Monday, December 16, 2013

সহিংসতা- এদের এখনই রুখতে হবে by আসাদুজ্জামান নূর

আমার নির্বাচনী এলাকায় কখনোই এ রকম সহিংসতা ঘটেনি। ২০০১ ও ২০০৮ সালে নীলফামারী-২ থেকে দুবার সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়েছি। আমার নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা হয়েছে, কিন্তু কখনোই সেটা সহিংসতায় রূপ নেয়নি। ফলে ঘটনাটি ছিল অভাবনীয়।

আমার নির্বাচনী এলাকার কোথাও কোথাও জামায়াতের ঘাঁটি আছে। এখানে আমার বিরুদ্ধে বিএনপি নয়, জামায়াতের প্রার্থীই দেওয়া হয়। সুতরাং, বিএনপির চেয়ে জামায়াত এখানে শক্তিশালী, সেটা বলাই যায়। কিন্তু এখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ছিল, আছে। কখনো কখনো হালকা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, কিন্তু তা লাঠালাঠির পর্যায়ে ছিল না। আমরা কেউই অবস্থাটা এ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবিনি কখনো।
সহিংসতার শুরু মাস ছয়েক আগে থেকে। যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আদালতের রায় আসতে লাগল, তখন থেকে। সে সময় আমাদের পলাশবাড়ী ইউনিয়নের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন প্রামাণিক ও তাঁর চাচার ওপর জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গুরুতর আহত হয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ইদানীং খবর পাচ্ছিলাম, জামায়াতের ক্যাডাররা রাস্তাঘাট কেটে ফেলছে, ব্রিজ খুলে নিচ্ছে। নীলফামারী শহরে কিন্তু এসব হচ্ছিল না। আমার নির্বাচনী এলাকা জেলা সদরে। জামায়াত চেষ্টা করছিল গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে। গ্রাম পর্যায়েও হরতালকারীদের সঙ্গে আমাদের উত্তেজনা ঘটেছে। কিন্তু তীব্র কোনো ঘটনা ঘটেনি।
১২ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে নীলফামারীতে এলাম। ১৩ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল। নির্বাচনী বিধিমালার কারণে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়ে গিয়েছিল। জাসদের প্রার্থীও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
১২ ডিসেম্বর রাতেই খবর পেয়েছিলাম, লক্ষ্মীচাপ ও পলাশবাড়ী ইউনিয়নে এসে হামলা করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে টুপামারি ইউনিয়নের জামায়াতের সমর্থকেরা। এখানে তারা বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপরে অমানুষিক অত্যাচার করেছে। বেশ রাত হয়ে যাওয়ায় সেখানে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা ফায়ার ব্রিগেডও সেখানে যেতে পারেনি। ১৪ ডিসেম্বর আমরা লক্ষ্মীচাপের দিকে রওনা হই। লক্ষ্মীচাপে যাওয়ার সাধারণ রাস্তা দিয়ে যাওয়া হয়নি। পলাশবাড়ীর রাস্তা দিয়ে যেতে হয়েছে। আমরা মোটরসাইকেল, গাড়িবহর নিয়ে পৌঁছালাম লক্ষ্মীচাপ। হাইস্কুল মাঠে আমরা সভা করেছি। সবাইকে সংঘবদ্ধ হয়ে থাকতে বলেছি। যাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়েছিল ওরা, তাদের আশ্বস্ত করেছি। সেখানকার মেয়েরা বলল, রাতে তারা আতঙ্কে ঘরে থাকতে পারে না। বন-জঙ্গলে রাত কাটায়। আমার মনে হলো, একাত্তরেও তো এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। রাজাকার-আলবদরদের ভয়ে বাড়ি থেকে সরে থাকতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে! একাত্তরের বিভীষিকাকেই মনে করিয়ে দিল তাদের বিবরণ। কীভাবে এই নৃশংসতা ও নাশকতা প্রতিরোধ করা যায়, তা নিয়ে ভাবছিলাম। ঢাকায় এসে পরিকল্পনা করব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে বলব ইত্যাদি ছিল মাথায়। কিন্তু টুপামারির ভেতর দিয়ে আসার সময়ই দেখলাম, পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। গাছ কেটে রাখা হয়েছে, রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে। আমরা কিছু গাছ আর ইট ফেলে রাস্তা ঠিক করে এগোতে থাকলাম। এই সময়ই হামলা শুরু হলো। রাস্তার দুদিকে ঢালু, নিচু ধানখেত। সেখান থেকে ইটপাটকেল মারতে লাগল ওরা। কারও হাতে চায়নিজ কুড়াল, কারও হাতে ধারালো ছুরি, রড। রামগঞ্জ বাজারে এসে পৌঁছানোর পথে বাজারের বিভিন্ন গলিপথ দিয়ে ওরা একযোগে আক্রমণ করতে থাকে আমাদের গাড়িবহরের ওপর। আমাদের গাড়িবহরের পেছনের অংশ আমাদের সঙ্গে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিল। সেখানেই মূল আঘাত আসে। চারজন গুরুতর আহত হন, এর মধ্যে সেখানেই দুজন নিহত হন, দুজন মারা যান হাসপাতালে নেওয়ার পর। আহত অনেকের ঠাঁই হয়েছে নীলফামারী হাসপাতালে। গুরুতর আহতদের নেওয়া হয়েছে রংপুর হাসপাতালে। এই নাশকতার পর অপরাধীদের খুঁজতে বিজিবি, র‌্যাব রাতে গিয়েছিল সেখানে। কাউকে পায়নি। বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
এটা যে পূর্বপরিকল্পিত হামলা, তা নিয়ে আমার একেবারেই সন্দেহ নেই। ওরা আমাদের কয়েকজন কর্মীর হাত-পায়ের রগ এমনভাবে কেটেছে, যা পাকা হাতের কাজ। চিকিৎসকেরা বলেছেন, এগুলো প্রশিক্ষিত কেউ করেছে। এরা হয় বাইরে থেকে এসেছে, অথবা বাইরের কেউ এদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সেটা আমি বিশ্বাস করি। কারণ, নীলফামারীর মানুষ এ ধরনের সহিংস কাজে অভ্যস্ত বলে আমি মনে করি না। পরে শুনেছি, আক্রমণকারীদের অনেককেই এই এলাকার মানুষ চেনে না। এরা অন্য এলাকা থেকে এসেছে। এদের মূল টার্গেট আওয়ামী লীগের সমর্থক ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। ঠিক একাত্তরের মতোই।
জামায়াত-শিবির একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মতোই নৃশংস হয়ে উঠেছে। তারা নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করছে, লুটতরাজ করছে; বাড়িতে, যানবাহনে আগুন লাগাচ্ছে। তাদের পাশবিক তাণ্ডবের ফলে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে মানুষ, কাতরাচ্ছে নারী ও শিশু, বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে আত্মরক্ষা করছে কেউ কেউ, আতঙ্কে বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছে বহু মানুষ। একাত্তরে এই অত্যাচারী ঘাতকদের আমরা পরাজিত করেছি। কিন্তু তারা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বহু তরুণকে তারা ধর্মের নামে বিপথগামী করতে পেরেছে। এদের এখনই রুখতে না পারলে জাতি হিসেবে আমরা বিপন্ন হব।
নির্বাচনকে সুনির্দিষ্টভাবে মাথায় রেখেই আমরা আমাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছি। এবার সহিংস রাজনীতির জন্ম হতে পারে, সে রকম আশঙ্কা আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়ে থাকতে পারে। ফলে এ ধরনের তাণ্ডব মোকাবিলার ব্যাপারে আমাদের মানসিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি ছিল না। এই দুর্ঘটনা ঘটার পর আমি মনে করি, আমাদের মানসিক প্রস্তুতিরও খুব দরকার। সেই প্রস্তুতি থাকলে আমরা লড়াই করতে পারি, যেমন করেছিলাম একাত্তরে। এখনো সময় আছে। এখনই সাংগঠনিকভাবে আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আপাতত আক্রান্ত এলাকা পলাশবাড়ী ও লক্ষ্মীচাপের সাধারণ মানুষই রাত জেগে দল বেঁধে নিজেদের পাহারা দিচ্ছে। এভাবেই গড়ে উঠবে প্রতিরোধ।

আসাদুজ্জামান নূর: সাংসদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

বিজয় দিবস- ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ by সেলিনা হোসেন

১৯৭১ সালের বিজয় দিবস দেখেছি। আমার দেখা অবিস্মরণীয় দিন ছিল সেটি। জনতার উল্লাস-মুক্তিযোদ্ধা-মিত্রবাহিনীর শহরে প্রবেশ-পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ-শহরজুড়ে লাল-সবুজ পতাকার উড্ডয়ন মিলিয়ে দুঃখ-বেদনা-আনন্দ-গৌরব ছিল সেই বিজয় দিবসে।
রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণ করছিলেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ থেকে ভেসে আসছিল আজানের ধ্বনি।

এ কথা এক গভীরতম সত্য যে এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে, তারা বুঝতে চায় না ইসলাম শান্তির ধর্ম। সহিংসতার ধর্ম নয়। তাদের হঠকারিতার কারণে তারা রাজনীতির নামে ধর্মের মৌল সত্যকে অস্বীকার করেছে। তাই রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কখনোই ভোটে বিজয়ী হতে পারেনি এই দল।
২০১৩ সালের বিজয়ের মাস বাঙালির জীবনে আবার গভীর তাৎপর্য নিয়ে ফিরে এসেছে। বাঙালি তার অসমাপ্ত কাজের কিছু অংশ সম্পন্ন করতে পেরেছে। এই বিজয়ের মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াতের নেতা যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। বিজয়ের মাসে এটি আরেকটি অবিস্মরণীয় দিন।
যে যুদ্ধাপরাধীরা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে, তাদের শাস্তি পেতেই হবে। দেশের প্রতিটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবিতে এক হতে হবে। শক্ত অবস্থান তৈরি করে জঙ্গিবাদের উত্থান বন্ধ করতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। সবার স্বপ্নের বাংলাদেশ যেন গৌরবের জায়গা থেকে দূরে সরে না যায়।
এই বিজয়ের মাসে মানুষের বুকফাটা আর্তনাদে তলিয়ে গেছে স্বদেশ। পুড়ে দগ্ধ হওয়া মানুষেরা একাত্তরের পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের সমতুল্য যন্ত্রণা ভোগ করেছে। হত্যা-নির্যাতন-জাতীয় সম্পদ ধ্বংস-বৃক্ষনিধন, যানবাহনে আগুন, ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, গ্রেনেড, পেট্রলবোমার ব্যবহার ইত্যাদি করে জামায়াতে ইসলামী নামের দলটি মানুষকে একাত্তরে তাদের অবস্থান আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দোসর হয়েও সেদিন তারা জিততে পারেনি, আজও পারবে না। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চেও তরুণ প্রজন্মের সমাবেশ এই সত্যকে প্রতীয়মান করে। তারা বলছে, রাজাকারমুক্ত করবে স্বদেশ।
যে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন-সহযোগিতা না দিয়ে হানাদার বাহিনী পাকিস্তানিদের সহযোগিতা দিয়েছিল, ৪২ বছর পরও তারা ভোলেনি সেই সব স্বাধীনতাবিরোধীদের। আপনজন তখন ছিলেন নিক্সন-কিসিঞ্জার, এখন আছেন ওবামা-জন কেরি। সে জন্য কাদের মোল্লার প্রাণরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন। যে ভুল করেছিলেন একাত্তরে, তার জন্য অনুতপ্ত হন না। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের দিকে তাকিয়ে তাঁদের বোঝা উচিত ছিল তরুণ প্রজন্ম কী চায়। সময়ের নাড়ি অনুধাবন না করে তাঁরা আবার নিক্সন-কিসিঞ্জারের ভূমিকা পালন করছেন।
এটা সত্যি যে একাত্তরে যেমন তাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, ২০১৩-তেও তাদের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হয়েছে। অনেক দুঃখ-বেদনা-মৃত্যুর যন্ত্রণার মধ্যে এটা সান্ত্বনা। সামনে আরও পথ পাড়ি দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হবে, ‘সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান আগে।’
বাংলাদেশের বিজয়ের মাসে মৃত্যুবরণ করলেন বিশ্ববিবেক নন্দিত রাজনীতিবিদ-রাষ্ট্রনায়ক নেলসন ম্যান্ডেলা। তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উৎসবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বলেছিলেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। যে প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি ভিন্ন দেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তার ন্যূনতম মানবিক আবেগ মার্কিন রাষ্ট্রনায়কদের ছিল না।
৪২ বছর পরে দেশ অনেক এগিয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়েছে এ দেশের মানুষ। একাত্তরের খুনির মানবাধিকার কী করে ভিন্ন দেশের মানুষের কাছে বড় হয়, এটা অবিশ্বাস্য লাগে।
ম্যান্ডেলার রাজনীতির দর্শনে শান্তি ও গণতন্ত্র শব্দ দুটো অটল ছিল। তিনি প্রতিরোধ ও সমঝোতার বিষয়কে গভীরভাবে দেখেছিলেন। আজকের বাংলাদেশে এ সত্যটি দেখার সময় হয়েছে। রাজনীতি যেন মানুষের পক্ষেই থাকে সত্য উপলব্ধির ভেতর দিয়ে। মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে দাঁড়িয়ে কোনো নারী যেন কাঁদতে কাঁদতে না বলেন যে গণতন্ত্রকে লাথি মারি।
আমরা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই। একজন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়াই শেষ কথা নয়। আমরা সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকর দেখতে চাই। আমরা শান্তি ও স্বস্তির দেশ দেখতে চাই। বাংলাদেশ একটি ধর্মের দেশ নয়, সব ধর্মের, জাতি-বৈচিত্র্যের দেশ, এটা বড় গলায় বলার উৎসব চাই। যারা সহিংস রাজনীতি নিয়ে মানুষের জীবন ছারখার করছে, তাদের শক্ত হাতে দমন করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই। বিজয়ে
মানুষ আনন্দ করবে, সেই পরিসর উন্মুক্ত করার জন্য বিরোধী দলকে অনুরোধ জানাই।
২০১৩ সালের বিজয়ের মাস দেশের মানুষের মর্যাদার বোধকে সমুন্নত করেছে—২০১৩ সালের বিজয়ের মাস তরুণ প্রজন্মকে প্রতিজ্ঞায় উদ্বুদ্ধ করেছে—এই হোক আমার শান্তি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই—‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।’
সেলিনা হোসেন: কথাসাহিত্যিক।

বিএনপিকে অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে- দেশ ধ্বংসের আন্দোলন!

