Showing posts with label WikiEconomy. Show all posts
Showing posts with label WikiEconomy. Show all posts

Saturday, December 19, 2015

শেষ হলো শূন্য সুদহারের যুগ by শওকত হোসেন

জ্যানেট ইয়েলেন, চেয়ারম্যান, ফেডারেল রিজার্ভ
শূন্য সুদের যুগ শেষ হয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক প্রায় এক দশক পর প্রথমবারের মতো সুদহার শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। এর ফলে এখন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সুদের হার দাঁড়াল শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ।
সুদহার সামান্য বাড়লেও বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব অতটা সামান্য হবে না। এর প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকা মার্কিন অর্থনীতিকে একটু টেনে ধরার জন্যই সুদহার বাড়ানো হয়েছে। এতে অবশ্য অনেক দেশের ক্ষেত্রে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে। আর যুক্তরাষ্ট্র সেটাই চায়।
গত বুধবার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জ্যানেট ইয়েলেন এই সুদহার বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এর আগে ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি বা এফওএমসি এ নিয়ে দুই দিন বৈঠক করেছে। বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে আর এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। কমিটি মনে করছে, এই অবস্থায় ফেডারেল ফান্ডের সুদহার সামান্য বাড়ানোই যথাযথ হবে।
ফেডারেল রিজার্ভের এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়েই। তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন পর্যন্ত যত সিদ্ধান্ত হয়েছে তার মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে প্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত। জরিপেও দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনই নিশ্চিত ছিল যে এই ঘোষণা আসবে। ফলে সব পক্ষই যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং বাজারও সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সর্বশেষ সুদের হার বাড়িয়েছিল ২০০৬ সালে। এরপর তা কমে ২০০৮ সালে শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছায়। সুদ হার ছিল দশমিক ২৫ শতাংশ, যাকে প্রায় শূন্যই বলা যায়। বড় ধরনের মন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্র শূন্য সুদহারের নীতি নিয়েছিল। এখন দেশটি মনে করছে সেই নীতি থেকে সরে আসার সময় হয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের আশা, এবার প্রবৃদ্ধি আরেকটু বাড়বে, হবে ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রায় এক দশক আগে ফেডারেল রিজার্ভের সে সময়ের চেয়ারম্যান বেন বার্নানকে সুদহার শূন্যে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রত্যাশা ছিল, এর ফলে মানুষের হাতে বাড়তি টাকা আসবে, ঋণ সস্তা হবে, উৎপাদন বাড়বে, অর্থনীতি চাঙা হবে। এটা সত্যি, তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে। ইউরোপ মন্দা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। চীন ও অন্যান্য উঠতি অর্থনীতির দেশও নানা সংকটে আছে। এ অবস্থায় মূলত ২০১৩ সাল থেকেই মুদ্রানীতি বদলের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালে সুদহার বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছিল। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে বাড়ানোর কথাও হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত আর এ পথে এগোয়নি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। বিশেষ করে গত আগস্টে চীন হঠাৎ করে তাদের মুদ্রা ইউয়ানের দুই দফা অবমূল্যায়নের পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাযুদ্ধ শুরু হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির হার নিয়ে কিছুটা দ্বিধা থাকায় পিছিয়ে যায় ফেডারেল রিজার্ভ।
মূলত দুটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে মুদ্রানীতি পরিচালনা করে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ। এর একটি হচ্ছে সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান, অন্যটি স্থিতিশীল মূল্যস্তর। সাধারণত অর্থনীতি যখন দুর্বল থাকে তখন মূল্যস্ফীতিও কমতে থাকে। আবার অর্থনীতি যখন সর্বোচ্চ কর্মসংস্থানের দিকে যায় তখন মজুরি বাড়ানোর চাপ তৈরি হয় এবং এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। অর্থনীতি খুব দ্রুতগতিতে এগোতে থাকলে ফেডারেল রিজার্ভ তার বেঞ্চমার্ক সুদহার বাড়িয়ে দেয়। তাতে মানুষ খরচ কমিয়ে দেয় এবং সঞ্চয় বেশি করে। এর ফলে অর্থনীতি একটু শ্লথ হয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমে যায়। আবার অর্থনীতি বেশি শ্লথ হয়ে গেলে ফেড তখন সুদহার কমিয়ে দেয়। যেমন ২০০৮ সালের মন্দার পর কমাতে কমাতে প্রায় শূন্য হারে নিয়ে আসা হয়েছিল।
ফেডারেল রিজার্ভ মনে করছে, মূল্যস্ফীতি এখন কম। তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম কম থাকায় চাপটি কমই থাকবে। কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও যথেষ্ট ভালো। সুতরাং এখন সুদহার কম থাকায় মানুষ হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে, যা ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না। ফলে এখনই সুদহার বাড়ানোর উপযুক্ত সময়।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সুদহার বাড়ানোর ফলে শক্তিশালী থাকা ডলার আরও শক্তিশালী হবে। আর এতে অনেক দেশ ও কোম্পানি ঋণ নিতে সমস্যায় পড়বে। আর এতে ঝামেলায় পড়বে ইউরোপ। মন্দাকবলিত ইউরোপ এখন ঋণ নেওয়া আরও সহজ করতে চাচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র নিল উল্টো পথ।
তবে খুব প্রত্যাশিতভাবেই ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী সুদহার বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা দিয়েছে। ইউরোপিয়ান শেয়ারের দর কিছুটা বেড়েছে। ডলারের মানও বেড়েছে। আবার লন্ডন আন্তবাজার সুদহার বা লাইবর ২০০৯ সালের পর বেড়ে হয়েছে সর্বোচ্চ। তবে তেলের দাম কমেছে। এখন আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে ইউরোপ ও উঠতি অর্থনীতি আরও কী প্রতিক্রিয়া দেখায় তার জন্য। তবে শেষ কথা হচ্ছে সস্তায় বিনিয়োগের দিন আপাতত শেষ।

Saturday, October 10, 2015

অর্থনীতির জন্য নতুন বিপদ সংকেত by মিজান চৌধুরী

৬ দিনের ব্যবধানে সম্প্রতি দু’জন বিদেশী নাগরিক দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় সরকারের ওপর নানামুখী চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ ও দাতা সংস্থাগুলো বিষয়টি নিয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছে। কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের চলাফেরার ওপর সতর্কতা জারি করেছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হু গো সোয়ারে ৩ অক্টোবর তার পূর্বনির্ধারিত ঢাকা সফর বাতিল করেছেন। গার্মেন্টের বায়ার্স ফোরামের বৈঠকও বাতিল হয়েছে। বাতিল হয়েছে আলোচিত অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশ সফরও। বিদেশী অনেক পর্যটক এখানে তাদের সফরসূচি স্থগিত করেছেন। এর মধ্যে একের পর এক গ্রেনেড, বোমা ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ধরা পড়ার ঘটনাও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাত্রাকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব ইস্যুতে মহল বিশেষ বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
এদিকে যখন এ অবস্থা তখন অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতি সরকারকে দ্রুত শক্ত হাতে মোকাবেলা ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে শতভাগ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু এমন প্রত্যাশা সহসা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে বহির্বিশ্বে সরকারের ইমেজ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নানামুখী প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে বাধার মুখে পড়বে বিদেশী বিনিয়োগ ও রফতানি প্রবাহ। পাশাপাশি ঢাকায় আসন্ন দাতা সংস্থাদের ‘উন্নয়ন ফোরাম’র বৈঠক করা নিয়েও নানা সংশয় ও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। আর মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণকারী সংস্থার (এপিজি) কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে বাংলাদেশকে। এ সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দলের আগামী সপ্তাহে ঢাকা সফরের কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আমাদের রফতানি খাতের অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক নয়। বিদেশী ক্রেতারা চায় নিরাপত্তা। তারা এ দেশে না এলে অবশ্যই সমস্যা হবে। তিনি আরও বলেন, বিদেশী বিনিয়োগের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। কিন্তু এর মধ্যে এসব বিষয় চলতে থাকলে নির্ঘাত বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নিরৎসাহিত হবেন। আর সে রকম পরিস্থিতিতে দেশী বিনিয়োগকারীদের অনেকে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করতে চাইবেন না। সব কিছু মিলে এটি অর্থনীতির জন্য শুভ কিছু নয়।
জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় নিরাপত্তার ইস্যুতে বিদেশী ক্রেতারা বাংলাদেশে সফর বাতিল করেছেন। ইতিমধ্যে পোশাক খাতের ক্রেতাদের সংগঠন বায়ারস ফোরামের বৈঠকও বাতিল হয়েছে। ৫ অক্টোবর পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ নেতাদের সঙ্গে এ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। ২৮ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা ইস্যুতে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিম প্রথম বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার মহিলা ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফরও স্থগিত করে। ১৫ অক্টোবর ঢাকা সফরে আসার কথা ছিল এ দলটির।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রফতানিকারক অ্যসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা একটি ইমেজ সংকটে পড়েছি। এ মাসে বিদেশী অনেক ক্রেতার বৈঠক ও কারখানা পরিদর্শনের নির্ধারিত সময় ছিল। ক্রয়াদেশ দেয়ার মাসও বলা চলে। কিন্তু দু’জন বিদেশী নাগরিক খুনের ঘটনায় ক্রেতাদের সফরসূচি কিছুটা ওলটপালট হয়ে গেছে।’ তিনি নিজের গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘আমার একজন ক্রেতার ৫ অক্টোবর কারখানা পরিদর্শনে আসার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি তিনি বাতিল না করলেও অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে স্থানান্তর করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিগত আড়াই বছরের দুটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা শেষ হয়ে মাত্র ৫ মাস অতিক্রম হয়েছে। এরমধ্যে যখন আমরা একটু দাঁড়াতে চেষ্টা করছি, তখন দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একটু বিপাকে ফেলে দিয়েছে। তবে আশা করি এটি অতিক্রম করতে পারব।’
বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব এএইচএম রেজাউল কবির উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, এ ঘটনা দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রফতানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় পোশাক খাতের অর্ডার পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যাওয়ার পথকে সুগম করবে। পাশাপাশি সামগ্রিক রফতানির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর বাস্তবে যদি তাই হয়, তাহলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভার্বমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হতে পারে। কিন্তু এমনটি কারও কাছে কাম্য নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি দু’জন বিদেশী নাগরিক খুন হয়েছেন। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঘটনাটি দুঃখজনক। কিন্তু এর জন্য অর্থনীতিতে দ্রুত কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে সরকারকে দ্রুত অনুসন্ধান করে প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখতে হবে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়ে কিনা। তবে তার বিশ্বাস, সরকার যদি আইনশৃংখলা পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি করতে পারে তাহলে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে আসবে। যেসব বিদেশী নাগরিক ঢাকা সফর স্থগিত কিংবা বাতিল করেছেন তারা পুনরায় সফরসূচি ঠিক করে চলে আসবেন।
এদিকে বাংলাদেশের সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণে কতটুকু কাজ করেছে তা পর্যবেক্ষণে ১২ অক্টোবর এপিজির একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসছে। কিন্তু তাদের সফরে আসার আগেই বিদেশী দু’জন নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সরকারকে কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত যদি এটাই প্রতীয়মান হয় যে, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে জঙ্গিগোষ্ঠীর হাত রয়েছে তাহলে এ বৈঠকে বাংলাদেশকে যেমন কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে, তেমনি এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিচে নেমে যেতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ প্রতিনিধি দলের কাছে যদি মনে হয়, বাংলাদেশে জঙ্গি অর্থায়ন অব্যাহত আছে বা বেড়ে গেছে এবং এ কাজে মানি লন্ডারিং হচ্ছে, তাহলে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশকে ‘ধূসর’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। আর সত্যিই যদি এ তালিকায় চলে যায় তবে এখানে বিদেশী বিনিয়োগ, বিদেশীদের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে বাংলাদেশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এপিজি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে পুরনো হিসাব-নিকাশ মেলানোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিষয়গুলোর প্রশ্ন তুলবে। কেননা দুই বিদেশী খুন এবং চট্টগ্রামে গ্রেনেডসহ জেএমবির একটি গ্রুপকে আটক করার ঘটনাগুলো তাদের আসার পূর্বমুহূর্তে ঘটেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার কারণ বের না হওয়া পর্যন্ত এখানে সন্ত্রাসে অর্থায়ন হওয়ার বিষয়টি বলা যাবে না। তিনি জানান, এপিজি প্রতিনিধি দল আসবে। আমাদের প্রস্তুতিও ভালো। তারা ইতিপূর্বে যেসব প্রশ্ন জানতে চেয়েছে, আমরা সেগুলোর উত্তর দাখিল করেছি। নতুন করে খুব বেশি শংকার কারণ নেই।
এদিকে আগামী মাসে শুরু হচ্ছে দাতাদের সম্মেলন উন্নয়ন ফোরামের বৈঠক। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেত্তি ডিক্সন এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়ানচাই জাংসহ ৩৬টি দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা ওই বৈঠকে অংশ নেয়ার কথা। তবে নিরাপত্তাজনিত ইস্যুতে এ বৈঠক নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দাতাসংস্থার প্রতিনিধিদের দেশে নিয়ে আসা, বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়াসহ সব ধরনের নিরাপত্তার প্রস্তুতি সরকার নিয়েছে। কারণ দাতা সংস্থার এ বৈঠক কোনো কারণে বানচাল হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। এ প্রসঙ্গে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব যুগান্তরকে বলেন, ‘বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে এমসিসিআই চিন্তিত। আমরা আশা করছি, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে।’ তবে তিনি মনে করেন, এ দুটি ঘটনায় অর্থনীতির ওপর দ্রুত প্রভাব পড়বে না। কিন্তু এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এর বিরূপ প্রভাব অবশ্যই পড়বে।’
২৮ সেপ্টেম্বর গুলশান কূটনীতিকপাড়ায় ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। ৩ অক্টোবর আরেক ঘটনায় রংপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি।

ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন by মো: মিজানুর রহমান

কারো কারো মনে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিনিয়োগব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। কেউ বলেন, ইসলামি ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে শুধু লাভ নেয়; কিন্তু গ্রাহকের ব্যবসায় ক্ষতি হলে তা বহন করে না। আবার কেউ বলেন, ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে বিনিয়োগের বিপরীতে লাভ নিয়ে থাকে, যা সুদের নামান্তর। ইসলামি বিনিয়োগপদ্ধতি সম্পর্কে স্বল্প ধারণা বা নিছক অনুমানের ভিত্তিতেই অনেকে এজাতীয় নানা মন্তব্য করে থাকেন। ইসলামি ব্যাংকের বিনিয়োগপদ্ধতি প্রধানত তিনটি মূলনীতির ভিত্তিতে হয়ে থাকে। এগুলো হলো- ক্রয়-বিক্রয় নীতি, অংশীদারিত্বের নীতি এবং ভাড়াদান নীতি। ক্রয়-বিক্রয় নীতির আওতায় বাকি বিক্রি (বাই মুয়াজ্জাল), মুনাফার ভিত্তিতে বিক্রি (বাই মুরাবাহা), অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় (বাই সালাম ও বাই ইস্তিসনা) ইত্যাদি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই নীতির মূল কথা হলো, গ্রাহকের পক্ষে তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করে ক্রয়মূল্যের সাথে আনুষঙ্গিক খরচ, সেইসাথে যুক্তিসঙ্গত এবং ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত মুনাফা যোগ করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে তা গ্রাহকের কাছে বিক্রয় করা হয়। একজন খুচরা ব্যবসায়ী যখন কোনো পণ্য পাইকারি বিক্রেতার কাছ থেকে বাকিতে ক্রয় করে, তখন টাকা পরিশোধের একটা সময় নির্ধারণ করে দেয়। পরে খুচরা ব্যবসায়ী ওই পণ্য বিক্রি করে যদি ক্ষতির সম্মুখীন হন, তাহলে পাইকারি বিক্রেতা ওই ক্ষতির অংশ নিতে মোটেও বাধ্য নন। কারণ এখানে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে, লাভ-ক্ষতির অংশ নেয়ার কোনো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি এবং ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই তাদের মধ্যে দেনাদার ও পাওনাদারের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেহেতু ব্যাংক এখানে ক্রয়-বিক্রয় নীতি মেনে গ্রাহকের সাথে পণ্য কেনাবেচা করে, তাই তা মোটেও শরিয়াহপরিপন্থী হতে পারে না। ভাড়া বা ইজারা পদ্ধতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সম্পদের ভাড়া হিসেবে ব্যাংক মুনাফা নিয়ে থাকে বিধায় তা শরিয়াহপরিপন্থী নয়। শুধু অংশীদারিত্বের নীতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতি বণ্টন হয়ে থাকে; কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামি ব্যাংকগুলো মুশারাকা বা মুদারাবা ব্যবসায়ে এখনো বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে শুরু করেনি বলা যায়।
ব্যাংকিং লেনদেনের ধারণা প্রাচীন হলেও আধুনিক ব্যাংকিং ধারণার উদ্ভব মূলত দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ১১৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ভেনিসে প্রথম ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই সময়ের অর্থব্যবস্থা মূলত সুদভিত্তিক হওয়ার কারণে সুদভিত্তিক ব্যাংকব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অ্যাডাম স্মিথ, রিকার্ডো, উইলিয়াম সিনিয়রসহ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমান বিশ্বে ব্যাংকব্যবস্থা ছাড়া আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তির এ উৎকর্ষের যুগে অনলাইন ব্যাংকিং, প্লাস্টিক মানি, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের উদ্ভব হওয়ায় ব্যাংকব্যবস্থা ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অচল।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সুদ সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ায় মুসলমানেরা সুদভিত্তিক ব্যাংকব্যবস্থা মনেপ্রাণে কখনোই গ্রহণ করতে পারেনি। অপর দিকে, এর বিপরীতে শক্তিশালী কোনো বিকল্প তুলে ধরতেও পারেনি। বেশির ভাগ মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল বা দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকার কারণে মূলত স্বাধীনতা দাবির আন্দোলন মুখ্য হয়ে ওঠে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ইসলামি ব্যাংকিংব্যবস্থার ধারণা মুসলিম পণ্ডিতেরা কল্পনা করতে থাকেন এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে বিভিন্ন মুসলিম মনীষী ইসলামি ব্যাংকিংয়ের চিন্তা ও কাঠামোগত ধারণা পেশ করেন। ষাটের দশকে বেশির ভাগ মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা বা দেশ স্বাধীনতা লাভ করায় ইসলামি ব্যাংকের কাঠামোগত ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভের পথে অগ্রসর হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মিসরের ড. আহমাদ আল নাগগার প্রতিষ্ঠা করেন মিত্গামার ইসলামি সেভিংস ব্যাংক, মালয়েশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় তাবুং হাজী। মিসরের ব্যাংকটি ১৯৬৭ সালে বন্ধ হয়ে গেলেও থেমে যায়নি ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে গবেষণা। ১৯৭৪ সালে ইসলামি সম্মেলন সংস্থাভুক্ত দেশগুলো শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সনদ স্বাক্ষর করেছিল এবং ওই সনদের ভিত্তিতেই ১৯৭৫ সালে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক যাত্রা শুরু করে। ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন দেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং ধারার প্রচলন শুরু হয় এবং দেশে বর্তমানে আটটি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গরূপে ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রিবা সম্পর্কিত, আল কুরআনের সূরা রুমের ৩৯ নম্বর আয়াতটি রাসূল সা:-এর হিজরতের পাঁচ বছর আগে মক্কায় নাজিল হয়- ‘মানুষের ধনস¤পদে তোমাদের ধনস¤পদ বৃদ্ধি পাবে, এই আশায় তোমরা সুদে যা কিছু দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা দান করে থাকে, তারাই আল্লাহর সমীপে বর্ধিত করতে থাকবে।’ এখানে আল্লাহ তায়ালা শুধু বলেছেন, সুদের কারণে সম্পদের বৃদ্ধি হয় না, যদিও মানুষ তা মনে করে। মদিনায় হিজরত করার পর ইহুদিরা যে অন্যায়ভাবে সুদ খাচ্ছে, সে ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়। ‘আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের স¤পদ ভোগ করত অন্যায়ভাবে। বস্তুত, আমি কাফেরদের জন্য তৈরি করে রেখেছি বেদনাদায়ক আজাব’ (সূরা নিসা-১৬১)। উহুদ যুদ্ধের পর সুদ না খাওয়ার বিষয়ে প্রথম নির্দেশনা নাজিল হয়। ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো’ (সূরা আল ইমরান-১৩০)। চতুর্থ ধাপে এসে সূরা বাকারার ২৭৫ও ২৭৬ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে সুদকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
ইসলামে দুই প্রকার রিবার কথা বলা হয়েছে। প্রথম প্রকার হলো, রিবা আন-নাসিয়াহ বা মেয়াদি সুদ। এটা হলো প্রকৃত সুদ বা প্রাথমিক সুদ। কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে এ ধরনের সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইমাম আবু বকর জাসসাস ও আল রাজি রিবা আন নাসিয়ার যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা হলো- যে ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদ দেয়া থাকে এবং মূলধনের অতিরিক্ত প্রদানের শর্ত থাকে, সেটাই রিবা আন-নাসিয়াহ। রিবা আল ফজল হারাম হওয়ার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি রা: বলেন, একদা বিলাল রা: রাসূলে করিম সা:-এর সমীপে উন্নত মানের কিছু খেজুর নিয়ে হাজির হলেন। রাসূলুল্লাহ সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথা থেকে এ খেজুর আনলে? বিলাল রা: উত্তর দিলেন, আমাদের খেজুর নিকৃষ্ট মানের ছিল। আমি তার দুই সা’-এর বিনিময়ে এক সা’ উন্নত মানের বারমি খেজুর বদলিয়ে নিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ওহ! এত নির্ভেজাল সুদ। এরূপ কখনো করো না। তোমরা যদি উত্তম খেজুর পেতে চাও, তাহলে নিজের খেজুর বাজারে বিক্রি করবে, তারপর উন্নত মানের খেজুর কিনে নেবে। যেহেতু বর্তমান ব্যাংকিংয়ে ঋণের বিপরীতে সময় বেঁধে দিয়ে সুদ নেয়া হয়, সেহেতু তা রিবা আন-নাসিয়ার অন্তর্গত, যা কুরআনের আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়েছে।
আবার অনেকে মনে করেন, কুরআন ও হাদিসে যে রিবার উল্লেখ আছে, তার অর্থ ব্যক্তিগত পর্যায়ে পারিবারিক প্রয়োজন পূরণের জন্য দেয়া ঋণ, যাকে প্রচলিত ভাষায় মহাজনী সুদ বা উসারি বলা হয়; কিন্তু আজকের দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কর্তৃক প্রদেয় ঋণ উৎপাদন ও মুনাফাভিত্তিক খাতে দেয়া হয়। এখানে ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের টাকা দিয়ে ব্যবসায় করে নিজে লাভবান হন। তা ছাড়া এ জাতীয় সুদ হলো ব্যবসায়িক বা তেজারতি সুদ যা ব্যবসায়িক লেনদেনের মতোই উভয়ের সম্মতিক্রমে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, কোনো জবরদস্তি থাকে না, সুদের হার যথেষ্ট কম, এর মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, অর্থনীতির চাকা হয় গতিশীল। তাই এ জাতীয় সুদ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তাদের এ যুক্তি একেবারেই অসার ও ভুল। কারণ, জাহেলি যুগে ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য রীতিমতো পুঁজি লগ্নি করা হতো এবং সে জন্য সুদ আদায় করা হতো। সে সময়ে অনেকেই আজকের মতো ফার্ম খুলে এজেন্ট নিয়োগ করে সুদে পুঁজি খাটাত। এদের মধ্যে রাসূল সা:-এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও বনু মুগিরার বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল। তাদের আদায়কৃত সুদকে আরবিতে রিবা বলা হতো। রাসূল সা: তাঁর চাচার সুদি কারবার বন্ধ করে দেন এবং খাতকের কাছে প্রাপ্য বকেয়া সুদ রহিত করে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে অনেকের মধ্যে আজো ভুল ধারণাই বেশি। বিশেষ করে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিরোধিতা করার জন্যই অনেক সময় অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিও দায়িত্বহীন মন্তব্য করে থাকেন। তারা এমন কথাও বলেছেন, ইসলামি ব্যাংকিং একটি প্রতারণা। প্রচলিত সুদ নাকি নিষিদ্ধ নয়, বরং চক্রবৃদ্ধি হারে যে সুদ হয়, তাই ইসলামে নিষিদ্ধ। আরবি ‘রিবা’ শব্দের অর্থ নাকি সুদ নয়। ইসলামি ব্যাংকিং হয়তো বা অনেকেই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছেন না।
তাই বলে একে প্রতারণা বলাটা শুধু হাস্যকর নয়, স্ববিরোধীও বটে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোমধ্যে ইসলামি ব্যাংকিং গাইডলাইন প্রকাশ করা হয়েছে এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছেÑ কোনো ব্যাংক কোম্পানি, উহাকে প্রদত্ত বা উহা কর্তৃক রক্ষিত জামানত আদায়ের ক্ষেত্র ছাড়া, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো পণ্যের ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময় ব্যবসা করিবে না, অথবা আদায় বা কারবারের জন্য প্রাপ্ত বিনিময় বিলসংক্রান্ত কারণ ব্যতীত, অন্যের জন্য কোনো ব্যবসায় বা কোনো পণ্য ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময়ে লিপ্ত হইতে পারিবে না, তবে শর্ত থাকে যে, ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত ব্যাংক কোম্পানি কর্তৃক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বীকৃত ইসলামিপদ্ধতি অনুসরণপূর্বক মালামাল বা পণ্য ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময়ের ক্ষেত্রে এই ধারার কোনো কিছুই প্রযোজ্য হইবে না। অর্থাৎ বর্তমান ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আইনের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সুদমুক্ত জীবন যাপন করা মোটেও সম্ভব নয়। তাই প্রত্যেক মুসলমানকেই ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
লেখক : সিনিয়র ব্যাংকার, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লি:
E-mail : mizandaibb@yahoo.com

