Wednesday, October 1, 2025

মেহেদী হাসানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস: আওয়ামী লীগের স্থগিতাদেশ স্থায়ী নয়, যেকোনো সময় প্রত্যাহার হতে পারে by কাউসার মুমিন

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে অংশ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে সফররত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা স্বাধীন গণমাধ্যম জেটিও-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বৃটিশ-আমেরিকান সাংবাদিক মেহেদী হাসানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা আলোচনা করেন। শান্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নোবেল প্রাপ্তির চেষ্টা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রাজনীতির নানা বিষয়ে মেহেদী হাসানের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ড. ইউনূস। বাংলাদেশের পাসপোর্টে ইসরাইল সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞার পুনঃস্থাপন, মিয়ানমার ও গাজা পরিস্থিতি, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, তরুণদের দল গঠন,  রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে বৈশ্বিক পদক্ষেপ, পতিত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিতকরণ, হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত নির্যাতন, শেখ হাসিনার বিচার ও বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং কেন জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত হচ্ছে- এমন নান ইস্যুতে প্রশ্ন করেন মেহেদী হাসান।

সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করা সরকারের সিদ্ধান্তকে জোর সমর্থন করেন এবং এই পদক্ষেপ গণতন্ত্রকে দুর্বল করবে অথবা অতীতের দমন-পীড়নের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে বলে যে আন্তর্জাতিক সমালোচনা তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। সাংবাদিক মেহেদী হাসান এ বিষয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের উত্থাপিত উদ্বেগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ড. ইউনূস এর বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি দেন। অমর্ত্য সেন ইতিপূর্বে সতর্ক করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হাসিনার শাসনামলের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। জবাবে ড. ইউনূস বলেন, এটি ভুল সমালোচনা। আমরা দলটিকে নিষিদ্ধ করিনি। দলটি বৈধ রয়েছে। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে ইউনূস ব্যাখ্যা করেন, নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগকে আসন্ন নির্বাচনে সম্ভাব্য বিঘ্নকারী হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। তারা মনে করছে, আপাতত তাদেরকে (আওয়ামী লীগ) রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে না দেয়াই ভালো। তবে স্থগিতাদেশ স্থায়ী নয়। যেকোনো সময় তা প্রত্যাহার করা যেতে পারে।

লাখ লাখ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কণ্ঠস্বর প্রকাশে সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাধাগ্রস্ত করছে কিনা- মেহেদী হাসানের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস আওয়ামী লীগের দলীয় ভিত্তির স্কেলকে ছোট করে দেখান। তিনি বলেন, আমি বলব না লাখ লাখ। তাদের সমর্থক আছে, কিন্তু আমি জানি না কতজন বাকি আছে। অনেকেই প্রকৃত সমর্থক ছিলেন না বরং ক্ষমতার কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হন। ড. ইউনূস জোর দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বৈধ ভোটার হিসেবে থাকবেন, যারা আসন্ন নির্বাচনে অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে থেকে তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নিতে পারবেন।

ইউনূস আরও অভিযোগ করে বলেন, গত বছর ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ওপর সহিংস দমন-পীড়নের জন্য আওয়ামী লীগ দলটির কোনো অনুশোচনা নেই। যেখানে জাতিসংঘের পরিসংখ্যানে ওই সহিংসতায় আনুমানিক ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগ এখনও দুঃখ প্রকাশ বা কোনো দায় স্বীকার করেনি। একটি শব্দও নয়। তিনি বলেন, এসব কারণে দলটির স্থগিতাদেশকে ন্যায্যতা দেয়া হয়েছে।

হিন্দুসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার খবরে প্রথমেই চাপের মুখে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকার। গত নভেম্বরে হাজার হাজার হিন্দুর বিক্ষোভ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিত্বদের সমালোচনার জবাবে ইউনূস সেসব দাবিগুলোকে ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ভারতকে ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য অভিযুক্ত করেছেন। সম্প্রদায়ের (হিন্দু-মুসলিম) মধ্যে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে। কখনও কখনও জমি বা পাড়ার দ্বন্দ্ব থাকে। কিন্তু পদ্ধতিগত হিন্দু-বিরোধী সহিংসতার ধারণাটি অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেন ইউনূস। সমালোচনা সত্ত্বেও জোর দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবং কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশকে জর্জরিত করা কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক চক্রের পুনরাবৃত্তি রোধে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিতাদেশ প্রয়োজনীয়। ইউনূস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য কিনা তা নিয়ে প্রশ্নগুলো কার্যত এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, এটি নোবেল কমিটির বিষয়। তারা সিদ্ধান্ত নিবে। জবাবে মেহেদি হাসান অট্টহেসে বলেন, উত্তরটি খুব ভালো হয়েছে, খুব ভালো কূটনৈতিক উত্তর।

পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রশ্নে ড. ইউনূস এ বছর বাংলাদেশের পাসপোর্টে ইসরাইল ছাড়া সকল দেশের জন্য বৈধ লাইন পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ভ্রমণ দলিলে থাকা এই বাক্যাংশটি ২০২১ সালে শেখ হাসিনা সরকার কর্তৃক বাদ দেয়া হয়। ইউনূস ব্যাখ্যা করেন, পুরো বাংলাদেশই সেই সিদ্ধান্তের বিরোধী ছিল। আমরা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিইনি এবং আমরা এমন কোনো খোলামেলা পরিস্থিতি তৈরি করতে চাই না।

গাজায় চলমান সহিংসতাকে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, এটা বলতে নোবেল বিজয়ী হওয়ার প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ হিসেবেই এটি বলা যায় যে এটা গণহত্যা। শিশুরা মারা যাচ্ছে, খবারের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছে মানুষ। পুরো বিশ্বের জন্য লজ্জার বিষয় যে আমরা আমাদের স্ক্রিনে এটি দেখি কিন্তু কিছুই করি না।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি। ২৭ বছর বয়সী তরুণ নেতা নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে দলটি গঠিত হলেও সরকার প্রধান হিসেবে নিরপেক্ষ থাকা জরুরি বলে মনে করেন ড. ইউনূস। সাংবাদিক মেহেদী হাসানকে তিনি বলেন, যদি আমি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কিছু বলি তাহলে তা পক্ষপাতপূর্ণ মনে হবে। আমি শুধু আওয়ামী লীগ নিয়ে মন্তব্য করি কারণ তারা এখন দৃশ্যপটের বাইরে।

গত বছরের ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়া এবং কিছু সময়ের জন্য ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অংশ থাকা নাহিদ ইসলামের নতুন দলকে কিছু সমালোচক ইউনূসের প্রোটেজে হিসেবে দেখলেও মেহেদী হাসানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটি সমালোচকদের অনুমান বলে উল্লেখ করেন ইউনূস। তিনি বলেন হ্যাঁ, তিনি সরকারের একজন উপদেষ্টা ছিলেন এবং ছাত্রনেতাদের মধ্যে ছিলেন যারা আমাকে ডেকেছিল। তার সঙ্গে সম্পর্ক আছে, কিন্তু আমি তাকে সমর্থন করিনি। তাদের দলকেই নিজেদের নীতি এবং ভবিষ্যৎ কৌশল সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে হবে।

mzamin

ফিলিস্তিন নিয়ে ভারতকে চুপ থাকলে চলবে না by সোনিয়া গান্ধী

ফ্রান্স এখন যুক্তরাজ্য, কানাডা, পর্তুগাল ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যোগ দিয়ে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি বহু কষ্ট সহ্য করা ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য স্বপ্ন পূরণের পথে প্রথম ধাপ। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যদেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই ১৫০টির বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারত এ ক্ষেত্রে একসময় অগ্রগামী ছিল। বহু বছর ধরে পিএলওকে (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) সমর্থন করার পর ১৯৮৮ সালের ১৮ নভেম্বর ভারত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। এ সিদ্ধান্ত ছিল মূলত নৈতিক এবং ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভারত স্বাধীন হওয়ার আগেই জাতিসংঘে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য ইস্যু তুলেছিল এবং বর্ণবাদী শাসনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। আলজেরিয়ার স্বাধীনতাসংগ্রামের (১৯৫৪-৬২) সময় ভারত ছিল স্বাধীন আলজেরিয়ার জোরালো সমর্থক। ফলে আন্তর্জাতিক মহল এই সংগ্রামকে ভুলে যেতে পারেনি। এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ লড়াই।

১৯৭১ সালে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা ঠেকাতে এবং আজকের বাংলাদেশের জন্ম ঘটাতে দৃঢ়ভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল। ভিয়েতনামে রক্তপাতের সময় যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ চুপ করে ছিল, তখন ভারত ছিল নৈতিকতার কণ্ঠস্বর। ভারত তখন শান্তির আহ্বান জানিয়েছিল এবং বিদেশি আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছিল। আজও ভারত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অন্যতম বড় সেনা অবদান রাখছে। ভারতের সংবিধানের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্দেশক নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা’ ভারতের একটি কর্তব্য।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারত সব সময়ই সংবেদনশীল ও নীতিগত অবস্থান নিয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। ১৯৭৪ সালে ভারত প্রথম দিককার দেশগুলোর একটি ছিল, যারা পিএলওকে স্বীকৃতি দেয়। তখন থেকেই ভারত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষ নিয়ে আসছে; যেখানে ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকবে, আবার ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানও সম্ভব হবে।