১৮-দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপি দাবি করে আসছে যে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ধ্বংসাত্মক আন্দোলন ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড তারা সমর্থন করে না। তারা ‘শান্তিপূর্ণ’ আন্দোলন করছে সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে।
কিন্তু দলটি নিজেদের যৌক্তিক আন্দোলনকে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি করে ফেলেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ভিডিও বার্তা বা বিবৃতির মাধ্যমে বিএনপির নেতারা কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের হত্যা, নৈরাজ্য ও নাশকতা শুরু হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যজনক যে, বিরোধী দলের ‘শান্তিপূর্ণ’ অবরোধ কর্মসূচি শুধু জনগণের অবর্ণনীয় দুর্ভোগই সৃষ্টি করেনি, বহু প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞেরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর থেকে জামায়াতে ইসলামী সারা দেশে হত্যা, নৈরাজ্য ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। সরকারি স্থাপনা, পুলিশের যানবাহন, যাত্রীবাহী গণপরিবহন ও ট্রেনে চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর পাশাপাশি তারা সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, যা একাত্তরে দলটির মানবতাবিরোধী অপরাধের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

নীলফামারী জেলার এরকম একটি আক্রান্ত সংখ্যালঘু এলাকা পরিদর্শন শেষে গত শনিবার ঢাকায় ফেরার পথে স্থানীয় সাংসদ ও জনপ্রিয় অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের গাড়িবহরে হামলা চালায় জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা। তাদের নিবৃত্ত করতে পুলিশ অভিযান চালালে, তারাও পাল্টা আঘাত হানে এবং দুই পক্ষের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। এটি চোরাগোপ্তা নয়, পরিকল্পিত হামলা।
এখানে সরকারের ব্যর্থতার দিকটিও স্পষ্ট। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী যে আরও ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হতে পারে, সেটি কি সরকারের নীতিনির্ধারকেরা জানতেন না? জানলে কেন তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলেন না?
প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে বুঝতে হবে যে, তাদের কাঁধে ভর করে মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে আক্রোশমূলক সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা একাত্তরে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাইছে। এখন বিএনপিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা সেই যুদ্ধে কোন পক্ষে থাকবে?

খালেদা পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন: হানিফ

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, কাদের মোল্লার ফাঁসি হওয়ার পর পাকিস্তানের জামায়াত গায়েবানা জানাজা পড়েছে। এ থেকে পাকিস্তান প্রমাণ করেছে, তারা নীলনকশা করছে।
আর বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। ষড়যন্ত্রকারীরা পাকিস্তানের এজেন্ট দিয়ে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে আর সহ্য করা হবে না।

আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের সামনে বিজয় র্যালি-পূর্ব সমাবেশে হানিফ এ কথা বলেন।
সমাবেশে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেন, ‘প্রতিটি এলাকায় জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতা- কর্মীদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা যখন বিজয় দিবস পালন করছি, তখন তারা দেশে আগুন লাগিয়ে, বাস পুড়িয়ে, গাছ কেটে নিরীহ মানুষ হত্যা করছে। এটা আর হতে দেওয়া যায় না।’
পরিবেশ ও বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াত-শিবির জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অনেক ধৈর্য ধরেছে। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্র রক্ষায় তারা আর ধৈর্য ধরবে না। সরকার আরও কঠোরভাবে সহিংসতাকারীদের দমন করবে।
এ দিকে মত্স্য ভবন থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উদ্দেশে আওয়ামী লীগের বিজয় র্যালি শুরু হয়েছে। এতে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগসহ হাজারো নেতা-কর্মী অংশ নিয়েছেন। ঢোল-তবলা বাজিয়ে তাঁরা বিজয় উল্লাসে মেতে উঠেছেন।

নির্বাচনী সংকট- না থাকা সদিচ্ছার ওপর আস্থা by আলী ইমাম মজুমদার

আমাদের দেশটিতে অশান্ত অবস্থা বিরাজ করছে মোটামুটি দীর্ঘ সময়। সম্প্রতি এটি ধারণ করেছে প্রকট আকৃতি। প্রায় লাগাতার অবরোধ ও হরতাল জনজীবনকে অচল করে দিয়েছে। এসব কর্মসূচিতে প্রাণঘাতী পেট্রলবোমা ছোড়া হচ্ছে চলমান যানবাহনের ওপর।

বিজয় দিবস- পতাকার জন্য ভালোবাসা by শাহানা হুদা

বিজয় দিবসের একটি অনুষ্ঠানে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা’ গানটি গাইছে একজন তরুণ। কণ্ঠ ও সুর কোনোটাই সে রকম ভালো নয়। কিন্তু যারা শুনছে, তারা মোহিত হয়েই শুনছে। এরপর আরেকজন গাইল ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ গানটি।

না থাকা সদিচ্ছার ওপর আস্থা

আমাদের দেশটিতে অশান্ত অবস্থা বিরাজ করছে মোটামুটি দীর্ঘ সময়। সম্প্রতি এটি ধারণ করেছে প্রকট আকৃতি। প্রায় লাগাতার অবরোধ ও হরতাল জনজীবনকে অচল করে দিয়েছে। এসব কর্মসূচিতে প্রাণঘাতী পেট্রলবোমা ছোড়া হচ্ছে চলমান যানবাহনের ওপর। অগ্নিদগ্ধ হয়ে হতাহত হচ্ছেন অনেকে। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাস, ট্রাক, ট্রেন—এমনকি নদীতে নোঙর করা লঞ্চেও। রেললাইন উপড়ে ফেলা হচ্ছে। ঘটছে ট্রেন দুর্ঘটনা। হতাহত হচ্ছেন অসহায় যাত্রীরা। বাড়িঘর ও দোকানপাটে আগুন দেওয়া হচ্ছে। এমনকি হরতাল-অবরোধ অমান্য করেনি, এমন থেমে থাকা গাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা হেলপারও মারা গেছেন অগ্নিদগ্ধ হয়ে। প্রশ্ন আসবে এর দায় কার? কেন এ পরিস্থিতির উদ্ভব হলো, তাও আলোচনার দাবি রাখে। তবে তার আগে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পর্যালোচনা করা আবশ্যক। মানুষের যানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের। এ ক্ষেত্রে সরকার তা করতে সক্ষম হচ্ছে না। গোটা যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত স্তব্ধ। এতে অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বেশুমার। উৎপাদিত পণ্য কোথাও পচে যাচ্ছে। কোথাও বা সে পণ্য অগ্নিমূল্যে সংগ্রহ করতে হচ্ছে ভোক্তাকে।
মহাসড়কসহ দেশের কতিপয় স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ নেই। এদের সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদেরও নিরাপত্তাহীন দেখা যায়। খোদ রাজধানীতেও তারা আক্রান্ত ও তাদের গাড়ি অগ্নিদগ্ধ হয়। তাই তাদের সহায়তায় সামরিক বাহিনী নিয়োগ সময়ের দাবি। একটি দেশ দিনের পর দিন এভাবে অবরুদ্ধ থাকতে পারে না। এ জাতীয় নাশকতামূলক কাজের জন্য মামলা হচ্ছে। তবে সেসব মামলায় গ্রেপ্তার হচ্ছেন বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। এতে পরিস্থিতির অবনতিই ঘটছে। বেশ কিছু ঘটনার ভিডিও ফিল্ম আছে। গণমাধ্যমও সহায়তা করতে পারে তাদের সংগ্রহ থেকে। প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই যথোচিত হবে। তবে বিষয়টিতে বিরোধী দলের নেতাদের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। কর্মসূচি চলাকালে এ ধরনের নাশকতামূলক কাজের দায় তাঁদের ওপর আসে। আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানো নিশ্চয়ই তাঁরাও সমর্থন করেন না। সুতরাং, তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আবশ্যক। তদুপরি দেখার রয়েছে এর সুযোগ নিয়ে অন্য কেউ কিছু কিছু ঘটনা ঘটাচ্ছে কি না। আন্দোলনকারীরা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সততার সঙ্গে বিষয়টি দেখলে এমনটি হওয়ার সুযোগ থাকে না। বর্তমান পরিস্থিতি কীভাবে সৃষ্টি হলো? সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনে। বিরোধী দল সূচনা থেকেই এর বিরোধিতা করেছিল। অবশ্য তা মাঠে-ময়দানে।
এ সংশোধনী বিল সংসদে আলোচনা ও পাস হওয়ার সময় তারা সংসদে যোগ দেয়নি, করেনি সক্রিয় বিধিগত বিরোধিতা। তারা পূর্বতন পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমিত রাখে নিজেদের কার্যক্রম। আর সে কর্মসূচি ছিল মূলত হরতাল ও অবরোধ-জাতীয়। তবে সভা-সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচিও তারা নিয়েছিল সময়ে সময়ে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও তাদের সেসব সভা, সমাবেশ ও মিছিল প্রায় ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। উল্লেখ করা আবশ্যক যে বিরোধী দলের নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পণ্ড করার ঐতিহ্য নতুনভাবে সৃষ্টি হয়নি। আগের সরকারগুলোও তাই করত। আর নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি যখন কোনো দল আয়োজন করতে পারে না, তখন দলের অভ্যন্তরে চরমপন্থীদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। আসে হরতাল ও অবরোধ জাতীয় ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি। আগেও এসেছে। এখনো চলছে। কিন্তু এ ধরনের কর্মসূচি দেশের জন্য বরাবরই অমঙ্গল বয়ে এনেছে। ক্ষেত্রবিশেষে সাময়িক প্রতিকার মিললেও অগ্রহণযোগ্য নজির রেখে গেছে। সরকারের মেয়াদের শেষ সময়। নির্বাচন দ্বারপ্রান্তে। স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রকটভাবে সমস্যাটি দেখা দিয়েছে। এমনটা ঘটবে, এটা রাজনৈতিক নেতারা নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন। আর তাঁদের অজানা ছিল না, এতে অনেক উলুখাগড়ার প্রাণ যাবে। দেশটির বিকাশমান অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি আর এর ফলে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণীর ভোগান্তির কথাও তাঁদের চিন্তা-চেতনায় ছিল না এবং নেই। তবে আছে বক্তব্যে। উভয় পক্ষই বলছে তাদের অবস্থান জাতির কল্যাণের জন্য।
অথচ সে জাতি যাদের সমন্বয়ে গঠিত, সে মানুষগুলো আজ হাহাকার করে অসহায় অবস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে। যে বিষয়ে উভয় পক্ষের সরাসরি বিপরীতমুখী অবস্থান, তা অবশ্যই রাজনৈতিক। তাদের কার্যক্রমে আজ গোটা সমাজজীবন বিপর্যস্ত। কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে চাইছে না। এমনি অবস্থায় ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে সচেষ্ট রয়েছে আরও কয়েকটি পক্ষ। পরিস্থিতির অবনতিতে অবদান রাখছে অন্য কিছু বিষয়। এর একটি একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরোধিতা। ২০১৩-এর সূচনা থেকেই এ বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে চলছে। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও বিজিবি মোকাবিলা করছে পরিস্থিতি। অপর বিষয়টি হচ্ছে তৈরি পোশাকশিল্পে, ক্ষেত্রবিশেষে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। এগুলোর সঙ্গে মূল সমস্যাটির সম্পর্ক না থাকার কথা। কিন্তু কার্যত তা হচ্ছে না। আর প্রধান যে সমস্যাটি, তার সমাধানও করতে হবে রাজনৈতিকভাবে। অন্য কোনোভাবে এর কোনো সমাধানের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না। স্থায়িত্ব পাবে না এ ধরনের কোনো সমাধান। যেমন আসন্ন সংসদ নির্বাচনটিতে নাটকীয় কিছু না ঘটলে দেশের প্রধান বিরোধী দল অংশ নিচ্ছে না। ইতিমধ্যে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ই জয়লাভ করেছে মহাজোট-সমর্থিত প্রার্থীরা। সরকার গঠনও করবেন তাঁরাই।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা যেভাবে আছে, তা নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেলেই উন্নত হবে, এমনটা আশা করা যৌক্তিক নয়। হয়তো বা হরতাল-অবরোধ বা এ-জাতীয় কার্যক্রম চলতেই থাকবে। সে ক্ষেত্রে সরকার কঠোর কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে সাময়িক কিছু সুফল মিললেও তা ধরে রাখা অসম্ভব হবে। আমরা ক্ষমতার জন্য বিবদমান দুটি দলকেই শাসক হিসেবে দেখিছি ও দেখছি। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল শিগগির তাদের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হবে, এমন পরিস্থিতি লক্ষণীয় হচ্ছে না। তাই ঘুরেফিরে এরাই আসবে ক্ষমতায়, এমনটাই মনে হয়। তাদের শাসনকালে জনকল্যাণকর কাজ কিছু হলেও দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও সন্ত্রাসীদের লালনের অপবাদমুক্ত হতে পারেনি দুটি দলের কোনোটিই। সুশাসন শব্দটি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বৃত্তেই আটকা থাকে। দেশে চলমান মূল সংকটটি রাজনৈতিক। এটা সৃষ্টি করেছেন এবং জিইয়ে রেখেছেন রাজনীতিকেরা। চলমান সংকটে উদ্বিগ্ন দেশবাসী। পাশাপাশি অনেক বন্ধুপ্রতিম দেশও উদ্বিগ্ন। নির্বাচনকালে বরাবরই আমরা এ ধরনের সংকট ডেকে আনি। তখন এসব বন্ধুপ্রতিম দেশ বিভিন্ন পরামর্শ নিয়ে আসে। সচেষ্ট হয় বিবদমান পক্ষগুলোকে একটি সমঝোতায় আনতে। এভাবেই এসেছিলেন কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান।
আরেকবার কার্টার সেন্টার থেকে এলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। কিন্তু প্রচেষ্টা বিফল। এবারে জাতিসংঘের মহাসচিব স্বয়ং বিষয়টি নিষ্পত্তিতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি এ সহিংস সংঘাতে বিচলিত। যোগাযোগ করছেন প্রধান দুই দলের নেতার সঙ্গে। একাধিকবার পাঠিয়েছেন তাঁর বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে। তিনি আর্জেন্টিনার নাগরিক, জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব। পত্রিকান্তরের তথ্য অনুসারে, ডজন ডজন সভা করেছেন অপরিসীম ধৈর্যের সঙ্গে। সফল হয়েছেন দুটি বিবদমান দলকে এক ছাদের নিচে এনে বৈঠকে বসাতে। বৈঠকও তিনবার হয়েছে। তবে সাফল্য কিছুমাত্র লক্ষণীয় হচ্ছে না। প্রধান বিরোধী দল তার লাগাতার কর্মসূচি অব্যাহত রাখছে। সরকারও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও এ বৈঠকের সফলতা দেশবাসীর ঐকান্তিক কামনা। বন্ধুদেশগুলোও তা-ই চায়। তবে ভরসা করতে ভয় পাচ্ছে অনেকে।
তাদের সদিচ্ছার ওপর আস্থা রেখে তারানকো এবারের মতো চলে গেছেন। কিন্তু মনে হচ্ছে, তাঁরা কেউ তারানকোর এ সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হবেন না। তারানকো সজ্জন ব্যক্তি। অন্যের সদিচ্ছার ওপর তাঁর অবিচল আস্থা থাকারই কথা। তিনি বহু দূরদেশ থেকে এসেছেন। উল্লেখ্য, আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশ। কিন্তু একটি বিষয়ে দেশটি আমাদের খুব কাছের। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়ে লাখ লাখ বাঙালি দর্শক আর্জেন্টিনার সমর্থক বনে যান। এ দেশের আকাশে উড়ে হাজার হাজার আর্জেন্টাইন পতাকা। সে দেশের ফুটবল তারকা দিয়েগো ম্যারাডোনার নাম আজও বাঙালির কাছে কিংবদন্তির নায়কের মতো। তারানকোর নাম, তাঁর সদিচ্ছা আর আন্তরিক প্রচেষ্টার কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রাখবে জনগণ। তিনি স্মরণীয় ও বরণীয়। কিন্তু আমরা নিজেদের সৃষ্ট দুর্দিনে তাঁকে হয়তো বা ব্যর্থ নমস্কারেই ফেরত পাঠালাম।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

