Thursday, November 6, 2025

নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র কে এই জোহরান মামদানি

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরের নতুন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জোহরান মামদানি। তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমোকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন। মামদানির জয়ে নিউইয়র্ক প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম মেয়র পাচ্ছে।

এবারের ভোটে মামদানির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কুমো। মামদানির কাছে কুমোর এটাই প্রথম হার নয়। এর আগে গত জুনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে অভিজ্ঞ এই রাজনীতিককে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন জিতেছিলেন মামদানি।

মামদানির জয়কে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল শাখার জন্য একটি সাফল্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই জয় এল, যখন জাতীয় পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

ট্রাম্প নিজেও নিউইয়র্ক থেকে এসেছেন। তিনি সরাসরি মামদানির বিপক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, যদি মামদানি জেতেন, তবে তিনি নিউইয়র্ক নগরের নিয়ন্ত্রণ নেবেন।

গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ছয়টায় নিউইয়র্ক নগরের মেয়র নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়, শেষ হয় স্থানীয় সময় রাত ৯টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৮টা)। এর পরপরই শুরু হয় ভোট গণনা।

নিউইয়র্ক নগরের বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামসও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য লড়াইয়ে নেমেছিলেন। তবে সেপ্টেম্বরে নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান তিনি, পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী কুমোকে সমর্থন জানান। এই প্রতিযোগিতায় রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ছিলেন কার্টিস স্লিওয়া।

জোহরান মামদানি কে

জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনসভার তিনবারের নির্বাচিত সদস্য। একাধিক প্রতিযোগীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি মেয়র নির্বাচনের দৌড়ে আসেন। শুরুতে তিনি তেমন একটা গুরুত্ব পাননি। বরং শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল যে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী নির্বাচনে অ্যান্ড্রু কুমো সহজ জয় পেতে চলেছেন।

জোহরান মামদানির জন্ম উগান্ডায়। শিশু মামদানি বড় হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে। সাত বছর বয়সে মা–বাবার হাত ধরে তিনি নিউইয়র্কে চলে আসেন।

জোহরানের বাবার নাম মাহমুদ মামদানি। তিনি ভারতে জন্ম নেওয়া উগান্ডার শিক্ষাবিদ। তিনি নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁর মায়ের নাম মিরা নায়ার। তিনি বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা।

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনসভার সদস্য হওয়ার আগে জোহরান একজন কাউন্সিলর ছিলেন। এ ছাড়া তিনি একজন ‘র‍্যাপার’ও।

রাজনীতিতে মামদানির উত্থান

মাত্র এক বছর আগে নিউইয়র্কের মেয়র পদে প্রার্থী হতে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন চেয়ে আলোচনায় আসেন ৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি। যদিও শুরুতে তাঁকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কিন্তু দলীয় প্রাইমারিগুলোয় কুমোর বিরুদ্ধে তাঁর জয় তাঁকে নিয়ে দেশে ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়।

আজ জোহরান নিউইয়র্কের নির্বাচিত মেয়র। রাজনীতিতে তাঁর গত এক বছরের পথচলাকে এককথায় দুর্দান্ত উত্থান বলা যায়। দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর নিউইয়র্ককে শ্রমজীবী মানুষের জন্য আরও সাশ্রয়ী করে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে গেছেন জোহরান মামদানি।

রাজনীতিতে আসার আগে জোহরান মামদানি র‍্যাপার ছিলেন। তিনি ‘মিস্টার কার্ডামম’ নামে র‍্যাপ গাইতেন।

জোহরানের প্রচার দলের সহকারী অ্যান্ড্রু এপস্টেইন বলেন, তাঁর র‍্যাপ ক্যারিয়ার নির্বাচনী প্রচারে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে।

তবে মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির পক্ষে প্রচারে সবচেয়ে ভালো কাজ করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা তাঁর একের পর এক ভিডিও। ওই সব ভিডিওতে তিনি নানা শ্রেণির ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের মধ্যে সেই সব ভোটারও ছিলেন, যাঁরা ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন।

জোহরান মামদানির ডিজিটাল প্রচারণা ছিল যুগান্তকারী। ইংরেজির পাশাপাশি তিনি উর্দু, বাংলা, স্প্যানিশ ও আরবি ভাষায় ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছেন, স্লোগান দিয়েছেন, নানা প্রচারণামূলক ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

জোহরানের পরিচয়, তিনি একজন অভিবাসী এবং দক্ষিণ এশীয়। তিনি তাঁর নির্বাচনী প্রচারে এই দুই পরিচয়কেই কাজে লাগিয়েছেন।

অবশ্য সিটি হলের জন্য প্রার্থিতা ঘোষণার অনেক আগে থেকেই তিনি এই সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলতে শুরু করেছিলেন।

জোহরান প্রথম ২০২১ সালে দেশজুড়ে খবরের শিরোনাম হন। সেবার তিনি অতিরিক্ত ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির দাবিতে নিউইয়র্ক নগরের ট্যাক্সিচালকদের ১৫ দিনের অনশনে যোগ দিয়েছিলেন।

নিউইয়র্কের ট্যাক্সিচালকদের সঙ্গে মামদানির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। ট্যাক্সিচালকদের বেশির ভাগই অভিবাসী এবং তাঁদের অনেকেই দক্ষিণ এশীয়।

প্রচারের শেষ দিনগুলোয় জোহরান মধ্যরাতে লাগোর্ডিয়া বিমানবন্দরের ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে যান এবং পালা পরিবর্তনের সময় ট্যাক্সিচালকদের সঙ্গে দেখা করেন।

সেখানে জোহরান বলেন, রাতের শিফট ছাড়া, সকাল আসে না।

শেষ কয়েক দিনের নির্বাচন

নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নিউইয়র্কের ভোটারদের ‘অলিগার্ক বা ধনী শ্রেণি বনাম গণতন্ত্রের’ মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলেছিলেন। বিশেষ করে সপ্তাহান্তে আগাম ভোট শুরু হওয়ার আগে শহরজুড়ে ছুটে বেড়িয়েছেন জোহরান, সর্বত্র তাঁর উপস্থিতি দেখা গেছে।

জোহরান সকালে গির্জায় গেছেন, দুপুরে রেডিও শোতে। মূল শহরের বাইরের এলাকাগুলোর সুপারমার্কেটে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন, ইনফ্লুয়েন্সারদের লাইভ স্ট্রিমে হাজির হয়েছেন, ইউনিয়ন স্কয়ারে ফ্রিস্টাইল র‍্যাপ ব্যাটলে অংশ নিয়েছেন এবং নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিন শনিবার রাতে তিনি নাইট ক্লাবে গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। সেই রাতে তিনি ব্রুকলিনের ছয়টি নাইট ক্লাবের সব কটিতে গেছেন।

পরদিন রোববার আগাম ভোট গ্রহণ শুরু হয়। এবার নিউইয়র্কে মেয়র নির্বাচনে রেকর্ড পরিমাণ আগাম ভোট পড়েছে। নগরের মোট ভোটার ৪৭ লাখ। তার মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৩৫ হাজার আগাম ভোট পড়েছে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো নির্বাচনে নিউইয়র্ক শহরে এটিই সবচেয়ে বেশি আগাম ভোট পড়ার ঘটনা।

ইতিহাস সৃষ্টি করা মেয়র

আগামী বছরের ১ জানুয়ারি নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে শপথ নেবেন জোহরান। তিনি এমন একটি শহরের দায়িত্ব নিতে চলেছেন, যেটির চরিত্র বেশ জটিল। এখানে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ বসবাস করেন, রয়েছে বিশাল আকারের প্রশাসন, ৩ লাখ পৌরকর্মী এবং এই শহর পরিচালনার বাজেট সাড়ে ১১ হাজার কোটি ডলারের বেশি।

জোহরান শুধু নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়রই নন, তিনি প্রথম দক্ষিণ এশীয়, যিনি এ দায়িত্ব পালন করতে চলেছেন। তিনি নিউইয়র্কের আধুনিক ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ মেয়র হতে চলেছেন।

জোহরানের স্ত্রী একজন সিরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন শিল্পী, নাম রমা দুওয়াজি। কয়েক দিন আগেই তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয় উগান্ডায়।