Friday, October 9, 2015

কেবল বাংলাদেশই উল্টো পথে by শওকত হোসেন

দীর্ঘদিনের এক তাত্ত্বিক বিতর্কের অবসান ঘটাতে চাইছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বিতর্কটি মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে। বিশেষ করে মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা হলে রপ্তানিতে কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে নানা মতভেদ আছে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ, অনেক আগেই উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, ‘দুজন অর্থনীতিবিদ থাকলে সর্বদা দুটি মত পাওয়া যাবে। আর যদি সেখানে জন মেনার্ড কেইনস থাকেন, তাহলে মতামত পাওয়া যাবে তিনটি।’
অর্থনীতির তত্ত্ব বলে, অবমূল্যায়ন হলে রপ্তানি বাড়ে। আর অতিমূল্যায়ন হলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু বাস্তবে কী পরিমাণ এর লাভ-ক্ষতি, তা নিয়ে নানা মতভেদ ছিল। আইএমএফ এ নিয়ে গবেষণা করে এর ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। আইএমএফ বলছে, একটি দেশের মুদ্রামানের ১০ শতাংশ অবমূল্যায়ন করা হলে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৫ শতাংশ রপ্তানি বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন টালমাটাল অবস্থায়। বিশ্বজুড়ে এখন চলছে মুদ্রাযুদ্ধ। চীন গত আগস্টে হঠাৎ করে তাদের মুদ্রা ইউয়ানের বড় ধরনের অবমূল্যায়নের পর শুরু হয় এই মুদ্রাযুদ্ধ। বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশগুলো যখন যার যার মুদ্রার অবমূল্যায়নের প্রতিযোগিতায় নামে, তখনই শুরু হয় মুদ্রাযুদ্ধ। ইউয়ান ও ডলারের এই মুদ্রাযুদ্ধ ২০০৯ সাল থেকে শুরু হলেও এটি জোরালো হয়েছে মূলত গত আগস্ট থেকেই।
বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি চীন তাদের রপ্তানির প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে আগস্টে পরপর দুই দিন ইউয়ানের অবমূল্যায়ন ঘটায়। অন্যদিকে এক নম্বর অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট শক্তিশালী থাকায় দেশটির ডলারও তেজি। ফলে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক দেশকেই মুদ্রার মান কমাতে হয়েছে।
২০০৪ থেকে এই সময় পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে ইউরো ও ইউয়ানের বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে। এর বাইরে এই মুদ্রাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে ভারতের রুপি, রাশিয়ার রুবলসহ প্রায় সব দেশের মুদ্রাই। মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা হলে রপ্তানি বাড়াতে উৎসাহ পান উদ্যোক্তারা। এতে আগের চেয়ে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা বেশি পান তাঁরা। ফলে সব দেশই আগ্রহী অবমূল্যায়নে। আর এমনই এক সময়ে আইএমএফ সুনির্দিষ্ট করে জানাল অবমূল্যায়নের লাভ-ক্ষতি। বিশ্বজুড়ে মুদ্রাযুদ্ধের এই সময়ে বাংলাদেশই কেবল এর বাইরে।
গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান বেড়েছে ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর ডলারের বিপরীতে ভারতের রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বিজিএমইএ বলছে, ডলার ও ইউরোর ওঠানামার কারণে বাংলাদেশ গত অর্থবছরে ৩৮ কোটি ডলারের রপ্তানি হারিয়েছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখার কাজ পরোক্ষভাবে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক গত এক বছরে ডলারের চাহিদা ধরে রাখতে ৩৫০ কোটি ডলার কিনেছে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত যেমন বেড়েছে, তেমনি টাকা রয়ে গেছে তেজি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর মজুত ছিল ২ হাজার ৬৩৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। এর ফলে ডলারের দর এখন ৭৭ টাকা ৮০ পয়সায় ধরে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় মুদ্রা শক্তিশালী হলে আমদানিকারকেরা লাভবান হন। কারণ আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য কিছুটা কম দামে তাঁরা ডলার কিনতে পারেন। যেমন, এখন যদি ডলার কিনতে হয় প্রায় ৭৮ টাকায়, অবমূল্যায়ন হলে সেটি ৭৯ বা ৮০ টাকা হতে পারে। প্রতি ডলার কিনতে তখন আমদানিকারকদের বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানি ব্যয় কমানোর দিকেই বেশি আগ্রহী। এমনিতেই বিশ্বব্যাপী প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম কমে গেছে। টাকা শক্তিশালী রেখে আমদানিতে আরও বাড়তি সুবিধা নেওয়া হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর লক্ষ্যও এর মাধ্যমে অর্জিত হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের।
বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে ভারত ও চীন থেকে। আর দেশ দুটিতে রপ্তানি করে সামান্যই। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি ছিল ৬৫০ কোটি ডলার, রপ্তানি প্রায় ৫৩ কোটি ডলার। একই সময়ে চীন থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ৮২২ কোটি ডলারের পণ্য, রপ্তানি করেছে মাত্র ৭৯ কোটি ডলারের পণ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এ অবস্থায় আমদানিতেই বেশি লাভবান হচ্ছে বাংলাদেশ।
যদিও অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ এবং ব্যবসায়ীরা চান দ্রুত টাকার অবমূল্যায়ন হোক। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরে রপ্তানি ও প্রবাসী-আয়ের প্রবৃদ্ধিতে ওঠানামার কারণে দাবিটি জোরালো হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশেরও কম। জুলাই-আগস্ট সময়ে প্রবাসী-আয়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হলেও ঈদের কারণে সেপ্টেম্বরে বেড়েছে। ফলে অবমূল্যায়নকে একেবারেই বাতিলের খাতায় ফেলতে হয়তো পারবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে আইএমএফের গবেষণার পর বাংলাদেশ ব্যাংক কী করবে সেটাই এখন প্রশ্ন।