পতাকার জন্য ভালোবাসা

বিজয় দিবস
বিজয় দিবসের একটি অনুষ্ঠানে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা’ গানটি গাইছে একজন তরুণ। কণ্ঠ ও সুর কোনোটাই সে রকম ভালো নয়। কিন্তু যারা শুনছে, তারা মোহিত হয়েই শুনছে। এরপর আরেকজন গাইল ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ গানটি। আমি লক্ষ করলাম, আমার পাশে বসা আরেকজন তরুণ গানটি শুনতে শুনতে রুমালে চোখ মুছছে। খুব অস্বাভাবিক কোনো চিত্র নয়, তবু এতটাই অসাধারণ ও এতটাই হূদয়ছোঁয়া যে বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেলেও আমার স্মৃতিতে তা আজও অম্লান। সবচেয়ে বড় কথা, এই অনুষ্ঠানের অংশ হতে পেরে আমি অভিভূত। একদম ভিন্ন একটা পরিবেশে এমন কিছু বাঙালির সঙ্গে সেই বিজয় দিবস পালন করেছিলাম, যাঁরা বাস করছেন পাকিস্তানের করাচিতে। আমাদের অভিবাসী শ্রমিকেরা কাজ করছেন করাচির বিভিন্ন গার্মেন্টসে, কলকারখানায়।
অনুষ্ঠানে তাঁরা গাইলেন, আবৃত্তি করলেন। অন্য একটি কর্মশালায় অংশ নিতে গিয়েছিলাম লাহোরে। ফেরার পথে করাচিতে আমার এক আত্মীয়ার বাসায় ছিলাম দু-তিন দিন। ফেরার তারিখ ছিল ১৭ ডিসেম্বর। সত্যি কথা বলতে কি, পাকিস্তানে কর্মশালায় অংশ নিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেই খানিকটা অস্বস্তির মধ্যে ছিলাম। অস্বস্তি আরও বাড়ল এই ভেবে যে, আমাদের বিজয় দিবস আর আমি এই সময়টায় পাকিস্তানের মাটিতে! কিন্তু পরে মনে হয়েছে, ওই দিনটিতে ওখানে না থাকলে বিজয় দিবসের এই অন্য রকম অভিজ্ঞতাটিও আমার কখনো হতো না। আমার ভাইয়ের ছেলে রেজোয়ান ১৬ ডিসেম্বর সকালে এসে বলল, ‘ফুফু, চলেন আপনাকে বাঙালিদের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে নিয়ে যাই।’ ও আমাকে নিয়ে গেল একটি এলাকায়, যেখানে অনেকগুলো গার্মেন্টস আর তোয়ালের কারখানা। এখানেই একটি ভবনের নিচতলায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন করাচিতে থাকা বাঙালি অভিবাসী শ্রমিকেরা। ওখানে যাওয়ার আগে আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে করাচিতে এত বাঙালি অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন। বাংলাদেশের পতাকা দিয়ে ব্যানার টানিয়ে স্টেজ বানানো, চারদিকে ছোট ছোট কাগজের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে।
খুব সাধারণ আয়োজন কিন্তু অসাধারণ এক অনুভূতি। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, আজকে তো কর্মদিবস। সবাই মিলে অনুষ্ঠানে এলেন কীভাবে? একজন বললেন, ‘আপা, আমাদের পতাকার জন্য এটা আমাদের ভালোবাসা। আমরা প্রতিবছর ২৬ মার্চ আর বিজয় দিবসে ছুটি নিই। অনেকের ছুটি পেতে অসুবিধা হয় কিন্তু তাও আমরা এই দিনগুলোতে একত্র হই, দেশের গান গাই, পরিবারের কথা বলি। এ রকম দু-একটি দিন আছে বলেই আমরা বিদেশে বেঁচে আছি।’ ছুটির দিন হলে তাঁদের পাকিস্তানি সহকর্মীরাও অনুষ্ঠান দেখতে আসতেন বলে জানালেন। গিয়াস মিয়া নামের একজন শ্রমিক বললেন, ‘আপা, আমরা এমন একটা দেশে কাজ করি, যে দেশের আর্মি আমার দেশে গিয়া মানুষ মারছে। সেই কথা কিন্তু আমরা ভুলতে পারি না। যদিও এখানকার মানুষ আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। কিন্তু দেশের কথা মনে হলে সব বাদ দিয়ে ছুটে চলে যেতে চাই।’ সবশেষে আমার সোনার বাংলা গানটি গাইতে গাইতে অনেকেই ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন সেদিন। শামসুদ্দীন হোসেনের কথা শুনে অবাক হলাম।
তিনি জানালেন, তাঁদের পাকিস্তানি সহকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের কথা জানেন। অনেকে সমব্যথীও। মুহাজির যারা, বিশেষ করে মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টের (এমকিউএম) সঙ্গে যারা জড়িত, তারা মনে করে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতা তাদের থাকলে তাদের আন্দোলনও দ্রুত সফল হতো। মুহাজিররা মূলত পাঞ্জাব ও বিহার থেকে আসা উর্দুভাষী অভিবাসী। তাদের কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে বালুচ নেতা গাউস বক্স বিজেঞ্জোর মতো শ্রদ্ধা করে। তাদের কাছ থেকে আমি ইতিহাসের কিছু গল্প শুনলাম। শুধু একটি কাজের জন্য মানুষগুলো একেবারে ভিন্ন একটি পরিবেশে পড়ে আছে। ওদের অনেকেই জানালেন, বিদেশে থাকার কষ্ট তো আছেই, এর ওপর আরও কষ্ট যে তাঁরা পাকিস্তানে থাকেন। আমি সেই দিনটি তাঁদের সঙ্গে কাটিয়ে, একটি অন্য বিজয় দিবসের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এলাম। কেন জানি না, প্রতিবারই বিজয় দিবস এলে আমার সেই মানুষগুলোর কথা মনে হয়।

‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’

১৯৭১ সালের বিজয় দিবস দেখেছি। আমার দেখা অবিস্মরণীয় দিন ছিল সেটি। জনতার উল্লাস-মুক্তিযোদ্ধা-মিত্রবাহিনীর শহরে প্রবেশ-পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ-শহরজুড়ে লাল-সবুজ পতাকার উড্ডয়ন মিলিয়ে দুঃখ-বেদনা-আনন্দ-গৌরব ছিল সেই বিজয় দিবসে। রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণ করছিলেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ থেকে ভেসে আসছিল আজানের ধ্বনি। এ কথা এক গভীরতম সত্য যে এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে, তারা বুঝতে চায় না ইসলাম শান্তির ধর্ম। সহিংসতার ধর্ম নয়। তাদের হঠকারিতার কারণে তারা রাজনীতির নামে ধর্মের মৌল সত্যকে অস্বীকার করেছে। তাই রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কখনোই ভোটে বিজয়ী হতে পারেনি এই দল। ২০১৩ সালের বিজয়ের মাস বাঙালির জীবনে আবার গভীর তাৎপর্য নিয়ে ফিরে এসেছে। বাঙালি তার অসমাপ্ত কাজের কিছু অংশ সম্পন্ন করতে পেরেছে। এই বিজয়ের মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াতের নেতা যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। বিজয়ের মাসে এটি আরেকটি অবিস্মরণীয় দিন। যে যুদ্ধাপরাধীরা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে, তাদের শাস্তি পেতেই হবে।
দেশের প্রতিটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবিতে এক হতে হবে। শক্ত অবস্থান তৈরি করে জঙ্গিবাদের উত্থান বন্ধ করতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। সবার স্বপ্নের বাংলাদেশ যেন গৌরবের জায়গা থেকে দূরে সরে না যায়। এই বিজয়ের মাসে মানুষের বুকফাটা আর্তনাদে তলিয়ে গেছে স্বদেশ। পুড়ে দগ্ধ হওয়া মানুষেরা একাত্তরের পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের সমতুল্য যন্ত্রণা ভোগ করেছে। হত্যা-নির্যাতন-জাতীয় সম্পদ ধ্বংস-বৃক্ষনিধন, যানবাহনে আগুন, ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, গ্রেনেড, পেট্রলবোমার ব্যবহার ইত্যাদি করে জামায়াতে ইসলামী নামের দলটি মানুষকে একাত্তরে তাদের অবস্থান আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দোসর হয়েও সেদিন তারা জিততে পারেনি, আজও পারবে না। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চেও তরুণ প্রজন্মের সমাবেশ এই সত্যকে প্রতীয়মান করে। তারা বলছে, রাজাকারমুক্ত করবে স্বদেশ। যে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন-সহযোগিতা না দিয়ে হানাদার বাহিনী পাকিস্তানিদের সহযোগিতা দিয়েছিল, ৪২ বছর পরও তারা ভোলেনি সেই সব স্বাধীনতাবিরোধীদের। আপনজন তখন ছিলেন নিক্সন-কিসিঞ্জার, এখন আছেন ওবামা-জন কেরি। সে জন্য কাদের মোল্লার প্রাণরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন। যে ভুল করেছিলেন একাত্তরে, তার জন্য অনুতপ্ত হন না। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের দিকে তাকিয়ে তাঁদের বোঝা উচিত ছিল তরুণ প্রজন্ম কী চায়। সময়ের নাড়ি অনুধাবন না করে তাঁরা আবার নিক্সন-কিসিঞ্জারের ভূমিকা পালন করছেন।
এটা সত্যি যে একাত্তরে যেমন তাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, ২০১৩-তেও তাদের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হয়েছে। অনেক দুঃখ-বেদনা-মৃত্যুর যন্ত্রণার মধ্যে এটা সান্ত্বনা। সামনে আরও পথ পাড়ি দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হবে, ‘সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান আগে।’ বাংলাদেশের বিজয়ের মাসে মৃত্যুবরণ করলেন বিশ্ববিবেক নন্দিত রাজনীতিবিদ-রাষ্ট্রনায়ক নেলসন ম্যান্ডেলা। তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উৎসবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বলেছিলেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। যে প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি ভিন্ন দেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তার ন্যূনতম মানবিক আবেগ মার্কিন রাষ্ট্রনায়কদের ছিল না। ৪২ বছর পরে দেশ অনেক এগিয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়েছে এ দেশের মানুষ। একাত্তরের খুনির মানবাধিকার কী করে ভিন্ন দেশের মানুষের কাছে বড় হয়, এটা অবিশ্বাস্য লাগে। ম্যান্ডেলার রাজনীতির দর্শনে শান্তি ও গণতন্ত্র শব্দ দুটো অটল ছিল। তিনি প্রতিরোধ ও সমঝোতার বিষয়কে গভীরভাবে দেখেছিলেন। আজকের বাংলাদেশে এ সত্যটি দেখার সময় হয়েছে। রাজনীতি যেন মানুষের পক্ষেই থাকে সত্য উপলব্ধির ভেতর দিয়ে। মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে দাঁড়িয়ে কোনো নারী যেন কাঁদতে কাঁদতে না বলেন যে গণতন্ত্রকে লাথি মারি। আমরা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই। একজন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়াই শেষ কথা নয়। আমরা সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকর দেখতে চাই। আমরা শান্তি ও স্বস্তির দেশ দেখতে চাই। বাংলাদেশ একটি ধর্মের দেশ নয়, সব ধর্মের, জাতি-বৈচিত্র্যের দেশ, এটা বড় গলায় বলার উৎসব চাই। যারা সহিংস রাজনীতি নিয়ে মানুষের জীবন ছারখার করছে, তাদের শক্ত হাতে দমন করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই। বিজয়ে মানুষ আনন্দ করবে, সেই পরিসর উন্মুক্ত করার জন্য বিরোধী দলকে অনুরোধ জানাই। ২০১৩ সালের বিজয়ের মাস দেশের মানুষের মর্যাদার বোধকে সমুন্নত করেছে—২০১৩ সালের বিজয়ের মাস তরুণ প্রজন্মকে প্রতিজ্ঞায় উদ্বুদ্ধ করেছে—এই হোক আমার শান্তি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই—‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।’
সেলিনা হোসেন: কথাসাহিত্যিক।

