Wednesday, October 7, 2009

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ১৭তম বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপন

কোনো জাঁকজমক ছিল না। ছিল না কোনো আলাদা আনুষ্ঠানিকতা বা ভ্রমণ আয়োজন। গত শনিবার বেশ সাদামাটাভাবেই ১৭তম বিবাহবার্ষিকী পালন করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা। হোয়াইট হাউসে পা দেওয়ার পর এটিই তাঁদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী।
বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে জর্জ টাউনের কাছে ব্লু ডাক টাভের্ন নামের একটি রেস্তোরাঁয় নৈশভোজ করেন ওবামা দম্পতি। ওই দিন সন্ধ্যায় মোটর শোভাযাত্রা নিয়ে রেস্তোরাঁয় পৌঁছান তাঁরা। মিশেল ওবামার পরনে ছিল আজানুলম্বিত একটি পোশাক। বারাক ওবামা পরেছিলেন একটি কালো স্যুট। গত বছরও শিকাগোতে একটি অনাড়ম্বর নৈশভোজের মাধ্যমে বিয়ের ১৬তম বার্ষিকী পালন করেন ওবামা দম্পতি। ১৯৯২ সালের ৩ অক্টোবর শিকাগোর একটি গির্জায় বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন বারাক ও মিশেল।

শয়নকক্ষ থেকে জাপানের সাবেক অর্থমন্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার

জাপানের পুলিশ গতকাল রোববার দেশটির সাবেক অর্থমন্ত্রী শোইসি নাকাগাওয়ার মরদেহ তাঁর নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে। তাঁর মৃত্যুর কারণ তাত্ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। এএফপি।
স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, টোকিওর সেটাগায়া এলাকার নিজ বাসভবনের শয়নকক্ষে শোইসি নাগাকাওয়া (৫৬) মারা গেছেন।
নাকাগাওয়া ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) একজন প্রভাবশালী নেতা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে রোমে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে তিনি মাতাল অবস্থায় বক্তব্য দিয়ে নিজ দল ও বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন। এরই জেরে গত মাসে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

আফগান যুদ্ধ নিয়ে বিপাকে বারাক ওবামা by ইব্রাহীম চৌধুরী,

আফগানিস্তানে যুদ্ধ নিয়ে বড় ধরনের বিপাকে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। অবনতিশীল যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সেখানে আরও মার্কিন সেনা মোতায়েন করা জরুরি। সম্প্রতি আফগান রণাঙ্গনে মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। তালেবান জঙ্গিদের তত্পরতাও ক্রমশ বাড়ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী আদৌ আফগানিস্তান পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় বেড়ে গেছে।
আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে সংশয় জানিয়ে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস গত শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এখন পর্যন্ত তাঁর মেয়াদকালের কঠিনতম সিদ্ধান্তটি নিতে হবে, আর তা হচ্ছে আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত। আফগানিস্তানে নিয়োজিত মার্কিন সেনাবাহিনীর কমান্ডার জানিয়েছেন, আফগান রণাঙ্গনে আরও ৪০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য প্রয়োজন।
কয়েক মাস আগে প্রেসিডেন্ট ওবামা আফগান যুদ্ধকে ‘অপরিহার্য’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এ যুদ্ধে জেতার জন্য যা কিছু করা দরকার, সবই করতে প্রস্তুত ছিলেন তিনি। কিন্তু গত কয়েক মাসে পরিস্থিতি বদলে গেছে। আফগান পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা এখন বিভক্ত। ‘করতেই হবে’ এবং ‘করা সম্ভব’ বিতর্কে ভাগ হয়ে গেছেন তাঁরা। মার্কিন সেনা সমর্থনে ইরাকে একটি বৈধ সরকারকাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তানে ওই মার্কিন কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে নির্বাচনী নাটকের মহড়া দিয়েও কাজের কাজ হয়নি। হামিদ কারজাই সরকারের প্রতি সাধারণ আফগান জনগণের আদৌ কোনো আস্থা নেই। আফগানিস্তানে নিজস্ব সরকারকাঠামো সক্রিয় হচ্ছে না; উপরন্তু চোরাগোপ্তা হামলার সংখ্যা বেড়েই চলছে। পাকিস্তান সীমান্ত ব্যবহার করে তালেবান ও আল-কায়েদার জঙ্গিরা এখন অনেক বেশি তত্পর। এ ছাড়া আফগানিস্তানের সাধারণ জনগণের সঙ্গে ন্যূনতম আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর।
সাম্প্রতিক সাক্ষাত্কারে আফগানিস্তানে নবনিযুক্ত ব্রিটিশ জেনারেল ডেভিড রিচার্ড সেখানকার রণাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন। জেনারেল ডেভিড রিচার্ড বলেন, আফগানিস্তানে যৌথ বাহিনীর পরাজয়ের পরিণতি হবে ভয়াবহ। এ যুদ্ধে তালেবান ও আল-কায়েদা জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছে পরাজয় পশ্চিমাদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। জেনারেল ডেভিড রিচার্ড আরও বলেছেন, মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠী আফগানিস্তানে থেমে থাকবে না। জঙ্গিদের নাগালের মধ্যেই রয়েছে পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান। পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র করায়ত্ত করে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহারে পিছপা হবে না তারা।
মার্কিন বুদ্ধিজীবী মহলের একটি অংশের আশঙ্কা, রণাঙ্গনে বেশি সেনা পাঠানো হলে তাদের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দার এই সংকটপূর্ণ সময়ে সেখানে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে। হামিদ কারজাইয়ের মতো দুর্বল সরকারের পেছনে অর্থ ও মার্কিন সেনাদের জীবন বাজি রাখার পরিণাম নিয়েও ভাবতে হচ্ছে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের শুরু করে যাওয়া যুদ্ধের দায় এখন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাঁধে। তাঁর পক্ষে এখন পিছু হটারও কোনো অবকাশ নেই বলেই মনে হচ্ছে।

ইন্দিরার প্রতি কাজাখদের ভালোবাসা

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৫৫ সালে তাঁর বাবা জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে আধা বেলার সফরে কাজাখস্তানে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই ঘণ্টা কয়েকের সফরে তিনি কাজাখস্তানের মানুষের মনে এতটাই প্রভাব ফেলেন, তারা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছে। ইন্দিরা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কাজাখস্তানের মানুষ তাদের কন্যাসন্তানের নাম ‘ইন্দিরা’ রেখেছে। আজও তারা সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে।
কাজাখস্তানের সবচেয়ে বড় শহর আলমাতির কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম সাতারহান বলেন, ‘ইন্দিরা গান্ধীর নাম এখানকার অধিকাংশ মানুষের মনে দাগ কাটে। অনেকেই তাদের কন্যাসন্তানের নাম ইন্দিরা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
৮২ বছর বয়স্ক সাতারহান আরও বলেন, ‘১৯৫৫ সালে ওই সংক্ষিপ্ত সফরকালে ইন্দিরাকে কাজাখস্তানের সবাই দেখেছে—এমন নয়। তবে যারাই ইন্দিরাকে দেখেছে, তারা সবাই ইন্দিরার আকর্ষণীয় চেহারা, বাগ্মিতা ও অমায়িক আচরণে বিমোহিত হয়েছে। ইন্দিরার ওই সফরের পর থেকেই কাজাখস্তানের মানুষ তাদের কন্যাসন্তান ও নাতনিদের ইন্দিরার আদর্শে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে। তারা তাদের কন্যা ও নাতনিদের নাম ইন্দিরা রাখা শুরু করে। এই ধারা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এখন প্রতি ১০ জনের একজন মেয়ের নাম ইন্দিরা রাখা হয়।’ সাতারহান তাঁর নিজের নাতনির নামও ইন্দিরা রেখেছেন।
কাজাখস্তানের একটি চার-তারকা হোটেলের অভ্যর্থনাকর্মী ইন্দিরা ওসপানোভা বলেন, ‘আমার দাদা-দাদি আগ্রহ করেই আমার নাম ইন্দিরা রেখেছেন।’
কাজাখস্তানে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত অশোক সাজ্জানহার বলেন, ‘আশি ও নব্বইয়ের দশক তো বটেই, এমনকি আজও কাজাখস্তানের মানুষ তাদের সন্তানের নাম ইন্দিরা রাখছে। ভারতের প্রতি তীব্র ভালোবাসার কারণেই তারা ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি এ সম্মান দেখাচ্ছে।’
কাজাখস্তানের জাতীয় বিমান সংস্থা এয়ার আস্তানার বিমানবালা ইন্দিরা স্মাগুলোভা বলেন, ‘বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একজন নারীনেত্রীর নামে নাম রাখাটা বিশাল সম্মানের ব্যাপার। আমি ইন্দিরা গান্ধীকে কেবল ছবিতে দেখেছি। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্য আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে।’
শুধু ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিই নয়, কাজাখস্তানের জনগণ ইন্দিরার ছেলে ভারতের আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর প্রতিও সমান অনুরক্ত।
একজন নারী পর্যটক সহায়তাকারী (গাইড) রিমা কারমিসোভা বলেন, ‘রাজীব গান্ধীর আদর্শ আমাকে টানে। কিশোরী বয়সে আমি তাঁর প্রেমে পড়েছিলাম। তিনি ছিলেন একজন সুদর্শন পুরুষ। তাই আমি আমার সন্তানের নাম রাজীব রাখারই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোতে ভারতের গান্ধী পরিবার সব সময়ই বিশেষভাবে সমাদৃত। ভারতের অহিংস আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ও রাজনৈতিক সাধক মহাত্মা গান্ধীর নামে কাজাখস্তানে একটি সড়কও রয়েছে।

ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া লোকজনকে জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ

ইন্দোনেশিয়ায় গত বুধবারের ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া লোকজনের বেঁচে থাকার ব্যাপারে আশা ছেড়ে দিয়েছে সেখানকার উদ্ধারকারী দল। জাতিসংঘ ও রেডক্রস বলেছে, প্রায় চার হাজার লোক এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। এদিকে ভিয়েতনামে টাইফুন কেটসানার আঘাতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬২। গতকাল রোববার আরও ৮০ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। রেডক্রস ভিয়েতনামে ক্ষতিগ্রস্ত দুই লাখ লোকের জরুরি সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে। অন্যদিকে ফিলিপাইনে গত শনিবার টাইফুন পারমার আঘাতে ১৬ জন নিহত হয়েছে। খবর এএফপির।
ইন্দোনেশিয়ায় উদ্ধারকারী দলের প্রধান সামসুবিন বলেছেন, ভূমিকম্পের ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে যারা চাপা পড়ে আছে, তাদের জীবিত উদ্ধার করার সম্ভাবনা খুবই কম। ভূমিকম্পের চার দিন পরও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় উদ্ধার তত্পরতা চালানো হয়নি। কর্মকর্তারা বলেছেন, ওই সব এলাকায় জীবিত কাউকে উদ্ধার করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
এদিকে ইন্দোনেশিয়ার পাদাংয়ে একটি বহুতল হোটেলে ব্যাপক উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। গত শনিবার মোবাইল ফোনের একটি বার্তা পাওয়া যায়। এতে উদ্ধারকারী দল আশা করছে, ওই হোটেলের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া লোকজন বেঁচে থাকতে পারে। গত বুধবার ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়।
এদিকে ভিয়েতনামের কর্মকর্তারা বলেছেন, টাইফুন কেটসানার প্রভাবে দেশটির ১৪টি প্রদেশে ব্যাপক ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুয়াং নাগাই ও পার্বত্য কন টাম প্রদেশ। ঘরবাড়ি ও মাটির নিচে চাপা পড়ে কন টামে ৪৭ জন এবং কুয়াং নাগাইয়ে ৩৩ ব্যক্তি মারা গেছে।
রেডক্রস বলেছে, টাইফুনের প্রভাবে ভিয়েতনামে ৩০ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত শুক্রবার সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৫০ লাখ ডলার জরুরি সাহায্য কামনা করেছে।
ভিয়েতনামে রেডক্রসের মহাসচিব দোয়ান ভান থাই বলেছেন, ‘এ মুহূর্তে নগদ টাকা বা ত্রাণ যেকোনো সাহায্য পেলেই আমরা খুশি।’
এদিকে ফিলিপাইন পুলিশের সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট লোরেটো এসপিনেলি বলেছেন, গত শনিবার বেনগুয়েত প্রদেশে টাইফুন পারমার আঘাতে একটি পরিবারের পাঁচজন সদস্য মারা গেছে। এ ছাড়া ওই প্রদেশের আরও একটি পরিবারের পাঁচ সদস্যসহ সাতজন মারা গেছে। ম্যানিলার ওপর দিয়ে শক্তিশালী ঝড় কেটসানা বয়ে যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যে টাইফুন পারমা সেখানে আঘাত হানল।

ইরানের কাছে আণবিক বোমা বানানোর পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে

আণবিক বোমা বানানোর জন্য পর্যাপ্ত তথ্য ও নকশা সংগ্রহ করেছে ইরান—আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কর্মীদের একটি গোপন বিশ্লেষণী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গতকাল রোববার এ কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস।
গত বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে আলোচনায় বসে তেহরান। পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই আলোচনায় ইরান এরই মধ্যে সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার জন্য রাশিয়া ও ফ্রান্সে পাঠাতে নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে।
আইএইএর ওই গোপন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, সংস্থার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আণবিক বোমায় ব্যবহূত হয় এমন বিস্ফোরক তৈরির জন্য ইরানের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সংস্থার একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানান, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের একটি সারসংক্ষেপ প্রতিবেদনটির শেষে যুক্ত করা হয়েছে। এ বছরের শুরুতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। তার পর থেকে বিভিন্ন সময় প্রতিবেদনটির সংশোধন ও পরিমার্জন করা হচ্ছে। তবে প্রতিবেদনটি একটি আনুষ্ঠানিক দলিল হিসেবে প্রকাশের জন্য এখনো তৈরি নয় বলে সংস্থার আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
‘পসিবল মিলিটারি ডাইমেনশনস অব ইরানস নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে একটি জটিল প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আইএইএর প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত দূরপাল্লার শাহাব-৩ ক্ষেপণাস্ত্রে পরমাণু বোমা স্থাপনের লক্ষ্যে ওই কর্মসূচি পরিচালনা করছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০০২ সাল থেকে এ কার্যক্রম শুরু করে তেহরান। এতে আরও বলা হয়েছে, আণবিক বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নকশা ও তথ্য সম্ভবত বাইরের কোনো উত্স থেকে পেয়েছে ইরান।
তবে ইরানের পরমাণু বোমা তৈরির কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে পত্রিকাটির প্রতিবেদনে কিছুই জানানো হয়নি। পত্রিকাটি আরও জানায়, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সাম্প্রতিক সময় আইএইএ প্রধান এলবারাদির সঙ্গে সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতের অমিল দেখা গেছে। গত কয়েক সপ্তাহে আইএইএর বেশকিছু গোপন দলিল প্রকাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, সম্ভবত ওই সব প্রতিবেদন প্রকাশ করার জন্য এল বারাদির ওপর চাপ তৈরি করতেই এমনটি করা হয়েছে।
এদিকে ২০০৭ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, তেহরান ২০০৩ সালের দিকেই পরমাণু বোমা তৈরির কর্মসূচি স্থগিত করেছে। তবে সম্প্রতি ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইসরায়েল অভিযোগ তুলেছে, ইরান আবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কার্যক্রম শুরু করেছে। এ ব্যাপারে গত সপ্তাহে একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ২০০৭ সালের প্রতিবেদনটি আবার পর্যালোচনা করছে। এএফপি।
২৫ অক্টোবর ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র পরিদর্শন: জাতিসংঘের আণবিক সংস্থার (আইএইএ) প্রধান মোহাম্মদ এল বারাদি গতকাল রোববার বলেছেন, আইএইএর সদস্যরা ২৫ অক্টোবর ইরানের দ্বিতীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। তিনি বলেছেন, ‘ইরানের নতুন পরমাণুকেন্দ্র পরিদর্শন করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। আমাদের আশ্বস্ত হওয়া দরকার, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইরান এ কেন্দ্র তৈরি করেছে কি না।’
এল বারাদি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ও অন্য শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এ দিনক্ষণ ঠিক করেছেন। বৈঠক শেষে এল বারাদি তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, জাতিসংঘের একটি দল ২৫ অক্টোবর কোম নগরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। তিনি আরও জানান, ১৯ অক্টোবর অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইরানের প্রতিনিধিরা ফের আলোচনায় বসবেন।

উত্তর কোরিয়ায় গেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী

রাষ্ট্রীয় সফরে গতকাল প্রতিবেশি দেশ উত্তর কোরিয়ায় পৌঁছেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়া বাও। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি প্রশ্নে আলোচনা স্থবির হয়ে গেছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে ওই আলোচনা আবার পুনরুজ্জীবিত হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং ইলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। তবে তাঁদের আলোচনা কতটা ফলপ্রসু হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। কারণ প্রেসিডেন্ট কিম ইতিমধ্যেই তাঁর দেশের পরমাণু কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। তবে তিনি এখনো এই পরমাণু কর্মসূচির প্রশ্নে বহুপাক্ষিক আলোচনায় অনাগ্রহী হলেও তিনি জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে এ ব্যাপারে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তাঁর আপত্তি নেই। তবে চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়া বহুপাক্ষিক আলোচনার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট কিম জংকে রাজি করাতেই উত্তর কোরিয়া সফর করছেন বলে মনে করা হচ্ছে। গত এপ্রিলে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সমন্বয়ে গঠিত পরমাণু কর্মসূচিসংক্রান্ত আলোচনা থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয় উত্তর কোরিয়া।
তবে চীনের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে চীন ও উত্তর কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়া বাও পিয়ং ইয়ং সফর করছেন।

আসামে বোড়ো জঙ্গিদের গুলিতে নিহত ১১

ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের আসাম রাজ্যে বোড়ো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গুলিতে গতকাল রোববার রাতে দুই মহিলাসহ ১১ জন গ্রামবাসী নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ১৫ জন। আহতদের বিশ্বনাথ চারিয়ালি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গতকাল রাতে আসাম-অরুণাচল প্রদেশ সীমান্ত জেলা শোনিতপুরের বালিসাং গ্রামে আসামের জঙ্গি সংগঠন ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট অফ বোড়োল্যান্ডের (এনডিএফবি) জঙ্গিরা এই গ্রামে চাঁদা তুলতে এলে গ্রামবাসীরা বাধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জঙ্গিরা এই হামলা চালায়। অসমিয়া, নেপালি ও আদিবাসীর বাস এখানে।
শোনিতপুরের পুলিশ সুপার সুরিন্দর কুমার বলেছেন, এই হামলার পেছনে এনডিএফবির নাবলা গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে। এনডিএফবির গোবিন্দ বসুমাতারি গোষ্ঠী অবশ্য সংঘাত থামানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসলেও নাবলা গোষ্ঠী সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে।

