিশু রনি ও ৮ বছরের শিশু মিল্টন। সেখানে পড়েছিল অবিস্ফোরিত একটি ককটেল। কৌতূহলবশত লাল কাগজ মোড়ানো ককটেল দুটি একজন হাতে নিলে তা বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। এতে স্পি­ন্টারের আঘাতে মারাত্মক আহত হয় পথশিশু দুটি। স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে ফেনী যাচ্ছিল লাইফ লাইন নামের একটি অ্যাম্বুলেন্স। রোববার (২৭.১০.১৩) রাত ৩টার দিকে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড এলাকায় পৌঁছলে গাড়ি লক্ষ্য করে ছুটে আসে পাথর। এতে অ্যাম্বুলেন্সটির দুটি কাচ ভেঙে যায়। অ্যাম্বুলেন্স চালক মাহবুব বলেন, ‘ওই অবস্থায় গাড়িটি নিয়ে দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করি।’ ৬০ ঘণ্টার হরতাল চলাকালে সোমবার দুপুর পর্যন্ত এভাবে চারটি অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয়। এ অবস্থায় চাহিদা থাকা সত্ত্বেও চালকরা ভয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছিল না। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন রোগী ও স্বজনরা।
এভাবে প্রায় সারা দেশে রোগী বহনকারী গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স আক্রান্ত হচ্ছে। লাশ বহনকারী রেড সিগন্যাল লাগানো গাড়িকেও রেহাই দেয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ রাজনীতির উত্তেজনা মানবতা উপড়ে ফেলছে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হরতালকারীরা পত্রিকাবাহী গাড়িতে ককটেল নিক্ষেপ করছে, তাতে সাংবাদিকরা মারাত্মক আহত হচ্ছেন। এর মধ্যে পত্রিকায় আমরা দেখেছি, একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা অফিসে এবং কয়েকটি টিভি চ্যানেল অফিসে ককটেল-বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। বিকট আওয়াজে তা বিস্ফোরিতও হয়েছে।
হরতালে কাজে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলোর। তাদের ওপরই পড়ছে হরতালের আগুন আর ককটেল। পরিবারের প্রধান রোজগেরে লোকগুলো আহত হওয়ায় একদিকে কাজ বন্ধ, আয় বন্ধ, অন্যদিকে তাদের চিকিৎসা খরচ দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি আর্থিক কষ্টও তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর শাজাহানপুরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছুড়ে দেয়া পেট্রল বোমায় ঝলসে যায় চালক আইয়ুব আলীর বুকের নিচ থেকে তলপেট পর্যন্ত ও বাঁ পা।
পুড়ে যায় মুখমণ্ডলও। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শরীরের ১০ শতাংশ পুড়ে গেছে। সুস্থ হতে অন্তত দু’সপ্তাহ সময় লাগবে। এখন দরিদ্র, খেটে খাওয়া আইয়ুব আলীর সংসার কে চালাবে? হরতালকারীদের ছুড়ে মারা ককটেলে ৪৫ বছরের রংমিস্ত্রি আবদুর রহমান বাঁ চোখ হারিয়েছেন।
তাকে ভর্তি করা হয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে। বাঁ চোখে ব্যান্ডেজ নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন তিনি। উদাহরণ আর বাড়াতে চাই না। পত্রিকার পাতাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেছি, অসহায়, গরিব, নুন আনতে পান্তা ফুরানো মানুষেরা; নিু আয়ের পেশাজীবী-শ্রমজীবী এবং অসহায় শিশু-কিশোররা ককটেল বিস্ফোরণের শিকার হচ্ছে। এতে মায়ের কোল খালি হচ্ছে। দরিদ্র সংসারের রোজগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পেটে লাথি পড়ছে।
এই মানবতা লংঘনের রাজনীতি কবে শেষ হবে?
মাহমুদুল বাসার : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক, গবেষক

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের অর্থনীতি by মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন ও বিশ্ব^ স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সাল থেকে ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেয়। ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ২০০৬ সালে জাতিসংঘকে প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানায়। মূলত বাংলাদেশের প্রস্তাবে ১৪ নভেম্বরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জাতিসংঘ ২০০৭ সালে ৬১/২২৫নং প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই থেকে জাতিসংঘের সদস্য দেশ, বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের দুশর অধিক সদস্য সংগঠন, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও ডায়াবেটিক রোগীদের মাঝে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস প্রাসঙ্গিক প্রতিপাদ্য নিয়ে উদযাপিত হচ্ছে। ২০০৭ সালেই জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের ব্ল– সার্কেল লোগোটিও নির্বাচিত হয়। নীল বৃত্ত জীবন ও স্বাস্থ্যের ধনাÍক প্রতীক। নীল বৃত্ত বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিক মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ ও জয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের প্রতীক। এবার বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে- ডায়াবেটিস জটিলতা সম্পর্কে সজাগ হোন। ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে ১৯২১ সালে ফ্রেডারিক ব্যান্টিং (১৮৯১-১৯৪১) ও চার্লস বেস্ট (১৮৯৯-১৯৭৮) কর্তৃক ইনসুলিনের আবিষ্কার এক যুগান্তকারী অগ্রগতি। এ জন্য ব্যান্টিং চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯২৩ সালে। বস্তুত, ১৪ নভেম্বর ফ্রেডারিক ব্যান্টিংয়ের জন্মদিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০০৯-২০১৩) মূল প্রতিপাদ্য হল ডায়াবেটিসকে জানা এবং নিয়ন্ত্রণ। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে ব্যক্তির সজ্ঞান ও আন্তরিক আগ্রহ আবশ্যক বলেই তাকে উদ্বুদ্ধকরণ, সার্বিক সহায়তা প্রদান, চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি এবং উপকরণ সরবরাহ তথা পরিবেশ নির্মাণে বিরাট ভূমিকা রয়েছে সরকার ও সমাজের। কারণ সুস্থ জনশক্তি বা নাগরিকের সুস্বাস্থ্য সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার অন্যতম অবলম্বন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০০০ সালে বিশ্বে ডায়বেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ কোটি। আশংকা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে। প্রাদুর্ভাব ও বিস্তারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উন্নত বিশ্বে টাইপ-২ অর্থাৎ ইনসুলিন নিরপেক্ষ রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোয় সবচেয়ে বেশি (১৮০%), এরপর আফ্রিকা মহাদেশে (১৬০%), তারপর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (১৫৫%) ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা রয়েছে। বিশ্বে এ রোগের গড় বিস্তার যেখানে ১১৪%, সেখানে বাংলাদেশে বিস্তারের হার ১৪৯%, যা যথেষ্ট আশংকাজনক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষা অনুসারে নগরায়ন, ওয়েস্টার্ন ফুড ও সার্বিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা এ রোগের বিস্তারকে বেগবান করছে। বিশ্ব রোগ নিরাময় কেন্দ্রের মতে, এ শতকের মাঝামাঝি পৌঁছার আগেই এটি মহামারীরূপে দেখা দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ডায়াবেটিক তথ্য কেন্দ্রের হিসাব মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এ ঘাতকব্যাধি বছরে দেশটির জাতীয় অর্থনীতির অন্তত ১৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিসাধন করে।
দীর্ঘদিন ধরে রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকলে ডায়াবেটিস দেখা দেয়। ডায়াবেটিস সাধারণত বংশগত কারণে ও পরিবেশের প্রভাবে হয়। কখনও কখনও অন্যান্য রোগের কারণেও এ রোগ হতে পারে। ডায়াবেটিস একবার হলে আর নিরাময় হয় না। এটা সব সময় ও আজীবনের রোগ। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।
ডায়াবেটিস ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়। বেশি মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয়- এ ধারণাও সঠিক নয়। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, শৃংখলা এবং ওষুধ এ রোগ নিয়ন্ত্রণের উপায়। খাদ্যের গুণগত মানের দিকে নজর রেখে পরিমাণ মতো খাদ্য গ্রহণ, জীবনের সবক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন বা শৃংখলা অর্থাৎ কাজেকর্মে, আহারে-বিহারে, চলাফেরায়, এমনকি বিশ্রাম ও নিদ্রায় শৃংখলা মেনে চলা দরকার। নিয়ম-শৃংখলাই ডায়াবেটিস রোগীর জীবনকাঠি। ডায়াবেটিস রোগীকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মতো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম-শৃংখলা মেনে চলতে হয়। রোগ সম্বন্ধে ব্যাপক শিক্ষা ছাড়া ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। তবে ডায়াবেটিস বিষয়ে শিক্ষা কেবল রোগীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একই সঙ্গে আÍীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং ডাক্তার ও নার্সদেরও শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। রোগী যদি চিকিৎসকের সঙ্গে সহযোগিতা করে তার উপদেশ ও নির্দেশ ভালোভাবে মেনে চলে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে পালন করে, তবে সুখী, কর্মঠ ও দীর্ঘজীবন লাভ করা সম্ভব।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান, চিফ কো-অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি

কৌশলে ভুল করেছে বিরোধী দল by বদিউর রহমান

রাজনীতির মারপ্যাঁচের কৌশলটাই বড় মজাদার। যারা সরাসরি এসব কৌশল আঁটেন, প্রয়োগ করেন এবং অনেক সময়ে ঝুঁকি নেন, তাদের রাজনৈতিক বুকের পাটা বেশ বড় মাপের। তাদের বুদ্ধিশুদ্ধি অবশ্যই সুদূরপ্রসারী। তাদের প্রাপ্তি বা পরিণতিও হয় দেখার মতো। মওলানা ভাসানীর বেশ কিছু কৌশল আমরা দেখেছি, উপলব্ধি করেছি এবং তা বাস্তবায়নের বড় ফলও সবাই দেখেছে। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তার কৌশলী সমর্থন মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে আনতে সহায়ক হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনকে আরও জনপ্রিয় করেছে। বঙ্গবন্ধুর ’৬৬-এর ছয়দফা এবং পরে ’৭১-এর ৭ মার্চ তখনকার রেসকোর্স ময়দানের এক ঐতিহাসিক অদ্বিতীয় ভাষণ আরেক অকল্পনীয় কৌশলই বটে- যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ এবং শেষ কথা, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। অথচ তারপরও তিনি আলোচনা চালিয়ে গিয়েছেন, নিজে পালিয়ে না গিয়ে পাকিস্তানিদের হাতে ধরাও দিয়েছেন। কিন্তু বাঙালির রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। ফলে বঙ্গবন্ধু নেই, পাকিস্তানি কারাগারে, অথচ যুদ্ধ চলেছে তার নামে। কী আশ্চর্য জাদু যেন। এটাই নেতৃত্ব, এটাই রাজনীতির কৌশল, আর এটাই হল বড় ঝুঁকি নেয়ার বড় বুকের পাটা। সেই বঙ্গবন্ধুই আবার কৌশলের মারপ্যাঁচে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চরমভাবে ব্যর্থ হলেন। বাকশাল করে সমর্থন হারালেন, ঘৃণিত হলেন। সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে নিজেই নিজের হাতে গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে শেষতক নিজেও মরলেন, জাতিকেও অনেক বছরের জন্য মেরে গেলেন। তার উত্থান আর পতন দেখে আমার কেবল ‘প্যাট্রিয়ট’ কবিতার কথা মনে পড়ে- ‘দাজ আই এন্টার অ্যান্ড দাজ আই গো!’ মনে হয় যেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই অনেক আগে এ কবিতাটি লেখা হয়েছিল। একজন পোয়েট অব পলিটিক্সের জন্য আরেকজন পোয়েট কী এক অনবদ্য কবিতাই না লিখে রেখে গেলেন!