বছরের পর বছর ভারত জাতিসংঘের নানা প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং পশ্চিম তীর দখল ও বসতি স্থাপনকে নিন্দা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত ইসরায়েলের সঙ্গেও পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। জাতিসংঘ, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) প্ল্যাটফর্মে ভারত সব সময় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ভারত ফিলিস্তিনকে মানবিক সহায়তাও দিয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা, গাজা ও পশ্চিম তীরে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সাহায্য, শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভারতের বহু অবদান রয়েছে।

কিন্তু গত দুই বছরে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত শুরুর পর থেকে ভারত কার্যত তার আগের ভূমিকা থেকে সরে এসেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নৃশংস ও অমানবিক হামলায় ইসরায়েলি সাধারণ মানুষ নিহত হয়। এরপর ইসরায়েল যে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা একেবারে গণহত্যার পর্যায়ে চলে যায়।

এখন পর্যন্ত ৬৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে ১৭ হাজার শিশু। গাজার স্কুল, হাসপাতাল, বাসস্থান, কৃষি ও শিল্প সব ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিতে পড়েছে। ইসরায়েলি সেনারা খাদ্য ও ওষুধের ত্রাণ আটকে দিয়েছে। এমনকি মানুষ খাবার নিতে গেলে তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংস ঘটনা সেখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্বও খুব ধীরে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ফলে অনেকটা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে সম্প্রতি কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি অনেক দেরিতে হলেও ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এর মাধ্যমে ন্যায়বিচার, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকারের নীতিকে আবারও সামনে আনা হচ্ছে। এটা শুধু কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক দায়িত্বের স্বীকৃতি।

আধুনিক বিশ্বে নীরব থাকা নিরপেক্ষতা নয়; বরং অন্যায়ের সহযোগিতা। আর এখানেই ভারতের কণ্ঠস্বর, যা একসময় স্বাধীনতা ও মানবমর্যাদার পক্ষে দৃঢ় ছিল। কিন্তু সেই স্বর এখন অনেকটাই নীরব হয়ে গেছে। মোদি সরকারের প্রতিক্রিয়া মূলত নীরবতা আর মানবিকতা ও নৈতিকতার অভাবে ভরা। ভারতের সংবিধানের মূল্যবোধ বা কৌশলগত স্বার্থের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বন্ধুত্বই যেন তাদের অবস্থান ঠিক করছে।

কিন্তু এ ধরনের ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি টেকসই নয়। এটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দিশা হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য জায়গায় এমন প্রচেষ্টা ইতিমধ্যেই ব্যর্থ হয়ে দেশকে অপমানজনক পরিস্থিতিতে ফেলেছে। ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত গৌরব অর্জনের প্রচেষ্টায় গুটিয়ে যেতে পারে না, কিংবা শুধু অতীত ইতিহাসের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না।

এর জন্য দরকার ধারাবাহিক সাহস আর ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা। অবাক করার মতো বিষয় হলো মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। শুধু তা–ই নয়, বরং ইসরায়েলের বিতর্কিত সেই কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রীকেও ভারত আতিথ্য দিয়েছে, যিনি পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উসকানির কারণে আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত।

ফিলিস্তিন ইস্যুকে ভারত শুধু বৈদেশিক নীতি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি ভারতের নৈতিক ও সভ্যতাগত ঐতিহ্যেরও পরীক্ষা। ফিলিস্তিনের মানুষ বহু দশক ধরে বাস্তুচ্যুতি, দখল, বসতি সম্প্রসারণ, চলাফেরার বাধা, আর বারবার নাগরিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকারের ওপর আক্রমণ সহ্য করছে। তাদের এই দুর্দশা অনেকটা ভারতের ঔপনিবেশিক যুগের লড়াইয়ের মতো।

যখন আমাদের জনগণ সার্বভৌমত্ব হারিয়েছিল, দেশহীন ছিল, সম্পদ লুট হয়েছিল, আর সব অধিকার ও নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল; তখন আমরা যেভাবে লড়াই করেছিলাম, ফিলিস্তিনিরা একইভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তাই ভারতের উচিত ফিলিস্তিনের প্রতি ইতিহাসের সহমর্মিতা দেখানো এবং সেই সহমর্মিতাকে নীতিগত পদক্ষেপে রূপ দেওয়া।

ভারতের অতীত অভিজ্ঞতা, নৈতিক কর্তৃত্ব আর মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকার তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলতে, অবস্থান নিতে এবং কাজ করতে শক্তি জোগায়। প্রত্যাশা হলো, ভারত যেন পক্ষপাতিত্ব না করে। এখানে ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনের মধ্যে কাউকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নেই। প্রত্যাশা হলো ভারত যেন নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব দেখায়। যে মূল্যবোধের ওপর ভারত দাঁড়িয়ে আছে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় দেশটির যে আদর্শ ছিল, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারতকে ভূমিকা রাখতে হবে।

* সোনিয়া গান্ধী, ভারতের কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন
- দ্য হিন্দু থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-28%2Fzxsgsxdp%2Fsoniagandhi.jpg?rect=0%2C0%2C960%2C640&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সোনিয়া গান্ধী। ফাইল ছবি

গাজা ফ্লোটিলা নিয়ে উত্তেজনা: ‘হামলা হবে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’

গাজাগামী ত্রাণবাহী সুমুদ ফ্লোটিলা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের দিকে। তারা প্রবেশ করেছে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। এর আগে এই এলাকায় ত্রাণবাহী ফ্লোটিলার ওপর হামলা হয়। তাদের মোকাবিলা করে ইসরাইলি বাহিনী। সর্বশেষ খবরে জানা যাচ্ছে, এবারের ফ্লোটিলায় আছে দুটি বোট। তার একটি হলো আলমা এবং অন্যটি সিরিয়াস। গত রাতে আলো নিভিয়ে বেশ কিছু বোট তাদের দিকে অগ্রসর হয় এবং তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বলে খবরে বলা হয়েছে।

অনলাইন আল জাজিরা বলছে, বুধবার ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম কান রিপোর্টে বলেছে, নৌ কমান্ডো এবং যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করে এই ফ্লোটিলার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। উপকূলে থাকা ৫০টি নৌযানের মুখোমুখি হতে পারবে না তারা। তবে কিছু নৌযানকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা আছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বোট থেকে কয়েকশ অধিকারকর্মীকে আটক করার ইচ্ছা আছে ইসরাইলের। তারপর তাদেরকে আশদুদ বন্দর দিয়ে ফেরত পাঠাতে চায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক জলসীমায় আছে এমন জাহাজ বা বোটের নিয়ন্ত্রণ ইসরাইল নিতে পারে কিনা সে বিষয়ে উত্তর হলো না।

ওদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফ্লোটিলার আয়োজকরা বলেছেন, অজ্ঞাত নৌযান তাদেরকে রাতের বেলা ঘিরে ধরে। পরে তারা চলে যায়। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা বলেছে, আমরা গাজা অভিমুখে যাত্রা অব্যাহত রেখেছি। এখনও ১২০ নটিক্যাল মাইল দূরে আছি। ওদিকে ব্রাজিলের অধিকারকর্মী ও সুমুদের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য থিয়াগো আভিলা বলেন, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর একটি নৌযান দুটি ফ্লোটিলার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করেছে। তিনি আরও বলেন, তাতে বৈদ্যুতিক ডিভাইসের ক্ষতি ছাড়া কেউ আহত হননি। আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।

ওদিকে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন, ফ্লোটিলার ওপর কোনো হামলা হলে তা হবে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তিনি গাজা সুমুদ ফ্লোটিলায় কয়েকশ ক্রুর জীবন ও মর্যাদাকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান। পেত্রো আরও লিখেছেন, বেসামরিক মানুষ, মানবিক ও অহিংস মিশনে কারো ওপর হামলা হবে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ইসরাইলি হামলার আশঙ্কায় সব ক্রু জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট পরে আছেন। এই মিশনে কলম্বিয়ার দু’জন অধিকার কর্মী আছেন। তারা হলেন, ম্যানুয়েলা বেদোয়া এবং লুনা ব্যারেতো।

mzamin

ট্রাম্প বর্ণবাদী, নারী ও ইসলামবিদ্বেষী, তোপ দাগলেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। তিনি ট্রাম্পকে ‘বর্ণবাদী, লিঙ্গবৈষম্যকারী, নারী ও ইসলামবিদ্বেষী’ বলে মন্তব্য করেছেন।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সফরে গিয়ে ট্রাম্প লন্ডনের মেয়রের সমালোচনা করেন। এরপর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া গত মঙ্গলবারের ভাষণে ট্রাম্প আবারও বলেন, ‘লন্ডনে একজন খারাপ, অত্যন্ত খারাপ মেয়র আছেন। এটা (লন্ডন শহর) অনেকটাই বদলে গেছে। এখন তারা শরিয়াহ আইন চালু করতে চায়।’

এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সাদিক খান এবার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন। বিবিসিকে মেয়র বলেন, ‘মানুষ আশ্চর্য হয়, কেন ট্রাম্প আমার মতো একজন মুসলিম মেয়রের প্রতি এত মনোযোগ দিচ্ছেন; যিনি (সাদিক খান) একটি উদার, বহুসংস্কৃতির, প্রগতিশীল ও সফল শহর পরিচালনা করছেন।’

সাদিক খান আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেখিয়ে দিয়েছেন, তিনি একজন বর্ণবাদী, লিঙ্গবৈষম্যকারী, নারী ও ইসলামবিদ্বেষী মানুষ।’

ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ‘অত্যন্ত খারাপ মেয়র’ হিসেবে সমালোচিত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় সাদিক খান বলেন, লন্ডনে রেকর্ডসংখ্যক মার্কিন আসছেন, এ জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। অর্থাৎ সাদিক খান বলতে চাইছেন, তিনি যদি এত খারাপই হবেন, তবে রেকর্ডসংখ্যক মার্কিন কেন তাঁর এ শহরে আসছেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন মানদণ্ডে দেখা যায়, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে লন্ডন প্রায়ই বিশ্বের ১ নম্বর শহর।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
এর আগে গত বুধবার ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মন্ত্রী প্যাট মক্‌ফ্যাডন মেয়র সাদিক খানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সাদিক খানের মধ্যে কয়েক বছর ধরেই ‘ঝামেলা’ চলছে।

লন্ডন শরিয়াহ আইন চালু করতে চায়—ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের জবাবে যুক্তরাজ্যের এই রাজনীতিক বলেন, যুক্তরাজ্যে শুধু ব্রিটিশ আইন প্রযোজ্য। এর বাইরে অন্য কোনো আইন নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও লন্ডনের মেয়র সাদিক খান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

করবিনের নতুন দল বাম রাজনীতির শূন্যতা ঘোচাতে পারবে by জন রিস

আফ্রিকান হাতির গর্ভকাল প্রায় দুই বছর দীর্ঘ। কিন্তু যুক্তরাজ্যে একটি নতুন বামপন্থী দলের জন্মের জন্য যাঁরা অপেক্ষা করেছেন, তাঁদের অপেক্ষার তুলনায় সেটি যেন চোখের পলক ফেলার মতোই ক্ষণস্থায়ী। বহু মাস ধরে সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে একটি দল অন্যদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে। বিভিন্ন পরিকল্পনা তারা প্রণয়ন করছে। কিন্তু ঐকমত্যের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারেনি।

এখন অবশেষে করবিন ও জারাহ সুলতানা একটি নতুন দল গঠনের ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এই ঘোষণার সঙ্গে কোনো কর্মসূচি, নীতি, নাম বা সাংগঠনিক কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে কেবল সহনেতৃত্বের ঘোষণার ব্যাপারে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানোটাও সহজ কাজ ছিল না।

সৌভাগ্যক্রমে তৃণমূলের উদ্দীপনা এ মুহূর্তে এই দলকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দলের মূল উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঐকমত্যের ঘাটতিকে এই উদ্দীপনা ঢেকেও দিচ্ছে এবং এই মুহূর্তে বামপন্থীরা যত ঝামেলাতেই পড়ুক না কেন, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের তাদের সাহায্য করা বন্ধ করছেন না! সম্প্রতি ভিন্নমতাবলম্বী চারজন লেবার এমপিকে সমাজকল্যাণ তহবিল কাটছাঁটের বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহের কারণে পার্লামেন্টারি দল থেকে বহিষ্কার করে স্টারমার বামপন্থীদের আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে একটি নতুন দলের প্রয়োজন কতটা জরুরি। ডায়ান অ্যাবটকে হুইপের পদ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া প্রমাণ করে যে স্টারমারের বামপন্থাবিরোধী ঘৃণা এতটাই গভীর যে তা তাঁর নিজের দলের জন্যও আত্মঘাতী হয়ে উঠছে।

জন্মপর্বটি বেশ জটিল হওয়া সত্ত্বেও নতুন এই বামপন্থী দল বিশ্বব্যাপী ব্যাপক উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ছয় লাখের বেশি মানুষ সমর্থক হিসেবে নাম লিখিয়েছেন।

দলটির সামনে অবশ্যই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক—দুই দিক থেকেই অনেক চ্যালেঞ্জ আসবে। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হবেএকটি আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণ করা। কেননা, এই নীতিই কোটি কোটি ভোটারের কণ্ঠস্বরকে প্রতিধ্বনিত করবে। এটি তুলনামূলকভাবে সহজ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি মনে হতে পারে। কারণ, গত নির্বাচনে চারজন স্বতন্ত্র এমপি এবং জেরেমি করবিন ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁরা সফল হয়েছিলেন। কারণ, জনসাধারণের মধ্যে ইতিমধ্যেই ব্যাপক ফিলিস্তিনপন্থী মনোভাব রয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আর কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে কার্যত অনুপস্থিত।

কিন্তু এরপরও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল যে যুদ্ধ বিস্তার করছে, তাতে করে কেবল ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের প্রশ্নটিই নয়, আরও ইস্যু সামনে নিয়ে আসছে। ইরানে ইসরায়েলের হামলার ব্যাপারে কী হবে? এ ঘটনা কি গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা? হুতিদের নিয়ে নতুন বামপন্থী দলের অবস্থান কী হবে? কিংবা যুক্তরাজ্যের আইনে নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুল্লাহর ব্যাপারে দলটির দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে?

এ প্রশ্নগুলোর সমাধান হয়তো তুলনামূলকভাবে সহজেই করা সম্ভব হবে। কারণ, ইসরায়েল যুদ্ধবাদী অবস্থান ও তৎপরতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের অবস্থান এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে যে দেশটির বিরোধিতা ক্রমেই আরও স্বাভাবিক ও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অন্তত ভোটারদের এ অংশ নতুন একটি বামপন্থী দলকে ভোট দিতে আগ্রহী হবেন।

কিন্তু গাজার বাইরেও আরও কঠিন বিষয় রয়েছে, যেগুলো যুক্তরাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছে। ইউরোপজুড়ে এখন পুনরায় সামরিকীকরণ কর্মসূচি পুরোদমে চলছে। এটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রচারযুদ্ধ এবং ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এটা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এটি স্টারমার সরকারের একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক অবস্থান।

‘ন্যাশনাল এনডেভার’ নামে একটি বড় ‘দেশপ্রেমমূলক’ প্রচারাভিযান চলছে। স্টারমার বলেছেন, ‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি’ নিশ্চিত করতেই এ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা তো আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘আমরা’ আগামী ‘পাঁচ বছরের মধ্যে’ রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ব।

এই যুদ্ধ-তৎপরতার বিরোধিতা করা মানেই হচ্ছে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের তোপের মুখে পড়া এবং যুক্তরাজ্যের লেবার, কনজারভেটিভ ও রিফর্ম—এই তিন দলের সম্মিলিত অবস্থানের বিপক্ষে দাঁড়ানো।

করবিন এর আগেও এই অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। খুব কম মানুষ ভুলে যেতে পারেন, লেবার পার্টির নেতা থাকাকালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় সরাসরি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তাঁকে কীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হয়েছিল।

করবিন এই চাপকে মোকাবিলা করতে পেরেছিলেন, তার কারণ হলো তিনি জীবনব্যাপী যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিবাদী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন।

কিন্তু সুলতানা এখনো সেভাবে এ ধরনের শান্তিবাদী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে পারেননি। সেটা জোরদার করা তাঁর জন্য উপকারী হবে। করবিনের উপদেষ্টাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যক নেতায়ই শান্তিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

বামপন্থী সামাজিক গণতন্ত্র, যেটি একসময় ডানঘেঁষা সমাজতন্ত্রে পরিণত হয়, এ রকম কোনো রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা কেবল হতাশা ও ব্যর্থতার জন্ম দিতে পারে। এটি কোনো আকর্ষণীয় বিকল্প নয়।

নতুন বামপন্থী দলকে শুরু থেকেই আরও মৌলিক পরিবর্তন আকাঙ্ক্ষী ও দৃঢ়ভাবে সমাজতান্ত্রিক হতে হবে। পার্লামেন্টের বাইরের সংগ্রামকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করাই দলটির মুখ্য লক্ষ্য হওয়া উচিত। বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট এতটাই গভীর যে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে সামান্যতম পরিবর্তন আনতেও সবচেয়ে র‍্যাডিকাল পদক্ষেপ প্রয়োজন।

* জন রিস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো এবং স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

জেরেমি করবিন দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন করে আসছেন
জেরেমি করবিন দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন করে আসছেন। ছবি: এএফপি

জাতিসংঘে পরিস্থিতিতে খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন নেতানিয়াহু! by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