রমা দুওয়াজির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে। পরে লেখাপড়ার জন্য তিনি নিউইয়র্ক শহরে চলে আসেন। রমার বয়স ২৮ বছর। তিনি জেন-জি প্রজন্মের প্রথম নারী, যিনি নিউইয়র্কের ফার্স্ট লেডি হতে চলেছেন।

সাধারণত স্বামীর নির্বাচনী প্রচারণার সময় স্ত্রীকে আশপাশে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু রমাকে সেভাবে দেখা যায়নি। তিনি মামদানির প্রশাসনে কোনো ভূমিকা পালন করবেন কি না, সেটাও এখনো স্পষ্ট নয়।

তৃণমূল পর্যায়ে তরুণ ভোটারদের কাছে গিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন জোহরান মামদানি। এই ছবিটি অক্টোবরে তোলা
তৃণমূল পর্যায়ে তরুণ ভোটারদের কাছে গিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন জোহরান মামদানি। এই ছবিটি অক্টোবরে তোলা। ছবি: রয়টার্স

নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে সর্বশেষ হিসাবে কোন প্রার্থী কত ভোট পেলেন

নিউইয়র্ক শহরের গতকাল মঙ্গলবারের মেয়র নির্বাচনে প্রায় ২০ লাখ ভোটার ভোট দিয়েছেন, যা ৫৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে স্থানীয় সময় আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত প্রায় ৯১ শতাংশ ভোট গণনা শেষ হয়েছে।

এর মধ্যে সর্বশেষ হিসাবে ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়েছেন নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ১০ লাখ ৩৬ হাজার ৫১।

জোহরান মামদানির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমো পেয়েছেন ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৮ লাখ ৫৪ হাজার ৯৯৫। ৭ দশমিক ১ শতাংশ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৩৭ ভোট।

নিউইয়র্কের ১১১তম মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মামদানি কয়েকটি রেকর্ড গড়েছেন। তিনিই নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র। ১০০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে নিউইয়র্কের সবচেয়ে কম বয়সী মেয়রও তিনি। তাঁর বয়স ৩৪ বছর।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটের খরা চলছিল। বলা যায়, জোহরান তা ঘুচিয়ে দিয়েছেন। ১৯৬৯ সালের পর নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে এবারই প্রথমবারের মতো প্রায় ২০ লাখ ভোট সংগ্রহের রেকর্ড হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম পলিটিকো জানায়, দ্য নিউইয়র্ক সিটি বোর্ড অব ইলেকশনসের তথ্যমতে, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ৬টা পর্যন্ত ১৭ লাখ ৪৮ হাজার ৬৯৮টি ভোট রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল স্থানীয় সময় রাত ৯টা পর্যন্ত ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল। এ ছাড়া এবার ডাকযোগে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার মানুষ ভোট দিয়েছেন।

নিউইয়র্কের ১৯৬৯ সালে মেয়র নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন প্রায় ২৪ লাখ ৬০ হাজার ভোটার। তখন জন লিন্ডসে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে তাঁর প্রথম মেয়াদে ভোট পড়েছিল আরও বেশি, প্রায় ২৬ লাখ ৫০ হাজার।

লক্ষণীয় বিষয়, এবার মোট যত ভোট পড়েছে, তার অর্ধেকের বেশি পেয়েছেন জোহরান। এ ছাড়া এবার নিউইয়র্কের চার বছর আগের মেয়র নির্বাচনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক জনবহুল শহরটিতে গত মেয়র নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ১১ লাখের মতো।

ইতিহাস সৃষ্টিকারী কে এই জোহরান মামদানি?

নিউইয়র্ক সিটি—বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র, আধুনিক সভ্যতার প্রতীক। এই শহরের নেতৃত্ব এখন যাচ্ছে এক তরুণ মুসলিম ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাজনীতিকের হাতে। তার নাম জোহরান মামদানি। তাকে ঘিরে এখন শুধু মার্কিন রাজনীতিই নয়, আলোচনায় সরব গোটা বিশ্ব।

৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি যদি মেয়র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন, তাহলে তিনি হবেন নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং সর্বকনিষ্ঠ মেয়র।

শৈশব ও পরিবার

জোহরান মামদানি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯১ সালের ১৮ অক্টোবর, উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায়। তার মা প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার, আর বাবা মাহমুদ মামদানি একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী, যিনি ভারতের মাটিতে জন্ম নিলেও উগান্ডার নাগরিক।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পরিবারসহ দক্ষিণ আফ্রিকায় যান জোহরান, এরপর সাত বছর বয়সে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন নিউইয়র্কে। ছোটবেলা থেকেই তিনি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও অভিবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, যা পরে তার রাজনৈতিক চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে।

রাজনীতিতে উত্থান

২০২০ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে তিনি নির্বাচিত হন নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে। এখান থেকেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক উত্থান। সাধারণ মানুষের সমস্যা, বিশেষত ভাড়া, গণপরিবহন ও শিক্ষা নিয়ে সরাসরি কাজ করে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

২০২৪ সালে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন—তখনো তিনি তুলনামূলক অপরিচিত মুখ। কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনি নিউইয়র্কের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী হয়ে ওঠেন।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জনপ্রিয়তা


এই নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো এবং রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া। প্রথমে বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিলেও জনসমর্থনের অভাবে সরে দাঁড়ান। যদিও মামদানি তরুণ ও তুলনামূলক অনভিজ্ঞ, তার প্রচারাভিযান ছিল জনমানুষের ইস্যুতে সরাসরি সংযুক্ত। তিনি বারবার বলেছেন, বিশ্ব বদলাতে বয়স বা অভিজ্ঞতা নয়, প্রয়োজন হয় ইচ্ছা আর সততা।

তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে ছিল— • স্থায়ী ভাড়ার সীমা নির্ধারণ • গণপরিবহন বিনামূল্যে করা • শিশু যত্নের সার্বজনীন সুযোগ • ধনীদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে সামাজিক কল্যাণে ব্যয় এই প্রতিশ্রুতিগুলো শহরের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে দ্রুত সাড়া ফেলে দেয়।

আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অবস্থান

জোহরান মামদানি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সরব। তিনি গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার দাবি, গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত।

এমন অবস্থানের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করেন এবং হুমকি দেন, মামদানি জিতলে নিউইয়র্কের ফেডারেল তহবিল বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু এই বক্তব্য উল্টো মামদানির জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়।

ছবি : সংগৃহীত
জোহরান মামদানি। ছবি : সংগৃহীত

জোহরান মামদানিকে বেছে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে: ডোনাল্ড ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বুধবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘সার্বভৌমত্ব’ হারিয়েছে। কারণ, নিউইয়র্কের ভোটাররা ‘বামপন্থী’ জোহরান মামদানিকে (জোহরান একজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট) তাঁদের পরবর্তী মেয়র হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা বিষয়টা সামলে নেব।’ তবে তিনি এর অর্থ ব্যাখ্যা করেননি; বরং দাবি করেন, দেশের সবচেয়ে বড় শহরটি এখন ‘কমিউনিস্ট শহর’ হয়ে উঠবে।

মায়ামিতে গতকাল এক ভাষণে ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন। মামদানির বড় জয়ের এক দিন পরই তিনি এ–ও মনে করছেন, শিগগিরই ফ্লোরিডার এ শহর হবে সেসব মানুষের আশ্রয়স্থল, যাঁরা নিউইয়র্কের কমিউনিজম থেকে পালিয়ে আসবেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘মার্কিনদের সামনে এখন খুবই স্পষ্ট এক সিদ্ধান্ত—আমাদের সামনে আছে কমিউনিজম আর সাধারণ বুদ্ধির মধ্যে এক পছন্দ।’ তিনি আরও বলেন, এ সিদ্ধান্ত হচ্ছে ‘অর্থনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ ও ‘অর্থনৈতিক সাফল্যের বিস্ময়ের’ মধ্যে এক পছন্দ।

গত বছরের ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে পরাজিত করার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ট্রাম্প এ ভাষণ দেন। তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা আমাদের অর্থনীতি উদ্ধার করেছি, স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছি, আর একসঙ্গে আমরা আমাদের দেশকে বাঁচিয়েছি—৩৬৫ দিন আগে সেই গৌরবময় রাতে।’

নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানি জয়ী হয়েছেন ট্রাম্পসহ রিপাবলিকান নেতা ও আরও কিছু মহলের তীব্র সমালোচনা এবং বিরোধিতার মধ্যে। ট্রাম্পপন্থী ব্যবসায়ী মহল, রক্ষণশীল গণমাধ্যম বিশ্লেষক এবং ট্রাম্প নিজেও ৩৪ বছর বয়সী দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত জোহরানের নীতিমালা ও মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে তাঁকে কঠোরভাবে আক্রমণ করেছিলেন।

এদিকে গত মঙ্গলবার রাতে বিজয়োৎসবে জোহরান বলেন, ‘যদি কেউ দেখাতে পারেন যে ট্রাম্পের কারণে একটি দেশ প্রতারিত হয়েছে এবং তাঁকে হারানো যায়, তবে সেটা করতে পারবে সেই শহরই, যেখান থেকেই তিনি নিজে উঠে এসেছেন।’

জোহরানের জয়, পাশাপাশি ভার্জিনিয়া ও নিউ জার্সির গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য, এটাই ইঙ্গিত দেয় যে আগামী বছর অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আবহে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

গত মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি বড় জয় হলো, ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন যেন এখানকার নির্বাচনী এলাকা নতুন করে ভাগ করা যায়। এতে অন্য অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী এলাকা পুনর্বিন্যাসের কাজ পক্ষপাতদুষ্ট করার ট্রাম্পের চেষ্টা বন্ধ করা যায়।

এত সবের পরও মঙ্গলবারের ফলাফলের দায় নিতে অস্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, কিছু বেনামি জনমত জরিপকারী বলেছে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ হলো সরকারের অচলাবস্থা (শাটডাউন) এবং এ নির্বাচনে তাঁর নিজের নাম ব্যালটে না থাকা।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-06%2Fux23fi5e%2FUS-PresidentTrump.avif?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

মেয়র নির্বাচনে জয়ের পর এবার আসল চ্যালেঞ্জের মুখে মামদানি

নিউইয়র্ক শহরে মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির যাত্রাটা শুরু হয়েছিল গত বছর। তখন তাঁর না ছিল পরিচিতি, না ছিল খুব বেশি তহবিল, না ছিল ততটা দলীয় সমর্থন। এত সীমাবদ্ধতার পরও জনপ্রিয়তার চূড়ায় উঠেছেন মামদানি। তাঁর তারুণ্য ও অনন্যসাধারণ চরিত্র ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। এই জনপ্রিয়তায় ভর করে নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে নির্বাচন হয়েছেন তিনি।

মামদানি নিজের পরিচয় দেন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে। তাঁর পরিচয়ে সমাজতন্ত্রী শব্দটা নিয়ে অনেকের, বিশেষ করে ডানপন্থী রিপাবলিকানদের উষ্মা আছে। তবু নির্বাচনী লড়াইয়ে পিছু হটেননি মামদানি। বরং গর্বের সঙ্গে বামপন্থী বিষয়গুলোকে সমর্থন করেছেন। যেমন শিশুদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা, গণপরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং মুক্তবাজার ব্যবস্থায় সরকারি হস্তক্ষেপ।

নির্বাচনের পরও এই পরিচয় মামদানির জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন সমালোচকেরা। উদাহরণ হিসেবে বলা চলে, ১২ বছর আগে মেয়র পদে বসা ডেমোক্র্যাট বিল ডি ব্লাসিওর কথা। নিউইয়র্কের অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে সোচ্চার হয়ে নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন তিনি। মামদানির মতো ব্লাসিওর ওপরও বামপন্থীদের আশা ছিল, তিনি উদার শাসনব্যবস্থার উদাহরণ সৃষ্টি করবেন।

তবে আট বছর পর ব্লাসিওকে মেয়রের কার্যালয় ত্যাগ করতে হয়েছিল সফলতা, ব্যর্থতা ও হতাশার মিশ্র এক অভিজ্ঞতা নিয়ে। মেয়রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাগুলো, তাঁর নতুন অনেক নীতি বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্লাসিওর মতো মামদানির প্রতিও এখন নিউইয়র্কবাসীর একই ধরনের আশাবাদ থাকবে। তাই সফল মেয়র হতে নানা সীমাবদ্ধতা পেরোনোর চেষ্টা করতে হবে মামদানিকে।

এ ছাড়া মামদানি যে উচ্চাকাঙক্ষী লক্ষ্য নিয়ে মেয়র হিসেবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন, তা বাস্তবায়নে তহবিল জোগাড় করাও কষ্টসাধ্য হবে। কারণ, এই তহবিল গড়তে যে ধরনের কর বৃদ্ধির প্রয়োজন, তার বিরোধিতা করেছেন নিউইয়র্কের গভর্নর ও আরেক ডেমোক্র্যাট ক্যাথি হোকুল। আর মামদানি যদি যথেষ্ট তহবিলও পান, তাহলে এককভাবে তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা সম্ভব নয়।

নির্বাচনের প্রচারে নিউইয়র্কের বিভিন্ন বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অভিজাত শ্রেণির কড়া সমালোচনা করেছিলেন মামদানি। এই ব্যবসা ও অভিজাতদের কারণেই নিউইয়র্কের ম্যানহাটান বিশ্বের অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাই মেয়রের কাজ কার্যকরভাবে করতে হলে মামদানিকে অবশ্যই তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় কিছুটা হলেও ছাড় দিতে হবে। কাজটি হবে তাঁর নিজের নীতিবিরুদ্ধ।

মামদানির নির্বাচনী প্রচারের বড় অংশজুড়ে ছিল গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরোধিতা। নিউইয়র্কে পা রাখলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। এখন মেয়র হিসেবে নিজের মেয়াদের কোনো না কোনো সময়ে এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে মামদানিকে পরীক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে। যদিও প্রগতিশীল কিছু ইহুদি তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন।

মামদানির জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনী প্রচারের সময় মামদানিকে নাজেহালের কম চেষ্টা করেননি তিনি। মামদানির ভোট কাটতে শেষ মুহূর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ডু কুমো সমর্থন দিয়েছেন। অথচ রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ার এই সমর্থন পাওয়ার কথা ছিল। মামদানি মেয়র হলে নিউইয়র্কের জন্য কেন্দ্রীয় তহবিলের দ্বার বন্ধের হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প।

নির্বাচনে জয়ের পর ট্রাম্পের উদ্দেশে বেশ কড়া ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন মামদানি। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন হয়তো বেশ আগ্রহ নিয়েই মামদানির সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইয়ে জড়াবেন। নতুন মেয়রের যাত্রা জটিল করতে বহু পথ রয়েছে তাঁর সামনে। রিপাবলিকানরা মামদানির ত্রুটিবিচ্যুতি, নেতিবাচক অর্থনৈতিক সূচক বা অপরাধের পরিসংখ্যানগুলো আরও বড় করে দেখাবেন, এটা নিশ্চিত।

তবে মামদানির জন্য বড় একটি সুবিধা হলো প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিকদের মতো তাঁর অতীত কোনো বদনাম নেই। তিনি যখন আগামী জানুয়ারিতে মেয়র পদে বসবেন, তখন হোঁচট খেতে খেতে আরও জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারবেন। এখন পর্যন্ত মামদানির প্রতিভাই তাঁকে আজকের উচ্চতায় এনেছে। এখন দেখার পালা, সামনের বছরগুলোয় এই প্রতিভা কাজে লাগিয়ে প্রতিকূলতাগুলো কতটা সামাল দিতে পারেন তিনি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-05%2Fjsd479ri%2Fmamdania.JPG?rect=35%2C0%2C5358%2C3572&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নির্বাচনে জয়ের পর স্ত্রী রামা দুয়াজির সঙ্গে জোহরান মামদানি। ছবি: রয়টার্স

নিউইয়র্ক, ভার্জিনিয়া ও নিউ জার্সির ভোটাররা ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করে কী বার্তা দিলেন