বাংলাদেশে হালে দু’নেতার কৌশল নিয়ে ভাবতে গেলে আমার আরও মজা লাগে। শেখ হাসিনা আর বেগম জিয়া কী কৌশল যে শুরু করলেন! একজন চেলাচামুণ্ডাদের দেয়া খেতাব জননেত্রী থেকে এখন যেন এফিডেভিট করে ‘দেশরত্ন’ হওয়ার মহাজোটের মহাখায়েশে ব্যস্ত। গাজীপুরের জনসভায় বড় ব্যানারে দেখা গেল তাকে দেশরত্ন লেখা হল। কারা যে এসব লেখে বুঝি না, কিন্তু শেখ হাসিনা কেন যে তা মেনে নেন তা তো আরও বুঝি না। দেশরত্ন বোধকরি চেলাচামুণ্ডাদের ভাষায় জননেত্রী থেকেও বড়, হয়তো হবেও বা, কিন্তু রাজনীতির এ সময়ে ‘খেতাব’ নিয়ে এ ব্যস্ততা বড় দৃষ্টিকটু বটে। হতে পারে ভাবটা এমন যে, ভোটের প্রচারণার এ সময়েই নাম ফাটানোর বড় সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়। আর ডজন ডজন পাথরের যে সমাহার দেখা যায় তাতে মনে হয়, পারলে কেয়ামত পর্যন্ত এ দেশের যত উন্নয়ন হবে, সবই যেন তিনি এখনই উদ্বোধন করে দিয়ে যাবেন। সম্প্রতি প্রয়াত মান্না দের পাথরে নাম লেখা নিয়ে যে গান তার কথাও যেন আলীর (আওয়ামী লীগ) চাটুকাররা ভুলে গিয়েছেন। শেখ হাসিনাকে তার তোষামোদকারীদের কেউ কেউ হালে রাষ্ট্রনায়কও বলা শুরু করেছেন। তারা বলতেই পারেন, তারা যে চাটুকার! কিন্তু আমি বলি, রাষ্ট্রনায়করা কি এভাবে ডজনে ডজনে উদ্বোধনের ভিত্তিপ্রস্তরের পাথরের নামের মেলা বসায়? হতে পারে, এগুলো ওই এলাকার জনগণের ভোট পাওয়ার একটা সস্তা কৌশল। কিন্তু জনগণ কি এখন এত বোকা নাকি? ক্ষমতায় আসতে ব্যর্থ হলে এসব পাথরের অপব্যবহার হলেও কি আমরা অবাক হব? রাষ্ট্রনায়ক হলে তো কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের সমাপ্তিতে উদ্বোধনেই তিনি যেতেন না, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ একটা খবরের ঘোষণা দিয়েই তা চালু করে দিত। জনগণ কি বুঝত না কোন আমলে কারা এ উন্নয়ন করেছেন? হৃদয়ে নাম লেখালে পাথরের নাম কি আর থাকে? আবার মান্না দে! মান্না দে জিন্দাবাদ, মান্না দে চিরজীবী হোন।
তবে শেখ হাসিনা এক চুল নড়ে বেশ কৌশলের পরিচয় দিয়েছেন। টেলিফোনের আলাপের সময়ের আচরণ/মেজাজও তাকে সুবিধাজনক অবস্থানে এনেছে বলা যায়। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হয়েও তার অনেক অরাজনৈতিক আচরণসুলভ আচরণ থেকে এবার তিনি তুলনামূলকভাবে মুক্ত ছিলেন বলা চলে। টকশো আর লেখালেখিতে এসব নিয়ে, ৩৭ মিনিটের ‘ক্যারিকেচার’ নিয়ে কত যে বিশ্লেষণ, কত যে আঁতলামি আর মাতলামি! কেউ কেউ তো দু’নেত্রীর ফোনালাপকে ঐতিহাসিকও বলছেন। আমি বলি, এ ধরনের কথাবার্তা অর্থাৎ এ সংলাপকে ঐতিহাসিক বলাটা আস্ত ছাগলামি। বড় অসৌজন্যমূলক হয়ে গেল নাকি? বড় অভদ্রতা হল নাকি? সন্তান যদি মাকে মা বলে, বাপকে বাপ বলে- তা ঐতিহাসিক হবে কেন? এটা তো স্বাভাবিক, খুবই স্বাভাবিক। হতে পারে কোনো কারণে সন্তান অনেক দিন মা-বাপের সঙ্গে কথা বলেনি, তাই বলে পরে বলাটা ঐতিহাসিক হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী দলের নেত্রীর মধ্যে কথা হওয়া তো দেশের জন্য, জাতির কাছে সন্তানের মা-বাপকে মা-বাপ বলার মতোই। এতদিন যে তাদের কথা হয়নি, সেটাই বরং ঐতিহাসিক, নজিরবিহীন ও আশ্চর্যের বিষয়। এতদিন কথা না বলে তারা দু’জন শুধু অপরাধই করেননি, তারা জাতির সঙ্গে বেয়াদবিই করেছেন। এ বেয়াদবির জন্য তাদের দু’জনেরই জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত। জাতিকে নিয়ে রাজনীতি করবেন, জাতিকে নিয়ে খেলবেন, এ খেলা থেকে জননেত্রী-দেশনেত্রী খেতাব ভোগ করবেন, অথচ দু’জন কারও সঙ্গে কেউ কথা না বলে জাতির সঙ্গে বেয়াদবি করবেন- এটা তো মেনে নেয়া যায় না।
যাক, তবুও শেষতক টেলিফোনে তাদের সংলাপ হল, কখনও কখনও এ সংলাপকে ‘সঙের লাফ’ মনে হয়েছে। বেগম জিয়ার হাবভাব বেশ কঠোর ঠেকেছে। তিনি যে আপসহীন নেত্রী! হয়তো এবারও তিনি তাই হতে চেয়েছেন, আচরণে তাই দেখাতে চেয়েছেন, আলাপের সময়ে তার ক্ষোভ প্রকাশ্য হয়েছে। হয়তো এ আলাপের রেকর্ড যে আমজনতা দেখে ফেলবে তা তিনি ভাবেননি, হতে পারে আলীর কূটকৌশল তিনি টের পাননি। তবে আমরা দু’নেত্রীর ফোনালাপ প্রকাশকে সাধুবাদ জানাই। রাজনৈতিক আলাপ কেন গোপন থাকবে? শেখ হাসিনা যদি প্রকাশের মানসিকতা নিয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে থাকেন, আমি বলব এ কৌশলে তিনি লাভবান হয়েছেন। তার জনসমর্থন বেড়েছে। আমজনতা দু’নেত্রীর অঙ্গভঙ্গি, প্রকাশভঙ্গি, শব্দচয়ন, উচ্চারণের আবেগ-বিরক্তি সবই মূল্যায়ন করেছে। আমার দু’গ্রামের লড়াইয়ের কথা মনে পড়ল। কারা শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্তের জন্য শেষতক ঠিক হল দু’গ্রামের দু’পণ্ডিতের মধ্যে জ্ঞানের বচসা হবে, জ্ঞানের লড়াই হবে। যে পণ্ডিত হারবেন, সেই গ্রামের লোকই পরাজয় মেনে নেবে। উত্তম সিদ্ধান্ত, কেন অযথা রক্তক্ষয়, জীবননাশ। জ্ঞানী পণ্ডিত শক্ত ইংরেজির বাংলা জিজ্ঞেস করলেন- হর্নস অব ডাইলেমার অর্থ কী? কপাল গুণে অন্য গ্রামের কম জ্ঞানী-মূর্খ পণ্ডিত পেরে গেলেন- উভয় সংকট। এবার তার জিজ্ঞাসার পালা। জ্ঞান কম হলেও তার ধূর্ততা বেশ, তিনি বোঝেন মূর্খ গ্রামবাসী ইংরেজির আর কিই বা জানেন, তারা বাংলাই যা বোঝে। অতএব, তিনি জ্ঞানী পণ্ডিতকে জিজ্ঞেস করলেন, বলুন তো, আই ডু নট নো- এর বাংলা কী? যেইমাত্র জ্ঞানী পণ্ডিত জবাব দিলেন, আমি জানি না, অমনি মূর্খ পণ্ডিতের গ্রামবাসী লাঠি নিয়ে বিপক্ষ দলকে ‘হেরে গেছে, জানে না’ বলে তাড়াল। দু’নেত্রীর ফোনালাপের মধ্যে এমন কৌশল যদি থেকেও থাকে তবে বলতে হবে যে, তা-ও তো কৌশল, নাকি? খালেদা জিয়ার জন্মদিনকে নিয়ে রাসেলের প্রসঙ্গ টেনে এনে সস্তা সহানুভূতি পাওয়ার কৌশলী আকুতি আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, জনগণের মন জয়ের এবং খালেদা জিয়াকে খাটো করার লক্ষ্যেই এমনটি করা হয়েছে। কেউ ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করল কী করল না, তাতে ১৫ আগস্টের শোক বা ভাবগাম্ভীর্য কী করে কমে? শেখ হাসিনার এ ধরনের কথা বড় বিরক্তিকর বটে। খালেদা জিয়া ঠিকই বলেছেন, ১৫ আগস্ট কি কেউ জন্মাতে পারেন না? ১৯৪৬-এ তার জন্ম হলে তা তো ১৯৭৫-এর অনেক আগে, নয় কি? অতএব আমি বলি, জন্মদিন মিথ্যে হলেও খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ, বঙ্গবন্ধুর শোকে তিনি কেন কেক কাটবেন না? যত বছর, তত পাউন্ডের কেক, বেশ মজা, তাই না?
সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়ে শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার দু’দিনের আলটিমেটাম রক্ষা করেছেন। আলোচনার ব্যবস্থা তো শেখ হাসিনা করেছেন, নাকি? অতএব, খালেদা জিয়ার নিজের ঘোষিত ওয়াদা অনুসারে ৬০ ঘণ্টার হরতাল প্রত্যাহার করা উচিত ছিল। হতে পারে শেখ হাসিনা নির্দলীয় সরকারের কথা বলেননি, সর্বদলীয় সরকারের কথা বলেছেন; আলোচনার কথা তো বলেছেন। অতএব, হরতাল প্রত্যাহার করলে বাজাদের জনসমর্থন বাড়ত, খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি উন্নত হতো, তার সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটত। ১৮ দলের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া হরতাল প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়- তার এ ধরনের বক্তব্য জনগণ গিলেনি, তাকে ‘বেইমান’ ভেবেছে, এবার কিন্তু আপসহীন ভাবেনি। ’৮৬-এ শেখ হাসিনা যখন এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গেলে ‘জাতীয় বেইমান’ হবেন জেনেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউটার্ন নিয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে ‘জাতীয় বেইমান’ হয়েছিলেন, এবার খালেদাও তা-ই হলেন, অর্থাৎ ৮৬’র শেখ হাসিনার খেতাবটা ’১৩-এ এসে খালেদা নিলেন। আলোচনায় গিয়ে অবশ্যই সর্বদলীয় সরকার না মানতে পারতেন তিনি। নির্দলীয় সরকারের দাবি করতে পারতেন। হরতাল প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বলতে পারতেন, সংলাপে আসব, তবে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব গ্রহণ করছি না। তা না করে বাজাদ একটা বড় ‘মার’ খেল বটে। এবার আবার ৬০ ঘণ্টার, ৮৪ ঘণ্টার হরতাল দিয়ে জেএসসি পরীক্ষাকে বেকায়দায় ফেলে বাজাদ আরেকটা বড় ‘মার’ খেল। বাজাদ সমর্থক জনগণের সন্তানদের মধ্যেও লাখ লাখ পরীক্ষার্থী রয়েছে, তারাও অসন্তুষ্ট। হরতাল ঘোষণা কৌশল হিসেবে ঠিক ছিল, কিন্তু সরকারের অনুরোধের পর প্রত্যাহার করা হতো আরও বড় লাভজনক কৌশল। তাতে জনসমর্থন অনেক বাড়ত, ঘোষণা দেয়া যেত- ঠিক আছে, ৬০ ঘণ্টার, ৮৪ ঘণ্টার হরতাল পরীক্ষার পরে দেয়া হবে। রাজনৈতিক কৌশলে পরপর দু’বার ৬০ ঘণ্টা করে এবং পরে ৮৪ ঘণ্টার হরতাল দিয়ে, সংলাপে না গিয়ে বাজাদ মারই খেল। কোনো অর্জন হল না। জনসমর্থনের বেলায় বৃষ্টি বুঝে ছাতা ধরতে না পারলে গোঁয়ার্তুমি টিকে থাকে হয়তো, কিন্তু তা আপসহীন হয় না; তা হয় বরং রাজনৈতিক মার খাওয়া। বাজাদ এ বড় দুটি মার খেয়ে অবশ্যই বেশ জনসমর্থন হারিয়েছে এবং এতে আলী ফাউ সুবিধা পেয়ে গেল। একেই বলে রাজনীতি!
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

প্রধানমন্ত্রী আছেন মন্ত্রিসভা নেই

মন্ত্রীদের পদত্যাগ নিয়ে অনেকের মত হচ্ছে, পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর হয়ে গেছে। আবার অনেকের মতে, রাষ্ট্রপতির কাছে জমা না দেওয়ায় কার্যকর হয়নি। এ নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আমাদের সংবিধান অনুযায়ী একজন মন্ত্রী শপথ গ্রহণের পরপরই মন্ত্রিত্ব লাভ করেন। এবং মন্ত্রী তাঁর কার্যাবলি পরিচালনা করেন। সেখানে তাঁর যোগদান করার কোনো প্রশ্ন আসে না। সরকারি কর্মচারীদের যোগদানের জন্য পত্র দাখিল করতে হয়, যোগদানপত্র দিতে হয়। কিন্তু মন্ত্রীদের বেলায় তা লাগে না। কেননা, সংবিধানে আছে, শপথ গ্রহণের পরই তাঁরা কার্যভার গ্রহণ করেন। সংবিধানের ৫৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র দেওয়ামাত্রই কার্যকর হয়ে গেছে। এখন আর তাঁদের শপথের কার্যকারিতা নেই। পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা না-করার বিধান আমাদের সংবিধানে নেই। সাংবিধানিক পদ যে মুহূর্তে পদত্যাগ করছেন, সেই মুহূর্তে তা কার্যকর হবে। এর পরে তিনি যদি কোনো কাজ করেন মন্ত্রী হিসেবে, সেটা সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ হবে। তিনি যে বেআইনি কাজ করে যাচ্ছেন, সেই বেআইনি কাজের জন্য তাঁর দায়বদ্ধতা থাকবে। আমি মনে করি, যে মুহূর্তে আমাদের সংসদ সদস্যরা তাঁদের পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতে দিয়েছেন, সেই মুহূর্ত থেকে তাঁদের পদ শূন্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন,
সবাই তাঁকে সালাম করেছেন। এখানে আমাদের আইনমন্ত্রী একটা কথা বলেছেন, এটা সম্মতিপত্র। যদি সম্মতিপত্র হতো, তাহলে একটা কথা ছিল। কিন্তু প্রচার হয়েছে পদত্যাগপত্র, সংবিধানের ৫৮(১)ক ধারা অনুযায়ী। আর এটাও ঠিক, সম্মতিপত্র বলতে আমাদের সংবিধানে কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী যদি এটাকে নাটক হিসেবে নেন, ভবিষ্যতে আমাদের সংসদ সদস্যরা কীভাবে পদত্যাগ করবেন, যদি মহড়া হিসেবে নেন, তাহলে সেইভাবে বলা উচিত ছিল, যদি পদত্যাগপত্র আহ্বান করেন, সেটা এভাবে পদত্যাগ করবেন। কিন্তু বিষয়টি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক। এতে যাঁরা মন্ত্রী ছিলেন, উপমন্ত্রী ছিলেন, তাঁদের মান-মর্যাদার প্রশ্ন, দেশের সংবিধানের প্রশ্ন, আইনি প্রশ্ন এবং দেশবাসীর কাছে তাঁদের ভাবমূর্তির প্রশ্ন। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, সংবিধানে যে বিধান রয়েছে, সেই পদত্যাগপত্র দাখিল করার পরে মন্ত্রী হিসেবে তাঁদের গাড়িতে ফ্ল্যাগ, এমনকি মন্ত্রীর চেয়ারে বসে কাজ করা সম্পূর্ণ সংবিধানপরিপন্থী। এখানে দুই ধরনের মন্ত্রী আছেন, যাঁরা সংসদ সদস্য নন, তাঁদের ক্ষেত্রে সম্ভবত এটা প্রযোজ্য হবে না। যাঁরা সংসদ সদস্য হিসেবে মন্ত্রী আছেন, সে ক্ষেত্রে তাঁদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে কোনো মন্ত্রিসভা নেই। কেবল প্রধানমন্ত্রী আছেন। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন। এবং সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করতে পারেন।