Wednesday, October 7, 2015

ব্যাংকের আমানতে টান পুঁজি ভাঙছেন গ্রাহকরা by হামিদ বিশ্বাস

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ মন্দায় ব্যাংকের আমানত কমছে। যদিও সরকারি খাত সক্রিয় রয়েছে। তবে অর্থনীতির ৮০ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি খাত। সে কারণে সার্বিক মন্দার প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় গ্রাহক পুঁজিতে হাত দিচ্ছে। ভেঙে ফেলছে বিভিন্ন মেয়াদে রাখা সঞ্চিত টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন। একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা অপারেশন ম্যানেজার বলেন, মানুষের হাতে টাকা নেই। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পণ্যবাজারে ঊর্ধ্বগতি। লাফিয়ে দাম বাড়ছে সব পণ্যের। কাঁচা বাজারে গেলে ১০০০ টাকার নিচে বাজার হয় না। মানুষ দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। সে কারণে নিম্ন ও মধ্যম সারির গ্রাহকরা পুঁজিতে হাত দিচ্ছেন। ভেঙে ফেলছেন ৩, ৫ ও ১০ বছর মেয়াদি ডিপিএস।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জাতীয় সঞ্চয় প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। যা বিবিএসও উল্লেখ করেছে। অতীতের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিও খুব ভাল নয়। দুই ঈদে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হলেও সারা বছর নিম্নমুখী থাকে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ। এছাড়া, ব্যাংকের তুলনায় সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি থাকায় সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যদিও বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের সুদের হারও কমানো হয়েছে। 
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ মন্দার কারণে কমছে চলতি আমানত। অবকাঠামো পরিস্থিতি খুবই নাজুক। রাস্তাঘাট ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ। গ্যাস-বিদ্যুৎ নেই। রাজনৈতিক আবহাওয়াও ভাল নেই। সে কারণে কেউ নতুন বিনিয়োগ করছেন না। বেসরকারি খাত বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আর মেয়াদি আমানত কমছে অভাব-অনটন ও মূল্যস্ফীতির কারণে। তিনি বলেন, দেশে অভাবী লোকের সংখ্যা দিনের পর দিন বাড়ছে। সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি একটি মিশ্র সময় অতিক্রম করছে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিকভিত্তিতে তৈরি করা সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আর্থিক খাতে মোট আমানত সংগ্রহ করা হয়েছিল ৮৭ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। সমাপ্ত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) তা কমে হয়েছে ৭৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। এক বছরে আমানত কমেছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বা সাড়ে ১৩ শতাংশ। ব্যাংকারদের মতে, আমানত কমে গেলে বিনিয়োগের জন্য টাকার উৎস কমে যায়। এতে ব্যাংক আগের মতো বেশি পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারে না। কমে যায় ব্যাংকের বিনিয়োগসক্ষমতা। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও সর্বোপরি সুদহার কমে যাওয়ায় মানুষ ব্যাংকের আমানত ভেঙে ফেলছে। যার প্রভাব পড়ছে আমানতে। এটা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং খাতসহ পুরো অর্থনীতির জন্য খারাপ সংকেত বয়ে আনবে। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী, সাধারণত দুই ধরনের আমানত রাখা হয়। প্রথমত, স্বল্প সময়ে মুনাফা লাভের জন্য মানুষ চলতি আমানত রাখে। তিন মাস সময় থেকে এক বছর মেয়াদি এ আমানত রাখার সুযোগ রয়েছে। অপরদিকে দীর্ঘমেয়াদি মুনাফার জন্য মানুষ মেয়াদি আমানত রাখে ২ বছর, ৩ বছর, ৫ বছর, ১০ বছর ও তার ঊর্ধ্বে। তাদের মতে, মানুষ যখন তার প্রয়োজনীয় ব্যয় মিটিয়ে হাতে উদ্বৃত্ত থাকে তখন সে সঞ্চয় করে। আবার আয়ের তুলনায় যখন ব্যয় বেড়ে যায় তখন সঞ্চয় ভেঙে খায়। তখন চলতি আমানতসহ সামগ্রিক আমানত কমে যায়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে যখন স্থবিরতা নেমে আসে তখন তলবি আমানত নেতিবাচক হয়ে পড়ে। কারণ এ সময় ব্যবসায়ীরা আগের মতো লেনদেন করতে পারেন না। তাদের হাতে টাকা থাকে না। সব সময় ব্যবসায়ীরা টানাটানির মধ্যে থাকেন। আর মেয়াদি আমানত কমে যাওয়ার অর্থ হলো সাধারণ মানুষ আর আমানত রাখতে পারছেন না। মূল্যস্ফীতিই তাদের সঞ্চয় খেয়ে ফেলছে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ দিন ধরে দুই অঙ্কের ঘরে অবস্থান করছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয় সংকুলান করতে পারছে না নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষ। এ কারণে এখন ভবিষ্যতের জন্য জমানো অর্থে হাত দিয়েছেন। মেয়াদপূর্তির আগেই ব্যাংকে জমানো স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি ডিপিএস ভেঙে ফেলছে। সঞ্চয় ভেঙে খাওয়ায় কমে যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর আমানত। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমাপ্ত অর্থবছরে মেয়াদি ও তলবি আমানত দু’টিই আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। পাশাপাশি মেয়াদি আমানতও কম রাখছেন গ্রাহকরা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের বছরে মেয়াদি আমানত এসেছিল ৭৯ হাজার ৭৬ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৯০ শতাংশ। গত বছর মেয়াদি আমানত কমে হয়েছে ৬৭ হাজার ৮২১ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৮৯ শতাংশ। আর আগের বছরের চেয়ে গত বছর মেয়াদি আমানত কমেছে ১৪ দশমিক ২৩ ভাগ। এদিকে মেয়াদি আমানতের পাশাপাশি চলতি আমানতও আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগের অর্থবছরের চলতি আমানত এসেছিল ৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা, সমাপ্ত অর্থবছরে তা সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা কমে নেমেছে ৮ হাজার ১৩৬ কোটি টাকায়। আগের বছরের চেয়ে চলতি আমানত কমেছে ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ব্যাংক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত দুই কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যায়। প্রথমত, অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় ব্যাংকে লেনদেন কমে গেছে। আর ব্যাংক লেনদেন কমে যাওয়ায় তলবি আমানত কমে যাচ্ছে। অপরদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে আমানত কমে যায়। জিনিসপত্রের দাম যখন বেড়ে যায়, তখন মানুষ ব্যাংক থেকে বেশি পরিমাণ আমানত তুলে নিজের কাছে নগদ টাকা বেশি রাখে। এছাড়া, সামপ্রতিক সময়ের পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকের পরিবর্তে নিজের কাছেই অর্থ ধরে রাখছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতের চেয়ে ব্যাংকবহির্ভূত খাতে অধিক মুনাফা পেলে তখন ব্যাংকে আর কেউ টাকা রাখে না। অন্যত্র সরিয়ে ফেলে। এ কারণেও তলবি আমানত কমতে পারে বলে তিনি মনে করেন। মেয়াদি আমানত কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, মূল্যস্ফীতির কারণে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় তখন সাধারণ মানুষ সঞ্চয় করতে পারেন না। বরং সংসারের ঘাটতি মেটাতে ভবিষ্যতের জন্য জমানো সঞ্চয়ে হাত দেন। ওই ব্যাংকারের মতে, ব্যাংক থেকে বেশি মাত্রায় আমানত উত্তোলন হলে ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের সংকট দেখা দেবে। এটা সমন্বয় করতে না পারলে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সংকট পড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

Saturday, October 3, 2015

দেশের পরিবেশ ব্যবসাবান্ধব না

দেশের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করেন এখানে ব্যবসা করার মতো সহায়ক পরিবেশ নেই। সে কারণে এ বছর তাঁদের বিনিয়োগও কমে যেতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) করা এক তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন জরিপে এমন তথ্যই বেরিয়ে এসেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পক্ষে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল বুধবার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিপিডি। ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে এই জরিপটিও প্রকাশ করে সংস্থাটি।
এই জরিপে অংশ নেওয়া ৬২ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন, দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নেই। আগের বছরের জরিপে ব্যবসায়ীরা দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বিদ্যমান বলে মত দিয়েছিলেন।
জরিপে শুধু যে নেতিবাচক তথ্যই উঠে এসেছে এমন নয়। এতে অংশ নেওয়া ৬৯ শতাংশ ব্যবসায়ী বলেছেন, অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে। আবার তাঁদের ৮০ শতাংশ চলমান অবকাঠামো প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহে আছেন।
অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন ও তাৎক্ষণিক জরিপ প্রতিবেদনের নানা দিক তুলে ধরেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, এবারের জরিপে অংশ নিয়েছেন ৫৬ জন ব্যবসায়ী, যাঁদের সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি টাকার ওপরে। গত বছরের জরিপে অংশ নিয়েছিলেন ৭৭ জন ব্যবসায়ী।
জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের কাছে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের ব্যবসার পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। অবশ্য জরিপটি করা হয়েছে এ বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মে পর্যন্ত। বিশ্বের ১৪০টি দেশে একই সময়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জরিপের কাজটি করা হয়। একই ব্যবসায়ীদের ওপরই তাৎক্ষণিক জরিপটি চালায় সিপিডি।
ব্যবসায়ীরা প্রায়ই সভা-সেমিনারে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার নিয়ে সোচ্চার হন। এটাকে কমিয়ে এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনার দাবি জানান তাঁরা। তবে সিপিডির এই তাৎক্ষণিক জরিপে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। দেশে সুদের হার কমে আসায় জরিপে অংশ নেওয়া ৬৪ শতাংশ ব্যবসায়ী এখন আর এটিকে অতটা বড় সমস্যা হিসেবে দেখেন না। তবে ৩০ শতাংশ ব্যবসায়ী এখনো মনে করেন, উচ্চ সুদের হার ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সুশাসনে পেছনের সারিতে বাংলাদেশ: বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগোলেও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ এখনো পেছনের সারিতে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদনে সুশাসনের দিক থেকে বিশ্বের ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩২। আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-দপ্তরে ঘুষ দেওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯।
জরিপ অনুযায়ী, ৯১ শতাংশ ব্যবসায়ী বলেছেন, আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঘুষ দিতে হয়। ৮৪ শতাংশ ব্যবসায়ী বলেছেন, সরকারি সেবা পেতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঘুষ দিতে হয়। ৮৯ শতাংশ ব্যবসায়ীর মতে, কর পরিশোধের সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঘুষ দিতে হয়। আর ৮৮ শতাংশ বলেছেন, সরকারি চুক্তি কিংবা লাইসেন্স পেতেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঘুষ দিতে হয়।
অবশ্য দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট নৈতিকতাও বেশ দুর্বল বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কমেছে বলেও ৫৪ শতাংশ ব্যবসায়ী মন্তব্য করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনীতিকদের নৈতিক মান খুবই নিম্ন। সরকার খুব কম ক্ষেত্রেই ব্যবসা করার জন্য একটি টেকসই নীতি দিতে পারেন। সরকারি সেবাও যথেষ্ট নয়। শুধু তা-ই নয়, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা চুক্তি করার ক্ষেত্রে খাতিরের কোম্পানির প্রতি পক্ষপাত করেন দেশের সরকারি কর্মকর্তারা।
ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে ১৫টি বড় ঝুঁকি: সিপিডি গতকাল ‘২০১৫ সালে বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশ’ নামেও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এটি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদনেরই অংশ। ওই প্রতিবেদনে দেশের ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে আগামী ১০ বছরে বড় বৈশ্বিক ঝুঁকিগুলো উঠে এসেছে। প্রধান তিনটি ঝুঁকি হলো, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ার ধাক্কা, জাতীয়ভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন না হওয়া।
এ ছাড়া অন্য বড় ঝুঁকিগুলো হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা, আর্থিক খাত ও প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনায় ব্যর্থতা, গভীর সামাজিক অস্থিরতা, সম্পদের অতিমূল্যায়ন, জীববৈচিত্র্য ক্ষয় ও বাস্তুসংস্থানে ধস, সাইবার আক্রমণ, আন্তদেশীয় দ্বন্দ্ব, আর্থিক খাতের সংকট, মনুষ্যসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো ভেঙে পড়া এবং তথ্য চুরি।

Thursday, October 1, 2015

উদ্বেগজনকভাবে ৪ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ের হার কমছে

সরকারি মালিকানাধীন সোনালী, রূপালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ের হার উদ্বেগজনকভাবে কমছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এই চার ব্যাংকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে বলেছে।
সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে আজ বুধবার এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি শওকত আলী সাংবাদিকদের বলেন, এই চার ব্যাংকের ২০১৩ ও ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ঋণ আদায়ের পরিমাণ সন্তোষজনক নয়। কমিটি চারটি ব্যাংককে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক এবং আদায়ে আন্তরিক হতে বলেছে। উপযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে বলা হয়েছে।
বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে সোনালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৫ হাজার ১৭৬ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০১৪ সালে ৮ হাজার ৬৪৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৪ হাজার ৫০৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত ৮ হাজার ২৫৩ কোটি ১০ লাখ টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৮০৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এই সময়ে ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৫৯৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
জনতা ব্যাংক ২০১৩ সালে ৩ হাজার ১৭৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৫৭৬ কোটি এবং ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৭৩৪ কোটি টাকা আদায় করেছে। ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৯৩ কোটি টাকা।
অগ্রণী ব্যাংকের ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৬০৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৪৩১ কোটি ৪৮ লাখ এবং ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৮৯৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৪৯২ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৫০৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা হলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৩৪২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
রূপালী ব্যাংকের ২০১৩ সালে ২ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে ১৮০ কোটি এবং ২০১৪ সালে ১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে ১৩৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৫২৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৬৮ কোটি টাকা।
শওকত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য সুবিদ আলী ভূঁইয়া, নুরুল ইসলাম সুজন ও আবদুর রউফ এবং চার ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Tuesday, September 15, 2015

ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না গ্রামীণ উদ্যোক্তারা by আশরাফুল ইসলাম