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলজুড়ে ভোটাররা মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটদের জয় এনে দিয়েছেন। এই ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছরের মধ্যেই তাঁর প্রতি মানুষের অসন্তোষের সুস্পষ্ট প্রকাশ বলা চলে।

ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে মধ্যপন্থী প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক সদস্য অ্যাবিগাইল স্প্যানবার্গার রাজ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে সহজেই জয়ী হয়েছেন।

নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের আরেক মধ্যপন্থী প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য মিকি শেরিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যাক সিয়াটারেলি হারিয়ে দিয়েছেন।

নিউইয়র্ক নগরে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোরান মামদানি এই বছর দ্বিতীয়বারের মতো সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোকে হারিয়েছেন। প্রথমে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে এবং তারপর সাধারণ নির্বাচনে। সাধারণ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কুমো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছিলেন।

তীক্ষ্ণ আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের এসব জয় তাঁদের দলের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিতর্ককে খুব একটা মীমাংসা করতে পারবে না। সেই বিতর্ক হচ্ছে, তাঁদের কোন পথে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ, কয়েক মাসের মধ্যেই একাধিক মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় প্রাইমারি অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় প্রাইমারিও আসন্ন।

তবে ডেমোক্র্যাটদের সর্বশেষ নির্বাচনী প্রচারে কিছু বিষয়ে মিল ছিল। যদিও সমাধানের পথ তাঁরা ভিন্ন ভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। প্রার্থীরা মানুষের সাশ্রয়ী জীবনযাত্রার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁরা সবাই প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচক ছিলেন।

নিউইয়র্কের প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ জোহরান মামদানির বিজয় সমাবেশ থেকে সিএনএনকে বলেছেন, ‘এটি শুধু ডেমোক্র্যাটদের নিয়ে একটি বার্তা নয়; বরং গোটা দেশের জন্য একটি বার্তা। আমি মনে করি, মার্কিনরা এই প্রশাসনের কাছ থেকে যা দেখছেন, তাতে আতঙ্কিত।’

ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটাররা ‘ভোট পুনর্বিন্যাস’ ব্যালটের পদক্ষেপে অনুমোদন দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, আগামী বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের সুযোগ বৃদ্ধি করা।

পেনসিলভানিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের ডেমোক্র্যাট বিচারপতিরা পুনর্নিয়োগের ভোটে জয় পেয়েছেন। ফলে রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকছে। এই অঙ্গরাজ্য সব সময় রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্র, যেখানে ভোটের নিয়ম নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জ দেখা যায়।

কুমোকে আবার হারালেন মামদানি

মামদানি তাঁর প্রগতিশীল ভাবনা ও নতুন নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতির দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। নিউইয়র্ক নগরে তিনি মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দেন, যা ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে। ভোটাররা তাঁর পরিকল্পনাকে আরও এগিয়ে নিতে একাধিক প্রস্তাবও অনুমোদন করেছেন, যাতে সাশ্রয়ী মূল্যে বাড়ি নির্মাণের জটিল নিয়মগুলো সহজ করা যায়।

জোহরান যদি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেন, তাহলে নিউইয়র্ক নগর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে, বিশেষ করে যেখানে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য এটি একধরনের সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগে ২০২১ সালে গভর্নর পদ থেকে সরে দাঁড়ানো কুমো রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করছিলেন। তবে এই ফলাফল ছিল তাঁর জন্য হতাশাজনক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও এটি ব্যর্থতা। কারণ, তিনি শেষ মুহূর্তে রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়ার বদলে কুমোকেই সমর্থন জানিয়েছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিবিএসের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘যদি বিকল্প হয় এক খারাপ ডেমোক্র্যাট আর এক কমিউনিস্ট, তাহলে আমি সব সময় খারাপ ডেমোক্র্যাটকেই বেছে নেব।’

ভার্জিনিয়ায় বড় জয়

মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটদের প্রথম বড় জয় আসে ভার্জিনিয়া রাজ্যে। সেখানে সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার রিপাবলিকান লেফটেন্যান্ট গভর্নর উইনসাম আর্ল-সিয়ার্সকে পরাজিত করেন।

উত্তর ভার্জিনিয়ার লাউডন কাউন্টিতে স্প্যানবার্গারের জনপ্রিয়তা বিশেষভাবে নজরকাড়া ছিল। রাত ৯টার মধ্যে বেশির ভাগ ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, স্প্যানবার্গার ৬৪ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে কমলা হ্যারিসের চেয়ে ৮ পয়েন্ট বেশি ভোট পয়েছেন তিনি। ২০২১ সালের গভর্নর প্রার্থী টেরি ম্যাকঅলিফের চেয়ে এটি ৯ পয়েন্ট বেশি।

২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে রালফ নর্থাম যে ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, তার চেয়ে প্রায় ৫ পয়েন্ট বেশি ভোট পেয়ে স্প্যানবার্গার আরও ভালো ফল করেছেন।

সিএনএনের জরিপে দেখা যায়, ফেডারেল চাকরিজীবী পরিবারের ভোটারদের ৬১ শতাংশই স্প্যানবার্গারকে ভোট দিয়েছেন।

স্প্যানবার্গারের জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে ডেমোক্র্যাট অ্যাটর্নি জেনারেল প্রার্থী জে জোন্সও জয় পান। যদিও তিনি প্রায় ৫ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিলেন। তিনি রিপাবলিকান জেসন মিয়ারেসকে পরাজিত করেন।

ভার্জিনিয়ার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়

ফল যা–ই হোক না কেন, এই নির্বাচনে ইতিহাস তৈরি হয়েছে। কারণ, বিজয়ী হচ্ছেন রাজ্যের প্রথম নারী গভর্নর।

স্প্যানবার্গার বলেন, ‘আমার স্বামী সন্তানদের বলেছেন, তোমাদের মা ভার্জিনিয়ার গভর্নর হতে চলেছেন। এমন কথা আগে কখনো শোনা যায়নি। এটা বড় ব্যাপার যে এখন মেয়েরা জানেন, তাঁরাও যেকোনো কিছু অর্জন করতে পারেন।’

নিউ জার্সিতে ট্রাম্পবিরোধী বার্তা

নিউ জার্সির রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী জ্যাক সিয়াটারেলি ২০২১ সালের নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন। এবারও ভালো লড়াই করেছেন। তিনি নিজেকে ‘জার্সি মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও ট্রাম্পের সমর্থন ও প্রশংসা তাঁকে ডেমোক্র্যাটদের তীব্র প্রচারের নিশানায় নিয়ে আসে।

নিউ জার্সির গভর্নর পদে ভোট ছিল ট্রাম্পবিরোধী মনোভাবের এক বড় পরীক্ষার জায়গা।

সিএনএনের জরিপে দেখা গেছে, লাতিনো ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প ৪৬ শতাংশ ভোট পেলেও সিয়াটারেলি মাত্র ৩২ শতাংশ পান ভোট পান। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট শেরিল পান ৬৪ শতাংশ ভোট।

শেরিল কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ৯১ শতাংশ এবং কোনো দলের সঙ্গে নিবন্ধিত নয়, এমন ভোটারদের মধ্যেও ৭ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।

যাঁরা মনে করেন, করই সবচেয়ে বড় সমস্যা, তাঁদের ৩৪ শতাংশ সিয়াটারেলিকে ভোট দেন। তবে যাঁরা অর্থনীতিকে বড় বিষয় বলে মনে করেন (৩২ শতাংশ), তাঁদের ৬১ শতাংশই ভোট দেন শেরিলকে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় নিউসমের বড় পদক্ষেপ

ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটদের বড় স্বস্তি এনে দিয়েছেন। তাঁরা এমন একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন, যাতে নতুনভাবে ভোট পুনর্বিন্যাস করে ডেমোক্র্যাটদের জন্য পাঁচটি সুবিধাজনক আসন তৈরি হবে।

গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এই প্রচারে নেতৃত্ব দেন। এটি ছিল টেক্সাসের রিপাবলিকানদের পাল্টা জবাব, যাঁরা একইভাবে নিজেদের সুবিধার জন্য ভোট পুনর্বিন্যাস করেছিলেন।