তাঁর উত্তরসূরি না আসা পর্যন্ত তিনি স্বপদে বহাল থাকবেন। আমাদের সংবিধানে আরেকটি বিধান আছে, সংসদ ভেঙে দেওয়া হলে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী না আসা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী বহাল থাকবেন। আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে এ রকম বিধান থাকলেও মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে নেই। প্রধানমন্ত্রী এখন শূন্য পদগুলোতে অন্যদের নিয়োগ দিতে পারেন। ৫৮(১) অনুচ্ছেদের ক উপদফায় বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত অন্য কোনো মন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে, যদি তিনি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন।’ লক্ষ রাখতে হবে, রাষ্ট্রপতির কাছে মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র প্রদান করার সুযোগ নেই। তাই যে কথা বলা হচ্ছে যে তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র প্রদান করেননি, সেই যুক্তি অচল। কারণ, সংবিধানে বলা আছে, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র প্রদান করবেন। এবং তাঁরা দেশবাসীর সামনেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র প্রদান করে সংবিধান-নির্দেশিত শর্ত পূরণ করেছেন। তাই তাঁদের পদ শূন্য হয়ে গেছে। এখন তাঁরা বলতে পারেন, তাঁদের পদত্যাগপত্র তারিখবিহীন। তাহলে কি আরেকটি জালিয়াতি হয়ে গেল না? প্রধানমন্ত্রী তো এ কথাও বলেননি যে আপনারা পদত্যাগপত্র দেন, সময়মতো আমি এটা ব্যবহার করব।
জাতির সামনে তিনি তো এই অঙ্গীকার করেননি। তিনি স্পষ্টভাবে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং অনেকে তাঁকে সালামও করেছেন। এর অর্থ, আমরা বিদায় নিয়ে নিলাম। মন্ত্রীদের গাড়িতে এখন জাতীয় পতাকার ব্যবহার একটি অপব্যবহার। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সেদিকে একটু নজর রাখা উচিত হবে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আদালতে যেতে বলেছেন। আমরা কি সব ইস্যুতেই সুপ্রিম কোর্টে যাব? তাহলে পার্লামেন্ট রাখার দরকার কী? সবকিছু ভেঙে দিয়ে তবে সুপ্রিম কোর্টই রাখা হোক। সুপ্রিম কোর্ট থেকেই সব সমাধান মিলবে। রাষ্ট্রের খরচও কমে যাবে। রাষ্ট্র পরিচালনাও সহজ হয়ে আসবে। রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর রাজনৈতিক সমাধান হওয়া উচিত। আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে যদি সমাধানে আসেন, তাহলে উচ্চ আদালত বিতর্কিত হন। সেটা সমীচীন নয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
খন্দকার মাহবুব হোসেন: ভাইস চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল।

বর্জনে নির্বাচন ঠেকে না, কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা?

বিরোধী দল বা জোট নির্বাচন বর্জন করলে যে সব সময় নির্বাচন ঠেকে থাকে এমন নয়। বর্জন বা বয়কটের নির্বাচনের উদাহরণ আছে সাম্প্রতিক দুনিয়ায়। এই সেদিন, ৬ নভেম্বর মধ্য এশীয় দেশ তাজিকিস্তানে হয়ে গেল এ ধরনের একটি নির্বাচন। ১৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় গণপরিষদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে নেপালের মাওবাদীরা। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ার বিরোধী জোটও ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। ছিয়ানব্বইয়ের ১৫ ফেব্রুয়ারি একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। আবার নির্বাচন আসছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের কাছে মনোনয়নপত্র বিক্রিও শুরু করে দিয়েছে। এসব কিছুতেই নেই বিরোধী দল বিএনপি ও তার জোট। নেই নির্বাচন নিয়ে সমঝোতার কোনো লক্ষণও। আরেকটি বর্জনের নির্বাচনের দিকেই কি এগোচ্ছে বাংলাদেশ? নব্বইয়ের পর নির্বাচন বর্জনের বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে এমন কয়েকটি দেশ হচ্ছে: ঘানা, টোগো, মালি, আইভরি কোস্ট, গাম্বিয়া, গায়না ও ভেনেজুয়েলা। আর নব্বইয়ে গণতন্ত্রের পথে নতুন যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। এই দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো নাম উঠতে যাচ্ছে বাংলাদেশের? গণতন্ত্রের বিবেচনায় তাজিকিস্তান, মৌরিতানিয়া বা নেপালের কাতারে ফেলা যাবে না বাংলাদেশকে। তাজিকিস্তানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আছেন ২০ বছর ধরে।
আন্তর্জাতিকভাবে তিনি পরিচিত একজন একনায়ক হিসেবে। আর মৌরিতানিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহামেদ আবদেল আজিজ ২০০৮ সালে ক্ষমতা দখল করেছেন অভ্যুত্থান করে। বিরোধী জোট কখনো তাঁকে মেনে নেয়নি, বিবেচনা করে স্বৈরাচার হিসেবে। বিরোধী জোট কো-অর্ডিনেশন অব ডেমোক্রেটিক অপজিশন (সিওডি) নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্র বিলোপের পর গণতন্ত্রের পথে মাত্র যাত্রা শুরু করেছে নেপাল। বর্জনের নির্বাচনগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে না। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আমরা এই দেশগুলোর চেয়ে যতই উচ্চমানের ভাবি, সামনের নির্বাচনটি যদি একটি বয়কটের নির্বাচন হয়, তবে এই দেশগুলোর নামের পাশেই স্থান পাবে বাংলাদেশের নাম। ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দল ছাড়া একটি নির্বাচন করেছিল বিএনপি। তখন বিএনপির বাইরে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যে দলটির নাম নানা কারণে পরিচিত ছিল, সেটি ফ্রিডম পার্টি। ৩০০ আসনের মধ্যে ৪৮টিতে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচন করা সম্ভব হয়েছিল ২৫২টি আসনে আর নির্বাচন কমিশন গেজেট আকারে ফল প্রকাশ করতে পেরেছিল ২৪২টি আসনের।
এসব তথ্য-উপাত্তের মধ্যে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। সেই নির্বাচনের পর বিএনপি যে সরকার গঠন করেছিল, তার মেয়াদ ছিল দেড় মাস। ইতিহাসে কোনো কিছুরই হুবহু পুনরাবৃত্তি ঘটে না। এবারের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত যদি বিএনপি অংশ না নেয়, তবে সেটাও কোনোভাবেই ’৯৬ সালের নির্বাচনের অবিকল কিছু হবে না। সেই নির্বাচনের শিক্ষা বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কাজে লাগাবে। বর্জনের নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আজকের দুনিয়ায় নির্বাচন কোন দেশের শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যাপার নয়, এক সঙ্গে আন্তর্জাতিকও। আর আমাদের মতো দেশগুলোর নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটা ভূমিকা থাকে। তারা পর্যবেক্ষণ করে কী পেল, তার ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে কি না, তার একধরনের সনদ পাওয়া যায়। সম্ভবত সেই বিবেচনা থেকেই জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে গত সেপ্টেম্বরে বৈঠকের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নির্বাচনে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক পাঠানোর অনুরোধ করেছেন। সদস্যদেশগুলোর নির্বাচনে সহায়তা করার জন্য জাতিসংঘের একটি বিভাগ রয়েছে।
রাজনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীনে কাজ করে ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স বিভাগ। গত দুই বছরে ৫৯টি সদস্যদেশে নির্বাচনী সহায়তা দিয়েছে জাতিসংঘ। তবে বিশ্বে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ যে ভূমিকা পালন করে, এর কোনো নির্দিষ্ট বা সব দেশের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য মডেল নেই। বিষয়টি অনেকটা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থার মতো। সহায়তার বিষয়টিকে সাধারণভাবে তিনটি ভাগে করা আছে; ১. কারিগরি সহায়তা, ২. নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য মূল্যায়ন ৩. নির্বাচন তদারকি ও নির্বাচন অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথম ধরনের সহায়তার খুব প্রয়োজন নেই। কারণ, ১৯৯০ সালের পর থেকে ধারাবাহিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, ফলে কারিগরি ক্ষেত্রে অনেকটাই সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। আর তৃতীয় ধরনের সহায়তাটি অর্থাৎ নির্বাচন তদারকি বা অনুষ্ঠানের কাজটি শুধু বিশেষ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ করে থাকে। ১৯৯২-১৯৯৩ সালে পুরো দায়িত্ব নিয়ে কম্বোডিয়ার নির্বাচন করেছিল সংস্থাটি। ২০০৪-২০০৫ সালে আফগানিস্তান বা ২০০৫ সালে ইরাকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কিছু সদস্যদেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কাজটি সেরেছিল। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে পর্যবেক্ষক পাঠানোর যে অনুরোধ করেছেন, সেটা দ্বিতীয়টি অর্থাৎ ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য মূল্যায়ন’-এর মধ্যেই পড়ার কথা।
জাতিসংঘের রাজনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ওয়েবসাইট বলছে, কোনো দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে মূল্যায়ন করে তাকে বৈধতা দেওয়ার কাজটি একটি রাজনৈতিক বিষয়। ফলে এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়ে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কুশীলবদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থাহীনতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছলেই শুধু এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায়। এর বাইরে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছোট বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষক দলকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠানো হয় এবং সেসব দল মহাসচিবের কাছে অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন দিয়ে থাকে। শেখ হাসিনার পর্যবেক্ষক পাঠানোর অনুরোধের মাত্রাটি আসলে কী? এটা কি শুধু ছোট ‘বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষক দল’ পাঠানো, নাকি জাতিসংঘের কাছ থেকে নির্বাচনের ব্যাপারে সার্টিফিকেট চাওয়া? যদি জাতিসংঘের কাছ থেকে নির্বাচনের ব্যাপারে ম্যান্ডেট প্রত্যাশা করা হয়, তবে নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদের জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ‘কুশীলবদের পারস্পরিক আস্থাহীনতা’ দূর করার প্রক্রিয়ায়ও জাতিসংঘকে ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে জাতিসংঘের ছোট ‘বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষক’ দলের কথা বলা হয়ে থাকলে ভিন্ন কথা।ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আওতাও এখন ব্যাপক। নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনের দিন ও নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি সবই বিবেচনায় নেওয়া হয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন (ইউ-ইওএম) পাঠানো হবে কি হবে না, সেটা নির্ভর করে আগাম একটি মিশনের (এক্সপ্লোরেটরি মিশন) রিপোর্টের ওপর। ইউ-ইওএম পাঠানো ‘কার্যকর’ হবে কি না, সেটাই তারা বিবেচনা করে দেখে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ সব দলের অংশগ্রহণ, বিশেষ করে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে সেই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ইইউর কাছে কতটুকু ‘কার্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হবে?
এক্সপ্লোরেটরি মিশন কি প্রধান বিরোধী দলবিহীন কোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার সুপারিশ করবে? গণতন্ত্রের সঙ্গে যেমন নির্বাচনের সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে সব দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি। কোনো দল নির্বাচন বর্জন করলে জনগণের প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ কমে আসে। আর বাংলাদেশের মতো দেশে নির্বাচন বর্জন মানে তো শুধু শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন থেকে সরে আসা নয়। নেপালের মাওবাদীরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও দেশজুড়েই এখন ছড়িয়ে পড়েছে সংঘাত ও সহিংসতা। বাংলাদেশে তো সংঘাতের পর্ব এখন থেকেই চলছে। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করলে পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাবে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহী না হয়, তবে শুরুতেই আন্তর্জাতিকভাবে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। আর বিএনপি ও ১৮ দলের সমর্থকেরা যদি ভোট দিতে না যায়, তবে দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নির্বাচনের বাইরে থাকবে। মানে এই ভোটারদের কাছে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। আগেই বলেছি, কোনো দলের নির্বাচন বর্জনে হয়তো নির্বাচন ঠেকে না, প্রশ্নটি গ্রহণযোগ্যতার। কোনো নির্বাচন যদি ‘গ্রহণযোগ্য’ না হয়, তবে তাকে ‘নির্বাচন’ বলার সুযোগ থাকবে কি?