ঐক্যই পারে বিজয়কে সুসংহত করতে by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল এক কথায় নয় মাস, সূক্ষ্ম হিসেবে ২৬৬ দিন। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ১৯৪৮ সাল থেকেই স্বাধীন পাকিস্তানের ভেতর থেকে ভিন্ন আঙ্গিকের চেতনার জন্ম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬১-৬২ সালের সামরিক আইনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২-৬৩ সালের শিক্ষানীতিবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন ইত্যাদি সবকিছুই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট রচনার সহায়ক হয়েছে। অর্থাৎ হঠাৎ করেই ১৯৭১-এ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি, এর একটি প্রেক্ষাপট ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হচ্ছিল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এবং ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তবে ২৫ মার্চ ১৯৭১ দিবাগত রাত ১২টার পরই প্রত্যক্ষ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ক্রমান্বয়ে ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। অক্টোবরে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে একটা গোপন চুক্তি হয়। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে পরোক্ষ সহযোগিতার মাত্রা চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। ডিসেম্বরের ৩ তারিখ থেকে ভারত ও পাকিস্তান প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ভারত ও পাকিস্তান বলতে পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারত সীমান্তে এবং পূর্ব পাকিস্তান ও ভারত সীমান্তে যুদ্ধ শুরু হয়। ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্ন ৪টা পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় সামরিক বাহিনী ও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হয়। যুগপৎভাবে ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা যথা- ‘জেড’ ফোর্স, ‘এস’ ফোর্স, ‘কে’ ফোর্স এবং বিভিন্ন সেক্টরের সেক্টর ট্র–পসগণ ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধের সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে (সামরিক পরিভাষায় অর্ডার অব ব্যাটল) যৌথ কমান্ডের অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা, যারা সারা বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে শহরে নগরে ছড়িয়ে থেকে যুদ্ধরত ছিলেন তারা, বিগত মাসগুলোর মতো প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক গেরিলা তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। সার্বিকভাবে ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের ফলে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের রেকর্ড ও ছবি অনুযায়ী পাকিস্তানিদের পক্ষে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল এএকে নিয়াজি এবং আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। সেই অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি তৎকালীন কর্নেল এমএজি ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না (বা তাকে উপস্থিত রাখা হয়নি)। তার কোনো প্রতিনিধিকেও আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট করা হয়নি। অর্থাৎ বিষয়টিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে, ১৩ দিনের দীর্ঘ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে এবং ওই যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানিরা বিজয়ী ভারতীয়দের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্নে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সফলভাবেই মুক্তিবাহিনীর অবদান ও সাফল্যকে মার্জিনালাইজড করে দেয়। দু’বছর পর সিমলায় অনুষ্ঠিত আলোচনার পর যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেই চুক্তির ফলেও বাংলাদেশের মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে মার্জিনালাইজড করে ফেলা হয়েছিল। এখন ৪২ বছর পর পুরো স্বাধীনতাটাকেই মার্জিনালাইজড করে ফেলার প্রক্রিয়া উৎকটভাবে প্রতিফলিত।
২.
আজকের বিজয় দিবসে আমাদের হৃদয় আপ্লুত। দেশমাতৃকার মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের সবার মাঝে যে ইস্পাত কঠিন ঐক্য ছিল, আজ সে ঐক্য ম্লান হয়ে গেছে। দেশ আজ দু’ভাগে বিভক্ত। কথাটি হাজারো লোকে বলছেন। অনেক বছর আগে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানও বলতেন, ওয়ান কান্ট্রি টু নেশন। দেশ যে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল, এটি কি পরিকল্পিত নাকি অপরিকল্পিত? আমার মতে, এটা কিছুটা পরিকল্পিত কিছুটা অপরিকল্পিত। পরিকল্পিত অংশের সূক্ষ্ম পরিকল্পনাকারী এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী হচ্ছে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রধান নেতৃত্ব প্রদানকারী রাজনৈতিক দল এবং সেই রাজনৈতিক দলের অনুসারী সুধী সমাজ। এরূপ বিভাজিত জাতির জন্য স্থিতিশীল ধারাবাহিক অগ্রগতি অথবা অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় স্থিতিশীলতা আনা কঠিন কাজ। বিভাজিত জাতির দুটি ভাগের বৈশিষ্ট্যগুলো উৎকটভাবেই বিপরীতমুখী। একভাগ ভারত পছন্দের আরেক ভাগ ভারত অপছন্দের। যারা ভারত পছন্দের, তারা অপর ভাগকে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলে। আজকের বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। অথচ ১৯৭১ সালে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি। যেসব লোক ১৯৭১ সালে বয়স ও লেখাপড়ার কারণে পরিপক্ব জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন এবং নিজের স্বাধীন মত গঠন করে স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন এবং এখনও বেঁচে আছেন, এরূপ লোকের সংখ্যা আজকের তারিখে কত হতে পারে? ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের এ মুহূর্তের জনগোষ্ঠীতে ৬০ বছরের ওপরের জনসংখ্যা হার ২০ শতাংশের কম। আমার মতে, বর্তমানে মাত্র ১৫-২০ হাজার ব্যক্তি পাওয়া যাবে, যারা স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি ছিল। এই ১৫-২০ হাজার ব্যক্তির জন্য আজ আমরা পুরো জাতিকে বিভাজিত করে রেখেছি, যা কখনোই কাম্য হতে পারে না।
জাতিকে বিভাজন করার যে চেষ্টা অতীতে চালু হয়েছিল, সেটি আজ পরিপক্বতা পেয়েছে। জাতিকে বিভাজন না করেও ১৯৭১ সালের বিজয়ের চেতনাকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা গুরুত্ব পায়নি বলে আমার মনে হয়। আজ বিজয়ের ৪২ বছর পর তাই বিজয় দিবসের তাৎপর্য বিশেষ মনোযোগের দাবিদার।
৩.
১৯৭১ সালে কার ওপর কিসের বিজয় ছিল? দর্শনীয়ভাবে, পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের ওপর বিজয় অর্জন করেছিল মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড। দর্শনীয়ভাবে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ওপর বিজয় অর্জন করেছিল ভারত ও বাংলাদেশ নামক দুটি রাষ্ট্র যৌথভাবে। দার্শনিক বা তত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে : (এক) পাকিস্তানি সামরিক শাসন তথা স্বৈরশাসনের ওপর বিজয় অর্জন করেছিল বাংলাদেশের জনগণের শক্তি ও ইচ্ছা। (দুই) পাকিস্তানি অগণতান্ত্রিক অভ্যাস ও রেওয়াজের বিপরীতে বিজয় অর্জন করেছিল গণতান্ত্রিক অভ্যাস ও চিন্তা-চেতনা। (৩) পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান বাঙালি জনগোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত প্রতিবাদের বিজয় হয়। (৪) পাকিস্তান সরকার ও শাসকগোষ্ঠী শান্তি ও সাম্য

মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হল বলিদান by মহিউদ্দিন আহমদ

মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল জাফর ইমাম বীরবিক্রমের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় গত ৬ ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত দিবস উদযাপনের দুই ঘণ্টার ছোট অনুষ্ঠানটিতে এত সব মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণ আমাকে প্রবলভাবেই উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করে! মাঝারি সাইজের একটি বসার ঘরে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের উপাধিধারী এতজন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পরও তাদের অম্লান সব স্মৃতি। এরা সবাই ফেনী-বিলোনীয়া রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন। নামগুলো দেখুন- মেজর জেনারেল হেলাল মোরশেদ খান বীরবিক্রম, বাড়ি সিরাজগঞ্জ; মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান বীরবিক্রম, বাড়ি সিলেট; মেজর মিজানুর রহমান, বাড়ি ফরিদপুর; কমোডর এ. ডব্লিউ চৌধুরী বীরউত্তম-বীরবিক্রম (বাংলাদেশে এই একজন মুক্তিযোদ্ধারই দুটি খেতাব রয়েছে), বাড়ি ফুলগাজী; ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মীরন হামিদুর রহমান বীরপ্রতীক আর কর্নেল জাফর ইমাম বীরবিক্রম হোস্ট হিসেবে ছিলেনই। তবে উপস্থিত ছিলেন না কোনো কারণে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদুল ইসলাম বীরপ্রতীক, বাড়ি ফুলগাজীতে আমার পাশের গ্রাম পূর্ব বসিকপুরের এবং সিভিলিয়ান কমান্ডারদের একজন, ‘বায়রা’র সাবেক সভাপতি, গোলাম মোস্তফা, পাশের আরেক গ্রাম দরবারপুরের। আমার পাশের আরেক গ্রাম হাসানপুরের মেজর জেনারেল আমীন আহমেদ চৌধুরী বীরবিক্রম এক বছর আগে অপ্রত্যাশিতভাবে মারা গেছেন। তার বাড়ি ফেনীতে হলেও তিনি অবশ্য এই সেক্টরে যুদ্ধ করেননি।
’৭১-এ লন্ডনে ছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের কোনো ফ্রন্টে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করিনি। কিন্তু তারপরও কর্নেল জাফর ইমাম প্রতি বছরই আমাকে দাওয়াত দেন। আমি আগ্রহের সঙ্গেই দাওয়াত গ্রহণ করি, অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করি, এই সব মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণ শুনতে। স্মৃতিচারণে তারা অনেক শহীদের কথাও বললেন। শ্রদ্ধার সঙ্গে তারা স্মরণ করলেন শহীদ হাবিলদার এআর আহমেদ বীরবিক্রম, শহীদ হাবিলদার বায়েজেদুর রহমান, শহীদ মোসলেহ আহমেদ কচি এবং শহীদ মোশাররফ হোসেন হারুনের কথা।
এই বছর বিশেষভাবে দাওয়াত করা হয়েছিল প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসাকেও। তার গ্রামের বাড়িও আমাদের বাড়ির পাশে কুতুবপুর। আমার নুরপুর গ্রামের মাইল তিনেক উত্তরে জাফর ইমামদের নোয়াপুর গ্রাম। তার মাইলখানেক উত্তরে বেগম খালেদা জিয়ার পৈতৃক বাড়ি, শ্রীপুর, ফুলগাজী উপজেলা সদর থেকে মাইলখানেক পশ্চিমে। তার মাইলখানেক পশ্চিমে চোত্তাখোলা-ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একটি বাজার। এখানেই বছর তিনেক আগে আমাদের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি মুক্তিযুদ্ধ পার্ক নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এসেছিলেন। ত্রিপুরা সরকার তিন বছরের মধ্যে এই পার্কটির নির্মাণ সমাপ্ত করার কথা ছিল। আরও কথা ছিল, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই পার্কটি উদ্বোধন করবেন। ’৭১-এ এই চোত্তাখোলায় হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার, বিশেষ করে তখনকার ফেনী সাবডিভিশনের, প্রাথমিক ‘প্রসেসিং’ সম্পন্ন হয়েছিল। এখান থেকে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয় একাত্তরে। ত্রিপুরার মেলাঘর যেমন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, চোত্তাখোলারও কাছাকাছি একটি স্থান ছিল।
কর্নেল জাফর ইমাম ডাক নাম হুমায়ুন, তখন একজন ক্যাপ্টেন, তখনকার সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের অধীনে একজন সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। ফেনী পাইলট স্কুলে ছাত্রজীবনে দারুণ দুরন্ত ছিলেন হুমায়ুন। বাবা-চাচা দুজনই রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন, বাবা শেখ ওয়াহিদউল্লাহ চৌধুরী মুসলিম লীগ রাজনীতির সঙ্গে। মনে আছে ১৯৫৪-তে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী, মূসা ভাই, এবিএম মূসার মামা এবং শ্বশুর এবং তখনকার পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক আবদুস সালামের বিপরীতে মুসলিম লীগ প্রার্থী ছিলেন শেখ ওয়াহিদ উল্লাহ। হুমায়ুনের চাচা ছিলেন শেখ নুরুল্লাহ, সেই জামানায় দারুণ প্রতাপশালী ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট। পাশের ইউনিয়ন বোর্ড, তখন বোর্ডই বলা হতো- আনন্দপুরের প্রেসিডেন্ট হোসেনউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন মেজর জেনারেল আমীন আহমেদ চৌধুরী বীরবিক্রম এবং ফেনী জেলা পরিষদ প্রশাসক আজিজ আহমেদ চৌধুরীদের (গোলাপ ভাই) দাদা। একাত্তরে এই হোসেনউদ্দিন চৌধুরী তার বাড়িতে আরও কয়েকজনসহ শহীদ হয়েছিলেন। ফেনী শহরে মিজান ময়দান রোডে শেখ ওয়াহিদউল্লাহ চৌধুরীদের পাশেই স্টেশন রোডে শহীদ হোসেনউদ্দিন চৌধুরীর বাসা ছিল। এখন দুই জায়গাতেই মার্কেট; তবে শহীদ হোসেন চৌধুরীর বিপণিবিতান বেশি পরিচিত।
দুই.
ফেনীর একটু জিওগ্রাফি এবং বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করার মুখ্য উদ্দেশ্য হল, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য কর্তৃক তিন দিক পরিবেষ্টিত ‘ফেনী-বিলোনীয়া বাল্জ’ নামে পরিচিত এই জায়গাটিতে ’৭১-এ কতগুলো প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল। কর্নেল জাফর ইমামের বর্ণনা মতে, এই যুদ্ধগুলোর কথা কতগুলো দেশের সামরিক একাডেমিতেও পড়ানো হয়ে থাকে।
কর্নেল জাফর ইমামের বাসায় আমি এই বীরউত্তম এবং বীরবিক্রমদের মুখে ফেনী বিলোনীয়া রণাঙ্গনের স্মৃতির কথা শুনি আর অভিভূত হয়ে পড়ি। লক্ষ্য করুন, যুদ্ধটা হচ্ছে ফেনীর কতগুলো রণাঙ্গনে, কিন্তু এখানে যুদ্ধ করেছেন সিরাজগঞ্জের জেনারেল হেলাল মোরশেদ খান, সিলেটের জেনারেল ইমামুজ্জামান এবং ফরিদপুরের মেজর মিজান। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের এসব মানুষকে ফেনীর যুদ্ধে এমন সরাসরি সশস্ত্র অংশগ্রহণে দেখতে পাই, যদিও ফেনী জায়গাটা তাদের নয়, তাদের বাবা-মা, ভাইবোন কারও জন্মও এখানে নয়, এখানে তাদের দাদা-দাদি, মামা-মামির কবরও নেই। তারপরও তারা মনে করেছেন আক্রান্ত বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমিই তাদের, সুতরাং জানপ্রাণ দিয়েই তাদের প্রতিটি পবিত্র ইঞ্চি রক্ষা করতে হবে, শত্র“কে পবিত্র ভূমি থেকে তাড়াতে হবে। দেশপ্রেমের এই গভীর বোধ থেকে সেদিন ’৭১-এ তারা তাড়িত হয়েছিলেন, এই বোধ থেকে তারা গভীর ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন। ’৭১-এর এই ঐক্যে আমরা দেখি, সিলেট-ফেনীর মধ্যে তারা ফারাক দেখেননি, ফারাক করেননি জেনারেল ইমামুজ্জামান। সিরাজগঞ্জ-ফেনীর মধ্যে একই মায়ের ছবি দেখেছেন জেনারেল হেলাল মোরশেদ খান। মুসলিম লীগ পরিবারে জন্ম নেয়া কর্নেল জাফর ইমাম বীরবিক্রম যেমন উজ্জীবিত হয়ে ’৭১-এ যুদ্ধ করেছেন, তেমন যুদ্ধ করেছেন ফেনী শহরের পাশের বাড়ির অরাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেয়া মেজর জেনারেল আমীন আহমেদ চৌধুরী বীরবিক্রম।
বলতেই হয়, ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান- আমরা সবাই বাঙালি’ এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই সেদিন বাংলাদেশের প্রায় দুই লাখ সন্তান ফেনী, সিলেট, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম যুদ্ধ করেছেন, ১৬ ডিসেম্বর অনেক দিনের প্রত্যাশিত বিজয়টি অর্জন করেছিলেন।
তিন.
বিভিন্ন মতবাদ এবং ধারার তরুণরা ’৭১-এ কেমন উদ্দীপিত হয়েছিল, ঐক্য গড়ে তুলেছিল, তার একটি উৎকৃষ্ট বর্ণনা দেখেছিলাম বছর দুই আগে শহীদুল হক খান বাদলের একটি ছোট লেখায়। বাদলের কোনো লেখা আমি আগে পড়েছি বলে মনে পড়ে না। তবে একাত্তরে শহীদুল হক খান বাদলের ভূমিকার যথার্থ কতগুলো বর্ণনা আছে জাহানারা ইমামের সেই অসাধারণ বই ‘একাত্তরের দিনগুলিতে’। বাদল এবং শহীদ রুমি, বদি এবং আশফাকুস সামাদদের এই গ্র“পটি ’৭১-এ ঢাকায় বেশ কতগুলো সাহসী অভিযান চালিয়েছিল। জাহানারা আপা জীবিতকালে তার এলিফ্যান্ট রোডের ‘কণিকা’ নামের বাড়িটির দোতলায় তার বাসায় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় অনেকবার বর্ণনা করেছেন বাদলদের কথায়। তার আমেরিকা প্রবাসী ছোট ছেলে জামী এখনও যখন দেশে আসে, বাদলের বাসাতেই ওঠে থাকে। রুমী যেমন মা ডাকত জাহানারা ইমামকে; বাদল, বদি, সামাদ-আজাদ-শাহাদাত চৌধুরীরাও জাহানারা আপাকে তাই ডাকত। তো বাদল লিখেছেন তার আলোচ্য লেখায়- বাদলরা করত ছাত্র ইউনিয়ন, আর বদি করত এনএসএফ- ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন। আয়ুব খান-মোনেম খানদের গুন্ডা ছাত্র সংগঠন। বাদলের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল সালেক, তার এক বন্ধু স্বপন। তারা কোনো এক জায়গায় ফিজিক্যাল ট্রেনিং নিত। ’৭১-এর ২৫ মার্চের পর যখন কারফিউ প্রত্যাহার করা হল, তখন বদি এলো বাদলের কাছে, সঙ্গে সালেক এবং স্বপন। বদিকে দেখে বাদল স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা আতংকিত বোধ করে। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় দীক্ষিত এনএসএফের সদস্য বদি; আর বাদলরা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। বদির পাশে বাদলের বন্ধু মালেককে দেখে কিছুটা আশ্বস্তও বোধ করে বাদল। কিন্তু বাদলকে উদ্দেশ করে বদি বলে, listen you, commies (commies মানে communists) সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বল তোমরা, কিন্তু কোথায় বিপ্লব?let's go and fight. বদির এমন আহ্বানের জন্য অপ্রস্তুত বাদল, স্তম্ভিত হয়। চোখে মুখে বাদলের অবিশ্বাস।
বাদলের দ্বিধাদ্বন্দ্ব বুঝতে পারে বদি। পকেট থেকে ব্লেড বের করে বদি, তার এবং বাদলের কব্জিতে একটু আঁচড় দেয়। দুজনের কব্জি থেকে একটু রক্ত বের হয়। দুই কব্জির রক্ত মিলিয়ে বদি এবার বাদলকে বলে, From today, we are blood brothers. let's go and fight. একাত্তরে এই দুই যোদ্ধার একজন, বদি শহীদ হয়; আর বাদল, রাশেদ খান মেননদের ছোট ভাই শহীদুল হক খান বাদল, অসাধারণ মেধাবী একজন ছাত্র- এসএসসি এবং এইচএসসিতে ঢাকা বোর্ডের প্রথম স্থান অধিকারী এবং যুদ্ধশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিকস ডিপার্টমেন্ট থেকে অনার্সে ফার্¯¡ ক্লাস ফার্স্ট, কিন্তু এমএসসি করেননি একটি গুরুতর বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে। সে আরেক কাহিনী। ইংরেজি দৈনিক ‘নিউএজ’ এর প্রকাশক শহীদুল খান বাদল একেবারেই প্রচারবিমুখ। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা, অবদান ইত্যাদি বিষয়ে কত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, কত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, কত কিসিমের এবং বর্ণের কাহিনী টিভি এবং পত্রপত্রিকায় সাক্ষাৎকার ছড়াচ্ছে! কিন্তু আমি যে কত বছর ধরে কতগুলো পত্রিকা পড়ি, এতগুলো টিভি চ্যানেল দেখি, কোনো দিন শহীদুল খান বাদলকে কোথাও দেখিনি।
চার.
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, কাদের মোল্লার ফাঁসিও হয়ে গেছে। আজ এই বিশেষ দিনে জাহানারা ইমামকে খুব মনে পড়ছে।
১৯৯২ সালের মার্চের শুরু থেকে গোলাম আযম এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে অনেক সভা, সমিতিতে অনুষ্ঠান হয়। এসব অনুষ্ঠানে তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী, শেখ হাসিনা অথবা জাহানারা ইমাম আলাদা আলাদাভাবে অথবা দুজনই একত্রে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। ওই বছরের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উত্তাল জনসমুদ্রে ’৭১-এর ৭ মার্চের স্মৃতিস্তম্ভেব পাশে চারটি ট্রাক পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে তৈরি করা মঞ্চে ১২টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশ গণ-আদালতের চেয়ারম্যান হিসেবে জাহানারা ইমাম ‘গণ-আদালতে গোলাম আযমের ফাঁসির রায়টি পড়ে শোনান। শেখ হাসিনা তখন একে জনতার বিজয় বলে অভিহিত করেন। এই দিন সন্ধ্যায় দৈনিক ‘আজকের কাগজে’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জাহানারা ইমাম বলেন, ‘রায় কার্যকর না করলে দুর্বার আন্দোলন। পর্যায়ক্রমে সকল ঘাতকের বিচার করব।’ এর ১০ দিন পর জাহানারা আপা ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে আমাকে যে চিঠিখানা লিখেছিলেন, তা আজকের এই দিনে খুব প্রাসঙ্গিক মনে করি। এই চিঠিতে তার সাফল্য ও বিনয়ের প্রকাশ ঘটেছে। তাই চিঠিটি হুবহু তুলে দিলাম। নিউইয়র্কে তখন আমি জাতিসংঘে আমাদের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে ডেপুটি পারমান্যান্ট রিপ্রেজেনটেটিভ, উপস্থায়ী প্রতিনিধি।