নিউসম প্রচারের জন্য ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার সংগ্রহ করেন এবং সরাসরি বিজ্ঞাপনেও অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘প্রপ ৫০-এর মাধ্যমে আমরা ট্রাম্পের নির্বাচনী কারসাজি ঠেকাতে পারব।’

অনেকে মনে করছেন, এটি নিউসমের ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতার দিকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পেনসিলভানিয়ায় আদালতে ডেমোক্র্যাটদের জয়

এ ছাড়া পেনসিলভানিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের ডেমোক্র্যাট বিচারপতিরা পুনর্নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। ফলে রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতে তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকছে, যা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে ভোটের নিয়ম নিয়ে প্রায়ই আইনি লড়াই হয়।

সমর্থকদের সঙ্গে বিজয় উদ্‌যাপন করছেন নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। ৪ নভেম্বর ২০২৫, ব্রুকলিন
সমর্থকদের সঙ্গে বিজয় উদ্‌যাপন করছেন নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। ৪ নভেম্বর ২০২৫, ব্রুকলিন। ছবি: এএফপি

আমাদের ধনখড়েরাও অপমানিত হয়ে অপসারিত হয়েছিলেন by সালেহ উদ্দিন আহমদ

প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এক কলামে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় কী পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেছেন, তার বিস্তারিত লিখেছেন। সৌম্য লিখেছেন, এভাবে অসম্মানিত অপসারণ আরও ভয়ংকরভাবে এই বার্তা ছড়িয়ে দিল, ‘কর্তার’ রোষানলে পড়লে কারও রেহাই নেই।

এই বার্তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক আগেই প্রচারিত হয়েছিল। আমাদের দেশেও ধনখড় ছিল। অনেকে হয়তো জানেন না বা ভুলে গেছেন, আমাদের ধনখড়দেরও অনেক অসম্মান করে বিদায় দেওয়া হয়েছিল। তবে ‘কর্তার’ ইচ্ছায় নয়; বরং দুই ‘কর্ত্রীর’ ইচ্ছায়। সেসব ঘটনা ভারতের ধনখড়ের চেয়েও চমকপ্রদ এবং রাজনীতির নাটকে ভরপুর।

ধনখড় একসময় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন। সে সময়টায় রাজ্যের রাজনীতিতে তাঁর অতি সক্রিয়তা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অতিষ্ঠ করে তোলে। নিয়তির কী উপহাস, মোদি তাঁকে উপরাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণের একটা বড় কারণ ছিল ‘তাঁর অতি সক্রিয়তা’। অন্য বড় কারণটা ছিল ‘প্রটোকলের বিষয়ে স্পর্শকাতরতা’। আশ্চর্য এক মিল—বাংলাদেশের ধনখড়দের অপমান ও অপসারণের কারণও ছিল ঠিক এই দুটি।

বাংলাদেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ‘অতি সক্রিয়তা’ ও ‘প্রটোকলের বিষয়ে স্পর্শকাতরতা’ নিয়ে সুপ্রিম নেতাদের দেওয়া লাইনটা কিছুটা ‘অতিক্রম’ করেছিলেন। প্রতিক্রিয়া ছিল তৎক্ষণাৎ, তাঁদের অপমানিত হয়ে চাকরি হারিয়ে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। এই দুটি ঘটনা একসময় দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় দারুণ ঝড় তুলেছিল।

------- ২.

ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাবা কফিল উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন তুখোড় রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগের একজন বরেণ্য নেতা। ১৯৭২ সালে বাবার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ চেয়েছিল বদরুদ্দোজা চৌধুরী বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর শূন্যস্থান পূরণ করবেন। কিন্তু তিনি তা চাননি। তিনি একজন শীর্ষ স্থানীয় মেডিকেল শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসক হিসেবে নিজে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর উপস্থাপনায় অনুষ্ঠান ‘আপনার ডাক্তার’ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।

১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নেওয়ার পর তিনি জিয়ার উপদেষ্টা হন। পরে রাষ্ট্রপতি জিয়া যখন নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করেন ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী হলেন দলের মহাসচিব। সবাই আশ্চর্য হয়ে গেলেন। যে মানুষটা রাজনীতিকে এত কাছ থেকে দেখার পরও রাজনীতি থেকে এতটা বছর দূরে ছিলেন, হঠাৎ কেন রাজনীতিতে যোগ দিলেন?

রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে বি চৌধুরীর খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জিয়া খুব বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করতেন বি চৌধুরীকে। জিয়ার মৃত্যুর পর একসময় খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দলে ও খালেদা জিয়ার সরকারে বদরুদোজ্জা চৌধুরী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আইন অনুযায়ী তিনি মন্ত্রিত্ব ও বিএনপির সব দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি নেন।

বঙ্গভবনে যাওয়ার পর বি চৌধুরী সরকার ও দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তিনি রাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্সিকে দলের ওপরে স্থান দিতেন এবং প্রেসিডেন্সির স্বাধীন সত্তা ও প্রটোকল বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। দলের ভেতরে এর মধ্যে বিএনপি নেতা সাইফুর রহমান, অলি আহমদ, মতিন চৌধুরী হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়ার পরামর্শদাতা। তাঁরা দলের বাইরে বি চৌধুরীর স্বাধীন সত্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কান ভারী করতে থাকেন বলে আলোচনা আছে এবং দলের সংসদ সদস্যদেরও তাঁরা খেপিয়ে তোলেন। নিজের জন্য আলাদা ইমেজ গড়ে তোলার চেষ্টাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

দলের পার্লামেন্টারি বোর্ডে তৎপরতা শুরু হয় তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরাতে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সম্মতিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০ জুন, ২০০২ তারিখে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দল বৈঠক করে বি চৌধুরীকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেয়। পদত্যাগ না করলে কী শাস্তি, সেটা সবার জানা ছিল। পরবর্তী সময় বদরুদোজ্জা চৌধুরী পদত্যাগ করে রাষ্ট্রপতি ভবন ছাড়লেন।

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বি চৌধুরীর পদত্যাগের পর বিবিসির সংবাদে বলা হয়, ‘জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে ড. চৌধুরীর অনুপস্থিতি এবং মৃত্যুবার্ষিকীতে দেওয়া এক বার্তায় জিয়াউর রহমান যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, তা না বলায় বিএনপি নেতারা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।’

খালেদা জিয়া হয়তো মনে করতেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বি চৌধুরী তাঁকে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করতেন না। রাষ্ট্রপতির প্রটোকলের প্রতি অবিচল থাকায় চরম শাস্তি পেতে হলো বি চৌধুরীকে। তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দেওয়া হয়নি, প্রধানমন্ত্রী একটিবার তাঁর সঙ্গে কথা বললেন না। এই অপমান ধনখড়ের অপমানের চেয়ে কম নয়।

--------- ৩.

বাংলাদেশের সাবেক বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, যিনি এস কে সিনহা নামে বেশি পরিচিত, তাঁর ‘ধনখড় হওয়ার’ কাহিনিও কম চমকপ্রদ নয়। তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন।

এস কে সিনহা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে প্রধান বিচারপতি করার পর কলকাতার বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ২৫ মার্চ ২০১৬ সালে প্রথম পাতায় এক নিবন্ধ প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল—‘বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি সুরেন্দ্র কুমার?’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আবার সাধারণ নির্বাচন ২০১৯ সালে। তার আগেই বর্তমান রাষ্ট্রপতি হামিদের মেয়াদ ফুরানোর কথা। সেই শূন্য আসনে সুরেন্দ্র কুমারকে বসানোর সুযোগ ছাড়বেন কেন হাসিনা। বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণ করার সুযোগ তাঁর সামনে। সুরেন্দ্র কুমারও সেই ইঙ্গিত পেয়েছেন। তার জোরেই রাষ্ট্রীয় গরিমা প্রকাশে তিনি ব্যস্ত। সিলেটের সভায় তিনি বলেছেন, আমেরিকার ডলার যার, গণতন্ত্র তার। বাংলাদেশে তা নয়। এখানে সবাই সমান।’

তখন কি তিনি জানতেন ‘এখানে সবাই সমান’ যতক্ষণ ‘সবাই’ দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির সব কথামতো চলবেন। বিচারপতি সিনহা হাসিনা সরকারের উপদেশ মেনে সব বিচারব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আপিল বিভাগের যে বেঞ্চ বাতিল করেছিল, এস কে সিনহা ছিলেন তার অন্যতম সদস্য।