জ্বালানী সম্পদ -গভীর সমুদ্র কি গ্যাসের নতুন দিগন্ত হতে পারে by বদরূল ইমাম

বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার একটি বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা এ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। এ আলোচনা সম্প্রতি পাওয়া কিছু নতুন ভূতাত্ত্বিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। এ তথ্যগুলো ভারতীয় সমুদ্র অঞ্চলে পরিচালিত অনুসন্ধান কার্যক্রমের সূত্রে পাওয়া গেছে। এর কিছু অংশ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সভায় আলোচিত ও প্রকাশিত এবং কিছু অংশ অপ্রকাশিত ও গোপনীয় বলে বিবেচিত। পাঠকের সুবিধার্থে আলোচনায় ভূতাত্ত্বিক তথ্যের জটিল অংশগুলোতে সহজ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও এতে বক্তব্য অতি সহজীকরণের প্রভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
বিশ্বে অগভীর সমুদ্র অঞ্চলে বহু বছর ধরেই তেল-গ্যাস কার্যক্রম চলে আসছে, কিন্তু গভীর সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে নতুন। তবুও গভীর সমুদ্রবক্ষ পৃথিবীর অনেক দেশে তেল-গ্যাস ভাণ্ডারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ তার গভীর সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলের ওপর ভূতাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজনের তুলনায় নেই বললেই চলে। এমতাবস্থায় এর গ্যাস সম্ভাবনার ওপর বাস্তবধর্মী যুক্তি উপস্থাপন করা অসম্ভব না হলেও কঠিন। তবে এর সংলগ্ন ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনার একটি চিত্র দাঁড় করা যেতে পারে। এর আগে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার উভয়েই বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্র অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করে এবং বিগত বছরগুলোতে উভয়েই গ্যাসের বিরাট মজুদ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলও কি গ্যাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে?
বঙ্গোপসাগর ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কা—এই চারটি দেশের উপকূল ছাড়িয়ে বিশাল এলাকাব্যাপী বিস্তৃত এবং এ সাগরের গভীরতা প্রায় এক শ মিটার থেকে চার হাজার মিটার। তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে সাধারণত সমুদ্রে পানির গভীরতা ৪০০ মিটারের কম হলে তাকে অগভীর সমুদ্র এবং এর বেশি হলে তা গভীর সমুদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। গভীর সমুদ্রে সাধারণত পানির গভীরতা ২০০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয়ে থাকে। গভীর সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমে ভারত ও পূর্বে মিয়ানমার উভয় দেশেরই সীমানা চিহ্নিতকরণ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে এবং বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বাংলাদেশ দাবি করে, এ দুটি দেশই সমুদ্রবক্ষে এর সীমানার ভেতর অনুসন্ধানকাজ চালাচ্ছে।
গভীর সমুদ্রে ভারত: বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভারতের গভীর সমুদ্র ব্লক ডি-৬, আর এখানেই পাওয়া গেছে বিরাট গ্যাসের মজুদ, যা কিনা ভারতের অন্য যেকোনো এলাকার গ্যাস মজুদের চেয়ে বেশি। উল্লেখ্য, ভূখণ্ডে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের তুলনায় সমুদ্রবক্ষে অনুসন্ধান কারিগরিভাবে অনেক জটিল ও আর্থিকভাবে বহুগুণে ব্যয়বহুল এবং গভীর সমুদ্রে তা আরও বেশি। গভীর সমুদ্রে এই ব্লকটিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাচ্ছে ভারতের দেশীয় কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। শিল্পপতি ধীরুভাই প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি ভারত তথা বিশ্বে অন্যতম বৃহত্ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত হয়েছে। কোম্পানির বর্তমান কর্ণধার তাঁর পুত্র মুখেশ আদভানির সময়ে গভীর সমুদ্র ব্লক ডি-৬-এ একের পর এক আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলো (নাম দেওয়া হয় ধীরুভাই-১, ধীরুভাই-৩ ইত্যাদি) ভারতের গ্যাসচিত্রে আমূল পরিবর্তন বহন করে আনে। এ ছাড়া নিকটবর্তী একাধিক সমুদ্র ব্লকেও আশানুরূপ গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি কানাডার ভ্যানকুভার শহরে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক গ্যাস সম্মেলনে রিলায়েন্স কোম্পানির ভূবিজ্ঞানীরা ভারতের গভীর সমুদ্রে বিশাল গ্যাস মজুদ সৃষ্টির এক ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন। তাঁদের মতে, এটি সনাতনী প্রথায় সৃষ্ট থারমোজেনিক (thermogenic) প্রাকৃতিক গ্যাস নয় বরং এটি অসনাতনী বায়োজেনিক (biogenic) প্রাকৃতিক গ্যাস। গুণে ও মানে একই প্রকারের হলেও এরা উত্পত্তিগতভাবে ভিন্ন। সনাতনী থারমোজেনিক গ্যাস সৃষ্টি হয় ভূগর্ভে অনেক গভীরতায় শিলাস্তরের জৈবিক পদার্থগুলো উচ্চ তাপের প্রভাবে গ্যাসে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীতে পাওয়া বেশির ভাগ প্রাকৃতিক গ্যাসই থারমোজেনিক প্রকৃতির। অপরপক্ষে বায়োজেনিক গ্যাস সৃষ্টি হতে তাপ দরকার হয় না, বরং এ ক্ষেত্রে অতি অল্প গভীরতায় এক ধরনের জীবাণু দ্বারা জৈবিক পদার্থ গ্যাসে পরিণত হয়। বাংলাদেশে তেল-গ্যাসের উত্স নিয়ে যে ভূবিজ্ঞানীরা কাজ করে থাকেন, তাঁদের কাছে এ দেশের ভূগর্ভে পর্যাপ্ত তাপ (ভূবিজ্ঞানের ভাষায় thermal maturity বা তাপজনিত পরিপক্বতা) না থাকাটা পর্যাপ্ত গ্যাস সৃষ্টি হওয়ার পথে একটি বাধা। আর এ কারণেই গভীর সমুদ্রে থারমোজেনিক গ্যাসের পরিবর্তে বায়োজেনিক গ্যাসের (যা তৈরি হতে তাপ লাগে না) আবিষ্কার একটি আশাপ্রদ লক্ষণ।
ভারতীয় ভূবিজ্ঞানীরা এই গ্যাস সৃষ্টির পর তা মজুদ হওয়ার পদ্ধতিরও একটি নতুনতর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এই গ্যাস তৈরি হয়ে তা সরাসরি এসে মজুদ হয়নি বরং তা প্রথমে সাগরতলে গ্যাস হাইড্রেট (gas hydrate—গ্যাস ও পানিমিশ্রিত বরফসম পদার্থ) হিসেবে অবস্থান করেছে ও পরবর্তীকালে অল্প তাপে গ্যাস হাইড্রেট অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে ‘বরফ’ থেকে গ্যাস আলাদা হয়ে সুবিধাজনক স্থানে জমা হয়েছে। এ ব্যাখ্যাটি পুরোপুরি অসনাতনী অর্থাত্ গ্যাসবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারার বাইরে। তবে এটি একাধিক কারণে বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। প্রথমত, গ্যাস সৃষ্টি হয়ে তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু বরফসম গ্যাস হাইড্রেট গ্যাসকে সমুদ্রতলে আটকে রাখে। দ্বিতীয়ত, গ্যাস হাইড্রেট সম্প্রতিকালে ভূবিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন আগ্রহের জন্ম দিয়েছে এ কারণে যে বরফসম এ পদার্থটি বিশ্বের বহু সমুদ্রের গভীরে আবিষ্কৃত হয়েছে এবং এর সঙ্গে গ্যাসবিজ্ঞানের নানা সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে চলেছে। সুতরাং ভারতীয় গভীর সমুদ্র ব্লকে প্রাপ্ত গ্যাসের মজুদ নিয়ে রিলায়েন্স কোম্পানির ভূবিজ্ঞানীদের দেওয়া সূত্র যদি ঠিক হয়ে থাকে, তবে সে ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবক্ষে থাকার সম্ভাবনার কারণে এটিকেও গ্যাস সম্ভাবনাময় মোক্ষম এলাকা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
অন্যরা কী বলে: অনেকটা একই ধারণা পোষণ করেন ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানির ভূবিজ্ঞানী জনাথন এভান। এই কোম্পানি কিছুদিন আগে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধান করার আগ্রহ প্রকাশ করে এ দেশে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ সফরে পাঠায় কোম্পানির দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক এই ভূবিজ্ঞানীকে। তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এক সাক্ষাতে জানান, তাঁদের ধারণা, বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র অঞ্চলে নতুন অসনাতনী প্রকৃতির বায়োজেনিক গ্যাস পাওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ইতিমধ্যে আফ্রিকা মহাদেশে মিসরের গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান চালিয়ে আশানুরূপ বায়োজেনিক গ্যাসের সন্ধান পায়। তারা মনে করে, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে সে রকম পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লকগুলোর সীমানা নিয়ে বিরাজমান আন্তর্দেশীয় বিরোধের কারণে কেবল ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানিই নয়, অনেক বড় কোম্পানি এ মুহূর্তে এখানে আসতে আগ্রহ হারিয়েছে। যা-ই হোক, একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র অঞ্চলে গ্যাস সম্ভাবনার ব্যাখ্যায় ব্রিটিশ ভূবিজ্ঞানীর ধারণার সঙ্গে ভারতীয় ভূবিজ্ঞানীদের মতের মিল রয়েছে।
কেবল তা-ই নয়, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের পূর্ব দিকে মিয়ানমার সমুদ্র অঞ্চলে সম্প্রতি যে বিরাট গ্যাসের মজুদ (সুউ, সুউফিউ ও মিয়া গ্যাসক্ষেত্রগুলো) পাওয়া গেছে, তার ভূবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় একই ধরনের সূত্রের কথা বলা হচ্ছে। অর্থাত্ বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মাত্র ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে মিয়ানমার সমুদ্রে আবিষ্কৃত গ্যাসগুলোও বায়োজেনিক প্রাকৃতিক গ্যাস বলে জানা গেছে। এই গ্যাসের মজুদ এতটাই উল্লেখযোগ্য যে এটা কিনতে ভারত ও চীন উভয়েই তীব্র প্রতিযোগিতায় নামে এবং শেষ পর্যন্ত চীনেরই জয় হয়।
উপসংহার: বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের দুটি প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার নিজ নিজ সমুদ্রবক্ষে (যদিও তারা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে) অনেক বড় আকারের গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কার করে গ্যাসসম্পদের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পেরেছে। ফলে এ সাগর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে নতুনভাবে আকৃষ্ট করেছে। বিজ্ঞানীরা এখানে গ্যাসসম্পদের উত্স নিয়ে নতুন সূত্র ব্যাখ্যা করে এর ব্যাপ্তি ও সম্ভাবনার নানা বিষয় নিয়ে মত দিচ্ছেন। গ্যাসবিজ্ঞানের প্রচলিত সূত্রে নয়, বরং স্বল্প গভীরতায় তাপের প্রভাব ছাড়াই জীবাণুর দ্বারা সৃষ্ট বায়োজেনিক গ্যাস শীতল সাগরতলে ‘বরফসম’ গ্যাস হাইড্রেটে পরিণত হওয়া এবং পরে ‘বরফ’ গলে গ্যাস বের হয়ে সুবিধাজনক স্থানে মজুদ আকারে জমা হওয়া—এ সবই গ্যাস-ভূবিজ্ঞানে নতুনতর অসনাতনী ব্যাখ্যা। এ সূত্র যথার্থ প্রমাণিত হলে তা গ্যাসবিজ্ঞানে যেমন, তেমনি গভীর সমুদ্রে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবক্ষ ভূতাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞাত এলাকা। এই অঞ্চল গ্যাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে কি না, এটি বাস্তবিক পক্ষে মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, যার উত্তর এখন পর্যন্ত কারও জানা নেই। তবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাফল্য বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রকে সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এ সম্ভাবনার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করতে হলে প্রয়োজন ব্যাপক আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান। বহুসংখ্যক অজ্ঞাত বৈজ্ঞানিক উপাদানকে ব্যাপক অনুসন্ধান-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রথমে সত্যায়িত করা এবং এর ওপর ভিত্তি করে কার্যপন্থা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করাই উপরিউক্ত প্রশ্নের উত্তরের সন্ধান পাওয়ার একমাত্র পথ।
বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, রেজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা

কৃষকের ফরিয়াদ

বাংলাদেশের মাটি কৃষকের প্রাণ। কৃষিপ্রধান দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের শতকরা ৭৫ জন লোক কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এমতাবস্থায় সরকারকে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। কৃষি উপকরণের দাম কমাতে হবে। এ প্রসঙ্গে কৃষিঋণের কথা অবশ্যই বলতে হয়। যেসব কৃষক ২৫,০০০ টাকা থেকে এক লাখ পর্যন্ত কৃষিঋণ নিয়েছেন তাদের সুদ মাফ করা হোক। যদি কৃষিঋণের সুদ মাফ করা হয়, তাহলে সেই সব কৃষক কৃষিকাজে আগ্রহী হবেন এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন।
তাই মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃষককুলের পক্ষ থেকে বিনীত অনুরোধ, এ দেশের কৃষকদের কথা বিবেচনা করে স্বল্পতম সময়ে কৃষিঋণের সুদ মাফ করার ব্যবস্থা নিন।
ইমরান হোসেন
তালিনা, ঝিনাইদহ।

শিক্ষক সনদ বাস্তবায়ন করুন-বিশ্ব শিক্ষক দিবস by মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান

শিক্ষা মানুষের মানবিক গুণাবলি বিকশিত করে, মানবজীবনকে পরিশীলিত করে এবং উন্নত ও সুন্দর সমাজ গঠনের সুপ্ত শক্তিকে করে জাগ্রত। তাই শিক্ষা জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান নিয়ামক। শিক্ষা কথাটি বললেই প্রথমেই যে কথাটি আসে তা হলো শিক্ষক। কেননা শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও প্রচেষ্টার ওপরই নির্ভর করে শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত উত্কর্ষ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা থেকে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠনের ক্রমাগত প্রচেষ্টা এবং ইউনেস্কো আইএলওর সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সদিচ্ছায় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর অর্জিত হয় এই ঐতিহাসিক শিক্ষক সনদ। ১৪৬ ধারা-উপধারাবিশিষ্ট এই সনদে যেমন শিক্ষাকে জাতি গঠন ও উন্নয়নের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তেমনি এই সনদে শিক্ষকের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার, মর্যাদা এবং তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত সব দেশের প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ শিক্ষকের ২১০টি জাতীয় শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থা ‘এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল’। এ সংস্থার ক্রমাগত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ইউনেসকোর ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেসকোর তত্কালীন মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক মেয়রের যুগান্তকারী ঘোষণার ফলে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর সারা বিশ্বে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালিত হয়। আজ ৫ অক্টোবর সারা বিশ্বে ১৫তম বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে, অথচ আমাদের দেশে এই দিবস পালনে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই।
শিক্ষকতা কেবল চাকরি নয় বরং একটি মহান পেশা। একজন আদর্শ শিক্ষক জানেন তাঁর চলা পথ কণ্টকাকীর্ণ এবং ভবিষ্যত্ বিড়ম্বনাময়, তবু তিনি হূদয়ের টানে এই সুকঠিন জীবিকার পথ বেছে নেন। এ জন্য তাঁকে জীবনব্যাপী সংগ্রাম করতে হলেও তিনি আদর্শচ্যুত হন না। সর্বদা ন্যায়-নীতির প্রশ্নে তিনি আপসহীন। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর—এ নামেই তিনি আখ্যায়িত। শিক্ষানিকেতন তাঁর কর্মশালা। তিনি শিক্ষার্থীর মনন, মেধা ও আত্মশক্তির বিকাশ, পরিশীলন, উন্নয়ন ও প্রসার সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সমাজ গঠনে, দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়নে, দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বিশ্বের দরবারে নিজ দেশের গৌরবময় অবস্থান গড়ে তুলতে একজন আদর্শ শিক্ষকের অবদান কোনো রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ বা সমাজনেতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাই বলা যায়, একজন আদর্শ শিক্ষক দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান ও শ্রেষ্ঠ মানুষের অন্যতম। জাতি সঙ্গত কারণেই শিক্ষকের কাছে অনেক আশা করে। তাই শিক্ষককে হতে হবে নিজ পেশার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। এখন প্রশ্ন, এই মহান পেশার প্রতি শিক্ষকসমাজ কতটুকু যত্নবান?
পাশাপাশি প্রশ্ন আসে, শিক্ষকের দায়িত্ব পালনে পারিপার্শিক অবস্থা ও পরিবেশ কতটুকু সহায়ক? আবার দেশের এই শ্রেষ্ঠ মানুষ শিক্ষকেরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা পান কতটুকু? এ প্রসঙ্গে নির্দ্বিধায় বলা যায়, বহু উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে কয়েক দফা শিক্ষানীতি প্রণীত হলেও আজও কোনো শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন হয়নি। অর্থাত্ শিক্ষাব্যবস্থাপনায় নেই কোনো দিকনির্দেশনা, বরং রয়েছে প্রচুর অসঙ্গতি। তা ছাড়া শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি কর্তৃপক্ষের পরস্পরবিরোধী অস্পষ্ট, জটিল ও বৈষম্যমূলক বিধিবিধান, নিয়ম-নির্দেশনা ও কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের অভাবে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যোগ্য ও মেধাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের জন্য জাতীয় পর্যায়ে কোনো নিয়োগ কমিটি বা কর্মকমিশন না থাকায় তথাকথিত ডোনেশনের নামে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে স্থানীয়ভাবে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা কেবল দুঃখজনকই নয় বরং সামাজিক অনাচার। এ কথা সত্য যে শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। সে জন্য প্রতিভাবান, মেধাবী ও সৃজনশীল ব্যক্তিদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হবে। শিক্ষককে জ্ঞানসমৃদ্ধ, কুশলী ও দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষকতা জীবনের প্রথম থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মের প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের দেশে শিক্ষকের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও আজও ব্রিটিশ শাসন আমলের ঔপনিবেশিক বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা বিরাজমান। যদিও একটি স্বাধীন দেশে কোনোক্রমেই এ ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়, তাই স্বাধীনতা লাভের পর শিক্ষকসমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বৈষম্যের অবসানকল্পে শিক্ষাব্যবহার সব স্তরকে জাতীয়করণের মাধ্যমে এক ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নীতিগতভাবে অঙ্গীকার করলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তা ছাড়া ইউনেসকো এবং আইএলওর সদস্যভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষকদের জন্য ১৯৬৬ সালে গৃহীত ‘শিক্ষক সনদ’ থেকে আমাদের শিক্ষকসমাজ বঞ্চিত।
মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষকতা পেশার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি উপযুক্ত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু অতি দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে অবহেলা ও অবজ্ঞার ফলেই শিক্ষকতা পেশা মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকের বৈষম্য দূর করে অবিলম্বে যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুসারে শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন-ভাতাদি প্রদান ও পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি গঠনে অসঙ্গতিপূর্ণ নীতিমালা থাকার কারণে বেসরকারি শিক্ষকের চাকরির কোনো নিরাপত্তা নেই। যেহেতু সরকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ১০০ ভাগ বেতন প্রদান করছে সে কারণে তথাকথিত এই ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির প্রথা অনতিবিলম্বে বাতিল করে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুরূপ বিধিমালায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য যেমন নেই কোনো আবাসিক ব্যবস্থা তেমনি নেই নিজ কর্মস্থলে যাতায়াত করার ব্যবস্থা। আবার ভ্রমণভাতা ও চিত্তবিনোদনের নেই কোনো ব্যবস্থা। তাতে মনে হয়, শিক্ষকদের জীবনে কোনো ভ্রমণ বা চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন নেই। সামগ্রিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে এ কথাই বলতে হয় যে শিক্ষকেরা এক চরম হতাশার মধ্যে দিন যাপন করছেন। যার ফলে নতুন কিছু সৃষ্টি তো দূরের কথা বরং স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করার স্পৃহাও থাকে না।
আর বঞ্চনা বা করুণা নয়, বরং মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষকতা পেশার প্রতি যথাযথ গুরুত্বারোপ করতে হবে এবং শিক্ষক সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমাদের শিক্ষার গুণগতমান বিকশিত হবে—বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এই প্রত্যাশাই করি।
মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান: সভাপতি, শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট।

