Saturday, May 2, 2015

‘ভোটের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে’ -বিবিসি বাংলা সংলাপে আলোচকরা

বিবিসি বাংলা সংলাপে অংশ নিয়ে প্যানেল আলোচকরা বলেছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। তারা আরও বলেছেন, সরকারকে যত দোষই দেয়া হোক না কেন, নির্বাচন কমিশনের উচিৎ ছিল সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করা। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর টিসিবি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপের একশ পনেরতম পর্ব। অনুষ্ঠানে প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার (অব:) আ স ম হান্নান শাহ, ডেমোক্রেসিওয়াচের নির্বাহী পরিচালক তালেয়া রেহমান এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত দর্শকদের বেশিরভাগ প্রশ্ন ছিল সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে। দর্শকদের প্রশ্নের জবাবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, এর আগে ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এ সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে হয়েছে এবং বিএনপি জয়ী হয়েছে। প্রশ্ন শুধু এই নির্বাচন নিয়েই। এ অভিযোগ ভিত্তিহীন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি পথ হারিয়েছে। তারা একই সঙ্গে সন্ত্রাস করবে আবার গণতন্ত্রও চাইবে তা হবে না। সুরঞ্জিত বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও আসলে এগুলো দলীয় নির্বাচনই। রাজনীতির মেরুকরণ হয়েছে। একদিকে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দল আর মৌলবাদী গোষ্ঠি। তবে, আইন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় রাজনীতির প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি নেতা হান্নান শাহ বলেন, সিটি নির্বাচনে ৯৮ ভাগ নির্বাচনী কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সেখানে কোন সুষ্ঠু ভোট হয়নি। তবে, এবিষয়ে সরকারকে যত দোষই দিই না কেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার চেষ্টায় আছে বিএনপিকে বাদ দিয়ে জাতীয় পার্টিকে রাজনীতির তৃতীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশে এখনও কোন শক্তিশালী তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয়নি। তালেয়া রেহমান বলেন, এটা একেবারেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন, এর ফলাফল নিয়ে এতো আলোচনার কিছু না থাকলেও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিএনপিকে গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হলে, নতুন নেতাকর্মী দিয়ে সংগঠিত করতে হবে। আলোচনায় শাহীন আনাম বলেন, নির্বাচনে ভোট নিয়ে জালিয়াতি হয়েছে, আবার অনেক জায়গায় হয়নি। কিন্তু জালিয়াতির কোন চিত্র নির্বাচন কমিশন বা নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল, সরকার বা বিরোধী দল কারও কাছ থেকেই আসেনি। এটা প্রকাশ হওয়া দরকার। নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন।

শিশুর ঘুম কেড়ে নিচ্ছে টিভি, ফোন, ইন্টারনেট

টিভি, ফোন ও ইন্টারনেটের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার
বড়দের পাশাপাশি শিশুদের ওপরও বিরূপ প্রভাব
ফেলছে। এগুলো শিশুদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।
টিভি, ফোন কিংবা ইন্টারনেট ছাড়া আধুনিক জীবনযাত্রা কল্পনাই করা যায় না। এগুলো এখন জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশেই পরিণত হয়েছে। কিন্তু টিভি, ফোন ও ইন্টারনেটের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার বড়দের পাশাপাশি শিশুদের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এগুলো শিশুদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে দিনের বেলা তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। কাজে মনোযোগ কমে যায়। সব মিলিয়ে পড়ালেখা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভারতের সফদারজং হাসপাতাল পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ বছর বয়সী অনেক শিশুই মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে থাকে। আর ১১ বছর বয়সী বেশির ভাগ শিশুই রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার আগে ঘুমাতে যায় না। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
শিশুরা রাত জাগলেও ঠিকই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হচ্ছে তাদের। কারণ বেশির ভাগ স্কুলেই সকাল আটটা থেকে ক্লাস শুরু হয়। এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে একজন গবেষক জানান, ৫০০টি স্কুলে গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, শিশুদের এক-তৃতীয়াংশই দিনের বেলা ঝিমোয় এবং ছুটির দিনে মাত্রাতিরিক্ত ঘুমায়। তারা ঠিকমতো স্কুলে যায় না। পড়ালেখায় ভালো করতে পারে না। দিনের বেলা তারা সতেজ থাকতে পারে না। সারা দিন বিরক্তিকর অনুভূতি কাজ করে তাদের ভেতর।
কেবল ভারতেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সম্প্রতি দেশটিতে একটি জরিপ পরিচালনা করে ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন নামের একটি এনজিও। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মোট শিশুর অর্ধেকেরও কমসংখ্যক শিশু পর্যাপ্ত সময় নিয়ে ঘুমায়। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতির কারণে শিশুরা পড়ালেখাসহ অন্যান্য কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। পরীক্ষার ফলাফল খারাপ করছে। সম্প্রতি স্কুলের ক্লাস শুরুর সময় এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেড্রিয়াট্রিকস।
এদিকে সফদারজং হাসপাতালের স্লিপ মেডিসিন বিভাগের প্রধান ড. জে সি সুরিও স্কুলের ক্লাস শুরুর সময় পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ভাষ্য, শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব কাটানোর জন্য স্কুলের ক্লাস শুরুর সময় পিছিয়ে দেওয়াই একমাত্র পথ বলে আমি মনে করছি। কারণ ইন্টারনেট কিংবা মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে পারেন না আপনি। শিগগির আমরা দিল্লি স্কুলকে ক্লাস শুরুর সময় পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেব। শিশুদের স্বাস্থ্য এবং পড়ালেখার মানোন্নয়নে জন্যই এমনটা করব আমরা।
দিল্লির একটি ইন্টারনেট ডি-অ্যাডিকশন সেন্টারের কর্ণধার রাহুল ভার্মা বলেন, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও এখন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং হাইক-এর মতো অ্যাপ ব্যবহার করছে। ইন্টারনেটে আসক্তির কারণে তাদের পড়ালেখা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে-বিষয়টি তাদের বোঝান বেশ কঠিন।
এদিকে শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করার জন্য অভিভাবকদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক মনবীর ভাটিয়া। তাঁর মতে, ‘আমরা দেখেছি, অভিভাবকেরা শিশুদের ঘুমাতে যাওয়ার কথা বলে নিজেরা রাত জেগে টিভি দেখেন। তাঁদের সঙ্গে শিশুরাও টিভি দেখে কিংবা রাত জেগে গল্প করে। শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করার জন্য অভিভাবকদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।’

মে দিবস যেমন কাটছে শ্রমিকদের

ছবি: শহীদুল ইসলাম, প্রথম আলো
ছবি: কমল জোহা খান, প্রথম আলো
ছবি: ফোকাস বাংলা, প্রথম আলো
মহান মে দিবস আজ। শ্রমিকদের আজ অধিকার আদায়ের দিন। কিন্তু বাস্তবে তাদের কতটুকু অধিকার আদায় হয় এই দিনে? বেশির ভাগ শ্রমিক জানেন না মে দিবস কী? এ দিন গণমাধ্যমে কেন তাদের নিয়ে আলোচনা চলে। রাস্তায় কেন তাদের নিয়ে মিছিল বের হয়। জানার সময় কোথায়? প্রতিদিনের মতো এদিনও তারা নেমে পড়েন রাস্তায়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন।
সারা দিন মাথায় করে মাটি বয়ে বেড়ান এরা। বিনিময়ে মেলে ২২০ টাকা। মে দিবসের দিনটিও কাটবে এভাবে। সকাল হতেই কাজে নেমে পড়েছেন তারা। ছবিটি রাজশাহীর শিরোইল মোল্লা মিল এলাকা থেকে তোলা।
মে দিবস উপলক্ষে আজ একটু বেশিই ব্যস্ত নয় বছরের হাবিব। ছুটির দিনে অনেকেই আজ বাজার করছেন বেশি। আর তাদের ভারী ব্যাগ টানছে হাবিব। ব্যাগ টানতে কষ্ট হলেও উপায় নেই। বরং টানতে পারলেই খুশি হাবিব। কারণ এভাবেই খাবার জুটবে।
মে দিবসে নয় বছরের হাবিব ব্যাগ ভরে বাজার করেনি। অন্যের করা বাজার টানছে সে। মে দিবস কী তা সে জানেই না। জানতে চাইলে পাল্টা বলে ‘এইডা আবার কী’। হাবিব অন্যের কেনা বাজার বয়ে বেড়ায়। মে দিবসেও থেমে নেই কাজ।
ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় মে দিবসের সকালে দেখা মেলে ঘামে ভেজা এই রিকশাচালকের সঙ্গে। গরমে এই তালপাতার পাখার বাতাসে ঠান্ডা হবেন অনেকেই। সেগুলো বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
মে দিবসে ছুটি মিলেছে পোশাক শ্রমিকদের। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে তারা নেমেছেন রাস্তায়। কিন্তু অধিকার আদায়ের এসব দাবি কবে পূরণ হবে জানেন না কেউই।

পশ্চিমা উদ্বেগে বিচলিত নয় সরকার: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সিটি নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপি তদন্তে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের ফোনসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত উদ্বেগে সরকার বিচলিত নয় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তবে তিনি বলেছেন, পশ্চিমা দেশ ও সংস্থাগুলোর পরামর্শে ভবিষ্যতের নির্বাচনে ইলেকট্রনিক  ভোটিং সিস্টেম চালুর বিষয়টি সরকার সক্রিয় বিবেচনায় রেখেছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ফরেন অফিস স্পাউসেস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের কাছে মন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিন সিটির নির্বাচনে অনিয়ম এবং বিএনপির বর্জনের ঘটনায় অসন্তোষের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ ক’টি দেশ। উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছেন স্বয়ং জাতিসংঘের মহাসচিব। প্রশ্নবিদ্ধ ওই নির্বাচন নিয়ে সমালোচনায় মুখর মার্কিন কংগ্রেসও। তবে এ নিয়ে সরকার যে খুব চিন্তিত মন্ত্রীর কথায় সেটি পাওয়া যায়নি। সেখানে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উগ্রবাদ মাথা চাড়া দিতে পারে এমন আশঙ্কাও নাকচ করেন মন্ত্রী মাহমুদ আলী। তিনি সরকারের অবস্থানের পক্ষে পাল্টা যুক্তি উত্থাপন করে বলেন, এ নিয়ে আমরা বিচলিত নই- কারণ বিএনপির নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা করছিল। এটি পূর্বপরিকল্পিত, এটা তাদের কৌশলও। মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারম্যান ২৮শে এপ্রিলের নির্বাচনের ঠিক পরপরই বাংলাদেশ সফরে আসেন। তার সফরের সঙ্গে নির্বাচনের  কোন সম্পর্ক আছে কিনা এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, না, নির্বাচনের সঙ্গে সফরের কোন সম্পর্ক নেই। ইলেক্ট্রনিক ভোটিং সিস্টেম প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এটা খুবই দরকার। ডিজিটাল বিষয়টাকে বাংলাদেশ খুব ভালোভাবে নিয়েছে। আমার মনে হয় সেটাও সমাদৃত হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের স্পাউসদের বৈশাখী ওই আয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ছাড়াও দেশী-বিদেশী কূটনীতিক সপরিবারে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে অনেক বিদেশী দূত বাঙ্গালীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পড়েছিলেন তারা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উপভোগ করেন। বর্ষবরণের এমন আয়োজনে দেশী-বিদেশী কূটনীতিকদের মেলবন্ধন পারস্পরিক সম্পর্কে আরও জোরদার করবে বলে আশা করেন আয়োজকরা।

নারায়ণগঞ্জে সাত খুন- ছোট্ট রোজার দিন কাটে না by আসিফ হোসেন

বাবা জাহাঙ্গীরের ছবির পাশে ছোট্ট রোজা l ছবি: প্রথম আলো
স্বামী পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার তিন মাস পর শামসুন নাহার নূপুরের কোল আলোকিত করে পৃথিবীতে আসে রোজা। সেই ছোট্ট মেয়ে রোজার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন নূপুর গতকাল বৃহস্পতিবার স্বামী হারানোর এক বছর পূর্তির দিনটি স্মরণ করে চোখের পানি ফেললেন।
নূপুরের স্বামী জাহাঙ্গীর ছিলেন গাড়িচালক। মাত্র ১১ মাসের দাম্পত্য জীবনের শেষ দিনটি ছিল গত বছরের ২৭ এপ্রিল। ওই দিন নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র নজরুলসহ গুম হওয়া সাতজনের একজন ছিলেন জাহাঙ্গীর। তিনি ছিলেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান খানের ব্যক্তিগত গাড়িচালক। ওই গাড়িতে চড়েই নারায়ণগঞ্জের আদালত থেকে বেরিয়ে ঢাকার দিকে যাচ্ছিলেন নজরুলসহ পাঁচজন।
স্বামীর গুম হওয়ার খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন নূপুর। তবে আশা ছিল স্বামীকে ফিরে পাবেন। কিন্তু ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে জাহাঙ্গীরসহ ছয়জনের এবং পরদিন একজনের লাশ ভেসে ওঠে। নূপুরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে জাহাঙ্গীরের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। তিন মাস পর একই হাসপাতালে জন্ম নেয় রোজা। এই রোজার জীবনে এখন নেমে এসেছে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা।
সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী উত্তরপাড়া এলাকায় গিয়ে খুব একটা বেগ পেতে হয় না জাহাঙ্গীরের বাড়ি খুঁজতে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেয় বাড়িটি। সেখানে গিয়ে পাওয়া গেল জাহাঙ্গীরের মা, স্ত্রী ও ছোট্ট রোজাকে।
নূপুর বলেন, ‘বাবার সাথে রোজার দেখা হয়নি। কখনো আর হবেও না কোনো দিন। তার পরও বাবার ছবি সামনে নিলেই অস্পষ্ট ভাষায় বাবাকে কি যেন বলতে চায় রোজা।’ এটুকু বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নূপুর। তিনি বলেন, বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে হোক কিংবা মেয়ে হোক, তাকে ডাক্তার বানাবে। সকাল সাতটা থেকে বিকেল ছয়টা পর্যন্ত পোশাক কারখানায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মাসে ছয় হাজার টাকা পারিশ্রমিক পান তিনি। তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই নিহত ব্যক্তিদের পরিবার দেখা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে।
নূপুর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তো আছি।’ কিন্তু গত এক বছর তাঁর কাছ থেকে আর কোনো ডাক পাননি তাঁরা।
স্বামীর কথা স্মরণ করতে গিয়ে নূপুর বলেন, শেষ দিনটিতে ব্যস্ততার কারণে সকালের নাশতা না খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। আর্থিক কষ্টের কারণে বিয়ের পর শখ কিংবা বিলাসিতা বলে তাঁর জীবনে কিছুই আসেনি। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে দু-একজন ছাড়া আর সবাই শুধু আশ্বাসের কথা শুনিয়েছেন।
তিনি বলেন, মেয়ে বড় হলে হয়তো জিজ্ঞেস করবে, তার বাবা কেমন ছিল? এ নিয়েও শঙ্কিত নূপুর। মেয়ে যখন শুনবে তার বাবাকে র্যা ব মেরে ফেলেছে, তখন হয়তো বাবাকে সে খারাপ মানুষ ভাববে। কিন্তু নূপুর তো জানেন অযথাই র্যা বের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল তাঁর স্বামীকে।
জাহাঙ্গীরের মা মেহেরুন নেসা তাঁর নিরপরাধ ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। মা নূপুর দিনের প্রায় ১২ ঘণ্টা পোশাক কারখানায় কাজে ব্যস্ত থাকেন। ছোট্ট রোজার দিনগুলো কাটে দাদির সঙ্গেই। রোজার কথা বলতে গিয়ে দাদি মেহেরুন নেসা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। শুধু রোজার সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা চাইলেন তিনি।