শুক্রবার জাতিসংঘে উপস্থিত হন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সবসময়ের মতো তিনি সঙ্গে নিয়ে যান একাধিক নাটকীয় প্রদর্শনী। কখনো মানচিত্রে ইসরাইলের কথিত শত্রুদের ওপর বিজয়সূচক ‘ভি’ আঁকেন, কখনো ‘আমেরিকান প্রশ্নপত্র’ তুলে ধরেন- যাতে বোঝানো হয় ইসরাইলের শত্রুরাই পুরো পশ্চিমাদের শত্রু। শেষ অবধি তিনি হাজির করেন এক ডিস্টোপিয়ান প্রচারণা কৌশল। শুক্রবার তিনি জাতিসংঘে ভাষণ দেয়ার সময় বিপুল পরিমাণ দেশের নেতারা তার বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে ওয়াকআউট করেন। কিন্তু হলঘরে থেকে যান মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ‘পা-চাটা’ দেশ। ইউরোপীয় প্রতিনিধি, আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো আব্রাহাম চুক্তির দেশগুলো তাদের আসনে বহাল তবিয়তে রয়ে যান। কিন্তু যে পরিমাণ নেতা ওয়াকআউট করেন, তাতে সম্ভবত বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন নেতানিয়াহু। তিনি ডায়াসে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ভরা চোখে তাদের চলে যাওয়া দেখছিলেন। এর পরই শূন্য আসনগুলো দেখানো হয় সরাসরি সম্প্রচার মাধ্যমগুলোতে। এমন দৃশ্য বিরল। এ জন্যই সম্ভবত নেতানিয়াহু হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি ইসরাইল বলতে গিয়ে বলে ফেলেন ইরান। অস্ট্রেলিয়া বলতে গিয়ে বলে ফেলেন অস্ট্রিয়া। ভাগ্য ভালো যে সঙ্গে সঙ্গে সম্বিত ফিরে পেয়েছেন। ওই যে বলে না, জাতে মাতাল তালে ঠিক। সেরকমই তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ফিলিস্তিনে ‘কাজ শেষ করবেন’। কতটা নিকৃষ্ট মানসিকতার হলে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েও একটি জনগোষ্ঠীকে নিঃশেষ করে দেয়ার দম্ভ প্রকাশ করতে পারেন! জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত তো এরই মধ্যে তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। তারপরও তার মতো ব্যক্তি কিভাবে জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানে যেয়ে বক্তব্য দেয় এবং দম্ভ প্রকাশ করে- তা এক বড় প্রশ্ন। কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি? এ প্রশ্ন তুলতে পারে সদস্য দেশগুলো। কিন্তু যারা এ প্রশ্ন তুলবে তারা আগেই নিজেদের মাথা বিক্রি করে দিয়ে বসে আছে।

হারেৎজে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি সেনারা তার ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করেছে গাজার ভেতরেও- লাউডস্পিকারে, এমনকি ফোন দখল করে। সেখানে হিব্রু ভাষায় সরাসরি বার্তা পাঠানো হয় আটক ব্যক্তিদের উদ্দেশে।

কিন্তু তার সবচেয়ে চমকপ্রদ পদক্ষেপ ছিল বুকের ওপর লাগানো একটি ব্যাজ, যাতে একটি বারকোড ছিল। প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, ৭ই অক্টোবরের আগে কেউই এই ব্যাজ পরেনি। যে কেউ কোডটি স্ক্যান করলে পৌঁছে যেত এক ওয়েবসাইটে, যেখানে প্রদর্শিত হচ্ছিল ৭ই অক্টোবর নিহত ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিকদের ভয়াবহ ছবি। কার্যত তিনি নিজের শরীরকেই ভয়াবহতার প্রদর্শনীতে পরিণত করেন। যুক্তি হিসেবে বলেন, কেন আমরা লড়াই করি আর কেন জিততেই হবে- এটাই ব্যাখ্যা।

কিন্তু এই নিখুঁতভাবে সাজানো সব প্রদর্শনী শুরু থেকেই ব্যর্থতার মুখোমুখি। কারণ, নেতানিয়াহু ও তার ঘনিষ্ঠরা বুঝতেই চান না- ৭ই অক্টোবরের নৃশংসতা কখনোই বৈধতা দিতে পারে না গাজায় প্রতিদিন ঘটে চলা নৃশংসতার অবসানহীন ধারাকে।

গাজার যুদ্ধ জাতিসংঘের ভেতরে-বাইরে ভয়াবহ চিত্রের বন্যা বইয়ে দিয়েছে। মাত্র দু’দিন আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগানও একই রকম কৌশল নেন। তিনি মঞ্চে গাজার ভয়ঙ্কর তিনটি ছবি তুলে ধরেন। নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন, তিনি মূলত নিজের ঘরোয়া সমর্থকদেরই উদ্দেশ্য করে কথা বলেছেন। তাই তার সামনে প্রায় খালি হল দেখে অবাক হওয়ার কথা নয়। বহু মুসলিম দেশ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এমনকি কিছু ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধিরাও তার বক্তব্য শুরু হতেই ওয়াকআউট করেন। এত মানুষ একসঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ায় হলের দরজায় সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, সভাপতিকে কয়েক মিনিট শৃঙ্খলার আহ্বান জানাতে হয়। অন্যদিকে গ্যালারিতে উপস্থিত কয়েক ডজন সমর্থক চিৎকার, শিস আর করতালিতে ভরিয়ে তোলেন।

শুধু ইরান, কাতার, আলজেরিয়ার আসনই নয়- মধ্যপন্থী বলে পরিচিত কিরগিজস্তানের আসনও ফাঁকা ছিল। আয়ারল্যান্ড অধিবেশনের এই সেশনে যোগই দেয়নি। স্পেন মাঝপথে চলে গেছে। তবে বেশিরভাগ ইউরোপীয় প্রতিনিধি, আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো আব্রাহাম চুক্তির দেশগুলো আসনে রয়ে যায়। ইসরাইলের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক একঘরে হয়ে পড়ার তুলনায় এটাকে তুলনামূলক ভালো খবর ধরা হয়।

ভাষণে একাধিক জিভ ফসকানো ভুল করেন নেতানিয়াহু। কখনো ‘ইসরাইল’ বলতে গিয়ে বলেন ‘ইরান’। কখনো অস্ট্রেলিয়া বলতে গিয়ে বলেন অস্ট্রিয়া। তবে দ্রুতই নিজেকে ঠিক করেন। ভাষণটি মূলত দুই শ্রোতাদের উদ্দেশে ছিল। প্রথমত, ইসরাইলের ডানপন্থী ভোটব্যাঙ্ক, যাদের জন্য পরবর্তীতে গাজায় সম্প্রচারিত ক্লিপ নিয়ে নির্বাচনী ভিডিও বানানো হবে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র- বিশেষ করে হোয়াইট হাউসে থাকা ব্যক্তির উদ্দেশে।

তিনি মার্কিন জেনারেলদের উদ্ধৃতি দেন, ইসরাইল থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে গোয়েন্দা সুবিধা পাচ্ছে তা জোর দিয়ে বলেন, আবারও দাবি করেন ইরান ও তার সহযোগীরা ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগান তোলে। তিনি অভিযোগ করেন, ইরান নাকি দু’বার মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টা করেছে (যদিও বাস্তবে শুধু ট্রাম্পের ওপর একবারের চেষ্টা ইরানের সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়)। এছাড়া তিনি ৭ অক্টোবর ইসরাইলের ক্ষতিকে আমেরিকান তুলনায় দাঁড় করান। বলেন, তারা যদি ৪০,০০০ আমেরিকানকে হত্যা করত, ১০,০০০ আমেরিকানকে জিম্মি করত।

তিনি ইউরোপীয় নেতাদেরও আক্রমণ করেন যারা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। দাবি করেন, ইসরাইলিদের বিপুল অংশই তার সঙ্গে একমত। প্রতিশ্রুতি দেন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের শক্তির ভিত্তিতে শান্তি আসবে। বৈশ্বিক ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আর জোর দিয়ে বলেন, গাজায় গণহত্যা হচ্ছে না।

রেটোরিক্যাল প্রশ্ন ছুড়ে দেন, নাজিরা কি ইহুদিদের বলেছিল চলে যাও, দয়া করে চলে যাও? ইঙ্গিত করেন ইসরাইল নাজিদের মতো আচরণ করছে না। অথচ ইতিহাসবিদরা জানেন- নাজি শাসনের প্রথম দিকে ঠিক এটিই করা হয়েছিল, জার্মানি থেকে ইহুদিদের স্বেচ্ছা প্রবাসে উৎসাহিত করা হতো। এ ছাড়া তার পুরো বক্তৃতাই ছিল পুরনো বুলি, মাসের পর মাস ধরে শোনা কথা। গাজার যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিংবা কোনো সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে তিনি নতুন কিছুই বলেননি। ভাষণ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনও শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়। জানানো হয়, সোমবার ওয়াশিংটন সফরের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন।

জাতিসংঘে আবারও প্রমাণ হলো- বিশ্বের উদ্দেশে নেতানিয়াহুর কোনো বার্তা নেই। কোনো সংলাপ নেই। তার সমস্ত আশা, ভয় আর প্রচেষ্টা নিবদ্ধ কেবল এক জায়গায়- হোয়াইট হাউসে, যার ওপর ইসরাইলের সরকার সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

mzamin

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ: ‘২৮ বছরেও কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি, কীভাবে বেঁচে আছি জানতে চায়নি’ by আব্দুল কুদ্দুস