কিন্তু ‘অতি সক্রিয়তা’ দেখিয়ে একটা ব্যাপারে তিনি সরকারের বিরোধিতা করলেন। এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। এর ফলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অসদাচরণ তদন্ত ও অপসারণের সুপারিশ করার ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই ফিরে আসে।

ক্ষমতাসীনেরা বিচারপতি অপসারণ ক্ষমতা তাঁদের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন, যাতে করে তাঁরা বিচারপতিদের হাতের মুঠোয় রাখতে পারেন। হাসিনা সরকার একে সিনহার অতি সক্রিয়তা ও অবাধ্যতা হিসেবে দেখল। তাঁর ওপর নেমে আসে অপমান ও হুমকির খড়্গ।

এস কে সিনহা ডেইলি স্টারকে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন কয় দিন আগে, ৩১ জুলাই তারিখে। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমার শেষ দিনগুলো ছিল খুবই ভয়ংকর, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটা কেবল উপলব্ধি করা যায়। আমি প্রধান বিচারপতি ছিলাম, আমাকেই গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। আমাকে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। আমার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। আমার বাড়ির চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনী (গোয়েন্দারা) পাহারা বসায়। আমার একজন স্টাফ বাসায় ঢুকতে গেলে তাকে পেটানো হয়। ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান সাইফুল আবেদীন মধ্যরাতে আমাকে বিরক্ত করতেন এবং পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দিতেন।’

এ অবস্থার মধ্যেই ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে ঢাকা ত্যাগ করেন বিচারপতি সিনহা এবং পরবর্তী সময় পদত্যাগ করেন।

সিনহা ঘটনার আরেক খলনায়ক ছিলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞা। তিনি ছিলেন তৎকালীন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি, তিনি অন্য সব বিচারপতিকে রাজি করান, তাঁরা যেন এস কে সিনহার সঙ্গে আদালতে না বসেন। তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সিনহার পর তাঁকেই প্রধান বিচারপতি করা হবে। যদিও তিনি কিছুদিন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি ছিলেন, তাঁকে বাদ দিয়ে নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার পর ওয়াহাব মিঞা সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ করেন।

-------- ৪.

আমাদের দেশেও যাঁরা নেতৃত্বের শীর্ষে থাকেন, তাঁরা একটা জিনিস একদম পছন্দ করেন না এবং তা হলো ‘অবাধ্যতা’। গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে বা পদ বজায় রাখতে সুপ্রিমলিডারকে মান্য করে টিম প্লেয়ার হয়ে শিশুর মতো বাধ্য থাকতে হবে।

নিচের নেতারা তাঁদের দেওয়া দায়িত্ব ও প্রত্যাশার বাইরে কাজ করবেন, সুপ্রিম নেতাদের তা কখনো পছন্দ নয়। আর আমাদের দেশে যাঁরা দলের সুপ্রিম নেতা, তাঁরা ছাড়া অন্য কারও কোনো বাড়তি প্রটোকল নেই, সবাই মোটামুটি সমান। এই নিয়ম শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা তাঁদের ক্ষমতার সময় শক্তভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। সব দলের নেতা-কর্মীরাও বিষয়টি ভালোভাবে জানতেন, তাই খুব হুঁশিয়ার থাকতেন।

তবু মাঝেমধ্যে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। বি চৌধুরী ও এস কে সিনহা ছাড়াও আরও অনেক রাজনৈতিক নেতাকে তাঁদের ‘বিচ্যুতির’ জন্য বিরাট মূল্য দিতে হয়েছিল, কারও কারও রাজনৈতিক কর্মজীবনে তালা লাগাতে হয়েছিল। তাঁদের কয়জন হলেন আওয়ামী লীগের ড. কামাল হোসেন, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল জলিল এবং বিএনপির আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও মেজর হাফিজ। বিএনপির সেক্রেটারি আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে বহিষ্কার করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৫০ জন সাবেক সংসদ সদস্য দলের রোষানলে পড়েন।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- salehpublic711@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা
প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। ফাইল ছবি

শব্দের চেয়ে তিনগুণ গতিসম্পন্ন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ঘোষণা পুতিনের

রাশিয়া নতুন প্রজন্মের একটি পারমাণবিক ক্রুজ মিসাইল বানানোর কাজ শুরু করেছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি জানান, ওই ক্ষেপণাস্ত্রের গতি শব্দের গতির চেয়ে তিনগুণ বেশি হবে। যা ভবিষ্যতে তা হাইপারসনিক স্তরে পৌঁছাবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।

এতে বলা হয়, ক্রেমলিনে এক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে পুতিন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ঘোষণা দেন পুতিন। বলেন, রাশিয়া কোনো দেশের জন্য হুমকি নয়। অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মতো আমরাও নিজেদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা উন্নত করছি। অনুষ্ঠানে তিনি বুরেভেস্তনিক নামের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পোসেইডন মানববিহীন ডুবোজাহাজ নির্মাণে জড়িত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের প্রশংসা করেন।

পুতিন আরো বলেন, বুরেভেস্তনিক উন্নয়ন রাশিয়ার জনগণ ও দেশের নিরাপত্তার জন্য ‘ঐতিহাসিক গুরুত্ব’ বহন করে এবং এটি আগামী কয়েক দশক ধরে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে। তিনি জানান, রাশিয়া এ বছর সার্মাত নামের আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও সফল হয়েছে এবং আগামী বছর এটি যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হবে।

গত মাসে এক বৈঠকে পুতিন বলেছেন, বুরেভেস্তনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সিদ্ধান্তমূলক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ওই ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ১৫ ঘণ্টা উড়ে ১৪ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। তিনি ২০১৮ সালে প্রথম বুরেভেস্তনিক ও পোসেইডনের ঘোষণা দেন। তখন সেগুলোকে তিনি ‘অসীম পাল্লার ও একক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পারমাণুচালিত অস্ত্র ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

রাশিয়ার এই ঘোষণার মধ্যেই পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ও নীতি নির্ধারকরা আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে যে হাইপারসোনিক ও দূরপাল্লার পারমাণবিক সক্ষমতা বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্য এবং স্থিতিশীলতার উপর কী প্রভাব ফেলবে। রাশিয়া এই প্রযুক্তি উন্নয়নের তীব্র প্রতিপত্তি ও আত্মরক্ষার দাবি করে আসছে।

mzamin

ট্রাম্প কি রাজার শাসন চালাচ্ছেন by কারলা নরলফ

রাজারা সাধারণত জন্মগত অধিকারে এবং জনগণের স্বাভাবিক আনুগত্যধন্য হয়ে শাসন করেন। অনেক সময় তাঁরা ভয় দেখিয়েও শাসন চালান। গত মাসে যখন যুক্তরাষ্ট্রে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে ‘আমরা রাজার শাসন চাই না’ বলে স্লোগান দেন, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা ওই ভিডিওতে তাঁর মাথায় রাজার মতো করে মুকুট পরাতে দেখা যায়। কিন্তু পরের দিনই তিনি আরেক পোস্টে বলেন, ‘আমি কোনো রাজা নই।’

তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়াচ্ছে, আসলে কোনটি সত্য? তিনি কি রাজা, নাকি তা নন। তরুণ পডকাস্টার ব্রাইলিন হলিহ্যান্ড এ প্রশ্নকে সরলভাবে দেখেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে কোনো রাজতন্ত্র নেই আর ট্রাম্পের ভিডিওগুলো নিছকই একধরনের মজা বা ‘ট্রলিং’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি এমন সব ক্ষমতা হাতের মুঠোয় নিতে চাইছেন, যা একসময় রাজাদের হাতে থাকত?