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রস্তুতি by আলী আকবর মল্লিক

নেপালে শনিবারের ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি,
ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩২১৮ জনে পৌঁছেছে
২৫ ও ২৬ এপ্রিল পরপর দুদিন ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ। এর কেন্দ্র নেপালে, দুদিন ধরে সেখানে দফায় দফায় ভূমিকম্প ঘটেই চলেছে। রাজধানী কাঠমান্ডুসহ দেশজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞে প্রাণহানি এরই মধ্যে দুই হাজারের কাছাকাছি পেঁৗছেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারত ও ভুটানের মতো কাছের দেশগুলোও। উত্তর ভারতেও অর্ধশত প্রাণহানি ঘটেছে। বাংলাদেশেও তিনজন লোক মারা গেছে বলে গণমাধ্যমে এসেছে। রাজধানী ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে কিছু ভবন হেলে পড়েছে বলে জানা গেছে। আশপাশের দেশে ভূমিকম্প ঘটলে আমরা কিছুটা নড়েচড়ে বসি। কিছুদিন যেতে না-যেতে আবার বিষয়টি ভুলে যাই। ভূমিকম্প যেহেতু বলে-কয়ে আসে না এবং পৃথিবী থেকে এর বিদায় নেওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই, তাই ভূমিকম্পে প্রস্তুতি ও সচেতনতা বৃদ্ধি করে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।
একটি ভূমিকম্পের মাত্রা একটিই, যা রিখটার স্কেল দিয়ে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু কম্পনের তীব্রতা একাধিক, যা ভূমিকম্পটির উৎসস্থল থেকে দূরত্বের সঙ্গে সাধারণত কমতে থাকে এবং মডিফায়েড মার্সিলি ইনটেনসিটি (এমএমআই) স্কেল দিয়ে প্রকাশ করা হয় (১ থেকে ১২ রোমান সংখ্যার মাধ্যমে)। নেপালে ২৫ এপ্রিলের এই ভূমিকম্পে কাঠমান্ডুতে আট থেকে নয়, ভারতের উত্তরাঞ্চলে সাত থেতে আট, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে চার থেকে পাঁচ, ঢাকায় তিন থেকে চার তীব্রতা ছিল। মাত্রা এবং তীব্রতাকে গুলিয়ে ফেলে একত্রীকরণ করা ভুল, যা গণমাধ্যমের কর্মীরা প্রায়ই করে থাকেন। বাংলাদেশ ছোট তীব্রতায় কম্পিত হলেও মানুষ ভয়ংকরভাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছে।
একসময় ছিল যখন ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দ্বিতল বাড়ির অধিক উচ্চতার বাড়ি ছিল না। ওই অবস্থায় ভূমিকম্প হলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাড়ির বাইরে খোলা জায়গায় বের হয়ে আসা সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন বহুতল বা সুউচ্চ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলো থেকে ৩০-৪০ সেকেন্ডের একটি কম্পনের মুহূর্তে গ্যাসলাইন, বিদ্যুৎ লাইন ইত্যাদি বন্ধ করে হাঁকডাক দিয়ে পরিবারের লোকজন সঙ্গে করে বের হয়ে আসা (তা–ও লিফট ব্যবহার করা যাবে না বলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে) অসাধ্য। কম্পনের মুহূর্তে এসব সুউচ্চ ভবন থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা না করে নিজ নিজ ফ্ল্যাটের মধ্যে আশ্রয় খোঁজা ভালো, যে সম্পর্কে নির্দেশনামূলক লেখা প্রথম আলোসহ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তবে ফ্ল্যাটটি যে বহুতল ভবনে অবস্থিত, সেই ভবন সম্পর্কে বাসিন্দাদের আস্থা থাকতে হবে। এই আস্থা তৈরিতে ভবনকে ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা দরকার। যে দেশে ভবন ভূমিকম্প ছাড়াই তার নিজ ভারে এবং তার মধ্যে থাকা জিনিসপত্র ও মানুষের ভারে ভেঙে পড়ার একাধিক ঘটনা আছে, সে দেশে এই আস্থা তৈরি সহজ বিষয় নয়।
যে ভবনে একজন বাসিন্দা বসবাস করেন, সেই ভবনটির ওপর বাসিন্দাদের আস্থা তৈরির কাজে দেশের রিয়াল এস্টেট ডেভেলপার, ডেভেলপারদের সংগঠন রিহ্যাব এবং রাজউকের দায়িত্ব অপরিসীম। দেশে থাকা ভূমিকম্পের কোড মেনে তাঁরা ভবন ডিজাইন ও নির্মাণ করছেন কি না, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা দরকার। ভবনের ওপর আস্থার সঙ্গে কম্পনের সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ও মাঝারি তীব্রতার কম্পন বছরে কয়েকবার অনুভূত হলে নাগরিকদের মধ্যে একধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে এমন কম্পন অনেকবার অনুভূত হয়েছে। কিন্তু কম্পনের সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। জাপানের টোকিও শহরে শিনজুকু এলাকায় ৫০ তলা বা তদূর্ধ্ব ভবন কয়েক ডজন আছে। অফিসের সময় বড় তীব্রতার কম্পন হলেও এসব অফিসে কাজ করা লোকজন এক ইঞ্চিও নড়েন না। বরং তাঁরা আশপাশের ভবনগুলোর দোল খাওয়া নিজ ভবনের প্যানারোমিক উইন্ডো থেকে দেখে মজা পান। এর মূল কারণ স্টিলের ফ্রেমের ওপর তৈরি (কিছু কংক্রিটের তৈরি) এসব ভবন কতটা তীব্রতা সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে সে সম্পর্কে জনগণের আস্থা।
বাংলাদেশে নতুন তৈরি হওয়া ভবনের দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। বিশেষ করে আবাসিক ভবনগুলোর নিচতলার কার পার্কিং তলাটি শুধু বিম-কলামের ওপর নির্মিত। বিম-কলাম কাঠামোর মধ্যে ইটের বা আরসি ওয়াল বা আরসি/স্টিল ব্রেসিং নির্মাণ করা হয় না। কিন্তু একই ভবনের বাসযোগ্য তলাগুলোতে বিম-কলাম কাঠামোর মধ্যে ইটের কাজ করা দেয়াল থকে। এর ফলে কার পার্কিং তলাটি নিকটবর্তী ওপরের বাসযোগ্য তলার চেয়ে পার্শ্বশক্তি সহনশীলতার বিচারে দুর্বল হয়, যা প্রকৌশল বিষয়ের ভাষায় সফট স্টোরি নামে পরিচিত। ভূমিকম্পের মুহূর্তে একটি ভবন কর্তনীয় ও বক্রনীয় পীড়ন দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই পীড়নদ্বয়ের প্রভাব একটি ভবনের ওপর থেকে যতই নিচের দিকে নামতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে। যেহেতু কার পার্কিং তলাটি ভবনের সর্বনিম্ন তলা, তাই এই তলাটিতে সবচেয়ে বড় মাত্রার কর্তনীয় ও বক্রনীয় পীড়ন কাজ করে।
তবে নিম্ন বা মধ্য উচ্চ তলা ভবনের ক্ষেত্রে বক্রনীয়র চেয়ে কর্তনীয় পীড়নের প্রভাব বেশি হওয়ায় এই কারণেই ভবন সহজে বিধ্বস্ত হয়। জাপান, চিলি, হাইতি, তুরস্ক, তাইওয়ানসহ যেকোনো দেশে ঘটা ভূমিকম্পে ভবনের এই ত্রুটির কারণে বিধ্বস্ত হতে দেখা গেছে। বাংলাদেশে এই বিষয়ে সচেতনতার প্রচণ্ড অভাব রয়েছে বলে এই ত্রুটি নিয়ে ভবন নির্মাণ হয়েই চলেছে। বিষয়টি নিয়ে সেমিনারে, ওয়ার্কশপে, পত্রপত্রিকায় যখন যেখানে সুযোগ হয়েছে বলেছি বা লিখেছি গত এক যুগের বেশি সময় ধরে। এ বিষয় ইদানীং বা এক যুগ পরে কিছু ভবন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সচেতনতা কিছুটা লক্ষণীয়। তা ছাড়া অল্প কয়েক বছর আগে ইউএনডিপির অর্থায়নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোর একটি গবেষণায় এর সপক্ষে জোরালো সত্যতা মিলেছিল।
এ ছাড়া আর একটি ত্রুটি হচ্ছে বিম বাদ দিয়ে ভবনকে শুধু পুরু স্লাব দ্বারা নির্মাণ করা। যদিও এর নির্মাণব্যয় অধিক তবুও নির্মাতা/ক্রেতা সবার কাছে এর জনপ্রিয়তার কারণ বিম না থাকায় দেখতে সুন্দর, ফ্ল্যাটের ভেতরে কক্ষ পুনর্বিন্যাস সহজ এবং নির্মাণকাজ সহজ বলে। কিন্তু মোটা পুরু স্লাবের কারণে ভবনের প্রতিতলার ওজন বেড়ে যায়, যা ভূমিকম্পের মুহূর্তে বেশি পার্শ্বশক্তির জোগান দেয় বলে ভবন সহজে বিধ্বস্ত হয়। বিধ্বস্ত হয়ে একটির ওপর আর একটি ফ্ল্যাট প্লেট স্যান্ডউইচ আকার ধারণ করে, যা অধিক প্রাণহানির কারণ হয়। তাই ফ্ল্যাট প্লেট দিয়ে ভবন নির্মাণ না করে বিম-স্লাব দিয়ে করতে হবে।
যে ভবনগুলো সফট স্টোরি বা পুরু স্লাব দিয়ে তৈরি হয়ে আছে, সেসব ভবনের নিচতলাটি রেট্রোফিটিং করা দরকার। রেট্রোফিটিং বিষয়টি হলো একটি দুর্বল কাঠামোকে শক্তিশালীকরণ। কাঠামোটি যখন নির্মিত হয়েছিল তখন অজ্ঞতাবশত বা যে কারণেই হোক দুর্বলভাবে নির্মিত হয়েছিল, পরে তাকে প্রয়োজনীয় শক্তিশালীকরণই হচ্ছে রেট্রোফিটিং। যদি রানা প্লাজার কলামে ফাটল দেখার পর ব্যবহার থেকে বিরত থেকে ভবনের কলামকে রেট্রোফিটিং করা হতো, তবে ওই বিপর্যয় খুব সহজে এড়ানো যেত। কলামকে আরসি জ্যাকেটিং করে এবং দুই কলামের মাঝে ব্রেসিং, সিয়ার ওয়াল বা উইং ওয়াল নির্মাণ করে দুর্বল কার পার্কিং তলাটিকে রেট্রোফিটিং করা যায়। এ জন্য সচেতনতার বিষয়টি খুবই জরুরি। ২০ কোটি টাকার একটি ভবনের দুর্বল বা ত্রুটি ২০ লাখ টাকা খরচ করে শক্তিশালী করিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো ইচ্ছা থাকতে হবে।
জাইকার অর্থায়নে ঢাকার সেগুনবাগিচার গণপূর্ত ভবনের একটিতে কয়েকটি পদ্ধতিতে রেট্রোফিটিংয়ের কাজ করে রাখা হয়েছে, যা সহজেই সরেজমিনে দেখা যেতে পারে। এই প্রজেক্টের আওতায় ঢাকার তেজগাঁও ফায়ার স্টেশন ভবনটিকে রেট্রোফিটিং করা হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের ফায়ার স্টেশন ভবন, হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত ভবন ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবন রেট্রোফিটিং করে ভূমিকম্প সহনশীল করা হবে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন সংস্থার অনেক প্রকৌশলীকে কারিগরি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ–সংক্রান্ত প্রকৌশল বিষয়ের ওপর প্রয়োজনীয় তথ্যাদি গণপূর্ত ভবনে যোগাযোগ করে পাওয়া যেতে পারে।
ভবনের নকশা ও কাঠামোর ডিজাইন করার সময় এই ত্রুটির বিষয়টি স্থপতি ও কাঠামো প্রকৌশলীর মাথায় থাকা দরকার। ঢাকার রাজউকসহ দেশের অন্যান্য শহরে প্ল্যান পাস করা কর্তৃপক্ষ যেন কার পার্কিং তলাটিতে বিম-কলামের সঙ্গে আরসি ব্রেসিং বা সিয়ার ওয়াল বা উইং ওয়াল থাকা বাধ্যতামূলক করে। এ ছাড়া দেশের পাঁচটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ও সব কটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে রেট্রোফিটিং বিষয়টি পাঠদানের অন্তর্ভুক্ত করা খুবই প্রয়োজন। এর মধ্য দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে নিরাপদ ভবনে রূপান্তরিত করা দরকার। আর নতুন ভবনগুলো যেন এসব ত্রুটিমুক্ত থাকে, সেদিকে খেয়াল থাকা দরকার। তাহলে ভবনের ওপর বাসিন্দাদের আস্থা সুদৃঢ় হবে।
ড. আলী আকবর মল্লিক: কাঠামো প্রকৌশলী, ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সাবেক মহাসচিব। বর্তমানে কম্বোডিয়ার নমপেনে কর্মরত।