কমে যাচ্ছে কর্মসংস্থান, চাপ বাড়ছে শহরের ওপর
ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। ভাটা পড়েছে ঋণ বিতরণেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই) এ খাতে (নন-ফার্ম রুরাল ক্রেডিট) ঋণ আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৫২ শতাংশ। গত অর্থবছরের প্রথম মাসে ঋণ আদায় হয়েছিল ১৬৪ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে তা কমে হয়েছে ৭৮ কোটি টাকা। শুধু ঋণ আদায়ই কমছে না, বিতরণও কমে গেছে। গেল বছরের জুলাইয়ে যেখানে বিতরণ হয়েছিল প্রায় ৯৩ কোটি টাকা, সেখানে চলতি মাসের জুলাইয়ে এসে কমে হয়েছে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা। এটাতো এক মাসের হিসাব। গেল অর্থবছরেও আগের বছরের চেয়ে ঋণ আদায় ও বিতরণ কমে গিয়েছিল। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে তৈরি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাব ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঙ্কটে জাতীয়পর্যায়ের মতো পল্লী এলাকায়ও এর প্রভাব পড়েছে। এতে কমে যাচ্ছে গ্রামীণ কর্মসংস্থান। চাপ বাড়ছে শহরের ওপর।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, শহরের চেয়ে গ্রামে অবকাঠামোর সুবিধা কম। শহরে যে হারে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়, গ্রামে ওই হারে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয় না। এমনও এলাকা আছে যেসব এলাকায় দিনে-রাতে ছয় থেকে আট ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় না। এর সাথে আস্থার সঙ্কটতো রয়েছেই।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যে ুদ্র উদ্যোক্তারাও লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। এতে তাদের ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে গেছে। এসবেরই প্রভাব পড়েছে ঋণ আদায়ে।
পল্লী এলাকার ঋণ বিতরণ ও আদায়ে ব্যাপক প্রভাব সম্পর্কে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেছেন, পল্লী এলাকায় ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার অন্যতম কারণ হলো অবকাঠামো ও আস্থার সঙ্কট। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা গ্রেফতার ও জেলের ভয়ে পলাতক ছিলেন। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসের টানা আন্দোলনের সময় তারা স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাতে পারেননি। অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নিয়েছিলেন। এসব কারণে তারা নতুন বিনিয়োগে যেতে পারেননি, পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখায় নিয়মিত ব্যাংকঋণও পরিশোধ করতে পারেননি। এ কারণে অনেকেই ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছেন, যার প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের ওপর।
প্রথম প্রজন্মের অপর এক ব্যাংকের এমডি গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, পল্লী এলাকায় ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকারদের এমনিতেই একটা অনীহা থাকে, এরওপর বিনিয়োগস্থবিরতার মাসে বিনিয়োগকারীরাও এগিয়ে আসছেন না। অনেকেই বছরের প্রথম তিন মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। ওই সময় যারা ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছিলেন তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। আর ঋণখেলাপি হলে ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ নিতে পারেন না। ফলে অনেকেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ ছাড়া শহরের মতো পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সুবিধা পান না। সব মিলেই নতুন উদ্যোক্তাও আসছেন না। আবার পল্লী এলাকায় সবচেয়ে বড় সমস্যা ভালো উদ্যোক্তার অভাব। যাকে ঋণ দেয়া হবে, তার কাছ থেকে ঋণ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলে পুরো ঋণই ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে। এসব বিবেচনায় পল্লী এলাকায় ঋণ বিতরণে ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে।
পল্লী এলাকায় ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। পল্লী এলাকায় কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হওয়ায় মানুষ কর্মের সংস্থানে শহরমুখী হচ্ছে। এতে শহরের ওপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়াতে কর মওকুফসহ সরকারি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে গ্রামমুখী বিনিয়োগ বাড়বে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি আরো চাঙ্গা হবে বলে তারা মনে করেন। এতে বেকারত্বের হারও কমে যাবে।

Monday, September 14, 2015

‘আমরা ধ্বংস হয়ে যাব’

রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সংবাদ
সম্মেলনে বক্তব্য দেন অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল
মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসাদুল আলম
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক কমলেও দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার। সরকারের এই সিদ্ধান্তে দেশের অনেক স্টিল রি-রোলিং মিল বন্ধ হয়ে যাবে। এ শিল্পে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আবার যখন দেশে বিদ্যুতের সংকট ছিল তখন সরকার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উৎসাহিত করেছে। ব্যবসায়ীরা ক্যাপটিভ পাওয়ারের মাধ্যমে নিজের শিল্পের চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করতেন। এত দিন এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪ টাকা ১৮ পয়সায় প্রতি ঘনমিটার গ্যাস দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে ৮ টাকা ৩৬ পয়সায়। এর ফলে কোটি কোটি টাকায় গড়া এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যাবে। এই দুই খাতসহ তিনটি খাতের পাঁচ ব্যবসায়ী সংগঠন গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানিয়েছে। নেতারা বর্ধিত গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য কমানোর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ডিপিডিসি, আরইবি এবং ডেসকোর বিদ্যুতের মূল্য সমান করার দাবিও জানিয়েছেন।
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ স্টিল মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ক্যাপটিভ পাওয়ার প্রোডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
লিখিত বক্তব্যে অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসাদুল আলম বলেন, দেশের ইস্পাতশিল্পের বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৮০ লাখ টন। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন হচ্ছে অর্ধেক, ৪০ লাখ টন। এর মধ্যে দেশের চাহিদা হলো ৩০ লাখ টন। উদ্বৃত্ত থাকছে ১০ লাখ টন। ফলে এই শিল্পের উদ্যোক্তারা লোকসান গুনছেন। সরকারিভাবে নির্মাণকাজ তেমন না হওয়ায় ইস্পাতপণ্যের প্রধান ক্রেতাই বেসরকারি খাত। এ অবস্থায় বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রাখলে রডের ব্যবহার আরও কমে যাবে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে রডের দাম আরও বাড়বে। বিক্রিও কমে যাবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বর্ধিত মূল্য কমানো না হলে দেশের ইস্পাতশিল্প হুমকির মুখে পড়বে। পর্যায়ক্রমে এসব শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। স্থানীয় বাজার আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। ফলে দেশ শিল্পবান্ধব না হয়ে বিদেশি পণ্যের একটি বাজারে পরিণত হবে।
পরে মাসাদুল আলম বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা আন্দোলন করতে চাই না। কিন্তু আমাদের মিল-ফ্যাক্টরি যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে কি আমরা ঘরে বসে থাকব। তবে সবার প্রথমে আমরা এফবিসিসিআই ঘেরাও করব। কারণ তারা এখনো কেন এটা নিয়ে মাঠে নামেনি।’
সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ার গ্রুপের ইস্পাত ও নির্মাণসংক্রান্ত বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারের অদক্ষতা ঢাকার জন্যই গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাদের সেই অদক্ষতা আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা আসলে বাংলাদেশে অস্বাভাবিক ঘটনা না। তিনি আরও বলেন, ‘সরকার বলছে বিশ্ববাজারের চেয়ে দেশে গ্যাসের দাম অনেক কম। আমার দেশের সম্পদ গ্যাস আমি কেন আন্তর্জাতিক বাজার দরে কিনব। তাহলে কি আমি বাংলাদেশের সেকেন্ড সিটিজেন।’
বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের আগে ৪০০ মিল ছিল। গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে ১০০-১৫০টি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আবারও দাম বাড়ানো হলো। আরও মিল বন্ধ হয়ে যাবে।’
সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ও মেট্রোসেম ইস্পাতের এমডি শহিদউল্লাহ বলেন, দেশের মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ সিমেন্ট এখন দেশীয় বিনিয়োগে করা হচ্ছে। আবার রপ্তানিও হচ্ছে। কিন্তু বর্ধিত গ্যাস-বিদ্যুতের দামের কারণে এসব বন্ধ হয়ে যাবে। কম দামে সিমেন্ট সরবরাহও সম্ভব হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বেসরকারি ক্যাপটিভ পাওয়ারে সরবরাহ করা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম দ্বিগুণ করা হলেও সরকারিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়নি। সেখানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস দেওয়া হচ্ছে ২ টাকা ৮২ পয়সায়। ফলে বেসরকারি ক্যাপটিভ পাওয়ারগুলো অসম প্রতিযোগিতায় টিকবে না। তাই আগের দামেই এখানে গ্যাস সরবরাহের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে স্টিল মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. শাহজাহান, ক্রাউন সিমেন্টের এমডি আলমগীর হোসেন,
বন্দর স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি আবুল কালাম উপস্থিত ছিলেন।

Tuesday, September 8, 2015

ইসলামী ব্যাংকের আরও ২৯ লাখ শেয়ার বিক্রির ঘোষণা

এক মাসের ব্যবধানে আরও শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকের (আইবিবি) প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান দুবাই ইসলামিক ব্যাংক (ডিআইবি)। গতকাল সোমবার বিদেশি এ ব্যাংকটি তাদের হাতে থাকা মোট ৩০ লাখ শেয়ারের মধ্যে ২৯ লাখ শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে গত ১০ আগস্ট কোম্পানিটি তাদের হাতে থাকা মোট ৬৭ লাখ শেয়ারের মধ্যে ৩৭ লাখ শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেয়। ওই শেয়ার বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার পর গতকাল নতুন করে আরও শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব শেয়ার বিক্রি সম্পন্ন হলে ডিআইবির হাতে থাকবে ইসলামী ব্যাংকের মাত্র এক লাখ শেয়ার।
ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, পর্যায়ক্রমে ডিআইবি তাদের হাতে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারই অংশ হিসেবে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে ধাপে ধাপে শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও সাতটি দেশের ব্যাংক খাতের বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছে দুবাই ইসলামিক ব্যাংক। এসব বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে ‘ব্যাংক অব খার্তুম’ নামে সুদানের এক ব্যাংকে বিনিয়োগ করবে।
১৯৮৩ সালের শুরুতে দেশি-বিদেশি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক। ওই বছরের ২৩ মার্চ ৬৮১টি শেয়ার কিনে উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হয় ডিআইবি। পরবর্তী সময়ে কয়েক ধাপে অধিকারমূলক (রাইট) শেয়ার কিনে ও বোনাস লভ্যাংশ পেয়ে শেয়ারের পরিমাণ বা বিনিয়োগ বেড়ে যায়।
প্রতিষ্ঠাকালীন বিদেশি উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে ডিআইবি সরে গেলেও এখনো ইসলামী ব্যাংকে সৌদি আরবের ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কুয়েত ফিন্যান্স হাউস, জর্ডান ইসলামিক ব্যাংক, কাতারের ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ করপোরেশন, বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংকসহ আরও বেশ কিছু বিদেশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে।
এদিকে, ২৯ লাখ শেয়ার বিক্রির ঘোষণা আসার পরও গতকাল ডিএসইতে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ২ টাকা ১০ পয়সা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ২৮ টাকায়। গত এক মাসের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিআইবি এককভাবে ৬৬ লাখ শেয়ার বিক্রি করেছে। আর এ এক মাসে শেয়ারবাজারে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে পাঁচ টাকা। গত ১০ আগস্ট ডিএসইতে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল প্রায় ২৬ টাকা। ১৬ আগস্ট তা সর্বোচ্চ প্রায় ৩১ টাকায় উঠেছিল।

Monday, September 7, 2015

মাথাপিছু ঋণ ১৩ হাজার ১৬০ টাকা, সর্বোচ্চ মুনাফা ইসলামী ব্যাংকের -সংসদে অর্থমন্ত্রী

বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ১৬০ টাকা। বৃহস্পতিবার সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ তথ্য জানান। অর্থমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তাঁর পক্ষে প্রশ্নের জবাবে দেন প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান।
এ সম্পর্কে নুরজাহান বেগমের প্রশ্নের জবাবে সংসদকে জানানো হয়, গত ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৭ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা।
এর আগে গত বছরের জুনে অর্থমন্ত্রী ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের হিসাব দিয়ে সংসদে বলেছিলেন, বাংলাদেশের জনগণে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১২ হাজার ৭০০ টাকা। এই হিসাবে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪৬০ টাকা।
অর্থমন্ত্রী জানান, ১১টি উন্নয়ন সহযোগী ও দেশের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ লাখ ২ হাজার ৩৪৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিপি) থেকে ৬১ হাজার ৮৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, জাপান থেকে ১৯ হাজার ৩৭৬ কোটি ১৮ লাখ এবং চীন থেকে ৭ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। বাকি ঋণ নেওয়া হয়েছে আইডিবি, ডেনমার্ক, ভারত, কুয়েত, দক্ষিণ কোরিয়া, ইফাদ ও অন্যান্যদের কাছ থেকে।
সর্বোচ্চ মুনাফা ইসলামী ব্যাংকের, লোকসানে বেসিক ব্যাংক
সরকারি দলের এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ এক হাজার ৪১৯ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। সোহরাব উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ এক হাজার ৬২১ কোটি ২১ লাখ টাকা মুনাফা করেছে ইসলামী ব্যাংক। লোকসানে আছে বেসিক ব্যাংক (১১০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা), কৃষি ব্যাংক (১৮৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা), আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক (২১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা) ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (৯৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা)।
নিজাম উদ্দিন হাজারীর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ২৫ হাজার ২০ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৪ সালে এর পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