সাদা বেলাভূমিতে সাগরের নীল ঢেউ আছড়ে পড়ছে। শান্ত সাগরে চক্কর দিচ্ছে কয়েকটা গাঙচিল। এমন চোখজুড়ানো দৃশ্য থেকে খানিক দূরেই হাবিবুর রহমানের বাড়ি। পলিথিনের ছাউনি দেওয়া বেড়ার জীর্ণ ঘর। একসময় গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) ছিলেন হাবিবুর। এখন অবসর নিয়েছেন। বাড়ির আঙিনায় পাওয়া গেল তাঁকে। কথা বলতে শুরু করেই নিজের ঘরের দিকে দেখালেন। বললেন, ‘১২ বছর আগে ঘরটা ভেঙে গেছে। এরপর পলিথিন আর বাঁশের বেড়া দিয়ে কোনোমতে সংস্কার করেছি। গত ২৮ বছরে কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি। কীভাবে বেঁচে আছি, জানতে চায়নি।’

কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২ নম্বর শেডের একটি ঘরের সামনে বসে কথাগুলো বলছিলেন হাবিবুর রহমান। ১৯৯৭ সালের ১৫ জুন সেন্ট মার্টিনের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্প ছিল এটি। সে সময় ঝড়ে ঘর হারানো হাবিবুর রহমানসহ ৫০টি পরিবারের স্থান হয়েছিল এই প্রকল্পে।

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়নের সাবেক দুই চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান ও ফিরোজ আহমদ খান বলেন, নির্মাণের পর দ্বীপের মধ্যভাগে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝের পাড়ায় গড়ে তোলা দেশের প্রথম এই আশ্রয়ণ প্রকল্প প্রতিষ্ঠার পর আর কেউ খোঁজখবর রাখেনি। সংস্কার হয়নি ঘরগুলোর। এখানকার বাসিন্দারা একরকম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

বেহাল আশ্রয়ণ প্রকল্প

দ্বীপের কয়েকজনের দান করা ৮০ শতক (দুই কানি) জমির ওপর টিনের ছাউনি ও বাঁশের বেড়া দিয়ে নির্মিত হয়েছিল আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাঁচটি লম্বা শেড। সেখানেই মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোর। স্থাপন করা হয়েছিল তিনটি নলকূপ ও তিনটি স্যানিটারি ল্যাট্রিন। নিরাপত্তার জন্য দেওয়া হয় কাঁটাতারের সীমানা বেড়াও।

ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছরে ঘরগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি। টিনের ছাউনি ও বাঁশের বেড়া নষ্ট হয়ে গেছে। বাসিন্দাদের অবস্থাও নাজুক।

মুজিবুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৯ জুন কক্সবাজার জেলাকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত জেলা ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন পর্যন্ত জেলার টেকনাফ, উখিয়া, সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলাতে দুই কক্ষবিশিষ্ট ৪ হাজার ৬৬৪টি পাকা ঘর হস্তান্তরের মাধ্যমে ১ হাজারের বেশি দরিদ্র পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু সেন্ট মার্টিনবাসীর কপালে জোটেনি একটিও ঘর। কারণ, ঘর তৈরির জন্য দ্বীপের কোথাও খাসজমি ছিল না। নানা অজুহাতে দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্পটি সংস্কারও করা হয়নি।

৬ সেপ্টেম্বর আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে ৮০টি পরিবারের ৪০০ জনের বেশি বাসিন্দা থাকছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোতে। লোক বাড়লেও বাড়েনি ঘরের সংখ্যা। জীর্ণ ঘরগুলোতে কোনোরকমে বসবাস করছেন বাসিন্দারা। নির্মাণের পর থেকে কোনো সংস্কার হয়নি বলে জানান আশ্রয়ণ প্রকল্পের লোকজন। দীর্ঘ ২৮ বছরে কেবল খাওয়ার পানি সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

মাঝের পাড়ার বাসিন্দা ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আল নোমান প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ ঘর বহু আগেই ভেঙে পড়েছে। পলিথিনের বেড়া ও ছাউনির ঝুপড়িতে অমানবিক জীবন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা। চারদিকঘেরা বেড়া নেই, নেই বিদ্যুৎ। ল্যাট্রিন নষ্ট হওয়ায় খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে। নলকূপগুলো কয়েক বছর অচল ছিল। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পাইপলাইন টেনে বাসিন্দাদের খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আয়রোজগারের কোনো সুযোগ না থাকায় জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। সাগরে মাছ ধরা না পড়লে দুঃখ-কষ্ট বেড়ে যায়।

৫ নম্বর শেডের আরেকটি কক্ষে থাকেন জুলেখা বেগম। সঙ্গে তাঁর অসুস্থ স্বামী, ছেলে, ছেলের বউ-নাতিসহ ১০ জন। স্থানসংকুলান না হওয়ায় পলিথিনের বেড়া ও ছাউনি দিয়ে আরেকটি পৃথক কক্ষ তৈরি করতে হয়েছে।

জুলেখা বেগম (৫০) প্রথম আলোকে বলেন, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে যখন দ্বীপে পর্যটক আসে। তখন ছেলে ইজিবাইক (টমটম) চালিয়ে কিছু আয় করে। অন্য সময় বেকার থাকতে হয়।

কবে হবে নতুন ঘর

জনপ্রতিনিধিরা জানান, ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান সেন্ট মার্টিন আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করেছিলেন। বাসিন্দাদের দুরবস্থা, দুঃখ-কষ্ট দেখে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘরগুলো সংস্কার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়িত হয়নি।

ইউপি সদস্য আল নোমান বলেন, পুরোনো ঘরগুলো সরিয়ে সেখানে পাঁচটি নতুন শেড ঘর নির্মাণের জন্য এক দশক ধরে বিভিন্ন দপ্তরে লেখালেখি করা হচ্ছে, কিন্তু কাজ হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. সালাহউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মেয়াদ বা কাজ গত জুন মাসে শেষ হয়েছে। এখন নতুন করে দেশের কোথাও আশ্রয়ণ প্রকল্প হচ্ছে না। সেন্ট মার্টিন আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কার করা হবে। আপাতত সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য খাদ্যসহায়তা পাঠানো হচ্ছে।

জীর্ণ হয়ে পড়েছে সেন্ট মার্টিনে দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। কষ্টে দিন কাটে  বাসিন্দাদের
জীর্ণ হয়ে পড়েছে সেন্ট মার্টিনে দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। কষ্টে দিন কাটে বাসিন্দাদের। ছবি: প্রথম আলো

যুক্তরাজ্যে লেবার সম্মেলন: ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে ভোট

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েল জাতিগত হত্যা চালাচ্ছে ও দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া উচিত—এমন একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির প্রতিনিধিরা। দলটির বার্ষিক সম্মেলনে প্রস্তাবটির ওপর এই ভোটাভুটি হয়। এ ফলাফলকে লেবার সম্মেলনের ইতিহাসে এক বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অভূতপূর্ব এ সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক অনুসন্ধান কমিশনের প্রতিবেদনই মেনে নিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল গাজায় জাতিগত হত্যা চালাচ্ছে। সম্মেলনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশটিতে অস্ত্র বিক্রিতে পূর্ণ অবরোধ আরোপের বিষয়েও সমর্থন জানানো হয়।

গত রোববার লিভারপুলে শুরু হওয়া এ সম্মেলনে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিরা নানা বিষয়ে প্রস্তাবে ভোট দিচ্ছেন।

প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইনের পরিচালক বেন জামাল বলেন, এটি সরকারের জন্য বড় পরাজয়। লেবার পার্টি অবশেষে স্বীকার করেছে, ইসরায়েল গাজায় জাতিহত্যা চালাচ্ছে। এ ঐতিহাসিক ভোট এখন সরকারের নীতিতে পরিণত হওয়া উচিত—ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা ও দেশটিতে অস্ত্র বিক্রির ওপর অবরোধ জারি করতে হবে।

ট্রান্সপোর্ট স্যালারিড ইউনিয়নের (টিএসএসএ) সাধারণ সম্পাদক মারিয়াম এসলামদুস্ত বলেন, ‘আজ লেবার আন্দোলন ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। লেবার নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট বার্তা গেছে—আমরা জাতিহত্যার অপরাধে নীরব থাকব না।’

গতকাল সন্ধ্যায় প্রতিনিধিরা আরেকটি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন, যা লেবারের প্রচলিত ইসরায়েল নীতিকে সমর্থন করছিল বলে ধারণা করা হয়।

আগের দিন গত রোববার যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হ্যামিশ ফ্যালকনার ওই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলেন। সেখানে ভুলভাবে দাবি করা হয়েছিল, ১৬ সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ অনুসন্ধান কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ‘জাতিহত্যার ঝুঁকি’ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলেছে, ইসরায়েল গাজায় জাতিহত্যা চালিয়েছে ও এখনো চালাচ্ছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের তথ্যমতে, যে জরুরি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ফ্যালকনার রোববার বক্তব্য দিয়েছিলেন, প্রস্তাবটি বরং বড় ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন সমর্থন পেয়েছে।

মিডল ইস্ট আই যে প্রস্তাবের কপি দেখেছে, তাতে বলা হয়েছে, ‘সম্মেলন জাতিসংঘ অনুসন্ধান কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণ করছে এবং লেবার সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছে, গাজায় গণহত্যা ঠেকাতে তার হাতে থাকা সব যুক্তিসংগত উপায় ব্যবহার করতে।’