ক্ষমা চাহিতে পারিলাম না, ক্ষমো হে মম দীনতা by শাহ নেওয়াজ বিপ্লব

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪২ বছর কেটে গেল, কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যা, ধর্ষণ আর লুণ্ঠনে অংশ নেয়া রাজাকার আর আলবদর বাহিনীর নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কাদের মোল্লা- কেউই ক্ষমা চাননি। দেড় বছর ধরে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালে তাদের বিচার চলছে ১৯৭১ সালে কৃত অপরাধের জন্য। সে বিচার নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক, শাহবাগ চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন, স্কাইপি কেলেংকারি, বিচারকের পদত্যাগ- নানা ঘটনা ঘটে গেল, সেই সঙ্গে বেশ ক’টি বিচারের রায়ও হয়ে গেল, কিন্তু যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত হওয়া একজনও বললেন না, ‘আমি অনুতপ্ত, আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’ কেউ বললেন না, ‘১৯৭১ সালে আমরা ভুল করেছিলাম; বাংলাদেশের মাটি, বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা আর তাদের স্বপ্নের সঙ্গে আমরা বেঈমানী করেছিলাম পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতা করে- রাজাকার, আলবদর আর শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে সক্রিয় থেকে।’
একজনও বললেন না, ‘আমরা অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছি বাংলাদেশের মাটির কাছে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে আর সেসব মায়ের কাছে, যারা যুদ্ধের বছর তাদের কিশোরী মেয়েদের বেড়ে না ওঠার জন্য প্রার্থনা করেছিল সৃষ্টিকর্তার কাছে; সেসব বোনের কাছে, আমাদের লোলুপ দৃষ্টির কাছে শহীদ হয়েছে যাদের সম্ভ্রম; আর মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদের কাছে- প্রতিদিন চুপি চুপি আসবে বলে বাংলাদেশের মানুষ যাদের জন্য সব ক’টা জানালা এখনও খুলে রাখে।’
না, কেউই ক্ষমা চাইলেন না। বরং উল্টো যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন সাজার রায়ের পর কাদের মোল্লা হাত তুলে দেখালেন বিজয় চিহ্ন। পত্রিকাগুলো কাদের মোল্লার বিজয় চিহ্নের যে ছবি ছেপেছিল, তাতে দেখা যায় সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা কাদের মোল্লা হাতের আঙুল উঁচিয়ে বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন আর মুখে তার একরাশ হাসি। মুখজুড়ে অনুতাপের, অনুশোচনার কোনো চিহ্ন নেই। এটি সবচেয়ে বিস্ময়ের যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের বিরোধিতা করার পরও তারা বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পেরেছে এবং এখনও রাজনীতি করছে। আর এসব অপরাধীর জন্য ইতিহাস না জানা কিছু তরুণ গাড়ি ভাঙছে, মিছিল করছে।
অথচ যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ক্ষমা চাওয়া আজ এক সভ্য আন্তর্জাতিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। ভারতে বিজেপির প্রভাবশালী রাজনীতিক নরেন্দ্র মোদি আগামীতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে কিছুদিন আগে ২০০২-এর গুজরাট দাঙ্গার জন্য তার দল বিজেপি ও শিবসেনার কিছু নেতাকে দায়ী করে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। ভারতের কথা যখন এলো তখন আরেকটু বলি, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘নট দ্য ব্রিটিশ ওয়ে অব ডুইং বিজনেস।’ তারপর ১৯৯৭ সালে স্বামী প্রিন্স ফিলিপকে নিয়ে অমৃতসরে এসেছিলেন কুইন এলিজাবেথ। দুজনে মিলে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের স্মরণে নির্মিত শহীদস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানিয়ে ঘটন

বাংলাদেশী আইকম্যানের মৃত্যুদণ্ড এবং একশ্রেণীর আঁতেলের বিলাপ by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