আওয়ামী লীগের গর্জন ও বিএনপির বর্জন by সোহরাব হাসান

সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হয়েছে- প্রধানমন্ত্রী
সকাল নয়টা। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের সামনে একদল তরুণ। সবার বুকে বা গলায় ঝোলানো সাঈদ খোকনের ইলিশ মাছ ও ঘুড়ি মার্কা ব্যাজ। ঘুড়ি ওই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী মুন্সী কামরুজ্জামানের প্রতীক। তাঁদের কেউ দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। কেউ ভোটারদের নম্বর বের করে দিচ্ছেন। এর আগে পথে ক্রাচে ভর দেওয়া এক প্রৌঢ়ের সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করি, ভোট দিয়েছেন? সহাস্যে বললেন, ‘ভোট দিইনি। তবে আমার ভোট আমি আব্বাস ভাইকেই দেব। কিন্তু কেন্দ্রে আব্বাস ভাইয়ের সমর্থক কাউকে পেলাম না।’ কেন্দ্রের ভেতরে নারী ভোটারদের লম্বা লাইন। তুলনায় পুরুষ ভোটারের সংখ্যা কম। ইলিশ মাছ ও ঘুড়ি মার্কাধারী তরুণেরা তাঁদের তদারক করছেন। প্রতিটি বুথে পোলিং কর্মকর্তারা ভোটারদের মুড়ি ছিঁড়ে ব্যালট পেপার দিচ্ছেন। সামনের টুলে বসা দুতিনজন পোলিং এজেন্ট। সবাই ইলিশ মাছ ও ঘুড়ি মার্কার সমর্থক। জিজ্ঞেস করলাম, মগ মার্কা বা অন্য প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট কোথায়? পোলিং কর্মকর্তা বললেন, আর কেউ আসেননি।
ফেরার পথে গেটে আনসার ভিডিপির জ্যাকেট পরা কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলেকে দেখলাম। কারও কারও বয়স ১৫-১৬। গায়ে আনসার ভিডিপি জ্যাকেট থাকলেও তারা আনসার বাহিনীর কেউ নয়। কেবল ভিকারুননিসা নূন স্কুল নয়, ঢাকা দক্ষিণের যে কটি কেন্দ্র ঘুরেছি, সবটাতেই আনসার ভিডিপির জ্যাকেট পরা এই অল্পবয়সী তরুণ-তরুণীদের দেখেছি।
এরপর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাইস্কুলের কেন্দ্রে গিয়ে দেখি ভোটার সংখ্যা খুবই অল্প। পোলিং কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উটকো লোকও আছেন। একজন–দুজন করে ভোটার ভোট দিচ্ছেন। এরই মধ্যে একটি বুথে কয়েকজন তরুণ ব্যালট বাক্সে বেশ কিছু ব্যালট গুঁজে দিলেন। পোলিং কর্মকর্তা দেখেও দেখলেন না। বুথ থেকে বেরিয়ে আসতেই আবু জুবায়ের মো. মিরাতিল্লাহ নামে একজন কাউন্সিলর প্রার্থী, যাঁর মার্কা করাত, আমাদের দেখে ছুটে এলেন। বললেন, ‘আপনাদের কাছে প্রতিকার চাই। আমি কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েও ভোট দিতে পারিনি। সকাল সাড়ে আটটায় কেন্দ্রে এসে দেখি, আমার ভোটটি দেওয়া হয়ে গেছে।’ তিনি প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন। এ রকম আরও কয়েকজন অভিযোগ করলেন, তাঁরা ভোট দিতে পারেননি।
ওখানেই আলাপ হয় ফেমার পর্যবেক্ষণ দলের সদস্য শাহজাহান ছিদ্দিকি ও নাজমা চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁরা এর আগে ইস্কাটন এলাকার কয়েকটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন দেখলেন? বললেন, তথৈবচ।
রাস্তা পার হতেই শান্তিনগরের একটি ভোটকেন্দ্র। ভেতরে ঢুকে দেখি থমথমে অবস্থা। আমাদের ঢুকতে দেখে কয়েকজন তরুণ বাঁকা চোখে তাকালেন। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা হেসে বললেন, ভোট শান্তিপূর্ণভাবেই হচ্ছে। কোনো গোলযোগ নেই। এর মধ্যে দক্ষিণে সিপিবি-বাসদের সমর্থক মেয়র প্রার্থী বজলুর রশীদ ও কাউন্সিলর প্রার্থী শম্পা বসু কয়েকজন সমর্থককে নিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে আসতেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। মেয়র প্রার্থীর সমর্থকেরা জানান, সকালে এই এলাকার প্রতিটি কেন্দ্রে তাঁরা পোলিং এজেন্ট পাঠালেও তাঁদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এঁদের মধ্যে ছিলেন পারভীন বেগম, শাম্মী আরা সাথি, মো. ইসয়াসিন। আমাদের দেখে ইলিশ মাছের সমর্থক একজন তরুণ এসে বললেন, কেন্দ্রের ভেতরে সাংবাদিকদের প্রবেশ করার নিয়ম নেই। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো আপনি কোন নিয়মে কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকেছেন। এ নিয়ে কিছুটা বাগ্বিতণ্ডা দেখা দিলে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ওই তরুণসহ সবাইকে বাইরে যেতে বললেন। কিন্তু বজলুর রশীদের সমর্থকেরা জানতে চান, কেন তাঁদের পোলিং এজেন্টদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এরপর দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা এখানে গোলযোগ করবেন না বলে সবাইকে কেন্দ্রের বাইরে যেতে বলেন। মেয়র প্রার্থীর সমর্থক একজন নারী কর্মী, যিনি নিজে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, ভিকারুননিসায় নারী ভোটারদের লম্বা লাইনের রহস্যভেদ করলেন। বললেন, রাতে বাস ভর্তি করে নারী শ্রমিকদের বাড্ডা এলাকায় নিয়ে আসা হয়েছে।
পরে আমরা মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বাড়ির পাশের কেন্দ্র শাহজাহানপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে যাই। সেখানকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট আছেন। তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম, কেমন ভোট হচ্ছে? বললেন, ভালো। অনেকগুলো বুথে বিভক্ত এই কেন্দ্রে ভোটের হারও সন্তোষজনক। বেলা ১১টা নাগাদ ৩০ ভাগ ভোট হয়ে গেছে। সেখানেই আলাপ হয় প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সৈয়দ লিয়াকত হোসেনের সঙ্গে। তিনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। কেমন ভোট হচ্ছে জিজ্ঞেস করলে বললেন, খেলতে নেমে মাঠে সক্রিয় না থাকলে যা হওয়ার তা–ই হচ্ছে।
ইতিমধ্যে খবর এল বিএনপি চট্টগ্রামে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে উপস্থিত আরেকজন বললেন, খালেদা জিয়া নীরব ভোট বিপ্লবের ডাক দিয়ে এখন নীরবে প্রস্থান করছেন। মাঝখানে দলের কর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
শাহজাহানপুর থেকে আরও কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাই। ইতিমধ্যে বিএনপি ঢাকায়ও ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বললেন, এটা কোনো নির্বাচনই নয়। সরকার ও নির্বাচন কমিশন মিলে সিটি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে। তাঁর পাশে ছিলেন দুই মেয়র প্রার্থী উত্তরের তাবিথ আউয়াল ও দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস।
বিএনপি অফিসে নেতা-কর্মীদের চেয়ে সাংবাদিকদের ভিড়ই বেশি। নিচের তলায় নামতে দলের দুই নারী কর্মীকে দেখলাম বেজার মুখে বসে আছেন। তাঁদের জিজ্ঞেস করি, আপনারা পোলিং এজেন্ট দিলেন না কেন? মাঠ ছেড়ে দিলেন কেন? বললেন, পুলিশ রাতেই পোলিং এজেন্টদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। তাদের বাবা-মাকে শাসিয়েছে। জীবনের মায়া সবার আছে। তাঁরা বললেন, আপনারা যা দেখলেন, তাই লিখুন।
নিচে নেমে এক ট্যাক্সিচালককে জিজ্ঞেস করলাম, ওপরে কী হচ্ছে জানেন? বললেন, ‘ম্যাডাম এসেছেন।’ না, খালেদা জিয়া তো আসেননি। তিনি বললেন, ‘আমি খালেদা জিয়ার কথা বলিনি। বলেছি, আফরোজা ম্যাডামের কথা।’ আসলে গত তিন সপ্তাহে বিএনপির যদি কোনো অর্জন থেকে থাকে একজন গৃহবধূকে নেত্রীর আসনে নিয়ে আসা। দক্ষিণের বিএনপির কর্মীদের কাছে আফরোজা আব্বাসই ম্যাডাম।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

প্রবাসীর টাকায় সেতু by প্রনঞ্জয় বৈদ্য

প্রবাসীর অর্থায়নে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় বাসিয়া নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। উপজেলার কোনারাই বাজার ও কাহিরঘাট বাজারের সংযোগস্থলে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মুজিবুর রহমান তাঁর দাদি মোছা. ফুলেছা বেগমের নামে সেতুটি নির্মাণ করেছেন।
সেতুটি নির্মাণের ফলে সিলেটের বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার মানুষের যাতায়াতের ঝুঁকি ও কষ্ট কমেছে। সরকারের অনুমতি নিয়ে ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮ ফুট প্রস্থের সেতুটির নির্মাণকাজ ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়। নির্মাণকাজ শেষে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ‘মোছা. ফুলেছা সেতু’র উদ্বোধন করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম।
এলাকার অনেকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে এখানে সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু কাজ হয়নি। অবশেষে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে সেই দাবি বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছেন মুজিবুর রহমান। সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা।
এলাকার শিক্ষক আকবর আলী বলেন, মহৎ মনের অধিকারী না হলে কেউ এমন কাজ করতে পারেন না। সেতুটি নির্মাণের ফলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হয়েছে। রোগীদের অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা হলো।
ইউপি সদস্য খায়রুল আমিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সেতু নির্মাণের চেষ্টা চললেও বাস্তবায়ন হচ্ছিল না। অবশেষে মুজিবুর রহমানের কল্যাণে তা সম্ভব হয়েছে। এলাকাবাসী চিরদিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করবেন।
বিশ্বনাথ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ আসাদুল হক বলেন, এ ধরনের সেতু নির্মাণ করতে উপজেলা পরিষদের আনুমানিক চার বছর সময় লাগবে। কিন্তু মুজিবুর রহমান এলাকাবাসীর দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে স্বল্প সময়েই তা বাস্তবায়ন করেছেন। সত্যিই এ কাজের জন্য তিনি সবার প্রশংসার দাবিদার।
বিশ্বনাথ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সুহেল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতাসংগ্রাম থেকে শুরু করে সব সময় এলাকার প্রবাসীরা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। অন্য উপজেলার বাসিন্দা হয়েও প্রবাসী মুজিবুর রহমান বিশ্বনাথে সেতুটি নির্মাণ করে তা আবারও প্রমাণ করলেন। মানবকল্যাণে তাঁর মতো যেসব প্রবাসী কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের জানাই হাজারো সালাম।’
বালাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদাল মিয়া বলেন, ‘সেতুটি নির্মিত হওয়ায় তিনটি উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ উপকৃত হবে। মুজিবুর রহমানকে আমরা (এলাকাবাসী) আজীবন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখব।’
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সিলেটের প্রবাসীরা আন্তরিক। তাই সব সময় তাঁদের পাশে থেকে কাজ করতে চাই। মুজিবুর রহমানের মতো মানুষের সংখ্যা সমাজে কম। তাঁর মতো এলাকার সব বিত্তবান ও প্রবাসীকে এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। এত টাকা দিয়ে সেতু নির্মাণ করে মুজিবুর রহমান উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার পূর্ব মান্দারুকা গ্রামের মো. আবদুল মানিক ও মোছা. দিলারা বেগম দম্পতির ছেলে মুজিবুর রহমান ১৯৭৮ সালে ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। এযাবৎ তিন-চারবার দেশে বেড়াতে এসেছেন তিনি। সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বছর তিনেক আগে আমার দাদি মোছা. ফুলেছা বেগম গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু বাসিয়া নদীতে সাঁকো না থাকায় চিকিৎসক আসতে দেরি হয়। একপর্যায়ে দাদি মারা যান। চিকিৎসক দ্রুত আসতে পারলে হয়তোবা আমার দাদি বেঁচে যেতেন। এ ঘটনায় আমি বেশ কষ্ট পাই। আর কেউ যাতে এমন কষ্ট না পায় এবং শিশুরা যাতে নিরাপদে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় যেতে পারে, সে জন্যই এই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিই। মানুষের কল্যাণে কিছু কাজ করার জন্য বাড়িতে দালান কিংবা সিলেট শহরে বাড়ি নির্মাণ না করে প্রথমে সেতুটি নির্মাণ করি। আর সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষেই মাত্র ১৪ দিনের জন্য দেশে এসেছি।’

যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে সাড়া ফেলেছেন আমরান

নির্বাচনী প্রচারে আমরান হোসাইন। ছবি: প্রথম আলো
বয়স মাত্র ২৯। এই বয়সে যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে লেবার দলের হয়ে এমপি পদে লড়ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমরান হোসাইন। এত অল্প বয়সে দলীয় টিকিট আদায় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেওয়া এই তরুণ এবার প্রচারেও সাড়া ফেলেছেন।
নর্থ ইস্ট হ্যাম্পশায়ার আসনে নির্বাচন করছেন আমরান। আসনটি কনজারভেটিভ দলের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। গতবার এখানে লেবার দলের অবস্থান ছিল তৃতীয়। এবার আমরানের চ্যালেঞ্জ দলের ভোট বাড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করা। লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছেন তিনি। নির্বাচিত হলে বেতনের ২৫ শতাংশ অর্থ স্থানীয় বাসিন্দাদের কল্যাণে ব্যয় করার ঘোষণা দিয়ে ইতিমধ্যে সাড়া ফেলেছেন আমরান।
আগামী বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে দেশটির প্রধান তিনটি দল থেকে মোট ১১ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী এমপি পদে লড়ছেন। তাঁদের মধ্যে লেবার দল থেকে সাতজন, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দল থেকে তিনজন এবং কনজারভেটিভ দল থেকে একজন মনোনয়ন পেয়েছেন। এই ১১ প্রার্থীর মধ্যে অক্সফোর্ড পড়ুয়া আমরান বয়সে সবচেয়ে তরুণ। গত ২৮ মার্চ তাঁর দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়।
যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া আমরানের আদি নিবাস বাংলাদেশের সিলেটের গোলাপগঞ্জে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ালেখা করা আমরান এনএইচএস (জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা) ইংল্যান্ড শাখার ন্যাশনাল ডেলিভারি অফিসার। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত আছেন। তিনি যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনীর একজন রিজার্ভ সৈনিক।
২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বারাক ওবামার নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন এই তরুণ। একই বছর লন্ডনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে সেরা স্বেচ্ছাসেবক হন আমরান।
রাজনীতিতে আসার কারণ জানতে চাইলে প্রথম আলোকে আমরান বলেন, মানুষের বিপদে পাশে থাকা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার শিক্ষা পরিবার থেকেই পেয়েছেন তিনি। রাজনীতির প্রতি আগ্রহের শুরুটাও সেখান থেকে।
আমরানের ভাষ্য, এনএইচএস এর একজন কর্মী হিসেবে তিনি ভালো করেই জানেন গত টোরি সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি কীভাবে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার মূল্যবোধকে নষ্ট করেছে। দেশের অন্যান্য এলাকার মতো তাঁর নির্বাচনী এলাকায়ও সরকারের বেপরোয়া খরচ কাটছাঁট নীতি মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়েছে।
আমরানের বিশ্বাস, একমাত্র লেবার পার্টিই যুক্তরাজ্যের কর্মজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষের কল্যাণে কাজ করে।
২০১০ সালের নির্বাচনে নর্থ ইস্ট হ্যাম্পশায়ার আসনে কনজারভেটিভ দলের প্রার্থী ৩২ হাজার ৭৫ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দলের প্রার্থী পেয়েছিলেন ১৩ হাজার ৪৭৮ ভোট। আর মাত্র পাঁচ হাজার ১৭৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন লেবার দলের প্রার্থী।
আসনটিতে দলের এই অতীত অবস্থান নিয়ে মোটেও শঙ্কিত নন আমরান। এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দলের এবং নিজের পরিকল্পনা জানিয়েছেন।
রাজনীতি সম্পর্কে এই তরুণের অভিমত, ‘রাজনীতিবিদেরা যা চাইবেন তা নয়, বরং জনগণ যা চাইবেন, তা-ই করবেন রাজনীতিবিদেরা।’
নিজের এমন বিশ্বাসের প্রতি ভোটাররা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন বলে দাবি আমরানের। এ বিষয়টি তাঁকে বেশ আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে জানিয়ে আমরান বলেন, ‘জয়ের লক্ষ্য নিয়েই তাঁর প্রচার চলছে।’
নর্থ ইস্ট হ্যাম্পশায়ার আসনে ১৯৯৭ সাল থেকে এমপি ছিলেন কনজারভেটিভ দলের জেমস আরবুথট। তিনি অবসর নেওয়ায় আসনটিতে এবার কনজারভেটিভ দল রনিল জয়বার্ধেনাকে মনোনয়ন দিয়েছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দলের হয়ে লড়ছেন গ্রাহাম ককরিল। এ ছাড়া এই আসনে ইউকে ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টি (ইউকিপ) ও গ্রিন পার্টিরও প্রার্থী রয়েছে। আসনটিতে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় ‘বিদ্রোহে’র পরিকল্পনা ফাঁস!