প্রস্তাবে আরও দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে চাপ দিতে সরকারকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে এবং যুক্তরাজ্যের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে জাতিহত্যায় সহযোগিতা না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

ব্রিটিশ প্যালেস্টিনিয়ান কমিটির পরিচালক সারা হুসেইনি বলেন, লেবার নেতৃত্বকে এখন নিজেদের দলের সদস্য, জাতিসংঘ, জাতিহত্যা বিশেষজ্ঞ ও অসংখ্য মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বীকার করতে হবে যে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে জাতিহত্যা চালাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের এ অপরাধে সম্পৃক্ততা বন্ধ করতে হবে।

স্টারমার সরকারের ওপর চাপ

প্রস্তাবটি পাস হওয়ায় গাজায় জাতিহত্যা নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

এ ঘটনা লেবার কর্মী–সমর্থকদের মধ্যে সরকারের নীতির প্রতি অসন্তুষ্টির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত সপ্তাহে ব্রিটেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে জাতিহত্যা বলে ঘোষণা করার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সরকার ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি–সংক্রান্ত ৩৫০টি লাইসেন্সের মধ্যে ৩০টি স্থগিত করেছিল। পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছিল, যুক্তরাজ্যের অস্ত্র গাজায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ভঙ্গের কাজে ব্যবহার হতে পারে।

তবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশের লাইসেন্স নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়। এই যুদ্ধবিমান সরাসরি গাজায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, লেবার পার্টির ৭২ শতাংশ ভোটার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করছেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে একের পর এক কূটনৈতিক বিরোধ দেখা দিয়েছে। এ দুই দেশ দীর্ঘদিনের মিত্র। এ মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্য সরকার দেশটিতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র মেলায় ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করে।

গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্রিটেনের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির সিদ্ধান্তকে ‘হামাসকে দেওয়া পুরস্কার’ বলে মন্তব্য করেন।

তবে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ গত সপ্তাহেই ব্রিটেনে যান ও ডাউনিং স্ট্রিটে স্টারমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

পরে হারজগ বলেন, তিনি স্টারমারের সঙ্গে একদিকে বিতর্ক করেছেন, অন্যদিকে কিছু বিষয়ে একমত হয়েছেন। স্টারমারকে তিনি ইসরায়েলের মিত্র আখ্যা দেন।

 যুক্তরাজ্যের বিচারবিষয়ক মন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি (বাঁয়ে) ও প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের লিভারপুলে লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনের প্রথম দিনে, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
যুক্তরাজ্যের বিচারবিষয়ক মন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি (বাঁয়ে) ও প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের লিভারপুলে লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনের প্রথম দিনে, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

কায়রোয় গড়ে উঠছে ‘ছোট্ট গাজা’ by শিরিন ফালাহ সাব

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে খুলুদ ও তাঁর স্বামী মোহাম্মদ সেই কাঙ্ক্ষিত টেলিফোন পান। ফোনে তাঁদের বিস্তারিত জানানো হয়, কীভাবে ও কোন পথে তাঁরা গাজার দক্ষিণ প্রান্তের রাফাহ থেকে বের হয়ে মিসরে প্রবেশ করতে পারবেন তাঁদের তিন সন্তান নিয়ে। এর পাঁচ মাস আগে তাঁরা গাজার খান ইউনিস ছেড়ে রাফাহ আসেন।

ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিজেদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা খান ইউনিসে আত্মীয়দের সঙ্গে ছিলেন। তখন অবশ্য গাজা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেননি তাঁরা। কিন্তু রাফাহতে আসার পর প্রতিনিয়ত ‘বোমা আর মৃত্যুর ভয়াবহতা নিয়ে তাঁবুতে বাস করা’ রীতিমতো দুঃসহ হয়ে ওঠে। তখনই খুলুদের স্বামী মোহাম্মদ ঠিক করেন যে তাঁরা যেভাবেই পারেন, মিসর যাবেন। তারপর যা হয় হবে।

‘অন্তত বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ একটু যেন ভালো হয়, সেটা ভেবেই এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়,’ বলেন খুলুদ। খুলুদ শিক্ষকতার পাশাপাশি গাজায় জাতিসংঘের একটি সংস্থার সঙ্গেও কাজ করতেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর পর প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েল গাজার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে। তখন থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক এক লাখ গাজাবাসী মিসরে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে গাজায় প্রতিনিয়ত মৃত্যুর বিভীষিকাকে সাময়িকভাবে পেছনে ফেললেও মিসরে তাঁদের জীবন বড্ড কঠিন ও অনিশ্চিত।

তারপর তাঁরা কেউ পারতপক্ষে এ নিয়ে কথা বলতে চান না পাছে আশ্রয়দাতা দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার দায়ে খেদিয়ে দেওয়া হয় বা জোর করে গাজায় ফেরত পাঠানো হয়।কিংবা মিসরীয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের হয়রানি করতে পারে আর গাজায় থেকে যাওয়া স্বজনদের মিসরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রবল।
তাই এ প্রতিবেদন তৈরিতে যাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা হয়েছে, এখানে তাঁদের পুরো নামধাম উল্লেখ করা হয়নি।

গাজা থেকে প্রাণ নিয়ে পালাতে খুলুদ ও মোহাম্মদকে শিশুদের জনপ্রতি ২ হাজার ৫০০ ডলার ও বড়দের জনপ্রতি ৫ হাজার ডলার করে মোট ১৭ হাজার ৫০০ ডলার দিতে হয়েছে একটি মিসরীয় কোম্পানিকে, যারা রাফাহ সীমান্ত অতিক্রম করে মিসরে প্রবেশের যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে।

টেলিফোন পাওয়ার কয়েক দিন পর পরিবারটি রাফাহ সীমান্ত অতিক্রম করে মিসরে প্রবেশের মুখে অভিবাসন কর্মকর্তা তাঁদের পাসপোর্টে ৪৫ দিন মেয়াদি পর্যটন ভিসার সিলছাপ্পর মেরে দেন। রাফাহ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে আরিশ হয়ে সিনাই মরুভূমির ওপর দিয়ে ৩১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মিসরের রাজধানী কায়রো গিয়ে পরিচিত একটি পরিবারের বাড়িতে ওঠেন খুলুদ-মোহাম্মদ দম্পতি।

ওখানে তিন দিন থেকে কায়রোর দক্ষিণে গিজার উত্তরাঞ্চলে ইমবাবা নামের একটি মহল্লায় ছোট্ট একটি বাসা নেন তাঁরা। প্রতি মাসে ভাড়া গুনতে হয় ১৮৫ ডলার, যা একই ধরনের বাসার জন্য মিসরীয়দের দেওয়া ভাড়ার তিন গুণ। ‘গাজার ভেতরে ও বাইরে সবাই এ যুদ্ধ থেকে মুনাফা লুটতে চায়,’ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন খুলুদ।

এখানে আসার পর মোহাম্মদ মাসখানেক কাজ খুঁজেছেন আর খুলুদ বাচ্চাদের নিয়ে বাসায় থেকেছেন। কারণ, বসবাসের পারমিট ছাড়া বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো যায় না। মোহাম্মদ এরপর তিন সপ্তাহের জন্য দুটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। তিনি ভোরে বাসা থেকে বেড় হতেন আর রাতে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে ফিরতেন।

এই দম্পতি অবশ্য সৌভাগ্যবান। কারণ, হাড়ভাঙা খাটুনির তিন সপ্তাহ পর গাজায় যে সংস্থা মোহাম্মদ কাজ করতেন, সেই সংস্থা মিসরের বাইরে তাঁর জন্য একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেয়। ফলে খুলুদ ও তাঁর তিন সন্তান মিসরে সাময়িকভাবে বসবাসের অনুমতিপত্র লাভ করেন। ‘অভিবাসীদের তুলনায় আমাদের লড়াইটা ভিন্ন ও কঠিনতর,’ বলেন খুলুদ। এখানে যেসব ফিলিস্তিনি থাকছেন, সবার ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য।

এখানে প্রধান সমস্যা হলো মিসরে তাঁদের কোনো বৈধ অবস্থান নেই। তাই তাঁরা ফোনের সিম কার্ড কিনতে পারেন না, ব্যাংকে হিসাব খুলতে পারেন না, শিশুদের স্কুলে পাঠাতে পারেন না, এমনি মিসর ছেড়ে অন্য কোনো দেশে যেতেও পারেন না।

দুই.