১২ ডিসেম্বর ছিল আমার জন্মদিন। ৮০ বছরে পা দিলাম। রোগে জর্জরিত দেহ। কোনো রকমে টেনেটুনে যদি আর একটা বছর বাঁচতে পারি, তাহলে প্রতিভা, মেধা ও খ্যাতিতে নয়, বয়সের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথকে ছুঁতে পারব। আমার এবারের জন্মদিনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এ দিন ৪২ বছর পর বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধী আইকম্যানদের একজনের ফাঁসি হল। এ দিনটি বাংলার ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন বলে চিহ্নিত হবে। বর্তমান হাসিনা সরকারের ভাগ্যে কী লেখা আছে জানি না। কিন্তু শেখ হাসিনা ইতিহাসে একজন কালজয়ী অমর নেত্রী হিসেবে নিজের স্থায়ী আসনটি করে নিলেন। আইকম্যান ছিলেন হিটলারের সহচর, জার্মানির নাৎসি যুদ্ধাপরাধী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে লাখ লাখ ইহুদি হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত। তার ইতিহাস আজ সবারই জানা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে অধিকাংশ নাৎসি যুদ্ধাপরাধী ধরা পড়ে এবং তাদের বিচার ও দণ্ড হয়। কিন্তু আইকম্যান জার্মানি থেকে ছদ্মবেশে পালিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধাপরাধীদের কারও কারও মতো প্রায় ৪০ বছর বিচার ও দণ্ড এড়াতে পেরেছিলেন। তিনি নাম-পরিচয় গোপন করে দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং সেখানেই বসবাস করছিলেন। কিন্তু ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে বিশ্বময় তাকে খুঁজতে শুরু করে। লাখ লাখ ইহুদি নর-নারী-শিশুকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যার সঙ্গে জড়িত এই ব্যক্তিকে দণ্ড না দিলে মানবতা কলঙ্কমুক্ত হবে না বলে তারা ঘোষণা করেন। দীর্ঘ কয়েক দশক পর আইকম্যানের খোঁজ মেলে। কিন্তু যে দেশটিতে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা তাকে ইসরাইল সরকারের হাতে তুলে দিতে রাজি ছিল না। ততদিনে ব্রিটেনসহ ইউরোপের বহু দেশে মৃত্যুদণ্ড প্রথা বাতিল হয়ে গেছে। আইকম্যানকে আশ্রয়দানকারী দেশটির সরকারেরও যুক্তি ছিল, ইসরাইলে তাকে পাঠালে মৃত্যুদণ্ড সুনিশ্চিত, সুতরাং তাকে ইসরাইলে পাঠানো যাবে না।
ইসরাইল সরকার তাতে দমে যায়নি। তাদের গোয়েন্দা সংস্থা নিপুণ পরিকল্পনা করে তাকে গোপনে অপহরণের। আন্তর্জাতিক সব আইন-কানুন, বাধ্যবাধকতা ভঙ্গ করে ইসরাইলি গোয়েন্দা চক্র আইকম্যানকে অপহরণ করে ইসরাইলে নিয়ে আসে এবং তার নারীঘাতী, শিশুঘাতী জঘন্য অপরাধের বিচার শুরু হয়। বিচারে আইকম্যানের সব অপরাধ প্রমাণিত হয় এবং আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন এটা সুনিশ্চিত জেনে তিনি এবং তার আইনজীবীরা একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করেন। এই কৌশলটি হল, হঠাৎ করে দাবি করা বিচারাধীন আইকম্যান যুদ্ধাপরাধী নাৎসি ঘাতক আইকম্যান নন। ইসরাইলের গোয়েন্দা ভুলক্রমে আইকম্যানের মতো দেখতে এক ব্যক্তিকে ধরে এনেছে।
এই কৌশলটি কাজে লাগেনি। তার বাড়ি থেকে জব্দ করা কাগজপত্র এবং পরিচিতজনের সাক্ষ্য থেকেই তার আসল পরিচয় বেরিয়ে আসে এবং তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। এই ফাঁসি হওয়ার পর লন্ডনের একটি প্রথম শ্রেণীর দৈনিকের সম্পাদকীয়ের হেডিং ছিল Justice was delayed but not denied (ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়েছে, কিন্তু অস্বীকৃত হয়নি)। আইকম্যানকে যে ইসরাইল অন্য দেশ থেকে অবৈধভাবে অপহরণ করে এনে নিজেরাই বিচারক সেজে (কোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নয়) এমন এক সময় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যখন ইউরোপের বহু দেশে এবং আমেরিকারও কোনো কোনো রাজ্যে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেছে, তাতে এসব দেশের কোনো মানবতাবাদী বা মিডিয়া টুঁ শব্দটি করেনি। পরবর্তীকালে ভানু (ঠধহঁ) নামে এক পলাতক ইহুদিকেই ইসরাইল বিদেশ থেকে অপহরণ করে এনে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। তাতেও যে খুব একটা হৈচৈ হয়েছে, তা আমার স্মরণ হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব স্বদেশদ্রোহী বিদেশী হানাদারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণে বর্বরতার বিশ্বরেকর্ড তৈরি করেছে, যাদের সন্ত্রাসের বিভীষিকায় প্রায় এক কোটি মানুষকে দেশত্যাগ করে বিদেশে আশ্রয় নিতে হয়েছিল; বাংলাদেশের সেই স্বদেশদ্রোহী ও মানবতার শত্র“দের দীর্ঘ ৪২ বছরেও কোনো বিচার ও দণ্ড হয়নি। তাদের শীর্ষ নেতারা বিদেশে পালিয়ে গিয়েও স্বদেশী মিত্রদের সহায়তায় শুধু দেশে ফিরে আসা নয়, ক্ষমতায় বসারও সুযোগ পেয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির বিরল। সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশেই তা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রায় নিহত মানবতা হয়তো চিরকাল কেঁদে বেড়াত, কয়েক লাখ শহীদের দীর্ঘশ্বাসে হয়তো দেশটির আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে থাকত, যদি না শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে নিজের জীবন বাজি রেখে এই মানবতার শত্র“দের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু এই বিচার শুরু হওয়ার প্রস্তুতি পর্বেই দেশে এবং বিদেশে হঠাৎ একদল ‘নব্য মানবতাবাদী’র আবির্ভাব লক্ষ্য করা গেল, যারা এই বর্বর ঘাতকদের বিচার ও দণ্ডদানের মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘন, ন্যায়বিচার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে মায়াকান্না শুরু করে দিতে দ্বিধা করেননি। ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধী ঘাতক আইকম্যানদের একজন কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতেই ব্রিটেন, আমেরিকা, এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত যেমন হায় হায় করে উঠেছে, তেমনি দেশের ভেতরে সুশীল সমাজ ও মিডিয়ার একদল মাথাওয়ালা ব্যক্তি পর্যন্ত মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের নামে হায় হায় করছেন।
এরা কেউ বলছেন না, বিচারাধীন ও দণ্ডিত যদ্ধাপরাধীরা কেউ যুদ্ধাপরাধ করেনি। তারা বলছেন, এদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং বিচার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, হাসিনা সরকার কেন তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ গ্রহণ করতে যাবে? ’৭১ সালে তো তারা শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী হত্যা করেনি। ’৭১ সালের মার্চ মাসে এবং ১৪ ডিসেম্বর তারিখে তারা যে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে, তাদের মধ্যে দু-একজন আওয়ামী লীগের সমর্থক থাকলেও বাকি সবাই ছিলেন বামপন্থী এবং বিভিন্ন বামপন্থী দলের সমর্থক।
একাত্তর সালে জামায়াত এবং তাদের উপদলগুলো তো কেবল আওয়ামী লীগার হত্যায় নামেনি, তারা বাঙালি হত্যায় নেমেছিল। তাই গোটা বাঙালি জাতির দাবি তাদের বিচার ও দণ্ড। এটা দলীয় প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপার হয় কী করে? বরং বর্তমান হাসিনা সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী জাতির এই দাবি পূরণের জন্যই চারদিকের বিশাল বাধা অতিক্রম করে এই বিচারের ব্যবস্থা করেছেন। যদি এটা প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয় তাহলে বলা চলে এটা গোটা বাঙালি জাতির প্রতিশোধ গ্রহণ। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডদান কি ছিল চার্চিল ও রুজভেল্টের রাজনৈতিক প্রতিশোধ গ্রহণ? এখন পর্যন্ত বলা হচ্ছে, এটা ছিল বর্বর ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটিয়ে সারা বিশ্বমানবতাকে রক্ষা করা।
বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হচ্ছে না বলে প্রচার চালানো হচ্ছে। এই প্রচার যারা চালাচ্ছেন তাদের মধ্যে সুশীল সমাজের একদল নবীন ও প্রবীণ আঁতেলকেও দেখা যায়। এদের বক্তব্য ও বিবৃতি পাঠ করলে ফাউস্টের কাহিনীর শয়তানের কাছে আÍবিক্রি করার বিবরণ আমার মনে পড়ে। পেট্রো ডলারের কৃপায় বাংলাদেশের জামায়াতিদের ঘরে এখন অঢেল টাকা। কেউ কেউ বলেন, এই টাকা দিয়ে তারা ইকোনমিস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, নিউইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকার সুর ঘুরিয়ে ফেলতে পারেন এবং তারা ঘোরাচ্ছেনও। কেউ কেউ বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ধনী আরব দেশের সহায়তায় এবং ইসলামের নাম ভাঙিয়ে ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স ও এনজিওর একচেটিয়া ব্যবসা করে জামায়াত আন্তর্জাতিকভাবে যে বিশাল জিহাদ ফান্ড তৈরি করেছে, তা দিয়ে ইউরোপের কোনো কোনো দেশের পার্লামেন্ট সদস্য এবং আমেরিকার সিনেট সদস্যও কিনে ফেলতে পারে এবং তারা কিনছেও।
এটা কতটা সত্য জানি না। কিন্তু বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী প্রচার অভিযান দেখে কথাটা সত্য বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ ও মিডিয়ার এক অংশের বর্তমান ভূমিকা দেখে তো ফাউস্টের শয়তানের কাছে আÍবিক্রির কাহিনীটি সম্পূর্ণ সত্য বলে মনে হয়। আইকম্যানের মতো একজন হত্যাকারীর পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে ইসরাইলের একজন ইহুদি আইনজীবীও রাজি হননি। ইসরাইল সরকারকে বিশেষ আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। আর কাদের মোল্লা বা অন্য ঘৃণ্য ঘাতকদের পক্ষে দাঁড়াতে বাংলাদেশে বাঙালি আইনজীবীর অভাব হয়নি। শুধু আইনজীবী হিসেবে ঘাতকদের পক্ষে দাঁড়ানো নয়, একজন ঘাতক কাদের মোল্লার ফাঁসির চূড়ান্ত রায় হতেই এরা আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ প্রদর্শনের নামে দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করেছেন।
ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচার কেন আন্তর্জাতিক বিচারের মানসম্পন্ন হচ্ছে না, তার একটাও নজির তারা দেখাতে পারেনি। ঘাতকদের দণ্ড থেকে বাঁচানোর জন্য আইকম্যানের মতোই একই ধরনের কৌশল তারা গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। এই কৌশলটি হল- ঘাতক কাদের মোল্লা আসল কাদের মোল্লা নন বলে শেষ সময়ে প্রচার। এ জন্য আওয়ামী লীগেরই একজন সাবেক সংসদ সদস্য এবং নানা দুষ্কৃতির দায়ে দণ্ডিত এক ব্যক্তির সাহায্য গ্রহণ করা হয়েছে। এই ব্যক্তি জেল থেকে বেরিয়েই কাদের মোল্লার লিখিত চিঠি বলে দাবি করে একটি চিরকুট দেখিয়ে বলেছেন, মোল্লা দাবি করেছেন, তিনি আসল কাদের মোল্লা নন। আসল কাদের মোল্লার বদলে নির্দোষ কাদের মোল্লাকে দণ্ড দেয়া হয়েছে।
ঠিক এই প্রচার আরেক দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সম্পর্কেও প্রচার করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এই সাঈদী একাত্তরের ঘাতক সাঈদী নন, বর্তমান সাঈদী এতই বুজুর্গ ব্যক্তি যে, তার চেহারা নাকি চাঁদের মধ্যেও দেখা গিয়েছিল। এই একুশ শতকে এ ধরনের মধ্যযুগীয় তামাশা সম্ভবত একমাত্র বাংলাদেশেই দেখানো সম্ভব। যা হোক শেষ পর্যন্ত কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডদানের প্রথার বিরোধী। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো লোক রাগে, উত্তেজনায় বা হিংসা ও লোভের বশবর্তী হয়ে যদি কাউকে হত্যা করে, তাকে প্রাণদণ্ড না দিয়ে লাইফ সেনটেন্স দেওয়া উচিত। অনেক সময় দেখা গেছে, বিচারের ভুলে নির্দোষ ব্যক্তিরও ফাঁসি হয়ে গেছে। একবার ফাঁসি হয়ে গেলে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে আর প্রাণ ফিরিয়ে দেয়া যায় না। এজন্যই মৃত্যুদণ্ডের প্রথা রদ হওয়া উচিত।
কিন্তু যারা রাগ, সাময়িক উত্তেজনা বা লোভের জন্য নয়, ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে জনসমষ্টিকে হত্যা করে এবং হত্যা করার পরও অনুতপ্ত হয় না, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া ছাড়া মানবতাকে কলঙ্কমুক্ত ও নিরাপদ করার দ্বিতীয় কোনো বিকল্প পথ নেই। এজন্যই কাদের মোল্লার প্রাণদণ্ডে আমি দুঃখিত নই। বরং আমার দাবি, অন্যান্য নরপশু যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও দণ্ডদানও ত্বরান্বিত করা হোক। এই ঘাতকদের সামনে খাড়া করে কারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে তার প্রমাণ তো পাওয়া গেছে পাকিস্তানের জামায়াত দলের ঘোষণায়। তারা পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনীকে অবিলম্বে বাংলাদেশ আক্রমণের আহ্বান জানিয়েছে। আর এই আহ্বান অনুসরণ করেই বাংলাদেশের জামায়াতিরা একাত্তরের মতো সারা দেশে বর্বর নাশকতার অভিযান শুরু করেছে।
কঠোরভাবে এই যুদ্ধের মোকাবেলা করতেই হবে এবং শেষবারের মতো প্রমাণিত হোক, এই যুদ্ধে বাংলাদেশের ভেতরে এবং বাইরে কারা দেশটির শত্র“ এবং মিত্র।