ইরান -হুজুগ আর বাস্তবতা এক নয় by ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন

বিদেশি নাগরিকদের জড়িয়ে যে জনকূটনীতি, তার সামনের কাতারে ফিরে এসেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ও ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নিকোলাস সারকোজির সঙ্গে মিলে যৌথভাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। মনে হলো আরও একবার তাঁরা ইরানকে এই ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের শর্ত মানার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিলেন। তাঁদের ভাষায় এসব হলো ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দাবি’। ডিসেম্বরের মধ্যে দাবি মেনে নাও, নয়তো নতুন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করো—এমনটাই তাদের অবস্থান। ওবামা বলেছেন, ‘ইরান এমন সব নিয়ম ভাঙছে যা সব দেশকে অবশ্যই মেনে চলতে হয়।’
এই হম্বিতম্বির চলতি উপলক্ষ হলো ইরানের একটি ঘোষণা। ইরান জানিয়েছে, দেশটি কুমের অঞ্চলের কাছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের লক্ষ্যে তিন হাজার সেন্ট্রিফিউজ-সংবলিত একটি স্থাপনা তৈরি করছে। ঘোষিত লক্ষ্য হলো বিদ্যুত্ উত্পাদন। ওবামার মতে, বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য এই সংখ্যা অত্যন্ত কম, কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান তৈরির জন্য এটাই আদর্শ। সুতরাং ইরানের অভিসন্ধি পরিষ্কার; পারমানবিক বোমা বানানো।
মনে হয় পশ্চিমা গোয়েন্দারা এই স্থাপনা তৈরি সম্পর্কে আগেই জানতে পেরেছিল। এ বিষয়ে তাদের ভাষ্য হলো, ইরান যেই বুঝতে পেরেছে যে পাশ্চাত্য শক্তিরা এর কথা জেনে গেছে সেহেতু ইরান আগেভাগেই এই স্থাপনা তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেছেন, পারমাণবিক বিস্তার-নিয়ন্ত্রণ চুক্তি অনুযায়ী এসব স্থাপনা চালু হওয়ার ছয় মাস আগে ঘোষণা করার দরকার ছিল। তাই তিনি এ সময় ঘোষণা দিয়েছেন।
যা-ই ঘটুক না কেন, ওবামা একে বড় ঘটনা হিসেবে দেখাচ্ছেন এবং ইরানের ওপর জাতিসংঘের আরো আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপের ভিত্তি হিসেবে এই নতুন তথ্যটি ব্যবহার করছেন। তাঁর আশা, এতে করে চীন বা রাশিয়াকে নতুন নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করায় অথবা কমপক্ষে বিরোধিতা থেকে বিরত থাকতে রাজি করানো সম্ভব হবে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থীরা বলছে, ‘আমরা তো এ কথা আগেই বলেছিলাম।’ তাদের মতে, ইরান সব সময় মিথ্যা বলছিল, এখনো বলছে। সেজন্যই একে অবশ্যই কঠিন শাস্তি দিতে হবে। আমরা কি তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কিনারে? অথবা যুক্তরাষ্ট্র নিজে অথবা যুক্তরাষ্ট্রের মৌনসম্মতিতে ইসরায়েল কি ইরান আক্রমণ করতে যাচ্ছে? আমার তা মনে হয় না। মনে হয়, সবাই বিরাট এক ধাপ্পাবাজি চালাচ্ছে।
ইরানের কথা দিয়েই শুরু করি। যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী ও ইসরায়েলিদের মতো আমিও মনে করি, ইরান পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে চায়। কিন্তু ওদের সঙ্গে আমার পার্থক্য কেবল এই যে, আমি মনে করি এই চাওয়া স্বাভাবিক, অপরিহার্য এবং আদৌ ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় নয়।
ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, ভারত, পাকিস্তান ও ইসরায়েল এই তিনটি পার্শ্ববর্তী পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশ এখনো পরমাণু অস্ত্র বিস্তার-নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করেনি। অথচ এদের প্রত্যেকেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের’ নিয়ম ভাঙার দায়ে তাদের অভিযুক্ত করা হয় না। তাই ইরানিদের প্রশ্ন, তাদের আলাদাভাবে দেখা হবে কেন? ইরান তো এনপিটি-তে স্বাক্ষর করেছে এবং এখন পর্যন্ত সেই তিন পার্শ্ববর্তী দেশের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান লঙ্ঘন করেনি। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুলা ডি সিলভা বলেছেন, তাঁর দেশও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। তিনি ইরানের এ কাজেও কোনো সমস্যা দেখেন না।
ওবামা যদি আগেই জেনে গিয়ে থাকেন যে ইরান পারমাণবিক কেন্দ্র বানাচ্ছে তাহলে তিনি তা এখন জানাচ্ছেন কেন? তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে পুরোপরি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, ওবামার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব এবং আফগানিস্তানে আরও সেনা পাঠানো নিয়ে দ্বিধা ডানপন্থীদের সমালোচনার কারণ হয়েছে। এ প্রেক্ষিতেই ইরানের উদ্দেশ্যে কড়া কথা বলে মুখরক্ষার কৌশল নিয়েছেন তিনি।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। ওবামার মতো আহমেদিনেজাদকেও অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কড়া কথা বলে তিনি জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগাতে পারবেন। আর পশ্চিম যদি পাল্টা কড়া কথা বলে, তাহলে তো এই জাতীয় আবেগকে কাজে লাগানো আরও সহজ হয়।
রাশিয়া ও চীন সব সময় কড়া নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে। তারা মনে করে, এটি উল্টো ফল বয়ে আনবে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বিরোধিতাও তারা খুব একটা করতে চায় না। তারা হয়তো তাদের অভিপ্রায় অস্পষ্ট রেখে ধীরে চলা নীতিই বজায় রাখবে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রসঙ্গে কয়েকটি বিবেচনা জরুরি। আফগানিস্তানে সামরিক তত্পরতা তীব্রতর করার দাবির মুখে আছেন ওবামা। আফগানিস্তানে তাদের নাজুক পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সমর্থন করবে কে? আর ইসরায়েলিদের উদ্বেগ ও আকাঙ্ক্ষা যা-ই হোক না কেন, তাদের যুদ্ধবিমানগুলো কোনো দেশের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে আক্রমণ করার মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা পাবে না।
তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াল? আমরা এক অচলাবস্থার মধ্যেই পড়ে থাকলাম। কথার বাহার যত কাজ ততই কম। আহমাদিনেজাদও কি তা-ই চান? হয়তো চান। যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থীরা কি এতে নিন্দা জানাবে? হয়তো জানাবে। এই পরিস্থিতি বদলাতে ওবামা কি কিছু করতে পারবেন? তেমন কোনো সম্ভাবনা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। হুজুগ আর বাস্তবতা তো এক নয়!
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন: মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ স্কলার।