এখন কায়রোতে বসবাস করছেন ৫৩ বছর বয়সী আয়েশা। তিনি স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে গাজা ছেড়েছিলেন ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। ‘আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে থাকতে পারি না। যদি যুদ্ধ থেমে যায়, তখন আমাদের কী হবে? আমাদের কি মিসর ছেড়ে চলে যেতে হবে?’ প্রশ্নগুলো করে নিজেই উত্তর দিলেন তিনি, ‘কিন্তু আমি গাজায় ফিরে যেতে চাই না। ওখানে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা গৃহহারা হয়েছি, দেশহারা হয়েছি।’

গাজা নগরীতে কনটেন্ট এডিটরের কাজ করতেন ২৪ বছরের মোহানদ। তাঁর মা–বাবা আগেই মিসরে আসতে পেরেছিলেন। মোহানদ তাঁদের একমাত্র সন্তান হওয়ায় অসুস্থ বাবার সেবাযত্ন করার জন্য পরবর্তী সময় কায়রোয় আসার অনুমতি পান। তাঁদের ভ্রমণ ভিসার ৪৫ দিন মেয়াদ অনেক আগেই ফুরিয়ে গেলেও তাঁরা সাময়িক বসবাসের অনুমতিপত্র পাননি এখনো। ‘আর এই অনুমতিপত্র ছাড়া কোনো স্থায়ী বা ভালো কাজ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। আমি তাই কোনোমতে অনলাইনে কাজ করে আর নিজের জমানো টাকা ভেঙে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।’

গাজা ছেড়ে চলে আসার আগে মোহানদের প্রতিদিনের কাজ ছিল খাবার-পানি জোগাড় করা। ‘এখানে আমার দৈনিক কাজের অংশ হলো গাজার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের খবর জানার চেষ্টা করা। তারা খাবার ও পানি পাচ্ছে কি না, নিরাপদে আছে কি না—এসব জানা,’  বলেন তিনি।

আসলে এটা তো শরণার্থী হিসেবে বেঁচে থাকার অনুভূতি। তাঁরা প্রতিনিয়ত অনুভব করেন, যেকোনো সময়ে তাঁদের মিসর থেকে চলে যেতে হতে পারে। মিসর কর্তৃপক্ষ এমন পদক্ষেপ নিতে পারে যে ফিলিস্তিনিদের বসবাস কঠিনতর হয়ে উঠতে পারে।

‘হয়তো আপনাকে সম্মান জানানো হচ্ছে, হয়তো গোটা মিসরবাসী আপনাকে ভালোবাসছে। কিন্তু দিন শেষে আপনি এখানে একজন অতিথি মাত্র,’ মোহানদ বলে চললেন। ‘মিসরীয়রা মেহমানদের সম্মান করে ঠিকই, কিন্তু আমাদের তো ভুললে চলবে না, আমরা কারা ও কোথা থেকে এসেছি। তাই আমাদের সব সময় চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে।’

তিন.

বিদেশিদের বিভিন্ন মেয়াদে অবস্থান করার জন্য মিসর সরকার বিভিন্ন রকম অনুমতিপত্র দিয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে আছে ভ্রমণ ভিসা, শিক্ষা ভিসা, বিনিয়োগ ভিসা, রিয়েল এস্টেট ক্রয়কারী ভিসা ও মিসরীয় নাগরিক বিয়ে করলে বিশেষ অনুমতিপত্র বা পারমিট।

গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে মিসর সরকার নতুন এক নিয়ম চালু করে। এতে বলা হয়, যুদ্ধের কারণে শরণার্থী হিসেবে কেউ সেখানে প্রবেশ করলে ও অনুমতিপত্র ছাড়া অবস্থান করলে এক হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হবে। পাশাপাশি শরণার্থীর পক্ষে কোনো মিসরীয় নাগরিক বা বৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশি কাউকে জামিনদার হতে হবে, তা না হলে ওই শরণার্থীকে মিসর ছেড়ে চলে যেতে হবে।

স্বাভাবিকভাবেই এ আইন প্রাণ বাঁচাতে গাজা থেকে পালিয়ে আসা ফিলিস্তিনিদের জন্যও প্রযোজ্য। আয়েশা জানান, তাঁর ২৬ বছর বয়সী মেয়ে নিদ্দা একজন মিসরীয়কে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, যদিও এটা তাঁর ইচ্ছা নয়।

‘গাজা থেকে চলে আসার আগে ওখানে এক চিকিৎসকের সঙ্গে ওর সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ওদের প্রায় বাগ্‌দান হতে চলেছিল,’ বলেন আয়েশা। ‘কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে আমরা পালিয়ে আসি আর ছেলেটা গাজায় রয়ে যায়।’ ‘এরপর আমরা ওকে মিসরে নিয়ে আসার জন্য যা করা সম্ভব, তা–ই চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

ওদিকে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমরাও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছি। যুদ্ধ হয়তো শেষ হবে, কিন্তু আমাদের কী হবে? আমি জানি, আমার মেয়ে ওর হৃদয়কে গাজায় ফেলে এসেছে। আর একজন মিসরীয়কে বিয়ে করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা তো আমাদের জন্য, আমার জন্য, এখানে আমাদের ভবিষ্যতে নিশ্চিত করার জন্য,’ ভগ্ন কণ্ঠে বলে গেলেন আয়েশা।

তবে ফিলিস্তিনিদের সবাই যে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, তা–ও নয়। গাজা ছেড়ে চলে আসা সচ্ছল পরিবারগুলো এখানে ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, এমনকি কায়রোতে তাদের সমৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো।

গাজার রিমালে এক বড়সড় রেস্তোরাঁর মালিক ছিলেন বাসসাম আবু আল-কুন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি মিসর চলে আসেন। দুই মাস পর কায়রোর উত্তর-পশ্চিমের নাসর শহরে একটি রেস্তোরাঁ খুলেছেন। এখানে পালিয়ে আসা অনেক ফিলিস্তিনি জড়ো হয়েছেন। তিনি তাই জায়গার নাম দিয়েছেন রিমাল। ‘এই জায়গা আমাদের গাজার কথা মনে করিয়ে দেয়,’ বলেন আয়েশা। ‘জায়গাটাকে ইতিমধ্যে সবাই “লিটল গাজা” বলে অভিহিত করতে শুরু করেছে।’

এখানে গাজার আরেক ব্যবসায়ী তাঁর বুজা ও বারাদ আইসক্রিম পার্লার খুলেছেন, যা যুদ্ধের আগে উপত্যকায় খুবই জনপ্রিয় ছিল।

আয়েশার ভাষায়, ‘গাজায় যা ছিল মানুষজন এখানে তা আবার গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ওখানকার আবহ, খাবার, স্বাদ। আর এ দুটি স্থান (রেস্তোরাঁ ও আইসক্রিম পার্লার) আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কারা।’

মোহানদও গাজার অভাব ভীষণভাবে অনুভব করেন। তবে তিনি এটাও বোঝেন যে ওখানে ফিরে যাওয়া আসলে কোনো সমাধান নয়। ‘গাজা অবাসযোগ্য হয়ে গেছে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই,’ হতাশ কণ্ঠে বললেন তিনি। ‘কেউ তো স্বেচ্ছায় শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। আমি তো নিজেকে জিজ্ঞাসা করি যে কীভাবে আমি ও আমার মতো অন্যরা নিজেদের অন্তরের গভীর ক্ষত আর বেদনাবহ স্মৃতি নিয়ে কোনো ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব।’

‘গাজার যা কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে, তার সবকিছুর স্মৃতি আমাদের মনে গেঁথে রয়েছে,’ মোহানদ বলে চললেন। ‘আমরা ফিরে যেতে চাই, ফিরে পেতে চাই সেসব, যা আমাদের ছিল। কিন্তু সবার আগে আমি ওখানকার কবরগুলোর কাছে যেতে চাই, যেখানে আমার প্রিয়জনেরা শুয়ে আছে। আমি আরও চাই, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া আমার ভালোবাসার মানুষদের দেহগুলোকে বের করে আনতে।’

চার

মিসর সরকারের আমলতান্ত্রিক হয়রানি ও ভীত আর প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করতে থাকা ফিলিস্তিনিদের অনেকেই এখন প্রবল অপরাধবোধে ভুগছেন তাঁদের সেসব আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু ও অন্য গাজাবাসীর জন্য, যাঁরা তাঁদের মতো সৌভাগ্য নিয়ে পালিয়ে আসতে পারেননি।

‘আমাকে পালাতেই হয়েছে,’ ৩৮ বছর বয়সী কনটেন্ট ক্রিয়েটর মাহা বলেন। ‘গাজা শহর ছেড়ে আমরা দক্ষিণে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। এ সফরে আমি ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সেই সঙ্গে ভয় সব সময় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। তাই আমার স্বামী ঠিক করেন, আমাদের মিসরে চলে যাওয়া উচিত। এখানে আসার পর আমাদের জীবনের সবকিছু বদলে গেছে। তবে আমি এখনো অনুভব করি না যে আমি গাজা থেকে চলে এসেছি।’
‘আমার পুরো পরিবারই তো ওখানে রয়ে গেছে,’ কান্নাভেজা কণ্ঠে মাহা বলে চললেন।

‘শারীরিকভাবে আমি মিসরে থাকলেও মানসিকভাবে, আবেগের সঙ্গে আমি তো গাজায় আছি। মিসর তো আমাদের কাছে গ্রীষ্ম অবকাশ কাটাতে যাওয়ার জায়গা, যদিও আমি এখন তা মোটেও উপভোগ করছি না।’

মাহা এ–ও বলেন, প্রতি মিনিটে তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ানো মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে আসতে পেরেছেন বটে, কিন্তু তাঁকে এখন এক অপরাধবোধ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ‘আমি যখন সুউচ্চ ভবন আর সুদৃশ্য ঘরবাড়ি দেখি, তখন আমার খালি মনে হয়, গাজার ঘরবাড়ি ও ভবনগুলো যদি এ রকমই থাকত।’

‘যখন আমি খেতে বসি, আমার পরিবারের লোকজনের কথা মনে হয়’, বলতে বলতে মাহার গলা ধরে আসে। ‘ভীষণ কষ্ট হয় এই ভেবে যে আমি যা খাচ্ছি, তা যদি ওরা খেতে পারত, আমার বাবা যদি তাঁর পছন্দের কফির কাপে চুমুক দিতে পারত, চারপাশে কোনো শব্দ ছাড়াই একটু ঘুমাতে পারত, আর আপনমনে গাছপালা ও ফুলের দিয়ে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকত পারত!’