সুস্থ অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে অসুস্থ রাজনীতি

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। ব্যবসায়ী নেতা ও এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান। তাঁর জন্ম ১৯৪২ সালে, কলকাতায়। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি কর্মজীবন শুরু করেন বহুজাতিক কোম্পানিতে। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন এপেক্স গ্রুপ। তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক এই সভাপতি বর্তমানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান
প্রথম আলো: বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের দায় ব্যবসায়ীরা এড়াতে পারেন না। কেননা, তাঁরাই তো রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: হ্যাঁ, ব্যবসায়ীদের এই দায় তো নিতেই হবে। যেমন, সরকারই ঠিক করে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কে হবেন। আমরাও সেটি মেনে নিচ্ছি। প্রথম আলোর রিপোর্ট সঠিক। কিন্তু এই প্রবণতা দেড়-দুই দশকের। তার আগে কখনো এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কে হবেন, তা নিয়ে সরকারপ্রধান মাথা ঘামাতেন না। কোনো সভ্য দেশেই এটি হয় না। দেখুন, সরকারপ্রধান যদি ঠিক করে দেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কে হবেন, তাহলে তো সেই সভাপতির পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলা সম্ভব নয়।
প্রথম আলো: এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা কী করবেন?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ব্যবসায়ীরা এখন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছেন। তাঁদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমি মনে করি, ব্যবসায়ীদের এই রাজনৈতিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যবসায়ীদের একাংশ সরকার-সমর্থক; অন্য অংশ সরকারবিরোধী। এ অবস্থায় ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি নেওয়া কঠিন। আমরা এখন চাই একটি সমঝোতা হোক। যে ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাকে তো দেশ চালাতে হবে। এভাবে চললে তো শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য সব বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের ঋণের পরিমাণ এত বেড়ে যাবে যে তা শোধ করা কঠিন হবে। বিদেশে পণ্য রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এমনকি দেশে বাজারজাত পণ্যও বিক্রি হচ্ছে না। ছোট দোকানদার, ফুটপাতের হকার—সবাই প্রায় বেকার হয়ে পড়েছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল-ধর্মঘট আগেও ছিল। কিন্তু এ রকম পরিস্থিতি গত ৩০ বছরেও দেখা দেয়নি। আগের হরতাল-ধর্মঘট সত্ত্বেও বন্দর থেকে মাল খালাস হয়ে ঢাকায় চলে আসত। আবার ঢাকা থেকে রপ্তানিপণ্য চট্টগ্রামে যেতে সমস্যা হতো না। অর্থাৎ পণ্য সরবরাহব্যবস্থাটি মোটামুটি সচল ছিল। এবারের লাগাতার অবরোধের কারণে সরবরাহব্যবস্থাটি একেবারে ভেঙে পড়েছে। ফলে আমরা ক্রেতা হারাচ্ছি। বাইরের কাঁচামাল না এলে কারখানা চালু রাখাও সম্ভব হবে না।
প্রথম আলো: ব্যবসায়ীদের সরাসরি রাজনীতিতে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কি ঠিক?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: এটা আমি পুরোপুরি অপছন্দ করি। টাকা দিয়ে মনোনয়ন কেনার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত। কোনো কোনো ব্যবসায়ী নিজের অন্যায় কাজ আড়াল করার জন্য সাংসদ হতে চান। তাঁরা ভাবেন, সাংসদ-মন্ত্রী হলে কেউ গায়ে হাত দিতে পারবে না। বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্য ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে আসা ঠিক নয়।
প্রথম আলো: বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী ফোরামে কি কোনো আলোচনা হয় না?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: অনেক সময় আলোচনা হয়, প্রস্তাবও নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন করা যায় না। আমাদের অনেক কিছু সংস্কার করার দরকার ছিল, যা হয়নি। নিজেদের মধ্যে ঐক্য না থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
প্রথম আলো: কোনো কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল ও জোট ভাঙারও অভিযোগ আছে?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: একজন ব্যবসায়ী কেন এই কাজ করবেন? পৃথিবীর সব দেশেই ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দেন। যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে এসব চাঁদা দেওয়া বা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তা নেই। ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দিলে তা রসিদ নিয়ে দেওয়া উচিত। এখানে সমস্যা হলো, এক দলকে চাঁদা দিলে অন্য দল বিরূপ চোখে দেখে।
প্রথম আলো: রাজনীতি যখন ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন আপনারা চাঁদা দেওয়া বন্ধ করছেন না কেন?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: আমরা যখন বৈঠক করি, তখন সবাই বলেন, আমরা চাঁদা দেব না। তারপর দেখা যায়, গোপনে কোনো দলকে চাঁদা দিয়ে আসেন। এই চাঁদা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, ওই দল ক্ষমতায় গেলে কিছু টেন্ডার বা লাইসেন্স বাগিয়ে নেওয়া।
প্রথম আলো: এই সংঘাতের শেষ কোথায়?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী  পাকিস্তান আমলে আমরা রাজনৈতিক সংঘাত দেখেছি। তখন আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তানিরা। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও সেই সংঘাত-সংঘর্ষ চলছে। একসঙ্গে ১০-১৫ বছর কখনো শান্তিতে থাকতে পারিনি। এটা হয়তো আমাদের জাতিগত সমস্যা। না হলে এ রকমটি হবে কেন?
প্রথম আলো: সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: উত্তরণের পথ হলো, নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে সবাইকে শান্তির পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। দলের চেয়ে দেশের ও মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি অসুস্থ রাজনীতি সুস্থ অর্থনীতিকে কীভাবে অসুস্থ করে, বাংলাদেশ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। গত পাঁচ বছরে আমাদের যথেষ্ট অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বেড়েছে। কিন্তু অসুস্থ রাজনীতির জন্য সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এত খারাপ অবস্থা কখনো আসেনি। আমরা ১৮ দল বা ১৪ দল বুঝি না। আমাদের একটাই চাওয়া যে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক। সেটি করতে না পারলে আওয়ামীপন্থী, বিএনপিপন্থী কোনো ব্যবসায়ীই থাকবেন না। রাজনীতিতে দল ও মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হতে পারে না।
প্রথম আলো: প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার কাছে ব্যবসায়ীরা স্মারকলিপি দিয়েছেন। কোনো ফল পেয়েছেন কি?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দেখা হলেও বিরোধী দলের নেতার দেখা তাঁরা পাননি। তিনি সে সময়ে অফিসে না থাকলেও পরে ব্যবসায়ীদের ডাকতে পারতেন। সেটি হয়নি। বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা চালিয়েও সফল হননি।
প্রথম আলো: আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দুবার দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে। এবারের পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: কঠিন প্রশ্ন। আমি মনে করি, সমঝোতার জন্য দুই নেত্রীকে বসতে হবে। দ্বিতীয় কোনো নেতা বসলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁরা একসঙ্গে না বসলে, সংলাপ না করলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, কেউ বলতে পারে না। দুজনকে বসে ঠিক করতে হবে, কে কতটুকু ছাড় দেবেন। শান্তির জন্য সবাইকে ছাড় দিতে হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় এসে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডি ক্লার্ককে ভাইস প্রেসিডেন্ট করেছিলেন দেশের ও জনগণের স্বার্থে। আমাদের দুই নেত্রীকেও দেশের স্বার্থে ছাড় দিতে হবে। তাঁরা একগুঁয়েমি দেখালে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।
প্রথম আলো: ব্যবসায়ীরা দুই নেত্রীকে বসানোর ব্যাপারে কিছু করতে পারেন কি না?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: আমার মনে হয় না, ব্যবসায়ীদের সেই শক্তি আছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের বাইরে যাঁরা আছেন, তাঁরা নীরব জনতা। তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও কিছু করার নেই। আওয়ামী ও বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীরাই সব নিয়ন্ত্রণ করেন।
প্রথম আলো: সরকার ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন করার ব্যাপারে অনড় আর বিরোধী দল বলছে, তফসিল পরিবর্তন করতে হবে।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দল না এলে এর গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। কোনো নির্বাচনে ২০ শতাংশের নিচে ভোটার উপস্থিত হলে সেটি গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে ভোটাররা কেন্দ্রে না গেলে উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।
প্রথম আলো: নির্বাচনের পরে কী হবে?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: যাঁরা নির্বাচন বর্জন করবেন, তাঁরাও নিশ্চয়ই বসে থাকবেন না। আরও হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি দেবেন। তাতে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য বলে কিছু থাকবে না। আমরা পথে বসে যাব।
প্রথম আলো: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর যদি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকে, তাহলে তারা সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, যা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জরুরি। তারা জানে, এলাকায় কারা সন্ত্রাসী, কারা সমাজবিরোধী। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক থাকলে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যান এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
প্রথম আলো: দলীয় সরকারের অধীনে এটি সম্ভব নয় কেন?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: এর জন্য নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের বাজেট সংসদে পাস করতে হবে। তাহলে ১০ লাখ টাকার জন্য তাদের অর্থমন্ত্রীর কাছে ধরনা দিতে হবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোকদেরই কমিশনে নিতে হবে। জনপ্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু জনপ্রশাসনের দলীয়করণ এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে সেটি আর সম্ভব নয়।
প্রথম আলো: একতরফা নির্বাচন হয়ে গেলে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: একতরফা নির্বাচন হলে শান্তি আসবে না। সে কারণে সমঝোতা নির্বাচনের আগেই হতে হবে।
প্রথম আলো: বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনীতির ওপর স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি কী প্রভাব পড়বে বলে আপনি মনে করেন?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: ইতিমধ্যে তৈরি পোশাক খাতের বেশ কিছু অর্ডার বাইরে চলে গেছে। আরও যেত, কিন্তু আমরা যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করি সেই পরিমাণ পণ্য অন্য দেশ এত কম সময়ে করতে পারছে না। আমাদের একটি কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার পর্যন্ত শ্রমিক কাজ করেন; যেটি ভারতে বা ভিয়েতনামে দেখা যাবে না। এই অস্থিরতা ও সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্রেতারাও বিকল্প চিন্তা করবেন। তখন তাঁরা বাংলাদেশের পণ্যের পরিমাণটি ভাগ করে একাধিক দেশ থেকে নিতে চাইবেন। সে ক্ষেত্রে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিটা অনেক বেশি হবে।
প্রথম আলো: বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ফিরে যাবেন কি না?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: কয়েক দিন আগে এক কোরিয়ান ব্যবসায়ী আমাকে বললেন, তিনি এখানে ১৮ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তিনি মিয়ানমারে চলে যাওয়ার চিন্তা করছেন। এভাবে অন্যরাও চলে যাবেন। অস্থিরতা থাকলে বিদেশি নতুন বিনিয়োগও আসবে না।
প্রথম আলো: বিজিএমইএসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন সরকারের কাছে সুদ মওকুফসহ নানা দাবি পেশ করেছে।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সরকার সবাইকে সেটি দিতে পারবে না। তবে বিজিএমইএ সুদ মওকুফের যে দাবি জানিয়েছে, তা পূরণ করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা জরুরি। বাণিজ্যিক ব্যাংক নিজে থেকে সুদ মওকুফ করতে পারবে না। ব্যাংকিংব্যবস্থা হলো অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, একে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও শিল্পোদ্যোক্তাদের একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই মুহূর্তে বড় সমস্যা হলো পণ্য সরবরাহ। আগে যে ট্রাক আমি ১০ হাজার টাকায় ভাড়া নিতাম, সেই ট্রাক এক লাখ টাকায়ও পাচ্ছি না। সরকার সংবিধান রক্ষার কথা বলছে, কিন্তু জনগণের জানমাল রক্ষার চিন্তা করছে না। এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে পণ্য সরবরাহ সচল রাখা জরুরি। সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকুন, আমাদের আপত্তি নেই; কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা তাঁকে দিতে হবে।
প্রথম আলো: সরকার যদি ব্যবসায়ীদের কথায় কর্ণপাত না করে?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: এর সহজ উত্তর নেই। আবার আমরা চুপচাপ বসে থাকব, তাও হতে পারে না। আমরা সমাবেশের কর্মসূচি নিয়েছি। সরকার ও বিরোধী দলকে বলছি, আপনারা সমঝোতায় আসুন, দেশকে বাঁচান।
প্রথম আলো: ব্যবসায়ীদের দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: আমি মনে করি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। যে সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছে, তারা ব্যবসায়ীদের পক্ষে টানতে চেয়েছে; আবার ব্যবসায়ীরাও সরকারের কাছে কিছু পাওয়ার জন্য দলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন।
প্রথম আলো: ধন্যবাদ।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

অবরোধবাসিনী

অবরোধবাসিনী
অবরোধ প্রথা আর সেভাবে নেই, যেভাবে বেগম রোকেয়া অবলোকন করেছিলেন শতাধিক বছর আগে এ দেশে। তখনকার দিনে পরিবার-সমাজ অবরোধ আরোপ করত, এখন রাজনীতি। এখনকার নারীরা অর্ধশতক আগের নারীদের অপেক্ষায় বেশি অবগুণ্ঠিত হলেও জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে আর অবরোধবাসিনী হয়ে থাকছেন না বা থাকতে পারছেন না। রাজনীতি অবরোধ আরোপ করলেও নারীদের কাজে বের হতে হচ্ছে।
লাখ লাখ নারী তাঁদের পোশাক তৈরির কারখানায় সব অবরোধ উপেক্ষা করে সকালে বের হচ্ছেন, কাজ শেষে সন্ধ্যার পর ফিরছেন। দিনমজুর বা অন্যান্য চাকরিজীবী নারীকেও জীবনের মায়া ত্যাগ করে বোমা, ককটেল, গুলি, আগুন, ইট, লাঠির আক্রমণ থেকে গা বাঁচিয়ে কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অফিস-আদালত কোনো অজুহাত শুনতে নারাজ। এমনকি রাস্তায় বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে অফিস শুরুর সময়ের কিছুক্ষণ পরে হাজির হলেও হাজিরা খাতায় লাল দাগ পড়ে। আর না যেতে পারলে তো চাকরি নিয়ে টানাটানি। কর্মক্ষেত্রে যাঁরা অফিসের গাড়িতে আসা-যাওয়ার সুবিধা পান, হরতাল-অবরোধে কর্তৃপক্ষ গাড়ি বের করতে দেন না। অগত্যা বাস না হয় রিকশা বা অটোরিকশা। কিছুই পাওয়া না গেলে পদব্রজে। অবরোধ আরোপকারীরা বলেন, শতভাগ অবরোধ পালিত হচ্ছে আর ক্ষমতাসীনেরা একদিকে বলেন কেউ অবরোধ মানছে না, অপরদিকে এক অবরোধ বা হরতালে দেশের আর্থিক ক্ষতি কয়েক হাজার কোটি টাকা বলে দোষারোপ করছেন। তাহলে সত্যিকার অবরোধবাসিনী বোধ হয় গৃহব্যবস্থাপক নারীরা? সে গুড়েও বালু। যাঁরা ঘরে থাকেন, তাঁদের দায়িত্ব একটুও কম নয়।
তাঁরা বাজারঘাট করেন, সন্তানদের কোচিংয়ে আনা-নেওয়া করেন, অসুস্থদের ডাক্তার-বদ্যি দেখান। কিন্তু কোথায় নিরাপত্তা? মা রিকশায় করে মেয়েকে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন, ধাঁ করে ইট এসে মেয়ের মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে। নারী যাচ্ছেন সন্তানকে নিয়ে বাসে চেপে পৌঁছে দিতে গন্তব্যে, পেট্রলবোমা মেরে মা-মেয়েকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। হায় রোকেয়া! তোমার অবরোধবাসিনীরা আজ অনবরোধবাসিনী হয়েও অবরোধের আগুনে পুড়ে মরছেন। বরং অবরোধ আহ্বানকারীরাই এখন স্বেচ্ছা-অবরোধবাসিনী। অবরোধের ডাক দিয়ে উঁচু দেয়ালঘেরা বাড়িতে নিরাপত্তাপ্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে অন্দরমহলে অবস্থান করছেন। আর যাঁদের আছে অঢেল ধনসম্পদ, তাঁরা এ অবরোধকে রীতিমতো উপভোগ করছেন। অবরোধ-হরতাল আসছে জানতে পেরেই তাঁরা মজুতদারদের মতো আগেভাগেই প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী নিজেদের ভাঁড়ারে জমা করে রাখছেন। অবরোধের প্রতিদিন তাদের টেবিলভরা খাবার, নরম বিছানা, দেয়ালে বিনোদনের চলচ্চিত্র। মনে পড়ে, একবার ভয়ংকর বন্যায় দরিদ্র মানুষেরা অপরিসীম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছিলেন আর ধনীর পোলারা সে প্লাবনের পানিতে নৌবিহারে বের হয়ে অকূলপাথার উপভোগে মেতে উঠেছিল। গোপালের সেই আলুপোড়া খাওয়ার গল্পের মতো। দিনমজুর নারীরা প্রত্যহ কাজের আশায় এসে বসে থাকছেন। মালিকেরা সাহস করছেন না দিনের কাজ শুরু করার। বসে থেকে থেকে সন্ধ্যায় খালি হাতে ফিরছেন অভুক্ত সন্তানদের কাছে। কেউ ফিরছেন আগুনে দগ্ধ হয়ে, কেউ বা একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী-ভাই-সন্তানের লাশ নিয়ে আহাজারিতে অবরোধের বাতাস ভারী করে তুলছেন।
কেউ অবরোধ শেষ হওয়ার দিন গুনছেন, অবরোধ শেষ হলে কাজ পাবেন, ঘরে ফিরবেন চাল-ডাল-আনাজের ব্যাগ নিয়ে। বেগম রোকেয়ার সুলতানা নারীস্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ দেশ নারীস্থান না হলেও নারীর অঙ্গুলি হেলনেই দেশ চলছে, থেমে আছে, উত্তাল হচ্ছে। অবরোধের প্রতিদিন গড়ে ছয়জন করে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। অথচ সুলতানারূপী বেগম রোকেয়া নারীশাসিত যে দেশ কল্পনা করেছিলেন, সেখানে তিনি ব্যক্ত করেছিলেন ‘আমাদের ধর্ম প্রেম ও সত্য। আমরা পরস্পরকে ভালবাসিতে ধর্মত: বাধ্য এবং প্রাণান্তেও সত্য ত্যাগ করিতে পারি না।...আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টিজগতের জীবহত্যায়—বিশেষত মানবহত্যায় আমোদ বোধ করি না। কাহারও প্রাণনাশ করিতে অপর প্রাণীর কী অধিকার?’ সুলতানার স্বপ্নের বেশ খানিকটা আমরা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি—সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে অবরোধবাসিনী হয়েও অবরোধ মানতে না পারার দোটানায় জীবন দোদুল্যমান। অবরোধ মানলে কাজ থেকে ছাঁটাই, না মানলে আগুন দিয়ে পোড়ানো। রোকেয়া তাই বলতে বাধ্য হয়েছিলেন— ‘এ তো ভারী বিপদ না ধরিলে রাজা বধে, —ধরিলে ভুজঙ্গ’।
উম্মে মুসলিমা: সাহিত্যিক।