আইপিএলের ‘জন্মদাতা’ মোদি সতর্ক করছেন আইসিসিকে,
বিদ্রোহ হয়তো আসন্ন! ফাইল ছবি
ধনকুবের সুভাষচন্দ্র, হতে চান ক্যারি পেকার!
ভারতের এসেল গ্রুপের কথা মনে আছে? আইসিএল? ২০০৮ সালে এই আইসিএলে খেলতে যাওয়ার কারণেই তো বাংলাদেশের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন হাবিবুল বাশার, খালেদ মাসুদ, মোহাম্মদ রফিক, শাহরিয়ার নাফীস, অলক কাপালি ও আফতাব আহমেদের মতো ক্রিকেটাররা। এই আইসিএল কেবল বাংলাদেশেই নয়, মিলিয়ন ডলারের সুবাস ছড়িয়ে এলোমেলো করে দিয়েছিল ভারতসহ অনেক ক্রিকেট খেলিয়ে দেশকেই। এসেল গ্রুপ ছিল সেই আইসিএলের উদ্যোক্তা।
আজ বেশ অনেক বছর পর এসেল গ্রুপ আবার পরিকল্পনা করছে ক্রিকেট দুনিয়াকে ভাগ করে খেলাটির জন্য নতুন এক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার। পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও সেটি এরই মধ্যে ফাঁস হয়ে গেছে সংবাদমাধ্যমে। আইপিএলের মতো সফল টুর্নামেন্টের পথ কিন্তু দেখিয়েছিল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যাওয়া আইসিএলই। এসেল গ্রুপ এবার আইসিসি মতোই বিকল্প একটি ক্রিকেট সংস্থাই নাকি গড়ে তুলতে চায়! স্বাভাবিকভাবেই এই খবরে উদ্বিগ্ন আইসিসি। উদ্বেগের আরও বড় কারণ, আইপিএলের ‘জন্মদাতা’, ভারতীয় বোর্ড থেকে এক রকম বিতাড়নের শিকার লোলিত মোদিকে নাকি এই উদ্যোগে হাত মেলানোর প্রস্তাব দিয়েছে এসেল গ্রুপ!
ভারতে অন্যতম ধনকুবের সুভাষচন্দ্রের মালিকানাধীন এসেল গ্রুপ ইতিমধ্যেই নাকি ৫ কোটি ডলারের প্রস্তাব ছুড়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ককে। কেবল ক্লার্কই নন, প্রস্তাব পেয়েছেন ডেভিড ওয়ার্নারও। ব্যাপারটা এখনো প্রস্তাব দেওয়ার পর্যায়ে থাকলেও পুরো বিষয়টি নিয়ে মারাত্মক চিন্তিত আইসিসি। ব্যাপারটি তদন্ত করতে জরুরি ভিত্তিতে একটি কমিটিও নাকি করে দেওয়া হয়েছে। দুবাইয়ের আইসিসি অফিসে এসেল গ্রুপের এই তৎপরতা ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গার্ডিয়ানের খবর বলছে, এসেল গ্রুপ অস্ট্রেলিয়ায় ‘অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট কন্ট্রোল প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করার চেষ্টা করেছিল। একইভাবে অন্যান্য ক্রিকেট খেলুড়ে দেশেও এমন ‘প্রাইভেট’ ক্রিকেট বোর্ড গঠন করার পরিকল্পনা নাকি আছে তাদের। সবগুলো দেশের ‘প্রাইভেট’ ক্রিকেট বোর্ডগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। যেটি হয়ে উঠতে পারে আইসিসির বিকল্প। এরই মধ্যে আইসিসি তদন্ত করে দেখছে, আসলেই অস্ট্রেলিয়ায় বেসরকারি ক্রিকেট বোর্ড ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করার চেষ্টা এসেল গ্রুপ করেছে কি না।
এ ব্যাপারে মুখ না খুললেও হিন্দুস্তান টাইমসকে এসেল গ্রুপের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নরেশ ধ্যানদয়াল বলেছেন, ‘ভারতে ক্রিকেট নিয়ে আমাদের সুবিশাল পরিকল্পনা আছে। অনেক রাজ্যে এ মুহূর্তে এ বিষয়ে প্রাথমিক অনেক কাজ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমি বিস্তারিত কিছু বলতে পারব না। তবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।’
আইসিএল ব্যর্থ হলেও মোদির মতো তীক্ষ্ণ ব্যবসায়িক বুদ্ধির মানুষ সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে হাত মেলালে ফলটা অন্য রকম হতেও পারে। তা ছাড়া ব্যক্তি স্বার্থে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে মোদী ক্রিকেটে বিদ্রোহের সূচনা করতে পারেন-এমন শঙ্কা আইসিসির মধ্যে থাকাটাও স্বাভাবিক। আইসিসির ভাবনা এসেল গ্রুপের মালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেল জি নেটওয়ার্ক ও টেন স্পোর্টস নিয়েও। দশ টেস্ট খেলুড়ে দেশের পাঁচটিরই ক্রিকেট সম্প্রচারের স্বত্ব আছে তাদের।
লোলিত মোদী অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, প্রথমে এসেল গ্রুপের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেও এই মুহূর্তে তিনি এমন পরিকল্পনায় নেই। তিনি পরিকল্পনাটিকে ‘অবাস্তব’ বলেও অভিহিত করেছেন। তবে তিনি শঙ্কার আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছেন সুভাষ চন্দ্রের চরিত্র বিশ্লেষণ করে। বলেছেন, ‘সুভাষকে যতটুকু জেনেছি, কোনো জিনিস একবার মাথায় এলে তা যেকোনো মূল্যে করার লোক তিনি। সবচেয়ে বড় কথা তাঁর আছে অনেক টাকা।’ মোদী খুব সম্ভবত বলতে চেয়েছেন, অর্থের প্রলোভন দিয়ে নিজের পরিকল্পনাটুকু বাস্তবায়ন করার সব শক্তিই সুভাষ চন্দ্রের আছে।
এদিকে, এসেল গ্রুপের এই উদ্যোগকে ‘অনুমান-নির্ভর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান ওয়ালি এডওয়ার্ডস। তিনি মাইকেল ক্লার্ক ও ডেভিড ওয়ার্নারের বিশাল প্রস্তাবের বিষয়টিও নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটাররা প্রায় সবাই ভালো পারিশ্রমিক পায়। ওয়ালি ক্রিকেট পরিকাঠামোর ভাগ রোধে আইসিসিকে সর্বাত্মক সহায়তার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আরও একটা বড় বিদ্রোহের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। একবার ব্যর্থ হলেও এ যুগের ‘ক্যারি পেকার’ হয়ে উঠতে সুভাষচন্দ্র যে ধনুকভাঙা পণ করেই নেমেছেন! সূত্র: ক্রিকইনফো, গার্ডিয়ান, হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া,

‘জিতব বিএনপি, নিব আওয়ামী লীগ’ by প্রতীক বর্ধন

সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে মগবাজার ওয়্যারলেস মোড়ের নজরুল শিক্ষালয়ে ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখে সেই পুরোনো প্রবাদের কথাই মনে পড়েছিল, ‘মর্নিং শোস দ্য ডে’, অর্থাৎ সকাল দেখেই বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে। কিন্তু দিন যতই গড়াতে লাগল, ততই এই প্রাচীন প্রবাদটি মিথ্যা প্রমাণিত হতে লাগল। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে যখন বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিল, তখন সবকিছুর পরিসমাপ্তি ঘটল। ২৯ এপ্রিল সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, তার সারসংক্ষেপ করলে এমনটাই দাঁড়ায়। নজরুল শিক্ষালয় থেকে বেরিয়ে মধুবাগ শেরেবাংলা স্কুলে গিয়েও দেখি বেশ ভালোই জটলা। প্রচুর মানুষ ভোটকেন্দ্রে ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। আবারও আশ্বস্ত হলাম, যাক নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে খটকা লাগল, এই দুই কেন্দ্রে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র বা কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের কাউকেই দেখা গেল না। এমনকি তাঁদের পোস্টারও দেখা গেল না। অথচ দিন দু-এক আগেও সেখানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পোস্টার দেখা গেছে। প্রচুর তরুণ কর্মীকে দেখা গেল সেখানে, সবার গলায় টেবিল ঘড়ি মার্কার ব্যাজ। প্রচুর মানুষের সমাগম হয়েছে, টেবিল ঘড়ির সমর্থকেরা তাদের ভোটার নম্বর সরবরাহ করছে। বেশ উৎসব উৎসব ভাব। আবার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকেরা ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে নিজেরাই উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। সেই কেন্দ্রের পাশে নয়াটোলা মাদ্রাসা কেন্দ্রেও দেখা গেল, ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। সেখানেও তাবিথ আউয়ালের কর্মী নেই। দুই কেন্দ্রেই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট নেই। তবে কেন্দ্রের সামনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের ভিড় দেখা গেল। কেন্দ্রে আসা ভোটারদের তারা বলছে, ‘ভাই, ঘুড়ি (আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর মার্কা) ও ঘড়িতে ভোটটা দিয়েন।’
সেখান থেকে গেলাম পশ্চিম রামপুরার মহানগর আবাসিক প্রকল্প এলাকায়। সেখানকার দুটি ছোট কেন্দ্রের সামনেও টেবিল ঘড়ির সমর্থকদের দেখা মিলল, যথারীতি সেখানও তাবিথ আউয়ালের সমর্থকদের অনুপস্থিতি চোখে পড়ল। তবে ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। কোনো উত্তেজনা চোখে পড়েনি। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেল, কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে ভোটারদের উপস্থিতি খুবই কম। বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্টও সেখানে নেই। সেখান থেকে পূর্ব রামপুরা ও উলনে গিয়ে দেখলাম, ভোটারদের সরব উপস্থিতি আছে। উৎসব উৎসব আমেজও আছে। অক্সফোর্ড স্কুল ও পূর্ব রামপুরা হাইস্কুলে তাবিথ আউয়ালের সমর্থকদের দেখা গেল। তারা সেখানে নির্বাচনী ক্যাম্প বসিয়ে ভোটার নম্বর সরবরাহ করছে। সেখানে তাবিথ আউয়ালের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সেই এলাকার কেন্দ্রে কেন্দ্রে তাঁদের পোলিং এজেন্টরা আছেন, সব ঠিকঠাক চলছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কাজে বাহন হিসেবে সঙ্গে ছিল বাইসাইকেল। রাস্তা ফাঁকা, সাইকেলের এক টানে পূর্ব রামপুরা থেকে চলে এলাম শান্তিনগরে। মালিবাগ মোড় পার হওয়ার পরই খটকা লাগল, রাস্তার দুই ধারে এত বাস কেন? সেখানে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিদ্ধেশ্বরী বালক ও বালিকা বিদ্যালয়, কিডস এরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, লুৎফা একাডেমি প্রভৃতি কেন্দ্রে দেখা গেল, ভোটারদের উপস্থিতি নগণ্য। সেখানে একচেটিয়াভাবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকনের সমর্থকদের ভিড়। যথারীতি সেখানেও বিএনপি-সমর্থিত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের সমর্থকদের দেখা মিলল না। বিএনপির কর্মীদের অভিযোগ, মির্জা আব্বাসের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি এবং বহিরাগত আওয়ামী লীগের কর্মীদের কেন্দ্রে ঢুকিয়ে সিল মারানো হয়েছে। আর এটাই নাকি সেই বাসরহস্য! ওই বাসে করেই তাদের আনা হয়েছে।
শান্তিনগরের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, তিনি কেন্দ্রে গিয়ে দেখেন তাঁর ভোট আগেই কেউ দিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে রাস্তায় জটলা দেখা গেল, এক শুভ্র কেশের প্রবীণ ব্যক্তি মাছরাঙা টিভিতে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে অভিযোগ করছেন, ‘আমি জাতীয় নির্বাচনে লুৎফা একাডেমিতে ভোট দিয়েছি, অথচ এবার এসে দেখি, সেখানে আমার ভোট নেই। সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভোটারদের হেনস্তা করছে।’ তাঁর কথা শুনে এক ব্যক্তি প্রতিবাদ করে বললেন, ‘আপনি ভোটার, আপনার দায়িত্ব নিজের ভোটকেন্দ্র খুঁজে বের করা।’ জানা গেল, সেই প্রতিবাদকারী একজন সরকারদলীয় কর্মী। এর মধ্যে খবর এল, বিএনপি তিন সিটি করপোরেশনেরই নির্বাচন বর্জন করেছে।
নির্বাচনের আগের রাতে রিকশায় বাসায় ফেরার সময় চালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কে জিতবে বলে মনে হচ্ছে? উত্তরে ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘জিতব বিএনপি, নিব আওয়ামী লীগ।’ হ্যাঁ, এবার বিএনপি বলতে পারবে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে তারা ভোটের মধ্যেই নির্বাচন বর্জন করেছে। রাজনীতিতে তারা আসলেই জিতল কি না, তা এখনই হলফ করে বলা যাচ্ছে না। সেটা নির্ভর করছে তাদের ওপরই।
প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক ও অনুবাদক।
bardhanprotik@gmail.com