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

সংলাপের স্বার্থেই মন্ত্রীদের পদত্যাগ by আবদুল বাছেত মজুমদার

মন্ত্রীদের পদত্যাগ নিয়ে অনেকের মত হচ্ছে, পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর হয়ে গেছে। আবার অনেকের মতে, রাষ্ট্রপতির কাছে জমা না দেওয়ায় কার্যকর হয়নি। এ নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া তো বলেই আসছেন, একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক।
আমি মনে করি, মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার ঘটনা জাতীয় সংলাপের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আমি বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে চাই। নির্বাচন আসন্ন। প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকার গঠন করার প্রয়োজনে মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। এই পদত্যাগের বিধান সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদে লেখা আছে। এতে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়া অন্য মন্ত্রীদের পদ শূন্য হবে, যখন রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র দেওয়ার জন্য মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্রগুলো দেবেন। কোনো কোনো সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলছেন, পদত্যাগপত্র প্রদান করা হলেই মন্ত্রীদের পদ শূন্য হয়ে যাবে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক তাঁদের এই ব্যাখ্যা যথার্থ নয় বলেই মনে করি। প্রশ্নটি হলো, প্রস্তাবিত যে সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা করা হবে, তার পথ সুগম করার জন্যই প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের কাছ থেকে পদত্যাগপত্রগুলো নিয়েছেন। এটা দ্বারা যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্ত্রীদের পদগুলো শূন্য হয়ে গেছে, সে কথা বলা যায় না। কারণ, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দল থেকেও মন্ত্রী নিতে চান। যখন তিনি মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করবেন, তখনই বর্তমান পদগুলো শূন্য ঘোষণা করা ঠিক হবে।
এখানে টেকনিক্যাল দিকের প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়ার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উদারতা ও শুভেচ্ছাকে বড় করে দেখতে হবে। নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করার স্বার্থেই তিনি মন্ত্রীদের কাছ থেকে পদত্যাগপত্রগুলো জমা নিয়েছেন বলে ধারণা করি। এখন মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্রের সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন না তুলে বিরোধী দলের উচিত হবে খোলা মন নিয়ে সমঝোতার পথে এগিয়ে আসা। তারা প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে অরাজকতার পথ পরিহার করে একটি গঠনমূলক পথে আসুক—এটাই এ মুহূর্তে জনগণের ঐকান্তিক অভিপ্রায়। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য মন্ত্রীদের পদগুলো এ মুহূর্তে শূন্য হলো কি শূন্য হলো না, সংবিধান অনুযায়ী তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলো কি ক্ষুণ্ন হলো না, সে বিতর্কে অযথা সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পরে মন্ত্রীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়ল কি উড়ল না, সেই বিষয়ে বিরোধী দলের কোনো কোনো নেতার বিরাট উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখতে পাচ্ছি। অথচ তাঁরা হরতাল ডেকে দেশব্যাপী মানুষের মধ্যে একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছেন। আমরা আশা করব, তাঁরা হরতালের পথ পরিহার করে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকারে যোগ দিয়ে নির্বাচন যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, সে ব্যাপারে ভূমিকা রাখবেন। তাই বলব, মন্ত্রীদের পদত্যাগ প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এর মাধ্যমে বিরোধী দলের দাবিও অনেকাংশে মেনে নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি একচুলও নড়বেন না। কিন্তু সেখান থেকে সরে এসে তিনিই কিন্তু সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন।
এমনকি তিনি যখন নিজে থেকেই বিরোধীদলীয় নেতার দাবি অনুযায়ী তাঁর কাছে টেলিফোন করেছেন, গণভবনে তাঁকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন; তখন আমরা দেখলাম, বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর দেওয়া কথা থেকে সরে এলেন। তিনি ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে হরতাল প্রত্যাহার করলেন না। অর্থাৎ আলোচনার সুযোগটি তিনি নষ্ট করলেন। এখনো আবার একইভাবে কারিগরি প্রশ্নটি বড় করে সমঝোতার পথ রুদ্ধ করা সমীচীন হবে না। বিরোধী দলকে বুঝতে হবে, এই পদত্যাগপত্রগুলো প্রধানমন্ত্রী তাঁর হাতে নিয়েছেন রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিতে নয়; নিয়েছেন, তাঁরা যাতে আস্থার সঙ্গে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাবে সাড়া দিতে পারেন। বিরোধী দলের মনে আস্থা বাড়াতেই পদত্যাগপত্রগুলো জমা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ের প্রতি তাঁদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ নিয়ে কূটতর্কে যাওয়া উচিত হবে না। এটা তাঁদের করতে হবে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থেই। সর্বদলীয় সরকারে তাঁরা কোন কোন মন্ত্রণালয় চান,
সেই বিষয়ের সরাসরি প্রস্তাব দিতে এখন বাধা নেই। বিরোধী দলকে মনে রাখতে হবে, প্রধানমন্ত্রী চলে গেলে তাঁদের সঙ্গে কে কথা বলবেন? এই প্রেক্ষাপটে তাই সংঘাত ছেড়ে তাঁরা সংলাপে বসুক জাতির বৃহত্তর স্বার্থে। এমনকি আমি তো বলব, তাঁরা যদি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানের পদও আশা করেন, তাহলে সেটাও প্রধানমন্ত্রীর কাছেই বলতে হবে। সে কারণে প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর পদে বহাল থাকতে হবে। সুতরাং মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া নিয়ে বিতর্ক করার সময় এখন নয়। দেশের এই সন্ধিক্ষণে একটু প্রশস্ত মন নিয়ে উভয় পক্ষের একত্রে বসা উচিত। আবদুল বাছেত মজুমদার: আহ্বায়ক, সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ, সাবেক সভাপতি, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি।