প্রার্থীবিহীন নির্বাচন

জামায়াতি নাশকতা এবং তা প্রতিরোধে জনপ্রশাসনের ব্যর্থতা ও অপারগতায় মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত। জনজীবনযাপন অচল হয়ে পড়েছে। একটি অভাবনীয় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে। ১৫১ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন। এবং সেখানেও দেখা যাচ্ছে, অপেক্ষাকৃত পেশিশক্তিধারীরা নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত বাস্তবে একটি বৃহত্তম তামাশাই নিশ্চিত করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে যে ধরনের তর্জন-গর্জন করেছিলেন, তা ইতিমধ্যেই ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, যাঁর বাড়িতে পেট্রলবোমার হামলা ঘটেছে, তিনি যদিও আশ্বস্ত করেছেন, শিগগিরই এই অবস্থা কেটে যাবে কিন্তু তাঁর এই আশ্বাসের বাস্তব ভিত্তি দেখা যাচ্ছে না। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, নোয়াখালীতে ১৮-দলীয় একটি মিছিল থেকে সরকারি অফিসে নাশকতা চালানো হয়েছে। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক আসাদুজ্জামান নূরের ওপর হামলার ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত।
আমরা সব ধরনের নাশকতার তীব্র নিন্দা ও দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাই। ইসিকে মানতে হবে, নির্বাচনী প্রচারণার পরিবেশ নেই। দিন যাচ্ছে। মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। অথচ এর কোনো বিচার-আচার নেই। জামায়াতের নির্বিচার নাশকতা ও ব্যাপকভিত্তিক নিষ্ঠুরতার মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রায় অসহায় বলে প্রতীয়মান হয়েছে।নির্বাচন কমিশন যদিও সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছে। অতীতে যেসব পরিস্থিতিতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, এবারের পরিস্থিতি তা থেকে ভিন্ন। নির্বাচনে সম্ভাব্য কারচুপি, ভোটকেন্দ্রে আসতে প্রতিপক্ষ কিংবা সংখ্যালঘু ভোটারদের বাধাদান এবং ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তাজনিত কারণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জনসাধারণ ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতেই পারবে না, এ ধরনের আশঙ্কামূলক পরিস্থিতিতে এর আগে সেনা মোতায়েনের কথা ওঠেনি। তাই সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ না করে নির্বাচন করা না-করা সমান কথা। মন্ত্রী আমির হোসেন আমু বিবিসিকে বলেছেন, ইসির পক্ষে আর তফসিল বদলানোর সুযোগ নেই। সাংবিধানিক বাধা আছে। ইসির উচিত নয় এ কথায় কান দেওয়া। কারণ, এবারে ভোটারও থাকবেন না। প্রার্থীও নেই। প্রার্থীবিহীন নির্বাচন খুবই বিরল।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একদলীয় নির্বাচন করার পরিস্থিতিও দেশে অনুপস্থিত। সেই নির্বাচনে প্রার্থীদের অভাব ঘটেনি। সামরিক শাসনামলের ভোটারবিহীন নির্বাচনগুলোতেও প্রার্থীসংকট এতটা তীব্র হয়নি। সরকারি দল যে আশা নিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে দলত্যাগের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল, তা সুফল দেয়নি। এমনকি বহুল আলোচিত বিএনএফ কুচক্রীদের মুখে চুনকালি মেখেছে। এরা কাজে আসেনি। জাপাও যে এ রকম করবে, তা-ও ছিল ধারণার বাইরে। সুতরাং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তফসিল স্থগিত করাই হবে সুচিন্তিত। কারণ, হাতে এখনো বেশ সময় আছে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদমতে, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের দ্বিতীয় বিকল্প এমনকি সংসদ রেখেও ১৫ দিন নির্বাচন পেছানোর সুযোগ আছে। ইসিকে প্রমাণ দিতে হবে, তারা সরকারি দলের বি টিম নয়। সমঝোতা না হতে পারে। সরকারি দলকে বড় রাজনৈতিক খেসারত দিতে হতে পারে। কিন্তু একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসিকে তার স্বাধীন সত্তা দেখানো উচিত।

১৮ শর্তে কংগ্রেস-বিজেপিকে সমর্থন দেবে আম আদমি

প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়েই বাজিমাতকারী ভারতের আম-আদমি পার্টি (এএপি) দিল্লি সরকার গঠন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে শর্ত পাঠিয়েছে দুই প্রধান দলের কাছে। ১৮ দফা শর্তে যে দল সমর্থন দেবে তাদের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এএপির। শর্ত মানলে বিজেপি বা কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি সরকার গঠন করবে এএপি- এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। নির্বাচনের পর কোনো দলই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন না পাওয়ায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট সৃষ্টি হয়। নয়াদিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৩২, এএপি ২৮ ও কংগ্রেস ৮টি আসন পেয়েছে। ৭০ আসনের মধ্যে দুটি ?আসন পেয়েছে অন্য দুটি দল। এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৩৬টি আসন। কিন্তু বিজেপি বা এএপি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই জানায়, তারা সরকার গঠন করবে। দুটি দলই একে অপরকে সরকার গঠনের আহ্বান জানায়।
গঠিত না হলে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানায়। এমন পরিস্থিতিতে সমালোচনায় পরে বিজেপি ও এএপি। এক বছর বয়সী এএপি প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনগণের সমর্থন পেয়েছে। আর তাই তাদের দায়িত্ব গ্রহণ এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে সমালোচনার তীরও বেশি আসছে। এটি ভেবেই জনগণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৮টি ইস্যুর তালিকা দিয়েছেন এএপি প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল বিল পাস, রাজধানীতে ভিআইপি সংস্কৃতির অবসান, বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর পর্যবেক্ষণ, পানি সমস্যাসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে ওই চিঠিতে। আম-আদমি নেতা কেজরিওয়াল দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর নাজিব জুংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাকেও ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী ও বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিংকে লেখা ১৮ দফা দাবি সংবলিত চিঠির কপি দেন। কেজরিওয়ালকে নাজিব জুং বলেছেন, এখন সরকার গঠন সম্ভব নয় মর্মে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন পাঠাবেন। নাজিব জুংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের পর কেজরিওয়াল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দিল্লির জনগণের কথা ভাবার আগে তিনি কংগ্রেস ও বিজেপির সাড়ার জন্য অপেক্ষা করবেন। তিনি বলেছেন, শর্তহীন সমর্থন দেয়ার কোনো বিষয় নেই। আমরা কংগ্রেসের কাছে সমর্থন চাচ্ছি না, তারা আমাদের শর্তে সমর্থন দিতে চাইলে দেবে।’ টাইমস অব ইন্ডিয়া।

রানীর বাদাম খায় রক্ষী!

রাজরক্ষীদের ওপর বেজায় চটেছেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। চুরি করে রানীর খাবার খায় তারা। এত সাহস!
২০০৫ সালে রাজরক্ষীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ জানিয়ে একটি ই-মেইল পাঠান রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ একজনকে। ঘটনাচক্রে সেই ই-মেইল সম্প্রতি হাতে আসে এক সাংবাদিকের। সেখান থেকেই জানা গেছে এ তথ্য। বাকিংহাম প্যালেসের রক্ষীদের ওপর রানী এতটাই খেপেছিলেন যে রীতিমতো নোটিশ দিয়ে জানিয়েছিলেন, কেউ যেন তার খাবারে হাত না দেয়। আসলে মাঝেমধ্যে টুকটাক কিছু খেতে পছন্দ করেন এলিজাবেথ। তাই প্রাসাদের নানা জায়গায় কৌটা ভর্তি করে রাখা থাকে কাজু-বাদামের মতো খাবার-দাবার। সেগুলো থেকেই লুকিয়ে খেয়ে নিতেন রক্ষীরাও। বিষয়টা বুঝতে পেরে এতটাই রেগে গিয়েছিলেন রানী যে, কৌটায় দাগ দিয়ে রাখতেন। আর লক্ষ্য রাখতেন, কাজু-বাদাম দাগ পর্যন্তই রয়েছে কি-না। ডেইলি মেইল।

বিকিনিতে বাংলাদেশি মডেল জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া!

তোলপাড় শুরু হয়েছে মডেল-অভিনেত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়ার বিকিনি পরা ছবি নিয়ে। সুন্দরী ও মডেল প্রতিযোগিতায় বিকিনি পরা বিভিন্ন প্রতিযোগীর সঙ্গে তার এ ছবি প্রকাশ হয়ে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন তিনি। সম্প্রতি একাধিক আন্তর্জাতিক ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পিয়ার বিকিনি পরা ছবি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। চলতি বছরের মার্চে মিশরের রেড সী, এলগোয়ানাতে অনুষ্ঠেয় 'টপ মডেল অব দ্য ওয়ার্ল্ড-২০১৩'-এ বিভিন্ন দেশের ৪৭ জন মডেলের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন পিয়া। বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। এটি মার্চের ১৬ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে রোববার রাতে ফেসবুকে দেশীয় একাধিক মডেল থেকে শুরু করে অনেকেই পিয়ার এ ছবি শেয়ার করতে থাকেন। যার ফলে সঙ্গে সঙ্গেই এ নিয়ে আলোচনার ঝড় শুরু হয়। সোমবার সকাল থেকে ‘টক অব দ্য শোবিজ’-এ অবস্থান করে বিষয়টি। কোন আন্তর্জাতিক ইভেন্টে দেশীয় মডেল-অভিনেত্রীর এ রকম বিকিনি পরা ছবি প্রকাশ পাওয়ার নজির নেই বললেই চলে। আর যদি থেকেও থাকে তা সেভাবে প্রকাশ না পাওয়ায় এমন আলোচনা-সমালোচনা হয়নি।

চলতি বছরই দেশের নামকরা র‌্যাম্প মডেল পিয়া রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘চোরাবালি’ ছবিতে অভিনয় করে অভিনেত্রী হিসেবেও সবার নজর কাড়েন। এ ছবিতেও বেশ খোলামেলা রূপে দেখা গেছে তাকে। ছবিটির মাধ্যমে বেড়ে যায় তার পরিচিতিও।

এদিকে কয়েক বছর ধরেই দেশীয় র‌্যাম্পে দাপটের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি পিয়া একাধিক আন্তর্জাতিক ইভেন্টেও অংশ নিয়েছেন, যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। এসব প্রতিযোগিতায় অন্যান্য দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সাফল্যও লাভ করেছেন।

এর আগে ২০০৭ সালে মিস বাংলাদেশ হন পিয়া। এরপরই লাইমলাইটে চলে আসেন তিনি। একাধিক ব্র্যান্ডের মডেল হিসেবেও দেখা গেছে তাকে। এরপর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পরিচিতি পান।

২০১১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড মিস ইউনিভার্সিটি’ খেতাব জয় করেন তিনি। চলতি বছরের শুরুতেই ‘ইন্ডিয়ান প্রিন্সেস ইন্টারন্যাশনাল’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন পিয়া। সেখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে বিজয়ের মুকুট মাথায় উঠে তার।

অন্যদিকে চলতি বছরই বাহরাইনে আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রিন্সেস’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। এছাড়া মিশরে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড টপ মডেল’ প্রতিযোগিতায় শীর্ষ মডেল হওয়ার সাফল্য অর্জন করেন পিয়া। আর এ প্রতিযোগিতায় অন্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে তার বিকিনি পরে পোজ দেয়া ছবিই দেশীয় মিডিয়ায় তাকে তুমুল আলোচনায় নিয়ে আসে।

ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন স্থানে পিয়ার বিকিনি পরা ছবি ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের বিষয়টিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বলেছেন, দেশীয় সংস্কৃতি, আমাদের ধর্ম কখনও এমন খোলামেলাভাবে উপস্থাপনকে সমর্থন করে না। পিয়ার এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন আমাদের সংস্কৃতিকে অসম্মানিত করেছে, কলুষিত করেছে। এমন অসংখ্য নেতিবাচক মন্তব্যের বিপরীতে অবশ্য ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও দেখা গেছে। অনেকে বলেছেন, দেশীয় একজন মডেলের আন্তর্জাতিক ইভেন্টে পদচারণা ও সাফল্য অর্জন করা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এটাকে নিরুৎসাহিত না করে বরং উৎসাহিত করা উচিত।

পিয়া জানান, এখানে বিকিনি পরে কাজ করতে হয়। আর আমি কিন্তু এমন নয় যে বিচে বিকিনি পরে একা একা পোজ দিয়েছি! মঞ্চে অন্য দেশের মডেলরাও কিন্তু আমার পাশে ছিল। আমার কাছে কাজটাই মুখ্য। কাজের মাধ্যমে নিজ দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি, এটা আমার জন্য বড় ব্যাপার।