লেভেলক্রসিং by শামসুজ্জামান হীরা

থপথপ থপথপ—রেললাইনের স্লিপারে পুরোনো চপ্পল পরা লোকটা এক লয়ে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে। কিছুদূর এগিয়ে আবার পিছিয়ে আসে। এখান থেকে সামনের লেভেলক্রসিং পর্যন্ত কতগুলো স্লিপার; গুনে দেখার কেন জানি প্রবল ইচ্ছা জাগে তার মনে। এ কাজটা এর আগে আর কেউ করেছে বলে তার জানা নেই। মুচকি হাসে লোকটা। যদিও হাসিটা তার এঁটে-থাকা আঠাল ঠোঁট দুটোতে ফাটল ধরাতে পারে না—বাঁকিয়ে দেয় শুধু খানিকটা। ওর এক বন্ধু, রেললাইনের পাশ ঘেঁষে যার বেশ বড়সড় এক রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শোরুম, ওকে যদি জিজ্ঞেস করা যায়: ‘বলো তো দেখি, জারুলডাঙ্গার লেভেলক্রসিং থেকে আশানগর ক্রসিং পর্যন্ত রেলপথটুকুতে কয়টি স্লিপার আছে?’ পারবে বলতে? প্রশ্নই ওঠে না। জবাব দেওয়ার বদলে ও হয়তো ওর ছ্যাঙার মতো ভুরুজোড়া বাঁকাবে; পান খাওয়া মুখ থেকে পিচ করে পিক ফেলবে পাশে রাখা পিকদানিতে। কিন্তু লোকটি ভেবে দেখল, রেলওয়ে স্লিপার গোনার সঙ্গে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। যদিও বিষয়গুলো কী, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই তার। তবে নিজেকে সে এখনো যথেষ্ট সৎ বলে মনে করে। মনে করে সৎভাবে জীবনযাপনই সবকিছু—অন্য যা কিছুকে লোকে গুরুত্ব দেয়, তার থোড়াই কেয়ার করে সে।
বিড়বিড় করে স্লিপারগুলো গুনে চলল ও।
রেললাইন ধরে আশানগর লেভেলক্রসিংয়ে যাওয়া শর্টকাট হয়। আরে শর্টকাট কী! ওই জায়গায় পৌঁছানোর আর কোনো পথ থাকলে তো! তা ছাড়া ওকে যে যেতেই হবে কেননা নারী ওকে কথা দিয়েছেন, আশানগর ক্রসিং পেরিয়েই বাঁ দিকে মোড় নিয়ে পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ—বিশাল পাকুড়গাছটার নিচে ছোট্ট কিন্তু ছিমছাম একটি ঘর, সেখানে তিনি তার জন্য অপেক্ষা করবেন। কটা থেকে কটা পর্যন্ত যেন? মনে করতে পারছে না। এ এক জ্বালা! অনেক দিন হলো কিচ্ছু মনে থাকে না ওর। এখন কটা বাজে? ক্যাসিও ডিজিটাল ঘড়িতে দুটো তিন মিনিট। নারীটি লাঞ্চের পর ওখানে আসবেন, সে কথা মনে আছে। তার জন্য অপেক্ষা করবেন। তিনি চাইলে কিছু একটা গতি হলেও হতে পারে লোকটার। কাউকে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখা সাজে না ওর। সাজে না কথাটার অর্থ কী দাঁড়ায়। কাদের সাজে! মন্ত্রী-মিনিস্টার, বুদ্ধিজীবী, আমলা—এঁদের? ও কখনো এ জাতীয় কিছু ছিল বলে আমাদের জানা নেই। জানা যায়, বছর সাতেক আগেও একজন দাপুটে ব্যবসায়ী ছিল, তারও বহুকাল আগে কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক (এই শব্দটা লোকটার মুখে শোনা যায় প্রায়ই) যুগে যুদ্ধ করেছিল এ দেশে হানাদার শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে। এখন কর্মহীন, বদ্ধবেকার। বদ্ধবেকার—হা হা হা, বদ্ধ উন্মাদের মতো শোনাল কথাটা!
সকালে আজ নাশতার টেবিলে কড়কড়ে দুই টুকরো পাউরুটি আর আলুভাজি রাখা ছিল। আর এক দিন থাকলে রুটির টুকরো দুটোতে ছত্রাক ধরত নির্ঘাত। ডায়াবেটিসের রোগী, খালি পেটে ওষুধ খাওয়ার পর কিছু তো খেতেই হয়। মিনমিনে সুরে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিল: ‘আর কিছু নাই?’
বাঁশচেরা গলায় স্ত্রীর জবাব: ‘বানাবে কে? বেশি খিদে লাগলে হোটেল থেকে নাশতা এনে খেলেই হয় (রেগে থাকলে প্যাসিভ ভয়েসে কথা বলে স্ত্রী)। এক পয়সা কামাইয়ের মুরোদ নাই, খাওয়ার খায়েশ তো ভালোই...।’
তা স্ত্রী যতই চিল্লাক, ও চুপ মেরে থাকে। উপায় কী! যা দু’পয়সা আয়-ইনকাম, তা তো ওর দ্বারাই, সংসারটা চলছে তো ওই নারীর কল্যাণেই। তার ওপর বেশ কদিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। বাসায় নেই কাজের বুয়া। মেজাজ খিটখিটে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তবে আশানগর গিয়ে পাকুড়তলায় পৌঁছাতে পারলে আশা করা যায় কিছু একটা হিল্লে হবে ওর। যদিও কী হবে, তা আগেভাগে আঁচ করা শক্ত। আশা-আশঙ্কার টানাপোড়েনে উন্মনা লোকটা স্লিপারে পা ফেলে এগিয়ে চলে। ভাবে, ভদ্রমহিলা হয়তো বসে আছেন ওর অপেক্ষায়, কিংবা হয়তো কিছুক্ষণ পর আসবেন, অথবা হয়তো মোবাইলে জানাবেন আজ অমুক কারণে আসা সম্ভব হচ্ছে না, সরি। কিন্তু তিনি সত্যি কি তাকে এই দুরবস্থা থেকে উদ্ধার করতে পারবেন? কাল যে কথাগুলো বলেছিলেন, কেমন জানি লেগেছিল ওর কাছে—অস্পষ্ট, যেন আলো-আঁধারিতে মেশানো হেঁয়ালিপূর্ণ কিছু একটা! ওর বিবেকে বাধে এমন ধরনের কোনো প্রস্তাব যদি তিনি রাখেন; ঠিক হবে কি তাতে সায় দেওয়া! কিন্তু না দিয়েই বা উপায় কী! মন থেকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, যা কিছুই হোক, তাকে করতেই হবে, কারণ না করে উপায় নেই। তারপরই মনে হয়, তিনি আদপেই কিছু করবেন তো তার জন্য! একবার মনে হয় করবেন, আবার মনে হয়, উহুঁ, কথা এ রকম অনেকেই দেয়, যাকে বলে কথার কথা! অতীতে অবশ্য এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে, যা রীতিমতো অবাক করার মতো। কোনো দিকে কোনো কূল-কিনারা দেখা যাচ্ছে না, এমন সময় হঠাৎ কিছু ঘটে গেছে, যাতে মুশকিল আসান! সুতরাং আবার হাঁটা এবং স্লিপার গুনে গুনে। ডবল লাইনের ডান দিকের ট্র্যাক ধরে হাঁটছে লোকটা। আর এরও একটা কারণ নিশ্চয়ই আছে।
এক শ একান্ন...বায়ান্ন...
এই যে সাহেব, অমন মাথা নিচা কইরা হাঁইট্যা যাইতাছেন কোন দিকে...?’
‘আশানগর...’
‘যা ঠাডাপড়া রইদ, চান্দি ফাইট্যা যাওনের জোগাড়...’
‘হুঁ...’
লোকটা কে? গায়ে পড়ে কথা বলল; মনে হয় ওদের মহল্লাতেই থাকে; চেনা চেনা লাগছে।
দিল ব্যাটা গোনাটা মাটি করে। কটা জানি গুনেছিল, যাহ্, ভুলে গেল। এখন উপায়! বহুদিন ধরেই স্মৃতিস্বল্পতায় ভুগছে লোকটা, সাধারণ স্বল্পতা নয়, বলা যায় ভয়ানক স্মৃতিস্বল্পতা—অ্যাকিউট ডেমেনশিয়া। এখন কী করা যায়? অনেকখানি পথ তো পেরিয়ে এসেছে। এখন পেছানো ছাড়া তো উপায় নেই। অ্যাবাউট টার্ন! সেনাবাহিনীতে ছিল না কখনো, তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ওস্তাদেরা ওদের উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিতে এ শব্দ দুটো বলে উচ্চ স্বরে হাঁক দিত। মুক্তিযুদ্ধ—আহা মুক্তিযুদ্ধ—তরতাজা যৌবনের সেই দিনগুলো, কী উন্মাদনা! কত আশা। দেশ স্বাধীন হলে কারও কোনো সমস্যা থাকবে না, থাকবে না কোনো টেনশন; সমাজতন্ত্র—যার যার সাধ্য অনুযায়ী কাজ, কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক; সোশ্যাল সিকিউরিটি, নো বেকারত্ব। স্বপ্ন...স্বপ্ন একঝাঁকাক... পেছনে হাঁটো। হ্যাঁ, আবার এক দুই তিন...; ১৩৫ গুনতে যাবে, এমন সময় চোখ পড়ল রেললাইন ঘেঁষে গড়ে ওঠা বস্তির সারির ওপর—এক ছাপরাতে। গুমরে গুমরে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে ওটা থেকে। ব্যাপারটা কী! চিন্তায় ছেদ পড়ল ওর। হেঁড়েগলার খিস্তি: ‘হালার পুতেগোর পুটকি মারি...! ওই দেখা যায় তাল গাছ ওই আমাগের ঘা, ওইখানেতে বাস করে হালার পু-পু—পুতেরা...!’ ছিন্ন তবন মালকোঁচামারা তোতলা লোকটা বিশাল এক ভবনের দিকে তাকিয়ে শূন্যে হাত ছুড়ে সক্রোধে খেঁকিয়েই চলেছে অনবরত। সারা গায়ে ছোপ ছোপ চিহ্ন—শ্বেতি নাকি আগুনের ছ্যাঁকা লাগা দাগ! ভবনটিকে ও চেনে; আশানগরের খুব কাছে শকুনতলিতে আকাশচুম্বী একটি অট্টালিকা; এখান থেকে স্পষ্ট নজরে আসছে। নামও মুখস্থ ওর, ‘পোশাক ভবন’। ছাপরার ভেতর আরেকজন গোঙানোরত নারী; বোধ হয় নিজের কোনো অঙ্গ হারিয়েছেন অথবা খুইয়েছেন কোনো স্বজন। এই তো কিছুদিন আগে পোশাক কারখানার ধসে পড়া বিল্ডিংয়ের নিচে চাপা পড়ে মরলেন যে ১ হাজার ১৩৫ জন, তাঁদেরই কেউ হবেন হয়তো! তাঁদের কতই তো স্বজন!
গোনায় ভুল হয়ে গেল আবার। টেকো মাথার ওপর অনবরত রৌদ্রের বর্শা এসে বিঁধছে। কিন্তু করার কী আছে। ফেরো আবার। নারীটি বলেছিলেন, লাঞ্চের পর—লাঞ্চের পর, মানে ধরে নেওয়া যায়, বিকেল তিনটে থেকে চারটের মধ্যে যেকোনো এক সময়। লাঞ্চের আগে আসতে বললে তো ভালোই হতো। ভদ্রতার খাতিরে হলেও নিশ্চয়ই বলতেন: ‘একসঙ্গে লাঞ্চ সারা যাক, কী বলেন?’ জিব একটু ভিজে আসে এবং তাতে ওর আঠাল ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক হয়, এবং সেই সুযোগে সে একচিলতে বক্র হাসি বলকানো বাতাসে মিশিয়ে দেয়! এখন মোটে আড়াইটা। ধীরে ধীরে সময় ক্ষেপণ করে হাঁটলেও তিনটার আগেই গন্তব্যে পৌঁছা যাবে।
যে নারীর কাছে যাচ্ছে লোকটা, তিনি কে?
বছর দশেক আগে ওদের ফ্ল্যাটের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকতেন তিনি। সুশ্রী ও বুদ্ধিমতী। স্বামী বিদেশে চাকরি করতেন। ডাক্তার। দেশে এসেছিলেন দুই মাসের ছুটি নিয়ে। এসেই বিয়ে। বিয়ের পরে ছুটি শেষ হতেই আবার পাড়ি জমিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে, তাঁর চাকরির স্থলে। দীর্ঘদিন কেটে যায়, ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। দাম্পত্যজীবনের স্বাদ পাওয়ার পর ওই বয়সে কত দিন একা কাটাতে পারে কোনো যুবতী! একদিন শোনা গেল কোনো এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর কালো মার্সিডিজ এসইউভি নাকি প্রায়ই সারা রাত নারীর গ্যারেজে ঘুমায়। বিষয়টা দেখতে দেখতে চাউর হয়ে পড়ে আশপাশে। কিছুদিন বাদে বিদেশ থেকে রেজিস্টার্ড ডাকে ডিভোর্স লেটার আসে। বাড়িঅলা নোটিশ দেয় বাসা ছাড়ার। নারী এখন আগের চেয়েও ভালো আছেন। অভিজাত এলাকায় দামি অ্যাপার্টমেন্টে ভালোই কাটছে তাঁর দিনকাল। নিজেরই ওটা। সেই কালো মার্সিডিজ এসইউভি এখনো তাঁর গ্যারেজে সারা রাত ঘুমায়। সমাজে সুন্দরী নারীদের কদর কখনোই কমে না খুব একটা। তার ওপর মুক্তবাজার অর্থনীতি...। কাল অপ্রত্যাশিতভাবে এক শপিং মলে দেখা হয়ে গেল, চিনতে লোকটার কিছু সময় ব্যয় হলেও সপ্রতিভ নারী তার দিকে প্রশ্ন ছুড়েছিলেন: ‘হাই, কেমন আছেন, ভাই? হাউ ইজ লাইফ?’
খুকখুক কেশে উত্তর দিয়েছিল লোকটা: ‘বেঁচে আছি...’
‘ব্যবসা?’
‘কবেই লাটে উঠেছে...’
‘টাকাপয়সা, ব্যাংক-ব্যালান্স...’
‘দুই হাজার দশে সব হাওয়া! হার্ড ক্যাশ, ফিক্সড ডিপোজিট, সোনাদানা—সব গেছে শেয়ারের পেটে! কী দেশ...! যেমন পারো লুটে নাও; লুটে নাও যত পারো...; ফ্রি মার্কেট ইকোনমি।’ ‘চাকরি করার ইচ্ছা আছে?’ ঠোঁটের কোনায় কেমন এক হাসির রেখা ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করেন নারীটি।
‘এই বয়সে!’
‘সব চাকরিতে বয়স লাগে নাকি! আপনি এখনো আগের মতোই আছেন দেখছি।’ ‘মানে বলছিলাম কী, মানে...’ কথার খেই পাচ্ছিল না যেন লোকটা।
‘আপনার মিসেস মিডিয়াতে আছেন না?’
‘হুঁ...’
‘অনেক হোমরাচোমরা, সেলিব্রিটির সঙ্গে ওনার জানাশোনা, ওঠাবসা থাকারই কথা; তা ছাড়াও মডেল, নায়িকা-গায়িকা...। কাল লাঞ্চের পর, আশানগর রেলক্রসিংয়ের কাছে শকুনতলিতে যে পাকুড়গাছটা, তার নিচে ফরচুন অ্যাপারেলের যে ওয়েটিংরুম, ওখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করব। অনেক কথা হবে। আসবেন কিন্তু।’ তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, চাপা গলায় ভারিক্কি চালে বলেছিলেন, ‘জীবনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা কঠিন বটে, তবে একবার ওঠার সঠিক কৌশলটা রপ্ত করতে পারলে একেবারে আকাশের ছাদে!’
স্লিপারে ঠিকঠাক পা ফেলে হেঁটে চলেছে লোকটা। রেললাইনের সম্মুখের প্রান্তটা শূন্যে তুলে ধরে ওটাকে ঠিক এই মুহূর্তে সীমাহীন একটা সিঁড়ি ভাবল সে এবং তাতে মনে মনে বেশ পুলক বোধ করল। একটা স্লিপারের ওপর পা রেখে ও কী জানি কী মনে করে অযথাই ফিসফিসিয়ে ‘তিন শ’ এবং সশব্দে বলে উঠল ‘আটষট্টি...’ হঠাৎই চারদিক থেকে হইচই, শোরগোল। কিছু না বুঝে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল লোকটা, আবার তার গোনা ছুটে যাবে না তো!
কিন্তু বিকট ঝমঝম আওয়াজ ছাপিয়ে লোকটার কানে এসে ঝাপটা দিল তীক্ষ্ণ এক আর্তনাদ: ‘চাপা পড়ল রে...এ-এ-এ...।’
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবকিছু বোঝা হয়ে গেল তার! ডান ট্র্যাক ধরে কালবোশেখির বেগে ছুটে চলে গেল ‘আন্তনগর অনন্ত এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি। কিছুক্ষণের মধ্যে লোকজনের ভালোই ভিড় জমে উঠল তিন শ আটষট্টি নম্বর স্লিপারের কাছে। সেখানে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে কিছু মাংসপিণ্ড। ভিড়ের মধ্য থেকে কে একজন জিজ্ঞেস করল: ‘কেউ চেনেন?’
উপস্থিত জনতা নীরবে কেবল ডানে-বাঁয়ে মাথা দোলাতে থাকল।
এক যুবক বেশ কসরত করে মুঠোফোনের ক্যামেরায় মাংসপিণ্ডের ছবি তুলল। পাশে দাঁড়ানো বন্ধুকে গর্বের সঙ্গে বলল: ‘লেটেস্ট মডেলের মোবাইল ক্যামেরা। দ্যাখ, দ্যাখ, কী রেজল্যুশন, কী জীবন্ত ছবি; দেখছস?’