ক্রসফায়ারই সমাধান by শাহ্দীন মালিক

৪ অক্টোবর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রথম কলামে প্রতিদিনের ‘উদ্ধৃতি’তে স্থান পেয়েছে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের বিবিসির বাংলা সংলাপের একটি বাক্য—‘ক্রসফায়ারের মাধ্যমেই একদিন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে’। পত্রিকাটির তৃতীয় পৃষ্ঠায় এ সংক্রান্ত বিস্তারিত সংবাদ এসেছে ‘ক্রসফায়ারকেই সমাধান মনে করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী’ শিরোনামে।
পড়লাম। মনে দুটো প্রশ্ন জেগেছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার কি নিতান্তই ভোটার ভুলানো রূপকথা; নাকি মন্ত্রীবিশেষকে সেই ইশতেহারকে অর্থহীন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে?
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আমাদের অঙ্গীকার, কর্মসূচি ও ঘোষণা’ শিরোনামের নিচের ‘অগ্রাধিকারের পাঁচটি বিষয়’- এর অন্তর্গত ৫:২তে- বলা হয়েছে ‘...বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে...।’
নৌপরিবহনমন্ত্রী অবশ্যই বলতে পারেন যে ইশতেহারে ‘বন্ধ করা হবে’ বলা হয়েছে। এখনই বন্ধ করা হবে তা তো বলা হয়নি। তাঁর যুক্তি হতে পারে—ক্রসফায়ারের মাধ্যমে সন্ত্রাসের সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে তারপর ক্রসফায়ার বন্ধ করা হবে।
একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিরও মাদক গ্রহণের পক্ষে যুক্তি থাকে—নিঃসঙ্গতা থেকে রেহাই পেতে; ব্যক্তি-জীবনের দুঃখ-দুর্দশা কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকতে; মন-মেজাজ ভালো রাখতে; পারিবারিক কলহ দারিদ্র্য বা বেকারত্ব থেকে মনকে দূরে রাখতে ইত্যাদি। মাদকাসক্ত ব্যক্তির নিজের কাছে এসব যুক্তি অকাট্য, খুবই গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য। এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য যে সে এসব যুক্তির কারণেই তার মাদক গ্রহণ চালিয়ে যায়।
আর হত্যা করে বা হত্যার মাধ্যমে যে একটা সমস্যার সমাধান করা যায়—এ ধারণাটা অতি পুরোনো। বিশ্বের বর্তমান ও নিকট অতীতের (অর্থাত্ যাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রমাণযোগ্য দলিল-দস্তাবেজ পাওয়া যায়) সব ধরনের উগ্র জঙ্গীগোষ্ঠী—ডান-বাম, ধর্ম-অধর্ম—হত্যাকেই সমাধান হিসেবে বেছে নিয়ে নির্বিচারে প্রতিপক্ষকে হত্যা করেছে। কিন্তু হত্যা করে কেউ কোনো সমস্যার সমাধান করেছে বলে আমার জানা নেই।
আমাদের ইদানীংকালের উগ্র মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের ধর্মের অভাবই সব সমস্যার মূল কারণ। বিচারকদের হত্যা সমাধান মনে করে তারা বোমা ফুটিয়ে বিচারকদের হত্যা করেছে, হত্যা সমাধান মনে করেই ২১ আগস্ট বোমা ফাটিয়ে তাদের শত্রু অর্থাত্ আওয়ামী লীগের শীর্ষ প্রায় সব নেতাকে হত্যার প্রায় সফল চেষ্টা করেছে। গান-বাজনা সমস্যা মনে করে রমনার বটমূলে বোমা ফাটিয়ে মানুষ হত্যা করেছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরেরাও একইভাবে মনে করেছিল যে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়া বা ইসলাম বিপন্ন হওয়ার যে আশঙ্কা বা সমস্যা তার সমাধান করবে। এই হত্যা-সমাধানের অগ্রপথিক ছিল ইউনিফর্ম পরা পাকিস্তান দেশটির সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের পক্ষে কিছু রাজনৈতিক নেতা।
হিটলার তাঁর দল ও সশস্ত্র বাহিনী একই ধারণায় উন্মাদ হয়েছিল। তারা ভেবেছিল জার্মানির সব সমস্যার মূল কারণ তাদের ইহুদি জনগোষ্ঠী। অতএব হত্যাযজ্ঞই ছিল সমাধান। আর অপরাধীদের হত্যা করে অপরাধ দমনের চেষ্টা কখনো করেনি এমন সমাজ খুব কমই আছে। কেউ সফল হয়নি। কিন্তু হত্যা অভিযানের একটা ফল বা পরিণতি সব সমাজই ভোগ করেছে। সমাজগুলোতে অপরাধ-নিরপরাধ সবাইকে হত্যা করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকার পড়েছিলাম তখন ভেবেছিলাম আওয়ামী লীগ হয়তো বুঝতে পেরেছে যে হত্যা দিয়ে হত্যা বন্ধ করা যায় না। নাকি আমার ভুল হচ্ছে। হতে পারে ক্ষমতায় গিয়ে এখন হত্যার পক্ষের লোকজনের যুক্তি বেশি অকাট্য মনে হচ্ছে।
দুই-তিন দিন আগে প্রথম আলোতেই প্রথম চোখে পড়ল গানম্যান নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞাপন। অনেক দিন ধরেই বলছি, লিখছি—এটা বর্বরতার ধারাবাহিকতায় অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এ সপ্তাহে প্রথম একটা গানম্যানের বিজ্ঞাপন অবশ্যম্ভাবীভাবে এক বছরের মধ্যে গণ্ডায় গণ্ডায় বিজ্ঞাপনে পরিণত হবে। প্রথমে গণ্যমান্য ব্যক্তি তারপর ধনী-প্রভাবশালী; তারপর তাদের স্ত্রী-পুত্র, মা-আয়া-বাবুর্চির জন্যও গানম্যান লাগবে। মেক্সিকো সিটিতে এখন সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি গানম্যানের সরকারি সংখ্যা লক্ষাধিক। মেক্সিকো সিটিতে দৈনিক খুন হয় শতাধিক। ঢাকা শহরে গড়ে দৈনিক দুই থেকে তিনজন। এই দুই বা তিনজন থেকে সেঞ্চুরিতে যেতে সময় লাগবে অত্যল্প। যদি খুনই সমাধান মনে করা হয়।

সন্ত্রাসীদের ক্রসফায়ারে মেরে সন্ত্রাস-সমস্যার সমাধান যদি এখন আওয়ামী লীগের নীতি হয়। তাহলে কোর্ট-কাচারি বন্ধ করে দিয়ে সব হত্যাকারী সন্ত্রাসীদের ক্রসফায়ারে মেরে ফেললেই হয়। অবশ্য অতটা নিশ্চয় সরকার করবে না। কিন্তু নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য কি সেদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে না বা যদি না হয় অন্তত তাঁর তো পদত্যাগ করা উচিত। অন্য মন্ত্রীরা অবশ্য ইদানীং বলছেন ক্রসফায়ার নেই, অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘আত্মরক্ষার্থে’ গুলি ছুড়ে হত্যা করছে।
নৌপরিবহনমন্ত্রী রাখঢাক ছাড়া বললেন, এটাই সমাধান। এটা সমাধান হতে পারে না।
আমাদের বাংলাদেশকে আমরা একটা মধ্যযুগীয় বর্বব দেশে পরিণত করতে আমরা দেব না।
হতে পারে দল এখন বলবে নৌপরিবহনমন্ত্রী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। আমরা ধরে নেব নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দল আইনের শাসনে সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করে, হত্যা-বর্বরতাকে ঘৃণা করে।
আর দুরাশা হলো—নৌপরিবহনমন্ত্রী তাঁর ভুল বুঝতে পেরে পদত্যাগ করবেন। অন্তত নিঃশর্ত ক্ষমা চাইবেন ভুলের জন্য। আমরা বর্বরতার পথ ছেড়ে সভ্যতার পথে ফিরে আসা শুরু করব জোরেশোরে।
ড. শাহ্দীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট।

প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি: অনেক ভয়ের মধ্যেও একটা অভয় by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