মাহা জানান, তিনি এখানে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। একবার একটানা চার রাত নির্ঘুম কাটিয়েছিলেন। কারণ, যখন তিনি ঘুমের কোলে ঢলে পড়েন, তখনই বোমা, পলায়ন আর ছোটাছুটির দুঃস্বপ্ন তাঁকে চেপে ধরে।

মিসরে বা অন্য কোনো দেশে তিনি তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন, জানতে চাইলে মাহা বলেন, এ রকম ভাবা খুব বেদনাদায়ক। ‘আমি এখনো গাজায় ফিরে যেতে চাই,’ তিনি বলেন। ‘যুদ্ধে আমি ভাইকে হারিয়েছি। আমি ওর অভাবটা খুব অনুভব করি। আমি গাজায় গিয়ে ওর কবরটা নিজ চোখে দেখা না পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছি না যে ও নেই। আশা করি, কবরটা এখনো আছে।’

‘আপনাদের কাছে বড় অদ্ভুত শোনাতে পারে, কিন্তু আমি অনুভব করি যে সবকিছুর পরও গাজায় জীবন সহজ ছিল,’ মাহা বেদনার্ত স্বরে বললেন। ‘সেখানে সবাই প্রতিনিয়ত অনুভব করে যে তারা যেকোনো সময়ে মরতে যাচ্ছে। কারণ, মৃত্যুই তাদের নিয়তি। আমরা ফিলিস্তিনিরা যারা পালিয়ে মিসরে এসেছি, তারা জানি না যে বাঁচতে হবে না মরতে হবে।’

- ইসরায়েলের প্রগতিশীল দৈনিক হারেৎজ থেকে নেওয়া  
- ইংরেজি থেকে রূপান্তর: আসজাদুল কিবরিয়া
* শিরিন ফালাহ সাব, আরব-ইসরায়েলি সাংবাদিক।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-20%2Ftrwzaivb%2FScreenshot-2025-08-20-125005.jpg?rect=0%2C0%2C1245%2C830&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রাফা সীমান্তে এক ফিলিস্তিনির কাগজপত্র যাচাই করছেন মিসরীয় পুলিশ। ছবি: রয়টার্স

গাজায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নতুন শান্তি পরিকল্পনা

গাজার জন্য একটি নতুন শান্তি পরিকল্পনায় একমত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পরিকল্পনায় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর অধীনে জীবিত ইসরাইলি ২০ জিম্মি এবং আরও দু’ডজনেরও বেশি মৃত বলে ধারণা করা জিম্মির দেহাবশেষ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দিতে হবে। বিনিময়ে শত শত বন্দি ফিলিস্তিনি মুক্তি পাবে। একজন ফিলিস্তিনি সূত্র যুদ্ধবিরতি আলোচনার সঙ্গে পরিচিত। তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, হামাস কর্মকর্তাদের হোয়াইট হাউসের ২০ দফা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে, হামাস গাজার শাসনে কোনোভাবেই ভূমিকা রাখতে পারবে না এবং ভবিষ্যতে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনার দরজা খোলা থাকবে। হোয়াইট হাউসে আলোচনার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই পরিকল্পনাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘শান্তির জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন’ হিসেবে। তবে তিনি আরও বলেন, হামাস যদি এই পরিকল্পনা না মেনে নেয় তবে হামাসের হুমকি ধ্বংস করার কাজ শেষ করতে নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করবে।

নেতানিয়াহু বলেন, হামাস যদি পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করে বা তা অনুসরণ না করে, তবে ইসরাইল ‘কাজটি শেষ করবে।’ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রচেষ্টাকে আন্তরিক ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে আখ্যায়িত করেছে। সংবাদ সংস্থা ওয়াফাতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র, আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহ ও অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ প্রতিশ্রুতি নবায়ন করছে- যুদ্ধের অবসান, গাজায় যথেষ্ট মানবিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ, জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে কাজ করতে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, মিশর, জর্ডান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও আন্তরিক প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত, যাতে এই চুক্তি চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করা যায়। এ চুক্তি শেষ পর্যন্ত একটি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে। যেখানে গাজা সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম তীরের সঙ্গে একীভূত হয়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ হবে এবং বিদ্যমান যুদ্ধরেখা অপরিবর্তিত থাকবে, যতক্ষণ না ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত পূরণ হয়। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুসারে, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে এবং তাদের সুড়ঙ্গ ও অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে হবে। প্রত্যেক ইসরাইলি জিম্মির দেহাবশেষ ফেরত দেয়ার বিনিময়ে ইসরাইল ১৫ জন ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ ফিরিয়ে দেবে। উভয় পক্ষ পরিকল্পনায় সম্মত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাজায় পূর্ণ মানবিক সহায়তা পাঠানো হবে। যুক্তরাষ্ট্র গাজার ভবিষ্যৎ শাসনের জন্যও একটি পরিকল্পনা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, একটি প্রযুক্তিগত ও অরাজনৈতিক ফিলিস্তিনি কমিটি সাময়িকভাবে গাজা শাসন করবে। এর ওপর নজরদারি করবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বোর্ড অব পিস, যার প্রধান হবেন ট্রাম্প। সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও এ শাসন কাঠামোর অংশ হবেন। তিনি পরিকল্পনাটিকে বলেছেন দুঃসাহসী ও বুদ্ধিদীপ্ত।

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আমরা সব পক্ষকে আহ্বান জানাই যেন তারা একত্রিত হয়, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে চুক্তিটি বাস্তবায়ন করে। হামাসকে এখনই পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে, অস্ত্র নামিয়ে রাখতে হবে এবং সব জিম্মি মুক্তি দিয়ে দুঃখ-কষ্টের অবসান ঘটাতে হবে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেন, তিনি নেতানিয়াহুর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় উৎসাহিত হয়েছেন। তিনি যোগ করেন, সব পক্ষকে এ মুহূর্তে শান্তিকে একটি সত্যিকারের সুযোগ দিতে হবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন প্রস্তাবটিকে প্রশংসা করে বলেছেন, ফ্রান্স শান্তি প্রতিষ্ঠা ও জিম্মি মুক্তির প্রচেষ্টায় অবদান রাখতে প্রস্তুত। ম্যাক্রন আরও বলেন, এই উপাদানগুলোকে অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি গড়ার জন্য গভীর আলোচনার পথ তৈরি করতে হবে, যা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভিত্তি গড়বে।

হামাসকে করুণ পরিণতির হুঁশিয়ারি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণার পর হামাসকে কড়া সতর্কতা দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, হামাস যদি এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে তাহলে ইসরাইল তার কাজ শেষ করবে। এর মধ্য দিয়ে গাজায় যেভাবে দখলদারিত্ব ও হামলা চালানো হয়েছে তাকে বুঝিয়েছেন তিনি। একই রকম কথা বলেছেন ট্রাম্পও।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নতুন শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করলে হামাসকে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। মিডিয়ার সামনে সংবাদ সম্মেলনে সোমবার বক্তব্য রাখছিলেন এই দু’নেতা। সেখানে ট্রাম্প বলেন, যদি হামাস এই পরিকল্পনা না মানে, তাহলে গাজায় ইসরাইলকে তার কাজ শেষ করায় পূর্ণাঙ্গ সমর্থন দেবেন তিনি। এরপরই ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রশংসা করে নেতানিয়াহু ধারাবাহিক পোস্ট দেন। তাতে তিনি লিখেছেন- মিস্টার প্রেসিডেন্ট যদি হামাস আপনার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে অথবা ধরুন তারা মেনে নিলো এবং তারপর তারা এটাকে মোকাবিলা করার সব রকম চেষ্টা করল, তখন ইসরাইল তার কাজ শেষ করবে।

ওদিকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হামাস এই পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছিল। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্ব নেতারা ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশ আছে।

‘ইসরাইলের কূটনৈতিক ব্যর্থতা’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নতুন শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করার একদিন পর মঙ্গলবার মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকে যোগ দেয়ার কথা ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। ওই মিটিংয়ে তিনি সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে বিরোধী দলের দুই উগ্রপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন গভির এবং বেজেলেল স্মোত্রিচের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন। এই চুক্তিকে কূটনৈতিক ব্যর্থতা বলে অভিহিত করেছেন বেজেলেল। মঙ্গলবার এ বিষয়ে দীর্ঘ পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন বেজেলেল স্মোত্রিচ। ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে চারদিকে যে উদযাপন তাকে ‘কূটনৈতিক শত্রুপক্ষের সঙ্গে আলিঙ্গনের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। বলেছেন, তা শেষ হবে কান্নায়। তিনি আরও বলেন, আমাদের সন্তানরা আবারও গাজায় যুদ্ধে যাবে। এটা হলো সত্য থেকে পালানো এক নেতৃত্বের কৌশল।

mzamin