গদ্যকার্টুন- ছেঁড়াখোঁড়া ডায়েরির অংশ by আনিসুল হক

তখন পড়ি ক্লাস সেভেনে। দেশে গণভোট হবে। গণভোটের নিয়ম অভূতপূর্ব। কোনো সিল-ছাপ্পড় মারতে হবে না। দুটো বাক্স থাকবে পোলিং বুথে। একটাতে লেখা থাকবে ‘না’। আরেকটাতে থাকবে সামরিক পোশাক পরা জেনারেল জিয়াউর রহমানের ছবি। সেটাতে লেখা ‘হ্যাঁ’। ব্যালট পেপারে কোনো মার্কাটার্কা থাকবে না। একেবারে ধবধবে সাদা কাগজ। প্রতিটা ভোটার একটা করে ব্যালট পেপার পাবে। তারপর সেই কাগজ ঢোকাতে হবে। ‘হ্যাঁ’ বাক্সেও ঢোকানো যাবে। ‘না’ বাক্সেও ঢোকানো যাবে। সেই ভোটের সময় চলে গেলাম গ্রামের বাড়িতে। গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানায়।
ভোট দেখতে মাইল খানেক দূরের স্কুলের মাঠে যাই।
যেই ভোট দিচ্ছেন, তাঁকেই একটা করে বিড়ি দেওয়া হচ্ছে।
বিড়ির লোভে অনেক কিষান মাঠ থেকে এসে ভোট দিয়েওছিলেন। তবে নারীরা আসেননি। আসার দরকার ছিল না। কারণ, নারীদের বিড়ি দেওয়া হয়নি। যদিও মাঝেমধ্যেই রব উঠছিল ভোট দিতে না এলে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। ছেলে-ছোকরার দল, যাদের ভোট নেই, তারা বেশ মজা পেয়েই গেল। বিড়ি নেয়। আর ভোটকেন্দ্রে যায়। দুইটা ভোট ‘হ্যাঁ’ বাক্সে ফেলে। দুইটা ভোট ‘না’ বাক্সে ফেলে। তারপরেও ভোটারের উপস্থিতি শতকরা ৫ শতাংশের বেশি হয় না। তার মধ্যে আবার অনেক ভোট বেয়াদব পোলাপানে ‘না’ বাক্সে ফেলেছে।
প্রিসাইডিং অফিসার ছিলেন আমাদের পরিচিত। বিকেল পাঁচটা বাজতে না-বাজতেই তিনি সব ব্যালট ছিঁড়লেন। তারপর সব ভরে ফেললেন হ্যাঁ বাক্সে। না বাক্সেরগুলোও ঢাললেন। সেসবও ভরলেন হ্যাঁ বাক্সে।
সেই ভোটের সরকারি ফল ছিল ৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। হ্যাঁ পেয়েছে প্রায় ৯৯ শতাংশ। না পড়েছে ১ শতাংশ।
সে আজ থেকে ৩৮ বছর আগের কথা। সেসব দিন কবেই গত হয়েছে। এখন এই দেশে ভোট কেমন হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতো করে আমাদেরও অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনের ভোটের জন্য আমাদের নিজেদেরই অভিনন্দন জানাতে হবে। একটা লাশ পড়েনি। একটা বুথে আগুন দেওয়া হয়নি। এত সুন্দর, এত সুষ্ঠু, এত শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সাম্প্রতিক কালে আর হয়নি। অভিনন্দন নির্বাচন কমিশন। একটি আদর্শ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মডেল হিসেবে ২৮ এপ্রিল ২০১৫-এর নির্বাচনকে সোনার ফ্রেমে বেঁধে রাখতে হবে। অভিনন্দন, গণতন্ত্র। গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে। ৩-০ ব্যবধানে গণতন্ত্র বিজয়ী হয়েছে। বিরোধীরা বাংলাওয়াশ হয়েছে।
সিটি নির্বাচনে ভোট দিতে আমিও গিয়েছিলাম। আমি দক্ষিণের ভোটার। সকাল সকালই কেন্দ্রে গিয়ে হাজির হয়েছি। আমার ভোট একটা স্কুলে। আমার স্ত্রীর ভোট আরেকটা স্কুলে। গিয়ে দেখি, কোথাও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের কোনো পোস্টার নেই, কোনো কর্মী নেই। ইলিশ মাছ মার্কার নেতা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন। করমর্দন করলেন। তাঁর কর্মীরা আছে। তারা টেবিল নিয়ে বসে ভোটারদের বুথ-কেন্দ্র ইত্যাদি খুঁজে পেতে সাহায্য করছে। কিশোর বয়সী ছেলেরা এগিয়ে এসে আমার সঙ্গে ফটোও তুলল। আমি বললাম, প্রতিদ্বন্দ্বীরা কোথায়। ওরা বলল, আসেনি।
আমি ভেতরে গিয়ে নিজের ভোট দিলাম। তিনজন বয়স্ক ভদ্রলোক পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন। ভেতরে ঢাকা-বিশেষজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক প্রধান নজরুল ইসলাম স্যারকেও পেলাম, ভোট দিয়ে বেরিয়ে আসছেন। তাঁকে বললাম, সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ভোটের বুথে এসে ঢাকা-বিশেষজ্ঞর সাক্ষাৎ পাওয়া খুব ভালো লক্ষণ। কিন্তু বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্ট দেখলাম না। কর্মী দেখলাম না। ইলিশ মাছের এজেন্টদের জিজ্ঞেস করলাম, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্ট কোথায়? ওরা বললেন, আসেনি।
প্রিসাইডিং অফিসারও এলেন। সৌজন্য সাক্ষাৎ করে গেলেন। এখান থেকে আমরা গেলাম আরেকটা কেন্দ্রে। আমার সহধর্মিণী সেখানে ভোট দেবেন। নির্বাচন পর্যবেক্ষক দুটো দলের সঙ্গে দেখা হলো সেখানে। পুরো ভোটকেন্দ্র ফাঁকা। কোথাও কোনো লাইন নেই। বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের কোনো কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, এজেন্টের দেখা পেলাম না।
২০০৮ সালে একই কেন্দ্রে ভোট দিয়েছি। সকালবেলা এসে দেখি ভিড়। সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখ হাসি-হাসি। আর চেহারা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে কোন মার্কায় তারা ভোট দিতে যাচ্ছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমরা গল্প-গুজব-আড্ডাতেও মেতে উঠলাম। অথচ আজকে জায়গাটাকে শোকের বাড়ি মনে হচ্ছে কেন?
সকাল নয়টা পর্যন্ত আমার দেখা দুটো কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু ভোটারের উপস্থিতি ছিল নগণ্য।
পর্যবেক্ষকদের জিজ্ঞেস করলাম, সকাল নয়টা বাজে, ভোটকেন্দ্রে ভোটারের ভিড় নেই কেন?
একজন বললেন, মানুষের আগ্রহ নেই। কোন পক্ষ জিতল বা হারল তাতে নগরবাসীর কিছু যায়-আসে বলে মনে হয় না। মানুষ খুব হতাশ।
জানি না তিনি ঠিক বললেন কি না।
ঘরে ফিরে এসে বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য টিভি অন করলাম। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে শান্তিপূর্ণ সুষ্ঠু অবাধ সিল মারার খবর আসছে, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সেসব প্রচার করছে।
সন্ধ্যা নাগাদ আমরা জানি ভোট পড়েছে ৪০ শতাংশের মতো। দুজনেই ভালো ভোট পেয়েছেন। আমার সেই ৩৮ বছর আগের বিকেলটা মনে পড়ছে।
সেদিন আমাদের গ্রামের প্রিসাইডিং অফিসার যখন না ভোটের বাক্স থেকে হ্যাঁ ভোটের বাক্সে সব ব্যালট ভরে দিচ্ছিলেন, তখন একজন পোলিং অফিসার বলছিলেন, স্যার, কাজটা কি ঠিক হইতেছে?
তখন প্রিসাইডিং অফিসার জবাব দিয়েছিলেন, আপনার কি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তাঁর নীতি ও কর্মের প্রতি আস্থা নেই?
হ্যাঁ, আছে।
আমরা তো সেই আস্থাই দেখাচ্ছি।
দেশ এগোচ্ছে। গণতন্ত্র এগোচ্ছে। এখন কেবল না-কে হ্যাঁ বানালে হয় না, কিছু না-তেও রাখতে হয়। আগে চক্ষুলজ্জা ছিল না। এখন আছে কি না জানি না, তবে স্মার্টনেস বেড়েছে। দক্ষতা বেড়েছে।
নেপালের ভূমিকম্প বেশ বড় ছিল। তারপরেও কিন্তু ৯০ শতাংশ ভবন অক্ষত আছে। কারণ, ভালোভাবে নকশা করা, ভালোভাবে নির্মিত ভবন সাধারণত ভূমিকম্পেও ভাঙে না। প্রকৌশল একটা বিশেষ বিদ্যা। এটা অর্জন করতে হয়। হাজার বছর ধরে জ্ঞান অর্জন করে সেটাকে বিশেষজ্ঞরা এই বিদ্যার ভান্ডারে সঞ্চয় করে রেখেছেন।
তবে নতুন নতুন বিভাগ ও বিষয় খুলতে হচ্ছে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। আমাদের চোখের সামনে হলো কম্পিউটার কৌশল বিভাগ। এটা আগে ছিল না।
এবার একটা নতুন বিভাগ খুলুন—ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। ইঞ্জিনিয়ারিং কাজটা ভালো হলে ভবন ধসে পড়ে না, মিছিলকারীরা ঝাঁকি দিলেও না। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ভালো হলে সরকার পড়বে না।
কিন্তু যে প্রশ্নের জবাব মিলছে না, তা হলো বিএনপি সব কেন্দ্রে এজেন্ট দিল না কেন? অন্তত ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রতিটা কেন্দ্রে ভোটারদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকল না কেন? তাহলেও লাখ লাখ কর্মীকে সেদিন মাঠে দেখা যেত। তাদের এজেন্টকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, এই খবর ছড়ালে তারা নির্বাচন কমিশনের দিকে যেতে পারতেন। ভোটারদের কোনো আগ্রহ নেই, দলীয় নেতা-কর্মীদেরও আগ্রহ নেই? আশ্চর্য!
স্মার্টনেস আসলেই বেড়েছে। প্রকৌশলবিদ্যাও এগোচ্ছে। ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার নিশ্চিতকরণ চলছে বটে। বটে!
কিন্তু বিএনপির হলোটা কী?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

ভোট দিতে হলে আ.লীগকেই দিতে হবে by আবদুর রশিদ

ছবি: আবদুস সালাম, প্রথম আলো
তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির আনুষ্ঠানিক ভোট বর্জনের পর তা আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে স্বীকার করেছেন দলটির নেতারা। তাঁরা বলেছেন, দুপুরের পরে নির্বাচন একতরফা হয়ে যাবে, সেটা তাঁরা ভাবতেই পারেননি।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য এ প্রসঙ্গে বলেছেন, বিএনপির মাঝপথে নির্বাচন বর্জন তাঁদের অবাক করেছে। দুইটার দিকেও যদি বিএনপি নির্বাচন বর্জন করত তাহলে তাদের অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী জয়ী হতে পারতো। তিনি মনে করেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ভোটারদের বুঝিয়েছে, ভোট দিতে হলে আওয়ামী লীগকেই দিতে হবে। অন্যদের ভোট দিয়ে লাভ নাই। কারণ অন্য কেউ ক্ষমতায় আসবে না। নির্বাচনে হারতে হারতে বিএনপি এক সময় জাসদ কিংবা মুসলিম লীগ হয়ে যাবে বলে তাঁরা মনে করেন। সেই লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন।
আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় তিনজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সিটি নির্বাচনের আগে কর্মীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছিল—‘তিন সিটি নির্বাচনেই তাঁদের জিততেই হবে। সেইভাবে প্রচারণা চালাও।’ সেইভাবে প্রচার চলছিল। দলের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও কাজ করছিল। ওই তিন নেতা স্বীকার করেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের সব আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলদের প্রতি তাঁদের সমান নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এ কারণে উত্তর-দক্ষিণের অধিকাংশ ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। এরপরে আবার নির্বাচনের দিন বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিএনপির ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। তখন বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে উত্তর ও দক্ষিণের আওয়ামী লীগের সমন্বয় কমিটির নেতাদের কাছে কাউন্সিলরদের ফোন আসতে থাকে। তাঁরা জানতে চান, এখন তাঁরা কী করবেন? তখন সমন্বয় কমিটির কোনো কোনো নেতা তাঁদের সমর্থক কাউন্সিলরদের বলেন, তোমাদের যা ইচ্ছা তাই কর। ওই তিন নেতা আরও বলেন, তাঁদের কাছে কাউন্সিলরা ফোন করে এমন কথা বলেন যে নির্বাচন ব্যাপারটা হরিলুট।
নির্বাচনের দিন শেষ পর্যন্ত সবকিছু আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল কি না জানতে চাইলে ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারের প্রধান সমন্বয়ক ফারুক খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আপনি দেখবেন মেয়র সমর্থকদের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ হয়নি। যা দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে তা কাউন্সিলরদের সমর্থকদের মধ্যে।’
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ১২টার পর তাঁদের কাছে খবর আসে কোনো কেন্দ্রে এখন আর বিএনপি-সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের কোনো এজেন্ট নেই। পরে বিএনপির ভোট বর্জনের ঘোষণার পর সবকিছু তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাঁর মতে, বিএনপির ভোট বর্জনের ঘোষণার পর চাইলেও তাঁরা অনিয়ম এড়াতে পারতেন না।
গত বুধবার সিলেটের কাজিরবাজার সেতুর নির্মাণকাজ পরিদর্শন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপির নীরব ভোট বিপ্লবের ডাক দেওয়া ও নীরবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা রহস্যজনক।’
বিএনপির সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস দক্ষিণের ৫৭টি ওয়ার্ডের ২৬টি কেন্দ্রের অনিয়মের কথা জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে তিনটি অভিযোগের চিঠি দেন। আর ঢাকা উত্তরের প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের অন্যতম নির্বাচন সমন্বয়কারী আবদুল্লাহ আল হারুন জানান, তাঁরা সকাল সাড়ে ১০টায় থেকেই রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) প্রথম অভিযোগ দেন। দুপুরের মধ্যেই তাঁরা অন্তত ২২টি অভিযোগ জমা দিয়ে সেগুলোর স্বীকৃতিপত্রও নেন। পরে ইসি আর অভিযোগ না নেওয়ায় ৩০টি অভিযোগ ফ্যাক্স করেন। নির্বাচন বয়কটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার উত্তর ও দক্ষিণের কোনো পক্ষই ইসিতে আর অভিযোগ দেননি তাঁরা। এ ছাড়া পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন কেন্দ্রের অনিয়মের অভিযোগ এসেছে।
নির্বাচনের দিনের ঘটনায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আওয়াল, দক্ষিণের মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, সহস্র নাগরিক কমিটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অনিয়মের তদন্ত চেয়েছেন।
আওয়ামী লীগের ওই তিন নেতার মতে, হয়তো বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত হবে। তবে বিজয়ী কারও প্রার্থিতা বাতিলের মতো ঘটনা ঘটবে না।