বাংলাদেশের মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতার হাতে শোষিত ও নির্যাতিত হতে হতে সেই প্রবাদের গরুর মতো অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে গরু আকাশে সিঁদুর-মেঘ দেখলেই ভাবে, গোয়ালে আগুন লেগেছে। রাষ্ট্র তথা সরকার (আমাদের দেশে এ দুটি সত্তার মধ্যে কোনো মৌল পার্থক্য নেই) নানা নিয়মকাকুনের নিগড়ে মানুষকে বেঁধে রাখে, অথচ সরকারের তথা সরকারি দলের (আমাদের দেশে এ দুটি সত্তার মধ্যেও কোনো মৌল পার্থক্য নেই) লোকজন এসব নিয়মকানুনের নিরাপদ দূরত্বে বসে এগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখায়। ফলে সরকারের নিয়ম-নীতির কথা উঠলে মানুষ ভয় পায়, এড়িয়ে যায়। আর যে নীতির পেছনে বেশি তোড়জোড় আর আওয়াজ থাকে, সে নীতিকে মানুষ বেশি অবিশ্বাস করে। ভাবে, ভালো ভালো শব্দ আর আপ্তকথার পেছনে মতলবটা হচ্ছে হাতিয়ে নেওয়া অথবা দলের স্বার্থ হাসিল করা।
বাংলাদেশে যে অনেক ক্ষেত্রে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি নেই, তা একদিকে এ জন্য ভালোই: নীতির নামে দলের আদর্শ/ইচ্ছা তাতে প্রয়োগ হচ্ছে না। যেমন, যদি একটা স্বাস্থ্যনীতি থাকত, বড় বড় অনেক কথা তাতে থাকত বটে, কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা যদি সরকারি দল না করেন, তাহলে ওই নীতির ফাঁদে তাঁরা পড়তেন। অন্যদিকে, এ রকম নীতি না থাকাটাও খারাপ; কেননা, নীতির অভাবে যেমন খুশি কাজ হয়; কাজের কোনো লক্ষ্যমাত্রা বা অর্জন-অনর্জন পরিমাপের সূত্র থাকে না। একটা সমন্বিত এবং গণবান্ধব স্বাস্থ্যনীতি থাকলে সোয়াইন ফ্লুর আতঙ্কে মানুষ দিনদুপুরে ভূত দেখত না, অথবা প্রতি সপ্তাহে যে কয়েক শ শিশু ডায়রিয়ায় সবার (শুধু তাদের পরিবার পরিজন ছাড়া) অগোচরে মারা যাচ্ছে তা হতো না। একটা সুষম, আধুনিক ও শিক্ষাবান্ধব শিক্ষানীতির অভাবে আমাদের শিক্ষা খাতে চলছে অরাজকতা। চার-পাঁচ ধারায় বিভাজিত শিক্ষাব্যবস্থা কোনোক্রমেই একটি আধুনিক ভবিষ্যত্মুখী রাষ্ট্রের প্রত্যাশা প্রতিফলিত করতে পারছে না, মেটানো দূরে যাক। শিক্ষা থেকে আমরা কি আমাদের শিশু-কিশোর-তরুণদের জন্য একুশ শতকের বড় রাস্তা ধরে অন্যান্য দেশের মতো দ্রুতি-তে ছোটার শক্তি গ্রহণ করব, নাকি তাদের (তাদের একটি বড় অংশকে অন্তত) মধ্যযুগে আটকে রেখে শুধু ধর্মীয় শিক্ষক বানাব? মাদ্রাসাশিক্ষা যে একুশ শতকের উপযোগী নয়, সে কথাটা সবাই বোঝেন; মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও বোঝে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার করতে কেউ সাহস পান না। তাঁদের ভয়, উগ্রপন্থী দল এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো এ নিয়ে কোলাহল করবে; তাঁদের যারা মেন্টর সেই মধ্যপ্রাচীয় দেশগুলো হইচই করবে এবং অপবাদ উঠবে—ইসলামকে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। অথচ ইসলামে জ্ঞান অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, নবীজি (সা.) জ্ঞানার্জনের জন্য চীনে যেতে বলেছেন অনুসারীদের। চীনে নিশ্চয় ওই সময় কোনো মাদ্রাসা ছিল না। চীনে যাওয়া মানে জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী হওয়া, জীবন-কুশলতা শেখা; অন্য ধর্মের দেশে থেকে, অন্য ধর্মের শিক্ষাগুরুর অধীনে শিক্ষা নিয়ে উদার এবং পরমত ও পরধর্মসহিষ্ণু হওয়া। গত জোট সরকারের সময় মনিরুজ্জামান মিঞার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন হয়েছিল। তাঁর কমিটি পরিশ্রম করে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিল। একটা ভালো নীতি তৈরিতে তার আন্তরিকতারও কমতি ছিল না। কিন্তু তাঁর ও তাঁর দলের পক্ষে সম্ভব ছিল না বিএনপি এবং বিশেষ করে জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শনের বাইরে গিয়ে একটি প্রকৃত গণমুখী ও আধুনিক শিক্ষানীতি তৈরি করা। ফলে মাদ্রাসাশিক্ষার কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুপারিশের সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ আমাদের দেশের মোট শিক্ষার্থীর একটি বিরাট অংশের জন্য একুশ শতকের রাস্তায় পা দেওয়াটা কঠিন হয়েই থাকল। মাদ্রাসাশিক্ষা নিয়ে চিন্তাভাবনা না থাকার আরেকটি কারণ, এর শিক্ষাত্রীদের শ্রেণীচরিত্র। মাদ্রাসায় সাধারণত দরিদ্র ছেলেমেয়েরাই পড়াশোনা করে। দরিদ্রদের নিযে এমনিতেই চিন্তাভাবনা হয় না, তার ওপর যদি সে ভাবনায় ধর্মীয় সংবেদনশীলতা যোগ হয়, তাহলে তো তা পরিত্যাজ্যই।

২.
সুখের কথা, শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় এবং প্রত্যাশিত কিছু সংস্কারের জন্য একটি নতুন শিক্ষানীতির খসড়া তৈরি হয়েছে। এ খসড়ার ওপর মতামত চাওয়া হয়েছে, তবে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ডিসেম্বর থেকে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে। চূড়ান্ত খসড়াটি আমি পড়েছি এবং এর ওপর পত্রপত্রিকায় বেশ কিছু আলোচনাও পড়েছি। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি নিয়ে এসব আলোচনা থেকে সরকার অনেক নতুন চিন্তাভাবনা পাবে, যেসব ক্ষেত্রে ফাঁকে রয়ে গিয়েছিল সেগুলো ভরাট হবে; যেসব ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক হতে বলা হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে সরকার নিশ্চয় সতর্ক হবে। তবে সব আলোচনা যে গঠনমূলক, তা নয়; কোনো কোনো পত্রিকার আলোচনা পড়ে মনে হলো, যেহেতু এই শিক্ষানীতি তৈরি করেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার, সেহেতু এটি ঘোড়ার ডিম, এবং এর বাস্তবায়নে সরকার হাত দিলে রাজপথ রাঙা হবে। কিছুদিন আগে এক প্রবন্ধ বইয়ের প্রকাশনা উত্সবে গিয়েছিলাম। পাঁচজন বক্তা ছিলেন বইটির এবং পাঁচজন বক্তাই বইটিতে যা অন্তর্ভুক্ত হয়নি, অথবা ‘হওয়া উচিত ছিল’ তার বর্ণনা দিলেন। বেচারা প্রবন্ধকার বইয়ের ভূমিকায় স্পষ্টই লিখেছেন, এ বিষয়ে আরও আলোচনা সম্ভব, তিনি শুধু একটি তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু বিষয় দেখেছেন, অথচ তাঁর এই সরল বক্তব্যও বক্তাদের ‘আরও কী লেখা যেত’র উপদেশ-প্রাবল্য থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারল না। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিও যেখানে পরিষ্কারভাবে লিখেছে, কোনো নীতিই অবিচল নয়, শিক্ষানীতিতেও ‘প্রয়োজনীয় রদবদলের সুযোগ থাকবে’, সেখানে অনেক আলোচক-সমালোচক ধরেই নিয়েছেন, এই নীতি এক্ষুনি ঠিক এই অবয়বেই বাস্তবায়িত হয়ে যাবে। আরও কিছু সমালোচনা এসেছে ব্যক্তি বা গ্রুপ স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে। আর আরেক শ্রেণীর সমালোচনা হচ্ছে নতুন কোনো কিছু গ্রহণ না করার মানসিকতা থেকে। যেমন, প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াটাকে অনেকেই মানতে পারছেন না। তাঁরা বলছেন, এত দিন ধরে চলে আসা একটা পদ্ধতি হঠাত্ করে বদলে ফেলার কারণ কী? কেউ কেউ বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কি ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াবেন? আরও কিছু ব্যক্তি এবং দু-একটি সংগঠন বলছে, এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত হলে এক লাখের ওপর শিক্ষক ও অন্যরা চাকরি হারাবেন। অথচ প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতেই লেখা আছে, নতুন প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে ‘দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অবকাঠামোগত এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপযুক্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা করা’। যদি নতুন শিক্ষক নিয়োগই দেওয়া হয়, তবে তাঁরাই তো ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াবেন। আমার তো বরং উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া নিয়ে ভয়। তা ছাড়া খসড়ার কোথাও তো লেখা নেই যে পুরোনোদের বাদ দেওয়া হবে। অদল-বদল হবে নিশ্চয়; মাধ্যমিক শিক্ষা অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত হলে বর্তমানে যাঁরা ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পড়াচ্ছেন, তাঁরা প্রাথমিকে যোগ দেবেন; যাঁরা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াচ্ছেন তাঁরা মাধ্যমিকের একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়াবেন। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বর্তমান তিনটি স্তর যখন দুটি স্তরে সমন্বিত হবে, তখন কিছুটা ওলটপালট তো হবেই। শিক্ষানীতিতেই বলা আছে, ২০১৮ সালের মধ্যে এর সুফল পাওয়া যাবে। আগে ছিল না বলে নতুন প্রস্তাবকে যদি পরিত্যাগ করা হয়, তাহলে আগের সব ব্যবস্থাতে ফিরে গেলেই তো হয়। লাকড়ি-চুলা বাদ দিয়ে তাহলে গ্যাসের চুলা কেন নেব? বৈঠায় নৌকা না চালিয়ে তাতে শ্যালো-ইঞ্জিন কেন লাগাব? আগের গরুই বা কী দোষ করল, ট্রাক্টর যেখানে জমি চাষ করছে? আরও বলা হচ্ছে, বর্তমান প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ভৌত সুবিধা দিতে পারবে না। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির সঙ্গে ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত প্রাক্কলিত ব্যয়ের একটা হিসাবও দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ রাখা হয়েছে অতিরিক্ত শ্রেণীকক্ষজনিত ব্যয়ে। সরকার আন্তরিক হলে স্থান সংকুলান বড় কোনো সমস্যা হতে পারে না।