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরকারের করা ‘ট্রাম্প বনাম যুক্তরাষ্ট্র’খ্যাত মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তার বলে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা এখন তাঁদের সংবিধানসম্মত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্ত’ এবং অন্যান্য সরকারি কাজের ক্ষেত্রে ‘আংশিক দায়মুক্ত’। অর্থাৎ এ রায়ের পর প্রেসিডেন্টের ওপর আইনি চ্যালেঞ্জ তোলা এখন অনেক কঠিন।

তবে ট্রাম্পের সমর্থকদের চোখে তাঁর এই আচরণগুলো শক্তিশালী ও দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁদের যুক্তি, ট্রাম্প তো সর্বশেষ নির্বাচনে পপুলার ভোটে জিতে এসেছেন। তাঁদের মতে, ট্রাম্প একজন সফল সিইওর মতো কাজ করছেন; অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করে জনগণের জন্য ‘সুফল’ এনে দিচ্ছেন।

কাগজে-কলমে ট্রাম্প যদিও কোনো রাজা নন, তবে তাঁর শাসনকৌশলে রাজাদের মতো ক্ষমতা খাটানোর বিষয়টি স্পষ্ট। তিনি আসলে দেশ চালাচ্ছেন টিউডর রাজা হেনরি সপ্তমের মতো। রাজা হেনরি তাঁর অভিজাত গোষ্ঠীভুক্ত প্রতিপক্ষদের দুর্বল করে, রাজকোষের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করে এবং প্রশাসনের কাঠামো বদলে দিয়ে নিজের হাতে সব ক্ষমতা নিয়েছিলেন।

রাজা হেনরি রাজস্ব আদায়ের জন্য বন্ধকিপত্র, চাঁদা আর জরিমানার মতো কিছু গোপন পদ্ধতি চালু করেছিলেন, যাতে পার্লামেন্টের অনুমতি ছাড়াই তিনি রাজকোষ ভরতে পারেন। ঠিক একইভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের জন্য সহায়তা হিসেবে বরাদ্দ করা কয়েক শ কোটি ডলার সম্প্রতি ‘স্থগিত’ করে রেখেছে। ওই অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ছাড় না করলে সে বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাবে।

কিন্তু এই অর্থ স্থগিত বা ফ্রিজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আসলে কংগ্রেসের, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী ‘অর্থের নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘পাওয়ার অব দ্য পার্স’ নামে পরিচিত। গত সেপ্টেম্বরে এক ফেডারেল বিচারক সরকারকে এই অর্থ ছাড় করতে আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের সেই স্থগিতাদেশের বেশির ভাগ অংশই বহাল রাখেন এবং অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত বরাদ্দ আটকে রাখার অনুমতি দেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প সরাসরি ‘রাজকোষের’ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছেন। এটি রাজা হেনরি সপ্তমের সময়কে মনে করিয়ে দেয়।

ট্রাম্পের সমর্থকদের মতে, এ ধরনের ‘অর্থ বরাদ্দ স্থগিতকরণ’ পুরোপুরি বৈধ। তাঁদের চোখে ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ তাঁর ভোটারদের স্বার্থে নেওয়া দৃঢ় ও কার্যকর সিদ্ধান্ত। তাঁদের যুক্তি, কংগ্রেস চাইলে তো আইন করে এমন কোনো বরাদ্দ পুনর্বহাল করতে পারে, তাই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে পুরোপুরি লাগামছাড়া বলা যাবে না।

ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদ পুনঃ শ্রেণীকরণ করেছে, সরকারি কর্মচারীদের সেবা সুরক্ষা দুর্বল করেছে এবং অভিজ্ঞ পেশাদারদের কাছ থেকে কর্তৃত্ব সরিয়ে তা বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠদের হাতে দিয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের আইনজীবীরা এখন নতুন করে নীতিমালা লিখছেন, বিজ্ঞানীরা পরিবেশ বিপর্যয়জনিত বিপদের মাত্রা কমিয়ে দেখাচ্ছেন আর নৈতিকতা-সংক্রান্ত কর্মকর্তারা ট্রাম্পের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের মতামত বারবার সংশোধন করে চলেছেন।

এখন আর আগের মতো প্রকাশ্য শুনানি বা মহাপরিদর্শকের তদন্তে বিষয়গুলোর মীমাংসা হয় না। এখন এসব গোপনে নিষ্পত্তি হচ্ছে। ফলে জনসমক্ষে কোনো রেকর্ডই থাকছে না। একটি মেধাভিত্তিক সরকারি ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সরকার যেন রাজদরবারের মতো না চলে, আনুগত্যের চেয়ে দক্ষতা যেন বেশি মূল্য পায়। কিন্তু যখন বিশ্বস্ত লোকদের অভিজ্ঞদের ওপরে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যোগ্যতার বদলে সম্পর্কের ভিত্তিতে। এতে তদারকি বা জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে।

ট্রাম্পের আমলে দেখা যাচ্ছে, যে পদগুলোর জন্য সিনেটের অনুমোদন দরকার, সেসব পদে ‘ভারপ্রাপ্ত’ কর্মকর্তাদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা প্রকাশের আগে মন্তব্য করার সময়সীমা আগে ছিল ৬০ দিন। এখন তা কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘোষণা এত তাড়াহুড়ায় দেওয়া হচ্ছে যে সঠিক পর্যালোচনার সুযোগই থাকছে না।

যেভাবে রাজা হেনরি তাঁর বিশ্বস্ত লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতেন বা কোনো কোনো পদ ফাঁকা রেখেই শাসন চালাতেন, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রেও ইন্সপেক্টর জেনারেলদের পদ দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকার কারণে তদন্তের গতি কমে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন কর্মকর্তাদের মধ্যে যাঁদের রাজনৈতিক সমর্থন দুর্বল, তাঁরা আইন প্রয়োগে অনাগ্রহী।

ট্রাম্পকে রাজা ঘোষণা করা হয়নি। কারণ, একজন প্রেসিডেন্ট কখনো রাজা হতে পারেন না। তিনি নির্বাচন ছাড়া শাসন করতে পারেন না, সংসদের অনুমোদন ছাড়া অর্থ খরচ করতে পারেন না, আদালত ভেঙে দিতে পারেন না বা অঙ্গরাজ্যগুলোর ক্ষমতা বিলুপ্ত করতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো এখনো টিকে থাকলেও তাদের কার্যকারিতা বদলে গেছে। ট্রাম্পের মাথায় রাজমুকুট না থাকলেও তিনি কার্যত রাজা হয়েই আছেন বলে মনে হচ্ছে।

কারলা নরলফ, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি

ট্রাম্প যুগের রাজনীতির প্রথম পরীক্ষায় ডেমোক্রেটদের ঝড়ো বিজয়

ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম বৃহৎ নির্বাচনে মঙ্গলবার ডেমোক্রেটরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে বড় জয় পেয়েছে। এগুলো হলো নিউইয়র্ক, ভার্জিনিয়া এবং নিউ জার্সি। এই ফলাফল আগামী বছরের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দলটির জন্য এক বিশাল প্রেরণা এনে দিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ফ্রান্স ২৪। এতে বলা হয়, নিউইয়র্ক সিটিতে ৩৪ বছর বয়সী ডেমোক্রেটিক সমাজতন্ত্রী জোহরান মামদানি মেয়র নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। রাজ্যের সাধারণ একজন আইনপ্রণেতা থেকে দেশের সবচেয়ে দৃশ্যমান ডেমোক্রেটদের একজনে পরিণত হওয়ার এক আশ্চর্য উত্থানের পরিণতি এটি। ভার্জিনিয়ায় অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার এবং নিউ জার্সিতে মিকি শেরিল যথাক্রমে গভর্নর নির্বাচনে ব্যাপক ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। এই নির্বাচনের ফল দেখিয়েছে আমেরিকানরা ট্রাম্পের নয় মাসের অস্থির শাসনকালকে কীভাবে দেখছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্রেটদের বিভিন্ন প্রচারণা কৌশল কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও যাচাইয়ের সুযোগ ছিল এটি।

তবে এখনো মধ্যবর্তী নির্বাচন এক বছর দূরে। আর ট্রাম্পের যুগে এক বছর মানেই সামনে বড় একটি সময়। তাছাড়া এই নির্বাচন হয়েছে সেইসব রাজ্যে যেখানে থেকে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দেয়নি।