কেন রাজনীতি ছাড়লেন মনজুর? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

নির্বাচন বর্জন শুধু নয়, রাজনীতি থেকেও অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র মনজুর আলম। নির্বাচনে নানা অনিয়ম, পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াসহ নানা অভিযোগে নির্বাচন শুরু হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন মনজুর। তখন তাঁর পাশে ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মামুন ও নগর সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যে অভিযোগ তাঁরা তুলেছেন, তাতে যে সত্যতা আছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু এত দ্রুত নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং রাজনীতি থেকে মনজুরের অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত নির্বাচনের প্রথমার্ধেই বর্জনের পরও তাঁর বড় অঙ্কের ভোট পাওয়ার (৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৭) ঘটনা সিদ্ধান্তটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
রাজনীতি থেকে কেন অবসর নিলেন মনজুর? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগেই যে কথাটি বলতে হবে, সেই অর্থে কখনোই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না তিনি। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক উদ্যোগে সমাজসেবামূলক কাজের জন্য তাঁর যতটা সুনাম ও পরিচিতি এ অঞ্চলে, রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে ততটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি তিনি, কিংবা হয়তো তা তিনি চানওনি।
দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড থেকে টানা তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তখনকার মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবে প্যানেল মেয়র যেমন ছিলেন, তেমনি বিভিন্ন সময় ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এক-এগারোর সরকার আসার পর একদিকে তৎকালীন মেয়র মহিউদ্দিন গ্রেপ্তার হলেন, অন্যদিকে মনজুর ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পেলেন। মহিউদ্দিন মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে সন্দেহ-অবিশ্বাস ও দূরত্ব সৃষ্টি হয় মনজুরের। এই দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝি নিরসনের অনেক উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে পারেননি মনজুর। একবার অন্তত ‘লিডারে’র সঙ্গে একান্ত আলাপের সুযোগ পেলে সব সংশয় দূর হয়ে যাবে—এমন কথা বারবার বলেও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তিনি।
যা-ই হোক, এসব ঘটনার পর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনজুর তাঁর ‘লিডার’ মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিএনপি তাঁকে সমর্থন দেয়। ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’র এই কৌশল যে ফলপ্রসূ হয়েছিল, সেই নির্বাচনে মনজুরের বিজয়ই তার প্রমাণ। এর মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন তিনি। বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টার পদও লাভ করেছেন। কিন্তু সে অর্থে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি বা আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেনসহ বড় একটি অংশের যে অভিযোগ, তা অনেকাংশেই সত্য। বরং মেয়র নির্বাচিত হওয়ার অল্প কিছুদিন পর থেকেই মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটে তাঁর। আগের মেয়াদে মহিউদ্দিনের নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প যেমন তিনি অব্যাহত রেখেছেন, তেমনি করপোরেশনেও মহিউদ্দিনের বলয় ভেঙে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেননি। মহিউদ্দিনের জামাতাকে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা পদে বহাল রাখা, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার মহিউদ্দিনের ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং এর ভিসি পদ বা থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (টিআইসি) পরিচালক পদে কোনো ধরনের পরিবর্তন না আনা ইত্যাদি পূর্বসূরির সঙ্গে তাঁর সমঝোতার পথে চলার অভিপ্রায়কেই প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যর্থতার যত সমালোচনাই হোক, সিটি করপোরেশনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা ও নিজের দুর্নীতিমুক্ত একটি ক্লিন ইমেজ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি।
নির্বাচন বর্জন করে মনজুর আলম বলেছেন, ‘জীবনে ছয়বার নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে না দিয়ে জোরপূর্বক কেন্দ্র দখলের মতো পরিস্থিতি কখনো দেখিনি। তাই ভবিষ্যতে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেব না।’ এ কথা শুধুই আবেগপ্রসূত নয়, ভোটের বাস্তব চিত্রেও তাঁর কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়।
মনজুরের রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া প্রসঙ্গে আমীর খসরু মাহমুদ বলেছেন, রাজনীতি ছাড়ার বিষয় একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। দলের কোনো সিদ্ধান্ত নয়। আবদুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, তিনি হয়তো বলতে চেয়েছেন বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিবেশ তাতে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। তিনি স্বচ্ছ রাজনীতির মানুষ হিসেবে পরিচিত, স্বচ্ছ রাজনীতি পছন্দ করেন। এসব কথার যুক্তি অস্বীকার না করেও বলতে পারি, ভেতরের কথা হচ্ছে, এত তাড়াতাড়ি নির্বাচন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত পছন্দ হয়নি তাঁর। তিনি হয়তো শেষ পর্যন্ত দেখতে চেয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, ভোটারদের মধ্যে তাঁর একটা নীরব সমর্থন আছে। সেটা যে আছে এত অনিয়মের পরও প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যাই তো তা বলে দেয়।
তিন ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা না দিলে কী হতো? নির্বাচনে অনিয়ম কারচুপির একই অভিযোগ কি তাঁরা পরে জানাতে পারতেন না? কেন্দ্রে বিএনপির পোলিং এজেন্টরা যেতে পারেননি, কিন্তু বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা কি কোনো কেন্দ্রে ছিলেন, যাতে কর্মীরা মনোবল পেতে পারেন, সমর্থকেরা নীরবে তাঁদের প্রার্থীর পক্ষে রায় দিতে পারেন? পরিচিত ও প্রভাবশালী নেতারা সরকারদলীয় সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে পড়লে বা নিগৃহীত হলে সেটা সংবাদমাধ্যম বা সাধারণ মানুষের কাছে আরও বড় সংবাদ হয়ে উঠত, অভিযোগেরও গুরুত্ব বাড়ত। কিন্তু বিএনপি নেতারা সেই ঝুঁকি নিতে চাননি।
এ প্রসঙ্গে নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে চাই। ২০০৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এসেছিলেন মেয়র পদপ্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমর্থনে প্রচারকাজে অংশ নিতে। নির্বাচনের দিন চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে একটি নির্বাচনী ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ক্যাম্পটিই ভেঙে দেয় বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী মীর নাছিরের সমর্থকেরা। তিনি রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় গাড়িযোগে মীর নাছির সেখানে হাজির হলে নূর ছুটে গিয়ে তাঁকে অভিযোগ জানালে মীর নাছিরও তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এসব ঘটনা ঘটছিল সাধারণ ভোটার ও সাংবাদিকদের সামনে। সেই নির্বাচনে হেরেছিলেন মীর নাছির। সবচেয়ে বড় কথা, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কেন্দ্রটিতে, যেখানে মহিউদ্দিনের সমর্থকেরা দাঁড়াতেও পারছিলেন না, সেখানে মীর নাছিরের দ্বিগুণ ভোট পেয়েছিলেন মহিউদ্দিন। নিজের চোখে দেখা এই ঘটনার উল্লেখ করার কারণ নিজেই সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, অনেক সময় কেন্দ্রের বাইরের চেহারা দেখে ভেতরের অবস্থা বোঝা যায় না।
২০১০ সালের মেয়র নির্বাচনের সময়ও দেখেছি, প্রবল প্রতাপশালী মহিউদ্দিনের হারিকেন মার্কা প্রতীকের ব্যাজ পরে ঘুরতে থাকা শত শত কর্মীর চোখ এড়িয়ে মনজুর আলমের আনারসের প্রতীকে ভোট দিয়েছিলেন। হারিকেন প্রতীকের ব্যাজ পরে মনজুরের সমর্থকেরাও যে ভিড়ে মিশে গিয়েছিলেন, সে কথাও তো পরে বোঝা গিয়েছিল।
এসব অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় থাকতে চেয়েছিলেন মনজুর। কিন্তু দল সেটা চায়নি, বরং অর্ধেকেরও বেশি সময় বাকি থাকতেই ওয়াকওভার দিয়েছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা।
নির্বাচনের পরিবেশ নিঃসন্দেহে হতাশাব্যঞ্জক, পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীদের ‘হাঁফ ছেড়ে বাঁচার’ মনোবৃত্তিও আশাহত করেছে মনজুরের সমর্থকদের। রাজনীতি থেকে মনজুরের অবসর গ্রহণের সিদ্ধান্তও এই হতাশার ফল বলে মনে করি আমরা।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

বলি হলো স্থানীয় সরকারব্যবস্থা by তোফায়েল আহমেদ

২৮ এপ্রিলের তিন সিটি নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচনী গণতন্ত্র, গণপ্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থা এবং সার্বিকভাবে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের নিরুদ্দেশ যাত্রায় নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হলো। এ নির্বাচনে একমাত্র অর্জন হচ্ছে পদবি। আর অন্যদিকে রাজনীতি ও গণতন্ত্র অন্ধকারের পথে যাত্রা করল। এ নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে নিয়মতান্ত্রিকতা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল, সহিংস ও অনিয়মতান্ত্রিকতার রাজনীতির গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও ফলাফল সেই সুযোগের মূলোৎপাটন করেছে।
এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আবার নতুন করে আস্থা স্থাপন করা কঠিন হবে। এ নির্বাচনে ক্ষতি হয়েছে গণতন্ত্রের, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার। জাতীয় রাজনীতির সব ভার স্থানীয় সরকারের ওপর চাপানো হয়েছিল। সে ভার সওয়ার সাধ্য তার ছিল না, ফলে তাতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষের মধ্যে একটা ব্যাপারে খুব মিল রয়েছে। তারা কেউই স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর বা শক্তিশালী করতে চায়নি বা চায় না। তাদের অভিপ্রায়ের মধ্যেও তা নেই এবং ছিল না। দুপক্ষের কৌশলেও বেশ মিল আছে। এই তিন সিটির নির্বাচন ছিল উপলক্ষ মাত্র। তারা উভয়েই জাতীয় রাজনীতির কৌশল হিসেবে স্থানীয় সরকারকে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এই কৌশলে উভয়েই জয়ী হয়েছে। বিরোধীরা এখন জোর গলায় বলা শুরু করেছে, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব না। তারা বলছে, এর ফলে তাদের নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আরও ‘পাকাপোক্ত’ হয়েছে। যদিও এই স্থানীয় নির্বাচনের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। আর সরকার দাবি করতে পারবে, বিরোধীরা কোণঠাসা হয়ে গেছে। তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। এই কৌশলের রাজনীতিতে উভয়েই জয়ী হয়েছে তা ঠিক, কিন্তু এর ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সেটা আমাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি।
কথা হচ্ছে, দেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক পরাশক্তির রাজনীতিতে স্থানীয় সরকারবিষয়ক নীতিকাঠামো নেই। নির্বাচনী রাজনীতিতে তারা স্থানীয় সরকারকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। আগে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন ও সর্বশেষ এই তিন সিটি নির্বাচনে বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। যেমন: পাঁচ সিটির মেয়রদের দুজন কারাগারে, তিনজন পলাতক, উপজেলা পরিষদের খবর নেই, আর সেই মিছিলে যুক্ত হলো এই তিন সিটি। তবে এবার যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা সরকার-সমর্থিত হওয়ায় সে সমস্যা হয়তো হবে না। তবে সিটি করপোরেশন যে খুব কার্যকর হবে, তা বলা যায় না।
এই বিজয়ে বিজয়ীদের উল্লাস নেই, পরাজিতদের মনে বেদনাও নেই। পরাজিতরা এই নির্বাচনকে কৌশলগত দিক দিয়ে নতুন জায়গায় নিয়ে যাবে। তারা নতুন উদ্যমে পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাবে, তবে কীভাবে তারা সেটা করবে, সেটাই দেখার বিষয়। ক্ষমতাসীনদের শিরস্ত্রাণে নতুন পালক যুক্ত হয়নি, বরং তাদের কপালে কলঙ্কতিলক জুটেছে।
এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও কম। তিন সিটিতে ভোট পড়েছে মোট ৪৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। স্থানীয় নির্বাচনের ইতিহাসে এটা সর্বনিম্ন। আবার এটাও যে প্রকৃত হিসাব, তা-ও জোর গলায় বলা যাচ্ছে না। এদিকে ২০১৬ সাল হচ্ছে স্থানীয় নির্বাচনের বছর, কিন্তু মানুষ ভোট দিতে আস্থা পাবে বলে মনে হয় না। স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় ত্রুটিও আছে। যেমন সব আলোচনা ও ডামাডোল হয়েছে মেয়র প্রার্থীকে কেন্দ্র করে। সব আলো ছিল তাঁদের ওপর। কিন্তু কাউন্সিল প্রার্থীদের নিয়ে কেউ কথা বলেনি। অথচ তাঁরাই হচ্ছেন স্থানীয় সরকারের প্রাণ, সেই চেতনার ধারক-বাহক। ফলে এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার চেতনা ধ্বংস করা হয়েছে। আবার সহিংসতা করেছেন কিন্তু কাউন্সিলর প্রার্থীরাই। সেটাও ঘটেছে সরকার-সমর্থিত প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে। এ কারণে এসব সামাল দেওয়া যেত। আর সেটা হলে নির্বাচনকে কিছুটা কলঙ্কমুক্ত করা যেত।
অন্যদিকে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা থাকলেও তারা ভোটারদের দিয়েই সেটা কাটিয়ে উঠতে পারত। ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করে তারা সরকারের গা-জোয়ারির জবাব দিতে পারত। কিন্তু তারা সেটা পারেনি। ফলে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় রাজনীতিতে বিরাজমান আস্থাহীনতার বলি হলো স্থানীর সরকারব্যবস্থা। এটা ক্রিয়াশীল না হলে গণতন্ত্র কখনো কার্যকর হতে পারবে না। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে বলে সেখানে নির্বাচনী গণতন্ত্র কার্যকর হয়েছে। আর সেখানে আমরা স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে আরও কমজোর করে ফেললাম। এর ফলে গণতন্ত্রের যে নিরুদ্দেশ যাত্রা শুরু হলো, তা কোথায় গিয়ে শেষ হবে, আমরা তা জানি না।
ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সদস্য, স্থানীয় সরকার কমিশন।

‘বিশৃঙ্খল অবস্থায় বাংলাদেশ’