৩.
প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে যেসব সংস্কার ও নতুন পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ওই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের স্তর নির্ধারণ, এ দুই স্তরে সব ধারাতেই কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যবই বাধ্যতামূলক করা, ৫+ শিশুদের জন্য একটি এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা; কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা। তা ছাড়া শিক্ষার উদ্দেশ্য যেন সংবিধানের নিশ্চয়তার সঙ্গে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করা। সরকার ইতিমধ্যেই বিনামূল্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে—প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার ব্যবস্থাসহ শিক্ষার্থীসহায়ক আরও কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাঠাগার উন্নয়ন ও স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এগুলো অবশ্যই ভালো উদ্যোগ এবং এগুলোর সুচিন্তিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন—অর্থাত্ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এখনই জোরদার করে পর্যায়ক্রমে দুই স্তরের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা।
তা ছাড়া শিক্ষানীতিতে মাদ্রাসার ছাত্রদের ইংরেজি ও বিজ্ঞান (বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি) শিক্ষা দিয়ে তাদের প্রতিযোগিতাগত সামর্থ্য বাড়ানোর উদ্যোগটিও প্রশংসার যোগ্য।
তবে মাদ্রাসাশিক্ষায় কওমি মাদ্রাসাগুলো সম্পর্কে খসড়াতে কোনো প্রস্তাব নেই। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোয় নিয়েও কোনো মন্তব্য নেই। অভিন্ন বিষয়গুলো কি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রযোজ্য হবে না, বিশেষ করে বাংলাদেশবিষয়ক পাঠ্যসূচি? উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে যে দুর্দশা, তার মূল একটি কারণ খসড়াটি এড়িয়ে গেছে এবং তা হলো উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ। এই রাজনৈতিকীরণের ফলে দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হয়, উপাচার্যসহ উচ্চ পদগুলোতে বসানো হয় দলীয় লোকদের, ফলে উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে এক্সেলেন্সের পরিবর্তে অরাজকতাই বিরাজ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জোট সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় যে ১১ জন অধ্যাপক-সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগ পেয়েছিলেন এই সরকার সম্প্রতি তাঁদের বরখাস্ত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলো ভাগ্যিস সরকারের। এই বরখাস্ত-জবরদস্তি ও তুঘলকি নিয়োগের অধিকারের বাইরে। তা না হলে সরকার বদল হলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেক শিক্ষক পালাক্রমে ছাঁটাই হয়ে যেতেন। তবে নিজস্ব বৃত্তে এসব বিশ্ববিদ্যালয় যে নানান তুঘলকি কাণ্ড চালাচ্ছে, তার খবর তো দেশবাসী প্রায়শই পায়। শিক্ষানীতি ও বিষয়টি মেনে নিয়ে যদি শক্ত কিছু সুপারিশ করা হতো, তাহলে ভালো হতো। শিক্ষক নিয়োগে, শিক্ষকদের উচ্চতর পদে নিয়োগে বৃত্তি প্রদানের ক্ষেত্রে মেধাই যে হওয়া উচিত একমাত্র যোগ্যতা, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের মূল্যায়ন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বছর বছর মূল্যায়ন করার একটা ব্যবস্থা থাকা উচিত। শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে বর্তমান পদ্ধতিটি প্রশাসনিকভাবে সহজ হলেও এটি শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের উপযুক্ত নয়। নতুন পদ্ধতি তৈরি করে শিক্ষার্থীদের পছন্দ ও যোগ্যতা অনুযায়ী বিষয়-নির্বাচনের সুযোগ দিতে হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আশা করি, খসড়া শিক্ষানীতিটি যখন চূড়ান্ত হবে, তখন আরও কিছু ভালো প্রস্তাব ও দিকনির্দেশনা তাতে অন্তর্ভুক্ত হবে। নীতি নিয়ে আমাদের যে ভয়, তাতে নতুন শিক্ষানীতি কিছুটা হলেও অভয় দিচ্ছে আমাদের। দেখা যাক।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বাড়ছে অভিবাসী নারীশ্রমিকের চাহিদা -দক্ষতা বৃদ্ধি ও অধিকার রক্ষায় উদ্যোগ বাড়াতে হবে

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায়ও বাংলাদেশের অভিবাসী নারীশ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে—এটি একটি সুখবর। বিভিন্ন দেশে আমাদের নারীশ্রমিকদের চাহিদা তৈরি হয়েছে। সরকার প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে এসব বাজার পর্যবেক্ষণ ও নতুন বাজারের খোঁজ করলে আরও অনেক শ্রমিক পাঠানো যাবে। এর জন্য সরকারের সদিচ্ছা ও উদ্যোগের বিষয়টি খুবই জরুরি।
পাশাপাশি তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে অভিবাসী শ্রমিকদের অবস্থা বেশ নাজুক। তাঁরা প্রতিনিয়ত দেশে-বিদেশে বঞ্চনা ও নিপীড়নের সম্মুখীন হচ্ছেন। সরকারি সহায়তা সাধারণত তাঁদের নাগালের বাইরেই থেকে যায়। আর নারীশ্রমিকদের অবস্থা তো আরও শোচনীয়।
যেসব খাতে নারীশ্রমিকদের জন্য নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে, সেগুলোতে আমাদের নারীশ্রমিকেরা যেন জায়গা করে নিতে পারেন, এ জন্য তাঁদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করা দরকার। বিদেশ গমনেচ্ছু নারীশ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বর্তমানে অল্পসংখ্যক খাতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। অন্যান্য খাতে এর সম্প্রসারণ ঘটানো তাই জরুরি। শ্রম, কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে।
বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে গমনেচ্ছু শ্রমিকদের যেন প্রতারিত না হতে হয় বা দালালের খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য তাঁদের জানা থাকা দরকার। সচেতনতার অভাবে নারীরা ধাপে ধাপে বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হন। তাই ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। বিদেশ গমনেচ্ছু শ্রমিকদের সঙ্গে শ্রম, কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা উচিত।
নারীশ্রমিকদের বিষয়ে বিভিন্ন দূতাবাস উত্সাহ কম দেখায়। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করে গমনেচ্ছুদের সহায়তা করতে পারে দূতাবাসগুলো। নারীশ্রমিকদের নিরাপত্তা ও তাঁরা যাতে বঞ্চনার শিকার না হন, সে জন্য আমাদের দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। যেসব দেশে আমাদের শ্রমিকেরা কাজ করেন, সেসব দেশের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ থাকা জরুরি। অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে।
শ্রম, কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নারীশ্রমিকদের বিষয়ে আলাদাভাবে নীতিকাঠামো করা হবে। এটি একটি প্রয়োজনীয় কাজ। আমাদের প্রত্যাশা, এই নীতিকাঠামো নারীশ্রমিকের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তাত্পর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটাবে।

বিশ্ববাজারে সারের দাম -দেশে আগের দামে বিক্রির ব্যাখ্যা কী

বিশ্ববাজারে সারের দাম প্রকারভেদে কমেছে ৬৭ থেকে ৩৯২ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে সব ধরনের সারই বিক্রি হচ্ছে আগের দামে। অথচ কোনো আমদানিপণ্যের দাম যখন বিশ্ববাজারে বাড়ে, তখন সে খবর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই এ দেশে সেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। কম দামে আমদানি করা পণ্যই বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নেন দেশীয় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। এটা নৈতিকভাবে নিন্দনীয়, আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য। এবার, সারের মতো অতি জরুরি পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিকারক-ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধ করা দরকার।
দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে খোঁজ নিয়ে আমাদের প্রতিনিধি জানতে পেরেছেন, নতুন ও কমে যাওয়া দামে সার আমদানি করে অনেক ব্যবসায়ী তা বিক্রি করছেন পুরোনো দামে, অর্থাত্ বেশি দরে। এসব এই মুহূর্তে বন্ধ করা জরুরি। প্রয়োজনে এমন অসাধু সার ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে সারা দেশে সতর্কবাণী দেওয়া যেতে পারে। তবে এখন সরকারের প্রধান কাজ হলো, সব ধরনের সারের নতুন হ্রাসকৃত মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া। আগের দামে আমদানি করা যে সার সরকারের নিজের মজুদে আছে, তাও যদি নতুন আন্তর্জাতিক দামে বিক্রি করা হয়, তাতে সরকারের লোকসান হয় না। আর নতুন দামে আমদানি করা সার তো স্বাভাবিকভাবেই অনেক কম দামে বিক্রি করা যায়।
আমদানিপণ্যের মধ্যে একমাত্র সারের বাজারই সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; কারণ সরকারই সারের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক। সরকার যে দামে সার বিক্রি করবে, বাজারের স্বাভাবিক দাম দাঁড়াবে সেটাই; বেসরকারি আমদানিকারকদের কোনো কারসাজিই ধোপে টিকবে না। এ ছাড়া সার অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি পণ্য, কৃষক সময়মতো ও ন্যায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার না পেলে কৃষিকাজ ব্যাহত হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ফসলের উত্পাদনে এবং শেষ পর্যন্ত উত্পাদিত ফসলের বাজারমূল্যের ওপর। গত বোরো মৌসুমে কৃষকেরা বড় ক্ষতির শিকার হয়েছেন; সামনের বোরো মৌসুমে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার একটা বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ববাজারে সারের দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায়। এখন কৃষকেরা যাতে এর সুফল পেতে পারেন এবং এর ফলে আগামী দিনে ধান-চালের দাম যাতে কমে গিয়ে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে, সে লক্ষ্যে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
শুধু ধান নয়, বিভিন্ন জাতের রবিশস্যসহ সব ধরনের ফসল উত্পাদনে সারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার কৃষক প্রয়োজনমতো ন্যায্যমূল্যে সেচ ও সারের সুবিধা পেলেই নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন। সারের দাবিতে আন্দোলনে নেমে তাঁদের প্রাণ দেওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। সুতরাং এ বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।