Friday, September 4, 2015

দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের চ্যালেঞ্জ by আনু মুহাম্মদ

দেড় শ কোটিরও বেশি মানুষের বাস এই দক্ষিণ এশিয়ায়। যেসব বহুল প্রচলিত কাঠি ব্যবহার করা হয় উন্নয়ন মাপার জন্য, তার কয়েকটিতে বেশ সন্তোষজনক চেহারাই দেখা যায় অঞ্চলের। বিশ্বের গড় হার বিবেচনায় এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার ভালো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিরাপদ, মুদ্রাস্ফীতি আয়ত্তের মধ্যে, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণশীল, সব কটি অর্থনীতিই আমদানি-রপ্তানি উদারীকরণে এগিয়ে, বিনিয়োগ হার ভালো ইত্যাদি ইত্যাদি। তা ছাড়া উর্বর জমি, মৎস্যসম্পদ, পানিসম্পদ, খনিজ সম্পদ, ভূবৈচিত্র্য, সমুদ্রসম্পদ, প্রাণবৈচিত্র্য, ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ইত্যাদি সবদিক থেকেই এই অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ‘উন্নয়ন’ নামে মুনাফা উন্মাদনার আগ্রাসনে অনেক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও এখনো এই অঞ্চল অনেক সম্ভাবনাময়।
প্রচলিত মাপকাঠিতে পরিসংখ্যান অনেক ভালো খবর দিলেও পাশাপাশি তা এটাও বলছে যে পুরো দক্ষিণ এশিয়া এখন বিশ্বের চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় অর্ধেক মানুষের অঞ্চল, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ কেন্দ্রীভূত এই অঞ্চলে। জাতিসংঘের ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক’ (Multidimensional Poverty Index) অনুযায়ী বিশ্বের দরিদ্রদের এক-চতুর্থাংশ আফ্রিকায় বাস করে, আর অর্ধেক বাস করে দক্ষিণ এশিয়ায়। এই সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, আফ্রিকার ২৬টি দরিদ্রতম দেশের চেয়ে বেশিসংখ্যক দরিদ্র মানুষ ভারতের আটটি রাজ্যে বাস করে। বলা হয়, এই সূচক অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র মানুষের অনুপাত শতকরা ৫৫। যদি দিনপ্রতি আয় দুই ডলার ধরে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়, তাহলে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এই অঞ্চলের শতকরা ৭৭ জন মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে। বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা, আশ্রয়—সব কটিতেই এসব দেশের বেশির ভাগ মানুষ বিপন্ন অবস্থায় আছে। শ্রেণিগত, জাতিগত, লিঙ্গীয়, ধর্মীয়, বর্ণগত বৈষম্য নিপীড়নে ক্ষতবিক্ষত শতকোটি মানুষ। প্রচলিত মানব উন্নয়ন সূচক বিবেচনা করলে শ্রীলঙ্কা ছাড়া সব কটি দেশই ১২০-এর পরে।
শ্রেণি ও লিঙ্গীয় বৈষম্য নিপীড়নে সব কটি দেশেই কমবেশি একই চিত্র। এ ছাড়া ভারতে বিশেষভাবে বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়ন, পাকিস্তানে শিয়া-সুন্নি-আহমদিয়া, বাংলাদেশে জাতিগত নিপীড়ন, শ্রীলঙ্কায় জাতিগত নিপীড়ন ও সংঘাত এবং এসব দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গত কয়েক দশকে, বিশেষত নব্বইয়ের পর সব কটি দেশেই জাতিবিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক-ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে।
গত কয়েক দশকের উন্নয়ন ধারায় এই দেশগুলোয় খুবই ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে বিপুল ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি, নির্লজ্জ মাত্রার ভোগবিলাস ও চোরাই অর্থনীতির দাপট বেড়েছে। ভারত ও পাকিস্তানে শুধু যুদ্ধ উন্মাদনাতেই বিপুল সম্পদ ব্যয় হয়। দারিদ্র্য-নিরক্ষরতা-বঞ্চনাভরা দুটো দেশের শাসকেরাই বিপুল অর্থব্যয়ে ভয়ংকর পারমাণবিক বোমা বানিয়ে গর্বিত এবং জনগণের মধ্যে এই গর্ব উন্মাদনা ছড়ানোতে তৎপর।Õ স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) সংকলিত তথ্য অনুযায়ী ভারত বর্তমান বিশ্বের সর্ববৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক এবং পাকিস্তান তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। দারিদ্র্যের পাশাপাশি ঐশ্বর্যের আর ধ্বংস উন্মাদনার এ রকম অশ্লীল সহাবস্থান খুব কম অঞ্চলেই আছে।
বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে তাই যোগাযোগ বাড়ানো দরকার, কথা বলা দরকার, সংহতি দৃঢ় করার জন্য বিতর্ক করা দরকার দারিদ্র্য বঞ্চনার কদর্য চেহারা আর প্রাচুর্যের জৌলুশ; মুক্ত চিন্তার পাশাপাশি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি; ক্রমবিস্তারমান বিরাজনীতিকৃত মধ্যবিত্তের পাশে বিভিন্ন প্রান্তে অপমানিত-বঞ্চিত কোটি মানুষের অদম্য লড়াই; গণতন্ত্রের চর্চার পাশাপাশি নিপীড়নের বর্বরতা ও ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ ইত্যাদি বৈপরীত্য নিয়েই দক্ষিণ এশিয়া। এই অঞ্চলে মিয়ানমার ছাড়া আর কোনো দেশেই এখন প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন নেই, কিন্তু সব দেশেই সামরিকীকরণ বেড়েছে। প্রায় সব কটি দেশেই নির্বাচিত সরকারের অধীনে একের পর এক ‘নিরাপত্তা আইন’, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ আর দমনমূলক নানা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দেখা যাচ্ছে।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও মূলধন সংবর্ধনের ধরন, বিশ্ব পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তার যুক্ততা, করপোরেট স্বার্থে মানুষ ও প্রকৃতিবিরোধী আগ্রাসন ইত্যাদিতে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের ঐক্য আছে। ঐক্য আছে নিপীড়নমুখী রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধির অবিরাম চেষ্টায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় কমবেশি অঙ্গীভূত সব কটি দেশই। ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ’ এখন সব দেশের শাসকদেরই নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিস্তারের প্রিয় কৌশলসূত্র।
রাষ্ট্র ও জনগণ সমার্থক নয়। অখণ্ড কোনো দেশ নেই, একক সত্তা বলে কোনো কিছু নেই। জাতীয়তাবাদী কিংবা ধর্মান্ধ আওয়াজ তুলে রাষ্ট্র নিজের পেছনে মানুষকে জমায়েত করতে চায়, সংঘাত আর বৈরিতার দেয়াল তুলতে চায় জনগণের মধ্যে। কিন্তু সব দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ অভিন্ন। সব দেশেই করপোরেট জগতের একটি অভিন্ন প্রচার আছে। যারা মানুষের জীবন-জীবিকার পক্ষে দাঁড়ায়, যারা ভুল প্রতিশ্রুতিতে নির্মিত বাঁধের জন্য উচ্ছেদ হওয়া কোটি কোটি মানুষের লড়াইয়ে শামিল, যারা নির্বিচার রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, লক্ষ কোটি মানুষ উচ্ছেদ করে ‘করপোরেট হাব’ বানানোর বিরোধী, যারা জনগণের শিক্ষা ও চিকিৎসা অধিকার নিয়ে সোচ্চার, তাদেরই, বাংলাদেশের মতোই, ভারতেও ‘উন্নয়নবিরোধী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। উন্নয়ন দর্শনে রাষ্ট্রগুলোর সংহতি আছে, সেখানে কাঁটাতার নেই। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভারতের সঙ্গে অন্য দেশের জনগণের যোগাযোগ খুবই কম, মাঝখানে দৃশ্যমান অদৃশ্য অনেক রকম কাঁটাতার।
সব দেশে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও আমরা যারা অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করি, তারা মানুষের জীবনকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়ন বিচার করি। আর তাই প্রকৃতি-পানি-মাটি রক্ষা আমাদের কর্তব্য জ্ঞান করি। আমাদের কাছে শিক্ষা-চিকিৎসা অধিকার, ব্যবসায়ীর পণ্য নয়। আমরা নদী, পানি, বন ও খনিজ সম্পদকে আমাদের সবার সম্পত্তি মনে করি; এগুলো কোনোভাবে মুনাফাখোরদের হাতে যেতে দিতে চাই না। আমাদের কাছে মানুষের মর্যাদা সবার ওপরে, লিঙ্গ বা ধর্ম বা বর্ণ বা ভাষা বা জাতি নয়। আমরা মনে করি, এই বিশ্বে মানুষের জন্য সম্পদের কোনো অভাব নেই, কিন্তু লুটেরা দস্যুদের জন্য সেই সম্পদ মানুষের হাতছাড়া অথবা বিপর্যস্ত। তাদের দখল লোভের জন্যই যুদ্ধ সংঘাত নিপীড়ন আর এই রাষ্ট্রব্যবস্থা। এর বিরুদ্ধে মানুষের দক্ষিণ এশিয়ার কণ্ঠ অভিন্ন, জীবন ও মরণ অভিন্ন লক্ষ্যে নিয়োজিত।
আশার কথা এই যে মানুষ নির্দিষ্ট মডেলের পতনে থেমে নেই, সব দেশেই জনগণের বিভিন্ন মাত্রার লড়াই আছে জল-জমি-জঙ্গলের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, লড়াই আছে করপোরেট আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে, লড়াই আছে শ্রেণি, জাতি, ধর্মীয়, লিঙ্গীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে, লড়াই আছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে। এসব লড়াইয়ের মধ্যে যে ঐক্যসূত্র আছে, তা থেকেই আমরা একটি মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি, যেখানে করপোরেট স্বার্থ নয়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে উন্নয়নের নতুন চেহারা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। গণতন্ত্র, সাম্য ও মর্যাদা নিয়ে নতুন ইতিহাস পর্বে প্রবেশ করবে এই এলাকার মানুষ। কিন্তু এর জন্য জনগণের লড়াই ও মুক্ত চিন্তার যে সংহতি দাঁড় করা দরকার, সেখানে বড় ঘাটতি আছে।
বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে তাই যোগাযোগ বাড়ানো দরকার, কথা বলা দরকার, সংহতি দৃঢ় করার জন্য বিতর্ক করা দরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে আমরা এই যাত্রা জোরদার করতে পারি। যেমন: প্রথমত, সর্বজনের মুক্ত বিশ্বের রূপকল্পের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার রূপকল্প দাঁড় করানো এবং তা মানুষের চিন্তা ও সক্রিয়তায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার সব সম্পদ, বিশেষত খনিজ সম্পদ ও পানিসম্পদ যাতে সব মানুষের কাজে সর্বোত্তম ব্যবহার করা সম্ভব হয়, সে জন্য আঞ্চলিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন বা নকশা তৈরির কাজ। এটা হবে বিশ্বব্যাংক, ইউএসএআইিড ও দেশি-বিদেশি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মুনাফামুখী উন্নয়ন কৌশলের পাল্টা নকশা। তৃতীয়ত, নদী ও পানিপ্রবাহ নিয়ে, সবার অধিকারে স্বীকৃতি দিয়ে, সমন্বিত চিন্তা ও পরিকল্পনা মূর্ত করা। চতুর্থত, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, শ্রেণি-লিঙ্গ-জাতি-বর্ণগত নিপীড়ন ও বৈষম্যবিরোধী আমাদের চিন্তা ও লড়াইকে পরস্পরের কাছে পরিষ্কার রাখা এবং সমন্বয় করা।
কয়েক হাজার একর জমি নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বিরোধ জিইয়ে ছিল ৬৮ বছর। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির পর বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ভারত এত দিন এটা আটকে রেখেছিল। এর জন্য দুই দেশের ছিটমহলে আটকে থাকা দুই দেশের মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এত বছর। ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে এ-সংক্রান্ত বিল পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার হলো যে ইচ্ছা করলে সহজ কাজ কত সহজে করা যায়! এত বছর পরে হলেও অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে, সে জন্য আমরা খুশি। আমরা চাই এখন সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে, কাঁটাতারের বেড়া থেকেও বাংলাদেশ মুক্ত হবে। আমরা চাই অভিন্ন নদী নিয়ে আমাদের বিপর্যয়ের অবসান হবে। আমরা চাই ট্রানজিট নিয়ে লুকোচুরি, অস্বচ্ছতা ও আগ্রাসী তৎপরতা বন্ধ হবে। আমরা চাই, সুন্দরবনধ্বংসী সব প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ ঘোষণা দিয়ে সরে যাবে এবং সুন্দরবন বিকাশে মন দেবে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