বাংলাদেশ বর্তমানে ‘বিশৃঙ্খল অবস্থায়’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলবিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান ম্যাট স্যামন।
এছাড়া ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের চেয়ারম্যান আলী রিয়াজ বলেছেন, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের গণতন্ত্র সমুন্নত রাখার একটি বড় সুযোগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হাতছাড়া করেছে। ফলে ২০১৫ সালের এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির দায় তারা এড়াতে পারে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ‘বাংলাদেশের সংকট: রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় উগ্রপন্থা’ শীর্ষক এক শুনানিতে ম্যাট স্যামন ও আলী রিয়াজ এই মন্তব্য করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া এবং প্যাসিফিক অঞ্চলবিষয়ক এই উপ-কমিটি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি কমিটি। খবর ইউএনবির।
শুনানিতে ম্যাট স্যামন বলেন, ‘যদিও দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ দুই ভাগে বিভক্ত; তবে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে এবং এতে বিপুলসংখ্যক নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।’ তিনি বলেন, এই ব্যাপারটিকে যথার্থ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া না হলে দেশটিতে বারবার কট্টর ইসলামপন্থীদের সহিংসতার ঘটনা ঘটতে থাকবে।
ম্যাট স্যামন বলেন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণে কর্মী সংগ্রহ করছে। এটি দমনে ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় তার আঞ্চলিক সহযোগীদের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা আশা করছে।
শুনানিতে অংশগ্রহণকারী হিসেবে আরও ছিলেন এশিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো লিসা কার্টিজ এবং হিন্দু-আমেরিকান ফাউন্ডেশনের সরকার বিষয়ক পরিচালক জয় কানসারা।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আলী রিয়াজ বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে সংঘর্ষ হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এই নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের সংকট সমাধানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগের অভাব ছিল।
আলী রিয়াজ বলেন, ওই নির্বাচনের পর পুরো ২০১৪ সাল জুড়ে বাংলাদেশে যে শান্ত অবস্থা ছিল তার সদ্ব্যবহারের সুযোগ শুধু ক্ষমতাসীনরাই হাতছাড়া করেনি বরং গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার সুযোগটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে ২০১৫ সালে সৃষ্ট রাজনৈতিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এড়াতে পারে না। তিনি বলেন, দিন দিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে খারাপের দিকে যাচ্ছে তাতে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা যোগাযোগের পথ ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে।

অগ্রহণযোগ্য সিটি নির্বাচন, নির্বাচন কমিশনই খলনায়ক

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অনুশীলনের ঘাটতি থাকলে যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না, তা আবারও প্রমাণিত হলো। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে জনসাধারণের মধ্যে যে প্রত্যাশা জেগেছিল, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের অতি-উৎসাহী কর্মীদের স্বেচ্ছাচারিতায় সেটি নস্যাৎ হয়ে গেছে। সিটি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি না ঘটার কারণ নির্বাচনকেন্দ্রিক নানামুখী হুমকিধমকি ও জবরদস্তি। বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের হয়রানি করার ক্ষেত্রে বল্গাহীন মনোভাব দেখিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনও চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার মুখে সংশ্লিষ্টদের ‘কঠোর নির্দেশ’ দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে কমিশনের ভূমিকা ছিল খলনায়কের। নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েন নিয়ে যে স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে জনমনে শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
অন্যদিকে, সবার জন্য সমতল মাঠ তৈরি করে দিতে তারা ন্যূনতম উদ্যোগ নিতেও ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, একটি দীর্ঘ সহিংস হরতাল–অবরোধের পটভূমিতে সমতল মাঠ করে দিতে হলে ইসির তরফে অনেক সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডে বরাবরই ক্ষমতাসীনদের তোষণের মনোভাব লক্ষ করা গেছে। বিএনপির চেয়ারপারসনের গাড়িবহর বিষয়ে তারা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনলেও তাঁর ওপর পুলিশের উপস্থিতিতে হামলার বিষয়ে তারা রহস্যজনক কারণে নীরব থেকেছে। ভোটের দিনে ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ কেন্দ্রে বিএনপিদলীয় নির্বাচনী এজেন্টরা অনুপস্থিত ছিলেন। ভোটকেন্দ্রের বাইরে প্রায় সর্বত্র সরকারদলীয় সমর্থকদের মহড়া ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
দায়দায়িত্ব যাঁরই কমবেশি হোক না কেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া থেকে বহু দূরে। নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সরকারি দলকেও এর দায় নিতে হবে। নির্বাচন বর্জন করার ডাক কিংবা যেকোনো মূল্যে জয়লাভের চেষ্টা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। অসুস্থ রাজনীতি ও অশিষ্ট নির্বাচনের এই ধারা থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই নির্বাচনে যে–ই জয়ী হোক না কেন পরাজিত হয়েছে গণতন্ত্র।

রাজনীতির আকাশে ফের কালো মেঘ by শেখ মামুনূর রশীদ

রাজনীতির আকাশে আবারও কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে- এমনটাই ভাবছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে আশার আলো দেখতে শুরু করেছিলেন তারা। কিন্তু এ নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি, কমিশনের একচোখা নীতি এবং নির্বাচনের মাঝপথে বিএনপির ভোট বর্জনের ঘটনায় নিভু নিভু করছে সেই আশার আলো। আবারও সূচনা হতে পারে সহিংসতার রাজনীতির। দেশের রাজনৈতিক সংকটও আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে আশংকা বিশ্লেষকদের।
দশম জাতীয় সংসদের বছর পূর্তির দিন অর্থাৎ গত ৫ জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি দেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আগের দিন গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে ওঠেন। একটানা ৩ মাস তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে অবরোধের পাশাপাশি হরতালও দেয় তারা। ২০ দলীয় জোটের টানা আন্দোলনে প্রাণহানিসহ বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর মধ্যেই সরকার উদ্যোগ নেয় তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের। ১৮ মার্চ সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। আওয়ামী লীগসহ অন্য দলগুলোর পাশাপাশি বিএনপিও এ নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে যে সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল, নির্বাচনের দিন থেকেই তা হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। সিটি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। যদিও এর প্রতিবাদে এখন পর্যন্ত তারা আন্দোলনের কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। বিএনপি নেতারা দাবি করেছেন, দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠকের পর আন্দোলনে যাবেন তারা। তবে এক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করতে নারাজ তারা। তাই আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সময় নিচ্ছে ২০ দলীয় জোট।
তবে বিশ্লেষকদের এসব আশংকা আমলে নিতে নারাজ শাসক দল দল আওয়ামী লীগ। তাদের মতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট প্রথম দিন থেকেই সরকার উৎখাতের আন্দোলন করছে। টানা ৩ মাস আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। জনগণকে জিম্মি করে রাজনীতি করেছে। এতে সরকারের কোনো ক্ষতি হয়নি, বরং জনমত উল্টো তাদের বিপক্ষে গেছে। যে কারণে তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেই সাধারণ মানুষ বিএনপি প্রার্থীদের বিপক্ষে রায় দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, বিএনপি এখন কাগুজে বাঘ। তাই তাদের হুমকি-ধমকিতে আওয়ামী লীগ ভয় পায় না। তিনি আরও বলেন, বিএনপির সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আসা এবং নির্বাচনের দিন সকালেই ভোট বর্জন ‘পূর্বপরিকল্পিত’ এবং রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তারা একটি ইস্যু তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায়। এতে কোনো লাভ হবে না। কারণ বিএনপির সঙ্গে দেশের মানুষ নেই।
এ মতের বিপরীতে বিএনপি বলছে অন্য কথা। তাদের মতে, বিএনপি প্রথম থেকেই বলে আসছে আওয়ামী লীগের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। যে কারণে তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই বিএনপি তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়। এ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি জনগণ স্বচক্ষে দেখেছে। যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে বিএনপির নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি ছিল যৌক্তিক। এ প্রসঙ্গে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ বলেন, সরকারের শত দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তারা তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার যে আচরণ করেছে, তাতে প্রমাণ হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনোভাবেই অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ আরও বলেন, এবার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দেখার পর জনগণও বুঝতে পেরেছে বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি কেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের যৌক্তিকতাও প্রমাণিত হয়েছে। জনগণের রায় প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদেরই পতন ত্বরান্বিত করেছে। তিনি বলেন, এত বড় ভোট ডাকাতির পর নিশ্চয়ই তারা ঘরে বসে থাকবেন না। শিগরিই মাঠে নামবেন। তিন সিটি নির্বাচনে ভোট ডাকাতিসহ সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজপথে নামবেন তারা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ আরও বলেন, দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কর্মসূচি নির্ধারণ করবেন। তারা আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না। হুটহাট কর্মসূচিও দেবেন না। এবার অনেক ভেবেচিন্তে কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামবেন।
দুই প্রধান দল ও জোটের এ মুখোমুখি অবস্থান রাজনীতির জন্য অশনি সংকেত বলে মন্তব্য করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে এক ধরনের সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন নিয়ে যা ঘটল তা কারও কাছেই কাক্সিক্ষত ছিল না। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও রাজনীতির আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের ফল নিয়ে যেমন প্রশ্ন আছে, তেমনি বেলা গড়াবার আগেই বিএনপির নির্বাচন বর্জন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একইভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেন, ভোটের রাজনীতি আবার মাঠে গড়াবে। হয়তো আবারও সংঘাত-সহিংসতার সংস্কৃতি ফিরে আসবে। এমনটি হলে তা সত্যিই আমাদের সবার জন্য দুঃখজনক হবে।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে টানা ৩ মাস সংঘাত-সহিংসতার মধ্যে ডুবে ছিল দেশ। সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ঘোষণা এবং এই নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণে মনে হয়েছিল গণতন্ত্র যেভাবে লাইনচ্যুত হয়ে পড়েছে, তা বুঝি আবার লাইনে আসছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মনে হচ্ছিল যেভাবে সব দল মিলে নির্বাচন করেছে, একসঙ্গে গলাগলি করেছেন, তাতে আমরা একটা সুস্থ ধারায় ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার কারণে এ নির্বাচন নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। তিনি আরও বলেন, তিন সিটিতেই নির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে তা সত্যিই অনভিপ্রেত। এরকমটা কারও কাছেই কাম্য ছিল না। সংঘাত-সহিংসতার আশংকা দেখা দেবে। যা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। সবাইকে এর জন্য খেসারত দিতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র বলতে মানুষ যেটি মনে করতেন, সেটি হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু সেই নির্বাচন তো আর হল না। এবারের তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে গেল দেশে আর গণতন্ত্র থাকল না। ২০১৪ সাল থেকে দেশে আর নির্বাচন নেই। সব চলছে গায়ের জোরে। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনা জাতীয় জীবন ও রাজনীতিতে অবশ্যই বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তবে কীভাবে ফেলবে, কতটুকু ফেলবে- তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ও পেশিশক্তির প্রয়োগে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হওয়ায় তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক একটি প্রতিষ্ঠান তার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ব্যাপক কারচুপির নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ থাকার পরেও কমিশন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে অস্বীকৃতি, মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে নিজেকে বিব্রত করেছে। এ ঘটনার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নতুন করে ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনীতি থেকে উত্তরণের যে ইতিবাচক সুযোগের সৃষ্টি হয়েছিল, তা নষ্ট হয়েছে।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়ম রাজনীতির জন্য একটি অশনি সংকেত। তিনি বলেন, মানুষ তার রাগ এবং ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় নির্বাচনে ভোট দিয়ে। তা যদি ব্যাহত হয় তাহলে সে অনিয়মতান্ত্রিক পথে হাঁটতে শুরু করে। ভোটের লড়াই রাজপথে গিয়ে পেশিশক্তির লড়াইয়ে পরিণত হয়। রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি সমাধানে আসার চেষ্টা চলে। আর এ চেষ্টা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তাহলেই গণতন্ত্র ব্যহত হয়। এ বিষয়টি সব পক্ষকে বুঝতে হবে। না বুঝলে বিপদ আসন্ন। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অনেক আশা, সংশয় ও অনিশ্চয়তা নিয়েই তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মানুষ আশা করেছিল, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কারণে বাংলাদেশের সহিংস রাজনীতিতে যে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করবে, তা অব্যাহত থাকবে। অনেকে এটাও আশা করেছিলেন, একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে বিদ্যমান রাজনৈতিক বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এ আশায় গুড়ে বালি হয়েছে। রাজনীতি বোধ হয় আবারও সেই পুরনো পথেই হাঁটতে শুরু করবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দলের নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি রাজনীতিকে আরও গভীরতম অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে। সন্ত্রাস, সহিংসতা ও নৈরাজ্য বাড়বে। যা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।
ঐক্য ন্যাপের সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনের নামে যা ঘটে গেল তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে রাজনীতিসহ সামগ্রিক জনজীবনে। তিনি বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু না হলে পরিণতি ভয়ংকর হয়। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচন বর্জনের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। একইভাবে নির্বাচন কমিশনও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, এখন ভোটের রাজনীতি মাঠে গড়াবে। এক দল সরকার হঠাতে শক্তি প্রদর্শন করবে। আর যারা ক্ষমতায় আছে তারাও টিকে থাকতে শক্তি প্রদর্শন করবে। ফলে রক্তপাত, সংঘাত-সহিংসতা বাড়বে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, যা ঘটেছে, যা পড়েছি, দেখেছি, উপলব্ধি করেছি তাতে এটা পরিষ্কার যে, নির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে তা মোটেও ভালো হয়নি। এর প্রভাব জাতীয় জীবনে, রাজনীতিতে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় পড়বে। তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনের পর পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাজনীতি ভঙ্গুর অবস্থানে চলে গেছে। এর পরিণাম মোটেও শুভ হবে না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আমরা একটা খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি। একটা খারাপ অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করেছি। তিন সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা এক ধরনের ‘ম্যানেজড’ নির্বাচনের যুগে প্রবেশ করেছি। ভবিষ্যতে যত নির্বাচন হবে এ ধরনের ‘ম্যানেজড’ নির্বাচনই হবে। জনগণও এই ‘ম্যানেজড’ নির্বাচনেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে। বিশেষ করে যারা ২০১০ সালের পর নতুন ভোটার হয়েছে তাদের কাছে এ ধরনের নির্বাচন তো স্বাভাবিক মনে হবে। কারণ তারা তো এর আগের ভালো নির্বাচন দেখেনি। তিনি বলেন, এটা দেশের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো নয়। এতে করে রাজনৈতিক সংকট আরও বেড়ে গেল।
সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য সরকার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে একটি নাটক খেলেছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখে এ দেশে ভবিষ্যতে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না- তা আরও একবার প্রমাণিত হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, এ নির্বাচন নিয়ে আর কী বলব। কী হয়েছে তা তো সবার কাছেই পরিষ্কার। তিনি বলেন, এ ঘটনার বিরূপ প্রভাব ফেলবে রাজনীতিতে। জাতীয় ও রাজনৈতিক জীবনে যে সংকট ছিল তা আরও ঘনীভূত হবে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন জানিপপের প্রধান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, নির্বাচনে সরকারি দল যা করেছে তা সত্যিই অনাকাক্সিক্ষত। অন্যদিকে মাঝপথে বিএনপির নির্বাচন বর্জন সুবিবেচনাপ্রসূত ছিল না। তিনি বলেন, নির্বাচনে কারচুপি কিংবা নির্বাচন বর্জনের সংস্কৃতি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী নয়, বরং দুর্বল করে।