তিন ডেমোক্রেট প্রার্থীই অর্থনৈতিক ইস্যু, বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয়যোগ্যতা বা ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি’-কে প্রাধান্য দিয়েছেন। স্প্যানবার্গার ও শেরিল দলের মধ্যপন্থী ঘরানার হলেও, মামদানি ভাইরাল ভিডিওনির্ভর প্রচারণার মাধ্যমে নিজেকে স্পষ্টবাদী প্রগতিশীল ও নতুন প্রজন্মের কণ্ঠ হিসেবে তুলে ধরেছেন। মামদানি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র। তিনি ৬৭ বছর বয়সী সাবেক গভর্নর অ্যানড্রু কুমো’কে পরাজিত করেছেন। ডেমোক্রেটিক মনোনয়ন হারানোর পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েন কুমো। চার বছর আগে যৌন হয়রানির অভিযোগে গভর্নরের পদ ত্যাগ করা কুমো মামদানিকে ‘চরম বামপন্থী’ বলে অভিযুক্ত করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন তার নীতিগুলো ‘অবাস্তব ও বিপজ্জনক।’ মামদানির প্রচারণা নিউইয়র্কবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। নির্বাচনী বোর্ডের তথ্যমতে, ২০ লাখেরও বেশি ভোট (অগ্রিম ভোটসহ) পড়েছে- যা ১৯৬৯ সালের পর মেয়র নির্বাচনে সর্বাধিক।

রিপাবলিকানরা ইতিমধ্যেই মামদানিকে ডেমোক্রেটিক পার্টির নতুন ‘চেহারা’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। ট্রাম্প ভুলভাবে তাকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন- তার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার ফলে শহরের জন্য ফেডারেল তহবিল বন্ধ করে দেবেন। মঙ্গলবার রাতে সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন- তার নাম ব্যালটে না থাকা এবং চলমান ফেডারেল সরকার বন্ধ (শাটডাউন)-এর কারণেই তার দল পরাজিত হয়েছে।

ট্রাম্পের ছায়া নির্বাচনে বিরাজমান
ভার্জিনিয়ায় স্প্যানবার্গার রিপাবলিকান লেফটেন্যান্ট গভর্নর উইনসোম আর্ল-সিয়ার্স’কে হারিয়ে রিপাবলিকান গভর্নর গ্লেন ইয়াংকিন-এর স্থলাভিষিক্ত হবেন। নিউ জার্সিতে শেরিল রিপাবলিকান জ্যাক সিয়াতারেলি’কে পরাজিত করে ডেমোক্র্যাট ফিল মারফির জায়গা নেবেন। দু’জনই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরেন, যাতে ট্রাম্পের অগোছালো শাসনের প্রতি ভোটারদের ক্ষোভ কাজে লাগানো যায়। স্প্যানবার্গার বিজয় ভাষণে বলেন, আমরা বিশ্বকে বার্তা দিয়েছি- ২০২৫ সালের ভার্জিনিয়া দলীয় বিভাজনের বদলে বাস্তববাদকে বেছে নিয়েছে। আমরা বিশৃঙ্খলার ওপর আমাদের রাজ্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।

ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্ত এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রচারণায় শেষ মুহূর্তের ‘অস্ত্র’ হয়ে ওঠে। সরকারে  শাটডাউনের সময় তিনি ফেডারেল কর্মীদের চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিয়েছিলেন- যা ওয়াশিংটনের সন্নিকটে অবস্থিত ভার্জিনিয়ার ভোটারদের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। এছাড়া তিনি নিউ জার্সির হাডসন নদীর নিচ দিয়ে চলা নতুন ট্রেন টানেল প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ বিলিয়ন ডলারের তহবিল স্থগিত করেন- যা সেখানে যাতায়াতকারী হাজারো নাগরিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গলবার ভার্জিনিয়ার ভোটকেন্দ্রে কয়েকজন ভোটার জানান, ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতিগুলোই তাদের মনে ছিল- বিশেষ করে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ এবং বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ, যার বৈধতা এখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। ২৫ বছর বয়সী স্বাধীন ভোটার হুয়ান বেনিতেজ প্রথমবার ভোট দিয়েছেন। তিনি জানান যে, তিনি ভার্জিনিয়ার সব ডেমোক্রেট প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি ও শাটডাউনের বন্ধের প্রতিবাদে।

অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটাররা মঙ্গলবার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন- ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতাদের কি নতুনভাবে কংগ্রেসীয় আসনের মানচিত্র (রিডিস্ট্রিক্টিং) আঁকার ক্ষমতা দেওয়া হবে কিনা। এটি এক জাতীয় বিতর্কের অংশ, যা আগামী বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর প্রতিনিধি পরিষদ কোন দলের হাতে থাকবে তা নির্ধারণ করতে পারে।
ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনের ভুয়া দাবির অনুকরণে, এই ভোটকেও ‘প্রতারণা’ বলে আখ্যা দেন এবং কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন- নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। রিপাবলিকানদের জন্য মঙ্গলবারের নির্বাচন ছিল এক পরীক্ষা- ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে বিজয়ী করতে যেসব ভোটার ভূমিকা রেখেছিলেন, তারা কি ট্রাম্প ব্যালটে না থাকলেও দলকে সমর্থন করবেন? 

mzamin

ধনকুবেরদের ৪ কোটি ডলার ব্যয়েও জিততে পারেননি কুমো

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ধনকুবের বিল অ্যাকম্যান এবং নিউইয়র্ক শহরের তিনবারের মেয়র ও ধনকুবের মাইকেল আর. ব্লুমবার্গসহ আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী অ্যান্ড্রু কুমোর পেছনে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করেছেন। তবে এরপরও তাঁরা কুমোকে জেতাতে পারেননি; পারেননি জোহরান মামদানিকে হারাতে।

মামদানির বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে বিশাল বিশাল ডিজিটাল বিলবোর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছিলেন কুমোর তহবিলের জোগানদাতারা। এসব বিজ্ঞাপনের মূল বার্তা ছিল—মামদানি একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী, তিনি ফিলিস্তিনের সমর্থক এবং তুলনামূলকভাবে কম অভিজ্ঞ।

প্রচারের শেষ দিকে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনগুলোর ভাষাকে ‘খোলামেলা ঘৃণা’ অভিহিত করেছিলেন মামদানি। কোনো কোনো বিজ্ঞাপনের ভাষা ইসলাম বিষয়ে ঘৃণা (ইসলামোফোবিয়া) ছড়াচ্ছিল। কুমোর পক্ষে তহবিল সংগ্রহকারী ‘ফর আওয়ার সিটি’ নামের প্ল্যাটফর্মের একটি বিজ্ঞাপনে বিধ্বস্ত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে হাস্যোজ্জ্বল মামদানির ছবি ব্যবহার করেছিল।

কুমোর পক্ষের রাজনৈতিক তহবিল কমিটিগুলো (প্যাক) ৪ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছিল। অন্যদিকে মামদানির পক্ষের প্যাকগুলো সংগ্রহ করতে পেরেছিল মাত্র ১ কোটি ডলারের মতো অর্থ।

কুমোর পক্ষে যেসব বড় বা সুপার প্যাক অর্থ সংগ্রহ ও প্রচারণা চালিয়েছে ‘ফিক্স দ্য সিটি’ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। মামদানিসহ কুমোর আরেক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে প্ল্যাটফর্মটি ২ কোটি ৯০ লাখের বেশি ডলার ব্যয় করেছে। কিন্তু তাদের এত অর্থ সফলতার মুখ দেখেনি।

নির্বাচনী প্রচারকে কেন্দ্র করে কুমোর দিক থেকে আসা আক্রমণগুলোর জুতসই জবাব দিয়েছেন মামদানি। তিনি ভোটারদের বারবার বলেছেন, এবারের মেয়র নির্বাচন ‘অলিগার্ক বা ধনী শ্রেণি বনাম গণতন্ত্রের’ মধ্যে প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি তিনি ধনীদের ওপর কর বসানোর পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক জনসংখ্যার শহরের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন, ধনীরা নিউইয়র্কবাসীর উন্নত জীবনযাত্রার পথে বাধা। ক্ষমতায় এতে তিনি নিউইয়র্কবাসীর সার্বিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন।

নিজের নির্বাচনী প্রচারের কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন জোহরান মামদানি। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে, ৪ নভেম্বর
নিজের নির্বাচনী প্রচারের কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন জোহরান মামদানি। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে, ৪ নভেম্বর। ছবি: এএফপি