Sunday, August 23, 2015

‘বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধি কৌশল’ নয় কেন? by মইনুল ইসলাম

৪ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার পর গত ২৪ দিনে পত্রপত্রিকায় বাজেটের ওপর নানা ধরনের সমীক্ষা ও মূল্যায়ন উপস্থাপিত হয়ে চলেছে। বাজেটের সমালোচনার মূল সুরটাই হলো এটা বাস্তবায়ন-অযোগ্য রকমের উচ্চাভিলাষী বাজেট, যার রাজস্ব-টার্গেট এবং ঘাটতি-অর্থায়ন টার্গেট দুটোই অর্জনের যৌক্তিক ভিত্তি নেই। এগুলো যেহেতু প্রাক্কলন, তাই বছরের শেষে শতভাগ ঘোষিত লক্ষ্য পূরণের তেমন দায় থাকে না অর্থমন্ত্রীর কিংবা সরকারি রাজস্ব-আহরণকারী বিভাগগুলোর, আর সেটারই সুযোগ নিয়ে বাজেট বক্তৃতায় অতি উচ্চাভিলাষী টার্গেট ঘোষণার অভ্যাসটা ছাড়েন না আমাদের অর্থমন্ত্রীরা। আলোচনার খোরাক জোগায় এ ধরনের বাগাড়ম্বরপূর্ণ বাজেট বক্তৃতা। এখনকার সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি যেহেতু সরকারের অংশীদার, সেহেতু এবারের বাজেট অধিবেশন অতিশয় নিষ্প্রাণ হচ্ছে। আজকের কলামে আমি বাজেটের ব্যয়-বরাদ্দ, ঘাটতি অর্থায়ন বা রাজস্বের উৎসের খঁুটিনাটি নিয়ে আলোচনা করব না, বাজেটের মাধ্যমে প্রতিফলিত ক্ষমতাসীন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করব।
বাংলাদেশ বেশ কয়েক বছর ধরে ৬ শতাংশের বেশি হারে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বছর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ৮ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হলেও তা অর্জিত হয়নি, এমনকি ৭ শতাংশেও পৌঁছানো যায়নি। বিএনপি এটাকে সরকারের ব্যর্থতা বলে গলাবাজি করলেও এ জন্য তাদের কৃতিত্বটাও (?) কম নয়। ২০১৩ সালে ও ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে বিএনপি-জামায়াতের যে প্রাণঘাতী তাণ্ডব পুরো দেশকে একটি ভয়ংকর পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করেছিল, তার মূল শিকার ছিল সাধারণ জনমানুষের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি। সরকারকে তারা হটাতে ব্যর্থ হলেও অর্থনীতিতে গতিসঞ্চারের পথে ওই জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর ও অবরোধ-হরতালের অভূতপূর্ব সন্ত্রাসী তাণ্ডব নিঃসন্দেহে বড়সড় বাধা সৃষ্টি করেছে। এতত্সত্ত্বেও দেশে যে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তাকে মোটেও খাটো করে দেখা যাবে না। তবে যে কথাটি জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন তাহলো দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের তাণ্ডব যদি কমানো যেত তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমপক্ষে আরও ১ শতাংশ বেশি হতো। ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটা অনায়াসে করা যায় তাহলো দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন কমানোর ব্যাপারে তাঁদের কোনো সদিচ্ছা কিংবা কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তাঁকে কেনা যায় না।’ কিন্তু তাঁর দলের মন্ত্রী, সাংসদ, অন্যান্য নেতা-কর্মী বা তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত আমলা ও ঠিকাদার-ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের দায়ও তিনি এড়াতে পারেন না। অতএব, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে তাঁকেই।
কিন্তু আজকের কলামে আমি আলোকপাত করতে চাই দেশে আয়বৈষম্য নিরসনের বিষয়টা যথাযোগ্য গুরুত্বের সঙ্গে বাজেটে উপস্থাপিত না হওয়ার ওপর। বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উন্নয়ন-দর্শন ঘোষিত হয়েছিল ‘দরিদ্রবান্ধব প্রবৃদ্ধি কৌশল’ অবলম্বনে। ওই পরিকল্পনা প্রণয়নে দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য গঠিত ‘প্যানেল অব ইকোনমিস্টস’-এর অন্যতম সদস্য ছিলাম আমি। আমার অবস্থান ছিল, ওই কৌশল ফাঁকিবাজির নামান্তর, ওতে হবে না। সরাসরি বৈষম্য নিরসনকে উন্নয়নের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, কারণ ১৯৭৫ সাল থেকে এ দেশের সরকারগুলো ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ ডামাডোলে শরিক হয়ে ব্যক্তি খাত ও বাজারীকরণকে আঁকড়ে ধরার ফলে এ দেশে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বেড়ে বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে গেছে। ওয়াকিবহাল মহলের অজানা থাকার কথা নয় যে হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিসার সার্ভে বা খানা আয় ও ব্যয় জরিপ মোতাবেক এ দেশের আয়বৈষম্য পরিমাপক গিনি সহগ (কো–ইফিশিয়েন্ট) ২০০৫ সালে ০.৪৬৭ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, এবং ২০১০ সালের একই জরিপে ওই সহগ ০.৪৬৫-এ রয়ে গেছে। তার মানে, ওই পাঁচ বছরে আয়বৈষম্য আর না বাড়লেও কমানো যায়নি। কোনো দেশের গিনি সহগ ০.৫ অতিক্রম করলে ওই দেশকে ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমরা তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।
১৯৭০ সালের পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি পরিবারের কথা বলা হতো, যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ওই ২২ পরিবারের মধ্যে দুটো পরিবার ছিল পূর্ব পাকিস্তানের, তা-ও একটি অবাঙালি। এই বাংলাদেশেই ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক ২৩,২১২ জন কোটিপতি ছিল। ২০১৪ সালে ওই সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোটিপতির এ ধরনের নাটকীয় প্রবৃদ্ধির হারকে কৃতিত্বপূর্ণ সাফল্য মনে করতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যে এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়ে যাওয়ার বিপৎসংকেত পাওয়া যাচ্ছে, সে ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকারের কি কোনো করণীয় নেই?
জনগণের কাছে বোধগম্য যেসব বিষয় এই বিপদটার জানান দিচ্ছে সেগুলো হলো: ১. ব্যাংকের ঋণ সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশে কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে এবং ঋণখেলাপি বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে; ২. দেশের জায়গা-জমি, অ্যাপার্টমেন্ট, প্লট, ফ্ল্যাট, মানে রিয়াল এস্টেটের দাম প্রচণ্ডভাবে বেড়েছে; ৩. বিদেশে পঁুজি পাচার ব্যাপক হারে বাড়ছে; ৪. দেশে গাড়ি, বিশেষত বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে; ৫. বিদেশে বাড়িঘর কেনা ও ব্যবসা–বাণিজ্য করার হিড়িক পড়েছে; ৬. ধনাঢ্য পরিবারগুলোর বিদেশ ভ্রমণ বাড়ছে; ৭. উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বিদেশে পড়তে যাওয়ার খায়েশ বাড়ছে; ৮. উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য ঘন ঘন বিদেশে যাওয়ার অভ্যাস বাড়ছে; ৯. প্রাইভেট হাসপাতাল ও বিলাসবহুল ক্লিনিক দ্রুত বাড়ছে; ১০. প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়েছে; এবং ১১. প্রধানত প্রাইভেট কারের কারণে সৃষ্ট ঢাকা ও চট্টগ্রামের ট্রাফিক জ্যাম নাগরিক জীবনকে বিপর্যস্ত করছে।
বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে একটি ‘গণপ্রজাতন্ত্র’, এবং ২০১০ সালের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রসহ রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতএব, ২০১০-১৫ মেয়াদের জন্য প্রণীত ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আমি বৈষম্য নিরসনকে উন্নয়ন কৌশলের প্রধান ফোকাস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়েছিলাম আমি। ‘প্যানেল অব ইকোনমিস্ট’-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদসহ প্রায় সব সদস্য আমাকে সমর্থন দিলেন। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, প্যানেলের আর কোনো সভা না ডেকেই পরিকল্পনার খসড়া মন্ত্রিসভায় পেশ করে পাস করে ফেলা হলো। ওখানে ‘দরিদ্রবান্ধব প্রবৃদ্ধি’ কৌশল ঠিকই বহাল রয়ে গেল। (যেটা খুবই অবাক কাণ্ড তাহলো, পরিকল্পনা দলিলের একটা কপি পর্যন্ত আমাকে পৌঁছানোর সৌজন্যটুকুও দেখানো হলো না)। অবশ্য, এ দেশের নীতিপ্রণেতারা আদতে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় পরিকল্পনা অনুসরণের রেওয়াজ কখনো মেনে চলেন না।
কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী যখন দাবি করলেন যে বর্তমান সরকার আয়বৈষম্যকে আর বাড়তে দেয়নি তখন ইস্যুটাকে আবার ফোকাসে নিয়ে আসা সমীচীন মনে করেছি আমি: বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধিকেই এ দেশের উন্নয়নের মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, এবং প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় এবং বাজেটে সুস্পষ্ট নীতি ও কর্ম-কৌশল ঘোষণা করতে হবে প্রতিবছর গিনি সহগকে কতখানি কমিয়ে আনা হবে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও চিলি এখন এ পথেই এগোচ্ছে। সাধারণ পাঠকেরা যেহেতু গিনি সহগের ব্যাপারটা ভালো বুঝবেন না, তাই তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, সরকারকে ওই সব দেশে আয় পুনর্বণ্টনের মূল এজেন্টের ভূমিকা পালনে এখন বাধ্য করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে ব্রাজিল ফুটবল বিশ্বকাপ চলার সময় ব্রাজিলের বিভিন্ন বড় বড় শহরে লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভ মিছিল প্রশমিত করার জন্য সে দেশের সরকারকে ঘোষণা দিতে হয়েছিল, পেট্রোলিয়াম রপ্তানি থেকে অর্জিত সমুদয় আয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হবে। কারণ, বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য খাতের বাজারীকরণ হলো আয়বৈষম্য বৃদ্ধির সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যবস্থা। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের পর এই দুটো ব্যবস্থাকেই এগিয়ে নিয়ে গেছে সরকারগুলো। তৃতীয় ডাইমেনশনটি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং চতুর্থটি হলো সরকারি রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থা। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়কে জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে নামানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। স্বাস্থ্য খাতের সরকারি ব্যয়ও জিডিপির শতাংশ হিসাবে কমে যাবে। আর এ দেশের দারিদ্র্য সৃষ্টির সবচেয়ে বড় যে কারখানা সে কৃষি খাতেও সরকারি ব্যয় বরাদ্দ কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী ব্যস্ত মানুষ। জানি না, তাঁর সময় হয়েছে কি না, সম্প্রতি বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটির বেস্ট সেলার ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি–ফার্স্ট সেঞ্চুরি বইটি পড়ার। ওই বইয়ে যে হাইপোথিসিসটি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তাহলো, রাষ্ট্র যদি অত্যন্ত কঠোরভাবে আয় ও সম্পদ পুনর্বণ্টনকারীর ভূমিকা পালন না করে তাহলে উন্নত-অনুন্নতনির্বিশেষে বিশ্বের সব দেশে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বাড়তে বাড়তে অতি দ্রুত বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে যাবে। সাইমন কুজনেৎস যে একপর্যায়ে উন্নত দেশগুলোতে বৈষম্য আর বাড়বে না বলে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, সেটাকে পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে পিকেটির বইয়ে। তিনি মনে করেন, অত্যন্ত প্রগতিশীল আয়কর ব্যবস্থা, সম্পত্তি কর ব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাপী পুঁজির ওপর ‘গ্লোবাল ট্যাক্স’ বসানোর মাধ্যমে এই আসন্ন মহাবিপদকে ঠেকানোর প্রয়োজনকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। পিকেটি অবশ্য ইউরোপীয় কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোকে এ ব্যাপারে তাঁর আদর্শ মনে করেন। টমাস পিকেটি তাঁর বইয়ে কার্ল মার্ক্সের কঠোর সমালোচনা করেছেন, কিন্তু তৎসত্ত্বেও বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধি কৌশল অবলম্বনের জন্য তাঁর আকুতি ফুটে উঠেছে বইয়ের উপসংহারে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ‘বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধি কৌশল’ কেন আমরা গ্রহণযোগ্য মনে করছি না, তার ব্যাখ্যা কী?
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Saturday, August 22, 2015

নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ: জিডিপির সঙ্গে বাড়ছে বৈষম্যও by মহিউদ্দিন আহমদ

১৯৬৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান তাঁর ডায়েরিতে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ সম্পর্কে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে লেখেন, ‘ইস্ট পাকিস্তান ইজ এ বটমলেস পিট’ (পূর্ব পাকিস্তান হলো একটা তলাবিহীন পাত্র)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭১ সালেই বাংলাদেশ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এ দেশকে একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ বলেছিলেন। আমাদের গণমাধ্যমে লেখা হলো তলাবিহীন ঝুড়ি (বটমলেস বাস্কেট)।
বাংলাদেশে মানুষ সাড়ে চার দশক ধরে অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছে তাদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য। জনগণের শ্রম, মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তির জোরে দেশটা এগিয়েছে অনেক দূর। আরও অনেক দূর যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অপচয়ের অর্থনীতি এবং একে প্রশ্রয় দানকারী বাগাড়ম্বরের রাজনীতির কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারিনি।
২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে শাসক দল আওয়ামী লীগ বলেছিল, তারা ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের একটি দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একে উন্নত দেশের পর্যায়ে নিয়ে যাবে। বিএনপি পাল্টাপাল্টি বলেছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তারা উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশ বানাবে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের সরকার বহাল থাকল। ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক থেকে একটা তথ্য প্রকাশিত হলো, বাংলাদেশসহ চারটি নিম্ন আয়ের দেশ নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। খুশির খবর, এতে সন্দেহ নেই। আমাদের গণমাধ্যমে এটা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমরা একটা বড়সড় হার্ডল (বিপত্তি) পার হলাম। ভারতের সঙ্গে ক্রিকেটে জিতে আমরা বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছি। এর সঙ্গে আরেকটা সুসংবাদ যোগ হলো। নিঃসন্দেহে আমাদের ‘জাতীয়তাবাদ’ এতে নতুন মাত্রা পাবে।
বিশ্বসভায় গরিব-মিসকিনকে করুণার চোখে দেখা হয়। আমাদের নেতা-নেত্রীদের চালচলন মোগল বাদশাহর মতো হলেও পশ্চিমের দেশগুলোতে তাঁরা যখন যান, অনেক বলে-কয়ে, টাকাপয়সা খরচ করে গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। আমি নিজে দেখেছি, জাতিসংঘের বিভিন্ন শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়ে পশ্চিমের ক্ষমতাধর দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পেছনে গণমাধ্যমের কর্মীরা যেমন হুমড়ি খেয়ে পড়েন, স্বল্পোন্নত দেশের সরকারপ্রধান সম্মেলন হলের করিডর দিয়ে হেঁটে গেলে কেউ তাঁদের দিকে তাকায় না। এই অবস্থার পরিবর্তন হবে, যদি আমরা আমাদের অর্থনৈতিক ভিতটা আরও মজবুত করতে পারি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যদি আমরা ‘গ্রহীতা’র সনাতন বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।
জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৬৮ সালে অতিদরিদ্র দেশগুলোর একটা জোট তৈরি হয়েছিল। এদের বলা হয় ‘লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রি’ বা স্বল্পোন্নত দেশ। এদের মাথাপিছু আয় কম, অর্থনীতি ভঙ্গুর এবং জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত নিচু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের ‘নৈতিক দায়বদ্ধতা’ থেকে এসব অতিদরিদ্র দেশকে সহায়তা দেওয়ার জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
শুরুতে এই ‘মিসকিনদের ক্লাবে’র সদস্যসংখ্যা ছিল ২৪। এই সংখ্যাটি ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে একবার ৫০-এ গিয়ে ঠেকেছিল। স্বল্পোন্নত দেশের ‘মর্যাদা’ পাওয়ার অনেকগুলো শর্তের একটা ছিল, জনসংখ্যা হতে হবে ৭৫ মিলিয়ন বা সাড়ে সাত কোটির কম। বাংলাদেশ এই শর্ত পূরণ করেনি। বাংলাদেশ নিজ আগ্রহে ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের জোটে যোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিল। এই আবেদন গ্রাহ্য হয় এবং তখন থেকেই বাংলাদেশের কপালে ‘স্বল্পোন্নত’ তকমা আঠার মতো লেগে আছে। ব্যাপারটা মোটেও গৌরবের নয়।
ভিয়েতনাম যখন মার্কিন সেনাবাহিনীকে দেশ থেকে হটিয়ে দিয়েছিল, তখন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। এমনকি ১৯৯০ সালেও ভিয়েতনামের মাথাপিছু আয় ছিল ১৯০ ডলার। ভিয়েতনাম স্বল্পোন্নত দেশের জোটে কখনোই যোগ দেয়নি। দেশটির মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫২ ডলার। ষাটের দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে আমরা তুলনীয় ছিলাম। এখন ওই দেশে মাথাপিছু আয় ২৮ হাজার ডলার। তারা পারল, আমরা পারলাম না। কেন?
বর্তমান দশকে মাত্র দুটো দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে ‘গ্র্যাজুয়েশন’ পেয়েছে; ২০১১ সালের জানুয়ারিতে মালদ্বীপ এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র সামোয়া। মালদ্বীপের মাথাপিছু আয় ২০১১ সালে ছিল ৭ হাজার ৪১৩ ডলার; ২০১৪ সালে সামোয়ার মাথাপিছু আয় ছিল ৪ হাজার ১৭৩ ডলার।
জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষে–মানুষে এবং অঞ্চলে– অঞ্চলে বৈষম্য কমানোর কৌশলও ঠিক করতে হবে। এটাই এ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ একটা দেশের হাল-হকিকতের একমাত্র নির্ণায়ক নয়। স্বল্পোন্নত দেশের সীমান্ত পেরোতে হলে ন্যূনতম তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, দেশটির মাথাপিছু আয় হতে হবে ন্যূনতম ১ হাজার ৪৫ ডলার। আয়ের এই পরিমাণটা বছর বছর পরিবর্তিত হয়। দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদের বিচারে দেশটি হতে হবে সবল। মানবসম্পদ ইনডেক্স নির্ধারণ করা হয় স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা এবং বয়স্ক সাক্ষরতার কোন পর্যায়ে আছে দেশটি, তার ওপর। তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি কতটুকু তা বিবেচনা করা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা টেকসই হচ্ছে কি না, তা বিবেচনায় আনা।
জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নজরদারি করে তার নিজস্ব নিয়মে। তিন বছর পরপর এর পর্যালোচনা হয়। বাংলাদেশকে নিয়ে পর্যালোচনা হবে ২০১৮ সালে। ওই পরীক্ষায় টিকে গেলেও বাংলাদেশ নজরদারির মধ্যে থাকবে আরও তিন বছর। ২০২১ সালে যদি বাংলাদেশ পরীক্ষায় আবারও উতরে যায়, তাহলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তকমাটাও মুছে ফেলতে পারবে।
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব নম্বর ৬৮/এল অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সর্বশেষ যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, তাতে দেখা গেছে যে বিশ্বে স্বল্পোন্নত দেশ আছে ৪৮টি। এর মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশে ৩৪টি, এশিয়ায় ৯টি, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৪টি ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে একটি। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, পূর্ব তিমুর, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল ও ইয়েমেন। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন (২০১৪) অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ৯২ কোটি এবং মাথাপিছু গড় আয় ৯২৮ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ের চেয়ে একটু বেশি। কিন্তু খুব বেশি নয়। মিয়ানমারের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশ থেকে বেশি। ভুটানের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণ। পূর্ব তিমুর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ও আমাদের চেয়ে বেশি। কিন্তু ওই দেশগুলো এখনো স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে রয়ে গেছে অন্যান্য সূচকে পেছনে পড়ে থাকার কারণে। সুতরাং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সূচকে উত্তীর্ণ হওয়ার লড়াইটা আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে।
আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবকেরা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন, ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছে যাব। ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। মা-বাবা ঘোষণা দিয়ে দিলেন, অমুক সালে আমার সন্তান এমএ পাস করবে। বিষয়টি অনেকটা সে রকমেরই। উন্নত (ডেভেলপড) দেশগুলোর মাথাপিছু গড় আয় ২০১১ সালে ছিল ৩৪ হাজার ১০০ ডলার। ২০১৬ সালে এটা সাড়ে ৪৬ হাজার ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুতরাং লক্ষ্যটা জানাই আছে, যেতে হবে কত দূর। এ নিয়ে এই মুহূর্তে কথার ফুলঝুরি না ছড়ানোই ভালো!
মাথাপিছু আয়ের মধ্যে অনেক ফাঁকি থেকে যায়। কথিত বিলিয়নিয়ার মুসা বিন শমসের আর আমার আয় যোগ করে দুই দিয়ে ভাগ করলে আমি হব বিলিয়নিয়ার। অথচ আমি কপর্দকশূন্য। দেশের মোট জাতীয় আয় এবং সেই সঙ্গে মাথাপিছু আয় বাড়লেই সব মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ে না। দেশে একজন কোটিপতি তৈরি হলে, তাঁর জন্য এক হাজার মানুষকে গরিব হয়ে যেতে হয়। অর্থনীতির এটাই নিয়ম। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাগরে ভাসমান অভিবাসন-প্রত্যাশী মানুষের আহাজারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দারিদ্র্য কত প্রকট, কর্মসংস্থানের কী দুরবস্থা! মানুষ কতটা বেপরোয়া হলে এ রকম ঝুঁকি নেয়।
দেশজ উৎপাদন এবং জাতীয় আয়ের হিসাবে নানা রকম ফাঁকফোকর আছে। যে আয় দেখানো হয়, তা ভাগ করে দিলেই সবার পকেটে তা পৌঁছায় না। জাতীয় আয়ের হিসাবটা হয় অন্যভাবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্বাস্থ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের অবস্থা বোঝা যায় না। একদিকে দেশজ উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। শহরে বড় বড় শপিংমল গড়ে উঠেছে। আবার জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উল্লম্ফনের খবর শুনে আহ্লাদিত হওয়ার অবকাশ নেই। আত্ম-অনুসন্ধান করারও প্রয়োজন আছে।
এই মুহূর্তে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষে–মানুষে এবং অঞ্চলে–অঞ্চলে বৈষম্য কমানোর কৌশলও ঠিক করতে হবে। এটাই এ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ। কোনো অযুত-নিযুত নাগরিক কমিটির ব্যানারে সরকারপ্রধানের জন্য আরেকটা ‘নাগরিক সংবর্ধনা’ আয়োজনের দরকার নেই।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক-গবেষক।
mohi2005@gmail.com