ওবামা অসৎ অবিশ্বস্ত

যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর এ মুহূর্তে বারাক ওবামার জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিনি এই প্রথম তাকে অসৎ আর অবিশ্বাসী বলে মনে করছেন। নতুন এক জনমত জরিপে এমনটিই দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, শতকরা ৫৮ ভাগ মার্কিনি ওবামার কাজে সন্তুষ্ট নয়। তার প্রতি আস্থা রয়েছে মাত্র ৩৯ শতাংশ মানুষের। এর আগে ১ অক্টোবরের পরিচালিত অন্য এক জরিপে ওবামার গ্রহণযোগ্যতার হার ছিল ৪৫ ভাগ। তার প্রতি নাখোশ ছিল ৪৯ শতাংশ। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ওবামার জনপ্রিয়তা সর্বনিু পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওবামার সার্বজনীন স্বাস্থ্যবীমা আইন (অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট) নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে এখন চরম হতাশা বিরাজ করছে। আইন প্রণয়নের আগে তিনি বলেছিলেন,
স্বাস্থ্যবীমা আছে এমন লোকজন ইচ্ছা করলে তাদের আগের বীমা ধরে রাখতে পারবেন। আইন কার্যকর হওয়ার সময় দেখা যাচ্ছে, লোকজনের আগে থেকে চালু থাকা পছন্দের বীমা বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে গত সপ্তাহে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ওবামা। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে প্রথমবারের মতো ওবামার বিশ্বস্ততা নিয়ে জনগণের সংশয় প্রকাশ পেয়েছে। জরিপে অংশ নেয়া ৫২ শতাংশ মানুষের মতে, ওবামাকে বিশ্বাস করা যায় না। তবে ৪৬ শতাংশ এই অভিমতের বিরোধিতা করেছে। ৫৩ শতাংশের মতে, ওবামা যোগ্যতার সঙ্গে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছেন। আগামী বছর দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে বলে মনে করছে মাত্র ১৯ ভাগ ভোটার। ৪৩ ভাগের ধারণা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আর পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে বলে মনে করছে ৩৩ ভাগ মার্কিনি। জরিপে বলা হয়, ওবামার কোনো সিদ্ধান্তে সমর্থন দিচ্ছেন মাত্র ৩৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক, অন্যদিকে তার সিদ্ধান্তের ওপর নাখোশ ৫৪ শতাংশেরও বেশি মানুষ।

লাশের দ্বীপ ফিলিপিন্সে নৈরাজ্যের দাপট

নিষ্প্রাণ ফিলিপিন্সের এলাকাগুলোতে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবাধ অরাজকতা। নিষ্ঠুর নৈরাজ্যে নাজেহাল সদ্য হুঁশে আসা দ্বীপরাষ্ট্রের ডাঙা। প্রকৃতি দৈত্য টাইফুনের কবল থেকে মুক্ত হতে না হতেই মানুষের জঙলে বসবাসরত বর্বর ক্ষুধা দানবের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ বাহিনী নামাতে হয়েছে ফিলিপিন্স সরকারকে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি চলেছে আইন-শৃংখলা ফেরানোর চেষ্টাও। রাতে ‘কারফিউ’ জারি করা হয়েছে তাকলোবানে। তথ্য বলছে, মঙ্গলবার তাকলোবানের মোট ২৯৩ জন পুলিশকর্মীর মধ্যে কাজে এসেছিলেন মাত্র ২০ জন।
বাকিদের বেশিরভাগই মৃত অথবা নিখোঁজ। তাকলোবান আপাতত তাই প্রশাসনহীন। সুযোগ বুঝে জাঁকিয়ে বসছে অপরাধ চক্র। মঙ্গলবারই সেখানকার একটি জেল ভেঙে পালিয়েছে বেশ ক’জন বন্দি। এদিকে মঙ্গলবার নতুন একটি নিরক্ষীয় ঝড়ের জেরে প্রবল বর্ষণ শুরু হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে। ফলে বাধা পাচ্ছে উদ্ধারকাজ। তাকলোবানের বহু এলাকায় এখনও কোমর সমান জল। তাতে ভেসে বেড়াচ্ছে অগনতি দেহ। গণসমাধির আয়োজন করছে প্রশাসন। কিন্তু তাতেও কুলোচ্ছে না। আর যারা কোনোক্রমে বেঁচে গেছেন, তাদের কী অবস্থা? খাবার নেই, ওষুধ নেই। পানীয়জল তা-ও মিলছে না। সহায়সম্বলহীন মানুষগুলো তাই মারমুখী হয়ে উঠেছেন। তাকলোবানের এক দোকান-মালিক এমা বারমেজো বললেন, ‘মানুষ অসম্ভব ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত। আর ক’দিনের মধ্যে এরা নিজেরাই একে অপরকে মারতে শুরু করবেন।’ কিন্তু তার পরই এমার প্রশ্ন, ‘আমার ব্যবসা শেষ। দোকানটা পুরোটাই লুট হয়ে গেছে। যদি খাবার এবং পানি চুরির জন্য এসব হতো, তার মানে ছিল। কিন্তু এর মধ্যেও টিভি, ওয়াশিং মেশিন চুরি? লজ্জার ব্যাপার।’ লজ্জার কথা স্বীকার করছেন এডওয়ার্ড গুয়ালবের্তোও। হাইয়ানের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি গ্রামের কাউন্সিলর তিনি। তিনদিন ধরে পেটে একফোঁটাও দানাপানি পড়েনি। বাধ্য হয়ে তাই অন্যের ঘরে ঢুকে তাদের খাবার চুরি করে খেয়েছেন। তবে সে বাড়িতে কারও অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন ছিল না। কারণ বাসিন্দারা সবাই মৃত। আর সেই লাশের উপর পা রেখেই ঘরে ঢুকেছেন এডওয়ার্ড।
ম্লান মুখে বললেন, ‘এই কালান্তক টাইফুন সভ্যতার পাঠ ভুলিয়েছে আমাদের।’ বাস্তবিক। ফি বছরে গড়ে ২০ থেকে ২৪টি টাইফুন আছড়ে পড়ে ফিলিপাইনে। কিন্তু এবারের মতো অভিজ্ঞতা কখনও হয়নি। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি প্রদেশ লেইট এবং সামারের অবস্থা শোচনীয় বললেও কম। বহু এলাকা পানির নিচে। পথে প্রান্তরে ভাসছে দেহ। বেশিরভাগই শিশুর। দেখেশুনে উদ্ধারকারী দলের ধারণা, এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণ গেছে খুদেদেরই। অথচ পরিস্থিতি বোঝার উপায় নেই। পানি পেরিয়ে এখনও প্রত্যন্ত জায়গায় পৌঁছতেই পারছে না উদ্ধারকারী দল। অগত্যা তাই বাবার কোলে সওয়ার হয়েই মর্গে পৌঁছচ্ছে শিশুকন্যার দেহ। কোথাও বা কোলের ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন মা। শোক, হাহাকার, কখনও বা পরিচিত মুখ খুঁজে বেড়ানো। ফিলিপিন্সের সমুদ্র-সংলগ্ন এলাকার ছবিটা কিছুটা এ রকমই। কিন্তু হাইয়ানের অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে যে বেশ অনেকটা সময় লেগে যাবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত প্রশাসন। ফিলিপিন্সের অর্থসচিব সিজার পুরিসিমার আশংকা, ঝড়ের ফলে নারকেল এবং ধানের ফলনে যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তাতেই আগামী বছরে আর্থিক বৃদ্ধি অন্তত ১ শতাংশ কমবে। সম্পত্তি, পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি, তার হিসাব এখনই সম্ভব নয়। কিন্তু সব কিছু পেরিয়ে ভেসে আসছে ক্যারল মামপাসের কণ্ঠস্বর ‘আমাদের আর কিছু রইল না। বাড়ি নেই, টাকা নেই, কোনো তথ্য-নথি নেই, পাসপোর্ট, স্কুলের রেকর্ড কিছুই নেই।’